বাংলাদেশ সরকারের বিদ্রোহ ও জনগণের দায়ভার

বিদ্রোহ শুধু প্রজারাই করে না। গুরুতর বিদ্রোহ হতে পারে খোদ সরকারের পক্ষ থেকেও। সেটি যেমন হতে পারে জনগণের সাথে কৃত ওয়াদার বিরুদ্ধে, তেমনি হতে পারে সর্বময় ক্ষমতার মালিক মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধেও। বাংলাদেশ সরকারের দ্বারা এমন বিদ্রোহ হচ্ছে বস্তুত উভয় ক্ষেত্রেই। এবং সেটি কিভাবে এবং কতটা গুরুতর ভাবে হচ্ছে সেটিই এ প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয়। আদালতের রায়, দেশের আইন বা শাসনতন্ত্রের বিরুদ্ধে কেউ বিদ্রোহ করলে বা “মানবো না বললে” তার বিরুদ্ধে তৎক্ষনাৎ পুলিশ ও গোয়েন্দা ছুটে আসে। গ্রেফতার করে তাকে আদালতে দাঁড় করায়। আদালত তাকে শাস্তি দিয়ে জেলে পাঠানো। বিদ্রোহটি গুরুতর হলে অপরাধীকে ফাঁসীতে ঝুলিয়ে বা গুলি করে হত্যা করা হয়। বিশ্বের কোন দেশের সরকারই বিদ্রোহীদের প্রতি সদয় নয়। কারণ, সেটি হলে রাষ্ট্র টেকে না। তাই বিদ্রোহ দমনে পুলিশ ব্যর্থ হলে সেনাবাহিনী তলব করা হয়। এটাই বিশ্বের সকল রাষ্ট্রের নীতি। তেমনি এক গুরুতর অপরাধ হল আল্লাহ ও তাঁর আইনের বিরুদ্ধে অবাধ্যতা বা বিদ্রোহ। আল্লাহর বিরুদ্ধে এরূপ বিদ্রোহের শাস্তিও অতি কঠোর। মহান আল্লাহ শুধু নামায-রোযা, হজ-যাকাতের বিধানই দেননি, সুস্পষ্ট বিধান দিয়েছেন সম্পদের বন্ঠন, চুরি-ডাকাতি, জ্বিনা ও খুনের ন্যায়ের নানাবিধ অপরাধের শাস্তির। সে বিধান পবিত্র কোরআনে সুস্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ। ইসলামে এটিই হল শরিয়ত।

দেশে রাস্তাঘাট, কলকারখানা, স্কুল-কলেজ বা হাসপাতাল কোথায় নির্মিত হবে তা নিয়ে দেশবাসী মাসের পর মাস বা বছরের পর বছর বিতর্ক করতে পারে। পবিত্র কোরআনে যে সব বিষয়ে কিছু বলা হয়নি বা নির্দেশ আসেনি, মানুষের অধিকার রয়েছে তা নিয়ে বিষদ বিশ্লেষণের। কিন্তু যে বিধান বা আইন পবিত্র কোরআনে বলে দেয়া হয়েছে সেক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র বিতর্কের সুযোগ নেই। তখন ঈমানদারের দায়িত্ব হয়,“সামি’না ওয়া তায়ানা” অর্থঃ ‘শুনলাম ও মেনে নিলাম’ বলা। আল্লাহর আইন বা হুকুমের গুাণাগুণ নিয়ে বিতর্কের অর্থই হল, আল্লাহর জ্ঞান ও বিচার শক্তি নিয়ে সন্দেহ। সে আইন না মানার অর্থ হল আল্লাহর আইনের বিরুদ্ধে অনাস্থা ও বিদ্রোহ। মুসলিম রাষ্ট্রে এমন বিদ্রোহীর বিরুদ্ধে বিচার এবং বিচার শেষে শাস্তি প্রয়োগ করা সরকারের অন্যতম দায়িত্ব। মুসলিম দেশের সরকারের উপর এটিই সবচেয়ে বড় আমানত। সে দায়িত্বপালনে অসমর্থ হলে বৈধতা হারায় সরকার। সরকারের বৈধতা নিছক নির্বাচনী বিজয়ের মধ্যে নয়, বরং সেটি হল পবিত্র আমানতের দায়ভার বহনের সামর্থ। নির্বাচনী বিজয় তো অর্থব্যয় ও ধোকাবাজীতেও সম্ভব। খেয়ানতকারী যত জনপ্রিয়ই হোক তাকে দেশ শাসনের অব্যাহত অধিকার দিলে দেশ বিপন্ন হতে বাধ্য। লিন্দুপ দর্জির ন্যায় যারা সিকিমকে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিল তারাও এক সময় জনপ্রিয় ছিল, নির্বাচনে জয়ীও হয়েছিল। বাংলাদেশকে যিনি ২৫ সালা দাসচুক্তির মাধ্যমে ভারতের হাতে তুলেছিলেন ও গণতন্ত্রকে কবরে পাঠিয়েছিলেন তিনিও বিপুল ভোটে নির্বাচনে জিতেছিলেন। জনগণের বিরুদ্ধে নির্বাচিত সরকারের বিদ্রোহ ও গাদ্দারী যে কতটা জঘন্য হতে পারে এ হল তার নজির। তারা একই ভাবে বিদ্রোহী হতে পারে মহান আল্লাহর স্বার্বভৌমত্ব ও তাঁর আইনের বিরুদ্ধে। আল্লাহর আইনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ নবীজী (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামের আমলেও হয়েছে। তবে তার শাস্তিও হয়েছে। হযরত আবু বকর (রাঃ)য়ের আমলে কিছু লোক যাকাত দিতে অস্বীকার করেছিল। সে অপরাধে তাদের প্রাণদন্ড দেয়া হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশের সরকার আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের কি শাস্তি দিবে? তারা নিজেরাই তো বিদ্রোহী। কাফের হওয়ার অর্থ শুধু মুর্তিপুজা নয়। বরং সেটি আল্লাহর আইনের বিরুদ্ধে যে কোন বিদ্রোহ। পবিত্র কোরআনে যেমন বলা হয়েছে, “আল্লাহ যে বিধান অবতীর্ণ করেছেন সে অনুযায়ী যারা ফায়সালা করে না তারা কাফের।” -সুরা মায়েদা, আয়াত ৪৪।

প্রজারূপে যেমন প্রতিটি মুসলমানের কিছু দায়-দায়িত্ব থাকে, তেমনি গুরুতর দায়িত্ব পালন করতে হয় শাসক রূপেও। এসব ক্ষেত্রে সামান্যতম অবাধ্যতা বা বিদ্রোহ চলে না। মুসলমান হওয়ার অর্থ সর্বাবস্থায় মুসলমান হওয়া। প্রজারূপে যেমন, তেমনি সরকার-প্রধান রূপেও। অথচ এখানেই বাংলাদেশ সরকারের মূল সমস্যা। তারা নিজেদের মুসলমান রূপে দাবী করে। নির্বাচন কালে কোরআন ও সূন্নাহর বিরুদ্ধে কোন রূপ আইন প্রণয়ন হবে না সে ওয়াদাও করে। কিন্তু বাস্তবে করে উল্টোটি। নিজ ওয়াদার বিরুদ্ধে তারা নিজেরাই বিদ্রোহ করে। আল্লাহর বিধানের প্রতি বাংলাদেশ সরকারের যে সামান্যতম শ্রদ্ধাবোধ নাই, এবং সে আইন মানতেও যে তারা রাজী নয় -সম্প্রতি সেটিই আবার প্রকান্ড ভাবে প্রকাশ পেল। এবং সেটি গত ৭ই ফেব্রেয়ারী সরকারের মন্ত্রীসভায় গৃহীত সিদ্ধান্তে। সরকার ‘নারী উন্নয়ন নীতিমালা ২০১১’ নামে গৃহীত সিদ্ধান্তটি হল, মৃত পিতার রেখে যাওয়া সম্পদে তার পুত্র ও কন্যারা সমান অধিকার পাবে। সরকারের ও ঘোষণাকে আল্লাহর আইনের প্রতি আত্মসমর্পন বলা যায় না, বরং সেটি সুস্পষ্ট বিদ্রোহ। পিতার মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়ার সম্পত্তির কে কতটা পাবে তা নিয়ে ইসলামে কোন অস্পষ্টতা নেই। কোরআনে নামাযের বিধান এসেছে। কিন্তু কোন ওয়াক্তে কত রাকাত নামায পড়তে হবে, রুকু সিজদা কতবার হবে, কখন কি পাঠ করতে হবে -সে বিষয়ে পবিত্র কোরআনে কোন ঘোষণা নেই। সে খুঁটিনাটি বিষয়গুলো শিখতে হয় নবীজী(সাঃ)র সূন্নত থেকে। ইসলামে পবিত্র কোরআনের পাশাপাশি হাদীসের গুরুত্ব তাই অপরিসীম। কিন্তু পিতার মৃত্যুর পর তার সম্পদ কীভাবে বন্টন করতে হবে সে বিষয়টি তিনি নবীজীর উপর ছেড়ে দেননি। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা সেটি স্বয়ং অতি বিস্তারিত ভাবে জানিয়ে দিয়েছেন। সেটি হল,“আল্লাহ তোমাদের সন্তান সম্বন্ধে নির্দেশ দিচ্ছেনঃ এক পুত্রের অংশ দুই কন্যার সমান। …..এ হল আল্লাহর নির্ধারিত সীমা (হুদুদুল্লাহ)। কেহ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করলে আল্লাহ তাঁকে জান্নাতে দাখিল করবেন। যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত; সেখানে তাঁরা স্থায়ী হবে এবং এটি মহা সাফল্য। আর যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্য হল এবং তার নির্ধারিত সীমা লংঘন করল, তিনি তাকে আগুণে নিক্ষেপ করবেন। সেখানে সে স্থায়ী হবে এবং তার জন্য লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি রয়েছে।”-(সুরা নীসা ১১-১৪)। বাংলাদেশ সরকারের অপরাধ, করুণাময় মহান আল্লাহতায়ালার কাছে আত্মসমর্পণের বদলে তারা তাঁর বিধানকেই অবিচারমূলক রূপে রহিত করল।

হুদুদুল্লাহ ইসলামের একটি বিশেষ পরিভাষা। হুদুদ শব্দটির অর্থ সীমানা। আল্লাহতায়ালা ঈমানদারদের জন্য সিদ্ধ-অসিদ্ধ, হারাম-হালালের একটি সুর্নিদ্দিষ্ট সীমানা নির্ধারন করে দিয়েছেন। মুসলমান হওয়ার অর্থ হল, নির্ধারিত সে সীমানার মধ্যে অবস্থান করা। সে সীমানার বাইরে যাওয়ার অর্থ ইসলাম থেকে বের হয়ে যাওয়া। এবং সে সীমানা থেকে বের হয়ে যাওয়ার শাস্তি হল জাহান্নাম। ফলে মুসলমানগণ যেখানে ঘর বাঁধে সেখানে শুধু মসজিদ গড়ে না, সেখানে ইসলামের হুদুদ আইনের প্রতিষ্ঠাও করে। কারণ সেটি না হলে মুসলমান হওয়ার মধ্যে প্রচন্ড অসম্পূর্ণতা থেকে যায়। শূণ্যতা থেকে যায় ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্রের। তাই সমগ্র ইতিহাসে এমন কোন মুসলিম রাষ্ট্র পাওয়া যাবে না যেখানে আল্লাহর হুদুদ প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। সেটি যেমন খোলাফায়ে রাশেদার আমলে হয়েছে, তেমনি আব্বাসীয়, উমাইয়া ও উসমানিয়া খলিফাদের আমলেও হয়েছে। সেটির পূর্ণ প্রতিষ্ঠা ছিল ভারতে মুসলিম শাসন আমলেও। ব্রিটিশ শাসনের প্রতিষ্ঠার পূর্বে বাঙলাতেও হুদুদ আইন তথা শরিয়তি আইনই ছিল দেশের আইন। কোন মুসলমানের পক্ষে যেমন নামায-রোযা পরিত্যাগ করা অভাবনীয়, তেমনি অভাবনীয় হল শরিয়তের বিধানকে পরিত্যাগ করা। অথচ বাংলাদেশ সরকার আল্লাহর সে হুদুদ আইনের প্রয়োগের বিরোধী। উপমহাদেশে শরিয়তী হুদুদ আইন কোন মুসলমানের হাতে বিলুপ্ত হয়নি, হয়েছিল ব্রিটিশদের হাতে। ব্রিটিশ শাসনের অবসান হয়েছে, কিন্তু অবসান হয়নি তাদের সেকুলার খলিফাদের শাসন। ফলে প্রতিষ্ঠা পায়নি ইসলামের শরিয়তী আইন। আওয়ামী লীগ সরকারের যুক্তি, সম্পদের বন্টনে ইসলামের যে হুদুদ আইন তাতে নারী-পুরুষের বৈষম্য রয়েছে।তারা চায় সে অসমতা ও বৈষম্য দূর করতে।

এটা ঠিক, সম্পদের বন্ঠনে ইসলামে নারী পুরষের মাঝে বৈষম্য রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, এরূপ অসমতা কি অবিচার? এবং সর্বক্ষেত্রে সমতা কি সুবিচার? সমতা যে কোন কোন ক্ষেত্রে চরম অবিচার ও জুলুমবাজীতে পরিনত হয় সে হুশ কি বাংলাদেশ সরকারের আছে? নারীপুরষের শরীরের গঠন, শক্তি, সৌন্দর্য ও সামর্থে রয়েছে সুস্পষ্ট অসমতা। সে অসমতা দূর করা কি আদৌ সম্ভব? পুরুষের পক্ষে কি সম্ভব সন্তান ধারণ? তার পক্ষে কি সম্ভব মায়ের ন্যায় সন্তানকে বুকের দুধদান, সেবাদান ও লালন পালন? তার পক্ষে কি সম্ভব একাকী চাষাবাদ করা? সম্ভব কি রণাঙ্গণে রাতের পর রাতে পুরুষের পাশাপাশি যুদ্ধ করা? নিভৃত রণাঙ্গনে কে দিবে তাকে নিরাপত্তা? সম্পদের প্রয়োজনও তো সবার সমান নয়। তাই সম্পদের বন্টনে সমতার চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হল কার কতটা প্রয়োজন সেদিকে নজর দেয়া। আর সেটি মহান আল্লাহতায়ালার চেয়ে আর কে বুঝে? অথচ ইসলামে অঙ্গিকারশূণ্য আওয়ামী লীগের নেতাগণ সেটি মানতে রাজী নয়।

ইসলাম নারীকে পুরুষের প্রতিদ্বন্দী রূপে দেখে না, এবং ভাই প্রতিদ্বন্দী নয় বোনের। নারী-পুরুষ, স্বামী-স্ত্রী, ভাই-বোন সবাইকে ইসলামি সমাজ নির্মানে বিশাল দায়ভার কাঁধে তুলে নিতে হয়। সে দায়ভার পালনে প্রতিটি মুসলমান হল মহান আল্লাহর খলিফা। তবে ইসলাম সে দায়ভারটি নারী-পুরুষের উপর সমান ভাবে বন্টন করে না। উভয়কে একই রণাঙ্গনে ও একই বাংকারেও হাজির করে না। উভয়ের লড়াইয়ের ক্ষেত্রের ন্যায় দায়ভারও ভিন্ন। তাই অসমান হল তাদের প্রয়োজনটিও। এক্ষেত্রে সুবিচারটি জরুরী, সমতা নয়। পরিবারীক ও সামাজিক শান্তির স্থাপনে বড় প্রয়োজনটি হল মূলত এই সুবিচার, এ ক্ষেত্রে অবিচার হলে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রজুড়ে জন্ম নেয় মহা অশান্তি। অশান্তির সে আগুণ থেকে পরিবারের কেউই রক্ষা পায়না। তাই পরিবারকে বিধ্বস্ত করার মধ্যে কারোই কোন কল্যাণ নেই। কিন্তু সে সুবিচার পরিবারে কীরূপে সম্ভব? সুবিচারের সে সামর্থ কি মানুষের আছে? ইসলামের পূর্বে তো নারীকে ভোগ্য পণের ন্যায় আরেক পণ্য গণ্য করা হত। হিন্দুরা তো সদ্য-বিধবাদের তাদের মৃত স্বামীর সাথে পুড়িয়ে মারতো। পরিবারে একত্রে কাজ করে শুধু স্বামী-স্ত্রী ও তাদের সন্তানেরা নয়, ভাই-বোনও। তাই ভাই-বোনকে একে অপরের প্রতিদ্বন্দিরূপে খাড়া করার মধ্যে কোন কল্যাণ নেই। ভাই তার স্ত্রীকে আনে ভিন্ন এক পরিবার থেকে। আর সে তার বোনকে স্ত্রীরূপে তুলে দেয় অন্য এক পরিবারের পুরুষের হাতে। বোন তার পিতার সম্পদের যে হিস্যা নিয়ে স্বামীর ঘরে যায়, সমপরিমান হিস্যা নিয়ে আসে তার স্ত্রীও। ইনসাফ কাজ করছে এখানেও। মুসলিম সমাজে সমস্যা অনেক। তবে বিগত ১৪ শত বছর ধরে মুসলিম সমাজে মৃত পিতার সম্পদের বন্টন নিয়ে কোন সমস্যা দেখা দেয়নি। অথচ আজ সেটিই আওয়ামী সরকারের কাছে বড় সমস্যা রূপে দেখা দিয়েছে। সে সমস্যার সমাধানে তারা আল্লাহর আইনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঝান্ডা উড়ানোটি জরুরী মনে করছে। ইসলামের শত্রুপক্ষ চায়, এভাবে যুদ্ধ শুরু হোক মুসলমানদের ঘরে ঘরে। এ যুদ্ধ তীব্রতর হলে মুসলমানরা তখন আর বিদেশী শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ফুরসতই পাবে না। আওয়ামী লীগ সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে হত্যা, সন্ত্রাস, ধর্ষণ, দূর্নীতি, চুরি-ডাকাতি, পানি-গ্যাস-বিদ্যুতের সমস্যা, সীমান্তে বাংলাদেশী হত্যা ও নারি অপহরনের ন্যায় গুরুতর সমস্যার সমাধানে। কিন্তু সে ব্যর্থতার মাঝে যুদ্ধের নতুন ফ্রন্ট খুলেছে ইসলামের বিরুদ্ধে। তাদের প্রত্যাশা, এতে বিপুল অর্থ ও রাজনৈতিক সর্মথন মিলবে ইসলাম বিরোধী আন্তর্জাতিক কোয়ালিশন থেকে এবং বিরোধীদের চিত্রিত করা যাবে ইসলামী মৌলবাদী রূপে।

সেক্যিউলারদের বড় অপরাধ যেমন আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, তেমনি তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক বড় ব্যর্থতাটি হল সম্পদের বন্টনে ভাই ও বোনের মাঝে যে অসমতা সেটির পিছনে যে মূল দর্শন সেটি বুঝতে না পারায়। যুদ্ধের ময়দানে সকল সৈনিকের সমান দায়িত্ব থাকে না। কেউবা লড়ে সম্মুখ ভাগে, কেউবা পশ্চাতে। কেউবা লড়াই করে ট্যাংক নিয়ে, কেউবা বন্দুক হাতে। কেউ বা পিছনে থেকে রশদ জোগায়। দায়িত্ব ও অবস্থান অনুযায়ী তাদের অস্ত্র ও সাজসজ্জাও ভিন্ন। কারো ভূমিকাকে এখানে খাটো করে দেখা যায় না। তেমনি অবস্থা সংসার জীবনেও। এখানেও নারী ও পুরুষের সামর্থ অনুযায়ী তাদের দায়িত্বের সাথে প্রয়োজনটাও ভিন্ন। দায়িত্ববন্টন ও সম্পদ বন্টনে তাই সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকাটি জরুরী। ইসলাম তো সে নীতিমালাটাই দেয়। নইলে বিশৃঙ্খলা অনিবার্য। যেখানেই সম-অধিকারের নামে সে শৃঙ্খলাকে ভাঙ্গার চেষ্টা হয়েছে সেখানেই নেমে এসেছে বিপর্যয়। এর উদাহরণ হল পাশ্চাতের পরিবার। পাশ্চাত্য দেশগুলিতে তালাকের পর পরিবারের সম্পদের সমান ভাবে ভাগাভাগীর বিধান চালু করা হয়েছে। ফল দাড়িয়েছে এই, অধিকাংশ পুরুষ আর বিয়ে করতেই রাজী হচ্ছে না। কারণ তাদের ভয়, বিয়ে ভাঙ্গলে তাদের দিন-রাতের কষ্টার্জিত সম্পদ, গৃহ, গাড়ী –সবকিছুর অর্ধেক তার তালাক প্রাপ্ত স্ত্রীকে দিতে হবে। পাশ্চাতে তো অর্ধেকের বেশী বিয়েই ভেঙ্গে যায়। ফল দাঁড়িয়েছে এই, নারী হারাচ্ছে কোন একজন পুরুষের সারা জীবনের জীবনসঙ্গি হওয়ার সুযোগ। ফলে তাকে কাটাতে হচ্ছে পুরুষের গার্ল ফ্রেন্ড বা কর্লগার্ল রূপে। জুটছে না স্ত্রীর মর্যাদা। আর্থিক নিরাপত্তার অভাবে হাজার হাজার মহিলা শামিল হচ্ছে পতিতাবৃত্তিতে। ফলে নারী হচ্ছে আরো অসহায়। পরিণত হচ্ছে ভোগ্যপণ্যে। স্ত্রী হিসাবে আজীবন সে ভালবাসা তার হাতের নাগালে ছিল এখন সেটি কল্পনার সামগ্রী। সমতার নামে নারীদের উপর এত দায়িত্ব চাপানো হয়েছে যে তার পক্ষে গর্ভধারণ ও সন্তান প্রতিপালনের দায়িত্বটি এখন অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ নারীর সবচেয়ে আপনজন হল তার সন্তানেরা। ইসলামে মায়ের সন্মান পিতার চেয়ে বেশী। বলা হয়েছে মায়ের পায়ের নীচে সন্তানের জান্নাত। তবে সন্মান সব সময়ই অর্জনের বিষয়, অর্জন করতে হয় সময়, শ্রম, ভালবাসা ও আবেগ বিণিয়োগ করে। যে মা বেশীর ভাগ সময় কাটায় ঘরের বাইরে এবং সন্তান পালনে যার হাতে কোন সময়ই থাকে না, তার পক্ষে কি সন্তানের সাথে ঘনিষ্ট হওয়ার সময় থাকে? ফলে সম-অধিকারের নামে পাশ্চাত্য সমাজ নারীকে শুধু তার স্বামী থেকেই দূরে সরিয়ে নেয়নি, দূরে সরিয়েছে তার সন্তান থেকেও। ফল নারী হয়েছে আপনজন হারা।  

 

নারী-পুরুষ উভয়ই মহান আল্লাহর সৃষ্টি। আর নিজ-সৃষ্টির প্রতি সুবিচার স্রষ্ঠার চেয়ে আর কে বেশী করতে পারে? তাছাড়া সম্পদই জীবনের সবকিছু নয়। সম্পদ থাকলেই কি নারীর পক্ষে একাকী সুখশান্তি অর্জন সম্ভব? কোটি কোটি টাকার মালিক হলেও তার পক্ষে কি সম্ভব হয় দূর গ্রামের কোন এক নির্ভত কোণে একাকী ঘর বেঁধে বসবাস করা? এমনটি মানব সমাজে কোন কালেও ঘটেনি। ইসলামে নারীকে একাকী হজে যাওয়ার অনুমতি দেয় না। একাকী সফরে বেরুনোর অনুমতি নেই। অনুমতি নেই একাকী হাটেবাজারে যাওয়ার। এ্টি তার নিরাপত্তার বিষয়। গৃহে ডাকাত পড়লে কোন সুস্থ্য ব্যক্তিই তার স্ত্রী বা কন্যাকে ডাকাতের মোকাবেলায় পাঠায় না। সে বরং নিজের জীবন বাজী রেখে মোকাবেলায় নামে। দেশে যুদ্ধ শুরু হলে শত্রুর মোকাবেলার মূল দায়িত্বটাও পুরুষের। পুরুষ যেমন বন-জঙ্গল, মাঠ-ঘাট, পাহাড়-পর্বত, সমূদ্র একাকী অতিক্রম করতে পারে সেটি কি কোন মহিলা পারে? এসব ক্ষেত্রে সমতাটা কোথায়?

শান্তি প্রতিষ্ঠাই ইসলামের মুল মিশন। সে শান্তি যেমন প্রতিটি নারীর, তেমনি প্রতিটি পুরুষের? কিন্তু কীরূপে সে শান্তি সম্ভব? বোনকে ভাইয়ের এবং নারীকে পুরুষের প্রতিদ্বন্দি রূপে খাড়া করায় যে কতটা বিপর্যয় আনে তার উদাহরণ পাশ্চাত্যের দেশগুলি। সারা জীবন নারীকে অফিসে বা কারখানায় খাটতে হয়, নিজের দায়ভার নিজেকেই নিতে হয়। বৃদ্ধ-কালে তার পাশে দাঁড়ানোর কেউ থাকে না। নিজ খরচে বা রাষ্ট্রের খরচে তাকে নার্সিং হোমে বা কেয়ার হোমে গিয়ে আশ্রয় নিতে হয়। অথচ মুসলিম সমাজে নারী অর্থশূণ্য হলেও তার পাশে বিপদের দিনে দাঁড়ানোর লোক থাকে। তার পাশে দাঁড়ায় সমগ্র পরিবার। জন্ম থেকে বিবাহ অবধি যেমন তার পিতামাতা ও ভাইবোন, তেমনি বিবাহের পর তার স্বামী ও সন্তানেরা। বিবাহ ভেঙ্গে গেলে আবার তার পিতা ও ভাইয়েরা সহায় হয়। নতুন করে আবার বিবাহেরও ব্যবস্থা হয়। পরিবার ও সমাজ এভাবে অসহায়ের পিছনে যে রূপ দায়িত্ব পালন করে সেটি কি নিছক অর্থ দিয়ে সম্ভব? পাশ্চাত্যে পরিবার প্রথা বিপর্যস্ত হওয়ায় নারীপুরুষকে বৃদ্ধকালে আশ্রয় নিতে হয় কেয়ার হোমে যা অতি ব্যয়বহুল। ব্রিটিশ সরকার প্রতি বছর শত শত কোটি পাউন্ড খরচ করছে এসব অহায় বৃদ্ধ নারী-পুরুষদের পিছনে। কিন্তু অর্থনৈতিক সংকটের কারণে এখন প্রচন্ড হিমশিম খাচ্ছে। ব্রিটিশ সরকারের বাজেটের খরচের অন্যতম বড় খাত হল এটি। কথা হল ব্রিটেনের মত একটি শিল্পোন্নত সম্পদশালী দেশেরই যেখানে এ অবস্থা সেখানে বাংলাদেশের মত দেশে সরকার কি সে দায়িত্ব নিতে পারে? অথচ নারীর নিরাপত্তা বাড়াতে ইসলাম একদিকে যেমন তাকে পিতামাতার সম্পদের অংশীদার বানিয়েছে, তেমনি অংশীদার বানিয়েছে তার স্বামী ও সন্তানের সম্পদের। ইসলাম এক্ষেত্রে অনন্য। আর কোন ধর্মে নারীর এরূপ অধিকার নেই। মুসলিম পরিবারে নারীর নিরাপত্তা-জালটি সুবিস্তৃত। কিন্তু বাংলাদেশের সরকারের আইন সে নিরাপত্তা বিধ্বস্ত করতে চায়। ভাই ও বোনকে পরস্পরেরর চিরপ্রতিদ্বন্দি রূপে খাড়া করতে চায়।

মুসলমান রূপে ব্যক্তির মূল দায়িত্বটা হল, আল্লাহর হুকুমের পূর্ণ আনুগত্য। আল্লাহর আইনে যদি নারীর জন্য পুরুষের চেয়ে দ্বিগুণ সম্পত্তি দেয়ার কথা থাকতো তখনও তার দায়িত্ব হত সে বিধানের প্রতি আনুগত্য। আল্লাহর কোন হুকুমের মধ্যে অবিচার বা অকল্যাণ খোঁজাটাই হারাম। এটা কাফেরের সাজে, কোন মুসলমানের নয়। আল্লাহর প্রতিটি বিধানের লক্ষ্য তো মানুষের জীবনকে সুখময় করা। অকল্যাণ তো শয়তানের কাজ। পবিত্র কোরআনের ঘোষণা, “ওয়া মাল্লাহু ইউরিদু জুলমান লিল আলামীন” সুরা আল ইমরান, আয়াত ১০৮। অর্থঃ আল্লাহর কাজ এ নয় যে তিনি জগৎবাসীর জন্য কোন জুলুম চাইবেন। তাই ইসলাম কবুলের সাথে সাথে প্রতিটি ঈমানদার নরনারীর কাজ হয়, আল্লাহর বিধানের পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করা। মোমেনের এ ভূমিকাই তাকে মহান আল্লাহর আনসার রূপে গণ্য হওয়ার ইজ্জত দিয়েছে। ক্ষ্রদ্র মানবসৃষ্টির জন্য এর চেয়ে বড় সম্মান আর কি হতে পারে? অথচ বাংলাদেশ সরকার সুস্পষ্ট ভাবে আল্লাহর প্রতিপক্ষ বা শত্রু রূপে  দাঁড়িয়েছে। কথা হল, এ অবস্থায় একজন মুসলমানের দায়িত্বটা কি? সে কি আল্লাহর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া এক বিদ্রোহী সরকার বা দলের পক্ষ নিবে? আরো কথা হল, আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ কি কখনই নিজেদেরকে ইসলামের পক্ষের শক্তি রূপে দাবী করেছে? ইসলামের পক্ষ নেয়াটিকে সব সময়ই মৌলবাদী বলে গালীগালাজ করে আসছে। জিহাদ যেখানে মোমেনের সর্বোচ্চ ইবাদত রূপে আখ্যায়ীত করেছে, সেখানে জিহাদের উপর লিখিত কোন বই ঘরে বা অফিসে রাখাটি ফৌজদারি অপরাধ রূপে চিত্রিত হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারেরর পুলিশ ও র‌্যাব বাহিনী ঘরে ঘরে ঢুকে এরূপ বই বাজেয়াপ্ত করছে এবং গ্রেফতার করছে গৃহকর্তাকে।  এমন এক সরকারের কাছে মহান আল্লাহর শরিয়তী বিধান অগ্রহণযোগ্য ও বর্জনীয় হবে সেটাই কি স্বাভাবিক নয়?

একজন মুসলমানকে শুধু আল্লাহর অস্তিত্বের উপর বিশ্বাস করলে চলে না, মহান আল্লাহকে রাষ্ট্রের সার্বভৌম আইনদাতা রূপেও মেনে নিতে হয়। আল্লাহকে সার্বভৌম মানার অর্থ, তাঁর আইনকে অলংঘনীয় রূপে মেনে নেয়া।  অথচ বাংলাদেশের শাসনতন্ত্রে সে সত্যটি স্বীকৃতি পায়নি। বরং এর মূল ভিত্তিটি আল্লাহর অবাধ্যতা ও বিদ্রোহের উপর। বাংলাদেশ একটি মুসলিম দেশ। একজন মুসলমান যেমন তার নাম, ধর্ম-কর্ম, খাদ্য, পোষাক-পরিচ্ছদ, আচরণ ও রুচীতে একজন কাফের থেকে ভিন্ন, তেমনি মুসলিম রাষ্ট্র ভিন্ন কাফের অধ্যুষিত দেশ থেকে। নবীজীর আমলে পৃথিবীতে শতাধিক রাষ্ট্র ছিল। কিন্তু সেসব রাষ্ট্র থেকে নবীজী (সাঃ) ও তাঁর পর সাহাবায়ে কেরামের রাষ্ট্রটি ভিন্ন চরিত্রের ছিল।  মুসলিম রাষ্ট্রের শাসক যেমন স্বৈরাচারি হতে পারে না, তেমনি সে রাষ্ট্রের আইন-আদালত, সংস্কৃতি, শিক্ষানীতিও আল্লাহর অবাধ্যতা ও বিদ্রোহের উপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। মুসলমান রূপে বাংলাদেশীদের বড় দায়িত্বটি শুধু নবীজীর (সাঃ) ন্যায় নামায-রোযা, হজ-যাকাত পালন নয়, বরং মদীনায় ১০টি বছর ধরে রাষ্ট্র পরিচালনার যে সূন্নতটি তিনি রেখে গেছেন সেটির  অনুকরণে রাষ্ট্র নির্মানও।  নইলে অসম্ভব হবে মুসলমান রূপে বেড়ে উঠা এবং আল্লাহর দরবারে নবীজী (সাঃ)র উম্মত রূপে পরিচয় দেয়া।

 

শেখ হাসিনা ও তাঁর দলের নেতাদের নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্বাস আছে। সে বিশ্বাসগুলো প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সুস্পষ্ট রাজনৈতিক কৌশলও আছে। তাদের সে রাজনৈতিক বিশ্বাসটি মূলত শরিয়তের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের উপর প্রতিষ্ঠিত। তারা বিশ্বাস করে বাঙালী জাতীয়তাবাদ ও সেক্যিউলারিজমে। সেক্যিউলারিজমের মূল কথা, কোন ধর্মীয় আইনকে রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত না করা। মহান আল্লাহর সে আইনকে তারা কোরআনের মধ্যে বন্দী দেখতে চায়। আল্লাহ ও তাঁর শরিয়তের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের এ যুদ্ধটি তাই কোন লুকানো বিষয় নয়। এটিই তাদের রাজনীতির বহু ঘোষিত মূল এজেন্ডা। সেটি বাস্তবায়নের লক্ষেই তারা লাগাতর কাজ করছে। এক্ষেত্রে তারা আন্তর্জাতিক ইসলাম বিরোধী কোয়ালিশনের পার্টনার। তারা পার্টনার ভারত সরকারের। তাদের পার্টনারদের ন্যায় তাদেরও আনন্দ আল্লাহর হুদুদ আইনের বিলুপ্তি দেখার মধ্যে। কিন্তু প্রশ্ন হল, বাংলাদেশের ১৫ কোটি মুসলমান কি আল্লাহর বিধানের এ পরাজয়কে মেনে নিবে? আর সেটি মেনে নিলে তারা আল্লাহর দরবারে কি জবাবটি দিবে? নবীজী (সাঃ)র আমলে এমন কোন সাহাবীও কি ছিলেন যিনি আল্লাহর বিধানকে বিজয়ী করার জন্য জানমালের কোরবানী পেশ করেননি। কিন্তু প্রশ্ন হল, এক্ষেত্রে বাংলাদেশের মুসলমানদের কোরবানীটি কি? দেশ অধিকৃত আজ ইসলামের বিপক্ষ শক্তির হাতে। তারা সে অধিকার জমিয়েছে জনগণের ভোটের বলে। নির্বাচনের সময় তারা জনগণকে সার্বভৌম এবং দেশের মালিক-মোখতার বলে। অথচ নির্বাচনের পর দেশের একমাত্র ভাগ্যনির্ধারক ও সার্বভৌম রূপে প্রতিষ্ঠা করে নিজেদের। তখন গুরুত্ব হারায় জনগণের ঈমান-আক্বিদার বিষয়টি। বাংলাদেশের ১৫ কোটি মুসলমানের ঈমান বা বিশ্বাসের দাবী তারা মানতেই রাজি নয়। প্রশ্ন হল, জনগণ কি এরূপ আল্লাহ-দ্রোহীদের বিদ্রোহ দীর্ঘায়ীত করতে কি নীরবই থাকবে?  

 

সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হলে পুলিশ ও সেনাবাহিনী তখন সে বিদ্রোহ দমনে ময়দানে নামে। প্রশ্ন হল, সরকারের পক্ষ থেকে আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হলে সে বিদ্রোহ দমনে কারা ময়দানে নামবে? অমুসলিম দেশে আল্লাহর পক্ষে ময়দানে নামার লোক না থাকাটা স্বাভাবিক। কিন্তু সেটি যদি মুসলিম দেশে ঘটে তবে অমুসলিম দেশ থেকে সে মুসলিম দেশটির পার্থক্য কোথায়? কোন দেশে মুসলিমের বসবাস থাকলে সে দেশের মসজিদগুলিতে যেমন নামাযী থাকবে, তেমনি রাজপথে আল্লাহর বাহিনীও থাকবে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহর বাহিনী রূপে যাদেরকে চিত্রিত করা হয়েছে তারা হল ঈমানদারগণ। প্রতিটি ঈমানদারের প্রতি মহান আল্লাহর সুস্পষ্ট নির্দেশটি হল, “ইয়া আইয়োহাল্লাযীনা আমানু কু’নু আনসারাল্লাহ” অর্থঃ হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর সাহায্যকারি হয়ে যাও। -সুরা সাফ, আয়াত ১৪। আনসার শব্দের অর্থ সাহায্যকারি। প্রশ্ন হল, কোন ঈমানদার কি মহান রাব্বুল আলামিনের এ নির্দেশের অবাধ্য হতে পারে? আর অবাধ্য হলে কি তার ঈমান থাকে? তাই মুসলমান হওয়ার অর্থই হল, আল্লাহর আনসার হওয়া। তখন সেটিই তাঁর বাঁচা-মরাসহ জীবনের মূল মিশন হয়ে দাঁড়ায়। সে নামায পড়ে, রোযা রাখে, হজ করে এবং যাকাত দেয়। এগুলো করে আল্লাহর প্রতি আনুগত্য ও আনসার রূপে তাঁর হুকুম পালনে অঙ্গিকারটি আরো মজবুত করার লক্ষ্যে। ইবাদতের মূল লক্ষ্য তো এটাই। যে ইবাদত আল্লাহর প্রতি আনুগত্য ও তাঁর আনসার রূপে দায়িত্ব পালনে অঙ্গিকার বাড়ায় না সেগুলি কি আদৌ ইবাদত? যে দেশে মুসলমানের সংখ্যা ১৫ কোটি, সেদেশে ১৫ কোটির এক বিশাল আনসার বাহিনী থাকবে সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? প্রতিটি ঈমানদার এখানে আল্লাহর পুলিশ। এমন এক বিশাল বাহিনী ময়দানে থাকতে সেদেশে আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হয় কি করে? বিদ্রোহীরা বিজয়ীই বা হয় কি করে? আল্লাহর দরবারে কি এ নিয়ে বিচার বসবে না? নবীজী (সাঃ)র আমলে প্রতিটি মুসলমান ছিল সে প্রতিরোধ বাহিনীর সদস্য। সে বাহিনীর এমন কোন সদস্যই ছিল না যিনি আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের প্রতিরোধে কোন রূপ ভূমিকা নেননি। শতকরা ৬০ ভাগের বেশী সাহাবী তো শহিদ হয়ে গেছেন। বাস্তবতা হল, সে বাহিনী ছাড়া মুসলমানদের কোন সেনাবাহিনী ছিল না। আল্লাহর আনসারদের কাজ শুধু কোরআন পাঠ, নামায-রোযা ও হজ-যাকাত পালন? নবীজী (সাঃ) এবং তার সাহাবাগণ কি সেগুলোর মাঝে নিজেদের ধর্মীয় জীবন সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন? তারা তো নামায-রোযা, হজ-যাকাতের পাশাপাশি দেশ জুড়ে আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের পরাজিতও করেছিলেন। আল্লাহর বিরুদ্ধে সরকারের বিদ্রোহের জবাব জনগণকেই দিতে হয়। এ কাজ ফেরেশতাদের নয়। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে মুসলমানদেরকে আল্লাহর বাহিনী (হিজবুল্লাহ)আখ্যায়ীত করেছেন। তাদের কাজ হল, তাঁর রাস্তায় জিহাদ করা। সে জিহাদের লক্ষ্য, শুধু বিদেশী শত্রুদের হাত থেকে দখদারমূক্ত করা নয়। বরং আল্লাহর বিদ্রোহীদের হাত থেকেও দেশকে মূক্ত করা।

 

বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক দেশ। গণতন্ত্রের সুফল হল, জনগণ এখানে নিরংকুশ ক্ষমতা পায় দেশ পরিচালনার। ফলে এখানে জনগণের দায়ভারটি বিশাল। তবে সে বিশাল দায়ভার ৫ বছর পর পর একবার কয়েক মিনিটের জন্য ভোটকেন্দ্রে হাজির হওয়ার মধ্য দিয়ে পালিত হয় না। এ দায়িত্ব প্রতিদিনের, প্রতি মুহুর্তের। ঘোড়ার পিঠে চড়ে লাগাম ছেড়ে দিলে ঘোড়া যে কোন দিকে নিয়ে যেতে পারে। এজন্যই ঘোড়ার মুখে লাগাম পড়াতে হয়। এবং প্রতি মুহুর্তে সে লাগাম হাতে রাখতে হয়। বিষয়টি অভিন্ন নির্বাচিত সরকারের বেলায়ও। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার কারণেই জনগণের প্রতি সরকার সব সময় সদয় হয় না। তাদের ইচ্ছার প্রতি শ্রদ্ধাশীলও হয় না। বরং সুযোগ পেলেই তারা স্বেচ্ছাচারী হয়। এমন কি কেড়ে নেয় জনগণের ভোটের অধিকার। জনগণের সাথে এভাবেই তো বার বার গাদ্দারী হয়। হিটলার ও শেখ মুজিবের ন্যায় অতি নিষ্ঠুর স্বৈরাচারি পয়দা হয়েছে তো জনগণের ভোটে নির্বাচিতদের মধ্য থেকে। তারা নির্বাচিত হওয়ার পরপরই বহুদলীয় গণতন্ত্র, মানাবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে কবরে পাঠিয়েছিল।

 

তাই ভোটদানের পর গণতান্ত্রিক দেশে জনগণের দায়ভার কমে না, বরং বাড়ে। প্রতি মুহুর্তে সরকারের গতিবিধি ও কর্মকান্ডের উপর জনগণকে নজর রাখতে হয়। ভোট হল জনগনের হাতের লাগাম, তবে সেটিই একমাত্র লাগাম নয়। জনগণের হাতে রয়েছে রাজপথ, রয়েছে মিডিয়া, রয়েছে  আন্দোলন ও হরতাল। পুলিশ ও সরকারি প্রশাসনের তুলনায় এগুলো যে কত বেশী শক্তিশালী সেটি তিউনিসিয়া, মিশর, লিবিয়া, ইয়েমেন, বাহরাইনসহ মধ্যপ্রাচ্যের নানা দেশে সেটি সম্প্রতি প্রমাণিত হচ্ছে। জনগণ যদি তার শক্তির যথার্থ প্রয়োগ করে তবে যে কোন শক্তিশালী স্বৈরাচারি সরকারকে ধরাশায়ী করা কোন কঠিন কাজ নয়। মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী স্বৈরাচারি শাসক ছিল ইরানের শাহ। নিরস্ত্র জনগণ আজ থেকে তিরিশ বছর আগেই তাকে আস্তাকুঁড়ে পাঠিয়েছে। আরব বিশ্বের আরেক শক্তিশালী স্বৈরাচারি শাসক ছিল হোসনী মোবারক। সেও এখন আবর্জনার স্তুপে। কিন্তু  বাংলাদেশে সমস্যা হল এসব আবর্জনা এখনও বসে আছে জনগণের মাথায় এবং ধ্বনি তুলছে আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের। দেশের আইন আদালত এখন বিদ্রোহীদের দখলে। ফলে জ্বিনা, পতিতাবৃত্তি, সূদখোরি, মদ্যপান, বিদেশী শত্রুর দালালী কোন অপরাধ নয়। বরং অপরাধ্য গণ্য করা হচ্ছে আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী সম্পদের বন্টন! কৃষি শিক্ষা, শিল্প, বিজ্ঞান, প্রশাসন বা রাজনীতিতে বাংলাদেশীদের ব্যর্থতা ও পরাজয় অনেক। তবে ১৫ কোটি মুসলমানের এটাই কি সবচেয়ে বড় পরাজয় নয় যে দেশ আজ অধিকৃত আল্লাহর দ্বীনের বিদ্রোহীদের হাতে?  ঘুমন্ত ও মৃত মানুষের মাথায় যেমন ক্ষুদ্র কীটও বাঁধে, তেমনি ঘুমন্ত জাতির বেলায়ও। একটি দেশে দুর্বৃত্তদের দুঃশাসন দেখে একথা নিশ্চিত ভাবেই বলা যায় সেদেশের মানুষ কতটা ঘুমন্ত বা চেতনাহীন। আর বাংলাদেশে দূর্নীতিতে পাঁচ বার বিশ্ব শিরোপা পেয়ে প্রমাণ করেছে দুর্বৃত্তরা দেশটিতে কতটা প্রবল ভাবে বাসা বেঁধেছে। তাই বাংলাদেশের মানুষের এখন ঘুম ভাঙানোর সময়। আরব দেশগুলী জুড়ে ঘুম ভাঙানোর কাজটি হয়েছে বিগত প্রায় ৪০ বছর ধরে। এখন তারা গা ঝাড়া দিয়ে উঠেছে। ফলে মাথা থেকে ঝড়ে পড়ছে বহুদিনের জমা আবর্জনাগুলো। আর আবর্জনার তো কোন শিকড় থাকে না। সেগুলো তো বেড়ে উঠে ঝড়ে পড়ার জন্যই। অতীত ইতিহাসের ন্যায় আরব বিশ্বে তো সেটাই নতুন করে প্রমানিত হচ্ছে। ১৯/০৩/১১

 




তীব্রতর হোক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে জিহাদ

স্বৈরাচারের নাশকতা

স্বৈরাচারের নাশকতা শুধু মানুষের মৌলিক অধিকার হনন নয়। শুধু শিক্ষা, শিল্প, সংস্কৃতি বা দেশধ্বংস নয়। বরং সবচেয়ে বড় অপরাধটি হলো মানুষের ঈমানধ্বংস।তাদের হাতে কোন দেশ অধিকৃত হলে তখন মানুষের ঈমাননাশে প্রচন্ড মহামারি দেখা দেয়। নমরুদ, ফিরাউনদের শাসনামালে তাই তাদেরকে খোদা বলার মত বিবেকশূণ্য বিশাল জনগণ সৃষ্টি হয়েছে। মানুষকে মানবতাশূণ্য ও ঈমান শূণ্য করা তখন রাষ্ট্রের মূল এজেন্ডায় পরিণত হয়। ফিরাউনদের আমলে বিশাল বিশাল পিরামিড নির্মিত হলেও কোন উন্নত মানব সৃষ্টি হয়েছে বা উচ্চতর আইন বা মূল্যবোধ নির্মিত হয়েছে -তার প্রমাণ নাই। অথচ খোলাফায়ে রাশেদার আমলে একখানি প্রাসাদ নির্মিত না হলেও তাদের আমলে যে মহামানব নির্মিত হয়েছে তারাই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব। সে আমলে যে মানের আইন,সাম্য, সুবিচার ও সামাজিক পলিসি প্রতিষ্ঠা দেয়া হয়েছিল সমগ্র মানব ইতিহাসে সেগুলিই সর্বশ্রেষ্ঠ। তখন উঠের পিঠে চাকরকে বসিয়ে খলিফা নিজে রশি ধরে টেনেছেন। সমগ্র মানব ইতিহাসে এমন দৃষ্টান্ত কি অন্যরা দেখাতে পেরেছে?

স্বৈরাচারি দুর্বৃত্তদের শাসন প্রতিযুগেই এক ভয়ানক বিপদের কারণ। সীমাহীন জুলুম, মিথ্যাচার ও চুরিডাকাতি তখন রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিণত হয়। বাংলাদেশীদের মাথায় আজ তেমনি এক শাসন চেপে বসেছে। ইসলামের এ শত্রুদের যুদ্ধ তাই স্রেফ মানুষের মৌলিক অধিকারের বিরুদ্ধে নয়, বরং তাদের মূল লড়াইটি হলো মহান আল্লাহর দ্বীন ও তাঁর শরিয়তি বিধানের বিরুদ্ধে। তারা নিষিদ্ধ করত চায় জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ তথা আল্লাহর পথে জিহাদ। রুখতে চায় কোরআনের চর্চা। কোন ঈমানদার কি ইসলামের এমন শত্রুর সামনে নীরব থাকতে পারে? আর তাতে কি ঈমান থাকে? তাদের দখলদারির কারণে সমগ্র রাষ্ট্র ও তার প্রতিষ্ঠানগুলি হয়ে পড়ে শয়তানের হাতিয়ারে। তারা অসম্ভব করে সিরাতুল মোস্তাকীমে চলা। অসম্ভব করে ইসলামের শরিয়তি বিধানের পূর্ণ অনুসরণ। তখন মুসলিম জীবনে শুরু হয় সূদ, ঘুষ, বিপর্দাগীর ন্যায় আল্লাহর বিরুদ্ধে গুরুতর বিদ্রোহ। পতিতাপল্লির জ্বিনাও তখন বানিজ্য রূপে স্বীকৃতি পায়।

মহান আল্লাহতায়ালার কাছে অতি ঘৃনার কাজটি হলো মানব হত্যা। কিন্তু তাঁর কাছে তার চেয়েও জঘন্য হলো ফিতনা। পবিত্র কোরআনে তিনি ফিতনাকে “আশাদ্দু মিনাল কাতলি” বলেছেন। অর্থাৎ মানব হত্যার চেয়েও এটিকে তিনি জঘন্য বলেছেন। “ফিতনা” একটি বিশেষ কোরআনী পরিভাষা। এর অর্থ হলো মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে এমন এক বিদ্রোহাত্মক ও গোলোযোগপূর্ণ অবস্থা সৃষ্টি যার ফলে সমাজে বা রাষ্ট্রে ইসলামের অনুশাসন পালনই অসম্ভব হয়ে পড়ে। অসম্ভব হয় ধর্মপালন। ফলে এমন সমাজে প্রচন্ড মহামারি ঘটে ঈমানের। ঈমানের প্রচন্ড মহামারির কারণেই একটি মুসলিম সংখ্যারিষ্ঠ দেশ দুর্বৃত্তিতে বিশ্বে প্রথম স্থান অধিকার করে। বাংলাদেশ সেটি ৫ বার অর্জন করেছে। মহান আল্লাহতায়ালা কি দুর্বৃত্তদের কখনো জান্নাতে স্থান দেন? দুনিয়াতে যারা এত ঘৃনীত হয় তাদেরকে কি জান্নাত দিয়ে সম্মানিত করবেন? ঈমানের মৃত্যুতে এভাবেই ভয়ানক ক্ষতিটি হয়।দেহের মৃত্যুর কারণে এতবড় ক্ষতি হয় না। নিছক মৃত্যুর কারণে জাহান্নামে পৌছাটি কারো জন্যই অনিবার্য নয়। বরং শহীদ রূপে নিহত হলে জান্নাতেও পৌঁছার দরজা খুলে যায়। মুজাহিদগণ তাই মৃত্যুকে ভালবাসেন,যেমন কাফেরগণ ভালবাসে দুনিয়াকে। বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলিতে রাজনীতির মুরতাদ নায়কেরা ফিতনার যে প্লাবন খাড়া করেছে তাতে মূল আয়োজনটি তো ঈমাননাশের। এবং সে অসম্ভব করেছে ইসলামের পথে তথা সিরাতুল মোস্তাকীমে চলা। ইসলামে সূদ হারাম, ঘুষ হারাম। জ্বিনাও হারাম। অথচ বাংলাদেশে কি সূদ বা ঘুষ না দিয়ে কোন কাজ উদ্ধার করা সম্ভব। নিজের হলাল রুজিতে জমি কিনে বা গাড়ি কিনে সেটিকে নিজ নামে রেজিস্ট্রি করার কাজটি কি ঘুষ না দিয়ে সম্ভব? অর্থাৎ মানুষ বাধ্য করা হচ্ছে আল্লাহর আইনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে। ইসলামে অতি ফরজ হলো কোরআনের জ্ঞানার্জন। সেটি সম্ভব না হলে অসম্ভব হয় মুসলমান হওয়া। অথচ ক্ষমতাসীন স্বৈরাচারি দুর্বৃত্তগণ সেটিও হতে দিতে রাজি নয়। বরং তাদের শিক্ষানীতি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহের মূল লক্ষ্যই হলো ইসলাম থেকে মানুষকে দূরে সরানো। বাংলাদেশে এজন্যই জিহাদ বিষয়ক বই বাজেয়াপ্ত করা হয়। অপর দিকে রাষ্ট্র এমন এক অবস্থা সৃষ্টি করে যাতে আল্লাহর শরিয়তি হুকুমের বিরুদ্ধে বিশাল বিদ্রোহও তখন অতি সহজ হয়ে পড়ে। অনৈসলামিক রাষ্ট্রে বসবাসের এটি এক ভয়াবহ বিপদ। কোন ঈমানদার কি এমন শাসন মেনে নেয়?

 

বাংলাদেশে মুরতাদদের রাজনীতি

ইসলামের উপর বিশ্বাস ও তার শরিয়তি বিধান থেকে যারা মুখ ফিরিয়ে নেয় বা আল্লাহতায়ালার কোরআনী হুকুমের বিদ্রোহ করে ইসলামে তাদেরকে মুরতাদ বলা হয়। ইসলামে এটি গুরুতর অপরাধ। মুরতাদদের বড় অপরাধ, তারা শুধু মানুষের চেতনার ভূমিতে নয়, রাষ্ট্র ও সমাজ জুড়েও বিশাল ফিতনা তথা বিদ্রোহাত্মক পরিবেশ সৃষ্টি করে। ইসলামের অর্থ হলো মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিটি হুকুমের কাছে পূর্ণ আনুগত্য। এবং যে কোন কোরঅানী হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহই হলো কাফেরের কাজ। বাংলাদেশে রাজনীতির নামে যা চলছে তা হলো ফিতনা সৃষ্টি তথা ইসলামে বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সংঘটিত করার রাজনীতি। তবে এমন বিদ্রোহের চেষ্টা যে পূর্বে হয়নি তা নয়। এমন কি খোলাফায়ে রাশেদার আমলেও হয়েছে। তবে সে বিদ্রোহীদের দমনে চেষ্টাও হয়েছে। হযরত আবু বকর (রাঃ)র আমলে কিছু মুসলিম নামধারি ব্যক্তি ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঝান্ডা নিয়ে যাকাত দিতে অস্বীকার করেছিল। ইসলামের হুকুমের বিরুদ্ধে সেটি ছিল প্রথম বিদ্রোহ। সে মুরতাদদের সেদিন হত্যা করা হয়েছিল। নামাজ-রোযা, হজ-যাকাত ও কালেমা পাঠ তাদেরকে সে শাস্তি থেকে বাঁচাতে পারিনি। তাছাড়া বিদ্রোহী হওয়ার জন্য কি সব হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হওয়ার প্রয়োজন পড়ে?

বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে করুণাময় ইসলামের বিধান যে কত কঠোর সেটি বুঝা যায় বনি ইসরাইলের সাথে মহান আল্লাহর আচরণ দেখে। বনি ইসরাইলকে তিনি সমগ্র মানব জাতির উপর মর্যাদা দিয়েছিলেন। ফিরাউনের হাত থেকে বাঁচাতে লোহিত সাগরকে তিনি দ্বিখন্ডিত করেছিলেন এবং তাদের চোখের সামনে ফিরাউনের বিশাল বাহিনীকে ডুবিয়ে হত্যা করেছিলেন। সিনা মরুভূমির মাঝে সূর্যের প্রখর উত্তাপ থেকে বাঁচাতে তাদের মাথার উপর মেঘের সামিয়ানা লাগিয়েছিলেন। আসমান থেকে খাদ্য রূপে মান্না ও সালওয়া নাযিল করেছিলেন। পানির তৃষ্ণা মেটাতে হযরত মূসা (আঃ)র লাঠির আঘাতে পাথর ফাটিয়ে পানির ১২টি ঝর্ণা বের করা হয়েছিল। সব কিছু ঘটেছিল তাদের চোখের সামনে। কিন্তু তারাই হযরত মূসা (আঃ)র অবর্তমানে বাছুরকে খোদা বানিয়ে পুজা শুরু করেছিল। হযরত মূসা (আঃ) ফিরে আসলে তারা সে পাপের জন্য অনুশোচনা করেছিল। এবং তাওবাও করেছিল। কিন্তু আল্লাহতায়ালা তাদের সে তাওবা কবুল করেন নি। তাওবা কবুলের শর্ত রূপে তাদেরকে বলা হয়েছিল নিজেদের হত্যা করতে। সেটি ছিল তাদের অবাধ্যতার কাফফারা। প্রখ্যাত তাফসিরকারক আল্লামা ইবনে কাছির (রহঃ)য়ের মতে তাতে ৬ লাখ ইহুদীদের মধ্য থেকে ৭০ হাজারকে হত্যা করা হয়েছিল। এরপর তাদের তাওবাকে কবুল করা হয়েছিল। (সুরা তা-হার তাফসির দ্রষ্টব্য)।এতে বুঝা যায়,জনগণের মাঝে আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ যখন প্রবলতর হয় তখন সে বিদ্রোহীগণ মুখে যতই মুসলমান রূপে জাহির করুক,তাদের তাওবা বা দোয়া কোনটাই তখন কবুল হয় না। আল্লাহতায়ালার কাছে মাগফিরাহ পেতে হলে প্রথমে বিদ্রোহের পথ ছেড়ে পূর্ণাঙ্গ আত্মসমর্পণের পথ ধরতে হয়,সে সাথে বিদ্রোহের কাফফরাও দিতে হয়। বনী ইসরাইলীগণ সে কাফফরা দিয়েছিল ৭০ হাজার মানুষের প্রাণ নাশের মধ্য দিয়ে।

 

অনিবার্য জিহাদ

মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বনি ইসরাইলীদের বিদ্রোহটি ঘটেছিল বাছুর পুজার মধ্য দিয়ে। তাতে নেতৃত্ব দিয়েছিল সামেরী। তবে আজকের মুসলমানগণ বাছুর পুজায় না নামলেও তাদের জীবনে বিদ্রোহটি হচ্ছে অন্যভাবে। এবং সেটিই কম ভয়ানক নয়। সেটি হচ্ছে মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশিত শরিয়তি বিধানের বিরুদ্ধে অবাধ্যতার মধ্য দিয়ে। বাছুর পুজা যেমন কাফেরের কাজ, তেমনি আল্লাহর শরিয়তি বিধান থেকে মুখ ফিরিয়ে আদালতে মানুষের তৈরী আইনকে প্রতিষ্ঠা দেয়াও কাফেরদের কাজ। সুরা মায়েদায় বলা হয়েছে, “মান লাম ইয়াহকুম বিমা আনযালাল্লাহু ফা উলায়িকা হুমুল কাফিরুন .. উলায়িকা হুমুয যালিমুযন .. উলায়িকা হুমুল ফাসিকুন। এ ঘোষণা এসেছে উক্ত সুরার আয়াত ৪৪, ৪৫, ৪৭য়ে)। অর্থঃ আল্লাহতায়ালার নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী যারা বিচারকার্য করে না তারাই কাফের, .. তারাই জালিম…. তারাই ফাসিক। বনী ইসরাইলের বাছুর পুজার চেয়ে আজকের মুসলমানদের বিদ্রোহ কি কম জঘন্য? মুসলিম ভূমিতে মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে এ বিদ্রোহে নেতৃত্ব হিন্দু,খৃষ্টান বা বৌদ্ধরা দিচ্ছে না, দিচ্ছে মুসলিম নামধারি সেক্যুলার রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীগণ। আল্লাহর আইনকে ১৪ শত বছরের পুরোন আইন বলে তারা উপহাসও করছে। আলেমদের অপরাধ, তারা এ বিদ্রোহ ও উপহাসের শুধু নীরব দর্শক নয়,বরং বহু ক্ষেত্রে তারা এ বিদ্রোহী রাজনৈতীক নেতাদের মিত্রও। শরিয়ত প্রতিষ্ঠার দাবী নিয়ে এসব আলেমগণও ময়দানে নেই। এ মুরতাদীরা আল্লাহর আইনকে অমান্য করে বেছে নিয়েছে কাফের ব্রিটিশদের তৈরী কুফরি আইনকে। যে আইনে ব্যাভিচার কোন অপরাধই নয় যদি তা উভয় পক্ষের সম্মতিতে হয়। অপরাধ নয় সূদ, ঘূষ এবং মদ্যপানও। এমন বিদ্রোহীদের হাতে দখলদারির কারণে সমগ্র রাষ্ট্র ও তার প্রতিষ্ঠানগুলি হয়ে পড়েছে শয়তানের হাতিয়ারে। তারা অসম্ভব করে রেখেছে সিরাতুল মোস্তাকীমে চলা। অসম্ভব করেছে ইসলামের জ্ঞানলাভ করা। অসম্ভব হয়েছে ইসলামের শরিয়তি বিধানের পূর্ণ অনুসরণ। মুসলিম জীবনে ঢুকেছে সূদ, ঘুষ, বিপর্দাগীর ন্যায় আল্লাহর বিরুদ্ধে নানাবিধ বিদ্রোহ। এ বিদ্রোহের বিস্তার এতই ব্যাপক যে পতিতাপল্লির জ্বিনাকে নিরাপত্তা দিতে রাতদিন যে পুলিশ পাহারা তার খরচ জোগাতে দেশের নামাজী ও রোযাদারগণও বিনাপ্রতিবাদে রাজস্ব দেয়।

নিজ ঘরে আগুন লাগলে সে আগুন থামানোর দায়িত্ব সে গৃহে বসবাসকারী সবার। সে সাথে পাড়ার লোকেরও। চোখের সামনে ঘর জ্বলতে দেখেও সে পরিবারের বা পাড়ার কেউ যদি আগুন নিভাতে উদ্যোগী না হয় তবে কি তাদেরকে সুস্থ বলা যায়? এমন বিবেকহীনদের কি মানুষ বলা যায়? মদিনার ক্ষুদ্র নগরীতে ইসলামি রাষ্ট্রের যখন সবেমাত্র শুরু তখন আরবের অসভ্য কাফেরগণ জোট বেঁধেছিল সে রাষ্ট্রকে ভূপৃষ্ঠ থেকে বিলুপ্ত করার। ১০ হাজারের অধিক মানুষ সেদিন মদিনাকে ঘিরে ধরেছিল। ইতিহাসে সে যুদ্ধকে জঙ্গে আহযাব বলা হয়। বলা হয় খন্দকের যুদ্ধও। কাফেরদের সে সম্মিলিত হামলা রুখতে প্রতিটি মুসলিম পুরুষই শুধু নয়, নারীগণও মোকাবেলায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। শত্রুর সে হামলার মুখে মুসলমানদের অংশগ্রহণ ছিল শতকরা শতভাগ। তারা রাতদিন পরিশ্রম করে মদিনা ঘিরে গভীর পরিখা খনন করেছিলেন। আল্লাহতায়ালাও তাদের জানমালের বিনিয়োগ দেখে ফেরেশতা পাঠিয়ে সাহায্য করেছিলেন। ফলে সদ্য প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্র সেদিন আসন্ন বিলুপ্তি থেকে রক্ষা পেয়েছিল।

 

শহীদের মর্যাদা

বাংলার মুসলিম ভূমি আজ অধিকৃত। অধিকৃত হয়েছে ভারতের সেবাদাস ও ইসলামের ঘোরতোর দুষমণদের হাতে। ইসলামের এমন দুষমনদের হটানোর দায়ভার কি শুধু বিএনপি,জামায়াত বা কিছু রাজনৈতীক দলের? এটি কি স্রেফ রাজনীতি? ইসলামে এমন দুর্বৃত্তদের হটানোর কাজা তো ইবাদত। এটি পবিত্র জিহাদ। এ দায়িত্ব তো প্রতিটি ঈমানদারের। মহান আল্লাহর কাছে এ প্রশ্নের জবাব অবশ্যই দিতে হবে, যখন দেশ ইসলামের শত্রুদের হাতে অধিকৃত হয়েছিল তখন তোমার ভূমিকা কি ছিল? তুমি কি সে সরকারের বিরুদ্ধে জিহাদ না করে বরং রাজস্ব দিয়ে সাহায্য করনি? ইসলামের স্বঘোষিত এ শত্রুদের হটানোর কাজে যে ঈমানদার প্রাণ দিবে তারা তো শহীদ। এমন শহীদদের জীবনে মৃত্যু নেই। তাদেরকে মৃত বলাকে মহান আল্লাহতায়ালা হারাম করে দিয়েছেন। তাদের জীবনে কবরের আযাব নাই। রোজ হাশরের বিচারের অপেক্ষায় হাজর হাজার বছরের ইন্তেজারও নাই। বিচারের দিনে “ইয়া নফসি, ইয়া নফসি”র আর্তনাদও নাই। আল্লাহর পথে যুদ্ধ নিহত হলে তারা সরাসরি ঢুকবে জান্নাতে। তাদের জীবনে কবরবাস নাই, আলমে বারযাখে বসবাসও নাই। কবরে তাদের লাশ থাকবে বটে কিন্তু তারা চলে যাবে জান্নাতে। শাহাদত প্রাপ্তির সাথে সাথে তারা মহান রাব্বুল আলামিনের মর্যাদাবান মেহমান হবেন। অন্যরা মারা গেলে সাথে সাথে তাদের খাদ্যপানীয় বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু শহীদগণ পাবেন রেজেক –যার প্রতিশ্রুতি পবিত্র কোরআনে দেয়া হয়েছে। এমন মর্যাদা, সরাসরি এরূপ জান্নাতে প্রবেশের সুখবর কি কোন সুফি দরবেশ,বুজুর্গ আলেম,হাফেজ, ক্বারি, মোহাদ্দেস, মোফাচ্ছের বা পীরকে দেয়া হয়েছে? কিয়ামতের দিনে বরং “ইয়া নফসি, ইয়া নফসি” বলতে বলতে তাদের গা দিয়ে ঘাম ছুটবে। মহান আল্লাহর দরবারে তাদেরকে চুলচেরা হিসাব দিতে হবে।পিতামাতা সেদিন নিজ সন্তানদের ভূলে যাবে। ভাই ভাইকে ভূলে যাবে। সবাই তখন নিজেকে বাঁচানো নিয়ে দিশেহারা হবে। শহীদের জীবনে সে দিন আসবে না। তারা তখন থাকবে জান্নাতের আনন্দভূমিতে।

 

মুমিনের দোয়া

দোয়ার মধ্যেই নিখুঁত ভাবে ধরা পড়ে ব্যক্তির জীবনের মূল প্রায়োরিটি। মানুষ সে প্রায়োটি নিয়েই আজীবন বাঁচে। সে অনুযায়ী শিক্ষা নেয়;এবং কর্ম, পেশা বা ব্যবসা গড়ে তোলে। যা যে চায় না তা কখনোই দোয়াতে আনে না। তাই দুনিয়াদার ব্যক্তির সবচেয়ে বড় দোয়াটি ডিগ্রি লাভ, সন্তান লাভ, অর্থ লাভ,চাকুরি লাভ বা স্বাস্থ্যলাভ নিয়ে। সে জন্য মৌলবী ডেকে দোয়ার আসরও বসায়। সে দোয়ায় শাহাদত লাভ গুরুত্ব পায় না। অথচ প্রকৃত মু’মিনের দোয়াতে গুরুত্ব পায় শাহাদত লাভের কামনা। সাহাবাগণ শাহাদত লাভের জন্য অন্যদেরকে দিয়ে দোয়া করাতেন। দোয়ার সাথে তাদের মনের গভীর সংযোগও ছিল। তাই শতকরা ৭০ভাগের বেশী সাহাবী রণাঙ্গণে শহিদও হয়ে গেছেন। প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের থেকে আজকের মুসলমানদের পার্থক্য অনেক। তবে সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো, আজকের মুসলমানগণ যেমন জিহাদবিমুখ, তেমনি শাহাদতবিমুখ। জান্নাতমুখি চেতনা যাদের মধ্যে অতি প্রচন্ড তারাই শাহাদতমুখি হয়।ব্যক্তির জান্নাতমুখিতা টুপিপাগড়ি,লম্বা দাড়ি ও নামায-রোযায় ধরাপড়া না। লাখ লাখ সূদখোর-ঘুষখোর ও মুনাফিকও লম্বা দাড়ি রাখে।মাথায় টুপি-পাগড়ি লাগায়।নিয়মিত নামায-রোযাও আদায় করে। ব্যক্তির জান্নাতমুখিতা ধরা পড়ে রাতের আঁধারে হাত তুলে মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে শাহাদতের আকুতি পেশের মধ্যে। যারা দুনিয়ামুখি তাদের মুখে সে দোয়া আসে না। তাদের ভয়,এমন দোয়া কবুল হলে তো সাধের দুনিয়া ছাড়তে হবে। দুনিয়ার জীবনে জৌলুস বাড়াতে তারা বরং জালেম শাসকের ভাড়াটে সৈনিকে পরিণত হয়। যুগে যুগে এরূপ দুনিয়ামুখি আলেমদের মধ্য থেকে জালেম শাসকেরা লক্ষ লক্ষ তাঁবেদার পেয়েছে। দুনিয়াকে আঁকড়ে ধরে বেশী দিন বেঁচে থাকাই তাদের জীবনের মূল লক্ষ্য। তাদের ধর্মপালন স্রেফ নামায-রোযা ও তাসবিহ পাঠে সীমিত। এমন বকধার্মিকদের কারণেই প্রতিটি মুসলিম ভূমি আজ ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে অধিকৃত।সে অধিকৃতি থেকে মুক্তির লড়াইয়ে সৈন্য নাই। কারণ লড়াই তো জানমালের বিনিয়োগ চাই। ফলে দেশে দেশে আল্লাহর দ্বীন ও তার শরিয়তি বিধান আজ পরাজিত। মহান আল্লাহতায়ালার হুকুম শুধু কিতাবেই রয়ে গেছে, আাইন-আদালতে নাই। ফলে কেড়ে নেয়া হয়েছে তাদের মানমর্যদাও। পবিত্র কোরআনে  মুসলমানদের অভিহিত করা হয়েছিল “কুনতুম খায়রা উম্মাতিন” (তোমরাই হলে শ্রেষ্ঠ জাতি)রূপে, অথচ তারাই আজ বিশ্বমাঝে সবচেয়ে পরাজিত ও অপমানিত।

আজকের বিশ্বের প্রায় ১৩০ কোটি মুসলমানের যে পতিত দশা তার কারণ তো এই স্বৈরাচারী দুর্বৃত্তদের শাসন।বাংলাদেশ তো এ কারণেই বিশ্বমাঝে মর্যাদাহীন। সাহাবায়ে কেরামের যুগে ইসলামের বিধানের বিরুদ্ধে এরূপ বিদ্রোহ হলে বা মুসলিম ভূমি স্বঘোষিত ইসলামের শত্রুদের হাতে অধিকৃত হলে কি ঈমানদারগণ কি ঘরে বসে থাকতেন? সাহাবায়ে কেরামগণ একটি একটি দিনও শরিয়তের হুকুম ছাড়া বেঁচেছেন? রাষ্ট্রের নির্মাণে, উন্নয়নে ও প্রতিরক্ষায় অংশ নেয়া ইসলামে কোন পেশাদারিত্ব নয়, চাকুরিও নয়; এটি স্রেফ রাজনীতিও নয়। এটি অতি পবিত্র জিহাদ। শুধু শ্রম ও অর্থ দানই নয়,অনেক সময় সে কাজে প্রাণদানও অপরিহার্য হয়ে পড়ে। এরূপ চেতনা বলেই প্রাথমিক কালের মুষ্টিমেয় দরিদ্র মুসলমানেরা সে আমলের দুটি বৃহৎ শক্তিকে পরাজিত করে সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার নির্মাণ করতে পেরেছিলেন। কিন্তু এযুগের মুসলিম শাসকেরা নানা বাহানায় সে ইবাদত পালনকে অসম্ভব করে রেখেছে। ইসলাম প্রতিষ্ঠার জিহাদে অংশগ্রহণকে তারা ফৌজদারী অপরাধে পরিণত করেছে। অথচ রাজনীতির জিহাদ হলো রাষ্ট্রের উন্নয়নের প্রচেষ্ঠা। এমন আত্মনিয়েোগ প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। অথচ স্বৈরাচার কবলিত বহুদেশে এটি মৃত্যুদন্ডনীয় অপরাধ। শেখ মুজিবও এটি নিষিদ্ধ করেছিল ইসলামপন্থীদের জন্য। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ অবধি দেশের ইসলামপন্থীদের রাজনৈতিক দলগুলোকে মুজিব বেআইনী ঘোষিত করেছিল এবং ১৯৭৪ এ এসে রাষ্ট্র পরিচালনার কাজকে পরিণত করেছিল তার পরিবার ও দলের নিজস্ব আভ্যন্তরীণ বিষয়ে। প্রতিষ্ঠা করেছিল একদলীয় বাকশালী শাসন। যে কোন স্বৈরাচারী শাসকের ন্যায় মুজিবও সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে দর্শকে পরিণত করেছিল। কোন টীমের শতকরা নিরানব্বই ভাগ খেলোয়াড়কে দর্শকের গ্যালারীতে বসিয়ে কোন দলই বিজয়ী হতে পারে না। তেমনি পারেনি মুজিব আমলের বাংলাদেশও। তার হাতে রাজনীতি পরিণত হয়েছিল লুণ্ঠনের হাতিয়ারে। ফলে নিঃস্ব হয়েছিল সরকারি তহবিল ও জনগণ, এবং তার কুশাসনে বাংলাদেশ অর্জন করেছিল লজ্জাজনক তলাহীন ঝুড়ির খেতাবটি। তার শাসনামলে দরিদ্র মানুষ কাপড়ের অভাবে মাছধরা জাল পরে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল। বাংলার ইতিহাসে আর কোন কালেই এরূপ ঘটনা ঘটেনি।

 

সরকারের নৃশংস বর্বরতা

যে দেশের সেনাবাহিনীর লোকেরা নিজদেশের নাগরিকদের খুন করে লাশ নদীতে ফেলে অর্থ কামায় সে দেশকে কি সভ্য দেশ বলা যায়? সে সরকারও কি সভ্য সরকার,যে সরকার নিরস্ত্র মানুষের উপর সশস্ত্র সেনা লেলিয়ে দিয়ে শতশত মানুষকে হতাহত করে এবং নিহতদের লাশ ময়লার গাড়িতে তুলে গায়েব করে দেয়? অথচ রাজধানীর শাপলা চত্বরে ২০১৩ সালের ৫ই মে তারিখে তো সেটিই হয়েছিল। কোন সভ্য সরকার কি নিজ দেশের নাগরিকদের ঘরবাড়ির উপর বুলডোজার চালিয়ে দেয়? রানা প্লাজার ন্যায় ভবন ধ্বস ও হত্যাকান্ড কি কোন সভ্যদেশে ঘটে।সারিবদ্ধ বালিবুঝাই ট্রাক দিয়ে অবরোধ করে কি বিরোধী দলীয় নেত্রীর বাসা? সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে,বালির গাড়ি দেয়া হয়েছে বিরোধী দলীয় নেত্রীর নিরাপত্তা বাড়াতে। প্রশ্ন তবে কেন প্রধানমন্ত্রীর বাসার সামনে বালির গাড়ি নাই? বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের হত্যা করা,গুম করা,রিমান্ডের নামে নির্যাতন সেলে নিয়ে দৈহীক অত্যাচার করা -কোন ধরণের সভ্যতা? বিরোধী দলের অফিসে ভাংচুর করা,তাদের অফিসে তালা লাগিয়ে দেয়া,বিরোধী পত্রিকা ও টিভি চ্যানেল বন্ধ করে দেয়া,বিরোধীদের দলীয় নেতাকর্মীদের রাজপথে সমাবেশ করতে না দেয়া,এমন কি তাদেরকে নিজ অফিসে মিটিং করতে না দেয়াও কি সভ্যতা? অথচ বিরোধী দল দমনে এরূপ নৃশংস বর্বরতাই হলো শেখ হাসিনা সরকারের নীতি। কোন সভ্য সরকার কি কখনো নির্বাচনের নামে ভোট ডাকাতি করে? ২০১৩ সালের জানুয়ারির যে নির্বাচনে সংসদ গঠন করা হলো সে নির্বাচনে ১৫৪ সিটে কোন ভোটদানের ঘটনাই ঘটেনি। এবং যেখানে ভোটদান হয়েছে সেখানে কি শতকরা ৫ জনও ভোট দিয়েছে? বিশ্বের কোন সভ্যদেশে কি এমন ঘটনা কোনকালেও ঘটেছে? কোন সভ্যদেশের আদালত কি দলীয় ক্যাডারদের দাবীতে বিচারের রায় পাল্টায়? অথচ বাংলাদেশের আদালত শুধু রায়ই পাল্টানো হয়নি,ক্যাডারদের খুশি করতে সংসদের সদস্যগণ আইনও পাল্টিয়েছে।এবং সে আইনের মাধ্যমে নিরপরাধ মানুষদের হত্যার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।এরূপ নানা অসভ্যতার পাশাপাশি দুর্বৃত্তিতে ৫ বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ান হওয়াটিও কি কম বর্বরতা? সভ্যদেশে চুরি-ডাকাতি,সন্ত্রাস ও খুনখারাবী করে কিছু চোর-ডাকাত,খুনি ও নরপিশাচ,এবং সে ভয়ানক অপরাধীদের গ্রেফতার করে কঠোর শাস্তি দেয় সরকার। কিন্তু অসভ্য দেশে সে ভয়ানক অপরাধগুলি করে খোদ সরকার। সরকারি দলের চুরি-ডাকাতির কারণেই বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অবকাঠামা নির্মাণের প্রজেক্ট পদ্মাসেতু বহু বছরের জন্য পিছিয়ে গেল। অসভ্য দেশে আইন-আদালত,পুলিশ ও সেনাবাহিনীর কাজ হয় দুর্বৃত্ত সরকারকে দিবারাত্র প্রটেকশন দেয়া। হালাকু-চেঙ্গিজদের আমলে সেটিই হতো।আজ  সেটিই হচ্ছে বাংলাদেশে।

 

যে ব্যর্থতা জনগণের 

জাতীয় জীবনে কদর্যতা স্রেফ সরকারের ব্যর্থতার কারণে আসে না। সেটি অনিবার্য হয় সর্বসাধারণের ব্যর্থতায়। জাতির অর্জিত সফলতার কৃতিত্ব যেমন প্রতিটি নাগরিকের,তেমনি ব্যর্থতার দায়ভারও প্রতিটি নাগরিকের। দেশগড়ার কাজে সমগ্র দেশবাসী একটি দলবদ্ধ টিম রূপে কাজ করে। টিম হারলে যেমন সে টিমের সবাই হারে, তেমনি জাতির বেলায়ও। দেশ গড়া, শান্তিপ্রতিষ্ঠা ও দেশের প্রতিরক্ষার দায়-দায়িত্ব তাই কিছু নিছক রাজনৈতিক নেতা,দেশের প্রেসিডেন্ট, মন্ত্রী ও প্রশাসনিক কর্মচারীদের নয়। এ কাজ সমগ্র দেশবাসীর। এটি খেলার বিষয় নয় যে,মুষ্টিমেয় খেলোয়াড়গণ খেলবে এবং আমজনতা দর্শকরূপে তা দেখবে। বরং এ কাজ রাজনৈতিক নেতা, বুদ্ধিজীবী, আলেম-উলামা, ছাত্র-শিক্ষক, প্রশাসনিক কর্মচারি, সেনাসদস্য, কৃষক-শ্রমিকসহ রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের। কোন জাতি যখন নীচে নামতে থাকে তখন সে নীচে নামার কারণ বহু। তবে মূল কারণটি হলো,দেশ গড়া ও দেশের প্রতিরক্ষার ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ কাজে জনগণের নিজ নিজ দায়িত্ব পালনা না করা। জাতির ঘাড়ে যখন দুর্বৃত্ত্ব সরকার চেপে বসে তখন পাড়া থেকে চোর-ডাকাত তাড়ানোর মত ঘাড় থেকে সে দুর্বৃত্ত্ব সরকার নামানোর  দায়িত্বটিকে জনগণকে নিজ হাতে নিতে হয়। সে জন্য প্রয়োজনে যুদ্ধ করতে হয়। কিন্তু জাতি বিপদে পড়ে যখন সে কাজগুলি মুষ্টিমেয় কিছু ব্যক্তির হাতে সীমাবদ্ধ হয় এবং বাঁকিরা দর্শকে পরিণত হয়। সকল বিফলতার জন্য তখন শুধু সেই মুষ্টিমেয় ব্যক্তিদের দায়বদ্ধ করা হয়।পলাশির যুদ্ধে বাংলার স্বাধীনতা যখন অস্তমিত হলো তখন শুধু সিরাজুদ্দৌলার পরাজয় হয়নি বরং পরাজিত হয়েছিল বাংলার সমগ্র মানুষ। এ পরাজয়ের জন্য শুধু মীর জাফরকে দায়ী করে অসুস্থ চেতনার মানুষই শুধু নিজের দায়ভার ও দুঃখ কমাতে পারে,বিবেকবান মানুষ তা পারে না। সে পরাজয়ের জন্য দায়ী ছিল বাংলার সমগ্র মানুষ।

একটি দেশ কতটা সভ্য সে বিচারটি দেশের ভূ-প্রকৃতি, জলবায়ু, গাছপালা, ক্ষেত-খামার দিয়ে হয় না। ইট-পাথর ও লোহালক্কর দিয়ে নির্মৃত ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট বা কলকারখানার সংখ্যা দিয়ে হয় না। বরং সে বিচারটি হয় সেদেশের মানুষের মান, শাসকের মান এবং আদালতের আইনের মান দিয়ে। হালাকু-চেঙ্গিজের ন্যায় চোরডাকাতের হাতে দেশ গেলে সেখানে ঘরবাড়ি,রাস্তাঘাট ও প্রাসাদ নির্মিত হলেও সভ্যতা নির্মিত হয়না। ইসলাম তার প্রাথমিক কালে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা জন্ম দিয়েছে কোন তাজমহল,পিরামিড বা কোন বিস্ময়কর প্রাসাদ না গড়েই। তারা জন্ম দিয়েছিল এমন বিবেকমান শাসকের যারা চাকরকে উঠের পিঠে চড়িয়ে নিজে উঠের রশি ধরে সামনে চলাকে নিজের নৈতীক দায়িত্ব মনে করেছে। প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল এমন উন্নত আইনের যে আইনের স্রষ্টা কোন মানুষ ও পার্লামেন্ট ছিল না, ছিলেন খোদ মহান আল্লাহতায়ালা। সে শরিয়তি আইনে নারী-পুরুষ তার মৌলিক স্বাধীনতা ও অধিকার পেয়েছিল। বিলুপ্ত হয়েছিল আদি আমল থেকে চলে আসা দাসপ্রথা। নারী শিশুরা সেদিন জীবন্ত দাফন হওয়া থেকে বেঁচেছিল। সমাজ থেকে বিলুপ্ত হয়েছিল চোর-ডাকাতেরা। বিলুপ্ত হয়েছিল মদ্যপান, জুয়া ও ব্যাভিচারের ন্যায় আদিম অপরাধ। নানা ধর্মের মানুষ সে সমাজে নিরাপদে বাস কবতে পারতো। সে রাষ্ট্রে কোন কালেই কোন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঘটেনি।অথচ বাংলাদেশ আজ হালাকু-চেঙ্গিজের ন্যায় বর্বর চোর-ডাকাত ও খুনিদের হাতে অধিকৃত। এদের হাতে যে শুধু ব্যাংক ডাকাতি হচ্ছে বা শেয়ার বাজার লুট হচ্ছে তা নয়, ডাকাতি হচ্ছে ভোটের বাক্সতেও। হাত পড়ছে মানুষের ইজ্জত-আবরু ও জানের উপরও। সাধারণ মানুষ আজ পথে-ঘাটে লাশ হচ্ছে। মৌলিক অধিকার, বাকস্বাধীনতা ও গণতান্ত্র আজ আস্তাকুঁরে গিয়ে পড়েছে। স্বৈরাচার আাজ মুজিব আমলের বাকশালী নিষ্ঠুরতার চেয়েও ভয়ংকর রূপ নিয়ে হাজির হয়েছে। ডাকাতেরা যেমন গৃহকর্তার হাত-পা বেঁধে বা তাকে খুন করে লুন্ঠন করে, তেমনি দেশবাসীকে বন্দি করে এবং তাদের উপর অত্যাচার ও হত্যাকান্ড চালিয়ে অতিশয় দুর্বৃত্ত্বরা আজ দেশ শাসন করছে। দেশ অসভ্যতায় রেকর্ড গড়ছে তো একারণেই।

তবে এরূপ ভয়াবহ অবস্থায় দেশ একদিনে পৌঁছেনি। রোগ ধীরে ধীরে বেড়ে অবশেষে একদিন শরীরের পতন ঘটায়। যে চোর-ডাকাত ও খুনিদের হাতে আজ বাংলাদেশ অধিকৃত তারা ইংরেজদের মত বিদেশ থেকে আসেনি। আসমান থেকেও পড়েনি। তারা তো বেড়ে উঠেছে জনগণের মাঝেই।মানুষকে শুধু চাষাবাদ বা ব্যবসাবাণিজ্য জানলে চলে না। স্রেফ বিষাক্ত শাপ ও হিংস্র বাঘ-ভালুকদের চিনলেও চলে না। সেগুলি জানার পাশাপাশি সমাজের চোর-ডাকাত ও খুনিদেরও চিনতে হয়। তাদের ঘৃনা করার সামর্থও থাকতে হয়। সেটিই তো বিবেকের সুস্থ্যাতা। সেটিই তো চেতনার বল। বাংলাদেশের মানুষ সে সুস্থ্যতা নিয়ে তেমন বেড়ে উঠেনি। চেতনায় সে বলও পায়নি। সে অসুস্থ্যতা যে শুধু স্বল্পসংখ্যক মানুষের -তা নয়। বরং সে রোগ বিপুল সংখ্যক মানুষের। এবং সে রোগটি নিখুঁত ভাবে ধরা পড়ে নির্বাচন কালে। এমন অসুস্থ্যতা মানুষের আধিক্যের কারণে কোন বিবেকমান সৎ মানুষের পক্ষে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়া অসম্ভব। বিলেতে কোন এমপি একবার মিথ্যুক প্রমাণিত হলে তার আর এমপি পদ থাকে না। অথচ বাংলাদেশে শুধু মিথ্যুক নয়, চোরডাকাত প্রমাণিত হলেও বিপুল ভোটে সে নির্বাচিত হয়।সেটি চেতনায় চরম অসুস্থ্যতার কারণে।বস্তুতঃ এমন এক অভিন্ন অসুস্থ্যতার কারণে মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব হযরত মহম্মদ (সাঃ)কেও মক্কার কাফেরদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে রাতের আঁধারে গোপনে জন্মভূমি ছাড়তে হয়েছে। একই অবস্থা হয়েছিল হযরত ইব্রাহীম (আঃ)ও হযরত মূসা (আঃ)র মত মানব ইতিহাসের অন্যান্য শ্রেষ্ঠ মানবদের।

 

অর্জিত আযাব  ও কাফফারা

অন্যায় ও অসত্যকে ঘৃণা,আর ন্যায় ও সত্যকে ভালবাসার সামার্থই মানব জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সামর্থ। এমন সামর্থের বলেই মানব ফেরেশতাদের চেয়েও শ্রেষ্ঠ হয়। সে সামর্থটি দৈহীক বলে আসে না, সে জন্য নৈতীক বল লাগে। সে জন্য লাগে চেতনায় সুস্থ্যতা। লাগে চিন্তা ও দর্শনর বল। বাংলাদেশের মানুষের সে নৈতীক বল অতি সামান্যই। তাদের মূল সমস্যাটি তো নৈতীক অসুস্থ্যতার।সে অসুস্থ্যতাটি ছড়িয়ে গেছে সমগ্র দেশ জুড়ে। আওয়ামী লীগ কি আজ হঠাৎ করে চোর-ডাকাত ও খুনিদের দলে পরিণত হয়েছে? এ রোগটি তো দলটির জন্মলগ্ন থেকেই।পাকিস্তান আমলেও কি এ দলের লোকজন চুরিডাকাতি কম করেছে? সরকারি অর্থচুরির অপরাধে ঢাকার আদালতে খোদ শেখ মুজিবের সাস্তি হয়েছিল, যদিও পরে ঢাকার উচ্চ আদালত তাকে ছেড়ে দেয়। বাংলাদেশে প্রতি বছর বহুলক্ষ অপরাধী বহু খুনখারাবী ও চুরিডাকাতি করে। কিন্তু ঢাকার উচ্চআদালত তাদের ক’জনকে শাস্তি দেয়? মুজিবকেও তারা দেয়নি। মুজিব ও তার অনুসারিরা কি পাকিস্তান আমলেও কোন বিরোধী দলকে শান্তিপূর্ণ সভা করতে দিয়েছে? তারা তো সংসদের অভ্যন্তরে ডিপুটি স্পীকার শাহেদ আলী হত্যা করেছে শতাধিক সংসদ সদস্যের সামনে।কিন্তু সে হত্যাকান্ডের অপরাধে কোন আদালত কি কাউকে একদিনেরও জেল দিয়েছে? ১৯৭০ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামি ও নুরুল আমীন সাহেবের পাকিস্তান ডিমোক্রাটিক পার্টিসহ কোন দলকেই মুজিব শান্তিপূর্ণ ভাবে নির্বাচনি জনসভা করতে দেয়নি। সর্বত্র গুন্ডা লেলিয়ে দিয়েছে। নির্বাচনের আগেই তারা রাজপথের রাজনীতির উপর নিজেদের দখলদারি প্রতিষ্ঠা করেছিল। শাপলা চত্বরের নৃশংস ভয়াবহতা নিয়ে তারা হাজির হয়েছিল ১৯৭০ সালে ১৮ই জানুয়ারিতে ঢাকার পল্টন ময়দানে জামায়াতে ইসলামির নির্বাচনি জনসভায়। সেদিন পল্টন ময়দানের পাশের রাস্তাগুলো উপর দাঁডিয়ে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের খুনিরা বৃষ্টির মত পাথর নিক্ষেপ সমাগত জনতার উপর। অবশেষে জনসভার অভ্যন্তরে ঢুকেও তারা মানুষ খুনে নেমেছিল। সেদিন জামায়াতের তিনজন নিরাপদ কর্মীকে তারা শহীদ করেছিল এবং আহত করেছিল বহুশত মানুষকে। অথচ সে নৃশংস হত্যাকান্ডের নিন্দার সামর্থ যে কোন সাধারণ মানুষেরই থাকে। এমন কি শিশুদেরও থাকে না। থাকে না শুধু অসভ্য খুনিদের। অথচ সে হত্যাকান্ডকে নিন্দা করে সে সময়ের বাঙালী বুদ্ধিজীবীগণ কোন বিবৃতি দেয়নি। কেউ রাজপথেও নামেনি। বরং পরের দিন দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক সংবাদ খবর ছেপেছিল জামায়াতের কর্মীরাই সমবেত শ্রোতাদের উপর হামলা চালিয়েছে। এই হলো বিপুল সংখ্যক বাঙালীর বিবেকের মান! বাংলাদেশের সে বিবেকশূণ্য জনগণ ১৯৭০ সালের নির্বাচনে সে নৃশংস খুনিদেরই বিপুলভাবে বিজয়ী করেছিল। মুজিবের শাসনামলেও কি এসব চোর-ডাকাত ও খুনিগণ কম অপরাধ করেছে? মুজিবের রক্ষি বাহিনীর হাতে তিরিশ হাজারের বেশী রাজনৈতিক কর্মী খুন হয়েছে। সিরাজ শিকদারকে খুন করে পার্লামেন্টে দাড়িয়ে কোথায় আজ সিরাজ শিকদার বলে হুংকার শুনিয়েছে। গণতন্ত্র কবরে পাঠিয়ে একদলীয় বাকশালী স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠা করাই যে মুজিবের শিক্ষা ও সে সাথে আওয়ামী লীগের গর্বের ঐতিহ্য -সেটি কি এতই পুরনো বিষয়? তারপরও জনগণ এ খুনি ও স্বৈরাচারি বর্বরদের বিপুল ভোটে বিজয়ী করেছে। সেটি যেমন ১৯৯৬ সালে, তেমনি ২০০৮ সালে। নেকড়ে যেখানে যাই সেখানে তার হিংস্রতা নিয়েই হাজির হয়। তেমনি আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীগণও পারে না স্বৈরাচারি দস্যুতা থেকে দূরে সরতে।

কোন সুস্থ্য মানুষের পা একই গর্তে বার বার পড়ে না। কিন্তু বাংলাদেশীরা জেনে বুঝে সে গর্তে বার বার পা দেয়। এটিই বাংলাদেশীদের বড় ব্যর্থতা। ফলে যে চোর-ডাকাত ও খুনিদের হাতে দেশ আজ অধিকৃত তারা বেড়ে উঠেছে জনগণের সাহায্য-সমর্থণ নিয়েই। তাই নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়, বাংলাদেশের উপর আজ যে অসভ্য বর্বরতা চেপে বসেছে সেটি জনগণের নিজস্ব অর্জন। এটি জনগণের নিজস্ব পাপ। মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে শুধু আওয়ামী নেতাকর্মদেরই তোলা হবে না। জনগণকেও তোলা হবে। জিহাদবিমুখ আলেমদেরও তোলা হবে। মহান আল্লাহতায়ালা শুধু ফিরাউনকে ডুবিয়ে হত্যা করেননি, তার সাথে তারা বহু লক্ষ অনুসারিকেও ডুবিয়ে মেরেছেন। তবে পাপ যত বিশালই হোক,সে পাপমোচনের পথ কোন কালেই বন্ধ হয় না। পাপ মোচনের পথ স্রেফ তাওবা নয়, ঘরে বসে স্রেফ তাসবিহ পাঠও নয়। বরং মহান আল্লাহর পথে তাঁর দ্বীন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কোরবানি। আর সে কোরবানি পেশ করতে হয় ইসলামের শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে জিহাদে। মহান আল্লাহর রহমত ছাড়া বাংলাদেশের বুকে কি শান্তি ও কল্যাণ আসতে পারে? আর সে রহমত তো আসে ঈমানদারের জানমালের বিনিয়োগের পর।   ০৬/০১/২০১৫

                        




ডাকাতি ও গণহত্যায় বুদ্ধিজীবীদের উস্কানি এবং বাংলাদেশে অসভ্যতার নতুন মাত্রা

গণহত্যা বাংলাদেশে

ফিরাউন, হিটলার, স্টালিন বা মুজির নিজে হাতে মানুষ খুন করেছেন -সে প্রমাণ নাই। অথচ মানব ইতিহাসে তারাই অতি জঘন্যতম গণগত্যার নায়ক। হুকুম পালনে অসংখ্য চাকর-বাকর থাকলে কি নিজ হাতে মানুষ খুনের প্রয়োজন পড়ে? বাংলাদেশের আইনেও আদালতে প্রমাণিত কোন খুনিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যার অধিকার কোন ম্যাজিস্টেটের থাকে না। জেলা জজেরও থাকে না। তাঁকেও দেশের হাইকোর্ট থেকে অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু স্বৈরাচারি সরকারগণ মানবহত্যার সে অধিকার তাদের আজ্ঞাবহ অশিক্ষিত দাস-সৈনিকদের দেয়। মুজিব তাই সে অধিকার দিয়েছিলেন রক্ষিবাহিনীর সাধারণ সেপাইদেরকে। মুজিবের এ সেপাইগণ ৩০ হাজারের বেশী মানুষ নির্বিচারে হত্যা করেছিল। দেশে মশামাছি মারলে যেমন বিচার হয়না, তেমনি ৩০ হাজার মানুষ হত্যারও কোন বিচার হয়নি। ফলে হত্যাকারি সেপাইদের মধ্যে কারো গায়ে কোন আঁচড়ও লাগেনি। অথচ কোন সভ্যদেশে এমন হত্যাকান্ড হবে এবং হত্যাকান্ড শেষে তার নায়কগণ বিনা বিচারে পার পেয়ে যাবে সেটি কি ভাবা যায়? কিন্তু বাংলাদেশে সেটিই রীতি।

একই রূপ নিষ্টুরতা বার বার ফিরে আসছে বাংলাদেশে। শেখ হাসিনা তার পিতার গনহত্যার রীতি পদে পদে অনুসরণ করছেন। নির্বিচারে মানবহত্যার সে অধিকার তিনি দিয়েছেন পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবীর সাধারণ সেপাইদের। তাই পক্ষিশিকারের ন্যায় তারা মানব শিকার করছে। ২৮শে ফেব্রেয়ারির একদিনেই তারা ৬০ জনের বেশী নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করেছে। পাকিস্তান আমলের পুরা ২৪ বছরে এর একতৃতীয়াংশ মানুষও কি পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছে? মন্দিরের সেবক পুরোহিতগণ ভক্তদের মাঝে নিজস্বার্থেই দেবদেবীর কেরামতি বাড়ায়। গরুছাগলও তাদের হাতে ভগবানে পরিণত হয়। এমন অজ্ঞতার প্রসারেই তাদের ভক্ত ও উপার্জন বাড়ে। তেমনি স্বৈরাচারি শাসকদের সেবকগণও ইতিহাসের অতি দুর্বৃত্ত শাসককেও মহামানব রূপে পেশ করে। তাই নমরুদ-ফিরাউনের ন্যায় গণহত্যার নায়কদেরকে তারা শুধু শাসক রূপে নয়, ভগবান রূপে পেশ করেছে। তেমনি এক দলীয় প্রয়োজনে মুজিবের অনুসারিরাও গণহত্যার নায়ক বাকশালী এ গণশত্রুকে বঙ্গবন্ধু রূপে প্রতিষ্ঠা দিতে চায়।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে পুলিশ গুলি চালিয়েছে আত্মরক্ষার্থে। অথচ প্রমাণ পেশ করা হয়নি যে, পুলিশের উপর কোথাও একটি গুলি চালানো হয়েছে। জনগণ বড় জোর পুলিশের উপর পাথর ছুঁড়েছে। কিন্তু তা থেকে বাঁচার জন্য পুলিশের মাথায় হেলমেট ছিল, সাঁজায়ো গাড়ি ছিল, কাঁদানে গ্যাস ছিল, রবার বুলেট ছিল এবং সাথে লাঠিও ছিল। কিন্তু সেগুলি ব্যাবহার না করে সরাসরি বুলেট ছুড়ার অধিকার তাদের কে দিল? হত্যা-পাগল সেপাইরাই কেবল এমন একটি হত্যাকান্ড ঘটাতে পারে। এবং সেটি ঘটে সরকারের নির্দেশে। এমন একটা হত্যাকাণ্ডকে গণহত্যা ছাড়া আর কি বলা যেতে পারে? এবং এর সাথে শেখ হাসিনা যে জড়িত তা নিয়েও কি সামান্য সন্দেহ থাকে? এমন হত্যাকে জায়েজ করতে প্রতিটি স্বৈরাচারি সরকারই বাহনা পেশ করে। নিহতদের বিরুদ্ধে আরোপিত করে মিথ্যা অপবাদ। এমন কি হযরত মূসা (আঃ)র ন্যায় আল্লাহর মহান রাসূলকে ফিরাউন রাজদ্রোহী, ষড়যন্ত্রকারি ও যাদুকর রূপে আখ্যায়ীত করেছে। সে মিথ্যাকে জনগণের মাঝে প্রচারের স্বার্থে মুজিবের ন্যায় শেখ হাসিনার হাতেও রয়েছে গৃহপালিত বিশাল মিডিয়া। এরা হত্যাপাগল পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবীর খুনিদের সন্ত্রাসী না বলে সন্ত্রাসী বলছে রাস্তায় মিছিলে নামা নিরস্ত্র মুসল্লিদের। মসজিদে তালা ঝুলানোও এদের কাছে কোন অপরাধ নয়। গণহত্যার এরূপ নায়কদের হাতে যুগে যুগে হত্যা ও নির্যাতনের কলাকৌশলগুলি বিশাল ইন্ডাস্ট্রিতে পরিণত হয়েছে। তাতে উৎপাদিত হয়েছে হত্যা ও নির্যাতনের দানবীয় যন্ত্র। নির্মিত হয়েছে আবি গারিবের ন্যায় বিশাল বিশাল কারাগার। আবিস্কৃত হয়েছে গ্যাসচেম্বার ও পারমাণবিক বোমা।

 

মুজিব-হাসিনার তৃপ্তির ঢেকুর

হিটলার যেমন হাজার হাজার ইহুদীদের গ্যাস চেম্বারে পাঠিয়ে ফুর্তি পেত, তেমনি ফুর্তি পেয়েছে শেখ মুজিব। খুনি মুজিব তো সিরাজ শিকদারকে হত্যা করার পর সংসদে ফুর্তিতে আস্ফালন তুলে বলেছেন, “কোথায় আজ সিরাজ শিকদার? বাকশালী মুজিব একদলীয় শাসন চাপিয়ে বিরোধীদের রাজনৈতীক অধিকারই শুধু হনন করেননি, তাদের প্রাণও হরন করেছেন। তিনি আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের হত্যাপাগল কর্মিদের দিয়ে গড়েছিলেন নৃশংস রক্ষিবাহিনী। সে রক্ষিবাহিনী গ্রাম-গঞ্জ ও অলি-গলিতে গিয়ে রাজনৈতীক বিপক্ষদের খুঁজতো। নিছক ভিন্ন রাজনৈতীক বিশ্বাসের কারণে তাদেরকে হত্যা করতো। মুজিব সে সময় বঙ্গভবনে বসে আনন্দে ঢেকুর গিলতেন। আর আজ একই ভাবে মাত্র কয়েক দিনে শতাধিক লাশ ফেলে আনন্দের ঢেকুর গিলছেন তারই কন্যা শেখ হাসিনা। উল্লাস করছেন তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও অন্যান্য আওয়ামী নেতাকর্মীরা। আদালতের পক্ষ থেকে যখন মাওলানা আবুল কালাম আযাদ ও মাওলানা দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীর ফাঁসির হুকম শোনানো হয়,তখন আনন্দে তারা মিষ্টি বিনরণ করে।

সরকার যে জামায়াত শিবিরের নির্মূলে কতটা বেপরোয়া সেটি বোঝা যায় সরকারর মন্ত্রীদের বক্তৃতা-বিবৃতিতে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আওয়ামী লীগের দলীয় কর্মীদের প্রতি আবেদন জানিয়েছেন জামায়াত-শিবির নির্মূলের। প্রধানমন্ত্রী হাসিনা আবেদন জানিয়েছেন, গ্রামে গ্রামে প্রতিরোধ কমিটি গড়ে তোলার। পত্রিকায় প্রকাশ, ঢাকার মেট্রোপলিটন পুলিশের কর্মকর্তা জনাব বেনজির আহম্মদ পুলিশের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন, জামায়াত-শিবির দেখা মাত্রই গুলির। ফলে পক্ষি-শিকারের ন্যায় মানব শিকারে কোথা থেকে অনুপ্রেরণা পায় সেটি কি বুঝতে বাঁকি থাকে?

 

হত্যা যখন গণহত্যা

চুরি-ডাকাতির ন্যায় হত্যাও প্রতি সমাজে অহরহ ঘটে। প্রশ্ন হলো, সাধারণ হত্যাকান্ড থেকে গণহত্যার পার্থক্য কোথায়? পার্থক্যটি সহজেই অনুমেয়। সাধারণ খুনিরা ব্যক্তির ধর্ম, ভাষা, গায়ের রং বা রাজনীতি দেখে খুন করে না। কোন দল বা জনগোষ্ঠিকে নিমূলের জন্যও খুন করে না। এখানে হত্যাকান্ড ঘটে ব্যক্তিগত ভাবে কিছু পাওয়া বা প্রতিশোধের স্বার্থে। সন্ত্রাসী বা ডাকাতদের হাতে সংঘটিত হত্যা তাই গণহত্যা নয়। কিন্তু যখন হত্যার লক্ষ্য হয় কোন বিশেষ একটি ধর্মীয় বিশ্বাস, বর্ণ, ভাষা ও রাজনীতির মানুষকে বেছে বেছে নির্মূল করা তখন সেটি নিতান্ত গণহত্যা। বনের হিংস্র পশুগণ শিকার ধরে নিছক বাঁচার তাগিদে। পেটের ক্ষুধা তৃপ্ত হলে পশু আর শিকার ধরে না। এমন শিকার ধরার মটিভটি নিছক বেঁচে থাকা, পশুকুলকে নির্মূল করা নয়। তাই হিংস্র পশুদের হামলায় কোন বনই পশুশূন্য হয় না। কিন্তু স্বৈরাচারি শাসকদের হাতে প্রকাণ্ড গণহত্যা ঘটে। বিরান হয় ঘরবাড়ি ও জনপদ। কারণ তাদের লক্ষ্য,নিছক পেটের ক্ষুধা মেটানো নয়, বরং মনের সীমাহীন খায়েশ পূরণ। পেট পানাহারে পূর্ণ হয়, কিন্তু ক্ষুদার্ত মন নিছক পানাহারে তৃপ্ত হয় না। তাদের মন চায় বিপক্ষ দল বা গোষ্ঠির সমূলে নির্মূল। তাই হিটলার শুধু জার্মানীতে বসবাসকারি ইহুদী নেতা ও বুদ্ধিজীবীদের নির্মূল নিয়ে খুশি ছিল না, তার লক্ষ্য ছিল প্রতিটি ইহুদীর মৃত্যূ। সে লক্ষ্যপূরণে হিটলার তাই বড় বড় গ্যাস চেম্বার নির্মাণ করেছিল।

মুজিব ৩০ হাজারের বেশী রাজনৈতীক কর্মীকে হত্যা করেছিল তাদের রাজনীতিকে নির্মূল করার লক্ষ্যে। তাই সেটি ছিল নিরেট গণহত্যা। আর হাসিনা তাঁর পিতার সে পদাংক অনুসরণ করে চলেছেন। হাসিনার লক্ষ্য, দেশে ইসলামপন্থিদের নির্মূল। তাঁর নিজের ও দলের প্রকাশ্য স্লোগান রাজাকার নির্মূলের। মুজিবের হাতে ছিল বিশাল রক্ষিবাহিনী। আর হাসিনা পেয়েছে পুলিশ বাহিনী, র‌্যাব আর বিজিবী। সে সাথে আছে ছাত্রলীগের অস্ত্রধারি ক্যাডার বাহিনী -যারা পুলিশের পাশে চাপাতি ও রিভলবার নিয়ে রাজনৈতিক শত্রু খোঁজে এবং তাদেরকে হত্যা করে। নির্যাতনে ও হত্যায় ছাত্রলীগের সে ক্যাডারগণ এতটাই বেপরোয়া যে কিছুদিন আগে বিশ্বজিত দাসের ন্যায় একজন নিরীহ ব্যক্তিকে দিনেদুপুরে পুলিশের সামনে কুপিয়ে হত্যা করেছে। শাহবাগে যারা সমবেত হয়েছে তাদেরও লক্ষ্য শুধু গোলাম আযম, নিজামী, মোজাহিদ বা সাঈদীর ফাঁসি নয়, তারা চায় প্রতিটি রাজাকারের ফাঁসি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের নামে হাসিনা সরকার যে আদালত বসিয়েছে তা থেকে শাহবাগের সমবেত সন্ত্রাসীরা ফাঁসির হুকুম বাস্তবায়ন ছাড়া অন্য কিছু চায় না। ফাঁসির চেয়ে কম কোন শাস্তিতে তারা রাজি নয়। বিশ্বের বহু দেশে যাবজ্জীবন কারাদন্ডই সর্বোচ্চ শাস্তি। জামায়াত নেতা আব্দুল কাদেরে বিরুদ্ধে আদালত তো সে শাস্তিই শুনিয়েছিল। কিন্তু তারা সে শাস্তিতে খুশি নয়। যেহেতু চায় বিরোধীদের নির্মূল, ফলে চায় ফাঁসি। কারণ নির্মূল তো ফাঁসি বা মৃত্যুদন্ড ছাড়া ঘটেনা।

 

ডাকাতি ও গণহত্যায় বুদ্ধিজীবী

একটি দেশ কখনোই কিছু চোরডাকাত, দুর্বৃত্ত অফিসার,সন্ত্রাসী খুনি বা পতিতার পাপে ধ্বংস হয় না। ধ্বংস হয় দুর্বৃত্ত বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতীক নেতাদের পাপে। কারণ তারাই দেশের ড্রাইভিং সিটে। নমরুদ-ফিরাউনের ন্যায় এরাই আল্লাহর আযাবকে জমিনের উপর নামিয়ে আনে। বাংলাদেশও আজ  এরূপ দুর্বৃত্ত বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতীক নেতাদের হাতে অধিকৃত। বাংলাদেশে বহু মানুষ গুম ও খুন হচ্ছে। যেমন পুলিশ ও র‌্যাবের হাতে,তেমনি রাজনৈতীক ক্যাডারদের হাতে।  এরূপ প্রতিটি খুনের আসল নায়ক পুলিশ বা র‌্যাব যেমন নয়, তেমনি রাজনৈতীক ক্যাডারগণও নয়,বরং মুল কলকাঠিটি নাড়ায় দলের নেতা। এবং সে নেতার সাথে কাজ করে এক পাল রক্তপিপাসু বুদ্ধিজীবী। বস্তুত জাতীয় পর্যায়ে সব সময়ই এমন একটি গণহত্যার পঠভূমিকা নির্মান করে বুদ্ধিজীবগণ। বিপক্ষীয় দলের নেতাকর্মীদের হত্যা করা, তাদের ঘরবাড়ি, দোকান-পাটে ডাকাতি করাকে তারা তাদের লেখনি ও বক্তৃতা-বিবৃতিতে প্রশংসনীয় ও বিরত্বপূর্ণ কর্ম রূপে চিত্রিত করে।

এরূপ বুদ্ধিজীবীগণও যে কতটা বিবেকহীন ও নৃশংস হতে পারে তার নজির দেখা গেছে একাত্তরে। সে হিংস্রতার নৃশংস প্রকাশ ঘটেছিল বিহারীদের বিরুদ্ধে। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গণে স্লোগন উঠেছিল “একটা একটা মাড়ু (অবাঙালী) ধরো, সকালবিকাল নাস্তা করো”। তখন নেশা চেপেছিল খুনের। তাদের সে উস্কানির ফলেই বাঙালীরা সেদিন হাজার হাজার বিহারদের নির্বিচারে হত্যা করেছে, তাদের দোকানপাট, ঘরবাড়ি দখল করেছে এবং শত শত বিহারী নারীদের ধর্ষণও করেছে। সে বীভৎস নৃশংসতার কিছু বিররণ পশ্চিমা বিশ্বের সাংবাদিক ও পশ্চিমবাংলার শর্মিলা বোসের লিখনীতে পাওয়া গেলেও বাংলাদেশের বাঙালী বুদ্ধিজীবীদের লেখনিতে নেই। তাদের লেখনিতে তা নিয়ে এক লাইন বর্ণনাও আসেনি। এবং সে নৃশংসতার বিরুদ্ধে তাদের থেকে সামান্যতম নিন্দাবাদও উঠেনি। এই হলো বাঙালী বুদ্ধিজীবীদের চরিত্র ও বিবেকের মান। তাদের একই রূপ চরিত্র আজ ফুটে উঠেছে শাহবাগের মঞ্চে। এখান তারা নাস্তা করতে চায় জামায়াত শিবিরের কর্মীদের রক্তমাংস দিয়ে। তারা ধ্বনি তুলছে “একটা একটা শিবির ধরো, সকাল বিকাল নাস্তা করো”।

 

লক্ষ্য দেশধ্বংস

আওয়ামী লীগের এজেন্ডা দেশগড়া নয়, বরং দেশধ্বংস। বাংলাদেশে শিল্পকারখানা পরিকল্পিত ভাবে ধ্বংস করা হয়েছিল মুজিব আমলে। এবং সেটি ছিল ভারতের হাতে বাংলাদেশের বাজার তুলে দেয়ার লক্ষ্যে। কারণ ভারতকে এছাড়া খুশি করার কোন সহজ পথ ছিল। ফলে মুজিব আমলে ভারতীয় পণ্যের সয়লাব এসেছিল। সেজন্য আদমজীর ন্যায় বিশ্বের সর্ববৃহৎ পাটকলকে ধ্বংস করাও ভারতীয় চরগণ অপরিহার্য মনে করে। ধ্বংস করা হয়েছিল পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত অন্যান্য শিল্প প্রতিষ্ঠানকে। তখন একের পর এক আগুন দেয়া হয়েছিল পাটের গুদামে। ভারতীয় পণ্যের জন্য খুলে দেয়া হয়েছিল দেশের সীমান্ত। এভাবেই একাত্তরে ভারতের সামরিক অধিকৃতি প্রতিষ্ঠা লাভের পর প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল অর্থনৈতিক অধিকৃতি। শেখ হাসিনাও ময়দানে নেমেছে সে অভিন্ন স্ট্রাটেজী নিয়ে। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের সবচেয়ে বৃহৎ বেসরকারি ব্যাংক। এ ব্যাংকের অর্থায়নে দেশে ৪ হাজারের বেশী শিল্প-কলকারখানা প্রতিষ্টিত হয়েছে। তাই ভারতীয় স্বার্থের সেবকগণ চায়, ইসলামী ব্যাংকের ন্যায় সফল প্রতিষ্ঠানটির আশু ধ্বংস। ইতিমধ্যেই তারা সরকারি ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি কাটা ডাকাতি করেছে। এখন ডাকাতি করতে চায় ইসলামি ব্যাংকের কোষাগারে। ডাকাতি করতে চায় ইবনে সিনা হাসপাতাল, ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিকালস এর ন্যায় ইসলামপন্থিদের প্রতিষ্ঠানগুলি। এমন খুন ও ডাকাত কর্মে উৎসাহ দিচ্ছে দেশের আওয়ামী লীগের বুদ্ধিজীবীগণ।

দেশধ্বংসী এসব বুদ্ধিজীবীদের মন যে কতটা সন্ত্রাসপূর্ণ, এবং বিপক্ষীয়দের সম্পদ লুন্ঠন ও তাদের রক্ত নিয়ে হোলি খেলায় তারা যে কতটা পুলক বোধ করেন তারই চিত্র বেরিয়ে এসেছে শাহবাগের সমাবেশে তাদের দেয়া বক্তৃতায়। এরা পেশাদার খুনি নয়, চোরডাকাতও নয়। কিন্তু তাদের ভূমিকাটি পেশাদার চোরডাকাত ও খুনিদের চেয়েও ভয়ংকর। খুনি ও চোরডাকাতগণ জনসভায় দাঁড়িয়ে মানুষকে হত্যা ও চুরিডাকাতিতে উৎসাহ দেয় না। তারা সে কুকর্মকে নিজেদের মধ্যেই সীমিত রাখে এবং গোপনে করে। কিন্তু আওয়ামী বুদ্ধিজীবীরা সে কুকর্মকে জাতীয় সংস্কৃতিতে পরিণত করতে চায়। শাহবাগে প্রদত্ত বক্তৃতায় তারা যেমন খুনে উৎসাহ দিয়েছেন, তেমনি উৎসাহ দিয়েছেন জামায়াতের গড়া প্রতিষ্ঠানগুলির সম্পদের উপর ডাকাতিতে।সে উৎসাহতে বহু স্থানে ইসলামী ব্যাংকের উপর হামলা হয়েছে। ইসলামপন্থিদের প্রতিষ্ঠিত বহু হাসপাতালেও বিপুল ভাংচুর হয়েছে।

 

রক্তপীপাসু বুদ্ধিজীবী

আওয়ামী বুদ্ধিজীবীদের মূল আগ্রহটিও দেশগড়া নয়,বরং দেশধ্বংস। সে লক্ষ্যে বুদ্ধিজীবী নামধারি এসব আওয়ামী দুর্বৃত্তগণ যে কতটা উগ্র সে চিত্রটি ফুটে উঠেছে দৈনিক সংগ্রামে ৭/৩/১৩ তারিখে ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিমের“শাহবাগের বুদ্ধিজীবীরা” শিরোনামে রচিত একটি নিবন্ধে। সে নিবন্ধ থেকে কিছু উদ্ধৃতি দেয়া যাকঃ “সমাবেশে আওয়ামীপন্থী লেখক ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল ও ড. আনোয়ার হোসেন সবচেয়ে বেশি উস্কানিমূলক বক্তব্য দেন। “জয় বাংলা” বলে বক্তব্য শুরু করে মুহাম্মদ জাফর ইকবাল বলেন,“শিবিরকে প্রতিহত করতে আমাদের রাস্তায় লাঠিসোটা নিয়ে নামতে হবে।তোমরা আজ জেগে উঠেছো, বিজয় হবেই হবে।” জামায়াত-শিবিরের সদস্যদের সমাজ,রাষ্ট্র ও সংবাদ মাধ্যমের সব ক্ষেত্র থেকে বর্জনের মাধ্যমে নতুন আন্দোলন গড়ে তোলার আহবান জানান তিনি।জাহাঙ্গির নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড.আনোয়ার হোসেন তো হামলার লক্ষ্যকে শুধু জামায়াতের নির্মূলে সীমিত না রেখে বিএনপির নির্মূলেও উস্কানি দিয়েছেন। সেদিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন,‘জামায়াতের বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যারা ইন্ধন জুগিয়েছে,তাদেরও বিচারের সময় এসে গেছে।জামায়াত-শিবিরকে ক্ষমা করার আর সময় নেই।জামায়াত-শিবির নিয়ন্ত্রিত সব প্রতিষ্ঠানকে বন্ধ করে দিতে হবে। জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে।” ডা.প্রাণ গোপাল দত্ত বলেন,‘এদেশের মাটিতে জামায়াত-শিবির ক্যানসার।একে প্রতিহত করতে না পারলে কেউ নিরাপদে থাকবে না। তাই এদের প্রতিহত করতে হবে। বাংলার মাটি থেকে জামায়াত-শিবিরকে চিরতরে উৎখাত করতে হবে।’ আর উৎখাত তো শুধু নির্যাতন ও তাদের সম্পদ ডাকাতিতে হয় না। এজন্য তাদের হত্যা করা চাই। তাই সে হত্যাকর্মটি যেমন জাফর ইকবাল ও আনোয়ার হোসেন চান, তেমনি চান ডাঃ প্রাণ গোপাল দত্ত। প্রশ্ন হলো,হত্যাপাগল নাযী বাহিনীর খুনিদের মুখে ইহুদীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত আক্রোশ কি এর চেয়ে ভিন্নতর ছিল?

যে কোন সভ্যদেশে গণহত্যায় এমন উস্কানিমূলক বক্তৃতা দেয়া নিতান্তই ফৌজদারি অপরাধ। সে অপরাধে নিশ্চয়ই তাদের শাস্তি হতো। কিন্তু ডাকাত পাড়ায় ডাকাতি ও খুনের উস্কানি দেয়া কোন অপরাধ নয়। বরং সেটি প্রশংসীন কাজ। নইলে ডাকাতপাড়ায় নতুন ডাকাত গড়ে উঠবে কীরূপে? ফলে বাংলাদেশে সে অপরাধে কাউকে গ্রেফতার করে আদালতে তোলা হয়না, শাস্তিও হয় না। সরকার দেশকে একটি ডাকাত-অধিকৃত জনপদে পরিণত করেছে। তাই এসব অপরাধী বুদ্ধিজীবীদের কোন শাস্তি হয়নি। বরং তারা স্ব স্ব পদে অধিষ্ঠিত আছেন। সমাবেশে আওয়ামী লীগ-বামপন্থী লেখক, বুদ্ধিজীবীদের নেতৃত্বে গণ-শপথ পাঠ করানো হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. চন্দ্রনাথ পোদ্দার বলেন, সমাবেশ থেকে যে কোনো একদিন গিয়ে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে অবস্থিত আমার দেশ কার্যালয় গুঁড়িয়ে দেয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। আওয়ামীপন্থী বুদ্ধিজীবী ও বাংলা একাডেমীর সভাপতি অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক রফিক উল্লাহ খানসহ আরও অনেকের বক্তৃতাতেও ছিল ফ্যাসিবাদ ও বাকশালের পদধ্বনি। সমাবেশে উচ্চারিত গানের মধ্যে ছিল, ‘একটা একটা শিবির ধর, সকাল বিকাল জবাই কর’, ‘জামায়াতের আস্তানা গুড়িয়ে দাও গুঁড়িয়ে দাও’, ‘জামায়াতের আস্তানা দখল কর, দখল কর’, ‘সাম্প্রদায়িকতার আস্তানা, ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’, ‘জ্বালো জ্বালো আগুন জ্বালো, শিবির ধরে জবাই করো’, ‘শিবির ধরো ধরো, সকাল বিকাল জবাই কর। অধিকাংশ  গানের মূল কথা ছিল জামায়াতে ইসলামী নেতাদের সম্পত্তি দখল করা এবং দলটির নেতা-কর্মীদের হত্যা বা জবাই করা।”

 

নাজী অধিকৃত বাংলাদেশ

ড.ইনায়েত রহিত নামের একজন প্রবাসী বাংলাদেশী বাংলাদেশের বর্তমান চিত্রটি তুলে ধরতে গিয়ে লিখেছেন,“ Bangladesh is going the way that Germany did in 1929-30-31-32-33. Please read the history of the Nazi party. I can see the exact reflection in Bangladesh. I can see Adolf Hitler, Joseph Goebbels, Herr Ribbentrop, Hermann Goering…….match them to the players in Dhaka…..you will find exact duplicates. They first chased the top Jewish hierarchy, who they blamed for defeat of World War I, and then expanded it to include every Jew…man, woman, child for their misfortune. First they looted their property, banned their clubs; then they went after their blood. Finally it was every Jew…man, woman and child who were to be rounded up and butchered. Blame was spread to include the children, and even unborn children, so Hitler decided on the “final solution”, so future generations would not be born. When I hear the shrill slogans from Dhaka to kill the children of “Razakars”, even their grandchildren, and even future generations to come, I shiver…..I get the cold feeling in my spinal cord, I cry….is this what is coming ? Are the followers of Prophet Muhammad going to face the same cruelty that the followers of Prophet  Moses faced less than a hundred years ago. Are these new Aryans ( the superior Bakshal race) as ruthless as their compatriots ( Nazis) of a couple of generations ago ?

প্রখ্যাত ব্যারিষ্টার Toby M. Cadman গত ৫মার্চ ২০১৩ তারিখে তার সাম্প্রতিক বাংলাদেশ সফরের অভিজ্ঞতার উপর একটি নিবন্ধ লিখেছেন। সে নিবন্ধে তিনি বাংলাদেশী বুদ্ধিজীবীদের একটি চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি আর্ন্তজাতিক মানবতাবিরোধীতা ট্রাইবুনাল (আইসিটি)সর্ম্পকে তিনি  লিখেছেন, All those accused of war crimes must be convicted and duly executed. Nothing less will suffice. One must ask what therefore is the point in a trial where the only acceptable result is execution. One is reminded of the words of Justice Jackson, Chief Prosecutor of the International Military Tribunal, Nuremberg who stated: “If you are determined to execute a man in any case there is no occasion for a trial. The world yields no respect to courts that are merely organized to convict.

To this point, the Prime Minister, Sheikh Hasina Wajed, has been reported as saying in Parliament that she would talk to the judges to convince them to take the sentiments of the protesters into account in formulating their decisions. It is notable that one of the first judgments issued by the Tribunal referred to the ‘will of the people’ in reaching its decision clearly demonstrating the emotive manner in which these trials are now being conducted.

On 28 February 2013, the third accused, Maulana Delwar Hossain Sayedee, was convicted and sentenced to death following a trial that was characterized by prosecutorial and judicial misconduct, witness perjury, witness abduction and a flagrant denial of basic human rights standards. The call for death echoed by the Shahbagh demonstrators has seemingly dictated the course of events unfolding in the Tribunal in an atmosphere where defence witnesses are now too afraid to appear and where the judges have now been swayed by mob, anti-Jamaat sentiment.” The big question is what would have been the response of the Shahbagh demonstrators had Sayedee not received the death sentence. It is clear that the Tribunal Judges were under such pressure to respond to the public calls for blood that, had they not responded as such, it is not inconceivable that it could have been their own blood spilt on Shahbagh.”

 

শাহবাগের পজিটিভ দিক

নর্দমার মশামাছি ও কীটগুলো কখনোই তাদের উপস্থিতি গোপন রাখতে পারে না। তাদের সামনে দুর্গন্ধময় আবর্জনা ফেললেই তারা স্বমুর্তিতে হাজির হয়। শাহবাগের মোড়ে ইসলামের শত্রু নাস্তিক-মুরতাদদের সমাবেশ শুরু হলে এসব আওয়ামী বুদ্ধিজীবীগণও নিজ ঘরে নীরবে বসে থাকতে পারেনি। তারা নিজ নিজ চরিত্র নিয়ে শাহবাগে হাজির হয়েছে। আল্লাহপাক তো এভাবেই সমাজের ভয়ানক দুর্বৃত্তদের সমাজে পরিচয় করিয়ে দেন। বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যায় বিদ্যাশিক্ষার গুরত্বপূর্ণ অঙ্গণেও ইসলামের কতবড় ভয়ংকর শত্রুগুলো বসে আসে সেটিও আল্লাহতায়ালা দুচোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন। শাহবাগের আন্দোলনের এটিই পজিটিভ দিক। ইসলামের রক্তপিপাসু খুনিদের তাই আর হ্যারিকেন লাগিয়ে নগরে বন্দরে খোঁজাখোঁজির প্রয়োজন নেই। তারা নিজেরাই নিজেদের প্রকৃত পরিচয়টি স্বশরীরে জনসম্মুখে তুলে ধরেছে। পানি এতই ঘোলা করা হয়েছে যে বড় বড় মাছ গুলো এখন ভেসে উঠেছে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে যারা ভাবেন তাদের জন্য এটি এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলাদেশে রোগ আর এখন লুকানো বিষয় নয়। রোগের জীবানূগুলো এখন রাজ পথে জোয়ার সৃষ্টি করেছে। কারা দেশের শত্রু আর কারা মিত্র সেটি এখন সুস্পষ্ট। এখন প্রয়োজন,রোগমুক্তির লক্ষ্যে এদের থেকে নিষ্কৃতির লড়াই।

 

চোরডাকাত ও খুনির সংস্কৃতি শাহবাগে

ডাকাতি করা, লুটতরাজ করা এবং মানুষ খুন করা যে কোন সমাজেই অতি গুরুতর অপরাধ। কোন সভ্য সাধারণ মানুষ এমন অপরাধ কর্মে নামে না। এটিই সভ্য সমাজের অতি ন্যূনতম মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি। এমন সভ্য সংস্কৃতির নির্মাণে বছরের পর বছর ধর্মপালন ও জ্ঞানচর্চার প্রয়োজন হয়। তাই ধর্মহীন ও জ্ঞানচর্চাহীন বনেজঙ্গলে তাই সভ্যতর মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি গড়ে উঠে না। পাপুয়া নিউগিনি, আন্দামান বা নিকোবরের বন্য মানুষগুলো তাই জীবন যাপনে পশুকুল থেকে সামান্যই ভিন্ন। কারণ তাদের মাঝে ধর্ম বা জ্ঞানচর্চার প্রবেশ ঘটেনি। ডাকাত-পাড়াতেও সে সংস্কৃতি থাকে না। সেখানে বরং ডাকাতি, খুন ও ধর্ষণও নিন্দনীয় না হয়ে বরং তেমন বর্বর কাজে লাগাতর উৎসাহ দেয়া হয়। ডাকাতপাড়ায় এ রোগটির মূল কারণঃ ধর্মীয় শিক্ষা ও উন্নত নৈতীক জ্ঞান না থাকা। অথচ ডাকাতপাড়ার সে সংস্কৃতি নেমে এসেছে ঢাকার শাহবাগের সমাবেশে। সে সমাবেশ থেকে তাই জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের জবাই করায় উৎসাহ দেয়া হচেছ। স্লোগান উঠেছে তাদের প্রতিষ্ঠানগুলির উপর ডাকাতির। স্লোগান দেয়া হচ্ছে সকল ইসলামপন্থিদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার। অথচ সে স্লোগান গুলো ডাকাতপাড়ার ডাকাত বা পতিতাপল্লির পতিতাও দিচ্ছে না। বরং দিচ্ছে সেখানে জমা হওয়া কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার ছাত্রশিক্ষক। দেশের বুদ্ধিজীবীগণ। বিদ্যাশিক্ষার নামের দেশে কি পরিমাণ ঘৃনা, অশিক্ষা ও কুশিক্ষা ছড়ানো হয়েছে শাহবাগের আন্দোলন হলো তারই উদাহরণ। উনানে বসিয়ে একটু তাপ দিলে পানির আবর্জনা যেমন ফেনা রূপে ভেসে উঠে, তেমনি শাহবাগীদের আন্দোলনে ভেসে উঠছে সমাজের আবর্জনা।

 

গভীরতর নৈতীক পচন

বাংলাদেশে নৈতীক পচনটি যে কতটা গভীরে ছড়িয়ে পড়েছে তার কিছু উদাহরণ দেয়া যাক। কোন সভ্যসমাজে কি কখনো এ স্লোগান উঠে যে, বিচারে রায় হতে হবে একমাত্র মৃত্যুদন্ড? অথচ বাংলাদেশে শুধু সে দাবীই উঠছে না, বরং হুমকি দেয়া হচ্ছে অন্য কোন রায় ঘোষিত হলে তা মানা হবে না। বলা হচ্ছে, ফাঁসির হুকুম না হলে রাজপথের আন্দোলন থামানো হবে না। এমন দাবিতে শাহবাগের আন্দোলনকারিগণ একা নয়, তাদের সে দাবীর প্রতি সমর্থন জানাতে শাহবাগে ছুটে গেছেন ড.কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার রফিকুল হক ও আসিফ নজরুলের মত ব্যক্তিবর্গ। ছুটে গেছেন বহু প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি। বাংলাদেশের পচন যে গত গভীর সেটি কি বুঝতে এরপরও বাঁকি থাকে? বাংলাদেশ অধিকৃত শুধু এক স্বৈরাচারি শাসকগোষ্ঠির হাতেই নয়, নিদারুন জিম্মি হয়ে পড়েছে নৈতিকতাহীন একপাল বু্দ্ধিজীবীদের হাতেও। আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে শাহবাগীদের বিদ্রোহ, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তাদের ফাঁসির দাবি এবং সে দাবির প্রতি এসব বুদ্ধিজীবীদের একাত্মতার এরূপ খবর যতই বিশ্বব্যাপী প্রচার পাচ্ছে ততই ধিক্কার উঠছে বাঙালীর নৈতীক পচন নিয়ে। এখন বিশ্ববাসী বুঝতে পারছে, একমাত্র এমন এক গভীর পচন নিয়েই একটি জাতি বিশ্বের ২০০টির বেশী দেশকে হারিয়ে দুর্বৃত্ত কর্মে পর পর ৫বার প্রথম হতে পারে। নৈতীক পচনটি শুধু দেশের চোর-ডাকাত, পতিতা, ঘুষখোর অফিসার, ডেস্টিনী-হলমার্কের ন্যায় কোম্পানীর কর্মকর্তাদেরকেই আক্রান্ত করেনি, চরম ভাবে আক্রান্ত করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর, আদালতের বিচারক, আইনবিদ, লেখক, বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদদেরও। শাহবাগীদের আন্দোলনের ফলে এদের ভদ্র লেবাস দেহ থেকে খুলে পড়েছে। বিশ্ববাসীর সামনে তারা আজ উলঙ্গ।

 

বাড়ছে বিশ্বব্যাপী অপমান

বিচারের রায় শুধু মৃত্যুদন্ড হলে আদালত বসানো দরকার কি? সে সমাজে তো দরকার শুধু এক পাল হত্যাপাগল জল্লাদের। সে জল্লাদদেরই বিপুল সমাবেশ হয়েছে শাহবাগে। সে প্রশ্নটি রেখেছেন বিলেতে প্রখ্যাত ব্যারিস্টার টবি ক্যাডমান। একই কারণে বিস্মিত হয়েছেন বিশ্বের প্রতিটি বিবেকমান ব্যক্তি। ট্রাইবুনাল বাতিলের বিরুদ্ধে শত শত মানুষ প্রতিবাদে রাজপথে নেমেছে লন্ডন, কায়রো, ইস্তাম্বুল, কলকাতা, কূয়ালামপুর ও টোকিওসহ বিশ্বের বহু নগরীতে। উদ্বেগ বেড়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারে। পৃথিবীপৃষ্ঠে বিচারের নামে এতবড় হত্যাকান্ড আধুনিক কালে হলে তাতে শুধু বাঙালীদেরও অপমান বাড়বে না, অপমান বাড়বে সমগ্র মানব জাতির,বিশেষ করে মুসলমানদের। বাঙালী মুসলমানগণ ইতিমধ্যেই মুসলিম ইতিহাসে বহু অপকর্মে রেকর্ড গড়েছে। সেটি যেমন একাত্তরে মুসলিম ভূমিতে বিশাল কাফের বাহিনী আহবান করে,তেমনি মুজিবামলে তলাহীন ভিক্ষার ঝুলি এবং নব্বইয়ের দশকে হাসিনার প্রথমবার ক্ষমতায় আসায় দুর্নীতিতে বিশ্বে প্রথম হওয়ার মধ্য দিয়ে।এখন বাংলাদেশের ইতিহাসে আরেক কলংক যোগ হতে যাচ্ছে। সেটি বিচারের নামে প্রতিটি রাজাকারের ফাঁসির হুকুমের নামে আরেক গণহত্যার।ফাঁসির রায় আদায়ে আদালতের উপর প্রচন্ড চাপসৃষ্টির উদ্দেশ্যে রাজপথে নামানো হয়েছে দলীয় ক্যাডারদের।বিচারকদের তারা জল্লাদ রূপে ব্যবহার করতে চায়। ক্যাডারদের দাবী,আদালতে ফাঁসির হুকুম না হলে তারা মাঠ ছাড়ছে না। সরকার তাদের শুধু উৎসাহ ও নিরাপত্তাই দিচ্ছে না,লাগাতর অর্থ ও খাদ্যপানীও জোগাচ্ছে। অথচ এরূপ পাইকারি ফাঁসির হুকুম নুরেমবার্গের আদালতে নাজীদের যেমন হয়নি,হেগের আন্তর্জাতিক আদালতে কোন যুদ্ধাপরাধীরও হয়নি। অথচ বাংলাদেশে এমন দাবি উঠছে ১৬ কোটি দেশবাসীর নামে।এমন দাবিতে বিশ্ববাসীর সামনে নিজেদের কদর্যতা ও অপমান ছাড়া আর কি অর্জিত হতে পারে? বাংলাদেশের বিরুদ্ধে এরচেয়ে বড় অপরাধই বা কি হতে পারে? বাংলাদেশের জনগণ কি এরূপ কদর্য অপরাধীদের বরদাশত করতে থাকবে?

 

বাঙালী মুসলমানের ব্যর্থতা

ইসলামে ইবাদত শুধু নামায-রোযা,হজ-যাকাত আদায় নয়,বরং অতি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের নির্মূল। আল্লাহর এ হুকুম পালনই মুসলমানের জীবনে মূল মিশন।সে মিশন পালনেই মুসলমানের জীবনে জিহাদ শুরু হয়।সে জিহাদের বরকতেই তারা পরিণত হয় শ্রেষ্ঠ মানবে। এবং নির্মিত হয় শ্রেষ্ঠতম সভ্যতা।সেটিই পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে,“তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত,তোমাদের আবির্ভাব হয়েছে মানবজাতির জন্য,তোমরা নির্দেশ দাও সৎকর্মের,আর নিষেধ করো অসৎকাজের,এবং বিশ্বাস করো আল্লাহকে।”–সুরা আল-ইমরান,আয়াত ১১০।আরো বলা হয়েছে,“তোমাদের মধ্যে অবশ্যই একটি দল থাকতে হবে যারা কল্যাণের দিকে মানুষকে আহবান করবে,এবং সৎকাজের নির্দেশ দিবে ও অসৎ কাজের নিষেধ করবে।এবং তারাই সফলকাম।”-সুরা আল-ইমরান,আয়াত ১০৪।যে মুসলমানের জীবনে আল্লাহ-নির্দেশিত এ মিশন নেই এবং সে মিশন পালনে জিহাদই নাই –তারা কি বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জাতি হতে পারে? তারা বরং নীচে নামায় বা দুর্বৃত্তিতে বিশ্বরেকর্ড গড়বে সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? বাংলাদেশের কলংক বাড়াচ্ছে একাত্তরের রাজাকারগণ নয়,বরং আজকের ক্ষমতাসীন এ দুর্বৃত্তরাই। বাংলাদেশে নামায-রোযা,মসজিদ-মাদ্রাসা বাড়লেও ১৫ কোটি মুসলমানের দেশটিতে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা যেমন বাড়েনি,অন্যায়ের তান্ডবও কমেনি।বরং সমগ্র দেশে অধিকৃত হয়ে আছে অতি দুর্বৃত্ত অপরাধিদের হাতে।বাংলাদেশের মুসলমানদের এর চেয়ে বড় ব্যর্থতা আর কি হতে পারে? এ ব্যর্থতা নিয়ে মহান আল্লাহর দরবারেই বা কি জবাব দিবে? ১০/৩/২০১৩

 




ছাত্রশিবিবের বিজয় মিছিল ও জামায়াতের গঠনতন্ত্র সংশোধন

এ মিছিল কাদের বিজয়ে?

পত্রিকায় প্রকাশ,গত ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশে ইসলামি ছাত্রশিবির বিশাল বিজয় মিছিল বের করেছে। এটি এক বিস্ময়। এ মিছিল কোন বিজয়ের? ১৬ই ডিসেম্বরে বিজয়ী হয়েছিল সেকুলারিস্ট, ন্যাশনালিস্ট, সোসালিস্টসহ ইসলামের বিপক্ষ শক্তি। বিজয়ী হয়েছিল আগ্রাসী ভারত। পূর্ব সীমান্তে ভারতীয় বাহিনীর বিজয় এবং পাকিস্তান ভাঙ্গার আনন্দে দিল্লিতে ভারতীয় পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধি সেদিন অতিউল্লাসে বলেছিলেন, “হাজার সাল কি বদলা লে লিয়া” অর্থঃ “হাজার বছরের প্রতিশোধ নিয়ে নিলাম”।আজও ভারতে সে হাজার বছরের প্রতিশোধ নেয়ার আনন্দে উৎসব হয়। বাংলাদেশের মুসলমানগণ কি ভারতের সে প্রতিশোধ নেয়ার আনন্দে নিজেরাও উৎসব করবে? সেদিনটি ছিল ঈমানদারদের অশ্রুবর্ষণের দিন। শুধু বাংলাতে নয়,শুধু পাকিস্তান বা ভারতের মুসলমানগণই নয়, বরং সেদিন হৃদয় শোকাহত হয়েছিল সমগ্র বিশ্বের মুসলমানগণ। ঈমানদার মাত্রই তো মুসলমানদের একতা চায়, চায় মুসলমানগণ আবার বিশ্বমাঝে মাথা উঁচুকরে দাঁড়াক। নিজেদের বিভক্তি সেটি অসম্ভব করে। মুসলিম দেশের পরাজয় ও বিভক্ত সেজন্যই প্রতিটি মু’মিন ব্যক্তিকে শোকাহত করে।

মুসলমানদের বিভক্তি তো একমাত্র কাফের ও তাদের মিত্রদেরই উৎসব মুখর করতে পারে, কোন ঈমানদারকে নয়। কাফেরদের ষড়যন্ত্রে আফ্রিকার সর্ববৃহৎ দেশ সূদানের ভেঙ্গে যাওয়াতে কোন মুসলিমই খুশি হয়নি। পাকিস্তান তো সূদানের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পাকিস্তান ভাঙ্গার সে স্মৃতি নিয়ে যেসব প্রবীন  মুসলমান বিশ্বের নানা দেশে এখনও জীবিত আছেন তাদেরকে জিজ্ঞেস করলে সে বিষাদের কথা আজও  জানা যাবে। (নিবদ্ধের লেখক সেটি জেনেছেন)। একাত্তরের এ বিশেষ দিনটিতেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুসলিম দেশটি ভেঙ্গে যায়। এবং সেটি কাফের শক্তির হাতে,যারা শুরুতেই দেশটির প্রতিষ্ঠার প্রবল বিরোধীতা করেছিল। মুসলমানরা আজ প্রায়  দেড়শত কোটি। তারা বিভক্ত ৫৫টির বেশী মুসলিম দেশে বিভক্ত। সে বিভক্তি নিয়ে আজ নানা মানচিত্র, নানা পতাকা, নানা সরকার। মুসলমানদের পচন আজ এ পর্যায়ে পৌঁছেছে যে,সে বিভক্তি নিয়ে আজ দেশে দেশে উৎসবও হচ্ছে! অথচ প্রকৃত মুসলমানদের মাঝে তো এ নিয়ে প্রতিদিন মাতম হওয়া উচিত। বিভ্ক্তির অর্থই তো আল্লাহর অবাধ্যতা, তা নিয়ে আবার উৎসব?

মুসলমানদের আজকের সবচেয়ে বড় দৈন্যতা সম্পদের নয়, জনসংখ্যার কমতিও নয়। সেটি তো একতার। বিভক্তির কারণেই মুসলমানগণ আজ শক্তিহীন। নিছক মসজিদ-মাদ্রাসা, রাস্তাঘাট, কলকারখানা বা ইসলামি সংগঠনের ক্যাডার বাড়িয়ে কি সে দৈন্যতার সমাধান হবে? ইসলামি ছাত্র শিবিরের নেতৃবৃন্দ কি এ সমস্যাটি বুঝে? কোমড়ভাঙ্গা মানুষকে বেশী বেশী খাইয়ে তার মেদ বাড়ানো যায়, কিন্তু সে কি কখনোই আর নিজ পায়ে খাড়া হতে পারে? মুসলমানদের খণ্ডিত ভূগোল কোমড় ভেঙ্গে দিয়েছে মুসলিম উম্মাহর  এজন্যই তো দেশে দেশে এমন বিভক্তির কাজে কাফের শক্তির এত বিনিয়োগ। এক আরব ভূখন্ড ভেঙ্গে ২২টি আরব রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে তো সাম্রাজ্যবাদী শত্রু শক্তি। মুসলমানদের কাজ কি শত্রুর গড়া সে খণ্ডিত মানচিত্র নিয়ে উৎসব করা?

মুসলমানকে শুধু নামায-রোযা, হজ-যাকাত, মসজিদ-মাদ্রাসা ও  দাওয়াতী কাজ নিয়ে বাঁচলে চলে না। দেশের ভূগোলও বাড়াতে হয়। নইলে রাজনৈতীক শক্তি বাড়ে না। অতীতের মুসলিম দেশের ভূগোল বাড়াতে তাই বহু অর্থ ও বহু রক্ত ব্যয় হয়েছে। কুয়েত ও কাতারের মাথাপিছু আয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে অধিক। সেটি যদি আরো শত গুণ বৃদ্ধি পায় তবুও কি বিশ্ব রাজনীতিতে এ দেশ দুটির কোন গুরুত্ব বাড়বে? ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান, সিরিয়া এবং মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যা কিছু হচ্ছে সে ঘটনাবলি প্রভাবিত করতে তাদের কি কোন সামর্থ বাড়বে? বাড়বে না। কারণ দেশ দুটির সামর্থ বন্দী হয়ে আছে ক্ষুদ্র ভূগোলে। বাংলাদেশেরও একই অবস্থা। নবীজী (সাঃ) তাই ইসলামকে  শুধু আরবভূখন্ডে সীমাবদ্ধ রাখার বিরোধী ছিলেন। সাহাবাদেরকে তিনি রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানি কন্সটান্টিনোপল দখলের নসিহত করেছিলেন। আজ সেটি ইস্তাম্বুল। সে জামানায় সে নসিহতটি ছিল, আজকের ওয়াশিংটন দখলের নসিহত। কিন্তু মুসলমানগণ নবীজী (সাঃ)র সে নসিহত পুরা করে ছেড়েছেন। নবীজী(সাঃ) ও তাঁর অনুসারি মুসলমানেরা কতটা স্ট্রাটেজিক চিন্তুা করতেন এ হলো তার নমুনা।  উপমহাদেশের নানা ভাষাভাষি মুসলমানেরা সে স্ট্রাটেজিক চিন্তা নিয়েও বৃহৎ ভূগোলের পাকিস্তান গড়েছিলেন। কিন্তু প্রকল্পের শুরু থেকেই চরম বিরোধী ছিল ভারত। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর তারা সে প্রকল্পে সফল হয়।

শিবিরের নেতাকর্মীরা ইসলামি আন্দোলনের কথা বলে, জিহাদের কথা বলে, ইসলামের প্রতিষ্ঠার কথাও বলে। কিন্তু ১৬ ডিসেম্বরের বিজয় মিছিলটি কিসের নমুনা? বাংলার খাজা নাজিমুদ্দিন, শহীদ সহরোয়ার্দী, মাওলানা আকরাম খাঁ, নূরুল আমীন, মৌলবী তমিজুদ্দীন, আব্দুস সবুর খান, ফজলুল কাদের চৌধুরি, শাহ আজিজুর রহমান, মাহমুদ আলী, আব্দুর রহমান বিশ্বাস –এদের কেউই ইসলামের আন্দোলনের নেতাকর্মী ছিলেন না। তারা মাওলানা মওদূদী, শহীদ কুতুব, হাসানূল বান্নাহর কেতাব পড়েননি। অথচ তারা নিজেদের ভাষা, ক্ষুদ্র ভোগাল,জলবায়ু, নিজেদের খাদ্য ও পোষাক-পরিচ্ছদ নিয়ে যে পরিচয় সেটি নিয়ে গর্ব না করে প্যান-ইসলামিক চেতনা নিয়ে রাজনীতি করেছেন। পাঞ্জাবী, সিন্ধি, পাঠান, বেলুচ, বিহারী –এরূপ নানা অবাঙালীদের সাথে মিলে বিশাল পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। অথচ ছাত্রশিবির ভেসে গেল বাঙালী বা বাংলাদেশী জাতিয়াতবাদের স্রোতে? মুসলমানদের কাজ তো স্রোতে ভাসা নয়, উজানে চলা। স্রোতের বিপরীতে স্রোত সৃষ্টি করা। আব্দুস সবুর খান, শাহ আজিজুর রহমান, আব্দুর রহমান বিশ্বাস, আব্দুল আলীমের ন্যায় নেতারা বিজয় মিছিল না করেও নির্বাচনে বার বার জিতেছেন। ১৯৭১য়ের ১৬ই ডিসেম্বর কাদের বিজয় এবং এদিনে কারা শহীদ হয়েছিল সে হুশ কি তাদের আছে? আজ  যে সন্ত্রাসী পক্ষের হাতে শিবির কর্মিরা শহীদ হচ্ছে, তাদের হাতেই একাত্তরে ইসলামী আন্দোলনের হাজার হাজার কর্মী শহীদ হয়েছেন। সে শহীদদের নির্যাতিত চেহারাগুলো কি তাদের স্মৃতীতে একবারও ভাসে না? ভাসলে তারা আজ বিজয় উৎসব করে কীরূপে? কতো নিষ্ঠুর নির্যাতনের মধ্য দিয়েই না তাদের হত্যা করা হয়েছিল। কথা হলো, বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতিতে বাঁচার জন্য কি জরুরী হয়ে পড়েছিল বিজয় মিছিল করতেই হবে? তারা কি মনে করে নিয়েছে, এ বিজয় মিছিল করলেই আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের কাছে তাদের গ্রহণ যোগ্যতা বাড়বে?

 

হিকমত না আত্মসমর্পণ?

বুদ্ধিবৃত্তিক ও আদর্শিক বিচ্যুতি শুধু যে শিবিবের মধ্যে -তা নয়। আরো উপরে। সম্প্রতি নির্বাচনি কমিশনের কাছে জামায়াতে ইসলামীকে রেজিস্ট্রী করার প্রয়োজনে দলটির গঠনতন্ত্র থেকে আল্লাহর আইন বাস্তবায়নের অঙ্গিকারটি আস্তাকুরে ফেলে দিয়েছে। কথা হলো,দল তো বাঁচে একটি আদর্শকে বাস্তবায়ীত করার লক্ষ্যে। মুসলমান রাজনৈতীক দল গড়ে আল্লাহর বিধানকে বিজয়ী করতে তথা শরিয়তের প্রতিষ্ঠা করতে। ইসলামি দল তো এই একটি মাত্র কারণেই অন্যান্য সেক্যুলার দল থেকে ভিন্ন। সে অঙ্গিকার আস্তাকুরে ফেললে আর রাজনীতি এবং দলগড়ার প্রয়োজনটাই কি? এটি হিকমত না আত্মসমর্পণ? দলটির গঠনতন্ত্র থেকে আল্লাহর আইন বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি আস্তাকুরে ছুড়ে না ফেলার কারণে জামায়াত যদি নিষিদ্ধও হতো বা নেতাদের জেলে যেতে হতো তবুও তো আল্লাহর আইনের উপর তাদের ঈমান বেঁচে যেত। মহান আল্লাহতায়ালা থেকে তখন পরকালে পুরস্কারও পেতেন। বাংলাদেশের ইসলামপ্রেমি মানুষের স্মৃতিতেও তাঁরা যুগ যুগ বেঁচে থাকতেন আল্লাহর শরিয়তি বিধানের প্রতি গভীর অঙ্গিকারের কারণে। এখন হয়তো তাদের দল বেঁচে যাবে, তারা নিজেরাও হয়তো বেঁচে যাবেন। কিন্তু তারা যা করলেন তাতে আল্লাহর শরিয়তের প্রতি তাদের অঙ্গিকার তো বাঁচলো না। আদর্শ বিসর্জন দিয়ে দল বাঁচানোর চেষ্টা কি শুধু এমপি হওয়া ও মন্ত্রী হওয়ার স্বার্থে? মুসলমানের রাজনীতি তো পরকালমুখি,এমন রাজনীতিতে গুরুত্ব পায় মহান আল্লাহতায়ালার কাছে কোনটি প্রিয় সেটি। এর বিপরীতে যে দলীয় স্বার্থচেতনা সেটি তো নিরেট সেক্যুলারিজম। সেক্যুলারিজমে গুরুত্ব পায় জনগণের ভাবনা,সরকারের ভাবনা,দলীয় নেতাদের নিরাপত্তা ও সুখশান্তির ভাবনা। মিশরে ইখওয়ানূল মুসলীমূনকে বিগত ৬০ বছরের বেশী কাল নিষিদ্ধ রাখা হয়েছিল। নেতাদের বছরের পর বছর জেলে নিদারুন নির্যাতন চালানো হয়েছে।যয়নব আল গাজালীর বই কি তার পড়েননি? গুলি করে হত্যা করা হয়েছে দলটির প্রতিষ্ঠাতা হাসানূল বান্নাকে। শহীদ কুতুবদের ন্যায় প্রথমসারির নেতাদেরকে ফাঁসীতেও ঝুলতে হয়েছে। কিন্তু তাতে কি তাদের অঙ্গিকার ও আন্দোলনে ছেদ পড়েছে? সে কোরবানী ও ত্যাগের বিনিময়েই তো তারা পেয়েছে মহান আল্লাহর সাহায্য।বেড়েছে জনগণের মাঝে বিপুল গ্রহনযোগ্যতা। ফলে এখন তারা বিজয়ী এবং ক্ষমতাসীন।

আন্দোলনের জন্য কি দল লাগে? লাগে উন্নত আদর্শ। লাগে সে আদর্শের পতাকাবাহি আপোষহীন নেতা।দল ছাড়াই আয়াতুল্লাহ খোমেনীর নেতৃত্বে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে শক্তিশালি স্বৈরাচারি শাসক মহম্মদ রেজা শাহকে হঠিয়ে ইরানে ইসলামি বিপ্লব হয়ে গেল। দল ছাড়াই এ উপমহাদেশে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বড় বড় আন্দোলন হয়েছে। ব্রিটিশের বিরুদ্ধে উপমহাদেশের ইতিহাসে সর্বপ্রথম যে গণআন্দোলন গড়ে উঠেছিল সেটি কংগ্রেস বা মুসলিম লীগের ন্যায় কোন রাজনৈতীক দলের নেতৃত্বে নয়। সেটি ছিল খেলাফত আন্দোলন। সে আন্দোলনের পিছনে কোন দল ও দলীয় ক্যাডার বাহিনী ছিল না। ছিল মাওলানা মহম্মদ আলী,মাওলানা শওকত আলীর ন্যায় নেতা ও তাদের প্যান-ইসলামিক আদর্শ। জামায়াত কি শুধু দল নিয়ে বেঁচে থাকতে চায়? এবং সেটি কি যে কোন মূল্যে?

 

কেন এ স্মৃতিবিলু্প্তি?

দলটির নেতারা আদালতে দাঁড়িয়ে যা কিছু বলেছেন সেটিই কি কম বিস্ময়কর? জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল জনাব আলী আহসান মোজাহিদ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি ভূয়সী শ্রদ্ধা জানিয়ে আদালতে বক্তব্য শুরু করেছেন। কাউকে শ্রদ্ধ জানানোর অর্থ তার নামকে নয়, বরং তার আদর্শ, কর্ম ও চরিত্রকে সমর্থন করা। অথচ পবিত্র কোরআনে ঘোষণা এসেছে, সকল ইজ্জত একমাত্র আল্লাহর, তাঁর রাসূল এবং তাঁর অনুসারি ঈমানদারদের। আল্লাহর কাছে তাঁর দ্বীনের বিজয়ে অঙ্গিকারহীন সেক্যুলারিস্টদের কোন সন্মান নেই। আছে ঘৃনা। ইসলামি শক্তিকে পরাজিত করা,মুসলিম ভূমিকে দ্বিখন্ডিত করা ও ইসলামপন্থিদের হত্যার শপথ নিয়ে যারা একাত্তরে কাফেরদের অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করলো,শত শত আলেমকে যারা শহীদ করলো, শহীদ করলো ইসলামী আন্দোলনের হাজার হাজার কমীকে, খোদ জামায়াতসহ সকল ইসলামী দলকে যারা নিষিদ্ধ করলো তাদের শ্রদ্ধা জানালে সে নেতার ইসলামি নীতি বা আদর্শ কি ড্রেনে গিয়ে পড়ে না? এমন ব্যক্তিগণ আদালতে দাঁড়িয়ে,“আমি রাজাকার ছিলাম না” বলবে, সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? রাজাকারগণ কি চোরডাকাত? তারা কি ছাত্রলীগ কর্মীদের ন্যায় খুনি-সন্ত্রাসী? তারা তো একটি আদর্শের প্রতীক। তাদের সে আদর্শটি ছিল ভাষা, বর্ণ, আঞ্চলিক সীমাবদ্ধতার উর্দ্ধে উঠে প্যান-ইসলামিক মুসলিম ভাতৃত্বের। সে আদর্শটি মুসলিম ভূমির উপর কাফের হামলার বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধের। হাজার হাজার বাঙালী মুসলিম যুবক একাত্তরে সে আদর্শ নিয়ে ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ময়দানে নেমেছিল।

একই সুরে একই কথা বলেছেন মাওলানা দেলাওয়ার হোসেন সাঈদী। আদালতে রাজাকার বলায় তিনি যে রাজাকার ছিলেন না সেটি প্রমাণ করতে উঠে পড়ে লেগে যান। বিস্ময়ের বিষয়, তিনি যে রাজাকার ছিলেন না সে প্রমাণ করতে সাক্ষীসাবুদ খুঁজে খুঁজে খাড়া করেছেন মুক্তি বাহিনীর লোকদের থেকে। অথচ একাত্তরে তাদের চোখের সামনে বহু রাজাকার শহীদ হয়েছেন। রাজাকারদের অনেকে তাদের সহকর্মীও ছিলেন। অনেকের জানাজাও তারা পড়েছেন। সে রাজাকারদের অপরাধটি কি ছিল? কোন শহীদ রাজাকারের রক্তমাখা ক্ষতবিক্ষত চেহারা কি এসব নেতাদের চোখের সামনে ভাসে না? কেন এ স্মৃতিবিলুপ্তি? অপর দিকে জামায়াতেরর আরেক নেতা আব্দুল কাদের মোল্লা তো আদালতে প্রমাণের চেষ্টা করেছেন,তিনি মু্ক্তিবাহিনীর ট্রেনিংও নিয়েছিলেন। এই হলো জামায়াতে ইসলামীর প্রথম সারির নেতাদের নৈতীক অবস্থা! জামায়াতের মধ্যে সেক্যুলারাইজেশন প্রজেক্ট কতটা সফল হয়েছে সেটির মাপকাঠি স্রেফ এ নয় যে,দলটি আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির ন্যায় সেক্যুলার দলগুলির সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বহু বছর একসাথে আন্দোলন করেছে, বরং সেটি হলো নেতাদের এরূপ সেক্যুলার বচন ও মানসিকতা।

 

জামায়াত নেতারা ভূলে যান, তাদেরকে রাজাকার হওয়ার জন্য আদালতে তোলা হয়নি। তোলা হয়েছে আজকের আওয়ামী বাকশালীদের রাজনৈতীক শত্রু হওয়ার কারণে। একাত্তরে লক্ষাধিক ব্যক্তি রাজাকারের পোষাকে পাকিস্তানের পক্ষে অস্ত্র হাতে নিয়েছিল। কিন্তু তাদের ক’জনকে আজ আদালতে তোলা হয়েছে? ভারতসেবী আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের কাছে রাজাকার হলো একটি প্রতিকী শব্দ। যার মধ্যে ইসলামের প্রতি অঙ্গিকার আছে, প্যান-ইসলামি চেতনা আছে এবং ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের জজবা আছে -তারাই ভারত ও তার সেবাদাসদের কাছে রাজাকার। এ সহজ সত্যটি কি জামায়াত নেতারা বুঝেন না? শাহ আজিজুর রহমানকে সংসদে বার বার রাজাকার বলা হয়েছে। রাজাকার বলা হয়েছে প্রেসিডেন্ট আব্দুর রহমান বিশ্বাসকে। রাজাকার বলা হয়েছে মেজর আব্দুল জলীলকে। রাজাকার বলা হয়েছ সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরিকে। কিন্তু তারা কি তা খন্ডনের চেষ্টা করেছেন?

 

একাত্তরের অর্জন

ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের চেতনা নিয়ে যাদের রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তি,তাদের জন্ম একাত্তরের পরে হলেও ভারতসেবী সেক্যুলারিস্টদের দৃষ্টিতে তারা প্রত্যেকেই রাজাকার। যতদিন বাংলাদেশে ভারতের স্বার্থ থাকবে ততদিন তারা বাংলাদেশের মাটি থেকে সে রাজাকারদের নির্মূলের্ চেষ্টাও চালাবে।আওয়ামী বাকশালী চক্র রাজাকার নির্মূলের সে প্রচেষ্ঠায় একাত্তরে যেমন ভারতের সহায়তা দিয়েছিল,এখনও তারা তা  দিবে। কারো কি তা নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ আছে?  মুসলমান রূপে বাংলাদেশে বাঁচতে হলে রাজাকারের ন্যায় ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের চেতনা নিয়েই বাঁচতে হবে। নইলে ভারতের সেবাদাস হওয়া ছাড়া ভিন্ন পথ নাই। এটিই হলো বাংলাদেশীদের জন্য একাত্তরের অর্জন।সেটি শুধু শেখ হাসিনাই বুঝেন না, এরশাদ এবং খালেদা জিয়াও বুঝেন। তাই সবাই দিল্লিতে দরবারে হাজিরা দেন এবং তাদের খুশি করাটি জরুরী মনে করেন। মনে হচ্ছে জামায়াতও সেটি বুঝতে শুরু করেছে। তাই একাত্তরে রাজাকার হয়েও “রাজাকার ছিলাম না” –সেকথাটি দলের নেতাকর্মীগণ জোর গলায় বলতে শুরু করেছে। অথচ রাজাকার বললে প্রতিটি ঈমানদারকে তা নিয়ে গর্ব করা উচিত। বাংলাদেশের স্বাধীনতার তারাই তো আগামী দিনের রক্ষক। সেটি অন্যরা না বুঝলেও, ভারত শতভাগ বুঝে।

গ্রামের ভীতু মানুষটি বাঘ দেখলে বাঘ বাঘ বলে চিৎকার দিবে,সেটিই তো স্বাভাবিক। তেমনি ভারতীয় সেবাদাসগণও রাজাকার দেখলে আতংক নিয়ে রাজাকার বলে চিৎকার তুলবে এতে ঘাবড়ানোর কি আছে? রাজাকার শব্দটিকে তারা যদি গালি হিসাবে ব্যবহার করতে চায় তাতেই বা দুঃখের কি আছে? ইসলামের শত্রুপক্ষের গালি খাওয়া তো নবীজী (সাঃ)র মহান সুন্নত। এতে বিশাল প্রতিদান মিলবে পরকালে। সে সাথে একাত্তরে যারা ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন তাদের কোরবানীর প্রতিও সম্মান প্রদর্শণ হবে। আল্লাহর কাছে তাঁর বন্ধু রূপে গণ্য হতে হলে তো তাঁর দ্বীনের শত্রুদের কাছেও শত্রু রূপে গণ্য হওয়া চাই। পরকালে পুরস্কার লাভের তো এটি এক বুনিয়াদি শর্ত। নইলে দুনিয়াতেও কি আল্লাহর সাহায্য জুটবে? ইসলামের বিপক্ষশক্তির কাছে তাই গ্রহনযোগ্য হওয়ার জন্য এত প্রচেষ্ঠা কেন? ফলে ১৬ই ডিসেম্বরে কেন এ বিজয় মিছিল? কেনই বা দলীয় সংবিধান থেকে শরিয়ত প্রতিষ্ঠার অঙ্গিকারকে আস্তাকুরে ফেলার আয়োজন? ২৫/১২/১২

 




আবুল বারাকাতের মহাবিপর্যয় ভীতি ও মিথ্যা উৎপাদন

কে এই আবুল বারাকাত?

রাজনৈতীক ভাবে নির্মূল হওয়ার ভীতি আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের মনে যে কতটা প্রকট সেটিরই উৎকট প্রকাশ ঘটেছে গত ১৮/০৫/১৩ তারিখে ঢাকা থেকে প্রকাশিত “সাপ্তাহিক”য়ে দেয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড.আবুল বারাকাতের একটি সাক্ষাতকারে। প্রশ্ন, কে এই আবুল বারাকাত? ইসলামের বিরুদ্ধে তার দুষমনি ও প্রতিহিংসার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ইসলামের শত্রু পক্ষের তিনি একজন প্রথমসারির সৈনিক। তার লড়াই বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানে। শাহবাগের নাস্তিক আয়োজকগণ হলো তার নিজের ভাষার আলোকিত সৈনিক। ফলে তারা যে তার অতি কাছের লোক সেটি তিনি গোপন রাখেনি। তার কন্যাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। ইসলামের বিরুদ্ধে তার ন্যায় তার কন্যার আক্রোশও অধিক।সম্প্রতি তার কন্যা সে আক্রোশের প্রকাশ ঘটিয়েছিল,সপ্তাহের আর সব দিন বাদ দিয়ে জুম্মার নামাযের সময় ছাত্রদের পরীক্ষার আয়োজন করে। অবশেষে ছাত্রদের প্রতিবাদের মুখে তার সে ষড়যন্ত্র সে বানচাল হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের বাংলাদেশকে তারা যে কোন দিকে নিতে চায় সেটি কি এর পরও গোপন  থাকে?

আবুল বারাকাত লেখাপড়া করেছেন সোভিয়েত রাশিয়ায়। ভারতীয় লবির অতি কাছের লোক তিনি। ঢাকায় অবস্থানরত পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী মহলের সাথেও তার ঘনিষ্ট সম্পর্ক। ইসলামের বিরুদ্ধে আজ বিশ্বব্যাপী যে কোয়ালিশন সে কোয়ালিশনের সাথে তার গভীর সম্পর্ক। চাকুরি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হলেও তার আসল  কাজটি অন্যত্র। গবেষণা ও ইভালিউশনের নামে তার একটি এনজিও আছে। সে এনজিও’র সূত্র ধরে তিনি প্রচুর অর্থ পান পশ্চিমা দাতা সংস্থাগুলো থেকে। সে সাথে আওয়ামী শাসনামলের অতি সুবিধাভোগী ব্যক্তিও। জনতা ব্যাংকের তিনি একজন কর্ণধার। আবুল বারাকাতের মূল কাজটি হলো, বাংলাদেশে ইসলামপন্থিদের নির্মূলের একটি বুদ্ধিবৃত্তিক পরিকল্পনা খাড়া করা এবং সেটির বাস্তবায়নে অন্যদের উস্কানি দেয়া। তার গবেষণা ও লেখালেখির বিষয় মূলতঃ দুটি। এক). কি করে বাংলাদেশের মাটিতে হিন্দু ও হিন্দুস্থানের স্বার্থকে বৃদ্ধি করা যায়, দুই). কি করে বাংলাদেশের ইসলামপন্থিদের রাজনৈতীক ও অর্থনৈতীক মেরুদন্ডকে ভেঙ্গে দেয়া যায়। বাংলাদেশ থেকে ভারতে চলা যাওয়া হিন্দুদের জমিজমা ফিরত দেয়ার পক্ষে তিনি জোর চাপ দিয়ে যাচ্ছেন। ভারত থেকে এ কাজে তিনি মদদও পাচ্ছেন। সরকার তার সে দাবি মেনে নিয়েছে। অথচ মুজিব আমলে বাংলাদেশের হাজার হাজার কোটি টাকা ভারত যে লুটে নিয়ে গেল তা নিয়ে তিনি কোন সময়ই মুখ খুলেননি। সে লুটের মধ্যে ছিল পাকিস্তান আর্মির অব্যবহৃত হাজার হাজার কোটি টাকার যুদ্ধাস্ত্র্র। ভারতীয় বাহিনীর  হাতে বাংলাদেশ অধিকৃত হওয়ার পর পাকিস্তান আর্মির ফেলে যাওয়া কোন ট্যাংক, কোন দূরপাল্লার কামান ও গোলাবারুদই তারা বাংলাদেশে রেখে যায়নি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট মুজিবের বিরুদ্ধে ঢাকার রাস্তায় যে কয়েক খানি ট্যাংক নামানো হয়েছিল তা এসেছিল মিশর থেকে। এসেছিল তৎকালীন মিশরীয় প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতের খয়রাত হিসাবে।

 

আবুল বারাকাতের ইসলামভীতি

কিছু কাল আগে আবুল বারাকাত গবেষনার ছদ্দবেশে এক বই লিখে দেখিয়েছিলেন, ইসলামি ব্যাংক কিভাবে বাংলাদেশে ইসলামপন্থিদের অর্থনীতির বিশাল ভিত গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ বেসরকারি এ ব্যাংকটিকে তিনি পেশ করেছেন বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য বিপদজনক প্রতিষ্ঠান রূপে। উস্কানি দিয়েছেন, এ ব্যাংককে ইসলামপন্থিদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে সরকারি নিয়ন্ত্রনে নেয়ার। লক্ষ্য, এ ব্যাংকটিও পরিনত হোক সোনালী ও জনতা বাংকের মত আওয়ামী বাকশালীদের লুটপাটের উর্বর ক্ষেত্র রূপে। ইসলামি ব্যাংকের অর্থে বাংলাদেশে যে কয়েক হাজার শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, গড়ে উঠেছে বহু হাসপাতাল, বহু পশুপালন ও মৎস্যপালন প্রতিষ্ঠান এবং রাস্তায় নেমেছে যেরূপ হাজার হাজার যানবাহন -সেটি তার নজরে পড়েনি। সম্প্রতি দেশের নানা স্থানে ইসলামি ব্যাংকের নানা শাখা ও বুথের উপর যে হামলা হয়েছে তার পিছনে আবুল বারাকাতের মত ব্যক্তিদের উস্কানি যে সক্রিয় ছিল তা নিয়ে কি সামান্যতম  সন্দেহ আছে?

সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামি ও ইসলামি ছাত্রশিবিরের উপর্যপরি হরতালের সফলতা দেখে আবুল বারাকাতের মত ব্যক্তিদের ভয় আরো গভীরতর হয়েছে। সে ভয় আরো তুঙ্গে উঠেছে ৬ই এপ্রিল হেফাজতে ইসলামের প্রায় তিরিশ লাখ লোকের লংমার্চ দেখে। এই ভয়ই তাদের মরণের ভয়। আবুল বারাকাতের আশংকা,বাংলাদেশ শ্রীঘ্রই তালেবান রাষ্ট্র হতে যাচ্ছে। তার নিজের উক্তি, “এখনই সমাধানে পৌঁছাতে না পারলে বাংলাদেশ তালেবান রাষ্ট্র হতেই পারে। কারণ একটি বিপ্লব বা পটপরিবর্তনের জন্য কোটি কোটি লোকের প্রয়োজন পড়ে না। শতকরা দুই ভাগ বা পাঁচ ভাগ কর্মী থাকলেই অনেক কিছু সম্ভব। জামায়াত-শিবিরের তো ৫ ভাগ সক্রিয় সমর্থক আছেই। এর সঙ্গে সেনাবাহিনীর একাংশ যোগ হতেই পারে। না হওয়ার কোনো কারণ আছে বলে আমি মনে করি না। কারণ, জামায়াত রাষ্ট্রের মধ্যে রাষ্ট্র তৈরি করেছে। আপনি আইনজীবীদের নির্বাচনগুলো দেখেন,ওরা কত শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।”

 

অসুস্থ্যতা যেখানে বিবেকের

অতি ভয়ে মানুষ পাগলের প্রলাপ বকে। এমন ভীতু মানুষের সামনে ছোট খাটো মানুষও ভয়ংকর দৈত্য মনে হয়।এমন ভয়ে আক্রান্ত আবুল বারাকাত।  তার মুখে তাই প্রলাপও অনেক। এরূপ ভয়ের কারণে জামায়াত ইসলামের ন্যায় একটি সংগঠন তার কাছে সাধারণ সংগঠন মনে হয়নি। মনে হয়েছে বাংলাদেশের মধ্যে প্রতিদ্বন্দী একটি পৃথক রাষ্ট্র। তার নিজের কথাঃ “তারা সৃষ্টি করেছে মূল ধারার রাষ্ট্রের মধ্যে আরেকটি রাষ্ট্র,মূল ধারার সরকারের মধ্যে আরেকটি সরকার,মূল ধারার অর্থনীতির মধ্যে আরেকটি অর্থনীতি।” প্রশ্ন হলো একটি রাষ্ট্র বলতে কি বোঝায় সে জ্ঞান কি আবুল বারাকাতের আছে? রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কিতাবে রাষ্ট্রের সংজ্ঞা কি সেটি কি কখনোই তিনি একবার পড়ে দেখেছেন? রাষ্ট্র মানব সমাজের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। রাষ্টের যেমন নিজস্ব মানচিত্র থাকে, তেমনি সরকার,বিশাল প্রশাসন ও  বিশাল বিশাল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানও থাকে। থাকে বিচার-কার্য নির্বাহের জন্য আইন-কানূন ও আদালত। থাকে বেতনভোগী বিশাল সশস্ত্র সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনী। কিন্তু জামায়াতে হাতে এর কোনটিও কি আছে? তাদের অফিসগুলি তো দীর্ঘকাল যাবত তালাবদ্ধ। তাদের কর্মীরা তো রাজপথে নামে খালি হাতে। তাদের রাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট মানচিত্র বা সীমানাটি কোথায়? কোথায় সে রাষ্ট্রের প্রহরায় সশস্ত্র সেনাবাহিনী? কোথায় তাদের সে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন? একটি ব্যাংক, কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার অর্থ কি পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা? ভারতে রামকৃষ্ণ মিশনের হাতে এর চেয়ে বেশী প্রতিষ্ঠান আছে। মিশরে ইখওয়ানাল মুসলিমিনের হাতে তার চেয়েও বেশী প্রতিষ্ঠা। তাই বলে সে সংগঠনকে কেউ কি রাষ্ট্র বলেছে? জামায়াত যদি আলাদা রাষ্ট্র হয়েই থাকে তবে সে রাষ্ট্রের প্রধান বছরের পর বছর শত্রু পক্ষের জেলে থাকলে সে রাষ্ট্র বেঁচে থাকে কি করে? আবুল বারাকাতের কাছে এসব প্রশ্নের উত্তর আছে কি? অথচ এরাই আওয়ামী লীগের প্রথম শ্রেণীর বুদ্ধিজীবী। এককালে বাংলাদেশের নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান। সে পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানের প্রাদেশিক গভর্নর ছিল এবং তার একটি প্রশাসনও ছিল। কিন্তু ১৯৭১ সালে ভারতীয় বাহিনীর দখলদারির ফলে সে প্রাদেশিক সরকারের সবাই কারারুদ্ধ হয়। তখন পাকিস্তানী রাষ্ট্রও এ প্রদেশটিতে আর বাঁচেনি।  ফলে জামায়াত যদি রাষ্ট্রই হয়ে থাকে তবে দলটির প্রধান ও তার কেন্দ্রীয় নেতাগণ কারারুদ্ধ হলে সে রাষ্ট্র বাঁচে কি করে? এসব প্রশ্ন কি আবুল বারাকাতের মনে একবারও উদয় হয়েছে?

বহু মানুষ শুধু মানসিক বিকলঙ্গতা নিয়ে জন্মায় না। জন্মের পর, এমন কি বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ডিগ্রি নিয়েও বহু মানুষ পাগল হয়। আওয়ামী লীগে এমন অপ্রকৃতস্থ পাগলের সংখ্যা কি কম? বরং এ আওয়ামী পাগলদের পাগলামীটা ভিন্ন মাত্রার। কোন পাগলও কি কখনো বলবে,কিছু মানুষের ঝাঁকুনিতে একটি ৮ তলা বিশাল বিল্ডিং ধ্বসে পড়বে? অথচ যিনি বলেছেন তিনি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী এবং পিএইচডি ডিগ্রিধারি। এবং তার  নাম মহিউদ্দীন আলমগীর। ফলে আওয়ামী লীগে এমন পাগল শুধু আবুল বারাকাত একা নন। ডাকাত দলে একজনও সুস্থ্য মানুষ খুঁজে পাওয়া যায় না, তেমনি পাওয়া যাবে না আওয়ামী লীগেও। কারণ সুস্থ্য মানুষের সুস্থ্যতার সবচেয়ে বড় গুণটি হলো ডাকাতিকে ঘৃণা করা। তাই ডাকাত দল গড়ে উঠে শতকরা শতভাগ অসুস্থ্য ও চরিত্রহীন মানুষ দিয়ে। এ অসুস্থ্যতাটি দৈহীক নয়, বরং নৈতীক। তেমনি কোন স্বৈরাচারি শাসকের দলেও কোন সুস্থ্য ও চরিত্রবান মানুষ পাওয়া যায় না। মুর্তিপুজারি কাফেরদের মন্দিরে ঈমানদার খুঁজে পাওয়ার ন্যায় সেটিও এক অচিন্তনীয় ব্যাপার।কারণ সুস্থ্য ও চরিত্রবান মানুষদের দিয়ে তো আর ফ্যাসীবাদী দল গড়া যায় না। এবং তাদের দিয়ে বাকশালী স্বৈরাচার ও হাজার হাজার মানুষ হত্যার নীতিকে সমর্থণ করিয়ে নেয়া যায় না।

 

মিথ্যা বলা যেখানে স্ট্রাটেজী

ইসলামের বিরুদ্ধে একটি দীর্ঘকালীন গণহত্যার যুদ্ধকে ন্যায় সঙ্গত করার স্বার্থে আল কায়েদাকে একটি দানবীয় শক্তিরূপে চিত্রিত করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন জনগণকে আল কায়েদা’র ভয় না দেখালে সরকারের পক্ষে কি সম্ভব হতো তাদের পকেট থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার লুট করা? সম্ভব হতো কি আফগানিস্তান ও ইরাকে প্রায় তিন ট্রিলিয়ন ডলার ব্যায়ের বিশাল যুদ্ধকে গ্রহণযোগ্য করা? বাংলাদেশেও তেমনি ইসলামপন্থিদের সহিংস নির্মূলের লক্ষ্যে ইসলামি দলগুলোকে দানবীয় শক্তিরূপে চিত্রিত করার সর্বপ্রকার প্রচেষ্টা হচ্ছে। হিফাজতে ইসলামের হাজার হাজার কর্মীকে নির্মম ভাবে হতাহত করাকে জায়েজ করতে তারা প্রচার করছে হেফাজতের মুসল্লিরা বায়তুল মোক্কাররমের সামনে বইয়ের দোকানে পবিত্র কোরআন শরিফ পুড়িয়েছে। বলা হচ্ছে,তারা রাস্তার গাছ নষ্ট করেছে। শত শত মানবহত্যাকারি এ খুনিরা এখন গাছপ্রেমিক হয়েছে। বলা হচেছ তারা নাকি ব্যাংকগুলোতে আগুন দেয়ার পরিকল্পনা করেছিল। এক্ষেত্রে আবুল বারাকাতের নিজের মিথ্যাচারটিও দেখবার মত। তিনি বলেছেন,“বাংলাদেশে এখন প্রতি ৩ জন ছাত্রের ১ জন মাদ্রাসার ছাত্র (যার মোট সংখ্যা হবে ৮০ লাখ)। দেশে মোট মাদ্রাসার সংখ্যা হবে ৫৫,০০০-এর বেশি,যার মধ্যে ৭৩ শতাংশ কওমি মাদ্রাসা;এসব মাদ্রাসা পরিচালনে বছরে ব্যয় হয় আনুমানিক ১,৪০০ কোটি টাকা,আর মাদ্রাসা পাসদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৭৫ শতাংশ।” বুঝা যাচ্ছে, যেখানেই তিনি নজর দেন সেখানেই মাদ্রাসার ছাত্র দেখতে পায়,সে সংখ্যা প্রতি তিন জনে একজন। ফলে সর্বত্র দেখতে পান বিপুল সংখ্যক ইসলামের ঝান্ডাবাহিদের। এটি তার মহা দুশ্চিন্তা।তার ভাষায় মহা বিপর্যয়। প্রশ্ন হলো,এমন মহাবিপর্যয়ের এত দুশ্চিন্তা নিয়ে তিনি ঘুমোন কি করে? অথচ তার মনে ঈমান থাকলে বিষয়টি ভিন্নতর হতো। কারণ যেখানেই ইসলাম, যেখানে মাদ্রাসার ছাত্র -তা দেখে তো একজন ঈমানদার প্রচন্ড খুশি হয়। কারণ তারা তো ইসলামের সেবক। তাদের দেখে মৃত্যুর ভয় পাবে তো ইসলামের শত্রুগণ। কিন্তু সেটিই হয়েছে আবুল বারাকাতের ক্ষেত্রে। ইসলাম ও মাদ্রাসার ছাত্র দেখে তিনি ভয়ে জর্জরিত। তিনি ভয় পাচ্ছেন, ইসলামপন্থিগণ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অচিরেই দখল করে নিবে। তার ভয়,ইসলামি যুবকদের আত্মদানে। তার বিস্ময়,তারা কেন শহীদ হয় এবং শহীদী জজবা নিয়ে বোমায় পরিণত হয়।

আরো প্রশ্ন হলো,এসব আজগুবি তথ্য আবুল বারাকাত পেলেন কোত্থেকে? বাংলাদেশের প্রতি তিন জন ছাত্রের মাঝে একজন মাদ্রাসা ছাত্র এবং তাদের সংখ্যা ৮০ লাখ –এসব কি বিশ্বাস যোগ্য? মাদ্রাসার পিছনে ১৪ শত কোটি টাকা ব্যয় হয় –এমন নিখুঁত হিসাবই বা কোত্থেকে বের করলেন। মিথ্যা আবিস্কারে তাদের মগজ যে কত উর্বর এ হলো তার নমুনা। একাত্তরে ৩০ লাখ নিহত হওয়ার তথ্যটি এভাবেই বাজারে ছাড়া হয়েছিল। যিনি এ ভূয়া   তথ্যটি ছেড়েছিলেন তিনি ভেবে দেখেননি,নিহতের সংখ্যা ৩০ লাখ হলে পাকিস্তান আর্মিকে যুদ্ধকালীন ৯ মাসের প্রতিদিন গড়ে ১১ হাজার মানুষের বেশী মানুষকে হত্যা করতে হত। এবং জনসংখ্যার প্রতি ২৫ জনে একজনকে মারতে হতো। হার্ভাডে বসে হাসিনা তনয় জয়ও এমন মিথ্যা আবিস্কার করেছিল। সে বলেছিল, বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর বিপুল সংখ্যক অফিসার হলো মাদ্রাসার ছাত্র। আওয়ামী নেতাকর্মী ও বুদ্ধিজীবীদের ঘরে ঘরে এভাবেই মিথ্যা উৎপাদনের ফ্যাক্টরি।

 

নিন্দিত হচ্ছে জিহাদ ও ইসলামি রাষ্ট্র

ইসলামের শত্রুদের কাছে ইসলামি রাষ্ট্র যেমন নিন্দিত। তেমনি অপরাধ হলো সে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জিহাদ।আবুল বারাকাত সে জিহাদকে চিত্রিত করেছেন জঙ্গিবাদ রূপে। তার মত লোকদের কাছে জঘন্য ভাষায় নিন্দিত হচ্ছে ইসলামপন্থিদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হাতে নেয়ার চেষ্ঠা। ইসলামি রাষ্ট্র তাদের কাছে ফ্যাসীবাদি রাষ্ট্র।  ইসলামের বিরুদ্ধে এমন এক বিষাক্ত ঘৃণা নিয়েই তো নাস্তিক ব্লগারগণ মহান আল্লাহতায়ালা,তাঁর প্রিয় রাসূল (সাঃ) ও রাসূল (সাঃ)র বিবিদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করেছে। হেফাজতে ইসলামের উত্থানের পর থেকে ইসলামের শত্রুপক্ষের মনে ইসলামভীতি এখন তুমুলে। তাদের বিরুদ্ধে আবুল বারাকাতের অভিযোগ, “সুসংগঠিত জঙ্গি কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে উদ্যত”। বলেছেন, “তারা ধর্মকে বর্ম হিসেবে ব্যবহার করছে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে”। অভিযোগ তুলেছেন,“ধর্মভিত্তিক এ রাজনৈতিক মতাদর্শ ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়।”

প্রশ্ন হলো, ইসলামের প্রতিষ্টায় জিহাদ করা এবং সে জিহাদের প্রাণ দেয়া এবং ধর্মকে নিজ স্বার্থে ব্যবহার করা কি এক কথা? মুসলমান হওয়ার দায়বদ্ধতা হলো, ইসলামি বিধানের প্রতিষ্টায় রাষ্ট্র ক্ষমতা হাতে নেয়া। রাষ্ট্র ক্ষমতা হাতে না নিলে রাষ্ট্রের বুকে ইসলামের শরিয়তি বিধানের প্রতিষ্ঠা কীরূপে সম্ভব? ইসলাম তাই মসজিদ,মাদ্রাসা,খানকাহ বা মাজারে বন্দী থাকার বিষয় নয়। নবীজী নিজে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হাতে নিয়েছেন, সাহাবাগণও নিয়েছেন। ইসলামের শত্রুপক্ষের অধিকৃতি হটিয়ে দখলে নেয়ার কাজটি হলো জিহাদ, এমন জিহাদে প্রাণদান হলো শাহাদাত। ইসলামে তো এটিই সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্মকর্ম। অথচ আবুল বারাকাত এর মধ্যে দোষ খুঁজছেন। ইসলাম যতদিন মসজিদ-মাদ্রাসা,সূফীদের মাজারে বা খানকায়ে আবদ্ধ থাকবে ততদিনই সেটি তার কাছে প্রকৃত ধর্ম। সেখান থেকে বেরিয়ে এসে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হাতে নেয়ার চেষ্টা হলেই সেটি উগ্র জঙ্গিবাদ। রাষ্ট্রক্ষমতা হাতে নিয়েছেন খোদ নবীজী (সাঃ) ও খোলাফায়ে রাশাদা।প্রশ্ন হলো, তাদেরকে  তিনি কি বলবেন? আবুল বারাকাতের কাছে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্টা হলো রাষ্ট্রীয় ফ্যাসিবাদ। অথচ মুজিব যেভাবে একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্টা করলো,ছিনিয়ে নিল জনগণের মৌলিক মানবিক অধিকার এবং হত্যা করলো ৩০-৪০ হাজার মানুষ -তাকে তিনি কি বলবেন? মুজিবের ন্যায় গণদুষমন ও গনতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রমাণিত শত্রুকে তিনি বঙ্গবন্ধু বলতে পাগল!  তিনি মুজিবকে এতটা মাথায় তুলেছেন তার নিজের অবস্থান গণতন্ত্র, মানবতা ও ইসলামের বিপক্ষে হওয়ার কারণে। মানবতা ও ইসলামের বিরুদ্ধে এমন একটি বিপক্ষীয় অবস্থান থেকে তিনি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের বিরুদ্ধে গালিগালাজ করবেন এবং শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের নাস্তিকদের ইসলামপন্থি রাজনীতি নিষিদ্ধ ও ইসলামি নেতাদের ফাঁসির আন্দোলনকে “তরুণ প্রজন্মের আলোকিত-আন্দোলন” বলবেন সেটিই কি স্বাভাবিক নয়?

 

পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা কি বিপর্যয়?

যেখানেই ইসলাম ও মুসলিম স্বার্থের প্রতি অঙ্গিকার সেখানেই আবুল বারাকাতের মত ব্যক্তিবর্গ পশ্চাতপদতা ও সাম্প্রদায়িকতা দেখেন। দেখেন বিপর্যয়। এবং মুসলমানদের গলাকাটার মধ্যে দেখেন প্রগতি। তাই প্রচন্ড প্রগতি দেখেছেন মতিঝিলে হাজার হাজার মুসল্লি হত্যার মধ্যে। অথচ ভারতে মুসলিম নিধন ও মুসলমান নারীদের ধর্ষণের মাঝে তিনি কোন পশ্চাদপদতা দেখেন না।তাই তার বিরুদ্ধে নিন্দাবাদও জানান না। বহু ভারতীয় হিন্দু ভারতে এরূপ মুসলিম হত্যার প্রবল নিন্দা জানিয়েছে।অরুন্ধতি রায়ের মত ব্যক্তিরা আন্দোলনেও নেমেছেন।কিন্তু আবুল বারাকাতগণ কি একটি বারের জন্যও নিন্দা বা প্রতিবাদ জানিয়েছে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাঝে যৌক্তিকতা দেখেছে এমনকি অনেক অমুসলমানেরাও। আবুল বারাকাতগণ যে ভারতীয় হিন্দুদের চেয়েও বেশী মুসলিম বিদ্বেষী সেটি কি এরপরও বুঝতে বাঁকি থাকে? এমন একটি মুসলিম বিদ্বেষ নিয়েই তিনি ১৯৪৭ সালের উপমহাদের মুসলমানদের পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা আন্দোলনকে বলেছেন পশ্চাদমুখি। তার কথায় “পূর্ব বাংলায় ইসলাম ধর্মের ইতিহাসে প্রথম বড় মাপের পশ্চাদমুখী রূপান্তর (বিপর্যয়) ঘটেছে গত শতাব্দীতে যখন ব্রিটিশ উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনের একপর্যায়ে যখন ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রসঙ্গ এলো।” যেখানেই মুসলমানের জাগরণ ও স্বার্থ রক্ষণের বিষয় –সেটিই আবুল বারাকাতের কাছে মনে হয়েছে পশ্চাদপদতা। সে ধারণা নিয়েই তিনি ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের প্রতিষ্টাকে বলছেন সাম্প্রদায়িকতা। কথা হলো, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টি না হলে আজকের বাংলাদেশ কোত্থেকে আসতো? সে হুশ কি তার আছে? তার আফসোস “ধর্মভিত্তিক দেশ বিভাজনে ইসলাম ধর্মের উদারনৈতিক-মানবিক ধারার সুফি-ওলামারা বাধা দিতে পারলেন না।” অথচ ভূলে যান, মহম্মদ ঘোরির হাতে দিল্লি বিজয়েরে পর দক্ষিণ এশিয়ার বুকে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা ছিল দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবজনক ঘটনা। মুসলমানের বিজয় ও গৌরব নিয়ে যাদের মনকষ্ট একমাত্র তারাই ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের সৃষ্টিতে কষ্ট পেতে পারে। সে কষ্ট যেমন ভারতীয় হিন্দুগণ পায় তেমনি বাংলাদেশের বুকে তাদের প্রতিপালিন এজেন্টগণও পায়।

বাংলাদেশে আজও ইসলামপন্থিদের ফাঁসিতে ঝুলানো যায়নি তা নিয়ে আবুল বারাকাতদের বড়ই আফসোস।  সে কাজ যে হাসিনা শুরু করেছে তাতেই তার আনন্দ। তবে তার ভয় বেড়েছে ইসলামের পক্ষে  গণজাগরণ দেখে।সে জাগরণের মাঝে তিনি বিপন্নতা দেখছেন।বলেছেন,“উগ্র জঙ্গিবাদ যে ‘আত্মঘাতী বোমা সংস্কৃতি’ চালু করেছে তার ফলে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-ধনী-নির্ধন নির্বিশেষে দেশের সব মানুষের জীবন বিপন্ন প্রায়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া যতই ত্বরান্বিত হচ্ছে এ বিপন্নতা ততই বাড়ছে।” অথচ আবুল বারাকাত দেখেও দেখেন না যে, দেশে আজ প্রচন্ড ফ্যাসীবাদী শাসন। শত শত মানুষ মারা যাচ্ছে ইসলামপন্থিদের হাতে নয়, বরং আওয়ামী দুর্বৃত্তদের হাতে। দেশ বিপন্ন তো হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের কারণে। দেশের স্বাধীনচেতা মানুষের পিঠ আজ দেয়ালে ঠেকে গেছে। ৩০-৪০ হাজার মানুষ আজ জেলে। ৫মে ও ৬ মে বহু হাজার মুসল্লিদর এ ফ্যাসিস্ট সরকার নির্মম ভাবে নিহত ও আহত করলো। তার আগে নিহত করেছে প্রায় দুই জামায়াত শিবির কর্মী ও সাধারন মানুষকে। সরকার বিরোধী গণমাধ্যমগুলো একের পর এক বন্ধ করা হচ্ছে। মানুষ গুম হচ্ছে। “আমার দেশ” সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার করে নির্যাতন করা হচ্ছে। নির্মম নির্যাতন করা হচ্ছে জামায়াত শিবিরের নেতাকর্মীদের। এরূপ ফ্যাসীবাদী নির্মমতার বিরুদ্ধে বহু বিবেকমান মানুষই প্রতিবাদ করছে। প্রতিবাদে সাধারণ জনগণও জেগে উঠেছে। জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হওয়া প্রতিটি মুসলমানের ঈমানী দায়িত্ব। যখনই কোন স্বৈরশাসক জনগণের উপর এরূপ আঘাত হানে তখনই জনগণ এভাবে জেগেছে। সেটি যেমন মুজিব আমলে জেগে উঠেছিল সেটি আজও হচ্ছে। এটিই একটি জীবিত জনগণের স্বাভাবিক রূপ। কিন্তু বিবেকের সে সুস্থ্যতা কি আবুল বারাকাতের মত আওয়ামী ঘরানার বুদ্ধিজীবীদের আছে? থাকলে এ নৃশংসতার বিরুদ্ধে তার মুখে প্রতিবাদ কই? জনগণের জেগে উঠার বিরুদ্ধে তারা এত শংকিত কেন?

 

ফ্যাসীবাদের নাশকতা

রোগজীবানূর আক্রমনে দেহের মৃত্যু ঘটে। আর ফ্যাসীবাদের আক্রমণে হাজার হাজার মানুষের দৈহীক মৃত্যুর সাথে মৃত্যু ঘটে অসংখ্য মানুষের বিবেকেরও। বিপুল হারে উৎপাদিত হয় দাস চরিত্রের মানুষ। বাংলাদেশের বুকে আওয়ামী ফ্যাসীবাদের হাতে এখানেই ঘটেছে সবচেয়ে বড় নাশকতা। তারা বহু হাজার মানুষকেই শুধু হত্যা করনি, হ্ত্যা করেছে লক্ষ লক্ষ মানুষের বিবেকও। অন্ধ করে দিয়েছে তাদের মনও। সেটি যেমন মুজিব আমলে ঘটেছিল তেমনি আজও ঘটছে। ফলে আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রপক্ষের হাজার হাজার নেতাকর্মীরা আজ বিবেকশূণ্য। হাসিনা সরকারের হাতে নির্মম নৃশংস ভাবে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু যেমন তাদের নজরে পড়ে না,তেমনি নজরে পড়ে না শেখ মুজিবের বাকশালী স্বৈরাচারের নিষ্ঠুরতাও। সরকারি প্রচার যন্ত্র ব্যস্ত মুজিবের সে নিষ্ঠুরতা ভূলিয়ে তাকে ফেরেশতা তূল্য জাহির করার কাজে। সে কাজে নেমেছেন আবুল বারাকাতের মত শত শত ব্যক্তি। সে মুজিবী নিষ্ঠুরতা যে কত নির্মম ছিল তার বিবরণ বহু। উদাহরণ দেয়া যাক কমিউনিস্ট নেতা (সিপিবি নয়)শান্তি সেনের স্ত্রী অরুণা সেনের বিবৃতি থেকে।অরুণা সেন ও তার পুত্রবধূ রিনা সেন ও হনুফা বেগমকে রক্ষীবাহিনী কী বর্বর নির্যাতনই না করেছিল! শারীরিক নির্যাতন,যৌন নির্যাতন,পুকুরে চুবানো,চাবুক দিয়ে পেটানো,নগ্ন-অসুস্থ অবস্থায় কম্বলচাপা দিয়ে শ্বাস রোধ করে রাখা (কথামালার রাজনীতি ১৯৭২-’৭৯/ড.রেজোয়ান সিদ্দিকী,তৃতীয় সংস্করণ,পৃ.৫৫)।মুজিব আমলে বাজিতপুরের ইকোটিয়া গ্রামের কৃষক আবদুল আলীর ছেলে রশিদের খুনের ঘটনাটি কত নৃশংসা ভাবে ঘটেছিল সে বিবরণ দিয়েছেন জনাব আবদুল আলী এক  সাক্ষাৎকারে। সেটি এরূপঃআমার সামনে ছেলেকে গুলি করে হত্যা করল। আমার হাতে কুঠার দিয়ে বলল,“মাথা কেটে দে,ফুটবল খেলব”। আমি কি তা পারি? আমি যে বাপ। কিন্তু অত্যাচার কতক্ষণ আর সহ্য করা যায়। সহ্য করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত নিজের হাতে ছেলের মাথা কেটে দিয়েছি।”-(বাংলাদেশে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড,ইতিহাসের কাঠগড়ায় আওয়ামী লীগ,আহমেদ মুসা,পৃ. ৬৭-৬৮)। এরূপ নির্যাতন ও এরূপ নৃশংস হত্যাকান্ড শুধু অরুণা সেন,রিনা সেন কিংবা কৃষক আবদুল আলীর ছেলে রশিদের ক্ষেত্রেই ঘটেনি;ঘটেছে আরও হাজার হাজার মানুষের ক্ষেত্রে। ইদানিং একই নৃশংসতা ঘটে গেল শাপলা চত্তরে। আজও ঘটছে ইসলামি ছাত্র শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও শত শত জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের সাথে।

 

ঘরের শত্রু ও বিপর্যয়ের পথে দেশ

কিন্তু আবুল বারাকাতের দৃষ্টিত এ নৃশংস মুজিবই বাংলার ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি।এবং তার দল আওয়ামী লীগই বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ সংগঠন। তিনি তার বয়ানে আওয়ামী লীগকে স্বাধীনতার সংগ্রামী সংগঠন রূপে ভূষিত করেছেন।অন্য কোন দলের প্রশংসায় তিনি একটি কথাও বলেননি। কথা হলো,আবুল বারাকাত কি স্বাধীনতার অর্থ বুঝেন?স্বাধীনতার অর্থ কি শুধু একটি মানচিত্র লাভ? বাংলার মানচিত্র কি আগেও কেউ গিলে খেয়েছিল? স্বাধীনতার অর্থ তো সাধারণ জনগণের মতামত প্রকাশ,সংগঠন গড়া,রাজনীতি করা ও দাবীদাওয়া নিয়ে আন্দোলন করার পূর্ণ স্বাধীনতা,সেটি স্রেফ কোন ব্যক্তি বা দলের স্বাধীনতা নয়।শেখ মুজিব ও তার দল আওয়ামী লীগ কি সে স্বাধীনতা জনগণকে কোন কালেও দিয়েছে? আজও  কি দিচ্ছে? বরং জনগণের সে স্বাধীনতা নির্মম ভাবে কেড়ে নিয়েছে আওয়ামী লীগ।সেটি যেমন একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠা করে।তেমনি পত্র-পত্রিকা ও মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা হরন করে। বরং আওয়ামী লীগের অপরাধ তো আরো জঘন্য।শুধু কথা বলা, দল গড়া বা রাজনীতির অধিকারই তারা হরন করেনি,বরং কেড়ে নিয়েছে হাজার হাজার মানুষের জীবনে বেঁচে থাকার অধিকারও। মুজিব তার শাসনামলে হত্যা করেছে ৩০-৪০ হাজার বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীকে। ৫ই মে ও ৬ই মে মাত্র এ দুটি দিনে মুজিব কন্যা নিহত ও আহত করেছে হেফাজতে ইসলামের হাজার হাজার মুসল্লিদের। বাংলার বুকে মুসলমানদের এতবড় ক্ষতি কোন মনুষ্য জীবের হাতে কি কোন কালেও হয়েছে? জনগণের জানমাল ও স্বাধীনতার এতবড় শত্রুকে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি বললে স্বাধীনের শত্রু কে?

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট মুজিব ও তার পরিবারের অনেকেই নিহত হয়েছেন। কিন্তু মুজিব পরিবারের সকল সদস্য তার পারিবারিক ঐতিহ্য নিয়ে ডাইনোসোরের ন্যায় নির্মূল হয়ে যায়নি। বাংলার মানুষ তাই ডাইনোসরকে না চিনলেও মুজিব ও তার পরিবারকে চেনে। মাঝে মাঝে ভূলে গেলেও স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্য মুজিব পরিবারের সদস্যরা এখনও বেঁচে আছে। গোখরা শাপ যেমন তার বিষাক্ত ফনা নিয়ে আজও  বাংলার নানা প্রান্তে বেঁচে আছে,তারাও রাজনীতিতে বেঁচে আছে মুজিবী নৃশংসতা নিয়ে।গোখরার প্রাণনাশী বিষাক্ততা জানার জন্য স্কুল-কলেজে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।গ্রামগঞ্জের নিরক্ষর শিশুরাও সেটি জানে।স্মৃতিতে মাঝে মধ্যে বিলুপ্তি ঘটলে সেটি ছোবল দিয়ে আবার স্মরণ করিয়ে দেয়।তেমনি বাংলাদেশে জনগণের বুকে বার বার ছোবল মারছে মুজিবী বাকশাল। আওয়ামী লীগের ইতিহাস জানার জন্য তাই কি ইতিহাসের বই পাঠের প্রয়োজন পড়ে? আবুল বারাকাতদের বায়ান শুনারও কি প্রয়োজন হয়? তবে তার বায়ানে যেটি প্রকাশ পেয়েছে সেটি তার নিরেট মিথ্যাচার ও চাটুকর চরিত্র।সে সাথে ইসলামের বিরুদ্ধে সহিংস আক্রোশ। বাংলাদেশের মুসলমানের বিরুদ্ধে এরাই ঘরের শত্রু।

জানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু গোখরা শাপগুলোক চিনলে চলে না,ভাল ভাবে চিনতে হয় এসব ঘরের শত্রুদেরও।চিনতে হয় বিদেশী শত্রুদেরও।বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় বড় ডিগ্রির চেয়েও এজ্ঞানের গুরুত্ব অনেক বেশী।নবীজী (সাঃ)র সময় কোন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না,কিন্তু মসজিদের পবিত্র মেঝেতে এ জ্ঞানলাভটি সঠিক ভাবে হয়েছিল।ফলে ঘরের গোখরা শাপগুলো চিনতে ও নির্মূলে সাহাবাগণ সেদিনি ভূল করেননি।ইসলামের শত্রু নির্মূলের সে জিহাদের হাজার হাজার সাহাবা সেদিন শহীদ হয়েছেন। শহীদের সে রক্তে আল্লাহর শরিয়ত যেমন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তেমনি মুসলমানগণ বেড়ে উঠেছে বিশ্বশক্তি রূপে। তাদের হাতে নির্মিত হয়েছে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা। কিন্তু বাংলাদেশে শত্রু চেনার সে কাজটাই যথার্থভাবে হয়নি।অজ্ঞতা নিয়ে ঘরের শত্রুদের মাথায় তোলা হয়েছে।দেশে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় বিপুল ভাবে বাড়লেও সে অজ্ঞতা দূর হয়নি। বরং বেড়েছে। ফলে দেশ অধিকৃত হয়ে গেছে ভয়ানক শত্রুদের হাতে। মুসলিম ভূমিতে তাই পরাজিত হয়ে আছে মহান আল্লাহর শরিয়তি বিধান। বিষাক্ত গোখরাগুলো এখন ফনা বিস্তার করে আছে শুধু শাপলা চত্ত্বরে নয়,বরং দেশের বিশ্ববিদ্যালয়,পুলিশ,র‌্যাব,বিজিবী,মিডিয়া ও প্রচার মাধ্যম,আদালত,প্রশাসন,অপরাধ ট্রাইবুনাল,মন্ত্রীপাড়াসহ ক্ষমতার সর্বোচ্চ আসনে।ফলে নিরীহ আলেম-উলামা,ইসলামি আন্দোলনের নেতাকর্মী ও তাওহিদী কাফেলার তরুন সৈনিকেরা পথেঘাটে লাশ হচ্ছে এবং তাদের লাশও গুম করা হচ্ছে।আল্লাহর শরিয়তি বিধানকে পরাজিত রাখা এবং ঈমানদার মুসল্লিদের এভাবে হাজারে হাজারে লাশ করা ও তাদের লাশগুলো গুম করার মধ্যেই তাদের উৎসব।বাংলাদেশের আওয়ামী শাসক মহলে তো সে উৎসবই মহা ধুমধামে লাগাতর চলছে।যেদিন কয়েক হাজার মানুষ লাশ হলো সাভারের রানা প্লাজা ধসে সেদিনও উৎসব বসেছিল প্রেসিডেন্ট ভবনে। অথচ স্বজন হারা এবং নিহত সন্তানের লাশ না পাওয়া আপনজনের ক্রন্দনে ভারি হয়ে উঠছে বাংলার বাতাস। প্রশ্ন হলো,যাদের হৃদয়ে সামান্য ঈমান আছে,আল্লাহর দ্বীনের বিজয়ে যাদের সামান্যতম অঙ্গিকার আছে এবং পরকালে জবাবদেহীতার ভয় আছে তারাও কি নীরবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে উৎসব দেখবে? আবুল বারাকাতরা তো সেটাই চায়। ২৭/০৫/১৩

 




উম্মাহর ব্যর্থতা ও মুসলমানের দায়ভার

কোন জাতির ব্যর্থতা নিছক সরকারের কারণে আসে না। বরং সেটি অনিবার্য হয় সে জাতির সাধারণ মানুষের ব্যর্থতায়। জাতির অর্জিত সফলতার কৃতিত্ব যেমন জনগণের, তেমনি ব্যর্থতার দায়ভারও জনগণের। দেশগড়ার দায়িত্ব নিছক রাজনৈতিক নেতা, প্রেসিডেন্ট, মন্ত্রী ও প্রশাসনিক কর্মচারীদের নয়। এ কাজ সমগ্র দেশবাসীর। এটি কোন খেলার বিষয় নয় যে, মুষ্টিমেয় খেলোয়াড় খেলবে এবং আমজনতা দর্শকরূপে দেখবে। এ কাজে দায়িত্ব সবার। একটি জাতি যখন নীচে নামতে থাকে তখন সে নীচে নামার কারণ, দেশ গড়ার গুরুত্বপূর্ণ কাজটি মুষ্টিমেয়র হাতে সীমাবদ্ধ হয় এবং বাকিরা দর্শকে পরিণত হয়। সকল বিফলতার জন্য তখন সেই মুষ্টিমেয় ব্যক্তিদের দায়বদ্ধ করা হয়। অথচ জাতির বিফলতার জিম্মাদারিত্ব সবার। পলাশির যুদ্ধে বাংলার স্বাধীনতা যখন অস্তমিত হলো তখন শুধু সিরাজুদ্দৌলার পরাজয় হয়নি বরং পরাজিত হয়েছিল বাংলার সমগ্র মানুষ। এ পরাজয়ের জন্য শুধু মীর জাফরকে দায়ী করে অসুস্থ চেতনার মানুষই শুধু নিজের দায়ভার ও দুরূখ কমাতে পারে, বিবেকবান মানুষ তা পারে না। সে পরাজয়ের জন্য দায়ী ছিল বাংলার সমগ্র মানুষ।

নিজ ঘরে আগুন লাগলে সে আগুন থামানোর  দায়িত্ব গৃহে বসবাসকারী সবার। ঘর জ্বলতে দেখেও সে পরিবারের কেউ নি‘িয় থাকলে তাকে আদৌ সুস্থ বলা যায় না। খন্দরে যুদ্ধে আরবের কাফেরদের সম্মিলিত হামলায় মদিনা নগরী যখন অবরুদ্ধ তখন প্রতিটি পুরুষই শুধু নয়, প্রতিটি নারীও মোকাবেলায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। শত্র“র সে হামলার মুখে মুসলমানদের অংশগ্রহণ ছিল শতকরা শতভাগ। ফলে সদ্য প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্রের বিলুপ্তি থেকে তারা রক্ষা পেয়েছিলেন। কিন্তু উপনিবেশিক বৃটিশ হামলার মুখে শতকরা ১ জন বাঙালী মুসলমান কি সেদিন ময়দানে অবতীর্ণ হয়েছিল? হয়নি। ফলে এমন জাতির স্বাধীনতা রক্ষা পায় কি করে? জাতির প্রতিরক্ষার মত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে আমাদের পূর্ব পুরুষরা সেদিন মুষ্টিমেয় ষড়যন্ত্রকারীর খেলায় পরিণত করেছিলেন। মুসলিম ভূমির প্রতিরক্ষাকে ইসলামে যেখানে জিহাদ বলা হয়েছে, সেটিকে সংগঠিত করতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। অথচ একই বৃটিশ বাহিনী যখন আফগানিস্তানে ঢুকেছিল তখন আফগান জনতা হাতে যা ছিল তা নিয়েই ময়দানে নেমেছিল।  ফলে বৃটিশ বাহিনীর অনেকেই সেদিন জ্যান্ত ফিরতে পারেনি। সে লোমহর্ষক পরাজয়ের কথা বৃটিশ জাতি আজও ভুলতে পারেনি। স্বৈরাচারী শাসনের সবচেয়ে বড় কুফল হলো, দেশগড়া ও দেশ শাসনের ন্যায় অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে মুষ্টিমেয় বেতনভুকের খেলা তামাশার বিষয়ে পরিণত করে। এ নিয়ে রচিত হয় নানা প্রাসাদ ষড়যন্ত্র। এবং দেশের আপামর সর্বসাধারণ পরিণত হয় নীরব দর্শকে। স্বৈরাচারী শাসনকালে তাই যুদ্ধ হয় দুটি শাসকগোষ্ঠির। দেশ গড়ার বিষয়টি গণ্য হয় তাদের নিজস্ব বিষয়রূপে।

আজকের বিশ্বে ১৫০ কোটি মুসলমানের যে পতিত দশা তার কারণে এই স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা। রাষ্ট্রের নির্মাণে ও প্রতিরক্ষায় অংশ নেয়া ইসলামে কোন পেশাদারিত্ব নয়, চাকুরিও নয়; এটি ইবাদত। শুধু শ্রম ও অর্থ দানই নয়, অনেক সময় প্রাণ দান অপরিহার্য হয়ে পড়ে। এ চেতনা বলেই প্রাথমিক কালের মুষ্টিমেয় দরিদ্র মুসলমানেরা সে আমলের দু দুটি বৃহ্ শক্তিকে পরাজিত করে সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার নির্মাণ করতে পেরেছিলেন। কিন্তু এযুগের মুসলিম শাসকেরা নানা বাহানয় সর্বসাধারণের রাজনীতিতে অংশগ্রহণকে ফৌজদারী অপরাধে পরিণত করেছে। অথচ রাজনীতি হলো রাষ্ট্রের উন্নয়নে জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ। ফলে প্রতিটি নাগরিকের এটি মৌলিক অধিকার। অথচ মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশে এটি মৃত্যুদন্ডনীয় অপরাধ। শেখ মুজিবও এটি নিষিদ্ধ করেছিলেন ইসলামপন্থীদের জন্য। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ অবধি তিনি দেশের ইসলামপন্থীদের রাজনৈতিক দলগুলোকে বেআইনী ঘোষিত করেছিলেন এবং ১৯৭৪ এ এসে রাষ্ট্র পরিচালনার কাজকে পরিণত করেছিলেন তার পরিবার ও দলের নিজস্ব বিষয়ে। প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একদলীয় বাকশালী শাসন। যে কোন স্বৈরাচারীর ন্যায় তিনিও সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে দর্শকে পরিণত করেছিলেন। কোন টীমের নবধ্বই ভাগ খেলোয়াড়কে দর্শকের গ্যালারীতে বসিয়ে কোন দলই বিজয়ী হতে পারে না। তেমনি পারেনি মুজিব আমলের বাংলাদেশ। তখন রাজনীতি পরিণত হয়েছিল লুণ্ঠনের হাতিয়ারে। ফলে নিরূস্ব হয়েছিল সরকারি তহবিল ও জনগণ। তিনিই বাংলাদেশের জন্য অর্জন করেছিলেন সবচেয়ে লজ্জাজনক তলবিহীন ঝুড়ির খেতাবটি। তার আমলে দরিদ্র মানুষ কাপড়ের অভাবে মাছ ধরা জাল পরে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল। দেশ গড়ার কাজকে সফল করতে হলে এ কাজে জনগণের সম্পৃক্ততা অবশ্যই ব্যাপকতর করতে হবে। তবে প্রশ্ন হলো সেটিই বা কেমনে সম্ভব? এ সম্পৃক্ততা বাড়ানো যেতে পারে জনগণের চেতনায় পরিবর্তনের মাধ্যমে।

দেশ গড়ার কাজ থেকে দূরে থাকা যে নিছক দায়িত্বহীনতাই নয়, অমার্জনীয় অপরাধ- সেটি প্রতিটি নারী পুরুষের মগজে বদ্ধমূল করতে হবে। এটি যে নিছক রাজনীতি বা পেশাদারিত্ব নয় বরং পবিত্র ইবাদত সেটিও প্রতিটি নাগরিকের চেতনায় দৃঢ়মূল করতে হবে। এজন্য ইসলামের হুকুম ও শিক্ষনীয় বিষয়গুলো জনগণের কাছে পৌঁছাতে হবে। আল¬াহ তায়ালা একটি সভ্য ও সুন্দর সমাজ নির্মাণের গুরুদায়িত্ব দিয়ে মানুষকে এ দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন। এ দায়িত্ব খেলাফতের। প্রতিটি মুসলমান তাই আল্লাহতায়ালার খলিফা তথা প্রতিনিধি। প্রেসিডেন্ট, মন্ত্রী বা সচিব হওয়ার চেয়েও এ পদের মর্যাদা আল¬াহর দরবারে অধিক। বিচার দিনে এ কাজের হিসাব দিতে হবে প্রত্যেককে। প্রেসিডেন্ট, মন্ত্রী বা সচিব হওয়ার চেয়েও এ পদের মর্যাদা আল্লাহতায়ালার দরবারে অধিক। বিচার দিনে এ কাজের হিসাব দিতে হবে প্রত্যেককে। প্রতিটি অফিস কর্মীকে তার অফিসে কি দায়িত্ব সেটি প্রথমেই জানতে হয়, নইলে তার দায়িত্ব পালন যথার্থ হয় না। তেমনি প্রতিটি ব্যক্তিকেও জেনে নিতে হয় এ বিশ্বে ও নিজ দেশে তার রোল বা ভূমিকা কি। জীবনের এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাঠ। তার জীবনের সকল কর্মকান্ড, দায়িত্ব পালন ও ত্পরতা নির্ধারিত হয় এটুকু জানার পরই। নইলে জীবনযাপনে ও রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যক্তি স্বেচ্চছাচারী হয়। তাই ইসলামের প্রথম শিক্ষাই হলো এ বিশ্বের ব্যক্তির রোল কি। কিন্তু অতিশয় পরিতাপের বিষয়, সে মৌল পাঠটিই আমাদের জানা হয়নি। আমাদের কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের বহু ভাষা ও জ্ঞান বিজ্ঞানের বহু বিষয় শেখালেও এ মৌলিক পাঠটি শেখায়নি। ফলে দেশ ও সমাজ নির্মাণের ফরজ কাজটি ফরজরূপে গণ্য হয়নি। বরং এটি গদি দখল, আরাম আয়েশ ও নিজস্ব জৌলুস বৃদ্ধির মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। অথচ দেশ গড়ার এ অঙ্গনে সবচেয়ে ধার্মিক ও নিষ্ঠাবান মানুষের আধিক্য অতি কািিখত ছিল। যেমনটি হয়েছিল খোলাফায়ে রাশেদার সময়। কারণ, অন্যরা না হোক যারা ধার্মিক তাদের অন্তত জানা উচিত ছিল, উচ্চচতর সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণের কাজ থেকে হাত গুটিয়ে নেয়ার অর্থ শুধু দায়িত্বহীনতাই নয়,’ িেট আল¬াহর নির্দেশের চরম অবাধ্যতা। বস্তুত বাংলাদেশে রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনার সর্বস্তরে যে দুর্নীতিপরায়ন ব্যক্তিদের দৌরাত“ সে দায়ভার এ তথাকথিত ধর্মপরায়নদেরও। সমাজের আবু লাহাব, আবু জেহেলের বিরুদ্ধে সে আমলের মুসলমানগণ যে আমৃত্যু যুদ্ধ করেছিলেন সেটি বাংলাদেশের ধর্ম পরায়ন মানুষদের দ্বারা সংঘটিতই হয়নি। ফলে সমাজের দুর্বৃত্তরা অনেকটা বীনা প্রতিরোধেই সমাজ ও রাজনীতির প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গন দখল করে নিয়েছে। তাছাড়া ময়দান কখনও খালি থাকে না। সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ মানুষেরা ময়দান খালি করে দিলে দুর্বৃত্তরা তা অবশ্যই দখল  করে নেয়। রাষ্ট্রের সম্পদ এভাবেই দুর্নীতিপরায়ন রাজনীতিবিদ ও প্রশাসনিক কর্মচারীদের অধীনস্ত হয়েছে। ফলে জনগণ নিরূস্ব হলেও ঐশ্বর্য বেড়েছে তাদের।

দেশ গড়ার ক্ষেত্র শুধু রাজনীতি বা রাষ্ট্রীয় প্রশাসন নয়। এ কাজটি হয় দেশের সর্বাঙ্গ জুড়ে। শুধু রাজনীতি দিয়ে একটি সভ্যতার সমাজ নির্মিত হয় না। এ লক্ষ্যে রাজনীতিতে যেমন স্ ও যোগ্য মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াতে হয় তেমনি বাড়াতে হয় দেশের শিক্ষা, সাহিত্য, সমাজসেবা ও ব্যবসা বাণিজ্যে তাদের উপস্থিতি। স্ মানুষকে শুধু স্ হলে চলে না, সাহসী ও সংগ্রামীও হতে হয়। নবীজীর (সারূ) সাহাবাগণ শুধু স্ই ছিলেন না, নির্ভীক ও অতিশয় লড়াকুও ছিলেন। এ যোগ্যতা বলেই দুর্বৃত্তদের দেশের রাজনীতি ও প্রশাসন থেকে হটিয়ে নিজেরা কান্ডারী হাতে নিয়েছিলেন। সে সুন্নত আজকের ধর্মপরায়ন মানুষদেরও কার্যে পরিণত করতে হবে। নিছক বক্তৃতা বা উপদেশ খয়রাতে দেশ সমৃদ্ধতর হবে না। তাদেরকে দেশের এক্সিকিউটিভ ফোর্স বা পলিসি বাস্তবায়নকারী শক্তিতে পরিণত হতে  হবে। এজন্য ময়দানে নামা প্রতিটি স্ ও ন্যায়নিষ্ঠ মানুষের জন্য অপরিহার্য। এটিই ইসলামের মৌল শিক্ষা। ফলে নবীজী (সারূ) যেমন নেমেছিলেন তেমনি নেমেছিলেন সাহাবায়ে কেরাম। সেদিন ন্যায় কর্ম ও ধর্মপরায়নতা শুধু মসজিদে নয় সমাজের সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। তবে জাতি গঠনের পূর্বে ব্যক্তি গঠন জরুরী। ইমারাত নির্মাণের পূর্বে ইট তৈরির ন্যায় এটি অপরিহার্য। আর ব্যক্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান নিছক জ্ঞান ও শারীরিক সুস্থ্যতা নয়, বরং সবচেয়ে অপরিহার্য হলো তার ব্যক্তিত্ব। ঐ ব্যক্তিত্বই একজন মানুষকে মহত্তর পরিচয় দেয়। এ গুণটির জন্যই সে প্রকৃত মানুষ। আর ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব সৃষ্টির মূল উপাদান হলো সত্যবাদিতা। হযরত আলী (রারূ) এক্ষেত্রে একটি অতিশয় মূল্যবান কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন, ব্যক্তির ব্যতিত্ব তার জিহধ্বায়। তথা সত্যবাদিতায়। যার জিহধ্বা বা কথা বক্র তার চরিত্রও বক্র। সুদর্শন ও সুস্থ্য শরীরের অধিকারী হয়েও সে ব্যক্তিত্ব পঙ্গু। ভাল মানুষ হিসেবে সে সমাজে পরিচিতি পেতে পারে না। বক্র ইট যেমন একটি ভাল প্রাসাদে বিন্যস্ত বা ফিট হতে পারে না তেমনি মিথ্যাচারী মানুষ দিয়ে একটি সভ্য ও উন্নততর সমাজ নির্মিত হয় না। এমন অস্ ও মিথ্যাচারী মানুষের ভীড়ে একটি জাতির অস্তিত্বই বিপন্ন হয়। গরু মহিষের সংখ্যা বৃদ্ধিতে বরং একটি জাতি বিস্তর লাভবানই হয়, কিন্তু মিথ্যাচারী মানুষের বৃদ্ধিতে দেশের ধধ্বংস নেমে আসে। প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ বা নৈসর্গিক পরিবেশও সে জাতির কোন কল্যাণই করতে পারে না। বাংলাদেশের বিপন্নতা বস্তুত মিথ্যাচারী মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধিতে, সম্পদের অপ্রতুলতায় নয়। ভুগোল, জলবায়ু বা জনসংখ্যার কারণেও নয়। জাতিকে সদাচারী ও সত্যবাদী বানানোর দায়িত্ব দেশের বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের। তারাই জাতির সংস্কৃতির নির্মাতা। তারা সংস্কার আনে ব্যক্তির আচরণ ও রুচীবোধে। অতি প্রতিকুল অবস্থাতেও সত্য কথা বলার জন্য যে মনোবল দরকার সেটির জোগান দেয় তারাই। তারাই সমাজের মিথ্যুক ও দুশ্চরিত্রদের বাঁচাটা নিরানন্দ করে দেয়। সম্পদের অধিকারী হয়েও দুর্বৃত্তরা সমাজে নন্দিত না হয়ে প্রচন্ড নিন্দিত হয় বস্তুত এদের কারণেই। নমরুদ,ি ফরাউন, হালাকু বা হিটলারগণ ইতিহাসে যে আজও ঘৃণিত তা এসব ন্যায়পরায়ন বুদ্ধিজীবীদের কারণেই। কিন্তু বাংলাদেশে সে কাজটিই হয়নি।

সমাজে আজ যে মূল্যবোধের প্রচন্ড অবক্ষয় সেটিই প্রমাণ দেয় বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীরা মানবিক মূল্যবোধের নির্মাণে কতটা ব্যর্থ। শিক্ষা ও সাহিত্যের ময়দান থেকে মানুষ একটি সমৃদ্ধ চেতনা পাবে, উন্নত মূল্যবোধ নির্মিত হবে এবং তা থেকে সমাজ একটি সভ্যতর স্তরে পৌঁছবার সামর্থ পাবে সেটি কািিখত ছিল। কিন্তু তা হয়নি। বরং তারাই জন্ম দিয়েছেন বর্তমান অবক্ষয়ের। বস্তুত তাদের কারণেই বাংলাদেশের শিক্ষিত সমাজই সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত সমাজ। তাদের সাথে যাদেরই সাহচর্য বেড়েছে তারাই রোগগ্রস্ত হয়েছে চৈতন্য, চরিত্রে ও মূল্যবোধে। আমাদের বুদ্ধিজীবীদের এ ব্যর্থতার বড় কারণ, তাদের অধিকাংশই কোন না কোন মিথ্যাচারী নেতার আশ্রিয় রাজনৈতিক শ্রমিক। সমাজে মূল্যবোধের প্রতিষ্ঠার চেয়ে এসব নেতাদের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠাই তাদের মূল লক্ষ্য। নেতাদের মিথ্যাচার ও চারিত্রিক কদর্যতাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে অন্যদের দেখিয়ে দেয়ার পরিবর্তে সে মিথ্যাচারের প্রচারে তারা স্বেচ্চছা শ্রমিকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। আমাদের রাজনৈতিকগণ কতটা মিথ্যাচারী এবং আমাদের বুদ্ধিজীবীরা সে মিথ্যা প্রচারে কতটা বিবেকবর্জিত তার সবচেয়ে চোখা ধাঁধানো নজির শেখ মুজিবের ৩০ লাখের তথ্য। আমাদের বুদ্ধিজীবীদের দুষ্কর্ম তুলে ধরার জন্য এ বিষয়টি একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। যে কোন ধর্ম যে কোন মূল্যবোধই মানুষকে সত্যবাদী হতে শেখায়। এমনকি চরম শত্র“র বিরুদ্ধেও। খুনের আসামীর বিরুদ্ধেও আদালতে মিথ্যা বলার অধিকার কোন আইনই কাউকে দেয়নি। একজন ব্যক্তির মিথ্যুক হওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে, শত্র“র সামনে সে মিথ্যা বলে। বন্ধুর সামনে ফেরেশতা সাজাতে সে চারিত্রিক ভ্রষ্টতা দূর হবার নয়। মিথ্যার প্রতি আসক্তিই ব্যক্তির চেতনার ও চরিত্রের সঠিক পরিমাপ দেয়। এ পরিমাপে শেখ মুজিবই শুধু নয়, তার অনুগত বুদ্ধিজীবীরাও সদাচারী প্রমাণিত হননি। শেখ মুজিব কোনরূপ জরিপ না করেই বললেন, একাত্তরে ৩০ লাখ মানুষ নিহত হয়েছে। সে সময় বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি। অর্থাৎ ৭৫ মিলিয়ন। ৭৫ মিলিয়নের মধ্যে ৩০ লাখ বা তিন মিলয়ন নিহত হলে প্রতি ২৫ জনে একজন নিহত হতে হয়। স্কুলের ছাত্ররা এ হিসাব বুঝে। যে গ্রামের প্রতি বাড়িতে গড়ে ৫ জনের বাস সে গ্রামে প্রতি ৫ বাড়িতে একজনকে নিহত হতে হয়। অতএব যে গ্রামে ১০০ ঘর আবাদী সেখানে কমপক্ষে ২০ জনকে প্রাণ দিতে হয়। সে গ্রামে যদি কেউই মারা না যান তবে পাশের সম বসতিপূর্ণ গ্রামে ১০০ ঘরে ৪০ জনকে নিহত হতে হবে। নইলে ৩০ লাখের হিসাব মিলবে না। বাংলাদেশে যাদের বাস তারা শেঝ মুজিবের এ মিথ্যা তথ্য বুঝলেও বুদ্ধিজীবীদের অধিকাংশই সেটি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর, আদালতের উকিল বা পত্রিকার কলামিস্ট হয়েও এখনও সে কথা নির্দ্বিধায় বলেন। মিথ্যাচারী হওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে, কোন কথা শুনা মাত্র তার সত্যাসত্য বিচার না করেই সে বলে বেড়াবে। যত তিক্তই হোক আমাদের বুদ্ধিজীবীদের মিথ্যাচারীতা প্রমাণের জন্য এ বিষয়টি একটি মজবুত দলিল।

আমাদের রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের চরিত্র বিধধ্বংসী এ মিথ্যা প্রবণতা দূর করতে হলে বুদ্ধি চর্চায় সততা ও স্বচ্চছতা আনতেই হবে। মিথ্যাচারিতা মহাপাপ। বস্তুত সব পাপের জন্ম এ পাপ থেকেই। নবীজী (সারূ) ব্যাভিচার, চৌর্যকর্ম ও মিথ্যাচারে লিপ্ত এক ব্যক্তিকে চারিত্রিক পরিশুদ্ধির জন্য প্রথমে যে পাপ কর্মটি পরিত্যাগ করতে উপদেশ দিয়েছিলেন সেটি হলো মিথ্যাচার। নানা পাপের বেড়াজাল থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদেরও মিথ্যা চর্চা বর্জন করতে হবে। ফলে আমাদের জাতীয় পুনর্গঠনে প্রথমে যে কাজটি শুরু করতে হবে সেটি মিথ্যাচারী রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তি পরিত্যাগের মধ্য দিয়ে। মিথ্যা ও মিথ্যাচারীদের দূরে হঠাতে পারলে অন্য সব পাপাচার এমনিতেই দূর হবে। নইলে সমাজের দুর্বৃত্ত মিথ্যাচারিরা শুধু দেশের নেতা, মন্ত্রী বা বুদ্ধিজীবী নয়, জাতির পিতা হওয়ারও স্বপ্ন দেখবে। কারণ মিথ্যাচারিতা জাতীয় জীবনে প্রাধান্য পেলে ফেরাউনরা শুধু রাজ নয়, খোদা হওয়ারও স্বপ্ন দেখে। এটিই ইতিহাসের শিক্ষা। তাই সব যুগের ফেরাউনেরাই মিথ্যাকে গণমুখিতা দিয়েছে। আর সে কাজে আশ্রিত শ্রমিক হিসেবে ব্যবহার করেছে সে সমাজের বুদ্ধিজীবীদের। কারণ, মিথ্যাচার প্রসারে তাদের ন্যায় কার্যকর শক্তি আর নেই। এজন্যই মধ্যযুগের স্বৈরাচারী রাজাদের দরবারে বহু গৃহপালিত সভাকবি থাকতো। বাংলাদেশেও এমন সত্য বিবর্জিত গৃহপালিত বুদ্ধিজীবীদের সংখ্যা অনেক। তাছাড়া তাদের উপর দেশটির চি?িত শত্র“দের পুঁজি নিয়োগ হয়েছে বিস্তর। তাই বাংলাদেশকে গড়তে হলে বুদ্ধিবৃত্তির মিথ্যাচারিতা বন্ধ করতে হবে।

ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে মৃত্যু ঘটে দেহের জীবকোষের, কিন্তু মিথ্যাচরিতায় মৃত্যু ঘটে বিবেকের। ফলে যক্ষা, কলেরা, টাইফয়েডের মহামারীতে বাংলাদেশের ততটা ক্ষতি হয়নি যতটা হয়েছে মিথ্যাচারিতার ব্যাপ্তিতে। দুর্নীতিতে বিশ্বে প্রথম হওয়ার মূল কারণ এটিই। মিথ্যাচারিতার যে বীজ আমাদের রাজনৈতিক নেতা ও বুদ্ধিজীবীদের দ্বারা প্রোথিত হয়েছিল তা এখন পরিণত হয়েছে প্রকান্ড মহিরুহে। মিথ্যার ফসল যে পাপাচার ও দুর্নীতি, বাংলাদেশ আজ তা নিয়ে বিশ্ববাসীর সামনে শিক্ষনীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে। নৈতিকতার ক্ষেত্রে জাতিকে সেটি তলাশূন্য করেছে। এ রোগ আমাদের ইজ্জত নিয়ে বেঁচে থাকার সম্ভাবনাকেই বিপন্ন করছে। মুসলমান হওয়ার অর্থই হলো সে সত্যের পক্ষে সাক্ষী দিবে এবং মিথ্যার মুখ উন্মোচিত করবে। এটি আমাদের ধর্মীয় দায়বদ্ধতা। কিন্তু সে কাজটিই যথাযথভাবে হয়নি। মিথ্যার সামনে নীরবতা ও সদাচারিতা থেকে এ বিচ্যুতি একটি জাতিকে কখনই সাফল্য দিতে পারে না। শুধু দেশ গড়াই নয়, মুসলমান হওয়ার জন্যও বস্তুত সত্য চর্চার বিকল্প নেই। সত্য প্রতিষ্ঠা পেলে মিথ্যা দুরীভূত হবেই। যেমন অন্ধকার অপসারিত হয় আলোর আগমনে। আর সে আলো জ্বালানোর দায়িত্ব নিতে হবে সত্যাচারী বুদ্ধিজীবীদের। মুসলিম সমাজে এ কাজের জন্যই তারা আল্লাহর খলিফা ও রাসুলের (সাঃ) প্রতিনিধি। দেশ গড়ার কাজ শুরু করতে হবে এখান থেকেই। প্রতিটি মুসলমানের উপর এটাই বড় দায়ভার।




বিপর্যয়ের মুখে পাশ্চাত্যের পরিবার

মানব ইতিহাসের সবচেয়ে পুরাতন ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতষ্ঠান হলো পরিবার। মানব-সভ্যতার বয়সের সমান এর বয়স। সভ্যতার জন্ম ও অগ্রগতিতে পরিবারের অবদানই সর্বাধিক। নিছক মাতৃর্গভে জন্ম নিলেই মানব-শিশু মানব রুপে বেড়ে উঠেনা। সে মানব রূপে বেড়ে উঠার মূল সবক ও প্রশিক্ষণ পায় পরিবার থকে। পরিবারের অপরিসীমের গুরুত্বরে কথা হাদীস শরীফে বহুভাবে র্বণতি হয়ছে। নবী কারীম (সাঃ) বলছেন, “প্রতিটি মানব শিশুই জন্ম নয়ে মুসলমান রূপ, কিন্তু পিতা-মাতা বা পরিবারের প্রভাবে বেড়ে উঠে ইহুদী, নাসারা বা অমুসলমি রূপে।” সভ্যতা নির্মানের কাজ একমাত্র মানুষের, পশুদের নয়। আল্লাহর খলীফা হওয়ার কারণে প্রতিটি মুসলমানই একাজে দায়বদ্ধ। তবে এ লক্ষ্যে পরিবার অপরিহার্য। কারণ, সভ্যতার যারা নির্মাতা তাদের নির্মানেও তো প্রতিষ্ঠান চাই। পরিবার বস্তুতঃ সে কাজটিই করে।

মানব ইতিহাসের এই সনাতন প্রতিষ্ঠানটি আজ বিপর্যের মুখে। ফলে বিপন্ন আজ মানবতা। এবং থমকে দাঁড়িয়েছে সভ্যতার অগ্রগতি। ইট ধ্বসে গেলে প্রাসাদও ধ্বসে যায়। তেমনি পরিবার বিধ্বস্ত হলে বিধ্বস্ত হয় সভ্যতা। নির্জন বনে-বাদাড়ে বা মরুভূমিতে  কোন মানবশিশুই সভ্য রূপে বেড়ে উঠনো, সভ্যতাও সেখানে নির্মিত হয়না। উদ্ভিদ বা পশু-পাখীর পক্ষে একাকী বেড়ে উঠা সম্ভব হলেও মানুষরে পক্ষে তা অসম্ভব। পশুকুলে মানব শিশুকে ছেড়ে দিলে সে শুধু দৈহিক নিরাপত্তাই হারায়না, মানবিক গুন নিয়ে বেড়ে উঠার সুযোগও হারায়। মানুষ প্রভাবিত হয়ে তার আশে-পাশের অন্যকে দেখে। ছোট বেলা থেকেই যে শিশু ধর্মের নামে পিতামাতা ও প্রতিবেশীদের শাপ-শকুন, গরু, পাহাড়-পর্বত ও মুর্তির উপসানা দেখে সে শিশু পরবর্তীতে নোবেল প্রাইজ পেলেও ছোটবেলার ধর্মীয় বিশ্বাস ও অভ্যাস সহজে ছাড়তে পারে না। এজন্যই ভারতীয় হিন্দু বিজ্ঞানীগণ শাপ-শকুন, পাহাড়-পর্বত ও মুর্তি পূজার মধ্যে মুর্খতা দেখতে পায়না। একই অস্বাাবিঅসএকই কারণে পাশ্চাত্যরে একজন সেরা দার্শনিক বা ধার্মিক ব্যক্তি কোনরূপ অসভ্যতা দেখেনা উলঙ্গতা, ব্যভিচার, মদ্যপান ও সমকামিতার মধ্যে। পশু যেমন পাশে উলঙ্গতা বা ব্যভিচার হলেও তাতে ভ্রুক্ষেপও করে না, তেমনি অবস্থা পাশ্চাত্য দেশের এসব শিক্ষিতদের। জঘন্য পাপাচার ও কদর্য অসভ্যতাও তাদের কাছে অতিশয় স্বাভাবিক সভ্য-কর্ম রূপে গণ্য হয়। পাপাচারের প্রকাশ্য প্রদর্শণী এজন্যই সমাজে বন্ধ হওয়া জরুরী। এজন্যই জরুরী হল, পাপাচারমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্রের নির্মান। ইসলামে এটি র্সবশ্রষ্ঠে ইবাদাত। ঈমানদাররে এ কাজটিতেই অন্যরা সবচেয়ে বেশী উপকৃত হয়। পরিবার, রাষ্ট্র ও সমাজ একমাত্র এপথেই পুতঃপবিত্রতা পায়। এবং যে কোন সমাজে এটিই সবচেয়ে ব্যয়বহুল কাজ। নবীজী (সাঃ) ও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় কোরবানীটি পেশ করেছেন মূলতঃ এ মহান কাজে। রক্তক্ষয়ী জিহাদ লড়েছেন তারা আমৃত্যূ।এরূপ অর্থ-ব্যয়,রক্তক্ষয় নামায-রোযা-হজ্জ-যাকাত বা আল্লাহর অন্য কোন  বিধান পালনে হয় না।

 

এ বিশ্বে সব জাতি সভ্যতা গড়েনি। জন্ম দেয়নি উন্নত রুচিবোধ বা মূল্যবোধের। সুশৃঙ্খল পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মানে যারা সফল, এ কাজ বস্তুতঃ তাদের। আবর্জনার স্তুপের পাশের আবাদী ছেড়ে মানুষ যখন নগর গড়েছে, সভ্যতার নির্মাণও তখন শুরু হয়েছে। নৃশংস বর্বরতায় আরবরা এককালে ইতিহাস গড়েছিল। নিজের জীবিত কণ্যাকে তারা জ্যান্ত দাফন করতো। কিন্তু এ আরবরাই আবার র্সবকালরে সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার জন্ম দিয়েছিল। তাদের এ সফলতার কারণ, আল্লাহর হেদায়াতের অনুসরণ। এবং নিজেদের গড়েছেন নবীজীর (সাঃ)আদর্শে। বেদের বস্তি বা ভিখারীর কুড়ে ঘর নির্মানে নকশা বা মডেল লাগেনা, কিছু বাঁশ-কঞ্চি ও খড়-কুটো হলেই যথেষ্ট। কিন্তু সেটি অপরিহার্য তাজমহল নির্মানে। উন্নত সমাজ ও সভ্যতার নির্মানে তেমনি অপরিহার্য হলো উন্নত আদর্শ বা নির্দেশনা। ইসলামে সে আদর্শ বা মড়েল হলেন স্বয়ং নবীজী (সাঃ)। আর নির্দেশনা ও মূল নকশাটি দিয়েছেন খোদ আল্লাহতায়লা। এবং আল্লাহতায়লার সে নির্দেশনা বা হেদায়েত এসেছে পবিত্র কোরআনে। অসভ্য বসবাসে আদর্শ লাগে না। আইয়ামে জাহিলিয়াত যুগের আরবরাই শুধু নয়, আজও বহুশত কোটি মানুষ বসবাস করছে আল্লাহর হেদায়েত ছাড়াই। এতে সভ্যতর মানব সৃষ্টির কাজ সামনে এগুয়নি। বরং প্রচন্ড অসুস্থ বেড়েছে মানব সভ্যতার। হালাকু-চেংঙ্গিজের চেয়ে বর্বর মানুষের জন্ম হয়েছে সভ্যতার এ অসুস্থ্যতার কারণে।

 

আল্লাহর হেয়ায়েত এবং রাসূল (সাঃ)র আদর্শের অনুসরণের ফায়দা যে কত বিশাল ও কল্যাণকর সেটি প্রমাণ করেছেন প্রাথমিক কালের মুসলমানেরা। এবং সেটি মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা নির্মানের মধ্য দিয়ে। আলোর মশাল গভীর অন্ধকারেও পথ দেখায়। তেমনি ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নির্মানে পথ দেখায় নবী-রাসূলের আদর্শ। এক্ষেত্রে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ হলেন সর্বশেষ নবী হযরত মহম্মদ (সাঃ। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা তাঁকে “উসওয়াতুন হাসানা” বা উত্তম আর্দশ বলেছেন। মুসলমান হওয়ার অর্থ নবীজী (সাঃ)কে শুধু আল্লাহর রাসূল হিসাবে মৌখিক স্বীকৃতি দেয়া নয়, বরং জীবনের প্রতিপদে তাঁকে অনুকরণীয় আদর্শ রূপে কবুল করা। নবীজী (সাঃ)র সাথে সাহাবায়ে কেরামের আচরণ সেটিই ছিল। তাঁকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে উত্তম আদর্শ রূপে বিশ্বাস করা বা অনুসরণ করাই কুফরি। এটি ইসলাম থেকে বিচ্যুতি। সাহাবায়ে কেরাম তাদের সমস্ত কর্ম ও আচরণে –তা সে ইবাদত হোক বা ব্যক্তি-পরিবার-রাষ্ট্র ও সমাজ গঠন হোক – তার অনুসৃত আদর্শকে অনুসরণ করেছিলেন। আলোর ন্যায় নবীজি (সাঃ)র আর্দশও আরবের ঘরগুলোকে সেদিন আলোকিত করেছিল। ফলে দূরীভূত হয়েছিল মিথ্যা ও অজ্ঞতার অন্ধকার। তখন ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ শিক্ষালয়ে পরনিত করছেলি মুসলমানদের প্রতিটি ঘর্ ও প্রতিটি পরিবার। এবং এভাবে অতি দ্রুত অগ্রসর হয়েছিলেন উচ্চতর সভ্যতা নির্মানের দিকে। সে কালে কোন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না, কিন্তু মুষ্টিমেয় সাহাবীদের ঘর থেকে যে মাপের জ্ঞানবান মানুষ তৈরী হয়েছিল তা মুসলিম বিশ্বের সবগুলো বিশ্ববিদ্যায় বিগদ হাজার বছরে পারেনি। উচ্চতর সভ্যতা নির্মানের কাজ তো এভাবেই ঘর বা পরিবার থেকে শুরু হয়। একাজে পরিবার নিষ্ক্রীয় হলে ব্যাক্তির উন্নয়নের সাথে উম্মাহর উন্নয়ন থমকে দাড়ায়। সভ্যতা কি? এটি হলো জাতীয় জীবনে সভ্যতর ব্যক্তিসমুহের সৃষ্টিশীল কর্ম ও সভ্যতর পরিবর্তনের যোগফল। ফলে একই রকম কুঁড়ে ঘরে হাজার বছর বাস করলে তাতে সভ্যতা নির্মিত হয়না। কারন এটি স্থবিরতা। এমন স্থবিরতায় প্রকাশ পায় আদিম অজ্ঞতাকে আঁকড়ে ধরে বসবাসের প্রবনতা। অথচ পিরামিড বা তাজমহল গড়লে সেটি সভ্যতার অংশ হয়ে যায়। কারন তাজমহলের নির্মানে স্থাপত্যশিল্পকে কুঁড়ে ঘর নির্মানের কৌশল থেকে বহু পথ পাড়ি দিতে হয়। সভ্যতার গুণাগুণ বিচারে তো সে অগ্রগতিটুকুরই বিচার হয়। কিন্তু সভ্যতার তুলনামূলক বিচারে কৃষি, শিল্প, প্রাসাদ বা নগর নির্মানের পাশাপাশি উচ্চতর মানুষ গড়ার শিল্প কতটা সামনে এগুলো সেটিই বেশী গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সেটি যখন উৎকর্ষ পায় তখনই শ্রেষ্ঠতর সভ্যতা নির্মিত হয়। মিশরে বিস্ময়কর পিরামিড বা চীনে বিশাল প্রাচীর নির্মিত হলেও মানবিকতা সম্পন্ন সে বিশাল মাপের মানুষ নির্মিত হয়নি। অথচ সেটি সম্ভব হয়েছিল ইসলামে। অন্য সভ্যতা থেকে ইসলামি সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্ব তো এখানেই।

 

নবীজী (সাঃ) বলেছেন, “দুঃখ হয় ঐ ব্যক্তির জন্য যার জীবনে দুইটি দিন অতিক্রান্ত হলো অথচ তার জ্ঞান ও তাকওয়ার কোন পরর্বিতনই হলোনা”। অথচ আজ মুসলিম বিশ্বে এমন মানুষের সংখ্যা কোটি কোটি যাদের জীবনে শুধু শুধু দুটি দিন নয়, হাজারো দিন -এমন কি সমগ্র জীবন কেটে গেছে অথচ তাদের জ্ঞান ও তাকওয়ার ভান্ডারে কোন পরিবর্তনই আসেনি। সারাটা জীবন বাস করছে অজ্ঞতার ঘোর অন্ধকারের মাঝে। অতিবৃদ্ধ বয়সেও কোরআনের সামান্য একটি ছুরাও বোঝবার সামর্থ অর্জন করেনি। একজন মানুষের কাছেও দ্বীনের দাওয়াত পৌছানোর সামর্থ অর্জন করেনি। যে মুসলমানের জীবনে পরর্বিতনহীন দুইটি দিন যেখানে অসহ্য সে ব্যক্তি কাদা-মাটি, লতা-পাতা, বাঁশ-কঞ্চির ঘরে হাজারো বছর কাটায় কি করে? অথচ বাংলাদেশের ন্যায় দেশে মুসলমানেরা তো সেটিই করেছে। একই রূপ ঘর, একই রূপ কৃষিকাজ ও একই রূপ সংস্কৃতির মাঝে তাদের বসবাস বহুশত বছরের। প্রাথমিক যুগের মুষ্টিমেয় মুসলমানদের হাতে সে সময় উন্নত সভ্যতার জন্ম হয়ছেলি সেটি তো সামনে চলার প্রবল প্রেরণা থেকেই। যেখানে পরিবর্তন নেই সেখানে সভ্যতাও নাই। বিশ্বে বহু ভাষা ও বহু ধর্মের বহু জাতির মানুষের বাস। কিন্তু সভ্যতার জন্মদান সবার দ্বারা হয়নি। সভ্যতার জন্ম দানে যারা ব্যর্থ, তাদের সে ব্যর্থতার কারণঃ তারা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্ররে মত প্রতিষ্ঠানগুলো সঠিক ভাবে গড়ে তুলতে পারিনি। তবে এক্ষেত্রে মূল ব্যর্থতা, আদর্শ পরিবার গড়ায় ব্যর্থতা। কারণ, প্রাসাদ গড়তে যেমন ভাল ইট লাগে তেমনি উচ্চতর সমাজ ও সভ্যতা গড়তেও ভাল মানুষ ও পরিবার লাগে।

 

পারিবার গড়ে উঠেছে বস্তুতঃ মানবিক প্রয়োজনের তাগিদে। অন্য প্রানীকূল থেকে মানুষের শ্রেষ্ঠতম হওয়ার এটিই মূল কারন। পশুদের জীবনে সহস্র বছরেও পরর্বিতন আসে না। গবাদি পশুরা হাজার বছর পূর্বেও যেভাবে ঘাস খেত বা জীবন ধারন করতো এখনো তাই করে। অথচ মানুষ সামনে এগিয়েছে। এর কারণ পরিবার। এ জীবনে নিজের প্রয়োজন আর কতটুকু? কুকুর বিড়ালও সমাজে না খেয়ে মরে না। কারণ তাদের একার প্রয়োজন সব সমাজেই পূরণ হয়। অথচ মানুষকে ভাবতে হয় তার পরিবার ও আপনজনদের নিয়ে। এ ভাবনাই তাকে কর্মশীল, গতিশীল ও দুঃসাহসী করে। পাহাড়-পর্বত, সাগর-মহাসাগরও পাড়ি দয়ে। এরূপ অবিরাম উদ্যোগ ও আত্মনিয়োগই ব্যক্তির যোগ্যতা ও সৃজনশীলতা বাড়ায়। মানুষ জীবনে যা শেখে তার সিংহভাগই শেখে কাজ করতে করতে। তাই যার জীবনে কাজ নেই, তার জীবনে জ্ঞানের বৃদ্ধিও নেই। প্রয়োজনের তাগিদেই সৃষ্টি হয় নতুন আবিষ্কার। যার পরিবার নাই তার জীবনে কর্মে প্রেরণাও নাই। কারণ তার প্রয়োজনের মাত্রাটি অতি সামান্য। পরিবার পরিজনহীন সাধু-সন্যাসীদের দ্বারা তাই সভ্যতার নির্মান দূরে থাকে একখানি গৃহ নির্মানও অসম্ভব। ফলে এমন মানুষরে সংখ্যা বৃদ্ধিতে ক্ষতগ্রিস্থ হয় সমাজ ও রাষ্ট্র। এবং বাধাগ্রস্ত হয় সভ্যতার নির্মান বা অগ্রগতি। ইসলামে তাই বৈরাগ্য জীবনের কোন স্থান নেই।

 

মানব শিশু তার পরিবার থেকে শুধু প্রতিপালনই পায় না, জীবনের মূল পাঠগুলোও পায়। শেখে, কি ভাবে তাকে বেড়ে উঠতে হয়। শেখে কর্মকুশলতা। শেখে কিভাবে অন্যদের দূঃখে দূঃখী এবং সুখে সুখী হতে হয়। পরিবার থেকেই ব্যক্তি পায় উন্নত রুচিবোধ, মূল্যবোধ ও বাঁচবার সংস্কৃতি। মানুষ যখন কলজে-বিশ্ববিদ্যালয় গড়েনি তখনও জীবনের সর্বোচ্চ শিক্ষা পেত পিতা-মাতা, ভাই-বোন, দাদা-দাদী ও অন্যান্য আপনজনদের থেকে। পিরামিড বা তহজমহলের ন্যায় শ্রেষ্ঠ স্থাপত্যশিল্পগুলো যারা গড়ছেলিনে তারাও কোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিদ্যা হাসিল করেননি।সে উচ্চতর বিদ্যা পেয়েছেলিনে নিজেদের পরিবার থেকে। পরিবারই যে মানব জাতির শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয় – সে প্রমান তাই প্রচুর। অথচ আজ সেটিই ভয়ানক বিপর্যয়ের মুখে। বিশাল বিশাল কল-কারখানা বৃদ্ধির সাথে যেমন বিলুপ্ত হয়েছে পরিবার ভিত্তিক কুঠির শিল্প, যান্ত্রীকতা বৃদ্ধির সাথে তেমনি বিলুপ্ত হচ্ছে পরিবার ও পরিবার ভিত্তিক শিক্ষালয়। ফলে মানুষের কেতাবী বা কারিগরি জ্ঞান বাড়লেও বিধস্ত হচ্ছে মূল্যবোধ। সম্পদ বাড়লেও মানুষ নিঃস্ব হচ্ছে মানবিক গুনাবলীত।

 

একমাত্র পারিবারীক শান্তিই ব্যক্তিকে দেয় প্রকৃত শান্তি। পরিবার হলো জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। ব্যক্তির সকল ব্যস্ততাই শুধু নয়, তার সকল স্বপ্ন ও আশা-ভরসা দোল খায় এ পরিবারকে ঘিরে। ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত মানুষ যেখানে শান্তি খুঁজে পায় সেটি তার অফিস নয়, কারখানা বা অন্যকোন কর্মক্ষেত্রও নয়। বরং সেটি হলো তার পরিবার। অশান্তি একবার পরিবারে বাসা বাঁধলে সেটি কোন ঔষধ্ই দূর হবার নয়। অশান্তির সে আগুন তখন গৃহের সীমানা ডিঙ্গিয়ে রাজপথে, লোকালয়ে বা কর্মস্থলে গড়িয়ে পড়ে। তখন সামাজিক অশান্তি বাড়ে সর্বত্র জুড়ে। ক্রমঃর্বধমান মাদকাসক্তি, গ্যাংফাইট ও সন্ত্রাস – এসব তো জন্ম পায় পারিবারীক অশান্তি থেকেই। উলঙ্গতা, মদ্যপান, ব্যাভিচার ও নানা পাপাচার পরিবারে প্রতিপালন পেলে তখন তাতে সমাজও পরিপূর্ণ হয়ে উঠে। মানুষ তার ন্যায়বোধ, রুচিবোধ, মূল্যবোধ ও আচার-আচরন নিয়ে জন্মায়না, এগুলো সে পায় পরিবার থেকে। আর এগুলো নিয়েই তার সর্বত্র বিচরন। অপর দিকে বাইরের জগতে যতই সমৃদ্ধি হোক, তাতে পরিবারে শান্তি আসেনা। একাজ ব্যক্তির একান্তই নিজস্ব। পরিবারকে ঘিরেই শান্তির নিরাপদ দুর্গটি গড়ে উঠে প্রেম-প্রীতি ,ভালবাসা ও উচ্চতর মূল্যবোধরে ভত্তিতি। নিছক পানাহার, যৌনতা বা যৌথবাসই পরিবারের ভিত্তি নয়। এটি নিছক পশু সুলভ। পরিবার গড়ে উঠে উচ্চতর এক উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে। দেহ-ভিত্তিক বা যৌনতা-ভিত্তিকি সম্পর্ক প্রাধান্য পেলে মানুষ তখন আর পশু থেকে শ্রেষ্ঠতর থাকে না। এর জন্য পরিবারের প্রয়োজনও পড়নো। ঘরবাড়ি ও পরিবার ছাড়াই জীব-জন্তু যুগ যুগ বেঁচে আছে। তাদের বংশবিস্তারও হয়েছে। পশুর মত বসবাস, পানাহার বা অবাধ যৌনতা এ বিশ্বে কোন কালেই কম ছিল না। এরপরও মানুষ ঘর বেঁধেছে, পরিবার গড়েছে। শুধু নিজের নয়, সমগ্র পরিবার ও পরিবারের সাথে সংশ্লিষ্ট অন্যদরে দায়-দায়িত্বও মাথায় তুলে নিয়েছে। শুধু ভোগ নয়, দায়ত্ব-পালনও যে বাঁচবার অন্যতম মিশন – মানুষ এ ভাবেই তার স্বাক্ষর রেখেছে। সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মান দুরে থাক একাকী একখানি ঘরও উঠানো যায়না। এর জন্য পারস্পারিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতা চাই। পরিকার তো শিশুকাল থেকে সেটিরও অভ্যাস গড়ে তুলে। প্রাকটিসের জন্য দেয় একটি অবকাঠামো। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মাধ্যমে যে সংযোগ গড়ে উঠে সেটি নিছক দুটি ব্যক্তির নয়, বরং সেটি দুটি পরিবার, দুটি গোত্র বা দুটি জনপদের মাঝে। সৃষ্টি হয় সৌর্হাদ-সম্প্রীতির অভ্যাস। রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনে এসম্পর্ক সিমেন্টের কাজ করে। মানব সমাজ এতে সংঘবদ্ধতা বা সামাজিক বন্ধন পায়। বৃদ্ধি পায় পারস্পরকি আস্থা ও শ্রদ্ধাবোধ। পরিবারের মূল ভিত্তি শুধু আইন নয় বরং এ মূল্যবোধ। ফলে এ মূল্যবোধ বিলুপ্ত হলে বিলুপ্ত হয় পরিবার। বস্তবাদী জীবন দর্শনে যা কিছু দর্শনীয় ও চিত্তাকর্ষক, যাতে থাকে নগদপ্রাপ্তি সে গুলোই গুরুত্ব পায়। তখন গুরুত্ব হারায় নীতি-নৈতিকতা, র্ধমীয় মূল্যবোধ, পরকালীন ভয় ইত্যাদি অদৃশ্য বিষয়। এমন সেকুলার পরিবারে স্বার্থপরতাও ন্যায্য কর্মে পরিনত হয়। পরিবার তখন পরিনত হয় দুর্বৃত্তদের দুর্গে। পাপাচারী দুবৃত্তরা সেখানে শুধু প্রতিরক্ষাই পায় না, সম্মানও পায়। তখন পরিবারগুলো পরিণত হয় দুর্বৃত্তদের পাঠশালায়। তখন দেশে স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালের সংখ্যা বাড়লেও দুর্বৃত্তি কমে না। বরং আকাশচুম্বি হয়। চোর-ডাকাত, ঘুষ-খোর, সূদ-খোর, ব্যাভিচারি, সন্ত্রাসী এমন ঘরে তিরস্কৃত না হয়ে নন্দিত হয়। পায় নতুন দুর্বৃত্তির অনুপ্রেরণা। একারণ্ই আধুনিক মানুষ দুর্বৃত্তি ও মানব-হত্যায় অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। এমন মানুষ তার কর্মে ও উদ্যোগে অনুপ্রেরণা পায় অর্থনৈতিক স্বার্থ-সিদ্ধি, যৌনলিপ্সা ও প্রতিপত্তা বিস্তারের তাড়না থেকে। যেখানেই শিকার, শিকারী পশুর সেখানেই পদচারনা। অনুরূপ অবস্থা বস্তুবাদী ও ভোগবাদী স্বার্থশিকারীদেরও। এমন এক স্বার্থশিকারি চেতনায় নতুন যৌন শিকার ধরতে নানা বাহানায় বিচ্ছিন্ন হচ্ছে পুরনো শিকারী থেকে। এতে বিচ্ছেদ নেমে আসছে বিবাহবন্ধনে। গাড়ী পাল্টানোর চেয়ে স্ত্রী বা স্বামী পাল্টানো এজন্যই রুটিনে পরিণত হয়েছে। আর এতে বাড়ছে পারিবারীক বিপর্যয়।

 

নিজেদের ভোগ-বিলাস ও আনন্দ-উল্লাস বাড়াতে পাশ্চাত্যরে মানুষ নিজের ঘাড় থেকে দায়িত্বের বোঝা কমিয়েছে। আর মানুষের ঘাড়ে তো সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো তার স্ত্রী-পুত্র-কন্যা প্রতিপালনের দায়িত্ব। সে দায়িত্ব কমাতে গিয়ে বিধ্বস্ত করেছে পরিবার। অধিকাংশ নারী হারিয়েছে সন্তান জন্মদানের আগ্রহ। অথচ স্বামী-স্ত্রীর মাঝে সন্তান বন্ধনের কাজ করে। তাছাড়া পরিবার গড়তে হলে বৈবাহিক জীবনের স্থায়ীত্বটি জরুরী। চোরাবালীর উপর যেমন বিল্ডিং গড়া যায়না, তেমনি নড়বড়ে বৈবাহিক সম্পর্কের উপর নিভর করে পরিবার গড়ে উঠে না। এজন্য স্বামী-স্ত্রীর সুসম্পর্ক ও টেকসই সম্প্রীতি প্রয়োজন। বিবাহের পর স্বামী-স্ত্রীর মাঝে একে অপররে উপর শুধু অধিকারই প্রতিষ্ঠিত হয়না, দায়িত্বও অর্পিত হয়। সে দায়ত্বি এড়াতে পাশ্চাত্যরে মানুষ বিবাহ এড়িয়ে যাচ্ছে। এমন অসুস্থ্য চেতনায় মজবুত পরিবার গড়ে উঠবে সেটি কি আশা করা যায়?  ফলে বিধস্ত হচ্ছে পারিবারীক শান্তি। শান্তির খোঁজে পাশ্চাত্যের অশান্ত মানুষ এখন বিকল্প পথ ধরেছে। বেড়েছে প্রমোদ-ভ্রমন, বেড়েছে মদ্যপান, বেশ্যাবৃত্তি, যৌনতা ও ড্রাগের আসক্তি। এমন স্বেচ্ছাচারি জীবন-উপভোগে পারিবারীক বন্ধনকে এরা পায়ের বেড়ী মনে করে, একারণেই শত্রুতা এটির বিরুদ্ধেও। সন্তান যৌন-বাজারে বাজার-দর কমাবে এ ভয়ে গর্ভপাতের নামে অবাধে শিশু হত্যা হচ্ছে। এভাবে পরিবার পরিনত হয়েছে মানব-হত্যার প্রশিক্ষণ ক্ষেত্রে।

 

পরিবার বিধস্ত হওয়ায় সবচেয়ে বেশী অসহায় ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নারী। পাশ্চাত্য সমাজে তাদের কদর বেড়েছে বিজ্ঞাপন, পর্ণ-ফিল্ম ও নাচ-গানের মত বিনাদন শিল্পে। অথচ আবহমান কাল থেকেই নারীদের জন্য পরিবার ছিল সুরক্ষিত দুর্গ। সেখানে মা হিসাবে সন্তানদের গভীর সম্মান, কন্যা ও বোনরূপে আদর ও স্নেহ এবং স্ত্রী হিসাবে ভালবাসা তারা যুগ যুগ পেয়ে এসেছে। অথচ নারী স্বাধীনতা, নারীর ক্ষমতায়ন ও সম-অধিকার ইত্যাদি নানা বাহানায় সেখান থেকে বের করে তাদরকে অসহায় ও অরক্ষতি করা হয়েছে। ফলে তারা আজ ধর্ষণ, হত্যা ও নানাবধি পাশবকি অত্যাচাররে শিকার। সুরক্ষিত পরিবার থেকে বের করে তাদরকে যেন ক্ষুধার্ত ও হিংস্র পশুর সামনে ফেলা হয়েছে। এমন অরক্ষিত অবস্থান থেকে নারীর পক্ষে সন্তান পালনের মত দায়িত্ব-পালন কি সম্ভব? তাছাড়া সন্তান পালন কোন লঘু-দায়িত্ব নয়, খন্ডকালীন কাজও নয়। এ কাজ নিজেই রাতদিনের এক সার্বক্ষনিক ব্যস্ততা। কল-কারখানা, অফিস-আদালত, সেনা বা পুলিশ বাহিনীতে গুরুদায়িত্ব পালনের পর কি এ কাজের আর সামর্থ থাকে? নারীর মর্যাদা বাড়াতে গিয়ে এভাবে বিপর্যয় বাড়ানো হয়েছে। পণ্যের ন্যায় নারীকেও  বাজারে তুলা হয়েছে।

 

নারীর দুটি সত্বা। একটি তার নারীত্ব। অপরটি যৌনতা। পর্দা যৌনতাকে আড়াল করে, আর প্রকাশ করে তার মহান নারীত্বকে। তখন সে সমাজে মা-বোন বা স্ত্রীর সম্মানজনক মর্যাদা পায়। মায়ের পায়ের নীচে সন্তানের জান্নাতের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। নারীত্বের বদলে যথন যৌনতা প্রাধান্য পেয়েছে তখনই নারীর জীবনে প্রচন্ড বিযর্যয় নেমে এসেছে। তখন বিধ্বস্ত হয়েছে পরিবার। যৌনতা নিয়ে বাণিজ্য জমে, কিন্তু তাতে পরিবার প্রতিষ্ঠা পায় না। এজন্যই পতিতাদের কোন পরিবার থাকে না। পাশ্চাত্যে নারীর যৌন সত্ত্বা নিয়ে ব্যণিজ্যে যে কতটা রমরমা ভাব, সেটির প্রমাণ মেলে অলিতে গলিতে নাইট ক্লাব, মদ্যশালা বা পাব ও পতিতাপল্লির সংখ্যা দেখে। পণ্যের বাজারজাত করণে গুরুত্বপূর্ণ হলো আর্কষনীয় প্যাকেজিং। তেমনটি ঘটেছে নারীর ক্ষেত্রেও। এবং সেটি ঘটেছে নিত্য-নতুন ফ্যাশানের নামে। ফ্যাশানের প্রকোপে বিলুপ্ত হয়েছে পর্দা ও শালীন পোষাক। অথচ পর্দা যুগ যুগ ধরে নারীর যৌনতাকে ঢেকে রেখেছে এবং নিরাপত্তা দিয়েছে এবং মহীয়ান করেছে তার নারীত্বকে। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে পর্দা চিহ্নিত হয়ে এসেছে সভ্যতা ও শিষ্ঠতার প্রতীক রূপে। মানব জাতির এটি অতি সনাতন প্রথা। যখন বস্ত্র ছলিনা তখনও মানুষ গাছের পাতা বা ছাল, চামড়া ইত্যাদি দিয়ে লজ্জা নিবারনের চেষ্টা করেছে।

বাংকার বা পরিখার নিরাপদ আশ্রয় থেকে কাউকে বের করে খোলা ময়দানে গুলীর লক্ষ্যবস্তু বানানো সহজ। স্বার্থশিকারী পুরুষেরাও চায় চায় ঘরের নিরাপদ আশ্রয় থেকে নারীদরে বের করে আনতে। পাশ্চাত্যে বস্তুতঃ সেটিই করা হয়েছে। ফলে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির জোয়ারে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নারী। র্ধমহীন ও বিবেকহীন মানুষের শোষন, শাসন ও নির্যাতনের শিকার যেমন দুর্বল মানুষ, তেমনি যৌন শোষনের শিকার হলো দুর্বল নারী। অথচ নারী স্বাধীনতা ও সম-অধিকারের গলাবাজী ও প্রলোভনে তাদরেকে আত্মভোলা করে রাখা হয়েছে।

 

স্বামী-স্ত্রীর বৈবাহিক সর্ম্পকে আপোষ চলনো। তাদের সর্ম্পকে অন্য কেউ ভাগীদার হবে সেটিও অকল্পনীয়। কিন্তু ভোগবাদীদের কাছে এমন আপোষহীনতা কুসংস্কার। মদমত্ত নাচের তালে অন্যের স্ত্রীকে যেমন তারা কাছে টানে, তেমনি নিজের স্ত্রীকে সঁপে দেয় অন্যের আলঙ্গিনে। এরূপ সংস্কৃতির পরিচর্যা বাড়াতেই পাশ্চাত্যে প্রতি লোকালয়ে গড়ে উঠেছে নাইট ক্লাব। আর  এটিই   হলো আধুনিক পাশ্চাত্য সংস্কৃতি। এ সংস্কৃতিতে যেটি বাড়ে সেটি পাপ। প্রসেডিন্টে, প্রধানমন্ত্রী, সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক দলের কর্মী, উচ্চ পদস্থ কর্মচারী, এমনকি গীর্জার পাদ্রীও আক্রান্ত এ পাপাচারে। ফলে বিপন্ন হয়েছে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরকি আস্থা ও সর্ম্পক। এতে ভেঙ্গে যাচ্ছে পরিবার এবং সুফল মিলছে না মিলশিমশিনো বার বার বিবাহতেও। আর বিবাহিত জীবন ব্যর্থ হলে যেটি বাড়ে সেটি হলো ব্যাভিচার। পাশ্চাত্যে সেটিই হয়েছে। আর কোন রাষ্ট্র বা সমা পাপাচারে প্লাবিত হলে পাপের সংজ্ঞাই পাল্টে যায়। তখন পাপ আর পাপ রূপে গণ্য হয় না। গণ্য হয় শিষ্ঠ কর্ম রূপে। এমন পাপকে পাপীষ্ঠরা অতীতে র্ধম-র্কমও বলছে। যেমন কা’বাকে ঘিরে পৌত্তলিক কাফেরদের উলঙ্গ তোয়াফ বা ভারতীয় মন্দিরে যৌন দাসীদের সাথে ব্যাভীচার। ব্যাীব্যভববববববচিার। পাপতো তাই যা নীতি ও নৈতিকতা বিরোধী, যা শিষ্ঠতার খেলাপ। সে নীতি ও নৈতিকতাই যদি পাল্টে যায় তবে সে গুলো কি আর পাপ রূপে গন্য হয়? ব্যাভিচার, সমকামিতা বা হোমোসেক্সুয়ালিটি এ কারনেই পাশ্চাত্য সমাজে আজ আর অপরাধ নয়, বরং আইনসিদ্ধ বৈধ কর্ম। এখন এ পাপ গুলোকেই তারা বিশ্বব্যাপী সিদ্ধ করতে চাচ্ছে। এরা এ পাপাচারকেই এখন নাগরিক অধিকারে পরিণত করতে চায়। এ কাজে তারা ব্যাবহার করছে জাতিসংঘকে। পরিবার ভেঙ্গে যারা পতিতার পল্লীতে আশ্রয় নিয়েছে তাদেরকে বলছে সেক্স ওয়ার্কার। ব্যাভিচারের ন্যায় পাপাচারের বিরুদ্ধে এতকাল যে ঘৃনাবোধ ছিল এখন সেটিই বিলুপ্ত করছে। প্রশ্ন হলো, যে মূল্যবোধে এমন পাপাচার প্রশ্রয় পায় সে মূল্যবোধে কি পরিবার বাঁচে?

 

প্রশ্ন হলো এ বিনাশী বিপর্যয় থেকে উদ্ধার কোন পথে? পথ একটিই, আর তা হলো ইসলামের পূর্ণ অনুসরণ। সে সাথে পাশ্চাত্যের মূল্যবোধ, জীবনচেতনা ও সংস্কৃতিকে বর্জন করা। চিন্তা-চেতনার মডেল না পাল্টালে কর্ম ও আচরনেও কোন পরর্বিতন আসে না। নবীজি (সাঃ) সে কাজটিই করেছিলেন। বিপর্যস্ত পরিবার বস্তুতঃ রোগাগ্রস্ত  চেতনার সিম্পটম মাত্র। মূল রোগ আরো গভীর। আর সেটি হলো ইসলামে অজ্ঞতা।  অজ্ঞতায় যেটি বাড়ে সেটি আল্লাহ ও তাঁর দ্বীনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। মানব-সভ্যতা কোন কালেই  সম্পদের কমতির কারণে বিপর্যস্ত হয়নি। বিপর্যস্ত হয়েছে নৈতিক বিপর্যয়ের কারণে। দুর্ভিক্ষে যদিও প্রান নাশ হয় তবে তাতে সভ্যতার বিনাশ হয় না। প্রচীন কালে পাহাড় কেটে কেটে সামুদ জাতি সুরম্য প্রাসাদ গড়ছেলি। তারা নিশ্চিহ্ন হয়েছিল। নিশ্চিহ্ন হয়েছিল নমরূদ ফিরাউন। এর কারণ আল্লাহর অবাধ্যতা। অথচ ফিরোউন বহু হাজার বছর আগে স্থাপত্যে বিস্ময়কর ইতিহাস গড়েছিল।

 

পাশ্চাত্যের ঘাড়ে এই একই রোগ চেপেছে। প্রাচুর্যের অহংকার শুধু সত্যকে মেনে নিতেই অমনোযোগী করেনি। বরং সেটি আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে তাদেরকে যুদ্ধাংদেহীও করেছে। উদ্ধত ও প্রচন্ড অহংকারী করেছে হোমোসেক্সুয়ালিটি, মদ্যপান, উলঙ্গতা, পর্নোগ্রাফী এসব পাপ কর্ম নিয়েও। এমন পাপের অধিকারকে তারা মানবাধিকার বলছে। অতীতে যে দুর্ভোগ হয়েছে রোগ-ব্যাধির কারণে, এখন তার চেয়েও বেশী দুর্ভোগ হচ্ছে এরূপ বিধ্বস্ত মূল্যবোধ ও বিপর্যস্ত পরিবারের কারণে। পাশ্চাত্যের মূল বিপদ এখানেই। গাড়ীর মডল  নিয়ে তাদরে যতটা ব্যস্ততা, পথের ডিরেকশন নিয়ে ততটা নয়। এ অবস্থায় রোগ যেমন বাড়ছে তেমনি তীব্রতর হচ্ছে সিম্পটম। এমন বিপর্যয়ের মুখে পাশ্চাত্যের সমাজ-বিজ্ঞানী বা দার্শনিকগণ অসহায়। যে স্রোতের টানে তারা গা ভাসিয়ে দিয়েছে সেটিয়ে তাদের ভাসিয়ে নিয়ে ছাড়বে। এ অসুস্থ্য সভ্যতাকে বাঁচাতে তাদের সকল সামর্থ নিঃশেষ। বিশ্বের অন্য র্ধম ও মতবাদগুলোরও একই রূপ বেহাল অবস্থা। তাছাড়া এসব অনৈতিক চেতনা ও জীবন-বোধ পরিবারে শান্তি এনেছে -সমগ্র ইতিহাসে তার নজির নেই। এমন নৈতিক বিপর্যয়ের মোকাবেলায় একমাত্র ইসলামই শেষ ভরসা। তাছাড়া এমন বিপর্যয়ের মুখে মানব জাতির উদ্ধারে একমাত্র ইসলামই অতীতে সফলতা দেখিয়েছে। সেটি একবার নয়, বহুবার। শুধু একটি জনপদে নয়, অসংখ্য জনপদে। ইসলামের সে সার্মথ এখনও অম্লান। আল্লাহর প্রদর্শিত এ পথটি এখনও অক্ষত তার বিস্ময়কর নির্ভূলতা নিয়ে। স্রষ্টার পক্ষ থেকে বস্তুতঃ এটিই একমাত্র প্রেসক্রিপশন। এ প্রেসক্রিপশন অপরিহার্য শুধু সমাজ ও রাষ্ট্রের সুস্থ্যতা বিধানেই নয়, বিপর্যস্ত পরিবারকে বাঁচাতেও। বর্তমানের পারিবারিক বিপর্যয় থেকে উদ্ধারের এটিই একমাত্র পথ। লন্ডন, ১৯/০৭/২০০৯