বিচিত্র প্রসঙ্গ-২

 ১.

দেশের স্বাধীনতার অর্থ দেশের আলোবাতাস বা মশামাছির স্বাধীনতা নয়; বরং সেটি জনগণের স্বাধীনতা। সে স্বাধীনতার অর্থ স্বাধীন ভাবে জনগণের মতপ্রকাশ, দলগড়া ও মিছিল-মিটিংয়ের স্বাধীনতা। তাই যারাই জনগণের সে স্বাধীনতা কেড়ে নেয় তাঁরাই স্বাধীনতার মূল শত্রু। সে স্বাধীনতা হরন করেছিল শেখ মুজিব। তার হাতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল একদলীয় বাকশালী স্বৈরাচার এবং নিষিদ্ধ হয়েছিল সকল বিরোধী রাজনৈতীক দল। নিষিদ্ধ কর হয়েছিল সকল বিরোধী দলীয় পত্র-পত্রিকা। সে স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছে শেখ হাসিনাও। তাই দিল্লির শাহিনবাগে বা কলকাতার পার্ক সার্কাসে মাসাধিক কাল ধর্ণা চললেও শেখ হাসিনা সেরূপ ধর্ণা রাজধানী ঢাকাতে এক দিনের জন্যও হতে দিতে রাজী নয়। তাই হিফাজতে ইসলামের শাপলা চত্ত্বরের শান্তিপূর্ণ ধর্ণা নির্মূলে সেনাবাহিনীকে দিয়ে কামান দাগা হয়েছিল। শত শত মুসল্লীকে রাতের আঁধারে হত্যা করা হয়েছিল। তাদের অনেকের লাশ ময়লার গাড়িতে করে গায়েব করা হয়েছিল। শেখ হাসিনা ব্যালটের উপর ডাকাতি করে কেড়ে নিয়েছে জনগণের ভোটদানের অধীকারও। ফলে স্বাধীনতার শত্রু তাই বাকশালী মুজিব ও হাসিনা। তবে বাংলাদেশী বাঙালীর বিবেকশূণ্যতাও কি কম? স্বাধীনতার শত্রুদের একজনকে এ বাঙালীরা বঙ্গবন্ধু বলে। আরেকজনকে মাননীয় জননেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী বলে।

২.
ফ্যাসিবাদী সরকার থেকে কখনোই মৌলিক মানবিক অধিকার মেলে না। সে সরকারের বিচারকদের থেকে ন্যায়বিচারও মেলে না। স্বৈরাচারি ফ্যাসিবাদী সরকারের অধীনে বিচারকদের মূল কাজটি হয় পুলিশের ন্যায় স্বৈরাচারি সরকার নিরাপত্তা দেয়া, জনগণকে ন্যায় বিচার দেয়া নয়। জামায়াতে ইসলামীর নেতাগণ ফাঁসিতে ঝুলে এবং খালেদা জিয়া জেলের মধ্যে বছরের পর বছর পচে সেটিই প্রমাণ করছেন।

৩.
একটি দেশের পত্রিকার দিকে নজর দিলেই বুঝা যায় সে দেশের জনগণ কতটা স্বাধীন। দিল্লিতে মুসলিম নিধন ও তাদের ঘরাড়ীতে আগুণ দেয়ার বিরুদ্ধে প্রচণ্ড ঘৃনা ও প্রতিবাদের ঝড় বইছে পাকিস্তানের পত্রিকাগুলোতে। এমন কি ঝড় তুলেছে কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকাও। কিন্তু খামোশ শুধু বাংলাদেশের সরকারই নয়, বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকাও। এতে স্পষ্ট বুঝা যায় বাংলাদেশ কতটা পরাধীন।

৪.

খালেদা জিয়ার রাজনীতির নতুন করে পাঠ নেয়া উচিত। রাজনীতির সামান্যতম জ্ঞান থাকলে তিনি কখনোই স্বৈরাচারি হাসিনা সরকারের চাকর-বাকরদের কাছে বিচার বা জামিন চাইতে যেতেন না। সে জ্ঞান থাকলে তিনি বুঝতেন, স্বৈরাচারি সরকারের অধীনস্থ্ বিচা্রকদের কাজ হয় বিরোধী দলীয় নেতাদের গলায় ফাঁসের দড়ি পড়ানো বা পায়ে জেলের শিকল লাগানো। বিরোধীদলীয় নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে হাসিনা যে কাজটি রাজপথে করছে তার চেয়েও জঘন্য কাজ করছে আদালতের বিচারকগণ।

৫.
ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গুজরাতে দুই হাজারের বেশী মুসলিম হত্যার সাথে জড়িত। মোদি যখন গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী তখন তিন মাস ধরে সেখানে মুসলিমদের বিরুদ্ধে গণহত্যা, মুসলিম নারীদের ধর্ষণ ও তাদের ঘরবাড়িতে আগুণ দেয়ার কাজ চলে। এমন দুর্বৃত্ত খুনির সাথে কি কোন সভ্য মানুষ সম্পর্ক রাখে। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা নরেন্দ্র মোদির উপর যুক্তরাষ্ট্রের ঢুকার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন। নিষেধাজ্ঞা লাগিয়েছিল ইউরোপীয় ইউনিয়নও। সে খুনি মোদিকে শেখ হাসিনা তার পিতা শেখ মুজিবের শত বার্ষিকীতে দাওয়াত দিয়েছে। এক খুনি ও ডাকাত আরেক খুনি ও ডাকাতকে সাক্ষী বানাবে সেটি তো এক পুরনো কৌশল। অথচ মুসলিম হত্যার সাথে জড়িত কোন কাফেরের সাথে যে ব্যক্তি বন্ধুত্ব করে সে তো তাবত মুসলিমের দুষমন। একাজ তো ভারতীয় বিজিপি ও আর.এস.এসের সদস্যদের। তবে কি বাংলাদেশও তারা দখলে নিয়েছে? শেখ হাসিনা কি নিজ দেশে এদেরই নেত্রী? এজন্যই কি মোদিকে দাওয়াত?

৬.
ঈমানদার ও বেঈমানের মধ্যে মূল পার্থক্যটি পোষাক-পবিচ্ছদে নয়, সেটি বাঁচার নিয়েতে। ঈমানদার প্রতি মহুর্ত বাঁচে পরকালে কী করে জান্নাতে পৌঁছা যায় -সে ভাবনা নিয়ে। ফলে তাদের হাতে বাড়ে নেককর্ম। অপরদিক বেঈমান বাঁচে এ দুনিয়ার জীবনে  ক্ষমতা ও জৌলুস  বাড়াতে। তাদের হাতে বাড়ে ভোট-ডাকাতি, ব্যাংক-ডাকাতি এবং গুম-খুনের রাজনীতি। সে বেঈমানীটা প্রকট ভাবে ধরা পড়ে বাংলাদেশের সরকারি দলের নেতাকর্মীদের জীবনে।

৭.
শেখ হাসিনা পূর্ববর্তী কংগ্রেস দলীয় সরকার এবং বর্তমান বিজিপি দলীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হাতে প্রতিপালিত। হাসিনার ভোট ডাকাতির অপরাধকে দেশে বিদেশে পুর্ণ সমর্থণ দিয়েছে নরেন্দ্র মোদি। হাসিনা তার পিতার ন্যায় ভারতের বিরুদ্ধে নিমক হারামী করতে রাজী নয়। ভারতে মুসলিম হত্যার বিরুদ্ধে এজন্যই শেখ হাসিনা নিরব। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে লড়াইটি তাই মামূলী বিষয় নয়। এটি মূলতঃ খুনি মোদির ও আর.এস.এসের গুণ্ডাদের বিরুদ্ধে লড়াই। বা্ংলাদেশের মুসলিমদের ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হবে সে লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে।

৮.
শেখ হাসিনা এ অবধি ভারতের নির্যাতিত মুসলিমদের পক্ষে একটি কথাও বলেনি। গুজরাতে যখন মুসলিম গণহত্যা চলে তখনও বলেনি। বরং পিতার শতবার্ষিকে নরেন্দ্র মোদিকে অতিথি করে সে দুর্বৃত্তকে সন্মানিত করেছে। এটি কি কোন সভ্য মানুষের কাজ হতে পারে? হাসিনা যে ভারতের সন্ত্রাসী হিন্দুদের সন্ত্রাসের পক্ষে –এ নিরবতা তো তারই প্রমাণ।

৯.
মুসলিম উম্মাহর একটি অংশের উপর যখন বিপদ নেমে আসে তখন অন্য মুসলিমদের পরীক্ষা শুরু হয়। ভারত, কাশ্মির, ফিলিস্তিন, উইঘুর ও রোহিঙ্গা মুসলিমদের উপর যে মহা দুর্যোগ চলছে -তা দেখে একমাত্র বেঈমানই নিরব থাকতে পারে? মাওলানা আবুল কালাম আযাদ লিখেছিলেন, আফ্রিকার জঙ্গলে কোন মুসলিমের পায়ে যদি কাঁটা বিদ্ধ হয় এবং সে কাঁটার ব্যাথা যদি তুমি হৃদয়ে অনুভব না করো তবে আল্লাহর কসম তুমি মুসলিম নও।

১০.
গরু-ছাগলের কাছে কে চোর-ডাকাত সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো মুখের সামনে প্রচুর ঘাস। তেমনি বেঈমান সামরিক-বেসামরিক সরকারি দাসদের কাছে জরুরী হলো মাস শেষে মোটা অংকের বেতন। বেতন বাড়িয়ে দিলে তারা ভোট-ডাকাত দুর্বৃত্ত সরকারকে বাঁচাতে প্রাণ দিবে। বাংলাদেশ তারই প্রমাণ। এ দাসশ্রেণীর কারণেই অতিশয় দুর্বৃত্ত ভোট-ডাকাতেরাও বিশাল প্রতাপ নিয়ে ক্ষমতায়।


১১.
উচ্চ আদালতের কিছু বিচারক রায় দিয়েছেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে মুজিবের দেয়া ভাষন জনগণের শোনানো উচিত। প্রশ্ন হলো, জনগণ কেন? যারা ব্যাংক ডাকাতি  এবং ভোট ডাকাতি করে তারা বাদ যাবে কেন?

১২.
পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভি এবং প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান দিল্লির মসজিদে আগুণ ও মুসলিম হত্যার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। বিশ্ববাসীর সামনে আবেদন রেখেছেন এ অপরাধের বিরুদ্ধ সোচ্চার হতে।  বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী নিরব।

গরুছাগল কাউকে ধর্ষিত বা জবাই হতে দেখেও প্রতিবাদ করে না। সে পশু নীতিই কি বাংলাদেশ সরকারের নীতি? বাংলাদেশের জনগণ কি এ পশু নীতির সরকারকে রাজস্ব দিয়ে প্রতিপালন করবে? 

১৩.
গুজরাতের এক খুনি নরেন্দ্র মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী। আরেক খুনি অমিত শাহ ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। দিল্লিতেও তারা শুরু হয়েছে গুজরাতের ন্যায় মুসলিম নির্মূলের গণহত্যা।এ বিপদে মুসলিমদের পিছনে দাঁড়ানোর কেউ নাই। স্মরণীয় হলো, সৌদি আরব ও আমিরাতের স্বৈরাচারি সরকার মোদিকে দেশের সর্বোচ্চ খেতাব দিয়ে সম্মানিত করেছে। বাংলাদেশ সম্মানিত করছে মুজিবে শত বার্ষিকিতে দাওয়াত দিয়ে। খুনি ও দুর্বৃত্তরা যদি এভাবে সম্মানিত হতে থাকে তব সত্য ও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠা পাবে কি করে? ২৭/০২/২০২০

 




বিচিত্র প্রসঙ্গ-১

১.

গুজরাতে মুসলিম গণহত্যার সাথে নরেন্দ্র মোদি জড়িত। জড়িত অযোধ্যায় বাবরি মসজিদর ধ্বংসের সাথেও। মোদি এখন চায় ভারতীয় মুসলিমদের নাগরিকতা কেড়ে নিতে। তৈরী করেছে নাগরিকত্য আইন। বিজেপি ও আরএসএসের ন্যায় হিন্দু সংগঠনের নেতাকর্মীদের কাছে বড়ই গর্ব হলো হিন্দু অতীত নিয়ে। ভারতের বুকে ৬ শত বছরের মুসলিম শাসন অতি লজ্জার কারণ। তার দাবী, প্রাচীন যুগে হিন্দু ধর্মগুরুগণ শকওটে চড়ে আকাশ ভ্রমন করতো। অথচ মার্কিন প্রেসিডেন্ট  ডোনান্ড ট্রাম্প ভারত সফরে আসায় তাকে দেখানোর জন্য হিন্দুদের গড়া কোন প্রতিষ্ঠান খুঁজে পাওয়া গেল না। ট্রাম্পকে নেয়ে হলো আগ্রার তাজমহল দেখাতে। প্রশ্ন হলো, হিন্দুত্ব ও হিন্দু ঐতিহ্য নিয়ে এত যে বড়াই তা গেল কোথায়?

২.

মুসলিমদের মাঝে একতা গড়া ফরজ এবং বিভক্তি গড়া হারাম। হারামের পথ জাহান্নামে নেয়। তাই ভাষা, গোত্র, এলাকা, ফেরকা ও দলের নামে যারা মুসলিমদের বিভক্তি গড়ে তারা জনগণকে জাহান্নামে নেয়ার রাস্তা গড়ে। শয়তান ও ইসলামের শত্রুপক্ষ সেটাই চায়।

সুরা আল ইমরানের ১০৩ নম্বর আয়াতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে বিভক্ত না হতে। এবং উক্ত সুরার ১০৫ নম্বর আয়াতে বিভক্তির শাস্তি রূপে ঘোষিত হয়েছে ভয়ানক আযাবের প্রতিশ্রুতি। অথচ মুসলিমদের মাঝে সে নির্দেশের প্রতি আনুগত্য কই? মহান আল্লাহর সে হুকুমের বিরুদ্ধে মুসলিমদের বিদ্রোহ এতটাই প্রবল যে, তারা দল গড়ে এবং দেশ গড়ে ভাষা, এলাকা ও গোত্রের নামে  বিভক্তির দেয়াল গড়ার লক্ষ্যে। ফলে তাদের ৫৭টি দেশ।

অথচ গৌরব যুগে মুসলিমদের একটি মাত্র দেশ ছিল। নবীজী ও তারা সাহাবাগণ দেশ গড়েছেন নানা ভাষা, নানা গোত্র ও নানা এলাকার মানুষের এক অখণ্ড ভূগোলে বসবাসের সুযোগ দিতে। ফলে আরব, ইরানী, তুর্কী, কুর্দি, মিশরীয়, মুর এক দেশে বসবাস করেছে। এক এলাকা বা শহর থেকে অন্য শহরে গিয়ে ঘর বাঁধতে আজকের ন্যায় কোন ভিসা লাগতো না। তাতে আল্লাহর রহমত এসেছে এবং মুসলিমগণ বিশ্বশক্তির মর্যাদা পেয়েছে। মুসলিমগণ আজ বিভক্ত। বিভক্ত বাঁচাতে সেনাবাহিনী গড়েছে। তাই প্রতিশ্রুত আযাবও তাই তাদের ঘিরে ধরেছে। নামায়-রোযা বা লক্ষ লক্ষ মসজিদ-মাদ্রাসা গড়ে কি এ শাস্তি থেকে মুক্তি মিলবে?ঐক্যের বিকল্প ঐক্যই। বিভক্তির জন্য কোর’আনে ঘোষিত যে প্রতিশ্রুত আযাব -তা থেকে মুক্তি একমাত্র একতা গড়েই সম্ভব।তাই প্রতিটি ঈমানদারের মেধা ও সামর্থ্যের বিপুল বিনিয়োগ হওয়া উচিত মুসলিম উম্মাহর একতার প্রতিষ্ঠায়।

৩.

পরকালের ভাবনা থেকেই রাজনীতি, সংস্কৃতি, যুদ্ধনীতি ও শিক্ষানীতি নির্ণীত হওয়া উচিত। একমাত্র তখনই গুম,খুন, ধর্ষণ ও ভোট ডাকাতির বদলে সভ্যতর রাজনীতির জন্ম হতে পারে। মানব জীবনের সবচেয়ে ভয়ানক শূণ্যতাটি শিক্ষা বা সম্পদের নয়। বরং সেটি আখেরাতের ভয় না থাকাটি। আখেরাতের ভয় থাকলে প্রতি মুহুর্তের ব্যস্ততাটি হয় নেক আমলে। চুরি, ডাকাতি ও ব্যভিচারের ন্যায় নানারূপ পাপের পথে নামার মূল কারণটি হলো পরকালের ভয় না থাকা।মহান আল্লাহতায়ালা সেটিরই ঘোষণা দিয়েছেন সুরা  আল মুদাচ্ছেরে।

৪.

মুসলিমদের রাজনীতি বা যুদ্ধে যখন কাফেরগণ খুশি হয়, বুঝতে হবে তাতে মুসলিমদের মহা ক্ষতি।আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিয়ে তাবৎ কাফেরগণ খুশি। তাই তাতে বিপদ বাড়ছে মুসলিমদের। কোন মুসলিম দেশ ভেঁঙ্গে যাওয়ায় খুশি হওয়াটি বেঈমানীর লংক্ষণ। মনে কষ্ট পাওয়াটি ঈমানের লক্ষণ। বেঈমানীর কারণেই মুসলিম বিশ্ব আজ বিভক্ত।এবং সে বিভক্তি নিয়ে বিজয় উৎসব হয়।

৫.

কারো বেঈমানীই কখনোই গোপন থাকেনা। সেটি ধরা পড়ে যেমন তার নিজের দুর্বৃত্তির মাঝে তেমনি চোর-ডাকাত-দুর্বৃত্তদের সরকারের প্রতি সমর্থণ করা থেকে। এরূ বেঈমানেরাই মুসলিমদেশগুলোতে ইসলামের পরাজয় বাড়িয়েছে। এরা ইসলামের বিজয় রুখতে অস্ত্র হাতে রাস্তায় নামে।

৬.

কে কতটা দৈহিক বল নিয়ে বাঁচলো মহান আল্লাহর দরবারে সে হিসাব হয় না। কারণ, সে বলটি দেন মহান মহান আল্লাহতায়ালা। তিনি অন্ধ বা পঙ্গু করেও জন্ম দিতে পারতেন। হিসাব হয় কে কতটা নৈতীক বল নিয়ে বাঁচলো সেটি। নৈতীক বলের মাঝেই ঈমানদারি। এর মাঝেই ধরা পড়ে ব্যক্তির নিজের অর্জন। এবং সেটি না থাকার মাঝ বেঈমানী।

৭.

চোর-ডাকাতেরা ক্ষমতায় গেলে তাদের মূল লক্ষ্য হয়, চুরি-ডাকাতিকে সহজ করা। যাতে মাঠ-ঘাট পাড়ি দিয়ে মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে তাদের চুরি ডাকাতি করতে না হয়। বাংলাদেশে সে চুরি-ডাকাতিকে সহজ করার পদ্ধতিটি হলো লোনের নামে চোর-ডাকাতদের হাতে ব্যাংকের টাকা তুলে দেয়া। ডাকাতদের মাঝে অর্থ বিতরণ হয় সরকারি প্রকল্পের নামে বাংলাদেশে তাই হাজার হাজার কোটি টাকা ডাকাতদের হাতে লুণ্ঠিত হয়ে গেছে।

৮.

শারিরীক বলে মানুষ নিজ পায়ে দাঁড়ানোর বল পায়। নৈতীক বলে শক্তি আসে দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে খাড়া হওয়ার।চোর-ডাকাতেরা ক্ষমতায় গেলে তাই হত্যা করে জনগণের নৈতীক বলকে।ফলে দেশে জোয়ার আসে দুর্বৃত্তদের। তাদের উন্নয়নকে তারা দেশের উন্নয়ন বলে।

৯.

বাঁচা এবং মরাটি একমাত্র আল্লাহতায়ালাকে খুশি করার লক্ষ্যে হলেই পরকালে জান্নাত জুটে। শয়তান সেটি হতে দিতে রাজি নয়। সে পথটি রুখে দেয়ায় শয়তানের মূল এজেন্ডা। এক্ষেত্রে শয়তানের বিজয়টি বিশাল। শয়তান প্ররোচিত করে দল, গোত্র, ভাষা, বর্ণ ও জাতীয়তার নামে প্রাণ দানে। সে লক্ষ্যে নানারূপ যুদ্ধের আয়োজনও বাড়ায়। ফলে এরূপ নানা যুদ্ধে লাখ লাখ মুসলিম মরলেও তাদের মাঝে আল্লাহর রাস্তায় জান দেয়ার আয়োজনটি বিরল। ফলে বাড়ছে ইসলামের পরাজয়।

১০.

স্বৈরশাসকের কাছে গুরুত্ব পায় নিজের ও নিজদলের শাসন এবং গুরুত্ব হারায় জনগণের মতামত। ভোটচুরি এবং ভোট ডাকাতিও তখন জনগণকে ধোঁকা দেয়ার কাজে ব্যবহৃত হয়।বাংলাদেশ তারই নমুনা।

১১.

সফল ডাকাতির পর ডাকাতের মুখে থাকে অট্টহাসি এবং লুন্ঠিত গৃহস্থের মুখে থাকে আহাজারি।ভোটডাকাতির পর ভোটডাকাতও তেমনি লুন্ঠিত জনগণের সামনে প্রতিদিন অট্টহাসি দেয় এবং আয়োজন করে আনন্দ উৎসবের।

১২.

দেহ বাঁচাতে নিয়মিত পানাহার জরুরী। তেমনি  ঈমান বাঁচাতে জরুরী কোরআনের জ্ঞান।এজন্যই নামায-রোযার আগে কোরআনের জ্ঞান ফরজ করেছেন। কোর’আন না বুঝে পডলে জ্ঞানার্জনের সে কাজটি হয়না।

১৩.

যে বাগানের গাছগুলো শুধু আলো-বাতাস ও সার নেয়, ফল দেয় না -সে বাগান উৎপাদনশূণ্য। সে অবস্থাটি মুসলিমদেরও। মুসলিমদের শুধু সংখ্যাই বেড়ে চলেছে কিন্তু বিজয় বাড়ছে না।

১৪.

মানবসৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য তারা প্রতি মুহুর্ত ইবাদত করবে আল্লাহর, বিনিময়ে পাবে জান্নাত। ইবাদতের অর্থ, মহান আল্লাহর প্রতি হুকুমের গোলামী। সে গোলামী হতে হবে এ জীবনের প্রতি অঙ্গণে এবং বাঁচার প্রতি পদে। রাজনীতি, বিচার, শি্ক্ষা-সংস্কৃতি এবং প্রশাসনও সে ইবাদতের অঙ্গণ।যাদের কাছে ইবাদতের অর্থ শুধু নামায়-রোযা, হজ্ব-যাকাত -তাদের জীবনের বাঁকি সময়টুকু ইবাদত-মুক্ত। তাদের অজ্ঞতাটি মূলতঃ ইবাদতের অর্থ বুঝা নিয়ে। ফলে তাদের কাছে সেক্যুলার রাজনীতি, সূদ, ঘুষ, মিথ্যাচার, চুরি, ভোটডাকাতি এবং বেপর্দাগীও অপরাধ গণ্য হয় না।

১৫.

কোন ডাকাত যদি বলে সে সমাজ থেকে অপরাধ দুর করবে -এর চেয়ে বড় মশকরা বা কৌতুক আর কি হতে পারে? বাংলাদেশের ইতিহাসে তাই বড় কৌতুক হলো, ভোট ডাকাত হাসিনার সরকারও নাকি দেশকে দুর্নীতি মুক্ত করবে।




যে নাশকতা বিভক্তির ও অসভ্য রাজনীতির

প্রতিটি জাতির জীবনেই কোন না কোন সময় ভয়ানক বিভক্তি আসে। সে বিভক্তি অনেক সময় গভীর রক্তক্ষরণও ঘটায়। রাজনীতির সভ্য বা অসভ্য চরিত্রটি ধরা পড়ে সে গভীর বিভক্তিকে কতটা সভ্য বা অসভ্য ভাবে মীমাংসা করা হয় তা থেকে। সম্প্রতি ব্রিটিশ জনজীবনে তেমনি এক বিভক্তি এসেছিল ই্‌উরোপীয়ান ইউনিয়নে থাকা বা না-থাকা নিয়ে। গত তিন বছর ধরে চলা প্রচন্ড রাজনৈতিক বিতন্ডার পর অবশেষে ৩১শে জানুয়ারির মধ্য রাতে যুক্তরাজ্য তথা গ্রেট ব্রিটেন ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন থেকে বিচ্ছিন্ন হলো। এ বিষয়টি নিয়ে ব্রিটিশ জনগণ পুরাপুরি দ্বি-ভাগে বিভক্ত ছিল। এ প্রসঙ্গে কয়েক বছর আগে অনুষ্ঠিত রেফারেন্ডামে শতকরা ৫২ ভাগ ভোট পড়ে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পক্ষে। বিপক্ষে পড়েছিল শতকরা ৪৮ ভাগ। উভয়ের মাঝে পার্থক্যটি তাই বিশাল ছিল না। তবে চিত্রটি ভিন্নতর ছিল ইংল্যান্ডের বাইরে। যেমন স্কটল্যান্ডে ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে ভোট পড়েছিল শতকরা ৬২ ভাগ। একই চিত্র ছিল উত্তর আয়্যারল্যান্ডে। সেখানেও অধিকাংশ ভোটার বিচ্ছিন্নতাকে সমর্থণ করেনি।

এরূপ জাতীয় বিষয়গুলি নিয়ে জনগণের মাঝে বিভক্তি দেখা দেয়াটি আদৌ অস্বাভাবিক নয়। কারণ, কিসে দেশ ও দেশবাসীর কল্যাণ –তা নিয়ে সবাই একই ভাবে ভাবে না। দেশের বড় বড় অর্থনীতিবিদগণ বলেছিলেন, বিচ্ছিন্নতায় ব্রিটিশ অর্থনীতির ক্ষতি হবে। শ্রমিক দলীয় সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার এবং গর্ডন ব্রাউন এবং রক্ষনশীল দলীয় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ও জন মেজরসহ বড় বড় বহু নেতাই ইউরোপীয়ান ইউনিয়নে থাকার মধ্যেই ব্রিটিশ জনগণের কল্যাণ ভাবতেন। বিচ্ছন্নতার বিরুদ্ধে তারা প্রচারে্ও নেমেছিলেন। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে উগ্র বর্ণবাদ ও জাতীয়তাবাদের যে ঢেউ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হানা দিয়েছে সেটির আছড় পড়েছে যুক্তরাজ্যেও। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে এককালে সূর্য্য অস্ত যেত না –সে গর্ব তাদেরকে অতিশয় অহংকারি করে তোলে। ই্‌উরোপের অন্য কোন দেশের সেরূপ ইতিহাস নেই। এরূপ অহংকার থেকে যা জন্ম নেয় তা হলো অন্যদের প্রতি ঘৃনা ও অবজ্ঞা। সে ঘৃণা ও অবজ্ঞার প্রভাব পড়ে দেশের রাজনীতিতেও। তখন জাতীয় জীবনে আসে বিচ্ছিন্নতা। এরূপ ঘৃণা নিয়েই গর্বিত ইরানীরা বিচ্ছিন্ন হয়েছিল মুসলিম উম্মাহর মূল দেহ থেকে। একই ভাবে গর্বিত আরবগণ বিচ্ছিন্ন হয়েছিল উসমানিয়া খেলাফত থেকে। ডোনাল্ড ট্রাম্প যেমন “America will be great again” স্লোগান তুলে মার্কিন জনগণের ভোট হাসিল করে, সেরূপ সফলতা লাভে বরিস জনসন এবং তার সাথীরাও লাগাতর বয়ান দিতে শুরু করে “UK will be great again”। ভোটে সে বয়ান কাজও দিয়েছে।  

বিচ্ছিন্নতা কখনোই একাকী আসেনা, জনগণের মাঝে তা জন্ম দেয় গভীর বিভক্তিও। বিচ্ছিন্নতার সে সূত্র ধরেই ব্রিটিশ জনগণ আজ গভীর ভাবে বিভক্ত। বিজয়ী দল প্রকাশ্যে উৎসব করছে, এবং পরাজিত দল নীরবে মাতম করছে। এরূপ বিভক্তি নিয়ে কোন দেশই সামনে এগুতে পারে না। এর ফলে দেশে সামাজিক সম্পৃতি ও শান্তিও প্রতিষ্ঠা্ পায় না। তাই যে কোন দেশে সভ্য রাজনীতির লক্ষ্য হয়, যতটা শীঘ্র সম্ভব দেশবাসীর মাঝে গড়ে উঠা বিভক্তিকে দ্রুত দূর করা। এবং ইসলামে এটি নামায-রোযার ন্যায় ফরজ। বিভক্তি দূর না করলে পবিত্র কোর’আনের সুরা আল ইমরানে ভয়ানক আযাবেরও প্রতিশ্রুতি শোনানো হয়েছে। মুসলিমগণ ইসলাম থেকে কতটা দূরে সরেছে তার প্রমাণ হলো, বিভক্তির উঁচু দেয়াল এবং সে দেয়াল বাঁচিয়ে রাখার কাজে হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ।

যে কোন দেশে দায়িত্বশীল নেতাদের প্রধান কাজটি হলো, বিভক্ত জনগণের মাঝে একতা গড়া। এমন এক দায়িত্ববোধ নিয়েই ৩১শে জানুয়ারির মধ্যরাতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বিচ্ছন্ন হওয়ার পর পরই জাতির উদ্দেশ্যে বক্তব্য রেখেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। তিনি বলেছেন, তার কাজ বিভক্ত জাতিকে আবার একতাবদ্ধ করা। প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের এ বক্তব্যের মধ্যেই রয়েছে বাংলাদেশী রাজনীতিবিদদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। বাংলাদেশেও গভীর বিভক্তি এসেছিল ১৯৭১ সালে। সেটি ছিল পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্নতা নিয়ে। তবে না নিয়ে কোন রেফারেন্ডাম হয়নি। পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার বিষয়টি নির্ধারিত হয়েছিল বন্দুকের নল দিয়ে। এবং সে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে জড়িয়ে পড়ে ভারতের ন্যায় আগ্রাসী একটি শত্রু রাষ্ট্র। এভাবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের অংশীদারিত্বও প্রতিষ্ঠা পায়। আওয়ামী লীগ,ন্যাপ, কম্যুনিষ্ট পার্টির ন্যায় ইসলামে অঙ্গিকারশূণ্য সেক্যুলার দলগুলো ছিল পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্নতার পক্ষে। ভারতের বিপুল রাজনৈতিক ও সামরিক বিনিয়োগ ছিল তাদের পক্ষে। তাদের পক্ষ নেয় আরেক শত্রু রাষ্ট্র সোভিয়েত রাশিয়া। অপর দিকে মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলাম, নিজামে ইসলাম, জমিয়তে ইসলামের ন্যায় মুসলিম চেতনা-সম্পন্ন দলগুলি ছিল বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে। বিচ্ছিন্নতার পক্ষ নেয়নি এমন কি বরেণ্য কোন আলেম, কোন পীর এবং মাদ্রাসার কোন শিক্ষক। তারা এ বিচ্ছিন্নতাকে হারাম গণ্য করেছে। এমন কি সেক্যুলার বিশ্বাবিদ্যালয়গুলোর শতাধিক শিক্ষকও পত্রিকায় বিবৃতি দেয় বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে। তাই বিভাজনটি স্রেফ রাজাকার ও সেক্যুলারিস্ট রাজনৈতিক দলগুলির মাঝে সীমিত ছিল না।

বাংলাদেশে একাত্তরের  পর রাজনীতির নামে যা কিছু হয়েছে তা ছিল অতি বিভেদপূর্ণ। দেশের জন্য তা অতি ক্ষতিকরও। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ব্রেক্সিট-পরবর্তী বিভক্ত জনগণকে জোড়া লাগানোর যে অঙ্গিকার জাহির করেছেন, তেমন সভ্য অঙ্গিকার একাত্তরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গণে দেখা যায়নি। জনগণের মাঝে বিভক্তি দূর না করে বরং সে বিভক্তিকে বাড়ানোর চেষ্টা হয়েছে অতি প্রবল ভাবে। প্রশ্ন হলো, ব্রিটিশ রাজনীতিতে কেন এ ঐক্যের সুর? কারণটি সুস্পষ্ট, ব্রিটিশ প্রধামন্ত্রী বরিস জনসন কোন ট্রাইবাল নেতা নন। তিনি একজন রাষ্ট্রনায়ক তথা স্টেট্সম্যান। স্টেট্সম্যানগণ শুধু বর্তমান নিয়ে ভাবে না, ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবে।  এজন্যই তাঁর বক্তব্যে সংহতির প্রতি এতো আগ্রহ। তাই ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে যারা বিচ্ছিন্নতার বিরোধী ছিল তাদেরকে কখনোই তিনি দেশের শত্রু রূপে আখ্যায়ীত করেননি। তাদের চরিত্রহননও করেননি। কারণ বিরোধীদের গালিগালাজ করে বা তাদের চরিত্রহনন করে বিভক্তিকে দূর করা যায় না। বরং তাতে সেটি বৃদ্ধি পায়। সভ্যতর রাজনীতির লক্ষণ হলো বিভক্তির বদলে সংহতির প্রেরণা। তেমন এক সভ্যতর রাজনীতি ১৯৪৭ সালে এ বঙ্গ ভূমিতে দেখা গেছে পাকিস্তান সৃষ্টির পর। সে সময়ও লাখ লাখ মানুষ পাকিস্তান সৃষ্টির বিরোধীতা করেছিল। কিন্তু সে কারণে কারো বিরুদ্ধে নির্মূলের ধ্বনি দেখা যায়নি। একাত্তরে যেমন লাখ লাখ বিহারীর ঘরবাড়ি কেড়ে নিয়ে বস্তিতে পাঠানো হয়েছে সেরূপ অসভ্যতা ১৯৪৭য়ে যারা পাকিস্তান সৃষ্টির বিরোধীতা করেছিল তাদের বিরুদ্ধে দেখা যায়নি।

যেখানে বিভক্তি, ঘৃনা ও চরিত্র হননের কদর্য রাজনীতি -সেটি তো উলঙ্গ অসভ্যতা। তখন  রাজনীতির অঙ্গণে ধ্বনিত হয় বিরোধীদের নির্মূলের ধ্বনি। বিলুপ্ত হয় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। নিষিদ্ধ হ্য় মিছিল মিটিংয়ের অধীকার।  বিরোধীদের তখন পিটিয়ে লাশ বানানো হয়, গুম করা হয় বা ফাঁসিতে চড়িয়ে হত্যা করা হয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফ্যাসিবাদী সে অসভ্যতাটি অতি প্রকট। সেরূপ নিরেট অসভ্যতা নিয়েই বিরোধী নেতা সিরাজ সিকদারকে হত্যা করার পর শেখ মুজিব সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছিল, “কোথায় আজ সিরাজ সিকদার?” এরূপ হত্যাপাগল নেতাগণ দ্রুত জনসমর্থণ হারায়। তখন জনগণকে বাদ দিয়ে তাদের নির্ভর করতে হয় বিদেশী প্রভুর উপর। ফলে শেখ মুজিবকে তাই আবির্ভুত হতে হয়েছিল ভারতের ক্রীড়নক একজন ট্রাইবাল নেতা রূপে। এজন্যই তার রাজনীতিতে বিজ্ঞ রাষ্ট্রনায়ক সুলভ প্রজ্ঞা ও ঐক্যের সুরটি দেখা যায়নি।

ট্রাইবাল রাজনীতি গণতন্ত্র বাঁচে না। অন্যদের জন্য রাজনীতিতে কোন স্থান দেয়া হয় না। তখন যা বাঁচে বা বেড়ে উঠে -তা হলো ট্রাইবাল নেতার একক কর্তৃত্ব ও স্বৈরাচার। নিজের ট্রাইবাল রাজনীতিকে বাঁচাতে শেখ মুজিব তাই অন্যদের রাজনীতিকে নিষিদ্ধ করেছিল। জারি করেছিল একদলীয় বাকশালী শাসন। নিষিদ্ধ করেছিল সকল বিরোধী দলীয় পত্র-পত্রিকা। জনগণের উপর দাবড়িয়ে দিয়েছিল তার পেটুয়া রক্ষিবাহিনী। তার মৃত্যু ঘটে ৩০ হাজারের বেশী রাজনৈতিক নেতা-কর্মীর। নিজের রক্ষাকর্তা রূপে জনগণকে বাদ দিয়ে বেছে নিয়েছিল ভারতকে। আর ভারত তো বিনা মূল্যে কাউকে সুরক্ষা দেয় না। মুজিবকে সে মূল্য পরিশোধ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা বন্ধক রেখে। একই পথ ধরেছে শেখ হাসিনা। সেও ব্যবহৃত হচ্ছে ভারতের লক্ষ্য পূরণে। মুজিব যেমন নিজের রাজনীতি বাঁচাতে গণতন্ত্রকে কবরে পাঠিয়ে একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল, হাসিনাও তেমনি গণতন্ত্রকে কবরে পাঠিয়ে ভোট ছাড়াই ক্ষমতা এসেছে। এবং সেটি মধ্য রাতে ভোটডাকাতির মাধ্যমে। ফলে ভোটার লিষ্টে নাম থাকলে কি হবে, জনগণ হারিয়েছে নিজের পছন্দসই নেতার পক্ষে ভোটদানের অধিকার। 

ভারতের কাছে বন্ধু হওয়াটি কোন কালেই নিঃশর্ত ছিল না। বরং সে পূর্বশর্তগুলি অতি সুস্পষ্ট। এবং মূল শর্তটি হলো, বাংলাদেশের মাটি থেকে ভারত বিরোধীদের নির্মূলে অতিশয় নির্দয় ও নিষ্ঠুর হওয়া। হাসিনা এরূপ অসভ্য নিষ্ঠুরতায় তার পিতাকে ছাড়িয়ে গেছে। তাই গুম, খুন, হত্যা ও ফাঁসির রাজনীতি মুজিবামলের চেয়ে আজ অধীক। ফলে ভারত শেখ মুজিবকে যে সুরক্ষা দেয়নি –যা তারা হাসিনাকে দিচ্ছে। বিএনপি বা অন্য কোন দলের পক্ষে সে শর্ত পূরণ সম্ভব নয়। ফলে তাদের পক্ষে সম্ভব নয় ভারতের কাছে বন্ধু হওয়া। আওয়ামী রাজনীতির এ অসভ্য নিষ্ঠুরতা থেকে এ জন্যই বাংলাদেশের সহজে নিস্তার নেই। এবং নিরাপত্তা নেই ভারত বিরোধী রাজনৈতীক নেতাকর্মীদেরও। আবরার ফা্হাদ লাশ হলো, ভিপি নূরুল হক ও তার সাথীরা বার বার মার খাচ্ছে তো সে ভারতীয় নীতি প্রতিষ্ঠা দেয়ার কারণেই।

 “বিভক্ত করো এবং শাসন ও শোষন কর” এটিই সর্বকালে দুষমন অতি প্রিয় পলিসি। দেশী ও বিদেশী দুষমনগণ তাই জনগণের একতার ঘৃণ্যতম দুষমন। ভারত চায় বাংলাদেশকে একটি বাঁদি রাষ্ট্রে পরিণত করতে। সে লক্ষ্যেই তাজুদ্দীনের সাথে ৭ দফা এবং মুজিবের সাথে ২৫ দফা চুক্তি স্বাক্ষর করে। ৭ দফা ও ২৫ দফা চুক্তির মেয়াদ শেষ হলেও ভারতের আগ্রাসী পলিসির আদৌ মৃত্যু হয়নি। সে অভিন্ন লক্ষ্য নিয়েই একাত্তর থেকেই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারত রাজনীতি কলকাঠি নাড়াচ্ছে্। একাজে ব্যবহার করছে শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগকে। আর এতে হাসিনার সুবিধা হচ্ছে, ক্ষমতায় থাকতে তাকে জনগণের ভোট লাগছে না। ফলে দেশ জুড়ে বাড়ছে নিরেট ফ্যাসিবাদ এবং অসম্ভব হচ্ছে একাত্তরে গড়ে উঠা বিভক্তিকে দূর করা্। এবং এতে প্রবলতর হচ্ছে সভ্য রাজনীতির বদলে বিরোধীদের নির্মূলের অসভ্য রাজনীতি। ২/২/২০২০  

 

        




দেশ ও মানুষ নিয়ে সাম্প্রতিক ভাবনা-২

১.

কোন ডাকাত যদি বলে সে সমাজ থেকে অপরাধ দুর করবে -এর চেয়ে বড় মশকরা আর কি হতে পারে? ডাকাতের ন্যায় অপরাধীগণ শুধু অপরাধ বাড়াতেই জানে, অপরাধের নির্মূল নয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে তাই সবচেয়ে বড় কৌতুক হলো, ভোট ডাকাতি করে যে শেখ হাসিনা দেশকে হাইজ্যাক করলো সে নাকি দেশকে দুর্নীতি মুক্ত করবে।

২.

চুরি, ডাকাতি, খুন ও ব্যভিচারের ন্যায় নানারূপ পাপের পথে নামার মূল কারণটি হলো পরকালের ভয় না থাকা। সে বিষয়টিই মহান আল্লাহতায়ালা সুস্পষ্ট করেছেন সুরা  মুদাছছেরের ৫৩ নম্বর আয়াতে।

৩.

আখেরাতের ভয় ব্যক্তিকে পাপ থেকে দূরে রাখে। তাই যারা চোর-ডাকাত, ভোট-ডাকাত ও গুম-খুনের রাজনীতির অনুসারি তারা যে আখেরাতের ভয়শূণ্য বেঈমান -তা নিয়ে কি সামান্যতম সন্দেহ থাকে? বাংলাদেশে তাদেরই রাজত্ব চলছে। পবিত্র কোরআনের বিশাল ভাগ ব্যয় হয়েছে বস্তুতঃ আখেরাতের ভয়কে তীব্রতর করতে। যারা না বুঝে কোর’আন তেলাওয়াত করে -তাদের মনে সে ভয় জাগে না।

৪.

মানুষের মাঝে সম্পদ, সন্তান, বিদ্যা-বুদ্ধি ও স্বাস্থ্যের ন্যায় আল্লাহতায়ালার নানা রূপ নিয়ামতের যে ভিন্ন ভিন্ন বন্টন তা নিয়ে যে ক্ষোভ –তা থেকেই জন্ম নেয় হিংসা-বিদ্বেষ। এটি মহান আল্লাহতায়ালার প্রজ্ঞা ও নীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। তাই এটি বিশাল পাপ। এটি বস্তুতঃ বেঈমানীর লক্ষণ। এ বন্টন নিয়ে রাজী থাকা এবং সন্তুষ্টির যে প্রকাশ –সেটিই হলো শুকরিয়া। এটি ইবাদত।

৫.

সাম্প্রতিক এক বক্তৃতায় শেখ হাসিনা জনগণকে তার উপর ভরসা করতে বলেছেন। অথচ এক্ষেত্রে তার নিজের আচরণটি লক্ষণীয়। তিনি জনগণের ভোটের উপর ভরসা না করে গভীর রাতে ভোট ডাকাতি করে গদিতে বসেছেন। কথা হলো, ডাকাতের উপর ভরসা করা কি কোন বু্দ্ধিমানের কাজ হতে পারে? এটি তো বেওকুপদের কাজ। কোন বুদ্ধিমান সভ্য ও সাহসী মানুষ কি কখনো ডাকাতের উপর ভরসা করে? তারা তো হাতের কাছে যা পায় তা দিয়ে ডাকাত তাড়াতে রাস্তায় নামে। হাসিনা যে ভাবে ক্ষমতায় এলো সেটি কি নেপাল, শ্রীলংকা বা ভূটানে সম্ভব হতো? তাই হাসিনা বাংলাদেশীদের জন্য বিশ্ব মাঝে যা বাড়িয়েছে তা উন্নয়ন নয়, বরং সীমাহীন অপমান।

৬.

দেশে কতটা কলকারখানা, রাস্তাঘাট ও বিল্ডিং হলো সেটি উন্নয়নের মাপকাঠি নয়।বরং সেটি হলো দেশে কতজন মনুষ চোর-ডাকাত, খুনি বা ধর্ষক না হয়ে সৎ মানুষ রূপে বেড়ে উঠলো সেটি। মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে এ প্রশ্ন কখনোই তোলা হবে না যে, দেশে কতটা কলকারখানা, রাস্তাঘাট ও বিল্ডিং গড়া হয়েছিল এবং সে গড়ার কাজে তোমার কি ভূমিকা ছিল।  বরং এ প্রশ্ন অবশ্যই উঠবে, কতজন সৎ মানুষ রূপে বেড়ে উঠেছিল সেটি।

৭.

মুসলিম বাঁচে, লড়াই করে ও প্রাণ দেয় কোন নেতা বা দলের স্বপ্ন পূরণে নয় বরং একমাত্র মহান আল্লাহর ইচ্ছা পূরণে।এরূপ বাঁচাতেই ঈমানদারী। “ইন্না লিল্লাহি ও ইন্না ইলাইহি”র এটিই অর্থ। একমাত্র মহান আল্লাহর ইচ্ছা পূরণে বাঁচার মধ্য দিয়েই মানুষ জান্নাতে পৌঁছবে। বাঁচাটি অন্য পথে হলে জাহান্নামের অন্তহীন আযাবটি অনিবার্য। রাষ্ট্র দুর্বৃত্তদের হাতে অধিকৃত হলে যা অসম্ভব হয় তা হলো আল্লাহর  লক্ষ্যে বাচা ও প্রাণ দেয়াটি অসম্ভব করা। সেরূপ বাচাকে তারা মৌলবাদ বলে। ইসলামের শত্রুপক্ষ সেটিকে সন্ত্রাস বলে।

৮.

অন্যায়ের নির্মূল এবং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হলো রাষ্ট্র। কিন্তু সে রাষ্ট্র যখন অধিকৃত হয় চোর-ডাকাত ও ভোটডাকাতদের হাতে তখন দেশ ইতিহাস গড়ে গুম,খুন, ধর্ষণ ও সন্ত্রাসের রাজনীতিতে। বাংলাদেশ তারই সুস্পষ্ট নজির।

৯.

যাত্রাপথে কেউই গন্তব্যের  আসল ঠিকানাকে ভূলে না। সব সময় সে ঠিকানাটি মাথায় রেখে পথ চলে। এখানে ভূল হলে যাত্রাটি ভূল পথে হয়। কিন্ত অধিকাংশ মানুষ জীবন যাপন করে জীবনের শেষ ঠিকানা আখেরাতকে ভূলে।

১০.

মানব সমাজে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো অন্যায়ের নির্মূল ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা। মুসলিম জীবনের এটিই মূল মিশন। এটিই ঈমানদারের জিহাদ। এ লক্ষ্য পূরণে মহান নবীজী (সাঃ) নিজের ঘর না ঘরে সর্বপ্রথম ইসলামী রাষ্ট্র গড়েছিলেন। শতকরা ৭০ ভাগ সাহাবী শহীদ হয়েছিলেন। এবং এমন কোন সাহাবী ছিলেন না যিনি জিহাদ করেননি। এ পবিত্র জিহাদে প্রতিটি মুসলিম তাদের সকল সামর্থ্য বিনিয়োগ করে বলেই পবিত্র কোর’আনে মহান আল্লাহতায়ালা তাদেরকে শ্রেষ্ঠ জাতি বলে অভিহিত করেছেন। অথচ যারা পৃথিবী পৃষ্ঠে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত ও অধঃপতিত জাতি রূপে ইতিহাসে স্থান পেতে যায় এবং পরকালে পেতে চায় জাহান্নাম তারা বেছে নেয় দুর্নীতির পথ। ২৯/০১/২০২০




কিছু অপ্রিয় ভাবনা-১

১.

ঈমানের সংজ্ঞা কি এবং ঈমানদার কাকে বলে -এ বিষয়ে সঠিক জ্ঞানটি মানব জীবনের সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ জ্ঞান। ভাষা, বিজ্ঞান বা গণিতের জ্ঞান না হলেও জান্নাতে পৌঁছা যাবে। কিন্তু ঈমানের অর্থ কি এবং ঈমানদার কীরূপে হওয়া যায় -সে বিষয়ে অ্জ্ঞতা নিয়ে প্রকৃত ঈমানদার হওয়া যেমন অসম্ভব, তেমনি অসম্ভব হলো জান্নাতে পৌঁছা। বিষয়টি এতই গুরুত্বপূর্ণ যে, এখানে ভূল হওয়ার কারণে অতিশয় বেঈমানও নিজেকে ঈমানদার মনে করে। তখন ভূল হয়, কে ইসলামের শত্রু এবং কে বন্ধু -সেটি চিনতে। অথচ মুসলিম বিশ্বে সবচেয়ে বড় অজ্ঞতাটি হলো এ বিষয়ে।

বান্দার উদ্দেশ্যে ঈমানদারের সংজ্ঞাটি জানিয়ে দিয়েছেন খোদ মহান আল্লাহতায়ালা। পবিত্র কোরআনে ঘোষিত সে সংজ্ঞাটি হলো: “ঈমানদার একমাত্র তাঁরাই যারা বিশ্বাস করে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে এবং এ নিয়ে আর কোন রূপ দ্বিধা-দ্বন্দ করে না এবং তারা নিজেদের মাল ও জান নিয়ে জিহাদ করে আল্লাহর রাস্তায়। ঈমানের দাবীতে একমাত্র তারাই হলো সত্যবাদী।” -(সুরা হুজরাত, আয়াত ১৫)।

তাই জীবনে জিহাদ ছাড়া নিজেকে ঈমানদার রূপে দাবী করাটি নিরেট ভন্ডামী। আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের অর্থ হলো আল্লাহর নিজের রাজ্যে অর্থাৎ দুনিয়ার বুকে একমাত্র তাঁরই সার্বভৌমত্ব ও তাঁরই প্রদত্ত শরিয়তী আইনের প্রতিষ্ঠার জিহাদ। তাই যার জীবনে আল্লাহর আইন তথা শরিয়তকে বিজয়ী করার জিহাদ নাই, সে ব্যক্তি নামাযী, রোযাদার বা হাজী হতে পারে; মসজিদের ইমাম, আলেম, মাদ্রাসার শিক্ষক, মোফাছছের বা ইসলামী দলের নেতাও হতে পারে; কিন্তু সে ব্যক্তি কি প্রকৃত ঈমানদার হতে পারে?

জিহাদের পাশাপাশি শরিয়ত পালনের বিষয়টি আল্লাহর দরবারে ঈমানদার রূপে গণ্য হওয়ার জন্য অতি জরুরী। সে বিষয়টি মহান আল্লাহতায়ালা পরিস্কার করেছেন পবিত্র কোর’আনের সুরা মায়েদার ৪৪, ৪৫ ও ৪৭ নম্বর আয়াতে। উপরুক্ত তিনটি আয়াতে বলা হয়েছে, যারা শরিয়তের আইন অনুযায়ী বিচার করে না তারা কাফের, জালেম ও ফাসেক। মুসলিম রূপে গণ্য হওয়ার জন্য বিষয়টি এতই গুরুত্বপূর্ণ যে, ঔপনিবেশিক কাফেরদের হাতে অধিকৃত হওয়ার আগে সিরাজুদ্দৌলা-শাসিত বাংলা, মোগল-শাসিত ভারতসহ প্রতিটি মুসলিম দেশে শরিয়তের আইন অনুযায়ী বিচার হতো।

২.
রাষ্ট্রের প্রতিটি কর্মচারি প্রতি কাজে সরকারি আইন মেনে চলে। সে আইন অমান্য করলে বা তা্র বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলে শুধু চাকুরি থেকেই বহিস্কৃত হয় না, কঠোর শা্স্তিও ভোগ করে। কোর্টমার্শাল হয় বিদ্রোহী সামরিক বাহিনীর সদস্যদের।

তাই জেল-জরিমানা থেকে বাঁচতে হলে দেশের আইন মেনে চলতে হয়। তেমনি জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচতে হলে মানতে হয় শরিয়তের আইন। স্রেফ নামায়-রোযায় মুক্তি মিলে না। ঈমানের প্রকাশ তাই জীবনের প্রতি পদে শরিয়ত মেনে চলায়। নইলে ঈমানের দাবীটি ভূয়া গণ্য হয়। শরিয়তের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হলে শাস্তি শুধু পরকালে নয়, দুনিয়ার বুকেও অনিবার্য হয়ে উঠে। মুসলিমগণ বস্তুতঃ দেশে দেশে সে আযাবের মধ্যেই। বাংলাদেশেও সে ভূয়া ঈমানেরই প্রদর্শণী হচ্ছে দেশের আদালতে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা না দিয়ে।

৩.
পরকালের ভয় না থাকলে অতি কঠিন পাপও সহজ হয়ে যায়। পরকালের ভয়ই ঈমানদারের জীবনে বিপ্লব আনে। তখন ঈমানদারের জীবনে জিহাদ আসে এবং রাষ্ট্রের বুকে শরিয়ত প্রতিষ্ঠায় শহীদ হওয়ার অদম্য বাসনাও জাগে। পরকালের ভয় থাকাতেই নবীজী (সাঃ)র সাহাবীদের শতকরা৭০ ভাগের বেশী শহীদ হয়ে গেছেন। ফলে মুসলিমগণ বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয়েছে। নামায-রোযা, হজ্ব-উমরাহ মুনাফিকও করতে পারে। কিন্তু তার জীবনে জিহাদ থাকে না, শহীদ হওয়ার আগ্রহও থাকে না। তাদের সকল সামর্থ্য ব্যয় হয় পার্থিব জীবনকে সমৃদ্ধ করতে।

৪.

আলু-পটল,মাছ বা পোষাক রপ্তানি করা যায়। কিন্তু নারীও কি রপ্তানি করা যায়? শরিয়তে নারীদের তো একাকী হজ্বে যাওয়ারও অনুমতি নাই। অজানা বিদেশে এক অপরিচিতের ঘরে একজন পিতা বা মাতা তার মেয়েকে, ভাই তার বোনকে এবং স্বামী তার স্ত্রীকে কীরূপে কাজ  করার অনুমতি দেয়? সে ব্যক্তি যে নারী লোভি দুর্বৃত্ত নয় -সে বিষয়ে তারা নিশ্চিত হলো কী করে? কত মেয়ে ধর্ষিতা হয়ে দেশে ফিরছে সেটি কি তারা জানে না? সরকারই বা কেন নারীদের বানিজ্যিক পণ্যে পরিণত করে? এ কুফুরির বিরুদ্ধে আলেমদেরই বা প্রতিবাদ কই? অর্থের লোভে মানুষ কি এতটাই বিবেকশূণ্য ও ঈমানশূণ্য হতে পারে? এ বিবেকশূণ্যতার কারণেই সূদী লেনদেন ও বেশ্যাবৃত্তির ন্যায় জঘন্য পাপ কর্মও বৈধ অর্থনৈতিক কর্মে পরিণত হয়েছে।

৫.
যে আরএসএস গান্ধীকে হত্যা করেছিল তাদের হাতেই আজ অধিকৃত ভারতের শাসন ক্ষমতা, পুলিশ ও আদালত। ফলে মসজিদ ভাঙ্গলে এবং মুসলিমদের হত্যা ও ধর্ষণ করলেও ভারতে শাস্তি হয়না। মুসলিম নির্যাতনের যে কাজটি করে থাকে আরএসএস’য়ের গুন্ডারা, সেটিই করছে নরেন্দ্র মোদি সরকারের পুলিশ। নরেন্দ্র মোদি নিজে আরএসএস’র প্রডাক্ট। অথচ তাকে ঘনিষ্ট বন্ধু রূপে পেয়ে নিজেকে ধণ্য মনে করে শেখ হাসিনা। উপঢৌকন রূপে হাসিনা মোদির জন্য পাঠায় বাংলাদেশী আম ও পাঞ্জাবী –যা বলেছে স্বয়ং মোদি। নরেন্দ্র মোদি যে নির্যাতনটি করছে ভারতীয় মুসলিমদের বিরুদ্ধে, হাসিনাও সেটিই করছে বাংলাদেশী মুসলিমদের বিরুদ্ধে। মোদি প্রখ্যাত ইসলামী মনিষী যাকির নায়েককে ভারতে নিষিদ্ধ করেছে। হাসিনা সেটিই করেছে বাংলাদেশে। যে বীভৎস ও নৃশংস মুসলিম হত্যাকান্ডটি মোদি ঘটিয়েছে গুজরাতে, শেখ হাসিনা সেরূপ নৃশংস হত্যাকান্ডটি ঘটিয়েছে হিফাজতে ইসলামের মুসল্লীদের বিরুদ্ধে ঢাকার শাপলা চত্ত্বরে।  




দেশ ও মানুষ নিয়ে ভাবনা-৮

১.
পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কিছু বললে কেউ ক্ষিপ্ত হয় না, পেটাতেও নামে না। কিন্তু ভারতের বিরুদ্ধে কিছু বললে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ ধেয়ে আসে কেন? এটি কি এজন্য নয় যে, তারা ভারতের দাস এবং কাজ করছে ভারতীয় স্বার্থের পাহারাদার রূপে?

২.
ভারতে অতি অসভ্যদের শাসন চলছে। অসভ্যদের শাসনে আইনের শাসন থাকে না; থাকে গুম, খুন, ধর্ষণ ও সন্ত্রাসের রাজনীতি। ভারতে তাই মুসলিমদের বিরুদ্ধে হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন ও নাগরিকত্বহীন করে বহিষ্কারের চেষ্টা হচ্ছে। অসভ্যদের শাসন চলছে বাংলাদেশেও। তাই ভারতে অসভ্য শাসনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সরকার কিছুই বলছে না। যারাই প্রতিবাদ করতে রাস্তায় নামছে তাদের বিরুদ্ধে হামলা হচ্ছে। নিজেদের যারা সভ্য রূপে দাবী করে তাদের এখন আওয়াজ তোলার সময়।

৩.
মশামাছি কখনোই ফুলের উপর বসেনা, আবর্জনা খুঁজে। তেমনি দুর্বৃত্তরা রাজনীতির অঙ্গণে খুঁজে চোর-ডাকাত ও ভোট-ডাকাতদের দল। বাংলাদেশে দুর্বৃত্তদের সংখ্যাটি বিশাল। তাই শেখ হাসিনার ভোট-ডাকাত সরকারের লোকবলের অভাব হচ্ছে না।

৪.
মিথ্যা বলা ও মিথ্যা নিয়ে বাঁচাটি কবিরা গুনাহ। বাঙালীর জীবনে বড় মিথ্যাটি হলো ১৯৭১’য়ে ৩০ লাখের মৃত্যু। এ গুনাহ থেকে বাঁচার জন্য চাই সঠিক তালিকা। কিন্তু যাদের রাজনীতি মিথ্যার উপর প্রতিষ্ঠিত তাদের মূল এজেন্ডা হলো মিথ্যাকে বাঁচিয়ে রাখা। কারণ মিথ্যা না বাঁচলে তাদের রাজনীতি বাঁচে না। এরাই জনগণকে বাধ্য করে মিথ্যা বলার কবিরা গুনাহতে। এরূপ কবিরা গুনাহর রাজনীতি বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে দেশে রাজাকারের তালিকা ও মুক্তিযুদ্ধাদের তালিকা হলেও একাত্তরে কতজন নিহত হলো -সে তালিকাটি বানানো হচ্ছে না।

শেখ হাসিনার লক্ষ্য হলো, পিতার তিরিশ লাখের মিথ্যাকে যে কোন মূল্যে বাঁচিয়ে রাখা। শেখ হাসিনা জানে, একাত্তরে কতজন মারা গেছে সে তালিকাটি গ্রামে গ্রামে গিয়ে বানানো হলে প্রমাণিত হতো, তার পিতা কত বড় মিথ্যাবাদি ছিল সেটি। তখন শেখ মুজিব ইতিহাসে যুগ যুগ বেঁচে থাকতো বিশাল মাপের মিথ্যাবাদি রূপে। জাতিও জানতে পারতো তাদের তথাকথিত বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গপিতা কতবড় মিথ্যুক ছিল। শেখ হাসিনা এজন্যই তেমন একটি গণনা চায় না।

৫.
সাহাবায়ে কেরামদের জান-মালের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগটি ছিল বিশাল মুসলিম রাষ্ট্র্রের প্রতিষ্ঠায়; মসজিদ-মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠায় নয়। অথচ আজকের মুসলিমদের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগটি হচ্ছে মুসলিম রাষ্ট্রকে ক্ষুদ্রতর করার কবিরা গুনাহতে। ১৯৭১’য়ে তেমন একটি কবিরা গুনাহতে বিশাল বিনিয়োগ ছিল বাঙালী মুসলিমদের। এবং সেটি ভারতীয় কাফেরদের অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ নিয়ে। বাঙালীদের সে বিনিয়োগে উপমহাদেশের মুসলিমগণ যেমন দুর্বল ও নিরাপত্তাহীন হয়েছে, তেমনি শক্তি বেড়েছে ভারতের। একাত্তরে যারা ভারতকে বিজয়ী করতে লড়েছিল এখন তাদেরই অনেকে লড়ছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের স্বার্থকে বাঁচিয়ে রাখায়। সেটি করছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের নামে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ কালে তেমন একটি কবিরা গুনাহতে মত্ত দেখা গেছে আরবদের। তাতে আরব ভূমি ২২ টুকরোয় বিভক্ত হয়েছে এবং তাতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে ইসরাইল। সে পাপের কারণেই ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন, লিবিয়া, ফিলিস্তিন ইতিমধ্যে ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে। বিভক্তিতে আযাব যে অনিবার্য -সেটি মহান আল্লাহতায়ালা সুরা আল-ইমরানের ১০৫ নম্বর আয়াতে সুস্পষ্ট ভাবে শুনিয়েছেন। মুসলিমগণ বিভ্ক্ত হয়ে এখন সেটিই প্রমাণ করছে।  

৬.
রাজাকারদের ইতিহাস হলো তারা কখনোই ভারতের দালালী করেনি। ভারতের দালালী কখনোই তাদের ধাতে সয়না। তাই ভারতের দালালদের রাজাকার বলাটি একাত্তরের ইতিহাস নিয়ে মূর্খতা। তেমন এক মুর্খতা হলো যারা ভারতের বিজয় বাড়াতে একাত্তরে যুদ্ধ করেছে সে ভারতসেবী গোলামদের রাজাকার বলা। অথচ বাংলাদেশে সে মুর্খতাটি প্রকট ভাবে হচ্ছে। এমনকি জামায়াত শিবিরের পক্ষ থেকেও হচ্ছে।

৭.
বাংলাদেশে এখন ভারতের প্রতি অনুগত দাসদের সরকার। তাই ভারতের বিরুদ্ধে কিছু বললে এ দাসেরা মারতে ধেয়ে আসে। এ দাসেরাই আবরারকে হত্যা করেছে এবং ভিপি নূরুল হকসহ অনেককে আহত করেছে।

৮.
পবিত্র কোর’আন জান্নাতের পথ দেখায়। তাই যারা কোর’আনের জ্ঞান থেকে দূরে থাকে তারা দূরে থাকে জান্নাতের পথ থেকে। কোর’আনের জ্ঞানহীনরা চলে জাহান্নামের পথে।

৯.
কে কতটা মুসলিম রূপে বেড়ে উঠলো -মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে সে বিষয়টির বিচার হবে। তার ভিত্তিতে জান্নাত বা জাহান্নাম মিলবে।  কে কতটা বাঙালী হলো সেদিন সেটির কোন গুরুত্বই থাকবে না।

১০.
সেক্যুলার মুসলিমদের মূল আগ্রহটি ভাষা ভিত্তিক পরিচয় নিয়ে বেড়ে উঠায়। তাই সেক্যুলার বাঙালী মুসলিমদের মুসলিম পরিচয় নিয়ে কোন গর্ব নাই; তাদের গর্বটি বাঙালী রূপে বেড়ে উঠায়। অথচ আল্লাহর দরবারে সে পরিচয়ের কোন মূল্যই নাই। ঈমানের দায়ভার তো মুসলিম রূপে বেড়ে উঠায়।

১১.
বিভক্তি আযাব আনে। এবং একতা বিজয় ও নিয়ামত আনে।  মুসলিমদের সংখ্যা ও সম্পদ যতই বৃদ্ধি পাক না কেন -তা দিয়ে আল্লাহর প্রতিশ্রুত আযাব, অপমান ও পরাজয় থেকে মুক্তি মিলবে না। অথচ যখন একতা ছিল তখন দরিদ্র মুসলিমও কম জনসংখ্যা নিয়ে বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয়েছে।

১২.
“যে ব্যক্তির জীবনে পর পর ২টি দিন আসলো অথচ তার জ্ঞানের ভান্ডারে কোন নতুন জ্ঞান যোগ হলো না তার জন্য বিপর্যয়।”- হাদীস।

১৩.
ডাকাতদের গর্ব তাদের সর্দারকে নিয়ে। কারণ সে ডাকাতির নতুন নতুন পথ দেখায়। আওয়ামী চোর-ডাকাত ও ভোট-ডাকাতদের গর্বও শেখ হাসিনাকে নিয়ে। আওয়ামী লীগের সম্মেলনে ওবায়দুল কাদের ও অন্যান্য আওয়ামী লীগ নেতাদের ভাষণে তো সেটিই ফুটে উঠলো।

১৪.
নেক কাজে সফলতা আসে আল্লাহতায়ালার রহমতের ফলে। তাই সফলতার জন্য ছওয়াব নাই। ছওয়াব জুটে শুধু নেক নিয়েত, মেধা, মেহনত, অর্থ, সময় তথা নিজ সামর্থ্যের বিনিয়োগে।




বিচারের নামে পরিকল্পিত হত্যা এবং বিচারমুক্ত খুনি

আব্দুল কাদের মোল্লার সৌভাগ্য

অবশেষে স্বৈরাচারি শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীরা অতি পরিকল্পিত ভাবে আব্দুল কাদের মোল্লাকে হত্যা করলো। এ হত্যার জন্য হাসিনা সরকার যেমন বিচারের নামে বিবেকহীন ও ধর্মহীন বিচারকদের দিয়ে আদালত বসিয়েছে, তেমনি সে আদালেতে মিথ্যা সাক্ষিরও ব্যবস্থা করেছে। ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করার লক্ষ্যে ইচ্ছামত আইনও পাল্টিয়েছে। ফাঁসী ছাড়া অন্য কোন রায় মানা হবে না -আদালতকে সে হুশিয়ারিটি শোনাতে কোটি কোটি টাকা ব্যায়ে শাহবাগ চত্বরে দলীয় ক্যাডারদের দিয়ে সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে। রাজপথে আওয়ামী-বাকশালীগণ ফাঁসীর যে দাবী তুলেছিল অবশেষে অবিকল সে দাবীই বিচারকগণ তাদের রায়ে লিখলেন। একটি দাঁড়ি-কমাও তারা বাদ দেয়নি।ফাঁসীতে ঝুলানোর জন্য যখন যা কিছু করার প্রয়োজন ছিল, হাসিনা সরকার তার সব কিছু্ই করেছে। তবে জনাব আব্দুল কাদের মোল্লার পরম সৌভাগ্য, মহল্লা খুনী বা সন্ত্রাসীর হাতে তাঁকে খুন হতে হয়নি। রোগজীবাণূর হাতেও তাঁর প্রাণ যায়নি। তাকে খুন হতে হয়েছে ইসলামের এমন এক চিহ্নিত শয়তানি জল্লাদদের হাতে -যাদের রাজনীতির মূল এজেন্ডাই হলো আল্লাহর শরিয়তি বিধানের প্রতিষ্ঠাকে প্রতিহত করা। তাদের কাছে পরম আনন্দের বিষয় হলো, রাষ্ট্রীয় জীবনে কোরআনের আইনকে পরাজিত অবস্থায় দেখা। আল্লাহর এরূপ প্রচন্ড বিপক্ষ শক্তির মোকাবেলায় সরাসরি তাদের সামনে দাঁড়িয়ে তাদেরই হাতে প্রাণ দেয়ার চেয়ে মুসলমানের জীবনে গৌরবজনক আর কি থাকতে পারে? যারা এভাবে প্রাণ দেয়, তারা মৃত্যুহীন প্রাণ পায়। সাহাবাগণ তো মহান আল্লাহর কাছে সবেচেয়ে প্রিয় ও সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষের সম্মান পেয়েছেন ইসলামের শত্রুদে হাতে এরূপ প্রাণদানের মধ্য দিয়ে। বাকশালী কীটগুলো কি কখনো শহীদের সে আনন্দের কথা অনুধাবন করতে পারে?

ইসলামের দুষমনদের কাছে শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদন্ডের শাস্তিও পছন্দ হয়নি। ফাঁসির দাবী নিয়ে তারা ঝাঁপিয়ে পড়েছে তাই রাজপথে। বাংলাদেশে যারা ভারতীয় কাফের শক্তির মূল এজেন্ট,তিনি ছিলেন তাদের পরম শত্রু।চরমচক্ষুশূল ছিলেন নাস্তিক ব্লগারদেরও।আল্লাহ ও রাসূলের বিরুদ্ধবাদী এসব বিদ্রোহীরা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় তাঁর মৃত্যুর দাবি নিয়ে শাহাবাগের মোড়ে দিনের পর দিন মিটিং করেছে। মূল দ্বন্দটি এখানে ইসলামের শত্রুপক্ষের সাথে শরিয়তের প্রতিষ্ঠাকামীদের। সে লড়াইয়ে জনাব আব্দুল কাদের মোল্লা ছিলেন ইসলামের পক্ষের শক্তির বিশিষ্ঠ নেতা। এমন এক লড়াই প্রান দেয়ার অর্থ,নিঃসন্দেহে শহীদ হওয়া। জনাব আব্দুল কাদের মোল্লা তাই শহীদ। তাকে মৃত বলাই হারাম। কারণ এমন শহীদদের মৃত বলতে নিষেধ করেছেন খোদ মহান আল্লাহতায়ালা। ফলে তাঁর জন্য এটি এক বিরাট পাওয়া।তার জীবনে সবচেয়ে বড় গৌরবটি হলো,নির্ঘাত মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়েও কোন মানুষের কাছে তিনি জীবন ভিক্ষা করেননি, কোন সাহায্যও চাননি। আল্লাহর পথে নির্ভয়ে জীবন দিয়ে তিনি গেয়ে গেলেন মহান আল্লাহতায়ালারই জয়গান। এ এক পরম সৌভাগ্য।

 

পরিকল্পিত খুন যেখানে রাষ্ট্রীয় শিল্প

কোন দেশ স্বৈরাচারি দুর্বৃত্তদের দ্বারা অধিকৃত হলে সে দেশে সবচেয়ে অসম্ভব হয়ে পড়ে ন্যায়বিচার। পরিকল্পিত খূন তখন রাষ্ট্রীয় শিল্পে পরিণত হয়। সে খূনের শিল্পে কারখানায় পরিণত হয় দেশের আদালত। ফিরাউন-নমরুদ, হালাকু-চেঙ্গিস, হিটলারের আমলে তাই ন্যায়বিচার মেলেনি। স্বৈরাচারি ফিরাউনের কাছে আল্লাহর রাসূল হযরত মুসা (আঃ)ও হত্যাযোগ্য গণ্য হয়েছে। হত্যাযোগ্য গণ্য হয়েছে বনি ইসরাইলের নিরপরাধ শিশুরাও। এরূপ স্বৈরাচারি শাসকই হযরত ঈসা (আঃ)কে শূলে চড়িয়ে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিল। ন্যায়বিচার অসম্ভব হয়েছিল বাকশালী মুজিবের আমলেও। মুজিবের আমলে ৩০ থেকে ৪০ হাজার মানুষকে বিনা বিচারে হত্যা করা হয়েছে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে। কিন্তু সে ভয়ানক অপরাধের অভিযোগে কাউকে কি আদালতে তোলা হয়েছে? বরং এসব খুনিদের আদালত সফল প্রটেকশ দিয়েছে। বরং স্বৈরাচারি খুনিদের প্রটেকশন দেয়াটিই দেশের আইনে পরিণত হয়েছে। সেরূপ আইনী প্রটেকশন নিয়েই সিরাজ সিকদারের খুনের পর শেখ মুজিব “কোথায় আজ সিরাজ সিকদার?” বলে সংসদে দাঁড়িয়ে আত্মপ্রসাদ জাহির করেছেন। এমন আচরণ কি কোন সুস্থ্ মানুষ করতে পারে? এটি তো মানসিক অসুস্থদের কাজ। নিষ্ঠুর মানবহত্যাও যে এসব অসুস্থ্য ব্যক্তিদের কতটা আনন্দ দেয় এ হলো তার নমুনা। আব্দুল কাদের মোল্লার খুন নিয়ে শেখ হাসিনা ও তার রাজনেতিক দোসরদের প্রচন্ড উৎসবের কারণ তো এরূপ মানসিক অসুস্থতা। সে অসুস্থ্যতা নিয়ে তারা রাজপথে উৎসবেও নেমে এসেছে। এরূপ অসুস্থ্ মানুষেরা ক্ষমতায় গেলে বা রাজনীতিতে স্বীকৃতি ও বৈধতা পেলে দেশে গুম,খুন, নির্যাতন ও নানারূপ অপরাধ বাড়ে। স্বৈরাচারি শাসনের এ হলো বড় আযাব। অথচ দেশে শরিয়ত প্রতিষ্ঠা পেলে শাসককেও তখন কাজীর সামনে খাড়া হতে হয়। খলিফা উমর (রাঃ)র ন্যায় ব্যক্তির ক্ষেত্রেও তাই ব্যতিক্রম ঘটেনি।

স্বৈরাচারি শাসকেরা পেশাদার খুনিদের দিয়ে শুধু যে পেটুয়া পুলিশ বাহিনী ও সেনাবাহিনী গড়ে তোলে তা নয়, তাঁবেদার আদালতও গড়ে। তখন দলীয় ক্যাডার বাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর পাশাপাশি এসব আদালতের বিচারকদেররও প্রধান কাজটি হয় সরকারের রাজনৈতিক শত্রুদের হত্যা করা। সে হত্যাকান্ডগুলোকে তখন ন্যায় বিচারের পোষাক পড়ানো হয়। এসব বিচারকদের লক্ষ্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা নয়। প্রকৃত অপরাধিদের শাস্তি দেয়াও নয়। বাংলাদেশে প্রতিদিন বহু মানুষ খুন হচ্ছে। বহু মানুষ গুম হচ্ছে। বহনারী ধর্ষিতাও হচ্ছে। কিন্তু সেসব খুন, গুম ও ধর্ষণের কি বিচার হচ্ছে? শাপলা চত্বরে বহু মানুষ নিহত হলো, বহুশত মানুষ আহতও হলো। রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ হলো,বহুহাজার কোটি টাকা লুট হলো শেয়ার বাজার থেকে। মন্ত্রীদের দূর্নীতির দায়ে বিশ্বব্যাংকের বরাদ্দকৃত পদ্মাব্রিজের বিশাল অংকের ঋণ বাতিল হয়ে গেল। এগুলির সবই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু এসব অপরাধ নিয়ে কি অপরাধীদের বিরুদ্ধে আদালতে কোন মামলা হয়েছে? সে মামলায় কি কারো শাস্তি হযেছে? বিচারকদের কি তা নিয়ে কোন মাথাব্যাথা আছে? এসব খুনি ও অপরাধিদের বিচার নিয়ে সরকারের মাথা ব্যাথা না থাকার কারণটি বোধগম্য।কারণ স্বৈরাচারি সরকারের তারা রাজনৈতিক শত্রু নয়। বরং তারা সরকারের নিজস্ব লোক। ফলে তাদের বিচার নিয়ে সরকারের যেমন মাথা নেই, তেমনি মাথাব্যাথা নাই বিচারকদেরও। একই কারণে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১৯৫ জন অভিযুক্ত সদস্যদের বিচারেও শেখ হাসিনার আগ্রহ নেই। আদালতের ব্যস্ততা বরং হাসিনা সরকারের রাজনৈতিক শত্রুদের ফাঁসি দেয়া নিয়ে ব্যস্ত। আব্দুল কাদের মোল্লার হত্যাটি তাই হাসিনা সরকারের পক্ষ থেকে যেমন প্রথম হত্যা নয়, তেমনি শেষ হত্যাও নয়। হাসিনা সরকার টিকে থাকলে এ হত্যাকান্ড যে আরো তীব্রতর হবে সে আলামতটি সুস্পষ্ট।

 

খুনের লক্ষ্যে সাঁজানো হলো আদালত

ডাকাত দলের সর্দার সবচেয়ে নিষ্ঠুর খুনিদের দিয়ে তার ডাকাত দলকে সাঁজায়। তেমনি দুর্বৃত্ত স্বৈরাচারি শাসকও সরকারের প্রতিটি বিভাগকে সবচেয়ে পরিপক্ক দুর্বৃত্তদের হাতে তুলে দেয়। কারণ ভাল মানুষদের দিয়ে যেমন ডাকাত দলা গড়া যায় না, তেমনি তাদের দিয়ে স্বৈর-শাসনও চলে না। স্বৈর-শাসনের দুর্বৃত্তায়ান প্রকল্পটি তাই শুধু দেশের পুলিশ, প্রশাসন বা দলীয় কর্মীবাহিনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং সে নীতির প্রকাপ পড়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালতেও। বিচারকের আসনগুলি তখন খুনিদের দখলে চলে যায়। অস্ত্রের সাথে বিচারকের কলমও তখন হত্যাকর্মে লিপ্ত হয়। ফলে স্বৈরাচারি শাসনামলে রাজপথে মিটিং-মিছিল করা বা পত্র-পত্রিকায় স্বাধীন মতামত প্রকাশ করাই শুধু কঠিন নয়, অসম্ভব হয়ে পড়ে ন্যায়বিচার পাওয়াও। তখন নিরপরাধ মানুষদের ফাঁসীতে ঝুলানো ব্যবস্থা করা হয়। মিসরে স্বৈরাচারি জামাল আব্দুন নাসেরে আমলে তাই সৈয়দ কুতুবের ন্যয় বিখ্যাত মোফস্সেরে কোরআনকে ফাঁসীতে ঝোলানো হয়েছে। আর আজ কাঠগড়ায় তুলেছে সে দেশের ইতিহাসে সর্বপ্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ড. মুরসীকে। অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে তুরস্কেও। সেদেশের স্বৈরাচারি সামরিক জান্তারা নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রি আদনান মেন্দারাসকে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছিল। ইসলামি চেতনার অভিযোগে জেলে তুলেছে প্রধানমন্ত্রী নাযিমুদ্দীন আরবাকেনকে। আর আজ বাংলাদেশে ফাঁসিতে ঝুলানোর হলো আব্দুল কাদের মোল্লাকে। ফাঁসিতে ঝুলানোর ষড়যন্ত্র হচ্ছে আরো বহু ইসলামি ব্যক্তিকেই। হিংস্র নেকড়েগণ সমাজে বেঁচে থাকলে শিকার ধরবেই। সেটিই স্বাভাবিক। তাই সভ্য মানুষদের দায়িত্ব হলো নেকড়ে নির্মূল। এছাড়া সমাজে শান্তি আসে না। এ নির্মূল কাজে জিহাদ হলো ইসলামের হাতিয়ার। নামায রোযার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত বলা হয়েছে জিহাদকে।জীবনে প্রতি মাস ও প্রতিটি দিন রোযা রেখে বা প্রতিটি রাত ইবাদতে কাটিয়েও কেউ কি মৃত্যুর পর অমরত্ব পায়? সমাজে ও আল্লাহর কাছে সে মৃত রূপেই গণ্য হয়। কিন্তু জিহাদে মৃত্যু ঘটলে সে শহীদ ব্যক্তিকে মৃত বলাটি গুরুতর গুনাহ। কারণ, পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা তাঁকে মৃত বলতে নিষেধ করেছেন, হুকুম দিয়েছেন জীবিত বলতে। তাই কোন শহীদকে মৃত বললে সে হুকুমের অবাধ্যতা হয়।পবিত্র কোরআনের সে হুকুমটি হলোঃ “এবং আল্লাহর রাস্তায় থাকার কারণে যাদেরকে কতল করা হয়েছে তোমরা তাদেরকে মৃত বলো না। বরং তারা তো জীবিত,যদিও তোমরা সেটি অনুধাবন করতে পারো না।” –সুরা বাকারা।

কে কতটা মানুষ না অমানুষ, সভ্য বা অসভ্য -সেটি পোষাক-পরিচ্ছদ বা চেহরা-সুরতে ধরা পড়ে না। ধরা পড়ে ন্যায়-অন্যায়ের বিচারবোধ থেকে। সে বিচার বোধ চোর-ডাকাত ও খুনিদের থাকে না। সে বিচারবোধটি না থাকার কারণেই ভয়ানক অপরাধও তাদের কাছে অপরাধ গণ্য হয় না। এটি হলো তাদের মনের অসুস্থ্যতা, সে সাথে অসভ্যতাও। সভ্য সমাজে এজন্যই এসব অসুস্থ্য ও অসভ্যরা চোর-ডাকাত-খুনি রূপে চিহ্নিত হয়। তেমনি একটি দেশ কতটা অপরাধীদের দ্বারা অধিকৃত সেটিও ধরা পড়ে সে দেশের আদালতের বিচার-আচারের মান থেকে। সভ্যদেশে তাই অতি ন্যয়নিষ্ঠ ও বিচারবোধ-সম্পন্ন ব্যক্তিদেরকে আদালতের বিচারক বানানো হয়। কিন্তু বাংলাদেশে সেটি ঘটেনি। কীরূপ অপরাধিদের দিয়ে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতকে সাঁজিয়েছে তার কিছু একটি বিবরণ দেয়া যাক। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের এক বিচারক হলেন সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। জামায়াত নেতা জনাব আব্দুল কাদের মোল্লাকে ফাঁসীতে ঝোলানোর জন্য যে পাঁচজন বিচারককে নিয়ে এই মামলার বেঞ্চ গঠন করা হয়েছে, তাদের একজন হলেন এই সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। জামায়াত নেতাদের হত্যায় এই সুরেন্দ্র বাবুর আগ্রহ এতটাই তীব্র যে Skype scandal-এ জড়িত ট্রাইবুনালের অপর বিচারপতি নাজমুলকে তিনি বলেছেন, “তিনটা ফাঁসির রায় দাও তাহলে তোমাকে আমরা সুপ্রীম কোর্টে নিয়ে আসতেছি”। একথা বিচারপতি নাজমুল তার ব্রাসেলস্থ বন্ধুকে স্কাইপী যোগে বলেছেন। পত্রিকায় সে সংলাপটি হুবহু প্রকাশও পেয়েছে। সুরেন্দ্র কুমার সিনহা তাই বিচার চান না, চান ফাঁসির রায়। এ কথা বলার অপরাধে যে কোন সভ্য দেশের আদালতে তার ন্যায় বিচারকের লেবাসধারি অপরাধীর কঠোর শাস্তি হতো। এবং অসম্ভব করা হতো বিচারকের আসনে বসা। কিন্তু বাংলাদেশে সেটি হয়নি। বরং তার এ খুনি মানসিকতার কারণেই হাসিনার কাছে তার কদর বেড়েছে। আব্দুল কাদের মোল্লার ন্যায় নিরাপরাধ মানুষকে ফাঁসিতে ঝোলানাো জন্য তো বিচারকের আসনে এমন নীতিহীন ও বিবেকহীন তাঁবেদার বিচারকই চাই। এজন্যই তার স্থান মিলেছে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতে। তেমনি আরেক বিচারক হলেন শামসুদ্দিন মানিক। অশালীন আচরণে ও বিতর্কিত বিচারকার্যে তিনি রেকর্ড গড়েছেন। তার বিরুদ্ধে বহু সিনিয়র আইনজীবী যেমন অভিযোগ তুলেছে তেমনি বহুশত পৃষ্ঠার প্রমানসহ অভিযোগনামা দাখিল করেছে বহু সাংবাদিক। কিন্তু কারো অভিযোগকে শেখ হাসিনা গুরুত্ব দেননি। কারণ, বিচারকের আসনে তার চাই তাঁবেদার আওয়ামী ক্যাডার। শেখ হাসিনা তাকে হাইকোর্ট থেকে উঠিয়ে সুপ্রীম কোর্টে বসিয়েছেন। এবং সেখান থেকে তুলে এনে আব্দুল কাদের মোল্লার মামলার আপিল ডিভিশানে বসিয়েছেন। কারণ, সে আওয়ামী লীগের ক্যাডার এবং আব্দুল কাদের মোল্লার মত নিরাপরাধ ব্যক্তিদের ফাঁসিতে ঝোলাতে সে আপোষহীন।

 

আইন বদলানো হলো স্রেফ খুনের স্বার্থে

ট্রাইবুনাল প্রথমে আব্দুল কাদের মোল্লাকে ফাঁসি দেয়নি, দিয়েছিল যাবজ্জীবন কারাদন্ড। তাঁকে ফাঁসি দিতে প্রয়োজন ছিল আইনের পরিবর্তন। সরকার তাঁর ফাঁসি দিতে এতটাই দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিল যে সেটি সম্ভব করতে প্রচলিত আ্ইনে ইচ্ছামত পবিবর্তন এনেছে। অথচ আন্তুর্জাতিক আইনে রীতিবিরুদ্ধ। শুধু তাই নয়, আপিলের সুযোগ থেকে্ও তাঁকে বঞ্চিত করা হযেছিল। সরকারের যুক্তি, আব্দুল কাদের মোল্লা একজন যুদ্ধাপরাধী, সে কারণে তাঁর জন্য আপিলের সুযোগ নেই। আব্দুল কাদের মোল্লার মামলা প্রসঙ্গে এ্যামনেস্ট্রি ইন্টারন্যাশন্যালের বক্তব্যঃ “This is the first known case of a prisoner sentenced to death directly by the highest court in Bangladesh. It is also the first known death sentence in Bangladesh with no right of appeal. Death sentence without right of judicial appeal defies human rights law.”

বিচারে যে কতটা অবিচার হযেছে সেটিও দেখা যাক। যে সাক্ষীর কথার উপর ভিত্তি করে আব্দুল কাদের মোল্লাকে হত্যা করা হলো তার নাম মোমেনা বেগম। মোমেনা বেগম অন্যদের কাছ থেকে শুনেছে যে, যারা তার পরিবারের অন্যদের হত্যা করেছে তার মধ্যে কাদের মোল্লা বলে একজন ছিল। কিন্তু সে নিজে সে অভিযুক্ত কাদের মোল্লাকে স্বচোখে কখনোই দেখেনি। প্রশ্ন হলো বাংলাদেশে বহু গ্রামে ও বহু মহল্লায় কাদের মোল্লা বলে কেউ থাকতেই পারে। হয়তো সে সময় মীরপুরেও এমন কাদের মোল্লা একাধিক ছিল। কিন্তু সে যে ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার আমিরাবাদ গ্রামের মরহুম সানাউল্লা মোল্লার ছেলে আবদুল কাদের মোল্লা -সে খবর কি মীরপুরের এই মোমেনা বেগম জানতো? সামনা সামনি খাড়া করলে কি তাঁকে চিনতে পারতো? যে কোন খুনের মামলার সাক্ষিকে তার অভিযুক্ত আসামীকে লাইনে দাড়ানো অনেকে মধ্য থেকে খুঁজে বের করতে হয়। অথচ যারা তাঁকে ফাঁসি দিল তারা তা নিয়ে তদন্তের সামান্যতম প্রয়োজনও মনে করেনি। তারা শুধু কাদের মোল্লার নামের মিলটিই দেখেছে। সেটিকে একমাত্র দলীল রূপে খাড়া করে ফরিদপুরের আমিরাবাদ গ্রামের আব্দুল কাদের মোল্লাকে ফাঁসিতে চড়ালো।

বিচারকগণ এটুকুও ভেবে দেখেনি, মীরপুরে খুনের ঘটনাটি ঘটেছে ২৫শের মার্চের কিছুদিন পর এপ্রিলের প্রথম দিকে। সে সময় আব্দুল কাদের মোল্লা কেন ঢাকাতে থাকতে যাবে? ঢাকাতে তাঁর কি কোন চাকুরি ছিল? তাঁর পিতার কি কোন বাড়ি ছিল? ঢাকায়  যাদের চাকুরি ও ঘরবাড়ি ছিল তারাও তো সে দুর্যোগ মুহুর্তে ঢাকা ছেড়ে মফস্বলে চলে যায়। আব্দুল কাদের মোল্লা তখন ছাত্র। এপ্রিলে ঢাকার কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কি খোলা ছিল? অতএব সে সময় ঢাকায় অনর্থক থাকার কি কোন কারণ থাকতে পারে? অপরদিকে মোমেনা বেগম মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর, মিরপুর জল্লাদখানা, আর আদালত -এই তিন জায়গায় তিন রকম কথা বলেছে। আদালতে আসার আগে অনেকগুলো সাক্ষাতকার দিলেও একবারের জন্যও আব্দুল কাদের মোল্লার নাম নেয়নি। ২০০৭ সালে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর কর্তৃপক্ষের কাছে দেয়া জবানবন্দীতে এই মামলার প্রধান সাক্ষী মোমেনা বেগম নিজের মুখে বলেন, হযরত আলী লষ্কর পরিবারের হত্যাকান্ডের দুইদিন আগে তিনি শ্বশুড়বাড়ি চলে যাওয়ায় প্রানে বেঁচে যান! অথচ ২০১২ তে কোর্টে এসে বলে, ঘটনার সময় সে উপস্থিত ছিল। এমন মিথ্যুকের কথায় কোন সভ্য দেশে কি কারো ফাঁসি হয়?

 

আদালত অধিকৃত অপরাধীদের হাতে

প্রতিটি খুনের মামলায় আদালতের মূল দায়িত্ব হলো খুনের মটিভটি খুঁজে বের করা। কোন সুনির্দিষ্ট মটিভ ছাড়া কেউ কাউকে খুন করা দূরে থাক,পাথরও ছুঁড়ে না। প্রতিটি খুনের পিছনে যেমন খুনি থাকে, তেমনি সে খুনির মটিভও থাকে। জনাব আব্দুল কাদের মোল্লা কোন পেশাদার খুনি নন,ফলে মানুষ খুন করা তার পেশা নয়। অথচ তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে তিন হাজার মানুষ হত্যার। অথচ তার বয়স তখন মাত্র ২২। সেটি হলে তো মানুষ খুনের কাজটি ফরিদপুরের সদরপুর থেকেই আরো অল্প বয়সে শুরু করতেন। তাছাড়া মানুষ খুনে তিনি কেন ঢাকার মীরপুরে আসবেন? কেনই বা সেটি মোমেনা বেগমের পরিবারে? কেন এত বড় খুনির হাতে তার নিজ এলাকায় কোন লাশ পড়লো না? কারণ খুনিরা যেখানে যায় সেখানেই তো তার নিজ খাসলতটা সাথে নিয়েই যায়। তাছাড়া তিনি একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তার খুনও তাই রাজনৈতিক হওয়াটাই স্বাভাবিক। অথচ মোমেনা বেগমের পিতা ও তার পরিবারটি রাজনৈতিক দিক দিয়েও তেমন কেউ নন। ফলে এ খুনের মটিভটি রাজনৈতিকও নয়। আদালতের দায়িত্ব,এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা।ব্যবসা-বানিজ্য বা অন্য কোন কারণে মোমেনা বেগমের পরিবারের সাথে আব্দুল কাদের মোল্লার বিবাদ ছিল -আদালত সে প্রমাণও হাজির করতে পরিনি।

একাত্তরের মার্চে ও এপ্রিলে হাজার হাজার বাঙালী ও বিহারি মারা গেছে নিছক ভাষা ও বর্ণগত ঘৃণার কারণে।সে বীভৎস হত্যাকান্ডগুলো যেমন বাঙালীদের হাতে হয়েছে তেমনি বিহারিদের হাতেও হয়েছে।তেমন হত্যাকান্ডে জড়িত হওয়ার জন্য তো ভাষা,বর্ণ ও আঞ্চলিক পরিচয় নিয়ে অতি উগ্র,সহিংস ও অসুস্থ মন চাই। তেমন অসুস্থ মনের খুনিরা সবচেয়ে বেশী সংখ্যায় গড়ে উঠেছিল শেখ মুজিব ও তার দল আওয়ামী লীগের হাতে। সে উগ্র সহিংসতাকে প্রবল করাই ছিল তাদের শেখ মুজিবের রাজনীতি।তাদের সংখ্যা ছিল সহিংস বিহারীদের চেয়ে বহু শতগুণ বেশী। সে কারণেই একাত্তরে বাঙালীদের চেয়ে বেশী মারা গেছে বিহারীরা। তাদেরকে ঘরবাড়ি ও দোকানপাট থেকে নামিয়ে রাস্তায়ও নামানো হয়েছে। আওয়ামী লীগারদের হাতে একাত্তরে হাজার হাজার বিহারী হত্যার বীভৎ বিবরণ পাওয়া যায় শর্মিলা বোসের ইংরেজীতে লেখা “ডেথ রেকনিং” বইয়ে। লগি বৈঠা নিয়ে এরাই নিরপরাধ মানব হত্যাকে ঢাকার রাজপথে উৎসবে পরিণত করেছে। শাহবাগ মোড়ে এরাই জামায়াত শিবির কর্মীদের লাশ নিয়ে সকাল বিকাল নাশতা করার আস্ফালন করে। আজও  সেসব খুনিদের হাতে শাপলা চত্বরসহ বাংলাদেশের নানা জনপদ রক্তলাল হচ্ছে।প্যান-ইসলামিক চেতনায় পরিপুষ্ট আব্দুল কাদের মোল্লার তেমন মানসিক অসুস্থতা ও সহিংসতা থাকার কথা নয়। তাছাড়া তেমন রোগ থাকলে তিনি বাঙালীদের উপর নয়,বিহারীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তেন।সেটি হলে শুধু মীরপুরে নয়,এবং শুধু একাত্তরেই নয়,বার বার বহুস্থানেই তার হাতে বহু মানুষ লাশ হতো। বিচারকদের উচিত ছিল গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়গুলো বিবেচনায় আনা। আর সেটি না আনাই তো বিচারকের অপরাধ। সে কাজটি হলে বিচারকগণ হত্যার মটিভ খুঁজে পেতেন। ন্যায়বিচারেও সফল হতেন। কিন্তু আদালত তাতে পুরাপুরি ব্যর্থ হয়েছে। লক্ষণীয় হলো,আদালতের বিচারকগণ এ বিষয়গুলোর বিচার-বিবেচনায় কোন আগ্রহই দেখাননি। তাদের বিচারে একটি মাত্র আগ্রহই বার বার গুরুত্ব পেয়েছে তা হলো,আব্দুল কাদের মোল্লা,মাওলানা দিলাওয়ার হোসেন সাঈদী ও মাওলানা আবুল কালাম আযাদের মত ব্যক্তিদের দ্রুত হত্যা করা। এবং সে হত্যাকান্ডের উপর আদালতের পক্ষ থেকে ন্যায়বিচারের লেবাস চাপিয়ে দেয়া। ফিরাউন-নমরুদ,হালাকু-­চেঙ্গিজ ও হিটলারের সময় তো অবিকল তাই হয়েছে। বিচারপতি নাজমুলের স্কাইপি সংলাপে তো সে বিষয়টিই প্রকাশ পেয়েছে। দেশের সরকার ও তার প্রশাসন,পুলিশ,র‌্যাবই শুধু নয়,আদালতগুলিও যে কতটা অসুস্থ,অযোগ্য ও অপরাধী মানুষের দ্বারা অধিকৃত -সেটি কি এরপরও বুঝতে বাঁকি থাকে?

শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লা যুদ্ধকালীন পুরো সময়ে যে বাড়িতে লজিং ছিলেন তার বিবরণ তিনি আদালতকে দিয়েছেন । সে সময় ঐ লজিং বাড়ীতে তিনি দুই মেয়েকে পড়াতেন।  তাদের একজনের স্বামী এখন সরকারেরই কর্মকর্তা। ট্রাইবুনাল ঐ পরিবারের কাউকেই, বিশেষ করে ঐ দুই মেয়েকে আদালতে সাক্ষী রূপ হাজির হতে দেয়নি। শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লাই যদি “কসাই কাদের” হয়ে থাকে তবে যে “তিন হাজার মানুষকে হত্যা করেছে” বলে ট্রাইবুনাল বিশ্বাস করে, কীভাবে সম্ভব সে এই কসাই কাদের মোল্লাই যুদ্ধের পরপরই ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে শহীদুল্লাহ হল’র আবাসিক ছাত্র রূপে অধ্যয়নের সুযোগ পেল? বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি লাভের পর কী রূপে তিনি উদয়ন স্কুলে শিক্ষক রূপে নিযুক্তি পান? কী রূপে তিনি বাংলাদেশ রাইফেলস স্কুল এন্ড কলেজে শিক্ষকতা করেন? ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের ভাইস প্রেসিডেন্ট রূপেই বা তিনি কীরূপে দুইবার নির্বাচিত হন? 

 

বিচারমুক্ত খুনি

সাধারণ মানুষেরা অপরাধ করলে তার শাস্তি হয়। কখনো কখনো আদালত তাদের বিরুদ্ধে ফাঁসির হুকুমও শোনায়। কোর্ট মার্শাল হয় সামরিক বাহিনীর অফিসারদের। কিন্তু বাংলাদেশের আদালতের বিচারকরূপী খুনিরা বিচারমুক্ত। অথচ আদালতের অঙ্গণে ভয়ানক অপরাধিরাও যে আছে -সে প্রমাণ তো প্রচুর। স্কাইপি সংলাপের মাধ্যেমে জনগণের সামনে তো সেটি প্রকাশও পেযেছে। প্রকাশ পেয়েছে আব্দুল কাদের মোল্লা, মাওলানা আবুল কালাম আযাদ ও মাওলানা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর বিরুদ্ধে দেয়া রায়তেও। শুধু কি চোরডাকাতের শাস্তি দিলে দেশে শান্তি আসে? দেশের অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হলো আদালত। আদালতের বিচারকের আসনে বসেছেন খোদ নবী-রাসূলগণ। অথচ বাংলাদেশে অতি গুরুত্বপূণ এ প্রতিষ্ঠানটি অধিকৃত হয়ে আছে সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, সামছুদ্দীন মানিক ও নাজমুলের মত নীতিহীন ও বিবেকহীন ব্যক্তিদের হাতে। একটি দেশে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়টি ঘটে যদি দেশের বিচার ব্যবস্থা দুর্বৃত্তদের হাতে অধিকৃত হয়ে যায়। তাদের বিচারে তখন ভয়ানক অপরাধিরাও মুক্তি পেয়ে যায়, আর ফাঁসিতে ঝুলাতে হয় নিরপরাধ ব্যক্তিদের। তাছাড়া মুসলমানের ক্ষেত্রে সে দায়ভারটি আরো বেশী। কারণ, ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের নির্মূল তো মুসলমানের জীবনে আল্লাহ নির্ধারিত মিশন। সেটি না হলে সমাজে ইসলাম বাঁচে না। তেমনি মুসলিম রূপে বেড়ে উঠাও যায় না।অথচ দুর্বৃত্ত বিচারকগণ ইসলামের সে মহান মিশনটিকেই ব্যর্থ করে দেয়। তাদের যুদ্ধ তো খোদ আল্লাহর বিরুদ্ধে। শুধু চোরডাকাতদের অপরাধ নিয়ে বিচার বসলে দেশে শান্তি আসবে না। বিচারের কাঠগড়ায় খাড়া করতে হবে এসব দৃর্বৃত্ত বিচারকদেরও। চোর-ডাকাতদের চেয়েও তাদের অপরাধটি তো বেশী। চোর-ডাকাতগণ কিছু লোকের সম্পদ কেড়ে নেয়। আর দুর্বৃত্ত বিচারকগণ কেড়ে নেয় সুবিচার ও শান্তি। ইসলামের তাদের শাস্তিটা তাই কঠোর।

কিন্তু বাংলাদেশে বিচারকদের অপরাধগুলো সনাক্ত করার যেমন কোন লোক নেই, তেমনি তাদের শাস্তি দেয়ারও কেউ নাই। বরং তারাই যেন দেশের একমাত্র সার্বভৌম শক্তি। কোনটি ন্যায় আর  কোনটি অন্যায়, কোনটি পবিত্র আর কোনটি অপবিত্র সে রায়টিও এখন তারা দেয়া শুরু করেছে। সকল দলের নেতারা মিলে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রথাটি গ্রহণ করলো, আদালতের এক বিচারক সেটিকে বেআইনী বলে ঘোষিত করলেন। আর সে রায়ের মাধ্যমে দেশকে উপহার দেয়া হলো এক রাজনৈতিক মহাসংকট। আদালত ভাষা আন্দোলনে নিহতদের স্মৃতি স্তম্ভকেও পবিত্র রূপে ঘোষণা দিয়েছে। অথচ কোনটি পবিত্র আর কোনটি অপবিত্র -সেটি ধর্মীয় বিষয়। আদালতের বিচারকদের তা নিয়ে নাকগলানোর কিছু নাই। অথচ বাংলাদেশে বিচারকদের সেক্ষেত্রেই পদচারণা। যে কোন প্রতিষ্ঠান মাত্রই যে অপরাধীদের দ্বারা অধিকৃত হতে পারে -সেটি যেন বাংলাদেশের আদালতের বিচারকদের বেলায় চলে না। এমন একটি দুষিত ধারণার কারণেই বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা সবচেয়ে ব্যর্থ।

 

গণবিপ্লবের পথে দেশ

বাংলাদেশের জনগণের পিঠ এখন দেয়ালে ঠেকে গেছে। মুক্তিকামী মানুষের কাছে দুর্বৃত্তশাসন নীরবে সয়ে যাওয়ার দিন এখন শেষ। সময় এসেছে খুনিদের শাস্তি দেয়ার। প্রেক্ষাপট এখন গণবিপ্লবের। এ গণবিপ্লবের মালিকানা জনগণ এখন নিজ হাতে নিয়ে নিয়েছে। ফলে শত শত নেতা ও কর্মীদের গ্রেফতার করেও সরকার এ আন্দোলন আর থামাতে পারছে না। বরং যতই বাড়ছে গ্রেফতারের সংখ্যা, আন্দোলন ততই তীব্রতর হচ্ছে। এখন এটি শুধু আর রাজনীতি নয়। নিছক ভোট যুদ্ধও নয়, বরং পরিণত হয়েছে ইসলামি জনতার পবিত্র জিহাদে। বাংলাদেশ যে ইসলামের দুষমনদের হাতে অধিকৃত ভূমি সেটি জনগণের কাছে আজ আর গোপন বিষয় নয়। হাসিনা সরকার যে শুধু গণতন্ত্রের শত্রু -তা নয়। ভয়ানক শত্রু ইসলামেরও। মুর্তিপুজারিদের কাছে মহান আল্লাহ ও তাঁর ইবাদতের কোন গুরুত্ব নাই। বরং তাদের কাছে উপসনাযোগ্য হলো তাদের নিজহাতে গড়া মুর্তি। আল্লাহর অবাধ্যদের কাছে তেমনি পবিত্র নয় মহান আল্লাহর পবিত্র কোরআন। তাদের কাছে বরং পবিত্র হলো নয় নিজেদের রচিত শাসনতন্ত্র। নিজেদের প্রতিষ্ঠিত কায়েমী স্বার্থকে সুরক্ষা দেয়ার জন্যই তারা রচনা করেছে এ শাসনতন্ত্র। আর সে শাসনতন্ত্রের দোহাই দিয়ে যেমন নির্দেলীয় সরকারের বিরোধীতা করছে, তেমনি দেশকে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের দিকে ধাবিত করছে। আল্লাহর বিরুদ্ধে তাদের বিদ্রোহ এতটাই প্রকট যে, শাসনতন্ত্রে তারা মহান আল্লাহর উপর আস্থার বানিটিও তারা বিলুপ্ত করেছে।

 

মুমিনের জীবনে বাধ্যবাধকতা

মুসলমান হওয়ার সাথে প্রতিটি ঈমানদারের উপর কিছু অলংঘনীয় বাধ্যবাধকতা এসে যায়। সেটি আল্লাহর হুকুমের প্রতি সদাসর্বদা আনুগত্য ও মহান আল্লাহর ইজ্জতকে যে কোন মূল্যে সমুন্নত রাখা। তাই কোন দেশে মুসলমানের সংখ্যা বাড়লে সেখানে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের প্রতিষ্ঠাও অনিবার্য হয়ে পড়ে। এবং সে ভূমিতে অতি স্বাভাবিক হয় শরিয়তের প্রতিষ্ঠা। রাজার সৈনিকেরা তার রাজ্য পাহারায় ও তার শাসন বহাল রাখায় যুদ্ধ করে ও প্রয়োজনে প্রাণও্র দেয়। সে কাজের জন্য যেমন মজুরি পায়, তেমনি সৈনিকের মর্যাদাও পায়। রাজার রাজ্য পাহারায় যে সৈনিক যুদ্ধ করে না সে কি সৈনিকের মর্যদা পায়? আর মুসলমানের মর্যাদাটি তো আল্লাহর সৈনিক রূপে। ফলে তাদের দায়বদ্ধতা খোদ মহান আল্লাহতায়ালার প্রতি। তারা আল্লাহর দ্বীনের বিজয়ে ও তার সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠায় যুদ্ধ করে। অর্থ, শ্রম, সময় ও প্রাণও দেয়। প্রতিদানে পায় জান্নাত। কে কতটা ঈমানদার সেটি তো যাচাই হয় আল্লাহর রাস্তায় কে কতটা কোরবানী দিল তা থেকে। মুমিনের জীবনে সে জিহাদ তাই অনিবার্য। মনের গভীরে ঈমান যে বেঁচে আছে সেটি তো বুঝা যায় সে জিহাদ থেকে। প্রাণশূণ্য মানুষের হাত-পা নড়াচড়াশূণ্য হয়। তেমনি ঈমানশূণ্য ব্যক্তির জীবনও জিহাদ শূণ্য হয়। একটি দেশে ইসলাম কতটা বিশুদ্ধ ভাবে বেঁচে আছে সেটি মসজিদে নামাযীর সংখ্যা দেখে বুঝা যায় না। সেটি বুঝা যায় সে সমাজে আল্লাহর শরিয়ত প্রতিষ্ঠায় জিহাদ কতটা চলছে তা থেকে। শয়তানি শক্তির ষড়যন্ত্রের শেষ নাই। ফলে সে ষড়যন্ত্রের মোকাবেলায় মু’মিনের জীবনে জিহাদেরর শেষ নেই। বরং সে জিহাদকেই অব্যাহত রাখাই হলো্ ঈমানদারের জীবনে সবচেয়ে বড় জিম্মাদারি। মুসলমানের জীবনে তাই ইসলামে দাখিল হওয়ার সাথে সাথেই আমরণ জিহাদ শুরু হয়ে যায়। সেটি যেমন সাহাবায়ে কেরামের জীবনে এসেছিল তেমনি এসেছিল তাদের অনুসারিদের জীবনে। ফলে তাদের আমলে শুধু মুসলিম রাষ্ট্রের ভূগোলই বাড়েনি, ইসলামি শরিয়তের প্রতিষ্ঠাও বেড়েছে। অপরদিকে শয়তানি শক্তির টার্গেট হলো, জিহাদ থেকে মুসলমানদের দূরে সরানো। নামায-রোযা পালন নিয়ে তাদের কোন আপত্তি নেই। আপত্তি নেই পীরের দরগাহ, দরগায় জিয়ারত, বা সূফিবাদ নিয়ে। বরং এগুলির পিছনের বিপুল অর্থব্যয়ে তারা রাজী।

 

ইস্যু স্রেফ সরকার পরিবর্তন নয়

মুসলমানের জীবনে তাই বড় ইস্যুটি সরকার পরিবর্তন নয়, সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্যে বার বার নির্বাচনও নয়। বরং সেটি হলো আল্লাহতায়ালার দেয়া শরিয়তের পুরাপুরি প্রতিষ্ঠা। শয়তান তো চায়, নির্বাচন নিয়ে মুসলমানেরা বছরের পর ব্যস্ত থাক। এবং ভূলে থাক শরিয়তের প্রতিষ্ঠার বিষয়টি। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থা এক সুবর্ণ সুযোগ এনে দিয়েছে ইসলামপন্থিদের সামনে। ইসলামের শত্রুপক্ষের দুর্গ এখান ধ্বসে পড়ার পথে। এমুহুর্তে আন্দোলনকে শুধু সরকার পরিবর্তনের আন্দোলনে সীমিত রাখলে সেটি হবে আল্লাহতায়ালা ও দ্বীনের সাথে সবচেযে বড় গাদ্দারি। তাতে ব্যর্থ হয়ে যাবে এ যাবত কালের সকল শহীদদের কোরবানি। নামায-রোযা পালনের দায়িত্ব যেমন প্রতিটি ঈমানদারের, তেমনি রাষ্ট্রের বুকে আল্লাহতায়ালার দ্বীনকে বিজয়ী করার দায়িত্বও প্রতিটি মু’মিনের। রোয হাশরের বিচার দিনে প্রতিটি ঈমানদারকে এ হিসাব অবশ্যই দিতে হবে, মহান আল্লাহর শরিয়তের প্রতিষ্ঠায় তার নিজের কোরবানিটা কত্টুকু?

কোন দেশ শয়তানি শক্তির হাতে অধিকৃত হলে সেখানে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা অসম্ভব হয়ে পড়ে। আর শরিয়তের অনুসরণ ছাড়া কি ইসলাম পালন হয়? পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা বার বার বলেছেন, “যারা আমার নাযিলকৃত আইন অনুযায়ী বিচার কার্য পরিচালনা করে না তারা কাফের, …তারাই যালিম, এবং …তারাই ফাসিক। -(সুরা মাযেদ)।তাই কোনটি মুসলমানের দেশ সেটি মসজিদ মাদ্রাসা দেখে বুঝা যায় না। ভারতের মত কাফের অধ্যুষিত  দেশেও এরূপ মসজিদ-মাদ্রাসার সংখ্যা বিপুল। সেটি বুঝা যায় সেদেশে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা দেখে। অথচ বাংলাদেশে সে কাজটি হয়নি। শহীদের রক্ত উম্মহার জীবনে ঈমানের ট্রানফিউশন ঘটায়। তখন ঈমানে জোয়ার আসে। তাতে বলবান হয় শরিয়ত প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। তাই যে দেশে ভূমিতে যত শহীদ সে ভূমিতে ততই ঈমানের জোয়ার। সেখানে বলবান হয় শরিয়ত প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লার শাহাদত তাই বৃথা যাবে না। তার রক্ত যে বাংলাদেশের মানুষের জীবনে ঈমানের ট্রানফিউশন ঘটাবে সেটি সুনিশ্চিত। তাছাড়া ঈমানদারগণ যখন আল্লাহর রাস্তায় প্রাণ দেয়া শুরু করে সে ভূমিতে তো আল্লাহতায়ালা তার ফেরেশতা প্রেরণ শুরু করেন। ফলে বাংলাদেশে শয়তানের দুর্গের পতন যে অনিবার্য তা নিয়ে কি বিন্দুমাত্র সন্দেহ আছে? ১৩/১২/১৩




বিচারের নামে পরিকল্পিত হত্যাঃ খুনিদের কি শাস্তি হবে না?

আব্দুল কাদের মোল্লার সৌভাগ্য

অবশেষে স্বৈরাচারি শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীরা অতি পরিকল্পিত ভাবে আব্দুল কাদের মোল্লাকে হত্যা করলো। এ হত্যার জন্য হাসিনা সরকার যেমন বিচারের নামে বিবেকহীন ও ধর্মহীন বিচারকদের দিয়ে আদালত বসিয়েছে, তেমনি সে আদালেতে মিথ্যা সাক্ষিরও ব্যবস্থা করেছে। ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করার লক্ষ্যে ইচ্ছামত আইনও পাল্টিয়েছে। ফাঁসী ছাড়া অন্য কোন রায় মানা হবে না -আদালতকে সে হুশিয়ারিটি শোনাতে কোটি কোটি টাকা ব্যায়ে শাহবাগ চত্বরে দলীয় ক্যাডারদের দিয়ে সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে। রাজপথে আওয়ামী-বাকশালীগণ ফাঁসীর যে দাবী তুলেছিল অবশেষে অবিকল সে দাবীই বিচারকগণ তাদের রায়ে লিখলেন। একটি দাঁড়ি-কমাও তারা বাদ দেয়নি।ফাঁসীতে ঝুলানোর জন্য যখন যা কিছু করার প্রয়োজন ছিল, হাসিনা সরকার তার সব কিছু্ই করেছে। তবে জনাব আব্দুল কাদের মোল্লার পরম সৌভাগ্য, মহল্লা খুনী বা সন্ত্রাসীর হাতে তাঁকে খুন হতে হয়নি। রোগজীবাণূর হাতেও তাঁর প্রাণ যায়নি। তাকে খুন হতে হয়েছে ইসলামের এমন এক চিহ্নিত শয়তানি জল্লাদদের হাতে -যাদের রাজনীতির মূল এজেন্ডাই হলো আল্লাহর শরিয়তি বিধানের প্রতিষ্ঠাকে প্রতিহত করা। তাদের কাছে পরম আনন্দের বিষয় হলো, রাষ্ট্রীয় জীবনে কোরআনের আইনকে পরাজিত অবস্থায় দেখা। আল্লাহর এরূপ প্রচন্ড বিপক্ষ শক্তির মোকাবেলায় সরাসরি তাদের সামনে দাঁড়িয়ে তাদেরই হাতে প্রাণ দেয়ার চেয়ে মুসলমানের জীবনে গৌরবজনক আর কি থাকতে পারে? যারা এভাবে প্রাণ দেয়, তারা মৃত্যুহীন প্রাণ পায়। সাহাবাগণ তো মহান আল্লাহর কাছে সবেচেয়ে প্রিয় ও সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষের সম্মান পেয়েছেন ইসলামের শত্রুদে হাতে এরূপ প্রাণদানের মধ্য দিয়ে। বাকশালী কীটগুলো কি কখনো শহীদের সে আনন্দের কথা অনুধাবন করতে পারে?

ইসলামের দুষমনদের কাছে শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদন্ডের শাস্তিও পছন্দ হয়নি। ফাঁসির দাবী নিয়ে তারা ঝাঁপিয়ে পড়েছে তাই রাজপথে। বাংলাদেশে যারা ভারতীয় কাফের শক্তির মূল এজেন্ট,তিনি ছিলেন তাদের পরম শত্রু।চরমচক্ষুশূল ছিলেন নাস্তিক ব্লগারদেরও।আল্লাহ ও রাসূলের বিরুদ্ধবাদী এসব বিদ্রোহীরা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় তাঁর মৃত্যুর দাবি নিয়ে শাহাবাগের মোড়ে দিনের পর দিন মিটিং করেছে। মূল দ্বন্দটি এখানে ইসলামের শত্রুপক্ষের সাথে শরিয়তের প্রতিষ্ঠাকামীদের। সে লড়াইয়ে জনাব আব্দুল কাদের মোল্লা ছিলেন ইসলামের পক্ষের শক্তির বিশিষ্ঠ নেতা। এমন এক লড়াই প্রান দেয়ার অর্থ,নিঃসন্দেহে শহীদ হওয়া। জনাব আব্দুল কাদের মোল্লা তাই শহীদ। তাকে মৃত বলাই হারাম। কারণ এমন শহীদদের মৃত বলতে নিষেধ করেছেন খোদ মহান আল্লাহতায়ালা। ফলে তাঁর জন্য এটি এক বিরাট পাওয়া।তার জীবনে সবচেয়ে বড় গৌরবটি হলো,নির্ঘাত মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়েও কোন মানুষের কাছে তিনি জীবন ভিক্ষা করেননি, কোন সাহায্যও চাননি। আল্লাহর পথে নির্ভয়ে জীবন দিয়ে তিনি গেয়ে গেলেন মহান আল্লাহতায়ালারই জয়গান। এ এক পরম সৌভাগ্য।

 

স্বৈরাচারের আযাবঃ পরিকল্পিত খুন যেখানে শিল্প

কোন দেশ স্বৈরাচারি দুর্বৃত্তদের দ্বারা অধিকৃত হলে সে দেশে সবচেয়ে অসম্ভব হয়ে পড়ে ন্যায়বিচার। পরিকল্পিত খূন তখন রাষ্ট্রীয় শিল্পে পরিণত হয়। সে খূনের শিল্পে কারখানায় পরিণত হয় দেশের আদালত। ফিরাউন-নমরুদ, হালাকু-চেঙ্গিস, হিটলারের আমলে তাই ন্যায়বিচার মেলেনি। স্বৈরাচারি ফিরাউনের কাছে আল্লাহর রাসূল হযরত মুসা (আঃ)ও হত্যাযোগ্য গণ্য হয়েছে। হত্যাযোগ্য গণ্য হয়েছে বনি ইসরাইলের নিরপরাধ শিশুরাও। এরূপ স্বৈরাচারি শাসকই হযরত ঈসা (আঃ)কে শূলে চড়িয়ে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিল। ন্যায়বিচার অসম্ভব হয়েছিল বাকশালী মুজিবের আমলেও। মুজিবের আমলে ৩০ থেকে ৪০ হাজার মানুষকে বিনা বিচারে হত্যা করা হয়েছে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে। কিন্তু সে ভয়ানক অপরাধের অভিযোগে কাউকে কি আদালতে তোলা হয়েছে? বরং এসব খুনিদের আদালত সফল প্রটেকশ দিয়েছে। বরং স্বৈরাচারি খুনিদের প্রটেকশন দেয়াটিই দেশের আইনে পরিণত হয়েছে। সেরূপ আইনী প্রটেকশন নিয়েই সিরাজ সিকদারের খুনের পর শেখ মুজিব “কোথায় আজ সিরাজ সিকদার?” বলে সংসদে দাঁড়িয়ে আত্মপ্রসাদ জাহির করেছেন। এমন আচরণ কি কোন সুস্থ্ মানুষ করতে পারে? এটি তো মানসিক অসুস্থদের কাজ। নিষ্ঠুর মানবহত্যাও যে এসব অসুস্থ্য ব্যক্তিদের কতটা আনন্দ দেয় এ হলো তার নমুনা। আব্দুল কাদের মোল্লার খুন নিয়ে শেখ হাসিনা ও তার রাজনেতিক দোসরদের প্রচন্ড উৎসবের কারণ তো এরূপ মানসিক অসুস্থতা। সে অসুস্থ্যতা নিয়ে তারা রাজপথে উৎসবেও নেমে এসেছে। এরূপ অসুস্থ্ মানুষেরা ক্ষমতায় গেলে বা রাজনীতিতে স্বীকৃতি ও বৈধতা পেলে দেশে গুম,খুন, নির্যাতন ও নানারূপ অপরাধ বাড়ে। স্বৈরাচারি শাসনের এ হলো বড় আযাব। অথচ দেশে শরিয়ত প্রতিষ্ঠা পেলে শাসককেও তখন কাজীর সামনে খাড়া হতে হয়। খলিফা উমর (রাঃ)র ন্যায় ব্যক্তির ক্ষেত্রেও তাই ব্যতিক্রম ঘটেনি।

স্বৈরাচারি শাসকেরা পেশাদার খুনিদের দিয়ে শুধু যে পেটুয়া পুলিশ বাহিনী ও সেনাবাহিনী গড়ে তোলে তা নয়, তাঁবেদার আদালতও গড়ে। তখন দলীয় ক্যাডার বাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর পাশাপাশি এসব আদালতের বিচারকদেররও প্রধান কাজটি হয় সরকারের রাজনৈতিক শত্রুদের হত্যা করা। সে হত্যাকান্ডগুলোকে তখন ন্যায় বিচারের পোষাক পড়ানো হয়। এসব বিচারকদের লক্ষ্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা নয়। প্রকৃত অপরাধিদের শাস্তি দেয়াও নয়। বাংলাদেশে প্রতিদিন বহু মানুষ খুন হচ্ছে। বহু মানুষ গুম হচ্ছে। বহনারী ধর্ষিতাও হচ্ছে। কিন্তু সেসব খুন, গুম ও ধর্ষণের কি বিচার হচ্ছে? শাপলা চত্বরে বহু মানুষ নিহত হলো, বহুশত মানুষ আহতও হলো। রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ হলো,বহুহাজার কোটি টাকা লুট হলো শেয়ার বাজার থেকে। মন্ত্রীদের দূর্নীতির দায়ে বিশ্বব্যাংকের বরাদ্দকৃত পদ্মাব্রিজের বিশাল অংকের ঋণ বাতিল হয়ে গেল। এগুলির সবই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু এসব অপরাধ নিয়ে কি অপরাধীদের বিরুদ্ধে আদালতে কোন মামলা হয়েছে? সে মামলায় কি কারো শাস্তি হযেছে? বিচারকদের কি তা নিয়ে কোন মাথাব্যাথা আছে? এসব খুনি ও অপরাধিদের বিচার নিয়ে সরকারের মাথা ব্যাথা না থাকার কারণটি বোধগম্য।কারণ স্বৈরাচারি সরকারের তারা রাজনৈতিক শত্রু নয়। বরং তারা সরকারের নিজস্ব লোক। ফলে তাদের বিচার নিয়ে সরকারের যেমন মাথা নেই, তেমনি মাথাব্যাথা নাই বিচারকদেরও। একই কারণে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১৯৫ জন অভিযুক্ত সদস্যদের বিচারেও শেখ হাসিনার আগ্রহ নেই। আদালতের ব্যস্ততা বরং হাসিনা সরকারের রাজনৈতিক শত্রুদের ফাঁসি দেয়া নিয়ে ব্যস্ত। আব্দুল কাদের মোল্লার হত্যাটি তাই হাসিনা সরকারের পক্ষ থেকে যেমন প্রথম হত্যা নয়, তেমনি শেষ হত্যাও নয়। হাসিনা সরকার টিকে থাকলে এ হত্যাকান্ড যে আরো তীব্রতর হবে সে আলামতটি সুস্পষ্ট।

 

সাঁজানো আদালত ও বিচার বিভাগীয় খুন

ডাকাত দলের সর্দার সবচেয়ে নিষ্ঠুর খুনিদের দিয়ে তার ডাকাত দলকে সাঁজায়। তেমনি দুর্বৃত্ত স্বৈরাচারি শাসকও সরকারের প্রতিটি বিভাগকে সবচেয়ে পরিপক্ক দুর্বৃত্তদের হাতে তুলে দেয়। দুর্বৃত্তায়ানটি তাই শুধু দেশের পুলিশ, প্রশাসন বা দলীয় কর্মীবাহিনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং সে নীতির প্রকাপ পড়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালতেও। বিচারকের আসনগুলি তখন ভয়ানক খুনিদের দখলে চলে যায়। ফলে স্বৈরাচারি শাসনামলে রাজপথে মিটিং-মিছিল করা বা পত্র-পত্রিকায় স্বাধীন মতামত প্রকাশ করাই শুধু কঠিন নয়, অসম্ভব হয়ে পড়ে ন্যায়বিচার পাওয়া্ও। তখন নিরপরাধ মানুষদের ফাঁসীতে ঝুলানো ব্যবস্থা করা হয়। মিসরে স্বৈরাচারি জামাল আব্দুন নাসেরে আমলে তাই সৈয়দ কুতুবের ন্যয় বিখ্যাত মোফস্সেরে কোরআনকে ফাঁসীতে ঝোলানো হয়েছে। আর আজ কাঠগড়ায় তুলেছে সে দেশের ইতিহাসে সর্বপ্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ড. মুরসীকে। অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে তুরস্কেও। সেদেশের স্বৈরাচারি সামরিক জান্তারা নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রি আদনান মেন্দারাসকে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছিল। ইসলামি চেতনার অভিযোগে জেলে তুলেছে প্রধানমন্ত্রী নাযিমুদ্দীন আরবাকেনকে। আর আজ বাংলাদেশে ফাঁসিতে ঝুলানোর হলো আব্দুল কাদের মোল্লাকে। ফাঁসিতে ঝুলানোর ষড়যন্ত্র হচ্ছে আরো বহু ইসলামি ব্যক্তিকেই। হিংস্র নেকড়েগণ সমাজে বেঁচে থাকলে শিকার ধরবেই। সেটিই স্বাভাবিক। তাই সভ্য মানুষদের দায়িত্ব হলো নেকড়ে নির্মূল। এছাড়া সমাজে শান্তি আসে না। এ নির্মূল কাজে জিহাদ হলো ইসলামের হাতিয়ার। নামায রোযার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত বলা হয়েছে জিহাদকে।জীবনে প্রতি মাস ও প্রতিটি দিন রোযা রেখে বা প্রতিটি রাত ইবাদতে কাটিয়েও কেউ কি মৃত্যুর পর অমরত্ব পায়? সমাজে ও আল্লাহর কাছে সে মৃত রূপেই গণ্য হয়। কিন্তু জিহাদে মৃত্যু ঘটলে সে শহীদ ব্যক্তিকে মৃত বলাটি গুরুতর গুনাহ। কারণ, পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা তাঁকে মৃত বলতে নিষেধ করেছেন, হুকুম দিয়েছেন জীবিত বলতে। তাই কোন শহীদকে মৃত বললে সে হুকুমের অবাধ্যতা হয়।পবিত্র কোরআনের সে হুকুমটি হলোঃ “এবং আল্লাহর রাস্তায় থাকার কারণে যাদেরকে কতল করা হয়েছে তোমরা তাদেরকে মৃত বলো না। বরং তারা তো জীবিত,যদিও তোমরা সেটি অনুধাবন করতে পারো না।” –সুরা বাকারা।

কে কতটা মানুষ না অমানুষ, সভ্য বা অসভ্য -সেটি পোষাক-পরিচ্ছদ বা চেহরা-সুরতে ধরা পড়ে না। ধরা পড়ে ন্যায়-অন্যায়ের বিচারবোধ থেকে। সে বিচার বোধ চোর-ডাকাত ও খুনিদের থাকে না। সে বিচারবোধটি না থাকার কারণেই ভয়ানক অপরাধও তাদের কাছে অপরাধ গণ্য হয় না। এটি হলো তাদের মনের অসুস্থ্যতা, সে সাথে অসভ্যতাও। সভ্য সমাজে এজন্যই এসব অসুস্থ্য ও অসভ্যরা চোর-ডাকাত-খুনি রূপে চিহ্নিত হয়। তেমনি একটি দেশ কতটা অপরাধীদের দ্বারা অধিকৃত সেটিও ধরা পড়ে সে দেশের আদালতের বিচার-আচারের মান থেকে। সভ্যদেশে তাই অতি ন্যয়নিষ্ঠ ও বিচারবোধ-সম্পন্ন ব্যক্তিদেরকে আদালতের বিচারক বানানো হয়। কিন্তু বাংলাদেশে সেটি ঘটেনি। কীরূপ অপরাধিদের দিয়ে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতকে সাঁজিয়েছে তার কিছু একটি বিবরণ দেয়া যাক। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের এক বিচারক হলেন সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। জামায়াত নেতা জনাব আব্দুল কাদের মোল্লাকে ফাঁসীতে ঝোলানোর জন্য যে পাঁচজন বিচারককে নিয়ে এই মামলার বেঞ্চ গঠন করা হয়েছে, তাদের একজন হলেন এই সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। জামায়াত নেতাদের হত্যায় এই সুরেন্দ্র বাবুর আগ্রহ এতটাই তীব্র যে Skype scandal-এ জড়িত ট্রাইবুনালের অপর বিচারপতি নাজমুলকে তিনি বলেছেন, “তিনটা ফাঁসির রায় দাও তাহলে তোমাকে আমরা সুপ্রীম কোর্টে নিয়ে আসতেছি”। একথা বিচারপতি নাজমুল তার ব্রাসেলস্থ বন্ধুকে স্কাইপী যোগে বলেছেন। পত্রিকায় সে সংলাপটি হুবহু প্রকাশও পেয়েছে। সুরেন্দ্র কুমার সিনহা তাই বিচার চান না, চান ফাঁসির রায়। এ কথা বলার অপরাধে যে কোন সভ্য দেশের আদালতে তার ন্যায় বিচারকের লেবাসধারি অপরাধীর কঠোর শাস্তি হতো। এবং অসম্ভব করা হতো বিচারকের আসনে বসা। কিন্তু বাংলাদেশে সেটি হয়নি। বরং তার এ খুনি মানসিকতার কারণেই হাসিনার কাছে তার কদর বেড়েছে। আব্দুল কাদের মোল্লার ন্যায় নিরাপরাধ মানুষকে ফাঁসিতে ঝোলানাো জন্য তো বিচারকের আসনে এমন নীতিহীন ও বিবেকহীন তাঁবেদার বিচারকই চাই। এজন্যই তার স্থান মিলেছে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতে। তেমনি আরেক বিচারক হলেন শামসুদ্দিন মানিক। অশালীন আচরণে ও বিতর্কিত বিচারকার্যে তিনি রেকর্ড গড়েছেন। তার বিরুদ্ধে বহু সিনিয়র আইনজীবী যেমন অভিযোগ তুলেছে তেমনি বহুশত পৃষ্ঠার প্রমানসহ অভিযোগনামা দাখিল করেছে বহু সাংবাদিক। কিন্তু কারো অভিযোগকে শেখ হাসিনা গুরুত্ব দেননি। কারণ, বিচারকের আসনে তার চাই তাঁবেদার আওয়ামী ক্যাডার। শেখ হাসিনা তাকে হাইকোর্ট থেকে উঠিয়ে সুপ্রীম কোর্টে বসিয়েছেন। এবং সেখান থেকে তুলে এনে আব্দুল কাদের মোল্লার মামলার আপিল ডিভিশানে বসিয়েছেন। কারণ, সে আওয়ামী লীগের ক্যাডার এবং আব্দুল কাদের মোল্লার মত নিরাপরাধ ব্যক্তিদের ফাঁসিতে ঝোলাতে সে আপোষহীন।

 

আইন বদলানো হলো স্রেফ খুনের স্বার্থে

ট্রাইবুনাল প্রথমে আব্দুল কাদের মোল্লাকে ফাঁসি দেয়নি, দিয়েছিল যাবজ্জীবন কারাদন্ড। তাঁকে ফাঁসি দিতে প্রয়োজন ছিল আইনের পরিবর্তন। সরকার তাঁর ফাঁসি দিতে এতটাই দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিল যে সেটি সম্ভব করতে প্রচলিত আ্ইনে ইচ্ছামত পবিবর্তন এনেছে। অথচ আন্তুর্জাতিক আইনে রীতিবিরুদ্ধ। শুধু তাই নয়, আপিলের সুযোগ থেকে্ও তাঁকে বঞ্চিত করা হযেছিল। সরকারের যুক্তি, আব্দুল কাদের মোল্লা একজন যুদ্ধাপরাধী, সে কারণে তাঁর জন্য আপিলের সুযোগ নেই। আব্দুল কাদের মোল্লার মামলা প্রসঙ্গে এ্যামনেস্ট্রি ইন্টারন্যাশন্যালের বক্তব্যঃ “This is the first known case of a prisoner sentenced to death directly by the highest court in Bangladesh. It is also the first known death sentence in Bangladesh with no right of appeal. Death sentence without right of judicial appeal defies human rights law.”

বিচারে যে কতটা অবিচার হযেছে সেটিও দেখা যাক। যে সাক্ষীর কথার উপর ভিত্তি করে আব্দুল কাদের মোল্লাকে হত্যা করা হলো তার নাম মোমেনা বেগম। মোমেনা বেগম অন্যদের কাছ থেকে শুনেছে যে, যারা তার পরিবারের অন্যদের হত্যা করেছে তার মধ্যে কাদের মোল্লা বলে একজন ছিল। কিন্তু সে নিজে সে অভিযুক্ত কাদের মোল্লাকে স্বচোখে কখনোই দেখেনি। প্রশ্ন হলো বাংলাদেশে বহু গ্রামে ও বহু মহল্লায় কাদের মোল্লা বলে কেউ থাকতেই পারে। হয়তো সে সময় মীরপুরেও এমন কাদের মোল্লা একাধিক ছিল। কিন্তু সে যে ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার আমিরাবাদ গ্রামের মরহুম সানাউল্লা মোল্লার ছেলে আবদুল কাদের মোল্লা -সে খবর কি মীরপুরের এই মোমেনা বেগম জানতো? সামনা সামনি খাড়া করলে কি তাঁকে চিনতে পারতো? যে কোন খুনের মামলার সাক্ষিকে তার অভিযুক্ত আসামীকে লাইনে দাড়ানো অনেকে মধ্য থেকে খুঁজে বের করতে হয়। অথচ যারা তাঁকে ফাঁসি দিল তারা তা নিয়ে তদন্তের সামান্যতম প্রয়োজনও মনে করেনি। তারা শুধু কাদের মোল্লার নামের মিলটিই দেখেছে। সেটিকে একমাত্র দলীল রূপে খাড়া করে ফরিদপুরের আমিরাবাদ গ্রামের আব্দুল কাদের মোল্লাকে ফাঁসিতে চড়ালো।

বিচারকগণ এটুকুও ভেবে দেখেনি, মীরপুরে খুনের ঘটনাটি ঘটেছে ২৫শের মার্চের কিছুদিন পর এপ্রিলের প্রথম দিকে। সে সময় আব্দুল কাদের মোল্লা কেন ঢাকাতে থাকতে যাবে? ঢাকাতে তাঁর কি কোন চাকুরি ছিল? তাঁর পিতার কি কোন বাড়ি ছিল? ঢাকায়  যাদের চাকুরি ও ঘরবাড়ি ছিল তারাও তো সে দুর্যোগ মুহুর্তে ঢাকা ছেড়ে মফস্বলে চলে যায়। আব্দুল কাদের মোল্লা তখন ছাত্র। এপ্রিলে ঢাকার কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কি খোলা ছিল? অতএব সে সময় ঢাকায় অনর্থক থাকার কি কোন কারণ থাকতে পারে? অপরদিকে মোমেনা বেগম মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর, মিরপুর জল্লাদখানা, আর আদালত -এই তিন জায়গায় তিন রকম কথা বলেছে। আদালতে আসার আগে অনেকগুলো সাক্ষাতকার দিলেও একবারের জন্যও আব্দুল কাদের মোল্লার নাম নেয়নি। ২০০৭ সালে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর কর্তৃপক্ষের কাছে দেয়া জবানবন্দীতে এই মামলার প্রধান সাক্ষী মোমেনা বেগম নিজের মুখে বলেন, হযরত আলী লষ্কর পরিবারের হত্যাকান্ডের দুইদিন আগে তিনি শ্বশুড়বাড়ি চলে যাওয়ায় প্রানে বেঁচে যান! অথচ ২০১২ তে কোর্টে এসে বলে, ঘটনার সময় সে উপস্থিত ছিল। এমন মিথ্যুকের কথায় কোন সভ্য দেশে কি কারো ফাঁসি হয়?

 

অপরাধীদের দখলে আদালত

প্রতিটি খুনের মামলায় আদালতের মূল দায়িত্ব হলো খুনের মটিভটি খুঁজে বের করা। কোন সুনির্দিষ্ট মটিভ ছাড়া কেউ কাউকে খুন করা দূরে থাক,পাথরও ছুঁড়ে না। প্রতিটি খুনের পিছনে যেমন খুনি থাকে, তেমনি সে খুনির মটিভও থাকে। জনাব আব্দুল কাদের মোল্লা কোন পেশাদার খুনি নন,ফলে মানুষ খুন করা তার পেশা নয়। অথচ তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে তিন হাজার মানুষ হত্যার। অথচ তার বয়স তখন মাত্র ২২। সেটি হলে তো মানুষ খুনের কাজটি ফরিদপুরের সদরপুর থেকেই আরো অল্প বয়সে শুরু করতেন। তাছাড়া মানুষ খুনে তিনি কেন ঢাকার মীরপুরে আসবেন? কেনই বা সেটি মোমেনা বেগমের পরিবারে? কেন এত বড় খুনির হাতে তার নিজ এলাকায় কোন লাশ পড়লো না? কারণ খুনিরা যেখানে যায় সেখানেই তো তার নিজ খাসলতটা সাথে নিয়েই যায়। তাছাড়া তিনি একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তার খুনও তাই রাজনৈতিক হওয়াটাই স্বাভাবিক। অথচ মোমেনা বেগমের পিতা ও তার পরিবারটি রাজনৈতিক দিক দিয়েও তেমন কেউ নন। ফলে এ খুনের মটিভটি রাজনৈতিকও নয়। আদালতের দায়িত্ব,এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা।ব্যবসা-বানিজ্য বা অন্য কোন কারণে মোমেনা বেগমের পরিবারের সাথে আব্দুল কাদের মোল্লার বিবাদ ছিল -আদালত সে প্রমাণও হাজির করতে পরিনি।

একাত্তরের মার্চে ও এপ্রিলে হাজার হাজার বাঙালী ও বিহারি মারা গেছে নিছক ভাষা ও বর্ণগত ঘৃণার কারণে।সে বীভৎস হত্যাকান্ডগুলো যেমন বাঙালীদের হাতে হয়েছে তেমনি বিহারিদের হাতেও হয়েছে।তেমন হত্যাকান্ডে জড়িত হওয়ার জন্য তো ভাষা,বর্ণ ও আঞ্চলিক পরিচয় নিয়ে অতি উগ্র,সহিংস ও অসুস্থ মন চাই। তেমন অসুস্থ মনের খুনিরা সবচেয়ে বেশী সংখ্যায় গড়ে উঠেছিল শেখ মুজিব ও তার দল আওয়ামী লীগের হাতে। সে উগ্র সহিংসতাকে প্রবল করাই ছিল তাদের শেখ মুজিবের রাজনীতি।তাদের সংখ্যা ছিল সহিংস বিহারীদের চেয়ে বহু শতগুণ বেশী। সে কারণেই একাত্তরে বাঙালীদের চেয়ে বেশী মারা গেছে বিহারীরা। তাদেরকে ঘরবাড়ি ও দোকানপাট থেকে নামিয়ে রাস্তায়ও নামানো হয়েছে। আওয়ামী লীগারদের হাতে একাত্তরে হাজার হাজার বিহারী হত্যার বীভৎ বিবরণ পাওয়া যায় শর্মিলা বোসের ইংরেজীতে লেখা “ডেথ রেকনিং” বইয়ে। লগি বৈঠা নিয়ে এরাই নিরপরাধ মানব হত্যাকে ঢাকার রাজপথে উৎসবে পরিণত করেছে। শাহবাগ মোড়ে এরাই জামায়াত শিবির কর্মীদের লাশ নিয়ে সকাল বিকাল নাশতা করার আস্ফালন করে। আজও  সেসব খুনিদের হাতে শাপলা চত্বরসহ বাংলাদেশের নানা জনপদ রক্তলাল হচ্ছে।প্যান-ইসলামিক চেতনায় পরিপুষ্ট আব্দুল কাদের মোল্লার তেমন মানসিক অসুস্থতা ও সহিংসতা থাকার কথা নয়। তাছাড়া তেমন রোগ থাকলে তিনি বাঙালীদের উপর নয়,বিহারীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তেন।সেটি হলে শুধু মীরপুরে নয়,এবং শুধু একাত্তরেই নয়,বার বার বহুস্থানেই তার হাতে বহু মানুষ লাশ হতো। বিচারকদের উচিত ছিল গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়গুলো বিবেচনায় আনা। আর সেটি না আনাই তো বিচারকের অপরাধ। সে কাজটি হলে বিচারকগণ হত্যার মটিভ খুঁজে পেতেন। ন্যায়বিচারেও সফল হতেন। কিন্তু আদালত তাতে পুরাপুরি ব্যর্থ হয়েছে। লক্ষণীয় হলো,আদালতের বিচারকগণ এ বিষয়গুলোর বিচার-বিবেচনায় কোন আগ্রহই দেখাননি। তাদের বিচারে একটি মাত্র আগ্রহই বার বার গুরুত্ব পেয়েছে তা হলো,আব্দুল কাদের মোল্লা,মাওলানা দিলাওয়ার হোসেন সাঈদী ও মাওলানা আবুল কালাম আযাদের মত ব্যক্তিদের দ্রুত হত্যা করা। এবং সে হত্যাকান্ডের উপর আদালতের পক্ষ থেকে ন্যায়বিচারের লেবাস চাপিয়ে দেয়া। ফিরাউন-নমরুদ,হালাকু-­চেঙ্গিজ ও হিটলারের সময় তো অবিকল তাই হয়েছে। বিচারপতি নাজমুলের স্কাইপি সংলাপে তো সে বিষয়টিই প্রকাশ পেয়েছে। দেশের সরকার ও তার প্রশাসন,পুলিশ,র‌্যাবই শুধু নয়,আদালতগুলিও যে কতটা অসুস্থ,অযোগ্য ও অপরাধী মানুষের দ্বারা অধিকৃত -সেটি কি এরপরও বুঝতে বাঁকি থাকে?

শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লা যুদ্ধকালীন পুরো সময়ে যে বাড়িতে লজিং ছিলেন তার বিবরণ তিনি আদালতকে দিয়েছেন । সে সময় ঐ লজিং বাড়ীতে তিনি দুই মেয়েকে পড়াতেন।  তাদের একজনের স্বামী এখন সরকারেরই কর্মকর্তা।ট্রাইবুনাল ঐ পরিবারের কাউকেই, বিশেষ করে ঐ দুই মেয়েকে আদালতে সাক্ষী রূপ হাজির হতে দেয়নি। শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লাই যদি “কসাই কাদের” হয়ে থাকে তবে যে “তিন হাজার মানুষকে হত্যা করেছে” বলে ট্রাইবুনাল বিশ্বাস করে, কীভাবে সম্ভব সে এই কসাই কাদের মোল্লাই যুদ্ধের পরপরই ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে শহীদুল্লাহ হল’র আবাসিক ছাত্র রূপে অধ্যয়নের সুযোগ পেল? বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি লাভের পর কী রূপে তিনি উদয়ন স্কুলে শিক্ষক রূপে নিযুক্তি পান? কী রূপে তিনি বাংলাদেশ রাইফেলস স্কুল এন্ড কলেজে শিক্ষকতা করেন? ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের ভাইস প্রেসিডেন্ট রূপেই বা তিনি কীরূপে দুইবার নির্বাচিত হন? 

 

বিচার হোক বিচারকদের

সাধারণ মানুষেরা অপরাধ করলে তার শাস্তি হয়। কখনো কখনো আদালত তাদের বিরুদ্ধে ফাঁসির হুকুমও শোনায়। কোর্ট মার্শাল হয় সামরিক বাহিনীর অফিসারদের। কিন্তু বাংলাদেশের আদালতের যারা বিচারক তারা কি ফেরেশতা? অথচ সেখানেও যে অপরাধিরা আছে সে প্রমাণ কি কম? স্কাইপি সংলাপের মাধ্যেমে জনগণের সামনে তো সেটি প্রকাশও পেযেছে। প্রকাশ পেয়েছে আব্দুল কাদের মোল্লা, মাওলানা আবুল কালাম আযাদ ও মাওলানা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর বিরুদ্ধে দেয়া রায়তেও। শুধু কি চোরডাকাতের শাস্তি দিলে দেশে শান্তি আসে? দেশের অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হলো আদালত। আদালতের বিচারকের আসনে বসেছেন খোদ নবী-রাসূলগণ। অথচ বাংলাদেশে অতি গুরুত্বপূণ এ প্রতিষ্ঠানটি অধিকৃত হয়ে আছে সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, সামছুদ্দীন মানিক ও নাজমুলের মত নীতিহীন ও বিবেকহীন ব্যক্তিদের হাতে। একটি দেশে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়টি ঘটে যদি দেশের বিচার ব্যবস্থা দুর্বৃত্তদের হাতে অধিকৃত হয়ে যায়। তাদের বিচারে তখন ভয়ানক অপরাধিরাও মুক্তি পেয়ে যায়, আর ফাঁসিতে ঝুলাতে হয় নিরপরাধ ব্যক্তিদের। তাছাড়া মুসলমানের ক্ষেত্রে সে দায়ভারটি আরো বেশী। কারণ, ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের নির্মূল তো মুসলমানের জীবনে আল্লাহ নির্ধারিত মিশন। সেটি না হলে সমাজে ইসলাম বাঁচে না। তেমনি মুসলিম রূপে বেড়ে উঠাও যায় না।অথচ দুর্বৃত্ত বিচারকগণ ইসলামের সে মহান মিশনটিকেই ব্যর্থ করে দেয়। তাদের যুদ্ধ তো খোদ আল্লাহর বিরুদ্ধে। শুধু চোরডাকাতদের অপরাধ নিয়ে বিচার বসলে দেশে শান্তি আসবে না। বিচারের কাঠগড়ায় খাড়া করতে হবে এসব দৃর্বৃত্ত বিচারকদেরও। চোর-ডাকাতদের চেয়েও তাদের অপরাধটি তো বেশী। চোর-ডাকাতগণ কিছু লোকের সম্পদ কেড়ে নেয়। আর দুর্বৃত্ত বিচারকগণ কেড়ে নেয় সুবিচার ও শান্তি। ইসলামের তাদের শাস্তিটা তাই কঠোর।

কিন্তু বাংলাদেশে বিচারকদের অপরাধগুলো সনাক্ত করার যেমন কোন লোক নেই, তেমনি তাদের শাস্তি দেয়ারও কেউ নাই। বরং তারাই যেন দেশের একমাত্র সার্বভৌম শক্তি। কোনটি ন্যায় আর  কোনটি অন্যায়, কোনটি পবিত্র আর কোনটি অপবিত্র সে রায়টিও এখন তারা দেয়া শুরু করেছে। সকল দলের নেতারা মিলে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রথাটি গ্রহণ করলো, আদালতের এক বিচারক সেটিকে বেআইনী বলে ঘোষিত করলেন। আর সে রায়ের মাধ্যমে দেশকে উপহার দেয়া হলো এক রাজনৈতিক মহাসংকট। আদালত ভাষা আন্দোলনে নিহতদের স্মৃতি স্তম্ভকেও পবিত্র রূপে ঘোষণা দিয়েছে। অথচ কোনটি পবিত্র আর কোনটি অপবিত্র -সেটি ধর্মীয় বিষয়। আদালতের বিচারকদের তা নিয়ে নাকগলানোর কিছু নাই। অথচ বাংলাদেশে বিচারকদের সেক্ষেত্রেই পদচারণা। যে কোন প্রতিষ্ঠান মাত্রই যে অপরাধীদের দ্বারা অধিকৃত হতে পারে -সেটি যেন বাংলাদেশের আদালতের বিচারকদের বেলায় চলে না। এমন একটি দুষিত ধারণার কারণেই বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা সবচেয়ে ব্যর্থ।

 

শুরু হয়েছে গণবিপ্লব

বাংলাদেশের জনগণের পিঠ এখন দেয়ালে ঠেকে গেছে। মুক্তিকামী মানুষের কাছে দুর্বৃত্তশাসন নীরবে সয়ে যাওয়ার দিন এখন শেষ। সময় এসেছে খুনিদের শাস্তি দেয়ার। শুরু হয়েছে তাই গণবিপ্লব। এ গণবিপ্লবের মালিকানা জনগণ এখন নিজ হাতে নিয়ে নিয়েছে। ফলে শত শত নেতা ও কর্মীদের গ্রেফতার করেও সরকার এ আন্দোলন আর থামাতে পারছে না। বরং যতই বাড়ছে গ্রেফতারের সংখ্যা, আন্দোলন ততই তীব্রতর হচ্ছে। এখন এটি শুধু আর রাজনীতি নয়। নিছক ভোট যুদ্ধও নয়, বরং পরিণত হয়েছে ইসলামি জনতার পবিত্র জিহাদে। বাংলাদেশ যে ইসলামের দুষমনদের হাতে অধিকৃত ভূমি সেটি জনগণের কাছে আজ আর গোপন বিষয় নয়। হাসিনা সরকার যে শুধু গণতন্ত্রের শত্রু -তা নয়। ভয়ানক শত্রু ইসলামেরও। মুর্তিপুজারিদের কাছে মহান আল্লাহ ও তাঁর ইবাদতের কোন গুরুত্ব নাই। বরং তাদের কাছে উপসনাযোগ্য হলো তাদের নিজহাতে গড়া মুর্তি। আল্লাহর অবাধ্যদের কাছে তেমনি পবিত্র নয় মহান আল্লাহর পবিত্র কোরআন। তাদের কাছে বরং পবিত্র হলো নয় নিজেদের রচিত শাসনতন্ত্র। নিজেদের প্রতিষ্ঠিত কায়েমী স্বার্থকে সুরক্ষা দেয়ার জন্যই তারা রচনা করেছে এ শাসনতন্ত্র। আর সে শাসনতন্ত্রের দোহাই দিয়ে যেমন নির্দেলীয় সরকারের বিরোধীতা করছে, তেমনি দেশকে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের দিকে ধাবিত করছে। আল্লাহর বিরুদ্ধে তাদের বিদ্রোহ এতটাই প্রকট যে, শাসনতন্ত্রে তারা মহান আল্লাহর উপর আস্থার বানিটিও তারা বিলুপ্ত করেছে।

 

মু’মিনের জীবনে বাধ্যবাধকতা

মুসলমান হওয়ার সাথে প্রতিটি ঈমানদারের উপর কিছু অলংঘনীয় বাধ্যবাধকতা এসে যায়। সেটি আল্লাহর হুকুমের প্রতি সদাসর্বদা আনুগত্য ও মহান আল্লাহর ইজ্জতকে যে কোন মূল্যে সমুন্নত রাখা। তাই কোন দেশে মুসলমানের সংখ্যা বাড়লে সেখানে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের প্রতিষ্ঠাও অনিবার্য হয়ে পড়ে। এবং সে ভূমিতে অতি স্বাভাবিক হয় শরিয়তের প্রতিষ্ঠা। রাজার সৈনিকেরা তার রাজ্য পাহারায় ও তার শাসন বহাল রাখায় যুদ্ধ করে ও প্রয়োজনে প্রাণও্র দেয়। সে কাজের জন্য যেমন মজুরি পায়, তেমনি সৈনিকের মর্যাদাও পায়। রাজার রাজ্য পাহারায় যে সৈনিক যুদ্ধ করে না সে কি সৈনিকের মর্যদা পায়? আর মুসলমানের মর্যাদাটি তো আল্লাহর সৈনিক রূপে। ফলে তাদের দায়বদ্ধতা খোদ মহান আল্লাহতায়ালার প্রতি। তারা আল্লাহর দ্বীনের বিজয়ে ও তার সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠায় যুদ্ধ করে। অর্থ, শ্রম, সময় ও প্রাণও দেয়। প্রতিদানে পায় জান্নাত। কে কতটা ঈমানদার সেটি তো যাচাই হয় আল্লাহর রাস্তায় কে কতটা কোরবানী দিল তা থেকে। মুমিনের জীবনে সে জিহাদ তাই অনিবার্য। মনের গভীরে ঈমান যে বেঁচে আছে সেটি তো বুঝা যায় সে জিহাদ থেকে। প্রাণশূণ্য মানুষের হাত-পা নড়াচড়াশূণ্য হয়। তেমনি ঈমানশূণ্য ব্যক্তির জীবনও জিহাদ শূণ্য হয়। একটি দেশে ইসলাম কতটা বিশুদ্ধ ভাবে বেঁচে আছে সেটি মসজিদে নামাযীর সংখ্যা দেখে বুঝা যায় না। সেটি বুঝা যায় সে সমাজে আল্লাহর শরিয়ত প্রতিষ্ঠায় জিহাদ কতটা চলছে তা থেকে। শয়তানি শক্তির ষড়যন্ত্রের শেষ নাই। ফলে সে ষড়যন্ত্রের মোকাবেলায় মু’মিনের জীবনে জিহাদেরর শেষ নেই। বরং সে জিহাদকেই অব্যাহত রাখাই হলো্ ঈমানদারের জীবনে সবচেয়ে বড় জিম্মাদারি। মুসলমানের জীবনে তাই ইসলামে দাখিল হওয়ার সাথে সাথেই আমরণ জিহাদ শুরু হয়ে যায়। সেটি যেমন সাহাবায়ে কেরামের জীবনে এসেছিল তেমনি এসেছিল তাদের অনুসারিদের জীবনে। ফলে তাদের আমলে শুধু মুসলিম রাষ্ট্রের ভূগোলই বাড়েনি, ইসলামি শরিয়তের প্রতিষ্ঠাও বেড়েছে। অপরদিকে শয়তানি শক্তির টার্গেট হলো, জিহাদ থেকে মুসলমানদের দূরে সরানো। নামায-রোযা পালন নিয়ে তাদের কোন আপত্তি নেই। আপত্তি নেই পীরের দরগাহ, দরগায় জিয়ারত, বা সূফিবাদ নিয়ে। বরং এগুলির পিছনের বিপুল অর্থব্যয়ে তারা রাজী।

 

ইস্যু স্রেফ সরকার পরিবর্তন নয়

মুসলমানের জীবনে তাই বড় ইস্যুটি সরকার পরিবর্তন নয়, সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্যে বার বার নির্বাচনও নয়। বরং সেটি হলো আল্লাহতায়ালার দেয়া শরিয়তের পুরাপুরি প্রতিষ্ঠা। শয়তান তো চায়, নির্বাচন নিয়ে মুসলমানেরা বছরের পর ব্যস্ত থাক। এবং ভূলে থাক শরিয়তের প্রতিষ্ঠার বিষয়টি। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থা এক সুবর্ণ সুযোগ এনে দিয়েছে ইসলামপন্থিদের সামনে। ইসলামের শত্রুপক্ষের দুর্গ এখান ধ্বসে পড়ার পথে। এমুহুর্তে আন্দোলনকে শুধু সরকার পরিবর্তনের আন্দোলনে সীমিত রাখলে সেটি হবে আল্লাহতায়ালা ও দ্বীনের সাথে সবচেযে বড় গাদ্দারি। তাতে ব্যর্থ হয়ে যাবে এ যাবত কালের সকল শহীদদের কোরবানি। নামায-রোযা পালনের দায়িত্ব যেমন প্রতিটি ঈমানদারের, তেমনি রাষ্ট্রের বুকে আল্লাহতায়ালার দ্বীনকে বিজয়ী করার দায়িত্বও প্রতিটি মু’মিনের। রোয হাশরের বিচার দিনে প্রতিটি ঈমানদারকে এ হিসাব অবশ্যই দিতে হবে, মহান আল্লাহর শরিয়তের প্রতিষ্ঠায় তার নিজের কোরবানিটা কত্টুকু?

কোন দেশ শয়তানি শক্তির হাতে অধিকৃত হলে সেখানে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা অসম্ভব হয়ে পড়ে। আর শরিয়তের অনুসরণ ছাড়া কি ইসলাম পালন হয়? পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা বার বার বলেছেন, “যারা আমার নাযিলকৃত আইন অনুযায়ী বিচার কার্য পরিচালনা করে না তারা কাফের, …তারাই যালিম, এবং …তারাই ফাসিক। -(সুরা মাযেদ)।তাই কোনটি মুসলমানের দেশ সেটি মসজিদ মাদ্রাসা দেখে বুঝা যায় না। ভারতের মত কাফের অধ্যুষিত  দেশেও এরূপ মসজিদ-মাদ্রাসার সংখ্যা বিপুল। সেটি বুঝা যায় সেদেশে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা দেখে। অথচ বাংলাদেশে সে কাজটি হয়নি। শহীদের রক্ত উম্মহার জীবনে ঈমানের ট্রানফিউশন ঘটায়। তখন ঈমানে জোয়ার আসে। তাতে বলবান হয় শরিয়ত প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। তাই যে দেশে ভূমিতে যত শহীদ সে ভূমিতে ততই ঈমানের জোয়ার। সেখানে বলবান হয় শরিয়ত প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লার শাহাদত তাই বৃথা যাবে না। তার রক্ত যে বাংলাদেশের মানুষের জীবনে ঈমানের ট্রানফিউশন ঘটাবে সেটি সুনিশ্চিত। তাছাড়া ঈমানদারগণ যখন আল্লাহর রাস্তায় প্রাণ দেয়া শুরু করে সে ভূমিতে তো আল্লাহতায়ালা তার ফেরেশতা প্রেরণ শুরু করেন। ফলে বাংলাদেশে শয়তানের দুর্গের পতন যে অনিবার্য তা নিয়ে কি বিন্দুমাত্র সন্দেহ আছে? ১৩/১২/১৩




স্বৈরশাসনের নিপাত কেন জরুরী?

বিপদ বিরামহীন যুদ্ধের

যে কোন মুসলিম দেশেই স্বৈরশাসনের আপদটি ভয়াবহ। ঈমানদার রূপে বেড়ে উঠা দূরে থাক, তখন অসম্ভব হয় সভ্য মানুষ রূপে বেড়ে উঠা। ঘুর্ণিঝড়, ভূমিকম্প, মহামারি বা প্লাবনে এতবড় বিপদ ঘটে না। ফিরাউন-নমরুদের ন্যায় তারাও মহান আল্লাহতায়ালার আযাবকে অনিবার্য করে তোলে। কারণ, এরা শুধু জনগণের শত্রু নয়, শত্রু মহান আল্লাহতায়ালারও। তাদের এজেন্ডা স্রেফ নিজেদের খেয়ালখুশির প্রতিষ্ঠা। নিজেদের স্বেচ্ছাচারিতা বাঁচাতে এরা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয় মহান আল্লাহতায়ালার কর্তৃত্ব ও তাঁর সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে। আইন তৈরীর অধিকার তারা নিজ হাতে নিয়ে নেয়। ফলে তাদের যুদ্ধ মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়ত, হুদুদ ও কেসাসের বিধানের বিরুদ্ধে। পবিত্র কোরআন এদেরকে চিত্রিত করা হয়েছে মুস্তাকবিরীন রূপে। আরবী ভাষায় মুস্তাকবিরীন বলতে তাদের বুঝায় যারা নিজেদেরকে সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ বা বড় মনে করে। অথচ নিজেকে শ্রেষ্ঠ বা বড় মনে করার অধিকারটি একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালার। মুস্তাকবিরীনদের কলাবোরেটর রূপে থাকে এমন এক দালাল শ্রেণীর দুর্বৃত্ত নেতা, কর্মী ও বুদ্ধিজীবী -যাদের কাজ স্বৈরশাসকের সকল দুষ্কর্মের সমর্থণ করা। তাদের আরো কাজ, স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে যখনই সত্য ও ন্যায়ের বানি নিয়ে ময়দানে নামে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করা। হযরত মূসা (আঃ) ও তাঁর অনুসারিদের নির্মূলে ফিরাউনের পাশে এদের অবস্থানটি ছিল তার মন্ত্রি, পরামর্শদাতা, সভাসদ, গোত্রপতি, সেনাপতি ও লাঠিয়াল রূপে। মানব ইতিহাসে এরাই হলো অতি নিকৃষ্ট শ্রেণীর দুর্বৃত্ত। এদের অপরাধ সাধারণ চোর-ডাকাতদের চেয়েও জঘন্য। সাধারণ চোর-ডাকাতগণ স্বৈরশাসকদের বাঁচাতে গণহত্যায় নামে না, কিন্তু এরা নামে। যুগে যুগে ফিরাউনগণ দীর্ঘায়ু পেয়েছে বস্তুতঃ এদের কারণেই।

পবিত্র কোরআনে ফিরাউনের ন্যায় স্বৈরশাসকদের সহযোগীদের মালাউন বলে অভিহিত করা হয়েছে। মালাউন শব্দটি মহান আল্লাহতায়ালার নিজের বাছাইকৃত বিশেষ এক বর্ণনাত্মক পরিভাষা তথা ন্যারেটিভ। এর কোন বিকল্প নেই। এর কোন অনুবাদও হয় না। মালাউন শব্দটির মধ্য দিয়ে মানব ইতিহাসের রঙ্গমঞ্চে মহান আল্লাহতায়ালা এমন এক শ্রেণীর দুর্বৃত্তদেরকে হাজির করেছেন -যাদের অপরাধের তুলনা একমাত্র তাদের নিজেদের সাথেই চলে। তাদের মূল অপরাধটি হলো, আল্লাহতায়ালা, তাঁর নবী-রাসূল ও তাঁর দ্বীনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। ফলে মহান আল্লাহতায়ালার ক্রোধ শুধু ফিরাউনদের উপর নয়, এসব মালাউনদের বিরুদ্ধেও। তাই মহান আল্লাহতায়ালা তাই শুধু ফিরাউনকে নয়, মালাউনদেরও ডুবিয়ে হত্যা করেছেন। পরকালে তাদের জন্য বরাদ্দ রেখেছেন জাহান্নামের অনন্ত কালের আযাব। স্বৈরাচারকে বস্তুতঃ বাঁচিয়ে এ মালাউন শ্রেণী। ফলে যে দেশেই স্বৈরাচার আছে, সে দেশেই মালাউন আছে। এসব মালাউনদের কারণেই গ্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে লক্ষ লক্ষ মানব হত্যার কাজটি হিটলারকে নিজ হাতে করতে হয়নি। শাপলা চত্ত্বরের গণহত্যায় বা ফাঁসি ঝুলিয়ে জামায়াত নেতাদের হত্যার কাজটিও শেখ হাসিনাকে নিজে হাতে করতে হয়নি। বাংলাদেশ আজ অধিকৃত বস্তুতঃ এরূপ মালাউন শ্রেণী ও তাদের প্রভু স্বৈরশাসকের হাতে। ফলে জুলুম নেমে এসেছে সেসব নিরীহ মানুষের উপর -যারা গণতান্ত্রিক অধিকার চায় এবং ইসলামের বিজয় ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠা চায়।

স্বৈরশাসনের আরেকটি ভয়ানক কুফল হলো, দেশ বিভক্ত হয় দ্বি-জাতিতে। সে বিভক্তির পিছনে কাজ করে দু’টি ভিন্ন লক্ষ্য, দুটি ভিন্ন মূল্যবোধ এবং দু’টি ভিন্ন দর্শন। সে বিপরীতমুখি লক্ষ্য, মুল্যবোধ ও দর্শনকে ঘিরে শুরু হয় রাজনীতির তীব্র মেরুকরণ। এক মেরুতে অবস্থান নেয় স্বৈরশাসক ও তার অনুসারিরা; এবং অন্য মেরুতে অবস্থান নেয় স্বৈরাচারবিরোধী সকল দল ও সেসব দলের নেতাকর্মীগণ। সে মেরুকরণের রাজনীতিতে স্বৈরশাসকের পক্ষ থেকে ধ্বনিত হয় বিরোধীদের বিরুদ্ধে নির্মূলের চিৎকার। যেমন ফিরাউন ও তার সঙ্গি মালাউনগণ ধ্বনি তুলেছিল হযরত মূসা (আঃ) ও তাঁর অনুসারিদের নির্মূলে এবং আবু জেহল-আবু লাহাব নির্মূলে নেমেছিল হযরত মহাম্মদ (সাঃ) ও তাঁর অনুসারিদের। নির্মূলের লক্ষ্যে সৃষ্টিহয় যুদ্ধাবস্থা।

স্বৈরশাসক মাত্রই বিজয় খুঁজে নিরস্ত্র বিরোধীদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র  যুদ্ধে। ভোটে নয়, বন্দুকের জোরে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা শুরু হয়। স্বৈর-শাসকের সে লক্ষ্য পূরণে দেশের সশস্ত্র বাহিনীর লোক-লশ্করেরা পরিণত হয় চাকর-বাকরে। ফলে দেশের সেনাবাহিনী দেশ বা জনগণকে কি প্রতিরক্ষা দিবে, তারা ব্যর্থ হয় এমন কি নিজেদের অফিসারদের জীবন বাঁচাতে। তাদের সে অক্ষমতার প্রমাণ, ২০০৯ সালে ঢাকার পিলখানায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৫৩ জন সেনা-অফিসারের নৃশংস মৃত্যু। পাকিস্তান ১৯৬৫ সালে ও ১৯৭১ সালে দুটি প্রকাণ্ড যুদ্ধ লড়েছে। কিন্তু কোন যুদ্ধেই দেশটির ৫৩ জন অফিসারের মৃত্যু হয়নি, কিন্তু বাংলাদেশে এতো বড় হত্যাকাণ্ড কোন রণাঙ্গণে হয়নি, বরং রাজধানীর সেনা ছাউনিতে। অন্যদের প্রাণ বাঁচানো নিয়ে স্বৈরশাসকদের গরজ থাকে না; তাদের গরজ স্রেফ নিজের গদি বাঁচানো। সে কাজে তারা ব্যবহার করে পুলিশের সাথে দেশের সেনাবাহিনীকেও। নিরস্ত্র নাগরিক হত্যায় তখন ব্যারাক থেকে হাজার হাজার সৈন্য, মেশিন গান, ভারী কামান -এমন কি টাংক নামিয়ে আনে রাজপথে। জন্ম দেয় গৃহযুদ্ধের। বাংলাদেশের দরিদ্র জনগণ সেনা বাহিনী, বিজিবি, RAB এবং মুজিব আমলের রক্ষি বাহিনী পালনে হাজার হাজার কোটি ব্যয় করেছে। বিগত ৪৬ বছরে দেশের সীমান্তে তারা কোন যুদ্ধ লড়েনি। বরং যুদ্ধ লড়েছে সে সব নিরস্ত্র নাগরিক হত্যায় -যারা তাদেরকে রাজস্ব দিয়ে পালে এবং অভিজাত এলাকায় প্লট দিয়ে রাজার হালে বাঁচার সুবিধা করে দেয়।

গণতন্ত্রে স্বৈরশাসক বাঁচে না। এজন্যই নিজেদের শাসন বাঁচাতে গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে স্বৈরাচারের যুদ্ধটি অবিরাম। অথচ গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অর্থ জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। শেখ মুজিবের স্বৈরশাসনকে সুরক্ষা দিতে জনগণের বিরুদ্ধে সে রক্তাত্ব যুদ্ধটি লড়েছিল রক্ষি বাহিনী। তিরিশ হাজারেরও বেশী নাগরিককে তারা হত্যা করেছিল। একই কারণে শেখ হাসিনার স্বৈর শাসন বাঁচাতে  সেনা বাহিনী, বিজিবি, RAB, এবং পুলিশের সেপাহীদের এতটা নৃশংস হতে দেখা যায়। ২০১৩ সালে ৫ই মে শাপলা চত্ত্বরে এসব বাহিনীর সেপাহীগণ সম্মিলিত ভাবে গোলাবারুদ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল নিরস্ত্র মুছল্লীদের উপর। সে গণহত্যায় হাজার হাজার মানুষ নিহত ও আহত হয়েছিল। নিহতদের সংখ্যাটি গোপন করতে সরকারের আয়োজনটি ছিল চোখে পড়ার মত। হত্যাযজ্ঞ চলা কালে সেখানে কোন নিরপেক্ষ সাংবাদিককে থাকতে দেয়নি। নিভিয়ে দেয়া হয়েছিল রাস্তার আলো। খামোশ করে দেয়া হয়েছিল টিভি ক্যামেরা। ঐ রাতেই বন্ধ করে দেয় ইসলাম টিভি চ্যানেল। পেশাদার খুনি যেমন রাতের আঁধারে খুন করে পালিয়ে যেতে চায়, তেমন স্ট্রাটেজী ছিল শাপলা চত্ত্বরের খুনিদেরও। গণহত্যার কাজে সরকারি খুনিদের সুবিধাগুলি এমনিতেই বিশাল। তখন অপরাধ ঘটে এবং অপরাধের আলামত গায়েবের চেষ্টা হয় পুলিশী প্রহরায়। শাপলা চত্ত্বর থেকে লাশ গায়েব ও রক্তের দাগশূণ্য না হওয়া পর্যন্ত সেখানে কাউকে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। গণহত্যার আলামত গায়েব করতে মিউনিসিপালিটির ময়লা বহনের গাড়িতে করে নিহতদের লাশ রাতারাতি সরানো হয়েছে। রক্ত দাগ মুছে ফেলা হয়েছে পানি ঢেলে। পরের দিন বুঝার উপায় ছিল না, সেখান কামান দাগা হয়েছে, হাজার হাজার রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়েছে এবং শত শত মানুষকে সেখান নিহত ও আহত করা হয়েছে।

মানব ইতিহাসের নৃশংস হত্যাকাণ্ডগুলি কোন কালেই হিংস্র পশুকুলের হাতে হয়নি। এমন কি ডাকাতদল বা সন্ত্রাসী দলের হাতেও নয়। এমন গণহত্যা একমাত্র জালেম স্বৈরশাসকের পক্ষেই সম্ভব। কয়েক হাজার নয়, কয়েক লক্ষ মানুষ হত্যা করলেও আদালতে তাকে আসামী রূপে দাঁড়াতে হয় না। সে হত্যাকাণ্ড নিয়ে যেমন তদন্ত হয় না, তেমনি বিচারও বসে না। ফলে কারো শাস্তিও হয় না। কারণ, স্বৈরশাসকগণ শুধু খুন, গুম, ধর্ষণের ন্যায় অপরাধকেই বেগবান করে না, অচল করে বিচার ব্যবস্থাকেও। বরং বিচারকদের উপর ফরমায়েশ দেয়া হয় বিরোধীদের ফাঁসিতে ঝুলানোর তাগিদ দিয়ে –যেরূপ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়েশাস্তিযোগ্য অপরাধ স্বাইপীর কথোপকথনে ধরা পড়েছে। স্বৈরাচারি শাসনের আযাবে তাই হাজার হাজার মানুষকে লাশ হয়ে হারিয়ে যেতে হয়। কিন্তু কেন তারা লাশ হলো, কীরূপে লাশ হলো এবং কারা লাশ করলো -সে বিষয়টি কখনোই জনগণের জানতে দেয়া হয় না। সেসব নৃশংস অপরাধের ঘটনাগুলিকে বলা হয় রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার গোপন বিষয়। অপরাধ গণ্য হয় সেগুলি জনগণকে জানানো। সে গোপন বিষয় যারা সাহস করে প্রকাশ করে, স্বৈর সরকার তাদেরকে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার শত্রুরূপে অভিযুক্ত করে। রিমান্ডে নিয়ে তাদের উপর নির্যাতন করে এবং দীর্ঘকালীন জেলশাস্তি দেয়।

 

অপরাধ হক কথা বলাও

স্বৈর-সরকারের ক্ষমতার কোন কোন সীমা-সরহাদ থাকে না। ইচ্ছামত তারা গ্রেফতার করে, গুম ও খুন করে, এবং সেনাবাহিনীকে দিয়ে গণহত্যা চালায়। শুধু তাই নয়, নিজ দলের ক্যাডাদের দিয়ে ধর্ষণ করায় এবং দলের নেতা-কর্মিগণ ব্যাংক, ট্রেজারি ও শেয়ার মার্কেট লুণ্ঠনে নামে। ভাবটা এমন, এসবই যেন শাসক দলের শাসনতান্ত্রিক অধিকার। তাদের কথা, ক্ষমতায় থাকতে হলে এগুলি করতেই হয়। তারা অনুসরণ করে ফিরাউন-নমরুদ-হিটলারের সুন্নত। তারা যেহেতু করে গেছে, অতএব এগুলি অপরাধ হবে কেন? তাদের বিচারই বা হবে কেন? বরং শাস্তিযোগ্য অপরাধ তো ঘটে যাওয়া নৃশংসা ঘটনাগুলির চিত্র বাইরে প্রকাশ করা –বিশেষ করে বিদেশীদের কানে তুলে দেয়া। তাদের কথা, এসব গোপন বিষয় অন্যরা জানলে দেশের সম্মানের ক্ষতি হয় এবং দেশের শান্তি বিনষ্ট হয়। অতএব যারাই সরকারের গোপন বিষয় প্রকাশ করে তাদের শাস্তি দেয়াই বাংলাদেশের স্বৈর-সরকারের নীতি। একই নীতি মায়ানমার সরকারেরও। এবং বিচারের রায়ে তো সেটিই কার্যকর হয় -যা সরকার চায়। সম্প্রতি মায়ানমারের সরকার “রয়টার” সংবাদ সংস্থার দুইজন বার্মিজ সাংবাদিককে এরূপ অপরাধে গ্রেফতার করেছে এবং বিচার করেছে। এবং বিচারে ৭ বছরের জেল দেয়া হয়েছে। তাদের অপরাধ, রোহিঙ্গাদের গ্রামে গিয়ে আর্মির গণহত্যা ও গণকবরের কিছু চিত্র তাঁরা বিশ্ববাসীকে জানিয়েছে। একই রূপ অপরাধে বাংলাদেশের সরকার চিত্রশিল্পী শহীদুল আলমকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করেছে। শহীদুল আলমের অপরাধ, নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তায় নামা কিশোর বিদ্রোহীদের উপর পুলিশ ও সরকার দলীয় ক্যাডারদের নৃশংসতার কিছু বিবরণ তিনি আল-জাজিরা’কে জানিয়েছেন।

স্বৈরশাসকের নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা যে এক নয় –সে আইনগত ও নৈতিক বিষয়টি স্বৈরশাসগণ নিজ স্বার্থে ইচ্ছা করেই বুঝতে রাজি নয়। বুঝতে রাজী নয়, তাদের অনুগত আদালতের বিচারকগণও। ফলে প্রকাশ পায়, জনকল্যাণ নিয়ে তাদের যেমন আগ্রহ নাই, তেমনি আগ্রহ নেই অপরাধের নির্মূল নিয়েও। ফলে গরজ নেই, যেসব ভয়ংকর অপরাধীদের হাতে দেশ জিম্মি -তাদের বিচার নিয়েও। কারণ, অপরাধীগণ জনগণের শত্রু হলেও সরকারের শত্রু নয়। প্রতিবছর বাংলাদেশে একমাত্র বাস ড্রাইভারদের হাতেই প্রায় ৮ হাজার মানুষ নিহত হচ্ছে। কিন্তু তাতে স্বৈর-সরকারের ক্ষতি কি? মানুষ মারা পড়লেও স্বৈর-সরকারের কর্তাব্যক্তিদের গায়ে যে আঁচড় লাগছে না –তাতেই সরকার খুশি। অতএব, অপরাধীদের গ্রেফতার করা বা তাদের বিচার করা –সরকারের কাছে গুরুত্ব পাবে কেন? তাদের এজেন্ডা তো সরকার-বিরোধীদের নির্মূল করা। হিফাজতে ইসলামের বিরুদ্ধে এজন্যই শাপলা চত্ত্বরে ভারী কামান ও গোলাবারুদ দিয়ে সেনাবাহিনী নামানো হয়েছিল।

হত্যা, গুম ও নির্যাতনে স্বৈরশাসকের এতোটা নির্ভয় ও নৃশংস হওয়ার কারণ, ক্ষমতায় থাকার জন্য তাকে নিহত, আহত ও নির্যাতিতদের পরিবারের কাছে গিয়ে ভোট চাইতে হয় না। স্বৈরশাসক জানে, নির্বাচনে জিতবার জন্য জনগণের ভোটের দরকার নেই। সে কাজে নিয়োগপ্রাপ্ত সরকারি চাকর-বাকরগণই যথেষ্ঠ। প্রয়োজনীয় ভোট তারা কয়েক মিনিটের মধ্যেই ভোটের বাক্সে ঢালতে পারে। অতএব পরওয়া কিসের? ফলে গদি বাঁচাতে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা, অসংখ্য নগর ধ্বংস এবং নিজ দেশে বিদেশী শত্রুদের ডেকে আনতেও তারা পিছুপা হয় না। নিজের গদি ছাড়া কোন কিছুর উপরই স্বৈরশাসকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। সিরিয়ার স্বৈরশাসক বাশার আল আসাদ তো তারই দৃষ্টান্ত। একই নীতি যে শেখ হাসিনারও। সেটি বুঝার জন্য শাপলা চত্ত্বরের গণহত্যার পর আর কোন প্রমাণের প্রয়োজন পড়ে কি? শাপলা চত্ত্বরের গণহত্যাটি কীরূপ নৃশংস এবং কতোটা বিশাল ছিল সেটি জানার জন্য google’য়ে শাপলা চত্ত্বর লিখে টোকা মারাই যথেষ্ট। তখন দেখা যায়, সে বীভৎসতার অসংখ্য ছবি।

 

যুদ্ধ ঈমান ও অধিকার বিনাশে

স্বৈর-শাসকগণ কখনোই তাদের নিজেদের শত্রুদের চিনতে ভুল করে না। কারণ, এখানে ভূল হলে তাদের শাসন বাঁচে না। তাদের সে মূল্যায়নে শত্রু রূপে গণ্য হয় যেমন সাধারণ জনগণ, তেমনি তাদের উদ্দীপ্ত ঈমান। স্বৈরশাসকগণ সব সময়ই জনগণকে দুর্বল দেখতে চায়। কারণ, একমাত্র তাতেই বাড়ে তাদের গদির নিরাপত্তা। নির্বাচন যেহেতু জনগণের শক্তি প্রয়োগের হাতিয়ার, ফলে স্বৈরাচারি শাসক মাত্রই চায় সে হাতিয়ারটি বিকল করতে বা কেড়ে নিতে। স্বৈরশাসকদের দুষমনি তাই বিশেষ কোন রাজনৈতিক দল বা কোন নেতা বা নেত্রীর বিরুদ্ধে নয়, বরং সেটি খোদ জনগণের বিরুদ্ধে। চোর-ডাকাতের অপরাধ, তারা হাত দেয় জনগণের অর্থসম্পদে। কিন্তু স্বৈরশাসকদের অপরাধ তার চেয়েও নৃশংস। তাদের হানাটি শুধু অর্থসম্পদের উপর নয়, জনগণের নাগরিক অধিকারের উপরও। ফলে স্বৈর-শাসনামলে জনগণের রাষ্ট্রীয় অর্থভাণ্ডারের উপর চুরি-ডাকাতিটা মামূলী বিষয়ে পরিণত হয়; ছিনতাই হয় জনগণের মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার। এবং প্রহসনে পরিণত হয় নির্বাচন।

গণতান্ত্রিক অধিকার বিনাশের পাশাপাশি নরনারীর ঈমান ধ্বংসেও স্বৈরাচারি সরকারের যুদ্ধটি লাগাতর। কারণ তারা জানে, ঈমানদার মাত্রই স্বৈরাচার নির্মূলের মিশন নিয়ে বাঁচে। স্রেফ নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাত নিয়ে নয়, তারা বাঁচে একটি রাজনৈতিক এজেন্ডা নিয়েও। সেটি হলো, ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং অন্যায়ের নির্মূল। আল-কোরআনের ভাষায় “আমিরু বিল মারুফ, নেহী আনিল মুনকার।” ফলে তারা জানে, ঈমানদার ব্যক্তি কখনোই স্বৈরশাসকের মিত্র হয় না। মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশিত সে মিশনটির কারণেই নবী-রাসুলগণ যুগে যুগে দুর্বৃত্ত শাসকদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। অপরদিকে স্বৈরশাসকগণ নেমেছে তাদের নির্মূলে। স্বৈরশাসকের এজেন্ডা তাই স্রেফ জনগণের ভোটের অধিকার কেড়ে নেয়া বা নির্বাচন প্রক্রিয়া বিকল করা নয়, বরং জনগণের ঈমান বিলুপ্ত করাও। কারণ, স্বৈরশাসকদের সমস্যা ঈমানদারের দেহ, ভাষা বা বর্ণ নিয়ে নয়, বরং তাদের ঈমান নিয়ে। ঈমান বিলুপ্ত হলেই তাদের মিত্র হতে আর কোন বাধা থাকে না।

এজন্যই জনগণকে ইসলাম থেকে দূরে রাখা এবং তাদের ঈমান, আমল ও নৈতিকতা বিনষ্ট করার কাজে স্বৈরচারি শাসকচক্রের রাজনৈতিক ও সোসাল ইঞ্জিনীয়ারিংটি বাংলাদেশেও চোখে পড়ার মত।  ফিরাউন, নমরুদ ও আবু জেহলগণ যুগে যুগে ইসলাম ও নবী-রাসূলদের বিরুদ্ধে সাধারণ জনগণকে ক্ষেপিয়েছে। মহান নবীজী (সাঃ)র গায়ে পাথর মারতে কিশোরদের উস্কে দিয়েছিল তায়েফের সর্দারগণ। অবিকল সেরূপ একটি পরিকল্পণার অংশ রূপেই বাংলাদেশের স্বৈর-সরকারও স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের রাস্তায় নামিয়েছে ইসলামপন্থি নেতাদের ফাঁসির দাবী তুলতে। ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে শহরে শহরে নির্মূল কমিটিরও জন্ম দিয়েছে। তাদের কাছে সন্ত্রাস এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলো জিহাদ, শরিয়ত, হুদুদ ও খেলাফতের পক্ষ নেয়াটি।

 

সবচেয়ে বড় নাশকতাটি স্বৈর-শাসকের

মানবজীবনে সবচেয়ে বড় ক্ষতিটি সম্পদের ক্ষতি নয়; বরং সেটি ঘটে ঈমানের বিরুদ্ধে নাশকতায়। অথচ জনগণের বিরুদ্ধে সে ভয়ানক নাশকতাটি ঘটায় দেশের স্বৈর সরকার। সেটি শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি, মিডিয়া, সাহিত্য তথা নানা রূপ সোসাল ইঞ্জিনীয়ারিংয়ের মাধ্যমে। প্রশ্ন হলো, জনগণের এত বড় ক্ষতি কি কোন হিংস্র জন্তু-জানোয়ার, বিষাক্ত কীটপতঙ্গ বা রোগজীবাণূর হাতে ঘটে? সমাজের চোর-ডাকাতগণও কি মানব জীবনে এতবড় নাশকতা ঘটায়? জনগণের আর্থিক ক্ষতি করলেও তাদেরকে তারা জাহান্নামে নেয় না। ভয়নাক সে নাশকতাটি ঘটে স্বৈরাচারি সরকারের হাতে। তাই মহান আল্লাহতায়ালার দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় নেক কর্মটি কোটি কোটি টাকার দান-খয়রাত নয়, শত শত স্কুল- কলেজ-মাদ্রসা বা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠাও নয়। জঙ্গলের হিংস্র পশু বা বিষাক্ত কীট হত্যাও নয়, বরং সেটি হলো স্বৈরাচারি শাসক নির্মূল। পৃথিবীপৃষ্টে এরাই হলো শয়তানের প্রত্যক্ষ প্রতিনিধি। অন্যায়ের নির্মূল এবং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তাদের নির্মূল ছাড়া কি ভিন্ন পথ আছে? এরূপ শাসকদের বিরুদ্ধে হক কথা বলাটিও উত্তম জিহাদ; আর তাদের নির্মূলের যুদ্ধে প্রাণ গেলে জুটে শহীদের মর্যাদা।

কোন মুসলিম দেশে স্বৈরশাসন দীর্ঘকাল বেঁচে থাকার বিপদটি অতি ভয়াবহ। তারা বাঁচলে জনগণের জীবনে বাড়ে ইসলাম থেকে দুরে সরাটি। আর ইসলাম থেকে দুরে সরার অর্থ তো জাহান্নামের পথে ধাবিত হওয়া। এবং বাংলাদেশে দুরে সরানোর সে কাজটি চলছে জনগণের রাজস্বের অর্থে এবং ধর্ম, শিক্ষা-সংস্কৃতি, মিডিয়া ও সাহিত্য-সংঙ্গিতের নামে। বস্তুতঃ এটি হলো জনগণকে ঈমানশূণ্য করার সরকারি পরিকল্পনা। ঈমানশূণ্য করার সে পরিকল্পনা কতটা সফল হচ্ছে সেটি বুঝা যায়, দেশে চুরি-ডাকাতি, গুম,খুন, ধর্ষণ, ব্যাভিচারি, সন্ত্রাস কতটা বাড়লো -তা দিয়ে। আরো বুঝা যায়, দুর্বৃত্তগণ দেশের রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, প্রশাসন ও আইন-আদালতে কতটা অধিকার জমালো এবং ফিরাউনের ন্যায় শাসকগণ কতটা আয়ু পেল -তা থেকে। এরূপ দুর্বৃত্তকরণ প্রক্রিয়া বলবান হলে ফিরাউনগণ শুধু শাসকের পদে থাকে না, তারা ভগবানেও পরিণত হয়। তখন রাষ্ট্রের নীতি এবং সে সাথে উৎসবের বিষয় রূপে গণ্য হয় আল্লাহভীরু মানুষদের হত্যা করাটি। অপরাধীদের হাতে অধিকৃত এরূপ রাষ্ট্র পরিণত হয় পৃথিবীর পৃষ্ঠে সবচেয়ে বিপদজনক প্রতিষ্ঠানে। সমাজের বুকে সবচেয়ে বড় নেক কর্মটি চোর-ডাকাত নির্মূল নয়। বাঘ-ভালুক তাড়ানোও নয়। বরং এরূপ বিপদজনক রাষ্ট্রের হাতে থেকে পরিত্রানের ব্যবস্থা করা। এটিই তো নবীজীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সূন্নত। নির্মূলের সে কাজে নবীজী (সাঃ) ও তারঁ সাহাবাদের লাগাতর জিহাদ করতে হয়েছে। সে সূন্নতের বরকতেই আরবভূমিসহ বিশ্বের বিশাল ভূভাগ থেকে অপরাধীদের শাসন বিলুপ্ত হয়েছিল। অথচ আজকের মুসলিমগণ নবীজী (সাঃ)র সে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূন্নতটি বাদ দিয়েই তাঁর অনুসারি হতে চায়।  ১৮.০৩.২০১৯

 

 




ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা কেন শ্রেষ্ঠ ইবাদত

সর্বশ্রেষ্ঠ নেক কর্ম

মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার নির্মাণে হযরত মহম্মদ (সাঃ)’র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদানটি শুধু ইসলাম প্রচার ছিল না, বরং সেটি ছিল বিশাল ভূ-ভাগ থেকে দুর্বৃত্ত শাসকদের নির্মূল এবং ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। এ কাজটি না হলে স্রেফ কোর’আন তেলাওয়াত, নামায-রোযা ও হজ্বযাকাত পালন এবং মসজিদ-মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা বাড়িয়ে ইসলামের বিজয় ও মুসলিমের গৌরব বৃদ্ধি করা যেত না। এবং সম্ভব হতো না মানব জাতির কল্যাণে শিক্ষণীয় অবদান রাখাও। কারণ, জনকল্যাণে রাষ্ট্রের যে বিশাল ক্ষমতা -সেটি মসজিদ-মাদ্রাসা বা অন্য কোন প্রতিষ্ঠানের থাকে না। এদিকে ইসলাম অন্য ধর্ম থেকে পুরাপুরি ভিন্ন। কারণ, অন্যায়ের নির্মূল ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার বিষয়টি ইসলামের কেন্দ্রীয় বিষয়। এটি মুসলিম জীবনের মিশন রূপে নির্ধারিত করে দেয়া হয়েছে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে। মুসলিমগণ সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি তার কারণ তাদের জীবনে থাকে অন্যায়ের নির্মূল ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার মিশন। আর অন্যায়ের নির্মূলে ময়দানে নামলে দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে যুদ্ধটি অনিবার্য ও অবিরাম হয়ে উঠে। ইসলামের শত্রুদের নির্মূলের সে শক্তিটি তো আসে রাষ্ট্রীয় শক্তি থেকে। ইসলামি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা এজন্যই মুসলিম জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। মানব সভ্যতার ইতিহাসে এটিই হলো সবচেয়ে বড় নেক কর্ম। দুর্বৃত্তগণ ইসলামের শক্তির এ পরিচিত উৎস্যটি জানে। এজন্যই ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে এতো বিরোধীতা। এ লক্ষ্যে শয়তানী শক্তিবর্গের কোয়ালিশনটি তাই দুনিয়াব্যাপী।

ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার এজেন্ডা না থাকলে কাফের শক্তির সাথে সংঘাতের কোন কারণই সৃষ্টি হতো না। তাবলিগ জামায়াতের কর্মীদের এজন্যই কোন শত্রু নেই; তাদের জীবনে কোন সংঘাতও নাই। অথচ সংঘাত এড়াতে পারেননি নবী-রাসূলগণ। মুসলিম জীবনে এরূপ সংঘাত না থাকার অর্থ বস্তুতঃ প্রকৃত ঈমান না থাকা। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহতায়ালা ঈমানদারদের সামনে অনুকরণীয় মডেল রূপে খাড়া করেছেন মুসলিম উম্মাহর আদি পিতা হযরত ইব্রাহীম (আঃ)কে। তাঁর কোন লোকবল ছিল না; তিনি ছিলেন একা। কিন্তু নমরুদের নেতৃত্বাধীন সম্মিলিত কাফের শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছেন এ হুংকার দিয়েঃ “শুরু হলো তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ”। মহান আল্লাহতায়ালার কাছে তাঁর সে সাহসী ঘোষণাটি এতোই ভাল লেগেছিল যে, সেটিকে তিনি রেকর্ড করেছেন পবিত্র কোরআনের সুরা মুমতাহেনার ৪ নম্বর আয়াতে। তাঁকে অনুকরণ করার নির্দেশ দিয়ে ঈমানদারদের উদ্দেশ্য বলা হয়েছে, “তোমাদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে ইব্রাহীম (আঃ)’য়ে জীবনে।” এ থেকে বুঝা যায় মুসলিম জীবনে শত্রুশক্তির সাথে সংঘাতের অনিবার্যতা ও তার নির্মূলে জিহাদটি কতো গুরুত্বপূর্ণ।

নবীজী (সাঃ)র জীবনের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটি হলোঃ জিহাদের মাধ্যমেই নির্মূল করেছেন স্বৈর শাসন। এবং প্রতিষ্ঠা করেছেন ইসলামী রাষ্ট্র। লড়াই না থাকলে বিজয়ের প্রশ্নই উঠে না –সেটি বীজ না বুনে ফসল ঘরে তোলার ন্যায় কল্প বিলাস। জিহাদ না থাকলে তাই অসম্ভব হয় ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। আর ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা না পেলে লক্ষ লক্ষ মসজিদ-মাদ্রাসা গড়েও মুসলিম উম্মাহর শক্তিতে বৃদ্ধি আনা যায় না। বাংলাদেশে ঢাকা’র ন্যায় একটি জেলাতে যত মাদ্রাসা ও মসজিদ আছে তা খলিফা রাশেদার আমলে সমগ্র মুসলিম রাষ্ট্র জুড়ে ছিল না। কিন্তু তাতে লাভ কি হয়েছে? দেশে কি ইসলামের প্রতিষ্ঠা বেড়েছে? গৌরব বেড়েছে কি বাঙালী মুসলিমের। বরং তারা তো ৫ বার বিশ্বে প্রথম হয়েছে দুর্নীতিতে। নবীজী (সাঃ)র ইসলাম –যার অপরিহার্য উপাদান হলো শরিয়ত, হুদুদ, খেলাফত, শুরা, মুসলিম ঐক্য, সে ইসলাম বাংলাদেশে নাই। যেটি আছে সেটি হলো অপূর্ণাঙ্গ ও বিকৃত ইসলাম। পূর্ণাঙ্গ ইসলাম না থাকাতে সমাজ জুড়ে বেড়ে উঠেছে অধর্ম ও পথভ্রষ্টতা। এজন্যই দেশ বিশ্বরেকর্ড গড়েছে দুর্বৃত্তিতে। রেকর্ড গড়ছে এমন কি পৌত্তলিক সংস্কৃতির পরিচর্যাতেও। বর্ষবরণ ও বসন্তবরণের নামে দেশে যেরূপ পৌত্তলিক সংস্কৃতির জোয়ার সৃষ্টি হয় -তা এমন কি কলকাতার হিন্দু সংস্কৃতিকেও হার মানায়। ঢাকা শহরে বাংলা ১৪২৫’য়ের নববর্ষ পালন নিয়ে তেমন একটি রিপোর্ট ছেপেছে কলকাতার আনন্দ বাজার পত্রিকা।

 

রাষ্ট্রই সবচেয়ে শক্তশালী ও সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান

ইসলামের মৌল বিশ্বাস ও অনুশাসনের নির্মূলে রাষ্ট্রীয় ভাবে যখন রাজনৈতিক ও সামাজিক ইঞ্জিনীয়ারীং চলে, তখন লক্ষ লক্ষ মসজিদ-মাদ্রাসাও যে কতটা ব্যর্থ হয় –বাংলাদেশ মূলতঃ তারই নমুনা। অথচ ইসলামের শত্রুশক্তির নির্মূল হলে এবং ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে সমগ্র দেশ পরিণত হয় মসজিদ-মাদ্রসায়। নবীজী (সাঃ)র হাদীসঃ কেউ মসজিদ নির্মাণ করলে মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর জন্য জান্নাতে ঘর তৈরী করে দেন। মসজিদ নির্মাণে অর্থ ব্যয় হয়, কিন্তু তাতে রক্তের বিনিয়োগ হয় না। কিন্তু বিপুল অর্থ ও হাজার হাজার মানুষের রক্তের বিশাল বিনিয়োগটি অপরিহার্য হয় ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণে। ইসলামী রাষ্ট্র দেয়, মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব ও শরিয়তের বিজয়। দেয়, শত্রুর হামলার মুখে মুসলিম উম্মাহর প্রতিরক্ষা। দেয়, বিশ্বশক্তি রূপে উত্থানের সামর্থ্য। ফলে ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণের পুরস্কার যে কতো বিশাল -সেটি বুঝে উঠা কি এতই কঠিন? যে সমাজে সে কাজটি বেশী বেশী হয়, সে সমাজ পায় মহান আল্লাহতায়ালার অফুরন্ত নেয়ামত। তাদের সাহায্যে হাজার হাজার ফেরেশতা নেমে আসে। জুটে শত্রুর বিরুদ্ধে বিজয়। ফলে এ পৃথিবীপৃষ্ঠে এর চেয়ে সেরা নেক কর্ম এবং শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিশীল কাজ আর কি হতে পারে? সেটি না হলে যা আসে তা হলো কঠিন আযাব। সে কাজটি সবচেয়ে বেশী হয়েছিল সাহাবায়ে কেরামদের যুগে। নবীজী (সাঃ)র শতকরা৭০ ভাগের বেশী সাহাবা সে কাজে শহীদ হয়েছেন। তাদের অর্থ ও রক্তের বিনিয়োগের ফলে জুটেছে গায়েবী মদদ ও বিশ্বব্যাপী ইজ্জত। এবং তাতে মুসলিম উম্মাহর উত্থান ঘটেছে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী শক্তি রূপে। কিন্তু আজ সে কোরবানি নাই, ফলে মুসলিম উম্মাহর সে শক্তি এবং ইজ্জতও নাই।

ফিরাউনের জুলুম থেকে মুক্তি দেয়ার পর হযরত মুসা (সাঃ) এবং তাঁর অনুসারি বনি ইসরাইলীদের উপর যে হুকুমটি এসেছিল সেটি উপাসনালয় বা মাদ্রাসা গড়ার নয়; বরং সেটি ছিল ফিলিস্তিন থেকে স্বৈরশাসন নির্মূলের। নির্দেশ ছিল, স্বৈরশাসনের নির্মূল করে সেখানে তাওরাতে  ঘোষিত শরিয়ত প্রতিষ্ঠা দেয়ার। কিন্তু ইহুদীগণ সে হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। তাদের আচরণ এতটাই উদ্ধত ছিল যে তারা হযরত মূসা (আঃ)কে বলেছিল, “হে মূসা! তুমি ও তোমার আল্লাহ গিয়ে যুদ্ধ করো, আমরা অপেক্ষায় আছি।” তাদের গাদ্দারির ফলে স্বৈরাচারের নির্মূল ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠার কাজ সেদিন সফল হয়নি। ফলে হযরত মূসা (আঃ) উপর অবতীর্ণ শরিয়তি বিধান তাওরাতেই রয়ে গেছে, বাস্তবায়ীত হয়নি। মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে এরূপ গাদ্দারি কি কখনো রহমত ডেকে আনে? বরং ঘিরে ধরেছিল কঠিন আযাব। ফিলিস্তিনে ঢুকা তাদের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়; শত শত বছর তারা নানা দেশের পথে পথে ঘুরেছে উদ্বাস্তুর বেশে। অথচ তাদের যে জনবল ছিল তা মহান নবীজী (সাঃ) পাননি। নবীজী (সাঃ) তাঁর মক্কী জীবনের ১৩ বছরে ২০০ জনের বেশী লোক তৈরী করতে পারেননি। অথচ মিশর থেকে হিজরত কালে হযরত মূসা (আঃ) সাথে ইহুদীদের সংখ্যা ছিল লক্ষাধিক। কিন্তু সে বিশাল জনবল তাদের শক্তি ও ইজ্জত না বাড়িয়ে অপমানই বাড়িয়েছে। একই পথ ধরেছে আজকের মুসলিমগণ। বিপুল সংখ্যায় বাড়ছে তাদের জনবল; কিন্তু বাড়েনি মহান আল্লাহতায়ালার পথে তাদের অঙ্গিকার ও কোরবানী। ইহুদীদের ন্যায় তারাও নিষ্ক্রিয় স্বৈরশাসকদের নির্মূলে। এক্ষেত্রে বাঙালী মুসলিমদের ব্যর্থতাটি কি কম? দীর্ঘকাল যাবত তাদের ঘাড়ে চেপে বসা স্বৈরশাসক এবং ইসলামের পরাজয় বস্তুতঃ সে ব্যর্থতাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। অথচ মহান আল্লাহতায়ালার হুকুম মেনে চলায় সামান্য অঙ্গিকার থাকলে এ জালেম স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে গ্রামে গঞ্জে জিহাদ শুরু হতো।


অপরাধীদের অধিকৃতি ও প্রহসনের নির্বাচন

কোনটি গণতন্ত্র আর কোনটি স্বৈরাচার -সেটি বুঝা উঠে কি এতই কঠিন? গণতন্ত্রের মূল কথা, কারা দেশের শাসক হবে সেটি নির্ধারিত হবে একমাত্র জনগণের ভোটে। প্রশ্ন হলো, নিরপেক্ষ নির্বাচন না হলে জনগণ তাদের সে রায়টি জানাবে কেমনে? সে জন্য যে কোন দায়িত্বশীল সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্বটি হলো, নিরপেক্ষ নির্বাচনের সুষ্ঠ পরিবেশ সৃষ্টি করা। অথচ স্বৈরাচারি সরকারের বড় অপরাধটি হয় এ ক্ষেত্রে। নির্বাচন পরিণত হয় ভোটডাকাতির মাধ্যমে। ফলে এমন ভোটডাকাতির নির্বাচন বার বার হলেও তাতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায় না। তাতে জনগণের রায়েরও প্রতিফলন হয় না। বস্তুতঃ নির্বাচন কতটা বৈধ হলো সে বিচারটি হয়, নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহন কীরূপ এবং কতটা নিরপেক্ষ -তা দিয়ে। সেটি না হলে নির্বাচন অর্থহীন। এমন গণতন্ত্রহীন নির্বাচন স্বৈরশাসকদের শক্তি বাড়ায়। এবং শক্তিহীন ও নিছক দর্শকে পরিণত করে জনগণকে। এজন্যই স্বৈরশাসকগণ জনগণে শত্রু।

গণতন্ত্র বাঁচাতে হলে গণজীবনে বাঁচাতে হয় জনগণের কথা বলার স্বাধীনতা, মিটিং-মিছিলের স্বাধীনতা, সংগঠিত হওয়ার স্বাধীনতা এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণের স্বাধীনতা। নইলে গণতন্ত্র বাঁচে না। কিন্তু বাংলাদেশে এর কোনটাই বাঁচেনি। ফলে বেঁচে নাই গণতন্ত্রও। মিটিং-মিছিলের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক দল গড়ে সংগঠিত হওয়ার স্বাধীনতা শুধু পাকিস্তান আমলেই ছিল না, ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ আমলেও ছিল। কিন্তু এখন নাই। রাস্তায় নিরস্ত্র মানুষের  মিছিল শুরু হলে শুধু সশস্ত্র পুলিশ নয়, সরকার দলের ক্যাডারগণও অস্ত্র হাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। হাসিনার স্বৈর সরকার রাজপথে স্কুলের নিরীহ কিশোর-কিশোরীদের মিছিলও সহ্য করেনি। তাদের উপরও সশস্ত্র পুলিশ ও গুণ্ডাদের লেলিয়ে দিয়েছে। তাদের হাতে ছাত্র-ছাত্রীগণ শুধু আহতই হয়নি, যৌন ভাবে লাঞ্ছিতও হয়েছে। আল জাজিরা’ টিভি চ্যানেলের সামনে সে সত্য বিবরণ তুলে ধরাতে গৃহে হামলা দিয়ে ডিবি’র পুলিশ ফটোশিল্পী শহীদুল আলমকে উঠিয়ে নিয়ে নির্যাতন করেছে। নির্যাতনের ফলে আদালতে তাঁকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাজির হতে হয়েছে।

স্বৈর-সরকারের হাতে নির্বাচন হাইজ্যাকের কাজটি শুধু নির্বাচন কালে হয় না। সেটি শুরু হয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের বহু পূর্ব থেকেই। বস্তুতঃ সেটি চলে সমগ্র স্বৈর-শাসনামল জুড়ে। নির্বাচন হাইজ্যাকের কাজে ব্যবহৃত হয় দেশের আইন ও আদালত। আইন ও আদালতকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ভাবে চলতে না দিয়ে ব্যবহার করা হয় সরকারের শত্রু নির্মূলের কাজে। সেটি বুঝা যায় সরকারি দলের নেতাদের মিথ্যা মামলায় জেল ও ফাঁসি দেয়ার আয়োজন দেখে। কেড়ে নেয়া হয় রাজপথে প্রতিবাদের স্বাধীনতা। এরূপ অগণতান্ত্রিক পরিবেশে নির্বাচন হলে সে নির্বাচন কি কোন ভদ্র ও সুবোধ মানুষের স্বীকৃতি পায়? শেখ হাসিনার সরকার যে একটি অবৈধ, অসভ্য এবং অগণতান্ত্রিক সরকার –তা নিয়ে এজন্যই ভদ্র সমাজে কোন বিতর্ক নেই। ২০১৪ সালের নির্বাচনে সংসদের ৩০০ সিটের মাঝে ১৫৩ সিটে কোন ভোটাভুটি হয়নি। দেশব্যাপী শতকরা ৫ ভাগ ভোটার ভোট দেয়নি। কোন গণতান্ত্রিক দেশে কোন কালেও কি এমন নির্বাচন হয়েছে? এমন ভোটারহীন নির্বাচনকে নির্বাচন বললে ভোট ডাকাতির নির্বাচনকে কি বলা যাবে? প্রতিটি সভ্য সমাজেই সভ্য ও অসভ্য এবং ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে একটি সুস্পষ্ট পার্থক্য থাকে, সে পার্থক্য বিলুপ্ত করাটিই অসভ্য সমাজের রীতি। বাংলাদেশে সে পার্থক্য বিলুপ্ত হয়েছে শেখ হাসিনার ন্যায় স্বৈর-শাসকদের হাতে। ফলে সরকারের নীতিতে সত্য-মিথ্যা এবং ন্যায়-অন্যায় একাকার হয়েছে। ফলে ভোট ডাকাতির নির্বাচনও ঘোষিত হয় সুষ্ঠ নির্বাচন রূপে। যেসব ভয়নাক চোর-ডাকাতদের স্থান হওয়া উচিত ছিল কারাগারে, তারাই আবির্ভুত হয়েছে দেশের হর্তাকর্তা রূপে।

ডাকাত ও ভোট-ডাকাতঃ পার্থক্যটি কোথায়?

ডাকাত ও ভোট-ডাকাত –উভয়ই অপরাধী। তবে উভয় প্রকার ডাকাতের মাঝে পার্থক্যটি সৃষ্টি হয় বিবেকের বিরুদ্ধে নাশকতা ভেদে। চুরি-ডাকাতিকে অপরাধ গণ্য করার মত বিবেক চোর-ডাকাতদের মাঝে কিছুটা হলেও বেঁচে থাকে। শরমবোধ থাকে চোর-ডাকাত রূপে সমাজে পরিচিতি হওয়াতে। ডাকাতির অর্থকে এজন্যই তারা লুকিয়ে রাখে। এজন্যই দিনে নয়, রাতের আঁধারে তারা চুরি-ডাকাতিতে নামে। কিন্তু সে সামান্য বিবেকবোধ এবং চোর-ডাকাত রূপে পরিচিতি হওয়া নিয়ে সামান্য শরমবোধের মৃত্যু ঘটে ভোট-ডাকাতদের মাঝে। ফলে দর্পের সাথে তারা ভোট-ডাকাতি করে দিনদুপুরে। এমন বিবেকহীনতা ও শরমহীনতার কারণে দেশবাসীর সামনে এবং সে সাথে বিশ্ববাসীর সামনে নিজেকে প্রধানমন্ত্রী রূপে জাহির করতে শেখ হাসিনার কোন শরম হয়নি। শরম পায়নি ক্ষমতায় থাকা কালে ভোট ডাকাত এরশাদও। এরশাদ তাই খেতাব কুড়িয়েছিল বিশ্ববেহায়া রূপে। এদের হাতে পৃথিবীজুড়া অপমান বাড়ছে বাংলাদেশীদের। যে সব বিদেশীগণ বাংলাদেশে রাজনীতির খবর রাখে, তারা কি জানে না কীরূপে ক্ষমতায় এসেছে শেখ হাসিনা? তাঁর সাথে সাক্ষাত কালে বিদেশীদের স্মৃতিতেও নিশ্চিত জেগে উঠে তাঁর অপরাধের নৃশংসতা। সে স্মৃতিটি এক অপরাধি স্বৈরশাসকের। যার অপরাধ, ভোট ডাকাতির মাধ্যমে ক্ষমতা ছিনতাইয়ের।


বাংলাদেশে স্বৈরশাসনের ইতিহাসে হুসেন মহম্মদ এরশাদ এক অতি অসভ্য চরিত্র। এখন সে অসভ্য ব্যক্তিটি শেখ হাসিনার শুধু রাজনৈতিক মিত্রই নয়, বরং উভয়েই একত্রে অবস্থান গণতন্ত্রের নির্মূলে। চোর-ডাকাতদের নাশকতায় মানুষের আর্থিক ক্ষয়-ক্ষতি হলেও তাতে কারো ঈমান বিনষ্ট হয়না। কারণ, অর্থে হাত দিলেও তারা মানুষের ঈমান বা বিবেক হত্যায় হাত দেয় না। অথচ সে কাজটি করছে ভোট- ডাকাত স্বৈরশাসকগণ। ফলে তাদের শাসনে দেশে ব্যাপক ভাবে বাড়ে মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। বাড়ে গুম, খুন, ধর্ষণ, চুরি-ডাকাতি ও সন্ত্রাস। দেহের মধ্যে জীবাণু রেখে সুস্থ্য দেহ আশা করা যায় না, তেমনি বিবেকধ্বংসী স্বৈরাচারিদের ক্ষমতায় রেখে দেশগড়ার কাজও হয়না। নবীজী (সাঃ)র গুরুত্বপূর্ণ সূন্নত তাই স্রেফ নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত ও মসজিদের প্রতিষ্ঠা ছিল না, ছিল রাষ্ট্রের অঙ্গণ থেকে দুর্বৃত্ত নির্মূলও।


অপরাধীদের মনে সব সময়ই থাকে নিজ অপরাধ গোপন করার নেশা। শেখ হাসিনা তাই ২০১৪ সালের নির্বাচন জনগণ কর্তৃক বর্জনের জন্য দায়ী করেন বিরোধী দলকে। অথচ ইচ্ছা করেই এ সত্য বুঝতে তারা রাজী নয়, তাবলিগ, রিলিফ বিতরণ বা সৃষ্টিহীন হৈচৈ’য়ের জন্য কেউ রাজনৈতিক দল গড়ে না। রাজনৈতিক দল গড়ার মূল উদ্দেশ্যটি হলো, নির্বাচনে অংশ নিয়ে ক্ষমতায় যাওয়া। নির্বাচনে অংশ নেয়াকে প্রতিটি রাজনৈতিক দল এজন্যই অপরিহার্য ভাবে। ব্যবসা করতে হলে দোকান খুলতে হয়, তেমনি রাজনীতি করতে হলে নির্বাচনে অংশ নিতে হয়। শাসন ক্ষমতায় যাওয়ার এটিই একমাত্র বৈধ পথ। কিন্তু সরকারি দলের উদ্যোগে নিরপেক্ষ নির্বাচনকে যখন অসম্ভব করা হয়, তখন লাখ লাখ টাকা খরচ করে নির্বাচনে নামা ও রাতদিন প্রচার চালনাটি অর্থহীন। এমন সাঁজানো নির্বাচনে অংশ নিলে বৈধতা পায় স্বৈরাচারি শাসকের সিলেকশন প্রক্রিয়া। তাতে গাদ্দারি হয় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সাথে। ২০১৪ সালের নির্বাচন ছিল তেমনি একটি প্রহসন মূলক নির্বাচন। দেশের নিরক্ষর নাগরিকগণও সেটি বুঝতো। এজন্যই স্বৈরাচার বিরোধী দলগুলির কোনটিই ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ নেয়নি। এরূপ নির্বাচনে অংশ নিলে এসব দলের নেতা-নেত্রীগণ ইতিহাসে তারা গণতন্ত্রের শত্রুরূপে ধিকৃত হতো। এজন্য শত শত বছর পরও নতুন প্রজন্ম থেকে ধিক্কার কুড়াতো। কিন্তু স্বৈরশাসকদের সে লজ্জাশরমের ভাবনা থাকে না। কে কি বলবে -তা নিয়ে তারা ভাবে না। তাদের ভাবনা, কি ভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করা যায় -তা নিয়ে। তাই সে প্রহসনের নির্বাচনে শেখ হাসিনার সাথে অংশ নিতে দেখা গেছে গণতন্ত্রের আরেক ঘৃণীত দুষমন এরশাদকে।

দায়ভারটি জিহাদের

অতীতের গৌরবময় ইতিহাস জনগণকে দেয় নতুন ইতিহাস গড়ায় আত্মবিশ্বাস। মুসলিমদের সে ইতিহাস তো অতি সমৃদ্ধ। যে কৃষক ফসল ফলাতে জানে, তার ফসল বানের পানিতে বার বার ভেসে গেলেও সে আবার চাষাবাদে নামে। নিষ্ক্রিয় হওয়া, মনের দুঃখে হতোদ্যম হওয়া বা হতাশায় দেশ ছেড়ে যাওয়াটি তাঁর রীতিবিরুদ্ধ। গৃহে বার বার চুরি-ডাকাতি হবে এবং দিনের পর দিন গৃহ চোর-ডাকাতদের হাতে অধিকৃত থাকবে –এটি কি কোন সভ্য মানুষ মেনে নেয়? সেটি মেনে নেয়াটি শুধু অক্ষমতা নয়, বরং অসভ্যতাও। সভ্য মানুষ তাই চোর-ডাকাত তাড়াতে হাতের কাছে যা পায় তাই নিয়ে লড়াইয়ে নামে। ইসলামে সেটিই তো জিহাদ। এরূপ জিহাদের কারণেই রাষ্ট্র থেকে নির্মূল হয় শয়তানী শক্তির দখলদারি। শত্রুর নির্মূলে ও মুসলিম উম্মহর প্রতিরক্ষায় জিহাদই হলো বস্তুতঃ মূল হাতিয়ার। ফলে শত্রু শক্তির লাগাতর হামলাটি নামায-রোযা বা হজ্ব-যাকাতের বিরুদ্ধে নয়; বরং সেটির লক্ষ্য মুসলিম জীবন থেকে জিহাদের বিলুপ্তি।

প্রতিটি মুসলিম সমাজে জিহাদের বিরুদ্ধে শয়তানের কৌশলটিও চোখে পড়ার মত। শয়তান সমাজে নামে মোল্লা-মৌলভী, আলেম-উলামা, পীর-দরবেশ, ইমাম, হুজুরদের ছদ্দবেশে। এরা বলে পবিত্র কোরআনে ইসলামি রাষ্ট্র বলে কিছু নেই। শরিয়তের প্রতিষ্ঠা বলেও কিছু নাই্। যেন নবীজী (সাঃ) ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ও সে রাষ্ট্রের প্রধান হয়ে কোরআনের বিরুদ্ধে চলে গেছেন! (নাউযু  বিল্লাহ।) যেন ইসলামে খোলাফায়ে রাশেদা বলে কিছু ছিল না।  তাদের কাছে ইসলাম হলো স্রেফ তাওহীদে বিশ্বাস এবং নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত ও তাসবিহ-তাহলিল পালন। তারা মানুষকে নহিসত দেয় জিহাদে নামার আগে নিজেকে ফেরেশতা বানাতে। অথচ তারা জানে ফেরেশতা হওয়াটি অসম্ভব ব্যাপার। সে কাজ ফেরেশতাদের, মানুষের নয়। এক্ষেত্রে তাদের নিজেদের ব্যর্থতাটিও কি এ ক্ষেত্রে কম? এরূপ লক্ষ লক্ষ আলেম, ইমাম, হুজুর, পীর, সুফি ও দরবেশ প্রতি বছর দুনিয়া থেকে বিদায় নয় ফেরেশতা না হয়েই। তাদের নামায-রোযার ভাণ্ডারে অনেক ইবাদত জমলেও ঈমানের ভাণ্ডারটি থাকে শুণ্য। ফলে একটি দিনের জন্য তারা কোন জিহাদের ময়দানে হাজির হয় না। জিহাদ থেকে অধিকাংশ মুসলিমের দূরে থাকার কারণে মুসলিম দেশে শরিয়তের প্রতিষ্ঠাও ঘটেনি। অথচ দেশ যেখানে ইসলামের শত্রু শক্তির হাতে অধিকৃত এবং শরিয়ত যেখানে নির্বাসিত, জিহাদের ময়দান তো সে দেশে হাজির হয় প্রতিটি ব্যক্তির এবং প্রতিটি ঘরের দরজার সামনে। এবং জিহাদ প্রসঙ্গে নবীজী (সাঃ)র প্রসিদ্ধ সহীহ হাদীস, “যে ব্যক্তি জীবনে কোন দিন জিহাদ করলো না এবং জিহাদের নিয়েতও করলো না সে ব্যক্তি মুনাফিক।”  কারণ জিহাদ তো ঈমানের ফসল। বীজ থেকে যেমন চারা গজায় তেমনি ঈমান থেকে জিহাদ জন্ম নেয়। ঈমান থাকলে মু’মিনের জীবনে জিহাদ অনিবার্য ভাবেই এসে যায়। তাই নবীজী (সাঃ)’র অনুসারি এমন কোন সুস্থ্য সাহাবী ছিলেন না যিনি জিহাদের ময়দানে প্রাণ দানে হাজির হননি। অথচ যারা মুনাফিক, তাদের জীবনে নামায-রোযা থাকলেও জিহাদ থাকে না।

ঈমান কাকে বলে এবং কীভাবে তার প্রকাশ ঘটে পবিত্র কোরআন থেকে তার একটি উদাহরণ দেয়া যাক।  ফিরাউনের প্রাসাদে মূসা (আঃ)এর সাথে প্রতিযোগিতায় হেরে যাদুকরদের যে দলটি ঈমান এনে শহীদ হয়েছিলেন তাদের কেউই ফেরেশতা ছিলেন না। সারা জীবন তারা কাটিয়েছিলেন যাদুর ন্যায় কবিরা গুনাহর রাজ্যে। তাদের নামায-রোযার ভাণ্ডারটি ছিল শূণ্য। হযরত মূসা (আঃ)’র সাথে প্রতিযোগিতা দেখতে সেখানে হাজির ছিল আরো বহু হাজার মানুষ। একই মোজেজা তারাও দেখেছিল; কিন্তু তাদের কেউই ঈমান আনেনি। মহান আল্লাহতায়ালার বিচারে একজন ব্যক্তির এ সামর্থ্যটুকুর মূল্য তো বিশাল। এ দুনিয়ায় পদে পদে তো সে সামর্থ্যেরই পরীক্ষা হয়। যাদুকরদের কালেমায়ে শাহাদত মহান আল্লাহতায়ালার কাছে যে শুধু কবুল হয়েছিল তা নয়, বরং মহান রাব্বুল আ’লামিন তাতে এতোই খুশি হয়েছিলেন যে তাদের সে কাহিনী পবিত্র কোরআনে বার বার বর্ণনা করেছেন। হযরত মূসা (আঃ) মোজেজা দেখার সাথে সাথে তাদের ঈমানের ভাণ্ডারটি কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে উঠে এবং তাঁরা সেজদায় পড়ে যান। ঈমান আনার অপরাধে ফিরাউন তাদেরকে নির্মম ভাবে হাত-পা কেটে হত্যার হুকুম শুনেয়েছিল। কিন্তু সে নৃশংসতায় তাঁরা আদৌ বিচলিত হননি, শহীদ হয়ে গেছেন। তাদের লক্ষ্য ছিল, স্রেফ মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করা। এমন একটি চেতনার কারণে মু’মিনের জীবনে ঈমান কখনো গোপন থাকে না। সেটি যেমন নামাযে নেয়, তেমনি জিহাদে নেয়। কীভাবে ঈমানের প্রকাশ ঘটে -সেটি বুঝাতেই যাদুকরদের সে কাহিনী মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে তাঁর নিজের কালামের পাশে সংকলিত করে ক্বিয়ামত অবধি জিন্দা করে রেখেছেন। প্রশ্ন হলো, সারা জীবন নামায-রোযা পালন করার পরও যদি ঈমানের এরূপ প্রকাশ না ঘটে -তবে মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে সে নামায-রোযার মূল্য কতটুকু?

 

 

নীরবতা ঈমানদারি নয়

মুসলিম ভূমি ইসলামের শত্রুশক্তির হাতে অধিকৃত দেখেও নীরব থাকাটি তাই ঈমানদারি নয়। দেশ থেকে শত্রুশক্তির অধিকৃতি নির্মূলে মুসলিম মাত্রই জিহাদে নামবে তাতেই তো ঈমানের প্রকাশ। যারা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও হিন্দু আধিপত্যবাদ -এ দুই শক্তির বিরুদ্ধে রক্তাত্ব লড়াই করে ১৯৪৭-য়ে বিজয় এনেছিল, তারা কি এ নতুন অধিকৃতির মুখে আজ নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকতে পারে? এখানেই ভারতের ন্যায় আগ্রাসী হিন্দু সাম্প্রদায়ীক শক্তির ভয়। তাদের ভয়, পূর্ব সীমান্তে নতুন মুসলিম শক্তির উদ্ভবের। ভয় থেকে বাঁচতেই মানুষ সাথি খোঁঝে। ভারতীয়দের পক্ষ থেকে কলাবোরেটর রূপে শেখ মুজিব, শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে বেছে নেয়ার হেতু তো সেটিই। তাই শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যে লড়াই তাতে ভারতও জড়িয়ে পড়েত  বাধ্য।

শত্রুদের কাজ শুধু দেশ-ধ্বংস, মানব-হত্যা ও নারী-ধর্ষণ নয়, তারা ধ্বংস করতে চায় দেশবাসীর চেতনা ও গৌরবের ইতিহাসকে। কারণ চেতনা ও ইতিহাস বিলুপ্ত হলে বিলুপ্ত হয় আত্মবিশ্বাসও। তখন মানুষ ভূলে যায় নিজ জীবনের মিশন ও ভিশন। শত্রুগণ জানে, ১৯৪৭’য়ের বিজয়ের পিছনে বাংলার ভূমি বা জলবায়ুর কোন ভূমিকা ছিল না; বরং সেটি ছিল বাঙালী মুসলিমদের ইসলামী চেতনা ও ঈমানী দায়িত্ববোধ। তাই শত্রুগণ সে চেতনার বিরুদ্ধে নাশকতায় নেমেছে। তবে সে নাশকতার কাজে বাঙালী মুসলিমদের শত্রু শুধু বিদেশে নয়, ভিতরেও। ভিতরের শত্রু হলো ঘাড়ে চেপে বসা ঘাতক স্বৈরশাসক ও তার সাঙ্গপাঙ্গগণ। ইসলামি চেতনা বিনাশে ময়দানে নামিয়েছে ইসলামচ্যুৎ সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীবেশী বাঙালী কাপালিকদের। উঁই পোকার ন্যায় তারা ভিতর থেকে বিনাশ করছে বাঙালী মুসলিমের ঈমান, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আত্মবিশ্বাস। মুসলিম দেশে স্বৈরশাসকের নাশকতাটি তাই ব্যাপক ও সর্বগ্রাসী। ফলে তাদের নাশকতাপূর্ণ সে রাজনীতির নির্মূলের চেয়ে মুসলিম সমাজে গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা আর কি হতে পারে? বাঙালী মুসলিমদের স্বৈরাচার বিরোধী লড়াইটি তাই স্রেফ গণতন্ত্র বাঁচানোর লড়াই নয়, ঈমান বাঁচানোরও। এটি নিছক রাজনৈতিক লড়াই নয়, বরং পরিপূর্ণ এক জিহাদ। আর এ জিহাদ বাঙালী মুসলিমদের সামনে পেশ করেছে অর্থ, শ্রম, মেধা ও রক্ত বিনিয়োগের এক পবিত্র অঙ্গণ। এ অঙ্গণে কার কি বিনিয়োগ সেটিই নির্ধারন করবে অনন্ত অসীম পরকালে কোথায় সে স্থান পাবে এবিষয়টি। ফলে কোন সুস্থ্য ব্যক্তির জীবনে এরচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আর কি হতে পারে? ৮/০৯/২০১৮ Tweet:@drfmkamal; facebook.com/firozkamal