বাংলাদেশে গণহত্যা এবং যে দায়ভার ঈমানদারের

বধ্যভূমি বাংলাদেশ

হেফাজতে ইসলামের মুসল্লিদের রক্তের স্রোতে মতিঝিলের পিচঢালা কালো রাস্তা লালে লাল হয়েছে। ২০১৩ সালের ৫ই মে’র দিবাগত রাতে হেফাজতে ইসলামের লক্ষাধিক কর্মী যখন খোলা রাস্তায় বসে শান্তিপূর্ণ ভাবে ধর্না ছিল, কেউ বা জিকর করছিল, কেউ বা ঘুমিয়েছিল তখন রাত ২-৩০ মিনিটের দিকে হঠাৎ রাস্তায় বিদ্যুতের বাতি বন্ধ করে দেয়া হয়। সে ঘন আঁধারে বিজিবি, র‌্যাব ও পুলিশের হাজার হাজার সদস্য হায়েনার ন্যায় ঝাঁপিয়ে পড়ে হেফাজত কর্মীদের উপর। বৃষ্টির ন্যায় অবিরাম গুলি বর্ষণ ও গ্রেনেড নিক্ষেপে কেঁপে উঠে সমগ্র ঢাকা। যেন দেশের উপর শত্রু বাহিনীর সামরিক অভিযান চলছে। গুলির সাথে তাদেরকে লাঠি দিয়েও পেটানো হয়।“দৈনিক আমার দেশ” এর রিপোর্টঃ “রাত তখন প্রায় আড়াইটা।মতিঝিলের শাপলা চত্বরে আগত মুসল্লিদের অনেকেই ক্লান্ত শরীর নিয়ে তখন ঘুমিয়ে পড়েছেন।অসংখ্য মুসল্লি তখনও জিকিরে মশগুল। এ অবস্থায় মাইকে ভেসে আসে একটি ঘোষণা-আপনারা সরে যান।এখন আমরা শাপলা চত্বর খালি করার জন্য যা যা করা দরকার তাই করব। তাতে স্বভাবতই রাজি হয়নি আল্লাহর পথে নিবেদিতপ্রাণ মুসল্লিরা।এরপর আর কথা বাড়ায়নি সরকারের নিরাপত্তা বাহিনী।অন্তত ১০ হাজার পুলিশ,র‌্যাব,বিজিবি ও অন্যান্য সংস্থার সদস্যরা ত্রিমুখী হামলা শুরু করে।ব্রাশফায়ারের মুহুর্মুহু গুলি, গ্রেনেড,টিয়ারশেল আর সাউন্ড গ্রেনেড নিয়ে নিরস্ত্র মুসল্লিদের ওপর হামলা চালায় তারা।মুসল্লিদের দিকে গুলি আসতে থাকে বৃষ্টির মতো। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই শাপলা চত্বরে ঘটে ইতিহাসের বর্বরতম হত্যাযজ্ঞ।কেউ কেউ ঘুমের মধ্যেই চলে যান চিরঘুমের দেশে।অনেকে আবার কিছু বুঝে উঠার আগেই ঢলে পড়েন মৃত্যুর কোলে।-(আমার দেশ ৭/০৫/১৩)।

এমন নৃশংস বর্বরতা পাকিস্তানে আমলে ঘটেনি। ব্রিটিশ আমলেও ঘটেনি। কিন্তু ঘটলো বাংলাদেশ আমলে। মতিঝিল, দৈনিক বাংলার মোড়, ফকিরাপুর, ইত্তেফাক মোড়সহ আশেপাশের এলাকা হয়েছে রক্তে প্লাবিত। কতজন শহীদ হয়েছে সে সঠিক হিসাব এখনও পাওয়া যায়নি। যখন সে হত্যাকান্ড ঘটে সেখানে কোন সাংবাদিককে থাকতে দেয়া হয়নি। বলা হচ্ছে, সকাল হওয়ার আগেই রাতের আঁধারে সরকার অসংখ্য লাশ গোপন করেছে। বিভিন্ন সামাজিক গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে গতকাল এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশন জানায়,নিহতের সংখ্যা আড়াই হাজারের বেশি হতে পারে।হেফাজতের ইসলামের হিসাবে নিহতের সংখ্যা দুই হাজারের বেশি হবে।বিরোধী দল বিএনপি বলছে,শাপলা চত্বরে সহস্রাধিক লোককে হত্যা করেছে নিরাপত্তা বাহিনী।এ গণহত্যা ১৯৭১ এর ২৫ মার্চের কালোরাতের চেয়ে ভয়াবহ ও জঘন্য বলে মন্তব্য দলটির। বাংলাদেশের একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের একজন রিপোর্টার দাবি করেছেন, তিনি পাঁচটি ট্রাকে করে লাশ নিতে দেখেছেন। লাইভ রিপোর্টিংয়ের তার সেই তথ্য প্রচার করা হলেও পরে আর সেই খবর প্রচার করেনি চ্যানেলটি।অভিযান শুরু করে পুলিশ র‌্যাব ও বিজিবির যৌথবাহিনী।গুলি,টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেডের আওয়াজে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে মতিঝিল ও এর আশপাশের এলাকা।এ সময় হেফাজতে ইসলামের সদস্যরা আশপাশের বিভিন্ন অলিগলিতে আশ্রয় নেয়।একপর্যায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ওই সব অলিগলিতেও হানা দেন। যুদ্ধসাজে সজ্জিত যৌথ বাহিনী এরপর অভিযান চালায় গলিগুলোতেও। সেখান থেকেও পিটিয়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়া হয়।এর পরও চলতে থাকে পুলিশের তাণ্ডব। গুলি করতে করতে হেফাজতকর্মীদের ধাওয়া করতে থাকে তারা।এ সময় অনেককে পিটিয়ে আহত করা হয়। তাদের রক্তে বিভিন্ন স্থানে সৃষ্টি হয়েছে তাজা রক্তের ফোয়ারা।-(আমার দেশ ৭/০৫/১৩)।ব্রিটিশ সরকার নিষ্ঠুরতায় ইতিহাস গড়েছিল পাঞ্জাবের জালিয়ানাবাগে। সেখানে নিরস্ত্র জনসভার উপর সেনাবাহিনী গুলি চালিয়েছিল। তবে সেখানে লাশ গোপন করা হয়নি।রাতের আঁধারেও হয়নি। মতিঝিলে যা ঘটেছে তা জালিয়ানাবাগের চেয়েও নিষ্ঠুর।

 

আসল রূপে আওয়ামী লীগ

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেই নৃশংস বর্বরতার রেকর্ড নির্মিত হয়। আওয়ামী লীগের এটিই আসল রূপ। মুজিব রেকর্ড গড়েছিল গণতন্ত্র হত্যায় এবং সে সাথে তিরিশ-চল্লিশ হাজার বিরোধী দলীয় কর্মী হত্যায়। দলীয় ক্যাডারদের লুটতরাজের মধ্য দিয়ে দেশকে মুজিব তলাহীন ভিক্ষার ঝুলিতে পরিণত করে।ডেকে আনে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ।অসংখ্য নতুন রেকর্ড নির্মিত হলো হাসিনার আমলেও। সেটি যেমন পিলখানায়,তেমনি সাভারের রানা প্লাজা ধসে, তেমনি মতিঝিলে। মতিঝিলে রক্ত ধোয়ার জন্য সূর্য্য উঠার আগেই মিউনিসিপালিটির পানিবাহি ট্যাংকার আনা হয় এবং রাস্তায় প্রচুর পানি ঢালা হয়।লক্ষ্য,খুনের আলামত তাড়াতাড়ি মুছে ফেলা।কথা হলো, পানি ঢেলে এভাবে রাস্তার খুন মুছতে পারলেও কোটি কোটি মানুষের স্মৃতিতে বীভৎস বর্বরতার যেরস্মৃতি রয়ে গেল সেটি কি শত শত বছরেও বিলুপ্ত হবে? সরকার নাস্তিক ব্লগারদেরকে মাসের পর ব্যস্ত শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নেয়ার সুযোগ দিয়েছে,বিরিয়ানী খাইয়েছে এবং পুলিশ দিয়ে তাদেরকে প্রটেকশনও দিয়েছে। অথচ দেশের আলেম-উলামাদের সে সুযোগ একটি দিনের জন্যও দিল না। হাসিনা সরকারের কাছে ইসলামপন্থিরা যে কতটা অসহ্য,তাদের বিরুদ্ধে এ সরকার যে কতটা নিষ্ঠুর ও আগ্রাসী -এ হলো তার প্রমাণ।

 

কোরআনে আগুন ও আওয়ামী মিথ্যাচার

কোন ঈমানদার ব্যক্তি কি কোরআনে আগুন দেয়? পুড়িয়ে ছাই করে কি ইসলামি বইয়ের মার্কেট? এমন কান্ড কি কোন মুসলিম দেশে ভাবা যায়? এমন ঘটনা কি কোন দিন পাকিস্তান আমলে হয়েছিল না ব্রিটিশ আমলে? বাগদাদে এমন বর্বর কান্ডটি ঘটেছিল বর্বর হালালু খাঁর দস্যু বাহিনীর হাতে।তখন লক্ষ লক্ষ বই পুড়িয়ে ছাই করেছিল হালাকু বাহিনী।শেখ হাসিনার সরকার সে অসভ্যতাই নামিয়ে এনেছে বাংলাদেশে।গত ৫/৫/১৩ তারিখে তো সেটিই হলো।তাদের কাছে কোরআনের তাফসির মহফিল করা অপরাধ,সে অপরাধে ফাঁসীর হুকুম শুনানো হয়েছে দেশের বিখ্যাত তাফসিরকারক মাওলানা সাঈদীকে।আজও  কোথায় তাফসিরের মহফিল বসালো র‌্যাব ও পুলিশ ধেয়ে আসে। শেখ হাসিনা ও তার দল কোরআন-হাদীসের জ্ঞানচর্চায় প্রচণ্ড ভয় পায়।তবে তাদের সে ভয়ের কারণও রয়েছে।তারা জানে,একমাত্র কোরআন-হাদীসের জ্ঞানই মানব মন থেকে আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ধারণা বিলুপ্ত করে দেয়। অথচ তাদের রাজনীতিই মূল ভিত্তিই হলো আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ।সে বিদ্রোহী চেতনা নিয়েই তারা শরিয়তের প্রতিষ্ঠা রুখতে চায়। তখন আসে আসে সেক্যুলারিজমের নামে ইসলাম-বিরোধীতা।আসে অশ্লিলতা,আসে মুর্তিগড়া।আসে মঙ্গলপ্রদীপের সংস্কৃতি।অথচ কোরআনের তাফসির হলে এসবের চর্চা অসম্ভব হয়ে পড়ে। তখন বাড়ে জিহাদী চেতনা।এবং শুরু হয় লড়াই। এজন্যই সরকারের বহুমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের বহুনেতার অভিযোগ,মাদ্রাসা থেকে জিহাদী সৃষ্টি হয়।তাদের কেউ কেউ বলছেন,“ধর্ম আফিমের নেশা”। এজন্যই সরকার সুপরিকল্পিত ভাবে দেশের কোমলমতি যুবক-যুবতিদের কোরআন-হাদীসের শিক্ষা থেকে সরিয়ে নাচগানের দিকে নিতে চায়।শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের আকর্ষন বাড়াতে সরকার এ জন্যই যেমন সেখানে দিবারাত্র পুলিশী প্রহরা দিয়েছে এবং বিরিয়ানির খাওয়ানোর ব্যবস্থা করেছে।স্কুলের কচি শিশুদের পাঠিয়েছে মাথায় “ফাঁসি চাই”য়ের স্লোগান লেখা পটি বেঁধে।অপরদিকে সরকার কড়া নজর রাখছে,মসজিদে জুম্মার খোতবায় যাতে জিহাদ বিষয়ক বক্তব্য রাখা না হয়।তাই বাংলাদেশে ইসলামভীতি শুধু কাফেররদের নয়,বরং আওয়ামী লীগারদেরও। সে ভয় নিয়েই বায়তুল মোকাররমের ন্যায় দেশের বড় বড় মসজিদগুলোতে সরকার সমর্থক ইমাম বসানো হয়েছে। সে সাথে সরকার র‌্যাব ও পুলিশ নামিয়েছে শহর ও গ্রামেগঞ্জের ঘরে ঘরে জিহাদ বিষয়ক বই বাজেয়াপ্ত করার কাজে। কিন্তু তাতেও মনের সাধ মেটেনি। অবশেষে আগুন দিয়েছে বায়তুল মোকাররমের দক্ষিন গেটে অবস্থিত ইসলামী বইয়ের সবচেয়ে বড় বাজারটিতে।হাজার হাজার কোরআন-হাদীস ও ইসলামী বই সেখানে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এভাবে কমানো হলো দেশে ইসলামি বইয়ের সরবরাহ। ইসলামের শত্রু দুর্বৃত্তদের তাই এতে আনন্দই বাড়লো।

খুনি-সন্ত্রাসীরা সব সময়ই নিজেদের ঘৃণ্য অপরাধ জায়েজ করতে অবিরাম বাহানা তালাশ করে। শেখ মুজিব যখন গণতন্ত্র হত্যা করে বাকশাল কায়েম করেছিল এবং হত্যা করেছিল ৩০-৪০ হাজার বিরোধী দলীয় রাজনৈতীক কর্মী তখনও একটি বাহানা খাড়া করেছিল। তেমনি একাত্তরে যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়ার জন্যও বাহানা খাড়া করেছিল। তাদের লক্ষ্য একটাই,সেটি যে কোন ভাবে ক্ষমতায় যাওয়া এবং ক্ষমতায় টিকে থাকা। সে লক্ষ্য পুরণে সকল প্রকার যুদ্ধ-বিগ্রহ,খুণ,নিষ্ঠুরতা,মিথ্যা ও জালিয়াতিকে তারা জায়েজ মনে করে। এমনকি চিহ্নিত শত্রুর সাথে তারা জোট বাঁধতেও রাজী। সেজন্যই একাত্তরে একটি রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধকে ভারতের সাহায্য নিয়ে তারা অনিবার্য করে তুলেছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রথা বিলুপ্ত করার পিছনেও কারণ এটি। এবং সে অভিন্ন লক্ষ্য পুরণেই তারা রাতের আঁধারে ৫ই মে হেফাজতের নিরীহ কর্মীদের উপর নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে। এবং সে রাতের গণহত্যার পর দোষ ঢাকার জন্য বাহানা সৃষ্টি করে চলেছে। বলছে,বায়তুল মোকাররমে কোরআন হাদীসের দোকানে আগুন দিয়েছে হেফাজতে ইসলামের মুসল্লিরা। সরকারি দলের পত্রপত্রিকা ও টিভিতে লাগাতর প্রচারণা চালানো হচ্ছে,বায়তুল মোকাররমে বইয়ের দোকান এবং পল্টনের দোকানপাটে লুটপাট করেছে এবং আগুন লাগিয়েছে হেফাজতে ইসলামের হুজুরেরা। সেসব স্থান পরিদর্শন করতে গিয়ে মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের নেতাগণ টিভি ক্যামেরার সামনে একই অভিযোগ আনছে।

 

মিথ্যা রটনা যেখানে স্ট্রাটেজী

প্রশ্ন হলো,এ বিশাল মিথ্যাটি হয়তো আওয়ামী লীগের মিথ্যাচারি দলীয় দুর্বৃত্তদের সহজেই গেলানো যেতে পারে, হয়তো সমাজের কিছু বুদ্ধিহীন পাগলকেও বিশ্বাস করানো যেতে পারে, কিন্তু কোন বিবেকমান মানুষও কি সেটি বিশ্বাস করবে? বাংলাদেশের জনগণকে কি এতটাই বিবেকহীন যে এ ভিত্তিহীন অপপ্রচারকে তারা গ্রহণ করবে? এটি সত্য যে,এমন বিবেকহীন ব্যক্তি আওয়ামী লীগে অসংখ্য। তাদের বিপুল উপস্থিতি এমন কি হাসিনার সরকারের মন্ত্রী পর্যায়েও। সাভারে রানা প্লাজা ধসে যাওয়ার পর এরাই বলেছিল,“রানা প্লাজার পিলার ধরে মৌলবাদীরা ধাক্কা দেয়ার কারণে ভবনটি ধসার ঘটনাটি ঘটতে পারে।” সে কথাটি বলেছিল খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ নিরেট মিথ্যা কথাটি বলেছিল একটি স্ট্রাটেজীর অংশ রূপে। লক্ষ্য ছিল,তাদের সকল কুকর্মের দায়ভার বিরোধীদের ঘাড়ে চাপানো। ভবিষ্যতে সে লক্ষ্যপূরণে তারা যে আরো বহু মিথা বলবে তাতে কি সামান্যতম সন্দেহ আছে? সে অভিন্ন লক্ষ্য নিয়েই তারা একথাও বলছে,মতিঝিলের রাস্তার গাছগুলোও কেটেছে হেফাজতে ইসলামের কর্মীরা।যেন দা-কুড়াল ও করাত নিয়ে তারা রাস্তায় নেমেছিল।অথচ তাদের মগজে এ প্রশ্নের একবারও উদয় হলো না যে,হেফাজতে ইসলামের যে আলেমগণ সারাটা জীবন ব্যয় করেছে কোরআন-হাদীসের জ্ঞান শিক্ষা ও শেখানোর কাজে,তারা কি অবশেষে কোরআন-হাদীসে আগুণ দিবে? তারা কাটবে রাস্তার গাছ? এবং লুট করবে দোকান-পাট?

প্রত্যেকটি অপরাধেরই সুস্পষ্ট মটিভ বা উদ্দেশ্য থাকে।মটিভ ছাড়া কেউ কখনো সামান্যতম মেধা বা শ্রমের বিনিয়োগ করেনা। কাউকে যেমন ক্ষতি করেনা তেমনি কোথাও আগুনও দেয়না। প্রশ্ন হলো,কোরআন-হাদীসের দোকানে আগুন দেয়ার পিছনে হেফাজতে ইসলামের আলেমদের কি মটিভ থাকতে পারে? তা থেকে তাঁদের অর্জনটা কি? তাঁরা তো নেমেছে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার কাজে।তাদের কাছে এটি রাজনীতি নয়,বরং জিহাদ। পবিত্র জিহাদে তো তারা পবিত্র কাজগুলোই করবে। তাদের কেউ কেউ রাস্তায় নেমেছিলেন কাফনের কাপড় পড়ে। অনেকেই এসেছিলেন ঘর থেকে চিরবিদায় নিয়ে। ফলে কোরআন-হাদীসে আগুন দিলে কি মহান আল্লাহর কাছে তাদের গ্রহনযোগ্যতা বাড়তো? তারা তো রাস্তায় নেমেছে জনগণকে সাথে নিয়ে।এমন কুকর্মে কি জনগণের কাছেও তাদের গ্রহনযোগ্যতা বাড়তো? হেফাজতে ইসলামের লড়াই তো নাস্তিক এবং নাস্তিকদের পৃষ্ঠপোষক হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে। তাদের শত্রুতা কোন কালেই ইসলামি বইয়ের দোকানদারদের বিরুদ্ধে ছিল না। ফলে বইয়ের দোকানে তারা আগুন দিবে কেন? বরং তারা তো চাইবে বাংলাদেশের আনাচ কানাচে আরো বেশী বেশী কোরআন-হাদীসের দোকান ঘড়ে উঠুক এবং বেশী বেশী মানুষ জ্ঞানচর্চা করুক। এসব দোকানে আগুন দেয়ার কাজে মটিভ থাকবে তো তাদের,যারা বাংলাদেশ থেকে ইসলামের প্রভাব কমাতে চায়।চায়,ইসলামপন্থিদের গায়ে কুৎসিত কালিমা লেপন করতে। ইরানে বিপ্লবের শুরুতে বিপ্লব ঠেকাতে শাহের গুপ্তচর বাহিনী আবাদানের সিনেমা হলে আগুন দিয়ে বহু মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করেছিল। চরিত্রহননের লক্ষ্যে দোষ চাপিয়েছিল আয়াতুল্লাহ খোমেনীর অনুসারিদের উপর। দেশে দেশে শয়তানি শক্তির এটিই সনাতন কৌশল। আওয়ামী লীগের সে কৌশল ও মিথ্যাচার এখানেও অস্পষ্ট? মিথ্যার প্রতি যে প্রচন্ড আসক্তি নিয়ে আওয়ামী লীগ মন্ত্রী খ. ম. আলমগীর সাভারে ভবন ধসের দায়ভার চাপিয়েছিল ইসলামি মৌলবাদীদের উপর,এবা সে অভিন্ন মিথ্যাচার নিয়েই কোরআন হাদীসে আগুন ও রাস্তায় গাছ কাটার দোষ চাপিয়েছে হেফাজতে ইসলামের উপর। ভবিষ্যয়ে এরূপ আরো বহু অপবাদই যে ইসলামপন্থিদের উপর চাপানো হবে তাতে কি সামান্যতম সন্দেহ আছে? এমন দুর্বৃত্ত অতীতে নবী-রাসূলদের উপরও নানারূপ মিথ্যা অপবাদ লাগিয়েছে।

 

হেফাজতে ইসলামের বিবৃতি

হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম সম্পাদক মাইনুদ্দিন রুহী ও সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল হক ইসলামাবাদী স্বাক্ষরিত লিখিত বিবৃতিতে বলেন,সমাবেশ চলাকালে রোববার দুপুর থেকেই পল্টন,বায়তুল মোকাররম এলাকায় ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের সঙ্গে হেফাজতে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের অভিযোগ,গণহত্যার পরিবেশ সৃষ্টিতে পরিকল্পিতভাবেই এসব ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়।তারা বলেছেন,রোববার (৫/৫/১৩) দুপুরের পর থেকে গুলিস্তান,নয়াপল্টন,বায়তুল মোকররম উত্তর গেট, বিজয়নগরসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ছাত্রলীগ,যুবলীগ ও পুলিশের সম্মিলিত আক্রমণে এবং তাদেরই উসকানিতে যে জ্বালাও-পোড়াও ও হত্যাযজ্ঞ চলেছে তার দায়-দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে।হেফাজতে ইসলাম বারবার প্রমাণ করেছে,তারা শান্তিপূর্ণ, জ্বালাও-পোড়াও ও অগ্নিসংযোগে তারা বিশ্বাস করে না। কিন্তু বায়তুল মোকাররম এলাকার আশপাশে জ্বালাও-পোড়াওয়ের যে তাণ্ডব হয়েছে তা ছিল সরকার দলীয় ছাত্রলীগ,যুবলীগের সশস্ত্র ক্যাডারদের পূর্বকল্পিত হত্যাযজ্ঞ ও লুটপাট। তারা স্বর্ণের দোকানে লুটপাট করেছে,বইয়ের দোকানে আগুন দিয়েছে,পবিত্র কোরআন শরীফ জ্বালিয়ে দিয়েছে,গাড়ি ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে।পুলিশের নির্লজ্জ সহযোগিতায় রাজধানীর মধ্যাঞ্চলকে নরকে পরিণত করেছে। কিন্তু সরকারি সংবাদমাধ্যম ও মিডিয়ার মাধ্যমে হেফাজতকর্মীদের ঘাড়ে দোষ চাপানোর চেষ্টা করছে।

নেতারা বলেন,দফায় দফায় হামলা,গুলিবর্ষণ ও গণহত্যা চালানোর পরও মধ্যরাতে যখন হেফাজতে ইসলামের কর্মীরা শান্তিপূর্ণভাবে শাপলা চত্বরে অবস্থান করছিলেন,কেউ জিকির করছিলেন, কেউ নামাজ পড়ছিলেন,কেউ সামান্য সময়ের জন্য ঘুমন্ত ছিলেন,এই সময় সরকারের পুলিশ,বিজিবি ও র‌্যাব যে সাঁড়াশি আক্রমণ চালিয়েছে,হাজার হাজার শান্তিপূর্ণ মানুষকে শহীদ করেছে,২০ সহস্রাধিক মানুষকে পঙ্গু করেছে,তা ইতিহাসে কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তদুপরি এই হাজার হাজার শহীদের লাশকে পিকআপ,অ্যাম্বুলেন্স,ট্রাকে করে গুম করা হয়েছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা অভিযোগ করেছেন।এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানোর ভাষা আমাদের নেই। তবে মনে রাখতে হবে,জুলুম নির্যাতন করে,নিরীহ মানুষকে হত্যা করে কেউ অতীতে পার পায়নি,এখনও পাবে না।নেতারা বলেন,আমরা অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি,গতকাল ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কওমি মাদরাসা ও ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সরকারি পুলিশ বাহিনী হামলা চালিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে।সরকারদলীয় সশস্ত্র ক্যাডাররা রাস্তায় রাস্তায় নিরীহ জনগণের ওপর হামলা চালাচ্ছে,তাদের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে,পঙ্গু করে দিচ্ছে।কোথাও কোথাও দূরপাল্লার গাড়ি থেকে দাড়ি টুপিওয়ালাদের নামিয়ে শত শত মানুষের সামনে নির্যাতন চালাচ্ছে। ৬ই মে কালো রাতের বর্বরতা উল্লেখ করে তারা বলেন,সরকার নজিরবিহীনভাবে বিদ্যুত্সংযোগ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দিয়ে পুলিশ, বিজিবি র‌্যাব আচমকা সমাবেশস্থলে ব্রাশ ফায়ার শুরু করে। কয়েক ঘণ্টা ধরে চলা সেই ব্যাপক হত্যাযজ্ঞে কমপক্ষে দুই সহস্রাধিক নেতাকর্মী শাহাদাত বরণ করেছেন।অনেক লাশ গুম করা হয়েছে। ভোরের আলো ফোটার আগেই সিটি করপোরেশনের ময়লা বহনের গাড়িতে করে বিপুলসংখ্যক লাশ সরিয়ে ফেলা হয়েছে। বহু নেতাকর্মী এখনও নিখোঁজ রয়েছে বলে দাবি করেছে সংগঠনটি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আহত ও নিহতের চূড়ান্ত পরিসংখ্যান এখনও নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি বলেও জানানো হয় বিবৃতিতে।

 

সরকারি বাহিনীর সন্ত্রাস ও গণপ্রতিরোধ

ঢাকার নৃশংস গণহত্যার পরও সরকারি বাহিনীর সন্ত্রাস থেমে যায়নি। র‌্যাব,পুলিশ এবং বিজিবি হানা দিয়েছে মফস্বলের বিভিন্ন মাদ্রাসায়।প্রতিরোধ গড়ে তুলছে জনগণও।৬ই মে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের কাঁচপুর,সিদ্ধিরগঞ্জের সানারপাড় ও শিমরাইল,চট্টগ্রামের হাটহাজারী এবং বাগেরহাটে র‌্যাব,পুলিশ এবং বিজিবির সঙ্গে হেফাজতে ইসলামের কর্মীদের সংঘর্ষে পুলিশ ও বিজিবি সদস্যসহ অন্তত ২৮ জন নিহত হয়েছেন।এর মধ্যে না.গঞ্জে ১৯ জন হাটহাজারীতে ৭ ও বাগেরহাটে ২ জন নিহত হয়েছে। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন আড়াই শতাধিক। নারায়ণগঞ্জে নিহতদের মধ্যে দুজন পুলিশ ও তিনজন বিজিবি সদস্য রয়েছে। তবে নিহতের সংখ্যা আরও বেশি হবে বলে দাবি করছেন হেফাজতে ইসলাম ও স্থানীয়রা। আহত হয়েছেন সাংবাদিক, পুলিশ, বিজিবি ও পথচারীসহ দুই শতাধিক। এরমধ্যে অর্ধশতাধিক ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। সোমবার সকাল থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত দফায় দফায় সংঘর্ষে এ হতাহতের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষ চলাকালে প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।

 

মিডিয়া তালাবদ্ধ এবং শফিক রেহমানের বাসায় হামলা

খুনিরা কখনই খুনের কাজটি দিবালোকে করেনা। সবার চোখের সামনেও করে না। আওয়ামী লীগও ৫ই মে’র খুনের কাজটি দিবাভাগে করেনি। করেছে রাতে। এবং রাস্তার আলো নিভিয়ে।সে রাতে কি ঘটেছে সে খবর গোপন করতে সেখানে কোন মিডিয়া কর্মীকে থাকতে দেয়নি। প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে প্রাপ্ত খবরগুলো যাতে জনসম্মুখে পৌছতে না পারে সে জন্য সরকার বন্ধ করে দিয়েছে বেসরকারি টিভি চ্যানেল দিগন্ত টিভি ও ইসলাম টিভি। ফলে সরকারের গুণকীর্তনকারি টিভি স্টেশনগুলো ছাড়া বাংলাদেশে এখন আর কোন টিভি চ্যানেলই নেই। এ টিভি চ্যানেলগুলোর কাজ হয়েছে সরকারের নৃশংস বর্বরতাকে প্রশংসনীয় কর্ম রূপে প্রচার করা। আসল ঘটনা যাতে প্রচার না পায় সে জন্য আগেই বন্ধ করেছে “দৈনিক আমার দেশ”। কারাবন্দী করেছে আমার দেশের সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে। সম্প্রতি আওয়ামী গুন্ডারা হামলা করেছে সাহসী লেখক শফিক রেহমানের বাড়ীতে। শফিক রহমান থানায় খবর দিয়েও কোন সাহায্য পাননি। বাংলাদেশ এভাবে প্রবেশ করেছে এক যুদ্ধ অবস্থায়। সমগ্র দেশ পরিণত হয়েছে একটি জেল খানায়। বাংলাদেশ এখন ভারত ও তার সেবাদাসদের অধিকৃত ভূমি। রহিত হয়ে গেছে সকল দেশপ্রেমিকদের সকল মৌলিক মানবিক অধিকার। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাওয়ায় অতীতেও এমনটি হয়েছে। একাত্তরে তারা রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধ নিয়ে এসেছে। চুয়াত্তরে বাকশালী স্বৈরাচার এনেছে। এসেছে হত্যা­ ও গুমের রাজত্ব।মুজিব তার রক্ষিবাহিনী দিয়ে যেভাবে তিরিশ-চল্লিশ হাজার মানুষকে হত্যা করেছিলেন,হাসিনাও সে পথটি ধরেছে। হাসিনার ক্ষমতায় আসার পর তাই সংঘটিত হলো পিলখানা হত্যাকান্ড। আগুন লাগলো তাজনীন গার্মেন্টসে এবং সেখানে পুড়ে কয়লা হলো শতাধিক শ্রমিক। সম্প্রতি ধসে গেল রানা প্লাজা। এ ভবন ধসে ৬ শতাধিক লাশ উদ্ধার হলেও শ্রমিকগণ বলছেন,চাপা পড়ে চিরতরে হারিয়ে গেছে সহস্রাধিক মানুষ। আর এখন লাগাতর রক্ত ঝরছে শুধু মতিঝিলে নয়, সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে।এই হলো হাসিনার শাসনামল। হাসিনা ভাবছেন,এভাবে গায়ের জোরেই তিনি ক্ষমতায় থাকবে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ কি এত খুন এত অত্যাচার নীরবে মেনে নিবে? ইতিমধ্যেই আওয়াজ উঠেছে,“খুন হয়েছে আমার ভাই, সব খুনিদের ফাঁসি চাই”।

 

কবিরা গুনাহর রাজনীতি

আজ থেকে প্রায় শতবছর আগে মাওলানা আবুল কালাম আজাদ লিখেছিলেন,“বলকান যুদ্ধে কোন তুর্কি সৈনিকের পায়ে যদি কাঁটা বিদ্ধ হয় আর সে কাঁটার ব্যাথা যদি তুমি হৃদয়ে অনুভব না কর তবে খোদার কসম তুমি মুসলমান নও”।মুসলমান হওয়ার অর্থই হলো আরেক মুসলমানের ব্যাথার সাথে একাত্ম হওয়া এবং সে ব্যাথা হৃদয়ে অনুভব করা। কে কত বড় ঈমানদার সেটি তার দাড়ি-টুটি বা লম্বা জুব্বা দেখে বুঝা যায় না। সেটি বুঝা যায় তার মুসলিম ভাইয়ের ব্যাথায় ব্যাথীত হওয়া দেখে। মাওলানা আবুল কালাম আযাদ যখন এ কথাটি লিখেছিলেন তখন ইসলামের শত্রুরা খেলাফত ধ্বংসের লক্ষ্যে মুসলমানদের ভূগোলে হাত দিয়েছিল। ইউরোপের বলকান এলাকায় কাফেরদের পক্ষ থেকে পরিচালিত হচ্ছিল সে বিচ্ছিন্নতার যুদ্ধ। মুসলিম ভূমির ভূগোল বাঁচানোর লড়াই ইসলামে জিহাদ। সে জিহাদ লড়ছিল তুর্কি সৈনিকেরা। ভারতের মুসলমানগণ তখন উসমানিয়া খেলাফতের পক্ষ নিয়েছিল। কারণ, তাদের সাথে একাত্ম হওয়াটাই ছিল ঈমানদারি। যেখানে ঈমান আছে সেখানে সে সহমর্মিতা থাকবেই।

একমাত্র কাফেরগণই মুসলমানের ব্যাথা বেদনায় আনন্দ পেতে পারে। মুসলমানের ব্যাথা-বেদনা তাদের কাছে উৎসবের কারণ হয়। ঢাকার মতিঝিলে যে হত্যাকান্ড হয়ে গেল তাতে কি কোন মুসলমান ব্যাথীত না হয়ে পারে? অথচ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আজ হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের নিহত ও আহত হওয়ায় এবং ঢাকা থেকে তাদের সরাতে পারায় এখন আনন্দে ডুগডুগি বাজাচ্ছে। সেটি বোঝা যায় তাদের পত্র-পত্রিকা পড়লে। অনেক আওয়ামী লীগ কর্মী তাদের ব্লগে লিখেছে,“হেফাজতের কর্মীদের হত্যা করে সরকার ভালই করেছে। তারা পশু। হত্যাই তাদের পাওনা।” আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ঈমানহীনতা এবং সে সাথে বিবেকহীনতা যে কতটা প্রকট -এহলো তার নমুনা। আল্লাহতায়ালা ও তার রাসূলের ইজ্জতকে মহান করতে রাস্তায় নামা কি পশুত্ব? আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের চেতনা যে কতটা খারাপ এ হলো তার নমুনা। সিরাজ সিকদারকে হত্যা করার পর মুজিব যেমন “কোথায় আজ সিরাজ সিকদার?” বলে উল্লাস করেছিল তেমনি মতিঝিলের শত শত মুসল্লি হত্যার পর উল্লাস শুরু হয়েছে আওয়াম লীগের নেতাকর্মীদের মাঝে।

আওয়ামী লীগের রাজনীতি বড় নাশকতা এই নয় যে,তারা অগণিত মানুষ হত্যা করেছে,বা দেশকে দূর্নীতিতে ডুবিয়েছে বা বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান ভেঙ্গে ভারতের মুখ উজ্বল করেছে। বরং আওয়ামী রাজনীতির সবচেয়ে বড় নাশকতাটি সংঘটিত হয়েছে জনগণের বিবেক ও চেতনার রাজ্যে। তারা মানুষকে প্রচন্ড ঈমানহীন এবং দুর্বৃত্তও করেছে। তাদের কর্মীগণ তাই উল্লাস ভরে দেশের সম্মানিত আলেম-উলামাদের হত্যা করতে পারে। তাদের ফাঁসীর হুকুমও শুনাতে পারে। হত্যার পর লাশের পর দাঁড়িয়ে উল্লাসও করতে পারে। আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দাও ওহুদের যুদ্ধে মুসলমানদের সেনাপতি ও নবীজী(সাঃ)র চাচা হামজার কলিজা চিবিয়ে এরূপ উল্লাস করেছিল। মুসলমানদের হত্যাকরা যেমন কবিরা গুনাহ,তেমনি সে হত্যায় আনন্দিত হওয়াটাও কবিরা গুনাহ। অথচ আওয়ামী লীগ আজ দেশে সে কবিরাগুনাহর রাজনীতি শুরু করেছে। সেটি শুধু আজ থেকে নয়, একাত্তরের পূর্ব থেকেই। সে গুনাহর রাজনীতিতে তাদের বন্ধু হতে তাই ছুটে আসে ভারতের কাফেরগণই শুধু নয়, বরং বিশ্বের তাবত ইসলামবিরোধীগণও। বাংলাদেশেও ইসলামের সকল শত্রুপক্ষ তাদের নেতৃত্বে একতাবদ্ধ হয়েছে।

 

একমাত্র পথ

রোগ না সারালে দিন দিন তা জটিল আকার ধারণ করে। এক সময় তা চিকিৎসারও অযোগ্য হয়ে পড়ে। তাই বিবেকহীন দুর্বৃত্তদের যে দুঃশাসন বাংলাদেশের মাথার উপর চেপে বসেছে তা না নামালে ঘনিয়ে আসবে অতি ভয়ানক বিপর্যয়। ঘরে আগুন লাগলে যেমন দায়িত্ব বাড়ে সে ঘরের প্রতিটি বাসিন্দার,তেমনি দেশের বিপদে দায়িত্ব বাড়ে প্রতিটি নাগরিকের। দেশ কোন দলের নয়, দেশ সবার। তাই দেশ বাঁচাতেও সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। আর ঈমানদারদের কাছে এ কাজ তো স্রেফ রাজনীতি নয়, পবিত্র জিহাদ। এ জিহাদে মেধা, শ্রম, অর্থ ও রক্তের বিনিয়োগ মহান আল্লাহর দরবারে মহা প্রতিদান দেয়। প্রাণ গেলে তো জান্নাত অনিবার্য করে। শহীদগণ লাভ করবে মৃত্যুহীন প্রাণ। মহান আল্লাহতায়ালা তো সে প্রতিশ্রুতি পবিত্র কোরআনে একবার নয় বহু বার দিয়েছেন। বলেছেন,“যারা আল্লাহর রাস্তায় প্রাণ দেয় তাদেরকে তোমরা মৃত বলো না। তারা তো জীবিত, যদিও তা তোমরা অনুভব করতে পার না।” -সুরা বাকারা। সে সাথে তিনি জিহাদে নামার চুড়ান্ত তাগিদ দিয়েছেন।পবিত্র কোরআনে মহান রাব্বুল আ’লামীন সে নির্দেশটি হলো,“হে মু’মিনগণ! তোমাদের কি হলো যে যখন তোমাদের আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধে বের হওয়ার জন্য বলা হয় তোমরা ভারাক্রান্ত হয়ে ভূতলে ঝুঁকে পড়? তোমরা কি আখিরাতের জীবনে পরিবর্তে পার্থিব জীবনে পরিতুষ্ট হয়েছো? (অথচ) আখেরাতের তুলনায় পার্থিব জীবনের ভোগের উপকরণ তো অকিঞ্চিৎকর।” -(সুরা তাওবাহ,আয়াত ৩৮)।

আরো নির্দেশ দিয়েছেন,“তোমাদের প্রস্তুতি হালকা হোক বা ভারি হোক, তোমরা অভিযানে বের হয়ে পড় এবং লড়াই করো আল্লাহর পথে তোমাদের সম্পদ ও জীবন দিয়ে।ওটাই তোমাদের জন্য শ্রেয় যদি তোমরা জানতে।” -(সুরা তাওবাহ,আয়াত ৩৮)।কোন ঈমানদার ব্যক্তি কি মহান আল্লাহর এ কোরআনী নির্দেশ অমান্য করতে পারে? যার প্রাণে আল্লাহর আনুগত্য আছে, তার জীবনে জিহাদও তাই অনিবার্য হয়ে উঠে। একারণেই সাহাবায়ে কেরামের জীবনে জিহাদ এসেছে লাগাতর।সাহাবাদের সংখ্যা বাংলাদেশের একটি থানার জনসংখ্যার সমানও ছিলনা। কিন্তু সে মুষ্টিমেয় মানুষদের জিহাদের বদৌলতেই বিশাল আরবভূমি থেকে ইসলামের শত্রুদের দখলদারি বিলুপ্ত হয়েছিল। বাংলাদেশের বুক থেকে ইসলামের শত্রুপক্ষের দখলদারি বিলুপ্ত করারও কি এছাড়া ভিন্ন পথ আছে? তাছাড়া যখন ইসলামের শত্রুপক্ষের দ্বারা কোন মুসলিম ভূমি অধিকৃত হয় তখন সে ভূমি কাশ্মীর, ফিলিস্তিন বা সিরিয়ার ন্যায় জিহাদের শতভাগ বিশুদ্ধ ভূমিতে পরিণত হয়। তাই বাংলাদেশ আজ শুধু শত্রুর অধিকৃত বধ্যভূমিই নয়, বরং জিহাদের অতি পূণ্যভূমিও। ০৮/০৫/১৩

 




সভ্য সমাজ নির্মাণে কেন ব্যর্থ হচ্ছে বাঙালী মুসলিম?

ব্যর্থতা শিক্ষাব্যবস্থায়

দেশগড়ার কাজ থেকে দূরে থাকাটি স্রেফ দায়িত্বহীনতা নয়,এটি অপরাধ।দেশের নাগরিকগণ সে ধারণাটি পায় শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে। দেশগড়া নিছক রাজনীতি বা পেশাদারিত্ব নয় বরং পবিত্র ইবাদত -সেটি প্রতিটি নাগরিকের চেতনায় দৃঢ়মূল করতে হয়।এ লক্ষ্যে ইসলামের হুকুম ও শিক্ষনীয় বিষয়গুলোকে জনগণের কাছে পৌঁছানোর কাজটি জরুরী। সে কাজটি করে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা। আল্লাহতায়ালা একটি সভ্য ও সুন্দর সমাজ নির্মাণের গুরুদায়িত্ব দিয়েই মানুষকে এ দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন। সে নির্মাণকাজে রোডম্যাপটি হলো পবিত্র কোরআন। দেশগড়ার এ দায়িত্বটি খেলাফতের তথা আল্লাহর প্রতিনিধিত্বের।প্রতিটি মুসলমান তাই আল্লাহর খলিফা তথা প্রতিনিধি। দেশের প্রেসিডেন্ট,মন্ত্রী বা সচিব হওয়ার চেয়েও এ পদের মর্যাদা আল্লাহর দরবারে অধিক। প্রেসিডেন্ট,মন্ত্রী বা সচিব হওয়াতে মহান আল্লাহ থেকে পুরস্কার মেলবে না। কিন্তু খলিফার দায়িত্বপালনে সফল হলে প্রতিশ্রুতি রয়েছে নিয়ামতভরা বিশাল জান্নাতের।খেলাফতের সে দায়িত্বপালনে কে কতটা নিষ্ঠাবান,রোজ হাশরের বিচার দিনে এ হিসাব প্রত্যেককেই দিতে হবে।

প্রতিটি অফিসকর্মীকে তার কর্মশুরুর আগেই অফিসের করণীয় দায়ভারের বিষয়টি প্রথমেই জেনে নিতে হয়,নইলে তার দায়িত্ব পালন যথার্থ হয় না। তেমনি প্রতিটি ব্যক্তিকেও জেনে নিতে হয় এ পার্থিব জীবনে তার রোল বা ভূমিকাটি কি। মানজীবনের এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাঠ। তার জীবনের সকল কর্মকান্ড, দায়িত্ব-পালন ও ত্পরতা নির্ধারিত হয় এটুকু জানার পরই। তেমনি ইসলামের প্রথম পাঠটি হলো এ পৃথিবীতে ব্যক্তির ভূমিকা্টি যে আল্লাহর প্রতিনিধিত্বের সেটি জানিয়ে দেয়া। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো,সে মৌলপাঠটিই বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় দেয়া হয় না। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশ্বের বহুভাষা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের বহুবিষয় শেখালেও এ মৌলিক পাঠটি শেখায় না। ফলে দেশবাসীর কাছে দেশ ও সমাজ নির্মাণের ফরজ কাজটি ফরজরূপে গণ্য হয়নি। বরং রাজনীতি পরিণত হয়েছে গদিদখল,আরাম-আয়েশ ও নিজস্ব জৌলুস বৃদ্ধির হাতিয়ারে।

দেশগড়ার এ পবিত্র অঙ্গনে সবচেয়ে ধার্মিক ও সবচেয়ে নিষ্ঠাবান মানুষের আধিক্য অতি কাঙ্খিত ছিল। যেমনটি হয়েছিল খোলাফায়ে রাশেদার সময়। কারণ,অন্যরা না জানলেও যারা ধার্মিক তাদের জানা থাকার কথা,উচ্চচতর সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণের কাজ থেকে হাত গুটিয়ে নেয়ার অর্থ শুধু দায়িত্বহীনতাই নয়,আল্লাহতায়ালার কোরআনী হুকুমের বিরুদ্ধে সেটি বিদ্রোহ। বাংলাদেশে রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনার সর্বস্তরে যে দুর্নীতিপরায়ন ব্যক্তিদের দৌরাত্ব -সেজন্য দায়ী তথাকথিত এ ধর্মপরায়নগণও। সমাজের আবু লাহাব,আবু জেহেলের বিরুদ্ধে নবীআমলের মুসলমানগণ যে আমৃত্যু যুদ্ধ করেছিলেন সেরূপ যুদ্ধ বাংলাদেশের ধর্মপরায়ন মানুষদের দ্বারা কোন কালেই সংঘটিতই হয়নি। ফলে সমাজের দুর্বৃত্তরা অনেকটা বীনা যুদ্ধেই সমাজ ও রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গনগুলো দখল করে নিয়েছে। তাছাড়া ময়দান কখনও খালি থাকে না। সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ মানুষেরা ময়দান খালি করে দিলে দুর্বৃত্তরা তা অবশ্যই দখল  করে নেয়। রাষ্ট্রের সম্পদ এভাবেই দুর্নীতিপরায়ন রাজনীতিবিদ ও প্রশাসনিক কর্মচারীদের অধীনস্ত হয়েছে। ফলে জনগণ নিঃস্ব হলেও ঐশ্বর্য বেড়েছে তাদের।

 

যে দায়বব্ধতা সবার

দেশগড়ার ক্ষেত্রটি শুধু রাজনীতি বা রাষ্ট্রীয় প্রশাসন নয়। এ কাজটি হয় দেশের সর্বাঙ্গ জুড়ে। শুধু রাজনীতি দিয়ে একটি সভ্যতার সমাজ নির্মিত হয় না। সে লক্ষ্যটি পূরণে রাজনীতিতে যেমন স্ৎ ও যোগ্য মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াতে হয়,তেমনি যোগ্য মানুষের ভীড় বাড়াতে হয় দেশের শিক্ষা,সাহিত্য, বিজ্ঞান, সমাজসেবা ও ব্যবসা বাণিজ্যেও। মানুষকে শুধু সৎ হলে চলে না,সাহসী ও সংগ্রামীও হতে হয়। নবীজীর (সাঃ) সাহাবাগণ তাই শুধু অতি সৎই ছিলেন না,নির্ভীক ও অতিশয় লড়াকুও ছিলেন। এ যোগ্যতা বলেই দুর্বৃত্তদের রাজনীতি ও প্রশাসনের অঙ্গণ থেকে হটিয়ে নিজেরা কান্ডারী হাতে নিয়েছিলেন। নবীজীবনের সে সুন্নত আজকের ধর্মপরায়ন মানুষের জীবনেও আসতে হবে। নিছক বক্তৃতা বা উপদেশ খয়রাতে দেশ সমৃদ্ধতর হয় না। তাদেরকে দেশের এক্সিকিউটিভ ফোর্স বা পলিসি বাস্তবায়নকারী শক্তিতে পরিণত হতে  হবে। এটিই ইসলামের মৌল শিক্ষা। নবীজী (সাঃ) ও সাহাবাদের জীবনের মূল শিক্ষা তো এটিই। ফলে ন্যায় কর্ম ও ধর্মপরায়নতা শুধু মসজিদে নয় সমাজের সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল।

ইমারাত নির্মাণের পূর্বে ভাল ইট তৈরির ন্যায় জাতি গঠনের পূর্বে উত্তম ব্যক্তি-গঠন অপরিহার্য। আর যোগ্য ব্যক্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান শুধু জ্ঞান ও শারীরিক সুস্থ্যতা নয়,বরং সবচেয়ে অপরিহার্য হলো তার ব্যক্তিত্ব। ঐ ব্যক্তিত্বই একজন মানুষকে মহত্তর পরিচয় দেয়। এ বিশেষ গুণটির জন্যই সে প্রকৃত মানুষ। আর ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব সৃষ্টিতে মূল উপাদানটি হলো সত্যবাদিতা। হযরত আলী (রাঃ) এক্ষেত্রে একটি অতিশয় মূল্যবান কথা বলেছিলেন। বলেছেন,ব্যক্তির ব্যতিত্ব তার জিহ্বায়। তথা তার সত্যবাদিতায়। যার জিহ্বা বা কথা বক্র তার চরিত্রও বক্র। সুদর্শন ও সুস্থ্য শরীরের অধিকারী হয়েও ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রে সে পঙ্গু। এমন মিথ্যাবাদি মানুষ সমাজে ভাল মানুষ রূপে পরিচিতি পেতে পারে না। বাঁকা বা কাঁচা ইট দিয়ে যেমন প্রাসাদ নির্মাণের কাজ হয় না,তেমনি মিথ্যাচারী মানুষ দিয়ে একটি সভ্যতর ও উন্নততর সমাজ নির্মিত হয় না। বরং এরূপ অসৎ ও মিথ্যাচারী মানুষের আধিক্যে একটি জাতির অস্তিত্বই বিপন্ন হয়। অথচ কোন জাতির এমন ক্ষতি গরু মহিষের সংখ্যা বৃদ্ধিতে হয় না। তাতে বরং বিপুল অর্থলাভ হয়। কিন্তু মিথ্যাচারী মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধিতে দেশে অসভ্যতা, বর্বরতা ও ধ্বংস নেমে আসে। বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ বা অপরূপ নৈসর্গিক পরিবেশও সে জাতির কোন কল্যাণই করতে পারে না। সেটিরই প্রমাণ হলো আজকের বাংলাদেশ। দেশটির আজকের বিপন্নতা সম্পদের অপ্রতুলতায় নয়। ভুগোল,জলবায়ু বা জনসংখ্যাও নয়। বরং সেটি দুর্বৃত্ত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধিতে।

 

যে ব্যর্থতা বুদ্ধিজীবীদের

দেশবাসীকে সদাচারী ও সত্যবাদী বানানোর গুরু দায়িত্বটি দেশের বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের।একাজটি ক্ষেতখামার বা কোন কল-কারখানায় হয় না। রাজনীতি ও প্রশাসনিক দফতরেও হয় না। হয় দেশের জ্ঞানবান ব্যক্তিদের হাতে। তারাই দেশবাসীর শিক্ষক,তারাই সংস্কৃতির নির্মাতা। তারা সংস্কার আনে ব্যক্তির আচরণ, মূল্যবোধ ও রুচীবোধে। তাই একটি দেশ কতটা সভ্যতর পরিচয় নিয়ে মাথা তুলে দাঁড়াবে সে বিচারে সেদেশের জ্ঞানবানদের সততা ও সৎ সাহসের দিকে তাকাতে হয়। প্রতিকুল অবস্থাতেও সত্য কথা বলার জন্য যে মনোবল দরকার সেটির জোগান তো তারাই দেয়। তারাই সমাজের মিথ্যুক ও দুশ্চরিত্রদের বাঁচাটা নিরানন্দ ও বহুক্ষেত্রে অসম্ভব করে দেয়। সম্পদের অধিকারী হয়েও দুর্বৃত্তরা সমাজে নন্দিত না হয়ে প্রচন্ড নিন্দিত হয় বস্তুত এদের সৃষ্ট সামাজিক মূল্যবোধ ও বিচারবোধের কারণেই। নমরুদ,ফিরাউন, হালাকু বা হিটলারগণ ইতিহাসে যে আজও প্রচন্ড ঘৃণিত তা এসব সত্যনিষ্ঠ বুদ্ধিজীবীদের কারণেই। ইসলামে এমন কাজের গুরুত্ব অপরিসীম। নবীজী (সাঃ)র হাদীসঃ “যে ব্যক্তি লোকদের কোন একটি ভাল বিষয় শিক্ষা দেয় তার জন্য খোদ মহান আল্লাহতায়ালা, তাঁর ফেরেশতাকুল,সমগ্র আসমান জমিনের বাসিন্দা, এমনকি গর্তের পিঁপড়া ও সমুদ্রের মৎস্যকুলও তার জন্য দোয়া করতে থাকে।” –(তিরমিযি শরীফ)। ব্যক্তির জীবনে এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কি থাকতে পারে?

মু’মিন ব্যক্তি তাই অর্থলাভের জন্য জ্ঞান বিতরণ করে না বা ওয়াজে নামে না। বরং এ কাজে নেমে গালি খাওয়া ও পাথর খাওয়াই হলো নবীজী (সাঃ)র সূন্নত। সাহাবাগণ তাই পাহাড়-পর্বত, নদী-সমুদ্র অতিক্রম করে বহু দেশে সত্য প্রচার করেছেন। বাংলাদেশের মানুষ মুসলমান হয়েছে তো তাদের সে মেহনতের বরকতেই। কিন্তু বাংলাদেশে সে কাজটিই হয়নি। আলেমগণ অর্থ লাভ বা বেতন লাভের প্রতিশ্রুতি না পেলে কোরআন শিক্ষা দেন না। ওয়াজে মুখ খোলেন না। তাদের পক্ষ থেকে সেকাজটি না হওয়ার কারণেই দেশে ইসলামের বিজয় আসেনি। সুস্থ্য মূল্যবোধ ও বিচারবোধও প্রতিষ্ঠা পায়নি। বরং মহা বিজয় এসেছে দুর্বৃত্তদের। ফলে গণতন্ত্র হত্যা,বাকশালী স্বৈরশাসনের প্রতিষ্ঠা,দুর্ভিক্ষে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ও তিরিশ হাজারের বেশী বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীকে খুন করার পরও শেখ মুজিব নেতার মর্যাদা পায়। তার দলকেও জনগণ ভোট পায়।এবং দলটি দেশ শাসনেরও সুযোগ পায়।যেদেশে চোর-ডাকাত ও খুনিগণও নেতা এবং নির্বাচিত শাসকের মর্যাদা পায়, তখন কি বুঝতে বাঁকি থাকে সেদেশে নৈতীক পচনটি কত গভীর? এমন দেশে নির্বাচন শতবার হলেও কি কোন পরিবর্তন আসে? নৈতীক রোগ কি নির্বাচনে সারে? বরং প্রতি নির্বাচনে চোর-ডাকাতগণই যে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হবে সেটিই কি স্বাভাবিক নয়?

দেশে ফসলের ফলন না বাড়লে বীজ, ভূমি, জলবায়ু বা কৃষকের দোষ হয়। মানুষের চরিত্রে ও মূল্যবোধে প্রচন্ড অবক্ষয় দেখা দিলে দেশটির শিক্ষক, শিক্ষালয়, শিক্ষাব্যবস্থা ও বুদ্ধিজীবীরা কতটা ব্যর্থ সেটি ধরা পড়ে। শিক্ষা ও সাহিত্যের ময়দান থেকে মানুষ একটি সমৃদ্ধ চেতনা পাবে, উন্নত মূল্যবোধ নির্মিত হবে এবং তা থেকে সমাজ একটি সভ্যতর স্তরে পৌঁছবার সামর্থ পাবে সেটি কাঙ্খিত ছিল। কিন্তু তা হয়নি। বরং শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীরাই মূলত জন্ম দিয়েছেন বর্তমান অবক্ষয়ের। মাছের পচন যেমন মাথা থেকে শুরু হয়, তেমনি জাতির পচনের শুরুও বুদ্ধিজীবীদের থেকে। তাদের কারণেই বাংলাদেশের শিক্ষিত সমাজই সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত সমাজ। তাদের সাথে যাদেরই সাহচর্য বেড়েছে তারাই রোগাগ্রস্ত হয়েছে চৈতন্য, চরিত্রে ও মূল্যবোধে। আমাদের বুদ্ধিজীবীদের এ ব্যর্থতার বড় কারণ, তাদের অধিকাংশই কোন না কোন মিথ্যাচারী নেতার আশ্রিত ও গৃহপালিত রাজনৈতিক শ্রমিক। সমাজে মূল্যবোধের প্রতিষ্ঠার চেয়ে এসব নেতাদের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠাই তাদের মূল লক্ষ্য। নেতাদের মিথ্যাচার ও চারিত্রিক কদর্যতাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়ার পরিবর্তে সে মিথ্যাচারের প্রচারে তারা বরং স্বেচ্চছায় তাদের চাকর-বাকরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতাগণ যে কতটা মিথ্যাচারী এবং আমাদের শিক্ষক, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীরা সে মিথ্যা প্রচারে যে কতটা বিবেকবর্জিত তার সবচেয়ে চোখা ধাঁধানো নজির হলো শেখ মুজিবের একাত্তরে ৩০ লাখের মৃত্যুর তথ্য। আমাদের বুদ্ধিজীবীদের মিথ্যাচারিতা ও দুষ্কর্ম তুলে ধরার জন্য এই একটি মাত্র দৃষ্টান্তই যথেষ্ট। যে কোন ধর্ম যে কোন মূল্যবোধই মানুষকে সত্যবাদী হতে শেখায়। সত্যবাদী হতে বলে এমনকি শত্রুর বিরুদ্ধেও। খুনের আসামীর বিরুদ্ধেও তাই দুনিয়ার কোন আদালতই মিথ্যা বলার অধিকার দেয়না। বন্ধুর সামনে ফেরেশতা সাজা তো মামূলী ব্যাপার। সত্যবাদীতার প্রমাণ হয় তো শত্রুর বিরুদ্ধে মিথ্যা না বলায়। মিথ্যার প্রতি আসক্তিই ব্যক্তির চেতনার ও চরিত্রের সঠিক পরিমাপ দেয়। এ পরিমাপে শেখ মুজিবই শুধু নয়, তার অনুগত বুদ্ধিজীবীরাও সত্যবাদী প্রমাণিত হননি। শেখ মুজিব কোনরূপ জরিপ না করেই বলেছেন, একাত্তরে ৩০ লাখ মানুষ নিহত হয়েছে। সে সময় বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি। অর্থাৎ ৭৫ মিলিয়ন। ৭৫ মিলিয়নের মধ্যে ৩০ লাখ বা তিন মিলয়ন নিহত হলে প্রতি ২৫ জনে একজন নিহত হতে হয়। স্কুলের ছাত্ররা এ হিসাব বুঝে। যে গ্রামের প্রতি বাড়িতে গড়ে ৫ জনের বাস সে গ্রামে প্রতি ৫ বাড়িতে একজনকে নিহত হতে হয়। অতএব যে গ্রামে ১০০ ঘর আবাদী সেখানে কমপক্ষে ২০ জনকে প্রাণ দিতে হয়। সে গ্রামে যদি কেউই মারা না যান তবে পাশের সম বসতিপূর্ণ গ্রামে ১০০ ঘরে ৪০ জনকে নিহত হতে হবে। নইলে ৩০ লাখের হিসাব মিলবে না। বাংলাদেশে যাদের বাস তারা শেখ মুজিবের এ মিথ্যা তথ্য বুঝলেও বাঙালী বুদ্ধিজীবীদের অধিকাংশই সেটি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর, আদালতের উকিল বা পত্রিকার কলামিস্ট হয়েও এখনও সে কথা নির্দ্বিধায় বলেন। মিথ্যাচারী হওয়ার জন্য এটুকুই কি যথেষ্ট নয় যে, কোন কথা শুনা মাত্র তার সত্যাসত্য বিচার না করেই সে বলে বেড়াবে? বাঙালী বুদ্ধিজীবীদের মিথ্যাচারীতা প্রমাণের জন্য এটিই কি সবচেয়ে বড় দলিল নয়?

 

সবচেয়ে বড় দায়ভার

সব পাপের জন্ম মিথ্যা থেকে। নবীজী (সাঃ) ব্যাভিচার, চৌর্যকর্ম ও মিথ্যাচারে লিপ্ত এক ব্যক্তিকে চারিত্রিক পরিশুদ্ধির জন্য প্রথমে যে পাপ কর্মটি পরিত্যাগ করতে উপদেশ দিয়েছিলেন সেটি হলো এই মিথ্যাচার। নানা পাপের বেড়াজাল থেকে মুক্তি পেতে হলে বাংলাদেশেও সে কাজটি শুরু করতে হবে মিথ্যাচারী রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তি পরিত্যাগের মধ্য দিয়ে। মিথ্যা ও মিথ্যাচারীদের দূরে হঠাতে পারলে অন্য সব পাপাচার এমনিতেই দূর হবে। নইলে সমাজের দুর্বৃত্ত মিথ্যাচারিরা শুধু দেশের নেতা, মন্ত্রী বা বুদ্ধিজীবী নয়, জাতির পিতা হওয়ারও স্বপ্ন দেখবে। কারণ,কোন জাতি মিথ্যাচারিতায় ডুবলে সে জাতির ফেরাউনরা শুধু রাজা নয়, খোদা হওয়ারও স্বপ্ন দেখে। এটিই ইতিহাসের শিক্ষা। তাই সব যুগের ফেরাউনেরাই মিথ্যাকে প্রচন্ড গণমুখিতা দিয়েছে। আর সে কাজে চাকর-বাকর রূপে ব্যবহার করেছে রাষ্ট্রের বুদ্ধিজীবীদের। কারণ, মিথ্যাচারের প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় তাদের ন্যায় কার্যকর চাকর-বাকর আর নেই। এজন্যই মধ্যযুগের স্বৈরাচারী রাজাদের দরবারে বহু গৃহপালিত সভাকবি থাকতো। তেমনি বাংলাদেশেও বুদ্ধিজীবীর বেশে এমন গৃহপালিত চাকর-বাকরের সংখ্যা বহু হাজার। তারা মুজিবের ন্যায় বাকশালী স্বৈরাচারি দুর্বৃত্তকে ফিরাউনের ন্যায় খোদা রূপে প্রতিষ্ঠা দিতে না পারলেও অন্ততঃ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী রূপে প্রচার করেছে। তবে এ মিথ্যার প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের বুকে দেশী পুঁজির পাশাপাশি বিদেশী শত্রুদের পুঁজি নিয়োগও হয়েছে বিস্তর। বিপুল অর্থ এসেছে ভারত থেকে। বাংলাদেশকে সত্যকে প্রতিষ্ঠা দিতে হলে বুদ্ধিবৃত্তির নামে পারিচালিত এমন মিথ্যাচারিতাকে অবশ্যই নির্মূল করতে হবে।

কারণ, ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে মৃত্যু ঘটে শুধু দেহের জীবকোষের, কিন্তু মিথ্যাচরিতায় মৃত্যু ঘটে বিবেকের। ফলে মানুষ তখন অসভ্য অমানুষে পরিণত হয়। ফলে যক্ষা, কলেরা, টাইফয়েডের মহামারীতে বাংলাদেশের যতটা ক্ষতি হয়েছে বা হচ্ছে, তার চেযে অনেক বেশী ক্ষতি হচ্ছে মিথ্যাচারিতার ব্যাপ্তিতে। দুর্নীতিতে বিশ্বে প্রথম হওয়ার মূল কারণ এটিই।একই কারণে দেশবাসীর ঘাড়ের উপর চেপেছে এক অসভ্য সরকার। আর সবচেয়ে বেশী ক্ষতি অপেক্ষা করছে আখেরাতে। মিথ্যাচারিতার যে বীজ আমাদের রাজনৈতিক নেতা ও বুদ্ধিজীবীদের দ্বারা অতীতে প্রোথিত হয়েছিল তা এখন পরিণত হয়েছে প্রকান্ড মহিরুহে। মিথ্যার অনিবার্য ফসল যে সীমাহীন দুর্নীতি ও দুর্বৃত্ত-শাসন, তা নিয়ে বাংলাদেশ আজ বিশ্ববাসীর সামনে শিক্ষনীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে। নৈতিকতার ক্ষেত্রে জাতিকে এ মিথ্যাচার বরং তলাশূন্য করে ফেলেছে। এ রোগ বিপন্ন করছে আমাদের ইজ্জত নিয়ে বাঁচাকে। মুসলমান হওয়ার অর্থই হলো আমৃত্যু সত্যের পক্ষে সাক্ষী দেয়া এবং মিথ্যার রূপকে উন্মোচিত করা। এটিই মুসলিম হওয়ার প্রধান ধর্মীয় দায়বদ্ধতা। কিন্তু সে কাজটিই মুসলিম সমাজে যথার্থ ভাবে হয়নি। ইসলাম ও সত্যের বিরুদ্ধে এখানেই হয়েছে বাঙালী মুসলমানদের সবচেয়ে বড় অপরাধ। সে সাথে ঘটেছে ইসলামের সাথে সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা। ফলে দুর্বৃত্ত মিথ্যুকগণ চেপে বসেছে তাদের মাথার উপর। তাতে অসম্ভব হয়েছে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা ও ইসলামের বিজয়।

মিথ্যার সামনে এরূপ নীরবতা ও সদাচারিতা থেকে এরূপ বিচ্যুতি কি একটি জাতিকে কখনো সাফল্য দিতে পারে? শুধু দেশ গড়া নয়, মুসলমান হওয়ার জন্যও সত্য-চর্চার বিকল্প নেই। আর মিথ্যা তো দুরীভূত হয় একমাত্র সত্যকে প্রতিষ্ঠা দেয়ার মধ্য দিয়ে। যেমন অন্ধকার অপসারিত হয় একমাত্র আলোর আগমনের পরই। আর সে আলো জ্বালানোর মূল দায়িত্বটি নিবে সত্যাচারী বুদ্ধিজীবী বা আলেমগণ –সেটিই তো নিয়ম। বনি ইসরাইলের আলেমগণ সে দায়ভার পালন করেনি বলেই পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা তাদেরকে ভারবাহি গাধার সাথে তুলনা করেছেন। কারণ, গাধা শুধু আল্লাহর কিতাবের ভারই বহন করতে পারে, আল্লাহর দেয়া নির্দেশাবলীকে প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। অথচ আল্লাহর দ্বীনের প্রতিষ্ঠার কাজে প্রতিটি মু’মিন হলো আল্লাহর খলিফা ও তাঁর রাসুলের (সাঃ) প্রতিনিধি। তাই একাজ শুধু আলেম বা মাদ্রাসার শিক্ষকদের কাজ নয়, এ কাজ প্রতিটি মুসলমানের। মু’মিনের জীবনে দেশ গড়া এবং দেশের প্রতিরক্ষার লাগাতর প্রয়াস শুরু হয় তো এমন এক দায়বদ্ধতা থেকেই। একমাত্র তখনই দেশে ইসলামের বিজয় ও অসভ্য সরকারের নির্মূল অনিবার্য হয়।২০/০৫/২০১৪

 

 




বাংলাদেশে ইসলামের বিজয় কীরূপে

যে অভিন্ন স্বপ্ন প্রতিটি ঈমানদারের 

দেশের রাজনীতি, সমাজনীতি ও অর্থনীতির বহুবিষয় নিয়েই মুসলিমদের মাঝে মতভেদ থাকতে পারে। কিন্তু যা নিয়ে সামান্যতম বিরোধের অবকাশ নেই তা হল, ইসলামের বিজয়ের স্বপ্ন দেখা নিয়ে। কারণ, ইসলামকে পরাজিত দেখার মধ্যে আনন্দ থাকতে পারে একমাত্র কাফেরদের; মুসলিমের নয়। কে মুসলিম আর কে কাফের -সে বিচার ব্যক্তির নাম দেখে হয় না। মুখে কে কি বললো তা থেকেও নয়। বরং সে বিচার হয়, যেটি সে অন্তর থেকে চাইলো বা বাস্তবে করলো তা থেকে। আর মহান আল্লাহ তো মানুষের মনের ভাষা বুঝেন। এবং দেখেন প্রতিটি কর্ম। মুসলিম জীবনে প্রধানতম ভাবনা ও অঙ্গিকার হলো, আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করার ভাবনা। তার চেতনায় সবসময় কাজ করে কি করে সে তার সামর্থ্যকে সে কাজে বিণিয়োগ করবে। কারণ মুসলিম হওয়ার অর্থ, স্রেফ কালিমা পাঠ নয়। রাজনীতির খেলার মাঠে নীরব দর্শক হওয়াও নয়। বরং জ্বিহাদের ময়দানে সক্রিয় মোজাহিদে পরিনত হওয়া। একাজে আত্মনিয়োগ ছাড়া কোন মুসলিম কি মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করতে পারে? নামায-রোযা বা দান-খায়রাতে যেমন নিয়ত বাঁধতে হয়, তেমনি নিয়ত বা লক্ষ্য নিদ্ধারণ করতে হয় বাঁচা-মরা ও জীবন ধারনের ক্ষেত্রেও। ইবাদতের নিয়ত না থাকলে কোন ইবাদতই যেমন ইবাদত হয় না, তেমনি উচ্চতর নিয়ত না থাকলে বাঁচাটিও পশুদের বাঁচা থেকে ভিন্নতর হয়না। বোখারী শরিফের প্রথম হাদীসটি হল, “সকল কাজের মর্যাদা বা মূল্যমান নির্ধারিত হবে তার নিয়ত থেকে।” মানুষের বাঁচবার সে উচ্চতর নিয়ত শেখাতেই পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা আয়াত নাযিল করেছেন এবং বলেছেনঃ “বলুন (হে মহম্মদ)! আমার নামায, আমার কোরবানী এবং আমার জীবন-ধারণ ও মরণ –সব কিছুই সেই বিশ্ব-প্রতিপালক মহান আল্লাহর জন্য।” -সুরা আল-আনয়াম, আয়াত ১৬২।   

তবে শুধু মহান নবীজী (সাঃ)কে তাঁর বাঁচা-মরার নিয়ত শেখাতে উপরুক্ত আয়াতটি নাযিল হয়নি। নাযিল হয়েছিল সমগ্র মানব জাতির উদ্দেশ্যে। মানুষ কেন বাঁচবে, কেনই বা লড়াই করবে, কেনই বা প্রাণ দিবে –সেটি প্রতিটি মানুষের জীবনেই অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বরং জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো এটি। কোন ব্যক্তির পক্ষে তার সীমিত কান্ড-জ্ঞান নিয়ে এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর বের করা কঠিন। ফলে মানব জীবনে সবচেয়ে বড় ভূল হয় এ ক্ষেত্রটিতে। আর তাতে ব্যর্থ হয় সমগ্র জীবনের বাঁচাটাই। মানুষ তখন প্রান দেয় ইতিহাসের হিটলার ও চেঙ্গিজদের বিজয়ী করতে বা কোন সাম্রাজ্যবাদী, জাতীয়তাবাদী ও বর্ণবাদী যুদ্ধে। এভাবে তার বাঁচা বা মরাটি তখন পশুদের চেয়েও নিকৃষ্টতর হয়। কারণ পশু নিজে শিকার ধরলেও অন্যের হাতে গণহত্যা বা দেশ-দখলের হাতিয়ারে পরিণত হয় না। আল্লাহতায়ালা এমন মানুষদের উদ্দেশ্যেই বলেছেন, “উলায়িকা কা আল-আনয়াম, বাল হুম আদাল।” অর্থঃ এরাই হল তারা যারা গবাদী পশুর ন্যায়, বরং তার চেয়েও নিকৃষ্ট। উপনিবেশিক ব্রিটিশগণ তো তাদের সেনা বাহিনী পূর্ণ করেছে এসব মানুষ রূপী পশুদের দিয়েই। মানুষ তাদের বাহিনীতে ভাড়ায় খেটেছে। আজও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিশ্বজুড়ে আধিপত্য জমিয়েছে এসব পশুবৎ মানুষের সাহায্য নিয়ে। মহান আল্লাহতায়ালাকে তাই মানব জীবনের এ গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রটিতেও পথ দেখাতে হয়েছে। সুরা আনয়ামের উপরুক্ত আয়াতটিতে বস্তুতঃ তিনি মানুষের জন্য তাঁর পছন্দের নিয়তটি তথা জীবনধারণের লক্ষ্যটি সুস্পষ্ট ভবে নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আর মুসলমানের দায়িত্ব হল, আল্লাহর পক্ষ থেকে বেঁধে দেওয়া সে নিয়তটিকে নিজের নিয়েত রুপে গ্রহণ করা। অন্যথায় তার বাচাটি হবে জাহান্নামের পথে বাঁচা।

ঈমানদার এজন্যই নিছক বাঁচার জন্য বাঁচে না। সে বাঁচে আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত লক্ষ্যটি পূরণ করার লক্ষ্যে। নিছক আহারের সন্ধান, ঘরবাধা বা বংশ বিস্তারের লক্ষ্য তো পশুরও থাকে। তাই এরূপ লক্ষ্যে জীবন-ধারণ তাকে পশু-পাখি ও পোকা-মাকড় ভিন্নতর করে না, শ্রেষ্ঠতরও করে না। কোন রাষ্ট্রেই সকল নাগরিকের সম-মর্যাদা থাকে না। মর্যাদা নির্ধারিত হয় নাগরিকদের কাজের মর্যাদা থেকে। যে ব্যক্তিটি তার জীবনের সকল সামর্থ্য ব্যয় করে নিছক নিজের বেঁচে থাকা ও সুখ-সাচ্ছন্দের খাতিরে এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে যার কোন আগ্রহ বা সামর্থ্যই অবশিষ্ঠ থাকে না -তাকে কি সে ব্যক্তির সম-মর্যাদা দেওয়া যায় যে তার সমুদয় সামর্থ্য ব্যয় করে, এমনকি প্রাণও বিলিয়ে দেয় রাষ্ট্রের কল্যাণে? এ দুই ব্যক্তি কখনই কোন রাষ্ট্রে সম-মর্যাদা পায় না। ইসলামে শহিদের মর্যাদা এজন্যই অতুলনীয়। তারা জীবনদান করে আল্লাহর দ্বীনের বিজয়ে। তাদের বিজয়ে শান্তি নেমে আসে সমাজ ও রাষ্ট্র জুড়ে। আল্লাহপাক তাদেরকে মৃত্যুর পরও জীবিত রাখেন এবং পুরস্কৃত করেন জন্নাত দিয়ে। আল্লাহপাক তো চান, তার প্রতিটি বান্দাহ সে মহান লক্ষ্য নিয়ে বাঁচুক, এবং অর্জন করুক সে মহান মর্যাদা। সমাজ মূলতঃ দুটি বিপরীত-মুখী জীবন লক্ষ্য নিয়ে বাঁচার যুদ্ধ। একটি মহান আল্লাহর লক্ষ্যে, আরেকটি গায়রুল্লাহ লক্ষ্যে। প্রথমটি মহা-সাফল্যের। আর দ্বিতীয়টি চরম ব্যর্থতার -যা ব্যক্তিকে জাহান্নামে পৌঁছে দেয়। তাই কোরআনে বলা হয়েছে, “যারা ঈমানদার তাঁরা লড়াই করে আল্লাহর লক্ষ্যে আর যার কাফের তারা লড়াই করে শয়তানের লক্ষ্যে।”   

 

কীরূপে বিজয় ইসলামের?

প্রশ্ন হল, বাংলাদেশে ইসলামের বিজয় কীরূপে সম্ভব? এটি কি নির্বাচনের মাধ্যমে? নির্বাচনের মাধ্যমে যারা বাংলাদেশে ইসলামের বিজয়ের স্বপ্ন দেখে, বার বার শোচনীয় পরাজয়ের পর অন্ততঃ তাদের বোধোদয় হওয়া উচিত। নির্বাচন সমাজ বিপ্লবের হাতিয়ার নয। এমনকি আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার সফল মাধ্যমও নয়। অতীতে কোন দেশেই এ পথে কোন সমাজ বিপ্লব আসেনি। আসেনি মানুষের মন-মনন, রুচিবোধ, বাঁচবার সংস্কৃতিতে পরিবর্তন। বরং নির্বাচনে দেশ-শাসনের অধিকার পায় তারাই যারা সমাজের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক বিশ্বাসের সাথে সম্পৃক্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ। তাই সূদ, ঘুষ ও দূর্নীতি যে সমাজে প্রবল ভাবে বিজয়ী সে সমাজের নির্বাচনেও সূদখোর, ঘুষখোর ও দূর্নীতিবাজরাই বিজয়ী হয়। যেমন সবচেয়ে বড় ডাকাতটিই ডাকাত পাড়ায় সর্দার নির্বাচিত হয়। মক্কার দূর্বত্ত-কবলিত সমাজে আবু জেহল ও আবু লাহাবের ন্যায় দুর্বৃত্ত ব্যক্তি নেতা হবে সেটিই কি স্বাভাবিক ছিল না? তারা প্রত্যাখ্যান করেছিল নবীজী (সাঃ)র সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষকে।

মশা-মাছি কখনই ফুলের উপর বসে না, তারা তো আবর্জনা খুঁজে। তেমনি অবস্থা দূর্নীতিতে ডুবা জনগণের। যারা সমাজ পাল্টাতে চায় তাদের বুঝতে হবে, সমাজে নবীজী (সাঃ)র ন্যায় মহা-মানবকে নেতা রূপে গ্রহণ করার সামর্থ্য হাওয়ায় নির্মিত হয় না। এজন্য জনগণের চেতনায় ঈমানের প্রচণ্ড বল চাই। চাই, বিবেকমান হওয়ার সুশিক্ষা। অজ্ঞতায় ও কুশিক্ষায় সেটি হয় না। সে কারণেই মক্কার কাফেরদের সে সামর্থ্য ছিল না। নবীজী(সাঃ)কে প্রত্যাখ্যান করে তারা বস্তুতঃ নিজেদের নিরেট অযোগ্যতাই প্রমাণ করেছিল। এখানে ব্যর্থতা নবীজী(সাঃ)র ছিল না। ব্যর্থতা ছিল মক্কার মুশরিকদের। কথা হল, বাংলাদেশে এরূপ মাছি-চরিত্রের মানুষের সংখ্যা কি কম? চলতি শতাব্দীর শুরুতে দুর্বৃত্তিতে ৫ বার বিশ্ব-শিরোপা পাওয়ার মধ্য দিয়ে তারা কি প্রমাণ করেনি যে, এমন মাছি-চরিত্রের মানুষের সংখ্যা সমগ্র বিশ্বমাঝে বাংলাদেশেই সর্বাধিক? এটি তো যে কোন সুস্থ্য মানুষের বিবেকে কাঁপন ধরানোর মত বিষয়।

দেহের রোগ লুকিয়ে রেখে লাভ নাই। বরং চিকিৎসার স্বার্থে সে রোগের বিষয়টি যতটা পূর্ণভাবে ও সত্যভাবে বলা যায় ততই ভাল। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাই বলেছিলেন, “হে বিধাতা! সাত কোটি প্রাণীরে রেখেছো বাঙ্গালী করে, মানুষ করনি।” রবীন্দ্রনাথের এ উচ্চারণের মধ্যে ছিল রোগ-নিরাময়ের লক্ষ্যে বাঙ্গলীর মারাত্মক রোগটি নিয়ে অকপটে কিছু বলার আকুতি। রবীন্দ্রনাথ সেদিন বাঙ্গালীর যে রোগটি নিয়ে প্রচন্ড মনোবেদনায় ভুগছিলেন সেটি হলো, বাঙ্গালীর মানুষ রূপে বেড়ে উঠার ব্যর্থতা। আজ তার সাথে যোগ হয়েছে আরেকটি মারাত্মক রোগ, এবং সেটি হল দুর্বৃত্তি। কথা হল, এমন একটি দুর্বৃত্তকবলিত দেশে স্বয়ং কোন পয়গম্বর নেমে আসলেও তাঁর পক্ষে কি নির্বাচনী বিজয়-লাভ সম্ভব? এখানে তো হোসেন মহম্মদ এরশাদের মত আদালতে প্রমাণিত ও শাস্তিভূগী দুর্বৃত্তরাই বার বার বিপুল ভোটে জিতবে। জিতবে হাসিনা ন্যায় ভোট-ডাকাত। কোটি কোটি মানুষের কাছি শ্রেষ্ঠ বাঙালী রূপে চিত্রিত হবে বাকশালী স্বৈরাচারি শেখ মুজিব। মক্কায় বার বার নির্বাচন হলেও নবীজী (সাঃ) কি সেসব নির্বাচনে একবারও জিততেন? অথচ মক্কা বিজয়ের পর সমগ্র চিত্রটাই পাল্টে যায়। তখন হাজারো বার নির্বাচন হলেও তাঁকে কি কেউ একটি বারও পরাজিত করতে পারতো? কারণ, ইতিমধ্যে সমগ্র আরব জুড়ে অভাবনীয় বিপ্লব ঘটে গেছে। সে বিপ্লবে পাল্টে গিয়েছিল শুধু তাদের ধর্মীয়-বিশ্বাসই নয়, বরং জীবন ও জগত নিয়ে তাদের সকল ধ্যান-ধারনা। পাল্টে গিয়েছিল প্রকৃত যোগ্য মানুষের ধারণা। আমূল বিপ্লব এসেছিল তাদের আচার-আচরণ, রুচীবোধ, রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে। ইসলামের বিজয়ের পর আরবের এক কালের মাছি-চরিত্রের মানুষগুলো তখন আর আবর্জনার সন্ধান করেনি, নিজেরাই তখন বিশুদ্ধতা অর্জন করেছিল। মাছি-চরিত্রের বাদবাকি মানুষগুলো তখন আবর্জনার স্তুপে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল। সমাজ বিপ্লবের ক্ষেত্রে এটিই হলো নবীজী (সাঃ)র সফলতার নজির।

নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে ইসলামের বিজয় আনা বা শরিয়তের প্রতিষ্ঠা করা অনেকটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে কম্যুউনিস্টদের বিজয়ের মত। নির্বাচন আসে সেদেশের প্রতিষ্ঠিত শাসনতন্ত্র, আইন ও রাজনৈতিক রীতি-নীতির বৈধতা মেনে নিয়ে। এমন নির্বাচনে সরকার পরিবর্তিত হয়, কিন্তু তাতে পরিবর্তন আসে না দেশের আইন বা শাসনন্ত্রে। যেটি আসে সেটি পুরনো ঘরে রঙ-চং লাগানোর মত। শাসনতন্ত্র একটি দেশের নির্বাচিত সরকারের হাত পা যে কতটা কঠোর ভাবে বেধে দেয় তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হল তুরস্ক। ইসলামের ফরয বিধানগুলো বাস্তবায়ন দূরে থাক, নির্বাচনের মাধ্যমে বার বার ক্ষমতায় গিয়েও সেদেশের ইসলামপন্থিগণ ছাত্রীদের মাথায় রুমাল বাধার স্বাধীনতাটুকুও ফিরিয়ে দিতে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠার পথে প্রচন্ড বাধা হয়েছে সে দেশের ধর্মবিরোধী সেকুলার আইন। ফলে সেদেশে ব্যাভিচার হয়, প্রকাশ্য মদ্যপাণ হয়, প্লেবয় ম্যাগাজিনের এডিশনও ছাপা হয়, সর্বোপরি ইসরাইলের সাথে যৌথ সামরিক মহড়াও হয়। বাংলাদেশের নির্বাচনে ইসলামপন্থিগণ যদি জয়লাভও তবে কি তারা সমাজ পরিবর্তনেরর পথে বেশী দূর এগুতে পারবে? মহম্মদ রেজা শাহর আমলে ইরানে বহুবার নির্বাচন হয়েছে। কিন্তু সে নির্বাচনে ইরানের ইসলামপন্থিরা অংশ নেয়নি। আর অংশ নিলেও তারা কি জিততে পারতো? এবং জিতলেই কি তারা দেশটির তাগুতী শাহ ও তার বহুদিনের প্রতিষ্ঠিত শাসনব্যবস্থা কে পাল্টাতে পারতো? গ্রেট-ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী রূপে কোন আল্লামা বা আয়াতুল্লাহকে বসালেই তিনিই বা কি করতে পারতেন? সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের চেতনারাজ্য জুড়ে ব্যাপক বিপ্লব না এনে নিছক মন্ত্রী লাভ বা এমপি হওয়াতে ইসলামের কল্যাণ নেই। রেলগাড়ী শুধু বিছানো রেলপথ দিয়েই চলতে পারে, সে পথ থেকে ছিটকে পড়ালে আর এগুতে পারে না। তেমনি ঘটে একটি নির্বাচিত সরকারের বেলায়ও। তাকে বাধাধরা নিয়ম মেনে চলতে হয়, অধিকার থাকে না বিপ্লব ঘটানোর। কারণ সে ম্যান্ডেট নির্বাচনে কোন সরকারই পায় না। অথচ সে ক্ষমতা থাকে বিপ্লবী সরকারের। তাই ইরান, চীন, রাশিয়া বা কিউবাতে রাষ্ট্র জুড়ে যেরূপ ব্যাপক পরিবর্তণ এসেছিল সেটি কি কোন নির্বাচিত সরকার ভাবতে পারে? কারণ বিপ্লব অনুষ্ঠিত হয় রাজপথে জনগণের প্রচন্ড বিদ্রোহে ও বিপুল রক্তদানে। এমন গণবিপ্লবের ক্ষমতাই আলাদা।  

 

যে কুফরি ও শিরক গণতন্ত্রের নামে

বাংলাদেশের চলমান পরিস্থিতিতে যারা নির্বাচনে নামে তারা তো প্রতিযোগিতায় নামে প্রচলিত শাসতান্ত্রিক বিধি ও জনগণের মাঝে বিরাজমান রাজনৈতিক দর্শন ও সংস্কৃতির সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে। আর ইসলাম থেকে বিচ্যুতির শুরু হয় মূলতঃ এখান থেকেই। বাংলাদেশে যে শিরকটি প্রবল ভাবে প্রচার ও প্রতিষ্ঠা পেয়েছে সেটি মুর্তিপুজা নয়। সে শিরক শুধু মুশরিকদের মাঝেও সীমাবদ্ধ নয়। বরং তা হল গণতন্ত্রের নামে এমন এক বিশ্বাস যার মূল কথা, “জনগণই ক্ষমতার উৎস।” এবং সে সাথে “জনগণের সার্বভৌমত্ব”-এর ধারণা এবং “আইন প্রণোয়নে পার্লামেন্টের নিরংকুশ ক্ষমতার বিষয়।” অথচ মুসলমান হওয়ার অর্থই হল, আইন-প্রণোয়নের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের উপর থাকতে হবে একমাত্র মহান আল্লাহর পূর্ন-সার্বভৌমত্ব। এক্ষেত্রে আপোষ চলে না। আপোষ হলেই ঈমান বিলুপ্ত হয়। মহান আল্লাহতায়ালার আইনকে দূরে ঠেলে দিয়ে নিজেরাই পার্লামেন্টে আইন নির্মাণে উদ্যোগী হওয়া তো আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। এ বিদ্রোহ তো আইনদাতা হিসাবে আল্লাহর রাব্বানিয়াতের বিরুদ্ধে। এটি তো সুস্পষ্ট কুফরি। কোন ঈমানদার ব্যক্তি কি এমন বিদ্রোহ ও এরূপ কুফরিতে অংশ নিতে পারে? এমন বিদ্রোহ তো এমনকি মুগল সম্রাটরাও করেনি। করেনি বাংলার কোন মুসলিম শাসক। আল্লাহর আইনের বিরুদ্ধে ভারতবর্ষে প্রথম বিদ্রোহ করেছিল ব্রিটিশ শাসকেরা। আর বাংলাদেশের সেকুলার শাসকগণ আজও সে বিদ্রোহকেই বৈধতা দিয়েছে এবং অব্যাহত রেখেছে। বাংলাদেশের সেকুলার পক্ষটি এজন্যই ব্রিটিশসহ সমগ্র কাফের শক্তির এতটা পছন্দের। ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দল ও উলামাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো, দেশের জনগণকে এ প্রকাণ্ড কুফরির বিরুদ্ধে সতর্ক করতে পারিনি। অন্যদের কি সতর্ক কি করবে, তারা নিজেরাও সেটিকে যথার্থ ভাবে বুঝতে পারেনি।

অথচ ঈমানদারের ভয় জনগণের ভোট হারানো নিয়ে নয়, বরং ঈমান হারানো নিয়ে। সে সাথে আল্লাহর সাহায্য ও হেদায়াত হারানো নিয়ে। আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে প্রতিটি অবাধ্যতা সে অবাধ্য ব্যক্তিটিকে দূরে সরিয়ে নেয় মহান আল্লাহর হেদায়াত থেকে। এবং তাকে নিকটবর্তী করে শয়তানের। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালার সে ঘোষণাটি এসেছে এভাবেঃ “যারা (আল্লাহ ও তাঁর দ্বীনের উপর) বিশ্বাসস্থাপন করেনা, তাদের বন্ধুরূপে শয়তানদেরকে নির্দ্দিষ্ট করে দিয়েছি।”- (সুরা আল-আ’রাফ, আয়াত -২৭। আরো বলা হয়েছেঃ “এবং যারা কুফরি করলো, তাদের বন্ধু হলো শয়তান; তাদেরকে সে আলো থেকে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়। তারাই হলো জাহান্নামের বাসিন্দা, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে।”-(সুরা বাকারা, আয়াত ২৫৭। কথা হলো, কুফরির অর্থ কি? এর অর্থ কি সীমাবদ্ধ নিছক আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অস্বীকার করার মধ্যে? কুফরির নানা রূপ এবং মানুষের জীবনে এটি আসে নানা ভাবে। মক্কার কাফেরগণ আল্লাহকে শুধু বিশ্বাসই করতো না, নিজেদের সন্তানদের নাম আব্দুল্লাহ, আব্দুর রাহমানও রাখতো -যার অর্থ আল্লাহর দাস। কিন্তু তারপরও তারা কাফের রূপে চিহ্নিত হয়েছে। মুসলমান হওয়ার জন্য যা জরুরী তা শুধু আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে বিশ্বাস করা নয়; বরং আল্লাহর দ্বীনের সামগ্রীক বিজয় বা প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আপোষহীন অঙ্গিকার ও আত্মত্যাগ। ফলে প্রকৃত ঈমানদারের কাছে অতিশয় অসহ্য হলো আল্লাহর দ্বীনের পরাজয়। এক্ষেত্রে সামান্য আপোষমুখিতাই হল কুফরি। নবীজী (সাঃ) ও তার সাহাবায়ে কেরাম এ ব্যাপারে সামান্যতম আপোষ করেননি। হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর ন্যায় দয়ালু ব্যক্তি তাঁর খেলাফত কালে তাদেরকে কাফের রূপে চিহ্নিত করেছেন এবং হত্যার শাস্তি দিয়েছেন যারা আল্লাহতায়ালাকে বিশ্বাস ও নামায-কালাম পড়লেও যাকাত দিতে অস্বীকার করেছিল।

গণতন্ত্রের নামে অন্য যে জাহিলিয়াতটি মুসলিম দেশে জনপ্রিয়তা পেয়েছে সেটি হল, “জনগণ কখনই ভূল করে না”। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তারা বলে, “জনগণ একাত্তরেও ভূল করেনি এবং এখনও করছে না।” জনগণ যেন ফেরেশতা। নির্বাচনী বিজয়কে তারা ব্যক্তির শ্রেষ্ঠত্ব যাচায়ে একটি মাপকাঠি রূপে ব্যবহার করে। সে মাপকাঠিতেই শেখ মুজিবকে তারা বলছে ইতিহাসের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালী। কারণ, একাত্তরে সবচেয়ে বেশী ভোটে বিজয়ী তিনিই একমাত্র বাঙালী। অথচ তারা একথা বলে না, ইতিহাসে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সমর্থণ পেয়েছে এককালের নমরুদ ও ফিরাউন। জনগণ শুধু সমর্থনই দেয়নি তাদের পক্ষে তারা যুদ্ধ করেছে, প্রাণ দিয়েছে এবং ভগবানও বলেছে। অপর দিকে জনসমর্থণ হারিয়ে পথে পথে ঘুরেছেন হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ও হযরত মূসা (আঃ)। বহু শত বছর ধরে দিন-রাত বুঝিয়েও গণসমর্থণ পাননি হযরত নূহ (আঃ)। গণসমর্থণ না থাকায় রাতের আঁধারে লুকিয়ে মাতৃভূমি ছাড়তে হয়েছে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব বিশ্বনবী হযরত মহম্মদ (সাঃ)কে। দুর্বৃত্তরা সেদিন মক্কায় প্রবল ভাবে বিজয়ী হয়েছিল, সে বিজয় নিয়ে আজকের ন্যায় সেদিনও ইসলামের বিপক্ষশক্তি মহা-বিজয়ের উল্লাস করেছিল। তারা একথাও ভূলে যায়, বিপুল জনসমর্থণ পেয়েছে দুর্বৃত্ত হিটলার, জর্জ বুশ ও টনি ব্লেয়ার। তেমনি পেয়েছে একদলীয় বাকশালের প্রতিষ্ঠাতা ও বাংলাদেশে মানবিক অধিকারের হন্তা শেখ মুজিব। তাই জনগণের ভোটে কি কারো সততা, যোগ্যতা বা অন্য কোন মানবিক গুণ যাচাই হয়? সত্য ও মিথ্যা, ন্যায় ও অন্যায়ের, নেক ও দুর্বৃত্তের মাঝে বাছবিচারে জনগণ যে কতটা নিদারুন ভাবে ব্যর্থ হয় -এ হলো তারই নমুনা। গণতন্ত্রের এখানেই প্রচণ্ড ব্যর্থতা।এমন একটি বিফল বা ব্যর্থ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে কি ইসলামের বিজয় সম্ভব? বিজয়ের লক্ষ্যে ইসলামের রয়েছে নিজস্ব প্রক্রিয়া। সে প্রক্রিয়ায় দুর্বৃত্তকে ভোটদান নয়, বরং তার শিকড়সহ নির্মূল গুরুত্ব পায়। এখানে গুরুত্ব পায় জনগণের বিবেকবোধের উন্নয়ন। অথচ গণতন্ত্রে ভোটদান ও ভোটগণনা বিপুল গুরুত্ব পেলেও কদর পায় না সে অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি। ফলে প্রকাণ্ড বাধা হয়ে দাঁড়ায় ইসলামের বিজয়ে।

 

 




কেন অসম্ভব হচ্ছে ইসলামের বিজয়?

নবীজী (সাঃ) সর্বশেষ্ঠ সূন্নত

মুসলিম মাত্রই ইসলামের বিজয় চায়। সে চা্‌ওয়ার মধ্যেই ঈমানের প্রকাশ। যারা ইসলামের বিজয় না চেয়ে পরাজয় চায় -তারা হয় কাফের, না হয় মুনাফিক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ইসলামের কাঙ্খিত সে বিজয়টি কোন পথে? পথ একটিই, সেটি হলো নবীজী (সাঃ) দেখানো পথ। নামায-রোযা কি ভাবে পালন করতে হবে সেটি যেমন আবিস্কারের বিষয় নয়, তেমনি কীভাবে মহান আল্লাহতায়ালা দ্বীনের বিজয় আনতে এবং কীভাবে তাঁর  সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে সেটিও আবিস্কারের বিষয় নয়। ঘর-বাড়ী, রাস্তা-ঘাট কোথায়, কোন ডিজাইনে বা কোন সামগ্রী দিয়ে নির্মাণ করতে হবে -তা নিয়ে বিস্তর গবেষণার সুযোগ আছে। এসব খাতে প্রত্যেকেই নিজ নিজ প্রতিভার বিনিয়োগের আজাদীও রয়েছে। কিন্তু নবীজী (সাঃ) নিজ হাতে যে কাজে সূন্নত রেখে গেছেন, প্রতিটি ঈমানদারকে অনুসরণ করতে হবে সেটিই। নইলে ভ্রষ্টতা ও ফিতনা বাড়বে।

সঠিক পথে চলতে হলে সব পথে যেমন চলা যায় না, তেমনি সবাইকে অনুসরণও করা যায়। ইহকালে ও পরকালে সাফল্য তো সঠিক পথে চলা এবং সঠিক ব্যক্তিকে অনুসরণ করার মধ্যে। মানব জীবনে এটি হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা। সে সাথে অনিবার্য পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় পাশ যারা করেই পরকালে জান্নাত পেতে হয়। এবং ভূল হলে অনিবার্য হয় জাহান্নামের আযাব। অলিম্পিকে সোনার মেডেল পাওয়া বা আবিস্কারে নবেল প্রা্‌ইজ পাওয়ার চেয়েও কঠিন হলো সুস্থ্য রাষ্ট্র নির্মাণ এবং  জান্নাতের পথ চেনার ক্ষেত্রে নির্ভূল হওয়া। পানাহার ইতর পশুপাখিও সংগ্রহ করে, কিন্তু জান্নাতের পথ চেনার ক্ষেত্রে নবেল প্রাইজ বিজয়ীগণও ভূল করে। জনগণের মাঝে সে ভূলের ছড়াছড়ির কারণে ইতিহাসে ফিরাউন, নমরুদ, হিটলার, স্টাটিন এবং শেখ মুজিবের ন্যায় নৃশংস স্বৈরাচারিগণও কোটি কোটি সমর্থক পেয়েছে।

পথচেনার সে দুরুহ কাজটি সহজ ও নির্ভূল করতেই মহান আল্লাহতায়ালা পথ দেখানোর কাজটি কোন বান্দার হাতে না রেখে নিজ হাতে রেখেছেন। সে কাজটি সমাধা করতেই মানুষের মাঝে নবী-রাসূল নিয়োগ, নবী-রাসূলদের কাছে কিতাব প্রেরণ এবং ফিরশতা মারফত নিয়মত ওহি পাঠিয়েছেন। মহান আল্লাহতায়ালার সে মিশনকে পূর্ণাঙ্গ করতে মহা নবীজী (সাঃ) ছিলেন সর্বশেষ নবী এবং সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ মানব। তিনি ছিলেন সমগ্র মানব জাতির জন্য মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ (উসওয়াতুন হাসানা)। জান্নাতের পথে চলা এবং জাহান্নামে আগুণ থেকে বাঁচার জন্য যা কিছু অপরিহার্য –সে বিষয়গুলি নিজ হাতে করে সমগ্র মানব জাতির জন্য অনুকরণীয় আদর্শ রেখে যাওয়াই ছিল তার মূল দায়িত্ব। যেহেতু তিনি ছিলেন মহান আল্লাহতায়ালার, তিনি যা শিখিয়েছেন তাতেই প্রকাশ পেয়েছিল মহান রাব্বুল আলামীনের নিজের ই্চ্ছা। এবং বোধগম্য কারণেই তাঁর শিক্ষা স্রেফ নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাতের ন্যায় ইবাদত বন্দেগীর মাঝে সীমিত থাকেনি। শিখিয়ে গেছেন, মানব সভ্যতার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রকে কীরূপে মানবের সবচেয়ে বড় কল্যাণ কাজে লাগাতে হয় সেটিও। শিখেয়েছেন, সে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠায় জিহাদ এবং সে জিহাদে জানমালের কোরবানীর গুরুত্ব। নবীজীর হাদীসঃ প্রতিটি মানব শিশুরই জন্ম হয় মুসলিম রূপে। কিন্তু সে পরবর্তীতে অমুসলিম রূপে বেড়ে উঠে পরিবেশের গুণে। এবং পারিবারিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিবেশের নির্মাণে সবচেয়ে শক্তিশালী ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাটি রাখে রাষ্ট্র। প্রতিটি সমাজ ও রাষ্ট্রেই প্রতি মুহুর্তে চলমান থাকে একটি সোসাল ইঞ্জিনীয়ারিং। রাষ্ট্র ইসলামী হলে সে সোসাল ইঞ্জিনীয়ারিংয়ের ফলে মানবশিশুদের পক্ষে সহজ হয় জান্নাতের পথে চলা। নইলে উল্টোটি হয়। শয়তানি শক্তির হাতে রাষ্ট্র অধিকৃত হলে এমন কি মসজিদ-মাদ্রাসাও ঘোড়ার আস্তাবল বা মানুষকে জাহান্নামে নেয়ার হাতিয়ারে পরিণত হয় –যেমনটি অতীতে সোভিয়েত রাশিয়ায় হয়েছে। রাষ্ট্র থেকেই নিয়ন্ত্রিত হয় ব্যক্তির ধর্মীয় বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও রাজনীতি। ফলে হিন্দুপরিবার ও হিন্দু রাষ্ট্রে জন্ম নেয়া অতি মেধাবী ব্যক্তির পক্ষেও অসম্ভব হয় পৌত্তলিকতার বন্ধন থেকে বেড়িয়ে আসা। শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ধর্ম-কর্মের নামে এসব রাষ্ট্রে গড়ে তোলা হয় পথভ্রষ্ট করার পদ্ধতি।

ফলে শুধু মসজিদ-মাদ্রাসা গড়ে বা স্রেফ নামায-রোযা শিখিয়ে মানব শিশুদের এ ভয়াবহ বিপদ থেকে মুক্তি দেয়াটি অসম্ভব। প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রের ন্যায় এতবড় গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান শয়তানী শক্তির হাতে অধিকৃত থাক এবং ব্যবহৃত হোক জনগণকে জাহান্নামের নেয়ার কাজে – সেটি কি মহাজ্ঞানী মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর রসূলের কাছে কখনো কাম্য হতে পারে?  মানব সভ্যতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানটি নিয়ন্ত্রণে না থাকলে এমন কি ব্যক্তি জীবনেও অসম্ভব হয় দ্বীনপালন। এ বিপদ থেকে বাঁচাতে নবীজী (সাঃ) নিজের কাজকে তাই শুধু দ্বীনের দাওয়াত ও কোরআন শিক্ষার মধ্যে সীমিত রাখেননি। শক্তিশালী রাষ্ট্রও গড়েছেন। এবং নিজে রাষ্ট্র-প্রধানও হয়েছেন। দেখিয়ে গেছেন, রাষ্ট্রের কাজ স্রেফ কৃষি, শিল্প বা অর্থনীতিতে সমৃদ্ধি আনা নয়, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি হলো জাহান্নামের আগুন থেকে মানব সন্তানদের মুক্তি দেয়া এবং জান্নাতে পথ দেখানো। মানব জাতির কল্যাণে এটিই হলো মহান নবীজী (সাঃ)র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূন্নত। সাহাবায়ে কেরামের জান-মালের সবচেয়ে বড় কোরবানী হয়েছে এ কাজে। শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবা এ কাজে শহীদ হয়েছেন। মুসলিমগণ বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয়েছে এবং মানবজাতির ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার জন্ম দিয়েছে মূলতঃ নবীজী (সাঃ)র সে আদর্শকে অনুসরণ করার কারণে।  

তাছাড়া নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাতের চেয়ে ইসলামী রাষ্ট্র ও তার অবকাঠামো নির্মাণের কাজটি হলো সবচেয়ে কঠিন ও জটিলতম ইবাদত। এ ইবাদত পালনের কোন সূন্নতী তরীকা রেখে না গেলে সেটি মানব জাতির জন্য আরেক মহাবিপর্যয়ের কারণ হতো। তখন তারা নিজেদের সীমাবদ্ধতা নিয়ে ইসলামি বিপ্লবের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় নামতো। তাতে ব্যাপক অপচয় ঘটতো মানুষের অর্থ, মেধা, সময় ও রক্তের। আজও অনেক দেশে সেটিই হচ্ছে। সে শূণ্যতা দূর করতেই নবীজী (সাঃ) নিজ হাতে ইসলামী রাষ্ট্র গড়েছেন এবং রাষ্ট্রপ্রধান রূপে সূন্নত রেখে গেছেন। সে রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য নিজে বদর, ওহুদ, খন্দক ও হুনায়েনসহ বহুযুদ্ধ লড়েছেন এবং আহতও হয়েছেন। এভাবে উম্মাহর জন্য শিক্ষা রেখে গেছেন, রাষ্ট্রের মানব সভ্যতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ প্রতিষ্ঠানটি কখনোই ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে ছেড়ে দেয়া যায় না। ফলে যারা দ্বীন বলতে বুঝে স্রেফ নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত ও তাসবিহ-তাহলিল এবং দূরে থাকে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জিহাদ থেকে -তারা যে নবীজী (সাঃ)র ইসলামে নাই তা নিয়ে কি সন্দেহ থাকে?   

 

শুরুটি ওহীর জ্ঞান দিয়ে

ইসলামী বিপ্লবের শুরু হতে হবে ব্যক্তির চেতনা রাজ্যের বিপ্লব দিয়ে। তাছাড়া, চেনতা রাজ্যের বিপ্লবই তো রাষ্ট্রে বিপ্লব আনে। এবং সে বিপ্লবটি আসে ওহীর জ্ঞানের জোয়ারে। অর্থাৎ রাষ্ট্রকে মুসলিম বানানোর আগে জনগণের মগজ তথা ধ্যান-ধারনাকে প্রথমে মুসলিম বানাতে হয়। এটিই মহান আল্লাহতায়ালার সূন্নত। মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশমত মক্কী জীবনের ১৩ বছর যাবত নবীজী (সাঃ) সে কাজটিই করেছিলেন। এ কাজে সবচেয়ে কার্যকর ও অপরিহার্য  হাতিয়ার হলো পবিত্র কোর’আন। পবিত্র কোর’আনের জ্ঞানে বিপ্লব আনতে হয় ব্যক্তির জীবনদর্শনে। তাই নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাতের পূর্বে মুসলিমদের উপর মহান আল্লাহতায়ালা সর্বপ্রথম কোরআন-অধ্যয়ন ফরজ করেছেন। হাদীস পাকে বলা হয়েছে, “সবচেয়ে উত্তম জিহাদ হলো নিজের নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ।” মূলতঃ সব জিহাদের শুরু এখান থেকেই। তবে নফসের এ অঙ্গণে জিহাদের অস্ত্রটি কোন ঢাল-তলোয়ার বা গোলা-বারুদ নয়, বরং সেটি হলো পবিত্র কোরা’আনের জ্ঞান। এ জিহাদে বিজয়ী না হলে মানব সন্তানেরা নামাযী ও রোযাদার হয়েও শয়তানের সেপাহীতে পরিণত হয়। এবং যেদেশে নফসের বিরুদ্ধে জিহাদে বিজয়ীদের সংখ্যা অধীক, একমাত্র সেদেশেই শয়তানি শক্তির বিরুদ্ধে ইসলামকে বিজয়ী করার জিহাদটিও শুরু হয়। এবং যে দেশে সে জিহাদটিই শুরু হয়নি, বুঝতে হবে সেদেশে নফসের বিরুদ্ধে বিজয়ী মোজাহিদদের সংখ্যা নগন্য। কারণ নফসের বিরুদ্ধে বিজয়ী মোজাহিদগণ কখনোই রাষ্ট্রের বুকে আল্লাহর দ্বীনের পরাজয় মেনে নেয় না। এটি তাদের স্বভাব-বিরুদ্ধ। তাদের উপস্থিতিতে জিহাদ এ জন্যই অনিবার্য হয়ে উঠে। এবং সে চুড়ান্ত জিহাদের পরণতিতেই বিজয়ী হয় আল্লাহর দ্বীন। তাই একটি দেশে লক্ষ লক্ষ মসজিদ-মাদ্রাসা থাকাটি বড় কথা নয়। বড় কথা নয়, রোযাদার বা মুসল্লীর বিশাল সংখ্যাও। তাবলিগ জামাতের ইজতেমায় কত লক্ষ মুসল্লী জমা হলো -সেটিও এখানে কোন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নয়। বরং অতি গুরুত্বপূর্ণ হলো, দেশে ক’জন এরূপ নফসের বিরুদ্ধে বিজয়ী মোজাহিদ সৃষ্টি হলো সেটি।

বাংলাদেশে আল্লাহর দ্বীন আজ পরাজিত। শতকরা ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে বিজয়ী আদর্শ রূপে দেশের রাজনীতি, প্রশাসন, আইন-আদালত ও সংস্কৃতিতে যেটি জেঁকে বসে আছে সেটি ইসলাম নয়। সেটি সেক্যুলারিজম। এবং সেকুলারিষ্টদের আনন্দ ইসলামের পরাজয়ে। তাদের কারণে আইন-আদলতে আল্লাহর শরিয়তি আইনের প্রতিষ্ঠা যেমন সম্ভব নয়, তেমনি সম্ভব নয় সূদী ব্যাংকের উৎখাত। সম্ভব নয় পতিতাবৃত্তির ন্যায় পেশাদারি ব্যাভিচারের নির্মূল। এবং সম্ভব নয় ঘুষ, সরকারি তহবিল তছরুফ, চুরি-ডাকাতি ও সন্ত্রাসের ন্যায় নানাবিধ পাপাচারের উচেছদ। কারণ, সেকুলারিষ্টগণ বাঁচতে চায় ইহলৌকিক জীবনের সুখভোগ নিয়ে। সে ভোগের আনন্দ বাড়াতে সূদ, ঘুষ, চুরি-ডাকাতি ও সন্ত্রাস যেমন জরুরী, তেমনি জরুরী হলো ব্যাভিচারের উম্মুক্ত বাজার। এবং সে পাপাচার বাঁচিয়ে রাখতে জরুরী হলো শরিয়তী আইনের নির্মূল।

 

জরুরী হলো আত্মসমালোচনা 

যারা নিজেদের পরিচয় দেয় ইসলামের পক্ষের শক্তি রূপে, নিজেদের ব্যর্থতা নিয়ে তাদের আত্মসমালোচনা হওয়া উচিত। যে পথে আসছে অবিরাম ব্যর্থতা সে পথে হাজার বছর চললেও কি সফলতা আসবে? চলা থামিয়ে তাদের ভাবা উচিত। এ ভাবাটাই এখন বড় ইবাদত। প্রশ্ন করা উচিত, যে পথে তারা চলছে সেটি সঠিক তো? দেশে ইসলামের বিজয় আনার আগে তাদের জ্ঞানের ভূবনে ইসলামের বিজয় আসা উচিত। শুরু হওয়া উচিত নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ। অথচ এক্ষেত্রে ব্যর্থতা যে প্রকট সে প্রমাণ কি কম? নফসের উপর বিজয়ী মোজাহিদ গড়ার সফল কোন পদ্ধতি থাকলে অবশ্যই শুরু হত আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার লড়াই। কিন্তু বাংলাদেশে সে কাজটি হয়নি। এটি বাঙালী মুসলিমদের ধর্মপালনের এক নিদারুণ ব্যর্থতা। যে কোন ধর্মপ্রাণ মানুষকে এ ব্যর্থতার কারণ খুঁজতে হবে। প্রশ্ন হলো, ১৬ কোটি মুসলিমের দেশে ক’জন এমন মুসলিম যারা পবিত্র কোরআনের প্রথম পৃষ্টা থেকে শেষ পৃষ্টা পর্যন্ত একবার অর্থসহ বুঝে পড়েছে? এবং পাঠের সাথে তার উপর চিন্তা-ভাবনাও করেছে।

কোরআন মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বিপ্লবী গ্রন্থ। এ কিতাব পড়লে চিন্তাশীল পাঠকও বুঝতে পারে এ কিতাবের লেখক আর কেউ নন, লেখক সর্বশক্তিময় মহান আল্লাহ। এটিও সে বুঝতে পারে, এ মহান লেখকের প্রতিটি কথার কাঙ্খিত শ্রতা সে নিজে। তখন তার মনে প্রচণ্ড আগ্রহ বাড়তো আল্লাহর সে নির্দেশাবলীর অনুসরণে| তখন আমূল বিপ্লব শুরু হতো শুধু তার মন-জগতে নয়, বরং সমগ্র অস্তিত্ব জুড়ে। একারণেই নবীজীর আমলে সাহাবাগণ এ কিতাব পড়তে পড়তে অঝোরে কাঁদতেন। আল্লাহর ভয়ে কেঁপে উঠতো তাদের ক্বালব। পবিত্র কোরআনে আল্লাহপাক মোমেনের সে বাস্তব চিত্রটি বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে, “ঈমানদার হচ্ছে একমাত্র তারাই, যাদের ক্বালব ভয়ে কেঁপে উঠে যখন তাদেরকে আল্লাহর নাম শুনানো হয়। এবং যখন তাদেরকে আল্লাহর আয়াত তেলাওয়াত করে শুনানো হয় তখন তাদের ঈমান বেড়ে যায়। এবং তারা তাদের প্রতিপালক আল্লাহর উপর ভরসা করে।” –সুরা আনফাল, আয়াত ২। -“এবং তারাই হচ্ছে সত্যিকার ঈমানদার। তাদের জন্য রয়েছে আল্লাহর কাছে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান, রয়েছে মাগফেরাত এবং মর্যাদাপূর্ণ রিযিক।” –সুরা আনফাল, আয়াত ২।      

তাই ইসলামের বিজয় বাড়াতে হলে কোরআনের চর্চা বাড়াতে হবে। তবে কোরআন চর্চার অর্থ নিছক কোরআন পাঠ নয়, বরং সেটি হলো কোরআনের জ্ঞানের গভীর আত্মস্থ্যকরণ। এজন্য সম্ভব হলে কোরআনের ভাষা আরবীকেও শিখতে হবে। কারণ কোরআনের অনুবাদ পাঠে হৃদয় ভয়ে কেঁপে উঠবে -সে সম্ভবনা কম। কারণ, যিনি অনুবাদ করেন তিনি তো মানুষ। অথচ কোরআনের রচিয়েতা তো মহান আল্লাহ। আল্লাহর ভাষা, ভাব ও বর্ণনাভঙ্গির অনুবাদ কি কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব? কোরআনের মধ্যে যে ইমোশনাল ফোর্স তার অনুবাদ কোন মানুষই করতে পারে না। এটি সম্ভব নয় বলেই বহু আলেম কোরআনের অনুবাদকে অসম্ভব গণ্য করেছেন। যারা কোরআন বুঝায় আগ্রহী, তাদের সে কাজটি করতে হবে নিজ উদ্যোগে আরবী ভাষা শিক্ষার মধ্য দিয়ে। মহান আল্লাহতায়ালার কথা সরাসরি বুঝার খাতিরে মিশর, ইরাক, সিরিয়া, সূদান, লিবিয়া, মরক্কো, মালিসহ ২০টির বেশী দেশের মানুষ নিজেদের মাতৃভাষাকে দাফন করে আরবীকে নিজেদের ভাষা বানিয়ে নিয়েছিল। মহান আল্লাহতায়ালার লক্ষ কোটি সৃষ্টি, কিন্তু কোন সৃষ্টিই তাঁর বানী শোনায় না। শোনায় একমাত্র পবিত্র কোর’আন। ঈমানদার কি তার মহান রাব্বুল আলামীনের পবিত্র ও অমূল্য হিদায়েতের বানি বুঝায় অনাগ্রহী হতে পারে? তাই পাশ্চত্য দেশে যারাই ইসলাম কবুল করে, তাদের অনেকে আরব দেশে ছুটে যায় আরবী ভাষা শিখতে। কারণ, ভাল মুসলিম হতে হলে কোর’আন বুঝার বিকল্প নেই। তেমনি কোর’আনের বিকল্প নাই ইসলামকে বিজয়ী করার জিহাদকে শক্তিশালী করার। দলীয় নেতা-কর্মী, দলীয় তহবিল বা দলীয় অফিসের সংখ্যা বাড়িয়ে এ কাজ সম্ভব নয়। অথচ বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় অবহেলা হয়েছে কোরআন ও কোরআনের ভাষা বুঝার কাজে। ইসলামী দলগুলি ব্যস্ত শুধু কর্মী সংখ্যা বাড়াতে, কোর’আনের জ্ঞান বাড়াতে নয়। অন্যদিকে মোল্লা-মৌলবীগণ ওয়াজ করছেন, কোর’আন না বুঝে পড়লেও সওয়াব। অথচ না বোঝায় মহান আল্লাহতায়ালার সে পবিত্র ঘোষণাটির যে চরম অবাধ্যতা হয় সে হুশ কি আছে। বলা হয়েছেঃ “নিশ্চয়ই আমরা আয়াতকে বিষদ ভাবে বর্ণনা করেছি যাতে সেগুলি বুঝায় তোমরা নিজেদের আক্বলকে কাজে লাগাতে পারো।” –(সুরা হাদিদ, আয়াত ১৭)। মহান আল্লাহতায়ালার যা হুকুম সেটি তো বান্দার উপর ফরজ। অতএব প্রশ্ন হলো, না বুঝে তেলাওয়াতে কি বুঝার ফরজ আদায় হয়? হয় কি জাহেল থাকার পাপমুক্তি?   বাংলাদেশের নাগরিকগণ বিদেশী ভাষা যে শিখছে না -তা নয়, শিখছে চাকুরি-লাভ ও ব্যবসায়ীক স্বার্থে। ইউরোপ-আমেরিকায় গিয়ে তাদের অনেকে মাতৃভাষাও ভূলে যা্চ্ছে। তাদের কাছে বিদেশী ভাষা শিক্ষায় গুরুত্ব পাচ্ছে নিছক পার্থিব স্বার্থ হাছিলের লক্ষ্যে। অথচ যে ভাষাটি শেখার সাথে জড়িত অনন্ত-অসীম জীবনে সফলতা লাভের বিষয়, সেটিই গুরুত্ব পাচ্ছে না!

 

ইসলামের বিজয়ে নির্বাচন কতটা সহায়ক?   

অনেকে নির্বাচনে অংশ নেওয়াকে ইসলামের বিজয়ের একমাত্র পথ মনে করছে। তাই নির্বাচনে কোটি কোটি টাকা খরচেও তাদের আপত্তি নেই। অথচ এত টাকা দিয়ে বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে খোলা যেত, কোরআন ও আরবী ভাষা শিক্ষার শিক্ষাকেন্দ্র। খোলা যেত টিভি কেন্দ্র। প্রতিষ্ঠা করা যেত বহু পত্রিকা। পৌঁছে দেওয়া যেত লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে বীনামূল্যে কোরআনের অনুবাদ ও ইসলামের উপর লেখা বই। এভাবেই আসতে পারতো জ্ঞানের জোয়ার, সৃষ্টি হতে পারতো চেতনা রাজ্যে মহাবিপ্লব। আর এমন বিপ্লব আসলে সে বিপ্লবী মানুষটি ইসলামের বিজয় আনতে শুধু রায়ই দিত না, অর্থ, শ্রম, সময় -এমনকি প্রাণও দিত। এভাবে প্রতিটি ব্যক্তি পরিণত হতে পারতো সমাজ বিপ্লবের শক্তিশালী পাওয়ার হাউস। নবীজী (সাঃ) তার ১৩ বছরের মক্কী জীবনে তো সে কাজটিই করেছেন। একটি ক্ষুদ্র বীজের মধ্যে যেমন লুকিয়ে থাকে আগামী দিনের বিশাল বটবৃক্ষ, তেমনি এক শিশুর মনে লুকিয়ে থাকে সমাজ বিপ্লবের বিশাল পাওয়ার হাউস। ইসলামের বিজয়ের লক্ষ্যে যেটি প্রয়োজন সেটি হলো, সে পাওয়ার হাউসগুলো সক্রিয় করা। আর সে কাজটি হতে পারে একমাত্র কোর’আনের জ্ঞান। কোর’আনই হলো মহান আল্লাহর দেওয়া একমাত্র সফটওয়ার যা বিস্ময়কর ভাবে ক্ষমতা বাড়ায় ব্যক্তির। এ সফটওয়ার ছাড়া মানুষ পশু থেকে সামান্যই উপরে উঠতে পারে। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে বরং নীচে নামে। ঈমান না থাকায়, মানবতা যে কতটা বর্বর ভাবে পশুর চেয়েও নীচে নামতে পারে সে স্বাক্ষর তো আজকের ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান, ইরাক, কাশ্মীর, বসনিয়া, চেচনিয়া। কুকুর-বিড়ালের মুখে ভাষা থাকলে ফিলিস্তিনের গাজাতে যা হচ্ছে তারাও তার নিন্দা জানাতো। কিন্ত সে সামর্থ্য অধিকাংশ দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের নেই। মুখে ভাষা থাকলে অন্ততঃ কোন পশুই শিশু ও বেসামরিক নারীপুরুষ হত্যাকারি ইসরাইলীদের সমর্থন করতো না। কিন্তু মার্কিন প্রশাসন সেটিও করছে। তাদের সে ব্যর্থতার কারণ, তাদের মগজে যে সফটওয়ারটি কাজ করছে সেটি শয়তানি সফটওয়ার। মানবতার বেড়ে উঠার বিরুদ্ধে এটি এক প্রচণ্ড বাধা। অথচ কোরআনের গুণে আরবের নিরক্ষর মরুবাসী ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মানুষে পরিণত হতে পেরেছিলেন।

ইসলামে সবচেয়ে বড় পাপ হলো অজ্ঞতা। জাহেলদের পক্ষে ঈমানদার হওয়া অসম্ভব। অথচ সে পাপটি ছেয়ে আছে সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে। এবং সে অজ্ঞতা অতি প্রকটতর হলো ইসলাম ও কোরআনকে নিয়ে। এমন অজ্ঞতায় আর যাই হোক কোন সমাজ-বিপ্লব হয় না। তখন সমাজে বেড়ে উঠে না শান্তি, বিবেকবোধ ও মানবতা। যে কোন সমাজ বিপ্লবের বড় বড় মূল কাজগুলি হয় জনগণের কাতার থেকে, দেশের প্রশাসন থেকে নয়। এবং সেটি জ্ঞানবিতরণ ও ব্যাপক সমাজসেবার মধ্য দিয়ে। ইসলামী আন্দোলন তখন এক ব্যাপক সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হয়। বুদ্ধিবৃত্তির মূল কাজটি তো সরকারের নয়, দেশের আলেম বা জ্ঞানী ব্যক্তিদের। অতীতে কোন কালেই এটি কোন সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে হয়নি। তাফসির, ইসলামি দর্শন ও ফিকাহর ন্যায় ক্ষেত্রে যে বিশাল জ্ঞানভান্ডার, সেগুলী তো গড়ে উঠেছে ব্যক্তিগত উদ্যোগে। অথচ বাংলাদেশের ন্যায় ১৬ কোটি মুসলমানের দেশে এ কাজটি হয়নি। নবীজী (সাঃ) কোরআনের জ্ঞান বিতরণ করতে গিয়ে মার খেয়েছেন, তাইয়েফে পাথরের আঘাতে রক্তাত্ব হয়েছেন, বহু সাহাবী শহিদও হয়েছেন। অথচ বাংলাদেশে বহু আলেম অর্থ না দিলে ঘর থেকে বেব হন না এবং ওয়াজ করেন না। বুদ্ধিবৃত্তির এ ময়দানটিতে প্রবল ভাবে কাজ করছে ইসলামের বিপক্ষ শক্তি। তাদের কারণেই বার বার নির্বাচনী বিজয় ঘরে তুলছে দেশের সেক্যুলার রাজনৈতিক দলগুলি। এবং সে বিজয়ের ফলেই অসম্ভব হচ্ছে ইসলামের বিজয়।

নির্বাচনে যেটির প্রতিফলন ঘটে, সেটি তো জনগণের চলমান চেতনা বা বিশ্বাসের প্রতিফলন। যে দেশের মানুষ কোরআন বুঝার সুযোগই পেল না, জানতে পারলো না ইসলামের সামাজিক, রাজনৈতিক বা মানবিক কল্যাণের দিক, -তারা ইসলামের পক্ষে ভোট দিবে সেটি কি আশা করা যায়? গণতন্ত্রে নিয়ম হল, নির্বাচনে জিততে হলে বিজয় আনতে হবে ভোটগ্রহণের আগেই। সে বিজয়টি আনতে হয় মানুষের চেতনা-রাজ্যে ও রাজপথে। আর সে জন্য ব্যাপক ভাবে জিততে হয় বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানে। ইসলাম-বিরোধী সেকুলার পক্ষটি সে বিজয় এনেছে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার বহু আগেই। ১৯৪৭ সালে তাদের ঘটেছিল সর্বপ্রথম ও সর্বশেষ পরাজয়। এর পর তারা শুধু জিতেই চলেছে। ১৯৭০ য়ের নির্বাচনে ভোট গ্রহণের বহু আগেই তারা রাজপথ দখলে নিয়েছিল। তারা পাকিস্তানপন্থি ও ইসলামপন্থিগণকে হটিয়ে দিয়েছিল মিডিয়া ও রাজপথ থেকে। বুদ্ধিবৃদ্ধির ময়দানে এবং সে সাথে রাজপথে এমন একটি বিপ্লব আনার আগে নির্বাচনে যাওয়ার অর্থ নিজেদের শ্রম, অর্থ, সময় ও মেধার অপচয়। এমন প্রকাণ্ড অপচয়ে একটি আন্দোলনের শুধু দুর্বলতাই প্রকাশ পায় না, ক্ষতির অংকটিও বাড়ে। আর বাংলাদেশের ইসলামপন্থিদের সাথে সেটিই হচ্ছে।  

সমাজ-বিপ্লবের এ সহজ বিষয়টি মার্কসবাদীরা বুঝেছিল। তাই রাশিয়া, চীন, কিউবার ন্যায় কোন দেশেই তারা নির্বাচনের রাস্তা ধরেনি। বরং ধরেছিল সমাজ বিপ্লবের ধারা। এ সত্যটি বুঝেছিল ইরানের ইমাম খোমিনী ও তাঁর অনুসারিরাও। যে কোন সমাজ-বিপ্লবের ন্যায় ইসলামি সমাজ বিপ্লবেরও মূল হাতিয়ার যে জ্ঞান-সম্পদ বা বুদ্ধিবৃত্তি সেটি নবীজী (সাঃ) নিজ হাতে শিখিয়ে গেছেন। নবীজী (সাঃ) তার নবুয়ত জীবনের প্রথম ১৩টি বছর ধরে মক্কায় শুধু একাজটিই করেছেন। এ সময় তিনি কোন রাজনৈতিক সংঘাত বা প্রতিযোগিতায় অংশ নেননি। নীরবে নির্যাতন সয়েছেন, এবং সে সাথে অবিরাম জ্ঞান বিতরণের কাজ করেছেন। আর সে জ্ঞানের আলোকে ঈমানদারদের চরিত্র গড়েছেন। মক্কী জীবনে সে ১৩ বছরে তিনি দেড় শতের বেশী মানুষের বেশী তৈরী করতে পারেননি। কিন্তু তারাই ছিলেন ভবিষ্যৎ মুসলিম উম্মাহর মূল ইঞ্জিন। তারাই ছিলেন মানব জাতির ইতিহাসে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মানুষ। আগুণের উপর শুইয়ে দিয়েও কাফেরগণ তাদের ঈমান টলাতে পারেনি। অতি মুষ্টিমেয় হয়েও নিছক গুণের কারণে তারা জন্ম দিয়েছিলেন ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার। বিশ্বের ১৫০ কোটি মুসলমানের কাছে আজও এটিই শ্রেষ্ঠ গর্বের। ফেরেশতাদের চেয়েও তারা শ্রেষ্ঠতর পর্যায়ে পৌঁছেছিলেন। আর তার কারণ ছিল কোরআনী জ্ঞান। জ্ঞানচর্চার কারণে মক্কার সে দরিদ্র মানুষদের প্রত্যেকে পরিণত হযেছিলেন জগত বিখ্যাত আলেমে। অথচ আজ বাংলাদেশের শত শত মাদ্রাসায় আজীবন জ্ঞানচর্চার পরও সে মাপের কোন জ্ঞানী ব্যক্তি গড়ে উঠছে না।

কারণ এসব মাদ্রাসাগুলোতে ফিকাহ, হাদীস বা বিভিন্ন মাজহাবী কিতাব গুরুত্ব পেলেও গুরুত্ব পায়নি কোরআন চর্চা। এবং সেগুলি পড়েন নিজেদের ফেরকা বা মজহাবকে অন্যদের মোকাবেলায় সেরা প্রমাণ করার গরজে। অথচ কোরআন হল চিকিৎসা বিজ্ঞানের কিতাবের ন্যায় আমল-ভিত্তিক কিতাব। রোগ চিকিৎসায় হাসপাতালে না বসে শুধু বই পড়ে ডাক্তারি শেখা যায় না। তেমনি নেক আমল ও জ্বিহাদে না নেমে কোরআন শিক্ষাও হয় না। তাই কোরআন চর্চা নিছক মাদ্রাসায় বসে হয় না। এজন্য রাজনীতি, সমাজনীতি, মিডিয়া, ব্যাবসা-বাণিজ্যসহ জ্বিহাদেও নামতে হবে। অথচ বাংলাদেশে আলেমদের দ্বারা সেটি হচ্ছে না। আরো সমস্যা হল, বাংলাদেশের ইসলামপন্থিদের মাঝে সে ব্যর্থতা নিয়ে উপলদ্ধিও নেই। ফলে বার বার ব্যর্থ হলেও নির্বাচনের পথ ছাড়তে তারা রাজী নয়। অর্ধ বা অল্প শিক্ষিত আলেম বা দলীয় ক্যাডারদের দিয়ে লাঠিয়ালের কাজ চলে, কিন্তু তা দিয়ে সমাজ-বিপ্লব হয় না। অথচ তাদের অধিক মনযোগ মূলতঃ তাদের সংখ্যা বাড়ানো নিয়ে।

বাংলাদেশের ইসলামি সংগঠনগুলোর মূল ব্যস্ততা কর্মীদের আনুগত্য বাড়াতে। সে সাথে তাদের উপর আরেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রূপে চেপেছে অর্থসংগ্রহের বিষয়টি। দলীয় কর্মীদের গুণাগুণ যাচায়ে আনুগত্য, ভোটজোগার ও অর্থসংগ্রহের সামর্থ্য যতটা গুরুত্ব পেয়েছে ততটা জ্ঞানার্জন পায়নি। ফলে দিন দিন বেড়ে উঠেছে বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানে ব্যাপক শূণ্যতা। ফলে দেশে ইসলামী পক্ষ থেকে পত্র-পত্রিকায় বের হলেও তাতে ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে লেখার লোক নেই। তাদের পত্রিকায় লিখছে চিহ্নিত সেক্যুলারগণ। একই অবস্থা হয়েছিল ১৯৪৭-পরবর্তী মুসলিম লীগের। তারাও পত্রিকা বের করতো, কিন্তু সেগুলি দখলে নিত বামপন্থি সেক্যুলার লেখকেরা। ফলে ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশের ইসলামি লেখকদের প্রচেষ্টায় প্যান-ইসলামী চেতনার যে প্রবল জোয়ার শুরু হয়েছিল সেটি দ্রুত ভাটার টানে সহসায় হারিয়ে যায়। ফলে একাত্তরে ভেঙ্গে যায় পাকিস্তান। দেহের পুষ্টির জন্য নিয়মিত খাদ্যগ্রহণ যেমন জরুরী, বুদ্ধিবৃত্তিক সুস্থ্যতা টিকিয়ে রাখার জন্য তেমনি অপরিহার্য হলো অবিরাম জ্ঞানচর্চা। একাজ এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে হাদীসে বলা হয়েছে, সারা রাতের নফল ইবাদতের চেয়ে সামান্য ক্ষণের জ্ঞান-চর্চাও শ্রেষ্ঠতর। বাংলাদেশে জ্ঞানচর্চা মাদ্রাসাগুলোতে যেমন হয়নি, তেমনি হয়নি ইসলামি সংগঠনের দলীয় নেতা-কর্মীদের মাঝেও।            

রাজনীতির বাইরে বাংলাদেশে বিশাল জনশক্তি রয়েছে তাবলিগ জামাতের। অথচ তারা জ্ঞানচর্চার যে রেওয়াজ চালু করেছেন সেটি ইসলামের বিজয়ের পথে মারাত্মক বাধা। তারা যতটা ফাজায়েলে আমল পড়তে ব্যস্ত ততটা ব্যস্ত নয় কোরআন বুঝতে। মসজিদে মসজিদে তারা যে অসংখ্য তা’লীমী মজলিস করে সেখানেও কোরআনের আয়াত পড়ে শুনানো হয় না। বড় জোর কিছু হাদীস পাঠ করে শুনানো হয়। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে পাঠ করা হয় ফাজায়েলে আমল। বক্তারা দাড়িয়ে যে ওয়াজ করেন তাতেও শুনানো হয় না কোরআনের আয়াত। অথচ, নবীজী (সাঃ)-র সূন্নত হল তিনি তাঁর বক্তৃতায় বেশীর ভাগ জুড়ে কোরআনের আয়াত শুনাতেন। নিজের কথা সামান্যই বলতেন। কারণ, মহান আল্লাহর চেয়ে আর কে তাঁর দ্বীনকে উত্তম ভাবে বুঝাতে পারেন? ফলে নবীজী (সাঃ)র জুম্মার দুটি খোতবায় প্রায় সবটুকু জুড়ে থাকতো পবিত্র কোরআনের আয়াত। অপরদিকে তাবলিগী জামাতের লোকেরা দাওয়াত দেয় নিছক নামাযের দিকে। অথচ আল্লাহর নবী (সাঃ) ডেকেছেন পরিপূণ ইসলামের দিকে। সেখানে যেমন নামায-রোযা ছিল, তেমনি জ্ঞানচর্চা, সমাজসেবা, হিযরত এবং জিহাদও ছিল। অথচ তাবলিগ জামায়াতের নেতা-কর্মীদের শেষাক্তগুলীতে কোন মনযোগই নাই।

অনৈক্যে অনিবার্য হয় আযাব

ইসলামের বিজয়ের লক্ষ্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, মুসলিমদের একতা। একতা ছাড়া কোন আদর্শের বা দলেরই বিজয় আসে না। অনৈক্য শুধু পরাজয়ই আনে না, আল্লাহতায়ালার আযাবও আনে। সে হুশিয়ারিটি ধ্বনিত হয়েছে সুরা আল-ইমরানের ১০৫ নম্বর আয়াতে। বলা হয়েছেঃ “সুস্পষ্ট ভাবে বর্ণনা করে দেয়ার পরও যারা বিভক্ত হলো এবং মতভেদ গড়লো তাদের জন্য রয়েছে কঠিন আযাব।”  অথচ আজ মুসলিম উম্মাহ ভাষা, বর্ণ, গোত্র, ভূগোল, মাযহাব, ফেরকার নামে মতভেদ ও বিভক্তিতে জর্জরিত। এবং সে বিভক্তি নির্মূলের বদলে সেগুলি বাঁচাতে গড়া হয়েছে রাষ্ট্রীয় দেয়াল এবং তা নিয়েই আজ দেশে দেশে বিজয় উৎসব। ফলে ঘিরে ধরেছে প্রতিশ্রুত আযাব। কথা হলো, একতার প্রতিষ্ঠা কি করে সম্ভব? সেটি সম্ভব নিয়তের পরিশুদ্ধির মধ্য দিয়ে। নিয়ত যদি হয় একমাত্র আল্লাহর দ্বীনের বিজয়, তখন আর একতার পথে বাধা থাকে না। একই গন্তব্যস্থলের দিকে সবাই হাটা শুরু করলে পথটিও তখন অভিন্ন হয়। ভিন্নতা তো আসে তখন, যখন উদ্দেশ্য বা লক্ষ্যটি আলাদা আলাদা। একসাথে বহু হাজার নবী প্রেরীত হলেও তাদের মাঝে কোন বিরোধ হত না। কোন দলের সদস্যপদ দিয়ে তাদের বাধার প্রয়োজন হত না। কারণ তাঁরা তো কাজ করতেন এক অভিন্ন লক্ষ্যে। সেটি একমাত্র আল্লাহকে খুশি করতে, এবং তারই দ্বীনের বিজয়ে। সে লক্ষ্যে তাঁরা তো অপর মুসলিম ভাইয়ের সাথে একতা গড়াকে ফরজ ইবাদত মনে করতেন। একই পরিবারের ভাই-বোনদের বাঁধতে কি বিশেষ কোন সংগঠনের সদস্য করার প্রয়োজন পড়ে? আল্লাহপাক এক মুসলমানকে অন্য মুসলমানের ভাই বলেছেন। নিজের সে ভাইটি যদি ভিন্ন ঘর, ভিন্ন দল, ভিন্ন দেশ বা ভিন্ন মহাদেশে বাস করে তবুও তার সাথে মিলিত হওয়ার আগ্রহটি হবে অতি প্রবল। আর সে প্রবল আগ্রহটিই হলো তার ঈমান যাচায়ের মাপকাঠি যা বলে দেয় তার ঈমানের গভীরতা। যে ব্যক্তির মধ্যে অন্য শহর, অন্য ভাষা, অন্য দল, অন্য দেশ ও অন্য মাজহাবের মুসলমান ভাইয়ের প্রতি প্রবল ভালবাসা নাই, বুঝতে হবে তার মধ্যে ঈমানের গভীরতাও নাই। ভাইয়ের সাথে ভাইয়ের বন্ধনটি মজবুত করতে কি কোন দলীয় সদস্যপদের প্রয়োজন পড়ে? মুসলমানের ফরয এবাদত তো মুসলমানদের একতাবদ্ধ করা, দল গড়া নয়। ফিরকা গড়াও নয়। দল গড়া যেতে পারে শুধু সে ঐক্যকে শক্তিশালী করার স্বার্থে। কিন্তু দল যখন দলাদলি ও বিভক্তির মাধ্যমে পরিণত হয় তখন সেটি ফিতনায় পরিনত হয়। অথচ মুসলিম বিশ্বে আজ সেটিই হচ্ছে। ফলে দলের সংখ্যা বাড়লেও ঐক্য বাড়েনি। নবীজী (সাঃ)-এর আমলে মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করার জন্য কোন দল ও দলের সদস্য-পদের প্রয়জন পড়েনি। অথচ এরপরও তারা জন্ম দিতে পেরেছিলেন সীসা ঢালা প্রাচীরের ন্যায় মজবুত একতা গড়তে। ইমাম খোমিনী দল ছাড়াই বিরাট বিপ্লব করেছেন। আর বাংলাদেশের ইসলামপন্থিরা দলের পর দল গড়ছে, কিন্তু ছিটকে পড়ছে ইসলামের বিজয় অর্জন থেকে।   

বাংলাদেশের মুসলমানদের অনৈক্যের মূল কারণ, মাজহাব, ফিরকা ও দলগত বিভক্তি। বিভক্ত এ মুসলমানেরা চায় নিজ দল, নিজ ফিরকা, নিজ মাজহাবের বিজয়। ফলে আল্লাহর আইন আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হলেও তা নিয়ে তাদের মাথা ব্যথা নেই। মাদ্রাসার শিক্ষকদের বেতনে হাত পড়লে হাজার হাজার মাদ্রাসা শিক্ষক ঢাকার রাস্তা গরম করে তোলেন। অথচ আল্লাহর আইন অপমানিত হলেও তা নিয়ে তাদের সামান্যতম ভ্রুক্ষেপ নেই। সংসদে বসেও ইসলামি দলের এমপিগণও অতীতে দাবী তোলেন নি আল্লাহর আইনের প্রতিষ্ঠা নিয়ে। খেলার মাঠে বা খাওয়ার মজলিসে নানা মাজহাব, নানা দল ও নানা ফিরকার মুসলমান একত্রে বসতে পারলেও তারা একত্রে বসতে পারে না বা কাজ করতে পারে না আল্লাহর দ্বীনের বিজয় নিয়ে। মুসলমানদের জন্য এ এক ভয়ংকর ব্যর্থতা। আর এ ব্যর্থতা তাদের ব্যর্থতা বাড়াবে আখেরাতেও। কারণ, রোজ হাশরের বিচার দিনে এ প্রশ্ন তো উঠবেই, আল্লাহর দ্বীনের বিজয়ে বা উম্মাহর একতার প্রতিষ্ঠায় কতটুকু ছিল তার নিজস্ব প্রচেষ্টা বা কোরবানী? মহান আল্লাহর দরবারে সেদিন তার সাথে কোন দলীয় বা মাজহাবী নেতা খাড়া হবে না, থাড়া হতে হবে তাকে একাকীভাবেই। সেদিন মহান আল্লাহতায়ালা তার উপরই বেশী খুশী হবেন যিনি একমাত্র তারই বিধানকে বিজয়ী করতে সর্বোচ্চ কোরবানী পেশ করেছেন এবং চেষ্টা করেছেন মুসলিম উম্মাহকে একতাবদ্ধ করতে।

 

ফরজ হলো একতা গড়া

মহান আল্লাহতায়ালার কাছে অতি পছন্দের হলো তাঁর নিজ বাহিনীর বিজয়। এবং অতি অপছন্দের হলো, তাঁর নিজ বাহিনীতে বিভক্তি। কারণ, বিভক্তি অসম্ভব করে বিজয়কে। ইতিহাস তো সেটিই প্রমাণ করে। তাই বাংলাদেশে ইসলামের বিজয় আনতে হলে দলগত, ফিরকাগত বা মাজহাবগত বিভক্তির প্রাচীরকে ভাঙ্গতেই হবে। আঁকড়ে ধরতে হবে একমাত্র কোরআনকে। মহান আল্লাহপাক সেটিই বলেছেন পবিত্র কোরআনে, “এবং তোমরা সকলে মিলে আঁকড়ে ধর কোরআনকে, এবং বিভক্ত হয়ো না।”-সুরা আল-ইমরান। একতা স্থাপনের এটিই আল্লাহর নির্দেশিত প্রেসক্রিপশন। মুসলিম সমাজের বর্তমান বিভক্তি দেখে এ কথাটি নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়, মুসলমানেরা আল্লাহর সে প্রেসক্রিপশনের সাথে যথাযথ আচরণ করেনি। বরং সেটির সাথে প্রচন্ড গাদ্দারিই করেছে। কোরআনকে আঁকড়ে ধরার অর্থ এ মহান কিতাবকে শক্তভাবে ধরে বার বার চুমু খাওয়া নয়, বরং তা থেকে জ্ঞান লাভ ও সে জ্ঞানের পূর্ণ প্রয়োগ। অথচ মুসলমানদের পক্ষ থেকে অতি অবহেলা হয়েছে উভয় ক্ষেত্রেই। না হয়েছে কোরআন থেকে যথাযথ জ্ঞান-লাভ, না হয়েছে কোরআনী হুকুমের প্রয়োগ। ফলে সাফল্য ও বিজয় না বেড়ে বেড়েছে পরাজয় ও অপমান। অথচ কোরআনই হল সমগ্র মানবজাতির জন্য মহান আল্লাহতায়ালার শ্রেষ্ঠ নিয়ামত, – স্বর্ণ, তেল, গ্যাস বা অন্য কোন সম্পদ নয়। একমাত্র এ নিয়ামতটি পৌঁছাতেই মহান আল্লাহতায়ালা ২৩ বছর ধরে এ ধরাধামে তাঁর মহান ফিরেশতা জিবরাইল (আঃ)কে পাঠিয়েছেন, অন্য কোন সম্পদ পৌঁছাতে নয়। এ দানের বরকতেই আরবের নিঃস্ব ও বর্বর মানুষেরা শ্রেষ্ঠ মানুষে পরিণত হতে পেরেছিলেন। পেয়েছিলেন বিজেয়ের পর বিজয়ের সম্মান। কোরআনের সে ক্ষমতা আজও বর্তমান। সে কোরআনি শক্তির বিস্ফোরণ ঘটতে পারে যে কোন মুসলিম দেশের ন্যায় বাংলাদেশেও। আর তখন বাংলাদেশের মানুষও পেতে পারে অভূতপূর্ব বিজয় ও ইজ্জত। একমাত্র এ পথেই বিলুপ্ত হতে পারে দূর্নীতিগ্রস্ত দেশ হওয়ার অপমান। তবে সে জন্য দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসতে হবে খোদ বাংলাদেশের মানুষকে। কারণ আল্লাহর এ ভূমিতে এ দায়ভার একমাত্র তাদেরই। এবং সে দায়িত্বটি পালিত হতে পারে কোরআনী প্রেসক্রিপশনের পূর্ণ অনুসরণের মধ্য দিয়ে। আর ইসলামকে বিজয়ী করার এটিই হলো  একমাত্র পথ। ১১/০১/০৯, নতুন সংযোজন ৪/৩/২০১৯     

 




বাংলাদেশে অপরাধীদের অধিকৃতি এবং রাজনৈতিক ভূমিকম্প

ঘৃণার লাভা ও স্বৈরশাসকের মৃত্যুভয়

ভূমিকম্প শুরুর আগে ভূতলে তোলপাড় শুরু হয়। তারই ফল হলো ভূমিকম্প। তেমনি দেশের রাজনীতিতেও ভূমিকম্প আসার আগে তোলপাড় শুরু হয় জনগণের চেতনা-রাজ্যে। বাংলাদেশের জনগণের চেতনায় সেরূপ তোলপাড় যে চরমে পৌঁছেছে তার আলামত তো প্রচুর।  ভূমিকম্প রোধের সামর্থ্য কোন সরকারেরই থাকে না। তেমনি সামর্থ্য থাকে না রাজনৈতিক ভূমিকম্প রক্ষার সামর্থ্যও। বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষ লিবিয়া, তিউনিসিয়া, মিশর বা ইরানের জনগণের চেয়ে সংখ্যায় কম নয়, দুর্বলও নয়। আরো সত্য হলো, মিশরের হোসনী মোবারক, লিবিয়ার গাদ্দাফী, রাশিয়ার জার বা ইরানে শাহের চেয়ে শেখ হাসিনাও শক্তিশালী নয়। এখানেই বাংলাদেশের বুক থেকে স্বৈরশাসনের নিপাতে বিপুল আশাবাদ। তাছাড়া শীত সব সময় থাকে না। ২০১৪ সালের ভোটাবিহীন নির্বাচন এবং ২০১৮ সালের ভোটডাকাতির নির্বাচন হাসিনার দুর্বৃত্ত ও স্বৈরাচারি চরিত্রকে ষোল আনা ন্যাংটা করে দিয়েছে। এরূপ চোর-ডাকাতদের পাশে কি বিবেকমান সভ্য মানুষ দাঁড়াতে পারে? এখানেই জনগণের বল। সশস্ত্র ডাকাতের হাতে নিরস্ত্র জনগণের সম্পদ লুটের মধ্য দিয়ে কিচ্ছা শেষ হয় না; শুরু হয় মাত্র। ফলে তাতে বিপদ বাড়ে ডাকাতের জন্য।

হিংস্র পশুরা দিনের আলোয় জনপদে নামতে ভয় পায়। কারণ, জনগণের মাঝে নামার বিপদটি তারা বুঝে। একই কারণে ভোট-ডাকাতগণও জনগণের কাতারে নামতে ভয় পায়। এজন্যই মুজিবের প্রয়োজন পড়েছিল বিশাল রক্ষিবাহিনীর। ভোট-ডাকাতি, চুরি-ডাকাতি ও সকল প্রকার দুর্বৃত্তিকে ঘৃণা করার মধ্যে সভ্য মানুষের পরিচয়। সেরূপ ঘৃণার মধ্যেই তো ব্যক্তির ঈমানদারি। যার মধ্য সে ঘৃণা নাই, বুঝতে হবে তার মধ্যে সভ্যতা, ভদ্রতা ও সুস্থ্য বিবেকবোধও নাই। নাই ঈমানও। তবে ঈমানদারের দায়ভারটি শুধু ঘৃনা করার মধ্যে শেষ হয় না। তাঁকে অন্যায়কারিদের নির্মূলেও নামতে হয়। নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত তো সে বিশেষ মিশনের জন্য মুমিনকে প্রস্তুত করার প্রয়োজনে। এমন মিশন নিয়ে নবীজী (সাঃ)র শতকরা ৭০ ভাগ সাহাবা শহীদ হয়ে গেছেন। বুঝতে হবে, সমগ্র বাংলাদেশ জঙ্গল নয়, ডাকাত পাড়াও নয়। ফলে চোর-ডাকাত ও ভোট-ডাকাতদের জন্য এদেশের ভূমি নিরাপদ হবে সেটি কি ভাবা যায়? সামান্য পকেটমারদেরকে এদেশের মানুষ ঘৃণা ভরে পিটিয়ে হত্যা করে। ফলে কোটি কোটি মানুষের ভোটের উপর যারা ডাকাতী করে তাদেরকে জনগণ শ্রদ্ধাভরে মাথায় তুলবে -সেটি কি ভাবা যায়? সে বিষয়টি যেমন দেশের চোর-ডাকাতগণ ষোল আনা বুঝে, তেমনি বুঝে শেখ হাসিনা ও তার সহচর ভোট-ডাকাতগণও। এজন্যই শেখ হাসিনা ও তার সহচরগণ ক্ষমতা থেকে নামতে ভয় পায়। ফলে যে কোন রূপে ক্ষমতায় থাকাটি শেখ হাসিনা ও দলের নেতাকর্মীদের কাছে নিছক রাজনীতি বা ক্ষমতালিপ্সার বিষয় নয়, বরং সেটি তাদের প্রাণ বাঁচানোর বিষয়। জনগণের হাতে ব্যালট পেপার দিলে তাদের নিজেদের বিপদ যে বাড়তো -সেটি তারা পূর্বেই টের পেয়ে যায়। এরূপ বিপদে অপরাধীদের লজ্জা-শরম থাকে না। ফলে ২০১৮ সালের নির্বাচনে রাতের আঁধারেই ব্যালট পেপার ডাকাতি হয়ে যায়।এভাবে ডাকাতি হয়ে যায় নির্বাচন প্রক্রিয়া ও জনগণের ভোটাধিকার।

চুরি-ডাকাতি ও দুর্বৃত্তির বিরুদ্ধে ব্যক্তির ঘৃণা যতই তীব্রতর হয়, ততই জেগে উঠে তাঁর বিবেক। সমাজ ও রাষ্ট্রীয় বিপ্লবের জন্য জনগণের মাঝে এরূপ ঘৃনার সামর্থ্যটি অপরিহার্য। স্বৈরশাসকের দেশে রাজনৈতিক ভূমিকম্পের প্রেক্ষাপট তৈরী হয় তো এ ঘৃণা থেকেই। শেখ হাসিনার বিগত ১০ বছরের নৃশংস স্বৈরশাসন জনগণের চেতনা রাজ্যে যে পরিমান ঘৃনা উৎপাদন করেছে সেটি কি হাজার হাজার জনসভা করেও সম্ভব ছিল? সম্ভব ছিল কি দশ-বিশটি দৈনিক পত্রিকা বা টিভি চ্যানেল খুলে? রোগজীবাণু বা বনের হিংস্র পশু যেমন নিজের নাশকতা নিজেই জানিয়ে দেয়, তেমনি জানিয়ে দেয় স্বৈরশাসকগণও। ইরানের শাহ বা মিশরের স্বৈরশাসক হোসনী মোবারকের স্বৈর-শাসনের বিরুদ্ধে জনগণকে জাগিয়ে তুলতে তাই বিরোধী দলের মিটিং-মিছিল করতে হয়নি। টিভি চ্যানেল বা পত্র-পত্রিকাও প্রকাশ করতে হয়নি। মিছিল-মিটিং ও পত্রিকা প্রকাশের অধিকার না থাকাতেও স্বৈরশাসক নির্মূলের ভূমিকম্প সেগুলিতে থেমে থাকেনি। একই পথে দ্রুত এগুচ্ছে বাংলাদেশ। হাসিনার স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ঘৃণাপূর্ণ গভীর লাভা জমেছে এমন কি কিশোর-কিশোরীদের মনেও। সে ঘৃনা নিয়েই সম্প্রতি রাস্তায় নেমেছিল স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীগণ। তেমন আগ্নেয় লাভা জমেছিল মুজিবের বিরুদ্ধেও। শেখ মুজিব সকল দল, পত্র-পত্রিকা ও জনসভা নিষিদ্ধ করেছিলেন। কিন্তু তাতে তাঁর গদি বাঁচেনি। এমন কি তাঁর নিজের জীবনও বাঁচেনি।

আওয়ামী লীগের মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সৌভাগ্য হলো, ১৯৭৫ সালের অভ্যুত্থানে শেখ মুজিব নিহত হলেও আওয়ামী লীগ বেঁচে গিয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক ভূমিকম্পে শুধু স্বৈরশাসক নিপাত যায় না। নিপাত যায় তার পারিবারীক ও রাজনৈতিক গোত্র। মারা পড়ে স্বৈরাচারের রাজনৈতিক আদর্শও। সামরিক অভ্যুত্থান থেকে রাজনৈতিক ভূমিকম্পের এখানেই মূল পার্থক্য। তাছাড়া জনগণের কাছে এখন যে বিষয়টি অতি পরিস্কার তা হলো, ফ্যাসিবাদের ক্যান্সারটি শেখ মুজিব বা শেখ হাসিনার একার বা তাদের পরিবারীক রোগ নয়। সেটি মূলতঃ আওয়ামী লীগের দলীয় রোগ তাই মুজিব মারা গেলেও ফ্যাসিবাদের ক্যান্সার শুধু বেঁচে নেই, চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে বরং দেশের আনাচে কানাচে জন্ম নিয়েছে ফ্যাসিবাদের চেতনাধারি হাজার হাজার মুজিব ও হাসিনা। এরই ফলে রাজনীতির অঙ্গণে সৃষ্টি হয়েছে ফ্যাসিবাদের জোয়ার। ফলে উধাও হয়েছে গণতন্ত্র এবং নিষিদ্ধ হয়েছে রাজপথের মিটিং-মিছিল। এবং অবাধ হয়েছে সরকারি সন্ত্রাস, গুম, খুন এবং দমন ফ্যাসিবাদের সে নৃশংস বর্বরতা থেকে মুক্তি পেতে জার্মানবাসীগণ শুধু হিটলারের শাসনকেই নির্মূল করেনি, নির্মূল করেছে তার মতবাদ ও  দলকে। ফলে ফ্যাসিবাদের পক্ষে কথা বলা সেদেশে ফৌজদারি অপরাধ। বাংলাদেশীদের সামনেও কি ভিন্ন পথ আছে?

 

উম্মোচিত আওয়ামী চরিত্র ও ইতিহাস

আওয়ামী লীগ এখন আর অজানা শক্তি নয়। প্রকাশ পেয়েছে তার প্রকৃত দর্শন, চরিত্র ও ইতিহাস। কোনটি আগুণ আর কোনটি বরফ -সেটি জানার জন্য কি ইতিহাস পাঠের প্রয়োজন পড়ে? নিরক্ষর মানুষও সেটি টের পায়। তেমনি আওয়ামী লীগের চরিত্রও গোপন বিষয় নয়। জনগণের চোখের সামনে দলটি তার প্রকৃত পরিচয় নিয়ে দীর্ঘকাল যাবত হাজির। যে কোন গণবিপ্লবের জন্য স্বৈরাচারি শক্তির সঠিক পরিচয়টি জরুরী। ইতিহাসের অতি শিক্ষণীয় বিষয় হলো, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেই দেশ ও দেশবাসীর মুখে কালিমা লেপন শুরু হয়। সেটি পাকিস্তান আমল থেকেই পাকিস্তান আমলে গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী এ দলটি পাকিস্তানের মুখে কালিমা লাগায় ঢাকাস্থ্ প্রাদেশিক সংসদের অভ্যন্তরে ডিপুটি স্পীকার শাহেদ আলীকে হত্যা করে। এমন বর্বরতা পাকিস্তানের অন্য ৪টি প্রাদেশিক পরিষদের কোনটিতেই ঘটেনি। কারণ সে প্রদেশগুলির কোনটিতে আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে ছিল না। দলটি তার অতিকায় কদর্য রূপটি দেখিয়েছে ১৯৭১য়ে। মুজিবের অনুসারিদের হাতে নিহত হয়, ধর্ষিতা হয় এবং ঘর-বাড়ী, চাকুরি-বাকুরি ও ব্যবসা-বাণিজ্য হারিয়ে রাস্তার পাশে বস্তিতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয় বহু লক্ষ অবাঙালী মুসলিম। আজ যে বর্বরতা মায়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিমদের জীবনে নেমে এসেছে, সেরূপ বর্বতার শিকার হয়েছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ভারত থেকে প্রাণ বাঁচাতে আসা অবাঙালীগণ। াংলার ইতিহাসে আর কোন কালেই এমন নৃশংসতা ঘটেনি। তবে নৃশংসতা সেখানেই থেমে যায়নি, হাসিনার শাসনামলে অবাঙালীদের বস্তিগুলোতে আগুণও দেয়া হচ্ছে।

মায়ানমারে যেমন বার্মিজ অপরাধীদের শাস্তি না দিয়ে প্রশ্রয় দেয়া হয়, বাংলাদেশেও তেমনি আওয়ামী লীগের অপরাধীদের শাস্তি না দিয়ে প্রশ্রয় দেয়া হয়। বরং বলা যায়, মায়ানমারের ফ্যাসিবাদি শাসকচক্রের খুনিরা আওয়ামী লীগারদেরই আদর্শিক আত্মীয়। মানব জীবনের সবচেয়ে বড় ভীরুতা, কাপুরুষতা ও বেঈমানী হলো চোখের সামনে অন্যায় হতে দেখেও নিশ্চুপ থাকা। পবিত্র কোরআনে মুসলিম উম্মাহকে মানব জাতির মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি বলা হয়েছে। তবে সেটি এজন্য নয় যে তারা বেশী বেশী নামায-রোযা করে। বরং এজন্য যে তারা অন্যায়কে নির্মূল করে এবং ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করে। -(সুরা আল ইমরান আয়াত ১১০ দ্রষ্টব্য)। অথচ আওয়ামী বাকশালীদের মিশনটি এর বিপরীত। নিজ দলের নেতা-কর্মী ও বুদ্ধিজীবীদের মাঝে তারা প্রতিষ্ঠা দিয়েছে অসত্য ও অন্যায়কে। এবং প্রবলতর করেছে অসত্য ও অন্যায়ের সামনে নিশ্চুপ থাকার সংস্কৃতিকে। একাত্তরে ৩০ লাখ নিহতের কিসসা তো এভাবেই বাজার পেয়েছে। দলটির নেতাকর্মীদের মাঝে নৃশংসতার বিরুদ্ধে নীরবতা এতটাই প্রবল যে, তাদের কথা শুনলে মনে হয়, একাত্তরে অবাঙালীদের বিরুদ্ধে যেন কিছুই করা হয়নি। যেন প্রায় ৫ লাখ অবাঙালী মুসলিম নিজেরাই নিজেদের ঘরবাড়ী ছেড়ে বস্তিতে গিয়ে উঠেছে। অথচ তাদের কাছে শাস্তিযোগ্য অপরাধ গণ্য হচ্ছে সত্য কথা বলা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে নামাটি। সম্প্রতি কিশোর বিদ্রোহীদের উপর পুলিশ ও দলীয় ক্যাডারদের লেলিয়ে দেয়ার হেতু তো সেটিই।

একাত্তেরর পর মুজিবের ফ্যাসিবাদী নৃশংসতা এবং ভারতের পদসেবার রাজনীতি থেকে পাকিস্তান বেঁচে গেছে। সে বাঁচার কারণে পাকিস্তান পরিণত হয়েছে পারমানবিক শক্তিতে। সামরকি শক্তিতে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে পাকিস্তানের সমকক্ষ অন্য কোন দেশ নেই। তাতে সামর্থ্য পেয়েছে ভারতের সামনে শক্ত মেরদণ্ড নিয়ে দাঁড়ানোর। দেশটিতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছ বহুদলীয় গণতন্ত্র। কিন্তু সে নৃশংসতা এবং ভারতের পদসেবার রাজনীতি থেকে বাংলাদেশ বাঁচেনি। নিহত হয়েছে গণতন্ত্র। বাংলার মাটিতে আজ থেকে ৬৪ বছর পূর্বে ১৯৫৪ সালে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল সেরূপ একটি নির্বাচনের কথা আজ কল্পনা করাও অসম্ভব। মুজিবের আগরতলা ষড়যন্ত্র ১৯৬৮ সালে সফল হয়নি। কিন্তু সফল হয়েছে ১৯৭১য়ে। ফলে ১৯৭১য়ে বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশ পরিচিতি পায় ভারতের আশ্রিত রাষ্ট্র রূপে। এরূপ একটি কারণে শুরুতে চীন, ইরান, সৌদি আরব, তুরস্কসহ বিশ্বের বহুদেশ স্বাধীন দেশ রূপে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে ইতস্ততঃ করেছে।

মুজিবের হাতে বাংলাদেশের মুখে কালিমা লেপনের অতি কুৎসিত কর্মটি হয়েছে আন্তর্জাতিক অঙ্গণে বাংলাদেশকে ভিক্ষার তলাহীন ঝুলি বানানোর মধ্য দিয়ে। মুজিব প্রভূ রাষ্ট্র ভারতের অর্থনৈতিক নাশকতার কারণে ১৯৭৩-৭৪ সালে জন্ম নেয় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। কংকালসার বাংলাদেশী শিশু পরিণত হয়ে ভিক্ষা সংগ্রহের আন্তর্জাতিক পোস্টার  শিশুতে। সোনার বাংলা রূপে পরিচিত দেশটির এমন ইজ্জতহানি আর কোন কালেই হয়নি। মুজিবের সৃষ্ট দুর্ভিক্ষে লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশীর মৃত্যু হয়েছিল। তবে দুর্ভিক্ষের দিনেও মুজিব ইতিহাস গড়েছেন অন্য ভাবে। দেশের সে দুর্দিনে তিনি পুত্রকে বিয়ে দিয়েছেন মাথায় সোনার মুকুট পড়িয়ে। গণতন্ত্রকে কবরে পাঠিয়ে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন বাকশালী স্বৈরাচার। পিতার সে পথটি ধরেছেন শেখ হাসিনাও। মুজিবের ন্যায় তিনিও ডিগবাজি দিলেন গণতান্ত্রিক রাজনীতি থেকে। পিতার ন্যায় তিনিও হত্যা করলেন গণতন্ত্র। পুলিশ ও সেনা বাহিনী পরিণত হয়েছে তার নিজস্ব লাঠিয়ালে। দেশের আদালত পরিণত হয়েছে রাজনৈতিক শত্রুদের ফাঁসিতে হত্যা বা কারারুদ্ধ করার হাতিয়ারে। নির্বাচনের নামে এমন ভোট-ডাকাতি শুধু বাংলাদেশের ইতিহাসে নয়, সমগ্র মানব ইতিহাসেও বিরল। তবে সবচেয়ে বড় নাশকতাটি ঘটেছে ধর্মীয় ও মানবিক মূল্যবোধ নির্মূলের ক্ষেত্রে। সেটি ব্যাপক ভাবে হলে জনগণ হারায় দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তদের ঘৃনা করার সামর্থ্য। চোর-ডাকাতগণ নেতা-নেত্রী, বন্ধু, পিতা ও ফিরাউনের ন্যায় ভগবানরূপে গণ্য হয় তো বিবেকের অঙ্গণে ব্যাপক নাশকতার কারণেই।

ঘৃনার রাজনীতি ঘৃনাই জন্ম দেয়; তাতে ভাতৃত্ব ও পারস্পরিক সম্প্রীতি জন্ম নেয় না। আওয়ামী লীগের ঘৃনা ও নাশকতার রাজনীতিতে ধ্বসে গেছে শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তার ভিত্তি। বেড়েছে স্বৈরাচার বিরোধী তীব্র ঘৃণা। ফলে শত শত পুলিশ প্রহরা ছাড়া রাস্তায় নামার সাহস শেখ হাসিনার নেই তাঁর আশে পাশে যারা ঘুরাফেরা করে তারা উচ্ছিষ্টভোগী চাকর-বাকর মাত্র এমন কি তাঁর দলীয় নেতাকর্মীগণও তাঁকে সুরক্ষা দেয়ার ক্ষেত্রে অসহায়। শেখ হাসিনাকে তারা আর কি প্রহরা দিবে, তারা নিজেরাও পিঠের চামড়া বাঁচাতে পুলিশ, RAB ও সেনাবাহিনীর উপর নির্ভরশীল। শেখ হাসিনার সামনে এখন উভয়মুখি সংকট; পালাবার রাস্তা নাই। নিরপেক্ষ নির্বাচনে তাঁর পরাজয় অনিবার্য। অপর দিকে ভোট-ডাকাতির নির্বাচন হলে অনিবার্য হবে গণবিদ্রোহ। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিলুপ্তির মূল কারণ তো পরাজয়-ভীতি। সেটি নিরক্ষর মানুষও বুঝে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বদলে নির্বাচন প্রক্রিয়ার উপর প্রতিষ্ঠা করেছেন নিরংকুশ নিজের দখলদারি। কৌশলটি হলো, নির্বাচনি কমিশনারের নামে দলীয় রিফারীকে ময়দানে নামানো। যার মূল কাজটি হবে, বিরোধী দলীয় প্রার্থীদের লাল কার্ড দেখিয়ে নির্বাচনের ময়দান থেকে বেড়ে করে দেয়া; এবং পেনাল্টি করলেও সরকার দলীয়দের পুরস্কৃত করা। নির্বাচনি কমিশনারের মাধ্যমে ইতিমধ্যেই জামায়াতে ইসলামীকে লাল কার্ড দেখানো হয়েছে। লাল কার্ড দেখানো হচ্ছে খালেদা জিয়া ও তাঁর পুত্র তারেক জিয়াকেও। একাজে ব্যবহৃত হচ্ছে দেশের আদালত। বিরোধী দলীয় নেতাদের ফাঁসি ও কারারুদ্ধ করা হচ্ছে তো সে পরিকল্পনার অংশ রূপে।

 

লাইফ সাপোর্টে স্বৈর-সরকার

এমন কি কিশোর বিদ্রোহ রুখতে রাস্তায় হাজার হাজার পুলিশ নামানোর ঘটনা তো এটিই সাক্ষ্য দেয়, শেখ হাসিনা হারিয়েছেন নিজ শক্তিতে বাঁচার সামর্থ্য। তাঁর স্বৈরশাসন বেঁচে আছে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী, পুলিশ, RAB ও ভারতীয় সরকারের দেয়া লাইফ সাপোর্টে। লাইফ সাপোর্টটি তুলে নিলে হাসিনার সরকার যে সাথে সাথে বিলুপ্ত হবে তা নিয়ে কি সামান্যতম সন্দেহ আছে? অপর দিকে স্বৈরশাসনকে সমর্থণ করার বদনামটি তো বিশাল। প্রতিটি সভ্য সমাজেই অতি অসভ্য নিন্দিত কাজটি হলো, চোর-ডাকাতদের সমর্থণ দেয়ার ন্যায় ভোট-ডাকাতদের সমর্থণ করা ভারতের বুদ্ধিজীবী মহলে ইতিমধ্যেই ভারতের এ নীতির বিরুদ্ধে গুঞ্জন উঠেছে। কারণ ভারতে শুধু নরেন্দ্র মোদির বাস নয়, সেদেশে অরন্ধতি রায়ের মত ব্যক্তিও আছেন। ভারত সরকার হাসিনার স্বৈরশাসনকে সাপোর্ট দেয় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নিছক তার নিজ স্বার্থ বাঁচাতে। কিন্তু বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের স্বার্থ প্রচণ্ড হামলার মুখে পড়বে -যদি ভারত সরকার গণবিরোধী স্বৈরশাসককে সমর্থণ দেয়ার কাজটি অব্যাহত রাখে। জনগণ মারমুখি হলে ভারত যে নিজের স্বার্থ বাঁচাতে হাসিনার উপর থেকে লাইফ সাপোর্ট উঠিয়ে নিবে -তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে? কারণ, ভারতের কাছে তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থটি বড়, হাসিনা নয়।

কাশ্মীরে মুসলিম গণহত্যা ও হাজার হাজার মুসলিম নারীকে ধর্ষণের কারণে পাকিস্তানের মাটিতে ভারতপন্থি হওয়াটি গুরুতর নৈতীক ও রাজনৈতিক অপরাধ। সেটি গণ্য হয় মানবতাহীন নিরেট অসভ্যতা রূপেও। একই অবস্থা নেপালে। কারণ, দিল্লির আধিপত্যবাদী সরকার নেপালের রাজনীতিতে তার অনুগতদের প্রতিষ্ঠা দিতে ও নেপালী সরকারের মেরুদণ্ড ভাঙ্গতে ভারতের উপর দিয়ে নেপালে জ্বালানী তেলসহ ও অন্যান্য সামগ্রী বহনকারি ট্রাক চলাচল বন্ধ করে দিয়েছিল এবং এভাবে জন্ম দিয়েছিল চরম অর্থনৈতিক ও সামাজিক দুরাবস্থার নেপালের মানুষ ভারতসৃষ্ট সে যাতনার কথা ভূলেনি। একইরূপ প্রচণ্ড ভারত-বিরোধী ঘৃনা মালদ্বীপ ও শ্রীলংকায়। সেরূপ অবস্থা দ্রুত জন্ম নিচ্ছে বাংলাদেশেও। আরো বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ হিন্দুসংখ্যাগরিষ্ঠ নেপাল নয়; ক্ষুদ্র মালদ্বীপ বা শ্রীলংকাও নয়। এটি ১৭ কোটি মানুষের মুসলিম দেশ। বাঙালী মুসলিমগণ বিশ্বের অন্যান্য দেশের স্বৈরাচার বিরোধী জনগণের তুলনায় রাজনীতির অঙ্গণে ঐতিহ্যহীনও নয়। বরং তাদের রয়েছে আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গৌরবময় ইতিহাস। এই বাঙালী মুসলিমগণই ১৯৪৭ সালে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে প্রকাণ্ড ভূমিকম্প এনেছিল এবং পাল্টে দিয়েছিল দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র। কায়েদে আজম মুহম্মদ আলী জিন্নাহর পাকিস্তান আন্দোলনের মূল দুর্গটি ছিল বাংলায়; পাঞ্জাব, উত্তর প্রদেশ, সীমান্ত প্রদেশ, সিন্ধু বা ভারতীয় উপমহাদেশের অন্য কোন প্রদেশে নয়।

বাংলার বুকে মুসলিম লীগের জন্মই শুধু হয়নি, বরং সমগ্র ভারত মাঝে এ বাংলাতেই প্রতিষ্ঠা পায় মুসলিম লীগের প্রথম এবং একমাত্র দলীয় সরকার সিন্ধু ও পাঞ্জাবে মুসলিম লীগের সরকার প্রতিষ্ঠা পায় স্বাধীনতা লাভের পূর্ব মুহুর্তে। ১৯৪৬ সালের ১৬ই আগষ্ট জিন্নাহর ঘোষিত লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তানয়ের ডাকে সাড়া দিয়ে কলকাতার রাজপথে প্রায় ৭ হাজার বাঙালী মুসলিম প্রাণ দিয়েছিল কংগ্রেসী গুণ্ডাদের হাতে। অন্য কোন প্রদেশে সেরূপ প্রাণদানের ঘটনা ঘটেনি। বাঙালী মুসলিমদের রক্তদানের ফলে পাকিস্তানের অনিবার্যতা বুঝাতে মুহম্মদ আলী জিন্নাহকে আর কখনোই ব্রিটিশ সরকার ও কংগ্রেস নেতাদের সামনে নতুন করে উকিলসুলভ যুক্তিতর্ক পেশ করতে হয়নি। অবিভক্ত ভারতে হিন্দু-মুসলিমের একত্রে অবস্থান যে অসম্ভব -সেটি বুঝে ফেলে। ফলে ত্বরিৎ মেনে নেয় পাকিস্তান দাবীকে। বাঙালী মুসলিমগণ এভাবেই সেদিন ধুলিস্যাকরে দিয়েছিল আধিপত্যবাদী হিন্দুদের অখণ্ড ভারত নির্মাণের স্বপ্ন। কলকাতার রাজপথে তাদের রক্তদানের ফলেই দ্রুত প্রতিষ্ঠা পায় বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান। বাঙালী মুসলিমের সর্বকালের ইতিহাসে এটিই হলো তাদের সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান। পাকিস্তানের সংখ্যগরিষ্ঠ বাঙালী জনগোষ্ঠি ১৯৭১য়ে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হলেও দেশটি এখনো টিকে আছে ৫৭টি মুসলিম দেশের মাঝে সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তি রূপে যার ভাণ্ডারে রয়েছে শতাধীক পারমানবিক বোমা। ১৭৫৭ সালে পলাশীর ময়দানে বাঙালী মুসলিমগণ পরাজয় রুখতে পারেনি, কিন্তু ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার মধ্য দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ মুসলিম জনগোষ্ঠি রূপে নিজেদের দায়বদ্ধতা কিছুটা হলেও পুষিয়ে দিয়েছে।

 

নতুন দিনের আশাবাদ

শীত কখনোই চিরকাল থাকে না। শীত আসলে বসন্তের আসাটিও অনিবার্য হয়ে উঠে। তাই সেদিন বেশী দূরে নয়, দক্ষিণ এশিয়ার বুকে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশ আবারো ১৯০৬-৪৭য়ের ন্যায় রাজনীতির পাওয়ার হাউসে পরিণত হবে। সেটি ভারতসহ সকল ইসলামি বিরোধী শক্তি বুঝে। শেখ হাসিনা সে ভয় দেখিয়েই ভারত থেকে তাঁর নিজের সেবাদাসী রাজনীতির বিশাল মুজুরি দাবী করছে। দিল্লীর শাসকদের কাছে হাসিনার মূল দাবীটি হলোঃ বাংলাদেশে এবং সে সাথে সমগ্র পূর্ব-ভারতে তোমাদের স্বার্থ বাঁচাতে হলে, আমাকে বাঁচাও। বাংলাদেশের মাটিতে আওয়ামী লীগের যে বিকল্প নেই সেটিই ভারতীয় কানে বার বার ঢুকিয়ে দিচ্ছে। ভারত সে যুক্তি মেনে নিয়েই শেখ হাসিনার সরকারকে লাগাতর লাইফ সাপোর্টে রেখেছে। শেখ মুজিবকে যেভাবে তারা হারিয়েছে সেভাবে তারা হাসিনাকে হারাতে চায়। ভারতীয় লাইফ সাপোর্ট তুলে নিলে হাসিনা সরকারের যে ত্বরিৎ পতন ঘটবেতা নিয়ে বহু বাংলাদেশীর সন্দেহ থাকলেও ভারতীয়দের নেই। হাসিনাকে বাঁচাতে তাই সেনা ছাউনীসহ বাংলাদেশের আনাচে কানাচে ভারতীয় গোয়েন্দারা আস্তানা গেড়েছে। আগামী নির্বাচনে তাকে বিজয়ী করতে ভারত যে যথাসাধ্য চেষ্টা করবে তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে? হাসিনার রাজনীতির মূল ভরসা তাই বাংলাদেশের জনগণ নয়, সেটি ভারত।

বাঙালী মুসলিমগণ ১৯০৬-৪৭য়ের রাজনীতিতে যে ভূমিকম্প এনেছিল তার পিছনে বাংলার ভূমি বা জলবায়ু ছিল না; সেটি ছিল ইসলামের প্যান-ইসলামিক চেতনা এবং উমমহাদেশে মুসলিম স্বার্থরক্ষার ভাবনা। সে চেতনার বলেই বাঙালী মুসলিমগণ অবাঙালীদেরও ভাই রূপে গ্রহণ করার সামর্থ্য অর্জন করেছিল এবং কায়েদে আযমকে নেতারূপে গ্রহণ করেছিল। ফলে সম্ভব হয়েছিল বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। এক মুসলিম অন্য মুসলিমের ভাই ­তা যে অঞ্চল, যে ভাষা বা যে বর্ণেরই হোক না কেন। এ বিশেষ পরিচিতিটি মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া, সেটি অমান্য হলে কি কেউ মুসলিম হতে পারে? এমন প্যান-ইসলামিক মুসলিম ভাতৃত্বের কারণেই আরব-কুর্দি, ইরানী-তুর্কী মুসলিমগণ জন্ম দিয়েছিল সবেচেয়ে শক্তিশালী বিশ্বশক্তির। সে ভাতৃত্বের কারণে আজও উর্দু, পাঞ্জাবী, সিন্ধি, পশতু ও বেলুচ ভাষাভাষী পাকিস্তানীরা জন্ম দিয়েছে ৫৭টি মুসলিম দেশের মাঝে সবচেয়ে শক্তিশালী মুসলিম রাষ্ট্রের। অথচ এ পাকিস্তান ভেঙ্গে ৫টি বাংলাদেশের ন্যায় পৃথক পৃথক রাষ্ট্র সৃষ্টি হতে পারতো। মুসলিম জীবনে ঐক্য যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ -সেটি তো এভাবেই প্রমাণিত হয়।

তাই যে বাঙালী মুসলিমের অন্তরে সামান্য ঈমান আছে, সে কি  প্রতিবেশী আসামী, রোহিঙ্গা ও ভারতীয় মুসলিমের বেদনা ভূলে থাকতে পারে? সেটি ভূললে কি ঈমান থাকে? তাই কোন আসামী, রোহিঙ্গা বা ভারতীয় মুসলিমের গায়ে গুলি লাগলে বাঙালী মুসলিম তার বেদনা যে হৃদয়ে অনুভব করবে -সেটিই তো স্বাভাবিক। অথচ হাসিনা ও তাঁর অনুসারিদের মাঝে সে বেদনা নাই। তাদের রাজনীতিতে মুসলিম ভাতৃত্বের সে ভাবনাও নাই। তাদের মূল ভাবনাটি হলো দলীয় স্বার্থ ও ভারতীয় স্বার্থের পাহারাদারি। সে স্বার্থ বাঁচাতেই তাদের রাজনীতির মূল লক্ষ্য হলো, বাঙালী মুসলিম রাজনীতির মূল দুর্গে আঘাত হানা। তাই হামলার লক্ষ্য হলো ইসলাম ও ইসলামি চেতনা-সমৃদ্ধ ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও বই-পুস্তক। তাদের কাছে নবীজী (সাঃ)র ইসলাম যাতে রয়েছে ইসলামী রাষ্ট্র, শরিয়ত, হুদুদ, প্যান-ইসলামিক ভাতৃত্ব ও জিহাদের ধারণা, গণ্য হয় সন্ত্রাস রূপে। ইসলাম বলতে তারা বুঝে দেওবন্দি, তাবলিগী, মাজভাণ্ডারী ও কবর-পূজার ইসলাম যাতে নাই ইসলামি রাষ্ট্র, শরিয়ত, হুদুদ ও জিহাদের ন্যায় পবিত্র কোরআনের মৌল আহকামগুলি প্রতিষ্ঠায় সামান্যতম আগ্রহ। এবং নবীজী সাঃ)র ইসলাম নির্মূল কল্পে তারা শুরু করেছে রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, মিডিয়া ও ধর্ম শিক্ষার অঙ্গণে ব্যাপক সোসাল ইঞ্জিনীয়ারিং। একাজে হাসিনাকে রশদ জোগাচ্ছে শুধু ভারত নয়, বরং বহু অমুসলিম সরকার।  তাবত ভারতীয় ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে আওয়ামী লীগ যে ঘনিষ্ট পার্টনার -সেটি আজ আর গোপন বিষয় নয়। মহান আল্লাহতায়ার বিরুদ্ধে নেমেছিলেন শেখ মুজিব। তিনি কেড়ে নিয়েছিলেন ইসলামকে বিজয়ী করার সকল স্বাধিনতা। নিষিদ্ধ করেছিলেন সকল ইসলামী দল ও ইসলামী পত্র-পত্রিকা। অথচ কম্যুনিষ্ট পার্টিকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন মুসলিম ভূমিতে কম্যুনিজমের ন্যায় কুফরি মতবাদকে বিজয়ী করতে।

একই নীতি শেখ হাসিনার। তাঁর মন্ত্রী সভায় স্থান পেয়েছে চিহ্নিত ইসলামবিরোধীগণ।শেখ হাসিনা শুধু কোরআনের তাফসির, মসজিদে খোতবাদান, ইসলামি পুস্তক-প্রকাশ এবং মাদ্রাসার পাঠ্যসূচীর উপরই শুধু নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেননি, মাদ্রসাগুলিতে হিন্দু শিক্ষকদেরও নিয়োগ দিয়েছেন। সে সাথে ইসলামের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার বাড়তি নৃশংসতাটি হলো ইসলামপন্থিদের ফাঁসিতে ঝুলানোর নীতি। তবে ইসলামের বিরুদ্ধে এমন ষড়যন্ত্র নতুন নয়। ইংরেজদের হাতে অধিকৃত হওয়ার পূর্বে বাংলার এক-তৃতীয়াংশ জমি লা-খেরাজ তথা খাজানা মুক্ত ছিল। সে জমি বরাদ্দ ছিল মাদ্রাসাগুলির জন্য। কিন্তু ইংরেজগণ সে ভূমি ছিনিয়ে নিয়ে হিন্দু জমিদারদের হাতে  তুলে দেয়; ফলে বিলুপ্ত হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি। এর ফলে বাংলার মুসলিমগণ দ্রুত নিরক্ষরে পরিণত হয়। কিন্তু সকল ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে ১৯৪৭ সালে তারাই প্রকাণ্ড রাজনৈতিক ভূমিকম্পের জন্ম দেয়। কারণ, ইংরেজদের জুলুম এবং হিন্দু জমিদারদের শোষণ আমূল বিপ্লব এনেছিল তাদের চেতনায়। ভূমিকম্পের জন্ম ভূমির গভীরে; আর রাজনৈতিক ভূমিকম্প জন্ম নেয় মনের গভীরে।

বাংলাদেশের জনগণের মনের গভীরে জমেছে প্রচণ্ড আগ্নেয় লাভা। এ লাভা ঘৃণার। দিন দিন তা বেড়ে উঠছে ভারত ও ভারতীয়পন্থি স্বৈরশাসকের নৃশংসতার বিরুদ্ধে তীব্র ক্রোধ নিয়ে। আগ্নেয়গিরির ন্যায় যখন তখন তা বিস্ফোরিত হতে পারে। হাসিনার নৃশংসতা থেকে বাঁচতে লক্ষ লক্ষ বাঙালীদেশী নিজেদের ঘরবাড়ি থেকে পালিয়ে দিবারাত্র দৌড়ের উপর আছে। সে ঘৃণার আগুণে পেট্রোল ঢালছে ভারতীয় মুসলিমদের উপর হিন্দু সন্ত্রাসীদের বর্বরতা। গভীর ষড়যন্ত্র শুরু হচ্ছে আসাম থেকে ৪০ লাখ মুসলিমকে বাংলাদেশে প্রেরণ ও তাদের ভোটাধিকার, ঘরবাড়ি, জমিজমা, অর্থসম্পদ ও চাকুরি-বাকুরি ছিনিয়ে নিতে। নীল নকশার কারণে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দ্রুত জমে উঠছে ভারতবিরোধী ঘৃণার লাভা শুধু আসাম থেকেই নয়, হিন্দুত্ববাদি সরকার সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছে, পশ্চিম বাংলা থেকেও তারা অনুপ্রবেশকারি বাঙালী মুসলিমদের বাংলাদেশে তাড়িয়ে দিবে। তাদের দাবী, ভারতে মুসলিম জনসংখ্যা বাড়ছে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশের কারণে। মুসলিম ভীতি  তাদেরকে এতটাই পাগলে পরিণত করেছে যে, প্রতিটি পূর্ব-ভারতীয় মুসলিমই তাদের কাছে বাংলাদেশী মনে হয়। স্রেফ গরুর গোশত ঘরে রাখার সন্দেহে সে দেশে মুসলিমদের পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। এরূপ জালেমদের সাথে বন্ধুত্ব করা তো গুরুতর অপরাধ। সে বন্ধুত্ব জালেমকে উৎসাহিত করে আরো নৃশংস হতে। সে অপরাধ দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় রাজনীতির অঙ্গণে ঘনিয়ে আসছে ভারতবিরোধী ভূমিকম্প ভারতের এরূপ মুসলিম বিরোধী নীতিতে শেখ হাসিনা ও তাঁর দল নীরব থাকতে পারে; কিন্তু তাতে বাংলাদেশের জনগণও নীরব থাকবে? মোদীর পাশে দাঁড়ানোটি হাসিনার রাজনীতির বিষয় হতে পারে; কিন্তু বিপদে পড়া ভারতীয় মুসলিমদের পাশে দাঁড়ানোটি বাঙালী মুসলিমদের নূন্যতম ঈমানী বিষয়। সে দরদটুকু না থাকলে যে ঈমান থাকে না -সেটি হাসিনা না বুঝলেও নিরক্ষর বাঙালী মুসলিম ষোল আনা বুঝে। হাসিনার কাছে বাঙালীর ইতিহাসের শুরুটি ১৯৭১ থেকে। কিন্তু বাঙালী মুসলিমের গৌরবের ইতিহাসের সৃষ্টি তো ১৯০৪৭য়ে। ইতিহাস থেমে থাকে না। বস্তুতঃ ১৯৪৭য়ের বিজয়ের গৌরবই তাদেরকে আরেক বিজয়ে অনুপ্রাণীত করবে।

বাঙালী মুসলিম জীবনে এখন নিদারুন ক্রান্তিকাল। ভাগ্য নির্ণয়ের মুহুর্ত এখন বাঙালী মুসলিমের। এখন না দাঁড়ালে আগ্রাসী ভারত উঠে দাঁড়ানোর সামর্থ্যই বিলুপ্ত করে দিবে। দীর্ঘকাল খাঁচায় বন্দি রেখে খাঁচা খুলে দিলেও সিংহ বেড় হয় না। জনজীবনে একই অবস্থা নেমে স্বৈরশাসকের হাতে অধিকৃত হওয়ায়। তখন সমগ্র দেশ পরিণত হয় খাঁচায়। ভারত চায়, বাংলাদেশের জনগণ বেঁচে থাকুক খাঁচায় বন্দি সার্কাসের জীব রূপে। হাসিনা চায়, সে খাঁচার প্রহরী হতে। খাঁচার জীবনে মিছিল-মিটিং ও গণতন্ত্র থাকে না। প্রহরীর দায়িত্ব পেয়ে শেখ মুজিবও নিজেকে ধন্য মনে করতেন। তার হাতে ভারত ধরিয়ে দিয়েছিল ২৫ শালা দাসচুক্তির দলিল। যাদের মাথায় সামান্য ঘেলু আছে, তারা বিষয়টি বুঝে। এরূপ অবস্থায় আক্বলমন্দগণ দ্রুত কেবলা পাল্টায়। সময় থাকতে মাথা তুলে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। ফলে দেখা দেয় দ্রুত রাজনৈতিক মেরুকরণ। সেনাবাহিনী ও পুলিশের যেসব লোকেরা ভারতমুখি হাসিনাকে নিরাপত্তা দিচ্ছে, তারা যে সহসাই মত পাল্টাবে -তাতেও কি সন্দেহ আছে? স্বৈরাচার নির্মূলকালে ইরান, মিশর, তিউনিসিয়া এবং লিবিয়াতে তো সেটিই ঘটেছে। এমন কি ১৯৭৫ সালে সেটি বাংলাদেশেও দেখা গেছে। কেবলা পরিবর্তনের সে হাওয়া ইতিমধ্যেই বইতে শুরু করেছে। যারা এক সময় কাদের মোল্লার ফাঁসি চাইতো তারাই এখন হাসিনার পতন চেয়ে ময়দানে নামছে। ঢাকার রাজপথের সাম্প্রতিক কিশোর বিদ্রোহ তো সেটিরই আলামত।

এমন দেশপ্রেমিক চেতনার কারণে বাংলাদেশের মাটিতে ভারতীয় স্বার্থের পাহারাদারির রাজনীতি যে জনগণের বিরুদ্ধে অপরাধ এবং দেশদ্রোহীতা গণ্য হবে তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে? এরূপ অবস্থাতেই ক্ষোভে ও ঘৃণায় গণবিস্ফোরণ হয়। জনগণ অপরাধী ভারতীয়দের ধরতে না পারলেও তার কলাবোরেটরদের অবশ্যই হাতেনাতে ধরবে শাস্তিও দিবে একাজের জন্য বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, শিবির বা ছাত্রদল লাগবে না এক কালে যারা আওয়ামী লীগকে অন্ধভাবে সমর্থণ দিয়েছে -তারাই দ্রুত ময়দানে নেমে আসবে। নেমে আসবে অগণিত নির্দলীয় মানুষ। কারণ, বিষয়টি কোন দলের নয়, এটি সমগ্র দেশের। একাত্তরে পাকিস্তান বাঁচানোর প্রশ্নে বাঙালী মুসলিমদের মাঝে বিভক্তি দেখা দিয়েছিল; সেটি বাংলাদেশ বাঁচানো নিয়ে দেখা দিবে না। কারণ, স্বাধীন বাংলাদেশ না বাঁচলে তাদের নিজেদের স্বাধীন ভাবে বাঁচাটিও ভয়ানক বিপদে পড়বে। সেটি বুঝার সামর্থ্য এমন কি স্কুল ছাত্রদেরও আছে। সাম্প্রতিক কিশোর বিদ্রোহটি ছিল মূলতঃ সে সমঝ-বুঝেরই প্রদর্শণী। ২৩/০৯/২০১৮ Tweet:@drfmkamal; facebook.com/firozkamal

 

 




রাজনীতি যখন অপরাধের হাতিয়ার

একাকার অপরাধ-জগত ও রাজনীতির জগত

মানুষের ঈমান ও বিবেক দেখা যায় না। কিন্তু দেখা না গেলেও অজানা থাকে না। দেহের ত্রুটিকে পোষাকে ঢেকে রাখা গেলেও মনের রোগ লুকানো থাকে না। সেটি দ্রুত প্রকাশ পায় ব্যক্তির কর্ম ও আচরনে। ধরা পড়ে ন্যায়কে ভালবাসা এবং অন্যায়কে ঘৃনা করার সামর্থের মধ্য দিয়ে। আল্লাহর আইনে মানুষ গুরুতর অপরাধি হয় শুধু মুর্তি পুজার কারণে নয়। আল্লাহর বিরুদ্ধে মানুষের এটাই একমাত্র অপরাধ নয়। বরং সবচেয় বড় অপরাধটি ঘটে আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বা অবাধ্যতার মধ্য দিয়ে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা তাদেরকে কাফের,জালেম ও ফাসেক বলে অভিহিত করে। সে অবাধ্যতার ঘটতে পারে “আমিরু বিল মারুফ ওয়া নেহী আনিল মুনকার” অর্থ “ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা করো এবং অন্যায়কে প্রতিহত করো” এ কোরআনী হুকুমের অমান্য করার মধ্য দিয়েও। মু’মিন শাসক তাই ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং অন্যায়ের প্রতিরোধে আপোষহীন হয়। ন্যায়-অন্যায়ের সে সংজ্ঞাটি আসে শরিয়ত থেকে। সরকারের ঈমানদারি হলো সে শরিয়তের পূর্ণ প্রতিষ্ঠায়। একাজে নিষ্ঠা না থাকলে বুঝতে হবে,ভয়ানক রোগ আছে ক্ষমতাসীনদের ঈমানদারিতে। বার বার হজ-ওমরাহ বা নামায-রোযার মধ্য দিয়ে মুসলিম সাজা যায়,কিন্তু তাতে কি প্রকৃত ঈমানদার হওয়া যায়? ঈমানদার হওয়ার অর্থ তো, সর্বাবস্থায় আল্লাহর হুকুমের অনুগত হওয়া। ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায় নিষ্ঠাবান হওয়া। বাংলাদেশের সরকারের পক্ষ থেকে বড় অপরাধটি ঘটছে এক্ষেত্রটিতেও।

ভয়ানক খুনি ও জঘন্য অপরাধী হওয়ার জন্য জরুরী নয় যে তাকে নিজ হাতে কাউকে খুন করতে হবে বা কোন অপরাধে জড়িত হতে হবে। ফিরাউন, হিটলার বা শেখ মুজিব কাউকে নিজ হাতে কাউকে খুন করেছেন সে প্রমাণ নেই। কিন্তু হাজার মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে তাদের শাসন আমলে। এরূপ শাসকগণের চরিত্র হলো, তারা শুধু শিরক, ব্যাভিচার, সূদ-ঘুষ ও নাস্তিকতাতেই বৃদ্ধি আনে না, দ্রুত প্রতিষ্ঠা বাড়ায় ভয়ানক অন্যায়েরও। তারা অসম্ভব করেন ন্যায় বিচারকে। বাংলাদেশে অহরহ সেটিই ঘটছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি কোন খুনের মামলা দ্রুত করার জন্য হুকুম দিয়েছেন সে প্রমান নেই, কিন্তু নাটোরের চাঞ্চল্যকর গামা হত্যা মামলায় ২০ ফাঁসির আসামিকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। ক্ষমা করে দিয়েছেন লক্ষ্মীপুরের অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম হত্যা মামলার ফাঁসির আসামি বিপ্লবকে। ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও আইনজীবী আবদুর রাজ্জাক হত্যা মামলার ফাঁসির আসামি উপজেলা ছাত্রলীগ সভাপতি আহসান হাবীব ওরফে টিটুকেও। 

 

অপরাধ বিচার-রোধের

ডাকাত পাড়ায় কখনোই ডাকাতের বিচার বসে না। বরং ডাকাতির নৃশংসতা ডাকাতদের মাঝে প্রশংসিত হয়। সেখানে বরং নিরীহ মানুষের পকেটে হাত দেয়া হয়। তেমনি বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের সদস্যদের অপরাধ –তা যত ভয়ানকই হোক, তার নিয়ে বিচার বসেনা। অপরদিকে হাজার হাজার মামলা রুজু করে জেলে পাঠানো হয় হাজার হাজার বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মীদের। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের অপরাধীদের বিরুদ্ধে কয়েক হাজার মামলা করেছিল। সেগুলোও আদালতের মুখ দেখেনি, বরং ঢালাও ভাবে সেগুলো তুলে নেয়া হয়েছে। পুলিশ ও আদালত নিরপেক্ষ ভাবে কাজ করলে নিজদলীয় অপরাধীদের বিপদ। তাই অপরাধীদের দলীয় শাসন মজবুত করতে হলে অপরিহার্য হয় পুলিশ প্রশাসন  ও আদালতের গলায় রশি পড়ানো। এভাবে রুখতে হয় ন্যায়বিচারের। শেখ হাসীনা সেটি করেছেন তার পিতার দেখানো পথ ধরে। তিনি দেশের ৬৪টি জেলায় নিজ দলের প্রশাসক বসিয়েছেন যাতে তার দলের লোকেরা নিরাপত্তা পায়। তাই দেশে হাজার হাজার মানুষ খুণ হলে কিভাবে তাতে আওয়ামী লীগের কোন নেতার শাস্তি হয়নি। মুজিব আমলেও হয়নি। অথচ বহু স্থানে আাওয়ামী লীগ কর্মীরা বিরোধী দলীয় কর্মি ও নেতার খুণ ও গুম করার  সাথে জড়িত। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ কর্মীরা দিনের বেলায় অস্ত্র হাতে বিরোধীদের ধাওয়া করেছে। বহু ক্ষেত্রে হামলাকারিদের ছবিও পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। ।অথচ তাদের গ্রেফতারের জন্য পুলিশ তাদের পাড়ায় বা গৃহে একবারও তদন্তে যায়নি।

শেখ হাসিনা যখন ক্ষমতার বাইরে ছিলেন তখনও ন্যায় বিচারকে প্রতিহত করেছেন নানা ভাবে । আশির দশকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুইজন ছাত্রকে ছাত্রলীগ কর্মীরা নির্মম ভাবে হত্যা করেছিল। আদালতে তাদের বিচার হয়েছিল এবং শাস্তিও হয়েছিল। কিন্তু সে খুনের বিচার এবং খুনিদের সে শাস্তি তাঁর ভাল লাগেনি। এরশাদের সাথে যখন তাঁর প্রথম বৈঠক বসে তখন জিদ ধরেন, আলোচনার আগে শাস্তিপ্রাপ্তি খুনের আসামীদের মুক্তি দিতে হবে,নইলে কোন বৈঠক হবে না। তিনি যে ন্যায় বিচারের কতটা বিরোধী এবং খুনিদের মুক্ত করতে কতটা বদ্ধপরিকর -এ হলো তার নমুনা। দুর্বৃত্ত এরশাদেরও ন্যায়নীতি ও ন্যায়বিচারের প্রতি আগ্রহ ছিল না। তাঁর আগ্রহ ছিল শুধু নিজের গদীর দীর্ঘায়ু। তিনি ক্ষমতায় এসেছিলেন গণতন্ত্র হত্যার ন্যায় জঘন্য অপরাধ সংঘটিত করে। এমন অপরাধি কি খুনীর শাস্তিতে আপোষহীন হতে পারে? ফলে স্বৈরাচারি এরশাদ সেদিন শেখ হাসিনার দাবী মেনে নিয়ে খুনিদের মুক্তি দিয়েছিল। সে বিবরণ লিখেছেন সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী জনাব আতাউর  রহমান খান তাঁর স্মৃতিচারণ বইয়ে।

অপরাধীগণ শুধু ডাকাত পাড়ায় সীমাবদ্ধ থাকলে সমগ্র দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়না। কিন্তু তা দেশময় ছড়িয়ে পড়লে বিপন্ন হয় শান্তি-শৃঙ্খলা। আর সেটি ঘটে অপরাধীরা ক্ষমতায় গেলে। তখন দারোয়ান থেকে কর্তাব্যক্তি পর্যন্ত সমগ্র প্রশাসনই অপরাধী হয়ে উঠে। বাংলাদেশে সেটিই ঘটেছে। ফলে ডাকাতদের এখন আর দল গড়ে রাতের আঁধারে হাওর-বাওর, গ্রাম-গঞ্জ ঘুরে ডাকাতি করার ঝুকি নিতে হয় না। বরং তাতে থাকে গ্রামবাসীর প্রতিরোধে প্রাণনাশের সম্ভাবনা। তারা এখন আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগের সদস্য হয়ে দিন দুপুরে টেণ্ডার দখল করতে পারে। বনদখল, সরকারি জমি দখল, নদীদখল এবং চাঁদাবাজি করেও বিপুল অর্থ করতে পারে। এমন ডাকাতিতে যেমন অর্থলাভ প্রচুর, তেমনি সম্ভাবনা নেই প্রতিপক্ষের সামান্যতম প্রতিরোধের। বরং জুটে পুলিশ, র‌্যাব, সরকারি প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতাদের সার্বিক সমর্থন। সে সাথে বাড়ে রাজনৈতিক নেতা হওয়ার গৌরব। ফলে অপরাধী কাছে প্রবল আকর্ষন বাড়ছে এমন রাজনৈতিক পেশার। একারণেই পেশাদার অরাজনৈতিক ডাকাতদের সংখ্যা যেমন দিন দিন কমছে, তেমনি দ্রুত বেড়ে চলেছে রাজনৈতিক ডাকাতদের সংখ্যা। আর এভাবেই বাড়ছে দেশজুড়ে অপরাধীদের দখলদারি। অপরাধ জগৎ আর রাজনীতির জগৎ যেন একাকার হয়ে গেছে। ফলে সরকারি দলের কর্মীরা কোনরূপ ব্যবসা-বাণিজ্য বা চাকুরি না করেই ঢাকা শহরে বাড়ির মালিক হচ্ছে।

 

হাসিনার লক্ষ্য পিতার রেকর্ড ভাঙ্গা

দৈনিক “আমার দেশ” য়ের পরিসংখ্যানঃ ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে মহাজোট ক্ষমতায় আসার পর তিন বছরে দেশে ১২ হাজারেরও বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। সে অনুযায়ী প্রতিদিন প্রায় ১১ জন করে খুন হয়েছেন। রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ৫৯২ জন এবং আহত হয়েছেন ৪০ হাজার ১৯০ জন। চলতি বছর ইউপি নির্বাচনী সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ৮৩ জন। তবে পুলিশ সদর দফতরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ১০ হাজার ৬শ’ উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০০৯ সালে ৪২১৯ জন ও ২০১০ সালে ৪৩১৫ জন। খুনসহ ডাকাতি, দুর্ধর্ষ চুরি, অপহরণ, নারী নির্যাতন, শিশু নির্যাতন, মাদক কেনাবেচাসহ ৫ লাখেরও বেশি অপরাধের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২০০৯ সালে ১ লাখ ৫৭ হাজার ১০৮টি, ২০১০ সালে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫৩৪টি ও চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে ১ লাখ ৩৭ হাজার অপরাধের ঘটনা ঘটে। গত তিন বছরে শুধু রাজধানী ঢাকায় ৫ হাজার ৫৭৬টি বেওয়ারিশ লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা অধিকার-এর তথ্য অনুযায়ী, সরকারের ২ বছর ১১ মাসে ৪ সাংবাদিক নিহত, ২৮০ সাংবাদিক আহত, ৮৮ জন লাঞ্ছিত ও ৯৫ জন হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন। পেশা গত দায়িত্ব পালনকালে ৪০ সাংবাদিকের ওপর হামলা, দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানসহ ৩ জনকে গ্রেফতার, ১ জন অপহৃত ও ২৬ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। 

দেশে যেভাবে হত্যা-গুম-সন্ত্রাস ও দূর্নীতি বাড়ছে তাতে মনে হয় শেখ হাসিনা গোঁ ধরেছেন তিনি তাঁর পিতার রেকর্ড ভাঙ্গবেনই। বাংলাদেশের অতীতের অন্যদলীয় যে কোন সরকার এ প্রতিযোগিতায় তার ধারে কাছেও আসতে পারবে না। তাঁর পিতার আমলে তিরিশ থেকে চল্লিশ হাজারের মত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল। গ্রেফতার হয়েছিল লক্ষাধিক মানুষ। হাজার হাজার মানুষকে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল। তবে যে হারে অপরাধ কাণ্ড চলছে তাতে শেখ হাসিনা আর দুই বছর ক্ষমতায় থাকলে নিজ পিতাকে অতিক্রম করে অপরাধ কর্মে রেকর্ড অতিক্রম করতে পারবেন। তবে অপরাধ জগতের একটি ক্ষেত্রে তিনি তাঁর পিতার রেকর্ডকে ইতিমধ্যে অতিক্রম করেছেন। সেটি শেয়ার বাজারের বিনাশ। তার পিতা শিয়ার বাজার বলতে কিছু গড়ে উঠতে দেননি। আর তিনি গত তিন বছরে তাতে দুইবার মড়ক লাগিয়েছেন। ১৯৯৬ সালে যখন প্রথম বার ক্ষমতায় এসেছিলেন, তখনও শেয়ার বাজারকে রশাতলে নিয়েছিলেন।

 

আদর্শঃ মুজিবের অপরাধের রাজনীতি 


গণতান্ত্রিক শাসকের মূল কথা, নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হবে সংসদ। সে সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যগণ সরকার গঠন করবে। কিন্তু দেশের প্রশাসন ও আদালত কাজ করবে নিরপেক্ষ ভাবে। স্বৈরাচার থেকে গণতন্ত্রের এখানেই পার্থক্য। প্রশাসন ও আদালত -এ দুটি প্রতিষ্ঠানে সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হলে মৃত্যু ঘটে গণতন্ত্রের।  তখন প্রতিষ্ঠিত হয় দলীয় স্বৈরাচার। নির্বাচন তখন অর্থহীন হয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগের অপরাধ শুধু এ নয় যে, দলটির শাসনামলে দেশে হত্যা, গুম, সন্ত্রাস, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বৃদ্ধি পেয়েছিল। বরং গুরুতর অপরাধটি ঘটেছে গণতন্ত্র হত্যার মধ্য দিয়ে। গণতন্ত্র হত্যায় প্রতিপক্ষের নির্মূল সহজতর হয়। সহজতর হয় মানুষ হত্যা। স্বৈরাচারী শাসন অপরাধকর্মে যতটা আজাদী দেয়, গণতন্ত্র তা দেয় না। গণতন্ত্রে সরকারের দায়বদ্ধতা বাড়ে জনগণের কাছে। এমন ধরণের দায়বদ্ধতা নিয়ে শেখ মুজিবের কোন কালেই কোন আগ্রহ ছিল না। বাংলাদেশের ইতিহাসে শেখ মুজিব ও তার দলের অপরাধ বহু, তবে গুরুতর অপরাধ এই গণতন্ত্র হত্যা। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ আমলে যা ঘটেনি, পাকিস্তান আমলে যা ভাবা যায়নি, সেটিই ঘটেছে মুজিবামলে। পাকিস্তান আমলে মুজিব বহুবার জেলে গেছেন, কিন্তু কোনবারই তাঁকে ডাণ্ডাবেড়ি পড়ানো হয়নি। পুলিশী রিমাণ্ডে নিয়ে নির্যাতন করা হয়নি। কোন বারই তাকে লাশ হয়ে ফিরতে হয়নি। অথচ তাঁর উপর আগরতলা ষড়যন্ত্রের ন্যায় গুরুতর অভিযোগ ছিল। কিন্তু তার আমলে লাশ হয়ে ফিরেছেন শুধু মুসলিম লীগ নেতা ফজলুল কাদের চৌধুরি ও বামপন্থি সিরাজ শিকদারই নয়, বহু বহু হাজার রাজনৈতিক কর্মি।

ফ্যাসীবাদকে বুঝতে হলে বুঝতে হয় হিটলারকে। তেমনি আওয়ামী লীগের আজকের রাজনীতি বুঝতে হলে বুঝতে হবে শেখ মুজিবকে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আজ যা হচ্ছে তা মূলত মুজিবী আদর্শেরই প্রকাশ। শেখ মুজিব নিজেকে গনতন্ত্রি বলে দাবী করতেন। কিন্তু সে গণতন্ত্রে অন্যদের প্রচার, দলগঠন ও  সভাসমিতি করার অধিকার ছিল না। তাদের উপর তিনি যে শুধু সরকারি পুলিশ বাহিনী লেলিয়ে দিয়েছেন তা নয়, সরকারি বাহিনীর সাথে একযোগে কাজ করে দলীয় গুণ্ডা বাহিনীও। পুলিশের সাথে তারাও অস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্যে রাজপথে নেমেছে। জনগণের রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নিয়েছিলেন একদলীয় বাকশালী সরকার গঠনের মাধ্যমে। তাঁর গণতন্ত্রে অন্যদের স্বাধীন ভাবে কথা বলা, লেখালেখি করা বা পত্রিকা বের করার অনুমতিও ছিল না। বন্ধ করেছিলেন সকল বিরোধী মতের পত্রিকা। সে গণতন্ত্রে  স্বাধীন আদালত ও প্রশাসন বলে কিছু ছিল না। প্রশাসন দখল করতে তিনি প্রতি জেলায় নিজ-দলীয় ব্যক্তিদের গভর্নর রূপে নিয়োগ দিয়েছিলেন। আদালত ও প্রশাসনকে ব্যবহার করেছেন দলীয় এজেণ্ডা বাস্তবায়নে। আদালত থেকে বিরোধী দলীয় নেতাদের জামিন পাওয়ার পথ বন্ধ করেছিলেন। তাঁর আমলে হাজার হাজার মানুষ বিনা বিচারে বছরের পর জেলে থেকেছেন, এবং আদালত অনেককে নিছক পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষ নেয়ায় দীর্ঘ কারাবাসের শাস্তি শুনিয়েছে। ইসলামের পক্ষ নেয়াও অপরাধ গণ্য হয়েছে।আর প্রকাশ্য রাজপথে ঘুরেছে আওয়ামী লীগ ও ছাত্র লীগের চিহ্নিত খুনিরা। আজও  আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আদর্শ ও গর্ব শেখ মুজিবের সে বাকশালী স্বৈরাচার নিয়েই। হিটলারের প্রতি শ্রদ্ধার অর্থ তার ফ্যাসীবাদের প্রতি শ্রদ্ধা, তখন হিটলারের ভক্তদের রাজনীতি পরিনত হয় অন্যদের উপর নির্যাতন ও নির্মূলের হাতিয়ার রূপে। নিষ্ঠুর অপরাধীদের হাতে তখন অধিকৃত হয় পুলিশ, প্রশাসন,আদালত ও মিডিয়া। তখন লক্ষ লক্ষ্ ইহুদীর নির্মূল এবং বিরোধী রাজনীতি নিষিদ্ধকরণও তখন উৎসবযোগ্য গণ্য হয়। ফলে শেখ মুজিবের প্রতি শ্রদ্ধার সাথে বাকশালী স্বৈরাচার,অপরাধীদের শাসন ও বিরোধী কর্মীদের উপর নির্যাতন ও হত্যা নেমে না আসলে সেটি মুজিবী আদর্শ হয় কি করে? মুজিবের ভক্ত হওয়ার জন্য মুজিবের ন্যায় শুধু পোষাক পড়ল চলে না, বিরোধীদের নির্মূলে ও তাদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে তার ন্যায় অপরাধীও হতে হয়। বাংলাদেশে আজ যে মুজিবী আদর্শের অনুসারিদের শাসন -তা নিয়ে কি কোন সন্দেহ আছে?

মুজিবী আদর্শের অনুসারিরা বাড়বে অথচ অপরাধ বাড়বে না তা কি হয়?  সুন্দর মোড়কে মেকী জিনিষও মানুষের কাছে সহজে গছানো যায়। মুজিবের ন্যায় একজন অপরাধীর গায়ে “জাতির পিতা” ও “বঙ্গবন্ধু”র মোড়ক লাগানো হয়েছে সে একই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপূরণে। এটে আওয়ামী লীগের দলীয় স্ট্রাটেজী যা তারা বাংলাদেশের মানুষের ঘাড়ে চাপাতে সমর্থ হয়েছে। শেখ মুজিবকে “জাতির পিতা” ও “বঙ্গবন্ধু” করে তারা মুজিবের স্বৈরাচারি আদর্শকেই বাংলাদেশের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করতে সমর্থ হয়েছে। হিটলারকে নেতা রূপে কবুল করার কারণে তার নিষ্ঠুরতাও তাই কোটি কোটি জার্মানীর সমর্থণ পেয়েছিল। একই কারণে মুজিবের বাকশালী স্বৈরাচার যত অমানবিকই হোক বাংলাদেশে সেটিও অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। ফলে নির্বাচনে তাদের বিপুল বিজয়ও ঘটে। এবং সেটি তাঁকে “জাতির পিতা” ও “বঙ্গবন্ধু”র খেতাব দিয়ে জনগণের সামনে পেশ করার কারণে।

 

মূল লড়াইটি চেতনার মানচিত্রে

বাংলাদেশের বিপদ শুধু অপরাধীদের শাসন নয়, বরং বড় বিপদটি হলো বিপুল সংখ্যক মানুষের চেতনায় সে অপরাধীদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ। চেতনার এ এক ভয়ানক অসুস্থতা। এমন অসুস্থ্যতার কারণেই একজন মানুষ মানবতার ভয়ানক শত্রু ও প্রতিষ্ঠিত অপরাধীকেও “বন্ধু” বলতে পারে,এবং তাঁর পুত্র না হয়েও “পিতা” বলে ভক্তি দেখাতে পারে। ক্থি মুর্তিপুজা, লিঙ্গপুজা, গরুপুজা ও স্বর্পপুজা যত সনাতন অজ্ঞতাই হোক, বাংলাদেশে কোটি কোটি অনুসারি নিয়ে বেঁচে আছে তো সে কারণেই। যখন কোন মানুষ গরু,স্বর্প, মুর্তি ও লিঙ্গকে পুজা করে তখন কি বুঝতে বাঁকি সে মানুষটির বিবেক কতটা অসুস্থ্য। এমন অসুস্থ্যতা নিয়ে কি সে মানুষটি মহান আল্লাহতায়ার অস্তিত্বে বিশ্বাসী হতে পারে? ইসলাম কি তার কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়? পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা এমন অসুস্থ্য বিবেকের মানুষদের গবাদী পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট বলেছেন। গরুও আরেক গরুকে এবং স্বর্প আরেক  স্বর্পকে বা মুর্তিকে পুঁজা করে না। মানুষের বিবেক ও চেতনার মান পশু থেকেও যে কতটা নীচে নামতে পারে এ হলো তার নমুনা। হিটলারের মত অপরাধীরো ভোট পায় এবং ফিরাউনেরা ভগবান রূপে গণ্য হয়তো সে অসুস্থ্যতার কারণেই। মুজিবের ন্যায় স্বৈরাচারি অপরাধীকে যে মানুষটি “বন্ধু” ও “পিতা” বলে সম্মান দেখায়,এবং তাঁর আদর্শের প্রতিষ্ঠায় রাজনীতিতে নামে,তখন কি বুঝতে থাকে তার বিবেকের অসুস্থ্যতা কত প্রকট? এমন মানুষ যাত্রী ভর্তি বাসে আগুণ দিবে বা লগি বৈঠা নিয়ে রাজপথে মুসল্লিদের হত্যায় নামবে তাতে আর আশ্চর্যের কি আছে? হিটলারের মৃত্যু হয়েছে,সে সাথে ফ্যাসবাদও জার্মানীতে কবরস্থ হয়েছে। হিটলারের ন্যায় অপরাধী সে দেশে আর সম্মান পায় না, বরং ঘরে ঘরে ধিকৃত হয়। এর ফলে বিদায় নিয়েছে তার অনুসারিদের শাসনও। কিন্তু বাংলাদেশে তেমনটি ঘটেনি। শেখ মুজিব বিদায় নিলেও তার স্বৈরাচারি দর্শন ও রাজনীতি আজও  বেঁচে আছে। বরং তাঁর অনুসারিদের হাতেই দেশ আজ  অধিকৃত। এর ফলে বেঁচে আছে আওয়ামী অপরাধীদের শাসনও। দেশের মূল পরাধীনতা তো এখানেই। ফলে দেশকে যারা অপরাধমূক্ত এবং সে সাথে পরাধীনতামূক্ত দেখতে চায় তাদের সামনে লড়াই শুধু রাজনৈতীক নয়, বরং মূল লড়াইটি আদর্শিক। লড়াইটি হতে হবে চেতনার মানচিত্রে। জনগণের মগজে বাড়াতে হবে মুজিবের বাকশালী স্বৈরাচারকে ঘৃনা করার সামর্থ্য। তখন আওয়ামী অপরাধীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জনগণ পাবে ইম্যুউনিটি বা প্রতিরোধের ক্ষমতা। “বঙ্গবন্ধু” বা “জাতির পিতা” বলে গণতন্ত্রের দুষমনকে সম্মান দেখালে চেতনায় সে মূক্তি ঘটে না, বরং ভয়ানক ভাবে বাড়ে অপরাধীদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও অধীনতা।মানুষের কথার মধ্য দিয়ে তার ঈমান কথা বলে। আল্লাহর উপর ঈমান এ অনুমতি দেয় না, যে ব্যক্তি ইসলামের প্রতিষ্ঠা রুখতে সকল ইসলামী দলকে নিষিদ্ধ করলো,কোরআনের শিক্ষাকে সংকুচিত করলো এবং মানবিক অধিকারকে সংকুচিত করলো তাকে সে “দেশের বন্ধু” বা “জাতির পিতা” রূপে মেনে নিবে।  সে তো বরং এমন ব্যক্তির বিরুদ্ধে লড়াইকে জিহাদ রূপে গণ্য করবে। ইসলামের জিহাদ শুধু কাফেরদের বিরুদ্ধে নয়, বরং সর্বপ্রকার অপরাধীদের বিরুদ্ধেও। কোরআনে বর্নিত “ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের উৎখ্যাত” হলো সে জিহাদের মূল কথা। মুসলমান হওয়ার এ এক অনিবার্য দায়বদ্ধতা। ১৬ কোটি মুসলমানের দেশে সে জিহাদ যে হয়নি তার প্রমাণ হলো অপরাধীদের এ শাসন। তাই এ ব্যর্থতা নিছক কোন ব্যক্তি বা দলের নয়, সেটি বাংলাদেশের ১৬ কোটি মুসলমানের।  ৬/১/১২

 

 

 




বাংলাদেশে অপরাধীদের শাসন ও বর্ধিষ্ণু অসভ্যতা

অধিকৃতি অপরাধীদের

গবেষক ও কলামিস্ট জনাব বদরুদ্দীন উমর এক নিবন্ধে লিখেছিলেন, দেশে উম্মাদের শাসন চলছে। তাঁর মূল্যায়নটি সঠিক নয়। বাংলাদেশের পরিস্থিতি তার চেয়েও ভয়াবহ। উম্মাদের শাসন বললে সে ভয়াবহতার সঠিক প্রকাশ ঘটে না। উম্মাদদের দেশ শাসনের সামর্থ্য থাকে না। জেনে বুঝে অপরাধও তারা করে না। সেটি স্বেচ্ছায় এবং সজ্ঞানে করে অপরাধীরা। এটি তাই উম্মাদনা নয়, বরং নিরেট অসভ্যতা। এ অসভ্যতা রাস্তাঘাট, প্রাসাদ ও জাঁকজমক পোষাক-পরিচ্ছদ দিয়ে ঢাকা যায়। মিশরের দুর্বৃত্ত ফিরাউনগণ বহু বিস্ময়কর পিরামিড গড়েও সে অসভ্যতা ঢাকতে পারিনি। উম্মাদেরা যা করে, সেটি করে তাদের মানসিক বিকলঙ্গতার কারণে। ফলে তারা যা করে সেটি যেমন সজ্ঞানে করে না, তেমনি মটিভ নিয়েও করে না। সে সামর্থ্যও তাদের থাকে না। ফলে তারা খুন করলে বিচার হয় না। সে খুন নিয়ে গবেষণাও হয় না। কিন্তু বাংলাদেশে যারা শাসন ক্ষমতায়, তারা আদৌ উম্মাদ নয়,মটিভহীনও নয়। তাদের প্রতিটি কর্মের পিছনে রয়েছে সুস্পষ্ট রাজনৈতিক বিশ্বাস।রয়েছে সুনির্দ্দিষ্ট মটিভ,রয়েছে দীর্ঘ দিনের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি। তাদের মটিভ আদৌ কোন গোপন বিষষ নয়। সে মটিভটি তখনও সুস্পষ্ট ভাবে প্রকাশ পেয়েছিল যখন তারা সকল দলের সম্মতিতে গৃহীত নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিধিকে বিলুপ্ত করেছিল। মটিভটি তখনও গোপন থাকেনি যখন ২০১৪ সালে ভোটার বিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে। ভোটডাকাতি ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকার সে মটিভটি আবার প্রকাশ পায় ২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বরের তথাকথিত নির্বাচনে। দেশের প্রশাসন ও সরকার যখন অপরাধীদের থাকে অধিকৃত হয় তখন অন্যান্য রাজনৈতিক ও সামাজিক দুর্বৃত্তরাও আপরাধে উৎসাহ পায়। ফলে দেশে দূর্নীতির সয়লাব আসে।  এবং তারই নজির বাংলাদেশ। ফলে দেশে আজ শুধু অপরাধই বাড়ছে না, বাড়ছে অপরাধীদের সীমাহীন আধিপত্য ও দৌরাত্ম। বস্তুতঃ দেশ আজ তাদেরই দখলে। দেশের আইন-আদালত, পুলিশ, প্রশাসন,সেনাবাহিনী ও মিডিয়া নেমেছে তাদের প্রতি সহায়ক ভূমিকায়। যেমনটি ছিল ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনামলে তাদের ভূমিকা। নিরীহ জনগণ এখানে যেমন শক্তিহীন, তেমনি প্রতিরক্ষাহীন।

সভ্যতার যেমন সুস্পষ্ট মানদণ্ড আছে, তেমনি আছে অসভ্যতারও। সভ্যতার মানদণ্ড এ নয় যে, দেশ মানব-রপ্তানি, বস্ত্র- রপ্তানি, চিংড়ি-রপ্তানিতে ইতিহাস গড়বে এবং দুর্বৃত্তিতে বিশ্বে ৫ বার প্রথম হবে। সভ্যতার মানদণ্ড হলো আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ও জনগণের ব্যক্তিস্বাধীনতা। কিন্তু শত শত মানুষকে যখন বিনাবিচার হতা করা, গুম করা হয়, কেড়ে নেয়া হয় কথা বলার স্বাধীনতা এবং বিচারের নামে বিরোধীদের ফাঁসিতে ঝুলানো হয় –সেটি কি কোন সভ্যতা? এটিকে সভ্যতা বললে অসভ্যতা কোনটি? দেশে মশামাছি যখন বাড়ে তখন রোগভোগও বাড়ে। কারণ, মশামাছি কখনই একাকী আসেনা, সাথে নানারূপ রোগভোগও আনে। তেমনি অপরাধীরা যখনক্ষমতা পায় তখন বাড়ে অপরাধ। দৃর্গন্ধের ন্যায় তাদের দুষ্কর্মও পরিবেশকে বিষিয়ে তোলে। দৃর্গন্ধময় আবর্জনার উপস্থিতি অন্ধব্যক্তিও টের পায়। তেমনি দেশ অপরাধ কর্মে ভরে গেলে সেটি বুঝতে কি বাঁকি থাকে দেশ কাদের দখলে? ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ জোটের ক্ষমতায় আসার পর তিন বছর ধরে দেশে অপরাধকর্মের সুনামী শুরু হয়েছিল। তখন দৈনিক “আমার দেশ” পত্রিকা ২৬শে ডিসেম্বর (২০১১সাল) সংখ্যায় সরকারের তিন বছরের অপরাধ কর্মের একটি রিপোর্ট ছেপেছিল।  লিখেছিল, সে তিন বছরে খুন হয়েছিল ১২ হাজার, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল ৩৫৯টি এবং গুম হয়েছিল ১০০ জন। সাংবাদিক নিহত হয়েছিল ৪ জন এবং গ্রেফতার হয়েছিল ৩ জন। বিভিন্ন স্থান থেকে সাদা পোশাকধারীদের হাতে আটক প্রায় ১শ’ জনের খোঁজ মেলেনি,তারা চিরতরে হারিয়ে গেছে এদেশের বুক থেকে। পত্রিকাটি আরো রিপোর্ট করেছিল, রাজধানী ঢাকাতেই চলতি বছর গুম হয়েছিলের ৩০ জন। ১৬ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছির নদী, হাওর ও জঙ্গল থেকে। গুম হয়ে যাওয়া বিএনপি নেতা ও ঢাকার ৫৬ নং ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলমেরও কোনো হদিস মেলেনি। ভয়ানক দুশ্চিন্তার আরো কারণ হলো, সরকার মুক্তি দিয়েছে ২২ জন ফাঁসির আসামীকে। কারণ, সে অপরাধীগণ ছিল সরকারি দলের। ফলে সরকারের অবস্থানটি সুস্পষ্ট। তাদের অবস্থানটি অপরাধীদের পক্ষে। অপরাধীগণও আইন-আদালত থেকে নিজেদের বাঁচাতে দলে দলে সরকারি দলের সেপাহীতে পরিণত হচ্ছে।

 

বন্দুকের নল জনগণের বিরুদ্ধে

বিপদের আরো কারণ, জনগণ শুধু খুনি, সন্ত্রাসী ও পেশাদার দুর্বৃত্তদের হামলার শিকারই নয়,অপরাধ দমনের নামে যেসব সরকারি বাহিনীকে ময়দানে নামানো হয়েছে তাদের বন্দুকের নলও এখন জনগণের দিকে। আপনজন–হারা পরিবারগুলোর অভিযোগে র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটিলিয়ন তথা র‌্যাবের বিরুদ্ধে। র‌্যাব হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে ক্রসফায়ারের নামে। আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকাকালে ক্রসফায়ারের কঠোর বিরোধিতা করছিল। কিন্তু এখন সেটি ভূলে গেছে। র‌্যাবের মধ্যে অপরাধীদের সংখ্যা দুয়েক জন নয়, শত শত। দৈনিক “আমার দেশ’য়ে প্রকাশ, র‌্যাবের দেয়া তাদের নিজস্ব পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১০ সালের মাত্র এক বছরেই র‌্যাবের ৭৫৬ জন সদস্যের বিরুদ্ধে নানা অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এটি এক বিশাল সংখ্যা। এদের মধ্যে ৩১৪ সদস্যকে গুরুদণ্ড, ৩১০ জন লঘুদণ্ড এবং ১৩২ জনকে স্ব-স্ব হিনীতে ফেরত পাঠানো হয়েছে। অর্থাৎ যে শরিষা ভূত ছাড়াবে তার মধ্যেই এখন ভূতের বাসা।

খুন শুধু রাতের আঁধারে হচ্ছে না, মানুষ খুন হচ্ছে দিনেদুপুরে এবং প্রকাশ্য রাজপথে।সরকারি বাহিনীর হাতে কেউ খুন হলে কি সে খুনের বিচার হয়? র‌্যাব বা পুলিশের বিরুদ্ধে কেস করতে থানায় যাবে, সে সাহস ক’জনের? যেন জঙ্গলের অরাজকতা। জঙ্গলে হিংস্র পশুর হাতে কেউ নিহত হলে সে পশুর বিরুদ্ধে কোন পুলিশই তদন্তে নামে না। আদালতও সমন জারি করে না।ফলে তা নিয়ে কোন বিচারও বসে না। বাংলাদেশে সে শিকারী জন্তুটির স্থানটি নিয়েছে পুলিশ,র‌্যাব ও সরকারি দলের গুণ্ডারা। র‌্যাব ও পুলিশ পরিণত হয়েছে দেশের সবচেয়ে সংগঠিত সন্ত্রাসী প্রতিষ্ঠানে। এদের হাতে সংগঠিত হত্যাকাণ্ডকে বলা হচ্ছে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। সভ্য দেশে হত্যার প্রতিটি ঘটনাই গুরুতর অপরাধ। তাই প্রতিটি হত্যাকাণ্ডেরই বিচার হয়, কঠোর শাস্তিও হয়। বিচারের আগে খুনিদের উপর থেকে মামলা তুলে নেয়া মহাপরাধ। হত্যা হত্যাই – কোন হত্যাকে বিচারবহির্ভূত করে তাকে আলাদা মর্যাদা দেয়ার বিধান কোন সভ্য দেশে নেই। বাংলাদেশের সরকারি খুনিবাহিনীর এ এক নব্য আবিস্কার। ভাবটা এমন,এরা জঘন্য অপরাধী,বিচার হলে এদের প্রাণদণ্ড হতোই। তাই কে নেয় তাদের গ্রেফতার, এবং গ্রেফতার শেষে বিচারে অপরাধি প্রমাণের ঝামেলা? তাই সরকারি বাহিনী কাজ হয়েছে,বিচারের আগে তাদের হত্যা করা! খুনের মত একটি গুরুতর অপরাধকে এভাবে তারা লঘুতর করে নিয়েছে। এমন খুনের কাজ প্রথমে শুরু করেছিলেন স্বয়ং শেখ মুজিবুর রহমান, এবং সেটি সিরাজ সিকদারের হত্যার মধ্য দিয়ে। আওয়ামী লীগ মুজিবের সে ধারাকে সযত্নে শুধু ধরেই রাখেনি, তীব্রতরও করেছে।

অথচ সভ্য সমাজে গুরুতর অপরাধীরও বিনা বিচারে হত্যা করার অধিকার কারো থাকে না, এমন কি দেশের রাজা বা রাষ্ট্রপ্রধানেরও থাকে না। এটি এক নিরেট সন্ত্রাস। নিহত ব্যক্তিটি তখন লাশ হয়ে বিদায় নেয়। রাষ্ট্রের জীবিতদের থেকে সে আর কোনদিন পানাহার চাইবে না, অর্থও চাইবে না। কিন্তু জীবিতদের কাছে তার একমাত্র চাওয়াটি হলো,খুনির শাস্তি। বিচারের সে দায়ভার রেখে যায় জীবিতদের কাঁধে। সভ্যদেশে জনগণের পক্ষ থেকে নিহতদের প্রতি সে দায়ভারটি পালন করে সরকার। সে দায়ভারটি যথার্থ ভাবে পালিত না হলে খুনিরা প্রশ্রয় পায়, তাতে প্রতিষ্ঠিত পায় খুনের কালচার। বাংলাদেশে তো সেটিই হয়েছে। প্রলয়ংকরি প্লাবন ঠেকাতে হলে সরকারকে বহু কোটি টাকা ব্যয়ে বাঁধ দিতে হয়, নইলে লাখ লাখ মানুষের প্রাণ বাঁচে না। তেমনি দেশে খুনের সয়লাব ঠেকাতে হলে যত অর্থব্যয়ই হোক খুনিদের বিচার করতে হয়। এমন খুনের বিচারের উদাহরণ সৃষ্টি হয় ৩/০১/১২ তারিখে লন্ডনের এক আদালতে। সেদিন থেকে ১৮ বছর আগে স্টেফেন লরেন্স নামে এক কৃষ্ণাঙ্গ যুবক দক্ষিন পূর্ব লন্ডনের এক রাস্তায় বর্নবাদী হামলায় নিহত হয়েছিল। সে হত্যার তদন্ত ও বিচার হয়েছে তিনবার। প্রথম দুইবারে অপরাধীকে সনাক্ত করতে পুলিশ ব্যর্থ হয়েছিল। কিন্তু আদালত হাল ছাড়েনি। খুন যখন ঘটেছে, খুনিও নিশ্চয় আছে। অতএব খুঁজে বের করতেই হবে। শেষ বারে দুইজন খুনিকে সনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে এবং আদালত তাদের শাস্তিও দিয়েছে। শুধু তদন্ত কাজে ব্যয় হয়েছে ৪০ লক্ষ পাউন্ড -যা প্রায় ৫০ কোটি টাকার সমান। রাষ্ট্রের এ বিনিয়োগ শুধু একটি খুনের বিচারে নয়,বরং লক্ষ লক্ষ মানুষকে খুনিদের হাত থেকে বাঁচানোর তাগিদে। লন্ডনের রাস্তায় গভীর রাতে মহিলাও রাস্তায় একাকী নামতে পারে তো সে বিনিয়োগের কারণেই। রাষ্ট্রে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিছক রাস্তাঘাট, কল-কারখানা বা স্কুল কলেজ নির্মানে বাড়ে না। বাড়ে সুবিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। ইসলামে একাজ ফরজ। বিচারক এ মামলার রায়ে বলেছেন,খুনের সাথে আরো ব্যক্তি জড়িত ছিল,অতএব পুলিশকে অন্য খুনিদের খুঁজে বের করা। ফলে পুলিশের কাজ এখনও শেষ হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশের আদালতে ন্যায় বিচার মারা পড়েছে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতাদের হাতে। কোন খুনের মামলার বিচার হবে কি হবে না সে সিদ্ধান্ত নেয় রাজনৈতিক নেতারা। নিজ দলের নেতাকর্মীদের বাঁচাতে তদন্তের আগেই খুনের মামলা যেমন তুলে নেয়া হয়, তেমনি সাজাপ্রাপ্ত খুনিদের ছেড়েও দেয়া হয়। নেতারা শুধু আইনবহির্ভূত হত্যার নির্দেশই দেন না, তেমন হত্যা নিয়ে বুক ফুলিয়ে গর্বও করেন। যেমন সিরাজ শিকদারের হত্যার পর শেখ মুজিব সংসদে তাই বুক ফুলিয়ে বলেছিলেন, “কোথায় আজ সিরাজ শিকদার।” শেখ হাসিনার নিজেই বলেছেন এক খুনের বদলে দশ খুন করতে। পুলিশ ও আদালত পরিনত হয়েছে রাজনৈতিক হাতিয়ার। পুলিশের কাজ হয়েছে,সরকারের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে গ্রেফতার করে রিমাণ্ডে নিয়ে পেটানো। আদালতের কাজ হয়েছে,বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের রিমোণ্ডের নামে পুলিশের হাতে তুলে দেয়া এবং তাদের কারারুদ্ধ করার ব্যবস্থা করা। বাংলাদেশে প্রতিবছর বহু হাজার খুন হয়, কিন্তু কটি খুনের তারা বিচার করতে সমর্থ হন? ক’জনেরই বা শাস্তি দেন? শত  শত খুনী যেখানে প্রকাশ্যে ঘুরছে, তাদের না গ্রেফতার না করে রাজনৈতিক বিরোধীদের শায়েস্তা করার মতলবে বছরের পর গ্রেফতার করে তাদের বিরুদ্ধে মামলা, মামলার সাক্ষিসাবুদ ও নথিপত্র তৈরি এবং পুলিশী রিমাণ্ডে নিয়ে নির্যাতন করাটি রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেমনটি হচ্ছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে । ফলে আদালত ভরে উঠেছে হাজার হাজার মিথ্যা মামলায়। বাংলাদেশে জীবিতরা যেমন বঞ্চিত হচ্ছে বেঁচে থাকার অধিকার থেকে,তেমনি মৃতরা বঞ্চিত হচ্ছে ন্যায় বিচার থেকে। অথচ নিহতদেরও বেঁচে থাকার ন্যূন্যতম মানবিক অধিকার ছিল। খুনির হাতে অহরহ ছিনতাই হচ্ছে সে অধিকার। মানব জীবনে এটিই সবচেয়ে বড় ছিনতাই। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি কাউকে (বিনা বিচারে) হত্যা করে সে যেন সমগ্র মানব জাতিকে হত্যা করলো। আইনের দৃষ্টিতে এটিই সবচেয়ে বড় অপরাধ। আর সরকারের সবচেয়ে বড় অপরাধ হলো সে হত্যাকাণ্ডের বিচার না করা। র‌্যাবের হাতে বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং সে হত্যার বিচার না করে বাংলাদেশের সরকার সুস্পষ্ট জড়িত উভয় অপরাধের সাথেই।

 

প্রশাসন জিম্মি খুনিদের হাতে

দালান-কোঠা, রাস্তাঘাট,কলেজ-­বিশ্ববিদ্যালয় বা কলকারখানার কমতি থাকলেও সে সমাজকে অসভ্য বলা যায় না। নবীজী (সাঃ)র সময় দালান-কোঠা,রাস্তাঘাট, বিশ্ববিদ্যালয় বা কলকারখানায় বিল্পব আসেনি। কিন্তু মানুষ পেয়েছিল মানবিক অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকার পূর্ণ অধিকার, পেয়েছিল ন্যায় বিচারের অধিকার। হাজার হাজার টাকা ব্যয়ে তখন বিচার কিনতে হতো না। বরং বিনা খরচে সুবিচার নিশ্চিত করাটি ছিল সরকারের মূল দায়িত্ব।কোন মানুষ যখন মুসলমান হয় তখন সে নামায-রোযা পালন করে। সে ব্যক্তিটি যদি রাষ্ট্রক্ষমতা হাতে পায় সে তখন ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করে। এতেই ঈমানের পরিচয়। হাতে তসবিহ, মাথায় পটি, ঘন ঘন মাজার জিয়ারত এবং ওমরাহ পালনে ভণ্ডামিও থাকতে পারে। অপরাধী ব্যক্তি শাসক হলে সুবিচার প্রতিষ্ঠায় যেমন তার আগ্রহ থাকে না, তেমনি সামর্থ্য থাকে না অন্যায় ও অপরাধকে ঘৃনা করার।অথচ একটি জাতি কতটা সভ্য বা অসভ্য তার বিচার হয় অপরাধীদের প্রতি ঘৃনা ও তাদের বিরুদ্ধে বিচারের আয়োজন দেখে। অথচ বাংলাদেশের সরকারের তা নিয়ে ভাবনা নেই। বিচারের আয়োজনও নেই। র‌্যাব ও পুলিশের হাতে প্রতি বছর বহুশত মানুষের মৃত্যূ ঘটে। হাজার হাজার মানুষ নিহত হচ্ছে রাজনৈতিক গুণ্ডা এবং সন্ত্রাসীদের হাতে। কিন্তু তা নিয়ে বিচার নেই। বরং সরকার ব্যস্ত খুনিদের মাফ করে দেয়ায় এবং তাদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা তুলে নেয়ায়। একটি সরকারের জন্য এর চেয়ে বড় অপরাধ আর কি হতে পারে? অথচ এরূপ অপরাধীদের হাতেই দেশ আজ জিম্মি।

সরকার জানে, নিহতগণ কোনদিনই তাদের বিরুদ্ধে কৃত নৃশংস খুনের ঘট্না নিয়ে মিছিল করবে না, ভোট দিতেও আসবে না। কোনদিনই তারা আদালতে বিচার নিয়েও আসবে না। তারা তো চিরকালের জন্য হারিয়ে গেছে। কিন্তু ভোট দিবে এবং নির্বাচনী বিজয়ে সাহায্য করবে তো পুলিশ, র‌্যাব ও দলীয় গুণ্ডা বাহিনী। ফলে তাদের শাস্তি দিলে তার পক্ষে লাঠি ধরবে কে? নির্বাচন কালে বিরোধীদের দমন এবং তাঁর পক্ষে জাল ভোটের আয়োজনই বা কে করবে? রাজনৈতিক স্বার্থটাই এখানেই বড়। ফলে গুরুত্ব পাচেছ নিহতদের কথা ভূলে খুনিদের নিয়ে ক্ষমতায় থাকার রাজনীতিকে মজবুত করা। ফলে খুনিরা পরিনত হয়েছে রাজনৈতিক যুদ্ধের অবৈতনিক সৈনিকে। ফলে খুনিদের গ্রেফতার ও তাদের বিচারের বিষয়টি আস্তাকুঁড়ে গিয়ে পড়েছে। এ এক নিদারুন জিম্মিদশা।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী আওয়ামী লীগ শাসনের ২০০৯, ২০১০ ও ২০১১ সালের নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় তিন বছরে (৩৫ মাসে) ৩৫৯ জন ব্যক্তি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে নিহত হন। এর মধ্যে রয়েছেন ২০০৯ সালে ১৫৪ জন, ২০১০ সালে ১২৭ জন ও ২০১১ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে ৭৮ জন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০৪ সালে র‌্যাবের যাত্রা শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত র‌্যাবের বিরুদ্ধে ৭০০ লোককে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। পুলিশের বিরুদ্ধেও অভিযোগ বিস্তর। হরতাল চলাকালের জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুকের ওপর পুলিশের নির্মম নির্যাতন করে। গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাতে আটক হয়ে প্রাণ হারান বিশিষ্ট আইনজীবী এম.ইউ. আহমেদ। বিএনপি নেতা ও ডিসিসির সদ্য বিদায়ী মেয়র সাদেক হোসেন খোকাকে পুলিশের সামনে দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাত, দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে আটক করে অন্ধকার প্রকোষ্ঠে রেখে নির্মম নির্যাতন ও বস্ত্রহীন করা –এগুলো হলো অতি ন্যক্কারজনক ঘটনা। গ্রেফতার করে নিয়ে সরকারি বাহিনী দীর্ঘ দিনের জন্য শয্যাশায়ী ও পঙ্গু করেছে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর পুত্র তারেক জিয়াকেও। যেদেশে নেতৃস্থানীয় লোকদেরই মানবাধিকারের এরূপ অবস্থা সে দেশে সাধারণ মানুষ যে কতটা অসহায় সেটি কি বুঝতে বাঁকি থাকে? পেশাদার অপরাধীরা আজ আর শুধু ডাকাত পাড়া ও সন্ত্রাসীদের দলে নয়, স্থান করে নিয়েছে পুলিশ বাহিনী ও র‌্যাবের দলে এবং সুযোগ পেলেই তারা মানুষ শিকার করছে। কথা হলো, দেশের রাজনীতি, পুলিশ ও প্রশাসনের মাঝে যখন এরূপ অপরাধের কালচার, তাতে কি কখনো সভ্যসমাজ গড়ে উঠে? তাতে বরং তীব্রতর হয় অসভ্যতা।

 

সরকারের মূল কাজঃ জাহান্নামের আগুণ থেকে জনগণকে বাঁচানো 

জনজীবনে রাষ্ট্রের প্রভাব অপ্রতিরোধ্য। কারণ, দেশের ড্রাইভিং সিটে থাকে সরকার। দেশ কোন দিকে যাবে সেটি নির্ধারণ করে ক্ষমতাসীন সরকার। তাই কোন সভ্য সরকারের কাজ শুধু রাস্তাঘাট, কলকারখানা, দালান-কোঠা ও ব্যবাসা-বাণিজ্যে উন্নয়ন আনা নয়; বরং জনগণকে দুর্বৃত্তদের সৃষ্ট আযাব ও অসভ্যতা থেকে মুক্তি দেয়া। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বটি হলো পরকালে জাহান্নামের আগুণ থেকে তাদেরকে মুক্তি দেয়া এবং জান্নাতের পথে নেয়া । এজন্য জরুরী হলো, রাষ্ট্রীয় অর্থ ও বিশাল অবকাঠামোকে কাজে লাগিয়ে ব্যাপক সোসাল ইঞ্জিনীয়ারিং। এ জন্য জরুরী হলো, উপযোগী ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতি। সে মহান মিশনকে সফল করতেই রাষ্ট্র-প্রধানের আসনে খোদ মহান নবীজী (সাঃ) বসেছিলেন। এভাবেই তিনি শিখিয়ে যান রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার আসনে সমাজের সবচেয়ে যোগ্য ও ন্যায়পরায়ন ব্যক্তিকে বসানো কতটা গুরত্বপূর্ণ। তাই তাঁর ইন্তেকালের পর সে আসনে বসেছিলন শ্রেষ্ঠ সাহাবাগণ।মুসলিমদের হাতে সে আমলে মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা গড়ে উঠার মূল কারণ তো এটি। এ আসনে দুর্বৃত্তকে বসানো হারাম। সেটি হলে রাষ্ট্রে দুর্নীতির জোয়ার আসে।

প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রপ্রধানের যে আসনে বসেছিলেন খোদ নবীজী (সাঃ) ও তাঁর মহান সাহাবীগণ -সে আসনে ভোট-ডাকাত, দুর্বৃত্ত ফ্যাসিস্ট ও কাফেরশক্তির দাসদের বসিয়ে কি সভ্য-সমাজ নির্মাণের স্বপ্ন দেখা যায়?  বরং তারা যেটি করে তা হলো, জনগণকে জাহান্নামে নেয়ার জন্য প্রবল সোসাল ইঞ্জিনীয়ারিং। একাজে তারাও ব্যবহার করে দেশের শিক্ষা-সংস্কৃতি ও প্রশাসনিক অবকাঠামো। এজন্যই ইসলামে সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত হলো জনগণকে দুর্বৃত্ত জালেম সরকার থেকে মুক্তি দেয়া ও ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ। ইসলামে এটিই হলো জিহাদ। সে সমাজে ইসলামী রাষ্ট্র নাই এবং জনজীবনে জিহাদ নেই সে সমাজে প্রবলতর হয় জাহান্নামের পথে চলার স্রোত। স্রেফ নামায-রোযা ও তাসবিহ-তাহলিল দিয়ে সে স্রোতের টান থেকে নিজেকে বাঁচানো অতি কঠিন। ২/৩/২০১৯      




বাংলাদেশ সরকারের বিদ্রোহ ও জনগণের দায়ভার

বিদ্রোহ শুধু প্রজারাই করে না। গুরুতর বিদ্রোহ হতে পারে খোদ সরকারের পক্ষ থেকেও। সেটি যেমন হতে পারে জনগণের সাথে কৃত ওয়াদার বিরুদ্ধে, তেমনি হতে পারে সর্বময় ক্ষমতার মালিক মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধেও। বাংলাদেশ সরকারের দ্বারা এমন বিদ্রোহ হচ্ছে বস্তুত উভয় ক্ষেত্রেই। এবং সেটি কিভাবে এবং কতটা গুরুতর ভাবে হচ্ছে সেটিই এ প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয়। আদালতের রায়, দেশের আইন বা শাসনতন্ত্রের বিরুদ্ধে কেউ বিদ্রোহ করলে বা “মানবো না বললে” তার বিরুদ্ধে তৎক্ষনাৎ পুলিশ ও গোয়েন্দা ছুটে আসে। গ্রেফতার করে তাকে আদালতে দাঁড় করায়। আদালত তাকে শাস্তি দিয়ে জেলে পাঠানো। বিদ্রোহটি গুরুতর হলে অপরাধীকে ফাঁসীতে ঝুলিয়ে বা গুলি করে হত্যা করা হয়। বিশ্বের কোন দেশের সরকারই বিদ্রোহীদের প্রতি সদয় নয়। কারণ, সেটি হলে রাষ্ট্র টেকে না। তাই বিদ্রোহ দমনে পুলিশ ব্যর্থ হলে সেনাবাহিনী তলব করা হয়। এটাই বিশ্বের সকল রাষ্ট্রের নীতি। তেমনি এক গুরুতর অপরাধ হল আল্লাহ ও তাঁর আইনের বিরুদ্ধে অবাধ্যতা বা বিদ্রোহ। আল্লাহর বিরুদ্ধে এরূপ বিদ্রোহের শাস্তিও অতি কঠোর। মহান আল্লাহ শুধু নামায-রোযা, হজ-যাকাতের বিধানই দেননি, সুস্পষ্ট বিধান দিয়েছেন সম্পদের বন্ঠন, চুরি-ডাকাতি, জ্বিনা ও খুনের ন্যায়ের নানাবিধ অপরাধের শাস্তির। সে বিধান পবিত্র কোরআনে সুস্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ। ইসলামে এটিই হল শরিয়ত।

দেশে রাস্তাঘাট, কলকারখানা, স্কুল-কলেজ বা হাসপাতাল কোথায় নির্মিত হবে তা নিয়ে দেশবাসী মাসের পর মাস বা বছরের পর বছর বিতর্ক করতে পারে। পবিত্র কোরআনে যে সব বিষয়ে কিছু বলা হয়নি বা নির্দেশ আসেনি, মানুষের অধিকার রয়েছে তা নিয়ে বিষদ বিশ্লেষণের। কিন্তু যে বিধান বা আইন পবিত্র কোরআনে বলে দেয়া হয়েছে সেক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র বিতর্কের সুযোগ নেই। তখন ঈমানদারের দায়িত্ব হয়,“সামি’না ওয়া তায়ানা” অর্থঃ ‘শুনলাম ও মেনে নিলাম’ বলা। আল্লাহর আইন বা হুকুমের গুাণাগুণ নিয়ে বিতর্কের অর্থই হল, আল্লাহর জ্ঞান ও বিচার শক্তি নিয়ে সন্দেহ। সে আইন না মানার অর্থ হল আল্লাহর আইনের বিরুদ্ধে অনাস্থা ও বিদ্রোহ। মুসলিম রাষ্ট্রে এমন বিদ্রোহীর বিরুদ্ধে বিচার এবং বিচার শেষে শাস্তি প্রয়োগ করা সরকারের অন্যতম দায়িত্ব। মুসলিম দেশের সরকারের উপর এটিই সবচেয়ে বড় আমানত। সে দায়িত্বপালনে অসমর্থ হলে বৈধতা হারায় সরকার। সরকারের বৈধতা নিছক নির্বাচনী বিজয়ের মধ্যে নয়, বরং সেটি হল পবিত্র আমানতের দায়ভার বহনের সামর্থ। নির্বাচনী বিজয় তো অর্থব্যয় ও ধোকাবাজীতেও সম্ভব। খেয়ানতকারী যত জনপ্রিয়ই হোক তাকে দেশ শাসনের অব্যাহত অধিকার দিলে দেশ বিপন্ন হতে বাধ্য। লিন্দুপ দর্জির ন্যায় যারা সিকিমকে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিল তারাও এক সময় জনপ্রিয় ছিল, নির্বাচনে জয়ীও হয়েছিল। বাংলাদেশকে যিনি ২৫ সালা দাসচুক্তির মাধ্যমে ভারতের হাতে তুলেছিলেন ও গণতন্ত্রকে কবরে পাঠিয়েছিলেন তিনিও বিপুল ভোটে নির্বাচনে জিতেছিলেন। জনগণের বিরুদ্ধে নির্বাচিত সরকারের বিদ্রোহ ও গাদ্দারী যে কতটা জঘন্য হতে পারে এ হল তার নজির। তারা একই ভাবে বিদ্রোহী হতে পারে মহান আল্লাহর স্বার্বভৌমত্ব ও তাঁর আইনের বিরুদ্ধে। আল্লাহর আইনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ নবীজী (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামের আমলেও হয়েছে। তবে তার শাস্তিও হয়েছে। হযরত আবু বকর (রাঃ)য়ের আমলে কিছু লোক যাকাত দিতে অস্বীকার করেছিল। সে অপরাধে তাদের প্রাণদন্ড দেয়া হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশের সরকার আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের কি শাস্তি দিবে? তারা নিজেরাই তো বিদ্রোহী। কাফের হওয়ার অর্থ শুধু মুর্তিপুজা নয়। বরং সেটি আল্লাহর আইনের বিরুদ্ধে যে কোন বিদ্রোহ। পবিত্র কোরআনে যেমন বলা হয়েছে, “আল্লাহ যে বিধান অবতীর্ণ করেছেন সে অনুযায়ী যারা ফায়সালা করে না তারা কাফের।” -সুরা মায়েদা, আয়াত ৪৪।

প্রজারূপে যেমন প্রতিটি মুসলমানের কিছু দায়-দায়িত্ব থাকে, তেমনি গুরুতর দায়িত্ব পালন করতে হয় শাসক রূপেও। এসব ক্ষেত্রে সামান্যতম অবাধ্যতা বা বিদ্রোহ চলে না। মুসলমান হওয়ার অর্থ সর্বাবস্থায় মুসলমান হওয়া। প্রজারূপে যেমন, তেমনি সরকার-প্রধান রূপেও। অথচ এখানেই বাংলাদেশ সরকারের মূল সমস্যা। তারা নিজেদের মুসলমান রূপে দাবী করে। নির্বাচন কালে কোরআন ও সূন্নাহর বিরুদ্ধে কোন রূপ আইন প্রণয়ন হবে না সে ওয়াদাও করে। কিন্তু বাস্তবে করে উল্টোটি। নিজ ওয়াদার বিরুদ্ধে তারা নিজেরাই বিদ্রোহ করে। আল্লাহর বিধানের প্রতি বাংলাদেশ সরকারের যে সামান্যতম শ্রদ্ধাবোধ নাই, এবং সে আইন মানতেও যে তারা রাজী নয় -সম্প্রতি সেটিই আবার প্রকান্ড ভাবে প্রকাশ পেল। এবং সেটি গত ৭ই ফেব্রেয়ারী সরকারের মন্ত্রীসভায় গৃহীত সিদ্ধান্তে। সরকার ‘নারী উন্নয়ন নীতিমালা ২০১১’ নামে গৃহীত সিদ্ধান্তটি হল, মৃত পিতার রেখে যাওয়া সম্পদে তার পুত্র ও কন্যারা সমান অধিকার পাবে। সরকারের ও ঘোষণাকে আল্লাহর আইনের প্রতি আত্মসমর্পন বলা যায় না, বরং সেটি সুস্পষ্ট বিদ্রোহ। পিতার মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়ার সম্পত্তির কে কতটা পাবে তা নিয়ে ইসলামে কোন অস্পষ্টতা নেই। কোরআনে নামাযের বিধান এসেছে। কিন্তু কোন ওয়াক্তে কত রাকাত নামায পড়তে হবে, রুকু সিজদা কতবার হবে, কখন কি পাঠ করতে হবে -সে বিষয়ে পবিত্র কোরআনে কোন ঘোষণা নেই। সে খুঁটিনাটি বিষয়গুলো শিখতে হয় নবীজী(সাঃ)র সূন্নত থেকে। ইসলামে পবিত্র কোরআনের পাশাপাশি হাদীসের গুরুত্ব তাই অপরিসীম। কিন্তু পিতার মৃত্যুর পর তার সম্পদ কীভাবে বন্টন করতে হবে সে বিষয়টি তিনি নবীজীর উপর ছেড়ে দেননি। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা সেটি স্বয়ং অতি বিস্তারিত ভাবে জানিয়ে দিয়েছেন। সেটি হল,“আল্লাহ তোমাদের সন্তান সম্বন্ধে নির্দেশ দিচ্ছেনঃ এক পুত্রের অংশ দুই কন্যার সমান। …..এ হল আল্লাহর নির্ধারিত সীমা (হুদুদুল্লাহ)। কেহ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করলে আল্লাহ তাঁকে জান্নাতে দাখিল করবেন। যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত; সেখানে তাঁরা স্থায়ী হবে এবং এটি মহা সাফল্য। আর যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্য হল এবং তার নির্ধারিত সীমা লংঘন করল, তিনি তাকে আগুণে নিক্ষেপ করবেন। সেখানে সে স্থায়ী হবে এবং তার জন্য লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি রয়েছে।”-(সুরা নীসা ১১-১৪)। বাংলাদেশ সরকারের অপরাধ, করুণাময় মহান আল্লাহতায়ালার কাছে আত্মসমর্পণের বদলে তারা তাঁর বিধানকেই অবিচারমূলক রূপে রহিত করল।

হুদুদুল্লাহ ইসলামের একটি বিশেষ পরিভাষা। হুদুদ শব্দটির অর্থ সীমানা। আল্লাহতায়ালা ঈমানদারদের জন্য সিদ্ধ-অসিদ্ধ, হারাম-হালালের একটি সুর্নিদ্দিষ্ট সীমানা নির্ধারন করে দিয়েছেন। মুসলমান হওয়ার অর্থ হল, নির্ধারিত সে সীমানার মধ্যে অবস্থান করা। সে সীমানার বাইরে যাওয়ার অর্থ ইসলাম থেকে বের হয়ে যাওয়া। এবং সে সীমানা থেকে বের হয়ে যাওয়ার শাস্তি হল জাহান্নাম। ফলে মুসলমানগণ যেখানে ঘর বাঁধে সেখানে শুধু মসজিদ গড়ে না, সেখানে ইসলামের হুদুদ আইনের প্রতিষ্ঠাও করে। কারণ সেটি না হলে মুসলমান হওয়ার মধ্যে প্রচন্ড অসম্পূর্ণতা থেকে যায়। শূণ্যতা থেকে যায় ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্রের। তাই সমগ্র ইতিহাসে এমন কোন মুসলিম রাষ্ট্র পাওয়া যাবে না যেখানে আল্লাহর হুদুদ প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। সেটি যেমন খোলাফায়ে রাশেদার আমলে হয়েছে, তেমনি আব্বাসীয়, উমাইয়া ও উসমানিয়া খলিফাদের আমলেও হয়েছে। সেটির পূর্ণ প্রতিষ্ঠা ছিল ভারতে মুসলিম শাসন আমলেও। ব্রিটিশ শাসনের প্রতিষ্ঠার পূর্বে বাঙলাতেও হুদুদ আইন তথা শরিয়তি আইনই ছিল দেশের আইন। কোন মুসলমানের পক্ষে যেমন নামায-রোযা পরিত্যাগ করা অভাবনীয়, তেমনি অভাবনীয় হল শরিয়তের বিধানকে পরিত্যাগ করা। অথচ বাংলাদেশ সরকার আল্লাহর সে হুদুদ আইনের প্রয়োগের বিরোধী। উপমহাদেশে শরিয়তী হুদুদ আইন কোন মুসলমানের হাতে বিলুপ্ত হয়নি, হয়েছিল ব্রিটিশদের হাতে। ব্রিটিশ শাসনের অবসান হয়েছে, কিন্তু অবসান হয়নি তাদের সেকুলার খলিফাদের শাসন। ফলে প্রতিষ্ঠা পায়নি ইসলামের শরিয়তী আইন। আওয়ামী লীগ সরকারের যুক্তি, সম্পদের বন্টনে ইসলামের যে হুদুদ আইন তাতে নারী-পুরুষের বৈষম্য রয়েছে।তারা চায় সে অসমতা ও বৈষম্য দূর করতে।

এটা ঠিক, সম্পদের বন্ঠনে ইসলামে নারী পুরষের মাঝে বৈষম্য রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, এরূপ অসমতা কি অবিচার? এবং সর্বক্ষেত্রে সমতা কি সুবিচার? সমতা যে কোন কোন ক্ষেত্রে চরম অবিচার ও জুলুমবাজীতে পরিনত হয় সে হুশ কি বাংলাদেশ সরকারের আছে? নারীপুরষের শরীরের গঠন, শক্তি, সৌন্দর্য ও সামর্থে রয়েছে সুস্পষ্ট অসমতা। সে অসমতা দূর করা কি আদৌ সম্ভব? পুরুষের পক্ষে কি সম্ভব সন্তান ধারণ? তার পক্ষে কি সম্ভব মায়ের ন্যায় সন্তানকে বুকের দুধদান, সেবাদান ও লালন পালন? তার পক্ষে কি সম্ভব একাকী চাষাবাদ করা? সম্ভব কি রণাঙ্গণে রাতের পর রাতে পুরুষের পাশাপাশি যুদ্ধ করা? নিভৃত রণাঙ্গনে কে দিবে তাকে নিরাপত্তা? সম্পদের প্রয়োজনও তো সবার সমান নয়। তাই সম্পদের বন্টনে সমতার চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হল কার কতটা প্রয়োজন সেদিকে নজর দেয়া। আর সেটি মহান আল্লাহতায়ালার চেয়ে আর কে বুঝে? অথচ ইসলামে অঙ্গিকারশূণ্য আওয়ামী লীগের নেতাগণ সেটি মানতে রাজী নয়।

ইসলাম নারীকে পুরুষের প্রতিদ্বন্দী রূপে দেখে না, এবং ভাই প্রতিদ্বন্দী নয় বোনের। নারী-পুরুষ, স্বামী-স্ত্রী, ভাই-বোন সবাইকে ইসলামি সমাজ নির্মানে বিশাল দায়ভার কাঁধে তুলে নিতে হয়। সে দায়ভার পালনে প্রতিটি মুসলমান হল মহান আল্লাহর খলিফা। তবে ইসলাম সে দায়ভারটি নারী-পুরুষের উপর সমান ভাবে বন্টন করে না। উভয়কে একই রণাঙ্গনে ও একই বাংকারেও হাজির করে না। উভয়ের লড়াইয়ের ক্ষেত্রের ন্যায় দায়ভারও ভিন্ন। তাই অসমান হল তাদের প্রয়োজনটিও। এক্ষেত্রে সুবিচারটি জরুরী, সমতা নয়। পরিবারীক ও সামাজিক শান্তির স্থাপনে বড় প্রয়োজনটি হল মূলত এই সুবিচার, এ ক্ষেত্রে অবিচার হলে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রজুড়ে জন্ম নেয় মহা অশান্তি। অশান্তির সে আগুণ থেকে পরিবারের কেউই রক্ষা পায়না। তাই পরিবারকে বিধ্বস্ত করার মধ্যে কারোই কোন কল্যাণ নেই। কিন্তু সে সুবিচার পরিবারে কীরূপে সম্ভব? সুবিচারের সে সামর্থ কি মানুষের আছে? ইসলামের পূর্বে তো নারীকে ভোগ্য পণের ন্যায় আরেক পণ্য গণ্য করা হত। হিন্দুরা তো সদ্য-বিধবাদের তাদের মৃত স্বামীর সাথে পুড়িয়ে মারতো। পরিবারে একত্রে কাজ করে শুধু স্বামী-স্ত্রী ও তাদের সন্তানেরা নয়, ভাই-বোনও। তাই ভাই-বোনকে একে অপরের প্রতিদ্বন্দিরূপে খাড়া করার মধ্যে কোন কল্যাণ নেই। ভাই তার স্ত্রীকে আনে ভিন্ন এক পরিবার থেকে। আর সে তার বোনকে স্ত্রীরূপে তুলে দেয় অন্য এক পরিবারের পুরুষের হাতে। বোন তার পিতার সম্পদের যে হিস্যা নিয়ে স্বামীর ঘরে যায়, সমপরিমান হিস্যা নিয়ে আসে তার স্ত্রীও। ইনসাফ কাজ করছে এখানেও। মুসলিম সমাজে সমস্যা অনেক। তবে বিগত ১৪ শত বছর ধরে মুসলিম সমাজে মৃত পিতার সম্পদের বন্টন নিয়ে কোন সমস্যা দেখা দেয়নি। অথচ আজ সেটিই আওয়ামী সরকারের কাছে বড় সমস্যা রূপে দেখা দিয়েছে। সে সমস্যার সমাধানে তারা আল্লাহর আইনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঝান্ডা উড়ানোটি জরুরী মনে করছে। ইসলামের শত্রুপক্ষ চায়, এভাবে যুদ্ধ শুরু হোক মুসলমানদের ঘরে ঘরে। এ যুদ্ধ তীব্রতর হলে মুসলমানরা তখন আর বিদেশী শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ফুরসতই পাবে না। আওয়ামী লীগ সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে হত্যা, সন্ত্রাস, ধর্ষণ, দূর্নীতি, চুরি-ডাকাতি, পানি-গ্যাস-বিদ্যুতের সমস্যা, সীমান্তে বাংলাদেশী হত্যা ও নারি অপহরনের ন্যায় গুরুতর সমস্যার সমাধানে। কিন্তু সে ব্যর্থতার মাঝে যুদ্ধের নতুন ফ্রন্ট খুলেছে ইসলামের বিরুদ্ধে। তাদের প্রত্যাশা, এতে বিপুল অর্থ ও রাজনৈতিক সর্মথন মিলবে ইসলাম বিরোধী আন্তর্জাতিক কোয়ালিশন থেকে এবং বিরোধীদের চিত্রিত করা যাবে ইসলামী মৌলবাদী রূপে।

সেক্যিউলারদের বড় অপরাধ যেমন আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, তেমনি তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক বড় ব্যর্থতাটি হল সম্পদের বন্টনে ভাই ও বোনের মাঝে যে অসমতা সেটির পিছনে যে মূল দর্শন সেটি বুঝতে না পারায়। যুদ্ধের ময়দানে সকল সৈনিকের সমান দায়িত্ব থাকে না। কেউবা লড়ে সম্মুখ ভাগে, কেউবা পশ্চাতে। কেউবা লড়াই করে ট্যাংক নিয়ে, কেউবা বন্দুক হাতে। কেউ বা পিছনে থেকে রশদ জোগায়। দায়িত্ব ও অবস্থান অনুযায়ী তাদের অস্ত্র ও সাজসজ্জাও ভিন্ন। কারো ভূমিকাকে এখানে খাটো করে দেখা যায় না। তেমনি অবস্থা সংসার জীবনেও। এখানেও নারী ও পুরুষের সামর্থ অনুযায়ী তাদের দায়িত্বের সাথে প্রয়োজনটাও ভিন্ন। দায়িত্ববন্টন ও সম্পদ বন্টনে তাই সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকাটি জরুরী। ইসলাম তো সে নীতিমালাটাই দেয়। নইলে বিশৃঙ্খলা অনিবার্য। যেখানেই সম-অধিকারের নামে সে শৃঙ্খলাকে ভাঙ্গার চেষ্টা হয়েছে সেখানেই নেমে এসেছে বিপর্যয়। এর উদাহরণ হল পাশ্চাতের পরিবার। পাশ্চাত্য দেশগুলিতে তালাকের পর পরিবারের সম্পদের সমান ভাবে ভাগাভাগীর বিধান চালু করা হয়েছে। ফল দাড়িয়েছে এই, অধিকাংশ পুরুষ আর বিয়ে করতেই রাজী হচ্ছে না। কারণ তাদের ভয়, বিয়ে ভাঙ্গলে তাদের দিন-রাতের কষ্টার্জিত সম্পদ, গৃহ, গাড়ী –সবকিছুর অর্ধেক তার তালাক প্রাপ্ত স্ত্রীকে দিতে হবে। পাশ্চাতে তো অর্ধেকের বেশী বিয়েই ভেঙ্গে যায়। ফল দাঁড়িয়েছে এই, নারী হারাচ্ছে কোন একজন পুরুষের সারা জীবনের জীবনসঙ্গি হওয়ার সুযোগ। ফলে তাকে কাটাতে হচ্ছে পুরুষের গার্ল ফ্রেন্ড বা কর্লগার্ল রূপে। জুটছে না স্ত্রীর মর্যাদা। আর্থিক নিরাপত্তার অভাবে হাজার হাজার মহিলা শামিল হচ্ছে পতিতাবৃত্তিতে। ফলে নারী হচ্ছে আরো অসহায়। পরিণত হচ্ছে ভোগ্যপণ্যে। স্ত্রী হিসাবে আজীবন সে ভালবাসা তার হাতের নাগালে ছিল এখন সেটি কল্পনার সামগ্রী। সমতার নামে নারীদের উপর এত দায়িত্ব চাপানো হয়েছে যে তার পক্ষে গর্ভধারণ ও সন্তান প্রতিপালনের দায়িত্বটি এখন অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ নারীর সবচেয়ে আপনজন হল তার সন্তানেরা। ইসলামে মায়ের সন্মান পিতার চেয়ে বেশী। বলা হয়েছে মায়ের পায়ের নীচে সন্তানের জান্নাত। তবে সন্মান সব সময়ই অর্জনের বিষয়, অর্জন করতে হয় সময়, শ্রম, ভালবাসা ও আবেগ বিণিয়োগ করে। যে মা বেশীর ভাগ সময় কাটায় ঘরের বাইরে এবং সন্তান পালনে যার হাতে কোন সময়ই থাকে না, তার পক্ষে কি সন্তানের সাথে ঘনিষ্ট হওয়ার সময় থাকে? ফলে সম-অধিকারের নামে পাশ্চাত্য সমাজ নারীকে শুধু তার স্বামী থেকেই দূরে সরিয়ে নেয়নি, দূরে সরিয়েছে তার সন্তান থেকেও। ফল নারী হয়েছে আপনজন হারা।  

 

নারী-পুরুষ উভয়ই মহান আল্লাহর সৃষ্টি। আর নিজ-সৃষ্টির প্রতি সুবিচার স্রষ্ঠার চেয়ে আর কে বেশী করতে পারে? তাছাড়া সম্পদই জীবনের সবকিছু নয়। সম্পদ থাকলেই কি নারীর পক্ষে একাকী সুখশান্তি অর্জন সম্ভব? কোটি কোটি টাকার মালিক হলেও তার পক্ষে কি সম্ভব হয় দূর গ্রামের কোন এক নির্ভত কোণে একাকী ঘর বেঁধে বসবাস করা? এমনটি মানব সমাজে কোন কালেও ঘটেনি। ইসলামে নারীকে একাকী হজে যাওয়ার অনুমতি দেয় না। একাকী সফরে বেরুনোর অনুমতি নেই। অনুমতি নেই একাকী হাটেবাজারে যাওয়ার। এ্টি তার নিরাপত্তার বিষয়। গৃহে ডাকাত পড়লে কোন সুস্থ্য ব্যক্তিই তার স্ত্রী বা কন্যাকে ডাকাতের মোকাবেলায় পাঠায় না। সে বরং নিজের জীবন বাজী রেখে মোকাবেলায় নামে। দেশে যুদ্ধ শুরু হলে শত্রুর মোকাবেলার মূল দায়িত্বটাও পুরুষের। পুরুষ যেমন বন-জঙ্গল, মাঠ-ঘাট, পাহাড়-পর্বত, সমূদ্র একাকী অতিক্রম করতে পারে সেটি কি কোন মহিলা পারে? এসব ক্ষেত্রে সমতাটা কোথায়?

শান্তি প্রতিষ্ঠাই ইসলামের মুল মিশন। সে শান্তি যেমন প্রতিটি নারীর, তেমনি প্রতিটি পুরুষের? কিন্তু কীরূপে সে শান্তি সম্ভব? বোনকে ভাইয়ের এবং নারীকে পুরুষের প্রতিদ্বন্দি রূপে খাড়া করায় যে কতটা বিপর্যয় আনে তার উদাহরণ পাশ্চাত্যের দেশগুলি। সারা জীবন নারীকে অফিসে বা কারখানায় খাটতে হয়, নিজের দায়ভার নিজেকেই নিতে হয়। বৃদ্ধ-কালে তার পাশে দাঁড়ানোর কেউ থাকে না। নিজ খরচে বা রাষ্ট্রের খরচে তাকে নার্সিং হোমে বা কেয়ার হোমে গিয়ে আশ্রয় নিতে হয়। অথচ মুসলিম সমাজে নারী অর্থশূণ্য হলেও তার পাশে বিপদের দিনে দাঁড়ানোর লোক থাকে। তার পাশে দাঁড়ায় সমগ্র পরিবার। জন্ম থেকে বিবাহ অবধি যেমন তার পিতামাতা ও ভাইবোন, তেমনি বিবাহের পর তার স্বামী ও সন্তানেরা। বিবাহ ভেঙ্গে গেলে আবার তার পিতা ও ভাইয়েরা সহায় হয়। নতুন করে আবার বিবাহেরও ব্যবস্থা হয়। পরিবার ও সমাজ এভাবে অসহায়ের পিছনে যে রূপ দায়িত্ব পালন করে সেটি কি নিছক অর্থ দিয়ে সম্ভব? পাশ্চাত্যে পরিবার প্রথা বিপর্যস্ত হওয়ায় নারীপুরুষকে বৃদ্ধকালে আশ্রয় নিতে হয় কেয়ার হোমে যা অতি ব্যয়বহুল। ব্রিটিশ সরকার প্রতি বছর শত শত কোটি পাউন্ড খরচ করছে এসব অহায় বৃদ্ধ নারী-পুরুষদের পিছনে। কিন্তু অর্থনৈতিক সংকটের কারণে এখন প্রচন্ড হিমশিম খাচ্ছে। ব্রিটিশ সরকারের বাজেটের খরচের অন্যতম বড় খাত হল এটি। কথা হল ব্রিটেনের মত একটি শিল্পোন্নত সম্পদশালী দেশেরই যেখানে এ অবস্থা সেখানে বাংলাদেশের মত দেশে সরকার কি সে দায়িত্ব নিতে পারে? অথচ নারীর নিরাপত্তা বাড়াতে ইসলাম একদিকে যেমন তাকে পিতামাতার সম্পদের অংশীদার বানিয়েছে, তেমনি অংশীদার বানিয়েছে তার স্বামী ও সন্তানের সম্পদের। ইসলাম এক্ষেত্রে অনন্য। আর কোন ধর্মে নারীর এরূপ অধিকার নেই। মুসলিম পরিবারে নারীর নিরাপত্তা-জালটি সুবিস্তৃত। কিন্তু বাংলাদেশের সরকারের আইন সে নিরাপত্তা বিধ্বস্ত করতে চায়। ভাই ও বোনকে পরস্পরেরর চিরপ্রতিদ্বন্দি রূপে খাড়া করতে চায়।

মুসলমান রূপে ব্যক্তির মূল দায়িত্বটা হল, আল্লাহর হুকুমের পূর্ণ আনুগত্য। আল্লাহর আইনে যদি নারীর জন্য পুরুষের চেয়ে দ্বিগুণ সম্পত্তি দেয়ার কথা থাকতো তখনও তার দায়িত্ব হত সে বিধানের প্রতি আনুগত্য। আল্লাহর কোন হুকুমের মধ্যে অবিচার বা অকল্যাণ খোঁজাটাই হারাম। এটা কাফেরের সাজে, কোন মুসলমানের নয়। আল্লাহর প্রতিটি বিধানের লক্ষ্য তো মানুষের জীবনকে সুখময় করা। অকল্যাণ তো শয়তানের কাজ। পবিত্র কোরআনের ঘোষণা, “ওয়া মাল্লাহু ইউরিদু জুলমান লিল আলামীন” সুরা আল ইমরান, আয়াত ১০৮। অর্থঃ আল্লাহর কাজ এ নয় যে তিনি জগৎবাসীর জন্য কোন জুলুম চাইবেন। তাই ইসলাম কবুলের সাথে সাথে প্রতিটি ঈমানদার নরনারীর কাজ হয়, আল্লাহর বিধানের পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করা। মোমেনের এ ভূমিকাই তাকে মহান আল্লাহর আনসার রূপে গণ্য হওয়ার ইজ্জত দিয়েছে। ক্ষ্রদ্র মানবসৃষ্টির জন্য এর চেয়ে বড় সম্মান আর কি হতে পারে? অথচ বাংলাদেশ সরকার সুস্পষ্ট ভাবে আল্লাহর প্রতিপক্ষ বা শত্রু রূপে  দাঁড়িয়েছে। কথা হল, এ অবস্থায় একজন মুসলমানের দায়িত্বটা কি? সে কি আল্লাহর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া এক বিদ্রোহী সরকার বা দলের পক্ষ নিবে? আরো কথা হল, আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ কি কখনই নিজেদেরকে ইসলামের পক্ষের শক্তি রূপে দাবী করেছে? ইসলামের পক্ষ নেয়াটিকে সব সময়ই মৌলবাদী বলে গালীগালাজ করে আসছে। জিহাদ যেখানে মোমেনের সর্বোচ্চ ইবাদত রূপে আখ্যায়ীত করেছে, সেখানে জিহাদের উপর লিখিত কোন বই ঘরে বা অফিসে রাখাটি ফৌজদারি অপরাধ রূপে চিত্রিত হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারেরর পুলিশ ও র‌্যাব বাহিনী ঘরে ঘরে ঢুকে এরূপ বই বাজেয়াপ্ত করছে এবং গ্রেফতার করছে গৃহকর্তাকে।  এমন এক সরকারের কাছে মহান আল্লাহর শরিয়তী বিধান অগ্রহণযোগ্য ও বর্জনীয় হবে সেটাই কি স্বাভাবিক নয়?

একজন মুসলমানকে শুধু আল্লাহর অস্তিত্বের উপর বিশ্বাস করলে চলে না, মহান আল্লাহকে রাষ্ট্রের সার্বভৌম আইনদাতা রূপেও মেনে নিতে হয়। আল্লাহকে সার্বভৌম মানার অর্থ, তাঁর আইনকে অলংঘনীয় রূপে মেনে নেয়া।  অথচ বাংলাদেশের শাসনতন্ত্রে সে সত্যটি স্বীকৃতি পায়নি। বরং এর মূল ভিত্তিটি আল্লাহর অবাধ্যতা ও বিদ্রোহের উপর। বাংলাদেশ একটি মুসলিম দেশ। একজন মুসলমান যেমন তার নাম, ধর্ম-কর্ম, খাদ্য, পোষাক-পরিচ্ছদ, আচরণ ও রুচীতে একজন কাফের থেকে ভিন্ন, তেমনি মুসলিম রাষ্ট্র ভিন্ন কাফের অধ্যুষিত দেশ থেকে। নবীজীর আমলে পৃথিবীতে শতাধিক রাষ্ট্র ছিল। কিন্তু সেসব রাষ্ট্র থেকে নবীজী (সাঃ) ও তাঁর পর সাহাবায়ে কেরামের রাষ্ট্রটি ভিন্ন চরিত্রের ছিল।  মুসলিম রাষ্ট্রের শাসক যেমন স্বৈরাচারি হতে পারে না, তেমনি সে রাষ্ট্রের আইন-আদালত, সংস্কৃতি, শিক্ষানীতিও আল্লাহর অবাধ্যতা ও বিদ্রোহের উপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। মুসলমান রূপে বাংলাদেশীদের বড় দায়িত্বটি শুধু নবীজীর (সাঃ) ন্যায় নামায-রোযা, হজ-যাকাত পালন নয়, বরং মদীনায় ১০টি বছর ধরে রাষ্ট্র পরিচালনার যে সূন্নতটি তিনি রেখে গেছেন সেটির  অনুকরণে রাষ্ট্র নির্মানও।  নইলে অসম্ভব হবে মুসলমান রূপে বেড়ে উঠা এবং আল্লাহর দরবারে নবীজী (সাঃ)র উম্মত রূপে পরিচয় দেয়া।

 

শেখ হাসিনা ও তাঁর দলের নেতাদের নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্বাস আছে। সে বিশ্বাসগুলো প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সুস্পষ্ট রাজনৈতিক কৌশলও আছে। তাদের সে রাজনৈতিক বিশ্বাসটি মূলত শরিয়তের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের উপর প্রতিষ্ঠিত। তারা বিশ্বাস করে বাঙালী জাতীয়তাবাদ ও সেক্যিউলারিজমে। সেক্যিউলারিজমের মূল কথা, কোন ধর্মীয় আইনকে রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত না করা। মহান আল্লাহর সে আইনকে তারা কোরআনের মধ্যে বন্দী দেখতে চায়। আল্লাহ ও তাঁর শরিয়তের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের এ যুদ্ধটি তাই কোন লুকানো বিষয় নয়। এটিই তাদের রাজনীতির বহু ঘোষিত মূল এজেন্ডা। সেটি বাস্তবায়নের লক্ষেই তারা লাগাতর কাজ করছে। এক্ষেত্রে তারা আন্তর্জাতিক ইসলাম বিরোধী কোয়ালিশনের পার্টনার। তারা পার্টনার ভারত সরকারের। তাদের পার্টনারদের ন্যায় তাদেরও আনন্দ আল্লাহর হুদুদ আইনের বিলুপ্তি দেখার মধ্যে। কিন্তু প্রশ্ন হল, বাংলাদেশের ১৫ কোটি মুসলমান কি আল্লাহর বিধানের এ পরাজয়কে মেনে নিবে? আর সেটি মেনে নিলে তারা আল্লাহর দরবারে কি জবাবটি দিবে? নবীজী (সাঃ)র আমলে এমন কোন সাহাবীও কি ছিলেন যিনি আল্লাহর বিধানকে বিজয়ী করার জন্য জানমালের কোরবানী পেশ করেননি। কিন্তু প্রশ্ন হল, এক্ষেত্রে বাংলাদেশের মুসলমানদের কোরবানীটি কি? দেশ অধিকৃত আজ ইসলামের বিপক্ষ শক্তির হাতে। তারা সে অধিকার জমিয়েছে জনগণের ভোটের বলে। নির্বাচনের সময় তারা জনগণকে সার্বভৌম এবং দেশের মালিক-মোখতার বলে। অথচ নির্বাচনের পর দেশের একমাত্র ভাগ্যনির্ধারক ও সার্বভৌম রূপে প্রতিষ্ঠা করে নিজেদের। তখন গুরুত্ব হারায় জনগণের ঈমান-আক্বিদার বিষয়টি। বাংলাদেশের ১৫ কোটি মুসলমানের ঈমান বা বিশ্বাসের দাবী তারা মানতেই রাজি নয়। প্রশ্ন হল, জনগণ কি এরূপ আল্লাহ-দ্রোহীদের বিদ্রোহ দীর্ঘায়ীত করতে কি নীরবই থাকবে?  

 

সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হলে পুলিশ ও সেনাবাহিনী তখন সে বিদ্রোহ দমনে ময়দানে নামে। প্রশ্ন হল, সরকারের পক্ষ থেকে আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হলে সে বিদ্রোহ দমনে কারা ময়দানে নামবে? অমুসলিম দেশে আল্লাহর পক্ষে ময়দানে নামার লোক না থাকাটা স্বাভাবিক। কিন্তু সেটি যদি মুসলিম দেশে ঘটে তবে অমুসলিম দেশ থেকে সে মুসলিম দেশটির পার্থক্য কোথায়? কোন দেশে মুসলিমের বসবাস থাকলে সে দেশের মসজিদগুলিতে যেমন নামাযী থাকবে, তেমনি রাজপথে আল্লাহর বাহিনীও থাকবে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহর বাহিনী রূপে যাদেরকে চিত্রিত করা হয়েছে তারা হল ঈমানদারগণ। প্রতিটি ঈমানদারের প্রতি মহান আল্লাহর সুস্পষ্ট নির্দেশটি হল, “ইয়া আইয়োহাল্লাযীনা আমানু কু’নু আনসারাল্লাহ” অর্থঃ হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর সাহায্যকারি হয়ে যাও। -সুরা সাফ, আয়াত ১৪। আনসার শব্দের অর্থ সাহায্যকারি। প্রশ্ন হল, কোন ঈমানদার কি মহান রাব্বুল আলামিনের এ নির্দেশের অবাধ্য হতে পারে? আর অবাধ্য হলে কি তার ঈমান থাকে? তাই মুসলমান হওয়ার অর্থই হল, আল্লাহর আনসার হওয়া। তখন সেটিই তাঁর বাঁচা-মরাসহ জীবনের মূল মিশন হয়ে দাঁড়ায়। সে নামায পড়ে, রোযা রাখে, হজ করে এবং যাকাত দেয়। এগুলো করে আল্লাহর প্রতি আনুগত্য ও আনসার রূপে তাঁর হুকুম পালনে অঙ্গিকারটি আরো মজবুত করার লক্ষ্যে। ইবাদতের মূল লক্ষ্য তো এটাই। যে ইবাদত আল্লাহর প্রতি আনুগত্য ও তাঁর আনসার রূপে দায়িত্ব পালনে অঙ্গিকার বাড়ায় না সেগুলি কি আদৌ ইবাদত? যে দেশে মুসলমানের সংখ্যা ১৫ কোটি, সেদেশে ১৫ কোটির এক বিশাল আনসার বাহিনী থাকবে সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? প্রতিটি ঈমানদার এখানে আল্লাহর পুলিশ। এমন এক বিশাল বাহিনী ময়দানে থাকতে সেদেশে আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হয় কি করে? বিদ্রোহীরা বিজয়ীই বা হয় কি করে? আল্লাহর দরবারে কি এ নিয়ে বিচার বসবে না? নবীজী (সাঃ)র আমলে প্রতিটি মুসলমান ছিল সে প্রতিরোধ বাহিনীর সদস্য। সে বাহিনীর এমন কোন সদস্যই ছিল না যিনি আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের প্রতিরোধে কোন রূপ ভূমিকা নেননি। শতকরা ৬০ ভাগের বেশী সাহাবী তো শহিদ হয়ে গেছেন। বাস্তবতা হল, সে বাহিনী ছাড়া মুসলমানদের কোন সেনাবাহিনী ছিল না। আল্লাহর আনসারদের কাজ শুধু কোরআন পাঠ, নামায-রোযা ও হজ-যাকাত পালন? নবীজী (সাঃ) এবং তার সাহাবাগণ কি সেগুলোর মাঝে নিজেদের ধর্মীয় জীবন সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন? তারা তো নামায-রোযা, হজ-যাকাতের পাশাপাশি দেশ জুড়ে আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের পরাজিতও করেছিলেন। আল্লাহর বিরুদ্ধে সরকারের বিদ্রোহের জবাব জনগণকেই দিতে হয়। এ কাজ ফেরেশতাদের নয়। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে মুসলমানদেরকে আল্লাহর বাহিনী (হিজবুল্লাহ)আখ্যায়ীত করেছেন। তাদের কাজ হল, তাঁর রাস্তায় জিহাদ করা। সে জিহাদের লক্ষ্য, শুধু বিদেশী শত্রুদের হাত থেকে দখদারমূক্ত করা নয়। বরং আল্লাহর বিদ্রোহীদের হাত থেকেও দেশকে মূক্ত করা।

 

বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক দেশ। গণতন্ত্রের সুফল হল, জনগণ এখানে নিরংকুশ ক্ষমতা পায় দেশ পরিচালনার। ফলে এখানে জনগণের দায়ভারটি বিশাল। তবে সে বিশাল দায়ভার ৫ বছর পর পর একবার কয়েক মিনিটের জন্য ভোটকেন্দ্রে হাজির হওয়ার মধ্য দিয়ে পালিত হয় না। এ দায়িত্ব প্রতিদিনের, প্রতি মুহুর্তের। ঘোড়ার পিঠে চড়ে লাগাম ছেড়ে দিলে ঘোড়া যে কোন দিকে নিয়ে যেতে পারে। এজন্যই ঘোড়ার মুখে লাগাম পড়াতে হয়। এবং প্রতি মুহুর্তে সে লাগাম হাতে রাখতে হয়। বিষয়টি অভিন্ন নির্বাচিত সরকারের বেলায়ও। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার কারণেই জনগণের প্রতি সরকার সব সময় সদয় হয় না। তাদের ইচ্ছার প্রতি শ্রদ্ধাশীলও হয় না। বরং সুযোগ পেলেই তারা স্বেচ্ছাচারী হয়। এমন কি কেড়ে নেয় জনগণের ভোটের অধিকার। জনগণের সাথে এভাবেই তো বার বার গাদ্দারী হয়। হিটলার ও শেখ মুজিবের ন্যায় অতি নিষ্ঠুর স্বৈরাচারি পয়দা হয়েছে তো জনগণের ভোটে নির্বাচিতদের মধ্য থেকে। তারা নির্বাচিত হওয়ার পরপরই বহুদলীয় গণতন্ত্র, মানাবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে কবরে পাঠিয়েছিল।

 

তাই ভোটদানের পর গণতান্ত্রিক দেশে জনগণের দায়ভার কমে না, বরং বাড়ে। প্রতি মুহুর্তে সরকারের গতিবিধি ও কর্মকান্ডের উপর জনগণকে নজর রাখতে হয়। ভোট হল জনগনের হাতের লাগাম, তবে সেটিই একমাত্র লাগাম নয়। জনগণের হাতে রয়েছে রাজপথ, রয়েছে মিডিয়া, রয়েছে  আন্দোলন ও হরতাল। পুলিশ ও সরকারি প্রশাসনের তুলনায় এগুলো যে কত বেশী শক্তিশালী সেটি তিউনিসিয়া, মিশর, লিবিয়া, ইয়েমেন, বাহরাইনসহ মধ্যপ্রাচ্যের নানা দেশে সেটি সম্প্রতি প্রমাণিত হচ্ছে। জনগণ যদি তার শক্তির যথার্থ প্রয়োগ করে তবে যে কোন শক্তিশালী স্বৈরাচারি সরকারকে ধরাশায়ী করা কোন কঠিন কাজ নয়। মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী স্বৈরাচারি শাসক ছিল ইরানের শাহ। নিরস্ত্র জনগণ আজ থেকে তিরিশ বছর আগেই তাকে আস্তাকুঁড়ে পাঠিয়েছে। আরব বিশ্বের আরেক শক্তিশালী স্বৈরাচারি শাসক ছিল হোসনী মোবারক। সেও এখন আবর্জনার স্তুপে। কিন্তু  বাংলাদেশে সমস্যা হল এসব আবর্জনা এখনও বসে আছে জনগণের মাথায় এবং ধ্বনি তুলছে আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের। দেশের আইন আদালত এখন বিদ্রোহীদের দখলে। ফলে জ্বিনা, পতিতাবৃত্তি, সূদখোরি, মদ্যপান, বিদেশী শত্রুর দালালী কোন অপরাধ নয়। বরং অপরাধ্য গণ্য করা হচ্ছে আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী সম্পদের বন্টন! কৃষি শিক্ষা, শিল্প, বিজ্ঞান, প্রশাসন বা রাজনীতিতে বাংলাদেশীদের ব্যর্থতা ও পরাজয় অনেক। তবে ১৫ কোটি মুসলমানের এটাই কি সবচেয়ে বড় পরাজয় নয় যে দেশ আজ অধিকৃত আল্লাহর দ্বীনের বিদ্রোহীদের হাতে?  ঘুমন্ত ও মৃত মানুষের মাথায় যেমন ক্ষুদ্র কীটও বাঁধে, তেমনি ঘুমন্ত জাতির বেলায়ও। একটি দেশে দুর্বৃত্তদের দুঃশাসন দেখে একথা নিশ্চিত ভাবেই বলা যায় সেদেশের মানুষ কতটা ঘুমন্ত বা চেতনাহীন। আর বাংলাদেশে দূর্নীতিতে পাঁচ বার বিশ্ব শিরোপা পেয়ে প্রমাণ করেছে দুর্বৃত্তরা দেশটিতে কতটা প্রবল ভাবে বাসা বেঁধেছে। তাই বাংলাদেশের মানুষের এখন ঘুম ভাঙানোর সময়। আরব দেশগুলী জুড়ে ঘুম ভাঙানোর কাজটি হয়েছে বিগত প্রায় ৪০ বছর ধরে। এখন তারা গা ঝাড়া দিয়ে উঠেছে। ফলে মাথা থেকে ঝড়ে পড়ছে বহুদিনের জমা আবর্জনাগুলো। আর আবর্জনার তো কোন শিকড় থাকে না। সেগুলো তো বেড়ে উঠে ঝড়ে পড়ার জন্যই। অতীত ইতিহাসের ন্যায় আরব বিশ্বে তো সেটাই নতুন করে প্রমানিত হচ্ছে। ১৯/০৩/১১

 




তীব্রতর হোক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে জিহাদ

স্বৈরাচারের নাশকতা

স্বৈরাচারের নাশকতা শুধু মানুষের মৌলিক অধিকার হনন নয়। শুধু শিক্ষা, শিল্প, সংস্কৃতি বা দেশধ্বংস নয়। বরং সবচেয়ে বড় অপরাধটি হলো মানুষের ঈমানধ্বংস।তাদের হাতে কোন দেশ অধিকৃত হলে তখন মানুষের ঈমাননাশে প্রচন্ড মহামারি দেখা দেয়। নমরুদ, ফিরাউনদের শাসনামালে তাই তাদেরকে খোদা বলার মত বিবেকশূণ্য বিশাল জনগণ সৃষ্টি হয়েছে। মানুষকে মানবতাশূণ্য ও ঈমান শূণ্য করা তখন রাষ্ট্রের মূল এজেন্ডায় পরিণত হয়। ফিরাউনদের আমলে বিশাল বিশাল পিরামিড নির্মিত হলেও কোন উন্নত মানব সৃষ্টি হয়েছে বা উচ্চতর আইন বা মূল্যবোধ নির্মিত হয়েছে -তার প্রমাণ নাই। অথচ খোলাফায়ে রাশেদার আমলে একখানি প্রাসাদ নির্মিত না হলেও তাদের আমলে যে মহামানব নির্মিত হয়েছে তারাই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব। সে আমলে যে মানের আইন,সাম্য, সুবিচার ও সামাজিক পলিসি প্রতিষ্ঠা দেয়া হয়েছিল সমগ্র মানব ইতিহাসে সেগুলিই সর্বশ্রেষ্ঠ। তখন উঠের পিঠে চাকরকে বসিয়ে খলিফা নিজে রশি ধরে টেনেছেন। সমগ্র মানব ইতিহাসে এমন দৃষ্টান্ত কি অন্যরা দেখাতে পেরেছে?

স্বৈরাচারি দুর্বৃত্তদের শাসন প্রতিযুগেই এক ভয়ানক বিপদের কারণ। সীমাহীন জুলুম, মিথ্যাচার ও চুরিডাকাতি তখন রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিণত হয়। বাংলাদেশীদের মাথায় আজ তেমনি এক শাসন চেপে বসেছে। ইসলামের এ শত্রুদের যুদ্ধ তাই স্রেফ মানুষের মৌলিক অধিকারের বিরুদ্ধে নয়, বরং তাদের মূল লড়াইটি হলো মহান আল্লাহর দ্বীন ও তাঁর শরিয়তি বিধানের বিরুদ্ধে। তারা নিষিদ্ধ করত চায় জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ তথা আল্লাহর পথে জিহাদ। রুখতে চায় কোরআনের চর্চা। কোন ঈমানদার কি ইসলামের এমন শত্রুর সামনে নীরব থাকতে পারে? আর তাতে কি ঈমান থাকে? তাদের দখলদারির কারণে সমগ্র রাষ্ট্র ও তার প্রতিষ্ঠানগুলি হয়ে পড়ে শয়তানের হাতিয়ারে। তারা অসম্ভব করে সিরাতুল মোস্তাকীমে চলা। অসম্ভব করে ইসলামের শরিয়তি বিধানের পূর্ণ অনুসরণ। তখন মুসলিম জীবনে শুরু হয় সূদ, ঘুষ, বিপর্দাগীর ন্যায় আল্লাহর বিরুদ্ধে গুরুতর বিদ্রোহ। পতিতাপল্লির জ্বিনাও তখন বানিজ্য রূপে স্বীকৃতি পায়।

মহান আল্লাহতায়ালার কাছে অতি ঘৃনার কাজটি হলো মানব হত্যা। কিন্তু তাঁর কাছে তার চেয়েও জঘন্য হলো ফিতনা। পবিত্র কোরআনে তিনি ফিতনাকে “আশাদ্দু মিনাল কাতলি” বলেছেন। অর্থাৎ মানব হত্যার চেয়েও এটিকে তিনি জঘন্য বলেছেন। “ফিতনা” একটি বিশেষ কোরআনী পরিভাষা। এর অর্থ হলো মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে এমন এক বিদ্রোহাত্মক ও গোলোযোগপূর্ণ অবস্থা সৃষ্টি যার ফলে সমাজে বা রাষ্ট্রে ইসলামের অনুশাসন পালনই অসম্ভব হয়ে পড়ে। অসম্ভব হয় ধর্মপালন। ফলে এমন সমাজে প্রচন্ড মহামারি ঘটে ঈমানের। ঈমানের প্রচন্ড মহামারির কারণেই একটি মুসলিম সংখ্যারিষ্ঠ দেশ দুর্বৃত্তিতে বিশ্বে প্রথম স্থান অধিকার করে। বাংলাদেশ সেটি ৫ বার অর্জন করেছে। মহান আল্লাহতায়ালা কি দুর্বৃত্তদের কখনো জান্নাতে স্থান দেন? দুনিয়াতে যারা এত ঘৃনীত হয় তাদেরকে কি জান্নাত দিয়ে সম্মানিত করবেন? ঈমানের মৃত্যুতে এভাবেই ভয়ানক ক্ষতিটি হয়।দেহের মৃত্যুর কারণে এতবড় ক্ষতি হয় না। নিছক মৃত্যুর কারণে জাহান্নামে পৌছাটি কারো জন্যই অনিবার্য নয়। বরং শহীদ রূপে নিহত হলে জান্নাতেও পৌঁছার দরজা খুলে যায়। মুজাহিদগণ তাই মৃত্যুকে ভালবাসেন,যেমন কাফেরগণ ভালবাসে দুনিয়াকে। বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলিতে রাজনীতির মুরতাদ নায়কেরা ফিতনার যে প্লাবন খাড়া করেছে তাতে মূল আয়োজনটি তো ঈমাননাশের। এবং সে অসম্ভব করেছে ইসলামের পথে তথা সিরাতুল মোস্তাকীমে চলা। ইসলামে সূদ হারাম, ঘুষ হারাম। জ্বিনাও হারাম। অথচ বাংলাদেশে কি সূদ বা ঘুষ না দিয়ে কোন কাজ উদ্ধার করা সম্ভব। নিজের হলাল রুজিতে জমি কিনে বা গাড়ি কিনে সেটিকে নিজ নামে রেজিস্ট্রি করার কাজটি কি ঘুষ না দিয়ে সম্ভব? অর্থাৎ মানুষ বাধ্য করা হচ্ছে আল্লাহর আইনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে। ইসলামে অতি ফরজ হলো কোরআনের জ্ঞানার্জন। সেটি সম্ভব না হলে অসম্ভব হয় মুসলমান হওয়া। অথচ ক্ষমতাসীন স্বৈরাচারি দুর্বৃত্তগণ সেটিও হতে দিতে রাজি নয়। বরং তাদের শিক্ষানীতি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহের মূল লক্ষ্যই হলো ইসলাম থেকে মানুষকে দূরে সরানো। বাংলাদেশে এজন্যই জিহাদ বিষয়ক বই বাজেয়াপ্ত করা হয়। অপর দিকে রাষ্ট্র এমন এক অবস্থা সৃষ্টি করে যাতে আল্লাহর শরিয়তি হুকুমের বিরুদ্ধে বিশাল বিদ্রোহও তখন অতি সহজ হয়ে পড়ে। অনৈসলামিক রাষ্ট্রে বসবাসের এটি এক ভয়াবহ বিপদ। কোন ঈমানদার কি এমন শাসন মেনে নেয়?

 

বাংলাদেশে মুরতাদদের রাজনীতি

ইসলামের উপর বিশ্বাস ও তার শরিয়তি বিধান থেকে যারা মুখ ফিরিয়ে নেয় বা আল্লাহতায়ালার কোরআনী হুকুমের বিদ্রোহ করে ইসলামে তাদেরকে মুরতাদ বলা হয়। ইসলামে এটি গুরুতর অপরাধ। মুরতাদদের বড় অপরাধ, তারা শুধু মানুষের চেতনার ভূমিতে নয়, রাষ্ট্র ও সমাজ জুড়েও বিশাল ফিতনা তথা বিদ্রোহাত্মক পরিবেশ সৃষ্টি করে। ইসলামের অর্থ হলো মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিটি হুকুমের কাছে পূর্ণ আনুগত্য। এবং যে কোন কোরঅানী হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহই হলো কাফেরের কাজ। বাংলাদেশে রাজনীতির নামে যা চলছে তা হলো ফিতনা সৃষ্টি তথা ইসলামে বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সংঘটিত করার রাজনীতি। তবে এমন বিদ্রোহের চেষ্টা যে পূর্বে হয়নি তা নয়। এমন কি খোলাফায়ে রাশেদার আমলেও হয়েছে। তবে সে বিদ্রোহীদের দমনে চেষ্টাও হয়েছে। হযরত আবু বকর (রাঃ)র আমলে কিছু মুসলিম নামধারি ব্যক্তি ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঝান্ডা নিয়ে যাকাত দিতে অস্বীকার করেছিল। ইসলামের হুকুমের বিরুদ্ধে সেটি ছিল প্রথম বিদ্রোহ। সে মুরতাদদের সেদিন হত্যা করা হয়েছিল। নামাজ-রোযা, হজ-যাকাত ও কালেমা পাঠ তাদেরকে সে শাস্তি থেকে বাঁচাতে পারিনি। তাছাড়া বিদ্রোহী হওয়ার জন্য কি সব হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হওয়ার প্রয়োজন পড়ে?

বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে করুণাময় ইসলামের বিধান যে কত কঠোর সেটি বুঝা যায় বনি ইসরাইলের সাথে মহান আল্লাহর আচরণ দেখে। বনি ইসরাইলকে তিনি সমগ্র মানব জাতির উপর মর্যাদা দিয়েছিলেন। ফিরাউনের হাত থেকে বাঁচাতে লোহিত সাগরকে তিনি দ্বিখন্ডিত করেছিলেন এবং তাদের চোখের সামনে ফিরাউনের বিশাল বাহিনীকে ডুবিয়ে হত্যা করেছিলেন। সিনা মরুভূমির মাঝে সূর্যের প্রখর উত্তাপ থেকে বাঁচাতে তাদের মাথার উপর মেঘের সামিয়ানা লাগিয়েছিলেন। আসমান থেকে খাদ্য রূপে মান্না ও সালওয়া নাযিল করেছিলেন। পানির তৃষ্ণা মেটাতে হযরত মূসা (আঃ)র লাঠির আঘাতে পাথর ফাটিয়ে পানির ১২টি ঝর্ণা বের করা হয়েছিল। সব কিছু ঘটেছিল তাদের চোখের সামনে। কিন্তু তারাই হযরত মূসা (আঃ)র অবর্তমানে বাছুরকে খোদা বানিয়ে পুজা শুরু করেছিল। হযরত মূসা (আঃ) ফিরে আসলে তারা সে পাপের জন্য অনুশোচনা করেছিল। এবং তাওবাও করেছিল। কিন্তু আল্লাহতায়ালা তাদের সে তাওবা কবুল করেন নি। তাওবা কবুলের শর্ত রূপে তাদেরকে বলা হয়েছিল নিজেদের হত্যা করতে। সেটি ছিল তাদের অবাধ্যতার কাফফারা। প্রখ্যাত তাফসিরকারক আল্লামা ইবনে কাছির (রহঃ)য়ের মতে তাতে ৬ লাখ ইহুদীদের মধ্য থেকে ৭০ হাজারকে হত্যা করা হয়েছিল। এরপর তাদের তাওবাকে কবুল করা হয়েছিল। (সুরা তা-হার তাফসির দ্রষ্টব্য)।এতে বুঝা যায়,জনগণের মাঝে আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ যখন প্রবলতর হয় তখন সে বিদ্রোহীগণ মুখে যতই মুসলমান রূপে জাহির করুক,তাদের তাওবা বা দোয়া কোনটাই তখন কবুল হয় না। আল্লাহতায়ালার কাছে মাগফিরাহ পেতে হলে প্রথমে বিদ্রোহের পথ ছেড়ে পূর্ণাঙ্গ আত্মসমর্পণের পথ ধরতে হয়,সে সাথে বিদ্রোহের কাফফরাও দিতে হয়। বনী ইসরাইলীগণ সে কাফফরা দিয়েছিল ৭০ হাজার মানুষের প্রাণ নাশের মধ্য দিয়ে।

 

অনিবার্য জিহাদ

মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বনি ইসরাইলীদের বিদ্রোহটি ঘটেছিল বাছুর পুজার মধ্য দিয়ে। তাতে নেতৃত্ব দিয়েছিল সামেরী। তবে আজকের মুসলমানগণ বাছুর পুজায় না নামলেও তাদের জীবনে বিদ্রোহটি হচ্ছে অন্যভাবে। এবং সেটিই কম ভয়ানক নয়। সেটি হচ্ছে মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশিত শরিয়তি বিধানের বিরুদ্ধে অবাধ্যতার মধ্য দিয়ে। বাছুর পুজা যেমন কাফেরের কাজ, তেমনি আল্লাহর শরিয়তি বিধান থেকে মুখ ফিরিয়ে আদালতে মানুষের তৈরী আইনকে প্রতিষ্ঠা দেয়াও কাফেরদের কাজ। সুরা মায়েদায় বলা হয়েছে, “মান লাম ইয়াহকুম বিমা আনযালাল্লাহু ফা উলায়িকা হুমুল কাফিরুন .. উলায়িকা হুমুয যালিমুযন .. উলায়িকা হুমুল ফাসিকুন। এ ঘোষণা এসেছে উক্ত সুরার আয়াত ৪৪, ৪৫, ৪৭য়ে)। অর্থঃ আল্লাহতায়ালার নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী যারা বিচারকার্য করে না তারাই কাফের, .. তারাই জালিম…. তারাই ফাসিক। বনী ইসরাইলের বাছুর পুজার চেয়ে আজকের মুসলমানদের বিদ্রোহ কি কম জঘন্য? মুসলিম ভূমিতে মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে এ বিদ্রোহে নেতৃত্ব হিন্দু,খৃষ্টান বা বৌদ্ধরা দিচ্ছে না, দিচ্ছে মুসলিম নামধারি সেক্যুলার রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীগণ। আল্লাহর আইনকে ১৪ শত বছরের পুরোন আইন বলে তারা উপহাসও করছে। আলেমদের অপরাধ, তারা এ বিদ্রোহ ও উপহাসের শুধু নীরব দর্শক নয়,বরং বহু ক্ষেত্রে তারা এ বিদ্রোহী রাজনৈতীক নেতাদের মিত্রও। শরিয়ত প্রতিষ্ঠার দাবী নিয়ে এসব আলেমগণও ময়দানে নেই। এ মুরতাদীরা আল্লাহর আইনকে অমান্য করে বেছে নিয়েছে কাফের ব্রিটিশদের তৈরী কুফরি আইনকে। যে আইনে ব্যাভিচার কোন অপরাধই নয় যদি তা উভয় পক্ষের সম্মতিতে হয়। অপরাধ নয় সূদ, ঘূষ এবং মদ্যপানও। এমন বিদ্রোহীদের হাতে দখলদারির কারণে সমগ্র রাষ্ট্র ও তার প্রতিষ্ঠানগুলি হয়ে পড়েছে শয়তানের হাতিয়ারে। তারা অসম্ভব করে রেখেছে সিরাতুল মোস্তাকীমে চলা। অসম্ভব করেছে ইসলামের জ্ঞানলাভ করা। অসম্ভব হয়েছে ইসলামের শরিয়তি বিধানের পূর্ণ অনুসরণ। মুসলিম জীবনে ঢুকেছে সূদ, ঘুষ, বিপর্দাগীর ন্যায় আল্লাহর বিরুদ্ধে নানাবিধ বিদ্রোহ। এ বিদ্রোহের বিস্তার এতই ব্যাপক যে পতিতাপল্লির জ্বিনাকে নিরাপত্তা দিতে রাতদিন যে পুলিশ পাহারা তার খরচ জোগাতে দেশের নামাজী ও রোযাদারগণও বিনাপ্রতিবাদে রাজস্ব দেয়।

নিজ ঘরে আগুন লাগলে সে আগুন থামানোর দায়িত্ব সে গৃহে বসবাসকারী সবার। সে সাথে পাড়ার লোকেরও। চোখের সামনে ঘর জ্বলতে দেখেও সে পরিবারের বা পাড়ার কেউ যদি আগুন নিভাতে উদ্যোগী না হয় তবে কি তাদেরকে সুস্থ বলা যায়? এমন বিবেকহীনদের কি মানুষ বলা যায়? মদিনার ক্ষুদ্র নগরীতে ইসলামি রাষ্ট্রের যখন সবেমাত্র শুরু তখন আরবের অসভ্য কাফেরগণ জোট বেঁধেছিল সে রাষ্ট্রকে ভূপৃষ্ঠ থেকে বিলুপ্ত করার। ১০ হাজারের অধিক মানুষ সেদিন মদিনাকে ঘিরে ধরেছিল। ইতিহাসে সে যুদ্ধকে জঙ্গে আহযাব বলা হয়। বলা হয় খন্দকের যুদ্ধও। কাফেরদের সে সম্মিলিত হামলা রুখতে প্রতিটি মুসলিম পুরুষই শুধু নয়, নারীগণও মোকাবেলায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। শত্রুর সে হামলার মুখে মুসলমানদের অংশগ্রহণ ছিল শতকরা শতভাগ। তারা রাতদিন পরিশ্রম করে মদিনা ঘিরে গভীর পরিখা খনন করেছিলেন। আল্লাহতায়ালাও তাদের জানমালের বিনিয়োগ দেখে ফেরেশতা পাঠিয়ে সাহায্য করেছিলেন। ফলে সদ্য প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্র সেদিন আসন্ন বিলুপ্তি থেকে রক্ষা পেয়েছিল।

 

শহীদের মর্যাদা

বাংলার মুসলিম ভূমি আজ অধিকৃত। অধিকৃত হয়েছে ভারতের সেবাদাস ও ইসলামের ঘোরতোর দুষমণদের হাতে। ইসলামের এমন দুষমনদের হটানোর দায়ভার কি শুধু বিএনপি,জামায়াত বা কিছু রাজনৈতীক দলের? এটি কি স্রেফ রাজনীতি? ইসলামে এমন দুর্বৃত্তদের হটানোর কাজা তো ইবাদত। এটি পবিত্র জিহাদ। এ দায়িত্ব তো প্রতিটি ঈমানদারের। মহান আল্লাহর কাছে এ প্রশ্নের জবাব অবশ্যই দিতে হবে, যখন দেশ ইসলামের শত্রুদের হাতে অধিকৃত হয়েছিল তখন তোমার ভূমিকা কি ছিল? তুমি কি সে সরকারের বিরুদ্ধে জিহাদ না করে বরং রাজস্ব দিয়ে সাহায্য করনি? ইসলামের স্বঘোষিত এ শত্রুদের হটানোর কাজে যে ঈমানদার প্রাণ দিবে তারা তো শহীদ। এমন শহীদদের জীবনে মৃত্যু নেই। তাদেরকে মৃত বলাকে মহান আল্লাহতায়ালা হারাম করে দিয়েছেন। তাদের জীবনে কবরের আযাব নাই। রোজ হাশরের বিচারের অপেক্ষায় হাজর হাজার বছরের ইন্তেজারও নাই। বিচারের দিনে “ইয়া নফসি, ইয়া নফসি”র আর্তনাদও নাই। আল্লাহর পথে যুদ্ধ নিহত হলে তারা সরাসরি ঢুকবে জান্নাতে। তাদের জীবনে কবরবাস নাই, আলমে বারযাখে বসবাসও নাই। কবরে তাদের লাশ থাকবে বটে কিন্তু তারা চলে যাবে জান্নাতে। শাহাদত প্রাপ্তির সাথে সাথে তারা মহান রাব্বুল আলামিনের মর্যাদাবান মেহমান হবেন। অন্যরা মারা গেলে সাথে সাথে তাদের খাদ্যপানীয় বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু শহীদগণ পাবেন রেজেক –যার প্রতিশ্রুতি পবিত্র কোরআনে দেয়া হয়েছে। এমন মর্যাদা, সরাসরি এরূপ জান্নাতে প্রবেশের সুখবর কি কোন সুফি দরবেশ,বুজুর্গ আলেম,হাফেজ, ক্বারি, মোহাদ্দেস, মোফাচ্ছের বা পীরকে দেয়া হয়েছে? কিয়ামতের দিনে বরং “ইয়া নফসি, ইয়া নফসি” বলতে বলতে তাদের গা দিয়ে ঘাম ছুটবে। মহান আল্লাহর দরবারে তাদেরকে চুলচেরা হিসাব দিতে হবে।পিতামাতা সেদিন নিজ সন্তানদের ভূলে যাবে। ভাই ভাইকে ভূলে যাবে। সবাই তখন নিজেকে বাঁচানো নিয়ে দিশেহারা হবে। শহীদের জীবনে সে দিন আসবে না। তারা তখন থাকবে জান্নাতের আনন্দভূমিতে।

 

মুমিনের দোয়া

দোয়ার মধ্যেই নিখুঁত ভাবে ধরা পড়ে ব্যক্তির জীবনের মূল প্রায়োরিটি। মানুষ সে প্রায়োটি নিয়েই আজীবন বাঁচে। সে অনুযায়ী শিক্ষা নেয়;এবং কর্ম, পেশা বা ব্যবসা গড়ে তোলে। যা যে চায় না তা কখনোই দোয়াতে আনে না। তাই দুনিয়াদার ব্যক্তির সবচেয়ে বড় দোয়াটি ডিগ্রি লাভ, সন্তান লাভ, অর্থ লাভ,চাকুরি লাভ বা স্বাস্থ্যলাভ নিয়ে। সে জন্য মৌলবী ডেকে দোয়ার আসরও বসায়। সে দোয়ায় শাহাদত লাভ গুরুত্ব পায় না। অথচ প্রকৃত মু’মিনের দোয়াতে গুরুত্ব পায় শাহাদত লাভের কামনা। সাহাবাগণ শাহাদত লাভের জন্য অন্যদেরকে দিয়ে দোয়া করাতেন। দোয়ার সাথে তাদের মনের গভীর সংযোগও ছিল। তাই শতকরা ৭০ভাগের বেশী সাহাবী রণাঙ্গণে শহিদও হয়ে গেছেন। প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের থেকে আজকের মুসলমানদের পার্থক্য অনেক। তবে সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো, আজকের মুসলমানগণ যেমন জিহাদবিমুখ, তেমনি শাহাদতবিমুখ। জান্নাতমুখি চেতনা যাদের মধ্যে অতি প্রচন্ড তারাই শাহাদতমুখি হয়।ব্যক্তির জান্নাতমুখিতা টুপিপাগড়ি,লম্বা দাড়ি ও নামায-রোযায় ধরাপড়া না। লাখ লাখ সূদখোর-ঘুষখোর ও মুনাফিকও লম্বা দাড়ি রাখে।মাথায় টুপি-পাগড়ি লাগায়।নিয়মিত নামায-রোযাও আদায় করে। ব্যক্তির জান্নাতমুখিতা ধরা পড়ে রাতের আঁধারে হাত তুলে মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে শাহাদতের আকুতি পেশের মধ্যে। যারা দুনিয়ামুখি তাদের মুখে সে দোয়া আসে না। তাদের ভয়,এমন দোয়া কবুল হলে তো সাধের দুনিয়া ছাড়তে হবে। দুনিয়ার জীবনে জৌলুস বাড়াতে তারা বরং জালেম শাসকের ভাড়াটে সৈনিকে পরিণত হয়। যুগে যুগে এরূপ দুনিয়ামুখি আলেমদের মধ্য থেকে জালেম শাসকেরা লক্ষ লক্ষ তাঁবেদার পেয়েছে। দুনিয়াকে আঁকড়ে ধরে বেশী দিন বেঁচে থাকাই তাদের জীবনের মূল লক্ষ্য। তাদের ধর্মপালন স্রেফ নামায-রোযা ও তাসবিহ পাঠে সীমিত। এমন বকধার্মিকদের কারণেই প্রতিটি মুসলিম ভূমি আজ ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে অধিকৃত।সে অধিকৃতি থেকে মুক্তির লড়াইয়ে সৈন্য নাই। কারণ লড়াই তো জানমালের বিনিয়োগ চাই। ফলে দেশে দেশে আল্লাহর দ্বীন ও তার শরিয়তি বিধান আজ পরাজিত। মহান আল্লাহতায়ালার হুকুম শুধু কিতাবেই রয়ে গেছে, আাইন-আদালতে নাই। ফলে কেড়ে নেয়া হয়েছে তাদের মানমর্যদাও। পবিত্র কোরআনে  মুসলমানদের অভিহিত করা হয়েছিল “কুনতুম খায়রা উম্মাতিন” (তোমরাই হলে শ্রেষ্ঠ জাতি)রূপে, অথচ তারাই আজ বিশ্বমাঝে সবচেয়ে পরাজিত ও অপমানিত।

আজকের বিশ্বের প্রায় ১৩০ কোটি মুসলমানের যে পতিত দশা তার কারণ তো এই স্বৈরাচারী দুর্বৃত্তদের শাসন।বাংলাদেশ তো এ কারণেই বিশ্বমাঝে মর্যাদাহীন। সাহাবায়ে কেরামের যুগে ইসলামের বিধানের বিরুদ্ধে এরূপ বিদ্রোহ হলে বা মুসলিম ভূমি স্বঘোষিত ইসলামের শত্রুদের হাতে অধিকৃত হলে কি ঈমানদারগণ কি ঘরে বসে থাকতেন? সাহাবায়ে কেরামগণ একটি একটি দিনও শরিয়তের হুকুম ছাড়া বেঁচেছেন? রাষ্ট্রের নির্মাণে, উন্নয়নে ও প্রতিরক্ষায় অংশ নেয়া ইসলামে কোন পেশাদারিত্ব নয়, চাকুরিও নয়; এটি স্রেফ রাজনীতিও নয়। এটি অতি পবিত্র জিহাদ। শুধু শ্রম ও অর্থ দানই নয়,অনেক সময় সে কাজে প্রাণদানও অপরিহার্য হয়ে পড়ে। এরূপ চেতনা বলেই প্রাথমিক কালের মুষ্টিমেয় দরিদ্র মুসলমানেরা সে আমলের দুটি বৃহৎ শক্তিকে পরাজিত করে সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার নির্মাণ করতে পেরেছিলেন। কিন্তু এযুগের মুসলিম শাসকেরা নানা বাহানায় সে ইবাদত পালনকে অসম্ভব করে রেখেছে। ইসলাম প্রতিষ্ঠার জিহাদে অংশগ্রহণকে তারা ফৌজদারী অপরাধে পরিণত করেছে। অথচ রাজনীতির জিহাদ হলো রাষ্ট্রের উন্নয়নের প্রচেষ্ঠা। এমন আত্মনিয়েোগ প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। অথচ স্বৈরাচার কবলিত বহুদেশে এটি মৃত্যুদন্ডনীয় অপরাধ। শেখ মুজিবও এটি নিষিদ্ধ করেছিল ইসলামপন্থীদের জন্য। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ অবধি দেশের ইসলামপন্থীদের রাজনৈতিক দলগুলোকে মুজিব বেআইনী ঘোষিত করেছিল এবং ১৯৭৪ এ এসে রাষ্ট্র পরিচালনার কাজকে পরিণত করেছিল তার পরিবার ও দলের নিজস্ব আভ্যন্তরীণ বিষয়ে। প্রতিষ্ঠা করেছিল একদলীয় বাকশালী শাসন। যে কোন স্বৈরাচারী শাসকের ন্যায় মুজিবও সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে দর্শকে পরিণত করেছিল। কোন টীমের শতকরা নিরানব্বই ভাগ খেলোয়াড়কে দর্শকের গ্যালারীতে বসিয়ে কোন দলই বিজয়ী হতে পারে না। তেমনি পারেনি মুজিব আমলের বাংলাদেশও। তার হাতে রাজনীতি পরিণত হয়েছিল লুণ্ঠনের হাতিয়ারে। ফলে নিঃস্ব হয়েছিল সরকারি তহবিল ও জনগণ, এবং তার কুশাসনে বাংলাদেশ অর্জন করেছিল লজ্জাজনক তলাহীন ঝুড়ির খেতাবটি। তার শাসনামলে দরিদ্র মানুষ কাপড়ের অভাবে মাছধরা জাল পরে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল। বাংলার ইতিহাসে আর কোন কালেই এরূপ ঘটনা ঘটেনি।

 

সরকারের নৃশংস বর্বরতা

যে দেশের সেনাবাহিনীর লোকেরা নিজদেশের নাগরিকদের খুন করে লাশ নদীতে ফেলে অর্থ কামায় সে দেশকে কি সভ্য দেশ বলা যায়? সে সরকারও কি সভ্য সরকার,যে সরকার নিরস্ত্র মানুষের উপর সশস্ত্র সেনা লেলিয়ে দিয়ে শতশত মানুষকে হতাহত করে এবং নিহতদের লাশ ময়লার গাড়িতে তুলে গায়েব করে দেয়? অথচ রাজধানীর শাপলা চত্বরে ২০১৩ সালের ৫ই মে তারিখে তো সেটিই হয়েছিল। কোন সভ্য সরকার কি নিজ দেশের নাগরিকদের ঘরবাড়ির উপর বুলডোজার চালিয়ে দেয়? রানা প্লাজার ন্যায় ভবন ধ্বস ও হত্যাকান্ড কি কোন সভ্যদেশে ঘটে।সারিবদ্ধ বালিবুঝাই ট্রাক দিয়ে অবরোধ করে কি বিরোধী দলীয় নেত্রীর বাসা? সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে,বালির গাড়ি দেয়া হয়েছে বিরোধী দলীয় নেত্রীর নিরাপত্তা বাড়াতে। প্রশ্ন তবে কেন প্রধানমন্ত্রীর বাসার সামনে বালির গাড়ি নাই? বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের হত্যা করা,গুম করা,রিমান্ডের নামে নির্যাতন সেলে নিয়ে দৈহীক অত্যাচার করা -কোন ধরণের সভ্যতা? বিরোধী দলের অফিসে ভাংচুর করা,তাদের অফিসে তালা লাগিয়ে দেয়া,বিরোধী পত্রিকা ও টিভি চ্যানেল বন্ধ করে দেয়া,বিরোধীদের দলীয় নেতাকর্মীদের রাজপথে সমাবেশ করতে না দেয়া,এমন কি তাদেরকে নিজ অফিসে মিটিং করতে না দেয়াও কি সভ্যতা? অথচ বিরোধী দল দমনে এরূপ নৃশংস বর্বরতাই হলো শেখ হাসিনা সরকারের নীতি। কোন সভ্য সরকার কি কখনো নির্বাচনের নামে ভোট ডাকাতি করে? ২০১৩ সালের জানুয়ারির যে নির্বাচনে সংসদ গঠন করা হলো সে নির্বাচনে ১৫৪ সিটে কোন ভোটদানের ঘটনাই ঘটেনি। এবং যেখানে ভোটদান হয়েছে সেখানে কি শতকরা ৫ জনও ভোট দিয়েছে? বিশ্বের কোন সভ্যদেশে কি এমন ঘটনা কোনকালেও ঘটেছে? কোন সভ্যদেশের আদালত কি দলীয় ক্যাডারদের দাবীতে বিচারের রায় পাল্টায়? অথচ বাংলাদেশের আদালত শুধু রায়ই পাল্টানো হয়নি,ক্যাডারদের খুশি করতে সংসদের সদস্যগণ আইনও পাল্টিয়েছে।এবং সে আইনের মাধ্যমে নিরপরাধ মানুষদের হত্যার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।এরূপ নানা অসভ্যতার পাশাপাশি দুর্বৃত্তিতে ৫ বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ান হওয়াটিও কি কম বর্বরতা? সভ্যদেশে চুরি-ডাকাতি,সন্ত্রাস ও খুনখারাবী করে কিছু চোর-ডাকাত,খুনি ও নরপিশাচ,এবং সে ভয়ানক অপরাধীদের গ্রেফতার করে কঠোর শাস্তি দেয় সরকার। কিন্তু অসভ্য দেশে সে ভয়ানক অপরাধগুলি করে খোদ সরকার। সরকারি দলের চুরি-ডাকাতির কারণেই বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অবকাঠামা নির্মাণের প্রজেক্ট পদ্মাসেতু বহু বছরের জন্য পিছিয়ে গেল। অসভ্য দেশে আইন-আদালত,পুলিশ ও সেনাবাহিনীর কাজ হয় দুর্বৃত্ত সরকারকে দিবারাত্র প্রটেকশন দেয়া। হালাকু-চেঙ্গিজদের আমলে সেটিই হতো।আজ  সেটিই হচ্ছে বাংলাদেশে।

 

যে ব্যর্থতা জনগণের 

জাতীয় জীবনে কদর্যতা স্রেফ সরকারের ব্যর্থতার কারণে আসে না। সেটি অনিবার্য হয় সর্বসাধারণের ব্যর্থতায়। জাতির অর্জিত সফলতার কৃতিত্ব যেমন প্রতিটি নাগরিকের,তেমনি ব্যর্থতার দায়ভারও প্রতিটি নাগরিকের। দেশগড়ার কাজে সমগ্র দেশবাসী একটি দলবদ্ধ টিম রূপে কাজ করে। টিম হারলে যেমন সে টিমের সবাই হারে, তেমনি জাতির বেলায়ও। দেশ গড়া, শান্তিপ্রতিষ্ঠা ও দেশের প্রতিরক্ষার দায়-দায়িত্ব তাই কিছু নিছক রাজনৈতিক নেতা,দেশের প্রেসিডেন্ট, মন্ত্রী ও প্রশাসনিক কর্মচারীদের নয়। এ কাজ সমগ্র দেশবাসীর। এটি খেলার বিষয় নয় যে,মুষ্টিমেয় খেলোয়াড়গণ খেলবে এবং আমজনতা দর্শকরূপে তা দেখবে। বরং এ কাজ রাজনৈতিক নেতা, বুদ্ধিজীবী, আলেম-উলামা, ছাত্র-শিক্ষক, প্রশাসনিক কর্মচারি, সেনাসদস্য, কৃষক-শ্রমিকসহ রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের। কোন জাতি যখন নীচে নামতে থাকে তখন সে নীচে নামার কারণ বহু। তবে মূল কারণটি হলো,দেশ গড়া ও দেশের প্রতিরক্ষার ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ কাজে জনগণের নিজ নিজ দায়িত্ব পালনা না করা। জাতির ঘাড়ে যখন দুর্বৃত্ত্ব সরকার চেপে বসে তখন পাড়া থেকে চোর-ডাকাত তাড়ানোর মত ঘাড় থেকে সে দুর্বৃত্ত্ব সরকার নামানোর  দায়িত্বটিকে জনগণকে নিজ হাতে নিতে হয়। সে জন্য প্রয়োজনে যুদ্ধ করতে হয়। কিন্তু জাতি বিপদে পড়ে যখন সে কাজগুলি মুষ্টিমেয় কিছু ব্যক্তির হাতে সীমাবদ্ধ হয় এবং বাঁকিরা দর্শকে পরিণত হয়। সকল বিফলতার জন্য তখন শুধু সেই মুষ্টিমেয় ব্যক্তিদের দায়বদ্ধ করা হয়।পলাশির যুদ্ধে বাংলার স্বাধীনতা যখন অস্তমিত হলো তখন শুধু সিরাজুদ্দৌলার পরাজয় হয়নি বরং পরাজিত হয়েছিল বাংলার সমগ্র মানুষ। এ পরাজয়ের জন্য শুধু মীর জাফরকে দায়ী করে অসুস্থ চেতনার মানুষই শুধু নিজের দায়ভার ও দুঃখ কমাতে পারে,বিবেকবান মানুষ তা পারে না। সে পরাজয়ের জন্য দায়ী ছিল বাংলার সমগ্র মানুষ।

একটি দেশ কতটা সভ্য সে বিচারটি দেশের ভূ-প্রকৃতি, জলবায়ু, গাছপালা, ক্ষেত-খামার দিয়ে হয় না। ইট-পাথর ও লোহালক্কর দিয়ে নির্মৃত ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট বা কলকারখানার সংখ্যা দিয়ে হয় না। বরং সে বিচারটি হয় সেদেশের মানুষের মান, শাসকের মান এবং আদালতের আইনের মান দিয়ে। হালাকু-চেঙ্গিজের ন্যায় চোরডাকাতের হাতে দেশ গেলে সেখানে ঘরবাড়ি,রাস্তাঘাট ও প্রাসাদ নির্মিত হলেও সভ্যতা নির্মিত হয়না। ইসলাম তার প্রাথমিক কালে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা জন্ম দিয়েছে কোন তাজমহল,পিরামিড বা কোন বিস্ময়কর প্রাসাদ না গড়েই। তারা জন্ম দিয়েছিল এমন বিবেকমান শাসকের যারা চাকরকে উঠের পিঠে চড়িয়ে নিজে উঠের রশি ধরে সামনে চলাকে নিজের নৈতীক দায়িত্ব মনে করেছে। প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল এমন উন্নত আইনের যে আইনের স্রষ্টা কোন মানুষ ও পার্লামেন্ট ছিল না, ছিলেন খোদ মহান আল্লাহতায়ালা। সে শরিয়তি আইনে নারী-পুরুষ তার মৌলিক স্বাধীনতা ও অধিকার পেয়েছিল। বিলুপ্ত হয়েছিল আদি আমল থেকে চলে আসা দাসপ্রথা। নারী শিশুরা সেদিন জীবন্ত দাফন হওয়া থেকে বেঁচেছিল। সমাজ থেকে বিলুপ্ত হয়েছিল চোর-ডাকাতেরা। বিলুপ্ত হয়েছিল মদ্যপান, জুয়া ও ব্যাভিচারের ন্যায় আদিম অপরাধ। নানা ধর্মের মানুষ সে সমাজে নিরাপদে বাস কবতে পারতো। সে রাষ্ট্রে কোন কালেই কোন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঘটেনি।অথচ বাংলাদেশ আজ হালাকু-চেঙ্গিজের ন্যায় বর্বর চোর-ডাকাত ও খুনিদের হাতে অধিকৃত। এদের হাতে যে শুধু ব্যাংক ডাকাতি হচ্ছে বা শেয়ার বাজার লুট হচ্ছে তা নয়, ডাকাতি হচ্ছে ভোটের বাক্সতেও। হাত পড়ছে মানুষের ইজ্জত-আবরু ও জানের উপরও। সাধারণ মানুষ আজ পথে-ঘাটে লাশ হচ্ছে। মৌলিক অধিকার, বাকস্বাধীনতা ও গণতান্ত্র আজ আস্তাকুঁরে গিয়ে পড়েছে। স্বৈরাচার আাজ মুজিব আমলের বাকশালী নিষ্ঠুরতার চেয়েও ভয়ংকর রূপ নিয়ে হাজির হয়েছে। ডাকাতেরা যেমন গৃহকর্তার হাত-পা বেঁধে বা তাকে খুন করে লুন্ঠন করে, তেমনি দেশবাসীকে বন্দি করে এবং তাদের উপর অত্যাচার ও হত্যাকান্ড চালিয়ে অতিশয় দুর্বৃত্ত্বরা আজ দেশ শাসন করছে। দেশ অসভ্যতায় রেকর্ড গড়ছে তো একারণেই।

তবে এরূপ ভয়াবহ অবস্থায় দেশ একদিনে পৌঁছেনি। রোগ ধীরে ধীরে বেড়ে অবশেষে একদিন শরীরের পতন ঘটায়। যে চোর-ডাকাত ও খুনিদের হাতে আজ বাংলাদেশ অধিকৃত তারা ইংরেজদের মত বিদেশ থেকে আসেনি। আসমান থেকেও পড়েনি। তারা তো বেড়ে উঠেছে জনগণের মাঝেই।মানুষকে শুধু চাষাবাদ বা ব্যবসাবাণিজ্য জানলে চলে না। স্রেফ বিষাক্ত শাপ ও হিংস্র বাঘ-ভালুকদের চিনলেও চলে না। সেগুলি জানার পাশাপাশি সমাজের চোর-ডাকাত ও খুনিদেরও চিনতে হয়। তাদের ঘৃনা করার সামর্থও থাকতে হয়। সেটিই তো বিবেকের সুস্থ্যাতা। সেটিই তো চেতনার বল। বাংলাদেশের মানুষ সে সুস্থ্যতা নিয়ে তেমন বেড়ে উঠেনি। চেতনায় সে বলও পায়নি। সে অসুস্থ্যতা যে শুধু স্বল্পসংখ্যক মানুষের -তা নয়। বরং সে রোগ বিপুল সংখ্যক মানুষের। এবং সে রোগটি নিখুঁত ভাবে ধরা পড়ে নির্বাচন কালে। এমন অসুস্থ্যতা মানুষের আধিক্যের কারণে কোন বিবেকমান সৎ মানুষের পক্ষে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়া অসম্ভব। বিলেতে কোন এমপি একবার মিথ্যুক প্রমাণিত হলে তার আর এমপি পদ থাকে না। অথচ বাংলাদেশে শুধু মিথ্যুক নয়, চোরডাকাত প্রমাণিত হলেও বিপুল ভোটে সে নির্বাচিত হয়।সেটি চেতনায় চরম অসুস্থ্যতার কারণে।বস্তুতঃ এমন এক অভিন্ন অসুস্থ্যতার কারণে মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব হযরত মহম্মদ (সাঃ)কেও মক্কার কাফেরদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে রাতের আঁধারে গোপনে জন্মভূমি ছাড়তে হয়েছে। একই অবস্থা হয়েছিল হযরত ইব্রাহীম (আঃ)ও হযরত মূসা (আঃ)র মত মানব ইতিহাসের অন্যান্য শ্রেষ্ঠ মানবদের।

 

অর্জিত আযাব  ও কাফফারা

অন্যায় ও অসত্যকে ঘৃণা,আর ন্যায় ও সত্যকে ভালবাসার সামার্থই মানব জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সামর্থ। এমন সামর্থের বলেই মানব ফেরেশতাদের চেয়েও শ্রেষ্ঠ হয়। সে সামর্থটি দৈহীক বলে আসে না, সে জন্য নৈতীক বল লাগে। সে জন্য লাগে চেতনায় সুস্থ্যতা। লাগে চিন্তা ও দর্শনর বল। বাংলাদেশের মানুষের সে নৈতীক বল অতি সামান্যই। তাদের মূল সমস্যাটি তো নৈতীক অসুস্থ্যতার।সে অসুস্থ্যতাটি ছড়িয়ে গেছে সমগ্র দেশ জুড়ে। আওয়ামী লীগ কি আজ হঠাৎ করে চোর-ডাকাত ও খুনিদের দলে পরিণত হয়েছে? এ রোগটি তো দলটির জন্মলগ্ন থেকেই।পাকিস্তান আমলেও কি এ দলের লোকজন চুরিডাকাতি কম করেছে? সরকারি অর্থচুরির অপরাধে ঢাকার আদালতে খোদ শেখ মুজিবের সাস্তি হয়েছিল, যদিও পরে ঢাকার উচ্চ আদালত তাকে ছেড়ে দেয়। বাংলাদেশে প্রতি বছর বহুলক্ষ অপরাধী বহু খুনখারাবী ও চুরিডাকাতি করে। কিন্তু ঢাকার উচ্চআদালত তাদের ক’জনকে শাস্তি দেয়? মুজিবকেও তারা দেয়নি। মুজিব ও তার অনুসারিরা কি পাকিস্তান আমলেও কোন বিরোধী দলকে শান্তিপূর্ণ সভা করতে দিয়েছে? তারা তো সংসদের অভ্যন্তরে ডিপুটি স্পীকার শাহেদ আলী হত্যা করেছে শতাধিক সংসদ সদস্যের সামনে।কিন্তু সে হত্যাকান্ডের অপরাধে কোন আদালত কি কাউকে একদিনেরও জেল দিয়েছে? ১৯৭০ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামি ও নুরুল আমীন সাহেবের পাকিস্তান ডিমোক্রাটিক পার্টিসহ কোন দলকেই মুজিব শান্তিপূর্ণ ভাবে নির্বাচনি জনসভা করতে দেয়নি। সর্বত্র গুন্ডা লেলিয়ে দিয়েছে। নির্বাচনের আগেই তারা রাজপথের রাজনীতির উপর নিজেদের দখলদারি প্রতিষ্ঠা করেছিল। শাপলা চত্বরের নৃশংস ভয়াবহতা নিয়ে তারা হাজির হয়েছিল ১৯৭০ সালে ১৮ই জানুয়ারিতে ঢাকার পল্টন ময়দানে জামায়াতে ইসলামির নির্বাচনি জনসভায়। সেদিন পল্টন ময়দানের পাশের রাস্তাগুলো উপর দাঁডিয়ে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের খুনিরা বৃষ্টির মত পাথর নিক্ষেপ সমাগত জনতার উপর। অবশেষে জনসভার অভ্যন্তরে ঢুকেও তারা মানুষ খুনে নেমেছিল। সেদিন জামায়াতের তিনজন নিরাপদ কর্মীকে তারা শহীদ করেছিল এবং আহত করেছিল বহুশত মানুষকে। অথচ সে নৃশংস হত্যাকান্ডের নিন্দার সামর্থ যে কোন সাধারণ মানুষেরই থাকে। এমন কি শিশুদেরও থাকে না। থাকে না শুধু অসভ্য খুনিদের। অথচ সে হত্যাকান্ডকে নিন্দা করে সে সময়ের বাঙালী বুদ্ধিজীবীগণ কোন বিবৃতি দেয়নি। কেউ রাজপথেও নামেনি। বরং পরের দিন দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক সংবাদ খবর ছেপেছিল জামায়াতের কর্মীরাই সমবেত শ্রোতাদের উপর হামলা চালিয়েছে। এই হলো বিপুল সংখ্যক বাঙালীর বিবেকের মান! বাংলাদেশের সে বিবেকশূণ্য জনগণ ১৯৭০ সালের নির্বাচনে সে নৃশংস খুনিদেরই বিপুলভাবে বিজয়ী করেছিল। মুজিবের শাসনামলেও কি এসব চোর-ডাকাত ও খুনিগণ কম অপরাধ করেছে? মুজিবের রক্ষি বাহিনীর হাতে তিরিশ হাজারের বেশী রাজনৈতিক কর্মী খুন হয়েছে। সিরাজ শিকদারকে খুন করে পার্লামেন্টে দাড়িয়ে কোথায় আজ সিরাজ শিকদার বলে হুংকার শুনিয়েছে। গণতন্ত্র কবরে পাঠিয়ে একদলীয় বাকশালী স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠা করাই যে মুজিবের শিক্ষা ও সে সাথে আওয়ামী লীগের গর্বের ঐতিহ্য -সেটি কি এতই পুরনো বিষয়? তারপরও জনগণ এ খুনি ও স্বৈরাচারি বর্বরদের বিপুল ভোটে বিজয়ী করেছে। সেটি যেমন ১৯৯৬ সালে, তেমনি ২০০৮ সালে। নেকড়ে যেখানে যাই সেখানে তার হিংস্রতা নিয়েই হাজির হয়। তেমনি আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীগণও পারে না স্বৈরাচারি দস্যুতা থেকে দূরে সরতে।

কোন সুস্থ্য মানুষের পা একই গর্তে বার বার পড়ে না। কিন্তু বাংলাদেশীরা জেনে বুঝে সে গর্তে বার বার পা দেয়। এটিই বাংলাদেশীদের বড় ব্যর্থতা। ফলে যে চোর-ডাকাত ও খুনিদের হাতে দেশ আজ অধিকৃত তারা বেড়ে উঠেছে জনগণের সাহায্য-সমর্থণ নিয়েই। তাই নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়, বাংলাদেশের উপর আজ যে অসভ্য বর্বরতা চেপে বসেছে সেটি জনগণের নিজস্ব অর্জন। এটি জনগণের নিজস্ব পাপ। মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে শুধু আওয়ামী নেতাকর্মদেরই তোলা হবে না। জনগণকেও তোলা হবে। জিহাদবিমুখ আলেমদেরও তোলা হবে। মহান আল্লাহতায়ালা শুধু ফিরাউনকে ডুবিয়ে হত্যা করেননি, তার সাথে তারা বহু লক্ষ অনুসারিকেও ডুবিয়ে মেরেছেন। তবে পাপ যত বিশালই হোক,সে পাপমোচনের পথ কোন কালেই বন্ধ হয় না। পাপ মোচনের পথ স্রেফ তাওবা নয়, ঘরে বসে স্রেফ তাসবিহ পাঠও নয়। বরং মহান আল্লাহর পথে তাঁর দ্বীন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কোরবানি। আর সে কোরবানি পেশ করতে হয় ইসলামের শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে জিহাদে। মহান আল্লাহর রহমত ছাড়া বাংলাদেশের বুকে কি শান্তি ও কল্যাণ আসতে পারে? আর সে রহমত তো আসে ঈমানদারের জানমালের বিনিয়োগের পর।   ০৬/০১/২০১৫

                        




ডাকাতি ও গণহত্যায় বুদ্ধিজীবীদের উস্কানি এবং বাংলাদেশে অসভ্যতার নতুন মাত্রা

গণহত্যা বাংলাদেশে

ফিরাউন, হিটলার, স্টালিন বা মুজির নিজে হাতে মানুষ খুন করেছেন -সে প্রমাণ নাই। অথচ মানব ইতিহাসে তারাই অতি জঘন্যতম গণগত্যার নায়ক। হুকুম পালনে অসংখ্য চাকর-বাকর থাকলে কি নিজ হাতে মানুষ খুনের প্রয়োজন পড়ে? বাংলাদেশের আইনেও আদালতে প্রমাণিত কোন খুনিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যার অধিকার কোন ম্যাজিস্টেটের থাকে না। জেলা জজেরও থাকে না। তাঁকেও দেশের হাইকোর্ট থেকে অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু স্বৈরাচারি সরকারগণ মানবহত্যার সে অধিকার তাদের আজ্ঞাবহ অশিক্ষিত দাস-সৈনিকদের দেয়। মুজিব তাই সে অধিকার দিয়েছিলেন রক্ষিবাহিনীর সাধারণ সেপাইদেরকে। মুজিবের এ সেপাইগণ ৩০ হাজারের বেশী মানুষ নির্বিচারে হত্যা করেছিল। দেশে মশামাছি মারলে যেমন বিচার হয়না, তেমনি ৩০ হাজার মানুষ হত্যারও কোন বিচার হয়নি। ফলে হত্যাকারি সেপাইদের মধ্যে কারো গায়ে কোন আঁচড়ও লাগেনি। অথচ কোন সভ্যদেশে এমন হত্যাকান্ড হবে এবং হত্যাকান্ড শেষে তার নায়কগণ বিনা বিচারে পার পেয়ে যাবে সেটি কি ভাবা যায়? কিন্তু বাংলাদেশে সেটিই রীতি।

একই রূপ নিষ্টুরতা বার বার ফিরে আসছে বাংলাদেশে। শেখ হাসিনা তার পিতার গনহত্যার রীতি পদে পদে অনুসরণ করছেন। নির্বিচারে মানবহত্যার সে অধিকার তিনি দিয়েছেন পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবীর সাধারণ সেপাইদের। তাই পক্ষিশিকারের ন্যায় তারা মানব শিকার করছে। ২৮শে ফেব্রেয়ারির একদিনেই তারা ৬০ জনের বেশী নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করেছে। পাকিস্তান আমলের পুরা ২৪ বছরে এর একতৃতীয়াংশ মানুষও কি পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছে? মন্দিরের সেবক পুরোহিতগণ ভক্তদের মাঝে নিজস্বার্থেই দেবদেবীর কেরামতি বাড়ায়। গরুছাগলও তাদের হাতে ভগবানে পরিণত হয়। এমন অজ্ঞতার প্রসারেই তাদের ভক্ত ও উপার্জন বাড়ে। তেমনি স্বৈরাচারি শাসকদের সেবকগণও ইতিহাসের অতি দুর্বৃত্ত শাসককেও মহামানব রূপে পেশ করে। তাই নমরুদ-ফিরাউনের ন্যায় গণহত্যার নায়কদেরকে তারা শুধু শাসক রূপে নয়, ভগবান রূপে পেশ করেছে। তেমনি এক দলীয় প্রয়োজনে মুজিবের অনুসারিরাও গণহত্যার নায়ক বাকশালী এ গণশত্রুকে বঙ্গবন্ধু রূপে প্রতিষ্ঠা দিতে চায়।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে পুলিশ গুলি চালিয়েছে আত্মরক্ষার্থে। অথচ প্রমাণ পেশ করা হয়নি যে, পুলিশের উপর কোথাও একটি গুলি চালানো হয়েছে। জনগণ বড় জোর পুলিশের উপর পাথর ছুঁড়েছে। কিন্তু তা থেকে বাঁচার জন্য পুলিশের মাথায় হেলমেট ছিল, সাঁজায়ো গাড়ি ছিল, কাঁদানে গ্যাস ছিল, রবার বুলেট ছিল এবং সাথে লাঠিও ছিল। কিন্তু সেগুলি ব্যাবহার না করে সরাসরি বুলেট ছুড়ার অধিকার তাদের কে দিল? হত্যা-পাগল সেপাইরাই কেবল এমন একটি হত্যাকান্ড ঘটাতে পারে। এবং সেটি ঘটে সরকারের নির্দেশে। এমন একটা হত্যাকাণ্ডকে গণহত্যা ছাড়া আর কি বলা যেতে পারে? এবং এর সাথে শেখ হাসিনা যে জড়িত তা নিয়েও কি সামান্য সন্দেহ থাকে? এমন হত্যাকে জায়েজ করতে প্রতিটি স্বৈরাচারি সরকারই বাহনা পেশ করে। নিহতদের বিরুদ্ধে আরোপিত করে মিথ্যা অপবাদ। এমন কি হযরত মূসা (আঃ)র ন্যায় আল্লাহর মহান রাসূলকে ফিরাউন রাজদ্রোহী, ষড়যন্ত্রকারি ও যাদুকর রূপে আখ্যায়ীত করেছে। সে মিথ্যাকে জনগণের মাঝে প্রচারের স্বার্থে মুজিবের ন্যায় শেখ হাসিনার হাতেও রয়েছে গৃহপালিত বিশাল মিডিয়া। এরা হত্যাপাগল পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবীর খুনিদের সন্ত্রাসী না বলে সন্ত্রাসী বলছে রাস্তায় মিছিলে নামা নিরস্ত্র মুসল্লিদের। মসজিদে তালা ঝুলানোও এদের কাছে কোন অপরাধ নয়। গণহত্যার এরূপ নায়কদের হাতে যুগে যুগে হত্যা ও নির্যাতনের কলাকৌশলগুলি বিশাল ইন্ডাস্ট্রিতে পরিণত হয়েছে। তাতে উৎপাদিত হয়েছে হত্যা ও নির্যাতনের দানবীয় যন্ত্র। নির্মিত হয়েছে আবি গারিবের ন্যায় বিশাল বিশাল কারাগার। আবিস্কৃত হয়েছে গ্যাসচেম্বার ও পারমাণবিক বোমা।

 

মুজিব-হাসিনার তৃপ্তির ঢেকুর

হিটলার যেমন হাজার হাজার ইহুদীদের গ্যাস চেম্বারে পাঠিয়ে ফুর্তি পেত, তেমনি ফুর্তি পেয়েছে শেখ মুজিব। খুনি মুজিব তো সিরাজ শিকদারকে হত্যা করার পর সংসদে ফুর্তিতে আস্ফালন তুলে বলেছেন, “কোথায় আজ সিরাজ শিকদার? বাকশালী মুজিব একদলীয় শাসন চাপিয়ে বিরোধীদের রাজনৈতীক অধিকারই শুধু হনন করেননি, তাদের প্রাণও হরন করেছেন। তিনি আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের হত্যাপাগল কর্মিদের দিয়ে গড়েছিলেন নৃশংস রক্ষিবাহিনী। সে রক্ষিবাহিনী গ্রাম-গঞ্জ ও অলি-গলিতে গিয়ে রাজনৈতীক বিপক্ষদের খুঁজতো। নিছক ভিন্ন রাজনৈতীক বিশ্বাসের কারণে তাদেরকে হত্যা করতো। মুজিব সে সময় বঙ্গভবনে বসে আনন্দে ঢেকুর গিলতেন। আর আজ একই ভাবে মাত্র কয়েক দিনে শতাধিক লাশ ফেলে আনন্দের ঢেকুর গিলছেন তারই কন্যা শেখ হাসিনা। উল্লাস করছেন তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও অন্যান্য আওয়ামী নেতাকর্মীরা। আদালতের পক্ষ থেকে যখন মাওলানা আবুল কালাম আযাদ ও মাওলানা দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীর ফাঁসির হুকম শোনানো হয়,তখন আনন্দে তারা মিষ্টি বিনরণ করে।

সরকার যে জামায়াত শিবিরের নির্মূলে কতটা বেপরোয়া সেটি বোঝা যায় সরকারর মন্ত্রীদের বক্তৃতা-বিবৃতিতে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আওয়ামী লীগের দলীয় কর্মীদের প্রতি আবেদন জানিয়েছেন জামায়াত-শিবির নির্মূলের। প্রধানমন্ত্রী হাসিনা আবেদন জানিয়েছেন, গ্রামে গ্রামে প্রতিরোধ কমিটি গড়ে তোলার। পত্রিকায় প্রকাশ, ঢাকার মেট্রোপলিটন পুলিশের কর্মকর্তা জনাব বেনজির আহম্মদ পুলিশের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন, জামায়াত-শিবির দেখা মাত্রই গুলির। ফলে পক্ষি-শিকারের ন্যায় মানব শিকারে কোথা থেকে অনুপ্রেরণা পায় সেটি কি বুঝতে বাঁকি থাকে?

 

হত্যা যখন গণহত্যা

চুরি-ডাকাতির ন্যায় হত্যাও প্রতি সমাজে অহরহ ঘটে। প্রশ্ন হলো, সাধারণ হত্যাকান্ড থেকে গণহত্যার পার্থক্য কোথায়? পার্থক্যটি সহজেই অনুমেয়। সাধারণ খুনিরা ব্যক্তির ধর্ম, ভাষা, গায়ের রং বা রাজনীতি দেখে খুন করে না। কোন দল বা জনগোষ্ঠিকে নিমূলের জন্যও খুন করে না। এখানে হত্যাকান্ড ঘটে ব্যক্তিগত ভাবে কিছু পাওয়া বা প্রতিশোধের স্বার্থে। সন্ত্রাসী বা ডাকাতদের হাতে সংঘটিত হত্যা তাই গণহত্যা নয়। কিন্তু যখন হত্যার লক্ষ্য হয় কোন বিশেষ একটি ধর্মীয় বিশ্বাস, বর্ণ, ভাষা ও রাজনীতির মানুষকে বেছে বেছে নির্মূল করা তখন সেটি নিতান্ত গণহত্যা। বনের হিংস্র পশুগণ শিকার ধরে নিছক বাঁচার তাগিদে। পেটের ক্ষুধা তৃপ্ত হলে পশু আর শিকার ধরে না। এমন শিকার ধরার মটিভটি নিছক বেঁচে থাকা, পশুকুলকে নির্মূল করা নয়। তাই হিংস্র পশুদের হামলায় কোন বনই পশুশূন্য হয় না। কিন্তু স্বৈরাচারি শাসকদের হাতে প্রকাণ্ড গণহত্যা ঘটে। বিরান হয় ঘরবাড়ি ও জনপদ। কারণ তাদের লক্ষ্য,নিছক পেটের ক্ষুধা মেটানো নয়, বরং মনের সীমাহীন খায়েশ পূরণ। পেট পানাহারে পূর্ণ হয়, কিন্তু ক্ষুদার্ত মন নিছক পানাহারে তৃপ্ত হয় না। তাদের মন চায় বিপক্ষ দল বা গোষ্ঠির সমূলে নির্মূল। তাই হিটলার শুধু জার্মানীতে বসবাসকারি ইহুদী নেতা ও বুদ্ধিজীবীদের নির্মূল নিয়ে খুশি ছিল না, তার লক্ষ্য ছিল প্রতিটি ইহুদীর মৃত্যূ। সে লক্ষ্যপূরণে হিটলার তাই বড় বড় গ্যাস চেম্বার নির্মাণ করেছিল।

মুজিব ৩০ হাজারের বেশী রাজনৈতীক কর্মীকে হত্যা করেছিল তাদের রাজনীতিকে নির্মূল করার লক্ষ্যে। তাই সেটি ছিল নিরেট গণহত্যা। আর হাসিনা তাঁর পিতার সে পদাংক অনুসরণ করে চলেছেন। হাসিনার লক্ষ্য, দেশে ইসলামপন্থিদের নির্মূল। তাঁর নিজের ও দলের প্রকাশ্য স্লোগান রাজাকার নির্মূলের। মুজিবের হাতে ছিল বিশাল রক্ষিবাহিনী। আর হাসিনা পেয়েছে পুলিশ বাহিনী, র‌্যাব আর বিজিবী। সে সাথে আছে ছাত্রলীগের অস্ত্রধারি ক্যাডার বাহিনী -যারা পুলিশের পাশে চাপাতি ও রিভলবার নিয়ে রাজনৈতিক শত্রু খোঁজে এবং তাদেরকে হত্যা করে। নির্যাতনে ও হত্যায় ছাত্রলীগের সে ক্যাডারগণ এতটাই বেপরোয়া যে কিছুদিন আগে বিশ্বজিত দাসের ন্যায় একজন নিরীহ ব্যক্তিকে দিনেদুপুরে পুলিশের সামনে কুপিয়ে হত্যা করেছে। শাহবাগে যারা সমবেত হয়েছে তাদেরও লক্ষ্য শুধু গোলাম আযম, নিজামী, মোজাহিদ বা সাঈদীর ফাঁসি নয়, তারা চায় প্রতিটি রাজাকারের ফাঁসি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের নামে হাসিনা সরকার যে আদালত বসিয়েছে তা থেকে শাহবাগের সমবেত সন্ত্রাসীরা ফাঁসির হুকুম বাস্তবায়ন ছাড়া অন্য কিছু চায় না। ফাঁসির চেয়ে কম কোন শাস্তিতে তারা রাজি নয়। বিশ্বের বহু দেশে যাবজ্জীবন কারাদন্ডই সর্বোচ্চ শাস্তি। জামায়াত নেতা আব্দুল কাদেরে বিরুদ্ধে আদালত তো সে শাস্তিই শুনিয়েছিল। কিন্তু তারা সে শাস্তিতে খুশি নয়। যেহেতু চায় বিরোধীদের নির্মূল, ফলে চায় ফাঁসি। কারণ নির্মূল তো ফাঁসি বা মৃত্যুদন্ড ছাড়া ঘটেনা।

 

ডাকাতি ও গণহত্যায় বুদ্ধিজীবী

একটি দেশ কখনোই কিছু চোরডাকাত, দুর্বৃত্ত অফিসার,সন্ত্রাসী খুনি বা পতিতার পাপে ধ্বংস হয় না। ধ্বংস হয় দুর্বৃত্ত বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতীক নেতাদের পাপে। কারণ তারাই দেশের ড্রাইভিং সিটে। নমরুদ-ফিরাউনের ন্যায় এরাই আল্লাহর আযাবকে জমিনের উপর নামিয়ে আনে। বাংলাদেশও আজ  এরূপ দুর্বৃত্ত বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতীক নেতাদের হাতে অধিকৃত। বাংলাদেশে বহু মানুষ গুম ও খুন হচ্ছে। যেমন পুলিশ ও র‌্যাবের হাতে,তেমনি রাজনৈতীক ক্যাডারদের হাতে।  এরূপ প্রতিটি খুনের আসল নায়ক পুলিশ বা র‌্যাব যেমন নয়, তেমনি রাজনৈতীক ক্যাডারগণও নয়,বরং মুল কলকাঠিটি নাড়ায় দলের নেতা। এবং সে নেতার সাথে কাজ করে এক পাল রক্তপিপাসু বুদ্ধিজীবী। বস্তুত জাতীয় পর্যায়ে সব সময়ই এমন একটি গণহত্যার পঠভূমিকা নির্মান করে বুদ্ধিজীবগণ। বিপক্ষীয় দলের নেতাকর্মীদের হত্যা করা, তাদের ঘরবাড়ি, দোকান-পাটে ডাকাতি করাকে তারা তাদের লেখনি ও বক্তৃতা-বিবৃতিতে প্রশংসনীয় ও বিরত্বপূর্ণ কর্ম রূপে চিত্রিত করে।

এরূপ বুদ্ধিজীবীগণও যে কতটা বিবেকহীন ও নৃশংস হতে পারে তার নজির দেখা গেছে একাত্তরে। সে হিংস্রতার নৃশংস প্রকাশ ঘটেছিল বিহারীদের বিরুদ্ধে। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গণে স্লোগন উঠেছিল “একটা একটা মাড়ু (অবাঙালী) ধরো, সকালবিকাল নাস্তা করো”। তখন নেশা চেপেছিল খুনের। তাদের সে উস্কানির ফলেই বাঙালীরা সেদিন হাজার হাজার বিহারদের নির্বিচারে হত্যা করেছে, তাদের দোকানপাট, ঘরবাড়ি দখল করেছে এবং শত শত বিহারী নারীদের ধর্ষণও করেছে। সে বীভৎস নৃশংসতার কিছু বিররণ পশ্চিমা বিশ্বের সাংবাদিক ও পশ্চিমবাংলার শর্মিলা বোসের লিখনীতে পাওয়া গেলেও বাংলাদেশের বাঙালী বুদ্ধিজীবীদের লেখনিতে নেই। তাদের লেখনিতে তা নিয়ে এক লাইন বর্ণনাও আসেনি। এবং সে নৃশংসতার বিরুদ্ধে তাদের থেকে সামান্যতম নিন্দাবাদও উঠেনি। এই হলো বাঙালী বুদ্ধিজীবীদের চরিত্র ও বিবেকের মান। তাদের একই রূপ চরিত্র আজ ফুটে উঠেছে শাহবাগের মঞ্চে। এখান তারা নাস্তা করতে চায় জামায়াত শিবিরের কর্মীদের রক্তমাংস দিয়ে। তারা ধ্বনি তুলছে “একটা একটা শিবির ধরো, সকাল বিকাল নাস্তা করো”।

 

লক্ষ্য দেশধ্বংস

আওয়ামী লীগের এজেন্ডা দেশগড়া নয়, বরং দেশধ্বংস। বাংলাদেশে শিল্পকারখানা পরিকল্পিত ভাবে ধ্বংস করা হয়েছিল মুজিব আমলে। এবং সেটি ছিল ভারতের হাতে বাংলাদেশের বাজার তুলে দেয়ার লক্ষ্যে। কারণ ভারতকে এছাড়া খুশি করার কোন সহজ পথ ছিল। ফলে মুজিব আমলে ভারতীয় পণ্যের সয়লাব এসেছিল। সেজন্য আদমজীর ন্যায় বিশ্বের সর্ববৃহৎ পাটকলকে ধ্বংস করাও ভারতীয় চরগণ অপরিহার্য মনে করে। ধ্বংস করা হয়েছিল পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত অন্যান্য শিল্প প্রতিষ্ঠানকে। তখন একের পর এক আগুন দেয়া হয়েছিল পাটের গুদামে। ভারতীয় পণ্যের জন্য খুলে দেয়া হয়েছিল দেশের সীমান্ত। এভাবেই একাত্তরে ভারতের সামরিক অধিকৃতি প্রতিষ্ঠা লাভের পর প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল অর্থনৈতিক অধিকৃতি। শেখ হাসিনাও ময়দানে নেমেছে সে অভিন্ন স্ট্রাটেজী নিয়ে। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের সবচেয়ে বৃহৎ বেসরকারি ব্যাংক। এ ব্যাংকের অর্থায়নে দেশে ৪ হাজারের বেশী শিল্প-কলকারখানা প্রতিষ্টিত হয়েছে। তাই ভারতীয় স্বার্থের সেবকগণ চায়, ইসলামী ব্যাংকের ন্যায় সফল প্রতিষ্ঠানটির আশু ধ্বংস। ইতিমধ্যেই তারা সরকারি ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি কাটা ডাকাতি করেছে। এখন ডাকাতি করতে চায় ইসলামি ব্যাংকের কোষাগারে। ডাকাতি করতে চায় ইবনে সিনা হাসপাতাল, ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিকালস এর ন্যায় ইসলামপন্থিদের প্রতিষ্ঠানগুলি। এমন খুন ও ডাকাত কর্মে উৎসাহ দিচ্ছে দেশের আওয়ামী লীগের বুদ্ধিজীবীগণ।

দেশধ্বংসী এসব বুদ্ধিজীবীদের মন যে কতটা সন্ত্রাসপূর্ণ, এবং বিপক্ষীয়দের সম্পদ লুন্ঠন ও তাদের রক্ত নিয়ে হোলি খেলায় তারা যে কতটা পুলক বোধ করেন তারই চিত্র বেরিয়ে এসেছে শাহবাগের সমাবেশে তাদের দেয়া বক্তৃতায়। এরা পেশাদার খুনি নয়, চোরডাকাতও নয়। কিন্তু তাদের ভূমিকাটি পেশাদার চোরডাকাত ও খুনিদের চেয়েও ভয়ংকর। খুনি ও চোরডাকাতগণ জনসভায় দাঁড়িয়ে মানুষকে হত্যা ও চুরিডাকাতিতে উৎসাহ দেয় না। তারা সে কুকর্মকে নিজেদের মধ্যেই সীমিত রাখে এবং গোপনে করে। কিন্তু আওয়ামী বুদ্ধিজীবীরা সে কুকর্মকে জাতীয় সংস্কৃতিতে পরিণত করতে চায়। শাহবাগে প্রদত্ত বক্তৃতায় তারা যেমন খুনে উৎসাহ দিয়েছেন, তেমনি উৎসাহ দিয়েছেন জামায়াতের গড়া প্রতিষ্ঠানগুলির সম্পদের উপর ডাকাতিতে।সে উৎসাহতে বহু স্থানে ইসলামী ব্যাংকের উপর হামলা হয়েছে। ইসলামপন্থিদের প্রতিষ্ঠিত বহু হাসপাতালেও বিপুল ভাংচুর হয়েছে।

 

রক্তপীপাসু বুদ্ধিজীবী

আওয়ামী বুদ্ধিজীবীদের মূল আগ্রহটিও দেশগড়া নয়,বরং দেশধ্বংস। সে লক্ষ্যে বুদ্ধিজীবী নামধারি এসব আওয়ামী দুর্বৃত্তগণ যে কতটা উগ্র সে চিত্রটি ফুটে উঠেছে দৈনিক সংগ্রামে ৭/৩/১৩ তারিখে ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিমের“শাহবাগের বুদ্ধিজীবীরা” শিরোনামে রচিত একটি নিবন্ধে। সে নিবন্ধ থেকে কিছু উদ্ধৃতি দেয়া যাকঃ “সমাবেশে আওয়ামীপন্থী লেখক ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল ও ড. আনোয়ার হোসেন সবচেয়ে বেশি উস্কানিমূলক বক্তব্য দেন। “জয় বাংলা” বলে বক্তব্য শুরু করে মুহাম্মদ জাফর ইকবাল বলেন,“শিবিরকে প্রতিহত করতে আমাদের রাস্তায় লাঠিসোটা নিয়ে নামতে হবে।তোমরা আজ জেগে উঠেছো, বিজয় হবেই হবে।” জামায়াত-শিবিরের সদস্যদের সমাজ,রাষ্ট্র ও সংবাদ মাধ্যমের সব ক্ষেত্র থেকে বর্জনের মাধ্যমে নতুন আন্দোলন গড়ে তোলার আহবান জানান তিনি।জাহাঙ্গির নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড.আনোয়ার হোসেন তো হামলার লক্ষ্যকে শুধু জামায়াতের নির্মূলে সীমিত না রেখে বিএনপির নির্মূলেও উস্কানি দিয়েছেন। সেদিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন,‘জামায়াতের বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যারা ইন্ধন জুগিয়েছে,তাদেরও বিচারের সময় এসে গেছে।জামায়াত-শিবিরকে ক্ষমা করার আর সময় নেই।জামায়াত-শিবির নিয়ন্ত্রিত সব প্রতিষ্ঠানকে বন্ধ করে দিতে হবে। জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে।” ডা.প্রাণ গোপাল দত্ত বলেন,‘এদেশের মাটিতে জামায়াত-শিবির ক্যানসার।একে প্রতিহত করতে না পারলে কেউ নিরাপদে থাকবে না। তাই এদের প্রতিহত করতে হবে। বাংলার মাটি থেকে জামায়াত-শিবিরকে চিরতরে উৎখাত করতে হবে।’ আর উৎখাত তো শুধু নির্যাতন ও তাদের সম্পদ ডাকাতিতে হয় না। এজন্য তাদের হত্যা করা চাই। তাই সে হত্যাকর্মটি যেমন জাফর ইকবাল ও আনোয়ার হোসেন চান, তেমনি চান ডাঃ প্রাণ গোপাল দত্ত। প্রশ্ন হলো,হত্যাপাগল নাযী বাহিনীর খুনিদের মুখে ইহুদীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত আক্রোশ কি এর চেয়ে ভিন্নতর ছিল?

যে কোন সভ্যদেশে গণহত্যায় এমন উস্কানিমূলক বক্তৃতা দেয়া নিতান্তই ফৌজদারি অপরাধ। সে অপরাধে নিশ্চয়ই তাদের শাস্তি হতো। কিন্তু ডাকাত পাড়ায় ডাকাতি ও খুনের উস্কানি দেয়া কোন অপরাধ নয়। বরং সেটি প্রশংসীন কাজ। নইলে ডাকাতপাড়ায় নতুন ডাকাত গড়ে উঠবে কীরূপে? ফলে বাংলাদেশে সে অপরাধে কাউকে গ্রেফতার করে আদালতে তোলা হয়না, শাস্তিও হয় না। সরকার দেশকে একটি ডাকাত-অধিকৃত জনপদে পরিণত করেছে। তাই এসব অপরাধী বুদ্ধিজীবীদের কোন শাস্তি হয়নি। বরং তারা স্ব স্ব পদে অধিষ্ঠিত আছেন। সমাবেশে আওয়ামী লীগ-বামপন্থী লেখক, বুদ্ধিজীবীদের নেতৃত্বে গণ-শপথ পাঠ করানো হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. চন্দ্রনাথ পোদ্দার বলেন, সমাবেশ থেকে যে কোনো একদিন গিয়ে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে অবস্থিত আমার দেশ কার্যালয় গুঁড়িয়ে দেয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। আওয়ামীপন্থী বুদ্ধিজীবী ও বাংলা একাডেমীর সভাপতি অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক রফিক উল্লাহ খানসহ আরও অনেকের বক্তৃতাতেও ছিল ফ্যাসিবাদ ও বাকশালের পদধ্বনি। সমাবেশে উচ্চারিত গানের মধ্যে ছিল, ‘একটা একটা শিবির ধর, সকাল বিকাল জবাই কর’, ‘জামায়াতের আস্তানা গুড়িয়ে দাও গুঁড়িয়ে দাও’, ‘জামায়াতের আস্তানা দখল কর, দখল কর’, ‘সাম্প্রদায়িকতার আস্তানা, ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’, ‘জ্বালো জ্বালো আগুন জ্বালো, শিবির ধরে জবাই করো’, ‘শিবির ধরো ধরো, সকাল বিকাল জবাই কর। অধিকাংশ  গানের মূল কথা ছিল জামায়াতে ইসলামী নেতাদের সম্পত্তি দখল করা এবং দলটির নেতা-কর্মীদের হত্যা বা জবাই করা।”

 

নাজী অধিকৃত বাংলাদেশ

ড.ইনায়েত রহিত নামের একজন প্রবাসী বাংলাদেশী বাংলাদেশের বর্তমান চিত্রটি তুলে ধরতে গিয়ে লিখেছেন,“ Bangladesh is going the way that Germany did in 1929-30-31-32-33. Please read the history of the Nazi party. I can see the exact reflection in Bangladesh. I can see Adolf Hitler, Joseph Goebbels, Herr Ribbentrop, Hermann Goering…….match them to the players in Dhaka…..you will find exact duplicates. They first chased the top Jewish hierarchy, who they blamed for defeat of World War I, and then expanded it to include every Jew…man, woman, child for their misfortune. First they looted their property, banned their clubs; then they went after their blood. Finally it was every Jew…man, woman and child who were to be rounded up and butchered. Blame was spread to include the children, and even unborn children, so Hitler decided on the “final solution”, so future generations would not be born. When I hear the shrill slogans from Dhaka to kill the children of “Razakars”, even their grandchildren, and even future generations to come, I shiver…..I get the cold feeling in my spinal cord, I cry….is this what is coming ? Are the followers of Prophet Muhammad going to face the same cruelty that the followers of Prophet  Moses faced less than a hundred years ago. Are these new Aryans ( the superior Bakshal race) as ruthless as their compatriots ( Nazis) of a couple of generations ago ?

প্রখ্যাত ব্যারিষ্টার Toby M. Cadman গত ৫মার্চ ২০১৩ তারিখে তার সাম্প্রতিক বাংলাদেশ সফরের অভিজ্ঞতার উপর একটি নিবন্ধ লিখেছেন। সে নিবন্ধে তিনি বাংলাদেশী বুদ্ধিজীবীদের একটি চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি আর্ন্তজাতিক মানবতাবিরোধীতা ট্রাইবুনাল (আইসিটি)সর্ম্পকে তিনি  লিখেছেন, All those accused of war crimes must be convicted and duly executed. Nothing less will suffice. One must ask what therefore is the point in a trial where the only acceptable result is execution. One is reminded of the words of Justice Jackson, Chief Prosecutor of the International Military Tribunal, Nuremberg who stated: “If you are determined to execute a man in any case there is no occasion for a trial. The world yields no respect to courts that are merely organized to convict.

To this point, the Prime Minister, Sheikh Hasina Wajed, has been reported as saying in Parliament that she would talk to the judges to convince them to take the sentiments of the protesters into account in formulating their decisions. It is notable that one of the first judgments issued by the Tribunal referred to the ‘will of the people’ in reaching its decision clearly demonstrating the emotive manner in which these trials are now being conducted.

On 28 February 2013, the third accused, Maulana Delwar Hossain Sayedee, was convicted and sentenced to death following a trial that was characterized by prosecutorial and judicial misconduct, witness perjury, witness abduction and a flagrant denial of basic human rights standards. The call for death echoed by the Shahbagh demonstrators has seemingly dictated the course of events unfolding in the Tribunal in an atmosphere where defence witnesses are now too afraid to appear and where the judges have now been swayed by mob, anti-Jamaat sentiment.” The big question is what would have been the response of the Shahbagh demonstrators had Sayedee not received the death sentence. It is clear that the Tribunal Judges were under such pressure to respond to the public calls for blood that, had they not responded as such, it is not inconceivable that it could have been their own blood spilt on Shahbagh.”

 

শাহবাগের পজিটিভ দিক

নর্দমার মশামাছি ও কীটগুলো কখনোই তাদের উপস্থিতি গোপন রাখতে পারে না। তাদের সামনে দুর্গন্ধময় আবর্জনা ফেললেই তারা স্বমুর্তিতে হাজির হয়। শাহবাগের মোড়ে ইসলামের শত্রু নাস্তিক-মুরতাদদের সমাবেশ শুরু হলে এসব আওয়ামী বুদ্ধিজীবীগণও নিজ ঘরে নীরবে বসে থাকতে পারেনি। তারা নিজ নিজ চরিত্র নিয়ে শাহবাগে হাজির হয়েছে। আল্লাহপাক তো এভাবেই সমাজের ভয়ানক দুর্বৃত্তদের সমাজে পরিচয় করিয়ে দেন। বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যায় বিদ্যাশিক্ষার গুরত্বপূর্ণ অঙ্গণেও ইসলামের কতবড় ভয়ংকর শত্রুগুলো বসে আসে সেটিও আল্লাহতায়ালা দুচোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন। শাহবাগের আন্দোলনের এটিই পজিটিভ দিক। ইসলামের রক্তপিপাসু খুনিদের তাই আর হ্যারিকেন লাগিয়ে নগরে বন্দরে খোঁজাখোঁজির প্রয়োজন নেই। তারা নিজেরাই নিজেদের প্রকৃত পরিচয়টি স্বশরীরে জনসম্মুখে তুলে ধরেছে। পানি এতই ঘোলা করা হয়েছে যে বড় বড় মাছ গুলো এখন ভেসে উঠেছে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে যারা ভাবেন তাদের জন্য এটি এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলাদেশে রোগ আর এখন লুকানো বিষয় নয়। রোগের জীবানূগুলো এখন রাজ পথে জোয়ার সৃষ্টি করেছে। কারা দেশের শত্রু আর কারা মিত্র সেটি এখন সুস্পষ্ট। এখন প্রয়োজন,রোগমুক্তির লক্ষ্যে এদের থেকে নিষ্কৃতির লড়াই।

 

চোরডাকাত ও খুনির সংস্কৃতি শাহবাগে

ডাকাতি করা, লুটতরাজ করা এবং মানুষ খুন করা যে কোন সমাজেই অতি গুরুতর অপরাধ। কোন সভ্য সাধারণ মানুষ এমন অপরাধ কর্মে নামে না। এটিই সভ্য সমাজের অতি ন্যূনতম মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি। এমন সভ্য সংস্কৃতির নির্মাণে বছরের পর বছর ধর্মপালন ও জ্ঞানচর্চার প্রয়োজন হয়। তাই ধর্মহীন ও জ্ঞানচর্চাহীন বনেজঙ্গলে তাই সভ্যতর মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি গড়ে উঠে না। পাপুয়া নিউগিনি, আন্দামান বা নিকোবরের বন্য মানুষগুলো তাই জীবন যাপনে পশুকুল থেকে সামান্যই ভিন্ন। কারণ তাদের মাঝে ধর্ম বা জ্ঞানচর্চার প্রবেশ ঘটেনি। ডাকাত-পাড়াতেও সে সংস্কৃতি থাকে না। সেখানে বরং ডাকাতি, খুন ও ধর্ষণও নিন্দনীয় না হয়ে বরং তেমন বর্বর কাজে লাগাতর উৎসাহ দেয়া হয়। ডাকাতপাড়ায় এ রোগটির মূল কারণঃ ধর্মীয় শিক্ষা ও উন্নত নৈতীক জ্ঞান না থাকা। অথচ ডাকাতপাড়ার সে সংস্কৃতি নেমে এসেছে ঢাকার শাহবাগের সমাবেশে। সে সমাবেশ থেকে তাই জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের জবাই করায় উৎসাহ দেয়া হচেছ। স্লোগান উঠেছে তাদের প্রতিষ্ঠানগুলির উপর ডাকাতির। স্লোগান দেয়া হচ্ছে সকল ইসলামপন্থিদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার। অথচ সে স্লোগান গুলো ডাকাতপাড়ার ডাকাত বা পতিতাপল্লির পতিতাও দিচ্ছে না। বরং দিচ্ছে সেখানে জমা হওয়া কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার ছাত্রশিক্ষক। দেশের বুদ্ধিজীবীগণ। বিদ্যাশিক্ষার নামের দেশে কি পরিমাণ ঘৃনা, অশিক্ষা ও কুশিক্ষা ছড়ানো হয়েছে শাহবাগের আন্দোলন হলো তারই উদাহরণ। উনানে বসিয়ে একটু তাপ দিলে পানির আবর্জনা যেমন ফেনা রূপে ভেসে উঠে, তেমনি শাহবাগীদের আন্দোলনে ভেসে উঠছে সমাজের আবর্জনা।

 

গভীরতর নৈতীক পচন

বাংলাদেশে নৈতীক পচনটি যে কতটা গভীরে ছড়িয়ে পড়েছে তার কিছু উদাহরণ দেয়া যাক। কোন সভ্যসমাজে কি কখনো এ স্লোগান উঠে যে, বিচারে রায় হতে হবে একমাত্র মৃত্যুদন্ড? অথচ বাংলাদেশে শুধু সে দাবীই উঠছে না, বরং হুমকি দেয়া হচ্ছে অন্য কোন রায় ঘোষিত হলে তা মানা হবে না। বলা হচ্ছে, ফাঁসির হুকুম না হলে রাজপথের আন্দোলন থামানো হবে না। এমন দাবিতে শাহবাগের আন্দোলনকারিগণ একা নয়, তাদের সে দাবীর প্রতি সমর্থন জানাতে শাহবাগে ছুটে গেছেন ড.কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার রফিকুল হক ও আসিফ নজরুলের মত ব্যক্তিবর্গ। ছুটে গেছেন বহু প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি। বাংলাদেশের পচন যে গত গভীর সেটি কি বুঝতে এরপরও বাঁকি থাকে? বাংলাদেশ অধিকৃত শুধু এক স্বৈরাচারি শাসকগোষ্ঠির হাতেই নয়, নিদারুন জিম্মি হয়ে পড়েছে নৈতিকতাহীন একপাল বু্দ্ধিজীবীদের হাতেও। আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে শাহবাগীদের বিদ্রোহ, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তাদের ফাঁসির দাবি এবং সে দাবির প্রতি এসব বুদ্ধিজীবীদের একাত্মতার এরূপ খবর যতই বিশ্বব্যাপী প্রচার পাচ্ছে ততই ধিক্কার উঠছে বাঙালীর নৈতীক পচন নিয়ে। এখন বিশ্ববাসী বুঝতে পারছে, একমাত্র এমন এক গভীর পচন নিয়েই একটি জাতি বিশ্বের ২০০টির বেশী দেশকে হারিয়ে দুর্বৃত্ত কর্মে পর পর ৫বার প্রথম হতে পারে। নৈতীক পচনটি শুধু দেশের চোর-ডাকাত, পতিতা, ঘুষখোর অফিসার, ডেস্টিনী-হলমার্কের ন্যায় কোম্পানীর কর্মকর্তাদেরকেই আক্রান্ত করেনি, চরম ভাবে আক্রান্ত করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর, আদালতের বিচারক, আইনবিদ, লেখক, বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদদেরও। শাহবাগীদের আন্দোলনের ফলে এদের ভদ্র লেবাস দেহ থেকে খুলে পড়েছে। বিশ্ববাসীর সামনে তারা আজ উলঙ্গ।

 

বাড়ছে বিশ্বব্যাপী অপমান

বিচারের রায় শুধু মৃত্যুদন্ড হলে আদালত বসানো দরকার কি? সে সমাজে তো দরকার শুধু এক পাল হত্যাপাগল জল্লাদের। সে জল্লাদদেরই বিপুল সমাবেশ হয়েছে শাহবাগে। সে প্রশ্নটি রেখেছেন বিলেতে প্রখ্যাত ব্যারিস্টার টবি ক্যাডমান। একই কারণে বিস্মিত হয়েছেন বিশ্বের প্রতিটি বিবেকমান ব্যক্তি। ট্রাইবুনাল বাতিলের বিরুদ্ধে শত শত মানুষ প্রতিবাদে রাজপথে নেমেছে লন্ডন, কায়রো, ইস্তাম্বুল, কলকাতা, কূয়ালামপুর ও টোকিওসহ বিশ্বের বহু নগরীতে। উদ্বেগ বেড়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারে। পৃথিবীপৃষ্ঠে বিচারের নামে এতবড় হত্যাকান্ড আধুনিক কালে হলে তাতে শুধু বাঙালীদেরও অপমান বাড়বে না, অপমান বাড়বে সমগ্র মানব জাতির,বিশেষ করে মুসলমানদের। বাঙালী মুসলমানগণ ইতিমধ্যেই মুসলিম ইতিহাসে বহু অপকর্মে রেকর্ড গড়েছে। সেটি যেমন একাত্তরে মুসলিম ভূমিতে বিশাল কাফের বাহিনী আহবান করে,তেমনি মুজিবামলে তলাহীন ভিক্ষার ঝুলি এবং নব্বইয়ের দশকে হাসিনার প্রথমবার ক্ষমতায় আসায় দুর্নীতিতে বিশ্বে প্রথম হওয়ার মধ্য দিয়ে।এখন বাংলাদেশের ইতিহাসে আরেক কলংক যোগ হতে যাচ্ছে। সেটি বিচারের নামে প্রতিটি রাজাকারের ফাঁসির হুকুমের নামে আরেক গণহত্যার।ফাঁসির রায় আদায়ে আদালতের উপর প্রচন্ড চাপসৃষ্টির উদ্দেশ্যে রাজপথে নামানো হয়েছে দলীয় ক্যাডারদের।বিচারকদের তারা জল্লাদ রূপে ব্যবহার করতে চায়। ক্যাডারদের দাবী,আদালতে ফাঁসির হুকুম না হলে তারা মাঠ ছাড়ছে না। সরকার তাদের শুধু উৎসাহ ও নিরাপত্তাই দিচ্ছে না,লাগাতর অর্থ ও খাদ্যপানীও জোগাচ্ছে। অথচ এরূপ পাইকারি ফাঁসির হুকুম নুরেমবার্গের আদালতে নাজীদের যেমন হয়নি,হেগের আন্তর্জাতিক আদালতে কোন যুদ্ধাপরাধীরও হয়নি। অথচ বাংলাদেশে এমন দাবি উঠছে ১৬ কোটি দেশবাসীর নামে।এমন দাবিতে বিশ্ববাসীর সামনে নিজেদের কদর্যতা ও অপমান ছাড়া আর কি অর্জিত হতে পারে? বাংলাদেশের বিরুদ্ধে এরচেয়ে বড় অপরাধই বা কি হতে পারে? বাংলাদেশের জনগণ কি এরূপ কদর্য অপরাধীদের বরদাশত করতে থাকবে?

 

বাঙালী মুসলমানের ব্যর্থতা

ইসলামে ইবাদত শুধু নামায-রোযা,হজ-যাকাত আদায় নয়,বরং অতি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের নির্মূল। আল্লাহর এ হুকুম পালনই মুসলমানের জীবনে মূল মিশন।সে মিশন পালনেই মুসলমানের জীবনে জিহাদ শুরু হয়।সে জিহাদের বরকতেই তারা পরিণত হয় শ্রেষ্ঠ মানবে। এবং নির্মিত হয় শ্রেষ্ঠতম সভ্যতা।সেটিই পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে,“তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত,তোমাদের আবির্ভাব হয়েছে মানবজাতির জন্য,তোমরা নির্দেশ দাও সৎকর্মের,আর নিষেধ করো অসৎকাজের,এবং বিশ্বাস করো আল্লাহকে।”–সুরা আল-ইমরান,আয়াত ১১০।আরো বলা হয়েছে,“তোমাদের মধ্যে অবশ্যই একটি দল থাকতে হবে যারা কল্যাণের দিকে মানুষকে আহবান করবে,এবং সৎকাজের নির্দেশ দিবে ও অসৎ কাজের নিষেধ করবে।এবং তারাই সফলকাম।”-সুরা আল-ইমরান,আয়াত ১০৪।যে মুসলমানের জীবনে আল্লাহ-নির্দেশিত এ মিশন নেই এবং সে মিশন পালনে জিহাদই নাই –তারা কি বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জাতি হতে পারে? তারা বরং নীচে নামায় বা দুর্বৃত্তিতে বিশ্বরেকর্ড গড়বে সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? বাংলাদেশের কলংক বাড়াচ্ছে একাত্তরের রাজাকারগণ নয়,বরং আজকের ক্ষমতাসীন এ দুর্বৃত্তরাই। বাংলাদেশে নামায-রোযা,মসজিদ-মাদ্রাসা বাড়লেও ১৫ কোটি মুসলমানের দেশটিতে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা যেমন বাড়েনি,অন্যায়ের তান্ডবও কমেনি।বরং সমগ্র দেশে অধিকৃত হয়ে আছে অতি দুর্বৃত্ত অপরাধিদের হাতে।বাংলাদেশের মুসলমানদের এর চেয়ে বড় ব্যর্থতা আর কি হতে পারে? এ ব্যর্থতা নিয়ে মহান আল্লাহর দরবারেই বা কি জবাব দিবে? ১০/৩/২০১৩