বিবিধ ভাবনা ৭২

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. ধর্ম নিয়ে বিভ্রান্তি ও অধর্মের জয়

অধিকাংশ মুসলিমের মাঝে সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তি ও সবচেয়ে বড় অধর্ম ঘটছে ধর্ম নিয়ে। এ বিভ্রান্তি ও অধর্মের কারণ, ধর্ম নিয়ে গণমনে গভীর অজ্ঞতা। অজ্ঞতা নিয়ে কখনোই ধর্ম পালন হয় না। মুসলিমও হওয়া যায় না। মুসলিম হতে হলে তাই প্রথমে অজ্ঞতা সরাতে হয়। সেটি নবীজী (সা:) প্রথম করেছেন। অজ্ঞতার আরবী পরিভাষা হলো জাহিলিয়াত। ইসলামপূর্ব আরবের যুগকে বলা হয় আইয়ামে জাহিলিয়াত তথা অজ্ঞতার যুগ। মহান নবীজী (সা:) ইসলামের আবাদ বাড়িয়েছেন এ অজ্ঞতা দূর করে। এবং কুর’আনী জ্ঞানের আলোও জ্বেলে।

বস্তুত মানব জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি হলো মন থেকে অজ্ঞতা সরানো। এটাই ইসলামে পবিত্রতম ইবাদত। তাই নামায-রোযা ফরজ হওয়ার এক দশকেরও বেশী আগে জ্ঞানার্জনকে ফরজ করা হয়। পবিত্র কুর’আনের প্রথম শব্দটি তাই নামায-রোযা নিয়ে নয়, বরং সেটি হলো “ইকরা” তথা “পড়” অর্থাৎ জ্ঞানবান হও।  কিন্তু বাংলাদেশে সে জ্ঞানবান করার কাজটি হয়নি। বরং কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার নামে ইসলাম থেকে দূরে সরানোর কাজটি অধিক হয়েছে। ফলে বেড়েছে অজ্ঞতা ও বিভ্রান্তি। ফলে বেড়েছে ইসলামচ্যুত জাতীয়তাবাদী, সমাজবাদী, ফ্যাসিবাদী, ও সেক্যুলারিস্টদের সংখ্যা। এ কারণেই বাংলাদেশে ইসলাম পরাজিত এবং বিজয় এসেছে ইসলাম বিরোধী শক্তির।

ধর্মকর্ম বলতে সাধারণতঃ বুঝা হয় নামায-রোযা, হজ্জ-যাকাত ও দোয়া-দরুদের মত কিছু আনুষ্ঠিকতাকে। মুসলিম জীবনে বাধ্যতামূলক এ ধর্মীয় বিধানগুলির অবশ্যই গুরুত্ব আছে। কিন্তু ধর্মের মূল কথা কি স্রেফ নামায-রোযা, হজ্জ-যাকাত ও দোয়া-দরুদ? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় গুণটি হলো মিথ্যার ভীড়ের মাঝে সত্যকে চেনার সামর্থ্য। ফিরাউনের ইঞ্জিনীয়ারদের বিস্ময়কর পিরামিড গড়ার সামর্থ্য থাকলেও সত্যকে চেনার সামর্থ্য তাদের ছিল না। ফলে ফিরাউনকে তারা খোদা বলতো। একই অবস্থা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রীধারী বহু লক্ষ বাঙালীর। অজ্ঞতার কারণেই তারা জাতীয়তাবাদ, সমাজবাদ, ফ্যাসিবাদ ও সেক্যুলারিজমের ন্যায় ভ্রান্ত মতবাদের অনুসারি হয়েছে। বাংলাদেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ব্যর্থতা হলো তারা ছাত্রদের চেতনা থেকে জাহিলিয়াত তথা অজ্ঞতা সরাতে পারিনি। বরং নব্য জাহিলিয়াতে দীক্ষা দিয়েছে।

অতি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মকর্ম হলো সদা সত্য কথা বলা, হারাম উপার্জন থেকে দূরে থাকা এবং নেক আমলে লেগে থাকা। অথচ বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশে সেটিও গুরুত্ব পায়নি। ফলে সৎ আমলের বদলে দেশে প্লাবন এসেছে দুর্নীতিতে। অপর দিকে শুধু গাছ লাগালেই চলে না, আগাছাও নির্মূল করত হয়। ধার্মীক ব্যক্তিকে তাই শুধু মিথ্যা ও দুর্বৃত্তি থেকে দূরে থাকলেই চলে না, দুর্বৃত্তি নির্মূলেও নামতে হয়। ইসলামে নির্মূলের একাজটি এতোই গুরুত্বপূর্ণ যে সেটিকে সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত তথা জিহাদের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। রাষ্ট্রে ইসলাম বিজয়ী হয় এই জিহাদের কারণে। স্রেফ নামায-রোযার কারণে নয়। ব্যক্তির প্রকৃত ঈমান তো এ জিহাদের মধ্যেই ধরা পড়ে। সুরা হুজরাতের ১৫ নম্বর আয়াতে জিহাদকে তাই ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ রূপে ঘোষণা করা হয়েছে। যাদের জীবনে জিহাদ আছে একমাত্র তাদেরকেই সত্যিকার ঈমানদার বলা হয়েছে। নবীজী (সা:) ও তাঁর প্রতিটি সাহাবার মাঝে তাই জিহাদ ছিল। নামায-রোযা-হ্জ্জ-উমরাহ এবং দান-খয়রাত বহু ঘুষখোর, চোরডাকাত ও দুর্বৃত্তও করে। কিন্তু তাদের সত্য বলার সামর্থ্য থাকে না; সামর্থ্যও থাকে না দুর্বৃত্তি হারাম উপার্জন থেকে বাঁচার। তারা দুর্বৃত্ত নির্মূলের জিহাদেও নামে না।

 

২. ইসলামর খুঁটি

ইসলামের খুঁটি ৫টি। ইসলামের বিশাল ঘরটি দাঁড়িয়ে থাকে এই ৫টি খুঁটির উপর। সেগুলি হলো ঈমান, নামায, রোযা, হজ্জ ও যাকাত। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খুঁটিটি হলো ঈমান। ঈমান সঠিক হলেই নামায, রোযা, হজ্জ ও যাকাতের ন্যায় ইবাদতগুলি সঠিক হয় এবং মহান আল্লাহতায়ালার কাছে সেগুলি গ্রহনযোগ্য হয়। ঈমানই আমলের ওজন ও মূল্য বাড়ায়। ঈমানে ভেজাল থাকলে অন্যান্য ইবাদতগুলিতে ভেজাল দেখা দেয়। ঈমানই মু’মিনের জীবনে কম্পাসের কাজ করে। ঈমানের মূল কথাটি হলো, মহান আল্লাহতায়ালার উপর গভীর বিশ্বাস এবং প্রতিটি কর্মে ও আচরণে তাঁকে খুশি করার চেতনা। যে কর্মগুলি মহান আল্লাহতায়ালার অপছন্দের তা থেকে দূরে থাকার সার্বক্ষণিক চেতনা। প্রতি পদে এ বিশ্বাস ও চেতনা নিয়ে বাঁচাই হলো তাকওয়া। এটিই হলো প্রকৃত আল্লাহভীতি।

মু’মিনের ঈমানদারী তথা তাকওয়া শুধু তার নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাতে ধরা পড়ে না। ধরা পড়ে চরিত্র, আচরণ, পোষাক-পরিচ্ছদ, রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, অর্থনীতিসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে। তাই কথাবার্তায় সে যেমন সত্যবাদী হয়, তেমনি তাঁর রাজনীতিতে থাকে অন্যায়ের নির্মূল ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার তীব্র তাড়না। থাকে, দেশের আদালতে শরিয়ত প্রতিষ্ঠার তীব্র প্রেরণা। তাঁর রাজনীতি হয় ভাষা, বর্ণ, ভূগোল-ভিত্তিক বাঁধনের উর্দ্ধে উঠে প্যান-ইসলামীক মুসলিম ভাতৃত্বের। তার রাজনীতি তখন সেক্যুলার বা ধর্মহীন না হয়ে পবিত্র জিহাদে পরিণত হয়। অথচ বেঈমানের রাজনীতিতে সেটি থাকে না। তার বেঈমানী নামায-রোযায় ঢাকা পড়লেও সুস্পষ্ট ধরা পড়ে তার রাজনীতিতে। বাংলাদেশ সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশ হলে কি হবে দেশটিতে জিহাদের সে রাজনীতি প্রতিষ্ঠা পায়নি, পেয়েছে ইসলাম বিরোধীতার রাজনীতি। এখানেই ধরা পড়ে ঈমানের অঙ্গণে ভেজালটি।

বেঈমানী যেখানে প্রবল হয়, সেখানে রম রমা ব্যবসা জমে উঠে ধর্মের নামে। বাংলাদেশে সেটি বহুশত কোটি টাকার ব্যবসা। কোভিড, ম্যালেরিয়া বা কলেরার ন্যায় দৈহিক রোগগুলি চেনা যেমন সহজ, তেমনি সহজ হলো ঈমানের রোগ চেনা। সহজ হলো ধর্মব্যবসায়ীদের চেনা। ঈমানদারের লক্ষণ: তারা নিজেদের জান-মাল দিয়ে জিহাদ করে ইসলামের বিজয় ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠা দিতে। এ জিহাদে তারা তারা কারাবন্দী হয়, নির্যাতিত হয় ও শহীদ হয়। অপর দিকে ধর্ম ব্যবসায়ীদের লক্ষণ: এরা অর্থ দেয় না, বরং অর্থ নেয়। এদের জীবনে শরিয়তের লক্ষে জিহাদ থাকে না, ফলে তারা তেমন নির্যাতিত হয় না, তেমনি কারাবন্দীও হয় না। বরং থাকে ক্ষমতাসীন জালেমে সাথে তাদের সখ্যতা। তাদের জীবনে থাকে নিজ মত, নিজ ফেরকা, নিজ দল ও নিজ নেতাকে প্রতিষ্ঠা দেয়ার লড়াই। ফলে বাংলাদেশে এসব ধর্মব্যবসায়ীদের ব্যবসা জমলেও ইসলাম বিজয়ী হচ্ছে না।    

 

৪. মহান আল্লাহতায়ালার খলিফা ও শয়তানের খলিফা

মুসলিমদের সংখ্যা আজ প্রায় ১৬০ কোটি। ১৬০ কোটি গরু দুধ দিলে সাগর হয়ে যায়। ১৬০ কোটি গাছ ফল দিলে পাহাড় হয়ে যায়। অথচ ১৬০ কোটি মুসলিম আজ কি দিচ্ছে? অথচ মুসলিমদের সংখ্যা যখন ১ কোটিও ছিল না তখন তারা জন্ম দিয়েছে বিশ্বশক্তির। জন্ম দিয়েছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ রাষ্ট্রের। বিশ্ববাসীকে দিয়েছে সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা ও শিক্ষা। কিন্তু আজকের এ ব্যর্থতা নিয়ে মুসলিমদের মাঝে ভাবনা কই? যে পথে চলে বিজয় ও গৌরব জুটলো সে পথে চলার উদ্যোগই বা কই? এ নিয়ে কোথায় সে আত্মসমালোচনা? বাঙালী মুসলিম বুদ্ধিজীবীগণ এ নিয়ে নীরব কেন? বিবেকবান মানুষের বড় পরিচয় হলো, তারা আত্মসমালোচনা নিয়ে বাঁচে। নিজের ব্যর্থতা নিয়ে ভাবে। খোঁজে সাফল্যের পথ। কিন্তু মুসলিম জীবনে আজ কোথায় সে ভাবনা? 

পবিত্র কুর’আনে বর্ণীত মুসলিমদের মূল পরিচয়টি হলো, তারা মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত খলিফা। রোজ হাশরের বিচার দিনে তাদের পুরস্কার মিলবে খলিফা রূপে তারা কতটা দায়িত্ব পালন করেছে তার ভিত্তিতে। দায়বদ্ধতাটি এখানে মহান আল্লাহতায়ালার কাছে। প্রতি দেশে রাজার খলিফা হলো দেশের প্রশাসনিক কর্মকর্তা, সেনা সদস্য, আদালত-বাহিনী ও থানার পুলিশ। তাদের কাজ রাজার সার্বভৌমত্ব ও আইনের প্রতিষ্ঠা দেয়া। শুধু প্রশিক্ষণ নিলে বা নিয়মিত অফিস করলে সে দায়িত্ব পালিত হয় না। প্রয়োজনে রাজার পক্ষে যুদ্ধও করতে হয়। সে যুদ্ধে প্রাণও দিতে হয়। রাজ্যের ভিতর ও বাহির থেকে বিদ্রোহীদের নির্মূল করতে হয়। তেমনি মহান আল্লাহতায়ালার খলিফা রূপে প্রতিটি মুসলিমের দায়িত্ব হলো মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়তী আইনকে প্রতিষ্ঠা দেয়া। অর্থাৎ বিদ্রোহীদের নির্মূল করে তাঁর দ্বীনকে বিজয়ী করা। নবীজী (সা:) ও তাঁর মহান সাহাবাগণ তো সেটাই করেছেন। তাঁরা ধর্মকর্মকে নিছক নামায-রোযা ্ হজ্জ-যাকাতে সীমিত রাখেননি। দ্বীনের শত্রুদের বিরুদ্ধে সমাজের প্রতি অঙ্গণে যেমন বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই করেছেন, তেমনি রণাঙ্গণেও প্রাণ দিয়েছেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, ১৬০ কোটি মুসলিমের মধ্যে ক’জন ইসলামকে বিজয়ী করতে একটি দিন ব্যয় করে? ক’জন প্রান দেয়? ক’জন ইসলামের পক্ষে কলম ধরে বা কথা বলে? ক’জন অর্থ ব্যয় করে? অথচ ভাষার নামে, দলের নামে, দেশীয় বা আঞ্চলিক স্বার্থের নামে হাজার হাজার মুসলিম কথা বলছে, কলম ধরছে এবং প্রান দিচ্ছে। এমন কি অনেকে ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে কাফেরদের বাহিনীতে যোগ দিয়ে।

প্রশ্ন হলো, আজকের ১৬০ কোটি মুসলিম কি পৃথিবীর কোথাও কি মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনের বিজয় এনেছে? প্রতিষ্ঠা দিয়েছে কি তাঁর শরিয়তী আইন? বরং তাদের হাতেই সমগ্র মুসলিম বিশ্ব জুড়ে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে মানুষের তৈরী কুফরি আইন। এবং বিলুপ্ত হয়েছে শরিয়ত। তাদের রাজনীতির কারণে বিজয়ী হয়েছে জাতীয়তাবাদ, বর্ণবাদ, সেক্যুলারিজম, স্বৈরাচারের ন্যায় শয়তানী বিধান। তবে কি মুসলিমগণ পরিণত হয়েছে শয়তানের খলিফায়?

 

৫. বিজয়টি দুর্বৃত্তদের

বাংলাদেশে প্রবল বিজয়টি দুর্বৃত্তদের। এবং পরাজয় ইসলামের। এ দুর্বৃত্তদের মূল হাতিয়ারটি হলো মিথ্যাচার। এরা ইসলামের সত্য বিধানগুলিকেও মিথ্যা বলে। এবং শরিয়তের ন্যায় ইসলামের সে বিধানগুলি প্রতিষ্ঠা্র পথে বাধা সৃষ্টি করে। মিথ্যচারী এসব চোর-ডাকাত, ভোটডাকাত, সন্ত্রাসী ও দুর্বৃত্তগণ কথা বলে ফেরেশতাদের মত। অতীতে তারা ওয়াদা দিয়েছে সোনার বাংলার। প্রচার করেছে, তারাই একমাত্র দেশপ্রেমিক। এবং চরিত্রহরন করেছে অন্যদের। সেটি বুঝা যায়, শেখ মুজিবের অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়লে ও শেখ হাসিনার ব্ক্তৃতা শুনলে। এরা বলে, তারা নাকি দেশ থেকে দুর্নীতি দূর করবে! বলে, জনগণের ভোটের অধিকার দিবে ও ভাগ্য পাল্টাবে!

এদের প্রকৃত চেহারাটি এখন আর গোপন বিষয় নয়। এরাই দেশে চুরি-ডাকাতি, ভোট-ডাকাতি, গুম, খুন, ভারতের ন্যায় বিদেশের দালালী, সন্ত্রাস ও ফাঁসির রাজনীতির জন্ম দিয়েছে। মুখে এরা গণতন্ত্রের কথা বলে, অথচ এরাই গণতন্ত্রকে কবরে পাঠিয়েছে এবং প্রতিষ্ঠা দিয়েছে নিরেট ফ্যাসিবাদের। এরাই বিরোধীদের তীব্র সমালোচনা করে, কিন্তু নিশ্চুপ থাকে নিজেদের কুকর্মগুলো নিয়ে। দেশকে অধিনত করেছে ভারতের। এরাই ক্ষমতায় গেলে সত্য কথা বলা এবং ইসলামী বিচার ব্যবস্থা তথা শরিয়তের প্রতিষ্ঠার রাজনীতিকে শাস্তিযোগ্য অপরাধে পরিণত করে। এরাই রাষ্ট্রীয় প্রশাসনকে দুর্বৃত্ত বিস্তারের হাতিয়ারে পরিণত করেছে।  এভাবে সম্ভব করেছে দুর্বৃত্তি এবং অসম্ভব করেছে ন্যায়-নীতি নিয়ে বাঁচা।

 

৬. বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদ ও জিহাদহীন মুসলিম

অস্ত্রের যুদ্ধে বিরতি আছে। কিন্তু এক মুহুর্তের জন্যও বিরতি নাই বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধের। বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইটি হলো মিথ্যা, অজ্ঞতা, অসত্য ও দুর্বৃত্তির বিরুদ্ধে। এ লড়াই অজ্ঞতা সরিয়ে আলো জ্বালানোর। এ যুদ্ধ হয় কথা, কলম ও বুদ্ধি দিয়ে। ইসলামে এটিও পবিত্র জিহাদ। বুদ্ধিবৃত্তিক এ যুদ্ধটি না হলে কখনোই অস্ত্রের যুদ্ধের পরিবেশ সৃষ্টি হয় না। সে যুদ্ধে সৈনিক জুটে না, এবং বিজয়ও আসে না। ঘোড়ার আগে যেমন গাড়ি জোড়া যায় না, তেমনি বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধের আগে অস্ত্রের যুদ্ধ করায যায় না। নবীজী (সা;)’র জীবনে বুদ্ধিবৃত্তিক এ যুদ্ধটি শুরু হয় নবুয়ত লাভের প্রথম দিন থেকেই। এবং বদরের যুদ্ধ তথা অস্ত্রের যুদ্ধটি আসে নবুয়তের প্রায় ১৫ বছর পর। ইসলামের শত্রু শয়তান ও তার অনুসারিগণ কখনোই তাদের শত্রুদের চিনতে ভূল করে না। তাই বুদ্ধিবৃত্তিক যোদ্ধাদেরও তারা একই রূপ শত্রু রূপে দেখে, যেমন দেখে রণাঙ্গণের সশস্ত্র যোদ্ধাদের। বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গণের মুজাহিদগণও তাই শত্রু শক্তির টার্গেটে পরিণত হয়। এবং তারই প্রমাণ, ইসলামের শত্রু শক্তির হাতে নিহত হতে শহীদ কুতুবের ন্যায় মিশরের প্রখ্যাত মুফাচ্ছিরে কুর’আনকে তাই অস্ত্র হাতে ময়দানে নামতে হয়নি। তার বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদ তথা লেখনির কারণেই তাঁকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়।

বুদ্ধিবৃত্তিক যোদ্ধাদের মূল কাজটি হলো কোনটি সত্য এবং কোনটি মিথ্যা -সেটিকে জনগণের সামনে সুস্পষ্ট ভাবে তুলে ধরা। ভ্রান্ত পথের ভিড়ে জনগণকে সিরাতুল মুস্তাকীম দেখানো। জনগণের চেতনায় বাড়াতে হয় শত শত মিথ্যার মাঝে সত্যকে চেনার সামর্থ্য। এবং জনগণকে অন্যায় ও মিথ্যার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মুজাহিদ রূপে গড়ে তোলা। পবিত্র কুর’আন এবং নবীজী (সা:)’র সূন্নত তো সেটিই শেখায়। বুদ্ধিবৃত্তিক এ লড়াইয়ে বিজয় না এলে রণাঙ্গণের যুদ্ধে বিজয় জুটেনা। বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের মূল লক্ষ্যটি হলো, চেতনার ভূমিকে শত্রুর হামলা থেকে যেমন প্রতিরক্ষা দেয়া, তেমনি শত্রুপক্ষের আরোপিত অস্ত্রের যুদ্ধের মোকাবেলায় লড়াকু সৈনিক গড়ে তোলা।

বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধ যে পবিত্র জিহাদ এবং এ জিহাদের মূল হাতিয়ারটি যে পবিত্র কুর’আন –মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে সে ঘোষণাটি এসেছে পবিত্র কুর’আনে। বলা হয়েছে, “ফালা তুতিয়ীল কাফিরিনা ওয়া জাহিদ’হুম বিহি জিহাদান কাবিরা।” অর্থ: “অতঃপর কাফিরদের অনুসরণ করো না, এবং তাদের বিরুদ্ধে বড় সে জিহাদটি করো সেটি দিয়ে তথা কুর’আন দিয়ে।”-(সুরা ফুরকান, আয়াত ৫২)। উপরুক্ত আয়াতে মহান আল্লাহতায়ালা যে “জিহাদান কাবিরা” তথা বড় জিহাদের কথা বলেছেন সেটি অস্ত্রের যুদ্ধ নয়, সেটি বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদ। এবং সে জিহাদের হাতিয়ার রূপে বলা হয়েছে পবিত্র কুর’আনকে। উপরক্ত আয়াতটি এসেছে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট হুকুম রূপে। তাই এ হুকুম পালন করা প্রতিটি মুসলিমের উপর নামায-রোযার ন্যায় ফরজ। তাই প্রতিটি মুসলিমকে শুধু নামায-রোযা পালন করলে চলে না, তাকে বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদের সৈনিকও হতে হয়। এজন্য তার জিহ্ববা, কলম ও জ্ঞানকে কাজে লাগাতে হয়। কিন্তু ক’জনের রয়েছে সে ফরজ পালন তথা বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদে অংশ নেয়ার সামর্থ্য?

অস্ত্রের জিহাদে চাই অস্ত্র চালানোর সামর্থ্য। তেমনি বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদে চাই কুর’আনী জ্ঞান প্রয়োগের সামর্থ্য। কিন্তু পবিত্র কুর’আন যারা না বুঝে তেলাওয়াতে দায়িত্ব সারে তারা কি সে বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদে কুর’আনের জ্ঞানকে ব্যবহার করতে পারে? তারা কি সেই বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদে মুজাহিদ হতে পারে? হাতিয়ারহীন সৈনিকদের ন্যায় এরূপ জ্ঞানশূণ্যরা সে জিহাদের দর্শকে পরিণত হয়। শয়তান তো সেটিই চায়। শয়তান চায় মুসলিমগণ বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদে হাতিয়ারহীন হোক এবং জিহাদ থেকে দূরে থাকুক। এবং চায়, বিনা যুদ্ধে বিজয়ী হোক তার দল। সে লক্ষ্য সাধনে শয়তান তার খলিফাদের মাধ্যমে প্রচার করে কুর’আন বুঝার প্রয়োজন নাই, না বুঝে পড়লেই অনেক ছওয়াব। শয়তান এভাবে মানুষদের ছওয়াবে মনযোগী করে, বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদে নয়। মুসলিম দেশগুলিতে শয়তানের বিজয় ও ইসলামের পরাজয়ের মূল কারণ তো বুদ্ধিবৃত্তিক এ পবিত্র জিহাদে লড়াকু মুজাহিদের অভাব।      

 

৭. পবিত্র কুর’আনের শক্তি ও শ্রেষ্ঠত্ব

পবিত্র কুর’আনের আরেক নাম হলো নূর তথা আলো। যেমন সুরা তাগাবুনের ৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “ফা আ’মিনু বিল্লাহি ওয়া রাসূলিহি ওয়া নূরিল্লাযী আনজালনা..।” অর্থ: অতঃপর বিশ্বাস করো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর এবং সে নূরের (কুর’আনের) উপর -যা আমি নাযিল করেছি। তাই এ কুর’আনকে বাদ দিলে  মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এবং অসম্পূর্ণ থেকে যায় ইসলামের মিশন। পৃথিবী পৃষ্ঠে পবিত্র কুর’আন কাজ করে মহান আল্লাহতায়ালার মুখপত্র ও হাতিয়ার রূপে। তাই যেখানে পবিত্র কুর’আনী জ্ঞানের প্রতিষ্ঠা ও ব্যপ্তি নাই, সেখানে ইসলা্মও নাই। পবিত্র কুর’আনের আলো ব্যক্তির জীবন থেকে অন্ধকার সরায়। তাই কুর’আনী জ্ঞান না থাকলে, জাহিলিয়াত বা অজ্ঞতা থাকবে সেটিই সুনিশ্চিত। সে অজ্ঞতার অন্ধকারে সঠিক পথ তথা সিরাতুল মুস্তাকীম চেনা অসম্ভব। যে ব্যক্তি কুর’আনের আলো পায়, একমাত্র সে ব্যক্তিই কুর’আনী আলোয় সে সিরাতুল মুস্তাকীম দেখতে পায়। এমন আলোকিত ব্যক্তিই মিথ্যাসেবী, ধর্ম-ব্যবসায়ী ও ক্ষমতালোভী দুর্বৃত্ত রাজনীতিবিদদের ধোকায় পড়ে না।

কুর’আনের আরেক নাম হিকমাহ। হিকমাহ’র অর্থ প্রজ্ঞা। তাই পবিত্র কুর’আন দেয় গভীর প্রজ্ঞা। ফলে যে ব্যক্তি কুর’আন বুঝলো সে কখনোই বেওকুফের ন্যায় আচরন করে না। সে প্রজ্ঞার বলেই তার চেতনায় থাকে অনন্ত-অসীম আখেরাতের ভাবনা। সে জাহান্নামের আযাবে ভয় তাকে পাপে পথ থেকে দূরে রাখে। এবং মনযোগী করে নেক আমলে। এরূপ ব্যক্তিগণই আখেরাতের ভান্ডারে লাগাতর সঞ্চয় বাড়ায়। এমন প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিগণই ধর্ম, বুদ্ধিবৃত্তি ও রাজনীতির ময়দানে কখনোই কুর’আনী জ্ঞানের জ্ঞানশূণ্য বেওকুফদের অনুসারী হয় না। তাই যে দেশের রাজনীতিতে মিথ্যাচারী দুর্বৃত্তদের বিজয় এবং পরাজয় ইসলামের, বুঝতে হবে সে দেশে মানবদের প্রজ্ঞাবান করে গড়ে তোলার কাজটি হয়নি। তখন বুঝা যায়, সে সমাজে কুর’আনী জ্ঞান বিতরণের কাজটি হয়নি। পানাহার না পেলে যেমন দেহের পতন ঘটে, তেমনি কুর’আনী জ্ঞানের অভাবে মৃত্যু ঘটে প্রজ্ঞার। 

পবিত্র কুর’আনের অপর নাম হলো হুদা অর্থাৎ পথ-প্রদর্শনকারী রোডম্যাপ। যেমন সুরা বাকারার দ্বিতীয় আয়াতে বলা হয়েছে, “যালিকাল কিতাবু লা রাইবা ফি’হি হুদাল লিল মুত্তাকীন।” অর্থ: “এই হলো সেই কিতাব যাতে নাই কোন সন্দেহ এবং মু্ত্তাকীনদের জন্য এই হলো পথ-প্রদর্শনকারী রোডম্যাপ।” অর্থাৎ নানা ভ্রান্তপথের মাঝে একমাত্র এই কুর’আনই আল্লাহভীরু মানবদেরকে সঠিক পথটি দেখায়। তখন প্রাপ্তি ঘটে সিরাতুল মুস্তাকীমের। তাই যারা কুর’আনের জ্ঞান পায়, তারাই জান্নাতের পথ পায়। তাই যে ব্যক্তি কুর’আন বুঝে না -সে ব্যর্থ হয় জীবনের চলার পথে সঠিক পথটি খুঁজে পেতে। এরূপ পথহারাদের পথচলাটি হয় জাহান্নামের পথে। এরূপ পথভ্রষ্টরাই সেক্যুলারিস্ট, ন্যাশনালিস্ট, বর্ণবাদী, ও স্বৈরাচারী রাজনীতির নেতাকর্মী হয়।

পবিত্র কুর’আনের আরেক নাম হলো আয-যিকরা তথা স্মরণ। সুরা ক্বাফ’য়ের ৩৭ নম্বর আয়াতে তাই বলা হয়েছে, “ইন্না ফি জালিকা লা যিকরা লি’মান কানা লাহু ক্বালবুন আও আলক্বাস সাময়া ওয়া হুয়া শাহীদ। অর্থ: “নিশ্চয়ই এই কুর’আনের মধ্যে তাঁর জন্য রয়েছে (মহান আল্লাহতায়ালার) যিকর (স্মরণ) যার রয়েছে আলোকিত হৃদয়, রয়েছে শ্রবনের সামর্থ্য এবং রয়েছে পর্যবেক্ষণ ও সাক্ষ্যদানের ক্ষমতা।” পবিত্র কুর’আনের পাঠ তাই ঈমানদারের হৃদয়ে জাগ্রত করে মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণ। তখন তার স্মৃতিতে জেগে উঠে মহান প্রভুর অপার মহিমা, করুণা ও তাঁর প্রতি দায়বদ্ধতার কথা। এবং স্মরণে আসে রোজ-হাশরের বিচার দিন, জান্নাত ও জাহান্নামের কথা। তাই সর্বশ্রেষ্ঠ যিকর হলো অর্থ বুঝে পবিত্র কুর’আন তেলাওয়াত।

 কুর’আনের আরেক নাম হলো ফুরকান -যা সামর্থ্য দেয় কোনটি সত্য ও কোনটি মিথ্যা এবং কোনটি ন্যায় ও কোনটি অন্যায় –সেগুলির মাঝে পার্থক্য করার সামর্থ্য। তাই বেঈমানের বেঈমানী, দুর্বৃত্তের দুর্বৃত্তি ও মিথ্যুকের মিথ্যাচার -কুর’আনের জ্ঞানে যারা আলোকিত তাদের কাছে অজানা থাকে না। অথচ যে ব্যক্তি কুর’আন বুঝে না, সে ব্যর্থ হয় সে সামর্থ্য অর্জনে। এরাই রাজনীতিতে মিথ্যাচারী দুর্বৃত্তদের চিনতে ব্যর্থ হয় এবং তাদের পক্ষ নেয়। বাংলাদেশের মত দেশে দুর্বৃত্তদের বিজয়ের বড় কারণ হলো জনগণের মাঝে কুর’আনী জ্ঞানের এই শূণ্যতা। অন্ধকার যেমন চোর-ডাকাতের অপরাধকর্ম সহজ করে দেয়, তেমনি সমাজ থেকে কুর’আনী জ্ঞানের আলো বিলুপ্ত হলে সহজ হয়ে যায় ইসলাম বিরোধী দুর্বৃত্তদের দুর্বৃত্ত । ইসলামের শত্রুপক্ষ এজন্যই পবিত্র কুর’আন শিক্ষার এতো বিরোধী। ১১/০৮/২০২১

 




বিবিধ ভাবনা ৭১

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. ঈমানের সংজ্ঞা ও বেঈমানী

ঈমানের সংজ্ঞা কি, ঈমানদার কাকে বলে এবং ঈমানকে শক্তিশালীই বা কীরূপে করা যায় -এগুলি হলো মানব জীবনের সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এক্ষেত্রে অজ্ঞতা নিয়ে ঈমানদার হওয়া অসম্ভব। ইসলামে ৫টি খুঁটির মাঝে ঈমানই হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খুঁটি। এ খুঁটিকে মজবুত না করে নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাতের ন্যায় অন্য খুটিগুলিকে মজবুত করা অসম্ভব। মহান আল্লাহতায়ালা ব্যক্তির আমলের ওজন দেখেন। এবং সে ওজন বৃদ্ধি পায় ঈমানের গভীরতায়। এবং ঈমানের খুঁটি মজবুত করার একমাত্র মাধ্যম হলো ওহীর জ্ঞান। ইসলামে এ জ্ঞানার্জন ফরজ। নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাত ফরজ করার এক দশকের বেশী আগে এ জ্ঞানার্জনকে তাই ফরজ করা হয়েছে। সে ফরজ আদায়কে সফল করার জন্যই নাযিল করা হয়েছে পবিত্র কুর’আন। পবিত্র কুর’আনের জ্ঞান ছাড়া ঈমান নিয়ে বেড়ে উঠা অসম্ভব। মহান আল্লাহতায়ালার ঘোষণা: একমাত্র জ্ঞানীরাই আমাকে ভয় করে অর্থাৎ সত্যিকার মুসলিম হয়। তবে সে অপরিহার্য জ্ঞানটি ভাষা, বিজ্ঞান, ইতিহাস, গণিত বা অন্য বিষয়ের জ্ঞান নয়। সেটি পবিত্র কুর’আনের জ্ঞান। বস্তুত সত্যিকার ঈমানদার হওয়ার পথে কুর’আনের জ্ঞানই হলো মূল দরজা।

মুসলিম বিশ্বে আজ সবচেয়ে বড় অজ্ঞতাটি হলো পবিত্র কুর’আনের জ্ঞানে। কুর’আন তেলাওয়াতের বিপুল আয়োজন হলেও তা বুঝার চেষ্টা হয় না। ফলে আদায় হয়না জ্ঞানার্জনের ফরজ। তাই কুর’আনী জ্ঞানের গভীর অজ্ঞতা নিয়ে বসবাস বাংলাদেশের মত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর, শিক্ষক, সর্বোচ্চ আদালতের বিচারক, সাংসদ, সচিব, উকিল, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকসহ তথাকথিত শিক্ষিতজনদের। অথচ মুসলিম শিশুর শিক্ষার শুরু হওয়া উচিত ঈমান কাকে বলে এবং কীভাবে সে ঈমানকে আরো শক্তিশালী করা যায় –সে বিষয়গুলি শেখানোর মধ্য দিয়ে। জ্ঞানদান ও জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে এ গভীর ব্যর্থতার কারণে ব্যর্থ হয়েছে সত্যিকার মুসলিম হওয়ার কাজটি।

কুর’আনী জ্ঞানের অজ্ঞতার কারণে অজ্ঞতা বেড়েছে ঈমানের পরিচয় নিয়ে। অধিকাংশ মুসলিম ঈমান বলতে বুঝে মহান আল্লাহতায়ালা, তাঁর নবী-রাসূল, তাঁর নাযিলকৃত গ্রন্থ, রোয হাশরের বিচার দিন, তাকদির, জান্নাত-জাহান্নাম ও ফেরেশতাদের উপর বিশ্বাস। কিন্তু ঈমানের পরিসীমা আরো গভীর। কারা প্রকৃত ঈমানদার -সে বিষয়টি অতি সহজ ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন খোদ মহান আল্লাহতায়ালা। পবিত্র কোরআনে ঘোষিত ঈমানদারের সে পরিচয়টি হলো: “ঈমানদার একমাত্র তাঁরাই যারা বিশ্বাস করে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে এবং এ নিয়ে আর কোন রূপ দ্বিধা-দ্বন্দ করে না এবং তারা নিজেদের মাল ও জান নিয়ে জিহাদ করে আল্লাহর রাস্তায়। ঈমানের দাবীতে একমাত্র তারাই হলো সত্যবাদী।” -(সুরা হুজরাত, আয়াত ১৫)। উপরক্ত সংজ্ঞা মতে শুধু মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর রাসুলের উপর ঈমান আনলেই ঈমানদার হওয়া যায় না। তাকে মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনের বিজয়ে জিহাদে নামতে হয়। জিহাদ হলো ঈমানের প্রকাশ; যেমন উত্তাপের মাঝে আগুণের প্রকাশ। জিহাদ ছাড়া ঈমানের কথা তাই ভাবাই যায় না। তাই নবীজী (সা:)’র প্রতিটি সাহাবার জীবনে জিহাদ ছিল। জিহাদে সংশ্লিষ্ট না হয়ে নিজেকে ঈমানদার রূপে দাবী করাটি তাই ঈমানের সাথে নিরেট ভন্ডামী।

প্রশ্ন হলো জিহাদ কি? জিহাদ হলো মহান আল্লাহতায়ালার রাজ্যে দুর্বৃত্তির নির্মূল ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার লড়াই। সেটি একমাত্র তাঁরই সার্বভৌমত্ব ও তাঁরই প্রদত্ত আইন শরিয়ত প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ। তাই যার জীবনে আল্লাহর আইন তথা শরিয়তকে বিজয়ী করার জিহাদ নাই, সে ব্যক্তি নামাযী ও রোযাদার বা হাজী হতে পারে, মসজিদের ইমাম, আলেম, মাদ্রাসার শিক্ষক, মোফাছছের বা ইসলামী দলের নেতাও হতে পারে, কিন্তু সে ব্যক্তি প্রকৃত ঈমানদার নয়।

তাই ঈমানদার হওয়ার জন্য মূল শর্ত হলো, শরিয়তের পালন ও প্রতিষ্ঠা নিয়ে বাঁচা। এবং শরিয়ত নিয়ে বাঁচতে গেলে ঈমানদারের জীবনে জিহাদ অনিবার্য হয়ে উঠে। ঈমান ও জিহাদ তাই ব্যক্তির জীবনে সমান্তরাল ভাবে চলে। নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাত নিয়ে বাঁচায় এমন কি কাফের দেশেও ইসলামের শত্রুদের আপত্তি নাই। তাদের আপত্তি শরিয়ত নিয়ে। দেশের আইন-আদালত ও বিচার ব্যবস্থাকে তারা নিজেদের দখলে রাখতে চায়। চায়, নিজেদের গড়া আইনের শাসন। শরিয়তকে প্রতিষ্ঠা দিলে তাদের স্বার্থ বাঁচে না। মুসলিম জীবনে ঈমানের মূল পরীক্ষাটি হয় বস্তুত শরিয়ত পালনের এ ক্ষেত্রটিতে। কারণ জিহাদ এখানে অনিবার্য। যাদের জীবনে শরিয়তের পালন নাই, মহান আল্লাহতায়ালার সংজ্ঞা মতে তারাই ঈমানশূণ্য বেঈমান। সে বিষয়টি মহান আল্লাহতায়ালা সুস্পষ্ট করেছেন পবিত্র কোর’আনের সুরা মায়েদার ৪৪, ৪৫ ও ৪৭ নম্বর আয়াতে। উপরুক্ত তিনটি আয়াতে বলা হয়েছে, যারা শরিয়তের আইন অনুযায়ী বিচার করে না তারা কাফের, জালেম ও ফাসেক। সকল মুসলিম শাসক ও জনগণ ইসলামের এ মৌল বিষয়টি বুঝতো। তাদের কাছে গুরুত্ব পেয়েছে মহাপ্রভুর কাছে ঈমানদার রূপে গণ্য হওয়াটি। ফলে ঔপনিবেশিক কাফেরদের হাতে অধিকৃত হওয়ার আগে সিরাজুদ্দৌলা-শাসিত বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা, মোগল-শাসিত ভারতসহ প্রতিটি মুসলিম দেশে শরিয়তের আইন অনুযায়ী বিচার হতো। সেটি বিলুপ্ত করে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক কাফের শাসকগণ এবং প্রতিষ্ঠা দেয় নিজেদের মনগড়া আইনের। পরিতাপের বিষয় হলো, বিদেশী কাফেরদের শাসন বিলু্প্ত হলেও শরিয়তী শাসন ফিরে আসেনি। আজও কাফেরদের প্রতিষ্ঠিত কুফরি আইন প্রতিষ্ঠিত রয়েছে তাদের খলিফাদের হাতে –যারা বেড়ে উঠেছে তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে।

 

২. মহড়াটি ভূয়া ঈমানের

রাজনীতি ও সংস্কৃতির মাঝে ধরা পড়ে ব্যক্তির প্রকৃত আনুগত্যটির ক্ষেত্রটি কোথায়? এবং অনুকরণীয় সত্ত্বা ও দর্শনটিই বা কী? এখানেই দৃশ্যমান হয় ব্যক্তির ঈমান। কে কতটা নামায-রোযা ও তাসবিহ পাঠ করে -সেটি পথেঘাটে ও কর্মক্ষেত্রে দর্শণীয় হয় না। অথচ রাজনীতি ও সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে ব্যক্তির ঈমান ও বেঈমানী কথা বলে। তাই ঈমানের সাথে বিপ্লব আসে রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের মত একটি মুসলিম দেশের রাজনীতি ও সংস্কৃতির অঙ্গণে কোথায় সে ঈমানের পরিচয়? কোথায় সে কাঙ্খিত ইসলামী বিপ্লব?

রাষ্ট্রের প্রতিটি কর্মচারি প্রতিটি কর্মে সরকারি আইন মেনে চলে। আইন অমান্য করলে বা আইনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলে চাকুরি থেকে শুধু বহিস্কৃতই হয় না, শাস্তিও ভোগ করে। কোর্টমার্শাল হয় বিদ্রোহী সামরিক বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে। রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিককেও মানতে হয় রাষ্ট্রের প্রতিটি আইন। তাই জেল-জরিমানা থেকে বাঁচতে হলে সবাইকে আইন মেনে চলতে হয়। তেমনি জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচতে হলে মানতে হয় মহান আল্লাহতায়ালার আইন শরিয়তকে। স্রেফ নামায়-রোযায় মুক্তি মিলে না। ঈমানের প্রকৃত প্রকাশ তো জীবনের প্রতি পদে শরিয়ত মেনে চলায়। নইলে মহা প্রভুর দরবারে ঈমানের দাবীটি ভূয়া গণ্য হয়। শরিয়তের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হলে শাস্তি শুধু পরকালে নয়, দুনিয়ার বুকেও অনিবার্য হয়ে উঠে। সে অবাধ্যতা আযাব ডেকে আনে। অথচ বাংলাদেশের মত একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশের আদালতে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা নাই। আদালত চলছে ব্রিটিশ কাফেরদের প্রণীত আইনে। মহান আল্লাহর বিরুদ্ধে এর চেয়ে সুস্পষ্ট বিদ্রোহ আর কি হতে পারে? বিস্ময়ের বিষয় হলো, একদিকে চলছে প্রবল বিদ্রোহ, অপর দিকে জোর দেয়া হচ্ছে নামায-রোযা ও তাসবিহ-তাহলিল পালনে।

অথচ মুসলিম হওয়ার অর্থ হলো, মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিটি হুকুমের পূর্ণ আত্মসমর্পণ। ইসলাম শব্দটির উৎপত্তি হলো আসলামা তথা আত্মসমর্পণ থেকে। সে হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ কাফেরে পরিণত করে। এবং সে হুকুমগুলি শুধু নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাতে সীমিত নয়। নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাতের হুকুমগুলি তো মুষ্টিমেয়। অধিকাংশ কুর’আনী হুকুম তো শরিয়ত বিষয়ক। একমাত্র শরিয়তই দেয় জুলুমের নির্মূল, সুশাসন ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার গ্যারান্টি। নামায-রোযার কাজ সেগুলি নয়। তাই শরিয়ত ছাড়া ইসলাম তাই অপূর্ণ। তখন অসম্ভব হয় সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিশুদ্ধি ও ইসলামী সভ্যতার নির্মাণ। শরিয়ত অমান্য করে তাই মুসলিম হওয়া সম্ভব কীরূপে? অথচ বাংলাদেশের মত একটি মুসলিম দেশে সে ভূয়া ঈমানেরই মহড়া হচ্ছে। এবং সেটি দেশের আদালতে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা না দিয়ে। এখানে প্রকাশ পাচ্ছে মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। কথা হলো, এ বিদ্রোহ নিয়ে কি জান্নাতের স্বপ্ন দেখা যায়?

 

৩. মশকরা মহান আল্লাহতায়ালার সাথে!

কর্ম, চরিত্র ও আচরণ নিয়ন্ত্রিত হয় ব্যক্তির চেতনা থেকে। আর ঈমানদারের চেতনার ভূমিতে কাজ করে পরকালের ভয়। পরকালের ভয় না থাকলে অতি কঠিন পাপও সহজ হয়ে যায়। মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহও তখন মামূলী ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। তখন প্রবৃত্তির লালসাই জীবনের ইঞ্জিনে পরিণত হয়। প্রবৃত্তি যা বলে, বেঈমানের জীবনের গাড়ি সেদিকেই চলে। হালাল-হারামে বাছ-বিচার তখন গৌণ হয়ে দাঁড়ায়। অপর দিকে ঈমানদারের জীবনে বিপ্লব আনে পরকালের ভয়। ব্যক্তির জীবনে তখন ইবাদত-বন্দেগী আসে এবং নেক আমলে তাড়াহুড়া শুরু হয়। তখন লাগাতর জিহাদ আসে এবং রাষ্ট্রের বুকে অন্যায়ের নির্মূল ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠায় শহীদ হওয়ার অদম্য বাসনাও জাগে। এভাবেই জনগণের জীবনে নৈতিক ও চারিত্রিক বিপ্লব শুরু হয়। মানুষ তখন ফেরেশতাদের পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছে। এগুলি কোন ইউটোপিয়ান ভাবনা নয়, মুসলিমদের গৌরব যুগে অবিকল তো তাই ঘটেছিল

পরকালের ভয় থাকাতেই নবীজী (সা:)’র সাহাবীদের শতকরা ৬০ ভাগের বেশী শহীদ হয়ে গেছেন। তাদের সে আত্মত্যাগের ফলেই সমাজ থেকে দুর্বৃত্তি বিলুপ্ত হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠা পেয়েছে মহান আল্লাহতায়ালার বিধান। এবং মুসলিমগণ পরিণত হয়েছে বিশ্বশক্তিতে। অথচ চেতনায় পরকালের ভয় না এলে নামায-রোযা, হজ্জ-উমরাহ পালন করেও মানুষ দুর্বৃত্ত ও মুনাফিক হয়। এমন ব্যক্তিদের জীবনে নৈতিক ও চারিত্রিক বিপ্লব আসে না। মুসলিম সমাজে এমন নামাযী ও রোযাদারের সংখ্যা প্রচুর। এরা নামায পড়েও সূদ খায়, ঘুষ খায় এবং জিহাদকে সন্ত্রাস বলে। এদের সংখ্যা বৃদ্ধিতে মুসলিমদের বিজয় ও গৌরব আসে না।

মুনাফিকদের বড় পরিচয়টি হলো, দেশে নানারূপ দুর্বৃত্তির জোয়ার এলেও তাদের জীবনে অন্যায়ের নির্মূল ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায় জিহাদ থাকে না। শহীদ হওয়ার আগ্রহও থাকে না। তাদের সকল সামর্থ্য ব্যয় হয় নিজেদের পার্থিব জীবনকে সমৃদ্ধ ও আনন্দময় করতে। এবং নামায-রোযার ন্যায় ধর্মের কিছু কিছু বিধানকে তারা খেয়াল-খুশি মত বেছে নেয়। অথচ মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশ হলো, ইসলামের সকল বিধানগুলিতে পূর্ণ আত্মসমর্পণ। পবিত্র কুর’আনে বলা হয়েছে, “উদখুলো ফিস সিলমে কা’ফফা।” এর অর্থ: প্রবেশ করো ইসলামে পুরাপুরী ভাবে। ইসলামের আংশিক পালন ও পবিত্র কুর’আনে কোন একটি বিধানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের কোন অবকাশ নাই। অথচ সে বিদ্রোহই পরিণত হয়েছে বাংলাদেশী মুসলিমদের রাজনীতি, সমাজনীতি, সংস্কৃতি, বিচার আচার ও অর্থনীতিতে। তাই দেশের আদালতে কুফরি আইন, অর্থনীতিতে সূদ, প্রশাসনে ঘুষ, বিদ্যালয়ে কুর’আন বর্জন, শহরে পতিতা পল্লী –এ নিয়েই বাংলাদেশীদের ইসলাম পালন! মহান আল্লাহতায়ালার সাথে এর চেয়ে বড় মশকরা আর কি হতে পারে?  

 

৪. নারী রপ্তানীর হারাম বিষয়টি

আলু-পটল, মাছ বা পোষাক বিদেশে রপ্তানি করা যায়। কিন্তু নারীও কি রপ্তানি করা যায়? অথচ বাংলাদেশে সেটি অবাধে হচ্ছে। নারী পরিণত হয়েছে রপ্তানি পণ্যে। অথচ শরিয়তে নারীদের একাকী হজ্জে যাওয়ার অনুমতিও নাই। এ ফয়সালাটি মহান আল্লাহতায়ালার। অজানা বিদেশে এক অপরিচিতের ঘরে একজন পিতা বা মাতা তার মেয়েকে, ভাই তার বোনকে এবং স্বামী তার স্ত্রীকে কীরূপে কাজ করার অনুমতি দেয়? অজানা সে ব্যক্তিটি যে নারী-লোভী দুর্বৃত্ত নয় -সে বিষয়ে তারা নিশ্চিত হলো কী করে? কত মেয়ে ধর্ষিতা হয়ে এবং দৈহিক নির্যাতনের চিহ্ন নিয়ে দেশে ফিরছে -সেটি কি তারা জানে না? সরকারই বা কেন নারীদের বানিজ্যিক পণ্যে পরিণত করে? সরকারের দায়িত্ব তো নারীদের প্রতিরক্ষা দেয়া, হারামকে প্রশ্রয় দেয়া নয়। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার এ বিষয়ে পুরাপুরি দায়িত্বহীন। তারা শুধু বিদেশ থেকে অর্থ লাভকেই গুরুত্ব দেয়। ইসলাম কি বলে -সেটি তাদের কাছে গুরুত্বহীন।

সরকারের এ কুফুরি আচরনের বিরুদ্ধে আলেমদেরই বা প্রতিবাদ কই? সাধারণ মানুষই বা কেন কথা বলে না? অর্থের লোভে মানুষ কি এতটাই বিবেকশূণ্য ও ঈমানশূণ্য হতে পারে? এরূপ ভয়ানক বিবেকশূণ্যতার কারণেই সূদী লেনদেন ও বেশ্যাবৃত্তির ন্যায় জঘন্য পাপ কর্মও বাংলাদেশের ন্যায় একটি মুসলিম দেশে বৈধ অর্থনৈতিক কর্মে পরিণত হয়েছে। এসব কি ঈমানদারীর পরিচয়? বাংলাদেশীদের মধ্যে সত্যিকার ঈমান থাকলে এসবের বিরুদ্ধে জিহাদ শুরু হয়ে যেত। স্রেফ মসজিদ-মাদ্রাসা গড়ে কি এ বেঈমানী ঢাকা যায়?

 

৫. প্রতিযোগিতা শয়তানকে খুশি করায়

আর.এস.এস (রাষ্ট্রীয় সেবক সংঘ) হলো ভারতীয় হিন্দুদের অতি উগ্র সাম্প্রদায়িক হিন্দুত্ববাদী সংগঠন। এ সংগঠন থেকেই জন্ম নিয়েছে বিজিপি। এ সংগঠনের কর্মী নাথুরাম গড়সে ভারতের কংগ্রেস নেতা গান্ধীকে হত্যা করেছিল। আজ এ হত্যাপাগল সংগঠনের কর্মীদের হাতেই অধিকৃত হলো ভারতের শাসন ক্ষমতা, পুলিশ ও আদালত। তারা ভারত থেকে মুসলিমদের নির্মূল করতে চায়। তাদের কথা, হিন্দুস্থান শুধু হিন্দুদের জন্য, এবং ভারতে মুসলিমদের স্থান নাই। রাজপথে তারা স্লোগান দেয়, “মুসলিম কো লিয়ে দো স্থান: পাকিস্তান ইয়া কবরস্থান।” অর্থ: “মুসলিমদের জন্য দুটি স্থান: হয় পাকিস্তান, নয় কবরস্থান।”

ফলে মসজিদ ভাঙ্গলে এবং মুসলিমদের হত্যা ও ধর্ষণ করলেও ভারতের আদালতে শাস্তি হয়না। গুজরাত, মুম্বাই ও দিল্লিতে বহু হাজার মুসলিমকে হত্যা করা হলো, কিন্তু কারো কি শাস্তি হয়েছে? দিন-দুপুরে মাটিতে মিশিয়ে দেয়া হলো ঐতিহাসিক বাবরী মসজিদ, সে অপরাধেও কি কারো শাস্তি হয়েছে? অথচ ভারতের আইনেও সেটি ছিল জঘন্য অপরাধ। মুসলিম হত্যা ও নির্যাতনের কাজটি করে থাকে আর,এস.এস’য়ের গুন্ডারা, সে কাজগুলিই আজ সরকারী ভাবে করছে নরেন্দ্র মোদি সরকারের পুলিশ। নরেন্দ্র মোদি নিজে আর.এস.এস.’র ফসল। অথচ সে মোদীকে ঘনিষ্ট বন্ধু রূপে পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে করে শেখ হাসিনা। উপঢৌকন রূপে শেখ হাসিনা মোদির জন্য হাজার কেজি আম পাঠায়। মুসলিমদের জান-মালের প্রতি সামান্য দরদ থাকলে মোদীর ন্যায় মুসলিম হত্যার নায়ক এক জঘন্য অপরাধীকে কেউ কি বন্ধু রূপে গ্রহণ করে? বন্ধুর মধ্যেই ধরা পড়ে একজন ব্যক্তির নিজের পরিচয়। কারণ, বন্ধু নির্বাচনে মানুষ তার মনের কাছের মানুষকে বেছে নেয়। তখন মধ্য ধরা পড়ে তার নিজের পছন্দের ও অপছন্দের বিষয়টি। তাই মোদিকে চিনলেই হাসিনাকে চেনা যায়।

লক্ষণীয় হলো, নরেন্দ্র মোদি যে নির্যাতনটি করছে ভারতীয় মুসলিমদের বিরুদ্ধে, হাসিনাও সেটিই করছে বাংলাদেশী মুসলিমদের বিরুদ্ধে। উভয়েরই অভিন্ন নীতি। নরেন্দ্র মোদি প্রখ্যাত ইসলামী মনিষী যাকির নায়েককে ভারতে নিষিদ্ধ করেছে। হাসিনাও বাংলাদেশে যাকির নায়ককে নিষিদ্ধ করেছে। মোদি নিষিদ্ধ করেছে ইসলামী চ্যানেল পিস টিভি। হাসিনাও নিষিদ্ধ করেছে ইসলামী টিভি চ্যানেল ও ইসলামপন্থীদের দিগন্ত টিভি। হাসিনা বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রখ্যাত তাফসির কারক দেলওয়ার হোসেন সাঈদীকে সারা জীবনের জন্য কারাবন্দী করেছে। যে বীভৎস ও নৃশংস মুসলিম হত্যাকান্ডটি মোদি ঘটিয়েছে গুজরাতে, শেখ হাসিনা সেরূপ নৃশংস হত্যাকান্ডটি ঘটিয়েছে হিফাজতে ইসলামের মুসল্লীদের বিরুদ্ধে ঢাকার শাপলা চত্ত্বরে। তাই মুসলিম নির্যাতন ও ইসলাম দমনে মোদীর সাথে হাসিনার প্রতিযোগীতা চলছে। তাদের উভয়েরই লক্ষ্য, মুসলিম ও ইসলাম দমন। এ তো নরেন্দ্র মোদীর সাথে হাসিনার শয়তানকে খুশি করার প্রতিযোগিতা। এমন মুসলিম-দুষমন ব্যক্তি কি কোন মুসলিম দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার অধিকার রাখে? এমন দুর্বৃত্তকে শাসক রূপে মেনে নিলে কি ঈমান থাকে? অথচ রাষ্ট্র-প্রধানের এ পবিত্র আসনে ১০ বছর যাবত বসেছেন খোদ নবীজী (সা:)। বসেছেন তাঁর মহান সাহাবাগণ। এ পবিত্র আসন হাসিনার ন্যায় একজন ভোটডাকাত দুর্বৃত্তের হাতে হাইজ্যাক হওয়া নিয়ে বাঙালী মুসলিমদের আদৌ কি কোন ক্ষোভ আছে?

 

৬. শিক্ষা খাতের কদর্য ব্যর্থতা

অজ্ঞ বা জ্ঞানশূণ্য ব্যক্তি কখনোই ঈমানদার হতে পারেনা। ঈমানের খাদ্য হলো জ্ঞান। অজ্ঞতায় মারা যায় ঈমান। বাতি জ্বালাতে যেমন তেল লাগে, ঈমানের বাতি জ্বালাতে তেমনি জ্ঞান লাগে। জাহেলিয়াত বা অজ্ঞতায় সেটি হয়না। এজন্যই নামায-রোযা ফরজ করার আগে মহান আল্লাহতায়ালা জ্ঞান অর্জনকে ফরজ করেছেন। প্রতিটি নারী ও পুরুষের উপর নামায-রোযার ন্যায় সেটি আমৃত্যু ফরজ। মুসলিমের জীবনে দুই অবস্থা। হয় সে কিছু শেখার কাজে ব্যস্ত, নতুবা কাউকে কিছু শেখানোর কাজে ব্যস্ত। শেখা ও শেখানো -এ দুটি কাজই অতি পবিত্র ইবাদত। তাই ঈমানদারের বড় পরিচয়টি হলো, সে সব সময় ব্যস্ত থাকে জ্ঞান অর্জনে বা জ্ঞান বিতরণে। তাই যেদেশে প্রকৃত মুসলিমের বসবাস সেদেশে অশিক্ষা ও কুশিক্ষা থাকতে পারে না। মুসলিম সমাজের অর্থই শিক্ষিত ও সভ্য সমাজ। যে মুসলিম সমাজে অশিক্ষা, কুশিক্ষা ও অসভ্যতা, বুঝতে হবে সে সমাজের মানুষ মুসলিম হতেই ব্যর্থ হয়েছে।

উন্নয়নের ন্যায় দেশের ধ্বংসের শুরুটিও হয় শিক্ষার অঙ্গণ থেকে। শুধু রাজনীতি, আন্দোলন ও বক্তৃতা দিয়ে জাতির ভাগ্য পাল্টানো যায় না। বাংলাদেশে এসব বহু হয়েছে। কিন্তু দেশ ডুবছে। দেশের ভাগ্য পাল্টানোর মূল জায়গাটি হলো শিক্ষালয়। অথচ বাংলাদেশে সে জায়গাকেই ধ্বংস করা হচ্ছে। তাছাড়া শিক্ষাকে শুধু স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসায় সীমিত রাখলে জাতিকে শিক্ষিত করা যায় না। মসজিদ, পত্র-পত্রিকা, বই, সাহিত্য, রেডিও-টিভি -এসবই জ্ঞানদানের শক্তিশালী মাধ্যম। সরকার অপরাধী হয় যদি দেশের একজন নাগরিকও খাদ্যাভাবে মারা যায়। কারণ খাদ্য জোগানোর মূল দায়িত্বটি সরকারের। তেমনি সরকার অপরাধী হয় যদি কোন একজন ব্যক্তিও শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়। প্রতিটি নাগরিককে শিক্ষিত করার মূল দায়িত্বটি সরকারের। অশিক্ষা ব্যক্তির বাঁচাটিই ব্যর্থ করে দেয়। জনগণের এ ব্যর্থতার জন্য দায়ী দেশের ব্যর্থ সরকার। দেশে রাস্তাঘাট, ব্রিজ ও কলকারখানা কম হলেও জাতির এতো ক্ষতি হয়না, যতটা ক্ষতি হয় জাতির সবাইকে শিক্ষিত না করলে। রাস্তাঘাট, ব্রিজ ও কলকারখানা গড়া মহান আল্লাহতায়ালা ফরজ করেননি, কিন্তু ফরজ করেছেন শিক্ষাদানকে। তাই শিক্ষাদানই হলো একটি সভ্য সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত।

দেশে কতটা রাস্তাঘাট-ব্রিজ নির্মিত হলো বা অর্থনৈতিক অগ্রগতি হলো -সে প্রশ্নগুলি রোজহাশরের বিচার দিনে উঠবে না। বরং প্রশ্ন উঠবে, জনগণকে জাহান্নাম থেকে ফেরানোর কাজ তথা ঈমানদার রূপে গড়ার কাজ কতটা হয়েছে -তা নিয়ে। আর ঈমানদার রূপে গড়তে হলে তো সুশিক্ষার আয়োজন বাড়াতে হয়। মানুষ পানাহারের অভাবে কাফের ও অসভ্য দুর্বৃত্ত জীবে পরিণত হয় না। সেটি হয় সুশিক্ষার অভাবে। তাই শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন করে লাভ কি যদি মানুষ বেঈমান, অসভ্য ও দুর্বৃত্তে পরিণত হয়? বাংলাদেশের ঘুষখোর, সূদখোর, মদখোর, ধর্ষক, সন্ত্রাসী, চোর-ডাকাত, ভোটডাকাত ও দুর্নীতিপরায়ন ডাক্তার-ইঞ্জিনীয়ার ও সরকারি কর্মচারীগণ বন-জঙ্গলে বেড়ে উঠেনি। তারা বিপুল সংখ্যায় বেড়ে উঠেছে দেশের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলি থেকে। বিরাজমান বিপুল সংখ্যক এ অপরাধীরাই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতা ও কুকীর্তিগুলি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। ­­    

ঔষধে ভেজাল হলে রোগী বাঁচে না। শিক্ষায় ভেজাল হলে চরিত্র বাঁচে না। সভ্য দেশে এ দুইটি ক্ষেত্রেই ভেজাল  অসহ্য। যে দেশে শিক্ষকগণ অসৎ, অলস ও ফাঁকিবাজ এবং পরীক্ষায় যে দেশে নকল হয় ও প্রশ্নপত্র ফাঁস হয় -সে দেশের শিক্ষায় ভেজালটি অতি গভীর। অপর দিকে শিক্ষাকে শুধু স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসায় সীমিত রাখলে জাতিকে শিক্ষিত করা যায় না। মাদ্রাসায় পরিণত করতে হয় সমগ্র দেশকে। বলা হয়ে থাকে, একটি শিশুকে গড়ে তোলার দায়িত্ব শুধু একটি পরিবারের নয়, সে দায়িত্ব সমগ্র মহল্লাবাসী বা গ্রামবাসীর। একটি গাছও একাকী বেড়ে উঠেনা। সে জন্য চাই সহযোগী পরিবেশ ও আলোবাতাস। তাই প্রতিটি ঘর ও জনপদে চাই শেখা ও শেখানোর পরিবেশ। শিক্ষাদানটি হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্মিলিত সামাজিক দায়িত্ব পালনের জায়গা। মুসলিমগণ যখন শিক্ষাদীক্ষায় সবচেয়ে বড় বিপ্লব এনেছিল এবং গড়ে উঠেছিল বিশ্বশক্তি রূপে তখন তাদের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ই ছিল না। তারা প্রতিটি গৃহকে পরিণত করেছিল সার্বক্ষণিক বিদ্যালয়ে এবং প্রতিটি মসজিদকে পরিণত করেছিল কলেজে। মায়েরা পরিণত হয়েছিল সার্বক্ষণিক শিক্ষিকায়। জ্ঞানবান ও চরিত্রবান মানুষ গড়ে উঠেছিল সেসব বিদ্যালয় থেকেই।

মুসলিমদের গৌরব কালে শিক্ষার সর্বশ্রেষ্ঠ পাঠ্য বইটি ছিল পবিত্র কুর’আন। এটিই হলো ভূপৃষ্ঠের বুকে সর্বশ্রেষ্ঠ কিতাব। এ কিতাবের রচিয়তা মহাজ্ঞানী মহান আল্লাহতায়ালা। মহান আল্লাহতায়ালার ভাষায়, পবিত্র কুর’আন হলো নূর তথা আলো। এটি হলো জ্ঞানের আলো। একমাত্র সে আলোই মানুষকে আলোময় জান্নাতের পথ দেখায়। আলোময় এ পথটি সত্য, সুবিচার ও সভ্যতার পথ। অজ্ঞতা হলো অন্ধকার। অজ্ঞতার পথটি হলো মিথ্যা, অবিচার ও অসভ্যতার পথ। তাই যে সমাজে কুর’আনের চর্চা নাই সে সমাজে আলো নাই। সত্য, সুবিচার ও সভ্যতাও নাই। সে সমাজ দুর্বৃত্তময় ও অন্ধকারাচ্ছন্ন। সে অন্ধকার নেয় জাহান্নামের পথে। ঈমানদারগণ যখন রাষ্ট্র গড়ে তখন নামায-রোযার ন্যায় জনগণকে আলোর পথ তথা জান্নাতের পথ দেখানোটি সর্বাধিক গুরুত্ব পায়। এবং সেটি শিক্ষাকে সার্বজনীন করার মাধ্যমে। অথচ বাংলাদেশে মানব শিশুদের হৃদয়ে আলো জ্বালানোর সে কাজটিই হয়নি এবং হচ্ছে না। শিক্ষার নামে স্রেফ সার্টিফিকেট বিতরণ হচ্ছে। সার্টিফিকেট দিয়ে কি দেশ গড়া যায়? মুসলিমগণ যখন সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার জন্ম দিয়েছিল তখন তাদের কারোই কোন সার্টিফিকেট ছিল না। তাদের ছিল ঈমান, জ্ঞান ও চরিত্র। অথচ বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় অভাব হলো এই তিনটি খাতে। কারণ, যে শিক্ষাব্যবস্থায় ঈমান, জ্ঞান ও চরিত্র গড়া হয় সেটিই ধ্বংস করা হয়েছে। ০৪/০৮/২০২১




বিবিধ ভাবনা ৭০

 ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. হিসাব দেয়ার আগেই হিসাব নেয়া উচিত

মহান আল্লাহতায়ালার কাছে হিসাব দেয়ার আগেই প্রতিটি মুসলিমের নিজের হিসাব নিজে নেয়া উচিত। এর মধ্যেই প্রকৃত প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তা। এ নসিহতটি হযরত ওমরের (রা:)। তখন থেকে প্রস্তুতির পর্ব শুরু হয়ে যায়। এতে সহজ হয় রোজ হাশরের বিচার দিনে মহাবিচারক মহান রাব্বুল আলামীনের কাছে হিসাব দেয়া। অথচ বাঙালী মুসলিমের জীবনে সে হিসাবটি কই? প্রতিটি মুহুর্ত সে বিচার নিয়ে বাঁচার ভাবনাই হলো তাকওয়া। বাঙালী মুসলিম জীবনে সে বিচার থাকলে তো নিজেদের ব্যর্থতা নিয়ে গভীর ভাবনা শুরু হতো। সে ব্যর্থতা শুধরানোরও চেষ্টা হতো। তখন চরিত্র ও কর্মে বিপ্লব আসতো। যার জীবনে হিসাব-নিকাশ নাই তার জীবনে কি কোন বিপ্লব আসে? বাংলাদেশীগণ আফগানদের তুলনায় ৫ গুণ। আফগানগণ সংখ্যায় এতো কম হয়েও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত রাশিয়া ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ন্যায় তিনটি বিশ্বশক্তিকে শোচনীয় ভাবে পরাজিত করেছে। মানব জাতির ইতিহাসে এ কৃতিত্ব একমাত্র তাদের। আফগানদের জীবনে কেন এতো বিজয় এবং বাঙালী মুসলিম জীবনে কেন এতো পরাজয় -তা নিয়েই বা ভাবনা ক’জনের।

বাংলাদেশে এখন ভোটডাকাত শেখ হাসিনার অধিকৃতি। উপরুক্ত বিশ্বশক্তি গুলির তুলনায় হাসিনা ক্ষুদ্র মশা মাত্র। কিন্তু বাঙালী মুসলিমগণ মশাও তাড়াতে পারছে না। মশা মারতে কি কামান দাগা লাগে? খালি হাতেই মারা যায়। ইরানের শাহ, মিশরের হোসনী মোবারক, তিউনিসিয়ার জয়নাল বিন আলী, রোমানীয়ার চচেস্কুর মত বহু স্বৈরশাসক তাড়াতে জনগণকে কামান দাগতে হয়নি। সে সব স্বৈর শাসকদের জনগণ খালী হাতেই তাড়িয়েছে। অথচ সেসব স্বৈরশাসকগণ হাসিনার চেয়ে অধিক শক্তিশালী ছিল। তাদের পিছনে বিশ্বশক্তির সমর্থনও ছিল।

হংকংয়ের জনসংখ্যা মাত্র ৮০ লাখ। সেখানে চীনের স্বৈরনীতির বিরুদ্ধে ২০ লাখ লোক প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছে। অথচ বাংলাদেশে এক লাখ মানুষও কি কখনো স্বৈরাশাসনের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছে? অথচ বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি। ঢাকা শহরেই বাস করে প্রায় দুই কোটি। যদি ৪০ লাখ ঢাকার রাজপথে অবস্থান ধর্মঘট করতো তবে হাসিনার পুলিশ কি তা রুখতে পারতো? যুদ্ধ দূরে থাক, রাস্তায় নামার সাহসটুকুও যাদের নাই –তারা কি সভ্য জীবনের স্বাদ পায়? তাদের বাঁচতে হয় গুম, খুন, ধর্ষণ ও সন্ত্রাসের অসভ্যতা নিয়ে। অথচ হাত-পা, দেহ, মগজ –এসব কি আফগানী বা হংকংবাসীদের তুলনায় বাঙালীদের কম? হাতে তরবারী থাকলেই জয় আসে না, যুদ্ধে জিততে হলে সেটির ব্যবহার করতে হয়। তেমনি সভ্য ভাবে বাঁচতে হলে মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া নেয়ামতের ব্যবহার করতে হয়। পশুর সে সামর্থ্য থাকেনা বলেই সে পশু। মানুষও পশুতে পরিণত হয়, সে সামর্থ্যের ব্যবহার যদি না করে। মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুর’আনে এমন মানুষদের পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট বলেছেন। অপর দিকে সেই শ্রেষ্ঠ মানব যে এসব সামর্থ্যের সুষ্ঠ ব্যবহার করে। সভ্য মানুষের দায়ভার তাই দেশকে সভ্যতর কাজে অসভ্যদের নির্মূলে নামতে হয়। এবং সে কাজে নিজের দৈহিক, আর্থিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সামর্থ্যে ব্যবহার করতে হয়।

দেশের শাসন ক্ষমতায় ভোটডাকাত, আদালতে কাফেরদের রচিত কুফরি আইন, শিক্ষায় ইসলাম বর্জন, ব্যাংকে সুদ, শহরে পতিতা পল্লী বসিয়ে বাঙালী মুসলিমদের কত সুখের বসবাস! কোন ঈমানদার কি তা সহ্য করে? সহ্য করলে কি ঈমান থাকে? নবীজী (সা:) ও সাহাবাদের সময় কি এমনটি ভাবা যেত? কিন্তু বাঙ্গালীরা এসব পাপকে শুধু সহ্যই করে না, সেগুলি বাঁচাতে ট্যাক্সও দেয়। রাজনীতিক, প্রশাসক ও পুলিশ হয়ে সেগুলিকে তারা পাহারা দেয়। ইসলামের বিরুদ্ধে এ বিশাল বিদ্রোহ নিয়ে তাদের মাঝেও কোন প্রতিবাদ ও ক্ষোভ নাই যারা প্রতিদিন নামায পড়ে। এ কি কম বিস্ময়ের? কথা হলো, এগুলি মেনে নিলে কি কেউ মুসলিম থাকে? দাড়ি লম্বা করে, মাথায় টুপি দিয়ে, হাতে তাসবিহ নিয়ে কি এ পাপ মোচন হয়? এ নিয়ে কি বাঙালী মুসলিমের কোন ভাবনা আছে? মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে কি এ নিয়ে হিসাব অবশ্যই দিতে হবে না? সে হিসাব দেয়ার আগে হিসাবটি নিলে কি কল্যাণ হতো না?

২. সভ্য ও স্বাধীন ভাবে বাঁচার খরচ

পানাহারের বাঁচার খরচটি পশুপাখিও জুটাতে পারে। কিন্তু সভ্য ভাবে বাঁচার খরচটি বিশাল। এখানেই ব্যক্তির ঈমান ও গুণাগুণের বিচার হয়। সভ্য ভাবে বাঁচতে হলে দুর্বৃত্ত নির্মূলের লড়াই নিয়ে বাঁচতে হয়। মুসলিম জীবনে এটি স্রেফ রাজনীতি নয়, এটিই হলো সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত। এটি পবিত্র জিহাদ। মহান আল্লাহতায়ালা চান তাঁর বান্দারা দুর্বৃত্ত শাসকের গোলাম রূপে নয়, বরং মানবিক অধিকার নিয়ে সভ্য ভাবে বাঁচুক। সেরূপ সভ্য ভাবে বাঁচার প্রচেষ্ঠাকেই তিনি জিহাদের মর্যাদা দিয়েছেন। নামায-রোযায় মারা গেলে কেউ শহীদ হয় না, বিনা হিসাবে জান্নাতও মেলে না। কিন্তু বিনা হিসাবে জান্নাত জুটে দুর্বৃত্ত নির্মূল ও ইসলাম প্রতিষ্ঠার জিহাদে নিহত হলে। অথচ সে নূন্যতম সভ্য চেতনাটি বাঙালীর নাই, কিন্তু আফগানদের আছে। তাই আফগানদের জীবনে জিহাদ আছে। তাঁরা জিহাদে শহীদ হয়ে বিনা হিসাবে জান্নাত পাওয়ার রাস্তায় খুঁজে। লাখে লাখে তারা শহীদও হয়েছে। নিজ দেশে বিদেশী শত্রুর বিজয় ও ইসলামের পরাজয় কখনোই তাঁরা মেনে নেয়নি। একই কাজে নবীজী (সা:)’র অর্ধেকের বেশী সাহাবা শহীদ হয়েছেন। অথচ বাঙালী বেছে নিয়েছে দুর্বৃত্ত শাসকের পদতলে গোলামীর পথ। কারণ, এ পথটি সহজ, এবং এ পথে যুদ্ধ লাগে না। এজন্যই বাঙালীর বড় পরিচয়টি হলো, সমগ্র এশিয়ার বুকে তারাই হলো ইংরেজদের সবচেয়ে সিনিয়র গোলাম। তাদের আগে এশিয়া মহাদেশের আর কেউই ইংরেজ শাসকের গোলাম হয়নি। দিল্লির পতন হয় ১৮৫৭ সালে এবং বাংলার পতন হয় ১০০ বছর আগে ১৭৫৭সালে। বেশী দিন গোলামী করলে গোলামীই জাতির সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। যেমন, দীর্ঘদিন খাঁচায় বন্দী রাখার পর খাঁচার পাখিকে ছেড়ে দিলেও সে আবার খাঁচায় ফিরে আসে। এজন্যই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বাঙালীর নেশা ধরে আবার গোলামীতে ফিরে যাওয়ায়। এবং সেটি ভারতের পদতলে। ১৯৭১’য়ে সেটিই ঘটেছে। বিস্ময়ের বিষয় হলো, বাঙালীর এ বিশাল ব্যর্থতা নিয়ে বাঙালী বুদ্ধিজীবী মহলে কোন গবেষণা নাই। আলোচনাও নাই। বরং নানা ভাবে গর্ব উপচিয়ে পড়ছে। 

আর আজ বাঙালীরা ইতিহাস গড়ছে হাসিনার ন্যায় এক দুর্বৃত্ত ভোটডাকাতের গোলামী মেনে নিয়ে! সমগ্র দেশবাসীর ভোটডাকাতি হয়ে গেল, অথচ তা নিয়ে কোন প্রতিবাদ হলো না। বরং সে ভোটডাকাতকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর, আদালতের বিচারক, উকিল, সচিব, সেনাবাহিনীর জেনারেলও মনের মাধুরি মিশিয়ে মাননীয় বলে। এটি কি কম লজ্জার? অথচ সে লজ্জা দূরীকরণের কোন উদ্যোগ নাই। একাত্তরে পাকিস্তান ভেঙ্গে যাওয়ার বড় কারণটি এখানেই। বাঙালীর ঘাড়ে চেপেছিল ভারতের গোলামী নিয়ে বাঁচার উম্মাদনা। স্বাধীন পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ স্বাধীন নাগরিক রূপে বাঁচার রুচি তারা হারিয়ে ফেলেছিল। বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্রের  রাষ্ট্র প্রধান হয়েছেন বাঙালী। তিনি হলেন খাজা নাযিমুদ্দীন। কায়েদে আযমের মৃত্যুর পর তিনিই তাঁর আসনে বসেন। তিন বার দেশটির প্রধানমন্ত্রীও হয়েছেন বাঙালী। তারা হলেন খাজা নাযিমুদ্দীন, মহম্মদ আলী বোগরা ও হোসেন শহীদ সোহরোওয়ার্দী। সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্রের নেতা রূপে তারা পেয়েছিলেন আন্তর্জাতিক অঙ্গণে বিশেষ মর্যাদা। পেয়েছেন বিশ্ব-রাজনীতিতে প্রভাব ফেলার সুযোগ। কিন্তু সে মর্যাদা বাঙালীর ভাল লাগেনি। স্বাধীনতা বাদ দিয়ে বেছে নিয়েছে ভারতের গোলামী। এবং ভারতের পদতলে গোলামীকেই ভেবেছে স্বাধীনতা। এখন সেটিই পুরাদমে চলছে। ভারতের বিরুদ্ধে কথা বললে তাই আবরার ফাহাদের ন্যায় নৃশংস ভাবে লাশ হতে হয়, অথবা ইলিয়াসের ন্যায় গুম হয়ে যেতে হয়। শুধু হাসিনার নয়, কোটি কোটি বাঙালীর চেতনার ভূমি দখল করে নিয়েছে ভারত।

স্বাধীনতা নিয়ে বাঁচার খরচটি বিশাল। স্বাধীন রূপে বাঁচতে পাকিস্তানকে তাই বিশাল সামরিক বাহিনী গড়তে হয়েছে। নিজ হাতে নির্মাণ করতে হয়েছে পারমানবিক বোমা, বোমারু বিমান, ট্যাংক, মিজাইল ইত্যাদি। বাংলাদেশীদের কি সে সামর্থ্য আছে? সে সামর্থ্য না থাকলে কি স্বাধীনতা দোয়া-দরুদে বাঁচে? পরাধীনতা তখন অনিবার্য হয়। মেজর আব্দুল জলিলের কথাই বলতে হয় “অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা।” সেই পরাধীনতাই হলো একাত্তরের মূল অর্জন। তেমন একটি পরাধীনতা থেকে বাঁচার জন্যই ১৯৪৭ সালে বাঙালী মুসলিম নেতাগণ স্বেচ্ছায় পাকিস্তানভুক্ত হয়। কিন্তু সে সামান্য ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের বিষয়টি বুঝার সামর্থ্য ইসলামশূণ্য এবং ইতিহাসের জ্ঞানশূণ্য মুজিব-তাজুদ্দীনের যেমন ছিল না, তেমিন মেজর জিয়াউর রহমানেরও ছিল না। শেখ মুজিব ১৯৪৭’য়ে বাংলার মুসলিমদের পাকিস্তান-প্রেম নিজ চোখে দেখেছে। নিজেও কলকাতার রাস্তায় জনসমুদ্রে মিশে “লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান” বলেছে। তাই পাকিস্তান ভাঙ্গার কথা প্রকাশ্যে মুখে আনতে ভয় পেয়েছে। এজন্যই পাকিস্তান ভাঙ্গার লক্ষ্যে ভারতকে সাথে নিয়ে যা কিছু করেছে সেটি গোপনে করেছে। তাই বন্দী হওয়ার পূর্বে সুযোগ ও সময় হাতে থাকা সত্ত্বেও শেখ মুজিব কখনোই স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়নি। কিন্তু সে চেতনা ও সে ইতিহাস জ্ঞান মেজর জিয়ার ছিল না। তাই সে চট্রগ্রামের কালুর ঘাট থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়। এবং স্বেচ্ছায় গিয়ে উঠে ভারতের কোলে। ভারতের কোলে উঠাকেই ভেবেছিল বাঙালীর স্বাধীনতা।

এখন গোপন তথ্যগুলি প্রকাশ পাচ্ছে। পাকিস্তান ভাঙ্গার মূল প্রকল্পটি ছিল সোভিয়েত রাশিয়া, ভারত ও ইসরাইলের। এবং সেটি মুজিবের অজান্তে ১৯৭১ সালের বহু আগে থেকেই। পাকিস্তান বেঁচে থাকুক সেটি ভারত ১৯৪৭ সালে দেশটির জন্ম থেকেই চায়নি। চায়নি সোভিয়েত রাশিয়াও। সোভিয়েত রাশিয়া পাকিস্তানকে গণ্য করতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব-বলয়ের দেশ রূপে। ফলে পাকিস্তানকে দুর্বল করার মাঝে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্টকে দুর্বল করা মনে করতো। অপরদিকে ইসরাইল কখনোই চাইতো না মুসলিম বিশ্বের সর্ববৃহৎ এই মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান বেঁচে থাক। ইসরাইলের ন্যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও চায়নি পাকিস্তান বেঁচে থাক। কারণ, পাকিস্তানের শক্তিবৃদ্ধি মানেই মুসলিমদের শক্তিবৃদ্ধি। তাতে বাধাপ্রাপ্ত হতো বৃহত্তর ইসরাইল নির্মাণের প্রজেক্ট।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইহুদী জেনারেল জ্যাকব ছিল তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের উপর হামলার মূল স্থপতি। এমন কি ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনেরাল মানেক শ’ও পাকিস্তানের উপর হামলায় ইতস্ততঃ করছিল। তার ধারণা ছিল, চীন পাকিস্তানের পক্ষে দাঁড়াবে। জেনারেল জ্যাকবের মাধ্যমেই আওয়ামী লীগের কিছু নেতা ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক গড়ে। তারই ধারাবাহিকতায় মুজিব কন্যা হাসিনা পাসপোর্টে ইসরাইলে প্রবেশের উপর বাধা-নিষেধ তুলে নিয়েছে এবং গড়ে তুলেছে ইসরাইলের সাথে বানিজ্য চুক্তি। এবং কিনেছে স্পাই সফ্ট ওয়ার। ভারত, রাশিয়া এবং ইসরাইল –এ দেশ তিনটির কারোই স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ার ভাবনা ছিল। তাদের মূল এজেন্ডাটি ছিল পাকিস্তানের ন্যায় একটি মুসলিম দেশকে খন্ডিত করা। এবং সে রাশিয়া-ভারত-ইসরাইলী প্রকল্পের সাথে যোগ দিয়েছিল বাঙালী বামপন্থি, রামপন্থি, মুজিবপন্থি ও জিয়াপন্থিগণ। এরা সেদিন ভারতের সাথে একাকার হয়ে বাঙালীর স্বাধীনতা বাড়ায়নি বরং বিজয় বাড়িয়েছে সোভিয়েত রাশিয়া, ভারত ও ইসরাইলের। এরাই একাত্তরে সংগঠিত করে অবাঙালী মুসলিম নির্মূলের লক্ষ্যে বিশাল গণহত্যা। বাংলার ইতিহাসে এটিই হলো সবচেয়ে নৃশংস গণহত্যা। অথচ সে নৃশংস গণহত্যার কথা তারা মুখে আনে না। বাঙালীর ইতিহাসের বইয়েও তার কোন বর্ণনা নাই। যেন একাত্তরে বিহারীদের বিরুদ্ধে কিছুই ঘটেনি। এরা শুধু পাকিস্তানী সেনাদের হাতে বাঙালী হত্যার কথা বলে। এই হলো বাঙালী জাতীয়তাবাদী বুদ্ধিজীবীদের বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্বৃ্ত্তি। এরাই আজ উৎসব করে হাসিনার হাতে ইসলামপন্থিদের নির্মূল হওয়া নিয়ে।

মেজর জিয়া নিজে হাতে চট্টগ্রামে হত্যা করেছে তার সিনিয়র নিরস্ত্র অবাঙালী পাকিস্তানী অফিসারদের। নিরস্ত্র অফিসারদের এভাবে হত্যা করাটি ছিল আন্তর্জাতিক আইনে শতভাগ যুদ্ধাপরাধ। যেসব দুর্বৃত্তগণ একাত্তরে বিহারীদের ঘরবাড়ী ও দোকানপাঠ দখল করছিল প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তাদের হাতে ঘরবাড়ীর মালিকানার দলিল তুলে দেন। এটি ছিল আরেক মানবতাবিরোধী অপরাধ। জেনারেল জিয়া একাত্তরের সে ভয়ানক অপরাধকে রাষ্ট্রের তরফ থেকে বৈধতা দেন। বিমান বাহিনীর প্রধান তোয়াবের ন্যায় নরম ইসলামপন্থিও জিয়ার কাছে সহ্য হয়নি। জেনারেল জিয়া তাকে বরখাস্ত করেন। এসবই ইতিহাস। তার বেপর্দা স্ত্রী খালেদা জিয়া তার নগ্ন মাথায় মহান আল্লাহতায়ালার বিধানের বিরুদ্ধে সর্বদা বিদ্রোহের ঝান্ডা নিয়ে ঘুরাফেরা করেন। জামায়াতে ইসলামীর সমর্থণ না পেলে তার পক্ষে প্রধানমন্ত্রী হওয়া অসম্ভব ছিল। কিন্তু প্রতিদানে জামায়াত নেতা প্রফেসর গোলাম আযমকে তিনি জেলবন্দী করেন। বিশ্বাসঘাতকতা আর কাকে বলে? আজ বাংলাদেশে যা কিছু চলছে তার জন্য তো দায়ী মূলত বাপপন্থি, রামপন্থি, মুজিবপন্থি ও জিয়াপন্থিগণ। আজও এরাই বাঙালী মুসলিমদের ইসলাম নিয়ে বেড়ে উঠার মূল শত্রু। ইসলামকে বিজয়ী করতে হলে এদের সাথে লড়াই অনিবার্য।  

 

৩. জাতীয়তাবাদী রাজনীতির নাশকতা

জাতীয়তাবাদ ইসলামে শতভাগ হারাম –যেমন হারাম শুকরের গোশতো খাওয়া ও জ্বিনা করা। অথচ জাতীয়তাবাদ হলো বাংলাদেশে বাপপন্থি-মুজিবপন্থি-জিয়াপন্থিদের মূল কালেমা। শুকরের গোশতো খেয়ে ও জ্বিনা করে মাত্র কিছু লোক জাহান্নামমুখি হয়। কিন্তু জাতীয়তাবাদী রাজনীতি জাহান্নামমুখি করে সমগ্র দেশবাসীকে। আধুনিক কালে মুসলিমদের সবচেয়ে বড় বড় ক্ষতিগুলি ইহুদী, খৃষ্টান ও পৌত্তলিকদের হাতে হয়নি, হয়েছে মুসলিম নামধারী জাতীয়তাবাদীদের হাতে। এরাই মুসলিমদের ঘরের শত্রু। তারাই আরব বিশ্ব ভেঙ্গে ২২ টুকরো করেছে এবং একাত্তরে পাকিস্তানকে ভেঙ্গেছে। নানা ভাষাভাষী মানুষের মাঝে একত্রে বসবাসকে তারা অসম্ভব করেছে। এভাবে শক্তিহানী করেছে মুসলিমদের এবং বিজয় বাড়িয়েছে ইসলামের শত্রুদের। এদের কারণেই ভারত আজ আঞ্চলিক শক্তি এবং চেপে বসেছে বাংলাদেশের উপর।

কোন মুসলিম দেশের ভাঙ্গার অর্থই তো মুসলিমদের শক্তিহানী করা। এজন্যই বিভক্তি গড়া ইসলামে শতভাগ হারাম। মুসলিমদের বিভক্তিতে খুশি হয় শয়তান। এবং একতায় খুশি হন মহান আল্লাহতায়ালা। মুসলিমদের বিজয় ও গৌবব তো তখনই বেড়েছে যখন তারা দেশ ভাঙ্গার বদলে গড়ায় ও ভূগোল বাড়ানোতে মনযোগী হয়েছে। পরাজয়ের শুরু তো তখন থেকেই যখন গড়ার বদলে ভাঙ্গার কাজ শুরু করেছে। এবং সেটি হয়েছে ভাষা, বর্ণ, আঞ্চলিকতার নামে। তাই যার মধ্যে শরিষার দানা পরিমাণ ঈমান আছে -এমন ব্যক্তি কি কখনো জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে যোগ দিতে পারে? এজন্যই একাত্তরে কোন ইসলামী দল, কোন হাক্কানী আলেম, মাদ্রাসার কোন শিক্ষক ও কোন পীর পাকিস্তান ভাঙ্গার পক্ষ নেয়নি। শয়তানী শক্তিবর্গকে খুশি করার এ কাজটি ছিল ইসলাম থেকে দূরে সরা বিভ্রান্ত লোকদের। যাদের বড়াই সেক্যুলারিস্ট ও জাতীয়তাবাদী হওয়া নিয়ে।  

 

৪. বাঙালী মুসলিমের বিকৃত ইসলাম

বাঙালী মুসলিমগণ বেঁচে আছে নিজেদের আবিস্কৃত এক বিকৃত ইসলাম নিয়ে। তাতে আছে মিলাদ পড়া, কবর পূজা, পীরের দরবারে অর্থ দেয়া, হাসিনার ন্যায় ভোটডাকাতকে কওমী জননী ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলা, এবং তাবলিগ জামায়াতের চিল্লা-গাশত নিয়ে বাঁচা। তারা ইসলামের বিজয় নিয়ে ভাবে না। তারা ইসলামের শত্রুদের নির্মূল নিয়েও ভাবে না। কুর’আন-হাদীস কি নির্দেশনা দেয় –সে খোঁজও তারা রাখে না। দেশে মহান আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও আদালতে তাঁর শরিয়তী আইনের প্রতিষ্ঠা নিয়েও ভাবে না। তারা ভাবে শুধু নিজেদের বাঁচা ও ভোগবিলাস নিয়ে।

কিছু নামায-রোযা-হজ্জ-যাকাত করে, কিছু মসজিদ-মাদ্রাসা গড়ে ও কিছু দান-খয়রাত করেই তারা ভাবে অনন্তকালের জন্য জান্নাতে বিশাল প্রাসাদের মূল্যটি পরিশোধ করা হয়ে গেছে। এখন শুধু মৃত্যুর পর বুঝে নেয়ার পালা। কুর’আন পড়লেও জানার চেষ্টা করে না, বান্দাদের থেকে মহান আল্লাহতালার মূল চাওয়ার বিষয়টি কি। কুর’আন বুঝা তাদের রুচিতে সয় না। ফলে তারা না বুঝে কুর’আন পড়ে। মনে করে কুর’আন স্রেফ না বুঝে পড়া, চুমু খাওয়া ও মখমলে জড়িয়ে উপরে তুলে রাখার জন্য নাযিল হয়েছে। ভাবে, তা থেকে কিছু জানা ও মানার কোন প্রয়োজন নাই। মোল্লা-মৌলভীরাও কুর’আন বুঝার উপর গুরুত্ব দেন না। কুর’আন বুঝা নয়, মক্তব-মাদ্রাসায় স্রেফ পড়তে শেখানো হয়। না বুঝে পড়াকেই তারা বিশাল ছওয়াবের কাজ বলে। অথচ ইসলামের গৌরব কালে কুর’আন বুঝার গরজে মুসলিমগণ নিজের মাতৃ ভাষা দাফন করে আরবীকে গ্রহণ করেছে।

যারা জান্নাতে যেতে চায়, মৃত্যুর আগে তাদেরকে জান্নাতের মূল্য পরিশোধ করতে হয়। জান্নাতের মূল্য পরিশোধ করতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরামগণ নিজেদের জান ও মাল নিয়ে জিহাদের ময়দানে নেমেছেন। এভাবেই ইসলামকে তারা বিজয়ী করেছেন। এবং ইসলামের শত্রুদের নির্মূল করেছেন। জিহাদ না থাকলে কি নবীজী (সা:) ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারতেন? সম্ভব হতো কি সর্ববৃহৎ বিশ্বশক্তি রূপে মুসলিমদের উত্থান?

জিহাদই দেয় প্রতিরক্ষা। জিহাদই দেয় বিজয়। জিহাদের পথেই ঘটে শত্রুর নির্মূল। যেখানে জিহাদ নাই, সেখানে পরাজয় অনিবার্য। জিহাদই দরিদ্র আফগানদের তিনটি বিশ্বশক্তির বিরুদ্ধে বিজয় দিয়েছে। তাই যারা ইসলামের শত্রু তাদের লক্ষ্য মুসলিমদের নামাযশূণ্য করা নয়, বরং জিহাদশূণ্য করা। হাসিনার ন্যায় ইসলামের শত্রুশক্তি তাই জিহাদ বিষয়ক বই বাজেযাপ্ত করছে। হাসিনা সেটি করছে শয়তানকে খুশি করতে এবং ইসলামের পরজয়কে স্থায়ী করতে।

বাংলাদেশের মুসলিমগণ নবীজী (সা:) এবং তাঁর সাহাবাদের অনুসৃত জিহাদের পথে নাই। তারা বরং ইসলামের পরাজয় বাড়িয়েছে ইসলামের শত্রুদের পক্ষে ভোট দিয়ে, অর্থ দিয়ে ও তাদের পক্ষে লাঠি ধরে। এরপরও দাবী করে তারা নাকি বিশ্বের সবচেয়ে ধর্মভীরু মুসলিম! তাদের গর্ব, তারা দেশ ভরে ফেলেছে মসজিদ-মাদ্রাসা দিয়ে। অথচ মহান আল্লাহতায়ালা কাছে মসজিদ-মাদ্রাসার সংখ্যাটি গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো তার শরিয়তী আইন কতটা প্রতিষ্ঠা পেল এবং কতটা প্রতিষ্ঠা পেল তার সার্বভৌমত্ব। তিনি চান, ইসলামের পূর্ণ বিজয়। কোন সত্যিকার মুসলিম কি তাই মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনের পরাজয় মেনে নিতে পারে? অথচ বাঙালী মুসলিমগণ ইসলামের পরাজয় শুধু মেনেই নেয়নি, সে পরাজয় নিয়ে চিহ্নিত শত্রুদের সাথে নিয়ে উৎসব করে।

৫. বিশ্বাসঘাতকতা মহান আল্লাহতায়ালার সাথে

রাজার পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যগণ রাজার আইনের প্রতিষ্ঠায় আপোষহীন। আইনভঙ্গকারীকে দেখা মাত্রই তারা আদালতে তোলে। সে কাজের জন্যই তারা রাজার ভান্ডার থেকে বেতন পায়। মুসলিম তো মহান আল্লাহতায়ালার সার্বক্ষণিক সৈনিক। সৈনিকসুলভ কাজের প্রতিদান স্বরূপ সে পরকালে পাবে অনন্ত কালের জন্য জান্নাত। সে জিহাদে নামে সর্বজাহানের রাজা মহান আল্লাহতায়ালার আইনের প্রতিষ্ঠা দিতে। মুসলিম জীবনে সে জিহাদ না থাকলে কাউকে কি মুসলিম বলা যায়? সে দায়িত্বহীনতা তো মহান আল্লাহতায়ালার সাথে সুস্পষ্ট বিশ্বাসঘাতকতা।

নবীজী (সা:) ও সাহাবায়ে কেরামদের আমলে কি ভাবা যেত, আদালতে বিচার হবে কাফেরদের রচিত আইনে? সেরূপ হলে কি তাঁরা বসে থাকতেন? অথচ আজ বাংলাদেশের মুসলিমগণ শুধু বসেই থাকে না, কাফেরদের আইনের কাছে বিচার ভিক্ষা করে! অথচ পবিত্র কুর’আনে মহান আল্লাহতায়ালার ঘোষণা: যারা তার নাযিলকৃত বিধান (শরিয়ত) অনুযায়ী বিচারকার্য পরিচালনা করেনা তারা কাফের, তারা জালেম এবং তারা ফাসেক। -(সুরা মায়েদা ৪৪, ৪৫, ৪৭)। এরূপ হুশিয়ারী একজন ঈমানদার ভূলে কী করে? এ হুশিয়ারীর কারণে ইউরোপীয় কাফেরদের হাতে অধিকৃত হওয়ার পূর্ব কোন মুসলিম দেশে একদিনের জন্যও শরিয়ত ভিন্ন অন্য কোন আইনে বিচার হয়নি। শরিয়ত বিলুপ্ত করেছে বিদেশী কাফেরগণ। মুসলিমদের বড় অপরাধ হলো, তারা সেটিকে পুণরায় বহাল করেনি। এখন বাঁচছে সে গুরুতর অপরাধ নিয়েই। বিস্ময়ের বিষয় হলো তথাকথিত আলেমদের মাঝেও এ নিয়ে কোন ক্ষোভ ও বিক্ষোভ নাই। শরিয়তের প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কোন আন্দোলন নাই।

বাংলাদেশে ১৬ কোটি মুসলিম। এর মধ্যে এক লাখ মুসলিমের মাঝেও যদি বিনা হিসাবে জান্নাতে যাওয়ার ভাবনা থাকতো তবে দেশে শরিয়তের প্রতিষ্ঠার দাবী নিয়ে লাগাতর জিহাদ শুরু হয়ে যেতো। নিশ্চিত জান্নাত লাভের সেটিই তো একমাত্র পথ। তখন দেশে শরিয়ত প্রতিষ্ঠা পেত। ভারতে বহু হাজার কৃষক নিজেদের দাবী নিয়ে ৮ মাস যাবত দিল্লির রাস্তায় অবস্থান ধর্মঘট করছে। প্রচণ্ড শীত ও গরমে প্রায় ৫০০ জন মারা গেছে। ঢাকার রাস্তায় আল্লাহতায়ালার আইন শরিয়তের দাবী নিয়ে রাস্তায় বসার জন্য কি ১ লাখ ঈমানদার আছে? নামলে কি সরকার তাদের দাবী অগ্রাহ্য করার সাহস দেখাতো? কথা হলো মহান আল্লাহতায়ালার আইনের প্রতিষ্ঠা নিয়ে সে ভাবনা ক’জনের? দেশের পুলিশ, প্রশাসন, আদালত ও সেনাবাহিনীর অধিকাংশ সদস্য নিজেদের মুসলিম রূপে পরিচয় দেয়। তাদের অনেকে নামায-রোযাও পালন করে। কিন্তু শরিয়তের প্রতিষ্ঠা নিয়ে তাদের আগ্রহ কই? আগ্রহ না থাকাটি কি ঈমানের পরিচয়? ০২/০৮/২০২১




  বিবিধ ভাবনা ৬৯

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. দুর্নীতি নির্মূলের পথ

কোন চোর বা ডাকাত যদি বলে, সমাজ থেকে সে অপরাধ দুর করবে –তবে তার চেয়ে বড় মশকরা আর কি হতে পারে? বাংলাদেশে সে কৌতুকও হয়। চোর-ডাকাতদের ন্যায় অপরাধীগণ শুধু অপরাধই বাড়াতে জানে, অপরাধের নির্মূল নয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে তাই সবচেয়ে বড় কৌতুক হলো, ভোট ডাকাতি করে যে শেখ হাসিনা দেশকে হাইজ্যাক করলো -সে নাকি দেশকে দুর্নীতি মুক্ত করবে। বরং দেশ জুড়ে দুর্নীতির জোয়ার আজ যেরূপ প্রবলতর হচ্ছে -তার কারণ তো হাসিনার ন্যায় ভোটডাকাতের শাসন।

দেশকে তো তারাই দুর্নীতি মুক্ত করতে পারে যারা নিজেদের প্রথমে দুর্নীতিমুক্ত করে। দুর্নীতিবাজগণ সব সময়ই নিজেদের আশে পাশে বন্ধু বা সহকারি রূপে দুর্নীতিবাজদের বেছে নেয়। তাদের নিজেদের মনে থাকে সুনীতির ধারকদের বিরুদ্ধে প্রবল ঘৃণা। কারণ তারা জানে, তাদের বিরুদ্ধে সৎ ও সুনীতির ধারকদের ঘৃণাটিও অতি প্রবল। রাজনীতির ময়দানে তারা তাদের ঘোরতোর শত্রু। সৎ মানুষদের কাছে রাখলে যখন তখন তাদের দুর্নীতির গোপন বিষয় অন্যদের কাছে বলে বিপদ ঘটাতে পারে। এজন্যই সৎ মানুষদের নিজেদের আশে পাশে রাখাকে তারা নিজেদের জন্য বিপদ মনে করে। ফলে চোর-ডাকাত দেশের প্রধানমন্ত্রী হলে তার অন্যান্য মন্ত্রী ও সচিবগণ চোর-ডাকাত হয়। শাসক খুনি হলে, আশে পাশেও সে খুনিদের রাখে। কথায় বলে ঝাঁকের মাছ ঝাঁকে চলে। সেটি অতি সত্য দুর্নীতি পরায়ন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও।

তাই দেশকে দুর্নীতি মুক্ত করতে হলে সে নির্মূলের কাজটি উপর থেকে শুরু করতে হয়। সরকারের সর্বোচ্চ আসনে সবচেয়ে বড় চোর বা ডাকাতকে বসিয়ে গ্রামের ছিঁছকে চোরকে জেলে পাঠিয়ে দেশ দুর্নীতিমুক্ত হয় না। বিষয়টি গাছের বিশাল কান্ডকে অক্ষত রেখে ছোট ডালা পালা কাটার ন্যায়। চোর-ডাকাতগণও তাদের আশে-পাশের সহচরদের মাঝে কিছু দান খয়রত করে। কিন্তু তাতে দেশের কল্যাণ হয়। সে দানখয়রাতের মাঝে রাজনীতি থাকে। এখানে লক্ষ্য, দুর্নীতিবাজ শাসকের পক্ষে চাটুকর বৃদ্ধি। এ চাটুকরগণ চোরডাকাত ও ভোটডাকাত সরকারের পক্ষে রাজপথে জিন্দাবাদ বলে। এবং চোরডাকাতকে ফেরেশতা বলে প্রচার করে। বাংলাদেশে সেটিই হচ্ছে। 

 

২. সংকট জনগণের স্তরে

সম্প্রতি বিশিষ্ঠ লেখক ও গবেষক ডাক্তার পিনাকী ভট্রাচার্যের একটি কঠোর মন্তব্য যথেষ্ট ভাইরাল হয়েছে। পিনাকী ভট্রাচার্য বলেছেন, “আওয়ামী লীগ দুনিয়ার সব চাইতে স্মার্ট পলিটিক্যাল পার্টি, এরা “গু”কেও হালুয়া বলে ওদের সাপোর্টারদের খাওয়ায়ে দিতে পারে।” এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর গভীর উদ্বেগ ও অতিশয় বেদনার কথা। আসলে বিষয়টি তা নয়। রোগটি আরো গভীরে। সারাতে হলে সেই গভীরে হাত দিতে হবে।

আসলে আওয়ামী লীগ স্মার্ট নয়। বরং বুদ্ধিবিবেচনাহীন আবাল হলো বাংলাদেশের জনগণ। অন্যরা জনগণের সে আবাল-অর্বাচীন অবস্থা থেকে ফায়দা নেয়না, কিন্তু আওয়ামী লীগ পুরাদমে নেয়। এ অপ্রিয় সত্য কথাটি বলতেই হবে। নইলে সত্য লুকানোর গুনাহ হবে। মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুর’আনে এক শ্রেণীর মানুষকে গরুছাগলের চেয়েও নিকৃষ্ট বলেছেন। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহতায়ালার নিজের কথাটি হলো, “উলাইয়েকা কা’আল আনয়াম, বাল হুম আদাল।” অর্থ হলো: তারাই গবাদী পশুর ন্যায়, বরং তার চেয়েও নিকৃষ্ট। মানুষ যে কতটা নীচে নামতে পারে -তা নিয়ে মহাজ্ঞানী মহান স্রষ্টার এই হলো নিজস্ব বয়ান। তাছাড়া বাঙালীর মানুষ রূপে বেড়ে উঠার ব্যর্থতা নিয়ে দারুন অভিযোগ ছিল রবীন্দ্রনাথেরও। তিনি লিখেছিলেন, হে বিধাতা সাত কোটি প্রানীরে রেখছো বাঙালী করে, মানুষ করোনি। ট্রান্সপেরেন্সি ইন্টার ন্যাশনালের জরিপে বাংলাদেশ এ শতাব্দীর শুরুতে বিশ্বের সকল দেশগুলির মাঝে দুর্নীতি পর পর ৫ বার প্রথম হয়েছে। এটি ভয়ানক চারিত্রিক অসুস্থ্যতার কথা। কিন্তু তা নিয়ে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী কথা বলে না। কথা বলে না রাজনীতিকগণও। যেন কিছুই হয়নি। অথচ এটি তো যে কোন সভ্য মানুষের মগজে ঝাঁকুনি দেয়ার কথা। বাঙালীর এ ব্যর্থতা রবীন্দ্রনাথের মগজে ঝাঁকুনি দিয়েছিল বলেই তিনি বিধাতার কাছে উপরুক্ত ফরিয়াদ তুলেছিলেন।   

ক্যান্সারের ন্যায় চারিত্রিক বা চেতনার রোগের সিম্পটমগুলোও গোপন থাকে না। সে সিম্পটমের কিছু উদাহরণ দেয়া যাক। হংকং’য়ের জনসংখ্যা ৮০ লাখ। চীনের স্বৈরাচারী সরকার সেখানে এতো দিন চলে আসা গণতান্ত্রিক অধিকারগুলি কেড়ে নিয়েছে। প্রতিবাদে ২০ লাখ নারী-পুরুষ প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছে। অর্থাৎ প্রতি ৪ জনের একজন রাস্তায় নেমে এসেছে। হাজার হাজার মানুষ কারাবন্দী হয়েছে। এ হলো মানুষের গণতন্ত্রের প্রতি ভালবাসা ও চেতনার মান। ঢাকা শহরের জনসংখ্যা প্রায় দুই কোটি। গণতন্ত্র বাংলাদেশেও কেড়ে নেয়া হয়েছে। নির্বাচন না হয়ে ভোট ডাকাতি হয়ে গেছে। কিন্তু ২০ লাখ দূরে থাক, ২০ হাজার মানুষও রাস্তায় নামেনি। মানুষ যখন তার মানবিক চেতনা হারিয়ে ফেলে তখন সে গণতন্ত্র নিয়ে ভাবে না।

বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক জনগণ যে কতটা আবাল – ইতিহাস থেকে তার কিছু প্রমাণ দেয়া যাক। শেখ মুজিব ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ৮ আনা সের চাউল ও সোনার বাংলা গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট নিয়েছিল। ওয়াদা দিয়েছিল গণতন্ত্রের। কিন্তু খাইয়েছিল ৮ টাকা সের চাউল। গণতন্ত্রকে কবরে পাঠিয়ে একদলীয় বাকশালী স্বৈরাচার উপহার দিয়েছিল। শেখ মুজিব নিজেকে আমৃত্যু প্রেসিডেন্ট করার ব্যবস্থা করেছিল। এক দেশ, এক নেতার বাকশালী তত্ত্ব বাজারে ছেড়েছিল। তিরিশ হাজারের বেশী বিরোধী দলীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে হত্যা করেছিল। ইসলামপন্থীদের জন্য রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছিল। সোনার বাংলার বদলে দুর্ভিক্ষের বাংলায় পরিণত করেছিল। বহু লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছিল দুর্ভিক্ষ ডেকে এনে। স্বাধীনতার বদলে দিয়েছিল ভারতের গোলামী। শেখ মুজিব ভারতের সাথে মিলে আগরতলা ষড়যন্ত্র করেছিল। এ ষড়যন্ত্রের সত্যতা এখন আওয়ামী লীগের নেতাগণও স্বীকার করে। ভারতীয় পণ্যের বাজার নিশ্চিত করতে দেশীয় শিল্পকে ধ্বংস করেছিল। বিশ্বের সর্ববৃহৎ পাটকল আদমজী জুটমিলকে লোকসানী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছিল। মুজিবের ইতিহাসটিই তাই বিশ্বাসঘাতকতা ও জাতি-বিরোধী গুরুতর অপরাধের।  কিন্তু সে শেখ মুজিবকে আবাল বাঙালীগণ জাতির বাপ ও বঙ্গবন্ধু বলে? এমনটি কি কোন সভ্য দেশে ঘটে? সভ্য দেশে এরূপ অপরাধীদের তো ইতিহাসে আস্তাকুঁড়ে ফেলে। কখনোই বাপ বলে না। এরূপ আবাল জনগণকে হালুয়ার নামে বিশুদ্ধ “গু” খাইয়ে দিতে কি স্মার্ট হওয়া লাগে?

হাসিনা ২০১৮ সালে ভোট ডাকাতি করে ক্ষমতা হাইজ্যাক করলো। এটি কি ভারত, পাকিস্তান, নেপাল বা শ্রীলংকার ন্যায় অন্য কোন প্রতিবেশী দেশে সম্ভব? সম্ভব নয়। কারণ ঐসব দেশের লোক এতো আবাল নয়। তাই ভোট ডাকাতির কথা সেসব দেশে কোন চোর বা ডাকাত ভাবতেই পারে না। সভ্য মানুষেরা ডাকাত দেখলে দল বেঁধে হাতের কাছে যা পায় তা দিয়ে হামলা করে। কিন্তু বাংলাদেশে সেটি ঘটে না। বরং ঘটে উল্টোটি। ডাকাত সর্দারনীর গলায় বিজয়ের মালা পড়িয়ে তাকে সন্মানিত করা হয়। শুধু আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীগণই নয়, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর, আদালতের বিচারক, সংসদের সদস্য, সরকারের সচিব, মিডিয়া কর্মী, বু্দ্বিজীবী ও উকিলগণ যে কতটা আবাল সেটি বুঝা যায় যখন তারা একজন ভোটডাকাতকে সভা-সমিতির বক্তৃতায় বা লেখনীতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলে। অথচ সভ্য মানুষ তো বাঁচে দুর্বৃত্তদের প্রতি প্রবল ঘৃণা নিয়ে। এটুকু বিলুপ্ত হলে কি সভ্যতা, মানবতা ও নৈতিকতা বাঁচে?      

 

৩. ডাকাতের উপর ভরসা

এক বক্তৃতায় শেখ হাসিনা জনগণকে তার উপর ভরসা করতে বলেছে। অথচ এক্ষেত্রে তার নিজের আচরণটি লক্ষণীয়। হাসিনা নিজে কিন্তু জনগণের ভোটের উপর কখনোই ভরসা করেনি। জনগণের ভোটের উপর ভরসা না করে রাতে ভোট ডাকাতি করে গদিতে বসেছে। কথা হলো, ডাকাতের উপর ভরসা করা কি কোন বু্দ্ধিমানের কাজ হতে পারে? এটি তো আবাল বেওকুপদের কাজ। কোন বুদ্ধিমান সভ্য ও সাহসী মানুষ কি কখনো ডাকাতের উপর ভরসা করে? তারা তো হাতের কাছে যা পায় তা দিয়ে ডাকাত তাড়াতে রাস্তায় নামে। হাসিনা যে ভাবে ক্ষমতায় এলো সেটি কি কোন সভ্য দেশে সম্ভব? হাসিনা বাংলাদেশীদের জন্য যা বাড়িয়েছে তা উন্নয়ন নয়, বরং সীমাহীন দুর্নীতি ও বিশ্বজুড়া অপমান।

 

৪. পরকালের ভয় থেকেই চারিত্রিক বিপ্লব

মিথ্যাচার, চুরি-ডাকাতি, সন্ত্রাস, খুন, ধর্ষণ ও ব্যাভিচারের ন্যায় নানারূপ পাপের পথে নামার মূল কারণটি হলো পরকালের ভয় না থাকা। সে রায়টি অন্য কারো নয়, সেটি মহাজ্ঞানী মহাপ্রভু মহান আল্লাহতায়ালার। বিষয়টি তিনি সুস্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন সুরা মুদাছছেরের ৫৩ নম্বর আয়াতে। কোন মানুষের মনে যদি এ ধারণা বাসা বাঁধে, সামান্য কিছু বছরের এ পার্থিব জীবনটি পাপ থেকে পবিত্র রাখলে অনন্ত অসীম কালের জন্য জাহান্নামের আগুনে দগ্ধিভুত হওয়া থেকে বাঁচা যাবে -তবে সে ব্যক্তি কখনোই গুনাহর পথে পা রাখে না।

এক ফোটা পানির সাথে মহা সমুদ্রের বিশাল পানির তুলনা করা যায়। কারণ দু’টোই সসীম। কিন্তু ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন বছরেও যে অনন্ত পরকালীন জীবন শেষ হওয়ার নয়, সে জীবনের সাথে কি ৭০ বা ৮০ বছরের জীবনের তুলনা হয়? তাই সামান্য ক্ষণের জন্য পাপে নেমে কেন সীমাহীন কালের জন্য জাহান্নামের আগুনে জ্বলবে? এটি তো গুরুতর ভাবনার বিষয়। এ ভাবনাটুকুই হলো তাকওয়া। প্রকৃত ঈমানদার প্রতি মুহুর্ত বাঁচে এ ভাবনা নিয়ে। এ ভাবনা ঈমানদারের জীবনে প্রতি  মুহুর্তে পুলিশের কাজ করে। এমন ব্যক্তিগণ তাদের সমগ্র সামর্থ্য বেশী বেশী নেক আমলে ব্যয় করে। এমন ব্যক্তিরাই ফেরেশতায় পরিণত হয়।

কিন্তু যার মনে জাহান্নামের ভয় নাই, পাপের পথে চলায় তার কোন নৈতিক বাধাই থাকে না। পাপের মধ্যে তখন তার জন্য আনন্দ-উৎসবের কারণ হয়। অথচ সামান্য পাপও ঈমানদারকে বেদনা দেয়। সে তাওবা করে সে পাপ থেকে বাঁচার। অথচ সে বোধ বেঈমানের থাকে না। তাই চোর-ডাকাত, ভোট-ডাকাত ও গুম-খুনের রাজনীতির নায়কদের দেখে নিশ্চিত বলা যায় এরা বেঈমান। এদের মনে আখেরাতের কোন ভয় নাই। ভয় থাকলে পাপ তাদের আনন্দ দিত না। পরিতাপের বিষয় হলো, বাংলাদেশে চলছে এ বেঈমানদেরই রাজত্ব।

পবিত্র কুরআনের বিশাল ভাগ ব্যয় হয়েছে বস্তুত আখেরাতের ভয়কে তীব্রতর করতে। বিশেষ করে মক্কায় নাযিলকৃত সুরা গুলিতে। তাই যারা নিজের মনে আখেরাতে ভয় সৃষ্টি করতে চায় তারা মনযোগী হয় বেশী বেশী কুর’আন বুঝতে। কিন্তু যারা না বুঝে কুর’আন তেলাওয়াত করে -তাদের মনে সে ভয় জাগে না। অথচ বাংলাদেশে না বুঝে কুর’আনের কাজটিই বেশী বেশী হচ্ছে। ফলে পবিত্র কুর’আন যে চারিত্রিক বিপ্লব আনে সেরূপ বিপ্লব বাংলাদেশে ঘটছে না।

 

৫. জীবনটাই পরীক্ষাময়

মানুষের মাঝে সম্পদ, সন্তান, বিদ্যা-বুদ্ধি ও স্বাস্থ্যের ন্যায় মহান আল্লাহতায়ালার নানা রূপ নিয়ামতের যে ভিন্ন ভিন্ন বন্টন তা নিয়ে যে ক্ষোভ –তা থেকেই জন্ম নেয় হিংসা-বিদ্বেষ। এটি মহান আল্লাহতায়ালার প্রজ্ঞা ও নীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। তাই এটি বিশাল পাপ। এটি বস্তুত বেঈমানীর লক্ষণ। এ বন্টন নিয়ে রাজী থাকা এবং সন্তুষ্টির যে প্রকাশ –সেটিই হলো শুকরিয়া। সেটিই প্রকৃত ঈমানদারী ও তাকওয়া।

এ পার্থিব জীবনের প্রতিটি মুহুর্ত জুড়েই হলো পরীক্ষা। জীবনের প্রতিটি নিয়ামত ও বিপদ-আপদ বিনা উদ্দেশ্যে আসে না, আসে পরীক্ষা নিতে। সকল মানুষের ঈমানের ও যোগ্যতার মান যেমন সমান নয়, তেমনি এক নয় পরীক্ষাপত্রও। তাই প্রত্যেকের হাতে ভিন্ন ভিন্ন পরীক্ষাপত্র। কাউকে পরীক্ষা নেন সম্পদ, সন্তান ও স্বাস্থ্য দিয়ে। আবার কারো জীবনে পরীক্ষা আসে সেগুলি সীমিত করে বা না দিয়ে। জান্নাত পেতে হলে এ পরীক্ষায় পাশ করতেই হবে। ঈমানদারী তো এ পরীক্ষায় পাশ করার সার্বক্ষণিক চেতনা নিয়ে বাঁচা। প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো, প্রতি মুহুর্তে সে পরীক্ষায় পাশের সামর্থ্য বাড়ানো। সেটি কুর’আনী জ্ঞান, সঠিক দর্শন ও বুদ্ধিবৃত্তিকে কাজে লাগিয়ে। এ কাজটি দেশের মসজিদ-মাদ্রাসা, স্কুল-কলেজ, মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবীদের। কিন্তু বাংলাদেশে সে কাজটিই যথার্থ ভাবে হচ্ছে না।      

                                                                                                                         ৬. উন্নয়নের সঠিক ও বেঠিক মাপকাঠি

দেশে কতগুলি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, কলকারখানা, রাস্তাঘাট, ব্রিজ ও বিল্ডিং হলো -সেটি উন্নয়নের সঠিক মাপকাঠি নয়। বরং সঠিক মাপকাঠিটি হলো, দেশে কতজন নর-নারী প্রতারক, চোর-ডাকাত, সন্ত্রাসী, খুনি ও ব্যাভিচারী না হয়ে সৎ, চরিত্রবান ও সৃষ্টিশীল মানুষ রূপে বেড়ে উঠলো -সেটি। এ মাপকাঠিতে বাংলাদেশের উন্নয়নের মান বিশ্বের দরবারে অতি নীচে। এ দিক দিয়ে সবচেয়ে দুরাবস্থা দেশের শাসক চক্রের। তারাই নীচের নামার দৌড়ে প্রথম সারীতে।

মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে এ প্রশ্ন কখনোই তোলা হবে না, দেশে কতগুলি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, কলকারখানা, রাস্তাঘাট ও বিল্ডিং গড়া হয়েছিল এবং সে গড়ার কাজে কার কি ভূমিকা ছিল। বরং যে প্রশ্নের জবাব দিতে প্রত্যেককেই কাঠগড়ায় অবশ্যই দাঁড়াতে হবে তা হলো, পাপচার থেকে জীবন কতটা পবিত্র ছিল এবং নেক আমলের ভান্ডার কতটা সমৃদ্ধ ছিল? বিপদের কারণ হলো, মুসলিমের জীবন থেকে আখেরাতের সে মাপকাঠিগুলোই ভূলিয়ে দেয়া হয়েছে। কারণ, সেক্যুলারিজমে আখেরাতকে গুরুত্ব দেয়াটি নীতি বিরুদ্ধ।  আখেরাতের ভাবনা গণ্য হয় পশ্চাতপদতা রূপে। উন্নয়নের এমন সব মাপকাঠি খাড়া করা হয়েছে যা উন্নয়ন নিয়ে শুধু বিভ্রান্তিই বাড়িয়েছে। এবং আখেরাতে যা গুরুত্বহীন সেগুলিকে অধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

মহাসড়কে গাড়ি চালনার সময় গন্তব্যস্থলকে সব সময় স্মরণে রাখতে হয়্ সেটি স্মরণে না থাকলে গাড়ি চালনাই ভিন্ন পথে হয়। তেমনি জীবন চালনায় সব সময় স্মরণে রাখতে হয় আখেরাতকে। এবং প্রস্তুত রাখতে হয় মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে যে প্রশ্নগুলির সম্মুখীন হতে হবে -সেগুলির জবাব নিয়ে। অথচ বাংলাদেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তির কাজ হয়েছে শুধু আখেরাতকেই ভূলিয়ে দেয়া নয়, বরং বিচার দিনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলিকেও ভূলিয়ে দেয়া। যাতে মানুষ সে ভয়ানক দিনটির জন্য নিজেকে প্রস্তুত না করতে পারে। শয়তান তো সেটিই চায়।    

 

৭. বাঁচা ও মরার এজেন্ডা

মানব জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাঁচা-মরার এজেন্ডা। এটি এতোই গুরুত্বপূর্ণ যে এখানে ভূল হলে সমগ্র বাঁচাটিই ব্যর্থ হয়। অথচ মানব এই এজেন্ডা নির্ধারণেই সবচেয়ে বেশী ভূল করে। সে ভূল থেকে বাঁচাতে সে এজেন্ডাটি বেঁধে দিয়েছেন মহান আল্লাহতায়ালা। কুর’আনে সে এজেন্ডার কথাটি বলা হয়েছে এভাবে: “ক্বুল ই্ন্নাস সালাতি ওয়া নুসুকু ওয়া মাহইয়া’আ ওয়া মামাতি লিল্লাহে রাব্বিল আলামীন।” অর্থ: “বলো (হে মুহম্মদ) আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার বাঁচা ও আমার মৃত্যু বিশ্ব প্রতিপালক আল্লাহর জন্য।”। তাই মুসলিম বাঁচে, লড়াই করে ও প্রাণ দেয় কোন নেতা বা দলের স্বপ্ন পূরণে নয় বরং একমাত্র মহান আল্লাহর ইচ্ছা পূরণে। একমাত্র এরূপ বাঁচাতেই প্রকৃত ঈমানদারী। যে বিশ্বাসটি মহান আল্লাহতায়ালার ঈমানদারের চেতনায় সর্ব সময়ের জন্য বদ্ধমূল করতে চান সেটি হলো: “ইন্না লিল্লাহি ও ইন্না ইলাইহি রাজিয়ুন।” অর্থ: “নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং আল্লাহতেই আমাদের ফিরে যাওয়া।” মুমিনের বাঁচা ও মরার পিছনে এটিই তো মূল দর্শন। এই দর্শনই জীবনে সঠিক পথ দেখায়।

বাঁচা ও মরার এ কুর’আনী পথটিকেই বলা হয় সিরাতুল মুস্তাকীম। পথটি অন্য রূপ হলে সেটি জাহান্নামের অন্তহীন আযাবকে অনিবার্য করে। সেটিই হলো শয়তানের পথ। রাষ্ট্র দুর্বৃত্তদের হাতে অধিকৃত হলে যা অসম্ভব হয় তা হলো, আল্লাহর লক্ষ্যে বাঁচা ও প্রাণ দেয়া। তখন নিষিদ্ধ হয় জীবনে জিহাদ নিয়ে বাঁচা। জিহাদ তো মহান আল্লাহতায়ালা-প্রদত্ত ইসলামী বিধানকে বিজয়ী করার চেতনা নিয়ে বাঁচা ও প্রাণ দেয়া। ইসলামের শত্রুগণ সেরূপ জিহাদ নিয়ে বাঁচাকে সন্ত্রাস বলে। এভাবেই বাঁধা দেয় জান্নাতের পথে চলায়। শয়তানী শক্তির হাতে দেশ অধিকৃত হওয়ার এটিই হলো সবচেয়ে বড় বিপদ। ২৫/০৭/২০২১

 




বিবিধ ভাবনা ৬৮

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. শুধু কিছু ভাল কাজ দিয়ে কি সভ্য দেশ গড়া যায়?

শুধু ভাল কাজ করলেই দেশ সভ্য হয় না। শান্তিও আসে না। ভাল কাজের সাথে দুর্বৃত্ত নির্মূলেরও লাগাতর লড়াই থাকতে হয়। পবিত্র কুর’আন তাই শুধু আমারু বিল মারুফ (ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা)’র কথা বলে না, নেহী আনিল মুনকার (অন্যায়ের নির্মূল)’র কথাও বলে। এ দুটি কাজ একত্রে চালাতে হয়। ইসলামে অন্যায় তথা দুর্বৃত্তদের নির্মূলের কাজটিই হলো পবিত্র জিহাদ। যে দেশে জিহাদ নাই সে দেশ দুর্বৃত্তদের দখলে যায়। যেমন শুধু বিজ ছিটালেই না, আগাছা নির্মূলের কাজটি নিয়মিত না হলে সেখানে গাছ বাঁচে না। তেমনি দেশ দুর্বৃত্তদের দখলে গেলে সুনীতি নিয়ে সভ্য মানুষের বাঁচাটি অসম্ভব হয়। এমন একটি দেশের উদাহরণ হলো বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ পুরাপুরি দখলে নিয়েছে চোর-ডাকাত, ভোটডাকাত এবং গুম-খুন-সন্ত্রাসের নৃশংস হোতারা। তাদের নির্মূলের কোন আয়োজন নাই। বন-জঙ্গলে যেমন বিনা বাধায় ঝোপ-ঝাড়-আগাছা বেড়ে উঠে, বাংলাদেশে তেমনি বিনা বাধায় দুর্বৃত্তগণ বেড়ে উঠে। যারা ইসলামকে ভাল বাসে তারা ভেবে নিয়েছে, মসজিদ-মাদ্রাসা গড়লে এবং নামায-রোযা আদায় করলেই দেশ শান্তিতে ভরে উঠবে। অথচ সেটি ইসলামের রীতি নয়। মহান নবীজী (সা:)’র সূন্নতও নয়। নবীজী (সা:) যেমন নামায-রোযা করেছেন, মসজিদ গড়েছেন এবং নানাবিধ ভাল কাজ করেছেন, তেমনি দুর্বৃত্তদের নির্মূলে জিহাদে নেমেছেন। অথচ বাংলাদেশের মানুষের মাঝে নবীজী (সা:)’র সে ইসলাম বেঁচে নাই। তারা জিহাদমুক্ত এক বিকৃত ইসলাম আবিস্কার করে নিয়েছে। সে ইসলামে নবীজী (সা:)’র আমলের ইসলামী রাষ্ট্র নাই, শরিয়ত নাই, জিহাদ নাই এবং কুর’আন শিক্ষার রাষ্ট্রীয় আয়োজন নাই। দুর্বৃত্তদের দখলদারী নিয়ে বাঁচাটি তারা অভ্যাসে পরিণত করেছে। ফলে চোখের সামনে ইসলাম ও ইসলামপন্থীদের নির্মূল হতে থাকলেও তাদের মাঝে কোন প্রতিক্রিয়া নাই।

অপর দিকে দেশের চোরডাকাত ও ভোটডাকাত সরকারের পক্ষ থেকে লাগাতর যুদ্ধ শুরু হয়েছে জিহাদের বিরুদ্ধে। জিহাদকে বলা হচ্ছে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস। জিহাদ বিষয়ক বই রাখাকে দন্ডনীয় অপরাধ গণ্য করছে। পুলিশের কাজ হয়েছে জিহাদ বিষয়ক বই বাজেয়াপ্ত করা। যেমন জিহাদ বলে কুর’আন-হাদীসে কোন কথাই নাই। এটি নিতান্তই তাদের নিজেদের বাঁচার স্বার্থে। কারণ তারা জানে, জিহাদ হলো মুসলিমের হাতিয়ার। তাদের মত চোরডাকাত ও ভোটডাকাত দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে ঈমানদারের যুদ্ধকে বলে জিহাদ। এমন একটি যুদ্ধ তারা চায় না। তাই নিজেদের বাঁচাটি নিরাপদ করতে তারা ইসলামের শিক্ষাকেই বিকৃত করছে। নবীজী (সা)’র ইসলামকে ভূলিয়ে দিতে তারা নামায-রোযা, মিলাদ মহফিল ও দোয়া-দরুদের মাঝে ইসলামকে সীমিত রাখছে। এটি হলো তাদের ইসলামের জিহাদ নির্মূলের যুদ্ধ।  

২. শেখ হাসিনার সবচেয়ে বড় অপরাধটি প্রসঙ্গে

দেশ কতটা সভ্য সেটি দালান-কোঠা, রাস্তা-ঘাট ও কল-কারখানা দেখে বুঝা যায় না। কারণ এগুলি ন্যায়-নীতি, সত্য-মিথ্যা ও সভ্য-অসভ্যতার কথা বলে না। এগুলির নিজস্ব কোন চরিত্র থাকে না। এগুলি কথা বলে না। চরিত্র থাকে এবং সরবে নীতি-নৈতিকতা ও দুর্নীতির বয়ান দেয় দেশের আদালত।  আদালতের রায়ের মধ্য দিয়ে সভ্য-অসভ্যতা, ন্যায় নীতি, দুর্বৃত্তি, ও বিবেক বোধ কথা বলে। একটি সভ্য জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টিটি কখনোই প্রাসাদ, রাস্তাঘাট বা কল-কারখানা নয়। সেটি হলো ন্যায় বিচারের আদালত। অসভ্য দেশে সেটি থাকে না। অসভ্য জাতির অসভ্যতা শুধু পতিতাপল্লী, মদ-গাঁজার আসর, ডাকাত পাড়ায় ধরে পড়ে না, সে অসভ্যতা দেখা যায় দেশের আদালতে। বাংলাদেশে সেটি দেখা গেছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে। দেখা গেছে হাসিনার ন্যায় ভোটডাকাতকে বিচারের বাইরে রাখাতে।

তাই জাতির সভ্যতা ও অসভ্যতার বিচারে ঘরে ঘরে নেমে গবেষণার প্রয়োজন পড়ে না। পুলিশের খাতায় দুর্বৃত্তদের তালিকার খোঁজ নেয়ারও প্রয়োজন পড়ে না। সেটি দেশের আদালতের দিকে নজর দিলেই সুস্পষ্ট বুঝা যায়। সূর্য দেখে যেমন দিনের পরিচয় মেলে তেমনি আদালতের ন্যায় বিচার দেখে সভ্যতার পরিচয় মেলে। সভ্য মানুষের কাছে দুর্গন্ধময় আবর্জনা যেমন অসহ্য, তেমনি অসহ্য হলো আদালতের বিচারকদের দুর্বৃত্তি ও অবিচার। এটিকেই বলা হয় অবিচারের বিরুদ্ধে সভ্য মানুষের জিরো টলারেন্স। এটিই ঈমানদারের গুণ। কিন্তু দুর্বৃত্ত, অসভ্য ও বেঈমানদের সে রুচি থাকে না। মশামাছি যেমন আবর্জনায় বাচে এরাও তেমনি দুর্বৃত্তি নিয়ে বাঁচে। দুর্বৃত্তির মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়া ও ক্ষমতা ধরে রাখাই যেমন তাদের রীতি, তেমনি তাদের বড় দুর্বৃত্তি হলো আদালতে অবিচারের প্রতিষ্ঠা দেয়া।

অথচ সভ্য শাসকদের সর্বশ্রেষ্ঠ গুণটি রাস্তাঘাট ও কলকারখানা গড়া নয়, সেটি হলো দেশে ন্যায় বিচারকে প্রতিষ্ঠা দেয়া। মহান নবীজী (সা:) দশ বছর রাষ্ট্র-প্রধান ছিলেন। তিনি প্রাসাদ, কলকারখানা ও রাস্তাঘাট গড়েননি, প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন ন্যায় বিচারকে। মহান আল্লাহতায়ালা রোজ হাশরের বিচার দিনে কোন শাসককে প্রাসাদ, কলকারখানা ও রাস্তাঘাট গড়া নিয়ে কাঠগড়ায় তুলবেন না। কিন্তু অবশ্যই কাঠগড়ায় তুলবেন ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থতা নিয়ে। এবং সে ন্যায় বিচারের জন্য তিনি আইনও দিয়েছেন। পবিত্র কুর’আনে ঘোষিত সে আইনকে বলা হয় শরিয়ত। যারা সে শরিয়ত অনুসারে বিচার করে না তাদেরকে কাফের, জালেম ও ফাসেক বলা হয়েছে। তাই শাসকের ঈমানদারী ধরা পড়ে রাষ্ট্রে শরিয়তী আইনের বিচার দেখে। এবং বেঈমানী ধরা পড়ে নিজেদের গড়া কুফরি আইনের অবিচার দেখে। 

বাংলাদেশে সবচেয়ে অসভ্য ও ব্যর্থ খাতটি হলো বিচার ব্যবস্থা। জেনারেল এরশাদ বন্দুকের জোরে পুরা দেশ ডাকাতি করে নিল তার কোন শাস্তি হলো না। শেখ হাসিনাও পুলিশ ও সেনাবাহিনী দিয়ে জনগণের ভোট ডাকাতি করে নিল, তারও কোন শাস্তি হলো না। অথচ ফাঁসি দেয়া হলো বিরোধী দলীয় নেতাদের। কথা হলো যে দেশের আদালতে নিরপরাধদের ফাঁসি দেয়া হয়, দন্ডপ্রাপ্ত খুনিকে জেলখানা থেকে মুক্তি দেয়া হয় এবং ভোটডাকাতকে প্রধানমন্ত্রী রূপে রায় দেয়া হয় -সে দেশকে কি আদৌ সভ্য বলা যায়? শেখ হাসিনার সবচেয়ে বড় অপরাধ এই নয় যে সে জনগণের ভোটের উপর ডাকাতি করেছে। বরং তার সবচেয়ে বড় অপরাধটি হল, দেশের আদালতে অবিচারকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। এবং আদালতের বিচারকদের মানুষ খুনের লাঠিয়ালে পরিনত করেছে। এভাবে বাংলাদেশকে একটি অসভ্য দেশের পর্যায়ে নামিয়েছে। এভাবে বাংলাদেশীদের জন্য বাড়িয়েছে বিশ্বজুড়া অপমান। এ অপরাধের স্মৃতি নিয়ে শেখ হাসিনা বহু শত বছর ইতিহাসে বেঁচে থাকবে। বাংলাদেশীদের যদি কোন দৃর্বৃত্তকে যুগ যুগ ধরে সর্বাধিক ঘৃনা করতে হয় তবে সে দুর্বৃত্তটি যে নিশ্চয় শেখ হাসিনাই হবে -তা নিয়ে কি সামান্যতম সন্দেহ আছে?  

 

৩. সময়টি কি ঘুমিয়ে থাকার?

কোন পথে জাতির ধ্বংস ও অপমান এবং কোন পথে বিজয় ও গৌরব -সেটি কোন জটিল রকেটি সায়েন্স নয়। ইতিহাসের বইগুলি সেসব কাহিনীতে ভরপুর। যে কোন শিক্ষিত ব্যক্তিই তা থেকে শিক্ষা নিতে পারে। তবে ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেয়াই মানব জাতির ইতিহাস। রোগের মহামারি অসংখ্য মানবের জীবনের মৃত্যু ডেকে আনে। তবে মহামারিতে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ঘটলেও তাতে কোন দেশ বা জাতি ধ্বংস হয় না। কিন্তু দেশবাসীর ভাগ্যে ধ্বংস, পরাজয় ও অপমান আনে দুর্বৃত্তদের শাসন। তারা সভ্য ভাবে বাঁচাটাই অসম্ভব করে। তাই দুর্বৃত্ত শাসকগণই হলো জাতির সবচেয়ে বড় শত্রু। সাধারণ ছিঁছকে চোর-ডাকাত, সন্ত্রাসী ও খুনিদের কারণে দেশের এত বড় ক্ষতি হয় না।

তাই দেশ ও দেশবাসীর কল্যাণে মসজিদ-মাদ্রাসা, স্কুল-কলেজ ও হাসপাতাল নির্মাণের ন্যায় কাজগুলি করাই শুধু ভাল কাজ নয়, বরং সবচেয়ে সেরা ভাল কাজটি হলো দুর্বৃত্ত শাসন নির্মূলের জিহাদ। এটিই ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত। দেশের মানুষ পুরাপুরি ইসলাম পালন করতে পারবে কিনা –সে বিষয়টি নির্ভর করে এই জিহাদের উপর। যে দেশে জিহাদ নাই সেদেশে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা থাকেনা এবং আদালতে থাকে নাশরিয়তের বিচার। আর শরিয়ত পালন ছাড়া কি ইসলাম পালন হয়?

একমাত্র জিহাদের মাধ্যমেই জাতি দুর্বৃত্তমুক্ত হয়। এবং বিজয়ী হয় ইসলাম। একাজ স্রেফ নামায-রোযা ও দোয়াদরুদে হওয়ার নয়। নবীজী (সা:)কে তাই শত শত ভাল কাজের সাথে জিহাদেও নামতে হয়েছে। এ জিহাদে নিহত হলে বিনা হিসাবে জান্নাত মেলে। এতবড় কল্যাণকর কাজ দ্বিতীয়টি নাই। একাজের পুরস্কারও তাই বিশাল। এ কাজে নিহত হলে বিনা হিসাবে মেলে জান্নাত। দুর্বত্ত শাসকগণ শুধু জনগণের শত্রু নয়, শত্রু মহান আল্লাহতায়ালার। যারা জিহাদ করে একমাত্র তারাই মহান আল্লাহতায়ালার শত্রুদের নির্মূল করে। এজন্য রাব্বুল আলামীন তাদের উপর এতো খুশি।

দুর্বৃত্ত শাসকের নির্মূল না করে কোন সভ্য রাষ্ট্র গড়ার কাজটি অসম্ভব। যেমন আগাছার শিকড় না তুলে সেখানে গাছ লাগানো যায় না। দুর্বৃত্তির বিশাল বট গাছটি স্বস্থানে রেখে কি ইসলামের চারা লাগানো যায়? ইসলামবিরোধীদের নির্মূলের পথ ধরতেই হবে। দুর্বৃত্ত শাসনের নির্মূলের মধ্য দিয়েই বিজয়ী হয় ইসলাম। মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনকে প্রতিষ্ঠা দেয়ার এটিই একমাত্র পথ।  শত শত মসজিদ-মাদ্রাসা, রাস্তাঘাট ও কল-কারখানা গড়ে দুর্বৃত্ত নির্মূলের কাজটি সমাধা করা যায় না। নির্মূলের কাজে যে জিহাদ তার কোন বিকল্প নাই। তাই যারা প্রকৃত ঈমানদার ও জ্ঞানী তারা দুর্বত্ত নির্মূলের জিহাদে মনযোগী হয়। সে জিহাদে বিনিয়োগ করে নিজেদের অর্থ, মেধা, বুদ্ধিবৃত্তি, ও রক্ত। এটিই নবীজী (সা:) ও সাহাবায়ে কেরামদের পথ। একাজে সাহাবাদের অর্ধেকের বেশী শহীদ হয়ে গেছেন। মসজিদ মাদ্রাসার নির্মাণে কোটি কোটি টাকা দিলেও বিনা হিসাবে জান্নাত প্রাপ্তির কোন প্রতিশ্রুতি নাই। কিন্তু সে প্রতিশ্রুতি আছে জিহাদে প্রাণদানে।

বাংলাদেশে যারা শাসন ক্ষমতায়, ইসলামের বিরুদ্ধে তাদের শত্রুতা কি কোন গোপন বিষয়? দ্বীনের এ শত্রুগণ কুর’আনের তাফসির হতে দিতে রাজী নয়। দেশের সবচেয়ে বড় তাফসিরকারক দেলোয়ার হোসেন সাঈদীকে আজীবন জেলবন্দী করার ব্যবস্থা করেছে। শেখ হাসিনার পিতা শেখ মুজিব স্কুলের সিলেবাস থেকে বিলুপ্ত করেছিল ধর্ম শিক্ষা। একই ভাবে হাসিনাও ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছে। স্কুল-কলেজের পাঠদানে কুর’আন-হাদীস ও নবীজী (সা:)’র চরিত্রের উপর কোন পাঠের ব্যবস্থা নাই। ইসলামপন্থীদের ফাঁসি দিচ্ছে, জেলে নিচ্ছে এবং গুম করছে। ইসলামের বিরুদ্ধে হাসিনার যুদ্ধ দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে। এ অবস্থায় ইসলামপন্থীদের কি ঘুমিয়ে থাকার সময়?

 

৪. কেন এ পরাজয় ও আযাব?

নিয়মিত নামায-রোযা করে এবং টুপি-দাড়ি আছে -এমন লোকের সংখ্যা বাংলাদেশে বহু কোটি। কিন্তু আল্লাহর হুকুম ও তাঁর শরিয়তি আইন প্রতিষ্ঠার জিহাদে লোক নাই। ঈমানের ফাঁকিটি এখানেই ধরা পড়ে। এরূপ ফাঁকিবাজীর ফলে দেশের রাজনীতি, প্রশাসন, আদালত ও শিক্ষা-সংস্কৃতির অঙ্গণে বিজয়টি শয়তানের পক্ষের শক্তির এবং পরাজয় ইসলামের। যার মধ্যে সামান্য ঈমান আছে সে কি শয়তানের এ বিজয় মেনে নিতে পারে? মেনে নিলে কি মহান আল্লাহতায়ালা খুশি হন?

ইসলামের পক্ষের শক্তির এখন বড়ই দুর্দিন। রাস্তায় নামলে এবং ইসলামের পক্ষে কথা বলেই তাদের গুম হতে হয়। অথবা জেল ও পুলিশী নির্যাতনের মুখে পড়তে হয়। এটি কি কম আযাব? অথচ এ আযাব তাদের নিজ হাতের কামাই। অনৈক্যের পথে এমন আযাব যে অনিবার্য -সে হুশিয়ারী তো মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুর’আনে বার বার শুনিয়েছেন। কিন্তু সে আযাব থেকে বাঁচায় ইসলামপন্থীদের আগ্রহ কই? অনৈক্যের পথটি  যে নিশ্চিত পরাজয় ও নৃশংস দুর্গতির পথ -সেটি জেনেও বাংলাদেশে ইসলামপন্থীগণ অনৈক্যের পথই বেছে নিয়েছে।   

কিন্তু কেন এতো অনৈক্য? কারণটি সুস্পষ্ট। মানুষ যখন একমাত্র মহান আল্লাহতায়াকে খুশি করার জন্য কাজ করে তখন একতা গড়া তাদের জন্য অতি সহজ হয়। তাই কোথাও লক্ষাধিক নবী-রাসূল একত্রে কাজ করলে তাদের মাঝে সীসাঢালা দেয়ালের ন্যায় একতা দেখা দিত। এবং ইসলামের গৌরবের দিনগুলিতেও দেখা গেছে। কিন্তু একতা অসম্ভব হয় যদি লক্ষ্য হয় দল, নেতা, ফেরকা, পীর, মাজহাবকে বিজয়ী করা। বাংলাদেশের ইসলামপন্থীদের ক্ষেত্রে সেটিই ঘটেছে। তাদের গরজ যতটা নিজ দল, নিজ ফেরকা ও নিজ পীরগিরি বিজয়ী করা নিয়ে সে গরজ মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনকে বিজয়ী করা নিয়ে নাই। ফলে অসম্ভব হয়েছে একতাবদ্ধ হওয়া ।

৫. ঈমানদারী ও বেঈমানী

ঈমান ও বেঈমানী সুস্পষ্ট দেখা যায়। সেটি ব্যক্তির চিন্তাধারা, রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি, কর্ম ও আচরনের মধ্যে। যার মধ্যে শরিষার দানা পরিমাণ ঈমান আছে সে কি কখনো জাতীয়তাবাদ, বর্ণবাদ, সেক্যুলারিজম, সমাজবাদের বিশ্বাসী হতে পারে? সে ভ্রান্ত মতবাদগুলি বিজয়ী করার জন্য লড়াই করতে পারে? এগুলিকে বিজয়ী করার অর্থ তো ইসলামকে পরাজিত করা। বাংলাদেশে তো সেটিই হয়েছে। বাংলাদেশে ইসলামের পরাজয় এবং শয়তানের বিজয় এসেছে তাদের হাতে যারা নিজেদের মুসলিম রূপে পরিচয় দেয়।

কথা হলো, শুধু নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাত পালন করলেই কি মুসলিম হওয়া যায়? তাকে তার রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি, শিক্ষা-সংস্কৃতি এবং যুদ্ধ-বিগ্রহকে ইসলামকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে হতে হয়। মুসলিমের জন্য এটি পুরাপুরি হারাম যে, সে বিশ্বাস করবে ইসলামে অথচ যুদ্ধ করবে জাতীয়তাবাদ, সমাজবাদ, সেক্যুলারিজম বা বর্ণবাদকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে। এমন কর্মগুলি মূলত ইসলামের সাথে গাদ্দারী।

৬. জিজ্ঞাস্য বিষয়

প্রতিটি বাংলাদেশীর নিজেকে জিজ্ঞাসা করা উচিত, সে কি সত্যিই মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনের বিজয় চায়? এবং চাইলে আদালতে শরিয়তের আইন নাই কেন? ব্যক্তি কি চায় এবং কি চায়না –তার মধ্যেই প্রকাশ পায় তার ঈমান বা বেঈমানী। ঈমানদার মাত্রই তাই ইসলামের বিজয় চায়। এবং বেঈমান মাত্রই ইসলামের পরাজয় চায়। কিন্তু শতকরা ৯০ ভাগ মুসলিমের দেশে সে বিজয়টি কোথায়?

লাখ লাখ সৈনিক পুষে লাভ কি যদি রাজার সার্বভৌমত্ব ও আইনই না চলে? মুসলিম মাত্রই তো মহান আল্লাহতায়ালার সৈনিক। তাদের উপর ঈমানী দায়ভার তো মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়তী আইনের প্রতিষ্ঠা দেয়া। সেকাজে ইসলামের গৌরব কালে মুসলিমদের জীবনে লাগাতর যুদ্ধ দেখা গেছে। কিন্তু সে কাজে বাংলাদেশের মুসলিমদের বিনিয়োগ কই? সাফল্যই বা কতটুকু? তারাই কি নিজেদের রাজস্বের অর্থে ও নিজেদের সমর্থনে ইসলামের শত্রুদের বিজয়ী করেনি? মুজিবের ন্যায় ইসলামের শত্রু কি অমুসলিমদের ভোটে নির্বাচিত হয়েছিল? ইসলামের বিরুদ্ধে মুজিবের শত্রুতা কি কোন গোপন বিষয়? মুজিবই তো স্কুল-কলেজে ইসলামের পাঠ নিষিদ্ধ করেছিল, কারাবন্দী করেছিল ইসলামী দলগুলির নেতাদের, নিষিদ্ধ করেছিল ইসলামের নামে সংগঠিত হওয়াকে এবং জাতীয় আদর্শ রূপে ঘোষণা দিয়েছিল জাতীয়তাবাদ, সেক্যুলারিজম ও সমাজবাদের ন্যায় হারাম মতবাদগুলিকে। তাজ্জবের বিষয় হলো, ইসলামের সে প্রমাণিত শত্রুকে আজও তারা বঙ্গবন্ধু ও জাতির পিতা বলে।

অথচ ব্যক্তির ঈমান তো তার কথা ও বিশ্বাসে ধরা পড়ে। যে হিন্দু পুরোহিতটি মুর্তিপূজা পরিচালনা করে -তার সে হারাম কর্মকে সমর্থন ও প্রশংসা করলে কি কেউ মুসলিম থাকে? তেমনি যে নেতা জাতীয়তাবাদ, সেক্যুলারিজম ও সমাজবাদের ন্যায় হারাম মতবাদকে দেশবাসীর উপর চাপিয়ে দেয় -তাকে জাতির পিতা ও বঙ্গবন্ধু বললে কি ঈমান থাকে? এরূপ হারাম কর্মে কি মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করা যায়? ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন বিধান। ধর্মকর্ম, রাজনীতি, আইন-আদালত, প্রশাসন, শিক্ষা-সংস্কৃতি, ও যুদ্ধ-বিগ্রহের ন্যায় সর্বক্ষেত্রে রয়েছে ইসলামের দিক-নির্দেশনা। মুসলিমদের ঈমানী দায়বদ্ধতা তো একমাত্র ইসলামকে জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে অনুসরণ করা। মুজিব ও হাসিনার ন্যায় কোন হারাম মতবাদকে অনুসরণ করা নয়। ইসলামকে পুরাপুরি বিশ্বাস করার মধ্যেই তো ঈমানদারী। অথচ বাংলাদেশীদের মাঝে সে ঈমানদারীটি কই? এ নিয়ে আপন মনে প্রশ্নই বা ক’জনের মনে? মহান আল্লাহতায়ালার কাছে হিসাব দেয়ার আগে এ হিসাব নেয়া কি জরুরি নয়? ২৪/০৭/২০২১

 




বিবিধ ভাবনা ৬৭

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. পালিত হচ্ছে না পবিত্র কুর’আনের ফরজ

প্রতিটি ফরজ বিধান প্রতিটি মুসলিমের উপর বাধ্যতামূলক। কোন ফরজ বিধান পালন না করে কেউই মুসলিম রূপে গণ্য হওয়ার কথা ভাবতে পারেনা। তবে ইসলামে শুধু নামায-রোযা ও হ্জ্জ-যাকাতই ফরজ করা হয়নি। তার সাথে আরেকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কেও ফরজ করা হয়েছে। সেটি হলো পবিত্র কুর’আন। সে ঘোষণাটি এসেছে সুরা কাসাসের ৮৫ নম্বর আয়াতে। বলা হয়েছে, “ইন্নাল্লাযীনা ফারাদা আলাইকাল কুর’আনা..”। অর্থ: নিশ্চয়ই (হে মুহম্মদ তিনি সেই মহান আল্লাহ) যিনি আপনার উপর ফরজ করেছেন কুর’আন।

প্রশ্ন হলো, কুর’আন ফরজ করার অর্থ কি? অন্ধকার গহীন জঙ্গলে বা বিশাল মরুর বুকে যে পথিক পথ হারিয়েছে তার কাছে রোডম্যাপের গুরুত্ব অপরিসীম। পথের সন্ধান না পেলে তার মৃত্যু অনিবার্য। তমনি গুরুত্বপূর্ণ হলো পথহারা মানুষের কাছে পবিত্র কুর’আন। একমাত্র এ কুর’আনই পথ দেখায় জান্নাতের। তাই যে ব্যক্তি কুর’আন পায়, একমাত্র সেই জান্নাত পায়। নইলে অনিবার্য হয় জাহান্নামে পৌঁছা। একজন বিবেকমান মানুষের কাছে জাহান্নামের আগুনে কোটি কোটি বছর দগ্ধিভুত হওয়া থেকে বাঁচাটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ হলো কুর’আন বুঝা এবং তা অনুসরণ করা।

মুসলিম উম্মাহর মাঝে বহু কোটি মানুষ আছে যারা নামায-রোযা ও হ্জ্জ-যাকাতের ন্যায় ফরজগুলি গুরুত্ব দিয়ে পালন করে। কিন্তু পালন করেনা পবিত্র কুর’আনের ফরজ। মুসলিম উম্মাহর মূল রোগটি এখানেই। ফলে তাদের জীবনে নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাত থাকলেও তারা কুর’আনের পথে তথা জান্নাতের পথে নাই। বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশে কোটি কোটি মানুষ যে পথহারা তা নিয়ে সন্দেহ আছে? যারা জান্নাতের পথে থাকে তারা কি কখনো জাতীয়তাবাদ, সেক্যুলারিজম, লেবারালিজম ও সমাজবাদের পথে থাকে। তারা কি বিভক্ত হয় এবং নিজ হাতে নিজ দেশ ভেঙ্গে কাফেরদের সাথে নিয়ে উৎসব করে? আদালত থেকে কি বিলুপ্ত করে শরিয়ত? এগুলি তো শয়তানের পথ তথা জাহান্নামের পথ। জান্নাতের পথে শুধু নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাতই থাকে না, থাকে কুর’আনী জ্ঞান শিক্ষা, ইসলামী রাষ্ট্র, শরিয়ত, হুদুদ, জিহাদ, প্যান-ইসলামিক মুসলিম ঐক্য, শুরাভিত্তিক শাসন ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু বাংলাদেশে এর কোনটিই নাই। অথচ নবীজী (সা:)’র আমলে এর সবগুলিই ছিল। এবং ঐগুলিই হলো জান্নাতের যাত্রাপথের মাইল ফলক। জান্নাতে পৌঁছতে হলে যাত্রাপথের এই সবগুলি মাইল ফলক অতিক্রমের নিয়েত থাকতে হয়। এবং সে লক্ষ্যে জিহাদও থাকতে হয়। 

কুর’আনের ফরজ কখনোই গ্রন্থ্যটিকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেলে পালিত হয়না। না বুঝে তেলাওয়াতেও পালিত হয়না। সে ফরজ তো তখনই পালিত হয় যখন মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া এ সর্বশ্রেষ্ঠ দানটি বুঝার চেষ্টা করা হয় এবং কুর’আনে বর্ণিত বিধানগুলিকে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রতিষ্ঠা দেয়া হয়। মুসলিমদের গৌরব কালে তো সেটিই হয়েছিল। কুর’আনের ফরজ আদায় সে সময় এতটাই গুরুত্ব পেয়েছিল যে মিশর, সুদান, সিরিয়া, ইরাক, মরক্কো, আলজিরিয়া, লিবিয়া, তিউনিসিয়া ও মৌরতানিয়ার ন্যায় বহু দেশের জনগণ তাদের মাতৃভাষাকে দাফন করে আরবী ভাষাকে নিজেদের ভাষা রূপে গ্রহণ করেছিল। তারা বুঝেছিল, কুর’আন না বুঝলে ও না মানলে কুর’আনের ফরজ পালিত হয়না। এবং সে ফরজ পালিত না হলে জান্নাতেও পৌঁছা যায় না।

অথচ বাংলাদেশের ন্যায় বহুদেশের মুসলিমের মূল ব্যর্থতাটি এখানেই। পবিত্র কুর’আনের ফরজ পালন না করেই তারা মুসলিম হওয়ার দাবী করে! এটি অবিকল ডাক্তারী বই না পড়েই ডাক্তারী পেশায় নামার ন্যায়। এভাবে ব্যর্থ হচ্ছে মুসলিম রূপে বেড়ে উঠা। নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাতের ফরজগুলি তো তখনই কাঙ্খিত ফল দেয় যখন কুর’আনের ফরজটি প্রথমে পালিত হয়। কারণ কুর’আনের জ্ঞানই আমলে ও ইবাদতে ওজন বাড়ায়। আর মহান আল্লাহতায়ালা তো আমলের ওজন দেখেন, সংখ্যা নয়। জাহিল ব্যক্তির ইবাদত তাই কখনোই জ্ঞানী ব্যক্তির ইবাদতের সমান হয়না। ইসলামে জ্ঞানার্জনের মর্যাদা এত বেশী যে, হাদীসে বলা হয়েছে: যখন কোন ব্যক্তি জ্ঞানার্জনের লক্ষ্যে ঘর ছেড়ে পথে বের হয় তখন শুধু ফিরেশতাগণ নয় সকল জীবজন্তু, পশুপাখী ও পানির মাছ তার জন্য দরুদ পড়তে থাকে। এবং জ্ঞানীর যখন মৃত্যু হয় তখন যেন আসমান থেকে একটি নক্ষত্র খসে পড়লো। অথচ সে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকেই মুসলিম সমাজে গুরুত্ব দেয়া হয়না।

কুর’আনের ফরজ আদায়ের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে মোল্লা-মৌলভী-আলেমগণ। না বুঝে কুর’আন তেলাওয়াত করলেই বিপুল সওয়াব –এরূপ কথা বলে কুর’আনের ফরজ আদায়ের আগ্রহই তারা বিলুপ্ত করেছেন। এবং তারা ব্যর্থ হয়েছেন সাধারণ জনগণের মাঝে কুর’আন বুঝায় আগ্রহ সৃষ্টি করতে। তাদের কারণে মানুষ না বুঝে তেলাওয়াত করেই আত্মপ্রসাদ লাভ করে। নবীজী (সা:) ও সাহাবাদের আমলে কি সেটি ভাবা যেত? মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর পবিত্র কুর’আনকে না বুঝে তেলাওয়াতের জন্য নাযিল করেননি। বরং এ জন্য নাযিল করেছেন যে মানুষ তা পড়বে, বুঝবে এবং পদে পদে তা অনুসরণ করবে। যেমনটি হয়ে থাকে পথ চলায় রোডম্যাপ অনুসরণের ক্ষেত্রে।

অথচ এ সহজ-সরল বিষয়টি বাংলাদেশের সাধারণ মুসলিমগণ যেমন বুঝতে পারিনি, তেমনি বুঝতে পারিনি দেশের সরকার, শিক্ষাবিদ ও মোল্লা-মৌলভী-আলেমগণ। এজন্যই বাংলাদেশের মত দেশে ঘরে ঘরে কুর’আন তেলাওয়াতের বিপুল আয়োজন থাকলেও তা বুঝার আয়োজন নাই। শয়তান তো এটিই চায়। শয়তান চায়, জনগণ কুর’আন চর্চাকে শুধু তেলাওয়াতের মাঝে সীমিত রাখুক। ফলে চলছে শয়তানকে খুশি করার আয়োজন। মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া ফরজ বিধানগুলিকে পবিত্র কুর’আনের পৃষ্ঠাগুলিতে বন্দী রাখার এর চেয়ে মোক্ষম উপায় আর কি হতে পারে? প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের মত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলিতে কি শয়তানকে খুশি করা ও শয়তানী প্রকল্পকে সফল করার এ কাজগুলিই লাগাতর চলতে থাকবে?

 

২. যুদ্ধময় জীবন ও শত্রু-মিত্রের পরিচয়

ঈমানদারের জীবনের প্রতিটি মুহুর্তই যুদ্ধময়। প্রতিটি আলোর যেমন উত্তাপ থাকে, তেমনি ঈমানদারের জীবনেও যুদ্ধ থাকে। বস্তুত যুদ্ধই পরিচয় দেয় সে কি আদৌ মুসলিম। মুসলিম রূপে নিজেকে পরিচয় দিল, অথচ জীবনে যুদ্ধ নাই -সেটি কি ভাবা যায়? তবে ঈমানদারের যুদ্ধটি শুধু পানাহারে বাঁচার যুদ্ধ নয়। বরং সেটি আদর্শ নিয়ে বাঁচার। মুসলিম জীবনে সে আদর্শটি হলো ইসলাম। এবং আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মুসলিম যোদ্ধাকে শুধু যুদ্ধ জানলে চলে না, কে শত্রু এবং কে মিত্র -সেটিও সঠিক ভাবে জানতে হয়। নইলে ভাল যুদ্ধ করেও পরাজয় এড়ানো যায় না।

তবে ঈমানদারের জীবনে প্রতি মুহুর্তে যে যুদ্ধ -সেটি মূলত শয়তানী শক্তির পক্ষ থেকে চাপানো যুদ্ধ। বলা হয়ে থাকে, ঈমানদার যদি কোন পাহাড়ে বা বিজন মরুভূমিতে একাকী পথ চলে, সেখানেও তাঁর পিছনে শয়তান এসে হাজির হয়। শয়তান কখনোই তার শত্রু তথা প্রকৃত ঈমানদারকে চিনতে ভূল করেনা। তাই যার জীবনে শয়তানের আরোপিত যুদ্ধ নাই, বুঝতে হবে শয়তান এবং শয়তানের অনুসারিগণ তাকে শত্রু রূপে গণ্যই করে না। এবং শয়তানের দৃষ্টিতে সে ঈমানদার নয়।

নবীজী (সা:)’র চেয়ে অধিক শান্তিবাদী ও সত্যাবাদী মানব সে সময় সমগ্র আরবে আর কে ছিল? নবুয়ত লাভের পূর্ব থেকেই বিবাদমান গোত্রগুলির মাঝে তিনি মীমাংসা করে দিতেন। কিন্তু যখনই তিনি ইসলামের দিকে মানুষদের ডাকা শুরু করলেন, তখনই তাঁর উপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল। প্রতি সমাজেই যুদ্ধের দুটি রূপ: এক). বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধ; দুই). অস্ত্রের যুদ্ধ। মক্বার ১৩ বছর চলে নবীজী (সা:)’র বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধ। শত্রুগণ তাঁকে বিনা বাঁধায় এক পাও এগুতে দেয়নি। শুরু হয় লাগাতর গালিগালাজ, হাসি-মস্করা, মিথ্যা অপবাদ আরোপের পালা। তাকে পাগল, যাদুকর ও জ্বিনের আছড়গ্রস্ত বলেও অভিহিত করা হয়। বয়কট করা হয় সামাজিক ভাবে। এসবই ছিল তাঁকে মানসিক ভাবে পরাস্ত ও পঙ্গু করার কৌশল।

সে বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধে নবীজী (সা:)’র হাতিয়ারটি ছিল পবিত্র কুর’আন। এবং কুর’আনকে হাতিয়ার রূপে ব্যবহারের হুকুমও এসেছে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে। বলা হয়েছে “জাহিদু বিল কুর’আন”; অর্থ: কুর’আন দিয়ে জিহাদ করো। অথচ বাংলাদেশের মত দেশগুলিতে যারা ইসলামের পক্ষে লড়াই করে তাদের হাতে সে পবিত্র হাতিয়ারটি নাই। মহান আল্লাহতায়ালার ওয়াজের বদলে তারা নিজেদের ওয়াজ চালিয়ে যায়। অথচ মক্কার বুকে ১৩ বছর যাবত যুদ্ধে নবীজী (সা:) কুর’আনকে ব্যবহার করেছেন হাতিয়ার রূপে। শেষের দিকে ষড়যন্ত্র শুরু হয় তাঁর প্রাণনাশের। এ পর্যায়ে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে তাঁকে মদিনায় হিজরতের নির্দেশ দেয়া হয়।

মদিনায় হিজরতের পরও নবীজী (সা:)’র জীবনে যুদ্ধ থেমে যায়নি। বরং শুরু হয় গালিগালাজের বদলে অস্ত্রের যুদ্ধ। লক্ষ্য, তাঁর ও তাঁর অনুসারীদের মদিনা থেকে সমূলে নির্মূল। নবীজী (সা:)ও থেমে যাননি। তাঁকে ইসলামের মিশন চালিয়ে যেতে হয়েছে বদর, ওহুদ, খন্দকের ন্যায় চুড়ান্ত যুদ্ধে বিজয় অর্জনের মধ্য দিয়েই। আজও মুসলিমদের সামনে যুদ্ধ ছাড়া কি ভিন্ন পথ আছে? যুদ্ধ থেকে দূরে থাকার অর্থ বিনা যুদ্ধে শয়তানী শক্তির কাছে পরাজয় মেনে নেয়া। অথচ এরূপ পরাজয় মেনে নেয়াতে ইসলাম বাঁচে না। ঈমানও বাঁচে না। তখন প্রতিষ্ঠা পায় শয়তানের বিধান। বাংলাদেশের মত দেশগুলিতে সেটিই হয়েছে। ফলে শয়তানী শক্তির হাতে বিলুপ্ত হয়েছে রাষ্ট্রের বুকে মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব, বিলুপ্ত হয়েছে শরিয়তী আইন এবং বিলুপ্ত হয়েছে নবীজী (সা:)’র আমলের ইসলাম এবং ইসলামী রাষ্ট্র। ফলে বিজয়ের মহোৎসব বেড়েছে সেক্যুলারিস্ট, ন্যাশনালিস্ট, ও ফ্যাসিস্টদের ন্যায় নানারূপ শত্রুশক্তির।

নিরাপদ জীবন শুধু পানাহারে নিশ্চিত হয় না। চিনতে হয় আশে পাশের হিংস্র পশু ও বিষাক্ত সাপ-বিচ্ছু ও পোকামাকড়দেরও। এ জ্ঞান না থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি দিয়ে লাভ হয়না। তেমনি যুদ্ধে বিজয়ী হতে হলে কে শত্রু এবং কে মিত্র –সেটিও জানতে হয়। পবিত্র কুর’আনে তাই শুধু নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাতের বিধানই দেয়নি, নানা ভাবে পরিচয় পেশ করা হয়েছে ইসলামের শত্রুদেরও। ইসলামের শত্রুদের চেনার ২টি সহজ উপায় হলো: এক). ইসলামের শত্রুদের বিজয় ও ইসলামপন্থিদের ফাঁসি, নির্যাতন ও কারাবন্দী হতে দেখে তাদের উল্লাস আর গোপন থাকে না; বাঁধ ভাঙ্গা প্লাবনের পানির ন্যায় তা উপচে পড়ে। ইসলামপন্থিদের বিপদ দেখলেই তারা উৎসব করে। দুই). তারা কখনোই কুর’আন-হাদীস ও ইসলামী বিধানের প্রশংসা করে না। সে বিধানের প্রতিষ্ঠায় আগ্রহও দেখায় না। বরং তারা প্রশংসায় গদ গদ হয় ভারতের ন্যায় কাফের শক্তির এবং সে সাথে জাতীয়তাবাদ, সেক্যুলারিজম ও সমাজবাদের মত কুফরী মতবাদের।

যুদ্ধে পরাজয়ের আরেক কারণ হলো, নিজ দেশে ছদ্দবেশী শত্রুর উপস্থিতি। জিততে হলে এদেরও চিনতে হয়। নিজেকে এরা মুসলিম রূপে পরিচয় দেয় এবং জনসম্মুখে নামায-রোযাও পালন করে। এরাই হলো মুনাফিক। এবং এরাই বিশ্বাসঘাতক। মুসলিমদের বড় বড় পরাজয়ের কারণ হলো এ মুনাফিকগণ। কাফেরদের চেয়েও এরাই হলো ইসলামের বড় শত্রু। খোদ নবীজী (সা:)’র আমলেও তাদের সংখ্যা কম ছিল না। সে সময় যারা নিজেদেরকে মুসলিম রূপে পরিচয় দিত তাদের মাঝে তারা ছিল প্রায় শতকরা ৩০ ভাগ। তবে তাদের চেনাটিও কঠিন নয়। মুনাফিকদের চরিত্রের ২টি বিশেষ আলামত হলো: এক). ইসলামের শত্রুদের বিজয়, ইসলামী শক্তির পরাজয় এবং দেশের আদালত থেকে শরিয়তের বিলুপ্তি দেখেও তাদের মনে দুঃখ হয়না। শরিয়তের প্রতিষ্ঠা নিয়ে তথা ইসলামের বিজয় নিয়ে তাদের কোন আগ্রহ থাকে না। জিহাদের কথা কখনোই মুখে আনে না। দুই). ইসলামের যারা অতি পরিচিত শত্রু তারা কখনোই এ জীবদের নিজেদের শত্রু মনে করে না। তাদেরকে বরং বন্ধু মনে করে।

৩. চারিত্রিক বিপ্লব কীরূপে?

চরিত্রে আমূল বিপ্লব আনে আখেরাতের ভয়। সে বিপ্লব দেখা গেছে নবীজী (সা:)’র সাহাবাদের জীবনে। যেদেশে সে বিপ্লব আসেনি, নিশ্চিত বুঝতে হবে সে দেশের মানুষ যতই মসজিদ-মাদ্রাসা গড়ুক বা নামায-রোযা পালন করুক, তাদের মাঝে আখেরাতের ভয় সৃষ্টি হয়নি। কেউ যদি সত্যিই বিশ্বাস করতো, পৃথিবীর সামান্য ক’টি বছরের ভাল কাজের বদলে আখেরাতে জুটবে অনন্ত অসীম কালের জন্য জান্নাত এবং মুক্তি মিলবে কোটি কোটি বছরের জাহন্নামের আগুন থেকে, সে ব্যক্তি কখনোই চুরিডাকাতি, খুন-ব্যাভিচার, সন্ত্রাস ও দুর্বৃ্ত্তিতে নামতো না। তার জীবনে তখন শুরু হতো ভাল কাজে প্রতিযোগিতা। এবং আজীবন লেগে থাকতো জিহাদে। কারণ, জিহাদই হলো সর্বশ্রেষ্ঠ নেক কর্ম এবং জান্নাতে প্রবেশের অব্যর্থ চাবি। পবিত্র কুর’আনে মহান আল্লাহতায়ালা বার বার ওয়াদা করেছেন, যারা জিহাদে নিহত হবে তাদের বিনা হিসাবে জান্নাত দেয়া হবে। সে বিশ্বাসটি প্রবল ভাবে দেখা গেছে নবীজী (সা:)’র সাহাবাদের মাঝে। এমন চেতনা নিয়ে বাঁচায় নির্মূল হয় মিথ্যা ও দুর্বৃত্তি এবং প্রতিষ্ঠা পায় সত্য, সুবিচার ও শান্তি।

অতি শিক্ষণীয় একটি কাহিনী আছে। মানুষ যখন বহুশত বছর বাঁচতো তখন এক নবীর কাছে সন্তানহারা এক মা গিয়ে দুঃখভরে বলে, তারা পুত্রটি মারা গেছে। তখন সে নবী তাকে জিজ্ঞাসা করেন, তোমার পুত্রের বয়স কত ছিল? সে বলে আমার পুত্রের বয়স ছিল তিনশত বছরের কিছু বেশী। তখন উক্ত নবী তাঁকে বলেন, এমন এক সময় আসবে মানুষ যখন গড়ে ৭০ বছরেরও কম বাঁচবে। নবীর মুখ থেকে সে কথা শুনে উক্ত মা বিস্ময়ে বলেন, আমি সে সময় হলে ৭০ বছরের সে সময়টি সিজদাতেই কাটিয়ে দিতাম। অনন্তকালের জান্নাতের জন্য ৭০ বছরের সিজদা তাঁর কাছে অতি সামান্যই মনে হয়েছে। একেই বলে প্রজ্ঞা।

কিন্তু যারা নিজেদের ঈমানদার রূপে দাবী করে ও নিয়মিত নামায-রোযা পালন করে -তাদের মাঝেই বা সে প্রজ্ঞা কোথায়? সেটি থাকলে তো তাদের মাঝে নেক আমলের প্লাবন সৃষ্টি হতো। জিহাদের জোয়ার আসতো এবং দেশ থেকে বিলুপ্ত হতো ইসলামের শত্রুশক্তির শাসন। তখন বিজয় আসতো ইসলামের এবং প্রতিষ্ঠা পেত মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব ও শরিয়ত।

৪. ভিতটিই গড়া হয়নি

নেক আমলে অর্থ, জ্ঞান ও মেহনত লাগে। সবচেয়ে বড় নেক আমল হলো কাউকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানো। সে কাজে জ্ঞান লাগে। এমন কি জ্ঞান অপরিহার্য হলো নিজেকে বাঁচানোর জন্যও। এবং সে অপরিহার্য জ্ঞানটি হলো পবিত্র কুর’আনের জ্ঞান। জ্ঞান তাই নেক আমলের সর্বশ্রেষ্ঠ হাতিয়ার। নিজের পরিশুদ্ধির জন্যও অপরিহার্য হলো এই জ্ঞান। জাহেলের জীবনে পরিশুদ্ধির কথা তাই ভাবাই যায়না। তার পক্ষে জান্নাতে পথ চেনা এবং সে পথে চলা অসম্ভব। জ্ঞানার্জন এজন্যই শ্রেষ্ঠ ইবাদত।  

দালান গড়তে যেমন ভিত থেকে শুরু করতে হয়, তেমন মানুষ গড়তে শিক্ষা থেকে শুরু করতে হয়। এজন্যই মহান আল্লাহতায়ালা নামায-রোযার আগে জ্ঞানার্জনকে প্রথম ফরজ করেছিলেন। কিন্তু মুসলিম দেশগুলিতে শতকরা কত ভাগ মানুষের আছে পবিত্র কুর’আনের জ্ঞান? এমন কি যারা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী তাদেরই বা ক’জন কুর’আন বুঝতে পারে? ২০ বছরের শিক্ষা বছরে ছাত্র-ছাত্রীদের কি একটি আয়াতও শেখানো ও বুঝানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে? এর অর্থ দাঁড়ায় মানব গড়া ও সভ্যতা গড়ার কাজে ভিত গড়ার কাজটিই করা হয়নি। মুসলিমদের সকল ব্যর্থতার মূল কারণ তো এখানেই। ১৮/০৭/২০২১




বিবিধ ভাবনা ৬৬

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. মহান নবীজী (সা)’র নালিশ

পবিত্র কুর’আনের সুরা ফুরকানে মহান আল্লাহতায়ালা একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মানব জাতির সামনে তুলে ধরেছেন। সেটি নবীজী (সা:) পক্ষ থেকে উত্থাপিত একটি অভিযোগের জবাব দিতে গিয়ে। নবীজী (সা:) তাঁর প্রভুর দরবারে নালিশ তুলেছেন তাঁর কাউমের অপরাধী লোকদের বিরুদ্ধে। তাদের অপরাধ, তারা কুর’আনকে পরিতাজ্য মনে করে। এবং অন্যদেরও পরিত্যাগ করতে বলে। মহান আল্লাহতায়ালা নবীজী (সা:)’র সে বয়ানটি তুলে ধরেছেন এভাবে: “এবং রাসূল বললেন, “হে আমার রব! আমার কাউমের লোকেরা তো এই কুর’আনকে পরিত্যাজ্য মনে করে।” -(সুরা ফুরকান, আয়াত ৩০)। নবীজী (সা:)’র অভিযোগের জবাবে মহান আল্লাহতায়ালা বলেন, “এই ভাবেই আমি প্রত্যেক নবীর শত্রু করেছিলাম সমাজের অপরাধীদেরকে। আপনার পথপ্রদর্শক ও সাহায্যকারী রূপে আপনার রবই যথেষ্ট।” –(সুরা ফুর’কান, আয়াত ৩১)।

মহান আল্লাহতায়ালার বয়ান থেকে বুঝা যায় সত্যবানীর প্রচার কোথায় শুরু হলে তার বিরোধীতা হবেই। প্রতি সমাজেই কিছু অপরাধী লোক থাকে। মক্কার কাফেরদের মাঝেও ছিল। তারা কুর’আনের বানীকে অবিশ্বাস করতো এবং তা নিয়ে হাসিতামাশা করতো। তারা সে বানীকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিতে চাইতো। নবীদের এবং নবীর অনুসারীদের সে বিরোধীতা মোকাবিলা করেই সামনে এগুতে হয়। তবে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে অভয় বানী শোনানো হয়েছে এবং জানানো হয়েছে সাহায্যের কথা।

প্রতিটি মুসলিমকেই বুঝতে হবে পবিত্র কুর’আনের অপরিসীম গুরুত্বের কথা। ইসলামের মূল শক্তি হলো পবিত্র কুর’আন। মানব জাতির জন্য মহান আল্লাহতায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ দান হলো এই কুর’আন। এই পবিত্র গ্রন্থ্যই হলো মহান আল্লাহতায়ালার সাথে বান্দার একমাত্র যোগসূত্র। যে কুর’আনকে বুঝলো, সেই মহান আল্লাহতায়ালার কুদরতকে বুঝলে। উন্নত মানুষ রূপে বেড়ে উঠা ও উচ্চতর সভ্যতার নির্মাণে একমাত্র রোডম্যাপ হলো এই পবিত্র কুর’আন। মুসলিমগণ যে তাদের গৌরব কালে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার জন্ম দিয়েছিল তার মূলে ছিল এই কুর’আনী রোডম্যাপ।

অন্য কোন কিছুই অনন্ত-অসীম কালের জান্নাতের সন্ধান দেয় না। পথও দেখায় নায়। পথ দেখায় একমাত্র পবিত্র কুর’আন। জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর ন্যায় মানব জাতির সবচেয়ে বড় কল্যাণটি করে এই পবিত্র কুর’আন। এরূপ কল্যাণ-কর্মটি কি হাজার কোটি টাকা দানেও সম্ভব? অথচ মানবের ঘরে ঘরে সে কল্যাণকর্মটিই পৌছে দেয়াই ছিল মহান নবীজী (সা:)’র মূল মিশন। কুর’আনের মাধ্যমে তিনি যেমন নিজে জান্নাতের পথ পেয়েছেন, তেমনি অন্যদেরও সে পথটি দেখানোর কাজকে নিজ জীবনের আমৃত্যু মিশন পরিণত করেছিলেন। এটিই ছিল নবী (সা:)’র জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ কর্ম। এটিই নবীজী (সা:)’র শ্রেষ্ঠ সূন্নত। এবং যারাই পবিত্র কুর’আনের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় তারাই হলো অপরাধী।

যেখানে কুর’আন নাই সেখানে সিরাতুল মুস্তাকীমও নাই। তখন সে জনপদে অনিবার্য হয় জাহান্নামের পথে চলা। শয়তান তো সেটিই চায়। সে কাজে শয়তান একা নয়, তার সাথে রয়েছে সমাজের অসংখ্য অপরাধী মানুষ। এরাও মানবরূপী শয়তান। এসব অপরাধীদের সবচেয় বড় অপরাধটি স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদ, মানুষ খুন, চুরিডাকাতি, ধর্ষণ ও সন্ত্রাস নয়, বরং সবচেয়ে বড় অপরাধটি হলো কুর’আনের পথ থেকে তথা জান্নাতের পথ থেকে মানুষদের দূরে রাখা। সে লক্ষ্যে তারা যেমন স্কুল-কলেজে কুর’আন শিক্ষাকে বিলুপ্ত করে, তেমনি মাঠে-ময়দানে কুর’আনের তাফসিরের উপর বিধি নিষেধ আরোপ করে। এবং প্রসিদ্ধ তাফসিরকারকদের কারারুদ্ধ করে। বাংলাদেশে শেখ হাসিনা তো সেটিই করেছে। এর পূর্বে তার পিতা শেখ মুজিবও একই কাজ করেছিল। তাদের অভিযোগ, কুর’আন পড়লেই মানুষ রাজাকার হয়। এবং আওয়ামী লীগের সেক্যুলারিজম ও জাতীয়তাবাদী নীতিকে ঘৃনা করে। তাই তারা মাদ্রাসাগুলিকে রাজাকারের ঘাঁটি বলে। এরা শরিয়তী আইনকে কাদিম যুগের আইন বলে অবজ্ঞা করে। মহান নবীজী (সা:) তাঁর আমলের এরূপ অপরাধীদের বিরুদ্ধে মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে নালিশ তুলেছেন। অথচ এমন অপরাধীদের সংখ্যা বাংলাদেশে বিপুল। দেশটি মূলত তাদেরই দখলে।   

কুর’আন থেকে দূরে রাখার শয়তানী কৌশলগুলি বহুবিধ। নবীজী (সা)’র আমলে কাফেরদের কৌশল ছিল, কুর’আনের বানী যাতে মানুষের কানে না পৌছে তার ব্যবস্থা নেয়া। সে লক্ষ্যে কুর’আনের তেলাওয়াত শুনলেই তারা জোরেশোরে শোরগোল শুরু করতো। পবিত্র কুর’আনে কাফেরদের সে কৌশলটি নিয়ে বলা হয়েছে, “কাফেরগণ (তাদের সাথীদের) বলে, তোমরা এই কুর’আন শ্রবন করো না এবং কোথাও এর তেলাওয়াত হলে শোরগোল করো -যাতে তোমরা বিজয়ী হতে পার।” –(সুরা ফুস্সিলাত, আয়াত ২৬)।

পৃথিবীর সর্বত্রই আধুনিক শয়তানী গোষ্ঠির একই রূপ স্ট্রাটেজী। তাদের মূল লক্ষ্য, পবিত্র কুর’আন থেকে মানুষদের দূরে থাকা। সে লক্ষ্যে শয়তানের কৌশলগুলি বিবিধ। প্রথম কৌশলটি হলো: মানুষ যাতে কুর’আন পড়ার সামর্থ্য অর্জন না করতে পারে সে ব্যবস্থা নেয়া। সে লক্ষ্যে বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশগুলিতে কুর’আনের ভাষা আরবী শেখান হয় না। অথচ কুর’আন শিক্ষা প্রতিটি নরনারীর উপর ফরজে আইন। ডাক্তার, ইঞ্জিনীয়ার, কৃষিবিদ, হিসাববিদ, উকিল বা অন্য কোন পেশাদারী হওয়া কারো উপরই ফরজ নয়; এগুলি জীবিকা বা জনসেবার মাধ্যম মাত্র। জান্নাতের পথ চেনার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ এ জীবনে আর কি হতে পারে? সঠিক পথ চেনার পরই সে পথের উন্নত বাহন নিয়ে ভাবা যেতে পারে।

শয়তানের দ্বিতীয় কৌশলটি হলো: কুর’আন শিক্ষাকে শুধু তেলাওয়াতের মাঝে সীমিত রাখা। এবং নিশ্চিত করা, যাতে মানুষ কুর’আন বার বার পড়েও তার অর্থ বুঝতে না পারে। বিশ্বের আর কোন কিতাবের সাথে এরূপ আচরণ করা হয়না। পাঠের সাথে সেটি বুঝাই হলো সভ্য মানুষের রীতি। তেমন একটি অদ্ভুত কাজকে জনপ্রিয় করতে না বুঝে কুর’আন পড়াকে মোল্লা-মৌলভীদের পক্ষ থেকে ছওয়াবের কাজ রূপে প্রচার করা হয়। শয়তানের তৃতীয় কৌশলটি হলো: কুর’আন বুঝলেও সেগুলির উপর যেন আমল না হয়। শয়তান এ শেষাক্ত লক্ষ্যেও পুরাপুরি সফল হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের ন্যায় দেশে বহু লক্ষ মানুষ আছে যারা কুর’আন বুঝে কিন্তু তার উপর আমল করে না।

অথচ পবিত্র কুর’আনের সুরা মায়েদার ৪৪, ৪৫ ও ৪৭ নম্বর আয়াতে অতি সহজ সরল ভাষায় বলা হয়েছে যারা কুর’আনে নাযিলকৃত আইন অনুযায়ী বিচারকার্য পরিচালনা করে না তারাই কাফের, তারাই জালেম এবং তারাই ফাসেক। এর অর্থ দাঁড়ায়, শরিয়ত আইন ছাড়া দেশের আদালত চালানো শত ভাগ হারাম। অথচ বাংলাদেশের আদালতে সেটিই হচ্ছে। এরূপ কাজ কাফের, জালেম ও ফাসেকে পরিণত করে। একথা মাদ্রাসার সব শিক্ষক এবং মসজিদের সব ইমামই জানে। কিন্তু তারা বুঝেসুঝেও পরিত্যাগ করেছে কুর’আনের বিধানকে। এবং জিহাদে নামে না শরিয়তের প্রতিষ্ঠায়। অথচ ইউরোপীয় কাফেরদের হাতে অধিকৃত হওয়ার পূর্বে শরিয়তই ছিল বাংলাসহ সকল মুসলিম দেশের আদালতের একমাত্র আইন।

এর অর্থ কি দাঁড়ায়? মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে নবীজী (সা:) তৎকালীন মক্কার কাফেরদের বিরুদ্ধে কুর’আন পরিত্যাগের যে নালিশ তুলেছিলেন সে অপরাধের জড়িত তো আজকের মুসলিমগণও। পার্থক্য এটুকু যে, কাফেরগণ কুর’আন না পড়ে পরিত্যাজ্য গণ্য করতো। কিন্তু আজকের মুসলিমগণ কুর’আন পড়েও তার বিধানকে পরিত্যাজ্য মনে করে। 

 

২. হারাম নীতির বিজয়

ইসলাম শুধু নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাতের ন্যায় ইবাদতের বিধান দেয় না। বিধান দেয় দেশ শাসন, আইন-আদালত ও শিক্ষা-সংস্কৃতিরও। মুসলিমকে মেনে চলতে হয় প্রতিটি বিধানকেই। সে বিধানের বিরুদ্ধে কারো কোন রূপ বিদ্রোহের অধিকার নাই। মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া যে কোন বিধানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ব্যক্তিকে কাফেরে পরিণত করে। এবং প্রতিটি বিদ্রোহই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। একটি মাত্র হুকুম অমান্য করায় ইবলিস অভিশপ্ত শয়তানে পরিণত হয়। অথচ আজকের মুসলিমদের পদে পদে অবাধ্যতা।

রাজনীতিতে ইসলামের সুস্পষ্ট বিধানটি হলো, রাজত্বের অধিকার কোন রাজা, প্রধান মন্ত্রী বা প্রেসিডেন্টের নাই। সে ক্ষমতা একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালার। মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর শাসন পরিচালনা করেন নিজ খলিফাদের মাধ্যমে। তার শাসনে কোন রাজা নাই, সবাই প্রজা। আদালত চলে তাঁর আইনের উপর। পবিত্র কুর’আনের পরিভাষায় মহান আল্লাহতায়ালা হলেন “মালিকুল মুলক”। আইন প্রণয়নের অধিকারও একমাত্র তাঁরই। ইসলামে সে আইনকে বলা হয় শরিয়ত। যেসব শাসক, পার্লামেন্ট বা জনগণ নিজেদেরকে সার্বভৌম এবং আইন প্রণেতা রূপে ঘোষণা দেয় -তারা মূলত যুদ্ধ ঘোষণা করে মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে। তাদের অপরাধ তারা মহান আল্লাহতায়ালাকে শাসকের পবিত্র আসন থেকেই হটিয়ে দেয়। এরাই সমাজের ফিরাউন। মুসলিমদের বাঁচতে হয় এসব ফিরাউনে বিরুদ্ধে পবিত্র জিহাদ নিয়ে। একাজে তাঁরাই মহান আল্লাহতায়ালার সৈনিক।

রাষ্ট্রগঠন মুসলিম ইতিহাসে নতুন কিছু নয়। মুসলিম ইতিহাসে প্রথম রাষ্ট্র গঠন করে খোদ মহান নবীজী (সা:)। এর আগে ছিলেন হযরত দাউদ (আঃ) ও হযরত সুলাইমান (আঃ)। নবীজী (সা:) রাষ্ট্রনায়কের আসনে ছিলেন ১০ বছর। তাঁর পর সে আসনে বসেন হযরত আবু বকর (রা:), হযরত উমর (রা:), হযরত উসমান (রা:) এবং হযরত আলী (রা:)। তাদের পরে আসেন উমাউয়া, আব্বাসীয় ও উসমানিয়া শাসকগণ। তারা পরিচিত ছিলেন খলিফা রূপে, রাজা বা সম্রাট রূপে নয়। তখনও পৃথিবীতে বহু দেশ ছিল। সেসব দেশের শাসকদের বলা হতো রাজা। বাকি সবাই ছিল প্রজা। রাজারা ছিল সার্বভৌম। আইন তৈরী হতো রাজার ইচ্ছা অনুযায়ী। রাজ হতো বিচার ও আইনের উর্দ্ধে। যাকে ইচ্ছা তাকে রাজা ফাঁসি দিতে পারতো। এবং যাকে ইচ্ছা মাফ করে দিত। 

ইসলাম রাজা ও রাজত্বের ধারণাই পাল্টে দেয়। রাজা কেবল মহাপ্রভু মহান আল্লাহতায়ালা। আইন দেয়ার অধিকারও একমাত্র তাঁরই। মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে সে আইন দেয়া হয়েছে পবিত্র কুর’আনে। শাসন ক্ষমতায় যে ব্যক্তি বসে সে কেবল তাঁর খলিফা তথা প্রতিনিধি, সার্বভৌম শাসক নয়। ইসলাম তাই রাজনীতির অঙ্গণে যোগ করে নতুন পরিভাষা এবং সেটি হলো “খলিফা”। কোন ব্যক্তি বা পার্লামেন্টের পক্ষ থেকে সার্বভৌম হওয়ার দাবী করা তাই শতভাগ হারাম। তেমনি শরিয়ত আইনের বদলে আইন প্রণয়নের দায়িত্ব নিজ হাতে নেয়াও হারাম। রাজনীতির অঙ্গণে এই হলো ইসলামের মৌল নীতি।

বিস্ময়ের বিষয় হলো বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলিতে হারাম রীতিই বিজয়ী হয়েছে। এবং বিলুপ্ত হয়েছে ইসলামী বিধান। মুসলিম জনগণের অপরাধ হলো তারা এই হারাম রাজনীতিকেই মেনে নিয়েছে। বিস্ময়ের বিষয় হলো, মহান আল্লাহতায়ালার যে শাসন ও তাঁর শরিয়তী বিধানের উপর শয়তানী শক্তির যে ডাকাতি হলো মুসলিমদের মাঝে সেটিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা দেয়ার কোন ভাবনাই নাই। অথচ মুসলিম তো সেই -যে বাঁচে মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনকে বিজয়ী করার দায়বদ্ধতা নিয়ে। একাজের জন্যই সে তাঁর সৈনিক। কথা হলো, মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়তী আইনেরই যদি বিলুপ্তি ঘটে তবে শুধু মসজিদ-মাদ্রাসা গড়ে কি পরকালে মুক্তি মিলবে?  মুসলিমদের গৌরবকালে মসজিদ-মাদ্রাসা থেকে মুজাহিদ পয়দা হয়েছে। কিন্তু কোথায় আজ সে মুজাহিদ?

৩. ক্ষুধা বিলুপ্তির বিপদ

ক্ষুধা না থাকলে রোগীকে খাওয়ানো যায় না। গুরুতর ব্যাধীর এটিই হলো বড় লক্ষণ। ঔষধ দিয়ে খাদ্যের কাজ হয়। সেজন্য ক্ষুধা ও ক্ষুধা মেটাতে পানাহার চাই। সেটি না হলে মৃত্যু দ্রুত ঘনিয়ে আসে। বাংলাদেশীদের সমস্যা হলো তাদের লোপ পেয়েছে স্বাধীনতা, মানবিক অধিকার ও ইজ্জত নিয়ে বাঁচার ক্ষুধা। ফলে মারা গেছে গণতন্ত্র। ফলে দেশ চোরডাকাত, ভোটডাকাত, খুনি ও সন্ত্রাসীদের দখলে গেলেও তারা তা নিয়ে ভাবে না। চোরডাকাত তাড়াতে তারা রাস্তায় নামে না। তাই দেশের ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারের জন্য শুধু ভোটচোর হাসিনা দায়ী নয়, দায়ী জনগণও।

ইজ্জত নিয়ে বাঁচার একটি খরচ আছে। যে খরচে মেটাতে সভ্য মানুষেরা যুদ্ধে নামে এবং প্রাণের কুর’বানী দেয়। ইসলাম এমন যুদ্ধকে জিহাদের মর্যাদা দেয়। ফলে এ যুদ্ধ একটি পবিত্র ইবাদত। কিন্তু বাংলাদেশে মানুষে সে পবিত্র কাজে রুচি নাই। নিজের ও পরিবারের পানাহার ও আয়-উপার্জন ছাড়া কোন উচ্চতর কাজে তাদের রুচি নাই। বাংলাদেশে গণতন্ত্রের মৃত্যুর কারণ জনগণের এ রুচিহীনতা। গণতন্ত্রের শত্রুরা সেটি জানে। যে গ্রামে জনগণ ডাকাত তাড়াতে রাস্তায় নামে না, সে গ্রামে বার বার ডাকাত পড়ে। বাংলাদেশের ভোটডাকাগণও জানে, বার বার ভোটডাকাতি করলেও জনগণ কখনোই রাস্তায় নামবে না। তাই তারা ভোটডাকাতিতে নামে। যে দেশের জনগণ গণতন্ত্র নিয়ে ভাবে সে দেশে কি এরূপ ভোটডাকাতির ঘটনা ঘটে?

 

৪. নেয়াতেই আগ্রহ, দেয়াতে নয়

বাংলাদেশের রাজস্ব ভান্ডার থেকে সবাই নেয়ার ধান্দায়। কেউ বা নিচ্ছে বৈধ ভাবে, কেউবা অবৈধ ভাবে। কেউবা নেমেছে রাষ্ট্রীয় ভান্ডারের উপর চুরি-ডাকাতি। কিন্তু ক’জন দিতে আগ্রহী? আমেরিকা বিশ্বের সবচেয়ে ধনি দেশ। কারণ, সে দেশে রয়েছে বিল গেটসের মত অসংখ্য সৃষ্টিশীল মানুষ যারা দেশকে দিয়েছে শত শত বিলিয়ন ডলার।

মুসলিমগণ তো তখনই বিজয় ও গৌরব পেয়েছে যখন জনগণের মাঝে নেয়ার চেয়ে দেয়ার আগ্রহটি ছিল প্রবল। রাষ্ট্রকে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা দেয়ার কাজে সাহাবাগণ দিয়েছেন তাদের অর্থ, শ্রম ও রক্ত। তখন মুসলিম সেনাদলে কোন বেতন ভোগী সৈনিক ছিল না। রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষার জন্য শ্রম দেয়া, মেধা দেয়া এবং অর্থ ও রক্ত দেয়াকে মুসলিমগণ নিজেদের পবিত্র দায়িত্ব মনে করতো। সে কাজকে তারা পবিত্র জিহাদ গণ্য করতো। ফলে নিজের ঘোড়া, নিজের তলোয়ার, নিজের ঘরের খাবার নিয়ে মুসলিমগণ জিহাদের ময়দানে হাজির হতো। তারা সে বিনিয়োগের প্রতিদান আশা করতো আখেরাতে। যত বিনিয়োগ ততো প্রতিদান –এ বিশ্বাসে তাদের মাঝে বিনিয়োগে কোন কার্পণ্য ঘটতো না। নিহত হলো শহীদের মর্যাদা এবং বিনা হিসাবে জান্নাত সেটি তারা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতো। এমন একটি আত্মত্যাগী চেতনাই তো দেশকে সমৃদ্ধ ও বিজয়ী করে। তবে সে চেতনা হাওয়ায় গড়ে উঠে না, সে জন্য ঈমান লাগে। আর ঈমান গড়তে কুর’আনের জ্ঞান লাগে। কিন্তু বাংলাদেশে এসবেরই প্রচণ্ড অভাব। ফলে অসম্ভব হচ্ছে সভ্য ভাবে বেড়ে উঠা। 

 

৫.ঈমানদারের বাঁচা ও বেঈমানের বাঁচা

ঈমানদার ও বেঈমানের মাঝে পার্থক্যটি শুধু ঈমান ও ইবাদতে নয়। বরং সেটি বাঁচার রুচিতে। এ জীবনে প্রতি দিনের লাগাতর লড়াইটি নিছক নিজের বা পরিবারের সদস্যদের আনন্দঘন বাঁচা নিয়ে হলে তাতে ঈমানের প্রকাশ ঘটে না। লড়াইটি হতে হয় নিজ দেশের প্রতিরক্ষার পাশাপাশি ইসলামের প্রতিষ্ঠা ও বিজয় বাড়াতে। একমাত্র তখনই ঈমানদারের বাঁচাটি হয় মহান আল্লাহতায়ালার উদ্দেশ্যে বাঁচা। সাহাবাগণ এভাবে বাঁচতে গিয়ে দলে দলে শহীদ হয়েছেন। এরাই ইতিহাসে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব। মহান আল্লাহতায়ালাও তাদের নিয়ে ফেরেশতাদের মাঝে গর্ব করেন। কাফের বা সেক্যুলারিস্টদের বাঁচা থেকে মুসলিমের বাঁচার মূল পার্থক্যটি এখানেই।

দুনিয়ার স্বার্থপরতা থেকে বাঁচতে হলে পরকালের স্বার্থে প্রচণ্ড মনযোগী হতে হয়। জান্নাত লাভের প্রচণ্ড ভাবনাই দুনিয়ার বুকে মানুষকে স্বার্থহীন ফেরেশতায় পরিণত করে। তখন সে জীবনের প্রতিটি মুহুর্ত এবং প্রতিটি সামর্থ্য ব্যয় করে নেক আমল বাড়াতে। নেক আমল শুধু ইবাদত-বন্দেগী নয়, প্রতিটি জনকল্যাণমূলক কাজই হলো নেক আমল। পথের একটি কাঁটা তুলে ফেলাও নেক কর্ম। এমন মানুষের জীবনে চুরি-ডাকাতি, ধোকাবাজী ও দুর্নীতির ভাবনা আসে না। সমাজে এমন মানুষের সংখ্যা বাড়লে পুলিশ ও কোর্ট-কাচারির প্রয়োজন কমে যায়। জনগণ তখন নিজেরাই পুলিশে পরিণত হয়। চোরডাকাত, ভোটডাকাত, খুনি, ব্যাভিচারি ও সন্ত্রাসী ধরতে তখন পুলিশ লাগে না, তাদের ধরতে জনগণ নিজেরাই রাস্তায় নামে। তখন দেশ ইতিহাসে গড়ে শান্তি ও সমৃদ্ধিতে। সভ্যতর সমাজ নির্মাণের এটাই তো রোডম্যাপ। এ রোডম্যাপ অনুসরণ করেই মুসলিমগণ অতীতে বিজয়ের পর বিজয় ও গৌরব এনেছিলেন। নির্মাণ করেছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা। কিন্তু বাংলাদেশে সে রোডম্যাপের অনুসারি কই? ১৪/০৭/২০২১

 




বিবিধ ভাবনা ৬৫

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. জাতির পতন হয় কীরূপে এবং উত্থানই বা কেমনে?

জাতির পতন কীরূপে এবং উত্থানই বা কীরূপে –সেটি কোন জটিল রকেট সায়েন্স নয়। মানব জাতির ইতিহাস সে জ্ঞানে পরিপূর্ণ। যে কেউ তা থেকে শিক্ষা নিতে পারে। কিন্তু ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেয়াই আরেক ইতিহাস। ব্যক্তির যোগফলেই গড়ে উঠে জাতি। ভাল ইট না হলে যেমন ভাল বিল্ডিং গড়া যায় না, তেমনি ভাল মানুষ ছাড়া উন্নত জাতি গড়া যায় না। তাই যারা জাতি গঠনে আগ্রহী তারা ব্যক্তির গঠনে মনযোগী হয়।

পুষ্টিকর পানাহারই ব্যক্তির গঠনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নয়, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সুশিক্ষা। পুষ্টিকর পানাহার পশুপাখিও পায়। কিন্তু তাতে তাদের ইতর জীবনে বিপ্লব আসে না। তেমনি চোর-ডাকাত, ঘুষখোর, সূদখোরও ভাল পানাহার পায়, কিন্তু তাতে তাদের চরিত্রে পরিশুদ্ধি আসে না। চরিত্রের শুদ্ধি আসে চেতনার শুদ্ধি থেকে। এবং চেতনার ভূবনে শুদ্ধির কাজটি করে জ্ঞান। এবং জ্ঞানের সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসটি হলো মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া পবিত্র কুর’আন। বাংলাদেশে নানা রূপ দুর্বৃত্তির জোয়ার দেখে নিশ্চিত বলা যায়, চেতনার শুদ্ধির কাজটি আদৌ হয়নি। এর কারণ, দেশটিতে কুর’আনী জ্ঞানের বিতরণের কাজটি হয়নি। সেটি সীমিত রয়েছে কিছু মাদ্রাসায়। মহান আল্লাহতায়ালা চান তাঁর বান্দাহগণ কুর’আনের আলোয় আলোকিত হোক এবং জান্নাতের পথে পাক। এবং শয়তান, চায় কুর’আন থেকে দূরে সরিয়ে অন্ধকারে নিতে। এটিই জাহান্নামের পথ। বাংলাদেশে শয়তানই বিজয়ী হয়েছে।

কুশিক্ষার নাশকতাটি ভয়ানক। দূষিত পানাহারে কিছু ব্যক্তির স্বাস্থ্যহানী ঘটে। কিন্তু শিক্ষায় দূষণ ঘটলে চরিত্রহানী ঘটে সমগ্র জাতির। তাই যারা সভ্য জাতি গড়তে চায় তারা শিক্ষার অঙ্গণে সামান্যতম দুর্নীতির প্রশ্রয় দেয়না। শিক্ষার নামে ছাত্রদের মগজে তারা কদর্য ধ্যান-ধারণা ঢুকতে দেয়না। তাই জাতীয় জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি বড় বড় ইন্ডাস্ট্রি বা রাস্তাঘাট গড়া নয়, সেটি শিক্ষায় শতভাগ শুদ্ধি আনা। শিক্ষার গুণেই জাতি এগুয় এবং ধ্বংস হয় শিক্ষায় ব্যর্থতায়। অথচ বাংলাদেশে সীমাহীন ব্যর্থতাটি শিক্ষাঙ্গণে। দুর্নীতিতে ডুবে গেছে শুধু ছাত্ররা নয়, শিক্ষকগণও। থানার পুলিশের ন্যায় স্কুলের শিক্ষকগণ কম দুর্নীতিপরায়ন নয়। তাদের কারণেই পরীক্ষায় নকল সহনীয় হয়ে গেছে। নকল হয় শিক্ষকদের চোখের সামনে। স্বাভাবিক হয়ে গেছে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়াটি। এসব দুর্নীতিতে কারো কোন শাস্তি হয়না। এবং শিক্ষাঙ্গণ গড়ে উঠছে খুনি, সন্ত্রাসী ও ধর্ষকের লালনক্ষেত্র রূপে। কোন সভ্য দেশে কি এটি ভাবা যায়? শিক্ষকদের মাঝে রয়েছে দায়িত্ব পালনে প্রচণ্ড অবহেলা। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসরদেরকেও স্মরণ করিয়ে দিতে হয় তাদের দায়িত্বের কথা। তাদের আগ্রহ নেই গবেষণায়। নজরদারী রাখতে হয় তাদের কাজের উপর। ক’জন শিক্ষক সঠিক সময়ে বিদ্যালয়ে আসে এবং যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে পাঠদান করে? শিক্ষকের মাঝে যেখানে প্রচণ্ড ফাঁকিবাজি, ছাত্ররা সেখানে সততা নিয়ে বেড়ে উঠবে কীরূপে?

জাতির ভাগ্য ক্ষেত-খামার বা কলকারখানায় নির্ধারিত হয় না, সেটি হয় শিক্ষাঙ্গণে। ক্ষেতের ফসল বানের পানিতে ভেসে গেলেও দেশ ধ্বংস হয়না। আমদানী করে চালিয়ে নেয়া যায়। কিন্তু কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ফসল নষ্ট হয়ে গেলে বিদেশ থেকে আমদানী করা যায় না। কারণ, খাদ্য শস্যের ন্যায় অন্যদেশের হাট-বাজার থেকে দেশপ্রেমিকদের কেনা যায় না। তাদেরকে নিজ দেশে গড়ে তুলতে হয়। সেটি না হলে জাতীয় জীবনে বিপর্যয় আসে। তাই যারা জাতিকে সামনে নিতে চায় তারা প্রথমে শিক্ষার সংস্কারে হাত দেয়। এবং এটিই হলো মহান আল্লাহতায়ালার সূন্নত। সর্ব-প্রথম নামায-রোযা বা হজ্জ-যাকাত ফরজ না করে তিনি ফরজ করেছেন শিক্ষাকে। এবং সেটি কুর’আন শিক্ষাকে। ইকরা তথা “পড়ো” তাই পবিত্র কুর’আনের প্রথম শব্দ। নামায-রোযা যেমন প্রতিটি নর ও নারীর উপর ফরজ, তেমনি ফরজ হলো কুর’আন শিক্ষা। কিন্তু বাংলাদেশে ক’জনের জীবনে পালিত হচ্ছে এ গুরুত্বপূর্ণ ফরজটি?

 

২. ভিত না গড়ে ছাদ গড়ার ভাবনা

আমার এক বন্ধুর বড় আফসোস হলো, তিনি ঢাকায় এক গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি করেছিলেন। এতে তিনি এক মহা বিপদে পড়েছিলেন। একপাল দুর্নীতিবাজ ও উচ্ছৃঙ্খল শ্রমিক নিয়ে ছিল কায়-কারবার। তাদের কন্ট্রোল করতে সর্বক্ষণ অন-কল থাকতে হতো। ফলে বছরের পর তিনি তার গ্রামের বাড়ি যেতে পারেননি। অবশেষে সামাল দিতে না পেরে কারখানাই বন্ধ করে দেন। একই কারণে আমার আরেক বন্ধু গার্মেন্ট কারখানা করে চালাতে না পেরে সে ব্যবসা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। তিনি বলতেন, শ্রমিকরা যখন ডিউটি ছেড়ে বাসায় ফিরতো তখন নারী-পুরুষ সবাইকে তল্লাশী রুমে ন্যাংটা করে চেক করতে হতো। নইলে তারা সেলাই মেশিনের দামী যন্ত্রাংশ অন্তর্বাসের নীচে লুকিয়ে নিয়ে চোরা বাজারে বিক্রি করতো। আমার এক সিনিয়র মুরব্বী বিদেশ থেকে অনেক অর্থ নিয়ে ঢাকায় এক বিশাল অত্যাধুনিক প্রেস বসিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, তারা প্রিন্টিং প্রেসের দামী যন্ত্রাংশ প্রায়ই শ্রমিকরা চুড়ি করে নিত। পাহারা বসিয়েও রোধ করা মুশকিল হত। সে সব যন্ত্রপাতি একবার হারালে ঢাকার বাজারে তা পাওয়া যেতনা। বিদেশ থেকে অর্ডার করে আনতে হত। ফলে যন্ত্রাংশের অভাবে দিনের পর দিন প্রেস বন্ধ থাকতো। ব্যবসায় তিনি সুবিধা করতে পারেননি। এই হলো বাংলাদেশের ব্যবসায়ী জগতের ফাস্টহান্ড রিপোর্ট।

গতকাল পাকিস্তানের করাচি থেকে প্রকাশিত প্রখ্যাত দৈনিক ডন পত্রিকার পোষ্ট এডিটরিয়াল পড়ছিলাম। লেখক একজন পদার্থবিদ এবং ফ্রিল্যান্স কলামিস্ট। ভদ্রলোকের লেখাতে দেশের উন্নয়ন-বিষয়ক গভীর ভাবনা থাকে। মুসলিম বিশ্বের যে দুটি দেশ সামনে এগুনো নিয়ে ব্যতিব্যস্ত তার মধ্যে একটি হলো পাকিস্তান, অপরটি হলো তুরস্ক। এ দুটি দেশের পত্র-পত্রিকায় বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধের যে আয়োজন থাকে –তা থেকে বাংলাদেশীদেরও অনেক কিছু শেখার আছে। দেশের ব্যর্থতা নিয়ে দৈনিক ডনের কলামিস্টের একই রূপ বেদনা যা আমরা নিজেরা অনুভব করি বাংলাদেশ নিয়ে। তিনি লিখেছেন, পাকিস্তানে শ্রমিকের মজুরি চীনের চেয়ে কম। কিন্তু উৎপাদন খরচ চীনে পাকিস্তানের চেয়ে কম। কারণ, পাকিস্তানী শ্রমিকগণ কাজে অদক্ষ ও অমনযোগী। তারা চাকুরী করে, কিন্তু কাজে আনন্দ পায়না ও মনও দেয়না। তাদের ধান্দা থাকে কাজে ফাঁকি দেয়ার। কাজ না করে আড্ডা দেয়াতেই তাদের বেশী আনন্দ। অথচ এরূপ ফাঁকিবাজী ও বিবেকশূণ্যতা চীনে নাই। তারা কাজে আনন্দ পায় এবং ফাঁকিবাজীকে অপরাধ মনে করে। চীনের উন্নতির মূলে এই উন্নত মানের শ্রমিক।

শুধু ভূমি ও মোটা অর্থের পুঁজি হলেই শিল্প গড়ে উঠে না। অর্থের সাথে জরুরি হলো উন্নত মানের মানব-পুঁজি (হিউম্যান ক্যাপিটাল)। অর্থনীতির ভাষায় এটিই হলো সামাজিক পুঁজি। বাংলাদেশে সে পুঁজির বড়ই দৈন্য দশা। মানব এখানে বেড়ে উঠে সমস্যা রূপে, পুঁজি রূপে নয়। মানবিক পুঁজি গড়ার স্থানটি শিক্ষালয়। জাপান, চীন, ও কোরিয়ার ন্যায় যে দেশগুলি শিল্পে বিশাল সাফল্য অর্জন করেছে তাদের সে সাফল্যের মূলে হলো তাদের উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা। ঘোড়ার আগের গাড়ি জোড়া যায় না। তাই কারখানা গড়ার আগে তারা উন্নত মানের স্কুল কলেজ গড়েছে। এসব দেশের শিক্ষাঙ্গণে কোন রূপ ফাঁকিবাজি বরদাশত করা হয় না। প্রাইমারি পর্যায় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ছাত্রদের নিরবিচ্ছন্ন ব্যস্ত থাকতে হয় জ্ঞান-আর্জনে। শিক্ষকদের ব্যস্ত থাকতে হয় জ্ঞানদানে। ছাত্রদের রাজনীতি ও সন্ত্রাস করার সুযোগ নাই। পরীক্ষায় সামান্যতম দুর্নীতি নেই। ভর্তিপরীক্ষায় কোনরূপ দলীয় সুপারিশ, কোটাবাজী ও দখলদারী চলে না। অথচ বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে সন্ত্রাসী ও খুনি তৈরী হয়। আবরার ফাহাদদের মত ছাত্রদের খুন করতে তাই বাইরে থেকে খুনি আনতে হয়না, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাই সে কাজটি দলবেধে সমাধা করে। জাপান, চীন, কোরিয়া বা ভিয়েতনামের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন কান্ড কি কোন কালে ঘটেছে?

মজার ব্যাপার, দৈনিক ডনের উক্ত কলামিস্ট পাকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলির জাঁদরেল প্রফেসরদের প্রতি একটি দারুন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, এসব প্রফেসরদের কেউই চীনের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হওয়া দূরে থাক, ভর্তি পরীক্ষাতেও পাশ করতে পারবে না। বিষয়টি বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসরদের জন্যও যে খাটে –তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে? পাকিস্তানের কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের তবুও বিশ্বের মাঝে পরিচিতি আছে, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলির তো তাও নাই। বহু ব্যর্থতার পরও পাকিস্তান যে এগিয়ে আছে সে প্রমাণ তো অনকে। দেশটি একটি পারমানবিক শক্তি। তারা যুদ্ধ বিমান, বালিস্টিক মিজাইল ও ট্যাংক বানায়। যারা এগুলো বানানোর সাথে জড়িত তারা পাকিস্তানের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই গড়ে উঠেছে। 

বাংলাদেশের সকল দুরবস্থা ও সকল দুর্নীতির জন্য দায়ী হলো শিক্ষাঙ্গণের দুর্নীতি। সভ্য দেশে শিক্ষাঙ্গণ থেকে সকল প্রকার অসভ্যতা ও দুর্নীতির নির্মূলে লড়াকু সৈনিক তৈরী হয়। অথচ বাংলাদেশ হচ্ছে উল্টোটি। দুর্নীতি, অসভ্যতা ও সন্ত্রাস জন্ম নিচ্ছে শিক্ষাঙ্গণে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা পরিণত হচ্ছে দুর্বৃত্ত ভোটডাকাত সরকারের লাঠিয়ালে। আরো সমস্যা হলো, বাংলাদেশের শিক্ষাখাতের এ ব্যর্থতা নিয়ে ভাবনাই বা ক’জনের। কোন রোগী যদি বুঝতেই ব্যর্থ হয় যে তার দেহে মারাত্মক ব্যাধী রয়েছে –তবে কোন চিকিৎসক কি সে রোগের চিকিৎসা করতে পারে? অনুরূপ অবস্থা বাংলাদেশেরও। বাংলাদেশের সরকার ভিত না গড়ে ছাদ দেয়া নিয়ে ভাবে।  

 

৩. ব্যর্থতা মুসলিম হওয়ায়

মুসলিম একজন বিপ্লবী মানুষের নাম। মুসলিম তো সেই যার চেতনায় আসে আমূল বিপ্লব। চেতনায় সে বিপ্লব না এলে তাকে কি মুসলিম বলা যায়? সে বিপ্লবের ফলেই অন্যরা জগতকে যেভাবে দেখে মুসলিম সে ভাবে দেখে না। সে বিপ্লবের মূলে হলো কুরআনী জ্ঞান। এ জ্ঞান তার দেখবার ও ভাবনার ক্ষমতাই পাল্টে দেয়। মুসলিমকে মুসলিম রূপে গড়ে তোলার জন্য কুর’আনী জ্ঞানের গুরুত্ব এতোই অধিক যে, নামায-রোযার আগে কুর’আন শিক্ষা ফরজ করা হয়েছিল। প্রতিটি মুসলিমের উপর ফরজ হলো কুর’আন বুঝার সামর্থ্য অর্জন করা। নামায-রোযার পালনের দায়িত্ব প্রতিটি ব্যক্তির একান্তই নিজের। তেমনি প্রত্যেকের নিজ নিজ দায়িত্ব হলো কুর’আনের জ্ঞানার্জন। যতদিন সে সামর্থ্য অর্জতি না হয়, ততদিন দায়িত্ব হলো যার কাছে সে জ্ঞান আছে তার থেকে শিক্ষা নেয়া।

জ্ঞান থেকেই ব্যক্তির চেতনা, চরিত্র ও কর্ম স্থির হয়। অজ্ঞ ও জ্ঞানী তাই এক নয়। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য মুসলিমকে মুসলিম করা। লক্ষ্য, পরকালের পরীক্ষায় পাশের সামর্থ্য দেয়া। আর যারা পরকালের পরীক্ষায় পাশের সামর্থ্য অর্জন করে তারাই উত্তম মানুষ হয়। কিন্তু মুসলিমদের আজকের বিপর্যয়ের মূল কারণ, তাদের কাছে ডাক্তার, ইঞ্জিনীয়ার, উকিল, কৃষিবিদ, বিজ্ঞানী অন্য বহু কিছু হওয়াই গুরুত্ব পেয়েছে, কিন্তু গুরুত্ব পায়নি মুসলিম হওয়া। ফলে ব্যর্থ হচ্ছে ভাল মানুষ হতে। বাংলাদেশের ন্যায় দেশগুলিতে শিক্ষার মূল ব্যর্থতা এখানেই।

৪. দায়িত্বহীনতার পাপ

মুসলিম মাত্রই মহান  আল্লাহতায়ালার খলিফা তথা ভাইসরয়। পৃথিবী পৃষ্ঠে এটি হলো সবচেয়ে মর্যাদাকর ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়ভার। এ কাজের পুরস্কারটিও বিশাল। সেটি অনন্তকালের জন্য নেয়ামত ভরা জান্নাত –যার এর বর্গহাত ভূমি পৃথিবীর সকল সম্পদ দিয়েও কেনা যায় না। রোজ হাশরের বিচার দিনে কে কোন পেশায় বা চাকুরীতে কতটা সফল হলো -সে প্রশ্ন উঠবে না। বরং প্রশ্ন উঠবে, মহান আল্লাহতায়ালার খলিফা রূপে কে কতটা দায়িত্ব পালন করলো -সে বিষয়টি। ফলে মানব জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা হলো, খলিফার দায়িত্বপালন। খলিফার কাজ শুধু নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাত নয়, বরং রাষ্ট্র জুড়ে সুরক্ষা দিতে হয় তাঁর নিয়োগদাতা মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমতাকে। রুখতে হয় তাঁর শরিয়তী আইনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকে। যেমন রাজার আইন রক্ষার দায়িত্ব নিতে হয় রাজকর্মচারীদের। তাই আল্লাহতায়ালার খলিফা রূপে প্রতিটি মুসলিমকে দেখতে হয় রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, আইন-আদালত, যুদ্ধ-বিগ্রহসহ সর্বক্ষেত্রে ইসলামের স্বার্থ। কিন্তু বাংলাদেশে ঘটছে উল্টোটি। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে পরাজয়টি ইসলামের এবং বিজয় শয়তানের। বিলুপ্ত হয়েছে মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর আইন। এর কারণ, বিপুল সংখ্যক মানুষ খাটছে শয়তানের খলিফা রূপে এবং তারাই পরাজয় এনেছে ইসলামের। অধিকাংশ মানুষ জাহান্নামে যাবে খুন, ধর্ষণ ও চুরিডাকাতির কারণে নয়। বরং সেটি রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, সাহিত্য, বুদ্ধিবৃত্তি, যুদ্ধ-বিগ্রহ, ও আইন-আদালতে মহান আল্লাহতায়ালার খলিফা হওয়ার বদলে শয়তানের খলিফা হওয়ার কারণে।

ঈমানদারের জীবন অতিশয় দায়িত্বশীল জীবন। তাঁকে শুধু নিজের ব্যবসা-বানিজ্য, চাকুরি-বাকুরি ও পরিবার-পরিজনের সুখ-স্বচ্ছন্দ নিয়ে ভাবলে চলে না। শুধু কুর’আন-হাদীস শিক্ষা, নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাতে ব্যস্ত থাকলেও চলে না। তাকে ভাবতে হয়ে এবং ময়দানে নামতে হয় সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্ববাসীর কল্যাণেও। সেরূপ কল্যাণ-কর্মকে  ইসলামের পরিভাষায় বলা হয় হক্কুল ইবাদ তথা জনগণের হক। এবং নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাত হলো হক্কুল আল্লাহ তথা মহান আল্লাহতায়ালার হক। আল্লাহতায়ালা ও বান্দা -উভয়ের হক পালনই ইবাদত। কারণ তাতে পালিত হয় মহান আল্লাহতায়ালার হুকুম।  নবীজী (সা:) তাঁর সাহাবাদের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব বলেছেন। হেতু কী? সেটির কারণ এটিই, তারা শুধু নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাত পালনের মাঝে নিজেদর দায়িত্ব সারেননি। মানবজাতির কল্যাণে তারা তাদের জান ও মালের বিশাল বিনিয়োগ করেছেন। অর্ধেকের বেশী সাহাবা শহীদ হয়ে গেছেন। তাদের কুরবানীর কারণেই মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীন বিজয়ী হয়েছে, মুসলিমগণ বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয়েছে এবং কুর’আনের বানী কোটি কোটি মানুষের ঘরের আঙিনায় পৌঁছতে পেরেছে। এরূপ কুর’বানী অন্য কোন নবীর উম্মতই দেয়নি। তাদের কুর’বানীর বিনিময়েই কোটি কোটি মানুষ জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি পেয়েছে। এতবড় কল্যাণ আর কোন জনগোষ্ঠি করেছে? বহু ট্রিলিয়ন ডলার দান করেও কি এতবড় কল্যাণ করা যেত? আজ প্রায় ১৫০ কোটি মুসলিমের যে জনসংখ্যা সেটি তো তাদের কুর’বানীর বরকতেই।

মানব-কল্যাণের কাজটি শুধু কুর’আন-হাদীস বুঝায় ও তার প্রচারে সীমিত নয়। হক্কুল ইবাদ তথা মানব-কল্যাণের শক্তিশালী হাতিয়ারগুলি হলো চিকিৎসা, কৃষি, ইঞ্জিনীয়ারিং, বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোল, দর্শনসহ জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা শাখা-প্রশাখার জ্ঞান। হক্কুল ইবাদের সে সামর্থ্য বাড়াতে মহান নবীজী (সা:) এমন কি চীনে জ্ঞানার্জনে যেতে বলেছেন। অতীতের গৌরব কালে মুসলিমগ তাই শুধু কুর’আন-হাদীস-ফিকাহ’র উপরই পান্ডিত্য অর্জন করেননি। তারা চিকিৎসা, গণিত, বিজগণিত, রসায়ন,পদার্থ বিজ্ঞান, ভূগোল, ইতিহাস, জ্যোতির্বিজ্ঞানসহ জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা শাখায় তারা বিস্ময়কর অবদান রেখেছেন। অথচ পবিত্র কুর’আনের পূর্বে আরবী ভাষায় কোন বই ছিল না। অথচ আজ মাদ্রাসাগুলোর পাঠ্যসূচী অতি সীমিত; কুর’আন-হাদীসের বাইরে অন্য কিছু শেখানো হয় না।

সবচেয়ে বড় হক্কুল ইবাদত তথা জনকল্যাণ-মূলক কাজটি হয় জনগণকে জাহান্নামের আগুণ থেকে বাঁচানোর মধ্য দিয়ে। এবং সে বিশাল কাজটির জন্য চাই দেশের শিক্ষানীতি, রাজনীতি, প্রশাসন, বিচার বিভাগ ও মিডিয়ার উপর নিয়ন্ত্রণ। নইলে সেগুলি শয়তানের হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে। হক্কুল ইবাদত সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী হাতিয়ারটি হলো রাজনীতি। কারণ দেশ কোন দিকে যাবে, শিক্ষানীতি কি হবে, দেশের কল্যাণে কোন কোন খাত গুরুত্ব পাবে, কোন খাতে কত বিনিয়োগ হবে, দেশের প্রতিরক্ষা কীরূপে সুনিশ্চিত করা যাবে  -সে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি নির্ধারিত রাজনীতির অঙ্গণে। এজন্যই নবীজী (সা:)কে রাষ্ট্র প্রধানের আসনে বসেছেন। সে পদে তিনি ১০ বছর আসীন ছিলেন। তাঁর ইন্তেকালের পর সে আসনে বসেছেন খোলাফায়ে রাশেদার মহান খলিফাগণ। কিন্তু নবীজী(সা;) এবং খোলাফায়ে রাশেদার সে সূন্নত বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলির মোল্লামৌলভীগণ মানতে রাজী নয়। তারা সাংবাদিক সন্মেলন করেন দাবী করেন তারা রাজনীতিতে নাই। হক্কুল ইবাদ বলতে তারা বুঝেন মিলাদ পাঠ, কুর’আন খতম, মুরদা দাফন, মুয়াজ্জিনী ও ইমামতি। অথচ তারাই নবীজী (সা:)’র উত্তরাধিকারী হওয়ার দাবী করেন। যাদের উপর ছিল পথ দেখানোর দায়িত্ব, তারাই আজ পথভ্রষ্ট। আজকের মুসলিমদের বিপর্যয়ের মূল কারণ তো এখানেই। ১২/০৭/২০২১




বিবিধ ভাবনা ৬৪

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. জান্নাতের মূল্য পরিশোধ এবং ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের শুদ্ধিকরণ

পরকালে রয়েছে অভাবনীয় নিয়ামত ভরা জান্নাত। সেখানে মানুষ পাবে অন্তহীন এক আনন্দময় জীবন। তবে তার একটি মূল্য আছে। সেটি পেতে হলে মৃত্যুর আগেই প্রতিটি ব্যক্তিকে তার মূল্য পরিশোধ করে যেতে হয়। মৃত্যুর পর সে সুযোগ থাকেনা। মূল্য পরিশোধের সে বিশাল কাজটি অন্যদের চোখের পানি, দোয়া-দরুদ ও দান-সাদকায়ে হয়না। জান্নাতে নিজের বাসস্থানের মূল্য পরিশোধের দায়িত্বটি প্রতিটি ব্যক্তির নিতান্তই নিজের। জান্নাতের এক বর্গহাত জমি পাহাড়সমান সোনা দিয়েও কেনা যায় না। কিনতে হয় বলিষ্ঠ ঈমান ও নেক আমল দিয়ে। নেক আমল হলো মহান আল্লাহতায়ালার কাছে একমাত্র গ্রহণযোগ্য ক্যারেন্সি।

নেক আমলের অসীম সামর্থ্য প্রতিটি নারী ও পুরুষকে মহান আল্লাহতায়ালা দান করেছেন। দৈহিক বল, , বুদ্ধির বল ও অর্থ-সম্পদ –এসবই দেয় নেক আমলের সামর্থ্য। এভাবে মহান আল্লাহতায়ালার ব্যক্তিকে দিয়েছেন জান্নাতের মূল্য পরিশোধের পর্যাপ্ত সামর্থ্য। মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া সে নেয়ামতগুলির সঠিক ব্যবহারের মধ্য দিয়ে মানুষ ফিরেশতাদের পর্যায়ে পৌঁছতে পারে। একজন ভেড়ার রাখাল, দরিদ্র কৃষক এবং নিঃস্ব দিনমজুরও সে মূল্য পরিশোধ করতে পারে। স্রেফ কথার দ্বারা এমন এমন নেক আমল করা যায় যা বহু কোটি টাকা দানেও করা যায় না। সেটি যেমন সত্য বানী প্রচার ও সত্যের পক্ষে সাক্ষী দিয়ে, তেমনি মিথ্যার ও মিথ্যুকদের মুখ উম্মেচন করে।

নবী-রাসূলগণ সম্পদশালী ছিলেন না। তাদের নেক আমলের মূল হাতিয়ারটি ছিল জিহবা তথা মুখের কথা। সে জিহবাকে তাঁরা ব্যবহার করেছেন অন্যদের জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর কাজে। তাঁরা পথহারা মানুষদের পথ দেখিয়েছেন জান্নাতের। হাজার কোটি টাকা দানেও কি এমন নেক আমল করা যায়? এছাড়াও নেক আমলের রয়েছে আরো অসংখ্য পথ। সেটি যেমন পথ থেকে কাঁটা তুলে, পথিককে পথ দেখিয়ে, ক্ষুদার্ত ব্যক্তিকে খাদ্য দিয়ে, জ্ঞানহীনকে জ্ঞান দিয়ে এবং বস্ত্রহীনকে বস্ত্র দিয়ে। মানুষ শিক্ষিত হবে, নানারূপ দক্ষতা অর্জন করবে  এবং উপার্জনের নামবে শুধু নিজের আনন্দ বাড়াতে নয়, বরং নেক আমলের সামর্থ্য বাড়াতে। সে ব্যক্তির চেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত আর কে যে তার সকল সামর্থ্য শুধু নিজের আরাম-আয়াশ বৃদ্ধিতেই ব্যয় করলো এবং কিছুই যোগ করলো না নেক আমলের ভান্ডারে? এরূপ ব্যক্তিরাই ব্যর্থ হয় জান্নাতের মূল্য পরিশোধে। তারাই বাসিন্দা হবে জাহান্নামের।  

তবে নেক আমল যেমন জান্নাতে নেয়, পাপ কর্ম নেয় জাহান্নামে। তাই শুধু নেক আমল করলেই চলে না, বাঁচতে হয় পাপকর্ম থেকেও। সবচেয়ে বড় পাপ কর্মটি শুধু মহান আল্লাহতায়ালাকে অবিশ্বাস করা নয়, বরং সেটি তার তাঁর শরিয়তী বিধানকে অস্বীকার করা এবং সে বিধানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। রাজার আইন অমান্য হলে কি রাজার রাজত্ব বাঁচে? এ অপরাধে কঠোর শাস্তি দেয়া হয়। তেমনি শরিয়তী আইন পালিত না হলে কি মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব বাঁচে? তাই দেশের আদালতে শরিয়তী আইনের প্রতিষ্ঠা না দেয়াটি হলো এক ভয়ংকর পাপ। এ পাপ ব্যক্তিকে কাফের, জালেম ও ফাসেকে পরিণত করে –যা বলা হয়েছে সুরা মায়াদের ৪৪, ৪৫ ও ৪৭ নম্বর আয়াতে। অথচ সে পাপটিই হচ্ছে বাংলাদেশে। এ ভয়ংকর পাপের সাথে জড়িত যেমন শাসক চক্র, তেমনি জড়িত জনগণও। এক্ষেত্রে জনগণের পাপটি হলো, শরিয়তের বিলুপ্তিকে বিনা জিহাদ ও বিনা প্রতিবাদে মেনে নেয়ায়। অথচ বাংলাদেশের ন্যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশে মুসলিমদের পক্ষ থেকে সে পাপটিই হচ্ছে।     

নেক আমলের সর্বশ্রেষ্ঠ ক্ষেত্রটি হলো জিহাদ। এটিই হলো জান্নাতের মূল্য পরিশোধের সর্বশ্রেষ্ট উপায়। হাদীসে বলায় হয়েছে, জিহাদের ময়দানে রক্ত ঢেলে দেয়ার সাথে সাথে জান্নাতের মূল্য পরিশোধ হয়ে যায়। শহীদের জীবনে কখনো মৃত্যু আসে না, সে মৃত্যুহীন জীবন পায় সরাসরি প্রবেশ করে জান্নাতে। শহীদ হওয়ার পরও সে রিযিক পায়। রোজহাশরের বিচার দিনে শহীদকে বিচারের কাঠগড়ায় উঠতে হবেনা। প্রশ্ন হলো, জিহাদ কি? মিথ্যা ও অন্যায়ের নির্মূল এবং কুর’আনী সত্য ও ন্যায়কে বিজয়ী করার প্রতিটি প্রচেষ্টাই হলো জিহাদ। এটি হলো শয়তানী শক্তির নির্মূলের মধ্য দিয়ে মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনকে বিজয়ী করার যুদ্ধ। সে জিহাদ যেমন কথার সাহায্যে হতে পারে, তেমনি হতে পারে লেখনি, অর্থ ও অস্ত্রের সাহায্যেও। নবীজী (সাা:)’র হাদীস: জালেম শাসকের সামনে হক কথা বলা উত্তম জিহাদ। জালেমের নির্মূলে যে ঈমানদারগণ নিজের জান বিলিয়ে দেয় -তারাই শহীদের মর্যাদা পায়।

যে দেশের মানুষের মাঝে মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করা ও জান্নাতের মূল্য পরিশোধে আগ্রহটি প্রবল, সে দেশে নেক আমলের জোয়ারটিও প্রবল। সে দেশে জালেম শাসক থাকতে পারে না। কারণ তারা জালেম
শাসকের নির্মূলকে আল্লাহকে খুশি করা ও জান্নাত লাভের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম মনে করে। জান্নাতের মূল্য পরিশোধে শ্রেষ্ঠ মাধ্যমটি যেহেতু দুর্বৃত্ত শাসক নির্মূলের জিহাদ, দেশবাসী ঈমানদার হলে প্রচণ্ড ভিড় জমে জিহাদের ময়দানে। জনপদে বিষাক্ত সাপ বা হিংস্র পশু ঢুকলে সভ্য মানুষ মাত্রই সেটিকে বধ করে। একই কান্ড ঘটে শাসনক্ষমতায় কোন দুর্বৃত্ত বসলে। দুর্বৃত্তমুক্ত সভ্য রাষ্ট্র ও সভ্য সমাজ তো এভাবেই গড় উঠে। এভাবেই পরিশুদ্ধি আসে রাষ্ট্রে। কিন্তু যে দেশে চোরডাকাত, ভোটডাকাত, খুনি ও সন্ত্রাসীর দীর্ঘ দিনের শাসন এবং জনগণের মাঝে নাই সে দুর্বৃত্ত শাসক নির্মূলের জিহাদ, বুঝতে হবে সে দেশে জান্নাতের মূল্য পরিশোধে আগ্রহী মানুষের সংখ্যাটি অতি নগন্য।     

২. যে বিপদ মানসিক রোগীর শাসনে

আল্লাহতায়ালার কাছে প্রিয় হওয়া, পরকালে জান্নাত পাওয়া ও ইতিহাসে প্রসংশনীয় স্থান পাওয়া নিয়ে যাদের কোন আগ্রহ নাই -তারাই শেখ হাসিনার ন্যায় খুনি, ভোটডাকাত ও নৃশংস স্বৈরচারী হয়। দুর্বৃত্তির পথে চলাটাই তাদের নীতিতে পরিণত হয়। এদের সন্মদ্ধে সুরা বাকারার ১৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহতায়ালা বলেছেন: “এরাই হলো তারা যারা হিদায়েতের বদলে কিনে নিয়েছে পথভ্রষ্টতাকে। তাদের এই বানিজ্যে কোন লাভ নাই। এবং এরা সঠিক পথে নাই।” শেখ হাসিনা অবুঝ নয়। সে জানে, চুরিডাকাতি, ভোটডাকাতি, গুম,খুন,নির্যাতন ও সন্ত্রাসের রাজনীতি কোন সুস্থ্য মানুষের কাছেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ্কথাও সে জানে, এরূপ কুকর্মের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের পাতায় কেউ সুনামের সাথে বেঁচে না। বাঁচে জনগণের ঘৃনা নিয়ে।

শেখ হাসিনা জেনে বুঝেই ভোটডাকাতির ন্যায় দুর্বৃত্তি ও নৃশংস স্বৈরাচারের পথটি বেছে নিয়েছে। অপরাধী মানুষের মূল চারিত্রিক সমস্যাটি এখানেই। যারা চোরডাকাত, খুনি, সন্ত্রাসী ও ধর্ষক তারা কখনোই মানুষ কি বলবে তা নিয়ে ভাবে না। তারা বরং নৃশংস অপরাধকর্মকে উপভোগ করে। এবং দিন দিন নৃশংসতার নতুন নতুন মাত্রা আবিস্কার করে। একই পথ ধরেছে শেখ হাসিনা। জনগণকে বেশী বেশী কষ্ট দিয়েই তার বেশী বেশী আনন্দ। এটিকেই মেডিক্যাল সায়েন্সে বলা হয় স্যাডিজম। এটি এক গুরুতর মানসিক রোগ। এ রোগ কোন শাসককে ধরলে রাষ্ট্র তখন নৃশংস অসভ্যতায় ইতিহাস গড়ে। ভয়ানক বিপদ ঘটে মানসিক রোগীকে বাসের ড্রাইভার বানালে। অথচ হাসিনা এখন বাংলাদেশের ড্রাইভিং সিটে। বাংলাদেশীদের ভয়ানক বিপদ এখানেই। যে মানসিক রোগীর স্থান হওয়া উচিত ছিল পাগলা গারদে, সে এখন বাংলাদেশের শাসনক্ষমতায়।       

৩. ইসলাম-পালন ছাড়াই মুসলিম?

প্রতিটি মুসলিমের নিজেকে অবশ্যই প্রশ্ন করা উচিত, সে কি ইসলামী বিধান তথা শরিয়তের প্রয়োগ চায়? যদি না চায় তবে সে কিসের মুসলিম? এবং আরো প্রশ্ন করা উচিত, সে যদি ইসলামের বিজয় তথা শরিয়তের প্রয়োগ চায়, তবে সে লক্ষ্যে তার ভূমিকাই বা কী? যদি ভূমিকা না থাকে তবে সে কিসের মুসলিম? মুসলিম পরিচয়টি কি নিছক কোন সাইন বোর্ড?

চৌধুরী ও খান বংশের কোন সন্তান পাগল বা চরিত্রহীন হলেও সে চৌধুরী ও খান হতে পারে। সে পরিচয়ের জন্য কোন চরিত্র বা যোগ্যতা লাগে না। কিন্ত ইসলামী চেতনা ও চরিত্র না থাকার কারণে মুসলিমের সন্তান কাফের, জালেম ও ফাসেকও হতে পারে। মুসলিম কোন বংশগত উপাধী নয়। এটি একটি গুণগত পরিচয়। একজন সৈনিককে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব নিয়ে বাঁচতে হয়। তাকে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে হয় এবং যুদ্ধ শুরু হলে তাকে যুদ্ধে গিয়ে প্রাণ দেয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়। যে ব্যক্তি সে দায়িত্বের দায়ভার বহন করতে রাজী নয় সে সৈনিক হতে পারেনা। তার চাকুরি থাকে না। বিষয়টি অভিন্ন প্রতিটি মুসলিমের ক্ষেত্রেও। প্রতিটি মুসলিমকেই সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব নিয়ে বাঁচতে হয়। সেটি মহান আল্লাহতায়ালার সার্বক্ষণিক সৈনিকের। দায়িত্ব এখানে যেমন নিজ জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে ইসলামী বিধানের প্রয়োগ, তেমনি রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতি অঙ্গণে ইসলামকে বিজয়ী করার যে সার্বক্ষণিক জিহাদ –সে জিহাদের নিজের আত্মনিয়োগ। নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাদের জীবনের মূল শিক্ষা তো এটাই। তাদের জীবনে ইসলাম বিজয়ী করার জিহাদ ছিল। সে জিহাদে অর্ধেকের বেশী সাহাবী শহীদ হয়েছেন। কিন্তু আজ ক’জন মুসলিমের জীবনে সে দায়িত্ব নিয়ে বাঁচার চেতনা? সে দায়িত্ব-পালন ছাড়া কি মুসলিম হওয়া যায়?     

৪. ইসলামের বিরুদ্ধে সেক্যুলারিস্টদের শত্রুতা

সেক্যুলারিস্টদের দাবী, তারা ধর্ম নিরপেক্ষ। এটি শুধু নিরেট মিথ্যা নয়, প্রতারণাপূর্ণও। ধর্ম নিরেপক্ষতার অর্থ: কোন ধর্মের প্রতি থাকবে না শত্রুতা। কিন্তু সেক্যুলারিস্টদের দর্শন, রাজনীতি ও কর্মকান্ড প্রচণ্ড ইসলাম-বিরোধী। তাদের নীতি ইসলামের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সাথে সাংঘর্ষিক। ইসলাম শুধু নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাতের বিধান দেয় না। দেয় প্রশাসন, রাজনীতি, বিচার-আচার, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও যুদ্ধবিগ্রহের নীতিও। নবীজী (সা:) নিজে ১০ বছর রাষ্ট্র প্রধান ছিলেন এবং তাঁর লিগাসী তথা সূন্নত রয়েছে সবকিছুতেই। ফলে মুসলিমকে পদে পদে মেনে চলতে হয় নবীজী (সা:)’র সে সূন্নতগুলিকে। এজন্যই তাঁকে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বস্তরে ইসলামের প্রতিষ্টা দিতে সচেষ্ট হতে হয়। রাষ্ট্রকে গড়তে চায় জনগণকে জান্নাতে নেয়ার বাহন রূপে।

সেক্যুলারিস্টগণ মসজিদ-মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা এবং নামায-রোযা, হজ্জ-যাকাত, তাসবিহ-তাহলিলের অধিকার দিলেও রাষ্ট্রের বুকে ইসলামের বিজয় চায় না। কিন্তু ইসলামের অর্থ কি শুধু নামায-রোযা, হজ্জ-যাকাত, তাসবিহ-তাহলিল? সেটি মেন নিলে নবীজী (রা;) যে রাষ্ট্র প্রধান ছিলেন এবং শরিয়তের প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন –সে সূন্নতের কি হবে? ইসলাম পালনের অর্থ হলো, স্বৈরাচারের বদলে শুরাভিত্তিক দেশ-পরিচালনা, আদালতে পূর্ণ শরিয়ত-পালন, অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তার নীতি, প্রশাসনে দুর্বৃত্তির নির্মূল ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা, স্কুল-কলেজে কুর’আন শিক্ষা, মসজিদ এবং মাঠে-ময়দানে কুর’আন-হাদীসের পূর্ণ স্বাধীনতা। কিন্তু সেক্যুলারিস্টগণ এসব হতে দিতে রাজী নয়। ইসলামকে তারা মসজিদের চার দেয়ালের মাঝে বন্দী রাখতে চায়। আদালতে প্রবেশাধিকার দিতে রাজী নয় শরিয়তের। এবং তাদের শিক্ষানীতি ও রাজনীতির মূল লক্ষ্য হলো মুসলিমদের ইসলাম থেকে দূরে সরানো। প্রশাসন, পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে তারা ব্যবহার করে ইসলামপন্থিদের নির্মূল বা দমিয়ে রাখার কাজে। বাংলাদেশের সেক্যুলারিস্টগণ তো সে নীতিরই প্রয়োগ করছে। 

৫. ষড়যন্ত্র সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদতকে নিষিদ্ধ করার

শত্রুগণ নামায-রোযা, হজ্জ-যাকাত ও মসজিদ-মাদ্রাসা দেখে ভয় পায়না। ভয় পায় জিহাদ দেখে। যারা জিহাদশূণ্য এবং ধর্মকর্মকে শুধু নামায-রোযা, হজ্জ-যাকাত ও তাসবিহ-তাহলিলে সীমিত করে -তারা কখনোই শত্রুদের প্রতিরোধে জিহাদে খাড়া হয়না। শত্রুদের জন্য রণাঙ্গণকে তারা খালি ছেড়ে দেয়। যাদের মাঝে জিহাদী চেতনা আছে, একমাত্র তারাই শত্রুদের রুখতে রণাঙ্গণে হাজির হয়। এজন্যই ইসলামের শত্রুদের সকল আক্রোশ জিহাদ ও জিহাদীদের বিরুদ্ধে। শত্রুগণ তাই মুসলিমদের জিহাদশুণ্য করার ষড়যন্ত্র করছে। হাসিনার পুলিস তাই জিহাদের বই পেলে বা জিহাদের উপর ওয়াজ করলে জেলে তুলে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রগণ মুসলিম দেশগুলির উপর চাপ দিচ্ছে স্কুল-কলেজের সিলেবাস থেকে জিহাদ বিষয়ক বিষয়গুলিকে বাদ দিতে। তারা জিহাদকে বলছে সন্ত্রাস। মসজিদের খতিবদের উপয় চাপ দিচ্ছে খোতবায় জিহাদ নিয়ে আলোচনা না করতে। এভাবে ষড়যন্ত্র হচ্ছে মুসলিমদের জীবনে ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদতকে নিষিদ্ধ করার। এরূপ জিহাদশূণ্য করার লক্ষ্য একটিই। সেটি হলো শত্রুর হামলার মুখে মুসলিমদের জিহাদশূর্ণ তথা প্রতিরোধহীন করা। আর এতে শত্রুর জন্য সহজ হয় বিনা যুদ্ধে মুসলিম দেশ দখলে নেয়ার।   

৬. বিজয়টি শয়তানের

পবিত্র কুর’আনের সহজ সরল কথাগুলি বুঝার জন্য মুফতি-মৌলভী হওয়া লাগেনা। কুর’আন শুধু মুফতি-মৌলভীদের জন্য নাযিল হয়নি। নাযিল হয়েছে সহজ সরল ভাষায় সাধারন মানুষকে পথ দেখানোর জন্য। ডাক্তার, ইঞ্জিনীয়ার, আইনজ্ঞ হওয়ার জন্য বিদেশী ভাষা শিখতে হয়। মোটা মোটা বহু বই পড়তে হয়। সেটি শুধু এ পার্থিব জীবনের আরাম-আয়েশ বাড়ানোর জন্য। কিন্তু সেসব বইয়ে জান্নাতের পথের সন্ধান মেলে না। সে পথের সন্ধান দেয় পবিত্র কুর’আন ও হাদীস।

মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানবকে জান্নাতে নিতে চান। সে জন্য জান্নাতের পথ চেনাটি ফরজ করেছেন। আর সে ফরজ বিধানটি হলো কুর’আন শিক্ষা। অপর দিকে শয়তান চায় মানুষকে জাহান্নামে নিতে। এ লক্ষ্যে শয়তানের স্ট্রাটেজী এ নয় যে সবাই সে মুর্তিপূজায় ডাকবে। বরং শয়তানের মূল স্ট্রাটেজীটি হলো জনগণের দৃষ্টি থেকে জান্নাতের পথকে লুকিয়ে রাখা। তখন পথহারা মানুষদের জাহান্নামে নেয়াটি সহজ হয়। এজন্যই চায় কুর’আন শিক্ষা থেকে মানুষকে দূরে রাখতে। বাংলাদেশের মত দেশগুলিতে বিজয়টি শয়তানের। ফলে ছাত্রগণ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করলেও পবিত্র কুর’আনের একটি আয়াত বুঝার সামর্থ্য তারা অর্জন করতে পারে না। ফলে ইসলামের বিচারে তারা মুর্খই থেকে যায়। অথচ বিস্ময়ের বিষয় হলো, বাংলাদেশের মানুষ মসজিদ-মাদ্রাসায় দেশ ভরে ফেললেও তারা শয়তানী শক্তির নির্মূলে জিহাদে নাই। ফলে বাধা বাড়ছে মুসলিম রূপে বাঁচা ও বেড়ে উঠায়।   

৭. ক্ষতির পথ ও বিজয়ের পথ

যারা ভাষা, দল ও জাতীয় স্বার্থের নামে রাজনীতি করে এবং অর্থ, শ্রম, মেধা ও প্রাণ বিলিয়ে দেয় তারা মহান আল্লাহতায়ালার কাছ থেকে কি আশা করে? এটিই তো ক্ষতির ব্যবসা। রুজি-রোজগার ও পেশাদারীতে কতটা বিজয় হলো বা পরাজয় এলো -তা নিয়ে পরকালে প্রশ্নই উঠবে না। বরং জবাব দিতে হবে ন্যায়ের পক্ষে এবং অন্যায়ের নির্মূলে জান-মাল ও মেধার কতটা বিনিয়োগ হয়েছে তা নিয়ে। পরকালে তো তাঁরাই পুরস্কার পাবে যাদের বাঁচা-মরার মূল লক্ষ্য এবং শ্রম, মেধা, অর্থ ও রক্তের বিনিয়োগটি হয় মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করার লক্ষ্যে। ঈমানের অর্থ কি শুধু মহান আল্লাহতায়ালা, তাঁর রাসূল, তাঁর কিতাব, আখেরাত ও রোয হাশরের উপর বিশ্বাস? ঈমানের অর্থ তো তাঁর দেয়া কুর’আনী বিধানের উপর বিশ্বাসও। এবং সে বিশ্বাসকে শুধু বিশ্বাসে সীমিত রাখলে চলে না, সে কুর’আনী বিধানের প্রতিষ্ঠাতেও নামতে হয়। নবীজী (সা:) তো সেটিই শিখিয়ে গেছেন।

এজন্যই হৃদয়ে প্রকৃত ঈমান থাকলে ইসলামকে বিজয়ী করার লাগাতর জিহাদও এসে যায়। জিহাদের শুরুটি হয় বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানে। সে বুদ্ধিবৃত্তির জিহাদের মূল হাতিয়ারটি হলো পবিত্র কুর’আন। তবে শত্রুর নির্মূলে চুড়ান্ত লড়াইটি হয় সশস্ত্র যুদ্ধের ময়দানে। বদরের যুদ্ধে নামার পূর্বে নবীজী (সা:) বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদটি লড়েছেন ১৪ বছেরর বেশী কাল ধরে। সে জিহাদের অঙ্গণেই তৈরী হয়েছে বদরের যুদ্ধের মুজাহিদ। যে দেশে সে বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদ নাই সে দেশে অস্ত্রের যুদ্ধের মুজাহিদও জুটে না। মুসলিমকে তাই লড়তে হয় উভয় যুদ্ধের কৌশলী সৈনিক রূপে। কিন্তু আজ মুসলিমদের মাঝে সে বুদ্ধিবৃত্তিক সে জিহাদটি কই? ০৮/০৭/২০২১




বিবিধ ভাবনা ৬৩

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. সভ্য সমাজের নির্মাণ কীরূপে?

গরু ঘাস নিয়ে ভাবে, গলার রশিটি নিয়ে ভাবে না। সামনে কাউকে খুন, ধর্ষিতা বা ডাকাতির শিকার হতে দেখেও গরু ঘাস খাওয়ায় বিরতি দেয় না। এটিই গরু চরিত্র। সে অভিন্ন চরিত্রটি দেখা যায় গরু চরিত্রের মানুষদের মাঝেও। তারাও দেশের চুরি-ডাকাতি, ভোটডাকাতি, গুম-খুন-ধর্ষণের রাজনীতির প্রতিকার নিয়ে ভাবে না। তারা ভাবে নিজেদের ব্যবসা-বানিজ্য, চাকুরি-বাকুরি ও ঘর-সংসার নিয়ে। এর বাইরে যেতে তারা রাজী নয়। নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মত সেটিকে অহেতুক মনে করে। অথচ ইসলাম প্রতিটি ব্যক্তিকে সামাজিক দায়ভার নিয়ে বাঁচার শিক্ষা দেয়। ঈমানদারের সে চরিত্রটি নিজের খেয়ে দুর্বৃত্ত নির্মূলের জিহাদে নামার। সে জিহাদে সে নিজের জান, মাল, মেধা, শ্রম ও সময়ের বিনিয়োগ করে। এবং এটিই হলো ইসলামে সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্মীয় কর্ম।

হংকংয়ের জনসংখ্যা ৮০ লাখ। ঢাকার জনসংখ্যা প্রায় দুই কোটি। কিছু দিন আগের হংকংয়ের ২০ লাখ মানুষ গণতন্ত্র রক্ষার দাবী নিয়ে রাস্তায় নেমেছিল। এটি ছিল হংকংয়ের মূল জনসংখ্যার প্রায় সিকি ভাগ। অথচ ঢাকার রাস্তায় ২০ হাজার লোকও গণতন্ত্রের দাবী নিয়ে রাস্তায় নামে না। হেতু কী? এটি কি হংকংয়ের ভিন্ন জলবায়ু ও ভূ-প্রকৃতির জন্য?  ভিন্নতাটি চেতনায়। সেটি গরু-চরিত্র পরিহার করে সামাজিক দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে বাঁচার চেতনা। এমন মানুষেরা গরুর ন্যায় স্রেফ পানাহারে খুশি হয় না, তারা স্বাধীনতা চায়। রাষ্ট্রের উপর নিজেদের বৈধ মালিকানা চায়।

গণতন্ত্রের অর্থই হলো রাষ্ট্রের উপর জনগণের দখলদারী। জনগণ সে দখলদারী প্রয়োগ করে ভোটে সরকার নির্বাচন করে, রাস্তায় মিটিং-মিছিল করে এবং পত্রপত্রিকা নিজের মতামত প্রকাশ করে। যেসব দেশে এরূপ চেতনার মানুষের বসবাস সে দেশে গণতন্ত্রের উপর হামলা হলে লাখ লাখ মানুষের মিছিল হয়। গরুরা কখনোই মিছিলে নামে না। মিছিলে নামার সে সাধ গরু চরিত্রের মানুষেরও থাকে না। এজন্যই নিজেদের ভোট ডাকাতি হয়ে গেলেও ঢাকার রাস্তায় মিছিল হয় না। কয়েক যুগ খাঁচায় থাকলে বাঘ-ভালুকও স্বাধীন জীবনের সাধ হারিয়ে ফেলে। খাঁচার গেট খুলে দিলেও তারা বাইরে বেরুয় না। মানুষের জীবনেরও সেটি ঘটে দীর্ঘকাল স্বৈর শাসনের কবলে থাকলে। স্বৈরাচারের এটাই সবচেয়ে বড় কুফল। স্বৈরাচারেরা চায় মানুষ গরু চরিত্র নিয়ে বেড়ে উঠুক এবং দেশের রাজনীতি ও প্রশাসন তাদের হাতে ছেড়ে দিক। বাংলাদেশে সেটিই ঘটেছে। শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনার বাকশালী স্বৈরাচার বাংলাদেশীদের স্বাধীন ও সভ্য ভাবে বাঁচার রুচিই কেড়ে নিয়েছে।

স্বৈরচারী শাসকেরা শুধু গণতন্ত্র হত্যা করে না। তারা মানুষের বিবেকও হত্যা করে। তারা চেতনায় অপচিন্তা ও পশুবৎ স্বার্থপরতার বিষ ঢুকিয়ে দেয়। নইলে তাদের চুরিডাকাতি, ভোটডাকাতি, গুম,খুন, ধর্ষণ ও সন্ত্রাসের রাজনীতিতে দুর্বৃত্ত চরিত্রের লোক-লস্কর জুটে না। স্বৈরাচার তাই সভ্য সমাজ নির্মাণের পথে সবচেয়ে বড় বাঁধা। বিশ্বের কোথাও স্বৈর শাসন থাকলো এবং সেখানে সভ্য সমাজ নির্মিত হলো – ইতিহাসে সেরূপ উদাহরণ নাই। তাই বাংলাদেশে যতদিন হাসিনার বা তার মত দুর্বৃত্তদের স্বৈর শাসন থাকবে ততদিন অসভ্যতার নতুন নতুন রেকর্ডই কেবল নির্মিত হবে। জনজীবনে দুঃশাসনের তীব্রতাই শুধু বাড়বে।

এজন্যই যারা সভ্য মানুষ ও সভ্য সমাজ নির্মাণ করতে চায় তাদের অবশ্যই নামতে হয় স্বৈর শাসনের নির্মূলে। সভ্যতর সমাজ নির্মাণে এটিই হলো প্রথম ধাপ। স্রেফ স্কুল-কলেজ ও মসজিদ-মাদ্রাসা গড়ে এছাড়া অসভ্যতা থেকে মুক্তি মেলে না। সভ্য মানুষও গড়ে উঠে না। বাংলাদেশে মসজিদ-মাদ্রসা ও স্কুল-কলেজে সংখ্যা কি কম? বাংলাদেশের যে কোন গৃহ থেকে দুই মাইলের মধ্যে একটি ডিগ্রি কলেজ পাওয়া যায়। আধা মাইলের মধ্যে মসজিদ পাওয়া যায়। ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিশ্বের কোন দেশেই এ সুবিধা নাই। কিন্তু তাকে কি মানব চরিত্র বিকশিত হয়েছে? ক্ষমতায় ফিরাউনের ন্যায় স্বৈর-শাসক বসিয়ে সভ্য মানুষ গড়া অসম্ভব। বাংলাদেশ তারই দৃষ্টান্ত। ইসলামে স্বৈরশাসক নির্মূলের গুরুত্ব এতোই অধিক যে, এটিকে নিছক রাজনীতির পর্যায়ে রাখা হয়নি। বরং সর্বোচ্চ ইবাদতের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। জালেম শাসকের সামনে হক কথা বলাকে নবীজী (সা:) উত্তম জিহাদ বলেছেন। এবং জিহাদ হলো সর্বোচ্চ ইবাদত।

শান্তিতে বসবাস করতে হলে লোকালয় থেকে হিংস্র পশুগুলোকে অবশ্যই নির্মূল করতে হয়। তেমনি দেশে শান্তি আনতে হলে নির্মূল করতে হয় দুর্বৃত্ত শাসকদের। জালেমদের নির্মূলে নবীজী (সা:)কে যুদ্ধে নামতে হয়েছে। শুধু নামায-রোযা ও দোয়া-দরুদে সমাজ থেকে দুর্বৃত্ত নির্মূল করা যায় না। এ কাজের জন্য মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশিত বিধানটি হলো জিহাদের। যে সমাজে জিহাদ নাই, সে সমাজ কখনোই সভ্য হতে পারে না। জিহাদ হলো সমাজ থেকে আবর্জনা চরিত্রের দুর্বৃত্ত নির্মূলের মোক্ষম হাতিয়ার। জিহাদ না থাকলে রাষ্ট্রের অঙ্গণে আবর্জনা জমতে বাধ্য। দেশে স্বৈরাচারী শাসন দেখে নিশ্চিত বলা যায়, সে দেশে জিহাদের পবিত্র হাতিয়ারকে কাজে লাগানো হয়নি। এটিই হলো মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে অবাধ্যতা। এবং সে অবাধ্যতার শাস্তি হলো স্বৈর শাসনের আযাব। বাংলাদেশের মানুষ আজ সে আযাবের মধ্যেই জর্জরিত।

শান্তিতে বাস করা ও পরকালে জান্নাতে পৌঁছার একটি খরচ আছে। সে খরচ আদায় না করে সেখানে পৌঁছা অসম্ভব। সে খরচ স্রেফ নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাতে আদায় হয় না। সে খরচ পরিশোধে নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাগণ জান, মাল, মেধা, শ্রম ও সময়ের সর্বোচ্চ বিনিয়োগ নিয়ে জিহাদে নেমেছেন। অর্ধেকের বেশী সাহাবা শহীদ হয়ে গেছেন। আজও এছাড়া বিকল্প পথ নাই। অসভ্য স্বৈর-শাসনের নির্মূলে তো তারাই যুদ্ধে নামে সে খরচ আদায়ে যাদের সামর্থ্য আছে। বাংলাদেশীদের মাঝে সে সামর্থ্য নাই বলেই চোরডাকাত, ভোটডাকাত, খুনি, ধর্ষক নির্মূল করতে মিছিলে লোক পাওয়া যায় না। নামায-রোযা ও তাসবিহ-তাহলিল করেই অনেক ভাবেন তারা জান্নাতের চাবি হাতে পেয়ে গেছে। জিহাদে কথা তারা মুখে আনে না। সাহাবাদের জীবনের সাথে নিজেদের জীবনকে তারা কখনোই মিলিয়ে দেখে না। মিলিয়ে দেখলে বুঝতো পার্থক্যটি কত বিশাল। তখন নিজেদের মুসলিম হওয়া নিয়েই সন্দেহ দেখা দিত। এমন মানুষের সংখ্যা দেশে যতই বৃদ্ধি পাক, তাতে কি চোরডাকাতদের হাত থেকে দেশ মুক্ত হয়? বিজয় আসে কি ইসলামের?

২. মিথ্যার নাশকতা ও মিথ্যুকের সন্ত্রাস

মিথ্যার নাশকতা অ্যাটম বোমার চেয়েও মারাত্মক। এ্যাটম বোমা একটি শহরকে ধ্বংস করে এবং সে শহরের কয়েক লাখ মানুষকে হত্যা করে। কিন্তু কাউকে জাহান্নামের আগুনে নেয় না। অথচ মিথ্যা বহু কোটি মানুষের বিবেক হত্যা করে, জাহান্নামে নেয়। মিথ্যাই হলো শয়তানের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। এ মিথ্যার সাহায্যেই শয়তান শত শত কোটি মানুষকে বিভ্রান্ত করছে ও জাহান্নামে নিচ্ছে। যে কোন সমাজে মিথ্যাচর্চা ও মিথ্যার প্রচারই হলো সবচেয়ে বড় অপরাধ। এটি অসম্ভব করে সত্যের প্রতিষ্ঠা ও সভ্য সমাজের নির্মাণ। নবীজী (সা:) মিথ্যাকে সকল পাপে জননী বলেছেন। মিথ্যচারীগণ হলো শয়তানের সৈনিক এবং মহান আল্লাহতায়ালার দুশমন।

বাংলাদেশে সবচেয়ে ভয়ংকর নাশকতাগুলি ঘটিয়েছে মিথ্যুকেরা। বাংলাদেশ এখন তাদের হাতেই অধিকৃত। রাজনীতির অঙ্গণে শয়তানের এ অস্ত্রটি ব্যবহার করেছে শেখ মুজিব এবং তার কন্যা শেখ হাসিনা। শেখ মুজিব ৮ আনা সের চাল, সোনার বাংলা ও গণতন্ত্রের মিথ্যা ওয়াদা দিয়ে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ভোটি নিয়েছিল। এসবই ছিল মিথ্যা। মিথ্যার প্লাবন সেদিন বিজয়ী হয়েছিল। মুজিবের লক্ষ্য ছিল, জনগণকে লোভ দেখিয়ে ভোট নেয়া এবং ক্ষমতা দখল করা। মুজিবের সে কৌশল সফল হয়েছিল। সে মিথ্যাগুলিই পরে প্রচণ্ড নাশকতা ঘটিয়েছে। সোনার বাংলার বদলে মুজিব দিয়েছে দুর্ভিক্ষের বাংলা -যাতে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। গণতন্ত্রকে কবরে পাঠিয়ে একদলীয় বাকশালী স্বৈরাচার উপহার দিয়েছে। স্বাধীনতার বদলে দিয়েছে ভারতের পদতলে গোলামী। বাংলাদেশে নদীর পানি, সমুদ্র বন্দর, অর্থনৈতিক বাজার, ভিতর দিয়ে করিডোর, তালপট্টি দ্বীপ –সব কিছুর উপরই ভারত প্রতিষ্ঠা করেছে নিজের সার্বভৌমত্ব। মুজিবের ন্যায় একভই রূপ নিরেট মিথ্যাকে অস্ত্র রূপে ব্যবহার করে চলেছে ভোটডাকাত হাসিনা। বিশুদ্ধ ভোটডাকাতিকেও সে বলছে শুদ্ধ নির্বাচন।

মানব জীবনের সবচেয়ে পবিত্র যুদ্ধটি হলো মিথ্যা নির্মূলের যুদ্ধ। মিথ্যা নির্মূল হলে দুর্বৃত্ত নির্মূল হয়। কোনটি সত্য এবং কোনটি মিথ্যা – সেটি সূর্য্যের ন্যায় সুস্পষ্ট। সেটি বুঝার জন্য স্কুল-কলেজের পাঠ নেয়া লাগে না। ভেড়ার রাখালও সেটি বুঝতে পারে। জীবনের সবচেয়ে গুরুতর পরীক্ষা হয় এ ক্ষেত্রে। তারাই সবচেয়ে অযোগ্য যারা সত্য ও মিথ্যার সে পার্থক্যটি বুঝতে ব্যর্থ হয় এবং মিথ্যার পক্ষ নেয়। এটিই সবচেয়ে বড় পাপ; এবং ভয়ানক অপরাধও। অধিকাংশ মানুষ খুন, জ্বিনা, চুরিডাকাতির অপরাধে জাহান্নামে যাবে না। জাহান্নামে যাবে সত্যকে সত্য রূপে এবং মিথ্যাকে মিথ্যা রূপে চিনতে ব্যর্থ হওয়া ও মিথ্যার পক্ষ নেয়ার কারণে। অথচ বাংলাদেশে মিথ্যাসেবী এ দুর্বৃত্তদের সংখ্যা কি কম?

মিথ্যাচারের নাশকতার কিছু উদাহরণ দেয়া যাক। একাত্তরের যুদ্ধে ইসলামপন্থি প্রতিটি দল ও প্রতিটি ব্যক্তিই অখন্ড পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল। ইতিহাসের এটি অতি সত্য বিষয়। কোন আলেম, মাদ্রাসার কোন শিক্ষক, মসজিদের কোন ইমাম ও কোন পীর ভারতে যাইনি এবং পাকিস্তান ভাঙ্গাকে সমর্থণ করেনি। আলেমদের মাঝে নানা বিষয়ে মতভেদ থাকলেও এ বিষয়ে তাদের মাঝে ঐকমত্য ছিল যে, পাকিস্তান ভাঙ্গা সম্পূর্ণ হারাম। দেশ বিভক্তির কাজ শয়তানকে খুশি করে এবং ক্রোধ বাড়ায় মহান আল্লাহতায়ালার। ঈমানদারের ধর্ম মুসলিম রাষ্ট্র গড়াতে, ভাঙ্গাতে নয়। পাকিস্তান ভাঙ্গার কাজটি ছিল ইসলামে অঙ্গিকারশূণ্য ভারতপন্থী আওয়ামী লীগ, বামপন্থি ন্যাপ, কম্যুনিষ্ট পার্টি ও হিন্দুদের। আজও এরাই নিজেদেরকে একাত্তরের চেতনাধারী রূপে পরিচয় দেয়। ইসলামপন্থী কাউকে ফাঁসিতে ঝুলাতে পারলে এদের মহলে আনন্দের উৎসব শুরু হয়।

নিজেদের কাজকে মহামান্বিত করা ও ইসলামপন্থিদের চরিত্র হননের জন্য ভারতসেবীগণ একাত্তর নিয়ে মিথ্যার প্লাবন সৃষ্টি করে। তাদের লক্ষ্য শুধু পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে হেয় করা ছিল না, লক্ষ্য ছিল ইসলামপন্থীদেরও বর্বর রূপে চিত্রিত করা। এজন্য প্রয়োজন দেখা দেয় একাত্তরের নিহতদের সংখ্যাকে বহুগুণ বাড়িয়ে প্রচার করা। এতে শুধু পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে নয়, পাকিস্তানপন্থীদের চরিত্র হননের কাজটি সহজ হয়। তারা বলে একাত্তরে ৩০ লাখ তথা তিন মিলিয়ন মানুষ নিহত হয়। বাংলার ইতিহাসে এটিই হলো সবচেয়ে বড় মিথ্যা। তখন পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্য ছিল সাড়ে সাত কোটি অর্থাৎ ৭৫ মিলিয়ন। এর অর্থ দাঁড়ায়, প্রতি ২৫ জনে একজন মারা গিয়েছিল (হিসাবটি এরূপ: ৭৫/৩=২৫)। অপর দিকে ৯ মাসে তিরিশ লাখ মারা গেলে প্রতি দিন মারা যেতে হয় ১১ হাজারেরও বেশী মানুষকে। কিন্তু সে হিসাবই বা ক’জন করেছে? মিথ্যা বলায় রেকর্ড গড়েছে কাদের সিদ্দিকী। এ মিথ্যুকটি তার বই “একাত্তর”য়ে লিখেছে ১৯৭১’য়ের ২৫ মার্চের একরাতে তিন লাখ মানুষকে হত্যা করা হয়।  

মিথ্যুকগণ কখনোই হিসাব করে কথা বলে না। তারা মিথ্যা বলে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারের লক্ষ্যে। মিথ্যা বলায় পুঁজি বা শ্রম লাগে না। মিথ্যা বলা যে মহাপাপ –সে ভয়ও এ দুর্বৃত্তদের থাকে না। বিস্ময়ের বিষয় হলো বাঙালীদের মাঝে এ মিথ্যুকগণ খরিদদার পেতে অসুবিধা  হয়নি। আজও তিরিশ লাখের এ বিশাল মিথ্যাটি অহরহ ধ্বনিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর, আদালতের বিচারক, সেনাবাহিনীর জেনারেল, লেখক, বুদ্ধিজীবী, স্কুলের শিক্ষক, কলেজ ছাত্র, সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের মুখে মুখে। অথচ মিথ্যুক হওয়ার জন্য তো এটুকুই যথেষ্ট, অন্যের রটানো মিথ্যাগুলি কেই শুনলো এবং কোন রূপ তদন্ত ও চিন্তা-ভাবনা না করেই তা প্রচার করলো। এভাবে মিথ্যাচার পরিণত হয়েছে অধিকাংশ বাঙালীর সংস্কৃতিতে। অথচ মানব চরিত্রের সবচেয়ে খারাপ দিকটি হলো এই মিথ্যাচার। এটিই হলো শয়তানের প্রধান খাসলত। অথচ শেখ মুজিব, শেখ হাসিনা ও তার সহচরগণ শয়তানের সে খাসলতটিই নিজেদের চরিত্রে পুরাপুরি মিশিয়ে নিয়েছে এবং এভাব আনন্দ বাড়িয়েছে শয়তানের। এবং নাশকতা বাড়িয়েছে ইসলামের।

তবে ঘৃণ্যতম অপরাধ শুধু মিথ্যা বলা নয়, বরং মিথ্যুককে সন্মানিত করাও। ঈমানদারের মৌলিক দায়িত্ব হলো সকল সামর্থ্য দিয়ে সত্যের পক্ষে সাক্ষ্য দেয়া এবং মিথ্যুকের মিথ্যাকে সবার সামনে উম্মোচিত করা। এটিই উত্তম ইবাদত। এবং হারাম হলো মিথ্যা বলা ও মিথ্যুকের পক্ষ নেয়া। বাংলাদেশীদের গুরুতর অপরাধ হলো তারা শেখ মুজিবের ন্যায় মিথ্যাবাদীকে ঘৃণা না করে তাকে জাতির পিতা ও বঙ্গবন্ধু বলে সন্মানিত করে! বাঙালীর চারিত্রিক পচন যে কতটা গভীর -সেটি বুঝতে কি এরপরও কিছু বাকি থাকে? চারিত্রিক এ পচন নিয়ে কি সভ্য সমাজ নির্মাণ করা যায়?

বাঙালীর এ গুরুতর চারিত্রক ব্যর্থতাটি কবি রবীন্দ্রনাথের চোখে ধরা পড়েছিল। তাই তিনি প্রচণ্ড ক্ষোভ নিয়ে লিখেছিলেন, “হে বিধাতা, সাত কোটি প্রাণীরে রেখেছো বাঙালী করে, মানুষ করোনি।” রবীন্দ্রনাথের কাছে বাঙালীল মানুষ রূপে বেড়ে উঠায় ব্যর্থতাটি ধরা পড়েছিল। তবে রবীন্দ্রানাথের ভূল এবং সে সাথে অপরাধ হলো, তিনি বাঙালীর ব্যর্থতাকে বিধাতার উপর চাপিয়েছেন। অথচ মানুষ রূপে বেড়ে উঠার দায়িত্বটি প্রতিটি ব্যক্তির। সে সামর্থ্যটি স্রষ্টার পক্ষ থেকে প্রতিটি মানুষকে জন্মসূত্রেই দেয়া হয়ে থাকে। সে সামর্থ্যকে ব্যবহার করে যে কোন ব্যক্তি ফেরেশতাদের পর্যায়ে পৌঁছতে পারে, আবার শয়তানের পথ ধরে নীচেও নামতে পারে। বাঙালী নীচে নামার পথটিই বেছে নিয়েছে। প্রশ্ন হলো, কেউ যদি মিথ্যাচার ও অসভ্যতার পথ বেছে নেয় -সেজন্য স্রষ্টা কেন দায়ী হবেন? অথচ বিস্ময়ের বিষয় হলো, রবীন্দ্রনাথ এক্ষেত্রে বাঙালীকে দায়ী না করে বিধাতাকে দায়ী করেছেন!               

৩. সমস্যা জনগণকে নিয়ে

বাংলাদেশের সমস্যাটি শুধু দুর্বৃত্ত ভোটডাকাত সরকারকে নিয়ে নয়। গুরুতর সমস্যা দেশের জনগণকে নিয়েও। যেদেশের মানুষ মুর্তিপূজারী সে দেশের মন্দিরে মন্দিরে মুর্তিরা পূজা পাবে -সেটিই স্বাভাবিক। তেমনি যে দেশের জনগণ বাকশালী মুজিবের পূজারী সেদেশে স্বৈরাচারী দুর্বৃত্তরা পূজা পাবে –সেটিও অতি স্বাভাবিক। এমন দেশে ভোটডাকাতও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী রূপে সমাদৃত হবে –সেটি আদৌ অভাবনীয় নয়। এমন জনগণের মাঝে কি কখনো গণতন্ত্র বাঁচে?  মুর্তিপূজা নিয়ে মুসলিম হওয়া যায় না। তেমনি যারা মুজিবের ন্যায় নৃশংস বাকশালী ফ্যাসিস্টকে জাতির পিতা ও বঙ্গঁবন্ধুর সন্মান দেয় তারা কখনোই গণতন্ত্রী হতে পারে না। তারা অবশ্যই স্বৈরাচারী হয়। হাসিনা ও তার বাকশালী সহচরগণ তো সেটিই প্রমাণ করছে।

মানবিক অধিকার নিয়ে বাঁচার জন্য রুচি লাগে। কিন্তু সে রুচি স্বৈরাচার-পূজারীদের থাকার কথা নয়। মশামাছি সব জায়গায় বসে না, আবর্জনা খোঁজে। তেমন একটি কারণেই ভোটচোর স্বৈরচারীদের কাছে বাংলাদেশ এতো প্রিয়। বাংলাদেশে নির্বাচনের নামে ২০১৪ ও ২০১৮ সালে যেরূপ ডাকাতি হলো সেটি কি বিশ্বের অন্য কোন দেশে সম্ভব? সেটি সম্ভব একমাত্র মুজিবপূজারীদের দেশেই। প্রতি ঘরেই প্রতিদিন আবর্জনা তৈরী হয়। সভ্য ভাবে বাঁচার জন্য ঘর থেকে নিয়মিত আবর্জনা সরানোর লোক থাকতে হয়। বিষয়টি অবিকল অভিন্ন সমাজ ও রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে। প্রতি দেশেই যেমন মশামাছি জন্ম নেয়, তেমনি দুর্বৃত্ত উৎপাদনের উর্বর ক্ষেত্র থাকে। সভ্য ভাবে বাঁচতে হলে সেগুলিকে নির্মূল করতে হয়। দুর্বৃত্ত নির্মূলের সে লাগাতর যুদ্ধই হলো পবিত্র জিহাদ। সে যুদ্ধটি না হলে দেশ দুর্বৃত্তদের দখলে চলে যায়। গণতান্ত্রিক দেশগুলিতে দুর্বৃত্তদের আবর্জনার স্তুপে ফেলার কাজটি হয় নির্বাচনের মাধ্যমে। কিন্তু স্বৈরাচার কবলিত দেশে সে সুযোগ থাকে না। দুর্বৃত্ত ভোটডাকাতকে নির্মূল না করে বরং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সন্মান দেয়া হয়। বাংলাদেশে সেটিই হয়েছে। বাঙালীর চেতনার বৈকলত্বের এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কি হতে পারে?

৪. জিহাদ কেন অপরিহার্য?

দেশ কখনোই কিছু সংখ্যক দুর্বৃত্তের কারণে অসভ্য হয় না। কিছু দুর্বৃত্ত মানুষ মহান নবীজী (সা:)’র যুগেও ছিল। দেশ অসভ্য হয় সেসব সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জন্য যারা চোখের সামনে চুরিডাকাতি, ভোটডাকাতি, গুম, খুন, ধর্ষণ হতে দেখেও নীরব ও নিষ্ক্রিয় থাকে। এরূপ নিষ্ক্রিয়তাই হলো নিরেট অসভ্যতা। ইসলামী বিধানে তাই চুরিডাকাতি, ভোটডাকাতি, গুম, খুন, ধর্ষণে লিপ্ত হওয়াই একমাত্র অপরাধ নয়, গুরুতর অপরাধ হলো চোখের সামনে এরূপ অপরাধ হতে দেখেও নিশ্চুপ থাকা। তখন মহান আল্লাহতায়ালার আযাব এরূপ অপরাধীদেরও ঘিরে ধরে। স্রেফ নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাত পালন করে এ আযাব থেকে মুক্তি মেলে না।

মুসলিম হলো মহান আল্লাহতায়ালার সার্বক্ষণিক সৈনিক। পবিত্র কুর’আনে মুসলিম উম্মাহকে বলা হয়েছে “হিযবুল্লাহ” তথা আল্লাহর দল। সৈনিককে প্রতিদিন শুধু প্রশিক্ষণ নিলে চলে না, তাকে প্রতি মুহুর্ত দায়িত্ব নিয়ে বাঁচতে হয়। নইলে তার শাস্তি হয়। দায়িত্বটি হলো দুর্বৃত্তদের নির্মূল ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা। এভাবে ইসলামের বিজয়ে তাঁকে সার্বক্ষণিক সৈনিক হতে হয়। এ বিষয়ে পবিত্র কুর’আনে মহান আল্লাহতায়ালার নিজের বয়ানটি হলো: “আমারু বিল মারুফ ওয়া নেহি আনিল মুনকার।” এটিই মুসলিম জীবনে প্রতি মুহুর্তের পবিত্রতম জিহাদ। মুসলিম জীবনে এ জিহাদ না থাকলে মহান আল্লাহতায়ালার বিধান শুধু কুর’আনেই থেকে যায়, প্রতিষ্ঠা পায় না। অথচ মহান আল্লাহতায়ালা চান তাঁর রাজত্বে অবশ্যই তাঁর বিধানের প্রয়োগ থাকতে হবে। নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাগণ তো সেটিই করে গেছেন। এবং সর্বশ্রেষ্ঠ সে বিধানের প্রয়োগের পথ ধরেই তারা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা নির্মাণ করতে পরেছিলেন।  

কিন্তু বাংলাদেশে সে জিহাদ কতটুকু হচ্ছে? মহান আল্লাহতায়ালার বিধানের তেলাওয়াত করেই তারা দায় সারছে, সেগুলির প্রতিষ্ঠায় নাই। দেশ মসজিদ-মাদ্রাসায় ভরে গেলে কি হবে, দেশের আদালতে বিচার-আচার চলছে ব্রিটিশ কাফেরদের প্রণীত কুফরি আইনে। হুজুরগণ এ নিয়ে আন্দোলনে নাই। যারা নামায-রোযা পালন করে, তাদের নজরও এদিকে নাই। মহান আল্লাহতায়ালা কি মুসলিমদের এরূপ আচরণে খুশি হতে পারেন? নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাত যেমন ব্যক্তির ব্যক্তিগত পরিশুদ্ধির বিধান, জিহাদ হলো সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিশুদ্ধির বিধান। জিহাদ ছাড়া কি তাই সভ্য রাষ্ট্র ও সভ্য সমাজ নির্মাণের কথা ভাবা যায়? মহান নবীজী (সা:) ও তাঁর মহান সাহাবাগণ কি কখনো এ জিহাদকে তাঁদের জীবন থেকে দূরে রেখেছিলেন? এ সহজ ও সত্য কথাগুলি বুঝতে বাঙালী মুসলিমের এতো ব্যর্থতা কেন? ০৪/০৭/২০২১