বিচারের নামে পরিকল্পিত হত্যা এবং বিচারমুক্ত খুনি

আব্দুল কাদের মোল্লার সৌভাগ্য

অবশেষে স্বৈরাচারি শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীরা অতি পরিকল্পিত ভাবে আব্দুল কাদের মোল্লাকে হত্যা করলো। এ হত্যার জন্য হাসিনা সরকার যেমন বিচারের নামে বিবেকহীন ও ধর্মহীন বিচারকদের দিয়ে আদালত বসিয়েছে, তেমনি সে আদালেতে মিথ্যা সাক্ষিরও ব্যবস্থা করেছে। ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করার লক্ষ্যে ইচ্ছামত আইনও পাল্টিয়েছে। ফাঁসী ছাড়া অন্য কোন রায় মানা হবে না -আদালতকে সে হুশিয়ারিটি শোনাতে কোটি কোটি টাকা ব্যায়ে শাহবাগ চত্বরে দলীয় ক্যাডারদের দিয়ে সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে। রাজপথে আওয়ামী-বাকশালীগণ ফাঁসীর যে দাবী তুলেছিল অবশেষে অবিকল সে দাবীই বিচারকগণ তাদের রায়ে লিখলেন। একটি দাঁড়ি-কমাও তারা বাদ দেয়নি।ফাঁসীতে ঝুলানোর জন্য যখন যা কিছু করার প্রয়োজন ছিল, হাসিনা সরকার তার সব কিছু্ই করেছে। তবে জনাব আব্দুল কাদের মোল্লার পরম সৌভাগ্য, মহল্লা খুনী বা সন্ত্রাসীর হাতে তাঁকে খুন হতে হয়নি। রোগজীবাণূর হাতেও তাঁর প্রাণ যায়নি। তাকে খুন হতে হয়েছে ইসলামের এমন এক চিহ্নিত শয়তানি জল্লাদদের হাতে -যাদের রাজনীতির মূল এজেন্ডাই হলো আল্লাহর শরিয়তি বিধানের প্রতিষ্ঠাকে প্রতিহত করা। তাদের কাছে পরম আনন্দের বিষয় হলো, রাষ্ট্রীয় জীবনে কোরআনের আইনকে পরাজিত অবস্থায় দেখা। আল্লাহর এরূপ প্রচন্ড বিপক্ষ শক্তির মোকাবেলায় সরাসরি তাদের সামনে দাঁড়িয়ে তাদেরই হাতে প্রাণ দেয়ার চেয়ে মুসলমানের জীবনে গৌরবজনক আর কি থাকতে পারে? যারা এভাবে প্রাণ দেয়, তারা মৃত্যুহীন প্রাণ পায়। সাহাবাগণ তো মহান আল্লাহর কাছে সবেচেয়ে প্রিয় ও সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষের সম্মান পেয়েছেন ইসলামের শত্রুদে হাতে এরূপ প্রাণদানের মধ্য দিয়ে। বাকশালী কীটগুলো কি কখনো শহীদের সে আনন্দের কথা অনুধাবন করতে পারে?

ইসলামের দুষমনদের কাছে শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদন্ডের শাস্তিও পছন্দ হয়নি। ফাঁসির দাবী নিয়ে তারা ঝাঁপিয়ে পড়েছে তাই রাজপথে। বাংলাদেশে যারা ভারতীয় কাফের শক্তির মূল এজেন্ট,তিনি ছিলেন তাদের পরম শত্রু।চরমচক্ষুশূল ছিলেন নাস্তিক ব্লগারদেরও।আল্লাহ ও রাসূলের বিরুদ্ধবাদী এসব বিদ্রোহীরা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় তাঁর মৃত্যুর দাবি নিয়ে শাহাবাগের মোড়ে দিনের পর দিন মিটিং করেছে। মূল দ্বন্দটি এখানে ইসলামের শত্রুপক্ষের সাথে শরিয়তের প্রতিষ্ঠাকামীদের। সে লড়াইয়ে জনাব আব্দুল কাদের মোল্লা ছিলেন ইসলামের পক্ষের শক্তির বিশিষ্ঠ নেতা। এমন এক লড়াই প্রান দেয়ার অর্থ,নিঃসন্দেহে শহীদ হওয়া। জনাব আব্দুল কাদের মোল্লা তাই শহীদ। তাকে মৃত বলাই হারাম। কারণ এমন শহীদদের মৃত বলতে নিষেধ করেছেন খোদ মহান আল্লাহতায়ালা। ফলে তাঁর জন্য এটি এক বিরাট পাওয়া।তার জীবনে সবচেয়ে বড় গৌরবটি হলো,নির্ঘাত মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়েও কোন মানুষের কাছে তিনি জীবন ভিক্ষা করেননি, কোন সাহায্যও চাননি। আল্লাহর পথে নির্ভয়ে জীবন দিয়ে তিনি গেয়ে গেলেন মহান আল্লাহতায়ালারই জয়গান। এ এক পরম সৌভাগ্য।

 

পরিকল্পিত খুন যেখানে রাষ্ট্রীয় শিল্প

কোন দেশ স্বৈরাচারি দুর্বৃত্তদের দ্বারা অধিকৃত হলে সে দেশে সবচেয়ে অসম্ভব হয়ে পড়ে ন্যায়বিচার। পরিকল্পিত খূন তখন রাষ্ট্রীয় শিল্পে পরিণত হয়। সে খূনের শিল্পে কারখানায় পরিণত হয় দেশের আদালত। ফিরাউন-নমরুদ, হালাকু-চেঙ্গিস, হিটলারের আমলে তাই ন্যায়বিচার মেলেনি। স্বৈরাচারি ফিরাউনের কাছে আল্লাহর রাসূল হযরত মুসা (আঃ)ও হত্যাযোগ্য গণ্য হয়েছে। হত্যাযোগ্য গণ্য হয়েছে বনি ইসরাইলের নিরপরাধ শিশুরাও। এরূপ স্বৈরাচারি শাসকই হযরত ঈসা (আঃ)কে শূলে চড়িয়ে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিল। ন্যায়বিচার অসম্ভব হয়েছিল বাকশালী মুজিবের আমলেও। মুজিবের আমলে ৩০ থেকে ৪০ হাজার মানুষকে বিনা বিচারে হত্যা করা হয়েছে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে। কিন্তু সে ভয়ানক অপরাধের অভিযোগে কাউকে কি আদালতে তোলা হয়েছে? বরং এসব খুনিদের আদালত সফল প্রটেকশ দিয়েছে। বরং স্বৈরাচারি খুনিদের প্রটেকশন দেয়াটিই দেশের আইনে পরিণত হয়েছে। সেরূপ আইনী প্রটেকশন নিয়েই সিরাজ সিকদারের খুনের পর শেখ মুজিব “কোথায় আজ সিরাজ সিকদার?” বলে সংসদে দাঁড়িয়ে আত্মপ্রসাদ জাহির করেছেন। এমন আচরণ কি কোন সুস্থ্ মানুষ করতে পারে? এটি তো মানসিক অসুস্থদের কাজ। নিষ্ঠুর মানবহত্যাও যে এসব অসুস্থ্য ব্যক্তিদের কতটা আনন্দ দেয় এ হলো তার নমুনা। আব্দুল কাদের মোল্লার খুন নিয়ে শেখ হাসিনা ও তার রাজনেতিক দোসরদের প্রচন্ড উৎসবের কারণ তো এরূপ মানসিক অসুস্থতা। সে অসুস্থ্যতা নিয়ে তারা রাজপথে উৎসবেও নেমে এসেছে। এরূপ অসুস্থ্ মানুষেরা ক্ষমতায় গেলে বা রাজনীতিতে স্বীকৃতি ও বৈধতা পেলে দেশে গুম,খুন, নির্যাতন ও নানারূপ অপরাধ বাড়ে। স্বৈরাচারি শাসনের এ হলো বড় আযাব। অথচ দেশে শরিয়ত প্রতিষ্ঠা পেলে শাসককেও তখন কাজীর সামনে খাড়া হতে হয়। খলিফা উমর (রাঃ)র ন্যায় ব্যক্তির ক্ষেত্রেও তাই ব্যতিক্রম ঘটেনি।

স্বৈরাচারি শাসকেরা পেশাদার খুনিদের দিয়ে শুধু যে পেটুয়া পুলিশ বাহিনী ও সেনাবাহিনী গড়ে তোলে তা নয়, তাঁবেদার আদালতও গড়ে। তখন দলীয় ক্যাডার বাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর পাশাপাশি এসব আদালতের বিচারকদেররও প্রধান কাজটি হয় সরকারের রাজনৈতিক শত্রুদের হত্যা করা। সে হত্যাকান্ডগুলোকে তখন ন্যায় বিচারের পোষাক পড়ানো হয়। এসব বিচারকদের লক্ষ্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা নয়। প্রকৃত অপরাধিদের শাস্তি দেয়াও নয়। বাংলাদেশে প্রতিদিন বহু মানুষ খুন হচ্ছে। বহু মানুষ গুম হচ্ছে। বহনারী ধর্ষিতাও হচ্ছে। কিন্তু সেসব খুন, গুম ও ধর্ষণের কি বিচার হচ্ছে? শাপলা চত্বরে বহু মানুষ নিহত হলো, বহুশত মানুষ আহতও হলো। রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ হলো,বহুহাজার কোটি টাকা লুট হলো শেয়ার বাজার থেকে। মন্ত্রীদের দূর্নীতির দায়ে বিশ্বব্যাংকের বরাদ্দকৃত পদ্মাব্রিজের বিশাল অংকের ঋণ বাতিল হয়ে গেল। এগুলির সবই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু এসব অপরাধ নিয়ে কি অপরাধীদের বিরুদ্ধে আদালতে কোন মামলা হয়েছে? সে মামলায় কি কারো শাস্তি হযেছে? বিচারকদের কি তা নিয়ে কোন মাথাব্যাথা আছে? এসব খুনি ও অপরাধিদের বিচার নিয়ে সরকারের মাথা ব্যাথা না থাকার কারণটি বোধগম্য।কারণ স্বৈরাচারি সরকারের তারা রাজনৈতিক শত্রু নয়। বরং তারা সরকারের নিজস্ব লোক। ফলে তাদের বিচার নিয়ে সরকারের যেমন মাথা নেই, তেমনি মাথাব্যাথা নাই বিচারকদেরও। একই কারণে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১৯৫ জন অভিযুক্ত সদস্যদের বিচারেও শেখ হাসিনার আগ্রহ নেই। আদালতের ব্যস্ততা বরং হাসিনা সরকারের রাজনৈতিক শত্রুদের ফাঁসি দেয়া নিয়ে ব্যস্ত। আব্দুল কাদের মোল্লার হত্যাটি তাই হাসিনা সরকারের পক্ষ থেকে যেমন প্রথম হত্যা নয়, তেমনি শেষ হত্যাও নয়। হাসিনা সরকার টিকে থাকলে এ হত্যাকান্ড যে আরো তীব্রতর হবে সে আলামতটি সুস্পষ্ট।

 

খুনের লক্ষ্যে সাঁজানো হলো আদালত

ডাকাত দলের সর্দার সবচেয়ে নিষ্ঠুর খুনিদের দিয়ে তার ডাকাত দলকে সাঁজায়। তেমনি দুর্বৃত্ত স্বৈরাচারি শাসকও সরকারের প্রতিটি বিভাগকে সবচেয়ে পরিপক্ক দুর্বৃত্তদের হাতে তুলে দেয়। কারণ ভাল মানুষদের দিয়ে যেমন ডাকাত দলা গড়া যায় না, তেমনি তাদের দিয়ে স্বৈর-শাসনও চলে না। স্বৈর-শাসনের দুর্বৃত্তায়ান প্রকল্পটি তাই শুধু দেশের পুলিশ, প্রশাসন বা দলীয় কর্মীবাহিনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং সে নীতির প্রকাপ পড়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালতেও। বিচারকের আসনগুলি তখন খুনিদের দখলে চলে যায়। অস্ত্রের সাথে বিচারকের কলমও তখন হত্যাকর্মে লিপ্ত হয়। ফলে স্বৈরাচারি শাসনামলে রাজপথে মিটিং-মিছিল করা বা পত্র-পত্রিকায় স্বাধীন মতামত প্রকাশ করাই শুধু কঠিন নয়, অসম্ভব হয়ে পড়ে ন্যায়বিচার পাওয়াও। তখন নিরপরাধ মানুষদের ফাঁসীতে ঝুলানো ব্যবস্থা করা হয়। মিসরে স্বৈরাচারি জামাল আব্দুন নাসেরে আমলে তাই সৈয়দ কুতুবের ন্যয় বিখ্যাত মোফস্সেরে কোরআনকে ফাঁসীতে ঝোলানো হয়েছে। আর আজ কাঠগড়ায় তুলেছে সে দেশের ইতিহাসে সর্বপ্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ড. মুরসীকে। অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে তুরস্কেও। সেদেশের স্বৈরাচারি সামরিক জান্তারা নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রি আদনান মেন্দারাসকে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছিল। ইসলামি চেতনার অভিযোগে জেলে তুলেছে প্রধানমন্ত্রী নাযিমুদ্দীন আরবাকেনকে। আর আজ বাংলাদেশে ফাঁসিতে ঝুলানোর হলো আব্দুল কাদের মোল্লাকে। ফাঁসিতে ঝুলানোর ষড়যন্ত্র হচ্ছে আরো বহু ইসলামি ব্যক্তিকেই। হিংস্র নেকড়েগণ সমাজে বেঁচে থাকলে শিকার ধরবেই। সেটিই স্বাভাবিক। তাই সভ্য মানুষদের দায়িত্ব হলো নেকড়ে নির্মূল। এছাড়া সমাজে শান্তি আসে না। এ নির্মূল কাজে জিহাদ হলো ইসলামের হাতিয়ার। নামায রোযার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত বলা হয়েছে জিহাদকে।জীবনে প্রতি মাস ও প্রতিটি দিন রোযা রেখে বা প্রতিটি রাত ইবাদতে কাটিয়েও কেউ কি মৃত্যুর পর অমরত্ব পায়? সমাজে ও আল্লাহর কাছে সে মৃত রূপেই গণ্য হয়। কিন্তু জিহাদে মৃত্যু ঘটলে সে শহীদ ব্যক্তিকে মৃত বলাটি গুরুতর গুনাহ। কারণ, পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা তাঁকে মৃত বলতে নিষেধ করেছেন, হুকুম দিয়েছেন জীবিত বলতে। তাই কোন শহীদকে মৃত বললে সে হুকুমের অবাধ্যতা হয়।পবিত্র কোরআনের সে হুকুমটি হলোঃ “এবং আল্লাহর রাস্তায় থাকার কারণে যাদেরকে কতল করা হয়েছে তোমরা তাদেরকে মৃত বলো না। বরং তারা তো জীবিত,যদিও তোমরা সেটি অনুধাবন করতে পারো না।” –সুরা বাকারা।

কে কতটা মানুষ না অমানুষ, সভ্য বা অসভ্য -সেটি পোষাক-পরিচ্ছদ বা চেহরা-সুরতে ধরা পড়ে না। ধরা পড়ে ন্যায়-অন্যায়ের বিচারবোধ থেকে। সে বিচার বোধ চোর-ডাকাত ও খুনিদের থাকে না। সে বিচারবোধটি না থাকার কারণেই ভয়ানক অপরাধও তাদের কাছে অপরাধ গণ্য হয় না। এটি হলো তাদের মনের অসুস্থ্যতা, সে সাথে অসভ্যতাও। সভ্য সমাজে এজন্যই এসব অসুস্থ্য ও অসভ্যরা চোর-ডাকাত-খুনি রূপে চিহ্নিত হয়। তেমনি একটি দেশ কতটা অপরাধীদের দ্বারা অধিকৃত সেটিও ধরা পড়ে সে দেশের আদালতের বিচার-আচারের মান থেকে। সভ্যদেশে তাই অতি ন্যয়নিষ্ঠ ও বিচারবোধ-সম্পন্ন ব্যক্তিদেরকে আদালতের বিচারক বানানো হয়। কিন্তু বাংলাদেশে সেটি ঘটেনি। কীরূপ অপরাধিদের দিয়ে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতকে সাঁজিয়েছে তার কিছু একটি বিবরণ দেয়া যাক। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের এক বিচারক হলেন সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। জামায়াত নেতা জনাব আব্দুল কাদের মোল্লাকে ফাঁসীতে ঝোলানোর জন্য যে পাঁচজন বিচারককে নিয়ে এই মামলার বেঞ্চ গঠন করা হয়েছে, তাদের একজন হলেন এই সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। জামায়াত নেতাদের হত্যায় এই সুরেন্দ্র বাবুর আগ্রহ এতটাই তীব্র যে Skype scandal-এ জড়িত ট্রাইবুনালের অপর বিচারপতি নাজমুলকে তিনি বলেছেন, “তিনটা ফাঁসির রায় দাও তাহলে তোমাকে আমরা সুপ্রীম কোর্টে নিয়ে আসতেছি”। একথা বিচারপতি নাজমুল তার ব্রাসেলস্থ বন্ধুকে স্কাইপী যোগে বলেছেন। পত্রিকায় সে সংলাপটি হুবহু প্রকাশও পেয়েছে। সুরেন্দ্র কুমার সিনহা তাই বিচার চান না, চান ফাঁসির রায়। এ কথা বলার অপরাধে যে কোন সভ্য দেশের আদালতে তার ন্যায় বিচারকের লেবাসধারি অপরাধীর কঠোর শাস্তি হতো। এবং অসম্ভব করা হতো বিচারকের আসনে বসা। কিন্তু বাংলাদেশে সেটি হয়নি। বরং তার এ খুনি মানসিকতার কারণেই হাসিনার কাছে তার কদর বেড়েছে। আব্দুল কাদের মোল্লার ন্যায় নিরাপরাধ মানুষকে ফাঁসিতে ঝোলানাো জন্য তো বিচারকের আসনে এমন নীতিহীন ও বিবেকহীন তাঁবেদার বিচারকই চাই। এজন্যই তার স্থান মিলেছে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতে। তেমনি আরেক বিচারক হলেন শামসুদ্দিন মানিক। অশালীন আচরণে ও বিতর্কিত বিচারকার্যে তিনি রেকর্ড গড়েছেন। তার বিরুদ্ধে বহু সিনিয়র আইনজীবী যেমন অভিযোগ তুলেছে তেমনি বহুশত পৃষ্ঠার প্রমানসহ অভিযোগনামা দাখিল করেছে বহু সাংবাদিক। কিন্তু কারো অভিযোগকে শেখ হাসিনা গুরুত্ব দেননি। কারণ, বিচারকের আসনে তার চাই তাঁবেদার আওয়ামী ক্যাডার। শেখ হাসিনা তাকে হাইকোর্ট থেকে উঠিয়ে সুপ্রীম কোর্টে বসিয়েছেন। এবং সেখান থেকে তুলে এনে আব্দুল কাদের মোল্লার মামলার আপিল ডিভিশানে বসিয়েছেন। কারণ, সে আওয়ামী লীগের ক্যাডার এবং আব্দুল কাদের মোল্লার মত নিরাপরাধ ব্যক্তিদের ফাঁসিতে ঝোলাতে সে আপোষহীন।

 

আইন বদলানো হলো স্রেফ খুনের স্বার্থে

ট্রাইবুনাল প্রথমে আব্দুল কাদের মোল্লাকে ফাঁসি দেয়নি, দিয়েছিল যাবজ্জীবন কারাদন্ড। তাঁকে ফাঁসি দিতে প্রয়োজন ছিল আইনের পরিবর্তন। সরকার তাঁর ফাঁসি দিতে এতটাই দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিল যে সেটি সম্ভব করতে প্রচলিত আ্ইনে ইচ্ছামত পবিবর্তন এনেছে। অথচ আন্তুর্জাতিক আইনে রীতিবিরুদ্ধ। শুধু তাই নয়, আপিলের সুযোগ থেকে্ও তাঁকে বঞ্চিত করা হযেছিল। সরকারের যুক্তি, আব্দুল কাদের মোল্লা একজন যুদ্ধাপরাধী, সে কারণে তাঁর জন্য আপিলের সুযোগ নেই। আব্দুল কাদের মোল্লার মামলা প্রসঙ্গে এ্যামনেস্ট্রি ইন্টারন্যাশন্যালের বক্তব্যঃ “This is the first known case of a prisoner sentenced to death directly by the highest court in Bangladesh. It is also the first known death sentence in Bangladesh with no right of appeal. Death sentence without right of judicial appeal defies human rights law.”

বিচারে যে কতটা অবিচার হযেছে সেটিও দেখা যাক। যে সাক্ষীর কথার উপর ভিত্তি করে আব্দুল কাদের মোল্লাকে হত্যা করা হলো তার নাম মোমেনা বেগম। মোমেনা বেগম অন্যদের কাছ থেকে শুনেছে যে, যারা তার পরিবারের অন্যদের হত্যা করেছে তার মধ্যে কাদের মোল্লা বলে একজন ছিল। কিন্তু সে নিজে সে অভিযুক্ত কাদের মোল্লাকে স্বচোখে কখনোই দেখেনি। প্রশ্ন হলো বাংলাদেশে বহু গ্রামে ও বহু মহল্লায় কাদের মোল্লা বলে কেউ থাকতেই পারে। হয়তো সে সময় মীরপুরেও এমন কাদের মোল্লা একাধিক ছিল। কিন্তু সে যে ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার আমিরাবাদ গ্রামের মরহুম সানাউল্লা মোল্লার ছেলে আবদুল কাদের মোল্লা -সে খবর কি মীরপুরের এই মোমেনা বেগম জানতো? সামনা সামনি খাড়া করলে কি তাঁকে চিনতে পারতো? যে কোন খুনের মামলার সাক্ষিকে তার অভিযুক্ত আসামীকে লাইনে দাড়ানো অনেকে মধ্য থেকে খুঁজে বের করতে হয়। অথচ যারা তাঁকে ফাঁসি দিল তারা তা নিয়ে তদন্তের সামান্যতম প্রয়োজনও মনে করেনি। তারা শুধু কাদের মোল্লার নামের মিলটিই দেখেছে। সেটিকে একমাত্র দলীল রূপে খাড়া করে ফরিদপুরের আমিরাবাদ গ্রামের আব্দুল কাদের মোল্লাকে ফাঁসিতে চড়ালো।

বিচারকগণ এটুকুও ভেবে দেখেনি, মীরপুরে খুনের ঘটনাটি ঘটেছে ২৫শের মার্চের কিছুদিন পর এপ্রিলের প্রথম দিকে। সে সময় আব্দুল কাদের মোল্লা কেন ঢাকাতে থাকতে যাবে? ঢাকাতে তাঁর কি কোন চাকুরি ছিল? তাঁর পিতার কি কোন বাড়ি ছিল? ঢাকায়  যাদের চাকুরি ও ঘরবাড়ি ছিল তারাও তো সে দুর্যোগ মুহুর্তে ঢাকা ছেড়ে মফস্বলে চলে যায়। আব্দুল কাদের মোল্লা তখন ছাত্র। এপ্রিলে ঢাকার কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কি খোলা ছিল? অতএব সে সময় ঢাকায় অনর্থক থাকার কি কোন কারণ থাকতে পারে? অপরদিকে মোমেনা বেগম মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর, মিরপুর জল্লাদখানা, আর আদালত -এই তিন জায়গায় তিন রকম কথা বলেছে। আদালতে আসার আগে অনেকগুলো সাক্ষাতকার দিলেও একবারের জন্যও আব্দুল কাদের মোল্লার নাম নেয়নি। ২০০৭ সালে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর কর্তৃপক্ষের কাছে দেয়া জবানবন্দীতে এই মামলার প্রধান সাক্ষী মোমেনা বেগম নিজের মুখে বলেন, হযরত আলী লষ্কর পরিবারের হত্যাকান্ডের দুইদিন আগে তিনি শ্বশুড়বাড়ি চলে যাওয়ায় প্রানে বেঁচে যান! অথচ ২০১২ তে কোর্টে এসে বলে, ঘটনার সময় সে উপস্থিত ছিল। এমন মিথ্যুকের কথায় কোন সভ্য দেশে কি কারো ফাঁসি হয়?

 

আদালত অধিকৃত অপরাধীদের হাতে

প্রতিটি খুনের মামলায় আদালতের মূল দায়িত্ব হলো খুনের মটিভটি খুঁজে বের করা। কোন সুনির্দিষ্ট মটিভ ছাড়া কেউ কাউকে খুন করা দূরে থাক,পাথরও ছুঁড়ে না। প্রতিটি খুনের পিছনে যেমন খুনি থাকে, তেমনি সে খুনির মটিভও থাকে। জনাব আব্দুল কাদের মোল্লা কোন পেশাদার খুনি নন,ফলে মানুষ খুন করা তার পেশা নয়। অথচ তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে তিন হাজার মানুষ হত্যার। অথচ তার বয়স তখন মাত্র ২২। সেটি হলে তো মানুষ খুনের কাজটি ফরিদপুরের সদরপুর থেকেই আরো অল্প বয়সে শুরু করতেন। তাছাড়া মানুষ খুনে তিনি কেন ঢাকার মীরপুরে আসবেন? কেনই বা সেটি মোমেনা বেগমের পরিবারে? কেন এত বড় খুনির হাতে তার নিজ এলাকায় কোন লাশ পড়লো না? কারণ খুনিরা যেখানে যায় সেখানেই তো তার নিজ খাসলতটা সাথে নিয়েই যায়। তাছাড়া তিনি একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তার খুনও তাই রাজনৈতিক হওয়াটাই স্বাভাবিক। অথচ মোমেনা বেগমের পিতা ও তার পরিবারটি রাজনৈতিক দিক দিয়েও তেমন কেউ নন। ফলে এ খুনের মটিভটি রাজনৈতিকও নয়। আদালতের দায়িত্ব,এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা।ব্যবসা-বানিজ্য বা অন্য কোন কারণে মোমেনা বেগমের পরিবারের সাথে আব্দুল কাদের মোল্লার বিবাদ ছিল -আদালত সে প্রমাণও হাজির করতে পরিনি।

একাত্তরের মার্চে ও এপ্রিলে হাজার হাজার বাঙালী ও বিহারি মারা গেছে নিছক ভাষা ও বর্ণগত ঘৃণার কারণে।সে বীভৎস হত্যাকান্ডগুলো যেমন বাঙালীদের হাতে হয়েছে তেমনি বিহারিদের হাতেও হয়েছে।তেমন হত্যাকান্ডে জড়িত হওয়ার জন্য তো ভাষা,বর্ণ ও আঞ্চলিক পরিচয় নিয়ে অতি উগ্র,সহিংস ও অসুস্থ মন চাই। তেমন অসুস্থ মনের খুনিরা সবচেয়ে বেশী সংখ্যায় গড়ে উঠেছিল শেখ মুজিব ও তার দল আওয়ামী লীগের হাতে। সে উগ্র সহিংসতাকে প্রবল করাই ছিল তাদের শেখ মুজিবের রাজনীতি।তাদের সংখ্যা ছিল সহিংস বিহারীদের চেয়ে বহু শতগুণ বেশী। সে কারণেই একাত্তরে বাঙালীদের চেয়ে বেশী মারা গেছে বিহারীরা। তাদেরকে ঘরবাড়ি ও দোকানপাট থেকে নামিয়ে রাস্তায়ও নামানো হয়েছে। আওয়ামী লীগারদের হাতে একাত্তরে হাজার হাজার বিহারী হত্যার বীভৎ বিবরণ পাওয়া যায় শর্মিলা বোসের ইংরেজীতে লেখা “ডেথ রেকনিং” বইয়ে। লগি বৈঠা নিয়ে এরাই নিরপরাধ মানব হত্যাকে ঢাকার রাজপথে উৎসবে পরিণত করেছে। শাহবাগ মোড়ে এরাই জামায়াত শিবির কর্মীদের লাশ নিয়ে সকাল বিকাল নাশতা করার আস্ফালন করে। আজও  সেসব খুনিদের হাতে শাপলা চত্বরসহ বাংলাদেশের নানা জনপদ রক্তলাল হচ্ছে।প্যান-ইসলামিক চেতনায় পরিপুষ্ট আব্দুল কাদের মোল্লার তেমন মানসিক অসুস্থতা ও সহিংসতা থাকার কথা নয়। তাছাড়া তেমন রোগ থাকলে তিনি বাঙালীদের উপর নয়,বিহারীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তেন।সেটি হলে শুধু মীরপুরে নয়,এবং শুধু একাত্তরেই নয়,বার বার বহুস্থানেই তার হাতে বহু মানুষ লাশ হতো। বিচারকদের উচিত ছিল গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়গুলো বিবেচনায় আনা। আর সেটি না আনাই তো বিচারকের অপরাধ। সে কাজটি হলে বিচারকগণ হত্যার মটিভ খুঁজে পেতেন। ন্যায়বিচারেও সফল হতেন। কিন্তু আদালত তাতে পুরাপুরি ব্যর্থ হয়েছে। লক্ষণীয় হলো,আদালতের বিচারকগণ এ বিষয়গুলোর বিচার-বিবেচনায় কোন আগ্রহই দেখাননি। তাদের বিচারে একটি মাত্র আগ্রহই বার বার গুরুত্ব পেয়েছে তা হলো,আব্দুল কাদের মোল্লা,মাওলানা দিলাওয়ার হোসেন সাঈদী ও মাওলানা আবুল কালাম আযাদের মত ব্যক্তিদের দ্রুত হত্যা করা। এবং সে হত্যাকান্ডের উপর আদালতের পক্ষ থেকে ন্যায়বিচারের লেবাস চাপিয়ে দেয়া। ফিরাউন-নমরুদ,হালাকু-­চেঙ্গিজ ও হিটলারের সময় তো অবিকল তাই হয়েছে। বিচারপতি নাজমুলের স্কাইপি সংলাপে তো সে বিষয়টিই প্রকাশ পেয়েছে। দেশের সরকার ও তার প্রশাসন,পুলিশ,র‌্যাবই শুধু নয়,আদালতগুলিও যে কতটা অসুস্থ,অযোগ্য ও অপরাধী মানুষের দ্বারা অধিকৃত -সেটি কি এরপরও বুঝতে বাঁকি থাকে?

শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লা যুদ্ধকালীন পুরো সময়ে যে বাড়িতে লজিং ছিলেন তার বিবরণ তিনি আদালতকে দিয়েছেন । সে সময় ঐ লজিং বাড়ীতে তিনি দুই মেয়েকে পড়াতেন।  তাদের একজনের স্বামী এখন সরকারেরই কর্মকর্তা। ট্রাইবুনাল ঐ পরিবারের কাউকেই, বিশেষ করে ঐ দুই মেয়েকে আদালতে সাক্ষী রূপ হাজির হতে দেয়নি। শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লাই যদি “কসাই কাদের” হয়ে থাকে তবে যে “তিন হাজার মানুষকে হত্যা করেছে” বলে ট্রাইবুনাল বিশ্বাস করে, কীভাবে সম্ভব সে এই কসাই কাদের মোল্লাই যুদ্ধের পরপরই ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে শহীদুল্লাহ হল’র আবাসিক ছাত্র রূপে অধ্যয়নের সুযোগ পেল? বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি লাভের পর কী রূপে তিনি উদয়ন স্কুলে শিক্ষক রূপে নিযুক্তি পান? কী রূপে তিনি বাংলাদেশ রাইফেলস স্কুল এন্ড কলেজে শিক্ষকতা করেন? ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের ভাইস প্রেসিডেন্ট রূপেই বা তিনি কীরূপে দুইবার নির্বাচিত হন? 

 

বিচারমুক্ত খুনি

সাধারণ মানুষেরা অপরাধ করলে তার শাস্তি হয়। কখনো কখনো আদালত তাদের বিরুদ্ধে ফাঁসির হুকুমও শোনায়। কোর্ট মার্শাল হয় সামরিক বাহিনীর অফিসারদের। কিন্তু বাংলাদেশের আদালতের বিচারকরূপী খুনিরা বিচারমুক্ত। অথচ আদালতের অঙ্গণে ভয়ানক অপরাধিরাও যে আছে -সে প্রমাণ তো প্রচুর। স্কাইপি সংলাপের মাধ্যেমে জনগণের সামনে তো সেটি প্রকাশও পেযেছে। প্রকাশ পেয়েছে আব্দুল কাদের মোল্লা, মাওলানা আবুল কালাম আযাদ ও মাওলানা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর বিরুদ্ধে দেয়া রায়তেও। শুধু কি চোরডাকাতের শাস্তি দিলে দেশে শান্তি আসে? দেশের অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হলো আদালত। আদালতের বিচারকের আসনে বসেছেন খোদ নবী-রাসূলগণ। অথচ বাংলাদেশে অতি গুরুত্বপূণ এ প্রতিষ্ঠানটি অধিকৃত হয়ে আছে সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, সামছুদ্দীন মানিক ও নাজমুলের মত নীতিহীন ও বিবেকহীন ব্যক্তিদের হাতে। একটি দেশে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়টি ঘটে যদি দেশের বিচার ব্যবস্থা দুর্বৃত্তদের হাতে অধিকৃত হয়ে যায়। তাদের বিচারে তখন ভয়ানক অপরাধিরাও মুক্তি পেয়ে যায়, আর ফাঁসিতে ঝুলাতে হয় নিরপরাধ ব্যক্তিদের। তাছাড়া মুসলমানের ক্ষেত্রে সে দায়ভারটি আরো বেশী। কারণ, ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের নির্মূল তো মুসলমানের জীবনে আল্লাহ নির্ধারিত মিশন। সেটি না হলে সমাজে ইসলাম বাঁচে না। তেমনি মুসলিম রূপে বেড়ে উঠাও যায় না।অথচ দুর্বৃত্ত বিচারকগণ ইসলামের সে মহান মিশনটিকেই ব্যর্থ করে দেয়। তাদের যুদ্ধ তো খোদ আল্লাহর বিরুদ্ধে। শুধু চোরডাকাতদের অপরাধ নিয়ে বিচার বসলে দেশে শান্তি আসবে না। বিচারের কাঠগড়ায় খাড়া করতে হবে এসব দৃর্বৃত্ত বিচারকদেরও। চোর-ডাকাতদের চেয়েও তাদের অপরাধটি তো বেশী। চোর-ডাকাতগণ কিছু লোকের সম্পদ কেড়ে নেয়। আর দুর্বৃত্ত বিচারকগণ কেড়ে নেয় সুবিচার ও শান্তি। ইসলামের তাদের শাস্তিটা তাই কঠোর।

কিন্তু বাংলাদেশে বিচারকদের অপরাধগুলো সনাক্ত করার যেমন কোন লোক নেই, তেমনি তাদের শাস্তি দেয়ারও কেউ নাই। বরং তারাই যেন দেশের একমাত্র সার্বভৌম শক্তি। কোনটি ন্যায় আর  কোনটি অন্যায়, কোনটি পবিত্র আর কোনটি অপবিত্র সে রায়টিও এখন তারা দেয়া শুরু করেছে। সকল দলের নেতারা মিলে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রথাটি গ্রহণ করলো, আদালতের এক বিচারক সেটিকে বেআইনী বলে ঘোষিত করলেন। আর সে রায়ের মাধ্যমে দেশকে উপহার দেয়া হলো এক রাজনৈতিক মহাসংকট। আদালত ভাষা আন্দোলনে নিহতদের স্মৃতি স্তম্ভকেও পবিত্র রূপে ঘোষণা দিয়েছে। অথচ কোনটি পবিত্র আর কোনটি অপবিত্র -সেটি ধর্মীয় বিষয়। আদালতের বিচারকদের তা নিয়ে নাকগলানোর কিছু নাই। অথচ বাংলাদেশে বিচারকদের সেক্ষেত্রেই পদচারণা। যে কোন প্রতিষ্ঠান মাত্রই যে অপরাধীদের দ্বারা অধিকৃত হতে পারে -সেটি যেন বাংলাদেশের আদালতের বিচারকদের বেলায় চলে না। এমন একটি দুষিত ধারণার কারণেই বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা সবচেয়ে ব্যর্থ।

 

গণবিপ্লবের পথে দেশ

বাংলাদেশের জনগণের পিঠ এখন দেয়ালে ঠেকে গেছে। মুক্তিকামী মানুষের কাছে দুর্বৃত্তশাসন নীরবে সয়ে যাওয়ার দিন এখন শেষ। সময় এসেছে খুনিদের শাস্তি দেয়ার। প্রেক্ষাপট এখন গণবিপ্লবের। এ গণবিপ্লবের মালিকানা জনগণ এখন নিজ হাতে নিয়ে নিয়েছে। ফলে শত শত নেতা ও কর্মীদের গ্রেফতার করেও সরকার এ আন্দোলন আর থামাতে পারছে না। বরং যতই বাড়ছে গ্রেফতারের সংখ্যা, আন্দোলন ততই তীব্রতর হচ্ছে। এখন এটি শুধু আর রাজনীতি নয়। নিছক ভোট যুদ্ধও নয়, বরং পরিণত হয়েছে ইসলামি জনতার পবিত্র জিহাদে। বাংলাদেশ যে ইসলামের দুষমনদের হাতে অধিকৃত ভূমি সেটি জনগণের কাছে আজ আর গোপন বিষয় নয়। হাসিনা সরকার যে শুধু গণতন্ত্রের শত্রু -তা নয়। ভয়ানক শত্রু ইসলামেরও। মুর্তিপুজারিদের কাছে মহান আল্লাহ ও তাঁর ইবাদতের কোন গুরুত্ব নাই। বরং তাদের কাছে উপসনাযোগ্য হলো তাদের নিজহাতে গড়া মুর্তি। আল্লাহর অবাধ্যদের কাছে তেমনি পবিত্র নয় মহান আল্লাহর পবিত্র কোরআন। তাদের কাছে বরং পবিত্র হলো নয় নিজেদের রচিত শাসনতন্ত্র। নিজেদের প্রতিষ্ঠিত কায়েমী স্বার্থকে সুরক্ষা দেয়ার জন্যই তারা রচনা করেছে এ শাসনতন্ত্র। আর সে শাসনতন্ত্রের দোহাই দিয়ে যেমন নির্দেলীয় সরকারের বিরোধীতা করছে, তেমনি দেশকে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের দিকে ধাবিত করছে। আল্লাহর বিরুদ্ধে তাদের বিদ্রোহ এতটাই প্রকট যে, শাসনতন্ত্রে তারা মহান আল্লাহর উপর আস্থার বানিটিও তারা বিলুপ্ত করেছে।

 

মুমিনের জীবনে বাধ্যবাধকতা

মুসলমান হওয়ার সাথে প্রতিটি ঈমানদারের উপর কিছু অলংঘনীয় বাধ্যবাধকতা এসে যায়। সেটি আল্লাহর হুকুমের প্রতি সদাসর্বদা আনুগত্য ও মহান আল্লাহর ইজ্জতকে যে কোন মূল্যে সমুন্নত রাখা। তাই কোন দেশে মুসলমানের সংখ্যা বাড়লে সেখানে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের প্রতিষ্ঠাও অনিবার্য হয়ে পড়ে। এবং সে ভূমিতে অতি স্বাভাবিক হয় শরিয়তের প্রতিষ্ঠা। রাজার সৈনিকেরা তার রাজ্য পাহারায় ও তার শাসন বহাল রাখায় যুদ্ধ করে ও প্রয়োজনে প্রাণও্র দেয়। সে কাজের জন্য যেমন মজুরি পায়, তেমনি সৈনিকের মর্যাদাও পায়। রাজার রাজ্য পাহারায় যে সৈনিক যুদ্ধ করে না সে কি সৈনিকের মর্যদা পায়? আর মুসলমানের মর্যাদাটি তো আল্লাহর সৈনিক রূপে। ফলে তাদের দায়বদ্ধতা খোদ মহান আল্লাহতায়ালার প্রতি। তারা আল্লাহর দ্বীনের বিজয়ে ও তার সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠায় যুদ্ধ করে। অর্থ, শ্রম, সময় ও প্রাণও দেয়। প্রতিদানে পায় জান্নাত। কে কতটা ঈমানদার সেটি তো যাচাই হয় আল্লাহর রাস্তায় কে কতটা কোরবানী দিল তা থেকে। মুমিনের জীবনে সে জিহাদ তাই অনিবার্য। মনের গভীরে ঈমান যে বেঁচে আছে সেটি তো বুঝা যায় সে জিহাদ থেকে। প্রাণশূণ্য মানুষের হাত-পা নড়াচড়াশূণ্য হয়। তেমনি ঈমানশূণ্য ব্যক্তির জীবনও জিহাদ শূণ্য হয়। একটি দেশে ইসলাম কতটা বিশুদ্ধ ভাবে বেঁচে আছে সেটি মসজিদে নামাযীর সংখ্যা দেখে বুঝা যায় না। সেটি বুঝা যায় সে সমাজে আল্লাহর শরিয়ত প্রতিষ্ঠায় জিহাদ কতটা চলছে তা থেকে। শয়তানি শক্তির ষড়যন্ত্রের শেষ নাই। ফলে সে ষড়যন্ত্রের মোকাবেলায় মু’মিনের জীবনে জিহাদেরর শেষ নেই। বরং সে জিহাদকেই অব্যাহত রাখাই হলো্ ঈমানদারের জীবনে সবচেয়ে বড় জিম্মাদারি। মুসলমানের জীবনে তাই ইসলামে দাখিল হওয়ার সাথে সাথেই আমরণ জিহাদ শুরু হয়ে যায়। সেটি যেমন সাহাবায়ে কেরামের জীবনে এসেছিল তেমনি এসেছিল তাদের অনুসারিদের জীবনে। ফলে তাদের আমলে শুধু মুসলিম রাষ্ট্রের ভূগোলই বাড়েনি, ইসলামি শরিয়তের প্রতিষ্ঠাও বেড়েছে। অপরদিকে শয়তানি শক্তির টার্গেট হলো, জিহাদ থেকে মুসলমানদের দূরে সরানো। নামায-রোযা পালন নিয়ে তাদের কোন আপত্তি নেই। আপত্তি নেই পীরের দরগাহ, দরগায় জিয়ারত, বা সূফিবাদ নিয়ে। বরং এগুলির পিছনের বিপুল অর্থব্যয়ে তারা রাজী।

 

ইস্যু স্রেফ সরকার পরিবর্তন নয়

মুসলমানের জীবনে তাই বড় ইস্যুটি সরকার পরিবর্তন নয়, সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্যে বার বার নির্বাচনও নয়। বরং সেটি হলো আল্লাহতায়ালার দেয়া শরিয়তের পুরাপুরি প্রতিষ্ঠা। শয়তান তো চায়, নির্বাচন নিয়ে মুসলমানেরা বছরের পর ব্যস্ত থাক। এবং ভূলে থাক শরিয়তের প্রতিষ্ঠার বিষয়টি। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থা এক সুবর্ণ সুযোগ এনে দিয়েছে ইসলামপন্থিদের সামনে। ইসলামের শত্রুপক্ষের দুর্গ এখান ধ্বসে পড়ার পথে। এমুহুর্তে আন্দোলনকে শুধু সরকার পরিবর্তনের আন্দোলনে সীমিত রাখলে সেটি হবে আল্লাহতায়ালা ও দ্বীনের সাথে সবচেযে বড় গাদ্দারি। তাতে ব্যর্থ হয়ে যাবে এ যাবত কালের সকল শহীদদের কোরবানি। নামায-রোযা পালনের দায়িত্ব যেমন প্রতিটি ঈমানদারের, তেমনি রাষ্ট্রের বুকে আল্লাহতায়ালার দ্বীনকে বিজয়ী করার দায়িত্বও প্রতিটি মু’মিনের। রোয হাশরের বিচার দিনে প্রতিটি ঈমানদারকে এ হিসাব অবশ্যই দিতে হবে, মহান আল্লাহর শরিয়তের প্রতিষ্ঠায় তার নিজের কোরবানিটা কত্টুকু?

কোন দেশ শয়তানি শক্তির হাতে অধিকৃত হলে সেখানে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা অসম্ভব হয়ে পড়ে। আর শরিয়তের অনুসরণ ছাড়া কি ইসলাম পালন হয়? পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা বার বার বলেছেন, “যারা আমার নাযিলকৃত আইন অনুযায়ী বিচার কার্য পরিচালনা করে না তারা কাফের, …তারাই যালিম, এবং …তারাই ফাসিক। -(সুরা মাযেদ)।তাই কোনটি মুসলমানের দেশ সেটি মসজিদ মাদ্রাসা দেখে বুঝা যায় না। ভারতের মত কাফের অধ্যুষিত  দেশেও এরূপ মসজিদ-মাদ্রাসার সংখ্যা বিপুল। সেটি বুঝা যায় সেদেশে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা দেখে। অথচ বাংলাদেশে সে কাজটি হয়নি। শহীদের রক্ত উম্মহার জীবনে ঈমানের ট্রানফিউশন ঘটায়। তখন ঈমানে জোয়ার আসে। তাতে বলবান হয় শরিয়ত প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। তাই যে দেশে ভূমিতে যত শহীদ সে ভূমিতে ততই ঈমানের জোয়ার। সেখানে বলবান হয় শরিয়ত প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লার শাহাদত তাই বৃথা যাবে না। তার রক্ত যে বাংলাদেশের মানুষের জীবনে ঈমানের ট্রানফিউশন ঘটাবে সেটি সুনিশ্চিত। তাছাড়া ঈমানদারগণ যখন আল্লাহর রাস্তায় প্রাণ দেয়া শুরু করে সে ভূমিতে তো আল্লাহতায়ালা তার ফেরেশতা প্রেরণ শুরু করেন। ফলে বাংলাদেশে শয়তানের দুর্গের পতন যে অনিবার্য তা নিয়ে কি বিন্দুমাত্র সন্দেহ আছে? ১৩/১২/১৩




বিচারের নামে পরিকল্পিত হত্যাঃ খুনিদের কি শাস্তি হবে না?

আব্দুল কাদের মোল্লার সৌভাগ্য

অবশেষে স্বৈরাচারি শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীরা অতি পরিকল্পিত ভাবে আব্দুল কাদের মোল্লাকে হত্যা করলো। এ হত্যার জন্য হাসিনা সরকার যেমন বিচারের নামে বিবেকহীন ও ধর্মহীন বিচারকদের দিয়ে আদালত বসিয়েছে, তেমনি সে আদালেতে মিথ্যা সাক্ষিরও ব্যবস্থা করেছে। ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করার লক্ষ্যে ইচ্ছামত আইনও পাল্টিয়েছে। ফাঁসী ছাড়া অন্য কোন রায় মানা হবে না -আদালতকে সে হুশিয়ারিটি শোনাতে কোটি কোটি টাকা ব্যায়ে শাহবাগ চত্বরে দলীয় ক্যাডারদের দিয়ে সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে। রাজপথে আওয়ামী-বাকশালীগণ ফাঁসীর যে দাবী তুলেছিল অবশেষে অবিকল সে দাবীই বিচারকগণ তাদের রায়ে লিখলেন। একটি দাঁড়ি-কমাও তারা বাদ দেয়নি।ফাঁসীতে ঝুলানোর জন্য যখন যা কিছু করার প্রয়োজন ছিল, হাসিনা সরকার তার সব কিছু্ই করেছে। তবে জনাব আব্দুল কাদের মোল্লার পরম সৌভাগ্য, মহল্লা খুনী বা সন্ত্রাসীর হাতে তাঁকে খুন হতে হয়নি। রোগজীবাণূর হাতেও তাঁর প্রাণ যায়নি। তাকে খুন হতে হয়েছে ইসলামের এমন এক চিহ্নিত শয়তানি জল্লাদদের হাতে -যাদের রাজনীতির মূল এজেন্ডাই হলো আল্লাহর শরিয়তি বিধানের প্রতিষ্ঠাকে প্রতিহত করা। তাদের কাছে পরম আনন্দের বিষয় হলো, রাষ্ট্রীয় জীবনে কোরআনের আইনকে পরাজিত অবস্থায় দেখা। আল্লাহর এরূপ প্রচন্ড বিপক্ষ শক্তির মোকাবেলায় সরাসরি তাদের সামনে দাঁড়িয়ে তাদেরই হাতে প্রাণ দেয়ার চেয়ে মুসলমানের জীবনে গৌরবজনক আর কি থাকতে পারে? যারা এভাবে প্রাণ দেয়, তারা মৃত্যুহীন প্রাণ পায়। সাহাবাগণ তো মহান আল্লাহর কাছে সবেচেয়ে প্রিয় ও সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষের সম্মান পেয়েছেন ইসলামের শত্রুদে হাতে এরূপ প্রাণদানের মধ্য দিয়ে। বাকশালী কীটগুলো কি কখনো শহীদের সে আনন্দের কথা অনুধাবন করতে পারে?

ইসলামের দুষমনদের কাছে শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদন্ডের শাস্তিও পছন্দ হয়নি। ফাঁসির দাবী নিয়ে তারা ঝাঁপিয়ে পড়েছে তাই রাজপথে। বাংলাদেশে যারা ভারতীয় কাফের শক্তির মূল এজেন্ট,তিনি ছিলেন তাদের পরম শত্রু।চরমচক্ষুশূল ছিলেন নাস্তিক ব্লগারদেরও।আল্লাহ ও রাসূলের বিরুদ্ধবাদী এসব বিদ্রোহীরা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় তাঁর মৃত্যুর দাবি নিয়ে শাহাবাগের মোড়ে দিনের পর দিন মিটিং করেছে। মূল দ্বন্দটি এখানে ইসলামের শত্রুপক্ষের সাথে শরিয়তের প্রতিষ্ঠাকামীদের। সে লড়াইয়ে জনাব আব্দুল কাদের মোল্লা ছিলেন ইসলামের পক্ষের শক্তির বিশিষ্ঠ নেতা। এমন এক লড়াই প্রান দেয়ার অর্থ,নিঃসন্দেহে শহীদ হওয়া। জনাব আব্দুল কাদের মোল্লা তাই শহীদ। তাকে মৃত বলাই হারাম। কারণ এমন শহীদদের মৃত বলতে নিষেধ করেছেন খোদ মহান আল্লাহতায়ালা। ফলে তাঁর জন্য এটি এক বিরাট পাওয়া।তার জীবনে সবচেয়ে বড় গৌরবটি হলো,নির্ঘাত মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়েও কোন মানুষের কাছে তিনি জীবন ভিক্ষা করেননি, কোন সাহায্যও চাননি। আল্লাহর পথে নির্ভয়ে জীবন দিয়ে তিনি গেয়ে গেলেন মহান আল্লাহতায়ালারই জয়গান। এ এক পরম সৌভাগ্য।

 

স্বৈরাচারের আযাবঃ পরিকল্পিত খুন যেখানে শিল্প

কোন দেশ স্বৈরাচারি দুর্বৃত্তদের দ্বারা অধিকৃত হলে সে দেশে সবচেয়ে অসম্ভব হয়ে পড়ে ন্যায়বিচার। পরিকল্পিত খূন তখন রাষ্ট্রীয় শিল্পে পরিণত হয়। সে খূনের শিল্পে কারখানায় পরিণত হয় দেশের আদালত। ফিরাউন-নমরুদ, হালাকু-চেঙ্গিস, হিটলারের আমলে তাই ন্যায়বিচার মেলেনি। স্বৈরাচারি ফিরাউনের কাছে আল্লাহর রাসূল হযরত মুসা (আঃ)ও হত্যাযোগ্য গণ্য হয়েছে। হত্যাযোগ্য গণ্য হয়েছে বনি ইসরাইলের নিরপরাধ শিশুরাও। এরূপ স্বৈরাচারি শাসকই হযরত ঈসা (আঃ)কে শূলে চড়িয়ে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিল। ন্যায়বিচার অসম্ভব হয়েছিল বাকশালী মুজিবের আমলেও। মুজিবের আমলে ৩০ থেকে ৪০ হাজার মানুষকে বিনা বিচারে হত্যা করা হয়েছে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে। কিন্তু সে ভয়ানক অপরাধের অভিযোগে কাউকে কি আদালতে তোলা হয়েছে? বরং এসব খুনিদের আদালত সফল প্রটেকশ দিয়েছে। বরং স্বৈরাচারি খুনিদের প্রটেকশন দেয়াটিই দেশের আইনে পরিণত হয়েছে। সেরূপ আইনী প্রটেকশন নিয়েই সিরাজ সিকদারের খুনের পর শেখ মুজিব “কোথায় আজ সিরাজ সিকদার?” বলে সংসদে দাঁড়িয়ে আত্মপ্রসাদ জাহির করেছেন। এমন আচরণ কি কোন সুস্থ্ মানুষ করতে পারে? এটি তো মানসিক অসুস্থদের কাজ। নিষ্ঠুর মানবহত্যাও যে এসব অসুস্থ্য ব্যক্তিদের কতটা আনন্দ দেয় এ হলো তার নমুনা। আব্দুল কাদের মোল্লার খুন নিয়ে শেখ হাসিনা ও তার রাজনেতিক দোসরদের প্রচন্ড উৎসবের কারণ তো এরূপ মানসিক অসুস্থতা। সে অসুস্থ্যতা নিয়ে তারা রাজপথে উৎসবেও নেমে এসেছে। এরূপ অসুস্থ্ মানুষেরা ক্ষমতায় গেলে বা রাজনীতিতে স্বীকৃতি ও বৈধতা পেলে দেশে গুম,খুন, নির্যাতন ও নানারূপ অপরাধ বাড়ে। স্বৈরাচারি শাসনের এ হলো বড় আযাব। অথচ দেশে শরিয়ত প্রতিষ্ঠা পেলে শাসককেও তখন কাজীর সামনে খাড়া হতে হয়। খলিফা উমর (রাঃ)র ন্যায় ব্যক্তির ক্ষেত্রেও তাই ব্যতিক্রম ঘটেনি।

স্বৈরাচারি শাসকেরা পেশাদার খুনিদের দিয়ে শুধু যে পেটুয়া পুলিশ বাহিনী ও সেনাবাহিনী গড়ে তোলে তা নয়, তাঁবেদার আদালতও গড়ে। তখন দলীয় ক্যাডার বাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর পাশাপাশি এসব আদালতের বিচারকদেররও প্রধান কাজটি হয় সরকারের রাজনৈতিক শত্রুদের হত্যা করা। সে হত্যাকান্ডগুলোকে তখন ন্যায় বিচারের পোষাক পড়ানো হয়। এসব বিচারকদের লক্ষ্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা নয়। প্রকৃত অপরাধিদের শাস্তি দেয়াও নয়। বাংলাদেশে প্রতিদিন বহু মানুষ খুন হচ্ছে। বহু মানুষ গুম হচ্ছে। বহনারী ধর্ষিতাও হচ্ছে। কিন্তু সেসব খুন, গুম ও ধর্ষণের কি বিচার হচ্ছে? শাপলা চত্বরে বহু মানুষ নিহত হলো, বহুশত মানুষ আহতও হলো। রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ হলো,বহুহাজার কোটি টাকা লুট হলো শেয়ার বাজার থেকে। মন্ত্রীদের দূর্নীতির দায়ে বিশ্বব্যাংকের বরাদ্দকৃত পদ্মাব্রিজের বিশাল অংকের ঋণ বাতিল হয়ে গেল। এগুলির সবই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু এসব অপরাধ নিয়ে কি অপরাধীদের বিরুদ্ধে আদালতে কোন মামলা হয়েছে? সে মামলায় কি কারো শাস্তি হযেছে? বিচারকদের কি তা নিয়ে কোন মাথাব্যাথা আছে? এসব খুনি ও অপরাধিদের বিচার নিয়ে সরকারের মাথা ব্যাথা না থাকার কারণটি বোধগম্য।কারণ স্বৈরাচারি সরকারের তারা রাজনৈতিক শত্রু নয়। বরং তারা সরকারের নিজস্ব লোক। ফলে তাদের বিচার নিয়ে সরকারের যেমন মাথা নেই, তেমনি মাথাব্যাথা নাই বিচারকদেরও। একই কারণে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১৯৫ জন অভিযুক্ত সদস্যদের বিচারেও শেখ হাসিনার আগ্রহ নেই। আদালতের ব্যস্ততা বরং হাসিনা সরকারের রাজনৈতিক শত্রুদের ফাঁসি দেয়া নিয়ে ব্যস্ত। আব্দুল কাদের মোল্লার হত্যাটি তাই হাসিনা সরকারের পক্ষ থেকে যেমন প্রথম হত্যা নয়, তেমনি শেষ হত্যাও নয়। হাসিনা সরকার টিকে থাকলে এ হত্যাকান্ড যে আরো তীব্রতর হবে সে আলামতটি সুস্পষ্ট।

 

সাঁজানো আদালত ও বিচার বিভাগীয় খুন

ডাকাত দলের সর্দার সবচেয়ে নিষ্ঠুর খুনিদের দিয়ে তার ডাকাত দলকে সাঁজায়। তেমনি দুর্বৃত্ত স্বৈরাচারি শাসকও সরকারের প্রতিটি বিভাগকে সবচেয়ে পরিপক্ক দুর্বৃত্তদের হাতে তুলে দেয়। দুর্বৃত্তায়ানটি তাই শুধু দেশের পুলিশ, প্রশাসন বা দলীয় কর্মীবাহিনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং সে নীতির প্রকাপ পড়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালতেও। বিচারকের আসনগুলি তখন ভয়ানক খুনিদের দখলে চলে যায়। ফলে স্বৈরাচারি শাসনামলে রাজপথে মিটিং-মিছিল করা বা পত্র-পত্রিকায় স্বাধীন মতামত প্রকাশ করাই শুধু কঠিন নয়, অসম্ভব হয়ে পড়ে ন্যায়বিচার পাওয়া্ও। তখন নিরপরাধ মানুষদের ফাঁসীতে ঝুলানো ব্যবস্থা করা হয়। মিসরে স্বৈরাচারি জামাল আব্দুন নাসেরে আমলে তাই সৈয়দ কুতুবের ন্যয় বিখ্যাত মোফস্সেরে কোরআনকে ফাঁসীতে ঝোলানো হয়েছে। আর আজ কাঠগড়ায় তুলেছে সে দেশের ইতিহাসে সর্বপ্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ড. মুরসীকে। অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে তুরস্কেও। সেদেশের স্বৈরাচারি সামরিক জান্তারা নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রি আদনান মেন্দারাসকে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছিল। ইসলামি চেতনার অভিযোগে জেলে তুলেছে প্রধানমন্ত্রী নাযিমুদ্দীন আরবাকেনকে। আর আজ বাংলাদেশে ফাঁসিতে ঝুলানোর হলো আব্দুল কাদের মোল্লাকে। ফাঁসিতে ঝুলানোর ষড়যন্ত্র হচ্ছে আরো বহু ইসলামি ব্যক্তিকেই। হিংস্র নেকড়েগণ সমাজে বেঁচে থাকলে শিকার ধরবেই। সেটিই স্বাভাবিক। তাই সভ্য মানুষদের দায়িত্ব হলো নেকড়ে নির্মূল। এছাড়া সমাজে শান্তি আসে না। এ নির্মূল কাজে জিহাদ হলো ইসলামের হাতিয়ার। নামায রোযার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত বলা হয়েছে জিহাদকে।জীবনে প্রতি মাস ও প্রতিটি দিন রোযা রেখে বা প্রতিটি রাত ইবাদতে কাটিয়েও কেউ কি মৃত্যুর পর অমরত্ব পায়? সমাজে ও আল্লাহর কাছে সে মৃত রূপেই গণ্য হয়। কিন্তু জিহাদে মৃত্যু ঘটলে সে শহীদ ব্যক্তিকে মৃত বলাটি গুরুতর গুনাহ। কারণ, পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা তাঁকে মৃত বলতে নিষেধ করেছেন, হুকুম দিয়েছেন জীবিত বলতে। তাই কোন শহীদকে মৃত বললে সে হুকুমের অবাধ্যতা হয়।পবিত্র কোরআনের সে হুকুমটি হলোঃ “এবং আল্লাহর রাস্তায় থাকার কারণে যাদেরকে কতল করা হয়েছে তোমরা তাদেরকে মৃত বলো না। বরং তারা তো জীবিত,যদিও তোমরা সেটি অনুধাবন করতে পারো না।” –সুরা বাকারা।

কে কতটা মানুষ না অমানুষ, সভ্য বা অসভ্য -সেটি পোষাক-পরিচ্ছদ বা চেহরা-সুরতে ধরা পড়ে না। ধরা পড়ে ন্যায়-অন্যায়ের বিচারবোধ থেকে। সে বিচার বোধ চোর-ডাকাত ও খুনিদের থাকে না। সে বিচারবোধটি না থাকার কারণেই ভয়ানক অপরাধও তাদের কাছে অপরাধ গণ্য হয় না। এটি হলো তাদের মনের অসুস্থ্যতা, সে সাথে অসভ্যতাও। সভ্য সমাজে এজন্যই এসব অসুস্থ্য ও অসভ্যরা চোর-ডাকাত-খুনি রূপে চিহ্নিত হয়। তেমনি একটি দেশ কতটা অপরাধীদের দ্বারা অধিকৃত সেটিও ধরা পড়ে সে দেশের আদালতের বিচার-আচারের মান থেকে। সভ্যদেশে তাই অতি ন্যয়নিষ্ঠ ও বিচারবোধ-সম্পন্ন ব্যক্তিদেরকে আদালতের বিচারক বানানো হয়। কিন্তু বাংলাদেশে সেটি ঘটেনি। কীরূপ অপরাধিদের দিয়ে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতকে সাঁজিয়েছে তার কিছু একটি বিবরণ দেয়া যাক। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের এক বিচারক হলেন সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। জামায়াত নেতা জনাব আব্দুল কাদের মোল্লাকে ফাঁসীতে ঝোলানোর জন্য যে পাঁচজন বিচারককে নিয়ে এই মামলার বেঞ্চ গঠন করা হয়েছে, তাদের একজন হলেন এই সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। জামায়াত নেতাদের হত্যায় এই সুরেন্দ্র বাবুর আগ্রহ এতটাই তীব্র যে Skype scandal-এ জড়িত ট্রাইবুনালের অপর বিচারপতি নাজমুলকে তিনি বলেছেন, “তিনটা ফাঁসির রায় দাও তাহলে তোমাকে আমরা সুপ্রীম কোর্টে নিয়ে আসতেছি”। একথা বিচারপতি নাজমুল তার ব্রাসেলস্থ বন্ধুকে স্কাইপী যোগে বলেছেন। পত্রিকায় সে সংলাপটি হুবহু প্রকাশও পেয়েছে। সুরেন্দ্র কুমার সিনহা তাই বিচার চান না, চান ফাঁসির রায়। এ কথা বলার অপরাধে যে কোন সভ্য দেশের আদালতে তার ন্যায় বিচারকের লেবাসধারি অপরাধীর কঠোর শাস্তি হতো। এবং অসম্ভব করা হতো বিচারকের আসনে বসা। কিন্তু বাংলাদেশে সেটি হয়নি। বরং তার এ খুনি মানসিকতার কারণেই হাসিনার কাছে তার কদর বেড়েছে। আব্দুল কাদের মোল্লার ন্যায় নিরাপরাধ মানুষকে ফাঁসিতে ঝোলানাো জন্য তো বিচারকের আসনে এমন নীতিহীন ও বিবেকহীন তাঁবেদার বিচারকই চাই। এজন্যই তার স্থান মিলেছে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতে। তেমনি আরেক বিচারক হলেন শামসুদ্দিন মানিক। অশালীন আচরণে ও বিতর্কিত বিচারকার্যে তিনি রেকর্ড গড়েছেন। তার বিরুদ্ধে বহু সিনিয়র আইনজীবী যেমন অভিযোগ তুলেছে তেমনি বহুশত পৃষ্ঠার প্রমানসহ অভিযোগনামা দাখিল করেছে বহু সাংবাদিক। কিন্তু কারো অভিযোগকে শেখ হাসিনা গুরুত্ব দেননি। কারণ, বিচারকের আসনে তার চাই তাঁবেদার আওয়ামী ক্যাডার। শেখ হাসিনা তাকে হাইকোর্ট থেকে উঠিয়ে সুপ্রীম কোর্টে বসিয়েছেন। এবং সেখান থেকে তুলে এনে আব্দুল কাদের মোল্লার মামলার আপিল ডিভিশানে বসিয়েছেন। কারণ, সে আওয়ামী লীগের ক্যাডার এবং আব্দুল কাদের মোল্লার মত নিরাপরাধ ব্যক্তিদের ফাঁসিতে ঝোলাতে সে আপোষহীন।

 

আইন বদলানো হলো স্রেফ খুনের স্বার্থে

ট্রাইবুনাল প্রথমে আব্দুল কাদের মোল্লাকে ফাঁসি দেয়নি, দিয়েছিল যাবজ্জীবন কারাদন্ড। তাঁকে ফাঁসি দিতে প্রয়োজন ছিল আইনের পরিবর্তন। সরকার তাঁর ফাঁসি দিতে এতটাই দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিল যে সেটি সম্ভব করতে প্রচলিত আ্ইনে ইচ্ছামত পবিবর্তন এনেছে। অথচ আন্তুর্জাতিক আইনে রীতিবিরুদ্ধ। শুধু তাই নয়, আপিলের সুযোগ থেকে্ও তাঁকে বঞ্চিত করা হযেছিল। সরকারের যুক্তি, আব্দুল কাদের মোল্লা একজন যুদ্ধাপরাধী, সে কারণে তাঁর জন্য আপিলের সুযোগ নেই। আব্দুল কাদের মোল্লার মামলা প্রসঙ্গে এ্যামনেস্ট্রি ইন্টারন্যাশন্যালের বক্তব্যঃ “This is the first known case of a prisoner sentenced to death directly by the highest court in Bangladesh. It is also the first known death sentence in Bangladesh with no right of appeal. Death sentence without right of judicial appeal defies human rights law.”

বিচারে যে কতটা অবিচার হযেছে সেটিও দেখা যাক। যে সাক্ষীর কথার উপর ভিত্তি করে আব্দুল কাদের মোল্লাকে হত্যা করা হলো তার নাম মোমেনা বেগম। মোমেনা বেগম অন্যদের কাছ থেকে শুনেছে যে, যারা তার পরিবারের অন্যদের হত্যা করেছে তার মধ্যে কাদের মোল্লা বলে একজন ছিল। কিন্তু সে নিজে সে অভিযুক্ত কাদের মোল্লাকে স্বচোখে কখনোই দেখেনি। প্রশ্ন হলো বাংলাদেশে বহু গ্রামে ও বহু মহল্লায় কাদের মোল্লা বলে কেউ থাকতেই পারে। হয়তো সে সময় মীরপুরেও এমন কাদের মোল্লা একাধিক ছিল। কিন্তু সে যে ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার আমিরাবাদ গ্রামের মরহুম সানাউল্লা মোল্লার ছেলে আবদুল কাদের মোল্লা -সে খবর কি মীরপুরের এই মোমেনা বেগম জানতো? সামনা সামনি খাড়া করলে কি তাঁকে চিনতে পারতো? যে কোন খুনের মামলার সাক্ষিকে তার অভিযুক্ত আসামীকে লাইনে দাড়ানো অনেকে মধ্য থেকে খুঁজে বের করতে হয়। অথচ যারা তাঁকে ফাঁসি দিল তারা তা নিয়ে তদন্তের সামান্যতম প্রয়োজনও মনে করেনি। তারা শুধু কাদের মোল্লার নামের মিলটিই দেখেছে। সেটিকে একমাত্র দলীল রূপে খাড়া করে ফরিদপুরের আমিরাবাদ গ্রামের আব্দুল কাদের মোল্লাকে ফাঁসিতে চড়ালো।

বিচারকগণ এটুকুও ভেবে দেখেনি, মীরপুরে খুনের ঘটনাটি ঘটেছে ২৫শের মার্চের কিছুদিন পর এপ্রিলের প্রথম দিকে। সে সময় আব্দুল কাদের মোল্লা কেন ঢাকাতে থাকতে যাবে? ঢাকাতে তাঁর কি কোন চাকুরি ছিল? তাঁর পিতার কি কোন বাড়ি ছিল? ঢাকায়  যাদের চাকুরি ও ঘরবাড়ি ছিল তারাও তো সে দুর্যোগ মুহুর্তে ঢাকা ছেড়ে মফস্বলে চলে যায়। আব্দুল কাদের মোল্লা তখন ছাত্র। এপ্রিলে ঢাকার কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কি খোলা ছিল? অতএব সে সময় ঢাকায় অনর্থক থাকার কি কোন কারণ থাকতে পারে? অপরদিকে মোমেনা বেগম মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর, মিরপুর জল্লাদখানা, আর আদালত -এই তিন জায়গায় তিন রকম কথা বলেছে। আদালতে আসার আগে অনেকগুলো সাক্ষাতকার দিলেও একবারের জন্যও আব্দুল কাদের মোল্লার নাম নেয়নি। ২০০৭ সালে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর কর্তৃপক্ষের কাছে দেয়া জবানবন্দীতে এই মামলার প্রধান সাক্ষী মোমেনা বেগম নিজের মুখে বলেন, হযরত আলী লষ্কর পরিবারের হত্যাকান্ডের দুইদিন আগে তিনি শ্বশুড়বাড়ি চলে যাওয়ায় প্রানে বেঁচে যান! অথচ ২০১২ তে কোর্টে এসে বলে, ঘটনার সময় সে উপস্থিত ছিল। এমন মিথ্যুকের কথায় কোন সভ্য দেশে কি কারো ফাঁসি হয়?

 

অপরাধীদের দখলে আদালত

প্রতিটি খুনের মামলায় আদালতের মূল দায়িত্ব হলো খুনের মটিভটি খুঁজে বের করা। কোন সুনির্দিষ্ট মটিভ ছাড়া কেউ কাউকে খুন করা দূরে থাক,পাথরও ছুঁড়ে না। প্রতিটি খুনের পিছনে যেমন খুনি থাকে, তেমনি সে খুনির মটিভও থাকে। জনাব আব্দুল কাদের মোল্লা কোন পেশাদার খুনি নন,ফলে মানুষ খুন করা তার পেশা নয়। অথচ তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে তিন হাজার মানুষ হত্যার। অথচ তার বয়স তখন মাত্র ২২। সেটি হলে তো মানুষ খুনের কাজটি ফরিদপুরের সদরপুর থেকেই আরো অল্প বয়সে শুরু করতেন। তাছাড়া মানুষ খুনে তিনি কেন ঢাকার মীরপুরে আসবেন? কেনই বা সেটি মোমেনা বেগমের পরিবারে? কেন এত বড় খুনির হাতে তার নিজ এলাকায় কোন লাশ পড়লো না? কারণ খুনিরা যেখানে যায় সেখানেই তো তার নিজ খাসলতটা সাথে নিয়েই যায়। তাছাড়া তিনি একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তার খুনও তাই রাজনৈতিক হওয়াটাই স্বাভাবিক। অথচ মোমেনা বেগমের পিতা ও তার পরিবারটি রাজনৈতিক দিক দিয়েও তেমন কেউ নন। ফলে এ খুনের মটিভটি রাজনৈতিকও নয়। আদালতের দায়িত্ব,এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা।ব্যবসা-বানিজ্য বা অন্য কোন কারণে মোমেনা বেগমের পরিবারের সাথে আব্দুল কাদের মোল্লার বিবাদ ছিল -আদালত সে প্রমাণও হাজির করতে পরিনি।

একাত্তরের মার্চে ও এপ্রিলে হাজার হাজার বাঙালী ও বিহারি মারা গেছে নিছক ভাষা ও বর্ণগত ঘৃণার কারণে।সে বীভৎস হত্যাকান্ডগুলো যেমন বাঙালীদের হাতে হয়েছে তেমনি বিহারিদের হাতেও হয়েছে।তেমন হত্যাকান্ডে জড়িত হওয়ার জন্য তো ভাষা,বর্ণ ও আঞ্চলিক পরিচয় নিয়ে অতি উগ্র,সহিংস ও অসুস্থ মন চাই। তেমন অসুস্থ মনের খুনিরা সবচেয়ে বেশী সংখ্যায় গড়ে উঠেছিল শেখ মুজিব ও তার দল আওয়ামী লীগের হাতে। সে উগ্র সহিংসতাকে প্রবল করাই ছিল তাদের শেখ মুজিবের রাজনীতি।তাদের সংখ্যা ছিল সহিংস বিহারীদের চেয়ে বহু শতগুণ বেশী। সে কারণেই একাত্তরে বাঙালীদের চেয়ে বেশী মারা গেছে বিহারীরা। তাদেরকে ঘরবাড়ি ও দোকানপাট থেকে নামিয়ে রাস্তায়ও নামানো হয়েছে। আওয়ামী লীগারদের হাতে একাত্তরে হাজার হাজার বিহারী হত্যার বীভৎ বিবরণ পাওয়া যায় শর্মিলা বোসের ইংরেজীতে লেখা “ডেথ রেকনিং” বইয়ে। লগি বৈঠা নিয়ে এরাই নিরপরাধ মানব হত্যাকে ঢাকার রাজপথে উৎসবে পরিণত করেছে। শাহবাগ মোড়ে এরাই জামায়াত শিবির কর্মীদের লাশ নিয়ে সকাল বিকাল নাশতা করার আস্ফালন করে। আজও  সেসব খুনিদের হাতে শাপলা চত্বরসহ বাংলাদেশের নানা জনপদ রক্তলাল হচ্ছে।প্যান-ইসলামিক চেতনায় পরিপুষ্ট আব্দুল কাদের মোল্লার তেমন মানসিক অসুস্থতা ও সহিংসতা থাকার কথা নয়। তাছাড়া তেমন রোগ থাকলে তিনি বাঙালীদের উপর নয়,বিহারীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তেন।সেটি হলে শুধু মীরপুরে নয়,এবং শুধু একাত্তরেই নয়,বার বার বহুস্থানেই তার হাতে বহু মানুষ লাশ হতো। বিচারকদের উচিত ছিল গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়গুলো বিবেচনায় আনা। আর সেটি না আনাই তো বিচারকের অপরাধ। সে কাজটি হলে বিচারকগণ হত্যার মটিভ খুঁজে পেতেন। ন্যায়বিচারেও সফল হতেন। কিন্তু আদালত তাতে পুরাপুরি ব্যর্থ হয়েছে। লক্ষণীয় হলো,আদালতের বিচারকগণ এ বিষয়গুলোর বিচার-বিবেচনায় কোন আগ্রহই দেখাননি। তাদের বিচারে একটি মাত্র আগ্রহই বার বার গুরুত্ব পেয়েছে তা হলো,আব্দুল কাদের মোল্লা,মাওলানা দিলাওয়ার হোসেন সাঈদী ও মাওলানা আবুল কালাম আযাদের মত ব্যক্তিদের দ্রুত হত্যা করা। এবং সে হত্যাকান্ডের উপর আদালতের পক্ষ থেকে ন্যায়বিচারের লেবাস চাপিয়ে দেয়া। ফিরাউন-নমরুদ,হালাকু-­চেঙ্গিজ ও হিটলারের সময় তো অবিকল তাই হয়েছে। বিচারপতি নাজমুলের স্কাইপি সংলাপে তো সে বিষয়টিই প্রকাশ পেয়েছে। দেশের সরকার ও তার প্রশাসন,পুলিশ,র‌্যাবই শুধু নয়,আদালতগুলিও যে কতটা অসুস্থ,অযোগ্য ও অপরাধী মানুষের দ্বারা অধিকৃত -সেটি কি এরপরও বুঝতে বাঁকি থাকে?

শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লা যুদ্ধকালীন পুরো সময়ে যে বাড়িতে লজিং ছিলেন তার বিবরণ তিনি আদালতকে দিয়েছেন । সে সময় ঐ লজিং বাড়ীতে তিনি দুই মেয়েকে পড়াতেন।  তাদের একজনের স্বামী এখন সরকারেরই কর্মকর্তা।ট্রাইবুনাল ঐ পরিবারের কাউকেই, বিশেষ করে ঐ দুই মেয়েকে আদালতে সাক্ষী রূপ হাজির হতে দেয়নি। শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লাই যদি “কসাই কাদের” হয়ে থাকে তবে যে “তিন হাজার মানুষকে হত্যা করেছে” বলে ট্রাইবুনাল বিশ্বাস করে, কীভাবে সম্ভব সে এই কসাই কাদের মোল্লাই যুদ্ধের পরপরই ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে শহীদুল্লাহ হল’র আবাসিক ছাত্র রূপে অধ্যয়নের সুযোগ পেল? বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি লাভের পর কী রূপে তিনি উদয়ন স্কুলে শিক্ষক রূপে নিযুক্তি পান? কী রূপে তিনি বাংলাদেশ রাইফেলস স্কুল এন্ড কলেজে শিক্ষকতা করেন? ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের ভাইস প্রেসিডেন্ট রূপেই বা তিনি কীরূপে দুইবার নির্বাচিত হন? 

 

বিচার হোক বিচারকদের

সাধারণ মানুষেরা অপরাধ করলে তার শাস্তি হয়। কখনো কখনো আদালত তাদের বিরুদ্ধে ফাঁসির হুকুমও শোনায়। কোর্ট মার্শাল হয় সামরিক বাহিনীর অফিসারদের। কিন্তু বাংলাদেশের আদালতের যারা বিচারক তারা কি ফেরেশতা? অথচ সেখানেও যে অপরাধিরা আছে সে প্রমাণ কি কম? স্কাইপি সংলাপের মাধ্যেমে জনগণের সামনে তো সেটি প্রকাশও পেযেছে। প্রকাশ পেয়েছে আব্দুল কাদের মোল্লা, মাওলানা আবুল কালাম আযাদ ও মাওলানা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর বিরুদ্ধে দেয়া রায়তেও। শুধু কি চোরডাকাতের শাস্তি দিলে দেশে শান্তি আসে? দেশের অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হলো আদালত। আদালতের বিচারকের আসনে বসেছেন খোদ নবী-রাসূলগণ। অথচ বাংলাদেশে অতি গুরুত্বপূণ এ প্রতিষ্ঠানটি অধিকৃত হয়ে আছে সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, সামছুদ্দীন মানিক ও নাজমুলের মত নীতিহীন ও বিবেকহীন ব্যক্তিদের হাতে। একটি দেশে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়টি ঘটে যদি দেশের বিচার ব্যবস্থা দুর্বৃত্তদের হাতে অধিকৃত হয়ে যায়। তাদের বিচারে তখন ভয়ানক অপরাধিরাও মুক্তি পেয়ে যায়, আর ফাঁসিতে ঝুলাতে হয় নিরপরাধ ব্যক্তিদের। তাছাড়া মুসলমানের ক্ষেত্রে সে দায়ভারটি আরো বেশী। কারণ, ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের নির্মূল তো মুসলমানের জীবনে আল্লাহ নির্ধারিত মিশন। সেটি না হলে সমাজে ইসলাম বাঁচে না। তেমনি মুসলিম রূপে বেড়ে উঠাও যায় না।অথচ দুর্বৃত্ত বিচারকগণ ইসলামের সে মহান মিশনটিকেই ব্যর্থ করে দেয়। তাদের যুদ্ধ তো খোদ আল্লাহর বিরুদ্ধে। শুধু চোরডাকাতদের অপরাধ নিয়ে বিচার বসলে দেশে শান্তি আসবে না। বিচারের কাঠগড়ায় খাড়া করতে হবে এসব দৃর্বৃত্ত বিচারকদেরও। চোর-ডাকাতদের চেয়েও তাদের অপরাধটি তো বেশী। চোর-ডাকাতগণ কিছু লোকের সম্পদ কেড়ে নেয়। আর দুর্বৃত্ত বিচারকগণ কেড়ে নেয় সুবিচার ও শান্তি। ইসলামের তাদের শাস্তিটা তাই কঠোর।

কিন্তু বাংলাদেশে বিচারকদের অপরাধগুলো সনাক্ত করার যেমন কোন লোক নেই, তেমনি তাদের শাস্তি দেয়ারও কেউ নাই। বরং তারাই যেন দেশের একমাত্র সার্বভৌম শক্তি। কোনটি ন্যায় আর  কোনটি অন্যায়, কোনটি পবিত্র আর কোনটি অপবিত্র সে রায়টিও এখন তারা দেয়া শুরু করেছে। সকল দলের নেতারা মিলে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রথাটি গ্রহণ করলো, আদালতের এক বিচারক সেটিকে বেআইনী বলে ঘোষিত করলেন। আর সে রায়ের মাধ্যমে দেশকে উপহার দেয়া হলো এক রাজনৈতিক মহাসংকট। আদালত ভাষা আন্দোলনে নিহতদের স্মৃতি স্তম্ভকেও পবিত্র রূপে ঘোষণা দিয়েছে। অথচ কোনটি পবিত্র আর কোনটি অপবিত্র -সেটি ধর্মীয় বিষয়। আদালতের বিচারকদের তা নিয়ে নাকগলানোর কিছু নাই। অথচ বাংলাদেশে বিচারকদের সেক্ষেত্রেই পদচারণা। যে কোন প্রতিষ্ঠান মাত্রই যে অপরাধীদের দ্বারা অধিকৃত হতে পারে -সেটি যেন বাংলাদেশের আদালতের বিচারকদের বেলায় চলে না। এমন একটি দুষিত ধারণার কারণেই বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা সবচেয়ে ব্যর্থ।

 

শুরু হয়েছে গণবিপ্লব

বাংলাদেশের জনগণের পিঠ এখন দেয়ালে ঠেকে গেছে। মুক্তিকামী মানুষের কাছে দুর্বৃত্তশাসন নীরবে সয়ে যাওয়ার দিন এখন শেষ। সময় এসেছে খুনিদের শাস্তি দেয়ার। শুরু হয়েছে তাই গণবিপ্লব। এ গণবিপ্লবের মালিকানা জনগণ এখন নিজ হাতে নিয়ে নিয়েছে। ফলে শত শত নেতা ও কর্মীদের গ্রেফতার করেও সরকার এ আন্দোলন আর থামাতে পারছে না। বরং যতই বাড়ছে গ্রেফতারের সংখ্যা, আন্দোলন ততই তীব্রতর হচ্ছে। এখন এটি শুধু আর রাজনীতি নয়। নিছক ভোট যুদ্ধও নয়, বরং পরিণত হয়েছে ইসলামি জনতার পবিত্র জিহাদে। বাংলাদেশ যে ইসলামের দুষমনদের হাতে অধিকৃত ভূমি সেটি জনগণের কাছে আজ আর গোপন বিষয় নয়। হাসিনা সরকার যে শুধু গণতন্ত্রের শত্রু -তা নয়। ভয়ানক শত্রু ইসলামেরও। মুর্তিপুজারিদের কাছে মহান আল্লাহ ও তাঁর ইবাদতের কোন গুরুত্ব নাই। বরং তাদের কাছে উপসনাযোগ্য হলো তাদের নিজহাতে গড়া মুর্তি। আল্লাহর অবাধ্যদের কাছে তেমনি পবিত্র নয় মহান আল্লাহর পবিত্র কোরআন। তাদের কাছে বরং পবিত্র হলো নয় নিজেদের রচিত শাসনতন্ত্র। নিজেদের প্রতিষ্ঠিত কায়েমী স্বার্থকে সুরক্ষা দেয়ার জন্যই তারা রচনা করেছে এ শাসনতন্ত্র। আর সে শাসনতন্ত্রের দোহাই দিয়ে যেমন নির্দেলীয় সরকারের বিরোধীতা করছে, তেমনি দেশকে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের দিকে ধাবিত করছে। আল্লাহর বিরুদ্ধে তাদের বিদ্রোহ এতটাই প্রকট যে, শাসনতন্ত্রে তারা মহান আল্লাহর উপর আস্থার বানিটিও তারা বিলুপ্ত করেছে।

 

মু’মিনের জীবনে বাধ্যবাধকতা

মুসলমান হওয়ার সাথে প্রতিটি ঈমানদারের উপর কিছু অলংঘনীয় বাধ্যবাধকতা এসে যায়। সেটি আল্লাহর হুকুমের প্রতি সদাসর্বদা আনুগত্য ও মহান আল্লাহর ইজ্জতকে যে কোন মূল্যে সমুন্নত রাখা। তাই কোন দেশে মুসলমানের সংখ্যা বাড়লে সেখানে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের প্রতিষ্ঠাও অনিবার্য হয়ে পড়ে। এবং সে ভূমিতে অতি স্বাভাবিক হয় শরিয়তের প্রতিষ্ঠা। রাজার সৈনিকেরা তার রাজ্য পাহারায় ও তার শাসন বহাল রাখায় যুদ্ধ করে ও প্রয়োজনে প্রাণও্র দেয়। সে কাজের জন্য যেমন মজুরি পায়, তেমনি সৈনিকের মর্যাদাও পায়। রাজার রাজ্য পাহারায় যে সৈনিক যুদ্ধ করে না সে কি সৈনিকের মর্যদা পায়? আর মুসলমানের মর্যাদাটি তো আল্লাহর সৈনিক রূপে। ফলে তাদের দায়বদ্ধতা খোদ মহান আল্লাহতায়ালার প্রতি। তারা আল্লাহর দ্বীনের বিজয়ে ও তার সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠায় যুদ্ধ করে। অর্থ, শ্রম, সময় ও প্রাণও দেয়। প্রতিদানে পায় জান্নাত। কে কতটা ঈমানদার সেটি তো যাচাই হয় আল্লাহর রাস্তায় কে কতটা কোরবানী দিল তা থেকে। মুমিনের জীবনে সে জিহাদ তাই অনিবার্য। মনের গভীরে ঈমান যে বেঁচে আছে সেটি তো বুঝা যায় সে জিহাদ থেকে। প্রাণশূণ্য মানুষের হাত-পা নড়াচড়াশূণ্য হয়। তেমনি ঈমানশূণ্য ব্যক্তির জীবনও জিহাদ শূণ্য হয়। একটি দেশে ইসলাম কতটা বিশুদ্ধ ভাবে বেঁচে আছে সেটি মসজিদে নামাযীর সংখ্যা দেখে বুঝা যায় না। সেটি বুঝা যায় সে সমাজে আল্লাহর শরিয়ত প্রতিষ্ঠায় জিহাদ কতটা চলছে তা থেকে। শয়তানি শক্তির ষড়যন্ত্রের শেষ নাই। ফলে সে ষড়যন্ত্রের মোকাবেলায় মু’মিনের জীবনে জিহাদেরর শেষ নেই। বরং সে জিহাদকেই অব্যাহত রাখাই হলো্ ঈমানদারের জীবনে সবচেয়ে বড় জিম্মাদারি। মুসলমানের জীবনে তাই ইসলামে দাখিল হওয়ার সাথে সাথেই আমরণ জিহাদ শুরু হয়ে যায়। সেটি যেমন সাহাবায়ে কেরামের জীবনে এসেছিল তেমনি এসেছিল তাদের অনুসারিদের জীবনে। ফলে তাদের আমলে শুধু মুসলিম রাষ্ট্রের ভূগোলই বাড়েনি, ইসলামি শরিয়তের প্রতিষ্ঠাও বেড়েছে। অপরদিকে শয়তানি শক্তির টার্গেট হলো, জিহাদ থেকে মুসলমানদের দূরে সরানো। নামায-রোযা পালন নিয়ে তাদের কোন আপত্তি নেই। আপত্তি নেই পীরের দরগাহ, দরগায় জিয়ারত, বা সূফিবাদ নিয়ে। বরং এগুলির পিছনের বিপুল অর্থব্যয়ে তারা রাজী।

 

ইস্যু স্রেফ সরকার পরিবর্তন নয়

মুসলমানের জীবনে তাই বড় ইস্যুটি সরকার পরিবর্তন নয়, সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্যে বার বার নির্বাচনও নয়। বরং সেটি হলো আল্লাহতায়ালার দেয়া শরিয়তের পুরাপুরি প্রতিষ্ঠা। শয়তান তো চায়, নির্বাচন নিয়ে মুসলমানেরা বছরের পর ব্যস্ত থাক। এবং ভূলে থাক শরিয়তের প্রতিষ্ঠার বিষয়টি। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থা এক সুবর্ণ সুযোগ এনে দিয়েছে ইসলামপন্থিদের সামনে। ইসলামের শত্রুপক্ষের দুর্গ এখান ধ্বসে পড়ার পথে। এমুহুর্তে আন্দোলনকে শুধু সরকার পরিবর্তনের আন্দোলনে সীমিত রাখলে সেটি হবে আল্লাহতায়ালা ও দ্বীনের সাথে সবচেযে বড় গাদ্দারি। তাতে ব্যর্থ হয়ে যাবে এ যাবত কালের সকল শহীদদের কোরবানি। নামায-রোযা পালনের দায়িত্ব যেমন প্রতিটি ঈমানদারের, তেমনি রাষ্ট্রের বুকে আল্লাহতায়ালার দ্বীনকে বিজয়ী করার দায়িত্বও প্রতিটি মু’মিনের। রোয হাশরের বিচার দিনে প্রতিটি ঈমানদারকে এ হিসাব অবশ্যই দিতে হবে, মহান আল্লাহর শরিয়তের প্রতিষ্ঠায় তার নিজের কোরবানিটা কত্টুকু?

কোন দেশ শয়তানি শক্তির হাতে অধিকৃত হলে সেখানে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা অসম্ভব হয়ে পড়ে। আর শরিয়তের অনুসরণ ছাড়া কি ইসলাম পালন হয়? পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা বার বার বলেছেন, “যারা আমার নাযিলকৃত আইন অনুযায়ী বিচার কার্য পরিচালনা করে না তারা কাফের, …তারাই যালিম, এবং …তারাই ফাসিক। -(সুরা মাযেদ)।তাই কোনটি মুসলমানের দেশ সেটি মসজিদ মাদ্রাসা দেখে বুঝা যায় না। ভারতের মত কাফের অধ্যুষিত  দেশেও এরূপ মসজিদ-মাদ্রাসার সংখ্যা বিপুল। সেটি বুঝা যায় সেদেশে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা দেখে। অথচ বাংলাদেশে সে কাজটি হয়নি। শহীদের রক্ত উম্মহার জীবনে ঈমানের ট্রানফিউশন ঘটায়। তখন ঈমানে জোয়ার আসে। তাতে বলবান হয় শরিয়ত প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। তাই যে দেশে ভূমিতে যত শহীদ সে ভূমিতে ততই ঈমানের জোয়ার। সেখানে বলবান হয় শরিয়ত প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লার শাহাদত তাই বৃথা যাবে না। তার রক্ত যে বাংলাদেশের মানুষের জীবনে ঈমানের ট্রানফিউশন ঘটাবে সেটি সুনিশ্চিত। তাছাড়া ঈমানদারগণ যখন আল্লাহর রাস্তায় প্রাণ দেয়া শুরু করে সে ভূমিতে তো আল্লাহতায়ালা তার ফেরেশতা প্রেরণ শুরু করেন। ফলে বাংলাদেশে শয়তানের দুর্গের পতন যে অনিবার্য তা নিয়ে কি বিন্দুমাত্র সন্দেহ আছে? ১৩/১২/১৩




স্বৈরশাসনের নিপাত কেন জরুরী?

বিপদ বিরামহীন যুদ্ধের

যে কোন মুসলিম দেশেই স্বৈরশাসনের আপদটি ভয়াবহ। ঈমানদার রূপে বেড়ে উঠা দূরে থাক, তখন অসম্ভব হয় সভ্য মানুষ রূপে বেড়ে উঠা। ঘুর্ণিঝড়, ভূমিকম্প, মহামারি বা প্লাবনে এতবড় বিপদ ঘটে না। ফিরাউন-নমরুদের ন্যায় তারাও মহান আল্লাহতায়ালার আযাবকে অনিবার্য করে তোলে। কারণ, এরা শুধু জনগণের শত্রু নয়, শত্রু মহান আল্লাহতায়ালারও। তাদের এজেন্ডা স্রেফ নিজেদের খেয়ালখুশির প্রতিষ্ঠা। নিজেদের স্বেচ্ছাচারিতা বাঁচাতে এরা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয় মহান আল্লাহতায়ালার কর্তৃত্ব ও তাঁর সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে। আইন তৈরীর অধিকার তারা নিজ হাতে নিয়ে নেয়। ফলে তাদের যুদ্ধ মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়ত, হুদুদ ও কেসাসের বিধানের বিরুদ্ধে। পবিত্র কোরআন এদেরকে চিত্রিত করা হয়েছে মুস্তাকবিরীন রূপে। আরবী ভাষায় মুস্তাকবিরীন বলতে তাদের বুঝায় যারা নিজেদেরকে সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ বা বড় মনে করে। অথচ নিজেকে শ্রেষ্ঠ বা বড় মনে করার অধিকারটি একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালার। মুস্তাকবিরীনদের কলাবোরেটর রূপে থাকে এমন এক দালাল শ্রেণীর দুর্বৃত্ত নেতা, কর্মী ও বুদ্ধিজীবী -যাদের কাজ স্বৈরশাসকের সকল দুষ্কর্মের সমর্থণ করা। তাদের আরো কাজ, স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে যখনই সত্য ও ন্যায়ের বানি নিয়ে ময়দানে নামে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করা। হযরত মূসা (আঃ) ও তাঁর অনুসারিদের নির্মূলে ফিরাউনের পাশে এদের অবস্থানটি ছিল তার মন্ত্রি, পরামর্শদাতা, সভাসদ, গোত্রপতি, সেনাপতি ও লাঠিয়াল রূপে। মানব ইতিহাসে এরাই হলো অতি নিকৃষ্ট শ্রেণীর দুর্বৃত্ত। এদের অপরাধ সাধারণ চোর-ডাকাতদের চেয়েও জঘন্য। সাধারণ চোর-ডাকাতগণ স্বৈরশাসকদের বাঁচাতে গণহত্যায় নামে না, কিন্তু এরা নামে। যুগে যুগে ফিরাউনগণ দীর্ঘায়ু পেয়েছে বস্তুতঃ এদের কারণেই।

পবিত্র কোরআনে ফিরাউনের ন্যায় স্বৈরশাসকদের সহযোগীদের মালাউন বলে অভিহিত করা হয়েছে। মালাউন শব্দটি মহান আল্লাহতায়ালার নিজের বাছাইকৃত বিশেষ এক বর্ণনাত্মক পরিভাষা তথা ন্যারেটিভ। এর কোন বিকল্প নেই। এর কোন অনুবাদও হয় না। মালাউন শব্দটির মধ্য দিয়ে মানব ইতিহাসের রঙ্গমঞ্চে মহান আল্লাহতায়ালা এমন এক শ্রেণীর দুর্বৃত্তদেরকে হাজির করেছেন -যাদের অপরাধের তুলনা একমাত্র তাদের নিজেদের সাথেই চলে। তাদের মূল অপরাধটি হলো, আল্লাহতায়ালা, তাঁর নবী-রাসূল ও তাঁর দ্বীনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। ফলে মহান আল্লাহতায়ালার ক্রোধ শুধু ফিরাউনদের উপর নয়, এসব মালাউনদের বিরুদ্ধেও। তাই মহান আল্লাহতায়ালা তাই শুধু ফিরাউনকে নয়, মালাউনদেরও ডুবিয়ে হত্যা করেছেন। পরকালে তাদের জন্য বরাদ্দ রেখেছেন জাহান্নামের অনন্ত কালের আযাব। স্বৈরাচারকে বস্তুতঃ বাঁচিয়ে এ মালাউন শ্রেণী। ফলে যে দেশেই স্বৈরাচার আছে, সে দেশেই মালাউন আছে। এসব মালাউনদের কারণেই গ্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে লক্ষ লক্ষ মানব হত্যার কাজটি হিটলারকে নিজ হাতে করতে হয়নি। শাপলা চত্ত্বরের গণহত্যায় বা ফাঁসি ঝুলিয়ে জামায়াত নেতাদের হত্যার কাজটিও শেখ হাসিনাকে নিজে হাতে করতে হয়নি। বাংলাদেশ আজ অধিকৃত বস্তুতঃ এরূপ মালাউন শ্রেণী ও তাদের প্রভু স্বৈরশাসকের হাতে। ফলে জুলুম নেমে এসেছে সেসব নিরীহ মানুষের উপর -যারা গণতান্ত্রিক অধিকার চায় এবং ইসলামের বিজয় ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠা চায়।

স্বৈরশাসনের আরেকটি ভয়ানক কুফল হলো, দেশ বিভক্ত হয় দ্বি-জাতিতে। সে বিভক্তির পিছনে কাজ করে দু’টি ভিন্ন লক্ষ্য, দুটি ভিন্ন মূল্যবোধ এবং দু’টি ভিন্ন দর্শন। সে বিপরীতমুখি লক্ষ্য, মুল্যবোধ ও দর্শনকে ঘিরে শুরু হয় রাজনীতির তীব্র মেরুকরণ। এক মেরুতে অবস্থান নেয় স্বৈরশাসক ও তার অনুসারিরা; এবং অন্য মেরুতে অবস্থান নেয় স্বৈরাচারবিরোধী সকল দল ও সেসব দলের নেতাকর্মীগণ। সে মেরুকরণের রাজনীতিতে স্বৈরশাসকের পক্ষ থেকে ধ্বনিত হয় বিরোধীদের বিরুদ্ধে নির্মূলের চিৎকার। যেমন ফিরাউন ও তার সঙ্গি মালাউনগণ ধ্বনি তুলেছিল হযরত মূসা (আঃ) ও তাঁর অনুসারিদের নির্মূলে এবং আবু জেহল-আবু লাহাব নির্মূলে নেমেছিল হযরত মহাম্মদ (সাঃ) ও তাঁর অনুসারিদের। নির্মূলের লক্ষ্যে সৃষ্টিহয় যুদ্ধাবস্থা।

স্বৈরশাসক মাত্রই বিজয় খুঁজে নিরস্ত্র বিরোধীদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র  যুদ্ধে। ভোটে নয়, বন্দুকের জোরে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা শুরু হয়। স্বৈর-শাসকের সে লক্ষ্য পূরণে দেশের সশস্ত্র বাহিনীর লোক-লশ্করেরা পরিণত হয় চাকর-বাকরে। ফলে দেশের সেনাবাহিনী দেশ বা জনগণকে কি প্রতিরক্ষা দিবে, তারা ব্যর্থ হয় এমন কি নিজেদের অফিসারদের জীবন বাঁচাতে। তাদের সে অক্ষমতার প্রমাণ, ২০০৯ সালে ঢাকার পিলখানায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৫৩ জন সেনা-অফিসারের নৃশংস মৃত্যু। পাকিস্তান ১৯৬৫ সালে ও ১৯৭১ সালে দুটি প্রকাণ্ড যুদ্ধ লড়েছে। কিন্তু কোন যুদ্ধেই দেশটির ৫৩ জন অফিসারের মৃত্যু হয়নি, কিন্তু বাংলাদেশে এতো বড় হত্যাকাণ্ড কোন রণাঙ্গণে হয়নি, বরং রাজধানীর সেনা ছাউনিতে। অন্যদের প্রাণ বাঁচানো নিয়ে স্বৈরশাসকদের গরজ থাকে না; তাদের গরজ স্রেফ নিজের গদি বাঁচানো। সে কাজে তারা ব্যবহার করে পুলিশের সাথে দেশের সেনাবাহিনীকেও। নিরস্ত্র নাগরিক হত্যায় তখন ব্যারাক থেকে হাজার হাজার সৈন্য, মেশিন গান, ভারী কামান -এমন কি টাংক নামিয়ে আনে রাজপথে। জন্ম দেয় গৃহযুদ্ধের। বাংলাদেশের দরিদ্র জনগণ সেনা বাহিনী, বিজিবি, RAB এবং মুজিব আমলের রক্ষি বাহিনী পালনে হাজার হাজার কোটি ব্যয় করেছে। বিগত ৪৬ বছরে দেশের সীমান্তে তারা কোন যুদ্ধ লড়েনি। বরং যুদ্ধ লড়েছে সে সব নিরস্ত্র নাগরিক হত্যায় -যারা তাদেরকে রাজস্ব দিয়ে পালে এবং অভিজাত এলাকায় প্লট দিয়ে রাজার হালে বাঁচার সুবিধা করে দেয়।

গণতন্ত্রে স্বৈরশাসক বাঁচে না। এজন্যই নিজেদের শাসন বাঁচাতে গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে স্বৈরাচারের যুদ্ধটি অবিরাম। অথচ গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অর্থ জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। শেখ মুজিবের স্বৈরশাসনকে সুরক্ষা দিতে জনগণের বিরুদ্ধে সে রক্তাত্ব যুদ্ধটি লড়েছিল রক্ষি বাহিনী। তিরিশ হাজারেরও বেশী নাগরিককে তারা হত্যা করেছিল। একই কারণে শেখ হাসিনার স্বৈর শাসন বাঁচাতে  সেনা বাহিনী, বিজিবি, RAB, এবং পুলিশের সেপাহীদের এতটা নৃশংস হতে দেখা যায়। ২০১৩ সালে ৫ই মে শাপলা চত্ত্বরে এসব বাহিনীর সেপাহীগণ সম্মিলিত ভাবে গোলাবারুদ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল নিরস্ত্র মুছল্লীদের উপর। সে গণহত্যায় হাজার হাজার মানুষ নিহত ও আহত হয়েছিল। নিহতদের সংখ্যাটি গোপন করতে সরকারের আয়োজনটি ছিল চোখে পড়ার মত। হত্যাযজ্ঞ চলা কালে সেখানে কোন নিরপেক্ষ সাংবাদিককে থাকতে দেয়নি। নিভিয়ে দেয়া হয়েছিল রাস্তার আলো। খামোশ করে দেয়া হয়েছিল টিভি ক্যামেরা। ঐ রাতেই বন্ধ করে দেয় ইসলাম টিভি চ্যানেল। পেশাদার খুনি যেমন রাতের আঁধারে খুন করে পালিয়ে যেতে চায়, তেমন স্ট্রাটেজী ছিল শাপলা চত্ত্বরের খুনিদেরও। গণহত্যার কাজে সরকারি খুনিদের সুবিধাগুলি এমনিতেই বিশাল। তখন অপরাধ ঘটে এবং অপরাধের আলামত গায়েবের চেষ্টা হয় পুলিশী প্রহরায়। শাপলা চত্ত্বর থেকে লাশ গায়েব ও রক্তের দাগশূণ্য না হওয়া পর্যন্ত সেখানে কাউকে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। গণহত্যার আলামত গায়েব করতে মিউনিসিপালিটির ময়লা বহনের গাড়িতে করে নিহতদের লাশ রাতারাতি সরানো হয়েছে। রক্ত দাগ মুছে ফেলা হয়েছে পানি ঢেলে। পরের দিন বুঝার উপায় ছিল না, সেখান কামান দাগা হয়েছে, হাজার হাজার রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়েছে এবং শত শত মানুষকে সেখান নিহত ও আহত করা হয়েছে।

মানব ইতিহাসের নৃশংস হত্যাকাণ্ডগুলি কোন কালেই হিংস্র পশুকুলের হাতে হয়নি। এমন কি ডাকাতদল বা সন্ত্রাসী দলের হাতেও নয়। এমন গণহত্যা একমাত্র জালেম স্বৈরশাসকের পক্ষেই সম্ভব। কয়েক হাজার নয়, কয়েক লক্ষ মানুষ হত্যা করলেও আদালতে তাকে আসামী রূপে দাঁড়াতে হয় না। সে হত্যাকাণ্ড নিয়ে যেমন তদন্ত হয় না, তেমনি বিচারও বসে না। ফলে কারো শাস্তিও হয় না। কারণ, স্বৈরশাসকগণ শুধু খুন, গুম, ধর্ষণের ন্যায় অপরাধকেই বেগবান করে না, অচল করে বিচার ব্যবস্থাকেও। বরং বিচারকদের উপর ফরমায়েশ দেয়া হয় বিরোধীদের ফাঁসিতে ঝুলানোর তাগিদ দিয়ে –যেরূপ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়েশাস্তিযোগ্য অপরাধ স্বাইপীর কথোপকথনে ধরা পড়েছে। স্বৈরাচারি শাসনের আযাবে তাই হাজার হাজার মানুষকে লাশ হয়ে হারিয়ে যেতে হয়। কিন্তু কেন তারা লাশ হলো, কীরূপে লাশ হলো এবং কারা লাশ করলো -সে বিষয়টি কখনোই জনগণের জানতে দেয়া হয় না। সেসব নৃশংস অপরাধের ঘটনাগুলিকে বলা হয় রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার গোপন বিষয়। অপরাধ গণ্য হয় সেগুলি জনগণকে জানানো। সে গোপন বিষয় যারা সাহস করে প্রকাশ করে, স্বৈর সরকার তাদেরকে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার শত্রুরূপে অভিযুক্ত করে। রিমান্ডে নিয়ে তাদের উপর নির্যাতন করে এবং দীর্ঘকালীন জেলশাস্তি দেয়।

 

অপরাধ হক কথা বলাও

স্বৈর-সরকারের ক্ষমতার কোন কোন সীমা-সরহাদ থাকে না। ইচ্ছামত তারা গ্রেফতার করে, গুম ও খুন করে, এবং সেনাবাহিনীকে দিয়ে গণহত্যা চালায়। শুধু তাই নয়, নিজ দলের ক্যাডাদের দিয়ে ধর্ষণ করায় এবং দলের নেতা-কর্মিগণ ব্যাংক, ট্রেজারি ও শেয়ার মার্কেট লুণ্ঠনে নামে। ভাবটা এমন, এসবই যেন শাসক দলের শাসনতান্ত্রিক অধিকার। তাদের কথা, ক্ষমতায় থাকতে হলে এগুলি করতেই হয়। তারা অনুসরণ করে ফিরাউন-নমরুদ-হিটলারের সুন্নত। তারা যেহেতু করে গেছে, অতএব এগুলি অপরাধ হবে কেন? তাদের বিচারই বা হবে কেন? বরং শাস্তিযোগ্য অপরাধ তো ঘটে যাওয়া নৃশংসা ঘটনাগুলির চিত্র বাইরে প্রকাশ করা –বিশেষ করে বিদেশীদের কানে তুলে দেয়া। তাদের কথা, এসব গোপন বিষয় অন্যরা জানলে দেশের সম্মানের ক্ষতি হয় এবং দেশের শান্তি বিনষ্ট হয়। অতএব যারাই সরকারের গোপন বিষয় প্রকাশ করে তাদের শাস্তি দেয়াই বাংলাদেশের স্বৈর-সরকারের নীতি। একই নীতি মায়ানমার সরকারেরও। এবং বিচারের রায়ে তো সেটিই কার্যকর হয় -যা সরকার চায়। সম্প্রতি মায়ানমারের সরকার “রয়টার” সংবাদ সংস্থার দুইজন বার্মিজ সাংবাদিককে এরূপ অপরাধে গ্রেফতার করেছে এবং বিচার করেছে। এবং বিচারে ৭ বছরের জেল দেয়া হয়েছে। তাদের অপরাধ, রোহিঙ্গাদের গ্রামে গিয়ে আর্মির গণহত্যা ও গণকবরের কিছু চিত্র তাঁরা বিশ্ববাসীকে জানিয়েছে। একই রূপ অপরাধে বাংলাদেশের সরকার চিত্রশিল্পী শহীদুল আলমকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করেছে। শহীদুল আলমের অপরাধ, নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তায় নামা কিশোর বিদ্রোহীদের উপর পুলিশ ও সরকার দলীয় ক্যাডারদের নৃশংসতার কিছু বিবরণ তিনি আল-জাজিরা’কে জানিয়েছেন।

স্বৈরশাসকের নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা যে এক নয় –সে আইনগত ও নৈতিক বিষয়টি স্বৈরশাসগণ নিজ স্বার্থে ইচ্ছা করেই বুঝতে রাজি নয়। বুঝতে রাজী নয়, তাদের অনুগত আদালতের বিচারকগণও। ফলে প্রকাশ পায়, জনকল্যাণ নিয়ে তাদের যেমন আগ্রহ নাই, তেমনি আগ্রহ নেই অপরাধের নির্মূল নিয়েও। ফলে গরজ নেই, যেসব ভয়ংকর অপরাধীদের হাতে দেশ জিম্মি -তাদের বিচার নিয়েও। কারণ, অপরাধীগণ জনগণের শত্রু হলেও সরকারের শত্রু নয়। প্রতিবছর বাংলাদেশে একমাত্র বাস ড্রাইভারদের হাতেই প্রায় ৮ হাজার মানুষ নিহত হচ্ছে। কিন্তু তাতে স্বৈর-সরকারের ক্ষতি কি? মানুষ মারা পড়লেও স্বৈর-সরকারের কর্তাব্যক্তিদের গায়ে যে আঁচড় লাগছে না –তাতেই সরকার খুশি। অতএব, অপরাধীদের গ্রেফতার করা বা তাদের বিচার করা –সরকারের কাছে গুরুত্ব পাবে কেন? তাদের এজেন্ডা তো সরকার-বিরোধীদের নির্মূল করা। হিফাজতে ইসলামের বিরুদ্ধে এজন্যই শাপলা চত্ত্বরে ভারী কামান ও গোলাবারুদ দিয়ে সেনাবাহিনী নামানো হয়েছিল।

হত্যা, গুম ও নির্যাতনে স্বৈরশাসকের এতোটা নির্ভয় ও নৃশংস হওয়ার কারণ, ক্ষমতায় থাকার জন্য তাকে নিহত, আহত ও নির্যাতিতদের পরিবারের কাছে গিয়ে ভোট চাইতে হয় না। স্বৈরশাসক জানে, নির্বাচনে জিতবার জন্য জনগণের ভোটের দরকার নেই। সে কাজে নিয়োগপ্রাপ্ত সরকারি চাকর-বাকরগণই যথেষ্ঠ। প্রয়োজনীয় ভোট তারা কয়েক মিনিটের মধ্যেই ভোটের বাক্সে ঢালতে পারে। অতএব পরওয়া কিসের? ফলে গদি বাঁচাতে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা, অসংখ্য নগর ধ্বংস এবং নিজ দেশে বিদেশী শত্রুদের ডেকে আনতেও তারা পিছুপা হয় না। নিজের গদি ছাড়া কোন কিছুর উপরই স্বৈরশাসকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। সিরিয়ার স্বৈরশাসক বাশার আল আসাদ তো তারই দৃষ্টান্ত। একই নীতি যে শেখ হাসিনারও। সেটি বুঝার জন্য শাপলা চত্ত্বরের গণহত্যার পর আর কোন প্রমাণের প্রয়োজন পড়ে কি? শাপলা চত্ত্বরের গণহত্যাটি কীরূপ নৃশংস এবং কতোটা বিশাল ছিল সেটি জানার জন্য google’য়ে শাপলা চত্ত্বর লিখে টোকা মারাই যথেষ্ট। তখন দেখা যায়, সে বীভৎসতার অসংখ্য ছবি।

 

যুদ্ধ ঈমান ও অধিকার বিনাশে

স্বৈর-শাসকগণ কখনোই তাদের নিজেদের শত্রুদের চিনতে ভুল করে না। কারণ, এখানে ভূল হলে তাদের শাসন বাঁচে না। তাদের সে মূল্যায়নে শত্রু রূপে গণ্য হয় যেমন সাধারণ জনগণ, তেমনি তাদের উদ্দীপ্ত ঈমান। স্বৈরশাসকগণ সব সময়ই জনগণকে দুর্বল দেখতে চায়। কারণ, একমাত্র তাতেই বাড়ে তাদের গদির নিরাপত্তা। নির্বাচন যেহেতু জনগণের শক্তি প্রয়োগের হাতিয়ার, ফলে স্বৈরাচারি শাসক মাত্রই চায় সে হাতিয়ারটি বিকল করতে বা কেড়ে নিতে। স্বৈরশাসকদের দুষমনি তাই বিশেষ কোন রাজনৈতিক দল বা কোন নেতা বা নেত্রীর বিরুদ্ধে নয়, বরং সেটি খোদ জনগণের বিরুদ্ধে। চোর-ডাকাতের অপরাধ, তারা হাত দেয় জনগণের অর্থসম্পদে। কিন্তু স্বৈরশাসকদের অপরাধ তার চেয়েও নৃশংস। তাদের হানাটি শুধু অর্থসম্পদের উপর নয়, জনগণের নাগরিক অধিকারের উপরও। ফলে স্বৈর-শাসনামলে জনগণের রাষ্ট্রীয় অর্থভাণ্ডারের উপর চুরি-ডাকাতিটা মামূলী বিষয়ে পরিণত হয়; ছিনতাই হয় জনগণের মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার। এবং প্রহসনে পরিণত হয় নির্বাচন।

গণতান্ত্রিক অধিকার বিনাশের পাশাপাশি নরনারীর ঈমান ধ্বংসেও স্বৈরাচারি সরকারের যুদ্ধটি লাগাতর। কারণ তারা জানে, ঈমানদার মাত্রই স্বৈরাচার নির্মূলের মিশন নিয়ে বাঁচে। স্রেফ নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাত নিয়ে নয়, তারা বাঁচে একটি রাজনৈতিক এজেন্ডা নিয়েও। সেটি হলো, ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং অন্যায়ের নির্মূল। আল-কোরআনের ভাষায় “আমিরু বিল মারুফ, নেহী আনিল মুনকার।” ফলে তারা জানে, ঈমানদার ব্যক্তি কখনোই স্বৈরশাসকের মিত্র হয় না। মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশিত সে মিশনটির কারণেই নবী-রাসুলগণ যুগে যুগে দুর্বৃত্ত শাসকদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। অপরদিকে স্বৈরশাসকগণ নেমেছে তাদের নির্মূলে। স্বৈরশাসকের এজেন্ডা তাই স্রেফ জনগণের ভোটের অধিকার কেড়ে নেয়া বা নির্বাচন প্রক্রিয়া বিকল করা নয়, বরং জনগণের ঈমান বিলুপ্ত করাও। কারণ, স্বৈরশাসকদের সমস্যা ঈমানদারের দেহ, ভাষা বা বর্ণ নিয়ে নয়, বরং তাদের ঈমান নিয়ে। ঈমান বিলুপ্ত হলেই তাদের মিত্র হতে আর কোন বাধা থাকে না।

এজন্যই জনগণকে ইসলাম থেকে দূরে রাখা এবং তাদের ঈমান, আমল ও নৈতিকতা বিনষ্ট করার কাজে স্বৈরচারি শাসকচক্রের রাজনৈতিক ও সোসাল ইঞ্জিনীয়ারিংটি বাংলাদেশেও চোখে পড়ার মত।  ফিরাউন, নমরুদ ও আবু জেহলগণ যুগে যুগে ইসলাম ও নবী-রাসূলদের বিরুদ্ধে সাধারণ জনগণকে ক্ষেপিয়েছে। মহান নবীজী (সাঃ)র গায়ে পাথর মারতে কিশোরদের উস্কে দিয়েছিল তায়েফের সর্দারগণ। অবিকল সেরূপ একটি পরিকল্পণার অংশ রূপেই বাংলাদেশের স্বৈর-সরকারও স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের রাস্তায় নামিয়েছে ইসলামপন্থি নেতাদের ফাঁসির দাবী তুলতে। ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে শহরে শহরে নির্মূল কমিটিরও জন্ম দিয়েছে। তাদের কাছে সন্ত্রাস এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলো জিহাদ, শরিয়ত, হুদুদ ও খেলাফতের পক্ষ নেয়াটি।

 

সবচেয়ে বড় নাশকতাটি স্বৈর-শাসকের

মানবজীবনে সবচেয়ে বড় ক্ষতিটি সম্পদের ক্ষতি নয়; বরং সেটি ঘটে ঈমানের বিরুদ্ধে নাশকতায়। অথচ জনগণের বিরুদ্ধে সে ভয়ানক নাশকতাটি ঘটায় দেশের স্বৈর সরকার। সেটি শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি, মিডিয়া, সাহিত্য তথা নানা রূপ সোসাল ইঞ্জিনীয়ারিংয়ের মাধ্যমে। প্রশ্ন হলো, জনগণের এত বড় ক্ষতি কি কোন হিংস্র জন্তু-জানোয়ার, বিষাক্ত কীটপতঙ্গ বা রোগজীবাণূর হাতে ঘটে? সমাজের চোর-ডাকাতগণও কি মানব জীবনে এতবড় নাশকতা ঘটায়? জনগণের আর্থিক ক্ষতি করলেও তাদেরকে তারা জাহান্নামে নেয় না। ভয়নাক সে নাশকতাটি ঘটে স্বৈরাচারি সরকারের হাতে। তাই মহান আল্লাহতায়ালার দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় নেক কর্মটি কোটি কোটি টাকার দান-খয়রাত নয়, শত শত স্কুল- কলেজ-মাদ্রসা বা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠাও নয়। জঙ্গলের হিংস্র পশু বা বিষাক্ত কীট হত্যাও নয়, বরং সেটি হলো স্বৈরাচারি শাসক নির্মূল। পৃথিবীপৃষ্টে এরাই হলো শয়তানের প্রত্যক্ষ প্রতিনিধি। অন্যায়ের নির্মূল এবং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তাদের নির্মূল ছাড়া কি ভিন্ন পথ আছে? এরূপ শাসকদের বিরুদ্ধে হক কথা বলাটিও উত্তম জিহাদ; আর তাদের নির্মূলের যুদ্ধে প্রাণ গেলে জুটে শহীদের মর্যাদা।

কোন মুসলিম দেশে স্বৈরশাসন দীর্ঘকাল বেঁচে থাকার বিপদটি অতি ভয়াবহ। তারা বাঁচলে জনগণের জীবনে বাড়ে ইসলাম থেকে দুরে সরাটি। আর ইসলাম থেকে দুরে সরার অর্থ তো জাহান্নামের পথে ধাবিত হওয়া। এবং বাংলাদেশে দুরে সরানোর সে কাজটি চলছে জনগণের রাজস্বের অর্থে এবং ধর্ম, শিক্ষা-সংস্কৃতি, মিডিয়া ও সাহিত্য-সংঙ্গিতের নামে। বস্তুতঃ এটি হলো জনগণকে ঈমানশূণ্য করার সরকারি পরিকল্পনা। ঈমানশূণ্য করার সে পরিকল্পনা কতটা সফল হচ্ছে সেটি বুঝা যায়, দেশে চুরি-ডাকাতি, গুম,খুন, ধর্ষণ, ব্যাভিচারি, সন্ত্রাস কতটা বাড়লো -তা দিয়ে। আরো বুঝা যায়, দুর্বৃত্তগণ দেশের রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, প্রশাসন ও আইন-আদালতে কতটা অধিকার জমালো এবং ফিরাউনের ন্যায় শাসকগণ কতটা আয়ু পেল -তা থেকে। এরূপ দুর্বৃত্তকরণ প্রক্রিয়া বলবান হলে ফিরাউনগণ শুধু শাসকের পদে থাকে না, তারা ভগবানেও পরিণত হয়। তখন রাষ্ট্রের নীতি এবং সে সাথে উৎসবের বিষয় রূপে গণ্য হয় আল্লাহভীরু মানুষদের হত্যা করাটি। অপরাধীদের হাতে অধিকৃত এরূপ রাষ্ট্র পরিণত হয় পৃথিবীর পৃষ্ঠে সবচেয়ে বিপদজনক প্রতিষ্ঠানে। সমাজের বুকে সবচেয়ে বড় নেক কর্মটি চোর-ডাকাত নির্মূল নয়। বাঘ-ভালুক তাড়ানোও নয়। বরং এরূপ বিপদজনক রাষ্ট্রের হাতে থেকে পরিত্রানের ব্যবস্থা করা। এটিই তো নবীজীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সূন্নত। নির্মূলের সে কাজে নবীজী (সাঃ) ও তারঁ সাহাবাদের লাগাতর জিহাদ করতে হয়েছে। সে সূন্নতের বরকতেই আরবভূমিসহ বিশ্বের বিশাল ভূভাগ থেকে অপরাধীদের শাসন বিলুপ্ত হয়েছিল। অথচ আজকের মুসলিমগণ নবীজী (সাঃ)র সে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূন্নতটি বাদ দিয়েই তাঁর অনুসারি হতে চায়।  ১৮.০৩.২০১৯

 

 




ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা কেন শ্রেষ্ঠ ইবাদত

সর্বশ্রেষ্ঠ নেক কর্ম

মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার নির্মাণে হযরত মহম্মদ (সাঃ)’র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদানটি শুধু ইসলাম প্রচার ছিল না, বরং সেটি ছিল বিশাল ভূ-ভাগ থেকে দুর্বৃত্ত শাসকদের নির্মূল এবং ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। এ কাজটি না হলে স্রেফ কোর’আন তেলাওয়াত, নামায-রোযা ও হজ্বযাকাত পালন এবং মসজিদ-মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা বাড়িয়ে ইসলামের বিজয় ও মুসলিমের গৌরব বৃদ্ধি করা যেত না। এবং সম্ভব হতো না মানব জাতির কল্যাণে শিক্ষণীয় অবদান রাখাও। কারণ, জনকল্যাণে রাষ্ট্রের যে বিশাল ক্ষমতা -সেটি মসজিদ-মাদ্রাসা বা অন্য কোন প্রতিষ্ঠানের থাকে না। এদিকে ইসলাম অন্য ধর্ম থেকে পুরাপুরি ভিন্ন। কারণ, অন্যায়ের নির্মূল ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার বিষয়টি ইসলামের কেন্দ্রীয় বিষয়। এটি মুসলিম জীবনের মিশন রূপে নির্ধারিত করে দেয়া হয়েছে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে। মুসলিমগণ সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি তার কারণ তাদের জীবনে থাকে অন্যায়ের নির্মূল ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার মিশন। আর অন্যায়ের নির্মূলে ময়দানে নামলে দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে যুদ্ধটি অনিবার্য ও অবিরাম হয়ে উঠে। ইসলামের শত্রুদের নির্মূলের সে শক্তিটি তো আসে রাষ্ট্রীয় শক্তি থেকে। ইসলামি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা এজন্যই মুসলিম জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। মানব সভ্যতার ইতিহাসে এটিই হলো সবচেয়ে বড় নেক কর্ম। দুর্বৃত্তগণ ইসলামের শক্তির এ পরিচিত উৎস্যটি জানে। এজন্যই ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে এতো বিরোধীতা। এ লক্ষ্যে শয়তানী শক্তিবর্গের কোয়ালিশনটি তাই দুনিয়াব্যাপী।

ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার এজেন্ডা না থাকলে কাফের শক্তির সাথে সংঘাতের কোন কারণই সৃষ্টি হতো না। তাবলিগ জামায়াতের কর্মীদের এজন্যই কোন শত্রু নেই; তাদের জীবনে কোন সংঘাতও নাই। অথচ সংঘাত এড়াতে পারেননি নবী-রাসূলগণ। মুসলিম জীবনে এরূপ সংঘাত না থাকার অর্থ বস্তুতঃ প্রকৃত ঈমান না থাকা। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহতায়ালা ঈমানদারদের সামনে অনুকরণীয় মডেল রূপে খাড়া করেছেন মুসলিম উম্মাহর আদি পিতা হযরত ইব্রাহীম (আঃ)কে। তাঁর কোন লোকবল ছিল না; তিনি ছিলেন একা। কিন্তু নমরুদের নেতৃত্বাধীন সম্মিলিত কাফের শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছেন এ হুংকার দিয়েঃ “শুরু হলো তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ”। মহান আল্লাহতায়ালার কাছে তাঁর সে সাহসী ঘোষণাটি এতোই ভাল লেগেছিল যে, সেটিকে তিনি রেকর্ড করেছেন পবিত্র কোরআনের সুরা মুমতাহেনার ৪ নম্বর আয়াতে। তাঁকে অনুকরণ করার নির্দেশ দিয়ে ঈমানদারদের উদ্দেশ্য বলা হয়েছে, “তোমাদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে ইব্রাহীম (আঃ)’য়ে জীবনে।” এ থেকে বুঝা যায় মুসলিম জীবনে শত্রুশক্তির সাথে সংঘাতের অনিবার্যতা ও তার নির্মূলে জিহাদটি কতো গুরুত্বপূর্ণ।

নবীজী (সাঃ)র জীবনের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটি হলোঃ জিহাদের মাধ্যমেই নির্মূল করেছেন স্বৈর শাসন। এবং প্রতিষ্ঠা করেছেন ইসলামী রাষ্ট্র। লড়াই না থাকলে বিজয়ের প্রশ্নই উঠে না –সেটি বীজ না বুনে ফসল ঘরে তোলার ন্যায় কল্প বিলাস। জিহাদ না থাকলে তাই অসম্ভব হয় ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। আর ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা না পেলে লক্ষ লক্ষ মসজিদ-মাদ্রাসা গড়েও মুসলিম উম্মাহর শক্তিতে বৃদ্ধি আনা যায় না। বাংলাদেশে ঢাকা’র ন্যায় একটি জেলাতে যত মাদ্রাসা ও মসজিদ আছে তা খলিফা রাশেদার আমলে সমগ্র মুসলিম রাষ্ট্র জুড়ে ছিল না। কিন্তু তাতে লাভ কি হয়েছে? দেশে কি ইসলামের প্রতিষ্ঠা বেড়েছে? গৌরব বেড়েছে কি বাঙালী মুসলিমের। বরং তারা তো ৫ বার বিশ্বে প্রথম হয়েছে দুর্নীতিতে। নবীজী (সাঃ)র ইসলাম –যার অপরিহার্য উপাদান হলো শরিয়ত, হুদুদ, খেলাফত, শুরা, মুসলিম ঐক্য, সে ইসলাম বাংলাদেশে নাই। যেটি আছে সেটি হলো অপূর্ণাঙ্গ ও বিকৃত ইসলাম। পূর্ণাঙ্গ ইসলাম না থাকাতে সমাজ জুড়ে বেড়ে উঠেছে অধর্ম ও পথভ্রষ্টতা। এজন্যই দেশ বিশ্বরেকর্ড গড়েছে দুর্বৃত্তিতে। রেকর্ড গড়ছে এমন কি পৌত্তলিক সংস্কৃতির পরিচর্যাতেও। বর্ষবরণ ও বসন্তবরণের নামে দেশে যেরূপ পৌত্তলিক সংস্কৃতির জোয়ার সৃষ্টি হয় -তা এমন কি কলকাতার হিন্দু সংস্কৃতিকেও হার মানায়। ঢাকা শহরে বাংলা ১৪২৫’য়ের নববর্ষ পালন নিয়ে তেমন একটি রিপোর্ট ছেপেছে কলকাতার আনন্দ বাজার পত্রিকা।

 

রাষ্ট্রই সবচেয়ে শক্তশালী ও সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান

ইসলামের মৌল বিশ্বাস ও অনুশাসনের নির্মূলে রাষ্ট্রীয় ভাবে যখন রাজনৈতিক ও সামাজিক ইঞ্জিনীয়ারীং চলে, তখন লক্ষ লক্ষ মসজিদ-মাদ্রাসাও যে কতটা ব্যর্থ হয় –বাংলাদেশ মূলতঃ তারই নমুনা। অথচ ইসলামের শত্রুশক্তির নির্মূল হলে এবং ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে সমগ্র দেশ পরিণত হয় মসজিদ-মাদ্রসায়। নবীজী (সাঃ)র হাদীসঃ কেউ মসজিদ নির্মাণ করলে মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর জন্য জান্নাতে ঘর তৈরী করে দেন। মসজিদ নির্মাণে অর্থ ব্যয় হয়, কিন্তু তাতে রক্তের বিনিয়োগ হয় না। কিন্তু বিপুল অর্থ ও হাজার হাজার মানুষের রক্তের বিশাল বিনিয়োগটি অপরিহার্য হয় ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণে। ইসলামী রাষ্ট্র দেয়, মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব ও শরিয়তের বিজয়। দেয়, শত্রুর হামলার মুখে মুসলিম উম্মাহর প্রতিরক্ষা। দেয়, বিশ্বশক্তি রূপে উত্থানের সামর্থ্য। ফলে ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণের পুরস্কার যে কতো বিশাল -সেটি বুঝে উঠা কি এতই কঠিন? যে সমাজে সে কাজটি বেশী বেশী হয়, সে সমাজ পায় মহান আল্লাহতায়ালার অফুরন্ত নেয়ামত। তাদের সাহায্যে হাজার হাজার ফেরেশতা নেমে আসে। জুটে শত্রুর বিরুদ্ধে বিজয়। ফলে এ পৃথিবীপৃষ্ঠে এর চেয়ে সেরা নেক কর্ম এবং শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিশীল কাজ আর কি হতে পারে? সেটি না হলে যা আসে তা হলো কঠিন আযাব। সে কাজটি সবচেয়ে বেশী হয়েছিল সাহাবায়ে কেরামদের যুগে। নবীজী (সাঃ)র শতকরা৭০ ভাগের বেশী সাহাবা সে কাজে শহীদ হয়েছেন। তাদের অর্থ ও রক্তের বিনিয়োগের ফলে জুটেছে গায়েবী মদদ ও বিশ্বব্যাপী ইজ্জত। এবং তাতে মুসলিম উম্মাহর উত্থান ঘটেছে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী শক্তি রূপে। কিন্তু আজ সে কোরবানি নাই, ফলে মুসলিম উম্মাহর সে শক্তি এবং ইজ্জতও নাই।

ফিরাউনের জুলুম থেকে মুক্তি দেয়ার পর হযরত মুসা (সাঃ) এবং তাঁর অনুসারি বনি ইসরাইলীদের উপর যে হুকুমটি এসেছিল সেটি উপাসনালয় বা মাদ্রাসা গড়ার নয়; বরং সেটি ছিল ফিলিস্তিন থেকে স্বৈরশাসন নির্মূলের। নির্দেশ ছিল, স্বৈরশাসনের নির্মূল করে সেখানে তাওরাতে  ঘোষিত শরিয়ত প্রতিষ্ঠা দেয়ার। কিন্তু ইহুদীগণ সে হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। তাদের আচরণ এতটাই উদ্ধত ছিল যে তারা হযরত মূসা (আঃ)কে বলেছিল, “হে মূসা! তুমি ও তোমার আল্লাহ গিয়ে যুদ্ধ করো, আমরা অপেক্ষায় আছি।” তাদের গাদ্দারির ফলে স্বৈরাচারের নির্মূল ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠার কাজ সেদিন সফল হয়নি। ফলে হযরত মূসা (আঃ) উপর অবতীর্ণ শরিয়তি বিধান তাওরাতেই রয়ে গেছে, বাস্তবায়ীত হয়নি। মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে এরূপ গাদ্দারি কি কখনো রহমত ডেকে আনে? বরং ঘিরে ধরেছিল কঠিন আযাব। ফিলিস্তিনে ঢুকা তাদের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়; শত শত বছর তারা নানা দেশের পথে পথে ঘুরেছে উদ্বাস্তুর বেশে। অথচ তাদের যে জনবল ছিল তা মহান নবীজী (সাঃ) পাননি। নবীজী (সাঃ) তাঁর মক্কী জীবনের ১৩ বছরে ২০০ জনের বেশী লোক তৈরী করতে পারেননি। অথচ মিশর থেকে হিজরত কালে হযরত মূসা (আঃ) সাথে ইহুদীদের সংখ্যা ছিল লক্ষাধিক। কিন্তু সে বিশাল জনবল তাদের শক্তি ও ইজ্জত না বাড়িয়ে অপমানই বাড়িয়েছে। একই পথ ধরেছে আজকের মুসলিমগণ। বিপুল সংখ্যায় বাড়ছে তাদের জনবল; কিন্তু বাড়েনি মহান আল্লাহতায়ালার পথে তাদের অঙ্গিকার ও কোরবানী। ইহুদীদের ন্যায় তারাও নিষ্ক্রিয় স্বৈরশাসকদের নির্মূলে। এক্ষেত্রে বাঙালী মুসলিমদের ব্যর্থতাটি কি কম? দীর্ঘকাল যাবত তাদের ঘাড়ে চেপে বসা স্বৈরশাসক এবং ইসলামের পরাজয় বস্তুতঃ সে ব্যর্থতাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। অথচ মহান আল্লাহতায়ালার হুকুম মেনে চলায় সামান্য অঙ্গিকার থাকলে এ জালেম স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে গ্রামে গঞ্জে জিহাদ শুরু হতো।


অপরাধীদের অধিকৃতি ও প্রহসনের নির্বাচন

কোনটি গণতন্ত্র আর কোনটি স্বৈরাচার -সেটি বুঝা উঠে কি এতই কঠিন? গণতন্ত্রের মূল কথা, কারা দেশের শাসক হবে সেটি নির্ধারিত হবে একমাত্র জনগণের ভোটে। প্রশ্ন হলো, নিরপেক্ষ নির্বাচন না হলে জনগণ তাদের সে রায়টি জানাবে কেমনে? সে জন্য যে কোন দায়িত্বশীল সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্বটি হলো, নিরপেক্ষ নির্বাচনের সুষ্ঠ পরিবেশ সৃষ্টি করা। অথচ স্বৈরাচারি সরকারের বড় অপরাধটি হয় এ ক্ষেত্রে। নির্বাচন পরিণত হয় ভোটডাকাতির মাধ্যমে। ফলে এমন ভোটডাকাতির নির্বাচন বার বার হলেও তাতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায় না। তাতে জনগণের রায়েরও প্রতিফলন হয় না। বস্তুতঃ নির্বাচন কতটা বৈধ হলো সে বিচারটি হয়, নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহন কীরূপ এবং কতটা নিরপেক্ষ -তা দিয়ে। সেটি না হলে নির্বাচন অর্থহীন। এমন গণতন্ত্রহীন নির্বাচন স্বৈরশাসকদের শক্তি বাড়ায়। এবং শক্তিহীন ও নিছক দর্শকে পরিণত করে জনগণকে। এজন্যই স্বৈরশাসকগণ জনগণে শত্রু।

গণতন্ত্র বাঁচাতে হলে গণজীবনে বাঁচাতে হয় জনগণের কথা বলার স্বাধীনতা, মিটিং-মিছিলের স্বাধীনতা, সংগঠিত হওয়ার স্বাধীনতা এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণের স্বাধীনতা। নইলে গণতন্ত্র বাঁচে না। কিন্তু বাংলাদেশে এর কোনটাই বাঁচেনি। ফলে বেঁচে নাই গণতন্ত্রও। মিটিং-মিছিলের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক দল গড়ে সংগঠিত হওয়ার স্বাধীনতা শুধু পাকিস্তান আমলেই ছিল না, ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ আমলেও ছিল। কিন্তু এখন নাই। রাস্তায় নিরস্ত্র মানুষের  মিছিল শুরু হলে শুধু সশস্ত্র পুলিশ নয়, সরকার দলের ক্যাডারগণও অস্ত্র হাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। হাসিনার স্বৈর সরকার রাজপথে স্কুলের নিরীহ কিশোর-কিশোরীদের মিছিলও সহ্য করেনি। তাদের উপরও সশস্ত্র পুলিশ ও গুণ্ডাদের লেলিয়ে দিয়েছে। তাদের হাতে ছাত্র-ছাত্রীগণ শুধু আহতই হয়নি, যৌন ভাবে লাঞ্ছিতও হয়েছে। আল জাজিরা’ টিভি চ্যানেলের সামনে সে সত্য বিবরণ তুলে ধরাতে গৃহে হামলা দিয়ে ডিবি’র পুলিশ ফটোশিল্পী শহীদুল আলমকে উঠিয়ে নিয়ে নির্যাতন করেছে। নির্যাতনের ফলে আদালতে তাঁকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাজির হতে হয়েছে।

স্বৈর-সরকারের হাতে নির্বাচন হাইজ্যাকের কাজটি শুধু নির্বাচন কালে হয় না। সেটি শুরু হয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের বহু পূর্ব থেকেই। বস্তুতঃ সেটি চলে সমগ্র স্বৈর-শাসনামল জুড়ে। নির্বাচন হাইজ্যাকের কাজে ব্যবহৃত হয় দেশের আইন ও আদালত। আইন ও আদালতকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ভাবে চলতে না দিয়ে ব্যবহার করা হয় সরকারের শত্রু নির্মূলের কাজে। সেটি বুঝা যায় সরকারি দলের নেতাদের মিথ্যা মামলায় জেল ও ফাঁসি দেয়ার আয়োজন দেখে। কেড়ে নেয়া হয় রাজপথে প্রতিবাদের স্বাধীনতা। এরূপ অগণতান্ত্রিক পরিবেশে নির্বাচন হলে সে নির্বাচন কি কোন ভদ্র ও সুবোধ মানুষের স্বীকৃতি পায়? শেখ হাসিনার সরকার যে একটি অবৈধ, অসভ্য এবং অগণতান্ত্রিক সরকার –তা নিয়ে এজন্যই ভদ্র সমাজে কোন বিতর্ক নেই। ২০১৪ সালের নির্বাচনে সংসদের ৩০০ সিটের মাঝে ১৫৩ সিটে কোন ভোটাভুটি হয়নি। দেশব্যাপী শতকরা ৫ ভাগ ভোটার ভোট দেয়নি। কোন গণতান্ত্রিক দেশে কোন কালেও কি এমন নির্বাচন হয়েছে? এমন ভোটারহীন নির্বাচনকে নির্বাচন বললে ভোট ডাকাতির নির্বাচনকে কি বলা যাবে? প্রতিটি সভ্য সমাজেই সভ্য ও অসভ্য এবং ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে একটি সুস্পষ্ট পার্থক্য থাকে, সে পার্থক্য বিলুপ্ত করাটিই অসভ্য সমাজের রীতি। বাংলাদেশে সে পার্থক্য বিলুপ্ত হয়েছে শেখ হাসিনার ন্যায় স্বৈর-শাসকদের হাতে। ফলে সরকারের নীতিতে সত্য-মিথ্যা এবং ন্যায়-অন্যায় একাকার হয়েছে। ফলে ভোট ডাকাতির নির্বাচনও ঘোষিত হয় সুষ্ঠ নির্বাচন রূপে। যেসব ভয়নাক চোর-ডাকাতদের স্থান হওয়া উচিত ছিল কারাগারে, তারাই আবির্ভুত হয়েছে দেশের হর্তাকর্তা রূপে।

ডাকাত ও ভোট-ডাকাতঃ পার্থক্যটি কোথায়?

ডাকাত ও ভোট-ডাকাত –উভয়ই অপরাধী। তবে উভয় প্রকার ডাকাতের মাঝে পার্থক্যটি সৃষ্টি হয় বিবেকের বিরুদ্ধে নাশকতা ভেদে। চুরি-ডাকাতিকে অপরাধ গণ্য করার মত বিবেক চোর-ডাকাতদের মাঝে কিছুটা হলেও বেঁচে থাকে। শরমবোধ থাকে চোর-ডাকাত রূপে সমাজে পরিচিতি হওয়াতে। ডাকাতির অর্থকে এজন্যই তারা লুকিয়ে রাখে। এজন্যই দিনে নয়, রাতের আঁধারে তারা চুরি-ডাকাতিতে নামে। কিন্তু সে সামান্য বিবেকবোধ এবং চোর-ডাকাত রূপে পরিচিতি হওয়া নিয়ে সামান্য শরমবোধের মৃত্যু ঘটে ভোট-ডাকাতদের মাঝে। ফলে দর্পের সাথে তারা ভোট-ডাকাতি করে দিনদুপুরে। এমন বিবেকহীনতা ও শরমহীনতার কারণে দেশবাসীর সামনে এবং সে সাথে বিশ্ববাসীর সামনে নিজেকে প্রধানমন্ত্রী রূপে জাহির করতে শেখ হাসিনার কোন শরম হয়নি। শরম পায়নি ক্ষমতায় থাকা কালে ভোট ডাকাত এরশাদও। এরশাদ তাই খেতাব কুড়িয়েছিল বিশ্ববেহায়া রূপে। এদের হাতে পৃথিবীজুড়া অপমান বাড়ছে বাংলাদেশীদের। যে সব বিদেশীগণ বাংলাদেশে রাজনীতির খবর রাখে, তারা কি জানে না কীরূপে ক্ষমতায় এসেছে শেখ হাসিনা? তাঁর সাথে সাক্ষাত কালে বিদেশীদের স্মৃতিতেও নিশ্চিত জেগে উঠে তাঁর অপরাধের নৃশংসতা। সে স্মৃতিটি এক অপরাধি স্বৈরশাসকের। যার অপরাধ, ভোট ডাকাতির মাধ্যমে ক্ষমতা ছিনতাইয়ের।


বাংলাদেশে স্বৈরশাসনের ইতিহাসে হুসেন মহম্মদ এরশাদ এক অতি অসভ্য চরিত্র। এখন সে অসভ্য ব্যক্তিটি শেখ হাসিনার শুধু রাজনৈতিক মিত্রই নয়, বরং উভয়েই একত্রে অবস্থান গণতন্ত্রের নির্মূলে। চোর-ডাকাতদের নাশকতায় মানুষের আর্থিক ক্ষয়-ক্ষতি হলেও তাতে কারো ঈমান বিনষ্ট হয়না। কারণ, অর্থে হাত দিলেও তারা মানুষের ঈমান বা বিবেক হত্যায় হাত দেয় না। অথচ সে কাজটি করছে ভোট- ডাকাত স্বৈরশাসকগণ। ফলে তাদের শাসনে দেশে ব্যাপক ভাবে বাড়ে মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। বাড়ে গুম, খুন, ধর্ষণ, চুরি-ডাকাতি ও সন্ত্রাস। দেহের মধ্যে জীবাণু রেখে সুস্থ্য দেহ আশা করা যায় না, তেমনি বিবেকধ্বংসী স্বৈরাচারিদের ক্ষমতায় রেখে দেশগড়ার কাজও হয়না। নবীজী (সাঃ)র গুরুত্বপূর্ণ সূন্নত তাই স্রেফ নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত ও মসজিদের প্রতিষ্ঠা ছিল না, ছিল রাষ্ট্রের অঙ্গণ থেকে দুর্বৃত্ত নির্মূলও।


অপরাধীদের মনে সব সময়ই থাকে নিজ অপরাধ গোপন করার নেশা। শেখ হাসিনা তাই ২০১৪ সালের নির্বাচন জনগণ কর্তৃক বর্জনের জন্য দায়ী করেন বিরোধী দলকে। অথচ ইচ্ছা করেই এ সত্য বুঝতে তারা রাজী নয়, তাবলিগ, রিলিফ বিতরণ বা সৃষ্টিহীন হৈচৈ’য়ের জন্য কেউ রাজনৈতিক দল গড়ে না। রাজনৈতিক দল গড়ার মূল উদ্দেশ্যটি হলো, নির্বাচনে অংশ নিয়ে ক্ষমতায় যাওয়া। নির্বাচনে অংশ নেয়াকে প্রতিটি রাজনৈতিক দল এজন্যই অপরিহার্য ভাবে। ব্যবসা করতে হলে দোকান খুলতে হয়, তেমনি রাজনীতি করতে হলে নির্বাচনে অংশ নিতে হয়। শাসন ক্ষমতায় যাওয়ার এটিই একমাত্র বৈধ পথ। কিন্তু সরকারি দলের উদ্যোগে নিরপেক্ষ নির্বাচনকে যখন অসম্ভব করা হয়, তখন লাখ লাখ টাকা খরচ করে নির্বাচনে নামা ও রাতদিন প্রচার চালনাটি অর্থহীন। এমন সাঁজানো নির্বাচনে অংশ নিলে বৈধতা পায় স্বৈরাচারি শাসকের সিলেকশন প্রক্রিয়া। তাতে গাদ্দারি হয় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সাথে। ২০১৪ সালের নির্বাচন ছিল তেমনি একটি প্রহসন মূলক নির্বাচন। দেশের নিরক্ষর নাগরিকগণও সেটি বুঝতো। এজন্যই স্বৈরাচার বিরোধী দলগুলির কোনটিই ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ নেয়নি। এরূপ নির্বাচনে অংশ নিলে এসব দলের নেতা-নেত্রীগণ ইতিহাসে তারা গণতন্ত্রের শত্রুরূপে ধিকৃত হতো। এজন্য শত শত বছর পরও নতুন প্রজন্ম থেকে ধিক্কার কুড়াতো। কিন্তু স্বৈরশাসকদের সে লজ্জাশরমের ভাবনা থাকে না। কে কি বলবে -তা নিয়ে তারা ভাবে না। তাদের ভাবনা, কি ভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করা যায় -তা নিয়ে। তাই সে প্রহসনের নির্বাচনে শেখ হাসিনার সাথে অংশ নিতে দেখা গেছে গণতন্ত্রের আরেক ঘৃণীত দুষমন এরশাদকে।

দায়ভারটি জিহাদের

অতীতের গৌরবময় ইতিহাস জনগণকে দেয় নতুন ইতিহাস গড়ায় আত্মবিশ্বাস। মুসলিমদের সে ইতিহাস তো অতি সমৃদ্ধ। যে কৃষক ফসল ফলাতে জানে, তার ফসল বানের পানিতে বার বার ভেসে গেলেও সে আবার চাষাবাদে নামে। নিষ্ক্রিয় হওয়া, মনের দুঃখে হতোদ্যম হওয়া বা হতাশায় দেশ ছেড়ে যাওয়াটি তাঁর রীতিবিরুদ্ধ। গৃহে বার বার চুরি-ডাকাতি হবে এবং দিনের পর দিন গৃহ চোর-ডাকাতদের হাতে অধিকৃত থাকবে –এটি কি কোন সভ্য মানুষ মেনে নেয়? সেটি মেনে নেয়াটি শুধু অক্ষমতা নয়, বরং অসভ্যতাও। সভ্য মানুষ তাই চোর-ডাকাত তাড়াতে হাতের কাছে যা পায় তাই নিয়ে লড়াইয়ে নামে। ইসলামে সেটিই তো জিহাদ। এরূপ জিহাদের কারণেই রাষ্ট্র থেকে নির্মূল হয় শয়তানী শক্তির দখলদারি। শত্রুর নির্মূলে ও মুসলিম উম্মহর প্রতিরক্ষায় জিহাদই হলো বস্তুতঃ মূল হাতিয়ার। ফলে শত্রু শক্তির লাগাতর হামলাটি নামায-রোযা বা হজ্ব-যাকাতের বিরুদ্ধে নয়; বরং সেটির লক্ষ্য মুসলিম জীবন থেকে জিহাদের বিলুপ্তি।

প্রতিটি মুসলিম সমাজে জিহাদের বিরুদ্ধে শয়তানের কৌশলটিও চোখে পড়ার মত। শয়তান সমাজে নামে মোল্লা-মৌলভী, আলেম-উলামা, পীর-দরবেশ, ইমাম, হুজুরদের ছদ্দবেশে। এরা বলে পবিত্র কোরআনে ইসলামি রাষ্ট্র বলে কিছু নেই। শরিয়তের প্রতিষ্ঠা বলেও কিছু নাই্। যেন নবীজী (সাঃ) ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ও সে রাষ্ট্রের প্রধান হয়ে কোরআনের বিরুদ্ধে চলে গেছেন! (নাউযু  বিল্লাহ।) যেন ইসলামে খোলাফায়ে রাশেদা বলে কিছু ছিল না।  তাদের কাছে ইসলাম হলো স্রেফ তাওহীদে বিশ্বাস এবং নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত ও তাসবিহ-তাহলিল পালন। তারা মানুষকে নহিসত দেয় জিহাদে নামার আগে নিজেকে ফেরেশতা বানাতে। অথচ তারা জানে ফেরেশতা হওয়াটি অসম্ভব ব্যাপার। সে কাজ ফেরেশতাদের, মানুষের নয়। এক্ষেত্রে তাদের নিজেদের ব্যর্থতাটিও কি এ ক্ষেত্রে কম? এরূপ লক্ষ লক্ষ আলেম, ইমাম, হুজুর, পীর, সুফি ও দরবেশ প্রতি বছর দুনিয়া থেকে বিদায় নয় ফেরেশতা না হয়েই। তাদের নামায-রোযার ভাণ্ডারে অনেক ইবাদত জমলেও ঈমানের ভাণ্ডারটি থাকে শুণ্য। ফলে একটি দিনের জন্য তারা কোন জিহাদের ময়দানে হাজির হয় না। জিহাদ থেকে অধিকাংশ মুসলিমের দূরে থাকার কারণে মুসলিম দেশে শরিয়তের প্রতিষ্ঠাও ঘটেনি। অথচ দেশ যেখানে ইসলামের শত্রু শক্তির হাতে অধিকৃত এবং শরিয়ত যেখানে নির্বাসিত, জিহাদের ময়দান তো সে দেশে হাজির হয় প্রতিটি ব্যক্তির এবং প্রতিটি ঘরের দরজার সামনে। এবং জিহাদ প্রসঙ্গে নবীজী (সাঃ)র প্রসিদ্ধ সহীহ হাদীস, “যে ব্যক্তি জীবনে কোন দিন জিহাদ করলো না এবং জিহাদের নিয়েতও করলো না সে ব্যক্তি মুনাফিক।”  কারণ জিহাদ তো ঈমানের ফসল। বীজ থেকে যেমন চারা গজায় তেমনি ঈমান থেকে জিহাদ জন্ম নেয়। ঈমান থাকলে মু’মিনের জীবনে জিহাদ অনিবার্য ভাবেই এসে যায়। তাই নবীজী (সাঃ)’র অনুসারি এমন কোন সুস্থ্য সাহাবী ছিলেন না যিনি জিহাদের ময়দানে প্রাণ দানে হাজির হননি। অথচ যারা মুনাফিক, তাদের জীবনে নামায-রোযা থাকলেও জিহাদ থাকে না।

ঈমান কাকে বলে এবং কীভাবে তার প্রকাশ ঘটে পবিত্র কোরআন থেকে তার একটি উদাহরণ দেয়া যাক।  ফিরাউনের প্রাসাদে মূসা (আঃ)এর সাথে প্রতিযোগিতায় হেরে যাদুকরদের যে দলটি ঈমান এনে শহীদ হয়েছিলেন তাদের কেউই ফেরেশতা ছিলেন না। সারা জীবন তারা কাটিয়েছিলেন যাদুর ন্যায় কবিরা গুনাহর রাজ্যে। তাদের নামায-রোযার ভাণ্ডারটি ছিল শূণ্য। হযরত মূসা (আঃ)’র সাথে প্রতিযোগিতা দেখতে সেখানে হাজির ছিল আরো বহু হাজার মানুষ। একই মোজেজা তারাও দেখেছিল; কিন্তু তাদের কেউই ঈমান আনেনি। মহান আল্লাহতায়ালার বিচারে একজন ব্যক্তির এ সামর্থ্যটুকুর মূল্য তো বিশাল। এ দুনিয়ায় পদে পদে তো সে সামর্থ্যেরই পরীক্ষা হয়। যাদুকরদের কালেমায়ে শাহাদত মহান আল্লাহতায়ালার কাছে যে শুধু কবুল হয়েছিল তা নয়, বরং মহান রাব্বুল আ’লামিন তাতে এতোই খুশি হয়েছিলেন যে তাদের সে কাহিনী পবিত্র কোরআনে বার বার বর্ণনা করেছেন। হযরত মূসা (আঃ) মোজেজা দেখার সাথে সাথে তাদের ঈমানের ভাণ্ডারটি কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে উঠে এবং তাঁরা সেজদায় পড়ে যান। ঈমান আনার অপরাধে ফিরাউন তাদেরকে নির্মম ভাবে হাত-পা কেটে হত্যার হুকুম শুনেয়েছিল। কিন্তু সে নৃশংসতায় তাঁরা আদৌ বিচলিত হননি, শহীদ হয়ে গেছেন। তাদের লক্ষ্য ছিল, স্রেফ মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করা। এমন একটি চেতনার কারণে মু’মিনের জীবনে ঈমান কখনো গোপন থাকে না। সেটি যেমন নামাযে নেয়, তেমনি জিহাদে নেয়। কীভাবে ঈমানের প্রকাশ ঘটে -সেটি বুঝাতেই যাদুকরদের সে কাহিনী মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে তাঁর নিজের কালামের পাশে সংকলিত করে ক্বিয়ামত অবধি জিন্দা করে রেখেছেন। প্রশ্ন হলো, সারা জীবন নামায-রোযা পালন করার পরও যদি ঈমানের এরূপ প্রকাশ না ঘটে -তবে মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে সে নামায-রোযার মূল্য কতটুকু?

 

 

নীরবতা ঈমানদারি নয়

মুসলিম ভূমি ইসলামের শত্রুশক্তির হাতে অধিকৃত দেখেও নীরব থাকাটি তাই ঈমানদারি নয়। দেশ থেকে শত্রুশক্তির অধিকৃতি নির্মূলে মুসলিম মাত্রই জিহাদে নামবে তাতেই তো ঈমানের প্রকাশ। যারা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও হিন্দু আধিপত্যবাদ -এ দুই শক্তির বিরুদ্ধে রক্তাত্ব লড়াই করে ১৯৪৭-য়ে বিজয় এনেছিল, তারা কি এ নতুন অধিকৃতির মুখে আজ নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকতে পারে? এখানেই ভারতের ন্যায় আগ্রাসী হিন্দু সাম্প্রদায়ীক শক্তির ভয়। তাদের ভয়, পূর্ব সীমান্তে নতুন মুসলিম শক্তির উদ্ভবের। ভয় থেকে বাঁচতেই মানুষ সাথি খোঁঝে। ভারতীয়দের পক্ষ থেকে কলাবোরেটর রূপে শেখ মুজিব, শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে বেছে নেয়ার হেতু তো সেটিই। তাই শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যে লড়াই তাতে ভারতও জড়িয়ে পড়েত  বাধ্য।

শত্রুদের কাজ শুধু দেশ-ধ্বংস, মানব-হত্যা ও নারী-ধর্ষণ নয়, তারা ধ্বংস করতে চায় দেশবাসীর চেতনা ও গৌরবের ইতিহাসকে। কারণ চেতনা ও ইতিহাস বিলুপ্ত হলে বিলুপ্ত হয় আত্মবিশ্বাসও। তখন মানুষ ভূলে যায় নিজ জীবনের মিশন ও ভিশন। শত্রুগণ জানে, ১৯৪৭’য়ের বিজয়ের পিছনে বাংলার ভূমি বা জলবায়ুর কোন ভূমিকা ছিল না; বরং সেটি ছিল বাঙালী মুসলিমদের ইসলামী চেতনা ও ঈমানী দায়িত্ববোধ। তাই শত্রুগণ সে চেতনার বিরুদ্ধে নাশকতায় নেমেছে। তবে সে নাশকতার কাজে বাঙালী মুসলিমদের শত্রু শুধু বিদেশে নয়, ভিতরেও। ভিতরের শত্রু হলো ঘাড়ে চেপে বসা ঘাতক স্বৈরশাসক ও তার সাঙ্গপাঙ্গগণ। ইসলামি চেতনা বিনাশে ময়দানে নামিয়েছে ইসলামচ্যুৎ সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীবেশী বাঙালী কাপালিকদের। উঁই পোকার ন্যায় তারা ভিতর থেকে বিনাশ করছে বাঙালী মুসলিমের ঈমান, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আত্মবিশ্বাস। মুসলিম দেশে স্বৈরশাসকের নাশকতাটি তাই ব্যাপক ও সর্বগ্রাসী। ফলে তাদের নাশকতাপূর্ণ সে রাজনীতির নির্মূলের চেয়ে মুসলিম সমাজে গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা আর কি হতে পারে? বাঙালী মুসলিমদের স্বৈরাচার বিরোধী লড়াইটি তাই স্রেফ গণতন্ত্র বাঁচানোর লড়াই নয়, ঈমান বাঁচানোরও। এটি নিছক রাজনৈতিক লড়াই নয়, বরং পরিপূর্ণ এক জিহাদ। আর এ জিহাদ বাঙালী মুসলিমদের সামনে পেশ করেছে অর্থ, শ্রম, মেধা ও রক্ত বিনিয়োগের এক পবিত্র অঙ্গণ। এ অঙ্গণে কার কি বিনিয়োগ সেটিই নির্ধারন করবে অনন্ত অসীম পরকালে কোথায় সে স্থান পাবে এবিষয়টি। ফলে কোন সুস্থ্য ব্যক্তির জীবনে এরচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আর কি হতে পারে? ৮/০৯/২০১৮ Tweet:@drfmkamal; facebook.com/firozkamal

 

 




আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সংস্কৃতি ও রাজনীতি

 বিদ্রোহের সংস্কৃতি ও রাজনীতি

ব্যক্তির জীবনে প্রতিটি পাপ, প্রতিটি দুর্বৃত্তি, আল্লাহর হুকুমের প্রতিটি অবাধ্যতাই হলো আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। সে বিদ্রোহ ও অবাধ্যতা প্রকাশ পায় বেপর্দা, ব্যাভিচার, অশ্লিলতা, নাচগান, মদ্যপান, মাদকাশক্তি,সন্ত্রাস, দূর্নীতি ইত্যাদীর ব্যাপক বৃদ্ধিতে। জাতীয় জীবনে সেটি প্রকাশ পায় দেশে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা, সূদমূক্ত ব্যাংক ও অর্থনীতি প্রতিষ্ঠিত না হওয়ার মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের মত একটি মুসলিম দেশ আল্লাহর বিরুদ্ধে সে বিদ্রোহে সমগ্র বিশ্বমাঝে একবার নয়, ৫ বার শিরোপে পেয়েছে। তাদের সে মহাবিদ্রোহটি ঘটেছে আল্লাহর নির্দেশিত সুনীতি প্রতিষ্ঠার হুকুমের অবাধ্যতা এবং সর্বস্তরে দূর্নীতি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। এরূপ শিরোপা লাভই কি বলে দেয় না দেশটির মানুষের জীবনযাত্রার প্রক্রিয়া তথা সংস্কৃতি কতটা অসুস্থ্য ও বিদ্রোহাত্মক? এবং সাংস্কৃতিক যুদ্ধে ইসলামের পক্ষের শক্তি কতটা পরাজিত? প্রবল রূপ পেয়েছে বিদ্রোহের সংস্কৃতি।

ব্যক্তির সংস্কৃতির পরিচয় মেলে পোষাক-পরিচ্ছদ বা পানাহার থেকে নয়। বরং কীরূপ দর্শন বা চেতনা নিয়ে সে বাঁচলো তা থেকে। সংস্কৃতির মূল উপাদান হলো এই দর্শন। বস্তুত দর্শনই মানুষকে পশু থেকে পৃথক করে। নাচগান তো পশুপাখিও করে। কিন্তু তাতে কোন দর্শন থাকে না। তাই পশুপাখির নাচে-গানে কোন সমাজই সভ্যতর হয় না,সেখানে সভ্যতাও নির্মিত হয় না। তাই যে সমাজের সংস্কৃতি যতটা দর্শন-শূন্য সমাজ ততটাই মানবতা বর্জিত। সে সমাজ তখন ধাবিত হয় পশুত্বের দিকে। দর্শনই নির্ধারণ করে দেয় কে কীভাবে বাঁচবে, কীভাবে পানাহার করবে, কীভাবে জীবন যাপন করবে বা উৎসব করবে সেটি। চেতনার এ ভিন্নতার কারণেই একজন পতিতা, ঘুষখোর, সন্ত্রাসী এবং দুর্বৃত্তের বাঁচার ধরণ,পোষাক-পরিচ্ছদ, পানাহার ও উৎসবের ধরণ ঈমানদারের মত হয় না। মুসলমানের সংস্কৃতি এজন্যই অবিশ্বাসী বা কাফেরের সংস্কৃতি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। একটি বিশেষ বিশ্বাস বা দর্শন জন্ম দেয় একটি বিশেষ রুচী ও সে রুচীভিত্তিক অভ্যাস। সে অভ্যাসের কারণেই ব্যক্তি বেড়ে উঠে সে সংস্কৃতির মানুষ রূপে। সংস্কৃতি এভাবেই সমাজে নীরবে কাজ করে। মুসলিম সমাজ থেকে সৎ নামাযী ও রোযাদারের পাশাপাশী আপোষহীন মোজাহিদ বের হয়ে আসে তা তো সংস্কৃতির সে ইন্সটিটিউশন সক্রিয় থাকার কারণেই। যেখানে সেটি নেই, বুঝতে হবে সেখানে সে পূণ্যময় সংস্কৃতিও নাই।

মুসলমানদের শক্তির মূল উৎস তেল-গ্যাস নয়, জনশক্তিও নয়। সে শক্তি হলো কোরআন ভিত্তিক দর্শন ও সে দর্শন-ভিত্তিক সংস্কৃতি। এজন্যই শত্রুপক্ষের আগ্রাসনের শিকার শুধু মুসলিম দেশের ভূগোল নয়, বরং মূল টার্গেট হলো ইসলামি দর্শন ও সংস্কৃতি। তাই পাশ্চাত্য শক্তিবর্গ বাংলাদেশের মত দেশে বোমা বা যুদ্ধ বিমান নিয়ে হাজির হয়নি। হাজির হয়েছে সাংস্কৃতিক প্রকল্প নিয়ে। বাংলাদেশের হাজার হাজার এনজিওর উপর দায়িত্ব পড়েছে সে প্রকল্পকে কার্যকর করা। দেশের সংস্কৃতিকে তারা এভাবে ইসলামের শিক্ষা ও দর্শন থেকে মূ্ক্ত করতে চাচ্ছে। রাস্তায় মাটি কাটা ও তূত গাছ পাহাড়া দেওয়াকে মহিলার ক্ষমতায়ন বলে এসব এনজিওগুলো তাদেরকে বেপর্দা হতে বাধ্য করছে। অপর দিকে মাইক্রোক্রেডিটের নামে সাধারণ মানুষকে সূদ দিতে ও সূদ খেতেও অভ্যস্থ করছে। অথচ সূদ খাওয়া বা সূদ দেওয়া –উভয়ই হলো আল্লাহতায়ালার বিধানের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট বিদ্রোহ। ডক্টর ইউনুসকে পাশ্চাত্য মহল নোবেল প্রাইজ দিয়েছে। সেটি এজন্য নয় যে, বাংলাদেশ থেকে তিনি দারিদ্র্য নির্মূল করেছেন। বরং দেশে যতই বাড়ছে গ্রামীন ব্যাংক, ব্রাক বা সূদ ভিত্তিক মাইক্রোক্রেডিট এনজিওর শাখা ততই বাড়ছে দারিদ্র্য। ডক্টর ইউনুস নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন এজন্য যে, আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে বিদ্রোহ করতে তিনি অসামান্য সাফল্য দেখিয়েছেন। এত বড় সাফল্য ইংরেজগণ তাদের ১৯০ বছরের শাসনেও অর্জন করতে পারিনি। ফলে শুধু নোবেল পুরস্কার নয়, এর চেয়ে কোন বড় পুরস্কার থাকলেও তারা তাকে দিত।

 

লক্ষ্য: মুসলিম সংস্কৃতির বিনাশ

ইসলাম ও মুসলমানের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী কোয়ালিশনের মূল এজেন্ডাটি কি সেটি বুঝা যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের আফগানিস্তান দখল ও সেখানে চলমান কার্যক্রম থেকে। পাশ্চাত্য শক্তিবর্গ সেখানে মুসলিম সংস্কৃতির বিনাশে হাত দিয়েছে। আফগানিস্তানের অপরাধ, অতীতে দেশটির জনগণ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও সোভিয়েত সাম্রাজ্যবাদের ন্যায় দুটি বিশ্বশক্তিকে পরাজিত করেছে। এবং সেটি কোন জনশক্তি, সামরিক শক্তি বা অর্থনৈতিক শক্তির বলে নয়, বরং ইসলামি দর্শন ও সে দর্শন-নির্ভর আপোষহীন জিহাদী সংস্কৃতির কারণে। সে অভিন্ন দর্শন ও দর্শনভিত্তিক সংস্কৃতির বলেই তারা আজ  মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার মিত্রদের পরাজিত করতে চলেছে। ফলে পাশ্চাত্য শক্তিবর্গ সে দর্শন ও সে দর্শন-ভিত্তিক সংস্কৃতির নির্মূলে করতে চায়। এবং সে বিনাশী কর্মের পাশাপাশি বিপুল বিণিয়োগ করছে সেদেশে সেক্যুলার দর্শন ও সেক্যুলার সংস্কৃতির নির্মানে। এটিকে তারা বলছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বা অবকাঠামোর নির্মান। পরিকল্পিত ভাবে গড়ে তুলছে অসংখ্য সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। আফগানিস্তানের শিশুরা এখনও নানা রোগভোগে লাখে লাখে মারা যাচ্ছে। কিন্তু তা থেকে বাঁচানোয় আগ্রহ তাদের নেই, অথচ শত শত মিলিয়ন ডলার খরচ করছে তাদের নাচগান শেখাতে। বিবাহের বয়স বাড়িয়ে সহজতর করা হচ্ছে ব্যাভিচারকে।

বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মিশরের মত দেশে অতীতে একই রূপ স্ট্রাটেজী নিয়ে কাজ করেছিল ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকেরা। এদেশগুলির উপর তাদের দীর্ঘ শাসনমামলে তেমন কোন শিল্প কলকারখানা বা প্রযুক্তি গড়ে না উঠলেও তারা সে সব দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে সেক্যুলার করেছিল। সে আমলে প্রতিটি শহরে গড়া হয়েছে ব্যাভিচার পল্লি। গড়া হয়েছ সুদী ব্যাংক। ফলে এনেছে সাংস্কৃতিক জীবনে প্রচন্ড বিচ্যুতি ও বিভ্রান্তি। সেক্যুলারলিজমের অভিধানিক অর্থ হলো ইহজাগতিকতা। সেক্যুলারিজমের অর্থ, ব্যক্তি তার কাজ-কর্ম, অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে প্রেরণা পাবে ইহজাগতিক আনন্দ-উপভোগের তাগিদ থেকে, ধর্ম থেকে নয়। উপভোগ বাড়াতে সে নাচবে, গাইবে, বেপর্দা হবে, অশ্লিল নাটক ও ছায়াছবি দেখবে। মদ্যপান করবে এবং ব্যাভিচারিতেও লিপ্ত হবে। উপার্জন বাড়াতে সে সূদ খাবে এবং ঘুষও খাবে। এগুলো ছাড়া তাদের এ পার্থিব জীবন আনন্দময় হয় কি করে? অপর দিকে ধর্মপালনকে বলেছে মৌলবাদী পশ্চাদ-পদতা ও গোঁড়ামী। তাই দেশে সেক্যুলারিজম বাড়লে অসভ্যতা এবং দূর্নীতিও বাড়ে। এ কারণেই বাংলাদেশ বিশ্বের দুইশত দেশের মাঝে দূর্নীতিতে লাগাতর ৫ বার প্রথম স্থান অধিকার করেছে।

কোন মুসলিম দেশে এমন সেক্যুলার চেতনা ও সংস্কৃতির প্রোকোপ বাড়লে জনগণের মন থেকে আল্লাহতায়ালার ভয়ই বিলুপ্ত হয়। মুসলমানগণ তখন ভূলে যায় নিজেদের ঈমানী দায়বদ্ধতা। বরং বাড়ে মহান আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের প্রবনতা। ফলে বাংলাদেশ, মিশর, পাকিস্তান বা তুরস্কের মত দেশে আল্লাহর আইন তথা শরিয়ত প্রতিষ্ঠা রুখতে কোন কাফেরকে অস্ত্র ধরতে হয়নি। সেকাজের জন্য বরং মুসলিম নামধারি সেক্যুলারগণই যথেষ্ঠ করিৎকর্মা প্রমাণিত হয়েছে। ইসলামের জাগরণ ও মুসলিম শক্তির উত্থান রুখার লক্ষ্যে আজও দেশে দেশে পাশ্চত্যের অনুগত দাস গড়ে তোলার এটিই সফল মডেল। মার্কিন দখলদার বাহিনী সেটিরই বাস্তবায়ন করছে আফগানিস্তানে। এ স্ট্রাটেজীক কৌশলটির পারঙ্গমতা নিয়ে ব্রিটিশ শাসকচক্রের মনে কোন রূপ সন্দেহ ছিল না। যেখানে অধিকার জমিয়েছে সেখানেই এরূপ সেক্যুলারদেরকেই সযত্নে গড়ে তুলেছে। তাদের সংখ্যা পর্যাপ্ত সংখ্যায় বাড়াতে যেখানে দেরী হয়েছে সেদেশের স্বাধীনতা দিতেও তারা বিলম্ব করেছে। সে ব্রিটিশ পলিসির পরিচয়টি মেলে মিশরে ব্রিটিশ শাসনের প্রতিনিধি লর্ড ক্রোমারের লেখা থেকে। তিনি লিখেছেন, “কোন ব্রিটিশ উপনিবেশকে স্বাধীনতা দেওয়ার প্রশ্নই উঠেনা যতক্ষণ না সে দেশে এমন এক সেক্যুলার শ্রেণী গড়ে না উঠে যারা চিন্তা-চেতনায় হবে ব্রিটিশের অনুরূপ।”

ইসলাম থেকে দূরে সরানোর কাজে ব্রিটিশ পলিসি যে কতটা ফলপ্রসু হয়েছে তার প্রমাণ মিলে বাংলাদেশের মত সাবেক ব্রিটিশ উপনিবেশগুলোর প্রশাসন, রাজনীতি, সেনাবাহিনী ও বিচার ব্যবস্থায় সেক্যুলার ব্যক্তিদের প্রবল আধিপত্য দেখে। আজও আইন-আদালতে ব্রিটেশের প্রবর্তিত পেনাল কোড। বাংলাদেশের সেক্যুলার সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাগণ মুসলিম দেশের জনগণের রাজস্বের অর্থে প্রতিপালিত হলে কি হবে, দেশে যারা শরিয়ত বা আল্লাহর আইনের প্রতিষ্ঠা চায় ব্রিটিশদের ন্যায় তারাও তাদেরকে শত্রু মনে করে। আর বিশ্বস্থ্য আপনজন মনে করে ভিন্ দেশী কাফেরদের। এদের কারণেই মুসলিম দেশে হামিদ কারজাইয়ের মত দাস পেতে ইসলারেম শত্রুপক্ষের কোন বেগ পেতে হয় না। ইসলামি দর্শন থেকে দূরে সরানো এবং মগজে সেক্যুলার চেতনার পরিচর্যাকে তীব্রতর করার লক্ষ্যে বাংলাদেশের মত দেশে সেক্যুলার দিনক্ষণকে ইতিহাস থেকে খুঁজে বের করে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দিচ্ছে। এরই উদাহরণ, বাংলাদেশের মত দেশে বসন্তবরণ বা নববর্ষের দিন উদযাপন। নবীজীর হাদীস, মুসলমানের জীবনে বছরে মাত্র দুটি উৎসব। একটি ঈদুল ফিতর, এবং অপরটি ঈদুল আদহা বা কোরবানীর ঈদ। বাংলার মুসলমানগণ এ দুটো দিনই এতদিন ধুমধামে উদযাপন করে আসছে। বাংলার মুসলমানদের জীবনে নববর্ষের উৎসব কোন কালেই গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।

 

 

শয়তানী শক্তির লক্ষ্য: মূল পরীক্ষায় বিফল করা

এ জীবনে কে কতটা সফল বা বিফল -সে মূল্যায়নটি আসে মহান আল্লাহতায়লার মূল্যায়ন থেকে। এ বিষয়ে মহান আল্লাহর নিজস্ব ঘোষণাটি হলো, “তিনিই (মহান আল্লাহতায়ালা) জীবন ও মৃত্যুকে সৃষ্টি করেছেন যেন পরীক্ষা করতে পারেন তোমাদের মধ্যে কে কর্মে উত্তম।” –(সুরা মুলুক, আয়াত ২)। অর্থাৎ মানুষের জন্য এ পার্থিব জীবন পরীক্ষা-কেন্দ্র মাত্র। শয়তানের লক্ষ্য: জীবনের এ চুড়ান্ত পরীক্ষায় বিফল করা। সে লক্ষ্য পূরণে শয়তানের স্ট্রাটেজী বহুবিধ। হাজির হয় সাংস্কৃতিক ক্রিয়াকর্মের নামে। আয়োজন বাড়ে খেলাধুলা ও নাচগানের। তখন শুরু হয় জাহান্নামের পথে চলা। প্রশ্ন হলো, পরীক্ষা দিতে বসে কেউ কি নাচগান করে? নাচগান, খেলাধুলা বা উৎসবের আয়োজন তো পরীক্ষায় মনযোগী হওয়াই অসম্ভব করে তোলে। নবীজীর হাদীস,“পানি যেমন শস্য উৎপাদন করে,গানও তেমনি মুনাফেকি উৎপন্ন করে।” মুনাফেকী তো ইসলামে অঙ্গিকার শূন্যতা,ঈমানের সাথে তার আমলের গড়মিল। তাই প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের হাতে মুসলমানদের শক্তি ও মর্যাদা বাড়লেও নাচগান বাড়েনি। সংস্কৃতির নামে এগুলো শুরু হলে যেটি বাড়ে তা হলো পথভ্রষ্টতা। তখন সিরাতুল মোস্তাকিমে পথচলাই অসম্ভব হয়ে উঠে। তাই এগুলো শয়তানের স্ট্রাটেজী, মুসলমানের নয়।

নতুন বছর, নতুন মাস, নতুন দিন নবীজী(সাঃ)র আমলেও ছিল। কিন্তু তা নিয়ে তিনি নিজে যেমন কোনদিন উৎসব করেননি, সাহাবাগণও করেননি। অথচ তারাই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা ও সংস্কৃতি গড়েছিলেন। নবীজী (সাঃ) ও সাহাবাগান এ ব্যাপারে অতিশয় মনযোগী ছিলেন যেন শিক্ষা ও সংস্কৃতির নামে সমাজ বা রাষ্ট্রে এমন কিছুর চর্চা না হয় যাতে সিরাতুল মোস্তাকিমে চলাই অসম্ভব হয়। এবং মনযোগে ছেদ পড়ে ধর্মের পথে পথচলায়। ড্রাইভিং সিটে বসে নাচগানে মত্ত হলে কি সঠিক ভাবে গাড়ী চালানো যায়? এতে বিচ্যুতি ও বিপদ তো অনিবার্য। অবিকল সেটি ঘটে জীবন চালোনার ক্ষেত্রেও। নবীজী(সাঃ)র আমলে সংস্কৃতির নামে আনন্দ উপভোগের প্রতি এত আকর্ষণ ছিল না বলেই সিরাতুল মোস্তাকিমে চলা তাদের জন্য সহজতর হয়েছিল। বরং তারা জন্ম দিয়েছিলেন মানব-ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম সংস্কৃতির। সে সংস্কৃতির প্রভাবে একজন ভৃত্যও খলিফার সাথে পালাক্রমে উঠের পিঠে চড়েছেন। এবং খলিফা ভৃত্যকে উঠের পিঠে বসিয়ে নিজে রশি ধরে টেনেছেন। সমগ্র মানব ইতিহাসে এর কোন তুলনা  নেই। অথচ বাংলাদেশে আজ সংস্কৃতির নামে কি হচ্ছে? ২০১০ সালে এপ্রিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা নববর্ষের কনসার্টে কী ঘটেছিল? যৌন ক্ষুধায় অতি উদভ্রান্ত অসংখ্য হায়েনা কি সেদিন নারীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়িনি? অসংখ্য নারী কি সেদিন  লাঞ্ছিত হয়নি? কিছু কাল আগে ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে ব্যান্ড সঙ্গীতের আসরে কী ঘটলো? শত শত নারী কি সেদিন ধর্ষিতা হয়েছিল শত শত নারী। এটিই কি বাঙালী সংস্কৃতি? দেশের সেক্যুলার পক্ষ এমন সংস্কৃতির উৎকর্ষতা চায়?

 

লক্ষ্য: ইসলাম থেকে দূরে সরানো

নববর্ষ উদযাপনের নামে নারী-পুরুষদের মুখে উলকি কেটে বা নানান সাজে একত্রে রাস্তায় নামানোর রীতি কোন মুসলিম সংস্কৃতি নয়। বাঙালীর সংস্কৃতিও নয়। এমনকি বাঙালী হিন্দুদেরও নয়। নববর্ষে নামে বাংলায় বড়জোর কিছু হালখাতার অনুষ্ঠান হতো। কিন্তু কোন কালেই এদিনে কনসার্ট গানের আয়োজন বসেনি। জন্তু-জানোয়ারের প্রতিকৃতি নিয়ে মিছিলও হয়নি। পাশ্চাত্যেও নববর্ষের দিনে এমন উৎসব দিনভর হয় না। বাংলাদেশে এগুলীর এত আগমন ঘটেছে নিছক রাজনৈতিক প্রয়োজনে। যুদ্ধজয়ের লক্ষ্যে অনেক সময় নতুন প্রযুক্তির যুদ্ধাস্ত্র সৈনিকদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। অনেক সময় তাতে বিজয়ও আসে। মুসলমানদের বিরুদ্ধে পরিচালিত এ সাংস্কৃতিক যুদ্ধে সংস্কৃতির নামে এসব অভিনব আয়োজন বাড়ানো হয়েছে তেমনি এক ত্বড়িৎ বিজয়ের লক্ষ্যে। তাদের লক্ষ্য নাচ-গান, কনসার্টের নামে জনগণকে ইসলাম থেকে দূরে সরানো। বিপুল সংখ্যক নারী-পুরুষ নিয়ে  নতুন ঢংযের এসব আয়োজন বাড়ানো হয়েছে তেমনি এক ষড়যন্ত্রমূলক প্রয়োজনে। পাশ্চাত্যের যুবক-যুবতীদের ধর্ম থেকে দূরে টানার প্রয়োজন নেই। জন্ম থেকেই তারা ধর্ম থেকে দূরে। নাচগান, মদ, অশ্লিলতা, উলঙ্গতা ও ব্যভিচারের মধ্য দিয়েই তাদের বেড়ে উঠা। তাই নববর্ষের নামে তাদের মাঝে এ সবে অভ্যস্থ করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু সেটির প্রয়োজন রয়েছে বাংলাদেশে। সেটি ধর্ম থেকে ও নিজেদের সংস্কৃতি থেকে দূরে সরানোর লক্ষ্যে। এসবের চর্চা বাড়াতে কাজ করছে প্রচুর দেশী-বিদেশী এনজিও। এমন অনুষ্ঠানে বিপুল অর্থ ব্যয়ও হচ্ছে। এবং সে অর্থ আসছে বিদেশীদের ভান্ডার থেকে। এভাবে নারীপুরুষের অবাধ মেলামেশার পাশপাশি অশ্লিলতারও সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এবং লুপ্ত করা হচেছ ব্যভিচার ও অশ্লিলতাকে ঘৃণা করার অভ্যাস, -যা পাশ্চাত্য থেকে বহু আগেই বিলুপ্ত হয়েছে।

শুধু বাংলাদেশে নয়, অন্যান্য মুসলিম দেশেও এরূপ নববর্ষ পালনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অধিকাংশ পাশ্চাত্য দেশ বিপুল অংকের অর্থ সাহায্য দিচ্ছে। ইরানী-আফগানী-কিরগিজী-কুর্দীদের নওরোজ উৎসবের দিনে প্রেসিডেন্ট ওবামা বিশেষ বানীও দিয়েছে। তবে নববর্ষের নামে বাংলাদেশে ইসলামের শত্রুপক্ষের বিণিয়োগের মাত্রাটি আরো বিচিত্র ও ব্যাপক। এখানে বানী নয়, আসছে বিপুল বিণিয়োগ। কারণ, বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৫ কোটি। আফগানিস্তানের চেয়ে প্রায় ৫ গুণ। জনসংখ্যার ৯০% ভাগ মুসলমান, যাদের আপনজনেররা ছড়িয়ে আছে ব্শ্বিজুড়ে। ফলে এদেশে ইসলামের দর্শন প্রচার পেলে তা ছড়িয়ে পড়বে বিশ্বময়। এ বিশাল জনগণকে ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে সেক্যুলার সংস্কৃতিতে বশ করানো তাদের কাছে তাই অতিগুরুত্বপূর্ণ। তারা চায় এ পৃথিবীটা একটি মেল্টিং পটে পরিণত হোক। আলু-পটল, পেঁয়াজ-মরিচ যেমন চুলার তাপে কড়াইয়ে একাকার হয়ে যায়, তেমনি বিশ্বের সব সংস্কৃতির মানুষ একক সংস্কৃতির মানুষের পরিণত হোক। এভাবে নির্মিত হোক গ্লোবাল ভিলেজ। আর সে গ্লোবাল ভিলেজের সংস্কৃতি হবে পাশ্চাত্যের সেক্যুলার সংস্কৃতি। এজন্যই বাংলাদেশে নারী-পুরুষকে ভ্যালেন্টাইন ডে, বর্ষপালন,মদ্যপান, অশ্লিল নাচ, পাশ্চাত্য ধাঁচের কনসার্টে অভ্যস্থ করায় এসব এনজিওদের এত আগ্রহ। তারা চায় তাদের সাংস্কৃতিক সীমানা বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশের প্রতি বসতঘরের মধ্যেও বিস্তৃত হোক। তাই বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সীমানা আজ বিলুপ্ত।

 

মহাবিপর্যের পথে

বিপদের আরো কারণ, এতবড় গুরুতর বিষয় নিয়েও কারো কোন  দুশ্চিন্তা নেই। কোন পরিবারে কেউ মৃত্যুশয্যায় পড়লে সে পরিবারে দুশ্চিন্তার অন্ত থাকে না, দৌড়াদৌড়ি শুরু হয় কিভাবে তাকে বাঁচানো যায় তা নিয়ে। অথচ আজ সততা, নৈতীকতা ও ঈমান-আমলের দিক দিয়ে শয্যাশায়ী সমগ্র বাংলাদেশ। সমগ্র দেশবাসী ছুটে চলেছে মহা বিপদের দিকে। সামনে অনন্ত অসীম কালের জাহান্নাম। অথচ তা নিয়ে ক’জন আলেম, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ ও লেখক উদ্বিগ্ন? ক’জন মুখ খুলেছেন বা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন? ১৭৫৭ সালের চেতনা থেকে বাংলার মুসলমান কি সামান্যতমও সামনে এগিয়েছে? তখন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ব্রিটিশের দখলদারি। অস্তমিত হয়েছিল বাংলার মুসলমানদের স্বাধীনতা। সে পরাধীনতা বিরুদ্ধে কোন জনপদে ও গ্রাম-গঞ্জে সাথে সাথে কোনরূপ প্রতিরোধ বা বিদ্রোহের ধ্বনি উঠেছিল -সে প্রমাণ নেই। বরং যে যার কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ততা থেকেছে। দেশের স্বাধীনতা নিয়ে কিছু ভাবা বা কিছু করার প্রয়োজনীয়তা কেউ অনুভব করেনি। অথচ শত্রুর হামলার মুখে প্রতিরোধের এ দায়ভার প্রতিটি মুসলমানের। এ কাজ শুধু বেতনভোগী সৈনিকের নয়। প্রতিটি নাগরিকের। ইসলামে এটি জিহাদ। মুসলমানদের গৌরব কালে এজন্য কোন সেনানীবাস ছিল না। প্রতিটি গৃহই ছিল সেনানীবাস। প্রতিটি নাগরিক ছিল সৈনিক। প্রতিটি যুদ্ধে ঈমানদারগণ তখন স্বেচ্ছায় নিজ নিজ ঘর থেকে নিজ খরচে যুদ্ধে গিয়ে হাজির হয়েছেন। সে জিহাদের সমুদয় খরচ তারা নিজেরা পেশ করেছেন। অথচ আজ সেনানীবাসের পর সেনানীবাস বেড়েছে, রাজস্বের সিংহভাগ সৈন্যপালেন খরচ হচ্ছে অথচ শত্রুর হামলার মুখে কোন প্রতিরোধ নেই। দেশের পর দেশ তাই অধিকৃত। এবং অধিকৃত মুসলিম দেশের শিক্ষা-সংস্কৃতিও। এতে দূরত্ব বেড়েছে নবীজী (সা:) আমলের ইসলাম থেকে।

সাংস্কৃতিক সীমানা রক্ষার লড়ায়ে পরাজিত হলে পরাজয় অনিবার্য হয় ঈমান-আক্বীদা রক্ষার লড়ায়েও। কারণ, মুসলমানে ঈমান-আক্বীদা কখনো অনৈসলামিক সাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে উঠে না। মাছের জন্য যেমন পানি চাই, ঈমান নিয়ে বাঁচার জন্যও তেমনি ইসলামি রাষ্ট্র ও ইসলামি সংস্কৃতি চাই। মুসলমান তাই শুধু কোরআন পাঠ ও নামায-রোযা আদায় করেনি, ইসলামি রাষ্ট্র এবং সে রাষ্ট্রে শরিয়ত ও ইসলামি সংস্কৃতিরও প্রতিষ্ঠা করেছে। মুসলমানদের অর্থ, রক্ত, সময় ও সামর্থ্যের সবচেয়ে বেশী ভাগ ব্যয় হয়েছে তো ইসলামি রাষ্ট্র ও ইসলামি শিক্ষা-সংস্কৃতির নির্মাণে। নামায-রোযার পালন তো কাফের দেশেও সম্ভব। কিন্তু ইসলামী শরিয়ত ও ইসলামী সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠা ও পরিচর্যা তথা ইসলামী বিধানের পূর্ণ পালন কি অমুসলিম দেশে সম্ভব? অতীতের ন্যায় আজকের মুসলমানদের উপরও একই দায়ভার। সেটি শুধু কলম-সৈনিকের নয়, প্রতিটি আলেম, প্রতিটি শিক্ষক, প্রতিটি ছাত্র ও প্রতিটি নাগরিকের উপরও। এ লড়ায়ে তাদেরকেও ময়দানে নেমে আসতে হয়। এ লড়াইটি হয় কোরআনী জ্ঞানের তরবারী দ্বারা। নবীজী (সাঃ)র যুগে সেটিই হয়েছে। ইসলামে জ্ঞানার্জনকে এজন্যই নামায-রোযার আগে ফরয করা হয়েছে। কিন্তু সে ফরয পালনের আয়োজনই বা কোথায়?

অনেকেই জ্ঞানার্জন করছেন নিছক রুটিরুজির তালাশে। ফরয আদায়ের লক্ষে নয়। ফলে প্রচণ্ড শূণ্যতা ও বিচ্যুতি রয়েছে জ্ঞানার্জনের নিয়তেই। ফলে সে জ্ঞানচর্চায় তাদের রুটি-রুজী জুটছে ঠিকই, কিন্তু তাতে জ্ঞানার্জনের ফরয আদায় হচ্ছে না। বাড়ছে না জিহাদের ময়দানে লোকবল। এবং বাড়ছে না ইসলামের প্রতিষ্ঠা। বাংলাদেশের মুসলমানদের জন্য এটি এক বিপদজনক দিক। আগ্রাসী শত্রুর হামলার মুখে অরক্ষিত শুধু দেশটির রাজনৈতিক সীমান্তুই নয়, বরং প্রচণ্ড ভাবে অরক্ষিত দেশের সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক সীমান্তও। দেশ তাই দ্রুত ধেয়ে চলেছে সর্বমুখি পরাজয় ও প্রচণ্ড বিপর্যের দিকে। ইসলামের নামে যা বেঁচে আছে সেটি নবীজী(সাঃ)র আমলের কোরআনী ইসলাম নয়। যে সনাতন ইসলামে শরিয়ত, খেলাফত, হুদুদ, শুরা, প্যান-ইসলামিক মুসলিম ভাতৃত্ব ও জিহাদ ছিল, দেশটিতে সে ইসলামে মৃত্যু ঘটেছে বহু আগেই।  শুধু মসজিদ-মাদ্রাসা ও নামায-রোযার সংখ্যা বাড়িয়ে কি এ বিপদ থেকে মুক্তি মিলবে? দ্বিতীয় সংস্করণ, ০৩/০৮/২০১৭

 

 




বাংলাদেশে মুরতাদদের অপরাধ এবং শেখ হাসিনার মুরতাদপ্রীতি

অপরাধ ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে উস্কানির

মুরতাদ তারাই যারা প্রকাশ্যে ইসলাম পরিত্যাগ করে এবং আল্লাহর কোরআনী হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে।বাংলাদেশের এমন মুরতাদের সংখ্যা বহু। এবং তাদের অপরাধও অতি জঘন্য। তারা যে শুধু নিজেরা ইসলাম পরিত্যাগ করেছে ও আল্লাহ বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে তা নয়। সাধারণ মানুষকেও তারা নানা ভাবে উস্কানি দিচ্ছে ইসলামের মৌল শিক্ষা পরিত্যাগে ও আল্লাহর বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিদ্রোহে।একাজে তারা ব্যবহার করছে দেশের টিভি নেটওয়ার্ক,পত্রপত্রিকা,ইন্টারনেটসহ নানা এনজিও ফোরাম। ইসলামের বিরুদ্ধে এভাবে যুদ্ধ শুরু করে তারা বিনষ্ট করছে বাংলাদেশের সামাজিক শান্তি। গত ৬ই এপ্রিল হেফাজতে ইসলামের ডাকে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সমাবেশ হওয়ায় তারা জোরে শোরে প্রচার শুরু করছে বাংলাদেশ মধ্যযুগের অন্ধকারে ফিরে যাচ্ছে।নারীদের বলছে,ইসলাম এলে তাদের স্বাধীনতা ও অধিকার কেড়ে নেয়া হবে এবং নারী শিক্ষা বন্ধ করে তাদেরকে গৃহবন্দী করা হবে। ইসলামি জাগরণের বিরুদ্ধে এসব কথা বলে তারা স্কুলছাত্রী ও গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রির নারী শ্রমিকদেরও ময়দানে নামানোর ষড়যন্ত্র করছে।

যে কোন দেশে এমন বিদ্রোহে উস্কানি দান গুরুতর শাস্তিযোগ্য অপরাধ।খলিফা রাশেদার যুগে এ অপরাধে মুরতাদদের মৃত্যুদন্ড দেয়া হতো। হযরত আবুবকর (রাঃ)র আমলে যারা যাকাত দিতে অস্বীকার করেছিল তাদেরও মুরতাদ বলা হয়েছে এবং শাস্তি দেয়া হয়েছে। অথচ বাংলাদেশের সরকার আজ  নানা ভাবে মুরতাদদের মদদ জোগাচ্ছে। মুরতাদদের সাথে সুর মিলিয়ে এমনকি মন্ত্রীরা বলছে,হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবি মেনে নিলে দেশ পিছিয়ে মধ্যযুগে যাবে। বলা হচ্ছে ১৩ দফা দাবি সংবিধান পরিপন্থি। প্রশ্ন হলো,মুসলমানের নিরুংকুশ আনুগত্য কি আল্লাহর প্রতি না সংবিধানের প্রতি? শতকরা ৯০ ভাগ মুসলামনের দেশে মুসলমান যদি তার স্রষ্টা মহান আল্লাহর প্রতি শত ভাগ আনুগত্যই করতে না পারে তবে তার ধর্মপালনের স্বাধীনতা কোথায়? হেফাজতে ইসলাম ১৩ দফা দাবী উত্থাপন করেছে কোরআনী হুকুমের প্রতি আনুগত্য দেখাতে। সংবিধান যদি সে আনুগত্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় তবে সে সংবিধানকে আবজর্নার স্তুপে ফেলাই কি যথার্থ নয়? সংবিধানকে আবর্জনায় ফেললে পরকালে সামান্যতম শাস্তিও হবে না। কিন্তু কোরআনী হুকুমের প্রতি সামান্য অবহেলা দেখালেও কি ঈমান বাঁচে? তাতে তো তার জন্য জাহান্নাম অনিবার্য করবে! মুসলমান হওয়ার অর্থ তো কোরআনের প্রতিটি হুকুমের পূর্ণ আনুগত্য। কোন একটি হুকুম পালনে সামান্যতম অবাধ্যতা চলে না। মুসলিমগণ তো পৃথক রাষ্ট্র গড়ে অমুসলিম রাষ্ট্রের সে কুফরি অনুশাসন থেকে বাঁচার স্বার্থে। ১৯৭২ সালে সংবিধান তৈরীর আগে ১৯৭০ সাল আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিব জনগণ থেকে ভোট নিয়েছিল এ ওয়াদা দিয়ে যে, কোরআন-সূন্নাহর বিরোধী কোন আইন তৈরী হবে না।এখনও প্রতি নির্বাচনে ভোটারদের সামনে আওয়ামী লীগ জোরে সোরে সে ওয়াদা করে। তাহলে প্রশ্ন হলো,সংবিধানে ইসলাম এবং হেফাজতে ইসলামে ১৩ দফার সাথে সাংঘর্ষিক বিধান আসলো কি করে? বাংলাদেশের সংবিধানের বিরুদ্ধে কথা বলা বললে শাস্তি হয়। শাস্তি হয় শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে কথা বললেও। কিন্তু মহান আল্লাহ ও তাঁর দেয়া দেয়া পবিত্র সংবিধানের বিরুদ্ধে কেউ বিদ্রোহ করলে বা মিথ্যাচার করলে শাস্তি দূরে থাকে পুরস্কৃত করা হয়।মুসলিম দেশের কোন সরকারের এটি কি মুসলিম-সুলভ আচরণ?

 

ফিরিয়ে নিতে চায় সনাতন জাহিলিয়াতে

সমাজ বা রাষ্ট্র যত আধুনিকই হোক সেখানে লাগাতর সংঘাত চলে সনাতন সত্য তথা ইসলামের বিরুদ্ধে সনাতন অজ্ঞতা তথা জাহিলিয়াতের। পরিতাপের বিষয় হলো, বাংলাদেশের ন্যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশে জাহিলিয়াতের অনুসারিরাই বিজয়ী এবং পরাজিত হয়েছে ইসলাম। ফলে দেশের আদালতে যেমন শরিয়ত আইন নেই, তেমনি বৈধতা পেয়েছে মদ্যপান, সূদ, জুয়া, অশ্লিলতা এবং বেশ্যাবৃত্তির ন্যায় সনাতন পাপাচার। জাহিলিয়াতের অনুসারিরা ইসলামের পক্ষ নেয়া এবং শরিয়তী বিধানের প্রতিষ্ঠাকে বলছে সাম্প্রদায়িকতা। কথা হলো, প্রতিরাষ্ট্রে ও সমাজে প্রতিটি নরনারীকে একটি পক্ষ নিয়ে বাঁচতে হয়। মুসলিমদের বাঁচতে হয় ইসলামের প্রতিষ্ঠার পক্ষ নিয়ে; এ প্রসঙ্গে নিরপেক্ষ হলে তাকে কাফের বা মুনাফিক হতে হয়। মক্কার বুকে নবীজী (সাঃ) যখন ইসলামের দাওয়াত দেয়া শুরু করেন তখন সেখানে ছিল জাহিলিয়াতের বিজয়। কিছু সত্যসন্ধানী নবীজী (সাঃ)র সে দাওয়াত কবুল করে মুসলমান হয়ে যান। তারাই শুরু করেছিলেন ইসলামের প্রতিষ্ঠা ও জাহিলিয়াত নির্মূলের যুদ্ধ। সে যুদ্ধই হলো ঈমানদারের জিহাদ। জাহিলিয়াত নির্মূলের সে জিহাদে নবীজী (সাঃ)র সাহাবাদের বেশীর ভাগ শহীদ হয়ে যান। সে সংঘাতময় সমাজে নিরপেক্ষ বা অসাম্প্রদায়িক বলে কেউ ছিল না। প্রত্যেকেই কোন পক্ষ বা সম্প্রদায়ভূক্ত ছিলেন। ফলে যারা ইসলামের পক্ষ নেয়াকে সাম্প্রদায়িকতা বলে তারা মূলতঃ মুসলিমদের ইসলাম থেকে দূরে সরতে বলে। তারা চায় মুসলিমদের আদিম জাহিলিয়াতে ফিরিয়ে নিতে।

মানব ইতিহাসের অতি পুরাতন সত্যটি হলো, সত্যকে মেনে নেওয়ায় সবার রুচী থাকে না। বহুকীট আজীবন শুধু নর্দমার আবর্জনা খুঁজে। বহু মানুষও তেমনি দিবারাত্র নিরেট মিথ্যা খুঁজে এবং মিথ্যাকে আঁকড়ে ধরে আজীবন বেঁচে থাকে।এমন মানুষের সংখ্যা কি বাংলাদেশে কম? বরং বিপুল। ফলে শাপ-শকুন,গরু-ছাগল ও কাদামাটির পুতুল যেমন বহু কোটি অনুসারি পেয়েছে,তেমনি কার্ল মার্কস,মাওসেতু্ংয়ের ন্যায় কম্যুনিস্টগণও বহু হাজার মাইল দূরের এ দেশটিতে বিপুল সংখ্যক ভক্ত পেয়েছে। বহু ভক্ত পেয়েছে মুজিবের ন্যায় স্বৈরাচারি,বাকশালী, ভারতসেবী মানবতা বিরোধী নেতাও। শাহবাগে ফ্যাসিস্ট ব্লগারদেরও সার্কাসেও তাই বিপুল জনসমাগম হয়। নবীজী (সাঃ)র আমলে এমন মিথ্যাসেবকগণই নবীজী(সাঃ)কে যাদুগ্রস্ত পাগল বলেছে এবং তাঁর দাওয়াতকে পাগলের প্রলাপ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।ধর্ম,সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের নামে তারা বাপদাদার অনুসৃত মুর্তিপুজা,অশ্লিলতা ও পাপাচারকেই অনুসরণ করেছে।এ শ্রেণীর মানুষ বাংলাদেশেও আজ মঙ্গলঘট,মঙ্গলপ্রদীপ,স্মৃতিস্তম্ভে নগ্নপদে ফুলদানের সংস্কৃতিতে ফিরে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট করা হচ্ছে উলঙ্গতা,অশ্লিল নাচগান,নারীপুরুষের অবাধ মেলামেশা,মদ্যপান,ব্যাভিচারে –এসব নানারূপ কুকর্মে।এভাবে ফিরিয়ে নিচ্ছে সনাতন জাহিলিয়াতে। মিথ্যাসেবীদের কাছে এরূপ পাপাচার প্রতিযুগেই শালিন কর্ম এমন কি ধর্মকর্ম রূপে গণ্য হয়েছে। খুন-রাহাজানি এবং দুর্বলের উপর অত্যাচারকেও তার অন্যায় মনে করেনি। এমনকি নিজের কণ্যাকে তারা জ্যান্ত দাফন করতো।এমন দুর্বৃত্তরা নবীজী(সাঃ)র এর ন্যায় মানব ইতিহাসের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানবকেও এক ইঞ্চি ভূমি বিনা যুদ্ধে ছেড়ে দেয়নি।বাংলাদেশেও তাদের উত্তরসুরীরা ইসলামের প্রতিষ্ঠাকামি উম্মাহকে ছাড় দিতে রাজী নয়।ফলে বাংলাদেশেও তাই অনিবার্য হয়ে উঠছে সংঘাত। কারণ,প্রকৃত মুসলমান তার ঘরবাড়ি ছাড়তে পারে,দেশ ত্যাগও করতে পারে,এমনি কি নিজের জানমালও কোরবানী করতে পারে। কিন্তু আল্লাহর দ্বীনের বিজয় এবং শরিয়তের প্রতিষ্ঠার জিহাদ থেকে তো একটি দিনের জন্য বিরত থাকতে পারে না। মেনে নিতে পারে আল্লাহর জমিনের উপর তার বিদ্রোহীদের এ দখলদারি। কারণ সেটি করলে তাঁর ঈমান বাঁচে না,এবং পরকালে জাহান্নামের আগুন থেকেও নিস্কৃতি মিলবে না।

 

ইসলাম কি মধ্যযুগীয় বর্বরতা?

শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট সরকারের লাগাতর ইসলামবিরোধী নীতি ও নাস্তিক-মুরতাদের পক্ষাবলম্বনের কারণে মুসলমানদের পিঠ আজ দেয়ালে ঠেকে গেছে। ইসলামের পক্ষে সৃষ্টি হয়েছে বিপুল জাগরণ। লক্ষ লক্ষ মানুষের লংমার্চ ও ৬ই এপ্রিল বিশাল জনসমুদ্রের পর বাংলাদেশের মুসলমানগণ নতুন আত্মবিশ্বাস পেয়েছে। হেফাজতের ইসলামের ১৩ দফা দাবী এবং সে দাবী মেনে নেয়া না হলে আগামী ৫ই মে ঢাকা অবরোধের ঘোষণার পর ইসলামের বিপক্ষ শক্তি ভাবছে,বাংলাদেশে ইসলামের বিজয় বুঝি এসেই গেল।সে বিজয়কে রুখবার জন্যই জোরে শোরে বলতে শুরু করেছে,বাংলাদেশ মধ্যযুগে ফিরে যাচ্ছে। প্রশ্ন হলো,প্রশাসন ও রাজনীতিতে ইসলামের বিজয় এবং আদালতে শরিয়তি আইনের প্রতিষ্ঠাকে কেউ মধ্যযুগীয় বর্বরতা বললে –সে কি আদৌ মুসলমান থাকে? সে রাষ্ট্রে ইসলামের প্রতিষ্ঠার কাজটি তো খোদ নবীজী (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরাম করেছেন। তবে কি নবীজী (সাঃ)ও সাহাবায়ে কেরাম আরবের বুকে অন্ধকার যুগ নামিয়ে এনেছিলেন? অথচ মুসলমান হওয়ার অর্থ শুধু কালেমা পাঠ নয়,বরং আল্লাহর কোরআনী বিধানের উপর পূর্ণ আস্থা এবং সেগুলি মেনে চলা। সে সাথে রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা করা। নবীজী (সাঃ)র জীবন-ইতিহাস তো সে কথাই বলে।

 

ইসলামে নারীর মর্যাদা

ইসলাম নারীকে কারো মা,কারো কন্যা বা কারো স্ত্রী রূপে আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে যে মর্যাদা দিয়েছিল সেটি কি আর কোন ধর্ম দিয়েছে? ভারতে তো সে মর্যাদা দেয়া দূরে থাক,লক্ষ লক্ষ নারী শিশুকে জন্মের আগেই প্রতিবছর আবোরশনের মাধ্যমে হত্যা করা হচ্ছে।অথচ ইসলামে অতি ছওয়াবের কাজ হলো নারী শিশুর পালন।নবীজী(সাঃ)র হাদীসঃ যে ব্যক্তি তিনটি এমনকি দুটি বা একটি কন্যা সন্তান যথার্থ ভাবে লালন-পালন করলো সে ঈমানদার ব্যক্তিটি জান্নাত পাবে। ইসলাম নারীকে দিয়েছে মৃত পিতামাতার সম্পত্তির উপর উত্তরাধিকার। ইসলামের আগে আর কোন ধর্ম কি সেটি দিয়েছে? হিন্দুধর্মে নারীকে সম্পদের উপর অধিকার দেয়া দূরে থাক,তাকে তো মৃত স্বামীর সাথে চিতায় জ্বালিয়ে হত্যা করা হতো। গ্রীসের মানুষ নারীকে গৃহের অস্থাবর সম্পদের ন্যায় আরেক গৃহ-সম্পদ মনে করতো।কেউ মারা গেলে তার সম্পদের ন্যায় স্ত্রীদেরও বিলিবন্ঠন করা হতো। অথচ ইসলাম স্ত্রীকে দিয়েছে স্বামীর সমান নাগরিক অধিকার। সন্তানের বেহেশত বলা হয়েছে মায়ের পায়ের নীচে। ফলে এমন ইসলামকে নারী-বিরোধী বলার চেয়ে বড় মিথ্যাচার এবং ইসলামের বিরুদ্ধে নিকৃষ্ট হামলা আর কি হতে পারে? এমন কথা তো কাফের, মুনাফেক ও মুরতাদ তথা ইসলামের দুষমনদের কথা। এমন কথা বলার অর্থ নবীজী (সাঃ) ও তারা সাহাবায়ে কেরামকে নারী-বিরোধী বর্বর(নাউযু বিল্লাহ মিন যালিক)রূপে আখ্যায়ীত করা! অথচ শাহবাগ গণমঞ্চের আয়োজক নাস্তিক ব্লগারগণ তো তাদের ব্লগে এমন কথাই বহুবছর ধরে বলে আসছে। ফলে নাস্তিক ব্লগারদের থেকে আওয়ামী লীগের নেতাদের পার্থক্য কোথায়? যার অন্তরে আল্লাহর উপর ঈমান আছে এবং তাঁর দেয়া ইসলামী বিধানের উপর সামান্যতম আস্থা আছে সে কি এমন কথা মুখে আনতে পারে? আল্লাহর উপর বিশ্বাসের অর্থ কি শুধু তাঁর অস্তিত্বের উপর বিশ্বাস? বিশ্বাস তো হতে হবে ইসলামের প্রতিটি হুকুম এবং আল্লাহর শরিয়তের প্রতিটি বিধানের উপর।কোরআন পাকে মহান আল্লাহর নির্দেশ,“উদখুলু ফিস সিলমে কা’ফফা” অর্থাৎ তোমরা প্রবেশ করো ইসলামের বিধানে পরিপূর্ণ ভাবে। তাই কোন কোরআনী অনুশাসনের বিরুদ্ধে কোনরূপ অনাস্থা চলে কি?

 

মধ্যযুগ কি অন্ধকার যুগ?

কথা হলো,মধ্যযুগ নিয়ে এত ভীতি কেন? ইসলাম নিয়ে এমন ভীতি তো কাফেরদের। তাদের সে ভীতি তো প্রতিযুগের ইসলাম ও মুসলমানদেরকে নিয়েই। কারণ ইসলামের মধ্যে তারা তাদের নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কৃতির মৃত্যু দেখে। কিন্তু মুসলমানদের মনে সে ভীতি আসে কি করে? মুসলিম ইতিহাসের যা কিছু অতি গর্বের এবং যা কিছু অতিমহান তা তো সবই মধ্যযুগের। সে আমলেই এসেছিলেন ইসলামের নবী হযরত মহম্মদ (সাঃ)।সে সময় এসেছিল এশিয়া আফ্রিকা ও ইউরোপের বিশাল ভূভাগ জুড়ে ইসলামের বিজয়। তখনই প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল সর্ববৃহৎ বিশ্বশক্তি রূপে মুসলিম উম্মাহ। জন্ম নিয়েছিল খোলাফায়ে রাশেদার ন্যায় মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসন ব্যবস্থা। গড়ে উঠেছিল দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং নিরপেক্ষ ও সহজলভ্য বিচারব্যবস্থা। হযরত আবুবকর (রাঃ),হযরত উমর (রাঃ),হযরত উসমান (রাঃ),হযরত আলী (রাঃ),হযরত খালেদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ),আবু ওবাইয়া (রাঃ) সাদ বিন আক্কাস (রাঃ),হযরত উমর বিন আব্দুল আজীজ (রাঃ),তারিক বিন জিয়াদ ও মহম্মদ বিন কাসিমের ন্যায় অসংখ্য মহান ব্যক্তিবর্গ।শুধু মুসলিম ইতিহাসে নয়, সমগ্র মানব ইতিহাসে তারাই শ্রেষ্ঠ সন্তান। সে আমলেই মুসলমানদের হাতে পরাজিত হয়েছিল রোমান ও পারসিক সাম্রাজ্যের ন্যায় তৎকালীন দুই বিশ্বশক্তি। সে আমলে সারা বিশ্বের সকল বিজ্ঞানীদের অধিকাংশই বাস করতো মুসলিম ভূমিতে।একমাত্র সুলতান মাহমুদের রাজ্যে তখন যত বিজ্ঞানীর বসবাস ছিল অবশিষ্ঠ বিশ্বে তার অর্ধেক বিজ্ঞানীও ছিল না। ইউরোপ তো তখন অন্ধকারে আচ্ছন্ন। আমেরিকা তখনও আবিস্কৃতই হয়নি।গণিতশাস্ত্র,রসায়ন,ভূগোল,চিকিৎসা,জ্যোতিষশাস্ত্র,স্থাপত্য বিদ্যা,কৃষি,জরিপ,মুদ্রা,সমরবিদ্যা,দর্শন,ইতিহাসশাস্ত্র ইত্যাদী বিষয়ে মুসলমানদের অবদান কি কম? ইউরোপীয় মনিষীগণও সেটি স্বীকার করে।স্পেনে মুসলমানদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউরোপীয় ছাত্রগণ বিদ্যালাভে আসতো। ইউরোপের রেনেসাঁর সূত্রপাতে স্পেনের মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান কি কেউ অস্বীকার করতে পারে? অথচ বাংলাদেশের ইসলামের বিপক্ষ শক্তিটি ইসলামের সে গৌরব যুগকে অন্ধকার যুগ বলছে!মুর্খতা আর কাকে বলে!

মধ্যযুগীয় বাংলাও কি আজকের ন্যায় এতটা কলংকিত ছিল? ইখতিয়ার মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির হাতে বাংলায় মুসলিম শাসনের শুরুর ঘটনাটি কি কোন আধুনিক কালে ঘটেছিল? অথচ বাংলাদেশের সমগ্র ইতিহাসে সেটিই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারি ঘটনা। সে ঘটনাটিই বাংলার মুসলমানদের ভাগ্য চিরকালের জন্য পাল্টে দেয়। সে মুসলিম বিজয়ের মধ্য দিয়েই বঙ্গিয় এ ভূমিতে আগমন ঘটে আল্লাহর একমাত্র মনোনিত দ্বীন ইসলামের। সে বিজয়ের মধ্য দিয়েই বাংলার মানুষ সেদিন মহান আল্লাহর সত্যদ্বীনকে চেনা এবং মিথ্যাকে বর্জনের সৌভাগ্য পেয়েছিল।বাংলার মাটিতে মহান আল্লাহর রহমত অঢেল। তবে এ বঙ্গীয় ভূমিতে মুসলমানদের বিজয় ও ইসলামের আগমনই ছিল সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামত। আর সেটি এসেছিল মধ্যযুগে।  মধ্যযুগের সে গৌরবময় দিনগুলো না আসলে বাংলার আজকের মুসলমানদের কী অবস্থা হতো সেটি কি কোন ঈমানদার ভেবে দেখেছে? তাদেরকে কি শাপশকুন,গরুছাগল,গাছপালা,নদীনালা আর উলঙ্গ সাধুদের ভগবান বলে পুঁজা করতো হতো না?  তার চেয়ে বড় অন্ধকারময় জাহেলিয়াত আর কি হতে পারতো? তাতে বাংলার মানুষ কি পরকালে জাহান্নামের কঠিন আযাব থেকে মুক্তি পেত? মানব জীবনের বড় অর্জনটি সম্পদ-লাভ বা সন্তান-লাভ নয়। বরং সেটি হেদায়েত-লাভ। একমাত্র হেদায়েত লাভের মাধ্যমেই জান্নাতপ্রাপ্তি ঘটে। বাংলার কোটি কোটি মানুষের জীবনে সে হেদায়াত লাভটি ঘটেছিল মধ্যযুগে।তাই নিশ্চিত বলা যায়, বাংলার ইতিহাসে সে যুগটিই হলো সবচেয়ে আলোঝলোমল যুগ। সে আলোময় যুগের বরকতেই বাংলাদেশের ৯০ ভাগ মানুষ আজ  মুসলমান। একমাত্র নর্দমার কীটগণই সে যুগকে অন্ধকার যুগ বলতে পারে। প্রকৃত অন্ধকার যুগ তো ইসলাম-পূর্ববর্তী কাফের শাসনের যুগ।অথচ বাংলাদেশের সেক্যুলারিস্টগণ তো বাংলার সনাতন সংস্কৃতির নামে বাংলাদেশীদেরকে সে অন্ধকার যুগেই ফিরিয়ে নিতে চায়।

 

মধ্যযুগের বাংলা

সে মধ্যযুগেরই বাংলার আরেক গৌরব হলো মোগল সুবেদার শায়েস্তা খান। তাঁর আমলে বাংলা দুনিয়ার বুকে সবচেয়ে প্রাচুর্যময় দেশ রূপে খ্যাতি পেয়েছিল। বিদেশী পরিব্রাজকগণ বাংলার সে প্রাচুয্য দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হয়েছিলেন। সুবে বাংলা সেদিন সত্যই সোনারবাংলা ছিল। অথচ আজকের অর্জন? একমাত্র আধুনিক কালেই বাংলাদেশ পরিচয় পেয়েছে বিশ্বের তলাহীন ভিক্ষার ঝুড়ি রূপে। সেটি আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবের আমলে। বিশ্বজুড়ে নিন্দিত হয়েছে দূর্নীতিতে ৫বার প্রথম হওয়ার মধ্য দিয়ে। আজও  সে পরিচয়টি বিলুপ্ত হয়নি। সীমাহীন দূর্নীতির কারণে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর জন্য বরাদ্দ্যকৃত ঋণ বাতিল করে দিল।এ আধুনিক কালে দেশজুড়ে বেড়েছে খুন-ডাকাতি,বেড়েছে ব্যাভিচার,বেড়েছে বিদেশের পতিতাপল্লিতে নারী রপ্তানি। আজ বাংলাদেশে যত পতিতার বসবাস সম্ভবত বিগত ৫০০ বছরের সমগ্র সময়েও বাংলার বুকে এত পতিতার বসবাস হয়নি। এত সূদখোর,এত ঘুষখোর ও এত সন্ত্রাসীও জন্ম নেয়নি। এত শাহবাগী নাস্তিকও জন্ম নেয়নি। সরকারের হাতে নাগরিকের নিরাপত্তা না বেড়ে বেড়েছে প্রাণনাশ। অহরহ হচ্ছে হামলা,হত্যা ও গুম। মাত্র গত দুই মাসে দুইশত নাগরিককে সরকারের পুলিশ ও র‌্যাব বাহিনী হত্যা করেছে। এর চেয়ে অন্ধকার যুগ বাংলাদেশে কোন কালেও কি ছিল? তাই প্রশ্ন হলো,সোনার বাংলার সে মধ্যযুগীয় গৌরবযুগকে অন্ধকার যুগ বলা হলে আজকের এ দুর্বৃত্তকবলিত আওয়ামী যুগকে কি বলা যাবে?

সোনারবাংলা যুগের সে গৌরবের কারণটি বাংলার ভূগোল বা জলবায়ু ছিল না,ছিল শরিয়তের আইন,ছিল কাজীদের বিচার।দেশের আদালতে তখন আল্লাহর কোরআনী আইন অনুসারে বিচার হতো। চোর-ডাকাত,ব্যাভিচারি ও খুনিদের সেদিন শাস্তি দেয়া হতো। আল্লাহর সে বিধানকে আদালত থেকে হটিয়েছিল ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকগণ। আর তাদের খলিফাগণই আজ ও সেটি বহাল রেখেছে। কোন মু’মিন ব্যক্তি কি আল্লাহর আইনের এ পরাজিত দশা মেনে নিতে পারে? মেনে নিলে কি তার ঈমান থাকে? মানুষের ঈমান তো যাচাই হয় রাজনীতিতে কোন পক্ষ নিল,এবং কোথায় সে তাঁর মেধা,শ্রম ও রক্তের বিনিয়োগ করলো তা থেকে। মুসলমান তাই ভারতপন্থি হয় না,মার্কিন বা চীনপন্থিও হয় না। সে নেয় করূনাময় মহান আল্লাহর পক্ষ। আল্লাহর শরিয়তের প্রতিষ্ঠাই হয় তাঁর রাজনীতি। সে উদ্দেশ্যেই তাঁর বেঁচে থাকা ও মৃত্যু। কিন্তু সমস্যা হলো,নর্দমার কীট কখনোই ফুলে বাসা বাঁধে না। নর্দমার দুর্গন্ধময় আবর্জনা থেকে সে একটুও বেরুতে চায় না।কারণ,সে তো পুষ্টি পায় গলিত আবর্জনা থেকেই। বাংলাদেশের আওয়ামী বাকশালীদের এখানেই মূল রোগ। তাই তারা বার বার ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচার এবং ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে নিষ্ঠুর নাশকতায় ফিরে যায়। বাংলাদেশ আজ  যে ভাবে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ রূপে পরিচিতি পেয়েছে,যেভাবে বেড়েছে চুরিডাকাতি,ধর্ষণ,সন্ত্রাস,মানবাধিকার হত্যা ও গণতন্ত্র বিরোধী নাশকতা –আওয়ামী বাকশালীদের তো তা নিয়েই প্রচুর আনন্দ। এ পাপের রাজনীতি থেকে তারা বেরিয়ে আসতে রাজী নয়। অপমানজনক এ যুগের নায়ক ছিলেন গণতন্ত্রহত্যাকারি বাকশালী মুজিব। অথচ আওয়ামী লীগ তাকেই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী বলছে। হিরোইন সেবনের মধ্যে প্রবল নেশাগ্রস্ততা থাকে। তেমনি প্রকট নেশাগ্রস্ততা থাকে স্বৈরাচারি রাজনীতির মাঝেও। সে নেশাগ্রস্ততার কারণে গণতান্ত্রিক শাসনপদ্ধতিতে ফিরে যাওয়া তাদের পক্ষে আর কখনোই সম্ভব হয় না। ফলে গণতন্ত্রহত্যাকারি বাকশালী মুজিবের প্রতি আজও  তাদের এত আসক্তি।

 

সনাতন সত্য ও সনাতন জাহিলিয়াত

তাছাড়া যা কিছু সত্য এবং যা কিছু মহান -তা কি যুগের তালে মিথ্যা হয়ে যায়? যে সত্যের আবির্ভাব হযরত ইব্রাহীম (আঃ)র সময়ে হয়েছিল তা তো হযরত মূসা (আঃ) ও হযরত ঈসা (আঃ)র সময়ও নিরেট সত্য রূপেই গণ্য হয়েছিল।তাদের ইন্তেকালের বহুশত বছরও সে সত্য সত্য রূপে গণ্য হয়েছিল হযরত মুহম্মদ (সাঃ)র সময়।এবং আজও  তা বেঁচে আছে সত্য রূপেই। খাদ্য-পানীয় পচে যায়, লোহাতেও মরিচা ধরে, সুরম্য প্রাসাদও ধ্বসে যায়। কিন্তু সত্য তো সর্বকালে অম্লান। ফলে মধ্যযুগীয় কোরআনী সত্য আজ প্রতিষ্টা পেলে বাংলাদেশ অন্ধকারে ডুববে কেন? তাছাড়া কোরআন কি শুধু নবীজী (সাঃ)র যুগের মুসলিমদের জান্নাতে নেয়ার জন্য এসেছিল? কোরআন তো নাযিল হয়েছে নবীজী(সাঃ)-পরবর্তী সর্বযুগের সর্বমানুষকে পথ দেখাতে। পবিত্র কোরআনের উপর সে বিশ্বাস না থাকলে কেউ কি মুসলিম থাকে। প্রতি যুগের প্রতি ঈমানদারের দায়িত্ব তো সে কোরআনকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরা।এখানেই ঈমানদারের ঈমানদারি। তাছাড়া যা কিছু মিথ্যা ও অসত্য সেগুলিও কি যুগের পরিবর্তনে আধুনিক হয়? আবর্জনা তো চিরকালই আবর্জনা। মক্কার কাফেরগণ যে মুর্তিপুজা করতো আজকের পৌত্তলিকগণও তো সেটি করে। এজন্য কি তাদেরকে আধুনিক বা আলোকিত বলা যাবে? আঁধারের রূপ তো সব সময়ই এক।

হেফাজতের ইসলামের ১৩ দফা দাবীকে মধ্যযুগীয় বর্বরতা বলার চেতনাটি আদৌ আধুনিক নয়। মক্কার কাফেরগণও নবীজী(সাঃ)র সত্যবানীকে সেদিন কাদিম যুগের কল্পকথা বলে তিরস্কার করতো।আজকের মিথ্যাসেবীগণ তাদের চেতনা ও চরিত্রের ন্যায় ভাষাও যে পাল্টায়নি এ হলো তার প্রমাণ।কাদিম জাহিলিয়াত আজও  কাদিমই রয়ে গেছে।মিথ্যা এভাবেই নানা রূপ নিয়ে সমাজে বার বার ফিরে আসে।তাই বার বার ফিরে আসে একই রূপ কাদিম উলঙ্গতা,অশ্লিলতা,ব্যাভিচার,মদ্যপান,নাস্তিকতাসহ নানা প্রাচীন পাপাচার।তাই বাংলাদেশের সেক্যুলারিস্ট,নাস্তিক,পৌত্তলিক ও ইসলামে অবিশ্বাসীগণ যেভাবে নিজেদেরকে আধুনিক বলছে সেটি নিতান্তই মিথ্যাচার।উলঙ্গতা,অশ্লিলতা,ব্যাভিচার,মদ্যপান,নাস্তিকতা,চুরি-ডাকাতির কি কোন আধুনিক রূপ আছে? বরং তা তো সনাতন জাহেলিয়াত।পার্থক্যটুকু তো শুধু পোষাক,ফ্যাশান বা বোতলের ব্রান্ডে। ইতিহাসের সাক্ষ্য,পথভ্রষ্ট মানুষেরা যুগে যুগে মহান আল্লাহতায়ালার প্রদর্শিত সনাতন সত্যকে ভূলে বার বার একই রূপ জাহিলিয়াতের দিকেই ধাবিত হয়েছে।

 

শত্রু আল্লাহর ও ইসলামপন্থিদের

বাংলাদেশের মুরতাদদের যুদ্ধটি নিছক আলেম-উলামাদের বিরুদ্ধে নয়,বরং তাদের মূল যুদ্ধটি খোদ মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে।মক্কার বহু কাফের সেকালে নিজেদের সন্তানদের নাম আব্দুল্লাহ ও আব্দুর রহমান রাখতো। এবং সেরূপ নাম ধারণ করেই তারা মুর্তিপুজা করতো। তারা মহান নবীজী(সাঃ)র বিরুদ্ধে যুদ্ধেও নেমেছে। আজও বাংলাদেশে বহু মুরতাদ মুসলিম নাম ধারণ করে ইসলামের প্রতিষ্ঠা রুখতে ব্যস্ত। কেউ তো মাথায় টুপি, মুখে দাড়ি, হাতে তসবিহ, মাথায় কালোপট্টি ও নামের আগে মাওলানা লাগিয়ে ইসলামের বিজয় রুখতে ময়দানে নেমেছে। অথচ মুসলমান হওয়ার দায়বদ্ধতা হলো,নানা যুগের বহুরূপী এ জাহেলদের চেনা এবং তাদের প্রতিষ্ঠিত সে মিথ্যার বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তোলা।সে সাথে মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে যে শরিয়তী বিধান দিয়েছেন সেটির প্রতিষ্ঠায় আপোষহীন থাকা।

মহান আল্লাহতায়ালালা ও তাঁর রাসূলকে যে কুলাঙ্গর গালি দেয় তাকে ঘৃণা করা প্রতিটি ঈমানদারের উপর ফরয। ফরয রূপে গণ্য হয় তাকে সর্বশক্তি প্রতিরোধ করা। এবং বিধান রয়েছে সামর্থ্য থাকলে এমন শত্রুর নির্মূলের। ইসলামের এমন শত্রুর প্রতি সামান্য দরদ দেখালে সে কি মুসলমান থাকে? মহান আল্লাহতায়ালার ভাষায় পবিত্র কোরআনে মুসলমানদের চরিত্রের যে বর্ণনাটি দেয়া হয়েছে তা হলো,“আশাদ্দু আলাল কুফ্ফার ও রুহামাঁও বায়নাহুম”।অর্থাৎ তারা হলো কাফেরদের বিরুদ্ধে অতিশয় কঠোর এবং পরস্পরে অতিশয় রহমদিল-সম্পন্ন।বিষাক্ত গোখরার প্রতি রহম দিল দেখানোটি বেওকুপি। তাই আক্রোশপূর্ণ শত্রুর সাথে দয়াভরা রহমদিলের আচরণ করা ইসলামে নিষিদ্ধ।তারই প্রমাণ হলো, মক্কার এক কাফের শত্রুর সাথে স্রেফ পত্র যোগাযোগ করার কারণে নবীজী (সাঃ) তাঁর এক সাহাবাকে মদিনার বুকে সামাজিক ভাবে বয়কটের নির্দেশ দিয়েছিলেন। আপোষহীন সে প্রচন্ড কঠোরতা নিয়েই মহান নবীজী (সাঃ) ও তাঁর সাহাবাগণ বহু হামলাকারি কাফেরকে হত্যা করেছেন। অনেককে আরবভূমি থেকে চিরতরে বহিস্কারও করেছেন।

কিন্তু শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনার নীতিটি হলো সম্পূর্ণ উল্টো। তাদের কঠোর দমন নীতিটি শুধু ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে,ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে নয়। বরং সকল মিত্রতা ইসলামের শত্রুদের সাথে। তাই দেশের রাজনীতি,সংস্কৃতি,আইন-আদালত ও শিক্ষা থেকে হাসিনার সরকার যেমন ইসলামকে সরাতে চায়,তেমনি ফাঁসীতে লটকাতে চায় ইসলামপন্থিদের।সংবিধান থেকে আল্লাহর উপর আস্থার বানি সরানো হয়েছে তো মহান আল্লাহর বিরুদ্ধে সেরূপ এক নির্ভেজাল আক্রোশ নিয়েই। কথা হলো, সামান্য ঈমান থাকলেও কি কোন ব্যক্তি এমন কাজ করতে পারে? কোন ছেড়া কাগজের টুকরায় আল্লাহর নাম থাকলে ঈমানদার ব্যক্তি সে কাগজকে সম্মান দেখায়। অথচ শেখ হাসিনা ও তার দল সে সম্মান সংবিধানের লিপিবদ্ধ আল্লাহর নামে সাথে দেখায়নি। তাই  অতি উদ্ধত বেশেই সেটি সরিয়ে দিল। আর তার পিতা কোরআনের আয়াত সরিয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রাম থেকে। অবশেষে তাকে নিজেকেও অতি অপমানজনক ভাবে সরতে হয়েছে। কারণ পাপ কাউকে ছাড়ে না। হাসিনা সরকার শত শত হিজাবধারি মহিলাদের স্রেফ কোরআন শিক্ষার আসরে অংশ নেয়া বা রুমে ইসলমি বই রাখার অপরাধে সরকার গ্রেফতার করে জেলে তুলছে।

 

ইতিহাস নির্মিত হলো ফটিকছড়িতে

২০১৩ সালে ফঠিকছড়িতে যা ঘটেছিল সেটি অবিস্মরণীয়।জনগণ তাদের নিজেদের দায়িত্বের কথা যে বুঝে তারই প্রকাশ ঘটেছিল ফঠিকছড়িতে। তাদের স্মরণে জাগ্রত হয়েছিল আল্লাহতায়ালার কাছে জবাবদেহীতার কথা। ধর্ম ও দেশ বাঁচানোর দায়িত্ব প্রতিটি নাগরিকের। গ্রামে আগুন লাগলে কোন গ্রামবাসী কি ঘরে ঘুমুতে পারে? তেমনি কোন মুসলিম ভূমি ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে অধিকৃত থাকলে কোন ঈমানদার কি নীরব থাকতে পারে? ঈমানের প্রকৃত পরীক্ষা তো এখান থেকেই শুরু হয়।নাস্তিকেরা দুমাস যাবত শাহবাগে দিবারাত্র সমাবেশ করেছে। তাদের দাবী ছিল, সকল ইসলামি দলের রাজনীতি নিষিদ্ধকরণ এবং সকল রাজাকারদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা। কিন্তু তারা ভূলে যায়,তারাই বাংলাদেশের সমগ্র জনগণ নয়।শাহবাগের বাইরে রয়েছে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগণ।ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের কোরবানীর কাছে শাহবাগী নাস্তিকদের ত্যাগ নস্যিতূল্য। তারাও তো ইসলামের প্রতিরক্ষায় শুধু অর্থ ও সময় নয়,জীবন দিতে পরোয়া করে না। বাংলাদেশে ইতিমধ্যেই স্বৈরশাসকের হাতে প্রাণ দিয়েছে বহু হাজার মানুষ। জীবন দেয়ার সে জজবা নিয়ে ৫ এপ্রিল ২০১৩ সালের লংমার্চে শত শত মুসল্লী কাফনের কাপড় পড়ে রাজপথে নেমেছিল। বাংলাদেশে গ্রামেগঞ্জে এমন মুসল্লির সংখ্যা লক্ষ লক্ষ। এরাই স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে পালন করছিল ১১ই এপ্রিলের হরতাল। অথচ আওয়ামী লীগ সে হরতালে বাধা দিতে শত শত মোটর সাইকেল,বহুকার ও মাইক্রোবাস নিয়ে রাস্তায় নেমেছিল। এটি ছিল চরম উস্কানি মূলক উদ্যোগ। এটি ছিল জনগণের ইসলামি অনুভূতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা। অতীতে আওয়ামী লীগ যখন হরতাল ডেকেছে তখন কি দেশের ১০০% ভাগ সে হরতালের পক্ষে ছিল? কিন্তু যারা বিপক্ষে ছিল তারা কি কখনো মিছিল বের করেছে?

ফটিকছড়ি ঢাকা নয়, এটি গ্রাম বাংলার হাজার হাজার গ্রামের ন্যায় গ্রামীন জনপদ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান,সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও মিডিয়ার নামে নাস্তিক ও ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী যোদ্ধা উৎপাদনের যত ইন্ডাস্ট্রি ঢাকা শহরে রয়েছে তা কি ফঠিকছড়িতে আছে? এখানে পরিস্থিতিই ভিন্ন।গ্রামবাংলায় তাই শাহবাগের সার্কাস গড়া সম্ভব নয়। ফলে ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণাকারিরা ফটিকছড়ির মত একটি গ্রাম এলাকায় হরতালের দিনে মিছিল বের করবে এবং তাতে নিস্তার পাবে সেটি তারা ভাবলো কি করে? তাই ফটিকছড়ির বিক্ষুব্ধ নারীপুরুষেরা সেদিন হাতের কাছে যা পেয়েছে রাস্তায় নেমে আসে। ফলে গণপিটুনির মুখে পড়ে হরতাল বিরোধীদের মিছিল। জনগণ তাদের গাড়ী এবং শতাধিক মটরসাইকেল দগ্ধিভূত করেছে। হামলার মুখে পড়েছে পুলিশ,র‌্যাব ও বিজিবী সদস্যগণও। শুকনো কাঠের স্তুপে পেট্রোল বিছানো থাকলে তাতে বিস্ফোরণ ঘটাতে বেশ কিছু লাগে না। আগুনের সামান্য স্ফুলিঙ্গই সেটি ঘটাতে পারে। সারা বাংলাদেশ জুড়ে আজ  ঘৃনার পেট্রোল বিছানো। যে কোন স্থানে সরকারি দল সামান্য উস্কানি দিলেই বিস্ফোরণ ঘটবে। ফটিকছড়িতে তো সেটিই ঘটলো। তবে এমন পরিস্থিতি ফটিকছড়ির একার নয়,সমগ্র বাংলাদেশই আজ  ফটিকছড়ি।

 

হাসিনার মুরতাদপ্রীতি

১৪/০৪/১৩ তারিখে দৈনিক “নয়াদিগন্ত”য়ের খবরে প্রকাশ,সরকার ইন্টারনেটের ফেসবুকে বা ব্লগে প্রকাশিত কোন কিছুকে ডাউনলোড করে পত্রিকায় ছপানোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এর অর্থ হলো,আল্লাহ-রাসূল ও ইসলামের বিরুদ্ধে নাস্তিক-মুরতাদের লেখা প্রকাশ করে দৈনিক “আমার দেশ” ও দৈনিক “ইনকিলাব” যেভাবে জনসম্মুখে তাদের মুখোশ উম্মোচিত করে দিয়েছে সেটি এখন আর করা যাবে না। এখন থেকে সেটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ রূপে চিহ্নিত হবে। সরকারের পক্ষ থেকে এমনটি করা হোক -সেটি ছিল শাহানবাগের নাস্তিক ব্লগারদের দাবী। সরকার তাদের সে দাবিই মেনে নিল,এবং এভাবে ইন্টারনেটে তাদের ইসলামবিরোধী প্রচারণাকে প্রটেকশন দিল। ভারতও সেটিই চাচ্ছিল। অপর দিকে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকারি বিরোধীদের ওয়েব সাইট “বাঁশের কেল্লা” বন্ধ করে দেয়ার।

ইসলামবিরোধী নাস্তিকদের সাথে হাসিনা সরকারের বন্ধন যে কতটা মজবুত সেটি কি এরপরও বুঝতে বাঁকি থাকে? সরকার বিরোধীদলীয় নেতাদের আদৌ মাঠে নামতে দিচ্ছে না,এমনকি অফিসেও বসতে দিচ্ছে না। অথচ শাহবাগী ব্লগারদের পুলিশী প্রটেকশন দেয়া হচ্ছে। এ পুলিশকে দিয়েই দুই শতাধিক মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। ফলে এমন একটি জুলুমবাজ ও ইসলামবিরোধী সরকারের বিরুদ্ধে ইসলামপন্থিদের লড়াই যে শত ভাগ জিহাদ তা নিয়ে কি কোন সন্দেহ থাকে? কারণ লক্ষ্য তো এখানে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা। লক্ষ্য এখানে মুরতাদদের দখলদারি থেকে স্বাধীনতা লাভের। এর চেয়ে পবিত্র জিহাদ তাইআর কি হতে পারে? মহান আল্লাহতায়ালা তো এমন একটি জিহাদেই মু’মিনের আত্মনিয়োগ তথা জানমালের বিনিয়োগ দেখতে চান।জানমালের বিনিয়োগকারিকে দিতে চান জান্নাতের সুসংবাদ। বাংলাদেশে তেমন একটি খালেছ জিহাদই তো শুরু হয়ে গেছে। আর এখানেই বাংলাদেশীদের জন্য  সুখবর। কারণ এমন একটি জিহাদের কারণে মহান আল্লাহতায়ালা এদেশের কিছু লোককে প্রমোশন দিতে চান। অনেকে এ জিহাদে শহীদ হবে,আহতও  হবে। তাদের মহান রব তাদেরকে জান্নাতে নিতে চান।বাংলাদেশী মুসলমানদের জন্য এর চেয়ে বড় সৌভাগ্যের বিষয় আর কি হতে পারে? ১৪/০৪/১৩

 

 




বাংলাদেশে ইসলামের বিজয় কীরূপে?

ইসলামের বিজয় ও নির্বাচন প্রসঙ্গ

প্রশ্ন হল, বাংলাদেশে ইসলামের বিজয় কীরূপে সম্ভব? এটি কি নির্বাচনের মাধ্যমে? নির্বাচনের মাধ্যমে যারা বাংলাদেশে ইসলামের বিজয়ের স্বপ্ন দেখে, অন্ততঃ তাদের এখন বোধোদয় হওয়া উচিত। কারণ, নির্বাচনে তাদের বিজয় দূরে থাক, পরাজয়ের মাত্রাই দিন দিন বেড়ে চলেছে। নবীজী (সাঃ) মাত্র ২৩ বছরে যে বিপ্লব এনেছিলেন, নির্বাচনের পথে বহু যুগ ব্যয় করেও তারা সেরূপ বিজয়ের ধারে কাছেও পৌঁছতে পারিনি। অথচ নবীজী (সাঃ)র সূন্নত রেখে গেছেন শুধু নামায-রোযার ন্যায় ইবাদতে নয়, বরং তাঁর সবচেয়ে বড় সূন্নতটি হলো রাষ্ট্রীয় বিপ্লবের ন্যায় সবচেয়ে বড় ইবাদতে তথা জিহাদে। অথচ সে সূন্নত থেকে আজকের মূসলিমগণ সামান্যই শিক্ষা নিচ্ছে। বরং অনুসরণ করা হচ্ছে অন্যদের দেয়া সেক্যুলার মডেল -যেখানে পবিত্র জিহাদ চিহ্নিত হয় সন্ত্রাস রূপে। এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ গণ্য হয় ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংগঠিত হওয়া।

তারা বুঝতে ভূল করে, নির্বাচন কখনোই সমাজ বিপ্লবের হাতিয়ার নয়। এমনকি আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার সফল মাধ্যমও নয়। অতীতে কোন দেশেই এ পথে কোন সমাজ বিপ্লব আসেনি। আসেনি মানুষের মন-মনন, রুচিবোধ, বাঁচবার সংস্কৃতিতে পরিবর্তন। বরং নির্বাচনে দেশ-শাসনের অধিকার পায় তারাই যারা সমাজের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক বিশ্বাসের সাথে সম্পৃক্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ। তাই সূদ, ঘুষ ও দূর্নীতি যে সমাজে প্রবল ভাবে বিজয়ী সে সমাজের নির্বাচনেও সূদখোর, ঘুষখোর ও দূর্নীতিবাজরাই বিজয়ী হয়। যেমন সবচেয়ে বড় ডাকাতটিই ডাকাত পাড়ায় সর্দার নির্বাচিত হয়। মক্কার দূর্বত্ত-কবলিত সমাজে আবু জেহল ও আবু লাহাবের ন্যায় দুর্বৃত্ত ব্যক্তি নেতা হবে সেটিই কি স্বাভাবিক ছিল না? তারা প্রত্যাখ্যান করেছিল নবীজী (সাঃ)র ন্যায় সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষকে।

মশা-মাছি কখনই ফুলের উপর বসে না, তারা খোঁজে আবর্জনার স্তুপ। তেমনি অবস্থা দূর্নীতিতে ডুবা জনগণের। নবীজী (সাঃ)র ন্যায় মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানবকে নিজেদের নেতা রূপে গ্রহণ করার সামর্থ্য হাওয়ায় নির্মিত হয় না। এজন্য চাই, জনগণের চেতনায় ঈমানের পরিপুষ্টি। চাই ওহীর জ্ঞান। মক্কার মুশরিকদের সে সামর্থ্য ছিল না। তাই নবীজী(সাঃ)কে প্রত্যাখ্যান করে তারা নিজেদের অযোগ্যতাই প্রমাণ করেছিল। এখানে ব্যর্থতা নবীজী(সাঃ)র ছিল না। ব্যর্থতা ছিল মক্কার মানুষের। কথা হল, বাংলাদেশে এরূপ মাছি-চরিত্রের মানুষের সংখ্যা কি কম? এ শতাব্দীর শুরুতে দুর্বৃত্তিতে ৫ বার বিশ্ব-শিরোপা পাওয়ার মধ্য দিয়ে তারা কি প্রমাণ করেনি, এরূপ ভ্রষ্ট চরিত্রের মানুষের সংখ্যা বিশ্বমাঝে বাংলাদেশেই সর্বাধিক? এটিতো বিবেকে কাঁপন ধরানোর মত বিষয়।

দেহের রোগ লুকিয়ে রেখে লাভ নাই। বরং চিকিৎসার স্বার্থে সে রোগের বিষয়টি যতটা পূর্ণভাবে ও সত্যভাবে উপলব্ধি করা যায় ততই ভাল। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাই বলেছিলেন, “হে বিধাতা! সাত কোটি প্রাণীরে রেখেছো বাঙ্গালী করে, মানুষ করনি।” রবীন্দ্রনাথের এ উচ্চারণের মধ্যে ছিল বাঙ্গলীর মাঝে বিদ্যমান রোগ নিয়ে অকপটে কিছু বলার আকুতি। একথাটি পাকিস্তান আমলে কোন পশ্চিম পাকিস্তানী নেতা বা বুদ্ধিজীবী বললে তো তাদের বিরুদ্ধে সাথে সাথে যুদ্ধ শুরু হত। কিন্তু বলেছেন এমন এক ব্যক্তি যার গান না গাইলে বাংলাদেশের পতাকা উপরে উঠানো যায় না। বাঙ্গালীর যে বিশেষ রোগটি নিয়ে রবীন্দ্রনাথ প্রচণ্ড মনোবেদনায় ভুগছিলেন সেটি হলো, মানুষ রূপে বেড়ে উঠার ব্যর্থতা। সে ব্যর্থতা এখন স্বৈরাচারি শাসকের হাতে ষোল কলায় পূর্ণ হয়েছে। ফলে পৃথিবীর কোন দেশে পর পর ৫ বার দুর্নীতিতে প্রথম না হলেও বাংলাদেশ হয়। নির্বাচনের নামে ২০১৪ এবং ২০১৮ সালে যেরূপ ভোট-ডাকাতি হলো সেটি পৃথিবীর অন্য কোন দেশে না হলেও বাংলাদেশে হয়। সে প্রচণ্ড অসভ্যতার বিরুদ্ধে জনগণও রাজপথে নামে না। প্রশ্ন হলো, রবীন্দ্রনাথ এখন বেঁচে থাকলে এ ব্যর্থতা নিয়ে কি বলতেন? যখন তিনি উপরুক্ত চরণটি লিখেছেন তখন তো বাঙালীর এতো ব্যর্থতা ছিল না।

 

অপরিহার্য চেতনা রাজ্যের বিপ্লব

কথা হলো, এমন একটি দুর্বৃত্তকবলিত ও নৈতিকতাশূণ্য দেশে স্বয়ং কোন পয়গম্বর নেমে আসলেও তাঁর পক্ষে কি নির্বাচনী বিজয়-লাভ সম্ভব হতো? রাজনৈতিক বিপ্লবের জন্য তো চাই জনগণের চেতনার জগতে বিপ্লব। ভূমি প্রস্তুত না করে কি কখনো ফসল ফলানো যায়? তেমনি রাজনৈতিক বিপ্লবের জন্য   চাই প্রস্তুত করতে হয় ভূমিকেও। নইলে হোসেন মহম্মদ এরশাদের মত আদালতে প্রমাণিত ও শাস্তিভূগী দুর্বৃত্তরাই বার বার বিপুল ভোটে জিতবে। মক্কায় বার বার নির্বাচন হলেও নবীজী (সাঃ) কি সেসব নির্বাচনে একবারও জিততেন? অথচ মক্কা বিজয়ের পর সমগ্র চিত্রটাই পাল্টে যায়। তখন হাজারো বার নির্বাচন হলেও তাঁকে কি কেউ একটি বারও পরাজিত করতে পারতো? কারণ, ইতিমধ্যে সমগ্র আরব জুড়ে অভাবনীয় বিপ্লব ঘটে গেছে। সে বিপ্লবে পাল্টে গিয়েছিল শুধু তাদের ধর্মীয়-বিশ্বাসই নয়, বরং জীবন ও জগত নিয়ে তাদের সকল ধ্যান-ধারনা। পাল্টে গিয়েছিল প্রকৃত যোগ্য মানুষের ধারণা। আমূল বিপ্লব এসেছিল তাদের আচার-আচরণ, রুচীবোধ, রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে। আরবের এককালের মাছি-চরিত্রের মানুষগুলো তখন আর আবর্জনার সন্ধান করেনি, নিজেরাই তখন বিশুদ্ধতা অর্জন করেছিল। মাছি-চরিত্রের বাদবাকি মানুষগুলো তখন আবর্জনার স্তুপে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল। সমাজ বিপ্লবের ক্ষেত্রে এটিই হলো নবীজী (সাঃ)র সূন্নত।

নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে ইসলামের বিজয় আনা বা শরিয়তের প্রতিষ্ঠা করা অনেকটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে কম্যুউনিস্টদের বিজয়ের মত। নির্বাচন আসে সেদেশের প্রতিষ্ঠিত শাসনতন্ত্র, আইন ও রাজনৈতিক রীতি-নীতির বৈধতা মেনে নিয়ে। এমন নির্বাচনে সরকার পরিবর্তিত হয়, কিন্তু তাতে পরিবর্তন আসে না দেশের আইন বা শাসনন্ত্রে। যেটি আসে সেটি পুরনো ঘরে রঙ-চং লাগানোর মত। শাসনতন্ত্র একটি দেশের নির্বাচিত সরকারের হাত পা যে কতটা কঠোর ভাবে বেধে দেয় তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হল তুরস্ক। ইসলামের ফরয বিধানগুলো বাস্তবায়ন দূরে থাক, নির্বাচনের মাধ্যমে বার বার ক্ষমতায় গিয়েও সেদেশের ইসলামপন্থিগণ ছাত্রীদের মাথায় রুমাল বাধার স্বাধীনতাটুকুও ফিরিয়ে দিতে পারছে না। ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠার পথে প্রচন্ড বাধা হয়েছে সে দেশের ধর্মবিরোধী সেকুলার আইন। ফলে সেদেশে ব্যাভিচার হয়, প্রকাশ্য মদ্যপান হয়, প্লেবয় ম্যাগাজিনের এডিশনও ছাপা হয়, সর্বোপরি ইসরাইলের সাথে যৌথ সামরিক মহড়াও হয়। বাংলাদেশের নির্বাচনে ইসলামপন্থিগণ যদি জয়লাভও তবে কি তারা সমাজ পরিবর্তনেরর পথে বেশী দূর এগুতে পারবে? মহম্মদ রেজা শাহর আমলে ইরানে বহুবার নির্বাচন হয়েছে। কিন্তু সে নির্বাচনে ইরানের ইসলামপন্থিরা অংশ নেয়নি। আর অংশ নিলেও তারা কি জিততে পারতো? এবং জিতলেই কি তারা দেশটির তাগুতী শাহ ও তার বহুদিনের প্রতিষ্ঠিত শাসনব্যবস্থা কে পাল্টাতে পারতো? গ্রেট-ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী রূপে কোন আল্লামা বা আয়াতুল্লাহকে বসালেই তিনিই বা কি করতে পারতেন? সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের চেতনারাজ্য জুড়ে ব্যাপক বিপ্লব না এনে নিছক মন্ত্রী লাভ বা এমপি হওয়াতে ইসলামের কল্যাণ নেই। রেলগাড়ী শুধু বিছানো রেলপথ দিয়েই চলতে পারে, সে পথ থেকে ছিটকে পড়ালে আর এগুতে পারে না। তেমনি ঘটে একটি নির্বাচিত সরকারের বেলায়ও। তাকে বাধাধরা সাংবিধানিক নিয়ম মেনে চলতে হয়, এজন্য নির্বাচনে বিজয়ের পর সেগুলি মানার কসমও খেতে হয়। ফলে বিজয়ীদের বৈধ অধিকার থাকে না বিপ্লব ঘটানোর। নির্বাচনে বিপ্লব ঘটানোর সে ম্যান্ডেট  কোন সরকারই পায় না। অথচ সে ক্ষমতা থাকে বিপ্লবী সরকারের। তাই ইরান, চীন, রাশিয়া বা কিউবাতে রাষ্ট্র জুড়ে যেরূপ ব্যাপক পরিবর্তন এসেছিল সেটি কি কোন নির্বাচিত সরকার ভাবতে পারে? কারণ বিপ্লব অনুষ্ঠিত হয় জনগণের প্রচন্ড বিদ্রোহে ও বিপুল রক্তদানে। এমন গণবিপ্লবের ক্ষমতাই আলাদা।

 

যে শিরক ও কুফরি গণতন্ত্রের নামে

বাংলাদেশের চলমান পরিস্থিতিতে যারা নির্বাচনে নামে তারা তো প্রতিযোগিতায় নামে প্রচলিত শাসতান্ত্রিক বিধি ও জনগণের মাঝে বিরাজমান রাজনৈতিক দর্শন ও সংস্কৃতির সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে। আর ইসলাম থেকে বিচ্যুতির শুরু হয় মূলতঃ এখান থেকেই। বাংলাদেশে যে শিরকটি প্রবল ভাবে প্রচার ও প্রতিষ্ঠা পেয়েছে সেটি মুর্তিপুজা নয়। সে গুরুতর শিরকটি শুধু মুশরিকদের মাঝেও সীমাবদ্ধ নয়। বরং তা হল গণতন্ত্রের নামে এমন এক বিশ্বাস যার মূল কথা, “জনগণই ক্ষমতার উৎস।” এবং সে সাথে “জনগণের সার্বভৌমত্ব”-এর ধারণা এবং “আইন প্রণোয়নে পার্লামেন্টের নিরংকুশ ক্ষমতার বিষয়।” অথচ মুসলিম হওয়ার অর্থই হল, আইন-প্রণোয়নের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের উপর থাকতে হবে একমাত্র মহান আল্লাহর পূর্ন-সার্বভৌমত্ব। এক্ষেত্রে আপোষ চলে না। আপোষ হলে ঈমানই থাকে না। আল্লাহর আইনকে দূরে ঠেলে দিয়ে নিজেরাই পার্লামেন্টে আইন নির্মাণে উদ্যোগী হওয়া তো আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। এ বিদ্রোহ তো আইনদাতা হিসাবে আল্লাহর রাব্বানিয়াতের বিরুদ্ধে। এটি তো সুস্পষ্ট কুফরি। কোন ঈমানদার ব্যক্তি কি এমন বিদ্রোহ ও এরূপ কুফরিতে অংশ নিতে পারে? এমন বিদ্রোহ তো এমনকি মুগল সম্রাটরাও করেনি। করেনি বাংলার কোন মুসলিম শাসক। আল্লাহর আইনের বিরুদ্ধে ভারতবর্ষে প্রথম বিদ্রোহ করেছিল ব্রিটিশ শাসকেরা। আর বাংলাদেশের সেকুলার শাসকগণ আজও সে বিদ্রোহকে অব্যাহত রেখেছে। বাংলাদেশের সেকুলার পক্ষটি এজন্যই ব্রিটিশসহ সমগ্র কাফের শক্তির এতটা পছন্দের। ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দল ও উলামাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা যে দেশের জনগণকে এ প্রকান্ড কুফরির বিরুদ্ধে সতর্ক করতে পারিনি। অন্যদের কি সতর্ক কি করবে, তারা নিজেরাও সেটি যথার্থ ভাবে বুঝতে পারেনি।

ঈমানদারের সার্বক্ষণিক ভয়টি হতে হবে ঈমান হারানো নিয়ে; জনগণের ভোট হারানো নিয়ে নয়। সে সাথে আল্লাহর সাহায্য ও হেদায়াত হারানো নিয়ে। আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে প্রতিটি অবাধ্যতা সে অবাধ্য ব্যক্তিটিকে দূরে সরিয়ে নেয় মহান আল্লাহর হেদায়াত থেকে। এবং তাকে নিকটবর্তী করে শয়তানের। সেটিরই বর্ণনা পবিত্র কোরআনে এসেছে এভাবে। মহান আল্লাহতায়ালার ঘোষণাঃ “যারা (আমার ও আমার দ্বীনের উপর) বিশ্বাসস্থাপন করেনা, তাদের বন্ধুরূপে শয়তানদেরকে নির্দ্দিষ্ট করে দিয়েছি।”- (সুরা আল-আ’রাফ, আয়াত -২৭)। তিনি আরো বলেছেন, “এবং যারা কুফরি করলো, তাদের বন্ধু হলো শয়তান; তাদেরকে সে আলো থেকে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়। তারাই হলো জাহান্নামের বাসিন্দা, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে।”-(সুরা বাকারা, আয়াত ২৫৭)।

কথা হলো, কুফরির অর্থ কি? এর অর্থ কি শুধু মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অস্বীকার করার মধ্যে? কুফরির নানা রূপ। এবং তা মানুষের জীবনে আসে নানা ভাবে। মক্কার কাফেরগণ আল্লাহকে শুধু বিশ্বাসই করতো না, নিজেদের সন্তানদের নাম আব্দুল্লাহ, আব্দুর রাহমানও রাখতো -যার অর্থ আল্লাহর দাস। কিন্তু তারপরও তারা কাফের রূপে চিহ্নিত হয়েছে। মুসলমান হওয়ার জন্য যেটি জরুরী সেটি শুধু আল্লাহর ও তাঁর রাসূলকে বিশ্বাস করা নয়, বরং আল্লাহর দ্বীনের সামগ্রীক বিজয় বা পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আপোষহীন অঙ্গিকার ও আত্মত্যাগ। প্রকৃত ঈমানদারের কাছে অতিশয় অসহ্য হলো আল্লাহর দ্বীনের পরাজয়। এক্ষেত্রে সামান্য আপোষমুখিতাই হল কুফরি। নবীজী (সাঃ) ও তার সাহাবায়ে কেরাম এ ব্যাপারে সামান্যতম আপোষ করেননি। হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর ন্যায় দয়ালু ব্যক্তি তার খেলাফত কালে কাফের রূপে তাদের বিরুদ্ধে হত্যার শাস্তি দিয়েছেন যারা আল্লাহকে বিশ্বাস ও নামায-কালাম পড়লেও রাষ্ট্রের ভাণ্ডারে যাকাত দিতে অস্বীকার করেছিল।

গণতন্ত্রের নামে অন্য যে জাহিলিয়াতটি মুসলিম দেশে জনপ্রিয়তা পেয়েছে সেটি হল, “জনগণ কখনই ভূল করে না”। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তারা বলে, “জনগণ একাত্তরেও ভূল করেনি এবং এখনও করছে না।” জনগণ যেন ফেরেশতা। নির্বাচনী বিজয়কে তারা ব্যক্তির শ্রেষ্ঠত্ব যাচায়ে একটি মাফকাঠি রূপে ব্যবহার করে। সে মাফকাঠিতেই শেখ মুজিবকে তারা বলছে ইতিহাসের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালী। কারণ, একাত্তরে সবচেয়ে বেশী ভোটে বিজয়ী তিনিই একমাত্র বাঙালী। অথচ তারা একথা বলে না, ইতিহাসে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সমর্থণ পেয়েছে এককালের নমরুদ ও ফিরাউন। জনগণ শুধু সমর্থনই দেয়নি তাদের পক্ষে তারা যুদ্ধ করেছে, প্রাণও দিয়েছে। অপর দিকে জনসমর্থন হারিয়ে পথে পথে ঘুরেছেন হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ও হযরত মূসা (আঃ)। ৯৫০ বছর ধরে দিন-রাত বুঝিয়েও গণসমর্থন পাননি হযরত নূহ (আঃ)। গণসমর্থন না থাকায় রাতের আঁধারে লুকিয়ে মাতৃভূমি ছাড়তে হয়েছে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব বিশ্বনবী হযরত মহম্মদ (সাঃ)কে। দুর্বৃত্তরা সেদিন মক্কায় প্রবল ভাবে বিজয়ী হয়েছিল, সে বিজয় নিয়ে আজকের ন্যায় সেদিনও ইসলামের বিপক্ষশক্তি মহা-বিজয়ের উল্লাস করেছিল। তারা একথাও ভূলে যায়, বিপুল জনসমর্থন পেয়েছে দুর্বৃত্ত হিটলার, জর্জ বুশ ও টনি ব্লেয়ার। তেমনি পেয়েছে একদলীয় বাকশালের প্রতিষ্ঠাতা ও বাংলাদেশে মানবিক অধিকারের হন্তা শেখ মুজিব। তাই জনসমর্থন দিয়ে কি কারো সততা, যোগ্যতা বা অন্য কোন মানবিক গুণ যাচাই হয়?

 

সাফল্য  একমাত্র নবীজী(সাঃ)র অনুসরণে

প্রশ্ন হলো, ইসলামের বিজয়-সাধনের পথ কোনটি? পথ একটিই, আর সেটি হলো নবীজী (সাঃ) দেখানো পথ। নবীজী (সাঃ) শুধু নামায-রোযার পদ্ধতিই শিখিয়ে যাননি, শিখিয়ে গেছেন সমাজ বিপ্লবের পথও। তাছাড়া নামায-রোযার চেয়ে এটিই তো জটিলতম ইবাদত। তাই এ ইবাদত পালনের কোন সূন্নতী তরীকা রেখে না গেলে সেটি মানব জাতির জন্য আরেক বিপর্যয়ের কারণ হত। মানুষ তখন তাদের নিজস্ব সীমাবদ্ধতা নিয়ে ইসলামি বিপ্লবের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় নামতো। আর এতে ব্যাপক অপচয় ঘটতো মানুষের অর্থ, মেধা, সময় ও রক্তের। আজও অনেক দেশে সেটিই হচ্ছে। ইসলামী বিপ্লবের শুরু হতে হবে ব্যক্তির চিন্তারাজ্য থেকে। আর এক্ষেত্রে সবচেয়ে হাতিয়ার হল কোরআন। কোরআনের জ্ঞানের আলোকে গভীর বিপ্লব আনতে হবে ব্যক্তির জীবনদর্শনে। হাদীস পাকে বলা হয়েছে, “সবচেয়ে উত্তম জ্বিহাদ হলো নিজের নফসের বিরুদ্ধে জ্বিহাদ।” সব জ্বিহাদের শুরু মূলতঃ এখান থেকেই। তাই এ জ্বিহাদে বিজয়ী ব্যক্তির সংখ্যা যে দেশে বৃদ্ধি পায়, একমাত্র সেদেশেই শয়তানি শক্তির বিরুদ্ধে ইসলামকে বিজয়ী করার চুড়ান্ত জ্বিহাদটিও শুরু হয়। আর যে দেশে সে চুড়ান্ত জ্বিহাদটিই শুরু হয়নি, বুঝতে হবে সেদেশে নফসের বিরুদ্ধে বিজয়ী মোজাহিদের সংখ্যাও তেমন একটি নেই। কারণ নফসের বিরুদ্ধে বিজয়ী মোজাহিদ কখনই রাষ্ট্র ও সমাজে আল্লাহর দ্বীনের পরাজয় ও অপমাণ মেনে নিতে পারে না। ফলে জ্বিহাদ সেখানে অনিবার্য। এবং সে চুড়ান্ত জ্বিহাদের পরণতিতেই বিজয়ী হয় আল্লাহর দ্বীন। তাই একটি দেশে লক্ষ লক্ষ মসজিদ-মাদ্রাসা থাকাটি বড় কথা নয়। বড় কথা নয় রোযাদার বা মুসল্লীর সংখ্যাও। তাবলিগ জামাতের ইজতেমায় কত লক্ষ মুসল্লী জমা হলো -সেটিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং অতি গুরুত্বপূর্ণ হলো সেদেশে ক’জন এরূপ আত্মবিজয়ী মোজাহিদ সৃষ্টি হলো সেটি। বাংলাদেশে আল্লাহর দ্বীন আজ পরাজিত। শতকরা ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে বিজয়ী আদর্শ রূপে যেটি দেশের রাজনীতি, প্রশাসন, আইন-আদালত ও সংস্কৃতিতে জেঁকে বসে আছে সেটি ইসলাম নয়। সেটি সেকুলারিজম। এবং সেকুলারিষ্টদের আনন্দ ইসলামের পরাজয়ে। তাদের কারণে আইন-আদলতে আল্লাহর শরিয়তি আইনের প্রতিষ্ঠা যেমন সম্ভব নয়, তেমনি সম্ভব নয় সূদী ব্যাংকের উৎখাত। সম্ভব নয় পতিতাবৃত্তির ন্যায় পেশাদারি ব্যাভিচারের নির্মূল। এবং সম্ভব নয় ঘুষ, সরকারি তহবিল তছরুফ, চুরি-ডাকাতি ও সন্ত্রাসের ন্যায় নানাবিধ পাপাচারের উচেছদ।  

যারা ইসলামের পক্ষের শক্তি, নিজেদের ব্যর্থতা নিয়ে তাদের আত্মসমালোচনা হওয়া উচিত। যে পথে আসছে অবিরাম ব্যর্থতা সে পথে হাজার বছর চললেও কি সফলতা আসবে? চলা থামিয়ে তাদের ভাবা উচিত যে পথে তারা চলছে সেটি সঠিক তো? দেশে ইসলামের বিজয় আনার আগে ব্যক্তি-জীবনে ইসলামের বিজয় আসা উচিত। শুরু হওয়া উচিত নফসের বিরুদ্ধে জ্বিহাদ। অথচ এক্ষেত্রে ব্যর্থতা যে প্রকট সে প্রমাণ কি কম? আত্ম-বিজয়ী তথা নিজের নফসের উপর বিজয়ী মোজাহিদ গড়ার সফল পদ্ধতি থাকলে অবশ্যই শুরু হত আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার লড়াই। কিন্তু বাংলাদেশে সে কাজটি হয়নি। এটি বাংলাদেশের মুসলমানদের ধর্মপালনের এক নিদারুণ ব্যর্থতা। যে কোন ধর্মপ্রাণ মানুষকে এ ব্যর্থতার কারণ খুঁজতে হবে। প্রশ্ন হলো, ১৫ কোটি মুসলমানের দেশে ক’জন মুসলমান এমন আছে যারা পবিত্র কোরআনের প্রথম পৃষ্টা থেকে শেষ পৃষ্টা পর্যন্ত একবার অর্থসহ বুঝে পড়েছে? এবং পাঠের সাথে তার উপর চিন্তা-ভাবনাও করেছে। কোরআন মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বিপ্লবী গ্রন্থ। এ কিতাব পড়লে চিন্তাশীল পাঠকও বুঝতে পারে এ কিতাবের লেখক আর কেউ নন, লেখক সর্বশক্তিময় মহান আল্লাহ। এটিও সে বুঝতে পারে, এ মহান লেখকের প্রতিটি কথা তার নিজেকে উদ্দেশ্য করে লেখা। তখন তার মনে প্রচন্ড আগ্রহ বাড়ে আল্লাহর সে নির্দেশাবলীর অনুসরণে| তখন আমূল বিপ্লব শুরু হয় শুধু তার মন-জগতে নয়, বরং সমগ্র অস্তিত্ব জুড়ে। একারণেই নবীজীর আমলে সাহাবাগণ এ কিতাব পড়তে পড়তে অঝোরে কাঁদতেন। আল্লাহর ভয়ে কেঁপে উঠতো তাদের ক্বালব। পবিত্র কোরআনে আল্লাহপাক মোমেনের সে বাস্তব চিত্রটি বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে, “ঈমানদার হচ্ছে একমাত্র তারাই, যাদের ক্বালব ভয়ে কেঁপে উঠে যখন তাদেরকে আল্লাহর নাম শুনানো হয়। এবং যখন তাদেরকে আল্লাহর আয়াত তেলাওয়াত করে শুনানো হয় তখন তাদের ঈমান বেড়ে যায়। এবং তারা তাদের প্রতিপালক আল্লাহর উপর ভরসা করে।” –সুরা আনফাল, আয়াত ২। -“এবং তারাই হচ্ছে সত্যিকার ঈমানদার। তাদের জন্য রয়েছে আল্লাহর কাছে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান, রয়েছে মাগফেরাত এবং মর্যাদাপূর্ণ রিযিক।” –সুরা আনফাল, আয়াত ৩।

 

মূল হাতিয়ারটি কোরআন

তাই ইসলামের বিজয় বাড়াতে হলে কোরআনের চর্চা বাড়াতে হবে। এছাড়া বিকল্প পথ নেই। দলীয় নেতা-কর্মী, দলীয় তহবিল বা দলীয় অফিসের সংখ্যা বাড়িয়ে এ কাজ সম্ভব নয়। তবে কোরআন চর্চার অর্থ নিছক কোরআন পাঠ নয়, বরং সেটি হলো কোরআনের জ্ঞানের গভীর আত্মস্থ্যকরণ। এজন্য সম্ভব হলে কোরআনের ভাষা আরবীকেও শিখতে হবে। কারণ কোরআনের অনুবাদ পাঠে হৃদয় ভয়ে কেঁপে উঠবে -সে সম্ভবনা কম। কারণ, যিনি অনুবাদ করেন তিনি তো মানুষ। আর কোরআনের রচিয়েতা তো মহান আল্লাহ। আল্লাহর ভাষা, ভাব ও বর্ণনাভঙ্গির অনুবাদ কি কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব? এটি সম্ভব নয় বলেই বহু আলেম কোরআনের অনুবাদকে অসম্ভব গণ্য করেছেন। যারা কোরআন বুঝায় আগ্রহী, তাদের সে কাজটি করতে হবে নিজ উদ্যোগে আরবী ভাষা শিক্ষার মধ্য দিয়ে। অথচ বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় অবহেলা হয়েছে কোরআন ও কোরআনের ভাষা বুঝার কাজে। অথচ প্রাথমিক কালে নিছক কোরআন বুঝার তাগিদে মিশর, আলজিরিয়া, মরক্কো, সূদান, লিবিয়া, তিউনিসিয়া, সিরিয়া, ইরাকসহ বহু দেশের মানুষ নিজ মাতৃ ভাষা ছেড়ে কোরআনের ভাষাকে শিখেছে। বাংলাদেশের নাগরিকগণ বিদেশী ভাষা যে শিখছে না তা নয়, শিখছে চাকুরি-লাভ ও ব্যবসায়ীক স্বার্থে। ইউরোপ-আমেরিকায় গিয়ে তাদের অনেকে মাতৃভাষাও ভূলছে। তাদের কাছে বিদেশী ভাষা শিক্ষায় গুরুত্ব পাচ্ছে নিছক পার্থিব স্বার্থ হাছিলের লক্ষ্যে। অথচ যে ভাষাটি শিক্ষার সাথে জড়িত অনন্ত-অসীম জীবনে সফলতা লাভের বিষয়, সেটিই গুরুত্ব হারাচ্ছে।

অনেকে নির্বাচনে অংশ নেওয়াকে ইসলামের বিজয়ের একমাত্র পথ মনে করছে। তাই নির্বাচনে কোটি কোটি টাকা খরচেও তাদের আপত্তি নেই। অথচ এত টাকা দিয়ে বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে খোলা যেত, কোরআন ও আরবী ভাষা শিক্ষার শিক্ষাকেন্দ্র। খোলা যেত টিভি কেন্দ্র। প্রতিষ্ঠা করা যেত বহু পত্রিকা। পৌঁছে দেওয়া যেত লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে বীনামূল্যে কোরআনের অনুবাদ ও ইসলামের উপর লেখা বই। এভাবেই আসতে পারতো জ্ঞানের জোয়ার, সৃষ্টি হতে পারতো মনরাজ্যে বিপ্লব। আর এমন বিপ্লব আসলে সে বিপ্লবী মানুষটি ইসলামের বিজয় আনতে শুধু রায়ই দিত না, অর্থ, শ্রম, সময় -এমনকি প্রাণও দিত। এভাবে প্রতিটি ব্যক্তি পরিণত হতে পারতো সমাজ বিপ্লবের শক্তিশালী পাওয়ার হাউস। নবীজী (সাঃ) তার ১৩ বছরের মক্কী জীবনে তো সে কাজটিই করেছেন। একটি ক্ষুদ্র বীজের মধ্যে যেমন লুকিয়ে থাকে আগামী দিনের বিশাল বটবৃক্ষ, তেমনি এক শিশুর মনে লুকিয়ে থাকে সমাজ বিপ্লবের বিশাল পাওয়ার হাউস। ইসলামের বিজয়ের লক্ষ্যে যেটি প্রয়োজন সেটি হলো, সে পাওয়ার হাউসগুলো সক্রিয় করা। আর সে কাজটি হতে পারে একমাত্র কোরআন দ্বারা। কোরআনই হলো মহান আল্লাহর দেওয়া একমাত্র সফটওয়ার যা বিস্ময়কর ভাবে ক্ষমতা বাড়ায় ব্যক্তির। এ সফটওয়ার ছাড়া মানুষ পশু থেকে সামান্যই উপরে উঠতে পারে। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে বরং নীচে নামে। ঈ্মা ন না থাকায়, মানবতা যে কতটা বর্বর ভাবে পশুর চেয়েও নীচে নামতে পারে সে স্বাক্ষর তো আজকের ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান, ইরাক, কাশ্মীর, বসনিয়া, চেচনিয়া। কুকুর-বিড়ালের মুখে ভাষা থাকলে আজ ফিলিস্তিনের গাজাতে যা হচ্ছে তারাও তার নিন্দা জানাতো। কিন্ত সে সামর্থ জর্জ বুশ বা বারাক ওবামার নেই। মুখে ভাষা থাকলে অন্ততঃ কোন পশুই শিশু ও বেসামরিক নারীপুরুষ হত্যাকারি ইসরাইলীদের সমর্থন করতো না। কিন্তু মার্কিন প্রশাসন সেটিও করছে। তাদের সে ব্যর্থতার কারণ, তাদের মগজে যে সফটওয়ারটি কাজ করছে সেটি শয়তানি সফটওয়ার। মানবতার বেড়ে উঠার বিরুদ্ধে এটি এক প্রচন্ড বাধা। অথচ কোরআনের গুণে আরবের নিরক্ষর মরুবাসী ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মানুষে পরিণত হতে পেরেছিলেন।

 

অজ্ঞতাই সবচেয়ে বড় পাপ 

ইসলামে সবচেয়ে বড় পাপ হলো অজ্ঞতা। অথচ সে পাপটিই ছেয়ে আছে সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে। এবং সে অজ্ঞতা অতি প্রকটতর হলো ইসলাম ও কোর’আনকে নিয়ে। এমন অজ্ঞতায় আর যাই হোক কোন সমাজ-বিপ্লব হয় না। তখন সমাজে বেড়ে উঠে না শান্তি, বিবেকবোধ ও মানবতা। যে কোন সমাজ বিপ্লবের বড় বড় মূল কাজগুলি হয় জনগণের কাতার থেকে, দেশের প্রশাসন থেকে নয়। এবং সেটি জ্ঞানবিতরণ ও ব্যাপক সমাজসেবার মধ্য দিয়ে। ইসলামী আন্দোলন তখন এক ব্যাপক সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হয়। বুদ্ধিবৃত্তির মূল কাজটি তো সরকারের নয়, দেশের আলেম বা জ্ঞানী ব্যক্তিদের। অতীতে কোন কালেই এটি কোন সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে হয়নি। তাফসির, ইসলামি দর্শন ও ফিকাহর ন্যায় ক্ষেত্রে যে বিশাল জ্ঞানভান্ডার, সেগুলী তো গড়ে উঠেছে ব্যক্তিগত উদ্যোগে। অথচ বাংলাদেশের ন্যায় ১৫ কোটি মুসলমানের দেশে এ কাজটি হয়নি। নবীজী (সাঃ) কোরআনের জ্ঞান বিতরণ করতে গিয়ে মার খেয়েছেন, তাইয়েফে পাথরের আঘাতে রক্তাত্ব হয়েছেন, বহু সাহাবী শহিদও হয়েছেন। অথচ বাংলাদেশে বহু আলেম অর্থ না দিলে জ্ঞান-বিতরণে মুখই খুলেন না। বুদ্ধিবৃত্তির এ ময়দানটিতে প্রবল ভাবে কাজ করছে ইসলামের বিপক্ষ শক্তি। তাদের কারণেই বার বার নির্বাচনী বিজয় ঘরে তুলছে দেশের সেকুলার রাজনৈতিক দলগুলি। এবং সে বিজয়ের ফলেই অসম্ভব হচ্ছে ইসলামের বিজয়। নির্বাচনে যেটির প্রতিফলন ঘটে, সেটি তো জনগণের চলমান চেতনা বা বিশ্বাসের প্রতিফলন। যে দেশের মানুষ কোরআন বুঝার সুযোগই পেল না, জানতে পারলো না ইসলামের সামাজিক, রাজনৈতিক বা মানবিক কল্যাণের দিক, -তারা ইসলামের পক্ষে ভোট দিবে সেটি কি আশা করা যায়? গণতন্ত্রে নিয়ম হল, নির্বাচনে জিততে হলে বিজয় আনতে হবে ভোটগ্রহণের আগেই। সে বিজয়টি আনতে হয় মানুষের চেতনা-রাজ্যে ও রাজপথে। আর সে জন্য ব্যাপক ভাবে জিততে হয় বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানে। ইসলাম-বিরোধী সেকুলার পক্ষটি সে বিজয় এনেছে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার বহু আগেই। ১৯৪৭ সালে তাদের ঘটেছিল সর্বপ্রথম ও সর্বশেষ পরাজয়। এর পর তারা শুধু জিতেই চলেছে। ১৯৭০ য়ের নির্বাচনে ভোট গ্রহণের বহু আগেই তারা রাজপথ দখলে নিয়েছিল। তারা পাকিস্তানপন্থি ও ইসলামপন্থিগণকে হটিয়ে দিয়েছিল মিডিয়া ও রাজপথ থেকে। বুদ্ধিবৃদ্ধির ময়দানে এবং সে সাথে রাজপথে এমন একটি বিপ্লব আনার আগে নির্বাচনে যাওয়ার অর্থ নিজেদের শ্রম, অর্থ, সময় ও মেধার অপচয়। এমন প্রকান্ড অপচয়ে একটি আন্দোলনের শুধু দুর্বলতাই প্রকাশ পায় না, ক্ষতির অংকটিও বাড়ে। আর বাংলাদেশের ইসলামপন্থিদের সাথে সেটিই হচ্ছে।

সমাজ-বিপ্লবের এ সহজ বিষয়টি মার্কসবাদীরা বুঝেছিল। তাই রাশিয়া, চীন, ধরেছিল সমাজ কিউবার ন্যায় কোন দেশেই তারা নির্বাচনের রাস্তা ধরেনি। বরং বিপ্লবের ধারা। এ সত্যটি বুঝেছিল ইরানের ইমাম খোমিনী ও তাঁর অনুসারিরাও। যে কোন সমাজ-বিপ্লবের ন্যায় ইসলামি সমাজ বিপ্লবেরও মূল হাতিয়ার যে জ্ঞান-সম্পদ বা বুদ্ধিবৃত্তি সেটি নবীজী (সাঃ) নিজ হাতে শিথিয়ে গেছেন। নবীজী (সাঃ) তার নবুয়ত জীবনের প্রথম ১৩টি বছর ধরে মক্কায় শুধু একাজটিই করেছেন। এ সময় তিনি কোন রাজনৈতিক সংঘাত বা প্রতিযোগিতায় অংশ নেননি। নীরবে নির্যাতন সয়েছেন, এবং সে সাথে অবিরাম জ্ঞান বিতরণের কাজ করেছেন। আর সে জ্ঞানের আলোকে ঈমানদারদের চরিত্র গড়েছেন। মক্কী জীবনে সে ১৩ বছরে তিনি দেড় শতের বেশী মানুষের বেশী তৈরী করতে পারেননি। কিন্তু তারাই ছিলেন ভবিষ্যৎ মুসলিম উম্মাহর মূল ইঞ্জিন, ছিলেন সমগ্র মানজ জাতির ইতিহাসে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মানুষ। আগুণের উপর শুইয়ে দিয়েও কাফেরগণ তাদের ঈমান বিন্দুমাত্র টলাতে পারেনি। অতি মুষ্টিমেয় হয়েও নিছক গুণের কারণেই তারা জন্ম দিয়েছিলেন ইতিহাসের সর্ব-কালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার। বিশ্বের ১৫০ কোটি মুসলমানের কাছে আজও এটিই শ্রেষ্ঠ গর্বের। ফেরেশতাদের চেয়েও তারা শ্রেষ্ঠতর পর্যায়ে পৌঁছেছিলেন। আর তার কারণ ছিল কোরআনী জ্ঞান। জ্ঞানচর্চার কারণে মক্কার সে দরিদ্র মানুষদের প্রত্যেকে পরিণত হযেছিলেন জগত বিখ্যাত আলেমে। অথচ আজ বাংলাদেশের শত শত মাদ্রাসায় আজীবন জ্ঞানচর্চার পরও সে মাপের কোন জ্ঞানী ব্যক্তি গড়ে উঠছে না। কারণ এসব মাদ্রাসাগুলোতে ফিকাহ, হাদীস বা বিভিন্ন মাজহাবী কিতাব গুরুত্ব পেলেও গুরুত্ব পায়নি কোরআন চর্চা। কোরআন হল চিকিৎসা বিজ্ঞানের কিতাবের ন্যায় আমল-ভিত্তিক কিতাব। রোগ চিকিৎসায় হাসপাতালে না বসে শুধু বই পড়ে ডাক্তারি শেখা যায় না। তেমনি নেক আমল ও জ্বিহাদে না নেমে কোরআন শিক্ষাও হয় না। তাই কোরআন চর্চা নিছক মাদ্রাসায় বসে হয় না। এজন্য রাজনীতি, সমাজনীতি, মিডিয়া, ব্যাবসা-বাণিজ্যসহ জ্বিহাদেও নামতে হবে। অথচ বাংলাদেশে আলেমদের দ্বারা সেটি হচ্ছে না। আরো সমস্যা হল, বাংলাদেশের ইসলামপন্থিদের মাঝে সে ব্যর্থতা নিয়ে উপলদ্ধিও নেই। ফলে বার বার ব্যর্থ হলেও নির্বাচনের পথ ছাড়তে তারা রাজী নয়। অর্ধ বা অল্প শিক্ষিত আলেম বা দলীয় ক্যাডারদের দিয়ে লাঠিয়ালের কাজ চলে, কিন্তু তা দিয়ে কি সমাজ-বিপ্লব হয়? অথচ তাদের অধিক মনযোগ মূলতঃ তাদের সংখ্যা বাড়ানো নিয়ে। প্রায় বছর চার-পাঁচ আগে একটি গবেষণা চালানো হয়েছিল বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ইসলামি ছাত্র-সংগঠনটির সদস্যদের উপর। সে গবেষণায় প্রকাশ পায়, এ সংগঠনের সদস্যরা প্রতি-বছর মাত্র দেড়খানা ইসলামি বই পড়েন। কথা হল, এত স্বল্প লেখাপড়া নিয়ে কি কোন সমাজবিপ্লবের জন্ম দেওয়া যায়? গড়ে তোলা যায় কি বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ?

বাংলাদেশের ইসলামি সংগঠনগুলোর মূল ব্যস্ততা কর্মীদের আনুগত্য বাড়াতে। সে সাথে তাদের উপর আরেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রূপে চেপেছে অর্থসংগ্রহের বিষয়টি। দলীয় কর্মীদের গুণাগুণ যাচায়ে আনুগত্য, ভোটজোগার ও অর্থসংগ্রহের সামর্থ যতটা গুরুত্ব পেয়েছে ততটা জ্ঞানার্জন পায়নি। ফলে দিন দিন বেড়ে উঠেছে বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানে ব্যাপক শূণ্যতা। ফলে দেশে ইসলামী পক্ষ থেকে পত্র-পত্রিকায় বের হলেও তাতে ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে লেখার লোক নেই। তাদের পত্রিকায় লিখছে চিহ্নিত সেকুলারগণ। একই অবস্থা হয়েছিল ১৯৪৭-পরবর্তী মুসলিম লীগের। তারাও পত্রিকা বের করতো, কিন্তু সেগুলি দখলে নিত বামপন্থি সেকুলার লেখকেরা। ১৯৪৭ সালের পূর্বে ভারতীয় উপমহাদেশে এক ঝাঁক শক্তিশালী ইসলামি চেতনা সমৃদ্ধ লেখকের জন্ম হয়েছিল। আল্লামা ইকবাল, মাওলানা হালী, মাওলানা মোহম্মদ আলী, শিবলী নোমানী, আবুল কালাম আযাদ ছিলেন তাদের কয়েকজন। তাদের প্রচেষ্টায় প্যান-ইসলামী চেতনার প্রবল জোয়ার শুরু হয়েছিল সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে। কিন্তু সেটি ১৯৪৭-পরবর্তী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে দ্রুত ভাটার টানে হারিয়ে যায়। ফলে একাত্তরে ভেঙ্গে যায় পাকিস্তান। দেহের পুষ্টির জন্য নিয়মিত খাদ্যগ্রহণ যেমন জরুরী, বুদ্ধিবৃত্তিক সুস্থ্যতা টিকিয়ে রাখার জন্য তেমনি অপরিহার্য হলো অবিরাম জ্ঞানচর্চা। একাজ এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে হাদীসে বলা হয়েছে, সারা রাতের নফল ইবাদতের চেয়ে সামান্য ক্ষণের জ্ঞান-চর্চাও শ্রেষ্ঠতর। অথচ সে জ্ঞানচর্চা বাংলাদেশে মাদ্রাসাগুলোতে যেমন হয়নি,  হয়নি ইসলামি সংগঠনের দলীয় নেতা-কর্মীদের মাঝেও।

 

যে বাধা তাবলিগ জামায়াতের পক্ষ থেকে

রাজনীতির বাইরে বাংলাদেশে বিশাল জনশক্তি রয়েছে তাবলিগ জামায়াতের। অথচ তারা জ্ঞানচর্চার যে রেওয়াজ চালু করেছেন সেটি ইসলামের বিজয়ের পথে ভয়ানক বাঁধা। তারা যতটা ফাজায়েলে আমল পড়তে ব্যস্ত ততটা ব্যস্ত নয় কোরআন বুঝতে। মসজিদে মসজিদে তারা যে অসংখ্য তা’লীমী মজজিস করে সেখানেও কোরআনের আয়াত পড়ে শুনানো হয় না। বড় জোর কিছু হাদীস পাঠ করে শুনানো হয়। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে পাঠ করা হয় ফাজায়েলে আমল। বক্তারা দাড়িয়ে যে ওয়াজ করেন তাতেও শুনানো হয় না কোরআনের আয়াত। অথচ, নবীজী (সাঃ)-র সূন্নত হল তিনি তাঁর বক্তৃতায় বেশীর ভাগ জুড়ে কোরআনের আয়াত শুনাতেন। নিজের কথা সামান্যই বলতেন। কারণ, মহান আল্লাহর চেয়ে আর কে তাঁর দ্বীনকে উত্তম ভাবে বুঝাতে পারেন? ফলে নবীজী (সাঃ)র জুম্মার দুটি খোতবায় প্রায় সবটুকু জুড়ে থাকতো পবিত্র কোরআনের আয়াত। অপরদিকে তাবলিগ দাওয়াত দেয় নিছক নামাযের দিকে। অথচ আল্লাহর নবী (সাঃ) ডেকেছেন পরিপূণ ইসলামের দিকে। সেখানে যেমন নামায-রোযা ছিল, তেমনি জ্ঞানচর্চা, সমাজসেবা, হিযরত এবং জ্বিহাদও ছিল। অথচ তাবলিগ জামায়াতের নেতা-কর্মীদের শেষাক্তগুলীতে কোন মনযোগই নাই। ফলে তাদের জনশক্তি বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু ইসলামের বিজয়ের সম্ভাবনা বাড়ছে না। বরং ইজতেমায় যতই তাদের লোক সমাগম বাড়ছে, দেশজুড়ে ততই বাড়ছে দূর্নীতি। অথচ নবীজীর আমলে ঘটেছিল তার উল্টোটি। তাই প্রশ্ন, তাদের জনশক্তি বাড়াতে ইসলাম ও মুসলমানের কল্যাণ টি কোথায়? বরং  টঙ্গিতে যে বিশ বা তিরিশ লাখ মানুষ ইজতেমায় প্রতিবছর যোগ দেয় তারা যদি ঢাকার রাজপথে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠার দাবী নিয়ে তিন-চার দিনের অবস্থান ধর্মঘট করতো তবে বাংলাদেশের রাজনীতির চেহারাই পাল্টে যেত। বিশাল জনতার রাজপথের অবস্থান নিলে সেটি যে কতবড় শক্তিশালী শক্তিতে পরিণত হয় তারই সাম্প্রতিক উদাহরণ হলো থাইল্যান্ড। সেদেশের মানুষের বিপুল ভোটে নির্বাচিত সরকারকে তারা কয়েক সপ্তাহে হটিয়ে ছেড়েছে। অতীতে সে শক্তি দেখা গেছে ইরান, পোলান্ড, রোমানিয়া, ইউক্রেন, জর্জিয়ায়। সরকার হটাতে সে সব দেশের জনগণকে অস্ত্র হাতে নিতে হয়নি। লাখে লাখে রাজপথে নেমে আসাতেই  সেটি শান্তিপূর্ণ ভাবে সাধিত হয়েছে। ইসলাম তো সেটি চায় যে, প্রতিটি ঈমানদার রাজনীতির দর্শক না হয়ে রাজপথে নেমে  আসুক। শুধু ভোটদাতা নয়, প্রতিটি ব্যক্তি রাজনৈতিক বিপ্লবের অতন্দ্র সৈনিকে পরিণত হোক। এবং সে বিপ্লব হোক আল্লাহর দ্বীনের বিজয়ে। নবীজী (সাঃ)র সাহাবীদের মাঝে কেউ কি রাজনীতির নীরব দর্শক ছিলেন? কিছু অন্ধ, বধিক ও পঙ্গু ছাড়া সবাই তো হাজির হয়েছিলেন জ্বিহাদের ময়দানে। আর না যাওয়াটি চিহ্নিত হত মোনাফেকি রূপে।

 

একতা অপরিহার্য 

ইসলামের বিজয়ের লক্ষ্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ হলো, মুসলিমদের একতা। একতা ছাড়া কোন আদর্শের বা দলেরই বিজয় আসে না। একতা ছাড়া জুটে না মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্য। কথা হলো একতার প্রতিষ্ঠা কি করে সম্ভব? সেটি সম্ভব নিয়তের পরিশুদ্ধির মধ্য দিয়ে। নিয়ত যদি হয় একমাত্র আল্লাহর দ্বীনের বিজয়, তখন আর একতার পথে বাধা থাকে না। একই গন্তব্যস্থলের দিকে সবাই হাটা শুরু করলে পথটিও তখন অভিন্ন হয়। ভিন্নতা তো আসে তখন, যখন উদ্দেশ্য বা লক্ষ্যটি আলাদা আলাদা। একসাথে বহু হাজার নবী প্রেরীত হলেও তাদের মাঝে কোন বিরোধ হত না। কোন দলের সদস্যপদ দিয়ে তাদের বাধার প্রয়োজন হত না। কারণ তাঁরা তো কাজ করতেন এক অভিন্ন লক্ষ্যে। সেটি একমাত্র আল্লাহকে খুশি করতে, এবং তারই দ্বীনের বিজয়ে। সে লক্ষ্যে তাঁরা তো অপর মুসলিম ভাইয়ের সাথে একতা গড়াকে ফরজ ইবাদত মনে করতেন। একই পরিবারের ভাই-বোনদের বাঁধতে কি বিশেষ কোন সংগঠনের সদস্য করার প্রয়োজন পড়ে? আল্লাহপাক এক মুসলিমকে অন্য মুসলিমের ভাই বলেছেন। নিজের সে ভাইটি যদি ভিন্ন ঘর, ভিন্ন দল, ভিন্ন দেশ বা ভিন্ন মহাদেশে বাস করে তবুও তার সাথে মিলিত হওয়ার আগ্রহটি হতে হবে অতি প্রবল। আর সে প্রবল আগ্রহটিই হলো তার ঈমান যাচায়ের মাপকাঠি যা নির্ভূল ভাবে বলে দেয় তার ঈমানের গভীরতা। যে ব্যক্তির মধ্যে অন্য শহর, অন্য ভাষা, অন্য দল, অন্য দেশ ও অন্য মাজহাবের মুসলিম ভাইয়ের প্রতি প্রবল ভালবাসা নাই, বুঝতে হবে তার মধ্যে ঈমানের গভীরতাও নাই। ভাইয়ের সাথে ভাইয়ের বন্ধনটি মজবুত করতে কি কোন দলীয় সদস্যপদের প্রয়োজন পড়ে? মুসলমানের ফরয এবাদত তো মুসলমানদের একতাবদ্ধ করা, দল গড়া নয়। ফিরকা গড়াও নয়। দল গড়া যেতে পারে শুধু সে ঐক্যকে শক্তিশালী করার স্বার্থে। কিন্তু দল যখন দলাদলি ও বিভক্তির মাধ্যমে পরিণত হয় তখন সেটি ফিতনায় পরিনত হয়। অথচ মুসলিম বিশ্বে আজ সেটিই হচ্ছে। ফলে দলের সংখ্যা বাড়লেও ঐক্য বাড়েনি। নবীজী (সাঃ)-এর আমলে মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করার জন্য কোন দল ও দলের সদস্য-পদের প্রয়জন পড়েনি। অথচ এরপরও তারা জন্ম দিতে পেরেছিলেন সীসা ঢালা প্রাচীরের ন্যায় মজবুত একতা গড়তে। ইমাম খোমিনী দল ছাড়াই বিরাট বিপ্লব করেছেন। আর বাংলাদেশের ইসলামপন্থিরা দলের পর দল গড়ছে, কিন্তু বহুদূর ছিটকে পড়ছে ইসলামের বিজয় অর্জনের মূল লক্ষ্য থেকে।

বাংলাদেশের মুসলিমদের অনৈক্যের মূল কারণ, মাজহাব, ফিরকা ও দলগত বিভক্তি। বিভক্ত এ মুসলিমগণ চায় নিজ দল, নিজ ফিরকা, নিজ মাজহাবের বিজয়। ফলে আল্লাহর আইন আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হলেও তা নিয়ে তাদের মাথা ব্যথা নেই। মাদ্রাসার শিক্ষকদের বেতনে হাত পড়লে হাজার হাজার মাদ্রাসা শিক্ষক ঢাকার রাস্তা গরম করে তোলেন। অথচ আল্লাহর আইন অপসারিত হলেও তা নিয়ে তাদের সামান্যতম ভ্রুক্ষেপ নেই। সংসদে বসেও ইসলামি দলের এমপিগণ দাবী তোলে না আল্লাহর আইনের প্রতিষ্ঠা নিয়ে। খেলার মাঠে বা খাওয়ার মজলিসে নানা মাজহাব, নানা দল ও নানা ফিরকার মুসলমান একত্রে বসতে পারলেও তারা একত্রে বসতে পারে না বা কাজ করতে পারে না আল্লাহর দ্বীনের বিজয় নিয়ে। মুসলমানদের জন্য এ এক ভয়ংকর ব্যর্থতা। আর এ ব্যর্থতা তাদের ব্যর্থতা বাড়াবে আখেরাতেও। কারণ, রোজ হাশরের বিচার দিনে এ প্রশ্ন তো উঠবেই, আল্লাহর দ্বীনের বিজয়ে বা উম্মাহর একতার প্রতিষ্ঠায় কতটুকু ছিল তার নিজস্ব প্রচেষ্টা বা কোরবানী? মহান আল্লাহর দরবারে সেদিন তার সাথে কোন দলীয় বা মাজহাবী নেতা খাড়া হবে না, থাড়া হতে হবে তাকে একাকীভাবেই। সেদিন মহান আল্লাহতায়ালা তার উপরই বেশী খুশী হবেন যিনি একমাত্র তারই বিধানকে বিজয়ী করতে সর্বোচ্চ কোরবানী পেশ করেছেন। কতটুকু চেষ্টা করেছেন মুসলিম উম্মাহকে একতাবদ্ধ করতে। আল্লাহতায়ালার কাছে অতি অপছন্দের হলো, তাঁর নিজ বাহিনীতে বিভক্তি। এমন বিভক্তি নিয়ে শুধু পতনই সম্ভব, বিজয় নয়। ইতিহাস তার সাক্ষী। তাই বাংলাদেশে ইসলামের বিজয় আনতে হলে দলগত, ফিরকাগত বা মাজহাবগত বিভক্তির প্রাচীরকে ভাঙ্গতেই হবে। আঁকড়ে ধরতে হবে একমাত্র কোরআনকে। মহান আল্লাহপাক সেটিই বলেছেন পবিত্র কোরআনে, “এবং তোমরা সকলে মিলে আঁকড়ে ধর কোরআনকে, এবং বিভক্ত হয়ো না।”-সুরা আল-ইমরান। একতা স্থাপনের এটিই আল্লাহর নির্দেশিত প্রেসক্রিপশন।

মুসলিম সমাজের বর্তমান বিভক্তি দেখে এ কথাটি নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়, মুসলমানেরা আল্লাহর সে প্রেসক্রিপশনের সাথে যথাযথ আচরণ করেনি। বরং সেটির সাথে হয়েছে প্রচণ্ড গাদ্দারি। কোর’আনকে আঁকড়ে ধরার অর্থ এ পবিত্র কিতাবকে ধরে বার বার চুমু খাওয়া নয়, বরং তা থেকে জ্ঞান লাভ ও সে জ্ঞানের পূর্ণ প্রয়োগ। অথচ মুসলমানদের পক্ষ থেকে অতি অবহেলা হয়েছে উভয় ক্ষেত্রেই। না হয়েছে কোরআন থেকে যথাযথ জ্ঞান-লাভ, না হয়েছে কোরআনী হুকুমের প্রয়োগ। ফলে সাফল্য ও বিজয় না বেড়ে বেড়েছে পরাজয় ও অপমান। অথচ কোরআনই হল সমগ্র মানবজাতির জন্য মহান আল্লাহতায়ালার শ্রেষ্ঠ নিয়ামত, – স্বর্ণ, তেল, গ্যাস বা অন্য কোন সম্পদ নয়। একমাত্র এ নিয়ামতটি পৌঁছাতেই মহান আল্লাহতায়ালা ২৩ বছর ধরে এ পৃথিবীপৃষ্ঠে তাঁর মহান ফিরেশতা জিবরাইল (আঃ)কে পাঠিয়েছেন, অন্য কোন সম্পদ পৌঁছাতে নয়। এ দানের বরকতেই আরবের নিঃস্ব ও বর্বর মানুষেরা শ্রেষ্ঠ মানুষে পরিণত হতে পেরেছিলেন। পেয়েছিলেন বিজেয়ের পর বিজয়ের সম্মান। কোরআনের সে ক্ষমতা আজও বর্তমান। সে কোরআনি শক্তির বিস্ফোরণ ঘটতে পারে যে কোন মুসলিম দেশের ন্যায় বাংলাদেশেও। আর তখন বাংলাদেশের মানুষও পেতে পারে অভূতপূর্ব বিজয় ও ইজ্জত। একমাত্র এ পথেই বিলুপ্ত হতে পারে দূর্নীতিগ্রস্ত দেশ হওয়ার অপমান। তবে সে জন্য দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসতে হবে খোদ বাংলাদেশের মুসলিমদের। কারণ, মহান আল্লাহর এ ভূমিতে এ দায়ভার একমাত্র তাদেরই। একাজে প্রত্যেকেই তাঁর খলিফা। এবং খেলাফতের সে গুরু দায়িত্বটি পালিত হতে পারে কোরআনী প্রেসক্রিপশনের পূর্ণ অনুসরণের মধ্য দিয়ে। ইসলামকে বিজয়ী করার এছাড়া কি ভিন্ন পথ থাকতে পারে? ১১/০১/০৯, সংক্ষিপ্ত সংযোজন ৬/৩/২০১৯।  

 

 




বাংলাদেশে পরাজিত ইসলাম প্রসঙ্গ

কলংক গাদ্দারির

মুসলিম দেশে ইসলাম বিজয়ী হবে এবং মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া শরিয়তি আইন প্রতিষ্ঠা পাবে -সেটিই তো স্বাভাবিক। যেমনটি হয়েছিল নবীজী (সাঃ) এবং তাঁর সাহাবায়ে কেরামের আমলে। এটিই তো সিরাতুল মুস্তাকীমের পথ। এটি না হলে প্রচণ্ড গাদ্দারি হয় মহান আল্লাহতায়ালা ও তার দ্বীন ইসলামের সাথে। তখন আসে সুস্পষ্ট পথভ্রষ্টতা -যা জাহান্নামে নিয়ে পৌঁছায়। অথচ অতি অপ্রিয় সত্য কথাটি হলো, বাংলাদেশে সে গাদ্দারিটাই হচ্ছে অতি প্রকট ভাবে। পরিতাপের বিষয় হলো, সে গাদ্দারি নিয়ে দেশের মোল্লামৌলবীগণও নীরব। যেন কিছুই হয়নি। এমন পথভ্রষ্টতার নেত্রীকে তারা কওমীদের জননীও বলছে। প্রশ্ন হলো, নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত ও তাসবিহ-তাহলিল করে কি এমন গাদ্দারির পাপ মোচন হয়? এমন গাদ্দারি যে ভয়ানক আযাব ও অপমান নিয়ে আসবে -সেটিই তো স্বাভাবিক। বাংলাদেশে সে অপমান কি কম জুটেছে? বিশ্বের প্রায় দু’শতটি দেশের মাঝে দুর্নীতিতে ৫ বার প্রথম হওয়ার খেতাবটি কি কম অপমানের? এটি ভরা বাজারে পকেট মার রূপে ধরা পড়ার মত। এতবড় অপমান নিয়ে তো বাংলাদেশীদের বোধোদয় হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু সেটি হয়নি। সে অপমান নিয়ে বাংলাদেশে কারো মাথা হেট হয়নি; কোন মাতমও হয়নি। ভাবটা এমন যেন কিছুই হয়নি। মানুষ ঈমানশূণ্য হলে লজ্জাশূণ্যও হয়। এজন্যই নবীজী লজ্জাকে ঈমানের অর্ধেক বলেছেন। ঈমানশূণ্যদের কাছে মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর দ্বীনের পরাজয় যেমন মাতম সৃষ্টি করে না, তেমন বিশ্বজোড়া অপমানেও তাদের মাতা হেট হয় না।

বাংলাদেশে ইসলামের পরাজয়টি নতুন নয়, সেটি ঔপনিবেশিক ইংরেজদের শাসনামল থেকেই। আইন-আদালত, শিক্ষা-সংস্কৃতি, অর্থনীতি, প্রশাসন থেকে আল্লাহর আইন নির্মূল হয়েছে সে আমলেই। তখন থেকেই দেশে ব্যাভিচার শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়। সূদও হারাম নয়। নাচ-গান, বিনোদন, সিনেমা-নাটকের নামে অশ্লিলতাও নিষিদ্ধ নয়। এজন্যই মুসলিম জীবনে ভয়ানক বিপদটি আসে কাফেরদের হাতে অধিকৃত হওয়াতে। তখন সে অধিকৃত দেশে স্বপ্নপূরণ হয় কাফেরদের। অথচ ঈমানদার মুসলিমদের বাঁচতে হয় ভিন্নতর স্বপ্ন ও ভিন্নতর জীবনবোধ নিয়ে। সেটি যেমন অন্যায় ও দুবৃত্তির নির্মূল, তেমনি ইসলামের পূর্ণ প্রতিষ্ঠা। এখানে ঈমানদারের আপোষ চলে না। দেশের রাজনীতি, সমাজনীতি ও অর্থনীতির বহু বিষয় নিয়েই ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের মাঝে পরস্পরে মতভেদ থাকতে পারে। কিন্তু যা নিয়ে সামান্যতম বিরোধ থাকতে পারে না সেটি হলো ইসলামের বিজয় নিয়ে। কারণ,সেটি তো মহান আল্লাহতায়ালার এজেন্ডা। মুসলিম হওয়ার অর্থই হলো, সে এজেন্ডার সাথে পুরাপুরি একাত্ম হওয়া। ইসলামকে পরাজিত দেখার মধ্যে আনন্দ থাকতে পারে একমাত্র কাফের ও মুনাফিকদের। কোন মুসলিমের নয়।

কে মুসলমান আর কে কাফের -সে বিচারটি কখনোই ব্যক্তির নাম বা পোষাক-পরিচ্ছদ দেখে হয় না। মুখে কে কি বললো -তা থেকেও নয়। বরং সে বিচার হয়, যেটি সে অন্তর থেকে চাইলো বা বাস্তবে করলো -তা থেকে। আর মহান আল্লাহতায়ালা তো মানুষের মনের ভাষা বুঝেন এবং কর্মও দেখেন। মুসলিম জীবনে প্রধানতম ভাবনা ও অঙ্গিকার হল, আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করার ভাবনা। তার চেতনায় সবসময় কাজ করে, সে বিজয়ের লক্ষ্যে তাঁর সমগ্র সামর্থ্যের যথার্থ বিণিয়োগে নিয়ে। কারণ মুসলমান হওয়ার অর্থ, রাজনীতির ময়দানে দর্শক হওয়া নয়, বরং সক্রিয় মোজাহিদে পরিনত হওয়া। একাজে আত্মনিয়োগ ছাড়া কোন ব্যক্তি কি তার মহান আল্লাহকে খুশি করতে পারে? ইসলামে নীরব বা নিষ্ক্রিয় মুসলিম বলে কেউ নেই। তাই নবীজী (সাঃ)র এমন কোন সাহাবা ছিল না যিনি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বের রণাঙ্গণে যাননি।

ঈমানের প্রকাশ নিয়তে

নামায-রোযা বা দান-খায়রাতে অবশ্যই নিয়ত বাঁধতে হয়। তেমনি নিয়ত বা লক্ষ্য নিদ্ধারণ করতে হয় বাঁচা-মরা ও জীবন ধারনের ক্ষেত্রেও। ইবাদতের নিয়ত না থাকলে কোন ইবাদতই যেমন ইবাদত হয় না, তেমনি উচ্চতর নিয়ত না থাকলে বাঁচাটিও পশুদের বাঁচা থেকে ভিন্নতর হয়না। বোখারী শরিফের প্রথম হাদীসটি হলো, “সকল কাজের মর্যাদা বা মূল্যমান নির্ধারিত হবে তার নিয়ত থেকে।” তা্‌ই মানবের মূল্যমান ও মর্যাদাও নির্ধারিত হয় তার বাঁচবার নিয়ত থেকে। একজন কাফের থেকে একজন মুসলিমের মূল পার্থক্য তো এই নিয়তে। যে নিয়ত নিয়ে একজন কাফের বাঁচে, যুদ্ধ করে বা প্রাণ দেয়, সে নিয়ত নিয় মুসলিম কখনো বাঁচে না, যুদ্ধ করে না এবং প্রাণও দেয়না। মানুষের বাঁচা-মরার সে নিয়ত শেখাতেই পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা আয়াত নাযিল করেছেন এবং বলেছেনঃ “বলুন (হে মহম্মদ)! আমার নামায, আমার কোরবানী এবং আমার জীবন-ধারণ ও মরণ –সব কিছুই সেই বিশ্ব-প্রতিপালক মহান আল্লাহর জন্য।”–(সুরা আল-আনয়াম, আয়াত ১৬২।

উপরুক্ত আয়াত একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়াত। যে ব্যক্তি  এ আয়াত থেকে নির্দেশনা ন্যায় সে কখনোই ভাষা, বর্ণ, শ্রেণী বা ভূগোলের গৌরব বাড়াতে যুদ্ধ করে না। প্রাণও দেয় না। সেটি আল্লাহতায়ালাপ্রদত্ত আমানতের খেয়ানত।  ফলে সে খেয়ানতের শাস্তি জাহান্নাম। তাই কোন ঈমানদার কাফের দেশে গিয়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে প্রশিক্ষণ নেয় না। তাদের অর্থ ও অস্ত্র নিয়ে কখনো যুদ্ধও করে না। এজন্য কোন আলেম ১৯১৭ সালে ব্রিটিশ কাফেরদের অস্ত্র নিয়ে ওসমানিয়া খেলাফত ভাঙ্গতে যুদ্ধ যুদ্ধ করেনি। তেমনি ১৯৭১য়েও কোন আলেম, মাদ্রাসার কোন ছাত্র এবং কোন ইসলামী দলের কর্মী ভারতে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে তাদের সহচর রূপে যুদ্ধে নামেনি। সেটিকে তারা হারামা গণ্য করেছে।

এ পৃথিবী মানব কেন বাঁচবে, কেনই বা লড়বে, কেনই বা প্রাণ দিবে –এ প্রশ্নগুলি অতি গুরুত্বপূর্ণ। বরং বলা যায় জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো এগুলি। কোন ব্যক্তির পক্ষে তার সীমিত কান্ড-জ্ঞান নিয়ে এসব প্রশ্নের সঠিক উত্তর বের করা কঠিন। ফলে মানব জীবনে সবচেয়ে বড় ভূল হয় এ ক্ষেত্রটিতে। এবং সে ভূলে ব্যর্থ হয়ে যায় সমগ্র জীবনের বাঁচাটাই। মানুষ তখন প্রান দেয় ফিরাউন, হিটলার ও চেঙ্গিজদের বিজয়ী করতে। অথবা কোন সাম্রাজ্যবাদী, জাতীয়তাবাদী ও বর্ণবাদী যুদ্ধে। এমন ব্যক্তিদের পরিচয় যাই হোক, তাদের বাঁচা-মরাটি পশুদের চেয়েও নিকৃষ্টতর হয়। কারণ পশু নিজে শিকার ধরে নিজের প্রাণ বাঁচানোর জন্য। কিন্তু  সে কখনো অন্যের হাতে গণহত্যা, জুলুম-নির্যাতন বা দেশ-দখলের হাতিয়ারে পরিণত হয় না। আল্লাহতায়ালা এমন মানুষদের উদ্দেশ্যেই বলেছেন, “উলায়িকা কা আল-আনয়াম, বাল হুম আদাল।” অর্থঃ এরাই হল তারা যারা গবাদী পশুর ন্যায়, বরং তার চেয়েও নিকৃষ্ট। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশগণ তো তাদের সেনা বাহিনী পূর্ণ করেছে এসব মানবরূপী পশুদের দিয়েই। মানুষ তাদের বাহিনীতে ভাড়ায় খেটেছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে দুই লাখের বেশী ভারতীয় মুসলিম এবং প্রায় দশ লাখ আরব মুসলিম যুদ্ধ করেছিল পবিত্র জেরুজালেমসহ মুসলিম ভূমির দখলদারি ঔপনিবেশিক কাফেরদের হাতে দেয়ার জন্য। আজও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিশ্বজুড়ে আধিপত্য জমিয়েছে এসব পশুবৎ মানুষদের সাহায্য নিয়ে। এদের কারণেই মুসলিম দেশগুলিতে তারা সরকারের ভিতরে ও বাইরে বিপুল সংখ্যক কলাবোরেটর পাচ্ছে্। তাই মহান আল্লাহতায়ালাকে মানব জীবনের এ অতি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রটিতেও পথ নির্দেশনা দিতে হয়েছে। জীবনে বাঁচার নিয়তটি কি হওয়া উচিত –উপরুক্ত আয়াতে সেটি তিনি অতি স্পষ্টতর করেছেন। ফলে প্রতিটি ঈমানদারের উপর ফরজ হলো, আল্লাহর পক্ষ থেকে বেঁধে দেওয়া সে নিয়তটিকে নিজের নিয়েত রুপে গ্রহণ করা। অন্যথায় তার বাঁচাটি হবে ভ্রান্ত পথে বাঁচা, তথা জাহান্নামের পথে বাঁচা।

 

অর্জিত পরাজয়

প্রকৃত ঈমানদার তাই নিছক বাঁচার জন্য বাঁচে না। সে বাঁচে আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত লক্ষ্যটি পূরণ করার লক্ষ্যে। নিছক আহারের সন্ধান, ঘরবাধা বা বংশ বিস্তারের লক্ষ্য তো পশুরও থাকে। এরূপ লক্ষ্যে জীবন-ধারণ তাকে পশু-পাখি ও পোকা-মাকড় থেকে ভিন্নতর করে না, শ্রেষ্ঠতরও করে না। কোন রাষ্ট্রেই সকল নাগরিকের সম-মর্যাদা থাকে না। মর্যাদা নির্ধারিত হয় নাগরিকদের কাজের মর্যাদা থেকে। যে ব্যক্তিটি তার জীবনের সকল সামর্থ্যয ব্যয় করে নিছক নিজের বেঁচে থাকা ও সুখ-সাচ্ছন্দের খাতিরে এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে যার কোন আগ্রহ বা সামর্থই অবশিষ্ঠ থাকে না -তাকে কি সে ব্যক্তির সম-মর্যাদা দেওয়া যায় যে তার সময় ও সামর্থ্য ব্যয় করে, এমনকি প্রাণও বিলিয়ে দেয় রাষ্ট্রের কল্যাণে? এ দুই ব্যক্তি কখনই কোন রাষ্ট্রে সম-মর্যাদা পায় না। ইসলামে শহিদের মর্যাদা এজন্যই অতুলনীয়। তারা তো জানমাল কোরবানী করে আল্লাহর দ্বীনের বিজয়ে। সে বিজয়ে শান্তি নেমে আসে সমাজ ও রাষ্ট্র জুড়ে। আল্লাহপাক তাদেরকে মৃত্যুর পরও জীবিত রাখেন এবং পুরস্কৃত করেন জন্নাত দিয়ে। আল্লাহপাক তো চান, তার প্রতিটি বান্দাহ সে মহান লক্ষ্য নিয়ে বাঁচুক, এবং অর্জন করুক সে মহান মর্যাদা। প্রতিটি সমাজ ও রাষ্ট্র জুড়ে প্রতিনিয়ত যা ঘটে তা হলো দুটি বিপরীত-মুখী জীবন লক্ষ্য নিয়ে বাঁচার যুদ্ধ। এর একটি মহান আল্লাহর লক্ষ্যে, অপরটি গায়রুল্লাহ তথা শয়তানের লক্ষ্যে। প্রথমটি মহা-সাফল্যের। এ পথ জান্নাতের। আর দ্বিতীয়টি চরম ব্যর্থতার -ব্যক্তিকে এটি জাহান্নামে পৌঁছে দেয়। তাই কোরআনে বলা হয়েছে, “যারা ঈমানদার তাঁরা লড়াই করে আল্লাহর লক্ষ্যে, আর যার কাফের তারা লড়াই করে শয়তানের লক্ষ্যে।”

উপরুক্ত আয়াতে মহান আল্লাহতায়ালা কে ঈমানদার আর কে কাফের সেটি সংজ্ঞায়ীত করেছেন। সে পরিচয়টি সুস্পষ্ট ভাবে প্রকাশ পায় যুদ্ধে। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশে নিজেদের ঈমানদার রূপে দাবী করে এমন মানুষের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার শতকরা প্রায় ৯০ ভাগ। প্রতিনিয়ত লড়াই লেগে আছে রাজনীতির অঙ্গণে। কিন্তু কোথায় আল্লাহর পথে সে লড়াই। কোন দেশে বিশাল মুসলিম জনবসতি ও বিপুল সংখ্যক মসজিদ-মাদ্রাসা দিয়ে সে দেশে ইসলামের প্রতিষ্ঠা বা বিজয় নির্ণীত হয়? নির্ণীত হয়, দেশের রাজনীতি, প্রশাসন, আইন-আদালত, অর্থনীতি ও শিক্ষা-সংস্কৃতিতে কোন নীতি অনুসৃত হয় -তা থেকে। যেহেতু বাংলাদেশের বুকে এর কোনটিতেই ইসলামের কোন স্থান নাই, দেশের আদালত দখলে নিয়েছে কুফরি আইন এবং ইসলাম বন্দী হয়ে আছে মসজিদ-মাদ্রাসার চার দেয়ালের মাঝে –ফলে মুসলিমের জনসংখ্যা যত বিশালই হোক তার উপর ভিত্তি করে বাংলাদেশকে ইসলামী বলা যাবে?  বরং দেশে বিজয় বেড়েছে অনৈসলামের। সে সাথে গুরুতর পাপের বিষয় হলো, বাংলাদেশে ইসলামের পরাজয় বেড়েছে কোন কাফের বাহিনীর যুদ্ধজয়ের কারণে নয়। বরং ইসলামের এ পরাজয় এসেছে তাদের হাতে যারা নিজেদেরকে মুসলিম রূপে পরিচয় দেয়। এখন তাদের কাজ হয়েছ. ইসলামের সে পরাজয়কে দীর্ঘায়ীত করা। একটি মুসলিম জনগোষ্ঠির জন্য এর চেয়ে বড় অপমান আর কি হতে পারে? পরিতাপের বিষয় হলো, সে অপমান নিয়েও দেশবাসীর মাঝে কোন ক্ষোভ নাই!  ৭.০৩.২০১৯




বাংলাদেশে গণহত্যা এবং যে দায়ভার ঈমানদারের

বধ্যভূমি বাংলাদেশ

হেফাজতে ইসলামের মুসল্লিদের রক্তের স্রোতে মতিঝিলের পিচঢালা কালো রাস্তা লালে লাল হয়েছে। ২০১৩ সালের ৫ই মে’র দিবাগত রাতে হেফাজতে ইসলামের লক্ষাধিক কর্মী যখন খোলা রাস্তায় বসে শান্তিপূর্ণ ভাবে ধর্না ছিল, কেউ বা জিকর করছিল, কেউ বা ঘুমিয়েছিল তখন রাত ২-৩০ মিনিটের দিকে হঠাৎ রাস্তায় বিদ্যুতের বাতি বন্ধ করে দেয়া হয়। সে ঘন আঁধারে বিজিবি, র‌্যাব ও পুলিশের হাজার হাজার সদস্য হায়েনার ন্যায় ঝাঁপিয়ে পড়ে হেফাজত কর্মীদের উপর। বৃষ্টির ন্যায় অবিরাম গুলি বর্ষণ ও গ্রেনেড নিক্ষেপে কেঁপে উঠে সমগ্র ঢাকা। যেন দেশের উপর শত্রু বাহিনীর সামরিক অভিযান চলছে। গুলির সাথে তাদেরকে লাঠি দিয়েও পেটানো হয়।“দৈনিক আমার দেশ” এর রিপোর্টঃ “রাত তখন প্রায় আড়াইটা।মতিঝিলের শাপলা চত্বরে আগত মুসল্লিদের অনেকেই ক্লান্ত শরীর নিয়ে তখন ঘুমিয়ে পড়েছেন।অসংখ্য মুসল্লি তখনও জিকিরে মশগুল। এ অবস্থায় মাইকে ভেসে আসে একটি ঘোষণা-আপনারা সরে যান।এখন আমরা শাপলা চত্বর খালি করার জন্য যা যা করা দরকার তাই করব। তাতে স্বভাবতই রাজি হয়নি আল্লাহর পথে নিবেদিতপ্রাণ মুসল্লিরা।এরপর আর কথা বাড়ায়নি সরকারের নিরাপত্তা বাহিনী।অন্তত ১০ হাজার পুলিশ,র‌্যাব,বিজিবি ও অন্যান্য সংস্থার সদস্যরা ত্রিমুখী হামলা শুরু করে।ব্রাশফায়ারের মুহুর্মুহু গুলি, গ্রেনেড,টিয়ারশেল আর সাউন্ড গ্রেনেড নিয়ে নিরস্ত্র মুসল্লিদের ওপর হামলা চালায় তারা।মুসল্লিদের দিকে গুলি আসতে থাকে বৃষ্টির মতো। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই শাপলা চত্বরে ঘটে ইতিহাসের বর্বরতম হত্যাযজ্ঞ।কেউ কেউ ঘুমের মধ্যেই চলে যান চিরঘুমের দেশে।অনেকে আবার কিছু বুঝে উঠার আগেই ঢলে পড়েন মৃত্যুর কোলে।-(আমার দেশ ৭/০৫/১৩)।

এমন নৃশংস বর্বরতা পাকিস্তানে আমলে ঘটেনি। ব্রিটিশ আমলেও ঘটেনি। কিন্তু ঘটলো বাংলাদেশ আমলে। মতিঝিল, দৈনিক বাংলার মোড়, ফকিরাপুর, ইত্তেফাক মোড়সহ আশেপাশের এলাকা হয়েছে রক্তে প্লাবিত। কতজন শহীদ হয়েছে সে সঠিক হিসাব এখনও পাওয়া যায়নি। যখন সে হত্যাকান্ড ঘটে সেখানে কোন সাংবাদিককে থাকতে দেয়া হয়নি। বলা হচ্ছে, সকাল হওয়ার আগেই রাতের আঁধারে সরকার অসংখ্য লাশ গোপন করেছে। বিভিন্ন সামাজিক গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে গতকাল এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশন জানায়,নিহতের সংখ্যা আড়াই হাজারের বেশি হতে পারে।হেফাজতের ইসলামের হিসাবে নিহতের সংখ্যা দুই হাজারের বেশি হবে।বিরোধী দল বিএনপি বলছে,শাপলা চত্বরে সহস্রাধিক লোককে হত্যা করেছে নিরাপত্তা বাহিনী।এ গণহত্যা ১৯৭১ এর ২৫ মার্চের কালোরাতের চেয়ে ভয়াবহ ও জঘন্য বলে মন্তব্য দলটির। বাংলাদেশের একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের একজন রিপোর্টার দাবি করেছেন, তিনি পাঁচটি ট্রাকে করে লাশ নিতে দেখেছেন। লাইভ রিপোর্টিংয়ের তার সেই তথ্য প্রচার করা হলেও পরে আর সেই খবর প্রচার করেনি চ্যানেলটি।অভিযান শুরু করে পুলিশ র‌্যাব ও বিজিবির যৌথবাহিনী।গুলি,টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেডের আওয়াজে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে মতিঝিল ও এর আশপাশের এলাকা।এ সময় হেফাজতে ইসলামের সদস্যরা আশপাশের বিভিন্ন অলিগলিতে আশ্রয় নেয়।একপর্যায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ওই সব অলিগলিতেও হানা দেন। যুদ্ধসাজে সজ্জিত যৌথ বাহিনী এরপর অভিযান চালায় গলিগুলোতেও। সেখান থেকেও পিটিয়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়া হয়।এর পরও চলতে থাকে পুলিশের তাণ্ডব। গুলি করতে করতে হেফাজতকর্মীদের ধাওয়া করতে থাকে তারা।এ সময় অনেককে পিটিয়ে আহত করা হয়। তাদের রক্তে বিভিন্ন স্থানে সৃষ্টি হয়েছে তাজা রক্তের ফোয়ারা।-(আমার দেশ ৭/০৫/১৩)।ব্রিটিশ সরকার নিষ্ঠুরতায় ইতিহাস গড়েছিল পাঞ্জাবের জালিয়ানাবাগে। সেখানে নিরস্ত্র জনসভার উপর সেনাবাহিনী গুলি চালিয়েছিল। তবে সেখানে লাশ গোপন করা হয়নি।রাতের আঁধারেও হয়নি। মতিঝিলে যা ঘটেছে তা জালিয়ানাবাগের চেয়েও নিষ্ঠুর।

 

আসল রূপে আওয়ামী লীগ

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেই নৃশংস বর্বরতার রেকর্ড নির্মিত হয়। আওয়ামী লীগের এটিই আসল রূপ। মুজিব রেকর্ড গড়েছিল গণতন্ত্র হত্যায় এবং সে সাথে তিরিশ-চল্লিশ হাজার বিরোধী দলীয় কর্মী হত্যায়। দলীয় ক্যাডারদের লুটতরাজের মধ্য দিয়ে দেশকে মুজিব তলাহীন ভিক্ষার ঝুলিতে পরিণত করে।ডেকে আনে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ।অসংখ্য নতুন রেকর্ড নির্মিত হলো হাসিনার আমলেও। সেটি যেমন পিলখানায়,তেমনি সাভারের রানা প্লাজা ধসে, তেমনি মতিঝিলে। মতিঝিলে রক্ত ধোয়ার জন্য সূর্য্য উঠার আগেই মিউনিসিপালিটির পানিবাহি ট্যাংকার আনা হয় এবং রাস্তায় প্রচুর পানি ঢালা হয়।লক্ষ্য,খুনের আলামত তাড়াতাড়ি মুছে ফেলা।কথা হলো, পানি ঢেলে এভাবে রাস্তার খুন মুছতে পারলেও কোটি কোটি মানুষের স্মৃতিতে বীভৎস বর্বরতার যেরস্মৃতি রয়ে গেল সেটি কি শত শত বছরেও বিলুপ্ত হবে? সরকার নাস্তিক ব্লগারদেরকে মাসের পর ব্যস্ত শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নেয়ার সুযোগ দিয়েছে,বিরিয়ানী খাইয়েছে এবং পুলিশ দিয়ে তাদেরকে প্রটেকশনও দিয়েছে। অথচ দেশের আলেম-উলামাদের সে সুযোগ একটি দিনের জন্যও দিল না। হাসিনা সরকারের কাছে ইসলামপন্থিরা যে কতটা অসহ্য,তাদের বিরুদ্ধে এ সরকার যে কতটা নিষ্ঠুর ও আগ্রাসী -এ হলো তার প্রমাণ।

 

কোরআনে আগুন ও আওয়ামী মিথ্যাচার

কোন ঈমানদার ব্যক্তি কি কোরআনে আগুন দেয়? পুড়িয়ে ছাই করে কি ইসলামি বইয়ের মার্কেট? এমন কান্ড কি কোন মুসলিম দেশে ভাবা যায়? এমন ঘটনা কি কোন দিন পাকিস্তান আমলে হয়েছিল না ব্রিটিশ আমলে? বাগদাদে এমন বর্বর কান্ডটি ঘটেছিল বর্বর হালালু খাঁর দস্যু বাহিনীর হাতে।তখন লক্ষ লক্ষ বই পুড়িয়ে ছাই করেছিল হালাকু বাহিনী।শেখ হাসিনার সরকার সে অসভ্যতাই নামিয়ে এনেছে বাংলাদেশে।গত ৫/৫/১৩ তারিখে তো সেটিই হলো।তাদের কাছে কোরআনের তাফসির মহফিল করা অপরাধ,সে অপরাধে ফাঁসীর হুকুম শুনানো হয়েছে দেশের বিখ্যাত তাফসিরকারক মাওলানা সাঈদীকে।আজও  কোথায় তাফসিরের মহফিল বসালো র‌্যাব ও পুলিশ ধেয়ে আসে। শেখ হাসিনা ও তার দল কোরআন-হাদীসের জ্ঞানচর্চায় প্রচণ্ড ভয় পায়।তবে তাদের সে ভয়ের কারণও রয়েছে।তারা জানে,একমাত্র কোরআন-হাদীসের জ্ঞানই মানব মন থেকে আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ধারণা বিলুপ্ত করে দেয়। অথচ তাদের রাজনীতিই মূল ভিত্তিই হলো আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ।সে বিদ্রোহী চেতনা নিয়েই তারা শরিয়তের প্রতিষ্ঠা রুখতে চায়। তখন আসে আসে সেক্যুলারিজমের নামে ইসলাম-বিরোধীতা।আসে অশ্লিলতা,আসে মুর্তিগড়া।আসে মঙ্গলপ্রদীপের সংস্কৃতি।অথচ কোরআনের তাফসির হলে এসবের চর্চা অসম্ভব হয়ে পড়ে। তখন বাড়ে জিহাদী চেতনা।এবং শুরু হয় লড়াই। এজন্যই সরকারের বহুমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের বহুনেতার অভিযোগ,মাদ্রাসা থেকে জিহাদী সৃষ্টি হয়।তাদের কেউ কেউ বলছেন,“ধর্ম আফিমের নেশা”। এজন্যই সরকার সুপরিকল্পিত ভাবে দেশের কোমলমতি যুবক-যুবতিদের কোরআন-হাদীসের শিক্ষা থেকে সরিয়ে নাচগানের দিকে নিতে চায়।শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের আকর্ষন বাড়াতে সরকার এ জন্যই যেমন সেখানে দিবারাত্র পুলিশী প্রহরা দিয়েছে এবং বিরিয়ানির খাওয়ানোর ব্যবস্থা করেছে।স্কুলের কচি শিশুদের পাঠিয়েছে মাথায় “ফাঁসি চাই”য়ের স্লোগান লেখা পটি বেঁধে।অপরদিকে সরকার কড়া নজর রাখছে,মসজিদে জুম্মার খোতবায় যাতে জিহাদ বিষয়ক বক্তব্য রাখা না হয়।তাই বাংলাদেশে ইসলামভীতি শুধু কাফেররদের নয়,বরং আওয়ামী লীগারদেরও। সে ভয় নিয়েই বায়তুল মোকাররমের ন্যায় দেশের বড় বড় মসজিদগুলোতে সরকার সমর্থক ইমাম বসানো হয়েছে। সে সাথে সরকার র‌্যাব ও পুলিশ নামিয়েছে শহর ও গ্রামেগঞ্জের ঘরে ঘরে জিহাদ বিষয়ক বই বাজেয়াপ্ত করার কাজে। কিন্তু তাতেও মনের সাধ মেটেনি। অবশেষে আগুন দিয়েছে বায়তুল মোকাররমের দক্ষিন গেটে অবস্থিত ইসলামী বইয়ের সবচেয়ে বড় বাজারটিতে।হাজার হাজার কোরআন-হাদীস ও ইসলামী বই সেখানে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এভাবে কমানো হলো দেশে ইসলামি বইয়ের সরবরাহ। ইসলামের শত্রু দুর্বৃত্তদের তাই এতে আনন্দই বাড়লো।

খুনি-সন্ত্রাসীরা সব সময়ই নিজেদের ঘৃণ্য অপরাধ জায়েজ করতে অবিরাম বাহানা তালাশ করে। শেখ মুজিব যখন গণতন্ত্র হত্যা করে বাকশাল কায়েম করেছিল এবং হত্যা করেছিল ৩০-৪০ হাজার বিরোধী দলীয় রাজনৈতীক কর্মী তখনও একটি বাহানা খাড়া করেছিল। তেমনি একাত্তরে যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়ার জন্যও বাহানা খাড়া করেছিল। তাদের লক্ষ্য একটাই,সেটি যে কোন ভাবে ক্ষমতায় যাওয়া এবং ক্ষমতায় টিকে থাকা। সে লক্ষ্য পুরণে সকল প্রকার যুদ্ধ-বিগ্রহ,খুণ,নিষ্ঠুরতা,মিথ্যা ও জালিয়াতিকে তারা জায়েজ মনে করে। এমনকি চিহ্নিত শত্রুর সাথে তারা জোট বাঁধতেও রাজী। সেজন্যই একাত্তরে একটি রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধকে ভারতের সাহায্য নিয়ে তারা অনিবার্য করে তুলেছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রথা বিলুপ্ত করার পিছনেও কারণ এটি। এবং সে অভিন্ন লক্ষ্য পুরণেই তারা রাতের আঁধারে ৫ই মে হেফাজতের নিরীহ কর্মীদের উপর নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে। এবং সে রাতের গণহত্যার পর দোষ ঢাকার জন্য বাহানা সৃষ্টি করে চলেছে। বলছে,বায়তুল মোকাররমে কোরআন হাদীসের দোকানে আগুন দিয়েছে হেফাজতে ইসলামের মুসল্লিরা। সরকারি দলের পত্রপত্রিকা ও টিভিতে লাগাতর প্রচারণা চালানো হচ্ছে,বায়তুল মোকাররমে বইয়ের দোকান এবং পল্টনের দোকানপাটে লুটপাট করেছে এবং আগুন লাগিয়েছে হেফাজতে ইসলামের হুজুরেরা। সেসব স্থান পরিদর্শন করতে গিয়ে মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের নেতাগণ টিভি ক্যামেরার সামনে একই অভিযোগ আনছে।

 

মিথ্যা রটনা যেখানে স্ট্রাটেজী

প্রশ্ন হলো,এ বিশাল মিথ্যাটি হয়তো আওয়ামী লীগের মিথ্যাচারি দলীয় দুর্বৃত্তদের সহজেই গেলানো যেতে পারে, হয়তো সমাজের কিছু বুদ্ধিহীন পাগলকেও বিশ্বাস করানো যেতে পারে, কিন্তু কোন বিবেকমান মানুষও কি সেটি বিশ্বাস করবে? বাংলাদেশের জনগণকে কি এতটাই বিবেকহীন যে এ ভিত্তিহীন অপপ্রচারকে তারা গ্রহণ করবে? এটি সত্য যে,এমন বিবেকহীন ব্যক্তি আওয়ামী লীগে অসংখ্য। তাদের বিপুল উপস্থিতি এমন কি হাসিনার সরকারের মন্ত্রী পর্যায়েও। সাভারে রানা প্লাজা ধসে যাওয়ার পর এরাই বলেছিল,“রানা প্লাজার পিলার ধরে মৌলবাদীরা ধাক্কা দেয়ার কারণে ভবনটি ধসার ঘটনাটি ঘটতে পারে।” সে কথাটি বলেছিল খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ নিরেট মিথ্যা কথাটি বলেছিল একটি স্ট্রাটেজীর অংশ রূপে। লক্ষ্য ছিল,তাদের সকল কুকর্মের দায়ভার বিরোধীদের ঘাড়ে চাপানো। ভবিষ্যতে সে লক্ষ্যপূরণে তারা যে আরো বহু মিথা বলবে তাতে কি সামান্যতম সন্দেহ আছে? সে অভিন্ন লক্ষ্য নিয়েই তারা একথাও বলছে,মতিঝিলের রাস্তার গাছগুলোও কেটেছে হেফাজতে ইসলামের কর্মীরা।যেন দা-কুড়াল ও করাত নিয়ে তারা রাস্তায় নেমেছিল।অথচ তাদের মগজে এ প্রশ্নের একবারও উদয় হলো না যে,হেফাজতে ইসলামের যে আলেমগণ সারাটা জীবন ব্যয় করেছে কোরআন-হাদীসের জ্ঞান শিক্ষা ও শেখানোর কাজে,তারা কি অবশেষে কোরআন-হাদীসে আগুণ দিবে? তারা কাটবে রাস্তার গাছ? এবং লুট করবে দোকান-পাট?

প্রত্যেকটি অপরাধেরই সুস্পষ্ট মটিভ বা উদ্দেশ্য থাকে।মটিভ ছাড়া কেউ কখনো সামান্যতম মেধা বা শ্রমের বিনিয়োগ করেনা। কাউকে যেমন ক্ষতি করেনা তেমনি কোথাও আগুনও দেয়না। প্রশ্ন হলো,কোরআন-হাদীসের দোকানে আগুন দেয়ার পিছনে হেফাজতে ইসলামের আলেমদের কি মটিভ থাকতে পারে? তা থেকে তাঁদের অর্জনটা কি? তাঁরা তো নেমেছে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার কাজে।তাদের কাছে এটি রাজনীতি নয়,বরং জিহাদ। পবিত্র জিহাদে তো তারা পবিত্র কাজগুলোই করবে। তাদের কেউ কেউ রাস্তায় নেমেছিলেন কাফনের কাপড় পড়ে। অনেকেই এসেছিলেন ঘর থেকে চিরবিদায় নিয়ে। ফলে কোরআন-হাদীসে আগুন দিলে কি মহান আল্লাহর কাছে তাদের গ্রহনযোগ্যতা বাড়তো? তারা তো রাস্তায় নেমেছে জনগণকে সাথে নিয়ে।এমন কুকর্মে কি জনগণের কাছেও তাদের গ্রহনযোগ্যতা বাড়তো? হেফাজতে ইসলামের লড়াই তো নাস্তিক এবং নাস্তিকদের পৃষ্ঠপোষক হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে। তাদের শত্রুতা কোন কালেই ইসলামি বইয়ের দোকানদারদের বিরুদ্ধে ছিল না। ফলে বইয়ের দোকানে তারা আগুন দিবে কেন? বরং তারা তো চাইবে বাংলাদেশের আনাচ কানাচে আরো বেশী বেশী কোরআন-হাদীসের দোকান ঘড়ে উঠুক এবং বেশী বেশী মানুষ জ্ঞানচর্চা করুক। এসব দোকানে আগুন দেয়ার কাজে মটিভ থাকবে তো তাদের,যারা বাংলাদেশ থেকে ইসলামের প্রভাব কমাতে চায়।চায়,ইসলামপন্থিদের গায়ে কুৎসিত কালিমা লেপন করতে। ইরানে বিপ্লবের শুরুতে বিপ্লব ঠেকাতে শাহের গুপ্তচর বাহিনী আবাদানের সিনেমা হলে আগুন দিয়ে বহু মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করেছিল। চরিত্রহননের লক্ষ্যে দোষ চাপিয়েছিল আয়াতুল্লাহ খোমেনীর অনুসারিদের উপর। দেশে দেশে শয়তানি শক্তির এটিই সনাতন কৌশল। আওয়ামী লীগের সে কৌশল ও মিথ্যাচার এখানেও অস্পষ্ট? মিথ্যার প্রতি যে প্রচন্ড আসক্তি নিয়ে আওয়ামী লীগ মন্ত্রী খ. ম. আলমগীর সাভারে ভবন ধসের দায়ভার চাপিয়েছিল ইসলামি মৌলবাদীদের উপর,এবা সে অভিন্ন মিথ্যাচার নিয়েই কোরআন হাদীসে আগুন ও রাস্তায় গাছ কাটার দোষ চাপিয়েছে হেফাজতে ইসলামের উপর। ভবিষ্যয়ে এরূপ আরো বহু অপবাদই যে ইসলামপন্থিদের উপর চাপানো হবে তাতে কি সামান্যতম সন্দেহ আছে? এমন দুর্বৃত্ত অতীতে নবী-রাসূলদের উপরও নানারূপ মিথ্যা অপবাদ লাগিয়েছে।

 

হেফাজতে ইসলামের বিবৃতি

হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম সম্পাদক মাইনুদ্দিন রুহী ও সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল হক ইসলামাবাদী স্বাক্ষরিত লিখিত বিবৃতিতে বলেন,সমাবেশ চলাকালে রোববার দুপুর থেকেই পল্টন,বায়তুল মোকাররম এলাকায় ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের সঙ্গে হেফাজতে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের অভিযোগ,গণহত্যার পরিবেশ সৃষ্টিতে পরিকল্পিতভাবেই এসব ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়।তারা বলেছেন,রোববার (৫/৫/১৩) দুপুরের পর থেকে গুলিস্তান,নয়াপল্টন,বায়তুল মোকররম উত্তর গেট, বিজয়নগরসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ছাত্রলীগ,যুবলীগ ও পুলিশের সম্মিলিত আক্রমণে এবং তাদেরই উসকানিতে যে জ্বালাও-পোড়াও ও হত্যাযজ্ঞ চলেছে তার দায়-দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে।হেফাজতে ইসলাম বারবার প্রমাণ করেছে,তারা শান্তিপূর্ণ, জ্বালাও-পোড়াও ও অগ্নিসংযোগে তারা বিশ্বাস করে না। কিন্তু বায়তুল মোকাররম এলাকার আশপাশে জ্বালাও-পোড়াওয়ের যে তাণ্ডব হয়েছে তা ছিল সরকার দলীয় ছাত্রলীগ,যুবলীগের সশস্ত্র ক্যাডারদের পূর্বকল্পিত হত্যাযজ্ঞ ও লুটপাট। তারা স্বর্ণের দোকানে লুটপাট করেছে,বইয়ের দোকানে আগুন দিয়েছে,পবিত্র কোরআন শরীফ জ্বালিয়ে দিয়েছে,গাড়ি ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে।পুলিশের নির্লজ্জ সহযোগিতায় রাজধানীর মধ্যাঞ্চলকে নরকে পরিণত করেছে। কিন্তু সরকারি সংবাদমাধ্যম ও মিডিয়ার মাধ্যমে হেফাজতকর্মীদের ঘাড়ে দোষ চাপানোর চেষ্টা করছে।

নেতারা বলেন,দফায় দফায় হামলা,গুলিবর্ষণ ও গণহত্যা চালানোর পরও মধ্যরাতে যখন হেফাজতে ইসলামের কর্মীরা শান্তিপূর্ণভাবে শাপলা চত্বরে অবস্থান করছিলেন,কেউ জিকির করছিলেন, কেউ নামাজ পড়ছিলেন,কেউ সামান্য সময়ের জন্য ঘুমন্ত ছিলেন,এই সময় সরকারের পুলিশ,বিজিবি ও র‌্যাব যে সাঁড়াশি আক্রমণ চালিয়েছে,হাজার হাজার শান্তিপূর্ণ মানুষকে শহীদ করেছে,২০ সহস্রাধিক মানুষকে পঙ্গু করেছে,তা ইতিহাসে কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তদুপরি এই হাজার হাজার শহীদের লাশকে পিকআপ,অ্যাম্বুলেন্স,ট্রাকে করে গুম করা হয়েছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা অভিযোগ করেছেন।এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানোর ভাষা আমাদের নেই। তবে মনে রাখতে হবে,জুলুম নির্যাতন করে,নিরীহ মানুষকে হত্যা করে কেউ অতীতে পার পায়নি,এখনও পাবে না।নেতারা বলেন,আমরা অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি,গতকাল ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কওমি মাদরাসা ও ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সরকারি পুলিশ বাহিনী হামলা চালিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে।সরকারদলীয় সশস্ত্র ক্যাডাররা রাস্তায় রাস্তায় নিরীহ জনগণের ওপর হামলা চালাচ্ছে,তাদের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে,পঙ্গু করে দিচ্ছে।কোথাও কোথাও দূরপাল্লার গাড়ি থেকে দাড়ি টুপিওয়ালাদের নামিয়ে শত শত মানুষের সামনে নির্যাতন চালাচ্ছে। ৬ই মে কালো রাতের বর্বরতা উল্লেখ করে তারা বলেন,সরকার নজিরবিহীনভাবে বিদ্যুত্সংযোগ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দিয়ে পুলিশ, বিজিবি র‌্যাব আচমকা সমাবেশস্থলে ব্রাশ ফায়ার শুরু করে। কয়েক ঘণ্টা ধরে চলা সেই ব্যাপক হত্যাযজ্ঞে কমপক্ষে দুই সহস্রাধিক নেতাকর্মী শাহাদাত বরণ করেছেন।অনেক লাশ গুম করা হয়েছে। ভোরের আলো ফোটার আগেই সিটি করপোরেশনের ময়লা বহনের গাড়িতে করে বিপুলসংখ্যক লাশ সরিয়ে ফেলা হয়েছে। বহু নেতাকর্মী এখনও নিখোঁজ রয়েছে বলে দাবি করেছে সংগঠনটি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আহত ও নিহতের চূড়ান্ত পরিসংখ্যান এখনও নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি বলেও জানানো হয় বিবৃতিতে।

 

সরকারি বাহিনীর সন্ত্রাস ও গণপ্রতিরোধ

ঢাকার নৃশংস গণহত্যার পরও সরকারি বাহিনীর সন্ত্রাস থেমে যায়নি। র‌্যাব,পুলিশ এবং বিজিবি হানা দিয়েছে মফস্বলের বিভিন্ন মাদ্রাসায়।প্রতিরোধ গড়ে তুলছে জনগণও।৬ই মে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের কাঁচপুর,সিদ্ধিরগঞ্জের সানারপাড় ও শিমরাইল,চট্টগ্রামের হাটহাজারী এবং বাগেরহাটে র‌্যাব,পুলিশ এবং বিজিবির সঙ্গে হেফাজতে ইসলামের কর্মীদের সংঘর্ষে পুলিশ ও বিজিবি সদস্যসহ অন্তত ২৮ জন নিহত হয়েছেন।এর মধ্যে না.গঞ্জে ১৯ জন হাটহাজারীতে ৭ ও বাগেরহাটে ২ জন নিহত হয়েছে। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন আড়াই শতাধিক। নারায়ণগঞ্জে নিহতদের মধ্যে দুজন পুলিশ ও তিনজন বিজিবি সদস্য রয়েছে। তবে নিহতের সংখ্যা আরও বেশি হবে বলে দাবি করছেন হেফাজতে ইসলাম ও স্থানীয়রা। আহত হয়েছেন সাংবাদিক, পুলিশ, বিজিবি ও পথচারীসহ দুই শতাধিক। এরমধ্যে অর্ধশতাধিক ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। সোমবার সকাল থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত দফায় দফায় সংঘর্ষে এ হতাহতের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষ চলাকালে প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।

 

মিডিয়া তালাবদ্ধ এবং শফিক রেহমানের বাসায় হামলা

খুনিরা কখনই খুনের কাজটি দিবালোকে করেনা। সবার চোখের সামনেও করে না। আওয়ামী লীগও ৫ই মে’র খুনের কাজটি দিবাভাগে করেনি। করেছে রাতে। এবং রাস্তার আলো নিভিয়ে।সে রাতে কি ঘটেছে সে খবর গোপন করতে সেখানে কোন মিডিয়া কর্মীকে থাকতে দেয়নি। প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে প্রাপ্ত খবরগুলো যাতে জনসম্মুখে পৌছতে না পারে সে জন্য সরকার বন্ধ করে দিয়েছে বেসরকারি টিভি চ্যানেল দিগন্ত টিভি ও ইসলাম টিভি। ফলে সরকারের গুণকীর্তনকারি টিভি স্টেশনগুলো ছাড়া বাংলাদেশে এখন আর কোন টিভি চ্যানেলই নেই। এ টিভি চ্যানেলগুলোর কাজ হয়েছে সরকারের নৃশংস বর্বরতাকে প্রশংসনীয় কর্ম রূপে প্রচার করা। আসল ঘটনা যাতে প্রচার না পায় সে জন্য আগেই বন্ধ করেছে “দৈনিক আমার দেশ”। কারাবন্দী করেছে আমার দেশের সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে। সম্প্রতি আওয়ামী গুন্ডারা হামলা করেছে সাহসী লেখক শফিক রেহমানের বাড়ীতে। শফিক রহমান থানায় খবর দিয়েও কোন সাহায্য পাননি। বাংলাদেশ এভাবে প্রবেশ করেছে এক যুদ্ধ অবস্থায়। সমগ্র দেশ পরিণত হয়েছে একটি জেল খানায়। বাংলাদেশ এখন ভারত ও তার সেবাদাসদের অধিকৃত ভূমি। রহিত হয়ে গেছে সকল দেশপ্রেমিকদের সকল মৌলিক মানবিক অধিকার। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাওয়ায় অতীতেও এমনটি হয়েছে। একাত্তরে তারা রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধ নিয়ে এসেছে। চুয়াত্তরে বাকশালী স্বৈরাচার এনেছে। এসেছে হত্যা­ ও গুমের রাজত্ব।মুজিব তার রক্ষিবাহিনী দিয়ে যেভাবে তিরিশ-চল্লিশ হাজার মানুষকে হত্যা করেছিলেন,হাসিনাও সে পথটি ধরেছে। হাসিনার ক্ষমতায় আসার পর তাই সংঘটিত হলো পিলখানা হত্যাকান্ড। আগুন লাগলো তাজনীন গার্মেন্টসে এবং সেখানে পুড়ে কয়লা হলো শতাধিক শ্রমিক। সম্প্রতি ধসে গেল রানা প্লাজা। এ ভবন ধসে ৬ শতাধিক লাশ উদ্ধার হলেও শ্রমিকগণ বলছেন,চাপা পড়ে চিরতরে হারিয়ে গেছে সহস্রাধিক মানুষ। আর এখন লাগাতর রক্ত ঝরছে শুধু মতিঝিলে নয়, সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে।এই হলো হাসিনার শাসনামল। হাসিনা ভাবছেন,এভাবে গায়ের জোরেই তিনি ক্ষমতায় থাকবে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ কি এত খুন এত অত্যাচার নীরবে মেনে নিবে? ইতিমধ্যেই আওয়াজ উঠেছে,“খুন হয়েছে আমার ভাই, সব খুনিদের ফাঁসি চাই”।

 

কবিরা গুনাহর রাজনীতি

আজ থেকে প্রায় শতবছর আগে মাওলানা আবুল কালাম আজাদ লিখেছিলেন,“বলকান যুদ্ধে কোন তুর্কি সৈনিকের পায়ে যদি কাঁটা বিদ্ধ হয় আর সে কাঁটার ব্যাথা যদি তুমি হৃদয়ে অনুভব না কর তবে খোদার কসম তুমি মুসলমান নও”।মুসলমান হওয়ার অর্থই হলো আরেক মুসলমানের ব্যাথার সাথে একাত্ম হওয়া এবং সে ব্যাথা হৃদয়ে অনুভব করা। কে কত বড় ঈমানদার সেটি তার দাড়ি-টুটি বা লম্বা জুব্বা দেখে বুঝা যায় না। সেটি বুঝা যায় তার মুসলিম ভাইয়ের ব্যাথায় ব্যাথীত হওয়া দেখে। মাওলানা আবুল কালাম আযাদ যখন এ কথাটি লিখেছিলেন তখন ইসলামের শত্রুরা খেলাফত ধ্বংসের লক্ষ্যে মুসলমানদের ভূগোলে হাত দিয়েছিল। ইউরোপের বলকান এলাকায় কাফেরদের পক্ষ থেকে পরিচালিত হচ্ছিল সে বিচ্ছিন্নতার যুদ্ধ। মুসলিম ভূমির ভূগোল বাঁচানোর লড়াই ইসলামে জিহাদ। সে জিহাদ লড়ছিল তুর্কি সৈনিকেরা। ভারতের মুসলমানগণ তখন উসমানিয়া খেলাফতের পক্ষ নিয়েছিল। কারণ, তাদের সাথে একাত্ম হওয়াটাই ছিল ঈমানদারি। যেখানে ঈমান আছে সেখানে সে সহমর্মিতা থাকবেই।

একমাত্র কাফেরগণই মুসলমানের ব্যাথা বেদনায় আনন্দ পেতে পারে। মুসলমানের ব্যাথা-বেদনা তাদের কাছে উৎসবের কারণ হয়। ঢাকার মতিঝিলে যে হত্যাকান্ড হয়ে গেল তাতে কি কোন মুসলমান ব্যাথীত না হয়ে পারে? অথচ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আজ হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের নিহত ও আহত হওয়ায় এবং ঢাকা থেকে তাদের সরাতে পারায় এখন আনন্দে ডুগডুগি বাজাচ্ছে। সেটি বোঝা যায় তাদের পত্র-পত্রিকা পড়লে। অনেক আওয়ামী লীগ কর্মী তাদের ব্লগে লিখেছে,“হেফাজতের কর্মীদের হত্যা করে সরকার ভালই করেছে। তারা পশু। হত্যাই তাদের পাওনা।” আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ঈমানহীনতা এবং সে সাথে বিবেকহীনতা যে কতটা প্রকট -এহলো তার নমুনা। আল্লাহতায়ালা ও তার রাসূলের ইজ্জতকে মহান করতে রাস্তায় নামা কি পশুত্ব? আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের চেতনা যে কতটা খারাপ এ হলো তার নমুনা। সিরাজ সিকদারকে হত্যা করার পর মুজিব যেমন “কোথায় আজ সিরাজ সিকদার?” বলে উল্লাস করেছিল তেমনি মতিঝিলের শত শত মুসল্লি হত্যার পর উল্লাস শুরু হয়েছে আওয়াম লীগের নেতাকর্মীদের মাঝে।

আওয়ামী লীগের রাজনীতি বড় নাশকতা এই নয় যে,তারা অগণিত মানুষ হত্যা করেছে,বা দেশকে দূর্নীতিতে ডুবিয়েছে বা বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান ভেঙ্গে ভারতের মুখ উজ্বল করেছে। বরং আওয়ামী রাজনীতির সবচেয়ে বড় নাশকতাটি সংঘটিত হয়েছে জনগণের বিবেক ও চেতনার রাজ্যে। তারা মানুষকে প্রচন্ড ঈমানহীন এবং দুর্বৃত্তও করেছে। তাদের কর্মীগণ তাই উল্লাস ভরে দেশের সম্মানিত আলেম-উলামাদের হত্যা করতে পারে। তাদের ফাঁসীর হুকুমও শুনাতে পারে। হত্যার পর লাশের পর দাঁড়িয়ে উল্লাসও করতে পারে। আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দাও ওহুদের যুদ্ধে মুসলমানদের সেনাপতি ও নবীজী(সাঃ)র চাচা হামজার কলিজা চিবিয়ে এরূপ উল্লাস করেছিল। মুসলমানদের হত্যাকরা যেমন কবিরা গুনাহ,তেমনি সে হত্যায় আনন্দিত হওয়াটাও কবিরা গুনাহ। অথচ আওয়ামী লীগ আজ দেশে সে কবিরাগুনাহর রাজনীতি শুরু করেছে। সেটি শুধু আজ থেকে নয়, একাত্তরের পূর্ব থেকেই। সে গুনাহর রাজনীতিতে তাদের বন্ধু হতে তাই ছুটে আসে ভারতের কাফেরগণই শুধু নয়, বরং বিশ্বের তাবত ইসলামবিরোধীগণও। বাংলাদেশেও ইসলামের সকল শত্রুপক্ষ তাদের নেতৃত্বে একতাবদ্ধ হয়েছে।

 

একমাত্র পথ

রোগ না সারালে দিন দিন তা জটিল আকার ধারণ করে। এক সময় তা চিকিৎসারও অযোগ্য হয়ে পড়ে। তাই বিবেকহীন দুর্বৃত্তদের যে দুঃশাসন বাংলাদেশের মাথার উপর চেপে বসেছে তা না নামালে ঘনিয়ে আসবে অতি ভয়ানক বিপর্যয়। ঘরে আগুন লাগলে যেমন দায়িত্ব বাড়ে সে ঘরের প্রতিটি বাসিন্দার,তেমনি দেশের বিপদে দায়িত্ব বাড়ে প্রতিটি নাগরিকের। দেশ কোন দলের নয়, দেশ সবার। তাই দেশ বাঁচাতেও সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। আর ঈমানদারদের কাছে এ কাজ তো স্রেফ রাজনীতি নয়, পবিত্র জিহাদ। এ জিহাদে মেধা, শ্রম, অর্থ ও রক্তের বিনিয়োগ মহান আল্লাহর দরবারে মহা প্রতিদান দেয়। প্রাণ গেলে তো জান্নাত অনিবার্য করে। শহীদগণ লাভ করবে মৃত্যুহীন প্রাণ। মহান আল্লাহতায়ালা তো সে প্রতিশ্রুতি পবিত্র কোরআনে একবার নয় বহু বার দিয়েছেন। বলেছেন,“যারা আল্লাহর রাস্তায় প্রাণ দেয় তাদেরকে তোমরা মৃত বলো না। তারা তো জীবিত, যদিও তা তোমরা অনুভব করতে পার না।” -সুরা বাকারা। সে সাথে তিনি জিহাদে নামার চুড়ান্ত তাগিদ দিয়েছেন।পবিত্র কোরআনে মহান রাব্বুল আ’লামীন সে নির্দেশটি হলো,“হে মু’মিনগণ! তোমাদের কি হলো যে যখন তোমাদের আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধে বের হওয়ার জন্য বলা হয় তোমরা ভারাক্রান্ত হয়ে ভূতলে ঝুঁকে পড়? তোমরা কি আখিরাতের জীবনে পরিবর্তে পার্থিব জীবনে পরিতুষ্ট হয়েছো? (অথচ) আখেরাতের তুলনায় পার্থিব জীবনের ভোগের উপকরণ তো অকিঞ্চিৎকর।” -(সুরা তাওবাহ,আয়াত ৩৮)।

আরো নির্দেশ দিয়েছেন,“তোমাদের প্রস্তুতি হালকা হোক বা ভারি হোক, তোমরা অভিযানে বের হয়ে পড় এবং লড়াই করো আল্লাহর পথে তোমাদের সম্পদ ও জীবন দিয়ে।ওটাই তোমাদের জন্য শ্রেয় যদি তোমরা জানতে।” -(সুরা তাওবাহ,আয়াত ৩৮)।কোন ঈমানদার ব্যক্তি কি মহান আল্লাহর এ কোরআনী নির্দেশ অমান্য করতে পারে? যার প্রাণে আল্লাহর আনুগত্য আছে, তার জীবনে জিহাদও তাই অনিবার্য হয়ে উঠে। একারণেই সাহাবায়ে কেরামের জীবনে জিহাদ এসেছে লাগাতর।সাহাবাদের সংখ্যা বাংলাদেশের একটি থানার জনসংখ্যার সমানও ছিলনা। কিন্তু সে মুষ্টিমেয় মানুষদের জিহাদের বদৌলতেই বিশাল আরবভূমি থেকে ইসলামের শত্রুদের দখলদারি বিলুপ্ত হয়েছিল। বাংলাদেশের বুক থেকে ইসলামের শত্রুপক্ষের দখলদারি বিলুপ্ত করারও কি এছাড়া ভিন্ন পথ আছে? তাছাড়া যখন ইসলামের শত্রুপক্ষের দ্বারা কোন মুসলিম ভূমি অধিকৃত হয় তখন সে ভূমি কাশ্মীর, ফিলিস্তিন বা সিরিয়ার ন্যায় জিহাদের শতভাগ বিশুদ্ধ ভূমিতে পরিণত হয়। তাই বাংলাদেশ আজ শুধু শত্রুর অধিকৃত বধ্যভূমিই নয়, বরং জিহাদের অতি পূণ্যভূমিও। ০৮/০৫/১৩

 




সভ্য সমাজ নির্মাণে কেন ব্যর্থ হচ্ছে বাঙালী মুসলিম?

ব্যর্থতা শিক্ষাব্যবস্থায়

দেশগড়ার কাজ থেকে দূরে থাকাটি স্রেফ দায়িত্বহীনতা নয়,এটি অপরাধ।দেশের নাগরিকগণ সে ধারণাটি পায় শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে। দেশগড়া নিছক রাজনীতি বা পেশাদারিত্ব নয় বরং পবিত্র ইবাদত -সেটি প্রতিটি নাগরিকের চেতনায় দৃঢ়মূল করতে হয়।এ লক্ষ্যে ইসলামের হুকুম ও শিক্ষনীয় বিষয়গুলোকে জনগণের কাছে পৌঁছানোর কাজটি জরুরী। সে কাজটি করে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা। আল্লাহতায়ালা একটি সভ্য ও সুন্দর সমাজ নির্মাণের গুরুদায়িত্ব দিয়েই মানুষকে এ দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন। সে নির্মাণকাজে রোডম্যাপটি হলো পবিত্র কোরআন। দেশগড়ার এ দায়িত্বটি খেলাফতের তথা আল্লাহর প্রতিনিধিত্বের।প্রতিটি মুসলমান তাই আল্লাহর খলিফা তথা প্রতিনিধি। দেশের প্রেসিডেন্ট,মন্ত্রী বা সচিব হওয়ার চেয়েও এ পদের মর্যাদা আল্লাহর দরবারে অধিক। প্রেসিডেন্ট,মন্ত্রী বা সচিব হওয়াতে মহান আল্লাহ থেকে পুরস্কার মেলবে না। কিন্তু খলিফার দায়িত্বপালনে সফল হলে প্রতিশ্রুতি রয়েছে নিয়ামতভরা বিশাল জান্নাতের।খেলাফতের সে দায়িত্বপালনে কে কতটা নিষ্ঠাবান,রোজ হাশরের বিচার দিনে এ হিসাব প্রত্যেককেই দিতে হবে।

প্রতিটি অফিসকর্মীকে তার কর্মশুরুর আগেই অফিসের করণীয় দায়ভারের বিষয়টি প্রথমেই জেনে নিতে হয়,নইলে তার দায়িত্ব পালন যথার্থ হয় না। তেমনি প্রতিটি ব্যক্তিকেও জেনে নিতে হয় এ পার্থিব জীবনে তার রোল বা ভূমিকাটি কি। মানজীবনের এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাঠ। তার জীবনের সকল কর্মকান্ড, দায়িত্ব-পালন ও ত্পরতা নির্ধারিত হয় এটুকু জানার পরই। তেমনি ইসলামের প্রথম পাঠটি হলো এ পৃথিবীতে ব্যক্তির ভূমিকা্টি যে আল্লাহর প্রতিনিধিত্বের সেটি জানিয়ে দেয়া। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো,সে মৌলপাঠটিই বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় দেয়া হয় না। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশ্বের বহুভাষা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের বহুবিষয় শেখালেও এ মৌলিক পাঠটি শেখায় না। ফলে দেশবাসীর কাছে দেশ ও সমাজ নির্মাণের ফরজ কাজটি ফরজরূপে গণ্য হয়নি। বরং রাজনীতি পরিণত হয়েছে গদিদখল,আরাম-আয়েশ ও নিজস্ব জৌলুস বৃদ্ধির হাতিয়ারে।

দেশগড়ার এ পবিত্র অঙ্গনে সবচেয়ে ধার্মিক ও সবচেয়ে নিষ্ঠাবান মানুষের আধিক্য অতি কাঙ্খিত ছিল। যেমনটি হয়েছিল খোলাফায়ে রাশেদার সময়। কারণ,অন্যরা না জানলেও যারা ধার্মিক তাদের জানা থাকার কথা,উচ্চচতর সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণের কাজ থেকে হাত গুটিয়ে নেয়ার অর্থ শুধু দায়িত্বহীনতাই নয়,আল্লাহতায়ালার কোরআনী হুকুমের বিরুদ্ধে সেটি বিদ্রোহ। বাংলাদেশে রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনার সর্বস্তরে যে দুর্নীতিপরায়ন ব্যক্তিদের দৌরাত্ব -সেজন্য দায়ী তথাকথিত এ ধর্মপরায়নগণও। সমাজের আবু লাহাব,আবু জেহেলের বিরুদ্ধে নবীআমলের মুসলমানগণ যে আমৃত্যু যুদ্ধ করেছিলেন সেরূপ যুদ্ধ বাংলাদেশের ধর্মপরায়ন মানুষদের দ্বারা কোন কালেই সংঘটিতই হয়নি। ফলে সমাজের দুর্বৃত্তরা অনেকটা বীনা যুদ্ধেই সমাজ ও রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গনগুলো দখল করে নিয়েছে। তাছাড়া ময়দান কখনও খালি থাকে না। সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ মানুষেরা ময়দান খালি করে দিলে দুর্বৃত্তরা তা অবশ্যই দখল  করে নেয়। রাষ্ট্রের সম্পদ এভাবেই দুর্নীতিপরায়ন রাজনীতিবিদ ও প্রশাসনিক কর্মচারীদের অধীনস্ত হয়েছে। ফলে জনগণ নিঃস্ব হলেও ঐশ্বর্য বেড়েছে তাদের।

 

যে দায়বব্ধতা সবার

দেশগড়ার ক্ষেত্রটি শুধু রাজনীতি বা রাষ্ট্রীয় প্রশাসন নয়। এ কাজটি হয় দেশের সর্বাঙ্গ জুড়ে। শুধু রাজনীতি দিয়ে একটি সভ্যতার সমাজ নির্মিত হয় না। সে লক্ষ্যটি পূরণে রাজনীতিতে যেমন স্ৎ ও যোগ্য মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াতে হয়,তেমনি যোগ্য মানুষের ভীড় বাড়াতে হয় দেশের শিক্ষা,সাহিত্য, বিজ্ঞান, সমাজসেবা ও ব্যবসা বাণিজ্যেও। মানুষকে শুধু সৎ হলে চলে না,সাহসী ও সংগ্রামীও হতে হয়। নবীজীর (সাঃ) সাহাবাগণ তাই শুধু অতি সৎই ছিলেন না,নির্ভীক ও অতিশয় লড়াকুও ছিলেন। এ যোগ্যতা বলেই দুর্বৃত্তদের রাজনীতি ও প্রশাসনের অঙ্গণ থেকে হটিয়ে নিজেরা কান্ডারী হাতে নিয়েছিলেন। নবীজীবনের সে সুন্নত আজকের ধর্মপরায়ন মানুষের জীবনেও আসতে হবে। নিছক বক্তৃতা বা উপদেশ খয়রাতে দেশ সমৃদ্ধতর হয় না। তাদেরকে দেশের এক্সিকিউটিভ ফোর্স বা পলিসি বাস্তবায়নকারী শক্তিতে পরিণত হতে  হবে। এটিই ইসলামের মৌল শিক্ষা। নবীজী (সাঃ) ও সাহাবাদের জীবনের মূল শিক্ষা তো এটিই। ফলে ন্যায় কর্ম ও ধর্মপরায়নতা শুধু মসজিদে নয় সমাজের সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল।

ইমারাত নির্মাণের পূর্বে ভাল ইট তৈরির ন্যায় জাতি গঠনের পূর্বে উত্তম ব্যক্তি-গঠন অপরিহার্য। আর যোগ্য ব্যক্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান শুধু জ্ঞান ও শারীরিক সুস্থ্যতা নয়,বরং সবচেয়ে অপরিহার্য হলো তার ব্যক্তিত্ব। ঐ ব্যক্তিত্বই একজন মানুষকে মহত্তর পরিচয় দেয়। এ বিশেষ গুণটির জন্যই সে প্রকৃত মানুষ। আর ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব সৃষ্টিতে মূল উপাদানটি হলো সত্যবাদিতা। হযরত আলী (রাঃ) এক্ষেত্রে একটি অতিশয় মূল্যবান কথা বলেছিলেন। বলেছেন,ব্যক্তির ব্যতিত্ব তার জিহ্বায়। তথা তার সত্যবাদিতায়। যার জিহ্বা বা কথা বক্র তার চরিত্রও বক্র। সুদর্শন ও সুস্থ্য শরীরের অধিকারী হয়েও ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রে সে পঙ্গু। এমন মিথ্যাবাদি মানুষ সমাজে ভাল মানুষ রূপে পরিচিতি পেতে পারে না। বাঁকা বা কাঁচা ইট দিয়ে যেমন প্রাসাদ নির্মাণের কাজ হয় না,তেমনি মিথ্যাচারী মানুষ দিয়ে একটি সভ্যতর ও উন্নততর সমাজ নির্মিত হয় না। বরং এরূপ অসৎ ও মিথ্যাচারী মানুষের আধিক্যে একটি জাতির অস্তিত্বই বিপন্ন হয়। অথচ কোন জাতির এমন ক্ষতি গরু মহিষের সংখ্যা বৃদ্ধিতে হয় না। তাতে বরং বিপুল অর্থলাভ হয়। কিন্তু মিথ্যাচারী মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধিতে দেশে অসভ্যতা, বর্বরতা ও ধ্বংস নেমে আসে। বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ বা অপরূপ নৈসর্গিক পরিবেশও সে জাতির কোন কল্যাণই করতে পারে না। সেটিরই প্রমাণ হলো আজকের বাংলাদেশ। দেশটির আজকের বিপন্নতা সম্পদের অপ্রতুলতায় নয়। ভুগোল,জলবায়ু বা জনসংখ্যাও নয়। বরং সেটি দুর্বৃত্ত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধিতে।

 

যে ব্যর্থতা বুদ্ধিজীবীদের

দেশবাসীকে সদাচারী ও সত্যবাদী বানানোর গুরু দায়িত্বটি দেশের বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের।একাজটি ক্ষেতখামার বা কোন কল-কারখানায় হয় না। রাজনীতি ও প্রশাসনিক দফতরেও হয় না। হয় দেশের জ্ঞানবান ব্যক্তিদের হাতে। তারাই দেশবাসীর শিক্ষক,তারাই সংস্কৃতির নির্মাতা। তারা সংস্কার আনে ব্যক্তির আচরণ, মূল্যবোধ ও রুচীবোধে। তাই একটি দেশ কতটা সভ্যতর পরিচয় নিয়ে মাথা তুলে দাঁড়াবে সে বিচারে সেদেশের জ্ঞানবানদের সততা ও সৎ সাহসের দিকে তাকাতে হয়। প্রতিকুল অবস্থাতেও সত্য কথা বলার জন্য যে মনোবল দরকার সেটির জোগান তো তারাই দেয়। তারাই সমাজের মিথ্যুক ও দুশ্চরিত্রদের বাঁচাটা নিরানন্দ ও বহুক্ষেত্রে অসম্ভব করে দেয়। সম্পদের অধিকারী হয়েও দুর্বৃত্তরা সমাজে নন্দিত না হয়ে প্রচন্ড নিন্দিত হয় বস্তুত এদের সৃষ্ট সামাজিক মূল্যবোধ ও বিচারবোধের কারণেই। নমরুদ,ফিরাউন, হালাকু বা হিটলারগণ ইতিহাসে যে আজও প্রচন্ড ঘৃণিত তা এসব সত্যনিষ্ঠ বুদ্ধিজীবীদের কারণেই। ইসলামে এমন কাজের গুরুত্ব অপরিসীম। নবীজী (সাঃ)র হাদীসঃ “যে ব্যক্তি লোকদের কোন একটি ভাল বিষয় শিক্ষা দেয় তার জন্য খোদ মহান আল্লাহতায়ালা, তাঁর ফেরেশতাকুল,সমগ্র আসমান জমিনের বাসিন্দা, এমনকি গর্তের পিঁপড়া ও সমুদ্রের মৎস্যকুলও তার জন্য দোয়া করতে থাকে।” –(তিরমিযি শরীফ)। ব্যক্তির জীবনে এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কি থাকতে পারে?

মু’মিন ব্যক্তি তাই অর্থলাভের জন্য জ্ঞান বিতরণ করে না বা ওয়াজে নামে না। বরং এ কাজে নেমে গালি খাওয়া ও পাথর খাওয়াই হলো নবীজী (সাঃ)র সূন্নত। সাহাবাগণ তাই পাহাড়-পর্বত, নদী-সমুদ্র অতিক্রম করে বহু দেশে সত্য প্রচার করেছেন। বাংলাদেশের মানুষ মুসলমান হয়েছে তো তাদের সে মেহনতের বরকতেই। কিন্তু বাংলাদেশে সে কাজটিই হয়নি। আলেমগণ অর্থ লাভ বা বেতন লাভের প্রতিশ্রুতি না পেলে কোরআন শিক্ষা দেন না। ওয়াজে মুখ খোলেন না। তাদের পক্ষ থেকে সেকাজটি না হওয়ার কারণেই দেশে ইসলামের বিজয় আসেনি। সুস্থ্য মূল্যবোধ ও বিচারবোধও প্রতিষ্ঠা পায়নি। বরং মহা বিজয় এসেছে দুর্বৃত্তদের। ফলে গণতন্ত্র হত্যা,বাকশালী স্বৈরশাসনের প্রতিষ্ঠা,দুর্ভিক্ষে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ও তিরিশ হাজারের বেশী বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীকে খুন করার পরও শেখ মুজিব নেতার মর্যাদা পায়। তার দলকেও জনগণ ভোট পায়।এবং দলটি দেশ শাসনেরও সুযোগ পায়।যেদেশে চোর-ডাকাত ও খুনিগণও নেতা এবং নির্বাচিত শাসকের মর্যাদা পায়, তখন কি বুঝতে বাঁকি থাকে সেদেশে নৈতীক পচনটি কত গভীর? এমন দেশে নির্বাচন শতবার হলেও কি কোন পরিবর্তন আসে? নৈতীক রোগ কি নির্বাচনে সারে? বরং প্রতি নির্বাচনে চোর-ডাকাতগণই যে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হবে সেটিই কি স্বাভাবিক নয়?

দেশে ফসলের ফলন না বাড়লে বীজ, ভূমি, জলবায়ু বা কৃষকের দোষ হয়। মানুষের চরিত্রে ও মূল্যবোধে প্রচন্ড অবক্ষয় দেখা দিলে দেশটির শিক্ষক, শিক্ষালয়, শিক্ষাব্যবস্থা ও বুদ্ধিজীবীরা কতটা ব্যর্থ সেটি ধরা পড়ে। শিক্ষা ও সাহিত্যের ময়দান থেকে মানুষ একটি সমৃদ্ধ চেতনা পাবে, উন্নত মূল্যবোধ নির্মিত হবে এবং তা থেকে সমাজ একটি সভ্যতর স্তরে পৌঁছবার সামর্থ পাবে সেটি কাঙ্খিত ছিল। কিন্তু তা হয়নি। বরং শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীরাই মূলত জন্ম দিয়েছেন বর্তমান অবক্ষয়ের। মাছের পচন যেমন মাথা থেকে শুরু হয়, তেমনি জাতির পচনের শুরুও বুদ্ধিজীবীদের থেকে। তাদের কারণেই বাংলাদেশের শিক্ষিত সমাজই সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত সমাজ। তাদের সাথে যাদেরই সাহচর্য বেড়েছে তারাই রোগাগ্রস্ত হয়েছে চৈতন্য, চরিত্রে ও মূল্যবোধে। আমাদের বুদ্ধিজীবীদের এ ব্যর্থতার বড় কারণ, তাদের অধিকাংশই কোন না কোন মিথ্যাচারী নেতার আশ্রিত ও গৃহপালিত রাজনৈতিক শ্রমিক। সমাজে মূল্যবোধের প্রতিষ্ঠার চেয়ে এসব নেতাদের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠাই তাদের মূল লক্ষ্য। নেতাদের মিথ্যাচার ও চারিত্রিক কদর্যতাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়ার পরিবর্তে সে মিথ্যাচারের প্রচারে তারা বরং স্বেচ্চছায় তাদের চাকর-বাকরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতাগণ যে কতটা মিথ্যাচারী এবং আমাদের শিক্ষক, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীরা সে মিথ্যা প্রচারে যে কতটা বিবেকবর্জিত তার সবচেয়ে চোখা ধাঁধানো নজির হলো শেখ মুজিবের একাত্তরে ৩০ লাখের মৃত্যুর তথ্য। আমাদের বুদ্ধিজীবীদের মিথ্যাচারিতা ও দুষ্কর্ম তুলে ধরার জন্য এই একটি মাত্র দৃষ্টান্তই যথেষ্ট। যে কোন ধর্ম যে কোন মূল্যবোধই মানুষকে সত্যবাদী হতে শেখায়। সত্যবাদী হতে বলে এমনকি শত্রুর বিরুদ্ধেও। খুনের আসামীর বিরুদ্ধেও তাই দুনিয়ার কোন আদালতই মিথ্যা বলার অধিকার দেয়না। বন্ধুর সামনে ফেরেশতা সাজা তো মামূলী ব্যাপার। সত্যবাদীতার প্রমাণ হয় তো শত্রুর বিরুদ্ধে মিথ্যা না বলায়। মিথ্যার প্রতি আসক্তিই ব্যক্তির চেতনার ও চরিত্রের সঠিক পরিমাপ দেয়। এ পরিমাপে শেখ মুজিবই শুধু নয়, তার অনুগত বুদ্ধিজীবীরাও সত্যবাদী প্রমাণিত হননি। শেখ মুজিব কোনরূপ জরিপ না করেই বলেছেন, একাত্তরে ৩০ লাখ মানুষ নিহত হয়েছে। সে সময় বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি। অর্থাৎ ৭৫ মিলিয়ন। ৭৫ মিলিয়নের মধ্যে ৩০ লাখ বা তিন মিলয়ন নিহত হলে প্রতি ২৫ জনে একজন নিহত হতে হয়। স্কুলের ছাত্ররা এ হিসাব বুঝে। যে গ্রামের প্রতি বাড়িতে গড়ে ৫ জনের বাস সে গ্রামে প্রতি ৫ বাড়িতে একজনকে নিহত হতে হয়। অতএব যে গ্রামে ১০০ ঘর আবাদী সেখানে কমপক্ষে ২০ জনকে প্রাণ দিতে হয়। সে গ্রামে যদি কেউই মারা না যান তবে পাশের সম বসতিপূর্ণ গ্রামে ১০০ ঘরে ৪০ জনকে নিহত হতে হবে। নইলে ৩০ লাখের হিসাব মিলবে না। বাংলাদেশে যাদের বাস তারা শেখ মুজিবের এ মিথ্যা তথ্য বুঝলেও বাঙালী বুদ্ধিজীবীদের অধিকাংশই সেটি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর, আদালতের উকিল বা পত্রিকার কলামিস্ট হয়েও এখনও সে কথা নির্দ্বিধায় বলেন। মিথ্যাচারী হওয়ার জন্য এটুকুই কি যথেষ্ট নয় যে, কোন কথা শুনা মাত্র তার সত্যাসত্য বিচার না করেই সে বলে বেড়াবে? বাঙালী বুদ্ধিজীবীদের মিথ্যাচারীতা প্রমাণের জন্য এটিই কি সবচেয়ে বড় দলিল নয়?

 

সবচেয়ে বড় দায়ভার

সব পাপের জন্ম মিথ্যা থেকে। নবীজী (সাঃ) ব্যাভিচার, চৌর্যকর্ম ও মিথ্যাচারে লিপ্ত এক ব্যক্তিকে চারিত্রিক পরিশুদ্ধির জন্য প্রথমে যে পাপ কর্মটি পরিত্যাগ করতে উপদেশ দিয়েছিলেন সেটি হলো এই মিথ্যাচার। নানা পাপের বেড়াজাল থেকে মুক্তি পেতে হলে বাংলাদেশেও সে কাজটি শুরু করতে হবে মিথ্যাচারী রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তি পরিত্যাগের মধ্য দিয়ে। মিথ্যা ও মিথ্যাচারীদের দূরে হঠাতে পারলে অন্য সব পাপাচার এমনিতেই দূর হবে। নইলে সমাজের দুর্বৃত্ত মিথ্যাচারিরা শুধু দেশের নেতা, মন্ত্রী বা বুদ্ধিজীবী নয়, জাতির পিতা হওয়ারও স্বপ্ন দেখবে। কারণ,কোন জাতি মিথ্যাচারিতায় ডুবলে সে জাতির ফেরাউনরা শুধু রাজা নয়, খোদা হওয়ারও স্বপ্ন দেখে। এটিই ইতিহাসের শিক্ষা। তাই সব যুগের ফেরাউনেরাই মিথ্যাকে প্রচন্ড গণমুখিতা দিয়েছে। আর সে কাজে চাকর-বাকর রূপে ব্যবহার করেছে রাষ্ট্রের বুদ্ধিজীবীদের। কারণ, মিথ্যাচারের প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় তাদের ন্যায় কার্যকর চাকর-বাকর আর নেই। এজন্যই মধ্যযুগের স্বৈরাচারী রাজাদের দরবারে বহু গৃহপালিত সভাকবি থাকতো। তেমনি বাংলাদেশেও বুদ্ধিজীবীর বেশে এমন গৃহপালিত চাকর-বাকরের সংখ্যা বহু হাজার। তারা মুজিবের ন্যায় বাকশালী স্বৈরাচারি দুর্বৃত্তকে ফিরাউনের ন্যায় খোদা রূপে প্রতিষ্ঠা দিতে না পারলেও অন্ততঃ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী রূপে প্রচার করেছে। তবে এ মিথ্যার প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের বুকে দেশী পুঁজির পাশাপাশি বিদেশী শত্রুদের পুঁজি নিয়োগও হয়েছে বিস্তর। বিপুল অর্থ এসেছে ভারত থেকে। বাংলাদেশকে সত্যকে প্রতিষ্ঠা দিতে হলে বুদ্ধিবৃত্তির নামে পারিচালিত এমন মিথ্যাচারিতাকে অবশ্যই নির্মূল করতে হবে।

কারণ, ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে মৃত্যু ঘটে শুধু দেহের জীবকোষের, কিন্তু মিথ্যাচরিতায় মৃত্যু ঘটে বিবেকের। ফলে মানুষ তখন অসভ্য অমানুষে পরিণত হয়। ফলে যক্ষা, কলেরা, টাইফয়েডের মহামারীতে বাংলাদেশের যতটা ক্ষতি হয়েছে বা হচ্ছে, তার চেযে অনেক বেশী ক্ষতি হচ্ছে মিথ্যাচারিতার ব্যাপ্তিতে। দুর্নীতিতে বিশ্বে প্রথম হওয়ার মূল কারণ এটিই।একই কারণে দেশবাসীর ঘাড়ের উপর চেপেছে এক অসভ্য সরকার। আর সবচেয়ে বেশী ক্ষতি অপেক্ষা করছে আখেরাতে। মিথ্যাচারিতার যে বীজ আমাদের রাজনৈতিক নেতা ও বুদ্ধিজীবীদের দ্বারা অতীতে প্রোথিত হয়েছিল তা এখন পরিণত হয়েছে প্রকান্ড মহিরুহে। মিথ্যার অনিবার্য ফসল যে সীমাহীন দুর্নীতি ও দুর্বৃত্ত-শাসন, তা নিয়ে বাংলাদেশ আজ বিশ্ববাসীর সামনে শিক্ষনীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে। নৈতিকতার ক্ষেত্রে জাতিকে এ মিথ্যাচার বরং তলাশূন্য করে ফেলেছে। এ রোগ বিপন্ন করছে আমাদের ইজ্জত নিয়ে বাঁচাকে। মুসলমান হওয়ার অর্থই হলো আমৃত্যু সত্যের পক্ষে সাক্ষী দেয়া এবং মিথ্যার রূপকে উন্মোচিত করা। এটিই মুসলিম হওয়ার প্রধান ধর্মীয় দায়বদ্ধতা। কিন্তু সে কাজটিই মুসলিম সমাজে যথার্থ ভাবে হয়নি। ইসলাম ও সত্যের বিরুদ্ধে এখানেই হয়েছে বাঙালী মুসলমানদের সবচেয়ে বড় অপরাধ। সে সাথে ঘটেছে ইসলামের সাথে সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা। ফলে দুর্বৃত্ত মিথ্যুকগণ চেপে বসেছে তাদের মাথার উপর। তাতে অসম্ভব হয়েছে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা ও ইসলামের বিজয়।

মিথ্যার সামনে এরূপ নীরবতা ও সদাচারিতা থেকে এরূপ বিচ্যুতি কি একটি জাতিকে কখনো সাফল্য দিতে পারে? শুধু দেশ গড়া নয়, মুসলমান হওয়ার জন্যও সত্য-চর্চার বিকল্প নেই। আর মিথ্যা তো দুরীভূত হয় একমাত্র সত্যকে প্রতিষ্ঠা দেয়ার মধ্য দিয়ে। যেমন অন্ধকার অপসারিত হয় একমাত্র আলোর আগমনের পরই। আর সে আলো জ্বালানোর মূল দায়িত্বটি নিবে সত্যাচারী বুদ্ধিজীবী বা আলেমগণ –সেটিই তো নিয়ম। বনি ইসরাইলের আলেমগণ সে দায়ভার পালন করেনি বলেই পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা তাদেরকে ভারবাহি গাধার সাথে তুলনা করেছেন। কারণ, গাধা শুধু আল্লাহর কিতাবের ভারই বহন করতে পারে, আল্লাহর দেয়া নির্দেশাবলীকে প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। অথচ আল্লাহর দ্বীনের প্রতিষ্ঠার কাজে প্রতিটি মু’মিন হলো আল্লাহর খলিফা ও তাঁর রাসুলের (সাঃ) প্রতিনিধি। তাই একাজ শুধু আলেম বা মাদ্রাসার শিক্ষকদের কাজ নয়, এ কাজ প্রতিটি মুসলমানের। মু’মিনের জীবনে দেশ গড়া এবং দেশের প্রতিরক্ষার লাগাতর প্রয়াস শুরু হয় তো এমন এক দায়বদ্ধতা থেকেই। একমাত্র তখনই দেশে ইসলামের বিজয় ও অসভ্য সরকারের নির্মূল অনিবার্য হয়।২০/০৫/২০১৪