অশিক্ষা ও কুশিক্ষার নাশকতা – প্রথম পর্ব

শিক্ষার কুফল –
মানব জীবনের মূল সাফল্যটি স্রেফ মনুষ্য প্রাণী রূপে বাঁচায় নয়। সেটি পরিপূর্ণ ঈমানদার রূপে বাঁচায়। আর ঈমানের পুষ্টি কখনোই খাবারের প্লেটে, সম্পদে বা ঔষধে মেলে না। সেটি আসে পবিত্র কোরআনের জ্ঞানে। ফলে কোরআনের জ্ঞানের শূন্যতা নিয়ে যে শিক্ষা তার কুফলটি অতি ভয়ংকর। এমন শিক্ষাই মূলতঃ কুশিক্ষা। এমন কুশিক্ষার ফলেই মানব শিশু অতি হিংস্র ও ইতর দুর্বৃত্তে পরিণত হয়। সে কুশিক্ষা পরকালে জাহান্নামের আগুনেও হাজির করে। মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বড় ক্ষতিগুলো কোন কালেই হিংস্র পশু, রোগজীবাণু, ঘুর্ণিঝড়, ভূমিকম্প বা সুনামীর কারণে হয়নি। সে বীভৎস বর্বরতাগুলো ঘটেছে এমন সব দুর্বৃত্তদের হাতে যারা বেড়ে উঠেছে অশিক্ষা ও কুশিক্ষার মধ্য দিয়ে। তাই মানব সমাজে সবচেয়ে বড় নেক কর্মটি অর্থদান, খাদ্যদান বা চিকিৎসা-দান নয়, সেটি সুশিক্ষা-দান। এবং সবচেয়ে জঘন্য অপরাধ কর্মটি হলো কুশিক্ষা-দান। কুশিক্ষার কারণে মানব সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়ে যায়। কুশিক্ষিত সে ইতর মানুষটি মহান আল্লাহতায়ালার খলিফা হওয়ার বদলে শয়তানের খলিফায় পরিণত হয়। মুসলিম রূপে বেড়ে উঠা দূরে থাক, সাধারণ মানুষ রূপে বেড়ে উঠাও তার পক্ষে অসম্ভব হয়। কুশিক্ষা এভাবেই মানব জীবনে সবচেয়ে বড় নাশকতাটি ঘটায়। এমন ব্যক্তির দেহের পুষ্টিতে নাশকতা বাড়ে ইসলামের বিরুদ্ধে। অপর দিকে শত কোটি টাকা দানেও কাউকে জাহান্নামের আগুণ থেকে বাঁচানো যায় না। দানের অর্থ গুনাহের কাজে বিনিয়োগ করে সে ব্যক্তি বরং জাহান্নামের বাসিন্দা হতে পারে। এজন্যই মহান আল্লাহর সূন্নত, তিনি যখন কারো সবচেয়ে বড় কল্যানটি করেন, তাকে পবিত্র কোরআনের জ্ঞান দান করেন।

কোরআনী জ্ঞান ব্যক্তিকে যেমন মানব-সৃষ্টির মূল রহস্যটি জানায়, তেমনি জানায় মানব-জীবনের মূল মিশনটি। এভাবে সে জ্ঞান যেমন প্রকৃত মানব রূপে বেড়ে উঠতে সাহায্য করে, তেমনি পদে পদে জান্নাতের পথও দেখায়। সে জ্ঞানের বরকতেই মানুষ জাহান্নামের পথে ধাবিত হওয়ার মহাবিপদ থেকে বাঁচে। তখন ব্যক্তি পায় মহান আল্লাহতায়ালার প্রিয় বান্দা রূপে বেড়ে উঠার সামর্থ্য। এবং সে জ্ঞানের অভাবে অজানা থেকে যায় জীবনের মূল মিশন, ইবাদতের সঠিক বিধান, শরিয়তী আইন, ন্যায়-অন্য়ায়ের সংজ্ঞা এবং জান্নাত-জাহান্নাম –এরূপ বহু বিষয়। তখন জীবন ভরে উঠে অজ্ঞতার অন্ধকারে ও ব্যর্থতায়। অপরদিকে ওহীর জ্ঞানে যারা সুশিক্ষিত হয় তারা বেড়ে উঠে মহান আল্লাহতায়ালা দায়িত্ববান খলিফা রূপে। শ্রেষ্ঠ এ মানুষদের নিয়ে স্বয়ং মহান আল্লাহতায়ালাও ফেরেশতাদের মাঝে গর্ব করেন। সমগ্র মানব জাতির কল্যাণে মহান আল্লাহতায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ দানটি তাই সোনা-রূপা, তেল-গ্যাস বা অঢেল সম্পদ নয়; সেটি হলো আল-কোরআনের জ্ঞান। সে জ্ঞানের বলেই প্রাথমিক যুগের মুসলিমগণ বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয়েছিলেন; এবং গড়েছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা।

যে শিক্ষায় ওহীর জ্ঞান নাই, সেখানে সুশিক্ষা ও সুসভ্যতা গড়ার উপকরণও নাই। সেটিই মূলতঃ কুশিক্ষা। সে শিক্ষায় সৃষ্টি হয় না জান্নাতের পথ চেনা ও সে পথে চলার সামর্থ্য। মানব জাতির সকল ব্যর্থতার মূল কারণ হলো এ কুশিক্ষা। এতে মানব শিশু বেড়ে উঠে হিংস্র পশুর চেয়ে বহুগুণ হিংস্র জীব রূপে। পশুর হাতে পারমানবিক বোমা, রাসায়নিক বোমা, ক্লাস্টার বোমা, মিজাইল, ও ড্রোন থাকে না। কিন্তু মানব রূপী এ হিংস্র জীবদের থাকে। তাদের হাতে রক্ত ঝরে কোটি কোটি মানুষের। এবং বিধ্বস্ত হয় শত শত নগর-বন্দর। তখন উদ্বাস্তু হয় লক্ষ লক্ষ মানুষ। সিরিয়া, ইরাক, ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান, আরাকান, কাশ্মিরসহ পৃথিবীর নানা দেশে গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চলছে তো এসব হিংস্র জীবদের হাতেই। মানব সভ্যতার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা তাই কৃষি ও শিল্প খাতে নয়, সেটি শিক্ষা খাতে। শিক্ষা খাতের এ ব্যর্থতার কারণেই মানব ব্যর্থ হচ্ছে উচ্চতর মানবিক গুণ নিয়ে বেড়ে উঠতে। সে কুশিক্ষার কারণেই সৃষ্টি হয়েছে পূজিবাদ, উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, জাতীয়তাবাদ, কম্যুনিজম, বর্ণবাদ, বর্ণবাদী নির্মূলীকরণ, বিশ্বযুদ্ধ ও পারমানবিক অস্ত্রের ন্যায় নানাবিধ ঘাতক মতবাদ ও নাশকতার উপকরণ।

সুশিক্ষার প্রধান উপকরণটি হলো, ওহীর জ্ঞান। সে জ্ঞান ভিন্ন মুসলিম হওয়া অসম্ভব। ওহীর জ্ঞানার্জন এজন্যই সর্বপ্রথম ফরজ ঘোষিত হয়েছে। তাই “ইকরা” তথা পড়ো এবং পবিত্র কোরআন থেকে জ্ঞানার্জন করো -সেটি মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে নবীজী (সাঃ)র উপর নাযিলকৃত প্রথম নির্দেশ। নামায-রোযা, হজ-যাকাত ফরজ হয়েছে প্রায় এক যুগ পর। ব্যক্তির ঈমান মজবুত হয় এবং ইবাদত যথার্থ হয় তো ওহীর জ্ঞানে। অথচ আজকের মুসলিমদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাটি হলো পবিত্র কোরআনের জ্ঞানার্জনে। তারা যেন মুসলিম রূপে বাঁচতে চায় ও মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করতে চায় তাঁর দেয়া গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশাবলি না পড়ে ও না বুঝেই!

অক্ষরজ্ঞান, লিখনির জ্ঞান বা গণিতের জ্ঞানে নিরক্ষতা দূর হয় বটে, তবে তাতে অশিক্ষা ও কুশিক্ষা দূর হয় না। বরং অশিক্ষা ও কুশিক্ষার হিংস্র নাশকতা তাতে আরো ভয়ংকর ও রক্তাক্ত হয়। দুইটি বিশ্বযুদ্ধ বাধিয়ে যারা সাড়ে সাত কোটি মানুষকে হত্যা করলো, ধ্বংস করলো হাজার হাজার নগর-বন্দর এবং ধুলিস্যাৎ করলো বহু কোটি ঘর-বাড়ি ও কল-কারখানা -তাদের কেউ কি নিরক্ষর ছিল? এশিয়া, আফ্রিকা, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার বিশাল ভু-ভাগকে যেসব ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদীগণ জবর-দখল করলো, লুন্ঠন করলো এবং সেসব দেশের বহু কোটি আদিবাসীকে হত্যা করলো বা দাসরূপে কেনাবেচা করলো –তাদের কেউ কি নিরক্ষর ছিল? আজও যেসব আগ্রাসীদের হাতে ফিলিস্তিন, ইরাক, সিরিয়া, কাশ্মির, আরাকান ও আফগানিস্তানের বহু লক্ষ মানুষ নির্যাতিত ও নিহত হচ্ছে এবং হাজার হাজার নারী ধর্ষিতা হচ্ছে তাদের কেউ কি নিরক্ষর? হিটলারের মত নৃশংস স্বৈরাচারি বা ডোনাল্ড ট্রাম্পের ন্যায় বর্ণবাদি ও মিথ্যাবাদী দুর্বৃত্তকে যারা নির্বাচনে বিজয়ী করেছে তারাও কি নিরক্ষর? শুধু তাই নয়। এমন কি বাংলাদেশের ন্যায় একটি মুসলিম দেশকে দূর্নীতিতে যারা বিশ্বে ৫ বার প্রথম স্থানে পৌঁছে দিল এবং মৌলিক মানবিক অধিকার হনন করে বাকশালী স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠা দিল -তারাও কি দেশটির নিরক্ষর সাধারণ মানুষ? বরং দুর্বৃত্তির এ নায়কগণ তো কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী নেতানেত্রী, পুলিশ ও প্রশাসনিক কর্মচারি। নিরক্ষরতা দূর হলেও অশিক্ষা ও কুশিক্ষার নাশকতা যে দূর হয় না -এটি তো তারই প্রমাণ। অশিক্ষা ও কুশিক্ষার কারণে মানুষ শুধু পশু নয়, পশুর চেয়েও ভয়ংকর জীবে পরিণত হয় –সে প্রমাণ তো অসংখ্য। সে ঐতিহাসিক সত্য নিয়ে মহান আল্লাহতায়ালার নিজের ঘোষণাটি হলোঃ “উলা’য়িকা কা’আল আনয়াম, বাল হুম আদাল”। অর্থঃ তারাই হলো পশু, বরং পশুদের চেয়েও নিকৃষ্ট।

শয়তানি শক্তির নাশকতা
কোন দেশ যখন মানবরূপী হিংস্র জীবদের হাতে অধিকৃত হয় তখন ভয়ংকর বিপদ ঘনিয়ে আসে গণ-জীবনে। সে দেশে মহান আল্লাহতায়ালার নাযিলকৃত ওহীর জ্ঞানচর্চা যেমন নিষিদ্ধ হয়, তেমনি শরিয়তি আইনের বদলে প্রতিষ্ঠা পায় কুফরি আইন। তখন শুধু বর্বর স্বৈরাচার, নৃশংস নির্যাতন, বিনা বিচারে হত্যা, সন্ত্রাস, দুর্নীতি, দেশের রাজস্ব লুন্ঠন ও মৌলিক অধিকার হননই এজেন্ডায় পরিণত হয় না, বরং সর্বাত্মক চেষ্টা হয় সত্যের বিলুপ্তি ও সমগ্র জনগণকে দ্রুত জাহান্নামের দিকে নেয়ায়। অতীতে সেরূপ দুর্বৃত্তিতে নেমেছিল নমরুদ ও ফিরাউনের ন্যায় স্বৈরাচারি শাসকবর্গ। যুগে যুগে এরাই নবী-রাসূলদের মিশনের প্রবল প্রতিপক্ষ রূপে দাঁড়িয়েছে। এসব নরপশুদের কারণে হযরত ইব্রাহীম (আঃ), হযরত মূসা (আঃ) ও হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)র মত মানব ইতিহাসের অতি শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদেরও নিজ জন্ম ভূমি ছাড়তে হয়েছে। ইসলামের দুশমনদের হাতে কোন দেশ অধিকৃত হওয়ার মূল বিপদ তো এটিই। যেখানে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা নাই এবং শিক্ষাঙ্গণে কোরআনী জ্ঞানের চর্চা নাই, বুঝতে হবে সে দেশের উপর দখলদারিটি মূলতঃ শয়তানী শক্তির। মহান আল্লাহতায়ালা মানব জাতিকে শয়তানী শক্তির হাতে অধিকৃতির এ মহাবিপদ থেকে মুক্তি দিতে চান। সেটি ঈমানদারদের হাত দিয়ে। এজন্যই ঈমানদারদের প্রতি মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশ তাঁর আনসার তথা সাহায্যকারি হওয়ার। সুরা সাফ’য়ের ১৪ নম্বর আয়াতে তাই বলা হয়েছেঃ “হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহতায়ালার সাহায্যকারি হও।” সুরা সাফ’য়ের ১০-১১ আয়াতে তাদের জন্য একটি ব্যবসার কথাও বলা হয়েছে -যা মুক্তি দেয় জাহান্নামের কঠিন আযাব থেকে। বলা হয়েছেঃ “হে ঈমানদারগণ, তোমাদের কি এমন এক ব্যবসার কথা বলবো -যা মুক্তি দিবে কঠিন আযাব থেকে? সেটি হলো, তোমরা ঈমান আনো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করো তোমাদের সম্পদ ও জান দিয়ে। এটাই তোমাদের জন্য কল্যানকর যদি তোমরা বুঝতে। “তাই মানব জীবনে শ্রেষ্ঠ নেক কর্মটি সন্যাসীদের ন্যায় ধ্যানে বসা নয়, বরং জাহান্নামের আগুনে নেয়ার শয়তানী প্রকল্পের নির্মূলে যুদ্ধে নামা। ইসলামে এটিই পবিত্রতম জিহাদ। একমাত্র এ পথেই সুশিক্ষার প্রতিষ্ঠা ঘটে, এবং মুক্তি ঘটে জাহান্নামের পথ থেকে।

যুগে যুগে মানবরূপী হিংস্র জীবগণ শুধু যে মন্দির বা গির্জা গড়ায় পরিচর্যা দিয়েছে -তা নয়; বরং অসম্ভব করে তুলেছে সুশিক্ষার বিস্তারকে। তারা জানে, শিক্ষার সামর্থ্য বিস্ময়কর। এটি যে শুধু জান্নাতের পথ দেখায় –তা ¬¬¬¬¬নয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি অতি ব্যাপক ভাবে ব্যবহৃত হতে পারে ইসলাম দিকে দূরে সরানোর কাজে -তথা জাহান্নামের পথে নেয়ায়। তাই প্রতিদেশে ইসলামের বিপক্ষ শক্তির এজেন্ডা হলো, কোরআনী জ্ঞান-ভিত্তিক সুশিক্ষাকে বিলুপ্ত বা নিয়ন্ত্রন করা এবং ওহীর জ্ঞান বিরোধী কুশিক্ষার প্রতিষ্ঠা দেয়া। কম্যুনিস্ট শাসিত দেশগুলিতে এজন্যই মসজিদ-মাদ্রাসাগুলোকে ঘোড়ার আস্তাবল বানানো হয়েছিল। কুশিক্ষার দেশে তাই যুদ্ধাস্ত্র, কৃষি, শিল্প ও বিজ্ঞানে উন্নয়ন হলেও সে দেশগুলিতে কঠিন হয়ে পড়ে মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশিত পথে বাঁচা। সমগ্র রাষ্ট্রীয় শক্তি ও তার বিশাল অবকাঠামো তখন ব্যবহৃত হয় মিথ্যার প্রসার বাড়াতে ও সত্যের নির্মূলে। মিথ্যা যখন প্রবল ভাবে বিজয়ী হয়, ফিরাউনের ন্যায় দুর্বৃত্তগণও তখন ভগবান রূপে প্রতিষ্ঠা পায়। গণহত্যার নায়কগণও তখন দেশবাসীর নেতা, পিতা ও বন্ধু রূপে প্রতিষ্ঠা হয়।

মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীন প্রতিষ্ঠা না পেলে মিথ্যাসেবীদের শক্তি দেশ জুড়ে ভয়ানক নাশকতা ঘটায়। তখন দেশ পরিণত হয় জনগণকে জাহান্নামে পৌছানোর বাহনে। হিংস্র পশু, মহামারি, সুনামী বা ভূমিকম্প সেটি করে না। তাই ইসলামে শ্রেষ্ঠতম কাজটি হিংস্র পশু হত্যা নয়, মশা-মাছি নির্মূলও নয়। বরং সেটি রাষ্ট্রের বুক থেকে মানবরূপী হিংস্র জীবদের নির্মূল। মহান নবীজী (সাঃ) ও তাঁর সাহাবাগণ আমৃত্যু সেটিই করেছিলেন। সেটি না হলে কোরআন শিক্ষা, প্রকৃত ইসলাম নিয়ে বেড়ে উঠা, সিরাতুল মুস্তাকীমে চলা ও ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা অসম্ভব হতো। মুসলিমগণ তাতে ব্যর্থ হতো ইসলামী সভ্যতার নির্মাণে –যেমনটি আজ হচ্ছে। ইসলামের বিপক্ষ শক্তির নির্মূলের কাজটি না হলে রাষ্ট্র জুড়ে যা প্রতিষ্ঠা পায় সেটি হলো শয়তানী শক্তির এজেন্ডা। ইসলামের বিপক্ষ শক্তি তখন বিজয়ী শক্তি রূপে আবির্ভূত হয়। তাতে বিলুপ্ত হয় মহান আল্লাহর দেয়া শরিয়তি বিধান; এবং নিষিদ্ধ হয় পবিত্র কোরআনের জ্ঞান বিতরণ। কোন ঈমানদার ব্যক্তি কি এমন অধিকৃতির মুখে নীরব বা নিরপক্ষ থাকতে পারে? মানব সভ্যতার অতি গুরুত্বপূর্ণ কর্ম হলো এরূপ অধিকৃতি থেকে মুক্তি লাভের যুদ্ধ। এমন যুদ্ধ ইসলামে জিহাদ; এ জিহাদে নিহত হলে শহীদ রূপে সরাসরি প্রবেশ ঘটে জান্নাতে। কবরের আযাব, পুলসিরাত ও রোজ হাশরের কঠিন দুর্যোগ থেকে এমন শহীদদের জীবন হবে মুক্ত। এরূপ বিশাল পুরস্কার অন্য কোন নেক কর্মে নেই। অপরদিকে ইসলামের বিপক্ষ শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ ও তাদের সাথে সহযোগিতার শাস্তিটিও ভয়ানক। এবং সেটি অনন্ত কালের। সেটি শুরু দুনিয়ার জীবন থেকেই। দুশমনের অধিকৃ্তির বিরুদ্ধে জিহাদ না থাকায় মুসলিম উম্মাহ বস্তুতঃ আজ সে শাস্তিরই গ্রাসে।

বাঙালী মুসলিম জীবনে কুশিক্ষা ও ব্যর্থতা
বাঙালী মুসলিমের জীবনে আজ যেরূপ শরিয়তের বিলুপ্তি ও ইসলামের বিপক্ষ শক্তির জয়জয়াকার –সেটিও হঠাৎ সৃষ্টি হয়নি। এটি হলো ১৭৫৭ সালে কাফের শক্তির হাতে অধিকৃত ও গোলাম হওয়ারই ধারাবাহিকতা। পাপ এখন এক স্থায়ী আযাবে রূপ নিয়েছে। বাংলার মাটিতে মুসলিমদের এ দুর্দশা ও ইসলামের এ পরাজয়ের পিছনে রয়েছে বাঙালী মুসলিমের দায়িত্ব পালনে প্রচণ্ড ব্যর্থতা। গাদ্দারীর অপরাধ ঘটেছে মহান আল্লাহতায়ালার কোরআনি নির্দেশের বিরুদ্ধে। মুসলিম জীবনে অনিবার্য দায়ভার হলো, কাফের শক্তির আগ্রাসনের মুখে নিজ দেশকে প্রতিরক্ষা দেয়া। নইলে অসম্ভব হয় প্রকৃত ইসলাম-পালন ও প্রকৃত মুসলিম রূপে বেড়ে উঠা। দখলদার কাফের শক্তি মুসলিম ভূমিতে নামায-রোযা নিষিদ্ধ না করলেও বিলুপ্ত করে কোরআনের জ্ঞান-চর্চা। বিদ্যাশিক্ষার নামে তারা চালু করে কুশিক্ষা এবং ইসলামী জ্ঞানের শিকড় কাটার প্রকল্প। এভাবে তারা অসম্ভব করে ঈমানে পুষ্টিলাভ ও ইসলাম নিয়ে বাঁচা। অধিকৃত দেশের পরাধীন মুসলিমগণ তখন অন্য মুসলিমের কল্যাণে আর কি ভূমিকা রাখবে? তারা ব্যর্থ হয় এমন কি নিজেদের পার্থিব ও পরকালীন কল্যাণে অবদান রাখতে। এজন্যই নামায-রোযা, হজ-যাকাতের পাশাপাশি ইসলামে সর্বশ্রেষ্ঠ ফরজ ইবাদতটি হলো, দুশমনের হামলার মুখে মুসলিম ভূমিকে সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিরক্ষা দেয়া। নবীজী (সাঃ)র হাদীসঃ দেশের সীমান্তে এক মুহুর্তের পাহারাদারীর সওয়াব সারা রাত নফল ইবাদতের চেয়ে অধীক।

মু’মিনের সর্বক্ষণের প্রস্তুতিটি তাই শুধু ৫ ওয়াক্ত নামাযের নয়, বরং হানাদার দুশমনদের বিরুদ্ধে জিহাদেরও। সেটিই মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশ। তাই ঈমানদারকে শুধু নামাযী হলে চলে না, আমৃত্যু মুজাহিদও হতে হয়। নইলে মুসলিম দেশের স্বাধীনতা যেমন বাঁচে না, তেমনি ঈমান বাঁচেনা মুসলিম সন্তানদের। পবিত্র কোরআনের ঘোষণাঃ “তোমরা সর্বশক্তি দিয়ে প্রস্তুত হও তাদের (দুশমনদের) বিরুদ্ধে। এবং (যুদ্ধের জন্য) ঘোড়ার লাগামকে শক্তভাবে বাঁধো। এবং ভীত-সন্ত্রস্ত করো তোমাদের এবং আল্লাহর দুশমনদের।”- (সুরা আনফাল, আয়াত ৬০)। তাই দুশমনদের সৃষ্ট সন্ত্রাসে সন্ত্রস্ত হওয়া ঈমানদারের কাজ নয়। বরং ঈমানদার সন্ত্রস্ত করে দুশমনদের। এমন এক চেতনার কারণেই নবীজী (সাঃ)র এমন কোন সাহাবী ছিলেন না যার জীবনে জিহাদের প্রস্তুতি ছিল না। দুশমনের পক্ষ থেকে যখনই হামলা হয়েছে, সাথে সাথে তারা রণাঙ্গনে হাজির হয়েছেন। শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবী শহীদও হয়েছেন। কোন ভীরুতা বা কাপুষতা তাদের মাঝে দেখা দেয়নি। অথচ সে সময় মুসলিমদের সংখ্যা বাংলাদেশের একটি জেলার সমানও ছিল না। বিশ্বশক্তি রূপে মুসলিমদের উত্থানের মূলে ছিল তাদের সে জিহাদী চেতনা ও কোরবানী। সেদিন ঈমানদারদের জান ও মালের কোরবানী মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে সাহায্য নামিয়ে এনেছিল। তেমনি এক প্রস্তুতি ও কোরবানীর কারণে সংখ্যায় ক্ষুদ্র হয়েও আফগান মুসলিমগণ ব্রিটিশদের দুই বার পরাজিত করেছে। ব্রিটিশদের তখন ছিল বিশ্বশক্তির মর্যাদা। বিগত শতাব্দীর আশির দশকে পরাজিত করেছে আরেক বিশ্বশক্তি সোভিয়েত রাশিয়াকে। এবং আজ পরাজিত করছে মার্কিনী যুক্তরাষ্ট্রকে। আফগানদের এরূপ বার বার বিজয়ের পিছনে সে দেশের সরকার ও সরকারি সেনাবাহিনী ছিল না, বরং পুরা কৃতিত্বটি সেদেশের মুসলিম জনগণের।

আযাবের গ্রাসে
অশিক্ষা ও কুশিক্ষা থেকেই জন্ম নেয় অজ্ঞতা তথা জাহিলিয়াত। জাহিলিয়াত থেকে জন্ম নেয় পথভ্রষ্টতা। এবং পথভ্রষ্টদের উপর প্রতিশ্রুত আযাব শুধু পরকালেই আসে না; আসে এ পার্থিব জীবনেও। আযাব আসে যেমন ঘুর্ণিঝড়, ভূমিকম্প, সুনামী, মহামারি, দুর্ভিক্ষ ও প্লাবনের বেশে, তেমনি আসে দুশমন শক্তির হাতে অধিকৃতি, পরাধীনতা, বোমা বর্ষন, গণহত্যা, ধ্বংস ও নানা রূপ নির্যাতনের বেশে। সেরূপ আযাব অতীতে যেমন বার বার এসেছে, তেমনি এখনো আসছে। সে আযাব যেন আজকের মুসলিমদের চারি দিক দিয়ে ঘিরে ধরেছে। আযাবের ন্যায় পথভ্রষ্টতার আলামতগুলিও অদৃশ্য বা বায়বীয় কিছু নয়, খালি চোখেও সেগুলি দেখা যায়। সে পথভ্রষ্টতা হলো মহান আল্লাহর সার্বভৌমত্ব, শরিয়ত, শুরা, হুদুদ, খেলাফত ও কোরআনী জ্ঞান ছাড়াই জীবন কাটানো এবং সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনা করা।

তবে আযাবকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলাটাই ইসলামী চেতনাশূন্যদের রীতি। তাদের সেক্য়ুলার দর্শনে আযাব বলে কিছু নাই। তাই আযাবকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলে মহান আল্লাহতায়ালার অসীম কুদরতকে অস্বীকার করা। মহান আল্লাহতায়ালার অনুমতি ছাড়া যেখানে গাছের একটা পাতাও পড়ে না, সেখানে দুর্ভিক্ষ, ভূমিকম্প, মহামারি ও ঘুর্ণিঝড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয় কি করে? এগুলিকে কি আল্লাহতায়ালার রহমত বলা যায়? প্রকৃতির নিজস্ব কোন সামর্থ্য নাই। প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানই তো মহান আল্লাহতায়ালার সৃষ্টি। ফলে, সেগুলি যা কিছু করে তা স্রেফ মহান আল্লাহতায়ালার ইচ্ছাকে বাস্তবায়ন করতে। তাই ব্যক্তির ঈমানদারি শুধু মহান আল্লাহতায়ালার উপর বিশ্বাস নয়, বরং তাঁর প্রতিটি আযাবকে আযাব রূপে দেখাতেও। একমাত্র তখনই সে আযাব থেকে শিক্ষা নিতে পারে।

প্রতিটি রোগ-ভোগই অসুস্থ মানুষকে ভাবিয়ে তোলে। অথচ সে ভাবনাটি মৃত মানুষের থাকে না। তেমনি আযাবের ঘটনাও ভাবিয়ে তোলে প্রতিটি সুস্থ চেতনার মানুষকে। সে ভাবনাটি না থাকাই বরং চেতনার প্রচণ্ড অসুস্থততা। এ প্রেক্ষাপটে বাঙালী মুসলিমদের নিয়ে ভাবনার বিষয় যেমন অনেক; তেমনি শিক্ষার বিষয়ও অনেক। তাদের মূল ব্যর্থতাটি প্রকৃত মুসলিম রূপে বেড়ে উঠা ও ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায়। এবং সে ব্যর্থতা তাদের জীবনে হঠাৎ করে আসেনি। তারও একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আছে। তাই বর্তমানের এ আযাবকে বুঝত হলে অতীতের সে প্রক্ষাপটকে অবশ্যই বুঝতে হবে। কারণ, অতীতের মাঝেই তো বর্তমানের বীজ। তাই যাদের জীবনে সে ইতিহাসে পাঠ নাই, তারা ব্যর্থ হয় চলমান ব্যর্থতা ও বিপর্যয়ের কারণ বুঝতে। এবং ব্যর্থ হয় আযাব থেকে বেরুনোর পথ খুঁজে পেতে। ইতিহাস পাঠের গুরত্ব ইসলামে এজন্য়ই এতো অধীক।

মানব জীবনে দুর্যোগ আসে মূলতঃ দুটি কারণে। কখনো সেটি আসে পরিকল্পিত পরীক্ষা অংশ রূপে। সে পরীক্ষায় যারা সফলকাম হয়, মহান অআল্লাহতায়ালা তাদের জান্নাত দিয়ে পুরস্কৃত করেন। জান্নাত প্রাপ্তির জন্য তেমন একটি পরীক্ষায় কৃতকার্য হওয়াটি অনিবার্য। কখনো বা সে বিপর্যয় আসে পূর্বের পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়ার আযাব রূপে। এমন কি নবী-রাসূলদের জীবনেও এমন পরীক্ষা বার বার এসেছে। বাঙালী মুসলিমের জীবনে তেমনি একটি পরীক্ষা এবং সে পরীক্ষায় ভয়ানক ব্য়র্থতা এসেছিল ১৭৫৭ সালে। সেদিন কাফের হানদারদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সে দায়িত্বটি আদৌ পালিত হয়নি। সে সময় সবচেয়ে বড় অপরাধটি ঘটে হানাদার ইংরেজদের বিরুদ্ধে ফরজ জিহাদে অংশ না নেয়ায়। সেটি যেমন রাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে, তেমন জনগণের কাতার থেকে।

ইংরেজদের হামলার বিরুদ্ধে দেশ বাঁচানোর দায়িত্বটি স্রেফ নবাব সিরাজুদ্দৌলার একার ছিল না, সে দায়িত্বটি ছিল বাংলার প্রতিটি নাগরিকের। তাই পলাশীর যুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার অপরাধটি শুধু মীর জাফরের একার নয়। বাংলার জনগণ সেদিন জিহাদ সংগঠিত না করে পরিচয় দিয়েছে প্রচণ্ড ভীরুতা ও কাপুষতার। তাছাড়া জিহাদের ন্যায় ফরজ ইবাদত পালিত না হলে মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিশ্রুত আযাব না আসাটাই তো অস্বাভাবিক। বস্তুতঃ বাংলার বুকে সে আযাবটি এসেছিল প্রচণ্ড ভয়াবহতা নিয়েই। সেটি যেমন ১৯০ বছরের গোলামী নিয়ে, তেমন অনাহার, নির্যাতন এবং শোষণে জীবন নাশের মধ্য় দিয়ে। আজও চলছে সে আযাবের ধারাবাহিকতা। অথচ ১৭৫৭ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা আফগানিস্তানের চেয়ে কয়েকগুণ অধিক ছিল। তখন দেশে হাজার হাজার আলেম-উলামাও ছিল। ৮০ হাজারের বেশী মাদ্রাসা ছিল।

বাঙালী মুসলিমগণ ব্রিটিশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ থেকে বাঁচলেও দুর্ভিক্ষ থেকে বাঁচেনি। এক-তৃতীয়াংশ বাঙালী ( প্রায় এক কোটি) মারা গেছে ব্রিটিশদের শোষণে সৃষ্ট ১৭৬৯ সাল থেকে ১৭৭৩ সাল অবধি চলমান দুর্ভিক্ষে। বাংলার সমগ্র ইতিহাসে এতবড় বিশাল আকারের প্রাণনাশ কোনকালেই ঘটেনি। অথচ ব্রিটিশের হাতে অধিকৃত হওয়ার আগে বাংলাই ছিল সমগ্র এশিয়ার মাঝে সবচেয়ে সম্পদশালী দেশ। খাদ্যে ছিল স্বয়ংসম্পন্ন। বস্ত্র শিল্প উৎপাদনে ছিল বিশ্বে সেরা। বাংলার বস্ত্র বিশেষ করে মসলিন তুরস্ক, মিশর, ইউরোপ, এবং চীনসহ বিশ্বের নানা দেশে যেত। সরকারের ভাণ্ডার ছিল সোনা-রূপায় পরিপূর্ণ। ইতিহাসবিদদের মতে বাংলার উপর বিজয়ের সাথে সাথে সে গচ্ছিত সম্পদ ইংল্যান্ডে নিতে ২০০টির বেশী জাহাজ বাংলার তৎকালীন রাজধানী মুর্শিদাবাদ থেকে লন্ডন মুখি রওনা দেয়। সে লুন্ঠনের ফলে লর্ড ক্লাইভের মত ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্ণধারগণ রাতারাতি বিশ্বের ধনী ব্যক্তিতে পরিণত হয়।

ডাকাতদের লুন্ঠনে অভাব ও অনাহার আসবে -সেটিই তো স্বাভাবিক। তবে পার্থক্য হলো ডাকাতগণ মানুষের ঈমানে হাত দেয় না, জ্ঞানচর্চায়ও ব্যাঘাত ঘটায় না। অথচ কাফের শক্তির হাতে দেশ অধিকৃত হলে সবচেয়ে ভয়ানক ক্ষতিটি হয় ঈমানের ভূবনে। ইংরেজ শাসকদের হাতে সে নাশকতাটি অতি নৃশংস ভাবেই ঘটেছে। রাজস্বভাণ্ডার ও জনগণের অর্থভান্ডার শূন্য করার পাশাপাশি প্রচণ্ড নাশকতা ঘটিয়েছে ইসলামি জ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে। বাংলার মুসলিম জীবনে ইসলাম থেকে আজ যে বিশাল বিচ্য়ুতি এবং সর্বত্র যে দুর্বৃত্তি তার মূলে হলো প্রায় দুই শত বছরের কাফের শক্তির অধিকৃতি। আজও সে নাশকতা অব্যাহত রয়েছে সে শিক্ষানীতিতে বেড়ে উঠা সাম্রাজ্যবাদীদের আদর্শিক খলিফাদের হাতে। সে দীর্ঘকালীন নাশকতার ফলে বাংলার বুকে যে ইসলাম বেঁচে আছে সেটি নবীজী (সাঃ)র আমলের ইসলাম নয়। বেঁচে থাকা এ ইসলামে যেমন পবিত্র কোরআনে নির্দেশিত শরিয়ত, ইসলাম, শুরা, খিলাফত নাই, তেমনি নাই জিহাদের কোন ধারণা। এভাবে
কোরআনী জ্ঞানার্জনে ব্যাঘাত ঘটাতে সমর্থ হলে ইসলামে থেকে দূরে সরাতে মুসলিম সন্তানকে মন্দিরে বা গির্জায় নেয়ার প্রয়োজন পড়ে না। দেশ তখন অমুসলিম দেশের ন্যায় ইসলামশূন্য হয়। কোরআনের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার প্রকল্প নিয়েই লর্ড মেকলে ভারতে শিক্ষার নামে কুশিক্ষার নীতি প্রণয়ন করেন। বাংলাদেশে আজও বেঁচে আছে ইসলামশূন্য সে শিক্ষানীতি। ইসলামের প্রতিপক্ষ রূপে আজ যারা দেশের উপর দখল জমিয়েছে তারা তো সে শিক্ষা নীতিরই ফসল। ইসলাম থেকে দূরে সরা এসব কুশিক্ষিত মানুষদের প্রতারণাটিও জঘন্য়। নিজেদের ইসলাম বিরোধী অভিসন্ধি ঢাকতে নিজেদেরকে তারা মুসলিম রূপে পরিচয় দেয়। অথচ তাদের মূল যুদ্ধটি ইসলামের বিরুদ্ধে। এদের কারণেই ইসলামের বিজয় ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠা রুখতে বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলিতে বিদেশী কাফেরদের নামতে হচ্ছে না। সে কাজে নিজেরাই যথেষ্ট নৃশংসতার পরিচয় দিচ্ছে। সে বর্বর নৃশংসতা এবং ইসলামের বিরুদ্ধে চরম আপোষহীনতার কারণেই তারা গৃহীত হচ্ছে ইসলামের আন্তর্জাতিক কোয়ালিশনের বিশ্বস্ত পার্টনার রূপে। ৫/২/২০১৮




দেশের শিক্ষাঙ্গণ ও শিক্ষানীতির নাশকতা

ইন্ডাস্ট্রি দুর্বৃত্ত উৎপাদনের

শিক্ষাঙ্গণ শুধু জ্ঞানের বিকাশই ঘটায় না; জন্ম দেয় অসত্য-অজ্ঞতা, ঘৃণা-বিদ্বেষ এবং মানবতাধ্বংসী ভয়ানক রুগ্ন ধারণারও। এগুলি পরিণত হতে পারে দুর্বৃত্ত উৎপাদনের বিশাল বিশাল ইন্ডাস্ট্রিতে। স্বৈরাচার, ফ্যসিবাদ, বর্ণবাদ, জাতিয়তাবাদ, উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ এবং কম্যুনিজমের ন্যায় মানবতা-নাশক মতবাদগুলির জন্ম কোন কালেই বনজঙ্গলে হয়নি, বরং হয়েছে শিক্ষাঙ্গনে। এবং এ মতবাদগুলির নাশকতা বিষাক্ত রোগ-জীবাণু ও সুনামী-ভূমিকম্পের চেয়েও অধীক। মানব জাতির সমগ্র ইতিহাসে সবচেয়ে বেশী লোকক্ষয় রোগজীবাণু বা সুনামী-ভূমিকম্পের হাতে হয়নি। সেটি হয়েছে শিক্ষাঙ্গণে বেড়ে উঠা মানবরূপী ভয়ানক দানবদের হাতে। বিগত দুটি বিশ্বযুদ্ধেই তারা সাড়ে সাত কোটি মানুষকে হত্যা করেছে এবং শত শত নগর-বন্দরকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছে। ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদী শাসনকে প্রতিষ্ঠা দিতে এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোতে যারা গতহত্যা ও গণনির্মূলে নেতৃত্ব দিয়েছে তারাও কোন গুহাবাসী ছিল না; তারা শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ পেয়েছে অক্সফোর্ড, কেম্ব্রিজ ও হার্ভাডের ন্যায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। ভারতের বুকে যে কোটি কোটি মানুষ গরুছাগল, শাপ-পেঁচা, পাহাড়-পর্বত ও মুর্তিকে দেবতা মনে করে, তারা কি কোন বন-জঙ্গলের বাসিন্দা? তাদের অনেকে তো কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী। ডিগ্রি নেয়া এবং জ্ঞানী ও বিবেকমান হওয়া যে এক নয় –তার প্রমাণ তো এ নৃশংসতার ইতিহাস।

 

বা্ংলাদেশের ইতিহাসেও এরূপ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাশকতা কি কম? যারা শাপলা চত্ত্বরে মুসল্লিদের উপর গণহত্যা ঘটালো -এরা কি বনে জঙ্গলে বেড়ে উঠেছে? এরাও বেড়ে উঠেছে দেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং সামরিক ও পুলিশ এ্যাকাডেমিগুলিতে। ক’মাস আগে এদেরই দলবদ্ধ ভাবে দেখা গেছে নিরাপদ সড়কের দাবীতে রাস্তায় নামা যায় কিশোরীদের উপর যৌন সন্ত্রাসে। এরাই থার্টি ফার্স্ট নাইটে রাস্তায় নারীদের বিবস্ত্র করে লালসা পূরণ করে। এদেরই একজন নব্বইয়ের দশকে জাহাঙ্গির নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণে সেঞ্চুরীর উৎসব করেছিল। তখন দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন শেখ হাসিনা। একজন নারী সাংবাদিককে চরিত্রহীন বলায় ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেনকে জেলে ঢুকানো হয়েছে। এবং সেটি নারীর সম্ভ্রম রক্ষার নামে। অথচ হাসিনা ধর্ষণে সেঞ্চুরীকারি ছাত্রলীগ নেতাকে শাস্তি না দিয়ে নিরাপদে বিদেশে পাড়ি জমাতে দিয়েছিল।

নাশকতা ঐক্য বিনাশে

ইসলামের মৌলিক চেতনা বিনাশেও কি সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থার নাশকতা কি কম? ইসলাম অতি মৌলিক শিক্ষাটি স্রেফ মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান আনা নয়; বরং ভাষা, বর্ণ, ভূগোল বা অঞ্চলের উর্দ্ধে উঠে মুসলিমদের মাঝে ভাতৃত্বের বন্ধন গড়া। সে সাথে বাধ্যতামূলক হলো মুসলিমদের মাঝে অনৈক্যকে ঘৃণা করা এবং পরিহার করা। নামায-রোযার ন্যায় এটিও ফরজ। পবিত্র কোরআনে মুসলিমদের মাঝে সীসাঢালা অটুল দেয়াল গড়ার হুকুমটি এসেছে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে। সেটি সুরা সাফের ৪ নম্বর আয়াতে। আর যেখানে মহান আল্লাহতায়ালার হুকুম, সেটি অমান্য করলে কি ঈমান থাকে? তাই ভাষা,বর্ণ, অঞ্চলের নামে মুসলিমদের মাঝে বিভক্তি গড়াটি মদপান, জ্বিনা ও মানব হত্যার ন্যায় হারাম। মুসলিমদের মাঝে বিভক্তি গড়লে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে আযাব যে অনিবার্য হয় –সে হুশিয়ারিটিও শোনানো হয়েছে। সে ঘোষণাটি এসেছে সুরা ইমরানের ১০৫ নম্বর আয়াতে। মুসলিমদের উপর আযাবের সে আলামত কি আজ কম?

অথচ ভাষার নামে শুধু বিভক্তি গড়া নয়, বরং খুনোখুনি ও অবাঙালীদের নির্মূল করাটি হলো বাঙালী জাতীয়তাবাদী রাজনীতির মূল কথা। এদিক দিয়ে তাদের ঘনিষ্ট আদর্শিক আত্মীয় হলো মায়ানমারের অসভ্য বার্মীজগণ। জাতীয়তাবাদী এ নৃশংস বর্বরগণ রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে গণহত্যা, ধর্ষণ ও বর্ণবাদী নির্মূলে নেমেছে। একই রূপ জাতীয়তাবাদী বর্বরতায় বাংলার মাটিতে সবচেয়ে অসভ্য কর্মটি ঘটেছে একাত্তরে। তখন হত্যা, ধর্ষণ ও লুণ্ঠনের শিকার হয়েছিল কয়েক লক্ষ বিহারী মুসলিম। তারা ভারত থেকে প্রাণ বাঁচাতে পূর্ব পাকিস্তানে আশ্রয় নিয়েছিল। ব্যক্তির দৈহিক দুর্বলতা জানিয়ে দেয়, তার খাদ্যে পুষ্টির মান ভাল নয়। তেমনি ব্যক্তির চরিত্রহীনতা জানিয়ে দেয়, তার শিক্ষায় রয়েছে প্রচুর কুশিক্ষা। বাংলাদেশ দুর্নীতিতে বিশ্বে ৫ বার শীর্ষ স্থান পেয়েছে তো কুশিক্ষার কারণেই।

বাংলাদেশে সেক্যুলার শিক্ষা নীতির মূল নাশকতাটি স্রেফ এ নয়, এটি বিলুপ্ত করতে পেরেছে মুসলিম মগজ থেকে প্যান-ইসলামিক চেতনা। বরং কেড়ে নিয়েছে নৃশংস বর্বরতাকে ঘৃণা করার সামর্থ্য। কেড়ে নিয়েছে সুনীতি নিয়ে বেড়ে উঠার ঈমানী বল। এজন্যই বাংলা সাহিত্যে বিহারীদের বিরুদ্ধে সংগঠিত নৃশংসতার কোন বিবরণ নেই। লেখা হচ্ছে না শাপলা চত্ত্বরের গণহত্যার বিরুদ্ধেও। একই কারণে বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গণে ধর্ষণে সেঞ্চুরি করার বিষয়টিও ইতিহাস থেকে হারিয়ে গেছে। দেহে একবার রোগ দেখা দিলে বুদ্ধিমান ব্যক্তি তা সারা জীবন মনে রাখে এবং তা থেকে বাঁচার জন্য সব সময় সতর্ক থাকে। বিবেকমান জনগোষ্ঠিও তেমনি নিজদের ইতিহাসের কালো অধ্যায়গুলি ভুলে যায় না, বরং বাঁচিয়ে রাখে তা থেকে ভবিষ্যতে বাঁচার আশায়। নইলে আত্মভোলা সে জনগণের জীবনে বাকশালী স্বৈরাচার ও শাপলা চত্ত্বরের গণহত্যার ন্যায় নৃশংসতাগুলো নিত্যনৈমিত্তিক হয় দাঁড়ায়।

সুশিক্ষা শুধু ঈমানই বাড়ায় না, ঈমানদারদের মাঝে সিমেন্টও লাগায়। ফলে গড়ে উঠে অটুট ঐক্য। অপর দিকে কুশিক্ষা বাড়ায় বিভেদ ও অনৈক্য। গড়ে তোলে বিভক্তির দেয়াল। মুসলিমদের মাঝে অনৈক্য দেখে অন্ততঃ এ বিষয়টি নিশ্চিত বলা যায়, তাদের মাঝে সুশিক্ষা নাই। অথচ সুশিক্ষার কারণেই ইসলামের গৌরবকালে আরব, কুর্দী, তুর্কী, ইরানী ও আফ্রিকান মুসলিমগণ নিজেদের ভাষা ও বর্ণের কথা ভূলে একতাবদ্ধ উম্মাহর জন্ম দিয়েছিল। কিন্ত ইসলামি শিক্ষা থেকে যখনই তারা দূরে সরেছে, তখন শুধু বিভক্তিই বাড়েনি, পরাজয় এবং অপমানও বেড়েছে। একতা ছাড়া অসম্ভব, ইসলামি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। অসম্ভব হয়, শরিয়ত, হুদুদ, একতা ও খেলাফার ন্যায় ইসলামের মূল বিধানগুলির প্রতিষ্ঠা। ব্যর্থ হয়, ইসলামের মূল এজেন্ডার বাস্তবায়ন। যাদের মধ্যে ঈমান আছে তারা শুধু ভিন্ ভাষা, ভিন্ বর্ণ ও ভিন্ এলাকার ঈমানদার মানুষদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এক জামাতে শুধু নামাযই পড়ে না; তারা রাষ্ট্র গড়ে এবং একই রণাঙ্গনে যুদ্ধও করে। এটিই তো ঈমানের লক্ষণ। সে ঈমানের কারণে বাঙালী, পাঞ্জাবী, বিহারী, সিন্ধি, পাঠান, গুজরাতি ও অন্যান্য ভাষার মুসলিমগণ একত্রে মিলে ১৯৪৭’য়ে বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল। সে অভিন্ন চেতনার কারণেই ১৯৭১’য়ে কোন আলেম, পীর বা কোন ইসলামী দল পাকিস্তান ভাঙ্গাকে সমর্থণ করেনি। তাদের কেউ ভারতে গিয়ে সামরিক প্রশিক্ষণও নেয়নি।

ঈমান ও একতার প্রতি আগ্রহ সব সময়ই একত্রে চলে। ঈমান বিলুপ্ত হলে একতাও বিলুপ্ত হয়। তখন ভাষা,বর্ণ ও ভূগোলের নামে বিভক্তির অসংখ্য দেয়াল গড়ে উঠে। জাতীয় রাষ্ট্রের নামে সে বিভক্তির দেয়ালকে সুরক্ষা দেয়া তখন দেশপ্রেম গণ্য হয়। প্রশ্ন হলো, বিভক্তির দেয়াল এবং সে বিভক্তি নিয়ে উৎসব কি ঈমানের লক্ষণ? বরং প্রকৃত ঈমানদারের মনে এরূপ বিভক্তি নিয়ে মাতম উঠবে -সেটিই তো স্বাভাবিক। কিন্তু আজ সে মাতম নাই, বিভক্তি নিয়ে দুঃখবোধও নাই। অথচ মুসলিম জাহানে যখন কোন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না, তখনও একজন নিরক্ষর মুসলিম একতার গুরুত্ব বুঝতো। তাই তখন আরব,ইরানী, তুর্কী, কুর্দী, আফ্রিকান মুসলিম একত্রে যুদ্ধ করেছে। অথচ আজ সেটি অসম্ভব। শিক্ষাব্যবস্থা সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে যে কতটা দূরে সরিয়েছে –এ হলো তার প্রমাণ।

নাশকতা চিন্তাশূণ্যতার

জ্ঞানের অর্থ শুধু তথ্য,তত্ত্ব,উপাত্ত,গদ্যপদ্য,পরিসংখ্যান বা কিসসা-কাহিনী জানা নয়,বরং নানা বিষয় নিয়ে চিন্তা-ভাবনা এবং সে চিন্তা-ভাবনা থেকে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সামর্থ্য। কোরআনের নানা স্থানে নানা ভাবে মহান আল্লাহতায়ালা মানুষকে চিন্তা-ভাবনায় উৎসাহিত করেছেন। প্রতিটি জীবজন্তু,প্রতিটি উদ্ভিদ,প্রতিটি পাহাড়-পর্বত,প্রতিটি নদীনালা,আকাশের প্রতিটি নক্ষত্র,প্রকৃতির প্রতিটি দৃশ্যপটই মহান আল্লাহর মূল্যবান আয়াত। কোরআনের ভাষায় তা হলো “আয়াতিল লি উলিল আলবাব” অর্থ চিন্তাশীল মানুষের জন্য নিদর্শন। বিদ্যাশিক্ষার কাজ মূলতঃ মহান আল্লাহর সে আয়াতগুলো থেকে শিক্ষা গ্রহণের সামর্থ্য সৃষ্টি। মানুষের মনে সে আয়াতগুলি বহুভাবে বহুকথা বলে। কোনটি সরব ভাবে,কোনটি নীরব ভাবে। ব্যক্তির চক্ষু,কর্ণ,বিবেকের সামনে এগুলো লাগাতর সাক্ষ্য দেয় সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহর অপার অসীম কুদরতের। বিদ্যাশিক্ষার কাজ হলো সে সাক্ষ্য বুঝতে ও আল্লাহর পক্ষে সাক্ষ্যদানে সামর্থ্য সৃষ্টি করা। সে সামর্থ্য অর্জনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি লাগে না। সেজন্য যা জরুরী তা হলো চিন্তার সামর্থ্য। ইসলামে চিন্তাকে তাই শ্রেষ্ঠ ইবাদত বলা হয়েছে। চিন্তাশিল মনই হলো জ্ঞানের সবচেয়ে বড় পাওয়ার হাউস। চিন্তার বলে আল্লাহর অসংখ্য আয়াত থেকে শিক্ষা নেয়ার যে সামর্থ্য গড়ে উঠে তার গুণে মানব ইতিহাসের বহু নিরক্ষর ব্যক্তিও বিখ্যাত দার্শনিকে পরিণত হয়েছে। অথচ সে সামর্থ্য না থাকায় বহু পিএইচডি ধারিও প্রচণ্ড আহম্মকে পরিণত হয়।বাংলাদেশে তো এমন আহম্মকদের কাছে গরুছাগল ও শাপশকুন যেমন ভগবান মনে হয় তেমনি বঙ্গশত্রু,গণশত্রু এবং অতি স্বৈরাচারি দুর্বৃত্তরাও মহমানব বন্ধু মনে হয়। চিন্তাশূণ্যতার এটিই হলো নাশকতা।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় শুধু এমন আহম্মকের সংখ্যাই বাড়েনি, ভয়ানক দুর্বৃত্তের সংখ্যাও বেড়েছে। এ শিক্ষার কাজ হয়েছে,শুধু চিন্তার সামর্থ্য কেড়ে নেয়া নয়,কোরআনের সাথে সম্পর্ককে ছিন্ন করারও। পারিবারিক বা সাংস্কৃতিক সূত্রে কোরআনের সাথে যদি কোনরূপ সম্পর্ক গড়েও উঠে,বাংলাদেশের শিক্ষার কাজ হয়েছে সে সম্পর্ক বহাল রাখাকে কঠিন করে দেয়া। শিক্ষাব্যবস্থার কাজ হয়েছে ছাত্রদের ইবাদতের সামর্থ্য কেড়ে নেয়া,এবং সে সামর্থ্য যাতে গড়ে না উঠে তার ব্যবস্থা করা। মুসলিম শিশুর জীবনে ভ্যালু এ্যাড বা মূল্য সংযোজন না করে বরং পারিবারিক বা সাংস্কৃতিক সূত্রে সংযোজিত মূল্যও কেড়ে নিচেছ। ফলে কৃষকের সুবোধ পুত্রটি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ব্যাভিচারি,ধর্ষক,চোরডাকাত ও সন্ত্রাসী খুনি হয়ে বের হচ্ছে। এবং এরাই রাজপথে আল্লাহর শরিয়তী বিধানের বিরুদ্ধে সৈনিক রূপে নামছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামের বিপক্ষে আজ যে বিপুল বাহিনী এবং পথেঘাটে,অফিস-আদালত,ব্যবসা-বাণিজ্যে যে অসংখ্যক দুর্বৃত্ত -তারা কি কাফেরদের ঘরে, মন্দিরে বা বনেজঙ্গেলে বেড়ে উঠেছে? তারা তো বেড়ে উঠেছে দেশী স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

দুর্গ ইসলামের শত্রুপক্ষের

অজ্ঞ লোকদের সহজেই বিভ্রান্ত করা যায়। কিন্তু জ্ঞানী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে কি সেটি অসম্ভব। বাংলাদেশে ইসলাম বিরোধীদের শক্তির মূল উৎসটি হলো, কোরআন থেকে জ্ঞানলাভে অসমর্থ জনগণ। তারা চায়, জনগণের ইসলাম নিয়ে অজ্ঞতা দীর্ঘায়ু পাক। চায়, সেটি আরো গভীরতর হোক। কোরআনী জ্ঞানের এজন্যই তারা মহাশত্রু। পবিত্র কোরআনের জ্ঞান বাড়লে সে জ্ঞান শক্তি জোগায় ঈমান নিয়ে বেড়ে উঠায়। তারা ইসলামের বিজয়ে তখন আপোষহীন হয়। শরিয়ত প্রতিষ্ঠার আন্দোলন তখন বিপুল সংখ্যায় আপোষহীন মোজাহিদ পায়। এখানেই ইসলামের শত্রু পক্ষের ভয়। সে ভয় নিয়েই য়ভয়। ভয়। আরবী ভাষা এবং সে সাথে কোরআনের চর্চা রুখা হচ্ছে ইসলামের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একটি কৌশল রূপে।

দেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলি পরিণত হয়েছে ইসলামের শত্রু পক্ষের মূল দুর্গে। মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া শরিয়তি আইন প্রতিষ্ঠা নিয়ে রাজপথে নামলে তার বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে যারা হামলা করে তারা কোন মন্দির,গীর্জা বা বনজঙ্গল থেকে আসে না। বরং আসে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রাঙ্গণ থেকেই। অথচ এগুলির নির্মানে ব্যয় ধর্মপ্রাণ মুসলিম নাগরিকদের দেয়া রাজস্বের অর্থ। প্রশ্ন হলো, শিক্ষার নামে মুসলিমগণ কি এভাবে নিজ ধর্ম,নিজ ঈমান,সর্বোপরি মহান আল্লাহতায়ালার শত্রু পালনে অর্থ জোগাতে থাকবে? মেনে চলবে কি শিক্ষাঙ্গণের উপর ইসলামের শত্রুপক্ষের এ দখলদারি?




বিপর্যয়ের মুখে পাশ্চাত্যের পরিবার

মানব ইতিহাসের সবচেয়ে পুরাতন ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতষ্ঠান হলো পরিবার। মানব-সভ্যতার বয়সের সমান এর বয়স। সভ্যতার জন্ম ও অগ্রগতিতে পরিবারের অবদানই সর্বাধিক। নিছক মাতৃর্গভে জন্ম নিলেই মানব-শিশু মানব রুপে বেড়ে উঠেনা। সে মানব রূপে বেড়ে উঠার মূল সবক ও প্রশিক্ষণ পায় পরিবার থকে। পরিবারের অপরিসীমের গুরুত্বরে কথা হাদীস শরীফে বহুভাবে র্বণতি হয়ছে। নবী কারীম (সাঃ) বলছেন, “প্রতিটি মানব শিশুই জন্ম নয়ে মুসলমান রূপ, কিন্তু পিতা-মাতা বা পরিবারের প্রভাবে বেড়ে উঠে ইহুদী, নাসারা বা অমুসলমি রূপে।” সভ্যতা নির্মানের কাজ একমাত্র মানুষের, পশুদের নয়। আল্লাহর খলীফা হওয়ার কারণে প্রতিটি মুসলমানই একাজে দায়বদ্ধ। তবে এ লক্ষ্যে পরিবার অপরিহার্য। কারণ, সভ্যতার যারা নির্মাতা তাদের নির্মানেও তো প্রতিষ্ঠান চাই। পরিবার বস্তুতঃ সে কাজটিই করে।

মানব ইতিহাসের এই সনাতন প্রতিষ্ঠানটি আজ বিপর্যের মুখে। ফলে বিপন্ন আজ মানবতা। এবং থমকে দাঁড়িয়েছে সভ্যতার অগ্রগতি। ইট ধ্বসে গেলে প্রাসাদও ধ্বসে যায়। তেমনি পরিবার বিধ্বস্ত হলে বিধ্বস্ত হয় সভ্যতা। নির্জন বনে-বাদাড়ে বা মরুভূমিতে  কোন মানবশিশুই সভ্য রূপে বেড়ে উঠনো, সভ্যতাও সেখানে নির্মিত হয়না। উদ্ভিদ বা পশু-পাখীর পক্ষে একাকী বেড়ে উঠা সম্ভব হলেও মানুষরে পক্ষে তা অসম্ভব। পশুকুলে মানব শিশুকে ছেড়ে দিলে সে শুধু দৈহিক নিরাপত্তাই হারায়না, মানবিক গুন নিয়ে বেড়ে উঠার সুযোগও হারায়। মানুষ প্রভাবিত হয়ে তার আশে-পাশের অন্যকে দেখে। ছোট বেলা থেকেই যে শিশু ধর্মের নামে পিতামাতা ও প্রতিবেশীদের শাপ-শকুন, গরু, পাহাড়-পর্বত ও মুর্তির উপসানা দেখে সে শিশু পরবর্তীতে নোবেল প্রাইজ পেলেও ছোটবেলার ধর্মীয় বিশ্বাস ও অভ্যাস সহজে ছাড়তে পারে না। এজন্যই ভারতীয় হিন্দু বিজ্ঞানীগণ শাপ-শকুন, পাহাড়-পর্বত ও মুর্তি পূজার মধ্যে মুর্খতা দেখতে পায়না। একই অস্বাাবিঅসএকই কারণে পাশ্চাত্যরে একজন সেরা দার্শনিক বা ধার্মিক ব্যক্তি কোনরূপ অসভ্যতা দেখেনা উলঙ্গতা, ব্যভিচার, মদ্যপান ও সমকামিতার মধ্যে। পশু যেমন পাশে উলঙ্গতা বা ব্যভিচার হলেও তাতে ভ্রুক্ষেপও করে না, তেমনি অবস্থা পাশ্চাত্য দেশের এসব শিক্ষিতদের। জঘন্য পাপাচার ও কদর্য অসভ্যতাও তাদের কাছে অতিশয় স্বাভাবিক সভ্য-কর্ম রূপে গণ্য হয়। পাপাচারের প্রকাশ্য প্রদর্শণী এজন্যই সমাজে বন্ধ হওয়া জরুরী। এজন্যই জরুরী হল, পাপাচারমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্রের নির্মান। ইসলামে এটি র্সবশ্রষ্ঠে ইবাদাত। ঈমানদাররে এ কাজটিতেই অন্যরা সবচেয়ে বেশী উপকৃত হয়। পরিবার, রাষ্ট্র ও সমাজ একমাত্র এপথেই পুতঃপবিত্রতা পায়। এবং যে কোন সমাজে এটিই সবচেয়ে ব্যয়বহুল কাজ। নবীজী (সাঃ) ও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় কোরবানীটি পেশ করেছেন মূলতঃ এ মহান কাজে। রক্তক্ষয়ী জিহাদ লড়েছেন তারা আমৃত্যূ।এরূপ অর্থ-ব্যয়,রক্তক্ষয় নামায-রোযা-হজ্জ-যাকাত বা আল্লাহর অন্য কোন  বিধান পালনে হয় না।

 

এ বিশ্বে সব জাতি সভ্যতা গড়েনি। জন্ম দেয়নি উন্নত রুচিবোধ বা মূল্যবোধের। সুশৃঙ্খল পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মানে যারা সফল, এ কাজ বস্তুতঃ তাদের। আবর্জনার স্তুপের পাশের আবাদী ছেড়ে মানুষ যখন নগর গড়েছে, সভ্যতার নির্মাণও তখন শুরু হয়েছে। নৃশংস বর্বরতায় আরবরা এককালে ইতিহাস গড়েছিল। নিজের জীবিত কণ্যাকে তারা জ্যান্ত দাফন করতো। কিন্তু এ আরবরাই আবার র্সবকালরে সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার জন্ম দিয়েছিল। তাদের এ সফলতার কারণ, আল্লাহর হেদায়াতের অনুসরণ। এবং নিজেদের গড়েছেন নবীজীর (সাঃ)আদর্শে। বেদের বস্তি বা ভিখারীর কুড়ে ঘর নির্মানে নকশা বা মডেল লাগেনা, কিছু বাঁশ-কঞ্চি ও খড়-কুটো হলেই যথেষ্ট। কিন্তু সেটি অপরিহার্য তাজমহল নির্মানে। উন্নত সমাজ ও সভ্যতার নির্মানে তেমনি অপরিহার্য হলো উন্নত আদর্শ বা নির্দেশনা। ইসলামে সে আদর্শ বা মড়েল হলেন স্বয়ং নবীজী (সাঃ)। আর নির্দেশনা ও মূল নকশাটি দিয়েছেন খোদ আল্লাহতায়লা। এবং আল্লাহতায়লার সে নির্দেশনা বা হেদায়েত এসেছে পবিত্র কোরআনে। অসভ্য বসবাসে আদর্শ লাগে না। আইয়ামে জাহিলিয়াত যুগের আরবরাই শুধু নয়, আজও বহুশত কোটি মানুষ বসবাস করছে আল্লাহর হেদায়েত ছাড়াই। এতে সভ্যতর মানব সৃষ্টির কাজ সামনে এগুয়নি। বরং প্রচন্ড অসুস্থ বেড়েছে মানব সভ্যতার। হালাকু-চেংঙ্গিজের চেয়ে বর্বর মানুষের জন্ম হয়েছে সভ্যতার এ অসুস্থ্যতার কারণে।

 

আল্লাহর হেয়ায়েত এবং রাসূল (সাঃ)র আদর্শের অনুসরণের ফায়দা যে কত বিশাল ও কল্যাণকর সেটি প্রমাণ করেছেন প্রাথমিক কালের মুসলমানেরা। এবং সেটি মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা নির্মানের মধ্য দিয়ে। আলোর মশাল গভীর অন্ধকারেও পথ দেখায়। তেমনি ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নির্মানে পথ দেখায় নবী-রাসূলের আদর্শ। এক্ষেত্রে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ হলেন সর্বশেষ নবী হযরত মহম্মদ (সাঃ। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা তাঁকে “উসওয়াতুন হাসানা” বা উত্তম আর্দশ বলেছেন। মুসলমান হওয়ার অর্থ নবীজী (সাঃ)কে শুধু আল্লাহর রাসূল হিসাবে মৌখিক স্বীকৃতি দেয়া নয়, বরং জীবনের প্রতিপদে তাঁকে অনুকরণীয় আদর্শ রূপে কবুল করা। নবীজী (সাঃ)র সাথে সাহাবায়ে কেরামের আচরণ সেটিই ছিল। তাঁকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে উত্তম আদর্শ রূপে বিশ্বাস করা বা অনুসরণ করাই কুফরি। এটি ইসলাম থেকে বিচ্যুতি। সাহাবায়ে কেরাম তাদের সমস্ত কর্ম ও আচরণে –তা সে ইবাদত হোক বা ব্যক্তি-পরিবার-রাষ্ট্র ও সমাজ গঠন হোক – তার অনুসৃত আদর্শকে অনুসরণ করেছিলেন। আলোর ন্যায় নবীজি (সাঃ)র আর্দশও আরবের ঘরগুলোকে সেদিন আলোকিত করেছিল। ফলে দূরীভূত হয়েছিল মিথ্যা ও অজ্ঞতার অন্ধকার। তখন ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ শিক্ষালয়ে পরনিত করছেলি মুসলমানদের প্রতিটি ঘর্ ও প্রতিটি পরিবার। এবং এভাবে অতি দ্রুত অগ্রসর হয়েছিলেন উচ্চতর সভ্যতা নির্মানের দিকে। সে কালে কোন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না, কিন্তু মুষ্টিমেয় সাহাবীদের ঘর থেকে যে মাপের জ্ঞানবান মানুষ তৈরী হয়েছিল তা মুসলিম বিশ্বের সবগুলো বিশ্ববিদ্যায় বিগদ হাজার বছরে পারেনি। উচ্চতর সভ্যতা নির্মানের কাজ তো এভাবেই ঘর বা পরিবার থেকে শুরু হয়। একাজে পরিবার নিষ্ক্রীয় হলে ব্যাক্তির উন্নয়নের সাথে উম্মাহর উন্নয়ন থমকে দাড়ায়। সভ্যতা কি? এটি হলো জাতীয় জীবনে সভ্যতর ব্যক্তিসমুহের সৃষ্টিশীল কর্ম ও সভ্যতর পরিবর্তনের যোগফল। ফলে একই রকম কুঁড়ে ঘরে হাজার বছর বাস করলে তাতে সভ্যতা নির্মিত হয়না। কারন এটি স্থবিরতা। এমন স্থবিরতায় প্রকাশ পায় আদিম অজ্ঞতাকে আঁকড়ে ধরে বসবাসের প্রবনতা। অথচ পিরামিড বা তাজমহল গড়লে সেটি সভ্যতার অংশ হয়ে যায়। কারন তাজমহলের নির্মানে স্থাপত্যশিল্পকে কুঁড়ে ঘর নির্মানের কৌশল থেকে বহু পথ পাড়ি দিতে হয়। সভ্যতার গুণাগুণ বিচারে তো সে অগ্রগতিটুকুরই বিচার হয়। কিন্তু সভ্যতার তুলনামূলক বিচারে কৃষি, শিল্প, প্রাসাদ বা নগর নির্মানের পাশাপাশি উচ্চতর মানুষ গড়ার শিল্প কতটা সামনে এগুলো সেটিই বেশী গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সেটি যখন উৎকর্ষ পায় তখনই শ্রেষ্ঠতর সভ্যতা নির্মিত হয়। মিশরে বিস্ময়কর পিরামিড বা চীনে বিশাল প্রাচীর নির্মিত হলেও মানবিকতা সম্পন্ন সে বিশাল মাপের মানুষ নির্মিত হয়নি। অথচ সেটি সম্ভব হয়েছিল ইসলামে। অন্য সভ্যতা থেকে ইসলামি সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্ব তো এখানেই।

 

নবীজী (সাঃ) বলেছেন, “দুঃখ হয় ঐ ব্যক্তির জন্য যার জীবনে দুইটি দিন অতিক্রান্ত হলো অথচ তার জ্ঞান ও তাকওয়ার কোন পরর্বিতনই হলোনা”। অথচ আজ মুসলিম বিশ্বে এমন মানুষের সংখ্যা কোটি কোটি যাদের জীবনে শুধু শুধু দুটি দিন নয়, হাজারো দিন -এমন কি সমগ্র জীবন কেটে গেছে অথচ তাদের জ্ঞান ও তাকওয়ার ভান্ডারে কোন পরিবর্তনই আসেনি। সারাটা জীবন বাস করছে অজ্ঞতার ঘোর অন্ধকারের মাঝে। অতিবৃদ্ধ বয়সেও কোরআনের সামান্য একটি ছুরাও বোঝবার সামর্থ অর্জন করেনি। একজন মানুষের কাছেও দ্বীনের দাওয়াত পৌছানোর সামর্থ অর্জন করেনি। যে মুসলমানের জীবনে পরর্বিতনহীন দুইটি দিন যেখানে অসহ্য সে ব্যক্তি কাদা-মাটি, লতা-পাতা, বাঁশ-কঞ্চির ঘরে হাজারো বছর কাটায় কি করে? অথচ বাংলাদেশের ন্যায় দেশে মুসলমানেরা তো সেটিই করেছে। একই রূপ ঘর, একই রূপ কৃষিকাজ ও একই রূপ সংস্কৃতির মাঝে তাদের বসবাস বহুশত বছরের। প্রাথমিক যুগের মুষ্টিমেয় মুসলমানদের হাতে সে সময় উন্নত সভ্যতার জন্ম হয়ছেলি সেটি তো সামনে চলার প্রবল প্রেরণা থেকেই। যেখানে পরিবর্তন নেই সেখানে সভ্যতাও নাই। বিশ্বে বহু ভাষা ও বহু ধর্মের বহু জাতির মানুষের বাস। কিন্তু সভ্যতার জন্মদান সবার দ্বারা হয়নি। সভ্যতার জন্ম দানে যারা ব্যর্থ, তাদের সে ব্যর্থতার কারণঃ তারা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্ররে মত প্রতিষ্ঠানগুলো সঠিক ভাবে গড়ে তুলতে পারিনি। তবে এক্ষেত্রে মূল ব্যর্থতা, আদর্শ পরিবার গড়ায় ব্যর্থতা। কারণ, প্রাসাদ গড়তে যেমন ভাল ইট লাগে তেমনি উচ্চতর সমাজ ও সভ্যতা গড়তেও ভাল মানুষ ও পরিবার লাগে।

 

পারিবার গড়ে উঠেছে বস্তুতঃ মানবিক প্রয়োজনের তাগিদে। অন্য প্রানীকূল থেকে মানুষের শ্রেষ্ঠতম হওয়ার এটিই মূল কারন। পশুদের জীবনে সহস্র বছরেও পরর্বিতন আসে না। গবাদি পশুরা হাজার বছর পূর্বেও যেভাবে ঘাস খেত বা জীবন ধারন করতো এখনো তাই করে। অথচ মানুষ সামনে এগিয়েছে। এর কারণ পরিবার। এ জীবনে নিজের প্রয়োজন আর কতটুকু? কুকুর বিড়ালও সমাজে না খেয়ে মরে না। কারণ তাদের একার প্রয়োজন সব সমাজেই পূরণ হয়। অথচ মানুষকে ভাবতে হয় তার পরিবার ও আপনজনদের নিয়ে। এ ভাবনাই তাকে কর্মশীল, গতিশীল ও দুঃসাহসী করে। পাহাড়-পর্বত, সাগর-মহাসাগরও পাড়ি দয়ে। এরূপ অবিরাম উদ্যোগ ও আত্মনিয়োগই ব্যক্তির যোগ্যতা ও সৃজনশীলতা বাড়ায়। মানুষ জীবনে যা শেখে তার সিংহভাগই শেখে কাজ করতে করতে। তাই যার জীবনে কাজ নেই, তার জীবনে জ্ঞানের বৃদ্ধিও নেই। প্রয়োজনের তাগিদেই সৃষ্টি হয় নতুন আবিষ্কার। যার পরিবার নাই তার জীবনে কর্মে প্রেরণাও নাই। কারণ তার প্রয়োজনের মাত্রাটি অতি সামান্য। পরিবার পরিজনহীন সাধু-সন্যাসীদের দ্বারা তাই সভ্যতার নির্মান দূরে থাকে একখানি গৃহ নির্মানও অসম্ভব। ফলে এমন মানুষরে সংখ্যা বৃদ্ধিতে ক্ষতগ্রিস্থ হয় সমাজ ও রাষ্ট্র। এবং বাধাগ্রস্ত হয় সভ্যতার নির্মান বা অগ্রগতি। ইসলামে তাই বৈরাগ্য জীবনের কোন স্থান নেই।

 

মানব শিশু তার পরিবার থেকে শুধু প্রতিপালনই পায় না, জীবনের মূল পাঠগুলোও পায়। শেখে, কি ভাবে তাকে বেড়ে উঠতে হয়। শেখে কর্মকুশলতা। শেখে কিভাবে অন্যদের দূঃখে দূঃখী এবং সুখে সুখী হতে হয়। পরিবার থেকেই ব্যক্তি পায় উন্নত রুচিবোধ, মূল্যবোধ ও বাঁচবার সংস্কৃতি। মানুষ যখন কলজে-বিশ্ববিদ্যালয় গড়েনি তখনও জীবনের সর্বোচ্চ শিক্ষা পেত পিতা-মাতা, ভাই-বোন, দাদা-দাদী ও অন্যান্য আপনজনদের থেকে। পিরামিড বা তহজমহলের ন্যায় শ্রেষ্ঠ স্থাপত্যশিল্পগুলো যারা গড়ছেলিনে তারাও কোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিদ্যা হাসিল করেননি।সে উচ্চতর বিদ্যা পেয়েছেলিনে নিজেদের পরিবার থেকে। পরিবারই যে মানব জাতির শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয় – সে প্রমান তাই প্রচুর। অথচ আজ সেটিই ভয়ানক বিপর্যয়ের মুখে। বিশাল বিশাল কল-কারখানা বৃদ্ধির সাথে যেমন বিলুপ্ত হয়েছে পরিবার ভিত্তিক কুঠির শিল্প, যান্ত্রীকতা বৃদ্ধির সাথে তেমনি বিলুপ্ত হচ্ছে পরিবার ও পরিবার ভিত্তিক শিক্ষালয়। ফলে মানুষের কেতাবী বা কারিগরি জ্ঞান বাড়লেও বিধস্ত হচ্ছে মূল্যবোধ। সম্পদ বাড়লেও মানুষ নিঃস্ব হচ্ছে মানবিক গুনাবলীত।

 

একমাত্র পারিবারীক শান্তিই ব্যক্তিকে দেয় প্রকৃত শান্তি। পরিবার হলো জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। ব্যক্তির সকল ব্যস্ততাই শুধু নয়, তার সকল স্বপ্ন ও আশা-ভরসা দোল খায় এ পরিবারকে ঘিরে। ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত মানুষ যেখানে শান্তি খুঁজে পায় সেটি তার অফিস নয়, কারখানা বা অন্যকোন কর্মক্ষেত্রও নয়। বরং সেটি হলো তার পরিবার। অশান্তি একবার পরিবারে বাসা বাঁধলে সেটি কোন ঔষধ্ই দূর হবার নয়। অশান্তির সে আগুন তখন গৃহের সীমানা ডিঙ্গিয়ে রাজপথে, লোকালয়ে বা কর্মস্থলে গড়িয়ে পড়ে। তখন সামাজিক অশান্তি বাড়ে সর্বত্র জুড়ে। ক্রমঃর্বধমান মাদকাসক্তি, গ্যাংফাইট ও সন্ত্রাস – এসব তো জন্ম পায় পারিবারীক অশান্তি থেকেই। উলঙ্গতা, মদ্যপান, ব্যাভিচার ও নানা পাপাচার পরিবারে প্রতিপালন পেলে তখন তাতে সমাজও পরিপূর্ণ হয়ে উঠে। মানুষ তার ন্যায়বোধ, রুচিবোধ, মূল্যবোধ ও আচার-আচরন নিয়ে জন্মায়না, এগুলো সে পায় পরিবার থেকে। আর এগুলো নিয়েই তার সর্বত্র বিচরন। অপর দিকে বাইরের জগতে যতই সমৃদ্ধি হোক, তাতে পরিবারে শান্তি আসেনা। একাজ ব্যক্তির একান্তই নিজস্ব। পরিবারকে ঘিরেই শান্তির নিরাপদ দুর্গটি গড়ে উঠে প্রেম-প্রীতি ,ভালবাসা ও উচ্চতর মূল্যবোধরে ভত্তিতি। নিছক পানাহার, যৌনতা বা যৌথবাসই পরিবারের ভিত্তি নয়। এটি নিছক পশু সুলভ। পরিবার গড়ে উঠে উচ্চতর এক উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে। দেহ-ভিত্তিক বা যৌনতা-ভিত্তিকি সম্পর্ক প্রাধান্য পেলে মানুষ তখন আর পশু থেকে শ্রেষ্ঠতর থাকে না। এর জন্য পরিবারের প্রয়োজনও পড়নো। ঘরবাড়ি ও পরিবার ছাড়াই জীব-জন্তু যুগ যুগ বেঁচে আছে। তাদের বংশবিস্তারও হয়েছে। পশুর মত বসবাস, পানাহার বা অবাধ যৌনতা এ বিশ্বে কোন কালেই কম ছিল না। এরপরও মানুষ ঘর বেঁধেছে, পরিবার গড়েছে। শুধু নিজের নয়, সমগ্র পরিবার ও পরিবারের সাথে সংশ্লিষ্ট অন্যদরে দায়-দায়িত্বও মাথায় তুলে নিয়েছে। শুধু ভোগ নয়, দায়ত্ব-পালনও যে বাঁচবার অন্যতম মিশন – মানুষ এ ভাবেই তার স্বাক্ষর রেখেছে। সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মান দুরে থাক একাকী একখানি ঘরও উঠানো যায়না। এর জন্য পারস্পারিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতা চাই। পরিকার তো শিশুকাল থেকে সেটিরও অভ্যাস গড়ে তুলে। প্রাকটিসের জন্য দেয় একটি অবকাঠামো। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মাধ্যমে যে সংযোগ গড়ে উঠে সেটি নিছক দুটি ব্যক্তির নয়, বরং সেটি দুটি পরিবার, দুটি গোত্র বা দুটি জনপদের মাঝে। সৃষ্টি হয় সৌর্হাদ-সম্প্রীতির অভ্যাস। রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনে এসম্পর্ক সিমেন্টের কাজ করে। মানব সমাজ এতে সংঘবদ্ধতা বা সামাজিক বন্ধন পায়। বৃদ্ধি পায় পারস্পরকি আস্থা ও শ্রদ্ধাবোধ। পরিবারের মূল ভিত্তি শুধু আইন নয় বরং এ মূল্যবোধ। ফলে এ মূল্যবোধ বিলুপ্ত হলে বিলুপ্ত হয় পরিবার। বস্তবাদী জীবন দর্শনে যা কিছু দর্শনীয় ও চিত্তাকর্ষক, যাতে থাকে নগদপ্রাপ্তি সে গুলোই গুরুত্ব পায়। তখন গুরুত্ব হারায় নীতি-নৈতিকতা, র্ধমীয় মূল্যবোধ, পরকালীন ভয় ইত্যাদি অদৃশ্য বিষয়। এমন সেকুলার পরিবারে স্বার্থপরতাও ন্যায্য কর্মে পরিনত হয়। পরিবার তখন পরিনত হয় দুর্বৃত্তদের দুর্গে। পাপাচারী দুবৃত্তরা সেখানে শুধু প্রতিরক্ষাই পায় না, সম্মানও পায়। তখন পরিবারগুলো পরিণত হয় দুর্বৃত্তদের পাঠশালায়। তখন দেশে স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালের সংখ্যা বাড়লেও দুর্বৃত্তি কমে না। বরং আকাশচুম্বি হয়। চোর-ডাকাত, ঘুষ-খোর, সূদ-খোর, ব্যাভিচারি, সন্ত্রাসী এমন ঘরে তিরস্কৃত না হয়ে নন্দিত হয়। পায় নতুন দুর্বৃত্তির অনুপ্রেরণা। একারণ্ই আধুনিক মানুষ দুর্বৃত্তি ও মানব-হত্যায় অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। এমন মানুষ তার কর্মে ও উদ্যোগে অনুপ্রেরণা পায় অর্থনৈতিক স্বার্থ-সিদ্ধি, যৌনলিপ্সা ও প্রতিপত্তা বিস্তারের তাড়না থেকে। যেখানেই শিকার, শিকারী পশুর সেখানেই পদচারনা। অনুরূপ অবস্থা বস্তুবাদী ও ভোগবাদী স্বার্থশিকারীদেরও। এমন এক স্বার্থশিকারি চেতনায় নতুন যৌন শিকার ধরতে নানা বাহানায় বিচ্ছিন্ন হচ্ছে পুরনো শিকারী থেকে। এতে বিচ্ছেদ নেমে আসছে বিবাহবন্ধনে। গাড়ী পাল্টানোর চেয়ে স্ত্রী বা স্বামী পাল্টানো এজন্যই রুটিনে পরিণত হয়েছে। আর এতে বাড়ছে পারিবারীক বিপর্যয়।

 

নিজেদের ভোগ-বিলাস ও আনন্দ-উল্লাস বাড়াতে পাশ্চাত্যরে মানুষ নিজের ঘাড় থেকে দায়িত্বের বোঝা কমিয়েছে। আর মানুষের ঘাড়ে তো সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো তার স্ত্রী-পুত্র-কন্যা প্রতিপালনের দায়িত্ব। সে দায়িত্ব কমাতে গিয়ে বিধ্বস্ত করেছে পরিবার। অধিকাংশ নারী হারিয়েছে সন্তান জন্মদানের আগ্রহ। অথচ স্বামী-স্ত্রীর মাঝে সন্তান বন্ধনের কাজ করে। তাছাড়া পরিবার গড়তে হলে বৈবাহিক জীবনের স্থায়ীত্বটি জরুরী। চোরাবালীর উপর যেমন বিল্ডিং গড়া যায়না, তেমনি নড়বড়ে বৈবাহিক সম্পর্কের উপর নিভর করে পরিবার গড়ে উঠে না। এজন্য স্বামী-স্ত্রীর সুসম্পর্ক ও টেকসই সম্প্রীতি প্রয়োজন। বিবাহের পর স্বামী-স্ত্রীর মাঝে একে অপররে উপর শুধু অধিকারই প্রতিষ্ঠিত হয়না, দায়িত্বও অর্পিত হয়। সে দায়ত্বি এড়াতে পাশ্চাত্যরে মানুষ বিবাহ এড়িয়ে যাচ্ছে। এমন অসুস্থ্য চেতনায় মজবুত পরিবার গড়ে উঠবে সেটি কি আশা করা যায়?  ফলে বিধস্ত হচ্ছে পারিবারীক শান্তি। শান্তির খোঁজে পাশ্চাত্যের অশান্ত মানুষ এখন বিকল্প পথ ধরেছে। বেড়েছে প্রমোদ-ভ্রমন, বেড়েছে মদ্যপান, বেশ্যাবৃত্তি, যৌনতা ও ড্রাগের আসক্তি। এমন স্বেচ্ছাচারি জীবন-উপভোগে পারিবারীক বন্ধনকে এরা পায়ের বেড়ী মনে করে, একারণেই শত্রুতা এটির বিরুদ্ধেও। সন্তান যৌন-বাজারে বাজার-দর কমাবে এ ভয়ে গর্ভপাতের নামে অবাধে শিশু হত্যা হচ্ছে। এভাবে পরিবার পরিনত হয়েছে মানব-হত্যার প্রশিক্ষণ ক্ষেত্রে।

 

পরিবার বিধস্ত হওয়ায় সবচেয়ে বেশী অসহায় ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নারী। পাশ্চাত্য সমাজে তাদের কদর বেড়েছে বিজ্ঞাপন, পর্ণ-ফিল্ম ও নাচ-গানের মত বিনাদন শিল্পে। অথচ আবহমান কাল থেকেই নারীদের জন্য পরিবার ছিল সুরক্ষিত দুর্গ। সেখানে মা হিসাবে সন্তানদের গভীর সম্মান, কন্যা ও বোনরূপে আদর ও স্নেহ এবং স্ত্রী হিসাবে ভালবাসা তারা যুগ যুগ পেয়ে এসেছে। অথচ নারী স্বাধীনতা, নারীর ক্ষমতায়ন ও সম-অধিকার ইত্যাদি নানা বাহানায় সেখান থেকে বের করে তাদরকে অসহায় ও অরক্ষতি করা হয়েছে। ফলে তারা আজ ধর্ষণ, হত্যা ও নানাবধি পাশবকি অত্যাচাররে শিকার। সুরক্ষিত পরিবার থেকে বের করে তাদরকে যেন ক্ষুধার্ত ও হিংস্র পশুর সামনে ফেলা হয়েছে। এমন অরক্ষিত অবস্থান থেকে নারীর পক্ষে সন্তান পালনের মত দায়িত্ব-পালন কি সম্ভব? তাছাড়া সন্তান পালন কোন লঘু-দায়িত্ব নয়, খন্ডকালীন কাজও নয়। এ কাজ নিজেই রাতদিনের এক সার্বক্ষনিক ব্যস্ততা। কল-কারখানা, অফিস-আদালত, সেনা বা পুলিশ বাহিনীতে গুরুদায়িত্ব পালনের পর কি এ কাজের আর সামর্থ থাকে? নারীর মর্যাদা বাড়াতে গিয়ে এভাবে বিপর্যয় বাড়ানো হয়েছে। পণ্যের ন্যায় নারীকেও  বাজারে তুলা হয়েছে।

 

নারীর দুটি সত্বা। একটি তার নারীত্ব। অপরটি যৌনতা। পর্দা যৌনতাকে আড়াল করে, আর প্রকাশ করে তার মহান নারীত্বকে। তখন সে সমাজে মা-বোন বা স্ত্রীর সম্মানজনক মর্যাদা পায়। মায়ের পায়ের নীচে সন্তানের জান্নাতের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। নারীত্বের বদলে যথন যৌনতা প্রাধান্য পেয়েছে তখনই নারীর জীবনে প্রচন্ড বিযর্যয় নেমে এসেছে। তখন বিধ্বস্ত হয়েছে পরিবার। যৌনতা নিয়ে বাণিজ্য জমে, কিন্তু তাতে পরিবার প্রতিষ্ঠা পায় না। এজন্যই পতিতাদের কোন পরিবার থাকে না। পাশ্চাত্যে নারীর যৌন সত্ত্বা নিয়ে ব্যণিজ্যে যে কতটা রমরমা ভাব, সেটির প্রমাণ মেলে অলিতে গলিতে নাইট ক্লাব, মদ্যশালা বা পাব ও পতিতাপল্লির সংখ্যা দেখে। পণ্যের বাজারজাত করণে গুরুত্বপূর্ণ হলো আর্কষনীয় প্যাকেজিং। তেমনটি ঘটেছে নারীর ক্ষেত্রেও। এবং সেটি ঘটেছে নিত্য-নতুন ফ্যাশানের নামে। ফ্যাশানের প্রকোপে বিলুপ্ত হয়েছে পর্দা ও শালীন পোষাক। অথচ পর্দা যুগ যুগ ধরে নারীর যৌনতাকে ঢেকে রেখেছে এবং নিরাপত্তা দিয়েছে এবং মহীয়ান করেছে তার নারীত্বকে। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে পর্দা চিহ্নিত হয়ে এসেছে সভ্যতা ও শিষ্ঠতার প্রতীক রূপে। মানব জাতির এটি অতি সনাতন প্রথা। যখন বস্ত্র ছলিনা তখনও মানুষ গাছের পাতা বা ছাল, চামড়া ইত্যাদি দিয়ে লজ্জা নিবারনের চেষ্টা করেছে।

বাংকার বা পরিখার নিরাপদ আশ্রয় থেকে কাউকে বের করে খোলা ময়দানে গুলীর লক্ষ্যবস্তু বানানো সহজ। স্বার্থশিকারী পুরুষেরাও চায় চায় ঘরের নিরাপদ আশ্রয় থেকে নারীদরে বের করে আনতে। পাশ্চাত্যে বস্তুতঃ সেটিই করা হয়েছে। ফলে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির জোয়ারে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নারী। র্ধমহীন ও বিবেকহীন মানুষের শোষন, শাসন ও নির্যাতনের শিকার যেমন দুর্বল মানুষ, তেমনি যৌন শোষনের শিকার হলো দুর্বল নারী। অথচ নারী স্বাধীনতা ও সম-অধিকারের গলাবাজী ও প্রলোভনে তাদরেকে আত্মভোলা করে রাখা হয়েছে।

 

স্বামী-স্ত্রীর বৈবাহিক সর্ম্পকে আপোষ চলনো। তাদের সর্ম্পকে অন্য কেউ ভাগীদার হবে সেটিও অকল্পনীয়। কিন্তু ভোগবাদীদের কাছে এমন আপোষহীনতা কুসংস্কার। মদমত্ত নাচের তালে অন্যের স্ত্রীকে যেমন তারা কাছে টানে, তেমনি নিজের স্ত্রীকে সঁপে দেয় অন্যের আলঙ্গিনে। এরূপ সংস্কৃতির পরিচর্যা বাড়াতেই পাশ্চাত্যে প্রতি লোকালয়ে গড়ে উঠেছে নাইট ক্লাব। আর  এটিই   হলো আধুনিক পাশ্চাত্য সংস্কৃতি। এ সংস্কৃতিতে যেটি বাড়ে সেটি পাপ। প্রসেডিন্টে, প্রধানমন্ত্রী, সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক দলের কর্মী, উচ্চ পদস্থ কর্মচারী, এমনকি গীর্জার পাদ্রীও আক্রান্ত এ পাপাচারে। ফলে বিপন্ন হয়েছে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরকি আস্থা ও সর্ম্পক। এতে ভেঙ্গে যাচ্ছে পরিবার এবং সুফল মিলছে না মিলশিমশিনো বার বার বিবাহতেও। আর বিবাহিত জীবন ব্যর্থ হলে যেটি বাড়ে সেটি হলো ব্যাভিচার। পাশ্চাত্যে সেটিই হয়েছে। আর কোন রাষ্ট্র বা সমা পাপাচারে প্লাবিত হলে পাপের সংজ্ঞাই পাল্টে যায়। তখন পাপ আর পাপ রূপে গণ্য হয় না। গণ্য হয় শিষ্ঠ কর্ম রূপে। এমন পাপকে পাপীষ্ঠরা অতীতে র্ধম-র্কমও বলছে। যেমন কা’বাকে ঘিরে পৌত্তলিক কাফেরদের উলঙ্গ তোয়াফ বা ভারতীয় মন্দিরে যৌন দাসীদের সাথে ব্যাভীচার। ব্যাীব্যভববববববচিার। পাপতো তাই যা নীতি ও নৈতিকতা বিরোধী, যা শিষ্ঠতার খেলাপ। সে নীতি ও নৈতিকতাই যদি পাল্টে যায় তবে সে গুলো কি আর পাপ রূপে গন্য হয়? ব্যাভিচার, সমকামিতা বা হোমোসেক্সুয়ালিটি এ কারনেই পাশ্চাত্য সমাজে আজ আর অপরাধ নয়, বরং আইনসিদ্ধ বৈধ কর্ম। এখন এ পাপ গুলোকেই তারা বিশ্বব্যাপী সিদ্ধ করতে চাচ্ছে। এরা এ পাপাচারকেই এখন নাগরিক অধিকারে পরিণত করতে চায়। এ কাজে তারা ব্যাবহার করছে জাতিসংঘকে। পরিবার ভেঙ্গে যারা পতিতার পল্লীতে আশ্রয় নিয়েছে তাদেরকে বলছে সেক্স ওয়ার্কার। ব্যাভিচারের ন্যায় পাপাচারের বিরুদ্ধে এতকাল যে ঘৃনাবোধ ছিল এখন সেটিই বিলুপ্ত করছে। প্রশ্ন হলো, যে মূল্যবোধে এমন পাপাচার প্রশ্রয় পায় সে মূল্যবোধে কি পরিবার বাঁচে?

 

প্রশ্ন হলো এ বিনাশী বিপর্যয় থেকে উদ্ধার কোন পথে? পথ একটিই, আর তা হলো ইসলামের পূর্ণ অনুসরণ। সে সাথে পাশ্চাত্যের মূল্যবোধ, জীবনচেতনা ও সংস্কৃতিকে বর্জন করা। চিন্তা-চেতনার মডেল না পাল্টালে কর্ম ও আচরনেও কোন পরর্বিতন আসে না। নবীজি (সাঃ) সে কাজটিই করেছিলেন। বিপর্যস্ত পরিবার বস্তুতঃ রোগাগ্রস্ত  চেতনার সিম্পটম মাত্র। মূল রোগ আরো গভীর। আর সেটি হলো ইসলামে অজ্ঞতা।  অজ্ঞতায় যেটি বাড়ে সেটি আল্লাহ ও তাঁর দ্বীনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। মানব-সভ্যতা কোন কালেই  সম্পদের কমতির কারণে বিপর্যস্ত হয়নি। বিপর্যস্ত হয়েছে নৈতিক বিপর্যয়ের কারণে। দুর্ভিক্ষে যদিও প্রান নাশ হয় তবে তাতে সভ্যতার বিনাশ হয় না। প্রচীন কালে পাহাড় কেটে কেটে সামুদ জাতি সুরম্য প্রাসাদ গড়ছেলি। তারা নিশ্চিহ্ন হয়েছিল। নিশ্চিহ্ন হয়েছিল নমরূদ ফিরাউন। এর কারণ আল্লাহর অবাধ্যতা। অথচ ফিরোউন বহু হাজার বছর আগে স্থাপত্যে বিস্ময়কর ইতিহাস গড়েছিল।

 

পাশ্চাত্যের ঘাড়ে এই একই রোগ চেপেছে। প্রাচুর্যের অহংকার শুধু সত্যকে মেনে নিতেই অমনোযোগী করেনি। বরং সেটি আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে তাদেরকে যুদ্ধাংদেহীও করেছে। উদ্ধত ও প্রচন্ড অহংকারী করেছে হোমোসেক্সুয়ালিটি, মদ্যপান, উলঙ্গতা, পর্নোগ্রাফী এসব পাপ কর্ম নিয়েও। এমন পাপের অধিকারকে তারা মানবাধিকার বলছে। অতীতে যে দুর্ভোগ হয়েছে রোগ-ব্যাধির কারণে, এখন তার চেয়েও বেশী দুর্ভোগ হচ্ছে এরূপ বিধ্বস্ত মূল্যবোধ ও বিপর্যস্ত পরিবারের কারণে। পাশ্চাত্যের মূল বিপদ এখানেই। গাড়ীর মডল  নিয়ে তাদরে যতটা ব্যস্ততা, পথের ডিরেকশন নিয়ে ততটা নয়। এ অবস্থায় রোগ যেমন বাড়ছে তেমনি তীব্রতর হচ্ছে সিম্পটম। এমন বিপর্যয়ের মুখে পাশ্চাত্যের সমাজ-বিজ্ঞানী বা দার্শনিকগণ অসহায়। যে স্রোতের টানে তারা গা ভাসিয়ে দিয়েছে সেটিয়ে তাদের ভাসিয়ে নিয়ে ছাড়বে। এ অসুস্থ্য সভ্যতাকে বাঁচাতে তাদের সকল সামর্থ নিঃশেষ। বিশ্বের অন্য র্ধম ও মতবাদগুলোরও একই রূপ বেহাল অবস্থা। তাছাড়া এসব অনৈতিক চেতনা ও জীবন-বোধ পরিবারে শান্তি এনেছে -সমগ্র ইতিহাসে তার নজির নেই। এমন নৈতিক বিপর্যয়ের মোকাবেলায় একমাত্র ইসলামই শেষ ভরসা। তাছাড়া এমন বিপর্যয়ের মুখে মানব জাতির উদ্ধারে একমাত্র ইসলামই অতীতে সফলতা দেখিয়েছে। সেটি একবার নয়, বহুবার। শুধু একটি জনপদে নয়, অসংখ্য জনপদে। ইসলামের সে সার্মথ এখনও অম্লান। আল্লাহর প্রদর্শিত এ পথটি এখনও অক্ষত তার বিস্ময়কর নির্ভূলতা নিয়ে। স্রষ্টার পক্ষ থেকে বস্তুতঃ এটিই একমাত্র প্রেসক্রিপশন। এ প্রেসক্রিপশন অপরিহার্য শুধু সমাজ ও রাষ্ট্রের সুস্থ্যতা বিধানেই নয়, বিপর্যস্ত পরিবারকে বাঁচাতেও। বর্তমানের পারিবারিক বিপর্যয় থেকে উদ্ধারের এটিই একমাত্র পথ। লন্ডন, ১৯/০৭/২০০৯