রবীন্দ্রসাহিত্যের নাশকতা এবং বাঙালী মুসলিমের আত্মপচন

বাঙালীর রবীন্দ্র-আসক্তি ও আত্মপচন

দৈহিক পচনের ন্যায় আত্মপচনের আলামতগুলিও গোপন থাকে না। আত্মপচনে মৃত্যু ঘটে বিবেকের; তাতে বিলুপ্ত হয় নীতি ও নৈতিকতা। চুরি-ডাকাতি, ভোট-ডাকাতি, সন্ত্রাস, গুম, হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, ধর্ষণে উৎসব,লগি-বৈঠা নিয়ে রাজপথে হত্যা, পুলিশী রিম্যান্ডে হত্যা, ক্রসফায়ারে হত্যা–এ রূপ নানা নিষ্ঠুরতা তখন নিত্তনৈমত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। অতি নির্মম ও নিষ্ঠুর কাজেও তখন বিবেকের পক্ষ থেকে বাঁধা থাকে না। এর ফলে রাস্তাঘাটে শুধু অর্থকড়ি,গহনা ও গাড়ি ছিনতাই হয় না, নারী ছিনতাইও শুরু হয়। পত্রিকায় প্রকাশ, মাত্র গত তিন মাসে দেশে ১২৩ জন মহিলা ছিনতাই ও ধর্ষণের শিকার হয়েছে। (দৈনিক আমার দেশ, ২৬/০৫/১৫)। তবে সব ধর্ষিতাই যে থানায় এসে নিজের ধর্ষিতা হওয়ার খবরটি জানায় -তা নয়। কারণ তাতে অপরাধীর শাস্তি মেলে না বরং সমাজে ধর্ষিতা রূপে প্রচার পাওয়ায় অপমান বাড়ে। অধীকাংশ ধর্ষণের ঘটনা তাই গোপনই থেকে যায়।ফলে ধর্ষিতা নারীদের আসল সংখ্যা যে বহুগুণ বেশী –তা নিয়ে সন্দেহ থাকার কথা নয়।জাহিলিয়াত যুগের আরবগণ এরূপ আত্মপচনের ফলে নানারূপ নিষ্ঠুরতায় ডুবেছিল। কন্যাদের তারা জীবন্ত দাফন দিত। সন্ত্রাস, রাহাজানি, ব্যাভিচারি, কলহ-বিবাদ ও গোত্রীয় যুদ্ধে ডুবে থাকাই ছিল তাদের সংস্কৃতি।

তবে জাহেলিয়াত যুগের আরবগণ আত্মপচন থেকে শুধু যে রক্ষা পেয়েছিল তা নয়,সমগ্র মানব ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতারও জন্ম দিয়েছিল। তারা যে দ্রুত বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয়েছিল সেটিই মূল নয়,নীতি-নৈতিকতার ক্ষেত্রেও যে উচ্চতায় তারা পৌঁছেছিল -অন্য কোন জাতি সে স্তরে কোন কালেই পৌঁছতে পারিনি। কীরূপে তারা সে পচন থেকে রক্ষা পেল,কীভাবে তারা এত উপরে উঠলো এবং বাঙালী মুসলিমেরাই বা কেন এত দ্রুত নীচে নামছে -সেটিই আজ সমাজ বিজ্ঞানের অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।পতিত আরবদের এত দ্রুত উপরে উঠার মাঝেই নিহীত রয়েছে সমগ্র মানবজাতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। কারণ শয্যাশায়ী কান্সারের রোগীও যে ঔষধে সুস্থ্য হয়ে উঠে সে ঔষধ থেকে মানব জাতি দৃষ্টি ফেরায় কি করে? আরবগণ  জেগে উঠে প্রমাণ করে গেছে আত্মপচনেরও মোক্ষম চিকিৎসা আছে। মানবজাতির জন্য তাদের সে শিক্ষাটিই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষা। আকাশে উড়া,চাঁদে নামা ও আনবিক বোমার তৈরীর বিদ্যা না শিখিয়ে তারা শিখিয়ে গেছে আত্মপচনের পর্যায় থেকে সর্বশ্রেষ্ঠ মানবিক রূপে বেড়ে উঠার বিদ্যা। এর চেয়ে উপকারি বিদ্যা আর কি হতে পারে? দেহে যে রোগ আছে শুধু এটুকু জেনে লাভ কী? লাভ তো রোগের সুচিকিৎসাটি জানায়। বাঙালী মুসলিমের এখানেই ব্যর্থতা। গার্মেন্টস শিল্পে বাংলাদেশে বিশ্বে দ্বিতীয়, মৎস্য উৎপাদনে চতুর্থ। পাঠ উৎপাদনে শীর্ষে। কিন্তু দুর্বৃত্ত উৎপাদন বিপুল সংখ্যায় হওয়ায় অন্যসব অর্জন ম্লান হয়ে যাচ্ছে। দুর্বৃত্তদের কারণে বাংলাদেশ দ্রুত বাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। ফলে হাজার হাজার বাঙালী মুসলমান দেশ ছাড়ছে রহিঙ্গাদের পরিচয় নিয়ে।নিজ দেশ ছেড়ে তারা গভীর সমুদ্রে গিয়ে ভাসছে, অন্য দেশে আশ্রয় না পেয়ে প্রাণ বাঁচাতে মূত্রপান করছে।আরবদের পচনটি কোন কালেই কি এ পর্যায়ে পৌছেছে? নিজ দেশ ছেড়ে তারা কি কখনো সাগরে গিয়ে ভেসেছে? গভীর সংকটের আরো  কারণ,এরূপ ভয়ানক বিপর্যের মাঝে পড়েও বাঙালী মুসলিমের আগ্রহ নেই রোগের কারণ ও তার চিকিৎসা নিয়ে। দেশে কৃষিপণ্য,শিল্পপণ্য,মৎস্য চাষ, গরুমহিষের আবাদ বা মনুষ্যজীবের রপ্তানি বেড়েছে। কিন্তু তা দিয়ে কি আত্মপচন থেকে বাঁচা যায়? আত্মপচনের কারণটি অর্থাভাব, খাদ্যাভাব, দেহের অপুষ্টি বা রোগব্যাধী নয়। বরং সেটি মনের প্রচন্ড অপুষ্টি ও অসুস্থ্যতা। মনের সে অপুষ্টি ও অসুস্থ্যতার কারণ,জ্ঞানশূণ্যতা। এবং সে জ্ঞানশূণ্যতাটি পবিত্র ওহীর জ্ঞানের। দেহ বল পায় পুষ্টিকর খাদ্য থেকে; এবং বিবেক পুষ্টি পায় সত্যজ্ঞান ও সঠিক দর্শন থেকে। নিরেট সত্য ও সঠিক দর্শনের উৎস্য তো মহান আল্লাহতায়ালার নাযিলকৃত গ্রন্থ। চেতনার রোগ সারাতে ও বিবেককে সবল করতে সে নাযিলকৃত সত্যের সামর্থটি বিশাল। সেটি প্রমাণিত হয়েছে আজ থেকে সাড়ে ১৪ শত বছর আগে। মুসলিম মন তখন প্রবল পুষ্টি পেয়েছিল পবিত্র কোরআন থেকে। তাতে দূর হয়েছিল আরব মনের অসুস্থ্যতা। ফলে এককালের অসভ্য আরবগণ অতিদ্রুত সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানবে পরিণত হতে পেরেছিলেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাঙালী মনের সে অসুস্থ্যতা সারাতে বাংলাদেশে সত্যজ্ঞান ও দর্শনের উৎস্যটি কি? সেটি কি পৌত্তলিক রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও গান? সেটি কি সেক্যুলার বাঙালী সাহিত্যিকদের লেখা প্রবন্ধ, গল্প ও উপন্যাস? সেটি কি মুক্তমনা নাস্তিকদের দর্শন? সেক্যুলার বাঙালীরা তো ভেবেছে এগুলিই তাদের শান্তি ও প্রগতির পথ দেখাবে। কিন্তু সেটি যে মিথ্যা সেটি প্রমাণ করতে কি আরো নীচে নামতে হবে? আরো কত হাজার বাঙালীকে সমুদ্রে ভেসে মূত্রপান করতে হবে? আরো কত হাজার নারীকে ধর্ষণ ও সে ধর্ষণের ইতর উৎসব দেখতে হবে? শাপলা চত্বরের গণহত্যাই আর কত বার সহ্য করবে? কতবার দেখবে ভোট-ডাকাতির নির্বাচন?

নাশকতা সেক্যুলার রাজনীতির
বাংলাদেশে আজ যে ভয়ানক আত্মপচন তার মূল কারণঃ চেতনায় ও বুদ্ধিবৃত্তিতে ভয়ানক বিষক্রিয়া। আর সেটি সেক্যুলার রাজনীতি ও কুসাহিত্যের কারণে। পানির পাইপ যেমন গৃহে গৃহে দূষিত পানির সরবরাহ বাড়ায়, তেমনি কুসাহিত্যের মাধ্যমে নরনারীর চেতনাতেও লাগাতর বিষপান ঘটে। বাংলাদেশে সে কাজটি প্রচন্ড ভাবে হয়েছে। বিগত শত বছরে বাঙালীর ভাত-মাছ-ডাল-শাক-সবজি তথা খাদ্যে কোন পরিবর্তন আসেনি। বাংলার গাছপালা,আলোবাতাস বা জলবায়ুতেও তেমন পরিবর্তন আসেনি।কলেরা-টাইফয়েড-ম্যালেরিয়ার স্থলে কোন নতুন রোগেরও আবির্ভাব হয়নি। ফলে বর্তমান বিপর্যয়ের জন্য এর কোনটিকেও দোষ দেয়া যায় না।  বিগত শত বছরে বাংলার বুকে বিশাল পরিবর্তন এসেছে মূলতঃ দুটি ক্ষেত্রে। এক). বাংলার মুসলিম গৃহে শত বছর আগে রবীন্দ্র সাহিত্য ও রবীন্দ্রসঙ্গিতের চর্চা ছিল না। নাচগানও ছিল না। নাচগান সীমিত ছিল হিন্দু ও পতিতাপল্লির বাইজীদের গৃহে। কিন্তু রবীন্দ্রসঙ্গিত ও নাচগান এখন নেমে এসেছে সাধারণ মানুষের গৃহে। সমগ্র দেশজুড়ে হাজার হাজার এনজিও গড়ে উঠেছে যাদের কাজ হয়েছে সেগুলি শেখানো।দুই). শত বছর আগে বাংলার রাজনীতিতে সেক্যুলারিস্টদের স্থান ছিল না। রাজনীতিতে তখন ইসলামের প্রতি প্রবল অঙ্গিকার ছিল। ফলে বাংলার মাটিতে সেদিন গড়ে উঠেছিল খেলাফত আন্দোলন ও  পাকিস্তান আন্দোলনের ন্যায় দুটি বিশাল গণআন্দোলন। অথচ আজ  দেশ অধিকৃত হয়ে আছে ধর্মচ্যুৎ ও ইসলামচ্যুৎ উগ্র সেক্যুলারিস্টদের হাতে। তাদের যুদ্ধ ইসলামের বিরুদ্ধে। কোরআনে তাফসির বন্ধ করা, জিহাদবিষয়ক বই বাজেয়াপ্ত করা, ইসলামপন্থিদের ফাঁসিতে ঝুলানো,মুসল্লিদের হত্যাকরা এবং তাদের লাশকে ময়লার গাড়িতে তুলে গায়েব করাই তাদের সংস্কৃতি। তাদের নেতৃত্বে দেশে যা শুরু হয়েছে তা মূলত পৌত্তলিক সাহিত্য ও সেক্যুলার রাজনীতিরই ভয়ানক বিষক্রিয়া। বাঙালী মুসলমানের আজকের আত্মপচনের মূল কারণ হলো এটি।

দেশে আজ স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, পত্র-পত্রিকার সংখ্যা বিপুল। কিন্তু তাতে সত্যজ্ঞান ও সত্য-দর্শনের আবাদ বাড়েনি; বরং বেড়েছে ঈমানবিনাশী বিষপানের মহা আয়োজন। জনগণের জীবনে এখন শুরু হয়েছে তারই বিষক্রিয়া। ইসলামের পূর্বে আরবী সাহিত্যে বিষপানের যে আয়োজনটি ছিল, সে তুলনায় বাংলাভাষার ভাণ্ডারটি বিশাল। পৌত্তলিকদের এতবড় সাহিত্যভাণ্ডার বিশ্বের আর কোন ভাষায় নেই। এ কাজে রবীন্দ্রনাথের তো নবেল প্রাইজও মিলেছে। তবে এ ভাণ্ডার শুধু রবীন্দ্রনাথ বা বঙ্কিমচন্দ্রের সৃষ্ট নয়,বরং গড়ে উঠেছে শত শত বাঙালী পৌত্তলিক সাহিত্যিকের সম্মিলিত চেষ্টায়।আধুনিক বাংলা গড়ে উঠেছে মূলত হিন্দুদের দ্বারা। এবং সেটি হিন্দুদের গোড়া হিন্দু রূপে গড়ে তোলার প্রয়োজনে। বাংলা ভাষার শতকরা ৯০ ভাগের বেশী বইয়ের লেখক তারাই। ফলে বেদ, পুরান, গীতা,উপনিষদ, রামায়ন, মহাভারতের চরিত্রগুলি তাই বাংলা সাহিত্যে অতি সরব ও সোচ্চার। শুধু বঙ্কিম সাহিত্যে নয়, রবীন্দ্র সাহিত্যেও হিন্দু ধর্ম, হিন্দু একতা ও হিন্দুরাজের চেতনাটি যে কতটা প্রকট সেটিও এ প্রবন্ধে নীচে তুলে ধরা হয়েছে।

ঈমান,আমল ও সৎ চরিত্র নিয়ে বাঁচতে হলে চেতনার সুস্বাস্থটি জরুরী। চেতনার মানচিত্রে লাগাতর বিষ ঢুকলে সেটি  সম্ভব নয়, অথচ পৌত্তলিক সাহিত্য পাঠে তো সেটিই ঘটে। ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ অতীতে এ বিষের ভাণ্ডারকে তাই সতর্কতার সাথে পরিহার করেছে। তারা বরং চেতনায় পুষ্টি জুগিয়েছে উর্দু ও ফার্সী ভাষা থেকে। কিন্তু ১৯৭১য়ের ডিসেম্বরে যুদ্ধে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের উপর ভারতীয় সেনাবাহিনীর অধিকৃতি প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর সংযোগ গড়া হয় হিন্দুদের গড়া পৌত্তলিক বিষ ভান্ডারের সাথে। জ্ঞানচর্চার অঙ্গণে সংযোগ ছিন্ন করা হয় পবিত্র কোরআনের সাথেও। বাঙালী মুসলিমের চেতনায় তখন বাঁধ ভাঙ্গা জোয়ারের ন্যায় ঢুকানো হয় পৌত্তলিক সাহিত্য, সিনেমা ও গান। পৌত্তলিক চেতনায় সমৃদ্ধ বরীন্দ্রনাথের “আমার সোনার বাংলা” গানটিকে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিতের মর্যাদা দেয়া হয়।অথচ সে লক্ষে এ গানটি লেখা হয়নি।

বিবেকে বিষক্রিয়া

শিক্ষা ও সাহিত্যের নামে লাগাতর বিষপান হলে বিবেকে বিষক্রিয়া দেখা দিবে –সেটিই তো স্বাভাবিক। তখন সৃষ্টি হয় চরম নৈতিক বিপর্যয়। মুসলিম শিশুদের মুসলিম রূপে গড়ে তোলার কাজটি বিশাল। একাজ শুধু পিতামাতা ও মসজিদ-মাদ্রাসার দ্বারা হওয়ার নয়। বরং সবচেয়ে বড় ভূমিকাটি রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত টিভি,পত্রপত্রিকা ও প্রকাশনা সংস্থার। ছাত্রদের শুধু বিষপান থেকে বাঁচালে চলে না, তাদের চেতনায় কোরআনী জ্ঞানের পুষ্টিও জোগাতে হয়।রাষ্ট্রের ঘাড়ে এটিই সবচেয়ে বড় দায়ভার। অথচ বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠের দেশে সরকারের পক্ষ থেকে সে দায়িত্ব পালিত হয়নি। মুসলিম শিশুকে মুসলিম রূপে গড়ে তোলার কাজটি সরকারি মহলে সাম্প্রদায়িকতা গণ্য হয়।অথচ স্কুল-কলেজে পৌত্তলিক সাহিত্য পড়ানোর কাজটি সরকার নিজ কাঁধে নিয়েছে। অতি পরিকল্পিত ভাবেই ছাত্র-ছাত্রীদের কোরআন বুঝার সামর্থ বাড়াতে উদ্যোগ নেয়া হয়নি।অথচ সে সামর্থ অর্জনটি প্রতিটি মুসলমান নরনারীর উপর ফরজ। সরকারের এরূপ ইসলামবিরোধী শিক্ষানীতির কারণে দেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডাক্তার, ইঞ্জিনীয়ার, কৃষিবিদ, আইনবিদ,হিসাববিদ ও অন্যান্য পেশাধারি তৈরী হলেও সত্যিকার মুসলিম তৈরী হচ্ছে খুব কমই। যারা হচ্ছে তারা নিজ উদ্যোগে।কোরআনী জ্ঞানের জ্ঞানশূণ্যতায় কি ঈমান বাঁচে? বাঁচে কি চরিত্র? ফলে যা হবার তাই হয়েছে। ঈমাননাশ ও চরিত্রনাশের মহামারি ছেয়ে গেছে সমগ্র দেশ জুড়ে। ফলে জাহেলী যুগের আরবদের চেয়েও ভয়াবহ দুর্বৃত্তি নেমে এসেছে বাংলাদেশের উপর।লাগাতর বিষপানের পরিণতিতে এ ভয়ানক বিষক্রিয়া। ইসলামপূর্ব যুগে আরবের জাহেলগণ দুর্বৃত্তিতে বিশ্বে শিরোপা পেয়েছে -সে প্রমাণ ইতিহাসে নেই। লুন্ঠনে লুন্ঠনে দেশের বুকে তারা দুর্ভিক্ষ ডেকে এনেছে বা মহিলাদের মাছধরা জাল পড়তে বাধ্য করেছে -সে প্রমাণও নেই। বরং জাহিলিয়াতের যুগেও মেহমানদারিতে তাদের সুনাম ছিল, হাতেম তায়ীর মত ব্যক্তিও তাদের মাঝে জন্ম নিয়েছে। বিদেশীদের ঘরে তারা কখনোই নিজেদের কন্যা, বোন বা স্ত্রীদেরও রপ্তানি করেনি। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশী জাহেলদের নীচে নামার অর্জনটি তো বিশাল। দুর্বৃত্তিতে তারা বিশ্বে ৫ বার প্রথম হয়েছে। ১৯৭৪ সালে দেশে ভয়ানক দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করা হয়েছে; কাপড়ের অভাবে মহিলারা বাধ্য হয়েছে মাছধরা জাল পড়তে। এবং নারী রপ্তানি পরিণত হয়েছে দেশের অর্থনীতিতে।

হাসিনা বর্বরতার আরেক ইতিহাস গড়েছে অন্য ভাবে। সেটি প্রাণ বাঁচাতে আসা ও সমুদ্রে ভাসা রোহিঙ্গা মুসলমানদের বঙ্গীয় উপকূলে উঠতে না দিয়ে। সে বর্বরতাটিও বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে। এমন কি জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল মিষ্টার বান কি মুনও তাকে এরূপ নিষ্ঠুর আচরন পরিহারে আহবান জানিয়েছিলেন। রোহিঙ্গাদের প্রতি সদয় হতে বলেছিলেন। কিন্তু বিবেকহীন নিষ্ঠুরতাই যার রাজনীতির মূলমন্ত্র, তার কাছে কি মানবতা বা কারো সুপরামর্শ গুরুত্ব পায়? এখন রোহিঙ্গাদের পরিচয় নিয়ে খোদ বাংলাদেশীরা কদর্য ইতিহাস গড়ছে মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও নানা দেশে চাকুরির সন্ধানে নেমে। মালয়েশিয়ার সরকারের দাবী,সমূদ্রে ভাসা উদ্বাস্তুদের শতকরা ৭০ ভাই বাংলাদেশী।(এ প্রবন্ধের লেখক নিজে ইস্তাম্বুলের রাস্তায় এমন বাংলাদেশীদের দেখেছেন যারা নিজেরাই লেখককে বলেছে,রোহিঙ্গা পরিচয় দিয়ে তারা তুরস্কের সরকার থেকে নিয়মিত ভাতা নিচ্ছে এবং সে সাথে কারখানায় কাজও করছে।) অপর দিকে বিহারীদের সাথে কৃত নিষ্ঠুরতা কি কম? স্রেফ অবাঙালী হওয়ার কারণে প্রায় ৪ লক্ষ বিহারীকে তাদের ঘরবাড়ী ও দোকান-পাট থেকে নামিয়ে সেগুলির দখল করে নিয়েছে বাঙালীরা। অথচ ১৯৭১য়ের পর সে পাকিস্তানে অবাঙালীদের মাঝে গিয়ে উঠেছে ১০ লাখের বেশী বাঙালী।

কোন দেশই দুয়েকজন নাগরিকের আত্মপচন, চুরিডাকাতি ও খুনখারাবীর কারণে দুর্বৃত্তিতে বিশ্বরেকর্ড গড়ে না। সেরূপ রেকর্ড গড়তে আত্মপচনটি মহামারি রূপে দেখা দেয়া জরুরী। তেমনি এক আত্মপচনের মহামারি ছেয়ে গেছে সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে। ফলে দেশজুড়ে ভোট ডাকাতি, ব্যাংক ডাকাতি, শেয়ার মার্কেট লুট বা শাপলা চত্বরের ন্যায় নৃশংস গণহত্যাও তখন স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়ায়।বিবেকের এ মহামারিতে চিকিৎসাতেও কোন আগ্রহ থাকে না।চোর-ডাকাতদের পাড়ায় চুরি-ডাকাতি,খুন-ধর্ষণ ও সন্ত্রাস নিয়ে তাই কখনো বিচার বসে না। তা নিয়ে কারো লজ্জাবোধও হয় না।বরং সে মহল্লায় পাপকর্মে যার অধীক সামর্থ তাকে নিয়ে গর্ব হয়;এবং উৎসবেরও আয়োজন হয়।জাহাঙ্গির নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণে সেঞ্চুরির উৎসব এবং এবারের বাংলা নববর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি প্রাঙ্গণে মহিলাদের কাপড় খুলে শ্লীলতাহানির উৎসবের পিছনে তো তেমনি এক অসুস্থ্য চেতনা কাজ করেছে। ধর্ষকদের কাছে প্রতিটি সফল ধর্ষণ এবং ডাকাতদের কাছে প্রতিটি সফল ডাকাতিতেই তো উৎসব। তাই যে দুর্বৃত্তপাড়ায় ধর্ষণ হয় বা ডাকাতি হয় সেখানে প্রচণ্ড উৎসবও হয়। ডাকাতিতে সফল নেতৃত্বের জন্য সর্দার বা সর্দারনীকে বিপুল সংবর্ধনাও দেয়া হয়।তাই প্রতিদিন উৎসব লেগে আছে বাংলাদেশের মন্ত্রীপাড়ায়, সরকারি দলের অফিসে, দলীয়কর্মীদের ঘরে ঘরে এবং সরকারি প্রশাসনে।এমন উৎসবমুখর মহলে ভোটডাকাতি,ব্যাংকডাকাতি, দুর্বৃত্তি,সন্ত্রাস,মানবপাচার,নারীপাচার,গভীর সমূদ্রে ভাসমান হাজার হাজার বাংলাদেশী ও জীবন বাঁচাতে রোহিঙ্গাদের প্রস্রাবপান নিয়ে তাদের মাঝে দুশ্চিন্তা থাকার কথা নয়।লজ্জা-শরম থাকারও কথা নয়। বরং যা হবার তাই হচ্ছে। সেটি ভোট-ডাকাতিতে সফল নেতৃত্ব দেয়ায় ও দলীয় নেতাকর্মীদের চুরিডাকাতির সুযোগ করে দেয়ায় হাসিনার বিপুল সংবর্ধনার। আত্মপচনের এর চেয়ে বড় আলামত আর কি হতে পারে?

রবীন্দ্র সাহিত্যের বিষভান্ডার

রবীন্দ্রসাহিত্যে হিন্দুদের জন্য অনুপ্রেরণার প্রচুর উপকরণ থাকলেও বাঙালী মুসলিমদের জন্য তা ছিল এক বিশাল বিষভান্ডার। রবীন্দ্রনাথ যে কতটা মুসলিম বিরোধী ছিলেন সেটি কোন গোপন বিষয় নয়, নানা ভাবে তার প্রকাশ ঘটেছে। সে চেতনাটির প্রথম প্রকাশ ঘটে ১৯০৫ সালে। বিহার,বাংলা এবং আসাম নিয়ে তখন বৃহত্তর বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি প্রদেশ ছিল। ব্রিটিশ শাসকদের পক্ষে বিশাল এ প্রদেশের উপর প্রশাসনিক নজরদারী রাখা তখন কঠিন পড়ে। তাই নিজেদের প্রশাসনিক স্বার্থে তারা প্রদেশটিকে বিভক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়, এবং ১৯০৫ সালে পূর্ববঙ্গ ও আসামকে নিয়ে গঠন করে একটি নতুন প্রদেশ। এ নতুন প্রদেশের রাজধানি হয় ঢাকা।এ সিদ্ধান্তের পিছনে ব্রিটিশদের মনে কোনরূপ মুসলিমপ্রীতি কাজ করেনি, বরং কাজ করেছে সাম্রাজ্যবাদি স্বার্থ। কিন্তু হিন্দুরা বিষয়টিকে হিন্দু স্বার্থের বিরুদ্ধে  ক্ষতিকর রূপে গণ্য করে। পূর্ব বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ছিল দরিদ্র মুসলিম। পূর্ব বাংলার সম্পদে পশ্চিম বাংলার মানুষের উন্নতি ঘটলেও পূর্ব বাংলার মানুষের তাতে কোন পরিবর্তন ঘটেনি। পূর্ববাংলা ছিল কলকাতা কেন্দ্রীক কলকারখানার কাঁচা মালের প্রধানতম উৎস,কিন্তু তাদের উন্নয়নে কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ১৯০৫ সালে নতুন প্রদেশ সৃষ্ট হওয়াতে পূর্ব বাংলার মুসলিমগণ শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অঙ্গণে কিছুটা উন্নয়নের মুখ দেখেছিল। কিন্তু সেটি গণ্য হয় বহু যুগ ধরে প্রতিষ্ঠিত বর্ণহিন্দুদের কায়েমি স্বার্থের উপর প্রচন্ড আঘাত রূপে। তখন বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদের অজুহাত খাঁড়া করে বর্ণ হিন্দুরা নতুন এ প্রদেশকে বাতিল কররা দাবীতে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সে আন্দোলনে সকল হিন্দু জমিদার, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক,সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীরা এক হয়ে যান। সেই সময় ভারতীয় কংগ্রেস শুরু করে স্বদেশী আন্দোলন। সে আন্দোলনে প্রয়োজন ছিল একজন জাতীয় হিন্দু নেতার মডেল। সে প্রয়োজন তারা ইতিহাস থেকে তুলে আনেন শিবাজীর ন্যায় ভারতের মুসলিম শাসনের কট্টোর বিরোধী ও সন্ত্রাসী শিবাজীকে। কংগ্রেসি নেতা বাল গঙ্গাধর তিলক শিবাজীকে ভারতীয় হিন্দু-জাতীয়তাবাদের জনক রূপে খাড়া করেন। তখন থেকেই রাজনীতির ময়দানে শুরু হয় সাম্প্রদায়িক রাজনীতির গোড়াপত্তন। শিবাজীকে ভারতীয় হিন্দুদের জাতীয় নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে ১৯০৪ সালে চালু করা হয় শিবাজী উৎসব। এর আগে ১৮৯৩ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় “গো-রক্ষিণী সভা”। এ সব আয়োজনের মাধ্যমে হিন্দু মুসলিমের মধ্যে তৈরি হয় সাম্প্রদায়িক হানাহানির পরিবেশ। ব্রিটিশ সরকার ১৮৯৭ সালে এর জন্য তিলককে গ্রেফতার করে। রবীন্দ্রনাথের সাম্প্রদায়িক চেতনা তখন আর গোপন থাকেনি।  ভারতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির জনক তিলককে মুক্ত করতে তিনি তখন রাস্তায় নেমে পড়েন। তাকে মুক্ত করার জন্য অর্থ সংগ্রহে দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করতেও তিনি  দ্বিধা করেননি। শুধু অর্থ ভিক্ষা নয়,তিলকের আবিষ্কৃত শিবাজীর পথকেই ভারতীয় হিন্দুদের মুক্তির পথ রূপে বেছে নিয়েছিলেন। তিনি নিজে মেতে উঠেছিলেন শিবাজী বন্দনায়।

রবীন্দনাথের নিজের একটি রাজনৈতিক দর্শন ছিল, ভারতীয় রাজনীতিতে সে দর্শন নিয়ে একটি প্রবল পক্ষ ছিল এবং সে পক্ষের সাথে রবীন্দ্রনাথের গভীর একাত্মতাও ছিল।  সে রাজনৈতিক দর্শনের প্রবল প্রকাশ ঘটেছে তার লেখা কবিতা, গল্প, উপন্যাস ও গানে। “শিবাজি উৎসব” কবিতাটি হলো রবীন্দ্রনাথের তেমনি এক রাজনৈতিক দর্শনের কবিতা। সে দর্শনটি ছিল উগ্র হিন্দুত্ববাদের। এ কবিতাটিতে প্রকাশ পেয়েছে তার রাজনৈতিক ভাবনার সাথে তার পূজনীয় বীরের ছবি। বাঙালী হলেও রবীন্দ্রনাথ ভাবনাটি বাংলার আলো-বাতাস ও ভূগোল দিয়ে সীমিত ছিল না। তিনি ভাবতেন অখন্ড ভারত নিয়ে। অখন্ড ভারতের সে মানচিত্রে মুসলমানদের জন্য কোন স্থান ছিল না। রবীন্দ্রনাথের পিতা ও পিতামহ ব্রাহ্মধর্মের অনুসারি হলেও রবীন্দ্রনাথ স্বপ্ন দেখতেন একজন গোঁড়া হিন্দু রূপে। তার স্বপ্নটি ছিল সমগ্র ভারতজুড়ে হিন্দু ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার। সে হিন্দু ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে রবীন্দ্রনাথের কাছে যিনি বীর রূপে যিনি গণ্য হয়েছেন তিনিও বাঙালী নন, বরং সূদুর মহারাষ্ট্রের অবাঙালী শিবাজী। “শিবাজি-উৎসব” কবিতাটিতে প্রকাশ পেয়েছে শিবাজির সে রাজনৈতিক মিশনের সাথে রবীন্দ্রনাথের একাত্মতা। শিবাজিকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ লেখেন,

মারাঠার কোন শৈলে অরণ্যের অন্ধকারে ব’সে,

হে রাজা শিবাজি,

তব ভাল উদ্ভাসিয়া এ ভাবনা তড়িৎপ্রভাবৎ

এসেছিল নামি-

“এক ধর্মরাজ্য পাশে খণ্ড ছিন্ন বিক্ষিপ্ত ভারত

বেধে দিব আমি।”

“খণ্ড চ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত” ভারতকে আবার এক অখণ্ড হিন্দু ধর্মরাজ্য রূপে গড়ে তোলার যে স্বপ্ন শিবাজি দেখেছিল সেটিই ছিল রবীন্দ্রনাথের নিজের স্বপ্ন। সে অভিন্ন স্বপ্ন নিয়ে রবীন্দ্রনাথ আর শিবাজির চেতনা একাকার হয়ে গেছে।এখানেই রবীন্দ্রনাথ দাড়িয়েছেন শিবাজির ন্যায় ইসলাম ও মুসলমানের প্রতিপক্ষ রূপে। ভারত জুড়ে তখন মোগলদের শাসন। হিন্দু ধর্ম রাজ্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শিবাজী বেছে নেয় মুসলিম শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও সন্ত্রাসের পথ। শিবাজির  মুসলিম শাসনবিরোধী সে বিদ্রোহ ও সন্ত্রাস শতাধিক বছর পূর্বে হলেও রবীন্দ্রনাথের মনে তা নিয়ে উৎসব মুখর হয়ে উঠে। “শিবাজি-উৎসব” কবিতায় তো সেটিরই প্রকাশ ঘটেছে। রবীন্দ্র সাহিত্যে এভাবেই মুসলিম বিরোধী নাশকতার শুরু। রবীন্দ্রনাথের মাঝে এ নিয়ে প্রচন্ড দুঃখবোধ ছিল যে,বাঙালীগণ সে সময় শিবাজিকে চিনতে পারিনি এবং তার স্বপ্ন ও সন্ত্রাসের সাথে একাত্ম হতে পারিনি।রবীন্দ্রনাথ তার কবিতাটিতে বাঙালী বলতে যাদের বুঝিয়েছেন সেখান বাংলাভাষী মুসলমানদের কোন স্থান ছিল না । বাঙালী বলতে তিনি একমাত্র হিন্দুদেরই বুঝিয়েছিলেন। শরৎচন্দ্র তার লেখায় “আমাদের পাড়ায় বাঙালী ও মুসলমানদের খেলা” যে বাঙালীদের বুঝিয়েছিলেন সে বাঙালীদের মাঝেও বাঙালী মুসলমানদের জন্য কোন স্থান ছিল না।

বাঙালী মুসলিমের বিষপান

রবীন্দ্রনাথ হিন্দু ছিলেন।অখণ্ড ভারত জুড়ে শিবাজির ন্যায় তার মনেও হিন্দুধর্ম রাজ্য প্রতিষ্ঠায় প্রচণ্ড আগ্রহ জাগবে  -তাতেই দোষের কি? হিন্দু মন্দির গড়বে, হিন্দু ধর্মরাজ্য গড়বে সেটিই তো স্বাভাবিক। বাঙালী ও মুসলমানদের মাঝে চেতনার পরিচয়ে যে বিভাজন রেখা টানবেন –তাতেই বা দোষের কি? মানুষে মানুষে বিভাজন তো গড়ে উঠে ধর্ম, সংস্কৃতি ও চেতনার সে ভিন্ন ভিন্ন পরিচয়ে। সে ভিন্ন পরিচয় নিয়ে বাঙালী হিন্দু  ও মুসলমানগণ যে সম্পূর্ণ দুটি ভিন্ন ধারার এবং তাদের মাঝে মিলন যে অসম্ভব –সেটি রবীন্দ্রভক্ত বাঙালী মুসলিমগণ না বুঝলেও রবীন্দ্রনাথ বুঝতেন। ফলে রবীন্দ্রনাথ সজ্ঞানে ও স্বেচ্ছায় হিন্দুত্বের সে ধারায় গিয়ে মিশে গেছেন। যে কোন মিশনারীর ন্যায় রবীন্দ্রনাথও চাইতেন অন্যরাও তার সে হিন্দুত্বের ধারায় মিশে যাক। হিন্দুত্বের সে ধারাটিতে রয়েছে ভারতের বুকে মুসলিম প্রভাবের বিলুপ্তির প্রবল ব্যগ্রতা। রয়েছে হিন্দু ধর্মরাজ্যের প্রতিষ্ঠায় আপোষহীনতা। এমন রবীন্দ্রনাথের ন্যায় এমন এক উগ্র হিন্দুর সাহিত্যকে আপন রূপে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে এখানেই মুসলমানদের মূল সমস্যা। এটি তো বিষপান। হিন্দুধর্ম রাজ্যের এমন এক উগ্র ধ্বজাধারিকে একজন মুসলমান তার নিজ চেতনার প্রতিনিধি রূপে গ্রহণ করে কি করে? তার লেখা গান ও  কবিতাই একজন মুসলমান গায় কি করে? তার জন্ম দিনে উৎসবই বা করে কি করে? ইসলাম ও মুসলিমদের সাথে রবীন্দ্রভক্ত বাংলাদেশীদের এখানেই বড় গাদ্দারি। এ গাদ্দারগণই মুসলিম চেতনায় লাগাতর বিষ ঢালছে।

স্বপ্নটি হিন্দু ধর্মরাজ্যের প্রতিষ্ঠার

শিবাজি মারা গেছে। কিন্তু হিন্দু ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার দর্শন ও রাজনৈতিক অভিলাষটি মারা পড়েনি। ভারতে সে চেতনাটি বেঁচে আছে শিবসেনা, আরএসএস, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ,বজরং দল ও ভারতীয় জনতা পার্টির ন্যায় বিভিন্ন উগ্র হিন্দুবাদি দলগুলোর মাঝে। রবীন্দ্রনাথ নিজেও যে ভূগোলের স্বপ্নটি দেখতেন সেটি অবিভক্ত বাংলার নয়। সেটি অখণ্ড হিন্দু ধর্মরাজ্য ভারতের। নিজের  জীবদ্দশাতে রবীন্দ্রনাত সে হিন্দু ধর্মরাজ্যের প্রতিষ্ঠার অঙ্গিকারটি দেখতে পেয়েছিলেন বাল গঙ্গাধর তিলকের রাজনীতিতে।তিলক তার কাছে গণ্য হয়েছিল শিবাজি’র মিশনকে এগিয়ে নেয়ার রাজনীতিতে আদর্শ নেতা রূপে। শিবাজী সে মিশনকে বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থেই তিলক নিজ রাজ্য মহারাষ্ট্রে শিবাজি উৎসবের শুরু করেন। সে উৎসবের সাথে একাত্মতার ঘোষণা দিতে বাঙালী কংগ্রেস নেতা সুরেন্দ্রনাথ বানার্জি ছুটে যান বোম্বাইয়ে। মারাঠীদের ন্যায় কলকাতার বাঙালী হিন্দুদের উদ্যোগে শিবাজি উৎসব শুরু হয় বাঙলার বুকেও।

শিবাজী তার হিন্দু ধর্ম রাজ্য প্রতিষ্ঠার যুদ্ধটি শুরু করে মোগল সম্রাট আরোঙ্গজেবের সময়। কিন্তু সে প্রচেষ্ঠা ব্যর্থ হয়। বাংলার মানুষই শুধু নয়, ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুরাও শিবাজীর সে আন্দলনে সারা দেয়নি। শিবাজির মিশনটিকে চিনতে বাঙালীর সে ব্যর্থতা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের মনে প্রচন্ড আফসোস ছিল। কিন্তু এবারে তার মনে গভীর আনন্দ।এবং মনের সে বিপুল আনন্দ নিয়েই রবীন্দ্রনাথের শিবাজি উৎসব কবিতা। সেটি একারণে যে,বাঙালীরা শিবাজিকে চিনতে পেরেছে এবং তার দর্শন নিয়ে মারাঠীদের সাথে মিলে উৎসব শুরু হয়েছে। তবে বাঙালীদের থেকে রবীন্দ্রনাথের চাওয়াটি আরেকটু গভীর। তিনি চান, বাঙালীগণ আবির্ভূত হোক হিন্দু ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার সৈনিক রূপে। রবীন্দ্রনাথ এখানে আবির্ভূত হয়েছেন স্রেফ কবি হিসাবে নয়, বরং হিন্দু ধর্মরাজ্যে স্বপ্নদ্রষ্টা ও রাজনৈতিক নেতা রূপে। তাই তিনি লিখেছেন,

“মারাঠার প্রান্ত হতে একদিন তুমি ধর্মরাজ,

ডেকেছিলে যবে

রাজা ব’লে জানি নাই, মানি নাই, পাই নাই লাজ

হে ভৈরব রবে।

তোমারে চিনেছি আজি, চিনেছি চিনেছি হে রাজন,

তুমি মহারাজ।

তব রাজকর লয়ে আট কোটি বঙ্গের নন্দন

দাঁড়াইবে আজ।”

 

বাল গঙ্গাধর তিলকের নেতৃত্বে হিন্দু ধর্ম রাজ্য প্রতিষ্ঠার আন্দোলনটি রবীন্দ্রনাথের মনে যে কীরূপ উম্মাদনা সৃষ্টি করে সেটিই প্রকাশ পায় শিবাজি-উৎসব কবিতায়। মনের মাধুরি মিশিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন:

“সেদিন শুনিনি কথা
আজি মোরা তোমার আদেশ
শির পাতি লব,
কণ্ঠে কণ্ঠে বক্ষে বক্ষে
ভারতে মিলিবে সর্বশেষ ধ্যান-মন্ত্র তব।
ধ্বজা ধরি উড়াইব বৈরাগীর উত্তরী বসন
দরিদ্রের বল,
এক ধর্ম রাজ্য হবে এ ভারতে
এ মহাবচন করব সম্বল।
মারাঠির সাথে আজি,হে বাঙ্গালী
এক কণ্ঠে বল ‘জয়তু শিবাজী।
মারাঠির সাথে আজি,হে বাঙ্গালি,
এক সঙ্গে চলো মহোৎসবে সাজি।
আজি এক সভা তলে
ভারতের পশ্চিম পুরব দক্ষিণ ও বামে
একত্রে করুক ভোগ এক সাথে একটি গৌরব
এক পুণ্য নামে।—

শিবাজীর মিশন থেকে আর দূরে থাকা নয়, রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠে এবার ঘোষিত হলো শিবাজী’র উগ্রহিন্দুত্বের দর্শন ও আন্দোলেনের সাথে “কণ্ঠে কণ্ঠে বক্ষে বক্ষে” পূর্ণ একাত্মতার ঘোষণা। সে  সময় তিলক ও অন্যান্য হিন্দু সাম্প্রদায়িক নেতাগণ শুরু করেন হিন্দুদের গো-দেবতা বাঁচানোর লড়াই। হিন্দুদের এ লড়াইয়ে আক্রমণের মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় মুসলমানগণ। কারণ, মুসলিমরা গরু জবাই করে গরুর গোশতো খায় অথচ গরু হিন্দুদের উপাস্য। গো-দেবতা হত্যা বন্ধ ও হত্যার প্রতিশোধ নিতে গড়ে তোলা হলো গরু রক্ষা সমিতি। এতে গরুর নিরাপত্তা বাড়লেও ভারত জুড়ে নিরাপত্তা হারালো মুসলিমের জানমাল ও ইজ্জত-আবরু। অথচ তাদের গো-দেবতার ভক্ষক শুধু মুসলিম ছিল না, ছিল খৃষ্টানগণও। অর্থাৎ খৃষ্টান ইংরেজগণ।কিন্তু হিন্দু নেতাদের দ্বারা খৃষ্টান বা ইংরেজগণ দেবতার ভক্ষক রূপে চিত্রিত হয়নি, ফলে তাদের বিরুদ্ধে উগ্রবাদি হিন্দুদের কোনরূপ অভিযোগ বা  উচ্চবাচ্য ছিল না। ফল দাঁড়ালো,এ আন্দোলনের ফলে হিন্দু ও মুসলিমনগণ একে অপরের শত্রু রূপে চিহ্নিত হলো। শুরু হলো সংখ্যালঘিষ্ট মুসলমানদের বিরুদ্ধে চরম ঘৃনা ও প্রতিশোধের স্পৃহা। শুরু হলো ভারত জুড়ে মুসলিম নির্মূলের দাঙ্গা।

মুসলিম বিদ্বেষী উগ্র রবীন্দ্রনাথ

রবীন্দ্রনাথের মুসলিম বিদ্বেষী ও উগ্র হিন্দুত্বের চেতনাটি শুধু শিবাজি-উৎসব কবিতায় সীমিত নয়। সেটির প্রকাশ পেয়েছে তার “বিচার”,“মাসী”,“বন্দীবীর”,“হোলীখেলা” কবিতায় এবং “সমস্যা পুরাণ”,“দুরাশা”,“রীতিমত নভেল” ও “কাবুলিওয়ালা” গল্পে। মুসলিমদের প্রতি রবীন্দ্রনাথের ধারণাটি কীরূপ ছিল সেটি প্রকাশ পায় “রীতিমত নভেল” নামক একটি ছোটগল্পে। তিনি লিখেছেনঃ “আল্লাহো আকবর শব্দে বনভূমি প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠেছে। একদিকে তিন লক্ষ যবন সেনা অন্য দিকে তিন সহস্র আর্য সৈন্য। … পাঠক, বলিতে পার … কাহার বজ্রমন্ত্রিত ‘হর হর বোম বোম’ শব্দে তিন লক্ষ ম্লেচ্ছ কণ্ঠের ‘আল্লাহো আকবর’ ধ্বনি নিমগ্ন হয়ে গেলো। ইনিই সেই ললিতসিংহ। কাঞ্চীর সেনাপতি। ভারত-ইতিহাসের ধ্রুব নক্ষত্র।” রবীন্দ্রনাথের ‘দুরাশা’ গল্পের কাহিনীটি আরো উৎকট মুসলিম বিদ্বেষে পূর্ণ। এখানে তিনি দেখিয়েছেন, একজন মুসলিম নারীর হিন্দু ধর্ম তথা ব্রাহ্মণদের প্রতি কি দুর্নিবার আকর্ষণ এবং এই মুসলিম নারীর ব্রাহ্মণ হওয়ার প্রাণান্তকর প্রচেষ্ঠার চিত্র। রবীন্দ্রনাথে শেষ জীবনে যে মুসলমানির গল্পটি লিখিয়েছিলেন সে গল্পের নায়ক ছিলেন হবি খাঁ। হবি খাঁ’র মধ্যে তিনি উদারতার একটি চিত্র তূল ধরেছেন। তবে সে উদারতার কারণ রূপে দেখিয়েছেন,হবি খাঁ’র মা ছিল হিন্দু অভিজাত রাজপুতিনী। এভাবে তিনি প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন,মুসলিম একক ভাবে মহৎ হতে পারেনা।

মুসলমান সমাজের প্রতি রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিভঙ্গির নিখুঁত পরিচয়টি পাওয়া যায় ‘কণ্ঠরোধ’ (ভারতী, বৈশাখ-১৩০৫) নামক প্রবন্ধে। সিডিশন বিল পাস হওয়ার পূর্বদিনে কলকাতা টাউন হলে এই প্রবন্ধটি তিনি পাঠ করেন। এই প্রবন্ধে উগ্র সাম্প্রদায়িকতাবাদী যবন, ম্লেচ্ছদের একটি ক্ষুদ্র দৃষ্টান্ত দিতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেন,“কিছুদিন হইল একদল ইতর শ্রেণীর অবিবেচক মুসলমান কলিকাতার রাজপথে লোষ্ট্র খন্ড হস্তে উপদ্রবের চেষ্টা করিয়াছিল। তাহার মধ্যে বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে- উপদ্রবের লক্ষ্যটা বিশেষরূপে ইংরেজদেরই প্রতি। তাহাদের শাস্তিও যথেষ্ট হইয়াছিল। প্রবাদ আছে- ইটটি মারিলেই পাটকেলটি খাইতে হয়; কিন্তু মূঢ়গণ (মুসলমান) ইটটি মারিয়া পাটকেলের অপেক্ষা অনেক শক্ত শক্ত জিনিস খাইয়াছিল। অপরাধ করিল, দণ্ড পাইল; কিন্তু ব্যাপারটি কি আজ পর্যন্ত স্পষ্ট বুঝা গেল না। এই নিম্নশ্রেণীর মুসলমানগণ সংবাদপত্র পড়েও না, সংবাদপত্রে লেখেও না। একটা ছোট বড়ো কাণ্ড – হইয়া গেল অথচ এই মূঢ় (মুসলমান) নির্বাক প্রজা সম্প্রদায়ের মনের কথা কিছুই বোঝা গেল না। ব্যাপারটি রহস্যাবৃত রহিল বলিয়াই সাধারণের নিকট তাহার একটা অযথা এবং কৃত্রিম গৌরব জন্মিল। কৌতূহলী কল্পনা হ্যারিসন রোডের প্রান্ত হইতে আরম্ভ করিয়া তুরস্কের অর্ধচন্দ্র শিখরী রাজপ্রাসাদ পর্যন্ত সম্ভব ও অসম্ভব অনুমানকে শাখা পল্লবায়িত করিয়া চলিল। ব্যাপারটি রহস্যাবৃত রহিল বলিয়াই আতঙ্ক চকিত ইংরেজি কাগজে কেহ বলিল, ইহা কংগ্রেসের সহিত যোগবদ্ধ রাষ্ট্র বিপ্লবের সূচনা; কেহ বলিল মুসলমানদের বস্তিগুলো একেবারে উড়াইয়া পুড়াইয়া দেয়া যাক, কেহ বলিল এমন নিদারুণ বিপৎপাতের সময় তুহিনাবৃত শৈলশিখরের উপর বড়লাট সাহেবের এতটা সুশীতল হইয়া বসিয়া থাকা উচিত হয় না।” -এই হলো হলো নির্ভেজাল রবীন্দ্র চেতনা। মুসলিম এবং ইসলামের বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথের মগজ যে কতটা বিষপূর্ণ ছিল সেটি বুঝতে কি এরপরও কিছু বাঁকি থাকে?

গুরু মুসলিম নির্মূলের

রবীন্দ্রনাথের পরিবারের জমিদারী ছিল কুষ্টিয়ার শিলাইদহ, পাবনার শাহজাদপুর, রাজশাহীর পতিসর প্রভৃতি অঞ্চলে। আর এই অঞ্চলগুলি ছিল মুসলিম প্রধান। মুসলিম প্রজাগণই তার রাজস্ব জোগাতো। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ব্যর্থ হন সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রজাদের সাথে মনের সংযোগ বাড়াতে। তাদের সমস্যাগুলোর সমাধান নিয়েও তিনি কোনদিন মাথা ঘামাননি। প্রজাদের জোগানো অর্থ দিয়ে মুসলিম প্রধান কুষ্টিয়া, পাবনা বা রাজশাহীতে তিনি একটি প্রাথমিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন –তার প্রমাণ নাই। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন হিন্দুপ্রধান পশ্চিম বাংলার বোলপুরে। উল্টো তার সাহিত্যে প্রকাশ পেয়েছে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের বিরুদ্ধে উগ্র সাম্প্রদায়িক মনভাব। উৎকট মুসলিম বিরোধী সংলাপ দেখা যায় তার নাটকে। নাটকের নট-নটিরা মঞ্চে দাঁড়িয়ে যা বলে তা তাদের নিজেদের কথা নয়।নিজেদের ইচ্ছায় কিছু বলার অধিকার তাদের থাকে না। তারা তো তাই বলে যা নাট্যকার তাদের মুখ দিয়ে বলাতে চায়। ফলে নাটকের সংলাপের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় নাট্যকারের মনের চিত্রটি। মুসলিম বিরোধী রবীন্দ্রমনের সে কুৎসিত চিত্রটি প্রকাশ পেয়েছে তার রচিত ‘প্রায়শ্চিত্ত’ নাটকে। প্রতাপাদিত্যের মুখ দিয়ে তিনি উচ্চারন করান,“খুন করাটা যেখানে ধর্ম, সেখানে না করাটাই পাপ। যে মুসলমান আমাদের ধর্ম নষ্ট করেছে তাদের যারা মিত্র তাদের বিনাশ না করাই অধর্ম।” সাহিত্যের নামে এ ছিল মুসলিম নিধনে রবীন্দ্রনাথের পক্ষ থেকে খোলাখোলি উস্কানি। এ হলো রবীন্দ্রমানস! 

ভারতের বুকে মুসলিম শাসন আমলে কোন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়নি। একই শহরে ও একই গ্রামে হিন্দু মুসলমান পাশাপাশি শত শত বছর শান্তিপূণ ভাবে বসবাস করেছে।রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়েছে, কিন্তু এক ধর্মের লোক অন্যধর্মের মানুষের ঘরে বা দোকানে আগুন দিয়েছে সে ঘটনা ঘটেনি। এমনকি হিন্দুদের রচিত ইতিহাসের বইয়েও তার উল্লেখ নাই। উল্লেখ নেই ইংরেজদের রচিত ইতিহাসের বইয়েও। দাঙ্গা সৃষ্টির জন্য চাই ঘৃনাপূর্ণ হিংস্র মনের মানুষ। সেরূপ মানুষ সৃষ্টির জন্য চাই বিষপূর্ণ সাহিত্য। আর মুসলিম শাসনামলে সেরূপ সাহিত্যই সৃষ্টি হয়নি। সে বিষপূর্ণ সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে ব্রিটিশ আমলে এবং রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র, হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের ন্যায় অসংখ্য মুসলিম বিদ্বেষী হিন্দু সাহিত্যিকদের দ্বারা। রাজনীতির অঙ্গনে দাড়িয়ে শিবসেনা নেতা বাল ঠ্যাকারে বা বিজিপী নেতা নরেন্দ্র মোদি যেরূপ মুসলিম বিরোধী উক্তি উচ্চারন করেন,তার চেয়েও বিষপূর্ণ লিখনি লিখেছেন তারা। ফলে মুসলিম নিধনের লক্ষ্যে দাঙ্গাগুলির শুরু গুজরাত, উত্তরপ্রদেশ বা বিহারে হয়নি, সেটি হয়েছে বাংলায়। এবং সেটি ব্রিটিশদের ভারত ত্যাগের আগেই। কলকাতার রাজপথে ১৯৪৬ সালের আগষ্টে কলকাতায় হিন্দু গুন্ডারা যেভাবে মুসলিম হত্যা করে সেরূপ হত্যাকান্ড আজও ভারতের অন্য কোন শহরে ঘটেনি। একদিনেই ৫ হাজারের বেশী মুসলমানকে হত্যা করা হয়। যাদের অধিকাংশই ছিল নোয়াখালির দরিদ্র মুসলিম যারা কলকাতায় শ্রমিকের কাজ করতো।

কলকাতার সে দাঙ্গার কিছু নিজ চোখে-দেখা ভয়াবহ অবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক বাঙালী প্রফেসর ড. তপন রায় চৌধুরী তার “বাঙাল নামা” বইতে। প্রফেসর ড.তপন রায়চৌধুরি লিখেছেন, “নিজের চোখে দেখা ঘটনার বিবরণে ফিরে যাই। হস্টেলের বারান্দা থেকে দেখতে পেলাম রাস্তার ওপারে আগুন জ্বলছে। বুঝলাম ব্যাপারটা আমার চেনা মহাপুরুষদেরই মহান কীর্তি। হস্টেলের ছাদে উঠে দেখলাম –আগুন শুধু আমাদের পাড়ায় না, যতদূর চোখ যায় সর্বত্র আকাশ লালে লাল। তিন দি্ন তিন রাত কলকাতার পথে ঘাটে পিশাচনৃত্য চলে। … দাঙ্গার প্রথম ধাক্কা থামবার পর বিপজ্জনক এলাকায় যেসব বন্ধুবান্ধব আত্মীয়স্বজন ছিলেন, তাঁদের খোঁজ নিতে বের হই। প্রথমেই গেলাম মুন্নুজন হলে। ..নিরঙ্কুশ হিন্দু পাড়ার মধ্যে ওদের হস্টেল। তবে ভদ্র বাঙালি পাড়া। সুতরাং প্রথমটায় কিছু দুশ্চিন্তা করিনি। কিন্তু দাঙ্গা শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে শিক্ষিত বাঙালির রুচি-সংস্কৃতির যেসব নমুনা দেখলাম, তাতে সন্দেহ হল যে, মুন্নুজান হলবাসিনী আমার বন্ধুদের গিয়ে আর জীবিত দেখবো না। …হোস্টেলের কাছে পৌঁছে যে দৃশ্য দেখলাম তাতে ভয়ে আমার বাক্যরোধ হল। বাড়ীটার সামনে রাস্তায় কিছু ভাঙা স্যুটকেস আর পোড়া বইপত্র ছড়ানো। বাড়িটা খাঁ খাঁ করছে। ফুটপথে এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়েছিলেন। বললেন – একটু আগে পুলিশের গাড়ি এসে মেয়েদের নিয়ে গেছে।…শুনলাম ১৬ই আগষ্ট বেলা এগারোটা নাগাদ একদল সশস্ত্র লোক হঠাৎ হুড়মুড় করে হস্টেলে ঢুকে পড়ে। প্রথমে তারা অশ্রাব্য গালিগালাজ করে যার মূল বক্তব্য –মুসলমান স্ত্রীলোক আর রাস্তার গণিকার মধ্যে কোনও তফাৎ নেই। …হামলাকারিরা অধিকাংশই ছিলেন ভদ্রশ্রেণীর মানুষ এবং তাঁদের কেউ কেউ ওঁদের বিশেষ পরিচিত, পাড়ার দাদা। ” –(তপন রায়চৌধুরী, বাঙাল নামা, ২০০৭)।

তিনি আরো লিখেছেন, “খুনজখম বলাৎকারের কাহিনী চারি দিক থেকে আসতে থাকে। …বীভৎস সব কাহিনী রটিয়ে কিছু লোক এক ধরনের বিকৃত আনন্দ পায়। তার চেয়েও অবাক হলাম যখন দেখলাম কয়েকজন তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত লোক মুসলমানদের উপর নানা অত্যাচারের সত্যি বা কল্পিত কাহিনি বলে বা শুনে বিশেষ আনন্দ পাচ্ছেন। এঁদের মধ্যে দু-তিনজন রীতিমত বিখ্যাত লোক। প্রয়াত এক পন্ডিত ব্যক্তি, যাঁর নাম শুনলে অনেক নিষ্ঠাবান হিন্দু এখনও যুক্তকরে প্রণাম জানায়, তাঁকে এবং সমবেত অধ্যাপকদের কাছে নিকাশিপাড়ার মুসলমান বস্তি পোড়ানোর কাহিনি বলা হচ্ছিল। যিনি বলছিলেন তিনি প্রত্যক্ষদর্শী এবং বিশ্বাসযোগ্য লোক। বেড়া আগুন দিয়ে বস্তিবাসীদের পুড়িয়ে মারা হয়। একজনও নাকি পালাতে পারিনি। ছেলেটি বলছিল, কয়েকটি শিশুকে আগুনের বেড়া টপকে তাদের মায়েরা আক্রমণকারীদের হাতে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, যাতে ওদের প্রাণগুলি বাঁচে। বাচ্চাগুলিকে নির্দ্বিধায় আবার আগুনে ছুঁড়ে দেওয়া হয়।আমরা শুনেছিলাম,এই কুকীর্তির নায়ক কিছু বিহারী কালোয়ার। তার ভয়াবহ বর্ণনাটি শুনে সুশোভনবাবু মন্তব্য করেন,“এর মধ্যে নিশ্চয়ই বাঙালি ছেলেরা ছিল না?” শুনে সেই পন্ডিতপ্রবর গর্জে উঠলেন,“কেন, বাঙালি ছেলেদের গায়ে কি পুরুষের রক্ত নেই?” –(তপন রায়চৌধুরী, বাঙাল নামা,২০০৭)।এই হলো বাঙালী বাবুদের কাণ্ড।“খুন করাটা যেখানে ধর্ম, সেখানে না করাটাই পাপ। যে মুসলমান আমাদের ধর্ম নষ্ট করেছে তাদের যারা মিত্র তাদের বিনাশ না করাই অধর্ম।” রবীন্দ্রনাথের এরূপ বিষপূণ্য সাহিত্য যে মুসলিম নিধনের জন্য হিন্দুদেরকে অতি হিংস্র ভাবে প্রস্তুত করেছিল –এ হলো সে হিংস্রতারই বহিঃপ্রকাশ।গুজরাত, মোম্বাই বা মিরাতের কোথাও একদিনে এত মুসলিমকে হত্যা করা হয়নি। “খুন করাটা যেখানে ধর্ম, সেখানে না করাটাই পাপ। যে মুসলমান আমাদের ধর্ম নষ্ট করেছে তাদের যারা মিত্র তাদের বিনাশ না করাই অধর্ম।” -রবীন্দ্রনাথের এরূপ বিষপূণ্য সাহিত্য যে মুসলিম নিধনের জন্য হিন্দুদেরকে অতি হিংস্র ভাবে প্রস্তুত করেছিল -তারই নৃশংস বহিঃপ্রকাশ ঘটে কলকাতার দাঙ্গায়।

বিনিয়োগে লাভ ও বিজয় উৎসব

মুসলিম নিধন ও হিন্দু ধর্মরাজ্য নির্মাণের লক্ষ্যে শিবাজি মারাঠায় যে সন্ত্রাস শুরু করেছিল, রবীন্দ্রনাথ তো সেটিই চাইতেন বাংলার বুকে। বিশ শতকের প্রথম দশক থেকে শুরু হওয়া হিন্দু মুসলিম দাঙ্গার মূল দায়ভার যে রবীন্দ্রনাথ ও বংকীম চন্দ্রের ন্যায় সাহিত্যিকদের –সেটি কি অস্বীকারের উপায় আছে। সাহিত্যকে তারা ব্যবহার করেছেন হিন্দুদের মনে ঘৃণার আগুণ জ্বালাতে। মুসলিম বিরোধী যে সন্ত্রাস ও দাঙ্গা বাংলার বুকে শুরু হয়েছিল সেটিই ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে তীব্র গতিতে ছড়িয়ে পড়ে। শিবসেনা নেতা বাল ঠ্যাকারে বা বিজিপী নেতা নরেন্দ্র মোদিদের কাছে রবীন্দ্রনাথ ও বংকীমেরা তো এজন্যই এত প্রিয়। এরাই হলো ভারতীয় উগ্র হিন্দুদের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক গুরু। এবং তার স্বীকৃতি মেলে বঙ্কিমের “বন্দেমাতরম” গান এবং রবীন্দ্রনাথের “জনগণ মনোঅধিনায়ক ভারত ভাগ্যবিধাতা” গানকে ভারতের জাতীয় সঙ্গিত রূপে মেনে নেওয়ার মধ্য দিয়ে। ফলে মুসলিম নির্মূলের লক্ষ্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা যে ভারতে রাজনৈতিক সংস্কৃতি রূপে প্রতিষ্ঠা পাবে -তা নিয়েও কি তাই সন্দেহ থাকে? বাংলাদেশের বুকে এমন রবীন্দ্র চেতনার চাষাবাদ বিপুল ভাবে বাড়াতে নরেন্দ্র মোদির সরকার সিরাজগঞ্জে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় গড়তে অর্থ জোগাবে –তাতে আর বিস্ময়ের কি আছে? এ তো সামান্য বিনিয়োগ, কিন্তু লাভটি বিশাল। এটি তো ১৬ কোটি বাংলাদেশী মানুষের চেতনার মানচিত্র জুড়ে এক বিশাল ভূগোল জয়ের।

রবীন্দ্র নাথ আজ বেঁচে থাকলে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিত রূপে তার গান গাওয়া দেখে বা তার নামে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা দেখে তিনি নিজেই যে বিস্ময়ে অট্টহাসি দিতেন -তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে? বাঙালী মুসলমানের আত্মপচন যে সকল সীমা ছাড়িয়ে গেছে সেটি দেখেও হয়তো তিনি প্রচুর পুলক পেতেন! কারণ ইসলামের শত্রুগণও কি মুসলিমদের এতো পচন অতীতে কখনো দেখেছে? রবীন্দ্রনাথ নিজেও হয়তো বাঙালী মুসলমানদের এরূপ পচন আশা করেননি। বিগত ১৪ শত বছরের অধীক কালের মুসলিম ইতিহাসে কোন মুসলিম জনগোষ্ঠি কি কোন পৌত্তলিকের গানকে মনের মাধুরি মিষিয়ে এভাবে গেয়েছে? পৌত্তলিকদের ন্যায় তারা কি কখনো মঙ্গলপ্রদীপ হাতে মিছিলে নেমেছে? রবীন্দ্রনাথ ও তার অনুসারিদের এখানেই বিশাল সফলতা। অজ্ঞান মানুষের মুখে বিষ ঢালা সহজ। আর বিষঢালার সে কাজটি করছে ভারতীয় আশ্রয়ে ও প্রশ্রয়ে পালিত বিপুল সংখ্যক চাকর-চাকরেরা। বাংলাদেশের রাজনীতি, সংস্কৃতি, প্রশাসন ও মিডিয়া জগতে তারাই তো বিজয়ী শক্তি। বাঙালী মুসলমানের অজ্ঞানতার কারণ ইসলামি চেতনাশূণ্যতা –যা জন্ম নিয়েছে কোরআনি জ্ঞানের অভাবে।এর ফলে বিষকে বিষ,কাফেরকে কাফের এবং শত্রুকে শত্রু রূপে সনাক্ত করার সামর্থটি লোপ পেয়েছে বহু আগেই। ফলে পৌত্তলিক চেতনাসিক্ত রবীন্দ্রসাহিত্যে অবগাহন বা তার “শিবাজি-উৎসব’ কবিতা ও “আমার সোনার বাংলা”গানটি রবীন্দ্রভক্ত উগ্র হিন্দুগণ এখন আর একাকী গায় না,গাচ্ছে বাঙালী মুসলিমগণও।হিন্দু না বানাতে না পারলেও ইসলাম থেকে এরূপ দূরে সরানোর আনন্দ কি শত্রু মহলে কম? বাংলাদেশের মত একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে মুসল্লি হত্যায় ও মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তি আইনের প্রতিষ্ঠা রুখতে তাই কোন অমুসলিমকে অস্ত্র নিয়ে রাস্তায় নামতে হচ্ছে না। বাংলাদেশের শিক্ষা-সংস্কৃতি,মিডিয়া ও রাজনীতিতে তাদের বিনিয়োগ তাই ব্যর্থ হয়নি। ইসলামের শত্রুদের ঘরে এজন্যই আজ এতো বিজয় উৎসব। ৩১/০৫/২০১৫




বাঙালী মুসলিমের ভয়ংকর সাহিত্য-সংকট

গভীর সংকটটি সাহিত্যে

 কোন ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠি কীরূপ শারীরীক বল বা সুস্থ্যতা পাবে -সেটি নির্ভর করে কি খায় বা পান করে তার উপর। কিন্তু কীরূপ চরিত্র পাবে তা নির্ভর করে কি সে পাঠ করে তার উপর। অনাহারে যেমন দেহ  বাঁচে না, তেমনি জ্ঞানের অভাবে বিবেক বাঁচে না। অথচ মৃত বা অসুস্থ্য বিবেক নিয়ে মুসলিম হওয়া দূরে থাক মানবিক পরিচয় বেড়ে উঠা্‌ও অসম্ভব হয়। পবিত্র কোর’আনে এদেরকেই পশুর চেয়ওও নিকৃষ্ট বলা হয়েছে। মহান আল্লাহতায়ালা তাই পানাহার ফরজ করতে কোর’আন বা কোন ওহী নাযিল করেনি। প্রাণী মাত্রই পানাহারের গুরুত্বটি বুঝে। কিন্তু লক্ষাধিক নবী পাঠিয়েছেন এবং ওহী নাযিল করেছেন যেমন জ্ঞানার্জনকে ফরজ করতে, তেমনি সে বিশুদ্ধ জ্ঞানের একটি বিশাল ভান্ডারকে সুনিশ্চিত করতে। কিন্তু যখনই কোন জনগোষ্ঠি সে জ্ঞানের ভান্ডার থেকে দূরে সরে তখনই তাদের যাত্রা শুরু হয় নীচে নামার দিকে। তখন তারা রেকর্ড গড়ে শুধু দুর্বৃত্তিতেই নয়, বরং নৃশংস স্বৈরাচার, সন্ত্রাস, চুরি-ডাকাতি, গুম-খুনের অসভ্যতা। বাংলাদেশের আজকের যাত্রা তো সে পথেই।

বাঙালী মুসলিমের আজকের সংকটটি যেমন খাদ্য বা সম্পদে নয়; তেমনি ভূমি বা জলবায়ূতেও নয়। বরং সেটি দেশের সাহিত্যে। সাহিত্যে দূষন দেখা দিলে চরম দূষন দেখা দেয় দেশবাসীর বিবেক, আচার-আচরণ, দর্শন, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও মূল্যবোধ। তখন সাহিত্য পাঠের নামে গণহারে বিষ পান হয়। তখন নৈতীক মড়ক আসে শুধু নিরক্ষর জনগোষ্ঠীর মাঝেই নয়, বরং অত্যাধীক বিষ পানের ফলে বিবেক ও মূল্যবোধে মহামারি আসে বেশী বেশী ডিগ্রিধারি, সাহিত্যসেবী ও অর্থশালীদের মাঝে। দেশের কবি-সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর, আদালতের বিচারপতি, দেশের প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রী, রাজনৈতিক নেতা-নেত্রী এবং সংসদ-সদস্যগণও তখন প্রচণ্ড দুর্বৃত্ত ও সন্ত্রাসী হয়। তখন সমগ্র জাতি অসুস্থ্য হয় নীতি ও নৈতিকতায়। দেহের রোগ যেমন জ্বর, দুর্বলতা, ক্ষুধা-হ্রাস ও ওজন-হ্রাসের ন্যায় নানারূপ লক্ষণ নিয়ে হাজির হয়, তেমনি নানারূপ লক্ষণ দেখা দেয় চেতনার রোগেও। দেশ তখন দূর্নীতিতে বিশ্বরেকর্ড গড়ে। প্রচণ্ডতা পায় পাপাচার। রাজনীতিতে বাড়ে স্বৈরাচার ও সন্ত্রাস।

বাংলাদেশে ব্যাপক দূর্নীতি, সন্ত্রাস, স্বৈরাচার ও নানাবিধ অপরাধের বিস্তার দেখে এটুকু সঠিক ভাবেই বলা যায়, বিপুল সংখ্যক মানুষের চেতনা,নৈতিকতা এবং বিবেক আদৌ সুস্থ্য নয়।এবং এটি কোন মামূলী বিষয়ও নয়। বাঙালী মুসলমানের সকল রাজনৈতিক, সমাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার জন্ম গুরুতর এই নৈতিক অসুস্থ্যতা থেকেই।এর ফলে বিশ্বমাঝে মাথা তুলে দাঁড়ানো দূরে থাক,ইজ্জত নিয়ে বাঁচাই দিন দিন কঠিনতর হচ্ছে। ইতিমধ্যে দূর্নীতিতে ৫ বার বিশ্বে প্রথম হওয়ার মধ্য দিয়ে বিশ্বাবাসীর পরিস্কার হয়ে গেছে নৈতিক সে রোগটি বাংলাদেশে কতটা প্রবল। বিপদের আরো ভয়াবহতা হল, বাঙালী মুসলিমদের মাঝে এ বিশাল সংকট নিয়ে চিন্তা-ভাবনা যেমন নেই, তেমনি ভাবনা নেই এ বিপদ থেকে কীরূপে উদ্ধার মিলবে তা নিয়েও। শয্যাগত মুমূর্ষরোগীর নিজের চিকিৎস্যা নিয়ে ভাবনা থাকে না। বোধও থাকে না। কোথায় এবং কীরূপে চিকিৎসা সম্ভব সে হুশটি লোপ পায় অনেক আগেই। লোপ পায় তার নিজের কল্যাণ চিন্তাও। এমন কি পানাহারের জন্যও তাকে নির্ভর করতে হয় অন্যের উপর। অনুরূপ অবস্থা হয় অধঃপতিত জাতিরও। দূর্নীতিতে ডুবা এমন অসুস্থ্য জাতির জীবনে দূর্নীতি মুক্তি নিয়ে কোন তাড়না থাকে না।

ব্যক্তি, সমাজ, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রের উন্নয়নে সাহিত্য যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ সে ভাবনাই বা ক’জনের? অথচ বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে বাঙালী মুসলমানের প্রচণ্ড গর্ব। জাতীয় জীবনে দিন দিন বিপর্যয় বাড়লে কি হবে,রাষ্ট্র-ভাষা রূপে বাংলার প্রতিষ্ঠাতেই অনেকের আনন্দ। ভাষার প্রয়োজনীতাটি কি নিছক সে ভাষায় কথাবলা? সরকারি নথি, চিঠিপত্র ও দলিল-দস্তাবেজ লেখা? কথোপকথোন, দোকান-পাঠ-অফিস বা ব্যাবসা-বাণিজ্যের কাজ চালনা ছাড়াও ভাষাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হয়। ক্ষেতখামারের কাজ যেমন দেশবাসীর পেটে খাদ্য জোগানো, ভাষার কাজ তেমনি চেতনায় পুষ্টি জোগানো। নইলে চরিত্র ও চেতনায় অসুস্থ্যতা অনিবার্য। ইতিহাসের বড় ছবক হলো, দেশের ভূমি যত উর্বর ও সুজলা-সুফলাই হোক, ভাষা ও সাহিত্যে সমৃদ্ধি না এলে সে দেশে যেমন চেতনাসমৃদ্ধ মানুষ যেমন গড়ে উঠে না, তেমনি উচ্চতর সভ্যতাও গড়ে উঠে না। তাই ইসলামী সভ্যতার নির্মাণ ও বিশ্বশক্তি রূপে মুসলিমদের উত্থান জনবিরল আরব মরুর বুকে সম্ভব হলেও বাংলাদেশের ন্যায় মাঝে উর্বর ও শস্য-শ্যামল বিশাল মুসলিম জনসংখ্যার দেশে সম্ভব হয়নি। বস্তুতঃ ভাষা ও ভাষালব্ধ দর্শন ও সাহিত্যের বিচারে সেকালের আরব এবং বাংলাদেশের মাঝে বিরাজমান বিশাল পার্থক্যের প্রতিফলন ঘটেছে সভ্যতার নির্মানে বাঙালী মুসলিমদের বিফলতায়। আরবী ভাষা যখন শ্রেষ্ঠতায় বিশ্বে অনন্য, বাংলা ভাষার তখনও জন্মই হয়নি।

আরবী ভাষার শ্রেষ্ঠত্বের কারণ, সে ভাষায় লেখা নিছক মানব রচিত সাহিত্য নয়। বরং মূল কারণটি হলো, এ ভাষাতেই অবতীর্ন হয়েছে মহান আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ দান এবং মানব ইতিহাসের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ আল-কোরআন। বিশাল এক সোনার খনি একটি দেশের অর্থনৈতিক ভাগ্য পাল্টে দিতে পারে। কিন্তু জ্ঞানের ভূবনে বিপ্লব এলে, বিপ্লব আসে জাতির শিক্ষা, সংস্কৃতি, চরিত্র ও সভ্যতায়।  তবে জ্ঞানের সে সূত্রটি মহান আল্লাহতায়ালা-প্রদত্ত আল-কোরআন হয় তবে বিপ্লবটি ঘটে আরো ব্যাপক ভাবে। তখন খোদ মানুষ পরিনত হয় খাঁটি সোনার চেয়েও দামী।

তবে সাহিত্যের অঙ্গণে বাংলা ভাষার দারিদ্র্যতা অতি প্রকট। বাংলা সাহিত্যের প্রধানতম উপকরণ কোরআন নয়। হাদিসও নয়। হাফিজ শিরাজী, রুমী, সাদী, গালিব বা ইকবালের ন্যায় কবিদের উচ্চতর দর্শন-নির্ভর সাহিত্যও নয়। বরং সেটি হল শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন, মনসা-মঙ্গল, চণ্ডি-মঙ্গল, বৈষ্ণব পদাবলী, খনার বচন,পুঁথি-সাহিত্য,বঙ্কিম-সাহিত্য,রবীন্দ্র-সাহিত্য, ইত্যাদী। এ সাহিত্যে কি উন্নত চেতনা,দর্শন,মূল্যবোধ ও সভ্যতা গড়ে উঠার সামগ্রী কতটুকু? পাইপ লাইনের মাধ্যমে ঘরে ঘরে বিশুদ্ধ পানি যেমন পৌঁছতে পারে, তেমনি পৌঁছতে পারে দূষিত পানিও। তেমনি সাহিত্যের মাধ্যমে ঘরে ঘরে যেমন ব্যক্তির উন্নত দর্শন, মূল্যবোধ ও জ্ঞান-বিজ্ঞানকে পৌছাতে পারে, মিথ্যা মতবাদ, ভ্রান্ত দর্শন, কুসংস্কার এবং মানব মনের অশ্লিল ও কুৎসিত বার্তাগুলোও পৌছাতে পারে। সাহিত্য এভাবে আলোর বদলে আঁধারের দিকেও যেমন টানতে পারে। মানব মনে ভয়ানক আবর্জনাও পৌঁছাতে পারে। ফলে দুষিত সাহিত্য সভ্যতার নির্মানে সহায়ক না হয়ে বরং দুর্গতি ও অবক্ষয়েরও কারণ হতে পারে। কিন্তু সে চিন্তা ক’জনের? যখন বাংলা ভাষার ন্যায় বহু আধুনিক ভাষার জন্মই হয়নি, তখনও শত শত রাষ্ট্র, সমাজ ও গোত্র গড়ে উঠেছে। বহু হাজার বছর ধরে সে সব রাষ্ট্র, সমাজ ও গোত্রের কার্যাবলী যেমন সমাধা হয়েছে তেমনি জনগণের মনের যোগযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কথোপকথনও হয়েছে। কিন্তু সব ভাষায় ও সব রাষ্ট্রে সভ্যতা গড়ে উঠেনি। উন্নত সভ্যতা তখনই নির্মিত হয়েছে যখনই কোন ভাষা উন্নত দর্শন ও সাহিত্যের বাহন হয়েছে এবং জনগণের চেতনা, কর্ম, আচরণ, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতিতে আমূল বিপ্লব এনেছে। 

সমগ্র সৃষ্টির মাঝে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব দেহের গুণে নয়; সেটি চিন্তা-ভাবনা বা দর্শনের গুণে। এই গুণটিই মানুষকে পশু থেকে পৃথক করে। উন্নত সভ্যতার নাগরিকগণ এ গুণের বলেই অনুন্নত বা বর্বরদের থেকে মাথা তুলে দাঁড়ায়। চিন্তা-ভাবনার সে বিস্ময়কর সামর্থ্য থেকেই জন্ম নেয় জ্ঞান-বিজ্ঞান। গড়ে তোলে সমৃদ্ধ সাহিত্য ও সংস্কৃতি। নির্মিত হয় উচ্চতর সভ্যতা। গাছ যেমন প্রতিদিন বাড়ে, তেমনি প্রতিদিন বেড়ে উঠতে হয় ব্যক্তিকেও। সেটি শুধু দেহের গুণে নয়, নীতি-নৈতিকতা ও মানবিক গুণেও। বেড়ে উঠার সামর্থ্য বাড়াতে প্রতি মুহুর্তে তাকে নতুন কিছু যেমন শিখতে হয়, তেমনি ভাবনা ও কর্মের মধ্য দিয়ে নতুন কিছু সৃষ্টিও করতে হয়। বেড়ে উঠার বিষয়টি ইসলামে এতই গুরুত্বপূর্ণ যে ইসলামের নবী (সাঃ)বলেছেন, “যার জীবনে পর পর দুটি দিন অতিবাহিত হল অথচ তার জ্ঞানের রাজ্যে কোন বৃদ্ধি এলো না তার জন্য বড়ই বিপদ।” সম্পদের উপর প্রতিদিনের সংযোজিত সমৃদ্ধিকে অর্থনীতির ভাষায় বলা হয় এ্যাডেড ভ্যালু বা সংযোজিত মূল্য। জাতির জিডিপ (গ্রস ডমিস্টিক প্রোডাক্ট) হল সে সংযোজিত মূল্যের যোগফল। তবে উচ্চতর সভ্যতার নির্মানে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি ঘটে অন্যত্র। মূল্য সংযোজনের সে মহা গুরুত্বপূর্ণ কাজটি ঘটে প্রতিটি ব্যক্তির জীবনে। সুস্থ্য ব্যক্তির জীবনে এমন সৃষ্টিশীলতা চলে আজীবন। সেটি যেমন তার জ্ঞানের রাজ্যে,তেমনি কৃষি,শিল্প,সংস্কৃতি,রাজনীতি ও অর্থনীতিতে।শিক্ষা ও সাহিত্যের কাজ হল, সে সৃষ্টিশীলতা বা মূল্য সংযোজনের কাজে জনগণের সামর্থ্য  বাড়ানো। সেটি যেমন বিদ্যালয়ে ও তেমনি বিদ্যালয়ের বাইরেও। বিদ্যালয়ের বাইরের সে কাজটি বেগবান করে সাহিত্য।

সৃষ্টিশীলতার বিপরীত যেটি সেটি হল স্থবিরতা। স্থবিরতা প্রাণহীন জড় বস্তু বা মৃত ব্যক্তির গুণ,জীবিতের নয়।জাতীয় জীবনে এমন স্থবিরতা ব্যাপকতর হলে অনিবার্য হয় সে পতন। অপরদিকে অতিক্ষুদ্র পরমাণুর উপর যখন সৃষ্টিশীলতা বা এ্যাডেড ভ্যালু যোগ হয়,তা থেকে জন্ম নেয় বিস্ময়কর পারমাণবিক শক্তি। সে এ্যাডেড ভ্যালু যখন কোন ব্যক্তির জীবনে যোগ হয়, সে মানুষটি ফেরেশতাদের চেয়েও শ্রেষ্ঠতর হয়।এমন লাগাতর সৃষ্টিশীলতার ফলেই সৃষ্টিশীল বিপ্লব আসে ব্যক্তি,সমাজ ও রাষ্ট্রে। সমৃদ্ধি আসে অর্থনীতি,সংস্কৃতি ও সাহিত্যে। একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির পরিমাপ হয় সে দেশের সম্পদের উপর বছরে সর্বসাকুল্যে কতটা মূল্য সংযোজিত হল বা নতুন সম্পদ সৃষ্টি হল তা থেকে। আর জাতির মানবিক উন্নয়নের পরিচয়টি মেলে মানবিক গুণে জনগণের জীবনে সর্বসাকুল্যে কতটা সমৃদ্ধি আসলো এবং চারিত্রিক ও নৈতিকতার উপর কতটা উন্নয়ন ঘটল তা থেকে।সেটি ব্যাপক ভাবে বাড়লে তখন বিপ্লব আসে দেশের সংস্কৃতি,সমাজনীতি,অর্থনীতি ও রাজনীতিতে।তখন গড়ে উঠে উচ্চতর সাহিত্য।আর সাহিত্য তো তাই যা গড়ে উঠে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাবনা,কল্পনা ও আবেগের সাথে ব্যক্তির সৃষ্টিশীল প্রতিভার সংযোজনের ফলে।হাফিজ শিরাজী,জালালুদ্দীন রুমী,গালিব বা ইকবাল তাদের শ্রেষ্ঠ সাহিত্য গড়ে তুলেছেন তো এ পথেই।এমন সাহিত্য নিজেই যেমন এক অমূল্য সৃষ্টিশীলতা,এবং তা থেকে অনুপ্রেরণা পায় বিপুল সংখ্যক সৃষ্টিশীল মানুষও।

অপর দিকে মুসলিম হওয়ার অর্থই হল সৃষ্টিশীল হওয়া। এটিই হলো তার ফিতরাত। তবে সৃষ্টিশীলতার জন্য চিন্তাশীলতাও জরুরী। চিন্তাশীলতার অভাবে মানুষ পরিণত হয় ইতর জীবে। যার মধ্যে চিন্তাশীলতা নেই, পবিত্র কোরআন থাকে তাকে পশুর চেয়েও অধম বলেছে। চিন্তাশীলতার মধ্য দিয়ে যা বাড়ে তা হল ঈমান ও তাকওয়া। ঈমানের বলেই মোমেন পায় লাগাতর নেক আমলের প্রেরণা তথা সৃষ্টিশীলতা। মোমেনের প্রতিটি নেক আমল মূলতঃ সে সৃষ্টিশীলতারই ফসল। প্রতিটি দিন এবং প্রতিটি মুহুর্তই ব্যক্তির জীবনে হাজির হয় নেক আমল তথা সৃষ্টিশীলতার বিশাল সুযোগ নিয়ে। একটি দিন অতিবাহিত হলো, অথচ সে কিছু শিখলো না, কাওকে কিছু শেখালোও না, কিছু করলোও না -এতে অপচয় ঘটে তাঁর জীবনের মূল্যবান একটি দিনের। অর্থের অপচয়ের চেয়েও এ অপচয়টি কি কম ক্ষতিকর? মহান আল্লাহর কাছে অতি অপছন্দের হলো এ অপচয়। নবীজী এমন অপচয়কারিদের শয়তানের ভাই বলেছেন। 

ঈমানদার তার প্রতিটি সৃষ্টশীল কর্মে প্রেরণা পায়, নির্দেশনা পায় এবং সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানটি পায়টি পবিত্র কোর’আনের জ্ঞান থেকে। কোর’আনী জ্ঞানের মূল কথাটি হল, এ জীবন মানুষের জন্য পরীক্ষাস্থল। মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে সে কথাটি বলেছেন এভাবে, “আল্লাযী খালাকাল মাওতা ওয়াল হায়াতা লি ইয়াবলুয়াকুম আইয়োকুম আহসানা আমালা।” -(সুরা মুলক,আয়াত ১)। অর্থঃ তিনিই সেই (মহান আল্লাহ) যিনি মৃত্যু ও জীবনকে সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমাদের মধ্যে কে কর্মের দিক দিয়ে উত্তম -সেটির পরীক্ষা হয়। ফলে এ পার্থিব জীবনে প্রতিটি ব্যক্তিই একজন পরীক্ষার্থী। আর পরীক্ষায় বসে পরীক্ষার্থীর লক্ষ্য হয়,প্রতি মুহুর্তে পরীক্ষার খাতায় নাম্বার বা স্কোর বাড়ানো। একই ভাবে ঈমানদার ব্যক্তি প্রতি মুহুর্তে স্কোর বাড়ায় তার আমলনামায়। সেটি নেক আমলের মাধ্যমে। যেমন সৎ কর্মে, তেমনি জ্ঞানের রাজ্যে। দুইটিই অতি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। লক্ষ্য,পরকালে জান্নাত লাভ। তাই যে দেশে ঈমানদারের সংখ্যা বাড়ে সেদেশে নেক আমল ও জ্ঞানের রাজ্যেও সমৃদ্ধি আসে। ইসলামের বিজয়ের আরবে তো সেটাই ঘটেছিল। তাই কোন দেশে মুসলমানের সংখ্যা বাড়লো অথচ সেদেশে সম্পদে ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধি আসলো না সেটি অভাবনীয়। এমনটি হলে বুঝতে হবে, সমস্যা রয়েছে জনগণের ইসলাম পালনে।  

মুসলিম হওয়ার অর্থ তাই শুধু নামায-রোযা ও তাসবিহ পাঠে মনযোগী হওয়া নয়। বরং সেটি হলো নেক আমল বৃদ্ধির কাজে আমৃত্যু এবং প্রতি মুহুর্ত লেগে যাওয়া। সৃষ্টিশীল এমন মিশনে লেগে থাকার কারণেই ব্যক্তির জীবনে লাগাতর উৎকর্ষ আসে; যেমন তার কর্মে, তেমনি তার ভাবনায়। আরবের মানুষগুলো ঈমান ও আমলে অতি দ্রুত উপরে উঠেছিল তো এ পথেই। তাঁরা পরিণত হয়েছিলেন মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মানবে। যারা এক কালে নিজেদের কন্যাকে জীবন্ত কবর দিত, তাঁরাই হাজার হাজার মাইল দূরের মানুষদের জাহান্নামের আগুণ থেকে বাঁচাতে ছুটে গিয়েছিলেন। দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে দিয়েছেন বড় বড় পাহাড়-পর্বত, নদীনালা ও মরুপ্রান্তর অতিক্রম করে। বাংলাদেশের চেয়ে ৫০ গুণ বৃহৎ রাষ্ট্রের খলিফা তার ভৃত্যুকে উঠের চড়িয়ে নিজে উঠের রশি ধরে টেনেছেন। খলিফা নিজে আটার বস্তা কাঁধে নিয়ে ক্ষুদার্ত মানুষে জনগণের ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন। এ ছিল তাঁদের সভ্যতার মান। সে সময় যে দেশেই ইসলামের প্রবেশ ঘটেছিল সে দেশেই এসেছিল এরূপ মানবিক গুণের বিপ্লব।এসেছিল প্রচণ্ড সৃষ্টিশীলতা ও চিন্তাশীলতা। আরবী ভাষায় পবিত্র কোরআনের পূর্বে কোন গ্রন্থ ছিল না। কিন্তু আরবদের ইসলাম গ্রহণের সাথে সাথে সে দেশে শুধু নামায-রোযা ও হজ-যাকাত আসেনি, বিপুল সমৃদ্ধি এসেছে তাদের ভাষা ও সাহিত্যে। ফলে আরবী ভাষায় অতি অল্প সময়ে গড়ে উঠে এক বিশাল জ্ঞান-ভান্ডার। আর এ ফলে গড়ে উঠে মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা। অথচ কোর’আনের পূর্বে আরবী ভাষায় কোন গ্রন্থ ছিল না। ইসলামের প্রবেশের ফলে সাহিত্য ও বিজ্ঞানে দ্রুত বিপ্লব এসেছিল ইরান দেশেও। ইরানের ইতিহাস বহু হাজার বছরের। কিন্তু সে দেশের মানুষের যা কিছু মহান সৃষ্টি তা গড়ে উঠেছে ইসলাম আগমনের পর। ইসলাম মহান বিপ্লব এনেছিল তুর্কীদের মাঝেও। তারা গড়ে তুলেছিল ওসমানিয়া খেলাফত যা ছিল বহুশত বছর ধরে সমগ্র বিশ্বের প্রধানতম বিশ্বশক্তি। ইসলাম কবুলের পর বিপ্লব এসেছিল আফগানদের জীবনেও। সুলতান মাহমুদের সময় তার রাজ্যে যত বিজ্ঞানীর বসবাস ছিল, তা সমগ্র বাঁকি বিশ্বে ছিল না।

কোন জাতির সংস্কৃতি,মূল্যবোধ ও মানবিক উন্নয়নের মান যাচায়ে সে জাতির লোকসংখ্যা,রাস্তাঘাট, মাঠঘাট বা কলকারখানার খতিয়ান নেয়াটি জরুরী নয়। বরং সে পরিচয় মেলে সে জাতির ভাষা ও সাহিত্য থেকে। গাড়ীর আগে যেমন ঘোড়া দৌড়ায়,তেমনি জাতির বিজয় বা উন্নয়নের আগে সে জাতির জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শন ও সাহিত্যের ঘোড়াটি দৌড়ায়। ভাষার মধ্যেই ধরে পড়ে জাতির ধর্ম-কর্ম, চরিত্র, বুদ্ধিবৃত্তি ও মূল্যবোধ। পরবর্তী বংশধরদের জন্য সাহিত্যের মধ্যে থাকে াভাস সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার। তবে সে উত্তরাধিকার যেমন কল্যাণকর হতে পারে,তেমনি অকল্যাণকরও হতে পারে। সন্তানের দেহে পিতামাতা যেমন সংক্রামক ব্যাধীর বীজ ছড়িয়ে মারা যেতে পারে, তেমনি শিশুর চেতনায় সংক্রামক অজ্ঞতা,পথভ্রষ্টতা বা কুসংস্কার রেখেও মারা যেতে পারে। শত শত বছর ধরে মানব সমাজে নানারূপ অজ্ঞতা ও পথভ্রষ্টতা যে বেঁচে থাকে তা তো এমন পারিবারীক বিশ্বাস ও সংস্কৃতির ধারাবাহিকতায়।পাপুয়া নিউগিনির মানুষ আজও  যেরূপ উলঙ্গ ভাবে বনে জঙ্গলে জীবন কাটায় সেটি তো একারণেই। পূর্বপুরুষ অগ্নিপুঁজা,পুতুলপুঁজা,সর্পপুঁজা,গরুপুঁজার বা নাস্তিকতার ঐতিহ্য পরিবারে রেখে মারা গেলে পরবর্তী বংশধরগণও গর্বভরে সেটাই অনুসরণ করে। সেটি বেঁচে থাকে দেশের আবহমান ধর্ম, সংস্কৃতি ও সাহিত্যের মাধ্যমে। মুসলিমদের কাজ শুধু ইসলাম প্রচার নয়,বরং সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের নামে যে অজ্ঞতা ও কুসংস্কার মানুষকে পথভ্রষ্ট করে সেগুলির বিলুপ্তি ঘটানো। সে কাজটি যথার্থ ভাবে না হলে অসম্পূর্ণ থেকে যায় ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মানের কাজটি। পানাহারের নামে বিষপানের ন্যায় সাহিত্য ও সংস্কৃতির নামে পথভ্রষ্টতাও তখন প্রবলতর হয়। এমন এক অপরিহার্য তাগিদেই মিশর, ইরান, আফগানিস্তানের মানুষ ইসলাম গ্রহণের সাথে সাথে তাদের বহু শত বছরের পুরনো ভাষা, সাহিত্য ও ঐতিহ্যের সাথে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছিল। ইসলামের প্রবেশের আগে মিশরীদের নিজস্ব ভাষা ছিল,সে ভাষায় শত শত বছর ধরে ফিরাউনদের রাষ্ট্রও পরিচালিত হয়েছিল। কিন্তু মিশরীয়রা সে মাতৃভাষাকে ত্যাগ করে তারা আরবীকে গ্রহণ করেছিল। নিজস্ব ভাষা ছিল ইরানীদেরও,সেটি ছিল ‘দারী’ ভাষা।সে ভাষায় সে আমলের বিশ্বশক্তি সাসানীদের রাজকার্য,ধর্ম-কর্ম ও শিক্ষার কাজ চলতো। কিন্তু ইরানীরা ইসলাম কবুলের সাথে সাথে ‘দারী’ বর্জন করে কোরআনের শব্দ, উপমা ও দর্শন নিয়ে নতুন ভাষা ফার্সীর জন্ম দেয়। ফার্সী ভাষার শতকরা ৭০ ভাগেরও বেশী শব্দ আরবী। ভারতে মুসলিমদের যখন আগমন ঘটে তখন এদেশে যে ভাষা বা সাহিত্য ছিল না তা নয়। তখন সংস্কৃত ভাষা ছিল, সে ভাষায় সাহিত্যও ছিল। তবে সংস্কৃত ভাষা ও সে ভাষায় রচিত রামায়ন, মহাভারত, বেদ,উপনিষদের কেচ্ছাকাহিনীপূর্ণ সাহিত্য দিয়ে চেতনা পূর্ণ করলে মুসলিমদের পক্ষে ঈমান বাঁচানোই অসম্ভব হত। ঈমান বাঁচাতে গিয়ে ভারতীয় মুসলিমগণ তাই নতুন ভাষা উর্দুর জন্ম দিয়েছে এবং সে ভাষায় বিশাল সাহিত্য-ভান্ডারও গড়ে তুলেছে। উর্দুর পাশাপাশি সাহায্য নিয়েছে আরবী ও ফার্সীর। মুসলিমরা এভাবে যেখানেই গেছে সেখান শুধু মসজিদ-মাদ্রাসা ও রাষ্ট্র নির্মান করেনি,নতুন নতুন ভাষা এবং সে ভাষায় সমৃদ্ধ সাহিত্যেরও জন্ম দিয়েছে।

বাঙালী মুসলিমদের বিপদ

কিন্তু মিশর, ইরান, আফগানিস্তান বা তুরস্কে যা ঘটেছে,বাংলাদেশে সেটি ঘটেনি।বাঙালী মুসলিমদের মূল বিপদটি এখানেই।আধুনিক বাংলা ভাষাটি গড়ে উঠেছে মূলত বাঙালী হিন্দুদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রয়োজনে। সেটির প্রমাণ মেলে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে। বাংলা সাহিত্যের জন্ম বৌদ্ধদের দ্বারা। এবং সেটি চর্যাপদের মাধ্যমে। ১৯০৭ সালে হর প্রাসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজকীয় পাঠাগারে ২৩ জন কবীর ৪৭টি চর্যাপদের সন্ধান পেয়েছিলেন। বাংলা সাহিত্যের সেটাই প্রাচীন কাল এবং এ চর্যাপদগুলিই সে আমলের সাহিত্য-ভান্ডারের একমাত্র সঞ্চয়। বলা হয়ে থাকে,এগুলো রচিত হয়েছিল দশম শতাব্দীতে। কিন্তু এরপর বাংলা সাহিত্যে বৌদ্ধদের অবদান আর নজরে পড়ে না। সম্ভবতঃ এ কারণে যে,হিন্দুদের দ্বারা ব্যাপক বৌদ্ধনির্মূল শুরু হলে তাদের দ্বারা সাহিত্য সৃষ্টি দূরে থাক,প্রাণে বাঁচাই কঠিন হয়ে পড়ে। তখন বাংলায় বৌদ্ধ পাল রাজাদের শাসনই শুধু বিলুপ্ত হয়নি,প্রায় বিলুপ্ত হয়েছিল বৌদ্ধ ধর্মও। জীবন বাঁচাতে বৌদ্ধরা তখন নেপাল, ভূটান, শ্রীলংকা, বার্মা ও অন্যান্য দেশে আশ্রয় নেয়। শরণার্থী বৌদ্ধদের সাথে চর্যাপদগুলি নেপালে পৌঁছানোর ফলে সেগুলি বেঁচে যায়। এরপর শুরু হয় বাংলা সাহিত্যের মধ্য যুগ। মধ্যযুগীয় সে সাহিত্যের প্রায় সবটুকুই বাঙালী হিন্দুদের সাহিত্য। সেটি বুঝা যায় সে সাহিত্যের উপকরণগুলির দিকে তাকালে। সেগুলি হলঃ এক)বৈষ্ণব সাহিত্য, দুই) শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন,তিন) বিদ্যাপতির পদাবলী, চার)চন্ডিদাশ পদাবলী, পাঁচ) মঙ্গল কাব্য, ছয়) সংস্কৃত সাহিত্য থেকে অনুবাদ, সাত) মহাভারতের অনুবাদ, এবং আট) বাউল গান। সে সাহিত্যে স্থান পেয়েছিল শ্রীকৃষ্ণ, রাম,শর্প, মনসা, রামায়ন ও মহাভারতের কথা। বাঙালী মুসলিমদের পক্ষে সে সাহিত্য থেকে চেতনায় পুষ্টি লাভ দূরে থাক,সে গুলির ভাষা, উপমা ও চরিত্র থেকে অর্থ-উদ্ধারই দূরুহ। শুধু একালে নয়, সেকালেও সেগুলি দূর্বোধ্য ছিল। বাংলায় মুসলিমদের বিজয় ত্রয়দশ শতাব্দীতে হলেও মুসলিম কবিদের সাহিত্যচর্চার শুরু হয় পঞ্চদশ শতাব্দীতে। প্রশ্ন হল, ত্রয়দশ থেকে পঞ্চদশ এ দুইশত বছর ধরে বাঙলার মুসলিমদের চেতনায় পুষ্টি জোগানো হল কি ভাবে? পঞ্চদশ শতাব্দীতে যে সাহিত্য রচনা শুরু হল সে সাহিত্যই বা কতটা সমৃদ্ধ ছিল? পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথম সারীর কবি হলেন শাহ মুহম্মদ ছগির।তিনি রচনা করেন ইউসুফ জুলেখা। পবিত্র কোরআনে ইউসুফ জুলেখার বর্ণনা রয়েছে। কিন্তু শাহ মুহম্মদ ছগির তার “ইউসুফ জুলেখা”য় যা লেখেন তা তাঁর নিজস্ব কল্পনাপ্রসূত। এ আমলের অন্যরা হলেন দৌলত উজির বাহরাম খান,শাহ বারিদ খান,মুহম্মদ কবীর প্রমুখ। দৌলত উজির বাহরাম খান রচনা করেন লায়লী মজনু, শাহ বারিদ খান লেখেন বিদ্যাসুন্দর এবং হানিফা-কয়রপরী কাব্য। মুহম্মদ কবীর রচনা করেন মধু মালতী। দুই শতাব্দী ধরে মাত্র ৫ জন কবির হাতে রচিত হয় মাত্র ছয়খানি আখ্যানকাব্য। (সুত্রঃ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, ২য় খণ্ড,২০০৮;বাংলা একাডেমী প্রকাশিত)।মধ্য যুগে অন্যান্য মুসলিম কবিগণ হলেন আলাওল, সৈয়দ সুলতান, মুজাম্মিল, ফয়জুল্লাহ প্রমুখ। এ আমলে মুসলিমদের রচিত সাহিত্যের কলেবর যেমন নগন্য,তার চেয়েও নগন্য হল জনগণের উপর তার প্রভাব।

এর পর শুরু হয় বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগ। প্রাচীন ও মধ্য যুগের ন্যায় আধুনিক যুগের সাহিত্যকর্মের শুরুও অমুসলিমদের হাতে। শুরুর কাজটি এবারও ঘটে ধর্মীয় প্রয়োজনে। তবে সেটি খৃষ্টানদের হাতে এবং খৃষ্টান ধর্মের প্রচারের স্বার্থে। শুরু হয় শ্রীরামপুর মিশন ও ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ থেকে। খৃষ্টানগণই সর্বপ্রথম এদেশে ছাপা খানা গড়ে তোলে এবং পত্রিকার প্রকাশও শুরু করে। খৃষ্টানদের মাঝে নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ছিলেন উইলিয়াম কেরী। তাদের দ্বারাই সর্ব প্রথম গদ্য সাহিত্যের জন্ম। এ আমলের সাহিত্য জগতের উল্লেখযোগ্য তারকা হলেন রাম মহন রায়, ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজ নারায়ন বসু,অক্ষয় কুমার দ্ত্ত, পেয়ারী চাঁদ মিত্র, কালী প্রসন্ন সিংহ, মাইকেল মধুসূদন, ইশ্বরচন্দ্র গুপ্ত,বঙ্কিমচন্দ্র চ্যাটার্জী,হেমচন্দ্র,নবীনচন্দ্র,বিহারীলাল চক্রবর্তী,দীনবন্ধু মিত্র,গিরিশচন্দ্র ঘোষ,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর,মোশাররফ হোসেন,শরৎচন্দ্র,সত্যন্দ্রনাথ দত্ত,মোহিতলাল মজুমদার,দ্বিজেন্দ্রলাল রায়,নজরুল ইসলাম,বিভূতি ভূষন বন্দোপাধ্যয়,তারাশংকর বন্দোপাধ্যয়, মানিক বন্দোপাধ্যয় এবং আরো অনেকে।

সংখ্যাগরিষ্ট হিন্দু সাহিত্যিকদের রচিত গল্প, উপন্যাস, নাটক, কাব্য ও মহাকাব্যের মূল লক্ষ্য ছিল হিন্দুদের ধর্মীয় বিশ্বাসগুলোকে শক্তিশালী করা এবং তাদের কল্যাণচিন্তাকে বলবান করা। সে সাহিত্যের প্রভাবেই বাংলার হিন্দুদের মাঝে দেখা দেয় রেনাসাঁ।সেটি যেমন শিক্ষা-দীক্ষা, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে,তেমনি রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও। মুসলমানের মনে পুষ্টি জোগানো দূরে থাক,সে সাহিত্যে মুসলিমদের উল্লেখটিও ছিল অতি সামান্য। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সে উল্লেখগুলি ছিল মুসলিমদের চরিত্রহননের লক্ষ্যে। বরং বাস্তবতা হল, বাংলার সংখ্যাগরিষ্ট জনগণ যে মুসলিম সেটি হিন্দুদের রচিত মধ্য যুগীয় ও আধুনিক কালের বাংলা সাহিত্যে পড়লে বোঝাই যায় না। বাংলার মাঠঘাট, ব্যবসা-বাণিজ্য, নগর-বন্দর ও অফিস-আদালতসহ সর্বত্র জুড়ে যেন শুধু হিন্দুই,মুসলমানের খোঁজ সে সাহিত্যে তেমন মেলে না। তাই মুসলিমদের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় প্রয়োজন মেটোনোর সামর্থ্য  এ সাহিত্যের ছিল না। বরং বিস্তর সামর্থ্য  ছিল মুসলিমদের মনবল ভেঙ্গে দেয়ার।মীর মোশাররফ হোসেনের মত ব্যক্তিদের রচিত সাহিত্যও মুসলিমদের কল্যাণে কাজের কাজ কিছুই করেনি। ইসলামের ইতিহাসের অতি বিয়োগান্ত ঘটনা ঘটেছিল কারবালায়। কারবালার সে ঘটনাকে তিনি রংচঙ চড়িয়ে ‘বিষাদ সিন্ধু’ রচনা করলেও সে গ্রন্থে কারবালার মূল শিক্ষাকে তিনি আড়াল করেছেন। কারবালার সে অতি করুণ ঘটনাকে তিনি প্রেমের কেচ্ছা বানিয়েছেন।সাহিত্যকে তিনি বিনোদনের বাহন বানিয়েছেন, জনগণের চেতনা ও দর্শনে সুস্থ্যতা বাড়ানোর কাজে তার অবদান তাই নগণ্য।

সাহিত্যের অবদানঃ চেতনায় প্রতিরোধ

মুসলমানের প্রতি কাজেই থাকে ইবাদতের প্রেরণা। পরীক্ষার খাতায় প্রতি শব্দ লেখার মধ্যে যেমন থাকে পাশের চিন্তা, তেমনি ঈমানদারের প্রতিটি বাক্য, প্রতিটি উচ্চারণ ও প্রতিটি ভাবনার মধ্যেও থাকে আখেরাতে মুক্তির ভাবনা। তাই যারা ঈমানদার কবি-সাহিত্যিক তারা শুধু সাহিত্যিকই নন, সাধক, দার্শনিক এবং মোজাহিদও। কবি ইকবাল তারই প্রকৃষ্ট উদাহরণ। সাহিত্যের মূল কাজ শুধু ঈমানে পুষ্টি জোগানো নয়,বরং অসুস্থ্য ভাবনা,মিথ্যা দর্শন,সামাজিক কুসংস্কার এবং অসত্য ও অধর্মের বিরুদ্ধে মানব মনে প্রতিরোধ বাড়ানো। ইসলামী সাহিত্য এভাবেই মানব মনে ভ্যাকসিনেশনের কাজ করে। সে ভ্যাকসিন ইম্যুনিটি বা প্রতিরক্ষা দেয় মিথ্যা, পাপাচার ও অধর্মের বিরুদ্ধে। পাপাচার কবলিত সমাজে সুস্থ্যতা নিয়ে বাঁচার জন্য এমন ইম্যুনিটি জরুরী। মুসলিমদের সবচেয়ে বড় সম্পদ তেল গ্যাস নয়,জন-সম্পদও নয়।সেটি হলো পবিত্র কোরআন-হাদীস,এবং সে কোরআন-হাদীসের ভিত্তিতে রচিত ইসলামী সাহিত্য। এ সাহিত্য থেকে সে পায় ঈমানের বল। তেল-গ্যাসের অর্থে এমন ইম্যুনিটি আসে না। বরং বিপদ হল,সাহিত্যের বদলে দেশে অপ-সাহিত্য গড়ে উঠলে সেটি অসুস্থ দর্শন,মিথ্যা মতবাদ,দুষিত সংস্কৃতি এবং পাপের বাহনও হতে পারে। বইয়ের পাতা বয়ে কোটি কোটি মানুষের চেতনায় তখন পৌঁছে বিষাক্ত বিষ। এমন বিষ প্রচণ্ডতা নেশাগ্রস্ততাও আনে। সে নেশাগ্রস্ততা হিরোইনের চেয়ে কম নয়। হিরোইনসেবীরা যেমন পুষ্টিকর খাদ্যে রুচী হারায়, তেমনি অপসাহিত্যের নেশাগ্রস্ত পাঠকগণ রুচী হারায় কল্যাণকর সাহিত্যে। জাতীয় জীবনে তখন বিপর্যয় নেমে আসে ভয়ানক ভাবে। কবি, নাট্যকার ও উপন্যাসিকের ছদ্দবেশে বাংলাদেশে এমন বিষ-ব্যাবসায়ী বা হিরোইন-ব্যবসায়ীর সংখ্যা কি কম?  দূষিত খাদ্য-পানীয়ের ন্যায় দুষিত সাহিত্যও পরিহার এজন্যই জরুরী। আরবের মুসলিমগণ তাই ইমরুল কায়সদের মত কবিদের সৃষ্ট অসুস্থ্য ও অশ্লিল সাহিত্যের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন। অথচ অসুস্থ্য ও অশ্লিল সাহিত্য জনপ্রিয়তা পাচ্ছে বাংলাদেশে। সাহিত্য পরিণত হয়েছে নিছক বিনোদনের মাধম্যে। কোন কোন ক্ষেত্রে সেটি অশ্লিলতার আশ্রয়ে।ফলে এ সাহিত্য জনমনে ইম্যুনিটি না বাড়িয়ে বরং সেটির ব্যাপক বিনাশ ঘটাচ্ছে। এইডস ভয়ানক রোগ,কারণ এ রোগটি দেহের প্রতিরোধ ক্ষমতা বিলুপ্ত করে। সুস্থ্য মানুষ দীর্ঘ কাল বাঁচে কোন ঔষধের গুণে নয়।বরং সেটি আল্লাহপ্রদত্ত প্রতিরোধ ক্ষমতার গুণে। সুস্থ্য দেহের নানা স্থানে লক্ষ লক্ষ জীবানূর বাস, কিন্তু সেগুলি দেহের প্রতিরক্ষা বুহ্য ভেদ করতে পারে না। ফলে সে জীবনূগুলো শরীরের অভ্যন্তরে বছরের পর বছর বাস করলেও তা থেকে রোগ সৃষ্টি হয় না। কিন্তু এইডস রোগীর জীবনে এ দুর্বল জীবানূগুলিই ত্বরিৎ মৃত্যু ডেকে আনে। চেতনা রাজ্যে তেমনি এইডস সৃষ্টি করে অপ-সাহিত্য। বাংলাদেশে সে বিনাশী কর্ম যে কতটা ভয়ানক ভাবে হচ্ছে সেটি বুঝা যায় নৈতিকতা ও মূল্যবোধের দুরাবস্থা ও দুর্নীতির ব্যাপক প্রচার দেখে। নৈতিক ইম্যুনিটি বিনষ্ট হওয়ার ফলেই বাংলাদেশ দূর্নীতে বিশ্ব-রেকর্ড গড়ছে। নবীজী (সাঃ)র আমলে মুসলিমগণ প্রথম ১৩টি বছর কাটিয়েছেন মক্কায়। সেখানে যেমন মদ-জুয়া ছিল,তেমনি উলঙ্গতা,অশ্লিলতা, দুর্বৃত্তি এবং ধর্মের নামে অধর্মও ছিল। সে সমাজ ছিল নৈতিক ব্যাধীতে পরিপূর্ণ। কিন্তু সেগুলি ঈমানদারদের স্পর্শ করতে পারেনি। ব্যর্থ হয়েছে তাদের মাঝে নৈতিক রোগ সৃষ্টি করতে। সেটি সম্ভব হয়েছিল তাদের চেতনায় প্রবল ইম্যুনিটির কারণে। আর সে ইম্যুনিটি প্রবল ভাবে বেড়েছিল আল-কোরআনের জ্ঞানে। অতীতে ভারতে আগত শক,হুন,জৈন,আর্য-অনার্য -নানা ধর্মের মানুষ ভারতীয় হিন্দুদের মাঝে হারিয়ে গেছে। কিন্তু হারিয়ে যায়নি মুসলিমগণ। হারিয়ে যাওয়া থেকে মুসলিমগণ বেঁচে গেছে কোরআনী জ্ঞানলব্ধ ইম্যুনিটির কারণে।কিন্তু সে ইম্যুনিটি বিনাশের লক্ষ্যে প্রচণ্ড আগ্রাসন শুরু হয়েছে বাংলাদেশে। আর সে লক্ষ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে সাহিত্য। এবং সে সাথে জনগণকে পরিকল্পিত ভাবে দূরে সরানো হচ্ছে কোরআন-হাদিসের জ্ঞান থেকে।

অধিকৃত চেতনাঃ সাহিত্য যেখানে হাতিয়ার

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, অমুসলমানের সাথে মুসলমানের পানাহার যেমন একত্রে চলে না, তেমনি সাহিত্যও চলে না। কারণ উভয়ের প্রয়োজনটা যেমন ভিন্ন, তেমনি ভিন্ন হল কোনটি ক্ষতিকর আর কোনটি উপকারি সে ধারণাটিও। মুসলিম ও অমুসলমানের পানাহার ভিন্ন ভিন্ন টেবিলে বা পৃথক কক্ষে হলে হালাল-হারামের বাছবিচারে এতটা মনযোগী না হলেও চলে। কিন্তু যখন সেটি হয় একই টেবিলে, তখন খাদ্য গ্রহনে ঈমানদারকে অত্যন্ত সতর্ক হতে হয়। তখন টেবিলের নানা কোন থেকে হালাল খাদ্যগুলো বেছে বেছে নিতে হয়। একাজে সামান্য অসতর্ক হলে হারাম খাদ্য ভক্ষণও অস্বাভাবিক নয়। তেমনটি সাহিত্যের ক্ষেত্রেও। সাহিত্যের ক্ষেত্রে বাছবিচারের বিষয়টি সহজতর করতে গিয়েই দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সকল অবাঙালী মুসলমানেরা শিক্ষার ভাষা, ধর্মের ভাষা ও সংস্কৃতির ভাষা রূপে উর্দুকে গ্রহন করেছে। উর্দুর আগে গ্রহণ করেছিল ফার্সীকে। আর হিন্দুরা গ্রহন করেছে হিন্দিকে। পাঞ্জাবের শিখরা তাদের শিক্ষা ও সংস্কৃতির ভাষা রূপে পাঞ্জাবীকে গ্রহণ করেছে। আর পাঞ্জাবের মুসলমানেরা গ্রহণ করেছে উর্দুকে। কিন্তু এক্ষেত্রে ভিন্নতর হল বাঙালী মুসলিমগণ। তারা প্রতিবেশী হিন্দুদের সাথে একত্রে বসে একই টেবিল থেকে তাদের নিজ চেতনার খাদ্যগুলো গ্রহণ করছে। এবং কোন রূপ বাছবিচার ছাড়াই। আর বাঙালী মুসলমানের জীবনে ভয়ানক বিপদটি ঘটছে এখানেই। সাহিত্য পাঠের নামে এখানেই ঘটছে বিষপান।এমন কি বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিতটিও নেয়া হয়েছে একজন পৌত্তলিক হিন্দু থেকে। সাহিত্যের মধ্য দিয়েই একটি চেতনা কথা বলে। তাই পৌত্তলিকের সাহিত্য এজন্যই ঈমানদারের সাহিত্য থেকে ভিন্নতর হয়। ইকবাল, গালিব বা হাফিজের কবিতার মধ্য দিয়ে যেমন তাদের মুসলিম মানস কথা বলে, তেমনি রবীন্দ্র-সাহিত্যে গোপন থাকেনি তাঁর প্রচণ্ড হিন্দুত্ব ।   

রবীন্দ্রনাথ বাঙালী হলেও তার স্বপ্ন ছিল অখণ্ড ভারতব্যাপী হিন্দু সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা ও হিন্দুত্বের বিজয়।তাঁর চেতনার সে মানচিত্রে মুসলমানের যেমন স্থান ছিল না,তেমনি ছিল না স্বাধীন বাংলাদেশের ধারণাও। গান্ধীর এক প্রশ্নের জবাবে তিনিই হিন্দি ভাষাকে ভারতের রাষ্ট্রভাষা রূপে গ্রহণের প্রস্তাব দিয়েছিলেন।রাজনৈতিক নেতা না হলেও রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক দর্শন বা অঙ্গিকার যে কতটা গভীর ছিল সেটির প্রমাণ হল তাঁর সাহিত্য। তাঁর কাছে অনুকরণীয় মডেল রূপে যিনি স্থান পেয়েছিলেন তিনি কোন বাঙালী ছিলেন না। গান্ধিও নন। তিনি হলেন ভারত থেকে মুসলিম-নির্মূলের নায়ক শিবাজী। শিবাজীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধাভরে তিনি ‘শিবাজী উৎসব’ কবিতা লেখেন। তাঁর মত কবি-সাহিত্যিক ও রাজনৈতিকদের উৎসাহে মারাঠার ন্যায় বাংলাতেও শিবাজী উৎসব শুরু হয়।রবীন্দ্রনাথের শিবাজী উৎসব কবিতার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়, শিবাজীর প্রতি তার নিজের ভক্তিটা কত গভীর এবং তার হিন্দুত্ব কতটা বিশাল। তিনি লেখেন:

“আমি কবি এ পূর্ব ভারতে

কী অপূর্ব হেরি,

বঙ্গের অঙ্গন দ্বারে কেমনে ধ্বনিল কোথা হতে

তব জয় ভেরি।

শুধু তব নাম আজি পিতৃলোক হতে এল নামি

করিল আহবান-

মুহুর্তে হৃদয়াসনে তোমারেই বরিল হে স্বামী,

বাঙালীর প্রাণ।

তোমারে চিনেছি আজি চিনেছি হে রাজন

তুমি মহারাজ।

তব রাজ করলয়ে আট কোটি বঙ্গের নন্দন

দাঁড়াইবে আজ ।

মারাঠির সাথে আজি হে বাঙালি, এক কন্ঠে বলো

‘জয়তু শিবাজী’

মারাঠির সাথে আজি হে বাঙালি, এক সঙ্গে চলো

মহোৎসবে আজি।”

অথচ এ মাত্র ৫ বছর পূর্বে ‘পণরক্ষা’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ মারাঠাদের দস্যু রূপে চিত্রিত করে লিখেছেন:

“মারাঠা দস্যু আসিছিরে ঐ

করো করো সবে সাজ।”

মারাঠাদের দস্যু চরিত্র রবীন্দ্রনাথের অজানা ছিল না। সে সাথে এটিও তাঁর অজানা ছিল না যে, মারাঠা নেতা শিবাজী মুসলিম নির্মূলের নায়ক। এবং তিনি হিন্দু পুনর্জাগরনের নেতা। লক্ষণীয় হল,শিবাজী উৎসব কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ৮ কোটি বাঙালীকে এক সঙ্গে ‘জয়তু শিবাজী’ ধ্বণি দিতে বলেছেন। এখানে অর্থ দাড়ালো কি? রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় বাঙালী হিন্দুর সংখ্যা ৮ কোটি ছিল না।এবং এখনও তারা ৮ কোটি নয়। তবে কি তিনি ‘জয়তু শিবাজী’ ধ্বনি দিতে মুসলিমদেরকেও আহবান করছেন? তবে কি তিনি চান,অখন্ড ভারত জুড়ে হিন্দু-রাজ্য নির্মানে শিবাজীর ন্যায় মুসলিম নির্মূলের নায়কের অনুসারি হয়ে বাঙালী মুসলমানেরাও শামিল হোক? মুসলিমদের সাথে এর চেয়ে নির্মম মস্করা আর কি হতে পারে? এটি তো মুসলিমদের নিজ কবর নিজ হাতে খনন করতে বলা। ভারতীয় শিব সেনা, বিজেপী, বজরং দল, বিশ্বহিন্দু পরিষত তো সেটিই চায়।কথা হল,এমন উগ্রহিন্দু চেতনাধারির রচিত গান বাঙালী মুসলমানের জাতীয় সঙ্গীত হয় কি করে?

হিন্দু মারাঠাদের পরিচালিত মুসলিম নির্মূল প্রক্রিয়াটি মুসলিমদের মনে এতটাই আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল যে হযরত শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভি (রহঃ) তৎকালীন আফগান শাসক আহম্মদ শাহ আবদালীকে মারাঠাদের দমনে ভারতে আসতে আহবান জানান।সে সময় ছিল মোগল শাসনের মুমূর্ষ অবস্থা, মারাঠাদের হামলার মুখে মোগলদের অবস্থা তখন অসহায়। ভারতে মুসলিম শাসনের সে দূর্দীনে আহম্মদ শাহ আবদালী সেদিন মারাঠা শক্তি নির্মূল করে আফগানিস্তান ফিরে যান। ভারতের মুসলিম ইতিহাসে এ যুদ্ধটি অতি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ,মারাঠা শক্তি বিনাশের ফলেই ভারতীয় মুসলিমগণ সে যাত্রায় নির্মূল প্রক্রিয়া থেকে বেঁচে যায়। নইলে ভারতীয় বৌদ্ধদের পরিনতি নেমে আসতো মুসলিমদের জীবনেও। কিন্তু উগ্র হিন্দুদের কাছে শিবাজী প্রতিষ্ঠা পায় মুসলিম বিরোধী রাজনীতির বীর পুরুষ রূপে। এবং সেটি রবীন্দ্রনাথের কাছেও। চরম মুসলিম-বিদ্বেষী আরেক মারাঠা শ্রী বাল গঙ্গাধর তিলক ১৮৯৩ সালে পুনা শহরে শিবাজীর জন্মস্থানে শিবাজী উৎসব প্রবর্তন করেন। শিবাজী পরিনত হন সারা ভারতে হিন্দু পুনরুজ্জীবনের প্রতীক রূপে। শিবাজী উৎসব আমদানী হয় কলিকাতা শহরেও। রবীন্দ্রনাথসহ অধিকাংশ হিন্দু বুদ্ধিজীবীগণই তাতে সাগ্রহে অংশগ্রহণ করেন।হিন্দু জাগরণ,মুসলিম নির্মূল এবং অখন্ড ভারতের বিষয়টি রবীন্দ্রনাথের কাছে এতটাই বড় হয়ে দাঁড়ায় যে দস্যূ শিবাজীকে তিনি অতি শ্রদ্ধাভরে ‘জয়তু শিবাজী’ বলেছেন। এভাবে সেদিন দিনের আলোর ন্যায় সুস্পষ্ট হয় রবীন্দ্র মানস। বিস্ময়ের বিষয় হল,সে রবীন্দ্রনাথের গানই বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিত! কোন মুসলিম নেতা বা বুদ্ধিজীবী এমন একটি গানকে কি মুসলিমদের জাতীয় সঙ্গিত রূপে গ্রহণ করতে পারে?

জাতীয় সঙ্গিতের সুর,ছন্দ বা কবিত্বই বড় কথা নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ হল, সে সঙ্গিতের মধ্য দিয়ে জাতির ভিশন,মিশন,ধর্ম,জীবন-দর্শন ও আশা-আকাঙ্খার কতটা প্রকাশ ঘটল সেটি। জাতীয় সঙ্গিতের মাঝে প্রতিফলিত হয় দেশের সংখ্যাগরিষ্ট মানুষের চেতনা। জাতীয় সঙ্গিতের লেখককে এজন্য নবেল-প্রাইজ বিজয়ী হওয়াটি জরুরী নয়। বিশ্বের দুই শত বেশী রাষ্ট্রের মধ্যে কয়টির দেশের জাতীয় সঙ্গিতের লেখক নবেল প্রাইজ বিজয়ী? এক্ষেত্রে জরুরী হল দেশবাসীর চেতনা ও বিশ্বাসের প্রতিনিধি হওয়ার সামর্থ্য  থাকা। কিন্তু সে সামর্থ্য  কি রবীন্দ্রনাথের ছিল? রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্ম বিশাল। হাজার হাজার পৃষ্ঠা তিনি লিখেছেন। যখন তিনি লেখালেখি নিয়ে ব্যস্ত তখন তার চোখের সামনেই এদেশের উপর চলছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জুলুমটি। সেটি সাম্রাজ্যবাদী ঔপনিবেশিক শাসন। সে শাসন সাথে এনেছিল অর্থনৈতিক শোষন। এনেছিল নীল চাষ। এনেছিল দেশীয় শিল্প, কৃষি ও শিক্ষার ধ্বংসের অভিনব কৌশল। বাংলার মসলিন শিল্পের ধ্বংসে তারা তাঁতীদের হাতের আঙ্গুল পর্যন্ত কেটেছে। ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদী শোষন, শাসন ও জুলুমের বিরুদ্ধে নিন্দাজ্ঞাপনের জন্য বেশী মানবতা লাগেনা। বিবেকের সে সামর্থ্য  বাংলার বহু সাধারণের ছিল। সে জুলুম, শোষণ ও অবিচারের বিরুদ্ধে বাংলার ফকিরগণ বিদ্রোহ করেছে। সাঁওতালরা বিদ্রোহ করেছে। সিপাহীরাও বিদ্রোহ করেছে। হাজার হাজার ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রাণ দিয়েছে। কিন্তু সে জুলুম ও শোষন রবীন্দ্রনাথের বিবেককে স্পর্ষ করেনি। সাম্রাজ্যবাদী জুলুমের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামা দূরে থাক একটি কবিতা, গান বা প্রবন্ধও লেখেননি। বরং ১৯১১ সালে যখন ব্রিটিশ সম্রাট পঞ্চম জর্জ দিল্লি আসেন তখন যে গানটি গেয়ে সে সাম্রাজ্যবাদী শাসককে অভিনন্দন জানানো হয়েছিল সে জ্ঞানটির লেখক ছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। এই হল রবীন্দ্রনাথের চেতনা ও বিবেকের মান।

শুধু তাই নয়। দেশে শিক্ষার বিস্তার কে না চায়? দেশের যে কোন প্রান্তে একটি স্কুল বা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা পেলে এমন কি পথের মানুষও আনন্দে আত্মহারা হয়। কিন্তু সে চেতনাটি কি রবীন্দ্রনাথের ছিল? ১৯১২ সালে পূর্ব বাংলার বিক্ষুব্ধ মুসলিমদের শান্ত করার জন্য ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ সে সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোলকাতার রাস্তায় নেমেছিলেন। এবং তারও একটি প্রেক্ষাপট আছে। ব্রিটিশ সরকার ১৯১১ সালে এসে ১৯০৫ সালে কৃত বঙ্গভঙ্গকে রদ করে দেয়। এতে বিক্ষুব্ধ হয় পূর্ব বাংলার মুসলিম। ১৯০৫ সালে বাংলা ভাগ হওয়াতে ঢাকা কেন্দ্রীক উন্নয়ন শুরু হয়েছিল। সেটি বহাল থাকলে বাংলার সম্পদ শুধু কোলকাতায় কেন্দ্রীভূত না হয়ে ঢাকায়ও কিছু জমা হত। এতে ১৯৪৭ সালে পূর্ব বাংলার মানুষ ঢাকা এবং সে সাথে পূর্ব বাংলাকে অনেকটা ভিন্ন ভাবে পেত। ঢাকায় এবং সে সাথে পূর্ব বাংলায় শিক্ষা, শিল্প, যোগাযোগ ও প্রশাসনিক অবকাঠামা গড়ে উঠত, যেমনটি যে কোন রাজধানীতে গড়ে উঠে। সাতচল্লিশের ঢাকা কোন রাজধানী নগরী ছিল না। ছিল একটি জেলা শহর মাত্র।কিন্তু ঢাকা ও পূর্ব বাংলার উন্নয়ন কোলকাতা কেন্দ্রীক হিন্দুদের পছন্দ হয়নি। পছন্দ হয়নি রবীন্দ্রনাথেরও। তাই রবীন্দ্রনাথও বঙ্গভঙ্গ রদের দাবীতে রাস্তায় নেমেছিলেন। এরপর যখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ওয়াদা দেয়া হয়, সেটির বিরোধীতাতে তিনি কোলকাতার রাজপথে মিছিল করেছেন। এসবই হল ইতিহাস। এবং এই হল রবীন্দ্র মানস ও রবীন্দ্র বিবেক। এ রবীন্দ্র মানস ও বিবেককে আলাদা করে কি তাঁর রচিত জাতীয় সঙ্গিত গাওয়া যায়? হিটলারের বক্তৃতা থেকে যেমন তার চরিত্র ও চেতনাকে আলাদা করা যায় না তেমনি পৃথক করা যায় না রবীন্দ্রনাথের রচিত গান থেকে তাঁর চরিত্র ও চেতনাকে।

আরো কথা হল,আজকের শতকরা ৯১ ভাগ মুসলমানের বাংলাদেশ রবীন্দ্রনাথের অবিভক্ত বাংলা যেমন নয়, তেমনি দেশটি ভারতও নয়। রবীন্দ্রনাথের অবিভক্ত বাংলায় মুসলিমদের সংখ্যা ৫৫% ভাগের বেশী ছিল না। সে বাংলা ঢাকাকেন্দ্রীকও ছিল না। এখন এটি এক ভিন্ন চরিত্রের বাংলাদেশ,-যে দেশে রবীন্দ্রনাথ একদিনের জন্যও বাস করেননি। কোনদিনও তিনি এদেশের নাগরিক ছিলেন না। এদেশের স্বাধীনতার কথা তিনি যেমন শোনেননি,তেমনি এ দেশের ৯১% ভাগ মুসলিমদের নিয়ে তিনি কোন স্বপ্নও দেখেননি। ফলে তাঁর পক্ষে বাংলাদেশের মানুষের চাওয়া-পাওয়া, স্বাধীনতা, আকাঙ্খা বা স্বপ্নের প্রতিনিধিত্ব করা কি সম্ভব? তাছাড়া এ সঙ্গিতটি সে উদ্দেশ্যে লেখাও হয়নি। জাতীয় সঙ্গিত নির্বাচনের বিষয়টি দোকান থেকে ‘রেডিমেড’ সার্ট কেনার ন্যায় নয়। এটিকে বরং বিশেষ রুচী, বিশেষ আকাঙ্খা,বিশেষ প্রয়োজন মেটাতে অতি বিশেষ গুণের ‘tailor made’ হতে হয়। প্রতিটি দেশেরই একটি রাজনৈতিক,সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিচয় থাকে। বিশেষ কিছু স্বপ্নও থাকে। সে বিচারে প্রতিটি দেশই অনন্য। সে অনন্য বৈশিষ্ঠের কারণেই পশ্চিম বাংলার ন্যায় বাংলাদেশে ভারতের অংশ নয়। জাতীয় সঙ্গিত রচিত হয় সে বিশিষ্ঠ পরিচয় ও স্বপ্নগুলো তুলে ধরতে। এমন সঙ্গিতের প্রতিটি শব্দ ও প্রতিটি উচ্চারণ থেকে প্রতিটি নাগরিক পায় নতুন প্রত্যয়, পায় নতুন প্রেরণা। কিন্তু বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিতের যে সুর,যে দর্শন,যে বর্ণনা এবং যে আকুতি সেটি নিতান্তই একজন পৌত্তলিক হিন্দুর,কোন মুসলমানের নয়। দেশের ভূমি,নদ-নদী,আলো-বাতাস,জলবায়ু –সব কিছুই মহান স্রষ্টার একক সৃষ্টি।এসব একমাত্র তাঁরই নেয়ামত। সর্বশ্রেষ্ঠ সে মহান স্রষ্টার সুপরিচিত নামও রয়েছে। সে নামটি ‘আল্লাহ’। মুসলিম তাঁর প্রতিকর্মে সে আল্লাহকেই স্মরণ করে এবং তাঁরই ইবাদত করে। সকল নেয়ামতের জন্য তারই শুকরিয়া আদায় করে। এবং সে স্মরণ এবং সে শুকরিয়া নিজ দেশের যে কোন কল্যাণ কর্মেও। এটিই ইসলামের সংস্কৃতি। সে সংস্কৃতিরই প্রকাশ ঘটে মুসলিম দেশের জাতীয় সঙ্গিতে। অথচ সে মহান আল্লাহ একজন হিন্দুর কাছে অপরিচিত। এবং অপরিচিত হল তাঁর স্মরণ ও তাঁর প্রতি শুকরিয়া জানানোর পদ্ধতিও। এ রবীন্দ্রগানটিতে বরং পুঁজনীয় হয়ে উঠেছে মহান আল্লাহর সৃষ্ট প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক নৈসগ্য। আরধ্য হয়ে উঠেছে ভূমি,ফুল ও ফল,আলো-বাতাস এবং নদ-নদী। এখানেই হিন্দু রবীন্দ্রনাথের সাথে একজন মুসলিম বাংলাদেশীর পার্থক্য। এমন প্রকৃতি পুঁজা ইসলামে হারাম। অথচ রবীন্দ্রনাথের কাছে শুধু দেশ ও দেশের মাটির নয়, শাপ-শকুন-গরুও দেবতাতূল্য। বাংলাদেশের শিশু-সন্তান ও নাগরিকের বিরুদ্ধে বড় জুলুমটি হল, একজন পৌত্তলিকের রচিত জাতীয় সঙ্গিতটি তাদেরকে দিনের পর দিন গাইতে হচেছ,এবং তারা ব্যর্থ হচ্ছে সে স্মরণীয় মুহুর্তে মহান আল্লাহকে স্মরণ করতে। অথচ মানব জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মহান আল্লাহর স্মরণ তথা যিকর। নামায, রোযা, হজ্ব, যাকাতসহ সকল ইবাদতের মূলটি লক্ষ্য হলো সে যিকরকে লাগাতর করা ও তীব্রতর করা। যিকর হলো পবিত্র কোর’আন পাঠ। যিকরের অর্থ ভাবনা শূণ্য মন নিয়ে স্রেফ মহান আল্লাহতায়ালার নাম জপা নয়। বরং সেটি হলো তাঁর পক্ষ থেকে অর্পিত দায়বদ্ধতা নিয়ে বাঁচার ধ্যানমগ্নতা। অথচ বাংলাদেশের সাহিত্য-সঙ্গিত, শিক্ষা-সংস্কৃতির কাজ হয়েছে সে যিকর বা ধ্যানমগ্নতা বিলুপ্ত করা। এমন কি বিলুপ্তির সে কাজটি হয় এক পৌত্তলিক কবির রচিত জাতীয় সঙ্গিত গাওয়ার নামেও। দেশের জাতীয় সঙ্গিতে দেশের মাটি, গাছ-পালা, ফলমূল ও আলো-বাতাসের বন্দনা থাকলেও যিকর নাই সেই মহান করুণাময় স্রষ্টার যিনি সেগুলি সৃষ্টি করেছেন। এভাবেই মহান আল্লাহতায়ালার যিকর ও ইসলামের মূল আক্বিদা থেকে ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক-সেনা এবং সাধারণ মানুষকে দূরে হটানো হচ্ছে। সে সাথে জন্ম দেয়া হচ্ছে শিরক তথা পৌত্তলিকতার। অথচ তা নিয়ে মোল্লা-মৌলভী, আলেম,পীর, মসজিদের ইমাম, মাদ্রাসার ছাত্র, ইসলামী দলগুলির নেতা-কর্মী এবং সাধারণ মুসল্লীদের মাঝে সামান্যতম প্রতিবাদ নাই। রাজনীতি ও অর্থনীতিতেই শুধু নয়, সাধারণ মানুষের চেতনার মানচিত্রও হিন্দু আগ্রাসীদের হাতে কতটা অধিকৃত এ হল তার নমুনা। সাহিত্য পরিনত হয়েছে এখানে ঈমান ধ্বংসের নীরব হাতিয়ারে। বাঙালী মুসলমানের সাহিত্য সংকট এভাবেই এক ভয়ংকর জাতীয়-সংকট সৃষ্টি করছে। ১৯/০২/১১; দ্বিতীয় সংস্করণ ৪/৮/২০১৯

 




সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিং ও সাংস্কৃতিক কনভার্শন

সভ্যতার সংঘাত ও সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিং

ইঞ্জিনিয়ারিং শব্দটি এতকাল ব্যবহৃত হয়েছে প্রকৌশল বিজ্ঞান বুঝাতে।গৃহউন্নয়ন,কলকারখানা¸রাস্তাঘাট,ব্রিজ,অস্ত্র,যন্ত্র,যানবাহন,কম্পিউটার,স্পেসসায়েন্স ইত্যাদীর উন্নয়নের ইঞ্জিনিয়ারিং বিদ্যার অবদান অপরিসীম। যান্ত্রিক সভ্যতার বিস্ময়কর উন্নয়নের মূলে বস্তুত এই ইঞ্জিনিয়ারিং। এক্ষেত্রে অগ্রগতির ফলে বিগত একশত বছরে বিজ্ঞান যতটা সামনে এগিয়েছে তা মানব ইতিহাসের বিগত বহু হাজার বছরেও এগুয়নি। সবচেয়ে দ্রুত এগিয়েছে বিগত ৫০ বছরে। বলা যায়,পৃথিবীতে যত বিজ্ঞানী আজ  জীবিত আছে,ইতিহাসের সমগ্র বাঁকি সময়ে হয়তো তার সিকি ভাগও জন্ম নেয়নি। তবে যান্ত্রিক উন্নয়ন বিস্ময়কর গতিতে ঘটলেও চেতনা,মূল্যবোধ, সংস্কৃতি ও বাঁচবার রুচিবোধে মানুষ সামান্যই সামনে এগিয়েছে। অর্থাৎ মানবিক ও সামাজিক উন্নয়ন সে হারে হয়নি। বরং শঠতা,শোষণ,উলঙ্গতা,অশ্লিলতা,সন্ত্রাস,আগ্রাসন,জাতিভেদ ও বর্ণভেদের ন্যায় বহু অসভ্যতা বেঁচে আছে তার আদিম কদর্যতা নিয়ে।

জ্ঞান-বিজ্ঞানের সীমা-সরহাদ নেই। আলোবাতাসের ন্যায় এটিও উদার। ফলে যে দেশে ও যে নগরে বিজ্ঞানের আগমন ঘটে সেখানে একই রূপ সুফল বয়ে আনে।পৃথিবী জুড়ে যান্ত্রিক উন্নয়নে এভাবেই মিল সৃষ্টি হয়। ফলে সব দেশের মটরগাড়ি,রেলগাড়ি,উড়ো জাহাজ ও ডুবো জাহাজ একই ভাবে নির্মিত হয় এবং চিকিৎসা পদ্ধতি,গৃহনির্মান ও সড়ক নির্মাণ পদ্ধতিও একই ধারায় চলে। কিন্তু সে মিলটি মানুষের ধর্ম,চিন্তা-চেতনা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে হয়নি। বরং চিন্তা-চেতনা, ধর্ম ও সংস্কৃতির মানচিত্রটি নানা জনে ও নানা জনপদে ভিন্ন ভিন্ন। পাশ্চাত্যের একজন বিজ্ঞানী যেরূপ মদ্যশালায় গিয়ে মদ পান করে বা হিন্দু বিজ্ঞানী যেরূপ শাপশকুন ও মুর্তিকে পুজা দেয়,কোন মুসলিম বিজ্ঞানী সেটি করেনা। ধর্ম, রুচিবোধ ও সংস্কৃতি নিয়ে তাদের ধারণাগুলিও ভিন্ন। আর সে ভিন্নতা থেকেই জন্ম নেয় পরস্পরে ঘৃনা এবং ঘৃনা থেকে শুরু হয় সংঘাত। সে ঘৃনা থেকেই মসজিদ, মসজিদের আযান বা মুসলিম রমনীর হিজাবের ন্যায় মুসলিম সংস্কৃতির বহু কিছুই পাশ্চাত্যের বহু দেশে অসহনীয় হয়ে পড়েছে। সে অসহনীয় চেতনার কারণেই পাশ্চাত্যের দেশগুলিতে মসজিদের আযান মসজিদের বাইরে আসতে দেয়া হয়না এবং দণ্ডনীয় অপরাধ রূপে ঘোষিত হয় মুসলিম মহিলার হিজাব। ফ্রান্সের ন্যায় পাশ্চাত্য সভ্যতার কেন্দ্রভূমিতে তো সেটিই হয়েছে। একটি দেশের জনগণ কি ধরণের আইন-আদালতকে গ্রহন করবে সেটি তাদের নিজস্ব ব্যাপার। এখানেই দেশটির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব। নামায-রোযা,হজ-যাকাতের ন্যায় শরিয়ত প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে প্রতিটি মুসলিম দায়বদ্ধ মহান আল্লাহর কাছে। এখানে কোন বিদ্রোহ বা অবাধ্যতা চলে না। অথচ সে অধিকার মুসলিম নাগরিকদের দেয়া হচ্ছে না। শরিয়তের প্রতিষ্ঠা রুখতে আফগানিস্তানের ন্যায় মুসলিম দেশ অধিকৃত হচ্ছে, মুসলিম ভূমিতে লাগাতর ড্রোন হামলাও হচ্ছে। হামলাটি কোন একটি দেশে সীমিত নয়, বরং হামলা হচ্ছে বহু দেশের বহু জনপদে। বলা যায় তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছে নতুন কৌশল নিয়ে। প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ৫ বছরের বেশী স্থায়ী হয়নি। কিন্তু মুসলমানদের বিরুদ্ধে শুরু করা যুদ্ধটির বয়স দশ বছরের বেশী হলেও শেষ হওয়ার নাম নিচ্ছে না। মার্কিন প্রফেসর হান্টিংটন এটিকে বলেছেন “ক্লাশ অব সিভিলাইজেশন” তথা সভ্যতার লড়াই। তবে সে সংঘাতে প্রফেসর হান্টিংটন দুটি প্রধান প্রতিদ্বন্দি পক্ষকে সনাক্ত করেছেন,একটি পাশ্চাত্য সভ্যতা এবং অপরটি ইসলাম।পাশ্চাত্য চায়,এ সংঘাতে তাদের নিজেদের বিজয়। সভ্যতার সে লড়াইটি যে শুধু সামরিক তা নয়,বরং লাগাতর লড়াইটি হচ্ছে সাংস্কৃতিক ময়দানে। মুসলিম উম্মাহর ঈমান ও কোমর ভাঙ্গার এ যুদ্ধটি চলছে কোনরূপ গোলাবারুদের শব্দ ছাড়াই। এ যুদ্ধের হাতিয়ার হলো সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিং,এবং লক্ষ্য কালচারাল কনভার্শন।

প্রত্যেকেই কোন না কোন ভাবে বেঁচে থাকে ও জীবন কাটায়;বেঁচে থাকার সে প্রক্রিয়াটি হলো তার সংস্কৃতি। সবাই একই ভাবে বাঁচে না,জীবনও কাটায় না। ফলে সবার সংস্কৃতিও এক নয়। সমাজ পাল্টাতে হলে সে সংস্কৃতিও পাল্টাতে হয়। এখানে পরিবর্তনটি শুরু হয় চেতনা থেকে।  ধর্ম,দর্শন ও নীতিবাক্য এখানে ইঞ্জিনের কাজ করে। সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ক্ষেত্রে দর্শন ও ধর্মের ভূমিকা তাই চুড়ান্ত। প্রাচীন প্রস্তর যুগের মানুষ যেরূপ জীবজন্তুর সাথে উলঙ্গ ভাবে বনে বাসে করে তার কারণ সেখানে কোন ধর্ম বা দর্শন কাজ করেনি। তাই ধর্ম ও দর্শন বই-পুস্তক,মসজিদ-মাদ্রাসা ও ক্লাসরুমে সীমিত থাকলে উচ্চতর সমাজ বা সভ্যতা নির্মিত হয় না। সেগুলির প্রকাশ ঘটাতে হয় মানুষের চেতনা-চরিত্র,মূল্যবোধ,পোষাক-পরিচ্ছদ,সামাজিকতা,রুচি,আচরণ ও কর্মের মধ্যে। তখন ঘটে সাংস্কৃতিক কনভার্শন এবং সেটিকে বেগমান করতেই প্রয়োজন পড়ে সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের তথা প্রকৌশলি পরিকল্পনার।

 

ইসলামি সভ্যতার নির্মান ও সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিং

ইসলাম মানবিক উন্নয়ন চায়,সে উন্নয়নের মধ্য দিয়ে বিশ্বজনীন সভ্যতার নির্মান চায়। এটিই ইসলামের ভিশন। ফলে নামায-রোযা,হজ-যাকাতের বাইরেও ইসলাম নিজ সংস্কৃতির প্রসার ও প্রতিষ্ঠা চায়। সংস্কৃতির দুটি ধারা,একটি আল্লাহর আনুগত্যের,অপরটি বিদ্রোহের। সন্ত্রাসী,মদ্যপায়ী ব্যাভিচারি ও পতিতার সংস্কৃতিতে যেটি প্রকাশ পায় সেটি আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের চেতনা। অথচ মুসলিম সংস্কৃতির মূলে কাজ করে ইবাদতের স্পিরিট। ইবাদতের বিধানটি কাজ করে আল্লাহর অনুগত সুশৃঙ্খল মানুষ গড়ার হাতিয়ার রূপে। ফলে এ সংস্কৃতি আসে পবিত্রতা। ইসলামের লক্ষ্য তাই শুধু ধর্মান্তর নয়,সাংস্কৃতিক কনভার্শনও। যে কোন সভ্যতার নির্মানে অপরিহার্য হলো এই সাংস্কৃতিক কনভার্শন। সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিষয়টি তাই শুধু পাশ্চাত্যে বিষয় নয়,ইসলামেরও। বরং পরিকল্পিত সমাজ বিপ্লবের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী প্রস্তুতি,ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো হলো ইসলামের। ইসলামের ইবাদত তাই শুধু ব্যক্তি-জীবনে সীমিত নয়,বরং ইবাদতকে সর্বব্যাপী করার লক্ষ্যে গড়ে তোলা হয়েছে সামাজিক,রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক অবকাঠামো। আল্লাহর খলিফা রূপে প্রতিটি মুসলমানের নিয়োগপ্রাপ্তি,মহল্লায় মহল্লায় মসজিদ নির্মান, ইসলামি রাষ্ট্র-নির্মান ও হজ-ওমরাহর বিধান তো সে অবকাঠামো। ব্রিজ, রাস্তাঘাট ও সামরিক স্থাপনার ন্যায় সাংস্কৃতিক অবকাঠামোও প্রতিরক্ষা চায়,সে সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই জিহাদ আল্লাহর নির্দেশিত পবিত্র ইন্সটিউশন।তাই যে সমাজে জিহাদ নেই সে সমাজে ইসলামি শরিয়ত যেমন বাঁচে না,তেমনি ইসলামি সংস্কৃতিও বাঁচে না।

সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কাজে নেতৃত্বের দায়িত্ব যেমন আল্লাহর ঘর মসজিদের,তেমনি ইসলামি রাষ্ট্রের। নামায সংঘটিত করাই মসজিদের মূল কাজ নয়,লক্ষ্য এখানে নামাযীদের সাস্কৃতিক কনভার্শনও। তেমনি রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলের কাজও শুধু রাস্তাঘাট গড়া বা অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়। বরং সেটি পরিপূর্ণ ইসলামি সভ্যতার নির্মান। আল্লাহর মিশন এখানে সরকারের মিশন হয়ে যায়। সে মিশনটি হলো কোরআনে বর্ণিত “লি ইউযহিরাহু আলা দ্বীনে কুল্লিহি” অর্থাৎ পৃথিবীর সকল ধর্ম ও মতাদর্শের উপর ইসলামের বিজয়ের। ইসলামে এজন্যই সার্বভৌম শাসকের কোন ধারণা নেই,বরং সে ধারণাটি খেলাফতের তথা মহান আল্লাহর প্রতিনিধিত্বের। ব্যক্তি,মসজিদ ও রাষ্ট্র সবই এখানে মহান আল্লাহর মিশন নিয়ে একাকার হয়ে কাজ করে। গ্রামের দরিদ্র ঈমানদার ব্যক্তিটির মিশন আর রাষ্ট্রের শক্তিধর শাসকের মিশনে কোন পার্থক্য নাই। সবাই এখানে একই রণাঙ্গনে এক ও অভিন্ন মিশন নিয়ে জিহাদ লড়ে। সে রণাঙ্গনে সমগ্র উম্মাহ নেমে আসে।

মুসলমান হওয়ার অর্থ হলো সভ্যতা নির্মাণের সে দায়ভার কাঁধে নেয়া। সে মিশনে জড়িত হওয়াটিই মু’মিনের সংস্কৃতি। এমন এক সর্বাত্মক অংশগ্রহণের কারণেই উচ্চতর সভ্যতার নির্মানে সমগ্র মানব ইতিহাসে সবচেয়ে বেশী সফলতা দেখিয়েছে ইসলাম। মানবতার কথা,নারীপুরুষের সমতার কথা,শোষনমুক্তির কথা,ইনসাফের কথা,দাসমূক্তির কথা এবং ধনীদরিদ্রের পার্থক্য দূরীকরণের কথা –এ সব বড় বড় কথা অতীতে বহু ব্যক্তি, বহু ধর্ম ও বহু মতবাদ নানা ভাবে বলেছে। কিন্তু একমাত্র ইসলামই সেগুলি বাস্তবে পরিণত করেছে। ইসলাম দাসমূক্তিকে শ্রেষ্ঠ ধর্মকর্মে পরিণত হয়েছে। সমতার বিধান? রাষ্ট্রের খলিফা আটার বস্তা নিজের কাঁধে তুলে অন্নহীনের ঘরে পৌছে দিয়েছেন এবং চাকরকে উঠের পিঠে চড়িয়ে নিজে উঠের রশি ধরে টেনেছেন। ইসলামের এ বিস্ময়কর সফলতার কারণ,ইসলাম শুধু ধর্মে পরিবর্তন আনে না, সাংস্কৃতিক কনভার্শনও আনে। আমূল বিপ্লব আনে বাঁচার সংস্কৃতিতে। ইসলামি রাষ্ট্র ও সভ্যতার মূল শক্তি তো এখানেই। কিন্তু বাংলাদেশের ন্যায় যেসব দেশে ইসলামি রাষ্ট্র ও সভ্যতা নির্মিত হয়নি সেখানে দোষটি ইসলামের নয়। বরং এখানে প্রচণ্ড অসম্পূর্ণতা রয়ে গেছে সাংস্কৃতিক কনভার্শনে। ইসলামকে মানুষ নিছক নামায-রোযা, হজ-যাকাতের বিধানকে কবুল করলেও তার সংস্কৃতিকে কবুল করেনি। বরং মানুষ বেড়ে উঠেছে জাহেলী যুগের দুর্বৃত্তি,সন্ত্রাস,ব্যভিচার ও মিথ্যাচার নিয়ে।দুর্বৃত্তিতে তার বিশ্বের দুই শতটির বেশী রাষ্ট্রকে ৫ বার হারিয়েও দিয়েছে। এটি কি কম বীভৎসতা! জাহিলী যুগের আরবগণ কি এর চেয়েও নীচে ছিল? বাংলাদেশের মুসলমানদের এখানেই বড় ব্যর্থতা। আর সে ব্যর্থতা থেকে আজ হাজারো ব্যর্থতা অসংখ্য ডালপালা নিয়ে গজিয়েছে।

ইসলাম-কবুলের অর্থ ব্যক্তির মনে কোরআনী সত্যের বীজ-রোপন। আর সংস্কৃতি হলো সে বীজ থেকে পত্র-পল্লব, ফুল ও ফলে সুশোভিত বিশাল বৃক্ষ। বিশাল বৃক্ষের বেড়ে উঠাকে নিশ্চিত করতে যেমন লাগাতর পরিচর্যা চাই, তেমনি সাংস্কৃতিক কনভার্শনের জন্যও চাই লাগাতর সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিং। মুসলিম রাষ্ট্র ও মসজিদ-মাদ্রাসার বড় দায়িত্ব হলো সে সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিংকে নিশ্চিত করা। পাশ্চাত্য দেশবাসী একটি নির্দিষ্ট মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি নিয়ে বাঁচে। সে মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি বাঁচিয়ে রাখতে বহু লক্ষ মদ্যশালা, নৃত্যশালা, ক্লাব,ক্যাসিনো, পতিতাপল্লি সেখানে বছরের প্রতিদিন কাজ করছে। সেগুলির পাশে কাজ হাজার হাজার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, অসংখ্য পত্র-পত্রিকা ও টিভি চ্যানেল। সে পাশ্চাত্য সংস্কৃতিকেই তারা বিশ্বময় করতে  চায়। কারণ তাদের বাঁচাটি এখন আর শুধু নিজ দেশে সীমিত নয়। তাদের অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমরনীতির কোন সীমান-সরহাদ নাই। সেটি বিশ্বব্যাপী। সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রয়োজনে অন্যদেশে তাদের বছরের পর বছর কাটাতে হয়। আফগানিস্তান ও ইরাকে লক্ষাধিক মার্কিনী ও ইউরোপীয়রা অবস্থান নিয়ে আছে দশ বছরেরও বেশী কাল ধরে। মাছ যেমন পানি ছাড়া বাঁচে না, মানুষ তো তেমন নিজ সংস্কৃতি ছাড়া বাঁচে না। তারা যেখানে যায় সেখানে শুধু পানাহার চায় না, মদ, জুয়া, ব্যাভিচার, সমকামিতার ন্যায় আরো বহু কিছু চায়। তাই মুসলিম দেশে তাদের বাঁচাটি দুরুহ হয়ে পড়েছে। ফলে নিজ সংস্কৃতির প্রসারে তারা সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিং নেমেছে। মুসলমানদের ধর্মান্তর না ঘটাতে পারলেও তারা চায় তাদের কালচারাল কনভার্শন। সে কাজে হাতিয়ার রূপে ব্যবহার করছে জাতিসংঘকে। জাতিসংঘ ব্যক্তি-স্বাধীনতা, নারী-স্বাধীনতা, পেশার স্বাধীনতার নামে একটি বিধিমালা তৈরী করেছে। সে বিধামালা অনুসারে সমকামিতার ন্যায় ভয়ানক পাপকর্ম যেমন অন্যায় ও অবৈধ নয়, তেমনি অবৈধ নয় ব্যভিচারও। পতিতাদেরকে বলছে সেক্স ওয়ার্কার। মদ্যপান, জুয়াও তাদের কাছে কোন অপরাধ-কর্ম নয়। মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির এই যে পাশ্চাত্যের সংজ্ঞা, সেটিকে তারা অন্যদেশের উপর চাপিয়ে দিতে চায়। না মানলে সে অবাধ্য রাষ্ট্রটির উপর অপরোধ আরোপ করছে, কোথাও কোথাও ড্রোন হামলাও হচ্ছে। সে সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অংশ রূপে বাংলাদেশের মহিলাদের যেমন রাস্তায় মাটি কাটা বা গাছ পাহারায় নিয়োজিত করছে,তেমনি আফগানিস্তানের পর্দানশিন মহিলাদের বেপর্দা করে তাদের নাচ-গান শেখাচ্ছে ও হাতে হারমনিয়াম তুলে দিচ্ছে।

বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশে ইসলামের অগ্রগতি শুধু ধর্মান্তরে সীমিত রয়ে গেছে। সাংস্কৃতিক কনভার্শনের কাজ সফল ভাবে হয়নি। ফলে ইসলামের সভ্যতার নির্মানে অংশ নেয়াটি জনগণের জীবন সংস্কৃতিতে পরিণত হয়নি। বরং অপরিচিত রয়ে গেছে নবীজী(সাঃ)র ইসলাম। নবীজী (সাঃ)র ইসলাম তাদের অনেকের কাছে জঙ্গি ইসলাম মনে হয়। ফলে আরব, ইরান, তুরস্ক ও আফগানিস্তানের জনগণের ইসলাম কবুলের সাথে সাথে সেসব দেশে ইসলাম যেভাবে বিশ্বশক্তি ও সভ্যতা রূপে আবির্ভুত হয়েছিল সেটি বাংলাদেশে হয়নি। এদেশে অন্যদের ইসলাম-কবুল যেমন থেমে গেছে, তেমনি থেমে গেছে ইসলামের সাংস্কৃতিক কনভার্শনও। বরং স্রোত উল্টো দিকে প্রবাহিত হতে শুরু করেছে। মুসলমান দীক্ষা নিচ্ছে অনৈসলামিক ধ্যান-ধারণা ও সংস্কৃতিতে। সোসাল ইঞ্জিনীয়ারীং হচ্ছে ইসলাম থেকে লোকদের দূরে সরানোর কাছে। মঙ্গলপ্রদীপ ও জীবযন্তুর মুর্তি নিয়ে মিছিল হচ্ছে, মুসলিম মহিলারা সিঁধুর লাগাচ্ছে এবং প্রবলতর হচ্ছে অশ্লিলতা। হিন্দু সংস্কৃতি থেকে মুসলমানদের যে ভিন্নতা ছিল সেটি দ্রুত বিলুপ্ত হচ্ছে।

 

নতুন স্ট্রাটেজী

মুসলমানদের খৃষ্টান,ইহুদী বা হিন্দু বানানো এখন আর শত্রু পক্ষের ইস্যু নয়,ইস্যু হলো সাংস্কৃতিক কনভার্শন। তারা এখন স্ট্রাটেজী নিয়েছে ইসলাম থেকে দূরে সরাতে।মুসলিম দেশগুলিতে আজকের প্রচারকগণ গীর্জার পাদ্রী নন,সবাই খৃষ্টানও নন। এসব প্রচারকদের অনেকে যেমন স্বদেশী,তেমনি মুসলমান-নামধারীও। ধর্মের প্রচারকও না হলেও তারা একটি মতের প্রচারক। সে মতবাদটি সেক্যুলারিজম। তারা আল্লাহ-রাসূল বা মুসলমানের ধর্মীয় বিশ্বাসে সরাসরি হামলা করে না। তাদের লড়াইটি সংস্কৃতির ময়দানে। সংস্কৃতি শুধু গান-বাজনা,পোষাক-পরিচ্ছদ বা সাহিত্য নয়,বরং মানুষ যে ভাবে বাঁচে এবং যে রুচি ও মূল্যবোধ নিয়ে বেড়ে উঠে সেটি। জীবন-ধারণের সে প্রক্রিয়ায় তথা সংস্কৃতিতে এতকাল যা প্রভাব রেখেছে তা হলো ধর্ম। তাই ধর্ম পাল্টে গেলে সংস্কৃতিও পাল্টে যায়। আরবের মানুষ যখন ইসলাম কবুল করে তখন তাদের গায়ের রং,দেহের গড়ন বা ভাষা পাল্টে যায়নি। পাল্টে যায় তাদের সংস্কৃতি। ইসলামের পূর্বে মদ্যপান, উলঙ্গ নাচগান ও ব্যাভিচার না হলে তাদের উৎসব হতো না। সে সংস্কৃতিতে পথিককে লুন্ঠন করা,কণ্যাসন্তানকে দাফন করা,মানুষকে ক্রীতদাস বানানো এবং পশুর ন্যায় মানুষকে হাটে তোলা গর্হিত কর্ম গণ্য হত না। বরং এসব ছিল আবহমান আরব সংস্কৃতি।

ঈমান ব্যক্তির অন্তরের বিষয়,সেটি চোখে দেখা যায় না। তবে ঈমান ধরা পড়ে তার বাইরের রূপে। ধরা পড়ে তার কর্ম ও সংস্কৃতিতে। জ্ঞানবান হওয়ার মধ্য দিয়ে যেমন সেটির শুরু,তেমনি লাগাতর ইবাদতের মধ্য দিয়ে সে সংস্কৃতির পরিশুদ্ধি। তাই যার জীবনে ঈমান ও ইবাদত নাই,তার জীবনে উচ্চতর সংস্কৃতিও নাই্।সমাজ ও সংস্কৃতিতে এভাবেই ইসলাম আনে পরিশুদ্ধি। ইসলামের এটাই হলো সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিং। পরিকল্পিত ইঞ্জিনিয়ারিং ছাড়া কোন সুন্দর গৃহ বা শহর গড়ে উঠে না। আধুনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বদৌলতেই দুর্গন্ধময় বস্তি থেকে সুশ্রী নগর নির্মিত হয়। তেমনি সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিং ছাড়া সুন্দর ও সভ্যতর সমাজ গড়ে উঠে না। ইসলামে কালচারাল কনভার্শন এজন্যই গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ধর্মান্তরের মধ্যে ইসলামের প্রচার সীমিত থাকলে তাতে ইসলামী সমাজ,রাষ্ট্র ও সভ্যতার নির্মাণ ঘটে না। ইসলামের প্রচার বহুদেশে হয়েছে, কোটি কোটি মানুষ ইসলাম কবুলও করেছে। কিন্তু সবদেশে সবার সাংস্কৃতিক কনভার্শনটি ঠিক মত হয়নি। ইসলাম কবুলের পরও যদি বেপর্দা ভাবে চলে,যদি মাথা নুইয়ে সালাম করে বা ইসলামে অঙ্গিকারশূণ্য ব্যক্তিকে ভোট দেয়,তবে বুঝতে হবে ইসলাম কবুল করলেও তার সাংস্কৃতিক কনভার্শনটি হয়নি। সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে সে ব্যক্তি হিন্দু বা অমুসলিমই রয়ে গেছে। বাংলাদেশসহ বহু মুসলিম দেশে সে সমস্যাটি প্রকট। বাংলাদেশে ইসলামের প্রচার হয়েছে প্রধানতঃ সুফিদের দ্বারা। নবীজী (সাঃ) এবং তাঁর সাহাবায়ে কেরাম যে ইসলাম পেশ করেছিলেন এসব সুফিগণ সে ইসলাম দেখেননি। সে ইসলামের জ্ঞানলাভ যেমন ঘটেনি, তেমনি সে ইসলামের পূর্ণ প্রকাশও তাদের জীবন ঘটেনি। তারা বেড়ে উঠেছেন পীরের খানকায়, কোন ইসলামি রাষ্ট্রে নয়। ফলে অপূর্ণাঙ্গতা রয়ে গেছে তাদের বেড়ে উঠায়। তাদের জীবনে ইসলামের জিহাদ এবং রাজনীতি যেমন ছিল না,তেমনি ইসলামের সংস্কৃতিও পুরাপুরি ছিল না। ফলে তাদের হাতে যেসব হিন্দু ইসলাম কবুল করেন তারা ইসলামের সংস্কৃতির পূর্ণ পরিচয় পায়নি।অথচ ইসলাম কবুলের অর্থ পুরোপুরি ইসলামে প্রবেশ। কোরআনে নির্দেশ এসেছে,“উদখুলু ফি সিলমে কা’ফ্ফা” অর্থঃ “তোমরা ইসলামে পুরিপুরি প্রবেশ করো”। অর্থাৎ ইবাদত-বন্দেগী,অর্থনীতি,সংস্কৃতি,রাজনীতির কোন অংশকেই ইসলামের বাইরে রাখা যাবে না।

 

পাশ্চাত্য বেঁচে আছে সেক্যুলার সংস্কৃতি নিয়ে

পাশ্চাত্য সভ্যতা আজ  খৃষ্টান ধর্ম বা অন্য কোন ধর্ম নিয়ে বেঁচে নাই,বেঁচে আছে একটি সংস্কৃতি নিয়ে। খৃষ্টান ধর্ম পাশ্চাত্য দেশগুলিতে প্রভাব হারিয়েছে অনেক আগেই। এখানে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে নানা উপাদান নিয়ে। তাতে যেমন প্রাগ-খৃষ্টান যুগের ইউরোপীয় প্যাগানিজম রয়েছে,তেমনি গ্রীক ও রোমান সভ্যতার সংস্কৃতি আছে,তেমনি খৃষ্টানধর্মের কিছু প্রভাবও আছে। তবে এখানে মূল সুরটি সেক্যুলারিজমের তথা ইহজাগতিক সুখসম্ভোগের। ইংরাজীতে যাকে বলা হয় হেডোনিজম। সে সুখ সম্ভোগের তাগিদে পাশ্চাত্য শুধু মদ্যপান,অশ্লিলতা ও উলঙ্গতাকে হালাল করে নেয়নি জায়েজ করে নিয়েছে সমকামিতার ন্যায় আদিম অসভ্যতাকেও। হিন্দু ধর্মের কোন শরিয়ত বা আইনী বিধান নেয়,ফলে এ ধর্মটিও বেঁচে আছে আবহমান এক সনাতন সংস্কৃতি নিয়ে। সাংস্কৃতিক সে আচার এবং ধর্মীয় আচার এখানে একাকার হয়ে গেছে,উভয়ে মিলে হিন্দু সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে। তেমনি খৃষ্টান ধর্মেও হালাল-হারামের কোন বিধান নেই। এটিও পরিনত হয়েছে এক সাংস্কৃতিক শক্তিতে। পাশ্চাত্য চায় সে সংস্কৃতির পৃথিবীব্যাপী প্রতিষ্ঠা। সে লক্ষ্যে তারা দেশে দেশে সাংস্কৃতিক কনভার্শনে মনযোগ দিয়েছে। এবং চালাচ্ছে সোসাল ইঞ্জিনীয়ারীং। পাশ্চাত্যের অর্থে প্রতিপালীত হাজার হাজার এনজিও কাজ করছে বস্তুত সে লক্ষ্যে।

শুরুতে মুসলিম দেশগুলিতে ঔপনিবেশিক খৃষ্টানদের লক্ষ্য শুধু লুণ্ঠন ছিল না। রাজনৈতিক প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠার সাথে খৃষ্টান ধর্মের প্রচারও ছিল। তখন হাজার হাজার খৃষ্টান-পাদ্রী ধর্মের প্রচার নিয়ে গ্রামে-গঞ্জে ঘুরেছে।তাদের সে প্রচেষ্ঠা ফিলিপাইন,পাপুয়া নিউগিনি,ফিজি,পূর্ব-তিমুর,নাগাল্যান্ড,মিজোরামের অমুসলিমদের মাঝে সফলতা মিললেও বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশে ১৯০ বছরের শাসনেও সে সফলতা মিলেনি।মুসলমানদের তারা ইসলাম থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় ধর্মচ্যুৎ করতে পারেনি।তাদের হাতে বহু মুসলিম দেশ অধিকৃত হয়েছে,অজ্ঞতা ও অশিক্ষাও বেড়েছে,কিন্তু তাদের অবস্থা এতটা পচেনি যে খৃষ্টান ধর্ম,বৌদ্ধ ধর্ম বা হিন্দু ধর্মের ন্যায় অন্য কোন ধর্ম তারা কবুল করবে। কয়লা থেকে স্বর্ণ, মলমুত্র থেকে মধুকে পৃথক করতে বিদ্যাবুদ্ধি লাগে না।অজ্ঞতা,ভ্রষ্টতা ও মিথ্যাচারপূর্ণ ধর্মগুলি থেকে ইসলামের শ্রেষ্ঠতা বুঝতেও বেশী বুদ্ধি লাগেনি। গ্রামের মুর্খ মুসলমানেরাও সেটি বুঝে। ফলে হিন্দু ধর্মের গরু-ছাগল,শাপ-শকুন,পাহাড়-পর্বত ও পুলিঙ্গ পুজনীয় হওয়ার ন্যায় প্রকাণ্ড মিথ্যাটি যেমন তাদের কাছে মিথ্যা রূপে ধরা পড়েছে তেমনি ধরা পড়েছে খৃষ্টান ধর্মের হযরত ঈসার ঈশ্বর হওয়া এবং সে ঈশ্বরের শুলে চড়ে মারা যাওয়ার মিথ্যাটিও। ধর্মের নামে এরূপ মিথ্যাচার তাই তারা মেনে নেয়নি।

 

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সমস্যা

বাংলাদেশের মূল সমস্যাটি নিছক অর্থনৈতিক নয়,বরং সেটি সাংস্কৃতিক। সে সাংস্কৃতিক সমস্যার কারণেই অসম্ভব হয়ে পড়েছে সুস্থ্য ও সভ্যমানুষ রূপে বেড়ে উঠায়। সে অসুস্থতা ধরা পড়ছে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও প্রশাসনিক দূর্নীতিতে। ধরা পড়ছে দ্রুত বর্ধিষ্ণু অশ্লিতা ও পাপাচারে। ইসলাম শুধু আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর বিশ্বাস বাড়ায়না। মানুষকে শুধু মসজিদমুখিই করেনা। বরং মানবতা,শ্লিলতা,পবিত্রতা যোগ করে তাদের বাঁচাতে। কিন্তু বাংলাদেশে সেটি ঘটেনি। এখানেই বাংলাদেশের বড় ব্যর্থতা।

সংস্কৃতির নির্মানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানটি হলো জ্ঞান। এই জ্ঞানের কারণেই মুর্খ বাউল,শ্মশানবাসী কাপালিক,জটাধর সাধু এবং জ্ঞানবান ঈমানদারের সংস্কৃতি এক হয় না। ইসলামে জ্ঞানার্জন এজন্যই ফরয। এবং অজ্ঞ থাকাই সবচেয়ে বড় পাপ। জ্ঞানার্জন ছাড়া ব্যক্তির জীবনে সত্যপথ প্রাপ্তি যেমন অসম্ভব,তেমনি সংস্কৃতির নির্মানও অসম্ভব। তবে সে জ্ঞানার্জনে বিশ্ববিদ্যালয় সহায়ক হলেও,ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে অধিক সংখ্যক বিজ্ঞ ব্যক্তি তৈরী হয়েছেন সে সময়ে যখন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ই ছিল না। অপরদিকে বাংলাদেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ইতিহাস গড়েছে বিভ্রান্ত,পথভ্রষ্ট ও দুর্বৃত্ত সৃষ্টিতে। বাংলাদেশকে যারা ৫ বার পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশে পরিণত করলো তারা গ্রামের মূর্খ রাখাল নয়,বরং কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারি ব্যক্তিবর্গ।তারা দেশের কদর্যতা বাড়িয়েছে দেশবাসীকে পথভ্রষ্ট করার মধ্য দিয়ে।

একমাত্র কোরআনী জ্ঞান থেকেই ব্যক্তি পায় পায় শ্লিল ও অশ্লিল,পবিত্রতা ও অপবিত্রতা চেনার সামর্থ। পায় সিরাতুল মোস্তাকীম। অন্যথায় জীবন মিথ্যাচারে পূর্ণ হয়ে উঠে। কোরআনকে এজন্যই মহান আল্লাহতায়ালা হুদা বা ফোরকান রূপে চিত্রিত করেছেন। হুদা’র অর্থ পথ প্রদর্শক আর ফোরকান হলো সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য সৃষ্টিকারি। মুসলমানের সংস্কৃতি এজন্যই খৃষ্টান, হিন্দু, শিখ বা প্রকৃতি পুজারির সংস্কৃতি থেকে ভিন্ন। তবে কতটা ভিন্ন তার উদাহরণ দেয়া যাক। ইসলামে পবিত্র-অপবিত্রতার যে সুস্পষ্ট বিধান তাতে মলমূত্রের ন্যায় গরুর গোবরও অপবিত্র। তাই কাপড়ে গোবর লাগলে তার পবিত্রতা থাকে না। কিন্তু হিন্দুধর্মে সেটি ভিন্ন। গোবর লাগানোটাই এ ধর্মে পবিত্রতা। অপবিত্র আসে বরং হিন্দুর ঘরে মুসলমান আসন নিলে। গোবর দিয়ে লেপে তখন তাতে পবিত্রতা আনা হয়। গান-বাজনা ও নৃত্য ছাড়া হিন্দুদের পুজা হয় না। অথচ ইসলামে সেটিও ভ্রষ্টতা। সিরাতুল মোস্তাকিমে চলায় গান-বাজনা ও নৃত্য যেমন অমনোযোগী করে,তেমনি ভ্রষ্টতাও বাড়ায়।

 

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অধিকৃতি

বাংলাদেশের ন্যায় অধিকাংশ মুসলিম দেশের আজকের বড় সমস্যা এ নয় যে,দেশগুলি শত্রুর হাতে সামরিক ভাবে অধিকৃত হয়েছে। বরং বড় সমস্যা এবং সে সাথে ভয়ানক বিপদের কারণ,দেশগুলির সাংস্কৃতিক সীমান্ত বিলুপ্ত হয়েছে এবং তা অধিকৃত হয়েছে ইসলামের শত্রুপক্ষের দ্বারা। দেশের রাজনৈতিক সীমান্ত বিলুপ্ত না হলেও মুসলিম দেশগুলির সংস্কৃতির মানচিত্র শত্রুপক্ষের দখলে গেছে। ফলে এদেশগুলিতেও সেগুলিই অহরহ হচ্ছে যা কাফের কবলিত একটি দেশে হয়ে থাকে। মুসলিম দেশের সংস্কৃতিও পরিনত হয়েছে মানুষকে আল্লাহর অবাধ্য রূপে গড়া তোলার ইন্সটিটিউশনে। পতিতাপল্লি, নাচের আসর, সিনেমা হল,মদ্যশালাই তাদের একমাত্র প্রতিষ্ঠান নয়,বরং গড়া হচ্ছে এবং নতুন ভাবে আবিস্কার করা হচ্ছে আরো বহু সাংস্কৃতিক আচারকে। মুর্তিপুজাকে বাঁচিয়ে রাখতে যেমন হাজারো মন্দির,তেমনি পাচাচার ও ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বাঁচিয়ে রাখতেও গড়া হয়েছে নানা আচার। এসব হলো শয়তানের সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিং। লক্ষ্য, শয়তানের আচারে কালচারাল কনভার্শন। এলক্ষ্যেই পহেলা বৈশাখ,ভালবাসা দিবস, থার্টি ফাষ্ট নাইট ইত্যাদি নানা দিবসকে বাঙালীর মুসলমানের জীবনে জুড়ে দেয়া হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের হাজার হাজার মুসলিম সন্তান মসজিদে না গিয়ে হিন্দুদের ন্যায় গেরুয়া পোষাক পড়ছে,মঙ্গলপ্রদীপ হাতে নিয়ে শোভাযাত্রা করছে, কপালে তীলক পড়ছে,অশ্লিল নাচগানও করছে। এসব হলো মানুষকে পথভ্রষ্ট ও পাপাচারি বানানোর কৌশল। এরাই বাংলাদেশের ন্যায় প্রতি দেশে শয়তানের পক্ষে লড়াকু সৈনিক,এবং তাদের  যুদ্ধাংদেহী রূপ শরিয়তের প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে।

অনৈসলামিক দেশে বসবাসের বড় বিপদটি খাদ্যাভাব নয়,রোগভোগ বা স্বাস্থ্যহানীও নয়। বরং সেটি সিরাতুল মোস্তাকিম সহজে খুঁজে না পাওয়ার। কারণ রাষ্ট্র,সমাজ ও পরিবার জুড়ে তখন যা প্রবলতর হয় তা সত্যচ্যুতির তথা পথভ্রষ্টতার। ইসলামী রাষ্ট্রের মূল দায়িত্বটি আল্লাহর রাস্তায় চলার সিরাতুল মোস্তাকীমটি জনসম্মুখে তুলে ধরা। কাফের রাষ্টনায়কগণ করে তার উল্টোটি। জনগণের দৃষ্টি থেকে তারা সমাজে সিরাতুল মুস্তাকীমকে লুকায়।কুফর শব্দের আভিধানিক অর্থও লুকানো। তারা বরং পথভ্রষ্টতার পথ গড়ে, এবং সে পথগুলি জাহান্নামের দিকে টানে।বিভ্রান্তির সে ভিড়ে হারিয়ে যায় সিরাতুল মোস্তাকীম। সে সমাজে দর্শন,বিজ্ঞান,ধর্ম,সাহিত্য ও সংস্কৃতির নামে জাহান্নামের ব্যবসায়ীগণ মোড়ে মোড়ে দোকান সাজিয়ে বসে,এবং অন্যদেরও সে পথে ডাকে। বাংলাদেশে শত শত পতিতাপল্লি,শত শত সূদিব্যাংক, হাজার হাজার এনজিও,বহু হাজার সাংস্কৃতিক সংস্থা,হাজার হাজার সিনেমা হল,মদের দোকান তো সে কাজটাই করছে। এমন একটি সমাজে প্রতি পদে পা ফেলতে হয় অতি সতর্কতার সাথে। নইলে পা জাহান্নামের গর্তে গিয়ে পড়ে।

মদ-জুয়া,নাচের আসর,পতিতাপল্লি,সূদীব্যাংক,সেক্যুলার শিক্ষা ও রাষ্ট্র ছাড়া যেমন প্রাশ্চাত্য সংস্কৃতি বাঁচে না,তেমনি নবীজী(সাঃ)র শিক্ষা অনুযায়ী রাষ্ট্র,সমাজ,মসজিদ-মাদ্রাসা ও আইন-আদালত কাজ না করলে ইসলামি সংস্কৃতিও বাঁচেনা। অথচ বাংলাদেশে এ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলি অধিকৃত হয়েছে ইসলামের বিপক্ষ শক্তির হাতে। যারা এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা তারা নামে মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও ইসলামের বিজয় নিয়ে তাদের কোন অঙ্গিকার নাই। ভাবনাও নাই। বরং তেমন একটি আগ্রহ থাকাটাই তাদের কাছে ফৌজদারি অপরাধ। এমন আগ্রহী ব্যক্তিকে তারা চিহ্নিত করে মৌলবাদী সন্ত্রাসী রূপে। তাদের নির্মূলে বরং তারা চিহ্নিত কাফেরদের সাথে কোয়ালিশন গড়ে।

 

অনৈসলামিক রাষ্ট্রের বিপদ ও ঈমানী দায়ভার

ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে বড় নেয়ামতটি হলো,সেখানে স্পষ্টতর হয় সিরাতুল মোস্তাকীম। এবং বন্ধ করা হয় জাহান্নামের পথ। এমন রাষ্ট্রের বরকতে কোটি কোটি মানুষ বাঁচে জাহান্নামের আগুণ থেকে। ইসলামী রাষ্ট্র নির্মান এজন্যই মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নেককর্ম। একাজে সামান্য সময় ব্যয়ও সারারাত তাহাজ্জুদ নামায পড়ার চেয়েও শ্রেষ্ঠ। -(হাদীস)। মহান আল্লাহর কাছে তার মর্যাদা “আনসারুল্লাহ”র তথা আল্লাহর সাহায্যকারির। একাজে তার শত্রুর হাতে তার মৃত্যু হলে সে পাবে শহীদের মর্যাদা। পাবে বিনা বিচারে জান্নাত। মু’মিনের এ মেহনত ও কোরবানীর বরকতেই বিজয়ী হয় আল্লাহর দ্বীন এবং গড়ে উঠে শ্রেষ্ঠতর সভ্যতা। একারণেই শয়তানী শক্তির সবচেয়ে বড় প্রজেক্ট হলো রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকে অসম্ভব করা। সে শয়তানী প্রজেক্ট নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেমেছে বহু রাজনৈতিক দল,বিদেশীদের অর্থে কাজ করছে বহু হাজার এনজিও। দেশটির জন্মকালে ইসলামের প্রতিষ্ঠা যেমন লক্ষ্য ছিল না। তেমনি আজও  নয়। ইসলামের প্রতি অঙ্গিকারকে রাষ্ট্রীয় ভাবে নিন্দিত হচ্ছে সাম্প্রদায়িকতা রূপে। সাংস্কৃতিক কনভার্শনের কাজে বিনিয়োগ হয়েছে ভারতসহ বহু কাফের দেশের শত শত কোটি টাকা। সে বিনিয়োগ ফলও দিয়েছে। সে বিনিয়োগের কারণে,পাকিস্তানের ২৩ বছরে যত দুর্বৃত্ত এবং ইসলামের যত শত্রু তৈরী হয়েছিল বাংলাদেশে গত ৪০ বছরে হয়েছে তার চেয়ে শতগুণ বেশী। ফলে কঠিন হয়ে পড়েছে আল্লাহর শরিয়তি বিধান প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া। দেশ দুর্বৃত্তিতে বিশ্বে পর পর ৫বার প্রথম হওয়ার মূল কারণ তো শয়তানী শক্তির এ বিশাল বিনিয়োগ। শয়তানী শক্তির সে বিনিয়োগ আজ যে শুধু অব্যাহত রয়েছে তা নয়,বরং বহুগুণ বৃদ্ধিও পেয়েছে। বাংলাদেশের মুসলমানদের ভয়ানক বিপদ বস্তুত এখানেই।

ইসলামি চরিত্রের নির্মান যেমন জঙ্গলে সম্ভব নয়, তেমনি পীরের খানকায়, মসজিদে বা নিজগৃহে নিছক কোরআন-হাদীস পাঠের মধ্য দিয়েও সম্ভব নয়। মুসলমানের ঈমান-আক্বীদা কখনই অনৈসলামিক সাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে উঠে না। সে জন্য ইসলামি রাষ্ট্র ও জিহাদী সংস্কৃতি চাই। সাহাবায়ে কেরাম,তাবে ও তাবে-তাবেয়ীগণ মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মানুষ রূপে গড়ে উঠেছিলেন তো ইসলামি রাষ্ট্র এবং সে রাষ্ট্রে জিহাদী সংস্কৃতির কারণেই। মুসলমানদের অর্থ,রক্ত,সময় ও সামর্থের সবচেয়ে বেশী ভাগ ব্যয় হয়েছে তো ইসলামি রাষ্ট্র ও ইসলামি শিক্ষা-সংস্কৃতির নির্মানে। নামায রোযার পালন তো কাফের দেশেও সম্ভব। কিন্তু ইসলামী শরিয়ত ও ইসলামী সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠা ও পরিচর্যাও কি অমুসলিম দেশে সম্ভব? সম্ভব নয় বলেই মুসলমানদের জীবনে হিযরত আসে। সে সাথে জিহাদও আসে। অতীতের ন্যায় আজকের মুসলমানদের উপরও একই দায়ভার। মহান আল্লাহর খলিফা রূপে এটাই একজন ঈমানদারের উপর সবচেয়ে বড় দায়ভার। এ লড়ায়ে সবাইকে ময়দানে নেমে আসতে হয়। এবং লড়াইয়ের শুরুটি কোরআনী জ্ঞানের তরবারী দিয়ে। জ্ঞানার্জনকে এজন্যই নামায-রোযার আগে ফরয করা হয়েছে।

কিন্তু বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশে সে ফরয পালনের আয়োজন কোথায়? অনেকেই জ্ঞানার্জন করছে নিছক রুটিরুজির তালাশে, ফরয আদায় এখানে লক্ষ্য নয়। প্রচন্ড বিচ্যুতি এখানে জ্ঞানার্জনের নিয়তে। ফলে লোভি,শঠ,ধুর্ত ও মিথ্যাচারি ব্যক্তি এ শিক্ষার বদলে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ঘুষখোর,ডাকাত বা সন্ত্রাসীতে পরিনত হচ্ছে। এমন জ্ঞানচর্চায় রুটি-রুজী জুটছে ঠিকই,কিন্তু জ্ঞানার্জনের ফরয আদায় হচ্ছে না। ফলে দেশে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বাড়লেও জিহাদের ময়দানে লোকবল বাড়ছে না। ফলে বিপ্লব আসছে না সমাজ ও রাষ্ট্রে। বাংলাদেশের মুসলমানদের জন্য এটি এক বিপদজনক দিক। আগ্রাসী শত্রুর হামলার মুখে অরক্ষিত শুধু দেশটির রাজনৈতিক সীমান্তুই নয়,বরং প্রচন্ড ভাবে অরক্ষিত দেশের সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক সীমান্তও। ফলে ইসলামের মুল শিক্ষা ও সংস্কৃতিই দেশবাসীর কাছে সবচেয়ে অপরিচিত থেকে যাচ্ছে। অজ্ঞতার বসে শত্রুর সংস্কৃতিকেই শুধু আপন করে নিচ্ছে না,আপন করে নিচ্ছে তাদের ইসলামবিনাশী রাজনৈতিক এজেণ্ডাও।এবং মুসলিম হত্যায় হাতে তুলে নিচ্ছে শত্রুর হাতিয়ার। দেশ তাই দ্রুত অধিকৃত হচ্ছে শত্রুদের হাতে। সেটি যেমন সামরিক,অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভাবে,তেমনি সাংস্কৃতিক ভাবেও। শত্রুর সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিং ও সাংস্কৃতিক কনভার্শন এভাবেই বাংলাদেশের ন্যায় একটি মুসলিম দেশে তাদের বিজয়কে সহজসাধ্য ও কম ব্যয়বহুল করে তুলেছে। সে সাথে ভয়ানক ভাবে বাড়িয়ে তুলেছে দেশবাসীর আখেরাতের বিপদও। তাই আজকের লড়াইটি নিছক রাজনৈতিক নয়।স্রেফ অর্থনৈতিকও নয়।সেটি যেমন শত্রুর হাত থেকে দখলদারি মুক্তির,তেমনি ইসলামি রাষ্ট্র ও সংস্কৃতি নির্মানের। ২৮/০৪/১২

 




বাংলাদেশে হিন্দু সংস্কৃতির জোয়ারঃ বাঙালী মুসলিম কি ভেসেই যাবে?

বর্ষবরণের নামে পূজা

পূজা মন্ডপ এখন আর মন্দিরে নয়, ঢাকার রাজপথে নেমে এসেছে। নানা রংয়ের নানা জীব-জন্তুর মুর্তি মাথায় নিয়ে যারা মিছিলে নেমেছে তারাও কোন মন্দিরের হিন্দু পুরোহিত  বা হিন্দু পূজারি নয়। তারা নিজেদের পরিচয় দেয় মুসলিম রূপে। এ চিত্রটি এখন আর শুধু ঢাকা শহরের নয়, সরকারি খরচে সেটিই সারা বাংলাদেশ জুড়ে হচ্ছে। কথা হলো, এতে কি কোন মুসলিম খুশি হতে পারে? যার মনে সামান্যতম ঈমান অবশিষ্ঠ আছে তার অন্তরে তো এ নিয়ে বেদনাসিক্ত ক্রন্দন উঠতে বাধ্য। কারণ, এ তো কোন সুস্থ্য সংস্কৃতি নয়। নির্দোষ কোন উৎসবও নয়। এটি তো মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের উৎসব। এটি তো সিরাতুল মুস্তাকীম ছেড়ে জাহান্নামের পথে চলা অসংখ্য মানুষের ঢল। এটি তো পৌত্তলিকদের পূজা মন্ডপ রাজপথে নামানোর মহা-উৎসব। এ উৎসব তো শয়তানের বিজয়ের। এবং সেটি মুসলিমদের রাজস্বের অর্থে। আরো পরিতাপের বিষয়, ইসলামের সংস্কৃতি ও অনুশাসনের বিরুদ্বে এ উদ্ধত শয়তানী বিদ্রোহের পাহারাদারে পরিণত হয়েছে দেশের পুলিশ ও প্রশাসন।

প্রশ্ন হলো, যে দেশের অধিকাংশ মানুষ মুসলিম সে দেশে কি কখনো এরূপ পূজামন্ডপ মাথায় নিয়ে মিছিল হয়? বিশ্বের কোন মুসলিম দেশে কি সেটি হয়?  এবং আয়োজিত হয় কি মুসলিমদের দ্বারা? এ কাজ তো মুরতাদদের। এতে আনন্দ বাড়ে একমাত্র পৌত্তলিক কাফেরদের। জাহান্নামের পথে ছুটে চলা এরূপ অসংখ্য মিছিলে লক্ষ লক্ষ সতীর্থ দেখে পৌত্তলিকদের মনে আনন্দের প্রচণ্ড হিল্লোল উঠবে -সেটিই তো স্বাভাবিক। সে আনন্দেরই প্রকাশ ঘটেছে ১৫ই এপ্রিল কলকাতার আনন্দ বাজার পত্রিকায়। এটি যে হিন্দুর পূজা মন্ডপ নিয়ে মিছিল -তা নিয়ে কোন পৌত্তলিকের সন্দেহ হওয়ার কথা নয়। সন্দেহ হয়নি আনন্দবাজার পত্রিকারও। তাই পত্রিকাটির রিপোর্টঃ “কার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে! কখনও মনে হচ্ছিল কলকাতার কলেজ স্কোয়ার বা একডালিয়ার পুজো মণ্ডপ। কখনও বা শান্তিনিকেতনের বসন্ত উৎসবের চেহারা। তা সে রমনার বটমূলের বৃন্দগানই হোক কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের রাজপথে মঙ্গল শোভাযাত্রা। পুজো, বসন্ত উৎসবের মিলমিশে একাকার ঢাকার নববর্ষের সকাল।”

আনন্দ বাজার পত্রিকা রাজপথের একজন অতি উৎসাহীর উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছে,‘‘এটাই এখন আমাদের জাতীয় উৎসব। যেখানেই থাকি ঠিক চলে আসি।’’ প্রশ্ন হলো, এমন পূজার মন্ডপ নিয়ে মিছিল বাঙালী মুসলিমের জাতীয় উৎসব হয় কি করে? কোনটি জাতীয় উৎসব এবং কোনটি নয় -সেটি কে নির্ধারণ করবে? সে ফয়সালা দিবে কি ইসলামবিরোধী এ বিদ্রোহীগণ?  এর পিছনে সরকারের বিনিয়োগ কতখানি সে বর্ণনাও দিয়েছে আনন্দবাজার পত্রিকা। লিখেছে, “হেলিকপ্টার থেকে ফুল ছড়িয়ে শুরু হয়ে গিয়েছে মঙ্গল শোভাযাত্রা। পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবকেরা দড়ির ব্যারিকেড দিয়েও উৎসাহী জনতাকে ঠেকাতে পারছেন না। অষ্টমীর রাতে কলকাতায় যেমন হয়। শোভাযাত্রায় মন্ত্রী-সান্ত্রি সবাই ছিলেন। শোভাযাত্রা ঘিরে থিকথিক করছিল পুলিশ। শুক্রবার রাতে দেখছিলাম রাস্তায় ছেলেমেয়েরা ভিড় করে আলপনা দিচ্ছেন। গাড়ি ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যেমনটা এখন পুজোর সময়ে কোনও কোনও রাস্তায় হয়।”

পুরা আয়োজন যে ছিল পূজার সেটি অনেক বাঙালী মুসলিমের নজরে না পড়লেও আনন্দবাজারের হিন্দু সাংবাদিকের নজরে ঠিকই ধরা পড়েছে। তাই তিনি লিখেছেন,“শুধু পুজো নয়, কলকাতার সরস্বতী পুজো, ভ্যালেন্টাইন্স ডে-র মেজাজও যেন ধরা পড়ল বাংলাদেশের এই নববর্ষে! জাতি-ধর্মের বেড়া ডিঙিয়ে এ যেন সর্বজনীন উৎসব।’’ প্রশ্ন হলো, হিন্দুর পূজা কি কখনো ধর্মের বেড়া ডিঙিয়ে ইসলামের চৌহদ্দিতে প্রবেশ করতে পারে? হিন্দুর পূজা কি মুসলিম সন্তানের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়? অথচ সে চেষ্টাই হচ্ছে জনগণের রাজস্বের অর্থে। সরকারের এজেন্ডা, হিন্দুর সে পূজাকেই বাংলাদেশে সার্বজনীন করা। বাংলাদেশের সরকার যে সে এজেন্ডা নিয়ে বহু কিছু করেছে এবং বহু দূর অগ্রসর হয়েছে, তাতেই আনন্দবাজারের মহা-আনন্দ। সে আনন্দটি মূলতঃ ভারত সরকারেরও। বাংলাদেশে তারা তো তেমন একটি সরকারকেই যুগ যুগ ক্ষমতায় রাখতে চায়।

 

স্ট্রাটেজী: ইসলাম প্রতিরোধের

আনন্দবাজার একই দিনে আরেকটি রিপোর্টে ছেপেছে, সেটি “মৌলবাদকে পথে নেমে মোকাবিলা বাংলাদেশে” শিরোনামে। তাতে শেখ হাসিনার প্রশংসায় পত্রিকাটি অতি গদগদ। মৌলবাদ চিত্রিত হয়েছে ইসলাম নিয়ে বাঁচার সংস্কৃতি ও তা নিয়ে রাজনীতি। যারা ইসলামের প্রতি সে অঙ্গিকার নিয়ে বাঁচতে চায় তারা চিত্রিত হচ্ছে “অন্ধকার অপশক্তি” রূপে।  তাই তাদের কাছে প্রতিটি ইসলামি দলই হলো অপশক্তি –সেটি যেমন জামায়াতে ইসলামী, তেমনি হেফাজতে ইসলাম। এমন কি বিএনপি’ও। ইসলামি শক্তির মোকাবেলায় নববর্ষের মতো একটি অনুষ্ঠানকেই হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেয়ায় পত্রিকাটি প্রচণ্ড খুশি। লক্ষ্য এখানে বাঙালী মুসলিমদের হিন্দু বানানো নয়, বরং তাদেরকে ইসলাম থেকে দূরে সরানো। তাই নেমেছে সাংস্কৃতিক প্রোগ্রামের ব্যানারে। ইসলামের বিশ্বব্যাপী জাগরণের প্রতিরোধে এটি মূলতঃ আন্তর্জাতিক সোসাল ইঞ্জিনীয়ারিংয়ের অংশ। ইসলাম বিরোধী এ আন্তর্জাতীক কোয়ালিশন শুধু যে স্ট্রাটেজীক পরিকল্পনা দিচ্ছে তা নয়, সে স্ট্রাটেজীর বাস্তবায়নে বিশ্বের তাবদ কাফের শক্তি শত শত কোটি টাকার অর্থও দিচ্ছে। সরকারি অর্থের পাশাপাশি এ বিদেশী অর্থে বিপুল ভাবে বেড়েছে মিছিলের সংখ্যা ও জৌলুস। মিছিলে মিছিলে ছেয়ে গেছে সমগ্র দেশ। আল্লাহর স্মরণ ভূলিয়ে দেয়ার এর চেয়ে সফল হাতিয়ার আর কি হতে পারে? আল্লাহর স্মরণ থেকে এরূপ বিস্মৃত  হওয়ার ভয়ানক শাস্তিটি হলো তখন শয়তানকে সঙ্গি রূপে বসানো হয় অবাধ্য ব্যক্তির ঘাড়ে। যার প্রতিশ্রুতি্ এসেছে সুরা যুখরুফের ৩৬ নম্বর আয়াতে। ইসলাম থেকে দূরে সরানোর কাজে নেমেছে যেমন জাতিসংঘ, তেমনি ইউনেস্কো। তাই ইউনেস্কো ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ’-এর পক্ষ থেকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে নববর্ষের ঢাকার মঙ্গল শোভাযাত্রাকে। ইসলাম-দমন প্রকল্পের অংশ রূপেই সিলেবাস থেকে বাদ দেয়া হয়েছে কোরআন-হাদীসের পাঠ, নিষিদ্ধ হয়েছে পিস টিভি ও ইসলামী টিভি চ্যানেল এবং জেলে ঢুকানো হয়েছে বিখ্যাত মোফাচ্ছেরদের। সে সাথে  বন্ধ করা হয়েছে তাফসির মাহফিল এবং ইসলামের নামে প্রতিষ্ঠিত সংগঠন। শত শত কোটি টাকা দেয়া হচ্ছে দেশী-বিদেশী এনজিওদের ডুগি, তবলা ও হারমনিয়াম দিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের নাচগান শেখাতে।

ইসলামে শত্রুপক্ষের মতলব গোপন নয়। ঘোষণা দিয়েই তারা মাঠে নেমেছে। তারা আঘাত হানতে চায় ইসলামের তাওহীদের মূলে। তাদের স্পর্ধা এতটাই বেড়েছে যে, উপাস্য রূপে খাড়া করেছে মহাপ্রভূ আল্লাহতায়ালার বদলে মানুষকে। ১৫ই এপ্রিলে অঞ্জন রায় নামক ব্যক্তি দৈনিক আনন্দ বাজারে রিপোর্ট করেছেঃ “সেই কবে এই জনপদের কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়ার গ্রামের আখড়ায় ফকির লালন সাঁইজি উচ্চরণ করেছিলেন, ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’। সেই উচ্চারণকে ধারণ করেই সত্যিকারের মানুষ হওয়ার বিষয়ে এ বারের শপথ ছিল ঢাকায়, বর্ষবরণের মঙ্গল শোভাযাত্রায়। মানুষের ভিড়ে এ বারের শোভাযাত্রার মিছিল হয়ে উঠেছিল মহামিছিল। সেই পুরনো পোশাকের ঢাকিরা সার বেধে বোল তুলেছেন ঢাকে। তালে তালে নাচছে শিশু থেকে বৃদ্ধ। জানান দিচ্ছে, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের সব মানুষের উৎসব পয়লা বৈশাখের অমিত শক্তির কথা।”

পত্রিকাটি সোনার মানুষ হওয়ার পথও বাতলিয়ে দিয়েছে। সেটি মহান আল্লাহতায়ালার ইবাদতের পথ নয়, সেটি মানুষের উপাসনা। এটি  একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমের দেশের জনগণের বিরুদ্ধে কতবড় সাংঘাতিক কথা? নবী-রাসূল নয়, পথ-প্রদর্শক রূপে পেশ করা হয়েছে লালন শাহকে। লালন শাহ মুসলিম ছিল, এক আল্লাহর উপাসক ছিল বা তার জীবনে নামায-রোযা ছিল -তার কোন প্রমাণ নাই। তার মত এক পথভ্রষ্টকে পেশ করা হয়েছে বাঙালীর পথের সন্ধানদাতা রূপে। এরূপ পথভ্রষ্টতাকে প্রতিষ্ঠা দিতে সরকারের বিনিয়োগও কি কম? অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির নামে নানা ভাবে এই পথভ্রষ্ট লালনকেই  সরকারি ভাবে প্রতিষ্ঠা দেয়া হচ্ছে্।

 

ইসলামের পক্ষের শক্তি কি অপশক্তি?

আনন্দ বাজার বড় আনন্দভরে উল্লেখ করেছে, “অন্ধকার অপশক্তির সঙ্গে লড়াইয়ে সবচেয়ে শক্তিমান বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস আর ঐতিহ্য। সেই ধারণাকে ধারণ করেই আয়োজিত হয়ে চলেছে এই মঙ্গল শোভাযাত্রার। প্রায় প্রত্যেকের হাতে বিশাল আকারের মুখোশ, শোলার সেই প্রাচীন রূপকথার পাখি, টেপা পুতুল, বিভিন্ন মঙ্গল প্রতীক।” কিন্তু কারা সে অপশক্তি সেটি আনন্দ বাজার প্রকাশ না করলেও গোপন থাকেনি। বাংলাদেশে চলছে বর্বর স্বৈরাচারি শাসন। চলছে লাগামহীন সরকারি ও বেসরকারি সন্ত্রাস। চলছে ব্যাংক লুট, ট্রেজারি লুট। ঘটছে শত শত ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড। অন্য কোন দেশের চেয়ে বেশী খরচে রাস্তা গড়লেও অর্থলুটের কারণে সে রাস্তা বেশী দিন টিকে না। খারাপ রাস্তার জন্য বাংলাদেশ এখন রেকর্ড গড়ছে। দূর্নীতিতে বাংলাদেশ ৫ বার বিশ্বে প্রথম হয়েছে। দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, আইন-আদালত ভয়ানক অপশক্তির দখলে। নির্বাচন ছিনতাইয়ের মাধ্যমে এক বর্বর ফ্যাসিবাদী শক্তি এখন ক্ষমতায়। তাদের কারণে সম্ভব নয় একটি নিরপক্ষ নির্বাচন। তারা অসম্ভব করে রেখেছে বিরোধী দলের সভা-সমাবেশ ও মিছিল। কিন্তু আনন্দবাজার পত্রিকায় যারা অপশক্তি রূপে চিত্রিত হয়েছে তারা কিন্তু এসব দানবীয় অপশক্তিগুলি নয়। বরং দখলদার স্বৈরাচারি অপশক্তি প্রশংসা কুড়িয়েছে আনন্দ বাজার পত্রিকার। তাদের কাছে অপশক্তি হলো তারা যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমের দেশে ইসলামি চেতনার প্রচার ও প্রতিষ্ঠা চায়। রাজনীতির এ অঙ্গণে ভারতের পৌত্তলিক কাফের ও বাংলাদেশের ভারতসেবী সেক্যুলারিস্টদের এজেন্ডা একাকার হয়ে গেছে।

আনন্দ বাজারের আরো পত্রিকার রিপোর্ট, “শোভাযাত্রায় একটাই শপথ -মানুষের মধ্যে প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠার যে আকাঙ্ক্ষা, প্রতিপাদ্যে সেই বার্তাই ছড়িয়ে দিতে চায় মঙ্গল শোভাযাত্রা,’’-এমনটাই বললেন শোভাযাত্রা আয়োজন কমিটির আহ্বায়ক চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেন। ‘‘এই উপস্থিতিই আশাবাদ,’’ এমনই বললেন বাংলাদেশের সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আহ্বায়ক গোলাম কুদ্দুস। তিনি বললেন, ‘‘বাংলাদেশের মানুষ কখনওই কোনও অপশক্তির কাছে মাথা নোয়ায়নি। আর ভয়কে জয় করে চলার যে পথ, সেটিই বাঙালির পথ। এ বারের শোভাযাত্রায় যে মানুষের ঢল, সেটাই প্রমাণ করে বাংলাদেশ পথ হারায়নি, অন্ধকার কখনও শেষ কথা নয়।’’ সেটাই জানান দিল আজকের মানুষের মিলিত ঢল।

কি মিথ্যা অহংকার নিয়ে উচ্চারণ যে ‘‘বাংলাদেশের মানুষ কখনোই কোন অপশক্তির কাছে মাথা নোয়ায়নি”। প্রশ্ন হলো, ঔপনিবেশিক ব্রিটিশের অধীনে ১৯০ বছরের গোলামীর জীবনও কি অপশক্তির বিরুদ্ধে বিজয়ের ইতিহাস? এতই যখন শক্তির বড়াই তবে ১৯৭১ য়ে বাংলার মাটিতে ভারতীয়দের ডেকে আনা হলো কেন? ভারতের সেনাবাহিনীর সাহায্য ছাড়া পুরা দেশ দূরে থাক একটি জেলাও কেন পাকিস্তানী সেনাবাহিনী থেকে স্বাধীন করতে পারলো না? আজ যে ফ্যাসীবাদী শক্তির অধিকৃতি, সেটিও কি গর্বের?  “বাংলাদেশ পথ হারায়নি” বলেই বা আয়োজকগণ কি বুঝাতে চান? সেটি কি পূজামন্ডপ নিয়ে মাঠে নামার পথ?

 

এটিই কি সেই একাত্তরের চেতনা?

‘কি সেই একাত্তরের চেতনা’ –শেখ মুজিব কখনো সেটি বলেননি। তবে না বললেও চেতনার বিষয়টি কখনোই গোপন থাকে না। চেতনা তো সেটিই যা ধর্ম-কর্ম, আচার-আচরণ, রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে প্রকাশ পায়। বলা হয়, পবিত্র কোরআনের তাফসির হলো নবীজী (সাঃ)র নবুয়ত-পরবর্তী জীবন। তাই তাঁকে বাদ দিলে ইসলামি চেতনার পরিচয় মেলে না। বিশুদ্ধ ইসলামি চেতনাটি তো প্রকাশ পেয়েছে নবীজী (সাঃ)র ইবাদত-বন্দেগী, আচার-আচারণ, কর্ম, রাজনীতি, বিচার-ব্যবস্থা ও জিহাদের মধ্য দিয়ে। প্রসিদ্ধ হাদীস গ্রন্থ ও তাঁর জীবন-ইতিহাস সামনে থাকার কারণে কোন কালেই ইসলামের চেতনা বুঝতে মুসলিমদের অসুবিধা হয়নি। চেতনা নিয়ে সে স্বচ্ছতার কারণেই দেশে দেশে যারাই ইসলাম কবুল করেছে তারাই নামায-রোযা ও হজ-যাকাতে যেমন আত্মনিয়োগ করেছে, তেমনি আত্মসমর্পণ করেছে শরিয়ত, হুদুদ, কেসাস, খেলাফা, মুসলিম একতা ও জিহাদের বিধানগুলির কাছে। যার মধ্যে এসবে আগ্রহ নাই, বুঝতে হবে তার মধ্যে যেমন ঈমান নাই, তেমনি ইসলামি চেতনাও না্ই।

তেমনি একাত্তরের চেতনা বুঝতে হলে সে চেতনার যারা ধারক তাদের ধর্ম-কর্ম, আচার- আচরণ, রাজনীতি ও চরিত্রকে বুঝতে হয়। নিঃসন্দেহে শেখ মুজিব হলো একাত্তরের চেতনার মূল নায়ক। তাকে বাদ দিলে একাত্তরের চেতনা বাঁচে না। লেলিনকে বাদ দিয়ে যেমন লেলিনিজম বুঝা যায় না, তেমনি মুজিবকে বাদ দিয়ে একাত্তরের চেতনারও পরিচয় মেলে না। আজও যারা বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতায় তাদের কেউই রাজাকার নন। তাদের প্রচণ্ড অহংকার একাত্তরের চেতনা নিয়ে। তাই সে চেতনার সন্ধান মিলে বর্তমানে যারা বাংলাদেশের শাসন-ক্ষমতায় তাদের ধর্ম-কর্ম, চরিত্র ও রাজনীতি থেকে। তারাই মূলতঃ একাত্তরের বিজয়ী রাজনীতির মূলধারার প্রতিনিধি। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের মাটিতে একাত্তরের চেতনায় উদ্বুদ্ধ শত শত জীবন্ত তারাকা থাকার পরও কি সে চেতনা নিয়ে অজ্ঞতা চলে?

বাংলার রাজনীতিতে আজ সে স্বৈরাচার এবং যে বাকশালী স্বৈরাচার শেখ মুজিব নিজে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন -সেটি কি কোন রাজাকারের সংস্কৃতি? পাকিস্তান আমলে কোন সময়ই  এক দলীয় বাকশালী স্বৈরাচার ছিল না। এটি নিরেট একাত্তর পরবর্তী ঘটনা। এবং এর প্রবর্তক খোদ শেখ মুজিব। ফলে এ স্বৈরাচারকে একাত্তরের চেতনা থেকে আলাদা করার উপায় নাই। আজও যে স্বৈরাচার শেখ হাসিনার নেতৃত্বে চেপে বসেছে সেটিও বাকশালী স্বৈরাচারের ধারাবাহিকতা মাত্র। একাত্তরের চেতনার আরেকটি অবিচ্ছেদ্দ উপাদান হলো ভারত-নির্ভরতা ও ভারত-সেবী রাজনীতি। সে চেতনাটিও আজ বেঁচে আছে শেখ হাসিনার রাজনীতি। তাই একাত্তরে যেমন ভারতীয় সেনাবাহিনীকে বাংলাদেশে ডেকে আনা হয়, আজও তেমনি ভারতকে অবাধে ট্রানজিট দেয়া হচ্ছে। দেশের রাজপথে পূজার সংস্কৃতির জয়জয়াকার সেটিও কোন রাজাকারের সংস্কৃতি নয়। এটিও একাত্তরের চেতনাধারীদের সংস্কৃতি। এ চেতনা ভারতকে দিয়েছে বাংলাদেশের উপর তার সাংস্কৃতিক আধিপত্য।

 

একমাত্র মুক্তির পথ 

একাত্তরের চেতনাধারীগণ বাংলাদেশকে কোন দিকে নিতে চায় সেটি আজ আর গোপন বিষয় নয়। বাঙালী মুসলিমদের সামনে এখন পথ মাত্র দু’টি। এক). বিদেশী প্রভূদের সাথে মিলে একাত্তরের চেতনাধারীগণ বাংলাদেশের রাজনীতি ও সংস্কৃতিত যে প্রবল স্রোত সৃষ্টি করেছে তাতে ভেসে যাওয়া। বহু মানুষ ভেসে যাওয়ার সে পথকেই যে বেছে নিয়েছে সেটি পহেলা বৈশাখের বিশাল মিছিলই বলে দেয়। দুই). স্রোতে না ভেসে প্রবল বিক্রমে প্রতিরোধে নামা। এটিই মূলতঃ ঈমানদারীর পথ। গাছের মরা পাতার ন্যায় স্রোতে ভাসাটি কোন মুসলিমের সংস্কৃতি নয়। মুসলিম তো সে ব্যক্তি, যার মধ্যে থাকে স্রোতের বিপরীতে সামনে চলার ঈমানী বল। সে ঈমানী বলে সমাজ ও রাষ্ট্রজুড়ে তারা সৃষ্টি করে নতুন স্রোত। মু’মিনের জীবনে সেটিই তো জিহাদ। সে ঈমানের বলের জন্যই ঈমানদার ব্যক্তি মহান আল্লাহতায়ালার কাছে পুরস্কার পায়। প্রশ্ন হলো, ঈমান, স্বাধীনতা ও জান্নাতের আশা নিয়ে বাঁচতে হলে এ ছাড়া কি বিকল্প পথ আছে?  ২রা বৈশাখ, ১৪২৫ (১৬/০৪/১৮)

 




বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক যুদ্ধ

অধিকৃত দেশ

যুদ্ধ শুধু আগ্নেয়াস্ত্রে হয় না। স্রেফ রণাঙ্গনেও হয় না।বরং সবচেয়ে বড় ও বিরামহীন যুদ্ধটি হয় বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক ময়দানে। এ যুদ্ধে হেরে গেলে রাজনৈতিক পরাজয়টি তখন নীরবে ঘটে। রণাঙ্গণের যুদ্ধ তখন অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। সোভিয়েত রাশিয়া ভেঙ্গে গেল এবং পোলান্ড, পূর্ব জার্মান, চেকোস্লাভিয়া, ক্রয়েশিয়া, সার্বিয়া, আলবানিয়া, বুলগারিয়ার ন্যায় বহু সমাজতান্ত্রিক দেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নভূক্ত হলো এবং সে সাথে ন্যাটোতে যোগ দিল –সেটি কি কোন সামরিক পরাজয়ের কারণে? বরং সে পরাজয়টি এসেছে সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানে। এমন একটি  যুদ্ধকেই বলা হয় স্নায়ুযুদ্ধ বা কোল্ড ওয়ার।  এ যুদ্ধে পরাজিত হলে বিলুপ্ত হয় পরাজিত জনগণের নিজস্ব রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়। বাংলাদেশে তেমনি একটি আরোপিত যুদ্ধ চলছে। এক সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইংরেজ, ফরাসী, জার্মান, ডাচ, আইরিশ, স্পেনিশ, আফ্রিকান –এরূপ নানাভাষী মানুষের বসতি ছিল। কিন্তু এখন সব মিলে মিশে মার্কিনী হয়ে গেছে। এখানে সংস্কৃতির সে মূল ধারাটি হলো গ্রীকো-রোমান সভ্যতার। ভারতে সেটি পৌত্তলিক হিন্দুত্বের।  হিন্দুত্বের সে রূপটি নিছক ধর্মীয় নয়,বরং তাতে রয়েছে সাংস্কৃতিক শক্তিও। সে শক্তির বলেই অতীতে শক, হুন, জৈন –এরূপ বহুজাতি হিন্দুত্বের সাথে মিশে গেছে। ধর্মীয় ভাবে হিন্দু না হলেও সাংস্কৃতিক ভাবে তারা হিন্দুতে পরিণত হয়েছে। প্রতিদেশেই এভাবে বিজয়ী শক্তির হাতে নীরবে সাংস্কৃতিক কনভার্শন ঘটে। বাংলাদেশে এমন সাংস্কৃতিক কনভার্টদের সংখ্যা আজ  লক্ষ লক্ষ।

সাংস্কৃতিক শক্তি প্রবল বল পায় রাজনৈতিক বিজয়ের ফলে। রাজনৈতিক,প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক শক্তি তখন সাংস্কৃতিক শক্তির বিকাশে দুয়ার খুলে দেয়। তখন শুরু হয় বিজয়ী শক্তির সাংস্কৃতিক বিপ্লব। বস্তুত এক সফল সাংস্কৃতিক বিপ্লবের লক্ষ্যেই প্রয়োজন পড়ে বিপুল রাজনৈতিক বিপ্লবের। মুসলিম শাসনামলে ভারতীয় হিন্দুগণ সে শক্তি পায়নি। তাদের সে শক্তিটি বিলুপ্ত হয়েছিল মুসলমানদের রাজনৈতিক বিজয়ে। ইসলাম তখন শুধু রাজনৈতিক শক্তি রূপে নয়, প্রবল সাংস্কৃতিক শক্তি রূপে আত্মপ্রকাশ করে। ফলে শক-হুন-জৈনগণ যে ভাবে হিন্দু সংস্কৃতিতে হারিয়ে গেছে, মুসলমানগণ সে ভাবে হারিয়ে যায়নি। কিন্তু হাজার বছর পর হিন্দুগণ ভারতে এখন সে রাজনৈতিক শক্তিটি ফিরে পেয়েছে। ফলে হিন্দুদের মাঝে জেগেছে হিন্দু আচারে সাম্রাজ্য নির্মাণের প্রেরণা। ফলে তাদের রাজনীতিতে এসেছে প্রচণ্ড সাম্রাজ্য লিপ্সা। ১৯৪৭য়ে স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৪৮য়ে কাশ্মীর ও হায়দারাবাদ দখল, ১৯৭১য়ে পূর্ব-পাকিস্তানে দখল এবং ১৯৭৪ সালে সিকিম দখলের ন্যায় ঘটনা ঘটেছে একই ধারাবাহিকতায়। ১৯৭১ সালে সামরিক বিজয়ের পর তাদের সে প্রভাব-বলয়ের অধীনে এসে গেছে বাংলাদেশ। ১৯৭২য়ে ভারতের সামরিক অধিকৃতি শেষ হলেও সাংস্কৃতি অধিকৃতি শেষ হয়নি। বরং সেটি আরো তীব্রতর হয়েছে।

ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর হিন্দুদের হাতে অখন্ড ভারতের শাসনক্ষমতা গেলে মুসলমানদের জন্য যে ভয়ানক বিপদ নেমে আসবে সেটি বহু আলেম,মুসলিম বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদ টের না পেলেও সেটি টের পেয়েছিলেন দার্শনিক আল্লামা ইকবাল। সে বিপদটি যে শুধু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক হবে না, বরং ভয়ানক রূপে নিবে সংস্কৃতির ময়দানে –তা নিয়ে তাঁর বিন্দুমাত্র সংন্দেহ ছিল না। সে বিপদ থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় ছিল হিন্দুদের রাজনৈতিক আধিপত্যের বাইরে স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্রের সৃষ্টি। তাঁর সে দুর্ভাবনার সে চিত্রটি ফুটে উঠে ১৯৩৭ সালের ২০ শে মার্চ কায়েদে আযম মুহম্মদ আলী জিন্নাহকে লেখা তাঁর এক চিঠিতে। তিনি লিখেছিলেন, “ভারতীয় মুসলমানদের মূল সমস্যাটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং বড় সমস্যাটি হলো সাংস্কৃতিক। মুসলমানদের সাংস্কৃতিক সমস্যার সমাধান অখণ্ড ভারতের কাঠামোয় সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু শাসনাধীনে থেকে সম্ভব নয়।” (সূত্রঃ জিন্নাহর প্রতি আল্লামা ইকবালের পত্রাবলী)।এ ভাবনা নিয়েই ভারতের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট প্রদেশ নিয়ে পাকিস্তানে গড়ার প্রস্তাব দেন। একজন মুসলমান তার অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান ইউরোপ, আমেরিকা বা অন্যকোন সমৃদ্ধ দেশে চাকুরি নিয়ে গিয়ে মেটাতে পারে। কিন্তু তাতে তার সাংস্কৃতিক প্রয়োজন মেটে না। সাংস্কৃতিক সমস্যার সমাধানে ইসলামী রাষ্ট্র গড়তে হয়। কারণ সংস্কৃতি খাদ্য-পানীয়,আলো-বাতাস, ভূমি বা জলবায়ুর উপর ভিত্তি করে উঠে না। সেটি সম্ভব হলে একই ভূখন্ডে বসবাসকারি হিন্দু-মুসলমান-খৃষ্টান-বৌদ্ধদের সংস্কৃতি এক হতো। এখানে কাজ করে একটি দর্শন। আর সে দর্শনের পিছনে কাজ করে ধর্মীয় শিক্ষা ও চেতনা। সে ধর্মীয় শিক্ষার প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্র শুধু জরুরী নয়, অপরিহার্য। শত বাধা অতিক্রম করে ও বহু রক্ত ব্যয় করে এমন একটি রাষ্ট্র নবীজী (সাঃ) নিজে নির্মান করে সেটি সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন।

 

সংস্কৃতির শক্তি

প্রশ্ন হলো,সংস্কৃতি কি? সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিপদই বা কি? মানুষ যেভাবে বাঁচে সেটাই তার সংস্কৃতি। বাঁচবার মধ্যে সভ্য মানুষের জীবনে আসে লাগাতর সংস্কার,এবং সে সংস্কার থেকেই তার সংস্কৃতি। পশুর জীবনে সেরূপ সংস্কার নাই, তাই সংস্কৃতিও নাই। সেটি না থাকার কারণে হাজার বছর আগের পশুটি যে ভাবে বাঁচতো আজকের পশুটিও সে ভাবেই বাঁচে। সংস্কারের সে প্রক্রিয়াকে ইসলাম তীব্রতর করে, এখানেই ইসলামের শক্তি। সে শক্তির বলে মরুর অসভ্য মানুষগুলো ফেরেশতাতূল্য হতে পেরেছিল।  সমগ্র মানব ইতিহাসে আর কোন কালেই এরূপ শক্তিশালী সাংস্কৃতিক শক্তির জন্ম হয়নি। ইসলামের হাতে সর্বশ্রেষ্ঠ মানবিক সভ্যতা গড়ে উঠার কারণ তো এটাই। মানুষে মানুষে ভেদাভেদ গড়ে উঠে তো সংস্কৃতির গুণে। বিশ্বাসী মুসলমান এবং মুর্তিপুজারি হিন্দু একই লক্ষ্যে এবং একই সংস্কার নিয়ে বাঁচে না, তাই তাদের সংস্কৃতিও এক নয়। বাঙালীর হিন্দু ও বাঙালী মুসলমান একই গ্রামে বা একই মহল্লায় বাস করলেও উভয়ের সংস্কৃতি এজন্যই এক নয়। উলঙ্গ ও অশ্লিল মানুষটির মাঝে সংস্কার নেই, সে বাঁচে আদিম প্রস্তর যুগের আচার নিয়ে। ফলে তার সংস্কৃতিও নেই।

সংস্কৃতি হলো মানুষের বাঁচাকে সভ্যতর করার এক লাগাতর প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়াকেই আরবী ভাষায় তাহজিব বলা হয়। এটি হলো ব্যক্তির কর্ম,রুচী,আচার-আচারণ, পোষাক-পরিচ্ছদ ও সার্বিক জীবন যাপনের প্রক্রিয়ায় পরিশুদ্ধিকরণ। এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মানুষ রিফাইনড হয় তথা সুন্দরতম হয়। দিন দিন সুন্দরতম হয় তার রুচীবোধ,আচার-আচরণ, কাজকর্ম ও চরিত্র। মুসলমানের ইবাদত ও সংস্কৃতি -এ দুটোর মূলে হলো তার ঈমান। ঈমানের বাহ্যিক প্রকাশ ঘটে তার ইবাদত ও সংস্কৃতিতে। যেখানে ঈমান নেই,সেখানে ইবাদত যেমন নাই তেমনি সংস্কৃতিও নাই্। অপরদিকে যখন ঈমানে জোয়ার আসে তখন শুধু আল্লাহ তায়ালার ইবাদতই বাড়ে না,সংস্কৃতিও সমৃদ্ধ হয়। ঈমান শুধু তার আত্মীক পরিশুদ্ধি দেয় না,পরিশুদ্ধি আনে তার রুচি,আচার-ব্যবহার,পানাহার,পোষাক-পরিচ্ছদ এবং চেতনা ও চৈতন্যে। পরিশুদ্ধি আসে তার অর্থনীতি ও রাজনীতিতেও। এভাবেই মুসলমানের পরিবার,সমাজ ও রাষ্ট্রজুড়ে শুরু হয় সংস্কৃতির নির্মাণ।

রাষ্ট্রের কাজ স্রেফ রাস্তাঘাট,স্কুল-কলেজ ও কলকারাখানা গড়া নয়।দেশ-শাসন ও বিচারকার্য পরিচালনাও নয়। বরং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি হলো,জনগণের ঈমান-বৃদ্ধি ও সংস্কৃতির নির্মাণ। সে কাজে কোরআনী জ্ঞানের প্রসার যেমন জরুরী তেমনি জরুরী হলো ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও পাপাচারের নির্মূল। পাপাচার বাঁচিয়ে যেমন সমাজে সংস্কার আনা যায় না,তেমনি ব্যক্তির জীবনেও তাতে পরিশুদ্ধি আসে না। তাই মুসলমানগণ যেখানে রাষ্ট্র গড়েছে সেখানে শুধু মসজিদ-মাদ্রাসাই গড়েনি,সংস্কৃতিকেও সমৃদ্ধ করেছে।এবং দূর করেছে অপসংস্কৃতিকে। এভাবে সভ্যতার নির্মাণে লাগাতর ভূমিকা রাখতে হয়েছে। নবীজী(সাঃ)র এটাই বড় সূন্নত। সাহাবাদের জানমালের সবচেয়ে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে একাজে। ভভএমন এক মহৎ লক্ষ্যে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের নির্মাণ উপমহাদেশের মুসলমানদের কাছে অপরিহার্য হয়ে পড়ে। কিন্তু সেটি অনাসৃষ্টি গণ্য হয় ইসলামের শত্রুপক্ষের কাছে। আল্লাহর অবাধ্যদের হাতে রাষ্ট্র অধিকৃত হলে কোরআনের জ্ঞান ও আল্লাহর শরিয়তই যে শুধু অবহেলিত হয় তা নয়,বরং উলঙ্গতা,অশ্লিলতা এবং নাচগানের ন্যায় পাপাচারও তখন শিল্পকলা রূপে গণ্য হয়। মানুষকে মানবতা-বর্জিত করার লক্ষ্যে এটাই হলো শয়তানি শক্তির মিশন। আল্লাহর অবাধ্য এ শক্তিটি মুসলমানদের হাত থেকে যে কোরআন কেড়ে নেয় -তা নয়।বরং কেড়ে নেয় সত্যিকার মুসলমান রূপে বেড়ে উঠার পদ্ধতি। আর মুসলিম রূপে বেড়ে উঠার সে প্রক্রিয়াটিই হলো সংস্কৃতি। সাহাবায়ে কেরাম,তাবেঈন ও তাবে-তাবেঈনগণ যেভাবে নিষ্ঠাবান মুসলমান রূপে বেড়ে উঠেছে -সেটি কি কোন মাদ্রাসা বা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার কারণে? বরং সেটি মুসলিম রাষ্ট্রে বিদ্যমান ইসলামী সংস্কৃতির কারণে। ইসলামি রাষ্ট্র বিলুপ্ত হলে বা ইসলামের বিপক্ষ শক্তির হাতে রাষ্ট্র অধিকৃত হলো বিলুপ্ত হয় সে সংস্কৃতি। সংস্কৃতির ময়দানে তখন শুরু হয় উল্টো স্রোত। ইসলামের শত্রুশক্তি এজন্যই ইসলাম থেকে মুসলমানদের ফেরাতে মুসলিম দেশের রাজনীতির উপর দখলদারি চায়।বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলির রাজনীতিতে কাফের শক্তির বিনিয়োগটি এজন্যই অধিক। আজকের বাংলাদেশ মূলত তাদের হাতেই অধিকৃত। যারা এ দেশটির শাসক তারা স্বাধীন নয়,বরং বিজয়ী বিদেশীদের পদসেবী এজেন্ট বা প্রতিনিধি মাত্র। বাংলাদেশের উপর ভারত সে মহাবিজয়টি পেয়েছিল ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। ১৯৭২য়ে তারা সৈন্য সরিয়ে নিলেও গুপ্তচর ও এজেন্টদের অপসারণ করেনি। বরং  এজেন্ট প্রতিপালনে প্রতি বছর যেমন শত শত কোটি টাকা ব্যয় করছে,তেমনি বহুশত কোটি টাকা ব্যয় করে প্রতিটি নির্বাচনে তাদেরকে বিজয়ী করতে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে ভারত তার আওয়ামী বাকশালী এজেন্টদের বিজয়ে যে বিপুল অর্থব্যয় করেছিল সে খতিয়ানটি দিয়েছে লন্ডনের বিখ্যাত পত্রিকা “দি ইকোনমিসস্ট”।

 

শত্রুর এজেন্ডা ও রিনিয়োগ

মুসলিম দেশে অমুসলিমদের যেমন এজেন্ডা থাকে তেমনি প্রচুর বিনিয়োগও থাকে। তবে সেটি অর্থনীতির ময়দানে নয়। সেটি বুদ্ধিবৃত্তি ও সংস্কৃতির ময়দানে। সে বিনিয়োগের অর্থে ফুলে ফেঁপে উঠেছে বহু হাজার এনজিও। উঁই পোকার মত এরা ভিতর থেকে শিকড় কাটে। বাংলাদেশের মুসলমানদের উপর ভারতের সে বিনিয়োগটির শুরু একাত্তর থেকে নয়, বরং ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পরের দিন থেকে। সে বিনিয়োগটিই প্রকাণ্ড ফল দেয় ১৯৭১ সালে এসে। বাংলাদেশের ভারতসেবী সেক্যুলারিস্টদের কাছে ইসলামের প্রতি অঙ্গিকার হলো সাম্প্রদায়িকতা। সে যুক্তিটি দেখিয়ে ভারতীয় হিন্দুরা ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা রুখতে চেয়েছে। এখন সে কথাটিই বাংলাদেশী সেক্যুলারিস্টরা ভারতীয়দের সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে বলে। এসব সেক্যুলারিস্টদের কাছে ভারতীয়দের হিন্দু হওয়াটি সাম্প্রদায়িকতা নয়, কিন্তু মুসলিমদের ইসলাম নিয়ে বেড়ে উঠাটিই সাম্প্রদায়িক। আরো লক্ষণীয় হলো, তাদের কাছে প্যান-হিন্দুবাদ নিয়ে নানা প্রদেশের নানাভাষী হিন্দুদের মাঝে ঐক্য এবং সে একতা নিয়ে অখণ্ড ভারত নির্মাণও সাম্প্রদায়িকতা নয়। কিন্তু মুসলিমদের  প্যান-ইসলামী চেতনা নিয়ে রাষ্ট্র নির্মাণ তাদের কাছে শুধু সাম্প্রদায়িকতাই নয়, সেটি চিহ্নিত হয় সন্ত্রাস রূপে। তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয় ইসলামী শরিয়তের প্রতিষ্ঠাও। কারণ, প্যান-ইসলামী চেতনা ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠা পেলে তাদের রাজনীতি থাকে না। প্যান-ইসলামী চেতনা গুরুত্ব পেলে অবাঙালী মুসলিমগণও তখন বাঙালী মুসলিমদের কাছে ভাই রূপে গৃহীত হয়। তখন মৃত্যু ঘটে বাঙালী জাতিয়তাবাদী জাহেলিয়াতের। আর শরিয়ত প্রতিষ্ঠা পেলে তো তাদের মত অপরাধীদের স্থান হয় কারাগারে অথবা কবরস্থানে। কারন তাদের অপরাধ তো আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধের।

তাই একাত্তরের চেতনাধারিদের লক্ষ্য শুধু পাকিস্তানের ধ্বংস ছিল না, মূল লক্ষ্যটি ছিল ইসলামি চেতনার বিনাশ। সেটি যেমন জনগণের চেতনা থেকে, তেমনি রাষ্ট্রের অঙ্গণ থেকেও। রাষ্ট্র ও তার প্রশাসনিক শক্তিকে তারা পরিনত করেছে ইসলামি চেতনা নির্মূলের হাতিয়ারে। একাত্তরের চেতনাধারিরা তাদের এ মিশনে সবচেয়ে বড় সাহায্য্যটি যে শুধু ভারত থেকে পাচ্ছে তা নয়, বরং সেটি আসছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট, ইউরেোপসহ বিশ্বের তাবত ইসলামবিরোধী শক্তি থেকে। তাদের কাছে ইসলামের প্রতিষ্ঠার যে কোন উদ্যোগই হলো মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস। তারা যে কোন স্বৈরাচারকে মেনে নিতে রাজী আছে,কিন্তু ইসলামের শরিয়ত প্রতিষ্ঠার রাজনীতিকে নয়। কারণ ইসলাম প্রতিষ্ঠার মধ্যে তারা একটি প্রতিপক্ষ সভ্যতার নির্মাণ দেখতে পায়। সভ্যতার সংঘাতের লড়াইয়ে এমন একটি শক্তিতে তারা নিজেদের প্রতিপক্ষ গণ্য করে। সভ্যতার এ লড়াইয়ে যারাই ইসলামের বিপক্ষ তারাই তাদের মিত্র। আওয়ামী বাকশালীরা তো এজন্য ভারতীয় শাসকচক্রের এত কাছের। ইসলামকে রুখতে তারা পাপাচারের জোয়ার সৃষ্টি করে। সেটিকে তারা বলে আধুনিকতা। সেক্যুলার এ সরকারগুলির কাজ তাই সুনীতির প্রতিষ্ঠা যেমন নয়,তেমনি পাপাচারের নির্মূলও নয়। নর্দমার কীট যেমন আবর্জনায় পরিপুষ্টি পায়, এরাই তেমনি পরিপুষ্টি পায় দুর্নীতিতে। ফলে এদের মুল কাজটি হলো,পাপাচারে ও দুর্নীতি দেশটিকে দ্রুত নীচে নামানো। সে মিশনে এরা যে কতটা সফল সেটির প্রমাণ মেলে পৃথিবীর দুইশতটি দেশটির মাঝে দুর্নীতিতে ৫ বার প্রথম হওয়ার মধ্য দিয়ে।

শুধু কালেমা পাঠে সংস্কৃতবান মানুষ সৃষ্টি হয় না। সেজন্য তাকে সংস্কারের একটি পদ্ধতির মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে হয়। বহু বীজ যেমন গজিয়ে শেষ হয়ে যায়, তেমনি বহু মানুষের জীবনে কালেমা পাঠ থাকলেও পরিপূর্ণ মুসলিম রূপে বেড়ে উঠার কাজটি হয়না। বাংলাদেশে বহু মুসলিম মুখে কালেমা পাঠ করলেও বেড়ে উঠেছে হিন্দু সংস্কৃতি নিয়ে। সংস্কারের চাষাবাদটি হয় চেতনারাজ্য, মুসলিম নরনারীর জীবনে সেখানে কাজ করে কোরআনী দর্শন। কোরআনের জ্ঞানার্জন এজন্যই ইসলামে ফরয। যেখানে সে জ্ঞান নাই, সেখানে সে সংস্কারও নাই। সে জ্ঞানহীনতার ইসলামী পরিভাষা হলো জাহিলিয়াত। জাহিলিয়াত নিয়ে মুসলমান হওয়াটি অসম্ভব। অথচ যার জীবন কোর’আনী জ্ঞানে সমৃদ্ধ তাঁর জীবনে সংস্কারটি আসে বিশাল আকারে। সে সংস্কারের চুড়ান্ত পর্ব হলো আল্লাহর রাস্তায় আত্মদান। তাই যে সমাজে কোরআনের চর্চা যত অধিক সে সমাজে ততই বাড়ে আল্লাহর পথে মোজাহিদ এবং শহীদের সংখ্যা। এবং সে জ্ঞানের শূন্যতায় বিপুল সংখ্যায় বেড়ে উঠে দুর্বৃত্তরা। ইসলামের শত্রু পক্ষ সেজন্যই কোর’আনী জ্ঞান নিয়ে বেড়ে উঠাটি রুখতে চায়। এজন্য তারা চায়, মুসলিম চেতনায় অশিক্ষা ও অজ্ঞতার তথা জাহিলিয়াতের আবাদ। সাবেক সোভিয়েত রাশিয়াতে এজন্যই কোরআনের জ্ঞানচর্চা বন্ধ করা হয়েছিল। তালা ঝুলিয়েছিল মসজিদ­-মাদ্রাসায়। অপরদিকে একই রূপ উদ্দেশ্য নিয়ে আজ মার্কিনীগণ মুসলিম দেশে সিলেবাস নিয়ন্ত্রণে নেমেছে।  বাংলাদেশের সেক্যুলারিস্টগণ তেমনি একটি উদ্দেশ্য নিয়েই পীর-ফকির ও  আউল-বাউলদের খুঁজছে। আজ থেকে কয়েক শত বছর আগে ইসলামের বিজয় রুখার সে তাগিদে চৈতন্যদেবকে হাজির করা হয়েছিল।

অথচ ইসলামি সংস্কৃতি মু’মিনকে ইসলামি সভ্যতার নির্মানে নিরলস সৈনিকে পরিণত করে। তখন তার মূল্যবোধ, রুচীবোধ, পানাহার,রাজনীতি, পোষাকপরিচ্ছদ ও তার সাহিত্যের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় সংস্কারপ্রাপ্ত এক মহান চেতনা ও জীবনবোধ। প্রকাশ পায় তার আল্লাহভীরুতা। এখানে কাজ করে আল্লাহর কাছে প্রিয়তর হওয়ার চেতনা। এ হলো তার বাঁচবার সংস্কৃতি। ঈমানদারের চিন্তুা ও কর্মে এভাবেই আসে পবিত্রতা -যা একজন কাফের বা মোনাফিকের জীবনে কল্পনাও করা যায় না। মুসলিম সমাজে এভাবেই আসে শান্তি,শৃঙ্খলা ও শ্লিলতা। অথচ সেক্যুলারের জীবনে সেটি আসে না। বরং সেক্যুলার সমাজে যেটি প্রবলতর হয় সেটি পার্থিব স্বার্থ হাসিলের প্রেরণা। জীবন-উপভোগে মানুষ এখানে প্রচণ্ড স্বেচ্ছাচারি হয়। সে স্বেচ্ছাচারকে ব্যক্তি-স্বাধীনতার লেবাস পড়িয়ে জায়েজ করে নিতে চায়। সেক্যুলার সমাজে পতিতাবৃত্তি,ব্যভিচার,সমকামিতা,অশ্লিলতা,মদ্যপানের ন্যায় নানাবিধ পাপাচার বৈধ্যতা পায় জীবন উপভোগের এমন স্বেচ্ছাচারি প্রেরণা থেকেই। সেক্যুলারিজম প্রবলতর হলে পাপাচারে এজন্যই প্লাবন আসে। বাংলাদেশ আজ তেমনি এক প্লাবনে নিমজ্জমান। দুর্নীতির দ্রুত বৃদ্ধির কারণ তো এটাই।

 

চাই শত্রুমূক্ত স্বাধীনতা

আজকের বাংলাদেশে ভৌগলিক ভাবে অধিকৃত নয়। এখানে অধিকৃতিটি সাংস্কৃতির। এরূপ সাংস্কৃতিক অধিকৃতিই অসম্ভব করেছে সত্যিকার মুসলিম রূপে বেড়ে উঠা। আর সে অধিকৃতিটি ভারতসহ ইসলামের শত্রুপক্ষের। মুসলিম রূপে বেড়ে উঠার জন্য এ অধিকৃতিমূক্তিটি অপরিহার্য। মুসলিম রূপে বেঁচে থাকার জন্য ঘরবাঁধা,চাষাবাদ করা বা কলকারখানা গড়াই সবকিছু নয়। শুধু পনাহারে জীবন বাঁচে বটে, তাতে ঈমান বাঁচে না। এমন বাঁচার মধ্য দিয়ে সিরাতুল মোস্তাকিম নাই। বরং জুটে পথভ্রষ্টতা। সে পথভ্রষ্টতায় বিপন্ন হয় আখেরাতের জীবন। ইহকাল ও পরকাল বাঁচাতে এজন্যই একজন চিন্তাশীল মানুষকে বেড়ে উঠতে হয় জীবন-বিধান, মূল্যবোধ, জীবন ও জগত নিয়ে একটি সঠিক ধারণা নিয়ে। নিত্য দিনের বাঁচবার সে কোরআনভিত্তিক প্রক্রিয়াটি হলো ইসলামী সংস্কৃতি। মুসলমান রূপে বেড়ে উঠাকে সহজ করার লক্ষ্যেই শত্রুমূক্ত স্বাধীনতা চাই।

১৯৪৭য়ের আগে মুসলমানদের প্রতিপক্ষ শুধু ব্রিটিশগণ ছিল না, প্রবল প্রতিপক্ষ ছিল হিন্দুরা্রা। আল্লামা ইকবাল চেয়েছিলেন শুধু ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের থেকে মুক্তি নয়, হিন্দুদের থেকে মুক্তিও। উভয়ের থেকে মুক্তির লক্ষ্যেই মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠায় আপোষহীন হতে পরামর্শ দেন। এজন্যই আল্লামা ইকবালকে বলা হয় পাকিস্তানের মূল স্বপ্নদ্রষ্টা। ইকবালের ধারণা যে কত নির্ভূল ছিল তার প্রমাণ আজকের ভারতীয় মুসলমানগণ। সংখ্যায় তারা পাকিস্তানের সমূদয় জনসংখ্যার চেয়ে অধিক, ইন্দোনেশিয়ার পরই তাদের অবস্থান। কিন্তু এতবড় বিশাল জনসংখ্যার সফলতা কোথায়? কিছু অভিনেতা, কিছু গায়ক-গায়ীকা, কিছু খেলোয়াড় সৃষ্টি করতে পারলেও তারা কি ইসলামী চেতনাসমৃদ্ধ মোজাহিদ, দার্শনিক ও আলেমের সৃষ্টি করতে পেরেছে? শুধু করাচীতে বা লাহোরে যে সংখ্যক আলেম, লেখক,বুদ্ধিজীবী,বিজ্ঞানী, ডাক্তার, ইঞ্জিনীয়ার, আইনবিদ, প্রফেসর, ব্যবসায়ী ও শিল্পোক্তদাতা সৃষ্টি হয়েছে তা কি ভারতের সমগ্র মুসলমানগণ সৃষ্টি করতে পেরেছে। হাজার হাজার পাকিস্তানীরা প্রাণ দিয়েছে আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত রাশিয়াকে হঠাতে, জিহাদের সে ময়দানে মোজাহিদ এসেছে সূদুর আফ্রিকা থেকে। কিন্তু ক’জন ভারতীয় মুসলমান সেখানে গেছে? অথচ মুসলমানের জীবনে জিহাদ তো অবিচ্ছেদ্য সংস্কৃতি। চেতনার সংস্কার যেখানে চুড়ান্ত,জিহাদ সে জীবনে অনিবার্য। কোন ভৌগলিক সীমান্ত দিয়ে কি সে জিহাদ সীমিত থাকে?

ভারত যে স্ট্রাটেজী নিয়ে ভারতীয় মুসলমানদের শক্তিহীন করেছে সে অভিন্ন স্ট্রাটেজী নিয়ে কাজ করছে বাংলাদেশের মুসলমানদের বিরুদ্ধেও। তবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে চলমান এ সাংস্কৃতিক যুদ্ধে ভারত একা নয়। কাজ করছে এক বিশাল কোয়ালিশন। এ কোয়ালিশনে ভারতের সাথে রয়েছে সমগ্র পাশ্চাত্য বিশ্ব এবং ইসরাইল। শত্রুপক্ষের এ কোয়ালিশনটি একই যুদ্ধ লড়ছে আফগানিস্তান,ইরাক ও ফিলিস্তিনে। বাংলাদেশের রণাঙ্গনে তারা অতি-উৎসাহী সহযোদ্ধা রূপে পেয়েছে দেশটির বিপুল সংখ্যক সেক্যুলার রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, সাংস্কৃতিক ক্যাডার, শিক্ষক-বুদ্ধিজীবী, লেখক-সাংবাদিক, আইনজীবী, বিচারপতিসহ বহু সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা। বিশ্ব-রাজনীতির অঙ্গণ থেকে সোভিয়েত রাশিয়ার বিদায়ের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভেবেছিল তাদের পথের কাঁটা এবার দূর হলো। আধিপত্য বিস্তৃত হবে এবার বিশ্বজুড়ে। কিন্তু সেটি হয়নি। একমাত্র আফগানিস্তান দখলে রাখতেই তাদের হিমশিম খেতে হচেছ। পরাজিত হয়েছে ইরাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ন্যায় মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ শেষ হতে ৫ বছর লেগেছিল। কিন্তু বিগত ১৭ বছর যুদ্ধ লড়েও মার্কিন নেতৃত্বাধীন ৫০টিরও বেশী দেশের কোয়ালিশ বাহিনী আফগানিস্তানে বিজয় আনতে পারিনি। বরং দ্রুত এগিয়ে চলেছে পরাজয়ের দিকে। এখন তারা জান বাঁচিয়ে পালাবার রাস্তা খুঁজছে।

 

লক্ষ্য ইসলামী চেতনা নির্মূল

পাশ্চাত্যের কাছে এখন এটি সুস্পষ্ট, আফগানিস্তান, ইরাক, ফিলিস্তিন, লেবানন, সোমালিয়ার মত ক্ষুদ্র দেশগুলো দখল করা এবং সেগুলোকে কন্ট্রোলে রাখার সামার্থ্য তাদের নেই। যে প্রতিরোধের মুখে তারা হারতে বসেছে সেটির মূল হাতিয়ার যুদ্ধাস্ত্র নয়। জনবল বা অর্থবলও নয়। বরং সেটি কোরআনী দর্শন ও ইসলামের সনাতন জিহাদী সংস্কৃতি। এ দর্শন ও সংস্কৃতিই মুসলমানের জন্য আত্মসমর্পণকে অসম্ভব ও অচিন্তনীয় করে তুলেছে। বরং অতি কাম্য গণ্য হচ্ছে আগ্রাসী শত্রুর বিরুদ্ধে আমৃত্যু লড়াই ও শাহাদত। এমন চেতনা এবং এমন সংস্কৃতির বলেই অতীতে মুসলমানেরা রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের ন্যায় দুটি বিশ্বশক্তিকে পরাজিত করেছিল। এ যুগেও তারা বিশ্বের সর্ববৃহৎ রাষ্ট্র ও বিশ্বশক্তি  রাশিয়াকে পরাজিত করেছে। এবং এখন গলা চেপে ধরেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। আফগান মোজাহিদদের জিহাদ তাই পাল্টে দিচ্ছে বিশ্বরাজনীতির সমীকরণ। কামান, বোমা ও যুদ্ধবিমানের বলে গণহত্যা চালানো যায়। নগর-বন্দরও ধ্বংস করা যায়। কিন্তু সে কামানে বা গোলায় কি দর্শন ও সংস্কৃতির বিনাশও সম্ভব? বরং তাদের আগ্রাসন ও গণহত্যায় প্রতিরোধের সে দর্শন ও সংস্কৃতিই দিন দিন আরো বলবান হচ্ছে। কোন মার্কিনীকে রণাঙ্গণে রাখতে মাথাপিছু প্রায় ১০ লাখ ডলার খরচ হয়। অথচ মুসলমানরা হাজির হচ্ছে নিজ খরচে। তারা শুধু স্বেচ্ছাই অর্থই দিচ্ছে না, প্রাণও দিচ্ছে।

অবস্থা বেগতিক দেখে পাশ্চাত্য এখন ভিন্ন স্ট্রাটেজী নিয়েছে। সেটি শুধু দেশদখল ও গণহত্যা নয়। নিছক নগর-বন্দর, ঘরবাড়ী এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের বিনাশও নয়। বরং সেটি ইসলামি দর্শন ও সংস্কৃতি ধ্বংসের। কোরআনে বিশুদ্ধ ইসলাম ও সে ইসলামের অনুসারিদেরকে তারা শত্রু মনে করে। তারা চায়, মুসলমান বেঁচে থাকুক এমন এক ইসলাম নিয়ে যে ইসলামে জিহাদ নেই, শরিয়তের বিধান নাই এবং সূদ-ঘুষ-মদ্যপান ও ব্যভিচারের ন্যায় পাপাচারগুলির বিরুদ্ধে যুদ্ধও নাই। এবং যুদ্ধ নাই সাম্রাজ্যবাদী দখলদারির বিরুদ্ধেও। আত্মসমর্পণের এমন বিকৃত ইসলামকে তারা বলছে প্রকৃত ইসলাম। বলছে মডারেট ইসলাম। সে লক্ষ্যে পৌছার জন্য শুরু করেছে প্রকান্ড আকারের এক সাংস্কৃতিক যুদ্ধ। নতুন এ স্ট্রাটেজীর আলোকে শুধু নিরপরাধ মানুষ হত্যাই করছে না, ঈমান হত্যাতেও তৎপর হয়েছে। এবং সেটি শুধু আফগানিস্তান ও ইরাকে সীমিত নয়। বাংলাদেশের ন্যায় প্রতিটি মুসলিম দেশই এখন একই রূপ সাংস্কৃতিক যুদ্ধের শিকার। তবে বাংলাদেশ তাদের অন্যতম টার্গেট হওয়ার কারণ, দেশটিতে ১৬ কোটি মুসলমানের বাস। তেল, গ্যাস বা অন্য কোন খনিজ সম্পদের চেয়ে ১৬ কোটি জনসংখ্যার ফ্যাক্টরটিই তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তেল, গ্যাস বোমায় পরিণত হয়না, কিন্তু মানুষ হয়। মাত্র ১৭ জন মুসলিম সৈনিক আজ থেকে হাজার বছর আগে বাংলাসহ সমগ্র পূর্ব ভারতের রাজনৈতীক ও সাংস্কৃতিক মানচিত্রই পাল্টে দিয়েছিল। যে চেতনা নিয়ে ১৭ জন মুসলিম সৈনিক বাংলা জয় করেছিল সে চেতনায় ১৬ কোটি মুসলমান জেগে উঠলে সমগ্র ভারতের মানচিত্রই যে পাল্টে যাবে। ভারতও সেটি বুঝে। তাই বাংলাদেশীরা যুদ্ধ না চাইলেও ভারতের পক্ষ থেকে অর্পিত যুদ্ধের টার্গেট হওযা থেকে বাঁচার উপার নাই। বাঁচতে হলে লড়াই করেই বাঁচতে হবে।

ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে শত্রুপক্ষের লড়াইটি সব সময়ই লাগাতর। শত্রুর পক্ষ থেকে চাপিয়ে দেয়া এমন যুদ্ধ থেকে খোদ নবীজীও বাঁচতে পারেননি। মাত্র ১০ বছরে তাকে ৫০ টির বেশী যুদ্ধ করতে হয়। এমন যুদ্ধে শত্রুর লক্ষ্য, শুধু দৈহীক নির্মূল নয়, মুসলমানদের ঈমানকে হত্যা করা। চলমান এ যুদ্ধে পরাজিত হলে অতি কঠিন হবে বাংলাদেশের মুসলমানদের ঈমান নিয়ে বাঁচা। ফলে সংকটে পড়বে আখেরাতের জীবনও। তবে শত্রুর কাছে যারা আত্মসমর্পিত, তাদের জীবনে যুদ্ধ আসে না, বরং আসে লাগাতর গোলামী। পোষা কুকুরে ন্যায় তাদের গলায় তখন শোভা পায় পরাধীনতার শিকল। তাজুদ্দীনের আমলে সে শিকলটি ছিল ভারতের সাথে ৭ দফা চুক্তির, আর মুজিবামলে সেটি ছিল ২৫ সালা চুক্তির। তবে গৃহপালীত বা আত্মবিক্রীত হলে আর চুক্তি লাগে না। এমন গোলামদের কাছে দাসত্ব তখন জীবন-সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। শেখ হাসিনার অআমলে তাই আর চুক্তি লাগছে না। ভারতের গোলামীটাই এখন রাজনীতির সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।

 

যে যুদ্ধের শেষ নেই

বাইবেলের বা বেদ-উপনিষদের জ্ঞান দিয়ে মুসলমানদের বিভ্রান্ত করা অসম্ভব। সেটি অসম্ভব মুসলিম জনপদে পাদ্রী বা পুরোহিতদের নামিয়ে। ব্রিটিশ শাসকেরা সেটি জানতো। জানে আজকের ভারতীয় হিন্দুশাসকগণও। ফলে ইসলামের বিরুদ্ধে তারা সৈন্য নামিয়েছে ইসলামী শিক্ষার ছ্দ্দবেশে। যুগে যুগে ইসলামের শত্রুপক্ষের এটাই কৌশল। মুসলমানেদের মাঝে কাউকে নামিয়েছে আলেমের বেশে, কাউকে বা রাজনীতিবিদ বা বুদ্ধিজীবীর বেশে। তেমন এক স্ট্রাটেজী নিয়ে ব্রিটিশগণ ভারতে আলিয়া মাদ্রাসা খুলেছিল। উপমহাদেশের মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হয়েছে এসব মুসলিম নামধারিদের হাতে। বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশে সূদী লেনদেন, ঘুষ, বেপর্দা ও অশ্লিলতা,সেক্যুলার রাজনীতি, পতিতাপল্লি, মদ্যপান ও ব্যভিচারের ন্যায় নানা দুর্বৃত্তি বিনা প্রতিরোধে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে তো তাদের কারণেই। এরা মুসলমানদের দৃষ্টি থেকে আড়াল করেছে জিহাদের ন্যায় ইসলামের মূল শিক্ষাকে। ফলে নিরাপদ হয়েছিল তাদের ১৯০ বছেরের শাসন। ইসলামে বিরুদ্ধে সে সফল স্ট্রাটেজী নিয়ে তারা আবার ময়দানে নেমেছে বাংলাদেশে। এখন সে কাজে বাংলাদেশে ব্যবহার করতে চায় জনগণের নিজ অর্থে প্রতিষ্ঠিত হাজার হাজার স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন সেক্যুলারিষ্টদের সহায়তায় ইতিমধ্যই এখন এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাদের হাতে অধিকৃত। অধিকৃত দেশের অধিকাংশ মিডিয়াও। শুরু হয়েছে ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রপাগান্ডা। তাদের কথা, ইসলাম এ যুগে অচল। ইসলামের নামে মুসলমানদের চৌদ্দশত বছর নেয়া যাবে না। যেন ইসলাম শুধু নবীজী (সাঃ)র জামানার লোকদের জন্যই নাযিল হয়েছিল। তারা শরিয়তকে বলছে মানবতাবিরোধী। সে প্রপাগান্ডাকে ব্যাপকতর করছে বাংলাদেশের বহু টিভি চ্যানেল,পত্র-পত্রিকা ও বই-পুস্তক। সেগুলির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠা করেছে হাজার হাজার এনজিও। এদের সম্মিলিত প্রচেষ্ঠা হলো, নবীজী (সাঃ)র আমলের ইসলামকে জনগণের মন থেকে ভূলিয়ে দেওয়া এবং আল্লাহর কোরআনী হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী করা।

বাংলাদেশে ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশী-বিদেশী ইসলামী বিরোধী শক্তির সম্মিলিত স্ট্রাটেজী হলো,মুসলমানদের জীবন থেকে জিহাদের সংস্কৃতি বিলুপ্ত করা। এবং ভূলিয়ে দেয়া ইসলামের এ মৌল শিক্ষাটিকে। অথচ ইসলাম থেকে নামায-রোযাকে যেমন আলাদা করা যায় না, তেমনি আলাদা করা যায় না জিহাদকেও। পবিত্র কোরআনে জিহাদে যোগ দেয়ার নির্দেশ এসেছে বার বার। শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবা শহীদ হয়েছেন জিহাদে। নবীজী (সাঃ) নিজে যুদ্ধ লড়েছেন বহুবার; ওহুদের যুদ্ধে শহীদও হয়েছেন। ইসলামের বহু শত্রুকে হত্যা এবং বনু কুরাইজা ও বনু নাযির ন্যায় ইহুদী বস্তিকে নির্মূল করা হয়েছে তাঁরই নির্দেশে। অথচ নবীজী (সাঃ)র সে আপোষহীন নীতি ও ইসলামের সে সংগ্রামী ইতিহাসকে তারা সুপরিকল্পিত ভাবে আড়াল করতে চায়। নামায-রোযা, হজ-যাকাতের বাইরেও শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি, প্রশাসন, প্রতিরক্ষা ও আইন-আদলতের সংস্কারে ঈমানদারের যে গুরুতর দায়ভার রয়েছে সেটিকেও ভূলিয়ে দিতে চায়।

সৈনিকদের হাত থেকে হাতিয়ার কেড়ে নিলে তারা শক্তিহীন ও প্রতিরক্ষাহীন হয়, তেমনি ঈমানদারগণ জিহাদশূণ্য হলে ইসলামের পক্ষে দাঁড়াবার কেউ থাকে। শত্রুপক্ষ তখন বিনা বাধায় আল্লাহর শরিয়তী বিধানকে আস্তাকুঁড়ে ফেলে। তখন আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু হয় সর্বত্র জুড়ে।বাংলাদেশের ১৬ কোটি মুসলমানের সামনে আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হচ্ছে,এবং তাঁর শরিয়তী বিধান অপমানিত হচ্ছে তো এ কারণেই। সাহাবায়ে কেরামের যুগে মুসলমানদের সংখ্যা এর হাজার ভাগের এক ভাগও ছিল না। কিন্তু তাদের সামনে আল্লাহর শরিয়তী বিধান এভাবে পরাজিত ও অপমানিত হয়নি। কারণ তাদের ঈমানের সাথে জিহাদও ছিল। বাংলাদেশের মাটিতে ইসলামের এ এক শোচনীয় পরাজয়। বিপুল বিজয়ীর বেশে এখানে ইসলামের শত্রুপক্ষ। মহান আল্লাহর বদলে রাষ্ট্রের মালিক-মোখতার হয়ে পড়েছে দুর্বৃত্তরা। অথচ এ বিজয় আনতে শত্রুপক্ষকে একটি তীরও ছুড়তে হয়নি। কারণ সে যুদ্ধটি হয়েছে বুদ্ধিবৃত্তি ও সংস্কৃতির ময়দানে,এবং যুদ্ধ লড়েছে সাংস্কৃতিক কর্মীরা। নিজেদের রক্তক্ষয় ও অর্থব্যয় এড়াতে বাংলাদেশের ন্যায় একটি মুসলিম ভূমিতে এমন একটি যুৎসই সাংস্কৃতিক যুদ্ধকেই তারা লাগাতর চালিয়ে যেতে চায়। ফলে এ যুদ্ধের শেষ নাই। দেশটির সাংস্কৃতিক রণাঙ্গনে তাদের বিপুল সৈন্যসমাবেশ ও আয়োজন দেখে তা নিয়ে কি কোন সন্দেহ আছে?  ১৪/০৪/২০১২ দ্বিতীয় সংস্করণ ১৭/০৩/২০১৯

 




পৌত্তলিক রবীন্দ্রনাথ, ঈমানবিনাশী জাতীয় সঙ্গিত ও বাঙালী মুসলিমের আত্মসমর্পণ

যে মহাপাপ কথা ও গানে

সমাজে বড় বড় অপরাধগুলি শুধু খুন,ব্যভিচার বা চুরিডাকাতি নয়।গুরুতর অপরাধ ঘটে মুখের কথায় ও গানে। যে ব্যক্তি মুখে মহান আল্লাহতায়ালাকে অস্বীকার করে বা তাঁর কোন হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঘোষণা দেয় -তাকে কি জাহান্নামে প্রবেশের জন্য খুন,বলাৎকার বা চুরি-ডাকাতিতে নামার প্রয়োজন পড়ে? বিদ্রোহের ঘোষণাটি মুখে মাত্র একবার দেয়াই সে জন্য যথেষ্ঠ। অভিশপ্ত শয়তানে পরিণত হতে ইবাদতে মশগুল ইবলিসকে তাই হত্যা বা ব্যভিচারে নামতে হয়নি। মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া একটি মাত্র হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহই তাকে লানতপ্রাপ্ত করেছে।সে হুকুমটি ছিল হযরত আদম (আঃ)কে সেজদার।তাই বক্তৃতায় কি বলা হয়, সঙ্গিতে কি গাওয়া হয় বা সাহিত্যের নামে কি লেখা হয় -সেটি অতি গুরুত্বপূর্ণ। তা রেকর্ড হয় এবং তা নিয়ে বিচার বসবে রোজ হাশরের বিচার দিনে। মু’মিন ব্যক্তিকে তাই শুধু উপার্জন বা খাদ্য-পানীয়’র ক্ষেত্রে হারাম-হালাম দেখলে চলে না। কথাবার্তা বা লেখালেখির ক্ষেত্রেও অতি সতর্ক হতে হয়।নবীজী(সাঃ)র হাদীসঃ অধিকাংশ মানুষ জাহান্নামে যাবে জিহ্বা ও যৌনাঙ্গের দ্বারা কৃত অপরাধের কারণে। তেমনি বহু মানুষ জান্নাতেও যাবে সত্য দ্বীনের পক্ষে সাক্ষি দেয়ার কারণে। ফিরাউনের দরবারে যে কয়েকজন যাদুকর হযরত মূসা (আঃ)র সাথে প্রতিযোগিতায় এসে হেরে গিয়ে মুসলমান হয়েছিলেন তারা জীবনে এক ওয়াক্ত নামায বা রোযা পালনের সুযোগ পাননি। “মুসা (আঃ)র রবের উপর ঈমান আনলাম” –তাদের মুখ থেকে উচ্চারিত এই একটি মাত্র বাক্যই তাদেরকে সরাসরি জান্নাতবাসী করেছে। ঈমানের প্রবল প্রকাশ ঘটেছিল তাদের সে উচ্চারণে। ঈমানের সে প্রকাশ ফিরাউনের কাছে সহ্য হয়নি, তাই তাদের হাত-পা কেটে নির্মম হত্যার হুকুম দেয়। মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষে সাক্ষদানে তারা এতই অটল ছিলেন যে,সে নির্মম হত্যাকান্ডও তাদের একবিন্দু বিচলিত করতে পারেনি। তাদের এ সাহসী উচ্চারনে মহান আল্লাহতায়ালা এতোটাই খুশি হয়েছিলেন যে পবিত্র কোরআনের একাধিক স্থানে নিজ কালামের পাশে তাদের সে ঘোষণাকেও লিপিবদ্ধ করেছেন, এবং ক্বিয়ামত অবধি মানব জাতির জন্য শিক্ষ্যণীয় করেছেন।

ঈমান বন্দুকের গুলি বা মিজাইলে মারা পড়ে না। ঈমানের মৃত্যু তখন ঘনিয়ে আসে যখন গান,সঙ্গিত বা সাহিত্যের নামে চেতনার ভূবনে লাগাতর বিষ ঢালা হয়। শয়তান বিষ পান করানোর সে কাজটাই মহা ধুমধামে করে নানারূপ গীত, গান,স্লোক ও মিথ্যা ধর্মগ্রন্থ পাঠ করানোর মধ্য দিয়ে। সে লক্ষ্যে বিশ্বজুড়ে শয়তানের লক্ষ লক্ষ পুরোহিত, মন্দির ও পূজামন্ডপ এবং হাজারো গান। বাংলার বুকে ইসলামের যখন প্রচন্ড জোয়ার,সে জোয়ার ঠেকাতে শয়তান যে অস্ত্রটি বেছে নিয়েছিল সেটিও কোন আধুনিক মারণাস্ত্র ছিল না। সেটি ছিল ভাববাদী গান।ইসলামের প্রসার রুখতে ভাববাদী গান ও হাতে বাদ্যযন্ত্র নিয়ে তখন মাঠে নেমেছিল চৈতন্য দেব। তার গানের আবেগ এতোটাই প্রবল ছিল যে, বাংলার বুকে হিন্দুদের মুসলমান হওয়ার জোয়ার দ্রুত থেমে যায়। ফলে কোটি কোটি ইসলামের আলোয় আলোকিত হতে ব্যর্থ হয়,থেকে যায় সনাতন জাহিলিয়াতের অন্ধকারে। বাংলাদেশের বুকে শয়তানের স্ট্রাটেজী আজও  অভিন্ন। তবে শয়তানের উদ্দেশ্য, হিন্দুদের মুসলমান হওয়া রুখা নয়।বরং সেটি মুসলমানদেরকে ইসলাম থেকে দূরে সরানো তথা ডি-ইসলামাইজেশন। সে কাজে শয়তান সৈনিক হিসাবে পেয়েছে আধুনিক মুর্তিপুজারি রবীন্দ্রনাথকে।

 

একাত্তরের আত্মসমর্পণ

বাঙালী মুসলমানদের চেতনায় ঈমানবিনাশী বিষ ঢালার কাজ যে পূর্বে হয়নি -তা নয়। সে কাজের শুরু প্রবল  হয়েছিল ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের আমলে। সেটি উগ্র পৌত্তলিক সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্রের “বন্দেমাতরম’ গান গাওয়ার মাধ্যমে। বাঙালী হিন্দুগন সে গানকে অবিভক্ত বাংলার সকল স্কুলে জাতীয় সঙ্গিতের মর্যাদা দেয়। কিন্তু বাঙালী মুসলিমগণ শত্রুদের সে ঈমানবিনাশী ষড়য্ন্ত্রের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ফলে সে প্রকল্প সেদিন ব্যর্থ হয়। বাঙালী মুসলিমদের সেদিনের সাফল্যের কারণ, মুসলিম রাজনীতির নেতৃত্ব মুজিবের ন্যায় ভারতীয় স্বার্থের সেবাদাসদের হাতে বন্দী ছিল না। বাঙালী মুসলিমগণ হিন্দু আধিপত্যের কাছে সেদিন আত্মসমর্পিতও ছিল। বরং তাদের চেতনার ভূমিতে সেদিন ছিল ইসলামের প্রতি গভীর অঙ্গিকার। সেদিন তারা বন্ধুহীনও ছিল না। তাদের পাশে ছিল দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য ভাষাভাষি বহু কোটি মুসলমান। কিন্তু ১৯৭১য়ে বাংলার রাজনীতির চিত্রই পাল্টে যায়। দেশ অধিকৃত হয় লক্ষাধিক ভারতীয় সৈন্যদের হাতে। এবং বাংলাদেশের রাজনীতির অঙ্গণ তখন অধিকৃত হয় ইসলামি চেতনাশূণ্য ও ইসলামচ্যুত সেক্যুলারিস্টদের হাতে। ভারতের প্রতি তখন বাড়ে সীমাহীন আত্মসমর্পণ। ভারতের অর্থে ও স্বার্থে প্রতিপালিত এ সেবাদাসদের অঙ্গিকারটি ভারতের প্রতি এতোই গভীর যে,একাত্তরের যুদ্ধে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বহু হাজার কোটি টাকার যুদ্ধাস্ত্র ভারতের হাতে ডাকাতি হওয়াতেও তাদের মনে সামান্যতম দুঃখবোদ জাগেনি। সে ডাকাতি রোধে তারা কোন চেষ্টাও করেনি।অথচ সে অস্ত্র কেনায় বাংলাদেশের জনগণের অর্থ ছিল।  তারা রুখেনি দেশের কলকারাখানার যন্ত্রপাতি লুন্ঠনও। বরং লুন্ঠনকে বাধাবিপত্তিহীন করতে সীমান্ত বাণিজ্যের নামে তারা বিলুপ্ত করে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সীমান্তও। ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গণে দেশ দ্রুত পরিণত হয় তলাহীন ভিক্ষার পাত্রে। ১৯৭৪ য়ে নেমে আসে ভয়ানক দুর্ভিক্ষ। আত্মসমর্পণের পর কি আর নিজের ইচ্ছা চলে? তখন তো প্রভুর ইচ্ছাই মেনে নিতে হয়। একাত্তরে ভারতের যুদ্ধজয়ের পর তেমনি একটি পরাজিত অবস্থা নেমে আসে বাংলার মুসলিম জীবনে।

দাসদের জীবনে কোনকালেই স্বাধীনতা আসে না।তারা তো বাঁচে আমৃত্যু পরাধীনতা নিয়ে। সে পরাধীনতাটি বরং গভীরতর হয় চেতনার ভূবনে। একাত্তর-পরবর্তী ভারতীয় দখলদারি ও তাদের ডাকাতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস ভারতীয় আশ্রয়ে প্রতিপালীত এহেন বাংলাদেশী দাসদের ছিল না। ফলে ভারত যা চেয়েছে সেটিই তারা অনায়াসে করতে পেরেছে। স্কুলে কি গাইতে হবে, কি পড়তে হবে সেটিও নির্ধারিত করে দেয় ভারত। শাসতন্ত্রের মূলনীতিগুলিও তারা নির্ধারণ করে দেয়। নিষিদ্ধ করে দেয় ইসলামপন্থিদের রাজনীতি। অথচ ১৯৭০য়ের নির্বাচনি মেনিফেস্টোতে মুজিব একটি বারের জন্যও এমন কথা উল্লেখ করেনি। এবং ইসলামপন্থি দলগুলো নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে জনগণের রায়ও নেয়নি। পরাধীন ব্রিটিশ আমলে ইসলামের শত্রুগণ “বন্দেমাতরম” গানটি গিলাতে না পারলেও একাত্তরের পর তারা “আমরা সোনার বাংলা”কে গিলাতে পেরেছে। রবীন্দ্রনাথ নিজেও তার জীবদ্দশাতে নিজের কোন গান বাঙালী মুসলমানদের এভাবে গিলাতে পারেনি যা পেরেছে একাত্তরের পর। ইসলামের শত্রুদের এটিই হলো একাত্তরের বড় অর্জন। প্রশ্ন হলো,ভাব ও ভাবনায় রবীন্দ্রনাথের “আামার  সোনার বাংলা” আর বঙ্কিমচন্দ্রের “বন্দেমাতরম” গানের মাঝে পার্থক্য কতটুকু? উভয় গানেই দেশ মাতৃতূল্য, সে সাথে পূজনীয়। ফলে উভয় গানের মূলেই রয়েছে অভিন্ন পৌত্তলিকতা। এমন গান কি কোন মুসলমান গাইতে পারে? বাংলাদেশের মুসলমানদের যারা ঈমানশূন্য ও ইসলামশূন্য দেখতে চায়,এ গান নিয়ে তাদের আগ্রহটি তাই গভীর। এরা দেখতে চায় পৌত্তলিকতার জয়জয়াকর। ফলে যাদের কাছে চৈতন্য দেব পূজনীয়, তাদের কাছে পূজনীয় রবীন্দ্রনাথও। মুসলমানের ঈমান ধ্বংসে যাদের আগ্রহটি প্রবল, একমাত্র তারাই এমন গানকে মুসলমানদের উপর চাপিয়ে দিবে।এ গানটি জাতীয় সঙ্গিত রূপে নির্বাচনে বিবেচনায় আনা হয়েছে আওয়ামী লীগ ও তার ভারতীয় মিত্রদের সেক্যুলার ও হিন্দুয়ানী মানদন্ড। তাদের সে মানদন্ডে রবীন্দ্রনাথ দেবতুল্য গণ্য হয়েছেন। ফলে তার গানকে তারা তীব্র ভক্তিভরে জাতীয় সঙ্গিতের মর্যাদা দিয়েছেন। ইসলাম কি বলে -সেটি আদৌ সেদিন বিবেচনায় আনা হয়নি। কিন্তু প্রশ্ন হলো সেক্যুলার মানদন্ডে যা কিছু হালাল,সেগুলি কি ইসলামি মানদন্ডেও জায়েজ? জ্বিনা সেক্যুলার মানদন্ডে কোন অপরাধই নয় -যদি সে ব্যাভিচারে সংশ্লিষ্ট নারী ও পুরুষের সম্মতি থাকে। অথচ ইসলামে রয়েছে বিবাহিত ব্যাভিচারীদের প্রস্তরাঘাতে প্রাণনাশের বিধান। আর অবিবাহিতের জন্য রয়েছে প্রকাশ্য লোকসম্মুখে ৮০টি বেত্রাঘাতের শাস্তি। ঈমানদার হওয়ার দায়বদ্ধতা শুধু নামায-রোযা, হজ-যাকাত পালন নয়,মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তি বিধানের কাছে পূর্ণ আত্মসমর্পণ।সেক্যুলারিস্টদের জীবনে সে আত্মসমর্পণ নাই,বরং প্রতিপদে প্রকাশ পায় বিদ্রোহ। এবং সে বিদ্রোহটি মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তি হুকুমের বিরুদ্ধে। তাদের সে অবাধ্য চেতনাটিই ধরা পড়েছে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিত নির্বাচনের ক্ষেত্রে।

একাত্তরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রবেশ বাঙালী মুসলমানদের স্বাধীনতা বা ঈমান বাড়ানোর স্বার্থে ঘটেনি। সেটি হয়েছে ভারতীয় আধিপত্য বাড়াতে। সে আধিপত্যটি শুধু রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গণে নয়,সংস্কৃতি,ধর্ম ও আদর্শের ক্ষেত্রেও। মহান আল্লাহতায়ালা তো চান প্রতিটি মুসলমান বেড়ে উঠুক তাঁর প্রতি অটুট ঈমান নিয়ে। ঈমানে বৃদ্ধি ঘটানোর প্রয়োজনেই মহান আল্লাহ-রাব্বুল আলামীনের রয়েছে নিজস্ব সিলেবাস। সেটি পবিত্র কোরআনের জ্ঞান বাড়িয়ে। মু’মিনদের উপর অর্থ বুঝে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতকে তিনি বাধ্যতামূলক করেছেন।সেটি ফরজটি যেমন প্রতিদিন ৫ ওয়াক্ত নামাযের প্রতি রাকাতে কোরআন পাঠে,তেমনি নামাযের বাইরেও। ঈমানের বৃদ্ধিতে কোরআন পাঠের গুরুত্ব যে কত অধীক -সেটি বর্ণীত হয়েছে পবিত্র কোরআনে। বলা হয়েছে “মুসলমান তো একমাত্র তারাই যাদের হৃদয় আল্লাহর নাম স্মরণ হওয়া মাত্রই ভয়ে কেঁপে উঠে এবং যখন তাদের কাছে কোরআনের আয়াত পড়ে শোনানো হয় তখন তাদের ঈমান বেড়ে যায় এবং তারা আল্লাহর উপর নির্ভরশীল।” -(সুরা আনফাল আয়াত ২)। মহান আল্লাহতায়ালার এ প্রকল্পকে বানচাল করতে শয়তানেরও রয়েছে নিজস্ব স্ট্রাটেজী। রয়েছে নিজস্ব সিলেবাস। শয়তান চায়,ঈমানের বিনাশ। চায়, মানব মন থেকে আল্লাহর স্মরণকে ভূলিয়ে দিতে। এ জন্য চায়, মানুষকে কোরআন থেকে দূরে টানতে। কোরআনের পাঠ নিষিদ্ধ করে বা সংকুচিত করে শয়তান তার নিজস্ব পাঠ্যসূচী গড়ে তোলে নাচ-গান ও খেলাধুলা দিয়ে। কোরপাঠের বদলে তখন গুরুত্ব পায় চৈতন্যদেব, বঙ্কীমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের ন্যায় পৌত্তলিকদের রচিত কবিতা, গান ও সাহিত্য। এভাবে শয়তান বাড়ায় মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে লাগাতর অবাধ্যতা। তাই ইসলামের শত্রুগণ কোরআন পাঠের বদলে তারা রবীন্দ্র-সঙ্গিত পাঠকে বাধ্যতামূলক করেছে। সেটি শুধু দেশের স্কুলগুলিতেই নয়,এমনকি ধর্মীয় মাদ্রাসাগুলোতেও। এমন কি জাতীয় সংসদের অধিবেশনসহ সকল সামরিক ও বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানেও।

 

রবীন্দ্রচেতনার নাশকতা

মানুষ শুধু তার দেহ নিয়ে বাঁচে না। বাঁচে তার চেতনা নিয়েও। সে সুস্থ্য চেতনাটির কারণেই মানব শিশু তার মানবিক পরিচয়টি পায়। সে চেতনাটি সাথে নিয়েই সর্বত্র তার বিচরণ। সেটি যেমন ধর্ম-কর্ম,রাজনীতি,সংস্কৃতি ও পোষাক-পরিচ্ছদে,তেমনি তার গদ্য,পদ্য,কথা ও গানে। মানুষ বেড়ে উঠে এবং তার মূল্যায়ন হয় সে চেতনাটির গুণে। ইসলামের পরিভাষায় সেটিই হলো তার ঈমান ও আক্বীদা। নামায-রোযা ও হজ-যাকাতের আগে মৃত্যর পর প্রথমে হিসাব হবে ঈমান ও আক্বীদার। সেটি কবরে যাওয়ার পরপরই। এখানে অকৃতকার্য হলে রোযহাশরের বিচারেও কি পাশের সম্ভবনা থাকে? শত বছরের ইবাদত দিয়েও সেটি কি পূরণ হওয়ার? মানুষের ধর্ম,কর্ম,সংস্কৃতি ও আচরনে বিপ্লব আসে ঈমান ও আক্বীদের গুণে। চেতনায় রোগ থাকলে কি ব্যক্তির ইবাদতে বা চরিত্রে পরিশুদ্ধি আসে? শিরক তো সে মহাবিপদটাই ঘটায়। শিরক হলো মহান আল্লাহর সার্বভৌম ক্ষমতার সাথে কাউকে শরীক করা। ইসলামের মহা সত্যটি হলো, মহান আল্লাহতায়ালার নিজ রাজ্যে কেউ তাঁর অংশীদার নয়। অথচ শিরক হলো তাঁর একচ্ছত্র রাজত্বে অংশীদারিত্ব আরোপ। মুশরিকগণ তো সেটিই করে। মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে অন্যসব পাপ মাফ হতে পারে,কিন্তু মাফ হয়না শিরকের পাপ।অথচ রবীন্দ্রনাথ তার সাহিত্যে সে শিরকের বীজই ছড়িয়েছেন। শিরকের সে চেতনাটি প্রবল ভাবে ছড়িয়ে আছে তার রচিত কবিতা,নাটক,ছোটগল্প ও গানে। রবীন্দ্রনাথ তাই গুরুতর অপরাধী। তার সে অপরাধটি মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে। লক্ষণীয় হলো, যখন থেকে বাংলাদেশের বুকে রবীন্দ্র সাহিত্যের প্রসার বেড়েছে তখন থেকেই প্রচন্ড অবাধ্যতা শুরু হয়েছে বাংলার মুসলমানদের মাঝে। এবং তখন থেকে শুরু হয়েছে বাঙালী মুসলমানদের ইসলাম থেকে দূরে সরা। ইসলাম থেকে দূরে সরার কাজটি যে কতটা গভীর ভাবে হয়েছে সে প্রমাণ কি আজ কম? সেটির প্রবল প্রকাশ পেয়েছে ২০১৩ ৫ই মে তারিখে ঢাকার শাপলা চত্বরে। মুসলিম সমাজে অতি সন্মানিত ব্যক্তি হলেন আলেম, হাফেজ ও মসজিদের ইমামগণ। কারণে প্রতি সমাজে তারাই নবীজী (সাঃ) প্রতিনিধি। তাদের হত্যা করা, হত্যাকরে লাশ ড্রেনে ফেলা বা ময়লার গাড়িতে ফেলার কাজ কি কোন মুসলমানের হতে পারে? একাজ তো নিরেট শয়তানদের। কারণ নবীজী (সাঃ) প্রতিনিধিদের সাথে শয়তানের যুদ্ধটি শুধু আদিকালেরই নয়, অনাগত কালেরও। ইসলামের শত্রুরূপে গণ্য হবে ও গণরোষে পড়বে -সে ভয়ে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ আমলে বিদেশী কাফেরগণও তাই আলেম-উলামা ও হাফেজে কোরআনদের গায়ে এরূপ নৃশংস ভাবে হাত দেয়নি। এমনকি ফিরাউনও হযরত মূসা (আঃ) ও তার অনুসারি ইহুদীদের সাথে এমন নিষ্ঠুরতা দেখায়নি। হযরত মূসা (আঃ) যখন ফিরাউনের সাথে বিতর্ক করেছেন তখন ফিরাউন দেশের বড় বড় যাদুকর ডেকে তার সাথে প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে। কিন্তু মুসা (আঃ)কে হত্যা করে তার লাশ ময়লার গাড়িতে তূলেনি। কিন্তু বাংলাদেশে হাসিনার ন্যায় রবীন্দ্রচেতনার ধারকেরা ইতিহাসের সে বর্বরতম কাণ্ডটি ২০১৩ সালে ঢাকার শাপলা চত্বরে করেছে দেশের শত শত আলেম, হাফেজ ও মসজিদের ইমামদের সাথে। শুধু ইসলাম থেকে দূরে সরানোর ক্ষেত্রেই নয়, ইসলাম ও মুসলমানদের শত্রু রূপে গড়ে তুলতে পৌত্তলিক রবীন্দ্রচেতনা যে বাংলার বুকে কতটা সফল হয়েছে এ হলো তার নমুনা। বাংলার মুসলিম পরিবারে কোনকালেই এরূপ বিপুল সংখ্যায় এমন নৃশংস দুর্বৃত্তদের উৎপাদন ঘটেনি। শয়তান এরূপ বাকশালী দুর্বুত্তদের বাম্পার উৎপাদন নিয়ে বিশ্বের কোনে কোনে গিয়ে নিঃসন্দেহে গর্ব করতে পারে। এমন দেশ বিশ্বের দরবারে বার বার দুর্বৃত্তিতে প্রথম হবে তা নিয়েও কি সন্দেহ থাকে? অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নাশকতার পাশাপাশি এ হলো রবীন্দ্রভক্ত ভারতসেবী বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের নৈতিক ও সাংস্কৃতিক নাশকতা।

 

মানব জীবনে ভয়ানক বিপদের কারণ হলো পথভ্রষ্টতা। মহান আল্লাহতায়ালার প্রদর্শিত পথ থেকে পথভ্রষ্টতাই পরকালে জাহান্নামের আগুণপ্রাপ্তিকে অনিবার্য করে। একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালার রহমতই এ বিপদ থেকে মানুষকে বাঁচাতে পারে। সে রহমত লাভের দোয়াই মানব জীবনের সবচেয়ে বড় দোয়া। প্রতি নামাজের প্রতি রাকাতে মহান আল্লাহতায়ালা তাই বিধিবদ্ধ করে দিয়েছেন সে বিশেষ দোয়া পাঠের বিধান। সে দোয়াটি যেমন ভ্রষ্টতা থেকে বাঁচার, তেমনি সিরাতুল মোস্তাকীম প্রাপ্তির। সে অতি গুরুত্বপূর্ণ দোয়াটি শেখানো হয়েছে সুরা ফাতেহা’তে। এ দোয়াটি শুধু নামাযে নয়, বরং ঈমানদারকে প্রতিদিন ও প্রতিক্ষণ বাঁচতে হয়ে এ দোয়ার আকুতি নিয়ে। অথচ সে দোয়ার দর্শনটি গুরুত্ব পায়নি বাংলাদেশের শিক্ষানীতিতে। বরং ছাত্র-শিক্ষক, নারী-পুরুষদেরকে পথ ভ্রষ্ট করার কাজটি হচ্ছে রাষ্ট্রীয় খরচে। আর ছাত্রদের পথভ্রষ্ট করার সে প্রকল্পে তাই গুরুত্ব পেয়েছে রবীন্দ্রসঙ্গিত। সে প্রকল্পকে প্রবলতর করার লক্ষ্যে প্রয়োজন পড়েছে একটি বিশাল রবীন্দ বিশ্ববিদ্যালয়ের –হাসিনা যার ভিত্তি প্রস্তর রাখলেন সিরাজগঞ্জে।  পৌত্তলিক চেতনায় বিশ্বের কোথাও উন্নত চরিত্র গড়ে উঠেছে বা উচ্চতর সভ্যতা নির্মিত হয় তার প্রমাণ নাই। সেটি তো আদিম জাহিলিয়াত তথা অজ্ঞতা ও পথভ্রষ্টতার পথ। এমন অজ্ঞতায় মানুষ নিষ্ঠুর হয়, অসভ্য হয় ও অশালীন হয়। এমন জাহিলিয়াতের কারণে ভারতে হিন্দুগণ মৃত স্বামীর চিতায় তার স্ত্রীকেও পুড়িয়ে মেরেছে। সে জাহিলিয়াতের কারণেই জাহেল রবীন্দ্রনাথ সে সতিদাহের প্রশংসায় কবিতা লেখেছেন। একই রূপ অজ্ঞতা ও অসভ্যতার কারণে ঢাকার বুকে রবীন্দ্রভক্তরা প্রকাশ্য রাজপথে নারীর শ্লীলতাহানিতে নামে। ১৪০০ শত বছর আগেই নবীজী ও তার সাহাবাগণ আরবের বুকে এমন একটি জাহেলিয়াতের কবর রচনা করেছিলেন। অথচ তেমন একটি পৌত্তলিক চেতনাকে বাংলাদেশের বাঙালীগণ জাতীয় সঙ্গিত রূপে মাথায় তুলেছে। রবীন্দ্রনাথের সংক্রামক পৌত্তলিক চেতনাটি ছড়ানো হচ্ছে যেমন তাঁর গানকে জাতীয় সঙ্গিত করে,তেমনি তাঁর রচিত গান,নাটক ও সাহিত্যকে জনগণের রাজস্বের অর্থে বিপুল ভাবে প্রচার করে। কোটি কোটি কণ্ঠে রবীন্দ্র সঙ্গিত গেয়ে এবং স্কুল-কলেজে তাঁর সাহিত্য পড়িয়ে যে চারিত্রিক বা নৈতিক বিপ্লব আসে না এবং বাংলাদেশে যে বিগত ৪০ বছরেও আসেনি সেটি কি এখনও প্রমাণিত হয়নি?

মুসলমান হওয়ার প্রকৃত অর্থটি হলো প্রবল এক ঈমানী দায়বদ্ধতা নিয়ে বাঁচা। সে দায়বদ্ধতাটি প্রতি মুহুর্তের। বেঈমান থেকে ঈমানদারের মূল পার্থক্যটি এখানেই। বেঈমান ব্যক্তি মনের খুশিতে যা ইচ্ছা যেমন খেতে বা পান করতে পারে,তেমনি গাইতে, বলতে বা লিখতেও পারে। তার জীবনে কোন নিয়ন্ত্রন নাই।মহান আল্লাহর কাছে তার কোন দায়বদ্ধতার চেতনাও নাই। অথচ মু’মিনের জীবনে নিয়ন্ত্রন সর্বক্ষেত্রে। ঈমানদারকে প্রতিপদে অনুসরণ করতে হয় সিরাতুল মুস্তাকীমকে। ঈমানের প্রথম আলামতটি শুরু হয় জিহ্ববার উপর নিয়ন্ত্রন থেকে। সে নিয়ন্ত্রনটি শুধু কালেমায়ে শাহাদত পাঠে সীমিত নয়। বরং সেটি তাঁর মুখ থেকে উচ্চারিত প্রতিটি কথার উপর। তাই জাহান্নামের বাসিন্দা হওয়ার জন্য মন্দিরে গিয়ে মুর্তিপূজার প্রয়োজন পড়ে না। জ্বিনা,উলঙ্গতা,মদ্যপান বা সূদ-ঘুষে লিপ্ত হওয়ারও প্রয়োজন পড়ে না।বরং জিহ্ববা দিয়ে আল্লাহর অবাধ্যতামূলক কিছু বলা বা পৌত্তলিক চেতনাপূর্ণ কিছু উচ্চারণ করাই সে জন্য যথেষ্ট। তাই মু’মিন ব্যক্তিকে শুধু পানাহার,পোষাকপরিচ্ছদে বা ইবাদতে সতর্ক হলে চলে না, বরং প্রতিটি কথা, প্রতিটি গান, প্রতিটি কবিতা ও প্রতিটি লেখনিতেও সদা সতর্ক থাকতে হয়। কাফের ব্যক্তি নোবেল প্রাইজ পেলেও তার জীবনে সে ঈমানী নিয়ন্ত্রন থাকে না। কারণ বড় কবি হওয়া বা নোবেল প্রাইজ পাওয়ার জন্য সেটি কোন শর্ত নয়। ইমরুল কায়েসে মত জাহেলিয়াত যুগের একজন কাফেরও আরবের অতি বিখ্যাত কবি ছিল। কিন্তু সে ইমরুল কায়েস মুসলমানদের কাছে গুরু রূপে স্বীকৃতি পায়নি। তাই কাফের বক্তি যত প্রতিভাবানই হোক তাঁর গানকে মুসলিম দেশের জাতীয় সঙ্গিত বানানো যায় না। কারণ তাতে সংক্রামিত হয় তার কুফরি চেতনা। অথচ বাংলাদেশে তো সে বিপদটি প্রকট ভাবে ঘটেছে।

জাতীয় সঙ্গিতের অর্থ শুধু ভাব,ভাষা,ছন্দ এবং আবেগের প্রকাশ নয়। বরং এর মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় সংখ্যাগরিষ্ট দেশবাসীর ঈমান-আক্বিদা,আশা-আকাঙ্খা,দর্শন,ভিশন ও মিশন। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন “আমার সোনার বাংলা” গানটি লিখেছিলেন তখন বাংলাদেশ বলে কোন স্বাধীন দেশ ছিল না,বরং বাংলা ছিল ভারতের একটি প্রদেশ। সে প্রদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ মুসলমান হলেও তাদের সংখ্যা আজকের ন্যায় শতকরা ৯২ ভাগ ছিল না।তাছাড়া রবীন্দ্রনাথ নিজেও সে গানটিতে বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আবেগ,দর্শন,চেতনা বা স্বপ্নের প্রকাশ ঘটাতে লেখেনি। সেটি যেমন তার লক্ষ্য ছিল না, ফলে সে লক্ষ্যে তাঁর প্রস্তুতিও ছিল না। পৌত্তলিকগণ সব সময়ই নতুন উপাস্য চায়। যাদের কাছে গরুবাছুড়, শাপশকুনও উপাস্য, তাদের কাছে নবেল বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ তো বিশাল। তাই রবীন্দ্রপূজারি পৌত্তলিকগণ রবীন্দ্রনাথকে পূজনীয় করেছে নিজেদের সে পৌত্তলিক চেতনাকে বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে। মনের সে পৌত্তলিক ক্ষুধা নিবারণেই “আমার সোনার বাংলা” গানকে বাংলাদেশে জাতীয় সঙ্গিতের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। ভারতে সে মর্যাদাটি পেয়েছে বঙ্কিমচন্দ্রের “বন্দেমাতরম” গানটি। সে গান গাইতে ভারতের মুসলমানদের বাধ্য করা হলেও এরূপ পৌত্তলিক গান কেন বাংলাদেশের মুসলমানগণ গাইবে?

 

পৌত্তলিক রবীন্দ্রনাথ ও তার সোনার বাংলা

পারিবারিক সূত্রে রবীন্দ্রনাথ ব্রাহ্ম হলেও কার্যতঃ ছিলেন পৌত্তলিক মুশরিক। এ জগতটাকে একজন মুসলমান যেভাবে দেখে, কোন পৌত্তলিকই সেভাবে দেখে না। উভয়ের ধর্মীয় বিশ্বাস যেমন ভিন্ন, তেমনি চেতনার জগতটাও ভিন্ন। আর কবিতা ও গানে তো সে বিশ্বাসেরই প্রকাশ ঘটে।একজন মুসলমানের কাছে এ পৃথিবীর ভূমি,আলোবাতাস,মাঠঘাট,গাছপালা,ফুল-ফল,নদী-সমুদ্র এবং সেগুলির অপরূপ রূপ –সবকিছুই মহান আল্লাহর আয়াত বা নিদর্শন। এসব নিদর্শন দেখে সে মহান আল্লাহর কুদরত যে কত বিশাল সে ছবকটি পায়। ফলে স্রষ্টার এ অপরূপ সৃষ্টিকূল দেখে মু’মিন ব্যক্তি সেগুলিকে ভগবান বা মা বলে বন্দনা করে না,বরং হামদ ও নাত গায় সেগুলির সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহতায়ালার।অথচ রবীন্দ্রনাথের চোখে বাংলার অপরূপ রূপ ধরা পড়লেও মহান আল্লাহতায়ালার সর্বময় অস্তিত্ব ধরা পড়েনি। এখানেই রবীন্দ্রনাথের অজ্ঞতা ও দৃষ্টির সীমাবদ্ধতা।

 

রবীন্দ্রনাথ তাঁর “আমার সোনার বাংলা” গানটিতে লিখেছেন:

আমার সোনার বাংলা,

আমি তোমায় ভালবাসি।

চিরদিন তোমার আকাশ,

তোমার বাতাস

আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি।

ও মা, ফাগুনে তোর আমের বনে

ঘ্রানে পাগল করে–

মরি হায়, হায় রে

ও মা, অঘ্রানে তোর ভরা খেতে,

আমি কি দেখেছি মধুর হাসি।।

কি শোভা কি ছায়া গো,

কি স্নেহ কি মায়া গো–

কি আঁচল বিছায়েছ

বটের মূলে,

নদীর কূলে কূলে।

মা, তোর মুখের বাণী

আমার কানে লাগে

সুধার মতো–

মরি হায়, হায় রে

মা, তোর বদনখানি মলিন হলে

আমি নয়ন জলে ভাসি।।

রবীন্দ্রনাথের এ গানে প্রচুর ভাব আছে, ভাষা আছে, ছন্দও আছে। কিন্তু এর বাইরেও এমন কিছু আছে যা একজন মুসলমানের ঈমানের সাথে প্রচন্ড সাংঘর্ষিক। এ গানে তিনি বন্দনা গেয়েছেন বাংলার ভূমির,এবং সে ভূমির আলো-বাতাস,নদীর কূল,ধানের ক্ষেত,আমবাগান ও বটমূলের। দেশকে তিনি মা বলেছেন; বিস্তৃত মাঠঘাট,নদীর পাড় ও বটমূলকে সে মা দেবীর আঁচল রূপে দেখেছেন।গানটিতে ধ্বনিত হয়েছে সে মা দেবীর প্রতি নয়ন ভাসানো বন্দনা। কিন্তু যে মহান আল্লাহতায়ালা সেগুলির স্রষ্টা,সমগ্র গানে একটি বারের জন্যও তাঁর বন্দনা দূরে থাক তাঁর নামের উল্লেখ পর্যন্ত নাই।একজন পৌত্তলিকের জন্য এটিই স্বভাবজাত। পৌত্তলিকের এখানেই মূল সমস্যা। এখানে পৌত্তলিকের ভয়ানক অপরাধটি হলো নানা দেবদেবী ও নানা সৃষ্টির নানা রূপ বন্দনার মাঝে মহান আল্লাহতায়ালাকে ভূলে থাকার। মানব জীবনের এটিই সবচেয়ে ঘৃণ্য কর্ম। মহাসত্যময় মহান আল্লাহতায়ালাকে অস্বীকারের এটিই সবচেয়ে জঘণ্যতম শয়তানি কৌশল। এটিই শিরক। এবং এজন্যই সে মুশরিক। মহান আল্লাহর বান্দার বহু বড় বড় গোনাহ মাফ করে দিবেন কিন্তু শিরকের গুনাহ কখনোই মাফ করবেন না। নবীজী (সাঃ) সে হুশিয়ারিটি বহুবার শুনিয়েছেন।

পৌত্তলিক ব্যক্তিটি তার মনে গহীন অন্ধকারের কারণে এ পৃথিবীপৃষ্ঠে অসংখ্য সৃষ্টি দেখতে পেলেও সে সৃষ্টিকূলের মহান স্রষ্টাকে খুঁজে পায় না। রবীন্দ্রনাথও সে সীমাবদ্ধতার উর্দ্ধে উঠতে পারেননি। তাছাড়া গদ্য,পদ্য কবিতা ও গানের মধ্য দিয়ে ব্যক্তির মুখ বা জিহবা কথা বলে না,কথা বলে তার চেতনা বা বিশ্বাস। ফলে সে কবিতা ও গানে ব্যক্তির আক্বিদা বা ধর্মীয় বিশ্বাস ধরা পড়ে। তাই “আমার সোনার বাংলা” গানে যে চেতনাটির প্রকাশ ঘটেছে সেটি পৌত্তলিক রবীন্দ্রনাথের। কোন মুসলমানের নয়। গানে ইসলামী চেতনার প্রকাশের সামর্থ থাকলে তো রবীন্দ্রনাথ মুসলমান হয়ে যেতেন। পৌত্তলিক চেতনা নিয়েই একজন পৌত্তলিক কবি কবিতা ও গান লিখবেন বা সাহিত্যচর্চা করবেন সেটিই তো স্বাভাবিক। এমন একটি চেতনার কারণেই পৌত্তলিক ব্যক্তি শাপ-শকুন,গরু, বানর-হনুমান,নদ-নদী,বৃক্ষ,পাহাড়-পর্বতকে উপাস্য রূপে মেনে নেয় এবং তার বন্দনাও গায়। “আমার সোনার বাংলা” গানের ছত্রে ছত্রে তেমন একটি পৌত্তলিক চেতনারই প্রবল প্রকাশ ঘটেছে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানে তাঁর নিজ চেতনার সাথে আদৌ গাদ্দারি করেননি। কিন্তু ইসলামি চেতনার সাথে এবং সে সাথে মহান আল্লাহতায়ালার সাথে একজন মুসলমানের গাদ্দারি তথা বিশ্বাসঘাতকতা তখনই শুরু হয় যখন পৌত্তলিক চেতনার এ গানকে মনের মাধুরি মিশিয়ে গাওয়া শুরু করে। বাংলাদেশে রবীন্দ্রভক্তদের মূল প্রকল্প হলো বিপুল সংখ্যায় এরূপ গাদ্দার উৎপাদন।এবং সে লক্ষ্য সাধনে তারা যে বিপুল সফলতা পেয়েছে তা নিয়েও কি সন্দেহ আছে? মুসলিম নামধারি এরূপ গাদ্দারদের কারণে আল্লাহর শরিয়তি বিধান আজও পরাজিত। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠের দেশে এটি কি কম অপমানের?

 

সোনার বাংলার প্রেক্ষাপট

“আমার সোনার বাংলা” গানটি রচনার একটি ঐতিহাসিক পেক্ষাপট আছে। গানটি রচিত হয়েছিল ১৯০৫ সালের পর। বাংলা দ্বিখণ্ডিত হয় ১৯০৫ সালে। পশ্চিম বঙ্গের তুলনায় অর্থনীতি ও শিক্ষাদীক্ষায় অতি পশ্চাদপদ ছিল পূর্ব বঙ্গ। পূর্ববঙ্গের সম্পদে দ্রুত শ্রীবৃদ্ধি ঘটেছিল কলকাতার। সে শহরের শতকরা ৮০ ভাগ বাসিন্দাই ছিল হিন্দু। শুধু প্রশাসনই নয়,বাংলার শিক্ষা ও শিল্প গড়ে উঠছিল স্রেফ কলকাতাকে কেন্দ্র করে। মুসলমানদের দাবী ছিল বাংলাকে বিভক্ত করা হোক এবং পূর্ববঙ্গের রাজধানি করা হোক ঢাকাকে। সে দাবীর ভিত্তিতে ভারতের তৎকালীন ভাইস রয় লর্ড কার্জন পূর্ব বঙ্গ ও আসামকে নিয়ে একটি আলাদা প্রদেশ গঠন  করেন। এ নতুন প্রদেশের রাজধানী রূপে গৃহীত হয় ঢাকা নগরী। শহরটি রাতারাতি জেলা শহর থেকে রাজধানী শহরে পরিণত হয়। তখন ঢাকায় কার্জন হলসহ বেশ কিছু নতুন প্রশাসনিক ইমারত এবং হাই কোর্ট ভবন নির্মিত হয়। নির্মিত হয় কিছু প্রশস্ত রাজপথ। নতুন এ প্রদেশটি ছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ। বাংলার এবং সে সাথে আসামের মুসলমানদের মাঝে সৃষ্টি হয় তখন নতুন রাজনৈতিক প্রত্যয়। সে প্রত্যয় নিয়ে ১৯০৬ সালে ঢাকার বুকে গঠিত হয় মুসলিম লীগ যা শুধু বাংলার মুসলমানদের জন্যই নয়, সমগ্র ভারতীয় মুসলমানদের মাঝে সৃষ্টি করে নতুন আত্মবিশ্বাস ও রাজনৈতিক চেতনা। মুসলমানদের এ রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং কলকাতা ছেড়ে ঢাকার এ মর্যাদা-বৃদ্ধি কলকাতার বাঙালী বাবুদের ভাল লাগেনি। কবি রবীন্দ্রনাথেরও ভাল লাগেনি। অথচ বাঙালী মুসলমানগণ সে বিভক্তিকে নিজেদের জন্য কল্যাণকর মনে করে। তারা এটিকে কলকাতাকেন্দ্রীক হিন্দু আধিপত্য থেকে মুক্তি রূপে দেখে। বাংলা বিভক্তির বিরুদ্ধে বর্ণ হিন্দুদের পক্ষ থেকে শুরু হয় সন্ত্রাসী আন্দোলন। সে সন্ত্রাস ছিল উগ্র হিন্দু সাম্প্রদায়িক চেতনায় পরিপুষ্ট। সন্ত্রাসীরা মন্দিরে গিয়ে শপথ নিত। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সে সন্ত্রাসী আন্দোলনের ঘোরতর সমর্থক। সে সন্ত্রাসের পক্ষে প্রয়োজন ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক অস্ত্রের। সে অস্ত্র জোগাতেই রবীন্দ্রনাথ যুদ্ধে নামেন তার কবিতা, গান ও উপন্যাস নিয়ে। এ প্রেক্ষাপটেই রচিত হয় “আমার সোনার বাংলা” গান।

“আমার সোনার বাংলা” গানে যা প্রকাশ পেয়েছে সেটি রবীন্দ্রনাথের একান্তই সাম্প্রদায়িক হিন্দু চেতনার,বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় চেতনা সে গানে স্থান পায়নি। রবীন্দ্রনাথ মুসলমান ছিলেন না। ফলে বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের বিশ্বাস,দর্শন,স্বপ্ন,ভিশন ও মিশনের প্রতিনিধিত্ব করার ইচ্ছা যেমন ছিল না, তেমনি সেগুলির প্রকাশ ঘটানোর সামর্থও তার ছিল না। পূর্ব বাংলা পশ্চাদপদ মুসলমানদের প্রতি অগ্রসর বাঙালী হিন্দুদের কোন দরদ না থাকলেও বাংলার প্রতি তখন তাদের দরদ উপচিয়ে পড়ে। বাংলার মাঠঘাট,আলোবাতাস,জলবায়ু,বৃক্ষরাজী ও ফলমূলের প্রতি আবেগ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ লেখেন এ গান। এ গানের একটি রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল। সেটি স্বাধীনতা ছিল না, বরং ছিল বাংলার বিভক্তির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা। ব্রিটিশদের থেকে স্বাধীনতার বদলে বাঙালী হিন্দুদের রাজনীতির মূল বিষয়টি হয়ে দাঁড়ায় বঙ্গভঙ্গ রদের দাবী।ব্রিটিশ শাসকদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন রবীন্দ্রনাথ।াভ ১৯১১ সালে ব্রিটিশ রাজা পঞ্চম জর্জ ভারত ভ্রমনে আসেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ভারত উপলক্ষে “জনগণ মনোঅধিনায়ক ভারত ভাগ্যবিধাতা” নামে কবিতা লেখেন। সেটিই আজ ভারতের জাতীয় সঙ্গিত। রবীন্দ্রনাথ ও  বাঙালী হিন্দুদের সে দাবী রাজা পঞ্চম জর্জ মেনে নেন এবং আবার বাংলা একীভূত হয়। প্রচণ্ড ক্ষোভ ও হতাশা নেমে আসে পূর্ব বঙ্গের মুসলমানদের মাঝে। বিক্ষুদ্ধ এ মুসলমানদের শান্ত করতে ভারতের ব্রিটিশ সরকার তখন ঢাকাতে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দেয়।কিন্তু সেটিও কলকাতার বাঙালী বাবুদের ভাল লাগেনি। তার মধ্যেও তারা কলকাতার শ্রীহানীর কারণ খুঁজে পায়। ফলে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধেও বাঙালী বাবুগণ তখন বিক্ষোভে রাজপথে নামেন। মিছিলে নেমেছিলেন খোদ রবীন্দ্রনাথও।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা রোধে কলকাতার গড়ের মাঠে অনুষ্ঠিত হয় জনসভা। সে জনসভাতেও সভাপতিত্ব করেন রবীন্দ্রনাথ। এই হলো রবীন্দ্র মানস। সে সাথে বাঙালী হিন্দুর মানস। মুসলিম বিদ্বেষ নিয়ে রচিত রবীন্দ্রনাথের সে গানটিই এখন বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিত।

আজকের শতকরা ৯১ ভাগ মুসলমানের বাংলাদেশ রবীন্দ্রনাথের আমলের অবিভক্ত বাংলা যেমন নয়,তেমনি দেশটি ভারতভূক্তও নয়। রবীন্দ্রনাথের অবিভক্ত বাংলায় মুসলমানদের সংখ্যা শতকরা ৫৫ ভাগের বেশী ছিল না। সে আমলের বাংলা ঢাকাকেন্দ্রীকও ছিল না। এখন এটি এক ভিন্ন চরিত্রের বাংলাদেশ -যে দেশে রবীন্দ্রনাথ একদিনের জন্যও বাস করেননি। কোনদিনও তিনি এদেশের নাগরিক ছিলেন না। এদেশের স্বাধীনতার কথা তিনি যেমন শোনেননি,তেমনি এ দেশের শতকরা ৯২ ভাগ মুসলমানদের নিয়ে তিনি কোন স্বপ্নও দেখেননি। ফলে বাংলাদেশের মানুষের চাওয়া-পাওয়া,স্বাধীনতা বা স্বপ্নের প্রতিনিধিত্ব করা কি তাঁর পক্ষে সম্ভব? সবচেয়ে বড় কথা,এ সঙ্গিতটি সে উদ্দেশ্যে লেখাও হয়নি। জাতীয় সঙ্গিত নির্বাচনের বিষয়টি দোকান থেকে ‘রেডিমেড’ সার্ট কেনার ন্যায় নয়। এটিকে বরং বিশেষ রুচী,বিশেষ আকাঙ্খা,বিশেষ প্রয়োজন মেটাতে অতি বিশেষ গুণের ‘tailor made’ হতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিত নির্বাচনের ক্ষেত্রে সে সতর্কতা অবলম্বন করা হয়নি। বরং এখানে গুরুত্ব পেয়েছে রবীন্দ্রভক্তি ও রবীন্দ্রপূজার মানসিকতা।

 

বাঙালী মুসলিমের আত্মসমর্পণ

আত্মসমর্পণের পর আর এ অধিকার থাকে না,কি খাবে বা কি পান করবে সে সিন্ধান্ত নেয়ার। প্রভু যা খাওয়ায় বা পান করায় সেটিই মেনে নিতে হয়। এমন কি বিষ পান করানো হলেও সেটির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সাহস থাকে না। তখন অধিকার থাকে না জাতীয় সঙ্গিত রূপে কি গাওয়া হবে সে সিদ্ধান্ত নেয়ার। শেখ মুজিব ও তার অনুসারিদের মূল কাজটি হয় সে আত্মসমর্পণে নেতৃত্ব দেয়া। তাদের কারণেই বাঙালী মুসলিম জীবনে নিদারুন আত্মসমর্পণ নেমে আসে ১৯৭১ য়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে অধিকৃত হওয়ার পর। আত্মসমর্পিত ব্যক্তি শুধু স্বাধীনতাই হারায় না, নিজ সম্পদের উপর দখলদারিও হারায়। নিজের কষ্টার্জিত সম্পদও তখন প্রভুর সম্পদে পরিণত হয়। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ফেলে যাওয়া হাজার হাজার কোটি টাকার অস্ত্রও তাই ভারতীয় সম্পদে পরিণত হয়। ভারতের সম্পদের পরিণত হয় বাংলাদেশী কলকারখানার কলকবজাও। ভারতীয় সম্পদে পরিণত হয় বাংলাদেশের নদীর পানি, রাস্তাঘাট ও নদ-নদী।তাই ভারতের আগ্রাসী হাত পড়েছে পদ্ম-তিস্তা-সুরমা-কুশিয়ারের পানির উপর। বাংলাদেশের বুক চিরে এপার-ওপার যাওয়ার করিডোরও ছিনিয়ে এনেছে। পাকিস্তান আমলের ২৩ বছরে ভারত কি সেরূপ অধিকার একদিনের জন্যও পেয়েছে? ১৯৭২য়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তর থেকে ভারত তার সেনাবাহিনীকে তুলে নিলেও হাজার হাজার সশস্ত্র চরও রাজনৈতিক এজেন্টদের তুলে নেয়নি। বরং দেশ এখন সে এজেন্টদেরই জবরদখলে। গণতন্ত্র ও নিরপেক্ষ নির্বাচনকে কবরে পাঠানো হয়েছে মূলত ভারতীয় এজেন্টদের এ জবরদখলকে স্থায়ী রূপ দেয়ার জন্য। ইংরেজগণ তাদের ১৯০ বছরের শাসনের গণদাবীর পরওয়া করেনি। তারা শাসন করেছে খলিফাদের মাধ্যমে;এবং সেটি হাজার হাজার মাইল দূর থেকে। ভারতীয়রাও দিল্লি বসে সেটিই চায়। সে জন্য তারাও আত্মসমর্পিত খলিফা। সে খলিফা প্রতিপালনে চায়,পৌত্তলিক চেতনার চাষাবাদ। সেটি বাড়াতেই প্রয়োজন পড়েছে রবীন্দ্র সঙ্গিত ও রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের। তাছাড়া শত্রু শক্তির কাছে আত্মসমর্পণে কি স্বাধীনতা মেলে? তাই স্বাধীনতা যেমন মুজিব আমলে মেলেনি, হাসিনা আমলেও নয়। একাত্তরের মূল অর্জনটি তো এই আত্মসমর্পণ। ভারতসেবী বাকশালীদের কাজ হয়েছে সে আত্মসমর্পণকে দীর্ঘায়ু দেয়া। কিন্তু সমস্যা হলো, রবীন্দ্রসঙ্গিতের বিষ পানে যাদের মগজ নেশাগ্রস্ত, তারা সে সত্যটি বোঝে?

ইসলামের শত্রুদের কাছে বাঙালী মুসলমানের আত্মসমর্পণের বড় প্রমাণ শুধু এ নয়, ইসলাম বিরোধী শাসনতন্ত্র, সূদী ব্যাংক,পতিতাপল্লি, জুয়া, মদের দোকান,অশ্লিল ছায়াছবি এবং আদালতে কুফরি আইনকে তারা বিনাযুদ্ধে মেনে নিয়েছে। আরো জোরালো প্রমাণ হলো, জাতীয় সঙ্গিত রূপে গেয়ে চলেছে পৌত্তলিক চেতনাপুষ্ট রবীন্দ্রসঙ্গিতকে। এরূপ আত্মসমর্পণে যা বাড়ে তা হলো মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও বেঈমানি।সে বিদ্রোহ ও বেঈমানি তখন ছড়িয়ে পড়ে জীবনের প্রতিক্ষেত্রে।ইসলামের সাথে গাদ্দারিটা তখন শুধু রাজনীতিতে সীমিত থাকে না। সেটি জাহির হয় যেমন আইন-আদালতে কুফরি আইন অনুসরণে, তেমনি পতিতাপল্লি ও সূদী ব্যংক বহাল রাখার মধ্যে।সে বিদ্রোহেরই প্রবল প্রকাশ ঘটে মনের মাধুারি মিশিয়ে পৌত্তলিকতা সমৃদ্ধ গান গাওয়াতে। মুসলিম সংহতির বুকে কুড়াল মারা এবং মুসলিম রাষ্ট্র বিনাশের ন্যায় হারাম কাজটিও তখন উৎসবযোগ্য গণ্য হয়।শেখ মুজিব ও তাঁর অনুসারিদের জীবনে মূল মিশনটি মূলত ভারতের পক্ষে সে যুদ্ধটি লাগাতর চালিয়ে যাওয়া।সেটি স্রেফ ১৯৭১ থেকে নয়, ১৯৪৭ সাল থেকেই্। ইসলামের বিরুদ্ধে তাদের ন্যায় আত্মসমর্পিতদের গাদ্দারি কি কম? ইসলামের নামে দলবদ্ধ হওয়া এবং ইসলামের শরিয়তী আইনের প্রতিষ্ঠার রাজনীতিকে মুজিব সাংবিধানিক ভাবে নিষিদ্ধ করেন। বেছে বেছে বিলুপ্ত করেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মনোগ্রাম ও নাম থেকে কোরআনের আয়াত এবং ইসলাম ও মুসলিম শব্দগুলি।ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রাম থেকে বিলুপ্ত হয় পবিত্র কোরআনের আয়াত। সলিমুল্লাহ মুসলিম হল হয়ে যায় সলিমুল্লাহ হল। জাহিঙ্গরনগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে যায় জাহ্ঙ্গিরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং নজরুল ইসলাম কলেজ হয় নজরুল কলেজ।

 

সাইনবোর্ড পৌত্তলিকতার

নবীজীর আমলেও আরব দেশে বিস্তৃত ভূমি,চন্দ্র-সূর্য্য ও আকাশ-বাতাস ছিল। সে ভূমিতেও মাঠ-ঘাট,ফুল-ফল ও বৃক্ষরাজি ছিল। কিন্তু মহান নবীজী (সাঃ) কি সেগুলিকে কখনো মা বলে সম্বোধন করেছেন? বরং আজীবন হামদ-নাত ও প্রশংসা গীত গেয়েছেন সে সৃষ্টিকূলের মহান স্রষ্টার। আল্লাহর অনুগত বান্দাহ রূপে মুসলমানের বড় দায়িত্ব হলো আল্লাহর নামকে সর্বত্র প্রবল ভাবে প্রকাশ করা বা বড় করা। কোন দেশ, ভূমি, ভাষা বা বর্ণকে যেমন নয়,তেমনি কোন ব্যক্তি বা জীবজন্তুকেও নয়। পৌত্তলিকদের থেকে ঈমানদারের এখানেই বড় পার্থক্য। এ জীবনে হেদায়াতপ্রাপ্তির চেয়ে মহান আল্লাহর বড় নেয়ামত নেই। তেমনি পথভ্রষ্ট হওয়ার চেয়ে বড় ব্যর্থতাও নেই। হেদায়াত প্রাপ্তির শুকরিয়া জানাতে ঈমানদার ব্যক্তি তাই আমৃত্যু আল্লাহর মহিমা প্রকাশ করে। এ জন্য সর্বত্র আল্লাহু আকবর বলে। এবং সেটির নির্দেশ রয়েছে পবিত্র কোরআনে। বলা হয়েছে,“তোমাদের হেদায়েত দান করার দরুন তোমরা আল্লাহর নামে তাকবির বল (অর্থাৎ আল্লাহ যে মহিমাময় সর্বশ্রেষ্ঠ সেটি মুখ দিয়ে প্রকাশ কর), যাতে তোমরা এভাবে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পার।” –(সুরা বাকারা, আয়াত ১৮৫)। তাই “আল্লাহু আকবর” বলে মুসলমান শুধু জায়নামাজে তাকবির দেয় না, রাজপথের মিছিলে বা জনসভাতেও দেয়। রাজনীতি,অর্থনীতি সংস্কৃতি,শিক্ষাদীক্ষা,কবিতা ও গানেও সে “আল্লাহু আকবর” বলে। এটি শুধু তাঁর রাজনৈতিক শ্লোগান নয়, বরং ইবাদত। মুসলমান তাই কোথাও সমবেত হলে “জয় বাংলা” বা “জয় হিন্দ” বলে না বরং সর্বশক্তিতে গগন কাঁপিয়ে “নারায়ে তাকবীর আল্লাহু আকবার” বলে। একজন মুসলমান তো এভাবেই একজন কাফের বা মুনাফিক থেকে ভিন্ন পরিচয় নিয়ে ধর্মকর্ম, রাজনীতি ও সংস্কৃতি চর্চা করে। পৌত্তলিকগণ সেটি পারে না। বাংলাদেশের সেক্যুলার পক্ষের বড় সাফল্য হলো ইসলামের সে বিশুদ্ধ চেতনাকে বহুলাংশে তারা বিলুপ্ত করতে সমর্থ হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের শাসনতন্ত্র, শিক্ষা-সংস্কৃতি, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে প্রতিনিয়ত যে জয়ধ্বণিটি ঘোষিত হয় সেটি মহান আল্লাহর নয়,বরং শয়তানি বিধানের।

ভগবান দাস আর আব্দুল্লাহ –এ দুটি শুধু ভিন্ন নাম নয়, বরং দুটি ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতীক। ব্যক্তির নাম থেকে এভাবেই তার ধর্ম, চেতনা ও বিশ্বাসের পরিচয় জানা যায়। সে পরিচয়টুকু জানার জন্য তাই কোন বাড়তি প্রশ্নের প্রয়োজন পড়ে না। ব্যক্তির নাম তাই আজীবন তার নিজ ধর্ম বা বিশ্বাসের পক্ষে সাইনবোর্ড রূপে কাজ করে। তেমনি জাতির জীবনে সাইন বোর্ড হলো জাতীয় সঙ্গিত। জাতীয় সঙ্গিত থেকেই পরিচয় মেলে জাতির ধর্মীয় বিশ্বাস ও চেতনার। তাই নাস্তিকের ও আস্তিকের ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবন যেমন এক হয় না, তেমনি এক হয় না জাতীয় সঙ্গিতও। বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিত থেকে দেশবাসীর যে পরিচয়টি মেলে সেটি কি কোন তৌহিদী মুসলিমের? সে পরিচয়টি রবীন্দ্রনাথের ন্যায় নিষ্ঠাবান পৌত্তলিকের।তাছাড়া এ গানটি জাতীয় সঙ্গিত রূপে নির্বাচনের একটি ইতিহাস আছে। সেটি গৃহীত হয়েছিল পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ সৃষ্টির পর। যারা এ সঙ্গিতটিকে গ্রহণ করেছিল তারা ছিল বাঙালী জাতিয়তাবাদী সেক্যুলার। তাদের চেতনায় ও রাজনীতিতে ইসলামের কোন প্রভাব ছিল না। বরং তারা ইতিহাসে পরিচিতি পেয়েছে ভারতপ্রীতি, রবীন্দ্রপ্রীতি,এবং ইসলামি চেতনা নির্মূলে আপোষহীনতার কারণে। লগি বৈঠা দিয়ে ইসলামপন্থিদের হত্যা,তাদের বিরুদ্ধে  মিথ্যা মামলা এনে ফাঁসিতে ঝুলানো এবং হত্যার পর তাদের লাশ ময়লার গাড়িতে তুলে গায়েব করাই তাদের রাজনীতি। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতিও শ্রদ্ধা দেখানো তাদের রীতি নয়। সেরূপ শ্রদ্ধাবোধ ছিল না মুজিবেরও। মুজিব যে শুধু রাজনীতিতে স্বৈরাচারি ছিলেন তা নয়,প্রচণ্ড স্বৈরাচারি ছিলেন বুদ্ধিবৃত্তি ও সংস্কৃতির অঙ্গণেও। দেশের উপর তিনি শুধু একদলীয় বাকশালই চাপিয়ে দেননি, চাপিয়েছেন সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ধর্মীয় বিশ্বাসকে উপেক্ষা করে পৌত্তলিক সংস্কৃতির আগ্রাসন। জাতীয় সঙ্গিত রূপে রবীন্দ্রনাথের “আমার সোনার বাংলা” গানটিকে চাপানো হয়েছে তেমন এক স্বৈরাচারি মানসিকতা থেকে। এক্ষেত্রে ভারতীয় বর্ণ হিন্দুদের থেকে তার চেতনাটি আদৌ ভিন্নতর ছিল না।

 

আকুতি নিষ্ঠবান পৌত্তলিকের

প্রতিটি দেশের শুধু রাজনৈতিক,ভৌগলিক ও ভাষাগত পরিচয়ই থাকে না, থাকে সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিচয়ও। জনগণের চেতনায় যেমন সুনির্দ্দিষ্ট দর্শন থাকে, তেমনি সে দর্শনের আলোকে রাজনৈতিক স্বপ্নও থাকে। সে স্বপ্ন নিয়ে বেড়ে উঠায় জনগণের কাঁধে গুরুতর দায়বদ্ধতাও থাকে। সে বিচারে প্রতিটি দেশই অনন্য। সে অনন্য বৈশিষ্ঠের কারণেই আজকের বাংলাদেশ পশ্চিম বাংলা থেকে ভিন্ন। সে ভিন্নতার কারণেই পশ্চিম বাংলার ন্যায় বাংলাদেশ ভারতের অংশ নয়। পশ্চিম বাংলার সাথে বাংলাদেশের পার্থক্যটি ভূমি,জলবায়ু বা আলোবাতাসের নয়,সেটি দর্শন এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের ভিশন ও মিশনের। পার্থক্যটি ভিন্ন স্বপ্ন নিয়ে বাঁচার। সে ভিন্ন স্বপ্নের কারণেই ১৯৪৭য়ে পশ্চিম বাংলার হিন্দুগণ যখন ভারতে যোগ দেয় তখন পূর্ব বাংলার মুসলমানগণ অতি সচেতন ভাবেই বাঙালী হিন্দুদের সাথে প্রতিবেশী ভারতে যায়নি। গিয়েছে পাকিস্তানে। সাতচল্লিশের সে ভাবনার সাথে পূর্ব বাংলার ৯৬% ভাগ মুসলমানের সমর্থণ ছিল। ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় হোক শেখ মুজিবও সেদিন সে ভাবনার সাথে একাত্ম হয়েছিলেন। প্রতিবেশী বাঙালী হিন্দুদের সাথে না গিয়ে তারা তখন ১২০০ মাইল দূরের অবাঙালী পশ্চিম পাকিস্তানীদের সাথে গেছে। আজও  সেটি ঐতিহাসিক সত্য।

 

প্রতিবেশী হিন্দুদের থেকে বাঙালী মুসলমানদের যে ভিন্নতর পরিচয় ও স্বপ্ন ছিল সেটি ইতিহাসের কোন গোপন বিষয় নয়। বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিত রচিত হতে হবে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সে বিশিষ্ঠ পরিচয় ও স্বপ্নগুলো তুলে ধরতে এবং প্রবলতর করতে। এমন সঙ্গিতের প্রতিটি শব্দ ও প্রতিটি উচ্চারণ থেকে প্রতিটি নাগরিক তখন পাবে নতুন প্রত্যয় ও নতুন প্রেরণা। পাবে স্বপ্নের সে পথটিতে অবিরাম টিকে থাকার মানসিক বল। কিন্তু জাতীয় সঙ্গিতের নির্বাচনে বাংলাদেশের মুসলমানদের সে ভিন্নতর পরিচয়কে মেনে নেয়া হয়নি। এ সঙ্গিতে যে সুর, যে দর্শন,যে বর্ণনা এবং যে আকুতি ধ্বণিত হয়েছে সেটি কোন মুসলমানের নয়, সেটি নিতান্তই একজন নিষ্ঠবান পৌত্তলিকের। এমন সঙ্গিত থেকে কোন মুসলিমই অনুপ্রেরণা পেতে পারে না, বরং পায় পথভ্রষ্টতা। পায় শিরকের ছবক। পায় জাহান্নামের পথ। যে ভ্রষ্টতার কারণে পৌত্তলিক মানুষটি বিষধর সাপকেও দেবতা রূপে গ্রহণ করার অনুপ্রেরণা পায়, এ সঙ্গিত পাঠকারি বাংলাদেশীও তেমনি উৎসাহ পায় ভারতের ন্যায় একটি শত্রুদেশকে বন্ধু রূপে গ্রহণ করার।হিন্দুস্থান চায়,বাংলাদেশের ১৯৪৭য়ের পরিচয়টি বিলুপ্ত হোক। চায় নির্মিত হোক ইসলামচ্যুত এক নতুন প্রজন্ম নিয়ে এক নতুন বাংলাদেশ। সে নতুন বাংলাদেশের ভারতভূক্তিটা হলো তাদের আসল উদ্দেশ্য। বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের রাজনীতি বুঝতে হলে ভারতের এ অভিপ্রায়কে অবশ্যই বুঝতে হবে। ইসলামি চেতনা প্রবলতর হয় এমন কোন গানকে ভারত ও তার চাকর-বাকরেরা এজন্যই জাতীয় সঙ্গিত করতে দেয়নি।

 

অধিকৃতি ভারতের

ভারতের আগ্রাসী নীতিটি শুধু অধিকৃত কাশ্মির, হায়দারাবাদ,গোয়া,মানভাদড় বা সিকিমের ক্ষেত্রে নয়,বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও। কাশ্মিরে ভারত যে ৬ লাখ সৈন্যের বিশাল বাহিনী মোতায়েন করেছে সেটি সেখানে গণতন্ত্র বা অর্থনীতি বাড়াতে নয়। বরং ভারতের অধিকৃতি নিশ্চিত করতে। ভারত একাত্তরে বাংলাদেশে যে বিশাল সামরিক বাহিনী নিয়োজিত করেছিল এবং আজ ও যেরূপ লক্ষ লক্ষ এজেন্ট মোতায়েন করে রেখেছে সেটিও কি বাংলাদেশের রাজনৈতিক,সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ময়দানে বাংলাদেশে স্বাধীনতা বা গণতন্ত্র বাড়াতে? কাশ্মিরে ভারতের বিপদটি হলো,কাশ্মিরীদের মধ্য থেকে এতটা সেবাদাস এজেন্ট পায়নি যতটা পেয়েছে বাংলাদেশে। ফলে এক কোটি মানুষের কাশ্মির দখলে রাখতে হাজার হাজার কোটি রুপি ব্যয়ে পাঞ্জাব,রাজস্থান,বিহার,গুজরাত,মহারাষ্ট্র,উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশসহ ভারতের অন্যান্য প্রদেশ থেকে ৬ লাখ সৈন্য সংগ্রহ করতে হয়েছে। সে ৬ লাখ সৈন্যের পানাহার, চলাচল ও লজিস্টিকের পিছনে প্রতি বছর বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে বহু হাজার কোটি রুপি। অথচ সাড়ে সাত কোটি মানুষের পূর্ব পাকিস্তানে এমনকি একাত্তরের যুদ্ধকালেও ৬০ হাজার পাকিস্তানী সৈন্য ছিল না। কাশ্মিরে এক লাখ ভারতীয় সৈন্য পালতে যত অর্থ ব্যয় হয় তা দিয়ে বাংলাদেশে অন্ততঃ দশ লাখ দালাল পালা সম্ভব। এজন্যই বাংলাদেশের রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি,মিডিয়া,প্রশাসন,সেনাবাহিনী,পুলিশ বাহিনী,শিক্ষাঙ্গণ,সংস্কৃতি ও আদালত প্রাঙ্গণে ভারতীয় দাসদের এত ছড়াছড়ি। বাংলাদেশের মাটি এক্ষেত্রে অতি উর্বর। সে উর্বরতা বাড়িয়েছে বাঙালী জাতীয়তাবাদী সেকুলারিস্টগণ। ভারতের দাস হওয়াতেই তাদের গর্ব। বাংলাদেশে বাকশালী দাসদের কারণে ভারত অতি অল্প খরচে ১৬ কোটি মানুষের বাংলাদেশকে দখলে রাখতে পেরেছে। ফলে বাংলাদেশের বুক চিরে করিডোর নিতে বা দেশের সমূদ্রবন্দর ও নদীবন্দরের উপর দখল নিতে ভারতকে একটি তীরও ছুড়তে হয়নি।

 

রবীন্দ্রসঙ্গিতের রাজনৈতিক এজেন্ডা

জাতীয় সঙ্গীত কোন সাধারণ গান নয়।এর একটি সাংস্কৃতিক,রাজনৈতিক ও দর্শনগত এজেন্ডা থাকে। তাতে দেশবাসীর মিশন ও ভিশনের ঘোষণাও থাকে। তেমন একটি এজেন্ডা নিয়েই কবি রবীন্দ্রনাথ এ গানটি রচনা করেছিলেন। সেটি অখন্ড বাংলার উপর হিন্দু দর্শন, হিন্দু সংস্কৃতি ও হিন্দু রাজনীতির দখলদারি। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের আশ্রয় ও প্রশ্রয়ে তাদের সে দখলদারি বেড়েছিলও প্রচুর। কিন্তু সে দখলদারি নির্মূলের সম্ভাবনা বাড়ে ১৯৪৭ সালে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলা পাকিস্তানে যোগ দিবে –সে সম্ভাবনা তখন বৃদ্ধি পায়। সমগ্র অখন্ড বাংলা পাকিস্তানে যোগ দিবে -সেটি তাদের কাছে ছিল অসহনীয়। ফলে হিন্দুদের রাজনৈতিক এজেন্ডাই তখন পাল্টে যায়। অখন্ড বাংলার বদলে তখন শুরু হয় বঙ্গভঙ্গের দাবী। ফলে বাঙালী হিন্দুগণ ১৯৪৭ সালে রবীন্দ্রনাথের “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভাল বাসি” গানটি আর গায়নি। কিন্তু ১৯৭১য়ের পাকিস্তান ভেঙ্গে যাওয়ার পর তাদের এজেন্ডা আবার পাল্টে যায়। ভারতীয় হিন্দুদের রাজনীতিতে আবার ফিরে এসেছে “অখন্ড বাংলা”র গড়ার প্রকল্প। কারণ অখন্ড বাংলা গড়লে সে বাংলার পক্ষে এখন আর পাকিস্তানে যোগ দেয়ার সুযোগ নাই। বরং সম্ভাবনা বেড়েছে পশ্চিম বাংলার সাথে যুক্ত হয়ে ভারত ভুক্ত হওয়ার। তাতে ভারত পাবে বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের উপর সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ। তাতে বাড়বে ভারতের সামরিক ও সামরিক শক্তি। এ সুযোগটি পেতে অতীতে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশগণ পৃথিবীর অন্যপ্রান্ত থেকে বাংলার বুকে এসে যুদ্ধ করেছে। তাই এতো কাছে থেকে ভারত সে সুযোগ ছাড়ে কেমনে?‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌ তবে সে জন্য শর্ত হলো,বাংলাদেশীদের চেতনার মানচিত্রে পরিবর্তন। চেতনাগত পবিবর্তনের লক্ষ্যেই পুণরায় প্রয়োজন পড়েছে অবিভক্ত বাংলার পক্ষে আবেগ সৃষ্টির। ফলে কদর বেড়েছে রবীন্দ্রনাথের “সোনার বাংলা” গানের। চেতনার সে উপযোগী ক্ষেত্র নির্মাণের লক্ষ্যেই ১৯৭১য়ের পর থেকে আবার শুরু হয়েছে বাংলাদেশের স্কুল-কলেজসহ সকল প্রতিষ্ঠান ও মিডিয়ায় “আমার সোনার বাংলা গান” গাওয়া। সে সাথে জোরে শোরে শুরু হয়েছে বাঙালী মুসলমানদের ইসলাম থেকে দূরে সরানোর নানা রূপ প্রকল্প।

 

কোন যুদ্ধই স্রেফ সামরিক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রকান্ড যুদ্ধ চলে বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানেও। ১৯৭১য়ের সামরিক যুদ্ধটি শেষ হয়েছে, কিন্তু তীব্র ভাবে এখনো চলছে বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধ। ভারতয় হামলার লক্ষ্য শুধু পাকিস্তান ভাঙ্গা ছিল না। তারা তো চায় অখন্ড ভারত নির্মাণ। পাকিস্তান ভাঙ্গার মধ্য দিয়ে ভারত এক ধাপ এগিয়েছে,কিন্তু মূল লক্ষ্য এখনো অর্জিত হয়নি। ভারতের বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধের লক্ষ্য,বাঙালী মুসলিমের আদর্শিক ভূবনে পরিবর্তন আনা।কারণ,পূর্ব বাংলার মুসলমানগণ ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান ভূক্ত হয় পশ্চিম পাকিস্তানীদের সাথে ভাষা, বর্ণ বা আঞ্চলিক বন্ধনের কারণে নয়।সেটি সম্ভব হয়েছিল প্যান-ইসলামি মুসলিম ভাতৃত্বের কারণে। ইসলাম এজন্যই ভারতীয় আদর্শিক যুদ্ধের মূল টার্গেট।১৯৭১য়ে সামরিক বিজয়ের পর ইসলামি চেতনা বিনাশের ভারতীয় প্রজেক্ট বহুদূর এগিয়ে গেছে। ১৯৪৭য়ে শতকরা ৯৬ ভাগ বাঙালী মুসলিম পাকিস্তানে যোগ দেয়ার পক্ষে ছিল। অথচ চিত্রটি এখন ভিন্ন। মনের মাধুরি মিশিয়ে যারা রবীন্দ্রনাথের “আমার সোনার বাংলা” গায় তাদের অনেকেই ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টিকে অনাসৃষ্টি মনে করে। তাদের সামনে ১৯৪৭ এলে তারা পাকিস্তানে যোগ দেয়ার পক্ষে ভোট দিত না। ভারত তাই বিজয়ী হচ্ছে বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধেও। নতুন প্রজন্ম ভূলে গেছে ১৯৪৭-পূর্ব বাঙালী মুসলমানদের দুরাবস্থার কথা। তখন বাংলার শহরে ও গ্রামে শতকরা ৯৫ ভাগ দালানকোঠা ও ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠানের মালিক ছিল হিন্দুরা। শহর এলাকার শতকরা ৮৫ ভাগের বেশী জমিজমার মালিক ছিল তারা। সরকারি চাকুরীতে মুসলমানদের সংখ্যা শতকরা ৫ ভাগও ছিল না। ভারতের মুসলমানগণ এখনো সে একই অবস্থায় রয়ে গেছে। অথচ পাকিস্তান সৃষ্টির পর তাদের ভাগ্যই পাল্টে যায়। ১৯৪৭য়ের পর একমাত্র ঢাকা শহরে যত মুসলিম ডাক্তার, ইঞ্জিনীয়ার, শিক্ষক, উকিল, বিজ্ঞানী ও শিল্পপতি গড়ে উঠেছে তা ভারতের প্রায় ২০ কোটি মুসলমানের মাঝেও সৃষ্টি হয়নি। করাচী, লাহোর, ইসলামাবাদ, পেশাওয়ার, কোয়েটার ন্যায় শহরগুলোতে মুসলমানদের হাতে যে পরিমাণ সম্পদ জমা হয়েছে এবং যতজন মুসলিম ডাক্তার, ইঞ্জিনীয়ার, শিক্ষক, উকিল, বিজ্ঞানী ও শিল্পপতি গড়ে উঠেছে সেটি কি ভারতীয় মুসলমানগণ কি কল্পনা করতে পারে? পাকিস্তান আজ ভারতের সমকক্ষ আনবিক শক্তিধারি একটি দেশ। অথচ ভারতীয় মুসলমানদের সংখ্যা পাকিস্তানের জনসংখ্যার চেয়ে অধীক। তবে মগজ ধোলাইয়ের পর বিস্ময়কর মোজেজাও আর কাজ দেয় না। ফিরাউনের প্রজাগণ তাই মূসা (আঃ) এর মোজেজা দেখেও ফিরাউনের দাসত্ব ছেড়ে ইসলাম কবুল করেনি। একই রূপ অবস্থা বাংলাদেশে মুজিব অনুসারিদের। তারা ইতিহাসের সত্য বিষয়গুলোও মানতে রাজী নয়। এরূপ বিবেকশূণ্য সেবাদাসদের আবাদ বাড়াতে ভারত বাংলাদেশে যে উর্বরতা পেয়েছে সেটি তারা অধিকৃত কাশ্মিরে কোন কালেই পায়নি। কারণ, বাংলার তুলনায় কাশ্মিরে রয়েছে প্রবল ইসলামী চেতনা। সে চেতনার কারণে সেখানে গড়ে উঠেছে ভারত বিরোধী বিদ্রোহ। ফলে বাংলাদেশের উপর দিয়ে ভারত যত সহজে যোগাযোগের নিরাপদ করিডোর পায়,কাশ্মিরে ৬ লাখ সৈন্য মোতায়েন করেও সে সুযোগ পায়নি। নিরাপত্তা পাচ্ছে না কাশ্মিরের কোন শহরে বা গ্রামে। অথচ ভারতীয় সীমান্তরক্ষির হাতে বাংলাদেশীরা অহরহ লাশ হলেও বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতীয়দের সে বিপদ নাই। বিপুল সংখ্যক সেক্যুলারিস্টদের চেতনা-রাজ্য ইতিমধ্যেই অখন্ড ভারতের চেতনা দ্বারা অধিকৃত। এরূপ অবস্থা আরো কিছুকাল চলতে থাকলে বাংলাদেশের ভারতভূক্তির জন্য ভারতকে একটি গুলিও ছুড়তে হবে না। ভারত তো সেটিই চায়।

 

আত্মসমর্পণে কি আখেরাত বাঁচবে?

বাঙালী মুসলিমের চেতনা রাজ্যে ভারতীয় দখলাদারিকে স্থায়ী রূপ দেয়ার দায়িত্ব নিয়েছে সেক্যুলার বাঙালী বুদ্ধিজীবীগণ।এরা হচ্ছে ভারতের পক্ষে খাঁচার ঘুঘু।এদের কাজ,অন্যদেরও খাঁচায় বন্দী হতে আহবান করা। এরূপ ভারতসেবী সাংস্কৃতিক সৈন্য গড়ে তোলার কাজে ভারতের বিনিয়োগটি ১৯৪৭ সাল থেকেই। ১৯৭১য়ে বাংলাদেশ সৃষ্টির পর ভারতের সে খরচটি বিপুল ভাবে কমেছে। ইসলাম থেকে দূরে সরানোর কাজে এখন ব্যয় হচ্ছে বাংলাদেশী মুসলিমের নিজস্ব রাজস্বের পুঁজি। ভারতের বর্তমান স্ট্রাটেজী হলো,একাত্তরে অর্জিত অধিকৃতিকে যে কোন ভাবেই হোক লাগাতর ধরে রাখা। বাংলাদেশের উপর ভারতের দখলদারিটি শুধু সামরিক, রাজনৈতিক বা অর্থনতিক নয়,বরং সাংস্কৃতিক। সে সাংস্কৃতিক অধিকৃতিরই প্রতীক হলো জাতীয় সঙ্গিত রূপে চাপিয়ে দেয়া পৌত্তলিক রবীন্দ্রনাথের গান। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন অখণ্ড হিন্দু ভারতের ধ্বজাধারি। সে অখণ্ড হিন্দু ভারতের চেতনা থেকেই ভারত থেকে মুসলিম নির্মূলের প্রবক্তা মারাঠী শিবাজীকে তিনি জাতীয় বীরের মর্যাদা দিয়েছেন। শিবাজীকে বন্দনা করে তিনি কবিতাও লিখেছেন। এখন সে রবীন্দ্রনাথকে ভারত ব্যবহার করছে বাংলাদেশের উপর সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য স্থাপনের যোগসূত্র রূপে। এজন্যই বাংলাদেশে রবীন্দ্রচর্চা ও রবীন্দ্রঅর্চনা বাড়াতে ভারত সরকার ও আওয়ামী লীগ সরকারের এত বিনিয়োগ। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের রাজস্বের অর্থে বাংলা এ্যাকাডেমীর কাজ হয়েছে প্রতিবছর পৌত্তলিক রবীন্দ্রনাথের উপর শত শত বই প্রকাশ করা। অথচ ইসলামের মহান নবীজী(সাঃ)এবং মানব-ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মানুষটির উপর কি এর দশ ভাগের এক ভাগ বই ছাপানোরও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে?

জনগণের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকারের সবচেয়ে বড় অপরাধটি রাজনৈতিক,প্রশাসনিক বা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নয়। সেটি ঘটভে চেতনা বা বুদ্ধিবৃত্তির অঙ্গণে।অপরাধটি এখানে জনগণকে জাহান্নামের আগুণে পৌছানোর। অথচ সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্বটি রাস্তাঘাট,ব্রিজ,কলকারখানা বা হাসপাতাল গড়া নয়,বরং জাহান্নামের আগুণ থেকে নাগরিকদের বাঁচানো। এবং সেটি সম্ভব জান্নাতের পথ তথা সিরাতুল মুস্তাকীমটি চিনতে এবং সে পথে পথচলায় লাগাতর সহয়তা দেয়ার মধ্য দিয়ে।ইসলামে এটি এক বিশাল ইবাদত এবং প্রতিটি শাসকের উপর এটি এক বিশাল দায়ভার।এ দায়িত্ব পালনের কাজটি সঠিক হলে মহান আল্লাহর দরবারে সে শাসক মহামর্যাদায় ভূষিত হন। এবং কিভাবে পালন করতে হয় খোদ নবীজী (সাঃ) দেশ শাসনের সে গুরু দায়ভার নিজ কাঁধে নিয়ে শিখিয়ে গেছেন।শাসকদের জন্য আজও  মহান নবীজী (সাঃ)র মহান সূন্নত।দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছেন খোলাফায়ে রাশেদার ন্যায় মহান সাহাবায়ে কেরামগণ। কিন্তু বাংলাদেশে সে দায়ভার পালিত। কারণ, শাসকের সে পবিত্র পদটি অধিকৃত হয়েছে ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে। এরা আবির্ভুত হয়েছে স্বার্থশিকারি চোর-ডাকাত রূপে। ক্ষমতালোভী এ সেক্যুলারিস্টদের মূল মিশনটি হলো,কোরআনে প্রদর্শিত সিরাতুল মুস্তাকীমকেই জনগণের দৃশ্যপট থেকে বিলুপ্ত করা এবং জাহান্নামে পৌঁছাটি সহজতর করা।সে লক্ষেই তাদের সেক্যুলার রাজনীতি ও শিক্ষানীতি। সে লক্ষ্যেই নৃত্য-গীত, মদ-জুয়া ও পতিতাপল্লির সংস্কৃতি। সে লক্ষ্যেই দেশ জুড়ে গড়া হচ্ছে শত শত নাট্যশালা ও সিনেমা হল।সে অভিন্ন লক্ষ্যেই এক পৌত্তলিকের রচিত সঙ্গিতকে জাতীয় সঙ্গিত রূপে গাইতে বা শুনতে জনগণকে বাধ্য করা হচ্ছে।এভাবে অধিকৃত হয়ে আছে জনগণের মনের ভূবন। জনগণের অধিকৃত সে মন বাধ্য হচ্ছে মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণ থেকে দূরে থাকতে।

অথচ মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণ থেকে দূরে থাকার বিপদটি তো ভয়াবহ। তখন সে ব্যক্তির উপর তার নিজের নিয়ন্ত্রণ থাকে না। তার সঙ্গিরূপে তখন নিয়োগ দেয়া হয় অভিশপ্ত শয়তানের। সে ঘোষণাটি এসেছে পবিত্র কোরআনে। বলা হয়েছে, “যে কেউ রহমানের স্মরণ থেকে দূরে সরবে তার উপর নিয়োগ দেয়া হবে শয়তানের, সে তার সঙ্গি হবে।” –(সুরা জুখরুফ আয়াত ৩৬)।ফলে রবীন্দ্র সঙ্গিত গাওয়ার অর্থ শুধু গান গাওয়া নয়।এর অর্থ,দেশবন্দনার মাঝে মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণ থেকে ভূলে থাকা। ফলে তার পরিণতিটি ভয়াবহ। এখানে মহাবিপদটি সঙ্গি রূপে শয়তানকে নিজ ঘাড়ে বসিয়ে নেয়ার। জনগণের কাঁধে শয়তান বসিয়ে দেয়ার সে ভয়ানক পাপের কাজটিই করছে বাংলাদেশের সরকার। সরকারের নীতির কারণেই দিন দিন শয়তানের অধিকৃতি বাড়ছে দেশবাসীর মনের ভূবনে। আর তাতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গণই শুধু নয়, জনগণের চেতনার মানচিত্রও অধিকৃত হয়ে যাচ্ছে পৌত্তলিক হিন্দুদের হাতে।এভাবে জাতীয় সঙ্গিত পরিনত হয়েছে জনগণের ঈমান ধ্বংস ও জাহান্নামে পৌছানোর নীরব হাতিয়ারে। প্রশ্ন হলো,এ অব্স্থায় কি আত্মসমর্পণ চলে? তাতে কি পরকাল বাঁচে? ১০/০৫/২০১৫

 




শত্রুর আরোপিত সাংস্কৃতিক যুদ্ধ ও অরক্ষিত বাংলাদেশ

ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদী কোয়ালিশনের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধটি নিছক সামরিক বা রাজনৈতিক নয়। বরং সে যুদ্ধটি প্রবল ভাবে হচ্ছে প্রতিটি মুসলিম দেশের সাংস্কৃতিক ময়দানে। সাংস্কৃতিক যুদ্ধের তেমনি একটি উত্তপ্ত রণাঙ্গণ হলো বাংলাদেশে। পাশ্চাত্যের সে কোয়ালিশনে যোগ দিয়েছে আরেক আগ্রাসী দেশ ভারত। ইসলাম ও মুসলিম বিরোধী্ পাশ্চাত্য এজেন্ডার সাথে ভারতীয় এজেন্ডা এক্ষেত্রে এক ও অভিন্ন। শত্রুপক্ষের এ কোয়ালিশন আফগানিস্তান,ইরাক বা ফিলিস্তিনের মুসলমানদের বিরুদ্ধে আজ যা কিছু করছে, ভারত অবিকল সেটিই করছে বিগত ৬০ বছরের বেশী কাল ধরে করছে অধিকৃত কাশ্মীরের অসহায় মুসলমানদের সাথে। বাংলাদেশের রণাঙ্গনে এ পক্ষটি অতি-উৎসাহী সহযোদ্ধা রূপে পেয়েছে দেশটির বিপুল সংখ্যক সেকুলার রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, সাংস্কৃতিক ক্যাডার, শিক্ষক-বুদ্ধিজীবী, লেখক-সাংবাদিক, এবং বহু সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা।

বিশ্ব-রাজনীতির অঙ্গণ থেকে সোভিয়েত রাশিয়ার বিদায়ের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভেবেছিল তাদের পথের কাঁটা এবার দূর হলো। আধিপত্য বিস্তৃত হবে এবার বিশ্বজুড়ে। কিন্তু সেটি হয়নি। আফগানিস্তান ও ইরাকের মত দুইটি দেশ দখলে রাখতেই তাদের হিমশিম খেতে হচেছ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ন্যায় মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ শেষ হতে ৫ বছর লেগেছিল। কিন্তু বিগত ১৭ বছর যুদ্ধ লড়েও মার্কিন নেতৃত্বাধীন ৪০টিরও বেশী দেশের কোয়ালিশ বাহিনী আফগানিস্তানে বিজয় আনতে পারিনি। বরং দ্রুত এগিয়ে চলেছে পরাজয়ের দিকে। এখন তারা জান বাঁচিয়ে পালাবার রাস্তা খুঁজছে। তালেবানদের সাথেও তারা বার বার আলোচনায় বসেছে। দেড় বছরের মধ্য সকল সৈন্য অপসারণে বাধ্য হচ্ছে। পাশ্চাত্যের কাছে এখন এটি সুস্পষ্ট, আফগানিস্তান, ইরাক, ফিলিস্তিন, লেবানন, সোমালিয়ার মত ক্ষুদ্র দেশগুলো দখল করা এবং সেগুলোকে কন্ট্রোলে রাখার সামার্থ্য তাদের নেই। যে প্রতিরোধের মুখে তারা হারতে বসেছে সেটির মূল হাতিয়ার অত্যাধিক যুদ্ধাস্ত্র নয়, জনবল বা অর্থবলও নয়। বরং সেটি কোরআনী দর্শন ও ইসলামের সনাতন জিহাদী সংস্কৃতি। এ দর্শন ও সংস্কৃতিই মুসলমানের জন্য আত্মসমর্পণকে অসম্ভব ও অচিন্তনীয় করে তুলেছে। বরং অতি কাম্য গণ্য হচ্ছে আগ্রাসী শত্রুর বিরুদ্ধে আমৃত্যু লড়াই ও শাহাদত। এমন চেতনা এবং এমন সংস্কৃতির বলেই এক কালের মুসলমানেরা রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের ন্যায় দুটি বিশ্বশক্তিকে পরাজিত করেছিল। এ যুগেও তারা বিশ্বের সর্ববৃহৎ রাষ্ট্র ও বিশ্বশক্তি রাশিয়াকে পরাজিত করেছে। এবং এখন গলা চেপে ধরেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। কামান, বোমা ও যুদ্ধবিমানের বলে গণহত্যা চালানো যায়। নগর-বন্দরও ধ্বংস করা যায়। কিন্তু সে কামানে বা গোলায় কি দর্শন ও সংস্কৃতির বিনাশও সম্ভব? বরং তাদের আগ্রাসন ও গণহত্যায় প্রতিরোধের সে দর্শন ও সংস্কৃতিই দিন দিন আরো বলবান হচ্ছে।

 

কোন মার্কিনীকে রণাঙ্গণে রাখতে মাথাপিছু প্রায় ১০ লাখ ডলার খরচ হয়। অথচ মুসলমানরা হাজির হচ্ছে নিজ খরচে। তারা শুধু স্বেচ্ছাই অর্থই দিচ্ছে না, প্রাণও দিচ্ছে। অবস্থা বেগতিক দেখে পাশ্চাত্য এখন ভিন্ন স্ট্রাটেজী নিয়েছে। সেটি শুধু গণহত্যা নয়। নিছক নগর-বন্দর, ঘরবাড়ী এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের বিনাশও নয়। বরং সেটি ইসলামি দর্শন ও সংস্কৃতি ধ্বংসের। তাই শুরু করেছে প্রকান্ড আকারের সাংস্কৃতিক যুদ্ধ। নতুন এ স্ট্রাটেজীর আলোকে ইরাক ও আফগানিস্তানে তারা শুধু মানুষ হত্যাই করছে না,ঈমান হত্যাতে তৎপরহয়েছে। এবং সেটি শুধু আফগানিস্তান ও ইরাকে সীমিত নয়। বাংলাদেশের ন্যায় প্রতিটি মুসলিম দেশই এখন একই রূপ সাংস্কৃতিক যুদ্ধের শিকার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের লক্ষ্য, মুসলমানদের জীবন থেকে জিহাদের সংস্কৃতি বিলুপ্ত করা। সে লক্ষ্যে ইসলামি আদর্শকে ভূলিয়ে দেওয়া। তেমন এক স্ট্রাটেজী নিয়ে ব্রিটিশগণ ভারতে আলিয়া মাদ্রাসা খুলেছিল। আর এখন সে কাজে বাংলাদেশে ব্যবহার করতে চায় জনগণের অর্থে প্রতিষ্ঠিত স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়। সে সাথে ইসলামের বিরুদ্ধে শুরু হয়েছে ব্যাপক মিথ্যা-প্রপাগান্ডা। বলতে চায়, ইসলাম এ যুগে অচল। শরিয়তকে বলছে মানবতা বিরোধী। সে প্রপাগান্ডাকে ব্যাপকতর করতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে বহু টিভি চ্যানেল, অসংখ্য পত্র-পত্রিকা এবং হাজার হাজার এনজিও। এদের সম্মিলিত প্রচেষ্ঠা হলো, নবীজী (সাঃ)র আমলের ইসলামকে জনগণের মন থেকে ভূলিয়ে দেওয়া। অথচ ইসলাম থেকে নামায-রোযাকে যেমন আলাদা করা যায় না, তেমনি আলাদা করা যায় না জিহাদকেও। পবিত্র কোরআনে জিহাদে অংশ নেওয়ার নির্দেশ এসেছে বার বার। সে সব জিহাদে অর্ধেকের বেশী সাহাবা শহীদ হয়েছেন। নবীজী (সাঃ) নিজে রক্তাক্ষয়ী বহুযুদ্ধ লড়েছেন বহুবার। ইসলামের বহু শত্রুকে হত্যা এবং বনু কুরাইজা ও বনু নাযির ন্যায় ইহুদী বস্তিকে নির্মূল করা হয়েছে তাঁরই নির্দেশে। অথচ নবীজী (সাঃ)র সে আপোষহীন নীতি ও ইসলামের সে সংগ্রামী ইতিহাসকে তারা সুপরিকল্পিত ভাবে আড়াল করতে চায়। নামায-রোযা, হজ-যাকাতের বাইরেও শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি, প্রশাসন, প্রতিরক্ষা ও আইন-আদলতের সংস্কারে ঈমানদারের যে গুরুতর দায়ভার রয়েছে সেটিকেও ভূলিয়ে দিতে চায়।

ইসলামের আক্বিদা-বিশ্বাস ও জিহাদী সংস্কৃতি আজ এভাবেই দেশে দেশে শত্রুপক্ষের হামলার শিকার। তাদের লক্ষ্য, মহান আল্লাহর কোরআনী নির্দেশের বিরুদ্ধে মুসলমানদেরকে বিদ্রোহী করা। বাংলাদেশের মুসলমানদের জন্য বিপদের কারণ হলো, এরূপ হামলার মুখে দেশটির ভৌগলিক সীমান্তের ন্যায় সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক সীমান্তও আজ অরক্ষিত। অথচ মুসলমানদের দায়িত্ব শুধু দেশের সীমান্ত পাহারা দেওয়া নয়। বরং অতিগুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো, চেতনার রাজ্য পাহারা দেওয়া। এবং সেটি সুস্থ্য ঈমান-আক্বিদা ও ইসলামি সংস্কৃতি গড়ে তোলার স্বার্থে। সীমান্ত পাহারায় অবহেলা হলে অনিবার্য হয় পরাজয় ও গোলামী। তখন বিপন্ন হয় জানমাল ও ইজ্জত-আবরু। যেমনটি ১৯৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে হয়েছিল। সে পরাজয়ের ফলেই মুসলমানদের জীবনে নেমে এসেছিল ১৯০ বছরের ঔপনিবেশিক শাসনের দাসত্ব। একই রূপ ভয়ানক পরিণতি নেমে আসে সাংস্কৃতিক ময়দান অরক্ষিত হলে। তখন অসম্ভব হয় সুস্থ্য ঈমান-আক্বিদা নিয়ে বেড়ে উঠা। আর মুসলমানের কাছে জানমালের চেয়ে ঈমান ও আক্বিদার গুরুত্ব কি কম? ঈমান নিয়ে বাঁচা অসম্ভব হলে অর্থহীন হয় জীবনে বাঁচাটাই। সে বাঁচা তখন অনিবার্য করে জাহান্নামের আযাব। ভৌগলিক সীমান্তকে সুরক্ষিত করার চেয়েও তাই গুরুত্বপূর্ণ হলো ঈমান-আক্বিদার এ সীমান্তকে সুরক্ষিত করা। কারণ শয়তানী শক্তির সবচেয়ে বিনাশী হামলা হয় চেতনার এ মানচিত্রে। এটি অধিকৃত হলে দেশ দখল অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। প্রতিটি ঈমানদারকে তাই সে হামলার বিরুদ্ধে লাগাতর জিহাদ করতে হয়। সশস্ত্র যুদ্ধের রণাঙ্গন থেকে অন্ধ-বধির বা পঙ্গু ব্যক্তির নিষ্কৃতি আছে। কিন্তু চেতনার মানচিত্রে শয়তানী শক্তির আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক হামলার বিরুদ্ধে যে লাগাতর জিহাদ তা থেকে সামান্য ক্ষণের নিষ্কৃতি নেই। এ জিহাদকেই ইসলামে ‌জিহাদে আকবর বা শ্রেষ্ঠ জিহাদ বলা হয়েছে। রাজনৈতিক বা সামরিক ক্ষেত্রের লড়াইটি আসে তার পড়ে। বদর, ওহুদ ও খন্দকের যুদ্ধের আগে তেরটি বছর ধরে এ জিহাদ লাগাতর চলেছে মক্কায়। মুসলমানের চেতনা রাজ্যের ময়দানকে সুরক্ষিত রাখার স্বার্থেই অপরিহার্য হলো মুসলিম ভূমির ভৌগলিক মানিচিত্রকে সুরক্ষিত করা।

শুধু ঘরবাঁধা, চাষাবাদ করা বা কলকারখানা গড়াই একটি জনগোষ্টির বেঁচে থাকার জন্য সবকিছু নয়। শুধু পনাহারে জীবন বাঁচে বটে, তাতে ঈমান বাঁচে না। এমন বাঁচার মধ্য দিয়ে সিরাতুল মোস্তাকিমও জোটে না। তখন যা জুটে তা হলো পথভ্রষ্টতা। সে পথভ্রষ্টতায় বিপদাপন্ন হয় শুধু পার্থিব জীবনটাই নয়, অনন্ত অসীম কালের আখেরাতের জীবনও। ইহকাল ও পরকাল বাঁচাতে এজন্যই একজন চিন্তাশীল মানুষকে বেড়ে উঠতে হয় জীবন-বিধান, মূল্যবোধ, জীবন ও জগত নিয়ে একটি সঠিক ধারণা নিয়ে। মুসলমানের কাছে সে জীবন-বিধান হলো ইসলাম। আর নিত্যদিনের বাঁচবার সে প্রক্রিয়া হলো ইসলামী সংস্কৃতি। নামায-রোযা, হজ-যাকাত এবং জিহাদ হলো একজন ঈমানদারের ইবাদতের প্রক্রিয়া। আর সংস্কৃতি হলো এ জগতে বাঁচবার বা জীবনধারনের প্রক্রিয়া। ইসলামি পরিভাষায় এ প্রক্রিয়া হলো তাহজিব। আরবী ভাষায় তাহজিবের অর্থ হলো, ব্যক্তির কর্ম,রুচী, আচার-আচারণ, পোষাক-পরিচ্ছদ ও সার্বিক জীবন যাপনের প্রক্রিয়ায় পরিশুদ্ধি করণের প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মানুষ রিফাইনড হয় তথা সুন্দরতম হয়। দিন দিন সুন্দরতম হয় তার রুচীবোধ, আচার-আচরণ, কাজকর্ম ও চরিত্র। তাই মুসলমানের ইবাদত ও সংস্কৃতি -এ দুটোকে পৃথক করা যায় না। উভয়ের মধ্যেই প্রকাশ পায় আল্লাহতায়ালার কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়া গভীর প্রেরণা ও প্রচেষ্টা। পাখি যেমন তার দুটো ডানার একটিকে হারালে উড়তে পারে না, ঈমানদারও তেমনি আল্লাহর ইবাদত ও ইসলামী সংস্কৃতিও একটি হারালে মুসলমান রূপে বেড়ে উঠতে পারে না। তাই মুসলমানগণ যেখানে রাষ্ট্র গড়েছে সেখানে শুধু মসজিদ-মাদ্রাসাই গড়েনি, ইসলামি সংস্কৃতিও গড়েছে। একটির পরিশুদ্ধি ও শক্তি আসে অপরটি থেকে। মোমেনের মূল্যবোধ, রুচী্বোধ, পানাহার, পোষাকপরিচ্ছদ, অপরের প্রতি ভালবাসার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় তার আল্লাহভীরুতা। অন্যের কল্যাণে সচেষ্ট হয় স্বার্থ চেতনায় নয়, বরং আল্লাহর কাছে প্রিয়তর হওয়ার চেতনায়। এ হলো তার সংস্কৃতি। এমন সংস্কৃতি থেকে সে পায় ইবাদতের স্পিরিট। ঈমানদারে চিন্তুা ও কর্মে এভাবেই আসে পবিত্রতা -যা একজন কাফের বা মোনাফিকের জীবনে কল্পনাও করা যায় না। মুসলিম সমাজে এভাবেই আসে শান্তি, শৃঙ্খলা ও শ্লিলতা। অথচ সেকুলার সমাজে সেটি আসে না। সেকুলার সমাজে যেটি প্রবলতর হয় সেটি পার্থিব স্বার্থ হাসিলের প্রেরণা। মানুষ এখানে জীবনের উপভোগে স্বেচ্ছাচারি হয়। সে স্বেচ্ছারকে তারা ব্যক্তি-স্বাধীনতার লেবাস পড়িয়ে জায়েজ করে নিতে চায়। সেকুলার সমাজে পতিতাবৃত্তি, ব্যভিচার, সমকামিতা, অশ্লিলতা, মদ্যপাণের ন্যায় নানাবিধ পাপাচার বৈধ্যতা পায় তো জীবন উপভোগের এমন স্বেচ্ছাচারি প্রেরণা থেকেই। ফলে সেকুলারিজম যেখানে প্রবলতর হয় সেখানে পাপাচারেও প্লাবন আসে।

অথচ মুসলমান ইবাদতে প্রেরণাও পায় তার সংস্কৃতি থেকে। ফলে স্কুল-কলেজ বা মাদ্রাসায় না গিয়েও মুসলিম সমাজে বসবাসকারি যুবক তাই মসজিদে যায়, নামায পড়ে, রোযা রাখে এবং মানুষের কল্যাণ সাধ্যমত চেষ্টাও করে। সীমান্তের প্রতিরক্ষায় বা শরিয়তের প্রতিষ্ঠায় জিহাদের ময়দানেও হাজির হয়। একাজে শুধু শ্রম-সময়-মেধা নয়, জানমালের কোরবানীও দেয়। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বা মাদ্রাসার ডিগ্রিধারি না হয়েও নিজেকে বাঁচায় বেপর্দা, ব্যাভিচার, অশ্লিলতা,চুরি-ডাকাতি, সন্ত্রাস-কর্ম ও নানা বিধ পাপাচার থেকে। প্রাথমিক কালের মুসলমানগণ যে মানব-ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সভ্যতার জন্ম দিতে পেরেছিলেন সেটি এজন্য নয় যে সেদিন বড় বড় কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বা মাদ্রাসা ছিল। বরং তখন প্রতিটি ঘর পরিণত হয়েছিল শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠান। সমগ্র রাষ্ট্র জুড়ে গড়ে উঠেছিল ইসলামী সংস্কৃতির বিশুদ্ধকরণ প্রক্রিয়া। সে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সেদিনের মুসলমানেরা উন্নত মানব রূপে বেড়ে উঠতে পেরেছিলেন।

বাংলাদেশের ন্যায় অধিকাংশ মুসলিম দেশের আজকের বড় সমস্যা এ নয় যে, দেশগুলি অধিকৃত হয়েছে। বরং সবচেয়ে বড় সমস্যা এবং সে সাথে ভয়ানক বিপদের কারণ হলো,দেশগুলির সাংস্কৃতিক সীমান্ত বিলুপ্ত হয়েছে এবং তা অধিকৃত হয়েছে ইসলামের শত্রুপক্ষের দ্বারা। দেশের সীমান্ত বিলুপ্ত না হলেও মুসলিম দেশগুলির সংস্কৃতির ময়দান শত্রু পক্ষের দখলে গেছে। ফলে এদেশগুলিতেও তাই হচ্ছে যা কাফের কবলিত একটি দেশে হয়ে থাকে। মুসলিম দেশের সংস্কৃতিও পরিনত হয়েছে মানুষকে আল্লাহর অবাধ্য রূপে গড়া তোলার ইন্সটিটিউশনে। এর ফলে বাংলাদেশের হাজার হাজার মুসলিম সন্তান মসজিদে না গিয়ে হিন্দুদের ন্যায় মঙ্গলপ্রদীপ হাতে নিয়ে শোভাযাত্রা করছে। কপালে তীলক পড়ছে, নাচগানও করছে। যুদ্ধাংদেহী রূপ তাদের শরিয়তের প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে।

ব্যক্তির জীবনে প্রতিটি পাপ, প্রতিটি দুর্বৃত্তি, আল্লাহর হুকুমের প্রতিটি অবাধ্যতাই হলো আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। সে বিদ্রোহ ও অবাধ্যতা প্রকাশ পায় বেপর্দা, ব্যাভিচার, অশ্লিলতা, মদ্যপান, মাদকাশক্তি, সন্ত্রাস, দূর্নীতি ইত্যাদীর ব্যাপক বৃদ্ধিতে। জাতীয় জীবনে সেটি প্রকাশ পায় দেশে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা, সূদমূক্ত ব্যাংক ও অর্থনীতি প্রতিষ্ঠিত না হওয়ার মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের মত একটি মুসলিম দেশ আল্লাহর বিরুদ্ধে সে বিদ্রোহে সমগ্র বিশ্বমাঝে একবার নয়, ৫ বার শিরোপে পেয়েছে। সে বিদ্রোহ ঘটেছে আল্লাহ-প্রদির্শিত সুনীতির স্থলে দূর্নীতির মধ্য দিয়ে। এরূপ বার বার শিরোপা লাভই বলে দেয় দেশটির মানুষের জীবনযাত্রার প্রক্রিয়া বা সংস্কৃতি কতটা অসুস্থ্য ও বিদ্রোহাত্মক।

ব্যক্তির সংস্কৃতির পরিচয় মেলে কীভাবে পোষাক-পরিচ্ছদ পড়লো বা পানাহার করলো তা থেকে নয়। বরং কীরূপ দর্শন বা চেতনা নিয়ে সে বাঁচলো তা থেকে। সংস্কৃতির মূল উপাদান হলো এটি। দর্শনই মানুষকে পশু থেকে পৃথক করে। নাচগান পশুপাখিও করে। কিন্তু তাতে কোন দর্শন থাকে না। তাই পশুপাখির নাচে-গানে কোন সমাজই সভ্যতর হয় না, সেখানে সভ্যতাও নির্মিত হয় না। তাই যে সমাজের সংস্কৃতি যতটা দর্শন-শূন্য সমাজ ততটাই মানবতা বর্জিত। সে সমাজ তখন ধাবিত হয় পশুত্বের দিকে। দর্শনই নির্ধারণ করে দেয় কে কীভাবে বাঁচবে, কীভাবে পানাহার করবে, কীভাবে জীবন যাপন করবে বা উৎসব করবে সেটি। চেতনার এ ভিন্নতার কারণেই একজন পতিতা, ঘুষখোর, সন্ত্রাসী এবং দুর্বৃত্তের বাঁচার ধরণ,পোষাক-পরিচ্ছদ, পানাহার ও উৎসবের ধরণ ঈমানদারের মত হয় না। মুসলমানের সংস্কৃতি এজন্যই অবিশ্বাসী বা কাফেরের সংস্কৃতি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। একটি বিশেষ বিশ্বাস বা দর্শন জন্ম দেয় একটি বিশেষ রুচী ও সে রুচীভিত্তিক অভ্যাস। সে অভ্যাসের কারণেই ব্যক্তি বেড়ে উঠে সে সংস্কৃতির মানুষ রূপে। সংস্কৃতি এভাবেই সমাজে নীরবে কাজ করে। মুসলিম সমাজ থেকে সৎ নামাযী ও রোযাদারের পাশাপাশী আপোষহীন মোজাহিদ বের হয়ে আসে তা তো সংস্কৃতির সে ইন্সটিটিউশন সক্রিয় থাকার কারণেই। যেখানে সেটি নেই, বুঝতে হবে সেখানে সে পূণ্যময় সংস্কৃতিও নাই।

মুসলমানদের শক্তির মূল উৎস তেল-গ্যাস নয়, জনশক্তিও নয়। সে শক্তি হলো কোরআন ভিত্তিক দর্শন ও সে দর্শন-ভিত্তিক সংস্কৃতি। এজন্যই শত্রুপক্ষের আগ্রাসনের শিকার শুধু মুসলিম দেশের ভূগোল নয়, বরং মূল টার্গেট হলো ইসলামি দর্শন ও সংস্কৃতি। তাই পাশ্চাত্য শক্তিবর্গ বাংলাদেশের মত দেশে বোমা বা যুদ্ধ বিমান নিয়ে হাজির হয়নি। হাজির হয়েছে সাংস্কৃতিক প্রকল্প নিয়ে। বাংলাদেশের হাজার হাজার এনজিওর উপর দায়িত্ব পড়েছে সে প্রকল্পকে কার্যকর করা। দেশের সংস্কৃতিকে তারা এভাবে ইসলামের শিক্ষা ও দর্শন থেকে মূ্ক্ত করতে চাচ্ছে। রাস্তায় মাটি কাটা ও তূত গাছ পাহাড়া দেওয়াকে মহিলার ক্ষমতায়ন বলে এসব এনজিওগুলো তাদেরকে বেপর্দা হতে বাধ্য করছে। অপর দিকে মাইক্রোক্রেডিটের নামে সাধারণ মানুষকে সূদ দিতে ও সূদ খেতেও অভ্যস্থ করছে। অথচ সূদ খাওয়া বা সূদ দেওয়া –উভয়ই হলো আল্লাহতায়ালার বিধানের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট বিদ্রোহ। ডক্টর ইউনুসকে পাশ্চাত্য মহল নোবেল প্রাইজ দিয়েছে। সেটি এজন্য নয় যে, বাংলাদেশ থেকে তিনি দারিদ্র্য নির্মূল করেছেন। বরং দেশে যতই বাড়ছে গ্রামীন ব্যাংক, ব্রাক বা সূদ ভিত্তিক মাইক্রোক্রেডিট এনজিওর শাখা ততই বাড়ছে দারিদ্র্য। ডক্টর ইউনুস নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন এজন্য যে, আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে বিদ্রোহ করতে তিনি অসামান্য সাফল্য দেখিয়েছেন।

ইসলামের বিরুদ্ধে পাশ্চাত্যের চলমান যুদ্ধের মূল এজেন্ডা কি সেটি বুঝা যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের আফগানিস্তান দখল ও সেখানে চলমান কার্যক্রম থেকে। পাশ্চাত্য শক্তিবর্গ সেখানে মুসলিম সংস্কৃতির বিনাশে হাত দিয়েছে। আফগানিস্তানের অপরাধ, অতীতে দেশটির জনগণ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও সোভিয়েত সাম্রাজ্যবাদের ন্যায় দুটি বিশ্বশক্তিকে পরাজিত করেছে। এবং সেটি কোন জনশক্তি, সামরিক শক্তি বা অর্থনৈতিক শক্তির বলে নয়, বরং ইসলামি দর্শন ও সে দর্শন-নির্ভর আপোষহীন জিহাদী সংস্কৃতির কারণে। সে অভিন্ন দর্শন ও দর্শনভিত্তিক সংস্কৃতির বলেই তারা আজ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার মিত্রদের পরাজিত করতে চলেছে। ফলে পাশ্চাত্য শক্তিবর্গ সে দর্শন ও সে দর্শন-ভিত্তিক সংস্কৃতির নির্মূলে করতে চায়। এবং সে বিনাশী কর্মের পাশাপাশি বিপুল বিণিয়োগ করছে সেদেশে সেকুলার দর্শন ও সেকুলার সংস্কৃতির নির্মানে। এটিকে তারা বলছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বা অবকাঠামোর নির্মান। পরিকল্পিত ভাবে গড়ে তুলছে অসংখ্য সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। এগুলোর কাজ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা আজ যা করছে সেগুলোকেই অব্যাহত রাখা।

বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মিশরের মত দেশে অতীতে এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সফলতা পেয়েছিল ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকেরা। এদেশগুলির উপর তাদের দীর্ঘ শাসনমামলে তেমন কোন শিল্প কলকারখানা বা প্রযুক্তি গড়ে না উঠলেও তারা সেসব দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে সেকুলার করেছিল। ফলে এনেছে সাংস্কৃতিক জীবনে প্রচন্ড বিচ্যুতি ও বিভ্রান্তি। সেকুলারলিজমের অভিধানিক অর্থ হলো ইহজাগতিকতা। সেকুলারিজমের অর্থ, ব্যক্তি তার কাজ-কর্ম, অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে প্রেরণা পাবে ইহজাগতিক আনন্দ-উপভোগের তাগিদ থেকে, ধর্ম থেকে নয়। এ উপভোগ বাড়াতেই সে নাচবে, গাইবে, বেপর্দা হবে, অশ্লিল নাটক ও ছায়াছবি দেখবে। সে মদ্যপান করবে এবং ব্যাভিচারিতেও লিপ্ত হবে। উপার্জন বাড়াতে সে সূদ খাবে এবং ঘুষও খাবে। এগুলো ছাড়া তাদের এ পার্থিব জীবন আনন্দময় হয় কি করে? তাই সেকুলারিজম বাড়লে এগুলো বাড়বে অনিবার্য কারণেই। অপর দিকে ধর্মের প্রতি আসক্তিকে বলেছে মৌলবাদী পশ্চাদ-পদতা ও গোঁড়ামী।

মুসলিম দেশে এমন চেতনা ও এমন সংস্কৃতির বৃদ্ধি পেলে জনগণের মন থেকে আল্লাহতায়ালার ভয়ই বিলুপ্ত হয়। মুসলমানগণ তখন ভূলে যায় নিজেদের ঈমানী দায়বদ্ধতা। বরং বাড়ে মহান আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের প্রবনতা। ফলে বাংলাদেশ, মিশর, পাকিস্তান বা তুরস্কের মত দেশে আল্লাহর আইন তথা শরিয়ত প্রতিষ্ঠা রুখতে কোন কাফেরকে অস্ত্র ধরতে হয়নি। সেকাজের জন্য বরং মুসলিম নামধারি সেকুলারগণই যথেষ্ঠ করিৎকর্মা প্রমাণিত হয়েছে। ইসলামের জাগরণ ও মুসলিম শক্তির উত্থান রুখার লক্ষ্যে আজও দেশে দেশে পাশ্চত্যের অনুগত দাস গড়ে তোলার এটিই সফল মডেল। মার্কিন দখলদার বাহিনী সেটিরই বাস্তবায়ন করছে আফগানিস্তানে। এ স্ট্রাটেজীক কৌশলটির পারঙ্গমতা নিয়ে ব্রিটিশ শাসকচক্রের মনে কোন রূপ সন্দেহ ছিল না। যেখানে অধিকার জমিয়েছে সেখানেই এরূপ সেকুলারদেরকেই সযত্নে গড়ে তুলেছে। তাদের সংখ্যা পর্যাপ্ত সংখ্যায় বাড়াতে যেখানে দেরী হয়েছে সেদেশের স্বাধীনতা দিতেও তারা বিলম্ব করেছে। সে ব্রিটিশ পলিসির পরিচয়টি মেলে মিশরে ব্রিটিশ শাসনের প্রতিনিধি লর্ড ক্রোমারের লেখা থেকে। তিনি লিথেছেন, “কোন ব্রিটিশ উপনিবেশকে স্বাধীনতা দেওয়ার প্রশ্নই উঠেনা যতক্ষণ না সে দেশে এমন এক সেকুলার শ্রেণী গড়ে উঠে যারা চিন্তা-চেতনায় হবে ব্রিটিশের অনুরূপ।” ব্রিটিশ পলিসি যে এক্ষেত্রে কতটা ফলপ্রসু হয়েছে তার প্রমাণ মিলে বাংলাদেশের মত সাবেক ব্রিটিশ উপনিবেশগুলোর প্রশাসন, রাজনীতি, সেনাবাহিনী ও বিচার ব্যবস্থায় সেকুলার ব্যক্তিদের প্রবল আধিপত্য দেখে। আজও আইন-আদালতে ব্রিটেশের প্রবর্তিত পেনাল কোড। বাংলাদেশের সেকুলার সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাগণ মুসলিম দেশের জনগণের রাজস্বের অর্থে প্রতিপালিত হলে কি হবে, দেশে যারা শরিয়ত বা আল্লাহর আইনের প্রতিষ্ঠা চায় তাদেরকে তারা ব্রিটিশদের ন্যায়ই শত্রু মনে করে। আর বিশ্বস্থ্য আপনজন মনে করে ভিন্ দেশী কাফেরদের। এদের কারণেই অধিকৃত  মুসলিম দেশে হামিদ কারজাইয়ের মত দাস পেতে ইসলামের শত্রুপক্ষের কোন বেগ পেতে হয় না।

ইসলামি দর্শন থেকে দূরে সরানো এবং মগজে সেকুলার চেতনার পরিচর্যা দেওয়ার লক্ষে বাংলাদেশের মত দেশে সেকুলার দিনক্ষণকে ইতিহাস থেকে খুঁজে বের করে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দিচ্ছে। এরই উদাহরণ, বাংলাদেশের মত দেশে বসন্তবরণ বা নববর্ষের দিন উদযাপন। নবীজীর হাদীস, মুসলমানের জীবনে বছরে দুটি উৎসব। একটি ঈদুল ফিতর, এবং অপরটি ঈদুল আদহা বা কোরবানীর ঈদ। বাংলার মুসলমানগণ এ দুটো দিনই এতদিন ধুমধামে উদযাপন করে আসছে। বাংলার মুসলমানদের জীবনে নববর্ষের উৎসব কোন কালেই গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। এর কারণ, তাদের ভিন্নতর বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি যা একজন কাফের বা সেকুলার থেকে ভিন্ন। মুসলমানের জীবনে সে ভিন্নতর মূল্যায়ন আসে এ জীবন নিয়ে মহান আল্লাহর নিজস্ব মূল্যায়ন থেকে। এ বিষয়ে মহান আল্লাহর নিজস্ব ঘোষণাটি হলো, “তিনিই (আল্লাহতায়ালা) জীবন ও মৃত্যুকে সৃষ্টি করেছেন যেন পরীক্ষা করতে পারেন তোমাদের মধ্যে কে কর্মে উত্তম।” -সুরা মুলুক। অর্থাৎ মানুষের জন্য এ পার্থিব জীবন পরীক্ষার হল মাত্র। পরীক্ষার হলে বসে কেউ কি নাচগান করে না। উৎসবও বসায় না। নাচগান বা উৎসবের আয়োজন তো পরীক্ষার হলে মনযোগী হওয়াই অসম্ভব করে তোলে। এব্যাপারে নবীজীর হাদীস, “পানি যেমন শস্য উৎপাদন করে, গানও তেমনি মুনাফেকি উৎপন্ন করে।” প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের হাতে মুসলমানদের শক্তি ও মর্যাদা বাড়লেও নাচগান বাড়েনি। সংস্কৃতির নামে এগুলো শুরু হলে যেটি বাড়ে তা হলো পথভ্রষ্টতা। তখন সিরাতুল মোস্তাকিমে পথচলাই অসম্ভব হয়ে উঠে। তাই এগুলো শয়তানের স্ট্রাটেজী হতে পারে, কোন মুসলমানের নয়।

নতুন বছর, নতুন মাস, নতুন দিন নবীজী(সাঃ)র আমলেও ছিল। কিন্তু তা নিয়ে তিনি নিজে যেমন কোনদিন উৎসব করেননি, সাহাবাগণও করেননি। অথচ তারাই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা ও সংস্কৃতি গড়তে পেরেছিলেন। নবীজী (সাঃ) ও সাহাবাগান এ ব্যাপারে অতিশয় মনযোগী ছিলেন যেন শিক্ষা ও সংস্কৃতির নামে সমাজ বা রাষ্ট্রে এমন কিছুর চর্চা না হয় যাতে সিরাতুল মোস্তাকিমে চলাই অসম্ভব হয়। এবং মনযোগে ছেদ পড়ে ধর্মের পথে পথচলায়। ড্রাইভিং সিটে বসে নাচগানে মত্ত হলে সঠিক ভাবে গাড়ী চালানো যায়? এতে বিচ্যুতি ও বিপদ তো অনিবার্য। অবিকল সেটি ঘটে জীবন চালোনার ক্ষেত্রেও। নবীজী(সাঃ)র আমলে সংস্কৃতির নামে আনন্দ উপভোগের প্রতি এত আকর্ষণ ছিল না বলেই সিরাতুল মোস্তাকিমে চলা তাদের জন্য সহজতর হয়েছিল। বরং তারা জন্ম দিয়েছিলেন মানব-ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম সংস্কৃতির। সে সংস্কৃতির প্রভাবে একজন ভৃত্যও খলিফার সাথে পালাক্রমে উঠের পিঠে চড়েছেন। এবং খলিফা ভৃত্যকে উঠের পিঠে বসিয়ে নিজে রশি ধরে টেনেছেন। সমগ্র মানব ইতিহাসে এর কোন তুলনা নেই। অথচ বাংলাদেশে আজ সংস্কৃতির নামে কি হচ্ছে? ২০১০ সালে এপ্রিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা নববর্ষের কনসার্টে কী ঘটলো? যৌন ক্ষুধায় অতি উদভ্রান্ত অসংখ্য হায়েনা কি সেদিন নারীদের উপর ঝাপিয়ে পড়িনি? অসংখ্য নারী কি সেদিন লাঞ্ছিত হয়নি? কিছুদিন আগে ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে ব্যান্ড সঙ্গীতের আসরে কী ঘটলো? শত শত নারী কি সেদিন ধর্ষিতা হয়েছিল শত শত নারী। এটিই কি বাঙালী সংস্কৃতি? দেশের সেকুলার পক্ষ এমন সংস্কৃতির উৎকর্ষতা চায়?

নববর্ষ উদযাপনের নামে নারী-পুরুষদের মুখে উলকি কেটে বা নানান সাজে একত্রে রাস্তায় নামানোর রীতি কোন মুসলিম সংস্কৃতি নয়। বাঙালীর সংস্কৃতিও নয়। এমনকি বাঙালী হিন্দুদেরও নয়। নববর্ষে নামে বাংলায় বড়জোর কিছু হালখাতার অনুষ্ঠান হতো। কিন্তু কোন কালেই এদিনে কনসার্ট গানের আয়োজন বসেনি। জন্তু-জানোয়ারের প্রতিকৃতি নিয়ে মিছিলও হয়নি। পাশ্চাত্যেও নববর্ষের দিনে এমন উৎসব দিনভর হয় না। বাংলাদেশে এগুলীর এত আগমন ঘটেছে নিছক রাজনৈতিক ও আদর্শিক কারণে। যুদ্ধজয়ের লক্ষ্যে অনেক সময় নতুন প্রযুক্তির যুদ্ধাস্ত্র সৈনিকদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। অনেক সময় তাতে বিজয়ও আসে। মুসলমানদের বিরুদ্ধে পরিচালিত এ সাংস্কৃতিক যুদ্ধে সংস্কৃতির নামে এসব অভিনব আয়োজন বাড়ানো হয়েছে তেমনি এক ত্বড়িৎ বিজয়ের লক্ষ্যে। তাদের লক্ষ্য নাচ-গান, কনসার্টের নামে জনগণকে ইসলাম থেকে দূরে সরানো। বিপুল সংখ্যক নারী-পুরুষ নিয়ে নতুন ঢংযের এসব আয়োজন বাড়ানো হয়েছে তেমনি এক ষড়যন্ত্রমূলক প্রয়োজনে। পাশ্চাত্যের যুবক-যুবতীদের ধর্ম থেকে দূরে টানার প্রয়োজন নেই। জন্ম থেকেই তারা ধর্ম থেকে দূরে। নাচগান, মদ, অশ্লিলতা, উলঙ্গতা ও ব্যভিচারের মধ্য দিয়েই তাদের বেড়ে উঠা। তাই নববর্ষের নামে তাদের মাঝে এ সবে অভ্যস্থ করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু সেটির প্রয়োজন রয়েছে বাংলাদেশে। সেটি ধর্ম থেকে ও নিজেদের সংস্কৃতি থেকে দূরে সরানোর লক্ষ্যে। এসবের চর্চা বাড়াতে কাজ করছে প্রচুর দেশী-বিদেশী এনজিও। এমন অনুষ্ঠানে বিপুল অর্থ ব্যয়ও হচ্ছে। এবং সে অর্থ আসছে বিদেশীদের ভান্ডার থেকে। এভাবে নারীপুরুষের অবাধ মেলামেশার পাশপাশি অশ্লিলতারও সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এবং লুপ্ত করা হচেছ ব্যভিচার ও অশ্লিলতাকে ঘৃণা করার অভ্যাস, -যা পাশ্চাত্য থেকে বহু আগেই বিলুপ্ত হয়েছে।

শুধু বাংলাদেশে নয়, অন্যান্য মুসলিম দেশেও এরূপ নববর্ষ পালনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অধিকাংশ পাশ্চাত্য দেশ বিপুল অংকের অর্থ সাহায্য দিচ্ছে। ইরানী-আফগানী-কিরগিজী-কুর্দীদের নওরোজ উৎসবের দিনে প্রেসিডেন্ট ওবামা বিশেষ বানীও দিয়েছে। তবে নববর্ষের নামে বাংলাদেশে ইসলামের শত্রুপক্ষের বিণিয়োগের মাত্রাটি আরো বিচিত্র ও ব্যাপক। এখানে বানী নয়, আসছে বিপুল বিণিয়োগ। কারণ, বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৫ কোটি। আফগানিস্তানের চেয়ে প্রায় ৫ গুণ। জনসংখ্যার ৯০% ভাগ মুসলমান, যাদের আপনজনেররা ছড়িয়ে আছে ব্শ্বিজুড়ে। ফলে এদেশে ইসলামের দর্শন প্রচার পেলে তা ছড়িয়ে পড়বে বিশ্বময়। এ বিশাল জনগণকে ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে সেকুলার সংস্কৃতিতে বশ করানো তাদের কাছে তাই অতিগুরুত্বপূর্ণ। তারা চায় এ পৃথিবীটা একটি মেল্টিং পটে পরিণত হোক। আলু-পটল, পেঁয়াজ-মরিচ যেমন চুলার তাপে কড়াইয়ে একাকার হয়ে যায়, তেমনি বিশ্বের সব সংস্কৃতির মানুষ একক সংস্কৃতির মানুষের পরিণত হোক। এভাবে নির্মিত হোক গ্লোবাল ভিলেজ। আর সে গ্লোবাল ভিলেজের সংস্কৃতি হবে পাশ্চাত্যের সেকুলার সংস্কৃতি। এজন্যই বাংলাদেশে নারী-পুরুষকে ভ্যালেন্টাইন ডে, বর্ষপালন,মদ্যপান, অশ্লিল নাচ, পাশ্চাত্য ধাঁচের কনসার্টে অভ্যস্থ করায় এসব এনজিওদের এত আগ্রহ। তারা চায় তাদের সাংস্কৃতিক সীমানা বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশের প্রতি বসতঘরের মধ্যেও বিস্তৃত হোক। তাই বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সীমানা আজ বিলুপ্ত।

কিন্তু আরো বিপদের কারণ, এতবড় গুরুতর বিষয় নিয়ে ক’জনের দুশ্চিন্তা? কোন পরিবারে কেউ মৃত্যুশর্যায় পড়লে সে পরিবারে দুশ্চিন্তার অন্ত থাকে না। আর শয্যাশায়ী সমগ্র বাংলাদেশ ও তার সংস্কৃতি। অথচ ক’জন আলেম, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ,শিক্ষাবিদ ও লেখক এ বিষয় নিয়ে উদ্বিগ্ন। ক’জন মুখ খুলেছেন বা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন? ১৭৫৭ সাল থেকে বাংলার মুসলমান কি সামান্যতমও সামনে এগিয়েছে? তখন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ব্রিটিশের দখলদারি। অস্তমিত হয়েছিল বাংলার মুসলমানদের স্বাধীনতা। কিন্তু সে পরাধীনতা বিরুদ্ধে কোন জনপদে, কোন গ্রাম-গঞ্জে কোন রূপ প্রতিরোধ বা বিদ্রোহের ধ্বনি উঠেছিল -সে প্রমাণ নেই। বরং যে যার কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ততা থেকেছে। দেশের স্বাধীনতা নিয়ে কিছু ভাবা বা কিছু করার প্রয়োজনীয়তা কেউ অনুভব করেনি। অথচ শত্রুর হামলার মুখে প্রতিরোধের এ দায়ভার প্রতিটি মুসলমানের। এ কাজ শুধু বেতনভোগী সৈনিকের নয়। প্রতিটি নাগরিকের। ইসলামে এটি জিহাদ। মুসলমানদের গৌরব কালে এজন্য কোন সেনানীবাস ছিল না। প্রতিটি গৃহই ছিল সেনানীবাস। প্রতিটি যুদ্ধে মানুষ স্বেচ্ছায় সেখান থেকে যুদ্ধে গিয়ে হাজির হয়েছে। অথচ আজ সেনানীবাস বেড়েছে অথচ হামলার মুখে কোন প্রতিরোধ নেই। জিহাদ নেই দেশের সাংস্কৃতিক সীমানার রক্ষার কাজেও।

সাংস্কৃতিক সীমানা রক্ষার লড়ায়ে পরাজিত হলে পরাজিত হতে হয় ঈমান-আক্বীদা রক্ষার লড়ায়েও। কারণ, মুসলমানে ঈমান-আক্বীদা কখন অনৈসলামিক সাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে উঠে না। মাছের জন্য যেমন পানি চাই, ঈমান নিয়ে বাঁচার জন্যও তেমনি ইসলামি রাষ্ট্র ও ইসলামি সংস্কৃতি চাই। মুসলমান তাই শুধু কোরআন পাঠ ও নামায-রোযা আদায় শুধু করেনি, ইসলামি রাষ্ট্র এবং সে রাষ্ট্রে শরিয়ত ও ইসলামি সংস্কৃতিরও প্রতিষ্ঠা করেছে। মুসলমানদের অর্থ, রক্ত, সময় ও সামর্থের সবচেয়ে বেশী ভাগ ব্যয় হয়েছে তো ইসলামি রাষ্ট্র ও ইসলামি শিক্ষা-সংস্কৃতির নির্মানে। নামায রোযার পালন তো কাফের দেশেও সম্ভব। কিন্তু ইসলামী শরিয়ত ও ইসলামী সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠা ও পরিচর্যা তথা ইসলামী বিধানের পূর্ণ পালন কি অমুসলিম দেশে সম্ভব? অতীতের ন্যায় আজকের মুসলমানদের উপরও একই দায়ভার। সেটি শুধু কলম-সৈনিকের নয়, প্রতিটি আলেম, প্রতিটি শিক্ষক, প্রতিটি ছাত্র ও প্রতিটি নাগরিকের উপরও। এ লড়ায়ে তাদেরকেও ময়দানে নেমে আসতে হবে। এবং এ লড়াই হতে হবে কোরআনী জ্ঞানের তরবারী দ্বারা। নবীজী (সাঃ)র যুগে সেটিই হয়েছে। ইসলামে জ্ঞানার্জনকে এজন্যই নামায-রোযার আগে ফরয করা হয়েছে। কিন্তু সে ফরয পালনের আয়োজনই বা কোথায়? অনেকেই জ্ঞানার্জন করছেন নিছক রুটিরুজির তালাশে। ফরয আদায়ের লক্ষে নয়। প্রচন্ড শূণ্যতা ও বিচ্যুতি রয়েছে জ্ঞানার্জনের নিয়তেই। ফলে সে জ্ঞানচর্চায় তাদের রুটি-রুজী জুটছে ঠিকই, কিন্তু সে জ্ঞানার্জনে ফরয আদায় হচ্ছে না। এবং জিহাদের ময়দানে বাড়ছে না লোকবল। বাংলাদেশের মুসলমানদের জন্য এটি এক বিপদজনক দিক। আগ্রাসী শত্রুর হামলার মুখে অরক্ষিত শুধু দেশটির রাজনৈতিক সীমান্তুই নয়, বরং প্রচন্ড ভাবে অরক্ষিত দেশের সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক সীমান্তও। দেশ তাই দ্রুত ধেয়ে চলেছে সর্বমুখি পরাজয় ও প্রচন্ড বিপর্যের দিকে।

 




অশিক্ষা ও কুশিক্ষার নাশকতা – প্রথম পর্ব

শিক্ষার কুফল –
মানব জীবনের মূল সাফল্যটি স্রেফ মনুষ্য প্রাণী রূপে বাঁচায় নয়। সেটি পরিপূর্ণ ঈমানদার রূপে বাঁচায়। আর ঈমানের পুষ্টি কখনোই খাবারের প্লেটে, সম্পদে বা ঔষধে মেলে না। সেটি আসে পবিত্র কোরআনের জ্ঞানে। ফলে কোরআনের জ্ঞানের শূন্যতা নিয়ে যে শিক্ষা তার কুফলটি অতি ভয়ংকর। এমন শিক্ষাই মূলতঃ কুশিক্ষা। এমন কুশিক্ষার ফলেই মানব শিশু অতি হিংস্র ও ইতর দুর্বৃত্তে পরিণত হয়। সে কুশিক্ষা পরকালে জাহান্নামের আগুনেও হাজির করে। মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বড় ক্ষতিগুলো কোন কালেই হিংস্র পশু, রোগজীবাণু, ঘুর্ণিঝড়, ভূমিকম্প বা সুনামীর কারণে হয়নি। সে বীভৎস বর্বরতাগুলো ঘটেছে এমন সব দুর্বৃত্তদের হাতে যারা বেড়ে উঠেছে অশিক্ষা ও কুশিক্ষার মধ্য দিয়ে। তাই মানব সমাজে সবচেয়ে বড় নেক কর্মটি অর্থদান, খাদ্যদান বা চিকিৎসা-দান নয়, সেটি সুশিক্ষা-দান। এবং সবচেয়ে জঘন্য অপরাধ কর্মটি হলো কুশিক্ষা-দান। কুশিক্ষার কারণে মানব সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়ে যায়। কুশিক্ষিত সে ইতর মানুষটি মহান আল্লাহতায়ালার খলিফা হওয়ার বদলে শয়তানের খলিফায় পরিণত হয়। মুসলিম রূপে বেড়ে উঠা দূরে থাক, সাধারণ মানুষ রূপে বেড়ে উঠাও তার পক্ষে অসম্ভব হয়। কুশিক্ষা এভাবেই মানব জীবনে সবচেয়ে বড় নাশকতাটি ঘটায়। এমন ব্যক্তির দেহের পুষ্টিতে নাশকতা বাড়ে ইসলামের বিরুদ্ধে। অপর দিকে শত কোটি টাকা দানেও কাউকে জাহান্নামের আগুণ থেকে বাঁচানো যায় না। দানের অর্থ গুনাহের কাজে বিনিয়োগ করে সে ব্যক্তি বরং জাহান্নামের বাসিন্দা হতে পারে। এজন্যই মহান আল্লাহর সূন্নত, তিনি যখন কারো সবচেয়ে বড় কল্যানটি করেন, তাকে পবিত্র কোরআনের জ্ঞান দান করেন।

কোরআনী জ্ঞান ব্যক্তিকে যেমন মানব-সৃষ্টির মূল রহস্যটি জানায়, তেমনি জানায় মানব-জীবনের মূল মিশনটি। এভাবে সে জ্ঞান যেমন প্রকৃত মানব রূপে বেড়ে উঠতে সাহায্য করে, তেমনি পদে পদে জান্নাতের পথও দেখায়। সে জ্ঞানের বরকতেই মানুষ জাহান্নামের পথে ধাবিত হওয়ার মহাবিপদ থেকে বাঁচে। তখন ব্যক্তি পায় মহান আল্লাহতায়ালার প্রিয় বান্দা রূপে বেড়ে উঠার সামর্থ্য। এবং সে জ্ঞানের অভাবে অজানা থেকে যায় জীবনের মূল মিশন, ইবাদতের সঠিক বিধান, শরিয়তী আইন, ন্যায়-অন্য়ায়ের সংজ্ঞা এবং জান্নাত-জাহান্নাম –এরূপ বহু বিষয়। তখন জীবন ভরে উঠে অজ্ঞতার অন্ধকারে ও ব্যর্থতায়। অপরদিকে ওহীর জ্ঞানে যারা সুশিক্ষিত হয় তারা বেড়ে উঠে মহান আল্লাহতায়ালা দায়িত্ববান খলিফা রূপে। শ্রেষ্ঠ এ মানুষদের নিয়ে স্বয়ং মহান আল্লাহতায়ালাও ফেরেশতাদের মাঝে গর্ব করেন। সমগ্র মানব জাতির কল্যাণে মহান আল্লাহতায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ দানটি তাই সোনা-রূপা, তেল-গ্যাস বা অঢেল সম্পদ নয়; সেটি হলো আল-কোরআনের জ্ঞান। সে জ্ঞানের বলেই প্রাথমিক যুগের মুসলিমগণ বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয়েছিলেন; এবং গড়েছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা।

যে শিক্ষায় ওহীর জ্ঞান নাই, সেখানে সুশিক্ষা ও সুসভ্যতা গড়ার উপকরণও নাই। সেটিই মূলতঃ কুশিক্ষা। সে শিক্ষায় সৃষ্টি হয় না জান্নাতের পথ চেনা ও সে পথে চলার সামর্থ্য। মানব জাতির সকল ব্যর্থতার মূল কারণ হলো এ কুশিক্ষা। এতে মানব শিশু বেড়ে উঠে হিংস্র পশুর চেয়ে বহুগুণ হিংস্র জীব রূপে। পশুর হাতে পারমানবিক বোমা, রাসায়নিক বোমা, ক্লাস্টার বোমা, মিজাইল, ও ড্রোন থাকে না। কিন্তু মানব রূপী এ হিংস্র জীবদের থাকে। তাদের হাতে রক্ত ঝরে কোটি কোটি মানুষের। এবং বিধ্বস্ত হয় শত শত নগর-বন্দর। তখন উদ্বাস্তু হয় লক্ষ লক্ষ মানুষ। সিরিয়া, ইরাক, ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান, আরাকান, কাশ্মিরসহ পৃথিবীর নানা দেশে গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চলছে তো এসব হিংস্র জীবদের হাতেই। মানব সভ্যতার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা তাই কৃষি ও শিল্প খাতে নয়, সেটি শিক্ষা খাতে। শিক্ষা খাতের এ ব্যর্থতার কারণেই মানব ব্যর্থ হচ্ছে উচ্চতর মানবিক গুণ নিয়ে বেড়ে উঠতে। সে কুশিক্ষার কারণেই সৃষ্টি হয়েছে পূজিবাদ, উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, জাতীয়তাবাদ, কম্যুনিজম, বর্ণবাদ, বর্ণবাদী নির্মূলীকরণ, বিশ্বযুদ্ধ ও পারমানবিক অস্ত্রের ন্যায় নানাবিধ ঘাতক মতবাদ ও নাশকতার উপকরণ।

সুশিক্ষার প্রধান উপকরণটি হলো, ওহীর জ্ঞান। সে জ্ঞান ভিন্ন মুসলিম হওয়া অসম্ভব। ওহীর জ্ঞানার্জন এজন্যই সর্বপ্রথম ফরজ ঘোষিত হয়েছে। তাই “ইকরা” তথা পড়ো এবং পবিত্র কোরআন থেকে জ্ঞানার্জন করো -সেটি মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে নবীজী (সাঃ)র উপর নাযিলকৃত প্রথম নির্দেশ। নামায-রোযা, হজ-যাকাত ফরজ হয়েছে প্রায় এক যুগ পর। ব্যক্তির ঈমান মজবুত হয় এবং ইবাদত যথার্থ হয় তো ওহীর জ্ঞানে। অথচ আজকের মুসলিমদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাটি হলো পবিত্র কোরআনের জ্ঞানার্জনে। তারা যেন মুসলিম রূপে বাঁচতে চায় ও মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করতে চায় তাঁর দেয়া গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশাবলি না পড়ে ও না বুঝেই!

অক্ষরজ্ঞান, লিখনির জ্ঞান বা গণিতের জ্ঞানে নিরক্ষতা দূর হয় বটে, তবে তাতে অশিক্ষা ও কুশিক্ষা দূর হয় না। বরং অশিক্ষা ও কুশিক্ষার হিংস্র নাশকতা তাতে আরো ভয়ংকর ও রক্তাক্ত হয়। দুইটি বিশ্বযুদ্ধ বাধিয়ে যারা সাড়ে সাত কোটি মানুষকে হত্যা করলো, ধ্বংস করলো হাজার হাজার নগর-বন্দর এবং ধুলিস্যাৎ করলো বহু কোটি ঘর-বাড়ি ও কল-কারখানা -তাদের কেউ কি নিরক্ষর ছিল? এশিয়া, আফ্রিকা, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার বিশাল ভু-ভাগকে যেসব ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদীগণ জবর-দখল করলো, লুন্ঠন করলো এবং সেসব দেশের বহু কোটি আদিবাসীকে হত্যা করলো বা দাসরূপে কেনাবেচা করলো –তাদের কেউ কি নিরক্ষর ছিল? আজও যেসব আগ্রাসীদের হাতে ফিলিস্তিন, ইরাক, সিরিয়া, কাশ্মির, আরাকান ও আফগানিস্তানের বহু লক্ষ মানুষ নির্যাতিত ও নিহত হচ্ছে এবং হাজার হাজার নারী ধর্ষিতা হচ্ছে তাদের কেউ কি নিরক্ষর? হিটলারের মত নৃশংস স্বৈরাচারি বা ডোনাল্ড ট্রাম্পের ন্যায় বর্ণবাদি ও মিথ্যাবাদী দুর্বৃত্তকে যারা নির্বাচনে বিজয়ী করেছে তারাও কি নিরক্ষর? শুধু তাই নয়। এমন কি বাংলাদেশের ন্যায় একটি মুসলিম দেশকে দূর্নীতিতে যারা বিশ্বে ৫ বার প্রথম স্থানে পৌঁছে দিল এবং মৌলিক মানবিক অধিকার হনন করে বাকশালী স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠা দিল -তারাও কি দেশটির নিরক্ষর সাধারণ মানুষ? বরং দুর্বৃত্তির এ নায়কগণ তো কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী নেতানেত্রী, পুলিশ ও প্রশাসনিক কর্মচারি। নিরক্ষরতা দূর হলেও অশিক্ষা ও কুশিক্ষার নাশকতা যে দূর হয় না -এটি তো তারই প্রমাণ। অশিক্ষা ও কুশিক্ষার কারণে মানুষ শুধু পশু নয়, পশুর চেয়েও ভয়ংকর জীবে পরিণত হয় –সে প্রমাণ তো অসংখ্য। সে ঐতিহাসিক সত্য নিয়ে মহান আল্লাহতায়ালার নিজের ঘোষণাটি হলোঃ “উলা’য়িকা কা’আল আনয়াম, বাল হুম আদাল”। অর্থঃ তারাই হলো পশু, বরং পশুদের চেয়েও নিকৃষ্ট।

শয়তানি শক্তির নাশকতা
কোন দেশ যখন মানবরূপী হিংস্র জীবদের হাতে অধিকৃত হয় তখন ভয়ংকর বিপদ ঘনিয়ে আসে গণ-জীবনে। সে দেশে মহান আল্লাহতায়ালার নাযিলকৃত ওহীর জ্ঞানচর্চা যেমন নিষিদ্ধ হয়, তেমনি শরিয়তি আইনের বদলে প্রতিষ্ঠা পায় কুফরি আইন। তখন শুধু বর্বর স্বৈরাচার, নৃশংস নির্যাতন, বিনা বিচারে হত্যা, সন্ত্রাস, দুর্নীতি, দেশের রাজস্ব লুন্ঠন ও মৌলিক অধিকার হননই এজেন্ডায় পরিণত হয় না, বরং সর্বাত্মক চেষ্টা হয় সত্যের বিলুপ্তি ও সমগ্র জনগণকে দ্রুত জাহান্নামের দিকে নেয়ায়। অতীতে সেরূপ দুর্বৃত্তিতে নেমেছিল নমরুদ ও ফিরাউনের ন্যায় স্বৈরাচারি শাসকবর্গ। যুগে যুগে এরাই নবী-রাসূলদের মিশনের প্রবল প্রতিপক্ষ রূপে দাঁড়িয়েছে। এসব নরপশুদের কারণে হযরত ইব্রাহীম (আঃ), হযরত মূসা (আঃ) ও হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)র মত মানব ইতিহাসের অতি শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদেরও নিজ জন্ম ভূমি ছাড়তে হয়েছে। ইসলামের দুশমনদের হাতে কোন দেশ অধিকৃত হওয়ার মূল বিপদ তো এটিই। যেখানে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা নাই এবং শিক্ষাঙ্গণে কোরআনী জ্ঞানের চর্চা নাই, বুঝতে হবে সে দেশের উপর দখলদারিটি মূলতঃ শয়তানী শক্তির। মহান আল্লাহতায়ালা মানব জাতিকে শয়তানী শক্তির হাতে অধিকৃতির এ মহাবিপদ থেকে মুক্তি দিতে চান। সেটি ঈমানদারদের হাত দিয়ে। এজন্যই ঈমানদারদের প্রতি মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশ তাঁর আনসার তথা সাহায্যকারি হওয়ার। সুরা সাফ’য়ের ১৪ নম্বর আয়াতে তাই বলা হয়েছেঃ “হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহতায়ালার সাহায্যকারি হও।” সুরা সাফ’য়ের ১০-১১ আয়াতে তাদের জন্য একটি ব্যবসার কথাও বলা হয়েছে -যা মুক্তি দেয় জাহান্নামের কঠিন আযাব থেকে। বলা হয়েছেঃ “হে ঈমানদারগণ, তোমাদের কি এমন এক ব্যবসার কথা বলবো -যা মুক্তি দিবে কঠিন আযাব থেকে? সেটি হলো, তোমরা ঈমান আনো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করো তোমাদের সম্পদ ও জান দিয়ে। এটাই তোমাদের জন্য কল্যানকর যদি তোমরা বুঝতে। “তাই মানব জীবনে শ্রেষ্ঠ নেক কর্মটি সন্যাসীদের ন্যায় ধ্যানে বসা নয়, বরং জাহান্নামের আগুনে নেয়ার শয়তানী প্রকল্পের নির্মূলে যুদ্ধে নামা। ইসলামে এটিই পবিত্রতম জিহাদ। একমাত্র এ পথেই সুশিক্ষার প্রতিষ্ঠা ঘটে, এবং মুক্তি ঘটে জাহান্নামের পথ থেকে।

যুগে যুগে মানবরূপী হিংস্র জীবগণ শুধু যে মন্দির বা গির্জা গড়ায় পরিচর্যা দিয়েছে -তা নয়; বরং অসম্ভব করে তুলেছে সুশিক্ষার বিস্তারকে। তারা জানে, শিক্ষার সামর্থ্য বিস্ময়কর। এটি যে শুধু জান্নাতের পথ দেখায় –তা ¬¬¬¬¬নয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি অতি ব্যাপক ভাবে ব্যবহৃত হতে পারে ইসলাম দিকে দূরে সরানোর কাজে -তথা জাহান্নামের পথে নেয়ায়। তাই প্রতিদেশে ইসলামের বিপক্ষ শক্তির এজেন্ডা হলো, কোরআনী জ্ঞান-ভিত্তিক সুশিক্ষাকে বিলুপ্ত বা নিয়ন্ত্রন করা এবং ওহীর জ্ঞান বিরোধী কুশিক্ষার প্রতিষ্ঠা দেয়া। কম্যুনিস্ট শাসিত দেশগুলিতে এজন্যই মসজিদ-মাদ্রাসাগুলোকে ঘোড়ার আস্তাবল বানানো হয়েছিল। কুশিক্ষার দেশে তাই যুদ্ধাস্ত্র, কৃষি, শিল্প ও বিজ্ঞানে উন্নয়ন হলেও সে দেশগুলিতে কঠিন হয়ে পড়ে মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশিত পথে বাঁচা। সমগ্র রাষ্ট্রীয় শক্তি ও তার বিশাল অবকাঠামো তখন ব্যবহৃত হয় মিথ্যার প্রসার বাড়াতে ও সত্যের নির্মূলে। মিথ্যা যখন প্রবল ভাবে বিজয়ী হয়, ফিরাউনের ন্যায় দুর্বৃত্তগণও তখন ভগবান রূপে প্রতিষ্ঠা পায়। গণহত্যার নায়কগণও তখন দেশবাসীর নেতা, পিতা ও বন্ধু রূপে প্রতিষ্ঠা হয়।

মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীন প্রতিষ্ঠা না পেলে মিথ্যাসেবীদের শক্তি দেশ জুড়ে ভয়ানক নাশকতা ঘটায়। তখন দেশ পরিণত হয় জনগণকে জাহান্নামে পৌছানোর বাহনে। হিংস্র পশু, মহামারি, সুনামী বা ভূমিকম্প সেটি করে না। তাই ইসলামে শ্রেষ্ঠতম কাজটি হিংস্র পশু হত্যা নয়, মশা-মাছি নির্মূলও নয়। বরং সেটি রাষ্ট্রের বুক থেকে মানবরূপী হিংস্র জীবদের নির্মূল। মহান নবীজী (সাঃ) ও তাঁর সাহাবাগণ আমৃত্যু সেটিই করেছিলেন। সেটি না হলে কোরআন শিক্ষা, প্রকৃত ইসলাম নিয়ে বেড়ে উঠা, সিরাতুল মুস্তাকীমে চলা ও ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা অসম্ভব হতো। মুসলিমগণ তাতে ব্যর্থ হতো ইসলামী সভ্যতার নির্মাণে –যেমনটি আজ হচ্ছে। ইসলামের বিপক্ষ শক্তির নির্মূলের কাজটি না হলে রাষ্ট্র জুড়ে যা প্রতিষ্ঠা পায় সেটি হলো শয়তানী শক্তির এজেন্ডা। ইসলামের বিপক্ষ শক্তি তখন বিজয়ী শক্তি রূপে আবির্ভূত হয়। তাতে বিলুপ্ত হয় মহান আল্লাহর দেয়া শরিয়তি বিধান; এবং নিষিদ্ধ হয় পবিত্র কোরআনের জ্ঞান বিতরণ। কোন ঈমানদার ব্যক্তি কি এমন অধিকৃতির মুখে নীরব বা নিরপক্ষ থাকতে পারে? মানব সভ্যতার অতি গুরুত্বপূর্ণ কর্ম হলো এরূপ অধিকৃতি থেকে মুক্তি লাভের যুদ্ধ। এমন যুদ্ধ ইসলামে জিহাদ; এ জিহাদে নিহত হলে শহীদ রূপে সরাসরি প্রবেশ ঘটে জান্নাতে। কবরের আযাব, পুলসিরাত ও রোজ হাশরের কঠিন দুর্যোগ থেকে এমন শহীদদের জীবন হবে মুক্ত। এরূপ বিশাল পুরস্কার অন্য কোন নেক কর্মে নেই। অপরদিকে ইসলামের বিপক্ষ শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ ও তাদের সাথে সহযোগিতার শাস্তিটিও ভয়ানক। এবং সেটি অনন্ত কালের। সেটি শুরু দুনিয়ার জীবন থেকেই। দুশমনের অধিকৃ্তির বিরুদ্ধে জিহাদ না থাকায় মুসলিম উম্মাহ বস্তুতঃ আজ সে শাস্তিরই গ্রাসে।

বাঙালী মুসলিম জীবনে কুশিক্ষা ও ব্যর্থতা
বাঙালী মুসলিমের জীবনে আজ যেরূপ শরিয়তের বিলুপ্তি ও ইসলামের বিপক্ষ শক্তির জয়জয়াকার –সেটিও হঠাৎ সৃষ্টি হয়নি। এটি হলো ১৭৫৭ সালে কাফের শক্তির হাতে অধিকৃত ও গোলাম হওয়ারই ধারাবাহিকতা। পাপ এখন এক স্থায়ী আযাবে রূপ নিয়েছে। বাংলার মাটিতে মুসলিমদের এ দুর্দশা ও ইসলামের এ পরাজয়ের পিছনে রয়েছে বাঙালী মুসলিমের দায়িত্ব পালনে প্রচণ্ড ব্যর্থতা। গাদ্দারীর অপরাধ ঘটেছে মহান আল্লাহতায়ালার কোরআনি নির্দেশের বিরুদ্ধে। মুসলিম জীবনে অনিবার্য দায়ভার হলো, কাফের শক্তির আগ্রাসনের মুখে নিজ দেশকে প্রতিরক্ষা দেয়া। নইলে অসম্ভব হয় প্রকৃত ইসলাম-পালন ও প্রকৃত মুসলিম রূপে বেড়ে উঠা। দখলদার কাফের শক্তি মুসলিম ভূমিতে নামায-রোযা নিষিদ্ধ না করলেও বিলুপ্ত করে কোরআনের জ্ঞান-চর্চা। বিদ্যাশিক্ষার নামে তারা চালু করে কুশিক্ষা এবং ইসলামী জ্ঞানের শিকড় কাটার প্রকল্প। এভাবে তারা অসম্ভব করে ঈমানে পুষ্টিলাভ ও ইসলাম নিয়ে বাঁচা। অধিকৃত দেশের পরাধীন মুসলিমগণ তখন অন্য মুসলিমের কল্যাণে আর কি ভূমিকা রাখবে? তারা ব্যর্থ হয় এমন কি নিজেদের পার্থিব ও পরকালীন কল্যাণে অবদান রাখতে। এজন্যই নামায-রোযা, হজ-যাকাতের পাশাপাশি ইসলামে সর্বশ্রেষ্ঠ ফরজ ইবাদতটি হলো, দুশমনের হামলার মুখে মুসলিম ভূমিকে সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিরক্ষা দেয়া। নবীজী (সাঃ)র হাদীসঃ দেশের সীমান্তে এক মুহুর্তের পাহারাদারীর সওয়াব সারা রাত নফল ইবাদতের চেয়ে অধীক।

মু’মিনের সর্বক্ষণের প্রস্তুতিটি তাই শুধু ৫ ওয়াক্ত নামাযের নয়, বরং হানাদার দুশমনদের বিরুদ্ধে জিহাদেরও। সেটিই মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশ। তাই ঈমানদারকে শুধু নামাযী হলে চলে না, আমৃত্যু মুজাহিদও হতে হয়। নইলে মুসলিম দেশের স্বাধীনতা যেমন বাঁচে না, তেমনি ঈমান বাঁচেনা মুসলিম সন্তানদের। পবিত্র কোরআনের ঘোষণাঃ “তোমরা সর্বশক্তি দিয়ে প্রস্তুত হও তাদের (দুশমনদের) বিরুদ্ধে। এবং (যুদ্ধের জন্য) ঘোড়ার লাগামকে শক্তভাবে বাঁধো। এবং ভীত-সন্ত্রস্ত করো তোমাদের এবং আল্লাহর দুশমনদের।”- (সুরা আনফাল, আয়াত ৬০)। তাই দুশমনদের সৃষ্ট সন্ত্রাসে সন্ত্রস্ত হওয়া ঈমানদারের কাজ নয়। বরং ঈমানদার সন্ত্রস্ত করে দুশমনদের। এমন এক চেতনার কারণেই নবীজী (সাঃ)র এমন কোন সাহাবী ছিলেন না যার জীবনে জিহাদের প্রস্তুতি ছিল না। দুশমনের পক্ষ থেকে যখনই হামলা হয়েছে, সাথে সাথে তারা রণাঙ্গনে হাজির হয়েছেন। শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবী শহীদও হয়েছেন। কোন ভীরুতা বা কাপুষতা তাদের মাঝে দেখা দেয়নি। অথচ সে সময় মুসলিমদের সংখ্যা বাংলাদেশের একটি জেলার সমানও ছিল না। বিশ্বশক্তি রূপে মুসলিমদের উত্থানের মূলে ছিল তাদের সে জিহাদী চেতনা ও কোরবানী। সেদিন ঈমানদারদের জান ও মালের কোরবানী মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে সাহায্য নামিয়ে এনেছিল। তেমনি এক প্রস্তুতি ও কোরবানীর কারণে সংখ্যায় ক্ষুদ্র হয়েও আফগান মুসলিমগণ ব্রিটিশদের দুই বার পরাজিত করেছে। ব্রিটিশদের তখন ছিল বিশ্বশক্তির মর্যাদা। বিগত শতাব্দীর আশির দশকে পরাজিত করেছে আরেক বিশ্বশক্তি সোভিয়েত রাশিয়াকে। এবং আজ পরাজিত করছে মার্কিনী যুক্তরাষ্ট্রকে। আফগানদের এরূপ বার বার বিজয়ের পিছনে সে দেশের সরকার ও সরকারি সেনাবাহিনী ছিল না, বরং পুরা কৃতিত্বটি সেদেশের মুসলিম জনগণের।

আযাবের গ্রাসে
অশিক্ষা ও কুশিক্ষা থেকেই জন্ম নেয় অজ্ঞতা তথা জাহিলিয়াত। জাহিলিয়াত থেকে জন্ম নেয় পথভ্রষ্টতা। এবং পথভ্রষ্টদের উপর প্রতিশ্রুত আযাব শুধু পরকালেই আসে না; আসে এ পার্থিব জীবনেও। আযাব আসে যেমন ঘুর্ণিঝড়, ভূমিকম্প, সুনামী, মহামারি, দুর্ভিক্ষ ও প্লাবনের বেশে, তেমনি আসে দুশমন শক্তির হাতে অধিকৃতি, পরাধীনতা, বোমা বর্ষন, গণহত্যা, ধ্বংস ও নানা রূপ নির্যাতনের বেশে। সেরূপ আযাব অতীতে যেমন বার বার এসেছে, তেমনি এখনো আসছে। সে আযাব যেন আজকের মুসলিমদের চারি দিক দিয়ে ঘিরে ধরেছে। আযাবের ন্যায় পথভ্রষ্টতার আলামতগুলিও অদৃশ্য বা বায়বীয় কিছু নয়, খালি চোখেও সেগুলি দেখা যায়। সে পথভ্রষ্টতা হলো মহান আল্লাহর সার্বভৌমত্ব, শরিয়ত, শুরা, হুদুদ, খেলাফত ও কোরআনী জ্ঞান ছাড়াই জীবন কাটানো এবং সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনা করা।

তবে আযাবকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলাটাই ইসলামী চেতনাশূন্যদের রীতি। তাদের সেক্য়ুলার দর্শনে আযাব বলে কিছু নাই। তাই আযাবকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলে মহান আল্লাহতায়ালার অসীম কুদরতকে অস্বীকার করা। মহান আল্লাহতায়ালার অনুমতি ছাড়া যেখানে গাছের একটা পাতাও পড়ে না, সেখানে দুর্ভিক্ষ, ভূমিকম্প, মহামারি ও ঘুর্ণিঝড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয় কি করে? এগুলিকে কি আল্লাহতায়ালার রহমত বলা যায়? প্রকৃতির নিজস্ব কোন সামর্থ্য নাই। প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানই তো মহান আল্লাহতায়ালার সৃষ্টি। ফলে, সেগুলি যা কিছু করে তা স্রেফ মহান আল্লাহতায়ালার ইচ্ছাকে বাস্তবায়ন করতে। তাই ব্যক্তির ঈমানদারি শুধু মহান আল্লাহতায়ালার উপর বিশ্বাস নয়, বরং তাঁর প্রতিটি আযাবকে আযাব রূপে দেখাতেও। একমাত্র তখনই সে আযাব থেকে শিক্ষা নিতে পারে।

প্রতিটি রোগ-ভোগই অসুস্থ মানুষকে ভাবিয়ে তোলে। অথচ সে ভাবনাটি মৃত মানুষের থাকে না। তেমনি আযাবের ঘটনাও ভাবিয়ে তোলে প্রতিটি সুস্থ চেতনার মানুষকে। সে ভাবনাটি না থাকাই বরং চেতনার প্রচণ্ড অসুস্থততা। এ প্রেক্ষাপটে বাঙালী মুসলিমদের নিয়ে ভাবনার বিষয় যেমন অনেক; তেমনি শিক্ষার বিষয়ও অনেক। তাদের মূল ব্যর্থতাটি প্রকৃত মুসলিম রূপে বেড়ে উঠা ও ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায়। এবং সে ব্যর্থতা তাদের জীবনে হঠাৎ করে আসেনি। তারও একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আছে। তাই বর্তমানের এ আযাবকে বুঝত হলে অতীতের সে প্রক্ষাপটকে অবশ্যই বুঝতে হবে। কারণ, অতীতের মাঝেই তো বর্তমানের বীজ। তাই যাদের জীবনে সে ইতিহাসে পাঠ নাই, তারা ব্যর্থ হয় চলমান ব্যর্থতা ও বিপর্যয়ের কারণ বুঝতে। এবং ব্যর্থ হয় আযাব থেকে বেরুনোর পথ খুঁজে পেতে। ইতিহাস পাঠের গুরত্ব ইসলামে এজন্য়ই এতো অধীক।

মানব জীবনে দুর্যোগ আসে মূলতঃ দুটি কারণে। কখনো সেটি আসে পরিকল্পিত পরীক্ষা অংশ রূপে। সে পরীক্ষায় যারা সফলকাম হয়, মহান অআল্লাহতায়ালা তাদের জান্নাত দিয়ে পুরস্কৃত করেন। জান্নাত প্রাপ্তির জন্য তেমন একটি পরীক্ষায় কৃতকার্য হওয়াটি অনিবার্য। কখনো বা সে বিপর্যয় আসে পূর্বের পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়ার আযাব রূপে। এমন কি নবী-রাসূলদের জীবনেও এমন পরীক্ষা বার বার এসেছে। বাঙালী মুসলিমের জীবনে তেমনি একটি পরীক্ষা এবং সে পরীক্ষায় ভয়ানক ব্য়র্থতা এসেছিল ১৭৫৭ সালে। সেদিন কাফের হানদারদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সে দায়িত্বটি আদৌ পালিত হয়নি। সে সময় সবচেয়ে বড় অপরাধটি ঘটে হানাদার ইংরেজদের বিরুদ্ধে ফরজ জিহাদে অংশ না নেয়ায়। সেটি যেমন রাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে, তেমন জনগণের কাতার থেকে।

ইংরেজদের হামলার বিরুদ্ধে দেশ বাঁচানোর দায়িত্বটি স্রেফ নবাব সিরাজুদ্দৌলার একার ছিল না, সে দায়িত্বটি ছিল বাংলার প্রতিটি নাগরিকের। তাই পলাশীর যুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার অপরাধটি শুধু মীর জাফরের একার নয়। বাংলার জনগণ সেদিন জিহাদ সংগঠিত না করে পরিচয় দিয়েছে প্রচণ্ড ভীরুতা ও কাপুষতার। তাছাড়া জিহাদের ন্যায় ফরজ ইবাদত পালিত না হলে মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিশ্রুত আযাব না আসাটাই তো অস্বাভাবিক। বস্তুতঃ বাংলার বুকে সে আযাবটি এসেছিল প্রচণ্ড ভয়াবহতা নিয়েই। সেটি যেমন ১৯০ বছরের গোলামী নিয়ে, তেমন অনাহার, নির্যাতন এবং শোষণে জীবন নাশের মধ্য় দিয়ে। আজও চলছে সে আযাবের ধারাবাহিকতা। অথচ ১৭৫৭ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা আফগানিস্তানের চেয়ে কয়েকগুণ অধিক ছিল। তখন দেশে হাজার হাজার আলেম-উলামাও ছিল। ৮০ হাজারের বেশী মাদ্রাসা ছিল।

বাঙালী মুসলিমগণ ব্রিটিশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ থেকে বাঁচলেও দুর্ভিক্ষ থেকে বাঁচেনি। এক-তৃতীয়াংশ বাঙালী ( প্রায় এক কোটি) মারা গেছে ব্রিটিশদের শোষণে সৃষ্ট ১৭৬৯ সাল থেকে ১৭৭৩ সাল অবধি চলমান দুর্ভিক্ষে। বাংলার সমগ্র ইতিহাসে এতবড় বিশাল আকারের প্রাণনাশ কোনকালেই ঘটেনি। অথচ ব্রিটিশের হাতে অধিকৃত হওয়ার আগে বাংলাই ছিল সমগ্র এশিয়ার মাঝে সবচেয়ে সম্পদশালী দেশ। খাদ্যে ছিল স্বয়ংসম্পন্ন। বস্ত্র শিল্প উৎপাদনে ছিল বিশ্বে সেরা। বাংলার বস্ত্র বিশেষ করে মসলিন তুরস্ক, মিশর, ইউরোপ, এবং চীনসহ বিশ্বের নানা দেশে যেত। সরকারের ভাণ্ডার ছিল সোনা-রূপায় পরিপূর্ণ। ইতিহাসবিদদের মতে বাংলার উপর বিজয়ের সাথে সাথে সে গচ্ছিত সম্পদ ইংল্যান্ডে নিতে ২০০টির বেশী জাহাজ বাংলার তৎকালীন রাজধানী মুর্শিদাবাদ থেকে লন্ডন মুখি রওনা দেয়। সে লুন্ঠনের ফলে লর্ড ক্লাইভের মত ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্ণধারগণ রাতারাতি বিশ্বের ধনী ব্যক্তিতে পরিণত হয়।

ডাকাতদের লুন্ঠনে অভাব ও অনাহার আসবে -সেটিই তো স্বাভাবিক। তবে পার্থক্য হলো ডাকাতগণ মানুষের ঈমানে হাত দেয় না, জ্ঞানচর্চায়ও ব্যাঘাত ঘটায় না। অথচ কাফের শক্তির হাতে দেশ অধিকৃত হলে সবচেয়ে ভয়ানক ক্ষতিটি হয় ঈমানের ভূবনে। ইংরেজ শাসকদের হাতে সে নাশকতাটি অতি নৃশংস ভাবেই ঘটেছে। রাজস্বভাণ্ডার ও জনগণের অর্থভান্ডার শূন্য করার পাশাপাশি প্রচণ্ড নাশকতা ঘটিয়েছে ইসলামি জ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে। বাংলার মুসলিম জীবনে ইসলাম থেকে আজ যে বিশাল বিচ্য়ুতি এবং সর্বত্র যে দুর্বৃত্তি তার মূলে হলো প্রায় দুই শত বছরের কাফের শক্তির অধিকৃতি। আজও সে নাশকতা অব্যাহত রয়েছে সে শিক্ষানীতিতে বেড়ে উঠা সাম্রাজ্যবাদীদের আদর্শিক খলিফাদের হাতে। সে দীর্ঘকালীন নাশকতার ফলে বাংলার বুকে যে ইসলাম বেঁচে আছে সেটি নবীজী (সাঃ)র আমলের ইসলাম নয়। বেঁচে থাকা এ ইসলামে যেমন পবিত্র কোরআনে নির্দেশিত শরিয়ত, ইসলাম, শুরা, খিলাফত নাই, তেমনি নাই জিহাদের কোন ধারণা। এভাবে
কোরআনী জ্ঞানার্জনে ব্যাঘাত ঘটাতে সমর্থ হলে ইসলামে থেকে দূরে সরাতে মুসলিম সন্তানকে মন্দিরে বা গির্জায় নেয়ার প্রয়োজন পড়ে না। দেশ তখন অমুসলিম দেশের ন্যায় ইসলামশূন্য হয়। কোরআনের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার প্রকল্প নিয়েই লর্ড মেকলে ভারতে শিক্ষার নামে কুশিক্ষার নীতি প্রণয়ন করেন। বাংলাদেশে আজও বেঁচে আছে ইসলামশূন্য সে শিক্ষানীতি। ইসলামের প্রতিপক্ষ রূপে আজ যারা দেশের উপর দখল জমিয়েছে তারা তো সে শিক্ষা নীতিরই ফসল। ইসলাম থেকে দূরে সরা এসব কুশিক্ষিত মানুষদের প্রতারণাটিও জঘন্য়। নিজেদের ইসলাম বিরোধী অভিসন্ধি ঢাকতে নিজেদেরকে তারা মুসলিম রূপে পরিচয় দেয়। অথচ তাদের মূল যুদ্ধটি ইসলামের বিরুদ্ধে। এদের কারণেই ইসলামের বিজয় ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠা রুখতে বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলিতে বিদেশী কাফেরদের নামতে হচ্ছে না। সে কাজে নিজেরাই যথেষ্ট নৃশংসতার পরিচয় দিচ্ছে। সে বর্বর নৃশংসতা এবং ইসলামের বিরুদ্ধে চরম আপোষহীনতার কারণেই তারা গৃহীত হচ্ছে ইসলামের আন্তর্জাতিক কোয়ালিশনের বিশ্বস্ত পার্টনার রূপে। ৫/২/২০১৮




দেশের শিক্ষাঙ্গণ ও শিক্ষানীতির নাশকতা

ইন্ডাস্ট্রি দুর্বৃত্ত উৎপাদনের

শিক্ষাঙ্গণ শুধু জ্ঞানের বিকাশই ঘটায় না; জন্ম দেয় অসত্য-অজ্ঞতা, ঘৃণা-বিদ্বেষ এবং মানবতাধ্বংসী ভয়ানক রুগ্ন ধারণারও। এগুলি পরিণত হতে পারে দুর্বৃত্ত উৎপাদনের বিশাল বিশাল ইন্ডাস্ট্রিতে। স্বৈরাচার, ফ্যসিবাদ, বর্ণবাদ, জাতিয়তাবাদ, উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ এবং কম্যুনিজমের ন্যায় মানবতা-নাশক মতবাদগুলির জন্ম কোন কালেই বনজঙ্গলে হয়নি, বরং হয়েছে শিক্ষাঙ্গনে। এবং এ মতবাদগুলির নাশকতা বিষাক্ত রোগ-জীবাণু ও সুনামী-ভূমিকম্পের চেয়েও অধীক। মানব জাতির সমগ্র ইতিহাসে সবচেয়ে বেশী লোকক্ষয় রোগজীবাণু বা সুনামী-ভূমিকম্পের হাতে হয়নি। সেটি হয়েছে শিক্ষাঙ্গণে বেড়ে উঠা মানবরূপী ভয়ানক দানবদের হাতে। বিগত দুটি বিশ্বযুদ্ধেই তারা সাড়ে সাত কোটি মানুষকে হত্যা করেছে এবং শত শত নগর-বন্দরকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছে। ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদী শাসনকে প্রতিষ্ঠা দিতে এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোতে যারা গতহত্যা ও গণনির্মূলে নেতৃত্ব দিয়েছে তারাও কোন গুহাবাসী ছিল না; তারা শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ পেয়েছে অক্সফোর্ড, কেম্ব্রিজ ও হার্ভাডের ন্যায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। ভারতের বুকে যে কোটি কোটি মানুষ গরুছাগল, শাপ-পেঁচা, পাহাড়-পর্বত ও মুর্তিকে দেবতা মনে করে, তারা কি কোন বন-জঙ্গলের বাসিন্দা? তাদের অনেকে তো কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী। ডিগ্রি নেয়া এবং জ্ঞানী ও বিবেকমান হওয়া যে এক নয় –তার প্রমাণ তো এ নৃশংসতার ইতিহাস।

 

বা্ংলাদেশের ইতিহাসেও এরূপ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাশকতা কি কম? যারা শাপলা চত্ত্বরে মুসল্লিদের উপর গণহত্যা ঘটালো -এরা কি বনে জঙ্গলে বেড়ে উঠেছে? এরাও বেড়ে উঠেছে দেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং সামরিক ও পুলিশ এ্যাকাডেমিগুলিতে। ক’মাস আগে এদেরই দলবদ্ধ ভাবে দেখা গেছে নিরাপদ সড়কের দাবীতে রাস্তায় নামা যায় কিশোরীদের উপর যৌন সন্ত্রাসে। এরাই থার্টি ফার্স্ট নাইটে রাস্তায় নারীদের বিবস্ত্র করে লালসা পূরণ করে। এদেরই একজন নব্বইয়ের দশকে জাহাঙ্গির নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণে সেঞ্চুরীর উৎসব করেছিল। তখন দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন শেখ হাসিনা। একজন নারী সাংবাদিককে চরিত্রহীন বলায় ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেনকে জেলে ঢুকানো হয়েছে। এবং সেটি নারীর সম্ভ্রম রক্ষার নামে। অথচ হাসিনা ধর্ষণে সেঞ্চুরীকারি ছাত্রলীগ নেতাকে শাস্তি না দিয়ে নিরাপদে বিদেশে পাড়ি জমাতে দিয়েছিল।

নাশকতা ঐক্য বিনাশে

ইসলামের মৌলিক চেতনা বিনাশেও কি সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থার নাশকতা কি কম? ইসলাম অতি মৌলিক শিক্ষাটি স্রেফ মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান আনা নয়; বরং ভাষা, বর্ণ, ভূগোল বা অঞ্চলের উর্দ্ধে উঠে মুসলিমদের মাঝে ভাতৃত্বের বন্ধন গড়া। সে সাথে বাধ্যতামূলক হলো মুসলিমদের মাঝে অনৈক্যকে ঘৃণা করা এবং পরিহার করা। নামায-রোযার ন্যায় এটিও ফরজ। পবিত্র কোরআনে মুসলিমদের মাঝে সীসাঢালা অটুল দেয়াল গড়ার হুকুমটি এসেছে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে। সেটি সুরা সাফের ৪ নম্বর আয়াতে। আর যেখানে মহান আল্লাহতায়ালার হুকুম, সেটি অমান্য করলে কি ঈমান থাকে? তাই ভাষা,বর্ণ, অঞ্চলের নামে মুসলিমদের মাঝে বিভক্তি গড়াটি মদপান, জ্বিনা ও মানব হত্যার ন্যায় হারাম। মুসলিমদের মাঝে বিভক্তি গড়লে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে আযাব যে অনিবার্য হয় –সে হুশিয়ারিটিও শোনানো হয়েছে। সে ঘোষণাটি এসেছে সুরা ইমরানের ১০৫ নম্বর আয়াতে। মুসলিমদের উপর আযাবের সে আলামত কি আজ কম?

অথচ ভাষার নামে শুধু বিভক্তি গড়া নয়, বরং খুনোখুনি ও অবাঙালীদের নির্মূল করাটি হলো বাঙালী জাতীয়তাবাদী রাজনীতির মূল কথা। এদিক দিয়ে তাদের ঘনিষ্ট আদর্শিক আত্মীয় হলো মায়ানমারের অসভ্য বার্মীজগণ। জাতীয়তাবাদী এ নৃশংস বর্বরগণ রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে গণহত্যা, ধর্ষণ ও বর্ণবাদী নির্মূলে নেমেছে। একই রূপ জাতীয়তাবাদী বর্বরতায় বাংলার মাটিতে সবচেয়ে অসভ্য কর্মটি ঘটেছে একাত্তরে। তখন হত্যা, ধর্ষণ ও লুণ্ঠনের শিকার হয়েছিল কয়েক লক্ষ বিহারী মুসলিম। তারা ভারত থেকে প্রাণ বাঁচাতে পূর্ব পাকিস্তানে আশ্রয় নিয়েছিল। ব্যক্তির দৈহিক দুর্বলতা জানিয়ে দেয়, তার খাদ্যে পুষ্টির মান ভাল নয়। তেমনি ব্যক্তির চরিত্রহীনতা জানিয়ে দেয়, তার শিক্ষায় রয়েছে প্রচুর কুশিক্ষা। বাংলাদেশ দুর্নীতিতে বিশ্বে ৫ বার শীর্ষ স্থান পেয়েছে তো কুশিক্ষার কারণেই।

বাংলাদেশে সেক্যুলার শিক্ষা নীতির মূল নাশকতাটি স্রেফ এ নয়, এটি বিলুপ্ত করতে পেরেছে মুসলিম মগজ থেকে প্যান-ইসলামিক চেতনা। বরং কেড়ে নিয়েছে নৃশংস বর্বরতাকে ঘৃণা করার সামর্থ্য। কেড়ে নিয়েছে সুনীতি নিয়ে বেড়ে উঠার ঈমানী বল। এজন্যই বাংলা সাহিত্যে বিহারীদের বিরুদ্ধে সংগঠিত নৃশংসতার কোন বিবরণ নেই। লেখা হচ্ছে না শাপলা চত্ত্বরের গণহত্যার বিরুদ্ধেও। একই কারণে বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গণে ধর্ষণে সেঞ্চুরি করার বিষয়টিও ইতিহাস থেকে হারিয়ে গেছে। দেহে একবার রোগ দেখা দিলে বুদ্ধিমান ব্যক্তি তা সারা জীবন মনে রাখে এবং তা থেকে বাঁচার জন্য সব সময় সতর্ক থাকে। বিবেকমান জনগোষ্ঠিও তেমনি নিজদের ইতিহাসের কালো অধ্যায়গুলি ভুলে যায় না, বরং বাঁচিয়ে রাখে তা থেকে ভবিষ্যতে বাঁচার আশায়। নইলে আত্মভোলা সে জনগণের জীবনে বাকশালী স্বৈরাচার ও শাপলা চত্ত্বরের গণহত্যার ন্যায় নৃশংসতাগুলো নিত্যনৈমিত্তিক হয় দাঁড়ায়।

সুশিক্ষা শুধু ঈমানই বাড়ায় না, ঈমানদারদের মাঝে সিমেন্টও লাগায়। ফলে গড়ে উঠে অটুট ঐক্য। অপর দিকে কুশিক্ষা বাড়ায় বিভেদ ও অনৈক্য। গড়ে তোলে বিভক্তির দেয়াল। মুসলিমদের মাঝে অনৈক্য দেখে অন্ততঃ এ বিষয়টি নিশ্চিত বলা যায়, তাদের মাঝে সুশিক্ষা নাই। অথচ সুশিক্ষার কারণেই ইসলামের গৌরবকালে আরব, কুর্দী, তুর্কী, ইরানী ও আফ্রিকান মুসলিমগণ নিজেদের ভাষা ও বর্ণের কথা ভূলে একতাবদ্ধ উম্মাহর জন্ম দিয়েছিল। কিন্ত ইসলামি শিক্ষা থেকে যখনই তারা দূরে সরেছে, তখন শুধু বিভক্তিই বাড়েনি, পরাজয় এবং অপমানও বেড়েছে। একতা ছাড়া অসম্ভব, ইসলামি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। অসম্ভব হয়, শরিয়ত, হুদুদ, একতা ও খেলাফার ন্যায় ইসলামের মূল বিধানগুলির প্রতিষ্ঠা। ব্যর্থ হয়, ইসলামের মূল এজেন্ডার বাস্তবায়ন। যাদের মধ্যে ঈমান আছে তারা শুধু ভিন্ ভাষা, ভিন্ বর্ণ ও ভিন্ এলাকার ঈমানদার মানুষদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এক জামাতে শুধু নামাযই পড়ে না; তারা রাষ্ট্র গড়ে এবং একই রণাঙ্গনে যুদ্ধও করে। এটিই তো ঈমানের লক্ষণ। সে ঈমানের কারণে বাঙালী, পাঞ্জাবী, বিহারী, সিন্ধি, পাঠান, গুজরাতি ও অন্যান্য ভাষার মুসলিমগণ একত্রে মিলে ১৯৪৭’য়ে বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল। সে অভিন্ন চেতনার কারণেই ১৯৭১’য়ে কোন আলেম, পীর বা কোন ইসলামী দল পাকিস্তান ভাঙ্গাকে সমর্থণ করেনি। তাদের কেউ ভারতে গিয়ে সামরিক প্রশিক্ষণও নেয়নি।

ঈমান ও একতার প্রতি আগ্রহ সব সময়ই একত্রে চলে। ঈমান বিলুপ্ত হলে একতাও বিলুপ্ত হয়। তখন ভাষা,বর্ণ ও ভূগোলের নামে বিভক্তির অসংখ্য দেয়াল গড়ে উঠে। জাতীয় রাষ্ট্রের নামে সে বিভক্তির দেয়ালকে সুরক্ষা দেয়া তখন দেশপ্রেম গণ্য হয়। প্রশ্ন হলো, বিভক্তির দেয়াল এবং সে বিভক্তি নিয়ে উৎসব কি ঈমানের লক্ষণ? বরং প্রকৃত ঈমানদারের মনে এরূপ বিভক্তি নিয়ে মাতম উঠবে -সেটিই তো স্বাভাবিক। কিন্তু আজ সে মাতম নাই, বিভক্তি নিয়ে দুঃখবোধও নাই। অথচ মুসলিম জাহানে যখন কোন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না, তখনও একজন নিরক্ষর মুসলিম একতার গুরুত্ব বুঝতো। তাই তখন আরব,ইরানী, তুর্কী, কুর্দী, আফ্রিকান মুসলিম একত্রে যুদ্ধ করেছে। অথচ আজ সেটি অসম্ভব। শিক্ষাব্যবস্থা সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে যে কতটা দূরে সরিয়েছে –এ হলো তার প্রমাণ।

নাশকতা চিন্তাশূণ্যতার

জ্ঞানের অর্থ শুধু তথ্য,তত্ত্ব,উপাত্ত,গদ্যপদ্য,পরিসংখ্যান বা কিসসা-কাহিনী জানা নয়,বরং নানা বিষয় নিয়ে চিন্তা-ভাবনা এবং সে চিন্তা-ভাবনা থেকে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সামর্থ্য। কোরআনের নানা স্থানে নানা ভাবে মহান আল্লাহতায়ালা মানুষকে চিন্তা-ভাবনায় উৎসাহিত করেছেন। প্রতিটি জীবজন্তু,প্রতিটি উদ্ভিদ,প্রতিটি পাহাড়-পর্বত,প্রতিটি নদীনালা,আকাশের প্রতিটি নক্ষত্র,প্রকৃতির প্রতিটি দৃশ্যপটই মহান আল্লাহর মূল্যবান আয়াত। কোরআনের ভাষায় তা হলো “আয়াতিল লি উলিল আলবাব” অর্থ চিন্তাশীল মানুষের জন্য নিদর্শন। বিদ্যাশিক্ষার কাজ মূলতঃ মহান আল্লাহর সে আয়াতগুলো থেকে শিক্ষা গ্রহণের সামর্থ্য সৃষ্টি। মানুষের মনে সে আয়াতগুলি বহুভাবে বহুকথা বলে। কোনটি সরব ভাবে,কোনটি নীরব ভাবে। ব্যক্তির চক্ষু,কর্ণ,বিবেকের সামনে এগুলো লাগাতর সাক্ষ্য দেয় সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহর অপার অসীম কুদরতের। বিদ্যাশিক্ষার কাজ হলো সে সাক্ষ্য বুঝতে ও আল্লাহর পক্ষে সাক্ষ্যদানে সামর্থ্য সৃষ্টি করা। সে সামর্থ্য অর্জনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি লাগে না। সেজন্য যা জরুরী তা হলো চিন্তার সামর্থ্য। ইসলামে চিন্তাকে তাই শ্রেষ্ঠ ইবাদত বলা হয়েছে। চিন্তাশিল মনই হলো জ্ঞানের সবচেয়ে বড় পাওয়ার হাউস। চিন্তার বলে আল্লাহর অসংখ্য আয়াত থেকে শিক্ষা নেয়ার যে সামর্থ্য গড়ে উঠে তার গুণে মানব ইতিহাসের বহু নিরক্ষর ব্যক্তিও বিখ্যাত দার্শনিকে পরিণত হয়েছে। অথচ সে সামর্থ্য না থাকায় বহু পিএইচডি ধারিও প্রচণ্ড আহম্মকে পরিণত হয়।বাংলাদেশে তো এমন আহম্মকদের কাছে গরুছাগল ও শাপশকুন যেমন ভগবান মনে হয় তেমনি বঙ্গশত্রু,গণশত্রু এবং অতি স্বৈরাচারি দুর্বৃত্তরাও মহমানব বন্ধু মনে হয়। চিন্তাশূণ্যতার এটিই হলো নাশকতা।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় শুধু এমন আহম্মকের সংখ্যাই বাড়েনি, ভয়ানক দুর্বৃত্তের সংখ্যাও বেড়েছে। এ শিক্ষার কাজ হয়েছে,শুধু চিন্তার সামর্থ্য কেড়ে নেয়া নয়,কোরআনের সাথে সম্পর্ককে ছিন্ন করারও। পারিবারিক বা সাংস্কৃতিক সূত্রে কোরআনের সাথে যদি কোনরূপ সম্পর্ক গড়েও উঠে,বাংলাদেশের শিক্ষার কাজ হয়েছে সে সম্পর্ক বহাল রাখাকে কঠিন করে দেয়া। শিক্ষাব্যবস্থার কাজ হয়েছে ছাত্রদের ইবাদতের সামর্থ্য কেড়ে নেয়া,এবং সে সামর্থ্য যাতে গড়ে না উঠে তার ব্যবস্থা করা। মুসলিম শিশুর জীবনে ভ্যালু এ্যাড বা মূল্য সংযোজন না করে বরং পারিবারিক বা সাংস্কৃতিক সূত্রে সংযোজিত মূল্যও কেড়ে নিচেছ। ফলে কৃষকের সুবোধ পুত্রটি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ব্যাভিচারি,ধর্ষক,চোরডাকাত ও সন্ত্রাসী খুনি হয়ে বের হচ্ছে। এবং এরাই রাজপথে আল্লাহর শরিয়তী বিধানের বিরুদ্ধে সৈনিক রূপে নামছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামের বিপক্ষে আজ যে বিপুল বাহিনী এবং পথেঘাটে,অফিস-আদালত,ব্যবসা-বাণিজ্যে যে অসংখ্যক দুর্বৃত্ত -তারা কি কাফেরদের ঘরে, মন্দিরে বা বনেজঙ্গেলে বেড়ে উঠেছে? তারা তো বেড়ে উঠেছে দেশী স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

দুর্গ ইসলামের শত্রুপক্ষের

অজ্ঞ লোকদের সহজেই বিভ্রান্ত করা যায়। কিন্তু জ্ঞানী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে কি সেটি অসম্ভব। বাংলাদেশে ইসলাম বিরোধীদের শক্তির মূল উৎসটি হলো, কোরআন থেকে জ্ঞানলাভে অসমর্থ জনগণ। তারা চায়, জনগণের ইসলাম নিয়ে অজ্ঞতা দীর্ঘায়ু পাক। চায়, সেটি আরো গভীরতর হোক। কোরআনী জ্ঞানের এজন্যই তারা মহাশত্রু। পবিত্র কোরআনের জ্ঞান বাড়লে সে জ্ঞান শক্তি জোগায় ঈমান নিয়ে বেড়ে উঠায়। তারা ইসলামের বিজয়ে তখন আপোষহীন হয়। শরিয়ত প্রতিষ্ঠার আন্দোলন তখন বিপুল সংখ্যায় আপোষহীন মোজাহিদ পায়। এখানেই ইসলামের শত্রু পক্ষের ভয়। সে ভয় নিয়েই য়ভয়। ভয়। আরবী ভাষা এবং সে সাথে কোরআনের চর্চা রুখা হচ্ছে ইসলামের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একটি কৌশল রূপে।

দেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলি পরিণত হয়েছে ইসলামের শত্রু পক্ষের মূল দুর্গে। মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া শরিয়তি আইন প্রতিষ্ঠা নিয়ে রাজপথে নামলে তার বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে যারা হামলা করে তারা কোন মন্দির,গীর্জা বা বনজঙ্গল থেকে আসে না। বরং আসে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রাঙ্গণ থেকেই। অথচ এগুলির নির্মানে ব্যয় ধর্মপ্রাণ মুসলিম নাগরিকদের দেয়া রাজস্বের অর্থ। প্রশ্ন হলো, শিক্ষার নামে মুসলিমগণ কি এভাবে নিজ ধর্ম,নিজ ঈমান,সর্বোপরি মহান আল্লাহতায়ালার শত্রু পালনে অর্থ জোগাতে থাকবে? মেনে চলবে কি শিক্ষাঙ্গণের উপর ইসলামের শত্রুপক্ষের এ দখলদারি?




বিপর্যয়ের মুখে পাশ্চাত্যের পরিবার

মানব ইতিহাসের সবচেয়ে পুরাতন ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতষ্ঠান হলো পরিবার। মানব-সভ্যতার বয়সের সমান এর বয়স। সভ্যতার জন্ম ও অগ্রগতিতে পরিবারের অবদানই সর্বাধিক। নিছক মাতৃর্গভে জন্ম নিলেই মানব-শিশু মানব রুপে বেড়ে উঠেনা। সে মানব রূপে বেড়ে উঠার মূল সবক ও প্রশিক্ষণ পায় পরিবার থকে। পরিবারের অপরিসীমের গুরুত্বরে কথা হাদীস শরীফে বহুভাবে র্বণতি হয়ছে। নবী কারীম (সাঃ) বলছেন, “প্রতিটি মানব শিশুই জন্ম নয়ে মুসলমান রূপ, কিন্তু পিতা-মাতা বা পরিবারের প্রভাবে বেড়ে উঠে ইহুদী, নাসারা বা অমুসলমি রূপে।” সভ্যতা নির্মানের কাজ একমাত্র মানুষের, পশুদের নয়। আল্লাহর খলীফা হওয়ার কারণে প্রতিটি মুসলমানই একাজে দায়বদ্ধ। তবে এ লক্ষ্যে পরিবার অপরিহার্য। কারণ, সভ্যতার যারা নির্মাতা তাদের নির্মানেও তো প্রতিষ্ঠান চাই। পরিবার বস্তুতঃ সে কাজটিই করে।

মানব ইতিহাসের এই সনাতন প্রতিষ্ঠানটি আজ বিপর্যের মুখে। ফলে বিপন্ন আজ মানবতা। এবং থমকে দাঁড়িয়েছে সভ্যতার অগ্রগতি। ইট ধ্বসে গেলে প্রাসাদও ধ্বসে যায়। তেমনি পরিবার বিধ্বস্ত হলে বিধ্বস্ত হয় সভ্যতা। নির্জন বনে-বাদাড়ে বা মরুভূমিতে  কোন মানবশিশুই সভ্য রূপে বেড়ে উঠনো, সভ্যতাও সেখানে নির্মিত হয়না। উদ্ভিদ বা পশু-পাখীর পক্ষে একাকী বেড়ে উঠা সম্ভব হলেও মানুষরে পক্ষে তা অসম্ভব। পশুকুলে মানব শিশুকে ছেড়ে দিলে সে শুধু দৈহিক নিরাপত্তাই হারায়না, মানবিক গুন নিয়ে বেড়ে উঠার সুযোগও হারায়। মানুষ প্রভাবিত হয়ে তার আশে-পাশের অন্যকে দেখে। ছোট বেলা থেকেই যে শিশু ধর্মের নামে পিতামাতা ও প্রতিবেশীদের শাপ-শকুন, গরু, পাহাড়-পর্বত ও মুর্তির উপসানা দেখে সে শিশু পরবর্তীতে নোবেল প্রাইজ পেলেও ছোটবেলার ধর্মীয় বিশ্বাস ও অভ্যাস সহজে ছাড়তে পারে না। এজন্যই ভারতীয় হিন্দু বিজ্ঞানীগণ শাপ-শকুন, পাহাড়-পর্বত ও মুর্তি পূজার মধ্যে মুর্খতা দেখতে পায়না। একই অস্বাাবিঅসএকই কারণে পাশ্চাত্যরে একজন সেরা দার্শনিক বা ধার্মিক ব্যক্তি কোনরূপ অসভ্যতা দেখেনা উলঙ্গতা, ব্যভিচার, মদ্যপান ও সমকামিতার মধ্যে। পশু যেমন পাশে উলঙ্গতা বা ব্যভিচার হলেও তাতে ভ্রুক্ষেপও করে না, তেমনি অবস্থা পাশ্চাত্য দেশের এসব শিক্ষিতদের। জঘন্য পাপাচার ও কদর্য অসভ্যতাও তাদের কাছে অতিশয় স্বাভাবিক সভ্য-কর্ম রূপে গণ্য হয়। পাপাচারের প্রকাশ্য প্রদর্শণী এজন্যই সমাজে বন্ধ হওয়া জরুরী। এজন্যই জরুরী হল, পাপাচারমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্রের নির্মান। ইসলামে এটি র্সবশ্রষ্ঠে ইবাদাত। ঈমানদাররে এ কাজটিতেই অন্যরা সবচেয়ে বেশী উপকৃত হয়। পরিবার, রাষ্ট্র ও সমাজ একমাত্র এপথেই পুতঃপবিত্রতা পায়। এবং যে কোন সমাজে এটিই সবচেয়ে ব্যয়বহুল কাজ। নবীজী (সাঃ) ও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় কোরবানীটি পেশ করেছেন মূলতঃ এ মহান কাজে। রক্তক্ষয়ী জিহাদ লড়েছেন তারা আমৃত্যূ।এরূপ অর্থ-ব্যয়,রক্তক্ষয় নামায-রোযা-হজ্জ-যাকাত বা আল্লাহর অন্য কোন  বিধান পালনে হয় না।

 

এ বিশ্বে সব জাতি সভ্যতা গড়েনি। জন্ম দেয়নি উন্নত রুচিবোধ বা মূল্যবোধের। সুশৃঙ্খল পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মানে যারা সফল, এ কাজ বস্তুতঃ তাদের। আবর্জনার স্তুপের পাশের আবাদী ছেড়ে মানুষ যখন নগর গড়েছে, সভ্যতার নির্মাণও তখন শুরু হয়েছে। নৃশংস বর্বরতায় আরবরা এককালে ইতিহাস গড়েছিল। নিজের জীবিত কণ্যাকে তারা জ্যান্ত দাফন করতো। কিন্তু এ আরবরাই আবার র্সবকালরে সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার জন্ম দিয়েছিল। তাদের এ সফলতার কারণ, আল্লাহর হেদায়াতের অনুসরণ। এবং নিজেদের গড়েছেন নবীজীর (সাঃ)আদর্শে। বেদের বস্তি বা ভিখারীর কুড়ে ঘর নির্মানে নকশা বা মডেল লাগেনা, কিছু বাঁশ-কঞ্চি ও খড়-কুটো হলেই যথেষ্ট। কিন্তু সেটি অপরিহার্য তাজমহল নির্মানে। উন্নত সমাজ ও সভ্যতার নির্মানে তেমনি অপরিহার্য হলো উন্নত আদর্শ বা নির্দেশনা। ইসলামে সে আদর্শ বা মড়েল হলেন স্বয়ং নবীজী (সাঃ)। আর নির্দেশনা ও মূল নকশাটি দিয়েছেন খোদ আল্লাহতায়লা। এবং আল্লাহতায়লার সে নির্দেশনা বা হেদায়েত এসেছে পবিত্র কোরআনে। অসভ্য বসবাসে আদর্শ লাগে না। আইয়ামে জাহিলিয়াত যুগের আরবরাই শুধু নয়, আজও বহুশত কোটি মানুষ বসবাস করছে আল্লাহর হেদায়েত ছাড়াই। এতে সভ্যতর মানব সৃষ্টির কাজ সামনে এগুয়নি। বরং প্রচন্ড অসুস্থ বেড়েছে মানব সভ্যতার। হালাকু-চেংঙ্গিজের চেয়ে বর্বর মানুষের জন্ম হয়েছে সভ্যতার এ অসুস্থ্যতার কারণে।

 

আল্লাহর হেয়ায়েত এবং রাসূল (সাঃ)র আদর্শের অনুসরণের ফায়দা যে কত বিশাল ও কল্যাণকর সেটি প্রমাণ করেছেন প্রাথমিক কালের মুসলমানেরা। এবং সেটি মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা নির্মানের মধ্য দিয়ে। আলোর মশাল গভীর অন্ধকারেও পথ দেখায়। তেমনি ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নির্মানে পথ দেখায় নবী-রাসূলের আদর্শ। এক্ষেত্রে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ হলেন সর্বশেষ নবী হযরত মহম্মদ (সাঃ। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা তাঁকে “উসওয়াতুন হাসানা” বা উত্তম আর্দশ বলেছেন। মুসলমান হওয়ার অর্থ নবীজী (সাঃ)কে শুধু আল্লাহর রাসূল হিসাবে মৌখিক স্বীকৃতি দেয়া নয়, বরং জীবনের প্রতিপদে তাঁকে অনুকরণীয় আদর্শ রূপে কবুল করা। নবীজী (সাঃ)র সাথে সাহাবায়ে কেরামের আচরণ সেটিই ছিল। তাঁকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে উত্তম আদর্শ রূপে বিশ্বাস করা বা অনুসরণ করাই কুফরি। এটি ইসলাম থেকে বিচ্যুতি। সাহাবায়ে কেরাম তাদের সমস্ত কর্ম ও আচরণে –তা সে ইবাদত হোক বা ব্যক্তি-পরিবার-রাষ্ট্র ও সমাজ গঠন হোক – তার অনুসৃত আদর্শকে অনুসরণ করেছিলেন। আলোর ন্যায় নবীজি (সাঃ)র আর্দশও আরবের ঘরগুলোকে সেদিন আলোকিত করেছিল। ফলে দূরীভূত হয়েছিল মিথ্যা ও অজ্ঞতার অন্ধকার। তখন ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ শিক্ষালয়ে পরনিত করছেলি মুসলমানদের প্রতিটি ঘর্ ও প্রতিটি পরিবার। এবং এভাবে অতি দ্রুত অগ্রসর হয়েছিলেন উচ্চতর সভ্যতা নির্মানের দিকে। সে কালে কোন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না, কিন্তু মুষ্টিমেয় সাহাবীদের ঘর থেকে যে মাপের জ্ঞানবান মানুষ তৈরী হয়েছিল তা মুসলিম বিশ্বের সবগুলো বিশ্ববিদ্যায় বিগদ হাজার বছরে পারেনি। উচ্চতর সভ্যতা নির্মানের কাজ তো এভাবেই ঘর বা পরিবার থেকে শুরু হয়। একাজে পরিবার নিষ্ক্রীয় হলে ব্যাক্তির উন্নয়নের সাথে উম্মাহর উন্নয়ন থমকে দাড়ায়। সভ্যতা কি? এটি হলো জাতীয় জীবনে সভ্যতর ব্যক্তিসমুহের সৃষ্টিশীল কর্ম ও সভ্যতর পরিবর্তনের যোগফল। ফলে একই রকম কুঁড়ে ঘরে হাজার বছর বাস করলে তাতে সভ্যতা নির্মিত হয়না। কারন এটি স্থবিরতা। এমন স্থবিরতায় প্রকাশ পায় আদিম অজ্ঞতাকে আঁকড়ে ধরে বসবাসের প্রবনতা। অথচ পিরামিড বা তাজমহল গড়লে সেটি সভ্যতার অংশ হয়ে যায়। কারন তাজমহলের নির্মানে স্থাপত্যশিল্পকে কুঁড়ে ঘর নির্মানের কৌশল থেকে বহু পথ পাড়ি দিতে হয়। সভ্যতার গুণাগুণ বিচারে তো সে অগ্রগতিটুকুরই বিচার হয়। কিন্তু সভ্যতার তুলনামূলক বিচারে কৃষি, শিল্প, প্রাসাদ বা নগর নির্মানের পাশাপাশি উচ্চতর মানুষ গড়ার শিল্প কতটা সামনে এগুলো সেটিই বেশী গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সেটি যখন উৎকর্ষ পায় তখনই শ্রেষ্ঠতর সভ্যতা নির্মিত হয়। মিশরে বিস্ময়কর পিরামিড বা চীনে বিশাল প্রাচীর নির্মিত হলেও মানবিকতা সম্পন্ন সে বিশাল মাপের মানুষ নির্মিত হয়নি। অথচ সেটি সম্ভব হয়েছিল ইসলামে। অন্য সভ্যতা থেকে ইসলামি সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্ব তো এখানেই।

 

নবীজী (সাঃ) বলেছেন, “দুঃখ হয় ঐ ব্যক্তির জন্য যার জীবনে দুইটি দিন অতিক্রান্ত হলো অথচ তার জ্ঞান ও তাকওয়ার কোন পরর্বিতনই হলোনা”। অথচ আজ মুসলিম বিশ্বে এমন মানুষের সংখ্যা কোটি কোটি যাদের জীবনে শুধু শুধু দুটি দিন নয়, হাজারো দিন -এমন কি সমগ্র জীবন কেটে গেছে অথচ তাদের জ্ঞান ও তাকওয়ার ভান্ডারে কোন পরিবর্তনই আসেনি। সারাটা জীবন বাস করছে অজ্ঞতার ঘোর অন্ধকারের মাঝে। অতিবৃদ্ধ বয়সেও কোরআনের সামান্য একটি ছুরাও বোঝবার সামর্থ অর্জন করেনি। একজন মানুষের কাছেও দ্বীনের দাওয়াত পৌছানোর সামর্থ অর্জন করেনি। যে মুসলমানের জীবনে পরর্বিতনহীন দুইটি দিন যেখানে অসহ্য সে ব্যক্তি কাদা-মাটি, লতা-পাতা, বাঁশ-কঞ্চির ঘরে হাজারো বছর কাটায় কি করে? অথচ বাংলাদেশের ন্যায় দেশে মুসলমানেরা তো সেটিই করেছে। একই রূপ ঘর, একই রূপ কৃষিকাজ ও একই রূপ সংস্কৃতির মাঝে তাদের বসবাস বহুশত বছরের। প্রাথমিক যুগের মুষ্টিমেয় মুসলমানদের হাতে সে সময় উন্নত সভ্যতার জন্ম হয়ছেলি সেটি তো সামনে চলার প্রবল প্রেরণা থেকেই। যেখানে পরিবর্তন নেই সেখানে সভ্যতাও নাই। বিশ্বে বহু ভাষা ও বহু ধর্মের বহু জাতির মানুষের বাস। কিন্তু সভ্যতার জন্মদান সবার দ্বারা হয়নি। সভ্যতার জন্ম দানে যারা ব্যর্থ, তাদের সে ব্যর্থতার কারণঃ তারা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্ররে মত প্রতিষ্ঠানগুলো সঠিক ভাবে গড়ে তুলতে পারিনি। তবে এক্ষেত্রে মূল ব্যর্থতা, আদর্শ পরিবার গড়ায় ব্যর্থতা। কারণ, প্রাসাদ গড়তে যেমন ভাল ইট লাগে তেমনি উচ্চতর সমাজ ও সভ্যতা গড়তেও ভাল মানুষ ও পরিবার লাগে।

 

পারিবার গড়ে উঠেছে বস্তুতঃ মানবিক প্রয়োজনের তাগিদে। অন্য প্রানীকূল থেকে মানুষের শ্রেষ্ঠতম হওয়ার এটিই মূল কারন। পশুদের জীবনে সহস্র বছরেও পরর্বিতন আসে না। গবাদি পশুরা হাজার বছর পূর্বেও যেভাবে ঘাস খেত বা জীবন ধারন করতো এখনো তাই করে। অথচ মানুষ সামনে এগিয়েছে। এর কারণ পরিবার। এ জীবনে নিজের প্রয়োজন আর কতটুকু? কুকুর বিড়ালও সমাজে না খেয়ে মরে না। কারণ তাদের একার প্রয়োজন সব সমাজেই পূরণ হয়। অথচ মানুষকে ভাবতে হয় তার পরিবার ও আপনজনদের নিয়ে। এ ভাবনাই তাকে কর্মশীল, গতিশীল ও দুঃসাহসী করে। পাহাড়-পর্বত, সাগর-মহাসাগরও পাড়ি দয়ে। এরূপ অবিরাম উদ্যোগ ও আত্মনিয়োগই ব্যক্তির যোগ্যতা ও সৃজনশীলতা বাড়ায়। মানুষ জীবনে যা শেখে তার সিংহভাগই শেখে কাজ করতে করতে। তাই যার জীবনে কাজ নেই, তার জীবনে জ্ঞানের বৃদ্ধিও নেই। প্রয়োজনের তাগিদেই সৃষ্টি হয় নতুন আবিষ্কার। যার পরিবার নাই তার জীবনে কর্মে প্রেরণাও নাই। কারণ তার প্রয়োজনের মাত্রাটি অতি সামান্য। পরিবার পরিজনহীন সাধু-সন্যাসীদের দ্বারা তাই সভ্যতার নির্মান দূরে থাকে একখানি গৃহ নির্মানও অসম্ভব। ফলে এমন মানুষরে সংখ্যা বৃদ্ধিতে ক্ষতগ্রিস্থ হয় সমাজ ও রাষ্ট্র। এবং বাধাগ্রস্ত হয় সভ্যতার নির্মান বা অগ্রগতি। ইসলামে তাই বৈরাগ্য জীবনের কোন স্থান নেই।

 

মানব শিশু তার পরিবার থেকে শুধু প্রতিপালনই পায় না, জীবনের মূল পাঠগুলোও পায়। শেখে, কি ভাবে তাকে বেড়ে উঠতে হয়। শেখে কর্মকুশলতা। শেখে কিভাবে অন্যদের দূঃখে দূঃখী এবং সুখে সুখী হতে হয়। পরিবার থেকেই ব্যক্তি পায় উন্নত রুচিবোধ, মূল্যবোধ ও বাঁচবার সংস্কৃতি। মানুষ যখন কলজে-বিশ্ববিদ্যালয় গড়েনি তখনও জীবনের সর্বোচ্চ শিক্ষা পেত পিতা-মাতা, ভাই-বোন, দাদা-দাদী ও অন্যান্য আপনজনদের থেকে। পিরামিড বা তহজমহলের ন্যায় শ্রেষ্ঠ স্থাপত্যশিল্পগুলো যারা গড়ছেলিনে তারাও কোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিদ্যা হাসিল করেননি।সে উচ্চতর বিদ্যা পেয়েছেলিনে নিজেদের পরিবার থেকে। পরিবারই যে মানব জাতির শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয় – সে প্রমান তাই প্রচুর। অথচ আজ সেটিই ভয়ানক বিপর্যয়ের মুখে। বিশাল বিশাল কল-কারখানা বৃদ্ধির সাথে যেমন বিলুপ্ত হয়েছে পরিবার ভিত্তিক কুঠির শিল্প, যান্ত্রীকতা বৃদ্ধির সাথে তেমনি বিলুপ্ত হচ্ছে পরিবার ও পরিবার ভিত্তিক শিক্ষালয়। ফলে মানুষের কেতাবী বা কারিগরি জ্ঞান বাড়লেও বিধস্ত হচ্ছে মূল্যবোধ। সম্পদ বাড়লেও মানুষ নিঃস্ব হচ্ছে মানবিক গুনাবলীত।

 

একমাত্র পারিবারীক শান্তিই ব্যক্তিকে দেয় প্রকৃত শান্তি। পরিবার হলো জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। ব্যক্তির সকল ব্যস্ততাই শুধু নয়, তার সকল স্বপ্ন ও আশা-ভরসা দোল খায় এ পরিবারকে ঘিরে। ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত মানুষ যেখানে শান্তি খুঁজে পায় সেটি তার অফিস নয়, কারখানা বা অন্যকোন কর্মক্ষেত্রও নয়। বরং সেটি হলো তার পরিবার। অশান্তি একবার পরিবারে বাসা বাঁধলে সেটি কোন ঔষধ্ই দূর হবার নয়। অশান্তির সে আগুন তখন গৃহের সীমানা ডিঙ্গিয়ে রাজপথে, লোকালয়ে বা কর্মস্থলে গড়িয়ে পড়ে। তখন সামাজিক অশান্তি বাড়ে সর্বত্র জুড়ে। ক্রমঃর্বধমান মাদকাসক্তি, গ্যাংফাইট ও সন্ত্রাস – এসব তো জন্ম পায় পারিবারীক অশান্তি থেকেই। উলঙ্গতা, মদ্যপান, ব্যাভিচার ও নানা পাপাচার পরিবারে প্রতিপালন পেলে তখন তাতে সমাজও পরিপূর্ণ হয়ে উঠে। মানুষ তার ন্যায়বোধ, রুচিবোধ, মূল্যবোধ ও আচার-আচরন নিয়ে জন্মায়না, এগুলো সে পায় পরিবার থেকে। আর এগুলো নিয়েই তার সর্বত্র বিচরন। অপর দিকে বাইরের জগতে যতই সমৃদ্ধি হোক, তাতে পরিবারে শান্তি আসেনা। একাজ ব্যক্তির একান্তই নিজস্ব। পরিবারকে ঘিরেই শান্তির নিরাপদ দুর্গটি গড়ে উঠে প্রেম-প্রীতি ,ভালবাসা ও উচ্চতর মূল্যবোধরে ভত্তিতি। নিছক পানাহার, যৌনতা বা যৌথবাসই পরিবারের ভিত্তি নয়। এটি নিছক পশু সুলভ। পরিবার গড়ে উঠে উচ্চতর এক উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে। দেহ-ভিত্তিক বা যৌনতা-ভিত্তিকি সম্পর্ক প্রাধান্য পেলে মানুষ তখন আর পশু থেকে শ্রেষ্ঠতর থাকে না। এর জন্য পরিবারের প্রয়োজনও পড়নো। ঘরবাড়ি ও পরিবার ছাড়াই জীব-জন্তু যুগ যুগ বেঁচে আছে। তাদের বংশবিস্তারও হয়েছে। পশুর মত বসবাস, পানাহার বা অবাধ যৌনতা এ বিশ্বে কোন কালেই কম ছিল না। এরপরও মানুষ ঘর বেঁধেছে, পরিবার গড়েছে। শুধু নিজের নয়, সমগ্র পরিবার ও পরিবারের সাথে সংশ্লিষ্ট অন্যদরে দায়-দায়িত্বও মাথায় তুলে নিয়েছে। শুধু ভোগ নয়, দায়ত্ব-পালনও যে বাঁচবার অন্যতম মিশন – মানুষ এ ভাবেই তার স্বাক্ষর রেখেছে। সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মান দুরে থাক একাকী একখানি ঘরও উঠানো যায়না। এর জন্য পারস্পারিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতা চাই। পরিকার তো শিশুকাল থেকে সেটিরও অভ্যাস গড়ে তুলে। প্রাকটিসের জন্য দেয় একটি অবকাঠামো। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মাধ্যমে যে সংযোগ গড়ে উঠে সেটি নিছক দুটি ব্যক্তির নয়, বরং সেটি দুটি পরিবার, দুটি গোত্র বা দুটি জনপদের মাঝে। সৃষ্টি হয় সৌর্হাদ-সম্প্রীতির অভ্যাস। রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনে এসম্পর্ক সিমেন্টের কাজ করে। মানব সমাজ এতে সংঘবদ্ধতা বা সামাজিক বন্ধন পায়। বৃদ্ধি পায় পারস্পরকি আস্থা ও শ্রদ্ধাবোধ। পরিবারের মূল ভিত্তি শুধু আইন নয় বরং এ মূল্যবোধ। ফলে এ মূল্যবোধ বিলুপ্ত হলে বিলুপ্ত হয় পরিবার। বস্তবাদী জীবন দর্শনে যা কিছু দর্শনীয় ও চিত্তাকর্ষক, যাতে থাকে নগদপ্রাপ্তি সে গুলোই গুরুত্ব পায়। তখন গুরুত্ব হারায় নীতি-নৈতিকতা, র্ধমীয় মূল্যবোধ, পরকালীন ভয় ইত্যাদি অদৃশ্য বিষয়। এমন সেকুলার পরিবারে স্বার্থপরতাও ন্যায্য কর্মে পরিনত হয়। পরিবার তখন পরিনত হয় দুর্বৃত্তদের দুর্গে। পাপাচারী দুবৃত্তরা সেখানে শুধু প্রতিরক্ষাই পায় না, সম্মানও পায়। তখন পরিবারগুলো পরিণত হয় দুর্বৃত্তদের পাঠশালায়। তখন দেশে স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালের সংখ্যা বাড়লেও দুর্বৃত্তি কমে না। বরং আকাশচুম্বি হয়। চোর-ডাকাত, ঘুষ-খোর, সূদ-খোর, ব্যাভিচারি, সন্ত্রাসী এমন ঘরে তিরস্কৃত না হয়ে নন্দিত হয়। পায় নতুন দুর্বৃত্তির অনুপ্রেরণা। একারণ্ই আধুনিক মানুষ দুর্বৃত্তি ও মানব-হত্যায় অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। এমন মানুষ তার কর্মে ও উদ্যোগে অনুপ্রেরণা পায় অর্থনৈতিক স্বার্থ-সিদ্ধি, যৌনলিপ্সা ও প্রতিপত্তা বিস্তারের তাড়না থেকে। যেখানেই শিকার, শিকারী পশুর সেখানেই পদচারনা। অনুরূপ অবস্থা বস্তুবাদী ও ভোগবাদী স্বার্থশিকারীদেরও। এমন এক স্বার্থশিকারি চেতনায় নতুন যৌন শিকার ধরতে নানা বাহানায় বিচ্ছিন্ন হচ্ছে পুরনো শিকারী থেকে। এতে বিচ্ছেদ নেমে আসছে বিবাহবন্ধনে। গাড়ী পাল্টানোর চেয়ে স্ত্রী বা স্বামী পাল্টানো এজন্যই রুটিনে পরিণত হয়েছে। আর এতে বাড়ছে পারিবারীক বিপর্যয়।

 

নিজেদের ভোগ-বিলাস ও আনন্দ-উল্লাস বাড়াতে পাশ্চাত্যরে মানুষ নিজের ঘাড় থেকে দায়িত্বের বোঝা কমিয়েছে। আর মানুষের ঘাড়ে তো সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো তার স্ত্রী-পুত্র-কন্যা প্রতিপালনের দায়িত্ব। সে দায়িত্ব কমাতে গিয়ে বিধ্বস্ত করেছে পরিবার। অধিকাংশ নারী হারিয়েছে সন্তান জন্মদানের আগ্রহ। অথচ স্বামী-স্ত্রীর মাঝে সন্তান বন্ধনের কাজ করে। তাছাড়া পরিবার গড়তে হলে বৈবাহিক জীবনের স্থায়ীত্বটি জরুরী। চোরাবালীর উপর যেমন বিল্ডিং গড়া যায়না, তেমনি নড়বড়ে বৈবাহিক সম্পর্কের উপর নিভর করে পরিবার গড়ে উঠে না। এজন্য স্বামী-স্ত্রীর সুসম্পর্ক ও টেকসই সম্প্রীতি প্রয়োজন। বিবাহের পর স্বামী-স্ত্রীর মাঝে একে অপররে উপর শুধু অধিকারই প্রতিষ্ঠিত হয়না, দায়িত্বও অর্পিত হয়। সে দায়ত্বি এড়াতে পাশ্চাত্যরে মানুষ বিবাহ এড়িয়ে যাচ্ছে। এমন অসুস্থ্য চেতনায় মজবুত পরিবার গড়ে উঠবে সেটি কি আশা করা যায়?  ফলে বিধস্ত হচ্ছে পারিবারীক শান্তি। শান্তির খোঁজে পাশ্চাত্যের অশান্ত মানুষ এখন বিকল্প পথ ধরেছে। বেড়েছে প্রমোদ-ভ্রমন, বেড়েছে মদ্যপান, বেশ্যাবৃত্তি, যৌনতা ও ড্রাগের আসক্তি। এমন স্বেচ্ছাচারি জীবন-উপভোগে পারিবারীক বন্ধনকে এরা পায়ের বেড়ী মনে করে, একারণেই শত্রুতা এটির বিরুদ্ধেও। সন্তান যৌন-বাজারে বাজার-দর কমাবে এ ভয়ে গর্ভপাতের নামে অবাধে শিশু হত্যা হচ্ছে। এভাবে পরিবার পরিনত হয়েছে মানব-হত্যার প্রশিক্ষণ ক্ষেত্রে।

 

পরিবার বিধস্ত হওয়ায় সবচেয়ে বেশী অসহায় ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নারী। পাশ্চাত্য সমাজে তাদের কদর বেড়েছে বিজ্ঞাপন, পর্ণ-ফিল্ম ও নাচ-গানের মত বিনাদন শিল্পে। অথচ আবহমান কাল থেকেই নারীদের জন্য পরিবার ছিল সুরক্ষিত দুর্গ। সেখানে মা হিসাবে সন্তানদের গভীর সম্মান, কন্যা ও বোনরূপে আদর ও স্নেহ এবং স্ত্রী হিসাবে ভালবাসা তারা যুগ যুগ পেয়ে এসেছে। অথচ নারী স্বাধীনতা, নারীর ক্ষমতায়ন ও সম-অধিকার ইত্যাদি নানা বাহানায় সেখান থেকে বের করে তাদরকে অসহায় ও অরক্ষতি করা হয়েছে। ফলে তারা আজ ধর্ষণ, হত্যা ও নানাবধি পাশবকি অত্যাচাররে শিকার। সুরক্ষিত পরিবার থেকে বের করে তাদরকে যেন ক্ষুধার্ত ও হিংস্র পশুর সামনে ফেলা হয়েছে। এমন অরক্ষিত অবস্থান থেকে নারীর পক্ষে সন্তান পালনের মত দায়িত্ব-পালন কি সম্ভব? তাছাড়া সন্তান পালন কোন লঘু-দায়িত্ব নয়, খন্ডকালীন কাজও নয়। এ কাজ নিজেই রাতদিনের এক সার্বক্ষনিক ব্যস্ততা। কল-কারখানা, অফিস-আদালত, সেনা বা পুলিশ বাহিনীতে গুরুদায়িত্ব পালনের পর কি এ কাজের আর সামর্থ থাকে? নারীর মর্যাদা বাড়াতে গিয়ে এভাবে বিপর্যয় বাড়ানো হয়েছে। পণ্যের ন্যায় নারীকেও  বাজারে তুলা হয়েছে।

 

নারীর দুটি সত্বা। একটি তার নারীত্ব। অপরটি যৌনতা। পর্দা যৌনতাকে আড়াল করে, আর প্রকাশ করে তার মহান নারীত্বকে। তখন সে সমাজে মা-বোন বা স্ত্রীর সম্মানজনক মর্যাদা পায়। মায়ের পায়ের নীচে সন্তানের জান্নাতের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। নারীত্বের বদলে যথন যৌনতা প্রাধান্য পেয়েছে তখনই নারীর জীবনে প্রচন্ড বিযর্যয় নেমে এসেছে। তখন বিধ্বস্ত হয়েছে পরিবার। যৌনতা নিয়ে বাণিজ্য জমে, কিন্তু তাতে পরিবার প্রতিষ্ঠা পায় না। এজন্যই পতিতাদের কোন পরিবার থাকে না। পাশ্চাত্যে নারীর যৌন সত্ত্বা নিয়ে ব্যণিজ্যে যে কতটা রমরমা ভাব, সেটির প্রমাণ মেলে অলিতে গলিতে নাইট ক্লাব, মদ্যশালা বা পাব ও পতিতাপল্লির সংখ্যা দেখে। পণ্যের বাজারজাত করণে গুরুত্বপূর্ণ হলো আর্কষনীয় প্যাকেজিং। তেমনটি ঘটেছে নারীর ক্ষেত্রেও। এবং সেটি ঘটেছে নিত্য-নতুন ফ্যাশানের নামে। ফ্যাশানের প্রকোপে বিলুপ্ত হয়েছে পর্দা ও শালীন পোষাক। অথচ পর্দা যুগ যুগ ধরে নারীর যৌনতাকে ঢেকে রেখেছে এবং নিরাপত্তা দিয়েছে এবং মহীয়ান করেছে তার নারীত্বকে। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে পর্দা চিহ্নিত হয়ে এসেছে সভ্যতা ও শিষ্ঠতার প্রতীক রূপে। মানব জাতির এটি অতি সনাতন প্রথা। যখন বস্ত্র ছলিনা তখনও মানুষ গাছের পাতা বা ছাল, চামড়া ইত্যাদি দিয়ে লজ্জা নিবারনের চেষ্টা করেছে।

বাংকার বা পরিখার নিরাপদ আশ্রয় থেকে কাউকে বের করে খোলা ময়দানে গুলীর লক্ষ্যবস্তু বানানো সহজ। স্বার্থশিকারী পুরুষেরাও চায় চায় ঘরের নিরাপদ আশ্রয় থেকে নারীদরে বের করে আনতে। পাশ্চাত্যে বস্তুতঃ সেটিই করা হয়েছে। ফলে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির জোয়ারে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নারী। র্ধমহীন ও বিবেকহীন মানুষের শোষন, শাসন ও নির্যাতনের শিকার যেমন দুর্বল মানুষ, তেমনি যৌন শোষনের শিকার হলো দুর্বল নারী। অথচ নারী স্বাধীনতা ও সম-অধিকারের গলাবাজী ও প্রলোভনে তাদরেকে আত্মভোলা করে রাখা হয়েছে।

 

স্বামী-স্ত্রীর বৈবাহিক সর্ম্পকে আপোষ চলনো। তাদের সর্ম্পকে অন্য কেউ ভাগীদার হবে সেটিও অকল্পনীয়। কিন্তু ভোগবাদীদের কাছে এমন আপোষহীনতা কুসংস্কার। মদমত্ত নাচের তালে অন্যের স্ত্রীকে যেমন তারা কাছে টানে, তেমনি নিজের স্ত্রীকে সঁপে দেয় অন্যের আলঙ্গিনে। এরূপ সংস্কৃতির পরিচর্যা বাড়াতেই পাশ্চাত্যে প্রতি লোকালয়ে গড়ে উঠেছে নাইট ক্লাব। আর  এটিই   হলো আধুনিক পাশ্চাত্য সংস্কৃতি। এ সংস্কৃতিতে যেটি বাড়ে সেটি পাপ। প্রসেডিন্টে, প্রধানমন্ত্রী, সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক দলের কর্মী, উচ্চ পদস্থ কর্মচারী, এমনকি গীর্জার পাদ্রীও আক্রান্ত এ পাপাচারে। ফলে বিপন্ন হয়েছে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরকি আস্থা ও সর্ম্পক। এতে ভেঙ্গে যাচ্ছে পরিবার এবং সুফল মিলছে না মিলশিমশিনো বার বার বিবাহতেও। আর বিবাহিত জীবন ব্যর্থ হলে যেটি বাড়ে সেটি হলো ব্যাভিচার। পাশ্চাত্যে সেটিই হয়েছে। আর কোন রাষ্ট্র বা সমা পাপাচারে প্লাবিত হলে পাপের সংজ্ঞাই পাল্টে যায়। তখন পাপ আর পাপ রূপে গণ্য হয় না। গণ্য হয় শিষ্ঠ কর্ম রূপে। এমন পাপকে পাপীষ্ঠরা অতীতে র্ধম-র্কমও বলছে। যেমন কা’বাকে ঘিরে পৌত্তলিক কাফেরদের উলঙ্গ তোয়াফ বা ভারতীয় মন্দিরে যৌন দাসীদের সাথে ব্যাভীচার। ব্যাীব্যভববববববচিার। পাপতো তাই যা নীতি ও নৈতিকতা বিরোধী, যা শিষ্ঠতার খেলাপ। সে নীতি ও নৈতিকতাই যদি পাল্টে যায় তবে সে গুলো কি আর পাপ রূপে গন্য হয়? ব্যাভিচার, সমকামিতা বা হোমোসেক্সুয়ালিটি এ কারনেই পাশ্চাত্য সমাজে আজ আর অপরাধ নয়, বরং আইনসিদ্ধ বৈধ কর্ম। এখন এ পাপ গুলোকেই তারা বিশ্বব্যাপী সিদ্ধ করতে চাচ্ছে। এরা এ পাপাচারকেই এখন নাগরিক অধিকারে পরিণত করতে চায়। এ কাজে তারা ব্যাবহার করছে জাতিসংঘকে। পরিবার ভেঙ্গে যারা পতিতার পল্লীতে আশ্রয় নিয়েছে তাদেরকে বলছে সেক্স ওয়ার্কার। ব্যাভিচারের ন্যায় পাপাচারের বিরুদ্ধে এতকাল যে ঘৃনাবোধ ছিল এখন সেটিই বিলুপ্ত করছে। প্রশ্ন হলো, যে মূল্যবোধে এমন পাপাচার প্রশ্রয় পায় সে মূল্যবোধে কি পরিবার বাঁচে?

 

প্রশ্ন হলো এ বিনাশী বিপর্যয় থেকে উদ্ধার কোন পথে? পথ একটিই, আর তা হলো ইসলামের পূর্ণ অনুসরণ। সে সাথে পাশ্চাত্যের মূল্যবোধ, জীবনচেতনা ও সংস্কৃতিকে বর্জন করা। চিন্তা-চেতনার মডেল না পাল্টালে কর্ম ও আচরনেও কোন পরর্বিতন আসে না। নবীজি (সাঃ) সে কাজটিই করেছিলেন। বিপর্যস্ত পরিবার বস্তুতঃ রোগাগ্রস্ত  চেতনার সিম্পটম মাত্র। মূল রোগ আরো গভীর। আর সেটি হলো ইসলামে অজ্ঞতা।  অজ্ঞতায় যেটি বাড়ে সেটি আল্লাহ ও তাঁর দ্বীনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। মানব-সভ্যতা কোন কালেই  সম্পদের কমতির কারণে বিপর্যস্ত হয়নি। বিপর্যস্ত হয়েছে নৈতিক বিপর্যয়ের কারণে। দুর্ভিক্ষে যদিও প্রান নাশ হয় তবে তাতে সভ্যতার বিনাশ হয় না। প্রচীন কালে পাহাড় কেটে কেটে সামুদ জাতি সুরম্য প্রাসাদ গড়ছেলি। তারা নিশ্চিহ্ন হয়েছিল। নিশ্চিহ্ন হয়েছিল নমরূদ ফিরাউন। এর কারণ আল্লাহর অবাধ্যতা। অথচ ফিরোউন বহু হাজার বছর আগে স্থাপত্যে বিস্ময়কর ইতিহাস গড়েছিল।

 

পাশ্চাত্যের ঘাড়ে এই একই রোগ চেপেছে। প্রাচুর্যের অহংকার শুধু সত্যকে মেনে নিতেই অমনোযোগী করেনি। বরং সেটি আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে তাদেরকে যুদ্ধাংদেহীও করেছে। উদ্ধত ও প্রচন্ড অহংকারী করেছে হোমোসেক্সুয়ালিটি, মদ্যপান, উলঙ্গতা, পর্নোগ্রাফী এসব পাপ কর্ম নিয়েও। এমন পাপের অধিকারকে তারা মানবাধিকার বলছে। অতীতে যে দুর্ভোগ হয়েছে রোগ-ব্যাধির কারণে, এখন তার চেয়েও বেশী দুর্ভোগ হচ্ছে এরূপ বিধ্বস্ত মূল্যবোধ ও বিপর্যস্ত পরিবারের কারণে। পাশ্চাত্যের মূল বিপদ এখানেই। গাড়ীর মডল  নিয়ে তাদরে যতটা ব্যস্ততা, পথের ডিরেকশন নিয়ে ততটা নয়। এ অবস্থায় রোগ যেমন বাড়ছে তেমনি তীব্রতর হচ্ছে সিম্পটম। এমন বিপর্যয়ের মুখে পাশ্চাত্যের সমাজ-বিজ্ঞানী বা দার্শনিকগণ অসহায়। যে স্রোতের টানে তারা গা ভাসিয়ে দিয়েছে সেটিয়ে তাদের ভাসিয়ে নিয়ে ছাড়বে। এ অসুস্থ্য সভ্যতাকে বাঁচাতে তাদের সকল সামর্থ নিঃশেষ। বিশ্বের অন্য র্ধম ও মতবাদগুলোরও একই রূপ বেহাল অবস্থা। তাছাড়া এসব অনৈতিক চেতনা ও জীবন-বোধ পরিবারে শান্তি এনেছে -সমগ্র ইতিহাসে তার নজির নেই। এমন নৈতিক বিপর্যয়ের মোকাবেলায় একমাত্র ইসলামই শেষ ভরসা। তাছাড়া এমন বিপর্যয়ের মুখে মানব জাতির উদ্ধারে একমাত্র ইসলামই অতীতে সফলতা দেখিয়েছে। সেটি একবার নয়, বহুবার। শুধু একটি জনপদে নয়, অসংখ্য জনপদে। ইসলামের সে সার্মথ এখনও অম্লান। আল্লাহর প্রদর্শিত এ পথটি এখনও অক্ষত তার বিস্ময়কর নির্ভূলতা নিয়ে। স্রষ্টার পক্ষ থেকে বস্তুতঃ এটিই একমাত্র প্রেসক্রিপশন। এ প্রেসক্রিপশন অপরিহার্য শুধু সমাজ ও রাষ্ট্রের সুস্থ্যতা বিধানেই নয়, বিপর্যস্ত পরিবারকে বাঁচাতেও। বর্তমানের পারিবারিক বিপর্যয় থেকে উদ্ধারের এটিই একমাত্র পথ। লন্ডন, ১৯/০৭/২০০৯