যে কারণে হত্যা করা হলো প্রেসিডেন্ট মুহম্মদ মুরসীকে

মিশরে এবার ফিরাউনের দিন

অতীতের ফিরাউন যদি মিশরের শাসন ক্ষমতায় আবার ফিরে আসতো তবে ইসলামের বিজয় নিয়ে যারা স্বপ্ন দেখে তাদের উপর অনিবার্য হতো এক অসহনীয় দুর্দিন। যে ভয়াবহ বিপদ নেমে এসেছিল হযরত মূসা (সাঃ) ও তার ক্‌ওম বনি ইসরাইলের উপর –সেরূপ বিপদের মুখে পড়তে হতো তাদেরও। নির্মম ভাবে তাদের নির্মূল করা হতো এবং বাঁচিয়ে রাখা হতো কেবল নির্যাতনে নির্যাতনে তাদের বাঁকি জীবনকে অতিষ্ট করার লক্ষ্যে। তবে ফিরাউন যেটি করতো সেটি নিখুঁত ভাবে করছে মিশরের স্বৈরাচারি শাসক জেনারেল আব্দুল ফাতাহ আল-সিসি। বরং সে আদিম বর্বরতায় যোগ হয়েছে আধুনিক নৃশংসতা। তার সরকারের হাতেই জেল খানায় নিহত হলো মিশরের ইতিহাসে সর্বপ্রথম নির্বাচিত সিভিলিয়ান প্রেসিডেন্ট ডক্টর মুহম্মদ মুরসী। উল্লেখ্য হলো, সরকারের পক্ষ থেকে সাঁজানো একটি মামলায় বহু আগেই প্রেসিডেন্ট মুরসীকে প্রাণদন্ড দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সে প্রাণদন্ড কার্যকর করতে জেনারেল সিসির সরকার ভয় পাচ্ছিল। ভয় ছিল, প্রাণদন্ড পরিকল্পিত হত্যাকান্ড রূপে চিত্রিত হওয়ার। অবশেষে তাঁকে অন্যপথে বিদায় দেয়া হলো। সেটি হার্ট এ্যাটাকের লেবেল এঁটে দিয়ে।

স্বৈরাচারি শাসকদের হাতে এমন পরিকল্পিত হত্যাকান্ড বিরল নয়, বরং অতি স্বাভাবিক। শুধু মিশরে নয়, মুসলিম বিশ্বের যেসব দেশ ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক কাফেরদের হাতে অধিকৃত হয়েছিল তাব সবগুলিতে একই রূপ বীভৎসতা। এ দেশগুলিতে ইসলামে সবচেয়ে নৃশংস দুষমনেরা কোন পতিতা পল্লিতে জন্ম নেয়নি, বরং তারা বেড়ে উঠেছে সামরিক বাহিনীর ছাউনীতে বা সেক্যুলারিস্টদের ঘরে। ইসলামের বিজয় বা গৌরববৃদ্ধি তাদের ধাতে সয় না। এসব দেশের সামরিক বাহিনীর যারা রোল মডেল বা তারকা-চরিত্র তাদের সামরিক জীবন শুরু হয়েছিল দেশের স্বাধীনতার সুরক্ষায় নয়, বরং সেটি ছিল কাফেরদের শাসনকে মুসলিম দেশে বলবান ও দীর্ঘায়ীত করার লক্ষ্যে। যেমন পাকিস্তানের জেনারেল আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান, টিক্কা খান, নিয়াজীর ন্যায় ব্যক্তিগণ। একই উদ্দেশ্য নিয়ে বাংলাদেশে সেনাবাহিনীর জেনারেল আতাউল গণি ওসমানীও ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিল। ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে সামরিক বাহিনীর সেক্যুলারিস্টদের সবচেয়ে বড় অপরাধটি হলো অবিভক্ত ভারতের নানাভাষী মুসলিমদের প্যান-ইসলামিক পাকিস্তান প্রজেক্টকে ব্যর্থ করে দেয়ায়। এমন কি তারা বার বার বাধাগ্রস্ত করেছে পাকিস্তানে এবং পরবর্তী কালে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ধারার শাসন প্রক্রিয়া।

নৃশংস নাশকতাটি সেক্যুলারিস্টদের

মুসলিম দেশে সামরিক বাহিনীর ক্যান্টনমেন্টগুলো হলো ইউরোপীয় কাফের সংস্কৃতির অতি সুরক্ষিত দ্বীপ। নিজদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের ইসলামী সংস্কৃতির সেখানে প্রবেশাধীকার নাই – বিশেষ করে সেদেশগুলিতে যেগুলি ইউরোপীয় কাফেরদের কলোনী ছিল। এ সেক্যুলার শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে গড়ে উঠা অফিসারগণ ইসলাম থেকে এতটাই বিচ্ছিন্ন যে মসজিদ-মাদ্রাসার উপর বোমা ফেলতেও এরা ইতস্ততঃ করে না -যেমনটি হয়েছে ইসলামাবাদের লাল মসজিদ ও হাফসা মাদ্রাসার উপর। এদের প্রাণ কাঁপে না নৃশংস গণহত্যাতেও। সেক্যুলারিজমের আভিধানিক অর্থ ইহজাগতিকতা। অতি ইহজাগতিকতার কারণেই সেক্যুলারিস্টদের মাঝে বিলুপ্ত হয় আখেরাতের ভয়। দেশের প্রতিরক্ষা কি দিবে, তারা বরং ইহজাগতিক সম্ভোগ বাড়াতে দখলে নেয় নিজ দেশের অতি মূল্যবান আবাসিক এলাকাগুলি। একই রোগ পাকিস্তান আর্মির ভগ্নাংশ ও সে অভিন্ন সেক্যুলার সংস্কৃতির ধারক বাংলাদেশ সেনাবাহিনীরও।

যে কোন মুসলিম রাষ্ট্র ভাঙ্গাই কবিরা গুনাহ তথা হারাম। তাতে কুফরি তথা অবাধ্যতা হয় মহান আল্লাহতায়ালার সে অলংঘনীয় কোরাআনী নির্দেশের যাতে বলা হয়েছে তোমরা বিভক্ত হয়ো না। বাংলাদেশের ইতিহাস একাত্তরে শেষ হয়নি। বহুশত পরও মুসলিম দেশ ভাঙ্গার ন্যায় হারাম কাজের বিচার ইসলামপ্রেমী মহলে বার বার বসবে। তখন সে বিচার রুখতে সেক্যুলারিস্ট সন্ত্রাসীরা থাকবে না। তবে সবচেয়ে চুড়ান্ত ও ভয়ানক বিচারটি হবে আখেরাতে। মুসলিম দেশের প্রতিইঞ্চি ভূগোল বাড়াতে অতীতে বহুরক্ত ব্যয় হয়েছে। এবং সে মুসলিম ভূগোলকে খন্ডিত করার কাজটি নিজ খরচে করে দিতে রাজী কাফেরগণ। ভারত তাই পাকিস্তান ভেঙ্গে দিতে ১৯৪৭ থেকেই দু’পায়ে খাড়া ছিল। তারা শুধু কলাবোরেটরদের অপেক্ষায় ছিল। সেটি জোটে ১৯৭১’য়ে। সে কাজে সর্বপ্রথম এগিয়ে আসে সামরিক ও অসামরিক অঙ্গণের বাঙালী সেক্যুলারিস্টগণ। তাই স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে, ভারতের ন্যায় কাফের দেশের কোলে গিয়ে উঠতে এবং কাফেরদের অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ নিয়ে যুদ্ধ করতে বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের মাঝে কোন ইতস্ততা দেখা যায়নি। ইসলামী চেতনাশূণ্য সেক্যুলার সেনাসদস্যগণই ২০১৩ সালের ৬ই মে শাপলা চত্ত্বরে বীরদর্পে হিফাজতে ইসলামের শত শত মুসল্লিদের নিষ্ঠুর ভাবে হ্ত্যা করেছে এবং জানাজা ছাড়াই তাদের লাশ ময়লা ফেলার গাড়িতে তুলে গায়েব করে দিয়েছে।  অতীতে এ সেক্যুলার সেনাবাহিনী যেমন অতি  বর্বর স্বৈরাশাসকদের জন্ম দিয়েছে, তেমনি বর্তমানে কাজ করছে ভোট-ডাকাত স্বৈরশাসকের বিশ্বস্ত পাহারাদার রূপে।

মুসলিম বিশ্বে সামরিক সরকারগুলির  ইসলাম বিরোধী নির্মম নিষ্ঠুরতাগুলি বুঝতে হলে সামরিক বাহিনীর অতি রেডিক্যাল সেক্যুলার আদর্শিক প্রেক্ষাপটকে অবশ্যই সামনে রাখতে হবে। ম্যালেরিয়া সবদেশে একই রূপ সিম্পটম নিয়ে হাজির হয়। তেমনি অবস্থা চেতনার রোগেরও। ফলে ইসলামী চেতনা শূণ্য সেক্যুলারিস্টদের চরিত্র সবদেশে একই রূপ নৃশংস হয়। সে গভীর রোগই আজ প্রকট ভাবে পাচ্ছে মিশরে। মিশরের ইতিহাসে অতি কট্টোর ইসলাম বিরোধী সামরিক ব্যক্তিত্ব ছিল কর্নেল জামাল আব্দুন নাসের। ইনিও বন্দুকের জোরে সিসির ন্যায় মিশরের প্রেসিডেন্ট হন। আর সব সেক্যুলারিস্টদেরই মূল দুষমনিটি ইসলামের বিরুদ্ধে। ইবলিস কোথাও ক্ষমতা হাতে পেলে যা করে -এরাও অবিকল তাই করে। ইসলামের বিরুদ্ধে জামাল আব্দুন নাসেরের দুষমনি এতটাই প্রকট ছিল যে, সাইয়েদ কুতুবের ন্যায় বিশ্ববিখ্যাত মোফাচ্ছের এবং “ফি জালালিল কোর’আন’এর ন্যায় প্রসিদ্ধ তাফসিরের রচিয়েতাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করেছিল। হত্যা করেছে আব্দুল কাদের আওদাসহ আরো অনেক বিখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদকে। আব্দুন নাসেরের পথ ধরেছে মিশরের বর্তমান স্বৈরশাসক প্রেসিডেন্ট আবুল ফাতাহ আল-সিসি। আব্দুন নাসেরের পাশে দাঁড়িয়েছিল সোভিয়েত রাশিয়া। স্বৈরাচারি সিসিকে সমর্থন দিচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় শাসকগণ ও ইসরা্‌ইল।

মিশরের সামরিক বাহিনীর অফিসারগণ এতটাই কট্টোর ইসলামবিরোধী যে ইসলাপন্থিদের সরকারে স্থান দেয়া দূরে থাক, তাদেরকে কোনরূপ মানবিক অধীকার দিতেও রাজী নয়। সেটিই প্রকট ভাবে প্রকাশ পেল ডক্টর মুরসীর হত্যার মধ্য দিয়ে। তাদের কাছে অসহ্য ছিল ডক্টর মুহম্মদ মুরসীর ন্যায় অতি ইসলামী ব্যক্তির নির্বাচনী বিজয়কে মেনে নেয়া। ফলে তাঁর নির্বচনি বিজয়ের পরই  ষড়যন্ত্র শুরু হয় অপসারণের। ক্ষেত্র তৈরী করে থাকে রাজপথে এবং রাজপথের বাইরে। অর্থ বিতরণ হয় রাজপথের বিক্ষোভে লোক বাড়াতে। বিজিনেস সিন্ডকেটকে উসকানো হয় দ্রব্যমূল্য বাড়াতে। তার বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলা হয় মিশরের সেক্যুলার মিডিয়াকে। সে কাজে বিপুল অর্থ নিয়ে এগিয়ে আসে মধ্যপ্রাচ্যের গণতন্ত্রের ঘোরতর শত্রু সৌদি আরব ও আরব আমিরাত। আন্তর্জাতিক অঙ্গণে বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলির সরকারগুলিকে প্রেসিডেন্ট মুরসির বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলতে সক্রিয় হয় ইসরাইল। কারণ, মুরসী একাত্মতা ঘোষণা করেন গাজার অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনীদের সাথে। ইসরাইলের কাছে সেটি ছিল অসহ্য।

 

নিরস্ত্র প্রতিবাদ এবং পবিত্র জিহাদ যেখানে সন্ত্রাস  

ইসলামের শত্রুপক্ষ সন্ত্রাসের  সংজ্ঞাই পাল্টে দিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও তাদের মিত্র পক্ষ সন্ত্রাসের যে সংজ্ঞা দিয়েছে সেটিই গ্রহণ করেছে মুসলিম দেশগুলির সেক্যুলারিস্টগণ। সে সংজ্ঞা মতে ইসলামের বিজয় বা শরিয়তের প্রতিষ্ঠার লক্ষে খাড়া হওয়াটিই সন্ত্রাস। সন্ত্রাস রূপে চিত্রিত হয় মার্কিনী বা ইসরাইলী অধিকৃতির বিরুদ্ধে কথা বলা। এমন কি সন্ত্রাস হলো মিশরের সিসি, বাংলাদেশের হাসিনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজাদের ফ্যাসিবাদী অধিকৃতির বিরুদ্ধে নিরস্ত্র মানুষের কথা বলাও। সে বিকৃত সংজ্ঞার প্রয়োগ হয়েছে প্রেসিডেন্ট মুরসী এবং তার দল ইখওয়ানুল মুসলিমের বিরুদ্ধে।

গাজা বা অধিকৃত ফিলিস্তিনের যে কোন অংশকে উম্মুক্ত জেলখানার চেয়ে অধীক মর্যাদা দিতে ইসরাইল ও তার মনিব মার্কিন যুক্তরাষ্ট কখনোই রাজী নয়। সে অবস্থা পরিবর্তনের যে কোন উদ্যোগই চিহ্নিত হয় সন্ত্রাস রূপে। প্রেসিডেন্ট মুরসীর আগে গাজাকে উম্মুক্ত জেল খানায় পরিণত করার কাজে ইসরাইলকে পূর্ণ সহায়তা দিয়েছে মিশরের হোসনী মোবারকের স্বৈরাচারি সরকার। ইসরাইলের এজেন্ডা পূরণে গাজার দক্ষিণ সীমান্ত পাহারা দিত মিশরের সেনাবাহিনী। ইসরাইলের পক্ষ থেকে আরোপিত বিধানটি ছিল, মরতে হলে জেলখানার মধ্যেই মরতে হবে; পালানোর রাস্তা দেয়া যাবে না। তেমনি এক করুণ অবস্থা ছিল গাজাবাসীর। তাই গাজার উপর অতীতে যখন অবিরাম বোমা বর্ষণ হয়েছে তখন আহত গাজাবাসীদেরও মিশরীয় সেনাবাহিনী মিশরে ঢুকতে দেয়নি। এরূপ কঠোর পাহারাদারি কাজে হোসনী মোবারকের সরকার অর্থ পেত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে।

কিন্তু মুহম্মদ মুরসীর প্রেসিডেন্ট হওয়াতে চিত্রই পাল্টে যায়। তিনি খুলে দেন মিশরের সাথে গাজার সীমান্ত।  মিশরের এমন স্বাধীন নীতি ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ছিল অতি অসহ্য। ইসরাইল এটিকে তার নিরাপত্তার প্রতি হুমকি মনে করে। ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়াটিই বড় কথা নয়, নির্বাচিত হলেও সন্ত্রাসী রূপে গণ্য হতে হয় যদি অবস্থান তাদের স্বার্থের পক্ষে না হয়। তাদের বিচারে সন্ত্রাসী হওয়ার জন্য অস্ত্র হাতে নেয়ার প্রয়োজন পড়ে না, ইসলাম ও ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলাই যথেষ্ট। ইখওয়ানুল মুসলিমুন এজন্যই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সন্ত্রাসী সংগঠন রূপে গণ্য হয়। সন্ত্রাসী গণ্য হয়েছে খোদ প্রেসিডেন্ট মুরসী। ফলে জেনারেল সিসি যখন মিশরের ইতিহাসের একমাত্র নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুরসীকে সামরিক শক্তির জোরে সরিয়ে দেয় তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার ইউরোপীয় মিত্রগণ সেটিকে সমর্থণ করে। এবং তাতে উল্লাস জাহির করে ইসরাইল।

সিসির সে অবৈধ ও অন্যায় সামরিক ক্যু’র বিরুদ্ধে রাজপথে অবস্থান নিয়েছিল মিশরের লক্ষ লক্ষ মানুষ। কিন্তু সামরিক সরকারের কাছে নিরস্ত্র মানুষের শান্তিপূর্ণ সে বিক্ষোভও সহ্য হয়নি –যেমন হাসিনার কাছে সহ্য হয়নি শাপলা চত্ত্বরে মুসল্লীদের শান্তিপূর্ণ অবস্থান। বিক্ষোভ থামাতে সামরিক বাহিনী রক্তাত্ব করেছিল মিশরের রাজপথ। ২০১৩ সালে ১৪ই আগষ্ট কায়রোর রাবা আল আদাবিয়া স্কোয়ারে দেড় হাজার থেকে দুই হাজার নিরস্ত্র নারীপুরুষকে কয়েক মিনিটের মধ্যে মেশিন গান ও কামান দেগে হত্যা করেছিল জেনারেল আবুল ফাতাহ সিসির সামরিক সরকার। এতবড় গণহত্যায় সাথে জড়িতদের কারোই কোন বিচার হয়নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার ইউরোপীয় মিত্রদের মহলেও সে নৃশংস হত্যাকাণ্ড নিন্দিত হয়নি। যেন ইসলামপন্থি হলে তাদেরকে হত্যা করা কোন অপরাধই নয়। ফলে যে নৃশংস দমন প্রক্রিয়া ও হত্যাকান্ড চলছে সৌদি আরব, সিরিয়া ও আরব আমিরাতে, অবিকল সেটিই চলছে মিশরে। 

ইসলামপন্থিদের বেঁচে থাকাটিও অসহনীয়

কারারুদ্ধ প্রেসিডেন্ট মুরসিকে হত্যা করায় শুধু মিশরের ইসলাম বিরোধী সেক্যুলার স্বৈরাচারি চক্রই খুশি হয়নি, খুশি হয়েছে সৌদি আরব, আরব আমিরাত এবং ইসরাইলের শাসক মহলও। খুশি হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের ন্যায় পাশ্চত্য দেশগুলোর সরকারগুলিও। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছে এ কথা ভেবে, শত্রু বিদায় হলো। প্রেসিডেন্ট মুরসী ছিলেন মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামী জাগরণের আদি সংগঠন ইখওয়ানুল মুসলিমের নেতা। যুদ্ধাংদেহী কাফের দেশগুলির কোনটিই চায়না কোন দেশে কোন ইসলামী সংগঠন ক্ষমতায় বসুক –তা যত সংখ্যাগরিষ্ট ভোটেই হোক। এমন কি জেলের মধ্যে তাদের বেঁচে থাকাটিও তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। জেনারেল আবুল ফাতাহ আল সিসি, শেখ হাসিনা, কিং সালমানের ন্যায় প্রচণ্ড স্বৈরাচারি ফ্যাসিষ্টদের শাসনকে তারা সমর্থন দিতে রাজী, কিন্তু কোন ইসলামী দলের গণতান্ত্রিক বিজয়কে নয়। তাই নব্বইয়ের দশকে আলজিরিয়ায় ইসলামপন্থিদের বিজয় রুখতে তারা সামরিক বাহিনীর ক্ষমতাদখলকে সমর্থন দিয়েছে। এবং তারা মেনে নেয়নি ফিলিস্তিনের নির্বাচনে হামাসের বিশাল নির্বাচনি বিজয়কে। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে ইসলামপন্থিদের বিজয় দূরে থাক করারুদ্ধ অবস্থায় তাদের বেঁচে থাকাও যে তারা মেনে নিতে রাজী নয় –প্রেসিডেন্ট মুরসীর অপসারন এবং বন্দী অবস্থায় তার হত্যা সেটিই নতুন করে প্রমাণ করলো।    

আরব বিশ্বে স্বৈরাচারি জালেম শাসকদের মূল সাহায্যদাতা হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ইংলান্ড, জার্মান মত পাশ্চত্য দেশগুলি। এরাই মুসলিম বিশ্বে গণতন্ত্রের মূল শত্রু। তারা জানে স্বৈরাচারি শাসন বিলুপ্ত হলে রাজৈনতিক ক্ষমতা যাবে ইসলামপন্থিদের হাতে। তাতে বিশ্বব্যাপী উত্থান হবে ইসলামের। পাশ্চাত্য সেটি হতে দিতে রাজী নয়। আরব বিশ্বকে ২০ টুকরোর অধীক খণ্ডে বিভক্ত করেছে সে উত্থানকে রুখতে। ইসলামের উত্থান রুখার লক্ষ্যে পাশ্চাত্যের কাফের শক্তিবর্গের নির্ভরযোগ্য সাহায্যকারি হলো এসব স্বৈরাচারি শাসকগণ। তাদের প্রতিশ্রুতি পেয়েই স্বৈরাচারি শাসকগণ অতি নৃশংস হত্যাকান্ড করতেও পিছপা হয়না। এদের হাতেই নিহত হতে হলো সৌদি আরবের প্রখ্যাত লেখক ও কলামিস্ট জামাল খাসোগীকে। তাঁর দেহকে ইলেকট্রিক করাত দিয়ে টুকরো টুকরো করে কেটে অ্যাসিডে গুলিয়ে ড্রেনে মধ্যে গায়েব করা হয়েছিল। তাঁর অপরাধ, তিনি ছিলেন সৌদি সরকারের সমলোচক। তাঁর সে হত্যাকান্ড মার্কিনী যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের কাছে অপরাধ গণ্য হয়নি। বরং ইসলামের উত্থান রুখতে এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে হত্যাকান্ডে দক্ষতা ও নৃশংসতা দেখাতে পারলে ইসলামের এ আন্তর্জাতিক শত্রুপক্ষ প্রয়োজনীয় অস্ত্র এবং অর্থ দিতেও রাজী। তারই নমুনা, ইয়েমেনে সেরূপ এক নৃশংস হত্যাকান্ড চালিয়ে যেতে বিপুল অস্ত্র পাচ্ছে সৌদি আরব। আন্তর্জাতিক মহলে সে নৃশংসতার বিরুদ্ধে নিন্দা জানানোরও উপায় নেই। তাদের অধিকৃতি সেসব মহলেও। মিশর থেকে ইসলামপন্থিদের নির্মূলে জেনারেল আল-সিসির সরকার যেরূপ লাগামহীন যুদ্ধে নেমেছে তাতেও তারা সর্বপ্রকার সাহায্য দিচ্ছে। এখন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের গলা টিপে হত্যায় হাত বাড়িয়েছে লিবিয়া এবং সুদানে। সে কাজে তাকে সহায়তা দিচ্ছে সৌদি আরব, আরব আমিরাতসহ গণতন্ত্রবিরোধী আন্তর্জাতিক চক্র। বস্তুতঃ প্রেসিডেন্ট মুরসী হত্যাকান্ডটি স্রেফ কোন ব্যক্তি বিশেষের হত্যা নয়, এটি মধ্যপ্রাচ্যে গণতন্ত্র হত্যার একটি সুদূরপ্রসারি ষড়যন্ত্র। এ ষড়যন্ত্রের মূল লক্ষ্য মুসলিম বিশ্বে ইসলামের বিজয়কে প্রতিহত করা। তাই এর সাথে শুধু জেনারেল সিসির সরকার জড়িত  নয়, জড়িত তার আন্তর্জাতিক মিত্রগণও। ১৯/৬/২০১৯  




তালেবান-মার্কিন আলোচনাঃ প্রস্তুতি কি নতুন যুদ্ধের?

 আসন্ন মার্কিনী পরাজয় এবং নতুন স্ট্রাটেজী

সাম্রাজ্যবাদী শক্তি কখনোই যুদ্ধ ছাড়া বাঁচে না। তাদের যুদ্ধ তাই শেষ হয় না; স্ট্রাটেজী পাল্টায় মাত্র। এবং প্রস্তুতি নেয় নতুন যুদ্ধের। আফগানিস্তানেও সেটি হতে যাচ্ছে। সেটিরই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে তালেবান-মার্কিন সাম্প্রতিক আলোচনার মাঝে। মার্কিন ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘকালীন যুদ্ধটি ১৮ বছর ধরে চলছে আফগানিস্তানে। বিজয় লাভে মার্কিনীদের অস্ত্র, সৈন্য ও অর্থের বিনিয়োগ এ যুদ্ধে কম হয়নি। কিন্তু তাতে লাভ হয়নি; বরং ধাবিত হচ্ছে অনিবার্য পরাজয়ের দিকে। মার্কিনী বাহিনী তাই দেশে ফেরার রাস্তা খুঁজছে। তবে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় এখন যুদ্ধের বদলে তালেবানদের সাথে আলোচনার গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রণীত হচ্ছে নতুন স্ট্রাটেজী। উনবিংশ শতাব্দীতে আফগান ভূমিতে দু্‌ইবার পরাস্তু হয়েছিল ব্রিটিশ বাহিনী। আশির দশকে পরাজিত হয়েছে সোভিয়েত রাশিয়া। এবং এখন পরাজয়ের দিন গুনছে আমেরিকা। লক্ষ্যণীয় হলো, প্রতিবারই এ বিজয় এসেছে জনগণের মধ্য থেকে উত্থিত মুজাহিদদের হাতে, রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনীর হাতে নয়। সমগ্র ইতিহাসে আফগান জনগণের এ এক বিরল কৃতিত্ব। বিশ্বের কোন দেশের জনগণই এভাবে তিনটি বিশ্বশক্তিকে পরাজিত করেনি। দেশটি পরিণত করেছে বিদেশী শক্তির কবরস্থানে।

আফগান ভূমিতে মার্কিন হামলার মূল কারণ ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টম্বরের হামলা। ঐদিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূমিতে বিশেষ করে নিউওর্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার এবং ওয়াশিংটনের পেন্টাগণে বিমান নিয়ে আঘাত হানায় প্রায় তিন হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। তবে সবচেয়ে বেশী আহত হয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আত্মসম্মান ও অহংবোধ। মার্কিনীদের ইতিহাস তো অন্য দেশে হামলা, ধ্বংস এবং গণহত্যা ঘটানো। অন্যরা এভাবে ভিতরে ঢুকে মার্কিনীদের হত্যা কররে – সেটি চিন্তার বাইরে। বদলা নিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ পাগল হয়ে উঠে এবং যুদ্ধ শুরু করে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে –যদিও কোন আফগান সে হামলায় জড়িত ছিল না। তালেবানদের অপরাধ, তারা আশ্রয় দিয়েছিল আল কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনকে।  তালেবান সরকারের দ্রুত পতন ঘটাতে পারলেও বিগত ১৮ বছর পরও যুদ্ধটি শেষ হওয়ার নাম নিচ্ছে না। ইতিমধ্যে বহুশত মার্কিনী সৈনিককে লাশ হতে হয়েছে, এবং মার্কিন কোষাগার থেকে গচ্চা গেছে বিপুল অর্থ। মার্কিন সরকার দ্রুত যুদ্ধজয়ে ৪০টির বেশী দেশ থেকে সৈনিক জোগার করেছিল, কিন্তু তাতেও লাভ হয়নি। শহরগুলি দখলে নিলেও আফগানিস্তানের শতকরা ৭০ ভাগ ভূমি থেকেছে তাদের কন্ট্রোলের বাইরে। এখনো ১৪ হাজার মার্কিন ও ন্যাটো সৈনিকের অবস্থান রয়েছে আফগানিস্তানে; কিন্তু ফলাফল শূন্যের কোঠায়।

কিন্তু পরিস্থিতি এখন নতুন মোড় নিচ্ছে। যে তালেবানদের নির্মূলের লক্ষ্যে যুদ্ধ শুরু করেছিল -এখন নির্মূলের সে চিন্তা বাদ দিয়ে তাদের সাথে আলোচনায় বসছে। আলোচনা সফল করার লক্ষ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে যালমায় খলিলযাদকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। খলিলযাদ নিজেও একজন আফগান বংশোদ্ভুদ মার্কিন নাগরিক; জর্জ বুশের আমলে সে ছিল জাতিসংঘে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি। আলোচনার কেন্দ্রস্থল রূপে বেছে নেয়া হয়েছে কাতারের রাজধানী দোহাকে। মার্কিনীদের নির্দেশেই কাতার সরকার তালেবানদের অনুমতি দিয়েছে দোহাতে দফতর খোলার। অপরদিকে তারা পাকিস্তানকে বাধ্য করা হয়েছে তালেবান নেতা মোল্লা আব্দুল গনি বারাদারকে জেল থেকে মুক্তি দিতে।  গতি ফেব্রেয়ারিতে দোহা’তে মোল্লা বারাদারের সাথে যালমায় খলিলযাদের প্রথম বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে উভয়েই আলোচনার অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে তারা আফগানিস্তান থেকে শীঘ্রই সৈন্য অপসারণ করবে। মার্কিনীদের মূল দাবী, কোন মার্কিন বিরোধী শক্তির জন্য আফগানিস্তান ভূমিকে ব্যবহার করতে দেয়া যাবে না। অপরদিকে তালেবানদের দাবী, আফগান ভূমিতে কোন মার্কিন বা ন্যাটো বাহিনীর ঘাঁটি ও সৈন্য থাকতে পারবে না।

তবে এ দ্বি-পাক্ষিক আলোচনায় প্রচণ্ড অখুশি  হলো আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি ও তার নেতৃত্বাধীন সরকারের শরীক দলগুলি। তাদের ভয়, অস্তিত্ব বিলুপ্তির। সে ভয়ের পিছনে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও রয়েছে। ১৯৮৮ সালে আফগান মুজাহিদদের সাথে চুক্তি ছাড়াই সোভিয়েত রাশিয়ার সৈন্য অপসারণে বাধ্য হয়। তার পরিণতিতে ১৯৯২ সালে সোভিয়েত রাশিয়া সমর্থিত সরকারের পতন ঘটেছিল এবং প্রেসিডেন্ট নজিবুল্লাহকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে কাবুলের রাস্তায় হত্যা করা হয়েছিল। সে রকম পরিণতি যে বর্তমান সরকারের কর্তাব্যক্তিদেরও হতে পারে –সেটিই মূল আশংকা। তাছাড়া প্রশ্ন হলো, তালেবানদের পরাজিত করার সামর্থ্য যেখানে মার্কিন ও ন্যাটো সৈন্যদেরই নাই, সে সামর্থ্য আফগান সরকার পায় কি করে? নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই আলোচনার বৈঠকে তারা উপস্থিত থাকতে চায়। কিন্তু তালেবান নেতৃবৃন্দ আলোচনায় আফগান সরকারকে অংশীদার করতে রাজী নয়। তাদের যুক্তি, চাকর-বাকরদের সাথে আলাপ করে কী লাভ? আলোচনা তো হবে মূল কর্তা-ব্যক্তির সাথে। আফগানিস্তানের বর্তমান সরকারের মূল কর্তা হলো দখলদার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।     

 

কেন এ আলোচনা?

প্রশ্ন হলো, তালেবানদের নির্মূলের উদ্দেশ্য নিয়ে যে যুদ্ধের শুরু ১৮ বছর আগে, হঠাৎ করে তাদের সাথে আলোচনায় আগ্রহ কেন? বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। সেটি বুঝতে হলে আফগানিস্তানে বর্তমান পরিস্থিতিকে বুঝতে হবে। কয়েক বছর হলো আফগানিস্তানের রণাঙ্গণে হাজির হয়েছে আইএস তথা ইসলামী স্টেট, তাতেই আমূল পাল্টে গেছে আফগানিস্তানের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি। ২০১৫ সালের জানুয়ারীতে আফগানিস্তানকে ইসলামী স্টেটের খোরাসান প্রদেশে অংশ রূপে ঘোষণা দেয়া হয়। এতেই শুধু মার্কিন শিবিরে নয়, তালেবান শিবিরেও নতুন কম্পন শুরু হয়। তালেবানগণ জিহাদের কথা বল্লেও তাদের সে লড়াই আফগানিস্তানের ভৌগলিক সীমানা দ্বারা সীমিত। যে চেতনা নিয়ে তারা যুদ্ধ লড়ছে সেটি নির্ভেজাল ইসলামী নয়, তাতে রয়েছে গোত্রগত, ভাষাগত ও ভৌগলিক চেতনার মিশ্রন। তাদের অধিকাংশ যোদ্ধাই হলো পশতু ভাষী আফগানী। তাদের লক্ষ্য আফগানিস্তানে তাদের নিজেদের শাসনকে প্রতিষ্ঠা দেয়া। কিন্তু ইসলামী স্টেটের রাজনৈতিক দর্শনে ও লড়াইয়ে ভৌগলিক বা ভাষাগত সীমানা বলে কিছু নাই। তারা প্যান-ইসলামিক। ফলে তাদের বাহিনীতে যেমন আছে পশতু, তাজিক, উযবেক ইত্যাদি নানা ভাষার আফগানী, তেমনি আছে বিশ্বের নানা দেশ থেকে আগত মোজাহিদ। ফলে ইসলামী স্টেটের সৈনিকদের মাঝে আছে  আফগানদের পাশাপাশি পাকিস্তানী, আরব, উযবেক, তাজিক, রাশিয়ান চেচেন, চীনা উইঘুর, ইত্যাদি নানা ভাষার মুসলিম। তাছাড়া শুধু আফগানিস্তানে নয়, ইসলামী স্টেট যুদ্ধ লড়ছে ইরাক, সিরিয়াসহ এশিয়া ও আফ্রিকার নানা দেশে। প্রতি দেশেই তাদের শত্রুপক্ষে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের সমর্থিত পক্ষ।

বিষয়টি আদৌ গোপন নয় যে, মার্কিনীদের কাছে স্থায়ী শত্রু বা স্থায়ী বন্ধু বলে কেউ নাই। তাদের নীতি প্রণোয়নে যে স্থায়ী বিষয়টি গুরুত্ব পায় তা হলো স্রেফ নিজেদের স্বার্থকে সুরক্ষা দেয়া। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভাষায় সেটি হলো “আমেরিকা ফার্স্ট” তথা “প্রথম আমেরিকা” নীতি। এ নীতিটি বারাক ওবামাসহ অন্যান্য মার্কিন প্রেসিডেন্টদেরও ছিল, কিন্তু তারা সেটি প্রকাশ্যে বলতো না। আফগানিস্তান, ইরাক ও সিরিয়ার উপর মার্কিনী হামলা এবং দেশ তিনটিকে তছনছ করে দেয়ার মূল লক্ষ্যটি সেখান থেকে তেল বা গ্যাস লাভ ছিল না। সেটি ছিল, বিশ্ববাসীকে ভীত-সন্ত্রস্ত করা ও মার্কিন কর্তৃত্বকে বিনা প্রতিবাদে মেন নিতে বাধ্য করা। এটি প্রমাণ করা শক্তি ও কর্তৃত্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই বিশ্বে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। বিশ্বাসীকে দেখিয়ে দেয়া, যে কোন রাষ্ট্রকে তারা যেমন ইচ্ছামত দখলে নিতে পারে, শহরের পর শহর ধ্বংসও করতে পারে, গণহত্যা চালাতে পারে এবং গোয়ান্তোনামো বে’র জেলে নিয়ে বিনা বিচারে বছরের পর অত্যাচারও করতে পারে। সে জন্য কারো কাছে জবাবদেহীতার জন্য তারা দায়বদ্ধ নয়। জাতিসংঘের নীতিমালা বা আন্তর্জাতিক আইন মানতেও তারা বাধ্য নয়। সন্ত্রাসের আভিধানিক অর্থ হলো ত্রাস সৃষ্টিতে অস্ত্রের প্রয়োগ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তো  বিশ্বব্যাপী সেটিই করছে। অপর দিকে মার্কিনীরা যাদেরকে সন্ত্রাসী বলে তাদের ত্রাস সৃষ্টির সামর্থ্য তো সীমিত। বড় জোর কিছু ব্যক্তিকে হত্যা বা কিছু দফতর ও স্থাপনাকে বিধ্বস্ত করে। অথচ বহু দেশ ধ্বংসস্তুপে পরিণত হচ্ছে মার্কিনী সন্ত্রাসে। সে সন্ত্রাস থেকে ইরাক ও সিরিয়ার মোসল, রামাদী, ফালুজা, রাক্কা, কোবানি, দেরাজোরের খুব কম গৃহই অক্ষত থেকেছে। সন্ত্রাসে সে ভয়ানক সামর্থ্য দেখাতেই জাপানের উপর তারা পারমানবিক বোমা ফেলেছিল। পাশ্চাত্য মিডিয়ার বড় সফলতাটি হলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের দেশ দখল, দেশ ধ্বংস এবং লক্ষ লক্ষ নরনারী হত্যার সন্ত্রাসকে বহুলাংশেই লুকাতে পেরেছে এবং সন্ত্রাস রূপে চিত্রিত করতে পেরেছে নিরস্ত্র ফিলিস্তিনীদের নিজ ভিটায় ফেরার দাবী নিয়ে ইসরাইলী সীমান্তে জমায়েত ও পাথর নিক্ষেপকে।      

মার্কিনীদের কাছে বড় শত্রু এখন আর তালেবান নয়, সে স্থানটি নিয়ে নিয়েছে ইসলামী স্টেট বা আইএস। মার্কিনীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে তালেবানগণ কখনোই আফগানিস্তানের বাইরে নেয়নি। কিন্তু মার্কিন বিরোধী ইসলামী স্টেটের যুদ্ধ চলছে এশিয়া-আফ্রিকার বহুদেশ জুড়ে। দিন দিন সে যুদ্ধ আরো ছড়িয়ে পড়ছে এবং তীব্রতর হচ্ছে। ইসলামী স্টেটের যুদ্ধের সামর্থ্য যে তালেবানদের চেয়ে অধীক সেটি এমন কি মার্কিন কতৃপক্ষও হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে ইরাক ও সিরিয়ায়।  রাজধানী কাবুল থেকে তালেবানদের হটাতে মার্কিন বাহিনীর এক সপ্তাহও লাগেনি। অথচ ৬ মাসের বেশী সময় লেগেছে ইসলামী স্টেটের হাত থেকে একমাত্র মোসল শহর নিতে। শহরটি দখলে নিতে সমগ্র শহরকে ধ্বংসস্তুপে পরিণত করতে হয়েছে। ছোট একটি শহর  কোবানী দখলে নিতে লেগেছে মাসাধিক কাল। অবশেষে সে ক্ষুদ্র শহরটিকেও মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হয়েছে। একই চিত্র রাক্কা, দেরাজুর, ফালুজা, রামাদিসহ অন্যান্য শহরের ক্ষেত্রে।  অথচ তালেবানদের পরাজিত করতে সেটি করতে হয়নি।

মার্কিনীদের একার পক্ষে  ইসলামী স্টেটের বিরুদ্ধে যুদ্ধজয় যে অসম্ভব –সেটি ইতিমধ্যেই প্রকাশ পেয়েছে। যেখানে যুদ্ধ ইসলামী স্টেটের বিরুদ্ধে, সেখানেই তাদের পার্টনার চাই। ইরাক এবং সিরিয়ায় এজন্যই ইরাকী এবং ইরানী শিয়াদের পাশাপাশি, কুর্দি এবং সেক্যুলার আরব গোত্রপতিদের সাথে নিতে হয়েছে। নিজেদের যুদ্ধবিমান, মিজাইল, ড্রোন, বোমায় কুলাচ্ছে না, সাথে নিতে হয়েছে রুশ, ব্রিটিশ ও ফরাসী বিমান বাহিনীকেও। একই চিত্র ঘটতে যাচ্ছে আফগানিস্তানেও। পুরাপুরি মার্কিন-নির্ভর প্রেসিডেন্ট  আশরাফ ঘানির সরকারকে সাথে নিয়ে ইসলামী স্টেটের বিরুদ্ধে যুদ্ধজয় অসম্ভব। মার্কিনীরা এখন ছোট শত্রুর সাথে কোয়ালিশন গড়ে বড় শত্রুকে পরাজিত করতে চায়। একই কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানীর বিরুদ্ধে যুদ্ধজয়ে সোভিয়েত রাশিয়ার কম্যুনিস্টদের সাথে পুঁজিবাদী পশ্চিমা শক্তির আঁতাত গড়াটি অপরিহার্য হয়ে পড়ে। তেমনি ঘটেছে সিরিয়াতেও। ইসলামী স্টেটকে পরাস্ত করতে তারা কোয়ালিশন গড়ে কুর্দি মার্কসিস্টদের সাথে। একই কারণে মার্কিনীদের কাছে আজ জরুরী হয়ে পড়েছে তালেবানদের সাথে শুধু আপোষ করা নয়, বরং কোয়ালিশন গড়া।

 

“ইসলামী স্টেট” ভীতি 

তাছাড়া আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের তো শেষ নাই; দিন দিন তা বেড়েই চলেছে। কারণ ইসলামী স্টেট প্রতিনিধিত্ব করে একটি আদর্শের। ইরাক ও সিরিয়ায় ইসলামী স্টেট পরাজিত হলেও সে আদর্শের মৃত্যুর ঘটেনি। সে আদর্শের মূল কথা, সাড়ে চৌদ্দশত বছরের সনাতন ইসলামে ফিরে যাওয়া -যেখানে ভাষা, গোত্র, বা অঞ্চল ভিত্তিক জাতীয় রাষ্ট্রের নামে বিভক্তির দেয়াল গড়ার কোন বৈধতা নেই। বরং তা গণ্য হয় হারাম রূপে। এবং গুরুত্ব পায় প্যান-ইসলামী রাষ্ট্র গড়া -যাতে গুরুত্ব পায় শরিয়ত, হুদুদ, জিহাদ, শুরা এবং খেলাফতের ন্যায় ইসলামের মৌল বিধানগুলির প্রতিষ্টা। ইসলামের এ সনাতন আদর্শই এক কালে নানা ভাষা, নানা বর্ণ ও নানা অঞ্চলের মানুষের মনের রাজ্যে অভুতপূর্ব বিপ্লব এনেছিল এবং তাদেকে মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার নির্মাণে নিজেদের অর্থ, রক্ত, শ্রম ও মেধার কোরবানীতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। এবং তা পতন ঘটিয়েছিল তৎকালীন বিশ্বের দুই বিশ্বশক্তির। বাস্তবতা হলো, সে আদর্শ প্রবল ও অক্ষত রূপে বেঁচে পবিত্র কোরআন, হাদীস ও ইসলামের ইতিহাসের মাঝে। এবং আজও তা অসংখ্য মানুষকে কাছে টানছে। ফলে সনাতন ইসলাম নিয়ে বাঁচার সে যুদ্ধটি না থেমে বরং চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে পোলারাইজেশন হচ্ছে মুসলিম বিশ্বজুড়ে। এমন একটি সিভিলাইজেশনাল পোলারাইজেশন ও সর্বব্যাপী যুদ্ধের পূর্বভাস দিয়েছেন মার্কিন প্রফেসর হান্টিংটন তার বই “ক্লাশ অব সিভিলাইজেশন” বইতে।

মার্কিনীদের জন্য বিপদের আরো কারণ, গোলাবারুদ ও মিজাইল দিয়ে মানুষ হত্যা করা যায়; শত শত শহরকেও ধ্বংস্তুপে পরিণত করা যায়। কিন্তু তাতে আদর্শ বা চিন্তাধারা বিলুপ্ত না হয়ে বরং ধারালো হয়।  ফলে যুদ্ধ বেঁচে থাকে এবং সে যুদ্ধ লাগাতর সৈনিক পায়। সে যুদ্ধ একাকী লড়ার সামর্থ্য যুদ্ধ-ক্লান্ত মার্কিনীদের নাই। ফলে প্রতিদেশেই তারা পার্টনার চায়। তাছাড়া আফগানিস্তানে ইসলামী স্টেটকে পরাজিত করাটি হবে আরো কঠিন। কারণ, গেরিলা যুদ্ধের জন্য অতি  উপযোগী ক্ষেত্রটি হলো পাহাড়-পর্বতে ঘিরা আফগানিস্তানের ভূ-পৃকৃতি, মরুধুসর ও গাছপালাহীন ইরাক বা সিরিয়া নয়। ট্যাংক, মিজাইল বা বিমান নিয়ে এখানে যুদ্ধজয় সম্ভব নয়। তাই মোসল, রাক্কা বা রামাদি ধ্বংসে মার্কিনীদের ৯, ৮০০ কেজি ওজনের “মাদার অব অল বোম্ব” ফেলতে হয়নি। সে কাজে দূর থেকে নিক্ষিপ্ত মিজাইলই যথেষ্ট ছিল। অথচ ১৬ মিলিয়ন ডলার মূল্যের “মাদার অব অল বোম্ব” ফেলেও মার্কিন বাহিনীর তেমন লাভ হয়নি। বড়জোর আফগানিস্তানের পাহাড়ে কিছু গর্ত সৃষ্টি করেছে, কিন্তু তা দিয়ে ইসলামী স্টেটের কোন ঘাটি নির্মূল করা সম্ভব হয়নি।

অপর দিকে আফগানিস্তানের ভূ-রাজনৈতীক গুরুত্ব অপরিসীম। দেশটির সীমান্ত ঘিরে চীন, ইরান, পাকিস্তান,উযবেকিস্তান, তাজাকিস্তানের ন্যায় ৫টি দেশের অবস্থান। অতি নিকটেই রাশিয়ার সীমান্ত। পাশেই যুদ্ধময় কাশ্মীর। ইসলামী স্টেট আফগানিস্তানে পা জমাতে পারলে তার প্রভাব প্রতিবেশী বিশাল এলাকার উপর গিয়ে পড়বে –তা নিয়ে মার্কিন মহল চিন্তিত। তাদের ভয় এখান থেকেই অপ্রতিরোধ্য ইসলামীক সিভিলাইজেশনাল স্টেটের উদ্ভব হতে পারে। তা নিয়ে গভীর ভাবে চিন্তিত শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নয়, বরং রাশিয়া, চীন, ইরান এবং ভারতও। সমস্যা দেখা দিয়েছে, ইসলামী স্টেটের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের দায়দায়িত্ব কে নিবে? ইসলামী স্টেটের বিরুদ্ধে নামতে হলে নামতে  হয় এক অন্তহীন যুদ্ধে প্রাণদানের অঙ্গিকার নিয়ে। অথচ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা তো যুদ্ধ লড়তে চায় নিজেদের প্রাণ বাঁচিয়ে। আফ্রিকার মালি থেকে ইসলামী যোদ্ধাদের হটাতে বিশ্বের আরেক প্রান্ত থেকে এসেছিল কেনাডিয়ান সৈন্য; কিন্তু নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে যুদ্ধ অসমাপ্ত রেখেই ঘরে ফিরেছে। ঘরে ফিরছে ফ্রান্সের সৈন্যরাও। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও কোথাও তাদের নিজেদের পদাতিক সৈন্যকে নামাতে  রাজি নয়। তারা চায় অন্যরা তাদের পক্ষে লড়ে দিক। সিরিয়ায় সেটি করেছে মার্কসিস্ট কুর্দিরা। সে কাজে আফগানিস্তানে তারা তালেবানদের নামাতে চায়। এক্ষেত্রে মার্কিনীদের বড় আশাবাদটি হলো, ইসলামী স্টেটকে শুধু আমেরিকাই শত্রু মনে করে না, শত্রু মনে করে তালেবানগণও। ইসলামী স্টেটের আগমনকে তালেবানগণ দেখছে নিজেদের অস্তিত্ব বিলুপ্তির চ্যালেঞ্জ রূপে। মার্কিন-তালবান আজ যে তাড়াহুড়া -তার মূল কারণ তো উভয়ের মনে গভীর “ইসলামী স্টেট” ভীতি।        

 

লক্ষ্যঃ বিশ্বশক্তি রূপে ইসলামের উত্থানরোধ                  

নিজেদের অর্থ ও রক্তের খরচ কমিয়ে স্বার্থ উদ্ধারে মার্কিনীরা চায় কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলতে। তাই যে সাদ্দাম হোসেনকে তারা এক সময় ইরানে বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যবহার করেছে এবং অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করেছে অবশেষে তারাই তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে এবং ফাঁসিতেও লটকিয়ে হত্যাও করেছে। তেমনি সিরিয়ার যে কুর্দিরা মার্কিনীদের কাছে সন্ত্রাসী রূপে গণ্য হতো, তাদেরকে কাজে লাগিয়েছে ইসলামী স্টেটের বিরুদ্ধে । ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিনীদের অভিযোগের শেষ নেই। অথচ সে ইরানকে মার্কিনীগণ ব্যবহার করেছে ২০০১ সালে আফগানিস্তান ও ২০০৩ সালে ইরাক দখলে। এবং সম্প্রতি ব্যবহার করলো সিরিয়া ও ইরাকের রণাঙ্গণে ইসলামী স্টেটের বিরুদ্ধে যুদ্ধে। অপরদিকে ১৯৯৬ সালে তালেবান শাসন প্রতিষ্ঠার পর ইরানের শাসক মহল আফগানিস্তানকে নিজেদের জন্য বিপদ মনে করেছে। তালেবান সরকারের নির্মূলে ইরান সরকার তাই উযবেক নেতা রশিদ দোস্তামকে এবং তাজিক নেতা আহম্মদ শাহ মাসূদকে সমর্থণ দিয়েছে। এবং ২০০১ সালে মার্কিন বাহিনী যখন তালেবানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে, সে যুদ্ধে ইরান মার্কিনীদের নানা ভাবে সমর্থণ দিয়েছে। কিন্তু এখন সে ইরানই তালেবানদের সাথে কোয়ালিশ গড়তে আগ্রহী। আফগানিস্তানে ইসলামী স্টেটের আগমনের সাথে সাথে ইরানের বড় শত্রু এখন আর তালেবানগণ নয়, বরং সেটি হলো ইসলামী স্টেট। ইসলামী স্টেটের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইরান তাই সিরিয়া ও ইরাকে মার্কিনীদের পাশে হাজির হয়েছে। ফলে আফগানিস্তানেও একই কাতারে দেখা যাবে মার্কনীদের সাথে শুধু তালেবান ও ইরানীদেরও।

তালেবানগণও জানে, আইএসের বিরুদ্ধে তাদের নিজেদের লড়াইটি এতটা সহজ হবে না। কারণ, আইএসের অধিকাংশ যোদ্ধা আফগানি। তারা তালেবানদের ঘরের খবর জানে। তাছাড়া তালেবানদের জন্য দুশ্চিন্তার বড় কারণ, অনেক তালেবান যোদ্ধা দল ছেড়ে ইতিমধ্যেই আইএসে যোগ দিয়েছে। তালেবানগণও তাই এ যুদ্ধে পার্টনার পেতে আগ্রহী। ইরান এক্ষেত্রে তাদের টার্গেট। কাতারে অবস্থিত তালেবান দফতর থেকে তাই একটি প্রতিনিধি দল সম্প্রতি ইরানী কর্তৃপক্ষের সাথে দেখা করতে তেহরান যায়। অপরদিকে দুশ্চিন্তা বেড়েছে রাশিয়ারও। কারণ শত শত রাশিয়ান চেচেন ও দাগিস্তানী যুদ্ধ লড়ছে আইএসে শামিল হয়ে। রাশিয়ার ভয়, আইএস আফগানিস্তানে বিজয়ী হলে তাতে চেচেন ও দাগেস্তানের স্বাধীনতা আন্দোলন তীব্রতর হবে। সে ভয় নিয়েই রাশিয়ানরাও কোয়ালিশন গড়ছে তালেবানদের সাথে। বরং মার্কিনীদের অভিযোগ, রাশিয়া তালেবানদের অস্ত্র জোগাচ্ছে। ফলে যতই দিন যাচ্ছে আফগানিস্তানে লড়াইয়ে মেরুকরণ আরো তীব্রতর হচ্ছে। তালেবান ও মার্কিনীদের মধ্যে চলমান আলোচনায় যুদ্ধ শেষ হবে -সে সম্ভাবনা তাই কম। বরং তীব্রতর হওয়ার সম্ভাবনাই বেশী।

 

কোন দেশ থেকে সৈন্য অপসারণ করলেই মার্কিনীদের যুদ্ধ শেষ হয় না। ইরাক থেকে সৈন্য অপসারণ করলেও যুদ্ধ সেখানে তাই শেষ হয়নি। যুদ্ধ করছে ইরাকীদের ঘাড়ে বন্দুক রেখে। আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তাই সৈন্য নামাতে হয়নি। তারা যুদ্ধ করেছে আকাশ থেকে; ব্যবহৃত হয় মিজাইল, বোমা ও ড্রোন।  সে নীতিতে ইরাক ও সিরিয়ার শত শত শহর ধ্বংস ও লক্ষ লক্ষ নরনারী নিহত ও উদ্বাস্তুতে পরিণত হলেও মার্কিনীদের প্রাণ হারাতে হয়নি। সে স্ট্রাটেজী কার্যকর হতে যাচ্ছে আফগানিস্তানে। তবে সমস্যা হলো, আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ লড়ার জন্য তো ভূমিতে বিপুল সংখ্যক লড়াকু সৈন্য চাই। সে দায়িত্ব তালেবানগণ নিলে মার্কিনীরা যে আফগানিস্তান ছাড়তে পুরাপুরি রাজী -সেটিই মার্কিনী দূত যালমাই খলিলযাদ তালেবানদের বুঝাচ্ছে। মজার ব্যাপার হলো, তালেবানদের সে সামর্থ্য নিয়েও মার্কিনীদের প্রচুর সন্দেহ  আছে। সাড়ে চৌদ্দশত বছর পূর্বে আরবভূমিতে বিশ্বশক্তি রূপে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা পাওয়ার অন্যতম কারণ, রোমান ও পারসিক –এ দু’টি বিশ্বশক্তি শাসন থেকে এ এলাকাটি ছিল মূক্ত। আফগানিস্তানকে সেভাবে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক শক্তির প্রভাব বলয়ের বাইরে থাকতে দিতে রাজী নয়। ইসলাম দমনের সে দায়িত্ব পাকিস্তানী সেনা বাহিনীর ঘাড়ে চাপানোর জন্য এমন কি এ প্রস্তাবও রেখেছে, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানকে সীমান্ত বিলুপ্ত করে এক অখণ্ড রাষ্ট্র নির্মাণের। কারণ, পাকিস্তানে রয়েছে মার্সেনারী চরিত্রের নিরেট সেক্যুলার আর্মি -যারা ইসলামের প্রতিষ্ঠা রুখতে আপোষহীন। ইসলামাবাদের লাল মসজিদে বোমা বর্ষন, হাফসা মাদ্রাসা ধ্বংস এবং উজিরীস্তানে ইসলামপন্থিদের নির্মূলের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান আর্মি সে সামর্থ্য প্রমাণও করেছে। মার্কিনীদের লক্ষ্য আফগানিস্তান থেকে তেল বা গ্যাস লাভ নয়, বরং যে কোন মূল্যে রুখতে চায় ইসলামিক সিভিলাইলাইজেশনাল স্টেটের প্রতিষ্ঠা। কারণ, তেমন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পেলে মুসলিমগণ পরিণত হবে এক অপরাজেয় বিশ্বশক্তিতে। তাদের কথা, সাড়ে চৌদ্দশত বছর পূর্বে তৎকালীন দুটি বিশ্বশক্তি -রোমান ও পারসিক সাম্রাজ্য, যেভাবে ইসলামি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা রুখতে ব্যর্থ হয়েছিল সেটি তারা হতে দিবে না। কারণ, সেটি হলে বিলুপ্ত হবে তাদের নিজেদের প্রতিপত্তি। ১৩/০৪/২০১৯                 

                                                                                              




শত্রুশক্তির যুদ্ধ ও ইসলাম বিনাশী নাশকতা

শেষ হয়নি যুদ্ধ

বাংলার বুকে ইসলামের শত্রুশক্তির যুদ্ধ শেষ হয়নি। বরং দিন দিন  তীব্রতর হচ্ছে। যুদ্ধটির শুরু আজ নয়; সূচনা ১৭৫৭ সালে। নবাব সিরাজুদ্দৌলার বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী কাফের শক্তির গোলাবারুদের যুদ্ধ পলাশীতে শেষ হলেও শেষ হয়নি ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে তাদের মূল যুদ্ধটি। সে যুদ্ধটি বরং লাগাতর চলছে দেশের আদর্শিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক অঙ্গণে। দেশের আইন-আদালত থেকে সাম্রাজ্যবাদি শত্রুশক্তি যেরূপ ইসলামের শরিয়তি বিধানকে বিলুপ্ত করেছিল এবং অসম্ভব রেখেছিল মুসলিম শক্তির উত্থানকে, আজও সেটিই তাদের মূল এজেন্ডা। তাই ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশের ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান হলেও আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক সে যুদ্ধটি এখনো শেষ হয়নি। শুধু বাংলাদেশে নয়, সমগ্র মুসলিম বিশ্বজুড়ে সেটিই ইসলামের শত্রুপক্ষের মূল যুদ্ধ। এ যুদ্ধে তাদের শত্রুর নিষ্ঠাবান দাস সৈনিক রূপে খাটছে ব্রিটিশ প্রনীত সেক্যুলার শিক্ষা ব্যবস্থায় গড়ে উঠা রাজনৈতিক, সামরিক, প্রশাসনিক ও বিচার বিভাগীয় বিশাল কর্মীবাহিনী। রাজনৈতিক শক্তি রূপে মুসলিমদের উত্থানকে ইংরেজগণ যেরূপ তাদের ১৯০ বছরের শাসনামলে রুখেছিল এবং দূরে রেখেছিল ইসলামের শরিয়তি বিধানকে – ইসলামের সেরূপ একটি পরাজিত অবস্থা বলবৎ রাখাই তাদের উপর শত্রুপক্ষের পক্ষ থেকে অর্পিত মূল দায়ভার। এ কারণেই পাশ্চাত্যের কাফেরদের ন্যায় তারাও সর্বভাবে ইসলামের বিজয়কে রুখতে চায়। দেশের সেনানীবাস, সিভিল প্রশাসন, জুডিশীয়ারী, অফিসার্স ক্লাব ও মন্ত্রীপাড়ার ন্যায় গুরুত্বপূ্র্ণ স্থানগুলি আজও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির সুরক্ষিত দ্বীপ। সে সাথে প্রশিক্ষণ ক্ষেত্রও। সেসব অধিকৃত সামরিক ও প্রশাসনিক ঘাঁটিতে বাংলার সাধারণ জনগণের মুসলিম রীতি-নীতি ও সংস্কৃতি দেখতে পাওয়া যায় না। কারো কারো জীবনে নামাজ-রোযা থাকলেও সেখানে প্রবেশ নিষিদ্ধ নবীর যুগের ইসলামের -যাতে রয়েছে শরিয়ত, খেলাফত, জিহাদ এবং ভাষা ও বর্ণের নামে গড়ে উঠা দেয়াল ভাঙ্গার বিধান। ইংরেজদের প্রস্থানের বহুবছর পরও তাই বাংলার মুসলিম ভূমিতে আজও বহাল তবিয়তে বেচেঁ আছে তাদের প্রতিষ্ঠিত দেহব্যবসা, জুয়া, সূদী ব্যাংকের ন্যায় নানারূপ হারাম কর্ম। রাজনীতি, সংস্কৃতি ও জীবনযাপনের নানা ক্ষেত্রে মহান আল্লাহতায়ালা ও আখেরাতের ভয়কে ভূলিয়ে দেয়াই ইসলামবিরোধী এ দখলদার দেশী শক্তির মূল কাজ। ফলে শতকরা ৯২ ভাগ মুসলিমের দেশে মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশিত শরিয়তি বিধানকে পরাজিত রাখতে ও ইসলামপন্থিরদের হত্যায় বিদেশী কাফের শক্তিকে ময়দানে নামতে হয় না। সে কাজটি নিষ্ঠুরতার সাথে সমাধা করে পাশ্চত্য-পূজারী বাঙালীগণ। ঢাকার শাপলা চত্ত্বরের গণহত্যার ন্যায় নিষ্ঠুর গণহত্যাগুলিতেও তাই কোন বিদেশী কাফেরকে  নামতে হয়নি। একাত্তরের গণহত্যাও ছিল দিল্লি, মস্কো, চীন ও পাশ্চাত্যের অনুসারি ইসলামের শত্রুপক্ষের নিজস্ব কাণ্ড –যাদের হাতে মারা গিয়েছিল অগণিত বাঙালী ও অবাঙালী মুসলমি।

কোন মুসলিম ভূমিতে কাফের শক্তির বিজয়ের নাশকতাটি এমনিতেই বিশাল। কিন্তু সে অধিকৃতি যদি ১৯০ বছরের হয় তবে সে নাশকতাটি ভয়ংকর রূপ নেয়। বাঙালী মুসলিমের জীবনে ক্ষতির সে অংকটি তাই বিশাল। এ কারণেই নবীজী (সাঃ)র যুগের কোরআনী ইসলাম থেকে বাঙালী মুসলিমদের অবস্থানটি বহু দূরে। নবীজী (সাঃ)র ইসলামে কাফের শক্তির অধিকৃতির বিরুদ্ধে জিহাদ ছিল, শরিয়তের পূর্ণ প্রতিষ্ঠা ছিল এবং নানা বর্ণ ও নানা ভাষার মুসলিমদের মাঝে সীসাঢালা প্রাচীরসম এসকতা ছিল। কিন্তু বাংলাদেশে সে ইসলামের প্রতিষ্ঠা চিহ্নিত হয় সন্ত্রাস বা জঙ্গিবাদ রূপে। নবীজী(সাঃ)র প্রবর্তিত সে কোরআনী ইসলামের তারা নির্মূল চায়। তাদের ইচ্ছা, মুসলিম বেঁচে থাক নবীজী (সাঃ)র ইসলামকে বাদ দিয়ে। এবং গ্রহণ করুক জাতীয়তাবাদ, বর্ণবাদ, ফেরকাবাদ, স্বৈরাচার ও সেক্যুলারিজমের ন্যায়  নানারূপ পথভ্রষ্টতা। ইসলামের যে বিকৃত রূপকে তারা মেনে নিতে বলছে তাতে রয়েছে শরিয়তের বদলে ব্রিটিশদের প্রণীত কুফরি আইন। তাতে আছে সূদী ব্যাংক, দেহব্যবসা, সূদ–ঘুষ, মদজুয়া, বেপর্দা ও নাচগানের ন্যায় নানারূপ কবিরা গুনাহ ও পাপাচারের আইনগত বৈধতা। প্রকৃত ইসলামের সাথে সম্পর্কচ্যুৎ এমন ভণ্ড মুসলিম গড়ে তোলার লক্ষ্যে তারা যেমন মাদ্রাস গড়েছে, তেমনি গড়েছে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ও। সে সাথে ময়দানে নামিয়েছে মুসলিম নামধারী দালাল শ্রেণীর সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী। মুসলিম ভূমিতে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকার লক্ষ লক্ষ সৈনিক পেয়েছে বস্তুত ইসলামি চেতনা বিনাশী এরূপ প্রকল্প সফল হওয়ার ফলে। দুর্বৃত্তিতে বাংলাদেশ যেরূপ বার বার বিশ্বরেকর্ড গড়েছে এবং আদালতে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা যেরূপ অসম্ভব হয়েছে -তা মূলতঃ তাদের প্রবর্তীত সে বিকৃত ইসলাম ও মানসিক গোলামদের শাসন দীর্ঘকাল বেঁচে থাকার কারণে।

 

শত্রুর যুদ্ধ শেষ হয়না

ইসলাম ও মুসলিমের বিরুদ্ধে শত্রুর যুদ্ধ কখনোই শেষ হয়না; অস্ত্র ও কৌশল পাল্টায় মাত্র। সময় ও সুযোগ বুঝে তারা গড়ে নতুন কোয়ালিশন; এবং সংগ্রহ করে নতুন সৈনিক। তাই শেষ হয়নি ইসলাম নির্মূলে শয়তান ও তার অনুসারিদের মূল যুদ্ধটিও। বাংলাদেশ তো তাদর হাতেই অধিকৃত। অধিকৃত এ ভূমিতে তাই শরিয়তের প্রতিষ্ঠা, সিরাতুল মুস্তাকীমে চলা, বিভক্তির দেয়াল ভাঙ্গা এবং সে পবিত্র লক্ষ্যে জিহাদে লিপ্ত হওয়াটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সেটি যেমন কাফের ব্রিটিশদের আমলে ছিল, তেমনি আজও। এমন অধিকৃত দেশে বাক স্বাধীনতা, লেখালেখীর স্বাধীনতা, ধর্মশিক্ষা ও ধর্ম পালনের স্বাধীনতার দাবি করাটাই সন্ত্রাস। স্বাধীনতা নাই সিরাতুল মুস্তাকীমে চলার। সিরাতুল মুস্তাকীমে চলার পথ তো শরিয়তের প্রতিষ্ঠাসহ ইসলামের পূর্ণ বিজয় ও পূর্ণ ইসলাম পালনের পথ। সেটি তো আল্লাহর জমিনে তাঁর দ্বীনের বিজয়ে অর্থ, শ্রম, মেধা ও প্রাণদানের পথ। গভীর জঙ্গলে কি মহাসড়ক গড়া যায়? সে জন্য তো জঙ্গল কেটে পথ করতে হয়। সিরাতুল মুস্তাকীম গড়তেও তেমনি অপরিহার্য হলো কুফরি শাসনের নির্মূল। অথচ অন্ধকারের পূজারীগণ সেটি হতে দিতে রাজী নয়। সমাজের নমরুদ-ফিরাউন-আবু জেহলগণ সর্বশক্তি দিয়ে সে কাজে বাধা দেয়। অথচ জাহিলিয়াতের সে অন্ধকার না সরালে কি ইসলাম পালন হয়? সে যুগের জাহিলিয়াতে ছিল পৌত্তলিকতা, অজ্ঞতা, নানারূপ দুবৃত্তি ও ট্রাইবাইলিজম। আর আজকের জাহিলিয়াতটি হলো জাতীয়তাবাদ, পুঁজিবাদ, স্বৈরাচারী ফ্যাসিবাদ ও সেক্যুলারিজমের। ইসলামের নির্মূলে এ নব্য জাহিলিয়াত আদিম জাহিলিয়াতের চেয়ে কম যুদ্ধাংদেহী ও কম নৃশংস নয়। প্রতি যুগেই ইসলাম পালনের পথটি তাই জাহিলিয়াত নির্মূলের পথ; তথা লাগাতর জিহাদের পথ। যার জীবনে সে জিহাদ নাই, বুঝতে হবে সে ব্যক্তির জীবনে কোরআনী ইসলামও নাই। মুসলিম জীবনে এরূপ জিহাদ না থাকলে সে মুসলিমদের রাষ্ট্রে কি ইসলাম বাঁচে? সে রাষ্ট্রে বরং প্রবল প্লাবন আসে জাহিলিয়াতের; এবং সেসাথে নানারূপ দুর্বৃত্তি ও পাপাচারের। বাংলাদেশ হলো তারই নমুনা। বাংলাদেশের একটি থানায় যত মুসলিমের বাস নবীজী (সাঃ)র  প্রতিষ্ঠিত মুসলিম রাষ্ট্রে সে সংখ্যক মুসলিম ছিল না। কিন্তু জাহিলিয়াত ও দুর্বৃত্তির বিরুদ্ধে মহান নবীজী (সাঃ) ও তাঁর সাহাবায়ে কেরামের জীবনে আমৃত্যু জিহাদ এসেছিল। ফলে সমগ্র আরব ভূমি থেকে নির্মূল হয়েছিল দুর্বৃত্তদের আধিপত্য; এবং দেশে দেশে বিজয়ী শক্তিরূপে আাবির্ভুত হয়েছিল ইসলাম। তখন জনগণ পেয়েছিল সিরাতুল মুস্তাকীমে চলার স্বাধীনতা। অথচ নমরুদ, ফিরাউন ও আবু জেহলদের যুগে সে স্বাধীনতা ছিল না। অজ্ঞতার বিরুদ্ধে নবীদের আওয়াজ তোলাটিও তখন হত্যাযোগ্য সন্ত্রাস গণ্য হত। একই অবস্থা বাংলাদেশেও। দেশটির স্বৈরাচারি শাসকদের কাছে নবীদের সে পবিত্র সূন্নত নিয়ে বাঁচাটি গণ্য হয় সন্ত্রাস রূপে।

 

মানবের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা

মানবের উপর অর্পিত মিশনটি স্রেফ নামায-রোযা এবং হজ-যাকাত পালন নয়। স্রেফ তাসবিহও পাঠ নয়। বিশ্বজগতের সকল সৃষ্টিই  মহান আল্লাহতায়ালার নামে তাসবিহ পাঠ করে। “ইউসাব্বিহু লিল্লাহি মা ফিস সামাওয়াতি ওয়া মা ফিল আরদি” এবং “সাব্বাহা লিল্লাহি মা ফিস সামাওয়াতি ওয়া মা ফিল আরদি” –পবিত্র কোরআনে এরূপ বাক্য বার বার ব্যবহার করে মহান আল্লাহতায়ালা সে সত্যটি বার বার ব্যক্ত করেছেন। তাই স্রেফ তাসবিহ পাঠের মাধ্যমে পাহাড়-পর্বত, জন্তু-জানোয়ার, কীটপতঙ্গ, গাছপালা ও উদ্ভিদ থেকে কোন মানব সন্তানই শ্রেষ্ঠতর হতে পারে না। মানবের জন্য শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের সে পথটি ভিন্নতর। সেটি হলো, পৃথিবী জুড়ে মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব ও শরিয়তের  প্রতিষ্ঠা। সেটি পৃথিবী জুড়ে ইসলামের বিজয়ে আত্মনিয়োগ। ঈমানদারের জীবনে মূল মিশনটি তাই মহান আল্লাহতায়ালার ভিশনের সাথে একাত্ম হওয়া। পবিত্র কোরআনে বর্নিত মহান আল্লাহতায়ালার সে ভিশনটি হলো, “লি’ইয়ুযহিরাহু আলা দ্দীনে কুল্লিহী” অর্থঃ “সকল দ্বীনের উপর ইসলামের বিজয়”। সে নির্ধারিত মিশন পালনে একজন ব্যক্তি কতটা সফল হলো, তাতেই নির্ধারিত হয় জন্তু-জানোয়ার, কীটপতঙ্গ,গাছপালা ও উদ্ভিদ থেকে তার শ্রেষ্ঠতর মর্যাদা। দায়িত্ব এখানে খেলাফতের।

মানবসৃষ্টির প্রকৃত মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব তাই মহান আল্লাহতায়ালার খলিফা বা প্রতিনিধি রূপে দায়িত্ব  পালনের মাঝে। সাহাবাগণ মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করতে পেরছিলেন খেলাফতের সে গুরু দায়িত্বটি সুষ্ঠভাবে পালনের মাধ্যমে। সে কাজে তারা নিজেদের জীবনের শ্রেষ্ঠতর অর্জন ব্যয় করেছেন; শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবী শহীদ হয়েছেন। ব্যক্তির প্রতিটি সামর্থ্য তা অর্থনৈতিক, দৈহীক বা বুদ্ধিবৃত্তিক হোক –সবই মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া আমানত। ব্যক্তির প্রকৃত ঈমানদারি হলো, মহামূল্য সে আমানতকে মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনের বিজয়ে বিনিয়োগ করবে। নইলে ভয়ানক খয়ানত হয় যা আযাব ডেকে আনে। সাহাবাদের সে বিনিয়োগটি ছিল বিশাল; তাতে ইসলামের অনুসারিগণ বিশ্বশক্তির মর্যাদা পেয়েছিল। অথচ সেরূপ বিনিয়োগে আজকের মুসলিমগণ ব্যর্থ হয়েছে। ফলে বেড়েছে ইসলামের পরাজয়। বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশগুলিতে আমানতের বিনিয়োগ হয়েছে মূলতঃ জাতীয়তাবাদ, সমাজবাদ, সেক্যুলারিজম ও স্বৈরাচারের ন্যায় নানারূপ  ভ্রষ্টতাকে বিজয়ী করতে।   বিনিয়োগ সীমিত রেখেছে স্রেফ নামায-রোযা ও  তাসবিহ পাঠে। অথচ তাসবিহ পাঠ যত লক্ষ বারই হোক -তাতে মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া বিশাল সামর্থ্যের বিনিয়োগ ঘটেনা। ফলে শ্রেষ্ঠত্বের প্রকাশও ঘটে না। গবাদী পশুর মিশন শরিয়তের প্রতিষ্ঠা নয়,খলিফা হওয়াও নয়। সেটি তো কৃষকের হাল টানা, দুধ দেয়া, পরিধেয় জুতা বা খাবার টেবিলে কোর্মা-কাবাব রূপে হাজির হওয়া। পশুগণ সে মিশন পালনে ব্যর্থ হচ্ছে না। কিন্তু মানুষ ব্যর্থ হচ্ছে তার উপর অর্পিত মিশন পালনে। কাফের ও মুনাফিকগণ এজন্যই পশুরও অধম। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা সে সত্যটিও তুলে ধরেছেন। বলা হয়েছে, “বাল হুম আদাল’ অর্থঃ তারা (পশুর) চেয়েও নিকৃষ্ট।  পশু, কীটপতঙ্গ বা গাছপালা তাই জাহান্নামে যাবে না, কিন্তু জাহান্নামের খোরাক হবে অবাধ্য ও বিদ্রোহী মানব।

বিশাল বিজয় শত্রুপক্ষের

শরিয়ত প্রতিষ্ঠার বিষয়টি উগ্রবাদ নয়, সন্ত্রাসও নয়। এটি নামায-রোযার ন্যায় ইসলামের অতি অপরিহার্য বিষয়। নামায-রোযা ছাড়া যেমন মুসলিম হওয়া যায় না, তেমনি ইসলামের বিজয় ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠায় জান ও মালের বিনিয়োগ ছাড়াও মুসলিম থাকা যায় না। রাষ্ট্রটি মুসলিম না অমুসলিমের সেটি বুঝা যায় সে রাষ্ট্রে শাসকের অঙ্গীকার ও আদালতে আইনের স্বরূপ দেখে। তাই ঔপনিবেশিক শাসনামলে ভারতের পরিচয় ছিল ব্রিটিশ ভারত, মুসলিম ভারত রূপে নয় –যদিও সে সময় ব্রিটশদের সংখ্যা প্রতি লাখে একজনও ছিল না। সেটিই স্বাভাবিক ছিল। অপর দিকে বাংলার বুকে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার সাথে সাথে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল শরিয়তী আইনের শাসন। অথচ সে সময় দেশটির মুসলিম জনসংখ্যা আজকের ন্যায় শতকরা ৯২ ভাগ ছিল না। এমনকি সিকিভাগও ছিল না। মুসলিম জনসংখ্যা কম হলেও খিলজী আমল, সুলতানী আমল, মোঘল আমল বা নবাবী আমলে ছিল শরিয়তী আইন। ফলে পরিচয় পায় মুসলিম আমল রূপে। ভারত থেকে শরিয়তি আইন বিলুপ্ত হয় ব্রিটিশ কাফেরদের শাসন প্রতিষ্ঠার পর। ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে অধিকৃত হওয়ার এটিই হলো সবচেয়ে বড় বিপদ। তখন অসম্ভব হয় ইসলামের মৌল বিধানগুলি মেনে চলা।

ঔপনিবেশিক কাফেরদের শাসন শেষ হয়েছে। কিন্তু শেষ হয়নি তাদের গড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ইসলামের শত্রুপক্ষের শাসন। ঔপনিবেশিক আমলের সেক্যুলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কারণে ইসলামের শত্রু বিপুল ভাবে বেড়েছে নিজ ভূমিতে। অতীতে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা রোধে মুসলিম জনগণের পক্ষ থেকে কোনরূপ বিরোধীতা হয়নি। মুসলিম কি কখনো নামায-রোযার প্রতিষ্ঠার বিরোধীতায় রাস্তায় নামে? তাতে কি তার ঈমান থাকে? তেমনি শরিয়তি আইনের প্রতিষ্ঠার বিরোধীতা কি কোন মুসলিমের নীতি হতে পারে? অথচ সেটিই হচ্ছে বাংলাদেশে! শরিয়তি আইনের নির্মূলে এক কালে যা ছিল সাম্রাজ্যবাদি শাসকদের নীতি, সে অভিন্ন নীতি নিয়ে দেশ শাসন করছে বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশের স্বৈরাচারি শাসকগণ। নিজেদের মুসলিম রূপে পরিচয় দিলেও দেশের রাজনীতি, আদালত, শিক্ষাসংস্কৃতিতে তারা ইসলামের জন্য সামান্যতম স্থানও ছেড়ে দিতে তারা রাজী নয়। বরং কাফেরদের অর্থ, অস্ত্র ও এজেন্ডা নিয়ে দেশে-বিদেশে যুদ্ধ করতে রাজি। বাংলার ন্যায় মুসলিম ভূমি এরূপ ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে অধিকৃত হওয়ায় কঠিন হয়ে পড়ছে জান্নাতের পথে চলা।

 

বিজয় শত্রুপক্ষের

বাংলাদেশে ইসলামের শত্রুপক্ষের বিজয়টি বিশাল। ইসলামের বিজয় বা উত্থানকে তারা সফল ভাবেই রুখতে পেরেছে। এবং অব্যাহত রাখতে পেরেছে ব্রিটিশদের প্রবর্তিত কুফরি আইনের শাসন। দেশটির জনসংখ্যার শতকরা ৯২ ভাগ নিজেদেরকে মুসলিম রূপে দাবী করলে কি হবে, ধর্মের নামে দেশে যা পালিত হয় তার সাথে নবীজী (সাঃ)র ইসলামের মিলের চেয়ে অমিলই প্রচুর। দেশটিতে আজও পৌত্তলিকতা বেঁচে আছে তার আদিম সনাতন পরিচয় নিয়ে। কিন্তু এ মুসলিম ভূমিতে নবীজী (সাঃ)র ইসলাম তার পরিচয়টি হারিয়ে ফেলেছে বহু আগেই। এবং বেঁচে নাই কোরআনে বর্নিত জিহাদ, শরিয়ত, হদুদ ও খেলাফতের ধারণা। ফলে পবিত্র কোরআনের সনাতন ইসলাম বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশী অপরিচিত। ইসলাম থেকে দূরে সরা জনগণ অতি আনন্দ চিত্তে বরণ করে নিয়েছে বর্ষবরণ, বসন্তবরণ, মঙ্গল প্রদীপসহ নানারূপ পৌত্তলিক সংস্কৃতিকে। লক্ষ লক্ষ মুসলিম সন্তান হাজির হচ্ছে এমন কি পূজামন্ডপে।

ইসলামের এ বিশাল পরাজয় নিয়ে দেশের লক্ষ লক্ষ আলেমও নিরব, যেন এ পরাজয়কে নিশ্চুপ মেনে নেয়া ছাড়া তাদেরও কিছু করার নাই। মসজিদ ও মাদ্রাসায় চাকুরির মাঝে সীমিত তাদের জীবন।  কোরআনকে তারা পড়তে পারে -সে জ্ঞানকেই তারা সামান্য মূল্যে ঘরে ঘরে ও মসজিদে মসজিদে বিক্রি করে বেড়াচ্ছে। শরিয়তী বিধানকে যেভাবে আঁস্তাকুড়ে ফেলা হয়েছে তা নিয়েও এসব আলেমদের মাঝে সামান্যতম মাতম উঠে না। শরিয়তের পুণঃপ্রতিষ্ঠা নিয়ে তাদের নেই সামান্যতম আগ্রহ। শরিয়ত পালন ছাড়া যে ইসলাম পালন হয়না -সে হুশও কি তাদের মাঝে বেঁচে আছে? ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে দেশ অধিকৃত হলে তখন জিহাদ আর ফরজে কেফায়া থাকে না, ফরজে আইনে পরিণত হয়। প্রতিটি মুসলিমকে তখন লড়াইয়ে নামতে হয়। তাদের মাঝে কতটুকু বেঁচে আছে ইসলামের সে মৌলিক জ্ঞানটুকু? ফলে ইসলামের শত্রুশক্তির অধিকৃতি মোচনের কোন প্রচেষ্ঠাও নেই। ইসলামকে তারা নিজেদের পছন্দ মত বানিয়ে নিয়েছে; এবং নিজেরা যা করছে সেটিকেই তারা খাঁটি ইসলাম বলছে। ঘরে ঘরে পবিত্র কোরআনকে রাখা হয় স্রেফ না বুঝে তেলাওয়াতের জন্য; মহান আল্লাহতায়ালা কি বলেছেন সেটি জানা বা অনুসরণের জন্য নয়।

নবীজী (সাঃ)র যুগে ইসলাম বলতে যা বুঝাতো তাতে ছিল রাষ্ট্রের উপর একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব; রাজা, জনগণ বা জনগণের নির্বাচিত পার্লামেন্টের নয়। শাসকের পরিচয় ছিল নবীজী (সাঃ)র খলিফা বা প্রতিনিধি রূপে; জনগণের উপর নিজের খেয়াল-খুশিকে চাপিয়ে দেয়ার অধিকার শাসকের ছিল না। আইনের উৎস ছিল পবিত্র কোরআন ও সূন্নাহ; ফলে দেশের আদালত কখনোই দেশের শাসকদের বা নির্বাচিত সদস্যদের প্রণীত আইনের হাতে অধিকৃত হয়নি। সূদ, ঘুষ, মদ, জুয়া সন্ত্রাস, চুরি-ডাকাতি ও দেহব্যবসা চিহ্নিত হতো শাস্তিযোগ্য জঘন্য অপরাধ রূপে। ফলে রাষ্ট্রের বুক থেকে সে পাপ ও পাপাচারের পথগুলোও নির্মূল হয়েছিল। অথচ বাংলাদেশ আজ ভয়ানক অপরাধীদের হাতে অধিকৃত। এদের চরিত্র, এরা শুধু স্বৈরাচারি ও চরম দুর্বৃত্তই নয়; ইসলামের প্রতিষ্ঠা প্রতিরোধে এরা আপোষহীনও। ফলে সরকার ও দখলদার রাজনৈতিক দলের রাজনৈতিক এজেন্ডাও সুস্পষ্ট। দেশের ক্রমবর্ধমান গুম-খুন, চুরি –ডাকাতি, শেয়ারমার্কেট লুট, ব্যাংক লুট নিয়ে তাদের কোন মাথা ব্যাথা নেই। তারা যেহেতু নিজেরাই অপরাধী, অপরাধীদের নির্মূল তাদের লক্ষ্য নয়। তারা চায় নিজেদের রাজনৈতিক শত্রুদের নির্মূল ও নিজেদের গদীর দীর্ঘায়ু। তারা নির্মূল করেত চায় তাদের যারা ইসলামের বিজয় চায়। নির্মূলের সে কাজটি সহজ করতেই তারা দেশের সকল ইসলাম বিরোধী ব্যক্তি, দল ও দুর্বৃত্তদের পক্ষে টেনেছে। এসব দুর্বৃত্তদের কেউ কেউ খুনের অপরাধে আদালতে প্রাণদণ্ড পেলেও দেশের সরকার ও প্রেসিডেন্টের কাজ হয়েছে তাদের প্রাণদণ্ডকে মাফ করে দেয়া।

শাসনতন্ত্রে শয়তানের এজেন্ডা

রাজা, জনগণ বা পার্লামেন্টের সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারি হওয়ার ধারণা  পবিত্র কোরআনে নাই। তাই সেরূপ কোন ধারণার অস্তিত্ব নবীজী (সাঃ)র যুগে ছিল না। এরূপ প্রতিটি ধারণাই কুফরি। শাসকগণ কাজ করতেন নবীজী(সাঃ)র খলিফা রূপে। সার্বভৌমত্ব দাবী করার অর্থ মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা। সে কাজ কাফেরদের। দেশে দেশে সেরূপ যুদ্ধ বস্তুত শয়তানের খলিফাদের। অথচ তেমন একটি যুদ্ধ ঘোষিত হয়েছে বাংলাদেশের শাসনতন্ত্রে। এভাবে শাসনতন্ত্র ব্যাহৃত হচ্ছে শয়তানের এজেন্ডা পূরণে। নবীজী (সাঃ)র আমলে ইবাদত বলতে বুঝাতো নামায-রোযা, হজ-যাকাত পালনের সাথে সাথে পবিত্র কোরআনে ঘোষিত মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিটি হুকুমের প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ এবং নবীজী (সাঃ)র সূন্নতের পূর্ণ অনুসরণ। ফলে মু’মিনের জীবনে অনিবার্য রূপে দেখা দিত ইসলামের বিজয়ে জিহাদে অংশগ্রহণ। তখন শুরু হত কোরআনে নাযিলকৃত মহান আল্লাহতায়ালার পবিত্র বানী আত্মস্থ করার ধ্যানমগ্নতা; ঈমানদারের প্রয়াস তাই স্রেফ তেলাওয়াতে সীমিত ছিল না। সে সাথে ছিল কোরআনের বানীকে দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে দেয়ার তাড়াহুড়া। ঘরে ঘরে ছিল নিজ জান ও মাল নিয়ে ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে সার্বক্ষণিক জিহাদের প্রস্তুতি। সেসব জিহাদে সাহাবগণ শুধু সঞ্চয়ের সিংহভাগই বিলিয়ে দেননি, শহীদও হয়েছেন। মুসলিমগণ তো সে পথ ধরেই বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে সে সনাতন ইসলামকে তার বিশুদ্ধ পরিচয় নিয়ে বাঁচতে দেয়া হয়নি। নবীজী (সাঃ)র ইসলামে যেরূপ শরিয়ত, খেলাফত, জিহাদ ও অন্য ভাষা বা অন্য বর্ণের মুসলিমদের সাথে একাত্ম হওয়ার আকুল আগ্রহ ছিল, বাঙালী মুসলিমের ইসলামে তার কোনটাই নাই। সে সনাতন ইসলাম ছেড়েছে দেশের আলেমগণও। রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি অঙ্গণে ইসলামের এ পরাজয় নিয়ে তাদের মাঝে কোন মাতম নেই।

বাংলাদেশের মাটিতে সবচেয়ে বড় ভণ্ডামীটি  হচ্ছে ইসলামের নামে। ইসলাম বেঁচে আছে স্রেফ মুষ্টিমেয় কিছু লোকের টুপি-দাঁড়ি, দোয়া-দরুদ ও নামায-রোযার মাঝে। সবচেয়ে বড় নেককর্ম রূপে গণ্য হয় কোরআন পাঠ, দরুদ পাঠ ও মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণ। সে তালিকায় ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের নির্মূল যেমন নাই, তেমনি নাই শরিয়তের প্রতিষ্ঠা নিয়ে কোন আগ্রহ। অথচ মহান আল্লাহতায়ালার কাছে মুসলিম উম্মাহর শ্রেষ্ঠতর হওয়ার কারণ, ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায় ও অন্যায়ের নির্মূলে আত্মনিয়োগ। -(সুরা আল ইমরান, আয়াত ১১০)। অথচ পবিত্র কোরআনের সে কথা ভূলে তারা বাঁচছে সম্পূর্ণ বিপরীত মিশন নিয়ে। সেটি মিথ্যা ও অন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং সত্য ও ন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। তেমন একটি মিশনের কারণেই বাংলাদেশ দূর্নীতিতে বিশ্বে ৫ বার বিশ্বরেকর্ড গড়েছে। তাদের কাছে গুরুত্ব হারিয়েছে কোরআন বুঝা ও নবী-আদর্শের প্রতিষ্ঠা। মহান আল্লাহতায়ালাকে মুখে প্রভু রূপে স্বীকার করা হলেও রাষ্ট্রের উপর তাঁর কোন প্রভুত্ব বা সার্বভৌমত্ব নাই। সেটির প্রতিষ্ঠা নিয়েও কোন আগ্রহ নাই। আইন-আদালতে প্রবেশধাধিকার নাই পবিত্র শরিয়তী আইনের। কোন মুসলিম দেশে কি সেটি ভাবা যায়? সাহাবায়ে কেরামের সময় শয়তানী শক্তি কি মুসলিম ভূমিতে এরূপ বিজয়ের কথা কল্পনা করতে পেরেছে? দেশে পতিতাদের দেহব্যবসার আইনগত বৈধতা আছে। বৈধতা আছে সূদখোর, ঘুষখোর ও জুয়ারীদের নিজ নিজ হারাম কাজ চালিয়ে যাওয়ার। দেশে নাচগানের অশ্লীল আসর জমানোও অপরাধ নয়। জনগণের অর্থে প্রতিপালিত পুলিশ এসব পাপাচারীদের সারাক্ষণ নিরাপত্তা দেয়। দেশে রাজনীতিতে পূর্ণ আজাদী রয়েছে নাস্তিক, সোসালিস্ট, সেক্যুলারিস্ট, ন্যাশনালিস্ট –তথা সকল প্রকার ইসলামবিরোধীদের। কিন্তু সন্ত্রাস রূপে চিহ্নিত হয় মহান আল্লাহতায়ালার আইনের প্রতিষ্ঠার দাবী নিয়ে ময়দানে নামা। ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হত্যাকাণ্ডকে বলা হয় আইনের শাসন। সেরূপ নির্মূলকরণকে বৈধতা দিতে আরো নতুন আইন প্রণোয়ন করা হচ্ছে। আইন প্রণোয়নের মূল লক্ষ্য, এখানে স্বৈরাচারি সরকারকে নিরাপত্তা দেয়া, সে সাথে ইসলামের প্রতিষ্ঠাকে প্রতিরোধ করা। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে সরকারের কোন ভাবনা নাই। ফিরাউন, নমরুদ, হালাকু-চেঙ্গিজ ও হিটলারের আমলেও একই রূপ আইনের শাসন ছিল। সে আইনে সরকার বিরোধীদের গ্রেফতার করা, নির্যাতন করা ও হত্যা করা ছিল রীতিমত আইনসিদ্ধ কাজ গণ্য হত। অনুরূপ অবস্থা চেপে বসেছে বাংলাদেশের বুকেও। দেশের পুলিশ, আদালত ও প্রশাসনের কাজ হয়েছে সে আইনকে প্রতিষ্ঠা দেয়া। সরকারি দলের দুর্বৃত্তেদর হাতে দেশের ব্যাংকগুলো থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুণ্ঠিত হচ্ছে, হাজার হাজার মহিলা ধর্ষিতা হচ্ছে এবং নিহত হয়েছ শত শত মানুষ। গুম হয়েছে বহু বিরোধী দলীয় নেতাকর্মী। কিন্তু এরূপ ভয়ানক অপরাধের নায়কদের কি এ অবধি গ্রেফতার করা হয়েছে? দেয়া হয়েছে কি শাস্তি। অপরাধের নায়ক যেহেতু সরকারি দলের নেতাকর্মী, তাদের তাই গ্রেফতার করা হয় না। কিন্তু  হত্যাযোগ্য অপরাধ হলো ইসলামের পক্ষে রাস্তায় বিক্ষোভে যোগ দেয়া বা সত্য কথা বলা। নিরস্ত্র মানুষের বিক্ষোভ দমনে ২০১৩ সালের ৫ মে’র রাতে শাপলা চত্ত্বরে তাই সেনাবাহিনী নামানো হয়েছিল এবং হেফাজতে ইসলামের শত শত নিরীহ মানুষকে লাশ করে গায়েব করা হয়েছিল।

দখলদারী শয়তানের সাহায্যকারীদের

ভাষা, বর্ণ, গোত্র ও অঞ্চলের নামে মানব জাতি শত শত রাষ্ট্র ও গোত্রে বিভক্ত হলেও মহান আল্লাহতায়ালার কাছে আসল বিভাজনটি মূলতঃ দ্বি-ভাগে। এক). আনসারুল্লাহ অর্থাৎ মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্যকারি দল, দুই). আনসারুশ শায়তান অর্থাৎ শয়তানের সাহায্যকারি দল। মহান আল্লাহতায়ালার বিচারে তৃতীয় কোন দল নাই। মুসলিম হওয়ার অর্থই হলো মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্যকারি হয়ে যাওয়া। লক্ষ্য, ইসলামের বিজয়। মুসলিম নর-নারীর উপর সেটি ফরজ। কারণ সেটি হতে মহান আল্লাহতায়ালা সুস্পষ্ট নির্দেশ এসেছে পবিত্র কোরআনে। সে নির্দেশটি এসেছে সুরা সা’ফ’এর ১৪ নম্বর আয়াতে। হুকুম এসেছে, “হে ঈমানদারগণ, আল্লাহর আনসার (সাহায্যকারি) হয়ে যাও”। পবিত্র কোরআনে ঘোষিত এ হুকুমের অবাধ্যতা হলো সুস্পষ্ট কুফরী। মহান আল্লাহতায়ালা সাহায্যকারি  হওয়ার অর্থ, তাঁর  ভিশন বা ইচ্ছা পূরণে সাহায্যকারি হয়ে যাওয়া। এটিই তো নবীজীবনের মূল শিক্ষা। সাহাবায়ে কেরাম তো নবীজীবনের সে শিক্ষাকেই জীবনের মিশন বানিয়ে নিয়েছিলেন। ফলে বিশাল ভূ-ভাগ জুড়ে বিজয়ী হয়েছিল ইসলাম; এবং  প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল  শরিয়ত। যারা মহান আল্লাহতায়ালা সাহায্যকারি  হতে ব্যর্থ, তাদের সামনে শয়তানের সাহায্যকারি হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। তাদের নামায-রোযা ও হজ-যাকাতে তাই মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীন বিজয়ী হয় না। আর তারই উদাহরণ হলো বাংলাদেশ। তাই বাংলাদেশে মসজিদ, মাদ্রাসা ও নামাজীর সংখ্যা বাড়লেও তাতে ইসলামের বিজয় না বেড়ে দাপট বেড়েছে ইসলামের শত্রুপক্ষের। দেশের সরকার পরিণত হয়েছে শয়তানের সাহায্যকারি বাড়াতে। এবং সে কাজে তাদের সহযোগিতা বাড়ছে ভারতসহ বিশ্বের তাবত কাফের শক্তির সাথে।

যারা মহান আল্লাহতায়ালার উপর বিশ্বাসী তারা আত্মসমর্পণ করে তাঁর প্রতিটি হুকুমের কাছে। এ আত্মসমর্পণ নিয়ে তারা কোন রূপ দ্বিধাদ্বন্দে ভোগে না। আনসারুল্লাহ হওয়ার কোরআনী হুকুমটি তারা শুধু পাঠই করে  না, নিজ জীবনের মূল মিশনেও পরিণত করে। অপর দিকে যারা মহান আল্লাহতায়ালাতে অবিশ্বাসী, তাদের আগ্রহ থাকে না মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্যকারি হতে। বরং সে হুকুমের বিরুদ্ধে তারা বিদ্রোহী হয় ও যুদ্ধে নামে। পবিত্র কোরআনে এরাই চিহ্নিত হয়েছে কাফের রূপে। কাফেরদের এ বিদ্রোহে কোন কপটতা বা প্রতারণা নাই। অথচ সে কপটতা বা প্রতারণা ধরা পড়ে মুনাফিকদের জীবনে। মুসলিম রূপে পরিচয় দেয়া সত্ত্বেও মুনাফিকদের যুদ্ধটি মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীন ও তাঁর শরিয়তের বিরুদ্ধে। পবিত্র কোরআনে এ বিষয়গুলো নিয়ে বার বার আলোচনা হয়েছে –যাতে মানুষ তার মৃত্যুর পূর্বে কোন দলে অবস্থান সেটি জানতে ভূল না করে। মুসলিমদের বিরুদ্ধে শত্রুতায় ও নাশকতায় মুনাফিকদের জুড়ি নাই। ইসলামের বিজয় তাদের কাছে অসহ্য। নবীজীর যুগে এরাই নব্য মুসলিম রাষ্ট্রের নির্মূলে কাফের ও ইহুদীদের সাথে কোয়ালিশন গড়েছিল। প্রতি মুসলিম দেশে শয়তানের সাহায্যকারিদের সেটিই সনাতন নীতি। সে অভিন্ন নীতি বাংলাদেশেও। তবে পার্থক্য হলো, মদিনার মুনাফিকগণ ছিল পরাজিত। অথচ তারা হলো বিজয়ী। ফলে মদিনার মুনাফিকদের ন্যায় ইসলামের শত্রুপক্ষ তথা কাফেরদের সাথে তারা গোপনে জোট বাঁধে না। তারা সেটি প্রকাশ্যেই করে। নিজেদেরকে আনসারুল্লাহ  বা ইসলামের পক্ষের শক্তি রূপেও তারা দাবী করে না। শরিয়তের প্রতিষ্ঠা প্রতিরোধ ও ইসলামের পক্ষের শক্তির নির্মূল যে তাদের রাজনীতির প্রধানতম লক্ষ্য -সেটিও তারা খোলাখোলি বলে। তাদের কারণেই দেশটিতে ইসলামের বিজয় ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠা রুখতে কোন কাফের শক্তিকে ময়দানে নামতে হচ্ছে না। সেটি তারা নিজেরাই করছে। প্রতিটি মুসলিম দেশে এরাই ইসলাম ও মুসলিমের ঘরের শত্রু। নিজেদের মুসলিম রূপে পরিচয় দেয়ার যে ভণ্ডামী -সে জন্য তাদের জাহান্নামের শাস্তিটা হবে কাফেরদের চেয়েও অধীক। পবিত্র কোরআনে তাই বলা হয়েছে, এরূপ মুনাফিকদের অবস্থান হবে জাহান্নামের সবচেয়ে নীচের স্তরে।

মহান নবীজী (সাঃ)র যুগে এরূপ নিকৃষ্ট জীব তথা মুনাফিকদের সংখ্যা নগন্য ছিল না। ওহুদের যুদ্ধের সময় সে সংখ্যা ছিল প্রায় শতকরা ৩০ ভাগ। সে পরিসংখ্যানটি ধরা পড়ে তখন যখন নবীজী (সাঃ) মাত্র এক হাজার সৈন্য নিয়ে মদিনা থেকে ওহুদের যুদ্ধে বের হন। তখন মুনাফিকদের ৩০০ জন সে বাহনী থেকে বেরিয়ে যায়। মুনাফিকদের চেনা ও আলাদা করার ব্যাপারে জিহাদ এভাবেই ছাঁকুনীর কাজ করে। এসব মুনাফিকগণ নবীজী (সাঃ)র পিছনে নামায পড়তো, রোযা-হজ-ওমরাহও পালন করতো। কিন্তু গোপনে গোপনে এরাই ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বিনাশে ইহুদী ও কাফেরদের সাথে কোয়ালিশন গড়েছিল। এমন মুনাফিক আজও বেঁচে আছে প্রতিটি মুসলিম দেশে, এবং বিশাল সংখ্যা নিয়ে।  নবীজী (সাঃ)র যুগে সংখ্যায় কম ও পরাজিত হওয়ায় তারা লুকিয়ে লুকিয়ে ষড়যন্ত্র করতো। কিন্তু বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলিতে তারা সংখ্যায় বিশাল, সে সাথে বিপুল ভাবে বিজয়ীও। ইসলামের বিরুদ্ধে এরা এতটাই উগ্র ও উদ্ধত যে ইসলামের শত্রুপক্ষের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তারা প্রকাশ্যে যুদ্ধে নামে। বঙ্গীয় এ ভূমিতে তাদেরকে ১৭৫৭’য়ে দেখা গেছে ইংরেজদের সাথে; ১৯৭১’য়ে দেখা গেছে ভারতীয়দের সাথে। আজ দেখা যায় মুসলিম বিরোধী আন্তর্জাতিক কোয়ালিশনের সাথে। নবীজী (সাঃ)র যুগে এরূপ প্রকাশ্যে যুদ্ধ নামার সাহস মুনাফিকগণ পায়নি।

সংকটে পড়েছে পরকালীন মুক্তি

ইসলামের যে শত্রুপক্ষের হাতে বাংলাদেশ আজ অধিকৃত, তারা দেশের রাজনীতি, প্রশাসন, সংবিধান, শিক্ষা-সংস্কৃতি, সেনাবাহিনী ও আইন-আদালতের ন্যায় অঙ্গণে ইসলাম ও ইসলামপন্থিদের জন্য সামান্যতম স্থান ছেড়ে  দিতে রাজী নয়। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে একমাত্র তাদেরই স্থান দেয়, যারা সমাজে পরিচিত মুর্তিপূজারী কাফের, নাস্তিক, সেক্যুলারিস্ট ও সোসালিস্ট রূপে। তাদের মনের ভূবনের সবটুকু দখল করে আছে ইসলাম প্রসঙ্গে নিজেদের মনগড়া ধারণা। পবিত্র কোরআনের ব্যাখ্যা হতে হবে তাদের মনপুত, নইলে সেটির প্রচার হতে দিতে তারা রাজী নয়। যে সব বইয়ে জিহাদ বিষয়ক আয়াতের উল্লেখ আছে – সেগুলিকে তারা সন্ত্রাসের বই রূপে চিহ্নিত করে। ঘরে বা দোকানে সে সব বই রাখা বা সেগুলি পাঠ করাকে তারা দণ্ডনীয় অপরাধ গণ্য করে। মসজিদে নামায পাঠ, দরুদ পড়া বা রোযা পালন নিয়ে তাদের আপত্তি নাই; কিন্তু নবীজী (সাঃ)র যুগের ন্যায় সমাজ ও রাষ্ট্রের পূর্ণ ইসলামীকরণ হতে দিতে তারা রাজী নয়। ইসলামীকরণের সে স্বপ্ন দেখাটিই তাদের কাছে অপরাধ। যারা সে স্বপ্ন দেখে তাদের বিরুদ্ধে দেয় নির্মূলের হুংকার। ফলে বাংলার মুসলিম ভূমিতে অসম্ভব হয়েছে নবীজী (সাঃ)র সে সব গুরুত্বপূর্ণ সূন্নতের অনুসরণ যাতে ছিল তাঁর রাজনীতি, প্রশাসন, জিহাদ ও শরিয়ত পালন। এভাবে অসম্ভব করা হয়েছে পরিপূর্ণ মুসলিম রূপে বেড়ে উঠা। বাঙালী মুসলিমের জীবনে এটিই হলো সবচেয়ে বড় সংকট। এভাবে সংকটে পড়েছে তাদের পরকালীন মুক্তি।

গুরুতর এ সংকটের কারণ, ঈমানদারীর দায়ভারটি স্রেফ নামায-রোযা, হজ-যাকাত ও তাসবিহ-তাহলিল নিয়ে বাঁচা নয়। বরং সেটি পরিপূর্ণ মুসলিম রূপে বাঁচা। এখানে কোন আপোষ চলে না। কাফের হওয়ার জন্য মহান আল্লাহতায়ালার একটি মাত্র হুকুম অমান্য করাই যথেষ্ট। প্রকৃত মুসলিম হওয়ার জন্য অপরিহার্য হলো,  মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিটি হুকুমের কাছে পূর্ণ আত্মসমর্পণ। একটি মাত্র হুকুম অমান্য করায় ইবলিস পাপীষ্ট শয়তানে পরিণত হয়েছে। অথচ মহান আল্লাহতায়ালার বহু হুকুম অমান্য করায় বাধ্য করছে বাংলাদেশের সরকার। পবিত্র কোরআনে ঘোষণা, “আমার নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী যারা বিচারের কাজ করে না তারা কাফের। ..তারাই জালেম। … তারাই ফাসেক।” –(সুরা মায়েদা, আয়াত ৪৪, ৪৫ ও ৪৬)।  কিন্তু বাংলাদেশে কি মহান আল্লাহতায়ালার এ হুকুম মান্য করা সম্ভব? সে জন্য তো রাষ্ট্রের আদালতে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা চাই। কোন অনৈসলামিক দেশে বসবাসের বড় বিপদ তো এটিই। সে বিপদ থেকে বাঁচতে ঈমানদার ব্যক্তি নিজ দেশ ছেড়ে ইসলামী দেশে হিজরত করে। অথচ সে বিপদটাই প্রকট রূপে বেড়েছে বাংলাদেশের ন্যায় একটি মুসলিম দেশে। বাংলাদেশে ইসলাম বিরোধী শক্তির এটিই হলো সবচেয়ে বড় নাশকতা। এটিই তাদের পরিকল্পিত ডি-ইসলামাইজেশন প্রজেক্ট। তাদের লক্ষ্য, মুসলিম জনগণকে মহান আল্লাহতায়ালার হুকুম পালন থেকে জোর পূর্বক দূরে রাখা। নবীজী (সাঃ)র ইসলাম থেকে এভাবে দূরে সরিয়ে তাদেরকে ভণ্ড মুসলিমে পরিণত করা। নামায-রোযা, হজ-যাকাতে অংশ নিয়েও মিথ্যা বলা, সূদ-ঘুষ খাওয়া, সেক্যুলার রাজনীতি ও শরিয়তি আইনের প্রতিষ্ঠা বিরুদ্ধে লাঠি ধরাও তখন এ ভণ্ডদের জন্য সহজ হয়ে যায়। বাংলাদেশে এবং সে সাথে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে, ভয়ানক ক্ষতিটি হয়েছে এরূপ অনৈসলামিক শাসকদের হাতে। বিগত হাজার বছরে খুব কম সংখ্যক মুসলিমই খৃষ্টান, বৌদ্ধ বা হিন্দু ধর্মে দীক্ষা নিয়েছে। কিন্তু তাদের মাঝে ইসলামের অনুসরণে প্রচন্ড ভাবে নিষ্ক্রীয় হয়েছে বিপুল সংখ্যায়। ইসলাম থেকে দূরে সরা এরূপ মুসলিমগণ ইসলাম নির্মূল করার যুদ্ধে দলে দলে হাত মিলিয়েছে শত্রুপক্ষের সাথে। ফলে বিগত কয়েক শত বছরে মুসলিমদের সংখ্যা বহুগুণ বাড়লেও শক্তি বাড়েনি। সম্মানও বাড়েনি। বরং বেড়েছে উপর্যুপরি পরাজয়। এদের কারণেই মুসলিম উম্মাহ আজ বিভক্ত। এবং আইন-আদালত থেকে নির্বাসিত হয়েছে মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তী আইন। এভাবে নবীজী (সাঃ)র ইসলাম অজানা ও অপরিচিত রয়ে গেছে খোদ মুসলিম দেশগুলিতে। মুসলিমের জীবনে সবচেয়ে বড় ইবাদত তাই নামায-রোযা, হজ-যাকাত, তাসবিহ-তাহলিল নয়। এরূপ ইবাদত নবীজী (সাঃ)র যুগে মুনাফিকগণও করতো। আজ কোটি কোটি বাঙালী মুসলিমও সেটি করে। বরং সে পবিত্র ইবাদতটি হলো এমন জিহাদ যা রাষ্ট্রের বুক থেকে সেসব  দুর্বৃত্ত শাসকদের নির্মূল করে যারা এ পৃথিবী পৃষ্ঠে মহান আল্লাহতায়ালার হুকুম পালনকে অসম্ভব করে। যারা সে কাজে প্রাণ দেয় তারা পায় বীনা হিসাবে জান্নাত। অন্য কোন ইবাদতে কি সেটি জুটে? করুণাময়ের দরবারে শহীদদের এরূপ বিশাল মর্যাদার কারণ, তাদের কারণেই মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীন বিজয়ী হয়; প্রতিষ্ঠা পায় শরিয়ত। এবং বাড়ে বিশ্বজুড়ে মুসলিমের শক্তি ও গৌরব। নবীজী (সাঃ)র সাহাবাগণ তো সে পথে অর্থ, শ্রম, মেধা ও প্রাণদানের মধ্য দিয়েই মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করেছিলেন। কিন্তু যে বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের ইতিহাস তলাহীন ভিক্ষার ঝুলি ও দুর্নীতিতে বিশ্বে শিরোপা লাভে -তাদের কি এ মহান মিশনে আগ্রহ থাকে? বাঙালী মুসলিমের বিপদের মূল কারণ, দেশ তো সে দুর্বৃত্তদের হাতেই জিম্মি।

 




মুসলিম দেশগুলির বিধ্বস্ত সোশাল রিফাইনারি

অপরিহার্য কেন সোশাল রিফাইনারি?

খনির খাম তেল সরাসরি গাড়ির ফুয়েল ট্যাংকে ঢাললে তাতে গাড়ি চলে না। বরং তাতে বিকল হয় ইঞ্জিন। খনির তেলকে তাই ব্যবহার-উপযোগী করতে হলে ওয়েল রিফাইনারিতে নিয়ে পরিশোধিত করাটি জরুরী। বিষয়টি শত ভাগ সত্য মানব সন্তানের পরিশুদ্ধি ও মুসলিম রূপে বেড়ে উঠার বেলায়ও। বিষয়টি এতোই গুরুত্বপূর্ণ যে, পরিশোধনের সে প্রক্রিয়াকে বলবৎ রাখতেই মহান আল্লাহতায়ালা প্রথম মানবকে স্রেফ মানব রূপে নয়, নবী রূপেও প্রেরণ করেছেন। এবং অব্যাহত রেখেছেন নবী-রাসূল প্রেরণ এবং সে সাথে ফেরেশতা মারফত ওহী প্রেরণ। ইসলামে ইসলামী রাষ্ট্র গড়া এবং শিক্ষা ও সংস্কৃতির কার্যকর অবকাঠামো গড়ে তোলা এজন্যই এতো জরুরী। নবীজী (সাঃ)র প্রসিদ্ধ হাদীস, প্রতিটি মানব শিশুই জন্ম নেয় মুসলিম রূপে। কিন্তু পরবর্তীতে সে মুসলিম রূপে বেড়ে উঠতে ব্যর্থ হয় পরিবার ও সামাজিক পরিবেশের কারণে। এর কারণ, প্রতিটি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের অঙ্গণে কাজ করে একটি বিশেষ ধাঁচের শক্তিশালী সোশাল ইঞ্জিনীয়ারিং। কোন শিশুই তা থেকে নিস্তার পায় না। ফলে হিন্দু, খৃষ্টান, শিখ বা বৌদ্ধ ঘরের সন্তান যত মেধাবীই হোক আল্লাহর দ্বীনকে বুঝা এবং সে অনুসারে বেড়ে উঠার সামর্থ্য সে পায় না।

ব্যক্তির চেতনা, চরিত্র, কর্ম ও জ্ঞানের ভূবনে কতটা ভ্যালু এ্যাড হবে এবং সে কোন ধর্ম বা মতবাদ নিয়ে বেড়ে উঠবে সেটি নির্ধারণ করে চলমান পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের অঙ্গণে চলমান সোশাল ইঞ্জিনীয়ারিং। সে সোশাল ইঞ্জিনীয়ারিং প্রক্রিয়াটি প্রতিষ্ঠা না পেলে কোন ধর্ম বা মতাদর্শ সমাজে বাঁচে না বা বিজয়ী হয় না। এজন্যই ইসলামের মহান নবীজী (সাঃ)কে শুধু ইসলামের প্রচারই করেননি, বরং ইসলামি রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার এবং ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতিরও প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন। বস্তুতঃ এটিই ছিল সে আমলে মুসলিমদের অর্থ, শ্রম, মেধা ও রক্ত বিনিয়োগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত। সে রাষ্ট্রকে প্রতিষ্ঠা ও প্রতিরক্ষা দিতে নবীজী (সাঃ)র শতকরা ৭০ ভাগের সাহাবীকে তাদের প্রাণের কোরবানী দিতে হয়েছে। তাদের সে কোরবানীর ফলেই রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার ও মসজিদ-মাদ্রাসা পরিণত হয়েছিল শক্তিশালী সোসাল রিফাইনারিতে। বিশ্বশক্তি রূপে মুসলিমদের উদ্ভব এবং সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার নির্মাণে তাদের যে বিশাল সফলতা জুটেছিল -তার মূলে ছিল নবীজীর (সাঃ)র হাতে প্রতিষ্ঠিত সে সোসাল রিফাইনারিগুলি। সে লক্ষ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ইসলামী শিক্ষা ও ইসলামী রাষ্ট্র। ইসলামী রাষ্ট্রের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান যেমন মানব সমাজে থাকতে পারে না। তেমনি শিক্ষাদানের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণি কোন কর্মও থাকতে পারে না। ফলে জীবনের যে দিনটিতে নবীজী (সাঃ) নবীর মর্যাদা পান, সেদিনই সর্বপ্রথম যে হুকুমটি পান সেটি হলো “ইকরা” তথা পড়ার। পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের হুকুম পান তার ১১ বছর পর। মক্কার কাফেরগণ ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার সুযোগ তাঁকে দেয়নি; কিন্তু সে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা দেন মদিনায় হিজরতের প্রথম দিনেই। গড়ে তোলেন মসজিদ। সে মসজিদে তিনি ছিলেন সার্বক্ষণিক শিক্ষক। বিদ্যা শিক্ষা এতটাই গুরুত্ব পেয়েছিল যে, বদরের যুদ্ধের হত্যাযোগ্য যুদ্ধাপরাধীদের এ শর্তে মুক্তি দিয়েছিলেন যে তারা মুসলিমদের বিদ্যা শিক্ষা দিবে।

সমাজ ও রাষ্ট্রের বুকে মানবের চিন্তা-চেতনার পরিশুদ্ধির একটি সফল ও শক্তিশালি অবকাঠামো না থাকলে শুধু মুসলিমদের সন্তানেরাই নয়, নবী-রাসূলদের সন্তানও ব্যর্থ হয় মুসলিম রূপে বেড়ে উঠতে। ইতিহাসে সে প্রমানও রয়েছে। তখন মুসলিম দেশ বিশ্বরেকর্ড গড়ে উন্নত নীতি-নৈতিকতায় নয়, বরং সীমাহীন দুর্নীতিতে। এ শতাব্দীর গোড়াতে বাংলাদেশ যেভাবে পর পর ৫ বার দুর্নীতে বিশ্বরেকর্ড গড়ে –সেটিই প্রমাণ করে দেশটিতে সোশাল রেফাইনারিগুলি কতটা ভয়ানক ভাবে বিকল। নিকোবর বা পাপুয়া নিউগিনির যে মানুষগুলো উলঙ্গ হয়ে বনেজঙ্গলে পশুদের মত গুহায় বাস করে সেটির কারণ, সাধারণ মানব থেকে তাদের দৈহিক ভিন্নতা নয়, বরং সেটি হলো সোসাল রিফাইনারির মধ্য দিয়ে পরিশোধিত না হওয়ার ফল। এরফলে এসব হতভাগ্য মানব শিশুগণ পুরাপুরি অপরিশুদ্ধ তথা খামই রয়ে যায়। ফলে বাসস্থান ও পানাহারের সন্ধানে তাদের প্রতিযোগিতা দিতে হয় বনের বানর-শৃগালদের সাথে। দেশের দায়িত্বহীন সরকার তাদের বাঁচিয়ে রেখেছে টুরিস্টদের জন্য দর্শণীয় জীব রূপে।

পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র জুড়ে পরিশোধনের যে চলমান প্রক্রিয়া সেটিই হলো ইসলামের তাহযিব। তাহযিবের আভিধানিক অর্থ হলো পরিশুদ্ধি করণ। বস্তুতঃ এটিই হলো ইসলামের সংস্কৃতি -যা মানব সন্তানকে মুসলিম রূপে গড় তোলে। মুসলিমদের পতনের কারণ কোন ভূমিকম্প বা সুনামী নয়, অর্থনৈতীক ব্যর্থতাও নয়। বরং সেটি হলো অকার্যকর তাহযিব তথা সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়া। রাষ্ট্র পরিণত হয়েছে স্রেফ শাসকের ভোগের আয়োজনে সমৃদ্ধি আনার হাতিয়ারে। ফলে মুসলিম পরিবারে জন্ম নিয়েও মুসলিম সন্তান ব্যর্থ হচ্ছে ইসলামের শিক্ষা নিয়ে বেড়ে উঠতে। ব্যর্থতার সে চিত্রটি আরো সুস্পষ্ট হয়ে ধরা পড়ে যখন তারা ইসলামকে বিজয়ী করার বদলে নিজেদের অর্থ, শ্রম ও রক্তের বিনিয়োগ করে জাতীয়তাবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, সমাজবাদ, স্বৈরাচার ও সেক্যুলারিজমকে বিজয়ী করার যুদ্ধে। তাই মুসলিম ভূমিতে কাফেরগণ লক্ষ লক্ষ দাস সৈনিক পায়। নিজ ধর্ম ও নিজ উম্মাহর সাথে তাদের বিশ্বাসঘাতকতার ভয়ানক চিত্রটি হলো, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে দশ লাখের বেশী আরব মুসলিম এবং দুই লাখের বেশী ভারতীয় মুসলিম যুদ্ধ করেছে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে বিজয়ী করতে। উসমানিয়া খেলাফা পরাজিত ও বিলুপ্ত হয়েছে, মুসলিম রাষ্ট্রগুলি ক্ষুদ্রতর হয়েছে, কাফেরদের হাতে মুসলিম ভূমি অধিকৃত হয়েছে এবং রাষ্ট্রীয় অঙ্গণে ইসলাম পরাজিত হয়েছে বস্তুতঃ মুসলিমদের নিজেদের হাতে। মুসলিমগণ মুসলিম রূপে বেড়ে উঠতে কতটা ব্যর্থতা হয়েছে এ হলো তার নমুনা।

 

ব্যর্থতা যেখানে কোরআন বুঝায়

ইসলামের সোশাল ইঞ্জিনীয়ারিংয়ের মূল হাতিয়ারটি হলো পবিত্র কোরআন। কোর’আনের জ্ঞান ছাড়া ইসলামের সোশাল রিফাইনারিগুলো অচল হতে বাধ্য। মুসলিমের সাফল্য তো প্রকৃত মুসলিম রূপে বেড়ে উঠায়। সে কাজটি জলবায়ু, ঘর-বাড়ী, বা পানাহারে হয় না। এজন্য অপরিহার্য হলো তার ঈমানের পুষ্টি। ঈমান সে পুষ্টি পায় কোর’আনের জ্ঞান থেকে। সেটি না হলো উন্নত ঘরবাড়ীর সুঠাম বাসিন্দাও ভয়ানক চোর-ডাকাতে পরিণত হয়। নামাযে বা নামায শেষে জায়নামাযে বসে সুরা তেলেওয়াত করলেই  কোর’আন পাঠের ফরজ আদায় হয় না। নামাযের নিয়েত বেঁধে যে সুরাগুলি জায়নামাযে তেলাওয়াত করা হয় তার মূল লক্ষ্যটি নামায আদায়। সে তেলাওয়াতে জ্ঞানার্জনের নিয়েত থাকে না, ফলে জ্ঞানার্জনের ফরজও তাতে আদায় হয়না। জ্ঞানার্জনের নিয়েত নিয়ে তাই কোরআন পাঠ করতে হয় নামাযের বাইরে। কোর’আন পাঠে যা গুরুত্বপূর্ণ তা হলোঃ এক). আয়াতগুলির অর্থ বুঝা, দুই). সেগুলি নিয়ে চিন্তাভাবনা করা এবং তিন). বাস্তব জীবনে সে কোর’আনী জ্ঞানের প্রয়োগ। না বুঝে বার বার কোর’আন তেলাওয়াতে জ্ঞানার্জনের ফরজ আদায় হয় না। এরূপ কোর’আন পাঠের ফলে জাহেল বা অজ্ঞ থাকার পাপ থেকে মুক্তি ঘটে না।

কোরআন বুঝা এতো কঠিন নয় যতটা কঠিন ডাক্তার, ইঞ্জিনীয়ার বা অন্য কোন পেশায় প্রফেশনাল পরীক্ষায় পাশ করা। সামান্য কয়েক দশকের সুখ-শান্তি বাড়াতে ছাত্রদের জীবনে সময় ও মেধার বিনিয়োগটি বিশাল। বছরের পর বছর ধরে, রাতের পর রাত জেগে, তারা বিশাল বিশাল বইয়ের হাজার হাজার পৃষ্ঠা বার বার পড়ে ও মুখস্থ করে। অথচ হাজার হাজার ট্রিলিয়ন বছরেও শেষ হবার নয় এমন এক অনন্ত অসীম কালের সুখশান্তি বাড়াতে অপরিহার্য যে কোরআনী জ্ঞানের পথনির্দেশনা –সে জ্ঞান বাড়াতে ছাত্রদের বিনিয়োগ বা মেহনত কতটুকু? সে অবহেলার কারণে ডাক্তার, ইঞ্জিনীয়ার বা অন্য কোন পেশায় তাদের সফলতা মিললেও বিপদে পড়ছে মুসলিম হওয়াটি। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালার ঘোষণা, “একমাত্র (পবিত্র কোরআনের জ্ঞানে) জ্ঞানবানগণই আমাকে ভয় করে।” মুসলিম হওয়ার জন্য জ্ঞানবান হওয়া তাই অপরিহার্য। চিকিৎসা বিজ্ঞানের জ্ঞান ছাড়া যেমন ডাক্তার হওয়া যায় না, তেমনি অসম্ভব হলো পবিত্র কোর’আনের জ্ঞান ছাড়া মুসলিম হওয়া। মুসলিম জীবনে মহাপাপ হলো অজ্ঞ বা জাহেল থাকা। মহান আল্লাহতায়ালা আমলের সংখ্যা দেখেন না, দেখেন ওজন। আর ওজন বাড়ে জ্ঞানের মিশ্রণ ঘটায়।

কিন্তু মুসলিমদের মাঝে পবিত্র কোরআ’ন থেকে জ্ঞানার্জনের সে চেষ্টা কই? যে পরিমান সময়, শ্রম ও মেধা তারা প্রফেশনাল জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য ব্যয় করে তার সিকি ভাগ সময় কোরআন বুঝার পিছনে ব্যয় করলে কোর’আনের উপর গভীর জ্ঞানলাভ হতো। তখন সে জ্ঞানে সহজ হতো সিরাতুল মুস্তাকীম প্রাপ্তি এবং সে সাথে জান্নাত-প্রাপ্তি। তাছাড়া কোর’আনের এ জ্ঞানার্জন এতটা কঠিনও নয় যতটা ভাবা হয়। এ নিয়ে মুসলিমদের মাঝে বিরাজ করছে প্রচণ্ড ভাষাগত ভীতি। অথচ কোর’আনের ভাষা অন্য বহু ভাষার চেয়ে সহজ। বাংলা ভাষার মধ্যেই রয়েছে বহু আরবী শব্দ। কোর’আনের ভাষা সহজ হওয়ার কারণেই এ পবিত্র কিতাব  মাতৃভাষা পাল্টিয়ে দিয়েছে ইরাক, সিরিয়া, মিশর, লিবিয়া, আলজিরিয়া, মরক্কো, মালি, সূদানসহ বহু দেশের মানুষের। অথচ আরবী ভাষা শিক্ষা দেয়ার জন্য সে সময় মুসলিম ভূমিত কোন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বা ভাষা ইন্সটিটিউট ছিল না। সরকারি উদ্যোগে গ্রামে গ্রামে শিক্ষক প্রেরণের আয়োজনও ছিল না। মহান আল্লাহতায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ এ দান থেকে কিছু সংগ্রহের আগ্রহই সে কাজকে সেদিন সহজ করে দিয়েছিল।  আরো লক্ষণীয় হলো, পবিত্র কোরআনের অতি প্রসিদ্ধ মোফাচ্ছিরগণ গড়ে উঠেছে অনারবদের মধ্য থেকে। সে উদাহরণ হলো, তাবারিস্তানের আত-তাবারী, ইরানের আল-রাযী, আধুনিক ভারতের ইউসুফ আলী।

এটিও সত্য এবং অতি বাস্তব যে, পবিত্র কোর’আন গভীর ভাবে বুঝতে হলে সে বুঝার কাজটি হতে হবে কোর’আনের ভাষাতেই। অনুবাদ পড়ে সেটি সম্ভব নয়। পবিত্র কোরআনের মাঝে রয়েছে প্রচণ্ড ইমোশনাল, ইন্সপিরেশনাল ও ইনটেলেকচুয়াল ফোর্স। এর অনুবাদ কোন ভাবেই সম্ভব নয়। ফলে অনুবাদ পড়ে কারো দিল কেঁপে উঠে না, চোখেও পানি আসে না। এমন কি মুসলিম ভূমি কাফেরদের হাতে অধিকৃত হলেও জিহাদের ময়দানে ছুটে যাওয়ার জজবা সৃষ্টি হয়না। কিন্তু দিল কাঁপে, চোখে পানি আসে ও জিহাদের ময়দানে ছুটে যাওয়ার জজবা সৃষ্টি হয় আরবী ভাষা বুঝে কোরআন পাঠ করলে। কোর’আন না বুঝে তেলাওয়াতের কারণেই মুসলিমদের সংখ্য বিপুল ভাবে বাড়লেও ইসলাম পালন হচ্ছে না। ইসলামের বিজয়ও বাড়ছে না। তবে যারা জালেম, গাফেল, দুনিয়াদার ও পাপী, তাদের মাতৃভাষা আরবী হলেও কোর’আন থেকে শিক্ষা নেয়ার সামর্থ্য তাদের থাকে না। আবু লাহাব, আবু জাহেলগণ তাই পায়নি। আজকের দুর্বৃত্ত আরব জালেমগণও পাচ্ছে না। কারণ, জালেমদের হিদায়েত না দেয়াটিই হলো পবিত্র কোর’আনে ঘোষিত মহান আল্লাহতায়ালার দৃঢ় প্রতিশ্রুতি।

 

মুসলিম ইতিহাসের কালো অধ্যায় ও তার কারণ

এ সত্য অস্বীকারের উপায় নেই, খলিফা রাশেদার বিলুপ্তি কোন কাফের শক্তির হাতে হয়নি। হয়েছে মুসলিমদের হাতে। এর হেতু কি? এর মূল কারণ, খোলাফায়ে রাশেদার শেষ দিনগুলিতে মুসলিমদের নিজেদের মাঝে বিচ্যুতি। সে বিচ্যুতিটি ঘটেছিল নবীজী (সাঃ) শিক্ষা থেকে দূরে সরায়। খোলাফায়ে রাশেদাকে বিলুপ্ত করে স্বৈরাচারি শাসনে রূপ দেয়ার কাজে সে সময় যারা নেতৃত্ব দেন তাদের কেউই প্রাথমিক যুগের সাহাবা ছিলেন না। তারা মুসলিম হয়েছিলেন মক্কা বিজয়ের পর। এক কালের মুশরিক-সর্দার আবু সুফিয়ানের পুত্র হযরত মুয়াবিয়া (রাঃ) ছিলেন তাদেরই একজন। ইসলামের ইতিহাসে তারা পরিচিত ‘তোলাকা’ রূপে। তারা ফিরিয়ে আনে নিজেদের গোত্রীয় শাসনকে। খলিফার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা যে কবিরা গোনাহ ও জঘন্য হারাম -সে য জ্ঞানের প্রমাণও তারা রাখতে পারেনি। একতার বদলে বিভক্তি গড়া তাদের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। প্রশ্ন হলো, এরই বা কারণ কি? ভাবতে হবে তা নিয়েও।

নবুয়ত প্রাপ্তির শুরু থেকেই মহান নবীজী (সাঃ) মুসলিমদের মাঝে জ্ঞান, ধ্যান-ধারণা ও চেতনা-চরিত্রের পরিশুদ্ধির যে প্রক্রিয়াও শুরু করেন সেটিই হলো সমগ্র মানব জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিপ্লবী ঘটনা। নবীজী (সাঃ)র পরিচালনায় প্রতিষ্ঠা পায় এমন এক সামাজিক রিফাইনারি -যা জন্ম দেয় পরিশুদ্ধ চেতনা-চরিত্রের অধিকারি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব। যারা পরিচিতি পায় নবীজী (সাঃ)র সাহাবা রূপে। সে সামাজিক রিফাইনারির মূল উপাদানটি ছিল পবিত্র কোর’আনের জ্ঞান ও নবীজী (সাঃ)র নেতৃত্ব। এবং সে ইসলামী রিফাইনারিটি নিয়মিত নজদারী ও দিক-নির্দেশনা পেয়েছিল খোদ মহান আল্লাহতায়ালা থেকে। নবীজী (সাঃ)র ইন্তেকালের পর মহান আল্লাহতায়ালার সাথে মুসলিম উম্মাহর সে সংযোগের ইতি ঘটে।

প্রশিক্ষণের অপরিহার্য অংশ রূপে স্রেফ জ্ঞানদান ও নামায-রোযা নয়, মহান নবীজী (সাঃ) সাহাবাদেরকে জিহাদের ময়দানেও হাজির করেছিলেন। লাগাতর জিহাদে অংশ নেয়ায় পরিপক্কতা পায় তাদের ঈমান। ইসলামী রাষ্ট্রের ন্যায় একটি আদর্শিক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা দেয়া এবং সেটিকে লাগাতর টিকে রাখার জন্য এমন এক সোশাল রিফাইনারীর গুরুত্বটি অপরিসীম। মক্কার বুকে ১৩ বছর ধরে চলে সে প্রশিক্ষণ। মানব ইতিহাসের বুকে কোন কালেই এতটা সফল প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা পায়নি। সে প্রশিক্ষণের অংশ রূপে শোবে আবু তালেবে তিন বছর অন্তরীণ থাকা কালে নবীজী (সাঃ) এবং তাঁর সাহাবাদেরকে অনাহারে গাছের পাতাও খেতে হয়। নবীজীর জীবনে সে তিনটি বছর ছিল সবচেয়ে কঠিন দিন। সে প্রশিক্ষণে শামিল ছিলেন নবীজী (সাঃ)র প্রথম স্ত্রী হযরত বিবি খাদিজা (রাঃ)। নবীজী (সাঃ)র জীবনে তিনিই ছিলেন তাঁর শ্রেষ্ঠ স্ত্রী। ইসলামের ইতিহাসের দিকে নজর দিলে দেখা যাবে, মুসলিম ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবজনক কর্মের নায়ক হলেন তারা -যারা ছিলেন ইসলামের সে শ্রেষ্ঠ সোশাল রিফাইনারিতে পরিশুদ্ধ হওয়া সাহাবা। তাদের মধ্য থেকে ১০ জন জীবিত অবস্থাতেই জান্নাতের প্রতিশ্রুতি পেয়েছিলেন। অথচ পরবর্তীতে যারা মুসলিম হয়েছেন তাদের বিপুল সংখ্যার মধ্য থেকে সে সৌভাগ্য একজনের হয়নি। মদিনায় হিযরত করার পর ইসলামে দাখিল হওয়া মুসলিমগণ এবং নবীজী (সাঃ)র পরবর্তী কালের স্ত্রীগণ মক্বী জীবনের সে প্রচণ্ড প্রশিক্ষণ পাননি। সেটিই বিপদ ঘটায় খোলাফায় রাশেদার শেষ দিনগুলিতে।

নবীজী (সাঃ)র ইন্তেকালের পর ইসলামের সে সোশাল রিফাইনারি বোধগম্য কারণেই দুর্বল হয়ে পড়ে। সংকটের প্রতিক্ষণে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে নির্দেশনা আসাও বন্ধ হয়ে যায়। সে বিপদ বুঝে হযরত আবু বকর (রাঃ) নবীজী (সাঃ)র ইন্তেকালের খবর শুনে কেঁদেছিলেন। হযরত আলী (রাঃ) যখন খলিফা হন তখন নবীজী (সাঃ)র নিজ হাতে গড়া প্রথম সারির সাহাবাদের অধিকাংশই ইতিমধ্যে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছিলেন। রাজনীতির অঙ্গণে তখন ভীড় জমে উঠে তোলাকাদের। নবদীক্ষিত এ মুসলিমদের সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও তাদের মাঝে কাঙ্খিত জ্ঞানগত, চেতনাগত ও চারিত্রিক পরিশুদ্ধি প্রথম সারির সাহাবাদের ন্যায় সৃষ্টি হয়নি। মুসলিম রাষ্ট্রের বিস্তার বহুগুণ বাড়লেও সে সুবিশাল রাষ্ট্র জুড়ে সোশাল রিফাইনারী গড়ে উঠেনি। ফলে তাদের মাঝে নৈতীক ও সাংস্কৃতিক বিপ্লব অপূর্ণ থেকে যায়। এর ফলে সৃষ্টি হয় ভয়ানক প্রাতিষ্ঠানিক, সাংস্কৃতিক ও চেতনাগত শূণ্যতা। সে সাথে ছিল বিভিন্ন প্রদেশে দায়িত্বপালনে লিপ্ত নেতাদের মাঝে মারাত্মক যোগাযোগ-শূণ্যতাও। চিন্তা-চেতনার ক্ষেত্রে সিরিয়ার মুসলিমগণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে মক্কা-মদিনা, ইরাক বা মিশরের মুসলিমদের থেকে। ফলে সৃষ্টি হয় ভূল বুঝাবুঝি এবং তা থেকে শুরু হয় ভয়ানক ভাতৃঘাতি যুদ্ধ। ফলে মানব ইতিহাসের একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান এবং খলিফায়ে রাশেদার একজন শ্রেষ্ঠ খলিফার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ন্যায় হারাম কাজও সেদিন সংঘটিত হয়েছে। খোলাফায়ে রাশেদা বিলুপ্ত হওয়ার এ হলো মূল কারণ। ভবিষ্যতের মুসলিমদের জন্য এ বিয়োগান্ত ঘটনার মধ্যে রয়েছে এক অতি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষণীয় দিক।

 

যে মহাবিপদে মুসলিম উম্মাহ

এ প্রসঙ্গে সবচেয়ে শিক্ষণীয় বিষয়টি হলো, ধর্মান্তর বা রাষ্ট্রের আয়োতনে দ্রুত বৃদ্ধি ঘটালেই চলে না, দ্রুত বিপ্লব আনতে হয় নাগরিকদের জ্ঞান, চেতনা ও সংস্কৃতির অঙ্গণেও। রাজনৈতিক, আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে তীব্রতর করতে হয় এক সাথে। মুসলিম ইতিহাসের কালো অধ্যায়গুলি বুঝতে হবে মুসলিম সমাজের সে অনাকাঙ্খিত প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখেই। তবে এরূপ নানা দুর্বলতা ও ব্যর্থতার পরও তাদের যে অবদান -সেটিও অতি বিশাল। তাদের আমলেই এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের বিশাল এলাকা জুড়ে মুসলিমদের বিজয় ঘটে। সে সব দেশের বিপুল সংখ্যক জনগণ মুসলিম হতে পেরেছে তাদের সে অবদানের কারণেই।

গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি বিষয় হলো, স্বৈরাচারি উমাইয়া, আব্বাসীয়, উসমানিয়া বা মোগল শাসকদেরকে কখনোই ইসলামের আদর্শ ব্যক্তি রূপে গণ্য করা যায় না। যেমন আদর্শ মুসলিম রূপে গণ্য করা যায় না, মুজিব, হাসিনা ও সৌদি রাজাদের ন্যায় বর্তমান যুগের স্বৈরাচারি শাসকদের। এরা প্রতিনিধিত্ব করে নিজের কদর্য চেতনা ও চরিত্রের, ইসলামের নয়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ঈমানের পরীক্ষায় সবাইকে নিজ সামর্থ্যে পাশ করতে হয়। পিতা বা স্বামী নবী-রাসূল ছিলেন বা বিখ্যাত সাহাবী ছিলেন -সে কারণে কেউ পরীক্ষায় পাশ করে না। হযরত আদম (আঃ) ও হযরত নূহ (আঃ)’র পুত্র যেমন সে পরীক্ষায় পাশ করেনি, তেমনি পাশ করেনি হযরত লুত (আঃ)’র স্ত্রী। তবে অতীতের মুসলিমদের ভূল-ভ্রান্তি যাই হোক, তা নিয়ে বিচারের মুখোমুখি তারা নিজেরা হবে। আমাদের কাজ হলো, নিজেদের ব্যর্থতা থেকে নিজেদের বাঁচানো। সে জন্য জরুরী হলো, অতীতের মুসলিমদের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেয়া। বুঝতে হবে, নিজেকে বাঁচানোর সে কাজে অতি অপরিহার্য হলো, কোর’আনী জ্ঞান, সে জ্ঞানের প্রয়োগ। তবে ইসলামীকরণের লক্ষ্যে আরো জরুরী হলো, পরিপূর্ণ ইসলামী রাষ্ট্র ও তার পূর্ণ অবকাঠামো গড়ে তোলা। একমাত্র এ পথেই প্রতিটি পরিবার এবং প্রতিটি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ইসলামের সোসাল রিফাইনারী রূপে গড়ে উঠে। সেগুলি তখন কাঙ্খিত পরিশুদ্ধি আনে সেখানে বসবাসকারি  প্রতিটি নরনারীর জীবনে। নইলে বিপন্ন হয় মুসলিমদের মুসলিম রূপে বেড়ে উঠা। তখন মুসলিম ভূমিতে বিজয় বাড়ে শত্রুপক্ষের। শত্রুশক্তির হাতে অধিকৃত হওয়ার ফলে দেশের শিক্ষা-সংস্কৃতি, সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসন, আইন-আদালতসহ রাষ্ট্রের সমগ্র অবকাঠামো ব্যবহৃত হয় নাগরিকদের ইসলাম থেকে দূরে সরানোর কাজে। যে কাজ এক কালে করতো দখলদার বিদেশী কাফের শত্রুগণ, আজ সেটিই করছে ইসলামের দেশী শত্রুগণ । তাদের সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক ইঞ্জিনীয়ারিংয়ের ফলে জনগণ মুসলিম রূপে পরিচয় দিলেও শত্রুতে পরিণত হয় ইসলামী রাষ্ট্র, শরিয়ত, হুদুদ, জিহাদ ও প্যান-ইসলামিক ঐক্যের ন্যায় ইসলামের মৌল বিষয়ের বিরুদ্ধে। এমন রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ মুসলিম হলেও সেখানে সহজ হয় জাহান্নামের পথে চলা এবং কঠিন হয় জান্নাতের পথ খুঁজে পাওয়া। বাংলাদেশসহ অধিকাংশ মুসলিম দেশে তো সেটিই হচ্ছে। ০২/০২/২০১৯

 




খেলাফত প্রতিষ্ঠার জিহাদ ও সাম্রাজ্যবাদি শক্তির কোয়ালিশন

নতুন সম্ভাবনার পথে

ইসলামের সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) শুধু পবিত্র কোরআনের প্রচারই করেননি বরং কোরআনী বিধানগুলির প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র এবং সে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি ও মজবুত অবকাঠামোও প্রতিষ্ঠা করে যান। সে রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোটিই পরবর্তীতে তাঁর মহান সাহাবীদের হাতে খেলাফত নামে পৃথিবীর বিশাল ভূখন্ড জুড়ে প্রতিষ্ঠা পায়।খোলাফায়ে রাশেদার শাসকগণ ছিলেন মূলত নবীজী (সাঃ)র প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র পরিচালনায় নবীজী (সাঃ)র রাজনৈতীক ও আধ্যাত্মীক প্রতিনিধি তথা খলিফা।খেলাফতী রাষ্ট্রীয় পদ্ধতির উদ্ভব হয়েছে তাই নবীজীর প্রতিনিধিত্বের দায়বদ্ধতা থেকে। মুসলমান যেমন নামাযের সময় হলে নবীজী (সাঃ)র অনুকরণে নামায পড়ে, মাহে রামাদ্বান এলে নবীজী (সাঃ)র ন্যায় রোযা রাখে, তেমনি কোন দেশ বা রাষ্ট্রের উপর দখল জমাতে পারলে সেখানে খেলাফতের আদর্শে রাষ্ট্রও গড়ে। নবীজী (সাঃ)র এ সুন্নত পালন মুসলমানদের জীবনে এক ধর্মীয় দায়ব্ধতা।নবীজী (সাঃ) নিজে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা না করলে মুসলমানদের সামনে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুন্নতই থাকতো না। শরিয়ত, জিহাদ, জিজিয়া, আ’মিরু বিল মারূফ ওয়া নেহীয়ানুল মুনকার তথা ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের নির্মূলের ন্যায় মহান আল্লাহতায়ালার বহু কোরআনী হুকুমই সমাজে পালিত হতো না। ফলে প্রতিষ্ঠা পেত না মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীন। তাছাড়া নবীজী (সাঃ)র এ সুন্নতের আনুগত্য ছাড়া কি আল্লাহর হুকুম পালিত হয়? তাতে কি মুসলমান হওয়া যায়? সাহাবাগণ নিজেদের অর্থ,শ্রম,মেধা ও প্রাণ দিয়েছেন তো সে খিলাফত প্রতিষ্ঠা ও সেটিকে প্রতিরক্ষা দেয়ার কাজে। খিলাফত প্রতিষ্ঠা না পেলে খৃষ্টানদের ন্যায় মুসলমানদের সংখ্যা বাড়লেও ইসলাম পরিচিতি পেত এক অপূর্ণাঙ্গ দ্বীন রূপে।ফলে মহান আল্লাহর নির্দেশিত পথে কোথাও শান্তি প্রতিষ্ঠা পেত না। ইসলামি ন্যায়নীতির উপর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতাও নির্মিত হতো না।

ইসলামের ইতিহাস অনন্য। পৃথিবীপৃষ্ঠে বহু হাজার নবী-রাসূল এসেছেন, মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে একাধীক আসমানি কিতাবও নাযিল হয়েছে। কিন্তু সমগ্র মানবজাতির ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি হলো মহান নবীজী (সাঃ)র নেতৃত্বে এই ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।এমন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা লাভের ফলে সমগ্র মানব জাতির ইতিহাসে এই প্রথমবার মহান আল্লাহতায়ালার মু’মিন বান্দারা সবচেয়ে শক্তিমান বিশ্বশক্তি রূপে প্রতিষ্ঠা লাভের সুযোগ পান। একমাত্র তখনই মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর মহান দ্বীনের প্রতিষ্ঠায় ও সে দ্বীনের প্রতিরক্ষায় সর্বশ্রেষ্ঠ একটি বিশ্বশক্তি তার সর্বসামর্থ নিয়ে পাশে দাঁড়ায়। মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তি বিধান তখন আর পবিত্র কোরআনের পাতায় বন্দি থাকেনি। বরং সমাজ ও রাষ্ট্রের বুকে পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠা লাভের গৌরব অর্জন করে। লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে তখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় কর্ম রূপে গুরুত্ব পায় খেলাফত ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠা ও সে খেলাফতের সুরক্ষায় জানমালের কোরবানি পেশ। একমাত্র তখনই একটি বিশাল রাষ্ট্র তার সমগ্র সামরিক, প্রশাসনিক, বিচারবিভাগীয় ও শিক্ষা বিষয়ক অবকাঠামো নিয়ে ইসলামের প্রতিষ্ঠায় অংশ নেয়। আজও এটিই সর্বকালের ও  সর্বদেশের মুসলমানদের জন্য অনুকরণীয় নবী আদর্শ।

তাই যারা নবীজী (সাঃ)র উম্মত রূপে পরিচয় দিতে চায় তাদের সামনে খেলাফতের প্রতিষ্ঠা ও তার প্রতিরক্ষা ছাড়া ভিন্ন পথ নেই। মহান আল্লাহতায়ালার নাযিলকৃত দ্বীনকে মসজিদ মাদ্রাসায় সীমিত করা কোন কোলেই নবীজী (সাঃ)র সূন্নত নয়। সেটি তারা সাহাবাগণও করেননি। নামায-রোযা, হজ-যাকাত ও পবিত্র কোরআনে পাঠের মধ্যে নিজেদের ধর্মকর্মকে তারা সীমিত রাখেননি। বরং কোরআনী বিধানের প্রতিষ্ঠায় তারা যেমন শক্তিশালী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন, তেমনি সে রাষ্ট্রের উপর ইসলামের পক্ষের শক্তির পূর্ণ দখলদারিও প্রতিষ্ঠা করেছেন। মুসলমানগণ দেরীতে হলেও ইরাক ও সিরিয়ায় সে প্রচেষ্ঠা আজ শুরু করেছে। সে খিলাফতের হাতে আজ গ্রেটব্রিটেনের চেয়েও বৃহত্তর ভূমি। মুসলমানদের সামনে তাই নতুন সম্ভাবনা।

আজকের ন্যায় নবীজী (সাঃ)র যুগেও ইসলামের শত্রুর অভাব ছিল না। শত্রুপক্ষে যেমন আরবের স্থানীয় কাফের ও ইহুদী গোত্রগুলো ছিল, তেমনি ছিল দুই বিশ্বশক্তি -বিশাল পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্য। তারা ইসলামের প্রচার যেমন চায়নি, তেমনি চায়নি খেলাফত ও আল্লাহতায়ালার শরিয়তি বিধানের প্রতিষ্ঠাও। ইসলাম ও মুসলমানদের নির্মূলে তারা শুরু থেকেই যুদ্ধ শুরু করে। তাদের লাগাতর হামলার মুখে ইসলামের অনুসারিদের প্রতিপদে যুদ্ধ এবং সে যুদ্ধে জানমালের বিপুল কোরবানি দিয়ে সামনে এগুতে হয়েছে। শত্রুর হাত থেকে খেলাফত এবং ইসলামের প্রতিষ্ঠা বাঁচাতে নবীজী (সাঃ)র প্রায় শতকরা ৭০ ভাগ সাহাবীকে শহীদ হতে হয়েছে। সে আমলের দুর্বৃত্ত শয়তানগণ ইসলামের সে মহান সৈনিকদের হাতে নির্মূল হয়েছিল, কিন্তু নির্মূল হয়নি তাদের সে শয়তানি মিথ্যাচার ও ষড়যন্ত্র। আজও তা ইসলামের বিরুদ্ধে একই রূপ হিংস্রতা নিয়ে প্রবল ভাবে বেঁচে আছে। ইসলামের এ শত্রুপক্ষগুলি প্রবল বল পায় যখন মুসলিম দেশগুলি সাম্রাজ্যবাদি কাফের শক্তির উপনিবেশে পরিণত হয়। রাষ্ট্রের সমগ্র শক্তি ও অবকাঠামো তখন ইসলামের শিকড় কাটার কাজে ব্যবহৃত হয়।

ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদি শক্তিবর্গ মুসলিম দেশ থেকে বিতাড়িত হয়েছে। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদ ও তার ষড়যন্ত্র বিলুপ্ত হয়নি। বিলুপ্ত হয়নি তাদের প্রতিপত্তিও। সাম্রাজ্যবাদের বিশ্বস্থ খলিফাদের হাতে মুসলিম দেশগুলি আজও অধিকৃত। এরা হলো তাদের হাতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও তাদেরই আদর্শে দীক্ষাপ্রাপ্ত সেক্যুলারিস্ট, ন্যাশনালিস্ট, ট্রাইবালিস্ট, সোসালিস্ট, সেক্যুলার সামরিক বাহিনী ও স্বৈরাচারি রাজাবাদশাহগণ। এরাই ইসলামের দেশী শত্রুপক্ষ। মুসলিম নামধারি হলেও ইসলামের প্রতিষ্ঠা রোধে তাদের শত্রুতা কোন কাফের শক্তির চেয়ে কম নয়। তাদের একাত্মতা বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, গ্রেটব্রিটেন, ফ্রান্স, হিন্দুস্থানসহ সকল কাফের শক্তির সাথে। ঢাকার শাপলা চত্ত্বরে যারা নিরপরাধ মুসল্লি করলো বা ইসলামবাদের লালমসজিদ ধ্বংস করলো এবং মসজিদ সংলগ্ন হাফসা মাদ্রাসার শতাধিক ছাত্রীদের হত্যা করলো তারা তো এরাই। মুসলিম দেশগুলি আজ তাদের হাতেই অধিকৃত। শয়তানি শক্তির এ নতুন প্রজন্ম আজ থেলাফত, শরিয়ত, জিহাদ, জিজিয়া ও প্যানইসলামিক মুসলিম ভাতৃত্বের ন্যায় ইসলামের বুনিয়াদি শিক্ষা ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সর্বসামর্থ নিয়ে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।

 

 

অপরিহার্য কেন খিলাফত?

মৌলিক মানবিক অধিকার, উচ্চতর মূল্যবোধ, নীতি ও নৈতীকতা, সুবিচার ও সাম্য –এসব নিয়ে বড় বড় কথা বলা খুবই সহজ। লক্ষ লক্ষ পন্ডিতজন শত শত বছর ধরে এমন কথা বলে আসছেন। ভবিষ্যতেও বলবেন। তাদের সেসব কথা হাজার হাজার বছর ধরে বইয়ের পাতায় বেঁচেও থাকবে। কিন্তু তাদের কথায় বিশ্বের কোথাও নির্যাতীতা নারীদের মুক্তি মিলেনি। দাসপ্রথাও বিলুপ্ত হয়নি। বর্ণবাদী, গোত্রবাদী ও জাতিয়তাবাদী বৈষম্য ও শোষণও বিলুপ্ত হয়নি। ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের নির্মূলে অতিশয় অপরিহার্য হলো সহায়ক রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো। আর তেমন রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোর প্রতিষ্ঠা এজন্যই ইসলামে সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত। সে ইবাদতের ছওয়াব কখনোই স্রেফ নামায-রোযা বা হজ-যাকাত পালনে অর্জিত হয় না। এমন রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষায় একমুহুর্ত ব্যয়কে নবীজী (সাঃ) সারা রাতের নফল ইবাদতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলেছেন। তাছাড়া মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্য নিয়ে হাজার হাজার ফেরেশতার বাহিনী কখনোই কোন বান্দাহর ঘরে হাজির হন না। কোন কামেল ব্যক্তির ঘর, সুফি খানকা বা মসজিদ-মাদ্রাসাও নয়। কারণ, সেগুলি তাদের অবতরণের ক্ষেত্র নয়। সে ক্ষেত্রটি সেটি হলো জিহাদের অঙ্গণ। তাদের উপস্থিতি তাই বদর, ওহুদ, হুনায়ুনের ন্যায় জিহাদের অঙ্গণে বার বার দেখা গেছে। মুসলমানের কাজ হলো তাই লাগাতর অবতরণের ক্ষেত্র নির্মাণ। সেজন্য চাই খেলাফা। চাই লাগাতর জিহাদ। চাই মু’মিনদের নিজেদের জানমালের কোরবানি। চাই শরিয়তের প্রতিষ্ঠার লাগাতর প্রচেষ্টা। এমন জিহাদ ও এমন কোরবানীর মাধ্যমে ঈমানদারগণ তখন খোদ মহান আল্লাহতায়ালার বাহিনীতে পরিণত হয়। আর মহান আল্লাহতায়ালার ফেরেশতা বাহিনী তো ভূপৃষ্ঠে নেমে আসেন স্রেফ মহান আল্লাহতায়ালার বাহিনীকে বিজয়ী করতে। যেদেশে মহান আল্লাহতায়ালার বাহিনী হওয়ার ব্যর্থতা সেদেশে রহমতের ফিরেশতাগণ নয়, নেমে আসেন আযাবের ফিরেশতাগণ। তাঁরা নামেন বন্যা, খড়া, অতিবৃষ্টি, ঘুর্ণিঝড়, ভূমিকম্প ও সুনামী নিয়ে। বাড়ে ফিতনা-ফ্যাসাদ। তেমন আযাব যে অতীতে বহু জনপদে বহুবার এসেছে সে সাক্ষ্যটি তো মহান আল্লাহতায়ালার -যা তিনি পবিত্র কোরঅনে বহুবার উল্লেখ করেছেন। তা নিয়ে কি কোন ঈমানদারের সামান্যতম সন্দেহ থাকতে পারে? সন্দেহ হলে কি সে আর মুসলমান থাকে? তাই খেলাফত আমলে সমাজে বিপর্যয় বা ফিতনা দেখা দিলে খলিফার দায়িত্ব ছিল ইসলামের শত্রুদেশের বিরুদ্ধে দ্রুত জিহাদ সংগঠিত করা। মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে গুনাহমাফ ও রহমত লাভের জন্য এটিই হতো সে আমলে বিজ্ঞ আলেমদের ফতওয়া।

বান্দার উপর মহান আল্লাহতায়ালার সবচেয়ে বড় নিয়ামত সন্তান-সন্ততি বা ধনসম্পদ নয়, সেটি হলো হিদায়েত ও শরিয়ত। হিদায়েত ও শরিয়তের সে মহান গ্রন্থটি হলো পবিত্র কোরআন। আর বান্দাহর উপর ফরজ হলোঃ প্রতিটি কথা, প্রতিটি কর্ম, প্রতিটি চিন্তা ও প্রতিটি আচরনে হিদায়েতের পথে চলা। নির্দেশ হলোঃ বিচার-আচারে শরিয়তের পরিপূর্ণ অনুসরণ। এখানে অবাধ্যতা বা বিদ্রোহ হলে আসে বিপর্যয়, মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে আসে আযাবও। সেটি যেমন দুনিয়ায়, তেমনি আখেরাতে। মহান আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামতের বড় খেয়ানত ও সে সাথে কবিরা গুনাহ হলো তাঁর নাযিলকৃত হিদায়েতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। তেমন বিদ্রোহে অতীতে ইতিহাস গড়েছিল ইহুদীদগণ, আর আজ সে পথ ধরেছে মুসলমানগণ। হযরত মূসা (আঃ) এর উপর মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র গ্রন্থ তাওরাত নাযিল করেছিলেন। তাওরাতে শরিয়তের বিধান ছিল। সে শরিয়তের প্রতিষ্ঠায় মহান আল্লাহতায়ালা তাদেরকে হযরত ইয়াকুব (আঃ) জন্মভূমি কানানে গিয়ে খেলাফত প্রতিষ্ঠার তাগিদ দিয়েছিলেন। সেখানে তখন শাসন চলছিল এক দুর্বৃত্ত জালেম গোষ্ঠির। খিলাফতের প্রতিষ্ঠায় তাদের বিরুদ্ধে জিহাদের প্রয়োজন ছিল, প্রয়োজন ছিল জান ও মালের কোরবানীর। কিন্তু ইহুদীদের তাতে আগ্রহ ছিল না। তাদের আগ্রহ ছিল স্রেফ মহান আল্লাহতায়ালা থেকে শুধু পাওয়ায়, তার পথে দেয়ায় নয়। তাই প্রচন্ড অবাধ্যতার সুরে তারা হযরত মূসা (আঃ)কে বলেছিল, “হে মুসা! তুমি ও তোমার আল্লাহ গিয়ে যুদ্ধ করো, আমরা অপেক্ষায় থাকলাম।” তাদের সে অবাধ্যতার কথা মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে বর্ণনা করেছেন। এমন অবাধ্যতা কি কোন জনগোষ্ঠির উপর আল্লাহ রহমত আনে? বরং যা আনে তা হলো কঠিন আযাব। সে আযাবেরই আলামত হলো, ইসরাইলীদের ভাগ্যে কোথায়ও কোন ইজ্জত মিলেনি। ভবঘুরের ন্যায় নানা দেশের পথেপ্রান্তরে হাজার হাজার বছর ধরে ঘুরে বেড়ানোই তাদের নিয়তিতে পরিণত হয়েছে। অবশেষে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশেরা অধিকৃত মুসলিম ভূমিতে অবৈধ ভাবে ইসরাইলের প্রতিষ্ঠা দেয়। কিন্তু তাতেও তাদের ইজ্জত বাড়েনি। নিরাপত্তাও নিশ্চিত হয়নি। বরং বিশ্বব্যাপী ধিক্কার কুড়াচ্ছে এক অতি বর্বর ও নৃশংস জাতি রূপে। তাওরাতের শরিয়তি বিধানকে প্রতিষ্ঠার মিশন দিয়ে হযরত ইসা (আঃ)কে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু সে শরিয়ত প্রতিষ্ঠায় কোন আগ্রহই দেখায়নি, বরং খৃষ্টানগণ হযরত ঈসা (আঃ)কে খোদা বানিয়ে পুজা শুরু করে। খৃষ্টান ধর্মে তারা হারাম-হালালে কোন পার্থক্যই রাখেনি। তারা বেঁচে আছে মদ্যপান, জুয়া, অশ্লিলতা ও ব্যাভিচারের ন্যায় আদিম পাপাচার নিয়ে। সমকামিতার ন্যায় পাপাচারকে তারা আইনগত বৈধতা দিয়েছে, তেমনি আইনসিদ্ধ করেছে পুরুষের সাথে পুরুষের এবং নারীর সাথে নারীর বিবাহের ন্যায় অপরাধকেও।একই ভাবে মুসলমানগণ আজ শরিয়তকে বিদায় দিয়েছে দেশের বিচারকার্য থেকে।

 

 

অনিবার্য কেন জিহাদ?

রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ দুর্বৃত্তদের হাতে অধিকৃত হলে ধর্ম তখন বিশুদ্ধতা নিয়ে বাঁচে না। নানা রূপ দূষন শুরু হয় ধর্মীয় আক্বিদা-বিশ্বাস ও ধর্মপালনের ক্ষেত্রে। সরকারি সহযোগিতায় তথন রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গণে দুর্বৃত্তির প্লাবন সৃষ্টি করা হয়। পতিতাপল্লি, সূদী ব্যাংক, মদের দোকান, নাচগানের আসর বাড়াতে তখন সরকারও তার প্রশাসন নিয়ে এগিয়ে আসে। সে নমুনা স্রেফ খৃষ্টান বা ইহুদী দেশে নয়, মুসলিম দেশগুলোতেও। বাংলাদেশের মুসলমানগণ দূর্নীতিতে ৫ বার বিশ্বরেকর্ডও স্থাপন করেছে সে প্লাবনের কারণেই। এজন্যই ইসলামে পবিত্র জিহাদ শুধু মুসলিম রাষ্ট্রের উপর কাফের শক্তির হামলা প্রতিরোধ করা নয়, অতি পবিত্র জিহাদ হলো রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের বুক থেকে পাপাচারের প্লাবন থামানো। ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের নির্মূল। এবং সে লক্ষ্যসাধনে জরুরী হলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের উপর থেকে ইসলাম বিরোধী শক্তির দখলদারি নির্মূল। খিলাফত বা ইসলামি রাষ্ট্র তো এ পথেই প্রতিষ্ঠিত হয়। মু’মিনের জীবনে এটিই জিহাদ। এপথে প্রাণ গেলে জান্নাতপ্রাপ্তি সুনিশ্চিত। সে প্রতিশ্রুতি মহান আল্লাহতায়ালার। সে জিহাদ যার মধ্যে নাই মহান নবীজী (সাঃ) তাকে মুনাফিক বলেছেন। নবীজী (সাঃ)র প্রখ্যাত হাদীসঃ “যে ব্যক্তি জিহাদ করলো না এবং জিহাদের নিয়েতও করলো না সে ব্যক্তি মুনাফিক।”

মুসলমানদের তাই শুধু নামায-রোযা ও হজ-যাকাতের বিধান শিখলে চলে না। যুদ্ধও শিখতে হয়। নামাযী ও রোযাদার হওয়ার পাশাপাশি আজীবন মুজাহিদের দায়িত্বও পালন করতে হয়। সাহাবায়ে কেরামের মাঝে এমন কোন সাহাবীকে কি পাওয়া যাবে যিনি নামায-রোযা শিখেছেন অথচ যুদ্ধাবিদ্যা জানতেন না বা জিহাদে যোগ দেননি? হযরত আম্মার (রাঃ)র ন্যায় বহু সাহাবী ৮০ বছর বয়সে জিহাদের ময়দানে গেছেন এবং শহীদও হয়েছেন। তাই ইসলামি রাষ্টের প্রতিটি নাগরিক যেমন সৈনিক,তেমনি পুরা রাষ্ট্র হলো ক্যান্টনমেন্ট।এবং লাগাতর শিক্ষালাভ ও সামরিক প্রশিক্ষণ লাভ হলো মুসলিম সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্দ্য অঙ্গ। ইসলামি সরকারের দায়িত্ব হলো সে সংস্কৃতির লালন। কিন্তু মুসলিম দেশ যখনই শয়তানি শক্তির হাতে আধিকৃত হয় তখন নির্মূল করা হয় সে সংস্কৃতি। প্রতিষ্ঠা দেয়া হয় নাচগান, খেলাধুলা, মদজুয়া, অশ্লিলতা ও ব্যাভিচারের সংস্কৃতি। এ হলো পরকালের ভাবনা ও আল্লাহর কাছে জবাবদেহীতা ভূলানোর সংস্কৃতি। এ সংস্কৃতিতে অস্ত্র তুলে দেয়া হয় ইসলামে অঙ্গিকার শূণ্য সেক্যুলারিস্টদের হাতে।এবং অস্ত্রহীন করা হয় আল্লাহর দ্বীনের মোজাহিদদের।ভারতের বুকে ব্রিটিশগণ সে রীতি ও সংস্কৃতি সরকারি ভাবে প্রতিষ্ঠা করে গেছে।আর আজ বাংলাদেশ,পাকিস্তান,তুরস্ক,মিশরের মত দেশগুলোতে সে সংস্কৃতির পরিচর্যা দিচ্ছে স্বদেশী সেক্যুলারিস্টগণ।

মুসলিম সমাজে যুদ্ধ কিছু বেতনভোগী সৈনিকদের পেশাদারিত্ব নয়।বরং নামায-রোযার ন্যায় প্রতিটি মুসলমানের জীবনে সেটি ফরজ ইবাদত। তাই ইসলামি রাষ্ট্রে বিশাল বেতন, বাড়ি-গাড়ি ও হাজার হাজার সরকারি প্লট দিয়ে বিশাল সেনাবাহিনী প্রতিপালনের প্রয়োজন পড়ে না। মুসলিম রাষ্ট্রের প্রতিটি ঘরই সৈনিকের ঘর। এ সৈনিকেরা ইসলামি রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষায় শুধু শ্রম, মেধা ও মালের কোরবানিই দেয় না, জানের কোরবানিও দেয়। খালিদ বিন ওলিদ, সাদ বিন আবি ওক্কাস, আমর ইবনুল আস, আবু ওবাইদা, তারিক বিন যিয়াদের ন্যায় মানব ইতিহাসের সবচেয়ে খ্যাতিনামা জেনারেলগণ কি কোন সামরিক কলেজ বা ক্যান্টনমেন্টের সৃষ্টি? তারা তো গড়ে উঠেছে মাটির ঘর থেকে। পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বড় বড় যুদ্ধ জয় তো তারাই করেছে। তাদের রণকৌশলগুলো এখন বিভিন্ন দেশের সামরিক কলেজে পড়ানো হয়।

তাছাড়া বিজয় তো আসে একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে। কোন যুদ্ধই মুসলমানগণ নিজ শক্তিবলে অর্জন করেনি। প্রতিটি বিজয় এসেছে মহান আল্লাহতায়ালার রহমতের বরকতে| তাদের বিজয়ী করতে হাজার হাজার ফিরেশতা মুসলিম বাহিনীতে যোগ দিত। তাই পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালার ঘোষণাঃ “কোন বিজয় নেই একমাত্র আল্লাহর সাহায্য ছাড়া; নিশ্চয়ই আল্লাহ শক্তিমান ও প্রজ্ঞাময়।” সুরা আনফাল আয়াত ১০। তাই আল্লাহর সাহায্য নামিয়ে আনার মূল সামর্থটাই সৈনিকের মূল সামর্থ। আর সে সামর্থ কি শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সামরিক কলেজ বা সেনানীবাসে তৈরী হয়? সে জন্য তো প্রয়োজন আল্লাহর পথে শহীদ হওয়ার সামর্থ। সে সামর্থ তো আসে মহান আল্লাহতায়ালার উপর ঈমান, কোরআনী জ্ঞান ও গভীর তাকওয়া থেকে। সে সামর্থ সৃষ্টিতে কি সেনানীবাস লাগে? তা তো গ্রাম-গঞ্জে এবং মাটির ঘরেও নির্মিত হতে পারে। সে সামর্থ সৃষ্টির মূল উপকরণ তো কোরআনী জ্ঞান ও সে জ্ঞানলদ্ধ আল্লাহর উপর গভীর বিশ্বাস। সে সামর্থের বদৌলতে বিশ্বের যে কোন দেশে ও যে কোন সময় আসতে পারে। সে সাহায্য তো আজও আসছে। তাই আজও আসছে বিস্ময়কর বিজয়। সেটিই সম্প্রতি দেখা গেল ইরাকের রণাঙ্গনে। ইরাকে দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মোসল করে নিল মাত্র আট শত মোজাহিদ। অথচ সেখানে তাদের যুদ্ধটি ছিল আধুনিক সেনানীবাস ও সামরিক কলেজে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তিরিশ হাজর ইরাকী সৈন্যদের বিরুদ্ধে। তারা প্রশিক্ষণ পেয়েছিল বিশ্বের সেরা মার্কিনী যুদ্ধবিশেষজ্ঞদের হাতে। অথচ সে বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে বিজয় লাভে মোজাহিদদের একদিনও লাগেনি।

আবার তাই প্রমাণিত হলো, মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্য পাওয়ার জন্য নবীজী (সাঃ) সাহাবা হওয়া ও তাঁর পিছনে নামায পড়ার প্রয়োজন পড়েনা। বরং অপরিহার্য হলো গভীর ঈমান, তাকওয়া ও নবীজী (সাঃ)র প্রদর্শিত পথে জানমাল কোরবানীর পূর্ণ প্রস্তুতি। সে প্রস্তুতির বরকতে নবীজীর ইন্তেকালের বহুহাজার বছর পরও পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্য যেমন আসে, তেমনি বিজয়ও আসে। মহান নবীজী (সাঃ)র সাহাবাগণ যেরূপ লাগাতর বিজয় আনতে পেরেছিলেন তা তো এমন মর্দেমুমিন মোজাহিদদের কারণেই। তখন খলিফার অধীনে কোন পেশাদার সেনাবাহিনীই ছিল না। অথচ তাঁরা নবীজী (সাঃ) ইন্তেকালের মাত্র ১০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী বিশ্বশক্তির জন্ম দেন। নির্মাণ করেন মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা। সে সভ্যতায় বুকে বড় বড় প্রাসাদ, দুর্গ, দেয়াল বা পিরামিড নির্মিত হয়নি। বরং নির্মিত হয়েছিল সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ ও মূল্যবোধ, সর্বশ্রেষ্ঠ আইন ও বিচার ব্যবস্থা এবং সর্বশ্রেষ্ঠ সামাজিক ও রাষ্ঠ্রীয় নীতি। সে মূল্যবোধে খলিফা তথা বিশ্বশক্তির রাষ্ট্রপ্রধান চাকরকে উঠের পিঠে চড়িয়ে নিজে রশি ধরে টেনেছেন। অথচ মুসলমানগণ আজ আল্লাহতায়ালার  সাহায্যপ্রাপ্তির সে বহু পরিক্ষিত পথটি ছেড়ে বনি ইসরাইলীদের অনুসৃত ও পরিক্ষিত অভিশপ্তের পথটি ধরেছে। তাদের অবাধ্যতা ও বিদ্রোহ খোদ আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে। হিদায়েত ও শরিয়তকে তারা নিজেদের জীবন থেকে বিসর্জন দিয়েছে। খেলাফতের দায়ভার বহনের বদলে তারা নিজেরাই সার্বভৌম রাজা-বাদশাহ ও শাসকে পরিণত হয়েছে। মহান আল্লাহতায়ালার আনুগত্যের বদলে আনুগত্য শুরু করেছে নিজের স্বৈরাচারি নফসের।

 

 

দায়িত্ব রাজনৈতীক প্রতিনিধিত্বের

মুসলমান হওয়ার অর্থ শুধু মহান আল্লাহর উপর অটল বিশ্বাস নয়, স্রেফ নামায-রোযা পালনও নয়। বরং সেটি ধর্মীয়, রাজনৈতীক, প্রশাসনিক ও সামরিক অঙ্গণে মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিনিধিত্বের। নিজ জীবনের প্রতিকর্ম, প্রতিসিদ্ধান্ত ও প্রতিটি আচরণেই সে মহান আল্লাহতায়ালার খলিফা। প্রতিনিধিত্ব এখানে মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়তি আইন প্রতিষ্ঠার। ঈমানদারের জানমালের বিনিয়োগ তো হয় এ দায়িত্বপালনে। অথচ আজ মুসলিম রাষ্ট্রগুলিতে শুধু যে খেলাফত বিলুপ্ত হয়েছে তা নয়, শত্রুশক্তির হাতে অধিকৃত হয়েছে মুসলিম রাষ্ট্রসমুহ ও তার প্রতিষ্ঠানগুলি। কার্যতঃ মুসলমানগণ পরিণত হয়েছে শয়তানের খলিফায়। ইসলামি দল, ইসলামি জামাত বা ইসলামি আন্দোলনের নামে এমন কিছু ব্যক্তিবর্গের উদ্ভব ঘটেছে যারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের বদলে মন্ত্রি, এমপি ও নেতা হওয়াকে গুরুত্ব দেয়। দেশের শাসনতন্ত্র ও আইন-আদালতে মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তী আইনের অনুপস্থিতি নিয়ে তাদের হৃদয়ে কোন মাতম উঠে না। মাতম উঠে তখন যখন তাদের নেতাকর্মীদের জেলে ঢুকানো নয় বা তাদের অফিসে তালা ঝুলানো হয়। তাদের রাজনীতির এজেন্ডা দেশে শরিয়তের প্রতিষ্ঠাও নয়। দেশে শাসনতন্ত্র ও আইন-আদালতে মহান আল্লাহতায়ালার আইন স্থান পায়নি। স্থান পেয়েছে ব্রিটিশ কাফেরদের প্রনীত আইন। মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্বের বদলে স্থান পেয়েছে মানুষের সার্বভৌমত্ব। মহান আল্লাহ তায়ালার বিরুদ্ধে এর চেয়ে বড় বিদ্রোহ আর কি হতে পারে? অথচ সে শাসনতন্ত্র ও আইন বাঁচানো নিয়েই তথাকথিত ইসলামি দলগুলির রাজনীতি। তাদের বক্তৃতা, লেখনি ও ওকালতি স্রেফ নিজের দল, নিজের নেতা ও নিজেদের ধর্মীয় ফিরকাকে বড় রূপে দেখানো নিয়ে। তাদের আন্দোলন স্রেফ নিজ দল, দলীয় স্বার্থ ও দলীয় নেতাদের বাঁচানো নিয়ে।সে লক্ষ্যে তারা দেশের বা বিদেশের কোন দল বা ব্যক্তিদের সাথে আঁতাত করতেও রাজী। শরিয়ত, খেলাফত ও জিহাদের পক্ষে তাদের মুখে কোন কথা নেই। আন্দোলনও নাই।

অথচ প্রকৃত ঈমানদারের প্রতিমুহুর্তের বাঁচাতো আল্লাহর দ্বীনের প্রতিটি বিধান ও প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে ওকালতি ও জিহাদ নিয়ে বাঁচা। সে সত্যের পক্ষে আমৃত্যু সাক্ষ্যদাতা ও উকিল। শরিয়ত, খেলাফত ও জিহাদের পক্ষে সে হবে নির্ভীক। মু’মীনের জীবনে মূল সামর্থ তো সত্যকে চেনা, সত্যের পক্ষ নেয়া ও সত্যের পক্ষে জানমাল কোরবানীর সামর্থ। ব্যক্তির ঈমানদারি তো সে সামর্থের মধ্যে ধরা পড়ে। নবীজীর (সাঃ) শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবা সে কাজে শহীদ হয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশের মুলমানদের মাঝে শতকরা একজনও সে কাজে হাজির? মহান আল্লাহ যাদের দিয়ে জাহান্নাম ভরবেন তারা যে সবাই চোর-ডাকাত, খুনি বা ব্যাভিচারি -তা নয়। অধিকাংশ মুশরিক এবং কাফের খুনি নয়। তারা চোর-ডাকাত বা ব্যাভিচারিও নয়। কিন্তু তারা জাহান্নামে যাবে সত্যকে চিনতে না পারা ও সত্যের পক্ষ না নেয়ার কারণে। বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক আবিস্কারের চেয়ে সত্যকে চেনার গুরুত্ব অপরিসীম। সে সামর্থের গুণেই ব্যক্তি জান্নাত পাবে। বৈজ্ঞানিক আবিস্কারে নয়।

রাসূলে পাক (সাঃ)এর সময়ও এমন ইহুদী ও খৃষ্টানদের সংখ্যা কি কম ছিল যারা উপোস, উপাসনা ও তাওরাত বা বাইবেল পাঠে শরীর পতন ঘটাতো? অথচ মহান আল্লাহপাক তাদেরকে কাফের বলেছেন। এবং মুসলমানদেরকে অতি সুস্পষ্ট ভাবে হুশিয়ার করে দিয়েছেন যেন তাদের অনুসরণ না করা হয়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালার সে হুশিয়ারিটি এসেছে এভাবেঃ “হে ঈমানদারগণ! যাদের কিতাব দেয়া হয়েছে তাদের মাঝের কোন দলকে যদি তোমরা অনুসরণ করো তবে তারা তোমাদেরকে ঈমান আনার পরও আবার কাফেরে পরিণত করবে।” –(সুরা আল ইমরান আয়াত ১০০)। ইহুদী ও খৃষ্টান আহলে কিতাবীদের কাফের বলার কারণ তারা মহান আল্লাহতায়ালার শেষ রাসূল ও শেষ আসমানি কিতাবকে চিনতে ব্যর্থ হয়েছিল। তারা ব্যর্থ হয়েছিল নবীজী (সাঃ)র মিশনের সাথে একাত্ম হতে। ধার্মিকের লেবাসে তাদের কাজ ছিল মানুষকে কাফেরে পরিণত করা। প্রশ্ন হলো, আজকের মুসলিম আলেম, আল্লামা ও মুফতিদের কি সে ব্যর্থতা কম? তারাদেরই বা ক’জন নবীজী (সাঃ)র মিশনকে চিনতে পেরেছে। নবীজী (সাঃ)এর রেখে যাওয়া খিলাফত, শরিয়ত ও জিহাদের সাথে তাদের ক’জন আজ সংশ্লিষ্ট? নবীজী (সাঃ)র অধীকাংশ সাহাবাগণ যে পথে শহীদ হয়েছেন এসব আলেমদের ক’জন সে পথে? যে যুবকগণ হাজার হাজার মাইল দূর থেকে স্রেফ খেলাফত, শরিয়ত ও জিহাদের লক্ষ্যে আরাম-আয়াশের ঘরবাড়ি ছেড়ে শহীদ হচ্ছে তাদেরকে এরা খারেজী ও কাফের বলছে! মোশাদ, সিআইয়ের এজেন্ট বলছে। নারী লোভীও বলছে! এবং খেলাফত প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে তারা হটকারিতা বলছে। তারা কি মনে করে এসব যুবকদের বদলে আসমান থেকে ফেরেশতারা এসে খেলাফত প্রতিষ্ঠা করবেন? অথচ উমাইয়া, আব্বাসী ও ওসমানিয়া খেলাফতের প্রতিষ্ঠারা কি ফেরেশতারা ছিলেন? তাদের ক’জন জিহাদের ময়দানে সশরীরে প্রাণ কোরবানীতে হাজির হয়েছেন? তারা ছিলেন দোষেগুণের মানুষ। তাদেরই শাসনামলে হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ)ও তাঁর ৭২ জন নিরপরাধ সঙ্গিকে কারবালায় নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়েছে। অথচ তারপরও তাদেরকে খলিফা রূপে স্বীকৃতি ও তাদের নামে জুম্মার খোতবা দেয়া হয়েছে। বিগত ৯০ বছর মুসলিম বিশ্বে কোন খলিফা নাই। ফেরেশতাতূল্য মহামানবদের অপেক্ষায় কি আরো অপেক্ষা করতে হবে?

 

 

বিষাক্ত প্রচারণা

আল্লাহর দ্বীনের প্রতি মুসলিম দেশের অধিকাংশ ইসলামি দলের নেতাকর্মী ও আলেমদের অঙ্গিকার যে কতটা ফাঁকা সেটি খেলাফত, শরিয়ত এবং জিহাদের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থানই সুস্পষ্ট করে দেয়। বনি ইসরাইলের আলেমগণ আজও মাথা-ঘাড় দুলিয়ে দুলিয়ে তাওরাতে নাযিলকৃত শরিয়তের বিধানগুলো মুখস্থ করে। কিন্তু তার প্রয়োগ নিয়ে তারা ময়দানে নেই। তাদের থেকে মুসলিম আলেমদের অবস্থা কতটুকু ভিন্নতর? তাদের বিভ্রান্তিকর ভূমিকার কারণেই মুসলিম দেশে জনবল বেড়েছে জাতিয়তাবাদী, রাজতন্ত্রি, স্বৈরাচারি ও সাম্রাজ্যবাদি শিবিবে। তাদের কারণেই পরাজয় বেড়েছে ইসলামের। এবং মুসলিম দেশগুলি অধিকৃত হয়ে গেছে ইসলামি শত্রুশক্তির হাতে। এবং বিলুপ্ত রয়ে গেছে খিলাফত। এসব ইসলামি দলের বর্তমান প্রচারনার সুর কোন কাফের শক্তির বিরুদ্ধে নয় বরং সেটি খেলাফত, শরিয়ত ও জিহাদের বিরুদ্ধে। সৌদি আরবের গ্রাণ্ড মুফতি ইসরাইলের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল করার নিন্দা করেছেন। অথচ যুদ্ধ করতে বলছেন ইরাকের জিহাদীদের বিরুদ্ধে। সৌদি আরবের গ্রাণ্ড মুফতি সৌদি আরবে মার্কিন কাফের সৈনিকদের অবস্থানের বিরুদ্ধে কথা বলেন না। অথচ হযরত ওমর (রাঃ) সমগ্র জাজিরাতুল আরব থেকে সকল অমুসলিমদের বিতাড়িত করেছিলেন। একই ভূমিকায় নেমেছেন শেখ ইউসুফ কারযাভী। তাঁর অবস্থান কাতারে। অথচ কাতার হলো সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি। তিনি সে মার্কিন অবস্থানের বিরুদ্ধেও মুখ খুলেন না। আল্লাহকে খুশি করার বদলে এরা গুরুত্ব দেন ইসলাম, মুসলমান ও আল্লাহর শত্রুদের সাথে সুসম্পর্ক রাখাকে। গুজরাতের মুসলিম নারী-শিশুর রক্তে রঞ্জিত ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ মোদীর হাত। অথচ বাংলাদেশের প্রধান ইসলামি দলের নেতা তার নির্বাচনি বিজয়কে অভিনন্দন করেছেন। সেটি স্রেফ দলীয় স্বার্থে। এটিই সেক্যুলারিজম। ইসলামি চেতনায় এটি অসম্ভব।এ বিষয়ে মহান আল্লাহতায়ালার হুশিয়ারি হলোঃ “হে ঈমানদারগণ, তোমরা আমার ও তোমাদের শত্রুদের বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করোনা। তোমরা তাদের প্রতি সৌহার্দপূর্ণ আচরণও করবে না, তারা তো অস্বীকার করেছে সে সত্যকে যা তোমাদের কাছে এসেছে?..) –সুরা মুমতেহানা আয়াত ১)। আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে শত্রুতাই নবীজী (সাঃ)র সূন্নত। তাদের বিজয়ে অভিনন্দন জানানো নয়। মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ সে সতর্কবানী একবার নয়, বহুবার এসেছে পবিত্র কোরআনে। অথচ সে হুশিয়ারির বিরুদ্ধে এসব নেতাদের ভ্রক্ষেপ নাই।

ব্যক্তির ঈমান শুধু নামায-রোযায় ধরা পড়ে না, নির্ভূল ভাবে ধরা পড়ে রাজনীতিতে। নামায-রোযা মুনাফিকও পড়তে পারে। কিন্তু শরিয়ত ও খেলাফতের প্রতিষ্ঠার জিহাদে অংশ নেয়া ও সে জিহাদে প্রাণ দেয়ার সামর্থ মুনাফিকের থাকে না। ঈমানের আরেক পরিচয় হলো প্যান-ইসলামিক মুসলিম ভাতৃত্বের চেতনা। সে চেতনা দেয় ভাষা, ভূগোল ও বর্ণের পরিচয় অতিক্রম করার সামর্থ। সে চেতনায় মুসলিম বিশ্বে জাতীয় রাষ্ট্রের নামে গড়া বিভক্তির মানচিত্র ও দেয়ালগুলি বৈধতা পায় না। ভাষা, ভূগোল ও বর্ণের পরিচয়ে বিভক্তি গড়া এবং বিভক্তিকে বৈধতা দেয়া ইসলামে হারাম। এটি মহান আল্লাহর ফরমান “লা তাফাররাকু” অর্থাৎ “বিভক্ত হয়োনা”র বিরূদ্ধে সুস্পষ্ট বিদ্রোহ। অথচ ইসলামের নামে যারা দল বা জামায়াত গড়ে তারাও এ বিভক্তিকে বৈধতা দেয় এবং ভক্তি করে মুসলিম বিশ্বের বিভক্ত মানচিত্রকে। এসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের জন্ম দিবস নিয়ে জাতিয়তাবাদীদের ন্যায় বিজয়-উৎসব করে। যেমনটি বাংলাদেশের ইসলামি দলগুলোর দ্বারা হচ্ছে। বিভক্ত এ মানচিত্র ভেঙ্গে বিশাল এক খেলাফতি রাষ্ট্র গড়ার জিহাদ শুরু হলে সে পবিত্র কর্মকে তারা যে শুধু ঘৃনা করে তা নয়, কাফেরদের সাথে নিয়ে তা প্রতিরোধেরও চেষ্টা করে। এমন জিহাদকে তারা আন্তর্জাতিক আইনবিরোধী বলে অভিহিত করে। খিলাফত প্রতিষ্ঠার জিহাদে যারা আজ কাফেরশক্তির বিমান হামলায় ইরাক ও সিরিয়ার বুকে শহীদ হচ্ছেন তাদেরকে বলে সিআইএ ও মোশাদের এজেন্ট। কি বিস্ময়! জিহাদীদের চরিত্র ধ্বংসে এরা প্রচার করে, মোসলের রাস্তায় তারা নাকি মহল্লাবাসীদের কাছে নারী সাপ্লাইয়ের দাবী জানিয়ে পোষ্টার লাগায়!সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার কত জঘন্য অপপ্রচার! এতো ব্যাভিচারের অপরাধ। অথচ কাউকে ব্যাভিচারির অপবাদ দেয়ার শরিয়তের শাস্তি হলো, তার পিঠে ৮০ চাবুকের ঘা। ব্যাভিচারিদের হাতে অস্ত্র থাকলে তারা কি পোষ্টার লাগিয়ে নারী খোঁজে? তারা বলে, এ জিহাদীরা নাকি খারেজী। অথচ ভূলে যায়, খারেজীদের যুদ্ধ ছিল খেলাফতের বিরুদ্ধে। তাদের যুদ্ধ খেলাফতের প্রতিষ্ঠা বা সুরক্ষা নিয়ে ছিল না। খারেজীরা যুদ্ধ করেছে ইসলামের মহান খলিফা হযরত আলী (রাঃ)র বিরুদ্ধে। অথচ আজ যাদেরকে খারেজী বলা হচ্ছে তাদের জিহাদ তো খেলাফতের প্রতিষ্ঠায়। তারা প্রাণ দিচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যায় কাফেরদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে। তাদের যুদ্ধ তো ইসলাম বিরোধী কুর্দি ও আরব জাতিয়তাবাদী, রাজতন্ত্রি, স্বৈরাচারি ও সেক্যুলারিস্টদের বিরুদ্ধে।

 

 

ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদীদের অপরাধ

ঔপনিবেশিক শত্রুদের অপরাধ শুধু দেশদখল এবং অধিকৃত দেশে গণহত্যা, অর্থনৈতীক শোষণ ও নির্যাতন নয়। তাদের দ্বারা সবচেয়ে বড় অপরাধটি ঘটেছে মুসলিম দেশের শিক্ষাঙ্গণে। শিক্ষাঙ্গণকে তারা ব্যবহার করেছে মগজ ধোলাইয়ের কারখানা রূপে। ফলে বাংলার ন্যায় মুসলিম ভূমিতে মুসলমানদের খৃষ্টান বানাতে না পারলেও ইসলাম থেকে দূরে সরাতে পেরেছে। এতে মড়ক লেগেছে মুসলমানদের ঈমানে। ঈমানের সে মড়কটি সবচেয়ে বেশী ঘটেছে তাদের জীবনে যারা শিক্ষা অর্জনের নামে মগজ ধোলাইয়ের সে কারখানায় প্রবেশ করেছে। ফলে বাংলার নিরক্ষর মুসলমানগণ যতটা ঈমান নিয়ে বেঁচেছে তথাকথিত বাঙালী শিক্ষিতরা তা পারেনি। বরং বহুদূর ছিটকে পড়েছে পবিত্র কোরআনে বর্নিত সিরাতুল মোস্তাকীম থেকে। আর যারা মূল রাস্তা থেকে ছিটকে গভীর খাদে গিয়ে জ্ঞান হারায় তাদের পক্ষে কি সেখান থেকে উঠে আসা সহজ? হিন্দু, খৃষ্টান বা ইহুদী থেকে ইসলাম থেকে দূরে সরা এসব মুসলিম নামধারিদের পার্থক্যই বা কতটুকু? বরং মিলতো বিশাল। হিন্দু, খৃষ্টান বা ইহুদীদের ন্যায় তাদের অবস্থানও সিরাতুল মোস্তাকীমে নয়। তারাও কাফেরদের ন্যায় শরিয়ত, খেলাফত ও জিহাদের বিরোধীতায় একই রূপ যুদ্ধাংদেহী। রাজনীতি, সংস্কৃতি ও যুদ্ধবিগ্রহের অঙ্গণে মুসলমান নামধারি এসব ব্যক্তিগণও তাই অমুসলমানের সাথে একত্রে নামে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ কালে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ বাহিনী যখন ইরাক ও ফিলিস্তিন দখলে হামলা চালায় তখন হানাদার সে সামরিক বাহিনীতে কবি কাজী নজরুল ইসলামের ন্যায় হাজার হাজার মুসলিম নামধারি যুবকও মুসলিম হত্যায় শামিল হয়েছিল। অন্তরে ঈমান থাকলে কেউ কি এভাবে কাফের বাহিনীতে যোগ দিতে পারে? এমন কাজ তো হারাম। কিন্তু সে হারামকেও বহু মুসলিম নামধারি সেদিন হালাল রূপে গ্রহণ করেছিল। লক্ষ লক্ষ আধুনিক শিক্ষিতরা আজও সে ধারাকে অব্যাহত রেখেছে। মুখে মুসলমান হওয়ার গগনবিদারি দাবী, অথচ তাদের সশস্ত্র অবস্থান শত্রু শিবিরে।একাত্তরে তাদেরকেই ভারতীয় কাফেরদের সাথে কাঁধ মিলিয়ে মুসলিম নিধনে দেখা গেছে। শিক্ষাদানের নামে ইংরেজগণ এভাবেই সেদিন বহু মুসলিম সন্তানকে ইসলাম থেকে দূরে সরাতে পেরছিল। এদের কারণেই ভারতের বুকে ১৯০ বছরে ঔপনিবেশিক শাসনে ব্রিটিশদের কলাবোরেটর পেতে কোনরূপ অসুবিধা হয়নি। ইসলাম থেকে দূরে সরা এ্মন মানুষদের কারণে খেলাফতের বিরুদ্ধে যোদ্ধা পেতে সাম্রাজ্যবাদি কাফেরশক্তির আজও কোন অসুবিধা হচেছ না।

মুসলিম দেশগুলিতে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটেছে। কিন্ত তাদের প্রতিষ্ঠিত ঈমানহীন করার কারখানাগুলো এখনো বন্ধ হয়নি। বরং অভিন্ন প্রকল্প নিয়ে বিপুল ভাবে বেড়েছে সেগুলির সংখ্যা ও সামর্থ। ফলে বিপুল ভাবে বেড়েছে ইসলামের শত্রু উৎপাদনও। তাতে দ্রুত বাড়ছে দিন দিন ইসলাম থেকে দূরে সরার কাজ। ফলে বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশে শরিয়ত, খেলাফত ও জিহাদের বিরুদ্ধে প্রচন্ড বিরোধীতাটি কাফেরদের পক্ষ থেকে আসছে না, আসছে তথাকথিত মুসলমানদের পক্ষ থেকে। এমন কি আসছে তথাকথিত আলেমদের পক্ষ থেকেও। আজ থেকে শত বছর আগেও বাংলার বা ভারতীয় মুসলমানদের অবস্থা এতটা শোচনীয় ছিল না। খেলাফতের পক্ষে সেদিন গড়ে উঠেছিল তুমুল গণআন্দোলন। ভারতীয় ইতিহাসে সেটি খিলাফত আন্দোলন নামে পরিচিত। ভারতের ইতিহাসে সেটিই ছিল সর্বপ্রথম গণআন্দোলন। গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে সেদিন খলিফার সাহায্যে মুষ্টির চালের হাড়ি বসানো হয়েছিল। বহু ভারতীয় মোজাহিদ সেদিন ছুটে গিয়েছিলেন খলিফার বাহিনীতে যোগ দিতে। অথচ তেমন আত্মত্যাগকে আজ বলা হচ্ছে সন্ত্রাস। জাতিয়তাবাদের ভূগোল ডিঙানো প্যান-ইসলামীক মুসিলিম ভাতৃত্বকে বলা হচ্ছে মৌলবাদ।

 

 

খিলাফত কেন অপরিহার্য?

ঈমানদারের জন্য ইসলামি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাটি শুধু রাজনৈতীক ও সাংস্কৃতিক প্রয়োজন নয়। বরং এমন একটি রাষ্ট্র অতি অপরিহার্য হলো মু’মিন রূপে বাঁচা ও ঈমান নিয়ে বেড়ে উঠার স্বার্থে। আলোবাতাস ও পানাহারে দেহ নিয়ে বাঁচা সম্ভব। কিন্তু তাতে ঈমান নিয়ে বাঁচাটি সম্ভব হয় না। ঈমান বাঁচাতে যা অপরিহার্য তা হলো ইসলামি শিক্ষা। ঈমানে পুষ্টি জোগানোর স্বার্থে পানাহারের ন্যায় ইসলামি শিক্ষার প্রয়োজনটিও প্রতিদিনের। সে প্রয়োজনটি কয়েক বছরের ছাত্রাবস্থায় মেটে না। ঈমানদারের সে ছাত্রাবস্থাটি আজীবনের।ফলে মুসলিম দেশের সব নাগরিকই কার্যত ছাত্র। তেমন একটি প্রয়োজন মেটাতে সমগ্র মুসলিম রাষ্ট্র তখন পরিণত হয় মাদ্রাসায়। শিক্ষাকে গুরুত্ব দেয়াই মহান নবীজী (সাঃ)র সূন্নত। শত্রুর বিরুদ্ধে কোরআনই ইসলামের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। ইসলামের যাত্রা তাই নামায-রোযা ও হজ-যাকাত দিয়ে হয়নি; হয়েছে ইকরা বা পড়া দিয়ে। সেটি নবুয়তের প্রথম দিন থেকেই। সেটির শুরু লাগাতর কোরআনী জ্ঞান-বিতরনের মধ্য দিয়ে।

নারী-পুরুষ ও সকল বয়সের ছাত্রদের ইসলামি জ্ঞানদান সুনিশ্চিত করার মূল দায়ভারটি রাষ্ট্রের। মূলতঃ রাষ্ট্রের ঘাড়ে এটিই হলো সবচেয়ে বড় দায়ভার। কোরআন-হাদীসের জ্ঞান হলো সে পুষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ ভান্ডার। অথচ রাষ্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থা কি ধরণের জ্ঞান জোগাবে সেটির পূর্ণ-নিয়ন্ত্রন থাকে সরকারের হাতে। তাই রাষ্ট্র্র ইসলামের শত্রুপক্ষের দখলে গেলে অসম্ভব হয় ইসলামি জ্ঞান লাভ। তাতে অসম্ভব হয় মুসলমানদের মুসলমান রূপে বাঁচা ও বেড়ে উঠা। কাফেরশক্তির হাতে দেশ অধিকৃত হওয়ার এখানেই মূল বিপদ।সে বিপদ যেমন ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের শাসনামলে বেড়েছে। তেমনি বেড়েছে জাতিয়তাবাদি সেক্যলারিস্টদের দখলদারিতেও। ফলে মুসলিম চেতনায় প্রবল ভাবে বেড়েছে কোরআনী জ্ঞানের অপুষ্টি। তাতে মুসলিম সন্তানের মনে ঈমান যে মারা যাবে সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলিতে সেটিই ঘটছে। ফলে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণ হয়, ধর্ষণে সেঞ্চুরির উৎসবও হয়।এবং দেশ দুর্বৃত্তিতে বিশ্বরেকর্ডও গড়ে।

জীবননাশী জীবাণুর চেয়ে ধ্যান-ধারণাও কম বিষাক্ত বা কম বিনাশী নয়। বিষাক্ত জীবাণু প্রাণনাশ ঘটায়। আর ঈমাননাশ ঘটায় দূষিত ধ্যান-ধারণা। বিষাক্ত ধ্যান-ধারণার সে নাশকতায় এমন কি দেশের ভূগোলেরও বিনাশ ঘটে। সে দৃষ্টান্ত হলো পাকিস্তান। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল ইসলাম প্রতিষ্ঠার নামে। নানা ভাষার ভারতীয় মুসলমানদের বিশাল রক্তের কোরবানীতে দেশটি সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু অধিকৃত হয়ে যায় সামরিক ও বেসামরিক সেক্যুলারিষ্টদের হাতে। ইসলামের এ শত্রুরা নিজেদের নানামুখি নাশকতার পাশাপাশি বিশ্বের নানা কাফের দেশ থেকে ঈমাননাশী জীবাণূ আমদানি শুরু করে। সে জীবাণু মার্কসবাদের নামে আনে সোভিয়েত রাশিয়া এবং চীন থেকে।সস্তায় মার্কসবাদের সে বিষাক্ত বই ও পত্রিকা পৌছিয়ে দেয়া হতো কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীদের হাতে। ফল দাঁড়ায়, মার্কসবাদের বিষপান করা ও মার্কসবাদী হওয়া তখন ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে ফ্যাশনে পরিণত হয়। সে সাথে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির বিষাক্ত বিষ আমদানি করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। সে বিষ আসে হলিউডের উলঙ্গ ছায়াছবির মাধ্যমে। সে বিষ দিবারাত্র পান করানো হতো সিনেমা হল গুলোতে। ফলে আমদানিকৃত সে বিষে মারা যায় প্যান-ইসলামিক চেতনা -যা ছিল পাকিস্তান সৃষ্টির মূল ভিত্তি। এবং প্রতিষ্ঠা পায় জাতিয়তাবাদ, সমাজবাদ ও সেক্যুলারিজমের ন্যায় ইসলাম-বিনাশী বিষাক্ত মতবাদ। ফলে ধ্বসে যায় বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম দেশ।এখন সে বিষাক্ত বিষ পচিয়ে দিচ্ছে বাঙালী মুসলমানের চরিত্রও। দেশে ভাত-মাছের আয়োজন বাড়িয়েও তাই শান্তি বাড়ছে না। বরং বাড়ছে আযাব। আযাব আসছে ভয়ানক এক দুর্বৃত্ত শাসনের বেশ ধরে|

মুসলিম রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু ভয়ানক রোগভোগ, পোকা-মাকড় ও পানাহার রোধই নয়, বিষাক্ত ধ্যান-ধারণার প্রতিরোধও। আর সে কাজটি কোন ব্যক্তির দ্বারা সম্ভব নয়।সে দায়িত্বটিও রাষ্ট্রের।ইসলামি রাষ্ট্র ঈমাননাশী ধারণার বিরুদ্ধে প্রতিরোধক ভ্যাকসিন দেয় কোরআনী-হাদীসের গভীর জ্ঞান দিয়ে। এতে ইম্যুনিটি বাড়ে কুফরি ধ্যানধারণার বিরুদ্ধে। ফলে ইসলামী রাষ্ট্রে জন্ম নেয়া শিশুর পক্ষে ঈমান নিয়ে বাঁচা ও বেড়ে উঠাটি সহজ হয়। অপরদিকে অনৈসলামি রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থা ছাত্রের চেতনায় ভ্যাকসিন দেয় ইসলামের বিরুদ্ধে। ফলে সে দেশে দুরূহ হয় ঈমান নিয়ে বেড়ে উঠা। কাফের অধ্যুষিত দেশে বা কাফেরদের প্রণীত শিক্ষাব্যবস্থায় বেড়ে উঠা মানুষের মাঝে আল্লাহর আইন, খিলাফত, জিহাদ ও জিজিয়ার বিরুদ্ধে ঘৃণাবোধ এজন্যই অতি প্রচন্ড। কাফের অধ্যুষিত দেশে বসবাস ও কাফেরদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষালাভের এটিই হলো সবচেয়ে বড় বিপদ। কাফেরদের কাছ থেকে আলুপটল বা হাসমুরগী কেনা চলে, তাদের থেকে প্রযুক্তি বা চিকিৎসা জ্ঞানও নেয়া যায়। কিন্তু তাদের থেকে রাজনীতি, সমাজনীতি, দর্শন, ধর্মজ্ঞান, নীতিজ্ঞান, ইতিহাস ও জীবন জিজ্ঞাসার অন্যান্য বিষয়ে শিক্ষা লাভের বিপদ ভয়ানক। এজন্যই নবীজী (সাঃ)র যুগে মদিনায় ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর কাফের দেশে বসবাস করা হারাম ঘোষিত হয় এবং ফরজ ঘোষিত হয় হিজরত।

 

খেলাফত বিলুপ্তির আযাব

খেলাফতের প্রতিষ্ঠা কোন কালেই ফেরেশতাদের হাতে ঘটেনি। দোষত্রুটি নিয়ে যে মানুষ তারাই খেলাফত প্রতিষ্ঠা ঘটেছে। কিন্তু সে ত্রুটির দোহাই দিয়ে খেলাফত বিলুপ্তিকে কোন কালে কি জায়েজ বলা হয়েছে? অথচ আজ খেলাফতের বিলুপ্তির লক্ষ্যে জিহাদীদের মাথার উপর বোমা ফেলার জন্য কাফের মার্কিন বাহিনীকে ডাকা হচ্ছে। দোষত্রুটি সম্পন্ন মানুষদের মধ্য থেকেই কাউকে খেলাফত প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব নিতে হবে। খলিফা হওয়ার শর্ত ফেরশতা হওয়া নয়। বরং সে শর্তটি হলো গোত্র, বর্ণ, ভাষাগত পরিচয়ের উর্দ্ধে উঠে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা, মুসলমানদের একতা ও লাগাতর জিহাদ সংগঠিত করায় আন্তরিক হওয়া। শর্ত হলো, বিশ্বের তাবত ভাষাভাষি মুসলমানদের জন্য ইসলামি রাষ্ট্রের দরওয়াজা সবসময়ের জন্য খুলে দেয়া। শর্ত হলো মুসলিম জাহান জুড়ে পৃথক পৃথক জাতীয় রাষ্ট্রের নামে যে বিভক্তির দেয়াল গড়া হয়েছে সেগুলো বিলুপ্ত করায় সচেষ্ট হওয়া।

মাত্র শত বছর আগেও যে কোন মুসলিম খলিফা শাসনভূক্ত যে কোন প্রদেশে, শহরে ও গ্রামে বসতি স্থাপন করতে পারতো। দোকান-পাঠ বসিয়ে ব্যবসা বাণিজ্য শুরু করতে পারতো। তাতে কোন বাধা ছিল না। কে আরব, কে তুর্কি, কে কুর্দি, হিন্দি, আফগানি বা বাঙালী -সে পরিচয় নেয়া হতো না। এমন কি আজ ই্সরাইলেও নেয়া হয়। ইসরাইলের নাগরিক হওয়ার জন্য ইহুদী হওয়াটিই যথেষ্ট। আমরিকা ও ইউরোপের দেশগুলোর নাগরিক হওয়ার জন্য সে সব দেশে ৫ বছরের বেশী বৈধ বসবাসই যথেষ্ট। অথচ সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের সবগুলি মুসলিম দেশে ২০ বা ৩০ বছর বৈধভাবে বসবাস ও খেদমতের পরও অনারব মুসলমানের নাগরিকত্ব জুটে না। এটি কি মানবতা? এটি কি ইসলাম? এতো আদিম জাহিলিয়াত যুগের বর্বরতা। অথচ এরূপ বর্বরদের হাতে মুসলিম ভূমিগুলি আজ অধিকৃত। এ হলো খেলাফত বিলুপ্তির আযাব।

আরব দেশগুলির উন্নয়নে যারা নিজেদের রক্ত পানি করছে সে দেশে তাদের নাগরিকত্ব লাভের অধিকার কি সেদেশের আদি জনগণের চেয়ে কম? কোন সভ্য দেশ কি সে অধিকার থেকে কাউকে বঞ্চিত করতে পারে? খেলাফত প্রতিষ্ঠিত খাকলে কি এরূপ বর্বরতা স্থান পেত? খলিফা তো বিশ্বের সমগ্র মুসলমানদের অভিভাবক। তার কাছে আরব-অনারব, সাদা-কালো সবাই সমান। তাই এমন বিভাজন উমাইয়া, আব্বাসীয় ও ওসমানীয়া খেলাফত আমলেও ছিল না। মহান আল্লাহতায়ালা প্রতিটি মু’মিনকে অপর মু’মিনের ভাই বলেছেন। প্রকৃত ঈমানদারের দায়িত্ব হলো মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে দেয়া ভাতৃত্বের পরিচয়ের প্রতি সম্মান দেখানো। নিজ ভাইয়ের প্রবেশ রুখতে কি দেয়াল গড়া যায়? অথচ আরব দেশগুলো সেটাই করেছে এবং এরপরও তারা নিজেদের মুসলমান রূপে দাবী করে! খেলাফত প্রতিষ্ঠা পেলে বিভক্তির দেয়াল লোপ পাবে। তখন বিলুপ্ত হবে আরব-অনারব, শ্বেতাঙ্গ-কষ্ণাঙ্গ, প্রাচ্য-পাশ্চাত্য মুসলমানের পার্থক্য।এবং প্রতিষ্ঠা পাবে প্যান-ইসলামিক ভাতৃত্ব। খলিফা বাগদাদীর পক্ষে থেকে তো সেটিরই ঘোষণা দেয়া হয়েছে। ইরাক এবং সিরিয়ার মাঝের সীমান্ত রেখাকে তাই ইতিমধ্যেই গুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আরব-অনারব, শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ, এশিয়ান-ইউরোপীয়ানগ সেখানে একই রণাঙ্গণে। বিশ্বের নানা ভাষা-ভাষী মুসলমানগণ আজ মিলেমিশে এক বিশাল বিশ্বশক্তি রূপে মাথা তুলে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু সেটি যেমন বিদেশী কাফেরগণ চায় না, তেমনি বর্ণবাদী, গোত্রবাদী, রাজতন্ত্রি ও স্বৈরাচারি জাতিয়তাবাদিগণও চায় না। আরব শাসকগণ ফিরে গিছে ইসলামপূর্ব আরব জাহিলিয়াতের দিকে। নবীজী (সাঃ) বিরুদ্ধে সে আমলের আবর গোত্রগুলি যেরূপ কোয়ালিশন গড়েছিল, আজকের স্বৈরাচারি আরব শাসকগণও সে পথ ধরেছে। খেলাফতের বিরুদ্ধে তাদের মধ্যে গড়ে উঠেছে গভীর একতা। গাজায় ইসরাইলী গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে তারা একটি দিন বা একটি ঘন্টার জন্য একত্রে বৈঠক করতে পারিনি। এখন খিলাফতের বিরুদ্ধে তাদের বৈঠকের শেষ নাই। এসব আরব শাসকবর্গ অনারব মুসলমানদের চেয়ে পাশ্চাত্যের কাফেরদেরকেই বেশী আপন ভাবছে। নিজেদের অবৈধ শাসনের প্রতিরক্ষায় তারা ইসলামের পবিত্র ভূমিতে কাফেরবাহিনীকে ডাকছে। খেলাফতের নির্মূলে গড়ে তুলেছে বৃহত্তর কোয়ালিশন। স্বৈরাচারি এসব আরব শাসকগণ ও তাদের গৃহপালিত আলেমগণ ইসলাম থেকে যে কতটা দূরে সরেছে সেটি বুঝতে কি এরপরও কিছু বাঁকি থাকে?  ২২/০৯/১৪