বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব ও অর্জিত পরাধীনতা

ফিরোজ মাহবুব কামাল

অর্জিত পরাধীনতা

একাত্তরের পর বাংলাদেশের ভূমি, সম্পদ ও জনগণ যে কতটা অরক্ষিত সেটি বুঝতে কি প্রমানের প্রয়োজন পড়ে? ২৩ বছরের পাকিস্তান আমলে যে দাবীগুলো ভারতীয় নেতাগণ মুখে আনতে সাহস পায়নি সেগুলি এখন মুজিবামলে আদায় করে ছেড়েছ। পাকিস্তান আমলে তারা বেরুবাড়ির দাবী করেনি, কিন্তু একাত্তরে শুধু দাবিই করেনি, ছিনিয়েও নিয়েছে। এবং সেটি মুজিবের হাত দিয়ে। প্রতিদানে কথা ছিল তিন বিঘা করিডোর বাংলাদেশকে দিবে। কিন্তু সেটি দিতে ৪০ বছরের বেশীকাল যাবত টালবাহানা করেছে। টালবাহানা করেছে আঙরপোতা, দহগ্রামের ন্যায় বহু বাংলাদেশী ছিটমহল দিতে। ভারত সেগুলিতে যাওয়ার করিডোর দিতে গড়িমসি করলে কি হবে, এখন বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে করিডোর আদায় করে নিল। সেটি নিল প্রতিবেশীর প্রতি পারস্পরিক সহযোগিতার দোহাই দিয়ে। অথচ এমন সহযোগিতা কোন কালেই ভারত প্রতিবেশীকে দেয়নি।

ষাটের দশকে পাকিস্তান সরকার তার পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের সাথে যোগাযোগের স্বার্থে করিডোর চেয়েছিল। সেটিকে তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী জওয়ারলাল নেহেরু একটি অদ্ভুদ দেশের অদ্ভুত আব্দার বলে মস্করা করেছিলেন। বলেছিলেন, ভারতের নিরাপত্তার প্রতি এমন ট্রানজিট হবে মারাত্মক হুমকি। শুধু তাই নয়, একাত্তরে ভারতীয় ভূমির উপর দিয়ে তৎকালীন পাকিস্তানের পিআইয়ের বেসামরিক বাণিজ্য বিমান উড়তে দেয়নি। এমন কি শ্রীলংকার উপর চাপ দিয়েছিল যাতে পাকিস্তানী বেসামরিক বিমানকে কোন জ্বালানী তেল না দেয়।

বাংলাদেশের সাথেই কি আচরন ভিন্নতর? একাত্তরের যুদ্ধে চট্টগ্রাম বন্দরে কয়েকটি জাহাজ ডুবিয়ে দেয়া হয়। ফলে গুরুতর ব্যাঘাত ঘটছিল বন্দরে মালামাল বোঝাই ও উত্তোলনের কাজে। এতে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি প্রচন্ড ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। দেশে তখন দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি। ছিল নিতান্তই দুঃসময়। বাংলাদেশের জন্য চট্রগ্রাম বন্দরটিই ছিল মূল বন্দর। এমন দুঃসময়ে অন্য কেউ নয়, ভারতের অতি বন্ধুভাজন শেখ মুজিব অনুমতি চেয়েছিলেন অন্ততঃ ৬ মাসের জন্য কোলকাতার বন্দর ব্যবহারের। তখন ভারত সরকার জবাবে বলেছিল ৬ মাস কেন ৬ ঘন্টার জন্যও বাংলাদেশকে এ সুবিধা দেয়া যাবে না। এটিকেও নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করেছিল। প্রতিবেশী সুলভ সহযোগিতার বুলি তখন নর্দমায় স্থান পেয়েছিল। এমনকি শেখ মুজিবকেও ভারত আজ্ঞাবহ এক সেবাদাস ভৃত্যের চেয়ে বেশী কিছু ভাবেনি। ভৃত্যকে দিয়ে ইচ্ছামত কাজ করিয়ে নেওয়া যায়, কিন্তু তার আব্দারও কি মেনে নেওয়া যায়? এসবই হলো একাত্তরের অর্জন। এভাবে বেড়েছে পরাধীনতা, স্বাধীনতা নয়।

প্রতিবেশীর প্রতি ভারতের এরূপ বৈরী আচরন নিত্যদিনের। প্রতিবেশী নেপাল ও ভূটানের সাথে বাণিজ্য চলাচল সহজতর করার জন্য ১৭ কিলোমিটারের ট্রানজিট চেয়েছিল বাংলাদেশ। নেপাল চেয়েছিল মংলা বন্দর ব্যবহারের লক্ষ্যে ভারতের উপর দিয়ে মালবাহি ট্রাক চলাচলের ট্রানজিট। ভারত সে দাবি মানেনি। অথচ সে ভারতই নিল বাংলাদেশের উপর দিয়ে প্রায় ছয় শত মাইলের করিডোর। ফলে বুঝতে কি বাঁকি থাকে, পারস্পারিক সহযোগিতা বলতে ভারত যেটি বুঝে সেটি হলো যে কোন প্রকারে নিজের সুবিধা আদায়। প্রতিবেশীর সুবিধাদান নয়। কথা হলো, বাংলাদেশের জন্য ১৭ কিলোমিটারের ট্রানজিট যদি ভারতের জন্য নিরাপত্তা-সংকট সৃষ্টি করে তবে সে যুক্তি তো বাংলাদেশের জন্যও খাটে। তাছাড়া বাংলাদেশের নিরাপত্তার বিরুদ্ধে ভারতের সৃষ্ট ষড়যন্ত্র নতুন নয়। ১৯৭৫ সালে মুজিব নিহত হওয়ার পর কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্ব কিছু আওয়ামী লীগ ক্যাডার ভারতে আশ্রয় নেয়। বাংলাদেশের সীমান্তে তারা সন্ত্রাসী হামলাও শুরু করে। তাদের হামলায় বহু বাংলাদেশী নিরীহ নাগরিক নিহতও হয়। ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থাগুলি তাদেরকে যে শুধু অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়েছে তাই নয়, নিজ ভূমিকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ব্যবহারেরও পূর্ণ সুযোগ দিয়েছে। আওয়ামী লীগের টিকেট পিরোজপুর থেকে দুই-দুইবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য চিত্তরঞ্জন সুতার ভারতে গিয়ে স্বাধীন বঙ্গভূমি আন্দোলন গড়ে তুলেছে সত্তরের দশক থেকেই। ভারত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত এসব সন্ত্রাসীদের বাংলাদেশের হাতে তুলে দেয়া দূরে থাক তাদেরকে নিজভূমি ব্যবহারের পূর্ণ সুযোগ দিয়েছে। এসব কি প্রতিবেশী-সুলভ আচরণ? অথচ সে ভারতই দাবি তুলেছে আসামের উলফা নেতাদের ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার। হাসিনা সরকার তাদেরকে ভারতের হাতে তুলেও দিচ্ছে। অথচ কাদের সিদ্দিকী ও চিত্তরঞ্জন সুতারের ন্যায় উলফা নেতাদের ভাগ্যে বাংলাদেশের মাটিতে জামাই আদর জুটেনি। ঘাঁটি নির্মান, সামরিক প্রশিক্ষণ ও বাংলাদেশের ভূমি থেকে প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে হামলা পরিচালনার সুযোগও জুটেনি। বরং জুটেছে জেল।

 

বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব ও ভারতীয় ষড়যন্ত্র

বাংলাদেশের উপর দিয়ে ভারতের করিডোর যে কতটা আত্মঘাতি এবং কিভাবে সেটি বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিনত করবে -সে বিষয়টিও ভাববার বিষয়। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব সীমান্ত জুড়ে মেঘালয়, আসাম, ত্রিপুরা, অরুনাচল, মনিপুর, নাগাল্যান্ড ও মিজোরাম -ভারতের এ সাতটি প্রদেশ। এ রাজ্যগুলির জন্য এমন কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট রয়েছে যা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এক). সমগ্র এলাকার আয়তন বাংলাদেশের চেয়েও বৃহৎ অথচ অতি জনবিরল। দুই) সমগ্র এলাকাটিতে হিন্দুরা সংখ্যালঘিষ্ট। ফলে হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ নিয়ে সমগ্র উপমহদেশে যে রাজনৈতিক সংঘাত ও উত্তাপ -এ এলাকায় সেটি নেই। ফলে এখানে বাংলাদেশ পেতে পারে বন্ধুসুলভ প্রতিবেশী যা তিন দিক দিয়ে ভারত দ্বারা পরিবেষ্ঠিত বাংলাদেশের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব -এ দুই দিকের সীমান্ত অতি সহজেই নিরাপত্তা পেতে পারে এ এলাকায় বন্ধু সুলভ কোন সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে। অপরদিকে নিরাপত্তা চরম ভাবে বিঘ্নিত হতে পারে যদি কোন কারণে তাদের সাথে বৈরীতা সৃষ্টি হয়। তাই এ এলাকার রাজনীতির গতিপ্রকৃতির সাথে সম্পর্ক রাখাটি বাংলাদেশের কাছে অতি গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তান যেমন আফগানিস্তানের রাজনীতি  থেকে হাত গুটাতে পারে না, তেমনি বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয় এ বিশাল এলাকার রাজনীতি থেকে দূরে থাকা। যেহেতু এ এলাকায় চলছে প্রকাণ্ড এক জনযুদ্ধ তাই তাদের সাথে শত্রুতা সৃষ্টি করা হবে আত্মঘাতি।  অথচ ভারত চায়, বাংলাদেশকে তাদের বিরুদ্ধে খাড়া করতে। তিন). একমাত্র ব্রিটিশ আমল ছাড়া এলাকাটি কখনই ভারতের অন্তর্ভূক্ত ছিল না, এমনকি প্রতাপশালী মুঘল আমলেও নয়। হিন্দু আমলে তো নয়ই। মুর্শিদ কুলি খাঁ যখন বাংলার সুবেদার তথা গভর্নর, তখন তিনি একবার আসাম দখলের চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু সে দখলদারি বেশী দিন টিকিনি। আসামসহ ৭টি প্রদেশের ভূমি ভারতভূক্ত হয় ব্রিটিশ আমলের একেবারে শেষ দিকে। ভারতীয়করণ প্রক্রিয়া সেজন্যই এখানে ততটা সফলতা পায়নি। এবং গণভিত্তি পায়নি ভারতপন্থি রাজনৈতিক দলগুলি। চার). সমগ্র এলাকাটি শিল্পে অনুন্নত এবং নানাবিধ বৈষম্যের শিকার। অথচ এলাকাটি প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ। ভারতের সিংহভাগ তেল, চা, টিম্বার এ এলাকাতে উৎপন্ন হয়। অথচ চা ও তেল কোম্মানীগুলোর হেড-অফিসগুলো কোলকাতায়। কাঁচামালের রপ্তানীকারক প্রতিষ্ঠানগুলিও এলাকার বাইরের। ফলে রাজস্ব আয় থেকে এ এলাকার রাজ্যগুলি বঞ্চিত হচ্ছে শুরু থেকেই। শিল্পোন্নত রাজ্য ও শহরগুলো অনেক দূরে হওয়ায় পণ্যপরিহন ব্যয়ও অধিক। ফলে সহজে ও সস্তায় পণ্য পেতে পারে একমাত্র উৎস বাংলাদেশ থেকেই। ভারতকে করিডোর দিলে সে বাণিজ্যিক সুযোগ হাতছাড়া হতে বাধ্য। পাঁচ) যুদ্ধাবস্থায় অতি গুরুত্বপূর্ণ হল নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা। কিন্ত এ এলাকায় সে সুযোগ ভারতের নেই। ভারতের সাথে এ এলাকার সংযোগের একমাত্র পথ হল পার্বত্যভূমি ও বৈরী জনবসতি অধ্যুষিত এলাকার মধ্য অবস্থিত ১৭ কিলোমিটার চওড়া করিডোর। এ করিডোরে স্থাপিত রেল ও সড়ক পথের কোনটাই নিরাপদ নয়। ইতিমধ্যে গেরিলা হামলায় শত শত সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তির সেখানে প্রাণনাশ হয়েছে। ছয়). নৃতাত্বিক দিক দিকে এ এলাকার মানুষ মাঙ্গোলিয়। ফলে মূল ভারতের অন্য যে কোন শহরে বা প্রদেশে পা রাখলেই একজন নাগা, মিজো বা মনিপুরি চিহ্নিত হয় বিদেশী রূপে। তারা যে ভারতী নয় সেটি বুঝিয়ে দেয়ার জন্য এ ভিন্নতাই যথেষ্ট। এ ভিন্নতার জন্যই সেখানে স্বাধীন হওয়ার জন্য মুক্তিযুদ্ধ চলছে বিগত প্রায় ৭০ বছর ধরে। ভারতীয় বাহিনীর অবিরাম রক্ত ঝরছে এলাকায়। বহু চুক্তি, বহু সমঝোতা, বহু নির্বাচন হয়েছে কিন্তু স্বাধীনতার সে যুদ্ধ থামেনি। ফলে বাড়ছে ভারতের অর্থনীতির উপর চাপ। সমগ্র এলাকা হয়ে পড়েছে ভারতের জন্য ভিয়েতনাম। যে কোন সময় অবস্থা আরো গুরতর রূপ নিতে পারে। আফগানিস্থানে একই রূপ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল রাশিয়ার জন্য। সে অর্থনৈতিক রক্তশূণ্যতার কারনে বিশাল দেহী রাশিয়ার মানচিত্র ভেঙ্গে বহু রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল। ভারত রাশিয়ার চেয়ে শক্তিশালী নয়। তেমনি স্বাধীনতার লক্ষ্যে এ এলাকার মানুষের অঙ্গিকার, আত্মত্যাগ এবং ক্ষমতাও নগণ্য নয়। ফলে এ সংঘাত থামার নয়। ভারত চায় এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে। কিন্তু ভারতের কাছে সংকট মুক্তির সে রাস্তা খুব একটা খোলা নাই।

ভারত বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে করিডোর নিয়েছে পণ্য-পরিবহন ও আভ্যন্তরীণ যোগাযোগের দোহাই দিয়ে। বিষয়টি কি আসলেই তাই? মেঘালয়, ত্রিপুরা, অরুনাচল, মনিপুর, নাগাল্যান্ড ও মিজোরামের সমুদয় জনসংখ্যা ঢাকা জেলার জনসংখ্যার চেয়েও কম। এমন ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠির জন্য পণ্যসরবরাহ বা লোক-চলাচলের জন্য এত কি প্রয়োজন পড়লো যে তার জন্য অন্য একটি প্রতিবেশী দেশের মধ্য দিয়ে করিডোর চাইতে হবে? সেখানে এক বিলিয়ন ডলার বিণিয়োগ করতে হবে? যখন তাদের নিজের দেশের মধ্য দিয়েই ১৭ কিলোমিটারের প্রশস্ত করিডোর রয়েছে। বাংলাদেশের বিগত সরকারগুলো দেশের আভ্যন্তরীণ সড়কের দুরবস্থার কথা জানিয়ে এতকাল পাশ কাটানোর চেষ্টা করেছে। এবার ভারত বলছে তারা সড়কের উন্নয়নে বাংলাদেশকে দুই বিলিয়ন ডলার লোন দিতে রাজী। এবার বাংলাদেশ যাবে কোথায়? অথচ এই এক বিলিয়ন ডলার দিয়ে ভারত তার ১৭ মাইল প্রশস্ত করিডোর দিয়ে একটি নয়, ডজনের বেশী রেল ও সড়ক পথ নির্মাণ করতে পারতো। এলাকায় নির্মিত হতে পারতো বহু বিমান বন্দর। ভারতের সে দিকে খেয়াল নাই, দাবী তুলেছে বাংলাদেশের মাঝ খান দিয়ে যাওয়ার পথ চাই-ই। যেন কর্তার তোগলোকি আব্দার। গ্রামের রাস্তা ঘুরে যাওয়ায় রুচি নেই, অন্যের শোবার ঘরের ভিতর দিয়ে যেতেই হবে। গ্রামের ঝোপঝাড়ের পাশ দিয়ে রাস্তায় পথ চলতে অত্যাচারি কর্তার ভয় হয়। কারণ তার কুর্মের কারণে শত্রুদের সংখ্যাটি বিশাল। না জানি কখন কে হামলা করে বসে। একই ভয় চেপে বসেছে ভারতীয়দের মাথায়। সমগ্র উত্তরপূর্ব ভারতের স্বাধীনতাকামী জনগণের কাছে তারা চিহ্নিত হয়েছে উপনিবেশিক ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী রূপে। তারা চায় ভারতীয় শাসন থেকে আশু মুক্তি। এ লক্ষে জানবাজি রেখে তারা যুদ্ধে নেমেছে। ফলে ভারতের জন্য অবস্থা অতি বেগতিক হয়ে পড়েছে। একদিকে কাশ্মীরের মুক্তিযুদ্ধ দমনে যেমন ছয় লাখেরও বেশী ভারতীয় সৈন্য অন্তহীন এক যুদ্ধে আটকা পড়েছে, তেমনি তিন লাখের বেশী সৈন্য যুদ্ধে লিপ্ত উত্তর-পূর্ব এ ভারতে। যুদ্ধাবস্থায় অতিগুরুত্বপূর্ণ হলো নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা। ফলে যতই এ যুদ্ধ তীব্রতর হচ্ছে ততই প্রয়োজন বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে করিডোরের। তাই করিডোর নেয়া হলো যে নিতান্তই সামরিক প্রয়োজনে -তা নিয়ে কি কোন সন্দেহ আছে? আর বাংলাদেশের জন্য শংকার কারণ মূলতঃ এখানেই। ভারত তার চলমান রক্তাত্ব যুদ্ধে বাংলাদেশকেও জড়াতে চায়। এবং সে সাথে কিছু গুরুতর দায়িত্বও চাপাতে চায়। কারো ঘরের মধ্য দিয়ে পথ চললে সে পথে কিছু ঘটলো সহজেই সেটির দায়-দায়িত্ব ঘরের মালিকের ঘাড়ে চাপানো যায়। তার বিরুদ্ধে আদালতে ফৌজদারি মামলাও দায়ের করা যায়। কিন্তু বিজন মাঠ বা ঝোপঝাড়ের পাশে সেটি ঘটলে আসামী খুঁজে পাওয়া দায়। ভারত এজন্যই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ৫ শত মাইলের করিডোর এবং সে করিডোরের নিরাপত্তার দায়-দায়িত্ব বাংলাদেশের কাঁধে চাপাতে চায়। এ পথে ভারতীয়দের উপর হামলা হলে বাংলাদেশকে সহজেই একটি ব্যর্থ দেশ এবং সে সাথে সন্ত্রাসী দেশ রূপে আখ্যায়ীত করে আন্তর্জাতিক মহলে নাস্তানাবুদ করা যাবে। সে সাথে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতীয় সামরিক হস্তক্ষেপকে ন্যায়সঙ্গত বলার বাহানাও পাওয়া যাবে। বাংলাদেশের জন্য এখানেই বিপদ।

 

যে হামলা অনিবার্য

প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের অভ্যন্তর দিয়ে ভারতীয় যানবাহন চলা শুরু হলে সেগুলির উপর হামলার সম্ভাবনা কি কম? ভারতীয় বাহিনী কাশ্মীরের মুসলমানদের উপর নিষ্ঠুর বর্বরতা চালিয়ে যাচ্ছে দীর্ঘ ৭০ বছর যাবত। এক লাখের বেশী কাশ্মীরীকে সেখানে হত্যা করা হয়েছে, বহু হাজার মুসলিম নারী হয়েছে ধর্ষিতা। এখনও সে হত্যাকান্ড ও ধর্ষণ চলছে অবিরাম ভাবে। জাতিসংঘের কাছে ভারত সরকার ১৯৪৮ সালে ওয়াদা করেছিল কাশ্মীরীদের ভাগ্য নির্ধারণে সেখানে গণভোট অনুষ্ঠিত করার অনুমতি দিবে। জাতিসংঘের নিরাপত্ত পরিষদ এ্যাডমিরাল নিমিটস্ এর উপর দায়িত্ব দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতিও শুরু হয়েছিল। কিন্তু ভারত সে প্রতিশ্রুতি রাখেনি। এবং সেটি নিছক গায়ের জোরে। এভাবে কাশ্মীরীদের ঠেলে দেওয়া হয়েছে রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধের পথে। অপর দিকে ভারত জুড়ে মুসলিমদের হত্যা, মুসলিম নারীদের ধর্ষণ, তাদের ঘরবাড়ীতে আগুণ, এমনকি মসজিদ ভাঙ্গার কাজ হয় অতি ধুমধামে ও উৎসবভরে। অযোধ্যায় বাবরী মসজিদ ভাঙ্গার কাজ হয়েছে হাজার পুলিশের সামনে দিন-দুপুরে। হাজার হাজার সন্ত্রাসী হিন্দুদের দ্বারা ঐতিহাসিক এ মসজিদটি যখন নিশ্চিহ্ন হচ্ছিল তখন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নরসীমা রাও, বিরোধী দলীয় নেতা বাজপেয়ী এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তাগণ সম্ভবতঃ আনন্দভরে ডুগডুগি বাজাচ্ছিলেন। এটি ছিল বড় মাপের একটি ঐতিহাসিক অপরাধ। অথচ এ অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ভারত সরকারের কোন পুলিশ কোন অপরাধীকেই গ্রেফতার করেনি। আদালতে কারো কোন জেল-জরিমানাও হয়নি। ভাবটা যেন, সেদেশে কোন অপরাধই ঘটেনি। মসজিদটি যেন নিজে নিজেই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। ভারতীয়দের মানবতাবোধ ও মূল্যবোধের এটিই প্রকৃত অবস্থা। এমন একটি দেশ থেকে কি সুস্থ্য পররাষ্টনীতি আশা করা যায়? দেশটিতে দাঙ্গার নামে হাজার হাজার মুসলমানকে জ্বালিয়ে মারার উৎসব হয় বার বার। সাম্প্রতিক কালে আহমেদাবাদে যে মুসলিম গণহত্যা হল সংখ্যালঘূদের বিরুদ্ধে তেমন কান্ড পাকিস্তানের ৭০ বছরের জীবনে একবারও হয়নি। বাংলাদেশের ৫০ বছরের জীবনেও হয়নি।

কংগ্রেস নেতা মাওলানা আবুল কালাম আযাদ লিখেছিলেন, ‘‘আফ্রিকার কোন জঙ্গলে কোন মুসলমান সৈনিকের পায়ে যদি কাঁটাবিদ্ধ হয় এবং সে কাঁটার ব্যাথা যদি তুমি হৃদয়ে অনুভব না কর -তবে খোদার কসম তুমি মুসলমান নও।” –(সুত্রঃ মাওলানা আবুল কালাম আযাদ রচনাবলী, প্রকাশক: ইসলামী ফাউন্ডেশন, ঢাকা)। এমন চেতনা মাওলানা আবুল কালাম আযাদের একার নয়, এটিই ইসলামের বিশ্ব-ভাতৃত্বের মৌলিক কথা। যার মধ্যে এ চেতনা নাই তার মধ্যে ঈমানও নাই। বাস্তবতা হল, বাংলাদেশে যেমন সেক্যুলারিজমের জোয়ারে ভাসা ভারতপন্থি বহু ক্যাডার আছে, তেমনি প্যান-ইসলামের চেতনায় উজ্জিবীতত বহু লক্ষ মুসলমানও আছে। করিডোরের পথে চোখের সামনে মুসলিম হত্যাকারি ও মসজিদ ধ্বংসকারি ভারতীয়দের কাছে পেয়ে এদের কেউ কেউ যে তাদের উপর বীরবিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়বে না -সে গ্যারান্টি কে দেবে? তাছাড়া ১৯৪৭ সালে বাংলার মুসলমানগণ যে স্বাধীন পাকিস্তানের জন্ম দিয়েছিলেন তা নিজ বাংলার বাঙালী হিন্দুদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নয়, বরং অবাঙালী মুসলমানদের সাথে কাঁধ মিলিয়ে। সে চেতনা ছিল প্যান-ইসলামের। সেটি কি এতটাই ঠুনকো যে আওয়ামী বাকশালীদের ভারতমুখি মিথ্যা প্রচারনায় এত সহজে মারা মরবে? চেতনাকে শক্তির জোরে দাবিয়ে রাখা যায়, হত্যা করা যায় না। আর ইসলামি চেতনাকে তো নয়ই। ভারত সেটি জানে, তাই বাংলাদেশ নিয়ে তাদের প্রচণ্ড ভয়।

তাছাড়া বাংলাদেশীদের প্রতি ভারতীয় সৈনিকদের আচরণটাই কি কম উস্কানিমূলক? প্রতি বছর বহু শত বাংলাদেশী নাগরিককে ভারতীয় বর্ডার সিকুরিটি ফোর্স তথা বিএসএফ হত্যা করে। তারকাটার বেড়ায় ঝুলে থাকে তাদের লাশ। এর কোন প্রতিকার বাংলাদেশীরা পায়নি। নিরীহ মানুষের এমন হত্যাকান্ড বিএসএফ পাকিস্তান সীমান্তে বিগত ৬০ বছরেও ঘটাতে পারিনি। এমনকি সেটি নেপাল, ভূটান বা বিশ্বের আর কোন দেশের  সীমান্তেও ঘটে না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ভারত সরকারের কাছে যে কতটা মূল্যহীন ও তুচ্ছ এবং দেশের জনগণ যে কতটা অরক্ষিত -সেটি বোঝানোর জন্য এ তথ্যটিই কি যথেষ্ট নয়? বহুবার তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কয়েক কিলোমিটার ঢুকে হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে। ইচ্ছামত ধরে নিয়ে যায় গরুবাছুড়। বাঁধ দিয়ে সীমান্তের ৫৪টি যৌথ নদীর পানি তুলে নিয়েছে বাংলাদেশের মতামতের তোয়াক্কা না করেই। ফারাক্কা বাঁধ নির্মান করে এক তরফা ভাবেই তুলে নিয়েছে পদ্মার পানি। ষড়যন্ত্র চলছে টিপাইমুখ বাধ দিয়ে সুরমা ও কুশিয়ারার পানি তুলে নেয়ার। বাঁধ দিয়ে পানিশূণ্য করা হচ্ছে তিস্তা। এদের মুখে আবার প্রতিবেশী মূলক সহযোগিতার ভাষা?

 

অধিকৃত বাংলাদেশ

ভারতের আগ্রাসী ভূমিকার কারণ ভারতবিরোধী চেতনা এখন বাংলাদেশের ঘরে ঘরে। বেতনভোগী কয়েক হাজার র’এর এজেন্ট দিয়ে এমন চেতনাধারিদের দমন অসম্ভব। সেটি ভারতও বুঝে। তাই চায়, বাংলাদেশ সরকার ভারত বিরোধীদের শায়েস্তা করতে বিশ্বস্ত ও অনুগত ঠ্যাঙ্গারের ভূমিকা নিক। শেখ হাসিনার সরকার সে ভূমিকাই বিশ্বস্ততার সাথে পালন করছে দেশের শত শত ইসলামপন্থি নেতা কর্মীদের গ্রেফতার ও নির্যাতন এবং ইসলামী বইপুস্তক বাজয়াপ্ত করার মধ্য দিয়ে। অথচ এটি কি কখনো কোন মুসলমানের এজেণ্ডা হতে পারে? শেখ হাসিনার সরকার রীতিমত যুদ্ধ শুরু করেছে দেশের ইসলামপন্থিদের নির্মূলে। সেটি শুধু জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে নয়, সকল ইসলামী দলের বিরুদ্ধেই। কে বা কোন দল একাত্তরে অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল সেটি তাদের কাছে বড় কথা নয়, বরং কারা এখন ইসলামের পক্ষ নিচ্ছে সেটিই তাদের বিবেচনায় মূল। এবং তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধেও নামছে। আওয়ামী বাকশালী পক্ষটি এমন একটি যুদ্ধের হুংকার বহু দিন থেকে দিয়ে আসছিল এবং এখন সেটি শুরুও হয়ে গেছে। বাংলাদেশের ঘাড়ে এভাবেই চাপানো হয়েছে একটি অঘোষিত ভারতীয় যুদ্ধ। এ যুদ্ধের ব্যয়ভার যেমন ভারতীয়রা বহন করছে, তেমনি কমাণ্ডও তাদের হাতে। বাংলাদেশ বস্তুত এ পক্ষটির হাতেই আজ  অধিকৃত।

হাসিনা জনগণের সমর্থণ নিয়ে ক্ষমতায় আসেনি। জনপ্রিয়তা হারানো নিয়েও তার কোন দুর্ভাবনা নেই। সে দুর্ভাবনা ও দায়ভারটি বরং ভারতীয়দের। শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হলে আওয়ামী লীগের চেয়েও বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হবে ভারত। তখন বিপদে পড়বে ভারতের প্রায় বহু বিলিয়ন ডলারের বিশাল বাজার। বিপদে পড়বে উত্তর-পূর্ব ভারতে তাদের যুদ্ধ।  চট্টগ্রাম বন্দরে আটককৃত ১০ ট্রাক অস্ত্র নিয়ে হাসিনা সরকার প্রমাণ করে ছেড়েছে তাঁর সরকার ভারতীয়দের স্বার্থের কতটা সহায়ক। বলা হয়, ১০ ট্রাক চীনা অস্ত্র আনা হয়েছিল উলফা বিদ্রোহীদের হাতে পৌঁছানোর জন্য। হাসিনা ক্ষমতাচ্যুৎ হলে ভবিষ্যতে ১০ ট্রাক নয় আরো বেশী অস্ত্র যে বিদ্রোহীদের হাতে পৌঁছতে পারে –সে ভয়ে দিল্লির শাসকচক্র অস্থির। ভারতীয় নেতারা শিশু নয় যে তারা সেটি বুঝে না। সে জন্যই ভারত চায়, শেখ হাসিনার সরকার শুধু ক্ষমতায় থাকুক তাই নয়, বরং ভারতের সাথে উলফা বিরোধী যুদ্ধে পুরাপুরি সংশ্লিষ্ট হোক। এ যুদ্ধে যোগ দিক সক্রিয় পার্টনার রূপে, যেমনটি দিয়েছিল একাত্তরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে।

 

লড়াই দেশ ও ঈমান বাঁচানোর

একাত্তরে যুদ্ধ ৯ মাসে শেষ হলেও এবারে সেটি হচ্ছে না। বরং বাংলাদেশীদের কাঁধে চাপানো হচ্ছে এমন এক লাগাতর যুদ্ধ যা সহজে শেষ হবার নয়। তাছাড়া এ যুদ্ধটি আদৌ বাংলাদেশীদের নিজেদের যুদ্ধ নয়। বরং সর্ব অর্থেই ভারতীয় এবং সেটি ভারতের স্বার্থ সংরক্ষণের।একাত্তরের যুদ্ধে ভারতের যে উদ্দেশ্য অসম্পূর্ণ থেকে যায়, ভারত এবার কোমর বেঁধেছে সেটিই পুরণ করতে। তাই ভারতের লক্ষ্য শুধু করিডোর লাভ নয়। সীমান্ত চুক্তি, সীমান্ত বাণিজ্য বা রাস্তাঘাট নির্মানে কিছু বিনিয়োগও নয়ও। বরং তার চেয়ে ব্যাপক ও সূদুর প্রসারী। সেটি যেমন দেশের ইসলামি চেতনার নির্মূল ও ইসলামপন্থি দেশপ্রেমিকদের কোমর ভাঙ্গার,তেমনি দেশটির উপর পরিপূর্ণ অধিকৃতি জমানোর। মি. ভার্মার ন্যায় ভারতীয় বুদ্ধিজীবীরা সে অভিলাষের কথা গোপন রাখেনি, তেমনি গোপন রাখছেন না বহু ভারতীয় রাজনৈতিক নেতাও। বিজেপির এক কেন্দ্রীয় নেতা তো সিলেট থেকে খুলনা বরাবর বাংলাদেশের অর্ধেক দখল করে নেয়ার দাবীও তুলেছেন। মুজিবের ন্যায় হাসিনাও চায় ভারতের ইচ্ছা পূরণ। কারণ, ক্ষমতায় থাকার জন্য সেটি গুরুত্বপর্ণ। তাই শরিয়তের প্রতিষ্ঠা, জিহাদের ন্যায় ইসলামের মৌল শিক্ষার প্রচারের উপর নিষেধাজ্ঞা এবং ইসলামী সংগঠনগুলির নেতাকর্মীদের উপর নির্যাতন দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে। বস্তুতঃ এসব করা হচ্ছে বাংলাদেশকে ভারতীয় মানচিত্রে বিলীন করার লক্ষ্যে। রাজনৈতিক মানচিত্র বিলুপ্ত না করলেও ইতিমধ্যই বিলুপ্ত করতে পেরেছ সাংস্কৃতিক মানচিত্র। বাংলাদেশীদের সামনে লড়াই এখন তাই শুধু গণতন্ত্র উদ্ধারের নয়। বরং তার চেয়েও গুরুতর। সেটি দেশ বাঁচানোর। এবং সে সাথে ঈমান ও ইসলাম বাঁচানোর। ১১/০৬/২০১৫; নতুন সংস্করণ ২৬/০৩/২০১৯

 

 




হাসিনা সরকারের অপরাধনামা

ফিরোজ মাহবুব কামাল

বিদ্রোহ আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে

শেখ হাসিনা ও তার আওয়ামী সরকারের মুল অপরাধটি স্রেফ জনগণের বিরুদ্ধে নয়, বরং খোদ মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর কোরআনী আহকামের বিরুদ্ধে। এ গুরুতর অপরাধটি বিদ্রোহের। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা শুধু সিরাতুল মোস্তাকীমই বাতলিয়ে দেননি, বরং সে সিরাতুল মোস্তাকীমে চলার পথে মু’মিনের জীবনে কীরূপ কর্মকান্ড বা মিশন হবে সেটিও সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। মিশন তো তাই যা মিশনারি ব্যক্তিটি প্রতিদিন করে, এবং যা নিয়ে তার লাগাতর ভাবনা ও ত্যাগ-সাধনা। সে পথ বেয়েই সে তার স্বপ্নের ভূবনে পৌঁছে। আর সে স্বপ্ন বা ভিশনটি হলো,আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীনের বিজয়। সে লক্ষ্যে আল্লাহতায়ালার নির্দেশিত মিশনটি হলো “আ’মিরু বিল মারুফ ওয়া নেহি আনিল মুনকার”, অর্থাৎ “ন্যায়ের নির্দেশ দান ও অপরাধীদের নির্মূল”। তবে সে বিজয় জায়নামাযে আসে না। মসজিদ-মাদ্রাসায় বা সুফীর আখড়াতেও আসে না। সে মিশন নিয়ে বাঁচায় অনিবার্য হয়ে উঠে আল্লাহবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে লাগাতর জিহাদ। রাষ্ট্র থেকে নমরুদ-ফিরাউনের ন্যায় অপরাধীদের নির্মূল করাই যে মহান আল্লাহতায়ালার সূন্নত সেটি তিনি নিজে তাদের নির্মূল করে দেখিয়েছেন। তিনি চান, মানুষ একাজে তার আনসার বা সহকারি হোক। ঈমান নিয়ে বাঁচার এ এক গভীর দায়বদ্ধতা। দায়বদ্ধতাই তাকে বেঈমানদের থেকে পৃথক করে ফেলে।

পবিত্র কোরআনে বার বার বলা হয়েছে, ঈমানদারগণ জিহাদ করে ও জানমালের কোরবানী পেশ করে “ফি সাবিলিল্লাহ” তথা আল্লাহতায়ালার পথে। আর বেঈমানেরা লড়াই করে “ফি সাবিলিত তাগুত” তথা তাগুত বা শয়তানের পথে। বাংলাদেশে এ দুটি পক্ষের যুদ্ধই দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে। বার বার ওমরা করলে কি হবে, হাসিনা সরকারের লড়াই যে আল্লাহর পথে নয় তা নিয়ে কি সামান্যতম সন্দেহ আছে? কারণ সেটি হলে সে লড়াইয়ে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা আসে। সে লড়াইয়ে দেশী ও ভিন দেশী কাফের শক্তির বিরুদ্ধে অঙ্গিকারও তখন তীব্রতর হয়। “ফি সাবিলিল্লাহ”র পথে বাঁচার অর্থ স্রেফ নামায-রোযা নিয়ে বাঁচা নয়, বরং “ন্যায়ের নির্দেশ দান ও অপরাধীদের নির্মূল”এর মিশন নিয়ে বাঁচা।পবিত্র কোরআনে সে তাগিদ বার বার এসেছে এবং সেটিরই বাস্তব প্রয়োগ করে গেছেন সাহাবায়ে কেরাম। প্রতি যুগে বান্দাহর দায়িত্ব হলো মহান আল্লাহর সে সূন্নতকেই অনুসরণ করা। মু’মিনের জীবনে এরূপ বাঁচার মধ্যেই তার রাজনীতি ও জিহাদ। মহান আল্লাহতায়ালার সে সূন্নতের পথ বেয়েই  নবীজী (সাঃ) ও তাঁর সাহাবাগণ রাষ্ট্রের বুক থেকে আবুলাহাব, আবুজেহেল ও তার অনুসারিদের নির্মূল করেছিলেন। তাদের নির্মূলের পর দুর্বৃত্ত শাসনের নির্মূলে নেমেছিলেন পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যভূক্ত বিশাল ভূ-ভাগেও। শয়তানি শক্তির নির্মূলের সে ধারা অব্যাহত রাখতেই একদল মুসলমান ইখতিয়ার মহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির নেতৃত্বে ত্রয়দশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে বাংলাদেশে পৌঁছেছিলেন। আর মুসলিম বাহিনীর বিজয়ই তো বিজিত দেশের নাগরিকদের জীবনে বিশাল নেয়ামত বয়ে আনে। ইখতিয়ার মহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির সে বিজয়ের বরকতেই বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ট মানুষ আজ মুসলমান। নইলে তাদের আজ মুর্তি পুঁজা, শাপশকুন ও গরুছাগলকে পুঁজা করতে হতো। আল্লাহর শত্রু নির্মূলে ঈমানদারগণ ময়দানে নামলে তাদের মদদে মহান আল্লাহতায়ালা ফিরাশতা নামিয়ে দেন।সেটিও মহান আল্লাহর সূন্নত।

ন্যায়ের হুকুম ও অপরাধীদের নির্মূলের কঠিন কাজটি জায়নামাজ থেকে অসম্ভব। সে কাজে শক্তি চাই। সে জন্য তো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হাতে নেয়াটি জরুরী। তাই নবীজী (সাঃ) ও তাঁর সাহাবীগণ নামায-রোযা, হজযাকাত পালনের মধ্যে তাদের ইবাদতকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। শত্রুশক্তিকে পরাজিত করে সে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ তারা নিজ হাতে নিয়েছেন এবং ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাই ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দিয়ে জায়নামাজে ধর্মকর্ম সীমিত রাখাটি ইসলাম নয়। নবীজী (সাঃ)র সূন্নতও নয়। সেটি হলে অবাধ্যতা হয় মহান আল্লাহর নির্দেশের। সে অবাধ্যতায় খুশি হয় শয়তান ও তার অনুসারিগণ। তারা চায়, মুসলমানগণ রাজপথ শূণ্য করে মসজিদে গিয়ে আশ্রয় নিক। আর রাষ্ট্রের উপর পুরা দখলদারিটা তাদের হাতে চলে আসুক। বাংলাদেশের আওয়ামী সেক্যুলার পক্ষটির খায়েশ কি তা থেকে আদৌ ভিন্নতর? দেশে শরিয়তের প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে কাউকে রাজপথে নামতে দিতে তারা রাজী নয়।কারণ, তাতে তাদের নিজেদের রাজনীতি বিপদে পড়ে। তাদের জিহাদশূণ্য ইসলামে সেটির স্থান নাই। নিজেদের সে বিকৃত ইসলামের দোহাই দিয়েই তারা শরিয়তের প্রতিষ্ঠাকামীদের রাজনীতিকে বলছে সন্ত্রাস। প্রশ্ন হলো, মক্কার কাফেরগণ ইসলামের বিরুদ্ধে যে অবস্থান নিয়েছিল তাদের এ অবস্থান কি তা থেকে ভিন্নতর?

বাংলাদেশে সেক্যুলারিস্টদের কাজ হয়েছে, রাষ্ট্রের চিহ্নিত অপরাধীদের পরিচর্যা দেয়া। সে সাথে পুরস্কৃত করাও। অপরাধ নির্মূল করতে তো অপরাধকে অপরাধ রূপে গণ্য করার মত মানসিকতা থাকতে হয়। শাস্তি দেয়ার জন্য উপযোগী আইনও থাকতে হয়। ইসলামের সে আইন হলো শরিয়ত। কিন্তু বাংলাদেশের সেক্যুলার দলগুলির অপরাধ, তারা অপরাধের সংজ্ঞাই পাল্টে দিয়েছে। দেশটির কুফরি আইনে ব্যাভিচার,জ্বেনা বা পতিতাবৃত্তি কোন অপরাধ নয়। অপরাধ নয় সূদ ও ঘুষ খাওয়া।অপরাধ নয় মিথ্যা কথা বলা বা মিথ্যা বলে কাউকে প্রতারিত করা। বরং সে প্রতারণার কাজটি সবচেয়ে বেশী করে রাজনৈতিক নেতাগণ। নির্বাচন কালে প্রতারণা করাটি একটি শিল্পে পরিণত হয়। আট আনা সের চাউল খাওয়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে মুজিব তাই দুর্ভিক্ষ উপহার দিয়েছিলেন। সে ব্যর্থতার জন্য মুজিবের বিবেকে কোন দংশন হয়নি, কোনরূপ শরমও হয়নি। আওয়ামী লীগের আজকের নেতারাও মুজিবের সে সীমাহীন ব্যর্থতা নিয়ে লজ্জিত নয়। বরং মুজিবের এরূপ ধোকাবাজি তাদের কাছে গণ্য হয় সেক্যুলার রাজনীতির অনিবার্য কালচার রূপে। একই অবস্থা মুজিবকন্যা শেখ হাসিনার। ২০০৮ সালে ভোট নিয়েছেন ঘরে ঘরে চাকুরি দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে। কিন্তু সে প্রতিশ্রুতি পূরণ নিয়ে কোন ভাবনার লেশ মাত্রও কি তো মধ্যে দেখা গেছে। হাসিনার কাছে অপরাধ নয় নিরপরাধ মানুষকে নির্যাতন করা এবং তাদের খুন করা। বরং এরূপ নৃশংস বর্বরতাগুলো তার কাছে গণ্য হয়েছে রাজনীতির কালচার রূপে। তাই শাপলা চত্বরে শত শত মানুষকে খুন, গুম ও আহত করা হলেও কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণে সেঞ্চুরি করার উৎসব হলেও সে ঘৃণ্য অপরাধীকে হাসিনা গ্রেফতার করেনি। অপরাধীগণ নিজ দলের হলে তাদের শাস্তি দেয়া দূরে থাক পরিচর্যা দেয়াই হয় তখন সরকারের নীতি। সে নীতির প্রয়োগ করতে গিয়ে হাসিনার সরকার তার দলীয় দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে আনীত হাজার হাজার ফৌজদারি মামলা তুলে নিয়েছেন। দলীয় প্রেসিডেন্টকে দিয়ে শাস্তি মাফ করে দিয়েছেন আদালতে শাস্তিপ্রাপ্ত  বহু খুনিকে। “আ’মিরু বিল মা’রুফ ওয়া নেহী আনিল মুনকার’ অর্থাৎ “ন্যায়ের নির্দেশ দান এবং অপরাধীর নির্মূল” এ কোরআনী নির্দেশের বিরুদ্ধে এর চেয়ে বড় অবাধ্যতা আর কি হতে পারে?

 

অপরিহার্য হলো অপরাধীদের নির্মূল

কোন দেশের স্বাধীনতা ও সভ্যতার মূল শত্রু সে দেশের চোর-ডাকাত নয়। চোর-ডাকাতদের লোভটি মানুষের অর্থের দিকে, দেশের স্বাধীনতা ও সংহতির বিরুদ্ধে নয়। ফলে তাদের কারণে কোন দেশ পরাধীন হয় না। খন্ডিতও হয় না। ১৭৫৭ সালে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশদের হাতে যখন বাংলা অধিকৃত হয় সেটি চোরডাকাদতের কারণে হয়নি, হয়েছে মীর জাফরদের ন্যায় অপরাধী রাজনীতিবিদদের কারণে। রাজনৈতিক অপরাধীগণই সুযোগ পেলে দেশের মানচিত্রে ও স্বাধীনতায় হাত দেয়। অথচ আজ এরূপ ভয়ংকর অপরাধীদের হাতেই বাংলাদেশ অধিকৃত। আর দেশ অপরাধীদের হাতে অধিকৃত হলে তখন নৃশংস হামলা শুধু জনগণের জানমালের উপরই হয় না। তখন বিপন্ন হয় দেশের স্বাধীনতা, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও অর্থনীতিও। রাষ্ট্রীয় কোষাগার, ব্যাংক, শেয়ার মার্কেট ও রাষ্ট্রমালিকানাধীন কলকারখানা লুন্ঠিত হওয়ার পাশাপাশি তখন জনগণও পথে ঘাটে লাশ হতে ও গুম হতে শুরু করে। পুলিশ, আর্মি, আাদালত ও প্রশাসনের কর্মচারিগণ তখন অত্যাচারের হাতিয়ারে পরিণত হয়। বাংলাদেশে তো আজ সেটাই সর্বস্তরে হচ্ছে। তাই ঢাকার শাপলা চত্বরে শত শত মানুষ যাদের হাতে লাশ হলো ও আহত হলো তারা আন্ডার ওয়ার্ল্ডের খুনি নয়। তারা জনগণের রাজস্বের অর্থে প্রতিপালিত পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব ও সেনাবাহিনীর সদস্য। এবং তারাই নিরীহ জনগণের উপর গুলি চালানোর কাজে সরকারের পক্ষ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত।যখন সে দায়িত্বটি নৃশংস ভাবে পালিত হয়, তখন শাসকশ্রেণী প্রচন্ড খুশি হয় এদের উপর এবং ভাবনা শুরু হয় কিভাবে তাদেরকে পুরস্কৃত করা যায় -তা নিয়ে।

নিজ দলের ডাকাতদের হাতে মানুষ খুন হলে ডাকাত সর্দার তার বিচার করে না। কারণ সে কাজের জন্যই সর্দারের পক্ষ থেকে সে নির্দেশপ্রাপ্ত। একই নীতি হয়েছে হাসিনা সরকারের। ফলে পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব ও সেনাবাহিনীর সদস্যদের হাতে হাজার হাজার মানুষ লাশ হলেও সরকার সে হ্ত্যাকান্ডের অভিযোগে কোন অপরাধী খুনিকে হাজতে তোলেনি। আদালতে তুলে তাদের বিচারও করেনি। পুলিশের হাতে যখন দুয়েকজন মানুষ খুন হয় তখন সে খুনে সরকারের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে কিছুটা সন্দেহ থাকে। সেটি পুলিশের বাড়াবাড়ি মনে হতে পারে। কিন্তু তাদের হাতে যখন শত শত মানুষ খুন ও ঘুম হয় এবং সে খুন ও গুম নিয়ে যখন বিচার বসে না, তখন তাতে সরকারের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে কি সন্দেহ থাকে? বাংলাদেশে এরূপ সরকারি খুনিরা শত শত বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের হত্যা করেছে। কিন্তু সে অপরাধে কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। বরং সরকারের কাজ হয়েছে, সবচেয়ে নৃশংস হত্যাকারিকে ও নির্যাতনকারিদের বেছে বেছে প্রমোশন দেয়া। মুজিব আমলে ৩০ থেকে ৪০ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। কিন্তু সে অপরাধে কাউকে শাস্তি দেয়া দূরে থাক, ডেকে জিজ্ঞেসও করা হয়নি কেন নিরাপরাধ মানুষকে হত্যা করলো?

স্বৈরাচারি সরকারের এজেন্ডা জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দেয়া নয়, বরং সেটি নিজের নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করা। সেটি করতে গিয়ে নিজের নিরপত্তায় নিয়োজিত বাহিনীকে হত্যা ও নির্যাতনের লাইসেন্স দেয়। দুর্বৃত্ত সরকার বেঁচে থাকে সেরূপ হত্যা ও নির্যাতনের উপর ভর করেই। কোন সভ্যদেশ এমন অপরাধী চক্র দ্বারা অধিকৃত হলে সে দেশের নাগরিকগণ মুক্তির লক্ষ্যে লড়াই করে। ইসলামে সে লড়াইটি নিছক রাজনীতি নয়, সেটি জিহাদ। ধর্মীয় ভাবে সেটি ফরজ। দেশের মানুষ কতটা সভ্য, কতটা আত্মসম্মানী ও কতটা ঈমানদার -সে বিচারটি হয় সে অপরাধী শাসকচক্রের বিরুদ্ধে নির্মূলের আয়োজন দেখে। অথচ সে ভাবনা গরুছাগলের থাকে না। স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে তাদের মাঝে প্রতিবাদও উঠে না। গরুছাগলের এজেন্ডাটি তো ঘাসপাতা খেয়ে বাঁচা। কিন্তু সভ্য মানুষ শুধু পানাহার, ঘর-সংসার নিয়ে বাঁচে না। তারা দেশকে সভ্যতরও করতে চায়। আর ফেরাউন-নমরুদ, আবু লাহাব-আবু জেহেলদের মত দুর্বৃত্তদের শাসনক্ষমতায় বসিয়ে কি দেশকে সভ্য করা সম্ভব? দেশ তখন দূর্নীতি, অসভ্যতা ও ভিক্ষাবৃত্তিতে বিশ্ব রেকর্ড গড়ে। যেমনটি মুজিব আমলে ও হাসিনার আমলে বাংলাদেশের ললাটে জুটেছে। তাই এমন দুর্বৃত্ত শাসকদের থেকে মুক্তিলাভ সমাজের সভ্য মানুষদের এক বড় দায়বদ্ধতা। স্রেফ নামাজ-কালাম ও হজ-যাকাত পালনে সে সভ্যতা নির্মিত হয় না বলেই আল্লাহতায়ালা জিহাদকেও ফরজ করেছেন।

স্বৈরাচারি শাসকদের নির্মুলকর্মটি তাই নিছক মানবাধিকার নয়। স্রেফ রাজনৈতিক ইস্যুও নয়। বরং প্রতিটি সভ্য নাগরিকের এক গভীর দায়বদ্ধতা। এমন একটি অধিকারের প্রতিধ্বনি করে বলিষ্ঠ বক্তব্য রেখেছেন ফ্রান্সের প্রখ্যাত লেখক Guy de Maupassant। মোপাসাঁ লিখেছেন, “Since governments take the right of death over their people, it is not astonishing if the people should sometimes take the right of death over governments.”। অর্থঃ “সরকার যখন তার নিজদেশের নাগরিকদের হত্যা করার অধিকারকে নিজ হাতে নেয়, তখন এটিও অবাক হওয়ার বিষয় নয় যে, জনগণেরও উচিত সে সরকারের হত্যার অধিকারটিও নিজ হাতে তুলে নেয়া”।১৭৮৯ সালে বিখ্যাত ফরাসী বিপ্লব ঘটেছিল তো তেমন এক দায়বদ্ধতা থেকেই। সে দায়বদ্ধতা থেকে বিপ্লব এসেছে ইরানেও। একের পর এক বিপ্লব আসছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতে। ইংরেজরাও সে চেতনা নিয়ে তাদের রাজা চার্লসের গর্দান কর্তন করেছিল।

 

অপরিহার্য হলো মুরতাদের শাস্তি

প্রশ্ন হলো, আবু জেহেল ও আবু লাহাবদের বাস কি বাংলাদেশে কম? দেশটিতে যারা আল্লাহর শরিয়তি নিজামের প্রতিষ্ঠাকে অসম্ভব করে রেখেছে তারা কি কম নৃশংস? এ রাষ্ট্রীয় অপরাধীদের হাতে যে শুধু আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হচ্ছে তা নয়, তাদের হাতে লাশ হচ্ছে ইসলামের পক্ষের শক্তির নেতাকর্মীরাও। লাশ হচ্ছে রাজপথে ধর্না দেয়া নিরস্ত্র মুসল্লিরা। তাদের লাশগুলোকে ময়লার গাড়িতে ফেলা হচ্ছে ও সে সাথে বহু লাশকে গায়েবও করা হয়েছে। যেমনটি গত ৬ই মে ২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে হলো। প্রশ্ন হলো, নবীজীর আমলে আল্লাহর শরিয়তী আইনের বিরুদ্ধে কেউ বিদ্রোহ ও অবাধ্যতার আওয়াজ তুললে তার মাথাটিকে কি দেহের উপর থাকতে দেয়া হতো? অথচ দেশের আওয়ামী সেক্যুলারিস্টদের রাজনীতির ভিত্তি হলো শরিয়তের বিরোধীতা করা। প্রশ্ন হলো, শরিয়তের এমন বিরোধীরা হাজার বার হজ-ওমরাহ করলে বা সারা জীবন নামাজ পড়লেও কি মুসলমান থাকে? মুরতাদ হওয়ার জন্য আল্লাহর শরিয়তের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হওয়াই কি যথেষ্ট নয়? হযরত আবু বকরের সময় কিছু লোকেরা রাষ্ট্রীয় ভান্ডারে যাকাত দিতে অস্বীকার করেছিল। সে অপরাধের কারণে তারা মুরতাদ রূপে ঘোষিত হয়েছিল এবং তাদের বিরুদ্ধে হযরত আবু বকর (রাঃ) যুদ্ধ শুরু করেছিলেন। আর যুদ্ধ তো শত্রুর কপালে চুমু দেয়ার জন্য হয় না। আবর্জনাকে ক্ষণিকের জন্যও ঘরে স্থান দেয়া ভদ্রতা নয়, স্বাস্থের জন্য সহায়কও নয়। তেমনি ভদ্রতা নয় আল্লাহর অবাধ্য অপরাধীদের রাষ্ট্রে স্থান দেয়া। কারণ তাতে রাষ্ট্রে পচন ধরে। অথচ বাংলাদেশ আজ এ অপরাধীদের রমরমা ভাব, রাষ্ট্র বরং তাদের হাতেই অধিকৃত।

সভ্যতার পরিমাপে নবী(সাঃ) ও তাঁর সাহাবায়ে কেরামের যুগই হলো সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ যুগ। তাদের সে শ্রেষ্ঠতার কারণ এ নয় যে, সে আমলে পিরামিড, তাজমহল বা চীনের প্রাচীর নির্মিত হয়েছিল। বা বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক আবিস্কার ঘটেছিল। বরং সে শ্রেষ্ঠত্ব বিপুল সংখ্যক মানুষের অতি উচ্চতর মানবিক পরিচয় নিয়ে বেড়ে উঠায়। পিরামিড বা তাজমহল নির্মিত না হলেও সে সময় অতি উচ্চমানের অসংখ্য মানুষ নির্মিত হয়েছিল। মানব জাতি আর কখনোই এতবড় সভ্যতার জন্ম দিতে পারিনি। বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় ৫০ গুণ বৃহৎ রাষ্ট্রের খলিফা তখন ভৃত্যকে উঠের পিঠে চড়িয়ে নিজে রশি ধরে টেনেছেন। মানুষে মানুষে সমতা ও মানবাধিকারের নীতিকথা নিয়ে বড় বড় বই লেখা হয়েছে। কিন্তু মানব ইতিহাসের কোন কালে একটি মুহুর্তের জন্যও কি এরূপ ঘটনা ঘটেছে? এ বিপ্লব একমাত্র ইসলামের। তখন প্রতি জনপদে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল “আ’মিরু বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার” এর কোরআনী নির্দেশ। তখন মানুষ পেয়েছিল সিরাতুল মোস্তাকীমের সন্ধান এবং নিয়োজিত হয়েছিল সে পথ বেয়ে জান্নাতের পথে বিরামহীন পথচলায়। জান্নাতের পবিত্র মানুষদের তখন দেখা যেত শুধু মসজিদ মাদ্রাসায় নয়, বরং পথেঘাটে, লোকালয়ে, হাটে-বাজারে, প্রশাসনে, রাজনীতি ও যুদ্ধবিগ্রহে। পাপাচারিদের দ্বারা দেশ অধিকৃত হলে কি সেটি আশা করা যায়? তখন শুধু পথঘাট নয়, রাষ্ট্রের প্রশাসন, আদালত, পুলিশ, সেনাবাহিনী ও রাজনীতির প্রতিটি অঙ্গণ ভরে উঠে আল্লাহর অবাধ্য জাহান্নামীদের দিয়ে। এরূপ আল্লাহদ্রোহী জাহান্নামীদের বৈশিষ্ঠ হলো, তারা সামর্থ হারায় সৎকর্মের। এবং সামর্থ পায় বীভৎস কুকর্মের। বাংলাদেশ তো তাদের কুকর্মের কারণেই দুই শতাধিক রাষ্টকে হারিয়ে ৫বার দুর্নীতিতে বিশ্বে প্রথম হয়েছে।

 

অপরাধ মানব-উন্নয়নকে অসম্ভব করার

সভ্যতার গুণাগুণ বিচারে মূল বিচার্য বিষয়টি হলো, মানবিকতায় মানুষ কতটা এগুলো সেটি। যান্ত্রিক বা কারিগরি উন্নয়ন নয়। কৃষি বা স্থাপত্যে উন্নয়নও নয়। অপরাধীদের হাতে রাষ্ট্র বা সমাজ অধিকৃত হলে সে মানব-উন্নয়নের কাজটি পুরাপুরি অসম্ভব হয়ে পড়ে। সেটি যেমন ফিরাউন-নমরুদ ও আবু-জেহেল-আবু-লাহাবদেরর আমলে অসম্ভব হয়েছিল, তেমনি আজ অসম্ভব হয়ে পড়েছে বাংলাদেশে। সংক্রামক রোগের ন্যায় পাপকর্মও ছোঁয়াচে। পাপীরা ক্ষমতায় গেলে সে রোগ তখন বেশী বেশী ছড়ায়। দুর্বৃত্তিতে দেশটির বিশ্বরেকর্ড গড়ার কারণ এ নয় যে, দেশটির গ্রামগঞ্জ ও বস্তিগুলি চোর-ডাকাতের দখলে গেছে। বরং এজন্য যে, ভয়ানক অপরাধীদের দখলে গেছে দেশের রাজনীতি, প্রশাসন, শিক্ষাসংস্কৃতি, পুলিশ ও আদালত। মুসলমানদের আজকের অধঃপতনের কারণ, মুসলিম সমাজ থেকে ক্ষতিকর আবর্জনা সরানোর কাজটি বন্ধ হয়ে গেছে। বরং বেড়েছে তাদের প্রতিপালনের কাজ। এবং সেটি রাজস্বের অর্থে।

মুর্তিপুজারিদের ধর্ম হলো মন্দিরের সবচেয়ে বড় মুর্তিটাকে বেশী বেশী পুজা দেয়া। বাংলাদেশের সেক্যুলারিস্টদের রাজনীতির মূল নীতিটি হলো দেশের অপরাধমূলক রাজনীতির সবচেয়ে বড় নায়ককে জাতির পিতার আসনে বসানো।প্রশ্ন হলো, সেক্যুলারিস্ট পুজারীগণ সেটি মেনে নিতে পারলেও কোন ঈমানদার কি এমন ব্যক্তিকে সামান্য ক্ষণের জন্যও সন্মান দেখায়? আর তাতে কি তার ঈমান বাঁচে? পথভ্রষ্ট বেঈমান ব্যক্তিগণ যে শুধু সিরাতুল মুস্তাকীম চিনতে ব্যর্থ হয় তা নয়। তারা ব্যর্থ হয় সৎ নেতা চিনতেও। তাদের পথভ্রষ্টতা পদে পদে। বাংলাদেশের মানুষের সে ব্যর্থতাটা ধরা পড়ে শুধু শরিয়তের অনুসরণে নয়, যোগ্য নেতা চেনার ক্ষেত্রেও। নইলে মুজিবের নয় গণতন্ত্র-দুষমন ও বিদেশের সেবাদাস ব্যক্তিটি এত জনপ্রিয়তা পায় কি করে? হাসিনা ও তার দুর্বৃত্ত দোসরগণই বা নির্বাচনে ভোট পায় কি করে? আর সে ভ্রষ্টতাটি এসেছে কোরআনী জ্ঞানের অজ্ঞতা থেকে। চোরডাকাতের দিনের আলোর ভয় পায়। ইসলামের শত্রুপক্ষ তেমনি ভয় পায় কোরআনী জ্ঞানের। ইসলামের শত্রুপক্ষ রাজনীতিতে নিজেদের প্রতিপত্তি টিকিয়ে রাখার স্বার্থে অজ্ঞতাকেই টিকিয়ে রাখতে চায়। এজন্যই গ্রামগঞ্জে পুলিশ, র‌্যাব ও দলীয় ক্যাডারদের নামানো হয়েছে ইসলামি পুস্তক বাজেয়াপ্ত করার কাজে। ইসলামের বিরুদ্ধে আওয়ামী সরকারেরও এটিও কি কম শাস্তিযোগ্য অপরাধ?    

যে অপরাধ মিথ্যাচারে

ইসলামে শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ শুধু খুন-ব্যাভিচার ও চুরিডাকাতি নয়। শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলো মিথ্যাচার। জাহান্নামে পৌছার জন্য মানুষ খুন বা ব্যাভিচার জরুরী নয়। মিথ্যাচারই সে জন্য যথেষ্ঠ।মিথ্যা কথা বলাকে নবীজী (সাঃ)সকল পাপের মা বলেছেন। তাই মিথ্যাচারিকে শাস্তি না দিলে রাষ্ট্র বা সমাজ থেকে পাপাচার বন্ধ হয় না। বাংলাদেশের মাটিতে বহু অপরাধির জন্ম। এদের কেউ খুনি, কেউ ব্যাভিচারি, কেউ মদ্যপায়ী, কেউ বা সন্ত্রাসী। কিন্তু মিথ্যাচারে তাদের কেউ কি শেখ হাসিনা ও আওয়ামী নেতা-কর্মীদের হারিয়ে দেয়ার সামর্থ রাখে? হাসিনার মিথ্যাচারের কিছু নমুনা দেয়া যায়। শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের বহু শত মানুষের নিহত, আহত ও গুম হওয়ার খবর বহু সাংবাদিক লিখেছেন। সরকারি মুখপাত্রগণও নিহত হবার খবর দিয়েছেন। কিন্তু হাসিনার বলেছেন “সেই (৫ মে) দিন কোনো গোলাগুলি বা সেরকম কোনো ঘটনাই ঘটেনি। তারা সেখানে গায়ে লাল রঙ মেখে পড়ে ছিল। পরে পুলিশ যখন তাদের ধরে টান দেয়,দেখা গেল উঠে দৌড়াচ্ছে।দেখা গেল লাশ দৌড় মারল।” হাসিনার এ বক্তব্যটি বাংলাদেশের প্রায় সবগুলো পত্রিকাতেই প্রকাশ পেয়েছে।  এ বক্তব্যটি তার মিথ্যাচারের দলীল। যে কোন সভ্য দেশের আইনে এরূপ মিথ্যা সাক্ষি দেয়া ফৌজদারি অপরাধ। সে রাতের প্রকৃত সত্যটি হলো, সেদিন প্রচন্ড গোলাগোলি হয়েছিল। গোলাগোলিতে বহু শত মানুষ হতাহত হয়েছে। শহীদ হওয়া ব্যক্তিদের লাশগুলো সেদিন হাসিনার কথা মত দৌড় মারেনি, বরং সেখানেই রক্তাত্ব নিথর দেহ নিয়ে পড়ে ছিল। সরকারি প্রেসনোট দাতারাও সে লাশগুলো দেখেছে। অনেক দেখেছে সে লাশগুলোকে ময়লার গাড়িতে তুলতে। অতএব এরূপ উদ্ভট মিথ্যা তথ্য দেয়ার জন্য শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ তথ্যপ্রযুক্তির আইনে বিচার ও সে বিচারে সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত। ১২ই মে তারিখে দৈনিক যুগান্তর রিপোর্ট করে, “পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবীর ৭ হাজার ৫ শত ৮৮ জন এ হামলায় অংশ নিয়েছিল। হামলাকারিদের মধ্যে ১৩০০ জন এসেছিল র‌্যাব থেকে। ৫,৭১২ জন এসেছিল পুলিশ বাহিনী থেকে এবং ৫৭৬ জন এসেছিল বিজিবী থেকে। হামলা শুরু হয় রাত আড়াইটার সময় এবং তিন দিক দিয়ে। দৈনিক যুগান্তর লিখেছে, সমগ্র এলাকাটি সে সময় বন্দুকের গুলি, টিয়ারগ্যাসের শেল ও ধোয়াতে পূর্ণ হয়ে যায়। পত্রিকাটি বিবরণ দিয়েছে, সেপাইদের পাশে হামলাতে অংশ নেয় ৫ জন কমান্ডো অফিসার।

হাসিনার দাবী, ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালে তার শাসনামলটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণযুগ। এ কথা বলে তিনি ভুলিয়ে দিতে চান যে, তার আমলে দূর্নীতি বাংলাদেশের প্রথম হওয়ার অপমান। হাসিনার কাছে বাংলাদেশের সেরা শাসক হলেন তার পিতা। অথচ তার বাকিশালী পিতার শাসনামলে কবরস্থ হয়েছিল গণতন্ত্র। নেমে এসেছিল ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ যাতে নিহত হয়েছিল বহু লক্ষ মানুষ। বন্ধ হয়ে যায় শত শত কলকারখানা।তার পিতাকে তিনি বলেন স্বাধীনতার জনক। এটিও কি কম মিথ্যাচার? তবে কি ১৯৪৭ সালে ১৯৭১ সাল অবধি কি বাংলাদেশ কি তবে পরাধীন গোলাম দেশ ছিল? আর গোলাম দেশে হলে কায়েদে আযমের মৃত্যুর পর ঢাকার খাজা নাজিমুদ্দীন রাষ্ট্রপ্রধান হন কি করে? বগুড়ার মুহম্মদ আলী ও আওয়ামী লীগ নেতা সহরোয়ার্দী সে দেশের প্রধানমন্ত্রী হন কি করে? ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে যেসব হাজার হাজার বাঙালী সৈন্য ভারতের বিরুদ্ধে লড়লো এবং অনেকে প্রাণও দিল -সেটি কি পাকিস্তানী ঔপনিবেশিক শাসনকে প্রতিরক্ষা দিতে?

হাসিনা নসিহত করে হরতালের বিরুদ্ধে । হরতাল যে দেশের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর সে উপদেশও দেয়। এটিও কি কম ভন্ডামী? অথচ তিনিই বিএনপি আমলে ১৭৩দিনের হরতাল করেছেন। একটানা ৯৬ ঘন্টার হরতাল করেছেন। তার দলীয় কর্মীরা হরতাল চলাকালে গানপাউডার দিয়ে ১১ জনকে পুড়িয়ে হত্যা করেছিল। প্রচন্ড ভন্ডামি হয়েছে সর্বদলীয় সরকারের নামে। সর্বদলীয় সরকারের নামে সরকার গঠিত হয়েছে মাত্র ৪টি দল থেকে। অথচ বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলের সংখ্যা বহু। কিন্তু হাসিনার সর্বদলের সংজ্ঞায় পড়ে মাত্র আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, জাসদ ও ওয়াকার্স পার্টি -এ চারটি দল। গণতন্ত্রের নামে তেমনি একটি মশকরা করেছিল হাসিনার পিতা শেখ মুজিবও। মুজিবের কাছে একদলীয় বাকশাল ছিল গণতন্ত্র। আর সকল বিরোধী দলীয় পত্রিকাকে বদ্ধ করাটি ছিল বাকস্বাধীনতা। বাংলাদেশের বুক দিয়ে ব্রিটিশ যুগ গেছে। পাকিস্তান আমলের ২৩ বছরও গেছে। কিন্তু গণতন্ত্রের নামে এতবড় ধাপ্পাবাজী কি কোনকালেও হয়েছে?

 

অপরাধ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে

যুদ্ধ প্রতিদেশেই রক্তপাত ডেকে আনে। একাত্তরের যুদ্ধে পাকিস্তানী ও ভারতীয় বাহিনীর রণক্ষেত্রে পরিণত হয় বাংলাদেশ। সে যুদ্ধে বহু বাঙালী যেমন প্রাণ হারিয়েছে, তেমনি প্রাণ হারিয়েছে বহু অবাঙালীও। সেটি যেমন পাকিস্তানী বাহিনী ও সহযোদ্ধাদের হাতে তেমনি ভারত ও তার সহযোদ্ধা মুক্তিবাহিনীর হাতে। যে কোন যুদ্ধে মূল যুদ্ধটি করে সেনাবাহিনীর লোকেরা। কারণ তাদের হাতেই থাকে সর্বাধিক মারণাস্ত্র। তাই যুদ্ধাপরাধের বিচার করতে হলে প্রথম ধরতে হয় তার জেনারেলদের। তাই নুরেমবার্গে অনুষ্ঠিত বিচারে যাদের শাস্তি দেয়া হয়েছিল তারা কেউ হিটলারের রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ছিল না। তারা ছিল সামরিক বাহিনীর অফিসার। কিন্তু হাসিনার সরকার পাকিস্তান ও ভারতীয় বাহিনীর অফিসারদের বিচারে তুলেননি। তার পিতা শেখ মুজিবও তোলেননি।  তাদের কাউকে ডেকে নিয়ে কোন প্রশ্ন পর্যন্ত করেননি। অথচ পাকিস্তানে সেনাবাহিনীর হাতে বহু নিরাপরাধ মানুষ মারা গেছে। তেমনে ভারতীয় বাহিনীর হাতে্ মারা গেছে। ভারতীয় বিমান বাহিনীর বোমা বর্ষণে ঢাকার একটি ইয়াতিম খানার শতাধিক আবাসিক ছাত্র নিহত হয়েছিল। সে খবর বিদেশী পত্রপত্রিকায় ছাপা হলেও আওয়ামী ঘরানার পত্রিকাগুলো তা কোনদিন ছাপেনি। অথচ সেটি ছিল ভয়ানক যুদ্ধাপরাধ। নিরস্ত্র রাজাকারদের ঢাকা স্টেডিয়ামে বেয়োনেট দিয়ে খুচিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। সে চিত্র বিদেশী পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। বাংলাদেশের আনাচে কাঁনাচে এভাবে হত্যা করা হয় বহু হাজার নিরস্ত্র রাজাকারকে। কয়েক লাখ অবাঙালীকে তাদের নিজ ঘরবাড়ী থেকে নামিয়ে পথে বসানো হয়। সেগুলি কি কম যুদ্ধাপরাধ? আজ একই ভাবে পথে ঘাটে গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে জামায়াত, শিবির ও বিএনপির নেতাকর্মীদের। এগুলিও কি কম অপরাধ? মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতদের শাস্তি দেয়ায় সরকারের সামান্যতম আগ্রহ থাকলে এ খুনিদের কেন বিচার হচ্ছে না? এসব আওয়ামী খুনিদের বিচার যে শেখ হাসিনার হাতে কোনকালেও হবে না তা নিয়েও কি সন্দেহ আছে?

বিচারে সুবিচার করতে হলে তাকে নিরপেক্ষ হতে হয়। কিন্তু যখন বেছে বেছে রাজনৈতিক শত্রুদের হাজতে তোলা হয় এবং তাদেরকে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন ও বিচার করা শুরু হয় -তখন সেটিকে কি আর বিচার বলা যায়? সেটি তো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা। সরকারের পক্ষ থেকে সে প্রতিহিংসার ঘটনা হলে সেটি ভয়ানক অপরাধ। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান তখন বিপন্ন হয়। সরকার এভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করছে। পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবী ও আওয়ামী লীগের দলীয় কর্মীবাহিনী রাজপথে বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের হত্যা করছে আর সরকার সেটি করছে আদালতের বিচারকদের দিয়ে। পার্থক্যটি কোথায়? পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর অফিসারগণ এখন আর আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক শত্রু নয়। ফলে তাদেরকে বিচারের কাঠগড়ায় তোলা হাসিনা সরকারের রাজনৈতিক লক্ষ্যও নয়। কিন্তু জামায়াতে ইসলামি এবং বিএনপির নেতা-কর্মীগণ তাদের রাজনৈতিক শত্রু। তাই তাদের নির্মূলটি আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের রাজনৈতিক লক্ষ্য। আর সে লক্ষ্য পূরণেই গঠিত হয় আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইবুনাল। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা কি মনে করে, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ বিচারের নামে এরূপ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বিষয়টি বোঝে না? শিশুরাও সেটি বুঝে। ফলে জামায়াতের প্রতি সাধারণ মানুষের সহানুভূতি বাড়ছে। সেটি বুঝা যায় তাদের মিছিল গুলোতে প্রচুর লোক সমাগম দেখে। সেটি বুঝেই তারা সুষ্ঠ নির্বাচনের বদলে ভোট ডাকাতিতে নামে।

গণতন্ত্রের পথে সবচেয়ে বড় বাধা এখন হাসিনা সরকার। সকল অপরাধী শক্তি এখন তার পক্ষ নিয়েছে। শুধু বাংলাদেশের মানুষই নয়, হাসিনা সরকারের ছলচাতুরি বিশ্ববাসীও বুঝে ফেলেছে। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন কোন থেকে এ বিচারের বিরুদ্ধে ধিক্কার শুরু হয়েছে। এতে আওয়ামী লীগ শুধু দেশের অভ্যন্তরে নয় বিদেশেও বন্ধুহীন হয়ে পড়েছে। ডুবু ডুবু হাসিনার একমাত্র রক্ষক এখন ভারত। প্রশ্ন হলো, ভারত একা কি শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের তলা ধ্বসে যাওয়া নৌকাকে আবার ভাসাতে পারবে? প্রচন্ড জন-উত্তালের মাঝে আওয়ামী লীগের ডুবন্ত নৌকা ভাসাতে আসলে তারা নিজেরাও যে ডুববে তা নিয়েও কি সন্দেহ আছে? এতে প্রচন্ড তীব্রতা পাবে বরং ভারতবিরোধীতা। তাতে প্রচন্ড লাভবান হবে বাংলাদেশের ইসলামের পক্ষের শক্তি এবং ক্ষতিগ্রস্ত হবে ভারত। ভারতের প্রখ্যাত ইংরেজী দৈনিকী “দি হিন্দু” ভারত সরকারকে তো সে হুশিয়ারিটিই শুনিয়েছে। ২৮/১১/১৩

 




কেন এতো ধর্ষণ বাংলাদেশে?

ফিরোজ মাহবুব কামাল

জ্বর কখনোই কোন সুস্থ্য দেহে আসে না। শরীরের উচ্চ তাপমাত্রাই বলে দেয় দেহে ম্যালেরিয়া, নিউমনিয়া, টাইফয়েড, কভিড বা অন্য কোন মারাত্মক ব্যাধি বাসা বেঁধেছে। জ্বর নিজেই কোন রোগ নয়, রোগের লক্ষণ মাত্র। তেমনি চুরি-ডাকাতি, ভোট-ডাকাতি, গুম-খুন, সন্ত্রাস ও ধর্ষণের ন্যায় অপরাধগুলোও কোন চরিত্রবান মানুষের জীবনে দেখা যায় না। এগুলো দেখা দিলে  বুঝা যায়, আক্রান্ত ব্যক্তির নৈতিক ব্যাধিটি কতটা তীব্র।সে তীব্র নৈতিক ব্যাধি ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ার কারণেই বাংলাদেশ এ শতাব্দীর শুরুতে পর পর ৫ বার দুর্বৃত্তিতে বিশ্বে প্রথম হয়েছিল। এখন ইতিহাস গড়ছে চুরি-ডাকাতি, ভোট-ডাকাতি, গুম-খুন, সন্ত্রাস ও ধর্ষণের ন্যায় মারাত্মক অপরাধে। দেশেটির এ গভীর দুর্দশা যে কোন বিবেকমান ব্যক্তিকেই ভাবিয়ে তুলতে বাধ্য।

প্যারাসিটামল খাওয়ালে জ্বর কমে যায়, কিন্তু তাতে রোগ সারে না। রোগ সারাতে হলে সঠিক রোগনির্ণয় জরুরী এবং সে অনুযায়ী চিকিৎসা জরুরী। তাই দেশে ধর্ষণের ন্যায় অপরাধ দমাতে হলে প্রথম জানতে হয় ধর্ষণ কেন হয় এবং সে কারণগুলি জানার পর সেগুলির মূলোৎপাটন করতে হয়। ধর্ষণ একটি ভয়ানক নৈতিক ব্যাধি। দৈহিক ও নৈতিক সত্ত্বার যোগফলেই মানুষ। খাদ্য-পানীয়তে দেহ বল পায় বটে, কিন্তু নৈতিক বল বাড়াতে হলে চাই জ্ঞান। চাই পরকালের ভয়। সমাজ ও রাষ্ট্র জুড়ে যখন চুরি-ডাকাতি, ভোট-ডাকাতি, গুম-খুন, সন্ত্রাস ও ধর্ষণের ন্যায় অপরাধে প্লাবন আসে তখন বুঝা যায় সে সমাজে জ্ঞানদানের কাজটি যথাযত হয়নি। পরকালের ভয়ও তেমন স্থান পায়নি। শুধু স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় গড়লেই জ্ঞানদান হয় না এবং চরিত্রও গড়ে উঠে না। ডিগ্রিদান ও জ্ঞানদান এক কথা নয়। বরং দেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলি কতজন অসভ্য মানুষকে সভ্য করলো, কতজনের চরিত্রে নৈতিক বল যোগ করলো এবং কতজনকে পাপাচার থেকে ফিরালো -তা দিয়েই বিচার হয় শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্য। এক্ষেত্র বাংলাদেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ব্যর্থতা বিশাল। অতিশয় পরিতাপের বিষয় হলো, অসভ্য মানুষকে সভ্য করা, চরিত্রে নৈতিক বল জোগানো, ও পাপাচার থেকে ফিরানো বাংলাদেশের শিক্ষানীতির আদৌও কোন লক্ষ্য নয়।

শিক্ষকগণ মনে করেন, প্রাথমিক স্তরে লিখতে, পড়তে ও হিসাব  কষতে শেখানোই তাদের মূল দায়িত্ব।কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যায়ে দেয়া হয়, কারিগরি, চিকিৎসা, কৃষি, আইন শাস্ত্র ও ইঞ্জিনীয়ারিংয়ের ন্যায় নানা বিষয়ে জ্ঞান। কিন্তু কোথাও চরিত্রে নৈতিক বল জোগানো, ও পাপাচার থেকে ফিরানোর কোন আয়োজন নাই। ফলে ব্যর্থতাগুলিও বিশাল। দুর্নীতি, চুরি-ডাকাতি, ভোট-ডাকাতি, গুম-খুন, সন্ত্রাস ও ধর্ষণের ন্যায় অপরাধের সাথে যারা জড়িত  তাদের কেউই মুর্খ বা নিরক্ষর নয়। তারা বনজঙ্গল বা ক্ষেত-খামার থেকেও উঠে আসেনি। তাদের সবাই স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তারা সার্টিফিকেট পেলেও বেড়ে উঠেছে মারাত্মক নৈতিক অপুষ্টি নিয়ে। তাদের মাঝে সৃষ্টি হয়নি পরকালের ভয়।

দৈহিক ভাবে বাঁচার জন্য নিয়মিত খাদ্য চাই। তেমনি খাদ্য চাই নৈতিক পুষ্টির জন্যও। নৈতিক পুষ্টির সে সেরা খাদ্যটি হলো ওহীর জ্ঞান তথা পবিত্র কোর’আনের জ্ঞান। তাই মানবকে মানব রূপে বেড়ে উঠার জন্য  মহান আল্লাহতায়ালা স্রেফ নানারূপ খাদ্যই দেননি, দিয়েছেন লক্ষাধিক নবী-রাসূলের মাধ্যমে ওহীর জ্ঞান। কোর’আন হলো ওহীর জ্ঞানের সর্বশেষ গ্রন্থ। এ জ্ঞান যেমন জান্নাতের পথ দেখায়, তেমনি বাঁচায় জাহান্নামের আগুন থেকেও। সৃষ্টি করে পরকালে জবাবদিহিতার ভয়। এবং সামর্থ্য জোগায় মানবিক গুণে বেড়ে উঠাতেও। প্রতিটি নরনারীর উপর ডাক্তার, ইঞ্জিনীয়ার বা বিজ্ঞানী হওয়া ফরজ নয়। ফরজ নয় এসব বিষয়ে জ্ঞান হাসিলও। কিন্তু প্রত্যেকের উপর নামায-রোযার ন্যায় যা ফরজ তা হলো পবিত্র কোর’আনের জ্ঞানার্জন। অক্সিজেন ছাড়া যেমন দেহ বাঁচে না, তেমনি কোর’আনের জ্ঞান ছাড়া ঈমানও বাঁচে না। তখন অসম্ভব হয় যেমন মুসলিম রূপে বেড়ে উঠা, এবং অসম্ভব হয় পাপাচার থেকে বাঁচা। সমাজ তখন পাপাচারি দুর্বৃত্তদের দিয়ে ভরে উঠে। বাংলাদেশে  তো সেটিই হয়েছে। পুলিশ দিয়ে বা  কিছু লোককে ফাঁসি দিয়ে এ নৈতিক ব্যাধি থেকে বাঁচা সম্ভব নয়। এ রোগের চিকিৎসায় আরো গভীরে যেতে হয়। বাঁচাতে হয় ব্যক্তির বিবেককে।

বাংলাদেশে স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি কাজ করছে বহু হাজার মাদ্রাসা। সেগুলিতে  ছাত্রদের  সংখ্যাও বহু লক্ষ। কিন্তু লক্ষণীয় হলো, ধর্ষণের অঙ্গণে মাদ্রাসার ছাত্রদের উপস্থিতটি বিরল। হেতু কি? কারণ, মাদ্রাসার ছাত্রদের রয়েছে কোর’আনের সাথে সংশ্রব। এ হলো কোর’আনী জ্ঞানের বিশাল সুফল। কোর’আনী জ্ঞান ব্যক্তির মনে ভ্যাকসিনের কাজ করে। দেয় পাপাচারের বিরুদ্ধে নৈতিক প্রতিরোধের ক্ষমতা। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ঘটছে উল্টোটি। স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষানীতিতে কোর’আনী জ্ঞানচর্চার কোন ব্যবস্থা নাই, বরং রয়েছে কোর’আন থেকে দূরে সরানোর আয়োজন। রয়েছে সেক্যুলারিজমের প্রবল আধিপত্য। ফলে এসব সরকারি প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীগণ ছাত্রজীবন শেষ করছে পবিত্র কোর’আনের একটি আয়াত না বুঝেই। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি পরিণত হয়েছে শয়তানের হাতিয়ারে। এখানে ভ্যাকসিন দেয়া হয় ছাত্রছাত্রীদের মনে ইসলামের প্রবেশ ঠেকাতে। এর ফলে এসব ছাত্র-ছাত্রীরা বিপুল সংখ্যায় বেড়ে  উঠছে শয়তানের এজেন্টরূপে। এরাই ১৯৭১’য়ে ভারতে কোলে গিয়ে উঠেছিল এবং ভারতের অস্ত্র নিয়ে মুসলিম বিরোধী ভারতীয় এজেন্ডা পূরণে যুদ্ধে নেমেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইসলামের পক্ষে কথা বললে এসব এজেন্টদের হাতে তাই খুন হতে হয়। ইসলামপ্রম, দেশপ্রেম ও সত্য কথা বলার সাহস থাকাটিও তাদের  কাছে হত্যাযোগ্য অপরাধ। নির্মম অত্যাচারে আবরার ফাহাদ লাশ হয়েছে তো এদের হাতেই। এরাই দেশে চুরি-ডাকাতি, ভোট-ডাকাতি, গুম-খুন, সন্ত্রাস ও ধর্ষণে বিপুল বিক্রম দেখাচ্ছে। তাই ধর্ষণে সেঞ্চুরির উৎসব এশিয়া ও আফ্রিকার কোন নিভৃত জঙ্গলে না হলেও সেটি হয় বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে।যেমনটি শেখ হাসিনার প্রথমবার ক্ষমতায় আসাতে হয়েছিল জাহাঙ্গির নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নব্বইয়ের দশকে। বিস্ময়ের বিষয় হলো, ক্যাম্পাসে ঘোষণা দিয়ে সে বর্বর কান্ডটি ঘটালেও সরকারের পক্ষ থেকে সে ধর্ষককে কোন রূপ শাস্তি দেয়া দেয়া হয়নি।

মানব শিশুকে মানব রূপে বেড়ে উঠতে হলে সব সময় বাঁচতে হয় এক পরিশুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। এ পরিশুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়ার গুরুত্ব বুঝাতে মহান আল্লাহতায়ালা সুরা আশ শামসে ৭ বার কসম খেয়েছেন। পবিত্র কোর’আনের আর কোথাও মহান আল্লাহতায়ালা এভাবে একের  পর এক সাতবার কসম খাননি। কসম শেষে ঘোষণা দিয়েছেন, “ক্বাদ আফলাহা মান যাক্কাহা।” অর্থঃ সে ব্যক্তিই নিশ্চিত কল্যাণ পেল যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করলো। এ পরিশুদ্ধিটি বস্তুতঃ ব্যক্তির আত্মিক, নৈতিক, চারিত্রিক ও কর্মের পরিশুদ্ধি। এ পরিশুদ্ধি করণ প্রক্রিয়াকে আরবীতে বলা হয় তাহজিব। তাহজিবকে সংস্কৃতি বললে তার পূর্ণ অর্থ প্রকাশ পায় না।তাহজিব শব্দটির উৎপত্তি হাজ্জাবা ক্রিয়াপদ থেকে। হাজ্জাবা শব্দের অর্থ হলো পরিশুদ্ধ করা। ব্যক্তির জীবনে এ পরিশুদ্ধি খাদ্য,পানীয় বা সম্পদে আসে না, আসে কোর’আনী জ্ঞানে। যান্ত্রিক পরিশুদ্ধির মাধ্যমে ক্ষেতের আঁখ চিনিতে পরিণত হয়; তেমন কোর’আনী জ্ঞানের মধ্য দিয়ে যে পরিশুদ্ধি আসে তাতে একজন জাহেল ব্যক্তিও ফেরেশতাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ হতে পারে। এরই উদাহরণ হলো, হযরত ওমর বিন খাত্তাব (রাঃ)। তিনি নবীজী (সাঃ)কে খুন করার জন্য তরবারি নিয়ে বের হয়েছিলেন। কিন্তু সদ্য মুসলিম হওয়া নিজ বোনের গৃহের দরজায় দাঁড়িয়ে পবিত্র কোর’আনের কয়েকটি আয়াতের তেলাওয়াত শুনে মুসলিম হয়ে গিয়েছিলেন। তার জীবনে সে বিপ্লবটি এতোই গভীর ছিল যে, তিনি যখন খলিফা হন তখন চাকরকে উঠের পিঠে চড়িয়ে নিজে রশি ধরে টেনেছেন। প্রজারা খাদ্যের অভাবে আছে জানলে নিজেও পেট ভরে আহার করতেন না। মাঝ রাতে না ঘুমিয়ে খাদ্যের বস্তা নিজ কাঁধে চাপিয়ে গরীবের ঘরে পৌছিয়ে দিয়েছেন। এরূপ বিপ্লব এসেছে বহু হাজার সাহাবীর জীবনে। এবং সেটি আত্মীক পরিশুদ্ধির ফলে। ফলে জন্ম নিয়েছে মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা।  নবীজী (সাঃ)র আগমনে আরবের আলোবাতাস বা খাদ্য-পানীয়ে কোন পরিবর্তন আসেনি। বরং মহাপ্লাবন এসেছিল কোর’আনী জ্ঞানে। এবং তাতে বিলুপ্ত হয়েছিল জাহেলিয়াতের অন্ধকার। সভ্য সমাজের নির্মাণে এটিই হলো মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশিত পথ।  

কিন্তু বাংলাদেশে সে তাহজিব বা বিশুদ্ধকরণ প্রক্তিয়াটি বিকল। বরং শিক্ষা ও সংস্কৃতির নামে আয়োজন বেড়েছে ভয়ানক  ভাবে চেতনা ও চরিত্রের দূষিতকরণের। শিক্ষাঙ্গণে যেমন নাই কোর’আনী জ্ঞানের অনুশীলন, তেমনি সাহিত্যের অঙ্গণে  নাই কোর’আনী জ্ঞান-সমৃদ্ধ বই-পুস্তক। বরং বাংলা সাহিত্যের ময়দানটি দখলে গেছে পৌত্তলিক কাফের ও সেক্যুলারিস্টদের হাতে। ফলে এ সাহিত্যে রয়েছে বিনোদনের সামগ্রী। রয়েছে যৌনতায়  উস্কানী দেয়ার  সামগ্রীও। কিন্তু  নাই চেতনায় পুষ্টি বা পরিশুদ্ধি  জোগানোর সামগ্রী। ফলে বাঙালীর জীবনে মানব রূপে বেড়ে উঠায় রয়ে গেছে বিশাল ব্যর্থতা। এ ব্যর্থতা নিয়ে রবিন্দ্রনাথের বেদনাও ছিল গভীর। তাই লিখেছেন, “হে বিধাতা, ৭ কোটি প্রাণীরে রেখেছো বাঙালী করে, মানুষ করোনি।” তবে রবিন্দ্রনাথও সাহিত্যের খাতিরে সাহিত্য রচনা করেছেন। ফলে তার সাহিত্যেও পরিশুদ্ধি তথা মানব রূপে বেড়ে উঠতে পুষ্টি জোগানোর উপকরণ সামান্যই। রবিন্দ্র সাহিত্যের প্রসার বাড়িয়েও কাজের কাজ তেমন হয়নি। মানব রূপে বেড়ে উঠার এ ব্যর্থতার কারণে এ শতাব্দীর শুরুতে দুর্বৃত্তিতে বিশ্বে ৫ বার প্রথম হওয়া বাংলাদেশের  জন্য এতটা সহজ হয়েছে। এবং এখন সম্ভব হচ্ছে চুরি-ডাকাতি, ভোটডাকাতি, খুন-গুম ও ধর্ষণে রেকর্ড গড়াও।

সর্বপ্রকার অপরাধ রোধ ও গণজীবনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মূল দায়িত্বটি সরকারের। সশস্ত্র ডাকাত, খুনি বা ধর্ষক দলের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সামর্থ্য কোন ব্যক্তিরই থাকে না। এ কাজটি বিশাল। এরূপ অপরাধীদের দমনে প্রতিটি সভ্য দেশেই বিশাল পুলিশ বাহিনী থাকে। থাকে প্রশাসন। থাকে আদালত। অথচ বাংলাদেশে সঠিক ভাবে কাজ করছে না এর কোনটিই। অথচ তাদের পালতে বিপুল অর্থের রাজস্ব দেয় জনগণ। বাস্তবতা হলো, কোন সভ্য দেশও অপরাধ মুক্ত নয়। এমন কি নবীজী (সাঃ)র আমলে অপরাধ হয়েছে। কিন্তু পার্থক্য হলো, প্রতিটি সভ্য দেশে সে অপরাধের শাস্তিও হয়েছে। কিন্তু অসভ্য দেশে সেটি ঘটে না। এজন্যই পবিত্র কোর’আন শুধু নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাতের বিধানই দেয় না, দেয় চোরদের হাত  কাটা এবং খুনি ও ধর্ষকদের হত্যারও নির্দেশও।

অপরাধীরা কখনোই নীতি কথায় বিশ্বাস করে না। পরকালের ভয়ও তাদের মাঝে কাজ করেন। তারা ভয় পায় একমাত্র পুলিশ ও আদালতকে। সে ভয়ই তাদের অপরাধ থেকে দূরে রাখে। তাই পুলিশ ও আদালত বিকল হলে তাদের ভয় করার কিছুই থাকে না। তখন সৃষ্টি হয় অপরাধ কর্মের জোয়ার। ফলে কোন দেশের রাষ্ট্রীয় প্রশাসন যখন অপরাধী চক্রের হাতে অধিকৃত হয় তখন সে দেশে অনিবার্য হয়ে উঠে অপরাধ কর্মের একটি ভয়ানক জোয়ার। কারণ অপরাধীদের দমন ও শাস্তিদান তখন সরকারের প্রায়োরিটিতে স্থান পায় না। বরং অপরাধীগণ স্থান পায় সরকারের শরিকদার রূপে। কারণ, এরাই তো সরকারের নিকটতম আদর্শিক আত্মীয়। বাংলাদেশে তো সেটিই ঘটেছে। দেশটিতে জনগণের রাজস্বের অর্থে প্রতিপালিত হচ্ছে একটি ভোটডাকাত সরকার। এ সরকারের মূল কাজ হলো, নিজের গদির নিরাপত্তা দেয়া। এবং লেশমাত্র ভাবনা নাই জনগণের জান-মাল ও ইজ্জতের নিরাপত্তা নিয়ে। প্রশাসন দখল করতে তারা পুলিশকে লাগাচ্ছে ভোটডাকাতিতে। এবং বিরোধীদের গুম ও খুন করতে ময়দানে নামিয়েছে দলীয় চোর-ডাকাত, ভোটডাকাত, খুন-গুমের সিদ্ধ নায়কদের। অথচ ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা পেলে ভোটডাকাতির অভিযোগে হাতকাটা বা প্রাণদন্ড হতো শেখ হাসিনা ও তার সাথীদের। ফলে এমন অপরাধী হাসিনা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় ও দুর্বৃত্ত দমনে সচেষ্ট হবে সেটি ভাবা যায়? ফলে হাসিনাকে ক্ষমতায় রেখে যারা গুম, খুন, সন্ত্রাস ও ধর্ষণমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখে তাদেরকে বেওকুফ বল্লেও কম বলা হয়। ১৪/১০/২০২০   

 




বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস ও ভোটডাকাতদের নাশকতা

দ্বি-মুখি হামলার মুখে জনগণ

ভয়ানক দ্বি-মুখি হামলার শিকার এখন বাংলাদেশের জনগণ। এক দিকে প্রাণনাশী করোনা ভাইরাসের মহামারি। অপরদিক ঘাড়ের উপর খাড়িয়ে ভোট-ডাকাতদের বিশাল ঘাতকদল। লাশ পড়ছে যেমন করোনা ভাইরাসে, তেমনি শত শত লাশ পড়ছে সরকারি দলের গুন্ডা, পুলিশ ও RAB এর খুনিদের হাতে। ফলে ভয়াবহ বিপদের মুখে এখন বাংলাদেশের জনগণ। এরূপ মহামারির মোকাবেলার সামর্থ্য আম জনগণের থাকে না। এটি এক বিশাল যুদ্ধ। এ যুদ্ধ এতই ভয়ংকর যে শিরকমুক্ত হয়ে নিহত হলে ইসলামে রয়েছে শহীদের মর্যাদা।এ যুদ্ধের মোকাবেলায় মার্কিন যুক্তরা্ষ্ট্রের ন্যায় বিশ্বশক্তিও হিমশিম খাচ্ছে। হিমশিম খাচ্ছে গ্রেট ব্রিটেন, ফান্স, রাশিয়া, ইটালী, স্পেন। প্রশ্ন হলো, এ মুহুর্তে বাংলাদেশ কি করবে? বাংলাদেশীদের জন্য মহাবিপদ এজন্য যে, দেশে দায়িত্বশীল কোন সরকার্ নেই। আছে এক ভোটডাকাত সরকার। ডাকাতদের কাজ তো ডাকাতি করা, তাদের কাছ থেকে কি জনকল্যাণ আশা করা যায়? 

সভ্য ও বিবেকবান মানুষের প্রধান গুণটি হলো, কিসে মানুষের কল্যাণ তা নিয়েই গভীর চিন্তা-ভাবনা করা এবং সে ভাবনা নিয়ে ত্বরিৎ ময়দানে নেমে পড়া। দেশ সভ্যতর ও সমৃদ্ধ হয় এমন বিবেকবান মানুষের কারণেই। কিন্তু চোর-ডাকাত ও ভোটডাকাতদের ন্যায় অপরাধীদের থেকে কি সেরূপ কিছু আশা করা যায়? যে অপরাধীদের কাজ চুরি-ডাকাতি, ভোটডাকাতি ও গুম-খুনের রাজনীতি, তাদের মানসিক বিকলাঙ্গতাটি বিশাল। তাদের থাকে না জনগণের কল্যাণ নিয়ে কিছু ভাবা ও কিছু করার সামর্থ্য। ক্যান্সারে পেট আক্রান্ত  হলে খাদ্যে রুচি থাকে না। তেমনি নীতি-নৈতিকতা মারা পড়লে, রুচি থাকে না সভ্য কাজে। ফলে জনগণের স্বাস্থ্য খাত, শিক্ষাখাত বা অন্য কোন জনকল্যাণ নিয়ে ভাবার রুচি চোর-ডাকাত ও ভোটডাকাতদের থাকে না। সভ্য কর্ম বাদ দিয়ে তারা বরং আবিস্কার করে দুর্বৃত্তির নতুন কৌশল। ২০১৮ সালে তেমনই এক অসভ্য আবিস্কার হলো নির্বাচন-পূর্ব রাতে ভোটডাকাতির কৌশল। ইতিহাসের বুকে বাংলাদেশ কোন সভ্য আবিস্কারে স্থান না পেলেও অবশ্যই বেঁচে থাকবে ভোটডাকাতির এ অসভ্য আবিস্কার নিয়ে। বিপদের আরো কারণ, বাংলাদেশ সে অসভ্যদের হাতেই আজ অধিকৃত। তাদের রাজনীতির মূল লক্ষ্য, যে কোন মূল্যে নিজেদের বাঁচানো, জনগণকে বাঁচানো নয়। সেটি বুঝা যায় তাদের রাজনীতির লক্ষ্য ও বিনিয়োগ দেখে।  

বাংলাদেশের ভোটডাকাতগণ কথা বলে ফেরেশতার ন্যায়। অথচ তাদের আসল চরিত্র কখনোই গোপন থাকার নয়। সেটি জানা যায়, কীভাবে তারা ক্ষমতায় এলো তা থেকে। জানা যায়, বাজেটের বিভিন্ন খাতে অর্থ বরাদ্দের দিকে নজর দিলে। রাজস্বের অর্থ জনগণের। ফলে জনগণের কল্যাণ নিয়ে যারা ভাবে, রাজস্বের অর্থ তারা ব্যয় করে জনগণের কল্যাণে। কোন নেতা বা নেত্রীর মৃত পিতা বা মাতার স্মৃতিকে বড় করতে নয়। জন-কল্যাণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাতটি হলো স্বাস্থ্য খাত। ফলে যারা জনগণের কল্যাণ নিয়ে ভাবে তারা জাতীয় বাজেটে সবচেয়ে বেশী বরাদ্দ রাখে স্বাস্থ্য খাতে। কারণ, এ খাতটি হলো জনগণকে মৃত্যু থেকে বাঁচানোর খাত। ফলে অন্য কোন খাত এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না। অধিকাংশ মানুষই নানা পেশায় নেমে নিজ পরিবারের ভরন-পোষনের দায়ভার নিজে পারে। কিন্তু নানা রোগ-ভোগে চিকিৎসায় খরচ বহনের সামর্থ্য সবার থাকে না। থাকে না প্রয়োজনীয় অর্থ। এ কাজটি তাই সরকারের। সরকার সে দায়ভার না নিলে গরীবদের বিনা চিকিৎসায় মারা যেতে হয়। তাই দেশের সরকার কতটা সভ্য, বিবেকমান ও দায়ত্বশীল  সেটি জানতে গবেষণার প্রয়োজন পড়ে না, বুঝা যায় জাতীয় বাজেটের স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেখে।

 

অবহেলিত স্বাস্থ্যখাত

বাংলাদেশের বাজেটের জনকল্যাণমুখি চরিত্র কতটুকু সেটির বিচার করা যাক। গ্রেট ব্রিটেনের জনসংখ্যা ৬ কোটি ৭০ লাখ। এ দেশটির বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ হলো ১৪০.৪ বিলিয়ন পাউন্ড। অপরদিকে বাংলাদেশের জনসংখ্য ১৭ কোটি যা গ্রেট ব্রিটেনের জনসংখ্যার আড়াই গুণ। বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দের পরিমাণ ২৯,৪৬৪ কোটি টাকা অর্থাৎ ২৯৪ বিলিয়ন টাকা। বর্তমানে পাউন্ডের মূল্য ১০০ টাকারও কিছু বেশী। অতএব স্বাস্থ্যখাতের বরাদ্দকৃত ২৯৪ বিলিয়ন টাকার পরিমাণটি ৩ বিলিয়ন পাউন্ডেরও কিছু কম। ৬ কোটি ৭০ লাখ জনগণের জন্য ১৪০.৪ বিলিয়ন পাউন্ড এবং ১৭ কোটি মানুষের জন্য ৩ বিলিয়নেরও কম। বাংলাদেশে মাথাপিছু স্বাস্থ্য বাজেট মাত্র ১৭ পাউন্ডেরও কাছাকাছি। অথচ বিলেতে সেটি ২ হাজার ৯৫ পাউন্ড।

বিষয়টি অন্যভাবে দেখা যাক। বাংলাদেশে অর্থভান্ডার গ্রেট ব্রিটেনের সাথে তূলনীয় নয়। কিন্তু তূলনা করা যেতে দেশ দুটির স্বাস্থ্য খাতের প্রায়োরিটির। সেটি বুঝা যায়, জিডিপি (Gross Domestic Product) ও  সর্বমোট বাজেটের কতটা স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় হয় -তা থেকে। বাজেট অর্থ বরাদ্দের পরিমান কম হতে পারে, কিন্তু তূলনামূলক বিচারে স্বাস্থ্য খাতের প্রায়োরিটি কখনোই কম পারে না। দেখা যাক,  জিডিপি’র কতটা ব্যয় হয় স্বাস্থ্য খাতে? গ্রেট ব্রিটেন তার জিডিপি’র ৭% খরচ করে স্বাস্থ্য খাতে।  বাংলাদেশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দিয়েছে জিডিপি’র মাত্র ১.০২%।  ব্যয়ের এ অনুপাতটি প্রতিবেশী ভারত, শ্রীলংকা, নেপাল ও পাকিস্তান থেকেও কম। ভারত ব্যয় করে জিডিপি’র ১.১৬% ৴এবং শ্রীলংকা ব্যয় করে ১.৫০%। তবে দক্ষিণ এশিয়ার বুকে সবচেয়ে বেশী বরাদ্দ নেপালের এবং দ্বিতীয় স্থানে পাকিস্তান । ২০১৬ সালে স্বাস্থ্য খাতে নেপাল ব্যয় করেছিল জিডিপি’র ৬.৩% এবং পাকিস্তান ব্যয় করেছিল তার জিডিপি’র ২.৭৫%। বাংলাদেশ ও ভারতের তুলনায় পাকিস্তানের জিডিপি ব্যয় ছিল দ্বিগুণ। নেপালের ছিল ৫ গুণ।  

তুলনা করা যাক, প্রতিবেশী দেশগুলোর মাঝে সমুদয় বাজেটের কে কতটা স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করে -সেটি? বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ের পরিমাণ সমুদয় বাৎসরিক বাজেটের মাত্র ৫.৬৩%। এ বরাদ্দটি প্রতিবেশী পাকিস্তানের তুলনায় অত্যন্ত কম। পাকিস্তানের সরকার  ২০১৯ সালের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দিয়েছে মোট বাজেটের ১৭.৭% ভাগ। অথচ দেশের ভোটডাকাত সরকারের দাবী, বাংলাদেশের অবস্থা পাকিস্তানের চেয়ে অনেক ভাল। এদের অনেকে পাকিস্তানকে ব্যর্থ রাষ্ট্র বলে। অপর দিকে সরকারের মন্ত্রীগণ বড়াই করে, বাংলাদেশ সিঙ্গাপুর হতে যাচ্ছে। অপরদিকে গ্রেট ব্রিটেন স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেয় মোট বাজেটের ২৪%। এমন বিশাল বরাদ্দের কারণেই ব্রিটিশ সরকার তার নাগরিকদের জন্য সরকারি হাসপাতালগুলোতে হার্ট অপারেশন, ট্রান্সপ্লান্ট অপরাশেন,ডায়ালাইসিসের ন্যায় সকল প্রকার চিকিৎসাই বিনা মূল্যে দেয়। অথচ বাংলাদেশে রোগীদেরও প্রাণ বাঁচানোর ঔষধ সরকার থেকে দেয়া হয় না। ডায়ালাইসিসের সামর্থ্য না থাকায় অধিকাংশ রোগীই বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছে বাংলাদেশে। ফলে বুঝতে কি বাঁকি থাকে, বাংলাদেশে জনগণের প্রাণ বাঁচানোর খাতটি কতটা অবহেলিত। তাতে ধরা পড়ে সরকারের দায়িত্বহীনতা। অথচ শত শত কোটি টাকা ব্যয় হয় মৃত মুজিবের নামে। শত কোটি টাকা ব্যয় করে মুর্তি গড়া হয়। হাজার হাজার কোটি টাকার চুরিডাকাতি হয়ে যাচ্ছে সরকারি তহবিল থেকে -যা দিয়ে শত শত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা দেয়া যেত, কেনা যেত বহু হাজার ভেন্টিলেটর এবং দেয়া যেত কিডনি ডায়ালাইসাইসিস। বহু লক্ষ মানুষকে তখন বিনা মূল্যে প্রাণ বাঁচানোর চিকিৎসা দেয়া যেত।

বাংলাদেশে অভাব অর্থের নয়, বরং সেটি বিবেকের। ভোটডাকাতদের সেটি থাকারও কথা নয়। তাদের এজেন্ডা মানুষকে বাঁচানো নয়, বরং গুমখুন,ফাঁসিতে ঝুলিয়ে বা ক্রসফায়ারে দিয়ে মানুষ মারার। এ দুর্বৃত্তগণ বাজেটের বেশীর ভাগ অর্থ খরচ করে নিজেদের গদি বাঁচাতে। নিজের পকেট ভরতে এরা সরকারি প্রজেক্টের অর্থের করে চুরি-ডাকাতি। তাদের চুরি-ডাকাতির ফলে প্রতি মাইল রাস্তা বানাতে বাংলাদেশে খরচ হয় বিশ্বের যে কোন দেশের তুলনায় বেশী। জনগণের দেয়া রাজস্বের অর্থ ব্যয় হচ্ছে পুলিশ বাহিনী, প্রশাসন, বিচারক, RAB ও সেনাবাহিনীর ন্যায় যারা ভোটডাকাত সরকারের গদির পাহারাদার ও ভোটডাকাতির ডাকাত তাদের জৌলুস বৃদ্ধিতে। অপরদিকে বিনা চিকিৎসায় লাখ লাখ মানুষ মারা গেলেও তা নিয়ে সরকারেরর মাথা ব্যথা নেই। বরং প্রচার দেয়া হয়, সরকার প্রচুর সেবা দিচ্ছে। যত দোষ রোগ-জীবানু ও জনগণের। 

 

যে আযাব অনিবার্য দুর্বৃত্ত শাসনে

যে কোন যুদ্ধ যোদ্ধা লাগে। এবং লাগে যুদ্ধাস্ত্র এবং যোগ্য জেনারেল বা নেতৃত্ব। খালি হাতে কোন সৈনিককে রণাঙ্গণে পাঠানোটি গুরুতর অপরাধ। এতে স্রেফ প্রাণক্ষয় হয়। তেমনি এক গুরুতর অপরাধ হচ্ছে বাংলাদেশের ডাক্তার ও নার্সদের সাথে। করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে ডাক্তার ও নার্সদের যুদ্ধটি করতে হচ্ছে অনেকটা খালি হাতে। শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে বেসরকারি ডাক্তার ও নার্সদের নির্দেশ দেয়া হচ্ছে, পারসোনাল প্রটেকটিক ইকুইপমেন্ট তথা মাস্ক, গ্লাভস, এ্যাপ্রোন, চোখের কভার নিজ খরচে কিনতে। যেন যুদ্ধে যেতে হবে নিজে অস্ত্র কিনে! 

যে কোন যুদ্ধে সৈনিকদের স্বীকৃতি ও তাদের প্রতি সৌজন্যবোধ  যে কোন সভ্য সমাজেই কাম্য। নইলে যুদ্ধে সৈনিক জোটে না। কিন্তু বাংলাদেশের সরকারি মহলে সেটি নেই। পাকিস্তানে ডাক্তার-নার্সদের হাসপাতালের সামনে গার্ড অব অনার দেয়া হচ্ছে। সে চিত্র টিভিতেও বার বার দেখানো হচ্ছে। বিলেতে ডাক্তার-নার্সদের শুধু সরকার নয়, জনগণও দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে সমস্বরে সাবাশ দিচ্ছে। সে চিত্রও টিভিতে বার বার দেখানো হচ্ছে। হাসপাতালের ডাক্তার-নার্সদের সাবাশ দিতে তাদের কাছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান উপঢৌকন নিয়ে হাজির হচ্ছে্। অথচ বাংলাদেশে তাদেরকে তিরস্কার করা হচ্ছে। জরুরী সামগ্রী না জুগিয়ে হাসিনা হুমকি দিচ্ছে, সে নাকি বিদেশ থেকে ডাক্তার আনবে।  

বাংলাদেশের হাসপাতালগুলির অবস্থাও বেহাল। নাই জরুরী সামগ্রী। নাই কোভিড-১৯ রোগীদের জন্য পৃথক পৃথক কামরা। অধিকাংশ হাসপাতালে নাই ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট। এ মুহুর্তে অতি জরুরী হলো ভেন্টিলেটর যা কৃত্রিম ভাবে অতি অসুস্থ্য রোগীকে অক্সিজেন জোগায়। তাতে রোগী পায় রোগের সাথে লড়াইয়ের সামর্থ্য এবং পায় কিছু বাড়তি সময়। অনেক রোগী তাতে বেঁচে যায়। ভেন্টিলেটর না লাগালে রোগের সাথে লড়াইয়ের সামর্থ্য দ্রুত লোপ পায় এবং রোগী মারা যায়। ভেন্টিলেটর সংগ্রহে সরকারের উদ্যোগ কই? হাসপাতালে নাই পর্যাপ্ত সংখ্যক মাস্ক। নাই রোগীদের ভাইরাস সনাক্ত করার টেস্ট সামগ্রী। দেশ জুড়ে পুরা এক বেহাল অবস্থা।

অপরদিকে মন্ত্রীদের দাবী, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকতে বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস আসা অসম্ভব। এভাবে এক ভোটডাকাত দুর্বৃত্তকে তারা অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারি দরবেশ বানিয়ে ফেলেছে। যেন বাংলাদেশে আসতে হলে ভাইরাসকে শেখ হাসিনার অনুমতি নিয়ে আসতে হবে। সুস্পষ্ট শিরক আর কাকে বলে? ভাবটা এমন, যে দেশে সাপ-শকুন, গরু-ছাগলকে ভগবান বলা হয়, সে দেশে হাসিনা কম কিসে? অথচ ভাইরাস শুধু আসে নাই, বহু লোক তাতে ইতিমধ্যে মারা গেছে। বাংলাদেশে যে কীরূপ বিবেকশূণ্য আহম্মকদের শাসন চলছে -সেটি কি এরপরও বুঝতে বাঁকি থাকে?     

দুর্বৃত্তদের ক্ষমতায় রাখার এটি হলো এক ভয়ংকর আযাব। আযাব তখন নানা বেশে মানুষকে ঘিরে ধরে। আযাবেরই এক রূপ, দেশ ছেয়ে যায় ভয়ানক দুর্বৃত্তদের দ্বারা।  মানব ইতিহাসের নৃশংস বর্বরতাগুলো কখন বাঘ-ভালুকের ন্যায় হিংস্র জানোয়ার হাতে হয়নি। বরং হয়েছে মানবরূপী এরূপ হিংস্র জন্তুদের হাতে। পবিত্র কোর’অআনে এদের শুধু পশু বলা হয়নি, তার চেয়েও নিকৃষ্ট জন্তু বলা হয়েছে। পবিত্র কোর’আনের ভাষায় সে বর্ণনাটি হলো, “উলা’য়িকা কা আল আন’য়াম, বালহুম আদাল” অর্থঃ এরাই হলো গবাদি পশুর ন্যায়, বরং তার চেয়েও নিকৃষ্ট।”

তাই ইসলামে সবচেয়ে বড় মাপের ইবাদতটি জঙ্গলের বাঘ-ভালুক নির্মূল নয়। ড্রেনের মশামারি নির্মূলও নয়। বরং সেটি হলো রাষ্ট্র থেকে দুর্বৃত্ত নির্মূলের জিহাদ। যারা প্রকৃত  মুসলিম তাদের মাঝে দুর্বৃত্ত নির্মূলের এ পবিত্র জিহাদটি নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাতের ন্যায় অতিশয় মজ্জাগত বলেই সুরা আল-ইমরানে মহান আল্লাহতায়ালা মুসলিমদের সমগ্র মানব জাতির মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি বলে অভিহিত করেছেন। কিন্তু বাংলাদেশে কোথায় সে মুসলিম? কোথা সে ইসলাম? এবং  কোথায় সে জিহাদ? ১৬/০৪/২০২০




বিবিধ প্রসঙ্গ-৯

১. যে অপরাধ ভারতকে বিজয়ী করায়

সমগ্র বিশ্বমাঝে মুসলিমদের জন্য সবচেয়ে বিপদজনক দেশ হলো ভারত। দেশটির সরকারের সামান্যতম আগ্রহ নাই মুসলিমদের জানমাল ও ইজ্জতের সুরক্ষায়। মুসলিমদের উপর কোথাও হামলা শুরু হলে পুলিশ বাহিনী সে হামলা না থামিয়ে নিজেরাই হিন্দু গুন্ডাদের পক্ষ নেয়। সে প্রামাণ্য চিত্রটি এবার দিল্লিতে দেখা গেল। সেখানে পুলিশ যেমন  নিজেরা পিটিয়েছে ও গুলি চালিয়েছে তেমন গুন্ডাদের হাতে ইটের টুকরো তুলে দিয়েছে। ১৯৪৭ সালের ভারতের স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর থেকে্ই মুসলিমগণ সেখানে বার বার গণহত্যার শিকার হচ্ছে। মুসলিম রমনীগণ হচ্ছে গণধর্ষণের শিকার। জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে মুসলিমদের ঘরবাড়ি ও দোকানপাট। সমগ্র কাশ্মিরই এখন একটি জেল; প্রতিটি নাগরিক সেখানে গৃহবন্দী। বিপদের আরো কারণ, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজেই একজন ভয়ংকর অপরাধী। ১৯৯২ সালে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হয় অযোধ্যার বাবরী মসজিদ। সে কাজে গুন্ডা সংগ্রহের কাজ করেছিল মোদি। তার সে কাজে মোহিত হয়ে ২০০২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী তাকে গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী রূপে নিয়োগ দেয়। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই ভয়াবহ দাঙ্গার আয়োজন করে গুজরাতে এবং সে দাঙ্গায় ২ হাজারের বেশী মুসলিম হত্যা করা হয় এবং পুড়িয়ে দেয়া হয় বহু হাজার  মুসলিমের ঘরবাড়ী। সেখানে গণহারে ধর্ষিতা হয়েছে মুসলিম নারীরা। এরূপ গণহত্যা ও গণধর্ষণ আয়োজন করাতে বিজিপি-আর, এস. এস মহলে নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তা তু্ঙ্গে উঠে। ফলে ২০১৪ সালে তাকে দেয়া হওয়া হয় ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পদ। উগ্র হিন্দুদের মাঝে নিজের জনপ্রিয়তা বাড়াতে নরেন্দ্র মোদি গত ফেব্রেয়ারিতে গুজরাতের মডেলের দাঙ্গা শুরু করে দিল্লিতে। হত্যা ও মুসলিমদের গৃহে ও দোকানে আগুণ দেএয়ার পাশাপাশি আগুণ দেয়া হয় দিল্লির ৯টি মসজিদে।

ভারতের মুসলিম বিরোধী চরিত্রটি তাই গোপন কিছু নয়। প্রশ্ন হলো, এরূপ মুসলিম গণহত্যাকারী ভারতের ঘরে যারা বিজয় তুলে দেয় এবং নিজ দেশের অভ্যন্তরে ভারতীয় পণ্যের জন্য বাজার খুলে দেয় –তারা কি ঈমানদার? ঈমানদার হতে হলে তো মুসলিমের শত্রুদের ঘৃণার সামর্থ্য লাগে। লাগে মুসলিম স্বার্থের সুরক্ষা দেয়ার গভীর ইচ্ছা। অথচ সে সামর্থ্য ও ইচ্ছা একাত্তরে মুজিবের ন্যায় বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের মাঝে দেখা যায়নি। মুসলিম বিরোধী এরূপ একটি দেশের সাথে যারা বন্ধুত্ব গড়ে তারা কি কখনো মুসলিম দেশের শাসক হওয়ার যোগ্যতা রাখে? হতে পারে কি মুসলিমের বন্ধু? অথচ ভারত বন্ধু গণ্য হচ্ছে মুজিবের ন্যায় হাসিনার কাছেও। এবং সর্বাত্মক সহযোগিতা দিচ্ছে ভারতকে। সেদেশে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যত হত্যা, যত ধর্ষণ এবং যত নির্যাতনই হোক না –শেখ হাসিনা তা নিয়ে মুখ খুলতে রাজী নয়। অথচ ভারত সরকারের নিন্দা করছে বহু ভারতীয় নেতাও। মুসলিম জীবনের অন্যতম মিশন হলো অন্যায় ও জুলুমের নির্মূল। তাই রাজা দাহিরের নির্যাতন থেকে সিন্ধুর হিন্দুদের বাঁচাতে মুসলিম বাহিনী জিহাদে নেমেছিল।      

প্রতিবেশী দেশ রূপে বাংলাদেশীদের দায়িত্বটি বিশাল। বিপন্ন মুসলিমদের পাশে দাঁড়ানো বাংলাদেশের প্রতিটি মুসলিমের উপর ফরজ। কিন্তু সে দায়িত্বটি পালিত হচ্ছে না। কারণ, ক্ষমতায় রয়েছে ভারতসেবী ইসলামের শত্রুগণ। হাসিনা ক্ষমতায় এসেছে ভোট ডাকাতি করে। ভারত এ নিয়ে নিশ্চু্প। বরং হাসিনার এরূপ ভোট ডাকাতির বিজয়ে প্রচণ্ড খুশি ভারত। কারণ ভারত চায়, দেশটিতে তার সেবাদাস ও সেবাদাসীগণ যে কোন রূপে ক্ষমতায় থাক এবং অব্যাহত থাকুক ভারতের প্রতি দাসত্বের রাজনীতি। তাছাড়া ভারত জানে, সুষ্ঠ নির্বাচন হলে শোচনীয় পরাজয় ঘটবে তার সেবাদাসদের।

 

২. প্রসঙ্গ বাঙালীর বিবেকবোধ, মূল্যবোধ ও ব্যক্তিত্ব

মানুষের বুদ্ধি ও প্রজ্ঞার প্রকাশ ঘটে শত্রুকে শত্রু এবং বন্ধুকে বন্ধু রূপে বরণ করার মাঝে। তাই সুবুদ্ধির কোন মানুষই কোন নেকড়কে গলা জড়িয়ে চুমু খায় না। এবং নিজ ঘরে তুলে আদর করে চোর-ডাকাতকে। বরং হাতের  কাছে যা পায় তা দিয়ে তাড়া করে। হিংস্র পশু ও চোর-ডাকাতদের প্রতি এটিই হলো সভ্য মানুষের সনাতন নীতি। তেমনি কোন বিবেকবান মানুষই স্বৈরাচারি শাসকের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে না। তাকে নেতার আসনেও বসায় না। কিন্তু বাংলাদেশে  সে সভ্য বিচারটি হয়নি। ফলে শেখ হাসিনার ন্যায় ভোট-ডাকাতও দেশের প্রধানমন্ত্রীর চেয়্যারে বসার সুযোগ পেয়েছে। এবং মুজিবের ন্যায় এক খুনি এবং স্বৈরাচারিও দেশের নেতা,পিতা ও বঙ্গবন্ধুর খেতাব পেয়েছে। কোন সভ্য দেশে কি এমনটি ভাবা যায়?

একদলীয় বাকশাল সরকার প্রতিষ্ঠা দিয়ে শেখ মুজিব কেড়ে নিয়েছিল দেশবাসীর স্বাধীনতা। এবং রাজনৈতিক দল গড়ার অধীকার কেড়ে নিয়েছিল ইসলামপন্থিদের। ইসলামপন্থিদের সাথে এরূপ অসভ্য ও অমানবিক আচরণ ঔপনিবেশিক কাফের শাসনামলেও হয়নি। মুজিবের শাসনামলে স্বাধীনতা পেয়েছিল কেবল মুজিবের অনুগত দুর্বৃত্ত দলীয় বাহিনী এবং তার প্রভুরাষ্ট্র ভারত। এবং যারাই মুজিবের বাকশালী স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আ্‌ওয়াজ তুলেছে্ তারা্ই গ্রেফতারি, হত্যা ও নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছে। রক্ষিবাহিনীর হাতে নিহত হয়েছে তিরিশ হাজারেরও বেশী রাজনৈতিক নেতাকর্মী। মুজিবের রাজনীতির মূল কথা ছিল ভারতের প্রতি নিঃশর্ত গোলামী। মুজিব ভারতকে দিয়েছিল ফারাক্কার মুখে পদ্মার বুক থেকে পানি তুলে নেয়ার অধিকার। দিয়েছিল বাংলাদেশের ভূমি বেরুবাড়ী। দেশের সীমান্ত বিলুপ্ত করে ভারতকে দিয়েছিল লুন্ঠনের অবাধ স্বাধীনতা। সে ভারতীয় লুটপাটের ফলেই নেমে আসে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ -যাতে মৃত্য হয় বহু লক্ষ বাংলাদেশীর। মুজিবের মৃত্যু হয়েছে, কিন্তু প্রবল ভাবে বেঁচে আছে মুজিবের ভারতসেবী রাজনীতি। এবং সেটি বাঁচিয়ে রেখেছে মুজিব কণ্যা হাসিনা।   

এখানেই প্রশ্ন উঠে। শেখ মুজিবের ন্যায় একজন স্বৈরাচারি খুনি ভোট-ডাকাত হাসিনার পিতা হতে পারে। বন্ধু হতে পারে আগ্রাসী ভারতেরও। কিন্ত বন্ধু বা পিতা হতে পারে কি কোন বিবেকমান বাংলাদেশীর? এ প্রশ্নটি উঠা উচিত তাদের পক্ষ থেকে যাদের মধ্যে বিবেক ও সাহস বলে এখনো কিছু বেঁচে আছে এবং যারা পরওয়া করে না ভোট-ডাকাত দুর্বৃত্তদের গালিগালাজের। চোর-ডাকাত, ভোট-ডাকাত ও ফ্যাসিস্টদের নেতা, নেত্রী, পিতা বা বন্ধু বলায় তাদের চারিত্রিক কালীমা কমে না, কিন্তু এরূপ চাটুকারিতায় মারা পড়ে স্তাবকের বিবেক, ব্যক্তিত্ব ও মূল্যবোধ। তাই দেশে যখন কোন চোর, ডাকাত, ভোট-ডাকাত ও ফ্যাসিস্টগণ নেতা, পিতা, বন্ধু বা প্রধানমন্ত্রী রূপে প্রতিষ্ঠা পায় -তখন কি বুঝতে বাঁকি থাকে বিপুল সংখ্যক দেশবাসীর মাঝে বিবেক, ব্যক্তিত্ব ও মূল্যবোধ কতটা মৃত?  

 

৩.স্বাধীনতা স্রেফ গোলামীর

স্বৈরাচারি শাসকদের স্বাধীনতা প্রতি যুগেই ছিল। কিন্তু  তাদের শাসনে স্বাধীনতা ছিল না জনগণের। জনগণকে সে স্বাধীনতা দিয়েছিল গণতন্ত্র। সেটি যেমন ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসনোর স্বাধীনতা, তেমনি নামানোর। ভোটডাকাত শেখ হাসিনা সে স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছে। এর আগে শেখ মুজিবও সে স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে একদলীয় শাসনের প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল। মত প্রকাশের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়ার লক্ষ্যে মুজিব নিষিদ্ধ করেছিল সকল বিরোধী দলীয় পত্রিকা। কেড়ে নিয়েছিল মিটিং-মিছিলের স্বাধীনতা। বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে এ ছিল মুজিবের অতি  নৃশংস ও ঘৃণ্য অপরাধ। এরূপ অসভ্য ও অপরাধী শাসককে সভ্য নাগরিকগণ ঘৃণা করবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু  বাংলাদেশে সেটি হয়নি। কারণটি বোধগম্য। ডাকাতদের কাছে নৃশংস ডাকাত সর্দারও যেমন হিরো রূপে গৃহীত হয়, তেমনি স্বৈরাচারি মুজিবও সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী রূপে গণ্য হচ্ছে ভোট-ডাকাত বাকশালীদের কাছে।   

শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনার কাছে স্বাধীনতার অর্থ হলো ভারতের প্রতি আত্মসমর্পণের স্বাধীনতা। সে আত্মসমর্পণ জাহির করতে পত্রিকায় লেখালেখিতে যেমন বাধা নাই, তেমনি বাধা নেই টেলিভিশনের পর্দায় কথা বলায় বা রাজপথের মিছিলে। কিন্তু ভয়ানক অপরাধ গণ্য হয়, সে আরোপিত গোলামীর বিরুদ্ধে কথা বলা। যারাই ভারতের বিরুদ্ধে মুখ খুলছে তাদের পিটাতে পুলিশ এবং শেখ হাসিনার দলীয় গুন্ডাগণ একত্রে ময়দানে নামছে। অপর দিকে আদালতের গোলাম বিচারকদের কাজ হয়েছে আইনের শাসনের প্রতিষ্ঠা নয়; বরং সরকার দলীয় গুন্ডা ও খুনিদেরকে আইনের হাত থেকে বাঁচানো। এরূপ গোলামদের হাতেই বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবারার ফাহাদকে শহীদ হতে হলো। গোলামগণ প্রতি যুগে এমনটিই করে তাদের বিদেশী প্রভুদের খুশি করতে।

 

৪. ঈমানদারের ইসলাম ও মুনাফিকের ইসলাম

বেঈমানের জীবনে মূল লড়াইটি হলো নিজ দল, নিজ নেতা ও নিজ দলীয় আদর্শকে বিজয়ী করায়। অপর দিকে ঈমানদারের লড়াইটি আল্লাহর দ্বীন তথা শরিয়তকে বিজয়ী করায়। যে দেশে ঈমানদার ও বেঈমানদের বসবাস সে দেশে এ দু’টি বিপরীত এজেন্ডা নিয়ে রাজনীতির অঙ্গণে সৃষ্টি হয় প্রচন্ড মেরুকরণ। এমন মেরুকরণের রাজনীতিতে থাকে মাত্র দু’টি পক্ষ। একটি আল্লাহর পক্ষ, অপরটি শয়তানের পক্ষ। মহান আল্লাহর নিজের ভাষায় হিযবুল্লাহ (আল্লাহর দল) ও হিযবুশশায়তান (শায়তানের দল)। নিরপেক্ষ বলে কেউ থাকে না। বাংলাদেশে শয়তানের পক্ষটি বিজয়ী। তাদের বিজয়ের ফলেই মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তি আইন আজ পরাজিত। এবং আদালতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে কাফেরদের রচিত  আইন। আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা পাক -এ শয়তানী পক্ষটি তা কখনোই চায় না।

বাংলাদেশে নিজেকে মুসলিম রূপে দাবী করে এমন মানুষের সংখ্যা ১৬ কোটি। কিন্তু মুসলিম হওয়ার অর্থ্ কি -তা নিয়েই তাদের অজ্ঞতাটি গভীর। তারা ভাবে, মুখে কালেম ও তাসবিহ পাঠ এবং নামায-রোযা-হজ্ব-যাকাত পালনের মধ্যেই পরিপূর্ণ ইসলাম। এবং মনে করে রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও যুদ্ধবিগ্রহের অঙ্গণে অন্য কিছু না করলেও চলে। অথচ মুসলিম হওয়ার অর্থ বিশাল। সেটি মহান আল্লাহতায়ালার এজেন্ডাকে আমৃত্যু হৃদয়ে নিয়ে জীবনের প্রতি অঙ্গণে বাঁচা। সে এজেন্ডার বিজয়ে থাকতে  হয় নিজের জান, মাল ও সর্বপ্রকার সামর্থ্যের বিনিয়োগ। সে এজেন্ডার অপরিহার্য বিষয় হলো ৫টি। ১).এমন এক পরিপূর্ণ ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা যেখানে থাকবে একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব এবং সে রাষ্ট্রে  বিলুপ্ত হবে জনগণ, পার্লামেন্ট, স্বৈরাচারি শাসক বা রাজার সার্বভৌমত্ব। ২). রাষ্ট্র চলবে শুরা বা পরামর্শের ভিত্তিতে; রাষ্ট্রীয় প্রধান সার্বভৌম হবে না, বরং হবে নবীজী (সাঃ)র খলিফা বা প্রতিনিধি। প্রায়োরিটি পাবে নবীজী (সাঃ)র আদর্শের প্রতিষ্ঠা ৩). প্রতিষ্ঠা পাবে শরিয়ত ও হুদুদের আইন, ৪). নানা ভাষা, নানা গোত্র ও নানা ভৌগলিক পরিচয়ের নামে গড়ে উঠা বিভক্তির দেয়ালের বিলুপ্তি এবং সচেষ্ট হবে একতার প্রতিষ্ঠায়, ৫), থাকবে অন্যায়ের নির্মূল এবং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার লাগাতর জিহাদ। নবীজী (সাঃ) এবং তার খলিফাদের জীবনে ইসলাম বলতে বুঝাতো এ এজেন্ডাগুলি নিয়ে বাঁচা। কিন্তু মুনাফিকের জীবনে ইসলামের চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের জীবনে এর কোনটিই থাকে না। কেবল থাকে “আমিও মুসলিম” এ কপট দাবী। এবং ময়দানে থাকে ইসলামকে পরাজিত রাখার লড়াইয়ে তাদের জান, মাল ও মেধার বিনিয়োগ।

 

৫.জান্নাতের পথ ও জাহান্নামের পথ

মুসলিম হওয়ার অর্থটি বিশাল ও বিপ্লবাত্মক। সেটি আমৃত্যু এক পরম দায়বদ্ধতা নিয়ে বাঁচা। সে দায়বদ্ধতাটি প্রতি পদে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে এবং অসত্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর। দোযগের আগুণ থেকে বাঁচতে হলে এ ছাড়া ভিন্ন পথ নাই। নইলে মরতে হয় শয়তানের অনুসারি এক বেঈমান রূপে। ঈমানের চুড়ান্ত পরীক্ষাটি কখনোই নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাতে হয় না। সেটি হয় কে কোন পক্ষ দাঁড়ালো ও প্রাণ দিল তা থেকে। নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত, দান-খয়রাত মুনাফিকদের জীবনেও থাকে। ফলে কাফেরদের গড়া স্কুল-কলেজ ও হাসপাতালের সংখ্যা কি কম? কিন্তু তাদের মধ্যে যে গুণটি থাকে না তা হলো, সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে এবং অসত্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সামর্থ্য। বাংলাদেশে যারা নিজেদেরকে মুসলিম রূপে দাবী করে তাদের মধ্যে এরূপ সামর্থ্যের অভাবটি বিকট। সে সামর্থ্য না থাকার কারণেই তথাকথিত ১৬ কোটি মুসলিমের দেশে ইসলাম আজ পরাজিত। এবং দেশ অধিকৃত ভোটডাকাতদের হাতে।

অথচ ঈমানদারগণ বাঁচে ভিন্নতর পরিচয় নিয়ে। তাদের অন্তরে থাকে নবী-রাসূল ও নেক বান্দাদের প্রতি যেমন গভীর ভালবাসা তেমনি থাকে চোর-ডাকাত, ভোট-ডাকাত ও গুম-খুনের রাজনীতির দুর্বৃত্তদের প্রতি প্রবল ঘৃণা। জান্নাতের পথে চলতে হলে ছাড়তে হয় দুর্বৃত্তদের পথ। আলো ও আঁধার কখনোই একত্রে চলে না। তেমনি একত্রে চলে না নবীপ্রেম ও দুর্বৃত্তপ্রেম। দুর্বৃত্তপ্রেম প্রবল হওয়ার কারণেই মুজিবের ন্যায় একজন গণতন্ত্র হত্যাকারি ও ভারতসেবী ফ্যাসিষ্টও জাতির পিতা ও বঙ্গবন্ধুর খেতাব পায়। অথচ দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে ঘৃনার সামর্থ্য না থাকলে ঈমানদার হওয়াই অসম্ভব। অসম্ভব হয় মানব হওয়াও। পবিত্র কোর’আনে এরূপ বেঈমানদের গবাদীপশুরও চেয়েও অধম বলা হয়েছে। কারণ, গবাদী পশু ঘাস খায় এবং জবাই হয় বটে, তবে দুর্বৃত্তদের পক্ষে ভোট দেয় না, মিছিল করে না ও তাদের পক্ষে লাঠিও ধরে না। ২৭/০৩/২০২০

 

 




এতো জরুরী কেন একাত্তরের ইতিহাস?

ব্যর্থতা ইতিহাস তুলে ধরায়

ইসলামের শত্রুপক্ষ বিজয়ী হলে বিচার-আচারের মানদন্ডটিও তাদের অনুকুলে পাল্টে দেয়া হয়। তখন সে মানদন্ডে ইসলামের ভয়ানক শত্রু এবং কাফের শক্তির সেবাদাসও বন্ধু ও পিতা রূপে চিত্রিত হয়। সে সাথে ইসলামের পক্ষের শক্তি চিত্রিত হয় ভিলেন রূপে। মিথ্যা অভিযোগ তুলে তাদের চরিত্রহরণ করা হয় এবং তাদের ফাঁসিতেও চড়ানো হয়। সেটি যেমন নমরুদ-ফিরাউনের আমলে হয়েছে, তেমনি হচ্ছে বাংলাদেশেও। এমন এক বিকৃত মানদন্ড প্রতিষ্ঠা দিয়ে শেখ মুজিবের ন্যায় গণতন্ত্র হত্যাকারি বাকশালীকে এবং তার দুর্বৃত্ত সাথীদেরকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী রূপে প্রতিষ্ঠা দেয়ার চেষ্টা হয়েছে। সে সাথে বন্ধু দেশ রূপে প্রতিষ্ঠা দেয়া হয়েছে ভারতকে। অপরদিকে যারা ইসলামি ব্যক্তিত্ব তাদের চরিত্র হরণ করা হয়েছে নানা রূপ মিথ্যা অপবাদ দিয়ে।

একাত্তরের ঘটনাবলিকে জনগণের সামনে তুলে ধরার ক্ষেত্রে ইসলামপন্থিদের ব্যর্থতাটি বিশাল। সত্য ইতিহাসকে তুলে ধরাটি মহান আল্লাহতায়ালার সূন্নত। পবিত্র কোর’আনে মহান আল্লাহতায়ালা সে বিশাল ইতিহাস তুলে ধরেছেন বলেই ফিরাউন, নমরুদ, কারুণের ন্যায় দুর্বৃত্তগণ  ইতিহাস থেকে হারিয়ে যায়নি। মানব ইতিহাসে তারা হাজার হাজার বছর বেঁচে আছে মানুষের ঘৃণা ও অভিশাপ নিয়ে এবং নিজ নিজ অপরাধ কর্মগুলির শিক্ষ্যণীয় বিবরণ নিয়ে। অপর দিকে মানব জাতির জন্য অনুকরণীয় শ্রেষ্ঠ চরিত্র রূপে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন হযরত ইব্রাহিম (আঃ), হযরত মূসা (আঃ) এবং অন্যান্য নবীগণ। ইসলামের পক্ষের শক্তির পক্ষ থেকে তেমন একটি মূল্যায়ন একাত্তর নিয়েও হওয়া জরুরী ছিল।

এটি সত্য যে, একাত্তরে ইসলামের পক্ষের শক্তি পরাজিত হয়েছে। কিন্তু তাদের সবচেয়ে বড় পরাজয়টি হয়েছে একাত্তরের পর। এবং সেটি নৈতিক, আদর্শিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক পরাজয়। তারা পুরাপুরি ব্যর্থ হয়েছে একাত্তরের সত্য ইতিহাস তুলে ধরতে। কেন তারা অখন্ড পাকিস্তানের পক্ষ নিল -সে সত্যটি তারা আজও তুলে ধরেনি। একাত্তরে যে দলগুলি পাকিস্তান ভাঙ্গার পক্ষ নিয়েছিল তারা হলো আওয়ামী লীগ, চীনপন্থি ও মস্কোপন্থি ন্যাপ, কম্যুনিস্ট পার্টি এবং হিন্দুগণ। এদের ভোট সংখ্যা আজ ৩৫% ভাগের বেশী নয়। অপর দিকে যারা অখন্ড পাকিস্তান বাঁচানোর পক্ষ নিয়েছিল তারা হলো মুসলিম লীগের তিনটি উপদল, জনাব নুরুল আমীনের পাকিস্তান ডিমোক্রাটিক পার্টি, নেজামে ইসলাম, জামায়াতে ইসলাম, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম এবং সকল আলেম সম্প্রদায় ও পীরগণ। এদের বিশাল গণভিত্তি ছিল। সেটি শেখ মুজিব জানতো বলেই তিনি স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টির নামে রেফেরেন্ডামের দাবী কখনোই করেনি। রেফেরেন্ডাম হলে পাকিস্তানপন্থিদের ভোট ৫-৬ দলের মাঝে বিভক্ত হতো না। তখন ভোট ভাগ হতো দুই ভাগে। শেখ মুজিব স্বাধীনতার দাবী তুলেছে ৬ দফার নামে ভোট নেয়ার পর।  ফলে পাকিস্তান ভাঙ্গার বিরোধী ছিল এমন বহু লোক তার দলকে ভোট দিয়েছে। এটি ছিল জনগণের সাথে মুজিবের বিশ্বাসঘাতকতা। কারণ জনগণ কখনোই তাকে পাকিস্তান ভাঙ্গার ম্যান্ডেট দেয়নি।

একাত্তরে নেজামে ইসলাম একটি বৃহৎ দল ছিল। পঞ্চাশের দশকের এ দলের নেতা চৌধুরী মহম্মদ আলী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। তার নেতৃত্বেই ১৯৫৬ সালে প্রণীত হয় পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান। দলটির আরেক নেতা কক্সবাজারের মৌলভী ফরিদ আহমেদ পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হয়েছিলেন। জামায়াত নেতা জনাব গোলাম আযম লিখেছেন পিস কমিটি বানানোর ব্যাপারে সবচেয়ে বেশী উদ্যোগী ছিলেন মৌলভী ফরিদ আহমেদ। আজকের হিফাজতে ইসলামের নেতা মাওলানা শফির ওস্তাদ মাওলানা সিদ্দিক আহমেদ সাহেব ছিলেন একাত্তরে নেজামে ইসলাম দলের প্রবীন নেতা। সত্তরের দশকে মাওলানা সিদ্দিক আহমেদ সাহেব ছিলেন হাট হাজারী মাদ্রাসার প্রধান। পাকিস্তানের অখন্ডতা বাঁচানোর কাজে এ দলটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। অথচ এ দলের নেতাগণও তাদের সে ভূমিকা নিয়ে আজ নিশ্চুপ। যেন তারা কিছুই জানে না। ফলে চরিত্র হনন হচ্ছে তাদেরও। তাদের নীরবতাটি বরং ইসলামের শত্রুদের জন্য চরিত্র হননের কাজটি আরো সহজ করে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, সত্য বলা থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি তাদের অনেকে ইসলামের শত্রুদের সাথে মিতালী গড়ে তাদের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা ও কদর বৃদ্ধিরও চেষ্টা করছেন। এ কাজে তাদেরকে শেখ হাসিনার পাশেও দেখা যায়। তাদের অনেকে হাসিনার ন্যায় এক দুর্বৃত্ত ভোট-ডাকাতকে ‘কওমী জননী’র খেতাবও দিয়েছে। নৈতীক দিক দিয়ে নীচের নামার এটি এক বিরল দৃষ্টান্ত।

ভারতীয় ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে একাত্তরে ইসলামের পক্ষের শক্তিগুলির যে গৌরবময় ভূমিকা ছিল -সেটিকে তারা নিজেরাই নিজেদের স্মৃতি থেকে বিলুপ্ত করেছে। এদিক দিয়ে  জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্র শিবিরের ভূমিকাটি অতি বিস্ময়কর। ‌বিজয় দিবসের নামে ১৬ ডিসেম্বরে  তারা যেরূপ বিজয় মিছিল বের করে -সেরূপ মিছিল একাত্তরের যারা প্রকৃত বিজয়ী তারাও করে না। অথচ কে না জানে, ‌১৬ ডিসেম্বরে বিজয়টি ইসলামের পক্ষের শক্তির ছিল না। সে বিজয় ছিল ভারত ও তার সেবাদাসদের। এ দিনটি ছিল বিশ্বব্যাপী মুসলিমদের মাতমের দিন। যাদের মনে সামান্যতম ঈমান আছে তারা কি কোন মুসলিম দেশ ভেঙ্গে যাওয়াতে খুশি হতে পারে? এ দিনে সে বিজয় মিছিলই বা বের করবে কোন আনন্দে? সে দেশটি পাকিস্তান না হয়ে যদি সূদান, ইন্দোনেশিয়া, ইরাক বা অন্য যে কোন মুসলিম দেশ হতো -তবু্ও তো সেটি মাতমের দিন রূপে গণ্য হতো।

 

জিহাদ চাই বুদ্ধিবৃত্তির অঙ্গণে

মুসলিমদের ব্যর্থতা শুধু বন্ধুদের চেনায় নয়, শত্রুদের চেনাতেও। এরূপ ব্যর্থতার কারণে মুসলিম উম্মাহর মাঝে একতার চেয়ে বিভক্তিই শ্রেয় গণ্য হয়েছে। এর ফলে শত্রুগণ যেমন নেতা বা পিতা রূপে চিহ্নিত হয়েছে, তেমনি বন্ধুগণ চিহ্নিত হয়েছে শত্রু রূপে। অথচ শত্রু-মিত্র চেনার এ ব্যর্থতাটিই ব্যক্তির সবচেয়ে বড় অযোগ্যতা। এরূপ অযোগ্যতায় মহান সৃষ্টিকর্তাকে চেনাও অসম্ভব হয়। ফিরাউনের ন্যায় দুর্বৃত্তগণ তখন জনগণের কাছে ভগবান, নেতা, পিতা বা প্রধানমন্ত্রী রূপে গৃহিত হয়। শাপ-শকুন, গরু-বাছুর, মুর্তি ভগবানের আসনে বসার সুযোগ পেয়েছে তো মানুষের সে বোধহীনতার কারণে। এক্ষেত্রে বাঙালী মুসলিমের ব্যর্থতাটি বিশাল।

একটি জনগোষ্ঠি কতটা জাহান্নামী -সেটি বুঝা যায় কাকে তারা ভগবান বলে মান্যতা দেয় বা পূজা দেয় তা থেকে। তেমনি একটি দেশের মানুষ কতটা অযোগ্য, অশিক্ষিত বা বোধশূণ্য সেটি বুঝা যায় সেদেশে কীরূপ মানুষ জাতির পিতা, নেতা বা শাসক রূপে গৃহীত হয় -তা দেখে। যেদেশে শেখ মুজিবের ন্যায় একজন গণহত্যাকারি বাকশালী ফ্যাসিস্টকে বঙ্গবন্ধু বা জাতির পিতার আসনে বসানো হয় বা শেখ হাসিনার ন্যায় নৈশকালীন ভোট-ডাকাতকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলা হয় –সে দেশের মানুষকে কি সুসভ্য, সুশিক্ষিত ও বিবেকবান বলা যায়? গণতন্ত্রের এরূপ শত্রুদেরকে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স বা জার্মানীর ন্যায় দেশে রাজনীতি করতে দেয়া দূরে থাক, বাঁচার অধিকার দিত? অথচ বাংলাদেশে এ দুর্বৃত্তগণই ছিল একাত্তরের নেতা এবং আজ দেশ তাদের হাতেই অধিকৃত।  

জীবনে বাঁচাটি নিরাপদ করতে হলে শুধু বিষাক্ত শাপ ও হিংস্র পশুকে চিনলে চলে না; মানবরূপী দুর্বৃত্তদেরও চিনতে হয়। সে সামান্য সামর্থ্যটুকু না থাকলে অসম্ভব হয় মহান আল্লাহতায়ালা, তাঁর দ্বীন ও তাঁর প্রিয় রাসূলকে চেনা। অসম্ভব হয় সমাজের সভ্য মানুষদের চেনা। অথচ এটিই মানব জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। এমন ব্যর্থতা ব্যক্তিকে জাহান্নামে নিয়ে পৌঁছায়। শাপ যে প্রাণনাশী -সেটি জানা যায় শাপের দংশনে কারো মৃত্যু দেখে। তেমনি দুর্বৃত্ত নেতাদের চেনা যায় তাদের হাতে জনগণের প্রাণনাশ, ক্ষয়-ক্ষতি ও মুসলিম উম্মাহ দুর্বল হওয়া দেখে। তাই যারা ভাষা, বর্ণ ও আঞ্চলিকতার নামে মুসলিম উম্মাহর দেহকে খণ্ডিত করে -তাদেরকে কি কখনো বন্ধু বা নেতা বলা যায়? অথচ বাংলাদেশে সেটিই হয়েছে।

বাংলাদেশে যারা ইসলামের পক্ষের আলেম, বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক নেতাকর্মী তাদের জন্য যে কাজটি অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, জনগণের মনকে কোর’আন-হাদীস ও ইতিহাসের জ্ঞানে আলোকিত করা। নইলে অন্ধকার নিয়ে কে শত্রু এবং কে মিত্র সেটি চেনার কাজ কখনোই সঠিক হয় না। বিশেষ করে সেটি একাত্তর প্রসঙ্গে। এটি এক বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদ। নইলে রাজনীতির অঙ্গণে ইসলামের শত্রু ও ভারতেসেবী মীর জাফরদের বিরুদ্ধে যে জিহাদ চলছে তাতে  বিজয়ী হওয়া অসম্ভব হবে। এক্ষেত্রে ইসলামপন্থিদের ব্যর্থটি বিশাল। এটি যে চরম ব্যর্থতা -সে ধারণাও তাদের নাই। এ ব্যর্থতার কারণেই কাফের শক্তির সেবাদাসগণ যেমন নেতা গণ্য হচ্ছে, তেমনি ইসলামপন্থি ব্যক্তিগণ ব্যর্থ হ্চছে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে। অথচ ভারতসেবী মীর জাফরদের মুসলিম স্বার্থ বিরোধী চক্রান্তকে তুলে ধরার জন্য একাত্তরের ঘটনাবলি হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল। একাত্তরের ইতিহাসের ছত্রে ছত্রে রয়েছে তাদের কৃত অপরাধের রক্তাত্ব স্বাক্ষর।

ইতিহাসের মধ্যে থাকে অমূল্য জ্ঞানের ভান্ডার। অতীতের ইতিহাস থেকে যেমন পাওয়া যায় শয়তানী শক্তির পরিচয়, তেমনি পাওয়া যায় সঠিক পথে সামনে চলার প্রয়োজনীয় জ্ঞান। বিজ্ঞান না জানার কারণে কোন জাতি জাহান্নামী হয় না, জাহান্নামী হয় ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেয়ার কারণে। তখন জ্ঞানহীন কাপালিকগণ নিজ যুগের ফিরাউনকেও পদসেবা দেয়। শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনার ন্যায় স্বৈরাচারি, বাকশালী ও মানব-হত্যাকারিদের নেতা হওয়ার পিছনে রয়েছে তো কাপালিক-সুলভ এ অজ্ঞতা। তাদের কারণেই তো দেশে প্লাবন এসেছে গুম, খুন, ধর্ষণ ও পিটিয়ে মানুষ হত্যার রাজনীতির। মহান আল্লাহতায়ালা তাই তাঁর পবিত্র কোর’আনে জীববিদ্যা, পদার্থ বিদ্যা বা গণিতের পাঠ দেননি, কিন্তু বিপুল পাঠ দিয়েছেন ইতিহাস জ্ঞানের। পরিতাপের বিষয় হলো সত্য জ্ঞান তুলে ধরায় মহান আল্লাহতয়ালার সে পবিত্র সূন্নত বাংলাদেশের ইসলামপন্থিদের দ্বারা পালিত হয়নি। অথচ এটিই কাঙ্খিত ছিল যে, একাত্তর নিয়ে সবচেয়ে বেশী লেখা-লেখি ও গবেষণা হবে ইসলামপন্থিদের পক্ষ থেকে। কিন্তু সেটি হয়নি। তারা সে ইতিহাসকে বরং ঢাকার চেষ্টা করেছে। ইতিহাস চর্চার এ অঙ্গনে তাদের অনুপস্থিতি শত্রুপক্ষের জন্য যেটি সহজ করেছে তা হলো ইতিহাস বিকৃতি। একাত্তরকে ভূলে নয়, বরং ইতিহাসের এ গুরুত্বপূর্ণ পর্ব থেকে শিক্ষা নিয়ে এবং শিক্ষা দান করেই ইসলামের পক্ষের শক্তিকে সামনে এগুতে হবে। ০১/০১/২০২০  

 




একাত্তরের শিক্ষা এবং স্বাধীনতার সুরক্ষা প্রসঙ্গ

যে ভয়ানক নাশকতাটি অনৈক্যের

মুসলিম উম্মাহ আজ যে কারণে শক্তিহীন ও ইজ্জতহীন -সেটি মুসলিম দেশগুলির ভূমি বা জলবায়ুর কারণে নয়। সম্পদের কমতির কারণেও নয়। জনসংখ্যার কমতিতেও নয়। বরং মূল কারণটি হলো, মুসলিমদের অনৈক্য্। সে অনৈক্যের মূল কারণটি হলো, মুসলিম দেশগুলিতে দুর্বৃত্তদের নেতৃত্ব। দেশ চলে নেতাদের নির্দেশে। ফলে নেতাগণ ভ্রষ্ট, অযোগ্য, দুর্বৃত্ত ও বেঈমান হলে দেশও তখন দুর্বৃত্ত কবলিত ও ব্যর্থ হতে বাধ্য। দুর্বৃত্ত নেতাদের সবচেয়ে বড় দুর্বৃত্তিটি হয় ভাষা ও বর্ণের নামে মুসলিমদের মাঝে বিভক্তির দেয়াল গড়ার মধ্য দিয়ে। মুসলিম সমাজে এরাই শয়তানের দাস। তাদের লক্ষ্য, মুসলিমদের কল্যাণ নয়, পরাজয় ক্ষতিসাধন। সেটি করে মুসলিমদের মাঝে বিভক্তি গড়ে। এজন্য তারা ইসলামের শত্রুশক্তির কাছে এতো প্রিয়। শেখ মুজিব এবং তার কন্যা হাসিনা ভারতের শাসকচক্রের কাছে এজন্যই এতো প্রিয়। একই রূপ গাদ্দারির কারণে ব্রিটিশ সরকার থেকে শুধু রাজনৈতিক প্রশ্রয়ই নয়, অর্থ, অস্ত্র এবং সামরিক বাহিনীর সহায়তা পেয়েছিল মক্বার গর্ভনর শরিফ হোসেনকে। কারণ সে উসমানিয়া খলিফার বিলুপ্তির লক্ষ্যে বিদ্রোহ করেছিল। 

দেশ বিভক্ত হলে দুর্বলতা বাড়ে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন যত বিশালই হোক ক্ষুদ্র ভূগোলের কারণে তা দিয়ে শক্তি বাড়ে না। মাথা পিছু আয়ের দিক দিয়ে কাতার সমগ্র পৃথিবীতে প্রথম। কিন্তু সে আয়ের কারণে দেশটির শক্তি বাড়েনি। মাথা পিছু আয় তা থেকে আরো শতগুণ বাড়লেও তাতে  কাতার কোন শক্তিশালী দেশে পরিণত হবে না। কারণ দেশটি ক্ষুদ্র। রাশিয়ার অর্থনীতি দক্ষিণ কোরিয়ার চেয়েও দুর্বল। কিন্তু তা সত্ত্বেও দেশটি একটি বিশ্বশক্তি। কারণ, রাশিয়ার রয়েছে বৃহৎ ভূগোল। তাই ভূগোল ক্ষুদ্রতর করা মানে রাষ্ট্রকে শক্তিহীন করা। ইসলামে তাই এটি হারাম। কারণ মহান আল্লাহতায়ালা মুসলিমদের দুর্বল দেখতে চান না। এতে খুশি হয় শয়তান এবং শয়তানের অনুসারি কাফেরগণ। তাই মুজিবের ন্যায় যারাই মুসলিম দেশের ভূগোল ছোট করেছে তারা ভয়ানক ক্ষতি করেছে মুসলিমদের। এমন ব্যক্তিগণ কখনোই মুসলিমদের বন্ধু হতে পারে না। ইসলামের এরূপ শত্রুদের বিজয়ে কাফেরগণ যেমন পুঁজি বিনিয়োগ করে, তেমনি তাদের বিজয় নিয়ে উৎসবও করে। একাত্তরে ভারত সেটিই করেছে।

অথচ ঈমানদারের চেতনাটি সম্পুর্ণ ভিন্ন। কোন মুসলিম দেশ যদি ভেঁঙ্গে যায় এবং ভেঁঙ্গে যাওয়ার বেদনাটি যদি কেউ হৃদয়ে অনুভব করে তবে বুঝতে হবে তার ঈমানের ভান্ডারটি শূণ্য। এজন্যই একাত্তরে কোন আলেম, কোন ইসলামী দল, ইসলামী চেতনাসমৃদ্ধ কোন বুদ্ধিজীবী এবং কোন পীর পাকিস্তান ভাঙ্গার পক্ষ নেয়নি। পাকিস্তান ভাঙ্গার প্রকল্পটি ছিল ইসলামের শত্রু পক্ষের। বাংলাদেশ আজ ইসলামের এ শত্রুদের হাতেই অধিকৃত। নামায়-রোযা, হজ্ব-উমরাহ মুনাফিকও পালন করতে পারে। নবীজী (সাঃ)র যুগে মুনাফিকগণ তার পিছনেও নামায পড়েছে। কিন্তু তারা হৃদয়ে ঈমান নিয়ে বেড়ে উঠতে পারে না।

যে কোন বৃহৎ দেশ সেদেশে বসবাসকারি মুসলিমদের জন্য বৃহৎ ভূমিকা পালনের সুযোগ সৃষ্টি করে। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র্র পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় জনগোষ্ঠি হওয়ার কারণে বাঙালী মুসলিমগণ বিশ্বব্যাপী বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বে যে ভূমিকা পালনের সুযোগ পেয়েছিল সে সুযোগ হারিয়ে তারা এখন ভারতের পদতলে আত্মসমর্পিত। ভারতের বিরুদ্ধে কথা বললে পিটুনি খেয়ে লাশ হতে হয়। এটিই হলো একাত্তরের প্রকৃত অর্জন। বাংলাদেশে অসভ্য নাচগানের আসর করতে অনুমতি লাগে না। কিন্তু অনুমতি লাগে কোরআনের তাফসির করতে। কম্যুনিস্ট, নাস্তিক বা অমুসলিমদের দল করতে বাঁধা নাই। কিন্তু বাঁধা আছে ইসলামের নামে দল করতে। সেটির শুরু মুজিবের হাতে।  ক্ষমতা হাতে পাওয়ার সাথে সাথে মুজিব সকল ইসলামী দলকে নিষিদ্ধ করে এবং দলগুলির নেতাকর্মীদের কারাবন্দী করে। অথচ পাকিস্তানে সে বিপদ ছিল না।

 

হারাম বিষয় কখনোই হালাল হয় না

কোর’আন-হাদীস নিয়ে যাদের সামান্য জ্ঞান আছে তাদের মাঝে মুসলিম দেশ ভাঙ্গার কাজটি যে হারাম -তা নিয়ে সামান্যতম সন্দেহ থাকার কথা নয়। অথচ সে হারামকে হালাল বানানোর চেষ্টাটি বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের মাঝে কম নয়। দেশ ভাঙ্গাকে জায়েজ করতে তাদের পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়, পাকিস্তান আমলে অনৈক ইসলামী কাজ ও হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তাতে কি একটি দেশ ভাঙ্গার ন্যায় একটি হারাম কাজ জায়েজ হয়? হারাম তো সব সময়ই হারাম। জনপদে সভ্য মানুষের বসবাস যেমন গড়ে উঠে, তেমনি বিষাক্ত সাপও সেখানে বাসা বাঁধার চেষ্টা করে। ঘরে সাপ ঢুকলো সে সাপ মারতে হয়, সে জন্য ঘরে আগুণ দেয়াটি শুধু বুদ্ধিহীনতাই নয়, গুরুতর অপরাধ। তাই শাসক যত দুর্বৃত্তই হোক -সে কারণে দেশ ভাঙ্গা জায়েজ হয় না। জায়েজ হয় না জনগণের মাঝে ভাষা বা বর্ণ ভিত্তিক ঘৃণা, ভিন্নতা বা শোষণের কারণেও। দেশ বাঁচিয়ে রেখেও এসব রোগের চিকিৎসা আছে। তাছাড়া প্রশ্ন হলো, একাত্তরের পূর্বে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭০ -এ ২২ বছরের পাকিস্তানী আমলে ২২ জন পূর্ব পাকিস্তানীও কি পুলিশ বা সেনাবাহিনীর হাতে নিহত হয়েছে? অথচ ২০১৩ সালের ৫’মের এক রাতে শাপলা চত্তরে হিফাজতে ইসলামের শত শত মুসল্লীকে হত্যা করা হয়েছে। এবং মিউনিসিপালিটির ময়লা ফেলার গাড়িতে তুলে তাদের লাশ গায়েব করা হয়েছে। পঞ্চাশের বেশী সেনা অফিসারদের হত্যা করা হয়েছে পিলখানাতে। মুজিবের শাসনামলে রক্ষিবাহিনী হত্যা করেছে তিরিশ হাজারের বেশী বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের। যু্দ্ধ আসলে সে সাথে  যুদ্ধাপরাধও আসে। একাত্তরের যুদ্ধে তাই বহু হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। অথচ বাংলাদেশে ভয়নাক গণহত্যাগুলি হয়েছে কোনরূপ যুদ্ধ ছাড়াই। ৯ মাসের যুদ্ধকালীন সময়টি ছাড়া পাকিস্তান আমলে কখনোই এরূপ গণহত্যা হয়নি।    

তাছাড়া অনেক খুনখারাবী ও অনৈসলামিক কাজ উমাইয়া ও আব্বাসী খলিফাদের আমলেও হয়েছে। মক্কায় পবিত্র ক্বা’বাতে আগুন দেয়া হয়েছে। হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। ইমাম হোসেন (রাঃ)’য়ের ন্যায় মহান ব্যক্তিও সে সরকারি নৃশংসতা থেকে রেহাই পাননি। তারপরও জনগণ মুসলিম রাষ্ট্রকে ভাঙ্গেনি। কারণ ক্বা’বাতে আগুন দেয়া বা হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষের হত্যার চেয়েও হাজার গুণ বেশী ক্ষতি হয় যদি মুসলিম রাষ্ট্র ভাঙ্গা হয়। এজন্যই মহাজ্ঞানী আল্লাহতায়ালা মুসলিমদের মাঝে বিভক্তি হারাম করেছেন এবং ভাষা ও বর্ণের নামে গড়ে উঠা ভেদাভেদের দেয়াল ভেঙ্গে একতা গড়াকে ইবাদত বলেছেন। একাত্তরে এ জ্ঞানটুকু থাকার কারণেই কোন ইসলামী দল বা ব্যক্তি পাকিস্তান ভাঙ্গার পক্ষ নেয়নি।

 

যে ব্যর্থতা জনগণের

তবে ব্যর্থতা শুধু নেতাদেরই নয়, সাধারণ জনগণের। জনগণকে শুধু চাষাবাদ, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকুরি-বাকুরি জানলে চলে না। তাকে সামাজিক ও রাজনৈতিক দায়িত্বপালনেও যোগ্যতার পরিচয় দিতে হয়। মুসলিম মাত্র দায়িত্ববান ব্যক্তি। দায়িত্বহীনগণ মুনাফিক হয়, কাফের হয়; কিন্তু তারা মুসলিম হতে পারে না। মুসলিমকে যোগ্যতার পরিচয় দিতে হয় শত্রু-মিত্র চেনাতেও। চোর-ডাকাতদের বন্ধু, নেতা বা পিতা রূপে জড়িয়ে ধরার মধ্যে যা প্রকাশ পায় সেটি বেঈমানী। তাতে যেমন দুনিয়ায় কল্যাণ নাই, তেমনি আখেরাতেও কল্যাণ নেই। এটি অবিকল বিষাক্ত শাপকে জড়িয়ে ধরার মত।

মুসলিমদের বড় বড় ক্ষতিগুলো যারা করেছে তাদের অপরাধগুলো কোন কালেই লুকানো ছিল না। কিন্তু তাদের সে অপরাধগুলি স্বচোখে দেখেও তারা সে অপরাধীদের নেতার আসনে বসিয়েছে। এরচেয়ে বড় অপরাধ কি হতে পারে? বাঙালী মুসলিমদের ব্যর্থতার মূল কারণ এখানেই। বাসের সকল যাত্রী মাতাল হলেও সে বাস গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে ব্যর্থ হয় না -যদি চালক সুস্থ্য হয়। কিন্তু যাত্রীগণ দরবেশ হলেও গাড়ী দুর্ঘটনা ঘটাবে বা সঠিক গন্তব্যে পৌঁছতে ব্যর্থ হবে -যদি চালক মাতাল বা মানসিক ভাবে অসুস্থ্য হয়। এজন্যই সবচেয়ে যোগ্যবান ব্যক্তিকে রাষ্ট্রের ড্রাইভিং সিটে বসানোর মধ্যেই কল্যাণ। এটিই নবীজী (সাঃ)র সূন্নত। তাই ইসলামের গৌরব যুগে রাষ্ট্র নায়কের সে সিটে বসেছেন খোদ নবীজী (সাঃ)। এবং নবীজী (সাঃ)’র ইন্তেকালের পর সে আসনে বসেছেন তাঁর শ্রেষ্ঠ সাহাবাগণ। অথচ বাংলাদেশ হচ্ছে তার উল্টোটি। রাষ্ট্র হাইজ্যাক হয়েছে ভোট-ডাকাত ফ্যাসিস্টদের হাতে। অথচ বাংলাদেশীদের মাঝে তা নিয়ে কোন প্রতিবাদ নেই। গরুছাগল সামনে কোন অন্যায় হতে দেখেও যেমন নীরবে ঘাস খায়, বাংলাদেশের মুসলিমদে অবস্থা কি তা থেকে ভিন্নতর?

রাষ্ট্রের কল্যাণ কাজের শুরুটি সমাজের নীচের তলা থেকে হয় না। সেটি শুরু করতে উপর থেকে। দেশের জনগণদের সবাইকে ফেরেশতা বানিয়ে তাই রাষ্ট্রে কল্যাণ আনা যায় না। সবাইকে ফেরেশতা বানানোর কাজটি সম্ভবও নয়। কারণ, অধিকাংশ মানুষ যে জাহান্নামে যাবে সেটি তো মহান আল্লাহতায়ালার কথা। সমাজ বিপ্লবের পথে তাই জরুরী হলো শাসন ক্ষমতায় নেক বান্দাদের বসানোর বিপ্লব। নইলে হাজার হাজার মসজিদ-মাদ্রাসা গড়েও দেশে কোন কল্যাণ আসবে না। বাঙালী মুসলিম দুর্গতির মূল কারণ, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ভাল মানুষকে বসানোর ন্যায় অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি জনগণের কাছে গুরুত্বই পায়নি। তারা কল্যাণ খুঁজেছে মসহজিদ-মাদ্রাসা গড়ায়। এবং স্রেফ নিজে ভাল হওয়ায়। নবীজী (সাঃ) ও তাঁর প্রিয় সাহাবাগণ রাষ্ট্রীয় বিপ্লবের যে মহান সূন্নত রেখে গেছেন -তা থেকে তারা কোন শিক্ষাই নেয়নি।

 

একাত্তরের যুদ্ধের ধারাবাহিকতা

ইসলামের শত্রুপক্ষীয় দুর্বৃত্তদের নীতি হলো, “মানুষকে বিভক্ত করো এবং শাসন করো”। এদের কাজ তাই ভাষা, বর্ণ, ভৌগলিক ভিন্নতা ও রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে জনগণের মাঝে বিভক্তি গড়া। শেখ মুজিবের রাজনীতির মূল পুঁজিই ছিল ঘৃণাভিত্তিক এ বিভক্তির রাজনীতি। পাকিস্তান আমলে তার বিভক্তির রাজনীতির ব্যাকারণ ছিল বাঙালী ও অবাঙালীর বিভক্তি। তেমন একটি ঘৃণাপূর্ণ মগজ নিয়ে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে নিজ দলকে শক্তিশালী করার কোন চেষ্টাই করেননি। সমগ্র পাকিস্তানে প্রধানমন্ত্রী হওয়া নিয়ে আগ্রহ থাকলে সে গরজটি তার মাঝে দেখা যেত। বাংলাদেশ সৃষ্টির পর বিভেদ গড়লেন বাংলাদেশ সৃষ্টির পক্ষ-বিপক্ষের ভিত্তিতে। এমন ক্ষমতালিপ্সু ক্ষুদ্র মনের মানুষদের কারণেই মুসলিম দেশগুলি খন্ডিত হয়েছে এবং দুর্বল হয়েছে। শয়তান এবং তাবত ইসলাম বিরোধীশক্তিও তো সেটিই চায়। এজন্যই কাফের অধিকৃত দেশগুলিতে তাই এদের বন্ধুর অভাব হয়না। বাংলাদেশের বুকে আত্মবিনাশী সে বিভক্তির রাজনীতিকে বলবান করার কাজে ভারতীয়দের বিনিয়োগ এজন্যই বিশাল। সে রাজনীতিকে বিজয়ী করতে একাত্তরে তারা যুদ্ধও করেছে। এবং তাদের সে নীতি আজও প্রয়োগ করে চলছে। ফলে শেখ হাসিনার পিছনে ভারতীদের রাজনৈতিক ও সামরিক বিনিয়োগটিও একাত্তরের ন্যায় বিশাল। দেহ খন্ডিত হলে যেমন অসম্ভব হয় নিজ পায়ে দাঁড়ানো, তেমনি এক পঙ্গুদশা হয় খন্ডিত দেশেরও। ইসলামে তাই এটি হারাম। অথচ শয়তানী শক্তির স্ট্রাটেজী সম্পূর্ণ বিপরীত।

ফলে ভারতের ন্যায় যারাই ইসলাম ও মুসলিমের ক্ষতিসাধনে উদগ্রীব তাদের স্ট্রাটেজীটি হলো, প্রতিটি মুসলিম দেশে বিচ্ছিন্নতাকামী দুর্বৃত্তদের ময়দানে নামানো। সেটি যেমন বাংলার মাটিতে পাকিস্তান আমলে দেখা গেছে, তেমনটি এখনও দেখা যাচ্ছে্। ভারত শুধু পাকিস্তান ভাঙ্গা নিয়ে খুশি নয়, মেরুদন্ড ভাঙ্গার বাসনা রাখে প্রতিটি মুসলিম দেশ ও জনপদে। মেরুদন্ড ভাঙ্গার সে কাজ ত্বরান্বিত করতেই কাশ্মীরে ভারত ৭ লাখ সৈন্য মোতায়েন করেছে। অথচ কাশ্মীরের জনসংখ্যা এক কোটিরও কম।  তেমন একটি মেরুদন্ড ভাঙ্গার লক্ষ্য বাংলাদেশেও। সে লক্ষ্যে ভারতের বিপুল বিনিয়োগ বাংলাদেশে। সেটি যেমন ভারতসেবী গুন্ডা উৎপাদনে, তেমনি গ্রামে গ্রামে গুপ্তচর বাহিনী গড়ে তোলায়। ভারতসেবীদের ক্ষমতায় রাখা এজন্যই ভারতীয়দের কাছে এতো গুরুত্বপূর্ণ। ভোটে জিতবে না সেটি নিশ্চিত হয়েই ভারত মধ্যরাতে ভোট-ডাকাতির মাধ্যমে হাসিনাকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার চক্রান্ত করে। এবং দমন প্রক্রিয়া চালু রেখেছে, এ ভোট-ডাকাত সরকারের বিরুদ্ধে যে কোন বিদ্রোহকে ব্যর্থ করায়।

ভারতীয়দের একাত্তরের যুদ্ধটি একাত্তরে শেষ হয়নি। একাত্তরে তাদের যুদ্ধটি ছিল পাকিস্তানকে খন্ডিত করার। পাকিস্তানকে খন্ডিত করার প্রয়োজনটি দেখা দিয়েছিল উপমহাদেশে মুসলিম শক্তিকে দুর্বল করার প্রয়োজনে। একাজে তারা কলাবোরেটর রূপে বেছে নিয়েছিল আওয়ামী লীগ ও ন্যাপসহ ইসলামী চেতনাশূণ্য সেক্যুলারিস্টদের। তবে পাকিস্তান খন্ডিত হলেও দুর্বল হয়নি, বরং পরিণত হয়েছে পারমানবিক শক্তিশালী দেশে। ফলে একাত্তরে যেরূপ রাশিয়ার সহায়তা নিয়ে বিজয়ী হয়েছিল, সেরূপ বিজয় এখন অসম্ভব। এর ফলে ভারতের সমস্যা বা ভয় কোনটাই কাটেনি। উপরুন্ত ভারতীয়দের মনে ভয় জেগেছে পূর্ব সীমান্তে আরেক শক্তিশালী মুসলিম রাষ্ট্রের উদ্ভব নিয়ে। ভারত-অনুগত দাস শাসনের অবসান হলে তেমন একটি বাংলাদেশের উদ্ভব যে সম্ভব -তা নিয়ে ভারত নিজের বিশ্বাসটিও প্রবল। তখন যুদ্ধ দেখা দিবে ভারতে পূর্বাঞ্চলীয় ৭টি প্রদেশে। এ কারণেই ভারতের গুরুত্বপূর্ণ স্ট্রাটেজী হলো বাংলাদেশের বুকে যারা ভারতের গোলামী নিয়ে বাঁচতে চায় তাদের সযত্নে বাঁচিয়ে রাখা। এবং যারা মুসলিম পরিচিতির ধারক তাদের নির্মূল করা। তেমন একটি লক্ষ্যে ভারত বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অবিরাম যুদ্ধ চালিয়ে যেতেও রাজি।   

বাংলাদেশের মাটিতে চলমান ভারতীয় যুদ্ধের আলামতগুলি প্রচুর। সেটি চলছে গুম-খুনের রাজনীতির নামে। বাংলাদেশের মাটিতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কথা বললে কেউ ক্ষিপ্ত হয়না। লাঠি হাতে কেউ ধেয়েও আসে না। কিন্তু ভারতের বিরুদ্ধে কথা বললে লাঠি হাতে মারতে তাড়া করে ছাত্রলীগের গুন্ডাগণ। এবং পিটিয়ে হত্যাও করে। ভারতের বিরুদ্ধে ফেস বুকে বক্তব্য দেয়ায় বুয়েটের আবরার ফাহাদ এদের হাতেই নৃশংস ভাবে লাশ হলো। একই কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এরা পিটিয়ে মরণাপন্ন করেছে ভিপি নুরুল হক সহ প্রায় তিরিশজনকে। অনেকে হয়েছে পঙ্গুত্বের শিকার।

 

মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের ভারতসেবী চেতনা

ভারতীয়দের একাত্তরের যুদ্ধের স্ট্রাটেজীর সাথে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে চলমান যুদ্ধটির ধারাবাহিকতা যে কতটা গভীর সেটি বুঝা যায়, ভারতবিরোধীদের উপর সরাসরি হামলাগুলি হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের নামের সংগঠন থেকে। মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের ক্যাডারদের কাজ হয়েছে যারাই ভারতের বিরুদ্ধে কথা বলছে তাদের উপর হামলা করা। তাদের কথা, ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোন কথা বলা যাবে না। কথা হলো, ভারতের বিরুদ্ধে নানা দেশে এবং জাতিসংঘে কথা বলা হচ্ছে, অতএব বাংলাদেশে যাবে না কেন? ভারতের বিরুদ্ধে কথা বলা দুষণীয় হলে তারা কেন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কথা বলে? ভারতীয় স্বার্থের পাহারাদার এ গুন্ডা সংগঠনটি জনবল পাচ্ছে ছাত্রলীগ থেকে। ভারতের ন্যায় ভারতসেবী হাসিনা সরকারের কাজ হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের এ দাস-যোদ্ধাদের প্রটেকশন দেয়া। ফলে তাদের হাতে সাধারণ ছাত্রগণ গুরুতর আহত হয়ে ইনটেনসিভ কেয়ারে ঢুকলেও পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে কেস নেয়না।

একাত্তরে ভারত ও ভারতসেবী আওয়ামী বাকশালীদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কি ছিল –সেটি বুঝার মোক্ষম সময় মূলতঃ এখন। মুজিব স্বাধীনতাও চায়নি, গণতন্ত্রও চায়নি। স্বাধীনতা চাইলে কি ভারতের সাথে ২৫ সালা দাসচুক্তি স্বাক্ষর করতো? গণতন্ত্রও চায়নি। গণতন্ত্র চাইলে কি দেশের সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠা করতো? নিষিদ্ধ করতো কি সকল বিরোধী দলীয় পত্র-পত্রিকা? মুজিবের ছিল একটি মাত্র এজেন্ডা। সেটি হলো যে কোন মূল্যে গদিতে বসা। সে লক্ষ্যে সে যেমন পাকিস্তান ভাঙ্গতে দু’পায়ে খাড়া ছিল, তেমনি প্রস্তুত ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিক্রি করাতেও। সে অভিন্ন এজেন্ডাটি নিয়ে কাজ করছে হাসিনাও। আর এরূপ ক্ষমতালোভী দেশ বিক্রেতাদের দাস রূপে পেলে ভারত তাকে দিয়ে ইচ্ছামত কাজ করিয়ে নিবে সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? তাই মুজিবকে দিয়ে যেমন ২৫ সালা দাসচুক্তি, পদ্মার পানি ও বেরুবাড়ি আদায় করে নিয়েছে, তেমনি হাসিনার মাধ্যেমে নিয়েছে করিডোর, তিস্তা ও ফেনি নদীর পানি, বাংলাদেশের বন্দরে ভারতীয় জাহাজের প্রবেশাধীকার এবং আরো অনেক কিছু। ক্ষমতালিপ্সুদের ক্ষমতায় যাওয়াতে এভাবে দেশের ভয়ানক স্বার্থহানি ঘটে।

ভারত ও ভারতসেবী আওয়ামী বাকশালীদের চেহারাটি একাত্তরেও সুস্পষ্ট ভাবে প্রকাশ পেয়েছিল। কিন্তু সেদিন অনেকের চোখই অন্ধ ছিল পাকিস্তানের প্রতি বিদ্বেষ ও ঘৃণার কারণে।  আকাশে মেঘ জমলে সূর্যও আড়াল হয়ে যায়; তেমনি মনে বিদ্বেষ ও ঘৃণা জমলে সত্যকে দেখার সামর্থ্যও বিলুপ্ত হয়। একাত্তরে ভারত ও ভারতসেবীদের কুৎসিত চেহারাটি এজন্যই অনেকে দেখতে পায়নি। এখন তো বাংলাদেশের মাটিতে পাকিস্তান নাই। ফলে সবাই দেখতে পাচ্ছে ভারত ও ভারতসেবী আওয়ামী বাকশালীদের প্রকৃত চেহারাটি। তাই তাদের প্রতি ঘৃণাটি শুধু একাত্তরের রাজাকারদের বিষয় নয়, সেটি পরিণত হয়েছে বাংলাদেশের প্রায় সকল মানুষের নিজস্ব উপলব্ধি।  

ফলে ভারতসেবী বাকশালীদের মিথ্যাচার সরিয়ে একাত্তরের সত্য ঘটনাগুলি জানার এখনই উপযুক্ত সময়।  প্রকৃত বীর, আর কারা ভারতসেবী গাদ্দার -একাত্তরের ইতিহাসের মাঝে রয়েছে তার প্রামাণিক দলিল।  সে দলিল যে বিষয়টি সুস্পষ্ট তা হলো, আগ্রাসী ভারতের হামলা থেকে স্বাধীনতা বাঁচানোর চেতনাটি কখনোই বাকশালী ভোট-ডাকাত ও মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের গুন্ডাদের চেতনা নয়। বরং সেটি হলো একাত্তরের রাজাকারদের চেতনা -যারা নিজেদের রক্ত দিয়ে ভারতীয় বাহিনী ও ভারতের অর্থে পালিত সেবাদাসদের বিশাল আগ্রাসন রুখতে জিহাদে নেমেছিল।  বহু হাজার রাজাকার সে ভারতীয় আগ্রাসন থেকে বাঁচতে শহীদও হয়েছিল। ০১/০১/২০২০  

 




বাংলাদেশে ভারতীয় স্বার্থের পাহারাদারদের সন্ত্রাস এবং স্বাধীনতার সংকট

ভিয়েতনামে যখন মার্কিন বাহিনীর আগ্রাসন ও গণহত্যা চলে তখন তার বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রায় প্রতিটি বড় বড় শহরে বহু প্রতিবাদ সভা ও মিছিল হয়েছে। অসংখ্য সভা ও মিছিল হয়েছে যখন সোভিয়েত রাশিয়ার হাতে আফগানিস্তান অধিকৃত হয়। ইরাকের উপর যখন মার্কিন হামলা হয় তখনও বাংলাদেশে বহু  প্রতিবাদ সমাবেশ ও মিছিল হয়েছে। সেরূপ মিছিল-সমাবেশ সমগ্র বিশ্ব ব্যপী হয়েছে। ইরাকের বিরুদ্ধে হামলার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় জনসভাটি হয়েছে লন্ডনে। হাইড পার্কের সে সমাবেশে বিশ লাখের বেশী নরনারী জমায়েত হয়েছিল। সচেতন মানুষেরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে এভাবেই প্রতিবাদ মুখর হয়।

যুদ্ধ-জুলুম-নির্যাতনে বিরুদ্ধে ঘৃণা ও প্রতিবাদ না থাকাটাই মানবতার মৃত্যু। তখন মানব দেহ বেড়ে উঠে নিরেট পশুত্ব নিয়ে। সামনে কাউকে জবাই হতে দেখেও গরু-ছাগল নীরবে ঘাস খায়। এতেই পশুত্বের পরিচয়। কিন্তু হৃদয়ে মানবতা নিয়ে যারা বাঁচে তারা সেটি পারে না। জুলুমের বিরুদ্ধে যে ঘৃণা সেটি কোন সীমা-সরহাদ মানে না। এ কারণেই কোন গৃহে কেউ খুন বা ধর্ষিতা হলে -সেটি আর সে গৃহের অভ্যন্তরীণ বিষয় থাকে না। সে জুলুম রুখতে বিবেকবান মানুষ মাত্রই আওয়াজ তুলে এবং প্রয়জনে অস্ত্র হাতে ছুটে আসে। প্রশ্ন হলো, ছাত্র লীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও শেখ হাসিনার মাঝে সে মানবিক রূপটি কই? তারা তো ভারতের জালেম শাসকের পক্ষ নিয়েছে।

তাছাড়া মানুষ হওয়ার সাথে সাথে যারা মুসলিম পরিচয় নিয়ে বাঁচে তাদের কিছু বাড়তি দায়-দায়িত্বও থাকে। সে দায়িত্ব নিয়ে বাঁচার মধ্যেই প্রকৃত ঈমানদারী। তাই বিশ্বের কোন এক প্রান্তে যদি কোন মুসলিম ধর্ষিতা, আহত, নিহত বা অত্যাচারিত হয় এবং তা নিয়ে যদি কোন ব্যক্তির হৃদয়ে বেদনা না জাগে -তবে বুঝতে হবে সে ব্যক্তি আদৌ মুসলিম নয়। তার দেহে প্রাণ থাকতে পারে, তবে সে প্রাণে যে বিন্দুমাত্র ঈমান নাই –তা নিয়ে কোন সন্দেহ নাই।  বেদনার সে জায়গাটি হলো ঈমান। এমন বেদনাশূণ্য ব্যক্তিটি বাঙালী হতে পারে, হিন্দু-বৌদ্ধ-খৃষ্টানও হতে পারে, কিন্তু সে কখনোই মুসলিম হতে পারে না। মাওলানা আবুল কালাম আযাদ তাই বলকান যুদ্ধকালীন সময়ে লিখেছিলেন, “যদি কোন তুর্কী সৈনিকের পা গুলিবিদ্ধ হয় আর সে গুলির আঘাতের বেদনা তুমি যদি হৃদয়ে অনুভব না করো -তবে খোদার কসম তুমি মুসলিম নও।” কারণ, মুসলিম হওয়ার শর্তই হলো অন্য মুসলিম ভাইয়ের বেদনায় পরম ব্যাথীত হওয়া এবং সে বেদনার প্রতিকারে কিছু করার ভাবনা নিয়ে বাঁচা।  অধিকৃত আফগান মুসলিমদের সে বেদনার উপশমে তাই হাজার হাজার মুজাহিদ বিশ্বের নানা কোণ থেকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে আফগানিস্তানে ছুটে এসেছিলেন।

মুসলিম মাত্রই তাই ঢাকার রাস্তায় ভারতে মুসলিম নির্যাতনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানাবে সেটিই তো স্বাভাবিক। মুসলিমদের গৌরব কালে এরূপ ঘটনা ঘটলে শুধু প্রতিবাদ নয়, জালেম শক্তির বিরুদ্ধে রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধও শুরু হত। মুসলিমের জীবনের মিশন কি স্রেফ নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত পালন এবং মসজিদ-মাদ্রসা নির্মাণ? মুল মিশন তো অন্যায় ও জুলুমের নির্মূল এবং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা। ইসলামের যে শান্তির ধর্ম –তা তো এ ভাবে দুর্বৃত্তদের নির্মূলের মাধ্যমেই প্রমাণিত হয়। প্রকৃত ঈমানদারগণ এমন পবিত্র মিশনে নিজেদের জান-মাল তথা সকল সামর্থ্যের বিনিয়োগ করে। নবীজী (সাঃ)র সাহাবীদের ৭০% ভাগের বেশী এ কাজে শহীদ হয়েছেন। মানব ইতিহাসে অন্য কোন ধর্ম বা জাতির লোকেরা সেটি করেনি। বেঈমানদের বিনিয়োগটি হয় নিছক নিজের গোত্র, ভাষা, বর্ণ, দল বা জাতীয়তার গৌরব বাড়াতে। সত্য ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায় তাদের কোন গরজ থাকে না। তারা নিজেরাই বরং দুর্বৃত্ত স্বৈর-শাসকে পরিণত হয় –যেমনটি শেখ মুজিবের ক্ষেত্রে হয়েছে। দুর্বৃত্তদের নির্মূল ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায় প্রকৃত মুসলিমদের সে বিশাল কোরবানীর কারণেই সুরা আল-ইমরানের ১১০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহতায়ালা তাদেরকে সমগ্র মানব সৃষ্টির মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মাহ রূপে ভূষিত করেছেন। অথচ শেখ হাসিনা ও তার অবৈধ সরকারের কাজ হয়েছে বাংলাদেশের মুসলিমদের ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের নির্মূলের সে অর্পিত কোর’আনী মিশন থেকে দূরে রাখা। এ মিশন রুখতে শেখ হাসিনা নিজে এবং তার দলের নেতা-কর্মীগণ ভারতের জালেম সরকারের পক্ষে সন্ত্রাসী লাঠিয়ালে পরিণত হয়েছে। সে লক্ষ্যে শেখ হাসিনা সফলতাটি যে কতটা বিশাল তারই প্রমাণ, ছাত্রলীগের কর্মীদের হাতে বুয়েটে আবরার ফাহাদের হত্যা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিপি নূরের উপর হামলা। তাদের উভয়ের অপরাধ, তারা মুখ খুলেছিল ভারতীয় অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে।      

ভারতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে শুধু যে হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন হচ্ছে তা নয়। ষড়যন্ত্র হচ্ছে তাদের নাগরিকত্ব হরণের। চেষ্টা হচ্ছে নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিতদেরকে বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারি রূপে আখ্যায়ীত করা। এবং বাঙালী অনুপ্রবেশকারির লেবেল লাগিয়ে তাদেরকে ভারত থেকে বাংলাদেশে “পুশ ইন” করা। এ ষড়যন্ত্রের রূপায়নে ইতিমধ্যেই আসামে ১৯ লাখ বাসিন্দাকে নাগরিকত্বহীন করা হয়েছে। যাদেরকে নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে তাদের মধ্যে ৭ লাখ মুসলিম। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে্, তারা বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশকারী। এভাবে ভারত সরকার ভারতীয় মুসলিমদের সাথে বাংলাদেশকেও জড়িয়ে ফেলেছে। দিল্লিতে সরকারি ভাবে এ কথা জোরেশোরে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ হিন্দু নির্যাতন হচ্ছে এবং হিন্দুগণ প্রাণ বাঁচাতে ভারতে আশ্রয় নিচ্ছে। ভারতের লোক সভায় বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সেরূপ একটি গুরুতর অভিযোগ এনেছে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ। তাই বিষয়টি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় হয় কি করে? প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের মানুষ এরূপ মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে নীরবই বা থাকে কী করে? অথচ বাংলাদেশের সরকার শুধু নীরবই থাকেনি, অন্যরা ভারতীয় মিথ্যাচার ও জুলুমের বিরুদ্ধে সরব হোক, সমাবেশ ও মিছিল করুক -সেটিও হাসিনার অবৈধ সরকার অসম্ভব করেছে। সেগুলি বাধা দিতে পেশী শক্তি নিয়ে ময়দানে নেমেছে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীগণ। তাদের হাতে  আহত হয়েই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের ভিপি নূর এবং আরো অনেকে। পুলিশ হামলাকারিদের গ্রেফতার না করে প্রমাণ করলো সরকারেরও সম্মতি হয়েছে এরূপ সন্ত্রাসী হামালায়।

লক্ষণীয় বিষয় হলো, মুসলিম নির্যাতনের বিরুদ্ধে মিটিং-মিছিল ভারতে সম্ভব হলেও সেটি বাংলাদেশে অসম্ভব করে রেখেছে শেখ হাসিনা ও তার অবৈধ সরকার। এভাবে শেখ হাসিনা এবং তাঁর সাথীগণ প্রমাণ করলো ভারতীয়দের চেয়েও তারা অধীক ভারতীয়। ছাত্র লীগ ও আওয়ামী লীগের কর্মীগণ আবির্ভুত হয়েছে ভারতীয় লাঠিয়াল বাহিনীর ঠ্যাঙ্গারে রূপে। ভিপি নূর ও তাঁর সাথীদের উপর হামলাকারীদের অভিযোগ ভিপি নূর ভারতে অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে রাজনীতি করছে। সে অভিযোগের ভিত্তিতে হুশিয়ারি দিয়েছে, তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ঢুকতে দিবে না। এবং ঢুকার চেষ্টা হওয়াতে তাঁর উপর হামলাও হচ্ছে।

শেখ হাসিনার অবৈধ সরকারের ভারতসেবী আচরণের প্রমাণ বহু। বুকার প্রাইজ বিজয়ী ভারতীয় লেখিকা অরুন্ধতি রায় ভারতের নানা শহরে ভারত সরকারের নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সভা করেন। তিনি ঢাকাতেও এসেছিলেন। তাঁর আগমন উপলক্ষে ডক্টর শহীদুল আলম ঢাকার একটি সেমিনার কক্ষে সুধি সমাবেশর আয়োজন করেছিলেন। কিন্তু সরকার সেটি করতে দেয়নি। কারণ অরুন্ধতি রায়ের খ্যাতি হলো, ভারত সরকারের জুলুমের বিরুদ্ধে অতি নির্ভয়ে হক কথা বলায়। তিনি কথা বলেন কাশ্মীরে ভারতীয় বাহিনীর অধিকৃতি ও জুলুমের বিরুদ্ধেও। কিন্তু হাসিনার অবৈধ সরকার চায়নি বাংলাদেশের মাটিতে ভারতের ভারতীয় নীতির কোনরূপ নিন্দা হোক। এখানে কাজ করেছে শেখ হাসিনার ভারতপ্রীতিই শুধু নয়, ভারতভীতিও। 

গণতন্ত্রবিরোধী এমন নিষ্ঠুর আচরণ একমাত্র অবৈধ সরকারই করতে পারে। কারণ, অবৈধ সরকার মাত্রই জানে, জনগণের ভোট নিয়ে তারা ক্ষমতায় আসেনি। ফলে তাদের আচরণ যত নিষ্ঠুরই হোক, সে জন্য তারা জনগণের কাছে জবাবদেহীতে বাধ্য নয়। তাদের দায়বদ্ধতা ষোল আনা কেবল প্রভুদের প্রতি। হাসিনার ক্ষেত্রে সে প্রভু হলো ভারত সরকার। কারণ, ভারতীয় গোয়েন্দাদের সহযোগিতা নিয়েই শেখ হাসিনা ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের রাতে ভোট ডাকাতি করে ক্ষমতায় বসেছে। আন্তর্জাতিক মহলে এরূপ একটি অবৈধ সরকারকে গ্রহণযোগ্য করতেও নানা দেশের রাজধানীতে কাজ করছে ভারতীয় কূটনৈতীক মহল। ফলে ভারতের প্রতি দায় পরিশোধ করতেই শেখ হাসিনা মাঠে নামিয়েছে তার লাঠিয়াল বাহিনীকে। ভিপি নূর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্রদের দ্বারা নির্বাচিত হলে কী হবে ক্যাম্পাসে প্রবেশে তাঁর উপর নিষেধাজ্ঞা লাগিয়েছে। একাত্তরে ইয়াহিয়া খানের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল নির্বাচনী বিজয়ের পরও মুজিবের হাতে ক্ষমতা দেয়া হয়নি। অথচ শেখ হাসিনা একই আচরণ করছে ভিপি নূরের বিরুদ্ধে।

যারা ভিপি নূরের মিছিল ও মিটিংয়ে বাধা দিচ্ছে তারা সেটি করছে “মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ”য়ের ব্যানারে। প্রশ্ন হলো, ভারত-বিরোধী আওয়াজ স্তব্ধ করার লক্ষ্যে “মুক্তিযুদ্ধ”য়ের নাম বা চেতনা ব্যবহারের হেতু কী? হেতুটি বিশাল। লক্ষ্য এখানে ১৯৭১’য়ে বাংলাদেশের জন্মে ভারতের অবদানকে স্মরণ করিয়ে দেয়া। তাদের কথা, বাংলাদেশের মাটিতে বসে ভারতের বিরুদ্ধে কথা বলার অর্থ ভারতের প্রতি নিমক-হারামী। এটি গাদ্দারি। সেটি হতে দিতে তারা রাজী নয়।  “মুক্তিযুদ্ধ”য়ের চেতনাটি হলো ভারতের ভাত-মাছ, লবন-পানি খেয়ে তাদের অর্থ,অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ নিয়ে ভারতের আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় মুসলিম শক্তিকে খর্ব করা এবং ভারত বিরোধীদের নির্মূলে ভারতকে সাথে নিয়ে যুদ্ধ করা। যুদ্ধ শেষে তাজুদ্দীনের ৭ দফা এবং মুজিবের ২৫ দফার গোলামী চুক্তি মেনে নিয়ে বসবাস করা।

বাংলাদেশের মাটিতে পাকিস্তানের বিলুপ্তি ঘটেছে। একাত্তরের রাজাকারদের অধিকাংশেরই মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু যা হয়নি তা হলো ভারত-বিরোধী চেতনার বিলুপ্তি। বরং বিপুল ভাবে সেটি বেড়েছে। ভারতকে যারা একাত্তরে চিনতে ভূল করেছে, তারা এখন চিনছে। চিনতে সাহায্য করছে যেমন মুজিবের বাকশালী স্বৈরাচার তেমনি শেখ হাসিনার ভোট ডাকাতি ফ্যাসিবাদ। ভারতের ভয় দ্রুত বাড়ছে বর্ধিষ্ণু ভারত বিরোধীতার কারণে। তাই ভারত চায়, বাংলাদেশীদের মনে ভারতের একাত্তরের অবদানকে স্মরণ করিয়ে দেয়া। সেটি মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের নামে। একাত্তরে যাদের ঘাড়ে অস্ত্র রেখে ভারত পাকিস্তান ভেঙ্গেছিল, এখনো তাদের ঘাড়ে অস্ত্র রেখেই ভারত-বিরোধীদের নির্মূল করতে চায়। চায়, একাত্তরেরর ন্যায় আরেকটি যুদ্ধ। সেটি করতেই প্রতিটি ভারত-বিরোধীই চিহ্নিত হচ্ছে রাজাকার রূপে। ফলে বিলুপ্তি ঘটছে না “মুক্তিযুদ্ধ” ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার। সে চেতনা ও যুদ্ধ আছে বলেই সে চেতনাধারীদের নির্মম প্রহারে প্রাণ হারালো বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদ। এবং গুরুতর ভাবে আহত হলো ভিপি নূর ও তাঁর সাথীরা।

বাংলাদেশীদের সামনে পথ মাত্র দুটি। এক). “মুক্তিযুদ্ধ” ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে শেখ হাসিনা ও তার গুন্ডাগণ ভারতসেবী যে দুর্বৃত্ত গোলামী শাসন প্রতিষ্ঠা দিয়েছে সেটি মাথা নত করে মেনে নেয়া। এটিই হলো শেখ মুজিব, শেখ হাসিনা ও সিকিমের লেন্দুপ দর্জির পথ। এ পথটি হলো বাকশালী ফ্যাসিবাদ, গুম-খুন, ভোট ডাকাতি এবং রাস্তায় লাশ হওয়ার পথ। দুই). ভারতের গোলামী মুক্ত হয়ে স্বাধীনতা নিয়ে বাঁচার পথ। স্বাধীনতার এ পথে চলতে হলে ভারতসেবীদের কাছে রাজাকার রূপে চিহ্নিত হওয়া ছাড়া উপায় নেই। কারণ, একাত্তরের রাজাকারদের চেতনা নিয়ে অনেকের ভূল ধারণা থাকলেও সেরূপ ভূল ভারত ও ভারতসেবীরা করে না। রাজাকারদের চিনতে তারা কখনোই সংশয়ে পড়ে না। তাদের জানা রাজাকারের চেতনার মূল কথাটি হলো, ভারতের গোলামী মুক্ত হয়ে স্বাধীন মুসলিম শক্তি রূপে বাঁচার চেতনা। সে সাথে ভাষা ও ভূগোলের সীমানা ডিঙ্গিয়ে বিশ্ব-মুসলিমদের সাথে প্যান-ইসলামিক ভাতৃত্বের চেতনা। সে চেতনার কারণেই ১৯৭১’য়ে বহু হাজার সাহসী যুবক পাকিস্তানকে বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছিল এবং ভারতসেবীদের পক্ষে বিশাল প্লাবন দেখেও তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছিল। কারণ, তারা বুঝেছিল ক্ষুদ্র ভূগোলে স্বাধীনতা বাঁচে না। সে জন্য বৃহৎ ভূগোল চাই। ১৯৪৭’য়ে তৎকালীন  বাঙালী মুসলিম নেতাগণ সেটি বুঝেছিল বলেই নিজ গরজে পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তানভূক্ত করেছিল।

ইসলামী ভাতৃত্বের চেতনার ধারকগণ একাত্তরে পরাজিত হলেও সে চেতনাটি মারা যায়নি, বরং প্রবলতর হচ্ছে ক্যাম্পাসে, রাজপথে ও সোসাল মিডিয়াতে। ভারতীয় মুসলিমগণ নির্যাতিত, ধর্ষিতা ও নিহত হলে ঢাকার রাস্তায় তাই আওয়াজ উঠে। ভারত ও ভারতসেবী হাসিনার কাছে ভারতবিরোধী সে আওয়াজটি অসহ্য। এরূপ প্রতিবাদি আওয়াজকে তারা রাজাকারের আওয়াজ মনে করে। এজন্যই আবরার ফাহাদের ন্যায় একজন নিরেট দেশপ্রেমিক মেধাবী ছাত্রকে ভারতসেবী অসভ্য স্বৈরশক্তির হাতে লাশ হতে হলো। এবং আহত হলো ভিপি নূর ও তাঁর সাথীরা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারী ভারতসেবীদের শাসনে কি এটিই স্বাভাবিক নয়? ফলে এরূপ বর্বর দমনমূলক শাসন যেমন মুজিব আমলে দেখা গেছে, দেখা যাচ্ছে হাসিনার আমলেও। ২৫/১২/২০১৯ 




দেশ এবং সমাজ নিয়ে ভাবনা-৪

1.
স্বৈরাচারি শাসনামালে অতি নৃশংস অপরাধগুলো শুধু সরকারের অনুগত পুলিশ এবং গুন্ডাদের হাতে হয় না। বরং বড় বড় নৃশংস অপরাধগুলো ঘটে দাস চরিত্রের বিচারকদের হাতে।এবং সেটি বিচারের নামে। নিরপরাধ মানুষদেরও তখন ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়। স্বৈরাচার শাসকগণ তাই শুধু অনুগত পুলিশ বাহিনীই গড়ে তোলে না, গড়ে তো অনুগত বিচারক বাহিনীও।

2.
বাংলাদেশে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকগণ যেন আওয়ামী লীগের ক্যাডার। এতকাল জয় বাংলা স্লোগান আওয়ামী  লীগ দলীয় মিটিং ও মিছিলে দেয়া হত। কে আওয়ামী লীগ, আর কে আওয়ামী লীগ নয় -সেটি চেনা যেত এ স্লোগান থেকে। এখন সকল সভায় সবার উপর জয় বাংলা বলাকে আদালত বাধ্যতামূলক করলো। এটি কি আদালতের কাজ?

3.
আদালতের মূল কাজ আইনের শাসন কায়েম করা। আইনের শাসন থাকলে কি মধ্যরাতের ভোট ডাকাতগণ ক্ষমতায় বসতে পারতো? বিচারে তাদের জেলে যেতে হতো।

4.
সুপ্রিম কোর্ট স্বৈরাচারের পক্ষে এবং জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানটি কোন দলের ছিল না, এটি প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল সকল দলের দাবীর ভিত্তিতে। স্বৈরাচারের পক্ষ থেকে যাতে ভোট ডাকাতি না -সেটি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। জনগণের ভোটের উপর ডাকাতিকে সহজ করতেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানকে আদালত বাতিল করেছে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের চরিত্র প্রকাশ পেয়েছে এ রায়ের মধ্য দিয়ে ।    

5.
যে বিচারকদের ভোট ডাকাতদের আদালতে কাঠগড়ায় খাড়া করে বিচার করার যোগ্যতা নাই তারা এ অধীকার কোত্থেকে পায় যে ভাষণ কি বলে শুরু করতে হবে ও শেষ করতে হবে সে ছবক শোনায়!

6.
আওয়ামী লীগ ভারত সরকারের কাছে অতি প্রিয়। কারণ ভারতের ইচ্ছা তারা সব সময় পূরণ করে।১৯৭১’য়েও ভারতকে বিজয়ী করে খুশির বন্যা দিয়েছিল ও বিশ্বের মুসলিমদের চোখে পানি এনেছিল।

7.
একটি মুসলিম দেশ যদি কাফের শক্তির হামলায় পরাজিত হয় ও ভেঁঙ্গে যায় এবং তা নিয়ে যদি কেউ উৎসব করে -তবে বুঝতে হবে তার ঈমান নাই। টুপি-দাড়ি, নামায-রোযা ও হজ্ব-উমরাহ দিয়ে এ বেঈমানী ঢাকা যায় ন। এরাই ইসলামের শত্রু।

8.
বাংলাদেশের শিক্ষানীতির সবচেয়ে বড় সফলতাটি হলো, এটি অধিকাংশ ছাত্রদের ইসলামশুণ্য করতে পেরেছে এবং চোরডাকাত ও ভোটডাকাতদের গদিতে বসিয়ে সন্মান দিতে  শিখিয়েছে।

9.
একটি ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার সফলতাটি বিশাল।চোর-ডাকাতগণ সবার ঘৃনার ভয়ে এতকাল মুখ লুকিয়ে থাকতো। এখন জনগণই ভয়ে হাসিনার ন্যায় এক ভোট ডাকাতকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলে

10.
ঈমান ব্যাক্তির মনের দৃষ্টি বাড়ায়। দেহের চোখ মাত্র দুটি, কিন্তু মনের চোখ অসংখ্য। মনের চোখ দিয়ে আল্লাহর নেয়ামত যেমন দেখা যায়, তেমনি দুর্বৃত্তদেরও চেনা যায। মনের এ দৃষ্টিকে পবিত্র কোর’আনের ভাষায় নূর বা বাসিরাত বলা হয়। ঈমানদার তাই ভোট ডাকাতকে কখনোই জননী বা কাওমী জননী বলেনা।

11.
শেখ হাসিনার বড় অহংকার, উন্নতি দিয়ে দেশ ভরে দিয়েছে। সেটি হলে ভোট ডাকাতিতে নামেন কেন? মিছিল-মিটিংয়ের স্বাধীনতাই বা কেড়ে নেন কেন? ভোট ও মাঠে নামার অধীকার দিয়ে জনপ্রিয়তা যাচাই করেন না কেন?

12.
বাংলাদেশে ন্যায্য বিচার থাকলে ভোট ডাকাতির অপরাধে শেখ হাসিনা ও তার সাথীদের কঠোর সাজা হতো। কিন্তু সেটি না হয়ে আদালত পরিনত হয়েছে বিরোধীদের শাস্তি দেয়ার সরকারি হাতিয়ারে।

13.
জনগণের মূল্যবান সম্পদ হলো তার ভোট। অতি ঘৃণ্যতম ডাকাতি হলো সে ভোটের উপর ডাকাতি করা।সে ডাকাতিতে হাতেনাতে ধরা পড়েছে শেখ হাসিনা। অথচ সে ডাকাতের হুকুমই বাংলাদেশের মানুষকে মেনে চলতে হয়। কথা হলো, যারা ডাকাতদের হুকুম মেনে চলে তাদের কি আন্তর্জাতিক অংগনে ইজ্জত থাকে?

14.
শেখ মুজিবকে চিনতে যাদের এখনো বাঁকি, শেখ হাসিনার হাতে সে মুজিবী আদর্শের বাস্তবায়ন দেখে তাকে চেনা উচিত। বুঝতে হবে এরাই ছিল ১৯৭১’য়ের রত্ম যারা সে সময় বহু লক্ষ মানুষের জীবন কেড়ে নেয়। এবং ডেকে এনেছিল ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ।

15.
আদালতে বিচার না করে পুলিশ এবং RAB’য়ের হাতে প্রতিটি হত্যাই হলো খুন। এখানে খুনি হলো দেশের ভোট-ডাকাত সরকার। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশী মানুষ খুন হচ্ছে স্বৈরাচারি এ সরকারের হাতে। অথচ সে খুনের কোন বিচার হচ্ছে না।

16.
কোর’আন ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের প্রতিটি সমস্যায় পথ দেখায়। অথচ সমস্যায় পড়লে মুসলিমগণ পথ খোঁজে নিজেদের মুসলিম পরিচয় বাদ দিয়ে এবং কোর’আন-হাদীসের বাইরে থেকে। এটি হলো মহান আল্লাহতায়ালা ও নবীপাকের সাথে চরম বেঈমানী। এ বেঈমানী আযাব ডেকে আনে।

১৭.
কেউ কেউ বলে, জিহাদ হলো নফসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। সেটি বলে অস্ত্রের যুদ্ধ থেকে মুসলিমদের দূলে রাখার লক্ষ্যে। প্রশ্ন হলো,  নবীজীর দাঁত ভাঙ্গলো এবং শতকরা ৭০ জনের অধীক সাহাবা শহীদ হলেন কি নফসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে।

 




একাত্তরের বিতর্ক

একাত্তর সম্পর্কে শুরু থেকেই বিপরীত মতামত রয়েছে এবং সেটি ভবিষ্যতেও থাকবে। বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদী শক্তি শুধু নিজেদের কথাই বলছে এবং তাদের বিরোধী মতের অনুসারিদের মুখ খুলতে দিচ্ছে না। এটি হলো তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সন্ত্রাস। অথচ এ নিয়ে খোলাখোলি আলোচনা হওয়া উচিত। যে কোন দেশে নানা বিষয়ে নানা লোকের ভিন্ন ভিন্ন মতামত থাকবে -সেটিই স্বাভাবিক। তবে কোনটি ঠিক এবং কোনটি সঠিক –সে বিচারটি হয় নানারূপ দর্শন ও চেতনার ভিত্তিতে। ফলে বিচারের রায়ও ভিন্ন হয়। যেমন, দুইজনের সম্মতিতে ব্যাভিচার হলে সেটি সেক্যুলার চেতনায় বা সেক্যুলার আইনে কোন অপারধই নয়। বাংলাদেশের সেক্যুলার আইনেও সেটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ গণ্য হয়না। সেক্যুলার চেতনায় সে ব্যাভিচার বরং প্রেম রূপে গণ্য হয়। বাংলাদেশের সেক্যুলার আইনে মদজুয়ার ন্যায় ব্যাভিচারের দোকান খোলাও কোন অপরাধ নয়।

তেমনি গোত্রবাদী ও জাতীয়তাবাদী সেক্যুলার চেতনায় কোন মুসলিম দেশ ভাঙ্গার কাজটিও অপরাধ গণ্য হয় না। সেটি বরং দেশপ্রেম গণ্য হয়। অথচ বিচারের মানদন্ডটি কোরআন-হাদীস হলে ব্যাভিচার ও দেশ ভাঙ্গা উভয়ই হত্যাযোগ্য অপরাধ রূপে গণ্য হয়। শাসক-শক্তি যদি অত্যাচারি, খুনি বা ধর্ষকও হয় তবুও সে জন্য দেশ ভাঙ্গা জায়েজ হয় না। এটিই শরিয়তের বিধান। কারণ শাসক যত জালেমই হোক সে শত শত বছর বাঁচে না। কিন্তু দেশকে দেশবাসীর জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হাজার হাজার বছর বাঁচিয়ে রাখতে হয়। নইলে বিপদ ঘনিয়ে আসে। দেশের এক গজ ভূগোল বাড়াতেও তো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করতে হয়। সে দেশকে তাই কি খন্ডিত করা যায়? এমন কাজ তো বেওকুপদের।

খন্ডিত করা মানে তো দেশকে দুর্বল করা। সেটি তো হারাম। ঘরে শাপ ঢুকলে সে শাপ তাড়াতে হয়, সেজন্য ঘরে আগুন দেয়াটি গুরুতর অপরাধ। বিষয়টি প্রাথমিক যুগের মুসলিমগণ জানতো বলেই খোলাফায়ে রাশেদা, উমাইয়া ও আব্বাসী আমলে আরব, ইরানী, তুর্কী, কুর্দ, মুর ইত্যাদী নানা ভাষার মুসলিমগণ একত্রে বসবাস করেছে। ভাষার নামে তারা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দেশ গড়েনি। বিভক্তিকে তারা হারাম গণ্য করেছে। তবে আজ যেমন শহরে শহরে পতিতাপল্লী গড়ে দেহব্যবসা করাটি যেমন স্বীকৃতি পেয়েছে, তেমনি বৈধতা পেয়েছে মুসলিম দেশগুলিকে খন্ডিত করা। তাই আরবগণ ২২ টুকরায় বিভক্ত। আর এরূপ হারাম কাজে লিপ্ত হলে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুত কঠোর আযাব আসবে -সেটিই তো স্বাভাবিক।

কোর’আন-হাদীস ভিত্তিক এমন একটি চেতনার কারণেই গুটিকয় ব্যতিক্রম ছাড়া একাত্তরের কোন ইসলামী দল, কোন আলেম, কোন পীর, মাদ্রাসার কোন ছা্ত্র ও শিক্ষক এবং ইসলামী কোন চিন্তাবিদ পাকিস্তান ভাঙ্গার পক্ষ নেয়নি। চেতনার দিক দিয়ে তারা সবাই ছিল রাজাকারের চেতনার অধিকারী। পাকিস্তান ভাঙ্গার পক্ষ নিয়েছিল মূলতঃ ইসলামে অঙ্গিকারশূণ্য আওয়ামী লীগ, চীনপন্থি ও রুশপন্থি ন্যাপ, কম্যুনিস্ট পার্টি এবং হিন্দুগণ। এমন কি বিশ্বের কোন মুসলিম দেশও পাকিস্তান ভাঙ্গাকে সমর্থন করেনি। বরং পাকিস্তান ভেঙ্গে যাওয়াতে মুসলিম বিশ্বের জনগণ সেদিন শোকাহত হয়েছে। পাকিস্তান ভাঙ্গাকে সমর্থন করেছে ভারত, রাশিয়া ও ইসরাইলের ন্যায় মুসলিমবিরোধী রাষ্ট্রগুলি। এবং আনন্দের বন্যা বয়েছে ভারতীয় কাফেরদের মনে। সে আনন্দ দেয়াতে ভারত আওয়ামী লীগকে তাই সব সময় মাথায় তুলে রেখেছে। অপর দিকে একাত্তরের যারা ভারতীয় প্রকল্পের কাছে মাথা নত করেনি তাদের নির্মূলের পথ বেছে নিয়েছে।

যারা কাফেরদের মনে আনন্দ বাড়ায়, মুসলিমদের শক্তিহানী করে এবং মুসলিমদের শোকাহত করে তাদেরকে কি ঈমানদার বলা যায়? নামায-রোযা, হজ্ব-উমরা মুনাফিকগণও পালন করে থাকে। কিন্তু বিশ্বমাঝে মুসলিম উম্মাহকে বিশ্বশক্তি রূপে দেখার স্বপ্নটি হৃদয়ে নিয়ে বাঁচার সামর্থ্য তাদের থাকে না। বস্তুতঃ এরাই একাত্তরে ভারতের কোলে গিয়ে উঠেছিল।ভারতের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ নিয়ে তাদেরকে বিজয়ী করতে যুদ্ধ করেছিল।এবং আজও বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্রটি ভেঙ্গে যাওয়াকে তারা উৎসবের বিষয় রূপে গণ্য করে।

ব্যক্তির ঈমান দাড়ি-টুপিতে ধরা পড়ে না। এমনকি নামায-রোযাতেও নয়। নবীজীর পিছনে কয়েক শত মুনাফিকও নামায পড়েছে। রোযাও রেখেছে। তাদের মুনাফিকী ধরা পড়েছে রণাঙ্গনে এবং রাজনীতিতে। জিহাদের ময়দানে কোন মুনাফিককে নবীজী (সাঃ)র পাশে দেখা যায়নি। বরং তাদের কামনা ছিল, রণাঙ্গণে কাফেরগণ বিজয়ী হোক। বাঙালী কাপালিকদেরও অনেকে মুসলিম রূপে দাবী করে। কিন্তু একাত্তরের যুদ্ধে তাদের দেখা গেছে পৌত্তলিক কাফের শক্তির পাশে। এবং মনেপ্রাণে চেয়েছে কাফেরগণই বিজয়ী হোক। এদের কে কি ঈমানদার বলা যায়?

নবীজী (সাঃ)র সাহাবাদের মধ্য থেকে শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবা শহীদ হয়েছেন। তারা কি মসজিদ-মাদ্রাসা গড়তে বা নামায-রোযা আদায়ে শহীদ হয়েছেন? তারা তো শহীদ হয়েছেন মুসলিম উম্মাহকে বিশ্বশক্তি রূপে প্রতিষ্ঠা দেয়ার প্রয়োজনে। আর শক্তিশালী হতে হলে তো দেশের ভূগোল বাড়াতে হয়। শুধু অর্থনৈতীক উন্নয়ন দিয়ে বিশ্বশক্তি হওয়া যায় না। তেমন একটি প্রয়োজনেই বাঙালী মুসলিমগণ ১৯৪৭ সালে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ মুসলিম দেশ পাকিস্তান বানিয়েছিল। কিন্তু সেটি ইসলামের দুষমনদের ভাল লাগেনি। সে দেশটি ভাঙ্গতেই তারা দেশের ভীতরে ভারতীয় কাফের বাহিনীকে ডেকে আনে।

রাষ্ট্র শক্তিশালী না হওয়ার বিপদটি তো ভয়ানক। তখন আগ্রাসী শক্তির গোলাম হতে হয়। যেমন আজকের বাংলাদেশ। কিন্তু তা নিয়ে বাঙালী কাপালিকদের কি কোন ক্ষোভ আছে? বরং ভারতের দাস হওয়া নিয়েই তাদের বিপুল আনন্দ। বরং তাদের ক্ষোভ এ নিয়ে, বাঙালী মুসলিম খাজা নাজিমুদ্দীন, মুহাম্মদ আলী (বগুড়ার) ও সহরোওয়ার্দীর কেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হলো? সে অপরাধে বাংলাদেশের ইতিহাস থেকেই তাদের বাদ দিয়েছে। যেন বাঙালী মুসলিমের ইতিহাসের শুরু মুজিব থেকে। ১৯৭১’য়ে পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক বিলুপ্ত হওয়াতে এখন তা নিয়ে সারা বছর বাংলাদেশে উৎসব হয়।

ব্যাঙ ক্ষুদ্র গর্তের সন্ধান করে। মুজিব এবং তার অনুসারিগণও তেমনি ক্ষুদ্র বাংলাদেশের ভূগোল চেয়েছিল। আর ক্ষুদ্রতা যে অন্যের গোলামী আনবে -সেটিই তো স্বাভাবিক। আর গোলামের জীবনে তো স্বাধীনতা থাকে না। স্বাধীনতা বিলুপ্ত হওয়ার সাথে বাঙালীর ভোটের অধীকারও তাই বিদায় নিয়েছে।

মুজিব জানতো বাংলার ধর্মভীরু সাধারণ মানুষ কখনোই পাকিস্তান ভাঙ্গাকে সমর্থন করবে না। ফলে ১৯৭০য়ের নির্বাচনে কোনদিনও পাকিস্তান ভাঙ্গার কথা বলেনি। পাকিস্তান ভেঙ্গে পৃথক বাংলাদেশ সৃষ্টি নিয়ে রেফারেন্ডামের দাবীও করেনি। মুজিব ভোট নিয়েছে পাকিস্তানকে অখন্ড রেখে ৬ দফা দাবী আদায়ের কথা বলে। নির্বাচনে ভোট নেয়ার পর মুজিব আওয়াজ তোলে “এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”। দাবী তুলে, অখন্ড পাকিস্তানের নয়, স্রেফ পূর্ব পাকিস্তানের ক্ষমতা আওয়ামী লীগের হাতে দিতে হবে। এবং সশস্ত্র যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে মুজিব তার সঙ্গিদের ভারতে যাওয়ার নসিহত করে।

ভাষা ও অঞ্চলের নামে দেশ স্বাধীন করায় মাঝে কল্যাণ থাকলে ভারত ভেঙ্গে ১২০ কোটি হিন্দুগণ বাংলাদেশের ন্যায় ২০টি স্বাধীন দেশ বানাতে পারতো। তাছাড়া দেশ ভাঙ্গা ইসলামে হারাম হলেও হিন্দু ধর্মে তো হারাম নয়। কিন্তু দেশ ভাঙ্গা যে আত্মঘাতি -সেটি ভারতীয় হিন্দুগণ ভাল করে বুঝে। তাই তারা সে পথে যায়নি। কিন্তু সে হুশ বাঙালী কাপালিকদের নাই। তাই তারা ক্ষুদ্র ভূগোল গড়া নিয়ে উৎসব করে।

তবে একাত্তরের সে জোয়ারের মাঝেও সব বাঙালীই যে বিবেক হারায়নি –সে প্রমাণও অনেক। তাই ১৯৭১য়ে মে মাসের মাঝামাঝিতে দৈনিক ইত্তেফাক পাকিস্তান ভাঙ্গার বিরোধীতা করে সম্পাদকীয় লিখেছিল, “দেশ ভাঙ্গাতে বাহাদুরি নাই” এ শিরোনামে। ঢাকা ও চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শতাধিক শিক্ষক সেদিন পাকিস্তান ভাঙ্গার বিরুদ্ধে বক্তব্য রেখেছিল। সে আমলের পত্রিকাগুলোর দিকে তাকালে তাদের সে বক্তব্যগুলো নজরে পড়বে। তাদের কথার পিছনেও যুক্তি ছিল। অথচ আজ সে সত্য কথাগুলো লুকানো হচ্ছে। এবং সেটি ফ্যাসিবাদী শক্তি প্রয়োগ করে।

একাত্তর নিয়ে বাঙালী কাপালিকগণ যে আকাশ চুম্বি মিথ্যাচার রটিয়েছে সেটি বিলুপ্ত করতে না পারলে কি বাঙালী মুসলিমদের কি উন্নততর মানুষ রূপে বেড়ে উঠার সম্ভাবনা আছে? এবং সেটি করতে হলে তো একাত্তর নিয়ে সত্য কথাগুলো প্রবল ভাবে বলতেই হবে। নইলে গুম-খুন-ধর্ষণ-চুরি-ডাকাতি-সন্ত্রাসের প্লাবনে দেশ আজ যে ভাবে ভাসছে তা যে আরো তীব্রতর হবে তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে?

তাছাড়া সবচেয়ে বড় ইবাদত এবং সবচেয়ে বড় জিহাদ তো জালেমের সামনে সত্য কথা বলা। তাছাড়া কারো ভয়ে সত্য লুকানোটি শুধু কবিরা গুনাহই নয়, বরং শিরক। কারণ যে ব্যক্তি ঈমানদার -সে তো ভয় করবে একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালাকে এবং অন্য কাউকে নয়। কিন্তু যে মানুষটি ভয়ে সত্য লুকায়, লুকানোর সে অপরাধটি করে অন্য কোন জালেম ব্যক্তি বা শক্তির ভয়ে। তাই সেটি শিরক। এবং যারা শিরক করে তাদের জন্য নিষিদ্ধ হলো জান্নাত –যা পবিত্র কোরআন ও হাদীসে বার বার বলা হয়েছে। ১০/১২/২০১৯