বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস ও ভোটডাকাতদের নাশকতা

দ্বি-মুখি হামলার মুখে জনগণ

ভয়ানক দ্বি-মুখি হামলার শিকার এখন বাংলাদেশের জনগণ। এক দিকে প্রাণনাশী করোনা ভাইরাসের মহামারি। অপরদিক ঘাড়ের উপর খাড়িয়ে ভোট-ডাকাতদের বিশাল ঘাতকদল। লাশ পড়ছে যেমন করোনা ভাইরাসে, তেমনি শত শত লাশ পড়ছে সরকারি দলের গুন্ডা, পুলিশ ও RAB এর খুনিদের হাতে। ফলে ভয়াবহ বিপদের মুখে এখন বাংলাদেশের জনগণ। এরূপ মহামারির মোকাবেলার সামর্থ্য আম জনগণের থাকে না। এটি এক বিশাল যুদ্ধ। এ যুদ্ধ এতই ভয়ংকর যে শিরকমুক্ত হয়ে নিহত হলে ইসলামে রয়েছে শহীদের মর্যাদা।এ যুদ্ধের মোকাবেলায় মার্কিন যুক্তরা্ষ্ট্রের ন্যায় বিশ্বশক্তিও হিমশিম খাচ্ছে। হিমশিম খাচ্ছে গ্রেট ব্রিটেন, ফান্স, রাশিয়া, ইটালী, স্পেন। প্রশ্ন হলো, এ মুহুর্তে বাংলাদেশ কি করবে? বাংলাদেশীদের জন্য মহাবিপদ এজন্য যে, দেশে দায়িত্বশীল কোন সরকার্ নেই। আছে এক ভোটডাকাত সরকার। ডাকাতদের কাজ তো ডাকাতি করা, তাদের কাছ থেকে কি জনকল্যাণ আশা করা যায়? 

সভ্য ও বিবেকবান মানুষের প্রধান গুণটি হলো, কিসে মানুষের কল্যাণ তা নিয়েই গভীর চিন্তা-ভাবনা করা এবং সে ভাবনা নিয়ে ত্বরিৎ ময়দানে নেমে পড়া। দেশ সভ্যতর ও সমৃদ্ধ হয় এমন বিবেকবান মানুষের কারণেই। কিন্তু চোর-ডাকাত ও ভোটডাকাতদের ন্যায় অপরাধীদের থেকে কি সেরূপ কিছু আশা করা যায়? যে অপরাধীদের কাজ চুরি-ডাকাতি, ভোটডাকাতি ও গুম-খুনের রাজনীতি, তাদের মানসিক বিকলাঙ্গতাটি বিশাল। তাদের থাকে না জনগণের কল্যাণ নিয়ে কিছু ভাবা ও কিছু করার সামর্থ্য। ক্যান্সারে পেট আক্রান্ত  হলে খাদ্যে রুচি থাকে না। তেমনি নীতি-নৈতিকতা মারা পড়লে, রুচি থাকে না সভ্য কাজে। ফলে জনগণের স্বাস্থ্য খাত, শিক্ষাখাত বা অন্য কোন জনকল্যাণ নিয়ে ভাবার রুচি চোর-ডাকাত ও ভোটডাকাতদের থাকে না। সভ্য কর্ম বাদ দিয়ে তারা বরং আবিস্কার করে দুর্বৃত্তির নতুন কৌশল। ২০১৮ সালে তেমনই এক অসভ্য আবিস্কার হলো নির্বাচন-পূর্ব রাতে ভোটডাকাতির কৌশল। ইতিহাসের বুকে বাংলাদেশ কোন সভ্য আবিস্কারে স্থান না পেলেও অবশ্যই বেঁচে থাকবে ভোটডাকাতির এ অসভ্য আবিস্কার নিয়ে। বিপদের আরো কারণ, বাংলাদেশ সে অসভ্যদের হাতেই আজ অধিকৃত। তাদের রাজনীতির মূল লক্ষ্য, যে কোন মূল্যে নিজেদের বাঁচানো, জনগণকে বাঁচানো নয়। সেটি বুঝা যায় তাদের রাজনীতির লক্ষ্য ও বিনিয়োগ দেখে।  

বাংলাদেশের ভোটডাকাতগণ কথা বলে ফেরেশতার ন্যায়। অথচ তাদের আসল চরিত্র কখনোই গোপন থাকার নয়। সেটি জানা যায়, কীভাবে তারা ক্ষমতায় এলো তা থেকে। জানা যায়, বাজেটের বিভিন্ন খাতে অর্থ বরাদ্দের দিকে নজর দিলে। রাজস্বের অর্থ জনগণের। ফলে জনগণের কল্যাণ নিয়ে যারা ভাবে, রাজস্বের অর্থ তারা ব্যয় করে জনগণের কল্যাণে। কোন নেতা বা নেত্রীর মৃত পিতা বা মাতার স্মৃতিকে বড় করতে নয়। জন-কল্যাণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাতটি হলো স্বাস্থ্য খাত। ফলে যারা জনগণের কল্যাণ নিয়ে ভাবে তারা জাতীয় বাজেটে সবচেয়ে বেশী বরাদ্দ রাখে স্বাস্থ্য খাতে। কারণ, এ খাতটি হলো জনগণকে মৃত্যু থেকে বাঁচানোর খাত। ফলে অন্য কোন খাত এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না। অধিকাংশ মানুষই নানা পেশায় নেমে নিজ পরিবারের ভরন-পোষনের দায়ভার নিজে পারে। কিন্তু নানা রোগ-ভোগে চিকিৎসায় খরচ বহনের সামর্থ্য সবার থাকে না। থাকে না প্রয়োজনীয় অর্থ। এ কাজটি তাই সরকারের। সরকার সে দায়ভার না নিলে গরীবদের বিনা চিকিৎসায় মারা যেতে হয়। তাই দেশের সরকার কতটা সভ্য, বিবেকমান ও দায়ত্বশীল  সেটি জানতে গবেষণার প্রয়োজন পড়ে না, বুঝা যায় জাতীয় বাজেটের স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেখে।

 

অবহেলিত স্বাস্থ্যখাত

বাংলাদেশের বাজেটের জনকল্যাণমুখি চরিত্র কতটুকু সেটির বিচার করা যাক। গ্রেট ব্রিটেনের জনসংখ্যা ৬ কোটি ৭০ লাখ। এ দেশটির বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ হলো ১৪০.৪ বিলিয়ন পাউন্ড। অপরদিকে বাংলাদেশের জনসংখ্য ১৭ কোটি যা গ্রেট ব্রিটেনের জনসংখ্যার আড়াই গুণ। বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দের পরিমাণ ২৯,৪৬৪ কোটি টাকা অর্থাৎ ২৯৪ বিলিয়ন টাকা। বর্তমানে পাউন্ডের মূল্য ১০০ টাকারও কিছু বেশী। অতএব স্বাস্থ্যখাতের বরাদ্দকৃত ২৯৪ বিলিয়ন টাকার পরিমাণটি ৩ বিলিয়ন পাউন্ডেরও কিছু কম। ৬ কোটি ৭০ লাখ জনগণের জন্য ১৪০.৪ বিলিয়ন পাউন্ড এবং ১৭ কোটি মানুষের জন্য ৩ বিলিয়নেরও কম। বাংলাদেশে মাথাপিছু স্বাস্থ্য বাজেট মাত্র ১৭ পাউন্ডেরও কাছাকাছি। অথচ বিলেতে সেটি ২ হাজার ৯৫ পাউন্ড।

বিষয়টি অন্যভাবে দেখা যাক। বাংলাদেশে অর্থভান্ডার গ্রেট ব্রিটেনের সাথে তূলনীয় নয়। কিন্তু তূলনা করা যেতে দেশ দুটির স্বাস্থ্য খাতের প্রায়োরিটির। সেটি বুঝা যায়, জিডিপি (Gross Domestic Product) ও  সর্বমোট বাজেটের কতটা স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় হয় -তা থেকে। বাজেট অর্থ বরাদ্দের পরিমান কম হতে পারে, কিন্তু তূলনামূলক বিচারে স্বাস্থ্য খাতের প্রায়োরিটি কখনোই কম পারে না। দেখা যাক,  জিডিপি’র কতটা ব্যয় হয় স্বাস্থ্য খাতে? গ্রেট ব্রিটেন তার জিডিপি’র ৭% খরচ করে স্বাস্থ্য খাতে।  বাংলাদেশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দিয়েছে জিডিপি’র মাত্র ১.০২%।  ব্যয়ের এ অনুপাতটি প্রতিবেশী ভারত, শ্রীলংকা, নেপাল ও পাকিস্তান থেকেও কম। ভারত ব্যয় করে জিডিপি’র ১.১৬% ৴এবং শ্রীলংকা ব্যয় করে ১.৫০%। তবে দক্ষিণ এশিয়ার বুকে সবচেয়ে বেশী বরাদ্দ নেপালের এবং দ্বিতীয় স্থানে পাকিস্তান । ২০১৬ সালে স্বাস্থ্য খাতে নেপাল ব্যয় করেছিল জিডিপি’র ৬.৩% এবং পাকিস্তান ব্যয় করেছিল তার জিডিপি’র ২.৭৫%। বাংলাদেশ ও ভারতের তুলনায় পাকিস্তানের জিডিপি ব্যয় ছিল দ্বিগুণ। নেপালের ছিল ৫ গুণ।  

তুলনা করা যাক, প্রতিবেশী দেশগুলোর মাঝে সমুদয় বাজেটের কে কতটা স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করে -সেটি? বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ের পরিমাণ সমুদয় বাৎসরিক বাজেটের মাত্র ৫.৬৩%। এ বরাদ্দটি প্রতিবেশী পাকিস্তানের তুলনায় অত্যন্ত কম। পাকিস্তানের সরকার  ২০১৯ সালের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দিয়েছে মোট বাজেটের ১৭.৭% ভাগ। অথচ দেশের ভোটডাকাত সরকারের দাবী, বাংলাদেশের অবস্থা পাকিস্তানের চেয়ে অনেক ভাল। এদের অনেকে পাকিস্তানকে ব্যর্থ রাষ্ট্র বলে। অপর দিকে সরকারের মন্ত্রীগণ বড়াই করে, বাংলাদেশ সিঙ্গাপুর হতে যাচ্ছে। অপরদিকে গ্রেট ব্রিটেন স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেয় মোট বাজেটের ২৪%। এমন বিশাল বরাদ্দের কারণেই ব্রিটিশ সরকার তার নাগরিকদের জন্য সরকারি হাসপাতালগুলোতে হার্ট অপারেশন, ট্রান্সপ্লান্ট অপরাশেন,ডায়ালাইসিসের ন্যায় সকল প্রকার চিকিৎসাই বিনা মূল্যে দেয়। অথচ বাংলাদেশে রোগীদেরও প্রাণ বাঁচানোর ঔষধ সরকার থেকে দেয়া হয় না। ডায়ালাইসিসের সামর্থ্য না থাকায় অধিকাংশ রোগীই বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছে বাংলাদেশে। ফলে বুঝতে কি বাঁকি থাকে, বাংলাদেশে জনগণের প্রাণ বাঁচানোর খাতটি কতটা অবহেলিত। তাতে ধরা পড়ে সরকারের দায়িত্বহীনতা। অথচ শত শত কোটি টাকা ব্যয় হয় মৃত মুজিবের নামে। শত কোটি টাকা ব্যয় করে মুর্তি গড়া হয়। হাজার হাজার কোটি টাকার চুরিডাকাতি হয়ে যাচ্ছে সরকারি তহবিল থেকে -যা দিয়ে শত শত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা দেয়া যেত, কেনা যেত বহু হাজার ভেন্টিলেটর এবং দেয়া যেত কিডনি ডায়ালাইসাইসিস। বহু লক্ষ মানুষকে তখন বিনা মূল্যে প্রাণ বাঁচানোর চিকিৎসা দেয়া যেত।

বাংলাদেশে অভাব অর্থের নয়, বরং সেটি বিবেকের। ভোটডাকাতদের সেটি থাকারও কথা নয়। তাদের এজেন্ডা মানুষকে বাঁচানো নয়, বরং গুমখুন,ফাঁসিতে ঝুলিয়ে বা ক্রসফায়ারে দিয়ে মানুষ মারার। এ দুর্বৃত্তগণ বাজেটের বেশীর ভাগ অর্থ খরচ করে নিজেদের গদি বাঁচাতে। নিজের পকেট ভরতে এরা সরকারি প্রজেক্টের অর্থের করে চুরি-ডাকাতি। তাদের চুরি-ডাকাতির ফলে প্রতি মাইল রাস্তা বানাতে বাংলাদেশে খরচ হয় বিশ্বের যে কোন দেশের তুলনায় বেশী। জনগণের দেয়া রাজস্বের অর্থ ব্যয় হচ্ছে পুলিশ বাহিনী, প্রশাসন, বিচারক, RAB ও সেনাবাহিনীর ন্যায় যারা ভোটডাকাত সরকারের গদির পাহারাদার ও ভোটডাকাতির ডাকাত তাদের জৌলুস বৃদ্ধিতে। অপরদিকে বিনা চিকিৎসায় লাখ লাখ মানুষ মারা গেলেও তা নিয়ে সরকারেরর মাথা ব্যথা নেই। বরং প্রচার দেয়া হয়, সরকার প্রচুর সেবা দিচ্ছে। যত দোষ রোগ-জীবানু ও জনগণের। 

 

যে আযাব অনিবার্য দুর্বৃত্ত শাসনে

যে কোন যুদ্ধ যোদ্ধা লাগে। এবং লাগে যুদ্ধাস্ত্র এবং যোগ্য জেনারেল বা নেতৃত্ব। খালি হাতে কোন সৈনিককে রণাঙ্গণে পাঠানোটি গুরুতর অপরাধ। এতে স্রেফ প্রাণক্ষয় হয়। তেমনি এক গুরুতর অপরাধ হচ্ছে বাংলাদেশের ডাক্তার ও নার্সদের সাথে। করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে ডাক্তার ও নার্সদের যুদ্ধটি করতে হচ্ছে অনেকটা খালি হাতে। শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে বেসরকারি ডাক্তার ও নার্সদের নির্দেশ দেয়া হচ্ছে, পারসোনাল প্রটেকটিক ইকুইপমেন্ট তথা মাস্ক, গ্লাভস, এ্যাপ্রোন, চোখের কভার নিজ খরচে কিনতে। যেন যুদ্ধে যেতে হবে নিজে অস্ত্র কিনে! 

যে কোন যুদ্ধে সৈনিকদের স্বীকৃতি ও তাদের প্রতি সৌজন্যবোধ  যে কোন সভ্য সমাজেই কাম্য। নইলে যুদ্ধে সৈনিক জোটে না। কিন্তু বাংলাদেশের সরকারি মহলে সেটি নেই। পাকিস্তানে ডাক্তার-নার্সদের হাসপাতালের সামনে গার্ড অব অনার দেয়া হচ্ছে। সে চিত্র টিভিতেও বার বার দেখানো হচ্ছে। বিলেতে ডাক্তার-নার্সদের শুধু সরকার নয়, জনগণও দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে সমস্বরে সাবাশ দিচ্ছে। সে চিত্রও টিভিতে বার বার দেখানো হচ্ছে। হাসপাতালের ডাক্তার-নার্সদের সাবাশ দিতে তাদের কাছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান উপঢৌকন নিয়ে হাজির হচ্ছে্। অথচ বাংলাদেশে তাদেরকে তিরস্কার করা হচ্ছে। জরুরী সামগ্রী না জুগিয়ে হাসিনা হুমকি দিচ্ছে, সে নাকি বিদেশ থেকে ডাক্তার আনবে।  

বাংলাদেশের হাসপাতালগুলির অবস্থাও বেহাল। নাই জরুরী সামগ্রী। নাই কোভিড-১৯ রোগীদের জন্য পৃথক পৃথক কামরা। অধিকাংশ হাসপাতালে নাই ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট। এ মুহুর্তে অতি জরুরী হলো ভেন্টিলেটর যা কৃত্রিম ভাবে অতি অসুস্থ্য রোগীকে অক্সিজেন জোগায়। তাতে রোগী পায় রোগের সাথে লড়াইয়ের সামর্থ্য এবং পায় কিছু বাড়তি সময়। অনেক রোগী তাতে বেঁচে যায়। ভেন্টিলেটর না লাগালে রোগের সাথে লড়াইয়ের সামর্থ্য দ্রুত লোপ পায় এবং রোগী মারা যায়। ভেন্টিলেটর সংগ্রহে সরকারের উদ্যোগ কই? হাসপাতালে নাই পর্যাপ্ত সংখ্যক মাস্ক। নাই রোগীদের ভাইরাস সনাক্ত করার টেস্ট সামগ্রী। দেশ জুড়ে পুরা এক বেহাল অবস্থা।

অপরদিকে মন্ত্রীদের দাবী, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকতে বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস আসা অসম্ভব। এভাবে এক ভোটডাকাত দুর্বৃত্তকে তারা অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারি দরবেশ বানিয়ে ফেলেছে। যেন বাংলাদেশে আসতে হলে ভাইরাসকে শেখ হাসিনার অনুমতি নিয়ে আসতে হবে। সুস্পষ্ট শিরক আর কাকে বলে? ভাবটা এমন, যে দেশে সাপ-শকুন, গরু-ছাগলকে ভগবান বলা হয়, সে দেশে হাসিনা কম কিসে? অথচ ভাইরাস শুধু আসে নাই, বহু লোক তাতে ইতিমধ্যে মারা গেছে। বাংলাদেশে যে কীরূপ বিবেকশূণ্য আহম্মকদের শাসন চলছে -সেটি কি এরপরও বুঝতে বাঁকি থাকে?     

দুর্বৃত্তদের ক্ষমতায় রাখার এটি হলো এক ভয়ংকর আযাব। আযাব তখন নানা বেশে মানুষকে ঘিরে ধরে। আযাবেরই এক রূপ, দেশ ছেয়ে যায় ভয়ানক দুর্বৃত্তদের দ্বারা।  মানব ইতিহাসের নৃশংস বর্বরতাগুলো কখন বাঘ-ভালুকের ন্যায় হিংস্র জানোয়ার হাতে হয়নি। বরং হয়েছে মানবরূপী এরূপ হিংস্র জন্তুদের হাতে। পবিত্র কোর’অআনে এদের শুধু পশু বলা হয়নি, তার চেয়েও নিকৃষ্ট জন্তু বলা হয়েছে। পবিত্র কোর’আনের ভাষায় সে বর্ণনাটি হলো, “উলা’য়িকা কা আল আন’য়াম, বালহুম আদাল” অর্থঃ এরাই হলো গবাদি পশুর ন্যায়, বরং তার চেয়েও নিকৃষ্ট।”

তাই ইসলামে সবচেয়ে বড় মাপের ইবাদতটি জঙ্গলের বাঘ-ভালুক নির্মূল নয়। ড্রেনের মশামারি নির্মূলও নয়। বরং সেটি হলো রাষ্ট্র থেকে দুর্বৃত্ত নির্মূলের জিহাদ। যারা প্রকৃত  মুসলিম তাদের মাঝে দুর্বৃত্ত নির্মূলের এ পবিত্র জিহাদটি নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাতের ন্যায় অতিশয় মজ্জাগত বলেই সুরা আল-ইমরানে মহান আল্লাহতায়ালা মুসলিমদের সমগ্র মানব জাতির মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি বলে অভিহিত করেছেন। কিন্তু বাংলাদেশে কোথায় সে মুসলিম? কোথা সে ইসলাম? এবং  কোথায় সে জিহাদ? ১৬/০৪/২০২০




বিবিধ প্রসঙ্গ-৯

১. যে অপরাধ ভারতকে বিজয়ী করায়

সমগ্র বিশ্বমাঝে মুসলিমদের জন্য সবচেয়ে বিপদজনক দেশ হলো ভারত। দেশটির সরকারের সামান্যতম আগ্রহ নাই মুসলিমদের জানমাল ও ইজ্জতের সুরক্ষায়। মুসলিমদের উপর কোথাও হামলা শুরু হলে পুলিশ বাহিনী সে হামলা না থামিয়ে নিজেরাই হিন্দু গুন্ডাদের পক্ষ নেয়। সে প্রামাণ্য চিত্রটি এবার দিল্লিতে দেখা গেল। সেখানে পুলিশ যেমন  নিজেরা পিটিয়েছে ও গুলি চালিয়েছে তেমন গুন্ডাদের হাতে ইটের টুকরো তুলে দিয়েছে। ১৯৪৭ সালের ভারতের স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর থেকে্ই মুসলিমগণ সেখানে বার বার গণহত্যার শিকার হচ্ছে। মুসলিম রমনীগণ হচ্ছে গণধর্ষণের শিকার। জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে মুসলিমদের ঘরবাড়ি ও দোকানপাট। সমগ্র কাশ্মিরই এখন একটি জেল; প্রতিটি নাগরিক সেখানে গৃহবন্দী। বিপদের আরো কারণ, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজেই একজন ভয়ংকর অপরাধী। ১৯৯২ সালে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হয় অযোধ্যার বাবরী মসজিদ। সে কাজে গুন্ডা সংগ্রহের কাজ করেছিল মোদি। তার সে কাজে মোহিত হয়ে ২০০২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী তাকে গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী রূপে নিয়োগ দেয়। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই ভয়াবহ দাঙ্গার আয়োজন করে গুজরাতে এবং সে দাঙ্গায় ২ হাজারের বেশী মুসলিম হত্যা করা হয় এবং পুড়িয়ে দেয়া হয় বহু হাজার  মুসলিমের ঘরবাড়ী। সেখানে গণহারে ধর্ষিতা হয়েছে মুসলিম নারীরা। এরূপ গণহত্যা ও গণধর্ষণ আয়োজন করাতে বিজিপি-আর, এস. এস মহলে নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তা তু্ঙ্গে উঠে। ফলে ২০১৪ সালে তাকে দেয়া হওয়া হয় ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পদ। উগ্র হিন্দুদের মাঝে নিজের জনপ্রিয়তা বাড়াতে নরেন্দ্র মোদি গত ফেব্রেয়ারিতে গুজরাতের মডেলের দাঙ্গা শুরু করে দিল্লিতে। হত্যা ও মুসলিমদের গৃহে ও দোকানে আগুণ দেএয়ার পাশাপাশি আগুণ দেয়া হয় দিল্লির ৯টি মসজিদে।

ভারতের মুসলিম বিরোধী চরিত্রটি তাই গোপন কিছু নয়। প্রশ্ন হলো, এরূপ মুসলিম গণহত্যাকারী ভারতের ঘরে যারা বিজয় তুলে দেয় এবং নিজ দেশের অভ্যন্তরে ভারতীয় পণ্যের জন্য বাজার খুলে দেয় –তারা কি ঈমানদার? ঈমানদার হতে হলে তো মুসলিমের শত্রুদের ঘৃণার সামর্থ্য লাগে। লাগে মুসলিম স্বার্থের সুরক্ষা দেয়ার গভীর ইচ্ছা। অথচ সে সামর্থ্য ও ইচ্ছা একাত্তরে মুজিবের ন্যায় বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের মাঝে দেখা যায়নি। মুসলিম বিরোধী এরূপ একটি দেশের সাথে যারা বন্ধুত্ব গড়ে তারা কি কখনো মুসলিম দেশের শাসক হওয়ার যোগ্যতা রাখে? হতে পারে কি মুসলিমের বন্ধু? অথচ ভারত বন্ধু গণ্য হচ্ছে মুজিবের ন্যায় হাসিনার কাছেও। এবং সর্বাত্মক সহযোগিতা দিচ্ছে ভারতকে। সেদেশে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যত হত্যা, যত ধর্ষণ এবং যত নির্যাতনই হোক না –শেখ হাসিনা তা নিয়ে মুখ খুলতে রাজী নয়। অথচ ভারত সরকারের নিন্দা করছে বহু ভারতীয় নেতাও। মুসলিম জীবনের অন্যতম মিশন হলো অন্যায় ও জুলুমের নির্মূল। তাই রাজা দাহিরের নির্যাতন থেকে সিন্ধুর হিন্দুদের বাঁচাতে মুসলিম বাহিনী জিহাদে নেমেছিল।      

প্রতিবেশী দেশ রূপে বাংলাদেশীদের দায়িত্বটি বিশাল। বিপন্ন মুসলিমদের পাশে দাঁড়ানো বাংলাদেশের প্রতিটি মুসলিমের উপর ফরজ। কিন্তু সে দায়িত্বটি পালিত হচ্ছে না। কারণ, ক্ষমতায় রয়েছে ভারতসেবী ইসলামের শত্রুগণ। হাসিনা ক্ষমতায় এসেছে ভোট ডাকাতি করে। ভারত এ নিয়ে নিশ্চু্প। বরং হাসিনার এরূপ ভোট ডাকাতির বিজয়ে প্রচণ্ড খুশি ভারত। কারণ ভারত চায়, দেশটিতে তার সেবাদাস ও সেবাদাসীগণ যে কোন রূপে ক্ষমতায় থাক এবং অব্যাহত থাকুক ভারতের প্রতি দাসত্বের রাজনীতি। তাছাড়া ভারত জানে, সুষ্ঠ নির্বাচন হলে শোচনীয় পরাজয় ঘটবে তার সেবাদাসদের।

 

২. প্রসঙ্গ বাঙালীর বিবেকবোধ, মূল্যবোধ ও ব্যক্তিত্ব

মানুষের বুদ্ধি ও প্রজ্ঞার প্রকাশ ঘটে শত্রুকে শত্রু এবং বন্ধুকে বন্ধু রূপে বরণ করার মাঝে। তাই সুবুদ্ধির কোন মানুষই কোন নেকড়কে গলা জড়িয়ে চুমু খায় না। এবং নিজ ঘরে তুলে আদর করে চোর-ডাকাতকে। বরং হাতের  কাছে যা পায় তা দিয়ে তাড়া করে। হিংস্র পশু ও চোর-ডাকাতদের প্রতি এটিই হলো সভ্য মানুষের সনাতন নীতি। তেমনি কোন বিবেকবান মানুষই স্বৈরাচারি শাসকের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে না। তাকে নেতার আসনেও বসায় না। কিন্তু বাংলাদেশে  সে সভ্য বিচারটি হয়নি। ফলে শেখ হাসিনার ন্যায় ভোট-ডাকাতও দেশের প্রধানমন্ত্রীর চেয়্যারে বসার সুযোগ পেয়েছে। এবং মুজিবের ন্যায় এক খুনি এবং স্বৈরাচারিও দেশের নেতা,পিতা ও বঙ্গবন্ধুর খেতাব পেয়েছে। কোন সভ্য দেশে কি এমনটি ভাবা যায়?

একদলীয় বাকশাল সরকার প্রতিষ্ঠা দিয়ে শেখ মুজিব কেড়ে নিয়েছিল দেশবাসীর স্বাধীনতা। এবং রাজনৈতিক দল গড়ার অধীকার কেড়ে নিয়েছিল ইসলামপন্থিদের। ইসলামপন্থিদের সাথে এরূপ অসভ্য ও অমানবিক আচরণ ঔপনিবেশিক কাফের শাসনামলেও হয়নি। মুজিবের শাসনামলে স্বাধীনতা পেয়েছিল কেবল মুজিবের অনুগত দুর্বৃত্ত দলীয় বাহিনী এবং তার প্রভুরাষ্ট্র ভারত। এবং যারাই মুজিবের বাকশালী স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আ্‌ওয়াজ তুলেছে্ তারা্ই গ্রেফতারি, হত্যা ও নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছে। রক্ষিবাহিনীর হাতে নিহত হয়েছে তিরিশ হাজারেরও বেশী রাজনৈতিক নেতাকর্মী। মুজিবের রাজনীতির মূল কথা ছিল ভারতের প্রতি নিঃশর্ত গোলামী। মুজিব ভারতকে দিয়েছিল ফারাক্কার মুখে পদ্মার বুক থেকে পানি তুলে নেয়ার অধিকার। দিয়েছিল বাংলাদেশের ভূমি বেরুবাড়ী। দেশের সীমান্ত বিলুপ্ত করে ভারতকে দিয়েছিল লুন্ঠনের অবাধ স্বাধীনতা। সে ভারতীয় লুটপাটের ফলেই নেমে আসে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ -যাতে মৃত্য হয় বহু লক্ষ বাংলাদেশীর। মুজিবের মৃত্যু হয়েছে, কিন্তু প্রবল ভাবে বেঁচে আছে মুজিবের ভারতসেবী রাজনীতি। এবং সেটি বাঁচিয়ে রেখেছে মুজিব কণ্যা হাসিনা।   

এখানেই প্রশ্ন উঠে। শেখ মুজিবের ন্যায় একজন স্বৈরাচারি খুনি ভোট-ডাকাত হাসিনার পিতা হতে পারে। বন্ধু হতে পারে আগ্রাসী ভারতেরও। কিন্ত বন্ধু বা পিতা হতে পারে কি কোন বিবেকমান বাংলাদেশীর? এ প্রশ্নটি উঠা উচিত তাদের পক্ষ থেকে যাদের মধ্যে বিবেক ও সাহস বলে এখনো কিছু বেঁচে আছে এবং যারা পরওয়া করে না ভোট-ডাকাত দুর্বৃত্তদের গালিগালাজের। চোর-ডাকাত, ভোট-ডাকাত ও ফ্যাসিস্টদের নেতা, নেত্রী, পিতা বা বন্ধু বলায় তাদের চারিত্রিক কালীমা কমে না, কিন্তু এরূপ চাটুকারিতায় মারা পড়ে স্তাবকের বিবেক, ব্যক্তিত্ব ও মূল্যবোধ। তাই দেশে যখন কোন চোর, ডাকাত, ভোট-ডাকাত ও ফ্যাসিস্টগণ নেতা, পিতা, বন্ধু বা প্রধানমন্ত্রী রূপে প্রতিষ্ঠা পায় -তখন কি বুঝতে বাঁকি থাকে বিপুল সংখ্যক দেশবাসীর মাঝে বিবেক, ব্যক্তিত্ব ও মূল্যবোধ কতটা মৃত?  

 

৩.স্বাধীনতা স্রেফ গোলামীর

স্বৈরাচারি শাসকদের স্বাধীনতা প্রতি যুগেই ছিল। কিন্তু  তাদের শাসনে স্বাধীনতা ছিল না জনগণের। জনগণকে সে স্বাধীনতা দিয়েছিল গণতন্ত্র। সেটি যেমন ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসনোর স্বাধীনতা, তেমনি নামানোর। ভোটডাকাত শেখ হাসিনা সে স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছে। এর আগে শেখ মুজিবও সে স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে একদলীয় শাসনের প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল। মত প্রকাশের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়ার লক্ষ্যে মুজিব নিষিদ্ধ করেছিল সকল বিরোধী দলীয় পত্রিকা। কেড়ে নিয়েছিল মিটিং-মিছিলের স্বাধীনতা। বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে এ ছিল মুজিবের অতি  নৃশংস ও ঘৃণ্য অপরাধ। এরূপ অসভ্য ও অপরাধী শাসককে সভ্য নাগরিকগণ ঘৃণা করবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু  বাংলাদেশে সেটি হয়নি। কারণটি বোধগম্য। ডাকাতদের কাছে নৃশংস ডাকাত সর্দারও যেমন হিরো রূপে গৃহীত হয়, তেমনি স্বৈরাচারি মুজিবও সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী রূপে গণ্য হচ্ছে ভোট-ডাকাত বাকশালীদের কাছে।   

শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনার কাছে স্বাধীনতার অর্থ হলো ভারতের প্রতি আত্মসমর্পণের স্বাধীনতা। সে আত্মসমর্পণ জাহির করতে পত্রিকায় লেখালেখিতে যেমন বাধা নাই, তেমনি বাধা নেই টেলিভিশনের পর্দায় কথা বলায় বা রাজপথের মিছিলে। কিন্তু ভয়ানক অপরাধ গণ্য হয়, সে আরোপিত গোলামীর বিরুদ্ধে কথা বলা। যারাই ভারতের বিরুদ্ধে মুখ খুলছে তাদের পিটাতে পুলিশ এবং শেখ হাসিনার দলীয় গুন্ডাগণ একত্রে ময়দানে নামছে। অপর দিকে আদালতের গোলাম বিচারকদের কাজ হয়েছে আইনের শাসনের প্রতিষ্ঠা নয়; বরং সরকার দলীয় গুন্ডা ও খুনিদেরকে আইনের হাত থেকে বাঁচানো। এরূপ গোলামদের হাতেই বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবারার ফাহাদকে শহীদ হতে হলো। গোলামগণ প্রতি যুগে এমনটিই করে তাদের বিদেশী প্রভুদের খুশি করতে।

 

৪. ঈমানদারের ইসলাম ও মুনাফিকের ইসলাম

বেঈমানের জীবনে মূল লড়াইটি হলো নিজ দল, নিজ নেতা ও নিজ দলীয় আদর্শকে বিজয়ী করায়। অপর দিকে ঈমানদারের লড়াইটি আল্লাহর দ্বীন তথা শরিয়তকে বিজয়ী করায়। যে দেশে ঈমানদার ও বেঈমানদের বসবাস সে দেশে এ দু’টি বিপরীত এজেন্ডা নিয়ে রাজনীতির অঙ্গণে সৃষ্টি হয় প্রচন্ড মেরুকরণ। এমন মেরুকরণের রাজনীতিতে থাকে মাত্র দু’টি পক্ষ। একটি আল্লাহর পক্ষ, অপরটি শয়তানের পক্ষ। মহান আল্লাহর নিজের ভাষায় হিযবুল্লাহ (আল্লাহর দল) ও হিযবুশশায়তান (শায়তানের দল)। নিরপেক্ষ বলে কেউ থাকে না। বাংলাদেশে শয়তানের পক্ষটি বিজয়ী। তাদের বিজয়ের ফলেই মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তি আইন আজ পরাজিত। এবং আদালতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে কাফেরদের রচিত  আইন। আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা পাক -এ শয়তানী পক্ষটি তা কখনোই চায় না।

বাংলাদেশে নিজেকে মুসলিম রূপে দাবী করে এমন মানুষের সংখ্যা ১৬ কোটি। কিন্তু মুসলিম হওয়ার অর্থ্ কি -তা নিয়েই তাদের অজ্ঞতাটি গভীর। তারা ভাবে, মুখে কালেম ও তাসবিহ পাঠ এবং নামায-রোযা-হজ্ব-যাকাত পালনের মধ্যেই পরিপূর্ণ ইসলাম। এবং মনে করে রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও যুদ্ধবিগ্রহের অঙ্গণে অন্য কিছু না করলেও চলে। অথচ মুসলিম হওয়ার অর্থ বিশাল। সেটি মহান আল্লাহতায়ালার এজেন্ডাকে আমৃত্যু হৃদয়ে নিয়ে জীবনের প্রতি অঙ্গণে বাঁচা। সে এজেন্ডার বিজয়ে থাকতে  হয় নিজের জান, মাল ও সর্বপ্রকার সামর্থ্যের বিনিয়োগ। সে এজেন্ডার অপরিহার্য বিষয় হলো ৫টি। ১).এমন এক পরিপূর্ণ ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা যেখানে থাকবে একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব এবং সে রাষ্ট্রে  বিলুপ্ত হবে জনগণ, পার্লামেন্ট, স্বৈরাচারি শাসক বা রাজার সার্বভৌমত্ব। ২). রাষ্ট্র চলবে শুরা বা পরামর্শের ভিত্তিতে; রাষ্ট্রীয় প্রধান সার্বভৌম হবে না, বরং হবে নবীজী (সাঃ)র খলিফা বা প্রতিনিধি। প্রায়োরিটি পাবে নবীজী (সাঃ)র আদর্শের প্রতিষ্ঠা ৩). প্রতিষ্ঠা পাবে শরিয়ত ও হুদুদের আইন, ৪). নানা ভাষা, নানা গোত্র ও নানা ভৌগলিক পরিচয়ের নামে গড়ে উঠা বিভক্তির দেয়ালের বিলুপ্তি এবং সচেষ্ট হবে একতার প্রতিষ্ঠায়, ৫), থাকবে অন্যায়ের নির্মূল এবং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার লাগাতর জিহাদ। নবীজী (সাঃ) এবং তার খলিফাদের জীবনে ইসলাম বলতে বুঝাতো এ এজেন্ডাগুলি নিয়ে বাঁচা। কিন্তু মুনাফিকের জীবনে ইসলামের চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের জীবনে এর কোনটিই থাকে না। কেবল থাকে “আমিও মুসলিম” এ কপট দাবী। এবং ময়দানে থাকে ইসলামকে পরাজিত রাখার লড়াইয়ে তাদের জান, মাল ও মেধার বিনিয়োগ।

 

৫.জান্নাতের পথ ও জাহান্নামের পথ

মুসলিম হওয়ার অর্থটি বিশাল ও বিপ্লবাত্মক। সেটি আমৃত্যু এক পরম দায়বদ্ধতা নিয়ে বাঁচা। সে দায়বদ্ধতাটি প্রতি পদে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে এবং অসত্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর। দোযগের আগুণ থেকে বাঁচতে হলে এ ছাড়া ভিন্ন পথ নাই। নইলে মরতে হয় শয়তানের অনুসারি এক বেঈমান রূপে। ঈমানের চুড়ান্ত পরীক্ষাটি কখনোই নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাতে হয় না। সেটি হয় কে কোন পক্ষ দাঁড়ালো ও প্রাণ দিল তা থেকে। নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত, দান-খয়রাত মুনাফিকদের জীবনেও থাকে। ফলে কাফেরদের গড়া স্কুল-কলেজ ও হাসপাতালের সংখ্যা কি কম? কিন্তু তাদের মধ্যে যে গুণটি থাকে না তা হলো, সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে এবং অসত্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সামর্থ্য। বাংলাদেশে যারা নিজেদেরকে মুসলিম রূপে দাবী করে তাদের মধ্যে এরূপ সামর্থ্যের অভাবটি বিকট। সে সামর্থ্য না থাকার কারণেই তথাকথিত ১৬ কোটি মুসলিমের দেশে ইসলাম আজ পরাজিত। এবং দেশ অধিকৃত ভোটডাকাতদের হাতে।

অথচ ঈমানদারগণ বাঁচে ভিন্নতর পরিচয় নিয়ে। তাদের অন্তরে থাকে নবী-রাসূল ও নেক বান্দাদের প্রতি যেমন গভীর ভালবাসা তেমনি থাকে চোর-ডাকাত, ভোট-ডাকাত ও গুম-খুনের রাজনীতির দুর্বৃত্তদের প্রতি প্রবল ঘৃণা। জান্নাতের পথে চলতে হলে ছাড়তে হয় দুর্বৃত্তদের পথ। আলো ও আঁধার কখনোই একত্রে চলে না। তেমনি একত্রে চলে না নবীপ্রেম ও দুর্বৃত্তপ্রেম। দুর্বৃত্তপ্রেম প্রবল হওয়ার কারণেই মুজিবের ন্যায় একজন গণতন্ত্র হত্যাকারি ও ভারতসেবী ফ্যাসিষ্টও জাতির পিতা ও বঙ্গবন্ধুর খেতাব পায়। অথচ দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে ঘৃনার সামর্থ্য না থাকলে ঈমানদার হওয়াই অসম্ভব। অসম্ভব হয় মানব হওয়াও। পবিত্র কোর’আনে এরূপ বেঈমানদের গবাদীপশুরও চেয়েও অধম বলা হয়েছে। কারণ, গবাদী পশু ঘাস খায় এবং জবাই হয় বটে, তবে দুর্বৃত্তদের পক্ষে ভোট দেয় না, মিছিল করে না ও তাদের পক্ষে লাঠিও ধরে না। ২৭/০৩/২০২০

 

 




এতো জরুরী কেন একাত্তরের ইতিহাস?

ব্যর্থতা ইতিহাস তুলে ধরায়

ইসলামের শত্রুপক্ষ বিজয়ী হলে বিচার-আচারের মানদন্ডটিও তাদের অনুকুলে পাল্টে দেয়া হয়। তখন সে মানদন্ডে ইসলামের ভয়ানক শত্রু এবং কাফের শক্তির সেবাদাসও বন্ধু ও পিতা রূপে চিত্রিত হয়। সে সাথে ইসলামের পক্ষের শক্তি চিত্রিত হয় ভিলেন রূপে। মিথ্যা অভিযোগ তুলে তাদের চরিত্রহরণ করা হয় এবং তাদের ফাঁসিতেও চড়ানো হয়। সেটি যেমন নমরুদ-ফিরাউনের আমলে হয়েছে, তেমনি হচ্ছে বাংলাদেশেও। এমন এক বিকৃত মানদন্ড প্রতিষ্ঠা দিয়ে শেখ মুজিবের ন্যায় গণতন্ত্র হত্যাকারি বাকশালীকে এবং তার দুর্বৃত্ত সাথীদেরকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী রূপে প্রতিষ্ঠা দেয়ার চেষ্টা হয়েছে। সে সাথে বন্ধু দেশ রূপে প্রতিষ্ঠা দেয়া হয়েছে ভারতকে। অপরদিকে যারা ইসলামি ব্যক্তিত্ব তাদের চরিত্র হরণ করা হয়েছে নানা রূপ মিথ্যা অপবাদ দিয়ে।

একাত্তরের ঘটনাবলিকে জনগণের সামনে তুলে ধরার ক্ষেত্রে ইসলামপন্থিদের ব্যর্থতাটি বিশাল। সত্য ইতিহাসকে তুলে ধরাটি মহান আল্লাহতায়ালার সূন্নত। পবিত্র কোর’আনে মহান আল্লাহতায়ালা সে বিশাল ইতিহাস তুলে ধরেছেন বলেই ফিরাউন, নমরুদ, কারুণের ন্যায় দুর্বৃত্তগণ  ইতিহাস থেকে হারিয়ে যায়নি। মানব ইতিহাসে তারা হাজার হাজার বছর বেঁচে আছে মানুষের ঘৃণা ও অভিশাপ নিয়ে এবং নিজ নিজ অপরাধ কর্মগুলির শিক্ষ্যণীয় বিবরণ নিয়ে। অপর দিকে মানব জাতির জন্য অনুকরণীয় শ্রেষ্ঠ চরিত্র রূপে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন হযরত ইব্রাহিম (আঃ), হযরত মূসা (আঃ) এবং অন্যান্য নবীগণ। ইসলামের পক্ষের শক্তির পক্ষ থেকে তেমন একটি মূল্যায়ন একাত্তর নিয়েও হওয়া জরুরী ছিল।

এটি সত্য যে, একাত্তরে ইসলামের পক্ষের শক্তি পরাজিত হয়েছে। কিন্তু তাদের সবচেয়ে বড় পরাজয়টি হয়েছে একাত্তরের পর। এবং সেটি নৈতিক, আদর্শিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক পরাজয়। তারা পুরাপুরি ব্যর্থ হয়েছে একাত্তরের সত্য ইতিহাস তুলে ধরতে। কেন তারা অখন্ড পাকিস্তানের পক্ষ নিল -সে সত্যটি তারা আজও তুলে ধরেনি। একাত্তরে যে দলগুলি পাকিস্তান ভাঙ্গার পক্ষ নিয়েছিল তারা হলো আওয়ামী লীগ, চীনপন্থি ও মস্কোপন্থি ন্যাপ, কম্যুনিস্ট পার্টি এবং হিন্দুগণ। এদের ভোট সংখ্যা আজ ৩৫% ভাগের বেশী নয়। অপর দিকে যারা অখন্ড পাকিস্তান বাঁচানোর পক্ষ নিয়েছিল তারা হলো মুসলিম লীগের তিনটি উপদল, জনাব নুরুল আমীনের পাকিস্তান ডিমোক্রাটিক পার্টি, নেজামে ইসলাম, জামায়াতে ইসলাম, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম এবং সকল আলেম সম্প্রদায় ও পীরগণ। এদের বিশাল গণভিত্তি ছিল। সেটি শেখ মুজিব জানতো বলেই তিনি স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টির নামে রেফেরেন্ডামের দাবী কখনোই করেনি। রেফেরেন্ডাম হলে পাকিস্তানপন্থিদের ভোট ৫-৬ দলের মাঝে বিভক্ত হতো না। তখন ভোট ভাগ হতো দুই ভাগে। শেখ মুজিব স্বাধীনতার দাবী তুলেছে ৬ দফার নামে ভোট নেয়ার পর।  ফলে পাকিস্তান ভাঙ্গার বিরোধী ছিল এমন বহু লোক তার দলকে ভোট দিয়েছে। এটি ছিল জনগণের সাথে মুজিবের বিশ্বাসঘাতকতা। কারণ জনগণ কখনোই তাকে পাকিস্তান ভাঙ্গার ম্যান্ডেট দেয়নি।

একাত্তরে নেজামে ইসলাম একটি বৃহৎ দল ছিল। পঞ্চাশের দশকের এ দলের নেতা চৌধুরী মহম্মদ আলী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। তার নেতৃত্বেই ১৯৫৬ সালে প্রণীত হয় পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান। দলটির আরেক নেতা কক্সবাজারের মৌলভী ফরিদ আহমেদ পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হয়েছিলেন। জামায়াত নেতা জনাব গোলাম আযম লিখেছেন পিস কমিটি বানানোর ব্যাপারে সবচেয়ে বেশী উদ্যোগী ছিলেন মৌলভী ফরিদ আহমেদ। আজকের হিফাজতে ইসলামের নেতা মাওলানা শফির ওস্তাদ মাওলানা সিদ্দিক আহমেদ সাহেব ছিলেন একাত্তরে নেজামে ইসলাম দলের প্রবীন নেতা। সত্তরের দশকে মাওলানা সিদ্দিক আহমেদ সাহেব ছিলেন হাট হাজারী মাদ্রাসার প্রধান। পাকিস্তানের অখন্ডতা বাঁচানোর কাজে এ দলটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। অথচ এ দলের নেতাগণও তাদের সে ভূমিকা নিয়ে আজ নিশ্চুপ। যেন তারা কিছুই জানে না। ফলে চরিত্র হনন হচ্ছে তাদেরও। তাদের নীরবতাটি বরং ইসলামের শত্রুদের জন্য চরিত্র হননের কাজটি আরো সহজ করে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, সত্য বলা থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি তাদের অনেকে ইসলামের শত্রুদের সাথে মিতালী গড়ে তাদের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা ও কদর বৃদ্ধিরও চেষ্টা করছেন। এ কাজে তাদেরকে শেখ হাসিনার পাশেও দেখা যায়। তাদের অনেকে হাসিনার ন্যায় এক দুর্বৃত্ত ভোট-ডাকাতকে ‘কওমী জননী’র খেতাবও দিয়েছে। নৈতীক দিক দিয়ে নীচের নামার এটি এক বিরল দৃষ্টান্ত।

ভারতীয় ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে একাত্তরে ইসলামের পক্ষের শক্তিগুলির যে গৌরবময় ভূমিকা ছিল -সেটিকে তারা নিজেরাই নিজেদের স্মৃতি থেকে বিলুপ্ত করেছে। এদিক দিয়ে  জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্র শিবিরের ভূমিকাটি অতি বিস্ময়কর। ‌বিজয় দিবসের নামে ১৬ ডিসেম্বরে  তারা যেরূপ বিজয় মিছিল বের করে -সেরূপ মিছিল একাত্তরের যারা প্রকৃত বিজয়ী তারাও করে না। অথচ কে না জানে, ‌১৬ ডিসেম্বরে বিজয়টি ইসলামের পক্ষের শক্তির ছিল না। সে বিজয় ছিল ভারত ও তার সেবাদাসদের। এ দিনটি ছিল বিশ্বব্যাপী মুসলিমদের মাতমের দিন। যাদের মনে সামান্যতম ঈমান আছে তারা কি কোন মুসলিম দেশ ভেঙ্গে যাওয়াতে খুশি হতে পারে? এ দিনে সে বিজয় মিছিলই বা বের করবে কোন আনন্দে? সে দেশটি পাকিস্তান না হয়ে যদি সূদান, ইন্দোনেশিয়া, ইরাক বা অন্য যে কোন মুসলিম দেশ হতো -তবু্ও তো সেটি মাতমের দিন রূপে গণ্য হতো।

 

জিহাদ চাই বুদ্ধিবৃত্তির অঙ্গণে

মুসলিমদের ব্যর্থতা শুধু বন্ধুদের চেনায় নয়, শত্রুদের চেনাতেও। এরূপ ব্যর্থতার কারণে মুসলিম উম্মাহর মাঝে একতার চেয়ে বিভক্তিই শ্রেয় গণ্য হয়েছে। এর ফলে শত্রুগণ যেমন নেতা বা পিতা রূপে চিহ্নিত হয়েছে, তেমনি বন্ধুগণ চিহ্নিত হয়েছে শত্রু রূপে। অথচ শত্রু-মিত্র চেনার এ ব্যর্থতাটিই ব্যক্তির সবচেয়ে বড় অযোগ্যতা। এরূপ অযোগ্যতায় মহান সৃষ্টিকর্তাকে চেনাও অসম্ভব হয়। ফিরাউনের ন্যায় দুর্বৃত্তগণ তখন জনগণের কাছে ভগবান, নেতা, পিতা বা প্রধানমন্ত্রী রূপে গৃহিত হয়। শাপ-শকুন, গরু-বাছুর, মুর্তি ভগবানের আসনে বসার সুযোগ পেয়েছে তো মানুষের সে বোধহীনতার কারণে। এক্ষেত্রে বাঙালী মুসলিমের ব্যর্থতাটি বিশাল।

একটি জনগোষ্ঠি কতটা জাহান্নামী -সেটি বুঝা যায় কাকে তারা ভগবান বলে মান্যতা দেয় বা পূজা দেয় তা থেকে। তেমনি একটি দেশের মানুষ কতটা অযোগ্য, অশিক্ষিত বা বোধশূণ্য সেটি বুঝা যায় সেদেশে কীরূপ মানুষ জাতির পিতা, নেতা বা শাসক রূপে গৃহীত হয় -তা দেখে। যেদেশে শেখ মুজিবের ন্যায় একজন গণহত্যাকারি বাকশালী ফ্যাসিস্টকে বঙ্গবন্ধু বা জাতির পিতার আসনে বসানো হয় বা শেখ হাসিনার ন্যায় নৈশকালীন ভোট-ডাকাতকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলা হয় –সে দেশের মানুষকে কি সুসভ্য, সুশিক্ষিত ও বিবেকবান বলা যায়? গণতন্ত্রের এরূপ শত্রুদেরকে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স বা জার্মানীর ন্যায় দেশে রাজনীতি করতে দেয়া দূরে থাক, বাঁচার অধিকার দিত? অথচ বাংলাদেশে এ দুর্বৃত্তগণই ছিল একাত্তরের নেতা এবং আজ দেশ তাদের হাতেই অধিকৃত।  

জীবনে বাঁচাটি নিরাপদ করতে হলে শুধু বিষাক্ত শাপ ও হিংস্র পশুকে চিনলে চলে না; মানবরূপী দুর্বৃত্তদেরও চিনতে হয়। সে সামান্য সামর্থ্যটুকু না থাকলে অসম্ভব হয় মহান আল্লাহতায়ালা, তাঁর দ্বীন ও তাঁর প্রিয় রাসূলকে চেনা। অসম্ভব হয় সমাজের সভ্য মানুষদের চেনা। অথচ এটিই মানব জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। এমন ব্যর্থতা ব্যক্তিকে জাহান্নামে নিয়ে পৌঁছায়। শাপ যে প্রাণনাশী -সেটি জানা যায় শাপের দংশনে কারো মৃত্যু দেখে। তেমনি দুর্বৃত্ত নেতাদের চেনা যায় তাদের হাতে জনগণের প্রাণনাশ, ক্ষয়-ক্ষতি ও মুসলিম উম্মাহ দুর্বল হওয়া দেখে। তাই যারা ভাষা, বর্ণ ও আঞ্চলিকতার নামে মুসলিম উম্মাহর দেহকে খণ্ডিত করে -তাদেরকে কি কখনো বন্ধু বা নেতা বলা যায়? অথচ বাংলাদেশে সেটিই হয়েছে।

বাংলাদেশে যারা ইসলামের পক্ষের আলেম, বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক নেতাকর্মী তাদের জন্য যে কাজটি অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, জনগণের মনকে কোর’আন-হাদীস ও ইতিহাসের জ্ঞানে আলোকিত করা। নইলে অন্ধকার নিয়ে কে শত্রু এবং কে মিত্র সেটি চেনার কাজ কখনোই সঠিক হয় না। বিশেষ করে সেটি একাত্তর প্রসঙ্গে। এটি এক বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদ। নইলে রাজনীতির অঙ্গণে ইসলামের শত্রু ও ভারতেসেবী মীর জাফরদের বিরুদ্ধে যে জিহাদ চলছে তাতে  বিজয়ী হওয়া অসম্ভব হবে। এক্ষেত্রে ইসলামপন্থিদের ব্যর্থটি বিশাল। এটি যে চরম ব্যর্থতা -সে ধারণাও তাদের নাই। এ ব্যর্থতার কারণেই কাফের শক্তির সেবাদাসগণ যেমন নেতা গণ্য হচ্ছে, তেমনি ইসলামপন্থি ব্যক্তিগণ ব্যর্থ হ্চছে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে। অথচ ভারতসেবী মীর জাফরদের মুসলিম স্বার্থ বিরোধী চক্রান্তকে তুলে ধরার জন্য একাত্তরের ঘটনাবলি হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল। একাত্তরের ইতিহাসের ছত্রে ছত্রে রয়েছে তাদের কৃত অপরাধের রক্তাত্ব স্বাক্ষর।

ইতিহাসের মধ্যে থাকে অমূল্য জ্ঞানের ভান্ডার। অতীতের ইতিহাস থেকে যেমন পাওয়া যায় শয়তানী শক্তির পরিচয়, তেমনি পাওয়া যায় সঠিক পথে সামনে চলার প্রয়োজনীয় জ্ঞান। বিজ্ঞান না জানার কারণে কোন জাতি জাহান্নামী হয় না, জাহান্নামী হয় ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেয়ার কারণে। তখন জ্ঞানহীন কাপালিকগণ নিজ যুগের ফিরাউনকেও পদসেবা দেয়। শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনার ন্যায় স্বৈরাচারি, বাকশালী ও মানব-হত্যাকারিদের নেতা হওয়ার পিছনে রয়েছে তো কাপালিক-সুলভ এ অজ্ঞতা। তাদের কারণেই তো দেশে প্লাবন এসেছে গুম, খুন, ধর্ষণ ও পিটিয়ে মানুষ হত্যার রাজনীতির। মহান আল্লাহতায়ালা তাই তাঁর পবিত্র কোর’আনে জীববিদ্যা, পদার্থ বিদ্যা বা গণিতের পাঠ দেননি, কিন্তু বিপুল পাঠ দিয়েছেন ইতিহাস জ্ঞানের। পরিতাপের বিষয় হলো সত্য জ্ঞান তুলে ধরায় মহান আল্লাহতয়ালার সে পবিত্র সূন্নত বাংলাদেশের ইসলামপন্থিদের দ্বারা পালিত হয়নি। অথচ এটিই কাঙ্খিত ছিল যে, একাত্তর নিয়ে সবচেয়ে বেশী লেখা-লেখি ও গবেষণা হবে ইসলামপন্থিদের পক্ষ থেকে। কিন্তু সেটি হয়নি। তারা সে ইতিহাসকে বরং ঢাকার চেষ্টা করেছে। ইতিহাস চর্চার এ অঙ্গনে তাদের অনুপস্থিতি শত্রুপক্ষের জন্য যেটি সহজ করেছে তা হলো ইতিহাস বিকৃতি। একাত্তরকে ভূলে নয়, বরং ইতিহাসের এ গুরুত্বপূর্ণ পর্ব থেকে শিক্ষা নিয়ে এবং শিক্ষা দান করেই ইসলামের পক্ষের শক্তিকে সামনে এগুতে হবে। ০১/০১/২০২০  

 




একাত্তরের শিক্ষা এবং স্বাধীনতার সুরক্ষা প্রসঙ্গ

যে ভয়ানক নাশকতাটি অনৈক্যের

মুসলিম উম্মাহ আজ যে কারণে শক্তিহীন ও ইজ্জতহীন -সেটি মুসলিম দেশগুলির ভূমি বা জলবায়ুর কারণে নয়। সম্পদের কমতির কারণেও নয়। জনসংখ্যার কমতিতেও নয়। বরং মূল কারণটি হলো, মুসলিমদের অনৈক্য্। সে অনৈক্যের মূল কারণটি হলো, মুসলিম দেশগুলিতে দুর্বৃত্তদের নেতৃত্ব। দেশ চলে নেতাদের নির্দেশে। ফলে নেতাগণ ভ্রষ্ট, অযোগ্য, দুর্বৃত্ত ও বেঈমান হলে দেশও তখন দুর্বৃত্ত কবলিত ও ব্যর্থ হতে বাধ্য। দুর্বৃত্ত নেতাদের সবচেয়ে বড় দুর্বৃত্তিটি হয় ভাষা ও বর্ণের নামে মুসলিমদের মাঝে বিভক্তির দেয়াল গড়ার মধ্য দিয়ে। মুসলিম সমাজে এরাই শয়তানের দাস। তাদের লক্ষ্য, মুসলিমদের কল্যাণ নয়, পরাজয় ক্ষতিসাধন। সেটি করে মুসলিমদের মাঝে বিভক্তি গড়ে। এজন্য তারা ইসলামের শত্রুশক্তির কাছে এতো প্রিয়। শেখ মুজিব এবং তার কন্যা হাসিনা ভারতের শাসকচক্রের কাছে এজন্যই এতো প্রিয়। একই রূপ গাদ্দারির কারণে ব্রিটিশ সরকার থেকে শুধু রাজনৈতিক প্রশ্রয়ই নয়, অর্থ, অস্ত্র এবং সামরিক বাহিনীর সহায়তা পেয়েছিল মক্বার গর্ভনর শরিফ হোসেনকে। কারণ সে উসমানিয়া খলিফার বিলুপ্তির লক্ষ্যে বিদ্রোহ করেছিল। 

দেশ বিভক্ত হলে দুর্বলতা বাড়ে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন যত বিশালই হোক ক্ষুদ্র ভূগোলের কারণে তা দিয়ে শক্তি বাড়ে না। মাথা পিছু আয়ের দিক দিয়ে কাতার সমগ্র পৃথিবীতে প্রথম। কিন্তু সে আয়ের কারণে দেশটির শক্তি বাড়েনি। মাথা পিছু আয় তা থেকে আরো শতগুণ বাড়লেও তাতে  কাতার কোন শক্তিশালী দেশে পরিণত হবে না। কারণ দেশটি ক্ষুদ্র। রাশিয়ার অর্থনীতি দক্ষিণ কোরিয়ার চেয়েও দুর্বল। কিন্তু তা সত্ত্বেও দেশটি একটি বিশ্বশক্তি। কারণ, রাশিয়ার রয়েছে বৃহৎ ভূগোল। তাই ভূগোল ক্ষুদ্রতর করা মানে রাষ্ট্রকে শক্তিহীন করা। ইসলামে তাই এটি হারাম। কারণ মহান আল্লাহতায়ালা মুসলিমদের দুর্বল দেখতে চান না। এতে খুশি হয় শয়তান এবং শয়তানের অনুসারি কাফেরগণ। তাই মুজিবের ন্যায় যারাই মুসলিম দেশের ভূগোল ছোট করেছে তারা ভয়ানক ক্ষতি করেছে মুসলিমদের। এমন ব্যক্তিগণ কখনোই মুসলিমদের বন্ধু হতে পারে না। ইসলামের এরূপ শত্রুদের বিজয়ে কাফেরগণ যেমন পুঁজি বিনিয়োগ করে, তেমনি তাদের বিজয় নিয়ে উৎসবও করে। একাত্তরে ভারত সেটিই করেছে।

অথচ ঈমানদারের চেতনাটি সম্পুর্ণ ভিন্ন। কোন মুসলিম দেশ যদি ভেঁঙ্গে যায় এবং ভেঁঙ্গে যাওয়ার বেদনাটি যদি কেউ হৃদয়ে অনুভব করে তবে বুঝতে হবে তার ঈমানের ভান্ডারটি শূণ্য। এজন্যই একাত্তরে কোন আলেম, কোন ইসলামী দল, ইসলামী চেতনাসমৃদ্ধ কোন বুদ্ধিজীবী এবং কোন পীর পাকিস্তান ভাঙ্গার পক্ষ নেয়নি। পাকিস্তান ভাঙ্গার প্রকল্পটি ছিল ইসলামের শত্রু পক্ষের। বাংলাদেশ আজ ইসলামের এ শত্রুদের হাতেই অধিকৃত। নামায়-রোযা, হজ্ব-উমরাহ মুনাফিকও পালন করতে পারে। নবীজী (সাঃ)র যুগে মুনাফিকগণ তার পিছনেও নামায পড়েছে। কিন্তু তারা হৃদয়ে ঈমান নিয়ে বেড়ে উঠতে পারে না।

যে কোন বৃহৎ দেশ সেদেশে বসবাসকারি মুসলিমদের জন্য বৃহৎ ভূমিকা পালনের সুযোগ সৃষ্টি করে। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র্র পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় জনগোষ্ঠি হওয়ার কারণে বাঙালী মুসলিমগণ বিশ্বব্যাপী বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বে যে ভূমিকা পালনের সুযোগ পেয়েছিল সে সুযোগ হারিয়ে তারা এখন ভারতের পদতলে আত্মসমর্পিত। ভারতের বিরুদ্ধে কথা বললে পিটুনি খেয়ে লাশ হতে হয়। এটিই হলো একাত্তরের প্রকৃত অর্জন। বাংলাদেশে অসভ্য নাচগানের আসর করতে অনুমতি লাগে না। কিন্তু অনুমতি লাগে কোরআনের তাফসির করতে। কম্যুনিস্ট, নাস্তিক বা অমুসলিমদের দল করতে বাঁধা নাই। কিন্তু বাঁধা আছে ইসলামের নামে দল করতে। সেটির শুরু মুজিবের হাতে।  ক্ষমতা হাতে পাওয়ার সাথে সাথে মুজিব সকল ইসলামী দলকে নিষিদ্ধ করে এবং দলগুলির নেতাকর্মীদের কারাবন্দী করে। অথচ পাকিস্তানে সে বিপদ ছিল না।

 

হারাম বিষয় কখনোই হালাল হয় না

কোর’আন-হাদীস নিয়ে যাদের সামান্য জ্ঞান আছে তাদের মাঝে মুসলিম দেশ ভাঙ্গার কাজটি যে হারাম -তা নিয়ে সামান্যতম সন্দেহ থাকার কথা নয়। অথচ সে হারামকে হালাল বানানোর চেষ্টাটি বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের মাঝে কম নয়। দেশ ভাঙ্গাকে জায়েজ করতে তাদের পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়, পাকিস্তান আমলে অনৈক ইসলামী কাজ ও হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তাতে কি একটি দেশ ভাঙ্গার ন্যায় একটি হারাম কাজ জায়েজ হয়? হারাম তো সব সময়ই হারাম। জনপদে সভ্য মানুষের বসবাস যেমন গড়ে উঠে, তেমনি বিষাক্ত সাপও সেখানে বাসা বাঁধার চেষ্টা করে। ঘরে সাপ ঢুকলো সে সাপ মারতে হয়, সে জন্য ঘরে আগুণ দেয়াটি শুধু বুদ্ধিহীনতাই নয়, গুরুতর অপরাধ। তাই শাসক যত দুর্বৃত্তই হোক -সে কারণে দেশ ভাঙ্গা জায়েজ হয় না। জায়েজ হয় না জনগণের মাঝে ভাষা বা বর্ণ ভিত্তিক ঘৃণা, ভিন্নতা বা শোষণের কারণেও। দেশ বাঁচিয়ে রেখেও এসব রোগের চিকিৎসা আছে। তাছাড়া প্রশ্ন হলো, একাত্তরের পূর্বে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭০ -এ ২২ বছরের পাকিস্তানী আমলে ২২ জন পূর্ব পাকিস্তানীও কি পুলিশ বা সেনাবাহিনীর হাতে নিহত হয়েছে? অথচ ২০১৩ সালের ৫’মের এক রাতে শাপলা চত্তরে হিফাজতে ইসলামের শত শত মুসল্লীকে হত্যা করা হয়েছে। এবং মিউনিসিপালিটির ময়লা ফেলার গাড়িতে তুলে তাদের লাশ গায়েব করা হয়েছে। পঞ্চাশের বেশী সেনা অফিসারদের হত্যা করা হয়েছে পিলখানাতে। মুজিবের শাসনামলে রক্ষিবাহিনী হত্যা করেছে তিরিশ হাজারের বেশী বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের। যু্দ্ধ আসলে সে সাথে  যুদ্ধাপরাধও আসে। একাত্তরের যুদ্ধে তাই বহু হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। অথচ বাংলাদেশে ভয়নাক গণহত্যাগুলি হয়েছে কোনরূপ যুদ্ধ ছাড়াই। ৯ মাসের যুদ্ধকালীন সময়টি ছাড়া পাকিস্তান আমলে কখনোই এরূপ গণহত্যা হয়নি।    

তাছাড়া অনেক খুনখারাবী ও অনৈসলামিক কাজ উমাইয়া ও আব্বাসী খলিফাদের আমলেও হয়েছে। মক্কায় পবিত্র ক্বা’বাতে আগুন দেয়া হয়েছে। হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। ইমাম হোসেন (রাঃ)’য়ের ন্যায় মহান ব্যক্তিও সে সরকারি নৃশংসতা থেকে রেহাই পাননি। তারপরও জনগণ মুসলিম রাষ্ট্রকে ভাঙ্গেনি। কারণ ক্বা’বাতে আগুন দেয়া বা হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষের হত্যার চেয়েও হাজার গুণ বেশী ক্ষতি হয় যদি মুসলিম রাষ্ট্র ভাঙ্গা হয়। এজন্যই মহাজ্ঞানী আল্লাহতায়ালা মুসলিমদের মাঝে বিভক্তি হারাম করেছেন এবং ভাষা ও বর্ণের নামে গড়ে উঠা ভেদাভেদের দেয়াল ভেঙ্গে একতা গড়াকে ইবাদত বলেছেন। একাত্তরে এ জ্ঞানটুকু থাকার কারণেই কোন ইসলামী দল বা ব্যক্তি পাকিস্তান ভাঙ্গার পক্ষ নেয়নি।

 

যে ব্যর্থতা জনগণের

তবে ব্যর্থতা শুধু নেতাদেরই নয়, সাধারণ জনগণের। জনগণকে শুধু চাষাবাদ, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকুরি-বাকুরি জানলে চলে না। তাকে সামাজিক ও রাজনৈতিক দায়িত্বপালনেও যোগ্যতার পরিচয় দিতে হয়। মুসলিম মাত্র দায়িত্ববান ব্যক্তি। দায়িত্বহীনগণ মুনাফিক হয়, কাফের হয়; কিন্তু তারা মুসলিম হতে পারে না। মুসলিমকে যোগ্যতার পরিচয় দিতে হয় শত্রু-মিত্র চেনাতেও। চোর-ডাকাতদের বন্ধু, নেতা বা পিতা রূপে জড়িয়ে ধরার মধ্যে যা প্রকাশ পায় সেটি বেঈমানী। তাতে যেমন দুনিয়ায় কল্যাণ নাই, তেমনি আখেরাতেও কল্যাণ নেই। এটি অবিকল বিষাক্ত শাপকে জড়িয়ে ধরার মত।

মুসলিমদের বড় বড় ক্ষতিগুলো যারা করেছে তাদের অপরাধগুলো কোন কালেই লুকানো ছিল না। কিন্তু তাদের সে অপরাধগুলি স্বচোখে দেখেও তারা সে অপরাধীদের নেতার আসনে বসিয়েছে। এরচেয়ে বড় অপরাধ কি হতে পারে? বাঙালী মুসলিমদের ব্যর্থতার মূল কারণ এখানেই। বাসের সকল যাত্রী মাতাল হলেও সে বাস গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে ব্যর্থ হয় না -যদি চালক সুস্থ্য হয়। কিন্তু যাত্রীগণ দরবেশ হলেও গাড়ী দুর্ঘটনা ঘটাবে বা সঠিক গন্তব্যে পৌঁছতে ব্যর্থ হবে -যদি চালক মাতাল বা মানসিক ভাবে অসুস্থ্য হয়। এজন্যই সবচেয়ে যোগ্যবান ব্যক্তিকে রাষ্ট্রের ড্রাইভিং সিটে বসানোর মধ্যেই কল্যাণ। এটিই নবীজী (সাঃ)র সূন্নত। তাই ইসলামের গৌরব যুগে রাষ্ট্র নায়কের সে সিটে বসেছেন খোদ নবীজী (সাঃ)। এবং নবীজী (সাঃ)’র ইন্তেকালের পর সে আসনে বসেছেন তাঁর শ্রেষ্ঠ সাহাবাগণ। অথচ বাংলাদেশ হচ্ছে তার উল্টোটি। রাষ্ট্র হাইজ্যাক হয়েছে ভোট-ডাকাত ফ্যাসিস্টদের হাতে। অথচ বাংলাদেশীদের মাঝে তা নিয়ে কোন প্রতিবাদ নেই। গরুছাগল সামনে কোন অন্যায় হতে দেখেও যেমন নীরবে ঘাস খায়, বাংলাদেশের মুসলিমদে অবস্থা কি তা থেকে ভিন্নতর?

রাষ্ট্রের কল্যাণ কাজের শুরুটি সমাজের নীচের তলা থেকে হয় না। সেটি শুরু করতে উপর থেকে। দেশের জনগণদের সবাইকে ফেরেশতা বানিয়ে তাই রাষ্ট্রে কল্যাণ আনা যায় না। সবাইকে ফেরেশতা বানানোর কাজটি সম্ভবও নয়। কারণ, অধিকাংশ মানুষ যে জাহান্নামে যাবে সেটি তো মহান আল্লাহতায়ালার কথা। সমাজ বিপ্লবের পথে তাই জরুরী হলো শাসন ক্ষমতায় নেক বান্দাদের বসানোর বিপ্লব। নইলে হাজার হাজার মসজিদ-মাদ্রাসা গড়েও দেশে কোন কল্যাণ আসবে না। বাঙালী মুসলিম দুর্গতির মূল কারণ, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ভাল মানুষকে বসানোর ন্যায় অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি জনগণের কাছে গুরুত্বই পায়নি। তারা কল্যাণ খুঁজেছে মসহজিদ-মাদ্রাসা গড়ায়। এবং স্রেফ নিজে ভাল হওয়ায়। নবীজী (সাঃ) ও তাঁর প্রিয় সাহাবাগণ রাষ্ট্রীয় বিপ্লবের যে মহান সূন্নত রেখে গেছেন -তা থেকে তারা কোন শিক্ষাই নেয়নি।

 

একাত্তরের যুদ্ধের ধারাবাহিকতা

ইসলামের শত্রুপক্ষীয় দুর্বৃত্তদের নীতি হলো, “মানুষকে বিভক্ত করো এবং শাসন করো”। এদের কাজ তাই ভাষা, বর্ণ, ভৌগলিক ভিন্নতা ও রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে জনগণের মাঝে বিভক্তি গড়া। শেখ মুজিবের রাজনীতির মূল পুঁজিই ছিল ঘৃণাভিত্তিক এ বিভক্তির রাজনীতি। পাকিস্তান আমলে তার বিভক্তির রাজনীতির ব্যাকারণ ছিল বাঙালী ও অবাঙালীর বিভক্তি। তেমন একটি ঘৃণাপূর্ণ মগজ নিয়ে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে নিজ দলকে শক্তিশালী করার কোন চেষ্টাই করেননি। সমগ্র পাকিস্তানে প্রধানমন্ত্রী হওয়া নিয়ে আগ্রহ থাকলে সে গরজটি তার মাঝে দেখা যেত। বাংলাদেশ সৃষ্টির পর বিভেদ গড়লেন বাংলাদেশ সৃষ্টির পক্ষ-বিপক্ষের ভিত্তিতে। এমন ক্ষমতালিপ্সু ক্ষুদ্র মনের মানুষদের কারণেই মুসলিম দেশগুলি খন্ডিত হয়েছে এবং দুর্বল হয়েছে। শয়তান এবং তাবত ইসলাম বিরোধীশক্তিও তো সেটিই চায়। এজন্যই কাফের অধিকৃত দেশগুলিতে তাই এদের বন্ধুর অভাব হয়না। বাংলাদেশের বুকে আত্মবিনাশী সে বিভক্তির রাজনীতিকে বলবান করার কাজে ভারতীয়দের বিনিয়োগ এজন্যই বিশাল। সে রাজনীতিকে বিজয়ী করতে একাত্তরে তারা যুদ্ধও করেছে। এবং তাদের সে নীতি আজও প্রয়োগ করে চলছে। ফলে শেখ হাসিনার পিছনে ভারতীদের রাজনৈতিক ও সামরিক বিনিয়োগটিও একাত্তরের ন্যায় বিশাল। দেহ খন্ডিত হলে যেমন অসম্ভব হয় নিজ পায়ে দাঁড়ানো, তেমনি এক পঙ্গুদশা হয় খন্ডিত দেশেরও। ইসলামে তাই এটি হারাম। অথচ শয়তানী শক্তির স্ট্রাটেজী সম্পূর্ণ বিপরীত।

ফলে ভারতের ন্যায় যারাই ইসলাম ও মুসলিমের ক্ষতিসাধনে উদগ্রীব তাদের স্ট্রাটেজীটি হলো, প্রতিটি মুসলিম দেশে বিচ্ছিন্নতাকামী দুর্বৃত্তদের ময়দানে নামানো। সেটি যেমন বাংলার মাটিতে পাকিস্তান আমলে দেখা গেছে, তেমনটি এখনও দেখা যাচ্ছে্। ভারত শুধু পাকিস্তান ভাঙ্গা নিয়ে খুশি নয়, মেরুদন্ড ভাঙ্গার বাসনা রাখে প্রতিটি মুসলিম দেশ ও জনপদে। মেরুদন্ড ভাঙ্গার সে কাজ ত্বরান্বিত করতেই কাশ্মীরে ভারত ৭ লাখ সৈন্য মোতায়েন করেছে। অথচ কাশ্মীরের জনসংখ্যা এক কোটিরও কম।  তেমন একটি মেরুদন্ড ভাঙ্গার লক্ষ্য বাংলাদেশেও। সে লক্ষ্যে ভারতের বিপুল বিনিয়োগ বাংলাদেশে। সেটি যেমন ভারতসেবী গুন্ডা উৎপাদনে, তেমনি গ্রামে গ্রামে গুপ্তচর বাহিনী গড়ে তোলায়। ভারতসেবীদের ক্ষমতায় রাখা এজন্যই ভারতীয়দের কাছে এতো গুরুত্বপূর্ণ। ভোটে জিতবে না সেটি নিশ্চিত হয়েই ভারত মধ্যরাতে ভোট-ডাকাতির মাধ্যমে হাসিনাকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার চক্রান্ত করে। এবং দমন প্রক্রিয়া চালু রেখেছে, এ ভোট-ডাকাত সরকারের বিরুদ্ধে যে কোন বিদ্রোহকে ব্যর্থ করায়।

ভারতীয়দের একাত্তরের যুদ্ধটি একাত্তরে শেষ হয়নি। একাত্তরে তাদের যুদ্ধটি ছিল পাকিস্তানকে খন্ডিত করার। পাকিস্তানকে খন্ডিত করার প্রয়োজনটি দেখা দিয়েছিল উপমহাদেশে মুসলিম শক্তিকে দুর্বল করার প্রয়োজনে। একাজে তারা কলাবোরেটর রূপে বেছে নিয়েছিল আওয়ামী লীগ ও ন্যাপসহ ইসলামী চেতনাশূণ্য সেক্যুলারিস্টদের। তবে পাকিস্তান খন্ডিত হলেও দুর্বল হয়নি, বরং পরিণত হয়েছে পারমানবিক শক্তিশালী দেশে। ফলে একাত্তরে যেরূপ রাশিয়ার সহায়তা নিয়ে বিজয়ী হয়েছিল, সেরূপ বিজয় এখন অসম্ভব। এর ফলে ভারতের সমস্যা বা ভয় কোনটাই কাটেনি। উপরুন্ত ভারতীয়দের মনে ভয় জেগেছে পূর্ব সীমান্তে আরেক শক্তিশালী মুসলিম রাষ্ট্রের উদ্ভব নিয়ে। ভারত-অনুগত দাস শাসনের অবসান হলে তেমন একটি বাংলাদেশের উদ্ভব যে সম্ভব -তা নিয়ে ভারত নিজের বিশ্বাসটিও প্রবল। তখন যুদ্ধ দেখা দিবে ভারতে পূর্বাঞ্চলীয় ৭টি প্রদেশে। এ কারণেই ভারতের গুরুত্বপূর্ণ স্ট্রাটেজী হলো বাংলাদেশের বুকে যারা ভারতের গোলামী নিয়ে বাঁচতে চায় তাদের সযত্নে বাঁচিয়ে রাখা। এবং যারা মুসলিম পরিচিতির ধারক তাদের নির্মূল করা। তেমন একটি লক্ষ্যে ভারত বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অবিরাম যুদ্ধ চালিয়ে যেতেও রাজি।   

বাংলাদেশের মাটিতে চলমান ভারতীয় যুদ্ধের আলামতগুলি প্রচুর। সেটি চলছে গুম-খুনের রাজনীতির নামে। বাংলাদেশের মাটিতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কথা বললে কেউ ক্ষিপ্ত হয়না। লাঠি হাতে কেউ ধেয়েও আসে না। কিন্তু ভারতের বিরুদ্ধে কথা বললে লাঠি হাতে মারতে তাড়া করে ছাত্রলীগের গুন্ডাগণ। এবং পিটিয়ে হত্যাও করে। ভারতের বিরুদ্ধে ফেস বুকে বক্তব্য দেয়ায় বুয়েটের আবরার ফাহাদ এদের হাতেই নৃশংস ভাবে লাশ হলো। একই কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এরা পিটিয়ে মরণাপন্ন করেছে ভিপি নুরুল হক সহ প্রায় তিরিশজনকে। অনেকে হয়েছে পঙ্গুত্বের শিকার।

 

মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের ভারতসেবী চেতনা

ভারতীয়দের একাত্তরের যুদ্ধের স্ট্রাটেজীর সাথে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে চলমান যুদ্ধটির ধারাবাহিকতা যে কতটা গভীর সেটি বুঝা যায়, ভারতবিরোধীদের উপর সরাসরি হামলাগুলি হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের নামের সংগঠন থেকে। মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের ক্যাডারদের কাজ হয়েছে যারাই ভারতের বিরুদ্ধে কথা বলছে তাদের উপর হামলা করা। তাদের কথা, ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোন কথা বলা যাবে না। কথা হলো, ভারতের বিরুদ্ধে নানা দেশে এবং জাতিসংঘে কথা বলা হচ্ছে, অতএব বাংলাদেশে যাবে না কেন? ভারতের বিরুদ্ধে কথা বলা দুষণীয় হলে তারা কেন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কথা বলে? ভারতীয় স্বার্থের পাহারাদার এ গুন্ডা সংগঠনটি জনবল পাচ্ছে ছাত্রলীগ থেকে। ভারতের ন্যায় ভারতসেবী হাসিনা সরকারের কাজ হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের এ দাস-যোদ্ধাদের প্রটেকশন দেয়া। ফলে তাদের হাতে সাধারণ ছাত্রগণ গুরুতর আহত হয়ে ইনটেনসিভ কেয়ারে ঢুকলেও পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে কেস নেয়না।

একাত্তরে ভারত ও ভারতসেবী আওয়ামী বাকশালীদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কি ছিল –সেটি বুঝার মোক্ষম সময় মূলতঃ এখন। মুজিব স্বাধীনতাও চায়নি, গণতন্ত্রও চায়নি। স্বাধীনতা চাইলে কি ভারতের সাথে ২৫ সালা দাসচুক্তি স্বাক্ষর করতো? গণতন্ত্রও চায়নি। গণতন্ত্র চাইলে কি দেশের সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠা করতো? নিষিদ্ধ করতো কি সকল বিরোধী দলীয় পত্র-পত্রিকা? মুজিবের ছিল একটি মাত্র এজেন্ডা। সেটি হলো যে কোন মূল্যে গদিতে বসা। সে লক্ষ্যে সে যেমন পাকিস্তান ভাঙ্গতে দু’পায়ে খাড়া ছিল, তেমনি প্রস্তুত ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিক্রি করাতেও। সে অভিন্ন এজেন্ডাটি নিয়ে কাজ করছে হাসিনাও। আর এরূপ ক্ষমতালোভী দেশ বিক্রেতাদের দাস রূপে পেলে ভারত তাকে দিয়ে ইচ্ছামত কাজ করিয়ে নিবে সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? তাই মুজিবকে দিয়ে যেমন ২৫ সালা দাসচুক্তি, পদ্মার পানি ও বেরুবাড়ি আদায় করে নিয়েছে, তেমনি হাসিনার মাধ্যেমে নিয়েছে করিডোর, তিস্তা ও ফেনি নদীর পানি, বাংলাদেশের বন্দরে ভারতীয় জাহাজের প্রবেশাধীকার এবং আরো অনেক কিছু। ক্ষমতালিপ্সুদের ক্ষমতায় যাওয়াতে এভাবে দেশের ভয়ানক স্বার্থহানি ঘটে।

ভারত ও ভারতসেবী আওয়ামী বাকশালীদের চেহারাটি একাত্তরেও সুস্পষ্ট ভাবে প্রকাশ পেয়েছিল। কিন্তু সেদিন অনেকের চোখই অন্ধ ছিল পাকিস্তানের প্রতি বিদ্বেষ ও ঘৃণার কারণে।  আকাশে মেঘ জমলে সূর্যও আড়াল হয়ে যায়; তেমনি মনে বিদ্বেষ ও ঘৃণা জমলে সত্যকে দেখার সামর্থ্যও বিলুপ্ত হয়। একাত্তরে ভারত ও ভারতসেবীদের কুৎসিত চেহারাটি এজন্যই অনেকে দেখতে পায়নি। এখন তো বাংলাদেশের মাটিতে পাকিস্তান নাই। ফলে সবাই দেখতে পাচ্ছে ভারত ও ভারতসেবী আওয়ামী বাকশালীদের প্রকৃত চেহারাটি। তাই তাদের প্রতি ঘৃণাটি শুধু একাত্তরের রাজাকারদের বিষয় নয়, সেটি পরিণত হয়েছে বাংলাদেশের প্রায় সকল মানুষের নিজস্ব উপলব্ধি।  

ফলে ভারতসেবী বাকশালীদের মিথ্যাচার সরিয়ে একাত্তরের সত্য ঘটনাগুলি জানার এখনই উপযুক্ত সময়।  প্রকৃত বীর, আর কারা ভারতসেবী গাদ্দার -একাত্তরের ইতিহাসের মাঝে রয়েছে তার প্রামাণিক দলিল।  সে দলিল যে বিষয়টি সুস্পষ্ট তা হলো, আগ্রাসী ভারতের হামলা থেকে স্বাধীনতা বাঁচানোর চেতনাটি কখনোই বাকশালী ভোট-ডাকাত ও মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের গুন্ডাদের চেতনা নয়। বরং সেটি হলো একাত্তরের রাজাকারদের চেতনা -যারা নিজেদের রক্ত দিয়ে ভারতীয় বাহিনী ও ভারতের অর্থে পালিত সেবাদাসদের বিশাল আগ্রাসন রুখতে জিহাদে নেমেছিল।  বহু হাজার রাজাকার সে ভারতীয় আগ্রাসন থেকে বাঁচতে শহীদও হয়েছিল। ০১/০১/২০২০  

 




বাংলাদেশে ভারতীয় স্বার্থের পাহারাদারদের সন্ত্রাস এবং স্বাধীনতার সংকট

ভিয়েতনামে যখন মার্কিন বাহিনীর আগ্রাসন ও গণহত্যা চলে তখন তার বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রায় প্রতিটি বড় বড় শহরে বহু প্রতিবাদ সভা ও মিছিল হয়েছে। অসংখ্য সভা ও মিছিল হয়েছে যখন সোভিয়েত রাশিয়ার হাতে আফগানিস্তান অধিকৃত হয়। ইরাকের উপর যখন মার্কিন হামলা হয় তখনও বাংলাদেশে বহু  প্রতিবাদ সমাবেশ ও মিছিল হয়েছে। সেরূপ মিছিল-সমাবেশ সমগ্র বিশ্ব ব্যপী হয়েছে। ইরাকের বিরুদ্ধে হামলার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় জনসভাটি হয়েছে লন্ডনে। হাইড পার্কের সে সমাবেশে বিশ লাখের বেশী নরনারী জমায়েত হয়েছিল। সচেতন মানুষেরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে এভাবেই প্রতিবাদ মুখর হয়।

যুদ্ধ-জুলুম-নির্যাতনে বিরুদ্ধে ঘৃণা ও প্রতিবাদ না থাকাটাই মানবতার মৃত্যু। তখন মানব দেহ বেড়ে উঠে নিরেট পশুত্ব নিয়ে। সামনে কাউকে জবাই হতে দেখেও গরু-ছাগল নীরবে ঘাস খায়। এতেই পশুত্বের পরিচয়। কিন্তু হৃদয়ে মানবতা নিয়ে যারা বাঁচে তারা সেটি পারে না। জুলুমের বিরুদ্ধে যে ঘৃণা সেটি কোন সীমা-সরহাদ মানে না। এ কারণেই কোন গৃহে কেউ খুন বা ধর্ষিতা হলে -সেটি আর সে গৃহের অভ্যন্তরীণ বিষয় থাকে না। সে জুলুম রুখতে বিবেকবান মানুষ মাত্রই আওয়াজ তুলে এবং প্রয়জনে অস্ত্র হাতে ছুটে আসে। প্রশ্ন হলো, ছাত্র লীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও শেখ হাসিনার মাঝে সে মানবিক রূপটি কই? তারা তো ভারতের জালেম শাসকের পক্ষ নিয়েছে।

তাছাড়া মানুষ হওয়ার সাথে সাথে যারা মুসলিম পরিচয় নিয়ে বাঁচে তাদের কিছু বাড়তি দায়-দায়িত্বও থাকে। সে দায়িত্ব নিয়ে বাঁচার মধ্যেই প্রকৃত ঈমানদারী। তাই বিশ্বের কোন এক প্রান্তে যদি কোন মুসলিম ধর্ষিতা, আহত, নিহত বা অত্যাচারিত হয় এবং তা নিয়ে যদি কোন ব্যক্তির হৃদয়ে বেদনা না জাগে -তবে বুঝতে হবে সে ব্যক্তি আদৌ মুসলিম নয়। তার দেহে প্রাণ থাকতে পারে, তবে সে প্রাণে যে বিন্দুমাত্র ঈমান নাই –তা নিয়ে কোন সন্দেহ নাই।  বেদনার সে জায়গাটি হলো ঈমান। এমন বেদনাশূণ্য ব্যক্তিটি বাঙালী হতে পারে, হিন্দু-বৌদ্ধ-খৃষ্টানও হতে পারে, কিন্তু সে কখনোই মুসলিম হতে পারে না। মাওলানা আবুল কালাম আযাদ তাই বলকান যুদ্ধকালীন সময়ে লিখেছিলেন, “যদি কোন তুর্কী সৈনিকের পা গুলিবিদ্ধ হয় আর সে গুলির আঘাতের বেদনা তুমি যদি হৃদয়ে অনুভব না করো -তবে খোদার কসম তুমি মুসলিম নও।” কারণ, মুসলিম হওয়ার শর্তই হলো অন্য মুসলিম ভাইয়ের বেদনায় পরম ব্যাথীত হওয়া এবং সে বেদনার প্রতিকারে কিছু করার ভাবনা নিয়ে বাঁচা।  অধিকৃত আফগান মুসলিমদের সে বেদনার উপশমে তাই হাজার হাজার মুজাহিদ বিশ্বের নানা কোণ থেকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে আফগানিস্তানে ছুটে এসেছিলেন।

মুসলিম মাত্রই তাই ঢাকার রাস্তায় ভারতে মুসলিম নির্যাতনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানাবে সেটিই তো স্বাভাবিক। মুসলিমদের গৌরব কালে এরূপ ঘটনা ঘটলে শুধু প্রতিবাদ নয়, জালেম শক্তির বিরুদ্ধে রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধও শুরু হত। মুসলিমের জীবনের মিশন কি স্রেফ নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত পালন এবং মসজিদ-মাদ্রসা নির্মাণ? মুল মিশন তো অন্যায় ও জুলুমের নির্মূল এবং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা। ইসলামের যে শান্তির ধর্ম –তা তো এ ভাবে দুর্বৃত্তদের নির্মূলের মাধ্যমেই প্রমাণিত হয়। প্রকৃত ঈমানদারগণ এমন পবিত্র মিশনে নিজেদের জান-মাল তথা সকল সামর্থ্যের বিনিয়োগ করে। নবীজী (সাঃ)র সাহাবীদের ৭০% ভাগের বেশী এ কাজে শহীদ হয়েছেন। মানব ইতিহাসে অন্য কোন ধর্ম বা জাতির লোকেরা সেটি করেনি। বেঈমানদের বিনিয়োগটি হয় নিছক নিজের গোত্র, ভাষা, বর্ণ, দল বা জাতীয়তার গৌরব বাড়াতে। সত্য ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায় তাদের কোন গরজ থাকে না। তারা নিজেরাই বরং দুর্বৃত্ত স্বৈর-শাসকে পরিণত হয় –যেমনটি শেখ মুজিবের ক্ষেত্রে হয়েছে। দুর্বৃত্তদের নির্মূল ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায় প্রকৃত মুসলিমদের সে বিশাল কোরবানীর কারণেই সুরা আল-ইমরানের ১১০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহতায়ালা তাদেরকে সমগ্র মানব সৃষ্টির মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মাহ রূপে ভূষিত করেছেন। অথচ শেখ হাসিনা ও তার অবৈধ সরকারের কাজ হয়েছে বাংলাদেশের মুসলিমদের ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের নির্মূলের সে অর্পিত কোর’আনী মিশন থেকে দূরে রাখা। এ মিশন রুখতে শেখ হাসিনা নিজে এবং তার দলের নেতা-কর্মীগণ ভারতের জালেম সরকারের পক্ষে সন্ত্রাসী লাঠিয়ালে পরিণত হয়েছে। সে লক্ষ্যে শেখ হাসিনা সফলতাটি যে কতটা বিশাল তারই প্রমাণ, ছাত্রলীগের কর্মীদের হাতে বুয়েটে আবরার ফাহাদের হত্যা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিপি নূরের উপর হামলা। তাদের উভয়ের অপরাধ, তারা মুখ খুলেছিল ভারতীয় অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে।      

ভারতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে শুধু যে হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন হচ্ছে তা নয়। ষড়যন্ত্র হচ্ছে তাদের নাগরিকত্ব হরণের। চেষ্টা হচ্ছে নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিতদেরকে বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারি রূপে আখ্যায়ীত করা। এবং বাঙালী অনুপ্রবেশকারির লেবেল লাগিয়ে তাদেরকে ভারত থেকে বাংলাদেশে “পুশ ইন” করা। এ ষড়যন্ত্রের রূপায়নে ইতিমধ্যেই আসামে ১৯ লাখ বাসিন্দাকে নাগরিকত্বহীন করা হয়েছে। যাদেরকে নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে তাদের মধ্যে ৭ লাখ মুসলিম। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে্, তারা বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশকারী। এভাবে ভারত সরকার ভারতীয় মুসলিমদের সাথে বাংলাদেশকেও জড়িয়ে ফেলেছে। দিল্লিতে সরকারি ভাবে এ কথা জোরেশোরে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ হিন্দু নির্যাতন হচ্ছে এবং হিন্দুগণ প্রাণ বাঁচাতে ভারতে আশ্রয় নিচ্ছে। ভারতের লোক সভায় বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সেরূপ একটি গুরুতর অভিযোগ এনেছে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ। তাই বিষয়টি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় হয় কি করে? প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের মানুষ এরূপ মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে নীরবই বা থাকে কী করে? অথচ বাংলাদেশের সরকার শুধু নীরবই থাকেনি, অন্যরা ভারতীয় মিথ্যাচার ও জুলুমের বিরুদ্ধে সরব হোক, সমাবেশ ও মিছিল করুক -সেটিও হাসিনার অবৈধ সরকার অসম্ভব করেছে। সেগুলি বাধা দিতে পেশী শক্তি নিয়ে ময়দানে নেমেছে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীগণ। তাদের হাতে  আহত হয়েই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের ভিপি নূর এবং আরো অনেকে। পুলিশ হামলাকারিদের গ্রেফতার না করে প্রমাণ করলো সরকারেরও সম্মতি হয়েছে এরূপ সন্ত্রাসী হামালায়।

লক্ষণীয় বিষয় হলো, মুসলিম নির্যাতনের বিরুদ্ধে মিটিং-মিছিল ভারতে সম্ভব হলেও সেটি বাংলাদেশে অসম্ভব করে রেখেছে শেখ হাসিনা ও তার অবৈধ সরকার। এভাবে শেখ হাসিনা এবং তাঁর সাথীগণ প্রমাণ করলো ভারতীয়দের চেয়েও তারা অধীক ভারতীয়। ছাত্র লীগ ও আওয়ামী লীগের কর্মীগণ আবির্ভুত হয়েছে ভারতীয় লাঠিয়াল বাহিনীর ঠ্যাঙ্গারে রূপে। ভিপি নূর ও তাঁর সাথীদের উপর হামলাকারীদের অভিযোগ ভিপি নূর ভারতে অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে রাজনীতি করছে। সে অভিযোগের ভিত্তিতে হুশিয়ারি দিয়েছে, তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ঢুকতে দিবে না। এবং ঢুকার চেষ্টা হওয়াতে তাঁর উপর হামলাও হচ্ছে।

শেখ হাসিনার অবৈধ সরকারের ভারতসেবী আচরণের প্রমাণ বহু। বুকার প্রাইজ বিজয়ী ভারতীয় লেখিকা অরুন্ধতি রায় ভারতের নানা শহরে ভারত সরকারের নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সভা করেন। তিনি ঢাকাতেও এসেছিলেন। তাঁর আগমন উপলক্ষে ডক্টর শহীদুল আলম ঢাকার একটি সেমিনার কক্ষে সুধি সমাবেশর আয়োজন করেছিলেন। কিন্তু সরকার সেটি করতে দেয়নি। কারণ অরুন্ধতি রায়ের খ্যাতি হলো, ভারত সরকারের জুলুমের বিরুদ্ধে অতি নির্ভয়ে হক কথা বলায়। তিনি কথা বলেন কাশ্মীরে ভারতীয় বাহিনীর অধিকৃতি ও জুলুমের বিরুদ্ধেও। কিন্তু হাসিনার অবৈধ সরকার চায়নি বাংলাদেশের মাটিতে ভারতের ভারতীয় নীতির কোনরূপ নিন্দা হোক। এখানে কাজ করেছে শেখ হাসিনার ভারতপ্রীতিই শুধু নয়, ভারতভীতিও। 

গণতন্ত্রবিরোধী এমন নিষ্ঠুর আচরণ একমাত্র অবৈধ সরকারই করতে পারে। কারণ, অবৈধ সরকার মাত্রই জানে, জনগণের ভোট নিয়ে তারা ক্ষমতায় আসেনি। ফলে তাদের আচরণ যত নিষ্ঠুরই হোক, সে জন্য তারা জনগণের কাছে জবাবদেহীতে বাধ্য নয়। তাদের দায়বদ্ধতা ষোল আনা কেবল প্রভুদের প্রতি। হাসিনার ক্ষেত্রে সে প্রভু হলো ভারত সরকার। কারণ, ভারতীয় গোয়েন্দাদের সহযোগিতা নিয়েই শেখ হাসিনা ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের রাতে ভোট ডাকাতি করে ক্ষমতায় বসেছে। আন্তর্জাতিক মহলে এরূপ একটি অবৈধ সরকারকে গ্রহণযোগ্য করতেও নানা দেশের রাজধানীতে কাজ করছে ভারতীয় কূটনৈতীক মহল। ফলে ভারতের প্রতি দায় পরিশোধ করতেই শেখ হাসিনা মাঠে নামিয়েছে তার লাঠিয়াল বাহিনীকে। ভিপি নূর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্রদের দ্বারা নির্বাচিত হলে কী হবে ক্যাম্পাসে প্রবেশে তাঁর উপর নিষেধাজ্ঞা লাগিয়েছে। একাত্তরে ইয়াহিয়া খানের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল নির্বাচনী বিজয়ের পরও মুজিবের হাতে ক্ষমতা দেয়া হয়নি। অথচ শেখ হাসিনা একই আচরণ করছে ভিপি নূরের বিরুদ্ধে।

যারা ভিপি নূরের মিছিল ও মিটিংয়ে বাধা দিচ্ছে তারা সেটি করছে “মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ”য়ের ব্যানারে। প্রশ্ন হলো, ভারত-বিরোধী আওয়াজ স্তব্ধ করার লক্ষ্যে “মুক্তিযুদ্ধ”য়ের নাম বা চেতনা ব্যবহারের হেতু কী? হেতুটি বিশাল। লক্ষ্য এখানে ১৯৭১’য়ে বাংলাদেশের জন্মে ভারতের অবদানকে স্মরণ করিয়ে দেয়া। তাদের কথা, বাংলাদেশের মাটিতে বসে ভারতের বিরুদ্ধে কথা বলার অর্থ ভারতের প্রতি নিমক-হারামী। এটি গাদ্দারি। সেটি হতে দিতে তারা রাজী নয়।  “মুক্তিযুদ্ধ”য়ের চেতনাটি হলো ভারতের ভাত-মাছ, লবন-পানি খেয়ে তাদের অর্থ,অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ নিয়ে ভারতের আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় মুসলিম শক্তিকে খর্ব করা এবং ভারত বিরোধীদের নির্মূলে ভারতকে সাথে নিয়ে যুদ্ধ করা। যুদ্ধ শেষে তাজুদ্দীনের ৭ দফা এবং মুজিবের ২৫ দফার গোলামী চুক্তি মেনে নিয়ে বসবাস করা।

বাংলাদেশের মাটিতে পাকিস্তানের বিলুপ্তি ঘটেছে। একাত্তরের রাজাকারদের অধিকাংশেরই মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু যা হয়নি তা হলো ভারত-বিরোধী চেতনার বিলুপ্তি। বরং বিপুল ভাবে সেটি বেড়েছে। ভারতকে যারা একাত্তরে চিনতে ভূল করেছে, তারা এখন চিনছে। চিনতে সাহায্য করছে যেমন মুজিবের বাকশালী স্বৈরাচার তেমনি শেখ হাসিনার ভোট ডাকাতি ফ্যাসিবাদ। ভারতের ভয় দ্রুত বাড়ছে বর্ধিষ্ণু ভারত বিরোধীতার কারণে। তাই ভারত চায়, বাংলাদেশীদের মনে ভারতের একাত্তরের অবদানকে স্মরণ করিয়ে দেয়া। সেটি মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের নামে। একাত্তরে যাদের ঘাড়ে অস্ত্র রেখে ভারত পাকিস্তান ভেঙ্গেছিল, এখনো তাদের ঘাড়ে অস্ত্র রেখেই ভারত-বিরোধীদের নির্মূল করতে চায়। চায়, একাত্তরেরর ন্যায় আরেকটি যুদ্ধ। সেটি করতেই প্রতিটি ভারত-বিরোধীই চিহ্নিত হচ্ছে রাজাকার রূপে। ফলে বিলুপ্তি ঘটছে না “মুক্তিযুদ্ধ” ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার। সে চেতনা ও যুদ্ধ আছে বলেই সে চেতনাধারীদের নির্মম প্রহারে প্রাণ হারালো বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদ। এবং গুরুতর ভাবে আহত হলো ভিপি নূর ও তাঁর সাথীরা।

বাংলাদেশীদের সামনে পথ মাত্র দুটি। এক). “মুক্তিযুদ্ধ” ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে শেখ হাসিনা ও তার গুন্ডাগণ ভারতসেবী যে দুর্বৃত্ত গোলামী শাসন প্রতিষ্ঠা দিয়েছে সেটি মাথা নত করে মেনে নেয়া। এটিই হলো শেখ মুজিব, শেখ হাসিনা ও সিকিমের লেন্দুপ দর্জির পথ। এ পথটি হলো বাকশালী ফ্যাসিবাদ, গুম-খুন, ভোট ডাকাতি এবং রাস্তায় লাশ হওয়ার পথ। দুই). ভারতের গোলামী মুক্ত হয়ে স্বাধীনতা নিয়ে বাঁচার পথ। স্বাধীনতার এ পথে চলতে হলে ভারতসেবীদের কাছে রাজাকার রূপে চিহ্নিত হওয়া ছাড়া উপায় নেই। কারণ, একাত্তরের রাজাকারদের চেতনা নিয়ে অনেকের ভূল ধারণা থাকলেও সেরূপ ভূল ভারত ও ভারতসেবীরা করে না। রাজাকারদের চিনতে তারা কখনোই সংশয়ে পড়ে না। তাদের জানা রাজাকারের চেতনার মূল কথাটি হলো, ভারতের গোলামী মুক্ত হয়ে স্বাধীন মুসলিম শক্তি রূপে বাঁচার চেতনা। সে সাথে ভাষা ও ভূগোলের সীমানা ডিঙ্গিয়ে বিশ্ব-মুসলিমদের সাথে প্যান-ইসলামিক ভাতৃত্বের চেতনা। সে চেতনার কারণেই ১৯৭১’য়ে বহু হাজার সাহসী যুবক পাকিস্তানকে বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছিল এবং ভারতসেবীদের পক্ষে বিশাল প্লাবন দেখেও তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছিল। কারণ, তারা বুঝেছিল ক্ষুদ্র ভূগোলে স্বাধীনতা বাঁচে না। সে জন্য বৃহৎ ভূগোল চাই। ১৯৪৭’য়ে তৎকালীন  বাঙালী মুসলিম নেতাগণ সেটি বুঝেছিল বলেই নিজ গরজে পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তানভূক্ত করেছিল।

ইসলামী ভাতৃত্বের চেতনার ধারকগণ একাত্তরে পরাজিত হলেও সে চেতনাটি মারা যায়নি, বরং প্রবলতর হচ্ছে ক্যাম্পাসে, রাজপথে ও সোসাল মিডিয়াতে। ভারতীয় মুসলিমগণ নির্যাতিত, ধর্ষিতা ও নিহত হলে ঢাকার রাস্তায় তাই আওয়াজ উঠে। ভারত ও ভারতসেবী হাসিনার কাছে ভারতবিরোধী সে আওয়াজটি অসহ্য। এরূপ প্রতিবাদি আওয়াজকে তারা রাজাকারের আওয়াজ মনে করে। এজন্যই আবরার ফাহাদের ন্যায় একজন নিরেট দেশপ্রেমিক মেধাবী ছাত্রকে ভারতসেবী অসভ্য স্বৈরশক্তির হাতে লাশ হতে হলো। এবং আহত হলো ভিপি নূর ও তাঁর সাথীরা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারী ভারতসেবীদের শাসনে কি এটিই স্বাভাবিক নয়? ফলে এরূপ বর্বর দমনমূলক শাসন যেমন মুজিব আমলে দেখা গেছে, দেখা যাচ্ছে হাসিনার আমলেও। ২৫/১২/২০১৯ 




দেশ এবং সমাজ নিয়ে ভাবনা-৪

1.
স্বৈরাচারি শাসনামালে অতি নৃশংস অপরাধগুলো শুধু সরকারের অনুগত পুলিশ এবং গুন্ডাদের হাতে হয় না। বরং বড় বড় নৃশংস অপরাধগুলো ঘটে দাস চরিত্রের বিচারকদের হাতে।এবং সেটি বিচারের নামে। নিরপরাধ মানুষদেরও তখন ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়। স্বৈরাচার শাসকগণ তাই শুধু অনুগত পুলিশ বাহিনীই গড়ে তোলে না, গড়ে তো অনুগত বিচারক বাহিনীও।

2.
বাংলাদেশে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকগণ যেন আওয়ামী লীগের ক্যাডার। এতকাল জয় বাংলা স্লোগান আওয়ামী  লীগ দলীয় মিটিং ও মিছিলে দেয়া হত। কে আওয়ামী লীগ, আর কে আওয়ামী লীগ নয় -সেটি চেনা যেত এ স্লোগান থেকে। এখন সকল সভায় সবার উপর জয় বাংলা বলাকে আদালত বাধ্যতামূলক করলো। এটি কি আদালতের কাজ?

3.
আদালতের মূল কাজ আইনের শাসন কায়েম করা। আইনের শাসন থাকলে কি মধ্যরাতের ভোট ডাকাতগণ ক্ষমতায় বসতে পারতো? বিচারে তাদের জেলে যেতে হতো।

4.
সুপ্রিম কোর্ট স্বৈরাচারের পক্ষে এবং জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানটি কোন দলের ছিল না, এটি প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল সকল দলের দাবীর ভিত্তিতে। স্বৈরাচারের পক্ষ থেকে যাতে ভোট ডাকাতি না -সেটি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। জনগণের ভোটের উপর ডাকাতিকে সহজ করতেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানকে আদালত বাতিল করেছে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের চরিত্র প্রকাশ পেয়েছে এ রায়ের মধ্য দিয়ে ।    

5.
যে বিচারকদের ভোট ডাকাতদের আদালতে কাঠগড়ায় খাড়া করে বিচার করার যোগ্যতা নাই তারা এ অধীকার কোত্থেকে পায় যে ভাষণ কি বলে শুরু করতে হবে ও শেষ করতে হবে সে ছবক শোনায়!

6.
আওয়ামী লীগ ভারত সরকারের কাছে অতি প্রিয়। কারণ ভারতের ইচ্ছা তারা সব সময় পূরণ করে।১৯৭১’য়েও ভারতকে বিজয়ী করে খুশির বন্যা দিয়েছিল ও বিশ্বের মুসলিমদের চোখে পানি এনেছিল।

7.
একটি মুসলিম দেশ যদি কাফের শক্তির হামলায় পরাজিত হয় ও ভেঁঙ্গে যায় এবং তা নিয়ে যদি কেউ উৎসব করে -তবে বুঝতে হবে তার ঈমান নাই। টুপি-দাড়ি, নামায-রোযা ও হজ্ব-উমরাহ দিয়ে এ বেঈমানী ঢাকা যায় ন। এরাই ইসলামের শত্রু।

8.
বাংলাদেশের শিক্ষানীতির সবচেয়ে বড় সফলতাটি হলো, এটি অধিকাংশ ছাত্রদের ইসলামশুণ্য করতে পেরেছে এবং চোরডাকাত ও ভোটডাকাতদের গদিতে বসিয়ে সন্মান দিতে  শিখিয়েছে।

9.
একটি ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার সফলতাটি বিশাল।চোর-ডাকাতগণ সবার ঘৃনার ভয়ে এতকাল মুখ লুকিয়ে থাকতো। এখন জনগণই ভয়ে হাসিনার ন্যায় এক ভোট ডাকাতকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলে

10.
ঈমান ব্যাক্তির মনের দৃষ্টি বাড়ায়। দেহের চোখ মাত্র দুটি, কিন্তু মনের চোখ অসংখ্য। মনের চোখ দিয়ে আল্লাহর নেয়ামত যেমন দেখা যায়, তেমনি দুর্বৃত্তদেরও চেনা যায। মনের এ দৃষ্টিকে পবিত্র কোর’আনের ভাষায় নূর বা বাসিরাত বলা হয়। ঈমানদার তাই ভোট ডাকাতকে কখনোই জননী বা কাওমী জননী বলেনা।

11.
শেখ হাসিনার বড় অহংকার, উন্নতি দিয়ে দেশ ভরে দিয়েছে। সেটি হলে ভোট ডাকাতিতে নামেন কেন? মিছিল-মিটিংয়ের স্বাধীনতাই বা কেড়ে নেন কেন? ভোট ও মাঠে নামার অধীকার দিয়ে জনপ্রিয়তা যাচাই করেন না কেন?

12.
বাংলাদেশে ন্যায্য বিচার থাকলে ভোট ডাকাতির অপরাধে শেখ হাসিনা ও তার সাথীদের কঠোর সাজা হতো। কিন্তু সেটি না হয়ে আদালত পরিনত হয়েছে বিরোধীদের শাস্তি দেয়ার সরকারি হাতিয়ারে।

13.
জনগণের মূল্যবান সম্পদ হলো তার ভোট। অতি ঘৃণ্যতম ডাকাতি হলো সে ভোটের উপর ডাকাতি করা।সে ডাকাতিতে হাতেনাতে ধরা পড়েছে শেখ হাসিনা। অথচ সে ডাকাতের হুকুমই বাংলাদেশের মানুষকে মেনে চলতে হয়। কথা হলো, যারা ডাকাতদের হুকুম মেনে চলে তাদের কি আন্তর্জাতিক অংগনে ইজ্জত থাকে?

14.
শেখ মুজিবকে চিনতে যাদের এখনো বাঁকি, শেখ হাসিনার হাতে সে মুজিবী আদর্শের বাস্তবায়ন দেখে তাকে চেনা উচিত। বুঝতে হবে এরাই ছিল ১৯৭১’য়ের রত্ম যারা সে সময় বহু লক্ষ মানুষের জীবন কেড়ে নেয়। এবং ডেকে এনেছিল ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ।

15.
আদালতে বিচার না করে পুলিশ এবং RAB’য়ের হাতে প্রতিটি হত্যাই হলো খুন। এখানে খুনি হলো দেশের ভোট-ডাকাত সরকার। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশী মানুষ খুন হচ্ছে স্বৈরাচারি এ সরকারের হাতে। অথচ সে খুনের কোন বিচার হচ্ছে না।

16.
কোর’আন ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের প্রতিটি সমস্যায় পথ দেখায়। অথচ সমস্যায় পড়লে মুসলিমগণ পথ খোঁজে নিজেদের মুসলিম পরিচয় বাদ দিয়ে এবং কোর’আন-হাদীসের বাইরে থেকে। এটি হলো মহান আল্লাহতায়ালা ও নবীপাকের সাথে চরম বেঈমানী। এ বেঈমানী আযাব ডেকে আনে।

১৭.
কেউ কেউ বলে, জিহাদ হলো নফসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। সেটি বলে অস্ত্রের যুদ্ধ থেকে মুসলিমদের দূলে রাখার লক্ষ্যে। প্রশ্ন হলো,  নবীজীর দাঁত ভাঙ্গলো এবং শতকরা ৭০ জনের অধীক সাহাবা শহীদ হলেন কি নফসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে।

 




একাত্তরের বিতর্ক

একাত্তর সম্পর্কে শুরু থেকেই বিপরীত মতামত রয়েছে এবং সেটি ভবিষ্যতেও থাকবে। বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদী শক্তি শুধু নিজেদের কথাই বলছে এবং তাদের বিরোধী মতের অনুসারিদের মুখ খুলতে দিচ্ছে না। এটি হলো তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সন্ত্রাস। অথচ এ নিয়ে খোলাখোলি আলোচনা হওয়া উচিত। যে কোন দেশে নানা বিষয়ে নানা লোকের ভিন্ন ভিন্ন মতামত থাকবে -সেটিই স্বাভাবিক। তবে কোনটি ঠিক এবং কোনটি সঠিক –সে বিচারটি হয় নানারূপ দর্শন ও চেতনার ভিত্তিতে। ফলে বিচারের রায়ও ভিন্ন হয়। যেমন, দুইজনের সম্মতিতে ব্যাভিচার হলে সেটি সেক্যুলার চেতনায় বা সেক্যুলার আইনে কোন অপারধই নয়। বাংলাদেশের সেক্যুলার আইনেও সেটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ গণ্য হয়না। সেক্যুলার চেতনায় সে ব্যাভিচার বরং প্রেম রূপে গণ্য হয়। বাংলাদেশের সেক্যুলার আইনে মদজুয়ার ন্যায় ব্যাভিচারের দোকান খোলাও কোন অপরাধ নয়।

তেমনি গোত্রবাদী ও জাতীয়তাবাদী সেক্যুলার চেতনায় কোন মুসলিম দেশ ভাঙ্গার কাজটিও অপরাধ গণ্য হয় না। সেটি বরং দেশপ্রেম গণ্য হয়। অথচ বিচারের মানদন্ডটি কোরআন-হাদীস হলে ব্যাভিচার ও দেশ ভাঙ্গা উভয়ই হত্যাযোগ্য অপরাধ রূপে গণ্য হয়। শাসক-শক্তি যদি অত্যাচারি, খুনি বা ধর্ষকও হয় তবুও সে জন্য দেশ ভাঙ্গা জায়েজ হয় না। এটিই শরিয়তের বিধান। কারণ শাসক যত জালেমই হোক সে শত শত বছর বাঁচে না। কিন্তু দেশকে দেশবাসীর জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হাজার হাজার বছর বাঁচিয়ে রাখতে হয়। নইলে বিপদ ঘনিয়ে আসে। দেশের এক গজ ভূগোল বাড়াতেও তো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করতে হয়। সে দেশকে তাই কি খন্ডিত করা যায়? এমন কাজ তো বেওকুপদের।

খন্ডিত করা মানে তো দেশকে দুর্বল করা। সেটি তো হারাম। ঘরে শাপ ঢুকলে সে শাপ তাড়াতে হয়, সেজন্য ঘরে আগুন দেয়াটি গুরুতর অপরাধ। বিষয়টি প্রাথমিক যুগের মুসলিমগণ জানতো বলেই খোলাফায়ে রাশেদা, উমাইয়া ও আব্বাসী আমলে আরব, ইরানী, তুর্কী, কুর্দ, মুর ইত্যাদী নানা ভাষার মুসলিমগণ একত্রে বসবাস করেছে। ভাষার নামে তারা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দেশ গড়েনি। বিভক্তিকে তারা হারাম গণ্য করেছে। তবে আজ যেমন শহরে শহরে পতিতাপল্লী গড়ে দেহব্যবসা করাটি যেমন স্বীকৃতি পেয়েছে, তেমনি বৈধতা পেয়েছে মুসলিম দেশগুলিকে খন্ডিত করা। তাই আরবগণ ২২ টুকরায় বিভক্ত। আর এরূপ হারাম কাজে লিপ্ত হলে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুত কঠোর আযাব আসবে -সেটিই তো স্বাভাবিক।

কোর’আন-হাদীস ভিত্তিক এমন একটি চেতনার কারণেই গুটিকয় ব্যতিক্রম ছাড়া একাত্তরের কোন ইসলামী দল, কোন আলেম, কোন পীর, মাদ্রাসার কোন ছা্ত্র ও শিক্ষক এবং ইসলামী কোন চিন্তাবিদ পাকিস্তান ভাঙ্গার পক্ষ নেয়নি। চেতনার দিক দিয়ে তারা সবাই ছিল রাজাকারের চেতনার অধিকারী। পাকিস্তান ভাঙ্গার পক্ষ নিয়েছিল মূলতঃ ইসলামে অঙ্গিকারশূণ্য আওয়ামী লীগ, চীনপন্থি ও রুশপন্থি ন্যাপ, কম্যুনিস্ট পার্টি এবং হিন্দুগণ। এমন কি বিশ্বের কোন মুসলিম দেশও পাকিস্তান ভাঙ্গাকে সমর্থন করেনি। বরং পাকিস্তান ভেঙ্গে যাওয়াতে মুসলিম বিশ্বের জনগণ সেদিন শোকাহত হয়েছে। পাকিস্তান ভাঙ্গাকে সমর্থন করেছে ভারত, রাশিয়া ও ইসরাইলের ন্যায় মুসলিমবিরোধী রাষ্ট্রগুলি। এবং আনন্দের বন্যা বয়েছে ভারতীয় কাফেরদের মনে। সে আনন্দ দেয়াতে ভারত আওয়ামী লীগকে তাই সব সময় মাথায় তুলে রেখেছে। অপর দিকে একাত্তরের যারা ভারতীয় প্রকল্পের কাছে মাথা নত করেনি তাদের নির্মূলের পথ বেছে নিয়েছে।

যারা কাফেরদের মনে আনন্দ বাড়ায়, মুসলিমদের শক্তিহানী করে এবং মুসলিমদের শোকাহত করে তাদেরকে কি ঈমানদার বলা যায়? নামায-রোযা, হজ্ব-উমরা মুনাফিকগণও পালন করে থাকে। কিন্তু বিশ্বমাঝে মুসলিম উম্মাহকে বিশ্বশক্তি রূপে দেখার স্বপ্নটি হৃদয়ে নিয়ে বাঁচার সামর্থ্য তাদের থাকে না। বস্তুতঃ এরাই একাত্তরে ভারতের কোলে গিয়ে উঠেছিল।ভারতের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ নিয়ে তাদেরকে বিজয়ী করতে যুদ্ধ করেছিল।এবং আজও বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্রটি ভেঙ্গে যাওয়াকে তারা উৎসবের বিষয় রূপে গণ্য করে।

ব্যক্তির ঈমান দাড়ি-টুপিতে ধরা পড়ে না। এমনকি নামায-রোযাতেও নয়। নবীজীর পিছনে কয়েক শত মুনাফিকও নামায পড়েছে। রোযাও রেখেছে। তাদের মুনাফিকী ধরা পড়েছে রণাঙ্গনে এবং রাজনীতিতে। জিহাদের ময়দানে কোন মুনাফিককে নবীজী (সাঃ)র পাশে দেখা যায়নি। বরং তাদের কামনা ছিল, রণাঙ্গণে কাফেরগণ বিজয়ী হোক। বাঙালী কাপালিকদেরও অনেকে মুসলিম রূপে দাবী করে। কিন্তু একাত্তরের যুদ্ধে তাদের দেখা গেছে পৌত্তলিক কাফের শক্তির পাশে। এবং মনেপ্রাণে চেয়েছে কাফেরগণই বিজয়ী হোক। এদের কে কি ঈমানদার বলা যায়?

নবীজী (সাঃ)র সাহাবাদের মধ্য থেকে শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবা শহীদ হয়েছেন। তারা কি মসজিদ-মাদ্রাসা গড়তে বা নামায-রোযা আদায়ে শহীদ হয়েছেন? তারা তো শহীদ হয়েছেন মুসলিম উম্মাহকে বিশ্বশক্তি রূপে প্রতিষ্ঠা দেয়ার প্রয়োজনে। আর শক্তিশালী হতে হলে তো দেশের ভূগোল বাড়াতে হয়। শুধু অর্থনৈতীক উন্নয়ন দিয়ে বিশ্বশক্তি হওয়া যায় না। তেমন একটি প্রয়োজনেই বাঙালী মুসলিমগণ ১৯৪৭ সালে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ মুসলিম দেশ পাকিস্তান বানিয়েছিল। কিন্তু সেটি ইসলামের দুষমনদের ভাল লাগেনি। সে দেশটি ভাঙ্গতেই তারা দেশের ভীতরে ভারতীয় কাফের বাহিনীকে ডেকে আনে।

রাষ্ট্র শক্তিশালী না হওয়ার বিপদটি তো ভয়ানক। তখন আগ্রাসী শক্তির গোলাম হতে হয়। যেমন আজকের বাংলাদেশ। কিন্তু তা নিয়ে বাঙালী কাপালিকদের কি কোন ক্ষোভ আছে? বরং ভারতের দাস হওয়া নিয়েই তাদের বিপুল আনন্দ। বরং তাদের ক্ষোভ এ নিয়ে, বাঙালী মুসলিম খাজা নাজিমুদ্দীন, মুহাম্মদ আলী (বগুড়ার) ও সহরোওয়ার্দীর কেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হলো? সে অপরাধে বাংলাদেশের ইতিহাস থেকেই তাদের বাদ দিয়েছে। যেন বাঙালী মুসলিমের ইতিহাসের শুরু মুজিব থেকে। ১৯৭১’য়ে পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক বিলুপ্ত হওয়াতে এখন তা নিয়ে সারা বছর বাংলাদেশে উৎসব হয়।

ব্যাঙ ক্ষুদ্র গর্তের সন্ধান করে। মুজিব এবং তার অনুসারিগণও তেমনি ক্ষুদ্র বাংলাদেশের ভূগোল চেয়েছিল। আর ক্ষুদ্রতা যে অন্যের গোলামী আনবে -সেটিই তো স্বাভাবিক। আর গোলামের জীবনে তো স্বাধীনতা থাকে না। স্বাধীনতা বিলুপ্ত হওয়ার সাথে বাঙালীর ভোটের অধীকারও তাই বিদায় নিয়েছে।

মুজিব জানতো বাংলার ধর্মভীরু সাধারণ মানুষ কখনোই পাকিস্তান ভাঙ্গাকে সমর্থন করবে না। ফলে ১৯৭০য়ের নির্বাচনে কোনদিনও পাকিস্তান ভাঙ্গার কথা বলেনি। পাকিস্তান ভেঙ্গে পৃথক বাংলাদেশ সৃষ্টি নিয়ে রেফারেন্ডামের দাবীও করেনি। মুজিব ভোট নিয়েছে পাকিস্তানকে অখন্ড রেখে ৬ দফা দাবী আদায়ের কথা বলে। নির্বাচনে ভোট নেয়ার পর মুজিব আওয়াজ তোলে “এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”। দাবী তুলে, অখন্ড পাকিস্তানের নয়, স্রেফ পূর্ব পাকিস্তানের ক্ষমতা আওয়ামী লীগের হাতে দিতে হবে। এবং সশস্ত্র যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে মুজিব তার সঙ্গিদের ভারতে যাওয়ার নসিহত করে।

ভাষা ও অঞ্চলের নামে দেশ স্বাধীন করায় মাঝে কল্যাণ থাকলে ভারত ভেঙ্গে ১২০ কোটি হিন্দুগণ বাংলাদেশের ন্যায় ২০টি স্বাধীন দেশ বানাতে পারতো। তাছাড়া দেশ ভাঙ্গা ইসলামে হারাম হলেও হিন্দু ধর্মে তো হারাম নয়। কিন্তু দেশ ভাঙ্গা যে আত্মঘাতি -সেটি ভারতীয় হিন্দুগণ ভাল করে বুঝে। তাই তারা সে পথে যায়নি। কিন্তু সে হুশ বাঙালী কাপালিকদের নাই। তাই তারা ক্ষুদ্র ভূগোল গড়া নিয়ে উৎসব করে।

তবে একাত্তরের সে জোয়ারের মাঝেও সব বাঙালীই যে বিবেক হারায়নি –সে প্রমাণও অনেক। তাই ১৯৭১য়ে মে মাসের মাঝামাঝিতে দৈনিক ইত্তেফাক পাকিস্তান ভাঙ্গার বিরোধীতা করে সম্পাদকীয় লিখেছিল, “দেশ ভাঙ্গাতে বাহাদুরি নাই” এ শিরোনামে। ঢাকা ও চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শতাধিক শিক্ষক সেদিন পাকিস্তান ভাঙ্গার বিরুদ্ধে বক্তব্য রেখেছিল। সে আমলের পত্রিকাগুলোর দিকে তাকালে তাদের সে বক্তব্যগুলো নজরে পড়বে। তাদের কথার পিছনেও যুক্তি ছিল। অথচ আজ সে সত্য কথাগুলো লুকানো হচ্ছে। এবং সেটি ফ্যাসিবাদী শক্তি প্রয়োগ করে।

একাত্তর নিয়ে বাঙালী কাপালিকগণ যে আকাশ চুম্বি মিথ্যাচার রটিয়েছে সেটি বিলুপ্ত করতে না পারলে কি বাঙালী মুসলিমদের কি উন্নততর মানুষ রূপে বেড়ে উঠার সম্ভাবনা আছে? এবং সেটি করতে হলে তো একাত্তর নিয়ে সত্য কথাগুলো প্রবল ভাবে বলতেই হবে। নইলে গুম-খুন-ধর্ষণ-চুরি-ডাকাতি-সন্ত্রাসের প্লাবনে দেশ আজ যে ভাবে ভাসছে তা যে আরো তীব্রতর হবে তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে?

তাছাড়া সবচেয়ে বড় ইবাদত এবং সবচেয়ে বড় জিহাদ তো জালেমের সামনে সত্য কথা বলা। তাছাড়া কারো ভয়ে সত্য লুকানোটি শুধু কবিরা গুনাহই নয়, বরং শিরক। কারণ যে ব্যক্তি ঈমানদার -সে তো ভয় করবে একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালাকে এবং অন্য কাউকে নয়। কিন্তু যে মানুষটি ভয়ে সত্য লুকায়, লুকানোর সে অপরাধটি করে অন্য কোন জালেম ব্যক্তি বা শক্তির ভয়ে। তাই সেটি শিরক। এবং যারা শিরক করে তাদের জন্য নিষিদ্ধ হলো জান্নাত –যা পবিত্র কোরআন ও হাদীসে বার বার বলা হয়েছে। ১০/১২/২০১৯

 




সাম্প্রতিক ভাবনা-৭

১. যে মহাবিপদ সেক্যুলারিজমে

ব্যক্তির ঈমানদারি, বেঈমানি ও মুনাফিকি গোপন থাকার বিষয় নয়। সেগুলি সুস্পষ্ট ধরা পড়ে ব্যক্তির বাঁচার লক্ষ্য, কর্ম ও বিনিয়োগের মাঝে। মহান আল্লাহতায়ালা প্রত্যেক ব্যক্তিকেই কিছু জ্ঞান, কিছু অর্থ-সম্পদ, চিন্তা-ভাবনার  কিছু সামর্থ্য, কিছু দৈহিক বল এবং বিবেক দিয়েছেন। এসবই মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে অতি গুরুত্বপূর্ণ আমানত। এসব সামর্থ্যের তথা এ পবিত্র আমানতের কোথায় ব্যয় হয় তাতেই প্রকাশ পায় ব্যক্তির ঈমানদারি, বেঈমানি ও মুনাফিকি।

ঈমানদারের পক্ষ থেকে আল্লাহতায়ালা-প্রদত্ত এ সামর্থ্যগুলির বিনিয়োগ ঘটে আখেরাতের ভাবনাকে হৃদয়ে রেখে। সে ভাবনার মূল কথা, আল্লাহর জমিনে তাঁর সার্বভৌমত্ব ও তাঁর আইন তথা শরিয়তকে বিজয়ী করা। এ লক্ষ্যে সকল বিনিয়োগ গণ্য হয় মহান আল্লাহর পথে জিহাদ রূপে। অপরদিক সেক্যুলারিস্টদের অর্থ, বুদ্ধিবৃত্তি ও জীবনের সকল সামর্থ্যের বিনিয়োগটি হয় সেক্যুলারিজমকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে। তাদের রাজনীতিটি হয় চেতনায় পার্থিব জীবনের আনন্দ বাড়ানোর এজেন্ডাকে ধারণ করে। সে রাজনীতিতে গুরুত্ব পায় শরিয়তকে পরাজিত রাখা। সে লক্ষ্যে সেক্যুলারিস্ট যেমন ভোট দেয়, তেমনি রাজনীতি করে ও যুদ্ধ করে। নামায-রোযা পালন এবং তাবলিগের এজতেমাতেও হাজির হলেও তাতে তাদের সামর্থ্যের বিনিয়োগের উপর কোন প্রভাব পড়ে না।

পরিনামে সেক্যুলারিস্টদের সকল বিনিয়োগ যে শুধু ব্যর্থতাই বাড়ায় -সে ঘোষণাটি এসেছে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে সুরা কাহাফের সুরা ১০৩ ও ১০৪ নম্বর আয়াতে। এ দুটি আয়াতে বলা হয়েছে, “বল (হে মুহম্মদ), তোমাদের কি বলে দিব, কারা কাজ-কর্মের দিক দিয়ে সবচেয়ে ক্ষতির মধ্যে? এরা হলো তারা যারা তাদের সকল প্রচেষ্টা ব্যয় করে দুনিয়ার আয়োজন বাড়াতে এবং মনে করে তাদের কর্মগুলি কতই না উত্তম।”  উপরুক্ত দুটি আয়াতের মাঝে রয়েছে সেক্যুলারিষ্টদের জন্য জাহান্নামের খবর। তাদের আমলগুলি এতই বিনষ্ট ও মূল্যহীন হবে যে, রোজ হাশরের বিচার দিনে সেগুলি ওজনের জন্য দাড়িপাল্লা খাড়া করারও প্রয়োজন হবে না। সে ঘোষনাটি এসেছে এ সুরার ১০৫ নম্বর আয়াতে। এবং ১০৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, তাদের স্থান হবে জাহান্নামে।   

সেক্যুলারিজমের আভিধানিক অর্থ ইহজাগিতকতা। অতএব এতে পারলৌকিক ভাবনার কোন স্থান নেই। পারলৌকিক ভাবনাটি গণ্য সাম্প্রদায়িকতা রূপে। সেক্যুলারিষ্টদের মূল কথা হলো, রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, বিচার-আদালতের মাঝে কোনরূপ ইসলামী চেতনা ও পারলৌকিক ভাবনা আনা যাবে না। ফলে সেক্যুলার রাজনীতিতে নির্মিত হয় স্রেফ জাহান্নামের রাস্তা। অপর দিকে ইসলামের শিক্ষা, দুনিয়ায় চলতে হবে প্রতি মুহুর্তে আখেরাতের ভাবনাকে হৃদয়ে নিয়ে। দুনিয়া একটি পরীক্ষা কেন্দ্র মাত্র; আসল ঠিকানাটি আখেরাতে। সেক্যুলারিস্টদের গুরুতর অপরাধ, আখেরাতের জীবনকে সফল করার মহা কল্যাণকর ইসলামী মিশনকে তারা বিফল করে দেয়। সেক্যুলারিস্টদের যুদ্ধটি তাই যেমন ইসলামের বিরুদ্ধে, তেমনি মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধেও। এ অপরাধটি মানব খুনের চেয়েও গুরুতর। খুনি খুন করলেও তারা সমাজের বুকে জান্নাতের পথে চলাটি রুদ্ধ করে না। কিন্তু সে বিপদটি সেক্যুলারিস্টগণ ঘটায়। এবং সেটি হৃদয়ে আখেরাতের ভাবনা নিয়ে রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, বিচার-আদালত পরিচালনাকে সংবিধান বিরোধী করে।          

২.
সন্তানকে পশু-পাখিও নিয়মিত পানাহার দেয়। কিন্ত মানবকে বাড়তি যেটি জোগাতে হয় সেটি হলো শিক্ষা। সেটি না হলে মানব সমাজও পশু সমাজে পরিণত হয়। ইসলামে তাই জ্ঞান অর্জনকে নামায-রোযা ফরজ হওয়ার ১১ বছর আগে ফরজ করা হয়েছে। এবং শ্রেষ্ঠ জ্ঞান হলো পবিত্র কোর’আনের জ্ঞান। এ জ্ঞান জীবনের প্রতি পদে পথ দেখা। এ জ্ঞানে অজ্ঞ থাকা তাই কবিরা গুনাহ।

৩.
ঈমানদারের মিশনটি বিশাল। সেটি স্রেফ নামায়-রোযায় শেষ হয়না। তাকের বাঁচতে হয় শরিয়ত প্রতিষ্ঠা ও দুর্বৃত্ত নির্মূলের আমৃত্যু জিহাদ নিয়ে। আগুনে যেমন উত্তাপ দেয়, ঈমানও তেমনি জিহাদ দেয়। যার জীবনে জিহাদ নাই, তার মাঝে ঈমানও নাই।  তাই নবীজী (সাঃ)র এমন কোন সাহাবী ছিলেন না যার জীবনে জিহাদ ছিল না। সাহাবাদের মাঝে ৭০%’য়ের বেশী শহীদ হয়েছেন। বাংলাদেশের ন্যায় ইসলামের এ ইতিহাসকে পড়ানো হয় না।

৪.
গাছের পাশে যেমন আগাছা থাকে, তেমনি মানুষের পাশেও অমানুষ থাকে। আগাছা নির্মূল না করলে ফসল বাঁচে না।  তেমনি অমানুষ নির্মূল করলে শান্তি প্রতিষ্ঠা পায় না। দেশ তখন বাসের অযোগ্য হয়। সুরা ইমরানের ১১০ নম্বর আয়াতে মুসলিমদের সমগ্র মানব জাতির মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি রূপে ঘোষণা দিয়েছেন। তবে সেটি এজন্য নয় যে তারা বেশী বেশী নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত পালন করে। বরং এজন্য যে তারা ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা দেয় এবং দুর্বৃত্তিকে নির্মূল করে।  দুর্বৃত্ত নির্মূলের সে লড়াইটি হলো জিহাদ।এটিই ইসলামে শ্রেষ্ঠ ইবাদত। জিহাদ না থাকলে দেশে গুম, খুন, ধর্ষণ, চুরি-ডাকাতি, ভোট-ডাকাতি ও বিরোধী দল নির্মূলের রাজনীতির জোয়ার আসে। বাংলাদেশ তারই উদাহরণ।

৫.
নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার বদলের যারা স্বপ্ন দেখে তারা বিবেক-বুদ্ধিহীন। দেশের পুলিশ, আদালত, সেনাবাহিনী, সরকারি প্রশাসন পরিণতি হয়েছে ভোট ডাকাতির হাতিয়ারে। এ অবস্থায় কি নিরপেক্ষ নির্বাচন হয়?  দেশ এখন ভোট-ডাকাতদের হাতে অধিকৃত। ঘর থেকে ডাকাত তাড়াতেও যুদ্ধ লাগে। দেশ থেকে ডাকাত নির্মূলের খরচটি আরো বেশী।সভ্য তো তাঁরাই যারা সে খরচ বহন করে।

৬.
আল্লাহতায়ালার শরিয়তি বিধান না মানা এবং সে অনুযায়ী রাষ্ট্র চালনা না করা কাফেরদের কাজ। ইসলামের বিজয় এবং শরিয়ত প্রতিষ্ঠার ৩টি উপায়। ১. ভোট, ২. গণ-আন্দোলন ও ৩. জিহাদ। নবীজী তৃতীয় পথটি বেছে নিয়েছিলেন।

৭.
খাদ্যের অভাবে দেহের মৃত্যু হয়। আর কোর’আনী জ্ঞানের অভাবে ঈমানের মৃত্যু হয়।তাই যে দেশে কোর’আন বুঝার আয়োজন নাই সে দেশে বেঈমানের সংখ্যা বেশী।যে ব্যক্তি ঈমান বাড়াতে চায়, সে কোর’আনের জ্ঞান বাড়াতে মনযোগী  হয়। অর্থ-সম্পদ দুর্বৃত্তরাও পায়, কিন্তু তারা ঈমান ও জ্ঞান পায় না। ঈমান ও জ্ঞান ছাড়া কি জান্নাত পাওয় যায়?

৮.

বেঈমান মানুষের পরিচয়: আল্লাহতায়ালা কোর’আনে কি বললেন সেটি জানায় অনাগ্রহ। ঈমানদারের পরিচয়: কোরআন কি বলে সেটি জানার জন্য পেরেশানী। এ পেরেশানীটিই ঈমানের পরিমাপ দেয়।

৯.
এক মুসলিম অন্য মুসলিমের ভাই -এটিই আল্লাহতায়ালার দেয়া পরিচয়। এ পরিচয় নিয়ে না বাঁচাতেই মুসলিম উম্মাহর মাঝে বিভক্তি। নানা ভাষা ও নানা বর্ণের কাফেরগণ এক দেশে বাস করে এবং বিশ্বশক্তি হয় –যেমন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত। সে গুণ মুসলিমদের নাই। অথচ সে পরিচয়টি প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল প্রাথমিক যুগের মুসলিমদের জীবনে। ফলে তারা বিশ্বশক্তিতে পরিণত হতে পেরেছিল।

১০
ত্রাস সৃষ্টির নীতিই সন্ত্রাস। মহল্লায় সন্ত্রাস করে ডাকাতেরা। দেশ জুড়ে সন্ত্রাস করে ভোট-ডাকাত সরকার। ডাকাতদের ক্ষমতায় বসিয়ে কি তাই সন্তাস বিলুপ্ত হয়? সন্ত্রাস হলো বাংলাদেশে সরকারি নীতি। এ ভোট-ডাকাত সরকার বলে, দেশ থেকে তারা দুর্নীতি নির্মূল করবে। সেটি চাইলে সে কাজের শুরু হওয়া উচিত তাদের নির্মূলের মধ্য দিয়ে।  

১১.
কোর’আন না মেনে চলাতেই মুসলিমদের পতন। পথ না চিনলে গন্তব্যস্থলে পৌঁছা যায় না। কোর’আন হলো জান্নাতের রোড ম্যাপ। অতএব কোর’আনের পথে না চললে কীরূপে জান্নাতে পৌঁছা সম্ভব? কোরআন শিক্ষা এজন্যই মুসলিম জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই সেটি নামায-রোযার আগে ফরজ হয়েছে।

১২.
দেশ শয়তানী শক্তির দখলে। আদালতে আল্লাহর আইনের কোন স্থান নেই। বিচার হচ্ছে কুফরি আইনে। এসবের নির্মূলে জিহাদ নাই। অথচ মোল্লা-মৌলভীগণ ব্যস্ত নিজ নিজ ফিরকার মুরিদ বাড়াতে। তারা এমন এক ইসলাম নিয়ে ব্যস্ত যেখানে নবীজী (সাঃ)র ইসলাম নাই। নবীজী (সাঃ)র ইসলামে ইসলামি রাষ্ট্র ছিল, খেলাফত ছিল, শরিয়ত ছিল, জিহাদ ছিল, এবং মুসলিম উম্মাহর একতা ছিল। কিন্তু তাদের ইসলামের এসবের কোন কিছুই নাই।  

১৩.
সমগ্র বাংলাদেশ এখন মুজিব-আদর্শের পাঠশালা। এ পাঠশালায় যতই বাড়ছে মুজিব-আদর্শের পাঠ, ততই বাড়ছে দেশ জুড়ে হত্যা, গুম ও চুরি-ডাকাতির রাজনীতি।মুজিব আট আনা সেরের চাউল ১০ টাকায় খাইয়েছে। আর হাসিনা পেঁয়াজ ২৫০ টাকা সের খাওয়াচ্ছে।

১৪.
গরু-ছাগল নিজের পানাহার ছাড়া দেশ নিয়ে ভাবে না। সে অভিন্ন চরিত্র পশু চরিত্রের মানুষেরও। অথচ মানব মহামানব হয় এবং পরকালে জান্নাত পায় দেশকে সভ্যতর করার কাজে নিজের জান-মালের বিনিয়োগের মাধ্যমে। ইসলামে এটিই পবিত্র জিহাদ।




দেশ নিয়ে ভাবনা -৪

১.

মেহনতি মানুষ বিদেশে গিয়ে কষ্ট করে দেশে টাকা পাঠায়। তাদের অর্জিত সে বিদেশী মুদ্রা ক্ষমতাসীন ডাকাত দলের সদস্যরা ডাকাতি করে বিদেশে নিয়ে যায়। বিদেশে তারা বাড়ি কেনে, ব্যবসা করে, জুয়া খেলে। এবং হাসিনার ছেলে জয় ফুর্তি করে আমেরিকাতে।

২.
ঘরে আবর্জনা জমলে সে  আবর্জনা সরানোর কাজটি ঘরের সবার। সেটিই সভ্য পরিবারের রীতি।তেমনি দেশ চোর-ডাকাতের দখলে গেলে সে চোর-ডাকাত খেদানোর কাজও সবার।সে কাজে যার ইচ্ছা নেই সে অসভ্য। অথচ বাংলাদেশে সে কাজটি হয়নি। দেশে কি স্রেফ মসজিদ-মাদ্রাসা গড়ে কি এ অসভ্যতা থেকে বাঁচা যায়? নবীজী (সাঃ) শুধু  মসজিদ বানাননি, ইসলামি রাষ্ট্রও গড়েছেন। সে কাজে শতকরা ৭০ ভাগের বেশী শহীদ হয়েছেন। বাংলাদেশের মুসলিমদের সে কাজে আগ্রহ কই?

৩.
বাংলাদেশ কি গণতান্ত্রিক দেশ? গণতান্ত্রিক দেশে তো ভোটে সরকার নির্বাচিত হয়। নিশীথ রাতের ভোট ডাকাতগণ ক্ষমতায় আসে কি করে? প্রতিটি গণতান্ত্রিক দেশে কথা বলা, মিটিং-মিছিল করার স্বাধীনতা থাকে। পাকিস্তান আমলে শেখ মুজিব শত শত মিছিল-মিটিং করেছে। বাংলাদেশে সে অধীকার ছিনিয়ে নেয়ার পরও সরকার বলে তারা নাকি গণতান্ত্রিক! এ সরকারের মুখে পাকিস্তানের বদনাম করা সাজে কি?

৪.
যিকির মানে প্রতি পদে মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিটি হুকুম মেনে চলার ফিকির। যিকিরে থাকে শরিয়ত মেনে চলার ফিকির। যেদেশে শরিয়তের আইন ছাড়াই বিচার হয়, বুঝতে হবে আল্লাহতায়ালার আনুগত্য নিয়ে তাদের কোন ফিকির নাই। এদের যিকির যে নিতান্তই ভূয়া –তা নিয়ে কি সামান্যতম সন্দেহ থাকে?

৫.
ঈমানদার হওয়া মানেই হলো মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনকে বিজয়ে করার জিহাদে মুজাহিদ হওয়া। নবীজী (সাঃ)র সাহাবাদের শতকরা শতভাগ সাহাবাই মুজাহিদ ছিলেন। যারা জিহাদের নামেননি তাদেরকে মুনাফিক বলা হয়েছে। যারা জিহাদ বিমুখ ইসলামে তাদের কোন স্থান নেই। বাংলাদেশে ১০০ জনের মাঝে যদি একজনও যদি নবীজী (সাঃ)র ইসলাম বুঝতো তবে ১৭ কোটির মাঝে ১৭ লাখ মুজাহিদ তৈরী হতো । তখন কি দেশ হাসিনার ন্যায় নিশীথ রাতের ভোট ডাকাতের হাতে অধিকৃত  হতো? তখন বরং শরিয়ত প্রতিষ্ঠার জন্য জিহাদ শুরু হয়ে যেত।
৬.
ঈমান ছাড়া আল্লাহতায়ালার দরবারে ভাল কাজের কোন মূল্য নাই। শত কোটি টাকা দান করলেও নয়। ভাল কাজ ছাড়া ঈমানও মূল্যহীন। কারণ উত্তাপ ছা্ড়া যেমন আগুণ হয় না, ভাল কাজ ছাড়া তেমনি ঈমান হয় না। মহান আল্লাহতায়ালা এ দুটিকে এক সাথে দেখতে চান। আল্লাহতায়ালার কাছে সবচেয়ে বড় ভাল কাজ হলো ইসলামের শত্রু নির্মূলের জিহাদ –যা সুরা সাফ’য়ের ৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে। ইসলামের শত্রুগণ জিহাদকে সন্ত্রাস বলে স্রেফ মুসলিমদের জিহাদ বিমুখ করার স্বার্থে। ব্রিটিশেরা সে প্রচার নিয়েই বাংলার মুসলিমদের জিহাদ থেকে দূরে রেখেছে এবং ১৯০ বছর শাসন করেছে। আজকের শত্রুগণও সেটিই চায়।

৭.
অসভ্যদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সামর্থ্য না থাকলে অসম্ভব হয় সভ্য ভাবে বাঁচা।তাই সভ্য সমাজ গড়তে দেশ থেকে শুধু হিংস্র পশু তাড়ালে চলে না, মানবরূপী পশুদেরও তাড়াতে হয়।এটিই ইসলামের পবিত্র জিহাদ। নইলে আবরার ফাহাদের ন্যায় মানবরূপী পশুদের হাতে লাশ হতে হয়।অথচ বাংলাদেশে সে কাজটি হয়নি।

৮.
দেশে জ্ঞানদান ও জ্ঞানলাভের আয়োজন কতটা পবিত্র, নিবিড় এবং ব্যাপক -তা দেখেই বুঝা যায় দেশ ভবিষ্যতে কতটা সভ্য ভাবে বেড়ে উঠবে। এখাতটি দুর্বত্তদের দখলে গেলে দেশও অসভ্য ডাকাতদের দখলে যায়। বাংলাদেশ হলো তারই উদাহরণ।
৯.
চোর-ডাকাতকে কি কোন সভ্য ও ভদ্র মানুষ সন্মান করে? তাদের সন্মান করা তো অসভ্য চোর-ডাকাতদের কাজ। অথচ বাংলাদেশে ডাকাতদলের ভোট-ডাকাত সর্দারনীকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলে সন্মান করা হয়। দেশের কওমী হুজুররা তাকে কওমী জননী বলে। অথচ ইসলামের হুকুম হলো, এরূপ দুর্বৃত্তদের শুধু ঘৃনা নয়, নির্মূল করা। হুকুম হলো তাদের শাস্তি দেয়ার। সে অদম্য চেষ্টাটুকু না থাকলে বুঝতে হবে ঈমানদার হওয়াতে অনেক বাঁকি রয়ে গেছে।

১০.

সুরা ইমরানের ১১০ নম্বর আয়াতে বিশ্বমাঝে মুসলিমদের সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি বলা হয়েছে। তবে এজন্য নয় যে, তারা বেশী বেশী নামায-রোযা করে। উক্ত আয়াতে যে কারণে তাদেরকে সর্বশ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে তা হলো, তারা দুর্বৃত্তিকে নির্মূল করে এবং ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা দেয়। ফলে চোর-ডাকাত ও ভোট-ডাকাতদের পক্ষ নিলে কি সে মর্যাদা কখনো অর্জিত হয়?  

১১.
যারা কোর’আন থেকে শিক্ষা নেয় এবং অন্যদের শিক্ষা নিতে সাহায্য করে -তাঁরাই হলো শ্রেষ্ঠ মানব।–নবীজী (সাঃ)র হাদীস। কথা হলো, বাংলাদেশে এমন মানুষের সংখ্যা শতকরা ক’জন? কোর’আন ঠিক মত বুঝলে তো দেশে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা ও ডাকাত নির্মূলের লক্ষ্যে লাগাতর জিহাদ শুরু হতো।

১২.
“হে ঈমানদারগণ, তোমরা আমার ও তোমাদের শত্রুদের বন্ধু রূপে গ্রহণ করো না”-(সুরা মুমতেহানা আয়াত ১)। অথচ বাংলাদেশে মহান আল্লাহতায়ালার এ কোর’আনী হুকুমের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড বিদ্রোহ হচ্ছে। ভারতীয় সরকার আল্লাহ ও মুসলিমদের দুষমন। কাশ্মিরে তারা ধর্ষণ ও গণহত্যায় লিপ্ত।  ভারতের বিভিন্ন স্থানে তারা যেমন মুসলিমদের হত্যা করছে, তেমনি মসজিদ ধ্বংস করছে। মসজিদের জমিতে তারা মন্দির বানাচ্ছে। এরপরও তাদের সাথে কি বন্ধুত্ব করা যায়? সেটি তো হারাম। আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে যারা বিদ্রোহী একমাত্র তারাই এমনটি করতে পারে? তাই শুধু ভারত নয়, ভারতের সেবাদাস হাসিনাও মুসলিমদের শত্রু।


১৩.
শেখ হাসিনা ভারতের সাথে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব নিয়ে গর্বিতা। কিন্তু বন্ধুত্ব তো তখনই সম্ভব যখন বাংলাদেশের ন্যায্য পাওনাগুলি ভারত দিয়ে দেয়। অথচ ভারত শুধু নেয়াতে আগ্রহী, দেয়াতে নয়। এমন কি ভারতীয় মুসলিম নাগরিকদের বাংলাদেশী বলে বাংলাদেশে পাঠাতে চায়। ফলে হাসিনা যা প্রতিষ্ঠা দিয়েছে তা বন্ধুত্ব নয়, তা বরং নিরেট গোলামী।

১৪.
আদম (আ:)কে সিজদা করার একটি মাত্র হুকুম অমান্য করায় ইবলিস অভিশপ্ত শয়তানে পরিণত হয়।যারা শরিয়তের অসংখ্য হুকুম অমান্য করে দেশ ও দেশের আদালত চালায় -তারা যে ইবলিসের চেয়েও অধীক অভিশপ্ত তা নিয়ে কি সন্দেহ করা চলে। অথচ বাংলাদেশ সে অভিশপ্ত শয়তানের দলের হাতেই অধিকৃত। বাংলাদেশে গুম, খুন, চুরি-ডাকাতি ও ধর্ষনের রাজনীতিকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে মানবরূপী এ শয়তানেরাই।




বাংলাদেশের ইতিহাসে রাজাকার ও মু্ক্তিযোদ্ধা

কারা রাজাকার ও কারা মুক্তিযোদ্ধা?

একাত্তরে ভারত এক ঢিলে দুই পাখি মেরেছে। এক). পাকিস্তানকে ভেঙ্গেছে। দুই). বাংলাদেশকে গোলাম বানিয়েছে। এ পথেই ভারত বিপুল শক্তি অধিকারি হয়েছে। ফলে মনযোগ দিতে পারছে কাশ্মীর দখলে এবং ভারতের ২০ কোটি মুসলিমের কোমর ভাঙ্গাতে। ভাঙ্গার কাজের শেষ আছে। কিন্তু গোলাম বানানোর কাজের শেষ নাই; এটি লাগাতর অব্যাহত রাখার যুদ্ধ। গোলাম বানানোর পাশাপাশি এখানে রয়েছে শোষণের নেশাও। ফলে বাংলাদেশের মাটিতে ভারতের যুদ্ধের শেষ নাই। বস্তুতঃ ভারতের যুদ্ধটি বাংলাদেশকে অধীনত রাখার এক অবিরাম যুদ্ধ। একাত্তরে বাংলাদেশকে গোলাম বানানোর কাজ ভারত একা করেনি। সে গোলামী অব্যাহত রাখার যুদ্ধেও ভারত আজ একাকী নয়। আজ  যারা বাংলাদেশের নদীর পানি, সমুদ্রবন্দর, গ্যাস, করিডোর ভারতকে দিচ্ছে তারাই একাত্তরে ভারতীয় প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র নিয়ে ভারতের পক্ষে যুদ্ধে নেমেছিল। এরাই হলো একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা। ভারতের চলমান এ যুদ্ধে তাদের প্রয়োজনও তাই শেষ হয়নি। ভারতীয়দের একাত্তরের সে ষড়যন্ত্র অধিকাংশ বাঙালী টের না পেলেও কিছু বাঙালী শত ভাগ টের পেয়েছিল। তারাই সেদিন ভারতীয়দের মোকাবেলায় যুদ্ধে নেমেছিল। এরাই হলো একাত্তরের রাজাকার। প্যান-ইসলামিজম ও ভারতীয় আধিপত্য থেকে মুক্তির প্রতি আপোষহীনতার কারণে রাজাকারদের চিনতে ভারতীয় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিবাহিনী যেমন একাত্তরে ভূল করেনি, এখনো করছে না। ফলে ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কথা বলাটি আজও তাদের কাছে হত্যাযোগ্য অপরাধ রূপে গণ্য হচ্ছে। বুয়েটের আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে লাশ বানালো তো সে অপরাধেই।   

মিথ্যাচার, দূর্নীতি ও স্বৈরাচারের নাশকতাগুলি বিশাল। এগুলি কখনোই একাকী আসে না। আনে চেতনা, দর্শন ও নৈতিক রোগের মহামারি। তাতে মৃত্যু বরণ করে জনগণের বিবেক। বিনষ্ট হয় শিক্ষা ও সংস্কৃতি। মিথ্যা বলা বা মিথ্যা লেখাও তখন অভ্যাসে পরিণত হয়। দেশের ইতিহাসও তখন মিথ্যাচারে পূর্ণ হয়। এতে মৃত্যু ঘটে বিবেকের; প্রতিষ্ঠা পায় ব্যক্তিপূজা। ফিরাউনের ন্যায় দুর্বৃত্তগণও তখন ভগবানে পরিণত হয়। তাছাড়া শুধু শাসক রূপেই শুধু নয়, ইতিহাসের পাতায়ও স্বৈরচারী দুর্বৃত্তদের বাঁচার খায়েশটি বিশাল। এ কারণে বিস্তর মিথ্যাচার ঢুকে ইতিহাসে। একাত্তরের ইতিহাসের বিশাল অংশ জুড়ে তাই মুক্তিযুদ্ধের গুণকীর্তন। কিন্তু রাজাকারদের নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা নেই; উল্লেখ আছে স্রেফ ভিলেন রূপে। চিত্রিত হয়েছে পাকিস্তানের দালাল রূপে। কিন্তু দালালের কর্মে থাকে অর্থপ্রাপ্তির লোভ, এবং তাতে মনের সম্পর্ক থাকে না। প্রাণদানের স্পৃহাও তাতে  জাগে না। বাংলাভাষী হলেও প্রতিটি রাজাকার ছিল জন্মসূত্রে পাকিস্তানী; তারা মুক্তিবাহিনীর প্রতিপক্ষ রূপে দাঁড়িয়েছিল পাকিস্তানের গর্বিত ও নিষ্ঠাবান নাগরিক রূপে। কথা হলো, নিজ জন্মভূমির পক্ষে নামলে তাদেরকে কি দালাল বলা যায়? কিন্তু একাত্তরের ইতিহাসে রাজাকারের সে পরিচয়টি আলোচিত হয়নি। তাই আগামী প্রজন্মের জন্য প্রশ্ন থেকে যায়, কারা এ রাজাকার? কি ছিল তাদের মিশন? কেনই বা বাঙালী হয়েও তারা বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠায় প্রাণপনে বিরোধীতা করলো এবং রক্ত দিল? কি ছিল তাদের রাজনৈতিক দর্শন? কিসে তারা অনুপ্রাণিত হলো? শুধু আজ নয়,বহুশত বছর পরও এ প্রশ্নগুলি বাংলাদেশের ইতিহাসের পাঠকের মনকে আন্দোলিত করবে। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসে এসব প্রশ্নের উত্তর নাই। অথচ বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপ্রকৃতি বুঝতে হলে কারা রাজাকার এবং কারা মুক্তিযোদ্ধা এবং একাত্তরে কি ছিল তাদের চিন্তাচেতনা -তা নিয়ে  বস্তুনিষ্ট আলোচনা অতি গুরুত্বপূর্ণ। মিথ্যা প্রপাগান্ডা দিয়ে এ বিষয়টিকে আড়াল করলে দেশেরই ক্ষতি বাড়বে এবং লাভবান হবে শত্রুরা।   

রাজাকার ও মুক্তিযোদ্ধা –উভয়েই একাত্তরের গুরুত্বপূর্ণ দুটি পক্ষ। যে কোন যুদ্ধে দুটি পক্ষ থাকে, সেটি একাত্তরেও ছিল। ইতিহাসের অর্থ স্রেফ একটি পক্ষের ধারাবিবরণী নয়। একাত্তরের যুদ্ধটি ছিল রাজনীতির দুটি বিপরীত ধারা ও দুটি বিপরীত দর্শনের সংঘাত। প্রতিদেশেই রাজনীতি নিয়ে এরূপ নানা মত থাকে, নানা প্রতিপক্ষও থাকে। সেসব মত ও পথ নিয়ে লড়াইও থাকে। কারণ, দেশের কল্যাণ নিয়ে সবাই একই ভাবে ভাবে না। বিপরীতমুখি নানা ভাবনা যেমন ১৯৭১ সালে ছিল, তেমনি ১৯৪৭ সালেও ছিল। আজ যেমন আছে, তেমনি আজ থেকে শত বছর বা হাজার বছর পরও থাকবে। এর মধ্যে কেউ হারবে এবং কেউ জিতবে। ইতিহাসে কারো বিজয়ই চিরস্থায়ী হয় না। দিন বদলের সাথে সরকারেও পরিবর্তন আসে। কিন্তু কোন একটি পক্ষের পরাজয় বা বিদায় হলে সে পক্ষের ইতিহাসকে বিলুপ্ত করা যায় না। তাদের জন্যও ইতিহাসে স্থান ছেড়ে দিতে হয়। ১৯৪৭ সালে মুসলিম লীগ জিতেছিল, কিন্তু ১৯৭১ সালে তারা হেরেছে। বাংলাদেশের ইতিহাস পড়লে মনে হয় দেশটির ইতিহাসের শুরুটি ১৯৭১ থেকে; বড় জোর ১৯৫২ সাল থেকে। এ ইতিহাসে ১৯৪৭ সালের নায়কদের জন্য স্থান রাখা হয়নি। কারণ তা হলে কায়েদে আযম মুহম্মদ আলী জিন্নাহ, নবাব সলিমুল্লাহ, খাজা নাযিমুদ্দীন, আল্লামা ইকবাল, শেরে বাংলা ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা আকরাম খাঁ, নূরুল আমীন, মহম্মদ আলী বোগরা, মৌলভী তমিজউদ্দীন খান, আব্দুর সবুর খান, ফজলুল কাদের চৌধুরী  ন্যায় শত শত ব্যক্তিকে ইতিহাসে স্থান দিতে হয়। আর সেটি হলে ইতিহাসের বইয়ে শেখ মুজিবের ন্যায় ১৯৭১’য়ের নায়কদের জন্য স্থান বহুলাংশে কমে যায়। মুজিবের অনুসারিগণ সে ছাড় দিতে রাজী নয়। মুজিবের অনুসারিদের লড়াই তাই স্রেফ রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল নিয়ে নয়, ইতিহাসের দখলদারি নিয়েও। বাংলাদেশের ইতিহাস  তাদের হাতেই অধিকৃত। স্বৈরাচারী রাজনীতির এ হলো আরেক কুফল।

বাংলাদেশে পক্ষপাতদুষ্ট ইতিহাস রচনার কাজটি শুরু করেছে ভারতের সাহায্যপুষ্ট একাত্তরের বিজয়ী পক্ষ। ইতিহাস রচনার নামে তাদের কাছে গুরুত্ব পেয়েছে পাকিস্তানপন্থী ও ইসলামপন্থী নেতাদের গায়ে লাগাতর কালিমা লেপন। ফলে রাজাকারকে চিত্রিত করেছে যুদ্ধাপরাধি রূপে; এবং নিজেদেরকে চিত্রিত করেছে দেশের সর্বকালের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সন্তান রূপে। মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে কোন মানুষ খুন, ধর্ষণ, গৃহ-লুট বা অন্য কোন অপরাধ সংঘটিত হয়েছে -ইতিহাসে তার বিন্দুমাত্র বিবরণও নেই। লক্ষাধিক বিহারী, রাজাকার ও পাকিস্তানপন্থীদের মৃত্যু হয়েছে যেন আসমান থেকে বাজ পড়ায়। তাদের ঘরবাড়ি, ব্যাবসা-বাণিজ্য ও সহায়-সম্পদ লুট হয়েছে যেন কোন অজানা কারণে! বাংলাদেশের ইতিহাসে এসব প্রশ্নের উত্তর নাই। দেশের ইতিহাস তো এভাবেই পক্ষপাতদুষ্ট হয়, পরিত্যক্ত হয় এবং আঁস্তাকুড়ে গিয়ে পড়ে। প্রতিটি ব্যক্তির রাজনীতি, কর্ম ও আচরণ পরিচালিত হয় তার চিন্তা-চেতনা ও দর্শন থেকে। এমনকি অতিশয় দুর্বৃত্তও দুর্বৃত্তিতে অনুপ্রেরণা পায় জীবন-জগত নিয়ে তার বিশেষ ধ্যান-ধারণা থেকে। মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণার সে উৎসটি কি? রাজাকারগণই বা কোত্থেকে পেল সে চরম দুর্দিনে স্রোতের বিপরীতে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা? বাংলাদেশের ইতিহাসে সে সবেরও উত্তর নেই। কিন্তু সেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া কি এতোই কঠিন? ভিলেন রূপে নয়, রাজাকারদেরকে রাজাকার রূপে দেখলে সে উত্তরটি অতি সহজেই পাওয়া যেত।

 

লড়াইটি দর্শনের

১৯৭১’য়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দু’টি দর্শন প্রবল ভাবে কাজ করেছিল। একটি হলো প্যান-ইসলামীক মুসলিম ভ্রাতৃত্বের দর্শন-এ থেকেই জন্ম নিয়েছিল অখণ্ড পাকিস্তান বাঁচানোর চেতনা। এটিই হলো রাজাকারের চেতনা। অপরটি ছিল ভাষাভিত্তিক বাঙালী জাতীয়তাবাদী সেক্যুলার দর্শন। মুক্তিযোদ্ধাদের চেতনার উৎস হলো এটি। একাত্তরের ঘটনাবলীর যথার্থ বিশ্লেষণে এ দু’টি চেতনাকে অবশ্যই বুঝতে হবে এবং ঘটনার মূল্যায়নে সে দু’টিকে সামনে রাখতে হবে। নইলে বিচারে প্রচণ্ড অবিচার হবে। ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে কর্ম, আচরণ, রুচীবোধ ও রাজনীতিতে যে ব্যাপক পার্থক্য -তা তো এই চেতনার পার্থক্যের কারণেই; খাদ্য-পানীয়, শারীরিক বৈশিষ্ট বা জলবায়ুর কারণে নয়। তাই একই রূপ পানাহার ও জলবায়ুতে বেড়ে উঠে কেউ রাজাকার হয়েছে এবং কেউ মুক্তিযোদ্ধা হয়েছে। ব্যক্তি ক্ষণজন্মা, কিন্তু চেতনা বেঁচে থাকে হাজার হাজার বছর। তাই আজকের বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যেমন বেঁচে আছে, তেমনি বেঁচে আছে রাজাকারের চেতনাও। এ দু’টি চেতনা ১৯৭১য়ে যেমন ছিল, তেমনি একাত্তরের পূর্বে ১৯৪৭য়েও ছিল। তেমনি বহু শত বা হাজার বছর পরও থাকবে।

ব্যক্তির চরিত্র, চেতনা ও রাজনৈতিক নীতিমালার নির্মাণে যেটি কাজ করে সেটি হলো একটি জীবন-দর্শন। মানব জীবনের অতি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো এ দর্শন। দর্শন বেঁচে থাকে হাজার হাজার বছর ধরে। সেটি যদি হয় ইসলামী দর্শন, তবে তা তো অমর। তাই সমাজতন্ত্র ও কম্যুনিজমের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেলেও ইসলাম টিকে আছে এবং দিন দিন প্রবলতর হচ্ছে। ব্যক্তি তার দর্শন থেকেই কর্মে, ত্যাগে ও প্রাণদানে প্রেরণা পায়। রাজাকারের চেতনায় সে দর্শনটি ছিল ইসলামের। সে দর্শন থেকেই তারা পেয়েছিল প্যান-ইসলামী চেতনা; পেয়েছিল মুসলিম স্বার্থের প্রতি অঙ্গীকার। ফলে রাজাকারদের রাজনীতিতে ভাষা, বর্ণ বা আঞ্চলিকতা কোনরূপ গুরুত্ব পায়নি। ফলে একাত্তরে বাংলা ভাষার নামে যখন পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ গড়ার যুদ্ধ হচ্ছিল, তখন রাজাকারগণ সে লড়ায়ে যোগ দেয়নি। বরং সে সময় বহু হাজার বাঙালী রাজাকার পাকিস্তানের প্রতিরক্ষায় প্রাণ দিয়েছে। তারা মুজিব সরকারের জেল খেটেছে এবং মুক্তিবাহিনীর হাতে নির্মম অত্যাচারের শিকার হয়েছে। তাদের সে ত্যাগের পিছনে যে দর্শনটি কাজ করেছিল সেটি ছিল মুসলিম ভ্রাতৃত্বের দর্শন। সে দর্শনে ভাষা, বর্ণ, গোত্র বা ভূগোলভিত্তিক বিভেদের প্রাচীর গড়ার বৈধতা নেই।বরং বিভেদের দেয়াল ভাঙ্গাটি তাদের কাছে ইবাদতে পরিণত হয়েছে। এমন দর্শনের প্রতিষ্ঠায় তারা অর্থ, শ্রম ও রক্তও দিয়েছে।

রাজাকারের দর্শনের জন্মটি একাত্তরে নয়, সাতচল্লিশেও নয়। এ দর্শনের জন্ম তো তখন, যখন ইসলাম সমগ্র মানব জাতির জন্য মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে একমাত্র ধর্ম রূপে নির্ধারিত হয়েছিল। এ ধর্ম বিভেদের দেয়াল ভাঙ্গতে শেখায়। বিভক্তির সে দেয়াল ভেঙ্গেই আরব, ইরানী, তুর্ক, কুর্দ, মুর ও অন্যান্য ভাষাভাষী মুসলিম ইসলামের পতাকা তলে একতাবদ্ধ হয়েছিল এবং উম্মতে ওয়াহেদার জন্ম দিয়েছিল। এটিই তো ইসলামের রীতি। রাজাকারগণ ছিল সে রীতির অনুসারি। শুধু একাত্তরে নয়, সর্বকালে ও সর্বস্থানে সে রীতি নিয়ে বাঁচাই হলো প্রকৃত ঈমানদারী। ইসলামের এ দর্শন বাঙালী মুসলিমদের মাঝে লক্ষ লক্ষ নিষ্ঠাবান অনুসারি পাবে -সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? একাত্তরে তো সেটিই ঘটেছিল। একাত্তেরর এ সত্যটি আবিস্কারে বাঙালী জাতীয়তাবাদীগণ ব্যর্থ হয়েছে।

ব্যক্তির মন যা জানে না,তার চোখও সেটি দেখতে পায় না। চোখ তো তখনই দেখে যখন তার পিছনে আলোকিত মন কাজ করে।মনের অন্ধকারে তাই চোখও অন্ধ হয়। মহান আল্লাহতায়ালার কুদরত দেখতে হলে তাই জ্ঞানবান মন চাই।তাঁর সৃষ্ট বিশাল জগতে বসবাস করেও বেঈমানেরা তাই তাঁর কুদরত দেখতে ব্যর্থ হয়।অজ্ঞের পক্ষে তাই ঈমানদার হওয়া অসম্ভব।ইসলামে তাই জ্ঞানার্জন প্রথমে ফরজ করা হয়েছে, নামায-রোযা বা হজ-যাকাত নয়।একই কারণে ইসলামী চেতনাশূণ্য সেক্যুলারিস্টগণ তাই রাজাকারদের দর্শনের বলটি দেখতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম দেশ এবং সে সাথে নিজের দেশ বাঁচাতে যে ধর্মপ্রেমিক ও দেশপ্রেমিক মানুষগুলো অকাতরে প্রাণ দিল -তাদের কাছে তারা অর্থলোভী দালাল ও যুদ্ধাপরাধী মনে হয়েছে!  

 

ভারতের লক্ষ্যপূরণ

বাঙালী জাতীয়বাদীদের দর্শনটি ছিল ভাষা ও আঞ্চলিকতার নামে মুসলিমদের মাঝে বিভক্তির দেয়াল গড়ার দর্শন। এটি ছিল পাপের পথ। ইসলামে এমন বিভক্তি যেমন হারাম, তেমনি শরিয়তের আইনে দণ্ডনীয় ফৌজদারি অপরাধ। মুক্তিবাহিনীর সদস্যগণ ছিল বাঙালী জাতীয়তাবাদীর অনুসারি; তাদের কাছে প্যান-ইসলামীক মুসলিম ভাতৃত্বের চেতনাটি পরিত্যক্ত হয়। এমন নীতি কাফেরদের থেকে সমর্থণ পাবে –সেটি স্বাভাবিক; কিন্তু কোরঅআন-হাদীস বা নবীজীর সূন্নাহ থেকে নয়। তাই একাত্তরে মুক্তিবাহিনীর আশ্রয়দাতা, সাহায্যদাতা, প্রশিক্ষণদাতা ও একান্ত বন্ধু গণ্য হয় ভারতীয় কাফেরগণ, কোন মুসলিম দেশ নয়। ভারতীয় এজেন্ডা রাজাকরগণ বুঝতে পারলো, মুক্তিবাহিনীর নেতাকর্মীগণ তা ইচ্ছে করেই বুঝতে চাইনি। ভারতের লক্ষ্য ছিল, প্রধান শত্রু পাকিস্তানকে খন্ডিত ও দুর্বল করা। সে সাথে বিচ্ছিন্ন পূর্ব পাকিস্তানের সহায়-সম্পদ লুন্ঠন। ভারতীয়দের সে লুন্ঠনে বাংলাদেশ পরিণত হয় আন্তর্জাতিক অঙ্গণে ভিক্ষার তলাহীন ঝুলি। দুর্ভিক্ষে মরতে হয় বহু লক্ষ বাংলাদেশীকে। পরিতাপের বিষয় হলো, ভারতের সে লক্ষ্য পূরণে মুক্তিবাহিনীর সদস্যগণ তাদের থেকে অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ নেয়; এবং মুসলিম হত্যায় যুদ্ধে নামে। লক্ষাধিক অবাঙালী মুসলিমকেই শুধু নয়, হত্যা করা হয় হাজার হাজার বাঙালী মুসলিমকেও।

লক্ষণীয় হলো, বাংলাদেশের ইতিহাসে একাত্তরের ভারতীয় লুন্ঠন নিয়ে কোন কথা নেই। সেটি নিছক প্রভু ভারতকে খুশি করতে। ইতিহাসের বইয়ের বিশাল অংশ ব্যয় হয়েছে রাজাকারদের হত্যাযোগ্য প্রতিপক্ষ রূপে খাড়া করতে। ভারত চায়, বাঙালী মুসলিমগণ বিচ্ছিন্ন হোক উপমহাদেশের অবাঙালী মুসলিমদের থেকে। সেটি বুঝা যায় ভারত ও ভারতপন্থিদের প্রচারনার ধরণ দেখে। অথচ মহান আল্লাহতায়ালার কোর’আনী হুকুম হলো, এক মুসলিম অন্য মুসলিমের ভাই -তা যে ভাষা বা যে এলাকারই হোক। অন্য মুসলিমকে নিজের ভাই রূপে মান্যতা দেয়ার মধ্যেই ঈমানদারি। সেটি না হলে বিদ্রোহ হয় মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে। তাই নামায-রোযা পালন করেও এমন বিদ্রোহী ব্যক্তি ব্যর্থ হয় প্রকৃত মুসলিম হতে। অথচ সে ইসলামী চেতনা মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে ছিল না। ফলে অবাঙালী মাত্রই তাদের কাছে “ছাতুখোর” শত্রু –এমনকি হত্যাযোগ্য গণ্য হয়েছে। অথচ রাজাকারদের কাছে সেটি মনে হয়নি। যেমন সাতচল্লিশে মনে হয়নি, তেমনি একাত্তরেও নয়। এবং আজ নয়। বরং পাঞ্জাবী, বিহারী, পাঠান, সিন্ধি, বেলুচ তথা সকল ভাষার মুসলিমগণ গণ্য হয়েছে তার প্রাণপ্রিয় মুসলিম ভাই রূপে। কারণ, সেরূপ গণ্য করাটাই মহান আল্লাহতায়ালার হুকুম।-(সুরা হুজরাত, আয়াত ১০)। তাই ঈমানদার কি পারে তার পাঞ্জাবী, পাঠান বা বিহারীকে হত্যা করতে পারে?

অথচ একাত্তরে বহুলক্ষ অবাঙালীকে নিজেদের ঘর থেকে বের করে যেভাবে বস্তিতে বসানো হয়েছে এবং তাদের ঘরবাড়ী, ব্যবসাবাণিজ্য ও সহায়-সম্পদকে যেভাবে ছিনতাই করা হয়েছে -সেটি কোন মুসলিম সংস্কৃতি নয়। মানবতার সংস্কৃতিও নয়। এটি নিতান্তই মুক্তিযুদ্ধের বাঙালী জাতীয়তাবাদী সংস্কৃতি। এমন অপরাধ কর্মের গভীর স্বাদৃশ্য মেলে হিটলারের ফ্যাসিবাদের সাথে। ইসলামে এমন কর্ম শুধু হারামই নয়, শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ। সেটি গুরুতর যুদ্ধাপরাধ আন্তর্জাতিক আইনেও। এরূপ বর্বর জাতীয়তাবাদী চেতনার কারণেই জার্মানগণ লক্ষ লক্ষ ইহুদীদের গ্যাস চেম্বারে পাঠিয়ে জ্যান্ত হত্যা করেছে। মুজিব ও তার অনুসারিগণ সে বর্বর ফ্যাসিবাদের আবাদ বাড়িয়েছে বাংলাদেশে। বঙ্গিয় ভূমিতে ইসলাম আগমনের পর এরূপ বর্বর অসভ্যতা আর কোন কালেই প্রতিষ্ঠা পায়নি। একই অসভ্যতা নিয়ে আজ ইসলাম ও মুসলিম স্বার্থের প্রতি সমর্থন থাকার কারণে রাজপথে পিটিয়ে তাদের লাশের উপর নাচা হচ্ছে।  মুজিব ও তার অনুসারিগণ আর কোন কারণে না হোক, অন্ততঃ এ অসভ্যতার কারণে বাঙালীর ইতিহাসে শত শত বছর বেঁচে থাকবে। অথচ বাঙলার মুসলিম সংস্কৃতিতে এমন অসভ্যতার কি স্থান আছে? বরং এ মুসলিম সংস্কৃতি তো তুর্কি বীর ইখতিয়ার মহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী, ইয়েমেনি সুফিসাধক শাহ জালাল, আফগান বীর ঈসা খাঁ’দের ন্যায় নানা ভাষা ও নানা বর্ণের মুসলিমদের বাংলার বুকে আপন করে নেয়ার সংস্কৃতি।

মহান আল্লাহতায়ালা ব্যক্তিকে ভাষা,বর্ণ ও আঞ্চলিকতার উর্দ্ধে উঠতে নির্দেশ দেন। পবিত্র কোরআনে বহু বার ঘোষিত হয়েছে সে নির্দেশ। বলা হয়েছে, “আক্বীমু দ্বীন ওয়ালা তাতাফাররাকূ” –(সুরা শুরা,আয়াত ১৩)। অর্থঃ  দ্বীনকে প্রতিষ্ঠা করো এবং বিভক্ত হয়োনা। বলা হয়েছে, “ওয়া তাছিমু বি হাবলিল্লাহি জামিয়াঁও ওলা তাফাররাকু” -(সুরা আল ইমরান, আয়াত ১০৩)। অর্থঃ এবং শক্ত ভাবে আঁকড়ে ধরো আল্লাহর রশি তথা কোর’আনকে এবং বিভক্ত হয়োনা। তাই যে কোন মুসলিম দেশে ভাঙ্গা ও মুসলিমদের মাঝে বিভক্তির দেয়াল গড়ার যুদ্ধটি মূলতঃ মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে যুদ্ধ। এমন যুদ্ধে পৌত্তলিক কাফেরগণ অর্থ দিবে, অস্ত্র দিবে, প্রশিক্ষণ দিবে এবং নিজ খরচে প্রকাণ্ড যুদ্ধও লড়ে দিবে -সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? একাত্তরে তো ভারত তো সেটিই ঘটেছে। তাই মুজিবকে স্বাধীনতার ঘোষণাও দিতে হয়নি। মুক্তি বাহিনীকে একটি জেলা বা মহকুমাকে স্বাধীন করতে হয়নি। ভারত প্রকান্ড একটি যুদ্ধ নিজে লড়ে বাংলাদেশ বানিয়ে দিয়েছে। তাই বাংলাদেশের জন্মদাতা যে  ভারত তা নিয়ে কি কোন সন্দেহ থাকে? ভারতীয় কর্তাগণ তো সে কথাটিই বার বার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে এবং জন্মদাতা রূপে একটি পর একটি ছিনিয়ে নেয়ার অধিকার দাবী করছে।

মু’মিনের জীবনের এজেন্ডা তাই আল্লাহর প্রদর্শিত শরিয়ত প্রতিষ্ঠায় নিষ্ঠাবান হওয়া এবং বিভক্তি থেকে বাঁচা। ফলে ঈমানদার হওয়ার দায়বদ্ধতা শুধু নামায-রোযা, হজ-যাকাত পালন নয়, মুসলিমদের মাঝে ঐক্য গড়াও। কিন্তু বাঙালী জাতীয়তাবাদীদের এজেন্ডাটি ঐক্য নয়, বরং ভাষা, বর্ণ ও আঞ্চলিকতার পরিচয়ে বিভক্তির দেয়াল গড়া। ফলে বিভক্তির এ রাজনীতি কি আদৌ কোন মুসলিমের রাজনীতি হতে পারে? এটি তো মহাপাপ। এ পাপ ব্যক্তিকে জাহান্নামের আগুণে নেয়। ভাষা,বর্ণ ও আঞ্চলিকতার উর্দ্ধে উঠার কারণেই বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ বহু হাজার মাইল দূরের ভূমিতে জন্ম নেয়া মুহাম্মদ (সাঃ)কে তারা প্রাণপ্রিয় রাসূল ও তার প্রচারিত ধর্মকে নিজ ধর্ম রূপে গ্রহণ করতে পেরেছিল। নামে মুসলিম হলেও মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের মাঝে সে ইসলামী চেতনা ও সে ঈমানী দায়বদ্ধতা গুরুত্ব পায়নি। বাঙালী হওয়াটিই তাদের কাছে সবেচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অপরদিকে রাজাকারের জীবনে বিশ্ব-ভ্রাতৃত্বের ইসলামী চেতনাটি ধারাবাহিকতা পেয়েছিল। এ চেতনাটি ১৯৪৭’য়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালী মুসলিমের জীবনে এতোটাই প্রবল ছিল যে, ভারত থেকে প্রাণ বাঁচাতে আসা অবাঙালী মুসলিমদের জন্য ঢাকাসহ পূর্ব-পাকিস্তানের বহু নগরে পরিকল্পিত বাসস্থানের ব্যাবস্থা করা হয়েছিল। কারণ তারা ছিল বাংলার মুসলিম ভূমিতে মেহমান।ভারত থেকে প্রাণ বাঁচাতে আসা অসহায় অবাঙালীদেরকে সাহায্য করাকে তারা পবিত্র ইবাদত মনে করতো। ভারত থেকে আসা প্রায় ৭০ লাখ মুহাজিরদের প্রতি অভিন্ন ভালবাসা দেখানো হয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানেও। অথচ তেমন একটি মানবিক আচরণ মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের মাঝে একাত্তরে দেখা যায়নি। বরং তারা নেমেছে অবাঙালীদের বিরুদ্ধে হত্যা, ধর্ষণ ও লুণ্ঠনে। বাঙালী মুসলিমের ইতিহাসে একাত্তর তাই ইসলামী চেতনা ও চরিত্রের এক গভীর অধঃপতনের দিন। অবাঙালী মুসলিমের বিরুদ্ধে এরূপ নৃশংস আচরণ সমগ্র মুসলিম ইতিহাসের অতি বর্বর অধ্যায় রূপে বহুহাজার বছর বেঁচে থাকবে -তা নিয়ে কি কোন সন্দেহ আছে? 

 

বিদ্রোহ মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে

ঈমানদারকে শুধু ইবাদত নিয়ে বাঁচলে চলে না, তাকে বাঁচতে হয় পারস্পারিক মুসলিম ভাতৃত্বের অটুট বন্ধন নিয়েও। কারণ, সে ভাবে বাঁচতেই নির্দেশ দেয়া হয়েছে পবিত্র কোরআনে। ফলে ভাতৃত্বের সে বন্ধন নিয়ে বাঁচার মধ্যেই প্রকৃত ঈমানদারী। অন্য ভাষা ও অন্য বর্ণের মুসলিমও তার কাছে তখন প্রাণপ্রিয় ভাই গণ্য হয়। এমন চেতনার কারণেই অতীতে ইসলামী খেলাফত বাংলাদেশের চেয়ে শতগুণ বৃহৎ ভূমির উপর বিস্তার লাভ করেছিল; এবং সে বিশাল ভূমিতে ভাষা, বর্ণ ও আঞ্চলিকতার নামে দেয়াল গড়ে উঠেনি। সে ভূগোল বাঁচাতে দেশের অভ্যন্তরে সেনাবাহিনীকে যুদ্ধ করতে হয়নি –যেমনটি পাকিস্তান বাঁচাতে একাত্তরে হয়েছে। ঈমানের প্রকাশ তাই শুধু নামায-রোযা, হজ-যাকাতে নয়,বরং সেটির প্রবল প্রকাশ ঘটে প্যান-ইসলামীক ভাতৃত্ব, রাজনীতি ও ভূগোলের মাঝে। যে মুসলিম দেশে সেরূপ ভাতৃত্ব নাই, বুঝতে হবে সে দেশের নাগরিকদের অপূর্ণতা আছে মুসলিম রূপে বেড়ে উঠায়। মুসলিম ভাতৃত্বের বন্ধন ছিন্ন করা বা সে বন্ধনকে অস্বীকার করার অর্থ মুসলিম উম্মাহ থেকে বেরিয়ে যাওয়া। মুক্তিবাহিনীর বিদ্রোহ তাই শুধু পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ছিল না, ছিল মহান আল্লাহতায়ালার ঘোষিত নির্দেশমালার বিরুদ্ধেও। সেক্যুলার বাঙালী জাতীয়তাবাদীদের বিজয় শুধু এ নয় যে, পাকিস্তান ভেঙ্গে তারা বাংলাদেশে গড়তে পেরেছে। বরং তাদের সবচেয়ে বড় সাফল্যটি হলো, প্যান-ইসলামী ভ্রাতৃত্বের বিরুদ্ধে নিজেদের বিদ্রোহটি সফল করতে পেরেছে। ইখতিয়ার মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির হাতে বঙ্গ বিজয়ের পর বাংলার মাটিতে এটিই ছিল মহান আল্লাহতায়ালার কোরআনে ঘোষিত প্যান-ইসলামী নীতির বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম সফল বিদ্রোহ।

প্যান-ইসলামী চেতনার কারণেই বাঙালী মুসলিমের কাছে কায়েদে আজম মুহম্মদ আলী জিন্নাহ, আল্লামা ইকবাল, নবাবজাদা লিয়াকত আলী খানের মত অবাঙালী নেতারা ১৯৪৭ সালে আপনজন মনে হত। পূর্ব পাকিস্তানে তাদের নামে অনেক প্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠেছিল। কিন্তু  সেক্যুলার বাঙালী জাতীয়তাবাদে তেমন মুসলিম ভাতৃত্ব গড়ে তোলা অসম্ভব ছিল। বরং সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে তারা একটি ভাষা ভিত্তিক সীমারেখা টেনে দেয়, যারা সে সীমারেখা অতিক্রম করে তাদেরকে শত্রু গণ্য করা হয়। সাতচল্লিশের মুসলিম নেতৃবৃন্দ ও একাত্তরের রাজাকারেরা যে অভিন্ন চেতনার ছিল -সেটি বুঝতে ইসলামের শত্রুপক্ষ আদৌ ভুল করেনা। একারণেই মুক্তিযোদ্ধরা শুধু নিরস্ত্র রাজাকার হত্যাতেই আনন্দ পায়নি, আনন্দ পেয়েছে বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে ১৯৪৭-য়ের পাকিস্তান আন্দোলনের মুসলিম নেতাদের নাম মুছে ফেলতেও। তাদের কাছে বরং অতি আপনজন মনে হয়েছে গান্ধি, নেহেরু, ক্ষুদিরাম, সূর্যসেন, চিত্তরঞ্জন সুতোর, জেনারেল ম্যানেক শ’ ও জেনারেল অরোরা ন্যায় ভারতীয় ব্যক্তিত্ব। এমন এক অসুস্থ চেতনার কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিন্নাহ হল হয়ে গেছে সূর্য সেন হল এবং ইকবাল হল থেকে বিলুপ্ত হয়েছে মহান কবি আল্লামা ইকবালের নাম। অথচ বাংলার মানুষ যদি সাতচল্লিশে কায়েদে আজম, ইকবাল, লিয়াকত আলী খানদের বাদ দিয়ে গান্ধি, নেহেরু, সূর্যসেন, ক্ষুদিরামের পথ ধরতো তবে আজকের বাংলাদেশই প্রতিষ্ঠা পেত না। কাশ্মীরী মুসলিমদের ন্যায় তাদেরও তখন ভারতীয় সৈন্যদের হাতে প্রতিদিন হত্যার শিকার হতে হত এবং মুসলিম রমনীদের ধর্ষিতা হতে হত। হত্যাযোগ্য অপরাধ গণ্য হত গরু কোরবানী ও গরুর গোশতো ভক্ষণ। শত্রু-মিত্র নির্ণয়ে একটি চেতনা যে মানব মনে কতটা গভীর প্রভাব ফেলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারীরা হলো তার নজির। এ চেতনার ফলে আল্লাহর আইনের প্রতিষ্ঠার দাবী নিয়ে রাজপথে নামা দাড়ী-টুপিধারী বাঙালী যুবকটিও মুক্তিবাহিনীর কাছে হত্যাযোগ্য মনে হয়। এজন্য তাকে পাঞ্জাবী বা বিহারী হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।

ভারত কোন প্রতিবেশী জনগোষ্ঠীর স্বাধীন বাড়াতে অতীতে যুদ্ধ করেনি। সাহায্যও দেয়নি। একাত্তরেও সে লক্ষ্যে যুদ্ধ করেনি।  পাকিস্তান বিভক্ত করতে যুদ্ধ করলেও কাশ্মীরের স্বাধীনতা দিতে তারা রাজী নয়। ভারতের জনসংখ্যা ১৩০ কোটির বেশী। বাংলার মত প্রায় বিশটির চেয়ে অধীক ভাষা রয়েছে ভারতে। ভাষাগত সে ভিন্নতা নিয়ে সেদেশে বাংলাদেশের মত ২০টি স্বাধীন দেশ নির্মিত হতে পারতো। অথচ তেমন বিচ্ছিন্নতাবাদী ধারণা ভারতীয় হিন্দুদের মাথায় স্থান পায়নি। ১৯৪৭’য়ে যেমন নয়, আজও  নয়। নানা ভাষার হিন্দুরা ভাষার উর্দ্ধে উঠে ভারতব্যাপী একটি মাত্র রাষ্ট্র গড়ার কারণেই তারা আজ বিশ্বের বুকে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। বাঙালী মুসলিমগণ সেটি পারেনি। ক্ষুদ্রতর ও দুর্বলতর হওয়ার নেশায় কি সেটি সম্ভব? মুসলিম হওয়ার অর্থ তাই শুধু কোরআন পাঠ, নামাজ-রোযা ও হজ-যাকাত পালনও নয়। সেটি ভাষা, বর্ণ ও ভৌগলিকতার উর্দ্ধে উঠে অন্য ভাষা ও অন্য বর্ণের মুসলিমদের সাথে একাত্ব হওয়ার সামর্থ্য। এরূপ একতা  গড়া ইসলামে ফরজ তথা বাধ্যতামূলক। বিজয় ও ইজ্জত আসে তো এরূপ একতার পথেই। নইলে শক্তি লোপ পায়; বিলুপ্ত হয় ইজ্জতও। মুসলিম উম্মাহকে বিভক্ত এবং শক্তিহীন ও ই্জ্জতহীন করার এজেন্ডা তো ইসলামের শত্রুপক্ষের। একাত্তরে সে এজেন্ডা নিয়েই যুদ্ধে নেমেছিল আওয়ামী লীগ ও মুক্তিবাহিনী। মুজিবের এজেন্ডার সাথে ভারতের এজেন্ডাও তখন একাকার হয়ে যায়।

মুক্তিবাহিনীর পিছনে ভারতের অর্থদান, অস্ত্রদান ও প্রশিক্ষণদানের মতলবটি বুঝতে হলে ভারতের এজেন্ডাকে অবশ্যই বুঝতে হবে। ভারত তো চায় তার সীমান্ত্র ঘিরে দুর্বল ভূটান,নেপাল, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা পাক, শক্তিশালী পাকিস্তান নয়। অথচ একাত্তরের ইতিহাস নিয়ে বাংলাদেশে বহু বই লেখা হয়েছে। কিন্তু সেসব বইয়ে ভারতীয় সে এজেন্ডাকে আদৌ তুলে ধরা হয়নি। অথচ বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের বর্তমান ষড়যন্ত্র ও দখলদারি বুঝতে হলে সে বিষয়টি জানা অতি গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাস-বিজ্ঞানের গুরুত্ব এজন্যই এতো অধীক। সে জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও চেতনার সে পুষ্টি ছাত্ররা কখনোই অংক, বিজ্ঞান বা চিকিৎসা বিজ্ঞান থেকে পায়না। অথচ বাংলাদেশে জ্ঞানার্জনের সে ক্ষেত্রটিও দেশের দেশী ও বিদেশী শত্রুদের হাতে অধিকৃত। ফলে মারা পড়ছে বিবেক। এবং বিবেকের সে মহামারি  শুধু  ছাত্রদের মাঝে সীমিত নয়; ছড়িয়ে পড়েছে বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ, বিচারপতি ও রাজনীতিবিদদের মাঝেও। এ মৃত বিবেকের মানুষের মাঝে রম রমা হচ্ছে গুম, খুন, লুটপাট ও সন্ত্রাস-নির্ভর রাজনীতি। ফলে দেশে ভোট-ডাকাতি করে ক্ষমতায় বসলেও যেমন বিচার হয় না, তেমন বিচার হয় না কারা দেশের প্রকৃত  বন্ধু এবং কারা শত্রু তা নিয়েও।