বাংলাদেশে স্বৈরাচারের নাশকতা এবং যে ব্যর্থতা বাঙালী মুসলিমের

স্বৈরাচারঃ দুশমন মানব সভ্যতার

স্বৈরশাসকদের নৃশংস অপরাধ শুধু এ নয়, বিপুল সংখ্যায় তারা মানুষ খুন করে, গুম করে ও নির্যাতন করে। বরং তাদের হাতে সবচেয়ে বড় অপরাধটি ঘটে মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশিত সনাতন সত্যদ্বীনের নির্মূলে। ভয়ানক অপরাধ করে মানুষের বিবেক নিধনের ক্ষেত্রেও। স্বৈরশাসকের নাশকতাটি তাই হিংস্র পশু ও প্রাণ-নাশক জীব-জীবাণুর চেয়েও ভয়াবহ। কারণ, ঘাতক পশু ও জীব-জীবাণু ইসলাম ও ঈমানের শত্রু নয়। পশুর কাজ স্রেফ দৈহিক হত্যা; বিবেক হত্যা বা ঈমান হত্যা নয়। তাই হিংস্র পশু ও জীব-জীবাণুর নাশকতা বৃদ্ধিতে মানুষ জাহান্নামে যায় না; জাহান্নামে যাওয়ার কারণ তো ঈমানের মৃত্যু এবং সৎ আমলের শূণ্য ভাণ্ডার। সেটি ঘটে স্বৈরশাসকদের হাতে দেশ অধিকৃত হওয়ায়। অসত্য অন্যায়ের প্রতিষ্ঠাকে প্রবলতর করে তারা অসম্ভব করে সুস্থ্য ঈমানআক্বীদা, শিক্ষা-সংস্কৃতি, ন্যায়নীতি ও নেক আমল নিয়ে বেড়ে উঠা। এভাবে অসম্ভব করে মুসলিম রূপে বাঁচা তথা ঈমান নিয়ে বেড়ে উঠা।

দেশে দেশে স্বৈরশাসকগণ কাজ করে শয়তানের খলিফা রূপে। মহান আল্লাহতায়ালার খেলাফতের বদলে তারা প্রতিষ্ঠা করে শয়তানের খেলাফত। শয়তানের খলিফাগণ নবী-রাসূল ও তাদের প্রচারিত ধর্মের জন্য কোন দিনই সামান্যতম স্থানও ছেড়ে দিতে রাজী হয়নি। অতীতের ন্যায় আজও সেটিই তাদের রীতি। বাংলাদেশের ন্যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশগুলোতে শরিয়ত, হুদুদ, খেলাফত, জিহাদের ন্যায় ইসলামের মৌল বিধানগুলোর বিরুদ্ধে স্বৈর-শাসকদের যেরূপ উগ্র অবস্থান -সেটি তাই কোন নতুন নীতি নয়। এটিই তাদের সনাতন ও স্বাভাবিক নীতি। শুধু রাষ্ট্রের অঙ্গণে নয়, এমনকি জনগণের মনের ভূবনেও চায় ইসলামী চেতনার নির্মূল। চায়, বর্ণবাদ, জাতীয়তাবাদ, সেক্যুলারিজমের ন্যায় নানারূপ ইসলাম বিরোধী মতবাদ বা ধ্যান-ধারনার অধিকৃতি। ইসলামের প্রতিষ্ঠাকামীদের বিরুদ্ধে স্বৈর-শাসকদের যুদ্ধ ও সন্ত্রাস এজন্যই এতটা লাগাতর এবং নৃশংস। গণতন্ত্রে যেহেতু দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মভীরু মুসলিম জনগণের ইসলামী আক্বীদার প্রতিষ্ঠার বিষয়টি গুরুত্ব ও বৈধতা পায়, শয়তানী শক্তিবর্গ এজন্যই গণতন্ত্রের ঘোরতর শত্রু। আলজিরিয়া, ফিলিস্তিন ও মিশরে ইসলামপন্থিদের বিজয়কে ছিনিয়ে নিয়ে স্বৈর শাসনকে চাপিয়ে দেয়ার মূল কারণ তো এটিই।

মদিনার বুকে ইসলামের দ্রুত বেড়ে উঠার বড় কারণ, সেখান ফিরাউন, নমরুদের ন্যায় শক্তিশালী দুর্বৃত্তদের স্বৈরশাসন ছিল না। এলাকাটি কোন কালেই স্বৈরশাসন কবলিত তৎকালীন রোমান পারস্য সাম্রাজ্যের ন্যায় দুটি দুর্বৃত্ত বিশ্বশক্তির কবজায় ছিল না। এতে মানুষের বিবেক বেঁচেছিল স্বৈরশাসকে হাতে নিহত হওয়া থেকে। ফলে মদিনার মানুষ নৈতীক যোগ্যতা পেয়েছিল মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীন কবুল ও তাঁর মহান নবীজীকে নিজ শহরে দাওয়াত দেয়ার। মানব ইতিহাসে এমন ঘটনা পূর্বে আর কখনোই ঘটেনি। সেখানে ইসলাম পেয়েছিল দ্রুত বেড়ে উঠার সহায়ক পরিবেশ। অথচ স্বৈরশাসকদের হাতে দেশ অধিকৃত হওয়ার নাশকতাটি এতটাই প্রকট যে, অতি কঠিন হয়ে পড়ে সেখানে সুস্থ্য ঈমান নিয়ে বেড়ে উঠা। যেমন কঠিন হয়েছিল নমরুদ ও ফিরাউনের শাসনামলে ইরাক ও মিশরে। এবং আজ হচ্ছে বাংলাদেশে।

শয়তানের এজেন্ডা পূরণে বিশ্বস্ত সহকারি রূপে কাজ করাই স্বৈর-শাসকদের নীতি। রাষ্ট্রকে তারা শয়তানের ইন্সটিউশনে পরিণত করে। শয়তানের অনুগত সৈনিক রূপে মানুষকে জাহান্নামে নেয়াই তাদের মূল মিশন। ফলে তারা প্রতিপক্ষ রূপে খাড়া হয় ইসলামের বিজয়ের বিরুদ্ধে। এজন্যই মানব সমাজের সবচেয়ে বড় নেক কাজটি হিংস্র পশু, মশামাছি বা ঘাতক রোগজীবাণু নির্মূল নয়, বরং সেটি হলো স্বৈরাচার নির্মূল। তাই ইসলামে সবচেয়ে বড় ইবাদতটি হলো স্বৈর শাসন নির্মূলের জিহাদ। এ কাজটি না হলে সে রাষ্ট্রে ঈমান নিয়ে বাঁচা এবং মহান আল্লাহতায়ালার এজেন্ডা বাস্তবায়ন অসম্ভব হয়ে পড়ে। স্বৈর শাসন নির্মূলের জিহাদে নবীজী (সাঃ)র শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবী শহীদ হয়ে গেছেন। স্বৈর শাসক এজিদের বিরুদ্ধে জিহাদে শহীদ হয়েছেন ইমাম হোসেন (রাঃ) ও তাঁর ৭২ জন সহচর। স্বৈরাচারি শাসকদের হাতে জনগণের বিবেক হত্যার অপরাধটি মহামারি আকারে হওয়ার কারণেই অতি দুর্বৃত্ত শাসকগণও জাতির নেতা, পিতা, বন্ধু এমন কি ভগবান রূপে স্বীকৃতি পায়। একারণেই নমরুদ ও ফিরাউনের ন্যায় স্বৈরশাসকগণ মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিপক্ষ রূপে গৃহীত হয়েছিল। এবং নিন্দিত, নির্যাতিত, নিহত বা দেশ ত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন এমন কি নবীরাসূলগণ। যে দেশে চোর-ডাকাত, খুনি ও স্বৈরাচারিগণ শাসকরূপে স্বীকৃতি পায় ও সন্মানিত হয়, বুঝতে হবে সেখানে বিবেকের মৃত্যুটি একমাত্র চোর ডাকাত ও স্বৈরাচারি শাসকদের নিজস্ব বিষয় নয়, সেরূপ বিবেকের মৃত্যু ঘটে সাধারণ মানুষের জীবনেও। মিশরের বুকে ফিরাউন শুধু একা অপরাধী ছিল না, অপরাধী ছিল সেদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণও। তাই আযাব তাদের সবাইকে ঘিরে ধরেছিল।

স্বৈরাচারঃ শয়তানের বিশ্বস্ত হাতিয়ার

ন্যায়ের নির্মূলে ও অন্যায়ের প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রীয় শক্তির ক্ষমতাটি বিশাল। কোনটি ন্যায় আর কোনটি অন্যায়, কোনটি সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা পাবে এবং কোনটি বর্জন করা হবে -সে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি নির্ধারণ করে রাষ্ট্র। সেখানে মহান আল্লাহতায়ালার বিধান কাজ করে না। ফলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হাতে থাকলে ধর্মীয় ও বর্ণগত নির্মূলকে যেমন বৈধ বলা যায়, তেমনি সুস্পষ্ট অন্যায়কেও ন্যায় বলা যায়। যেমনটি স্পেন থেকে মুসলিম নির্মূল এবং আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড থেকে আদিবাসীদের নির্মূলের ক্ষেত্রে হয়েছে। গ্যাস চেম্বারে লাখ লাখ মানুষ পুরিয়ে মারাকেও তখন আইনসিদ্ধ বলা যায়। যেমনটি হিটলার বলেছে। তখন বৈধতা দেয়া যায় মা-বাপদের কোল থেকে সন্তান ছিনিয়ে নেয়া, অন্যদের দেশ দখল করা, পারমানবিক বোমা নিক্ষেপ বা গোয়ান্তানামো বেএর ন্যায় জেলে বছরের পর বিনাবিচারে বন্দি রাখার ন্যায় নানারূপ অসভ্য কর্মকেও। যেমনটি করছে মার্কিনীরা। ক্ষমতার দাপটে একই ভাবে বহু হারাম কর্মকে মুসলিম দেশগুলিতে উৎসবযোগ্য করা হয়েছে। যেমন পৃথক ভাষা, বর্ণ, গোত্র ও ভূগোলের নামে মুসলিম দেশগুলিকে টুকরো টুকরো করে দুর্বল করা। এমন কি আইন সিদ্ধ করা বলা হয়েছে ভোটা-ডাকাতির নির্বাচনকেও। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তো সেটিই করেছে। সে লুন্ঠিত নির্বাচনে বিজয়ের দোহাই দিয়ে দাপটের সাথে দেশ-শাসনের অবৈধ অধিকার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

স্বৈর-শাসন ও তার রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোগুলো কাজ করে মূলতঃ শয়তানের একনিষ্ঠ হাতিয়ার রূপে। নামে মুসলিম হলেও তারা লড়ে শয়তানের ইসলাম বিরোধী এজেন্ডাকে বিজয়ী করার লক্ষে। তাই স্বৈরাচার শুধু সুস্থ্য রাজনীতি, নিরপেক্ষ নির্বাচন ও ন্যায়পরায়ণ প্রশাসনেরই শত্রু নয়; ভয়ানক শত্রু বিবেক-বুদ্ধি ও বুদ্ধিবৃত্তিরও। তাদের কারণে বিপুল প্রতিপত্তি পায় দুর্বৃত্ত মানুষ ও দুর্বৃত্ত বুদ্ধিজীবীগণ। অপরাধী স্বৈর-সরকার কখনোই নিজেদের ব্যর্থতার দায়ভার নিজেরা গ্রহণ করেনা। সর্ব-অবস্থায় নিজেদের দোষমুক্ত জাহির করাই তাদের নীতি। এমনকি ১৯৭৩-৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ যেরূপ প্রাণ হারালো -সেজন্য আওয়ামী লীগ আজও দোষ স্বীকার করেনি। দোষ চাপিয়েছে বিদেশীদের উপর। বিদেশীদের দোষ, তারা কেন যথা সময়ে পর্যাপ্ত ভিক্ষা দিল না? অথচ এ আত্মজিজ্ঞাসা কখনোই আওয়ামী শাসক মহলে উঠেনি, হাজার হাজার কোটি টাকার ভিক্ষালব্ধ সম্পদ যে দেশের অরক্ষিত সীমানা দিয়ে ভারতে পাচার হয়ে গেল সেজন্যও কি বিদেশীরা দায়ী? নিজের দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপানো যে কোন সভ্য আইনেই গুরুতর অপরাধ। অথচ সেটাই হলো সকল স্বৈরাচারি শাসকদের স্বভাবজাত অভ্যাস। তাদের বিচারে নিজেদের ব্যর্থতা মেনে নেয়ার অর্থ, নিজেদের পরাজয় মেনে নেয়া। তাদের ভয়, তাতে গণরোষে আবর্জনার স্তুপে পড়ার। সে ভয় থেকেই স্বৈরশাসকগণ সকল ব্যর্থতার দায়ভার বিরোধী পক্ষের উপর চাপায়। একই কারণে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের ভোট ডাকাতির কথাও তারা দেশবাসিকে ভূলিয়ে দিতে যায়। ভূলিয়ে দিতে চায়, ২০১৩ সালে ৫ই মের শাপলা চত্ত্বরের গণহত্যার কথাও।

 

 

যে অপরাধ বাঙালী সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীদের

দেশ ও জনগণের বিরুদ্ধে ভয়ানক নাশকতাটি শুধু স্বৈরশাসকদের হাতে ঘটে না, ঘটে স্বৈরশাসক প্রতিপালিত বুদ্ধিজীবীদের হাতেও। মন্দিরের ঠাকুর বা পুরোহিত ছাড়া পুতুল পূজা, শাপপূজা, লিঙ্গপূজার ন্যায় বর্বর জাহিলিয়াত বাঁচে না। তেমনি মিথ্যসেবী বুদ্ধিজীবী ছাড়া অসভ্য স্বৈরশাসনও বাঁচে না। ফিরাউন কখনো নিজে ঘরে ঘরে গিয়ে জনগণের কাছে নিজেকে ভগবান রূপে পেশ করেনি। সে কাজটি করেছিল তার উচ্ছিষ্টভোগী বুদ্ধিজীবী ও ধর্মজীবীরা। পবিত্র কোরআনে এ শ্রেণীর দুর্বৃত্ত মানুষদের মহান আল্লাহতায়ালা মালাউন বলে অভিহত করেছেন। প্রতি যুগে এবং প্রতি দেশে এসব বুদ্ধিজীবী ও ধর্মজীবীদের অবস্থান ইসলামের ঘোরতর বিপক্ষে। ইসলামের লড়াকু সৈনিকদের বিরুদ্ধে এরাই স্বৈর-শাসকের ভাণ্ডারে বুদ্ধিবৃত্তিক গোলাবারুদ সরবরাহ  করে। তাদের কারণেই শরিয়ত, হুদুদ, জিহাদ, খেলাফতের ন্যায় ইসলামের মৌল বিধানগুলি স্রেফ মুসলিম দেশ থেকে নয়, মুসলিম চেতনা থেকেও বিলুপ্ত হয়েছে। এরূপ বুদ্ধিজীবীদের কারণেই দীর্ঘ আয়ু পায় দুর্বৃত্ত স্বৈর শাসকগণও। বাংলাদেশে বাকশালী স্বৈরাচার যে এখনো বেঁচে আছে সেটিও তো তাদের কারণে। তাদের কাজ, মিথ্যা ও অন্যায়কে স্রেফ বৈধ ও সঙ্গত রূপে প্রতিষ্ঠা দেয়া নয়, বরং প্রকৃত অপরাধীদের অপরাধকে মানুষের চোখ থেকে আড়াল করা। দেশের সকল ব্যর্থতার জন্য স্বৈরাচারকে দায়ী না করে তারা দায়ী করে জনগণকে। স্বৈরাচারের অদক্ষতা ও দূর্নীতিকে লুকাতে গিয়ে দায়ী করে দেশের কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষকে। এমনকি দায়ী করে দেশের ভূমি, ভূগোল ও জলবায়ুক। দায়ী করে এমন কি ক্ষমতার মসনদ থেকে বহু দুরে থাকা বিরোধী দলকে। যেমন ফিরাউন দায়ী করতো হযরত মূসা (আঃ) ও তার ভাই হযরত হারুন (আঃ)কে।

সেবকশ্রেণীর এ বুদ্ধিজীবী ও ধর্মজীবীদের মূল কাজ স্রেফ স্বৈরশাসকদের গুণগান গাওয়া নয়, বরং তাদের কৃত জঘন্য অপরাধগুলি লুকানো। এদের সংখ্যাটি বাংলাদেশে বিশাল। সামান্য একটি উদাহরণ দেয়া যাক। গত ২৬শে জুন, ২০১৮ আওয়ামী ঘরানার বুদ্ধিজীবী সৈয়দ আবুল মকসুদ প্রথম আলোতে কলাম লিখেছেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনে যা কিছু হয়েছে তার জন্য স্রেফ আওয়ামী লীগকে দোষ দেয়া যাবে না। তাঁর কথা, দোষ অন্যান্য রাজনৈতিক দলেরও। তবে লক্ষ্যণীয় হলো, ২০১৪ সালে নির্বাচনের নামে যে ভয়ানক অপরাধ সংঘটিত হয়েছে -সেটি তিনিও অস্বীকার করতে পারছেন না। তবে সৈয়দ আবুল মকসুদের নিজের অপরাধটি অন্যত্র। সেটি হলো, ভয়ানাক অপরাধীকে অপরাধী গণ্য না করার। জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারের উপর ২০১৪ সালে যে নির্লজ্জ ডাকাতি হলো এবং সে ডাকাতির মূল নায়ক যে আওয়ামী লীগকে সে সত্যটি তিনি তার প্রবন্ধে গোপন করেছেন। এবং ডাকাতদের সামান্যতম নিন্দাও করেননি। অথচ সে ভয়ানাক অপরাধটি ছিল সমগ্র দেশবাসীর বিরুদ্ধে। আজকের রাজনৈতিক সংকটের মূল কারণও সেটি। এতবড় অপরাধের জন্য যারা দায়ী -তাদের শাস্তি না দেয়া তো আরেক অপরাধ। বুদ্ধিজীবীদের এ  অপরাধের কারণে সাহস বাড়ে প্রকৃত অপরাধীদের। অথচ সৈয়দ মকসুদ আহমেদ সে অপরাধ ও অপরাধীর বিরুদ্ধে শাস্তির কথা মুখে আনেননি। বরং আওয়ামী লীগের অপরাধ লঘু করতে তিনি দোষ চাপিয়েছেন অন্যান্য দলের উপরও। আওয়ামী লীগের পরিকল্পিত ভোট ডাকাতির ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিরোধী দলগুলি।  ভাবটা এমন, ঘরে ডাকাতি হলে দোষ শুধু ডাকাতদের নয়, গৃহস্বামীরও। গৃহস্বামীর অপরাধ, ডাকাতদের জন্য দরজা খুলে না দেয়ার। এবং ডাকাতিতে সহযোগিতা না করার। ডাকাত পাড়ায় বিচার বসলে বিচারের রায় তো এরূপই হয়। ২০১৪ সালের ভোট ডাকাতি নিয়ে সেরূপ অভিন্ন রায়টি তাই স্বৈরসেবক প্রতিটি বুদ্ধিজীবীর।

অথচ ২০১৪ সালের নির্বাচনে জনগণকে ভোটকেন্দ্রে আনায় আওয়ামী লীগের সামান্যতম আগ্রহ থাকলে নিরপেক্ষ কেয়ার টেকার সরকারের অধীনে নির্বাচন তারা মেনে নিত। বিরোধী দলের এ দাবী আদৌ অনায্য ছিল না। এ দাবী নিয়ে এক সময় শেখ হাসিনাও প্রচণ্ড আন্দোলন করেছেন। ফলে সে দাবী আজ অনায্য হয় কি করে? বিরোধী দল তো কখনো এ দাবী করেনি, তাদের পছন্দের লোকের হাতে ক্ষমতা দিয়ে নির্বাচন করাতে হবে। তারা তো চেয়েছে স্রেফ নির্দলীয় সরকারের হাতে নির্বাচন। নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের যে সামান্যতম ইচ্ছা নেই -সেটির প্রমাণ শেখ হাসিনা বার বার দিয়ে যাচ্ছেন। জনগণ ইচ্ছামত তাদের ভোট প্রয়োগ করুক সেটি তিনি চান না। বরং চান, যে কোন ভাবে নির্বাচনি বিজয়। জনগণের ভোট তাঁর কাছে সামান্যতম গুরুত্ব পেলে যে নির্বাচনে ১৫৩টি সিটে কোন ভোটকেন্দ্রই খোলা হলো না এবং শতকরা ৫ ভাগ ভোটারও ভোট দিল না -সে নির্বাচনের ফলাফল আওয়ামী লীগের কাছে গ্রহণযোগ্য হয় কি করে? অন্যরাই বা এ নির্বাচনকে স্বীকৃতি দেয় কি করে? কেয়ারটেকার সরকারের বিধান যে বিচারক বিলুপ্ত করেছেন তার কথা এটি সংবিধান বিরোধী। কথা হলো, সংবিধান বিরোধী হলে সেটিকে সহজেই সংশোধন করা যেত। তেমনি একটি সাংবিধানিক সংশোধনীতে কি দেশে বিপর্যয় সৃষ্টি হতো? বিপর্যয় সৃষ্টি হচ্ছে তো সেটি না করায়। অপর দিকে ২০১৮ সালের নির্বাচনে যে ভয়ানক ডাকাতি ঘটলো সেটি তো ২০১৪ য়ের ডাকাতির চেয়েও অভিনব। ২০১৪ সালে বিরোধী দলের উপর দোষ চাপানো হলো নির্বাচনে তারা অংশ না নিলে তাদের কি করার আছে? ২০১৮ সালে বিরোধী দল অংশ নিল। কিন্তু এবার ভোটের আগের রাতে সরকারি ভাণ্ডার থেকে ব্যালেট পেপার ছিনিয়ে সিল মেরে ব্যালট বক্স পূর্ণ করা হলো। নির্বাচনে জনগণকে ভোটদানের অধিকারই দেয়া হলো না।   

 

সমস্যাটি লজ্জা-শরম বিলুপ্তির

সভ্য মানুষের কাছে লজ্জা-শরমেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। তাকে ঈমান ও ইজ্জত নিয়ে বাঁচতে হয়। লজ্জা-শরমের কারণে সাধারণ মানুষ তাই অপরাধে নামে না। নবীজী (সাঃ) লজ্জা-শরমকে ঈমানের অর্ধেক বলেছেন। ফলে লজ্জা-শরম যার নেই, ঈমানের ভাণ্ডারেও তার থাকে প্রচণ্ড শূণ্যতা। শরমের ভয় থাকাতে এমন কি চোর-ডাকাতগণও রাতের আঁধারে লুকিয়ে চুরি-ডাকাতি করে। শরমের কারণে পতিতাও রাজপথে দেহ ব্যবসায়ে নামে না, গোপন আস্তানা খোঁঝে। কিন্তু স্বৈর-শাসকদের সে লজ্জা-শরম থাকে না। ফলে ডাকাতির পণ্য ভোটের উপর ডাকাতিতে তারা নামে দিন-দুপুরে এবং জনসম্মুখে। ফলে সমাজে এরাই হলো সবচেয়ে জঘন্য অপরাধী। এবং সবচেয়ে বড় বেঈমানও। অন্য অপরাধীরা কিছু লোকের সম্পদ ও ইজ্জত লুটে, কিন্তু স্বৈর-শাসক দখলে নেয় সমগ্র দেশ। স্বৈর-শাসক এরশাদ তাঁর সে লজ্জাহীনতা বার বার প্রমাণ করেছেন। সেজন্য যথার্থই তিনি আখ্যায়ীত হয়েছেন বেহায়া ও বেঈমান রূপে। ঝাঁকের কই ঝাঁকে  চলে। বেহায়া এরশাদও তাই স্বৈরাচার বাঁচাতে হাসিনার সাথে জোট বেঁধেছে।

২০১৪ ও ২০১৮ সালের ভোট-ডাকাতির নির্বাচনে প্রমাণিত হলো  স্বৈরাচারি এরশাদের  ন্যায় শেখ হাসিনারও লজ্জা-শরমের বালাই নেই। যা আছে তা হলো ক্ষমতার নেশা। নেশাগ্রস্ততার কারণেই তিনি জনগণের ভোটের অধিকারের উপর ডাকাতি করেছেন দিনের আলোয় হাজার হাজার মানুষের চোখের সামনে। তাই লজ্জাহীন হওয়াটি শুধু ড্রাগ-এ্যাডিক্টদের রোগ নয়; একই রোগ পাওয়ার-এ্যাডিক্টদেরও। সেটিই শেখ হাসিনা বার বার প্রমাণ করে চলেছেন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ডাকাতিটি কোন ব্যক্তি বা দলের বিরুদ্ধে ছিল না, ছিল সমগ্র জনগণের ভোটের উপর। জনগণের কাছে এ ভোটের গুরুত্বটি অপরিসীম। কে সংসদে বসবে বা মন্ত্রী -হবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার অধীকারটি শেখ হাসিনার নয়, সেটির হক একমাত্র জনগণের। জনগণ নিজেদের সে অধীকারটি প্রয়োগ করে রাজস্ব বা শ্রম দিয়ে নয়, বরং ভোট দিয়ে। অথচ শেখ হাসিনারও পছন্দ হয়নি জনগণ সে অধীকারের মালিক হোক। তাই ডাকাতির মাধ্যমে জনগণের সে অধীকারকে তিনি ছিনিয়ে নিয়েছেন। জনগণ পরিনত হয়েছে তাঁর স্বৈরাচারি আচরণের শক্তিহীন নীরব দর্শকে। জনগণের বদলে সংসদের সদস্য নির্বাচন করেছেন তিনি নিজে, সেটি দলীয় মনোনয়ন দিয়ে। রাজা-বাদশাহদের জনগণের ভোটের প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন হয়নি হাসিনার দলের সংসদ সদস্যদেরও। ২০১৪ সালের ভোট ডাকাতির বদৌলতে তারা ৫ বছর সংসদে বসেছেন। ২০১৮ সালে সে মেয়াদেরই নবায়ন করে নিল আরেক ডাকাতি করে।

 

মহামারিটি বিবেকের অঙ্গণে

আওয়ামী ঘরানার বুদ্ধজীবীদের ব্যর্থতাটিও কি কম? জনগণের অধিকারের প্রতি যাদের সামান্যতম দরদ ও শ্রদ্ধাবোধ আছে -তারা কি গুরুতর ভোট-ডাকাতিকে সমর্থন করতে পারে? কিন্তু সে দরদ ও বিবেকের প্রকাশ নেই আওয়ামী ঘরানার বুদ্ধিজীবীদের মাঝে। এখানে মহামারিটি তাদের বিবেকের অঙ্গণে। দেহের মৃত্যুর ন্যায় বিবেকের মৃত্যুও কখনো গোপন থাকে না। বিবেকের সে মৃত্যুটি বাংলাদেশে কতটা ব্যাপক সেটি বুঝা যায় দেশের পত্র-পত্রিকার পৃষ্ঠা, টিভি অনুষ্ঠান ও সেমিনার-সিম্পোজিয়ামের দিকে নজর দিলে। পত্রিকায় যারা লিখেন, সেমিনারে যারা বক্তৃতা দেন বা টিভি অনুষ্ঠানে যারা হাজির হন -তাদের কজনের মাঝে রয়েছে মিথ্যাকে মিথ্যা, অন্যায়কে অন্যায়, স্বৈরাচারকে স্বৈরাচার এবং ভোট-ডাকাতকে ভোট-ডাকাত বলার সামর্থ্য? বরং অধীকাংশই ভোট-ডাকাতদের পক্ষ নেন এবং তাদের অপরাধকে গোপন করেন। সৈয়দ আবুল মকসুদের মত বুদ্ধিজীবীদের লেখা তো তারই দৃষ্টান্ত।

সৈয়দ আবুল মকসুদের ন্যায় বুদ্ধিজীবীগণ কলম ধরার লক্ষ্য, জনগণের আহত স্মৃতির উপর মলম লাগানো। এবং ভোট ডাকাতের ইমেজ থেকে আওয়ামী লীগকে মুক্তি দেয়া। সেটি করতে গিয়ে সৈয়দ আবুল মকসুদ ২০১৪ সালের নির্বাচনে যা কিছু হয়েছে তার জন্য দোষ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলির উপরও চাপিয়েছেন। তবে একাজে সৈয়দ আবুল মকসুদ একা নন। তাঁর ন্যায় বুদ্ধিজীবীদের বিবেকশূণ্যতা এক্ষেত্রে অতি প্রকট। এ বিষয়টি তাদের বিবেচনায় আসে না, ২০১৪ সালে দেশে যে রাজনৈতিক দলগুলি ময়দানে ছিল সেগুলি ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনেও ছিল। তাদের কারণে সে নির্বাচনগুলোতে কি কোন সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিল? গাড়ি খাদে পড়ে তো নেশাগ্রস্ত চালকের কারণে, যাত্রীদের কারণে নয়। বিষয়টি অনুরূপ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বেলায়ও। ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে ভোট ডাকাতি না হওয়ার কারণ, সে নির্বাচনগুলি শেখ হাসিনার ন্যায় কোন পাওয়ার-এ্যাডিক্ট স্বৈর-শাসকের হাতে হয়নি। হয়েছে কেয়ার টেকার সরকারের অধীনে।

নির্বাচনের নামে ২০১৪ ও ২০১৮ সালে যা কিছু হয়েছে তার জন্য অন্য কোন পক্ষ জড়িত ছিল না। জড়িত ছিল একমাত্র শেখ হাসিনার স্বৈরাচারি সরকার। নির্বাচনটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ হোক সেটি কখনোই শেখ হাসিনার উদ্দেশ্য ছিল না। বরং তাঁর পরিকল্পিত উদ্দেশ্য ছিল, প্রশাসনকে ব্যবহার করে তাঁর নিজের দলের প্রার্থীকে বিজয়ী করা। সে পরিকল্পনার অংশ রূপেই নির্বাচনের কিছুকাল আগে খায়রুল হকের ন্যায় একজন আজ্ঞাবাহক বিচারককে দিয়ে তিনি কেয়ারটেকার সরকারের বিধিকে বিলুপ্ত করেন। কিছুকাল পরে সে বিচারককে নিজের রিলিফ ভাণ্ডার থেকে ১০ লাখ টাকার অর্থদানও করেছেন যা পত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছে। ফলে শুরু থেকেই নির্বাচন পরিচালনার জন্য নিরপেক্ষ নির্বাচনি কমিশন ও প্রশাসন গড়ে তোলাটি তাঁর এজেন্ডায় স্থান পায়নি। তাছাড়া কথা হলো, একদলীয় বাকশালী স্বৈরাচারের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিব যাদের কাছে বাঙালী ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব ও অনুকরণীয় আদর্শ তাদের কাছে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন থাকবে সেটিই বা কি রূপে ভাবা যায়? তারা বরং সুযোগ পেলে মুজিবের বাকশালী স্বৈরাচার ফিরিয়ে আনবে -সেটিই তো স্বাভাবিক। সে বাকশালী স্বৈরাচারের কারণেই দেশ বহু রাজনৈতিক দল থাকলে রাজনীতির অঙ্গণে দখলদারি মাত্র একটি দলেরই। সে বিষয়টি বাংলাদেশের নিরক্ষর কৃষক-শ্রমিকও বুঝে। কিন্তু আওয়ামী ঘরানার আবুল মকসুদগণ সেটি ইচ্ছা করেই বুঝতে রাজী নন। এর কারণ, তাদের চেতনার ভূমিতে যে চেতনাটি দখল জমিয়েছে সেটি কোন গণতান্ত্রিক চেতনার নয়; বরং সেটি মুজিবের একদলীয় বাকশালী স্বৈরাচারি আদর্শের।

 

 যে ব্যর্থতা বাঙালী মুসলিমের

ডাকাতদের নেতৃত্ব ও আধিপত্যের মধ্য দিয়ে প্রকাশ ঘটে একটি জনপদের অসভ্যতা। রাস্তা-ঘাট বা দালান-কোঠা দিয়ে সে অসভ্যতা ঢাকা যায় না। মিশরেরর ফিরাউনগণ অসংখ্য এবং বিস্ময়কর পিরামিড গড়েও সে অসভ্যতা ঢাকতে পারিনি। সভ্য মানুষেরা তাই সে বসতি থেকে হয় ডাকাত নির্মূল করে, নতুবা নিজেরাই অন্যত্র চলে যায়। আলো ও আঁধার যেমন একত্রে থাকে না, তেমন সভ্য ও অসভ্য মানুষেরাও কখনোই একত্রে বসবাস করে না। তাই হযরত মুসা (আঃ) ও তাঁর সঙ্গিসাথীগণ নিজেদের ঘরবাড়ী ও সহায়-সম্পদ জালেমদের হাতে ফেলে মিশর ছেড়েছিলেন। হযরত মহম্মদ (সাঃ) ও তাঁর সঙ্গিগণ ছেড়েছিলেন মক্কা। ইসলামে এটিই হলো পবিত্র হিজরত। স্রেফ উলঙ্গতা, ব্যাভিচার, চুরিডাকাতি, সন্ত্রাস, গরুপূজা, মু্র্তিপূজা বা লিঙ্গপূজাই কোন জাতির অসভ্যতার মূল মাপকাঠি নয়। অসভ্যতার অতি গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ভূল মাপকাঠি হলো দেশের উপর স্বৈরাচারি শাসন। কারণ, স্বৈরাচারি শাসন হলো মানুষকে বিবেকহীন, শক্তিহীন ও অসভ্য করার শয়তানের ইন্সটিটিউশন। স্বৈরশাসকদের হাতে অধিকৃত হলে সমগ্র দেশ তখন অসভ্য ডাকাত পাড়ায় পরিণত হয়। অতীতে ডাকাতদের সে অসভ্য সংস্কৃতিই জন্ম দিয়েছে উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদ। আজও সে সংস্কৃতি বিলুপ্তি হয়নি।

ঈমান-আমল ও মানব জীবনের শ্রেষ্ঠ গুণের পরিমাপটি স্রেফ নামায-রোযা, হজ-যাকাত ও দান-খয়রাত দিয়ে হয় না। সে সামর্থ্য বহু পাপী ও বহু মুনাফিকেরও থাকে। সে বিচারটি নির্ভূল ভাবে হয় রাষ্ট্রের বুক থেকে স্বৈরশাসনের অসভ্যতা নির্মূলে ব্যক্তির জান ও মালের বিনিয়োগ থেকে। নিজের স্বার্থ-উদ্ধারের লক্ষ্যে মানুষ এ ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বড় আপোষটি করে এবং অসভ্য স্বৈরাচারের সমর্থকে পরিণত হয়। এমন কি ধর্মের লেবাসধারিরাও। এজন্যই এজিদেরা তাদের দুর্বৃত্তিতে কখনো একাকী ছিল না। অথচ দুর্বৃত্তদের নির্মূলে কে কতটা অংশ নিল -সেটিই হলো ঈমান যাচায়ে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে ঘোষিত লিটমাস টেস্ট। সেটির ঘোষণা এসেছে পবিত্র কোরআনের সুরা আল ইমরানের ১১০ নম্বর আয়াতে। বলা হয়েছে, তোমাদের (মুসলিমদের) উত্থান ঘটানো হয়েছে সমগ্র মানব জাতির জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ জাতির মডেল রূপে। তোমরা প্রতিষ্ঠা করো ন্যায়ের এবং নির্মূল করো অন্যায়ের। এবং তোমরা ঈমান রাখো আল্লাহর উপর। অতএব মুসলিমদের সর্বশ্রেষ্ঠ জাতির মর্যাদা এজন্য নয় যে, তারা বেশী বেশী নামায পড়ে, রোযা রাখে বা পাড়ায় পাড়ায় মসজিদ গড়ে। বরং এজন্য যে, তারা অন্যায়কে নির্মূল করে এবং ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করে। এবং মহান আল্লাহতায়ালার উপর অটল বিশ্বাস রাখে। বাংলাদেশ যখন দুর্নীতিতে বার বার বিশ্বে প্রথম হয়, তখন ঘটে উল্টোটি। তখন প্রকাশ পায়, বাঙালী মুসলিমের গভীর ব্যর্থতা।

 

সর্বশ্রেষ্ঠ নেককর্ম এবং সর্বশ্রেষ্ঠ বিপ্লব

সুরা আল ইমরানের উপরুক্ত ১১০ নম্বর আয়াত থেকে অপর যে বিষয়টি সুস্পষ্ট বুঝা যায় সেটি হলো, মানব জীবনে সবচেয়ে বড় নেক কর্ম এবং রাষ্ট্রের বুকে সবচেয়ে বড় বিপ্লবটি কোটি কোটি টাকার দান খয়রাতে হয় না। বহুকোটি টাকার দান-খয়রাত বহু কাফেরও করে। বরং সর্বশ্রেষ্ঠ নেককর্মের শুরুটি হয় ব্যক্তির বিবেক ও জিহবা থেকে। বিবেকের দ্বারা সে নেক কাজটি হয় অন্যায়কে অন্যায় এবং সত্যকে সত্য রূপে চেনার মধ্য দিয়ে। বিবেকের ভূমিতে সে বিশাল বিপ্লবের কাজটি করে পবিত্র কোরআনের জ্ঞান। পবিত্র কোরআনের জ্ঞানার্জন এজন্যই প্রতিটি নর-নারীর উপর ফরজ। এ ফরজ পালন ছাড়া কোন ব্যক্তির পক্ষে সভ্যতর মানব রূপে গড়ে উঠা অসম্ভব। সভ্যতর সমাজ বা রাষ্ট্র গড়ার মহাবিপ্লবের শুরু তো এখান থেকেই। বাঙালী মুসলিমের ব্যর্থতার কারণও মূলতঃ এখানে।

সত্যকে সত্য রূপে এবং মিথ্যাকে মিথ্যা রূপে চেনার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় মানব জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সামর্থ্যের। ব্যক্তির বিবেকে সে সামর্থ্য না থাকলে মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশিত সত্য দ্বীন এবং মানব জীবনের মূল মিশনটিও অজানা থেকে যায়। তখন শয়তানের মিশনকে তারা নিজ জীবনের মিশন বানিয়ে নেয়। এর ফলে সমাজ ও রাষ্ট্র জুড়ে প্রতিষ্ঠা পায় ধর্ম ও মতবাদের নামে নানারূপ মিথ্যাচার ও অসভ্যতা। দেশে দেশে রাজনৈতিক মতবাদের নামে জাতীয়তাবাদ, বর্ণবাদ, ফ্যাসিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ এবং ধর্মের নামে শাপপূজা, লিঙ্গপূজা, গরুপূজা ও মুর্তিপূজার ন্যায় নানারূপ সনাতন মিথ্যা ও আদিম অসভ্যতা তো বেঁচে আছে বিবেকের সে অসামর্থ্যের কারণেই। অপর দিকে নেক আমলে এবং সমাজ বিপ্লবে জিহবার সামর্থটিও বিশাল। ব্যক্তির জিহবা শক্তিশালী হাতিয়ার রূপে কাজ করে সত্যের পক্ষে ও মিথ্যার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার মধ্য দিয়ে। বিবেক ও জিহবার সে সামর্থ্যের বলেই একজন ঈমানদার যেমন জনসম্মুখে কালেমায় শাহাদত পাঠ করে, তেমনি দুর্বৃত্ত স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধেও আমৃত্য সৈনিক রূপে খাড়া হয়। প্রবল বিক্রমে সে প্রতি অঙ্গণে সাক্ষ্য দেয়, মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর দ্বীনের পক্ষে। এরাই স্বৈরশাসকের নির্মূলে এবং সত্যদ্বীনের প্রতিষ্ঠায় নিজের জান ও মাল নিয়ে জিহাদে নামে।

নবী-রাসূলদের মূল কাজ তো ব্যক্তির বিবেক ও জিহবার সামর্থ্য বৃদ্ধি। এ কাজে মূল হাতিয়ারটি হলো পবিত্র ওহীর জ্ঞান। জ্ঞানের সে সমৃদ্ধিতেই ঘটে মানব জীবনে সর্বশ্রেষ্ঠ বিপ্লব। তখন ব্যক্তি খুঁজে পায় সিরাতুল মুস্তাকীম। জ্ঞান-সমৃদ্ধ বিবেকের সামর্থ্যেই ব্যক্তি পায়, সত্যকে চেনা ও জান্নাতের পথে চলার সামর্থ্য। নইলে মানুষ যেমন বিবেকহীন হয়, তেমনি মিথ্যাবাদী এবং দুর্বৃত্তও হয়। এমন বিবেকহীন মানুষই স্বৈরশাসকের সেবাদাসে পরিণত হয়। নবী-রাসূলগণ অর্থশালী ছিলেন না, তারা বড় বড় নেক কাজ করেছেন তাদের জ্ঞানসমৃদ্ধ বিবেক দিয়ে ও সাহসী জিহবা দিয়ে। তাঁরা জিহবাকে কাজে লাগিয়েছেন নির্ভয়ে জ্ঞানদানে ও সত্যের পক্ষে সাক্ষদানে। তাদের জ্ঞান-সমৃদ্ধ সে বিবেক ও জিহবা নিয়োজিত হয়েছিল অন্যায়, অসত্য ও স্বৈরাচার নির্মূলে। তাঁরা বীরদর্পে দাঁড়িয়েছেন স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে। সে কাজ করতে গিয়ে হাজার হাজার নবী-রাসূল শহীদ হয়েছেন। সাহাবাগণ তাদের পথ বেয়েই সামনে এগিয়েছেন। এবং তাদের প্রচেষ্ঠাতেই নির্মিত হয়েছে মানব সভ্যতার সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা।

আখেরাতে যারা জাহান্নামের বাসিন্দা হবে তাদের অধিকাংশ যে মানুষ খুন বা ব্যাভিচারের জন্য সেখানে যাবে -তা নয়। তারা সেখানে পৌঁছবে মিথ্যার পক্ষে সাক্ষী দেয়া এবং মিথ্যা-সেবী অপরাধীদের দলে শামিল হওয়ার কারণে। এরূপ মিথ্যা-সেবীদের খাসলত, তারা নিজেদের জিহবাকে ব্যবহার করে জালেম  সরকারের পক্ষে জিন্দাবাদ বলায়। বিবেককে ব্যবহার করে জাতিয়তাবাদী ও ফ্যাসিবাদী সরকারের পক্ষে সাফাই গাওয়া, মিছিল করা ও ভোট দেয়ার কাজে। বাংলাদেশে রাজনীতির নামে এমন অপরাধই তো বেশী বেশী হচ্ছে। এখানেই বাঙালী মুসলিমের বিশাল ব্যর্থতা। সে ব্যর্থতার কারণে অপরাধী স্বৈরশাসকগণ যেমন সমর্থণ পায়, ভোট পায় এবং অর্থ পায়, তেমনি ভ্রষ্ট মতবাদ, দূষিত শিক্ষা-সংস্কৃতি এবং শরিয়ত বিরোধী আইনও প্রতিষ্ঠা পায়। বস্তুতঃ এরূপ বিবেকহীনদের বিপুল সংখ্যার কারণেই বাংলাদেশে ইসলামের শত্রুপক্ষের লোকবলের অভাব হচ্ছে না। এতে পরাজয় বাড়ছে যেমন ইসলামের, তেমনি পাপ বাড়ছে মুসলিমদের। কথা হলো, স্রেফ নামায-রোযা পালন বা মসজিদ-মাদ্রসা গড়ে কি পরকালে এ পাপের শাস্তি থেকে মুক্তি মিলবে?

বাংলাদেশের মুসলিমগণ বিশেষ করে আলেমগণ বেশী বেশী নবীজী (সাঃ)র সূন্নতের কথা বলে। প্রশ্ন হলো, নবীজী (সাঃ)র সূন্নত কি স্রেফ নামায-রোযা, হজ-যাকাত, দান-খয়রাত, লম্বা জোব্বা বা দাড়ি টুপি?  সেটি কি স্রেফ মসজিদ-মাদ্রসার প্রতিষ্ঠা? সেটি তো জিহাদ। সেটি তো মহান আল্লাহতায়ালার কোরআনী বিধানের প্রতিষ্ঠায় জানমালের কোরবানী। সেটি দুর্বৃত্ত শাসকের নির্মূল ও শরিয়তি শাসনের প্রতিষ্ঠা। একমাত্র এভাবেই তো আসে ইসলামের  বিজয়। নবীজী (সাঃ)র সাহাবায়ে কেরামের যুগকে মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ যুগ বলা হয়। কিন্তু কেন সেটি সর্বশ্রেষ্ঠ যুগ? সে আমলে আজকের ন্যায় এতবড় বিশাল মুসলিম জনসংখ্যা ও এত মসজিদ-মাদ্রাসা ছিল না। তাদের গৌরবের  মূল কারণ, একমাত্র তাদের আমলেই পূর্ণাঙ্গ ভাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল ইসলামের শরিয়তি বিধান, হুদুদ,জিহাদ, খেলাফত ও শুরাভিত্তিক শাসনএবং নির্মূল হয়েছিল স্বৈরাচারি অসভ্যতা। এটিই ছিল মানব ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ বিপ্লব। সে বিপ্লব সফল করতে শতকরা ৭০ ভাগ সাহাবী শহীদ হয়েছিলেন। নবীজী (সাঃ) জিহাদের ময়দানে নেমেছেন এবং তিনি নিজে আহত হয়েছেন। বাংলাদেশের ওলামাগণ নবীজী (সাঃ)র প্রতি মহব্বত ও তাঁর সূন্নত পালনের কথা বললেও তাদের জীবনে সে সূন্নত নেই। পবিত্র কোরআনের জ্ঞান, ৫ ওয়াক্ত নামায, মাসব্যাপী রোযা, হজ-যাকাত, দান-খয়রাত ও নানারূপ ইবাদতের উদ্দেশ্য তো তেমন একটি নৈতীক ও রাজনৈতিক বিপ্লবের জন্য ঈমানদারকে প্রস্তুত করা। বাঙালী মুসলিমেদর দ্বারা সে কাজটি হয়নি। বাংলাদেশের মাটিতে ইসলামের শত্রুপক্ষের প্রতিপত্তি ও বিজয়ই বলে দেয়, ১৬ কোটি বাঙালী মুসলিমের ব্যর্থতাটি কত বিশাল। তাদের সে ব্যর্থতা আনন্দ বাড়িয়েছে ইসলামের শত্রুদের। আর শত্রুর বিজয় মুসলিম জীবনে দুঃসহ আযাব আনবে -সেটিই তো স্বাভাবিক। ৮/৭/২০১৮; নতুন সংস্করণ ১৯/০৩/২০১৯   Tweet:@drfmkamal; facebook.com/firozkamal

 




বাংলাদেশে স্বৈরাচারি অসভ্যতা ও মৃত গণতন্ত্র

মৃত গণতন্ত্র ও অসভ্যতা

বাঁচার অধিকার, মতপ্রকাশের অধিকার এবং দেশের ভাগ্য নির্ধারণে নাগরিকদের মৌলিক অধিকারকে কবরে পাঠিয়ে যে বাঁচা -তাতে সভ্য ভাবে বাঁচার কাজটি হয় না। সেটি নিরেট বর্বর যুগের অসভ্যতা। সে অসভ্যতা তাদের হাতেই প্রচণ্ড রূপ লাভ করে যাদের যুদ্ধের মূল লক্ষ্য জনগণের অধিকার হনন। বাংলাদেশের মাটিতে জনগণের অধিকার নির্মূলের যুদ্ধটি প্রথম শুরু করেন শেখ মুজিব। সে যুদ্ধে তিনি বিজয় লাভ করেন একদলীয় বাকশালের প্রতিষ্ঠা ও বহুদলীয় গণতন্ত্রকে কবরে পাঠানোর মধ্য দিয়ে। গণতন্ত্র বলতে আওয়ামী লীগ যা বুঝে তা হলো ১৯৭৩, ২০১৪ এবং ২০১৮’য়ের ভোট ডাকাতির নির্বাচন। এসব নির্বাচনে জনগণের স্বাধীন রায় দেয়ার অধিকার যেমন দেয়া হয়নি, তেমনি বিরোধীদের জন্য সংসদে কোন স্থানও রাখা হয়নি। শেখ মুজিবের মৃত্যু ঘটেছে। কিন্তু গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের যুদ্ধ থামেনি। বরং সে যুদ্ধের ধারাবাহিকতায় বাকশালী চেতনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে আজ শুধু জীবিতই নয়, এক বিজয়ী আদর্শে পরিণত হয়েছে। চলমান এ যুদ্ধে তাদের প্রতিপক্ষ হলো জনগণ। তাদের লক্ষ্য স্রেফ দেশকে অধিকৃত রাখা নয়, জনগণকে পরাজিত এবং নিরস্ত্র রাখাও। আরো লক্ষ্য হলো, তাদের বিদেশী  প্রভু ভারতকে খুশি রাখা। স্বৈরশাসকগণ জানে, জনগণের মোক্ষম  অস্ত্রটি ঢাল-তলোয়ার বা গোলাবারুদ নয়, সেটি হলো ভোট। সে ভোট দিয়েই জনগণ তাদের ইচ্ছামত কাউকে ক্ষমতায় বসায়, কাউকে নামায় এবং কাউকে আস্তাকুঁড়ে ফেলে। গণতন্ত্রে জনগণের শক্তি তাই বিশাল। এ শক্তিবলে বড় বড় স্বৈরশাসককে জনগণ অতীতে আস্তাকুঁড়ে ফেলেছে। এজন্যই প্রতিটি স্বৈরশাসক গণতন্ত্রকে ভয় পায়। তারা জনগণের ভোটে ক্ষমতাচ্যুৎ হওয়া থেকে বাঁচতে চায়। তাদের লক্ষ্য তাই জনগণের হাত থেকে ভোটের অধিকার কেড়ে নেয়া। ফলে  স্বৈরশাসক মাত্রই গণতন্ত্রের চিরশত্রু। স্বৈরতন্ত্র ও গণতন্ত্র –এ দুটি কখনোই একই ভূমিতে একত্রে বাঁচে না; একটির বাঁচা মানেই অপরটির মৃত্যু। জনগণের ভোটের অধিকার, মিছিল-মিটিং করার অধিকার ও মৌলিক মানবিক অধীকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও নৃশংস সহিংসতা ছাড়া স্বৈরশাসনের মৃত্যু তাই অনিবার্য়। গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে আওয়ামী বাকশালীদের লাগাতর ষড়যন্ত্র ও যুদ্ধের মূল কারণ তো এটিই।

বাংলাদেশের ইতিহাসে আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রকে তিনবার কবরে পাঠিয়েছে। প্রথমে কবরে পাঠানোর কাজটি করেন শেখ মুজিব নিজে; সেটি সকল বিরোধী দল নিষিদ্ধ করে একদলীয় বাকশালী স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। লক্ষ্যণীয় হলো, মুজিবের হাতে গণতন্ত্র হত্যার সে গণবিরোধী গর্হিত কর্মটি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কাছে কোনদিনই নিন্দনীয় গণ্য হয়নি। বরং তাদের কাছে গণতন্ত্র হত্যার সে স্বৈরাচারি নায়ক গণ্য হয় শ্রেষ্ঠ আদর্শ রূপে, এমনকি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী রূপে! ফলে এতে প্রমান মেলে,গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থানটি স্রেফ মুজিবের একার ছিল না, সেটিই ছিল আওয়ামী লীগের দলগণ অবস্থান। দলটি দ্বিতীয়বার গণতন্ত্র হত্যার কাজটি করে ১৯৮২ সালে; সেটি নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আব্দুস সাত্তারের বিরুদ্ধে জেনারেল এরশাদের সামরিক অভ্যুত্থানকে সমর্থণের মধ্য দিয়ে। লক্ষ্যণীয় হলো, সামরিক অভ্যুত্থানকে নিন্দা করাই বিশ্বের তাবত গণতান্ত্রিক শক্তির রীতি। কারণ, সামরিক অভ্যুত্থানে কোন দেশেই গণতন্ত্র বাঁচেনি, বরং সামরিক অভ্যুত্থানই হলো দেশে দেশে স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠার মূল হাতিয়ার। ফলে সামরিক জান্তাদের হাতে গণতন্ত্র হত্যার সে বর্বর কাজটিকে নিন্দার সামর্থ্য না থাকলে তাকে গণতন্ত্রী বলাটি মূলতঃ গণতন্ত্রের সাথে দুশমনি। গণতান্ত্রিক চেতনার মূল্যায়নে এটি হলো লিটমাস টেস্ট। কিন্তু সে টেস্টে আওয়ামী লীগ ফেল করেছে। কারণ, স্বৈরাচারি এরশাদের সামরিক অভ্যুত্থানকে আওয়ামী লীগ নিন্দা না করে বরং সমর্থন করেছে। এবং আজও গণতন্ত্র-হত্যাকারি স্বৈরাচারি এরশাদই হলো শেখ হাসিনার ঘনিষ্ট রাজনৈতিক মিত্র। এ হলো আওয়ামী লীগের স্বৈরাচার প্রীতির নমুনা। গণতন্ত্রকে তৃতীয়বার এবং সবচেয়ে বেশী কালের জন্য কবরে পাঠিয়েছেন দলটির বর্তমান নেত্রী শেখ হাসিনা। সেটি ২০১৪ সালে ভোট-ডাকাতি ও ভোটাবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে। জনগণের ভোটের ভাণ্ডারে শেখ হাসিনা পুণরায় ডাকাতি করে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরে। ডাকাতগণ কখনোই নিজেদের নৃশংস ডাকাতি নিয়ে লজ্জাবোধ করে না। বরং প্রচণ্ড গর্ববোধ করে সফল ডাকাতির। এজন্যই হাসিনার মুখে সব সময়ই খুশি খুশি তৃপ্তির হাঁসি। রায় দানের অধিকার ছিনতাইয়ের পর জনগণের কাজ এখন হাসিনার ফেরেশতা সুলভ কথা এবং হাসির মহড়া দেখা। এটিই তো স্বৈরাচারের রীতি। বাংলাদেশে নবী-রাসূলকে নিন্দা করলে শাস্তি হয় না। কিন্তু হাসিনার নিন্দা করলে জেলে যেতে হয়।

সামরিক অভ্যুত্থানে যেমন গণতন্ত্র বাঁচে না, তেমনি ভোট-ডাকাতিতেও গণতন্ত্র বাঁচে না। ফলে কেয়ার টেকার গভর্নমেন্টের হাত ধরে যে গণতন্ত্র কবর থেকে ফিরে এসেছিল -সেটি আবার হাসিনার হাতে নিহত ও কবরে শায়ীত। তবে ভোট ডাকাতি ও গণতন্ত্র হত্যাই শেখ হাসিনার একমাত্র অপরাধ নয়। তিনি তাঁর পিতার বাকশালকে প্রতিষ্ঠা করেছেন এক নতুন আঙ্গিকে। শেখ মুজিব সকল বিরোধী দলকে বিলুপ্ত করেছিলেন এবং নিষিদ্ধ করেছিলেন সকল বিরোধী দলীয় পত্রপত্রিকা। শেখ হাসিনা বিরোধী দলগুলিকে বিলুপ্ত না করে বিলুপ্ত করেছেন বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের মৌলিক মানবিক অধিকার। কেড়ে নিয়েছেন সভাসমিতি, মিছিল, জনসংযোগের অধিকার। নিষিদ্ধ করেছেন আমার দেশ, দিগন্ত টিভি, ইসলাম টিভি। ফলে বিরোধীদলগুলো নামে বাঁচলেও বিলুপ্ত হয়েছে সংসদ, রাজপথ ও মিডিয়া থেকে। গণতন্ত্র নির্মূলে শেখ হাসিনা তাঁর পিতা থেকেও বহু ধাপ এগিয়ে গেছেন। বিরোধী দলের মিটিংয়ে গুলি চালাতে ও বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের হত্যায় শেখ মুজিব কখনো সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করেননি। সে কাজে তাঁর ছিল একটি মাত্র বাহিনী, সেটির নাম ছিল রক্ষিবাহিনী। কিন্তু শেখ হাসিনা রক্ষি বাহিনী না গড়ে সেনাবাহিনী, বিজিবী, পুলিশ ও RAB (রাপিড আকশন ব্যাটিলন)কে রক্ষিবাহিনীতে পরিণত করেছেন। ২০১৩ সালের ৫ই শাপলা চত্ত্বরে হিফাজতে ইসলামের বিরুদ্ধে গণহত্যায় গোলাবারুদ ও ভারী মেশিন গান নিয়ে সাত হাজারের বেশী সশস্ত্র সেপাই যোগ দিয়েছিল। তারা এসেছিল উপরুক্ত চারটি বাহিনী থেকে।

জনগণের ভোটাধীকারের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার ঘৃণা কতটা তীব্র সেটি বুঝা যায় ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি এবং ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে সংসদের ১৫৩টি সিটে তিনি ভোটকেন্দ্র খোলার প্রয়োজন বোধ করেননি। অপর দিকে ২০১৮ সালের নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র খোলা হলেও ব্যালট পেপার ছিনতাইয়ের কাজটি পূর্বের রাতেই সমাধা করা হয়। ফলে ভোট কেন্দ্রে গিয়ে ভোট না দিয়েই ভোটারদের ফিরে আসতে। মানব ইতিহাসে গণতন্ত্র হত্যার এ এক নয়া রেকর্ড। ঘৃনা সব সময়ই ঘৃনার জন্ম দেয়। গণতন্ত্রের প্রতি শেখ হাসিনার মনে যে ঘৃণা তা জনগণের মনে প্রচণ্ড ভাবে জন্ম দিয়েছে তাঁর স্বৈর শাসনের বিরুদ্ধে ঘৃণা। সে ঘৃণার তীব্র প্রকাশ ঘটেছিল তার আয়োজিত ২০১৪ সালের নির্বাচন বয়কট করার মধ্য দিয়ে। ফলে ২০১৪ সালের নির্বাচনে শতকরা ৫ ভাগ ভোটারও ভোট দেয়নি।

নির্বাচনের লক্ষ্য তো জনগণের রায় নেয়া। সেটি অর্জিত না হলে কি তাকে নির্বাচন বলা যায়? বিশ্বের আর কোন দেশে কোন কালেই কি এরূপ ভোটারহীন নির্বাচন এবং ব্যালট পেপার ছিনতাইয়ের নির্বাচন হয়েছে? অথচ শেখ হাসিনা তো তাতেই খুশি। শেখ হাসিনার লক্ষ্য ছিল তাঁর দলের বিজয়, নির্বাচন কতটা সুষ্ঠ বা নিরপেক্ষ হলো এবং জনগণ তাতে কতটা অংশ নিল –তা নিয়ে তাঁর সামান্যতম আগ্রহ ছিল না। এ হলো তাঁর গণতন্ত্রের নমুনা। গণতন্ত্র হত্যায় আওয়ামী লীগ এভাবে স্বৈরাচারি এরশাদের চেয়েও বহুধাপ নিচে নেমেছে। ভোটারগণ তো তখনই ভোটকেন্দ্রে আসে যখন নির্বাচনে বিরোধীদল অংশ নেয়, নির্বাচনে প্রতিযোগিতা হয় এবং তারা নিজেদের পছন্দের প্রার্থীর বিজয়ে সম্ভাবনা দেখে। কিন্তু যে নির্বাচনের পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্য হলো, স্রেফ সরকারি দলকে যে কোন রূপে বিজয়ী করা –সে নির্বাচনে জনগণ ভোটকেন্দ্রে আসবে কেন? এজন্যই স্বৈরশাসকের আয়োজিত নির্বাচনগুলি নিতান্তই প্রহসন ও গণতন্ত্রের সাথে মশকরা ভিন্ন অন্য কিছু নয়।

 

স্বৈরাচারঃ অসভ্যতার প্রতীক

সভ্যতার ন্যায় অসভ্যতার নিজস্ব আলামত আছে। সেটি শুধু জন্তু-জানোয়ারের ন্যায় বনেজঙ্গলে বা গুহায় বসবাস নয়। বরং সে নিরেট অসভ্যতার প্রকাশটি বাড়ি-গাড়ি, রাস্তাঘাট ও অফিস-আদালতে পরিপূর্ণ আধুনিক শহরেও হতে পারে। বন-জঙ্গলের ন্যায় এসব শহরেও তখন বিলুপ্ত হয় ন্যায়-নীতি, আইন-আদালত ও ন্যূনতম মানবিক মূল্যবোধ। অসভ্যতার সে আয়োজনে কাজ করে সন্ত্রাসের শক্তি। যার শক্তি আছে সে যাকে ইচ্ছা তাকে ধরতে পারে, গুম করতে পারে, খুন করতে এবং ধর্ষণও করতে পারে। রিমান্ডে নিয়ে দিনের পর দিন নির্যাতনও করতে পারে। সে অসভ্যতায় এমন কি ৭-৮ বছরের বালিকাকে ধর্ষিতা হতে পারে। এমন কি বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গণে ধুমধামে শত নারী ধর্ষণের উৎসবও করতে পারে –যেমনটি শেখ হাসিনার প্রথমবার ক্ষমতায় আসাতে জাহাঙ্গির নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ নেতা করেছে। পত্রিকায় সে খবর ফলাও করে প্রকাশও পেয়েছে। এ অসভ্যতার আরো আলামত হলো, জঙ্গলে কেউ গুম, খুন বা ধর্ষিতা হলে যেমন বিচার বসে না, তেমনি আধুনিক অসভ্যতাতেও অপরাধীদের বিরুদ্ধে কোন বিচার বসে না। তাই বাংলাদেশের রেকর্ড শুধু দুর্বৃত্তিতে ৫ বার বিশ্বচাম্পিয়ান হওয়ায় নয়, বরং দুর্বৃত্তদের বিচার না করারও।  জঙ্গলের অসভ্যতায় ভাল-ভালুকের সামনে ছাগল-ভেড়ার জীবনে নিরাপত্তা থাকে না। তেমনি স্বৈরাচারের অসভ্যতায় নিরাপত্তা থাকে না নিরীহ সাধারণ মানুষের -বিশেষ করে সরকারবিরোধীদের। আদিম অসভ্যতার ন্যায় এখানেও হুকুম চলে একমাত্র দলীয় প্রধান বা স্বৈরশাসকের। অন্যরা পরিণত হয় চাকর-বাকরে। রাষ্ট্রের অর্থ, অস্ত্র এবং সকল সামরিক ও প্রশাসনিক শক্তি পরিণত হয় স্রেফ স্বৈরশাসকের ত্রাস সৃষ্টির হাতিয়ারে।

তবে বন-জঙ্গলের অসভ্যতা ও স্বৈরাচারের অসভ্যতার মাঝে মৌলিক কিছু পার্থক্যও আছে। হিংস্র জন্তুর সহিংসতায় থাকে নিছক প্রাণ বাঁচানোর তাগিদ। পেট পূর্ণ হলে তারা শিকার ধরে না। শিকার হত্যায় পশুদের মাঝে একটি নিয়ন্ত্রন দেখা যায়। ফলে বনে জঙ্গলে কখনো লাশ পড়ে থাকে না। ফলে গণনির্মূলের ন্যায় জঙ্গলে কখনো পশুনির্মূল হয় না। তাই পশুদের নৃশংসতায় স্ব-আরোপিত নিয়ন্ত্রণ থাকে। অথচ সেরূপ নিয়ন্ত্রণ থাকে না স্বৈরাচারের অসভ্যতায়। এজন্যই কোন দেশের বনজঙ্গলে বিপুল সংখ্যক হিংস্র পশুর বসবাস হলেও তাতে দেশ অসভ্যতায় ইতিহাস গড়ে না। কিন্তু সেটি হয় দেশের লোকালয়ে স্বৈরাচারি নেতাকর্মীদের সংখ্যা বাড়লে। স্বৈরাচারি নেতাকর্মীগণ নৃশংসতায় নামে স্রেফ প্রাণ বাঁচাতে নয়, বরং নিজেদের জুলুমবাজীর সংস্কৃতি বাঁচাতেও। কারণ জুলুমবাজী না বাঁচলে তাদের স্বৈর শাসন বাঁচে না। ফলে গুম, খুন, গণগ্রেফতার, গণহত্যা, গণনির্মূল –এসবই স্বৈরাচারি অসভ্যতার সহজাত সংস্কৃতি।  এবং থাকে সে নৃশংস অসভ্যতাকে একটি সভ্য রূপ দেওয়ার আয়োজন। সে অসভ্যতা বাঁচাতে যেমন নিত্য নতুন আইন তৈরী করা হয়, তেমনি আদালত বসিয়ে বিচারের নামে প্রহসনও হয়। এসব কিছুই হয় বিরোধীদের নির্মূলের কাজকে বৈধতা দিতে। যেমন রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে নৃশংস গণহত্যা ও উচ্ছেদের ন্যায় নিরেট অসভ্যতাকে আইনসিদ্ধ করতে মায়ানমারে আইন তৈরী করা হয়েছে। অনুরূপ রাষ্ট্রীয় অসভ্যতার কারণেই জার্মানীতে বহু লাখ ইহুদীকে গ্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে হত্যা করাকেও আইনের শাসন বলা হয়েছে। তেমনি বাংলাদেশেও আইনের শাসন রূপে গণ্য হয়েছে ঢাকার শাপলা চত্ত্বরে হিফাজতে ইসলামের শত শত কর্মীকে নিহত ও আহত এবং হত্যা শেষে তাদের লাশ গুম করার ন্যায় অসভ্যতা। একই রূপ আইনের শাসনের নাম করে জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের ফাঁসিতে ঝুলানো হয়েছে। আইনের শাসনের দোহাই দিয়ে বিরোধী দলীয় নেতা-নেত্রীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে এবং তাদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা খাড়া করা হচ্ছে। এভাবে আইন-আদালত ও প্রশাসন পরিণত হয়েছে স্বৈরাচারি অসভ্যতাকে দীর্ঘজীবী করার হাতিয়ারে।

 

কোয়ালিশন স্বৈরাচারি শক্তির

গণতন্ত্রের প্রাণ হলো, কে দেশের শাসক হবে সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের রায় নেয়া। সেটি না হলে মৃত্যু ঘটে গণতন্ত্রের। অথচ ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে জনগণ সে রায় দেয়নি। এমন নির্বাচন বার বার হলেও তাতে গণতন্ত্র বাঁচে না। ফলে যারা ক্ষমতায় বসেছে তারা গণতন্ত্রের নিজস্ব সংজ্ঞায় পুরাপুরি অবৈধ। জনগণের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা থাকলে এবং সামান্যতম আত্মসম্মান থাকলে এমন প্রহসনের নির্বাচনকে ভিত্তি করে কেউ কি ক্ষমতায় বসতে পারে? আত্মসম্মান ও জনগণের প্রতি শ্রদ্ধা না থাকাতেই ডাকাতগণ অন্যের গৃহে ঢুকে এবং তাদের সর্বস্ব ছিনিয়ে নেয়। একই রোগ তো স্বৈর শাসকের। একই রোগ সামরিক জান্তাদেরও। তারাও জনগণের অনুমতি না নিয়েই রাষ্ট্রের ঘরে ঢুকে। জনগণের শাসক রূপে নিজেদের ঘোষনা দেয়। ফলে যাদের মধ্যে সততা, মানবতা ও সামান্যতম বিবেকবোধ আছে এবং জনগণের মৌলিক অধিকারকে যারা সমর্থন করে -তারা কখনোই স্বৈরাচারের পক্ষ নেয় না। পক্ষ নেয় না সামরিক স্বৈরশাসকেরও। অথচ বাংলাদেশ গণতন্ত্র মারা পড়েছে যেমন স্বৈরশাসকের অধীনে অনুষ্ঠিত ভূয়া নির্বাচনে, তেমনি সামরিক অভ্যুর্থানে। আরো লক্ষ্যণীয় হলো, বাংলাদেশে গণতন্ত্র হত্যার সবগুলি অপরাধের সাথেই আওয়ামী লীগ জড়িত। এমন কি পাকিস্তানী আমলেও দলটির ভূমিকা আদৌ কম কদর্যপূর্ণ ছিল না। আওয়ামী লীগের নেতারা ঢাকার প্রাদেশিক আইন পরিষদের ডেপুটি স্পীকার জনাব শাহেদ আলিকে সহিংস ভাবে হত্যা করেছিল। এবং সে হত্যাকাণ্ডের তারা বিচার করেনি। লক্ষণীয় হলো, পাকিস্তানের অন্য কোন প্রদেশের আইন পরিষদের অভ্যন্তরে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড কখনোই ঘটেনি; কারণ সেসব প্রদেশের সংসদে আওয়ামী লীগ ছিল না।

আওয়ামী বাকশালীদের বর্তমান যুদ্ধটি মূলতঃ সে সব বিরোধী দলের বিরুদ্ধে যারা গণতন্ত্রকে কবর থেকে আবার ফিরিয়ে আনতে চায়। গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে এ যুদ্ধ চালিয়ে নিতে শেখ হাসিনা কোয়ালিশন গড়েছেন এরশাদের ন্যায় এক সাবেক স্বৈরশাসকের সাথে। সাথে নিয়েছেন গণতন্ত্র বিরোধী ও গণবিচ্ছিন্ন বামপন্থিদের। আওয়ামী বাকশালীদের এরূপ গণবিরোধী ভূমিকার কারণে গণতন্ত্র চর্চায় তুরস্কো, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মালদ্বীপ, তিউনিসিয়া, লেবানন, নাইজিরিয়ার মত মুসলিম দেশগুলি বহুদূর এগিয়ে গেছে। এগিয়ে গেছে শ্রীলংকা, নেপাল, ভুটানের ন্যায় দেশগুলিও। অথচ বাংলাদেশ রয়ে গেছে ৪৬ বছর পূর্বের মুজিব-প্রবর্তিত স্বৈরাচারি বাকশালী জামানায়। বাংলাদেশীদের আজকের পিছিয়ে পড়া নিয়ে বহুশত বছর পরও নতুন প্রজন্মের মনে নিশ্চয়ই প্রশ্ন উঠবে এবং সে সাথে ধিক্কারও উঠবে, “আমাদের পূর্বপুরুষগণ কি এতই অসাধু ছিল যে, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ন্যায় সভ্য কাজের সামান্য সামর্থ্যও তাদের ছিল না? অভিযোগ উঠবে, জনগণ কি এতই অযোগ্য ছিল যে, ব্যর্থ হয়েছে গণতন্ত্রের শত্রু নির্মূলে?”

প্রশ্ন হলো, আগামী প্রজন্মের দরবারে সে ইজ্জতের ভাবনা কি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আছে? সে ভাবনা যে নাই –সেটিই প্রকাশ পাচ্ছে নানা ভাবে। সে ভাবনা থাকলে তো আজকের বিশ্ববাসীর সামনেও তারা নিজেদের ইজ্জত নিয়ে ভাবতো। আত্মসম্মানের সে ভাবনায় অসম্ভব হতো দূর্নীতিতে বাংলাদেশের ৫ বার বিশ্বে প্রথম হওয়া। অসম্ভব হতো ভোটডাকাতি করা। তবে তেমন একটি সুস্থ্য ভাবনা না থাকার যথেষ্ঠ কারণও আছে। সেটি হলো, সভ্যতা, সম্মান  ও অগ্রগতি নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অদ্ভুত বিপরীতমুখী ভাবনা ও মূল্যবোধ। সে ভ্রষ্ট ভাবনার কারণে বাকশালী স্বৈরাচারকে তারা যেমন গণতন্ত্র বলে, তেমনি ১৫৩ সিটে নির্বাচন না করাকেও সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন বলে। এবং দেশের পিছিয়ে পড়াকেও অগ্রগতি বলে। গলা উঁচিয়ে আরো বলে, দেশ দ্রুত উন্নত দেশগুলির কাতারে শামিল হচ্ছে। এমন মানসিক বিকলাঙ্গগণ কি মানবতা বা গণতন্ত্রের বন্ধু হতে পারে? অথচ বাংলাদেশে ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে যারা নিরেপক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত করেছিল – তারা বিদেশী ছিল না। তারা এদেশেরই সন্তান ছিল। কিন্তু সেরূপ নির্বাচন এজন্যই সম্ভব হয়েছিল যে সেগুলি আওয়ামী বাকশালীদের দখলদারিতে অনুষ্ঠিত হয়নি, হয়েছিল নির্দলীয় কেয়ার টেকার সরকারের অধীনে। তেমন একটি সভ্য নির্বাচনের প্রতি আগ্রহ না থাকাতে এটিই প্রমাণিত হয়, দেশ আজ কতটা অশুভ ও অসভ্য শক্তির হাতে অধিকৃত।

 

চেতনায় রাজতন্ত্র

অসভ্যতার যেমন সুস্পষ্ট প্রকাশ আছে, তেমনি আছে সভ্যতারও। স্বৈরাচার যেমন অসভ্যতার প্রতীক, তেমনি সভ্যতার প্রতীক হলো গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মৌলিক মানবিক অধিকার নিয়ে বাঁচা। দেশ কতটা উন্নত বা পশ্চাদপদ, সভ্য বা অসভ্য –সে বিচারটি নির্ভূল ভাবে হয় মতপ্রকাশ, ধর্মপালন, রাজনীতি ও ভোট দানের স্বাধীনতা থেকে। চলাফেরা, ঘর বাঁধা, খাওয়া-পড়া, চাষাবাদের স্বাধীনতা এমন কি ঔপনিবেশিক বিদেশী শত্রুশক্তিও অতীতে কেড়ে নেয়নি। এরূপ স্বাধীনতা যেমন দেশের পশুপাখি পায়, তেমনি পায় জনগণও। কিন্তু দখলদার শত্রুশক্তি কেড়ে নেয় স্বাধীন মতপ্রকাশ, সভাসমিতি ও রাজনীতির ন্যায় সভ্য মানুষ রূপে বাঁচার মৌলিক অধিকার। তাই স্বৈরশাসকদের  আমলে ঘরবাড়ী, দোকানপাঠ, রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কলকারখানা ও স্কুল-কলেজ নির্মিত হলেও তাতে নাগরিক অধিকার নিয়ে বাঁচাটি নিশ্চিত হয় না। তেমনি স্বৈরশাসকদের আমলে বার বার নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন হলেই তাকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলা হয় না; সেজন্য জরুরী হলো মত প্রকাশ, দল গঠন ও নির্বাচনে  অংশ নেয়ার অবাধ স্বাধীনতা নিয়ে বাঁচার অধিকার। সেটি আসে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায়। একমাত্র গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই প্রতিষ্ঠা পায় এক দল, এক মত ও এক নেতার বদলে নানা নেতা, নানা মত ও নানা দলের মূক্ত রাজনীতি। কিন্তু সে স্বাধীনতা আওয়ামী বাকশালীগণ মুজিব আমলে যেমন দেয়নি, হাসিনার আমলেও দিচ্ছে না।

গণতন্ত্রের মূল কথা, রাষ্ট্রের ভাগ্য নির্ধারণে সবারই সমান অধিকার। কারো কোন বাড়তি অধিকার থাকে না। যে সম-অধিকার যেমন একজন ধনীর, তেমনি একজন গরীবেরও। ফলে নির্বাচনে কেউ যেমন দু’টি ভোটের অধিকারী নয়; তেমনি কেউ স্পেশালও নয়। গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে এখানেই শেখ হাসিনার প্রচণ্ড ক্ষোভ। কারণ, গণতান্ত্রিক চেনতায় বিলুপ্ত হয় তাঁর নিজের বিশেষ অধিকার। তিনি তো সাধারণ মানুষ নন। তাঁর পিতা তো জাতির পিতা। সেরূপ এক পিতার সন্তান রূপে তাঁর অধিকার তো সবার উপরে। দেশ-শাসনের অধিকার তো একমাত্র তাঁরই। রাজার সন্তানেরাই তো রাজা হয় –চেতনায় রাজতন্ত্র থাকায় শেখ হাসিনা নিজের ও নিজ পরিবারের সদস্যদের জন্য রাষ্ট্রের তহবিল থেকে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার খরচ ও প্রহরার ব্যবস্থা আদায় করেছেন। অথচ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সেরূপ বাড়তি অধিকার কারো থাকে না, নিরাপত্তার অধিকারটি এখানে সবার সমান। অথচ বাংলাদেশে জনগণের জীবনে সে নিপরাপত্তার অধিকার আজ সমাহিত। ফলে শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবার নিরাপত্তা পেলেও হাজার হাজার বাংলাদেশী লাশ হচ্ছে, গুম  হচ্ছে, ধর্ষিতা হচ্ছে এবং পুলিশের হাতে  নির্যাতিত হচ্ছে। জনগণকে সমান ভোটাধিকার দিলে তো হরণ হয় শেখ মুজিবে কণ্যা সূত্রে তাঁর নিজের অগ্রাধিকার। তাই রাজা-বাদশাহদের ন্যায় শেখ হাসিনাও জনগণকে ভোটাধিকার দিতে রাজী নন। তাঁর ভয়, জনগণকে সে অধিকার দিলে অতীতের ন্যায় সে অস্ত্র আবারো ব্যবহৃত হবে তাঁর অপসারণের কাজে। এমন একটি ভীতি নিয়েই তিনি জনগণের হাত থেকে ভোটের অস্ত্রটি ছিনিয়ে নিয়েছেন। গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে এরূপ নাশকতায় তিনি স্রেফ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকেই ধ্বংস করেননি, জনগণের মৌলিক নাগরিক অধিকারগুলিকেও আবর্জনার স্তুপে ফেলেছেন। তেমন একটি গণবিরোধী ধারণার কারণেই ২০১৪ সালে ১৫৩ আসনে নির্বাচন না করাটি তার কাছে আদৌ অপরাধ গণ্য হয়নি। অপরাধ গণ্য হয়নি ২০১৮ সালের ভোট ডাকাতি।

 

যে মহাবিপদ স্বৈরশাসনের

শাসক মাত্রই তার গদি বাঁচাতে শুধু প্রশাসন ও সেনাবাহিনীতে পরিবর্তন আনে না, পরিবর্তন আনে দেশবাসীর বিশ্বাস ও সংস্কৃতিতে। পরিবর্তন আনে কোনটি ঘৃণীত হবে এবং কোনটি গৃহিত হবে -সে বাছ-বিচারের মানদণ্ড। সংস্কৃতির নির্মাণে রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাবটি বিশাল। চোর-ডাকাতগণ সমাজে ঘৃণিত হয় এ কারণে যে, তাদের হাতে রাজনৈতিক দল থাকে না, থাকে না পুলিশ, প্রশাসন, সেনাবাহিনী,পত্র-পত্রিতা এবং আদালত। ফলে তাদের পক্ষে কথা বলা ও তাদের বাঁচাতে লাঠি ধরার কেউ থাকে না। কিন্তু ভোট-ডাকাতদের থাকে। তাদের হাতে থাকে জনগণের মতামত ও চেতনাকে প্রভাবিত করার বিপুল ক্ষমতা। ফলে তাদের হাতে কলুষিত হয় জনগণের বিশ্বাস, রুচি এবং সংস্কৃতি। তখন ফিরাউনের ন্যায় নৃশংস স্বৈরাচারি শাসকও জনগণের কাছে খোদা রূপে স্বীকৃতি পায়। একই কারণ ভোট-ডাকাতগণও জনগণের কাছে শাসক রূপে গৃহিত হয়। স্বৈরশাসনের এটিই সবচেয়ে বড় বিপদ। বিলেতে কোন এমপি বা মন্ত্রী মিথ্যা বলেছে বা চুরি করেছে -সেটি প্রমাণিত হলে তাকে নিজ পদ থেকে পদত্যাগ করতে হয়। অথচ বাংলাদেশে ভোট-ডাকাতি করেও এমপি, মন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী হওয়া যায়। এর কারণ, বিলেত থেকে বাংলাদেশের সংস্কৃতির ভিন্নতা। বিলেতের বুকে ভিন্নতর রীতি ও সংস্কৃতির কারণ, সেখানে কোন স্বৈরাচারি শাসন নেই। তাই কোন মিথ্যুক বা চোর-ডাকাত এমপি বা মন্ত্রী হবে -সেটি জনগণ ভাবতেও পারে না।

দীর্ঘ ১০ বছর ক্ষমতায় থাকার ফলে শুধু প্রশাসনকে নয়, দেশবাসীর চেতনা ও সংস্কৃতিকে কলুষিত করার পূর্ণ সুযোগ পেয়েছে আওয়ামী লীগ। সমগ্র সরকারি প্রশাসনকে তারা পরিণত  করেছে সরকারি দলের চাকর-বাকরে। সরকারি প্রশাসনের প্রতিটি বিভাগ পরিণত হয়েছে স্বৈরশাসকের ডাকাত বাহিনীতে। ফলে ভোট-ডাকাতির কাজটি এখন আর দলীয় নেতাকর্মীদের নিজ হাতে করতে হয় না, সেটি পুলিশ ও প্রশাসনের লোকেরা নিজ হাতে করে দেয়। সরকারি ডাকাত বাহিনীর অতি নৃশংসতাটি নগ্ন ভাবে দেখা গেছে ২০১৩ সালের ৫ই মে শাপলা চত্ত্বরে হেফাজতে ইসলামের কয়েক শত কর্মীকে হত্যা ও হত্যার পর লাশ গুমের কাজে। এখনো দেখা যায়, বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের উপর জুলুমবাজীর ক্ষেত্রে। এরূপ ডাকাতবাহিনীর হাতে নির্বাচন যে নিছক প্রহসনে পরিণত হবে -সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন স্বৈরশাসককে উৎখাত করা এজন্যই অসম্ভব। স্বৈরাচারি এরশাদকেও তাই ভোটের মাধ্যমে উৎখাত করা যায়নি। অপসারণ করা যায়নি মিশরে হোসনী মোবারক ও তিউনিসার বিন আলীকেও। কারণ, নির্বাচনি কমিশন, প্রেজাইডিং অফিসার, ভোট কেন্দ্রের পাহারাদার –এদের সবাই নিজেদেরকে স্বৈর-সরকারের বেতনভোগী চাকর-বাকর ছাড়া বড় কিছু ভাবেনা। তারা জানে, ভোটকেন্দ্রে তাদের মূল দায়িত্বটি হলো, সরকারি দলের প্রার্থীকে যে কোন ভাবে বিজয়ী করা। তারা এটাও জানে, সরকারি  দলকে বিজয়ী করার মধ্যেই তাদের নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার।

স্বৈরশাসনের আরেক বড় অসভ্যতা হলো, এতে বিলুপ্ত হয় ন্যায় বিচার। এবং যখন বিচারে শাস্তির ভয় থাকে না তখন দেশ পরিণত হয় অপরাধীদের অভয় অরণ্যে। তখন অপরাধীগণ অপরাধ ঘটায় অতি নৃশংস ভাবে। এবং সেটি দিন-দুপুরে অন্যদের চোখের সামনে। এমন কি তখন অপরাধের আলামত গোপন করাও অপরাধীদের কাছে অপ্রয়োজনীয় মনে হয়। বরং নিজেদের কৃত অপরাধকে বেশী বেশী জনসম্মুখে প্রকাশ করে এবং তা নিয়ে বাহাদুরি জাহির করে। তখন জনসম্মুখে রাস্তায় মানুষ খুন করা, বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্ত্র হাতে ছাত্রদের লাশ করা ও ধর্ষণ নিয়ে উৎসব করা, ভোটকেন্দ্রের অভ্যন্তরে দলবল নিয়ে স্বদর্পে আড্ডা দেয়া এবং প্রকাশ্যে ব্যালটে সিল মারাও অতি স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে অপরাধীদের জন্য এক অভয় অরণ্যে। কোন সভ্য দেশে কি ভাবা যায়, দিনদুপুরে ডাকাতি হবে এবং ডাকাতদের শাস্তি হবে না? এটি তো অসভ্যতার আলামত। অথচ বাংলাদেশে এরূপ অসভ্যতাকে প্রবলতর করাই হলো শেখ হাসিনা এবং তার দলের প্রধানতম অবদান। চোর-ডাকাতগণ স্বভাবতঃই চুরি-ডাকাতি করে। খুনিরাও মানুষ খুন করে। সেটি সব যুগেই হয়। কিন্তু স্বৈরাচারি সরকার যেরূপ রাষ্টের বুকে অসভ্যতার জন্ম দেয়, সেরূপ অপরাধ মহল্লার চোর-ডাকাতগণ করে না।

শেখ হাসিনাও এক দিন মারা যাবেন, কিন্তু তার সৃষ্ট অসভ্যতার ইতিহাস শত শত বছর বেঁচে থাকবে। তখন কবরে শুয়ে তার লাগাতর অর্জনটি হবে কোটি কোটি মানুষের ঘৃণা ও অভিশাপ। এবং সেটি শত শত বছর ধরে। তবে স্বৈরাচারিদের স্বভাব হলো, তারা জনগণের ঘৃণা বা অভিশাপ নিয়ে ভাবে না। সে ভাবনা থাকলে তো তারা ভোট-ডাকাতি, খুন ও গুমের রাজনীতিতে নামতো না।  তারা ভাবে নিজেদের শাসনকে কী করে আরো দীর্ঘায়ীত করা যায় -তা নিয়ে। ফলে ভাবে বেশী বেশী গুম, খুন ও ভোট-ডাকাতির পরিকল্পনা নিয়ে। এটি হলো পাপের প্রতি তারা অসভ্য নেশাগ্রস্ততা। এমন নেশাগ্রস্ততা নিয়ে শেখ মুজিব গণতান্ত্রিক অধিকার হনন করে একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন। সেরূপ নেশাগ্রস্ততা নিয়ে ফিরাউনও হযরত মূসা (আঃ)র ন্যায় মানব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। প্রতিটি স্বৈর-শাসকদের এটিই হলো স্বভাব। শেখ হাসিনা হাতে বাংলাদেশে সে অসভ্যতাই প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। তবে পার্থক্য হলো, ফিরাউন তার ফিরামিড নিয়ে গর্ব করতো। এবং হাসিনার গর্ব হলো মানব রপ্তানি, পোষাক রপ্তানি ও চিংড়ি রপ্তানি নিয়ে। ১৮/০৩/২০১৯




বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক যুদ্ধ এবং নাশকতা ইসলামের বিরুদ্ধে

নৃশংস নাশকতার রা্জনীতি

ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী কোয়ালিশনের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধটি নিছক সামরিক, রাজনৈতিক বা অর্থনৈতীক নয়। সমগ্র মুসলিম বিশ্বজুড়ে সে যুদ্ধটি অতি প্রবল ভাবে হচ্ছে সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক ময়দানে। সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক যুদ্ধের তেমনি একটি অতি রক্তাত্ব রণাঙ্গণ হলো বাংলাদেশ। ইসলামবিরোধী পাশ্চাত্যের সে কোয়ালিশনে যোগ দিয়েছে আরেক আগ্রাসী দেশ ও মুসলিমদের অতি পরিচিত শত্রু ভারত। শত্রুপক্ষের আন্তর্জাতিক কোয়ালিশন আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া বা ফিলিস্তিনের মুসলিমদের বিরুদ্ধে আজ যা কিছু করছে, ভারতে অবিকল সেটিই ঘটে আসছে বিগত ৬০ বছরের বেশী কাল ধরে। সেটি যেমন অধিকৃত কাশ্মিরে, তেমনি কাশ্মিরের বাইরে ভারতীয় জিম্মি মুসলিমদের বিরুদ্ধে। একাত্তরের পর সে যুদ্ধই প্রবল ভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে বাংলাদেশে। কাশ্মিরে রক্ত ঝরছে মুসলিমদের এবং কেড়ে নেয়া হয়েছে তাদের স্বাধীনতা, বাংলাদেশেও রক্ত ঝরছে তাদের যারা ইসলামের পক্ষে কথা বলে। এবং কেড়ে নেয়া হয়েছে তাদের স্বাধীনতাও।

ভারতীয় বর্ণহিন্দুদের থেকে গরু-বাছুর, সাপ-শকুনেরাও পূজা পায়। নিরাপত্তাও পায়। কিন্তু তাদের কাছে ঘৃণ্য ও হত্যাযোগ্য গণ্য হয় মুসলিম নরনারী ও শিশু। সে অভিন্ন ঘৃণা নিয়ে মুসলিমদের ঘরে আগুণও দেয়া হয়। তাই থলিতে বা ঘরে স্রেফ গরুর গোশত রাখার সন্দেহে সে দেশে দিবালোকে পুলিশের সামনে অতি নৃশংস ভাবে মুসলিমদের হত্যা করা হচ্ছে। ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে একই রূপ ধুমধাম করে অযোধ্যার বাবরী মসজিদও গুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। সে অপরাধ রুখতে যেমন পুলিশ কোনরূপ ব্যবস্থা নেয়নি। তেমনি মসজিদ গুড়িয়ে কাউকে শাস্তিও দেয়নি। ভারতীয় সরকার ও তার পুলিশের কাছে অপরাধের সংজ্ঞা যে ভিন্ন, সেটি কি এরপরও বুঝতে বাঁকি থাকে? কোন মুসলিম খুন হলে, মুসলিমের কোন ঘর জ্বালিয়ে দিলে বা কোন মসজিদ গুঁড়িয়ে দিলে ভারেত যে সেটি অপরাধ গণ্য হয় না -সেটি মুসলিম বিরোধী এত দাঙ্গা ও মুসলিমের এতো ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়ার পর গোপন থাকার কথা নয়। গরু বাঁচানোর লক্ষ্যে হাজার হাজার হিন্দু রাস্তায় নামলেও সে গরজ মুসলিমদের জান বাঁচাবার বেলায় নাই। বরং উল্টো, যারা গরু বাঁচাতে নেমেছ তারাই হত্যা করছে নিরীহ মুসলিমদের। এক্ষেত্রে সরকার ও সরকারি দলের প্রশ্রয়ও কি কম?

চোর-ডাকাত ও খুনিদের সাথে গলাগলি করে নিজ ঘরের বাসিন্দাদের চরিত্রে সাধুতা আনা যায় না। সভ্য হতে হলে তাই অসভ্যদের থেকে দূরে থাকতে হয়। এটিই ইসলামের শিক্ষা। কিন্তু বাংলাদেশী সরকারে পরম বন্ধু ও অভিভাবক হলো দিল্লির নরেন্দ্র মোদীর সরকার। অথচ নরেন্দ্র মোদীর হাত গুজরাতের মুসলিম রক্তে রঞ্জিত। এ অপরধের কারণে প্রেসিডেন্ট ওবামা যুক্তরাষ্ট্রে তারা প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছিলেন। তিনি যখন গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী তখন ২ হাজারের বেশী মুসলিম নারী, পুরুষ ও শিশুকে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়েছিল। শত শত মুসলিম নারীকে ধর্ষণ করা হয়েছিল। ধর্ষণ শেষে অনেক মহিলাকে আগুনে ফেলা হয়েছিল। সে  জঘন্য অপরাধ কর্ম দমনে মোদী যেমন উদ্যোগ নেননি, তেমনি অপরাধীদের শাস্তিও দেননি। সে অপরাধী মোদীই এখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। ফলে তার ন্যায় কোটি কোটি মোদী এখন ভারত জুড়ে ছেয়ে গেছে। এতে মুসলিম বিনাশী নৃশংসতা বেড়েছে সমগ্র ভারত জুড়ে। কাশ্মির পরিণত হয়েছে বধ্যভূমিতে। এরূপ ভয়ানক চেতনা নিয়ে মানবরূপী এসব দানবগণ শুধু ভারত বা কাশ্মিরে নয়, খোদ বাংলাদেশের রাজনীতিতেও জেঁকে বসেছে। তবে বাংলাদেশের রণাঙ্গনে তাদের বাড়তি সুবিধাটি হলো তারা দেশটিতে একা নয়; বরং সাথে পেয়েছে অভিন্ন চেতনার বিপুল সংখ্যক সহযোদ্ধা। ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধে এসব ভারতসেবী বাংলাদেশীগণ ভারতীয়দের চেয়েও ভারতীয়; এবং হিন্দুদের চেয়েও অধিক পূজারী হলো হিন্দু সংস্কৃতির। তাই মঙ্গল প্রদীপের পূজা যতটা ঢাকায় হয় এবং সেখানে লক্ষ লক্ষ বেদীমূলে যত ফুল দেয়া হয় তা কলকাতা বা দিল্লিতে হয় না। ভারতীয় স্বার্থের পাহারাদার রূপে বাংলাদেশের মাটিতে তাদের অবস্থান হলো রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, সাংস্কৃতিক ক্যাডার, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, লেখক, সাংবাদিক, আইনজীবী, বিচারপতি, সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা রূপে। তাদের উপর অর্পিত মূল দায়িত্ব হলো, বাংলার মাটিতে শরিয়ত, হুদুদ ও  কোরআনী নীতির বাস্তবায়নের ন্যায় ইসলামের মৌল বিষয়গুলিকে পরাজিত রাখা। লক্ষ্য: বাংলাদেশী মুসলিমদের পূর্ণ মুসলিম রূপে বেড়ে উঠতে না দেয়া। সে সাথে বাংলাদেশের রাজনীতি, প্রশাসন, প্রতিরক্ষা ও শিক্ষা-সংস্কৃতির উপর ভারতীয় দখলদারীকে বহাল রাখা।

ভারতীয়দের সাহায্যে ও প্রশ্রয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতসেবীদের সফলতাটি বিশাল। সেটি যেমন একাত্তরে, তেমনি আজও। মুসলিমদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই তারা বাংলার সমগ্র মুসলিম ইতিহাসের সবচেয়ে নৃশংস হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছে। একাত্তরে লক্ষাধিক বিহারী মুসলিমদের এরা বিনা বিচারে হত্যা করেছে। এখন সে অভিন্ন হত্যাকাণ্ড চলছে খোদ বাঙালী মুসলিমদের বিরুদ্ধে। তাই ২০১৩ সালে ঢাকার শাপলা চত্ত্বরে নিরস্ত্র মুসল্লীদের জমায়েতের উপর কামান দেগে শত শত নিরীহ মানুষ নিমিষের মধ্যে হত্যা করা হয়েছিল। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর বিগত ৭০ বছরে ভারতের বিভিন্ন শহরে অনুষ্ঠিত সকল মুসলিম বিরোধী দাঙ্গাতে যত মুসলিম নরনারীকে হত্যা করা হয়েছে ভারতসেবী বাঙালীগণ একমাত্র একাত্তরেই তার চেয়ে বেশী মুসলিমকে বাংলাদেশে হত্যা করেছে। শুধু অবাঙালীদের নয়, ভারতবিরোধী হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ বাঙালী মুসলিমদেরও তারা হত্যা করা হয়েছে। বিগত ৭০  বছরে অধিকৃত কাশ্মীরে যুদ্ধরত ৬ লাখ ভারতীয় সৈন্যও এত মুসলিম হত্যা করতে পারিনি যা ভারতসেবী বাঙালীগণ মাত্র  এক বছরে হত্যা করেছে। এজন্যই তাদের প্রতি ভারত এত প্রসন্ন এবং তাদের ক্ষমতায় রাখার জন্য দেশটির এত বিনিয়োগ।

একাত্তরে বিহারী মুসলিমগণ অপরাধী গণ্য হয়েছে এ কারণে যে, নিজেদের ঘর-বাড়ি ভারতে ফেলে ১৯৪৭য়ে তারা পাকিস্তানে আশ্রয় নিয়েছিল এবং একাত্তরে দেশটির ভাঙ্গার কাজে তারা ভারতের অস্ত্র নিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামেনি। বরং পাকিস্তানকে নিজেদের দেশ ভেবে দেশটির সংহতি ও দীর্ঘায়ু কামনা করেছে। বিহারীদের সবচেয়ে বড় অপরাধ, ভারতসেবী বাঙালীদের ন্যায় তারা ভারতীয় আধিপত্যের সেবাদাস হতে পারেনি। তবে সেরূপ না করার পিছনে প্রচুর কারণও ছিল। ভারতে জন্ম নেয়ার কারণে বিষপূর্ণ হিন্দু মানসিকতার সাথে তাদের পরিচিতিটি ছিল যে কোন বাংলাদেশীদের চেয়ে অতি গভীর। তাছাড়া এ অপরাধটি কি শুধু বিহারীদের? লক্ষ লক্ষ বাঙালী মুসলিমও তো সেদিন অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল। তাদের অনেকে ভারতীয় বাহিনী ও তার দোসরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধও করেছিল। একাত্তরে কোন একজন শিক্ষিত আলেম পাকিস্তান ভাঙাকে সমর্থণ করেছে -সে প্রমাণ কি আছে? প্রতিটি আলেম ও ইসলামপন্থি এজন্যই ভারতসেবীদের কাছে আজও রাজাকার। অথচ সে কারণে বিহারীদের বাঁচতে দেয়া হয়নি।

একাত্তর নিয়ে ভারতীয়দের সবচেয়ে বড় উল্লাসের কারণ শুধু এ নয় যে, তারা পাকিস্তান ভাঙ্গতে পেরেছে। বরং এজন্য যে, খোদ মুসলিম ভূমিতে লক্ষাধিক মুসলিমকে হত্যা করতে পেরেছে। ভারতীয় ভূমিতে এত মুসলিম হিন্দুদের হাতে নিহত হলে সমগ্র মুসলিম বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদ উঠতো, যেমনিট মায়ানমারের বিরুদ্ধে হচ্ছে। খুনিরা এজন্যই খুনখারাবীর জন্য নিজের বসত ভিটার বাইরে বধ্যভূমি বেছে নেয়। মার্কিনীদের কাছে তেমন বধ্যভূমি হলো আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া ও ইয়েমেন। ভারতীয়গণ বাংলাদেশকে তেমনি একটি বধ্যভূমি রূপে বেছে নিয়েছিল একাত্তরে। বাংলাদেশের মাটিতে সে সুযোগটি ভারত ধরে রাখতে চায়। নইলে পাকিস্তানের ন্যায় পূর্ব সীমান্তেও আরেক পাকিস্তান খাড়া হবে সে ভীতি তাদের মনে অতি প্রবল। সে জন্যই বাংলাদেশের রাজনীতি, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিতে ভারতীয়দের শত শত কোটি টাকার বিনিয়োগ। রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে মায়ানমারের বৌদ্ধ সন্ত্রাসীদের আচরণটি অতিশয় নৃশংস ও ভয়াবহ। হাজার হাজার রোহিঙ্গাদের ঘরে তারা আগুণ দিয়েছে। বহু হাজারকে তারা হত্যা করেছে। শত শথ রোহিঙ্গা মহিলাকে ধর্ষণ করা হয়েছে। কিন্তু একাত্তরে তার চেয়ে বহুগুণ বেশী নৃশংস বর্বরতা হয়েছে বিহারী মুসলমানদের বিরুদ্ধে। একই রূপ হত্যা, ধর্ষণ, লুন্ঠন ও গৃহ আগুনের প্রকোপে পড়েছে বিহারীগণ। এবং সেটি ভারতসেবী বাঙালীদের হাতে। দখলদার ভারতীয় সেনাবাহিনী সে বর্বরতা থামাতে কোন উদ্যোগ নেয়নি। মায়ানমারে মুসলমানের ঘরবাড়ী জ্বালানো হলেও এ বিধান কখনোই প্রয়োগ করা হয়নি যে, মায়ানমারে  কোন রোহিঙ্গা মুসলিমের ঘরবাড়ী ও দোকানপাঠের মালিক হওয়ার অধিকার নাই। ফলে কোন বৌদ্ধই রোহিঙ্গা মুসলিমের ঘরবাড়ি ও দোকান পাটের মালিকানা দাবি করেনি। অথচ সে নীতির প্রয়োগ করা হয়েছে বিহারী মুসলমানদের বিরুদ্ধে। তাদের থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে তাদের বসতবাড়ি, দোকানপাট ও ব্যবসা-বাণিজ্য। বিহারীদের তাদের নিজ ঘরবাড়ী থেকে উচ্ছেদ করে বস্তিতে পাঠানো হয়েছে। এবং তাদের ঘরবাড়ীর মালিক হয়েছে ভারতের সেবাদাসগণ। বাংলার সমগ্র ইতিহাসে কখনোই কি কোন জনগোষ্ঠির বিরুদ্ধে এমন অপরাধ হয়েছে? ১৯৪৭ সালে কি কোন হিন্দু পরিবারকে কি বস্তিতে বসানো হয়েছে? অথচ তারাতো পাকিস্তান সৃষ্টির প্রাণপণে বিরোধীতা করেছিল?

রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে নৃশংসতার বিরুদ্ধে বহু বার্মিজ বুদ্ধিজীবী যে সোচ্চার –সে প্রমাণ অনেক। তারা বিদেশী টিভি চ্যানেলে এমন কি সেদেশের নেত্রী অঙ সাং সূচীর বিরুদ্ধেও তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। কিন্ত বিহারী মুসলিমদের বিরুদ্ধে একাত্তরে যে বর্বর নৃশংসতা হলো তার বিরুদ্ধে কি কোন বাঙালী বুদ্ধিজীবী বা রাজনীতিবিদ প্রতিবাদী হয়ে রাস্তায় নেমেছে বা পত্রিকায় কোন বিবৃতি দিয়েছে? সে নৃশংসতা নিয়ে বিদেশের পত্র-পত্রিকায় বহু নিবন্ধ ছাপা হলেও ঢাকার কোন পত্রিকায় কি একটি নিবন্ধও ছাপা হয়েছে? ডাকাত পাড়ায় যেমন নৃশংস ডাকাতীর নিন্দা না হয়ে বরং তা নিয়ে প্রচণ্ড উল্লাস হয়, সেরূপ একটি অবস্থা ছিল বাংলাদেশের ভারতসেবীদের মহলে। বাঙালী বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদদের চেতনার ভূবন যে ভারতসেবীদের হাতে কতটা অধিকৃত ও মৃত -এ হলো তার নজির। একাত্তরে বিহারী মুসলমানদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তারা বাঙালী নয়। এখন বাঙালী মুসলিমদের বেছে বেছে হত্যা করা হচ্ছে এ কারণে যে, তারা ভারতসেবী রাজনীতির সেবাদাস নয়। সে অপরাধে এমনকি ৫৭ জন বাঙালী সেনা অফিসারকে নিহত হতে হয়েছে। ভারতসেবী রাজনীতিকে বলা হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। এবং সে চেতনার বিরুদ্ধে কথা বলা চিত্রিত হচ্ছে যুদ্ধাপরাধ বলে।

পাশের নেকড়ের হাতে কোন মানুষকে নিহত হতে দেখে পাশের নেকড়ে তাকে বাঁচাতে আগ্রহ দেখায় না। পারলে সে নেকড়েটিও সে নৃশংসতায় অংশ নেয়। সেরূপ আচরন মানবতাশূণ্য মনুষ্যরূপী দানবদেরও। তাই রোহিঙ্গাদের উপর প্রচণ্ড নৃশংসতা দেখে সুদূর তুরস্ক থেকে সেদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ত্রাণসামগ্রী নিয়ে মায়ানমারে ছুটে এসেছেন। মায়ানমারের সরকারের বিরুদ্ধে হুশিয়ারি জানিয়েছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীও। তিনিন জাহাজ-ভর্তি রিলিফও পাঠিয়েছেন। ছুটে এসেছেন জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান। কিন্তু নিশ্চুপ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকার। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নিশ্চুপ কাশ্মীরের হাজার হাজার মুসলিশ নরনারী ও শিশুকে নিহত ও আহত হতে  দেখেও। অথচ প্রতিবেশী দেশে মুসলিমদের বাঁচাতে মহান আল্লাহতায়ালা জিহাদ ফরজ করেছেন। বলেছেন, “তোমাদের কি হলো যে, তোমরা যুদ্ধ করবে না আল্লাহর পথে এবং অসহায় নরনারী ও শিশুদের বাঁচাতে যারা বলছে, “হে আমাদের রব! যালিমদের অধিকৃত এই জনপদ থেকে আমাদের মুক্ত করুন, আপনার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য অভিভাবক নিযুক্ত করুন এবং কাউকে আমাদের জন্য সাহায্যকারি রূপে প্রেরণ করুন।” –(সুরা নিসা, আয়াত ৭৫)। এটি এমন এক অর্পিত দায়িত্ববোধ যা এড়িয়ে যাওয়ার অর্থ মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা –যা ভয়ানাক কবিরা গুনাহ। তেমন দায়িত্ববোধে অত্যাচারি রাজা দাহিরেরর হাত থেকে অসহায় হিন্দু নরনারী ও শিশুদের বাঁচাতে সুদূর ইরাক থেকে মহম্মদ বিন কাসিম সিন্ধুতে ছুটে এসেছিলেন। এবং রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ লড়েছিলেন। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের উলামা সম্প্রদায়, ইসলামী দলসমুহের নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ মুসল্লীদের মাঝেই বা কতটুকু বেঁচে আছে সে ঈমান? কোথায় সে মহান আল্লাহতায়ালার হুকুম পালনের আগ্রহ?

 

স্ট্রাটেজী ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে

বিশ্ব-রাজনীতির অঙ্গণ থেকে সোভিয়েত রাশিয়ার বিদায়ের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভেবেছিল, তাদের পথের কাঁটা এবার বুঝি দূর হলো। ভেবেছিল, আধিপত্য বিস্তৃত হবে এবার বিশ্বজুড়ে। কিন্তু সে গুড়ে বালি। বাঁধা হয়ে দাড়িয়েছে মুসলিমগণ। আফগানিস্তান ও ইরাকের মত দুইটি  দেশ দখলে রাখতেই তাদের হিমশিম খেতে হচেছ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ন্যায় মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ শেষ হতে ৫ বছর লেগেছিল। কিন্তু বিগত ১৭ বছর যুদ্ধ লড়েও মার্কিন নেতৃত্বাধীন ৪০টিরও বেশী দেশের কোয়ালিশ বাহিনী আফগানিস্তানে বিজয় আনতে পারিনি। বরং দ্রুত এগিয়ে চলেছে পরাজয়ের দিকে। পাশ্চাত্যের কাছে এখন এটি সুস্পষ্ট, আফগানিস্তান, ইরাক, ফিলিস্তিন, লেবানন, সোমালিয়ার মত ক্ষুদ্র দেশগুলো দখল করা এবং সেগুলোকে কন্ট্রোলে রাখার সামার্থ্য তাদের নেই। যে প্রতিরোধের মুখে তারা হারতে বসেছে সেটির মূল হাতিয়ার অত্যাধিক যুদ্ধাস্ত্র নয়, জনবল বা অর্থবলও নয়। বরং সেটি কোরআনী দর্শন ও ইসলামের সনাতন জিহাদী সংস্কৃতি। এ দর্শন ও সংস্কৃতিই মুসলমানের জন্য আত্মসমর্পণকে অসম্ভব ও অচিন্তনীয় করে তুলেছে। বরং হাজার হাজার যুবকেদর কাছে অতিশয়  কাম্য গণ্য হচ্ছে আগ্রাসী শত্রুর বিরুদ্ধে আমৃত্যু লড়াই ও শাহাদত। এমন চেতনা এবং এমন সংস্কৃতির বলেই এক কালের মুসলমানেরা রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের ন্যায় দুটি বিশ্বশক্তিকে পরাজিত করেছিল। এ যুগেও তারা বিশ্বের সর্ববৃহৎ রাষ্ট্র ও বিশ্বশক্তি  রাশিয়াকে পরাজিত করেছে। এবং এখন গলা চেপে ধরেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। আফগান মোজাহিদদের জিহাদ তাই পাল্টে দিচ্ছে বিশ্বরাজনীতির সমীকরণ। কামান, বোমা ও যুদ্ধবিমানের বলে গণহত্যা চালানো যায়। নগর-বন্দরও ধ্বংস করা যায়। কিন্তু সে কামানে বা গোলায় কি দর্শন ও সংস্কৃতির বিনাশও সম্ভব? বরং তাদের আগ্রাসন ও গণহত্যায় প্রতিরোধের সে দর্শন ও সংস্কৃতিই দিন দিন আরো বলবান হচ্ছে। কোন মার্কিনীকে রণাঙ্গণে রাখতে মাথাপিছু প্রায় এক মিলিয়ন তথা ১০ লাখ ডলার খরচ হয়। অথচ মুসলমানরা হাজির হচ্ছে নিজ খরচে। তারা শুধু স্বেচ্ছাই অর্থই দিচ্ছে না, প্রাণও দিচ্ছে।

অবস্থা বেগতিক দেখে পাশ্চাত্য এখন ভিন্ন স্ট্রাটেজী নিয়েছে। সেটি শুধু গণহত্যা নয়। নিছক নগর-বন্দর, ঘরবাড়ী এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের বিনাশও  নয়। বরং সেটি হলো ইসলামের কোরআনী  দর্শন ও সংস্কৃতির ধ্বংস। তাই শুরু করেছে প্রকাণ্ড আকারের সাংস্কৃতিক যুদ্ধ। নতুন এ স্ট্রাটেজীর আলোকে ইরাক ও আফগানিস্তানে তারা শুধু মানুষ হত্যাই করছে না, ঈমান হত্যাতে তৎপর হয়েছে। এবং সেটি শুধু আফগানিস্তান ও ইরাকে সীমিত নয়। বাংলাদেশের ন্যায় প্রতিটি মুসলিম দেশই এখন একই রূপ সাংস্কৃতিক যুদ্ধের শিকার। তবে বাংলাদেশ তাদের অন্যতম টার্গেট হওয়ার কারণ, দেশটিতে ১৬ কোটি মুসলমানের ব্সবাস। তেল, গ্যাস বা অন্য কোন খনিজ সম্পদের চেয়ে ১৬ কোটি জনসংখ্যার ফ্যাক্টরটিই তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তেল, গ্যাস যোদ্ধা বা বোমায় পরিণত হয়না, কিন্তু মানুষ হয়। তাই বাংলাদেশীগণ না চাইলেও সাম্রাজ্যবাদীদের এ আগ্রাসনের টার্গেট হওযা থেকে বাঁচার উপার নাই। শত্রুর লক্ষ্য এখন মুসলমানদের ঈমানকে হত্যা করা। ফলে মহাসংকটে এবার শুধু দুনিয়ার জীবন নয়, আখেরাতের জীবনও। কারণ এ যুদ্ধে তারা বিজয়ী হলে অসম্ভব হবে ঈমান নিয়ে বাঁচা।

 

লক্ষ্য: কোরআন থেকে দূরে সরানো

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের স্ট্রাটেজী তাই  মুসলমানদের জীবন থেকে জিহাদের সংস্কৃতি বিলুপ্ত করা। এবং ভূলিয়ে দেওয়া শরিয়ত, হদুদ, শুরা, খেফাফত, জিহাদ, মুসলিম ঐক্যের ন্যায় ইসলামি মৌল বিষয়গুলোকে। তেমন এক স্ট্রাটেজী নিয়ে ব্রিটিশগণ ভারতে স্কুল-কলেজ ও আলিয়া মাদ্রাসা খুলেছিল। ধর্ম-শিক্ষার ছ্দ্দবেশে মুসলমানদের দৃষ্টি থেকে আড়াল করেছিল জিহাদের ন্যায় ইসলামের মূল হাতিয়ারকে। ফলে নিরাপদ হয়েছিল তাদের ১৯০ বছেরের শাসন। ইসলামে বিরুদ্ধে সে সফল স্ট্রাটেজীর প্রয়োগ কল্পে তারা আবার ময়দানে নেমেছে খোদ বাংলাদেশে। সে কাজে এখন ব্যবহার করছে জনগণের রাজস্বের অর্থে প্রতিষ্ঠিত হাজার হাজার স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। বাংলাদেশের রাজনীতি ও প্রশাসনসহ এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মূলত তাদের হাতেই অধিকৃত। অধিকৃত দেশের অধিকাংশ মিডিয়াও। ইসলামের বিরুদ্ধে শুরু হয়েছে ব্যাপক মিথ্যা-প্রপাগান্ডা। বলতে চায়, ইসলাম এ যুগে অচল। যেন ইসলাম শুধু নবীজী (সাঃ)র জামানার লোকদের জন্যই নাযিল হয়েছিল। তারা শরিয়তকে বলছে মানবতা বিরোধী। সে প্রপাগান্ডাকে ব্যাপকতর করতে বহু টিভি চ্যানেল, অসংখ্য পত্র-পত্রিকার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠা করেছে হাজার হাজার এনজিও।

ইসলামের এ শত্রুপক্ষের সম্মিলিত প্রচেষ্ঠা হলো, নবীজী (সাঃ)র আমলের ইসলাম –যাতে রয়েছে শরিয়তের প্রতিষ্ঠার রাজনীতি ও  ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের জিহাদ, তা জনগণের মন থেকে ভূলিয়ে দেওয়া। অথচ ইসলাম থেকে নামায-রোযাকে যেমন আলাদা করা যায় না, তেমনি আলাদা করা যায় না শরিয়তের প্রতিষ্ঠার রাজনীতি ও ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের জিহাদকেও। পবিত্র কোরআনে জিহাদে অংশ নেওয়ার নির্দেশ এসেছে বার বার। সে সব জিহাদে অর্ধেকের বেশী সাহাবা শহীদ হয়েছেন। নবীজী (সাঃ) নিজে রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধ লড়েছেন বহুবার। ইসলামের বহুশত্রুকে হত্যা এবং বনু কুরাইজা ও বনু নাযির ন্যায় ইহুদী বস্তিকে নির্মূল করা হয়েছে তাঁরই নির্দেশে। অথচ নবীজী (সাঃ)র সে আপোষহীন নীতি ও ইসলামের সে সংগ্রামী ইতিহাসকে তারা সুপরিকল্পিত ভাবে আড়াল করতে চায়। নামায-রোযা, হজ-যাকাতের বাইরেও শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি, প্রশাসন, প্রতিরক্ষা ও আইন-আদলতের সংস্কারে ঈমানদারের যে গুরুতর দায়ভার রয়েছে সেটিকেও ভূলিয়ে দিতে চায়। এ কারণেই ইসলামের আক্বিদা-বিশ্বাস ও জিহাদী সংস্কৃতি আজ দেশে দেশে শত্রুপক্ষের লাগাতর হামলার শিকার। তাদের লক্ষ্য, মহান আল্লাহর কোরআনী নির্দেশের বিরুদ্ধে মুসলমানদেরকে বিদ্রোহী করা।

 

চেতনার অরক্ষিত ভূমি

বাংলাদেশের মুসলমানদের জন্য বিপদের কারণ হলো, এরূপ হামলার মুখে দেশটির ভৌগলিক সীমান্তের ন্যায় সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক সীমান্ত আজ অরক্ষিত। অথচ মুসলমানদের দায়িত্ব শুধু দেশের সীমান্ত পাহারা দেওয়া নয়। বরং অতিগুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো, চেতনার রাজ্য পাহারা দেওয়া। সেটি সুস্থ্য ঈমান-আক্বিদা ও ইসলামি সংস্কৃতি গড়ে তোলার স্বার্থে। সীমান্ত পাহারায় অবহেলা হলে অনিবার্য হয় সামগ্রিক পরাজয় ও গোলামী। তখন বিপন্ন হয় জানমাল ও ইজ্জত-আবরু। যেমনটি ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে হয়েছিল। সে পরাজয়ের ফলেই মুসলমানদের জীবনে নেমে এসেছিল ১৯০ বছরের ঔপনিবেশিক শাসনের দাসত্ব। আর সামরিক ও রাজনৈতিক পরাজয় একাকী আসে না। আসে অর্থনৈতিক দুর্গতি,আসে দুর্ভিক্ষ। তাই পলাশীর পরাজয়ের পর এসেছিল ছিয়াত্তরের মনত্ত্বর। সে দুর্ভিক্ষে বাংলার বহু লক্ষ মানুষ মারা গিয়েছিল, এবং মৃতদের অধিকাংশই ছিল মুসলিম। একই ভাবে নেমে এসিছিল ১৯৭৪য়ের দুর্ভিক্ষ। একই রূপ ভয়ানক পরিণতি নেমে আসে সাংস্কৃতিক যুদ্ধে পরাজিত হলে। তখন মারা পড়ে ঈমান-আক্বিদা। আর মুসলমানের কাছে দৈহীক ভাবে বাঁচার চেয়ে ঈমান ও আক্বিদা নিয়ে বাঁচার গুরুত্ব কি কম? ঈমান নিয়ে বাঁচা অসম্ভব হলে পণ্ড হয় জীবনের মূল বাঁচাটাই। তখন অনিবার্য হয় জাহান্নামের অন্তহীন আযাব।

ভৌগলিক সীমান্তকে সুরক্ষিত করার চেয়েও তাই গুরুত্বপূর্ণ হলো ঈমান-আক্বিদার এ সীমান্তকে সুরক্ষিত করা। কারণ শয়তানী শক্তির সবচেয়ে বিনাশী হামলা হয় চেতনার এ মানচিত্রে। এটি অধিকৃত হলে দেশ দখল অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। প্রতিটি ঈমানদারকে তাই সে হামলার বিরুদ্ধে লাগাতর জিহাদ করতে হয়। সশস্ত্র যুদ্ধের রণাঙ্গন থেকে অন্ধ-বধির বা পঙ্গু ব্যক্তির নিষ্কৃতি আছে। কিন্তু চেতনার মানচিত্রে শয়তানী শক্তির আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক হামলার বিরুদ্ধে যে লাগাতর জিহাদ তা থেকে সামান্য ক্ষণের নিষ্কৃতি নেই। এ জিহাদকেই ইসলামে ‌জিহাদে আকবর বা শ্রেষ্ঠ জিহাদ বলা হয়েছে। রাজনৈতিক বা সামরিক ক্ষেত্রের লড়াইটি আসে তার পড়ে। বদর, ওহুদ ও খন্দকের যুদ্ধের আগে তেরটি বছর ধরে এ জিহাদ লাগাতর চলেছে মক্কায়। মুসলমানের চেতনার সীমান্তকে সুরক্ষিত রাখার স্বার্থেই অপরিহার্য হলো মুসলিম ভূমির ভৌগলিক মানিচিত্রকে সুরক্ষিত করা।

তাই ঘরবাঁধা, চাষাবাদ করা বা কলকারখানা গড়াই একটি জনগোষ্টির বেঁচে থাকার জন্য সবকিছু নয়। শুধু পনাহারে জীবন বাঁচে বটে, তাতে ঈমান বাঁচে না। এমন বাঁচার মধ্য দিয়ে সিরাতুল মোস্তাকিমও জোটে না। তখন যা জুটে তা হলো পথভ্রষ্টতা। সে পথভ্রষ্টতায় বিপদাপন্ন হয় আখেরাতের জীবন। ইহকাল ও পরকাল বাঁচাতে এজন্যই একজন চিন্তাশীল মানুষকে বেড়ে উঠতে হয় জীবন-বিধান, মূল্যবোধ, জীবন ও জগত নিয়ে একটি সঠিক ধারণা নিয়ে। মুসলমানের কাছে সে জীবন-বিধান হলো ইসলাম। আর নিত্য দিনের বাঁচবার সে প্রক্রিয়া হলো ইসলামী সংস্কৃতি। নামায-রোযা, হজ-যাকাত এবং জিহাদ হলো একজন ঈমানদারের ইবাদতের প্রক্রিয়া। আর সংস্কৃতি হলো এ জগতে বাঁচবার বা জীবনধারনের প্রক্রিয়া। ইসলামি পরিভাষায় এ প্রক্রিয়া হলো তাহজিব। আরবী ভাষায় তাহজিবের অর্থ হলো,ব্যক্তির কর্ম,রুচী, আচার-আচারণ, পোষাক-পরিচ্ছদ ও সার্বিক জীবন যাপনের প্রক্রিয়ায় পরিশুদ্ধি করণের প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মানুষ রিফাইনড তথা পরিচ্ছন্ন বা সুন্দরতম হয়। দিন দিন সুন্দরতম হয় তার রুচীবোধ, আচার-আচরণ, কাজকর্ম ও চরিত্র।

তাই মুসলমানের ইবাদত ও সংস্কৃতি -এ দুটোকে পৃথক করা যায় না। উভয়ের মধ্যেই প্রকাশ পায় আল্লাহতায়ালার কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়া গভীর প্রেরণা ও প্রচেষ্টা। পাখি যেমন তার দুটো ডানার একটিকে হারালে উড়তে পারে না, ঈমানদারও তেমনি আল্লাহর ইবাদত ও ইসলামী সংস্কৃতিও একটি হারালে মুসলমান রূপে বেড়ে উঠতে পারে না। তাই মুসলমানগণ যেখানে রাষ্ট্র গড়েছে সেখানে শুধু মসজিদ-মাদ্রাসাই গড়েনি, ইসলামি সংস্কৃতিও গড়েছে। একটির পরিশুদ্ধি ও পরিপুষ্টি আসে অপরটি থেকে। মোমেনের মূল্যবোধ, রুচী্বোধ, পানাহার, পোষাকপরিচ্ছদ, অপরের প্রতি ভালবাসার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় তার আল্লাহভীরুতা। তখন সে অন্যের কল্যাণে সচেষ্ট হয় আল্লাহর কাছে প্রিয়তর হওয়ার চেতনায়। এ হলো তার সংস্কৃতি। এমন সংস্কৃতি থেকে সে পায় ইবাদতের স্পিরিট। ঈমানদারে চিন্তুা ও কর্মে এভাবেই আসে পবিত্রতা -যা একজন কাফের বা মোনাফিকের জীবনে কল্পনাও করা যায় না। মুসলিম সমাজে এভাবেই আসে শান্তি, শৃঙ্খলা ও শ্লিলতা। অথচ সেক্যুলার সমাজে সেটি আসে না। সেক্যুলার সমাজে যেটি প্রবলতর হয় সেটি পার্থিব স্বার্থ হাসিলের প্রেরণা। এমন চেতনায় মানুষ শুধু রাজনীতিতেই স্বেচ্ছাচারি হয় না; জীবনের উপভোগেও স্বেচ্ছাচারি হয়। সে স্বেচ্ছাচারিতাকে তারা ব্যক্তি-স্বাধীনতার লেবাস পড়িয়ে জায়েজ করে নিতে চায়। সেক্যুলার সমাজে পতিতাবৃত্তি, ব্যভিচার, সমকামিতা, অশ্লিলতা, মদ্যপাণের ন্যায় নানাবিধ পাপাচার বৈধ্যতা পায় তো জীবন উপভোগের এমন স্বেচ্ছাচারি প্রেরণা থেকেই। ফলে সেক্যিউলারিজম যেখানে প্রবলতর হয় সেখানে পাপাচারেও প্লাবন আসে।

 

মূল ব্যর্থতা যে ক্ষেত্রটিতে

মুসলমান ইবাদতে প্রেরণাও পায় তার সংস্কৃতি থেকে। ফলে স্কুল-কলেজ বা মাদ্রাসায় না গিয়েও মুসলিম সমাজে বসবাসকারি যুবক তাই মসজিদে যায়,নামায পড়ে,রোযা রাখে এবং মানুষের কল্যাণ সাধ্যমত চেষ্টাও করে। সীমান্তের প্রতিরক্ষায় বা শরিয়তের প্রতিষ্ঠায় জিহাদের ময়দানেও হাজির হয়। একাজে শুধু শ্রম-সময়-মেধা নয়, জানমালের কোরবানীও দেয়। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বা মাদ্রাসার ডিগ্রিধারি না হয়েও নিজেকে বাঁচায় বেপর্দা, ব্যাভিচার, অশ্লিলতা,চুরি-ডাকাতি, সন্ত্রাস-কর্ম ও নানা বিধ পাপাচার থেকে। প্রাথমিক কালের মুসলমানগণ যে মানব-ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সভ্যতার জন্ম দিতে পেরেছিলেন সেটি এজন্য নয় যে সেদিন বড় বড় কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বা মাদ্রাসা ছিল। বরং তখন প্রতিটি ঘর পরিণত হয়েছিল শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠান। সমগ্র রাষ্ট্র জুড়ে গড়ে উঠেছিল চেতনা ও চরিত্রের বিশুদ্ধকরণ প্রক্রিয়া। সে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সেদিনের মুসলমানেরা উন্নত মানব রূপে বেড়ে উঠতে পেরেছিলেন।

বাংলাদেশের ন্যায় অধিকাংশ মুসলিম দেশের আজকের বড় সমস্যা শুধু এ নয় যে, দেশগুলি ইসলামের শত্রুপক্ষ বা ইসলামে অঙ্গিকারশূন্যদের হাতে অধিকৃত। বরং সবচেয়ে গুরুতর সমস্যা এবং সে সাথে ভয়ানক বিপদের কারণ হলো,দেশগুলির সাংস্কৃতিক অঙ্গণ থেকে ইসলাম বিলুপ্ত হয়েছে এবং তা অধিকৃত হয়েছে ইসলামের শত্রুপক্ষের দ্বারা। দেশের সীমান্ত বিলুপ্ত না হলেও মুসলিম দেশগুলির সংস্কৃতির ময়দান পুরাপুরি শত্রু পক্ষের দখলে গেছে। ফলে এদেশগুলিতেও তাই হচ্ছে যা কাফের কবলিত একটি দেশে হয়ে থাকে। মুসলিম দেশের সংস্কৃতিও পরিনত হয়েছে মানুষকে আল্লাহর অবাধ্য রূপে গড়া তোলার ইন্সটিটিউশনে। এর ফলে বাংলাদেশের হাজার হাজার মুসলিম সন্তান মসজিদে না গিয়ে হিন্দুদের ন্যায় মঙলপ্রদীপ হাতে নিয়ে শোভাযাত্রা করছে। কপালে তীলক পড়ছে,থার্টি ফাষ্ট নাইটে অশ্লিল নাচগানও করছে। এরাই শয়তানের পক্ষে লড়াকু সৈনিক। এবং তাদের  যুদ্ধাংদেহী রূপটি শরিয়তের প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে। দেশের সরকার তার চাকর-বাকরদের বেতন বৃদ্ধিতে আগ্রহী, কিন্তু তাদের ঈমান বৃদ্ধি নিয়ে নয়। কারণ, সরকার জানে চাকর-বাকরদের ঈমান বাড়লে তাদের দিয়ে চুরি-ডাকাতি ও ভোট-ডাকাতি করা যায় না। এরাই প্রতিটি মুসলিম ভূমিতে ইসলাম ও মুসলিমদের ঘরের শত্রু। এদের কারণেই বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশগুলিতে ইসলামের বিজয় এবং শরিয়তের প্রতিষ্ঠা রুখতে কোন হিন্দু, খৃষ্টান বা অন্য কোন অমুসলিমদের নামতে হচ্ছে না, সে কাজটি করছে তারাই যারা বড় গলায় নিজেদের মুসলিম রূপে পরিচয় দেয়। ২০১৩ সালের ৫ই মে’এর রাতে শাপলা চত্ত্বরে যারা শত শত মুসল্লিদের হত্যা করলো এবং ময়লার গাড়িতে তুলে তাদের লাশ গায়েব করলো -তারা কি কাফের ছিল? তারা কি খুনি নরেন্দ্র মোদীর হাতে গড়া খুনি? তারা কি কোন মন্দির বা গীর্জায় গিয়ে মুসলিম হত্যার শপথ নিয়েছিল? বরং তারা তো তারাই যারা বেড়ে উঠেছে মুসলিমদের নিজ ঘরে।

তাই অতি শিক্ষণীয় বিষয়টি হলো, মুসলিমদের শুধু দেশ বা ঘর থাকলে চলে না, সে দেশে ও ঘরে ইসলামের শিক্ষা-সংস্কৃতিও থাকতে হয়। কিনন্তু বাঙালী মুসলিমদের তেমন একটি দেশ যেমন নাই, তেমনি সে শিক্ষা-সংস্কৃতিও নাই। বাঙালী মুসলিমদের জীবনে এটিই হলো সবচেয়ে বড় শূন্যতা। মুসলিম জীবন থেকে সেরূপ শূন্যতা দূর করতেই মহান নবীজী (সাঃ) মহাজ্ঞানী মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের প্রথম দিনে নিজের ঘর না গড়ে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন। মসজিদ গড়ে প্রতিটি মুসলিম নর ও নারীর জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন। সে শিক্ষালয়ে তিনি ছিলেন সার্বক্ষণিক শিক্ষক। দেশের বুকে গড়ে তুলে ছিলেন নরনারী চরিত্রে উচ্চতর সংস্কার আনার সংস্কৃতি। সে ইসলামী রাষ্ট্রকে প্রতিরক্ষা দিতে নবীজী (সাঃ) এবং তাঁর সাহাবাগণ লাগাতর জিহাদ করেছেন। শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবা সে জিহাদে শহীদ হয়েছেন। অথচ বাঙালী মুসলিমগণ পুরাপুরি ব্যর্থ এক্ষেত্রে। তারা না পেরেছে কোন ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা দিতে, না পেরেছে ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে প্রতিষ্ঠা দিতে। এটিই হলো নবীজী (সাঃ)র ইসলাম থেকে বাঙালীর ইসলামের মূল পার্থক্য। বস্তুতঃ এ হলো এক বিশাল ব্যর্থতা ও বিচ্যুতি। প্রশ্ন হলো, এরূপ বিশাল ব্যর্থতা ও বিচ্যুতি নিয়ে শুধু পার্থিব জীবনে নয়, পরকালেও কি বিন্দুমাত্র সফলতা মিলবে? ১৭/০৩/২০১৯




অপরাধীদের শাসন এবং যুদ্ধ আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে

হাইজ্যাক হয়েছে নবীজীর আসন

ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায় এবং অন্যায়ের নির্মূলে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করে আদালতের বিচারকগণ। ইসলামে বিচারপতির মর্যাদা এই জন্যই বিশাল। ভূমি থেকে আাগাছা নির্মূল ও সে ভূমিতে ফসল ফলানোর দায়িত্ব যেমন কৃষকের,তেমনি দেশ থেকে দুর্বৃত্ত নির্মূল ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার বড় দায়িত্বটি হলো আদালতের বিচারকদের।এ লক্ষ্যে রাষ্ট্রের অতি গুরুত্বপূর্ণ ইন্সটিটিউশন হলো আদালত। আদালতের বিচারকগণ যোগ্যবান হলে সেদেশ দুর্বৃত্তদের দ্বারা অধিকৃত হয় না। বিচারকগণ তখন দুর্বৃত্ত পেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রীকেও আদালতের কাঠগড়ায় তোলে। একটি দেশ কতটা ব্যর্থ সেটি পরিমাপের জন্য তাই চোর-ডাকাতদের সংখ্যা গণনার প্রয়োজন পড়ে না। দেশের আদালত কতটা কীরূপ বিচারকদের দ্বারা অধিকৃত –তা থেকেই সে হিসাবটি পাওয়া যায়। এ দিক দিয়ে বাংলাদেশের ব্যর্থতা কি কম? অতীতে বিচারপতির আসনে বসেছেন খোদ নবীরাসূলগণ। তাদের অবর্তমানে বসেছেন তাদেরই বিশ্বস্থ্য সাহাবাগণ। ইসলামের যখন গৌরবযুগ তখন সে আসনে বসেছেন সবচেয়ে জ্ঞানী, ফকীহ ও চরিত্রবান ব্যক্তিগণ। ইসলামে এটি অতি উচ্চপর্যায়ের ইবাদত। রাষ্ট্র জুড়ে এ পবিত্র ইবাদতটি প্রতিষ্ঠা না পেলে কোটি কোটি মানুষের নামায-রোযা ও হ্জ-যাকাত,অর্থনৈতিক উন্নয়নে বা শত শত কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় দুর্বৃত্তি ও অবিচার নির্মূল হয় না। প্রতিষ্ঠা পায় না সৎকর্ম ও ন্যায়-নীতি। ইসলাম যে শান্তির ধর্ম সেটিও তখন প্রমাণিত হয় না। দুর্বৃত্ত-অধিকৃত সে দেশটিতে তখন আস্তাকুঁরে গিয়ে পড়ে সুবিচার। তাই শ্রেষ্ঠ জাতির মর্যাদা দিতে গিয়ে মহান আল্লাহতায়ালা মুসলমানদের উপর যে প্রধান শর্তটি আরোপ করেছেন তা হলো ঈমানের পাশাপাশি ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের নির্মূল। যে দেশে যোগ্যতর বিচারপতি ও সুবিচারের অভাব,সেদেশে অসম্ভব হলো সভ্যতর সমাজের নির্মাণ।দেশ তখন ইতিহাস গড়ে অবিচার ও দুর্বৃত্তিতে।বাংলাদেশে তো সেটিই ঘটেছে।

কোনটি ন্যায়,আর কোনটি অন্যায় -সে জ্ঞান নিরক্ষর ব্যক্তিদেরও থাকে। কিন্তু সত্যের পক্ষে দাঁড়াবার নৈতীক বলটি সবার থাকে না।এমনকি বহু উচ্চ শিক্ষিতদেরও থাকে না।অতি দুর্বৃত্তরাও জানে কোনটি ন্যায়,আর কোনটি অন্যায়।জেনে বুঝে অন্যায়ের পক্ষ নেয় বলেই তারা দুর্বৃত্ত। আাদালতের বিচারকদের দায়িত্ব হলো,শুধু ন্যায়ের পক্ষ নেয়া নয়,অন্যায়কারিকে শাস্তি দেয়াও। এটি এক গুরু দায়িত্ব। তাই বিচারের কাজ ভীরু,কাপুরুষ ও স্বৈরাচারের কাছে আত্মসমর্পিত ব্যক্তির দিয়ে হয় না। কিন্তু সে সামর্থ বাংলাদেশের আদালতে ক’জন বিচারকের? সে নৈতীক বল কি আইন শাস্ত্রের উপর ডিগ্রি নিলে সৃষ্টি হয়? আইনের জ্ঞান,চিকিৎসাবিজ্ঞান,হিসাবজ্ঞান বা প্রকৌশলের জ্ঞান –এরূপ নানারূপ সেক্যুলার জ্ঞানে পেশাগত জানাশোনা বাড়ে। উপার্জনের সামর্থও বাড়ে। কিন্তু তা দিয়ে কি ন্যায়পরায়নতা,সততা বা নৈতীক বল বাড়ে? সে জন্য তো চাই ঈমানের বল। ঈমানের বলবৃদ্ধির জন্য চাই চেতনায় ঝাঁকুনি দেয়ার মত দর্শনের বল। চাই আধ্যাত্মীক বল। সে সামর্থ লাভে অপরিহার্য হলো মহান আল্লাহর কাছে জবাবদেহীতার ভয়। সে জন্য পেশাদারি জ্ঞানের বাইরেও প্রয়োজন পড়ে গভীর জ্ঞানার্জনের।

গরুর গাড়ির চাকা কি রেলগাড়িতে লাগানো যায়? যে পবিত্র আসনে মহান নবী-রাসূলগণ বসেছেন সে আসনে কোরআনী জ্ঞানে অজ্ঞ ও ইসলামে অঙ্গিকারহীন ব্যক্তিদের কি বসানো যায়? এমন কর্ম যে হারাম এবং মহান আল্লাহতায়ালার বিধানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ -সে বিষয়টি একজন মুসলমান ভূলে যায় কি করে? বিচারকের আসনে কি গুরুছাগলকে বসানো যায়?  যারা কাফের, যারা নাস্তিক,ইসলামের শরিয়তি বিধানে যারা আস্থাহীন এবং ইসলামের পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠার যারা বিরোধী –তারা যত ডিগ্রিধারিই হোক,পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা তো তাদেরকে গরুছাগলের চেয়েও নিকৃষ্ট বলেছেন।তাদেরকে বিচারকের আসনে বসানো কি আদালতের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অবমাননা নয়? মুসলিম দেশে এমন হারাম কর্ম আদালতের অঙ্গণে চলতে থাকলে ঈমান নিয়ে ও আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ নিয়ে বাঁচাটিও যে সে আদালতে শাস্তিযোগ্য অপরাধ রূপে চিহ্নিত হবে সেটি কি স্বাভাবিক নয়? ফিরাউনের আদালতে তো তাই হয়েছিল। বাংলাদেশেও তো আজ সেটিই হচ্ছে।

 

গণতন্ত্র হত্যায় আদালতের ব্যবহার

বাংলাদেশে বার বার আগ্রাসন ও নাশকতা ঘটেছে জনগণের মৌলিক অধিকারের বিরুদ্ধে। সেগুলো ঘটেছে ঔপনিবেশিক বিদেশী শক্তি এবং দেশী সামরিক বাহিনী ও ফ্যাসিবাদি রাজনৈতিক শক্তির হাতে। কিন্তু দেশের মানুষের মৌলিক অধিকারের বিরুদ্ধে সর্বশেষ নাশকতাটি ঘটিয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের হাতে। সেটি বিচারের নামে। ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন সে অসম্ভব সে উপলব্ধিটি ছিল সকল রাজনৈতিক দলের। সেটি যেমন অতীতে বহুবার প্রমাণিত হয়েছে, তেমনি প্রমাণিত হয়েছে ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির এবং ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে। দীর্ঘ দিনের সে অভিজ্ঞতা নিয়েই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানটি তাই গৃহিত হয়েছিল সর্বদলীয় সিন্ধান্তের ভিত্তিতে। অথচ কি আশ্চর্যের বিষয়! দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার যে মৌল বিষয়টি দেশের সবগুলো রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীগণ বুঝতে পারলেও সেটিই বুঝতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকগণ। ফলে যে সম্মিলিত উপলব্ধির ভিত্তিতে দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান চালু হলো -সেটিকেই অবৈধ ঘোষণা দিল দেশের আদালত। আর এতে স্বৈরাচারি শেখ হাসিনা পেল,ইচ্ছামত ভোট ডাকাতির সুযোগ।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানকে অবৈধ বলে রায় দিয়েছে দেশের প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক। খায়রুল হক যে কতটা নীতিহীন ও মেরুদন্ডহীন সেটির প্রমাণ তিনি নিজেই দিয়েছেন। হাসিনা সরকারের পক্ষে রায় দেয়ার পর তিনি প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে ১০ লক্ষ টাকা ত্রাণ নিয়েছেন। -(সূত্র- দৈনিক আমার দেশ,৩০/৫/১১)। প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক উদ্বাস্তু নন, গৃহহীন বা অর্থহীনও নন। তিনি উচ্চ বেতনের চাকুরি থেকে অবসর নিয়েছেন। ফলে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে ত্রাণ নেয়ার প্রয়োজনটি তার দেখা দেয় কি করে? খায়রুল হকের দেয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির বিলুপ্তির রায়টি সুযোগ করে দেয় ২০১৪ সালের নির্বাচনী ডাকাতির। ডাকাতির অর্থ কামাইয়ে কোনরূপ চাকুরি-বাকুরি বা ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রয়োজন পড়ে না। তেমনি ভোট ডাকাতির নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দীতায় নামার প্রয়োজন পড়ে না। তাই সরকারি দলের ১৫১ জন প্রার্থী নির্বাচন জিতেছে কোনরূপ প্রতিদ্বন্দিতা না করেই। যেসব সিটে নির্বাচন হয়েছে,সেসব আসনেও শতকরা ৫% জন ভোটারও ভোট দিতে যায়নি। খেলার মাঠে প্রতিদ্বন্দি দুই দল খেলতে না নামলে কি সে খেলা দেখতে দর্শক হাজির হয়? এমন খেলা তো অবশ্যই পরিত্যক্ত হয়। অথচ দেশের সংসদ নির্বাচন খেলাধুলার ন্যায় মামূলী বিষয় নয়। এখানে নির্ধারিত হয় জাতির ভবিষ্যৎ। তাই গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচনি কমিশনের দায়িত্ব হলো এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা যাতে সরকারি ও বিরোধী দল –এ উভয় পক্ষের অংশগ্রহণই সুনিশ্চিত হয়। নইলে সে নির্বাচন পরিত্যক্ত হওয়াই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু এমন প্রতিদ্বন্দীতাহীন নির্বাচন বাংলাদেশে স্থগিত হয়নি!

 

আলেমদের অপরাধ

বাংলাদেশের নগরবন্দরে যেমন বেশ্যাবৃত্তি,সুদ,ঘুষ,মদ্যপান,সন্ত্রাস ও চুরিডাকাতির ন্যায় অসংখ্য হারাম কর্ম প্রতিষ্ঠা পেয়েছে,তেমনি আদালতের পবিত্র অঙ্গনে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে ব্রিটিশ কাফেরদের রচিত হারাম আইন ও হারাম বিচার রীতি। অথচ এ হারাম নিয়ে বাংলাদেশের আলেম-উলামা,পীর-মাশায়েখ ও ইসলামি দলের নেতাকর্মিগণও নীরব। এমন নীরবতা কি কম অপরাধ? মুসলিম ভূমির আইন-আদালত কাফেরদের হাতে অধিকৃত হলে কোন ঈমানদার কি নীরব থাকতে পারে? সে নীরবতায় কি তা ঈমান বাঁচে? নবীজী (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামের যুগে এরূপ হলে কি জিহাদ শুরু হতো না? পবিত্র কোরআনের ও হাদীসের জ্ঞান ছাড়া কোন ব্যক্তি সুবিচারের সামর্থ পাবে ও নৈতীক মেরুদন্ড পাবে -সেটি বিশ্বাস করাই তো পবিত্র কোরআন ও নবীজী (সাঃ)র সূন্নতের প্রতি অবমাননা। এমন অবমাননাকারি কি পরকালে মহান আল্লাহতায়ালা থেকে কল্যাণ পেতে পারে? মুসলমানদের থেকেই বা তারা সম্মান পায় কি করে? অথচ বাংলাদেশের আদালতে আল্লাহর দ্বীনের এমন অবাধ্য বিচারকদেরও মহামান্য বলতে হয়। মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তের প্রতিষ্ঠার যারা বিরোধী তাদের প্রতি এমন সম্মান প্রদর্শন কি খোদ আল্লাহতায়ালার সাথে মশকরা নয়? তা নিয়েই বা ভাবনা ক’জনের?

 

নবীজী (রাঃ)র আদালত ও বাংলাদেশের আদালত

ঈমানদারির দায়ভার শুধু নবীজী (সাঃ)র অনুকরণে নামায-রোযা,হজ-যাকাত আদায় করা নয়, তাঁর অনুকরণে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করাও।ইসলামে এটি ফরজ। কিন্তু সে ফরজ ইবাদতটি অসম্ভব হয় দুর্বৃত্তদের হাতে রাষ্ট্র অধিকৃত হলে। ন্যায় বিচারে মুসলমানগণ যখন ইতিহাস গড়েছিল তখন বিচার কাজের জন্য কোন প্রাসাদ ছিল না। বিচার বসতো মসজিদের মেঝে বা মাটির ঘরে জীর্ণ খেজুর পাতার উপর। সুবিচারের জন্য যা জরুরী তা হলো সুযোগ্য বিচারক। সুযোগ্য বিচারক গড়তে যা অপরিহার্য তা হলো ইসলামের গভীর জ্ঞান। সে জ্ঞানের মাধ্যমেই চেতনার ভূবনে বিপ্লব আসে,নির্মিত হয় বিচারকের অটুট মেরুদন্ড।সে জ্ঞানের বরকতেই ভেড়ার রাখালগণ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ট বিচারকে পরিণত হয়েছিলেন। মহান আল্লাহতায়ালা এমন উন্নত মানুষ গড়ার মিশন শুরু করেছিলেন কোরআনী জ্ঞানের আলো জ্বালানোর মধ্য দিয়ে। পবিত্র কোরআনের প্রথম আয়াতটি তাই “ইকরা” তথা “পড়”। প্রতিটি নরনারীর উপর ফরজ হলো পবিত্র কোরআনের জ্ঞানার্জন। এ জ্ঞান ছাড়া মুসলিম রাষ্ট্রের আদালতে কেউ বিচারকের আসনে বসবেন সেটি কি ভাবা যায়? সে জ্ঞান ছাড়া প্রকৃত ঈমানদার রূপে বেড়ে উঠাই কঠিন।

মানুষের চেতনা ও চরিত্রে মূল বিপ্লবটি আসে শিক্ষা ও দর্শনের গুণে। শিক্ষা ও দর্শনের গুণেই মানুষ পায় মজবুত মেরুদন্ড। পায় ন্যায়নীতিপূর্ণ মূল্যবোধ। চোর-ডাকাতদের থেকে ঈমানদারের মূল পার্থক্যটি পানাহারে বা পোষাক-পরিচ্ছদে নয়,দৈহীক গুণেও নয়। সেটি এই শিক্ষা ও জীবন-দর্শনের কারণে। মহান নবীজী (সাঃ)র আগমনে আরবের মানুষের মাঝে খাদ্য-পানীয়,বংশ-মর্যাদা ও আবহাওয়ায় পরিবর্তন আসেনি। বরং পাল্টে গিয়েছিল আরব জনগণের আক্বিদা-বিশ্বাস তথা জীবন-দর্শন। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সে দর্শনটি তারা পেয়েছিলেন মহাজ্ঞানী মহান আল্লাহতায়ালা থেকে। তাদের কাছে সেটি পৌঁছেছিল পবিত্র কোরআন মারফত। জ্ঞানচর্চার সে পবিত্র কাজটি শুধু স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সীমিত রাখলে চলে না। স্রেফ স্বল্পকালীন ছাত্রজীবনের গন্ডিতে সীমিত রাখলেও চলে না। মুসলমান আমৃত্যু ছাত্র। জীবনের প্রতিদিন ও প্রতিরাত জুড়ে চলে তার জ্ঞানার্জন। জ্ঞানচর্চার সে কাজকে ব্যাপকতর ও গভীরতর করার স্বার্থে প্রতিটি ঘর ও প্রতিটি জনপদকে তখন পাঠশালায় পরিণত করতে হয়। ইসলামের প্রথম ১৩ বছরে কোন মসজিদ,মাদ্রাসা,কলেজ বা বিশ্ববিদালয় গড়া হয়নি। অথচ শুধু মুসলিম ইতিহাসে নয়,সমগ্র মানব ইতিহাসের সবচেয়ে চরিত্রবান,জ্ঞানী ও শক্ত মেরুদন্ডের মানুষগুলো সৃষ্টি হয়েছে সেই ১৩ বছরে। সেটি সম্ভব হয়েছে মু’মিনের মনে লাগাতর কোরআনের জ্ঞানকে বদ্ধমূল করার মহান আল্লাহতায়ালার নিজস্ব স্ট্রাটেজীর ফলে। কিন্তু রাষ্ট্রে সে অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজটি অসম্ভব হয় দুর্বৃত্তদের হাতে রাষ্ট্র অধিকৃত হলে।

 

ইন্ডাস্ট্রি ঈমানধ্বংসের

সাম্রাজ্যবাদি শাসনের যুগে ব্রিটিশগণ ভারতে যেসব শিক্ষা নীতি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু করা হয়েছিল তার পিছনেও জঘন্য কু’মতলব ছিল। সেটি ছিল ব্রিটিশ স্বার্থের পাহারাদার ও ইংরেজ রাজকর্মচারিদের জন্য দোভাষী সৃষ্টি।লক্ষ ছিল মুসলমানদের ঈমান ধ্বংস। সে লক্ষ্যেই জোর দেয়া হয় ইংরাজী ভাষা শিক্ষার উপর। সে সময় মুসলমানদের বুদ্ধিবৃত্তিক পুষ্টির ভাষা ছিল ফার্সি। ঈমান পুষ্টি পেত সে ভাষা হতে। ফার্সি ছিল ভারতের রাষ্ট্র ভাষাও। অথচ সেটিকে বাদ দেয়া হয়। বুদ্ধিবৃত্তিক পুষ্টির ভাষাচর্চা নিষিদ্ধ হলে ঈমান যে মারা পড়বে সেটিই কি সুনিশ্চিত নয়? মুসলিম দেশে কাফের ব্রিটিশদের শাসনে মুসলমানদের শিল্প ধ্বংস হয়েছে সেটি সবচেয়ে বড় ক্ষতি নয়। বরং সবচেয়ে বড় ক্ষতিটি হয়েছে বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গণে। এতে মারা পড়েছে বা অসুস্থ্য হয়েছে মুসলমানদের ঈমান।

ব্যক্তির আত্মায় বা চেতনায় জীবাণু পৌঁছাতে ভাষা পাইপ-লাইনের কাজ করে। ঔপনিবেশিক শাসনামলে ইংরেজী ভাষায় ইসলাম বিষয়ে জ্ঞানলাভের কোন বইপুস্তক ছিল না। বরং ছিল মুসলিম চেতনায় দূষণ সৃষ্টি ও ইসলাম থেকে দূরে সরানোর বিপুল সামগ্রী। ফলে সে সাহিত্যের ফলে মুসলিম মনে বেড়েছে ডি-ইসলামাইজেশন। এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি পরিণত হয়েছে ঈমানধ্বংসের বিশাল ইন্ডাস্ট্রিতে। সে ইন্ডাস্ট্রি আজও একই মিশন নিয়ে মুসলিম দেশগুলির প্রতি অঙ্গণে কাজ করছে। মুসলমানগণ বিপুল হারে খৃষ্টান না হলেও,ইংরেজ-প্রবর্তিত সে শিক্ষানীতির ফলে তারা ইসলাম থেকে প্রচন্ড ভাবে দূরে সরেছে। সে শিক্ষাব্যবস্থায় ডাক্তার,ইঞ্জিনীয়ার, কৃষিবিদ,হিসাববিদ বা নানারূপ পেশাদার রূপে অনেকে বেড়ে উঠলেও সে শিক্ষা থেকে তারা ঈমানে পুষ্টি পায়নি। ঈমানে সে অপুষ্টি ও দূষণের কারণেই কাফেরদের ন্যায় তারাও শরিয়ত, জিহাদ, খেলাফতের বিরোধী। এরূপ ইসলাম বিরোধীদের হাতেই বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশের আইন-আদালত,শিক্ষা-সংস্কৃতি, পুলিশ,সেনাবাহিনী ও প্রশাসন জিম্মি।

দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা ও হাসপাতালগুলো বিফল হলে সমগ্র দেশ অসুস্থ্য মানুষে ভরে উঠে। আর বিচার ব্যবস্থা কাজ না করলে দেশে দুর্বৃত্তদের প্লাবন আসে। তখন দেশ পূর্ণ হয় ভয়ানক অপরাধীদের দিয়ে। বাংলাদেশে তো সেটিই ঘটেছে। তাই ইসলামের অতি গুরুত্বপূর্ণ মিশন হলো শরিয়তের বিধানের উপর আদালতের প্রতিষ্ঠা। আইন-আদালত ও বিচারব্যবস্থার ব্যর্থতার কারণেই সমগ্র দেশ আজ দুর্বৃত্তদের দ্বারা অধিকৃত। চলছে ঘুষখোর ও নানারূপ অপরাধীদের রাজত্ব। বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় ব্যর্থ খাতটি তাই দেশের কৃষি,শিল্প,বাণিজ্য বা চিকিৎসা খাত নয়। বরং সেটি হলো দেশের আইন-আদালত ও বিচারব্যবস্থা। সে ব্যর্থতার কারণেই সুবিচার ও ন্যায়নীতি আজ  কবরে শায়ীত।

 

যুদ্ধ মহান আল্লাহতায়ালার এজেন্ডার বিরুদ্ধে

মানব জাতির সবচেয়ে বড় বিপর্যয়টি খাদ্যাভাবে,বস্ত্রাভাবে,অর্থাভাবে বা চিকিৎসার অভাবে ঘটে না। বরং সেটি ঘটে সুবিচারের অভাবে। অবিচার এবং আল্লাহর আইনের অবাধ্যতা বরং আল্লাহর আযাবকে অনিবার্য করে তোলে। সুবিচারের প্রতিষ্ঠা মহান আল্লাহতায়ালার কাছে এতই গুরুত্বপূর্ণ যে সেটিকে সুনিশ্চিত করতেই মহাজ্ঞানী রাব্বুল আলামীন শরিয়তি বিধান দিয়েছেন,এবং সে সাথে সে বিধানের প্রতিষ্ঠাকে নামায-রোযা,হজ-যাকাতের ন্যায় ফরয তথা বাধ্যতামূলক করেছেন। তিনি খাদ্য,বস্ত্র,রাস্তাঘাট বা শিল্প বাড়াতে এরূপ ওহী নাযিল করেনি। অথচ ওহী পাঠিয়েছেন সুবিচারের পথ দেখাতে। পবিত্র কোরআনে স্পষ্ট ভাবে হুশিয়ার করে দেয়া হয়েছে এ বলে,“যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী বিচার করে না তারাই কাফির, তারাই যালিম ও তারাই ফাসিক।” -(সূত্রঃ সুরা মায়েদা আয়াত ৪৪,৪৫,৪৭)।তাই কাফের হওয়ার জন্য পুতুল পুজারি বা নাস্তিক হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া শরিয়তি বিধানের প্রতিষ্ঠায় অনাগ্রহ বা বিরোধীতাই সে জন্য যথেষ্ঠ। এ বিষয়ে পবিত্র কোরআনে কোন রূপ অস্পষ্টতা রাখা হয়নি।

মানব জাতির বড় প্রয়োজনটি স্রেফ সুযোগ্য কৃষক,শ্রমিক,শিক্ষক,চিকিৎসক,প্রকৌশলী বা বিজ্ঞানী নয়,বরং সবচেয়ে বড় প্রয়োজনটি হলো শরিয়তি বিচার ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা। সে কাজে প্রয়োজন হলো শরিয়তি আইনের উপর বিশেষজ্ঞ বিচারকদের। এবং পবিত্র কর্ম হলো শরিয়ত প্রতিষ্ঠার জিহাদ।পবিত্র কোরআনের পরিভাষায় এটি হলো জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ। মসজিদ-মাদ্রাসার সংখ্যা বাড়িয়ে,হাফিজ বা ক্বারির সংখ্যা বাড়িয়ে কি জিহাদের দায়ভার থেকে মুক্তি মেলে? খাদ্যপণ্য, শিল্পপণ্য বা বৈজ্ঞানিক সামগ্রিক বিদেশ থেকে কেনা যায়। কিন্তু শরিয়তি আদালতের ন্যায়-বিচারকদের বিদেশ থেকে আমদানি করা যায় না। তাদের গড়তে হয় নিজেদের মধ্য থেকে। নইলে সে ভূমিতে সুবিচার প্রতিষ্ঠা পায় না,সভ্য সমাজও নির্মিত হয় না। বাংলাদেশের বড় ব্যর্থতা তো এখানেই। নবীজী (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামের জীবনে একটি দিনও শরিয়তি বিধান ছাড়া অতিবাহিত হয়নি। এমনকি উমাইয়া,আব্বাসীয়,উসমানিয়া ও মোগল আমলেও নয়।বাংলার সুলতানি আমল বা সিরাজুদ্দৌলার আমলেও নয়। মুসলিম দেশগুলিতে শরিয়ত আইনকে বিলুপ্ত করেছে সাম্রাজ্যবাদি কাফের ব্রিটিশগণ। আর তাদের প্রতিষ্ঠিত সে কুফরি বিচার ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রেখেছে তাদেরই মানসিক গোলাম ও কলাবোরেটরগণ। আজকের মুসলিম দেশগুলিতে ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদি শাসনের এটিই হলো সবচেয়ে ক্ষতিকর লিগ্যাসি যা মুসলমানদেরকে মহান আল্লাহতায়ালার শত্রু রূপে খাড়া করছে। মুসলমানদের ভয়ংকর অপরাধ হলো তারা বাঁচিয়ে রেখেছে কাফেরদের সে ঈমানধ্বংসী লিগ্যাসী। বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশের ইসলামি দলের নেতাকর্মী ও আলেমদের ব্যর্থতাও এ ক্ষেত্রে বিশাল। দেশের আলেম ও পীরমাশায়েখগণ দাফন-কাফন,হায়েজ-নেফাস, ঢিলাকুলুপ ও মেছাওয়াকের মসলা নিয়ে বিস্তর জ্ঞানদান করলেও শরিয়ত প্রতিষ্ঠার ফরজ বিষয়টি নিয়ে কোন উচ্চবাচ্য করেন না। ইসলামি দলের নেতাকর্মীগণ সরকারের পতন,নেতাদের মুক্তি বা নির্বাচনের দাবীতে রাস্তায় বিপুল সংখ্যায় নামলেও শরিয়তের প্রতিষ্ঠা নিয়ে একটি আওয়াজও তোলেন না। আল্লাহর দ্বীনের প্রতিষ্ঠায় এরূপ অবহেলা নিয়ে ইহকাল বা পরকালের কোথাও কি মহান আল্লাহতায়ালার করুণা জুটবে?

 

নিয়ন্ত্রণ ইসলাম চর্চায়

ভারতে ব্রিটিশের প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো মূলতঃ কাজ করেছে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনের পক্ষে একপাল অনুগত সেবক সৃষ্টির ইন্ডাস্ট্রি রূপে। সে শিক্ষানীতির প্রবক্তা লর্ড ম্যাকলে নিজেই তেমন এক উদ্দেশ্যের কথা ব্রিটিশ পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন। সে শিক্ষানীতি ব্রিটিশের দালাল সৃষ্টিতে অপূর্ব সফলতা দেখিয়েছে। এ দালাল  সৃষ্টির কারণেই একমাত্র প্রথম বিশ্বেযুদ্ধেই ব্রিটিশের সাম্রাজ্য রক্ষায় ১০ লাখ ভারতীয় যুদ্ধ করেছে এবং ৭৪ হাজার ১৮৭ জন ভারতীয় প্রাণ দিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সে সংখ্যা ছিল আরো অধীক। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য রক্ষায় ১৯৩৯ সালে প্রায় ২৫ লাখ ভারতীয় ব্রিটিশ বাহিনীতে সৈনিক রূপে নাম রিজিস্ট্রিভূক্ত করে। তারা যুদ্ধ করেছে এশিয়া ও আফ্রিকার নানা রণাঙ্গণে। মানব জাতির সমগ্র ইতিহাসে এটিই হলো একটি বিদেশী শক্তির পক্ষে কোন একটি দেশ থেকে সবচেয়ে বৃহৎ দালাল বাহিনী। অথচ সে ভারতের বুকেই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ লড়তে সুভাষ বোস ২০-৩০ হাজার সৈন্য খুঁজে পেতেই্ প্রচন্ড হিমশীম খাচ্ছিলেন। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ সামরিক ও রাজনৈতিক অধীনতা থেকে মুক্তি মেলেছে এবং উপমহাদেশের ভূগোলও পাল্টে গেছে। কিন্তু ইংরেজদের প্রবর্তিত সেক্যেুলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে যারা ডিগ্রিপ্রাপ্তদের মনের ভুবন থেকে গোলামী এখনো দূর হয়নি। সে অভিন্ন ধারা আজও  অব্যাহত রয়েছে আজকের বাংলাদেশে।ফলে ব্রিটিশ কাফেরদের প্রবর্তিত কুফরি আইন ও বিচারব্যবস্থা এখনও বেঁচে আছে ১৫ কোটি মুসলিম অধ্যুষিত একটি দেশে। সাহাবায়ে কেরামের যুগে কি এটি ভাবা যেত? অথচ এরপরও আমরা নিজেদের তে ইসলামের অনুসারি মনে করি!

চোর-ডাকাতদের মহল্লায় কি ন্যায়নীতি প্রচার পায়? কদর পায় কি ন্যায়পরায়নতা? বিচার বসে কি ডাকাত দমনে? সেখানে তো প্রশংসা পায় চুরি-ডাকাতি,হত্যা ও হত্যায় নৃশংসতা। একই রূপ কদর্যতা বাড়ে দুর্বৃত্ত-কবলিত দেশে। তখন অপরাধ বাড়াতে ভূলিয়ে দেয়া হয় ধর্মের বাণী এবং ধর্মকর্মকে। রাজনীতিতে তখন গুরত্ব পায় এক খুনের বদলে ১০ খুনের রাজনীতি। বাংলাদেশে তো সেটিই হয়েছে। তাছাড়া দুর্নীতিতে যে দেশ ৫ বার বিশ্বে প্রথম হয় সে দেশে কি ভিন্নতর কিছু আশা করা যায়? ন্যায়বিচার ও ইসলামের শরিয়ত ভিত্তিক বিচার ব্যবস্থা কদর পাবে বা প্রতিষ্ঠা পাবে সেটিও কি আশা করা যায়? বাংলাদেশে মার্কসবাদ,লেলিনবাদ বা মাওবাদের প্রচার নিষিদ্ধ নয়। নিষিদ্ধ নয় বাইবেল প্রচার। নিষিদ্ধ নয় রামায়ান,বেদ বা ত্রিপঠক পাঠ। নিষিদ্ধ নয় বেশ্যাবৃত্তি, জুয়া, ঘুষ ও মদ্যপানের ন্যায় হারাম কর্মও। বরং পাপাচারের নিরাপত্তা বাড়াতে দেশের পতিতা পল্লিগুলিতে দিবারাত্র পুলিশ মোতায়েন করা হয়। অথচ মসজিদে মসজিদে সরকারের নজরদারি বেড়েছে নবীজী (সাঃ)র প্রচারিত সনাতন ইসলামের প্রচার রুখতে।

নবীজী (সাঃ)র ইসলামে জিহাদ ছিল,শরিয়তি ছিল,খেলাফত ছিল,শুরা ছিল। কিন্তু বাংলাদেশে ইসলামের এ সনাতন রীতিগুলি চিহ্নিত হচ্ছে সন্ত্রাস রূপে। শরিয়তের দাবী নিয়ে রাস্তায় নামলে বা ঘরে জিহাদ বিষয়ক বই রাখলে জেলে তোলা হয়। আদালতে ঈমানদারদের স্থান নাই। সেখানে বরং বেছে বেছে বসানো হয় দলীয় ক্যাডারদের।মহান আল্লাহর শরিয়তি বিধানের পরাজয় দেখতেই এসব বিচারকদের আনন্দ। রাজনৈতিক শত্রু নির্মূলে দলীয় ক্যাডারগণ যেমন রাজপথে লাঠি ধরে,একই লক্ষ্যে তারা আদালতের উপরও অধিকার জমিয়েছে। বিচারকের আসনে বসে নিজ দলের পক্ষে ও ইসলামের বিরুদ্ধে এরাই কলম ধরছে। এরূপ পক্ষপাত-দুষ্ট ও দেশবাসীর স্বাধীনতার প্রতি অঙ্গিকারশূণ্য বিচারকদের দিয়েই ঔপনিবেশিক শাসকেরা অধিকৃত দেশগুলিতে মুক্তি আন্দোলনের অসংখ্য নেতাকর্মীকে ফাঁসিত ঝুলিয়ে হত্যা করেছে।আর বাংলাদেশ ও মিশরের ন্যায় দেশগুলিতে এখন তারা ব্যবহৃত হচ্ছে গণতন্ত্র হত্যার কাজে। এবং আদালতে চলছে সরকার বিরোধীদের ফাঁসিতে ঝুলানোর তুমুল তান্ডব।

 

যে অপরাধ জনগণের

প্রতিটি ঈমানদারকে শুধু পানাহারে বাঁচলে চলে না,ঈমানী দায়ভার নিয়ে বাঁচতে হয়। সে দায়ভার পালনে প্রয়োজনে যুদ্ধেও নামতে হয়। সে দায়ভার পালনে নবীজী (সাঃ)র শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবী শহীদ হয়ে গেছেন। দায়িত্বপালনে গাদ্দারির কারণে ইহুদী জাতির লাগাতর আযাব ও অপমান নেমে এসেছে।তাদেরকেও স্বৈরাচারি ও সন্ত্রাসী শাসকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের হুকুম দেয়া হয়েছিল। কিন্তু অবাধ্য ইহুদীগণ সে হুকুমের জবাবে হযরত মূসা (আঃ)কে বলেছিল, “যাও, তুমি ও তামার আল্লাহ গিয়ে যুদ্ধ করো। আমরা অপেক্ষায় থাকলাম।” জনপদে বাঘ-ভালুক নামলে সেটি তাড়ানোর দায়িত্ব ফেরেশতাদের নয়। সে দায়ভারটি মহল্লাবাসীদের নিতে হয়। তেমনি রাষ্ট্র জালেম শক্তির হাতে অধিকৃত হলে তাদের নির্মূলের দায়ভারটিও জনগণের। অন্যায় কে মেনে নেয়ার মধ্যে কোন সাধুতা বা ভদ্রতা নেই। বরং সেটি হলো কাপুরুষতা ও অন্যায়ের কাছে আত্মসমর্পণ। ইসলামে এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ ধরণের অপরাধ পৃথিবী পৃষ্ঠে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে কঠিন আযাব নামিয়ে নামে। মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে এটি এক প্রচন্ড বিদ্রোহও। মহিমাময় মহান আল্লাহতায়ালা শুধু নামায-রোযা,হজ-যাকাত পালনের নির্দেশই দেননি। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন “নেহী আনিল মুনকার” তথা রাষ্ট্র থেকে দুর্বৃত্তদের নির্মূলেও। সামর্থবান মানুষের মহল্লায় যেমন নেকড়া বাঘ বাঁচে না,মুসলিম সমাজে তেমনি আবু লাহাব ও আবু জেহেলদের ন্যায় ইসলামের শত্রুগণও বাঁচে না।তাদের বিরুদ্ধে ঈমানদারদের লাগাতর জিহাদ শুরু হয়। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ এক্ষেত্রে অনেক নীচে নেমেছে। আজ থেকে ৬০ বছর আগেও বাংলার সমাজ ও রাজনীতি বর্বর সন্ত্রাসীদের হাতে এতটা অধিকৃত হয়নি। মানুষ গুম ও খুনে পূর্বের কোন সরকারই এতটা সাহস পায়নি।কিন্তু এখন পায়।কারণ,কোটি কোটি মানুষ এমন অপরাধী খুনিদের শুধু ভোটই দেয় না,তাদের পক্ষে অনেকে লাঠিও ধরে।অনেকে কলমও ধরে।

শরীরে ক্যান্সারের আলামতগুলি স্বচোখে দেখার পরও সেটির চিকিৎসা না করাটি অপরাধ। রোগীকে সে অপরাধের শাস্তি পোহাতে হয় অকাল মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। একই রূপ অপরাধ বাংলাদেশীদেরও। দেশে রাজনীতি,প্রশাসন ও আইন-আদালতের নামে প্রাণনাশী ক্যান্সার বেড়ে উঠছে বহুকাল যাবত। সেটি এখন ফুলে ফেঁপে উঠেছে এবং দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে বিশ্বব্যাপী। সে দুর্গন্ধ টের পাচ্ছে হাজার হাজার মাইল দূরের বিশ্ববাসীও। ফলে বাংলাদেশের প্রশাসন ও আইন-আদালতের অপরাধ নি্য়ে বিশ্বের নানা প্রান্তর থেকে প্রবল প্রতিবাদ উঠেছে। বিচারকগণ স্বৈরাচারি সরকারের এজেন্ডা পূরণে রাজনেতিক বিরোধীদের হত্যায় নেমেছে -সে গুরুতর অভিযোগটিও উঠেছে। হ্ত্যার সে সরকারি অভিলাষটি প্রকাশ পেয়েছে একজন সাবেক বিচারপতির স্কাইপী সংলাপ থেকে। কিন্তু যে দেশবাসী সে রোগে আক্রান্ত তাদের মাঝে এ নিয়ে আন্দোলন কই? এটি কি কম বিস্ময়ের? অথচ এরূপ সন্ত্রাসী দুর্বৃত্তদের হাতে কোন কোন সভ্য দেশ অধিকৃত হলে সে অধিকৃতির বিরুদ্ধে তৎক্ষনাৎ যুদ্ধ শুরু হতো। কিন্তু বাংলাদেশে বেড়েছে নীরব আত্মসমর্পণ। মুসলমান তো প্রতিমুহুর্তে বাঁচে মহান আল্লাহর কাছে পূর্ণ আত্মসমর্পণ নিয়ে। প্রশ্ন হলো,মহান আল্লাহতায়ালার কাছে আত্মসমর্পণের পাশাপাশি এরূপ দুর্বৃত্ত স্বৈরাচারের কাছে আত্মসমর্পণও কি একত্রে চলতে পারে? তাতে কি ঈমান বাঁচে? পরকালে কি তাতে জান্নাত জুটবে? ১৫/১২/১৪; নতুন সংস্করণ ১৬/৩/২০১৯

 

 




সন্ত্রাসী স্বৈরাচারিদের অপরাধনামা

একা নয় ঘাতকেরা

সন্ত্রাসী ঘাতকেরা কোন সমাজেই একা নয়। একার পক্ষে রাষ্ট্রের উপর দখলদারি প্রতিষ্ঠা দূরে থাক,কোন গৃহে একাকী ডাকাতি করাও অসম্ভব। বিপুল জনগণের সহযোগিতা না পেলে ফিরাউন,নমরুদ,হালাকু,চেঙ্গিজ,হিটলার,স্টালীন ও পলপটদের মত ভয়ানক নরঘাতকগণ কি কখনোই রাষ্ট্রের উপর দখলদারি প্রতিষ্ঠা করতে পারতো? বুশ-ব্লেয়ারও কি পারতো একাকী আফগানিস্তান ও ইরাকে আগ্রাসন চালাতে এবং দেশ দু’টির লক্ষ লক্ষ নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করতে? প্রতি সমাজেই এমন লোকের সংখ্যা প্রচুর যারা এ ধরণের মনুষ্য রূপধারী নৃশংস বর্বর জীবদেরকেই শুধু নয়,ইতর গরু-ছাগলকেও ভগবান বলতে রাজী। দক্ষিণ এশিয়ার বুকে এদের সংখ্যা তো আল্লাহতায়ালার উপাসনাকারিদের চেয়েও অধীক। নির্বাচনে এরা শুধু নৃশংস নরঘাতকদের ভোট দিয়ে বিজয়ীই করে না,তাদেরকে মাথায় তুলে উৎসবও করে। তাই হিটলার বা নরেন্দ্র মোদীর ন্যায় নরঘাতকগণ যেমন বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছে,তেমনি গণন্ত্রের ঘাতক ও ৩০-৪০ হাজার মানুষের প্রাণসংহারি বাকশালী মুজিবও নির্বাচিত হয়েছে। এসব বর্বরদের কোন যুদ্ধই একাকী লড়তে হয়নি। তাদের পক্ষ অস্ত্র ধরেছে লক্ষ লক্ষ মনুষ্য রূপধারী জীব।

যে গ্রামে অপরাধী চরিত্রের মানুষদের সংখ্যা অধিক,সে গ্রামে সহজেই বিশাল ডাকাত দল গড়ে উঠে।কোন রাষ্ট্রে এমন মানুষদের সংখ্যা বাড়লে সেখানে সন্ত্রাসী স্বৈরাচারিদের দুঃশাসন শুরু হয়।  হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষদের তখন লাশ হতে হয়। দুর্বৃত্ত-অধিকৃত এমন সমাজে নবীদের ন্যায় পুতঃপবিত্র চরিত্রের মহামানুষেরাও অত্যাচারিত হয়েছেন। স্বৈরাচারি সরকারের বড় অপরাধ হলো, সমগ্র রাষ্ট্রকে তারা দুর্বৃত্ত উৎপাদনের ইন্ডাস্ট্রিতে পরিণত করে। জনগণকে তারা নিজেদের দুর্বৃত্তির সহযোগী করে গড়ে তোলে। তারই দৃষ্টান্ত হলো আজকের বাংলাদেশ। বাংলাদেশে আজ  যেরূপ সন্ত্রাসী স্বৈরাচার চেপে বসেছে তা কি দুনিয়ার কোন সভ্য দেশে আশা করা যায়? এমন কি বাংলার বুকেও কি আজ থেকে শত বছর আগে কল্পনা করা যেত? যারা বলে,“জনগণ কখনোই ভূল করে না” -তারা মিথ্যা বলে। বরং প্রকৃত সত্য হলোঃ জনগণ শুধু ভূলই করে না,স্বেচ্ছায় তারা ভয়ানক অপরাধের সাথে নিজেদের সম্পৃক্তও করে। অথচ মহান আল্লাহতায়ালার কাছে গুরুতর অপরাধ শুধু ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা নয়। অপরাধ হলো, ইসলামের বিরুদ্ধে শত্রুপক্ষের আরোপিত যুদ্ধের মুখে নীরব থাকাও। এমন নীরবতা দেশে আযাব ডেকে আনে। একারণে,অতীতে আযাবগুলো স্রেফ ফিরাউনের ন্যায় দুর্বৃত্ত শাসকদের উপরই আসেনি, জনগণের উপরও এসেছে। বাংলাদেশে আজ যে সন্ত্রাসী স্বৈরাচারের বিজয় -তার জন্য কি জনগণ কম অপরাধী? জঙ্গলের গভিরতা বুঝে বাঘ-ভালুকেরা বাসা বাঁধে। তেমনি উপযোগী পরিবেশ খোঁজে সন্ত্রাসী স্বৈরাচারেরা। আজ থেকে ৬০ বছর আগে বাংলাদেশ সন্ত্রাসী স্বৈরাচারিদের জন্য এতটা উপযোগী ছিল না। ফলে তখন বাকশালী গণতন্ত্র, পিলখানায় ৫২ জন সেনা-অফিসার হত্যা, ২০১৩ সালের শাপলা চত্ত্বরের গণহত্যা, ২০১৪ সালের ভোটবিহীন নির্বাচন এবং ২০১৮ সালের ভোট-ডাকাতির নায়কদের ন্যয় অপরাধীগণ জনগণের মাঝে নামতে সাহস পায়নি। রক্ষিবাহিনী ও র‌্যাব-এর ন্যায় ঘাতক বাহিনীও তখন অস্তিত্ব পায়নি। তখন নিরীহ মুসল্লিদের হত্যা করে তাদের লাশ ময়লার গাড়িতে তুলে লাশ গায়েবের সাহস কোন সরকারই দেখায়নি।

ফলে আজ  থেকে ৬০ বছর আগে ১৯৫৪ সালে দলীয় সরকারের অধীনে যে নির্বাচন সম্ভব হয়েছিল,তেমন একটি নির্বচনের কথা আজ ভাবাই যায় না। বিগত ৬০ বছরে বাংলাদেশের আলোবাতাসে পরিবর্তন না এলেও দারুন ভাবে পিছিয়ে গেছে বাংলাদেশের মানুষের চেতনা,চরিত্র ও রুচি। ৬০ বছর আগে কোন পরিবার থেকে ঘরবাড়ি কেড়ে নিয়ে সে পরিবারের সদস্যদের রাস্তায় মুক্ত আকাশের নীচে বসানো হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশের বুকে বহুলক্ষ বিহারী নারী-পুরুষ-শিশু আজ নর্দমার পাশে বস্তিবাসী। ডাকাতপাড়ায় যেমন ডাকাতের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উঠে না তেমনি বাংলাদেশেও এমন বর্বরতার বিরুদ্ধে কোন প্রতিবাদ উঠেনি। বরং খোদ সরকার এগিয়ে এসেছে জবর দখলকারি ডাকাতদের সহায়তায়। ডাকাতদের নামে সরকার দখলকৃত বাড়ির দলীল করে দিয়েছে। যে দেশ দুর্বৃত্তিতে বিশ্বের ৫ বার প্রথম হয়,এমন নিষ্ঠুর ডাকাতিতে কি অন্য কোন দেশ সেদেশকে ছাড়িয়ে যেতে পারে? ভয়ানক অপরাধ প্রবনতা গণমুখিতা পেয়েছে। কোন জাতির লোকেদের মাঝে পরিবর্তন না এলে মহান আল্লাহতায়ালাও সে জাতির ভাগ্যে পরিবর্তন আনেন না। সে ঘোষণাটি তিনি পবিত্র কোরআনে দিয়েছেন। বলা হয়েছে,“নিশ্চয়ই আল্লাহ কোন জাতির অবস্থার পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ না পর্যন্ত তারা নিজেরাই নিজেদের পরিবর্তন না করে।” –(সুরা রা’দ আয়াত ১১)। অথচ নিজেদের অবস্থার পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে যা ঘটেছে সেটি চেতনা ও চরিত্র নির্মাণে উপরে উঠা নয়,বরং নীচে নামা।এমন জাতির কল্যাণে কি মহান আল্লাহতায়ালা এগিয়ে আসেন?

 

নৃশংস ও বীভৎ সন্ত্রাস

সন্ত্রাসের আভিধানিক অর্থঃ স্বার্থ সিদ্ধির লক্ষ্যে অস্ত্রের ব্যবহার। ডাকাতেরা গ্রামগঞ্জ ও রাস্তাঘাটে সেটি করে অস্ত্র দেখিয়ে। বাংলাদেশে সরকারের পক্ষ থেকে ত্রাস সৃষ্টির সে ভয়ানক অপরাধটিই সংঘটিত হচ্ছে সমগ্র রাষ্ট্র জুড়ে।সেটি রাস্তায় দলীয় ক্যাডার,পুলিশ,গোয়েন্দা পুলিশ,র‌্যাব,বিজিবী ও  সেনাবাহিনী নামিয়ে। রাস্তার অস্ত্রধারি ডাকাতদের তুলনায় সরকারের এ সন্ত্রাসী কর্মগুলো আরো বর্বর ও ধ্বংসাত্মক। এরূপ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের লক্ষ্য,সমগ্র দেশের উপর তাদের রাজনৈতিক দখলদারি এবং দেশজুড়ে লুন্ঠন। রাস্তার ডাকাতগণ মানুষের অর্থলুন্ঠন করে। কিন্তু ত্রাস সৃষ্টিতে ডাকাতদের সামর্থ সীমিত। দেশের রাজনীতি,আদালত,পুলিশ,প্রশাসন,সংস্কৃতি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উপর তাদের দখলদারি থাকে না। পুলিশ অফিসার,সেনাবাহিনীর সদস্য এবং আদালতের বিচারকদের লাঠিয়ালে পরিণত করার সামর্থও চোর-চোডাকাতদের থাকে না। কিন্তু সন্ত্রাসী সরকারের থাকে। ফলে ডাকাতের লুন্ঠনে কোন দেশেই দুর্ভিক্ষ নেমে আসে না। কিন্তু সেটি আসে সরকারি ডাকাতদলের লুন্ঠনে। সরকারের এরূপ দস্যুবৃত্তির কারণে বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনবার ভয়ানক দুর্ভিক্ষ এসেছে। দুইবার এসেছে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক দস্যুদের লুন্ঠনে। তৃতীয় বার এসেছে শেখ মুজিবের শাসনামলে ১৯৭৪ সালে। ব্রিটিশ দস্যুদের লুন্ঠনে প্রথম বার দুর্ভিক্ষ এসেছিল ১৭৭০ সালে (বাংলা সন ১১৭৬),এটিকে বলা হয় ছিয়াত্তরের মনন্তর। সে ছিল ভয়াবহ মহা দূর্ভিক্ষ। তাতে  বাংলার প্রায় একতৃতীয়াংশ মানুষের মৃত্যু হয়। কোন কোন হিসাব মতে অধিকৃত বাংলা ও বিহার জুড়ে প্রায় দেড় কোটির মানুষের মৃত্যু হয়। ১৯৭৪ সালে আওয়ামী সরকারের লুন্ঠনে সৃষ্ট দুর্ভিক্ষেও মারা যায় বহু লক্ষ মানুষ।

অপরদিকে স্বৈরাচারের আভিধানিক অর্থঃ দেশ পরিচালনায় শাসকের বা শাসক দলের স্বেচ্ছাচারিতা তথা খেয়ালখুশির প্রাধান্য। স্বৈর-শাসকদের হাতে দেশ অধিকৃত হলে কবরে শায়ীত হয় বহুদলীয় গণতন্ত্র। নির্বাচন তখন তামাশায় পরিণত হয়। তখন নিষিদ্ধ হয় সরকার বিরোধী সকল পত্র-পত্রিকা,বই-পুস্তক ও টিভি চ্যানেল। লুপ্ত করা হয় কথাবলা ও লেখালেখীর স্বাধীনতা। কোন দেশেই এরূপ স্বৈরাচার স্রেফ স্বেচ্ছাচারিতা নিয়ে হাজির হয় না। হাজির হয় ভয়ানক সন্ত্রাস নিয়েও। কারণ স্বৈরাচার তো বাঁচে সন্ত্রাসের মাধ্যমে। জনগণের মাঝে গ্রহনযোগ্যতা বা নির্বাচনি বিজয় নিয়ে তারা ভাবে না। বরং ভাবে সন্ত্রাসের হাতিয়ারগুলোকে আরো শানিত করা নিয়ে। শেখ মুজিব তাই শুধু একদলীয় বাকশালী শাসন,বিরোধী দলগুলির নিষিদ্ধকরণ ও সকল পত্রপত্রিকার অফিসে তালা ঝুলিয়েই খুশি হননি। পাশাপাশি দেশ জুড়ে ত্রাস সৃষ্টিতে রক্ষিবাহিনীও নামিয়েছেন। মুজিবের সে সন্ত্রাসে মৃত্যু ঘটে ৩০-৪০ হাজারের বেশী বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক কর্মীর। শেখ হাসিনাও বাংলাদেশের রাজনীতিতে আজ একই রূপ সন্ত্রাস,চুরিডাকাতি ও স্বৈরাচার নিয়ে হাজির।

 

আদালত যেখানে ঘাতকের হাতিয়ার

স্বৈরাচারি ও সন্ত্রাসী শাসকগণ শুধু রাজনীতি,পুলিশ,প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর উপরই কবজা করে না। কবজায় নেয় দেশের আইন-আদালত ও বিচার ব্যবস্থাকেও। পুলিশ ও সেনাবাহিনীর ন্যায় বিচারকগণও তখন পরিণত হয় সন্ত্রাসী সরকারের ঘাতক লাঠিয়ালে। তখন নির্বাসনে যায় ন্যায় বিচার। এমন সরকারের আমলে আদালতে উঠার অর্থই হলো কারাগারে বা রিমান্ডে গিয়ে অপমানিত,অত্যাচারিত ও শাস্তির মুখোমুখি হওয়া। আদালত পরিণত হয় অত্যাচারের নির্মম হাতিয়ারে। এমন সন্ত্রাসী সরকার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে ধর্মচর্চার উপরও। ফিরাউন-নমরুদ কখনোই হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ও হযরত মুসা (আঃ)র ন্যায় মহান ব্যক্তিদেরকে দ্বীন প্রচারের সুযোগ দেয়নি। প্রতিযুগে একই রীতি শয়তানি শক্তির। ফলে স্বৈরাচারি শাসনামলে অসম্ভব হয় স্বাধীন ও নির্ভেজাল ধর্মপালন। অধিকৃত হয় মসজিদও। তখন মসজিদের ইমামের মুখ থেকে তখন তাই ধ্বনিত হয় যা দেশের স্বৈরাচারি সরকার চায়। শরিয়ত প্রতিষ্ঠার পবিত্র জিহাদকে তখন মসজিদের মেম্বর থেকে সন্ত্রাস বলে চিহ্নিত করা হয়। মসজিদের মেম্বর থেকেই ৮০ বছরের বেশী কাল ধরে হযরত আলী (রাঃ)ন্যায় ব্যক্তির বিরুদ্ধে গালিগালাজ করা হয়েছে। কারণ, সেটিই ছিল উমাইয়া শাসকদের নীতি। অধিকৃত আদালত তখন সে রায়ই শোনায় যা স্বৈরাচারি সরকার চায়। এরূপ আদালতের অত্যাচার থেকে ইমাম আবু হানিফা (রহঃ),ইমাম শাফেয়ী (রহঃ),ইমাম মালেক (রহঃ)এবং হযরত ইমাম হাম্বলী (রহঃ)র ন্যায় বিখ্যাত ইমামগণও তাই রক্ষা পাননি। তারা অসম্ভব করেছে সুশাসন ও সুবিচারের প্রতিষ্ঠা। দেশে স্বৈরশাসনের এটিই সবচেয়ে গুরুতর বিপদ।

ঔপনিবেশিক লুন্ঠনকারি বা মোঙ্গল বর্বরেরা যখনই দেশ দখল ও লুন্ঠনে বের হতো তখন সাথে শুধু নৃশংস সৈনিকই থাকতো না,থাকতো একপাল ঘাতক বিচারকও। এসব ঘাতক বিচারকগণই ভারতসহ বহু অধিকৃত দেশের স্বাধীনতাকামী মহান সৈনিকদের ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে। এরূপ সন্ত্রাসী স্বৈরাচারিদের শাসনামলে সুবিচার আশা করাটি বৃথা। তখন বিচারের লক্ষ্য হয়,স্রেফ স্বৈরাচারকে নিরাপত্তা দেয়া। বিচারকগণ এরূপ পেশা বেছে নেয় স্রেফ নিজেদের রুটিরুজি নিশ্চিত করতে,আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে নয়। এরা পেটের গোলাম। এমন বিচারকদের কারণেই ফিরাউনের আদালতে দুর্বৃত্ত ফিরাউন ও তার সহচরদের কখনোই বিচার হয়নি। বরং বিচার বসেছে মানব সভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান হযরত মূসা (আঃ) ও তাঁর নিরপরাধ সহচরদের বিরুদ্ধে। এরূপ বিচারের লক্ষ্য,নিরপরাধ মানুষ হত্যাকে জায়েজ করা। এরূপ সন্ত্রাসী শাসকগণ আল্লাহর শরিয়তি আইন প্রতিষ্ঠা হতে দিতে রাজি নয়। কারণ সেটি হলে,আইন তখন দুর্বৃত্ত শাসক ও তাদের সহচরদেরও আদালতে তোলে। যে আাইন চোর-ডাকাত, ঘুষখোর ও দুর্বৃত্তদের হাত কাটে বা পিঠে চাবুক মারে সে আইন কি কখনোই চোর-ডাকাত ও দুর্বৃত্তরা চাইবে? বাংলাদেশের মত দুর্বৃত্ত-অধিকৃত দেশে এজন্যই শরিয়তের প্রতিষ্ঠার এতো বিরোধীতা।

 

অধিকৃত আদালত

বাংলাদেশের ইতিহাসে অতিশয় ঘৃণ্য অপরাধ ঘটেছে ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির এবং ২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বরের নির্বাচনে। নানারূপ জঘন্য অপরাধ যে কোন দেশেই ঘটতে পারে। কিন্তু আদালতের ব্যর্থতা স্পষ্টতর হয় সে অপরাধের বিচার না হওয়ার মধ্য দিয়ে। নির্বাচনের নামে কোন দেশে ভোট ডাকাতি হলে আদালতের দায়িত্ব হয় সে নির্বাচনকে বৈধতা না দিয়ে নির্বাচনের আয়োজকদেরকেই আসামীর কাঠগড়ায় খাড়া করা। কিন্তু বাংলাদেশে সেটি হয়নি। ডাকাতপাড়াতেও ডাকাতদের নিজস্ব সংস্কৃতি থাকে। সে সংস্কৃতিতে গুরুত্ব পায় নৃশংস ডাকাতদের সম্মান দেখানো। ডাকাতি কর্মে যে যত দুর্বৃত্ত ও নৃশংস,সেই তত বেশী সম্মান পায়। সবচেয়ে নৃশংস ডাকাতকে সর্দারের আসনে বসানো হয়। ফিরাউন-নমরুদের মত দুর্বৃত্ত রাজাদের শাসনে সবচেয়ে বেশী মর্যাদা পেয়েছে তো তারাই। এমনকি তাদেরকে ভগবানের মর্যাদাও দেয়া হয়েছে। স্বৈরাচার-প্রবর্তিত সে সংস্কৃতিতে শুধু রাজাকে নয়,রাজার পোষা কুকুর-বিড়ালকে সম্মান দেখানোই রীতি। দুর্বৃত্ত শাসকের ঘাতক বিচারকগণও তখন “মাই লর্ড” বা “মহামান্য” বলে অভিহিত হয়। ভারতবাসীর স্বাধীনতার চরম শত্রু ও সাম্রাজ্যবাদি ব্রিটিশের পদলেহী বিচারকগণ তো সে উপাধিতেই ব্রিটিশ ভারতের আদালতগুলিতে সম্মানিত হয়ে এসেছে। যুগে যুগে বর্বর স্বৈর-শাসকগণ স্রেফ অস্ত্রের জোরে বাঁচেনি, তারা যুগ যুগ বেঁচেছে এবং সম্মান পেয়েছে -এমনকি ভগবান রূপে আখ্যায়ীত হয়েছে জনগণের উপর চাপিয়ে দেয়া জাহিলিয়াত এবং অপসংস্কৃতির কারণে। তেমন এক জাহিলিয়াত এবং অপসংস্কৃতির জন্ম ও প্রচন্ড পরিচর্যা দেয়া হয়েছে বাংলাদেশের স্বৈরাচারি সরকারের পক্ষ থেকেও। এমন অপসংস্কৃতির কারণেই দেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের পরম শত্রু এবং বিদেশী শক্তির গোলামও জাতির পিতা, জাতির নেতা বা জননেত্রীর খেতাব পায়।

ডাকাতপাড়ায় ডাকাতদের বিচার হয় না। বাংলাদেশের তেমনি ভোট ডাকাতদেরও বিচার হয় না। অবৈধ নির্বাচনও তখন বৈধ নির্বাচন রূপে স্বীকৃতি পায়। প্রধানমন্ত্রী,মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য রূপে সন্মান পায় ভোট ডাকাতগণ। কথা হলো জন্ম সূত্রেই যে সরকার অপরাধী,তেমন সরকার থেকে কি ভাল কিছু আশা করা যায়? জীবাণু মাত্রই রোগ ছড়ায়। তেমনি অপরাধীগণও দেশজুড়ে অপরাধ ছড়াবে সেটিই স্বাভাবিক? নেকড়ে বাঘ সব জঙ্গলে একই রূপ হিংস্র। তেমনি অভিন্ন হলো সব দেশের ও সব সময়ের স্বৈরাচারি শাসকগণ। তাই নমরুদ-ফিরাউন মারা গেলেও আজকের নমরুদ-ফিরাউন বেঁচে আছে সে অভিন্ন স্বৈরাচার নিয়ে। সেটি যেমন মিশরে,তেমনি বাংলাদেশসহ বহুদেশে। মিশরের স্বৈরাচারি সরকারের সেনাবাহিনী ২০১৩ সালের ১৪ই আগষ্টের রাতে কায়রোর রাবা আল -আদাবিয়ার ময়দানে এক হাজারের বেশী নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করে। নিহতদের অপরাধ,সে দেশের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জনাব মুরসীর বিরুদ্ধে সামরিক অভ্যুর্ত্থানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে তারা রাস্তায় ধর্ণা দিয়ে বসেছিল। কিন্তু সে হত্যাকান্ডের অপরাধে কাউকে আদালতে তোলা হয়নি। কারো শাস্তিও হয়নি। লক্ষণীয় হলো,এরূপ গুরুতর অপরাধও বিচারকদের কাছে কোন অপরাধ রূপে গণ্য হয়নি! সম্প্রতি মিশরের সর্বোচ্চ আদালত সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসনী মোবারককে তার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত সকল খুনের মামলা থেকে বেকসুর খালাস করে দিল। নির্দোষ রূপে ঘোষণা দিল হুসনী মোবারকের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সকল অভিযুক্ত ব্যক্তিদের। তাদের বিরুদ্ধে বিচারকগণ কোন অপরাধ খুঁজে পায়নি। বরং সে বিচারকগণ অপরাধ খুঁজে পেয়েছে ২০১১ সালে সংঘটিত গণবিপ্লবের বিরুদ্ধে -যা স্বৈরশাসক হুসনী মোবারককে ক্ষমতা থেকে হঠিয়েছিল। ফলে সে বিপ্লবে যারা নেতৃত্ব দিয়েছিল তারা এখন জেলে। অথচ ২০১১ সালের সে বিপ্লবে হুসনী মোবারাকের স্বৈরাচারি সরকার ৮ শতের বেশী নিরীহ ও নিরস্ত্র মানুষকে রাজপথে হত্যা করেছিল। সে হত্যাকর্মকে দ্রুততর ও নৃশংস করার স্বার্থে রাজপথে ট্যাংক,কামান ও মেশিনগান নামানো হয়েছিল। মানুষ খুন হয়েছিল দিনের আলোতে এবং রাজপথে। অথচ মিশরের আদালত কোন খুনিকে খুঁজে পায়নি। সে অপরাধে কারো শাস্তিও হয়নি। স্বৈরাচারিদের হাতে দেশ অধিকৃত হয়ে ন্যায় বিচার যে কতটা অসম্ভব হয় এ হলো তার নজির। জঙ্গলে মানুষ খুন হলে কারো শাস্তি হয় না।তেমনি ৮ শতের বেশী মানুষ হত্যাতেও মিশরে কারো শাস্তি হলো না।স্বৈরাচার এভাবেই জনপদে বন্যতা নামিয়ে আনে।

 

মিশরে স্বৈরাচারি সরকার গণবিক্ষোভ থেকে বাঁচতে তড়িঘড়ি করে শত শত প্রতিবাদি মানুষের বিরুদ্ধে ফাঁসির হুকুম দিচ্ছে। বিচারকগণ সে ফাঁসির হুকুম দিচ্ছে শত শত মানুষের বিরুদ্ধে একসাথে। আসামী পক্ষের আইনজীবীগণ যুক্তি পেশেরও সুযোগ পাচ্ছে না। এমন কি রাস্তায় প্রতিবাদ মিছিলে নামার অপরাধে কয়েকশত স্কুলছাত্রীকে ৪ বছরের জেল দিয়েছে। একই অবস্থা বাংলাদেশে। বাংলাদেশের বিচারকগণও স্বৈরাচারি সরকারের অতি নিষ্ঠুরগুলোকেও অপরাধ রূপে দেখতে রাজি নয়। তাদেরকে আদালতে তুলতেও রাজী নয়। ২০১৩ সালের মে মাসে বাংলাদেশের শাপলা চত্বরে হিফাজতে ইসলামের নিরস্ত্র সমাবেশ রুখতে সেনাবাহিনী,র‌্যাব,বিজিবি ও পুলিশ নামানো হলো। অসংখ্য মানুষ নিহত হলো,এবং আহত হলো সহস্রাধিক। কিন্তু দেশের আদালতে সে হত্যাকান্ড নিয়ে কোনরূপ তদন্ত হলো না,কারো বিরুদ্ধে কোন বিচারও বসলো না। কারো কোন শাস্তিও হলো না। স্বৈরাচারি সন্ত্রাসীদের হাতে দেশ অধিকৃত হলে দেশের সমগ্র বিচার ব্যব্স্থা, প্রসিকিউশন ও আদালত যে কতটা ঘাতকদের হাতে অধিকৃত হয় -এ হলো তার নজির। তখন জঙ্গলে পরিনত হয় সমগ্র দেশ। তখন মানুষ শুধু পথেঘাটেই মারা যায় না,মারা পড়ে আদালতেও।

 

আস্তাকুরে ন্যায়বিচার

জাতি কতটা সভ্য ও উন্নত -সে বিচার জনসংখ্যা,অর্থনীতি বা সামরিক শক্তি দিয়ে হয় না। বড় বড় প্রাসাদ দিয়েও হয়না। সাম্রাজ্যবাদী দস্যুগণও উন্নয়নে বিস্ময়কর ইতিহাস গড়ে। কিন্তু বিশ্বব্যাপী আগ্রাসন,দস্যুবৃত্তি ও গণহত্যা তো বেড়েছে তাদের দ্বারাই। তাদের দ্বারাই সংঘটিত হয়েছে দুটি ভয়ানক বিশ্বযুদ্ধ। দু’টি বিশ্বযুদ্ধে সাড়ে সাত কোটি মানুষকে তারা হত্যা করেছে। আনবিক বোমা ফেলেছে জাপানের দুটি জনবহুল নগরীর উপর। বিশ্বযুদ্ধ থামলেও ধ্বংস ও গণহত্যা। ভয়ানক ধ্বংস ও গণহত্যা উপহার দিয়েছে ভিয়েতনাম,আফগানিস্তান ও ইরাকসহ নানা দেশে। সে সব অধিকৃত দেশে লক্ষ লক্ষ নিরপরাধ নারী-শিশুকে তারা হত্যা করেছে। যুদ্ধ তো নিজেই দুর্বলের বিরুদ্ধে অপরাধ। অপরাধটি অগণিত মানুষ হত্যার ও দেশ ধ্বংসের। ইতিহাসের কাঠগড়ায় তারা গণহত্যার আসামী। এখন সে অপরাধীরাই ড্রোন নিয়ে বিশ্বময় যুদ্ধে নেমেছে মুসলমানদের বিরুদ্ধে। এরূপ খুনিগণকে কি সভ্য রূপে চিত্রিত করা যায়? মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে প্রতিটি জাতির মূল্যায়ন হয় সুবিচারের প্রতিষ্ঠায় সে জাতির সফলতা দিয়ে।

মুসলমানদের উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহতায়ালার ঘোষণাঃ “তোমরা্‌ই হচ্ছো শ্রেষ্ঠ উম্মত;সমগ্র মানব জাতির জন্য তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে;তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দান করো,অসৎ কাজে নিষেধ করো এবং আল্লাহতে বিশ্বাস করো।” –(সুরা আল -ইমরান আয়াত ১১০)। বলা হয়েছে,“নিশ্চয়ই আমি রাসূলদের প্রেরণ করেছি স্পষ্ট প্রমাণাদিসহ;এবং অবতীর্ণ করেছি তাদের সাথে কিতাব ও মিযান (ন্যায়দনন্ড) যাতে মানুষ ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে পারে।” -(সুরা হাদীদ আয়াত ২৫)। তাই নবীরাসূল প্রেরণের লক্ষ্য স্রেফ মহান আল্লাহতায়ালার উপর ঈমান ও তাঁর ইবাদতের দিকে মানুষকে ডাকা নয়,বরং গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো সৎকাজের প্রতিষ্ঠা ও সুবিচারের প্রতিষ্ঠা। সৎকাজের প্রতিষ্ঠা ও সুবিচারের প্রতিষ্ঠায় কতটা সফল হলো তা দিয়েই নির্ণীত হয় জাতির মর্যাদা।তাই স্বৈরাচারি সন্ত্রাসীদের ক্ষমতায় বসিয়ে কি সভ্য জাতি রূপে বেড়ে উঠা সম্ভব? ইসলামে অজ্ঞ ও অঙ্গিকারহীনদের বিচারকের আসনে বসিয়ে কি ন্যায় বিচারের প্রতিষ্ঠা সম্ভব? বাংলাদেশের ব্যর্থতা কি এ ক্ষেত্রে কম? বিশ্বের দরবারে ৫ বার যারা সবচেয়ে দূর্নীতিগ্রস্ত দেশের খেতাব পায় সে দেশের মানুষ মহান আল্লাহতায়ালার দরবারেই বা কি মর্যাদা আশা করতে পারে? দেশে মসজিদ-মাদ্রাসা,চাল-ডাল,গরু-ছাগল,পোষাক-শিল্প বাড়িয়ে বা বিদেশে মনুষ্যজীব রপ্তানী করে কি মর্যাদা বাড়ানো যায়?

 




বাংলাদেশে শয়তানের দূত ও ঈমানধ্বংসী নাশকতা

শয়তানের ধর্ম ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান

শয়তানেরও ধর্ম আছে। দেশে দেশে সে ধর্মের অসংখ্য প্রচারক, দূত এবং অনুসারিও আছে। শয়তানের তাঁবেদার বিপুল সংখ্যক রাষ্ট্র যেমন আছে, তেমনি আছে আইন-আদালত, প্রশাসন, ও সেনাবাহিনী। আছে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান বা ইন্সটিটিউশন। দেশে দেশে এগুলিই তো মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীন, ইসলামি রাষ্ট্রের প্রকল্প এবং তাঁর শরিয়তি আইন-আদালতকে পরাজিত করে রেখেছে। এবং অসম্ভব করে রেখেছে পবিত্র কোর’আন থেকে শিক্ষালাভ এবং সে শিক্ষার প্রয়োগ। প্রশ্ন হলো, শয়তানের সে ধর্মটি কি? কি তার বার্তা? কারা তার দূত? তাদের কাজই বা কি? শয়তানের ধর্মের মূল মিশনটি হলো, মহান আল্লাহতায়ালার অবাধ্যতা। যেখানেই মহান আল্লাহতায়ালার বিধান বা হুকুম, সেখানেই ঘটায় তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। ইসলামের মূল ইন্সটিটিউশন যেমন মসজিদ ও,মাদ্রাসা,শয়তানের ধর্মের সে ইন্সটিটিউশনগুলো হলো স্বৈর-সরকার, সেক্যুলার রাজনৈতিক দল, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, পুলিশ ও আদালত, পতিতাপল্লি, নাচের ঘর, গানের আসর, সিনেমা হল, সূদী ব্যাংক ইত্যাদী। শয়তানের ধর্মের নিজস্ব সংস্কৃতি যেমন আছে, তেমনি আছে রাজনীতি এবং বহুমুখী স্ট্রাটেজীও। মহান আল্লাহতায়ালা মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে টানেন। সে কাজে তিনি নবী-রাসূল ও ফেরেশতা পাঠান,এবং ধর্মগ্রন্থও নাযিল করেন। হেদায়েত দিয়ে মানুষকে তিনি জান্নাতে নেন। আর শয়তানের কাজ হলো মানুষকে আলো থেকে আঁধারে নেয়া,এবং আঁধারেরর সে পথ দিয়ে জাহান্নামে নেয়া।                                                                                                           

২০১০ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের রাজধানীতে শয়তানের এক বিশাল দূতের আগমন ঘটেছিল। সে দূতটি হলো শাহরুখ খান। অনেকের কাছে তিনি মোম্বাইয়ের ফিল্মী জগতের বিশাল নক্ষত্র। তবে বহু ভারতীয়র কাছেও তিনি অশ্লিলতার নায়ক। শাহরুখ খানের সাথে ঢাকায় এসেছিল এক দল রাশিয়ান নর্তকী যাদের কাজ ছিল অশ্লিল নাচ পরিবেশন করা।এ খবরও বেরিয়েছে, এ সব রাশিয়ানদের অনেকে নাচের পাশাপাশি দেহব্যবসার সাথেও জড়িত। পতিতাবৃত্তিতে রাশিয়ান মেয়েরা ইউরোপে ইতিমধ্যেই যথেষ্ট পরিচিতি পেয়েছে, এখন তারা বাজার পেয়েছে ভারতেও। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, এতকাল যে নগ্ন নাচ-গান পতিতার পল্লিতে হতো, এখন সেটিই প্রকাশ্যে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। অনুষ্ঠিত হচ্ছে জনগণের অর্থে গড়া ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামে। নর্দমায় গলিত আবর্জনার পরিমান বেশী হলে তা যেমনন রাস্তায় গড়িয়ে পড়ে, তেমন অবস্থা এ অসভ্যতার। নগ্নতা ও অশ্লিলতার প্রদর্শনী হারাম। নৈতিক এ ব্যাধি নৈতিক মূল্যবোধের মহামারি ঘটায়। যে সমাজে এ রোগ বিস্তার পায় সে সমাজে কি শ্লিলতা বাঁচে? পাপাচার তখন উৎসবে পরিণত হয়। বুলেটে বিদ্ধ হয় যেমন দেহ, তেমনি পাপাচারে বিদ্ধ হয় ব্যক্তির ঈমান। প্রশ্ন হলো, যার মনে সামান্যতম ঈমান আছে সে কি অশ্লিল নাচ-গানে সুখ পায়, পায় কি বিনোদনের আনন্দ? ইসলামে এটি তো জঘন্য পাপ। পাপে আনন্দ লাভ তো বেঈমানীর লক্ষণ।

সরকারের দায়িত্ব শুধু পাপাচারের প্রতিরোধই নয়,পাপের নায়ক-নায়ীকাদের শাস্তির ব্যবস্থা করা। কিন্তু বাংলাদেশের সরকার এখানে বিপরীত ভূমিকা রাখছে। দেশে ওয়াজ-মহফিল ও কোরআন-হাদীসের তাফসির মহফিলগুলোকে তারা বন্ধ করেছে। বিখ্যাত তাফসিরকারকদের সরকার জেলে তুলেছে,এমন কি জিহাদের ন্যায় ইসলামের মৌল বিধানের উপর বই-পুস্তকও বাজেয়াপ্ত করছে। দেশের মসজিদের ইমাম ও মাদ্রাসার শিক্ষকদের উপর কড়া নজর রেখেছে যেন কোরআনের জিহাদ বিষয়ক আয়াতগুলো চর্চা না পায়। অপরদিকে নামাযী জনগণের অর্থে গড়া আর্মি স্টেডিয়ামকে তুলে দিয়েছে পাপের নায়কদের হাতে। এভাবে পাপের ভাগী করছে জনগণকে। অথচ এ স্টেডিয়ামে একদিনের জন্যও কি কোন ওয়াজ মহফিল হতে দেয়া হয়েছে? সৈনিকদের মাঝে ইসলামি চেতনার প্রসার বা পরিচর্যা বাড়াতে একদিনের জন্যও এ স্টেডিয়ামকে ওয়াজ-নসিহতের কাজে ব্যবহৃত হতে দেয়া হয়েছে?

 

লক্ষ্যঃ ডিইসলামাইজেশন

বাংলাদেশের সরকার ও দেশী-বিদেশী শয়তানের দূতেরা সম্মিলিত ভাবে যে অভিন্ন স্ট্রাটেজী নিয়ে কাজ করছে সেটি হলো দেশকে সর্বস্তরে ডি-ইসলামাইজেশন করা। অর্থাৎ ইসলামের বিধানগুলিকে সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে যেমন বিলুপ্ত করা, তেমনি জনগণকে ইসলাম থেকে দূরে সরানো।এ লক্ষ্যে বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারিভাবে শুধু শত শত কোটি টাকার বিণিয়োগ হচ্ছে তাই নয়,সে কাজে ঝাঁকে ঝাঁকে শয়তানের দূতরাও আসছে। শাহরুখ খানের আগমনের কয়েক দিন আগে ভারত থেকে এক ঝাঁক নর্তকী এসে নেচে গেয়ে গেল বাংলাদেশে। ভারত আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া,ইসরাইল থেকে শত শত বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র কিনছে,অথচ বাংলাদেশ শত শত কোটি টাকার বিণিময়ে বিদেশ থেকে নগ্নতা ও অশ্লিলতা আমদানী করছে। রবীন্দ্রনাথের জন্ম ও মৃত্য বার্ষিকী,ইংরেজী বর্ষবরণ,বাংলা বর্ষবরণ,বসন্ত বরণ,ভালাবাস দিবস, থার্টিফা্স্ট নাইট –এরূপ নানা দিনক্ষণকে ঘিরে নাচ-গান ও অশ্লিলতার নানা রূপ প্রচারে যোগ হচ্ছে দীর্ঘকালীন উৎসবের মাত্রা।

বাংলাদেশের সেক্যুলারিস্টদের মূল লক্ষ্য, ইসলামের মৌল বিশ্বাস ও বিপ্লবী চেতনা থেকে জনগণকে দূরে সরানো। এভাবে দ্বীনের প্রতিষ্ঠাকে অসম্ভব করা। এগুলিকে বেগবান ও সুদুর প্রসারি করতে একাত্তরের চেতনার বাহানা তুলা হচ্ছে। জনগণের মাঝে ইসলামের চেতনা বেঁচে থাকে ইবাদতের বিধান ও ইসলামের উৎসব গুলোর মধ্য দিয়ে। শয়তানের ধর্মে ঈদ নাই, ঈদের খুশিও নাই। কিন্তু এগুলোর বিকল্প রূপে প্রতিষ্ঠা দিচ্ছে নানা দিবসের নানা সাংস্কৃতিক ক্রিয়াকর্মকে। কবি সুফিয়া কামাল তো রবীন্দ্রনাথের গান শোনাকেই ইবাদত বলতেন। সেক্যুলার উৎসবগুলোকে জমজমাট করতে বিদেশী এনজিওগুলি বিপুল পুঁজি বিনিয়োগ করছে। অনেক এনজিওর কাজ হয়েছে নিছক নাচগান শেখানো। যে ইসলামে সমাজ ও রাজনীতির নিয়ন্ত্রন নিয়ে কথা আছে এবং হুকুম দেয় শরিয়তী বিধান প্রতিষ্ঠার, সে ইসলাম নিয়ে বাংলাদেশের সেক্যুলার পক্ষের প্রচণ্ড ভয়। সে ইসলামের অনুসারিদের তারা রাজনৈতিক শত্রু মনে করে। নিজেদের ক্ষমতা লাভের স্বার্থে তাদের নির্মূলকে তারা অপরিহার্য মনে করে। তাই এ ফ্যাসিস্টগণ যখন ক্ষমতার বাইরে ছিল তখন রাজপথে লগি-বৈঠা নিয়ে তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। এখন ক্ষমতায় গিয়ে তাদেরকে জেলে তুলছে। ইসলামের বিরুদ্ধে একই রূপ ভয় ভারতের এবং সে সাথে ইসলামের আন্তর্জাতিক শত্রুপক্ষের। তাদের সম্মিলিত স্ট্রাটেজী, সমাজের বুকে পাপের স্রোতকে প্রবলতর করে জনগণকে ভাসিয়ে নেয়া। এবং এভাবে আল্লাহর প্রদর্শিত সিরাতাল মুস্তাকীমকে আড়াল করা। তাই শাহরুখ খানের মত যারা পাপের প্রাকটিশনার ও প্রচারক তারা বাংলাদেশের সেক্যুলার পক্ষের কাছে অতি আপনজন । সে যে তাদের কতটা আপনজন  তার প্রমাণ মেলেছে ঢাকায় তার আগমনের মুহুর্তে। শাহরুখ খানকে ঢাকা বিমানবন্দরে যে অভ্যার্থনাটি দেয়া হয় সেটি ছিল অসাধারণ। তাকে শুধু ভিআইপি (ভেরি ইম্পরটেন্ট পারসন)নয়, ভিভিআইপি (ভেরি ভেরি ইম্পরটেন্ট পারসন)এর সম্মান দেয়া হয়। একজন মানুষের রুচীর পরিচয় মেলে তার পছন্দ-অপছন্দের মানুষটিকে দেখে। নামে মুসলমান হলেও শাহরুখ খান বিয়ে করেছে এক হিন্দু মহিলাকে। খোদ ভারতে তার বড় পরিচয়টি হলো “সেক্স ও অশ্লিলতার ফেরিওয়ালা” রূপে। বাংলাদেশের মত একটি মুসলিম দেশে এমন একজন ফেরিওয়ালাকে এমন অভূতপূর্ব অভ্যর্থনা দেয়া দেখে অবাক হয়েছে এমনকি বহু ভারতীয়ও। এতে বিদেশে, বিশেষ করে ভারতে বাংলাদেশী মুসলমানদের ঈমান-আমল ,মূল্যবোধ ও রুচীর কি পরিচয়টি প্রচার পেল?        

পাপকর্ম প্রকাশ্যে অনুষ্ঠিত হতে দেয়ার বিপদ ভয়ানক। সে পাপ তখন দেশ জুড়ে ব্যাপ্তি পায়। পাপের শিকড় তখন জনগণের চেতনার গভীরে ঢুকে। সাধারণ মানুষদের অনেকেই কোনটি ন্যায় বা শ্লিল, কোনটা অন্যায় বা অশ্লিল -তা নিয়ে কোন প্রবল ধারণা থাকে না। তারা ভেসে যায় বহমান সাংস্কৃতিক স্রোতে। তারা দেখে সমাজে কোনটি উৎসব রূপে বিপুল ভাবে উৎযাপিত হলো। দেখে কোনটি রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা পেল। এবং সেটি দেখে তারাও সেদিকে দৌড়াতে থাকে। পুতুল পুঁজা,গরু পুঁজা, সর্পপুঁজা, নানা দেবদেবী পুঁজা, ঝাড়ফুঁকের ন্যায় নানা প্রাচীন অজ্ঞতা সমাজে প্রতিষ্ঠা পায় তো অজ্ঞ মানুষের এমন স্রোতে-ভাসা প্রবনতার কারণেই। মানুষের এমন স্বভাবের কারণেই নবীগণ ইসলামের প্রচারে প্রচণ্ড বাধা পেয়েছেন। বাংলাদেশের মানুষও একই কারণে ইসলাম থেকে দূরে সরছে। ফলে মুসলিম রমনীরা গৃহ ছেড়ে রাস্তায় গাছ পাহাড়া দিচ্ছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ সূদ খাচ্ছে এবং সূদ দিচ্ছে। বহু গুনে বেড়েছে দেহব্যবসা।শয়তান তো এমনটিই চায়। অথচ মাত্র ৫০ বছর আগেও বাংলাদেশের অবস্থা এমন ছিল না। গ্রাম-গঞ্জের সাধারণ নারী-পুরুষ ও যুবক-যুবতিরা যখ্ন রাজধানীর আর্মির স্টেডিয়ামে মহা ধুমধামে অশ্লিল নাচগাণের অনুষ্ঠান হতে দেখে তখন সে অসভ্যতাকেই যে অনেকেই সমাজের ও সময়ের রীতি ভাববে -সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? সমাজে সামাজিক স্রোত বা রেওয়াজ নির্মিত হয় তো এভাবেই। পাশ্চাত্যের নরনারীরা এ পথেই আজকের অবস্থায় পৌঁছেছে। ফলে এ সমাজে ব্যাভিচার আজ আর কোন অপরাধ নয়, নিন্দনীয়ও নয়।

 

 

লক্ষ্যঃ হিদায়েতপ্রাপ্তির অযোগ্য করা

বিষ যেমন দেহকে ধ্বংস করে,পাপও তেমনি চরিত্রকে ধ্বংস করে। তাই জাতীয় চরিত্র রক্ষার স্বার্থে সরকার এবং সে সাথে দায়িত্ববান ব্যক্তি ও সংগঠনের কাজ শুধু বিষপান বন্ধ করা নয়,পাপাচার রোধ করাও। বিশেষ করে সেটি যখন জনসম্মুখে হয়। যে কোন পাপীষ্টই পাপ কর্মকে জনগণের সামনে করতে ভয় পায়, লজ্জাও পায়। এজন্যই পতিতারাও অন্যদের ন্যায় ভদ্রবেশে রাস্তায় বের হয়। মদ্যপায়ীরাও তেমনি প্রকাশ্যে মদ্যপানে লজ্জা পায়। ভয়ও পায় সম্মান হারানোর। অশ্লিল ছবিও তাই কেউ অন্যের সামনে দেখে না, ছেলেমেয়ে ও পরিবারের অন্যদের সামনে তো নয়ই। এটুকুই হলো হায়া। হায়া বা লজ্জাকে বলা হয় ঈমানের অর্ধেক। লজ্জার বুনিয়াদ ধ্বসে গেলে ঈমানও ধ্বসে যায়। তাই কারো ঈমান ধ্বংসের সহজ উপায় হলো তার লজ্জা নাশ করা। শয়তানের দূত ও সৈনিকদের প্রধান স্ট্রাটেজী তাই জনগণকে সরাসরি মুর্তি-পুজায় আহবান করা নয়, নাস্তিক হতেও বলা নয়। বরং সেটি হলো জনগণের মন থেকে লজ্জাকেই বিলুপ্ত করা। তাদেরকে বেশরম ও বেহায়া করা। যারা উলঙ্গ নর্তকী বা পতিতা -তারা যে উম্মাদ বা জ্ঞান শূণ্য তা নয়। তাদের মূল রোগটি হলো লজ্জাশূণ্যতা। পানিশূণ্য ভূমিতে যেমন বীজ গজায় না, তেমনি বেহায়া-বেশরমদের মনে ধর্মের কথা বা নীতির কথা স্থান পায় না। আরবের বুকে যারা শয়তানের সৈনিক রূপে কাজ করতো অনুরূপ স্ট্রাটেজী ছিল তাদেরও। তাদের সে স্ট্রাটেজী এতটাই সফলতা পেয়েছিল যে তাদের সে প্রচারের ফলে আরবের কাফেরগণ উলঙ্গ হয়ে কাবাকে ঘিরে তাওয়াফ করতো। এবং সেটিকে তারা ধর্ম মনে করতো। এমন অশ্লিলতা কেড়ে নেয় ইসালামের বিধান মেনে নেয়ার সামর্থ্য। ইসলাম তো পথ দেখায় মুত্তাকীদের, পাপাচারীদের নয়। কোরআনকে মহান আল্লাহতায়ালা সংজ্ঞায়ীত করেছেন “হুদাল লিল মুত্তাকীন” তথা মুত্তাকীনদের পথপ্রদর্শক রূপে। তিনি এ হুশিয়ারিও দিয়েছেন,“ওয়াল্লাহু লা ইয়াহদিল কাওমাল ফাসিকীন।” –(সুরা সাফ আয়াত ৫)। অর্থঃ “এবং আল্লাহতায়ালা ফাসিক তথা পাপীষ্টদের হেদায়েত দেন না।” অর্থাৎ পাপ পাপীকে বঞ্চিত করে মহান আল্লাহর হেদায়েত থেকে। অতি গুরুতর কোন শাস্তিও কি এর চেয়ে কঠিনতর হতে পারে? হেদায়াত হলো মহান আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামত; ধন-সম্পদ,ঘরবাড়ী বা সন্তান-সন্ততি সে তুলনায় কিছুই না। অথচ পাপকর্ম সে হেদায়াত থেকেই বঞ্চিত করে। এবং অনিবার্য করে পথভ্রষ্টতা। পথভ্রষ্টতার যে শাস্তি সেটি তো অনন্ত অসীম কালের জন্য জাহান্নামে বাস,হাজারো বছরের জেলের শাস্তিও সে তুলনায় অতি তুচ্ছ। লক্ষ্যনীয় হলো, নবীজীর আমলে তারাই সর্বপ্রথম মুসলমান হওয়ার সৌভাগ্য পেয়েছিলেন যারা ছিলেন হযরত আবু বকর(রাঃ), হযরত আলী(রাঃ),হযরত ওসমান(রাঃ)র ন্যায় লজ্জাশীল এবং পাপের সাথে সংশ্রবহীন।  

 

এজেন্ডাঃ জাহান্নামে নেয়া

তাই কাউকে পথভ্রষ্ট করার সহজ মাধ্যম হলো তাকে পাপে অভ্যস্থ করা। বাংলাদেশেও একই স্ট্রাটেজী নিয়ে শয়তানের সৈনিকেরা ময়দানে নেমেছে। তাই পাপকে তারা গৃহে,নাট্যশালায় বা সিনেমা হলে আবদ্ধ না রেখে সেটিকে গ্রামেগঞ্জে ছড়িয়ে দিচ্ছে। তাই গত ১০ ডিসেম্বরে সে উলঙ্গ নাচকে বৈশাখী টিভি চ্যালেনের মাধ্যমে সারা দেশের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছে। পিতামাতারা নিজ সন্তানদের সামনে সে নাচ দেখে বিব্রত বোধ করলেও সে বিব্রতকর লাজুক অবস্থাটি আর কতকাল বেঁচে থাকবে? পাপ তো এভাবেই আস্তে পরিবারে ঢুকে। আজ  যারা নগ্ননাচ বা পতিতাবৃত্তিতে লিপ্ত তাদের সবাই পতিতা পল্লি থেকে উঠে আসেনি। জন্ম নিয়েছিল সম্ভবত এমন সব পরিবারে যেখানে কিছু লজ্জা ছিল, শ্লিলতাও ছিল। হয়তো ধর্মচর্চাও ছিল। কিন্তু পরিবেশের গুণে তারা সে ধর্ম, লজ্জা ও শ্লিলতাকে হারিয়েছে। এখন তারা নিজেরাই সে লজ্জাহীন অশ্লিতার ফেরিওয়ালাতে পরিণত হয়েছে।

ইসলাম কাউকে অন্যের ঘরের অভ্যন্তরে ঢুকে বা উঁকি মেরে সে ঘরের অধিবাসীরা কি লেবাস পড়ছে বা কি পানাহার করছে -সেটি জানার অনুমতি দেয়না। সেটি গৃহবাসীর নিজস্ব বিষয়। সেখানে সে অশ্লিল বা উলঙ্গও থাকতে পারে। কিন্তু সেটি শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ রূপে গণ্য হয় যখন উলঙ্গতা ও অশ্লিলতা নিয়ে কেউ রাস্তায় নেমে আসে। তখন সেটি ভয়ানক এক সামাজিক সমস্যার জন্ম দেয়। তখন সে নৈতিক রোগে অন্যদেরও আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। পাপাচার লাগাতর চলতে দিলে সমাজে লজ্জা-শরম ও নীতি-নৈতিকতারই মৃত্যু ঘটে। কারো জাহান্নামের যাওয়ার নাগরিক অধিকার ইসলাম রহিত করে না, কিন্তু অধিকার দেয় না সে পথে অন্যকে প্ররোচিত করার। এটি কারো হাতে নিহত হওয়ার চেয়েও ক্ষতিকর। কারণ অন্যের হাতে নিহত হওয়ার মধ্য দিয়ে কারো জাহান্নাম প্রাপ্তি হয়না। অথচ পাপের পথে জাহান্নামের নেয়ার আয়োজনটি হলে সে মহাক্ষতিটি হয়। পাপাচারের প্রচারকদের আদালতের কাঠগড়ায় খাড়া করোনো ও তাদের বিচার করা তাই প্রতিটি দায়িত্বশীল সরকারে দায়িত্ব। 

 

 

জিহাদ যে কারণে অনিবার্য

ইসলামের জিহাদ এজন্যই শুধু আগ্রাসী শত্রুদের বিরুদ্ধেই নয়,নিজ দেশের দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধেও। পবিত্র কোরআনে সত্যের প্রতিষ্ঠা ও দুর্বৃত্তদের প্রতিরোধের নির্দেশটি তাই একবার নয়,বহু বার এসেছে। বলা হয়েছে,“তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল অবশ্যই থাকতে হবে যারা মানুষকে কল্যাণের দিকে ডাকবে, উত্তম কাজের নির্দেশ দিবে এবং দুর্বৃ্ত্তিমূলক কাজ থেকে রুখবে।এবং তারাই হলো সফলকাম।” –(সুরা আল ইমরান, আয়াত ১০৪)।তাই শুধু কল্যাণের দিকে ডাকলেই মুসলমানের দায়িত্ব শেষ হয় না। তাকে আরো গুরুত্বপূর্ণ কাজে আত্মনিয়োগ করতে হয়। সেটি ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং অন্যায়ের প্রতিরোধে। এবং প্রতিরোধের কাজে শক্তি প্রয়োগও অনিবার্য হয়ে উঠে। কারণ, ভাল কাজের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের প্রতিরোধ যেমন নামায-রোযা পালনে হয় না, তেমনি ওয়াজ-নসিহতেও হয় না। একাজটি আইন-প্রয়োগকারি সংস্থার। একাজ তাই রাষ্ট্রের। কারণ, কোন ব্যক্তি আইন নিজ হাতে তুলে নিতে পারে না। আইন প্রয়োগের স্বার্থে তখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকেই নিজ হাতে তুলে নিতে হয়। ন্যায়নীতির প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রকেও তখন ইসলামী করতে হয়। এটাই নবীজী (সাঃ)র সূন্নত। প্রতিটি মুসলিম ব্যক্তির যেমন বিশেষ চরিত্র থাকে, তেমনি বিশেষ ও বৈশিষ্ঠ্যপূর্ণ চরিত্র থাকে মুসলিম রাষ্ট্রেরও। সে চরিত্রটাই অমুসলিম রাষ্ট্র থেকে তাকে আলাদা করে। মুসলিম রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে সে প্রবল চরিত্রটি হলো ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং পাপের প্রতিরোধ। মহান আল্লাহতায়ালার ঘোষণা, যারা এমন কাজ করে তারাই সফলকাম। মুসলিম রাষ্ট্রের রাজনীতি ও সংস্কৃতি এজন্যই কাফের দেশের রাজনীতি ও সংস্কৃতি থেকে পৃথক। কারণ কাফের দেশে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও পাপের প্রতিরোধের সে প্রবল প্রেরণাটি থাকে না। তাই ভারতে বা অন্য কোন অমুসলিম দেশে যেভাবে পতিতাবৃত্তি, সূদী ব্যাংক, মদ্যপান, জুয়ার ন্যায় পাপকর্ম আইনগত ন্যায্যতা পায় সেটি বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশে অনাকাঙ্খিত।  

শয়তানের চেতনা বিশ্বজনীন। শয়তান চায় তার বাহিনী একক উম্মাহ হিসাবে বিশ্বজুড়ে কাজ করুক। তাই ভারত,রাশিয়া বা অন্য যে কোন দেশের নগ্নতার নায়কদের সাথে বাংলাদেশের নায়কদের একাকার হতে বাধা থাকে না। এক দেশের মার্কসবাদীগণ তাই হাজারো মাইল দূরের মার্কসবাদীদের সাথে একাত্ব হয়ে যায়। মার্কিন বা ইউরোপীয়রাও তাই বাংলাদেশী এনজিও নেতাদের সাথে গলায় গলায় একাত্ম হয়ে একই লক্ষ্য ও একই মিশন নিয়ে কাজ করে। এসব এদেশীয় পার্টনারদের গায়ে আঁচড় লাগলে লন্ডন,ওয়াশিংটন বা প্যারিসে তাই প্রতিবাদের ঝড় উঠে। সতীর্থদের শুধু প্রশংসাই নয়,, তাদেরকে তারা নবেল প্রাইজও জুটিয়ে দেয়। একই কারনে ভারতীয় শাহরুখ খান ও তার রাশিয়ান নর্তকীরা বাংলাদেশে প্রচুর সমাদার পায়। বিপুল অর্থও পায়। তাদের সাথে নেচে গেয়ে একাকার হয় বহু হাজার বাংলাদেশী সতীর্থরাও। বাংলাদেশের মত একটি মুসলিম দেশে অশ্লিলতার এসব নায়কেরা যেরূপ বাজার পেয়েছে সেটি কোন ঈমানদারকে শংকিত না করে পারে না। বাংলাদেশ বিশ্বের একটি দরিদ্র দেশ। বহু কোটি মানুষ পেট ভরে দুই বেলা খাবারও পায় না। অথচ এমন একটি দেশে কয়েক ঘন্টার অনুষ্ঠানের একটি টিকেট বিক্রি হয়েছে ২৫ হাজার টাকায়। সামনের সারিতে মূল্য ছিল আরো অধিক। প্রায় ২৫ হাজার মানুষ সেটি দেখেছে। বহু হাজার মানুষ টিকিট না পেয়ে আফসোস করেছে। মলমূত্রের উপর কতটা মাছি বসলো সেটি দেখে বোঝা যায় সে নোংরা পরিবেশে মাছির সংখ্যাটি কত বিশাল। তেমনি অশ্লিল নাচ বা পতিতাপল্লির খরিদদারদের বিপুল সংখ্যা দেখেই বোঝা যায় দেশ কতটা নৈতিকতাহীন ও দুর্বৃত্ত কবলিত।এজন্য কি জটিল হিসাব নিকাশের প্রয়োজন হয়?      

শয়তানের কোন ধর্মগ্রন্থ নাই, ইবাদতের কোন বিধানও নাই। তবুও শয়তানের পথে পথভ্রষ্টতার চর্চা কমেনি। বরং দিন দিন তা প্রবলতর হচ্ছে। এ পথভ্রষ্টতা বাঁচিয়ে রাখায় সমাজ ও রাষ্ট্রে যে গুলি ভূমিকা রাখে তা হলো অশ্লিল নাচ,গান,কবিতা,নাটক,পুজা-পার্বন ইত্যাদি। নবীজী (সাঃ)র সময় আরবের কাফেরদের কোন ধর্মগ্রন্থ ছিল না। তাদের কোন পয়গম্বরও ছিল না। কিন্তু তাদের সে অধর্ম চর্চায় হাজার হাজার বছরেও কোন বাধা পড়েনি। আল্লাহর অবাধ্য করা ও তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী করার কাজে হাতিয়ার হিসাবে কাজ দিয়েছে মদ্যপান,অশ্লিলতা এবং ব্যাভিচারের ন্যায় নানা পাপ। এগুলো পরিণত হয়েছিল তাদের সংস্কৃতিতে। এরূপ আদিম অসভ্যতার চর্চায় জ্ঞানের প্রয়োজন পড়ে না। প্রাচীন প্রস্তর যুগের অজ্ঞতা নিয়েও সেটি সম্ভব। আরবের কাফেরদের তাই কোন ধর্মগ্রন্থ বা বিদ্যাবু্দ্ধির প্রয়োজন পড়েনি।

 

টার্গেট কেন বাংলাদেশ?

বাংলাদেশ ১৬ কোটি মানুষের দেশ। দেশের শতকরা ৯০ ভাগ জনসংখ্যা মুসলমান। এ বিপুল সংখ্যক মানুষের মুসলমান রূপে বেড়ে উঠার মধ্যে তাবত বিপক্ষ শক্তি বিপদ দেখতে পায়। ফলে বাংলাদেশে ইসলামকে পরাজিত করা এবং অধর্মের চর্চাকে প্রসার দেয়া শুধু ভারতের স্ট্রাটেজী নয়,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলসহ সকল পাশ্চাত্য শক্তিরও। ফলে পরিকল্পিত ভাবে শুরু হয়েছে নানা দেশ থেকে শয়তানের শত শত দ্রুত আগমনের। এরা আসছে নানা বেশে। আসছে এনজিও-উপদেষ্টা রূপে,আসছে সাংস্কৃতিক কর্মী রূপে। ইসলামের বিজয় রুখতে তারা দেশের বহু হাজার এনজিওর সাথে নিবিড় পার্টনারশিপ গড়ে তুলেছে। ফলে আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ এদেশে এতটা প্রকট। মুসলিম দেশ হলে কি হবে,আইন-আদলতে শরিয়তী বিধানের কোন স্থান নেই।এবং বিলুপ্ত হচ্ছে ইসলামী মূল্যবোধ।

দেশ কোন দিকে যাবে সেটি শুধু রাজনীতির ময়দান থেকে নিয়ন্ত্রিত হয় না, নিয়ন্ত্রিত হয় সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ময়দান থেকেও। বাংলাদেশের ইসলামের পক্ষের শক্তি সমাজ ও রাষ্ট্রের উপর নিয়ন্ত্রন হারিয়েছে তো এমন এক প্রবল সাংস্কৃতিক জোয়ারের কারণেই। বাংলায় ইসলামের জোয়ার যখন প্রবলতর হচ্ছিল এবং মানুষ যখন লাখে ইসলাম কবুল করছিল তখন সে জোয়ার রোধের সামর্থ্য হিন্দু ধর্মের ছিল না। কিন্তু সে সময় চৈতন্যদেব ও তার বৈষ্টম-বৈষ্টমীগণ শুরু করে ভাববাদী নাচ-গানের জোয়ার যা অচিরেই ইসলামের জোয়ার থামিয়ে দেয়। ফলে সেদিন ইসলাম বাংলায় সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্ম হতে পারিনি। আজও  ইসলামের জাগরন রুখার সামর্থ হিন্দু ধর্মের নাই, সমাজবাদ বা মার্কসবাদেরও নেই। কিন্তু সে সামর্থ আছে অশ্লিল নাচ-গান-সম্বলিত অপসংস্কৃতির। শয়তানের এটি শক্তিশালী অস্ত্র। তাই ইসলামের বিপক্ষ শক্তির এটিই মোক্ষম অস্ত্র। তাই শাহরুখ খান ও তার সতীর্থদের বাংলাদেশের আগমন শুধু যেমন এই প্রথম নয়,শেষও নয়। এ প্রবাহ লাগাতর চলতেই থাকবে। বাংলাদেশে সে জোয়ারকে তীব্রতর করতে অগণিত টিভি চ্যানেল গড়ে উঠেছে, বাংলাদেশকে ঘিরে ভারতও বহু টিভি স্টেশন খুলেছে। ফলে লাগাতর বর্ষন শুরু হয়েছে ইসলামের বিরুদ্ধে। তাই বাংলাদেশের মুসলমানদের সামনে দুর্দিন। এটা শুধু রাষ্ট্র বাঁচানোর নয়,ধর্মকে বাঁচানোরও। আর ধর্ম চেতনা দুর্বল হলে রাষ্ট্র বাঁচানো কি আদৌ সম্ভব হবে? দেশের আর্থিক বা সামরিক বল নেই আগ্রাসী শক্তির মোকাবেলার। কিন্তু ইসলামী চেতনার বল থাকলে আনবিক বিশ্বশক্তিকেও পরাজিত করা যায়। জনসংখ্যায় বাংলাদেশের এক-পঞ্চমাংশ হয়েও দরিদ্র আফগানগণ সেটা প্রমাণ করেছে রাশিয়ার বিরুদ্ধে। ষাটের দশকে আলজেরিয়ানগণ প্রমাণ করেছে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে। সম্প্রতি লেবাননের হিযবুল্লাহ প্রমাণ করেছে ইসরা্রলের বিরুদ্ধে। ইসলামের পক্ষ নিলে মহান আাল্লাহও তখন পক্ষে দাঁড়ান। ফেরেশতারা তখন হাজির হন রণাঙ্গণে।এ নিয়ে মুসলমানের মনে কি সামান্যতম সন্দেহও থাকতে পারে?  আর থাকলে কি তাকে মুসলমান বলা যায়? ইসলামের সে দুর্জেয় শক্তি নিয়ে শয়তান অজ্ঞ নয়। তাই শয়তানী শক্তি ইসলামী চেতনা বিনাশে হাত দিয়েছে। আল্লাহর সাথে মুসলমানের সম্পর্ক ছিন্ন হয় তো এপথেই। দেশটিতে শত শত শয়তানের দূত আগমনের হেতু তো এটাই।  ২৬/১২/১০   

 

 

 

 

 

                       

 

 

 

 




এতো ভ্রষ্টতা ও বিপর্যয় কেন বাংলাদেশে?

রাজনীতিঃ জাতীয় জীবনের ইঞ্জিন

জাতীয় জীবনে মূল ইঞ্জিনটি হলো ক্ষমতাসীনদের রাজনীতি। এ ইঞ্জিনই জাতিকে সামনে টানে। এবং সে সামনে চলাটি কোন পথে হবে -নিছক বৈষয়ীক উন্নয়ন না নৈতিক ও সার্বিক মানবিক উন্নয়নের পথে- সেটি নির্ভর করে এ ইঞ্জিনের চালকদের উপর। কোন একটি জাতির ব্যর্থতা দেখে নিশ্চিত বলা যায়, সে জাতির রাজনৈতিক নেতাগণ সঠিক ভাবে কাজ করেনি। আর বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মূলতঃ সেটিই ঘটেছে। কোন দেশের উন্নয়ন বা সুখ-সমৃদ্ধির জন্য এটি জরুরী নয় যে, সেদেশের জলবায়ু, আবহাওয়া বা প্রাকৃতিক সম্পদে বিপুল বিপ্লব আসতে হবে। বরং বিপ্লব আনতে হয় নেতৃত্বে এবং সেদেশের রাজনীতিতে। রাজনীতির মাধ্যমে সাধারণ মানুষ পায় পথ-নির্দেশনা, রাজনৈতিক নেতাদের মাঝে পায় অনুকরণীয় মডেল খুজে পায়। আলেকজান্ডারের আমলে গ্রীস যখন বিশ্বশক্তি রূপে আত্মপ্রকাশ তখন গ্রীসের জলবায়ু, আবহাওয়া বা প্রাকৃতিক সম্পদে কোন পরিবর্তন আসেনি। পরিবর্তন এসেছিল রাজনৈতিক নেতৃত্বে। তেমনি আরবের মুসলিমগণ যখন বিশ্বের প্রধান শক্তি রূপে আত্মপ্রকাশ করলো তখন আরবের জলবায়ু, আবহাওয়া বা প্রাকৃতিক সম্পদে কোন বিপ্লব আসেনি। বরং বিপ্লব এসেছিল তাদের চরিত্রে, নেতৃত্বে ও রাজনীতিতে।

রাজনীতি হল সমাজসেবার সর্বশ্রেষ্ঠ হাতিয়ার। মুসলিম সমাজে এ কাজ করেছেন ইসলামের মহান নবী এবং তাঁর শ্রেষ্ঠতম সাহাবীগণ। রাষ্ট্রপ্রধানের আসনে দেশের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিকে বসানো তাই নবীজী (সাঃ)র সূন্নত। এ আসনে বসেছেন খোদ নবীজী (সাঃ)। নবীজী (সাঃ)র ওফাতের পর বসেছেন শ্রেষ্ঠ সাহাবাগণ। তাঁরা ছিলেন এমন সাহাবা যারা জীবদ্দশাতেই জান্নাতের সুসংবাদ পেয়েছিলেন। নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত পালনের পাশাপাশি যারা আল্লাহর রাস্তায় নিজের সময়, মেধা ও জানমাল কোরবান করতে দু’পায়ে খাড়া এ কাজটি মূলতঃ তাদের। কিন্তু সমাজসেবার এ মাধ্যমটি যদি ক্ষমতালিপ্সু ও স্বার্থশিকারী দুর্বৃত্তদের হাতে হাইজ্যাক হযে যায় তখন সে জাতির পতন, পরাজয় বা বিশ্বজোড়া অপমানের জন্য কি কোন বিদেশী শত্রুর প্রয়োজন পড়ে? ঝাড়ুদার হতে হলেও সততা লাগে, নইলে রাস্তা থেকে আবর্জনা দূর হয় না। আর রাজনীতিবিদদের মূল দায়িত্ব হলো রাষ্ট্র ও সমাজ থেকে আবর্জনারূপী দুর্বৃত্তদের সরানো। সে সাথে সুনীতির প্রতিষ্ঠা। কোরআনের ভাষায় মু’মিনের সে মিশনটি “আমারু বিল মারুফ” এবং “নেহী আনিল মুনকার”। অর্থাৎ ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং অন্যায়ের নির্মূল। সে কাজের প্রতি অতিশয় গুরুত্ব দিয়ে মহান আল্লাহতায়ালার ঘোষনাটি হলোঃ “তোমাদের মধ্যে অবশ্যই এমন একদল মানুষ থাকতে হবে যারা কল্যাণের পথে মানুষকে ডাকবে এবং ন্যায়ের নির্দেশ দিবে ও অন্যায়ের পথ থেকে রুখবে, এবং তারাই হল সফলকাম”। -সুরা আল-ইমরান, আয়াত ১০৪। আর এটাই তো মুসলমানের বাঁচা-মরা ও রাজনীতির মূল মিশন। নিছক নামায-রোযার মধ্য দিয়ে কি আল্লাহর নির্দেশিত এ হুকুমটি পালিত হয়? মেলে কি সফলতা? তাই আল্লাহতায়ালার কাছে যারা সফল হিসাবে গণ্য হতে চায় তাদেরকে শুধু নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত পালন করলে চলে না। পাশাপাশি এ পবিত্র কাজকেও জীবনের মিশন রূপে বেছে নিতে হয়। তাই তাই প্রকৃত ঈমানদারদের কাজ শুধু রাজনীতিতে অংশ নেওয়া নয়; বরং সে কাজে অর্থদান, শ্রমদান এমনকি প্রাণদানও। সাহাবায়ে কেরামের জীবনে তো সেটিই দেখা গেছে।

অথচ বাংলাদেশের অবস্থাটি ভিন্নতর। দেশটির লাখ লাখ মসজিদ ভরতে নামাযীর অভাব হয় না। এ দেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ রোযা রাখে। বহু হাজার মানুষ প্রতিবছর হজ্ব করে। বহু লক্ষ মানুষ প্রতিদিন কোরআন তেলাওয়াতও করে। অথচ ন্যায়ের পথে মানুষকে ডাকছে ক’জন? ক’জন সমাজ ও রাষ্ট্রের বুকে ন্যায়ের নির্দেশ দিচ্ছে? দুর্বৃত্ত মানুষদের রুখছেই বা ক’জন? অথচ রাজনীতিতে দেশের নামাজীরা যে অংশ নিচ্ছে না তা নয়। বরং তারাই সারি বেধে ভোট দেয় ইসলাম বিরোধীদের বিজয়ী করতে। নবীজী(সাঃ)র আমলে লক্ষ লক্ষ মসজিদ ছিল না, কোটি কোটি নামাযীও ছিল না। সংখ্যায় নগন্য সংখ্যক হয়েও তাঁরা আরব ভূমি থেকে দূর্নীতি ও দুর্বত্তদের নির্মূল করেছিলেন। নির্মূল করেছিলেন আবু লাহাব ও আবু জেহেলদের মত ইসলাম বিরোধী সকল নেতাদের। অথচ বাংলাদেশে ঘটেছে উল্টেটি। দেশটির সংখ্যাগরিষ্ট মুসলমানদের হাতে দুর্বৃত্ত ও ইসলাম-বিরোধী রাজনৈতিক নেতারা শুধু বিপুল ভোটে নির্বাচিত ও প্রতিপালিতই হয় না, প্রতিরক্ষাও পায়। বিপুল গণসমর্থণ নিয়ে এরা নেতা হয়, মন্ত্রী হয়, প্রশসনের কর্মকর্তাও হয়। দেশটির রাজনীতির ময়দানটি অধিকৃত হয়ে গেছে অতি দুষ্ট ও দুর্বত্ত প্রকৃতির লোকদের হাতে। অথচ যে দেশে আইনের শাসন আছে সে দেশে দূর্নীতিবাজদের পক্ষে নেতা হওয়া দূরে থাক, রাস্তার ঝাড়ুদার হওয়াও অসম্ভব। দূর্নীতিবাজদের দিয়ে রাস্তার ময়লা তোলার কাজটি যথার্থভাবে হয় না। কারণ খুটেঁ খুটেঁ ময়লা তোলার কাজেও অতি নিষ্ঠাবান ও দায়িত্বশীল হওয়াটি জরুরী। বরং জাতীয় জীবনে প্রকৃত আবর্জনা হল এ দূর্নীতিবাজেরা, তাই প্রতিদেশেই তাদের স্থান হয় কারাগারে। আবর্জনার ন্যায় তাদেরও স্থান হওয়া উচিত আস্তাকুঁড়ে। দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে ইসলাম অতি কঠোর ও আপোষহীন। যারা চুরি করে কোরআন তাদের হাত কেটে দিতে বলে।

 

ব্যর্থতার জন্য দায়ী দুষ্ট রাজনীতি

বাংলাদেশের ব্যর্থতা এজন্য নয় যে, দেশটিতে সম্পদের কমতি রয়েছে বা দেশের ভূগোল বা জলবায়ু প্রতিকূল। ব্যর্থতার জন্য মূলতঃ দায়ী দেশের দুষ্ট রাজনীতি। কারণ, বাংলাদেশে যে রাজনীতির চর্চা হচ্ছে সেটি আল্লাহতায়ালার প্রদর্শিত পথ বেয়ে এগুচ্ছে না। মহান আল্লাহতায়ালার প্রদর্শিত সে সরল পথটি হল সিরাতুল মোস্তাকিম, যা প্রকাশ পেয়েছে পবিত্র কোরআন ও নবীজী (সাঃ)র সূন্নাহতে। আর এ সিরাতুল মোস্তাকিম শুধু নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত, ইবাদত-বন্দেগীর পথই দেখায় না। দেখায় সুস্থ্য রাজনীতি, আইন-আদালত, শিক্ষা-সংস্কৃতি এবং অর্থনীতির পথও। আল্লাহর প্রদর্শিত পথ অনুসরণ না করে রাষ্ট্র, সমাজ বা পরিবারে শান্তি আসবে এরূপ বিশ্বাস করাই তো কুফরি তথা ঈমান-বিরুদ্ধ। এটি শিরক। তাই প্রশ্ন, এমন বিশ্বাস নিয়ে কি কেউ মুসলিম থাকতে পারে? আল্লাহর প্রদর্শিত পথ তথা ইসলাম ছাড়া শান্তি ও সমৃদ্ধি সম্ভব হলে তো ইসলামের প্রয়োজনই ফুরিয়ে যায়। অথচ তেমন একটি প্রচন্ড ইসলাম বিরোধী চেতনার প্রতিফলন ঘটছে বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও আইন-আদালতে। এ ক্ষেত্রগুলোতে ইসলামের প্রয়োজনই অনুভব করা হচ্ছে না। ইসলাম সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে নিছক মসজিদে ও কিছু পরিবারে। ফলে সমগ্র রাষ্ট্র জুড়ে বাড়ছে সূদ, পতিতাবৃত্তি, ব্যভিচার, ঘুষ, চুরি-ডাকাতি, সন্ত্রাস ও মদ্যপানের ন্যায় সর্ববিধ হারাম কাজ।

অথচ ইসলামের আগমন শুধু ব্যক্তির পরিশুদ্ধির লক্ষ্যে নয়, সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিশুদ্ধির লক্ষ্যেও। সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিবেশ যদি পাপে জর্জরিত থাকে তবে কি কোন মানব শিশু সহজে সিরাতুল মুস্তাকীম পায়? নবীজী (সাঃ)র হাদিসঃ প্রত্যেক মানব শিশুর জন্ম হয় মুসলিম রূপে। কিন্তু সে ইসলাম থেকে বিচ্যুত হয়ে হয়ে অমুসলিম হয় (পারিবারীক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়) পরিবেশের প্রভাবে। কোন শিশুই তার পরিবেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সামর্থ্য নিয়ে হাজির হয় না। যারা নবেল প্রাইজ পেয়েছে সে সামর্থ্য তাদেরও ছিল না। সে সামর্থ্য তো একটি বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধের। এজন্য তো চাই ওহীর তথা কোরাআনীর জ্ঞান। তাই কোন শিশুকে জাহান্নামের আগুণ থেকে বাঁচাতে হলে তাকে শুধু পানাহার দিলে চলে না; জাহিলিয়াত তথা অজ্ঞতার অন্ধকার পরিবেশ থেকে মুক্তি দিতে হয়। জাহিলী পরিবেশে এমন কি সিরাতুল মুস্তাকীম পায় না এমন কি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারীগণও। তাই সবচেয়ে সওয়াবে কাজ হলো, সমাজ ও রাষ্ট্রকে অজ্ঞতা তথা জাহিলিয়াত-মুক্ত করা। রাষ্ট্রের অবকাঠামো ও তার পরিচালনা কোর’আনের জ্ঞানে অজ্ঞ সেক্যুলারিস্টদের হাতে রেখে রাষ্ট্র বা সামাজের পরিবেশকে কি জাহিলিয়াত-মুক্ত করা যায়? সেটি অসম্ভব বলেই নবীজী (সাঃ) তার কর্মের পরিধি স্রেফ মসজিদ নির্মাণ ও কোর’আনের জ্ঞান বিতরণের মাঝে সীমিত রাখেননি। ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণ করেছেন এবং নিজে সে রাষ্ট্রের প্রধান রূপে দায়িত্ব পালন করেছেন।  

মানব জীবনের সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটে পথভ্রষ্ট অপরাধীদের হাতে রাষ্ট্র অধিকৃত হলে। রাষ্ট্র তখন জনগণকে জাহান্নামে নেয়ার দ্রুতগামী ট্রেনে পরিণত হয়। একটি বাসের সকল যাত্রী মাতাল হলেও তাদের সঠিক গন্তব্যস্থলে পৌঁছার সম্ভাবনা থাকে যদি চালক সুস্থ্য হয় এবং জ্ঞান রাখে সঠিক পথের। কিন্তু চালক নিজে মাতাল বা অজ্ঞ হলে সবার ভূল পথে চলাটি অনিবার্য হয়ে উঠে। এজন্যই ইসলামে শ্রেষ্ঠ নেক কর্মটি মসজিদ বা মাদ্রাসা নির্মাণ নয়, সেটি রাষ্ট্রকে অনৈসলামিক শক্তির হাত থেকে মুক্ত করে পরিপূর্ণ ইসলামী করা। বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশের জনগণের জন্য ভয়ানক বিপদের কারণ, দেশ অধিকৃত হয়েছে ভয়ানক অপরাধীদের হাতে। তাদের নিজেদের নাই পবিত্র কোরআনের তথা সিরাতুল মুস্তাকীমের জ্ঞান। তাদের রাষ্ট্র অধিকৃত হওয়ায় রাষ্ট্র পরিণত হয়েছে পথভ্রষ্ট করার হাতিয়ারে। ফলে ভ্রষ্ট্তা বাড়ছে শুধু শিশুদের নয়, বয়স্কদেরও। শিক্ষা ও সংস্কৃতির নামে সোসল ইঞ্জিনীয়ারিং হচ্ছে জনগণকে ইসলাম থেকে দূরে সরানোর কাজে। মৌলবাদ বলে পরিহার করা হচ্ছে ইসলামের বিধানকে।

ইসলামের প্রতি এরূপ আচরনকে শুধু ভ্রষ্টতা বললে ভূল হবে, বরং এটি হল আল্লাহর বিরুদ্ধে পরিপূর্ণ বিদ্রোহ। আর সে বিদ্রোহই প্রকাশ পাচ্ছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে। মুষ্টিমেয় ইসলামি দল ছাড়া বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলো আল্লাহর প্রদর্শিত সে সিরাতুল মোস্তাকিমের অনুসরণ দূরে থাক, সেটির প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করে না। আল্লাহর বিরুদ্ধে এটি কি সীমাহীন ঔদ্ধতা। এমন আচরণের তুলনা চলে চিকিৎস্যক ও তার দেওয়া চিকিৎসার বিরুদ্ধে মরনাপন্ন রোগীর ঔদ্ধতার সাথে। এরাই রাজনীতিকে পরিণত হয়েছে লুটপাঠ, শোষন এবং আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ারে। রাজনৈতিক দলের বহুলক্ষ কর্মী ও নেতা, সামরিক বাহিনীর শত শত অফিসার, শত শত সরকারি আমলা, হাজার হাজার ধনি ব্যবসায়ী ও ধর্মব্যবসায়ীসহ নানা জাতের সুযোগ সন্ধানীরা নেমেছে এ পেশাতে। কোন ডাকাত দলে বা সন্তাসী দলে এত দুর্বৃত্ত ও ধোকাবাজের সমাবেশ ঘটেনি যা ঘটেছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে। দুর্বত্তদের যারা যত বেশী দলে ভেড়াতে পারে তারাই বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে প্রভাবশালী ও প্রতাপশালী। রাজনীতির নামে রাস্তায় লগিবৈঠা দিয়ে পিঠিয়ে মানুষ হত্যা বা যাত্রীভর্তি বাসে আগুণ দেওয়া এরূপ রাজনৈতিক কর্মী ও নেতাদের কাছে কোন অপরাধই নয়। বরং ক্ষমতায় যাওয়ার লক্ষ্যে সেটিকে তারা অপরিহার্য মনে করে। বাংলাদেশের ইতিহাস এমন বর্বর ও বীভৎস অপরাধ কর্মে ভরপুর। খুণোখুণির ঘটনা ঘটেছে এমনকি সংসদেও। গণতন্ত্রের নামে দেশে বার বার নির্বাচন হয়, কিন্ত সে নির্বাচনে সৎ ও যোগ্য মানুষের নির্বাচন কি সম্ভব? মিথ্যা ওয়াদা ও ধোকাবাজীর উপর যে দেশে নিয়ন্ত্রণ নেই, সে দেশে কি দুর্বৃত্তদের পরাজিত করা যায়? নির্বাচন তাদের সামনে বরং রাস্তা খুলে দেয়।

নির্বাচন পরিণত হয়েছে নাশকতার আরেক হাতিয়ারে। ডাকাতি হয় ব্যালটের পর। এবং বিজয়ী হয় চোর-ডাকাতেরা। এরাই দখলে নেয় দেশের প্রশাসন, শিল্প, আইন-আদালতসহ সকল গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। ফলে বাংলাদেশে বার বার নির্বাচন হলেও শোষন, লুটপাঠ, দুবৃত্তি ও দূর্নীতি থেকে দেশবাসীর মূক্তি মিলছে না। বরং দিন দিন তা বেড়েই চলেছে। অপরাধীদের হাতে রাষ্ট্র অধিকৃত হলে কোন জাতি কি কখনো সুপথ পায়? তখন তো বিভ্রান্তি নেমে আসে সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বত্র জুড়ে। তেমনি বিপদ নেমে আসে রাজনীতি বিপথগামী হলে। তাই জাতীয় জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন ইস্যু হল, রাজনীতির ভ্রষ্টতা দূর করা। ইসলামে এটিই জিহাদ। নবীজীর আমলে মুসলমানদের সবচেয়ে বেশী কোরবানী পেশ করতে হয়েছে রাজনীতির ময়দানের আবর্জনা সরাতে। সে সমাজেও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের প্রতিরোধের পথে বড় বাধা রূপে কাজ করছিল আবু লাহাব, আবু জেহলের মত দুর্বৃত্ত নেতারা। এসব দুর্বৃত্তদের সরাতে যত লড়াই ও রক্তক্ষয় হয়েছে সমাজে নামায-রোয়া, হজ্ব-যাকাত বা অন্য কোন বিধান প্রতিষ্ঠা করতে তা হয়নি। মুসলমানের বাঁচার মধ্যে যেমন লক্ষ্য থাকে, তেমনি লক্ষ্য থাকে প্রতিটি কর্মের মধ্যেও। ইসলামী পরিভাষায় সেটিই হল নিয়ত। আর সে নিয়তের কারণেই মুসলমানের প্রতিটি কর্ম -তা যত ক্ষুদ্রই হোক- ইবাদতে পরিণত হয়।

কিন্তু কথা হল বাংলাদেশের রাজনীতির সে লক্ষ্যটি কি? রাজনীতির মূল ইস্যু বা এজেন্ডা কি শুধু সরকার পরিবর্তন? এটি কি নিছক নির্বাচন? লক্ষ্য কি শুধু রাস্তাঘাট, অফিস-আদালত ও কলকারাখানা নির্মান? অথবা পণ্য বা মানব রপ্তানীতে বৃদ্ধি? বাংলাদেশে এ অবধি নির্বাচন ও সে সাথে সরকার পরিবর্তন হয়েছে বহুবার। নানা দল নানা এজেন্ডা নিয়ে ক্ষমতায় গেছে। কিন্তু দেশ কতটুকু সামনে এগিয়েছে? জনগণের জীবনে উচ্চতর মানবিক মূল্যবোধই বা কতটুকু প্রতিষ্ঠা পেয়েছে? তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো এ জন্য দরিদ্র নয় যে, সেখানে সম্পদের অভাব। বরং দারিদ্র্যের কারণ, সে সব প্রাকৃতিক সম্পদে তারা অতি কমই মূল্য সংযোজন করতে পারে। তারা যেমন ব্যর্থ নিজেদের মূল্য বাড়াতে, তেমনি ব্যর্থ খনিজ বা প্রাকৃতিক সম্পদের মূল্য বাড়াতে। এটিই তাদের সবচেয়ে বড় অক্ষমতা। একটি দেশের প্রাচুর্য্য তো বাড়ে সে দেশে মানব ও প্রাকৃতিক সম্পদের উপর কতটুকু মূল্য সংযোজন হল তার উপর। পাট, তূলা, চা, কফি, তেল, গ্যাস, তামা, কপার, ইউরেনিয়াম, বক্সাইট, টিনের ন্যায় অধিকাংশ কৃষি ও খনিজ সম্পদের উৎস হল তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো। কিন্তু এ সম্পদের কারণে বেশী লাভবান হয়েছে পাশ্চাত্য। কারণ এসব কৃষি ও খণিজ সম্পদের উপর সিংহভাগ মূল্য সংযোজন হয়েছে পাশ্চাত্য দেশগুলির কারখানায়। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো রয়ে গেছে কাঁচামাল বা খনিজ সম্পদের জোগানদার রূপে। পাশ্চাত্য দেশের কোম্পানীগুলোর কারণেই আফ্রিকার কোকো সারা দুনিয়ার মানুষের কাছে চকলেট হিসাবে প্রচুর সমাদার পাচ্ছে। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ নানা ব্রান্ডের চকলেটের পিছনে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচও করছে। এভাবে চকলেট বিক্রি করে ধনী হয়েছে পাশ্চাত্য কোম্পানীগুলো। অথচ প্রচন্ড অনাহারে ভুগছে কোকা উৎপাদনকারি আফ্রিকার দেশগুলো। একই ভাবে তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারি দেশগুলোর চেয়ে বেশী অর্থ কামিয়েছে পাশ্চাত্যের তেল ও গ্রাস কোম্পানীগুলি। মূল্য সংযোজনের ফায়দা তো এটাই। তাই যারা ব্যবসা বুঝে তারা একত্রে হলে চেষ্টা করে কারখানা খোলার। কারণ, কারখানা হল মূল্য সংযোজনের অংগন।

তবে জাতি সবচেয়ে বেশী লাভবান হয় যখন মূল্য সংযোজন হয় মানুষের উপর। কারণ, মানুষই হলো আল্লাহতায়ালার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। তেলের বা সোনার মূল্য হাজারো গুণ বাড়লেও সেটি কি গুণবান ও সৃষ্টিশীল মানুষের সমান হতে পারে? মানুষের উপর মূল্য সংযোজন হলে সে মানুষটি মহৎ গুণে বেড়ে উঠে। সে মানুষটির সামর্থ্য বাড়ে প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদের উপর মূল্য সংযোজনে। এজন্যই শিল্পোন্নত দেশগুলো শিক্ষাখাতে তথা মানব সম্পদের উন্নয়নে এত ব্যয় করে। মানুষের মূল্য বৃদ্ধি বা গুণ বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা বা উদ্যোগ নেওয়া এজন্যই ইসলামে এত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামে মসজিদ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার সওয়াব এজন্যই এতো বেশী। কারণ এ প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজই হল মানুষের উপর মূল্য সংযোজন করা তথা তাদেরকে মহত্তর গুণ নিয়ে বেড়ে উঠায় সহায়তা দেওয়া। তাদের কারণে সমাজ ও রাষ্ট্র তখন বহুগুণে সমৃদ্ধ হয়। এমন রাষ্ট্রের বুকেই নির্মিত হয় উচ্চতর সভ্যতা। মানুষ গড়ার এ মহান কাজটিই এ জন্যই তো মুসলিম রাজনীতির মূল এজেন্ডা। তখন রাজনীতির মূল লক্ষ্য হয়, মানুষকে জান্নাতের যোগ্য করে গড়ে তোলা। এমন মানুষের গুণেই আল্লাহর সাহায্য ও শান্তি নেমে আসে ধরাপৃষ্টে। নবীজী (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামের আমলে তো সেটিই হযেছিল। ইসলামে এমন রাজনীতি তাই গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। কিন্তু বাংলাদেশে সে কাজটিই হয়নি। এজন্যই দেশটি বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পেয়েছে তলাহীন ভিক্ষার ঝুলি ও সর্বাধিক দূর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্র রূপে।

যে কোন দেশে রাজনীতির মূল ইস্যুটি নির্ধারিত হয় সে দেশের জনগণের ধর্ম, জীবনদর্শন, মূল্যবোধ, সংস্কৃতি এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রয়োজন থেকে। তাই পূঁজিবাদী ও সমাজবাদী দেশের রাজনৈতিক এজেন্ডা এক নয়। তেমনি এক নয় মুসলিম ও অমুসলিম দেশের রাজনৈতিক এজেন্ডা। ব্যক্তির অন্তরে বা চেতনায় লালিত আদর্শ বা বিশ্বাস শুধু তার ধর্ম-কর্ম, ইবাদত-বন্দেগী, খাদ্য-পানীয়ের ব্যাপারেই নিয়ম বেঁধে দেয় না, নির্ধারিত করে দেয় তার জীবনের মূল কাজটিও। তা থেকেই নির্ধারিত হয় মুসলমানের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক এজেন্ডা। তাই আরবের কাফেরদের এজেন্ডা ও মুসলমানদের এজেন্ডা এক ছিল না। মুসলমান যখন বিজয়ী হয় তখন সমাজ থেকে শুধু মূর্তিগুলোই অপসারিত হয়নি। অপসারিত হয়েছিল তাদের প্রচলিত সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক রীতিনীতি ও মূল্যবোধ। অপসারিত হয়েছিল ইসলাম বিরোধী নেতৃত্ব। কারণ, একটি মুসলিম সমাজ কখনই অমুসলিম বা সেকুলার মূল্যবোধ ও নেতৃত্বের অধীনে গড়ে উঠতে পারে না। এবং এগুতে পারে না কাঙ্খিত লক্ষ্যে। যেমন প্লেনের ইঞ্জিন নিয়ে কোন রেল গাড়ী সামনে এগুতে পারে না। রাজনীতি যেমন জাতির ইঞ্জিন, তেমনি সে ইঞ্জিনের জ্বালানী শক্তি হল উচ্চতরদর্শন বা ফিলোসফি। মুসলমানদের ক্ষেত্রে সেটি হল ইসলাম তথা কোরআনী দর্শন।

যে রাজনীতিতে উচ্চতর দর্শন নেই, সে রাজনীতিতে গতি সৃষ্টি হয় না উচ্চতর লক্ষ্যে চলার। তখন নেমে আসে জগদ্দল পাথরের ন্যায় স্থবিরতা। স্রোতহীন জলাশয়ে যেমন মশামাছি বাড়ে, তেমনি দর্শন-শূণ্য স্থবির রাজনীতিতে বৃদ্ধি ঘটে দর্শনশুন্য দুর্বৃ্ত্ত মানব-কীটদের। সেটিরই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো বাংলাদেশের রাজনীতি। নবীজী(সাঃ)র আমলে আরবের স্থবির ও পাপাচার-পূর্ণ জীবনে মানবিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে যে প্রচন্ড বিপ্লব ও গতি সৃষ্টি হয়েছিল তার কারণ, রাজনীতির ইঞ্জিন তখন আল্লাহপ্রদত্ত দর্শন পেয়েছিল। চালকের পদে বসেছিলেন মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মানবগণ। অথচ সে প্রচন্ড শক্তি থেকে দারুন ভাবে বঞ্চিত হচ্ছে বাংলাদেশের আজকের রাজনীতি। কারণ, বাংলাদেশের ড্রাইভিং সিটে বসে চোর-ডাকাত ও ভোট-ডাকাতগণ। দেশটির রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতির অঙ্গনে ইসলাম ও আল্লাহর নাম নেওয়া তাদের কাছে সাম্প্রদায়ীকতা। তারা দাবী তুলছে ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধ করার। স্বৈরাচারি আওয়ামী-বাকশালী আমলে নিষিদ্ধ হয়েছিল ইসলামের নামে রাজনীতির সে মৌলিক নাগরিক অধিকার। সরকারি মহলে নিষিদ্ধ হয়েছিল বিসমিল্লাহ। অপসারিত হয়েছিল সরকারি প্রতিষ্ঠানের মনোগ্রোম থেকে কোরআন ও আল্লাহর নাম। এভাবে দর্শনশূণ্য হয়েছিল মুজিবামলের রাজনীতি। এবং প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল মুজিব-বন্দনা। ফল দাড়িয়েছিল, সবচেযে বড় ও দ্রুত ধ্বংস নেমেছিল নীতি-নৈতিকতা, আইন-শৃঙ্খলা ও অর্থনীতিতে। সৃষ্টি হয়েছিল ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। প্রাণ হারিয়েছিল লক্ষ লক্ষ মানুষই শুধু নয়, দেশের স্বাধীনতা, মানবতা ও ণ্যূনতম মানবিক অধিকার। তখন ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের পায়ের তলায় পিষ্ট হযেছিল দেশের সার্বভৌমত্ব। গণতন্ত্র ও মানবতার সে কবরের উপর প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল মুজিবের একদলীয় বাকশালী স্বৈরাচার।

দাবী উঠেছে, ইসলামের নামে রাজনীতি নিষিদ্ধ করার। কথা হল, এ দাবী উঠানোর হেতু কি? কারণ একটিই, আর তা হল বাংলাদেশকে নীচে নামানোর কাজকে আবার তীব্রতর করা। ইসলামী দর্শন, আইন ও মূল্যবোধের পরাজয়ের মধ্যেই তাদের আনন্দ। রাজনীতির ইঞ্জিনকে পুণরায় দর্শন-শূণ্য করাই তাদের মূল লক্ষ্য, তাদের প্রভু ভারতও সেটিই চায়। সত্তরের দশকেও তারা সেটিই করেছিল। দাবীটিও এসেছে সেই একই আওয়ামী বাকশালীদের পক্ষ থেকে। এর কারণ, তাদের প্রচন্ড ইসলামি ভীতি। তাদের ভয়ের কারণ, বাংলাদেশের ৯০%ভাগ মানুষ মুসলমান। দেশটিতে প্রবল ভাবে বাড়ছে ইসলামী জ্ঞানচর্চা এবং সে সাথে প্রবলতর হচ্ছে ইসলামী চেতনা। ফলে বাড়ছে ইসলামপন্থিদের রাজনৈতিক শক্তি। আর ইসলামের বিজয় মানেই শরিয়তী আইনের প্রতিষ্ঠা। ইসলামের বিজয় মানে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতিতে ইসলামী বিধানের পূর্ণ-প্রয়োগ এবং সেকুলার মূল্যবোধ ও রীতি-নীতির বিলুপ্তি। তখন রাজনৈতিক পরাজয় ও বিলুপ্তি ঘটবে দেশের ইসলাম বিরোধী শক্তির রাজনীতির। আর এ কারণেই বাংলাদেশের আওয়ামী-বাকশালী সেকুলার মহলটির মনে ঢুকেছে প্রবল ইসলাম ভীতি। নিজেদের জন্য তেমন একটি পরাজয় মেনে নিতে রাজী নয়। তাই সে চুড়ান্ত লড়াইটি শুরু হওয়ার আগেই ইসলামের নামে দেশের ইসলামপন্থি জনগণকে সংগঠিত হওয়াটিকেই নিষিদ্ধ করতে চায়। আর সংগঠিত না হতে পারলে ইসলামপন্থিগণ তখন সে লড়াই বা করবে কি করে? একাকী কারো পক্ষেই বড় কিছু করা সম্ভব নয়। রাজনীতির ক্ষেত্রে তো নয়ই। আওয়ামী-বাকশালী সেকুলারদের পরাজয় করাটি তখন তাদের সাধ্য এবং সে সাথে স্বপ্নেরও বাইরে থেকে যাবে। আর এভাবে সহজেই নিশ্চিত হবে দেশের রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানে তাদের বর্তমানের বিজয়ী অবস্থাকে ধরে রাখা। ইসলামপন্থিগণ যাতে শক্তি সঞ্চয় করতে পারে সে জন্য এখন থেকেই তাদের বিরুদ্ধে নির্মূলের হুমকী দেয়। এমন একটি রাজনৈতিক লক্ষ্য কাফের বা ইসলামের চিহ্নিত দূষমনদের জন্য অস্বাভাবিক নয়, নতুনও নয়। কিন্তু প্রশ্ন হল, যে দেশের শতকরা ৯০ ভাগ মুসলমান সে দেশে এমন রাজনীতি বাজার পায় কি করে? বাংলাদেশের রাজনীতির এটি কি কম ভ্রষ্টতা? ২৫/১০/০৮

 




বাংলাদেশে যুদ্ধাবস্থাঃ জনগণ কি আত্মসমর্পণ করবে?

শুরু হয়েছে যুদ্ধ

বাংলাদেশে এখন লাগাতর যুদ্ধ। দিন দিন এ যুদ্ধ আরো তীব্রতর হচ্ছে। জনগণের উপর চাপিয়ে দেয়া এ যুদ্ধটির মূল লক্ষ্য,বিক্ষুব্ধ জনগণের হাত থেকে অবৈধ সরকারের গদী বাঁচানো। গদীতে আসীন থাকার ফায়দাগুলি তো বিশাল।এতে রাষ্ট্রীয় ভান্ডারের উপর অবাধ লুন্ঠনেরমেলে রাষ্ট্রের পুলিশ,প্রশাসন,র‌্যাব,বিজিবী,সেনাবাহিনী ও আদালতের বিচারকদের চাকর-বাকরের ন্যায় ইচ্ছামত ব্যবহা লাইসেন্স মেলে। তখন অর্থ লুন্ঠনে ঘরে ঘরে হানা দেয়ার প্রয়োজন পড়ে না। লাইসেন্স মেলে রাজনৈতীক বিরোধীদের হত্যা ও তাদের ঘরবাড়ি,ব্যবসা-বাণিজ্য ও ইজ্জত-আবরুর উপর খেয়ালখুশি মত হামলার।সে সাথে অধীকার রের। এমন অবাধ দখলদারি কি কোন দুর্বৃত্ত সরকার সহজে ত্যাগ করে? তাছাড়া বাংলাদেশের মত দেশে গায়ের জোরে ক্ষমতায় থাকতে কি সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোট,সংবিধান বা ন্যায়নীতির সমর্থণ লাগে? তাঁবেদার পুলিশ,বিজেবী,র‌্যাব,সেনাবাহিনী, মিডিয়া ও প্রশাসনই তো সে অবৈধ দখলদারিকে দীর্ঘায়ু দেয়ার জন্য যথেষ্ট।স্বৈরাচারি এরশাদ তো জনসমর্থণ ছাড়াই ১১ বছর ক্ষমতায় থেকে গেছে। শেখ হাসিনার স্বৈরাচারি সরকার তাই গদী ছাড়তে রাজী নয়।

সিরিয়ার স্বৈরাচারি শাসক বাশার আল আসাদ এবং মিশরের স্বৈরাচারি শাসক জেনারেল সিসি যেমন নিজেদের স্বৈরাচারি শাসন বাঁচাতে নিরস্ত্র জনগণের বিরুদ্ধে পুলিশ,সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনী নামিয়েছে এবং হাজার হাজার নিরস্ত্র ও নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করছে, বাংলাদেশের স্বৈরাচারি সরকারও তেমনি জনগণের বিরুদ্ধে প্রকান্ড যুদ্ধ শুরু করেছে। পুলিশ, বিজেবী, র‌্যাব ও র‌্যাবের পোষাকে সেনাসদস্যদের বন্দুকের নল এখন দেশবাসীর দিকে। তাদের গুলিতে নিরস্ত্র মানুষেরা প্রতিদিন প্রাণ হারাচ্ছে। যুদ্ধ কোন দেশেই সুবাতাস বয়ে আনে না। আনে বোমা,আগুন,মৃত্যু ও ধ্বংস। চলমান যুদ্ধাবস্থায় বাংলাদেশেও ভিন্নতর কিছু হচ্ছে না। আগুণ জ্বলছে প্রতিদিন। তাতে বাস ও গাড়ি জ্বলছে,মানুষও জ্বলছে। দিন দিন সে আগুণ আরো তীব্রতর হচ্ছে। তবে দেশের শত্রু নির্মূলে ও সমাজ বিপ্লবে যুদ্ধের বিকল্পও নাই। মহান নবীজী (সাঃ)যুদ্ধ পরিহার করতে পারেননি। বরং ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর লাগাতর যুদ্ধে লিপ্ত থাকতে হয়েছে। প্রায় দুই লাখ মানুষের মৃত্যুর পরও সিরিয়ার জনগণ তাই স্বৈরাচারি বাশার আল আসাদের সামনে আত্মসমর্পণ করছে না। বাংলাদেশের নিরস্ত্র জনগণের বিরুদ্ধে হাসিনা সরকারের রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধ এই প্রথম নয়। ২০১৩ সালের ৫ই মে’র মধ্যরাতে হিফাজতে ইসলামের সমাবেশ পন্ড করতে সরকার ১০ হাজারের বেশী সেনা-সদস্য,বিজিবী সদস্য,র‌্যাব ক্যাডার ও পুলিশ দিয়ে শাপলা চত্ত্বরে যুদ্ধ শুরু করেছিল এবং হতাহত করেছিল বহু হাজার নিরস্ত্র মুসল্লিকে।

 

বাসপ্রেম না গদিপ্রেম?

সরকার এখন বাস-প্রেমিক,গাছ-প্রেমিক,মানব-প্রেমিক ও অর্থনীতির প্রেমিক সেজেছে।অথচ আওয়ামী লীগ যখন বিরোধী দলে ছিল তখন তাদের রাজনীতির হাতিয়ার ছিল বাঁশ,বৈঠা ও গান পাউডার। হাসিনা নির্দেশ দিয়েছিল এক লাশের বদলে দশ লাশ ফেলার। তখন দলটি শতাধিক দিন হরতাল ডেকেছে। বাসে ও গাড়িতে আগুন দিয়েছে। হরতালের দিনে রিকশায় চড়াতে বাকশালী ক্যাডারগণ যাত্রীকে রাস্তায় উলঙ্গ করে কাপড় কেড়ে নিয়েছে। এবং গদীতে বসার পর প্রচুর লাশ ফেলেছে শাপলা চত্ত্বরে,তেমনি পিলখানায়। অথচ এখন তারা ভোল পাল্টিয়েছে। দেশ ও দেশের অর্থনীতি অচল হওয়ার জন্য হাসিনা সরকার বিরোধী দলের ডাকা অবরোধকে দায়ী করছে। কিন্তু সরকার ভূলে যায়,২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে দেশে অবরোধের রাজনীতি ছিল না। নির্বাচনের নামে আওয়ামী বাকশালীগণ যে ভোট ডাকাতি করেছে সেটি না হলে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে কোথাও কি কোন অবরোধই হতো? অবরোধ তো এসেছে রাজপথে শান্তিপূর্ণ মিটিং-মিছিলের রাজনীতি অসম্ভব করার কারণে।

ভোট ডাকাতির মাধ্যমে গদীদখল কোন সভ্যদেশে হলে সরকারের বিরুদ্ধে নির্বাচনের দিন থেকেই যুদ্ধ শুরু হতো। কোন দেশের আত্মসম্মানি জনগণই ভোট-ডাকাতদের এক বছর গদীতেও থাকার অবকাশ দিত না। কারণ, ডাকাতদের দ্রুত ধরা ও শাস্তি দেয়াই তো সভ্যসমাজের রীতি। ডাকাতগণ দর্প ও গর্ব দেখায় একমাত্র ডাকাত পাড়াতেই। মন্ত্রী বা এমপি রূপে মেনে নেয়া দূরে থাক,যে কোন সভ্যদেশে এরূপ ভোট-ডাকাতদের দীর্ঘ মেয়াদের জন্য জেল হতো। তাদের রাজনীতি নিষিদ্ধ হতো সারা জীবনের জন্য। ইসলাম তো চোরডাকাতদের আদালতে সাক্ষি দেয়ার অধিকারও কেড়ে নেয়। তবে বাংলাদেশের মানুষ যে চোর-ডাকাতদের শাস্তি দিতে জানে না তা নয়। দিবারাত্র পুলিশ প্রহরায় তারা যেরূপ দুর্গে আশ্রয় নিয়েছে তা থেকে একটু বেরিয়ে রাস্তায় নামলেই টের পেতো জনগণ তাদের ন্যায় ভোট ডাকাতদের কীরূপ ভাল বাসে!

দেরীতে হলেও বাংলাদেশের জনগণ আজ প্রচন্ড ক্ষোভ নিয়ে রাস্তায় নেমেছে। অবিরাম প্রতিরোধ শুরু হয়েছে সমগ্র দেশ জুড়ে। আর তাতে প্রচন্ড ভয় শুরু হয়েছে বাকশালী ডাকাতদের মনে। তারা সঙ্গিরূপে পেয়েছে এমন একপাল বিবেকশূণ্য মানুষদের যাদের নাই চুরিডাকাতি,দমননীতি, হত্যা ও নির্যাতনকে নিন্দা করার সামান্যতম সামর্থ। ডাকাতপাড়ায় নৃশংস ডাকাতিও বিশাল কর্ম রূপে প্রশংসিত হয়,এবং বীর রূপে নন্দিত হয় ডাকাত সর্দার। তেমনি এদের কাছেও ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির ভোট-ডাকাতি,শাপলা চত্ত্বরে মুসল্লি-হত্যা ও রাজপথে বিরোধী দলের মিছিল পন্ড করাও অতি মহান কর্ম মনে হয়। বাংলাদেশে এমন বিবেকহীন মীর জাফরদের সংখ্যা বিশাল। ফলে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের ১৯০ বছর মেয়াদী ডাকাতিতে কলাবেরটর পেতে কোনরূপ অসুবিধা হয়নি। ব্রিটিশদের জন্য এরা শুধু ভারতে নয়,বিদেশের মাটিতেও বিশ্বযুদ্ধ লড়ে দিয়েছে। এরূপ বিবেকহীন মানুষগণই আজ আদালতের বিচারক পদে আসীন। তাদের প্রবেশ ঘটেছে দেশের  সেনাবাহিনী,পুলিশ,প্রশাসন,কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ও মিডিয়াতে।

নিজেদের ভয়ানক অপরাধগুলি ঢাকতে স্বৈরাচারি আওয়ামী বাকশলীদের মিথ্যাচারের আয়োজনটি বিশাল। পত্র-পত্রিকা ও মিডিয়ার নামে গড়ে তুলেছে বিশাল প্রপাগান্ডা নেটওয়ার্ক। দেশের মানুষ দেশে বিদেশে গায়ে গতরে খেটে অর্থ উপার্জন করছে, আর সরকার সেটিকে নিজেদের অর্জিত অর্থনৈতিক উন্নয়ন বলে বাহাদুরি রূপে জাহির করছে। সরকার ২০১৪ সালের ভোটডাকাতির নির্বাচনকে বলছে বৈধ নির্বাচন। জনগণের উপর চাপিয়ে দেয়া রক্তক্ষয়ী যুদ্ধকে বলছে আইনের শাসন। অপর দিকে নিরস্ত্র মানুষের প্রতিবাদকে বলছে সন্ত্রাস। নির্বাচনের দাবী নিয়ে শান্তিপূর্ণ মিছিল-মিটিং করতে দিতেও সরকার রাজি নয়। বাকস্বাধীনতা রুখতে বিরোধী পত্র-পত্রিকা ও টিভি নেটওয়ার্কে ইতিমধ্যেই তালা ঝুলিয়েছে। এটিকে আবার বলছে গণতন্ত্র। নিত্যনতুন আইন গড়ছে স্রেফ গদী বাঁচানোর নৃশংসতাকে আইনগত বৈধতা দিতে।নিজের স্বৈরাচার বাঁচাতে দোহাই দিচ্ছে সংবিধানের। অথচ বার বার সংবিধান বদলিয়েছে স্রেফ বাকশালী স্বৈরাচারকে জায়েজ করতে।

 

শান্তি আসবে কি আত্মসমর্পণে?

গ্রামে যখন ডাকাত পড়ে বা হিংস্র পশুর প্রবেশ ঘটে,তখন জানমালের নিরাপত্তা থাকে না। সুস্থ্য ও সভ্য মানুষ তখন ঘরে দরজা লাগিয়ে ঘুমায় না। তাতে কি প্রাণ ও ইজ্জত বাঁচে? সভ্য সমাজে তখন ডাকাত বা পশু হত্যার লড়াই শুরু হয়। কিন্তু হিংস্র পশু বা নৃশংস ডাকাতের চেয়েও ভয়ানক কাজটি করে স্বৈরাচারি শাসকেরা।ডাকাতেরা গ্রামের সকল গৃহে হানা দেয় না। ডাকাতদের হাতে কিছু লোকের ক্ষতি হলেও সমগ্র দেশ ধ্বংস হয় না। দেশে দুঃর্ভিক্ষও আসে না। হিংস্র পশুরা পেট পূর্ণ থাকলে শিকার ধরে না। কিন্তু রাজনৈতীক হিংস্র জীবদের পেট কখনোই পূর্ণ হওয়ার নয়। তাদের নখর থেকে গরীবের নিরীহ সন্তান যেমন বাঁচে না,তেমনি গণতন্ত্রও বাঁচে না। মৌলিক মানবাধিকার তখন কবরে স্থান পায়। দেশকে তারা বিদেশের গোলামে পরিণত করে। সেরূপ অবস্থা যেমন মুজিবের আমলে সৃষ্টি হয়েছিল। এখন হাসিনার আমেলেও সৃষ্টি হয়েছে। এমন হানাদারদের কাছে আত্মসমর্পণে কি শান্তি আসে?

এজন্যই কোন সভ্যদেশ স্বৈরাচারি শাসকের দ্বারা অধিকৃত হলে বা বিদেশী শক্তির হামলা হলে সে দেশের জনগণ তাই যুদ্ধ শুরু করে। যুগে যুগে তাই স্বৈরাচারি রাজা-বাদশাহদের গলাকাটা পড়েছে;এভাবে নির্মূল হয়েছে স্বৈরাচার। এমন দস্যুদের নির্মূলে ইসলামে জিহাদ তাই ফরজ। ডাকাত দল যেমন ডাকাতিলব্ধ অর্থ নিয়ে বাঁচে,স্বৈরাচারি জালেম শাসকও তেমনি জনগণের বিরুদ্ধে লাগাতর যুদ্ধ ও লুন্ঠন নিয়ে বাঁচে।বিরামহীন ডাকাতির স্বার্থেই বাংলাদেশের জনগণের উপর ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ দস্যুগণ ১৯০ বছর মেয়াদী এক লাগাতর যুদ্ধ চাপিয়ে রেখেছিল।সে যুদ্ধে মুসলমানদের শক্তিহীন,অস্ত্রহীন ও যুদ্ধহীন রাখাই ছিল ব্রিটিশের রাষ্ট্রীয় নীতি। সে দখলদারির বিরুদ্ধে লড়াইকে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ ডাকাতেরাও সন্ত্রাস বলতো। ডাকাতপাড়ায় যেমন বিচার-আচার থাকে না,তেমনি সাম্রাজ্যবাদী ও স্বৈরাচারি শাসনে নিরপেক্ষ আইন-আাদালত ও ন্যায়বিচার বলে কিছু থাকে না। বিচারকগণও তখন সরকারের আজ্ঞাবহ সেবাদাস ও জল্লাদে পরিণত হয়। বিচারের নামে এসব বিচারকগণ স্বৈরাচার-বিরোধী যে কোন লড়াইকেই সন্ত্রাস বলে। স্বৈরাচার বাঁচাতে এরূপ বিচারকগণ প্রতিবাদি নিরস্ত্র মানুষদের প্রাণদন্ড দেয়াকে ন্যায়বিচার মনে করে। মিশরে এরূপ বিচারকগণ মাত্র কয়েক ঘন্টার এজলাসে স্বৈরাচারি বিরোধী শত শত নিরস্ত্র মানুষকে ফাঁসির হুকুম শুনাচ্ছে। এমন কি স্কুল ছাত্রছাত্রীদের দিচ্ছে দীর্ঘমেয়াদী জেল।

বঙ্গভূমি থেকে ব্রিটিশদের ডাকাতি ১৯৪৭ সালে ১৪ই আগষ্ট শেষ হয়েছে। কিন্তু এখন চলছে স্বৈরাচারি আওয়ামী-বাকশালী ডাকাতি। ডাকাতগণ ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ হোক আর বাঙালী হোক –ভাষার ভিন্নতায় তাদের চরিত্র পাল্টায় না। সভ্য জনগণ কি এরূপ নৃশংস ডাকাতদের সামনে আত্মসমর্পণ করে? আত্মসমর্পণে কি ইজ্জত-আবরু ও প্রাণ বাঁচে? ব্রিটিশ ডাকাতদের সামনে ১৯০ বছরের আত্মসমর্পণে বাঙালী মুসলমানদের জানমাল ও ইজ্জত-আবরু কোনটাই বাঁচেনি।জগৎখ্যাত মসলিন শিল্পিরা হারিয়েছে তাদের আঙ্গুল।ব্রিটিশ দস্যুদের নির্মম ডাকাতিতে বাংলার মাটিতে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ নেমে এসেছিল দুইবার। প্রথমবার এসেছিল বাংলা ১১৭৬ সালে (ইংরাজি ১৭৭০সালে) -যা ইতিহাসে ছিয়াত্তরের মনন্তর রূপে পরিচিত। বাংলার প্রায় এক তৃতীয়াংশ মানুষ সে দুর্ভিক্ষে প্রাণ হারিয়েছিল। আর দ্বিতীয় বার এসেছিল ১৯৪৩ সালে।সে দুর্ভিক্ষটি এসেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের বিজয়ী করার কাজে বিপুল অর্থ ও রশদ জোগানোর পরিণতিতে। বাংলার বহুলক্ষ মানুষ সে দুর্ভিক্ষে পথে-ঘাটে কুকুর বিড়ালের ন্যায় প্রাণ হারিয়েছিল। জালেমের সামনে আত্মসমর্পণ এভাবেই অপমানকর মৃত্যু ডেকে আনে। রোমান ও পারসিক –এ দুই বিশাল সাম্রাজ্যকে পরাজিত করতে,বিশাল ইসলামি রাষ্ট্রের নির্মাণে এবং বিশ্বশক্তি রূপে উত্থানে মুসলমানদের বহুযুদ্ধ লড়তে হয়েছে।কিন্তু বাংলার বুকে ব্রিটিশসৃষ্ট দুটি দুর্ভিক্ষে যত মানুষের প্রাণনাশ হয়েছে সে আমলের সকল যুদ্ধে তার সিকি ভাগ প্রানহানিও হয়নি। ১৭৫৭ সালে পলাশির যুদ্ধে ব্রিটিশের কাছে মুসলমানদের রণেভঙ্গ ও পরাজয় এবং পরাজয় শেষে ১৯০ বছর যাবত আত্মসমর্পেণের এই হলো করুণ শাস্তি। অথচ ইসলামের শরয়ী বিধান হলো, কোন মুসলিম ভূমিতে ইসলামের শত্রুপক্ষের হামলা হলে বা সে ভূমির উপর তাদের অধিকৃতি প্রতিষ্ঠা পেলে সে শত্রুশক্তির বিরুদ্ধে সশস্ত্র জিহাদ তখন আর ফরজে কেফায়া থাকে না,ফরজ নামায-রোযার ন্যায় ফরজে আইনে পরিণত হয়। অথচ বাংলার মাটিতে সে ফরজ ১৭৫৭ সালে পালিত হয়নি। শুধু তাই নয়,সে ফরজ তিতুমীর ও ফকির বিদ্রোহের ন্যায় কিছু বিরল ব্যতিক্রম ছাড়া ব্রিটিশ শাসনের ১৯০ বছর যাবত পালিত হয়নি। অথচ ফরজ পালিত না হলে কি পাপমোচন বা দোয়া কবুল হয়? তখন তো আযাব নেমে আসে।

 

নয়া বাকশালী নৃশংসতা

ব্রিটিশের কাছে আত্মসমর্পণ ও গোলামী ১৯৪৭য়ে শেষ হলেও বাঙালী মুসলমানের জীবনে আত্মসমর্পণ ও গোলামী পুণরায় শুরু হয় ১৯৭১য়ে। সেটি যেমন ভারতীয় দখলদারদের কাছে,তেমনি ভারতীয় সেবাদাস স্বৈরাচারি শেখ মুজিব ও তার দলীয় দুর্বৃত্তদের কাছে। মুজিব বিলুপ্ত করে দেয় ভারতের সাথে বাংলাদেশের অর্থনৈতীক,সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক সীমান্ত। সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক সীমান্ত দেয় মুসলমানদের নিজ ধর্ম ও নিজ তাহজিব তমুদ্দন নিয়ে বেড়ে উঠার নিরাপত্তা। অর্থনৈতীক ও রাজনৈতীক স্বাধীনতার চেয়ে সে সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক নিরাপত্তার গুরুত্বটি একজন ঈমানদারের কাছে অধীক। তেমন এক স্বাধীন ও নিরাপদ ভূগোল সৃষ্টির লক্ষ্যেই ভারতীয় মুসলমানগণ ১৯৪৭ সালে ভারত ভাঙ্গাকে অপরিহার্য মনে করে। কিন্তু মুজিব সে প্রকল্পকেই ব্যর্থ করে দেয়, এবং বিলুপ্ত করে পৃথক সীমান্ত। এভাবে সফল করে ১৯৪৭ সালের ভারতীয় হিন্দুদের প্রকল্প। অপর দিকে ভৌগলিক সীমান্ত একটি দেশের অর্থনৈতীক ভান্ডারের তলার কাজ করে। কিন্তু ভারতের স্বার্থপূরণে শেখ মুজিব দেশের সে তলাকেই ধ্বসিয়ে দেয়। ফলে বাংলাদেশ পরিণত হয় তলাহীন ভিক্ষার পাত্রে। ফলে বাংলাদেশের সম্পদ গিয়ে উঠে ভারতের ভান্ডারে। এমনকি বিদেশীদের দেয়া রিলিফের মালামালও বাংলাদেশে থাকেনি। ভারতীয়দের কাছে মুজিব এত প্রিয়। সে সাথে মুজিবের কাজ হয়,পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত কলকারখানাগুলোকে ত্বরিৎ ধ্বংস করা। মুজিবের সে বিনাশী প্রকল্প থেকে আদমজী জুটমিলের ন্যায় বিশ্বের সর্ববৃহৎ পাটকল ও বহু লাভজনক প্রতিষ্ঠানও বাঁচেনি। পরিণতিতে বাংলাদেশে নেমে আসে চরম অর্থনৈতীক ধ্বস ও ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। বাংলার মানুষ তখন ক্ষুধার তাড়নায় উচ্ছিষ্ঠ খাবার খুঁজতে কুকুর-বিড়ালের সাথে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। তখন কাপড়ের অভাবে নারীরা বাধ্য হয়েছে মাছধরা জাল পড়তে। বাংলার নর-নারীর জীবনে মুজিব এভাবে অসহনীয় অপমান ও দুঃখ ডেকে আনে।ভারতের প্রতিটি সরকার চায়,মুজিবের সে ভারতসেবী নীতিই বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা পাক।

মুজিবামলের ন্যায় বাংলাদেশ আবার একপাল দস্যুদের হাতে অধিকৃত। শেখ মুজিব হলো তাদের অনুকরণীয় আদর্শ। ফলে মুজিবের ন্যায় তারাও চায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা আগ্রাসী ভারতের হাতে তুলে দিতে। বাংলাদেশে বাজার তাই ভারতের বাজার। বাংলাদেশের রাস্তাঘাট হলো ভারতের ট্রানজিট।অথচ বাংলাদেশী ট্রাক ট্রানজিট পায় না নেপাল ও ভূটানে যাওয়ার। বাংলাদেশের পুলিশ ও সেনাবাহিনীর কাঁধে দায়িত্ব পড়েছে ভারতীয় যানবাহন,পণ্য ও নাগরিকদের পূর্ণ নিরাপত্তা দেয়া। বাকশালী মুজিবের ন্যায় মুজিবকণ্যা হাসিনাও কেড়ে নিয়েছে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার। এখন চায়,সমগ্র দেশের উপর লাগাতর ডাকাতিকে আরো দীর্ঘায়ীত করতে। দস্যুবৃত্তির স্বার্থে চায়, রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের উপর পূর্ণ দখলদারি।

 

কবরে গণতন্ত্র

গণতন্ত্রের রীতি হলো,জনগণকে ভোটকেন্দ্রে হাজির করা এবং তাদের রায় নিয়ে সরকার গঠনের ব্যবস্থা করা। জনগণ ভোটকেন্দ্র বর্জন করলে বা তাদের ভোটকেন্দ্রে আসার ব্যবস্থা না করলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায় না। খেলার মাঠে প্রতিদ্বন্দি একটি দল যদি মাঠে না নামে, কোন পক্ষে যদি একটি গোলও হলো না –তবে সে খেলায় হার-জিত নির্ধারিত হয় কীরূপে? স্বভাবতঃই সে খেলা তখন পরিত্যক্ত হয়। এ সহজ বিষয়টি বুঝতে কি বেশী বিদ্যাবুদ্ধি লাগে? অথচ দেশের সংসদীয় নির্বাচন ফুটবল খেলা নয়,সমগ্র দেশবাসীর জন্য এটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু হাসিনা সরকারের কাছে সকল দলের অংশদারিত্বমূলক নির্বাচন গুরুত্ব পায়নি। নির্বাচনের নামে সরকারের আয়োজনটি ছিল ভোট ডাকাতির, নিরপেক্ষ নির্বাচন নয়। পরিকল্পিত ভাবে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে যে বিরোধগুলি নির্বাচন বয়কট করতে বাধ্য হয়েছে। নির্বাচনে অংশ নিলে সে ডাকাতিকেই বরং বৈধতা দেয়া হতো। তাই সরকারের দায়িত্ব হলো,এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা যাতে জনগণ ভোটকেন্দ্রে যায় এবং নিজেদের রায় প্রয়োগ করে। নইলে গণতন্ত্র কবরস্থ হয়।শেখ হাসিনা জেনে বুঝেই নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণকে বাধাগ্রস্ত করেছে।কারণ সে জানতো,ভোটকেন্দ্রে জনগণের উপস্থিতির অর্থ তার নিশ্চিত পরাজয়। তাই বেছে নেয় ভোটারবিহীন নির্বাচন।সে ডাকাতির লক্ষ্যেই নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বদলে নিজ হাতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সকল দায়দায়িত্ব কুক্ষিগত করে। ফলে ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারীরিতে বাংলাদেশে কোন নির্বাচন হয়নি। হয়েছে নিরংকুশ ভোট ডাকাতি। ১৫১টি আসনে কোন ভোট কেন্দ্রই খোলা হয়নি। দেশজুড়ে শতকরা ৫ ভাগও মানুষও ভোট দেয়নি। নির্বাচনের নামে বাংলাদেশের ইতিহাসে এতবড় জঘন্য অপরাধ কি আর কোন কালে ঘটেছে?

চোর-ডাকাতেরা চুরি-ডাকাতির মালকে সব সময়ই নিজের মাল রূপে দাবি করে।তেমনি বাকশালী ভোট ডাকাতেরাও ভোট ডাকাতিতে অর্জিত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে ধরে রাখাকে তারা নিজেদের বৈধ অধিকার রূপে দাবী করছে। তাদের ঘোষণা,যে কোন মূল্যে তারা পুরা মেয়াদ ক্ষমতায় থাকবে। এরপর তারা যে আবার ভোট ডাকাতিতে নামবে তা নিয়েও কি সামান্যতম সন্দেহ আছে? শুধু হাসিনাকে নয়, তার পুত্র জয়কেও তখন ডাকাতির অধিকার দিতে হবে। কারণ ডাকাতির শাস্তি না হলে সে ডাকাতেরা যে বার বার হানা দিবে -সেটিই তো স্বাভাবিক। বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে এ ভোট ডাকাতগণ এখন লাগাতর যুদ্ধ শুরু করেছে। লক্ষ্য,যুদ্ধ করে তাদের ডাকাতিলব্ধ শাসন ক্ষমতাকে ধরে রাখা। তাতে দেশ যদি পুরাপুরি ধ্বংসও হয়ে যায় তাতেও তাদের আপত্তি নাই। কারণ,তাদের কাছে রাষ্ট্র হলো ডাকাতির মাধ্যমে অর্জিত মাল। আর ডাকাতির মালে আগুণ লাগলে তো ডাকাতদের কোন ক্ষতি হয় না। ক্ষতি তো তাদের যারা সে মালের প্রকৃত মালিক। স্বৈরাচারি শাসকেরা এজন্য গদি বাঁচাতে দেশবাসীর মাথার উপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়। গদীর তুলনায় দেশের মূল্য তাদের কাছে অতি নগন্য। তাই রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির ধ্বংস নিয়ে শেখ হাসিনার বাকশালী সরকারের কোন মাথা ব্যাথা নেই। শত শত মানুষের মৃত্যু নিয়েও তার মনে কোন দুঃখবোধ নেই। বরং অতীতে নিছক ক্ষমতা লাভের লোভে দলীয় কর্মীদেরকে এক লাশের বদলে ১০ লাশ ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাই চলমান আন্দোলনে যত জীবননাশই ঘটুক বা যত বাস-ট্রেনই জ্বলুক,তাতে শেখ হাসিনার কোন ভ্রুক্ষেপ নাই। তিনি গদি ছাড়তে রাজি নন।বাংলাদেশের চলমান আন্দোলনে মাত্র একদিনে যত মানুষ প্রাণ দিচ্ছে,১৯৬৯ সালে সমগ্র আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে তার অর্ধেক মানুষেরও প্রাণহানি হয়নি। কিন্তু তাতেই আইয়ুব খান পদত্যাগ করেছেন। কিন্তু হাসিনা ক্ষমতা ছাড়তে রাজি নন। ক্ষমতায় টিকে থাকতে তিনি সিরিয়ার স্বৈরাচারি শাসক বাশার আল আসাদের পথ ধরেছেন।বাশার আল আসাদ সিরিয়ার বুকে নিরস্ত্র জনগণের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে অসম্ভব করে দিয়েছে। এবং দেশকে এক ভয়ানক যুদ্ধের পথে ঠেলে দিয়েছে। তার বোমারু বিমানগুলো নিরস্ত্র মানুষের গৃহের উপর বোমা ফেলছে। এ যুদ্ধে ইতিমধ্যে প্রায় দুই লাখ মানুষ নিহত হয়েছে। আলেপ্প,হোমস,হামাসহ সিরিয়ার বড় বড় শহর ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে। শহর ছাড়িয়ে যুদ্ধ এখন গ্রামে প্রবেশ করেছে। কিন্তু ক্ষমতালোভী বাশার এরপরও ক্ষমতা ছাড়তে রাজি নয়।

 

নিরেট ধর্মীয়

বাংলাদেশের বর্তমান সংকট স্রেফ রাজনৈতীক নয়। তাছাড়া যা কিছু রাজনীতির বিষয়,সেটি মুসলমানের ঈমান-আক্বীদার বিষয়ও। এটি ধর্মীয়। ব্যক্তির দেহ থেকে তার মাথা বা হৎপিন্ডকে আলাদা করা যায় না। আলাদা করলে দেহ বাঁচে না। তাই যা কিছু মাথা বা হৃৎপিন্ডের বিষয় তা ব্যক্তির দেহের বিষয়ও। তেমনি মুসলমানের ধর্মকর্ম থেকে তার রাজনীতিকে পৃথক করা যায়না।তার রাজনীতির মধ্যেই প্রকাশ ঘটে তার নিজস্ব ধর্মীয় বিশ্বাস বা আক্বীদা। তাছাড়া রাজনীতি হলো আল্লাহর জমিনে আল্লাহর নির্দেশিত আইন ও হিদায়েত প্রতিষ্ঠার মূল হাতিয়ার। তাই মুসলমানের জীবন থেকে রাজনীতিকে পৃথক করলে শরিয়ত প্রতিষ্ঠার মিশনটি মাঠে মারা পড়ে। রাজনীতির ময়দানে তখন সে দর্শকে পরিণত হয়। অথচ মহান নবীজী (সাঃ)র নিজে কখনোই রাজনীতির দর্শক ছিলেন না। তাঁর জীবনে ইসলাম কি শুধু নামায-রোযা,হজ-যাকাত ও তাসবিহ-তাহলিলে সীমাবদ্ধ ছিল? তিনি স্বয়ং ছিলেন রাষ্ট্রের প্রধান;এবং যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন নিজে। তাঁর ন্যায় রাজনীতিতে অংশ নিয়েছেন তাঁর মহান সাহাবাগণও। সে সূন্নতকে মানতে হয় তো প্রতি যুগের প্রতিটি ঈমানদারকেই। তবে ঈমানদারের কাছে রাজনীতিতে অংশ নয়ার অর্থ স্রেফ ভোটদান নয়।শুধু মিছিল-মিটিংয়ে যোগ দেয়াও না। মু’মিনের জীবনে রাজনীতি তো পূর্ণাঙ্গ জিহাদ; সেটি ইসলামের শত্রু নির্মূলের এবং শরিয়তের পূর্ণ প্রতিষ্ঠা। মুসলমান তো সে কাজে তার জানমালের বিশাল কোরবানীও পেশ করে। দেশের ভাগ্য পরিবর্তনে রাজনীতি হলো মূল ইঞ্জিন। চাষাবাদ,ব্যবসা-বাণিজ্যে,শিল্প ও শিক্ষা-চিকিৎসায় যতই বিনিয়োগ হোক তাতে দেশের রাজনীতির ইঞ্জিন ডিরেকশন পাল্টায় না। মসজিদের জায়নামাজে বসে দোয়াদরুদ পাঠেও তাতে পরিবর্তন আনা যায় না। খোদ নবীজী (সাঃ) তাই ইঞ্জিনের ড্রাইভিং সিটে বসেছেন। নবীজী (সাঃ)ইন্তেকালের পর সে সিটে বসেছেন হযরত হযরত আবু বকর (রাঃ),হযরত উমর(রাঃ),হযরত ওসমান(রাঃ),হযরত আলী (রাঃ)র ন্যায় মহান ব্যক্তিবর্গ। প্রতিদেশে ও প্রতিমুহুর্তে মুসলমানদের তো সে নীতিই অনুসরণ করতে হবে। ইসলামী রাষ্ট্রের সে ড্রাইভিং সিটে কি তাই ইসলামের শত্রুদের বসানো যায়? তাতে কি ইসলাম বাঁচে? হাসিনা ও তার মন্ত্রীগণ যে শরিয়তের আইন প্রতিষ্ঠার বিরোধী –সেটি কি কোন গোপন বিষয়? শরিয়তের বিরোধীতা করলে সে ব্যক্তি যে মুরতাদ হয়ে যায় তা নিয়ে কি আলেমদের মাঝে কোন দ্বিমত আছে? শুধু যাকাত দেয়ার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করায় সে মুরতাদদের হযরত আবু বকর হত্যা করেছিলেন। অথচ আওয়ামী বাকশালীদের বিদ্রোহ তো সমগ্র শরিয়তের বিরুদ্ধে। এমন মুরতাদদের কি মুসলিম দেশের শাসন ক্ষমতায় বসানো যায়? তাই হাসিনাকে ক্ষমতায় বসানো আর একজন হিন্দুকে বসানোর মধ্যে পার্থক্য কোথায়?

তাই মু’মিনের ঈমানী দায়বদ্ধতা স্রেফ নামাযী,রোযাদার বা হাজি হওয়া নয়। রাজনীতির ময়দানেও তাকে বিশাল দায়ীত্ব পালন করতে হয়। প্রতিটি ঈমানদার তো সে দায়িত্বপালনে মহান আল্লাহতায়ালার খলিফা। বাংলাদেশের মুসলমানদের দ্বারা সে দায়িত্ব কি আদৌ পালিত হয়েছে? পালিত হয়নি বলেই দেশ আজ  আওয়ামী বাকশালীদের ন্যায় ইসলামের স্বঘোষিত শত্রুদের হাতে অধিকৃত। চোর-ডাকাত ধরতে হলেও তাদের পিছনেও বহুদূর দৌড়াতে হয়। আহত বা নিহত হ্ওয়ার ঝুঁকিও নিতে হয়। সমাজ এবং রাষ্ট্র তো এমন সাহসী মানুষদের কারণেই চোর-ডাকাত মুক্ত হয়। আর রাষ্ট্রকে ইসলামের শত্রুদের হাত থেকে মুক্ত করার কাজ তো বিশাল। সে কাজে শতকরা ৭০ ভাগ সাহাবীর প্রাণ গেছে। মু’মিনের জীবনে সে প্রয়াসই তো পবিত্র জিহাদ।মু’মিন মহান আল্লাহতায়ালা থেকে সবচেয়ে বড় পুরস্কারটি পায় তো এ জিহাদে অংশ নেয়ার মধ্য দিয়ে। মহান আল্লাহতায়ালা চান,প্রতিটি ঈমানদার ব্যক্তি সে জিহাদে লাগাতর নিযুক্ত থাকুক। আর মু’মিনের জীবনে সেটি ফরজ করতেই পবিত্র কোরআনে “আ’মিরু বিল মারুফ ওয়া নেহী আনিল মুনকার” অর্থাৎ “ন্যায়ের হুকুম এবং অন্যায়ের নির্মূল”কে মু’মিনের জীবনে মূল মিশন রূপে নির্ধারণ করে দিয়েছেন। মহান আল্লাহর উপর ঈমান আনার সাথে সাথে মু’মিনের জীবনে জিহাদ তাই অনিবার্য কারণেই এসে যায়। ফরয নামায প্রতিদিন ৫ বার।প্রতি বছর এক মাসের জন্য আসে রোযা। সারা জীবনে মাত্র একবার মাত্র আসে হজ। কিন্তু মু’মিন ব্যক্তিকে “ন্যায়ের হুকুম এবং অন্যায়ের নির্মূল”য়ের জিহাদ নিয়ে বাঁচতে হয় প্রতি দিন এবং প্রতিমুহুর্ত। জিহাদে কোন কাজা নাই। যারা সে জিহাদে অর্থ,শ্রম,মেধা ও প্রাণের কোরবানি দেয়,পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা বার বার তাদের গুনাহ মাফ ও নিয়ামত ভরা জান্নাত দিয়ে পুরস্কৃত করার ওয়াদা করেছেন। শহীদদের তিনি বিনা বিচারে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায় নির্মূলের সে ফরজ কাজটি পালিত হয়নি। বরং ঘটেছে উল্টোটি; ন্যায়ের বদলে বিপুল ভাবে বেড়েছে অন্যায়। ফলে দেশ দুর্বৃত্তিতে বিশ্বে ৫ বার প্রথম স্থান অধিকার করেছে। ১৯৭৫ সালে স্বৈরাচারি শেখ মুজিব নির্মূল হয়েছিল। কিন্তু মুজিবের গড়া অপরাধি সংগঠণ বাকশালী আওয়ামী লীগ বেঁচে গিয়েছিল। ফলে দলটি ভয়ানক চরিত্রের দুর্বৃত্ত উৎপাদনে দীর্ঘায়ু পায়।তারই ফল দাড়িয়েছে,বাংলাদেশ আজ স্বৈরাচারি দুর্বৃত্তদের দ্বারা অধিকৃত। তাই শুধু হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরালে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংকট কাটবে না। তাতে শান্তিও আসবে না। সে জন্য যা অপরিহার্য তা হলো,শুধু আওয়ামী বাকশালীদের নয়,সকল ইসলামবিরোধীদের শিকড় নির্মূল।আরবের ভূমি থেকে নবীজী (সাঃ)আবু জেহেল,আবু লাহাব ও ইহুদীদের শিকড় নির্মূল করেছিলেন বলেই সে ভূমিতে ইসলামের বিরুদ্ধে ভিতর থেকে কোন বিপ্লব হয়নি।ফলে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার নির্মাণ সেদিন সম্ভব হয়েছিল।নবীজী (সাঃ)র রাজনীতির এটিই ছিল বিশাল প্রজ্ঞা।সে প্রজ্ঞা নিয়ে বাঁচতে হবে বাংলার মুসলমানদেরও।

 

মুজিবের চেয়েও বর্বর

শাপ-শকুন ও গরু-বাছুর ইতর জীব। কিন্তু সে ইতর জীবদের চেয়ে অধীক ইতর হলো তারা যারা সে ইতর পশুদের দেবতা রূপে পুজা দেয়। কারণ,ভক্ত পুঁজারীগণ যত অর্থশালী বা ডিগ্রিধারিই হোক না কেন,যে দেব-দেবীকে তারা নিজেরা পুঁজা দেয় তার চেয়ে কি শ্রেষ্ঠ হতে পারে? তাই পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা এরূপ কাফেরদের শুধু পশু নয়,পশুদের চেয়েও ইতর বলেছেন। পবিত্র কোরআনের ভাষায়,“উলায়িকা কা’আল আনয়াম বাল হুম আদাল” অর্থঃ তারাই হলো গবাদি পশু,বরং তার চেয়েও নিকৃষ্ট। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে অতি নৃশংস ও স্বৈরাচারি চরিত্র ছিল শেখ মুজিবের। তার হাতে শুধু গণতন্ত্র হত্যা হয়নি।অগণিত মানব হত্যাও হয়েছে। সিরাজ সিকদারকে বন্দি অবস্থায় হত্যা করে সে খবরটির ঘোষণা শেখ মুজিব দম্ভ ভরে সংসদে এসে দেয়। মুজিবের তিন বছরের শাসনে ৩০ হাজারের বেশী বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মীকে রক্ষি বাহিনী দিয়ে হত্যা করা হয়। বহু লক্ষ বিহারীদের ঘরবাড়ি ও ব্যবসা-বাণিজ্য কেড়ে নিয়ে তাদেরকে বস্তিতে বসানো হয়। কোন সভ্য দেশে কি এমন নৃশংসতা ঘটে? মুজিবের জীবনে মূল মিশনটি ছিল ভারতের সেবাদাস রূপে দায়িত্ব পালন করা।সেটির প্রমাণে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাই একমাত্র দলিল নয়।ভারতের সাথে ২৫ সালা দাসচুক্তি,পদ্মার পানি ও বাংলাদেশী ভূমি বেরুবাড়িকে ভারতের হাতে তুলে দেয়ার ন্যায় আরো অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে। ইসলামের বিরুদ্ধেও মুজিবের আক্রোশ কি কম ছিল? ভারত, রাশিয়া ও চীনের দালালদের এবং নাস্তিক কম্যুনিষ্টদের রাজনৈতীক দল গড়ার অধিকার দিলেও সে অধিকার ইসলামপন্থিদের দেয়নি। এমন এক জঘন্য স্বৈরাচারি ও খুনি মুজিবকে যারা বঙ্গব্ন্ধু বা জাতির পিতা বলে তারা কি তার চেয়ে আদৌ ভাল হতে পারে? বরং নৃশংসতায় তারা যে স্বৈরাচারি ও খুনি মুজিবকে ছাড়িয়ে যাবে সেটিই তো অতি স্বাভাবিক। আর সেটিরই শতভাগ প্রমাণ রেখে চলেছে আওয়ামী বাকশালীদের ক্যাডার ও শেখ হাসিনার অবৈধ সরকার।

 

চুক্তিনামাটি মহান আল্লাহতায়ালার সাথে

ঈমানদারীর দায়ভারটি স্রেফ নিজ দেহ,নিজ বসন বা নিজ বাসস্থানের পবিত্রতা নয়। বরং সেটি রাষ্ট্র ও সমাজের।মোমিনের জীবনে এটি এক বিশাল দায়বদ্ধতা।মু’মিনের রাজনীতির মূল মিশন,রাষ্ট্রের বুকে সিরাতুল মুস্তাকীম তথা জান্নাতের পথ গড়ে তোলা। মু’মিন চায়,রাষ্ট্রের বুকে ইসলামের পূর্ণ বিজয়। চায়,শরিয়তের পূর্ণ প্রতিষ্ঠা। আগাছার মাঝে ফসল ফলে না,তেমনি অনৈসলামি শিক্ষা,সংস্কৃতি,রাজনীতি,প্রশাসনিক কাঠামোর মাঝে ইসলামের প্রতিষ্ঠা হয় না। এজন্যই কৃষক যেমন আগাছা নির্মূল করে,মু’মিন ব্যক্তিও তেমনি ইসলামের শত্রু নির্মূল করে।এ কাজে আপোষ চলে না। সে মিশনটি মহান আল্লাহতায়ালারও। সেটি হলো,“লিইয়ুযহিরাহু আলা দ্বীনি কুল্লিহি” অর্থঃ সকল ধর্ম ও মতাদর্শের উপর ইসলামের বিজয়। (সুরা সাফ)। মু’মিনের জীবনে যুদ্ধ তাই অনিবার্য রূপে দেখা দেয়।কারণ সমাজ ও রাষ্ট্র জুড়ে জেঁকে বসা ইসলামের শত্রুপক্ষ কখনোই বিনা রক্তপাতে ক্ষমতা ছাড়ে না। একারণেই ইসলামের বিজয় জানমালের বিপুল কোরবানী চায়।ইসলামের প্রাথমিক যুগে দুর্বৃত্তদের আধিপত্য নির্মূলে শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবীকে প্রাণ দিতে হয়েছিল।তাদের সে রক্তের জোয়ারেই ভেসে গিয়েছিল আরব জালেমদের সাথে রোমান ও পারসিক সাম্রাজ্যের জালেমগণও।ফলে বিশ্বশক্তির মর্যাদা পায় মুসলমানগণ। তেমন এক বিশাল বিনিয়োগের গুরুত্ব কি বাংলাদেশেও কম?

ইসলাম কবুলের সাথে সাথে মানব চরিত্রে সবচেয়ে বিশাল ও বিপ্লবাত্মক ঘটনাটি ঘটে যায়। এটি স্রেফ কালেমা পাঠ নয়। স্রেফ নামায-রোযা আদায়ও নয়। বরং মহান আল্লাহতায়ালার সাথে নিজের প্রিয় জানমালের বিক্রয়ে চুক্তিবদ্ধ হওয়া।পব্ত্রি কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালার সাথে ঈমানদারের জানমাল ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তিটি এসেছে এভাবে,“নিশ্চয়ই আল্লাহ মু’মিনের জান ও মাল ক্রয় করে নিয়েছেন জান্নাতের বিনিময়ে।তারা যুদ্ধ করে আল্লাহর রাস্তায়,তারা হত্যা করে(ইসলামের শত্রুদের)এবং নিজেরাও নিহত হয়।এটি আল্লাহর এমন এক ওয়াদা যার সত্যতা তাওরাত,ইঞ্জিল ও কোরআনে বর্নিত হয়েছে।এবং আল্লাহর চেয়ে ওয়াদা পালনে আর কে নিষ্ঠাবান? অতএব তোমরা উৎসব করো সে বিক্রয়নামাহ নিয়ে যা তোমারা আল্লাহর সাথে সম্পাদন করেছো, এবং সেটিই তো হলো শ্রেষ্ঠ বিজয়।” –(সুরা তাওবাহ আয়াত ১১১)। এ চুক্তির পর মু’মিনের জানমাল আর তার নিজের মালিকানায় থাকে না। তা মহান আল্লাহতায়ালার ক্রয়কৃত সম্পদে পরিণত হয়। মু’মিনে দায়ভার হলো, মহান আল্লাহতায়ালার ক্রয়কৃত সে জানমাল তার রাস্তায় বিলিয়ে দেয়া।

প্রতিদিন ও প্রতিমুহুর্তে মহান আল্লাহতায়ালার সাথে সম্পাদিত চুক্তির স্মরণকে নিয়ে বাঁচাই মুসলমানের জীবনে সবচেয়ে বড় দায়বদ্ধতা। সাহাবায়ে কেরাম এ চুক্তিনামাকে স্রেফ তেলাওয়াতের  মাঝে সীমিত রাখেননি। বরং সেটির প্রয়োগ করেছেনে জীবনের প্রতি পদে। তারা আল্লাহর শত্রুদের যেমন হত্যা করেছেন,তেমনি নিজেরাও নিহত হয়েছেন। সে চুক্তি পালনে শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবী শহীদ হয়ে গেছেন। মহান আল্লাহতায়ালা এজন্যই সাহাবাদের উপর এত খুশি।পবিত্র কোরআনে বলেছেন,“রাযী আল্লাহু আনহুম” অর্থঃ আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট। কিন্তু বাংলাদেশের মুসলমানদের জীবনে সে পবিত্র চুক্তির প্রয়োগ কই? আল্লাহর রাস্তার জিহাদ ছাড়া কি সে চুক্তির প্রয়োগ সম্ভব? কিন্তু বাঙালী মুসলমানের জীবনে সে জিহাদ কই? নিজের জীবনদান ও ইসলামের শত্রুদের নির্মূলের সে আয়োজনটিই বা কই? বরং তাদের সদস্যপদ তো ইসলামের বিপক্ষীয় সেক্যুলার রাজনৈতীক দলগুলোর সাথে। ফলে তাদের রাজনীতিতে জিহাদ এবং সে জিহাদে প্রাণদানের অঙ্গিকার নাই। ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের নির্মূলে আত্মনিয়োগের বদলে তারা নিজেরই বরং অন্যায়ের প্রসারে জড়িত। তারা বায়াত নেয় এমন সব পীরদের হাতে যাদের কাজ হলো জিহাদের ময়দান থেকে জনগণকে দূরে রাখা এবং ইসলামের পরাজয়কে সহনীয় করা। তারা যেমন সেক্যুলার দলগুলিকে অর্থ দেয়,তেমনি সে নির্বাচনে দলগুলোর নেতাদের ভোটও দেয়। প্রয়োজনে তাদের পক্ষে লাঠিও ধরে। এমন মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধিতে কি ইসলামের বিজয় আসে? বাংলাদেশের মাটিতে ইসলামের শত্রুপক্ষ বিজয় পেয়েছে তো এমন মুসলমানদের পক্ষ থেকে অর্থদান,ভোটদান ও শ্রমদানের কারণে। অথচ প্রকৃত ঈমানদার কখনোই নিজ ভূমিতে ইসলামের শত্রুপক্ষের বিজয় মেনে নেয় না।এমন আত্মসমর্পণে কখনোই ঈমান বাঁচে না। বরং তাতে প্রবলতর হয় শয়তানি শক্তির আধিপত্য।কোন সেক্যুলার বা ইসলামে অঙ্গিকারশূণ্য দলের সদস্য হওয়া তাই মুসলমানের কাজ নয়। ইসলামের এটি হারাম। মু’মিন ব্যক্তি তাই কোন সেক্যুলার দলকে বিজয়ী করতে ভোট দেয় না;অর্থ ও রক্তের বিনিয়োগও করে না। বরং তার জীবনে অনিবার্য রূপে যেটি দেখা দেয় সেটি হলো জিহাদ। জিহাদ না থাকার অর্থ ঈমান না থাকা। মহান নবীজী (সাঃ)র গুরুত্বপূর্ণ হাদীসঃ “যে ব্যক্তি কখনো জিহাদ করলো না এবং জিহাদের নিয়েতও করলো না সে ব্যক্তি মুনাফিক।”

জিততে হবে বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদে

জিহাদ শুধু রণাঙ্গণে হয় না। লাগাতর যুদ্ধ হয় বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গণেও। অথচ বাংলাদেশে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় পরাজয়টি ঘটেছে বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানে। এ রণাঙ্গেন ইসলামের পক্ষে লড়াকু সৈনিকের প্রচন্ড অভাব। বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধে পরাজয়ের ফলেই চেতনার ময়দানে প্রবল ভাবে বেঁচে আছে সেক্যুলারিজম। চেতনা রাজ্যে সেক্যুলারিজমের বিজয়ে মানুষ আল্লাহমুখি ও পরকালমুখি না হয়ে দলে দলে শয়তানমুখি ও দুনিয়ামুখি হয়েছে। দুনিয়ামুখি এমন মানুষেরা সামর্থ হারায় মহান আল্লাহতায়ালার সৈনিক হওয়ায়। সে তখন রাজনীতির ময়দানে সেক্যুলার দল খোঁঝে এবং সে দলের পক্ষে অর্থদেয়,ভোট দেয় ও লাঠি ধরে।বাকশালীরা পায়ের তলায় মাটি পায় তো এদের কারণে। বাংলাদেশে এরাই সমাজতন্ত্রি, কম্যুনিস্ট ও নানা জাতের বামপন্থি জীবাণূতে পরিণত হয়েছে। এমন কি ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ দস্যুগণও এদের মাঝ থেকে প্রচুর সেবাদাস পেয়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ৭০ হাজার ভারতীয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বাঁচাতে প্রাণ দিয়েছে। তাদের মধ্যে বহু হাজার ছিল কবি কাজি নজরুল ইসলামের মত মুসলমান। সেক্যুলরিজমের মিশনঃ পরকালের স্মরণকে ভূলিয়ে মানুষকে ইহকাল মুখি করা। ইসলামের বিরুদ্ধে সেক্যুলারিস্টদের বুদ্ধিবৃত্তিক মূল যুদ্ধটি এখানেই। এ বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধে তাদের অস্ত্রের ভান্ডার যেমন বিশাল,তেমনি ইন্সটিটিউশনের সংখ্যাও বিপুল। পতিতাপল্লি, মদ্যশালা, ক্লাব, ক্যাসিনো, নাট্যশালা, সিনেমা হল, সূদী ব্যাংক –এসবই হলো শয়তানের প্রতিষ্ঠান যা মানুষকে আখেরাতের ভয়-ভাবনা ভূলিয়ে দুনিয়ামুখি করে। ইসলাম থেকে দূরে সরানো ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠা রোধই এগুলোর মূল কাজ। মানুষকে জাহান্নামমুখি করতে শয়তান এখন মুসলমানদের পুতুলপুজায় ডাকে না। সে লক্ষ্যে সেক্যুলারিজম হলো তার মুল হাতিয়ার। এমন মতবাদের দীক্ষা নেয়া ইসলামে এজন্যই হারাম। এমন চেতনায় ঈমান বাঁচে না। আল্লাহর ভয় ও উত্তম চরিত্রও গড়ে উঠে না। তাই বাংলাদেশের ন্যায় দেশগুলির জনগণ যতই সেক্যুলারিজমের জোয়ারে ভাসছে ততই দুর্বৃত্তিতে বিশ্বরেকর্ড গড়ছে।এবং ততই বাড়ছে আওয়ামী-বাকশালী শক্তির ভোটব্যাংক।

নবীজী (সাঃ)ও তার অনুসারি সাহবাগণ একমহুর্তের জন্য সেক্যুলার বা দুনিয়ামুখি ছিলেন না। বরং তাঁর জীবনের প্রতি মুহুর্তের বাঁচাটিই ছিল ইসলামের প্রতি প্রবল অঙ্গিকার ও কোরবানী নিয়ে বাঁচা। এবং নবীজী (সাঃ)কে পূর্ন অনুসরণ করেছেন সাহাবায়ে কেরাম। অথচ আজকের মুসলমানদের সমগ্র চেতনা জুড়ে সেক্যুলারিজম। জিহাদের ময়দান এজন্যই সৈনিকশূণ্য। জিহাদের ময়দানে তো তারাই হাজির হয় যারা দ্রুত পরকালের মহাকল্যাণ চায়। মহান আল্লাহতায়ালার সান্নিধ্যে পৌঁছতে চায়। অন্ধকার কবরের আযাব,পুলসিরাতের বিপদ,আলমে বারযাখের অপেক্ষা এবং হাশরের ময়দানের “ইয়া নফসি ইয়া নফসি”র যাতনা এড়িয়ে যারা সরাসরি জান্নাতে হাজির হতে চায় তারাই তো জিহাদের ময়দানে হাজির হয়।বেশীর ভাগ সাহাবা তো এমন ভাবনা নিয়েই সে পথ ধরেছিলেন। কিন্তু দুনিয়ামুখি লোকদের সে আগ্রহ থাকে না। তাই যে দেশে সেক্যুলার চেতনার বিজয়,সেদেশের রাজনীতিতে ইসলামের পরাজয়টি অনিবার্য। নামে মুসলমান হলেও তাদের আগ্রহ থাকে না ইসলামের বিজয়ে। বরং ইসলামের বিজয়কে তারা চরমপন্থি জঙ্গিবাদ মনে করে। এমন দেশে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা এজন্যই অসম্ভব হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে এজন্যই বিজয়ী হয়েছে দুনিয়াদারগণ। অথচ ইসলামের বিজয়ে শ্রমদান,অর্থদান ও প্রাণদান মূলতঃ প্রতিটি ঈমানদারের ঈমানী দায়বদ্ধতা। মু’মিনের জীবনের সে দায়বদ্ধতা গভীরতর হয় পরকালমুখিতার কারণে।

আরবের মানুষেরা মহান আল্লাহতায়ালাকে যে অবিশ্বাস করতো তা নয়। নবীজী (সাঃ)র জন্মের বহু আগে থেকেই তারা আল্লাহতায়ালাকে বিশ্বাস করতো; নিজেদের সন্তানের নাম আব্দুল্লাহ,ওবায়েদুল্লাহ,আব্দুর রহমান রাখতো। কিন্তু তাদের অবিশ্বাস ছিল আখেরাতে। চেতনায় তারা সেক্যুলার বা ইহকালমুখি ছিল। মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে তাদের চেতনার ভূমিতে মূল হামলাটি হয় তাদের সেক্যুলার চেতনার নির্মূলে। সেটি সম্ভব হয় কোরআনী জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করার মধ্য দিয়ে। ফলে আমূল বিপ্লব (প্যারাডাইম শিফ্ট) আসে তাদের সমগ্র চেতনা রাজ্যে জুড়ে। ফলে পাল্টে যায় তাদের জীবনের মূল গতি। পবিত্র কোরআনই হলো বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধে মহান আল্লাহতায়ালা-প্রদত্ত সবচেযে কার্যকর অস্ত্র। আজও  মুসলমানদের সে অস্ত্রের প্রয়োগ ছাড়া ভিন্ন পথ নেই। একমাত্র এ কোরআনী অস্ত্রই সেকালের সেক্যুলারিস্টদের ন্যায় একালের সেক্যুলারিস্টদেরও বুদ্ধিবৃত্তিক ভাবে পরাজিত করতে পারে। তাদেরকে নির্মূল করতে পারে রাজনৈতীক ও সাংস্কৃতিক ভাবেও। নইলে বাংলাদেশের মাটিতে বার বার আন্দোলন হবে। বহু মানুষের রক্তও ঝরবে, অর্থনৈতীক ক্ষয়ক্ষতিও হবে কিন্তু ইসলামের বিজয় আসবে না। এবং এতে ইসলামের শত্রুদের শিকড়শুদ্ধ নির্মূলও সম্ভব হবে না। বরং অতীতের ন্যায় বার বার আন্দোলনের ফসল তুলবে ইসলামের শত্রুপক্ষ।বাংলাদেশের চলমান আন্দোলন থেকে ইসলামের পক্ষে বিজয় আনতে হলে এ বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে।

রণেভঙ্গ দেয়াটি কবিরা গুনাহ

জিহাদের বল বিশাল। জিহাদই পৃথিবী পৃষ্ঠে মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্য নামিয়ে আনে। সে সাহায্যের বলে বিশাল বিশ্বশক্তিকে পরাজয় করাও তখন সহজ হয়ে যায়। কারণ বিজয় তো আসে একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালা থেকেই। পবিত্র কোরআনে সে সত্যটি ব্যক্ত করা হয়েছে এভাবে,“ওয়া মা নাছরু ইল্লা মিন ইন্দিল্লাহ, ইন্নাল্লাহা আজিজুন হাকীম।”–(সুরা আনফাল আয়াত ১০)। অর্থঃ “বিজয় আসে একমাত্র আল্লাহ থেকেই। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী ও মহাজ্ঞানী”। ঈমানদার তাই নির্ভীক হয়। এক কালে সোভিয়েত রাশিয়া একটি বিশ্বশক্তি ছিল। ১৯৭৯ সালে দেশটি আফগানিস্তানের উপর হামলা করে বসে। আফগান জনগণ তখন বিদেশী অস্ত্র বা আর্থিক সাহায্যের অপেক্ষায় বসে থাকেনি। হাতের কাছে যা পেয়েছে তা দিয়েই হানাদার রুশদের বিরুদ্ধে জিহাদ শুরু করে,প্রায় এক যুগ যুদ্ধ করার পর সোভিয়েত রাশিয়াকে তারা পরাজয় করে। আফগানদের বিরুদ্ধে ২০০১ সালে আগ্রাসন হয় আরেক বিশ্বশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের।আফগানগণ তখনও বসে থাকেনি, সাথে সাথে জিহাদ শুরু করেছে। মার্কিন সরকার সে যুদ্ধে জিততে না পেরে ৪০টি দেশ থেকে সৈন্য ডেকে আনে। তাতেও মার্কিনীদের বিজয় আসেনি,পরাজয় কাঁধে নিয়ে তাদেরকে আফগানিস্তান ছাড়তে হয়েছে।

শেখ হাসিনা ও তার দল সোভিয়েত রাশিয়ার চেয়ে শক্তিশালী নয়। শক্তিশালী নয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও। আর বাংলাদেশের মুসলগণও কি আফগানিস্তানের আড়াই  কোটি মুসলমানের চেয়ে দুর্বল? অতএব বাংলাদেশে যে লড়াই শুরু হয়েছে তাতে ঈমানদারদের হারানোর কিছু নেই। বরং সামনের বিজয়ের মহাসম্ভাবনা। হাসিনা যে ইসলামের শত্রুপক্ষ তা নিয়ে কি সামান্যতম সন্দেহ আছে? অতএব ইসলামের পক্ষ নিয়ে জিহাদে চালিয়ে গেলে মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিশ্রুত সাহায্য অনিবার্য। বাংলাদেশের মাটি থেকে ইসলামের শত্রু পক্ষের শিকড় উপড়ানোর এর চেয়ে মোক্ষম সময় অতীতে আর কখনোই আসেনি।বাকশালীদের নেতা শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনা যে ইসলামের জন্য কত ক্ষতিকর সেটি বুঝতে কি বক্তৃতার প্রয়োজন আছে? তারা নিজেরই সেটি প্রমাণ করেছে। যে কোন লড়াইয়ে প্রচুর রক্তক্ষয় আছে,সম্পদ ও ঘরবাড়ির বিপুল বিনাশও আছে। কিন্তু যুদ্ধ ছাড়া নৃশংস জালেম শাসকদের নির্মূলের আর কোন পথও কি খোলা আছে? নবীজী (সাঃ)কি লড়াইয়ের এ পথ ছাড়া অন্য কোন পথে বিজয় আনতে পেরেছেন?

শেখ হাসিনার সরকার যে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা ও ইসলামের প্রচার রুখতে যে বদ্ধপরিকর তা নিয়ে কি বিন্দুমাত্র সন্দেহ আছে? সে লক্ষ্য নিয়েই হাসিনা সরকার বাংলাদেশে কোরআনের তাফসিরের উপর নিষেধাজ্ঞা লাগিয়েছে। প্রখ্যাত তাফসিরকারকদের কারারুদ্ধ করেছে। এবং ঘরে ঘরে গিয়ে জিহাদ বিষয়ক বই বাজেয়াপ্ত করছে।ইসলামের এমন শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদ যদি ফরজ না হয় তবে আর কবে ফরজ হবে? সে জিহাদই আজ শুরু হয়েছে বাংলাদেশে। কোন জিহাদই দুয়েক বছরে শেষ হয়। মু’মিনের জীবনে লড়া্ই তো আমৃত্যু। শরিয়তের পূর্ণ প্রতিষ্ঠা ও ইসলামের শত্রুদের শিকড় নির্মূল ছাড়া তা থামতে পারে না। জিহাদে রণে ভঙ্গ দেয়া বা পলায়ন করা তো কবিরা গুনাহ। বাংলাদেশের যে ১৫ কোটি মুসলমান কি জালেম শাসকের কাছে আত্মসমর্পণ বা পলায়নের পথ বেছে নিবে? হাসিনা সরকারের সাথে যারা আপোষ চায় তাদের লক্ষ্য,ইসলামের শত্রুপক্ষকে নির্মূল হওয়া থেকে বাঁচানো। তারা তাই ইসলামের শত্রুপক্ষ। যে লড়াই শুরু হয়েছে সেটিকে আরো ইসলামি করা ও প্রবলতর করার মধ্যেই কল্যাণ। তাতে আল্লাহতায়ালার প্রতিশ্রুত সাহায্যপ্রাপ্তিও অনিবার্য করবে। আর আল্লাহর সাহায্য জুটলে বিজয় কি কেউ রুখতে পারে? ১৭/০২/১৫

 




বাংলাদেশে মৃত গণতন্ত্র এবং  বিজয় স্বৈরাচারি অসভ্যতার  

যে নিরেট অসভ্যতা স্বৈরাচারে

স্বৈরাচার কোন কালেই দেশ শাসনের সভ্য রীতি ছিল না। ধর্মের নামে কোটি কোটি মানুষের জীবনে মুর্তিপূজা, শাপপূজা, গরুপূজা, লিঙ্গ পূজার ন্যায় সনাতন অপধর্ম ও অসভ্যতা যেমন এখনো বেঁচে আছে, তেমনি রাজনীতির নামে বহুদেশে প্রকট ভাবে বেঁচে আছে স্বৈরাচারের নগ্ন অসভ্যতাও। বাংলাদেশ তেমনি এক স্বৈরাচার কবলিত দেশ। কদর্য অসভ্যতার প্রকাশ শুধু পোষাক-পরিচ্ছদ, শিক্ষা-সংস্কৃতি, ধর্মপালন ও যৌন জীবনে থাকে না, থাকে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও। বস্তুত রাজনীতির অঙ্গণে সে আদিম অসভ্যতাটি হলো স্বৈরাচার। অন্যান্য অসভ্যতার তুলনায় স্বৈরাচারি অসভ্যতার নাশকতাটি ভয়াবহ ও ব্যাপক। পতিতালয়ের অসভ্যতা বাইরের অন্যদের সভ্য রূপে বেড়ে উঠার অধিকারকে কেড়ে নেয় না। কিন্তু স্বৈরাচারের অসভ্যতায় নিজ নিজ ধর্মীয় বিশ্বাস ও রাজনৈতীক মতবাদ নিয়ে বেড়ে উঠার স্বাধীনতাই শুধু বিলুপ্ত হয় না, কেড়ে নেয়া হয় প্রতিপক্ষের প্রাণে বাঁচার স্বাধীনতা টুকুও। তখন রাষ্ট্র ও জনগণের ভাগ্য নির্ধারণের সবটুকু ক্ষেত্র জুড়ে প্রতিষ্ঠা পায় একমাত্র স্বৈরশাসকের দখলদারি। সে অধিকৃত ভূমিতে অন্য কারো স্থান না দেয়াই স্বৈরাচারের রীতি। স্বৈরশাসকের জন্য সে স্থানটি নিরাপদ করতেই অন্যদের নির্মূল করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। স্বৈরাচারি অসভ্যতার ফসল তাই একদলীয় শাসন, গণহত্যা,গণনির্যাতন ও গণনির্মূল।

বাংলাদেশে স্বৈর শাসনের অসভ্য  রূপটি যেমন  একদলীয় বাকশালী শাসনামলে দেখা গেছে, তেমনি দেখা যাচ্ছে শেখ হাসিনার শাসনামলেও। দেখা গেছে এরশাদের আমলেও। তবে অসভ্যতার বড় নাশকতাটি হলো এতে মৃত্যু ঘটে লজ্জা-শরম ও বিবেকবোধের। একারণেই স্বৈর শাসকগণ লজ্জা পায় না ভোটারহীন নির্বাচন ও অর্ধেকের বেশী সিটে ভোটকেন্দ্র না খুলে নিজেকে নির্বাচিত প্রধান মন্ত্রী রূপে ঘোষণা দিতে। সেটি আরো দেখা গেল ২০১৮ সালের ব্যালট ডাকাতির নির্বাচনে। ভদ্র মানুষ কখনোই অন্যের পকেটে হাত দেয় না। কিন্তু স্বৈর শাসক অন্যের জীবনে হাত দেয় এবং তাকে লাশে পরিণত  করে। তাতে সে সামান্যতম শরম বোধও করে না। নিজেকে অপরাধীও মনে করে না। এটিই হলো স্বৈর শাসকদের নিরেট নৈতীক বিবস্ত্রতা। এরূপ অবস্থার কারণেই সিরাজ শিকদারকে বিনা বিচারে হত্যার পর সংসদে দাঁড়িয়ে শেখ মুজিব দরাজ গলায় বলতে পেরেছিলেন,কোথায় আজ সিরাজ শিকদার? কাউকে খুন করার পর জনসম্মুখে এমন চিৎকার করার ক্ষমতা সব খুনির থাকে না, কারণ সে জন্য নৈতীক দিক দিয়ে অনেক নীচে নামতে হয়। কিন্তু স্বৈর শাসকগণ সেটি পারে; এবং সে জন্যই তারা স্বৈর শাসক। কোন নির্বাচিত সরকার কি কখনো ভাবতে পারে, দেশের বিরোধী দলীয় নেত্রীর গৃহের সামনে বালির ট্রাক পাঠিয়ে তাঁকে অবরুদ্ধ করা হবে? সভ্য দেশে কোন কালেই কি সেটি ঘটেছে? কারণ, সেটি করলে নির্বাচনি ভোটে সরকারকে সে অসভ্য কর্মের জন্য শাস্তি পেতে হয়। কিন্তু স্বৈরশাসকের ভোটের ভয় থাকে না। কারণ স্বৈর শাসক ক্ষমতায় আসে তো ভোট ডাকাতির মাধ্যেম, জনগণের ভোটে নয়। ব্যালট পেপার যেহেতু স্বৈর শাসকের ছাপখানায় থাকে, ফলে তাদের আর ভোটের ভয় কিসের? তাই বাংলাদেশের ন্যায় যে সব দেশে প্রচণ্ড স্বৈরাচারি অসভ্যতা সেসব দেশে তেমনটি ঘটা মামূলী ব্যাপার মাত্র।

 

নাশকতা বেড়েছে শতগুণ

বিজ্ঞানের অগ্রগতি ও শক্তিশালী রাষ্টীয় অবকাঠামোর কারণে স্বৈর শাসক অধিকৃত দেশগুলিতে অসভ্যতার নাশকতা বেড়েছে শতগুণ। অত্যাধুনিক অস্ত্র, সশস্ত্র পুলিশ, বিশাল সেনাবাহিনী, গুপ্তচর বাহিনী এবং গৃহপালিত বিচারকদের কারণে বিপুল ভাবে বেড়েছ পরিকল্পিত হত্যা, গণহত্যা, গুম, নির্যাতন ও ফাঁসি। পূর্বকালে ছিল গোত্রপতি বা রাজার স্বৈরাচার। অথচ রাজনৈতিক অঙ্গণে এখন প্রতিষ্ঠা পেয়েছে রাজনৈতীক দলের নেতা-নেত্রীর স্বৈরাচার। স্বৈরাচারে সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার, তাদের ইচছা-অনিচ্ছা এবং কোনটি ন্যায় বা অন্যায় সে বিষয়গুলি আদৌ ধর্তব্যের মধ্যে আনা হয় না। বরং কাজ করে শাসকের নিজের ইচছা বা অনিচ্ছা তা যত অসভ্য ও অন্যায্যই হোক। আরো বিপদ এ কারণে যে, স্বৈর শাসকের সে স্বেচ্ছাচারিতা কেবল রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা নির্ধারণ করে দেশের ধর্ম, শিক্ষা-সংস্কৃতি, আইন-আদালত -এমন কি দেশের ইতিহাসে কি শেখানো হবে সে বিষয়গুলিও। তারই উদাহরণ, স্বৈরাচারি রোমান সম্রাট কন্সটান্টটাইন যখন খৃষ্টান ধর্ম কবুল করে, তখনই সাম্রাজ্যের সকল প্রজার জন্য খৃষ্টান হওয়াকে বাধ্যতা মূলক করা হয়। কোন অখৃষ্টানকে তাঁর সাম্রাজ্যে প্রাণে বাঁচার অধিকার দেয়া হয়নি। তেমনি ফিরাউনও বেঁচে থাকার অধিকার দেয়নি হযরত মূসা (আঃ), হযরত হারুন (আঃ) এবং তাদের স্বগোত্রীয় ইহুদীদের।

শেখ মুজিবও নিজের দুষমন নির্মূলে নিষিদ্ধ করেন দেশের সকল বিরোধী দলগুলিকে। রাজনীতির অঙ্গণে অন্যদের জন্য সামান্যতম স্থানও তিনি ছেড়ে দেননি। অন্যদের জন্য একটি মাত্র পথই তিনি খোলা রাখেন সেটি হলো, তাঁর নিজের দল বাকশালে শরীক হয়ে তাঁর প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের রাজনীতি। সে আনুগত্য না মেনে রাজনীতির ময়দানে যারাই সক্রিয় থাকার চেষ্টা করেছে রক্ষিবাহিনী লেলিয়ে তাদের জীবন কেড়ে নেয়া হয়েছে। প্রাণ কেড়ে নেয়া হয়েছে তিরিশ হাজারের বেশী বিরোধী নেতাকর্মীর। অন্যান্য স্বৈর-শাসকদের ন্যায় শেখ মুজিবের স্বৈরাচারও রাজনীতিতে সীমিত থাকেনি। বাংলাদেশের ইতিহাসে কি লিখতে হবে সে বিষয়গুলিও তিনি নির্ধারণ করে দেন । ফলে ১৯৭১ সালের যুদ্ধে কতজন নিহত হয় সে সংখ্যাটি বের করার দায়িত্ব তিনি কখনোই দেশের লোকগণনা ও পরিসংখ্যান বিভাগকে দেননি। বরং সেটি নির্ধারণ করে দেন তিনি নিজে। এবং সে সংখ্যাটির ঘোষণা দেন পাকিস্তান থেকে ফেরার পথে লন্ডনের বিমান বন্দরে সাংবাদিকদের সাথে আলোচনা কালে। অথচ সে সঠিক সংখ্যাটি ঘরে ঘরে ঘুরে পরিসংখ্যাণ না নিয়ে কোন ব্যক্তির পক্ষেই বলা সম্ভব নয়। সম্ভব নয় বলেই সে সংখ্যাটি নির্ণয় করতে প্রতি দেশে লোকগণনা বিভাগের হাজার হাজার কর্মিকে মাঠে নামানো হয়। অথচ সে পথে না গিয়ে এস জটিল সংখ্যাটি নির্ণয়ে  শেখ মুজিব তাঁর জিহ্ববা ও লাগামহীন কল্পনাকে কাজে লাগিয়েছেন। ফলে সেকেন্ডের মধ্যে সে সংখ্যাটি ৩০ লাখে নির্ধারণ করে দেন। বাংলাদেশের ইতিহাসের বইয়ে এখন সে কল্পিত তথ্যটি ইতিহাস রূপে পড়তে হয়। এরং দেশের কোটি কোটি নাগরিককে সে মিথ্যা তথ্যটিই বলতে হয় সর্বত্র। সে মিথ্যার প্রতিবাদ করাকে শেখ মুজিবের অসম্মান বলে দণ্ডনীয় করা হয়েছে।

স্বৈরাচারি শাসকের হাতে এভাবে শুধু অসংখ্য মানুষই মারা যায় না, মারা পড়ে প্রকৃত সত্য এবং দেশের সত্য ইতিহাসও। ইসলামের বিধানে প্রতিটি মিথ্যাই জঘন্য পাপ। কি রাজনীতি, কি ধর্ম, কি ইতিহাস এবং কি সমাজ-সংসার সর্বত্র জুড়ে যত পাপ তার জন্ম মূলতঃ মিথ্যা থেকে। নবীজী (সাঃ) তাই মিথ্যাকে সকল পাপের মা বলেছেন। মিথ্যার কারণেই মুর্তি, শাপ-শকুন, ও গরুর ন্যায় পশু এবং ফিরাউনের ন্যায় বহু দুর্বৃত্তও ভগবান রূপে গৃহিত হয়েছে। মিথ্যার স্তুপের মাঝে সত্যের সন্ধান মেলে না। এজন্যই মিথ্যার স্তুপ সরাতেই মহান আল্লাহতায়ালা লক্ষাধিক নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন। মানব ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ তাই বর্ণ, ভাষা বা ভূমি নিয়ে নয়, সেটি হলো মিথ্যার বিরুদ্ধে সত্যের যুদ্ধ। যুগে যুগে নবী-রাসূলগণ দাঁড়িয়েছেন সত্যের পক্ষে এবং শয়তান ও তার সেবকগণ দাঁড়িয়েছে মিথ্যার পক্ষে। ইসলামে সর্বশ্রেষ্ঠ নেক কর্ম তাই মিথ্যার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। অথচ সে সামর্থ্য স্বৈরশাসকদের থাকে না। বরং গদি বাঁচানোর স্বার্থে তারা শুধু নিজেরাই মিথ্যাচারি হয় না, মিথ্যাচারি বানায় জনগণকেও। স্বৈর শাসকের অধিকৃত দেশে এজন্যই প্রবল জোয়ার সৃষ্টি হয় নিরেট মিথ্যার। মিথ্যার সে জোয়ারের কারণেই মুর্তিরা পূজা পায় এবং ফিরাউনের ন্যায় দুর্বৃত্তগণও ভক্ত পায়। সে অভিন্ন কারণে মুজিবভক্তদের কাছে মুজিব গণ্য হয় সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী রূপে।

 

আক্রোশ কেন ইসলামের বিরুদ্ধে?

ইসলাম কখনোই স্বৈরশাসন, স্বৈরাচারি মিথ্যাচার এবং স্বৈরাচারি বর্বরতাকে সমর্থণ করে না। নবীজী (সাঃ)র আগে আরবে খৃষ্টান ছিল, ইহুদীগণও ছিল। কিন্তু তারা গোত্রপতিদের বর্বর স্বৈরাচার নির্মূলে কোনদিন যুদ্ধ করেনি। বরং বেছে নিয়েছিল শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থানের নীতি। কিন্তু নবীজী (সাঃ) তাদের নির্মূলে নেমেছেন। শতকরা ৭০ জনের বেশী সাহাবা সে জিহাদের শহীদও হয়েছেন। কারণ স্বৈরাচারের অসভ্যতা নির্মূল না করলে কি সভ্য সমাজের নির্মাণ সম্ভব? ফলে যারা নবীজী (সাঃ)র সূন্নতের নিষ্ঠাবান অনুসারি তাদের জীবনে স্বৈর শাসন নির্মূলের জিহাদটি অনিবার্য কারণেই এসে যায়। একারণেই তাদের বিরুদ্ধে স্বৈর-শাসকদের আক্রোশটি প্রকট। অথচ সেরূপ আক্রোশ অন্য ধর্মের অনুসারিদের বিরুদ্ধে থাকে না। এ জন্যই ইসলামের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোটি প্রতিটি স্বৈর শাসকের স্বভাবজাত বিষয়। মুসলিম দেশে তারা বন্ধু খুঁজে মুসলিম উম্মাহর বাইরে থেকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাথে মধ্যপ্রাচ্যের স্বৈর শাসকদের ঘনিষ্ট সম্পর্কের মূল কারণ তো ইসলাম ও মুসলিম ভীতি। সে ভীতি নিয়ে সৌদি আরব ও মিশরের জেলগুলি পূর্ণ করা হয়েছে মুসলিম উলামা দিয়ে। একই রূপ ইসলাম ও মুসলিম ভীতি নিয়ে ইরানের সাবেক স্বৈরাচারি শাসক মহম্মদ রেজা শাহ পুলিশ, গুপ্তচর বাহিনী ও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়েছিল ইরানে বসবাসরত অমুসলিম বাহাই ও ইহুদীদের। এক্ষেত্রে শেখ হাসিনার নীতিও ভিন্নতর নয়। নিজের স্বৈরাচার বাঁচাতে তাঁর কোয়ালিশনটিও দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগণের সাথে নয়, বরং বিশ্বের সর্ববৃহৎ পৌত্তলিক শক্তি ভারতের সাথে। শেখ হাসিনার সে ইসলাম মুসলিম ভীতি কাজ করছে বাংলাদেশের পুলিশ, বিচার ও প্রশাসনিক বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ পদে বিপুল সংখ্যায় হিন্দুদের নিয়োগ দেয়ার পিছনেও।

কাউকে সঠিক ভাবে চেনার সহজ ও নির্ভূল পদ্ধতিটি হলো তার বন্ধুদের চেনা। কারণ, কেউই তার বিপরীত চেতনার মানুষকে অন্তরঙ্গ বন্ধু রূপে গ্রহণ করে না। জনগণকে ধোকা দিতে কখনো ধর্ম, কখনো গণতন্ত্রের মুখোশ পড়লেও বন্ধুদের সামনে হাজির হয় মুখোশ সরিয়ে। তাই যে ব্যক্তি ভারতকে চিনতে ভূল করে না, সে ভূল করে না হাসিনাকে চিনতেও। সেটি দেখা গেছে পাকিস্তান আমলেও। যারা সে আমলে ভারতের এজেন্ডাকে চিনতে ভুল করেনি, একমাত্র তারাই সেদিন শেখ মুজিবকে চিনতে ভুল করেনি। ফলে মুজিবকে নিয়ে তারা সেদিন যা কিছু বলেছিল সেটিই ফলেছে তার শাসনামলে। তেল ও পানি যেমন একত্রে মেশে না, তেমনি রাজনীতিতে বিপরীত মতের মানুষের মাঝে কখনোই একতা গড়ে উঠে না। আদর্শিক ও কালচারাল ম্যাচিংটি এক্ষেত্রে অপরিহার্য়। একারণেই ভারত কোন ইসলামপন্থিকে নিজের বন্ধু রূপে গ্রহণ করে না। ভারতের বন্ধু হতে যেমন ইসলামপ্রীতি ছাড়তে হয়, তেমনি ভারতের এজেন্ডাকেও ষোল আনা গ্রহণ করতে হয়। এখানে আপোষ চলে না। ফলে বিএনপির নেতাদের মুখে যতদিন বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম ধ্বনিত হবে ততদিন ভারতের কাছে প্রিয় হওয়া তাদের পক্ষে অসম্ভব। এমন কি অসম্ভব পাশ্চাত্যের দেশগুলির কাছেও। পাকিস্তান আমলে ভারতের কাছে প্রিয় হওয়ার খাতিরে তৎকালীন আওয়ামী মুসলিম লীগের নেতাদের দলের নাম থেকে মুসলিম শব্দটি বিদায় দিয়ে আওয়ামী লীগ হতে হয়েছে।

 

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতীয় এজেন্ডা

ভারতের এজেন্ডার কাছে শেখ হাসিনার আত্মসমর্পণটি কোন গোপন বিষয় নয়। সে আত্মসমর্পণের কারণেই কাশ্মীরে ভারতীয় অধিকৃতি, গণহত্যা, নারী ধর্ষণ নিয়ে শেখ হাসিনার মনে কোন ক্ষোভ বা অভিযোগ নাই। কাশ্মীরীদের স্বাধীনতার লড়াইকে তিনি স্বাধীনতার লড়াই বলতেও রাজী নন। ভারতে শক্তিহানীকে তিনি তার নিজের শক্তিহানী মনে করেন। বরং আনন্দ বাড়ে মুসলিমের শক্তিহানীতে। ফলে তাঁর কাছে স্বাধীনতার লড়াই তো সেটি যা পাকিস্তান ভেঙ্গে স্বাধীন বেলুচিস্তান বা সিন্ধু বানাতে চায়। তাই কাশ্মীর প্রসঙ্গে ভারতের আগ্রসী শাসক চক্রের মুখে যে বুলি, অবিকল সেটিই ধ্বনিত হয় হাসিনার মুখে। নরেন্দ্র মোদীর সাথে সুর মিলিয়ে তিনিও কাশ্মীরী মুজাহিদদের সন্ত্রাসী বলে অভিহিত করে থাকেন। একারণেই কাশ্মীরে ৭ লাখ ভারতীয় সৈন্যের উপস্থিতি ও তাদের দখলদারি নিয়েও তাঁর কোন অভিযোগ নাই। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিরুদ্ধে পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির যে ক্ষোভ, সে ক্ষোভটুকুও হাসিনার নাই। কারণ মমতা ব্যানার্জি একজন স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক, কারো খুশি করতে তাকে রাজনীতি করতে হয় না। ফলে তার রাজনীতিতে মোদি থেকে ভিন্ন সুর তো থাকবেই। অথচ হাসিনার মুখে সেরূপ ভিন্ন সুর নাই। কারণ তাকে রাজনীতি করতে হয় ভারতের মুখের দিকে তাকিয়ে। এমন একটি ভারতমুখি সরকারকে ক্ষমতায় রাখতে ভারত সরকার একাত্তরের ন্যায় আরেকটি যুদ্ধ করবে সেটিই কি স্বাভাবিক নয়?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে মাত্র দুটি পক্ষঃ একটি জনগণ, অপরটি ভারত। একই সাথে দুই নৌকায় পা রাখা যেমন অসম্ভব, তেমনি অসম্ভব হলো এরূপ বিপরীতমুখী দুটি পক্ষকে খুশি করা। জনগণকে পক্ষে টানতে  গিয়ে বিএনপি ভারতকে হারিয়েছে। জনগণের পক্ষ নেয়ার অর্থ বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগণের ধর্মীয় বিশ্বাস, অনুভূতি ও সংস্কৃতিকে রাজনীতিতে গুরুত্ব দেয়া। জনগণের চেতনায় যেহেতু মজলুম কাশ্মীরী, ফিলিস্তিনী, রোহিঙ্গা মুসলিমদের প্রতি গভীর বেদনাবোধ, ফলে জনগণকে পক্ষে টানতে হলে রাজনীতিতে তাদের পক্ষ নেয়ার বিষয়টি অনিবার্য কারণেই এসে যায়। কিন্তু ভারতকে পক্ষ টানতে হলে নিজ দলের রাজনীতিতে আপন করে নিতে হয় সেদেশের মুসলিম নিধন, মসজিদ ধ্বংস, মুসলিম নারী ধর্ষণ ও গরু গোশতো খাওয়ার কারণে মুসলিমদের পিটিয়ে হত্যার ন্যায় নৃশংস বর্বরতাকে। শুধু তাই নয়। নিজ দেশে ইসলাম ও মুসলিমের বিরুদ্ধে ভারতীয় মডেলের নৃশংস বর্বরতা প্রয়োগ করে শিষ্যত্বের প্রমাণও দিতে হয়। এজন্যই হাসিনার রাজনীতিতে অনিবার্য রূপে দেখা দেয় শাপলা চত্ত্বরের উলামা হত্যাকান্ড, পিলখানার সেনা-অফিসার খুন, জামায়াত নেতাদের ফাঁসিতে ঝুলানো, বিএনপি নেতাদের গুম এবং ইসলামি টিভি চ্যালেনের নিষিদ্ধকরণের ন্যায় নানারূপ নাশকতা। এরূপ নাশকতা দিল্লির শাসক মহলে শেখ হাসিনার কদর যে বিপুল ভাবে বাড়িয়েছে -সে প্রমাণ তো প্রচুর। ভারতের সামনে হাসিনার বিকল্প একমাত্র হাসিনাই। তার চেয়ে উত্তম বিকল্প যে নেই ভারতের শাসক মহল সেটি বুঝে। ক্ষমতায় থাকতে হলে এছাড়া ভিন্ন রাস্তা নাই শেখ হাসিনাও সেটি বুঝে। তাই তাঁর রাজনীতি ইসলাম ও মুসলিম বিনাশী নৃশংসতা যে দিন দিন আরো প্রকটতর হবে -তা নিয়ে কি আদৌ সন্দেহ আছে?

বাংলাদেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠার রাজনীতিকে ভারত সমর্থণ দিবে সেটি কি ভাবা যায়? ভারতের সমর্থণ পেতে বরং অপরিহার্য হলো শুধু ইসলাম থেকে নয়, বাংলাদেশের জনগণ থেকে দূরে সরা। সে সাথে ইসলামের পক্ষের শক্তির নির্মূলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া। ইসলামের বিপক্ষে যাদের অবস্থানটি সবচেয়ে কঠোর তারাই ভারতের কাছে সবচেয়ে প্রিয়। ইসলামপন্থিদের সাথে জোট বাঁধার  কারণে ভারতের কাছে চক্ষশূল হয়েছে বিএনপি ও তার নেত্রী খালেদা জিয়া। মহিলাদের পর্দা না করা বা মাথায় কাপড় না দেয়াটি মহান আল্লাহতায়ালার বিধানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। যার মধ্যে সামান্যতম ঈমান আছে, সে এ পথে নামে না। বিদ্রোহের সে ঝান্ডা উড়িয়ে খালেদা জিয়া ধর্মভীরু মুসলিমদের মনকে লাগাতর আহত করলেও ইসলামের দুষমনদের কাছে কি প্রিয় হতে পেরেছেন? কারণ, ভারত শুধু খালেদা জিয়ার নগ্ন মাথার বিদ্রোহে খুশি নয়। দেখতে চায়, মুসলিম ও ইসলামের বিরুদ্ধে তার পক্ষ থেকে নৃশংস নাশকতা। শেখ হাসিনা ও তার পরামর্শদাতাগণ ভারতের সে অভিলাষটি ষোল আনা বুঝে। এজন্যই শেখ হাসিনার রাজনীতি খালেদা জিয়া থেকে ভিন্ন। তার রাজনীতির এজেন্ডা ইসলামের পক্ষের শক্তিকে শুধু রাজনীতির ময়দান থেকে নির্মূল করা নয়; বরং রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও জনগণের চেতনার অঙ্গণ থেকে ইসলামি চেতনাকে বিলুপ্ত করা। ভারতকে খুশি করার এটিই মোক্ষম উপায়। একারণেই হাসিনা সরকার শুধু ইসলামি টিভি চ্যানেল গুলোকেই বন্ধ করেনি, স্কুল-কলেজের সিলেবাস থেকে বাদ দিয়েছে ইসলাম ও মুসলিম ইতিহাসের শিক্ষাণীয় বিষয়গুলো। জেল ঢুকিয়েছে যেমন দেশের প্রসিদ্ধ তাফসিরকারকদের, তেমনি ঘরে ঘরে গিয়ে পুলিশ বাজেয়াপ্ত করছে জিহাদ বিষয়ক বই। অথচ জিহাদ ছাড়া কি ইসলাম বাঁচে? জিহাদ তো ইসলামকে বাঁচানো ও বিজয়ী করার লড়াই। ইসলাম কি স্রেফ নামায-রোযা, হজ-যাকাত ও দোয়া-দরুদ? ইসলামের অবিচ্ছেদ্দ অঙ্গ হলো শরিয়ত, হদুদ, খেলাফত, জিহাদ, মুসলিম উম্মাহর ঐক্য এবং শুরা ভিত্তিক শাসন। ইসলাম বাঁচাতে হলে তো এগুলিকেও অবশ্যই বাঁচাতে হয়। এবং ইসলাম বাঁচানোর সে লড়াইয়ে মুসলিমের জীবনে জিহাদও অনিবার্য রূপে হাজির হয়। বস্তুতঃ ঈমানের মূল পরীক্ষাটি তো হয় লড়াইয়ের সে ময়দানে। তাছাড়া জিহাদের চেতনা না থাকলে কাফেরদের হামলার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের চেতনাই বা গড়ে উঠবে কেমনে? কাফের হামলা থেকে বাঁচতে হলে জিহাদের সে প্রস্তুতিটি তো জরুরী। একমাত্র শয়তানই মুসলিমদের জিহাদহীন এবং জিহাদে প্রস্তুতিহীন দেখে খুশি হতে পারে। কারণ তাতে তার অনুসারিদের বিজয়টি বিজয়টি হয়। তবে শেখ হাসিনার এজেন্ডা শুধু ইসলাম বিরোধী নাশকতাতেই থেমে যায়নি। তার নাশকতার পথটি আরো নৃশংস। ইংরেজদের খুশি করতে মীর জাফর যেমন নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও অন্যান্য ইংরেজ-বিরোধীদের নির্মম ভাবে হত্যা করেছিল। ভারতকে খুশি করতে শেখ হাসিনাও একই পথ ধরেছে। ফলে তাঁর হাতে গুম, খুন ও ফাঁসিতে ঝুলছে একের পর ভারত বিরোধীগণ।

তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারত প্রেম শুধু শেখ হাসিনা ও তার দলের একার বিষয় নয়। শিক্ষা-সংস্কৃতি, পত্র-পত্রিকা ও টিভি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সে রোগই বছরের বছর ধরে দেশময় ছড়ানো হয়েছে। তাছাড়া হাসিনার রাজনীতি তো মুজিবের রাজনীতিরই ধারাবাহিকতা। এবং রাজনীতির যে অঙ্গণে গুরুত্ব পায় মুজিবের চেতনা, বাকশালী স্বৈরাচার তো সেখানে থাকবেই। সে সাথে থাকে ভারতপ্রেমও। কারণ হিটলার থেকে তাঁর ফ্যাসিবাদকে যেমন আলাদা করা যায় না, মুজিব থেকেও তেমনি আলাদা করা যায় না তাঁর বাকশালী স্বৈরাচার ও ভারতের প্রতি তাঁর গভীর আনুগত্য। সে আনুগত্যের সাথে আসে আগরতলা ষড়যন্ত্রের ঐতিহ্যও। মুজিবের রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো একাত্তর। সে একাত্তরের সবটুকু জুড়ে হলো তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ভারতের রাজনৈতিক ও সামরিক হস্তক্ষেপের ইতিহাস। সে হস্তক্ষেপ ছাড়া কি বাংলাদেশ সৃষ্টি হতো? মুক্তি বাহিনী সৃষ্টি না হলেও চলতো, কিন্তু ভারতের হস্তক্ষেপটি ছিল অপরিহার্য। তাই বাংলাদেশ সৃষ্টিতে মুক্তিবাহিনীকে একটি জেলা, একটি মহকুমা, এমন কি একটি থানাকেও স্বাধীন করতে হয়নি। পাকিস্তান ভেঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টির পুরা কাজটি করেছে ভারত তার নিজ পরিকল্পনা, নিজ অর্থ ও নিজ সেনাবাহিনী দিয়ে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে অধিকৃত ও লুণ্ঠিত হয়েছিল সমগ্র দেশ। ভারতের এরূপ রাজনৈতিক ও সামরিক অধিকৃতিই তো একাত্তরের চেতনার মূল কথা। একাত্তরের চেতনাধারীগণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক, আদর্শিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গণে ভারতের সে অধিকৃতিটি আজও চায়। ভারতে বিলীন না হয়েও ভারতের অধিকৃতি নিয়ে বাঁচার সে এক গোলামী চেতনা। কারণ তারা চায়, রাজনৈতিক, আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গণে ইসলামকে বাদ দিয়ে বাঁচতে। কিন্তু তারা জানে, ভারতের লাগাতর উপস্থিতি ছাড়া ইসলামী চেতনাকে এ দেশে যে বাদ দেয়া অসম্ভব। সেটি চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল ১৯৪৭ সালে।  এবং আজও সেটিই ব্যস্তবতা। এমন এক প্রেক্ষাপটে ১৯৭১ য়ে ভারতের বিজয় ছিল বিচ্ছিন্ন ঘটনা মাত্র। ভারত সেটি বুঝে। সে ধারণাটি তাদের মনে আরো বদ্ধমূল হয় মুজিবের মৃত্যুতে ঢাকার রাস্তায় মানুষের আনন্দ মিছিল দেখে। শেখ হাসিনার প্রতি ভারতে পূর্ণ সমর্থণের মূল কারণ তো একাত্তরের সে লিগ্যাসিকে বাঁচিয়ে রাখার অনিবার্য প্রয়োজনে।

বাংলাদেশের সেক্যুলার রাজনীতিতে মুজিবের চেতনার প্রতিষ্ঠা পাওয়ায় শুধু ভারতপ্রেম নয়, স্বৈরাচার-প্রেমও মহামারিতে রূপ নিয়েছে। তাছাড়া যে রাজনীতিতে মুজিবের চেতনা থাকে, তাতে বাকশালী স্বৈরাচার থাকবে না সেটি কি ভাবা যায়? তাই যেখানে মুজিবপ্রেম, তার গভীরে থাকে গভীর স্বৈরাচারপ্রেমও। তখন মারা পড়ে গণতন্ত্র। স্বৈরাচার-প্রেমের সে মহামারির কারণে দুর্বৃত্ত এরশাদও দেশের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট সাবেক বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে অপসারণ করে ক্ষমতা দখলের সাহস পায়। যে কোন দেশের কোন সভ্য মানুষের কাছে সামরিক জান্তার হাতে গণতন্ত্র হত্যার এরূপ নাশকতাটি গ্রহণযোগ্য হওয়ার কথা নয়। অথচ শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতাদের কাছে সেটি শুধু গ্রহণযোগ্যই হয়নি, উৎসবযোগ্য গণ্য হয়েছিল। গণতন্ত্র বলতে আওয়ামী লীগের নেতাগণ কি বুঝেনসেটিই সেদিন নগ্ন ভাবে প্রকাশ পেয়েছিল।

 

স্ট্রাটেজী কালচারাল ইঞ্জিনীয়ারিংয়ের

ভারতমুখী রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক এজেন্ডা ছিল শেখ মুজিবেরও। তার সে এজেন্ডায় ইসলাম ও মুসলিমের কোন স্থান ছিল না। কিন্তু তার জীবনে হঠাৎ ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট এসে পড়ায় সে এজেন্ডা পূরণের সুযোগ তিনি পাননি। সে অভিন্ন এজেন্ডা নিয়ে এখন অগ্রসর হচ্ছে শেখ হাসিনাকে। এবং সেটি বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতির দিকে তাকালে সহজেই চোখে পড়ে। ভারত জানে, হিন্দুদের থেকে ভিন্নতর ও প্রবলতর একটি সাংস্কৃতিক পরিচয়ের কারণেই ১৯৪৭ সালে বাঙালি মুসলিমগণ স্বেচ্ছায় পাকিস্তানে অঙ্গিভূত হয়েছিল। সে ভিন্ন পরিচয়টি হলো ইসলামী চেতনা ও সে চেতনা নির্ভর মুসলিম সংস্কৃতি। জনগণের চেতনায় ইসলাম বেঁচে থাকার কারণেই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ব বাংলা ১৯৪৭ সালে ভারতে বিলীন না হয়ে পৃথক মানচিত্র পায়। একই কারণে ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভেঙ্গে গেলেও স্বাধীন বাংলাদেশের পরিচয় নিয়ে এখনো বেঁচে আছে। বাঙালী মুসলিমদের স্বাধীন পরিচয় নিয়ে এরূপ বেঁচে থাকাটিই ভারতের কাছে চক্ষশূল। কারণ, তারা তো গড়তে চায় এক দেহে লীন অখণ্ড ভারত এবং সে ভারতের হিন্দুদের একক আধিপত্য। নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপীর পশ্চিম বাংলার প্রাদেশিক সভাপতি যখন প্রকাশ্যে হুংকার দেন, দুই বাংলা আবার এক হবে, তখন কি বুঝতে বাঁকি  থাকে, বাংলাদেশের পৃথক অস্তিত্ব তাদের কাছে কতটা অসহ্য?

অখণ্ড ভারত নির্মাণের পথে বাংলাদেশের মুসলিমদের মাঝে ইসলামী চেতনা ও মুসলিম সংস্কৃতি হলো বড় বাঁধা। সে বাঁধাটি নির্মূল করার লক্ষ্যেই ভারতের ও ভারতসেবী বাঙালী রাজনীতির মূল এজেন্ডা হলো, ইসলামের চেতনা ও মুসলিম সংস্কৃতির বিনাশ। ১৯৭১য়ে পূর্ব  পাকিস্তানের পরিচিতিটি বিলুপ্ত হলেও ইসলামি চেতনা ও মুসলিম সংস্কৃতি বিলুপ্ত হয়নি। তাই প্রয়োজন পড়েছে সরকারি অর্থে সুদুর প্রসারি কালচারাল ইঞ্জিনীয়ারিং। নব্য সংস্কৃতির সে ভারতীয় প্রকল্পে ইসলামের কোন স্থান নেই। বরং সেখানে জয়জয়াকার স্রেফ হিন্দু সংস্কৃতির। ফলে সরকারি উদ্যোগে সারা দেশ জুড়ে স্কুল, কলেজ ও রাজপথে শুরু হয়েছে ছবি পূজা, প্রদীপ পূজা, শাপ, পেঁচা, গরু-মহিষ, হুনুমান ইত্যাদি জীবজন্তুর ছবি নিয়ে বিশাল মিছিল। এভাবে সনাতন পৌত্তলিক জাহিলিয়াতকে বাঙালীর জাতীয় সংস্কৃতি রূপে প্রতিষ্ঠা দেয়া হচ্ছে। স্বৈর-শাসকের হাতে অধিকৃত হওয়ার বিপদটি তাই শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতার হারানোর নয়, বরং সেটি নিজ ধর্ম ও নিজ সংস্কৃতি নিয়ে বেড়ে উঠার ক্ষেত্রেও।

তাই যে দেশে স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠা পায়, সে দেশ ব্যর্থ হয় সভ্যদেশ রূপে বেড়ে উঠায়। তখন চরম অবক্ষয় শুরু হয় মূল্যবোধের। তাতে ইসলামের আদি রূপটি যেমন বাঁচে না, তেমনি বাঁচে না সত্য, সততা, ন্যায়নীতি ও সুস্থ্য সংস্কৃতি। এমন একটি নৈতীক অবক্ষয় ও অসভ্যতার কারণেই বিশ্বের প্রায় ২০০ দেশের মাঝে দুর্নীতিতে বাংলাদেশ প্রথম হয়েছে। এমন দেশে প্রবলতর হয় স্বৈরাচারি শাসকের স্বেচ্ছাচার ও সোসাল ইঞ্জিনীয়ারিং। তখন শুরু হয় ইসলাম থেকে দ্রুত দূরে সরা। যুগে যুগে তাই ইসলামের প্রতিষ্ঠা রুখতে শয়তানের সবচেয়ে বিশ্বস্থ্য সহচর হলো স্বৈরাচারি শাসক ও তার সহচরগণ। ভারতের শাসক চক্রটি এজন্যই শেখে হাসিনার উপর এতটা প্রসন্ন। আর এতে কাশ্মীরের মুসলিমদের ন্যায় দ্রুত বিপদ বাড়ছে বাংলাদেশের মুসলিমদের। বাংলাদেশ পরিণত হচ্ছে আরেক কাশ্মীরে। তবে ভারতের জন্য বাড়তি সুবিধাটি হলো, কাশ্মীরের ন্যায় বাংলাদেশে ভারতের ৭ লাখ সৈন্য মোতায়েন করতে হয়নি। ভারতীয় সৈন্যদের সে কাজটি করছে বাংলাদেশের ভারতবান্ধব সরকার, পুলিশ, বিজিবি ও সেনাবাহিনী। তাদের কারণেই শাপলা চত্ত্বরে হিফাজতে ইসলামের অগণিত নিরস্ত্র মুসল্লিদের বিরুদ্ধে গণহত্যায় কোন ভারতীয় সৈন্যদের নামতে হয়নি। স্বরাষ্ট্র দফতরের হিসাব মতে ২০১৩ সালের ৫ মের রাতে নিরস্ত্র মানুষের বিরুদ্ধে ১ লাখ ৫৫ হাজার গোলবারুদ ব্যবহৃত হয়েছে। ময়দানে নামানো হয়েছিল পুলিশ, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর ৭ হাজার ৫৮৫ জন সেপাহীকে।

প্রশ্ন হলো, ২৩ বছরের পাকিস্তানী আমলে কখনোই কি এতবড় বিশাল সশস্ত্র বাহিনীকে নিরস্ত্র মানুষের বিরুদ্ধে নামানো হয়েছে? এরূপ নৃশংসতা কি সুলতানী ও মোঘল আমলে হয়েছে? সরকার সে নৃশংস হত্যাকাণ্ড গোপন করার চেষ্টা করেছে। তবে সরকারের হত্যাকাণ্ডের প্রস্তুতি বুঝা যায় শাপলা চত্ত্বরে ৭ হাজার ৫৮৫ জন সেপাহীর উপস্থিতি দেখে। সে রাতে সেখানে তারা রথ দেখতে হাজির হয়নি। প্রত্যক্ষদর্শীর মতে, সে রাতে দুই শতাধিক মানুষ লাশ হয়েছে এবং আড়াই হাজার মানুষ নিখোঁজ হয়েছে। নিখোঁজদের অনেকেই যে লাশ হয়েছে তা নিয়ে কি সন্দেহ চলে? লাশ ময়লার গাড়িতে তুলে গায়েব করা হয়েছে। কোন সভ্যদেশে কি মৃতদের সাথে ‌এরূপ আচরণ হয়? স্বৈর শাসনের এটি এক অসভ্যতর অধ্যায়। হিফাজতে ইসলামের প্রধান মাওলানা শফি এটিকে গণহত্যা বলে অভিহিত করেছেন। এক রাতে এত অধীক সংখ্যক মুসলিমের নৃশংস হত্যাকাণ্ড কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগর বা অন্য কোন শহরে এ অবধি হয়নি। বস্তুতঃ এরূপ বীভৎ অসভ্যতাই হলো হাসিনার স্বৈর শাসনের মূল অবদান। উন্নয়নের মিথ্যা কোরাস গেয়ে কি এরূপ নৃশংসতার বেদনা লাঘব করা যায়? গড়ে উঠে কি সভ্য দেশ? ১৯৫২ সালে ২১শে ফেব্রেয়ারি পুলিশের গুলিতে তিন মারা গিয়েছিল। তা নিয়ে আজও আমার ভাইয়ের রক্ত রাঙ্গানো একুশে ফেব্রেয়ারী, আমি কি ভূলিতে পারি? গাওয়া হয়। কিন্তু ২০১৩ সালের ৫ই মের রাতে সে নৃশংস গণহত্যা হলো বাংলার মুসলিমগণ সেটি ভূলে কি করে? অথচ আজ সেটিও ভূলিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্র হচ্ছে। এবং সেটি স্বৈর শাসনের অসভ্যতাকে বাঁচানোর স্বার্থে। ২০/০৫/২০১৮ Tweet:@drfmkamal; facebook.com/firozkamal

 




বাংলাদেশে শত্রুশক্তির যুদ্ধ 

ইসলাম ও শত্রুপক্ষের রণকৌশল

মুসলমানগণ কোন কালেই শত্রুমূক্ত ছিল না। আজও নয়। যেখানেই মুসলমান আছে সেখানে শয়তান এবং তার দলবল ও রণকৌশলও আছে। ইসলাম থাকবে অথচ শয়তান থাকবে না -সেটি কি হয়? কোন বিজন দ্বীপে ঈমানদার ঘর বাঁধলেও শয়তান সেখানেও তার কুটকৌশল নিয়ে হাজির হয়। তাই ১৬ কোটি মুসলমানের দেশে শয়তান থাকবে না, এবং তার বাহিনী ও রণকৌশলও থাকবে না -সেটি কি ভাবা যায়? মুসলমানের দায়িত্ব হলো শয়তানের সে বাহিনী ও তার কৌশলগুলোকে সনাক্ত করা এবং এবং সে বাহিনীর বিরুদ্ধে লাগাতর লড়াই করা। প্রতিটি মুসলমানের উপর এ এক অর্পিত দায়ভার। সে দায়ভার পালনে নবীজী (সাঃ) ও তাঁর প্রতিটি সাহাবীকে আজীবন লড়াই লড়তে হয়েছে। অধিকাংশ সাহাবীকে শহীদ হতে হয়েছে। যারা সে লড়াইয়ে অংশ নেয়নি তাদেরকে মুনাফিক বলা হয়েছে। ঈমানদার হওয়ার অর্থই হলো শয়তানি শক্তির চিরকালের শত্রুতে পরিণত হওয়া। মু’মিন ব্যক্তির জীবনে এটিই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এবং সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। মু’মিন ব্যক্তিকে বাঁচতে হয় ইসলামের শত্রুর পক্ষ থেকে আরোপিত একটি ভয়ংকর যুদ্ধের চ্যালেঞ্জ নিয়েই্। সে চ্যালেঞ্জ নিয়ে বাঁচার পুরস্কার স্বরূপ পরকালে ঈমানদার ব্যক্তি পায় অফুরন্ত নিয়ামত ভরা জান্নাত। পরীক্ষায় পাশ না করলে যেমন প্রমোশন জুটে না, তেমনি এ চ্যালেঞ্জ সঠিক ভাবে মোকাবেলা না করলে জান্নাতও জুটবে না। এ বিষয়ে মহান আল্লাহতায়ালা কোন অস্পষ্টতা রাখেননি। সে সতর্ক বাণীটি পবিত্র কোরআনে বার বার শোনানো হয়েছে। বলা হয়েছে, “আমি অবশ্যই তোমাদর পরীক্ষা করবো ভয় দিয়ে, ক্ষুধা দিয়ে, জান ও মালের ক্ষতি দিয়ে এবং ফসলের লোকসান দিয়ে। সুসংবাদ দিন মু’মিনদের।” –(সুরা বাকারা )।

তাই মুসলিম জীবনের অর্থই লাগাতর লড়াই নিয়ে বাঁচা। ঈমানদারের জীবনে এটি হলো অপরিহার্য পরীক্ষা। এ পরীক্ষার পর্ব থেকে বাদ পড়েননি নবীরাসূল ও তাঁদের অনুসারিগণ।বরং সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা এসেছে তাঁদের জীবনে। নবীজী (সাঃ) র ন্যায় শান্তিপ্রিয় মহান দয়ালু মানুষটিও তাই তাঁর নবুয়তের জীবনের প্রথম দিন থেকেই শত্রুর হামলার শিকারে পরিণত হয়েছিলেন। আগুনে ফেলা হয়েছিল,দেশ ছাড়তে হয়েছিল এবং নিজ শিশু পুত্রের কোরবানীর হুকুম হয়েছিল হযরত ইব্রাহীম (আঃ)র উপর। হযরত মূসা (আঃ)কে তো তাঁর জন্মের প্রথম দিনেই নদীতে ভাসতে হয়েছে। তাঁকেও ফিরাউনের হামলার মুখে দেশ ছাড়তে হয়েছে। শূলে চড়িয়ে হত্যার ষড়যন্ত্র হয়েছিল হযরত ঈসা (সাঃ)এর বিরুদ্ধে। ঈমানদার যেমন মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীন প্রতিষ্ঠার বিশ্বস্থ্য সৈনিক রূপে তাঁর সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়,তেমনি প্রতিরোধ যুদ্ধের ঘোষণা দেয় শয়তান ও তার অনুগতদের হামলার বিরুদ্ধে। মু’মিনের জীবনে এটিই জিহাদ। মুসলমান হওয়ার অর্থই হলো আমৃত্যু এ লাগাতর জিহাদ নিয়ে বাঁচা। এমন জিহাদ যেমন নবীজী (সাঃ)র জীবনে ছিল,তেমনি সাহাবাদের জীবনেও ছিল। আজও যারা নবীজী (সাঃ)র অনুসারি হতে চায় তাদের জীবনেও যে থাকবে -সেটিই স্বাভাবিক।

ঈমানদারের জীবনে তাই শুধু কোরআন পাঠ, নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাতের ইবাদতগুলি একাকী আসে না, সাথে লাগাতর জিহাদও আসে। শয়তানি শক্তিবর্গ তা জানে। তাই ঈমানদারদের নির্মূলে শয়তানি শক্তির প্রচেষ্ঠাও লাগাতর। বরং শয়তানি শক্তির পক্ষ  থেকে হামলা না হলে সন্দেহ জাগে ঈমানদার হওয়া নিয়ে। বাংলার ভূমিও আজ শয়তান মূক্ত নয়। বরং ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে বাংলাদেশে এক অধিকৃত ভূমি। ফিরাউন, নমরুদ,আবু জেহেল ও আবু লাহাব যেমন তাদের হাতে অধিকৃত ভূমিতে ইসলামের চর্চা ও প্রতিষ্ঠাকে অসম্ভব করে রেখেছিল এবং অসম্ভব করেছিল মহান আল্লাহর শরিয়তি বিধান পালন,শরিয়তের প্রতিষ্ঠা তেমনি অসম্ভব হয়ে আছে বাংলাদেশে।এদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা আজ ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে। কোরআনের তাফসির, জিহাদ বিষয়ক বইয়ের প্রকাশনা ও সে গুলো প্রচার করা তাদের কাছে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অপর দিকে তারা অতি বেপরোয়া শয়তানের প্রজেক্ট বাস্তবায়নে। সে শয়তানি প্রজেক্টের অংশ রূপে তারা শুধু সূদ, ঘুষ, ব্যাভিচার, নাচগান ও অশ্লিলতার ন্যায় আদিম পাপাচারকেইও আইনসিদ্ধ করেনি, আইনসিদ্ধ করার পাঁয়তারা করছে সমকামিতা বা হোমোসেক্সুয়ালিজমের ন্যায় অতি জঘন্য কবিরা গুনাহকেও। ইসলামের আক্বিদা-বিশ্বাস ও মুসলিম সংস্কৃতির নির্মূলে এ হলো ইসলামের শত্রু পক্ষের হামলার নমুনা। এ হামলাটি যেমন আদর্শিক, তেমনি সাংস্কৃতিক। এ হামলাটি যে শুধু বাংলাদেশের বুকে জন্ম নেয়া ইসলামে অঙ্গিকারশূণ্য সেক্যুলারিস্টদের পক্ষ থেকে আসছে -তা নয়। এ হামলার সাথে জড়িত এক গ্লোবাল কোয়ালিশন। যারা চায় বহুমুখি কবিরা গুনাহর উপর বিশ্বজুড়ে রাজনীতি ও সংস্কৃতির নির্মাণ। পাশ্চাত্য দেশগুলো ভাসছে সে কুফরি রাজনীতি ও শিক্ষা-সংস্কৃতির উপর। বস্তুতঃ সে দেশগুলাো অধিকৃত শয়তানের সৈনিকদের কাছে। এখন তারা হাত বাড়িয়েছে বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলোতেও।

বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম ভূমির উপর হামলায় সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বন্ধুহীন নয়। ১৭৫৭ সালে বাংলার উপর আগ্রাসী হামলায় ইংরেজ বাহিনী যেমন মিরজাফরকে পেয়েছিল,তেমন মিরজাফরগণ আজকের শত্রুগণও পাচ্ছে। বরং আজকের পরিস্থিতি তাদের আরো অনুকূলে। ইংরেজদের তখন কয়েক হাজার নিজ সৈন্য নিয়ে পলাশীতে নামতে হয়েছিল। অথচ আজ ইসলামের বিরুদ্ধে পুরা যুদ্ধটি লড়ে দিচ্ছে বাংলাদেশে জন্ম নেয়া তাদের নিজেদের মিত্ররা। তাই গত ৬মে ঢাকার রাজপথে শত শত আলেম হত্যায় কোন অমুসলিমকে বন্দুক হাতে ময়দানে নামতে হয়নি। সেটি করে দিয়েছে বাংলাদেশের মাটিতে জন্ম নেয়া তাদের মানসিক গোলামেরা। পলাশীর ময়দানেও ইংরেজ সেপাহীদের হাতে এত মুসলমানের মৃত্যু হয়নি যা হয়েছে বাঙালী সেপাইদের হাতে মতিঝিলে গত ৫ই ও ৬ই মে। ইসলামের এ স্বদেশী শত্রুপক্ষের কাজে এ বিদেশী শত্রুরা এতই খুশি হয়েছিল যে তারা স্বৈরাচারি এ ইসলাম দুষমন সরকারের এ বীভৎস্য কর্মের বিরুদ্ধে কোন নিন্দা বা প্রতিবাদ জানায়নি। বরং প্রশংসা জুটেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। পত্রিকায় প্রকাশ র‌্যাবকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে ব্রিটিশ নিরাপত্তা বাহিনী। কিন্তু কি কারণে দিয়েছে সেটি কি এখনও বুঝতে বাঁকি থাকে? ইসলামের পক্ষের শক্তির নির্মূলে যে কাজটি তারা আফগানিস্তান ও ইরাকে স্বহাতে করেছে বা আজও করছে সে একই কাজ আদায় করে নিচ্ছে বাঙালী পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবী সেপাইদের দিয়ে। আজ থেকে শত বছর আগে হাজার হাজার বাঙালী ও হিন্দুস্থানী সৈনিকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে তারা শাতিল আরবে নিয়ে গিয়ে ইরাক অধিকৃত করেছিল। অধিকৃত করেছিল ফিলিস্তিন। অধিকৃত সে মুসলিম ফিলিস্তিনে তারা পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠিত করেছে ইসরাইল। আজকের বাংলাদেশকেও তারা এভাবে তাদের অনুগত সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক সৈনিকদের দ্বারা অধিকৃত রাখতে চায়।

ইসলামের শত্রুপক্ষের স্ট্রাটেজীর কারণেই বাংলাদেশ এখন এক উত্তপ্ত রণাঙ্গণ। বাংলাদেশ থেকে ইসলামের বিরুদ্ধে যা কিছু হচ্ছে তা স্রেফ কিছু ব্লগারের কর্মকান্ড নয়। শুধু শাহবাগের মঞ্চই তার সাথে জড়িত নয়। বরং তার পিছনে রয়েছে এক আন্তর্জাতিক মহা কোয়ালিশন। সে কোয়ালিশনের মূল নিয়ন্ত্রনটি পাশ্চাত্যের। সে কোয়ালিশনে যোগ দিয়েছে আরেক আগ্রাসী দেশ ভারত। কোয়ালিশন বাহিনীটি আফগানিস্তান,ইরাক বা ফিলিস্তিনের মুসলমানদের বিরুদ্ধে যা কিছু করেছে বা আজও করছে, ভারত অবিকল সেটিই করছে বিগত ৬০ বছরের বেশী কাল ধরে করছে অধিকৃত কাশ্মীরের অসহায় মুসলমানদের সাথে। বাংলাদেশের রণাঙ্গনে এ পক্ষটি অতি-উৎসাহী সহযোদ্ধা রূপে পেয়েছে দেশটির বিপুল সংখ্যক সেক্যুলার রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, সাংস্কৃতিক ক্যাডার, শিক্ষক-বুদ্ধিজীবী, লেখক-সাংবাদিক, আইনজীবী, বিচারপতিসহ বহু সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা।

 

শত্রুপক্ষের ইসলামভীতি

বিশ্ব-রাজনীতির অঙ্গণ থেকে সোভিয়েত রাশিয়ার বিদায়ের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রগণ ভেবেছিল তাদের পথের কাঁটা এবার দূর হলো। পুঁজিবাদ ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির আধিপত্য এবার বিস্তৃত হবে সমগ্র বিশ্বজুড়ে। কিন্তু সে গুড়ে বালি। আফগানিস্তানে তালেবানদের বিজয় তাদের কাছে চক্ষশূল মনে হচ্ছিল। ইরাকও তাদের কাছে অবাধ্য মনে হয়েছিল। প্রথমে আফগানিস্তান ও পরে ইরাক দখলে নেয়ার পর এ দুইটি  দেশ দখলে রাখতেই তাদের হিমশিম খেতে হচেছ। যুদ্ধের কারণে মার্কিন অর্থভান্ডার থেকে খসে গেছে তিন ট্রিলিয়ন ডলার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ন্যায় মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ শেষ হতে ৫ বছর লেগেছিল। কিন্তু বিগত ৭ বছর যুদ্ধ লড়েও মার্কিন নেতৃত্বাধীন ৪০টিরও বেশী দেশের কোয়ালিশ বাহিনী আফগানিস্তানে বিজয় আনতে পারিনি। বরং দ্রুত এগিয়ে চলেছে পরাজয়ের দিকে। এখন তারা জান বাঁচিয়ে পালাবার রাস্তা খুঁজছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ন্যায় একটি বিশ্বযুদ্ধের পরও মার্কিন অর্থনীতিতে এতটা মড়ক লাগেনি যা লেগেছে আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধের কারণে।

পাশ্চাত্যের কাছে এখন এটি সুস্পষ্ট, আফগানিস্তান, ইরাক, ফিলিস্তিন, লেবানন, সোমালিয়ার মত ক্ষুদ্র দেশগুলো দখল করা এবং সেগুলোকে কন্ট্রোলে রাখার সামার্থ্য তাদের নেই। যে প্রতিরোধের মুখে তারা হারতে বসেছে সেটির মূল হাতিয়ার অত্যাধিক যুদ্ধাস্ত্র নয়, জনবল বা অর্থবলও নয়। বরং সেটি কোরআনী দর্শন ও ইসলামের সনাতন জিহাদী সংস্কৃতি। এ দর্শন ও সংস্কৃতিই মুসলমানের জন্য আত্মসমর্পণকে অসম্ভব ও অচিন্তনীয় করে তুলেছে। বরং অতি কাম্য গণ্য হচ্ছে আগ্রাসী শত্রুর বিরুদ্ধে আমৃত্যু লড়াই ও শাহাদত। এমন চেতনা এবং এমন সংস্কৃতির বলেই এক কালের মুসলমানেরা রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের ন্যায় দুটি বিশ্বশক্তিকে পরাজিত করেছিল। এ যুগেও তারা বিশ্বের সর্ববৃহৎ রাষ্ট্র ও বিশ্বশক্তি  রাশিয়াকে পরাজিত করেছে। এবং এখন গলা চেপে ধরেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। আফগান মোজাহিদদের জিহাদ তাই পাল্টে দিচ্ছে বিশ্বরাজনীতির সমীকরণ। কামান, বোমা ও যুদ্ধবিমানের বলে গণহত্যা চালানো যায়। নগর-বন্দরও ধ্বংস করা যায়। কিন্তু সে কামানে বা গোলায় কি দর্শন ও সংস্কৃতির বিনাশও সম্ভব? বরং তাদের আগ্রাসন ও গণহত্যায় প্রতিরোধের সে দর্শন ও সংস্কৃতিই দিন দিন আরো বলবান হচ্ছে। কোন মার্কিনীকে রণাঙ্গণে রাখতে মাথাপিছু প্রায় ১০ লাখ ডলার খরচ হয়। অথচ মুসলমানরা হাজির হচ্ছে নিজ খরচে। তারা শুধু স্বেচ্ছাই অর্থই দিচ্ছে না, প্রাণও দিচ্ছে।

 

লক্ষ্য জিহাদী সংস্কৃতির বিনাশ

অবস্থা বেগতিক দেখে পাশ্চাত্য এখন ভিন্ন স্ট্রাটেজী নিয়েছে। সেটি শুধু গণহত্যা নয়। নিছক নগর-বন্দর, ঘরবাড়ী এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের বিনাশও  নয়। বরং সেটি ইসলামি দর্শন ও সংস্কৃতি ধ্বংসের। তাই শুরু করেছে প্রকান্ড আকারের সাংস্কৃতিক যুদ্ধ। নতুন এ স্ট্রাটেজীর আলোকে ইরাক ও আফগানিস্তানে তারা শুধু মানুষ হত্যাই করছে না, ঈমান হত্যাতেও তৎপর। এবং সেটি শুধু আফগানিস্তান ও ইরাকে সীমিত নয়। বাংলাদেশের ন্যায় প্রতিটি মুসলিম দেশই এখন একই রূপ সাংস্কৃতিক যুদ্ধের শিকার। হাসিনার সরকারের পক্ষ থেকে কোরআনের তাফসির নিষিদ্ধ করা,প্রখ্যাত আলেমদের গ্রেফতার ও তাদের ফাঁসির ব্যবস্থা, জিহাদ বিষয়ক বই বাজেয়াপ্ত করা, জামায়াত-শিবিরের মিছিল-মিটিং করতে না দেয়া ও হিফাজতে ইসলামের সমাবেশে ৭-৮হাজার সশস্ত্র সৈন্যর হামলার মূল কারণ তো এটাই। বাংলাদেশ তাদের অন্যতম টার্গেট হওয়ার কারণ, দেশটিতে ১৫ কোটি মুসলমানের বসবাস। তেল, গ্যাস বা অন্য কোন খনিজ সম্পদের চেয়ে ১৫ কোটি জনসংখ্যার ফ্যাক্টরটিই তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তেল, গ্যাস বোমায় পরিণত হয়না, কিন্তু মানুষ হয়। তাই বাংলাদেশী না চাইলেও তাদের এ আগ্রাসনের টার্গেট হওযা থেকে বাঁচার উপার নাই। শত্রুর লক্ষ্য এখন মুসলমানদের ঈমানকে হত্যা করা। ফলে মহা সংকটে এবার শুধু দুনিয়ার জীবন নয়, আখেরাতের জীবনও। কারণ এ যুদ্ধে ইসলামের এ শত্রুপক্ষ বিজয়ী হলে বাংলাদেশের মুসলমান দেহ নিয়ে বাঁচলেও ঈমান নিয়ে বাঁচবে না।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের স্ট্রাটেজী তাই  মুসলমানদের জীবন থেকে জিহাদের সংস্কৃতি বিলুপ্ত করা। এবং ভূলিয়ে দেওয়া ইসলামি মৌল শিক্ষাকে। তেমন এক স্ট্রাটেজী নিয়ে ব্রিটিশগণ ভারতে আলিয়া মাদ্রাসা খুলেছিল। ধর্ম-শিক্ষার ছ্দ্দবেশে মুসলমানদের দৃষ্টি থেকে তারা আড়াল করেছে জিহাদের ন্যায় ইসলামের মূল শিক্ষাকে। ফলে নিরাপদ হয়েছিল তাদের ১৯০ বছেরের শাসন। ইসলামে বিরুদ্ধে সে সফল স্ট্রাটেজী নিয়ে তারা আবার ময়দানে নেমেছে বাংলাদেশে। এখন সে কাজে বাংলাদেশে ব্যবহার করতে চায় জনগণের নিজ অর্থে প্রতিষ্ঠিত হাজার হাজার স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন সেক্যিউলারিষ্টদের সহায়তায় ইতিমধ্যই এখন এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাদের হাতে অধিকৃত। অধিকৃত দেশের অধিকাংশ মিডিয়াও। তারা শুরু হয়েছে ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যাপক মিথ্যা-প্রপাগান্ডা। বলতে চায়, ইসলাম এ যুগে অচল। যেন ইসলাম শুধু নবীজী (সাঃ)র জামানার লোকদের জন্যই নাযিল হয়েছিল। তারা শরিয়তকে বলছে মানবতা বিরোধী। সে প্রপাগান্ডাকে ব্যাপকতর করতে বহু টিভি চ্যানেল, অসংখ্য পত্র-পত্রিকার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠা করেছে হাজার হাজার এনজিও। এদের সম্মিলিত প্রচেষ্ঠা হলো, নবীজী (সাঃ)র আমলের ইসলামকে জনগণের মন থেকে ভূলিয়ে দেওয়া। অথচ ইসলাম থেকে নামায-রোযাকে যেমন আলাদা করা যায় না, তেমনি আলাদা করা যায় না জিহাদকেও। পবিত্র কোরআনে জিহাদে অংশ নেওয়ার নির্দেশ এসেছে বার বার। সে সব জিহাদে অর্ধেকের বেশী সাহাবা শহীদ হয়েছেন। নবীজী (সাঃ) নিজে রক্তাক্ষয়ী বহুযুদ্ধ লড়েছেন বহুবার। ইসলামের বহু শত্রুকে হত্যা এবং বনু কুরাইজা ও বনু নাযির ন্যায় ইহুদী বস্তিকে নির্মূল করা হয়েছে তাঁরই নির্দেশে। অথচ নবীজী (সাঃ)র সে আপোষহীন নীতি ও ইসলামের সে সংগ্রামী ইতিহাসকে তারা সুপরিকল্পিত ভাবে আড়াল করতে চায়। নামায-রোযা, হজ-যাকাতের বাইরেও শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি, প্রশাসন, প্রতিরক্ষা ও আইন-আদলতের সংস্কারে ঈমানদারের যে গুরুতর দায়ভার রয়েছে সেটিকেও ভূলিয়ে দিতে চায়।

ইসলামের আক্বিদা-বিশ্বাস ও জিহাদী সংস্কৃতি আজ এভাবেই দেশে দেশে শত্রুপক্ষের হামলার শিকার। তাদের লক্ষ্য, মহান আল্লাহর কোরআনী নির্দেশের বিরুদ্ধে মুসলমানদেরকে বিদ্রোহী করা। বাংলাদেশের মুসলমানদের জন্য বিপদের কারণ হলো, এরূপ হামলার মুখে দেশটির ভৌগলিক সীমান্তের ন্যায় সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক সীমান্ত আজ অরক্ষিত। অথচ মুসলমানদের দায়িত্ব শুধু দেশের সীমান্ত পাহারা দেওয়া নয়। বরং অতিগুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো, চেতনার রাজ্য পাহারা দেওয়া। এবং সেটি সুস্থ্য ঈমান-আক্বিদা ও ইসলামি সংস্কৃতি গড়ে তোলার স্বার্থে। সীমান্ত পাহারায় অবহেলা হলে অনিবার্য হয় পরাজয় ও গোলামী। তখন বিপন্ন হয় জানমাল ও ইজ্জত-আবরু। যেমনটি ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে হয়েছিল। সে পরাজয়ের ফলেই মুসলমানদের জীবনে নেমে এসেছিল ১৯০ বছরের ঔপনিবেশিক শাসনের দাসত্ব। আর সামরিক ও রাজনৈতিক পরাজয় একাকী আসে না। আসে অর্থনৈতিক দুর্গতি,আসে দুর্ভিক্ষ। তাই পলাশীর পরাজয়ের পর এসেছিল ছিয়াত্তরের মনত্ত্বর। সে দুর্ভিক্ষে বাংলার বহু লক্ষ মানুষ মারা গিয়েছিল, যার অধিকাংশই ছিল মুসলমান। একই ভাবে নেমে এসিছিল ১৯৭৪য়ের দুর্ভিক্ষ। একই রূপ ভয়ানক পরিণতি নেমে আসে সাংস্কৃতিক যুদ্ধে পরাজিত হলে। তখন অসম্ভব হয় সুস্থ্য ঈমান-আক্বিদা নিয়ে বেড়ে উঠা। আর মুসলমানের কাছে জানমালের চেয়ে ঈমান ও আক্বিদার গুরুত্ব কি কম? ঈমান নিয়ে বাঁচা অসম্ভব হলে পণ্ড হয় সমগ্র জীবনের বাঁচাটাই। তখন অনিবার্য করে জাহান্নামের আযাব।

 

শ্রেষ্ঠ জিহাদ

ভৌগলিক সীমান্তকে সুরক্ষিত করার চেয়েও তাই গুরুত্বপূর্ণ হলো ঈমান-আক্বিদার সীমান্তকে সুরক্ষিত করা। শয়তানী শক্তির সবচেয়ে বিনাশী হামলা হয় চেতনার এ মানচিত্রে। এটি অধিকৃত হলে দেশ দখল অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। প্রতিটি ঈমানদারকে তাই সে হামলার বিরুদ্ধে লাগাতর জিহাদ করতে হয়। সশস্ত্র যুদ্ধের রণাঙ্গন থেকে অন্ধ-বধির বা পঙ্গু ব্যক্তির নিষ্কৃতি আছে। কিন্তু চেতনার মানচিত্রে শয়তানী শক্তির আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক হামলার বিরুদ্ধে যে লাগাতর জিহাদ তা থেকে সামান্য ক্ষণের নিষ্কৃতি নেই। এ জিহাদকেই ইসলামে ‌জিহাদে আকবর বা শ্রেষ্ঠ জিহাদ বলা হয়েছে। রাজনৈতিক বা সামরিক ক্ষেত্রের লড়াইটি আসে তার পরে। বদর, ওহুদ ও খন্দকের যুদ্ধের আগে তেরটি বছর ধরে এ জিহাদ লাগাতর চলেছে মক্কায়। মুসলমানের চেতনা রাজ্যের ময়দানকে সুরক্ষিত রাখার স্বার্থেই অপরিহার্য হলো মুসলিম ভূমির ভৌগলিক মানিচিত্রকে সুরক্ষিত করা।

শুধু ঘরবাঁধা, চাষাবাদ করা বা কলকারখানা গড়াই একটি জনগোষ্টির বেঁচে থাকার জন্য সবকিছু নয়। শুধু পনাহারে জীবন বাঁচে বটে, তাতে ঈমান বাঁচে না। এমন বাঁচার মধ্য দিয়ে সিরাতুল মোস্তাকিমও জোটে না। তখন যা জুটে তা হলো পথভ্রষ্টতা। সে পথভ্রষ্টতায় বিপদাপন্ন হয় আখেরাতের জীবন। ইহকাল ও পরকাল বাঁচাতে এজন্যই একজন চিন্তাশীল মানুষকে বেড়ে উঠতে হয় জীবন-বিধান, মূল্যবোধ, জীবন ও জগত নিয়ে একটি সঠিক ধারণা নিয়ে। মুসলমানের কাছে সে জীবন-বিধান হলো ইসলাম। আর নিত্য দিনের বাঁচবার সে প্রক্রিয়া হলো ইসলামী সংস্কৃতি। নামায-রোযা, হজ-যাকাত এবং জিহাদ হলো একজন ঈমানদারের ইবাদতের প্রক্রিয়া। আর সংস্কৃতি হলো এ জগতে বাঁচবার বা জীবনধারনের প্রক্রিয়া। ইসলামি পরিভাষায় এ প্রক্রিয়া হলো তাহজিব। আরবী ভাষায় তাহজিবের অর্থ হলো,ব্যক্তির কর্ম,রুচী, আচার-আচারণ, পোষাক-পরিচ্ছদ ও সার্বিক জীবন যাপনের প্রক্রিয়ায় পরিশুদ্ধি করণের প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মানুষ রিফাইনড হয় তথা সুন্দরতম হয়। দিন দিন সুন্দরতম হয় তার রুচীবোধ, আচার-আচরণ, কাজকর্ম ও চরিত্র। তাই মুসলমানের ইবাদত ও সংস্কৃতি -এ দুটোকে পৃথক করা যায় না। উভয়ের মধ্যেই প্রকাশ পায় আল্লাহতায়ালার কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়া গভীর প্রেরণা ও প্রচেষ্টা। পাখি যেমন তার দুটো ডানার একটিকে হারালে উড়তে পারে না, ঈমানদারও তেমনি আল্লাহর ইবাদত ও ইসলামী সংস্কৃতিও একটি হারালে মুসলমান রূপে বেড়ে উঠতে পারে না। তাই মুসলমানগণ যেখানে রাষ্ট্র গড়েছে সেখানে শুধু মসজিদ-মাদ্রাসাই গড়েনি, ইসলামি সংস্কৃতিও গড়েছে। একটির পরিশুদ্ধি ও শক্তি আসে অপরটি থেকে। মোমেনের মূল্যবোধ, রুচী্বোধ, পানাহার, পোষাকপরিচ্ছদ, অপরের প্রতি ভালবাসার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় তার আল্লাহভীরুতা। অন্যের কল্যাণে সচেষ্ট হয় স্বার্থ চেতনায় নয়, বরং আল্লাহর কাছে প্রিয়তর হওয়ার চেতনায়। এ হলো তার সংস্কৃতি। এমন সংস্কৃতি থেকে সে পায় ইবাদতের স্পিরিট। ঈমানদারে চিন্তুা ও কর্মে এভাবেই আসে পবিত্রতা -যা একজন কাফের বা মোনাফিকের জীবনে কল্পনাও করা যায় না। মুসলিম সমাজে এভাবেই আসে শান্তি, শৃঙ্খলা ও শ্লিলতা। অথচ সেক্যুলার সমাজে সেটি আসে না। সেক্যুলার সমাজে যেটি প্রবলতর হয় সেটি পার্থিব স্বার্থ হাসিলের প্রেরণা। মানুষ এখানে জীবনের উপভোগে স্বেচ্ছাচারি হয়। সে স্বেচ্ছারকে তারা ব্যক্তি-স্বাধীনতার লেবাস পড়িয়ে জায়েজ করে নিতে চায়। সেক্যুলার সমাজে পতিতাবৃত্তি, ব্যভিচার, সমকামিতা, অশ্লিলতা, মদ্যপাণের ন্যায় নানাবিধ পাপাচার বৈধ্যতা পায় তো জীবন উপভোগের এমন স্বেচ্ছাচারি প্রেরণা থেকেই। ফলে সেক্যিউলারিজম যেখানে প্রবলতর হয় সেখানে পাপাচারেও প্লাবন আসে।

মুসলমান ইবাদতে প্রেরণাও পায় তার সংস্কৃতি থেকে। ফলে স্কুল-কলেজ বা মাদ্রাসায় না গিয়েও মুসলিম সমাজে বসবাসকারি যুবক তাই মসজিদে যায়,নামায পড়ে,রোযা রাখে এবং মানুষের কল্যাণ সাধ্যমত চেষ্টাও করে। সীমান্তের প্রতিরক্ষায় বা শরিয়তের প্রতিষ্ঠায় জিহাদের ময়দানেও হাজির হয়। একাজে শুধু শ্রম-সময়-মেধা নয়, জানমালের কোরবানীও দেয়। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বা মাদ্রাসার ডিগ্রিধারি না হয়েও নিজেকে বাঁচায় বেপর্দা,ব্যাভিচার,অশ্লিলতা,চুরি-ডাকাতি,সন্ত্রাস-কর্ম ও নানা বিধ পাপাচার থেকে। প্রাথমিক কালের মুসলমানগণ যে মানব-ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সভ্যতার জন্ম দিতে পেরেছিলেন সেটি এজন্য নয় যে সেদিন বড় বড় কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বা মাদ্রাসা ছিল। বরং তখন প্রতিটি ঘর পরিণত হয়েছিল শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠান। সমগ্র রাষ্ট্র জুড়ে গড়ে উঠেছিল ইসলামী সংস্কৃতির বিশুদ্ধকরণ প্রক্রিয়া। সে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সেদিনের মুসলমানেরা উন্নত মানব রূপে বেড়ে উঠতে পেরেছিলেন।

 

অধিকৃত শিক্ষা ও সংস্কৃতির ভূমি

বাংলাদেশের ন্যায় অধিকাংশ মুসলিম দেশের আজকের বড় সমস্যা এ নয় যে, দেশগুলি অধিকৃত হয়েছে। বরং সবচেয়ে বড় সমস্যা এবং সে সাথে ভয়ানক বিপদের কারণ হলো,দেশগুলির সাংস্কৃতিক সীমান্ত বিলুপ্ত হয়েছে এবং তা অধিকৃত হয়েছে ইসলামের শত্রুপক্ষের দ্বারা। দেশের সীমান্ত বিলুপ্ত না হলেও মুসলিম দেশগুলির সংস্কৃতির ময়দান শত্রু পক্ষের দখলে গেছে। ফলে এদেশগুলিতেও তাই হচ্ছে যা কাফের কবলিত একটি দেশে হয়ে থাকে। মুসলিম দেশের সংস্কৃতিও পরিনত হয়েছে মানুষকে আল্লাহর অবাধ্য রূপে গড়া তোলার ইন্সটিটিউশনে। এর ফলে বাংলাদেশের হাজার হাজার মুসলিম সন্তান মসজিদে না গিয়ে হিন্দুদের ন্যায় মঙ্গলপ্রদীপ হাতে নিয়ে শোভাযাত্রা করছে। কপালে তীলক পড়ছে,থার্টি ফাষ্ট নাইটে অশ্লিল নাচগানও করছে। এরাই শয়তানের পক্ষে লড়াকু সৈনিক, তাদের  যুদ্ধাংদেহী রূপ শরিয়তের প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে।

ব্যক্তির জীবনে প্রতিটি পাপ, প্রতিটি দুর্বৃত্তি, আল্লাহর হুকুমের প্রতিটি অবাধ্যতাই হলো আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। সে বিদ্রোহ ও অবাধ্যতা প্রকাশ পায় বেপর্দা, ব্যাভিচার, অশ্লিলতা, নাচগান, মদ্যপান, মাদকাশক্তি,সন্ত্রাস, দূর্নীতি ইত্যাদীর ব্যাপক বৃদ্ধিতে। জাতীয় জীবনে সেটি প্রকাশ পায় দেশে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা, সূদমূক্ত ব্যাংক ও অর্থনীতি প্রতিষ্ঠিত না হওয়ার মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের মত একটি মুসলিম দেশ আল্লাহর বিরুদ্ধে সে বিদ্রোহে সমগ্র বিশ্বমাঝে একবার নয়, ৫ বার শিরোপে পেয়েছে। তাদের সে মহাবিদ্রোহটি ঘটেছে আল্লাহর নির্দেশিত সুনীতি প্রতিষ্ঠার হুকুমের অবাধ্যতা এবং সর্বস্তরে দূর্নীতি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। এরূপ শিরোপা লাভই কি বলে দেয় না দেশটির মানুষের জীবনযাত্রার প্রক্রিয়া তথা সংস্কৃতি কতটা অসুস্থ্য ও বিদ্রোহাত্মক? এবং সাংস্কৃতিক যুদ্ধে ইসলামের পক্ষের শক্তি কতটা পরাজিত?

ব্যক্তির সংস্কৃতির পরিচয় মেলে পোষাক-পরিচ্ছদ বা পানাহার থেকে নয়। বরং কীরূপ দর্শন বা চেতনা নিয়ে সে বাঁচলো তা থেকে। সংস্কৃতির মূল উপাদান হলো এই দর্শন। বস্তুত দর্শনই মানুষকে পশু থেকে পৃথক করে। নাচগান তো পশুপাখিও করে। কিন্তু তাতে কোন দর্শন থাকে না। তাই পশুপাখির নাচে-গানে কোন সমাজই সভ্যতর হয় না,সেখানে সভ্যতাও নির্মিত হয় না। তাই যে সমাজের সংস্কৃতি যতটা দর্শন-শূন্য সমাজ ততটাই মানবতা বর্জিত। সে সমাজ তখন ধাবিত হয় পশুত্বের দিকে। দর্শনই নির্ধারণ করে দেয় কে কীভাবে বাঁচবে, কীভাবে পানাহার করবে, কীভাবে জীবন যাপন করবে বা উৎসব করবে সেটি। চেতনার এ ভিন্নতার কারণেই একজন পতিতা, ঘুষখোর,সন্ত্রাসী এবং দুর্বৃত্তের বাঁচার ধরণ,পোষাক-পরিচ্ছদ, পানাহার ও উৎসবের ধরণ ঈমানদারের মত হয় না। মুসলমানের সংস্কৃতি এজন্যই অবিশ্বাসী বা কাফেরের সংস্কৃতি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। একটি বিশেষ বিশ্বাস বা দর্শন জন্ম দেয় একটি বিশেষ রুচী ও সে রুচীভিত্তিক অভ্যাস। সে অভ্যাসের কারণেই ব্যক্তি বেড়ে উঠে সে সংস্কৃতির মানুষ রূপে। সংস্কৃতি এভাবেই সমাজে নীরবে কাজ করে। মুসলিম সমাজ থেকে সৎ নামাযী ও রোযাদারের পাশাপাশী আপোষহীন মোজাহিদ বের হয়ে আসে তা তো সংস্কৃতির সে ইন্সটিটিউশন সক্রিয় থাকার কারণেই। যেখানে সেটি নেই, বুঝতে হবে সেখানে সে পূণ্যময় সংস্কৃতিও নাই।

মুসলমানদের শক্তির মূল উৎস তেল-গ্যাস নয়, জনশক্তিও নয়। সে শক্তি হলো কোরআন ভিত্তিক দর্শন ও সে দর্শন-ভিত্তিক সংস্কৃতি। এজন্যই শত্রুপক্ষের আগ্রাসনের শিকার শুধু মুসলিম দেশের ভূগোল নয়, বরং মূল টার্গেট হলো ইসলামি দর্শন ও সংস্কৃতি। তাই পাশ্চাত্য শক্তিবর্গ বাংলাদেশের মত দেশে বোমা বা যুদ্ধ বিমান নিয়ে হাজির হয়নি। হাজির হয়েছে সাংস্কৃতিক প্রকল্প নিয়ে। বাংলাদেশের হাজার হাজার এনজিওর উপর দায়িত্ব পড়েছে সে প্রকল্পকে কার্যকর করা। দেশের সংস্কৃতিকে তারা এভাবে ইসলামের শিক্ষা ও দর্শন থেকে মূ্ক্ত করতে চাচ্ছে। রাস্তায় মাটি কাটা ও তূত গাছ পাহাড়া দেওয়াকে মহিলার ক্ষমতায়ন বলে এসব এনজিওগুলো তাদেরকে বেপর্দা হতে বাধ্য করছে। অপর দিকে মাইক্রোক্রেডিটের নামে সাধারণ মানুষকে সূদ দিতে ও সূদ খেতেও অভ্যস্থ করছে। অথচ সূদ খাওয়া বা সূদ দেওয়া –উভয়ই হলো আল্লাহতায়ালার বিধানের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট বিদ্রোহ। ডক্টর ইউনুসকে পাশ্চাত্য মহল নোবেল প্রাইজ দিয়েছে। সেটি এজন্য নয় যে, বাংলাদেশ থেকে তিনি দারিদ্র্য নির্মূল করেছেন। বরং দেশে যতই বাড়ছে গ্রামীন ব্যাংক, ব্রাক বা সূদ ভিত্তিক মাইক্রোক্রেডিট এনজিওর শাখা ততই বাড়ছে দারিদ্র্য। ডক্টর ইউনুস নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন এজন্য যে, আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে বিদ্রোহ করতে তিনি অসামান্য সাফল্য দেখিয়েছেন। এত বড় সাফল্য ইংরেজগণ তাদের ১৯০ বছরের শাসনেও অর্জন করতে পারিনি। ফলে শুধু নোবেল পুরস্কার নয়, এর চেয়ে কোন বড় পুরস্কার থাকলেও তারা তাকে দিত।

 

লক্ষ্য ইসলামি সংস্কৃতির নির্মূল

ইসলাম ও মুসলমানের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী কোয়ালিশনের মূল এজেন্ডাটি কি সেটি বুঝা যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের আফগানিস্তান দখল ও সেখানে চলমান কার্যক্রম থেকে। পাশ্চাত্য শক্তিবর্গ সেখানে মুসলিম সংস্কৃতির বিনাশে হাত দিয়েছে। আফগানিস্তানের অপরাধ, অতীতে দেশটির জনগণ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও সোভিয়েত সাম্রাজ্যবাদের ন্যায় দুটি বিশ্বশক্তিকে পরাজিত করেছে। এবং সেটি কোন জনশক্তি, সামরিক শক্তি বা অর্থনৈতিক শক্তির বলে নয়, বরং ইসলামি দর্শন ও সে দর্শন-নির্ভর আপোষহীন জিহাদী সংস্কৃতির কারণে। সে অভিন্ন দর্শন ও দর্শনভিত্তিক সংস্কৃতির বলেই তারা আজ  মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার মিত্রদের পরাজিত করতে চলেছে। ফলে পাশ্চাত্য শক্তিবর্গ সে দর্শন ও সে দর্শন-ভিত্তিক সংস্কৃতির নির্মূলে করতে চায়। এবং সে বিনাশী কর্মের পাশাপাশি বিপুল বিণিয়োগ করছে সেদেশে সেক্যুলার দর্শন ও সেক্যুলার সংস্কৃতির নির্মানে। এটিকে তারা বলছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বা অবকাঠামোর নির্মান। পরিকল্পিত ভাবে গড়ে তুলছে অসংখ্য সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। আফগানিস্তানের শিশুরা এখনও নানা রোগভোগে লাখে লাখে মারা যাচ্ছে। কিন্তু তা থেকে বাঁচানোয় আগ্রহ তাদের নেই, অথচ শত শত মিলিয়ন ডলার খরচ করছে তাদের নাচগান শেখাতে।

বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মিশরের মত দেশে অতীতে একই রূপ স্ট্রাটেজী নিয়ে কাজ করেছিল ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকেরা। এদেশগুলির উপর তাদের দীর্ঘ শাসনমামলে তেমন কোন শিল্প কলকারখানা বা প্রযুক্তি গড়ে না উঠলেও তারা সে সব দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে সেক্যুলার করেছিল। ফলে এনেছে সাংস্কৃতিক জীবনে প্রচন্ড বিচ্যুতি ও বিভ্রান্তি। সেক্যুলারলিজমের অভিধানিক অর্থ হলো ইহজাগতিকতা। সেক্যুলারিজমের অর্থ, ব্যক্তি তার কাজ-কর্ম, অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে প্রেরণা পাবে ইহজাগতিক আনন্দ-উপভোগের তাগিদ থেকে, ধর্ম থেকে নয়। এ উপভোগ বাড়াতেই সে নাচবে, গাইবে, বেপর্দা হবে, অশ্লিল নাটক ও ছায়াছবি দেখবে। মদ্যপান করবে এবং ব্যাভিচারিতেও লিপ্ত হবে। উপার্জন বাড়াতে সে সূদ খাবে এবং ঘুষও খাবে। এগুলো ছাড়া তাদের এ পার্থিব জীবন আনন্দময় হয় কি করে? তাই সেক্যিউলারিজম বাড়লে এগুলো বাড়বে অনিবার্য কারণেই। অপর দিকে ধর্মপালনকে বলেছে মৌলবাদী পশ্চাদ-পদতা ও গোঁড়ামী।

মুসলিম দেশে এমন চেতনা ও সংস্কৃতি বিলুপ্ত হলে বিলুপ্ত হয় জনগণের মন থেকে আল্লাহতায়ালার ভয়। মুসলমানগণ তখন ভূলে যায় নিজেদের ঈমানী দায়বদ্ধতা। বরং বাড়ে মহান আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। ফলে বাংলাদেশ, মিশর, পাকিস্তান বা তুরস্কের মত দেশে আল্লাহর আইন তথা শরিয়ত প্রতিষ্ঠা রুখতে কোন কাফেরকে অস্ত্র ধরতে হয়নি। সেকাজের জন্য বরং মুসলিম নামধারি সেক্যুলারগণই যথেষ্ঠ করিৎকর্মা প্রমাণিত হয়েছে। ইসলামের জাগরণ ও মুসলিম শক্তির উত্থান রুখার লক্ষ্যে আজও দেশে দেশে পাশ্চত্যের অনুগত দাস গড়ে তোলার এটিই সফল মডেল। মার্কিন দখলদার বাহিনী সেটিরই বাস্তবায়ন করছে আফগানিস্তানে। এ স্ট্রাটেজীক কৌশলটির পারঙ্গমতা নিয়ে ব্রিটিশ শাসকচক্রের মনে কোন রূপ সন্দেহ ছিল না। যেখানে অধিকার জমিয়েছে সেখানেই এরূপ সেক্যুলারদেরকেই সযত্নে গড়ে তুলেছে। তাদের সংখ্যা পর্যাপ্ত সংখ্যায় বাড়াতে যেখানে দেরী হয়েছে সেদেশের স্বাধীনতা দিতেও তারা বিলম্ব করেছে। সে ব্রিটিশ পলিসির পরিচয়টি মেলে মিশরে ব্রিটিশ শাসনের প্রতিনিধি লর্ড ক্রোমারের লেখা থেকে। তিনি লিথেছেন,“কোন ব্রিটিশ উপনিবেশকে স্বাধীনতা দেওয়ার প্রশ্নই উঠেনা যতক্ষণ না সে দেশে এমন এক সেক্যুলার শ্রেণী গড়ে না উঠে যারা চিন্তা-চেতনায় হবে ব্রিটিশের অনুরূপ।” ব্রিটিশ পলিসি যে এক্ষেত্রে কতটা ফলপ্রসু হয়েছে তার প্রমাণ মিলে বাংলাদেশের মত সাবেক ব্রিটিশ উপনিবেশগুলোর প্রশাসন, রাজনীতি, সেনাবাহিনী ও বিচার ব্যবস্থায় সেক্যুলার ব্যক্তিদের প্রবল আধিপত্য দেখে। আজও আইন-আদালতে ব্রিটেশের প্রবর্তিত পেনাল কোড। বাংলাদেশের সেক্যুলার সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাগণ মুসলিম দেশের জনগণের রাজস্বের অর্থে প্রতিপালিত হলে কি হবে, দেশে যারা শরিয়ত বা আল্লাহর আইনের প্রতিষ্ঠা চায় তাদেরকে তারা ব্রিটিশদের ন্যায়ই শত্রু মনে করে। আর বিশ্বস্থ্য আপনজন মনে করে ভিন্ দেশী কাফেরদের। এদের কারণেই মুসলিম দেশে হামিদ কারজাইয়ের মত দাস পেতে ইসলারেম শত্রুপক্ষের কোন বেগ পেতে হয় না।

 

বিদ্রোহী করা হচ্ছে সংস্কৃতির নামে

ইসলামি দর্শন থেকে দূরে সরানো এবং মগজে সেক্যুলার চেতনার পরিচর্যাকে তীব্রতর করার লক্ষ্যে বাংলাদেশের মত দেশে সেক্যুলার দিনক্ষণকে ইতিহাস থেকে খুঁজে বের করে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দিচ্ছে। এরই উদাহরণ, বাংলাদেশের মত দেশে বসন্তবরণ বা নববর্ষের দিন উদযাপন। নবীজীর হাদীস, মুসলমানের জীবনে বছরে মাত্র দুটি উৎসব। একটি ঈদুল ফিতর, এবং অপরটি ঈদুল আদহা বা কোরবানীর ঈদ। বাংলার মুসলমানগণ এ দুটো দিনই এতদিন ধুমধামে উদযাপন করে আসছে। বাংলার মুসলমানদের জীবনে নববর্ষের উৎসব কোন কালেই গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।

নিজ-জীবন নিয়ে একজন মুসলমানের মূল্যায়ন আসে মহান আল্লাহর মূল্যায়ন থেকে। এ বিষয়ে মহান আল্লাহর নিজস্ব ঘোষণাটি হলো,“তিনিই (মহান আল্লাহতায়ালা) জীবন ও মৃত্যুকে সৃষ্টি করেছেন যেন পরীক্ষা করতে পারেন তোমাদের মধ্যে কে কর্মে উত্তম।” -সুরা মুলুক। অর্থাৎ মানুষের জন্য এ পার্থিব জীবন পরীক্ষা-কেন্দ্র মাত্র। পরীক্ষা দিতে বসে কেউ কি নাচগান করে? উৎসবে যোগ দেয়? নাচগান বা উৎসবের আয়োজন তো পরীক্ষায় মনযোগী হওয়াই অসম্ভব করে তোলে। নবীজীর হাদীস,“পানি যেমন শস্য উৎপাদন করে,গানও তেমনি মুনাফেকি উৎপন্ন করে।” মুনাফেকী তো ইসলামে অঙ্গিকার শূন্যতা,ঈমানের সাথে তার আমলের গড়মিল। তাই প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের হাতে মুসলমানদের শক্তি ও মর্যাদা বাড়লেও নাচগান বাড়েনি। সংস্কৃতির নামে এগুলো শুরু হলে যেটি বাড়ে তা হলো পথভ্রষ্টতা। তখন সিরাতুল মোস্তাকিমে পথচলাই অসম্ভব হয়ে উঠে। তাই এগুলো শয়তানের স্ট্রাটেজী হতে পারে,কোন মুসলমানের নয়।

নতুন বছর, নতুন মাস, নতুন দিন নবীজী(সাঃ)র আমলেও ছিল। কিন্তু তা নিয়ে তিনি নিজে যেমন কোনদিন উৎসব করেননি, সাহাবাগণও করেননি। অথচ তারাই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা ও সংস্কৃতি গড়তে পেরেছিলেন। নবীজী (সাঃ) ও সাহাবাগান এ ব্যাপারে অতিশয় মনযোগী ছিলেন যেন শিক্ষা ও সংস্কৃতির নামে সমাজ বা রাষ্ট্রে এমন কিছুর চর্চা না হয় যাতে সিরাতুল মোস্তাকিমে চলাই অসম্ভব হয়। এবং মনযোগে ছেদ পড়ে ধর্মের পথে পথচলায়। ড্রাইভিং সিটে বসে নাচগানে মত্ত হলে সঠিক ভাবে গাড়ী চালানো যায়? এতে বিচ্যুতি ও বিপদ তো অনিবার্য। অবিকল সেটি ঘটে জীবন চালোনার ক্ষেত্রেও। নবীজী(সাঃ)র আমলে সংস্কৃতির নামে আনন্দ উপভোগের প্রতি এত আকর্ষণ ছিল না বলেই সিরাতুল মোস্তাকিমে চলা তাদের জন্য সহজতর হয়েছিল। বরং তারা জন্ম দিয়েছিলেন মানব-ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম সংস্কৃতির। সে সংস্কৃতির প্রভাবে একজন ভৃত্যও খলিফার সাথে পালাক্রমে উঠের পিঠে চড়েছেন। এবং খলিফা ভৃত্যকে উঠের পিঠে বসিয়ে নিজে রশি ধরে টেনেছেন। সমগ্র মানব ইতিহাসে এর কোন তুলনা  নেই। অথচ বাংলাদেশে আজ সংস্কৃতির নামে কি হচ্ছে? ২০১০ সালে এপ্রিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা নববর্ষের কনসার্টে কী ঘটলো? যৌন ক্ষুধায় অতি উদভ্রান্ত অসংখ্য হায়েনা কি সেদিন নারীদের উপর ঝাপিয়ে পড়িনি? অসংখ্য নারী কি সেদিন লাঞ্ছিত হয়নি? কিছু কাল আগে ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে ব্যান্ড সঙ্গীতের আসরে কী ঘটলো? সেদিন ধর্ষিতা হয়েছিল শত শত নারী। এটিই কি বাঙালী সংস্কৃতি? দেশের সেক্যুলার পক্ষ এমন সংস্কৃতির উৎকর্ষতা চায়?

নববর্ষ উদযাপনের নামে নারী-পুরুষদের মুখে উলকি কেটে বা নানান সাজে একত্রে রাস্তায় নামানোর রীতি কোন মুসলিম সংস্কৃতি নয়। বাঙালীর সংস্কৃতিও নয়। এমনকি বাঙালী হিন্দুদেরও নয়। নববর্ষে নামে বাংলায় বড়জোর কিছু হালখাতার অনুষ্ঠান হতো। কিন্তু কোন কালেই এদিনে কনসার্ট গানের আয়োজন বসেনি। জন্তু-জানোয়ারের প্রতিকৃতি নিয়ে মিছিলও হয়নি। পাশ্চাত্যেও নববর্ষের দিনে এমন উৎসব দিনভর হয় না। বাংলাদেশে এগুলীর এত আগমন ঘটেছে নিছক রাজনৈতিক প্রয়োজনে। যুদ্ধজয়ের লক্ষ্যে অনেক সময় নতুন প্রযুক্তির যুদ্ধাস্ত্র সৈনিকদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। অনেক সময় তাতে বিজয়ও আসে। মুসলমানদের বিরুদ্ধে পরিচালিত এ সাংস্কৃতিক যুদ্ধে সংস্কৃতির নামে এসব অভিনব আয়োজন বাড়ানো হয়েছে তেমনি এক ত্বড়িৎ বিজয়ের লক্ষ্যে। তাদের লক্ষ্য নাচ-গান, কনসার্টের নামে জনগণকে ইসলাম থেকে দূরে সরানো। বিপুল সংখ্যক নারী-পুরুষ নিয়ে নতুন ঢংযের এসব আয়োজন বাড়ানো হয়েছে তেমনি এক ষড়যন্ত্রমূলক প্রয়োজনে। পাশ্চাত্যের যুবক-যুবতীদের ধর্ম থেকে দূরে টানার প্রয়োজন নেই। জন্ম থেকেই তারা ধর্ম থেকে দূরে। নাচগান, মদ, অশ্লিলতা, উলঙ্গতা ও ব্যভিচারের মধ্য দিয়েই তাদের বেড়ে উঠা। তাই নববর্ষের নামে তাদের মাঝে এ সবে অভ্যস্থ করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু সেটির প্রয়োজন রয়েছে বাংলাদেশে। সেটি ধর্ম থেকে ও নিজেদের সংস্কৃতি থেকে দূরে সরানোর লক্ষ্যে। এসবের চর্চা বাড়াতে কাজ করছে প্রচুর দেশী-বিদেশী এনজিও। এমন অনুষ্ঠানে বিপুল অর্থ ব্যয়ও হচ্ছে। এবং সে অর্থ আসছে বিদেশীদের ভান্ডার থেকে। এভাবে নারীপুরুষের অবাধ মেলামেশার পাশপাশি অশ্লিলতারও সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এবং লুপ্ত করা হচেছ ব্যভিচার ও অশ্লিলতাকে ঘৃণা করার অভ্যাস, -যা পাশ্চাত্য থেকে বহু আগেই বিলুপ্ত হয়েছে।

শুধু বাংলাদেশে নয়, অন্যান্য মুসলিম দেশেও এরূপ নববর্ষ পালনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অধিকাংশ পাশ্চাত্য দেশ বিপুল অংকের অর্থ সাহায্য দিচ্ছে। ইরানী-আফগানী-কিরগিজী-কুর্দীদের নওরোজ উৎসবের দিনে প্রেসিডেন্ট ওবামা বিশেষ বানীও দিয়েছে। তবে নববর্ষের নামে বাংলাদেশে ইসলামের শত্রুপক্ষের বিণিয়োগের মাত্রাটি আরো বিচিত্র ও ব্যাপক। এখানে বানী নয়, আসছে বিপুল বিণিয়োগ। কারণ, বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৫ কোটি। আফগানিস্তানের চেয়ে প্রায় ৫ গুণ। জনসংখ্যার ৯০% ভাগ মুসলমান, যাদের আপনজনেররা ছড়িয়ে আছে ব্শ্বিজুড়ে। ফলে এদেশে ইসলামের দর্শন প্রচার পেলে তা ছড়িয়ে পড়বে বিশ্বময়। এ বিশাল জনগণকে ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে সেক্যুলার সংস্কৃতিতে বশ করানো তাদের কাছে তাই অতিগুরুত্বপূর্ণ। তারা চায় এ পৃথিবী একটি মেল্টিং পটে পরিণত হোক। আলু-পটল, পেঁয়াজ-মরিচ যেমন চুলার তাপে কড়াইয়ে একাকার হয়ে যায়, তেমনি বিশ্বের সব সংস্কৃতির মানুষ একক সংস্কৃতির মানুষের পরিণত হোক। এভাবে নির্মিত হোক গ্লোবাল ভিলেজ। আর সে গ্লোবাল ভিলেজের সংস্কৃতি হবে পাশ্চাত্যের সেক্যুলার সংস্কৃতি। এজন্যই বাংলাদেশে নারী-পুরুষকে ভ্যালেন্টাইন ডে, বর্ষপালন,মদ্যপান, অশ্লিল নাচ, পাশ্চাত্য ধাঁচের কনসার্টে অভ্যস্থ করায় এসব এনজিওদের এত আগ্রহ। তারা চায় তাদের সাংস্কৃতিক সীমানা বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশের প্রতি বসতঘরের মধ্যেও বিস্তৃত হোক। তাই বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সীমানা আজ বিলুপ্ত।

 

সামনে আরো বিপদ

সামনে আরো বিপদ। কিন্তু আরো বিপদের কারণ,এতবড় গুরুতর বিষয় নিয়েও জনগণের মাঝে এ নিয়ে ভাবনা নেই। কোন পরিবারে কেউ মৃত্যুশর্যায় পড়লে সে পরিবারে দুশ্চিন্তার অন্ত থাকে না। আর এখন শয্যাশায়ী হলো সমগ্র বাংলাদেশ ও তার সংস্কৃতি। অথচ ক’জন আলেম, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ,শিক্ষাবিদ ও লেখক এ বিষয় নিয়ে উদ্বিগ্ন। ক’জন মুখ খুলেছেন বা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন? ১৭৫৭ সাল থেকে বাংলার মুসলমান কি সামান্যতমও সামনে এগিয়েছে? তখন সে যুদ্ধহীন নীরবরতার মাঝে প্রতিষ্ঠিত পেয়েছিল ব্রিটিশের দখলদারি। অস্তমিত হয়েছিল বাংলার মুসলমানদের স্বাধীনতা। কিন্তু সে পরাধীনতা বিরুদ্ধে কোন জনপদে,কোন গ্রাম-গঞ্জে কোন রূপ প্রতিরোধ বা বিদ্রোহের ধ্বনি উঠেছিল -সে প্রমাণ খুব একটা বেশী নেই। শহীদ তিতুমীর ও মজনু শাহদের সংখ্যা অতি সামান্য। বরং যে যার কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ততা থেকেছে। দেশের স্বাধীনতা নিয়ে কিছু ভাবা বা কিছু করার প্রয়োজনীয়তা কেউ অনুভব করেনি। অথচ শত্রুর হামলার মুখে প্রতিরোধের এ দায়ভার প্রতিটি মুসলমানের। এ কাজ শুধু বেতনভোগী সৈনিকের নয়। প্রতিটি নাগরিকের। ইসলামে এটি জিহাদ। মুসলমানদের গৌরব কালে এজন্য কোন সেনানীবাস ছিল না। প্রতিটি গৃহই ছিল সেনানীবাস। প্রতিটি যুদ্ধে মানুষ স্বেচ্ছায় সেখান থেকে নিজ খরচে যুদ্ধে গিয়ে হাজির হয়েছে। এবং সেখানে অর্থের খরচ, শ্রমের খরচ ও রক্তের পেশ করেছে। অথচ আজ সেনানীবাসের পর সেনানীবাস বেড়েছে অথচ শত্রুর হামলার মুখে কোন প্রতিরোধ নেই। দেশের পর দেশ তাই অধিকৃত। এবং অধিকৃত মুসলিম দেশের সাংস্কৃতিও।

সাংস্কৃতিক সীমানা রক্ষার লড়ায়ে পরাজিত হলে পরাজয় অনিবার্য হয় ঈমান-আক্বীদা রক্ষার লড়ায়েও। কারণ, মুসলমানে ঈমান-আক্বীদা কখন অনৈসলামিক সাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে উঠে না। মাছের জন্য যেমন পানি চাই, ঈমান নিয়ে বাঁচার জন্যও তেমনি ইসলামি রাষ্ট্র ও ইসলামি সংস্কৃতি চাই। মুসলমান তাই শুধু কোরআন পাঠ ও নামায-রোযা আদায় করেনি,ইসলামি রাষ্ট্র এবং সে রাষ্ট্রে শরিয়ত ও ইসলামি সংস্কৃতিরও প্রতিষ্ঠা করেছে। মুসলমানদের অর্থ,রক্ত,সময় ও সামর্থের সবচেয়ে বেশী ভাগ ব্যয় হয়েছে তো ইসলামি রাষ্ট্র ও ইসলামি শিক্ষা-সংস্কৃতির নির্মানে। নামায রোযার পালন তো কাফের দেশেও সম্ভব। কিন্তু ইসলামী শরিয়ত ও ইসলামী সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠা ও পরিচর্যা তথা ইসলামী বিধানের পূর্ণ পালন কি অমুসলিম দেশে সম্ভব? অতীতের ন্যায় আজকের মুসলমানদের উপরও একই দায়ভার। সেটি শুধু কলম-সৈনিকের নয়,প্রতিটি আলেম, প্রতিটি শিক্ষক, প্রতিটি ছাত্র ও প্রতিটি নাগরিকের উপরও। এ লড়ায়ে তাদেরকেও ময়দানে নেমে আসতে হবে। এ লড়াই হতে হবে কোরআনী জ্ঞানের তরবারী দ্বারা। নবীজী (সাঃ)র যুগে সেটিই হয়েছে। ইসলামে জ্ঞানার্জনকে এজন্যই নামায-রোযার আগে ফরয করা হয়েছে। কিন্তু সে ফরয পালনের আয়োজনই বা কোথায়? অনেকেই জ্ঞানার্জন করছেন নিছক রুটিরুজির তালাশে। ফরয আদায়ের লক্ষে নয়। প্রচন্ড শূণ্যতা ও বিচ্যুতি রয়েছে জ্ঞানার্জনের নিয়তেই। ফলে সে জ্ঞানচর্চায় তাদের রুটি-রুজী জুটছে ঠিকই, কিন্তু সে জ্ঞানার্জনে ফরয আদায় হচ্ছে না। এবং জিহাদের ময়দানে বাড়ছে না লোকবল। বাংলাদেশের মুসলমানদের জন্য এটি এক বিপদজনক দিক। আগ্রাসী শত্রুর হামলার মুখে অরক্ষিত শুধু দেশটির রাজনৈতিক সীমান্তুই নয়,বরং প্রচন্ড ভাবে অরক্ষিত দেশের সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক সীমান্তও। দেশ তাই দ্রুত ধেয়ে চলেছে সর্বমুখি পরাজয় ও প্রচন্ড বিপর্যের দিকে। (নতুন সংস্করণঃ ৯/০৬/১৩)