আগ্রাসনের ভারতীয় স্ট্রাটেজী এবং অরক্ষিত বাংলাদেশ

লক্ষ্যঃ স্বার্থ শিকার

একাত্তরের পর থেকে বাংলাদেশের ভূমি, সম্পদ ও জনগণ যে কতটা অরক্ষিত সেটি বুঝতে কি প্রমানের প্রয়োজন আছে? ২৩ বছরের পাকিস্তান আমলে যে দাবীগুলো ভারতীয় নেতাগণ মুখে আনতে সাহস পায়নি সেগুলি মুজিবামলে আদায় করে ছেড়েছে। পাকিস্তান আমলে তারা বেরুবাড়ির দাবী করেনি, কিন্তু একাত্তরে শুধু দাবিই করেনি, ছিনিয়েও নিয়েছে। এবং সেটি মুজিবের হাত দিয়ে। প্রতিদানে কথা ছিল তিন বিঘা করিডোর বাংলাদেশকে দিবে। কিন্তু ভারত সেটি দেয়নি। বরং আঙরপোতা, দহগ্রামের ন্যায় বহু বাংলাদেশী ছিটমহল এখনও ভারতের কাছে জিম্মি। ভারত সেগুলিতে যাওয়ার করিডোর দিতে গড়িমসি করলে কি হবে, এখন জোরে সোরে চায় বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে করিডোর, যা দিয়ে তারা পূর্ব ভারতের প্রদেশগুলিতে যাবে। এটি চাইছে প্রতিবেশীর প্রতি পারস্পরিক সহযোগিতার দোহাই দিয়ে। অথচ এমন সহযোগিতা কোন কালেই তারা প্রতিবেশীকে দেয়নি। ষাটের দশকে পাকিস্তান সরকার তার পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের সাথে যোগাযোগের স্বার্থে করিডোর চেয়েছিল। সেটিকে তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী জওয়ারলাল নেহেরু একটি অদ্ভুদ দেশের অদ্ভুত আব্দার বলে মস্করা করেছিলেন। বলেছিলেন, ভারতের নিরাপত্তার প্রতি এমন ট্রানজিট হবে মারাত্মক হুমকি। শুধু তাই নয়, একাত্তরে ভারতীয় ভূমির উপর দিয়ে তৎকালীন পাকিস্তানের পিআইয়ের বেসামরিক বাণিজ্য বিমান উড়তে দেয়নি। এমন কি শ্রীলংকার উপর চাপ দিয়েছিল যাতে পাকিস্তানী বেসামরিক বিমানকে কোন জ্বালানী তেল না দেয়। বাংলাদেশের সাথেই কি আচরন ভিন্নতর? একাত্তরের যুদ্ধে চট্টগ্রাম বন্দরে কয়েকটি জাহাজ ডুবিয়ে দেয়া হয়। ফলে গুরুতর ব্যাঘাত ঘটছিল বন্দরে মালামাল বোঝাই ও উত্তোলনের কাজে। এতে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি প্রচন্ড ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। দেশে তখন দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি। ছিল নিতান্তই দুঃসময়। বাংলাদেশের জন্য চট্রগ্রাম বন্দরটিই ছিল মূল বন্দর। এমন দুঃসময়ে অন্য কেউ নয়, ভারতের অতি বন্ধুভাজন শেখ মুজিব অনুমতি চেয়েছিলেন অন্ততঃ ৬ মাসের জন্য কোলকাতার বন্দর ব্যবহারের। তখন ভারত সরকার জবাবে বলেছিল ৬ মাস কেন ৬ ঘন্টার জন্যও বাংলাদেশকে এ সুবিধা দেয়া যাবে না। এটিকেও নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করেছিল। প্রতিবেশী সুলভ সহযোগিতার বুলি তখন নর্দমায় স্থান পেয়েছিল। এমনকি শেখ মুজিবকেও ভারত আজ্ঞাবহ এক সেবাদাস ভৃত্যের চেয়ে বেশী কিছু ভাবেনি। ভৃত্যকে দিয়ে ইচ্ছামত কাজ করিয়ে নেওয়া যায়, কিন্তু তার আব্দারও কি মেনে নেওয়া যায়?

প্রতিবেশীর প্রতি ভারতের এরূপ বৈরী আচরন নিত্যদিনের। প্রতিবেশী নেপাল ও ভূটানের সাথে বাণিজ্য চলাচল সহজতর করার জন্য ১৭ কিলোমিটারের ট্রানজিট চেয়েছিল বাংলাদেশ। নেপাল চেয়েছিল মংলা বন্দর ব্যবহারের লক্ষ্যে ভারতের উপর দিয়ে মালবাহি ট্রাক চলাচলের ট্রানজিট। ভারত সে দাবি মানেনি। অথচ সে ভারতই চায় বাংলাদেশের উপর দিয়ে প্রায় ছয় শত মাইলের ট্রানজিট। ফলে বুঝতে কি বাঁকি থাকে, পারস্পারিক সহযোগিতা বলতে ভারত যেটি বুঝে সেটি হলো যে কোন প্রকারে নিজের সুবিধা আদায়। প্রতিবেশীর সুবিধাদান নয়। কথা হলো, বাংলাদেশের জন্য ১৭ কিলোমিটারের ট্রানজিট যদি ভারতের জন্য নিরাপত্তা-সংকট সৃষ্টি করে তবে সে যুক্তি তো বাংলাদেশের জন্যও খাটে। তাছাড়া বাংলাদেশের নিরাপত্তার বিরুদ্ধে ভারতের সৃষ্ট ষড়যন্ত্র নতুন নয়। ১৯৭৫ সালে মুজিব নিহত হওয়ার পর কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্ব অনেক আওয়ামী লীগ ক্যাডার ভারতে আশ্রয় নেয়। বাংলাদেশের সীমান্তে তারা সন্ত্রাসী হামলাও শুরু করে। তাদের হামলায় বহু বাংলাদেশী নিরীহ নাগরিক নিহতও হয়। ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থাগুলি তাদেরকে যে শুধু অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়েছে তাই নয়, নিজ ভূমিকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ব্যবহারেরও পূর্ণ সুযোগ দিয়েছে। আওয়ামী লীগের টিকেট পিরোজপুর থেকে দুই-দুইবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য চিত্তরঞ্জন সুতার ভারতে গিয়ে স্বাধীন বঙ্গভূমি আন্দোলন গড়ে তুলেছে সত্তরের দশক থেকেই। ভারত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত এসব সন্ত্রাসীদের বাংলাদেশের হাতে তুলে দেয়া দূরে থাক তাদেরকে নিজভূমি ব্যবহারের পূর্ণ সুযোগ দিয়েছে। এসব কি প্রতিবেশী-সুলভ আচরণ? অথচ সে ভারতই দাবি তুলেছে আসামের উলফা নেতাদের ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার। হাসিনা সরকার তাদেরকে ভারতের হাতে তুলেও দিচ্ছে। অথচ কাদের সিদ্দিকী ও চিত্তরঞ্জন সুতারের ন্যায় উলফা নেতাদের ভাগ্যে বাংলাদেশের মাটিতে জামাই আদর জুটেনি। ঘাঁটি নির্মান, সামরিক প্রশিক্ষণ ও বাংলাদেশের ভূমি থেকে প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে হামলা পরিচালনার সুযোগও জুটেনি। বরং জুটেছে জেল।

 

ষড়যন্ত্র ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার

বাংলাদেশের উপর দিয়ে ভারতের করিডোর যে কতটা আত্মঘাতি এবং কিভাবে সেটি বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিনত করবে সে বিষয়টিও ভাববার বিষয়। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব সীমান্ত জুড়ে মেঘালয়, আসাম, ত্রিপুরা, অরুনাচল, মনিপুর, নাগাল্যান্ড ও মিজোরাম -ভারতের এ সাতটি প্রদেশ। এ রাজ্যগুলির জন্য এমন কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট রয়েছে যা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এক). সমগ্র এলাকার আয়তন বাংলাদেশের চেয়েও বৃহৎ অথচ অতি জনবিরল। দুই) সমগ্র এলাকাটিতে হিন্দুরা সংখ্যালঘিষ্ট। ফলে হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ নিয়ে সমগ্র উপমহদেশে যে রাজনৈতিক সংঘাত ও উত্তাপ এ এলাকায় সেটি নেই। ফলে এখানে বাংলাদেশ পেতে পারে বন্ধুসুলভ প্রতিবেশী যা তিন দিক দিয়ে ভারত দ্বারা পরিবেষ্ঠিত বাংলাদেশের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব -এ দুই দিকের সীমান্ত অতি সহজেই নিরাপত্তা পেতে পারে এ এলাকায় বন্ধু সুলভ কোন সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে। অপরদিকে নিরাপত্তা চরম ভাবে বিঘ্নিত হতে পারে যদি কোন কারণে তাদের সাথে বৈরীতা সৃষ্টি হয়। তাই এ এলাকার রাজনীতির গতিপ্রকৃতির সাথে সম্পর্ক রাখাটি বাংলাদেশের কাছে অতি গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তান যেমন আফগানিস্তানের রাজনীতি  থেকে হাত গুটাতে পারে না তেমনি বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয় এ বিশাল এলাকার রাজনীতি থেকে দূরে থাকা। যেহেতু এ এলাকায় চলছে প্রকাণ্ড এক জনযুদ্ধ তাই তাদের সাথে শত্রুতা সৃষ্টি করা হবে আত্মঘাতি।  অথচ ভারত চায়, বাংলাদেশকে তাদের বিরুদ্ধে খাড়া করতে। তিন). একমাত্র ব্রিটিশ আমল ছাড়া এলাকাটি কখনই ভারতের অন্তর্ভূক্ত ছিল না, এমনকি প্রতাপশালী মুঘল আমলেও নয়। হিন্দু আমলে তো নয়ই। মুর্শিদ কুলি খাঁ যখন বাংলার সুবেদার তথা গভর্নর, তখন তিনি একবার আসাম দখলের চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু সে দখলদারি বেশী দিন টিকিনি। আসামসহ ৭টি প্রদেশের ভূমি ভারতভূক্ত হয় ব্রিটিশ আমলের একেবারে শেষ দিকে। ভারতীয়করণ প্রক্রিয়া সেজন্যই এখানে ততটা সফলতা পায়নি। এবং গণভিত্তি পায়নি ভারতপন্থি রাজনৈতিক দলগুলি। চার). সমগ্র এলাকাটি শিল্পে অনুন্নত এবং নানাবিধ বৈষম্যের শিকার। অথচ এলাকাটি প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ। ভারতের সিংহভাগ তেল, চা, টিম্বার এ এলাকাতে উৎপন্ন হয়। অথচ চা ও তেল কোম্মানীগুলোর হেড-অফিসগুলো কোলকাতায়। কাঁচামালের রপ্তানীকারক প্রতিষ্ঠানগুলিও এলাকার বাইরের। ফলে রাজস্ব আয় থেকে এ এলাকার রাজ্যগুলি বঞ্চিত হচ্ছে শুরু থেকেই। শিল্পোন্নত রাজ্য ও শহরগুলো অনেক দূরে হওয়ায় পণ্যপরিহন ব্যয়ও অধিক। ফলে সহজে ও সস্তায় পণ্য পেতে পারে একমাত্র উৎস বাংলাদেশ থেকেই। ভারতকে করিডোর দিলে সে বাণিজ্যিক সুযোগ হাতছাড়া হতে বাধ্য। পাঁচ) যুদ্ধাবস্থায় অতি গুরুত্বপূর্ণ হল নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা। কিন্ত এ এলাকায় সে সুযোগ ভারতের নেই। ভারতের সাথে এ এলাকার সংযোগের একমাত্র পথ হল পার্বত্যভূমি ও বৈরী জনবসতি অধ্যুষিত এলাকার মধ্য অবস্থিত ১৭ কিলোমিটার চওড়া করিডোর। এ করিডোরে স্থাপিত রেল ও সড়ক পথের কোনটাই নিরাপদ নয়। ইতিমধ্যে গেরিলা হামলায় শত শত সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তির সেখানে প্রাণনাশ হয়েছে। ছয়). নৃতাত্বিক দিক দিকে এ এলাকার মানুষ মাঙ্গোলিয়। ফলে মূল ভারতের অন্য যে কোন শহরে বা প্রদেশে পা রাখলেই একজন নাগা, মিজো বা মনিপুরি চিহ্নিত হয় বিদেশী রূপে। তারা যে ভারতী নয় সেটি বুঝিয়ে দেয়ার জন্য এ ভিন্নতাই যথেষ্ট। এ ভিন্নতার জন্যই সেখানে স্বাধীন হওয়ার জন্য মুক্তিযুদ্ধ চলছে বিগত প্রায় ৬০ বছর ধরে। ভারতীয় বাহিনীর অবিরাম রক্ত ঝরছে এলাকায়। বহু চুক্তি, বহু সমঝোতা, বহু নির্বাচন হয়েছে কিন্তু স্বাধীনতার সে যুদ্ধ না থেমে বরং দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে। ফলে বাড়ছে ভারতের অর্থনৈতিক রক্তশূণ্যতা। সমগ্র এলাকা হয়ে পড়েছে ভারতের জন্য ভিয়েতনাম। আফগানিস্থানে একই রূপ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল রাশিয়ার জন্য। সে অর্থনৈতিক রক্তশূণ্যতার কারনে বিশাল দেহী রাশিয়ার মানচিত্র ভেঙ্গে বহু রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল। ভারত রাশিয়ার চেয়ে শক্তিশালী নয়। তেমনি স্বাধীনতার লক্ষ্যে এ এলাকার মানুষের অঙ্গিকার, আত্মত্যাগ এবং ক্ষমতাও নগণ্য নয়। ফলে এ সংঘাত থামার নয়। ভারত চায় এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে। কিন্তু ভারতের কাছে সংকট মুক্তির সে রাস্তা খুব একটা খোলা নাই।

ভারত করিডোর নিচ্ছে পণ্য-পরিবহন ও আভ্যন্তরীণ যোগাযোগের দোহাই দিয়ে। বিষয়টি কি আসলেই তাই? মেঘালয়, ত্রিপুরা, অরুনাচল, মনিপুর, নাগাল্যান্ড ও মিজোরামের সমুদয় জনসংখ্যা ঢাকা জেলার জনসংখ্যার চেয়েও কম। এমন ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠির জন্য পণ্যসরবরাহ বা লোক-চলাচলের জন্য এত কি প্রয়োজন পড়লো যে তার জন্য অন্য একটি প্রতিবেশী দেশের মধ্য দিয়ে করিডোর চাইতে হবে? সেখানে এক বিলিয়ন ডলার বিণিয়োগ করতে হবে? যখন তাদের নিজের দেশের মধ্য দিয়েই ১৭ কিলোমিটারের প্রশস্ত করিডোর রয়েছে। বাংলাদেশের বিগত সরকারগুলো দেশের আভ্যন্তরীণ সড়কের দুরবস্থার কথা জানিয়ে এতকাল পাশ কাটানোর চেষ্টা করেছে। এবার ভারত বলছে তারা সড়কের উন্নয়নে বাংলাদেশকে এক বিলিয়ন ডলার লোন দিতে রাজী। এবার বাংলাদেশ যাবে কোথায়? অথচ এই এক বিলিয়ন ডলার দিয়ে ভারত তার ১৭ মাইল প্রশস্ত করিডোর দিয়ে একটি নয়, ডজনের বেশী রেল ও সড়ক পথ নির্মাণ করতে পারতো। এলাকায় নির্মিত হতে পারে বহু বিমান বন্দর। ভারতের সে দিকে খেয়াল নাই, দাবী তুলেছে বাংলাদেশের মাঝ খান দিয়ে যাওয়ার পথ চাই-ই। যেন কর্তার তোগলোকি আব্দার। গ্রামের রাস্তা ঘুরে যাওয়ায় রুচি নেই, অন্যের শোবার ঘরের ভিতর দিয়ে যেতেই হবে। গ্রামের ঝোপঝাড়ের পাশ দিয়ে রাস্তায় পথ চলতে অত্যাচারি কর্তার ভয় হয়। কারণ তার কুর্মের কারণে শত্রুর সংখ্যা অসংখ্য। না জানি কখন কে হামলা করে বসে। একই ভয় চেপে বসেছে ভারতীয়দের মাথায়। সমগ্র উত্তরপূর্ব ভারতের স্বাধীনতাকামী জনগণের কাছে তারা চিহ্নিত হয়েছে উপনিবেশিক ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী রূপে। তারা চায় ভারতীয় শাসন থেকে আশু মুক্তি। এ লক্ষে জানবাজি রেখে তারা যুদ্ধে নেমেছে। ফলে ভারতের জন্য অবস্থা অতি বেগতিক হয়ে পড়েছে। একদিকে কাশ্মীরের মুক্তিযুদ্ধ দমনে যেমন ছয় লাখেরও বেশী ভারতীয় সৈন্য অন্তহীন এক যুদ্ধে আটকা পড়ে আছে তেমনি তিন লাখের বেশী সৈন্য যুদ্ধে লিপ্ত উত্তর-পূর্ব এ ভারতে। যুদ্ধাবস্থায় অতিগুরুত্বপূর্ণ হলো নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা। ফলে যতই এ যুদ্ধ তীব্রতর হচ্ছে ততই জোরদার হচ্ছে এ করিডোরের দাবী। ভারত তাই দিশেহারা। বাংলাদেশে স্বৈরাচারি বা নির্বাচিত যে সরকাররই আসুক না কেন তারা তাদের যে কাছে যে দাবীটি অতি জোরালো ভাবে পেশ করছে তা হলো এই করিডোরের দাবী। এ বিষয়টি কি বুঝতে আদৌ বাঁকি থাকে, ভারত করিডোর চাচ্ছে নিতান্তই সামরিক প্রয়োজনে? আর বাংলাদেশের জন্য শংকার কারণ মূলত এখানেই। ভারত তার চলমান রক্তাত্ব যুদ্ধে বাংলাদেশকেও জড়াতে চায়। এবং কিছু গুরুতর দায়িত্বও চাপাতে চায়। কারো ঘরের মধ্য দিয়ে পথ চললে সে পথে কিছু ঘটলো সহজেই সেটির দায়-দায়িত্ব ঘরের মালিকের ঘাড়ে চাপানো যায়। তার বিরুদ্ধে আদালতে ফৌজদারি মামলা ঠুকা যায়। কিন্তু বিজন মাঠ বা ঝোপঝাড়ের পাশে সেটি ঘটলে আসামী খুঁজে পাওয়াই দায়। ভারত এজন্যই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ৬ শত মাইলের করিডোর এবং সে করিডোরের নিরাপত্তার দায়-দায়িত্ব বাংলাদেশের কাঁধে চাপাতে চায়। তখন এ পথে ভারতীয়দের উপর হামলা হলে বাংলাদেশকে সহজেই একটি ব্যর্থ দেশ এবং সে সাথে সন্ত্রাসী দেশ রূপে আখ্যায়ীত করে আন্তর্জাতিক মহলে নাস্তানাবুদ করা যাবে। সে সাথে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতীয় সামরিক হস্তক্ষেপকে ন্যায়সঙ্গত বলার বাহানাও পাওয়া যাবে।

 

ইসলামী চেতনা এবং সম্ভাব্য হামলা

প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের অভ্যন্তর দিয়ে ভারতীয় যানবাহন চলা শুরু হলে সেগুলির উপর হামলার সম্ভাবনা কি কম? ভারতী বাহিনী কাশ্মীরের মুসলমানদের উপর নিষ্ঠুর বর্বরতা চালিয়ে যাচ্ছে দীর্ঘ ৬০ বছর যাবত। প্রায় ৭০ হাজার কাশ্মীরীকে সেখানে হত্যা করা হয়েছে, হাজার হাজার নারী হয়েছে ধর্ষিতা। এখনও সে হত্যাকান্ড ও ধর্ষন চলছে অবিরাম ভাবে। ১৯৪৮ সালে অগ্রসর মুসলিম মুজাহিদদের হাতে শ্রীনগর শহরের পতন হওয়া থেকে বাঁচাতে জাতিসংঘের কাছে ভারত সরকার ওয়াদা করেছিল কাশ্মীরীদের ভাগ্য নির্ধারণে সেখানে গণভোট অনুষ্ঠিত করার অনুমতি দিবে। জাতিসংঘ নিরাপত্ত পরিষদ এ্যাডমিরাল নিমিটস্ এর উপর দায়িত্ব দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতিও শুরু হয়েছিল। কিন্তু ভারত সে প্রতিশ্রুতি রাখেনি। নিছক গায়ের জোরে। এভাবে কাশ্মীরীদের ঠেলে দেওয়া হয়েছে রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধের পথে। অপর দিকে ভারত জুড়ে মুসলিম হত্যা, ধর্ষণ, ঘরবাড়ীতে আগুণ, এমনকি মসজিদ ভাঙ্গা হয় অতি ধুমধামে ও উৎসবভরে। অযোধ্যায় বাবরী মসজিদ ভাঙ্গার কাজ হয়েছে হাজার পুলিশের সামনে দিন-দুপুরে। হাজার হাজার সন্ত্রাসী হিন্দুদের দ্বারা ঐতিহাসিক এ মসজিদটি যখন নিশ্চিহ্ন হচ্ছিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরসীমা রাও, বিরোধী দলীয় নেতা বাজপেয়ী এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তাগণ সম্ভবতঃ আনন্দ ও উৎসবভরে ডুগডুগি বাজাচ্ছিলেন। এটি ছিল বড় মাপের একটি ঐতিহাসি অপরাধ। অথচ এ অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ভারত সরকারের কোন পুলিশ কোন অপরাধীকেই গ্রেফতার করেনি। আদালতে কারো কোন জেল-জরিমানাও হয়নি। ভাবটা যেন, সেদেশে কোন অপরাধই ঘটেনি। ভারতীয়দের মানবতাবোধ ও মূল্যবোধের এটিই প্রকৃত অবস্থা। এমন একটি দেশ থেকে কি সুস্থ্য পররাষ্টনীতি আশা করা যায়? দেশটিতে দাঙ্গার নামে হাজার হাজার মুসলমানকে জ্বালিয়ে মারার উৎসব হয় বার বার। সাম্প্রতিক কালে আহমেদাবাদে যে মুসলিম গণহত্যা হল সংখ্যালঘূদের বিরুদ্ধে তেমন কান্ড পাকিস্তানের ৬০ বছরের জীবনে একবারও হয়নি। বাংলাদেশের ৪০ বছরের জীবনেও হয়নি।

কংগ্রেস নেতা মাওলানা আবুল কালাম আযাদ লিখেছিলেন, ‘‘আফ্রিকার কোন জঙ্গলে কোন মুসলমান সৈনিকের পায়ে যদি কাঁটাবিদ্ধ হয় আর সে কাঁটার ব্যাথা যদি তুমি হৃদয়ে অনুভব না কর তবে খোদার কসম তুমি মুসলমান নও।” -সুত্রঃ মাওলানা আবুল কালাম আযাদ রচনাবলী, প্রকাশক: ইসলামী ফাউন্ডেশন, ঢাকা। এমন চেতনা মাওলানা আবুল কালাম আযাদের একার নয়, এটিই ইসলামের বিশ্ব-ভাতৃত্বের কথা। যার মধ্যে এ চেতনা নাই তার মধ্যে ঈমানও নাই। বাস্তবতা হল, বাংলাদেশে যেমন সেকুলারিজমের জোয়ারে ভাসা ভারতপন্থি বহু ক্যাডার আছে, তেমনি প্যান-ইসলামের চেতনায় উজ্জিবীতত বহু লক্ষ মুসলমানও আছে। করিডোরের পথে সাক্ষাৎ চোখের সামনে তথা হাতের সামনে মুসলিম হত্যাকারি ও মসজিদ ধ্বংসকারি ভারতীয় সৈনিকদের কাছে পেয়ে এদের কেউ কেউ যে তাদের উপর বীরবিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়বে না সে গ্যারান্টি কে দেবে? তাছাড়া ১৯৪৭ সালে বাংলার মুসলমানগণ যে স্বাধীন পাকিস্তানের জন্ম দিয়েছিলেন তা নিজ বাংলার বাঙালী হিন্দুদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নয়, বরং অবাঙালী মুসলমানদের সাথে কাঁধ মিলিয়ে। সে চেতনা ছিল প্যান ইসলামের। সেটি কি এতটাই ঠুনকো যে আওয়ামী বাকশালীদের ভারতমুখি মিথ্যা প্রচারনায় এত সহজে মারা মরবে? চেতনাকে শক্তির জোরে দাবিয়ে রাখা যায়, হত্যা করা যায় না। আর ইসলামি চেতনাকে তো নয়ই। ভারত সেটি জানে, তাই বাংলাদেশ নিয়ে তাদের প্রচণ্ড ভয়।

তাছাড়া বাংলাদেশীদের প্রতি ভারতীয় সৈনিকদের আচরণটাই কি কম উস্কানিমূলক? প্রতি বছরে বহু শত বাংলাদেশী নাগরিককে ভারতীয় বর্ডার সিকুরিটি ফোর্স তথা বিএসএফ হত্যা করছে। তারকাটার বেড়ায় ঝুলিয়ে রাখা হয় তাদের লাশ। এবং এর কোন প্রতিকার কোন বাংলাদেশী পায়নি। নিরীহ মানুষের এমন হত্যাকান্ড বিএসএফ পাকিস্তান সীমান্তে বিগত ৬০ বছরেও ঘটাতে পারিনি। এমনকি নেপাল বা ভূটান সীমান্তেও হয়নি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ভারত সরকারের কাছে যে কতটা মূল্যহীন ও তুচ্ছ এবং দেশের জনগণ যে কতটা অরক্ষিত -সেটি বোঝানোর জন্য এ তথ্যটিই কি যথেষ্ট নয়? বহুবার তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কয়েক কিলোমিটার ঢুকে হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে। ইচ্ছামত গরুবাছুড়ও ধরে নিয়ে গেছে। বাঁধ দিয়ে সীমান্তের ৫৪টি যৌথ নদীর পানি তুলে নিয়েছে বাংলাদেশের মতামতের তোয়াক্কা না করেই। ফারাক্কা নির্মান করেছে এবং পদ্মার পানি তুলে নিয়েছে এক তরফা ভাবেই। টিপাইমুখ বাধ দিয়ে সুরমা ও কুশিয়ারার এবং তিস্তার উপর উজানে বাঁধ দিয়ে বাংলাদেশকে পানিশূণ্য করার ষড়যন্ত্র করছে। এদের মুখে আবার প্রতিবেশী মূলক সহযোগিতার ভাষা?

ভারতের আগ্রাসী ভূমিকার কারণ, বাংলাদেশের ঘরে ঘরে ভারতবিরোধী চেতনা। এমন চেতনাকে নিজের নিরাত্তার জন্য ভারত বিপদজনক মনে করে। বেতনভোগী কয়েক হাজার র’এর এজেন্ট দিয়ে এমন চেতনাধারিদের দমন যে অসম্ভব -সেটি ভারতও বুঝে। তাই চায়, বাংলাদেশ সরকার ভারত বিরোধীদের শায়েস্তা করতে বিশ্বস্ত ও অনুগত ঠ্যাঙ্গারের ভূমিকা নিক। শেখ হাসিনার সরকার সে ভূমিকাই বিশ্বস্ততার সাথে পালন করছে দেশের শত শত ইসলামপন্থি নেতা কর্মীদের গ্রেফতার ও নির্যাতন এবং ইসলামী বইপুস্তক বাজয়াপ্ত করার মধ্য দিয়ে। অথচ এটি কি কখনো কোন মুসলমানের এজেণ্ডা হতে পারে? শেখ হাসিনার সরকার রীতিমত যুদ্ধ শুরু করেছে দেশের ইসলামপন্থিদের নির্মূলে। সেটি শুধু জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে নয়, হিজবুত তাহরির, মাওলানা ফজলুল হক আমিনীর ইসলামী ঐক্যজোট, চরমোনাইয়ের পীর সাহেবের ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনসহ সকল ইসলামী দলের বিরুদ্ধেই। কে বা কোন দল একাত্তরে অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল সেটি তাদের কাছে বড় কথা নয়, বরং কারা এখন ইসলামের পক্ষ নিচ্ছে সেটিই তাদের বিবেচনায় মূল। এবং তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধেও নামছে। আওয়ামী বাকশালী পক্ষটি এমন একটি যুদ্ধের হুংকার বহু দিন থেকে দিয়ে আসছিল এবং এখন সেটি শুরুও হয়ে গেছে। বাংলাদেশের ঘাড়ে এভাবেই চাপানো হয়েছে একটি অঘোষিত ভারতীয় যুদ্ধ। এ যুদ্ধের ব্যয়ভার যেমন ভারতীয়রা বহন করছে, তেমনি কমাণ্ডও তাদের হাতে। বাংলাদেশ বস্তুত এ পক্ষটির হাতেই আজ  অধিকৃত।

 




আগ্রাসনের ভারতীয় অবকাঠামো এবং আত্মঘাতী বাংলাদেশ

দাবী করিডোরের

বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ভারত যা চায় সেটি মূলত করিডোর, ট্রানজিট নয়। ট্রানজিট  ও করিডোর –এ দুটি এক নয়। বরং সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়; এবং ব্যবহৃত হয় দুটি ভিন্ন উদ্দেশ্যে। ট্রানজিট কখনো অন্য দেশের মধ্য দিয়ে নিজ দেশে যাওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয় না। ট্রানজিট ব্যবহৃত হয় এক দেশের মধ্য দিয়ে তৃতীয় আরেকটি দেশে যাওয়ার জন্য, এক অনিবার্য প্রয়োজনে। যেমন বাংলাদেশ ভারতের মধ্য দিয়ে ট্রানজিট চায় নেপাল ও ভূটানে যাওয়ার জন্য,এবং সেটি কখনই নিজ দেশের অন্য কোন এলাকায় যাওয়ার জন্য নয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, পরিবহন ও লোক-চলাচলের ক্ষেত্রে ট্রানজিট শুধু গুরুত্বপূর্ণই নয়, অপরিহার্যও। কারণ নেপাল বা ভূটানের ন্যায় বিশ্বের বহুদেশই অন্যদেশের স্থলাভূমি দ্বারা আবদ্ধ, সমূদ্র পথে বেরুনোর কোন রাস্তাই নেই। এমন দেশগুলোকে অন্যদেশে যেতে হয় অবশ্যই আরেকটি দেশের বুকের উপর দিয়ে। সেটি যেন বিমান পথে, তেমনি স্থল ও জলপথে। অথচ বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ভারত যা চায় তা নিজ দেশের উত্তর-পূর্ব সীমান্তের ৭টি প্রদেশে পৌঁছতে, অন্য কোন দেশে যেতে নয়। তাছাড়া ভারতের এ সাতটি প্রদেশ বাংলাদেশ বা অন্যকোন দেশ দ্বারা ঘেরাও নয়,তাই ভৌগলিক কারণে ট্রানজিট অনিবার্য প্রয়োজনও নয়। ভারতের দাবী এখানে নিছক করিডোরের।এবং সেটি রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রয়োজনে। আর এটিকে তারা বলছে ট্রানজিট। ট্রানজিট নিয়ে ভারতের এ এক আরেক প্রতারণা।

আফগানিস্তান, নেপাল ও ভূটানের ন্যায় দেশগুলির জন্য করিডোর এতটাই অপরিহার্য যে সেটি ছাড়া এ দেশগুলির পক্ষে অন্য দেশে যাওয়াই অসম্ভব। আফগানিস্তানে তাই করিডোর নিয়েছে পাকিস্তানের উপর দিয়ে। আর নেপাল ও ভূটান নিয়েছে ভারত থেকে। বাংলাদেশের জন্যও করিডোর অপরিহার্য হল অঙ্গরপোতা ও দহগ্রাম -ভারতের অভ্যন্তরে অবস্থিত এ দুটি ছিট মহলে যাওয়ার জন্য। আন্তর্জাতিক রীতি অনুযায়ী ভারত এমন করিডোর দিতে বাধ্য। কারণ, করিডোর ছাড়া এ দুটি ছিট মহলের লোকজন অন্যদেশে যাওয়া দূরে থাক, নিজ দেশের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করাই অসম্ভব। ১৯৭৪ সালে শেখ মুজিব ও ইন্দিরা গান্ধির মধ্যে সম্পাদিত চুক্তিতে করিডোরের সে দাবী মেনেও নেয়া হয়। সে চুক্তি মোতাবেক ভারতের পক্ষ থেকে তিন বিঘা পরিমাণ জমি বাংলাদেশকে দেয়ার কথা। বিনিময়ে বাংলাদেশ ভারতকে দেয় দক্ষিণ বেরুবাড়ীর বহুগুণ বৃহৎ ভূমি। কিন্তু ৪০ বছর অতিক্রান্ত হলেও ভারত সরকার বাংলাদেশকে প্রতিশ্রুত সে তিন বিঘা জমি দেয়নি। তাদের যুক্তি, ভারতীয় সংবিধানে নিজ দেশের এক ইঞ্চি জমিও অন্য দেশকে দেয়ার বিধান নেই। অথচ বাধা নেই অন্যদেশ গ্রাসের! তাই প্রতিশ্রুত তিন বিঘার বিনিময়ে পাওয়া বাংলাদেশের ভূমি দক্ষিণ বেরুবাড়ীর উপর নিজ মালিকানা প্রতিষ্ঠিত করতে ভারত এক মুহুর্তও দেরী করেনি।

মালিকানা পেতে ব্যর্থ হয়ে অবশেষে বাংলাদেশ সরকার প্রতিশ্রুত তিন বিঘা জমি লিজ হিসাবে দেয়ার জন্য ভারতের কাছে দাবী করে। ভারত তাতেও রাজি হয়নি। বলে, করিডোর দিলে ভারতের রাষ্ট্রীয়  নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। নিরাপত্তা রক্ষার সে যুক্তি দেখিয়ে ভারত সে তিন বিঘা জমির উপর বসায় দিবারাত্রী কড়া প্রহরা। ফলে আঙ্গরপোতা ও দহগ্রামের প্রায় বিশ হাজার মানুষের জীববে নেমে আসে জেলখানার বন্দিদশা।বছরের পর বছর ধরে চলে আলোচনা, কিন্তু সে সহজ বিষয়টিও ভারতকে বুঝানো কঠিন হয়ে পড়ে। বহু বছরব্যাপী বহু দেন-দরবারের পর অবশেষে ভারত দিনের কিছু সময়ের জন্য বাংলাদেশেী নাগরিকদের জন্য উক্ত করিডোর দিয়ে চলাচলের সুযোগ দিতে রাজি হয়।এই হল ভারতের বিবেক এবং বাংলাদেশীদের প্রতি তাদের দরদ!অথচ সে ভারতই করিডোর চায় বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে। এবং সেটি দিনের কিছু সময়ের জন্য নয়, বরং সারা বছরের প্রতিদিন, প্রতি রাত, প্রতি ঘন্টা ও প্রতি মুহুর্তের জন্য। তাছাড়া যে ভূখণ্ডের জন্য বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে করিডোর চায় তা অঙ্গরপোতা ও দহগ্রামের ন্যায় বিদেশী ভূমি দ্বারা ঘেরাওকৃত ভূমি নয়, বরং ভারতের মূল ভূমির সাথে তা স্থলপথে ও বিমান পথে সংযুক্ত।

 

ভারতের বিনিয়োগ রাজনীতিতে

প্রশ্ন হল, বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে করিডোর লাভে ভারত এত বেপরোয়া কেন? কেনই বা সেটির উন্নয়নে এক বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ? কেনই বা সে করিডোর দিতে রাজী হয় নি আওয়ামী লীগ সরকার ভিন্ন বাংলাদেশের প্রতিটি সরকার? বিগত সরকারগুলোর এরূপ সিদ্ধান্তের পিছনে কারণগুলো কি? এ প্রশ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ। ভারতীয় অভিলাষ ও স্ট্রাটেজী বুঝার জন্য এ বিষয়টি বুঝা শুধু প্রয়োজনীয়ই নয়, অপরিহার্য। বাংলাদেশে বিনিয়োগের খাত শুধু রাস্তাঘাট বা করিডোর নয়। অথচ শিল্প-কৃষি-বিদ্যুৎসহ বিনিয়োগের অন্য কোন খাতেই ভারত আজ অবধি কোন বিনিয়োগ করেনি। অতএব করিডোর খাতে কেন তার এত আগ্রহ? ভারত নিজেও কোন ধনি দেশ নয়। সম্প্রতি এক আন্তর্জাতিক সংস্থার রিপোর্টে প্রকাশ, আফ্রিকার ২২টি দেশে যত গরীব মানুষের বাস,তার চেয়ে বেশী গরীবের বাস ভারতের ৮টি প্রদেশে। আফগানিস্তান বা ইরাকে মার্কিনীদের বিরুদ্ধে যত আত্মত্যাগী যুবক বোমা হামলায় প্রাণ দেয়,ভারতে তার চেয়ে শত গুণ বেশী কৃষক বা গৃহবধু দারিদ্র্য ও হতাশায় আত্মহত্যা করে। হাজার হাজার মানুষ আত্মহত্যা করে ঋণের অর্থ পরিশোধ করতে না পেরে। বাংলাদেশের রাস্তাঘাটের বদলে নিজ দেশে দারিদ্র্য বিমোচনে উক্ত এক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হলে দেশটির দরিদ্র মানুষের অনেক উপকার হত। অথচ সে পথে না গিয়ে ভারত আগ্রহ দেখাচ্ছে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে করিডোর খাতে,হেতু কি?

বাংলাদেশের বুকের উপর দিয়ে করিডোরের বিষয়টি বুঝতে হলে বুঝতে হবে ভারতের উচ্চবর্ণ ব্রাহ্মনদের আসমুদ্র-হিমাচল ব্যাপী এক হিন্দু সাম্রাজ্য গড়ার আগ্রাসী মানসিকতাকে। নিজ দেশের দরিদ্র মানুষদের প্রতি এসব বর্ণবাদী আগ্রাসী হিন্দুদের দরদ অতি সামান্যই। তারা বেছে বেছে সেখানেই বিনিয়োগ বাড়ায় যা তাদের সে আগ্রাসী অভিলাষ পুরণে জরুরী। আর সেচিত্রটিই ফুটে উঠে বাংলাদেশের প্রতি তাদের বিদেশ নীতি ও স্ট্রাটেজীতে। বাংলাদেশ একটি দরিদ্র দেশ। এদেশের উন্নয়নে বহু দূরবর্তী দেশের পূঁজিপতিও বিনিয়োগ করেছে। পাকিস্তান আমলে বিনিয়োগ করেছে আদমজী, বাওয়ানী, ইস্পাহানী, আমিনের ন্যায় বহু অবাঙালীও। কিন্তু বাংলাদেশের ভারতীয়দের বিনিয়োগ যে ছিল না তা নয়। তবে সেটি কখনই শিল্প বা অর্থনীতিতে নয়,ছিল রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও মিডিয়ার  ময়দানে। ভারত আজও বিনিয়োগের সে ধারাই অব্যাহত রেখেছে।  ফলে বাংলাদেশের মাটিতে ভারতীয় শিল্প-পণ্য উৎপাদিত না হলে কি হবে, বিপুল ভাবে বেড়েছে ভারত-ভক্ত ও ভারতীয় স্বার্থের সেবাদাস।

 

ভারতের যুদ্ধে বাংলাদেশ

বাংলাদেশের মাটিতে ভারতের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ ছিল একাত্তরের যু্দ্ধে। সেটি ছিল যেমন বিপুল অর্থের, তেমনি রক্তেরও। এ বিষয়টি অস্বীকারের উপায় নেই,ভারতীয়দের সে বিনিয়োগ না হলে বাংলাদেশ সৃষ্টিই হত না। তবে ভারতের সে বিনিয়োগ কি ছিল বাংলাদেশের স্বার্থে? ভারত কোন বিদেশীদের স্বাধীনতার স্বার্থে কখনো কি একটি তীরও ছুঁড়েছে? একটি পয়সাও কি ব্যয় করেছে? বরং ভারতের ইতিহাস তো অন্যদেশে সামরিক আগ্রাসন ও স্বাধীনতা লুন্ঠনের। সে লুন্ঠনের শিকার কাশ্মির, সিকিম, মানভাদর, হায়দারাবাদের স্বাধীনতা। ভারতীয়দের কাছে একাত্তরের যুদ্ধটি ছিল শতকরা শতভাগ ভারতীয় যুদ্ধ। তাই সে যুদ্ধের ঘোষণা যেমন শেখ মুজিব থেকে আসেনি, তেমনি কোন বাংলাদেশী জেনারেলের পক্ষ থেকেও আসেনি। এবং সে যুদ্ধের কমাণ্ড শেখ মুজিব বা তার অনুসারিদের হাতেও ছিল না। ভারতীয় অর্থ, নেতৃত্ব ও পরিকল্পনা দ্বারা পরিচালিত এ যুদ্ধটি ছিল সর্বক্ষেত্রেই একটি ভারতীয় যুদ্ধ। মুজিব স্বাধিনতার ঘোষনা দিল কি দিল না, মূক্তি বাহিনী যুদ্ধ করলো কি করলো না – ভারত সে অপেক্ষায় ছিল না। এ যুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিল ভারতীয় ভূমি থেকে,এবং ভারতীয় জেনারেলদের নেতৃত্বে। সে যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে ভারতীয় সেনানিবাস, বহু লক্ষ ভারতীয় সৈন্য এবং বহু ভারতীয় বিমান, কামান, ট্যাংক এবং গোলাবারুদ। ভারতীয়দের বরং সফলতা, তাদের বহুদিনের কাঙ্খিত সে যুদ্ধটিকে তারা বাংলাদেশীদের ঘাড়ে চাপাতে সমর্থ হয়েছিল। মুক্তিবাহিনীকে তারা নিজ অর্থে গড়ে তুলেছিল স্রেফ নিজস্ব প্রয়োজনে। তারা সেদিন কইয়ের তেলে কই ভেজেছিল। বিশ্ববাসীর কাছেও সে সত্যটি কখনই গোপন থাকেনি। বরং সেটি প্রকাণ্ড ভাবে প্রকাশ পায় যখন পাকিস্তানী সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করে ভারতীয় সেনাবাহিনীর জেনারেলদের কাছে, কোন বাংলাদেশী জেনারেল বা মুক্তি যোদ্ধার কোন কমাণ্ডারের কাছে নয়। আরো প্রকাশ পায়, যখন পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর ফেলে যাওয়া বিপুল পরিমান যুদ্ধাস্ত্র যখন ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়। একাত্তরে সে যুদ্ধটি যদি বাংলাদেশীদের দ্বারা বাংলাদেশের যুদ্ধ হত তবে পাকিস্তানের ফেলে যাওয়া বিপুল যুদ্ধাস্ত্র ভারতে যায় কি করে? পাকিস্তানী যুদ্ধবন্দীদেরকেই বা কেন ভারতে নেয়া হবে?

একাত্তরে ভারতের অর্থ, রক্ত, শ্রম ও মেধার বিনিয়োগটি ভারতের কোন খয়রাতি প্রকল্পও ছিল না, ছিল নিজ সাম্রাজ্য বিস্তারের অনিবার্য প্রয়োজনে। ছিল পাকিস্তান ভাঙ্গার লক্ষে। এবং সে সাথে সামরিক দিক দিয়ে পঙ্গু, রাজনৈতিক ভাবে অধিকৃত এবং অর্থনৈতিক দিক দিয়ে ভারতনির্ভর এক বাংলাদেশ সৃষ্টির। এমন একটা যুদ্ধ নিজ খরচে লড়ার জন্য ভারত ১৯৪৭ সাল থেকেই দুপায়ে খাড়া ছিল। ভারত পাকিস্তানের সৃষ্টি যেমন চাইনি, তেমনি দেশটি বেঁচে থাকুক সেটিও চায়নি। তাই ভারতের সে বিনিয়োগটি যেমন একাত্তরে শুরু হয়নি, তেমনি একাত্তরে শেষও হয়নি। সেটির শুরু হয়েছিল সাতচল্লিশে, এবং চলছে আজও। তবে চলছে ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে ও ভিন্ন ভিন্ন রণাঙ্গনে। বিশেষ করে সে সব খাতে যা আঞ্চলিক শক্তি রূপে প্রতিষ্ঠা লাভের জন্য তারা জরুরী মনে করে। করিডোর হল তেমনই এক গুরুত্বপূর্ণ খাত। তাই ভারত সরকারের পক্ষ থেকে করিডোরের দাবী, চট্রগ্রাম ও চালনা বন্দরসহ বাংলাদেশের নৌ ও বিমান বন্দর ব্যবহারের দাবি, বাংলাদেশের মিডিয়া খাতে ভারতীয়দের বিনিয়োগ, শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে আওয়াম লীগ ও তার মিত্রদের লাগাতর প্রতিপালন –এবিষয়গুলো বুঝতে হলে ভারতের সে আগ্রাসী মনভাব ও সামরিক প্রয়োজনটি অবশ্যই বুঝতে হবে। তখন সুস্পষ্ট হবে, যে এক বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ নিয়ে ভারত এগিয়ে আসছে সেটিও কোন খয়রাতি প্রজেক্ট নয়। ভারত এর চেয়ে অনেক বেশী বিনিয়োগ করে তার পূর্ব সীমান্তের সামরিক বাহিনীর পিছনে। বাংলাদেশের মাটিতে ভারতের এ বিনিয়োগ আসছে দেশটির সে আগ্রাসী স্ট্রাটেজীর অবিচ্ছিন্ন অংশ রূপে। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশীদের যে যাই বলুক,ভারতীয়দের মাঝে এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে কোন অস্পষ্টতা নেই। সেটি তার খোলাখোলী ভাবেই বলে। এবং সেটিই ফুটে উঠেছে “ইন্ডিয়ান ডিফেন্স রিভিউ” জার্নালের সম্পাদক মি. ভরত ভার্মার লেখা সাম্প্রতিক এক নিবন্ধে। এ প্রবন্ধে মি. ভার্মার সে নিবদ্ধ থেকে উদ্বৃতি দিয়ে বিষয়টি আরো সুস্পষ্ট করা হবে। তবে এ নিয়ে কোন রূপ রাখঢাক নাই তাদের সহযোগী বাংলাদেশী আওয়ামী বাকশালীদের মনেও। তারাও চায় বাঙালীর জীবনে একাত্তর বার বার ফিরে আসুক। এবং বাঙালী আবার লিপ্ত হোক ভারতীয়দের নেতৃত্বে এবং ভারতীয়দের অস্ত্র নিয়ে আরেকটি যুদ্ধে।

 

ভারত চায় আগ্রাসনের অবকাঠামো

বিশ্ব রাজনীতিতে যে অবস্থান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের, ভারত সেটিই হতে চায় সমগ্র এশিয়ার বুকে। আর সে অবস্থায় পৌঁছতে হলে অন্যদেশের অভ্যন্তরে শুধু দালাল বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদ প্রতিপালন করলে চলেনা। আগ্রাসনকে বিজয়ী ও স্থায়ী করতে নিজেদের বিশাল দূতাবাস, ঘাঁটি,সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনায় স্পাই নেটওয়ার্কের পাশাপাশি সেনা ও রশদ সরবরাহের অবকাঠামোও গড়ে তুলতে হয়। প্রয়োজনে সামরিক আগ্রাসনও চালাতে হয়। শুধু হামিদ কারজাইদের মত ব্যক্তিদের কারণে আফগানিস্তান মার্কিনীদের হাতে অধিকৃত হয়নি। এলক্ষে ঘাঁটি, বন্দর ও সড়ক নির্মানও করতে হয়েছে। অবিরাম গতিতে রক্তক্ষয়ী একটি যুদ্ধও চালিয়ে যেতে হচ্ছে। ভারতও তেমনি শুধু শেখ মুজিব, শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের প্রতিপালন নিয়ে খুশি নয়। পাকিস্তান ভাঙ্গার ভারতীয় প্রজেক্ট শুধু আগরতলা ষড়যন্ত্রের মাঝে সীমাবদ্ধ রাখলে তা কখনই সফল হত না। এ জন্য ভারতকে নিজের বিশাল বাহিনী নিয়ে একাত্তরে প্রকান্ড একটি যুদ্ধও লড়তে হয়েছে।

এটি এখন আর লুকানো বিষয় নয়, ২০০৮ সালের নির্বাচনে ভারত শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছিল তার অনুগত পক্ষকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে। সম্প্রতি সে তথ্যটিই বিশ্বময় ফাঁস করে দিয়েছে ব্রিটিশ প্রভাবশালী পত্রিকা ইকোনমিস্ট। তবে ভারতের এ বিনিয়োগ শুধু ২০০৮ সালে নয়, প্রতি নির্বাচনেই। যেমন ১৯৭০ সালের নির্বাচনে, তেমনি ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের নির্বাচনেও। তবে শুধু নির্বাচনী বিনিয়োগের মধ্য দিয়েই ভারতের আসল লক্ষ্য পূরণ হওয়ার নয়। ভারত ভাল ভাবেই জানে, শুধু নিজ দেশের সেনবাহিনীতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে বাংলাদেশের উপর আধিপত্য বিস্তার সম্ভব নয়। সে জন্য চাই,বাংলাদেশের রাজনীতি, মিডিয়া, বুদ্ধিবৃত্তি ও যোগাযোগসহ নানা ক্ষেত্রে লাগাতর বিনিয়োগ। তাছাড়া তাদের কাছে যুদ্ধ আগামী দিনের কোন বিষয় নয়,বরং প্রতি দিনের। দেশটি এক আগ্রাসী যুদ্ধে লিপ্ত তার জন্ম থেকেই। উত্তর-পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিম -এ দুই প্রান্তে দুটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের শুরু আজ থেকে প্রায় ৬০ বছর আগে। এখন তা অবিরাম গতিতে চলছে। ভারতে বহু সরকার ক্ষমতায় এসেছে, বিদায়ও নিয়েছে। কিন্তু সে যুদ্ধ দুটি থামার নামই নিচ্ছে না। ভারতের উত্তর-পূর্ব সীমান্তে চলমান যুদ্ধের প্রতিবেশী দেশ হল বাংলাদেশ। পাকিস্তানকে সংশ্লিষ্ট করা ছাড়া আফগান যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্টের পক্ষে বিজয় দূরে থাক টিকে থাকাই যেমন অসম্ভব তেমনি অবস্থা ভারতের জন্য বাংলাদেশের। পাকিস্তানের রাজনীতি, মিডিয়া, সামরিক বাহিনী ও যুদ্ধ-অবকাঠামোতে এ কারণেই মার্কিনীদের বিশাল বিনিয়োগ। জেনারেল  মোশাররফকে হটিয়ে পিপলস পার্টিকে ক্ষমতায় বসানোর মূল কারণ তো মার্কিনীদের সে যুদ্ধে পাকিস্তানীদের শামিল করার বিষয়টিকে নিশ্চিত করা। একই কারণে উত্তর-পূর্বের রণাঙ্গণে ভারত অপরিহার্য মনে করে বাংলাদেশকে সম্পৃক্ত করা।সে লক্ষেই বাংলাদেশের রাজনীতি, মিডিয়া, বুদ্ধিবৃত্তিতে ভারতের এত বিনিয়োগ। “শেখ হাসীনার ফারাক্কার পানিচুক্তিতে পদ্মায় পানি বেড়েছে বা টিপাইমুখ বাঁধের ফলে সুরমা, কুশিয়ারা ও মেঘনায় পানি থৈ থৈ করবে, বা একাত্তরের হাতিয়ার গর্জে উঠুক আরেকবার” –বাংলাদেশী বুদ্ধিজীবীরা তো এমন কথা বলে সে পুঁজি বিনিয়োগের ফলেই। একাত্তরের হাতিয়ার যে ছিল ভারতীয় হাতিয়ার সে কথা কি অস্বীকারের উপায় আছে? এবং সে হাতিয়ার নির্মিত হয়েছে যে স্রেফ ভারতীয় বিজয় ও ভারতীয় আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে তা নিয়েও কি কোন বিতর্ক আছে?

 

ভারতীয়দের ভয় ও স্ট্রাটেজী

সাম্রাজ্য বিস্তারে ভারতের যেমন স্বপ্ন আছে, তেমনি ভয়ও আছে। দেশটির সাম্রাজ্য-লিপ্সু নেতাদের মাঝে যেমন রয়েছে প্রচণ্ড পাকিস্তানভীতি ও ইসলামভীতি,তেমনি রয়েছে চীনভীতিও। চীন দ্রুত অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিসঞ্চয় করছে। প্রতিবেশী নেপালও এখন চীনের পক্ষে।  মধ্য ভারতের কয়েকটি প্রদেশে জুড়ে লড়াই করে চলেছে হাজার হাজার মাওবাদী বিপ্লবী। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ভাষায় মাওবাদীদের এ যুদ্ধই ভারতীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে বর্তমান কালের সবচেয়ে বড় হুমকি। অপরদিকে পাকিস্তানও এখন আর একাত্তরের দুর্বল পাকিস্তান নয়। তার হাতে এখন পারমাণবিক বোমা। রয়েছে দূরপাল্লার শত শত মিজাইল। রয়েছে হাজার হাজার আত্মত্যাগী ইসলামী বোমারু যোদ্ধা – যাদের মাত্র কয়েকজন মোম্বাই শহরকে কয়েকদিনের জন্য অচল করে দিয়েছিল। ১৯৪৮, ১৯৬৫ এবং ১৯৭১-এর যুদ্ধের কারণে অসম্ভব ও অচিন্তনীয় হয়ে পড়েছে পাকিস্তানের সাথে দেশটির বন্ধুত্ব। সম্প্রতি আফগানিস্তানে মার্কিনীদের সাথে ভারতের সহযোগী ভূমিকা ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানীদের সে ঘৃনা আরো তীব্রতর করছে। তাছাড়া লাগাতর যুদ্ধ চলছে কাশ্মীরে। সে যুদ্ধে ভারতের পক্ষে বিজয় দিন দিন অসাধ্য হয়ে উঠছে। এবং সে সত্যটি ভারতীয় সমরবিদদের কাছেও দিন দিন স্পষ্টতর হচ্ছে। বিজয় একই ভাবে অসাধ্য হয়ে উঠছে উত্তরপূর্ব সীমান্তের প্রদেশগুলির যুদ্ধেও। ভারতের আরো ভয়, আফগানিস্তানের যুদ্ধেও মার্কিন বাহিনী ও তাদের মিত্ররা দ্রুত পরাজিত হতে চলেছে। ফলে তাদের আশংকা, দেশটি পুনরায় দখলে যাচ্ছে তালেবানদের হাতে -যারা পাকিস্তানের মিত্র। ভারতীয়দের ভয়,তালেবানগণ কাবুলের উপর বিজয় অর্জনের পর মনযোগী হবে ভারত থেক কাশ্মীর আজাদ করতে। কাশ্মীরের মজলুল মুসলমানদের দুর্দশায় আফগানিস্তানের সেকুলার নেতৃবৃন্দ নিশ্চুপ থাকলেও ধর্মপ্রাণ তালেবানগণ সেটি সইবে না। বরং তাদের পক্ষে যুদ্ধ লড়াটি তারা ধর্মীয় ফরজ জ্ঞান করবে। সে সাথে ভারতীয়দের আতংক ধরেছে দেশটির উত্তর-পূর্ব সীমান্তের যুদ্ধে চীনের ক্রমঃবর্ধমান আগ্রহ দেখে।

ভারতীয়দের ভয়ের আরো কারণ, উত্তর-পূর্ব সীমান্তের ৭টি প্রদেশ তিনদিক দিয়েই শত্রু দ্বারা ঘেরাও। প্রদেশগুলি মূল ভারতের সাথে সংযুক্ত মাত্র ১৭ মাইল চওড়া শিলিগুড়ি করিডোর দিয়ে। মুরগির ঘাড়ের ন্যায় সরু এ করিডোরটি চীন যে কোন সময় বন্ধ করে দিতে পারে। বন্ধ করতে পারে পূর্ব সীমান্তের বিদ্রোহী বিচ্ছিন্ততাবাদীরাও। ভারতীয়দের সে ভয় ও আতংকের ভাবই প্রকাশ পেয়েছে মি. ভরত ভার্মার প্রবন্ধে। তবে তার লেখায় শুরুতে যেটি প্রকাশ পেয়েছে তা হলো আগ্রাসী ভারতীয়দের নিজ অভিলাষের কথা। তিনি লিখেছেন, “India has the potential to be to Asia, what America is to the world… Possibly India is the only country in Asia that boasts of the potential to occupy the strategic high ground gradually being vacated by the retreating western forces, provided it develops offensive orientation at the political level. অর্থঃ “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে মর্যাদা অর্জন করেছে সমগ্র পৃথিবীতে, ভারতের সামর্থ রয়েছে এশিয়ার বুকে সে অবস্থায় পৌঁছার।… সম্ভবতঃ ভারতই এশিয়ার একমাত্র দেশ যার সামর্থ রয়েছে পিছেহঠা পশ্চিমা শক্তিবর্গের ফেলে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ স্ট্রাটেজিক ক্ষেত্রগুলো দখলের। তবে সেটি সম্ভব হবে যদি দেশটি রাজনীতির ময়দানে আক্রমণাত্মক ছকে নিজেকে গড়ে তোলে।”

কোন বৃহৎ শক্তির একার পক্ষেই এখন আর বিশ্ব-রাজনীতি নিজ নিয়ন্ত্রনে রাখা সম্ভব নয়। একাজ অতি ব্যয়বহুল। আফগানিস্তানকে কবজায় রাখার বিপুল খরচ সোভিয়েত রাশিয়াকে শুধু পরাজিতই করেনি, টুকরো টুকরো করে ফেলেছে। তেমনি ইরাক ও আফগানিস্তান দখলদারির খরচ বিপাকে ফেলেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে। দেশটি আজ প্রচন্ড ভাবে বিপন্ন অর্থনৈতিক ভাবে। ফলে বিজয় দূরে থাক, তারা এখন পিছু হটার রাস্তা খুঁজছে। ভারতের খায়েশ, তারা সে শূণ্যস্থান দখলে নিবে। আর সে জন্য তারা এখন আগ্রাসী স্ট্রাটেজী নিয়ে এগুচ্ছে। অথচ একটি এশিয়ান শক্তি হওয়ার খরচও কম নয়। তবে এমন বাতিক শুধু হঠকারিই করে না, বিবেকশূণ্যও করে। তাই বিশ্বের সর্বাধিক দরিদ্র মানুষের বসবাস ভারতে হলে কি হবে, দেশটির বাতিক উঠেছে শত শত কোটি টাকার অস্ত্র কেনার। এবং প্রস্তুতি নিচ্ছে পাকিস্তান ও চীনের বিরুদ্ধে একটি প্রকান্ড যুদ্ধের। এ জন্যই প্রয়োজন পড়েছে বাংলাদেশের অভ্যন্তর দিয়ে করিডোরের। কারণ, ভারতীয় সমরবিদদের বিবেচনায় শিলিগুরি সরু করিডোরটি আদৌও নিরাপদ নয়। সম্ভব নয় এ পথ দিয়ে কোন যুদ্ধকালীন সময়ে ভারতের পূর্ব সীমান্তে লাগাতর রশদ সরবরাহ। সংকীর্ন এ গিরিপথের উপর ভরসা করে দীর্ঘকাল ব্যাপী কোন যুদ্ধ পরিচালনা অসম্ভব। ভারতীদের আতংক যে এ নিয়ে কতটা প্রকট সে বিবরণও পাওয়া যায় মি. ভার্মার লেখায়। তিনি লিখেছেন, “By 2012, to unravel India, Beijing is likely to para-drop a division of its Special Forces inside the Siliguri Corridor to sever the Northeast. There will be simultaneous attacks in other parts of the border and linkup with the Special Forces holding the Siliguri Corridor will be selected. All these will take place under the nuclear overhang. In concert Islamabad will activate the second front to unhook Kashmir by making offensive moves across the IB in the plains… Meanwhile the fifth columnists supporting these external forces will unleash mayhem inside. অর্থঃ “ভারতকে বিপাকে ফেলার জন্য ২০১২ সালের মধ্যে বেইজিং উত্তর-পূর্ব অঞ্চলকে বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যে শিলিগুরি করিডোরে এক ডিভিশন স্পেশাল ফোর্সকে প্যারাসুট যোগে নামাতে পারে। শিলিগুরি করিডোরের উপর স্পেশাল ফোর্সের দখলদারি বলবৎ রাখার জন্য সে সময় সীমান্তের অন্যান্য ক্ষেত্রেও একযোগে হামলা হতে পারে। সব কিছুই হবে এমন এক সময় যখন আনবিক বোমার ভয়ও মাথার উপর ঝুলতে থাকবে। এরই সাথে তাল মিলিয়ে কাশ্মীরকে বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যে ইসলামাবাদ কতৃপক্ষ আন্তর্জাতিক সীমান্ত বরাবর দ্বিতীয় রণাঙ্গণ খুলবে। দেশের অভ্যন্তরে একই সময় চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে পঞ্চম বাহিনীর লোকেরা।”

ভারতীয়দের মাথাব্যাথা শুধু শিলিগুড়ি, কাশ্মির বা আভ্যন্তরীন মাওবাদীদের নিয়ে নয়, আতংক বেড়েছে আফগানিস্তানকে নিয়েও। ভয়ের বড় কারণ, একমাত্র ব্রিটেশদের হামলা বাদে দিল্লি অভিমুখে অতীতের সবগুলি হামলা হয়েছে আফগানিস্তানের মধ্য দিয়ে। আর আফগানিস্তানের মধ্য দিয়ে প্রসারিত হল মধ্য এশিয়ার দেশগুলির যাওয়ার রাস্তা। সে আফগানিস্তান আজ দখলে যাচ্ছে পাকিস্তানপন্থি তালেবানদের হাতে! ভারতীয় এটি ভাবতেও ভয় হয়। মি. ভার্মা লিখেছেন, “With Afghanistan being abandoned by the West, beginning July 2011, Islamabad will craft a strategy to take over Kabul with the help of Islamic fundamentalist groups. The Taliban will initially concentrate on unraveling a soft target like India in concert with Beijing -Islamabad -Kabul or Chinese Communists- Pakistan Army- Irregular Forces axis.” অর্থঃ ২০১১ সালের জুলাইয়ের দিকে পশ্চিমা শক্তিবর্গ যখন আফগানিস্তান ছেড়ে চলে যাবে তখন ইসলামাবাদ কর্তৃপক্ষ ইসলামী মৌলবাদীদের সাথে মিলে পরিকল্পনা নিবে কাবুল দখলের। তালেবানগণ তখন বেইজিং-ইসলামাবাদ-কাবুল অথবা চীনা কম্যুনিষ্ট-পাকিস্তান সেনাবাহিনী-অনিয়মিত সৈন্য –এরূপ অক্ষীয় জোটের সাহায্য নিয়ে শুরুতে ভারতের ন্যায় সহজ টারগেটের উপর আঘাত হানতে মনযোগী হবে।”

ভারতীয়দের দৃষ্টিতে বাংলাদেশ ভারতের সীমান্ত প্রতিরক্ষা সীমানার বাইরের কোন দেশ নয়। বাংলাদেশকে সে পরিকল্পিত প্রতিরক্ষা বুহ্যের বাইরের দেশ ধরলে ভারতের জন্য কোন মজবুত ডিফেন্স স্ট্রাটেজী গড়ে তোলাই অসম্ভব। সেটি ভারত হাড়ে হাড়ে বুঝেছে ১৯৬২ সালে যখন চীনের সাথে ভারতের যুদ্ধ হয়। সে যুদ্ধে ভারত চরম ভাবে পরাজিত হয়। চীনের বিশাল বাহিনীর মোকাবেলায় ভারত প্রয়োজনীয় সংখ্যক সৈন্যসমাবেশই করতে পারেনি। কারণ সেরূপ রাস্তাই ভারতের জন্য সে সময় ছিল না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়ে ভারত তখন পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের উপর চাপ দিয়েছিল যাতে পূর্ব পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে সৈন্য সমাবেশের সুযোগ দেয়। কিন্তু আইয়ুব খান সে চাপের কাছে নতি স্বীকার করেননি। কিন্তু একাত্তরে পাকিস্তানের পরাজয়ের পর ভারতের সামনে সম্ভাবনার রাস্তা খুলে যায়। এশিয়ায় প্রভূত্ব বিস্তারে ভারত আজ যে স্বপ্ন দেখছে সেটি মুলতঃ একাত্তরের বিজয়ের ফলশ্রুতিতেই।

আফগানিস্তানের কারজাই তার জনপ্রিয়তা নিয়ে ভাবে না। তার ভাবনা মার্কিনীদের খুশি করা নিয়ে। সে জানে, জনগণের সমর্থণ নিয়ে সে ক্ষমতায় আসেনি। অধিকৃত দেশে সেটি জরুরীও নয়।  ক্ষমতায় বসানোর পর তাঁকে ক্ষমতায় রাখার দায়ভারও তাই মার্কিনীদের। তেমনি শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা হারানো নিয়ে কোন দুর্ভাবনা নেই। সে দুর্ভাবনা ও দায়ভার ভারতীয়দের। ২০০৮ সালের নির্বাচনে যারা তাঁকে বিজয়ী করেছিল তাকে ক্ষমতায় অব্যাহত রাখার দায়ভারও তাদের। শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হলে আওয়ামী লীগের চেয়েও বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হবে ভারত। তখন বিপদে পড়বে তাদের ৪ বিলিয়ন ডলারের বিশাল বাজার। বিপদে পড়বে উত্তর-পূর্ব ভারতে তাদের যুদ্ধ।  চট্টগ্রাম বন্দরে আটককৃত ১০ট্রাক অস্ত্র নিয়ে হাসিনা সরকার প্রমাণ করে ছেড়েছে তাঁর সরকার ভারতীয়দের কাছে কত গুরুত্বপূর্ণ। বলা হচ্ছে, সে ১০ট্রাক চীনা অস্ত্র আনা হয়েছিল উলফা বিদ্রোহীদের হাতে পৌছানোর জন্য। হাসিনা ক্ষমতাচ্যুৎ হলে ভবিষ্যতে ১০ ট্রাক নয় আরো বেশী অস্ত্র যে বিদ্রোহীদের হাতে পৌছবে তা নিয়ে কি ভারতীয়দের মনে কোন সন্দেহ আছে? ভারতীয় নেতারা কি এতই শিশু যে তারা সেটি বুঝে না? তাই ভারত চায়, শেখ হাসিনার আওয়ামী-বাকশালী সরকার শুধু ক্ষমতায় থাকুক তাই নয়, বরং ভারতের সাথে উলফা বিরোধী যুদ্ধে পুরাপুরি সংশ্লিষ্ট হোক। এ যুদ্ধে যোগ দিক সক্রিয় পার্টনার রূপে, যেমনটি দিয়েছিল একাত্তরে। মার্কিন সরকার এমনই একটি যুদ্ধ চাপিয়েছে পাকিস্তানের উপরও।সে যুদ্ধের ফল পাকিস্তানে যেমন ভাল হয়নি, বাংলাদেশেও তা সুফল বয়ে আনবে না।

 

ভারতীয় হস্তক্ষেপ অনিবার্য যে কারণে 

কাউকে নিজ ঘরে দাওয়াত দিলে তাকে নিরাপত্তাও দিতে হয়। মেহমানদারির এ এক মহা দায়ভার। নিজ গৃহে অন্যের উপর হামলা হলে সেটি আর তখন আভ্যন্তরীণ বিষয় থাকে না। তাকে বাঁচাতে অন্যরা তখন ঘরে ঢুকার বৈধতা পায়। তাছাড়া শত শত মাইল ব্যাপী করিডোরে শত শত ভারতীয় যানবাহন ও হাজার হাজার ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা দেয়ার দায়ভার কি এতই সহজ? বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চেয়ে বহুগুণ বিশাল হলো পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। কিন্তু ন্যাটো বাহিনীকে করিডোর দিয়ে নিরাপত্তা দিতে পারছে না। কোন দেশ কি পারে তার হাজার হাজার মাইল লম্বা রাজপথকে দিবারাত্র নিরাপত্তা দিতে? অথচ সে ব্যর্থতার কারণে পাকিস্তানকে তারা ব্যর্থ রাষ্ট্র বলার সুযোগ পাচ্ছে। অভিযোগ তুলেছে, পাকিস্তান তার সামরিক বাহিনীকে ন্যাটোর নিরাপত্তায় যথাযথ কাজে লাগাচ্ছে না। এখন নিজেদের নিরাপত্তার দায়ভার মার্কিনীরা নিজ হাতে তুলে নিয়েছে। এখন লাগাতর মার্কিনী ড্রোন হামলা এবং সে সাথে সামরিক হামলা হচ্ছে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে। এর ফলে ভূলুন্ঠিত হয়েছে পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব। কথা হল, পাকিস্তানের চাইতে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী কি বেশী শক্তিশালী? কিছুদিন আগেও পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর দক্ষতা নিয়ে খোদ মার্কিনীরাই প্রশংসা করতো। আর সেই সেনাবাহিনীকেই এখন তারা ব্যর্থ বলছে। ফলে করিডোর দিলে এবং সে করিডোরে চলমান ভারতীয় যানবাহনের উপর হামলা হলে তখন নিরাপত্তার দায়ভারও ভারতীয়রা নিজ হাতে নিতে চাইবে। তখন বাংলাদেশে ভারতীয় সৈন্য সমাবেশ যেমন বাড়বে,তেমনি বাড়বে তাদের উপর হামলাও। এর ফলে তীব্রতর হবে যুদ্ধও। এভাবেই বাংলাদেশের কাঁধে চাপবে ভারতের যুদ্ধ।

 

ভারত জানে, করিডোর দিলে ভারতের যুদ্ধে বাংলাদেশকে নামানো সহজতর হবে। কারণ করিডোর দিয়ে চলমান ভারতীয় যানের উপর হামলা রোধে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাহিনী তখন সীমান্ত ছেড়ে কামানের নলগুলি নিজ দেশের জনগণের দিকে তাক করতে বাধ্য হবে। দেশটি তখন পরিণত হবে আরেক ইরাক,আরেক আফগানিস্থান বা কাশ্মীরে। করিডোর দিলে এবং সে করিডোরে চলমান ভারতীয় যানবাহনের উপর হামলা হলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতীয় হস্তক্ষেপ যেমন বাড়বে তেমনি বাড়বে ভারতীয় সৈন্য সমাবেশ। পাকিস্তানের মহাসড়কে যতই বাড়ছে ন্যাটোর তেলবাহি ট্যাংকারের সংখ্যা ততই বাড়ছে সেগুলির উপর হামলা। সেখানে হাইজ্যাক হচ্ছে মার্কিনী নাগরিক। তেমনি একটি অবস্থা যে বাংলাদেশেও রশদবাহি ভারতীয় যানবাহন ও নাগরিকদের ক্ষেত্রেও হবে তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে? আর ভারতীয় যানবাহন ও নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হলে ভারত কি চুপচাপ বসে থাকবে? ভারত তখন বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র আখ্যা দিয়ে নিজেদের যানবাহন ও নাগরিকদের নিরাপত্তা নিজ হাতে নিতে আগ্রহী হবে। যে অজুহাতে মার্কিনী বাহিনী পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ঢুকে যাকে ইচ্ছা তাকে গ্রেফতার করছে বা হত্যা করছে, এবং যখন তখন ড্রোন হামলা করছে, সেটিই যে ভারত বাংলাদেশের অভ্যন্তরে করবে তা নিয়ে কি কোন সন্দেহ আছে? ভারতীয় বিএসএফ যেটি বাংলাদেশের সীমান্তে করছে সেটিই করবে দেশের ভিতরে ঢুকে। আর সে কাজে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার ও তার পশ্চিমা মিত্ররা যে ভারতকে অকুণ্ঠ সমর্থন দিবে তা নিয়েও কি কোন সংশয় আছে?  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তো ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে, ভারত দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক শক্তি রূপে দায়িত্ব পালন করুক। অর্থাৎ আফগানিস্তান এবং ইরাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যা কিছু করছে সেটিই ভারত বাংলাদেশ এবং পাশ্বর্ব্তী অন্যান্য দেশে পালন করুক। ভারত একই ভাবে মার্কিনীদের পাশে দাড়িয়েছে আফগানিস্তানে। বরং ভারতের আব্দার,মার্কিন বাহিনী যেন আফগানিস্তান ত্যাগ না করে।

 

ভারতের বিদেশ নীতিতে সম্প্রতি আরেক উপসর্গ যোগ হয়েছে। ভারতের যে কোন শহরে বোমা বিস্ফোরণ হলে তদন্ত শুরুর আগেই ভারত সরকার পাকিস্তানীদের পাশাপাশি বাংলাদেশীদের দায়ী করে বিবৃতি দিচ্ছে। যেন এমন একটি বিবৃতি প্রচারের জন্য পূর্ব থেকেই প্রস্তুত থাকে। কিন্তু এ অবধি এমন কাজে বাংলাদেশীদের জড়িত থাকার পক্ষে আজ অবধি কোন প্রমান তারা পেশ করতে পারিনি। এমন অপপ্রচারের লক্ষ্য একটিই। করিডোরসহ ভারত যে সুবিধাগুলো চায় সেগুলি আদায়ে এভাবে প্রচন্ড চাপসৃষ্টি করা। ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতির এটিই হলো এখন মূল স্ট্রাটেজী। লক্ষ্যনীয় হল, সেদেশে বার বার সরকার পরিবর্তন হলেও বাংলাদেশের প্রতি তাদের এ নীতিতে কোন পরিবর্তন নেই। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য বিপদ বাড়বে যদি এ লড়ায়ে বালাদেশ ভারতের পক্ষ নেয়। পণ্যের পাশাপাশি সৈন্য ও সামরিক রশদ তখন রণাঙ্গণে গিয়ে পৌঁছবে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে। ফলে পূর্ব এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে প্রতিপক্ষ রূপে চিহ্নিত হবে বাংলাদেশ। আজ অবধি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যারা একটি তীরও ছুঁড়েনি তারাই পরিণত হবে পরম শত্রুরূপে। তখন সসস্ত্র হামলার লক্ষ্যে পরিণত হবে বাংলাদেশের সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনা। তখন অশান্ত হয়ে উঠবে দেশের হাজার মাইল ব্যাপী উত্তর ও পূর্ব সীমান্ত। অহেতুক এক রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে বাংলাদেশ। কথা হলো, যে গেরিলা যোদ্ধাদের মোকাবিলা করতে গিয়ে বিশাল ভারতীয় বাহিনীই হিমসিম খাচ্ছে সেখানে বাংলাদেশের মত দেশ কি সফলতা পাবে? তখন বাংলাদেশের সম্ভাব্য বিচ্ছিন্নতাবাদীরা বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা বিদ্রোহীগণ বন্ধু ও নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পাবে এ এলাকায়। এ কারণেই বাংলাদেশের জন্য অতিশয় আত্মঘাতি হলো ভারতের জন্য ট্রানজিট দান।

 

 

 

খাল কাটা হচ্ছে কুমির আনতে

খাল কাটলে কুমির আসাবেই। সেটি শুধু স্বাভাবিকই নয়, অনিবার্যও। অথচ বাংলাদেশ সরকার সে পথেই এগুচ্ছে। করিডোর দিলে আগ্রাসী শক্তির পদচারণা হবেই। তখন শুধু মালবাহী ভারতীয় ট্রাকই আসবে না, সৈন্যবাহী যানও আসবে। তাদের বাঁচাতে ড্রোন হামলাও হবে। যেভাবে পাকিস্তানে আজ ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিনত করা হয়েছে, এবং সে অজুহাতে সেদেশে মার্কিনী ড্রোন হামলা ও সামরিক অনুপ্রবেশকে যে ভাবে জায়েজ করা হচ্ছে সেটি বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও হবে। তখন বাংলাদেশ প্রকৃত অর্থেই ভারতের এক অধিকৃত দেশে পরিনত হবে। ফলে আজকের আফগানিস্তান ও কাশ্মীরের যে অধিকৃত দশা সেটি বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ঘটবে। আর সে পরাধীনতাকে স্বাধীনতা বলার মত লোকের অভাব যেমন আফগানিস্তান ও কাশ্মীরে হয়নি, তেমনি বাংলাদেশেও হবে না। “ফারাক্কার পানিচুক্তির ফলে বাংলাদেশ লাভবান হয়েছে”, “টিপাই মুখ বাঁধ দেয়াতে সুরমা, কুশিয়ারা ও মেঘনায় পানি থৈ থৈ করবে” এবং “ভারতকে করিডোর দিলে হাজার হাজার কোটি টাকার অর্থ লাভ হবে” এমন কথা বলার লোক কি বাংলাদেশে কম? তারাই সেদিন ভারতের পক্ষে তাদের গলা জড়িয়ে প্রশংসা গীত গাইবে।

 

আরো লক্ষ্যণীয় হলো, বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী এ এলাকাটিতে ভূ-রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিবর্তন হচ্ছে অতি দ্রুতগতিতে। মেঘালায়, মিজোরাম ও ন্যাগাল্যান্ড রাজ্যগুলি ইতিমধ্যেই পরিণত হয়েছে খৃষ্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্যে। খৃষ্টান ধর্ম জোরে সোরে প্রচার পাচ্ছে পাশ্ববর্তী প্রদেশগুলিতেও। ফিলিপাইনের পর সমগ্র এশিয়ায় এটিই এখন সর্ববৃহৎ খৃষ্টান অধ্যুষিত এলাকা। তাছাড়া ভারতীয় সংখ্যাগরিষ্ট হিন্দুদের আচরণে এ ধর্মমতের অনুসারিরাও অতি অতিষ্ট। উগ্র হিন্দুদের কাছে হিন্দু ধর্ম ছাড়া অন্য ধর্মে দীক্ষা নেওয়া এক অমার্জনীয় অপরাধ। ফলে অতি জোরদার হচেছ খৃষ্টান অধ্যুষিত এলাকা নিয়ে একটি অখন্ড খৃষ্টান রাষ্ট্র নির্মানের ধারণা। পশ্চিমা খৃষ্টান জগতে এমন রাষ্ট্রের পক্ষে আগ্রহ দিন দিন বাড়বে সেটিই স্বাভাবিক। ইন্দোনেশিয়া থেকে পূর্ব তিমুরকে আলাদা করার পিছনে যে যুক্তি দেখানো হয়েছিল সে যুক্তির প্রয়োগ হবে ভারতের বিরুদ্ধেও। ফলে খৃষ্টান জগত এবং চীনের ন্যায় বৃহৎ শক্তিবর্গও তখন নিজ নিজ স্বার্থে স্বাধীনতাকামীদের পক্ষ নিবে।

 

এ অবস্থায় ভারতের পক্ষ নেওয়ার খেসারত দিতে হবে অন্যান্য আঞ্চলিক ও বৃহৎ শক্তির বিরাগ-ভাজন হয়ে। বাংলাদেশের জন্য সেটি হবে আত্মঘাতি। কিন্তু ভারতের জন্য চরম সুখের বিষয়টি হল, বাংলাদেশের মানুষের গলায় এ ঘাতক ফাঁসটি তাকে নিজে পড়িয়ে দিতে হচ্ছে না। দেশবাসীর গলায় সে ফাঁসটি পড়ানোর সে দায়িত্ব নিয়েছে বাংলাদেশের সরকার নিজে। ভারতীয়দের সৌভাগ্য যে,সে কাজে তারা একটি সেবাদাস সরকারও পেয়ে গেছে। এ মুহুর্তে ভারত সরকারের কাজ হয়েছে, সে পরিকল্পিত ফাঁসটি এ নতজানু সরকারের হাতে তুলে দেওয়া। একাত্তরের যুদ্ধের ফসল যেভাবে তারা নিজেরা ঘরে তুলেছিল,তারা একই কৌশল নিয়ে এগুচ্ছে এবারও। একাত্তরের যুদ্ধ শেষে তারা বাংলাদেশীদের উপহার দিয়েছিল স্বাধীনতার নামে ভারতের পদানত একদলীয় একটি বাকশালী সরকার, রক্ষিবাহিনীর নৃশংসতা, “ভিক্ষার তলাহীন ঝুড়ি” এবং ভয়ানক দুর্ভিক্ষ। উনিশ শ’ সত্তরের নির্বাচন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে হলেও দেশবাসীর ভাগ্যে সে গণতন্ত্র জুটেনি। সে নির্বাচনে যারা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন তার বাংলাদেশীদের ভবিষ্যত নিয়ে একাত্তরে একদিনের জন্যও কোন বৈঠকে বসেননি। তারা স্বাধীনতার ঘোষনা যেমন দেননি, তেমনি একাত্তরের যুদ্ধের ঘোষণা ও সে যুদ্ধের পরিচালনাও করেননি। সবই করেছে ভারত সরকার, ভারতীয় পার্লামেন্ট, ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থা ও সেনাবাহিনী। মুজিবামলে গণতন্ত্রকেই বধ করা হয়েছিল শেখ মুজিবের স্বৈরাচারি বাকশালী শাসনকে স্থায়ীরূপ দিতে। একই ভাবে গণতন্ত্র অকার্যকর করা হয়েছে ২০০৮ সালের নির্বাচনের পরও। বিরোধী দলীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের গ্রেফতার এবং তাদের উপর অত্যাচার, এমন কি সংসদ সদস্যদের রাজপথে পিটানো এখন রাজনীতির সংস্কৃতিতে পরিণত করা হয়েছে।

 

লড়াই দেশ ও ঈমান বাঁচানোর

একাত্তরে যুদ্ধ থেকে ৯ মাসে মুক্তি মিললেও এবারে সেটি মিলছে না। বরং বাংলাদেশীদের কাঁধে চাপানো হচ্ছে এমন এক লাগাতর যুদ্ধ যা সহজে শেষ হবার নয়। তাছাড়া এ যুদ্ধটি আদৌ তাদের নিজেদের যুদ্ধ নয়। বরং সর্ব অর্থেই ভারতীয় এবং সেটি ভারতের স্বার্থ সংরক্ষণের।একাত্তরের যুদ্ধে ভারতের যে উদ্দেশ্য অসম্পূর্ণ থেকে যায়, ভারত এবার কোমর বেঁধেছে সেটিই পুরণ করতে। তাই ভারতের লক্ষ্য শুধু করিডোর লাভ নয়। সীমান্ত চুক্তি, সীমান্ত বাণিজ্য বা রাস্তাঘাট নির্মানে কিছু বিনিয়োগও নয়ও। বরং তার চেয়ে ব্যাপক ও সূদুর প্রসারী। সেটি যেমন দেশের ইসলামি চেতনার নির্মূল ও ইসলামপন্থি দেশপ্রেমিকদের কোমর ভাঙ্গার,তেমনি দেশটির উপর পরিপূর্ণ অধিকৃতি জমানোর। মি. ভার্মার ন্যায় ভারতীয় বুদ্ধিজীবীরা সে অভিলাষের কথা গোপন রাখেনি, তেমনি গোপন রাখছেন না বহু ভারতীয় রাজনৈতিক নেতাও। সম্প্রতি বিজেপির এক কেন্দ্রীয় নেতা তো সিলেট থেকে খুলনা বরাবর বাংলাদেশের অর্ধেক দখল করে নেয়ার দাবীও তুলেছেন। শরিয়তের প্রতিষ্ঠা, জিহাদের ন্যায় ইসলামের মৌল শিক্ষার প্রচারের উপর নিষেধাজ্ঞা এবং ইসলামী সংগঠনগুলির নেতাকর্মীদের উপর নির্যাতন দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে বস্তুত একই ভারতীয় স্ট্রাটেজীর অবিচ্ছেদ্দ অংশরূপে। বাংলাদেশীদের সামনে লড়াই এখন তাই শুধু গণতন্ত্র উদ্ধারের নয় বরং তার চেয়েও গুরুতর। সেটি দেশ বাঁচানোর। এবং সে সাথে ঈমান ও ইসলাম বাঁচানোর। ০৯/০৯/১১

 




ভারতের ইসলামভীতি এবং বাংলাদেশের পরাধীনতা

ভারতীয় বিনিয়োগ ও আরোপিত পরাধীনতা

ভারতের শাসক মহলে যে বিষয়টি প্রচণ্ড ভাবে কাজ করে তা হলো ইসলাম ও মুসলিম ভীতি। সে ভয়ের ভিত্তিতেই প্রণীত হয় বাংলাদেশ বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র নীতি, সামরিক নীতি, বাণিজ্য নীতি ও বর্ডার নীতি। বাংলাদেশে কতটা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেল, জনগণ কতটা নাগরিক অধিকার পেল, মিডিয়া কতটা স্বাধীনতা পেল -সেগুলি ভারতের কাছে আদৌ কোন বিবেচ্য বিষয়ই নয়। বরং তাদের কাছে যা গুরুত্ব পায় তা হলো, বাংলাদেশের মুসলিম জনগণকে কতটা দাবিয়ে রাখা হলো, ইসলামের উত্থানকে প্রতিহত করা এবং হিন্দুদের কতটা উপরে তোলা হলো সেগুলি।  সে এজেন্ডা নিয়ে কাজ করার লক্ষ্যেই ভারত বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিশ্বস্থ্য ও অনুগত কলাবরেটর চায়। ভারতের সে এজেন্ডা পালনে কলাবরেটর রূপে কাজ করছে শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগ। সেটি ১৯৭১ সাল থেকে নয়, বরং তার বহু আগে থেকেই। শেখ হাসিনা ভারতকে যতটা সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে তা অন্য যে কোন স্বাধীন দেশ থেকে পেতে ভারতকে যুদ্ধ করতে হতো। এবং সে দেশের অর্থনীতিতে ভারতকে বিশাল বিনিয়োগ করতে হতো। যেরূপ পশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলি ও জাপানকে বন্ধু রূপে পেতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশাল বিনিয়োগ করেছে সে সব দেশের পুণঃনির্মাণে। অথচ ভারত বাংলাদেশ থেকে সেটি পেয়েছে কোনরূপ অর্থব্যয় না করেই। কারণ তারা জানে, চাকর-বাকরদের থেকে কিছু পেতে বিনিয়োগ করতে হয় না, এজন্য কিছু উচ্ছিষ্ট ব্যয়ই যথেষ্ঠ। ভারতীয় বর্ণ হিন্দুরা শেখ মুজিব, শেখ হাসিনা বা কোন বাঙালী মুসলিমকে কোনকালেই কি চাকর-বাকরের চেয়ে বেশী কিছু ভেবেছে?

ভারত বাংলাদেশের বুকের উপর দিয়ে ট্রানজিট নিয়েছে কোনরূপ রোড ট্যাক্স বা ট্রানজিট ফি না দিয়েই। কারণ চাকর-বাকরের ভিটার উপর দিয়ে হাটতে জমিদারকে কোন ফি দিতে হয় না। কৃতজ্ঞতাও জাহির করতে হয় না। বরং কথায় কথায় চাকর-বাকরদের গালি দেয়াটি জমিদারের অধিকার। তাই পশ্চিম বাংলা ও আসামের মুসলিমগণ গালি খাচ্ছে অনুপ্রবেশকারী বাঙালী মুসলিম রূপে। ভারতের অভিভাবক-সুলভ উদ্ধত দাদাগিরি ধরা পড়ে শেখ মুজিবের শাসনামল  থেকেই। সে আমলেই ভারত বাংলাদেশ থেকে বেরুবাড়ি ছিনিয়ে নিয়েছে প্রতিশ্রুত তিন বিঘা করিডোর না দিয়েই। তখনই ফারাক্কা দিয়ে পদ্মার পানি তুলে নেয়। এখন তুলে নিচ্ছে তিস্তার পানি। কুশিয়ারা ও সুরমার পানিতেও হাত দিচ্ছে। সে সাথে উত্তর-পূর্ব ভারতের মজলুম জনগণের মুক্তিযুদ্ধের সাথে শেখ হাসিনা ও তার দলের গাদ্দারিটা কি কম? সেটি একমাত্র ভারতকে খুশি করার লক্ষ্যে। অথচ বাংলাদেশের সাথে এ বিশাল এলাকার মুক্তিকামী মানুষের কোন কালেই কোন শত্রুতা ছিল না। বরং তারা বাংলাদেশের মিত্র ও বাংলাদেশী পণ্যের বিশাল বাজার হতে পারতো।

ভারতের একমাত্র বিনিয়োগ বাংলাদেশের রাজনীতি, সংস্কৃতি ও মিডিয়াতে। সেটি দেশের প্রচার, প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান  ও সেনাবাহিনীতে ভারতসেবী বিশাল দাসবাহিনী গড়ে তোলার স্বার্থে। এ বিনিয়োগের মূল লক্ষ্য, ইসলাম ও মুসলিমের বিরুদ্ধে ভারতের নাশকতাকে তীব্রতর করা। ভারতের এ বিনিয়োগে এক দিকে যেমন সীমাহীন স্বাধীনতা বেড়েছে ভারতসেবী দাসদের, তেমনি পরাধীনতা বেড়েছে বাংলাদেশের জনগণের। এর ফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মুসলিমদের পিটাতে একাত্তরের ন্যায় ভারতকে তার নিজের সেনাবাহিনী নামাতে হচ্ছে না। সেটি অতি নৃশংস ভাবেই করছে প্রতিপালিত দাসরাই। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই ভারতের মূল স্ট্রাটেজী হলো, বাংলাদেশের বুকে ভারতীয় দাসদের শাসনকে প্রতিষ্ঠা দেয়া এবং সেটিকে দীর্ঘায়ীত  করা। সেরূপ এক দাস-শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই ভারত একাত্তরে প্রকান্ড এক যুদ্ধ লড়েছিল। সে যুদ্ধটির মূল লক্ষ্য দেশটির পূর্ব সীমান্তে পাকিস্তানের ন্যায় আরেক স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠা ছিল না। বাঙালী মুসলিমদের গণতান্ত্রিক অধিকার দেয়াও ছিল না। বরং লক্ষ্য ছিল, ভারতসেবী শেখ মুজিব ও তার দলকে মুসলিম ও ইসলাম দলনে পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়া।এবং সেটি জনগণের স্বাধীনতাকে পদদলিত করে। শেখ মুজিবের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু ভারতীয় নীতির মৃত্যু হয়নি। ফলে মুজিবের ন্যায় শেখ হাসিনাও পাচ্ছে গণতন্ত্র হত্যা ও ফ্যাসিবাদি স্বৈরাচারি শাসন চালানোর ক্ষেত্রে ভারতের পক্ষ থেকে পূর্ণ সহযোগিতা। ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের ভোট-ডাকাতিকে সমর্থণ দিতে ভারত তাই কোন রূপ দেরী করেনি। গণতন্ত্র নৃশংস ভাবে নিহত হলেও তা নিয়ে ভারতীয় শাসক চক্রের বিবেকে কোন দংশন দেখা যায়নি।

যে কোন সাম্রাজ্যবাদি শক্তিই জনগণের বলকে নিজের জন্য চ্যালেঞ্জ মনে করে। ভারতও তেমনি বিপদ মনে করে বাংলাদেশের জনগণের শক্তিকে। এজন্যই ভারতের পলিসি হলো, বাংলাদেশের জনগণকে যে কোন মূল্যে শক্তিহীন করা। সেটি স্বৈরাচারি শাসন চাপিয়ে এবং জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে। গণতন্ত্র হত্যায় ভারতের বিনিয়োগটি এজন্যই বিশাল। সেরূপ বিনিয়োগ দেখা গেছে যেমন ২০০৮ সালের নির্বাচনে তেমনি অন্যান্য নির্বাচনেও। আসামের দৈনিক নববার্তা পত্রিকাটি গত ২১/১০/২০১৩ তারিখে প্রথম পৃষ্ঠায় লিড খবর ছাপে যে,হাসিনাকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার জন্য ২০১৪ সালের নির্বাচনে ভারত এক হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে। উক্ত পত্রিকায় ভাস্কর দেব আরো রিপোর্ট করে,ভারত গত ২০০৮ সনের নির্বাচনে ৮ শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছিল। বলা হয়, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতি নির্বাচনেই ভারত বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে। তবে ২০১৮ সালে ভারতকে পূজি বিনিয়োগ করতে হয়নি। কারণ, ভোট-ডাকাতিতে পূজি লাগে না, লাগে অস্ত্রধারি ডাকাত। শেখ হাসিনা সে ডাকাতদের সংগ্রহ করেছে দেশের পুলিশ ও সেনাবাহিনী থেকে। ডাকাতিতে সহায়তা দিয়েছে দেশের প্রশাসন ও নির্বাচনি কমিশন।

 

ভীতি মুসলিম-বাংলাদেশ নিয়ে

প্রশ্ন হলো, আওয়ামী লীগের পিছনে ভারতের এরূপ বিনিয়োগের হেতু কি? হেতু, স্বাধীন মুসলিম-বাংলাদেশ ভীতি। ভারত ভয় পায় বাংলাদেশের ১৫ কোটি মুসলিমের ইসলামের মৌল বিশ্বাস নিয়ে বেড়ে উঠা নিয়ে। ইতিহাসের ছাত্র মাত্রই জানে, ১৯৪৭’য়ে হিন্দুদের অখন্ড ভারত নির্মাণের স্বপ্নকে যারা ধুলিতে মিশিয়ে দিয়েছিল তারা পাঞ্জাব, সিন্ধু, সীমান্ত প্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ, বিহার বা অন্যকোন স্থানের মুসলিম নয়, তারা ছিল বাংলার মুসলিম। ১৯০৬ সালে ঢাকায় মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা থেকে ১৯৪০ সালে লাহোরে পাকিস্তান প্রস্তাব-পাশ ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলন পর্যন্ত প্রতিটি পর্বে যারা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে তারা ছিল এই বাংলার মুসলিম জনগণ। সে সময় মুসলিম লীগের মূল দুর্গটি ছিল বাংলায়। আজও সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার বুকে যে ভূখন্ডটিতে সবচেয়ে বেশী মুসলিমের বাস সেটিও পাঞ্জাব, সিন্ধু, আফগানিস্তান নয়, বরং সেটি বাংলাদেশ। আর যেখানে এত মুসলমানের বাস সেখানে ইসলামের জাগরণের ভয় থেকেই যায়। কারণ ঘুম যত দীর্ঘই হোক, সেটি তো মৃত্যু নয়। যত দেরীতেই হোক, এক সময় সে ঘুমও ভেঙ্গে যায়। বাংলার মুসলিমগণ সাতচল্লিশে জেগে উঠেছিল। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর আবার ঘুমিয়ে পড়েছিল। আর সে ঘুমের ঘোরেই ভারতীয় বাহিনী বাংলাদেশে ঢুকে তার দাসদের সহায়তায় বিরাট সর্বনাশটি করেছিল। কিন্তু বাংলার মুসলিমগণ যে আবার জেগে উঠতে উদগ্রীব -সে আলামত তো প্রচুর। আর তাতেই প্রচণ্ড ভয় ধরেছে ভারতের।

বাংলার মুসলিমদের সাতচল্লিশের জিহাদটি ছিল উপমহাদেশের অন্যান্য এলাকার মুসলমানদের সাথে কাঁধ মিলিয়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার। কারণ, প্রাসাদ গড়তে যেমন বৃহৎ ভূমি লাগে তেমনি সভ্যতা গড়তে বিরাট একটি রাষ্ট্র এবং বৃহৎ জনগোষ্ঠি লাগে। প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের এজন্যই মক্কা-মদিনা বা হেজাজের ক্ষুদ্র গন্ডি পেরিয়ে বিশাল দেশ গড়তে হয়েছে। সাতচল্লিশের সে জিহাদটি ছিল দু’টি বৃহৎ শক্তির বিরুদ্ধে। একদিকে ছিল সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ বিশ্বশক্তি, অপর দিকে ছিল আগ্রাসী বর্ণ হিন্দুশক্তি। মূল লক্ষ্যটি ছিল, বিশ্ব-রাজনীতিতে মুসলমানদের হৃত গৌরবকে আবার ফিরিয়ে আনা। উপমহাদেশের মুসলমানদের সম্মিলিত প্রচেষ্ঠার ফলেই সেদিন হিন্দু ও ব্রিটিশ -এ উভয়শক্তির বিরোধীতার সত্ত্বেও জন্ম নিয়েছিল বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম দেশ পাকিস্তান। ভারত শুরু থেকে সে বৃহৎ পাকিস্তানকে মেনে নিতে পারিনি। তেমনি আজ পারছে না স্বাধীন বাংলাদেশকে মেনে নিতে। তাদের ভয়,না জানি এটি আরেক পাকিস্তানে পরিণত হয়। ভারতের ভয়ের আরো কারণ, একাত্তরে পূর্ব পাকিস্তান বাংলাদেশে পরিণত হলেও বাঙালী মুসলিমের মন থেকে ইসলাম বিলুপ্ত হয়নি। বরং দিন দিন সে ইসলামী চেতনা আরো বলবান হচ্ছে। সে সাথে প্রবলতর হচ্ছে ভারতের পূর্ব প্রান্তে ইসলামি শক্তি রূপে বেড়ে উঠার সাধ। আর তাতে ভয় তীব্রতর হচ্ছে আগ্রাসী ভারতীয়দের মনে। সেটি আঁচ করা যায় ভারতীয় পত্র-পত্রিকায় সেদেশের রাজনৈতীক নেতা, বুদ্ধিজীবী ও কলামিস্টদের লেখা পড়লে।

 

ভারতীয়দের আপনজনপশ্চিমবঙ্গের মেয়ে হাসিনা

ভারত চায়, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নিজ স্বার্থের বিশ্বস্থ পাহারাদার। সেটি না হলে পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ সৃষ্টিতে ভারতের যুদ্ধ ও বিনিয়োগের মুল উদ্দেশ্যই বানচল হয়ে যায়। পাহারাদারীর সে কাজে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীগণ যে ভারতের আপনজন -সে সাক্ষ্যটি এসেছে ভারতীয় রাজনীতির অন্যতম এক নীতিনির্ধারকের মুখ থেকে। তিনি হলেন ভারতের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শ্রী সুশীলকুমার শিন্দে। শেখ হাসিনার ভারতপ্রেমে তিনি এতটাই মোহিত হন যে, এক অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনাকে তিনি “ভারতের আপনজন’ এবং “যেন পশ্চিমবঙ্গের মেয়ে” রূপে আখ্যায়ীত করেছেন। সে খবরটি ছেপেছিল কোলকাতার দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা তার ২০১৩ সালের ৭ই নভেম্বর সংখ্যায়। সুশীলকুমার শিন্দে এ কথাটি বলেছেন পাঞ্জাবের আট্টারি-ওয়াঘা সীমান্তের ধাঁচে বেনাপোল-পেট্রাপোল সীমান্তে জয়েন্ট রিট্রিট সেরিমনির সূচনা পর্বের এক সমাবেশে।

প্রতিটি বিনিয়োগের পিছনেই থাকে মুনাফা লাভের আশা। মুনাফা লাভের সম্ভাবনা না থাকলে একটি টাকা ও একটি মুহুর্তও কেউ বিনিয়োগ করে না। আর বাংলাদেশে ভারতের বিনিয়োগটি কোনকালেই খয়রাত ছিল না। খয়রাত ছিল না একাত্তরের যুদ্ধে ভারতীয়দের বিপুল অর্থ ও রক্তের বিসর্জনও। তবে বাংলাদেশ থেকে ভারতের মুনাফা তোলার মাত্রাটি অত্যাধিক বেড়ে যায় যখন শাসনক্ষমতা আওয়ামী লীগের হাতে যায়। ২০০৮ সালে হাসিনার ক্ষমতায় আসাতে ভারত যে প্রচুর মুনাফা তুলেছে সে সাক্ষ্যটি এসেছে খোদ ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শ্রী শিন্দের মুখ থেকে। বাংলাদেশ থেকে তারা এতই নিয়েছে যে এখন সাধ জেগেছে কিছু প্রতিদান দেয়ার। তবে সেটি বাংলাদেশের জনগণকে নয়,সেটি খোদ হাসিনাকে। সে প্রতিদানটি তারা দিতে চায় তাকে পুণরায় ক্ষমতায় বসানোর মধ্যদিয়ে। সে লক্ষ্যেই বাংলাদেশের ২০১৪ সালের নির্বাচনে ভারতের বিনিয়োগ ছিল এক হাজার কোটি রুপি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শিন্দের ভাষায়ঃ “পাঁচ বছরে হাসিনার আমলে ঢাকা ভারতকে যে ভাবে সহযোগিতা করেছে, তার প্রতিদান দিতে নয়াদিল্লিও বদ্ধপরিকর”। তাছাড়া আগামী নির্বাচন শুধু বাংলাদেশীদের জন্যই নয়, ভারতীয়দের কাছেও অতি গুরুত্বপূর্ণ। সে অভিমতটি এসেছে ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থা RAW’য়ের বাংলাদেশ ইনচার্জ ও সিনিয়ার অফিসার শ্রী বিবেকানন্দ থেকে। তিনিও সম্প্রতি জানিয়েছেন,বাংলাদেশের ২০১৪ সালের নির্বাচন ভারতের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ। আর নির্বাচনের গুরুত্ব বাড়লে তাতে ভারতীয়দের বিনিয়োগও যে বাড়বে সেটিই তো স্বাভাবিক।

 

ভারতসেবী দাসের আত্মতৃপ্তি

দাসদের জীবনে বড় চাওয়া-পাওয়াটি হলো মনিব থেকে নিষ্ঠাবান দাস রূপে স্বীকৃতি লাভ। সে স্বীকৃতিটুকু পাওয়ার মাঝেই তারা জীবনের সার্থকতা ভাবে। “দারোগা মোরে কইছে চাচি আমি কি আর মানুষ আছি”–এমন এক দাসসুলভ আত্মতৃপ্তি ফুটে উঠেছে বেনাপোল-পেট্রাপোল সীমান্তের জয়েন্ট রিট্রিট সেরিমনিতে উপস্থিত বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগিরর কথায়। গত ৬/১১/১৩ তারিখে অনুষ্ঠিত সে সেমিনারে ভারতের স্বরাষ্ট্র সুশীলকুমার শিন্দে যখন শেখ হাসিনাকে “ভারতের আপনজন’ এবং “যেন পশ্চিমবঙ্গের মেয়ে” আখ্যায়ীত করেন তখন করতালি দিয়ে সে কথাকে স্বাগত জানিয়েছেন মহিউদ্দিন খান আলমগির। তিনি তার নিজের বক্তৃতাতে ভূয়সী প্রশংসা করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহের। ভারত-বাংলাদেশের বন্ধুত্বকে ‘চিরায়ত’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, এ জন্য আমরা গর্বিত। এর পরে সুশীলকুমার শিন্দে বলেন,“দু’দেশের বন্ধুত্বের কথা বলতে গেলে শেখ হাসিনাজির কথা বলতেই হয়। আমার তো মনে হয়, উনি যেন এই বাংলারই মেয়ে। আমাদের অত্যন্ত আপনজন।” শিন্দের নিজের কথায়, “বাংলাদেশের মাটিতে আশ্রয় নেওয়া এদেশের জঙ্গি সংগঠনগুলিকে উচ্ছেদ করার ক্ষেত্রে হাসিনা সরকারের ভূমিকা প্রশংসনীয়। ভারত নিশ্চয়ই তার প্রতিদান দেবে।”

শ্রী শিন্দের কথায় বুঝা যায়, শেখ হাসিনার উপর ভারতীয় নেতাদের এত খুশির কারণ, বাংলাদেশের মাটিতে ইসলামপন্থিদের নির্মূলে তার নির্মম নৃশংসতা। ভারতীয় সেনাবাহিনী কাশ্মীরের মুসলমানদের সাথে যেরূপ আচরণ করতে ভয় পায়,শেখ হাসিনা তার চেয়েও নৃশংসতর আচরণ করেছে জামায়াত-শিবির কর্মী ও হেফাজতে ইসলামের মুসল্লিদের সাথে। ইসলামপন্থিদের নির্মূল-কর্মে আদালতকেও ব্যবহার করা হচ্ছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে যে আদালত বসানো হয়েছে -সেটি তো সে লক্ষ্যেই। সে অপরাধ কর্মে হাসিনা ঢাল হিসাবে ব্যবহার করছে নিজের মুসলিম নামের পরিচিতি। তিনি বলে থাকেন, আমিও মুসলমান। দাবি করেন, সকালে নাকি কোরআনে পড়ে কাজ শুরু করেন। প্রশ্ন হলো, অন্তরে সামান্য ঈমান থাকলে কেউ কি মুসল্লীদের উপর গুলি চালাতে পারে? সংবিধান থেকে বিলুপ্ত করে কি আল্লাহর উপর আস্থার বানী? নিষিদ্ধ করতে পারে কি তাফসির মহফিল? সে কি বিরোধীতা করে মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তী বিধানের? অথচ হাসিনা তো এর সবগুলিই করছেন। এদের সম্পর্কেই পবিত্র কোরআনে মহান রাব্বুল আ’লামীন বলেছেন, “তারা নিজেদের মুসলমান হওয়ার অঙ্গিকারটিকে ঢাল রূপে ব্যবহার করে। অথচ তারা আল্লাহর রাস্তা থেকে (মানুষকে) দূরে হটায়। কতই না নিকৃষ্ট হলো তারা যা করে সে কাজগুলি।”-(সুরা মুনাফিকুন আয়াত ২)।

বাংলাদেশের সীমান্তে আগামীতে যদি কোন বিদেশী সেনাবাহিনীর আগ্রাসন হয় তবে সেটি ১২শত মাইল দূরের পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দ্বারা হবে না। বাংলাদেশের শিশুরাও সেটি বুঝে। বাংলাদেশের উপর আজ যাদের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য সেটিও পাকিস্তানের নয়, সেটি ভারতের। বাংলাদেশের সীমান্তে আজ যারা ভারতীয় বিএসএফের গুলিতে মারা যাচ্ছে তারা পাকিস্তানী সীমান্ত প্রহরী নয়, তারা ভারতীয়। এবং ভারতীয়দের সে হামলার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের রাজপথে ও মিডিয়াতে যারা প্রতিবাদমুখর তারাও আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের কেউ নয়। তারা হলো বাংলাদেশের ইসলামি জনতা। ভারতীয়দের ভাষায় এরাই হলো বাংলাদেশের ইসলামি মৌলবাদী শক্তি। ভারত নিজের অপরাধগুলি দেখতে চায় না,বরং মৌলবাদী রূপে গালি দেয় তাদের যারা ভারতের সে আগ্রাসী নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে। ভারতীয়রা চায়, সিকিমের ন্যায় বাংলাদেশও ভারতের বুকে লীন হয়ে যাক। চায়,বাংলাদেশের মানুষ শেখ মুজিব,হাসিনা ও আওয়ামী ঘরানার রাজনৈতীক নেতাকর্মী ও বুদ্ধিজীবীর ন্যায় দাসসুলভ চরিত্র নিয়ে বেড়ে উঠুক। এ দাসদের বিশ্বাস, দাসসুলভ এ আত্মসমর্পণটি হলো ভারতের একাত্তরের ভূমিকার জন্য তাদের দায়বদ্ধতা। কিন্তু সেটি হচ্ছে না দেখেই ভারত প্রচন্ড বিক্ষুব্ধ। সে সাথে প্রচন্ড ভীত বাংলাদেশের বুকে প্রতিবাদী মানুষের বিপুল উত্থান দেখে।

 

দাস-শাসন বাংলাদেশে 

ইসলামের উত্থানের ফলে শুধু বাংলাদেশের রাজনীতিতে নয়, ভারতের রাজনীতিতেও যে ভূমিকম্প শুরু হবে তা ভারতীয় নেতারা বুঝে। কারণ ভারতে রয়েছে ২০ কোটি মুসলমানের বাস -যা সমগ্র বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম জনগোষ্ঠি। তাদের হিসাবে প্রতিটি মুসলমানই হলো সুপ্ত টাইম বোমা। সময়মত ও সুযোগমত তা বিস্ফোরিত হতে বিলম্ব করে না। তাছাড়া রাজনৈতীক জাগরণটি প্রচন্ড ছোঁয়াছেও। তাই যে বিপ্লব তিউনিসিয়ায় শুরু হয়েছিল তাই মিশর, লিবিয়া, ইয়েমেন, জর্দান, বাহরাইন ও সিরিয়ায় কাঁপন ধরিয়েছে। ঠোঁট উড়ে গেলে দাঁতেও বাতাস লাগে। তাই বাংলাদেশে ভারত সেবী দাসশক্তির দুর্গ বিলুপ্ত হলে ভারতেও তার আছড় পড়বে। ইসলামের জোয়ার নিয়ে ভারত এজন্যই চিন্তিত। ভারতীয় নেতারা তাই বার বার বলছে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামপন্থিরা বিজয়ী হলে তা পাল্টে দিবে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি। তখন সে বিপ্লব আঘাত হানবে শুধু ভারতে নয়, রোহিঙ্গার মুসলিম ভূমিতেও। ভারত চীনকে সে কথা বলে সে দেশের নেতাদের ইসলামের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে উস্কানি দিচ্ছে। এজন্যই ভারত  চায়,বাংলাদেশের মুসলমানদেরকে যে কোন মূল্যে ইসলাম থেকে দূরে রাখতে। চায়, ইসলামপন্থিদের নির্মূল। ভারতের বাংলাদেশ বিষয়ক নীতির সেটিই মূল কথা। সে লক্ষ্যে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের বিনিয়োগটি এজন্যই এত বিশাল।

আওয়ামী লীগের জন্য ভারত থেকে অর্থ সাহায্যের প্রয়োজন কমেছে। দলটির হাতে এখন বাংলাদেশের রাজস্ব-ভাণ্ডার। এখন পায় নির্দেশমালা। সেটি ১৯৭১ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিজয়ের পর থেকেই। সে সব ভারতীয় প্রতি আনুগত্যের কারণেই শেখ মুজিব ইসলামপন্থিদের রাজনীতিকে নিষিদ্ধ করেছিলেন।এবং জেলে তুলেছিলেন নেতাদের। শাসনতন্ত্রে মূলনীতি রূপে স্থান দেয়া হয়েছিল সমাজতন্ত্র,বাঙালী জাতিয়তাবাদ ও সেক্যেুলারিজমের ইসলাম বিরোধী মতবাদকে। অথচ ১৯৭০য়ের নির্বাচনে সেগুলি কোন নির্বাচনি ইস্যু ছিল না। অথচ সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগণের ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে এর চেয়ে বড় গাদ্দারি আর কি হতে পারে? মুসলমানের ঈমানী দায়বদ্ধতা হলো,ইসলামের প্রতিষ্ঠায় নিষ্ঠাবান হওয়া। অথচ মুজিব সেটিকে ফৌজদারি অপরাধে পরিণত করেছিলেন। ইসলামি দলের বহু নেতাকর্মীদের সেদিন নৃশংস ভাবে হত্যা করা হয়েছিল। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কাছে মুজিবের ন্যায় ইসলামের এতবড় দুষমণ হলো সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালী ব্যক্তিত্ব। আর যে শাসনতন্ত্রে গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতাকে দাফন করা হয়েছিল এবং প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল একদলীয় বাকশালীয় স্বৈরাচার, সেটিকেই বলা হলো সেরা শাসতন্ত্র। ভারতীয় নেতারা মুখে গণতন্ত্রের কথা বললেও মুজিবের ন্যায় গণতন্ত্রের এতবড় শত্রুকে সমর্থণ দিতে বিন্দুমাত্র লজ্জাবোধ করেনি। বরং আজ একই কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে শেখ হাসিনা। হাসিনাকে দিয়ে কোরআনের তাফসির মহফিলগুলো যেমন বন্ধ করা হয়েছে, তেমনি বাজেয়াপ্ত কর হচ্ছে ইসলাম বিষয়ক বইপুস্তক।ইসলামপন্থিদের দলনে ব্যবহৃত হচ্ছে দেশের আদালত। আদালতের নতজানু বিচারকগণ কেড়ে নিয়েছে জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন ইসলামী দলের নেতাকর্মীদের প্রাণ।

তবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারত তার সেবাদাসদের দিয়ে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও যুদ্ধাবস্থার  জন্ম দিয়েছে -তা কি সহজে শেষ হবার? যুদ্ধ বা রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু করা সহজ, কিন্তু শেষ করাটি আর আক্রমনকারির নিজের হাতে থাকে না। আফগানিস্তানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে যুদ্ধ ২০০১ সালে শুরু করেছিল তা বিগত ১৮ বছরেও শেষ হয়নি। ইরাকে যে যুদ্ধ ২০০৩ সালে শুরু করেছিল তাও শেষ হয়নি। বরং ছড়িয়ে পড়েছে শুধু সিরিয়া, ইয়েমেন ও মিশরে নয়, আফ্রিকাতেও। ভারতও তার নিজের যুদ্ধ কাশ্মীরে বিগত ৪০ বছরেও যেমন শেষ করতে পারিনি। শেষ করতে পারছে না  উত্তর-পূর্ব ভারতেও। বরং দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে।  ভারতের জন্য বিপদের কারণ হলো, বাংলাদেশ ৮০ লাখ মানুষের কাশ্মীর নয়। সাড়ে তিন কোটি মানুষের আফগানিস্তানও নয়। এবং ভারতও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে শক্তিশালী নয়। যে চোর-ডাকাত, ভোট-ডাকাতদের ঘাড়ে বন্দুক রেখে ভারত এ যুদ্ধ জিতছে চাচ্ছে সেটিও বা কতদূর সফল হবে? কারণ প্রতিটি যুদ্ধই জনগণের ঘুম ভাঙ্গিয়ে  দেয়। হাজার হাজার নতুন লড়াকু যোদ্ধাকে রণাঙ্গণে নিয়ে আসে। চোর-ডাকাত ও ভোট-ডাকাতগণ চুরি-ডাকাতিতে পটু হতে পারে, কিন্তু তারা কি যুদ্ধেও বিজয়ী হতে পারে? প্রথম সংস্করণ ১৭/১১/১৩, দ্বিতীয় সংস্করণ ৩০/০৩/২০১৯

 




বাংলাদেশঃ ভারতের অধীনতা এবং স্বাধীনতা প্রসঙ্গ

অনিবার্য ভারতীয় হস্তক্ষেপ

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের বিনিয়োগ এবং নাশকতার শুরুটি একাত্তরে নয়, বরং অনেক আগে থেকেই। বলার অপেক্ষা রাখে না, সে বিনিয়োগ ও নাশকতা এখন নতুন মাত্রা পেয়েছে। উপমহাদেশের মুসলিম রাজনীতিতে বহু পূর্ব থেকেই দু’টি প্রধান ধারা। একটি ইসলামের বিজয় এবং মুসলিমদের বিলুপ্ত গৌরব ফিরিয়ে আনার প্রতি বলিষ্ঠ অঙ্গিকারের। সে অঙ্গিকার নিয়েই ১৯৪৭ সালে নানা ভাষা ও নানা প্রদেশের মুসলিমগণ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত করেছিল। অপর ধারাটি ছিল ইসলামের বিজয় বা প্রতিষ্ঠার প্রতি অঙ্গিকার বিলুপ্ত করে ভারতীয় হিন্দু আধিপত্যের প্রতি অধীনতা। মুসলিমদের মাঝে এ শেষাক্ত ধারার অনুসারি ছিল ভারতীয় কংগ্রেসের সহযোগী দেওবন্দি আলেমগণ। ভারত ভেঙ্গে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা তাদের ভাল লাগেনি। ফলে তারা শুধু পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠারই বিরোধীতা করেনি; হিন্দু ও মুসলিম যে দুটি পৃথক জাতি –সেটিও তারা মানেনি। তারা গড়ে তোলে হিন্দু-মুসলিম সম্মিলিত একক ভারতীয় জাতিসত্ত্বার ধারণা। ভারতীয় উপমহাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমগণ তাদের সে ধারণাকে বর্জন করেছিল বলেই পাকিস্তান আজ পারমানবিক শক্তিধারি ভারতের সমকক্ষীয় শক্তি এবং ৫৭টি মুসলিম দেশের মাঝে সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ। অপর দিকে পাকিস্তান সৃষ্টির সে ধারাবাহিকতায় ১৬ কোটি মুসলিমের বাংলাদেশ হারিয়ে যায়নি ভারতের পেটে।

শেখ মুজিব ও তার দল আওয়ামী লীগের রাজনীতির মূল চরিত্রটি হলো লাগাতর ভারত নির্ভরতা। একাত্তরে ভারত তার বিশাল সেনা বাহিনী নিয়ে দাঁড়ায় মুজিবের পাশে। লক্ষ্য ছিল, ভারতের এবং সে সাথে মুজিবের অভিন্ন এজেন্ডা বাস্তবায়ন। একাত্তর নিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রচুর মিথ্যাচার হয়েছে।  প্রবল দু’টি মিথ্যার একটি হলো, মুক্তি বাহিনীর হাতে দেশের স্বাধীনতা অর্জনের বিষয়। অপরটি হলো, যুদ্ধে তিরিশ লাখের মৃত্যু। প্রথম মিথ্যাটি বলা হয়, ভারতের অবদানকে খাটো করে নিজেদের অবদানকে বিশাল করে দেখানোর জন্য। এবং দ্বিতীয় মিথ্যাটি বলা হয় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বর্বরতাকে  বিশাল করার লক্ষ্যে। অথচ একাত্তরের ৯ মাসে যুদ্ধে মুক্তিবাহিনী কোন একটি জেলাকে স্বাধীন করেছে -সে প্রমান নেই। এবং ৩০ লাখ লোকের মৃত্যু হতে হলে প্রতি ২৫ জনের মাঝে একজনকে (সহজ হিসাবটি এরূপ: ৭৫ মিলিয়ন : ৩ মিলিয়ন=২৫:১) এবং প্রতিদিন ১১ হাজারের বেশী মানুষকে মারা যেত হয়। সেটিও ঘটেনি। মিথ্যাবাদীতাই যাদের চরিত্র, সত্য আবিষ্কার ও হিসাব-নিকাশে তাদের আগ্রহ থাকে না।  নইলে বাংলাদেশে কয়েকবার লোক গণনা হয়েছে, সে গণনাকালে প্রতিটি পরিবারে ক’জন একাত্তরে মারা গিয়েছে এবং কাদের হাতে মারা গিয়েছে সে তথ্যটি ইতিমধ্যে সঠিক ভাবে জানা যেত। অপরদিকে ৩০ লাখের সংখ্যাটি যে কতবড় মিথ্যা -সেটি তো স্কুলের ছাত্রেরও সহজে বুঝে উঠার কথা। অথচ সে হিসাবটি দেশের প্রধানমন্ত্রী, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর বা সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিগনও বুঝে উঠতে পারে না। পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ সৃষ্টির মূল অবদানটি ছিল ভারতের। শেখ মুজিব পাকিস্তান ভাঙ্গার স্বপ্ন দেখেছিল বটে, তবে ভারত সে স্বপ্নটি দেখেছিল মুজিবের অনেক আগেই। বরং মুজিবকে সে স্বপ্ন দেখায় যেমন প্ররোচিত করেছিল, তেমনি সে স্বপ্ন বাস্তবায়নে সামরিক ও রাজনৈতিক সাহায্যও করেছিল। নইলে শেখ মুজিব তো নিজে ১৯৪৬-৪৭’য়ে কলকাতার রাস্তায় মুসলিম লীগের সভা-মিছিলে “লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান” ধ্বনিতে গগন কাঁপিয়েছেন। ফলে শেখ মুজিব বাংলাদেশের স্বপ্ন দ্রষ্টা বা স্রষ্টা –এর কোনটিই নয়। সেটি ভারতীয় শাসকগোষ্ঠি। তাই বাস্তবতা হলো, ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছেই পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর পরাজয় ঘটেছিল, মুক্তিবাহিনীর কাছে নয়।

ইতিহাসের আরেক সত্য হলো, ১৯৪৭ সালে যারা ভারতকে বন্ধু রূপে গ্রহণ করতে পারিনি, তাদের অধিকাংশই ১৯৭১’য়েও ভারতকে বন্ধু রূপে গ্রহণ করতে পারেনি। এবং আজও পারছে না।  বাংলাদেশের রাজনীতিতে এদের সংখ্যা কম নয়; বরং তারাই যে সংখ্যাগরিষ্ঠ সেটি বুঝা যায় আওয়ামী লীগ সরকারের দলন প্রক্রিয়া দেখে। ১৯৭০’য়ের নির্বাচনে ভারত-বিরোধীরা হেরেছিল নিজেদের মধ্যে বিভক্তির কারণে। এবং সে সাথে মুজিবের সোনার বাংলা গড়ার ধোকায় বিপুল সংখ্যক মানুষের ধোকাগ্রস্ত ও বিভ্রান্ত হওয়ার কারণে। তবে তাদের বেশীর ভাগই সে ধোকার আছড় থেকে মুক্তি পেয়েছে –সে প্রমাণও তো প্রচুর। ১৯৭৫’য়ে যারা মুজিবের বাকশালী ফ্যাসিবাদ থেকে দেশকে মুক্তি দিয়েছিল -তারা তো ধোকা থেকে মুক্তি-প্রাপ্তরাই। এবং যতই বাড়ছে ভারতের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ভূ-প্রাকৃতিক আগ্রাসন -ততই এরা দলে ভারী হচ্ছে। ফলে দেশটি দ্রুত বিভক্ত হচ্ছে ভারতসেবী ও ভারত-বিরোধী দ্বি-জাতিতে। কোন দেশের রাজনীতিতে যখন এমন বিভক্তি আসে তখন সংঘাতও অনিবার্য হয়। বস্তুতঃ বাংলাদেশ এগিয়ে চলছে তেমনি এক অনিবার্য সংঘাতের দিকে। বাংলাদেশের শাসক দল আওয়ামী লীগের গুরুতর অপরাধ হলো, দলটি শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পালাবদলের প্রক্রিয়াকে অসম্ভব করে তুলেছে। তবে দেখবার বিষয়টি হলো, সে আসন্ন সংঘাতে ভারতের ভূমিকা কি হয়? তবে সে সংঘাতে ভারত যে নিশ্চুপ বসে থাকবে না -সেটি নিশ্চিত। তাছাড়া যে দেশকে ভারত নিজ অর্থ, নিজ শ্রম ও নিজ সেনা-সদস্যদের রক্ত দিয়ে সৃষ্টি করলো -সে দেশের রাজনীতিতে ভারত ভূমিকা রাখবে না সেটি একমাত্র অতি আহম্মকই বিশ্বাস করতে পারে। আরেকটি বিষয় হলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যায় অনেকেই যে ভারতের তেমন একটি হস্তক্ষেপে সম্মতি দিবে তাতেও কি সন্দেহ আছে? ভারতপন্থিদের ভোট-ডাকাতি বিশ্বে যেরূপ গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে -তার পিছনেও তো ভারত।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা থেকেই ভারতের লক্ষ্য শুধু দেশটিকে খণ্ডিত ও দূর্বল করা ছিল না। তারা বিনাশ করতে চেয়েছ উপমহাদেশের মুসলিম জাগরণকেও। ফলে মুসলিমদের উপর হামলা হচ্ছে ভারতের ভিতরে ও বাইরে। ফলে বাবরী মসজিদের ন্যায় মসজিদগুলো জমিনে মিশিয়ে দেওয়াই তাদের একমাত্র লক্ষ্য নয়, গুড়িয়ে দিতে চায় ভারতের ভিতরে ও বাইরে মুসলিমদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, নৈতিক ও সামরিক শক্তিকেও। পাকিস্তানকে খণ্ডিত করার পর ভারতের তেমন একটি স্ট্রাটেজী ধরা পড়ে বাংলাদেশকে তলাহীন ও পঙ্গু করার মধ্যে। সেটির প্রমাণ মেলে একাত্তরের পর বাংলাদেশে ভারতীয় সেনা বাহিনীর ব্যাপক লুটপাট ও অব্যবহৃত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাজার হাজার কোটি টাকার অস্ত্র ভারতে নিয়ে যাওয়াতে। আরেক বাস্তবতা হলো, পাকিস্তান ভাঙ্গা ও বাংলাদেশ সৃষ্টির মধ্য দিয়েই আওয়ামী লীগের রাজনীতি শেষ হয়নি। দলটির পরবর্তী স্ট্রাটেজী হলো, বাংলাদেশের জনগণকে ইসলাম থেকে দূরে সরানো। কারণ, তারা জানে ইসলামের সাথে জনগণের সম্পৃক্ততা বাড়লে মারা পড়বে তাদের সেক্যুলার ও ভারতমুখি রাজনীতি।  বাংলাদেশে মাটিতে ভারত ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লক্ষ্য এজন্যই অভিন্ন। ফলে ভারতের কাছে আওয়ামী লীগের এবং আওয়ামী লীগের কাছে ভারতের প্রয়োজনীয়তা তাই ফুরিয়ে যায়নি। ফলে আওয়ামী লীগ একাত্তরে যেমন ভারতের পার্টনার ছিল, এখনও পার্টনার। ফলে ভোট-চুরি, ভোট-ডাকাতির মাধ্যমে শেখ হাসিনার নির্বাচনী বিজয় এবং তার গুম, খুন ও বিচারের নামে বিরোধী দলীয় নেতাদের জেল-ফাঁসী দেয়ার রাজনীতিকেও তারা অকুণ্ঠ সমর্থণ দেয়। লক্ষ্য এখানে বাংলাদেশের মাটিতে যে কোন মূল্য ভারতসেবীদের ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখা। এমন কি গণতন্ত্রকে কবরে পাঠিয়ে হলেও।  

ইতিহাস রচনায় চরিত্রহননের প্রজেক্ট

বাংলাদেশে ইতিহাস-বিকৃতি হয়েছে বিচিত্র ভাবে। বিকৃত সে ইতিহাসের ভাষ্য হলো, মুষ্টিমেয় কিছু রাজাকার ছাড়া সবাই একাত্তরে পাকিস্তান ভাঙ্গার পক্ষে ছিল। কিন্তু প্রকৃত সত্য কি তাই? শেখ মুজিব সেদিন বাঙ্গালী জাতীয়তার জোয়ার সৃ্ষ্টি করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু সবাই সে জোয়ারে ভেসে যায়নি –সে প্রমাণও তো প্রচুর। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসে তার উল্লেখ নাই। আওয়ামী লীগের বিপক্ষে শুধু রাজাকারগণই ছিল না, ছিল এক বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিপক্ষও। পাকিস্তান খন্ডিত হওয়াতে বাংলার মুসলমানদেরই শুধু নয়, বিশ্বের মুসলমানদেরও যে অপুরণীয় শক্তিহানী হবে সেটি যে শুধু ইসলামী দলের নেতাকর্মী, উলামা ও রাজাকারগণ অনুধাবন করেছিলেন -তা নয়। তাদের পাশাপাশি সে সময়ের বহু প্রথম সারির বুদ্ধিজীবীরাও বুঝতে পেরেছিলেন। তাদের যু্ক্তি ছিলঃ পাকিস্তানে বিস্তর সমস্যা আছে, সমাধানের রাস্তাও আছে। ঘর থাকলে সেখানে বিষাক্ত গোখরাও বাসা বাঁধতে পারে। ঘর থেকে শাপ তাড়ানোর মধ্যেই  বুদ্ধিমত্তা, শাপ মারতে ঘরে আগুন দেয়া বা সেটিকে ভেঙ্গে ফেলা নয়। বিশ্বের প্রতিদেশেই সেটি হয়ে। প্রকৃত বুদ্ধিমানদের কাজ দেশ থেকে দুর্বৃত্ত তাড়ানো, দেশ ভাঙ্গা নয়। বাহাদুরী তো গড়াতে, ভাঙ্গাতে নয়। দেশের সীমান্ত এক মাইল বাড়াতে হলেও প্রকাণ্ড যুদ্ধ লড়তে হয়। ফলে দেশ ভেঙ্গে উৎসব করা তো আহাম্মকদের কাজ। তাছাড়া মুসলিম রাষ্ট্র ভাঙ্গার কাজে কি একটি তীর ছুড়ারও প্রয়োজন আছে? একাজ করার জন্য অতীতের ন্যায় আজও কি শত্রুর অভাব আছে? মুসলিম দেশ ভাঙ্গার দাবী উঠালে বহু কাফের রাষ্ট্র সেটি নিজ খরচে করে দিতে দুই পায়ে খাড়া। কুয়েত, কাতার, আবুধাবি, দুবাই, বাহরাইনের মত তথাকথিত স্বাধীন দেশ সৃষ্টি করতে কি আরবদের অর্থব্যয়, শ্রমব্যয় বা রক্তব্যয় করতে হয়েছে? কারও একটি তীরও কি ছুঁড়তে হয়েছে? মুসলমানদের শক্তিহীন করা, ইসরাইলের নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করা এবং আরবদের তেল সম্পদকে লুন্ঠন করার স্বার্থে পাশ্চাত্য দেশগুলো নিজ খরচে এ দেশগুলোকে সৃষ্টি করেছে। ভারত তেমন একটি লক্ষ্যে পাকিস্তান ভাঙ্গায় ১৯৪৭ সালে দু’পায়ে খাড়া ছিল।

শুধু ভাঙ্গা কেন, পাকিস্তানের জন্ম বন্ধ করার জন্য ভারতীয় আধিপত্যবাদীদের চেষ্টা কি কম ছিল? একারণেই পাকিস্তান ভাঙ্গার যুদ্ধে আওয়ামী লীগকে একটি টাকাও ব্যয় করতে হয়নি। নিজ খরচে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রও খুলতে হয়নি। কোন অস্ত্রও কিনতে হয়নি। ভারতই সে কাজ নিজ খরচে ও নিজ উদ্যোগে করে দিয়েছে। এমন সহজ সত্যটি ভারতসেবীরা না বুঝলেও অনেকেই বুঝতেন। ফলে একাত্তরে তারা পাকিস্তানের বিরাজমান সমস্যার সমাধানে ভারতের মত একটি চিহ্নিত শত্রুদেশের হস্তক্ষেপ চাননি। চাননি ভারতীয় বাহিনীর বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ। তারা চাইতেন শান্তিপূর্ণ ভাবে একটি নিস্পতির, এবং কখনই সেটি পাকিস্তানেকে বিভক্ত করে নয়। পাকিস্তানের সংহতির পক্ষে আলেমদের মাঝে সে সময় যারা প্রথম সারিতে ছিলেন তারা হলেন কিশোরগঞ্জের প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন মাওলানা আতাহার আলী, চট্টগ্রামের প্রখ্যাত আলেম ও হাটহাজারী মাদ্রাসাব তৎকালীন প্রধান মাওলানা সিদ্দিক আহম্মদ, ঢাকার প্রখ্যাত মাওলানা মোস্তাফা আল মাদানী, লালবাগ মাদ্রাসার মাওলানা মোহাম্মদ উল্লাহ হাফেজজী হুজুর, পীর মোহসীন উদ্দিন দুদু মিয়া, শর্শিনার পীর আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহ, সিলেটের ফুলতলীর পীর এবং তাদের অনুসারিরা। তাদের সাথে  ছিলেন বাংলাদেশের প্রায় সকল গণ্যমান্য আলেম। প্রকৃত সত্য হলো, সে সময় কোন প্রসিদ্ধ আলেম পাকিস্তান ভাঙ্গার পক্ষ নিয়েছে এমন প্রমাণ নেই। তাদের যু্ক্তিটি ছিল, একটি মুসলিম দেশ ভাঙ্গলে মুসলিম উম্মাহর শক্তিহানী হয়। আর মুসলিম উম্মাহর শক্তিহানী তো কবিরা গুনাহ। একাজ তো কাফেরদের। অথচ ইসলামবিদ্বেষী বাঙালী সেকুলারিস্টদের কাছে মহান আল্লাহতায়ালা বা তাঁর রাসূল (সাঃ) কি বললেন -সেটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। কোনটি কুফরি ও কোনটি জায়েজ -সেটিও তাদের কারছে বিচার্য বিষয় ছিল না। এসব গুরুতর বিষয়গুলি গুরুত্ব পায়নি সেসব সেক্যুলারিস্ট স্বৈরাচারি আরবদের কাছেও যারা অখন্ড আরব ভূখন্ড বিশেরও বেশী টুকরায় বিভক্ত করতে সাম্রাজ্যবাদী কাফের শক্তিকে সাহায্য করেছে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিবর্গ আজও এসব শাসকদের সবচেয়ে বড় রক্ষক। একইভাবে মুজিব ও তাঁর অনুসারিদের রক্ষকের ভূমিকা নিয়েছে ভারত।

শুধু আলেম, ইসলামী দলগুলীর নেতাকর্মী ও রাজাকারগণই নয়, তাদের সাথে অখন্ড পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে বক্তব্য রেখেছেন ঢাকা, রাজশাহী ও চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু শিক্ষক এবং প্রথিতযশা বহু বুদ্ধিজীবী ও কবি-সাহিত্যিক। অথচ সে প্রকট সত্যটিকে আজ পরিকল্পিত ভাবে ভূলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। এবং যে মিথ্যাটি আজ জোরে শোরে বলা হচ্ছে তা হলো, পাকিস্তানের বিভক্তির বিরোধী করেছিল মুষ্টিমেয় রাজাকার। সেটি যে কতটা মিথ্যা তার কিছু প্রমাণ দেয়া যাক। সে সময় ৫৫ জন কবি, শিল্পি ও বুদ্ধিজীবী একটি বিবৃতি দেন। তাতে পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশী হস্তক্ষেপের বিরোধীতা ও নিন্দা করা হয়। এতে স্বাক্ষর করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ডক্টর সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন, প্রখ্যাত লেখক প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে বিভাগের প্রধান এম, কবীর, মনস্তত্ত্ব বিভাগের প্রধান ড. মীর ফখরুজ্জামান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের রিডার ড. কাজী দীন মোহাম্মদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সিনিয়র লেকচারার ও নাট্যকার নুরুল মোমেন, কবি আহসান হাবীব, চিত্র পরিচালক খান আতাউর রহমান, গায়িকা শাহনাজ বেগম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র লেকচেরার ও নাট্যকার আশকার ইবনে শাইখ, গায়িকা ফরিদা ইয়াসমিন, পল্লী গীতির গায়ক আব্দুল হালিম, চিত্র পরিচালক এ. এইচ. চৌধুরি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের রিডার ড. মোহর আলী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রধান মুনীর চৌধুরী, বাংলা উন্নয়ন বোর্ডের ড. আশরাফ সিদ্দিকী, গায়ক খোন্দকার ফারুক আহমদ, গায়ক এস, এ, হাদী গায়িকা নীনা হামিদ, গায়িকা লায়লা আর্জুমান্দ বানু, শামশুল হুদা চৌধুরী (জিয়া ক্যাবিনেটের মন্ত্রী এবং এরশাদ সরকারের পার্লামেন্ট স্পীকার), গায়ীকা সাবিনা ইয়াসমীন, গায়িকা ফেরদৌসী রহমান, গায়ক মোস্তাফা জামান আব্বাসী, ছোটগল্পকার সরদার জয়েদ উদ্দীন, লেখক সৈয়দ মুর্তুজা আলী, কবি তালিম হোসেন, ছোটগল্পকার শাহেদ আলী, মাসিক মাহে নও সম্পাদক কবি আব্দুস সাত্তার, নাট্যকার ফররুখ শীয়র, কবি ফররুখ আহম্মদ, পাকিস্তান অবজারভার (আজকের বাংলাদেশে অবজারভার) পত্রিকার সম্পাদক আব্দুল সালাম, অধুনা বিলুপ্ত ঢাকার মর্নিং নিউজ পত্রিকার সম্পাদক এস, জি, এম বদরুদ্দীন, দৈনিক পাকিস্তান (পরবর্তী কালের দৈনিক বাংলা)সম্পাদক আবুল কালাম সামসুদ্দীন, অভিনেতা ও চিত্র পরিচালক ফতেহ লোহানী, কবি হেমায়েত হোসেন, লেখক আকবর উদ্দীন, লেখক আকবর হোসেন, লেখক কাজী আফসার উদ্দীন আহমেদ, লেখক ও সাংবাদিক সানাউল্লাহ নূরী, লেখক ও কবি শাসসুল হক, লেখক সরদার ফজলুল করিম, গায়িকা ফওজিয়া খান প্রমুখ।– (সুত্রঃ দৈনিক পাকিস্তান (অধুনালিপ্ত দৈনিক বাংলার পাকিস্তান আমলের নাম), ১৭ই মে, ১৯৭১ সাল)।

বিবৃতিতে উল্লিখিত স্বাক্ষরকারীগণ বলেন, “পাকিস্তানী শাসন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আমাদের নিজস্ব অভাব-অভিযোগ রয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আমাদের যেটা প্রাপ্য সেটা না পেয়ে আমরা অসুখী। আমাদের এই অসন্তোষ আমরা প্রকাশ করেছি একই রাষ্ট্র কাঠামোর আওতায় পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ব্যাপক স্বায়ত্বশাসনের পক্ষে ভোট দিয়ে। কিন্তু আওয়ামী লীগের চরমপন্থিরা এই সহজ সরল আইনসঙ্গত দাবীকে একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণার দাবীতে রুপান্তরিত করায় আমরা হতাশ ও দুঃখিত হয়েছি। আমরা কখনও এটা চাইনি, ফলে যা ঘটেছে আমরা তাতে হতাশ ও দুঃখিত হয়েছি। বাঙালী হিন্দু বিশেষ করে কোলকাতার মারোয়াড়ীদের আধিপত্য ও শোষণ এড়ানোর জন্যেই আমরা বাংলার মুসলমানেরা প্রথমে ১৯০৫ সালে ব্রিটিশ রাজত্বকালে পৃথক পূর্ব বাংলা প্রদেশ গঠনের সিদ্ধান্ত নেই। এবং আবার ১৯৪৭ সালে ভোটের মাধ্যমেই পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রদেশের মুসলিম ভাইদের সাথে যুক্ত হওয়ার সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। উক্ত সিদ্ধান্তে অনুতপ্ত হওয়ার আমাদের কোন কারণ নেই। পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু প্রদেশ হিসেবে সারা পাকিস্তানকে শাসন করার অধিকার আমাদের আছে। আর সেটা আয়ত্তের মধ্যেই এসে গিয়েছিল। ঠিক তখনই চরমপন্থিদের দুরাশায় পেয়ে বসল এবং তারা জাতীয় অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে তুলল। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া দেশে সাধারণ নির্বাচন দিলেন। ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া আলোচনাকালে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া আওয়ামী লীগকে সংখ্যাগুরু দল হিসাবে অভিনন্দন জানিয়েছেন। কিন্তু উল্টোটাই ঘটে গেল এবং নেমে এল জাতীয় দুর্যোগ। .. কিন্তু আমরা আমাদের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে কোন বড় রকমের হস্তক্ষেপের বিরোধীতা ও নিন্দা করছি।” 

সে সময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পক্ষ থেকেও পত্রিকায় আরেকটি বিবৃতি ছাপা হয়। তারা বলেন, “আমরা নিম্নস্বাক্ষরকারী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ পাকিস্তানের সাম্প্রতিক ঘটনায় গভীর বেদনা বোধ করছি। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস যে, ভারতীয় যুদ্ধবাজ যারা মুসলমানদের স্বতন্ত্র আবাসভূমি হিসেবে পাকিস্তান সৃষ্টিকে কখনো গ্রহণ করেনি প্রধানত তাদের চক্রান্তের ফলেই এটা হয়েছে। …আমরা আমাদের প্রিয় স্বদেশ ভূমির সংহতি এবং অখন্ডতা  রক্ষার জন্য আমাদের সেনাবাহিনীর সময়োচিত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রশংসা করছি।.. আমরা দেশের সংহতি ও অখন্ডতা বিপন্ন করার জন্য চরমপন্থিদের অপপ্রয়াসের নিন্দা করছি। বহির্বিশ্বের চোখে পাকিস্তানের মর্যদা হ্রাস ও পাকিস্তানকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করার অপচেষ্টা এবং সীমান্তে সশস্ত্র অনুপ্রবেশকারী পাঠিয়ে আমাদের ঘরোয়া ব্যাপারে ভারতীয় হস্তক্ষেপের আমরা নিন্দা করছি। আমরা ভারতের ভিত্তিহীন ও দুরভিসন্ধিমূলক প্রচারণার নিন্দা করছি। ভারতীয় বেতারে প্রচারিত একটি খবরের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে। উক্ত খবরে বলা হয়েছে যে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ধ্বংস করে দিয়েছে। আমরা দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করছি, এটা নির্লজ্জ মিথ্যা প্রচারণা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণের সকল ভবন অক্ষত অবস্থায় রয়েছে এবং কোন ভবনের কোনরূপ ক্ষতিসাধন হয়নি। আমরা দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করি, বর্তমান মুহুর্তে সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন আমাদের সকলের মধ্যে ঐক্য ও শৃঙ্খলা। আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রেখে আমরা বর্তমান সংকট হতে মুক্ত হতে পারব।” বিবৃতিটিতে স্বাক্ষর করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত ভিসি এবং আইন ফ্যাকাল্টির ডিন ইউ, এন, সিদ্দিকী, ইতিহাস বিভাগের প্রধান ও সাবেক ভিসি ড. আব্দুল করিম, সমাজ বিজ্ঞানের ডিন ড. এম, বদরুজ্জা, ইসলামের ইতিহাস বিভাগের লেকচেরার মোহাম্মদ ইনামুল হক, রাষ্ট্র বিজ্ঞানের প্রধান ড. রফিকুল ইসলাম চৌধুরী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের রিডার মোঃ আনিসুজ্জামান, ইংরাজী বিভাগের সিনিয়র লেকচেরার খোন্দকার রেজাউর রহমান, রাষ্টবিজ্ঞানের লেকচেরার সৈয়দ কামাল মোস্তফা, রাষ্টবিজ্ঞানের লেকচেরার এম, এ, জিন্নাহ, ইতিহাসের সিনিয়র লেকচেরার রফিউদ্দীন, রসায়ন বিভাগের প্রধান এ, কে, এম, আহমদ, সমাজ বিজ্ঞানের সিনিয়র লেকচেরার রুহুল আমীন, বাণিজ্য বিভাগের প্রধান মোঃ আলী ইমদাদ খান, ইতিহাসের সিনিয়র লেকচেরার হোসেন মোঃ ফজলে দাইয়ান, বাংলা বিভাগের সিনিয়র লেকচেরার মোঃ দিলওয়ার হোসেন, সংখ্যাতত্ত্বের সিনিয়র লেকচেরার আব্দুর রশিদ, ইতিহাস বিভাগের রিডার মুকাদ্দাসুর রহমান, ইতিহাসের লেকচেরার আহসানুল কবীর, অর্থনীতি বিভাগের লেকচারার শাহ মোঃ হুজ্জাতুল ইসলাম, ইংরাজী বিভাগের প্রধান মোহম্মদ আলী, পদার্থ বিভাগের রিডার এজাজ আহমেদ, গণিতের লেকচারার জনাব এস, এম, হোসেন, গণিত বিভাগের রিডার জেড, এইচ চৌধুরী, সংখ্যাতত্ত্বের জনাব হাতেম আলী হাওলাদার, বাংলা বিভাগের রিডার ড. মোঃ আব্দুল আওয়াল, বাংলা বিভাগের সিনিয়র লেকচারার মোঃ মনিরুজ্জামান, বাংলা বিভাগের সিনিয়র লেকচারার মোঃ মনিরুজ্জামান হায়াত (লেখক হায়াত মাহমুদ), ইতিহাস বিভাগের গবেষণা সহকারী আব্দুস সায়ীদ, অর্থনীতির লেকচারার মোহাম্মদ মোস্তাফা, ইতিহাসের লেকচারার সুলতানা নিজাম, ইতিহাসের রিডার ড. জাকিউদ্দীন আহমদ এবং ফাইন আর্টের লেকচেরার আব্দুর রশীদ হায়দার। -(সুত্রঃ দৈনিক পাকিস্তান, ২৭শে জুন, ১৯৭১)

তবে যারা সেকুলার চেতনার বুদ্ধিজীবী তারাও সেদিন নীরবে বসে থাকেনি। তারা সেদিন আওয়ামী ক্যাডারদের সশস্ত্র যুদ্ধের প্রতি সর্বাত্মক সমর্থণ নিয়ে তারা এগিয়ে আসেন। তাদের মিশন হয়, যেভাবেই হোক পাকিস্তানের আশু ধ্বংস। ভারত, রাশিয়াসহ যে কোন দেশের সাহায্য লাভও তাদের কাছে অতি কাম্য হয়ে দাঁড়ায়। তাদের কামনা ছিল বাংলাদেশে অভ্যন্তরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অনুপ্রবেশ। তাদেরই ক’জন হলেনঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আবু সায়ীদ চৌধুরী, বাংলার অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান, অধ্যাপক ড. মাযহারুল ইসলাম, ড. এ, আর, মল্লিক, কবি আল মাহমুদ, রণেশ দাস গুপ্ত, অধ্যাপক ড. এবনে গোলাম সামাদ, আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী, শওকত ওসমান, আসাদ চৌধুরী, সরোয়ার মুর্শেদ। এদের অনেকে ভারতেও পাড়ি জমান।            

কারা দেশপ্রেমিক এবং কারা দালাল?

কারা প্রকৃত দেশপ্রেমিক এবং কারা দালাল -তা নিয়ে কি আদৌ কোন সুবিচার হয়েছে? প্রশ্ন হলো, যেসব রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ১৯৭১’য়ে অখন্ড পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিলেন তাদের দর্শন ও উদ্দেশ্যটি কি ছিল? আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী-বুদ্ধিজীবীগণ তাদেরকে চিত্রিত করেছে পাকিস্তানের দালাল রূপে। তারা কি সত্যই দালাল ছিলেন? দালালের সংজ্ঞা কি? দালাল তাদেরকে বলা হয়, যারা কাজ করে অন্যদেশের স্বার্থে। এবং সেটি করে অর্থলাভ বা সুবিধা লাভের আশায়। কিন্তু যারা সেদিন পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিলেন -তারা তো বিদেশের স্বার্থে কাজ করেননি। পাকিস্তান তাদের কাছে বিদেশ ছিল না, ছিল একান্ত নিজেদের দেশ। তারা কাজ করেছেন সে দেশটির স্বার্থে যে দেশটিকে তারা বা তাদের পিতামাতারা ১৯৪৬ সালে ভোট দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এ দেশটির একতা ও সংহতি রক্ষার শপথ নিয়ে এমনকি শেখ মুজিবও অতীতে মন্ত্রী হয়েছেন। এমনকি সে অঙ্গিকার ব্যক্ত করে শেখ মুজিব ১৯৭০ সনের নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। নির্বাচনী ভাষণে বার বার পাকিস্তান জিন্দাবাদ ধ্বনিও দিয়েছেন। তাদের অপরাধ (?) শুধু এ হতে পারে, মুজিবের ন্যায় তারা সে অঙ্গিকারের সাথে গাদ্দারী করেননি। বরং অখন্ড পাকিস্তানের মধ্যে তারা নিজেদের কল্যাণ ও সে সাথে বিশ্ব-মুসলিমের কল্যাণ দেখেছেন। সর্ববৃহৎ এবং সবচেয়ে শক্তিশালী মুসলিম রাষ্ট্রের সর্ববৃহৎ জনগোষ্ঠি রূপে মুসলিম উম্মাহর ভাগ্য নির্ধারণে তারা দেখতে পেয়েছিলেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ। দেশটির তিন বার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন পূর্ব পাকিস্তানী। আর অর্থ লাভের বিষয়? তারা তো বরং পাকিস্তানের প্রতিরক্ষায় এবং ভারতের মোকাবেলায় নিজেদের মেধা, শ্রম এমনকি প্রাণদানে হাজির হয়েছিলেন। সে চেতনা নিয়ে হাজার হাজার রাজাকার শহীদও হয়েছেন। কোন দালাল কি কারো খাতিরে প্রাণ দেয়? পাকিস্তান নয়, ভারত ছিল বিদেশ। নিজ দেশ পাকিস্তানের জন্য কাজ করা যদি দালালী হয় তবে যারা ভারতে গেল, ভারতীয় অর্থ নিল, তাদের ঘরে পানাহার করলো এবং ভারতীয় সেনাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করলো তাদের কি বলা যাবে?

দেখা যাক, যারা সে সময়ে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন তাদের নিজেদের অভিমত কি ছিল। পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ অবজারভার ও দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকার মালিক জনাব হামিদুল হক চৌধুরী তাদের নিজের অবস্থান নিয়ে ১৯৭১ সালের ৬ই এপ্রিলে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, ‘ভারতীয় প্রচরণার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করা এবং তার দ্বারা একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে এদেশের অস্তিত্ব বিলোপ করে নিজস্ব সম্প্রসারণবাদী মনোভাব চরিতার্থ করা। এ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য এবং বিশ্বকে বিভ্রান্ত করার জন্য তারা তাদের সকল প্রচার মাধ্যমের দ্বারা বিশ্ববাসীর নিকট হাজার হাজার নরহত্যা ও বোমাবর্ষণের ফলে শহর ধ্বংসের ভিত্তিহীন অভিযোগ প্রচার করছে।”-(সুত্রঃ একাত্তরের ঘাতক ও দালালেরা কে কোথায়?)। ১৯৭১ সালের ৬ই এপ্রিলে দেওয়া এক বিবৃতিতে জনাব শাহ আজিজুর রহমান (বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী) বলেন, “প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া প্রবল উৎকন্ঠার সঙ্গে রাজনৈতিক দলসমূহের অধিকতর স্বাধীনতা প্রদান পূর্বক দেশে পূর্ণ ও বাধাহীন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেন। .. আওয়ামী লীগ এই সুযোগের ভূল অর্থ করে বল প্রয়োগের … মাধ্যমে নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসাবে জয়লাভ করে নিজেদের খেয়ালখুশীতে দেশ শাসনের দাবী করে এবং এভাবেই অহমিকা, অধৈর্য এবং ঔদ্ধত্যের ফলে নিজেদের ভাসিয়ে দেয়। ..আমি সাম্রাজ্যবাদী ভারতের দুরভিসন্ধি নস্যাৎ করার উদ্দেশ্যে দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীকে সাহায্য করার জন্য জনগণের প্রতি আবেদন জানাচ্ছি।”-(সুত্রঃ একাত্তরের ঘাতক ও দালালেরা কে কোথায়?)। পূর্ব পাকিস্তান মাদ্রাসা শিক্ষক সমিতির সভাপতি মাওলানা আব্দুল মান্নান ১৯৭১ য়ের ২৭ শে এপ্রিল এক বিবৃতিতে বলেন, “সশস্ত্র অনুপ্রবেশকারী ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমূলে উচ্ছেদ করার উদ্দেশ্যে পূর্ব পাকিস্তানের দেশপ্রেমিক জনগণ আজ জেহাদের জোশে আগাইয় আসিয়াছে।” -(সুত্রঃ একাত্তরের ঘাতক ও দালালেরা কে কোথায়?)। পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর আমীর জনাব গোলাম আযম এক বিবৃতিতে বলেন, “পূর্ব পাকিস্তানীরা পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী ভারতকে ছিনিমিনি খেলতে দেব না। .. পূর্ব পাকিস্তানীরা কখনই হিন্দু ভারতের দ্বারা প্রভাবিত হবে না। ভারতীয়রা কি মনে করেছে যে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের এতদূর অধঃপতন হয়েছে যে তারা ভারতকে তাদের বন্ধু ভাববে।” –(দৈনিক সংগ্রাম, ৮ই এপ্রিল, ১৯৭১)। পাকিস্তান ডেমোক্রাটিক পার্টির সভাপতি এবং পুর্ব পাকিস্তানের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী জনাব নুরুল আমীন বলেন, “পাকিস্তান সৃষ্টির জন্য আমরা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ এবং ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছি এবং সে সংগ্রামে জয়ী হয়েছি। আজও পাকিস্তানের অখন্ডতা রক্ষার জন্য আমাদের বিরুদ্ধে শক্তির মোকাবেলা করতে হবে। -(দৈনিক পাকিস্তান, ১৬ই আগষ্ট, ১৯৭১)। পাকিস্তান ডিমোক্রাটিক পার্টির সহসভাপতি ও প্রখ্যাত পার্লামেন্টারীয়ান জনাব মৌলবী ফরিদ আহমদ বলেন, “পাকিস্তানকে খন্তিত করা এবং মুসলমানদের হিন্দু-ব্রাহ্মণ্য ফ্যাসীবাদীদের ক্রীতদাসে পরিণত করার ভারতীয় চক্রান্ত বর্তমানে নিরপেক্ষ বিশ্ববাসীর কাছে সুস্পষ্ট হয়ে গেছে।… একমাত্র ইসলামের নামে এদেশের সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাস ভারতীয় এজেন্টরা তথাকথিত সাংস্কৃতিক বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের নামে এমন জঘন্য কাজ সম্পাদনে সক্ষম হয়েছে যা করতে হিটলারের ঘাতকদের বর্বরতাও লজ্জা পাবে। (সম্ভবতঃ এখানে তিনি ১লা মার্চ থেকে ২০ শে এপ্রিল পর্যন্ত দেশ আওয়ামী লীগ ক্যাডারদের দখলে থাকার সময় অবাঙ্গালীদের উপর যে গণহত্যা, ধর্ষণ ও লুটতরাজ নেমে আসে সেটি বুঝিয়েছেন)-(দৈনিক পাকিস্তান ১৬ই আগষ্ট, ১৯৭১)। মুসলিম লীগ নেতা এবং পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সাবেক স্পীকার জনাব ফজলুল কাদের চৌধুরী বলেন, “জাতি আজ তার সংক্ষিপ্ত ইতিহাসের মারাত্মক সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। ..পূর্ব পাকিস্তানের শতকরা ৯৬ জন লোক পাকিস্তানের জন্য ভোট দিয়েছিল …ভারতীয় এজেন্টদের দ্বারা পরিচালিত তথাকথিত বাংলাদেশ বেতার থেকে দিনরাত তাঁর ও অন্যান্য মুসলিম লীগ নেতার মৃত্যুদন্ডের কথা তারস্বরে ঘোষণা করা হচ্ছে। …পাকিস্তানের জন্য সংগ্রাম করে যাব। কারণ পাকিস্তানই যদি না থাকে তাহলে অধিকারের জন্য সংগ্রামের অবকাশ কোথায়?”-(দৈনিক পাকিস্তান, ১৮ই জুলাই, ১৯৭১)।  

কথা হলো, যারা এমন এক প্রবল চেতনা নিয়ে পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিলেন তাদেরকে কি বিদেশীদের দালাল বলা যায়? তারা যদি দালালী করেই থাকেন তবে সেটি করেছেন তাদের নিজস্ব চেতনা-বিশ্বাস ও স্বার্থের সাথে। তারা লড়াই করেছিলেন এবং প্রাণ দিয়েছিলেন নিজদেশের প্রতিরক্ষায়। আজও একই চেতনা নিয়ে তারা কাজ করছেন বাংলাদেশে। দু’টি ভিন্ন চেতনা আবার সেদিনের মত মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশে। তাই বাংলাদেশে বিভক্তির রাজনীতি একাত্তরে শেষ হয়নি। শেষ হয়নি ভারতীয় আগ্রাসনও। বাংলাদেশের আজকের সমস্যা মূলতঃ ভারতপন্থিদের সৃষ্টি। তবে খেলা এখন বাংলাদেশের ঘরে নেই। বাংলাদেশ চাইলেও সেটি থামানোর সামর্থ্য তার নেই। নিয়ন্ত্রন নেই এমনকি আওয়ামী লীগেরও। বরং এ দলটি নিজেই খেলছে ভারতের ক্রীড়নক হিসাবে। একাত্তরেও একই অবস্থা ছিল। মুজিবের হাত থেকে খেলা আগেই ভারত নিয়ে নিয়েছিল। ফলে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ও ভূট্টোর সাথে আলোপ আলোচনার সময় মুজিব শুধু তাই বলেছে যখন যা ভারত তাঁকে বলতে বলেছে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধেই ইতিমধ্যেই যুদ্ধ শুরু হয়েছিল ঢাকার রাজপথে। অবশেষে বাকি খেলার পুরা দায়িত্ব ভারতকে দিয়ে জেনে বুঝে মুজিব পাকিস্তানের জেলে গিয়ে উঠেন। মুজিবনগর সরকার নামে যে পুতুল সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তার সামান্যই সামর্থ্য ছিল ভারতকে প্রভাবিত করার। বরং সে সরকার নিজের অস্তিত্ব নির্ভর করছিল ভারত সরকারের করুণার উপর।  

ভারত চায় পঙ্গু ও পরাধীন বাংলাদেশ

ভারতের  স্ট্রাটেজী হলো, বাংলাদেশকে একটি দূর্বল রাষ্ট্র রূপে কোন মত বাঁচিয়ে রাখা। যে উদ্দেশ্যে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশগণ ৫ শতের বেশী রাজ্যকে নামে মাত্র স্বাধীনতা দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছিল –ভারত সেটিই চায় বাংলাদেশকে।   কারণ, ভারতের জন্য এটি এক রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা। একাত্তরের যুদ্ধে ভারত বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছিল এবং তার হাজার হাজার সৈন্য প্রাণ দিয়েছিল সেটিও ছিল এ লক্ষেই। একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী বাংলাদেশ নির্মাণে ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল -সেটি কিছু বাংলাদেশী বেওকুফ বিশ্বাস করলেও কোন ভারতীয় বিশ্বাস করেনি। ভারত ঠিকই বুঝে, বাংলাদেশ সবল হওয়ার মধ্যেই ভারতের বিপদ। তখন বল পাবে ভারতীয় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ৭টি রাজ্যের বিদ্রোহীরা। বল পাবে ভারতের প্রায় ২০ কোটি মুসলিম। ভারতের কাছে সেটি অসহনীয়। তাই আরেক পাকিস্তানকে কখনই তারা ভারতের পূর্ব সীমান্তে বেড়ে উঠতে দিবে না। এ নিয়ে তাদের আপোষ নেই। এজন্যই তাদের কাছে অতি অপরিহার্য হলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিবাদ ও সংঘাত টিকিয়ে রাখা। কারণ এরূপ গৃহবিবাদই একটি দেশের মেরুদন্ড ভাঙ্গার মোক্ষম হাতিয়ার। তাই বিভক্তির সূত্রগুলো খুঁজে খুঁজে বের করে ভারত ও ভারতপন্থিগণ সেগুলিকে লাগাতর পরিচর্যা দিচ্ছে। তাই জনজীবনে একাত্তরের বিবাদ ও বিভক্তি বিলুপ্ত না হয়ে দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে। আরো লক্ষ্য হলো, ভারত-বিরোধীদের নির্মূলের প্রক্রিয়াকে বাঁচিয়ে রাখা। তাই মুজিব যা নিয়ে এগুনোর সাহস পায়নি, তার কন্যা তা নিয়ে বহু দূর এগিয়েছে। ফলে শুরু হয়েছে যুদ্ধাপরাধের নামে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে রাজনৈতিক বিরোধীদের হত্যা। শুরু হয়েছে হাজার হাজার বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের উপর পুলিশী হয়রানী, নির্যাতন ও  জেলজুলুম। ফ্রিডম পার্টি বা জামায়াতের নেতাদের নির্মূলই ভারতের একমাত্র লক্ষ্য নয়। বিএনপিকেও তারা নির্মূল করে ছাড়বে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের হস্তক্ষেপ ও বিশাল পুঁজি বিণিয়োগের মূল লক্ষ্য তো এটিই।

 

তবে ভারত অতীতের ন্যায় এবার সব ডিম এক থলিতে রাখেনি। বিস্তর পুঁজি বিণিয়োগ হয়েছে আওয়ামী লীগের বাইরেও। সেটি বোঝা যায় মিডিয়া ও এনজিও জগতের দিকে তাকালে। মুজিব আমলেও এত পত্রিকা ও এত বুদ্ধিজীবী ভারতের পক্ষ নেয়নি -যা আজ নিচ্ছে। এরাই আজ আরেকটি যুদ্ধের প্রেক্ষাপট তৈরী করছে। সেটি পত্র-পত্রিকা ও টিভির মাধ্যমে ঘৃণার বীজ ছড়িয়ে। তাদের পক্ষ থেকেই বার বার দাবী উঠছে, “শুরু হোক আরেক একাত্তর” এবং “আবার গর্জে উঠুক একাত্তরের হাতিয়ার”। একাত্তরের এক যুদ্ধই বাংলাদেশকে তলাহীন ভিক্ষার ঝুলিতে পরিণত করেছিল।  আরেক যুদ্ধের ব্যয়ভারবহনের সামর্থ্য কি বাংলাদেশের আছে? তাছাড়া আরেক যুদ্ধ শুরু হলে সেটি কি নয় মাসে শেষ হবে? সেটি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে হবে না, সেটি হবে গৃহযুদ্ধ। আর গৃহযুদ্ধে কোন পক্ষ জিতে না, হারে সমগ্র দেশ। সেটি হবে বাংলাদেশের জন্য বড় আত্মঘাত। ভারত তো সেটিই চায়। ভারতের লক্ষ্যই হলো মুসলমানদের বিভক্ত করা, পঙ্গু করা এবং অবিরাম শাসন করা। অধিকৃত দেশের অভ্যন্তরে যে কোন শত্রুদেশের এটিই হলো অভিন্ন স্ট্রাটেজী। নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করার লক্ষ্য হলো বাঙালী মুসলিমদের মাঝের বিভক্তিকে আরো দীর্ঘজীবী ও প্রবলতর করা।  

ভারতীয় কামানের মুখ এবার বাংলাদেশের দিকে

বাংলাদেশীদের  মাঝে বিভক্তি গড়ার বড় কাজটি করছে মিডিয়া। ভারতের পক্ষে আজকের বুদ্ধিবৃত্তিক মূল যুদ্ধটি করছে বস্তুতঃ তারাই। আর আওয়ামী লীগের ন্যায় ভারতপন্থি দলগুলীর মূল কাজটি হয়েছে সে বিভক্তিকে একটি রাজনৈতিক সংঘাতে রূপ দেওয়া। কারণ, এ পথেই বাড়ে ভারতের অর্থলাভ ও সাহায্যলাভ। তাই বাংলাদেশের অধিকাংশ মিডিয়া ও ভারতপন্থি দলগুলো এক ও অভিন্ন লক্ষ্যে কাজ করছে। ইসলামপন্থি এবং একাত্তরের পাকিস্তানপন্থিদের বিরুদ্ধে ভারতপন্থিদের আজকের আক্রমণ এজন্যই আজ নতুন মাত্রা পাচ্ছে। ফলে যে রাজনৈতিক বিভক্তি ও সংঘাতের আগুন জ্বলে উঠেছিল একাত্তরে, ৪০ বছর পরও সেটি নিভছে না। একাত্তরে তাদের কামানের মুখ ছিল পাকিস্তানের দিকে। কিন্ত এবারের রণাঙ্গণে পূর্ব পাকিস্তান নেই। কামানের নল এবার খোদ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। একাত্তরের চেতনার নামে এটিই ভারত ও ভারতসেবীদের মরণছোবল। একাত্তরে কারা রাজাকার ছিল তাদের কাছে সেটিই শুধু গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারা আজ ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরোধী – তাদের রাডার তাদের বিরুদ্ধেও। নির্মূলের টার্গেট তারাও। বাঙালী মুসলিমদের দুর্বল করার এমন একটি মাস্টার প্লান নিয়ে ভারত ১৯৪৭ থেকেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে লাগাতর বিনিয়োগ বাড়িয়েছিল। একাত্তরে পাকিস্তান ভাঙ্গার মধ্য দিয়ে সেটি অর্ধেক সফল হয়েছিল। সেটি বুঝা যায়, বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকার পাকিস্তানী অস্ত্রের  ভারতে পাচার এবং বাংলাদেশের অর্থনীতির তলা ধ্বসিয় দেয়ার মধ্য দিয়ে। এবার তারা সফল করতে চায় বাঁকিটুকু। তারা ব্যর্থ করতে চায় বাঙালী মুসলিমদের স্বাধীন ও শক্তিশালী বাংলাদেশ নির্মাণের প্রকল্প। বিলুপ্ত করতে চায় ইসলাম নিয়ে বেড়ে উঠার স্বপ্ন। প্রশ্ন হলো, কোন ঈমানদার কি এরূপ ভারতীয় প্রকল্পকে সমর্থন করতে পারে? সমর্থন করলে কি সে মুসলিম থাকে? একাত্তরে যাদের জিহাদ ছিল অখণ্ড ও শক্তিশালী পাকিস্তান বাঁচানোর লক্ষ্যে, এখন তাদের জিহাদ হতে হবে স্বাধীন বাংলাদেশ বাঁচাতে। একাজে তাদের কোয়ালিশন গড়তে হবে তাদের সাথেও যাদের ইতিমধ্যেই মোহমুক্তি ঘটেছে একাত্তরের মুজিবসৃষ্ট ভারত-প্রেম থেকে। নইলে ভারতীয় প্রজেক্টকে মোকাবেলা করা এবং ঈমান বাঁচানোই যে কঠিন হবে -তা নিয়ে কি সামান্যত সন্দেহ আছে? দ্বিতীয় সংস্করণ ১১/০৩/২০১৯




ভারত চায় পরাধীন বাংলাদেশ

স্ট্রাটেজী আশ্রিত বাংলাদেশ নির্মাণের

ভারত বাংলাদেশের সাথে বন্ধুত্বের কথা বলে। তাদের কাছে সে বন্ধুত্বের বিশেষ একটি সংজ্ঞাও আছে। সেটি হলো ভারতের কাছে নিঃশর্ত অধীনতা। নইলে বন্ধুত্বের লক্ষণ কি এই, ভারত বাংলাদেশকে ঘিরে কাঁটা তারের বেড়া দিবে? পদ্মা, মেঘনা, তিস্তাসহ বাংলাদেশের নদীগুলোর পানি তুলে নিবে? সীমান্তে ভারতীয় বর্ডার সিক্যিউরিটি ফোর্স (বি.এস.এফ) ইচ্ছামত বাংলাদেশী নাগরিকদের হত্যা করবে? বাংলাদেশের বাজারে ভারতীয় পণ্যের অবাধ বাজার চাইবে অথচ ভারতের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করবে? বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ট্রানজিট চাইবে আর বাংলাদেশের প্রাপ্য ৩ বিঘা করিডোর দিতে গড়িমসি করবে? বন্ধুত্ব কে না চায়? তবে বন্ধুত্বের কথা বললেই কি বন্ধুত্ব হয়? সে জন্য তো জরুরী হলো বন্ধুসুলভ মানসিকতা ও আচরণ। কিন্তু লক্ষ্য যেখানে বাজার দখল, নদী দখল, সীমান্তদখল ও আধিপত্য বিস্তার -সেখানে কি বন্ধুত্ব হয়? ভারত বন্ধুত্বের দোহাই দেয় স্রেফ ধোকা দেয়ার জন্য। বন্ধুত্বের লেবাসে ভারত চায় নিঃশর্ত আনুগত্য ও দাসত্ব। এখানে লক্ষ্য, পরাধীন বাংলাদেশের নির্মাণ। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনামলে স্বাধীনতার দাবী তোলাটি বিবেচিত হতো বিদ্রোহ ও সন্ত্রাস রূপে। তেমনি আজ ভারতের অধীনতার বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলাটি গণ্য হচ্ছে ভারত-বিরোধীতা ও সন্ত্রাস রূপে।

ভারত যখন সাম্রাজ্যবাদী ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের দ্বারা অধিকৃত ছিল তখন এদেশের বিশাল এলাকা জুড়ে পাহারাদারির মত সামরিক বল, প্রশাসনিক সামর্থ ব্রিটিশদের ছিল না। এদেশে তারা বসবাসের জন্য আসেনি, এসেছিল লুণ্ঠনে। লুণ্ঠনের হাতিয়ার ছিল সামরিক আগ্রাসন, ক্ষমতা দখল ও বাজার দখল। বাণিজ্যের ময়দান থেকে প্রতিদ্বন্দিদের হটাতে তারা বাংলার মসলিন তাঁতশিল্পিদের আঙ্গুল কেটেছিল। ধ্বংস করেছিল দেশী শিল্প। তখন  ভারতে অবস্থিত ব্রিটিশ লোকবল কোন কালেই কয়েক লাখের বেশী ছিল না। নিজেদের সামরিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের পাহারাদারির কাজে তা কোন কালেই পর্যাপ্ত ছিল না, ফলে লোকবলের সে ঘাটতি পূরণে ব্রিটিশ সরকার শুরু থেকেই তাই পার্টনার খুঁজতে থাকে। বহু ভারতীয় –বিশেষ করে হিন্দুরা সে দায়িত্ব পালনে দ্রুত এগিয়ে আসে। ব্রিটিশ সরকার তাদেরকেই ভারতের বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় শাসক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে। ভারতীয় ইতিহাসে এরাই রাজা, মহারাজা, রানী, মহারানী ও নবাব রূপে প্রতিষ্ঠা পায়। তাদের সংখ্যা ছিল সহস্রাধিক। শক্তিশালী সামরিক বাহিনী গঠনের অধিকার তাদের ছিল না। বিদেশ থেকে অস্ত্র-ক্রয়েরও কোন অধিকার ছিল না। এসব রাজা-মহারাজাগণ নিজেদের স্বাধীন বলে দাবী করতো। স্বাধীনতা ও স্বায়ত্বশাসনের নামে তাদের যে অধিকার ছিল তা কিছু কিছু উজির-নাযির রাখার। অধিকার ছিল কিছু খাজনা আদায়ের, এবং সে কাজের জন্য অধিকার ছিল কিছু নায়েব, গোমাস্তা, তহসিলদার, পাইক-পেয়াদা রাখার। অধিকার ছিল আদালত বসানোর। তাদের কোন বিদেশ নীতি ছিল না, অন্য কোন দেশে তাদের কোন দূতাবাসও ছিল না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় এমন দেশকে বলা হয় প্রটেক্টরেট বা আশ্রিত রাষ্ট্র। আশ্রিত রাষ্ট্রগুলি সাধারণতঃ এমন সব স্বায়ত্বশাসিত ভূখণ্ড যা অন্য যে কোন কোন তৃতীয় রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য হামলার বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র কর্তৃক কূটনৈতিক ও সামরিক নিরাপত্তা পায়। এই নিরাপত্তা প্রাপ্তির বিনিময়ে উক্ত আশ্রিত রাষ্ট্রের উপর কিছু বাধ্যবাধকতা থাকে, এবং এর ফলে সংকুচিত হয় তার স্বাধীনতা। ব্রিটিশ আমলে হায়দারাবাদ, ভূপাল, জয়পুর, উদয়পুর, ত্রিপুরা, গোয়া, বাহাওয়ালপুর ইত্যাদি রাজ্যগুলো হল সেরূপ আশ্রিত রাষ্টের নমুনা। হায়দারাবাদের নিজাম বিশ্বের সবচেয়ে ধনি ব্যক্তি রূপে পরিচিত হলেও দরিদ্র আফগাণদের যে স্বাধীনতা ছিল সেটি তার ছিল না। বিশাল ভারতীয় ভুমি খণ্ডিত করে এসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দেশীয় রাজ্যগুলো সৃষ্টি করা হয়েছিল এ জন্য যে, ভারতের উপরে ব্রিটিশের সামরিক, অর্থনৈতিক এ সাংস্কৃতিক আধিপত্য স্থাপনে তারা সহযোগিতা দিবে। এর ফলে ভারত শাসনে ব্রিটিশের দায়ভার কমেছিল,এবং কমেছিল তাদের অর্থ ও রক্তক্ষয়। আশ্রিত রাষ্ট্রগুলোর শাসকদের উপর আরোপিত দায়িত্বটি ছিল, তাদের রাজ্যে ব্রিটিশদের বিরোধী কোন যুদ্ধ বা আন্দোলন গড়ে উঠতে দিবে না। ব্রিটিশ বিরোধী কোন সামরিক বা বেসামরিক নেতাকর্মীদের তারা যেমন আশ্রয় দিবে না, তেমনি কোন শত্রুদেশের সাথে তারা কূটনৈতিক বা সামরিক সম্পর্কও গড়বে না।

 

একাত্তরের অধীনতা 

১৯৭১এর যুদ্ধে ভারত বিজয়ী হয়, পরাজিত ও খণ্ডিত হয় পাকিস্তান। পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চল নিয়ে সৃ্ষ্টি হয় বাংলাদেশ। প্রশ্ন হল, বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের স্ট্রাটেজীটা কি ছিল? এবং কীরূপে সংজ্ঞায়িত করা যাবে মুজিব আমলের সে বাংলাদেশকে? ভারত কি আদৌ চাইতো স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা? বস্তুত ভারতের চাওয়া-পাওয়ার বিষয়টি আদৌও গোপন বিষয় নয়। শুধু ভারত কেন, কোন দেশের রাজনীতি, পররাষ্ট্র নীতি ও সামরিক নীতিই গোপনীয় বিষয় নয়। ব্যক্তির কথা ও আচরনের মধ্যে দিয়ে যেমন ধরা পড়ে সে নিজেকে এবং অন্যকে নিয়ে কীরূপ ভাবে সে বিষয়টি। তেমনি একটি দেশের সরকারের লক্ষ্য, আদর্শ,ভিশন এবং প্রতিবেশী নিয়ে তার ধারণাটি ধরা পড়ে সে দেশের রীতিনীতি, আচরণ ও অন্য দেশের সাথে তার লেনদেন, ব্যবসাবাণিজ্য ও স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলোর মাধ্যমে। একটি দেশের চরিত্র বুঝার জন্য এগুলো হলো অতি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। বাংলাদেশের সাথে ভারত সরকার অনেকগুলো চুক্তি করেছিল। ভারত নিজেকে কীরূপ ভাবে এবং বাংলাদেশকেই বা কি মনে করে সেটির সুষ্ঠ পরিচয় মেলে সে সময়ের স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলো দেখলে। ভারতের পক্ষ থেকে চুক্তির শুরু স্রেফ ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বরের পর নয়, বরং তার পূর্ব থেকেই। আওয়ামী লীগ নেতা তাজুদ্দীন যখন অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তখন ভারতের সাথে ৭ দফা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির শর্ত গুলো ছিল এরূপঃ এক). ভারতীয় সমরবিদদের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশে আধা সামরিক বাহিনী গঠন করা হবে। গুরুত্বের দিক হতে এবং অস্ত্রশস্ত্রে ও সংখ্যায় এই বাহিনী বাংলাদেশের মূল সামরিক বাহিনী হতে বড় ও তাৎপর্যপূর্ণ হবে। (পরবর্তীকালে এই চুক্তির আলোকে রক্ষী বাহিনী গড়া হয়)। দুই). ভারত হতে সমরোপকরণ অস্ত্রশস্ত্র ক্রয় করতে হবে এবং সেগুলি করতে হবে ভারতীয় সমরবিদদের পরামর্শানুযায়ী। তিন). ভারতীয় পরামর্শেই বাংলাদেশের বহিঃবাণিজ্য কর্মসূচী নির্ধারণ করতে হবে। চার). বাংলাদেশের বাৎসরিক ও পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ভারতীয় পরিকল্পনার সহিত সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। পাঁচ).বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতির অনুরূপ হতে হবে। ছয়).ভারত-বাংলাদেশ চুক্তিগুলি ভারতীয় সম্মতি ব্যতীত বাতিল করা যাবে না। সাত). ভারত যে কোন সময় যে কোন সংখ্যায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারবে। -(সূত্রঃ অলি আহাদ, জাতীয় রাজনীতিঃ ১৯৪৫ থেকে ১৯৭৫)। প্রশ্ন হল, কোন স্বাধীন দেশ কি এমন নীতি মেনে নিতে পারে? মেনে নিলে কি তার স্বাধীনতা থাকে? এ চুক্তির পর কি আর প্রমাণের অপেক্ষা রাখে,বাংলাদেশের স্বাধীনতা নয়, ভারতের প্রতি অধীনতাকে সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যেই সে চুক্তি সাক্ষর করা হয়েছিল। আওয়ামী লীগ নেতারা জনসভায় প্রচণ্ড হুংকার তুলেন স্বাধীনতার, কিন্তু ভারতের কাছে তারা যে কতটা আত্মসমর্পিত ছিলেন তা উপরুক্ত ৭ দফা চুক্তি পাঠ করার পরও কি বুঝতে বাঁকি থাকে?   

 

আত্মসমর্পিত মুজিব

আশ্রিত বাংলাদেশ নিমাণের ভারতীয় প্রকল্পটি প্রকট ভাবে ধরা পড়ে শুধু তাজুদ্দীনের সাথে স্বাক্ষরিত ৭ দফা চুক্তিতে নয়, শেখ মুজিবের সাথে ইন্দিরা গান্ধির সাক্ষরিত বারোটি অনুচ্ছেদবিশিষ্ট পঁচিশ বছর মেয়াদি চুক্তিটিতেও। ধরা পড়ে ভারতের প্রতি শেখ মুজিবের আত্মসমর্পিত চরিত্রটিও। পাকিস্তান আমলে শেখ মুজিবসহ কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা উঠেছিল। মামলায় অভিযোগ ছিল শেখ মুজিব ও তাঁর সাথীরা ভারতের সাহায্য নিয়ে পাকিস্তানকে ভাঙ্গতে চায়। সেদিন শেখ মুজিব কসম খেয়ে বলেছিলেন, এমন কোন ষড়যন্ত্রের সাথে তিনি জড়িত ছিলেন না। এ মামলার জবাবে বলেছিলেন, এটি এক মিথ্যা ষড়যন্ত্র মামলা। কিন্তু আজ আওয়ামী লীগ নেতাদের মুখে ভিন্ন কথা। তারা আজ গর্বের সাথে বলেন, সে ষড়যন্ত্রটি সঠিক ছিল। বরং আজ সে আগরতলা ষড়যন্ত্রটি নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতাদের এক বিরাট অহংকার। প্রশ্ন হল, গোপনে চোরা পথে যে ব্যক্তিটি ভারতের আগরতলায় যেতে পারে,ভারতের কাছ থেকে কি করেই বা তিনি উচ্চতর মুল্যায়ন পেতে পারেন? দেখা যাক ভারতের কাছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূলায়নটি কেমন ছিল। সে মূল্যায়নে ২৫ সালা চু্ক্তিটির বিভিন্ন অনুচ্ছেদ থেকে কিছু উদ্ধৃতি দেয়া যাকঃ 

Article 4 : “The high contracting parties shall maintain regular contacts with each other on major international problems affecting the interests of both states, through meetings and exchange of views at all levels.” অর্থঃ “চুক্তিবদ্ধ পক্ষদ্বয় তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সমস্যা প্রসঙ্গে সকল পর্যায়ে সভা ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করবে।”  প্রশ্ন, আন্তর্জাতিক সমস্যা যে শুধু ভারতের সাথে হবে সেটি কি করে বলা যাবে? অন্য দেশের সাথেও তো হতে পারে। সেটি যেমন বার্মা, ভূটান, চীনের সাথে হতে পারে, নেপাল, শ্রীলংকা ও পাকিস্তানের সাথেও হতে পারে। কিন্তু ভারত এখানে বাংলাদেশের উপর শর্ত লাগায়, যে কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভারতের সাথে প্রথমে পরামর্শ করতে হবে। অর্থাৎ ভারত বাংলাদেশের চারদিকে একটি বেড়া লাগিয়ে দেয়। সে বেড়া অতিক্রম করে অন্যকোন দেশে যাওয়ার উপর লাগায় খবরদারি।  

Article 9 : “Each of the high contracting parties shall refrain from giving any assistance to any third party taking part in and armed conflict against the other party. In case either party is attacked or threatened with attack, the high contracting parties shall immediately enter into mutual consultations in order to take appropriate effective measures to eliminate the threat and thus ensure the peace and security of their countries.”  অর্থঃ “চুক্তিবদ্ধ পক্ষদ্বয় কোনো তৃতীয় পক্ষের সঙ্গে সশস্ত্র সংঘাতে লিপ্ত হলে কোনো পক্ষই সেই তৃতীয় পক্ষকে কোনোরূপ সহায়তা প্রদান করবে না। যে কোনো পক্ষ আক্রান্ত হলে অথবা হুমকির সম্মুখীন হলে সেই আক্রমণ অথবা হুমকি মোকাবেলা করে শান্তি স্থাপন ও নিরাপত্তা বিধানে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করার লক্ষ্যে চুক্তিবদ্ধ পক্ষদ্বয় জরুরি আলোচনায় মিলিত হবে।” একটি দেশের স্বাধীনতা সবচেয়ে ব্শেী বুঝা যায় সে দেশের পররাষ্ট্র নীতি থেকে, -স্বরাষ্ট্র নীতি, কৃষি নীতি বা শিক্ষা নীতি থেকে নয়। ভারত তার ২৫ সালা চুক্তিতে যে শর্ত লাগায় তেমন শর্ত সাধারনতঃ লাগানো হয় কোন জোটবদ্ধ একটি দেশের সাথে। সোভিয়েত রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন ওয়ারশো জোটভূক্ত দেশগুলোর উপর রাশিয়া এমন একটি বাধ্যবাধকতা রেখেছিল। ফলে পোলাণ্ড, পূর্ব জার্মানি, হাঙ্গেরির মত দেশগুলো যাতে স্বাধীন পররাষ্ট্র নীতি গ্রহণ না করতে পারে সেটি এভাবে নিয়ন্ত্রিত করেছিল। চুক্তির এ শর্তের মাধ্যমে বাংলাদেশ পরিণত হয় ভারতের জোটভূক্ত একটি দেশে, এবং দিল্লির আজ্ঞাবহ। অথচ ১৯৪৭ সালে যখন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয় তখন এমন কোন চুক্তি করতে হয়নি,ফলে দেশটি কোন দেশের আজ্ঞাবহও হয়নি। ফলে একদিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অপরদিকে চীন এবং মুসলিম বিশ্বের সাথে স্বাধীন পররাষ্ট্র নীতি গড়ে তোলে। অথচ বাংলাদেশ তার জন্ম থেকেই হাতপা বাঁধা অবস্থায় যাত্রা শুরু করে।

Article 10 : “Each of the high contracting parties solemnly declares that it shall not undertake any commitments, secret or open, toward one or more states which may be incompatible with the present treaty.” অর্থঃ “চুক্তিবদ্ধ পক্ষদ্বয় এই মর্মে ঘোষণা দিচ্ছে যে, তারা অন্য কোনো এক বা একাধিক রাষ্ট্রের সঙ্গে গোপন অথবা প্রকাশ্য এমন কোনো প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ হবে না যা এই চুক্তির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে।” কথা হল, কে কার সাথে চুক্তি বা বন্ধুত্ব করবে সেটি অন্য কারো বিষয় নয়, সেটি প্রত্যেকের নিজস্ব বিষয়। এটিই ব্যক্তি স্বাধিনতার মূল কথা। তেমনি একটি দেশের সার্বভৌমত্বের পরিচয় ফুটে উঠে যে কোন দেশের সাথে বন্ধুত্ব গড়ার স্বাধিনতার মধ্য দিয়ে। সেটি নিয়ন্ত্রিত হলে স্বাধীনতা বা সার্বভৌমত্ব থাকে না, তখন শুরু হয় অধীনতা। অথচ ভারত ২৫ সালা চুক্তির মাধ্যমে সে স্বাধীন অধিকারটুকুই কেড়ে নেয়।  ভারত শর্ত লাগায়, অন্য কোন দেশের  সাথে সম্পর্ক গড়তে হলে ভারতের সাথে পরামর্শ করতে হবে।  এর অর্থ দাড়ায় ভারতে সাথে শত্রুতা আছে এমন দেশের সাথে বন্ধুত্ব গড়া যাবে না। আর ভারতের শত্রুতা তো বহু দেশের সাথে। চীন, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলংকাসহ কোন প্রতিবেশী দেশের সাথে ভারতের সুসম্পর্ক নেই।  অথচ এ দেশগুলো বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ। ফলে এদেশগুলির সাথে সম্পর্ক গড়া বাংলাদেশের জন্য জরুরীও। প্রতিবেশী এ দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক মজবুত করার মধ্য দিয়েই দেশটি নিজ পায়ের উপর দাঁড়াতে পারে। গড়ে তুলতে পারে সহযোগিতা মূলক অর্থনীতি। অথচ ভারত বাংলাদেশকে সে অধিকার দিতে রাজী ছিল না। ভারত চায়, বাংলাদেশ একমাত্র ভারতমুখি হোক। আর এজন্যই ২৫ সালা চু্ক্তির ১০ নম্বর ধারা। এ চুক্তির কারণেই মুজিবামলে ভারত ও রাশিয়ার বাইরে বাংলাদেশের কোন বন্ধু ছিল না। চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সৌদিআরব, ইরানসহ বহু গুরুত্বপূর্ন দেশের সাথেই মুজিব সুসম্পর্ক গড়তে পারেননি। অর্থনৈতিক দুর্দশা বা বিপদের দিনে ভারত বা রাশিয়ার সাহায্য দেয়ার সামর্থ ছিল না। রাশিয়ার কাজ ছিল মার্কসবাদের উপর সস্তা বই সরবরাহের। অপর দিকে ভারতের কাজ ছিল নট-নটি, গায়ক-গায়িকার সরবরাহ, আর কোলকাতার লেখকদের বইয়ের জোয়ার সৃষ্টি। অর্থাৎ সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। বিশ্বের সর্বাধিক দরিদ্র জনগোষ্ঠির বসবাস ভারতে। সে দেশে প্রতিদিন বহু শত মানুষ অভাবের তাড়নায় আত্মহত্যা করে মারা যায়। তারা অন্য দেশকে অর্থনৈতিক সাহায্য দিবে সেটি কি কল্পনা করা যায়? ফলে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মত এক সাহায্যনির্ভর দরিদ্র দেশের জন্য এ ছিল এক ভয়ানক দুরাবস্থা। ভারতের প্রতি আনুগত্যের কারণে বিদেশ থেকে সাহায্য সংগ্রহের কাজটিও ভারত কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হয়। চীন, সৌদি আরব, কুয়েতসহ বহু দেশই বাংলাদেশকে ভারতের একটি আশ্রিত দেশ ভাবতে থাকে। মুজিবের জীবদ্দশাতে তারা দূতাবাস স্থাপনেও ইতস্ততঃ করেছে। বিপদের দিনে এমন বন্ধুহীন দেশের জনগণকে লাখে লাখে প্রাণ দিয়ে খেসারত দিতে হয়। বাংলাদেশের জনগণের জীবনে তেমনি এক ভয়ানক বিপদ নেমে আসে ১৯৭৪ সালের ভয়ানক দুর্ভিক্ষে । সে দুর্দিনে মুজিব সরকার সাহায্য পেতে ব্যর্থ হয়। ফলে বহু লক্ষ মানুষ তখন না খেয়ে মারা যায়। বস্ত্রের অভাবে মহিলারা মাছধরা জাল পড়তে বাধ্য হয়। বাংলাদেশের সমগ্র ইতিহাসে এমন নজির এই প্রথম।

 

ভারতের বিশ্বাসঘাতকতা       

ভারত সরকার মুজিবের উপর ২৫ সালা চুক্তি চাপিয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা শৃঙ্খলিত করতে। চুক্তি স্বাক্ষরের এটিই ছিল মূল লক্ষ্য। তবে ভারত নিজে সে চুক্তিটি অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে সে বিষয়টি ভারতের কাছে কোন কালেই গ্রহণ যোগ্যতা পাইনি। তাই  শর্ত ভাঙতে ভারত সরকার কোনো দিনই দ্বিধা করেনি।  সেটির প্রমাণ পাওয়া যায় মুজিবের মৃত্যুর পর পরই। চুক্তির ৮ নম্বর অনুচ্ছেদে কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিবাদে কোনো বিদ্রোহী পক্ষকে সহায়তা না করার সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি থাকা সত্ত্বেও ভারত অবলীলায় চুক্তি ভঙ্গ করে বাংলাদেশের সীমান্তের উপর হামলায় কাদের সিদ্দিকীকে আশ্রয় দেয়, অর্থ দেয় এবং প্রশিক্ষণ ও অস্ত্রও দেয়। অথচ চুক্তিটির ৮ অনুচ্ছেদে শর্ত ছিলঃ “Each of the High Contracting parties shall refrain from any aggression against the other party and shall not allow the use of its territory of committing any act that may cause military damage to or constitute a threat to the security of the other High Contracting Party.”  অর্থঃ চুক্তিবদ্ধ পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে সর্বপ্রকার আগ্রাসী তৎপরতা থেকে বিরত থাকবে এবং নিজের ভূখণ্ড অন্য পক্ষের সামরিক ক্ষয়ক্ষতি কিংবা তার নিরাপত্তার বিরুদ্ধে হুমকি সৃষ্টিকারী কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হতে দেবে না।” অথচ ভারত সে শর্ত ভঙ্গ করে। এবং সেটি কাদের সিদ্দিকী এবং তথাকথিত শান্তি বাহিনীকে অস্ত্র, প্রশিক্ষণ, অর্থ এবং অন্যান্য সহায়তা দিয়ে। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ পরিচালনায় ভারত এভাবে সরাসরি অংশগ্রহণ করছে। ভারত তার নিজ ভূমিকে এভাবে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে ব্যবহৃত হতে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, ভারতে বসেই প্রাক্তন আওয়ামী সংসদ সদস্য চিত্তরঞ্জন সুতোর এবং আরেক নেতা কালিপদ বৈদ্য স্বাধীন বঙ্গভূমি আন্দোলন সংগঠিত করেছে। ভারত তাদেরকেও বাংলাদেশের হাতে তুলে দেয়নি। এতে যে বিষয়টি পরিস্কার হয় তা হল, এমন একটি শর্ত রাখার পিছনে ভারতের মূল লক্ষ্যটি হল বাংলাদেশের ভূমি যাতে ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত না হয় সেটি নিশ্চিত করা। ভারতের ভূমি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হওয়া বন্ধ করা নয়।  পরবর্তীতে একই ভাবে ভারতীয় ভূমি ব্যবহৃত হচ্ছে সান্তু লারমা ও তার চাকমা গেরিলারা।

 

ব্যয়হুল ও বিপদজনক স্বপ্ন

ভারত ১২০ কোটি মানুষের এক বিশাল দেশ। ইদানীং দেশটিতে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এসেছে। আর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বাড়লে স্বপ্ন এবং লিপ্সাও বাড়ে।ভারত চায় বিশ্বে না হোক অন্ততঃ এশিয়ার বুকে একটি আঞ্চলিক শক্তি রূপে আত্মপ্রকাশ করতে। আর সে স্বপ্ন পূরণটি যেমন ব্যয়বহুল,তেমনি বিপদজনকও। সে বিপদ যেমন ভারতের জন্য তেমনি প্রতিবেশী বাংলাদেশের জন্যও। সে স্বপ্ন পূরণে চাই বিপুল সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তি। তবে সবচেয়ে বেশী দরকার অর্থনিতক বল। কারণ বৃহৎ সামরিক শক্তি হওয়ার খরচ অতি বিশাল। একটি যুদ্ধবিমান ক্রয়ের খরচ কেড়ে নেয় কয়েকটি হাসপাতাল বা স্কুল প্রতিষ্ঠার খরচ। সামরিক খরচের ভারে সোভিয়েত রাশিয়া খণ্ডিত হয়ে গেল। এবং একই কারণে বিশ্ব-শক্তির মঞ্চ থেকে হারিয়ে গেছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য। একই রূপ বিশাল খরচের ভারে প্রচণ্ড ধ্বস নেমেছে মার্কিন অর্থনীতিতে। দেশটি হাজার বিলিয়ন ডলারেরও বেশী ঋণগ্রস্ত একমাত্র চীনের কাছে। তবে মার্কিনীদের সুবিধা হল, দেশটির পূর্ব ও পশ্চিম সীমান্ত দুই মহাসমুদ্র দ্বারা সুরক্ষিত। উত্তর ও দক্ষিণের সীমান্তেও কোন যুদ্ধ লড়তে হয় না; কোন রূপ যুদ্ধ লড়তে হচ্ছে না দেশের অভ্যন্তরেও। দেশটির অভ্যন্তরে যেমন কাশ্মীর, আসাম, নাগাল্যান্ড, মিজোরাম যেমন নাই তেমনি সীমান্তে বা আশে পাশে চীন,পাকিস্তান বা আফগানিস্তানও নাই। অথচ ভারতের সে সুযোগটি নেই। প্রায় ৬০ বছর ধরে চলছে কাশ্মির, আসাম, ত্রিপুরা, মিজারাম, নাগাল্যাণ্ডে চলছে স্বাধীনতা যুদ্ধ -যা থামার নামা নেয়া দূরে থাক দিন দিন আরো তীব্রতর হচ্ছে। বরং দেশটির জন্য বিপদের বড় কারণ, দেশটিকে শত শত কোটি টাকা ব্যয় হয় স্রেফ সীমান্ত পাহারা দিতে। সে খরচ কমাতে এখন বাতিক চেপেছে তারকাঁটার বেড়া দেয়ার।যেন কাঁটা তারার বেড়া অলংঘনীয় বা দুর্লংঘনীয় কিছু। অথচ সে বাতিক মেটাতে খরচ বাড়ছে শত শত কোটি রুপীর।

স্মৃতি-বিলুপ্তি ভারত সরকারেরও কম নয়। ভারত ভূলে যায়, মুজিবের শাসন যেমন চিরকালের জন্য ছিল না, তেমনি হাসিনাও চিরকাল থাকার জন্য আসেনি। আজ হোক কাল হোক হাসিনা অপসারিত হবেই, এবং অন্যরা ক্ষমতায় আসবে। হাসিনাকে এতটা মাথায় তোলার পর কি ভারত অন্যদের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে পারবে? তাছাড়া হাসিনার ভরাডুবির জন্য ভারত থাকতে কি অন্য কোন শক্তির প্রয়োজন আছে? মুজিবের পতনের জন্য মুজিবের বাকশালী স্বৈরাচার ও তার দলের সীমাহীন দূর্নীতি যতটা দায়ী,তার চেয়ে বেশী দায়ী ভারতীয় লুণ্ঠন ও নীতিহীনতা। নিজে দস্যুতা করা ভয়ানক অপরাধ, কিন্তু দুর্বৃত্ত দস্যুর পক্ষ নেয়াও কি কম অপরাধ? অথচ মুজিবের সে অপরাধটি ছিল বিশাল। ভারতীয়দের লুণ্ঠন রোধে তিনি কোন ভূমিকাই নেননি। বরং তাদের সহযোগী হয়েছেন, যেমন অর্থ ও অস্ত্র লুণ্ঠনে তেমনি পদ্মার পানি লুণ্ঠনে। ভারতের লুণ্ঠন বাড়াতে তিনি সীমান্ত বাণিজ্যের নামে বাংলাদেশের সীমান্ত বিলুপ্ত করেছিলেন। এবং ক্যারেন্সি নোট ছাপার ঠিকাদারি দিয়েছিলেন ভারতীদের। এভাবে ভারতকে সুযোগ করে দিয়েছিলেন শত শত কোটি টাকার জাল নোট ছাপার। মুজিব ধ্বংস করেছিলেন বাংলাদেশের পাটশিল্প, এভাবে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিলেন পাকিস্তানী আমলে বহু কষ্টে গড়ে তোলা পাটের আন্তর্জাতিক বাজার।

 

আত্মঘাতি নির্বু্দ্ধিতা

ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলার হিন্দুরা নিজেদের মাঝে রেনেসাঁ এনেছিল। ভারতবর্ষের ইতিহাসে সেটি বাঙালী রেনেসাঁ নামে পরিচিত। আসলে এটি ছিল বাঙালী হিন্দুদের রেনেসাঁ। তারা বাঙালী মুসলমানদের পিছনে রেখে নিজেরা এগিয়ে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু তাতে তাদের কোন কল্যাণই হয়নি। যে দেশের মানুষের সাথে তাদের আলোবাতাস, নদ-নদী, পথঘাট ব্যবহার করতে হয় তাদের সাথে শত্রুতা করে কি কোন কল্যাণ হয়? তাদের সে নির্বু্দ্ধিতার কারণেই বাংলা সেদিন বিভক্ত হয়েছিল এবং তাদেরকে পৈতিক ভিটামাটি ছেড়ে ভারতে পাড়ি জমাতে হয়েছিল। আজও ভারত প্রতিবেশী দেশগুলিকে পিছনে ফেলে বৃহৎ শক্তি হতে চায়। তাদের আগ্রাসী নীতি বিপদে ফেলছে বাংলাদেশে বসবাসকারি আজকের হিন্দুদের। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও ইসরাইলকে মিত্ররূপে পাওয়ার তাড়নায় ভারত বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মুসলমানদের মৌলবাদী ও সন্ত্রাসী রূপে চিত্রিত করছে। আর যতই বাড়চ্ছে ভারতীয়দের এরূপ প্রচারণা ততই ভয় বাড়ছে বাংলাদেশের হিন্দুদের মনে। ভারতের এ নীতির কারণে তারা নিজেরাই নিজেদের অপরাধী ভাবছে। যেমনটি ১৯৪৭ সালে ভারতের পাকিস্তান বিরোধী নীতির কারণে তারা যেমনটি ভেবেছিল। বাংলাদেশে কোন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নেই। কিন্তু ভারতের নীতির কারণে বাংলাদেশের হিন্দুরা এদেশকে আর নিরাপদ ভাবতে পারছে না। একই রূপ ভারতীয় নীতির কারণে কাশ্মীর থেকে হিন্দুদের দেশ ত্যাগ করতে হয়েছে।

ভারতের আত্মঘাতি নীতির কারণেই প্রচণ্ড সংঘাত বাড়াচ্ছে বাংলাদেশের রাজনীতিতেও। আর এতে বিপদ বাড়ছে সকল নাগরিকের, সে সাথে হিন্দুদেরও। আওয়ামী লীগের কাঁধে বন্দুক রেখে ভারত ইসলাম ও বাঙালী মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছে। লক্ষ্য, বাংলাদেশের মানুষের কাছ থেকে ইসলামকে ছিনিয়ে নেয়া। জিহাদের ন্যায় ইসলামের মৌলশিক্ষাকে তারা জঙ্গিবাদ আখ্যা দিচ্ছে। একাজে নামিয়েছে তাদের নিজেদের প্রতিপালিত লেখক,বু্দ্ধিজীবী,কিছু মতলববাজ আলেম, সাংবাদিক ও মিডিয়াকর্মীদের। অথচ নবীজীর প্রসিদ্ধ হাদীসঃ যে ব্যক্তি জীবনে জিহাদ করলো না, এবং জিহাদের নিয়তও করলো না, সে মারা গেলে মারা যায় মুনাফিক রূপে। জনগণকে ইসলাম থেকে দূরে টানতে তারা দীক্ষা দিচ্ছে সেক্যুলারিজমে। বাংলাদেশে শরিয়তের প্রতিষ্ঠাকে তারা মেনে নিবে সে ঘোষণাও তারা বার বার দিচ্ছে। অথচ এটি বাংলাদেশের নিতান্তই অভ্যন্তরীন বিষয়।

ভারতীয়রা নিজেদেরকে প্রচণ্ড বুদ্ধিমান ও কৌশলী ভাবে। অথচ তাদের বুদ্ধিহীনতার কারণেই ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের সৃষ্টি করতে শিক্ষাদীক্ষা ও অর্থনীতিতে পশ্চাদপদতায় মুসলমানদের বড় একটা বেগ পেতে হয়নি। বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে তাদের সে বুদ্ধিহীনতাই মুজিবের পতন ডেকে এনেছিল। অনাচারি মানুষের মনযোগ নিছক অনাচার বা দুর্বৃত্তিতে,সুনীতি, সুবিচারের প্রয়োগ নিয়ে তার আগ্রম থাকে না। তেমনি অবস্থা আগ্রাসী দেশেরও। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান ছিল ভারতের চেয়ে ক্ষুদ্র ও অর্থনৈতিক ভাবে সর্বক্ষেত্রে অনগ্রসর দেশ। ভারতের উচিত ছিল উপমহাদেশের শান্তির সার্থে পাকিস্তানের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা। উচিত ছিল, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তারা হামলা করবে না সে অভয় দেয়া। এতে উভয় দেশের দরিদ্র মানুষের কল্যাণ হত। কিন্তু ভারত সে পথে যায়নি। স্বাধীনতা লাভের প্রথম দিন থেকেই দেশটির বিরুদ্ধে যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি করে। খণ্ডিত ভারত এবং পাকিস্তানের সৃষ্টি তাদের কাছে অগ্রহণযোগ্য -সেটি তারা শুরু থেকেই বলতে থাকে। এভাবে নিরাপত্তাহীন পাকিস্তানকে তারা সিয়াটো ও সেন্টো জোটে যোগ দিতে বাধ্য করে। ভারত বিভাগের সময় অখণ্ড ভারতের অর্থভাণ্ডারে কয়েক শত কোটি টাকার রিজার্ভ ফাণ্ড ছিল।  কিন্তু ভারতীয়দের অসততা হল,১৯৪৭-এ পাকিস্তানের প্রাপ্য অর্থ তারা দেয়নি। এর ফলটা হল,পাকিস্তানীদের প্রচণ্ড ভারত-বিরোধী করতে সেদেশে আর কোন নতুন জিন্নাহর প্রয়োজন পড়েনি। মানুষ সেখানে ভারত বিরোধী বোমায় পরিণত হচ্ছে, বিস্ফোরিত হচ্ছে মোম্বাই,দিল্লি ও কাশ্মীরে। ভারত মুসলিম শাসিত হায়দারাবাদ, গোয়া,মানভাদর দখল করে নেয়। দখল করে নেয় কাশ্মির। গণভোট অনুষ্ঠানের ওয়াদা দিয়েও কাশ্মিরে তারা নির্বাচন দেয়নি। ফলে এভাবে নিজ ঘাড়ে নিজেরাই চাপিয়ে নিয়েছে রক্তাক্ষয়ী এক লাগাতর যুদ্ধ। সে যুদ্ধাবস্থা আজও শেষ হয়নি। একই ভাবে বন্ধুত্ব রূপে পেতে ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশের জনগণকেও। অথচ ১৯৭১-এর পর বাংলাদেশের সাথে ভারত লাগাতর সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে পারতো। অথচ ভারত সে পথে যায়নি, বরং দেশটির সেনাবাহিনী বাংলাদেশে বর্বর লুণ্ঠনে নামে এবং  উপহার দেয় একটি ভয়ানক দুর্ভিক্ষ। ফলে মুজিবী শাসনের নির্মূলে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী বা কোন রাজাকারকে ময়দানে নামতে হয়নি।

অপর দিকে ভারতের আজকের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দেশটিকে ভয়ানক রাজনৈতিক সংকটের দিকে ধাবিত করছে। যতই বাড়ছে প্রবৃদ্ধি ততই বাড়ছে সামাজিক ও রাজনৈতিক সংঘাত। বাড়ছে রক্তক্ষয়ী লড়াই। ফলে আজ থেকে ৫০ বছর আগে কাশ্মীর, আসাম, নাগাল্যাণ্ড, মিজোরাম, ঝাড়খণ্ড, বিহার ও মধ্যপ্রদেশে যে রক্তক্ষয়ী বিদ্রোহ ছিল না এখন তা প্রকাণ্ড ভাবে আছে। ফল দাড়িয়েছে, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যাণ্ড এমনকি সিঙ্গাপুর তাদের নাগরিকদের জীবনে অর্থনৈতিক প্রাচুর্য আনতে পারলেও ভারত তা পারেনি। ফলে হাজার মানুষ সেখানে ঋণের ভারে ও অনাহারে আত্মহত্যা করছে। দেশটিতে তীব্রতর হচ্ছে মাওবাদীদের বিদ্রোহ। বাড়ছে বিচ্ছিন্নতা। দেশে শান্তি আনতে হলে সুবিচার ও ন্যায়নীতির বিকল্প নেই -ভারতীয় নেতারা সে পাঠটি নেয়নি। অনাচার ও অবিচার নিয়ে ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন ধর্ম ও ভিন্ন বর্ণের মানুষ দূরে থাক, সহদোর ভায়েরাও একত্রে শান্তিতে বসবাস করতে পারে না। অথচ ভারত জেনে বুঝে অনাচার,অবিচার ও আগ্রাসনের পথ ধরেছে। সেদেশে হরিজন, আদিবাসী ও মুসলমানদের এজন্যই এত বঞ্চনা। কাশ্মীরীদের আত্মনিয়ন্ত্রনের অধিকার দিতে এজন্যই তাদের এত আপত্তি। অথচ ১৯৪৮ সালেই প্রধানমন্ত্রী জওহারলাল নেহেরু সেখানে গণভোট অনুষ্ঠানের ওয়াদা দিয়েছিল। অবিচার ও আগ্রাসনের নীতি একটি দেশের জনগণের জীবনে যে কতটা বিপদ আনে আজকের ভারত হল তারই নমুনা।

 

মুজিব-হাসিনার স্বৈরাচারি অনিবার্যতা

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতপন্থি হওয়া বা হিন্দুদের সাথে মিত্রতার পথটি জনপ্রিয় হওয়ার পথ নয়, বরং সে পথ রাজনৈতিক আত্মহত্যার। হিন্দুদের মুসলিম বিরোধী আগ্রাসী চেতনার সাথে বাঙালী মুসলমানদের যতটা পরিচিতি তা সমগ্র ভারতের আর কোন প্রদেশের মুসলমানদের ছিল না। বাঙালী হিন্দুদের বিবেক ও চেতনার মানটি এতটাই নীচু ও অসুস্থ্য ছিল যে মুসলমানদের সামান্যতম কল্যাণে তাদের মাঝে মাতম দেখা দিত। সুস্থ্য চেতনার লক্ষণ তো এটাই,বিশ্ববিদ্যায় দূরে থাক দেশে একখানি পাঠশালা নির্মিত হতে দেখেও দেহমন জুড়ে আনন্দের শিহরণ উঠবে। কারণ মানুষকে মানুষ রূপে বেড়ে ঊঠার এটাই তো পথ। মানব জাতির সমগ্র ইতিহাসে এমন নজির নেই, কোন দেশে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে রাস্তায় মিছিল হয়েছে! তবে এক্ষেত্রে একমাত্র ব্যতিক্রম হল বাংলার হিন্দুরা। এক্ষেত্রে বিশ্বরেকর্ড গড়েছে একমাত্র তারা। ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা রুখতে তারা কোলকাতার রাস্তায় মিছিল করেছে। সে মিছিলে যে হিন্দু মহাসভা¸আর.এস.এস বা কংগ্রেসের মুসলিম বিরোধী উগ্র হিন্দুগুণ্ডরা অংশ নিয়েছে তা নয়, অংশ নিয়েছে খোদ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। অথচ এই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেই বলা হয় শ্রেষ্ঠ বাঙালী হিন্দু। বাঙালী হিন্দুদের এই হল চেতনার মান। বেরুবাড়ি গেছে, পদ্মার পানি লুণ্ঠিত হচ্ছে,মমতা ব্যানার্জি আজ তিস্তার পানি কেড়ে নিতে চায় -সেটির কারণ তো মনের সেই নীচুতা ও অসুস্থ্যতা। ১৯০৫ সালে যখন পূর্ব বাংলা ও আসাম নিয়ে যখন আলাদা প্রদেশ গঠন করা হয় তখন সেটির বিরোধীতার মূলেও ছিল সেই একই কারণ। একই রূপ মুসলিম বিদ্বেষ নিয়ে বিরোধীতা করেছিল পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠার এবং দেশটির বেঁচে থাকার।

মুসলমানদের ঘাড়ে হিন্দু জমিদারদের নির্যাতন ও শোষনের জোয়ালটি ছিল অতি কঠোর ও নির্মম। দাড়ি রাখার জন্যও খাজনা দিতে হত। ফলে এ প্রদেশেই জন্ম নেয় মুসলিম লীগ। এবং এ প্রদেশেই প্রতিষ্ঠিত হয় মুসলিম লীগের প্রথম সরকার। ব্যক্তির মৃত্যু ঘটে, কিন্তু তার অভিজ্ঞতা ও স্মৃতি যুগ যুগ বেঁচে থাকে।  আর লক্ষ লক্ষ মানুষের সে বেঁচে থাকা স্মৃতি নিয়েই গড়ে উঠে জাতীয় মানস। ১৯৭১এর পর বাঙালী মুসলমানের সে স্মৃতিকে ভূলিয়ে দেয়ার চেষ্ঠা হয়েছে প্রচুর। কিন্তু সে চেষ্ঠা সফল হয়নি। বরং একাত্তরের পর ভারতীয় লুণ্ঠন ও শোষন সে পুরোন স্মৃতিকে নতুন তীব্রতা দিয়েছে। তার তাতেই পতন ডেকে এনেছে তাদের সবচেয়ে পছন্দের ব্যক্তি শেখ মুজিবের। আর আজ শেখ মুজিবের পতনের ন্যায় শেখ হাসিনার পতনকে ভারত নিজ হাতে ত্বরান্বিত করছে। সেটি করতে বাংলাদেশকে ট্রানিজিট দিতে বাধ্য করছে, তুলে নিচ্ছে পদ্মার পানি এবং বাঁধ দিচ্ছে তিস্তা, মেঘনাসহ বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত পানি। পক্ষি শিকারের ন্যায় সীমান্তে মনুষ্য শিকারও করছে। ভারতীয় টিভির জন্য ভারতীয় টিভির জন্য খোলা বাজার আাদায় করলেও দরজা বন্ধ রেখেছে বাংলাদেশী টিভি সম্প্রচারের বিরুদ্ধে। বাধা সৃষ্টি করছে বাংলাদেশের পণ্য ঢুকতেও। লাগাতর প্রচেষ্ঠা চলছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা হননের। ফলে ভারতপ্রেমী হাসিনার পতন ঘটাতেও কি কোন শক্তিশালী বিরোধী দলের প্রয়োজন আছে? এ মুহুর্তে ভারতের পক্ষ নেয়াই আত্মঘাতি, এমন আত্মঘাতি রাজনীতিতে টিকে থাকার স্বার্থে শেখ হাসিনা স্বৈরাচারি হতে বাধ্য হচ্ছে। একই কারণে শেখ মুজিবও ধরেছিলেন বাকশালী স্বৈরাচারের পথ।

অপরদিকে ভারত তার নিজের পরাজয় ঠেকাতে বাংলাদেশকে টানছে নিজের উত্তর-পূর্ব সীমান্তের যুদ্ধে। বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ট্রানজিট নেয়ার মূল উদ্দেশ্য তো সেটাই্। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কোন উলফা নেতা আশ্রয় নিলে তাকে গ্রেফতার করে ভারতে পাঠনোর দাবী তোলে। অথচ চিত্তরঞ্জণ সুতোর,কাদের সিদ্দিকী,সান্তু লারমা ভারতে আশ্রয় নিল এবং বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র পাকালো তখন ভারত তাদের গ্রেফতার করেনি,বাংলাদেশে ফিরতও পাঠায়নি। আলজিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বুমেদীনসহ কয়েকটি মুসলিম দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের চাপে পড়ে শেখ মুজির ১৯৭৪ সালে ইসলামী রাষ্ট্রপ্রধানদের সম্মেলনে যোগ দিতে লাহোরে গিয়েছিলেন। কিন্তু ভারত তাতে খুশি হয়নি। চীন ও পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশ মজবুত গড়ে তুলুক ভারত আজও  সেটি চায় না। বাংলাদেশ একটি মজবুত সেনাবাহিনী গড়ে তুলুক সেটিতেও  ভারতের তুমুল আপত্তি। এরশাদের আমলে বাংলাদেশে কয়েকখানি মিগ-২১ কিনেছিল। তাতেই ভারতীয় মহলে প্রতিবাদ উঠেছিল। মুজিব আমলে আমলে বাংলাদেশের মাত্র এক ডিভিশন সৈন্য ছিল। শেখ মুজিব সে সৈন্য সংখ্যা বাড়াতে আগ্রহী ছিলেন না। ট্যাংক,কামান বা বিমান ক্রয় নিয়েও তাঁর আগ্রহ ছিল না। আগ্রহ ছিল না কোন সামরিক এ্যাকাডেমী স্থাপন নিয়েও। তাঁর আমলে বাংলাদেশের এসবের কোন বালাই ছিলনা। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সে সময় একটি প্রকাণ্ড যুদ্ধের জন্য যে বিশাল অস্ত্র সংগ্রহ ছিল মুজিব সেগুলোও ভারতীয় হাতে তুলে দিয়ে যেন আপদ বিদায় করেছিলেন। অথচ সেগুলির ক্রয়ে বেশী অর্থ জুগিয়েছিল পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ পুর্ব পাকিস্তানীরা। মুজিবের অস্ত্রাতার আগ্রহ ছিল একমাত্র রক্ষিবাহিনী আর লাল বাহিনী নিয়ে। কারণ তার ভাবনা দেশের প্রতিরক্ষা নিয়ে ছিল না, বরং প্রচণ্ড দুঃশ্চিন্তা ছিল নিজের গদীরক্ষা নিয়ে। ভারতের প্রতি এমন আত্মসমর্পিত নীতির কারণেই ভারতপ্রেমীদের কাছে শেখ মুজিব সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী।প্রশ্ন হল,একটি পরাধীন দেশ হওয়ার জন্য কি এরপর অন্য আর কিছু লাগে? ব্রিটিশ শাসনামলে কয়েক শত দেশীয় রাজা-মহারাজা কি এর চেয়ে বেশী কিছু ব্রিটিশের হাতে তুলে দিয়েছিল? মুজিব তো পাকিস্তানী অস্ত্রবিদায়, ২৫ সালা চুক্তি, সীমান্তবাণিজ্য চুক্তি, বেরুবাড়ী দান, পদ্মার পানি দান,ভারতীয় পণ্যের জন্য অবাধ-বাজার,স্বদেশী শিল্প-ধ্বংস সহ সব কিছুই নিশ্চিত করেছিলেন। ভারত তো এসবই চায়।একটি দেশের অধীনতা বলতে এর চেয়ে বেশী কিছু কি বোঝায়? শেখ হাসিনার পিতার তো সেটিই আদর্শ। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের বিশাল পুঁজি,দেশটির আঁনাচে কাঁনাচে বিপুল সংখ্যক ভারতীয় চর, ভারতীয় স্ট্রাটেজিস্ট ও ভারতীয় পরামর্শদাতারা তো চায় মুজিবের সে আদর্শেরই প্রতিষ্ঠা।

 

বিনিয়োগ এবং প্রস্তুতি আগ্রাসনের

মুজিবের উপর ভারতের অর্পিত সবচেয়ে গুরু দায়ভারটি ছিল ভারতীয় অধীনতার বিরুদ্ধে যে কোন বিদ্রোহের দমন এবং সে সাথে ইসলামী শক্তির বিনাশ। আর এতে ব্যয়ভার কমেছিল ভারতের। ভারত শুধু ফসলই তুলেছিল। অথচ কাশ্মীরে সে কাজটি সমাধা করতে ভারতকে ৭ লাখ সৈন্যের সমাবেশসহ বিপুল অর্থ ব্যয়ে প্রায় যুগ ব্যপী এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ লড়তে হচ্ছে। ভারতের সে অধীনতা নিশ্চিত করতেই শেখ মুজিব ইসলামপন্থিদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছিলেন এবং হরণ করেছিলেন দেশবাসীর সকল নাগরিক অধিকার। প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন একদলীয় বাকশালী স্বৈরশাসন। অথচ তিনি ১৯৭০-এর নির্বাচনে ভোটি নিয়েছিলেন বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে।শেখ হাসিনা দেশকে আজ  তাঁর নিজ পিতার সে পথ ধরেই এগিয়ে নিচ্ছেন। পিতার সে স্বৈরাচারি আদর্শ নিয়ে তাঁর এখ্নও প্রচণ্ড অহংকার। সে আদর্শের প্রতিষ্ঠায় তিনি আপোষহীনও। পিতার স্বৈরাচারি আদর্শ নিয়ে এমন অহংকার ও আপোষহীনতা ছিল ফিরাউনের বংশধরদেরও। সমগ্র প্রশাসন, আইন-আদালত,সেনা-পুলিশ ও রাজস্বের অর্থ ব্যয় হত সে ফিরাউনি আদর্শ ও ঐতিহ্যকে যুগ যুগ বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে। এবং সে সাথে হযরত মূসা (আঃ)ও তাঁর অনুসারিদের চিত্রিত করা হয়েছিল দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতার দুষমন রূপে। বাংলাদেশে ইসলামপন্থি নেতাকর্মীদের উপর র‌্যাব-পুলিশের অত্যাচার,মিথ্যামামলা,জেল-জুলুম,দণ্ডবেড়ির শাস্তি তো নেমে আসছে তো সে কারণেই। এসব কিছুই ঘটছে একটি রোড ম্যাপকে সামনে রেখে। সেটি ভারতের অধীনতাকেই আরো পাকাপোক্ত করার।

ভারতের সৌভাগ্য যে, কাশ্মীর দখলে রাখতে ভারত সরকারকে ৭ লাখ সৈন্য ও হাজার হাজার কোটি টাকার অর্থ ব্যয়ে যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ লড়তে হচ্ছে বাংলাদেশের মাটিতে তারা সে অধীনতাটি পাচ্ছে বাংলাদেশের রাজনীতি, মিডিয়া, সংস্কৃতি ও জাতীয় নির্বাচনে মাত্র কয়েক শত কোটি টাকার বিনিয়োগে। ভারতের পক্ষে সে যুদ্ধটি করছে সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী, তাঁবেদার মিডিয়াকর্মী, আওয়ামী লীগের ক্যাডার বাহিনী,বাংলাদেশী র‌্যাব ও পুলিশ। ভারতীয় সেনা ও পুলিশ বাহিনী কাশ্মীরে এত ইসলামী বই বাজেয়াপ্ত করেনি এবং এত বেশী ইসলামী নেতাকর্মীদের ডাণ্ডাবেরী পড়ায়নি যা পড়িয়েছে বাংলাদেশী র‌্যাব ও পুলিশ। এদিক দিয়ে ভারতকে ভাগ্যবানই বলতে হবে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতীয় বিনিয়োগ যে বিপুল বাম্পার ফলন দিচ্ছে এ হল তার নমুনা। ২০০৮ সালে নির্বাচনের তেমন এক বিনিয়োগের কথাই সম্প্রতি প্রকাশ করেছে লন্ডনের বিখ্যাত ইকোনমিস্ট পত্রিকা। তাই বাংলাদেশের দেশপ্রেমিকদের জন্য আজ এক ভয়ানক বিপদের দিন। তবে বিপদের আরো কারণ, ভারতের আরোপীত অধীনতাকে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা সুনিশ্চিত করতে না পারলে ভারত সীমান্তের ওপারে বসে বসে আঙুল চুষবে না। ১৯৭৫এর ১৫ই আগষ্ট থেকে তারা শিক্ষা নিয়েছে। ভারত এবার তার নিজস্ব বাহিনী নিয়ে ময়দানে নামবে। বাংলাদেশকে ঘিরে ভারত তার অভিপ্রায়ের কথাটি তাজুদ্দীনের সাথে ৭ দফা চুক্তি এবং শেখ মুজিবের সাথে ২৫ দফা চুক্তির মধ্য দিয়ে সুস্পষ্ট ভাবে জানিয়ে দিয়েছিল। এখন ভারত তেমন একটি আগ্রাসনের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ নিয়ে দিবারাত্রি ব্যস্ত। সেটি যেমন রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামরিক ক্ষেত্রে,তেমনি যোগাযোগের ক্ষেত্রেও। বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে তারা করিডোর আদায় করে নিল তো সে লক্ষ্যেই। ২০/১১/১১

 




বৌদ্ধদের উপর হামলা এবং দেশধ্বংসী সংকটে বাংলাদেশ

চুনকালি লাগলো মুখে

বাংলাদেশে মুসলিম শাসনের প্রতিষ্ঠা ৮শত বছর আগে।শুরু থেকেই এদেশে বহু বৌদ্ধের বাস বিশেষ করে চট্টগ্রাম এলাকায়। বিগত ৮ শত বছরে বাংলার বুকে বৌদ্ধদের ঘরবাড়ি ও উপাসনালয়ের উপর কোন হামলা হয়েছে তার কোন নজির নেই। কিন্তু সম্প্রতি চট্টগ্রামের রামু, পটিয়া এবং তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় যা ঘটে গেল তা যেমন হৃদয়বিদারক তেমনি দেশের জন্য বিপদজনক।আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের মুখে আবার চুনকালি লাগলো। বিশ্বব্যাপী খবর রটলো,বাংলাদেশের মাটিতে সংখ্যালঘুদের জানমাল,ব্যবসা-বাণিজ্য ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নিরাপদ নয়। কিন্তু কেন এটি ঘটলো? কোন ব্যক্তির মুখ দিয়ে যখন হঠাৎ রক্তবুমি শুরু হয় তখন বুঝতে হবে এটি ভয়ানক রোধ।ত্বরিৎ সে ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিতে হয়,রোগনির্ণয় এবং সে সাথে রোগের চিকিৎসাও শুরু করতে হয়। চট্টগ্রামে যেটি ঘটে গেল সেটি মামূলী বিষয় নয়,বাংলাদেশের দেহে যে ভয়ানক রোগ বাসা বেঁধেছে এ হলো তারই সুস্পষ্ট আলামত। এখন সেটির আশু নির্ণয় যেমন জরুরী,তেমনি জরুরী এর আশু চিকিৎসা।

ভারতে মুসলিম শাসনের শুরুর আগে পৃথিবীর এ ভূ-ভাগে বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে ভয়ানক নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। একসময় শুধু বাংলাতে নয়,ভারতেও ছিল বৌদ্ধ শাসন। বিখ্যাত ভারতীয় সম্রাট অশোক ছিলেন বৌদ্ধ। পরবর্তীতে হিন্দুদের দ্বারা শুধু বৌদ্ধ শাসনই নির্মূল হয়নি,নির্মূল প্রক্তিয়ায় পড়েছে খোদ বৌদ্ধরাও। সে নৃশংস নির্মূল প্রক্তিয়াটি তীব্রতর হয় হিন্দুরাজা শংকরাচার্যের শাসনামলে। তার আমলে বৌদ্ধরা ভারত থেকে প্রায় নির্মূলই হয়ে গেছে। যারা বেঁচেছে তারা পালিয়ে বেঁচেছে। সে পলায়নপর বৌদ্ধরা ভারতের উত্তর,মধ্য ও পশ্চিম ভাগ ছেড়ে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম এলাকাতে বসতি শুরু হয়। চট্টগ্রাম তখন উত্তরভারতীয় হিন্দু শাসনের বাইরে ছিল। বাংলায় মুসলিম শাসন শুরু হওয়ার পর বৌদ্ধদের ঘরবাড়ি ও ব্যবসাবাণিজ্যের উপর হামলা হয়েছে সে প্রমাণ নেই। ২৩ বছরের পাকিস্তানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রি শাসনামলেও সেটি হয়নি। কিন্তু প্রশ্ন হলো বাংলাদেশে সেক্যুলারিস্টদের শাসনামলে কেন হলো? কারণটি অবশ্যই খুঁজে বের করতে হবে, নইলে অসম্ভব এ ক্ষতিকর রোগের চিকিৎসা।

আওয়ামী লীগ শাসনমালে শুধু যে বৌদ্ধরা নিরাপত্তা হারিয়েছে তা নয়। নিরাপত্তা হারিয়েছে বাংলাদেশের সাধারন মানুষও। নিরাপত্তা হারিয়েছে এমন কি বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর সেসব অফিসারগণ যাদের দায়িত্ব দেশকে নিরাপত্তা দেয়া। সে নিরাপত্তাহীনতাই প্রমাণিত হলো রাজধানীর কেন্দ্রবিন্দু পিলখানাতে ৫৭ সামরিক অফিসারের নিহত হওয়ার মধ্য দিয়ে। তাদেরকে শুধু প্রাণ হারাতে হয়নি,মৃতদেহকে নর্দমায় ফেলা হয়েছে। পরিবারের মহিলাদের অনেককে ধর্ষিতাও হতে হয়েছে। সেনাবাহিনীর অফিসারদের নির্মূলের অভিযান যে শুধু বিভ্রান্ত সেপাইদের দ্বারা হয়েছে তা নয়। বিজ্ঞানমনস্কতা নিয়ে যাদের গর্ব এমন নেতাদের দ্বারাও হয়েছে। এরই উদাহরণ,এককালে আওয়ামী লীগের ক্যাডার,একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক,পরে জাসদের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের নেতা এবং বর্তমানে আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী হাসানূল হক ইনু গংদের দ্বারাও হয়েছে। তারা ১৯৭৫ য়ের নভেম্বরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সমুদয় অফিসারদের নির্মুলের বিপ্লব শুরু করেছিল। বহু অফিসার সেদিন নৃশংস ভাবে নিহতও হয়েছিল।

ক্যান্সারের বীজ দেহের বাইরে থেকে আসে না। বেড়ে উঠে দেহের অভ্যন্তরেই। মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় বড় হামলাগুলো হয়েছে এসব ভিতরের শত্রুদের হাতে। মুসলমানগণ তাদের খেলাফত হারিয়েছে এরূপ ভিতরের ক্যান্সারের কারণে। বাংলাদেশের বেলায়ও ঘটনা ভিন্নতর নয়। ইজ্জতের উপর হামলার ন্যায় বাংলাদেশের অর্থনীতির উপর হামলাও হচ্ছে এসব ঘরের শত্রুদের হাতে।প্রমাণ,বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চুরি কর্মের নায়ক রূপে যিনি ধৃত হয়েছেন তিনি কোন বিদেশী নয়,কোন রাজাকারও নন,বরং তিন বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর সাবেক প্রধান এবং  গর্বিত মুক্তিযোদ্ধা লে, জেনারেল (অবঃ)হারুনর রশিদ। এ ব্যক্তিটি জনগণের পকেট থেকে শত শত কোটি টাকা চুরি করেছে ডেস্টিনী নামের একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান রূপে। সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা ব্রাঞ্চ থেকে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা যারা চুরি করলো তারাও বিদেশী নয়,রাজাকারও নয়,বরং তারাও আওয়ামী ঘরানার লোক। সীমাহীন দূর্নীতির মধ্য দিয়ে মুজিব আমলে যারা দেশকে তলাহীন ভিক্ষার ঝুড়িতে পরিণত করলো তারাও তো একই ঘরানার। প্রশ্ন হলো,দেহের মাঝে এরূপ ক্যান্সার কীরূপে বেড়ে উঠলো? এ নিয়ে কি গবেষণা হয়েছে?

 

রোগটি চেতনায়

কোন গ্রামে বহু মানুষ যখন একত্রে কলেরায় আক্রান্ত হয় তখন ডাক্তারদের দায়িত্ব হয় সে গ্রামের মানুষের পানির উৎস্য তলিয়ে দেখা। কারণ কলেরা পানিবাহিত রোগ। ফলে সে গ্রামের পানিতে নিশ্চিয়ই যে কলেরার জীবাণূ আছে তা নিয়ে সন্দেহ চলে না। সে পানি পান থেকে গ্রামবাসীকে তখন বিরত রাখতে হয়। সে সাথে নিশ্চিত করতে হয় বিষুদ্ধ পানির সরবরাহ।তেমনি দেশে যখন ব্যাভিচার,চৌয্যবৃত্তি,পতিতাবৃত্তি,ডাকাতি,সন্ত্রাস,সূদ,ঘুষ,দূর্নীতি ও সাম্প্রদায়ীক সহিংসতার প্রসার বাড়ে তখন সে সেদেশের জলবায়ু,আলো-বাতাস,খাদ্য-পানীয় বা অর্থনীতি নিয়ে গবেষনা করে কারণ জানা যায় না।কারণ,এরোগের জীবাণু আলোবাতাসে ভেসে আসে না। খাবারে প্লেটেও আসে না।আসে ধ্যান-ধারণা,দর্শন ও মতবাদের ঘাড়ে চড়ে। ফলে দেখতে হয়,তারা মনের বা বিবেকের খাদ্য কোত্থেকে সংগ্রহ করে সেটি।ঘুষখোর,সূদখোর,চোর-ডাকাত,ব্যাভিচারি বা সন্ত্রাসীরা যে দেশের সৎ নাগরিকদের থেকে ভিন্ন জলবায়ুতে বাস করে বা ভিন্ন পানাহার গ্রহণ করে তা নয়। বরং তারা এক ভিন্ন ধরণের ধর্ম,ধ্যান-ধারনা ও চেতনার ধারক। এগুলো পরিবর্তনের সাথে পরিবর্তন আসে চরিত্র এবং আচরণেও ।

বাংলার যে মুসলমানগণ বিগত ৮শত বছরের ইতিহাসে বৌদ্ধদের ঘরে ও মঠে আগুণ দিল না,তাদের হঠাৎ কি হলো যে সে কুকর্মগুলো হাজার মানুষ এখন একত্রে শুরু করলো? এ পরিবর্তনটি সাম্প্রতিক। বাংলাদেশীদের ধ্যান-ধারণা ও দর্শনে যে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে এ হলো তারই প্রমাণ। এ নৃশংস পরিবর্তনটি প্রথম ধরে পড়ে ১৯৭১য়ে। বাংলাদেশের মাটিতে প্রথম যারা হিংস্র কুকর্মের শিকার হয় তারা এদেশে বসবাসকারি অবাঙালীরা –বিশেষ করে বিহারীরা। তখন বাঙালীর হাতে বহু লাখ অবাঙালী মারা গেছে। তাদের লাশ কুকুর শৃগালে খেয়েছে বা নদীতে নদীতে পচে পচে নিঃশেষ হয়েছে। বহু হাজার অবাঙালী নারীও ধর্ষিতা হয়েছে। তাদের হাজার হাজার ঘরবাড়ী সেদিন বাঙালীদের হাতে জবর দখল হয়েছে।এসবই বাঙালীর ইতিহাস, অস্বীকারের উপায় নাই। ঘরবাড়ী হারানো সে বহু লক্ষ অবাঙালীরা আজও  ঢাকাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন বস্তিতে বসবাস করে সে বর্বরতার স্বাক্ষর বহন করছে। বাঙালীর বিবেক সেদিন এতটাই মারা পড়েছিল যে সন্ত্রাসী কুকুর্ম থেকে তাদের বাঁচাতে বাংলাদেশের কোন সরকার,কোন পুলিশ,কোন রাজনীতিবিদ,কোন বুদ্ধিজীবি ও কোন মিডিয়াকর্মী এগিয়ে আসেনি। অবাঙালীদের বর্বরতা নিয়ে বাংলাদেশে শত শত বই লেখা হয়েছে। বহু নাটক ও বহু সিনেমাও নির্মিত হয়েছে। কিন্তু অবাঙালীদের উপর ঘটে যাওয়া এ বাঙালী বর্বরতা নিয়ে বই দূরে থাক বাঙালী সেক্যুলারিষ্টদের পক্ষ থেকে একটি নিবন্ধও লেখা হয়নি। বাংলাদেশী সেক্যুলারিষ্টদের দুর্বৃত্তির স্বাক্ষর তাই শুধু দূর্নীতিতে বিশ্বে ৫ বার শীর্ষস্থান দখল করাটা নয়,তার চেয়েও বড় স্বাক্ষর হলো বাঙালী বর্বরতার বিরুদ্ধে এমন নীরবতায়। একাত্তরের বাঙালী বর্বরতার কিছু চিত্র বিশ্ববাসীর সামনে যিনি তুলে ধরেছেন তিনি কোন বাংলাদেশী নন,বরং এক ভারতীয় বাঙালী শর্মিলা বোস। তিনি সে চিত্র তুলে ধরেছেন তাঁর ডেড রেকনিং‍ বইতে। যে জাতি নিজ দেহের ভয়ংকর ক্যান্সার নিয়ে ভাবে না, বরং খোঁজে বেড়ায় অন্যের দোষ সে জাতি কি ধ্বংস ও অপমান এড়াতে পারে?

 

নিহত হয়েছে মনের পুলিশ

মানুষ তখনই কুকর্ম করে যখন কোন জবাবদেহীতার ভয় থাকে না। সে ভয় তুলে নিলে সমাজের অনেক সুবোধ মানুষই চোর,ডাকাত,লম্পট ও ঘুষখোরে পরিণত হয়। মুসলমানের জীবনে সে জবাবদেহীতার ভয়টি হলো,রোয-হাশরের বিচার দিনে আল্লাহর কাছে হিসাব দেয়ার। এটিই মু’মিনের আখেরাতের ভয়। ইসলাম কবুলের সাথে সাথে বর্বর আরববাসীর জীবনে যে চারিত্রিক বিপ্লব শুরু হয়,হাজার হাজার আরব যার ফলে মহামানবে পরিণত হয় এবং জন্ম দেয় মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার,তার মূলে ছিল এই আখেরাতের ভয়। একেই বলা হয় প্যারাডাইম শিফ্ট। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তারা যে মহান আল্লাহতায়ালাকে বিশ্বাস করতো না তা নয়। আল্লাহর উপর বিশ্বাসই শুধু নয়,নিজ সন্তানের নাম “আব্দুল্লাহ”‍‍ বা আল্লাহর দাসও রাখতো। কিন্তু ছিল না আখেরাতের ভয়। ইসলাম কবুলের পর তাদের মনে প্রবেশ করে আখেরাতের ভয়। সে ভয় তাদের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সে ভয়টির কারণে ক্ষুদার্ত রোযাদার যেমন নির্জনেও পানাহার করে না,তেমনি সুযোগ পেলে কারো সম্পদে বা ইজ্জতে হাত দেয় না।

বাংলাদেশ যে কারণে এতকাল অপরাধ কর্মে বিশ্বরেকর্ড গড়েনি সেটি পুলিশ বা আদালতের ভয় ছিল না। বাংলাদেশের ইতিহাসে কোন কালেই এত পুলিশ ছিল না,এত আদালতও ছিল না। হাওর-বাওর,খালবিল,নদনদী ও চরভূমিতে পরিপূর্ণ বাংলাদেশের সর্বত্র পুলিশের পৌঁছার সামর্থও ছিল না। তবে যা ছিল তা জনমনে পরকালের ভয়। ছিল আল্লাহর কাছে জবাবদেহীতার ভয়। এমন ভয় ব্যক্তির মনে সদাজাগ্রত পুলিশের কাজ করে। এমন ভয়ের কারণে আল্লাহর প্রতিটি হুকুম পালনে মু’মিন ব্যক্তি অতি নিষ্ঠাবান হয়। আর ঈমানদারের উপর মহান আল্লাহতায়ালা হুকুম হলো, ‍‍‍‌‌‍‍‍‍‍‍‍‍‍“‍‍‍আমিরু বিল মা‌রুফ ওয়া নেহী আনিল মুনকার” অর্থাৎ ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের নির্মূল‍। এটিই আল্লাহর নির্দেশিত মিশন। মু’মিনের জীবনে এ মিশন নিয়ে বাঁচার তাড়না না থাকলে বুঝতে হবে তার ঈমানও নাই। কারণ ঈমানদার রূপে বাঁচার লক্ষ্যটি তো এছাড়া পূরণ হয় না। তখন সে বাঁচে অন্য মিশন নিয়ে। তখন ঘটে আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে অবাধ্যতা। এমন অবাধ্যতায় রোজ হাশরের বিচার দিনে ভয়ানক বিপদ অনিবার্য। সে বিপদ এড়াতেই ঈমানদার অতি দায়িত্বশীল হয়,পরিণত হয় ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের নির্মূলে আমৃত্যু পুলিশ। সে মিশন নিয়ে সে যেমন রাজনীতি করে,তেমনি শিক্ষাকতা করে,লেখালেখি করে এবং প্রয়োজনে জিহাদও করে। ফলে গ্রামের বা মহল্লার কোন গৃহে ডাকাতের হামলা হয়েছে এ খবর শুনে ঈমানদার ব্যক্তির পক্ষে বিছায় শুয়ে থাকা অসম্ভব হয়ে পরে। এমন সদাজাগ্রত বিবেকের মানুষরা অতীতে ডাকাত ধরতে ঘর থেকে ছুটে বেরিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে সে ঈমান,সে বিবেক ও সে জবাবদেহীতা সুপরিকল্পত ভাবে হত্যা করা হয়েছে। সেটি সেক্যুলার শিক্ষা ও সেক্যুলার রাজনৈতীক দর্শন ছড়িয়ে। এতে নিহত হয়েছে মনের পুলিশ। এবং নেমে এসেছ বিবেকের অন্ধত্ব। মানব মনের এটিই সবচেয়ে বড় রোগ। চোখের রোগে মানুষ দৃষ্টিশক্তি হারায়,আর বিবেকের অন্ধত্বে হারায় হিতাহিত জ্ঞান।অতিশয় অন্যায় ও জঘন্য দুষ্কর্মও তখন ন্যায় মনে হয়। ন্যায় মনে হয় অন্যের ঘরে বা উপাসনালয়ে আগুন দেয়া।অথচ অমুসলমানদের উপাস্যকে গালি দিতে এবং তাদের উপাসনালয়কে ধ্বংস করতে নিষেধ করেছেন মহান আল্লাহতায়ালা। অথচ অজ্ঞতার কারণে পবিত্র কোরআনের সে নির্দেশটি তাদের দেখতে পায় না।১৯৭১য়ে এমন জ্ঞানশূণ্য,বিবেকশূণ্য ও ধর্মশূণ্য বাঙালীদের কবলে পড়েছিল লক্ষ লক্ষ অবাঙালীরা। আর সম্প্রতি পড়েছে চট্টগ্রামের বৌদ্ধরা।

অথচ আজ  থেকে ৬০ বছর আগেও বাংলাদেশের চিত্র ভিন্ন ছিল। তখনও দারিদ্র ছিল, কিন্তু সে সাথে জাগ্রত বিবেকও ছিল। ফলে উদার মনে তারা নিজ ঘরের পাশে জায়গা করে দিয়েছিল পশ্চিম বাংলা,বিহার,আসাম ও ভারতের অন্য প্রদেশ থেকে প্রাণ বাঁচাতে মুসলমানদের। অধিকাংশ মানুষের ঘরে তখন দরজা ছিল না।কাদামাটি,পাঠকাঠি ও চাটাইয়ের বেড়া ছাড়া ঘরে কোন বেড়া ছিল না। কাছে থানা বা পুলিশও ছিল না।তারপরও চুরি-ডাকাতি ও খুনখারাবী এতটা হতো না যা আজ  হয়।নারীরা আজকের মত ধর্ষিতাও হতো না। লক্ষ লক্ষ নারী দেহবিক্রয়েও নামতো না। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি না থাকলেও তখন তাদের মনে আল্লাহর ভয় ছিল। সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থা লক্ষ লক্ষ সার্টিফিকেট বিতরণ করলেও কেড়ে নিয়েছে ঈমান।কেড়ে নিয়েছে আল্লাহর কাছে জবাবদেহীতার ভয়। ফলে সেক্যুলার মানুষটি পরিণত হয়েছে শিকার সন্ধানী জীবে। শিকার খুঁজছে অফিসে বসে,দোকানে বসে,রাজনৈতীক দলের অফিসে বসে,এমনকি মসজিদ-মাদ্রাসায় বসে। এরই ফলে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের মত স্থানে -মানুষ যেখানে নীতি-নৈতীকতা শিখতে যায়,সেখানেও ছাত্ররা অহরহ লাশ হচ্ছে,আহত হচ্ছে এবং ধর্ষিতাও হচ্ছে।

তবে আখেরাতে ভয়শূণ্য সেক্যুলার মানুষেরাও যে অপরাধ থেকে দূরে থাকে না তা নয়। তারা অপরাধ থেকে দূরে থাকে স্রেফ প্রশাসন,পুলিশ ও আদালতের ভয়ে। সে ভয় বিলুপ্ত হলে অপরাধ-কর্মের প্লাবন শুরু হয়। সে প্লাবন যে কতটা ভয়ানক হতে পারে সেটির প্রমাণ মিলেছে নিউয়র্ক শহরে কিছু কাল আগে রাতে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায়।সে রাতে চুরি,লুটতরাজ ও ধর্ষণের বাঁধ ভাঙ্গা জোয়ার শুরু হয়েছিল। পাশ্চাত্য দেশে এজন্যই জরুরী হলো দেশবাসীর মনে প্রশাসন,পুলিশ ও আদালতের ভয় বৃদ্ধি করা। সে ভয় বাড়াতে দেশের প্রতিটি গলি,প্রতিটি মহল্লা,প্রতিটি পার্ক ও প্রতি নির্জন মেঠো পথে বসানো হয়েছে লুকানো ক্যামেরা। দিবারাত্র ২৪ ঘন্টা ধরে ক্যামেরার সে ছবিগুলো মনিটরিং করা হয়। সে সাথে গড়ে তুলেছে জেনেটিক টেস্টসহ অপরাধী সনাক্তিকরণের জটিল বিজ্ঞান (ফরেনসিক সাইন্স)।এর সুফল হলো,রাতের গভীর আঁধারে গ্রামের কোন মেঠো পথে বা নির্জন পার্কে কেউ খুণ হলে বা ডাকাতির শিকার হলে পাশ্চাত্য দেশের পুলিশ সে অপরাধিকে সহজেই ধরে ফেলে।আদালত এমন অপরাধীর দ্রুত শাস্তিরও ব্যবস্থা করে। কিন্তু দেশে যখন এমন নজরদারি থাকে না এবং প্রশাসন,পুলিশ ও আদালত পরিণত হয় দুর্বৃত্তদের মিত্র বা প্রতিপালকে তখন জনগণের মন থেকে বিলুপ্ত হয় গ্রেফতারির ভয়। সন্ত্রাসীরা তখন অস্ত্র হাতে প্রকাশ্যে ঘুরে। তখন দিনে-দুপুরে ডাকাতি হয়। এবং লাশ হয় নিরীহ মানুষ। বাংলাদেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসগুলোতে সেরূপ ঘটনা অহরহ ঘটছে। এরূপ অস্ত্রধারিদের চিত্র পত্রিকাতেও ছাপা হয়। তবে পুলিশের হাতে খুনি ও সন্ত্রাসীরা গ্রেফতার হচ্ছে সে খবর নেই। কারণ ঘটনার নায়ক সরকারি দলের ছাত্ররা। তাদের স্পর্শ করার সামর্থ পুলিশের নেই। র‌্যাব বা সেনাবাহিনীরও নেই। বরং পুলিশই এদের হাতে অনেক সময় চড়থাপ্পর খাচ্ছে। লাথি খাচ্ছে আদালতের দরজা। কারণ অপরাধ কর্মের এসব নায়কদের সমর্থণে রয়েছে সরকারি দলের মন্ত্রী ও নেতা। মন্ত্রীদের চাপে পুলিশের কাজ হয়,সরকারি দলের অপরাধিদেরকে আদালতের শাস্তি থেকে বাঁচানো। আসামী করা হয় সরকারি সন্ত্রাসীদের হাতে আহতদের। সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ত্রাসের ঘটনায় সেটিই ঘটেছে। ছাত্রলীগের অস্ত্রধারিদের বিরুদ্ধে আহত  ছাত্রদের মামলা পুলিশ নথিভূক্ত করতেও রাজি হয়নি।

 

এ বিপদ সেক্যুলারিজমসৃষ্ট

সেক্যুলারিজমের আভিধানিক অর্থ ইহলৌকিকতা। এখানে পারলৌকিক বা আখেরাতের ধারণা নেই। আল্লাহর কাছে জবাবদেহীতার কোন ভয়ও নাই। সেক্যুলার মানুষটি কাজকর্ম করে স্রেফ ইহলৌকিক সুখশান্তি ও সম্ভোগ বাড়াতে।পরকালের ভয় এবং সে ভয়ের কারণ যে ধর্মীয় বিশ্বাস ও ধর্মকর্ম –এগুলি তাদের কাছে সেকেলে ও সাম্প্রদায়িক মনে হয়। ভোগের আয়োজন বাড়াতে এমন সেক্যুলারগণ তাই প্রচণ্ড স্বার্থপর হয়। পার্থিব জীবনে আনন্দ-সম্ভোগ বাড়াতে এজন্যই সেক্যুলার সমাজে কদর বাড়ে মদ-জুয়া,নাচ-গান,অশ্লিলতা ও ব্যাভিচারের।সে সম্ভোগে প্রয়োজন পড়ে অর্থের। আর অর্থের আয়োজন বাড়াতে তখন আগ্রহ বাড়ে চুরি-ডাকাতি ও সন্ত্রাসে। অর্থের প্রয়োজনে আগ্রহ বাড়ে এমনকি বিদেশী শক্তির পক্ষে লেজুড়বৃত্তিতে।একারণেই কোন দেশে সবচেয়ে বড় সেক্যুলারিস্ট শুধু সেদেশের চোর-ডাকাত,সন্ত্রাসী ও দেহব্যবসায়ীগণ নয়,বরং তারাও যারা ক্ষমতালোভী রাজনীতিবিদ,ঘুষখোর অফিসার,সুদখোর মহাজন এবং এনজিও নেতা-কর্মী। আখেরাতের ভয়-ভাবনা তাদের চেতনাতে থাকে না। ফলে দেশে সেক্যুলারিজমের প্রতিষ্টা বাড়লে শুধু চোর-ডাকাত,সন্ত্রাসী,খুনি এবং ব্যাভিচারির সংখ্যাই বাড়ে না,বিপুল হারে বাড়ে ক্ষমতালোভী রাজনৈতীক দল,বাড়ে রাজনৈতীক হানাহানি,বাড়ে এনজিও এবং বাড়ে অশ্লিলতা। এরই উজ্বল দৃষ্টান্ত হলো আজকের বাংলাদেশ। কারণ একাত্তরের পর যে দর্শনটির সবচেয়ে বেশী প্রচার ও প্রতিষ্ঠা বাড়ানো হয়েছে সেটি সেক্যুলারিজম।ইহজাগতিক সম্ভোগ বাড়াতে পাশ্চাত্যের সেক্যুলারিস্টগণ শুধু মদ,জুয়া,ব্যাভিচার,সেক্সট্যুরিজম,হোমোসেক্সুয়ালিটিই বাড়ায়নি,আন্তর্জাতিক ডাকাতেও পরিণত হয়েছে। তাদের সে আন্তর্জাতিক ডাকাতি কর্ম মানব ইতিহাসে পরিচিতি পেয়েছে ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদ রূপে।আজ সেটিই পরিণত হয়েছে বহুজাতিক সাম্রাজ্যবাদে। অসংখ্য আঞ্চলিক যুদ্ধ,বিশাল দুটি বিশ্বযুদ্ধ,ইথনিক ক্লিনজিং ও সাম্রাজ্যবাদসহ বহু কুকীর্তির জনক এই পাশ্চাত্যের সেক্যুলারিস্টগণ। সেক্যুলারিজম যে দেশে যায় সেদেশে এ বিপদ গুলোও সাথে নিয়ে যায়।ফলে বাড়ে বিপর্যয়।

 

এত কুকর্ম কেন আওয়ামী আমলে?

বিবেক ও ন্যায়নীতি সবার এক নয়।তেমনি এক নয় সবার বিবেকের পচন। জনে জনে তেমনি একই রূপ নয় সেক্যুলারিজমের তাণ্ডব। যার মাঝে এবং যে সংগঠনে সেক্যুলারিজমের প্রভাব যত বেশী,দুর্বৃত্তিও সেখানে তত অধিক। বাংলাদেশের সকল প্রতিষ্ঠানে দুর্বৃত্তি তাই সমভাবে বাড়েনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকের উপর সেক্যুলারিরজমের যে প্রভাব,মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকের মাঝে সেটি নেই। উভয়ের মাঝে বিশাল পার্থক্য তাই অপরাধ কর্মে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে যেরূপ ব্যাভিচার,সন্ত্রাস ও দুর্বৃত্তি সেটি মাদ্রাসাতে নেই। একই কারণে পার্থক্য গড়ে উঠেছে সেক্যুলার দল বা ইসলামি দলের নেতাকর্মীদের মাঝে। বাংলাদেশে সেক্যুলারিজম সবচেয়ে বেশী প্রতিষ্ঠা পেয়েছে মুক্তিযোদ্ধা এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মাঝে। দেশে সেক্যুলারিজমের তারাই মূল ফেরিওয়ালা। ফলে পার্থিব স্বার্থচেতনার ক্ষেত্রে দেশের বাঁকি নাগরিকদের থেকে তারা অনে বেশী অগ্রসর। তাই অতি অগ্রসর দুর্বৃত্ত মানব উৎপাদনেও। মুজিব আমলে ঢাকা শহর আওয়ামী লীগের প্রধান ও তৎকালীন রেড ক্রসের প্রধান ছিল গাজী গোলাম মোস্তাফা। রিলিফসামগ্রী চুরি ও নানাবিধ দুর্নীতিতে সে রেকর্ড গড়েছিল। সেসময় দেশী ও বিদেশী পত্র-পত্রিকাতে তার কুকীর্তির বহু কাহিনী ছাপা হয়েছে। চুরিতে সম্প্রতি রেকর্ড গড়লো আরেক মুক্তিযোদ্ধা লে.জেনারেল (অবঃ) হারুন অর রশীদ। অপর দিকে ধর্ষণে সেঞ্চুরির যে রেকর্ড,সেটিও এক ছাত্রলীগ কর্মীর। সেক্যুলারিস্টদের বড় হতাশা,এমন চোর ও এমন ব্যাভিচারি তারা রাজাকারদের মাঝে এ অবধি খুঁজে পায়নি। মাছ যেমন তার ঝাঁক চিনতে ভূল করে না,দূর্নীতিবাজও তেমনি দল চিনতে ভূল করে না। গাজী গোলাম মোস্তাফা,লে.জেনারেল (অবঃ) হারুন অর রশীদ,সাবেক মন্ত্রী আবুল হোসেন,মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনের মত লোকেরা তাই দল চিনতে ভূল করেনি।

আওয়ামী লীগের বড় গর্ব সেক্যুলারিস্ট হওয়া নিয়ে। একারণেই দুর্নীতির বড় রেকর্ডও নির্মিত হয়েছে আওয়ামী শাসনামলে। বাংলাদেশের অন্যরা যে ফেরেশতা -তা নয়। কিন্তু অন্যদের আমলে বৌদ্ধদের ঘরবাড়ি,ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উপর হামলা হয়নি।পাকিস্তান আমলেও হয়নি। অন্যদের আমলে ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট হয়েছে বা শেয়ার বাজারের বহু হাজার কোটি টাকা উধাও হয়েছে সে নজির নেই।দূর্নীতির কারণে বিশ্বব্যাংকের ঋণ স্থগিত হয়নি। কিন্তু সেগুলি আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসায় হচ্ছে।অথচ আওয়ামী লীগ নেতারা যে ভিন্ন জাতের ভাতমাছ খায় বা ভিন্ন আলোবাতাসে বাস করে -তা নয়। বরং বড় পার্থক্য হলো,তাদের মগজ পরিপূর্ণ পার্থিব স্বার্থচেতনায়।এবং তারা সেটি পেয়েছে সেক্যুলারিজম থেকে। পেয়েছে আখেরাতের ভয় বর্জন করার মধ্য দিয়ে।

তবে পাশ্চাত্যের সেক্যুলারিস্টদের তুলনায় বাংলাদেশের বিপদটি আরো গভীর ও ভয়ানক। কারণ, সেক্যুলারিজমের প্রতিষ্টা বাড়িয়ে বাংলাদেশের সেক্যুলারিস্টগণ বিপুল সংখ্যক মানুষের মন থেকে আখেরাতের ভয় বিলুপ্ত করতে সমর্থ হলেও ব্যর্থ হয়েছে পাশ্চাত্য দেশের ন্যায় অপরাধ দমনে সফল প্রশাসন,দক্ষ পুলিশ ও বিচার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে। ফলে ভেসে গেছে অপরাধ বিরোধী বেড়িবাঁধ। এতে দেশ ছেয়ে গেছে অপরাধ কর্মের প্লাবনে। ফলে অলিম্পিকে কোন মেডেল না জিতলে কি হবে, দুর্নীতে বিশ্বের ২০০টির বেশী দেশকে দ্রুত অতিক্রম করে ৫ বার প্রথম হয়েছে।

 

সরকারের এজেণ্ডা

বাংলাদেশের পুলিশ,প্রশাসন ও সরকারের মূল এজেণ্ডা অপরাধ দমন নয়। অপরাধীদের গ্রেফতার করা বা আদালতের কাঠগড়ায় তাদের খাড়া করাও নয়। বরং এজেণ্ডা হলো রাজনৈতিক শত্রুদের নির্মূল। এজন্য পুলিশের ও সরকারি উকিলদের মূল কাজ হয়েছে সরকারের রাজনৈতিক শত্রুদের খুঁজে খুঁজে বের করে তাদের বিরুদ্ধে জামিনের অযোগ্য মামলা খাড়া করা। অর্থাৎ মামলা উৎপাদন। সে সাথে আরো দায়িত্ব হলো,নিজ দলীয় অপরাধীদের পুলিশ ও জনগণের হাত থেকে সর্বদা প্রটেকশন দেয়া্। তাই ছাত্র লীগ বা যুব লীগের ক্যাডারগণ রাজপথে বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানুষ খুন করলেও তাদের বিরুদ্ধে পুলিশ মামলা নেয় না। বরং তাদের কাজ,ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক শত্রুগণ আজ  থেকে ৪০ বছর আগে কি করেছিল তার অনুসন্ধানে লেগে যাওয়া এবং সেগুলি আদালতে প্রমাণ করার জন্য সাক্ষ্যসাবুদ তৈরী করা। অখণ্ড পাকিস্তানের সমর্থণ করাকে তারা ফৌজদারি অপরাধে পরিণত করেছে। আদালত পরিনত হয়েছে রাজনৈতীক হাতিয়ারে।

রাজনৈতীক বিরোধীদের নির্মূলের বিষয়টি সরকারের এতই গুরুত্ব পেয়েছে যে জনগণের জানমাল,ঘরবাড়ী,ইজ্জত আবরুর নিরাপত্তা নিয়ে ভাবার সময় তাদের নাই। এ কারণেই সেনাবাহিনীর অফিসারগণ যখন পিলখানায় নিহত হলো,তাদের বাঁচাতে সরকার উদ্যোগ নিতে পারেনি। চট্টগ্রামে যা ঘটে গেল সেটি সরকারের সে চরিত্রটি আবার প্রকাশ করে দিল। পত্রিকাতে প্রকাশ, ২৯/৯/১২ তারিখের রাত ৯টা থেকে সাড়ে ৯টা মধ্যে রামুতে প্রায় শ’খানেক লোকের একটি মিছিল হয়। এরপর ভোর ৫ টা পর্যন্ত বৌদ্ধদের গৃহ,বিহার ও প্যাগোডায় লুটপাট,ভাংচুর ও অগ্নিকাণ্ড ঘটে। পরের দিন পটিয়াতে একই ঘটনা ঘটে। ১৫টি বৌদ্ধ বিহার,মন্দির ও প্যাগোডা পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। পুড়ানো হয়েছে ১৮টি বাড়ি। লুন্ঠিত হয়েছে সোনার মুর্তি।পত্রিকায় আরো প্রকাশ,আগুন লাগানো হয়েছিল গান পাউডার দিয়ে।

বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধগুলো জনমানবশুণ্য গভীর জঙ্গলে ঘটেনি। ঘটেছে পুলিশের নাকের ডগার উপর। রামুর যে বৌদ্ধ বিহারটি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে সেটি থানা থেকে মাত্র আধা কিলোমিটার দূরে। সে স্থান থেকে মাত্র ১৮ কিলোমিটার দূরে জেলার পুলিস সুপারের অফিস এবং মাত্র ৪ কিলোমিটার দূরে সেনা ক্যাম্প। এত কিছু থাকার পরও কেমন করে এতবড় বীভৎস কান্ডটি এত দীর্ঘক্ষণ ধরে ঘটার সুযোগ পেল? গ্রামের কোন ঘরে আগুন লাগলে শুধু সে গ্রামের মানুষই নয়,পাশ্ববর্তি বহু গ্রামের মানুষ ছুটে আসে। কিন্তু রামুর বৌদ্ধ বিহারটি বাঁচাতে কোন পুলিশ যায়নি।খবর যে আধা কিলোমিটার দূরের থানা পায়নি সেটি কি বিশ্বাস করা যায়? গ্রামের কোন ঘরে আগুণ লাগলে সে খবরটি সমগ্র গ্রামবাসী ত্বরিৎ বেগে পেয়ে যায়। ঘুমন্ত মানুষও সে খবরে জেগে উঠে। এত কাছে থেকেও থানা যদি সংবাদ না পেয়ে থাকে তবে সমস্যা তো আরো ভয়ানক। দেহের এক অঙ্গে আগুন লাগলে যদি অন্য অঙ্গ টের না পায় তবে সেটি তো গুরুতর।এ রোগ তো জ্ঞান বা প্রাণ হারানোর। পুলিশ কি তবে সে রোগে আক্রান্ত? কিন্তু রোগ এখানে সেটি নয়। কোন আওয়ামী লীগ নেতার ঘরে হামলা হলে পুলিশ কতটা সজাগ ও শক্তি রাখে সেটি নিশ্চয়ই দেখিয়ে দিত। তখন বহু মানুষের মাজায় রশি ও হাতে পায়ে বেড়ি বেঁধে থানায় হাজির করতো। মূল প্রশ্নটি এখানে পুলিশ,প্রশাসন ও সরকারের এজেন্ডা নিয়ে। এজেন্ডা যদি হয়কোন ব্যবস্থা না নেয়া এবং বিশ্ববাসীর সামনে বাংলাদেশের ইজ্জত ডুবানো,তখন প্রচন্ড সোরগোলের সাথে লুটতরাজ,ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটলেও পুলিশ সেটি টের পাবে না। থানার দরজায় লাগাতর ধাক্কা দিলেও পুলিশ তখন বাইরে বেরুবে না। পুলিশ ও প্রশাসন তখন জেগে জেগে ঘুমাবে। বৌদ্ধদের উপর হামলার সময় তো অবিকল সেটিই ঘটেছে।

পাশ্চাত্য দেশের কোন শহরে বা গ্রামে আগুন লাগলে বা কারো উপর হামলা হলে পুলিশ ও ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ীর সেখানে পৌঁছতে সাধারণতঃ ১০ মিনিটের বেশী লাগে না। এমন বিপদে মানুষ ৯৯৯য়ে ফোন করে। পুলিশের এ ফোন নাম্বারটি দেশের শিশুরাও জানে। পুলিশের দায়িত্ব হলো ফোন পাওয়া মাত্র ঘটনাস্থলে দ্রুত ছুটে যাওয়া। বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ফোনের সংখ্যা বেড়েছে,বেড়েছে গাড়ীর সংখ্যাও।কিন্তু গড়ে উঠেছে কি বিপদের মুখে জনগণের বাঁচানোর কোন সুব্যবস্থা? বাংলাদেশে সেটি হয়নি।কারণ সরকারের সেটি প্রায়োরিটি নয়। দেশের সরকার,প্রশাসন,পুলিশের মাথা ব্যাথা অন্যত্র। সরকার চায়,পুলিশকে রাজনৈতীক বিরোধীদের দমনে লাঠিয়াল রূপে ব্যবহার করতে। চোর-ডাকাত বা খুনিরা সরকারের গদীতে হামলা করে না। ফলে তারা সরকারের রাজনৈতীক শত্রুও নয়। তাদের ধরা তাই পুলিশের মূল প্রায়োরিটি নয়। জনগণের জানমালের পাহারা দেয়াও তাই পুলিশের মূল কাজ নয়। বাংলাদেশের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন সে বিষয় গোপন রাখেননি। তিনি বলেছেন, “কারো বেডরুম পাহারা দেয়া পুলিশের পুলিশের কাজ নয়”। বরং পুলিশের কাজ হলো মন্ত্রীদের ঘরবাড়ি ও বেডরুম পাহারা দেয়া। সে দায়িত্বপালনে পুলিশকে দিবারাত্র ক্ষমতাসীন লোকদের ফোনের অপেক্ষায় থাকতে হয়। শহরের বা গ্রামে কোথায় মানুষ খুন হলো বা কার ঘরে আগুন লাগলো সে খবর নেয়ার সময় কোথায়? পথের মানুষ তাদেরকে ফোনে ডাকবে এবং সে ডাকে সেখানে গিয়ে হাজির হবে -সেটি ভাবাও তাদের কাছে অসম্মানজনক মনে হয়। প্রশাসন ও পুলিশ বিভাগের সংস্কৃতিই ভিন্ন। দায়িত্বপালনে অবহেলায় কোন মন্ত্রীর বা দলীয় নেতার প্রাণ গেলে পুলিশের চাকুরি যায়। কিন্তু শত শত জনগণের প্রাণ গেলে বা মসজিদ,মন্দির বা মঠ আগুনে ভস্মিভূত হলে পুলিশের চাকুরি যাওয়া দূরে থাক, তাদের কি সামান্য তিরস্কারও করা হয়? বরং সরকার তখন পুলিশের পক্ষ নেয়। চট্টগ্রামে বৌদ্ধদের সাথে যা কিছু ঘটেছে সে জন্য তাই কোন পুলিশ বা র‌্যাব অফিসারের চাকুরি যাইনি। তিরস্কার বা জবাবদেহীতার মুখেও পড়তে হয়নি। বরং প্রধানমন্ত্রী এসব কুকর্মের জন্য দায়ী করেছেন স্থানীয় বিরোধীদলীয় নেতাদের।কারণ, সরকার প্রধানের কাছে এটি সবচেয়ে সহজ কাজ। এবং এমন দোষারপে সরকারের রাজনৈতীক লাভও।

 

সামনে মহাদুর্দিন

বাংলাদেশ ১৬ কোটি মুসলমানের দেশ। অমুসলিম বিশ্বজুড়ে আজ  ইসলাম ভীতি। বিশ্বজুড়া সভ্যতার দ্বন্দে মুসলমানগণ গণ্য হচ্ছে পাশ্চাত্যের শত্রুপক্ষ রূপে। যে দেশে যত মুসলিম জনসংখ্যা,সেদেশ নিয়ে তাদের ততই ভীতি। বাংলাদেশ এজন্যই আজ  শীর্ষতালিকায়। বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের যেমন ভীতি,তেমনি ভীতি পাশ্চাত্যের আগ্রাসী শক্তিবর্গের। ফলে যারাই ইসলামপন্থিদের দমনে নিষ্ঠুরতা দেখায় তাদের সে জঘন্য অপরাধকর্মগুলিও তখন পাশ্চাত্যের কাছে ইম্যুনিটি পায়। তাই ইসরাইল যখন ফিলিস্তিনীদের হত্যা করে বা ভারত যখন কাশ্মীরীদের উপর গণহত্যা চালায় তখন সেটি মার্কিনযুক্তরাষ্ট্রসহ পাশ্চাত্যের কাছে নিন্দনীয় হয় না। একই কারণে পাশ্চাত্য দেশগুলোতে নিন্দনীয় হচ্ছে না ইসলামপন্থিদের উপর আওয়ামী সরকারের নির্যাতন। আওয়ামী লীগের নেতারা সেটি বুঝে। ফলে তারা চায়,বাংলাদেশকে নিয়ে পাশ্চাত্যবাসীর মনে সে ভীতিকে আরো বাড়াতে। এবং ভারতসহ পাশ্চাত্যের শক্তিবর্গের এ কথাও বুঝাতে চায়, বাংলাদেশে ইসলামপন্থিদের দমনের বিকল্প নাই। এবং বলতে চায়,আওয়ামী লীগ ছাড়া বিকল্প দল নাই। ইসলাম পন্থিদের উপর নির্যাতনে তারা যে পারদর্শিতা দেখিয়েছে তাতে পাশ্চাত্যের কাছে তাদের বাজারদরও বেড়েছে।

এ নিয়ে সন্দেহ নাই,ভারত এবং পাশ্চাত্য শক্তিবর্গ বাংলাদেশে ইসলামী শক্তির উত্থানের বিরোধী।  ফলে আওয়ামী লীগ যেভাবে ইসলামপন্থিদের নির্মূলে নেমেছে তাতে তারা প্রচণ্ড খুশি। অন্ততঃ এ বিষয়টিতে ইসলামের আন্তর্জাতিক শত্রুপক্ষের সাথে আওয়ামী লীগের ঐক্যটি অটুট। বিগত নির্বাচনে তাদের আশির্বাদ গিয়ে পড়েছিল তাই আওয়ামী লীগের পক্ষে। আওয়ামী লীগের রাজনৈতীক কৌশলটি হলো নিজেদের রাজনৈতীক শত্রুদেরকে শুধু নিজেদের শত্রু রূপে নয়,পাশ্চাত্যের শত্রু রূপেও চিত্রিত করা। এবং এভাবে চায়,রাজনৈতীক প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের যেভাবে হত্যা,গুম ও জেলবন্দী করার উদ্যোগ নিয়েছে তার প্রতি াবেবিদেশী শক্তির লাগাতর সমর্থণ। এজন্যই চায়, সংখ্যালঘুদের কাছে বাংলাদেশকে একটি বিপদজনক রাষ্ট্র রূপে চিত্রিত করতে। এ লক্ষ্য পূরণে দলটির বুদ্ধিজীবীরা অতীতে বহুবই ও বহুভিডিও প্রস্তুত করে বিদেশীদের কাছে ছড়িয়েছে। তবে সেটি প্রমাণ করার জন্য প্রয়োজন হলো,সংখ্যালঘুদের উপর হামলা। অতীতে একই লক্ষ্যে হিন্দুদের উপর হামলা হয়েছে। মন্দিরও ভাঙ্গা হয়েছে। তবে সেসব হামলায় কোন ইসলামী দল বা মাদ্রাসার ছাত্ররা জড়িত ছিল তা আজ  অবধি আদালত প্রমাণ করতে পারিনি। সে অভিন্ন স্ট্রাটেজীরই অংশ রূপে এবারে বলি হলো চট্টগ্রামের বৌদ্ধরা। আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখার প্রয়োজনে আরো অনেককে যে ভবিষ্যতে এভাবে বলি হতে হবে –সে বিষয়ে কি সন্দেহ আছে? ইরানের শাহ তার নিজের গদী বাঁচাতে দর্শকভর্তি সিনেমা হলে আগুন দিয়ে দোষ চাপিয়েছিল ইসলামপন্থিদের উপর। দেশে দেশে ইসলামের শত্রুপক্ষ যে কতটা বর্বর ও মানবতাশূন্য এ হলো তার প্রমাণ। ফলে বাংলাদেশের ইসলামপন্থিরা চাইলেও সংখ্যালঘুদের উপর হামলা রোধের ক্ষমতা তাদের হাতে নাই।ইসলামপন্থিদের এবং সে সাথে বাংলাদেশের মুখে কালিলেপনের কাজ অতীতে যেমন হয়েছে,তেমনি ভবিষ্যতে হবে।

দেশটি আজ  বিবেকহীন স্বার্থশিকারীদের হাতে জিম্মি। তাদের কাছে নিজেদের রাজনৈতীক স্বার্থটিই মূল। দেশের স্বার্থ ও সংখ্যালঘুদের স্বার্থ তাদের কাছে মূল্যহীন। নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে এরা যেমন নদীর পানি বিদেশীর হাতে তুলে দিতে পারে,তেমনি দেশের মধ্য দিয়ে করিডোরও দিতে পারে।নির্মূল করতে পারে দেশের অর্থনৈতীক ও সাংস্কৃতিক সীমান্ত। তেমনি দেশকে চরমপন্থি-কবলিত প্রমাণ করতে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে দাঙ্গাও বাধাতে পারে। শুধু সংখ্যালঘুদের নয়,দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠদের জানমালও তাদের কাছে নিরাপদ নয়। নিরাপদ নয় দেশের স্বাধীন অস্তিত্ব।নিছক গদী বাঁচানোর স্বার্থে শেখ মুজিব গণতন্ত্রকে কবরে পাঠিয়েছিলেন। বাকশালী মুজিব কেড়ে নিয়েছিলেন জনগণের নূন্যতম মানবিক অধিকার। ভারতের সাথে মুজিব স্বাক্ষর করেছিলেন ২৫ সালা দাসত্বচুক্তি,-এভাবে শৃঙ্খলিত হয়েছিল দেশের স্বাধীনতা। ভারতীয় পণ্যের জন্য খুলে দিয়েছিলেন বাংলাদেশের সীমান্ত। ভারতকে অধিকার দিয়েছিলেন ফারাক্কার পানি তুলে নিয়ে বাংলাদেশের বিশাল ভূ-ভাগকে মরুভূমি বানানোর প্রকল্প নিয়ে সামনে এগুনোর। এটিই শেখ মুজিবের ঐতিহ্য বা লিগ্যাসী। শেখ হাসিনাসহ আওয়ামীগের বর্তমান নেতৃত্ব শেখ মুজিবের সে ঐতিহ্যের ষোলআনা প্রতিষ্ঠা চায়। বাংলাদেশের এখানেই মূল বিপদ। সামনে দুর্দিন তাই শুধু সংখ্যালঘুদের নয়,সমগ্র দেশবাসীর।১৫/১০/২০১২

 

 

                       




বাংলাদেশে বিজয় গুন্ডাতন্ত্রের এবং মৃত আইনের শাসন

বিজয় অসভ্যতার

প্রতিটি সভ্য সমাজই সুস্পষ্ট কিছু আলামত নিয়ে বেঁচে থাকে। সে আলামতগুলি হলোঃ এক). আইনের শাসন; দুই). নাগরিকদের জান, মাল ও ইজ্জত নিয়ে বাঁচার অধিকার, তিন).রাষ্ট্র পরিচালনায় নাগরিকদের অংশ গ্রহণের অধিকার, এবং চার) ধর্ম-পালন, সংসার-পালন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও মত-প্রকাশের স্বাধীনতা। দেহে হৃপিণ্ড, ফুসফুস ও মগজের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের কোন একটি কাজ না করলে মৃত্যু অনিবার্য। তেমনি সভ্য সমাজের মৃত্যুও অনিবার্য, যদি উপরের চারটি উপাদানের কোন একটি বিলুপ্ত হয়। তখন জোয়ার আসে অসভ্যতার। এজন্যই প্রতিটি সভ্য সমাজে শুধু লিপিবদ্ধ আইনই থাকে না, থাকে আইনের শাসনও। থাকে রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের অংশগ্রহণ। প্রতিটি নাগরিকের থাকে প্রাণে বাঁচার অধিকার। আইনের শাসনের অর্থ হলো কেউই বিচারের উর্দ্ধে নয়। অপরাধ করলে আইন অনুযায়ী শাস্তি পাওয়াটি অনিবার্য। দেশের প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্টও সে শাস্তি থেকে মুক্তি পেতে পারে না। সে শাস্তি না হওয়াটা তাই অনিয়ম এবং সেটি অসভ্যতার আলামত।

ইসলামে অতি গুরুত্বপূর্ণ হলো আইনের শাসন। কোনটি সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা -সে নির্ণয়টি কখনোই উন্নত পোষাক-পরিচ্ছদ, গাড়ি-বাড়ি ও পানাহার দিয়ে হয় না। বরং সেটি হয় ন্যায়নিষ্ঠ আইন এবং ন্যায় বিচার নিশ্চিত করতে সে আইনের কতটা সুষ্ঠ প্রয়োগ হলো তার ভিত্তিতে। বিষয়টি এতই গুরুত্বপূর্ণ যে মহান আল্লাহতায়ালা শুধু উত্তম খাদ্যপানীয়ই দেননি, বরং আইন প্রণয়নের দায়িত্বটি তিনি নিজ হাতে রেখেছেন। সে আইনের নাম হলো শরিয়ত। তাই ইসলামে অপরিহার্য শুধু নামায-রোযা, হজ-যাকাতের প্রতিষ্ঠা নয়, বরং অপরিহার্য হলো শরিয়তি আইনের প্রতিষ্ঠাও। কাফের হওয়ার আলামত তাই শুধু মহান আল্লাহতায়ালাকে অস্বীকার করা নয়, বরং তাঁর আইনের প্রয়োগে অবাধ্য হওয়া। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালার ঘোষণাটি হলোঃ “… যারা নাযিলকৃত আইন আনুযায়ী বিচারকার্য পরিচালনা করে না, তারাই কাফের। তারাই জালেম। তারাই ফাসেক। (সুরা মায়েদা, আয়াত ৪৪, ৪৫, ৪৭)। প্রাথমিক যুগের মুসলিমগণ মানব ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ যে সভ্যতাটির জন্ম দিয়েছিলেন তার মূলে ছিল শরিয়তি আইন প্রতিষ্ঠায় অটুট অঙ্গিকার। খলিফা ওমর (রাঃ)ও তাই বিচারকের সামনে হাজির হয়েছেন এবং কাজীর রায় বিনা প্রতিবাদে মেনে নিয়েছেন।

আইনের শাসন থাকায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের বিচারে শাস্তি হয়েছে। এবং অর্থচুরির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাঁকে গদি ছেড়ে জেলে যেতে হয়েছে। একটি মাত্র এ রায়ই পাকিস্তানের রাজনীতিতে বিপ্লব এনে দিয়েছে। ফলে গদি থেকে চোরকে সরাতে সেদেশের মানুষদের রাজপথে বিপ্লবে নামতে হয়নি। রাজনীতিতে সুস্থ্যতা আনতে ন্যায় বিচার যে কীরূপ শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে -এ হলো তার প্রমাণ। শুধু তাই নয়, পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট বিশ্ব-নন্দিত রায় দিয়েছে, অপরাধীদের জন্য রাজনীতিতে অংশ নেয়া নিষিদ্ধ। রাজনীতি হলো দেশগড়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার; এটি কখনোই দেশভাঙ্গা, চুরি-ডাকাতি ও নির্যাতনের হাতিয়ারে পরিণত হতে দেয়া যায় না। এ রায়ে পাকিস্তানের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকগণ বুঝিয়ে দিয়েছেন, রাজনীতির অঙ্গণ কখনো অপরাধীদের হাতে জিম্মি হতে দেয়া যায় না। কারণ, তাতে সমগ্র দেশ অধিকৃত হয় এবং জনগণ জিম্মি হয় ভয়ানক অপরাধীদের হাতে। তখন বর্বর অসভ্যতা নেমে দেশের গ্রামগঞ্জে, রাজপথে, জনপদে -এমন কি বিশ্ববিদ্যালয়েও। হিংস্র পশুকে জনপদে মুক্ত ঘুরতে দিলে কি জনজীবনে নিরাপত্তা থাকে? তেমনি শান্তি বিঘ্নিত হয় খুনি, গুন্ডা ও সন্ত্রাসীদের রাজনীতির অঙ্গণে মুক্ত ছেড়ে দিলে। তাদেরকে কারাগারে বন্দী রাখা তাই সভ্য সমাজের রীতি। সমাজের বুকে আইনের শাসন তো এভাবে প্রতিষ্ঠা পায়।

কিন্তু বাংলাদেশে ঘটছে উল্টোটি। দেশটি অধিকৃত অপরাধীদের হাতে। ভয়ানক খুনি, গুণ্ডা, ও ধর্ষণকারীদের মুক্ত ছেড়ে দেয়া হয়েছে রাজপথে। সম্প্রতি তাদের ঢাকার রাজপথে দেখা গেল স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের মিছিলে হামলা করতে। এবং সেটি পুলিশের সামনে। কোন সভ্যদেশেই বিনাবিচারে হত্যার অধিকার সরকারের থাকে না। সরকারেরর দায়িত্ব হলো প্রশাসন চালানো, দেশে উন্নয়ন আনা, দেশের প্রতিরক্ষাকে মজবুত করা ও নাগরিকদের জীবনে নিরাপত্তা দেয়া। কখনোই সেটি নাগরিক হত্যা নয়, নাগরিকদের উপর জুলুম করাও নয়। কাউকে হত্যাদণ্ড দেয়ার অধিকার একমাত্র আদালতের। সেটি এক বিশাল বিচার প্রক্রিয়ার পর। কিন্তু কোন দেশে স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠা পেলে এরূপ ন্যায়নিষ্ঠ বিচারের মৃত্যু ঘটে। তখন বিচারকদেরও স্বৈরশাসকের আজ্ঞাবহ হতে হয়। এরূপ বিচারকগণই মিশরে স্বৈরশাসক বিরোধী মিছিলে যোগ দেয়ার অপরাধে ৭৫জনের বিরুদ্ধে ফাঁসির হুকুম শুনিয়েছে। বাংলাদেশে বিচারের নামে চলছে রাজনৈতিক হত্যাকান্ড ও নির্যাতন। ন্যায় বিচার লাভের অধিকার হারিয়েছে শুধু জনগণ নয়, দেশের উচ্চ আদালতর বিচারকগণও। বিচারকগণও হারিয়েছেন এমন কি জীবনের নিরাপত্তাও। তাদের নিরাপত্তাহীনতা যে কতটা গভীর তা সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা প্রাণ ভয়ে হঠাৎ চাকুরি ছেড়ে দেশ ছেড়ে প্রমাণ করেছেন।

 

বিজয় গুণ্ডাতন্ত্রের

জীবনে বেঁচে থাকার অধিকারটি প্রতিটি নাগরিকের সবচেয়ে পবিত্র সাংবিধানিক নাগরিক অধিকার। কিন্তু সে অধিকার কেড়ে নেয় স্বৈরাচারি সরকার। সন্ত্রাসীদের ন্যায় মানুষ খুন করে স্বৈরাচারি সরকারের পুলিশ ও দলীয় ক্যাডারগণ। তখন প্রতিষ্ঠা পায় জঙ্গলের অসভ্যতা। গভীর জঙ্গলে হিংস্র পশুদের শিকার ধরায় যে অবাধ স্বাধীনতা, অধিকৃত দেশের জনপদে সে স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করে স্বৈরাচারি সরকারের পালিত গুণ্ডাগণ। ঢাকার শাপলা চত্ত্বরে যেভাবে শত শত মানুষকে হত্যা করা হলো -সেটি কি কোন জঙ্গলেও সচারচর ঘটে? বিনা বিচারে হত্যার সে অসভ্যতার শুরুটি শেখ মুজিবের হাতে। পুলিশের হাতে বন্দী সিরাজ সিকদারের হত্যার পর তিনিই সংসদে দাঁড়িয়ে অতি দর্পের সাথে ঘোষণা দেন, কোথায় আজ সিরাজ সিকদার। বিনা বিচার মানুষ হত্যার সে জঘন্য কাজটিকে সেদিন তিনি গর্বের এবং সে সাথের উৎসবের কাণ্ডে পরিণত করেছিলেন। রাষ্ট্র বিজ্ঞানের ভাষায় সরকার প্রধানের এমন আচরণকে বলা হয় নিরেট ফ্যাসিবাদ। বাংলাতে যাকে বলা যায় নির্ভেজাল গুণ্ডাতন্ত্র। এরূপ গুণ্ডাতন্ত্রে যা সবচেয়ে গুরুত্ব পায় তা হলো বিরোধীদের নির্মূল তা যতটা নৃশংস বা বেআইনী ভাবেই হোক।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের সরকার শেখ মুজিবের প্রবর্তিত গুণ্ডাতন্ত্র তথা ফ্যাসিবাদকেই ষোলকলায় পূর্ণ করেছে। ফলে তাঁর সরকার পরিণত হয়েছে গুণ্ডাদের লালনকর্তা। ফলে পুলিশের সামনে ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডারদের অস্ত্রহাতে ঘুরাফেরা ও নিরস্ত্র ছাত্র-ছাত্রীদের পেটানোর ন্যায় বর্বরতার ঘটনাও ঘটছে। কোন সভ্য দেশে পুলিশের সামনে এমন কাণ্ড অসম্ভব ব্যাপার। কিন্তু বাংলাদেশে পুলিশ ও সরকারি দলের গুণ্ডাগণ যেহেতু একই ঘরানার, ফলে রাজপথে উভয়েরই ঘটে সহযোগিতামূলক সহ-অবস্থান। ফলে যে অসভ্যতা এককালে ডাকাতপাড়া ও নিষিদ্ধ পল্লির বিষয় ছিল, তা এখন উঠে এসেছে রাজপথে -এমন কি বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গণেও। ফলে বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যলয়ের অঙ্গণে শুধু খুন-ধর্ষণই হয় না, ধর্ষণে সেঞ্চুরির উৎসবও হয়। যেমনটি শেখ হাসিনার প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হওয়াতে জাহাঙ্গির নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে হয়েছিল। সে খবর বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশ হওয়া সত্ত্বেও হাসিনার সরকার অপরাধীকে ধরতে কোন আগ্রহ দেখায়নি। যেমন িনি আজ আগ্রহ দেখান না পুলিশের সামনে গুন্ডামীতে লিপ্ত সন্ত্রাসীদের ধরতে। সরকার যখন গুন্ডামীর পালন ও লালন কর্তায় পরিণত হয় -তখন তো এমনটিই ঘটে।

সভ্য সমাজের আরেক আলামত হলো, প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক মানবিক অধিকার। সে অধিকার বলে সত্যকে সবার সামনে তুলে ধরা ও মিথ্যার বিরুদ্ধে কথা বলা কোন অপরাধ গণ্য হয় না। সে অধীকারের প্রকাশ যেমন রাজপথের মিছিল বা জনসভায় হয়, তেমনি হয় দেশের পত্র-পত্রিকায় ও টিভিতে। কিন্তু স্বৈরাচারি শাসকগণ জনগণকে সে অধিকার দেয় না। সত্য কথা বলা তখন শাস্তি যোগ্য অপরাধে পরিণত হয়। প্রখ্যাত আলোক চিত্র শিল্পী ডক্টর শহীদুল আলম সম্প্রতি আল জাজিরা টিভি চ্যানেলের সাথে সাক্ষাতকারে কিছু সত্য কথা বলেছিলেন। ঢাকার রাজপথে যা দেখেছেন সেটিই বলেছেন। এর মধ্যে কোন মিথ্যা বা অতিরঞ্জণ ছিল না। অথচ সেটিই অপরাধ গণ্য হয়েছে সরকারের কাছে। রাতের আঁধারে বাসায় ডাকাতের ন্যায় হামলা করে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। তাঁর উপর দৈহিক নির্যাতনও করা হয়। ফলে আদালতে তিনি সোজা ভাবে হাঁটতেও পারছিলেন না।

ড. শহিদুল আলমের সাথে যা ঘটেছে তাকে নিছক গুন্ডামী ছাড়া আর কি বলা যায়? এর মধ্যে কোন নীতি নাই, ন্যায়বিচার নাই, দর্শনও নাই বরং আছে বর্বর পেশী শক্তির প্রয়োগ। এমন গুন্ডামী তো নিরেট অসভ্যতা। হাসিনার সরকার একই রূপ অসভ্য কাণ্ড ঘটিয়েছে আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক জনার মাহমুদুর রহমানের সাথে। এরূপ অসভ্যতা মুজিবের আমলে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল বলে শুধু সিরাজ সিকদারকে নয়, ৩০ হাজারের বেশী মানুষকে বিনাবিচার মরতে হয়েছে। আজ সে অসভ্যতাকেই তাঁর অনুসারিগণ প্রবলতর করেছে। প্রশ্ন হলো, সত্য কথা বলা কোন দেশে এভাবে অসম্ভব করা হলে সে দেশে কি মানবতা বাঁচে? তখন তো সুনামীর ন্যায় ধেয়ে আসে অসভ্যতার তাণ্ডব। এমন দেশ খুন, গুম, ধর্ষণ ও দুর্বৃত্তিতে বিশ্বরেকর্ড গড়বে সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? হাসিনার সরকার বাংলাদেশকে তো সেদিকেই ধাবিত করছে। কোন সভ্য মানুষ কি সরকারের এরূপ অসভ্য প্রকল্পে সমর্থণ ও সহায়তা দিতে পারে?

 

মৃত গণতন্ত্র ও ব্যর্থ নির্বাচন-প্রক্রিয়া

সভ্য সমাজের অপর আলামতটি হলো, সেখানে সরকার নির্বাচিত হয় জনগণের রায়ে, শক্তির জোরে নয়। মানব ইতিহাসে সে সভ্য রীতি সর্বপ্রথম চালু করে ইসলাম। জনগণ তখন রায় প্রকাশ করতো প্রকাশ্যে সমর্থণ দিয়ে। সে প্রকাশ্য সমর্থণের ইসলামি পরিভাষা হলো বাইয়াত। ফলে বাংলাদেশের চেয়ে ৫০ গুণের চেয়ে বৃহৎ রাষ্ট্রের শাসক হতে হযরত আবু বকর (রাঃ), হযরত ওমর (রাঃ), হযরত ওসমান (রাঃ) ও হযরত আলী(রাঃ)কে রাজপুত্র বা শাসকপুত্র হতে হয়নি, শক্তির প্রয়োগও করতে হয়নি। ইসলামের আগে গ্রীকবাসী গণরায় নেয়ার সে রীতি প্রচলন করলেও সেটি ছিল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নগর-ভিত্তিক, বিশাল রাষ্ট্রভিত্তিক নয়। কিন্তু গণরায় নেয়ার সে প্রক্রিয়ায় আধুনিকরণ এসেছে। জনগণ এখন তাদের রায় জানিয়ে দেয় ভোটের মাধ্যমে। জনগণের সে অধিকার প্রতিষ্ঠা করতেই নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ নির্বাচন জরুরী। সেটি অনুষ্ঠিত করতে হয় নিরপেক্ষ নির্বাচনি কর্তৃপক্ষের অধীন। নির্বাচনি কর্তৃপক্ষের অপরিহার্য ক্ষমতাটি হলো নির্বাচনে যারা কারচুপি করে তাদের শাস্তি দেয়ার বা অযোগ্য ঘোষণার।

গণতন্ত্রে বহু দলীয় রাজনীতি থাকে। সে রাজনীতিতে নিরপেক্ষ নির্বাচন থাকে। সে নির্বাচনে জনগণের অবাধ অংশগ্রহনও থাকে। থাকে মতামত প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা। থাকে মাঠে ময়দানে সকল দলের মিছিল-মিটিংয়ের অবাধ অধিকার। অথচ বাংলাদেশে এর কোনটাই নাই। রাজপথে দূরে থাক, জামায়াতের নেতাকর্মীগণ ঘরের চার দেয়ালের মাঝে মিটিং করলেও তাদের গ্রেফতার করা হয়। এমন কি খেলাধুলাতেও অপরিহার্য হলো নিরপেক্ষ রিফারী। খেলার মাঠে সমান সুযোগ দিতে হয় উভয় পক্ষকেই। রিফারীর ক্ষমতা থাকে দুষ্ট খেলোয়ারকে লাল কার্ড দেখানোর। ক্ষমতা থাকে অপরাধী খেলোয়াড়কে পেনাল্টির শাস্তি দেয়ার। রিফারীর হাতে সে ক্ষমতা না থাকলে তাঁর পক্ষে অসম্ভব হয় খেলাকে সুষ্ঠ ভাবে পরিচালনা করা। তখন ফাউল খেলেও দুষ্ট দল বিজয়ী হয়। এরূপ দুর্বৃত্তি ঘটে স্বৈর-সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এটি গোপন নয়, ভোটকেন্দ্রে ঢুকে সরকারি দলের ক্যাডারগণ যখন ব্যালট পেপারে ইচ্ছামত সিল মেরে ভোট বাক্স পূর্ণ করে তখন তাদেরকে বাধা দেয়া বা লাল কার্ড দেখনোর সামর্থ্য বা অধিকার কোনটাই নির্বাচনি কমিশনরের থাকে না। যত রকম অনিয়ম বা কারচুপিই হোক সে কারণে নির্বাচন বাতিল ঘোষণা করার ক্ষমতাও তার নেই। তাঁর হাতে ক্ষমতা শুধু সরকারি দলের প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা দেয়া এবং নির্বাচন যে সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ হয়েছে -সেটি মিডিয়ার সামনে জোরেশোরে প্রচার করা। নির্বাচনি কমিশনরের জন্য নির্ধারিত দায়িত্ব শুধু সেটুকুই।

অথচ সংসদ নির্বাচন কোন খেলাধুলা নয়, জাতির জীবনে এটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জাতির ভাগ্য নির্ধারণ হয় এবং আগামীতে দেশ কোন দিকে যাবে -সেটি নির্ধারিত হয় নির্বাচনের ফলাফল থেকে। নির্বাচন হলো জনগণের হাতে ন্যস্ত অতি শক্তিশালী হাতিয়ার।  ভোট দিয়ে জনগণ অপরাধী ও অসৎ রাজনীতিবিদদের পরাজিত করে শাস্তি দেয়। এবং পুরস্কৃত করে যোগ্যবানদের বিজয়ী করে। কিন্তু স্বৈরাচারি শাসকগণ শাস্তিদান পুরস্কারদানের   অধিকার ভোটারদের হাতে দিতে রাজী নয়। সে অধিকারকে তারা নিজ হাতে রাখতে চায়। ফলে আবিস্কার করে ভোট ডাকাতির এমন এক প্রক্রিয়া যা দিয়ে নিজ দলের বিজয়কে সুনিশ্চিত করে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে তো সেটিই হয়েছে। এরূপ নির্বাচন বার বার হলেও তাতে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন হয় না; বরং প্রতিফলন হয় সেটিরই যা স্বৈরশাসক চায়।

শেখ হাসিনার আমলে নির্বাচন ঠিকই হয়েছে। কিন্তু সেসব নির্বাচনে নিরপেক্ষ রিফারী, সবদলের অংশগ্রহণ এবং জনগণের কাছে পৌঁছার সব দলের সমান সুযোগ-সুবিধা -এ বিষয়গুলি কখনোই গুরুত্ব পায়নি। সেগুলি নিশ্চিত করা শেখ হাসিনার হাতে নিয়োগপ্রাপ্ত নির্বাচনি কমিশনের এজেন্ডায় স্থান পায়নি। সেটি যেমন ২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনের ক্ষত্রে, তেমনি আজও। সেটি বুঝা যায় সাম্প্রতিক পৌর নির্বাচনগুলিতে। ফলে পুরা অকার্যকর হয়ে পড়েছে নির্বাচনি প্রক্রিয়া। কারা সংসদের সদস্য হবে -সেটি নির্ধারণ করেন শেখ হাসিনা নিজে এবং জনগণ পরিণত হয়েছে নিছক দর্শকে। জনগণ ভোট দিল কি দিল না -সেটিও তাঁর কাছে কোন বিচার্য বিষয় নয়। ২০১৪ সালের নির্বাচনে ৩০০ আসনের মাঝে ১৫৩ সিটে কোন নির্বাচন হয়নি। যেগুলিতে ভোটকেন্দ্র খোলা হয়েছে সেখানেও শতকরা ৫ জনের বেশী ভোট দেয়নি। কারণ, যে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী নেই সেখানে জনগণ ভোট দিতে যাবে কেন? কিন্তু তারপরও নির্বাচনকে সুষ্ঠ ও আইনসিদ্ধ বলা হয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বী দুটি দলের একটি মাঠে না নামলে যে খেলাই পরিত্যক্ত হয়। এটিই সভ্য সমাজের রীতি। সে রীতি স্বৈরাশাসকদেরও। তারাও প্রতিদ্বন্দ্বীকে নির্বাচনি ময়দানে দেখতে ভয় পায়। প্রতিদ্বন্দ্বীহীন ও ভোটারহীন নির্বাচন নিয়েই তারা অধীক স্বাচ্ছন্দ বোধ করে। ফলে স্বৈরশাসকের পাতানো নির্বাচনে মূল কৌশলটি হয়, নির্বাচনের ময়দান থেকে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীদের দূরে রাখা।

 

সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিবেক ধ্বংসে

বাংলাদেশের বর্তমান স্বৈরশাসনকে গণতান্ত্রিক বললে প্রচণ্ড অবমাননা হয় গণতন্ত্রের। তাতে প্রচণ্ড মিথ্যাচারও হয়। এবং গাদ্দারি হয় নিজের বিবেকের সাথে। কারণ, কোনটি আলো আর কোনটি আঁধার এ বিচারবোধ সুস্থ্য মানুষ মাত্রেরই থাকে। তেমনি থাকে কোনটি গণতন্ত্র আর কোনটি গুন্ডাতন্ত্র -সেটুকু বোঝার সামর্থ্যও। ফলে একজন সুস্থ্য মানুষ কি করে নিরেট গুন্ডাতন্ত্রকে গণতন্ত্র বলে? এতে অবমাননা হয় নিজের বিবেক ও বিচারবোধের। কিন্তু রাষ্ট্র বা সমাজের বুকে যখন নানারূপ দুষ্ট শক্তির পক্ষ থেকে বিবেকধ্বংসী ব্যাপক সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিং চলে তখন বহু বয়স্ক মানুষের মাঝেও সে সামান্য সামর্থ্যটুকু লোপ পায়। দেশে দেশে সেরূপ বিবেকধ্বংসী নাশকতা যেমন ধর্মের নামে হয়, তেমনি রাজনীতি ও শিক্ষাসংস্কৃতির নামেও হয়। ধর্মের নামে সে নাশকতা ব্যাপক ভাবে ঘটায় লক্ষ লক্ষ মন্দির ও তার পুরোহিতগণ। বিবেকের অঙ্গণে সে ব্যাপক নাশকতার কারণে ভারতে একশত কোটিরও বেশী মানুষের কাছে মুর্তি, পাহাড়-পর্বত, গরু-ছাগল, শাপ-শকুন এমন কি লিঙ্গও পূজনীয় গণ্ড হয়। মিশরে ফিরাউনগণও ভগবানে পরিণত হয়েছে।

ধর্মীয় অঙ্গণের বাইরে রাজনীতির ময়দানে বিবেকবিধ্বংসী সে নাশকতাটি ব্যাপক ভাবে ঘটায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং সেসব দলের নেতা-কর্মীগণ। তখন হিটলার, স্টালিন, মাও সে তুং ও শেখ মুজিবের ন্যায় নৃশংস স্বৈরাচারি শাসকগণও নেতা রূপে গৃহিত হয়। এসব স্বৈরাচারি শাসকগণ ক্ষমতায় গিয়ে শুধু যে গণহত্যা ঘটায় তা নয়, তাদের হাতে রাজনৈতিক দলগুলো পরিণত হয় বিবেক-বিধ্বংসী বিশাল বিশাল ইন্ডাস্ট্রিতে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ব্যাপক ভাবে বিবেকশূণ্য হওয়ার কারণ তো এটিই। সে বিবেকশূণ্যতার কারণে শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনার নিরেট গুন্ডাতন্ত্রও তাদের কাছে নির্ভেজাল গণতন্ত্র মনে হয়। তাদের কাছে রাজনীতি করার অধিকারটি যেন স্রেফ হাসিনার। ফলে অপরাধ গণ্য হয় নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তায় নামা ছাত্র-ছাত্রীদের সমর্থণ করাকে। সেটি চিত্রিত হচ্ছে ছাত্রদের রাজনীতিতে উস্কে দেয়ার অপরাধ রূপে। অথচ ছাত্রদের উস্কে দেয়ার রাজনীতি শুধু শেখ হাসিনার একার নীতি নয়, সেটি তাঁর পিতার নীতিও। রাজনৈতিক এজেন্ডা পূরণে তিনিই স্কুলের হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রীকে ক্লাসরুম থেকে বের করে শাহবাগ ময়দানে জড় করতে উৎসাহ দিয়েছেন। সেটি ছিল তাদের মুখ থেকে জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবী ধ্বনিত করার প্রয়োজনে। তাদের মুখে তখন গুঁজে দেয়া হয়েছিল, বিচার চাই না, ফাঁসি চাই স্লোগান। এভাবে বিচারকদের বাধ্য করা হয়েছিল জেলের হুকুম পাল্টিয়ে ফাঁসির হুকুম দিতে। রাজনৈতিক লক্ষ্যপূরণে ছাত্রদেরকে এরূপ নগ্ন ব্যবহারের নমুনা আর কি হতে পারে?

 

বিদ্রোহ সংবিধানের বিরুদ্ধে

প্রতিটি সরকারেরই কিছু সাংবিধানিক দায়-দায়িত্ব থাকে। গদিতে বসার আগে সরকার প্রধানকে সে দায়িত্ব পালনের কসম খেতে হয়। সংবিধানের কোন একটি বিধানের বিরুদ্ধে যে কোন বিদ্রোহই হলো একটি দণ্ডনীয় ফৌজদারি অপরাধ। অথচ বাংলাদেশে  সে অপরাধে লিপ্ত খোদ সরকার প্রধান। সে অপরাধের শাস্তি দিতে দেশের উচ্চ আদালতও নির্লপ্ত। সে বিচারটি না হওয়ায় সংবিধানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ এখন বিশেষ কোন ব্যক্তির মাঝে সীমিত নয়, সেরূপ বিদ্রোহ বিভিন্ন দল ও প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতিতে পরিনত হয়েছে। উদাহরণ দেয়া যাক। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মূল দায়িত্বটি দেশের পুলিশ বিভাগ ও আদালতের। এটি তাদের সাংবিধানিক দায়িত্বও। আইনের শাসনের অর্থ, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ। সে জন্য জরুরী হলো, বিচার বিভাগ ও পুলিশ বিভাগকে সরকারের প্রভাবমুক্ত রাখা এবং স্বাধীন ভাবে কাজ করতে  দেয়া। এবং তাদেরকে প্রভাব মুক্ত রাখার দায়িত্বটি মূলতঃ সরকার-প্রধানের। বস্তুতঃ সরকারের উপর অর্পিত এটিই হলো অন্যতম সাংবিধানিক দায়িত্ব। অথচ বাংলাদেশের স্বৈরসরকার এ দুটি প্রতিষ্ঠানের লোকদের চাকর-বাকরে পরিণত করেছে। পুলিশ বিভাগ ও দেশের আদালত কাজ করছে সরকারের নির্যাতনের হাতিয়ার রূপে।

শেখ হাসিনা নিজেও সংবিধান রক্ষা ও আইনের শাসনের কথা বলেন। সংবিধান যে কোন ব্যক্তিকে স্বাধীন ভাবে চলাচলের অধিকার দেয়। কিন্তু শেখ হাসিনা সে স্বাধীনতা বিরোধী দলীয় নেত্রীকে দেননি। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার বাসার দরজার সামনে সারিবদ্ধ বালিভর্তী ট্রাক দিয়ে যেভাবে তার ঘর থেকে বেরুনো অসম্ভব করেছিল তাতে কি সংবিধান বেঁচেছিল? একাজ তো অসভ্য গুন্ডাদের। কোন সভ্য ও ভদ্র মানুষ কি সেটি ভাবতে পারে? কিন্তু আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীগণ সেটি যেমন ভাবতে পারে, তেমনি তা করে দেখাতেও পারে। দেশের আইনের শাসন থাকলে এ নিয়ে আদালেত বিচার বসতো এবং বিচারে অপরাধীর শাস্তি হতো। কিন্তু বাংলাদেশ তার কোনটাই হয়নি। সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে নামলে পুলিশ যেমন রাস্তায় পিটায়, তেমনি আদালতও দিনের পর দিন অত্যাচারের সুযোগ করে দেয়। সেটি পুলিশের হাতে রিমান্ডে দিয়ে। এবং পুলিশের রিমান্ডে অত্যাচারটি রাস্তার গুন্ডাদের চেয়েও নৃশংসতর হয়। অথচ রাস্তায় প্রতিবাদে নামাটি প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। দেশের সংবিধান দেশবাসীকে নিজ মত প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়। অথচ স্রেফ গদি বাঁচানোর স্বার্থে সে সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। এভাবে সংবিধানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছে খোদ সরকার। অথচ সরকারের প্রধান দায়িত্ব হলো সংবিধানকে প্রতিরক্ষা দেয়া, অমান্য করা নয়। এই একটি মাত্র অপরাধেই শেখ হাসিনার সরকার বৈধতা বিলুপ্ত হয় দেশ শাসনের। দেশে স্বাধীন আদালত ও আইনের শাসন থাকলে, এ গুরুতর অপরাধে শেখ হাসিনাকে বহু আগেই জেলে জেলে হতো।

স্বৈরশাসকদের লক্ষ্য কখনোই সভ্য সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণ নয়, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাও নয়। সংবিধান কি বলে না বলে -সেটিও তাদের বিচার্য বিষয় নয়। তাদের লক্ষ্য, স্রেফ নিজেদের গদির নিরাপত্তা। সে লক্ষ্যে স্বৈরশাসকগণ শুধু তাঁবেদার প্রশাসন, পুলিশ ও আদালতই পালে না, হাজার হাজার গুন্ডাও পালে। এরা সবাই তখন প্রতিবাদি ছাত্রছাত্রী, রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও জনগণের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ হয়ে ময়দানে নামে। এভাবেই এরা সংঘবদ্ধ ভাবে পদদলিত করে জনগণের সাংবিধানিক অধিকার। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশী সংবিধান ও আইন অমান্যকারি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে সরকার ও সরকারি দল। যে কাজ আগে চোর-ডাকাত ও সন্ত্রাসীগণ করতো, সে কাজে নেমেছে খোদ সরকার ও সরকারি বাহিনীগুলি। বাংলাদেশের রাজপথ, প্রশাসন ও আদালতে সেটিরই প্রদর্শনী চলছে। ফলে সরকারি দলের গুন্ডাগণ যখন পুলিশের সামনে রামদা ও লাঠি হাতে নিরস্ত্র স্কুল ছাত্র-ছাত্রীদের উপর হামলা করে, পুলিশ তখন নীরবে দেখে। চোখের সামনে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের হামলা করতে দেখেও পুলিশ তাদেরকে গ্রেফতার করেনি। বরং পুলিশের কাজ ছিল, সরকারি দলের গুন্ডাদের সহায়তা ও নিরাপত্তা দেয়া। গুন্ডাদের বিরুদ্ধে পুলিশের নীরব ভূমিকা দেখে এ বিশ্বাসও অমূলক নয়, রামদা ও লাঠি হাতের গুন্ডাগুলি ছিল সিভিল পোষাকে পুলিশেরই লোক!  কায়রো ও দামস্কোর রাজপথে গুন্ডাবেশী পুলিশদের দেখা গেছে রাজপথে মিছিল থামাতে।

 

মৃত আইনের শাসন

সরকারের পক্ষ থেকে সংবিধানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হলে সেদেশে আইনের শাসন বাঁচে না। অথচ সভ্যদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কাজে সরকার ইঞ্জিনের কাজ করে। কিন্তু বাংলাদেশে আইনের শাসন কি এই, মাঝ রাতে একপাল পুলিশ গিয়ে একজন নিরস্ত্র মানুষকে হাইজ্যাক করতে হাজির হবে এবং তার ঘরের দরজা ভাঙ্গবে? এবং তারপর অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে তার উপর অত্যাচার করবে? অথচ সরকারের উপরের সবচেয়ে বড় দায়িত্বটি হলো জনগণের জানমাল ও ইজ্জতের হেফাজত। কিন্তু বাংলাদেশে হচ্ছে উল্টোটি। তাছাড়া সমস্যা শুধু পুলিশ বা রাজপথের গুন্ডাদের নিয়ে নয়; দুশ্চিন্তার কারণ, আদালতের বিচারকদের বিবেকশূণ্যতাও নিয়েও। সেটিও প্রকাশ পেয়েছে পুলিশের হাতে সদ্য গ্রেফতার হওয়া ফটো সাংবাদিক ড. শহীদুল আলমের সাথে বিচারকের আচরণে। আদালতের মেঝেতে বিচারক তাঁকে খোঁড়াতে দেখেছেন। গ্রেফতারের পর তাঁর উপর যে নির্মম নির্যাতন হয়েছে -তার আলামত ছিল সুস্পষ্ঠ। এক দিন পূর্বে যে ব্যক্তি সুস্থ্য ছিলেন, সে ব্যক্তি পুলিশের হাতে এক রাত থাকাতেই স্বাভাবিক ভাবে হাঁটতে পারছিলেন না। তিনি অন্যের ঘাড়ে ভর দিয়ে আদালতে আসেন। আশু চিকিৎসার জন্য বিচারক তাঁকে হাসপাতালে ভর্তির নির্দেশ দিয়েছেন।

কিন্তু হাসপাতালে পাঠালেই কি বিচারকের দায়িত্ব শেষ হয়? তাঁর উপর যে বর্বর জুলুম হয়েছে সেটির বিচার কে করবে? জুলুম যে হয়েছে -তার সাক্ষি তো বিচারক নিজে। সুতরায় তাঁর দায়িত্ব ছিল সুবিচার নিশ্চিত করা। অথচ বিচারে তিন কোন আগ্রহ দেখাননি। সেদিন আদালত প্রাঙ্গণে আইনকে মৃত দেখা গেছে। ফলে আদালত প্রাঙ্গণে এবং খোদ বিচারকের চোখের সামনে অপরাধ ঘটলেও বিচার জুটবে -সে সম্ভাবনা নেই। অথচ সুবিচার নিশ্চিত করাটি প্রতিটি বিচারকের সাংবিধানিক দায়িত্ব। যে কোন স্বৈর-সরকারের ন্যায় শেখ হাসিনাও চায়, জনগণ ততটুকুই বলবে যাতে সরকারের ভাবমুর্তির বিনষ্ট না হয়। এর অতিরিক্ত বললে তখন অভিযুক্ত রাষ্ট্রদ্রোহ রূপে। সদ্য গ্রেফতারকৃত ড. শহিদুল আলমের বিরুদ্ধে তো সরকার সে অভিযোগই এনেছে। সরকারের কাছে নিরস্ত্র শহিদুল আলম অপরাধী গণ্য হলেও, সশস্ত্র গুন্ডাগণ অপরাধী গণ্য হয়নি। কারণটি সুস্পষ্ট, গুন্ডাগণ ছাত্রছাত্রীদের পিটালেও তারা সরকারের শত্রু নয়। বরং গুন্ডাগণ চায় সরকারকে প্রতিরক্ষা দিতে।

 

প্রকল্পঃ চোর-ডাকাত প্রতিপালন ও নাশকতা

শেখ হাসিনার সৃষ্ট সংকট স্রেফ বর্বর স্বৈরশাসন বা গণতন্ত্রের বিনাশ নয়। তাঁর হাতে ভয়ানক নাশকতাটি ঘটেছে দেশের অর্থনীতির ক্ষেত্রে। সে নাশকতার মূলে হলো, তাঁর ও তাঁর দলের চোর-ডাকাত প্রতিপালন প্রকল্প। সিঙ্গাপুরের সাবেক প্রধানমন্ত্রী লি কোয়ান ইউ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট পার্ক চুঙ্গ হি স্বৈরশাসক ছিলেন। কিন্তু তাদেরকে কেউ চোর-ডাকাত বলে নাই। তাদের হাতে দেশের রাষ্ট্রীয় কোষাগার, সরকারি ব্যাংক, বাজেটের অর্থ বা শেয়ার মার্কেট লুণ্ঠিত হয়নি। তারা চোর-ডাকাতদের নিজ দলে আশ্রয় দিয়েছেন এবং চুরি-ডাকাতিতে তাদের প্রশ্রয় দিয়েছেন সে প্রমাণও নাই। ফলে তাদের আমলে দেশবাসীর কষ্টার্জিত সম্পদ বেঁচে গেছে লুণ্ঠন থেকে। ফলে দ্রুত সম্পদশালী হয়েছে সে দেশের জনগণ। ফলে সিঙ্গাপুরের নাগরিকদের মাথাপিছু আয় পৌঁছে গেছে ৫৭ হাজার ৭০০ ডলারে। দেশটি প্রতি বছর বিদেশে রপ্তানি করে ৩২৯.৭ বিলিয়ন ডলার। অপর দিকে দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতি বিশ্বের সর্ববৃহৎ রাষ্ট্র রাশিয়ার চেয়েও বৃহ

কিন্তু বাংলাদেশের চিত্রটি ভিন্ন। দেশটিতে স্বৈরশাসকের আশ্রয়ে ও প্রশ্রয়ে বেড়ে উঠেছে বিশাল এক পাল চোর-ডাকাত। তাদের হাতে লাগাতর ডাকাতি হচ্ছে জনগণের অর্থভাণ্ডারে। কোন গৃহে বার বার চুরি-ডাকাতি হলে কি সে গৃহের অর্থভাণ্ডারে কিছু বাঁকি থাকে? তখন সে গৃহের বাসিন্দাগণ তো অভাবে মারা পড়ে। সেটি ঘটে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের জনগণের বেলায়ও। বাংলাদেশে তো সেটিই হয়েছে। চোর-ডাকাতদের অবাধ লুণ্ঠনে ধ্বসে গেছে দেশের অর্থনীতির তলা। এতে রাষ্ট্রের সম্পদ রাষ্ট্রে না থেকে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। পত্রিকায় প্রকাশ, শেখ হাসিনার গত নয় বছর শাসনে সাড়ে ছয় লাখ কোটি টাকা পাচার হয়ে গেছে। ব্যাংকগুলির খেলাপি ঋণ ছাড়িয়ে গেছে এক লাখ কোটি টাকা। শেয়ারবাজার থেকে লুটপাট হয়ে গেছে আশি হাজার থেকে এক লাখ কোটি টাকা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে উধাও হয়েছে গেছে নব্বই মিলিয়ন ডলার। আরো খবর, বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টের সোনা তামা হয়ে গেছে। এবং উধাও গেছে কয়লা খনির এক লাখ ৪৪ হাজার মেট্রিক টন কয়লা। সরকারের ডিবি ও পুলিশ বাহিনীর লোকেরা রাতের আঁধারে হাজার হাজার শহীদুল আলমদের গ্রেফতার করে এবং তাদেরকে রিমান্ডেও নয়। কিন্তু যারা হাজার হাজার কোটি টাকা চুরি করেছে, তাদের কাউকে কি গ্রেফতার করেছে? এখানেই ধরা পড়ে সরকারের প্রায়োরিটি। চোর-ডাকাতগণ রাষ্ট্র ও জনগণের অর্থ চুরি করলেও সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে রাস্তায় নামে না। তারা দেশের শত্রু হলেও শেখ হাসিনার শত্রু নয়। ফলে তাদের গ্রেফতার করা ডিবি, RAB ও পুলিশ বাহিনীর এজেন্ডা নয়।

লক্ষ্যণীয় হলো, এতো চুরি-ডাকাতির পরও শেখ হাসিনার জৌলুস কমেনি, বরং দিন দিন তা বেড়েই চলেছে। রাষ্ট্রের খরচ বাঁচাতে পাশ্ববর্তী পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বানার্জি সরকারি প্রাসাদে উঠেননি। খরচ বাঁচাতে ইমরান খানও প্রধানমন্ত্রীর প্রাসাদে উঠছেন না। তিনি উঠছেন, প্রধানমন্ত্রীর দফতরের কর্মচারিদের স্টাফ কোয়ার্টারে। অথচ পত্রিকায় প্রকাশ, শেখ হাসিনার অফিসের বাৎসরিক খরচ বেড়ে তিন হাজার ২০০ কোটি টাকাতে পৌঁছেছে। একই অবস্থা ছিল মুজিব আমলে। তখন বিশ্বমাঝে বাংলাদেশ পরিচিতি পায় ভিক্ষার তলাহীন ঝুড়ি রূপে। তলাটি খসিয়ে দিয়েছিল শেখ মুজিবের ছত্রছায়ায় পালিত চোর-ডাকাতেরা। ফলে দেশের সম্পদ এবং সে সাথে বিদেশীদের দেয়া ত্রাণসামগ্রী দেশে থাকেনি, তলা দিয়ে বেরিয়ে প্রতিবেশী ভারতে গিয়ে উঠেছিল। আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশকে তলাহীন বলার প্রেক্ষাপট তো এটিই। সে লুটপাটের ফলে ধেয়ে এসেছিল ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ এবং তাতে মৃত্যু ঘটে বহু লক্ষ মানুষের। কিন্তু তাতে শেখ মুজিবের জৌলুস কমেনি। তিনি ছেলের বিয়ে দিয়েছেন সোনার মুকুট পড়িয়ে।

তবে এতো চুরি-ডাকাতির পরও মুজিবামলের ন্যায় দুর্ভিক্ষ না আসার কারণ, হাসিনা সরকারের কিরামতি নয়। সেটি হলো, বিদেশের শ্রম বাজার থেকে প্রায় এক কোটি প্রবাসী বাংলাদেশীর কষ্টার্জিত অর্থ এবং দেশের গার্মেন্ট ইন্ডাস্ট্রির বহু লক্ষ দরিদ্র শ্রমিকের হাড়ভাঙ্গা মেহনত। মুজিবামলে সে সুযোগটি ছিল না। চুরিডাকাতি না থাকলে বাংলাদেশ আজ সিঙ্গাপুর না হলেও দেশবাসীর জীবনে যে অনেক স্বাচ্ছন্দ আসতো তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে? পদ্মার সেতুর একটি নতুন পিলার বসানো হলে সেটির ছবি ফলাও করে পত্র-পত্রিকায় প্রকাশের ব্যবস্থা করা হয়। এভাবে বাজারে গুজব ছাড়া উন্নয়নের জোয়ারের। অথচ এ সত্যটি লুকানো হয়, সরকার দলীয় চোর-ডাকাতদের উপদ্রুপে বিশ্বব্যাংক তার অনুমোদিত ঋণ গুটিয়ে নিয়ে না ভাগলে আজ থেকে ৫ বছর আগেই কম খরচে পদ্মা সেতু নির্মিত হয়ে যেত। এবং ব্রিজের উপর দিয়ে গাড়ি চলতো। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং উচ্চতর সভ্যতার নির্মাণই শুধু নয়, অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথেও শেখ হাসিনার স্বৈর-সরকার যে কতবড় বাধা সেটি কি বুঝতে এরপরও কিছু বাঁকি থাকে? ১৩/০৮/২০১৮  Tweet:@drfmkamal; facebook.com/firozkamal

 




বিচারের নামে নগ্ন প্রতিহিংসা ও ষড়যন্ত্র

লক্ষ্য রাজনৈতিক শত্রুনিধন

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হাতে না থাকলে প্রতিপক্ষ নির্মূলে আওয়ামী লীগের কৌশল হয় অস্ত্র হাতে দলীয় কর্মীদের রাস্তায় নামানো। এ দলীয় সংস্কৃতি যে শুধু বাংলাদেশ আমলের তা নয়,পাকিস্তান আমলেও ছিল। পাকিস্তান আমল  আওয়ামী গুণ্ডাদের হামলায় বহু নিরীহ ও নিরস্ত্র মানুষ লাশ হয়েছেন। প্রমান,১৯৭০য়ের ১৮ই জানুয়ারিতে পল্টনে জামায়াতে ইসলামির জনসভা। বহু জনসভা পণ্ড হয়েছে এবং বহু মানুষ আহত হয়েছে ভাষানী ন্যাপ, মুসলিম লীগ ও অন্যান্য বিরোধী দলের। লাশ হয়েছে এমনি সংসদের ডিপুটি স্পীকার শাহেদ আলী। বাংলাদেশ সৃষ্টির পর তাদের শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতাই বাড়েনি,প্রবল ভাবে বেড়েছে সন্ত্রাসের ক্ষমতাও। ফলে বেড়েছে খুনের সংখ্যাও। একমাত্র মুজিব আমলেই খুন হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ। পিতার সে রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে শেখ হাসীনা শুধু দেশজুড়ে প্রতিষ্ঠাই করেননি, বরং বহুগুণে বৃদ্ধিও ঘটিয়েছেন। আর কোন কারণে না হোক, অন্ততঃ এ কারণে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের ইতিহাসে যুগ যুগ বেঁচে থাকবেন।

দলটির সশস্ত্র ক্যাডারদের হাতে সন্ত্রাসের ঘটনা এখন নিত্যদিনের ব্যাপার। তাদের হাতে এ যাবত বহু নিরীহ মানুষ লাশ হয়েছে,বহু বিরোধী দলীয় কর্মী গুম হয়েছে,বহুনারী ধর্ষিতা হয়েছে,এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাম্পাসে ধর্ষণে সেঞ্চুরিও হয়েছে। দলটির হাতে ক্ষমতা গেলে সমগ্র প্রশাসন তখন লাঠিয়ালে পরিনত  হয়। তাতে বাড়ে বিরোধী পক্ষের কোমর ভাঙ্গার সামর্থ। দলীয় লাঠিয়াল দিয়ে কিছু লোককে হত্যা বা পঙ্গু করা যায়। কিন্তু তাতে পুরা দলকে নির্মূল করা যায় না,আন্দোলনকেও হত্যা করা যায় না। সে জন্য চাই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা। চাই রাষ্ট্রের বিশাল পুলিশ বাহিনী। পুলিশের সাথে চাই আদালতের লাঠিও। একমাত্র রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হাতে পেয়েই শেখ মুজিব সকল বিরোধী দলকে রাতারাতি বিলু্প্ত করতে পেরেছিলেন। এবং দ্রুত নামিয়ে আনতে পেরেছিলেন ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটিই মুজিবী চেতনা। হাসীনা সে চেতনা নিয়েও ধাপে ধাপে এগিয়ে চলেছেন। ফ্রিডম পার্টি ও হিযবুত তাহরিরকে ইতিমধ্যেই বিলুপ্ত করেছেন, এখন হাত দিয়েছেন জামায়াতের নির্মূলে। এর পর নিশ্চয়ই হাত পড়বে বিএনপির উপর। মুজিবের বাকশালী চেতনা এভাবেই প্রতিষ্ঠা পাবে বাংলাদেশে। তাছাড়া যাকে তারা সর্বকালে সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী বলে বছরের প্রতিদিন ও প্রতিঘণ্টা মাতামাতি করে তাঁকে এবং তাঁর আরধ্য চেতনাকে আবর্জনার স্তুপে ফেলবেই বা কেমনে? বাংলাদেশের জন্য মহা বিপদের কারণ এখানেই।

 

সেয়ানা পিতার চেয়েও

তবে শেখ হাসিনা প্রমাণ করেছেন তিনি তাঁর পিতার চেয়েও সেয়ানা। মুজিব আমলে অন্ততঃ পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ন্যায় আর্মি অফিসারদের বিরুদ্ধে নির্মম হত্যাকাণ্ড হয়নি। আর্মী অফিসারদের লাশ হয়ে ড্রেনে পড়ে থাকতে হয়নি। অফিসারদের স্ত্রীদের ধর্ষিতাও হয়নি। পাকিস্তান থেকে ফেরা অফিসারদের রাজাকার বলে সেনাচাকুরি থেকে বরখাস্তও করা হয়নি। ইসলামী মৌলবাদের লেবেল এটে কাউকে বহিস্কারও করা হয়নি। শেখ মুজিব সেনা বাহিনীকে পৃথক রেখে আলাদা রক্ষিবাহিনী বানিয়েছিলেন। কিন্তু শেখ হাসিনা পুরা আর্মিকেই রক্ষিবাহিনী বানিয়ে ফেলেছেন। এক সিরাজ সিকদারকে হত্যার পর শেখ মুজিব কোথায় সিরাজ সিকদার বলে উল্লাস করেছেন। কিন্তু শেখ হাসিনার কর্মিবাহিনীতো পুরা যাত্রীভর্তি বাসে আগুণ দিয়ে আরোহীদের হত্যা করে উল্লাস করে। নির্যাতনের হাতিয়ার এখন আর শুধু দলীয় ক্যাডার বা রক্ষিবাহিনীর সেপাইরা নয়, বরং সমগ্র থানা-পুলিশ,র‌্যাব, কোর্ট, প্রশাসন ও শত শত সরকারি উকিল। এক বিশাল রাষ্ট্রীয় শিল্পে পরিনত হয়েছে বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা খাড়া করা ও তাদেরকে রিমাণ্ডে নিয়ে নৃশংস নির্যাতন করা। বিচার বিভাগের অন্যতম গুরু দায়িত্ব হয়েছে,থানা-পুলিশের হাত থেকে আওয়ামী লীগের কর্মীদের রক্ষা করা এবং গ্রেফতাকৃতদের উপর থেকে সকল প্রকার মামলা তুলে নিয়ে সত্বর মুক্তি দেয়া।

 

বিচারের নামে প্রহসন

আওয়ামী জোট সরকার একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনালের নামে বিচার শুরু করেছে। বিচারের নামে বাংলাদেশের মাটিতে যে কতটা অবিচার হতে পারে তা হলো যুদ্ধাপরাধীর এ বিচার। লক্ষ্য করার বিষয় হলো, বিচারের কাজ সম্প্রতি শুরু হলেও অভিযুক্তদের উপর নিদারুন শাস্তি শুরু হয়ে গেছে প্রায় দুই বছর আগে থেকেই। বিচার নিছক বাহানা, মূল লক্ষ্য যে রাজনৈতিক বিপক্ষ নেতাদের রাজনীতির অঙ্গন থেকে সরিয়ে দেয়া সেটি বুঝতে কি বেশী বিদ্যাবুদ্ধি লাগে? বিচারের নামে বাংলাদেশে যে কত কুৎসিত অভিনয় হতে পারে এবং সরকার যে কতটা প্রতিহিংসা পরায়ণ হতে পারে সেটিই এখন বিশ্ববাসী দেখছে। যে কোন আবিস্কারে মেধা লাগে। যে কোন খেলায় কৃতিত্ব দেখাতে প্রতিভা লাগে। কিন্তু কুৎসিত অভিনয়ে সে প্রতিভা লাগে না। বাংলাদেশের সরকার আজ সে কুৎসিত পথেই পা বাড়িয়েছে। বিদেশী পত্রপত্রিকায় এনিয়ে লেখালেখিও শুরু হয়ে গেছে। এ্যামনেস্টি ইন্টারনেশনালসহ বিশ্বের বহু মানবাধিকার সংস্থা ইতিমধ্যে তাদের গভীর অসন্তোষও জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিনামা আইনজ্ঞরা এ বিচার নিয়ে প্রচণ্ড আপত্তি তুলেছে। কিন্তু তা নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতাদের ভ্রুক্ষেপও নাই। অন্যদের সহিংস নির্মূল যাদের রাজনীতির মূলনীতি তাদের মাঝে কি কোন মূল্যবোধ,নীতিবোধ ও সুবিচার থাকে? যাত্রী ভর্তি বাসে পেট্রোল ঢেলে আগুণ দেয়া, বিনা বিচারে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হতা করা বা সরকারি সম্পদ লুণ্ঠন করা রাজনীতিতে গুরুত্ব পায় তো এমন নীতিহীনতার কারণেই। ডাকাত পাড়ায় এজন্যই কোন বিচার বসে না। বরং কোথায় নতুন ডাকাতি করা যায় তা নিয়ে বসে ষড়যন্ত্রের আসর।। তাই আওয়ামী লীগের মূল ব্যস্ততা জামায়াতে ইসলামী বা বিএনপির কাকে কিভাবে হাজতে তোলা যায় বা নির্মূল করা যায় তা নিয়ে। দুর্বৃত্তিতে বিশ্বে পাঁচবার প্রথম হওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ললাটে ইতিমধ্যেই বিশাল অপমান জুটেছে। এবার আরেক অপমান জুটতে যাচ্ছে বিচারের নামে প্রহসনমূলক প্রকাণ্ড নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার মধ্য দিয়ে। যে দুর্বৃত্তির জোয়ারে রাজনীতি ও প্রশাসন ইতিমধ্যে ডুবে গেছে সেটি এখন ডুবাতে যাচ্ছে আদালতকেও।

 

বিশ্বাসঘাতকতা যেখানে দলীয় সংস্কৃতি

যে কোন সরকারের প্রধান দায়িত্ব হলো ন্যায় বিচারের প্রতিষ্ঠা। জনগণ সরকার থেকে ভাত-কাপড় বা ঘরবাড়ি চায় না। জনগণ সে দায়িত্ব নিজ কাঁধে নেয়। কিন্তু আদালত বসানোর সামর্থ জনগণের থাকে না। প্রতিদেশে সে সামর্থ থাকে একমাত্র সরকারের। কিন্তু সে দায়িত্ব পালনে আওয়ামী লীগ সরকারের কোন রুচি নাই, আগ্রহও নাই। দেশে প্রতিদিন বহু মানুষ খুন হচ্ছে। দুর্বৃত্তদের হাতে দখল হয়ে যাচ্ছে সরকারি জমি, সরকারি টেণ্ডার,রাস্তার গাছ,বনভূমি,নদীর তীর,সমুদ্রসৈকত। কিন্তু সেসব দুর্বৃত্তদের ক’জনকে ধরেছে সরকার? ক’জনকে এপর্যন্ত শাস্তি দিয়েছে? বরং আওয়ামী সরকারের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে ন্যায় বিচারের পথকে সম্ভাব্য সকল ভাবে প্রতিহত করা। শেখ মুজিব গণতন্ত্রের কথা বলে ভোট নিয়েছিলেন,কিন্তু সরকার হাতে পাওয়ার পর গণতন্ত্রকে কবরে পাঠিয়েছিলেন;প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন বাকশালী স্বৈরতন্ত্র। উচ্চকণ্ঠে বাকস্বাধীনতার কথা বলতেন,তবে সেটি নিছক নিজের জন্য। জনগণের জন্য নয়। তাঁর ভাণ্ডারে বিরোধী দলের জন্য গণতন্ত্র ছিল না,বাকস্বাধীনতাও ছিল না। ফলে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকেই শুধু নয়,বিরোধী পত্রিকাগুলোকেও তিনি নিষিদ্ধ করেছিলেন। তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে কাউকে কথা বলার অধিকার যেমন দেননি,তেমনি লেখার অধিকারও দেয়নি। এমন এক শ্বাসরুদ্ধকর স্বৈরাচারি শাসন ব্রিটিশ আমলে যেমন ছিল না,পাকিস্তান আমলেও ছিল না। পাকিস্তান আমলকে উপনিবেশিক শত্রু শাসন রূপে চিত্রিত করা হয়। অথ সে আমলে আওয়ামী লীগই শুধু ষোলকলায় বেড়ে উঠেনি,বেড়ে উঠেছিল তাদের দলীয় পত্রিকা ইত্তেফাকও। পাকিস্তান আমলে আওয়ামী লীগের ছাড়াও বহু দল ছিল,বহু পত্রিকাও ছিল। কিন্তু সবই কেড়ে নিয়েছিল মুজিব। বাংলার ইতিহাসে এ এক বর্বরতার যুগ। কিন্তু আজ  সে বর্বরতার নায়কই আওয়ামী মহলের সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা। ফলে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের কথা তারা শিখবে কোত্থেকে? এই যাদের বিবেকের মান তাদের থেকে কি ন্যায় বিচার আশা করা যায়? ন্যায় বিচার ও আইনের শাসনের কথা শেখ মুজিবও বলতেন। অথচ কারারুদ্ধ সিরাজ সিকদারকে হত্যা করে পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে তিনি খোশ মেজাজে বলেছেন কোথায় আজ  সিরাজ সিকদার? কথা হলো মানুষ খুনের পর এমন দম্ভোক্তি ডাকাত পাড়ায় শোভা পেলেও পার্লামেন্টেও কি শোভা পায়? মুজিবামলে তাঁর দল, সরকার ও সংসদ যে কতটা বীভৎস ডাকাত পাড়ায় পরিণত হয়েছিল এ হলো তার প্রমাণ। তাঁর আমলে জেলের মধ্যে প্রাণ হারাতে হয়েছে প্রখ্যাত মুসলিম লীগ নেতা ফজলুল কাদের চৌধুরিকে।

নিজ প্রতিশ্রুতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা শুধু শেখ মুজিবের একার নীতি নয়,সেটি আজও  আওয়ামী লীগের দলীয় নীতি। দলটির বর্তমান বিশ্বাসঘাতকতা শুধু তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রথার সাথেই নয়,ন্যায় বিচারের সাথেও। মুখে আইনের শাসনের কথা বললেও তারা আইনের শাসনকে অসম্ভব করে তুলেছে। সেটি তারা প্রমাণ করেছে, বিচারবহির্ভূত শত শত নাগরিকের হত্যার মধ্য দিয়ে। কথা হলো, বিচার বর্হিভূত হত্যা কি কোন সভ্য দেশে সরকারের হাতে ঘটে? সেটি তো সন্ত্রাসী ডাকাতদের কাজ। ন্যায় বিচার কখনই অভিযুক্ত মানুষের দলীয় পরিচয় দেখে না। বর্ণ,গোত্র,পরিবার বা ভাষাগত পরিচয়টিও দেখে না। দেখে তার অপরাধকে। কিন্তু আওয়ামী লীগ যে বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে সে বিচারে অভিযুক্তদের দলীয় পরিচয়টি বড় করে দেখা হয়। আওয়ামী লীগ সেটি প্রমাণ করেছে বহু হত্যা মামলায় অভিযুক্ত নিজদলীয় আসামীদের মূক্ত করার মধ্য দিয়ে। প্রমাণ করেছে ফেনীর জয়নাল হাজারী,ঢাকার ডাক্তার ইকবাল, নোয়াখালির আবু তাহের এবং নারায়নগঞ্জের শামীম উসমানের মত শত শত সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা তুলে নিয়ে। প্রশ্ন হলো,যারা র‌্যাব,পুলিশ ও নিজ দলীয় ক্যাডারদের দিয়ে শত শত নাগরিককে বিচার ছাড়াই হত্যা করাতে পারে,তারা কি ন্যায় বিচারে আগ্রহী হয়? বরং তারা যে বিচারের নামে বিরোধী দলীয় কর্মীদের বছরের পর বছর বিনা বিচারে গ্রেফতার করে রাখবে,পুলিশী রিমাণ্ডে দিয়ে অমানুষিক নির্যাতন চালাবে এবং ন্যায়বিচারকে নানা ভাবে বাধাগ্রস্ত করবে –সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? বাংলাদেশে এখন তো সেটিই হচ্ছে।

 

আদালত যেখানে রাজনীতির হাতিয়ার

স্বৈরাচারি সরকারের হাতিয়ার শুধু দলীয় কর্মী,দেশের পুলিশ ও প্রশাসনই নয়, নির্যাতনের আরেক হাতিয়ার হলো আদালত। সরকার তার রাজনৈতিক শত্রুদের শুধু রাস্তাতে বা বদ্ধ ভূমিতেই হত্যা করে না, ফাঁসীতে ঝুলিয়েও হত্যা করে। সরকার যখন স্বৈরাচারি বা ফাসিস্ট হয় তখন তেমন ঘটনা ঘটে আরো ব্যাপক ভাবে। তখন শুধু জনগণই ক্ষমতা হারায় না,ক্ষমতা হারায় আদালতের বিচারকগণও। রাজনৈতিক প্রয়োজনটাই তখন বড় হয়ে দেখা দেয়, ন্যায় বিচার নয়। এমনই এক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জার্মানীতে বহু লক্ষ ইহুদীদের গ্যাস চেম্বারে হত্যা করা হয়। তখন সে হত্যাকাণ্ড নিয়ে কোন বিচার হয়নি। বিচারকদের ন্যায়বিচার মুখি হতেও দেয়া হয়নি। অথচ বিনা বিচারে কাউকে হত্যা করা কোন সভ্য দেশের রীতি নয়। এটি তো পশুদের রীতি। কিন্তু বাংলাদেশে সেটিই এখন সরকারি রীতি। সরকারে হাতে এখানে গ্যাস চেম্বার নেই, কিন্তু আছে র‌্যাব ও পুলিশ। আছে বিশাল দলীয় ক্যাডার বাহিনী। একই লক্ষ্যে মুজিব আমলে ছিল বিশাল রক্ষিবাহিনী। সে সময় হাজার হাজার রাজনৈতিক কর্মীকে রক্ষিবাহিনীর হাতে প্রাণ দিতে হয়েছিল। মুজিব সরকার তাদেরকে অপরাধী বলতো। কিন্তু সে অপরাধ প্রমাণ করতে কোনদিন একমুহুর্তের জন্যও কোথাও বিচার বসেনি। আদালতে না পাঠিয়ে তাদেরকে বধ্যভূমিতে রক্ষিবাহিনীর হাতে তুলে দেয়া হত। এটিই ছিল মুজিবী নীতি।

আওয়ামী লীগ ভোট নেয় জনগণের সার্বভৌমত্বের কথা বলে,অথচ সর্বত্র কায়েম করে দলীয় নেতা বা নেত্রীর সার্বভৌমত্ব। মুজিব আমলে সে সার্বভৌমত্ব ছিল একমাত্র শেখ মুজিবের। আর এখন সেটি শেখ হাসিনার। নিজস্বার্থের হেফাজতে এসব স্বৈরাচারিরা শুধু বিচারকদেরই নিয়োগ দেয় না,ঠিক করে দেয় ন্যায় বিচারের সংজ্ঞাও। তাদের দৃষ্টিতে ন্যায় বিচার তো তাই,যা তাদের মনঃপুত,এবং যা হেফাজত করে তাদের দলীয় স্বার্থ। তাদের বিচারে প্রচণ্ড অবিচার রূপে চিত্রিত হয় নিজ দলীয় খুনি ও ডাকাতদের জেলে রাখা বা তাদের বিচার করা। তেমন এক চেতনা নিয়েই শেখ হাসিনা শুধু তাঁর নিজের ও নিজ দলীর কর্মীদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত দুর্নীতির মামলাই তুলে নেয়ার ব্যবস্থা করেননি,নিজ দলীয় খুনিদেরও জেল থেকে মুক্ত করার ব্যবস্থা করেছেন। বিচারমন্ত্রলায় এবং স্বরাষ্টমন্ত্রনালয়ের উপর বেঁধে দেয়া বড় দায়িত্বটি হলো বিরোধী দলীয় কর্মীদের সায়েস্তা করা। ফলে দেশে খুন, সন্ত্রাস, লুটতরাজ বাড়লে কি হবে, জেলগুলো ভরা হচ্ছে রাজনৈতিক কর্মীদের দিয়ে। কয়েক লক্ষ মামলা দেশের আদালতগুলোতে বিচারের অপেক্ষায় ঝুলছে,কিন্তু বিচার বসেছে একাত্তরে কারা পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল তা নিয়ে। কারণটি বুঝা সহজ। খুনি, সন্ত্রাসী, ধর্ষণকারি ও চোর-ডাকাত জনগণের শত্রু হলে কি হবে, তারা আওয়ামী লীগের শত্রু নয়। ফলে তাদের নিয়ে দ্রুত বিচারের আগ্রহও তাদের নেই। একই অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল মুজিবামলেও। সে সময়ও অপরাধীদের দিক থেকে নজর ফিরিয়ে নজর দেয়া হয়েছিল রাজনৈতিক শত্রুদের নির্মূলে। ফলে রাস্তাঘাট নগর-বন্দর ও গ্রামগঞ্জ দখলে গিয়েছিল দুর্বৃত্তদের হাতে। আদালত সে সময় স্রেফ পাকিস্তানের পক্ষ নেয়ার অপরাধে যাবত জীবন কারাবাসের সাজা শুনিয়েছিল। কিন্তু যারা অবাঙালী ও পাকিস্তানপন্থিদের হত্যা ও তাদের ঘরবাড়ি, দোকানপাঠ, ও কলকারখানা জবর দখল করেছিল তাদের বিচার করেনি। বরং এ ভয়ংকর অপরাধীদের পুরস্কৃত করেছিল লুটকরা সম্পদ ও ঘরবাড়ির উপর অন্যায় দখলদারিকে আইনগত বৈধতা দিয়ে। শুধু তাই নয়, মুজিব সরকার অধ্যাপক গোলাম আযম, মা্ওলানা আব্দুর রহিম, জনাব খাজা খয়েরউদ্দীনসহ বহুনেতার নাগরিকত্বও কেড়ে নিয়েছিল। অথচ নাগরিকত্ব কেড়ে নিলে সে ব্যক্তি এ পৃথিবীতে রাষ্ট্রহীন হয়। নাগরিকত্ব কোন সরকারের দান নয়, বাংলাদেশের ১৬ কোটি নাগরিক তাদের নাগরিকত্ব পেয়েছে কোন সরকারের করুণার কারণে নয়। বরং সেটি পেয়েছে মহান আল্লাহতায়ালার ইচ্ছা মাফিক বাংলাদেশে জন্ম নেয়ার কারণে।

কিন্তু আওয়ামী লীগ মহান আল্লাহতায়ালার পরিকল্পনা এবং তাঁর ইচ্ছা-অনিচ্ছা নিয়ে খুশি নয়। যেমন তারা খুশি নয় তাঁর শরিয়তি আইনের অস্তিত্ব ও প্রতিষ্ঠা নিয়ে। তারা তো চায় নিজেদের দলীয় ইচ্ছার প্রতিষ্ঠা নিয়ে। নিজেদের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দীদেরকে রাজনীতির অধিকার দেয়া দূরে থাক, তাদেরকে তারা বাংলাদেশে বেঁচে থাকার অধিকার দিতে রাজীও নয়। দেশের সুপ্রিম কোর্ট জনাব গোলাম আযমকে নাগরিকত্ব দিয়েছিল। আওয়ামী ঘরানার উকিল সে সময় অভিযোগ এনেছিল, জনাব গোলাম আযম যুদ্ধাপরাধী এবং সে কারণে তাকে নাগরিকত্ব দেয়া যাবে না।। কিন্তু আদালতে সে অভিযোগ সেদিন টিকেনি। কিন্তু আওয়ামী লীগ আদালতের সে রায়ে খুশি হয়নি। তাই তারা আবার তাঁকে আদালতে তুলেছিল। এবার তারা আদালতকেই নতুন ভাবে সাঁজিয়েছে। অথচ সভ্য দেশের রীতি ভিন্ন। কোন নাগরিক অপরাধ করলে সেখানে আদালতে তার শাস্তি হয়,কিন্তু তার নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়া হয় না। এমন কি যারা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরে তাদেরও নয়।আওয়ামী লীগ নিজেও সেটি অন্যদের বিরুদ্ধে করছে না। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যে হাজার হাজার চাকমা ভারতের মদদে যুদ্ধ করেছিল তাদের কারো নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়া হয়নি। তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের মামলাও হয়নি। অথচ চাকমা বিদ্রোহীদের হাতে মৃত্যু ঘটেছে বহু শত সামরিক ও অসামরিক নাগরিকের। আওয়ামী লীগের বিচারে কারা দলের শত্রু সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। কে দেশের শত্রু সেটির গুরুত্ব তাদের কাছে নাই। শেখ হাসিনা জানে, বিদ্রোহী চাকমাগণ বাংলাদেশের শত্রু হলেও আওয়ামী লীগের নয়। ফলে তাদের সাথে সন্ধি করতে তাদের আপত্তি নাই। জামায়াতের নেতাকর্মীগণ বাংলাদেশকে মেনে নিলে কি হবে,তারা তো আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক শত্রু। এটিই জামায়াতের মূল অপরাধ। তাই বিচারের নামে জামায়াতে ইসলামীর নির্মূল করাটা তাদের কাছে এতটা গুরুত্বপূর্ণ। জামায়াতের নির্মূলটা যে তাদের কাছে কত গুরুত্বপূর্ণ সেটি বুঝা যায় তাদের নেতা-কর্মী ও বুদ্ধিজীবীদের রাজপথের শ্লোগানে এবং পত্রপত্রিকায় তাদের লিখনীতে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে এ অবধি যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দাবী কখনই ন্যায়-বিচার নয় বরং ফাঁসীর। বিচারে রায়টি কীরূপ হবে সে সিদ্ধান্তু নেয়ার দায়িত্ব যেন তাদের। আদালতের কাছে তাদের একমাত্র দাবী, রাজপথের সে ফাঁসীর দাবিটি আদালতের রায়েও ঘোষিত হোক এবং সত্বর কার্যকর করা হোক। তাদের আরো দাবী, আদালত সেটি নিশ্চিত করতে না পারলে গ্রেফতারকৃত নেতাদের তাদের হাতে তুলে দেয়া হোক। বিচার তখন তারা নিজেরাই করবে।

আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও বুদ্ধিজীবীদের মন যে কতটা বিষপূর্ণ ও প্রতিহিংসাপূর্ণ সম্প্রতি সেটির প্রকাশ ঘটেছে দলটির এক সংসদ সদস্য ও কলাম লেখক নুরুল ইসলামের লেখনীতে। ২১শে জানুয়ারীর যুগান্তরে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে তিনি জামায়াত নেতা অধ্যাপক গোলাম আযমের বিচার নিয়ে আদালতের কাছে দাবী জানিয়েছেন, “বিচারের নামে মাফ নয়,ফাঁসীর বিচার চাই”। ভদ্রলোকের যুক্তি,ফাঁসী না হলে বুঝতে হবে সঠিক বিচার হয়নি, তাঁকে মাফ করে দেয়া হয়েছে। সঠিক বিচার নিয়ে এ হলো ভদ্রলোকের ধারণা। যেদেশে এভাবে বিচার বসে রাজপথে, উদ্যানে এবং পত্র-পত্রিকার রাজনৈতিক কলামে সে দেশে বিচারকগণ কি ন্যায় বিচার করতে পারেন? ন্যায়বিচারে কি তাদের রুচি থাকে? বিচারকগণ অতিমানব বা মহামানব নন। অন্যদের ন্যায় তাদেরও আবেগ আছে,স্বার্থপরতা আছে,রাজনৈতিক বিশ্বাসও আচ্ছে। সে সাথে নিজের ও নিজ পরিবারের নিরাপত্তার চিন্তাও আছে। আবেগ ও গুজবের স্রোতে শুধু সাধারণ মানুষই ভাসে না,তারাও ভাসেন। তাই বিচারাধীন মামলা নিয়ে কোন সভ্যদেশের রাজপথে,পত্রিকায় বা উদ্যানে কেউ নিজের রায় শুনায় না। এটি আইন-বিরুদ্ধ কাজ। অথচ সে আইনবিরুদ্ধ কাজটিই বাংলাদেশে রীতি। রায় শুনানো হয় রাজপথে,জনসভায় ও পত্রিকার পাতায়। রাজপথের রায় তখন আদালতে প্রবেশ করে। বিচারকগণ তখন চাপের মুখে থাকে। আওয়ামী লীগ ন্যায় বিচারকে অসম্ভব করছে মূলত এভাবেও।

 

মেঠো আদালত থেকে আদালত

মাঠে ময়দানে গরু-ছাগল বা আলু-পটল বিক্রির বাজার বসানো যায়, কিন্তু আদালত বসানো যায় না। কারণ আদালতের কাজ গরু-ছাগল বা আলুপটলের ক্রেতা-বিক্রেতার হাক-ডাকের বিষয় নয়। আদালতে বিচার বসে দিনের পর দিন ধরে। সেখানে হাকডাক বা শ্লোগানের দাম নাই। নিরপেক্ষ ভাবে সবকিছুর সেখানে গভীর বিবেচনা হয়। কিন্তু আওয়ামী লীগের কাছে বিচার হলো ময়দানে গরু-ছাগল ও আলু-পটল বিক্রির বাজার। তাই তারা আদালত বসিয়েছিল ঢাকার সহরোয়ার্দী উদ্যানে। কোন সভ্য দেশে এমন আদালত বসানোর নজির নেই। কিন্তু বাংলাদেশ সে নজির স্থাপন করেছে। কোন আবিস্কারে নয়, অনাসৃষ্টিতে মানবতাশূন্য মগজ যে কতটা উর্বর এ হলো তার নজির। এমন লোকদের কাছে শাপ-শকুন ও মাটির মূর্তিও দেবতার মর্যাদা পায়। স্বৈরাচারি খুণিও সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালীর মর্যাদা পায়। বাংলাদেশে সরকার,বুদ্ধিবৃত্তি ও আদালত যে কাদের হাতে জিম্মি সেটি কি এর পরও বুঝতে বাঁকি থাকে? ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি সহরোয়ার্দী উদ্যানে যে আদালত বসিয়েছিল সে আদালতের একজন উকিল এখন বর্তমান যুদ্ধাপরাধ ট্রাইবুনালের বিচারক। সহরোয়ার্দি উদ্দানের গণআদালতে মহা উল্লাসে যারা অধ্যাপক গোলাম আযমসহ বহুব্যক্তির ফাঁসীর রায় শুনিয়েছিলেন,তিনি তাদেরই একজন।। ফলে লক্ষ্য পরিস্কার। যে লক্ষ্য নিয়ে সোহরোয়ার্দী উদ্যানে গণআদালত বসেছিল সে লক্ষ্য নিয়েই এখন ঢাকার পুরোনো হাইকোর্ট বিল্ডিংয়ে ট্রাইবুনাল বসেছে। সেদিন তারা রায় শুনিয়েছিলেন, কিন্তু সে রায় কার্যকর করতে পারেননি। কারণ তাদের হাতে তখন রাজনৈতিক ক্ষমতা ছিল না। কিন্তু এখন মাঠের সে ঘাদানিকগণ দেশের ক্ষমতা হাতে পেয়েছে। ফলে ফন্দি এঁটেছে, গণআদালতের সে ফাঁসীর রায় ট্রাইবুনালের হাত দিয়ে কার্যকর করে ছাড়বেন। আওয়ামী সংসদ সদস্য জনাব নুরুল ইসলাম তার প্রবন্ধে যুক্তি দেখিয়েছেন, জামায়াত নেতারা একাত্তরে স্বাধীন বা্ংলাদেশ প্রতিষ্ঠার বিরোধীতা করে এদেশে বসবাসের অধিকার হারিয়েছে। বুঝাতে

প্রশ্ন হলো, জনাব নুরুল ইসলামের এরূপ কথার মধ্যে কি মানবতার নামগন্ধ আছে? স্বাধীনতা আন্দোলন কালে প্রতিদেশেই প্রচুর বিরোধ থাকে। একই দেশ, একই আলোবাতাস ও একই জলবায়ুতে বসবাস করেও সবাই একই ভাবে দেশের মানচিত্রকে গড়তে চায় না। স্বাধীনতার স্বপ্নও সবাই একই ভাবে দেখে না। তার অর্থ এই নয় যে তারা দেশের শত্রু। বাংলার বুকে প্রথম স্বাধীনতা এসেছিল ১৯৪৭য়ে। তখন বাংলার মুসলমানদের কাছে স্বাধীনতা ছিল পাকিস্তানভূক্তির মধ্যে। আর হিন্দুরা সে স্বাধীন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিরোধীতা করেছিল। সে আন্দোলন কালে বহু হাজার মুসলমান হিন্দু গুণ্ডাদের হাতে মারাও গিয়েছিল। মুসলমানের রক্তে কলকাতার রাস্তায় স্রোত বয়েছিল। আগুণ দেয়া হয়েছিল মুসলিম মহল্লায়। ধর্ষিতা হয়েছিল মুসলিম নারী। কিন্তু ১৯৪৭য়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর লক্ষ লক্ষ হিন্দু পাকিস্তানে থেকে যায়। পাকিস্তানের বিরোধীতাকারী কংগ্রেসী নেতাদের কি সেদিন আসামীর কাঠগড়ায় তোলা হয়েছিল? বিলুপ্ত হয়েছিল কি তাদের পাকিস্তানে বসবাসের অধিকার? তাদের কাউকে কি সেদিন ফাঁসীতে ঝুলানো হয়েছিল? বরং ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ও মনরঞ্জন ধরের ন্যায় কংগ্রেসী নেতারা সেদিন পাকিস্তানের সংসদে বসেছেন। ভোগ করেছেন পুরা নাগরিক অধিকার।

 

বিচারের মান কি আন্তর্জাতিক?

প্রশ্ন হলো, যুদ্ধাপরধীদের বিচারে গঠিত ট্রাইবুনালটির মান কি আন্তর্জাতিক? ট্রাইবুনালের সকল বিচারকই বাংলাদেশী। উকিলগণও বাংলাদেশী।কোর্টের কেরানী, পেশকার এবং আর্দালীরাও বাংলাদেশী। বিচার বসেছে ঢাকার একটি কোর্ট বিল্ডিংয়ে। এ আদালতে আসামীর পক্ষে লন্ডন থেকে ব্যারিস্টার যোগ দিতে চেয়েছিল, কিন্তু তাকে সে অধিকার দেয়া হয়নি। ফলে কোন বিচারে এটি আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনাল? আন্তর্জাতিক তো তখনই হয় যখন তারা সাথে একাধিক জাতির নাগরিক যুক্ত হয়। আদালতের নামকরণেই যাদের এত অবিচার তারা কিসের সুবিচার করবে? তাছাড়া বিচার প্রক্রিয়াও কি আন্তর্জাতিক মানের? সভ্যদেশে আদালত শুধু বাদীকেই বিচার লাভের অধিকার দেয় না, আসামীকেও ন্যায় বিচার লাভের অধিকার নেয়। নইলে অসম্ভব হয় ন্যায়-বিচার। আসামীর অধিকারটি হলো, পুলিশ তার বিরুদ্ধে কি অভিযোগ করলো, তদন্তের নামে কি রিপোর্ট দাখিল করলো সেটি জানার। সেটি না জানলে আসামী আদালতে তার জবাবী ব্ক্তব্য রাখবে কি করে? কিন্তু আদালত সে অধিকার মাওলানা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীকে দেয়নি। তার উকিল কোর্টে আরজি পেশ করেও পুলিশের তদন্ত রিপোর্টের কপি পাননি। এটি কি ন্যায় বিচারের নীতি? তাছাড়া বিশ্বের প্রতি আদালতে আপিলের সুযোগ থাকে, কিন্তু এ আদালতে সে সুযোগ রাখা হয়নি। ফলে বুঝা যায়, এখানে লক্ষ্য ন্যায়-বিচার নয়, বরং অন্যকিছু।

আদালতের বিচারকদের যোগ্যতা ও ন্যায়-বিচার নিয়ে আসামীর সন্দেহ বা অভিযোগ থাকলে তার স্থলে অন্য বিচারক লাভের অধিকারটি বিশ্বে স্বীকৃত। কিন্তু তা স্বীকৃতি পায়নি এ আদালতে। বিচারকের অদক্ষতায় বা পক্ষপাতিত্বে বড় ক্ষতিটি হয় আসামীর।সে ভূলে তার প্রাণও যেতে পারে,বা আজীবন কারাবাসও হতে পারে। তাতে সরকারের কোন ক্ষতি হয় না। ফলে বিচারকের যোগ্যতা নিয়ে আসামীর সন্দেহ দূর করাটি আদালতের দায়িত্ব। সেটি সরকারের দায়িত্বও। কিন্তু সে অধিকার এখানে আসামীদের দেয়া হয়নি। দাবী উঠেছিল,ঘাতক দালাল নির্মূলের রাজনীতির সাথে সক্রিয় ভাবে যারা জড়িত এমন ব্যক্তিদের বিচারকের পদ থেকে সরানো হোক। দেশে আদালত থাকতে গণআদালত কোন সভ্য সমাজের রীতি নয়। গণআদালত বসানোর অর্থ,আইনকে নিজ হাতে তুলে নেয়া। কোন সভ্যদেশের সরকারই এভাবে আদালতের কাজকে নিজ হাতে তুলে নেয়ার অধিকার কাউকে দেয় না। দেশের সংবিধান ও আইন-আদালতের বিরুদ্ধে এটি শুধু অবমাননাই নয়,সুস্পষ্ট বিদ্রোহ। তাই এটি শাস্তিযোগ্য মহা অপরাধ। অথচ গণআদালতের আয়োজকগণ সেটিই করেছিল। এমন বিদ্রোহের সাথে জড়িত ব্যক্তির বিচার-বিবেচনার সামর্থ ও নৈতিক সুস্থ্যতা নিয়ে সন্দেহ জাগাটাই বরং স্বাভাবিক। অথচ সে বিদ্রোহের সাথে যারা জড়িত ছিল তাদেরই একজনকে এ ট্রাইবুনালের বিচারক করা হয়েছে। আদালতে এমন বিচারকের অংশগ্রহনের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড আপত্তি উঠলেও আদালত তা শুনেনি। অথচ বিচারকের বিচারবোধ ও নৈতিক সুস্থ্যতা নিয়ে বিচারপ্রার্থির পক্ষ থেকে আপত্তি উঠার প্রেক্ষিতে তাকে সরিয়ে অন্য বিচারক দেয়া যেত। দেশে বিচারকের অভাব ছিল না। কিন্তু ইচ্ছা করেই সেটি করা হয়নি। এখানে অভাব বিচারকের নয় বরং নিরপেক্ষ বিচারবোধের।

 

আলামত আমূল বিপ্লবের

আওয়ামী লীগ নিজ দলের জোয়ার দেখেছে, ভাটাও দেখেছে। কিন্তু কোন শিক্ষাই নেয়নি। পঁচাত্তরে শেখ মুজিব মারা গেলেও আওয়ামী লীগ বেঁচে গিয়েছিল। কিন্তু এবার টান পড়ছে আওয়ামী লীগের নিজের অস্তিত্ব নিয়ে। কারণ,দেশে এখন ভয়ানক বিপর্যয়ের মুখে। এ বিপর্যয়ের মূল কারণ শুধু শেখ হাসিনা নয়, বরং খোদ আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ বেঁচে থাকলে শেখ হাসিনারা নানা নামে বার বার ক্ষমতায় আসবে। মানুষ সেটি বুঝতে শেখেছে। আওয়ামী লীগ এখন বাংলাদেশের জন্য দেশধ্বংসি সুনামী। দেশের স্বার্থের চেয়ে ভারতের স্বার্থের প্রতি এদলের নেতাদের অধিক অঙ্গিকার। ভারতের চাইতেও তারা বেশী ভারতীয়। সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষিদের হাতে বাংলাদেশী যুবক নৃশংস অত্যাচারের শিকার হলে ভারতীয় পত্রিকায় তা নিয়ে প্রতিবাদ উঠেছে। ইংরেজী দৈনিক “হিন্দু” এ নিয়ে ভারত সরকারকে মাফ চেতে বলেছে। কিন্তু মুখে তালা লাগিয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। তাদের মুখে এ নিয়ে কোন নিন্দাধ্বনি নেই। জমিদারের জঘন্য অপরাধ স্বচোখে দেখেও গোলাম তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে না। কারণ সে সাহস তার থাকে না। তেমনি অবস্থা শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকারের।

চাল-ডাল-চিনিসহ সকল নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিষের দাম এখন আকাশচুম্বি। লক্ষ লক্ষ শিক্ষিত যুবক এখন বেকার। ভেঙ্গে পড়েছে আইনশৃঙ্খলা। বিধ্বস্ত হয়েছে শেয়ার বাজার। হাজার হাজার কোটি টাকা লুন্ঠিত হয়েছে শেয়ার বাজার থেকে। দুর্বৃত্ত সন্ত্রাসীদের হাতে মানুষ খুণ হচ্ছে পথে ঘাটে। পানি-বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সমস্যা এখন ঘরে ঘরে। দেশের পানি সম্পদের উপরে হাত পড়েছে প্রতিবেশী দস্যু রাষ্ট্রের। দেশের সমস্যা এখন গোলাম আযম নয়,নিজামী বা মোজাহিদও নয়। তাদের ফাঁসী দিলে সমস্যার সমাধান হবে না। বরং বাড়বে। দেশের মূল সমস্যা এখন শেখ হাসিনা ও তার দলীয় দুর্বৃত্তরা। আওয়ামী লীগ এখন দলের নাম নয়, বরং এক ভয়ানক মহামারির নাম। মুজিব মারা গেলেও এ ভয়ানক রোগটি রেখে গেছেন। সে মহামারিতে মুজিব আমলে বহু লক্ষ মানুষ মারা গিয়েছিল। এখন সেটিই প্রবল প্রতাপে জেঁকে বসেছে।

 

দেশ বিস্ফোরণের দিকে

অবিচার ও দুঃশাসন যে কোন দেশেই বিস্ফরোন ঘটায়। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর বিপ্লব আজ সে উদাহরণই তুলে ধরছে। আওয়ামী লীগ ইতিমধ্যেই তার দুঃশাসনের মধ্য দিয়ে দেশজুড়ে ঘৃনার পেট্রোল ছড়িয়েছে। সর্বক্ষেত্রে মন্দা দেখা দিলেও প্রচণ্ড উৎপাদন বেড়েছে ঘৃনার। ফলে দেশ এখন বিস্ফোরণ-উম্মুখ। সরকার যে সেটি বুঝে না তা নয়। বরং হাসিনা ও তার সরকার প্রচণ্ড নার্ভাস। বিস্ফোরণমুখি এ অবস্থা থেকে বাঁচতেই বিচারের নামে তিনি জনগণের দৃষ্টি অন্য দিকে হঠাতে চাচ্ছেন। সামরিক অভ্যুর্থানের কিসসাও শুনাচ্ছেন। শেখ হাসিনা জানেন, একমাত্র ভারত ছাড়া তাঁর বন্ধু নাই। তাই সামরিক অভ্যুর্থানের কিসসা শুনিয়ে তিনি ভারতীয়দের দেশের অভ্যন্তরে ডাকবার পথ তৈরী করছেন। এসবই নিছক নিজের গদী বাঁচানোর স্বার্থে। কখনো ভাবছেন, বিরোধী জামায়াত নেতাদের নির্মূল করতে পারলে তাঁর গদী বাঁচবে। অথচ তারা সমগ্র বাংলাদেশ নয়। দিন দিন বিক্ষুব্ধ হচ্ছে সমগ্র জনগণ। বিচারের নামে যদি অবিচার হলে সরকার পতনের আন্দোলনই তীব্রতর হয়।

শহীদের রক্ত জাতীয় জীবনে ঈমান শূণ্যতা দূরে করে। যেদেশে ইসলামের পক্ষে শহীদ নেই সে দেশের মানুষের মাঝে ঈমানের বলও নাই। মদিনার ন্যায় একটি গ্রাম থেকে যত শহীদ তৈরি হয়েছিল ১৬ কোটির বাংলাদেশ থেকে বিগত বহু শত বছরেও তা সৃষ্টি হয়নি। ফলে জেঁকে বসেছে অপরাধীদের শাসন। বাংলাদেশে শহীদদের এখন বড় প্রয়োজন। আওয়ামী লীগ সে সুযোগ সৃষ্টি করে বাংলাদেশের ইসলামপন্থিদের জন্য খুবই কল্যাণ করছে। এতে ত্বরিৎ মরণ আসবে ইসলামের দুষমনদের। শয়তানী শক্তির অত্যাচারে যেটি নিশ্চিত হয় সেটি আল্লাহতায়ালার সাহায্য লাভ। তখন ফিরাশতারা জমিনে নেমে আসে। কোরআনে সে বিবরণ অনেক। মহান আল্লাহর সে প্রতিশ্রুতি সর্বকালের সংগ্রামী মুসলমানদের জন্য। সে সাহায্য লাভে আল্লাহতায়ালা রাসূল হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না,বরং প্রয়োজনটি প্রকৃত ঈমানদার হওয়ার। তাঁর রাস্তায় জিহাদে আত্মনিয়োগ করার। ফিরাউনের অত্যাচারের ফলে বনি ইসরাইলীদের বাঁচাতে সাগর বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। আসমান থেকে নেমে এসেছিল মান্না ও সালওয়া। আওয়ামী লীগ যে ইসলামের বিপক্ষ শক্তি তা নিয়ে কি কোন সন্দেহ আছে? এ দলটিই কি সংবিধান থেকে আল্লাহর উপর আস্থার বানী বিলুপ্ত করেনি? যার ভিতরে সামান্যতম ঈমান আছে সে কি এমন কুকর্ম করতে পারে? এরূপ কুকর্ম তো তাদের,যারা আল্লাহর অবাধ্য। তাই ইসলামপন্থিদের হারাবার ভয় নেই। বরং রয়েছে বিজয়ের বিশাল সম্ভাবনা। বিপদে পড়েছে বরং খোদ আওয়ামী লীগ। তারা দিশেহারা। বিশ্ব জুড়ে এখন ইসলামী বিপ্লবের জোয়ার। ইতিমধ্যেই তুরস্ক, তিউনিশিয়া, লিবিয়া, সূদান, আলজিরিয়ার ন্যায় বহু দেশে স্বৈরাচারি দুর্গের পতন ঘটেছে। বিজয়ীর বেশে এখন জনগণ। শেখ হাসিনা হোসনী মোবারকের চেয়ে শক্তিশালী নয়। বাংলাদেশের ইসলামী জনতাও মিশরের চেয়ে সংখ্যায় কম নয়। ইতিমধ্যেই ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের কুকীর্তিগুলোর বিবরণ সমগ্র মুসলিম বিশ্বের মিডিয়াতে লাগাতর প্রকাশ পাচ্ছে। সমগ্র মুসলিম বিশ্বজুড়ে শেখ হাসিনার পরিচয় হিন্দু ভারতের পদলেহী সেবাদাসী রূপে। তাঁর সরকার এখন দেশে-বিদেশে এক ঘরে। অনুরূপ অবস্থা হয়েছিল তাঁর পিতা শেখ মুজিবেরও। সংবিধান থেকে আল্লাহর আস্থার বানীটি বিলুপ্ত করে শেখ হাসিনা সুস্পষ্ট ভাবেই শয়তানের থলিতে আশ্রয় নিয়েছেন। দুর্গার মন্ডপে গিয়ে দুর্গাকে “মা দুর্গা” এবং “দুর্গা এবার গজে চড়ে এসেছে” বলে নিজের ভ্রষ্টতা ও শয়তানের পক্ষে তাঁর নিজের অবস্থানটি সুস্পষ্ট করেছেন। ফলে শেখ হাসিনাকে বাঁচাতে আল্লাহর সাহায্য আসবে না। অথচ সাহায্য তো একমাত্র আল্লাহ থেকেই আসে। যেমন কোরআনে বলা হয়েছে, “ওয়া মা নাসরু ইল্লা মিন ইন্দিল্লাহ” অর্থঃ “এবং কোন সাহায্যই নাই একমাত্র আল্লাহর সাহায্য ছাড়া”। -(সুরা আনফাল আয়াত ১০)।

দেশে যারা শেখ হাসিনার একমাত্র বন্ধু তারা হলো গণধিকৃত নাস্তিক বামপন্থিরা। এরা আজন্মের মেরুদণ্ডহীন পরগাছা। এক কালে এরা রাশিয়া ও চীনের লেজুড়বৃত্তি করতো, এখন আওয়ামী লীগের পদধুলি নিয়ে ভারতের লেজুড়বৃত্তি করছে। শয়তানের ঝাঁকের কই রূপে তারা ঝাঁকে মিশে গেছে। অপর দিকে বাংলাদেশ আজ  আর একাত্তরের ন্যায় ভারতমুখি বাংলাদেশ নয়। ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জেগে উঠেছে অতি বিক্ষুব্ধ এক প্রতিরোধী জনগন। শত শত বই লিখে বা হাজার হাজার বক্তৃতা দিয়ে আওয়ামী লীগের যে কুকর্মগুলো তুলে ধরা যেত না, জনগণ এখন সেটি স্বচোখে দেখছে। ফলে জনগণ উপচে পড়ছে বিরোধী দলগুলোর সভাসমিতি ও রোডমার্চে। বাংলাদেশের জন্য এ এক চরম মুহুর্ত। তাছাড়া ভারতও তার নিজের দুর্বৃত্ত চেহারাটাকে সীমান্তে কাঁটাতারর বেড়া,লাগাতর বাংলাদেশী হত্যা,পদ্মা-তিস্তা-সুরমা-কুশিয়ারা পানি ডাকাতির মধ্য দিয়ে প্রকট ভাবে তুলে ধরেছে। জনগণকে আরো বিক্ষুব্ধ করেছে সামরিক ক্যুর ছুতা ধরে বাংলাদেশে সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি দিয়ে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আজ যত অস্থিরতাই থাক এটি এক চরম আশাপ্রদ দিক। কথা হলো শীত যখন এসেছে বসন্ত কি আর দূরে থাকতে পারে? ২৬/০১/১২

 




সভ্য সমাজ নির্মাণে বাঙালী মুসলিমের কেন এতো ব্যর্থতা?

যে ব্যর্থতা শিক্ষাব্যবস্থায়

সভ্য সমাজের আলামত এ নয়, দেশে ভোট-ডাকাতির মাধ্যে সরকার গঠিত হবে এবং গুম, খুন, বিনা বিচারে হত্যার রাজনীতি প্রতিষ্ঠা পাবে। আলামত এও নয়, দেশ থেকে মানবাধীকার বিলুপ্ত হবে এবং স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠা পাবে। এও নয়, দেশ ৫ বার দূর্নীতিতে দেশ বিশ্বে প্রথম স্থান অধিকার করবে। বাংলাদেশের জন্য এ এক বিশাল ব্যর্থতা। অথচ দেশগড়ার কাজ থেকে দূরে থাকাটি স্রেফ দায়িত্বহীনতা ও বিবেক হীনতা নয়, বরং গুরুতর অপরাধ। এখানে মূল ব্যর্থতাটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার। দেশের নাগরিকগণ দেশগড়ার দায়িত্ববোধ এবং প্রয়োজনীয় সামর্থ্য পায় শিক্ষার মাধ্যমে। দেশগড়া নিছক রাজনীতি বা পেশাদারিত্ব নয় বরং পবিত্র ইবাদত -সেটি প্রতিটি নাগরিকের চেতনায় দৃঢ়মূল করতে হয়।এ লক্ষ্যে ইসলামের হুকুম ও শিক্ষনীয় বিষয়গুলোকে জনগণের কাছে পৌঁছানোর কাজটি জরুরী। সে কাজটি করে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা। আল্লাহতায়ালা একটি সভ্য ও সুন্দর সমাজ নির্মাণের গুরুদায়িত্ব দিয়েই মানুষকে এ দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন। সে নির্মাণকাজে রোডম্যাপটি হলো পবিত্র কোরআন। দেশগড়ার এ দায়িত্বটি খেলাফতের তথা আল্লাহর প্রতিনিধিত্বের।প্রতিটি মুসলমান তাই আল্লাহর খলিফা তথা প্রতিনিধি। দেশের প্রেসিডেন্ট,মন্ত্রী বা সচিব হওয়ার চেয়েও এ পদের মর্যাদা আল্লাহর দরবারে অধিক। প্রেসিডেন্ট,মন্ত্রী বা সচিব হওয়াতে মহান আল্লাহ থেকে পুরস্কার মেলবে না। কিন্তু খলিফার দায়িত্বপালনে সফল হলে প্রতিশ্রুতি রয়েছে নিয়ামতভরা বিশাল জান্নাতের।খেলাফতের সে দায়িত্বপালনে কে কতটা নিষ্ঠাবান,রোজ হাশরের বিচার দিনে এ হিসাব প্রত্যেককেই দিতে হবে।

প্রতিটি অফিসকর্মীকে তার কর্মশুরুর আগেই অফিসের করণীয় দায়ভারের বিষয়টি প্রথমেই জেনে নিতে হয়,নইলে তার দায়িত্ব পালন যথার্থ হয় না। তেমনি প্রতিটি ব্যক্তিকেও জেনে নিতে হয় এ পার্থিব জীবনে তার রোল বা ভূমিকাটি কি। মানজীবনের এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাঠ। তার জীবনের সকল কর্মকান্ড, দায়িত্ব-পালন ও ত্পরতা নির্ধারিত হয় এটুকু জানার পরই। তেমনি ইসলামের প্রথম পাঠটি হলো এ পৃথিবীতে ব্যক্তির ভূমিকা্টি যে আল্লাহর প্রতিনিধিত্বের সেটি জানিয়ে দেয়া। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো,সে মৌলপাঠটিই বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় দেয়া হয় না। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশ্বের বহুভাষা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের বহুবিষয় শেখালেও এ মৌলিক পাঠটি শেখায় না। ফলে দেশবাসীর কাছে দেশ ও সমাজ নির্মাণের ফরজ কাজটি ফরজরূপে গণ্য হয়নি। বরং রাজনীতি পরিণত হয়েছে গদিদখল,আরাম-আয়েশ ও নিজস্ব জৌলুস বৃদ্ধির হাতিয়ারে।

দেশগড়ার এ পবিত্র অঙ্গনে সবচেয়ে ধার্মিক ও সবচেয়ে নিষ্ঠাবান মানুষের আধিক্য অতি কাঙ্খিত ছিল। যেমনটি হয়েছিল খোলাফায়ে রাশেদার সময়। কারণ,অন্যরা না জানলেও যারা ধার্মিক তাদের জানা থাকার কথা,উচ্চচতর সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণের কাজ থেকে হাত গুটিয়ে নেয়ার অর্থ শুধু দায়িত্বহীনতাই নয়,আল্লাহতায়ালার কোরআনী হুকুমের বিরুদ্ধে সেটি বিদ্রোহ। বাংলাদেশে রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনার সর্বস্তরে যে দুর্নীতিপরায়ন ব্যক্তিদের দৌরাত্ব -সেজন্য দায়ী তথাকথিত এ ধর্মপরায়নগণও। সমাজের আবু লাহাব,আবু জেহেলের বিরুদ্ধে নবীআমলের মুসলমানগণ যে আমৃত্যু যুদ্ধ করেছিলেন সেরূপ যুদ্ধ বাংলাদেশের ধর্মপরায়ন মানুষদের দ্বারা কোন কালেই সংঘটিতই হয়নি। ফলে সমাজের দুর্বৃত্তরা অনেকটা বীনা যুদ্ধেই সমাজ ও রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গনগুলো দখল করে নিয়েছে। তাছাড়া ময়দান কখনও খালি থাকে না। সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ মানুষেরা ময়দান খালি করে দিলে দুর্বৃত্তরা তা অবশ্যই দখল  করে নেয়। রাষ্ট্রের সম্পদ এভাবেই দুর্নীতিপরায়ন রাজনীতিবিদ ও প্রশাসনিক কর্মচারীদের অধীনস্ত হয়েছে। ফলে জনগণ নিঃস্ব হলেও ঐশ্বর্য বেড়েছে তাদের।

 

যে দায়বব্ধতা সবার

দেশগড়ার ক্ষেত্রটি শুধু রাজনীতি বা রাষ্ট্রীয় প্রশাসন নয়। এ কাজটি হয় দেশের সর্বাঙ্গ জুড়ে। শুধু রাজনীতি দিয়ে একটি সভ্যতার সমাজ নির্মিত হয় না। সে লক্ষ্যটি পূরণে রাজনীতিতে যেমন স্ৎ ও যোগ্য মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াতে হয়,তেমনি যোগ্য মানুষের ভীড় বাড়াতে হয় দেশের শিক্ষা,সাহিত্য, বিজ্ঞান, সমাজসেবা ও ব্যবসা বাণিজ্যেও। মানুষকে শুধু সৎ হলে চলে না,সাহসী ও সংগ্রামীও হতে হয়। নবীজীর (সাঃ) সাহাবাগণ তাই শুধু অতি সৎই ছিলেন না,নির্ভীক ও অতিশয় লড়াকুও ছিলেন। এ যোগ্যতা বলেই দুর্বৃত্তদের রাজনীতি ও প্রশাসনের অঙ্গণ থেকে হটিয়ে নিজেরা কান্ডারী হাতে নিয়েছিলেন। নবীজীবনের সে সুন্নত আজকের ধর্মপরায়ন মানুষের জীবনেও আসতে হবে। নিছক বক্তৃতা বা উপদেশ খয়রাতে দেশ সমৃদ্ধতর হয় না। তাদেরকে দেশের এক্সিকিউটিভ ফোর্স বা পলিসি বাস্তবায়নকারী শক্তিতে পরিণত হতে  হবে। এটিই ইসলামের মৌল শিক্ষা। নবীজী (সাঃ) ও সাহাবাদের জীবনের মূল শিক্ষা তো এটিই। ফলে ন্যায় কর্ম ও ধর্মপরায়নতা শুধু মসজিদে নয় সমাজের সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল।

ইমারাত নির্মাণের পূর্বে ভাল ইট তৈরির ন্যায় জাতি গঠনের পূর্বে উত্তম ব্যক্তি-গঠন অপরিহার্য। আর যোগ্য ব্যক্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান শুধু জ্ঞান ও শারীরিক সুস্থ্যতা নয়,বরং সবচেয়ে অপরিহার্য হলো তার ব্যক্তিত্ব। ঐ ব্যক্তিত্বই একজন মানুষকে মহত্তর পরিচয় দেয়। এ বিশেষ গুণটির জন্যই সে প্রকৃত মানুষ। আর ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব সৃষ্টিতে মূল উপাদানটি হলো সত্যবাদিতা। হযরত আলী (রাঃ) এক্ষেত্রে একটি অতিশয় মূল্যবান কথা বলেছিলেন। বলেছেন,ব্যক্তির ব্যতিত্ব তার জিহ্বায়। তথা তার সত্যবাদিতায়। যার জিহ্বা বা কথা বক্র তার চরিত্রও বক্র। সুদর্শন ও সুস্থ্য শরীরের অধিকারী হয়েও ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রে সে পঙ্গু। এমন মিথ্যাবাদি মানুষ সমাজে ভাল মানুষ রূপে পরিচিতি পেতে পারে না। বাঁকা বা কাঁচা ইট দিয়ে যেমন প্রাসাদ নির্মাণের কাজ হয় না,তেমনি মিথ্যাচারী মানুষ দিয়ে একটি সভ্যতর ও উন্নততর সমাজ নির্মিত হয় না। বরং এরূপ অসৎ ও মিথ্যাচারী মানুষের আধিক্যে একটি জাতির অস্তিত্বই বিপন্ন হয়। অথচ কোন জাতির এমন ক্ষতি গরু মহিষের সংখ্যা বৃদ্ধিতে হয় না। তাতে বরং বিপুল অর্থলাভ হয়। কিন্তু মিথ্যাচারী মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধিতে দেশে অসভ্যতা, বর্বরতা ও ধ্বংস নেমে আসে। বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ বা অপরূপ নৈসর্গিক পরিবেশও সে জাতির কোন কল্যাণই করতে পারে না। সেটিরই প্রমাণ হলো আজকের বাংলাদেশ। দেশটির আজকের বিপন্নতা সম্পদের অপ্রতুলতায় নয়। ভুগোল,জলবায়ু বা জনসংখ্যাও নয়। বরং সেটি দুর্বৃত্ত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধিতে।

 

যে ব্যর্থতা বুদ্ধিজীবীদের

দেশবাসীকে সদাচারী ও সত্যবাদী বানানোর গুরু দায়িত্বটি দেশের বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের।একাজটি ক্ষেতখামার বা কোন কল-কারখানায় হয় না। রাজনীতি ও প্রশাসনিক দফতরেও হয় না। হয় দেশের জ্ঞানবান ব্যক্তিদের হাতে। তারাই দেশবাসীর শিক্ষক,তারাই সংস্কৃতির নির্মাতা। তারা সংস্কার আনে ব্যক্তির আচরণ, মূল্যবোধ ও রুচীবোধে। তাই একটি দেশ কতটা সভ্যতর পরিচয় নিয়ে মাথা তুলে দাঁড়াবে সে বিচারে সেদেশের জ্ঞানবানদের সততা ও সৎ সাহসের দিকে তাকাতে হয়। প্রতিকুল অবস্থাতেও সত্য কথা বলার জন্য যে মনোবল দরকার সেটির জোগান তো তারাই দেয়। তারাই সমাজের মিথ্যুক ও দুশ্চরিত্রদের বাঁচাটা নিরানন্দ ও বহুক্ষেত্রে অসম্ভব করে দেয়। সম্পদের অধিকারী হয়েও দুর্বৃত্তরা সমাজে নন্দিত না হয়ে প্রচন্ড নিন্দিত হয় বস্তুত এদের সৃষ্ট সামাজিক মূল্যবোধ ও বিচারবোধের কারণেই। নমরুদ,ফিরাউন, হালাকু বা হিটলারগণ ইতিহাসে যে আজও প্রচন্ড ঘৃণিত তা এসব সত্যনিষ্ঠ বুদ্ধিজীবীদের কারণেই। ইসলামে এমন কাজের গুরুত্ব অপরিসীম। নবীজী (সাঃ)র হাদীসঃ “যে ব্যক্তি লোকদের কোন একটি ভাল বিষয় শিক্ষা দেয় তার জন্য খোদ মহান আল্লাহতায়ালা, তাঁর ফেরেশতাকুল,সমগ্র আসমান জমিনের বাসিন্দা, এমনকি গর্তের পিঁপড়া ও সমুদ্রের মৎস্যকুলও তার জন্য দোয়া করতে থাকে।” –(তিরমিযি শরীফ)। ব্যক্তির জীবনে এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কি থাকতে পারে?

মু’মিন ব্যক্তি তাই অর্থলাভের জন্য জ্ঞান বিতরণ করে না বা ওয়াজে নামে না। বরং এ কাজে নেমে গালি খাওয়া ও পাথর খাওয়াই হলো নবীজী (সাঃ)র সূন্নত। সাহাবাগণ তাই পাহাড়-পর্বত, নদী-সমুদ্র অতিক্রম করে বহু দেশে সত্য প্রচার করেছেন। বাংলাদেশের মানুষ মুসলমান হয়েছে তো তাদের সে মেহনতের বরকতেই। কিন্তু বাংলাদেশে সে কাজটিই হয়নি। আলেমগণ অর্থ লাভ বা বেতন লাভের প্রতিশ্রুতি না পেলে কোরআন শিক্ষা দেন না। ওয়াজে মুখ খোলেন না। তাদের পক্ষ থেকে সেকাজটি না হওয়ার কারণেই দেশে ইসলামের বিজয় আসেনি। সুস্থ্য মূল্যবোধ ও বিচারবোধও প্রতিষ্ঠা পায়নি। বরং মহা বিজয় এসেছে দুর্বৃত্তদের। ফলে গণতন্ত্র হত্যা,বাকশালী স্বৈরশাসনের প্রতিষ্ঠা,দুর্ভিক্ষে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ও তিরিশ হাজারের বেশী বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীকে খুন করার পরও শেখ মুজিব নেতার মর্যাদা পায়। তার দলকেও জনগণ ভোট পায়।এবং দলটি দেশ শাসনেরও সুযোগ পায়।যেদেশে চোর-ডাকাত ও খুনিগণও নেতা এবং নির্বাচিত শাসকের মর্যাদা পায়, তখন কি বুঝতে বাঁকি থাকে সেদেশে নৈতীক পচনটি কত গভীর? এমন দেশে নির্বাচন শতবার হলেও কি কোন পরিবর্তন আসে? নৈতীক রোগ কি নির্বাচনে সারে? বরং প্রতি নির্বাচনে চোর-ডাকাতগণই যে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হবে সেটিই কি স্বাভাবিক নয়?

দেশে ফসলের ফলন না বাড়লে বীজ, ভূমি, জলবায়ু বা কৃষকের দোষ হয়। মানুষের চরিত্রে ও মূল্যবোধে প্রচন্ড অবক্ষয় দেখা দিলে দেশটির শিক্ষক, শিক্ষালয়, শিক্ষাব্যবস্থা ও বুদ্ধিজীবীরা কতটা ব্যর্থ সেটি ধরা পড়ে। শিক্ষা ও সাহিত্যের ময়দান থেকে মানুষ একটি সমৃদ্ধ চেতনা পাবে, উন্নত মূল্যবোধ নির্মিত হবে এবং তা থেকে সমাজ একটি সভ্যতর স্তরে পৌঁছবার সামর্থ পাবে সেটি কাঙ্খিত ছিল। কিন্তু তা হয়নি। বরং শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীরাই মূলত জন্ম দিয়েছেন বর্তমান অবক্ষয়ের। মাছের পচন যেমন মাথা থেকে শুরু হয়, তেমনি জাতির পচনের শুরুও বুদ্ধিজীবীদের থেকে। তাদের কারণেই বাংলাদেশের শিক্ষিত সমাজই সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত সমাজ। তাদের সাথে যাদেরই সাহচর্য বেড়েছে তারাই রোগাগ্রস্ত হয়েছে চৈতন্য, চরিত্রে ও মূল্যবোধে। আমাদের বুদ্ধিজীবীদের এ ব্যর্থতার বড় কারণ, তাদের অধিকাংশই কোন না কোন মিথ্যাচারী নেতার আশ্রিত ও গৃহপালিত রাজনৈতিক শ্রমিক। সমাজে মূল্যবোধের প্রতিষ্ঠার চেয়ে এসব নেতাদের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠাই তাদের মূল লক্ষ্য। নেতাদের মিথ্যাচার ও চারিত্রিক কদর্যতাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়ার পরিবর্তে সে মিথ্যাচারের প্রচারে তারা বরং স্বেচ্চছায় তাদের চাকর-বাকরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতাগণ যে কতটা মিথ্যাচারী এবং দেশের শিক্ষক, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীরা সে মিথ্যা প্রচারে যে কতটা বিবেকবর্জিত তার সবচেয়ে চোখা ধাঁধানো নজির হলো শেখ মুজিবের একাত্তরে ৩০ লাখের মৃত্যুর তথ্য। বুদ্ধিজীবীদের পক্ষ থেকে মিথ্যাচারিতা ও দুষ্কর্ম তুলে ধরার জন্য এরূপ একটি মাত্র দৃষ্টান্তই যথেষ্ট। যে কোন ধর্ম এবং যে কোন মূল্যবোধই মানুষকে সত্যবাদী হতে শেখায়। সত্যবাদী হতে বলে এমনকি শত্রুর বিরুদ্ধেও। খুনের আসামীর বিরুদ্ধেও তাই দুনিয়ার কোন আদালতই মিথ্যা বলার অধিকার দেয়না। বন্ধুর সামনে ফেরেশতা সাজা তো মামূলী ব্যাপার। সত্যবাদীতার প্রমাণ হয় তো শত্রুর বিরুদ্ধে মিথ্যা না বলায়। মিথ্যার প্রতি আসক্তিই ব্যক্তির চেতনার ও চরিত্রের সঠিক পরিমাপ দেয়। এ পরিমাপে শেখ মুজিবই শুধু নয়, তার অনুগত বুদ্ধিজীবীরাও সত্যবাদী প্রমাণিত হননি। শেখ মুজিব কোনরূপ জরিপ না করেই বলেছেন, একাত্তরে ৩০ লাখ মানুষ নিহত হয়েছে। সে সময় বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি। অর্থাৎ ৭৫ মিলিয়ন। ৭৫ মিলিয়নের মধ্যে ৩০ লাখ বা তিন মিলয়ন নিহত হলে প্রতি ২৫ জনে একজন নিহত হতে হয়। স্কুলের ছাত্ররা এ হিসাব বুঝে। যে গ্রামের প্রতি বাড়িতে গড়ে ৫ জনের বাস সে গ্রামে প্রতি ৫ বাড়িতে একজনকে নিহত হতে হয়। অতএব যে গ্রামে ১০০ ঘর আবাদী সেখানে কমপক্ষে ২০ জনকে প্রাণ দিতে হয়। সে গ্রামে যদি কেউই মারা না যান তবে পাশের সম বসতিপূর্ণ গ্রামে ১০০ ঘরে ৪০ জনকে নিহত হতে হবে। নইলে ৩০ লাখের হিসাব মিলবে না। বাংলাদেশে যাদের বাস তারা শেখ মুজিবের এ মিথ্যা তথ্য বুঝলেও বাঙালী বুদ্ধিজীবীদের অধিকাংশই সেটি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর, আদালতের উকিল বা পত্রিকার কলামিস্ট হয়েও এখনও সে কথা নির্দ্বিধায় বলেন। মিথ্যাচারী হওয়ার জন্য এটুকুই কি যথেষ্ট নয় যে, কোন কথা শুনা মাত্র তার সত্যাসত্য বিচার না করেই সে বলে বেড়াবে? বাঙালী বুদ্ধিজীবীদের মিথ্যাচারীতা প্রমাণের জন্য এটিই কি সবচেয়ে বড় দলিল নয়?

 

সবচেয়ে বড় দায়ভার

সব পাপের জন্ম মিথ্যা থেকে। জীবনে ভয়ানক ভ্রষ্টতা এবং অপরাধ প্রবনতা আসে মিথ্যাচার থেকে। নবীজী (সাঃ) ব্যাভিচার, চৌর্যকর্ম ও মিথ্যাচারে লিপ্ত এক ব্যক্তিকে চারিত্রিক পরিশুদ্ধির জন্য প্রথমে যে পাপ কর্মটি পরিত্যাগ করতে উপদেশ দিয়েছিলেন সেটি হলো এই মিথ্যাচার। নানা পাপের বেড়াজাল থেকে মুক্তি পেতে হলে বাংলাদেশেও সে কাজটি শুরু করতে হবে মিথ্যাচারী রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তি পরিত্যাগের মধ্য দিয়ে। মিথ্যা ও মিথ্যাচারীদের দূরে হঠাতে পারলে অন্য সব পাপাচার এমনিতেই দূর হবে। নইলে সমাজের দুর্বৃত্ত মিথ্যাচারিরা শুধু দেশের নেতা, মন্ত্রী বা বুদ্ধিজীবী নয়, জাতির পিতা হওয়ারও স্বপ্ন দেখবে। কারণ,কোন জাতি মিথ্যাচারিতায় ডুবলে সে জাতির ফেরাউনরা শুধু রাজা নয়, খোদা হওয়ারও স্বপ্ন দেখে। এটিই ইতিহাসের শিক্ষা। তাই সব যুগের ফেরাউনেরাই মিথ্যাকে প্রচন্ড গণমুখিতা দিয়েছে। আর সে কাজে চাকর-বাকর রূপে ব্যবহার করেছে রাষ্ট্রের বুদ্ধিজীবীদের। কারণ, মিথ্যাচারের প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় তাদের ন্যায় কার্যকর চাকর-বাকর আর নেই। এজন্যই মধ্যযুগের স্বৈরাচারী রাজাদের দরবারে বহু গৃহপালিত সভাকবি থাকতো। তেমনি বাংলাদেশেও বুদ্ধিজীবীর বেশে এমন গৃহপালিত চাকর-বাকরের সংখ্যা বহু হাজার। তারা মুজিবের ন্যায় বাকশালী স্বৈরাচারি দুর্বৃত্তকে ফিরাউনের ন্যায় খোদা রূপে প্রতিষ্ঠা দিতে না পারলেও অন্ততঃ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী রূপে প্রচার করেছে। তবে এ মিথ্যার প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের বুকে দেশী পুঁজির পাশাপাশি বিদেশী শত্রুদের পুঁজি নিয়োগও হয়েছে বিস্তর। বিপুল অর্থ এসেছে ভারত থেকে। বাংলাদেশকে সত্যকে প্রতিষ্ঠা দিতে হলে বুদ্ধিবৃত্তির নামে পারিচালিত এমন মিথ্যাচারিতাকে অবশ্যই নির্মূল করতে হবে।

কারণ, ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে মৃত্যু ঘটে শুধু দেহের জীবকোষের, কিন্তু মিথ্যাচরিতায় মৃত্যু ঘটে বিবেকের। ফলে মানুষ তখন অসভ্য অমানুষে পরিণত হয়। ফলে যক্ষা, কলেরা, টাইফয়েডের মহামারীতে বাংলাদেশের যতটা ক্ষতি হয়েছে বা হচ্ছে, তার চেযে অনেক বেশী ক্ষতি হচ্ছে মিথ্যাচারিতার ব্যাপ্তিতে। দুর্নীতিতে বিশ্বে প্রথম হওয়ার মূল কারণ এটিই।একই কারণে দেশবাসীর ঘাড়ের উপর চেপেছে এক অসভ্য সরকার। আর সবচেয়ে বেশী ক্ষতি অপেক্ষা করছে আখেরাতে। মিথ্যাচারিতার যে বীজ আমাদের রাজনৈতিক নেতা ও বুদ্ধিজীবীদের দ্বারা অতীতে প্রোথিত হয়েছিল তা এখন পরিণত হয়েছে প্রকান্ড মহিরুহে। মিথ্যার অনিবার্য ফসল যে সীমাহীন দুর্নীতি ও দুর্বৃত্ত-শাসন, তা নিয়ে বাংলাদেশ আজ বিশ্ববাসীর সামনে শিক্ষনীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে। নৈতিকতার ক্ষেত্রে জাতিকে এ মিথ্যাচার বরং তলাশূন্য করে ফেলেছে। এ রোগ বিপন্ন করছে আমাদের ইজ্জত নিয়ে বাঁচাকে। মুসলমান হওয়ার অর্থই হলো আমৃত্যু সত্যের পক্ষে সাক্ষী দেয়া এবং মিথ্যার রূপকে উন্মোচিত করা। এটিই মুসলিম হওয়ার প্রধান ধর্মীয় দায়বদ্ধতা। কিন্তু সে কাজটিই মুসলিম সমাজে যথার্থ ভাবে হয়নি। ইসলাম ও সত্যের বিরুদ্ধে এখানেই হয়েছে বাঙালী মুসলমানদের সবচেয়ে বড় অপরাধ। সে সাথে ঘটেছে ইসলামের সাথে সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা। ফলে দুর্বৃত্ত মিথ্যুকগণ চেপে বসেছে তাদের মাথার উপর। তাতে অসম্ভব হয়েছে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা ও ইসলামের বিজয়।

মিথ্যার সামনে এরূপ নীরবতা ও সদাচারিতা থেকে এরূপ বিচ্যুতি কি একটি জাতিকে কখনো সাফল্য দিতে পারে? শুধু দেশ গড়া নয়, মুসলমান হওয়ার জন্যও সত্য-চর্চার বিকল্প নেই। আর মিথ্যা তো দুরীভূত হয় একমাত্র সত্যকে প্রতিষ্ঠা দেয়ার মধ্য দিয়ে। যেমন অন্ধকার অপসারিত হয় একমাত্র আলোর আগমনের পরই। আর সে আলো জ্বালানোর মূল দায়িত্বটি নিবে সত্যাচারী বুদ্ধিজীবী বা আলেমগণ –সেটিই তো নিয়ম। বনি ইসরাইলের আলেমগণ সে দায়ভার পালন করেনি বলেই পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা তাদেরকে ভারবাহি গাধার সাথে তুলনা করেছেন। কারণ, গাধা শুধু আল্লাহর কিতাবের ভারই বহন করতে পারে, আল্লাহর দেয়া নির্দেশাবলীকে প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। অথচ আল্লাহর দ্বীনের প্রতিষ্ঠার কাজে প্রতিটি মু’মিন হলো আল্লাহর খলিফা ও তাঁর রাসুলের (সাঃ) প্রতিনিধি। তাই একাজ শুধু আলেম বা মাদ্রাসার শিক্ষকদের কাজ নয়, এ কাজ প্রতিটি মুসলমানের। মু’মিনের জীবনে দেশ গড়া এবং দেশের প্রতিরক্ষার লাগাতর প্রয়াস শুরু হয় তো এমন এক দায়বদ্ধতা থেকেই। একমাত্র তখনই দেশে ইসলামের বিজয় ও অসভ্য সরকারের নির্মূল অনিবার্য হয়।২০/০৫/২০১৪




বাঙালী মুসলমানের আত্মঘাতি আত্মবিস্মৃতি

যে ভয়ানক বিপদ স্মৃতি বিলুপ্তির

বাঙালী মুসলমানের সমস্যা নিছক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নয়। সন্ত্রাস, দূর্নীতি,ব্যর্থ প্রশাসন বা আইন-আদলতও  নয়। মূল বিপদ আরো গভীরে, সেটি স্মৃতিবিলুপ্তির। স্মৃতিবিলুপ্তির সে রোগটি এতটাই ভয়ানক যে, তাতে হারিয়ে গেছে মুসলমান রূপে দায়িত্ব পালনের স্মৃতি। মুসলমান হওয়ার অর্থ যে আল্লাহর সৈনিক হওয়া এবং সে সৈনিকের মূল কাজ যে আল্লাহর দ্বীনের বিজয় আনা এবং সে বিজয় আনতে অর্থ, শ্রম, মেধা, এমনকি প্রাণের কোরবানী পেশ করা এবং সে কোরবানী ছাড়া জান্নাতে যাওয়া সম্পূর্ণ অসম্ভব –ইসলামের সে মৌলিক সত্য এবং নবীজী (সাঃ)র সে সূন্নতগুলো বাঙালী মুসলমানের স্মৃতি থেকে হারিয়ে গেছে। ফলে আল্লাহর শরিয়ত এবং ইসলামের পতাকা আজ শত্রু শক্তির পদানত হলেও ১৬ কোটি মানুষের এ দেশে সে পতাকা তুলে ধরার মত লোক নেই। বরং কোটি কোটি লোক আছে যারা কাফের ব্রিটিশদের প্রণীত আইন, তাদের সংস্কৃতি ও তাদের আইন-আদালতকে একান্ত আপন রূপে মনে করে। সেগুলির সুরক্ষায় যুদ্ধ করে এবং সে যুদ্ধে প্রাণও দেয়। হাজার হাজার মসজিদ মাদ্রাসার দেশে শরিয়তি বিধান প্রতিষ্ঠার উদ্যোগটি আজ আইনবিরোধী,এবং তার পক্ষ নেয়াটি জঙ্গিবাদ। ফলে শাস্তিযোগ্য অপরাধও। অথচ আইনসিদ্ধ হল বেশ্যাবৃত্তি, সূদীকারবার, মদ-উৎপাদন ও মদের ব্যবসা।  ফলে দেশে ব্যাভিচারি আজ প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা, সে ব্যবসায় কারো শাস্তি হয় না; কিন্তু শাস্তি হয় এবং পায়ে দণ্ডবেড়ী পড়ানো হয় শরিয়তের দাবী নিয়ে রাস্তায় নামলে।

চরম স্মৃতি-বিলুপ্তির শিকার দেশটির নিজের ইতিহাস। বাঙালী মুসলমান ভূলেই গেছে তাদের বিরুদ্ধে  ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও বর্ণহিন্দুদের অতীতের ষড়যন্তু ও শোষণের কথা। ভূলে গেছে শুধু ১৭৫৭ সালের মীরজাফরদেরই নয়, ১৯৪৭ এবং ১৯৭১ এর মীরজাফরদেরও। ভূলে গেছে, ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ অবধি পাকিস্তান নামে একটি দেশে তারা বসবাস করতো, বিশ্বের সর্ববৃহৎ সে মুসলিম রাষ্ট্রটির তারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক ছিল এবং সেদেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও প্রধানমন্ত্রীও একাধিকবার বাঙালী ছিল। একথাও ভূলে গেছে,পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠায় বাঙালী মুসলমানদের অবদানই সবচেয়ে বেশী ছিল। এবং প্রায় পুরাপুরি ভূলে গেছে,বাংলাদেশের স্বাধীনতার শুরু ১৯৭১ থেকে নয়,স্বাধীনতা দিবস রূপে ১৪ই আগষ্টের ন্যায় আরেকটি দিবস এ দেশের নগর-ব্ন্দর ও গ্রাম-গঞ্জে ২৩ বছর মহা ধুমধামে পালিত হত। সে সাথে ভূলে গেছে ১৯৪৭-এর স্বাধীনতার বিরুদ্ধে বর্ণহিন্দুদের প্রবল বিরোধীতার কথা।

আত্মবিস্মৃতি প্রতি পদে বিপর্যয় ডেকে আনে। মানুষের কর্ম ও আচরনের ন্যায় তার রাজনীতিও নিয়ন্ত্রিত হয় স্মৃতি থেকে। স্মৃতির ভাণ্ডার থেকেই মানুষ জানে কে তার শত্রু এবং কে তার মিত্র? “মেমোরি লস” বা স্মৃতি-বিলুপ্তিতে এসবই অসম্ভব হয়। তখন অসম্ভব হয় সুস্থ্য ও স্বাভাবিক ভাবে বাঁচা। মানুষ তখন পদে পদে ভূল করে, এমনকি চিনতে অসমর্থ হয় নিজের গৃহ, নিজের স্ত্রী এবং নিজের পুত্র-কণ্যাকে। অনেক সময় আপন  স্ত্রী এবং আপন পুত্র-কণ্যাকেও শত্রু-জ্ঞান করে মারতে তাড়া করে। এমন ব্যক্তি একাকী রাস্তায় বেরুলে সে আর নিজ ঘরে ফিরতে পারে না। চিকিৎসা শাস্ত্রে এমন রোগকে বলা হয় ডিমেনশিয়া বা এ্যাল্জহেইমারস ডিজিজ। তবে এমন স্মৃতি-বিলুপ্তি শুধু ব্যক্তি-জীবনে নয়, জাতীয় জীবনেও ঘটে। তখন সে জাতি চিরকালের ভয়ানক শত্রুকেও ভূলে যায়, এবং ভূলে যায় পরম মিত্রকেও। এমন স্মৃতি বিলুপ্তির নজির মানব ইতিহাসে অসংখ্য। আল্লাহকে ভূলে মানুষ শয়তানের পথ ধরে তো এমন স্মৃতিবিলুপ্তির ফলেই। ফিরোউনের বর্বর নিষ্ঠুরতা থেকে বনি ইসরাইলের লোকদের মহান আল্লাহতায়ালা প্রাণে বাঁচিয়েছিলেন। তাদের বাঁচাতে তিনি সাগর দ্বিখণ্ডিত করে তল দিয়ে প্রশস্ত রাস্তা করে দিয়েছিলেন। মিশর থেকে উদ্ধারের পর সিনাই মরুভূমিতে আহার জোগাতে তাদের জন্য বছরের পর বছর আসমান থেকে মান্না ও সালওয়া পাঠিয়েছেন। কিন্তু হযরত মূসা (আঃ) যখন মাত্র ৪০ দিনের জন্য আল্লাহর সান্নিধ্যে যান তখন করুণাময় আল্লাহকে ভূলতে তাদের দেরী হয়নি। নিজ হাতে তারা গরুর স্বর্ণমুর্তি গড়ে সেটির পুঁজা শুরু করে দিয়েছিল।

বাঙালী মুসলমানদের স্মৃতি থেকে শুধু আল্লাহর শরিয়তি বিধান প্রতিষ্ঠার দায়ভারই হারিয়ে যায়নি। হারিয়ে গেছে বাংলার শ্রেষ্ঠ মুসলমানদের স্মৃতি। ভূলিয়ে দেয়া হয়েছে ইখতিয়ার মহম্মদ বখতিয়ার খিলজীকে –যিনি বাংলা জয় করে পৃথিবীর এ প্রান্তে মুসলমানদের রাষ্ট্রীয় শক্তি রূপে সর্বপ্রথম প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন । হারিয়ে যাচ্ছে শাহজালাল, শাহ মখদুম ও খানজাহান আলীর মত মহামানবদের স্মৃতি। ভূলিয়ে দেয়া হচ্ছে সিরাজুদ্দৌলা,তিতুমির, হাজী শরিয়াতুল্লাহ।  স্মৃতি থেকে মুছে দেয়া হচ্ছে নবাব সলিমুল্লাহ, নবাব আব্দুল লতিফ, মুন্সি মেহেরুল্লার মত মহান ব্যক্তিদের। নবাব সলিমুল্লাহ জমিদার পুত্র ছিলেন। রাজনীতিকে তিনি জনসেবার মাধ্যম রূপে ব্যবহার করেন। ফলে সম্পদের পাহাড় না গড়ে বরং নিঃস্ব হয়েছেন। ইন্তেকাল করেছেন ঋণী অবস্থায়। নিজ অর্থে ঢাকার বুকে গড়ে তুলেছেন বহু প্রতিষ্ঠান। উপমহাদেশের মুসলিম নেতাদের ঢাকায় দাওয়াত দিয়ে ডেকে এনে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মুসলিম লীগ। সে মুসলিম লীগের হাতেই জন্ম নেয় বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান।মুহাম্মদ ঘোরীর হাতে দিল্লি বিজয়ের পর উপমহাদেশের মুসলিম ইতিহাসে সেটিই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। অথচ সে ইতিহাস আজ বাংলাদেশের স্কুল-কলেজে পড়ানো হয় না। বরং পড়ানো তাদের ইতিহাস যারা রাজনীতিকে ব্যবহার করেছে দূর্নীতির হাতিয়ার রূপে এবং দেশের সম্পদ লুটেছে দুহাতে।রাজনীতির মাধ্যমে ঢাকার অভিজাত এলাকায় তারা বাড়ি-গাড়ি ও বিশাল সম্পদের মালিক হয়েছে। তাদের সে লুণ্ঠনের কারণে বাংলাদেশ পরিচিতি পেয়েছে ভিক্ষার তলাহীন ঝুলি রূপে।

প্রচারণার সামর্থ্যটি বিশাল। লাগাতর প্রচারণার মাধ্যমে ফিরাউন-নমরুদের ন্যায় অতি দুর্বৃত্তদেরও ভগবান রূপে প্রতিষ্ঠা দেয় যায়। তেমনি শাপ-শকুন,গরু-ছাগলকেও দেব-দেবী রূপে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করা যায়। হিটলার, মুসোলিনি, স্টালিন, জর্জবুশ ও ব্লেয়ারের ন্যায় গণহত্যার নায়কদের যে নিজ নিজ দেশে নেতা রূপে প্রতিষ্ঠা মিলেছিল সেটি তো প্রচার-প্রপাগাণ্ডার জোরেই। লাগাতর প্রচারের মাধ্যমে মানুষের স্মৃতির মানচিত্রই পাল্টে দেয়া যায়। বাংলাদেশের ইতিহাসে অবিকল সেটিই ঘটেছে। দেশটির ইতিহাসের যারা সবচেয়ে বড় স্বৈরাচারি ও দুর্নীতিপরায়ন,গণতন্ত্রকে যারা কবরে পাঠিয়ে একদলীয় বাকশাল কায়েম করলো, বাংলাদেশকে যারা ভারতের গোলাম রাষ্ট্রে পরিণত করলো, দেশকে যারা আন্তর্জাতিক মহলে ভিক্ষার ঝুলি রূপে পরিচিত করলৌ এবং ইসলামের প্রতিষ্ঠার রাজনীতিকে যারা আইন করে নিষিদ্ধ করলো সে অতি দুর্বৃত্তদেরও বলা হচ্ছে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী রূপে। কাফের শক্তির সবচেয়ে বড় বন্ধুকে প্রতিষ্ঠা দেয়া হচ্ছে বাংলাদেশের জনগণের বন্ধু ও পিতা রূপে। অপরদিকে যারা শরিয়তের প্রতিষ্ঠা চায় তাদের পরিচিত করা হচ্ছে সন্ত্রাসী বলে।

 

যে অনিবার্য আযাব আত্মবিস্মৃতির

ব্যক্তির দায়িত্ব শুধু দেহ নিয়ে বাঁচা নয়, নানা রূপ স্মৃতি নিয়ে বাঁচাও। বিশেষ করে আল্লাহর প্রতি দায়ব্ধতার স্মৃতি নিয়ে বাঁচা। নামাযের প্রতি রাকাতে “ইয়্যাকানাবুদু ওয়া ইয়্যাকানাস্তাঈন” অর্থাৎ “আমরা একমাত্র আপনারই ইবাদত করি এবং আপনার থেকেই সাহায্য চাই” –জায়নামাযে দাঁড়িয়ে মু’মিনের এটি এক বিশাল দায়ভারপূর্ণ ঘোষনা। এখানে ঘোষণাটি মহান আল্লাহর কাছে পূর্ণ আত্মসমর্পণের। ঈমানদারকে তার জীবনের প্রতিটি দিন, প্রতিটি ঘন্টা, প্রতিটি মুহুর্ত বাঁচতে হয় এমন আত্মসমর্পেণের স্মৃতি নিয়ে। এরূপ বাঁচার মধ্যেই নিশ্চিত হয় সিরাতুল মোস্তাকীমে চলা। মুমিনের জীবনে এটিই প্রতি মুহুর্তের যিকর। আল্লাহর প্রতি দায়বদ্ধতার এ যিকর বা স্মৃতিচারণ থেকে সামান্য বিচ্যুতির অর্থ কাফের হয়ে যাওয়া। আল্লাহর প্রতি দায়বদ্ধতার স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থেই মুসলিমকে নামাযের প্রতি রাকাতে যেমন আত্মসমর্পিত গোলামের বেশে জায়নামাযে দাঁড়াতে হয়,তেমনি অবনত মস্তকে রুকু-সেজদাতে যেতে হয়। সে সাথে পবিত্র কোরআন থেকে পাঠও করতে হয়। নামাযের বাইরেও কোরআন-হাদীস পাঠ ও তাসবিহ-তাহলিলকে নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত করতে হয়।

আল্লাহর স্মরণ যে কত গুরুত্বপূর্ণ এবং তাঁকে ভূলে যাওয়া যে কত বিপদজনক -সে ঘোষণাটি পবিত্র কোরআনে বার বার এসেছে। বলা হয়েছে “যে আমার স্মরণে বিমুখ থাকবে,অবশ্যই তার জীবন-যাপন হবে সংকুচিত এবং আমি তাদেরকে কিয়ামতের দিন উত্থিত কররো অন্ধ অবস্থায়। সে বলবে,“হে আমার প্রতিপালক!কেন আমাকে অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করলে? আমি তো চক্ষুষ্মান ছিলাম।” তিনি বলবেন,“এরূপই আমার নিদর্শনবলী তোমার নিকট এসেছিল, কিন্তু তুমি সেগুলি ভূলে গিয়েছিলে এবং সেভাবে আজ  তুমিও বিস্মৃত হলে।” –(সুরা তা-হা আয়াত ১২৪-১২৬)। প্রতিদিন ৫ বার নামায আদায়ের মূল উদ্দেশ্যটি হলো মু’মিনের স্মৃতিতে আল্লাহর স্মরণকে চির জাগ্রত রাখা। তবে আল্লাহর স্মরণের অর্থ শুধু তাঁর নামের স্মরণ নয়,বরং তাঁর প্রতি দায়বদ্ধতার স্মরণ। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে,“আমিই আল্লাহ,আমি ব্যতীত কোন ইলাহ নাই। অতএব আমার ইবাদত কর এবং আমার স্মরণ জাগিয়ে রাখতে নামায কায়েম করো।” –(সুরা তা-হা আয়াত ১৪)। যে ব্যক্তির মনে আল্লাহর স্মরণটুকুই বেঁচে নেই তার স্মৃতিতে কি সিরাতুল মোস্তাকীমে চলার প্রেরণা থাকে? আল্লাহবিস্মৃত এমন ব্যক্তি যে পথভ্রষ্ট হবে এবং শয়তানের অনুসরণ কররে সেটিই তো স্বাভাবিক।

আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত দায়ভার থেকে আত্মবিস্মৃত হওয়ার অপরাধটি ইহুদীদের একার নয়। মহান আল্লাহর নেয়ামত ভোগের পর কোটি কোটি মানুষ আজও মুর্তি-পুজা করে,আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে এবং আল্লাহর আইন তথা শরিয়ত প্রতিষ্ঠার বিরোধীতা করে –তা তো এমন স্মৃতি বিলুপ্তির কারণেই। আত্মবিস্মৃতির এ রোগটি তখন মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ভয়ানক আযাব রূপে আসে। আল্লাহকে ভূলে যাওয়া মানুষগুলো তখন লিপ্ত হয় আল্লাহর অবাধ্যতায় । পবিত্র কোরআনে সে ঘোষণাটি এসেছে এভাবেঃ “তোমরা তাদের মত হয়ো না যারা আল্লাহকে ভূলে যায়। (আল্লাহকে ভূলে যাওয়ার কারণে) তাদের স্মৃতি থেকে তাদের নিজেদেরকেই বিস্মৃত করে দেয়া হয়েছে, তারাই হল পাপাচারী” –সুরা  হাশর আয়াত ১৯)। অর্থাৎ যেখানেই ব্যক্তির স্মৃতি থেকে আল্লাহর স্মরণ বিলুপ্ত, সেখানেই আযাব রূপে আসে চরম আত্মবিস্মৃতি। মানুষের জীবনে স্মৃতি তো কম্পাসের কাজ করে। ধর্ম-কর্ম, রাজনীতি,সংস্কৃতিসহ জীবনের প্রতি পদে সে স্মৃতিই পথ দেখায়। সে স্মৃতি হারিয়ে গেলে অসম্ভব হয় সঠিক পথে পথ চলা। আল্লাহবিমুখ মানুষের জন্য এটাই হল মহান আল্লাহর কঠিন শাস্তি। বেঈমানের জীবনে তাই কম্পাস নেই, ফলে নেই পথ চিনে সঠিক পথে চলার সামর্থ। সে পথ চলে পথ না চিনেই। কচুরিপানার ন্যায় নানা মত  ও মতবাদের স্রোতে তারা ভাসে। তাই বাংলাদেশে যারা এক সময় মার্কসবাদের জোয়ারে ভেসেছিল তারাই এখন ভারতপন্থি জাতিয়তাবাদী, কেউ বা মার্কিন শিবিরের এনজিও কর্মী।  

নিজের স্মৃতি থেকে নিজে বিলুপ্ত হওয়ার অর্থ, নিজের মন থেকে নিজের কল্যাণচিন্তা বিলুপ্ত হওয়া। এমন আত্মবিস্মৃত ব্যক্তি তখন মূক্তির পথ দেখতে পায় না। আল্লাহ ও তাঁর প্রদর্শিত সিরাতুল মোস্তাকিমের বদলে তখন তার স্মৃতিতে জেগে উঠে শয়তান এবং শয়তানের প্রদর্শিত নানা পথ। তখন কল্যাণকর মনে হয় জাহান্নামের পথগুলি। আর ব্যক্তির জীবনে সে আযাবটিই ডেকে আনে সেক্যুলিরাজিম। সেক্যুলারিজমের আভিধানিক অর্থ ইহজাগিকতা, ফলে এর লক্ষ্য হল মানুষকে আল্লাহবিমুখ ও পরকালবিমুখ করা। সেক্যুলারিস্ট ব্যক্তি তাই বেঁচে থাকে পার্থিব-স্বার্থ চিন্তা নিয়ে। এটি কোন আধুনিক মতবাদ নয়, বরং অতি আদিম জাহিলিয়াত। কাবিল ছিল মানব ইতিহাসের প্রথম সেক্যুলার ব্যক্তি, নিছক পার্থিব স্বার্থচেতনায় সে তার ভাই হাবিলকে হত্যা করেছিল। চেতনার ভূবনে এ মতবাদ প্রতিষ্ঠা পেলে বিলুপ্ত হয় আল্লাহর স্মরণ। তখন প্রকট আকার ধারণ করে আত্মবিস্মৃতি,এবং শুরু হয় পাপাচার। যাদের মনে মহান আল্লাহর স্মরণ নাই তাদের জীবনে অনিবার্য হয় নানা রূপের পথভ্রষ্টতা। তারা পরিণত হয় শয়তানের সহজ শিকারে। পথভ্রষ্ট হওয়ার আযাব আসে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকেও। তখন তাদের ঘাড়ে তিন চাপিয়ে দেন শয়তানকে। সে ঘোষণাটি এসেছে পবিত্র কোরঅআনের নিম্মুক্ত আয়াতেঃ “যারাই দয়াময়ের (রহমানের) যিকর থেকে বিস্মৃত হলো তাদের উপর আমরা চাপিয়ে দেই শয়তান, সে তখন তার সহচরে পরিণত হয়। নিশ্চয়ই তারা (শয়তান) বাধাগ্রস্ত করে সিরাতুল মুস্তাকীমে চলা, অথচ তারা (পথভ্রষ্টরা) মনে করে তারা হিদায়েতপ্রাপ্ত।”  -(সুরা যুখরাফ, আয়াত ৩৬-৩৭।  

চেতনা থেকে মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণ এবং তাঁর প্রতি দায়বদ্ধতার কথা বিলুপ্ত হলে মানুষ যে কতটা বিভ্রান্ত হয় তার একটি উদাহরণ দেয়া যাক। ঢাকার এক পুজামণ্ডপে গিয়ে শেখ হাসিনা বলেছিলেন “মা দুর্গা তার গজে চড়ে আসায় বাংলাদেশে ফসল বেড়েছে”। তাঁর এমন বক্তব্য বাংলাদেশের পত্রিকাগুলোতে ছাপাও হয়েছে। কোন ব্যক্তির স্মৃতিতে আল্লাহর স্মরণ বেঁচে থাকলে কি এভাবে দেব-দেবীর কথা মুখে আসে? শেখ হাসিনার এমন বিশ্বাস তাঁর চেতনায় হটাৎ গজায়নি। বরং এমন একটি কুফরি বিশ্বাসের জন্য বহু পূর্ব থেকেই সেক্যুলারিজম তার চেতনা জুড়ে বিশাল স্থান তৈরি করে দিয়েছিল।  সেটি আল্লাহর স্মরণ বিলুপ্তির মধ্য দিয়ে। সে শূণ্যস্থানে সহজেই আধিপত্য জমিয়েছে দুর্গা দেবী। সেক্যুলারিস্টদের কাছে পরকালের স্মরণ, রাজনীতিতে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার অঙ্গিকার, সংস্কৃতিতে পর্দাপুশিদা এজন্যই সাম্প্রদায়িকতা। সে সাথে পশ্চাদপদতাও।তারা আল্লাহর কাছে জবাবদেহীতা নিয়ে রাজনীতি করে না,বরং সেটি করে ব্যক্তি স্বার্থ,দলীয় স্বার্থ, বিদেশীদের স্বার্থের প্রতি নজর রেখে। ফলে সে রাজনীতির সর্বত্র জুড়ে আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সুর। শরিয়তের প্রতিষ্টার বিরুদ্ধে এজন্যই তাদের যুদ্ধ। ফলে যে দেশে ও যে সমাজে সেক্যুলারিজমের প্রসার ঘটে সে দেশে স্বভাবতই বিলুপ্ত হয় আল্লাহর ভয়,এবং বিস্মৃত হয় তাঁর দ্বীন প্রতিষ্ঠার ফরজ দায়িত্ববোধটি। সে স্মৃতি-বিলুপ্তি নিয়েই শেখ মুজিব বাংলাদেশে ইসলামের বিজয়ের লক্ষ্যে প্রচার করা,কোন সংগঠন বা সভা-সমিতি করা সাংবিধানিক ভাবে নিষিদ্ধ করেছিলেন। অথচ দরজা খুলে দিয়েছিলেন জাতীয়তাবাদী, মার্কসবাদী, সমাজবাদী -এরূপ নানা কুফরি মতবাদের প্রচারকদের।

আল্লাহর স্মরণ ও তাঁর প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে বিস্মৃত হলে অনিবার্য হয় মহান আল্লাহর প্রতিশ্রুত আযাব। আর সে আযাব আসে আত্মবিস্মৃতি রূপে, সেটি যেমন ব্যক্তি-জীবনে তেমনি জাতীয় জীবনে। জীবনে সুস্থ্যতা নিয়ে বাঁচতে হলে স্মৃতিতে শুধু বিশুদ্ধ খাদ্য-পানীয়’র চিত্র থাকলে চলে না। বিষ,বিষাক্ত শাপ ও হিংস্র জন্তজানোয়ারগুলোর চিত্রও মগজে রাখতে চয়। শিশুর সে স্মৃতি থাকে না, ফলে বিষাক্ত শাপকেও সে জড়িয়ে ধরে। তেমনি ভয়ানক ভূল হয় আল্লাহবিস্মৃত মানুষগুলোর জীবনে। তার ভূল করে ঘাতক শত্রুদের চিনতে। এমন স্মৃতিবিলুপ্তির কারণেই সেক্যুলার বাঙলী মুসলমানেরা ১৭৫৭ সালের শত্রুদের যেমন ভূলেছে, তেমনি ১৯৪৭ সালের শত্রুদেরও ভূলেছে। এবং ভুলেছে একাত্তর এবং একাত্তর পরবর্তী শত্রুদের চিনেতও। ভুলেছে ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতার বিশাল নেয়ামতটি। ফলে ১৯৭১য়ে যারা ভারতীয় লুটেরা বাহিনীকে বাংলাদেশে ডেকে আনলো, ১৯৭৪য়ে সীমান্ত বাণিজ্যের নামে যারা ভারতের হাতে সীমাহীন শোষণ এবং শোষণে শোষণে ভয়ানক দুর্ভিক্ষ উপহার দিল, ভারতের হাতে তুলে নিল পদ্মার পানি, লুণ্ঠন হতে দিল পাকিস্তান আমলের হাজার হাজার কোটি টাকার অস্ত্র, ভারতের দখলে দিল তালপট্টি ও বেরুবাড়ী -তারাও বন্ধু মনে হয়। বাংলাদেশের মুসলমানদের মূল সর্বনাশটি দেশের চোর-ডাকাতদের হাতে হয়নি,হয়েছে সেক্যুলারিস্টদের হাতে। তারা যে শুধু দেশকে শত্রুর কোলে তুলে দিয়ে স্বাধীনতা ও দেশবাসীর ইজ্জত-আবরুকে বিপন্ন করেছে তা নয়, বিপন্ন করছে বাঙালী মুসলমানের পরকালকেও।  দুর্বৃত্তরা অর্থ লুটে, এরা বিপন্ন করছে কোটি কোটি মানুষের জান্নাতপ্রাপ্তি।

 

যে স্মৃতি হারিয়ে গেছে বিস্মৃতিতে

বাঙালী মুসলমানের জীবনে স্মৃতিবিলুপ্তির রোগটি মারাত্মক ভাবে প্রকাশ পায় ১৯৭১ সালে। আর এখন সে রোগটি মহামারি রূপ ধারণ করেছে। সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীগণ হল এ “আত্মবিস্মৃতি” রোগের মূল ভাইরাস। এইডস রোগের ভাইরাস শরীরের ইম্যুনিটি বিলুপ্ত করে,এরাও তেমনি বিলুপ্ত করে চেতনা জগতের ইম্যুনিটি। ইম্যুনিটি হল রোগের বিরুদ্ধে শরীরের নিজস্ব প্রতিরোধের সামর্থ। এ প্রতিরোধ সামর্থ বিলুপ্ত হলে তখন অনায়াসে নানা রোগ-জীবাণূ দেহে রোগ ছড়ানোর সুযোগ পায়। সেক্যুলারিস্ট ভাইরাসগুলোর মূল কাজ,বাঙালী মুসলমানদের স্মৃতি থেকে ভারতীয় বর্ণহিন্দুদের অপরাধগুলো বিলুপ্ত করা। ফলে বাংলাদেশীরা হারাচ্ছে শত্রুর সামিরক ও সাংস্কৃতিক হামলার বিরুদ্ধে ইম্যুনিটি। ভূলিয়ে দিচ্ছে ভারতীয় লুণ্ঠনের ইতিহাসও। বিলুপ্ত করছে পাকিস্তান সৃষ্টির ইতিহাসও। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টি ছিল বাংলার মুসলমানদের জন্য আল্লাহর বিশাল নিয়ামত। মহান আল্লাহর অপার রহমত ছাড়া ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ ও ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের প্রবল বিরোধীতার মুখে ভারতের অনগ্রসর মুসলমানেদের একার পক্ষে ভারত ভেঙ্গে পাকিস্তান সৃষ্টি অসম্ভব ছিল। ১৬ কোটি বাংলাদেশী কি ভারত থেকে সামান্য তিন বিঘা ভূমিও নিতে পেরেছে? মহান আল্লাহতায়ালা যেমন পরাক্রমশালী ফিরাউনের কবল থেকে বনি ইসরাইলের অসহায় লোকদের উদ্ধার করেছিলেন, তেমনি ১৯৪৭ সালে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের শোষণ ও নির্যাতন থেকে উদ্ধার করেছিলেন কোটি কোটি মুসলমানদের। পাকিস্তান সৃষ্টি না হলে অবিভক্ত ভারতে মুসলমানদের আজকের অবস্থা হতো অচ্ছুৎ হরিজনদের থেকেও করুণ। প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের নিয়োজিত সাম্প্রতিক তদন্ত কমিশন তো ভারতীয় মুসলমানদের সে চিত্রটিই তুলে ধরেছে। ঢাকার ন্যায় একটি শহরে যতজন মুসলিম ডাক্তার, ইঞ্জিনীয়ার, বিজ্ঞানী, কৃষিবিদ, ব্যবসায়ী, প্রফেসর, সেনা অফিসারের বসবাস ভারতের ২০ কোটি মুসলিম তার অর্ধেকও সৃষ্টি করতে পারিনি। কারণ বেড়ে উঠার সে সুযোগই তাদের দেয়া হয়নি। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টি না হলে বাঙালী মুসলিমদের অবস্থা হতো ভারতীয় মুসলিমদের ন্যায়। অথচ স্মৃতিবিলুপ্তির ফলে সে ঐতিহাসিক সত্যটি আজ বাঙালী মুসলমানের স্মৃতি থেকে বিলুপ্ত হয়েছে।

স্মৃতি-বিলুপ্তিতে হারিয়ে যায় সত্য,তখন চেতনার সে শূন্য স্থানটিতে আসন গাড়ে নিরেট মিথ্যা। মিথ্যার প্রচারকদের কাছে স্মৃতিবিলুপ্তি ঘটানোটি এজন্যই এতটা জরুরী। ভারত-ভক্ত সেক্যুলারিস্টদের হাতে বাঙালী মুসলমানদের স্মৃতি-বিলুপ্তি যে কতটা ব্যাপক ভাবে হয়েছে তার কিছু উদাহরণ দেয়া যাক। বলা হয়,পূর্ব পাকিস্তান ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের কলোনি। অথচ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিতই হয়েছিল মূলত বাঙালী মুসলমানদের কারণে। সমগ্র ভারতের মাঝে বাংলার মুসলমানগণই ছিল সবচেয়ে শোষিত ও বঞ্চিত। তাদের ঘাড়ে ছিল দুটি জোয়ালঃ একটি ব্রিটিশের,অপরটি উচ্চজাতের হিন্দুদের। ফলে বাংলার মুসলমানগণ পাকিস্তানের প্রয়োজনটি যতটা সহজে বুঝেছিল ভারতের অন্য প্রদেশের মানুষদের সেটি বুঝাতে বহু শ্রম ও বহু সময় লেগেছিল। একমাত্র বাংলাতেই ছিল কায়েদে আযমের নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগের সরকার। মুসলিম লীগের জন্মও হয়েছিল ঢাকায়। ১৯৪০ সালে পাকিস্তান প্রস্তাবের উপস্থাপকও ছিলেন একজন বাঙালী, এবং তিনি শেরে বাংলা ফজলুল হক। ফলে যে বাঙালীরা মুসলিম লীগের জন্ম দিল,পাকিস্তানের প্রস্তাব উত্থাপণ করলো,যারা দেশটি সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক ছিল, এবং যে বাঙালীরা পাকিস্তানের তিন বার প্রধানমন্ত্রী হল সে বাংলা পাকিস্তানের কলোনী হয় কি করে? আরেকটি মিথ্যার ব্যাপক প্রচার ঘটে ১৯৭০ এর নির্বাচনকে সামনে রেখে। আওয়ামী লীগ তখন পোষ্টার ছেপে প্রচার করে, সোনার বাংলা শ্মশান হয়েছে পাকিস্তান আমলের শোষণে। অথচ পাকিস্তান আমলের ২৩ বছরে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে যে হারে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে তা বাংলার বহুহাজার বছরের ইতিহাসে কোন কালেই হয়নি। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭০ অবধি ২৩ বছরে পাকিস্তানে প্রবৃ্দ্ধির যে হার ছিল ভারত সেটি কোন সময়ই অতিক্রম করতে পারিনি। অতিক্রম করেছে আশির দশকের মাঝামাঝিতে এসে। তখন দক্ষিণ কোরিয়ান কর্মকর্তাগণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের ছবক নিতে পাকিস্তানে আসতো। স্মৃতি-বিলুপ্তির আরেক উদাহরণ, তারা শুধু পাকিস্তান সৃষ্টিকেই অনাসৃষ্টি বলে না,১৯৪৭-এ বাংলা বিভাগের জন্যও মুসলিম লীগকে দায়ী করে। অথচ অবিভক্ত বাংলার প্রাদেশিক সরকারে তখন মুসলিম লীগ। এবং দেশ-বিভাগ কি কোন দেশের শাসক দল করে? তারা চেষ্টা করেছিল বাংলাকে অবিভক্ত রাখায়। মুসলিম লীগের দাবী ছিল,বাংলা বিভক্তির পক্ষে-বিপক্ষে সিদ্ধান্ত হতে হবে প্রাদেশিক পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের ভোটে। সেটি হলে বাংলা বিভক্ত করা অসম্ভব ছিল। কারণ বাংলার সংসদে তারাই ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। কিন্তু কংগ্রেস ও হিন্দুমহাসভার পক্ষ থেকে মুসলিম লীগের সে প্রস্তাব অগ্রাহ্য করা হয়। তারা দাবী করে,সে সিদ্ধান্ত সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠদের ভোটে নয়,হিন্দুদের পৃথক ভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ার এবং সে সাথে তাদেরকে ভেটো দেয়ার অধিকার দিতে হবে। তারা ভাইস-রয় লর্ড মাউন্ট ব্যাটনকে তাদের সে দাবী মেনে নিতে বাধ্য করে। তখন হিন্দু সদস্যরা পৃথক ভাবে সিদ্ধান্ত নেয় বাংলা বিভক্তির,এবং তাদের সে দাবীর ভিত্তিতেই ব্রিটিশ সরকার বাংলাকে বিভক্ত করে। বাংলার মানচিত্রে বিভক্তির সে কাঁচিটি চালায় ব্রিটিশ র‌্যাডক্লিফ, মুসলিম লীগ নয়। কিন্তু সে স্মৃতি ক’জনের? স্মৃতি-বিলুপ্তি ঘটানোর সে ধারাবাহিকতায় বাঙালী মুসলমানের ইতিহাসে ১৯৪৭এর ১৪ই আগষ্টও যে একটি স্বাধীনতা দিবস ছিল,১৯৪৭ থেকে ১৯৭০ অবধি যে একটি যুগ ছিল সেটিও আজ  ভূলিয়ে দেয়া হয়েছে। প্রশ্ন হল,এত স্মৃতি বিলুপ্তি নিয়ে কি “কে শত্রু এবং কে মিত্র” সে বিচার সঠিক ভাবে হয়? বাংলাদেশীরা শত্রু মিত্র চিনতে যে পদে পদে ভূল করছে তা তো এ কারণেই। আর এর ফলে ঘনীভূত হচ্ছে বিপর্যয়। বিপর্যস্ত হচ্ছে স্বাধীনতার সুরক্ষা।

স্বাধীনতার সুরক্ষা ও কল্যাণে শুধু নিজ দেশের রাজনীতি, সমাজ, ভূপ্রকৃতি, জলবায়ু জানলে চলে না। নিছক ভাষাজ্ঞান, কৃষিজ্ঞান, কারিগরি জ্ঞান, চিকিৎসাজ্ঞান বাড়ালেও চলে না। সঠিক ভাবে জানতে হয় প্রতিবেশীর মতি-গতি, মন-মানসিকতা,রাজনীতি ও সংস্কৃতিকে। এজন্য দেশবাসীর স্মৃতি-বিলুপ্তি নয়, সে স্মৃতিকে প্রবল ভাবে বাড়াতে হয়। বিশেষ করে ইতিহাসের স্মৃতি। পাশের মহল্লায় বা জঙ্গলে কাদের বসবাস সে খবর না নিয়ে গৃহ নির্মান করাটি বুদ্ধিহীনতা। চোর-ডাকাত বা বাঘ-ভালুকের বসতিতে বসবাস নিরাপদ নয়। সে পরিবেশে পর্যাপ্ত প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়। ভারত ভূটান নয়,বার্মাও নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যায় অন্য গোলার্ধের দেশও নয়। বরং ভারত বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী, এবং ঘিরে আছে পশ্চিম-উত্তর-পূর্ব এ তিন দিক দিয়ে। এ জন্য জরুরী হল, ভারতীয় জনগণ ও সে দেশের শাসক চক্রের স্বপ্ন, দর্শন, আশা-আকাঙ্খা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির খবর নেয়া। তখন প্রয়োজন হয় মুসলমান, বৌদ্ধ ও অন্যান্য অহিন্দুদের সাথে তাদের অতীতের হিংস্র আচরণের বিষয়টি গভীর ভাবে জানা। কারণ জাতির চেতনা কথা বলে ইতিহাসের মধ্য দিয়ে। পাশ্চাত্যের দেশগুলো তাই বিপুল অর্থব্যয়ে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়, বৈজ্ঞানিক গবেষণাগার, কলকারখানা, রাস্তাঘাট, হাসপাতাল ও সেনা বাহিনীই গড়ে না, গড়ে তুলে বিশাল বিশাল সমাজ গবেষণা ইন্সটিটিউটও। সেগুলির কাজ, অন্যদের জীবন-দর্শন, ইতিহাস, রাজনীতি, সমরনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতির উপর লাগাতর মনিটরিং করা।  রাডার বিমান হামলার পূর্বাভাস দেয়, কিন্তু এ প্রতিষ্ঠানগুলো পূর্বাভাস দেয় শত্রুর রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিকসহ সামগ্রিক হামলার। এ প্রতিষ্ঠানগুলোর কারণেই সোভিয়েত রাশিয়ার পতন ঘটাতে পাশ্চাত্যের সোভিয়েত বিরোধী জোটকে একটি তীরও ছুঁড়তে হয়নি।

 

বার বার আসছে পরাধীনতা

জাতি কখনো হাসপাতাল,কলকারখানা বা ক্ষেতেখামারে মারা যায় না। মারা যায় চেতনার ময়দানে। জাতির বেঁচে থাকার চুড়ান্ত যুদ্ধটি হয় মূলত চেতনার এ রণাঙ্গনে। উদ্ভিদ বা পশুকুল থেকে মানুষের বাঁচাটি এজন্যই ভিন্নতর। জাতির বাঁচাটি নিরাপদ করতে হলে তাই অতীতের স্মৃতিকে তীব্রতর করতে হয়। আত্মবিস্মৃত ব্যক্তি শত্রু-মিত্র চেনে না। ব্যক্তি অন্যকে ভালবাসে বা ঘৃণা করে অতীত স্মৃতি নিয়েই। পিতা-মাতা নিজ সন্তুান থেকে শ্রদ্ধা ও ভালবাসা পায় শিশু বয়স থেকে পিতামাতার আদরের সে স্মৃতি নিয়ে বেড়ে উঠার কারণে। কার ঔরসে বা কার গর্বে জন্ম নিল শিশুর সেটি জানা থাকার কথা নয়,যা দেখে বা যা জানে তা হল পিতামাতার অকৃত্রিম ভালবাসা। তেমনি একটি দেশের রাজনীতি, সংস্কৃতি,সাহিত্য ও ইতিহাসে ফুটে উঠে অতীতের স্মৃতি। জাতির সে সামগ্রিক স্মৃতিতে বেঁচে থাকে যেমন মিত্রদের স্মৃতি, তেমনি ভয়ানক শত্রুদের স্মৃতিও। কিন্তু সেটি অসম্ভব হয় স্মৃতি বিলুপ্তিতে। অথচ সে স্মৃতি বিলুপ্তিই আজ বাংলাদেশে প্রকট,সেটি ডেকে এনেছে ভারতপন্থিরা। লক্ষ্য, ভারতের অপরাধগুলোকে বাংলাদেশীদের স্মৃতি থেকে বিলুপ্ত করা।

স্মৃতি-বিলুপ্তির ফলে একই ভূল বার বার হয়।তেমনি একই বিপর্যয়ে বার বার পড়ে আত্মবিস্মৃত জাতি। তখন পরাধীনতা আসে বার বার। তখন বার বার বিজয়ী হয় দুর্বৃত্ত মীরজাফররা। বাংলাদেশের বিপদ তাই কাটছে না। ১৯৪৭ সালে ভারতীয় হিন্দুদের থেকে আজাদী মিলেছিল। কিন্তু গোলামী সে শিকল আবার গলায় উঠেছে। এমন লাগাতর বিপর্যয় থেকে বাঁচতে হলে স্মৃতিকে সমৃদ্ধ করতে হয়। সেজন্য লাগাতর বাড়াতে হয় ইতিহাস জ্ঞান। ব্যক্তির চেতনা সদাসর্বদা জাগ্রত রাখার এটিই অপরিহার্য মাধ্যম। জ্ঞানবিজ্ঞানের অসংখ্য শাখা-প্রশাখার মাঝে ইতিহাস বিজ্ঞান তাই অপরিহার্য। পবিত্র কোরআনের বিশাল অংশ জুড়ে তাই ইতিহাস বিজ্ঞান। করুণাময় মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর পবিত্র কালামে বার বার নবী-রাসূলদের স্মৃতিকে যেমন তুলে ধরেছেন তেমনি তুলে ধরেছেন নমরুদ,ফিরাউনের ন্যায় ইসলামের শত্রুদের স্মৃতিও। ইতিহাস জ্ঞান মানুষের মনে র‌্যাডারের কাজ করে। সে র‌্যাডার রাজনীতি, সমাজনীতি, সংস্কৃতি ও যুদ্ধবিগ্রহে পথ দেখায়। অথচ এক্ষেত্রে বাংলাদেশের মত দেশগুলোর ব্যর্থতা শুরু থেকেই বিশাল। বাংলাদেশ প্রথম অধিকৃত হয় ১৭৫৭ সালে। সেটি ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের হাতে। অথচ পশ্চিম ইউরোপীয়রা হঠাৎ করে হানাদার ঔপনিবেশিক হয়ে উঠেনি। বরং সেটি হয়েছিল এক দীর্ঘ প্রস্তুতির ধারাবাহিকতায়। কিন্তু বাংলার ন্যায় তৃতীয় বিশ্বের মানুষ পশ্চিমা ঔপনিবেশিকদের লুণ্ঠনপ্রবন আগ্রাসী মনের পরিচয় ও তাদের প্রস্তুতির খবরটি যথাসময়ে ও যথার্থ ভাবে পায়নি। ফলে সে হামলার বিরুদ্ধে তারা প্রস্তুতিও নিতে পারিনি। ইঁদুর গর্ত করে স্রেফ ঘুমানোর জন্য নয়,লক্ষ্য লুণ্ঠন। তেমনি লক্ষ্য সাম্রাজ্যবাদীদেরও। সে সময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা বানিজ্যের নামে বাংলায় বহু কুঠি নির্মান করেছিল। তাদের লক্ষ্য নিছক চুরিমালা, চিরুনি বা পুথির মালা বিক্রি ছিল না। স্রেফ মসলিন ক্রয়ও ছিল না। সেসব ছিল ছদ্দবেশ। মূল লক্ষ্য ছিল সাম্রাজ্য স্থাপন। কিন্তু এদেশের শাসক মহল ও সাধারণ মানুষের চেতনার রাডারে সেটি ধরাই পড়েনি। ফলে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা সহজেই অধিকৃত হয়। ধীরে ধীরে অধিকৃত হয় সমগ্র ভারত। বুঝতে হবে, ভারতও নিছক মালামাল পারাপারের জন্য জল ও স্থল পথে করিডোর নিচ্ছে না। কিন্তু আওয়ামী কাপালিকদের কি সেটি বোঝার সামর্থ আছে? ইঁদুর যেমন ঘরের মেঝেতে গর্ত খুড়ে,এরাও তেমনি বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে করিডোর নিচেছ। তবে পার্থক্য হলো, তারা সেটি ইঁদুরের ন্যায় লুকিয়ে লুকিয়ে নিচ্ছে না।

বাংলাদেশ দ্বিতীয়বার অধিকৃত হয় ১৯৭১ সালে, এবং সেটি ভারতীয় বাহিনীর হাতে। ১৭৫৭ সালের পরাজয়ে বেনিয়া ব্রিটিশরা যতটা লুটেছিল তার চেয়ে বহুগুণ বেশী লুটেছিল ভারতীয় বেনিয়ারা। ভারতের সে লুটটি সম্ভব হয়েছিল তাদের পক্ষে বিপুল সংখ্যক সহায়তাদানকারির কারণে। ১৭৫৭-এ বিজয়ী ব্রিটিশদের প্রবল লুণ্ঠন-লিপ্সা থাকলেও দেশজুড়ে লুণ্ঠন চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় লোকবল ছিল না। তাদের পক্ষে সহায়তাদানকারি বাঙালীর সংখ্যাও ততটা বিশাল ছিল না। একাত্তরে ভারত-ভক্ত আওয়ামী লীগ যতটা সংগঠিত ছিল, ১৭৫৭ সালে ব্রিটিশ-ভক্ত মীরজাফর ও তার দলবল ততটা সংগঠিত ছিল না। ফল দাঁড়িয়েছিল, ১৭৫৭ এর পরাজয়ের পর ছিয়াত্তরের মনন্তর আসতে কিছু দেরী হয়েছিল। কিন্তু একাত্তরে ভারতীয় অধিকৃতির পর লুট এতটাই নির্মম ছিল যে তাতে অতি শীঘ্রই ভয়ানক দুর্ভিক্ষ নেমে আসে, এবং সেটি ১৯৭৪ সালে। বহু লক্ষ মানুষ তখন না খেয়ে মারা গিয়েছিল। তবে ভারত বাংলাদেশে দখল জমানোর  সে প্রস্তুতিটি স্রেফ ১৯৭১-এ নেয়নি। নিয়েছিল ১৯৪৭ সাল থেকেই। ভারত যে ভাবে করিডোর নিচ্ছে, দেশের বাজার দখল করছে, মিডিয়ার উপর অধিকার জমিয়েছে এবং রাজনীতিতে বিশাল মিত্রবাহিনী গড়ে তুলেছে -সেটিও তো এক গ্রাণ্ড স্ট্রাটেজীকে সামনে রেখেই।

 

মহা বিপর্যয়ের পথে দেশ

তাই আওয়ামী শাসনের বড় বিপদ দ্রব্যমূল্যের উর্দ্ধগতি নয়।রাস্তাঘাট,পানি-বিদ্যুত-গ্যাস সরবরাহে দুর্গতি,স্বৈরাচারী নির্যাতন বা আইনশৃঙ্খলার অবনতিও নয়। বরং সেটি সীমাহীন মিথ্যাচার। স্মৃতি থেকে সত্য-বিলুপ্তির কাজে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হল এ মিথ্যাচার। সে মিথ্যা যত বিশাল,ততই তার সত্যবিনাশী নাশকতা। স্মৃতি বিনাশের ফলে বিলুপ্ত হয় সত্য-মিথ্যা,ন্যায়-অন্যায় ও শত্রু-মিত্র বাছবিচারের সামর্থ। তখন জনগণের জীবনে আসে ভয়ানক চেতনা বিভ্রাট। য়ূয়ূএজন্যই ইসলামে মিথ্যাচারকে বলা হয় সকল পাপের মা। ইসলামে এটি কবিরা গুনাহ। স্মৃতি থেকে লা-শরিক আল্লাহর স্মরণকে ভূলাতে পৌ্ত্তলিকরা তাই মিথ্যা দেবদেবীর কিসসা শুনায়। খৃষ্টানরা তেমনি খাড়া করে ঈসা (আঃ)এর আল্লাহর পুত্র হওয়ার কাহিনী। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরাও তেমনি তাদের বাকশালী স্বৈরাচারি নেতার পর্বত সমান ব্যর্থতার স্মৃতি মুছে দিতে তাঁকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ হওয়ার কিসসা শুনায়। একাত্তরে তেমনি তারা তিরিশ লাখ নিহতের কিসসা খাড়া করেছিল। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর ঋণ বাতিল করেছে হাসিনা সরকারের দূর্নীতির কারণে। অথচ আওয়ামী লীগ প্রচার করছে বিশ্ব ব্যাংক প্রস্তাবিত ঋণ বাতিল করেছে পূর্ববর্তী সরকারের দূনীর্তির ফলে। শেখ হাসিনার এ মিথ্যাচারও যে বিপুল সংখ্যক খরিদদার পাবে -তা নিয়েও কি সন্দেহ আছে? যে সব বাঙালী নিহত তিরিশ লাখের কথা বিশ্বাস করে,বিশ্বাস করে শেখ মুজিবের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী রূপে,তারা শেখ হাসিনার এ নতুন মিথ্যাকে শুধু মেনেই নিবে না,প্রচারও করবে। যে ব্যক্তি পুতুল পুঁজা করে সে ব্যক্তি শাপ-শকুনকেও পুঁজা করে। একই কারণে ভারতের প্রতি আজকের অধীনতাকে তারা শুধু স্বাধীনতাই বলবে না,তা নিয়ে উৎসবও করবে। এবং বিরাট সফলতা বলবে আজকের আওয়ামী লীগ সরকারের সকল ব্যর্থতাগুলোকেও। যুগে যুগে বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্টদের শিবিরে কোন কালেও কি উৎসবের কমতি ছিল? মাসে মাসে পুঁজা-পার্বন লেগে থাকে তো সে পথভ্রষ্টতা বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে।বাংলাদেশের জাতিয়তাবাদী,সমাজবাদী,নাস্তিক সেক্যুলারিস্টগণও তেমনি তাদের মিথ্যাচার এবং সে মিথ্যাচারভিত্তিক রাজনীতিকে বাঁচিয়ে রাখার বছরের নানা দিনে নানা দিবস পালিত হবে,উৎসবও হবে। দিন দিন সে উৎসবগুলির সংখ্যা বেড়েই চলবে।| আল্লাহর স্মরণকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যেমন নামায-রোযা,তেমনি তাদের দুর্বৃত্তি ও পথভ্রষ্টতা বাঁচিযে রাখার জন্য হলো এ জাঁকজমকপুর্ণ উৎসব ও দিবস পালন।অতীতের ব্যর্থতা ও ভ্রষ্টতা নিয়ে আজ যেমন উৎসব হচ্ছে,তেমনি আজকের ব্যর্থতা,ভ্রষ্টতা ও দুর্বৃত্তি নিয়েও আগামীতেও বিপুল উৎসব হবে। সে উৎসবগুলো আরো বলবান করবে আজকের মিথ্যা ও পথভ্রষ্টতাকে। একটি দেশের জনগণের জন্য এর চেয়ে বড় বিপদ আর কি হতে পারে? ২৭/১০/১১ (পরিবর্ধিত:০৩/১১/১২ ও ১৪/০৪/২০১৯)