দেশ নিয়ে ভাবনা -৪

১.

মেহনতি মানুষ বিদেশে গিয়ে কষ্ট করে দেশে টাকা পাঠায়। তাদের অর্জিত সে বিদেশী মুদ্রা ক্ষমতাসীন ডাকাত দলের সদস্যরা ডাকাতি করে বিদেশে নিয়ে যায়। বিদেশে তারা বাড়ি কেনে, ব্যবসা করে, জুয়া খেলে। এবং হাসিনার ছেলে জয় ফুর্তি করে আমেরিকাতে।

২.
ঘরে আবর্জনা জমলে সে  আবর্জনা সরানোর কাজটি ঘরের সবার। সেটিই সভ্য পরিবারের রীতি।তেমনি দেশ চোর-ডাকাতের দখলে গেলে সে চোর-ডাকাত খেদানোর কাজও সবার।সে কাজে যার ইচ্ছা নেই সে অসভ্য। অথচ বাংলাদেশে সে কাজটি হয়নি। দেশে কি স্রেফ মসজিদ-মাদ্রাসা গড়ে কি এ অসভ্যতা থেকে বাঁচা যায়? নবীজী (সাঃ) শুধু  মসজিদ বানাননি, ইসলামি রাষ্ট্রও গড়েছেন। সে কাজে শতকরা ৭০ ভাগের বেশী শহীদ হয়েছেন। বাংলাদেশের মুসলিমদের সে কাজে আগ্রহ কই?

৩.
বাংলাদেশ কি গণতান্ত্রিক দেশ? গণতান্ত্রিক দেশে তো ভোটে সরকার নির্বাচিত হয়। নিশীথ রাতের ভোট ডাকাতগণ ক্ষমতায় আসে কি করে? প্রতিটি গণতান্ত্রিক দেশে কথা বলা, মিটিং-মিছিল করার স্বাধীনতা থাকে। পাকিস্তান আমলে শেখ মুজিব শত শত মিছিল-মিটিং করেছে। বাংলাদেশে সে অধীকার ছিনিয়ে নেয়ার পরও সরকার বলে তারা নাকি গণতান্ত্রিক! এ সরকারের মুখে পাকিস্তানের বদনাম করা সাজে কি?

৪.
যিকির মানে প্রতি পদে মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিটি হুকুম মেনে চলার ফিকির। যিকিরে থাকে শরিয়ত মেনে চলার ফিকির। যেদেশে শরিয়তের আইন ছাড়াই বিচার হয়, বুঝতে হবে আল্লাহতায়ালার আনুগত্য নিয়ে তাদের কোন ফিকির নাই। এদের যিকির যে নিতান্তই ভূয়া –তা নিয়ে কি সামান্যতম সন্দেহ থাকে?

৫.
ঈমানদার হওয়া মানেই হলো মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনকে বিজয়ে করার জিহাদে মুজাহিদ হওয়া। নবীজী (সাঃ)র সাহাবাদের শতকরা শতভাগ সাহাবাই মুজাহিদ ছিলেন। যারা জিহাদের নামেননি তাদেরকে মুনাফিক বলা হয়েছে। যারা জিহাদ বিমুখ ইসলামে তাদের কোন স্থান নেই। বাংলাদেশে ১০০ জনের মাঝে যদি একজনও যদি নবীজী (সাঃ)র ইসলাম বুঝতো তবে ১৭ কোটির মাঝে ১৭ লাখ মুজাহিদ তৈরী হতো । তখন কি দেশ হাসিনার ন্যায় নিশীথ রাতের ভোট ডাকাতের হাতে অধিকৃত  হতো? তখন বরং শরিয়ত প্রতিষ্ঠার জন্য জিহাদ শুরু হয়ে যেত।
৬.
ঈমান ছাড়া আল্লাহতায়ালার দরবারে ভাল কাজের কোন মূল্য নাই। শত কোটি টাকা দান করলেও নয়। ভাল কাজ ছাড়া ঈমানও মূল্যহীন। কারণ উত্তাপ ছা্ড়া যেমন আগুণ হয় না, ভাল কাজ ছাড়া তেমনি ঈমান হয় না। মহান আল্লাহতায়ালা এ দুটিকে এক সাথে দেখতে চান। আল্লাহতায়ালার কাছে সবচেয়ে বড় ভাল কাজ হলো ইসলামের শত্রু নির্মূলের জিহাদ –যা সুরা সাফ’য়ের ৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে। ইসলামের শত্রুগণ জিহাদকে সন্ত্রাস বলে স্রেফ মুসলিমদের জিহাদ বিমুখ করার স্বার্থে। ব্রিটিশেরা সে প্রচার নিয়েই বাংলার মুসলিমদের জিহাদ থেকে দূরে রেখেছে এবং ১৯০ বছর শাসন করেছে। আজকের শত্রুগণও সেটিই চায়।

৭.
অসভ্যদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সামর্থ্য না থাকলে অসম্ভব হয় সভ্য ভাবে বাঁচা।তাই সভ্য সমাজ গড়তে দেশ থেকে শুধু হিংস্র পশু তাড়ালে চলে না, মানবরূপী পশুদেরও তাড়াতে হয়।এটিই ইসলামের পবিত্র জিহাদ। নইলে আবরার ফাহাদের ন্যায় মানবরূপী পশুদের হাতে লাশ হতে হয়।অথচ বাংলাদেশে সে কাজটি হয়নি।

৮.
দেশে জ্ঞানদান ও জ্ঞানলাভের আয়োজন কতটা পবিত্র, নিবিড় এবং ব্যাপক -তা দেখেই বুঝা যায় দেশ ভবিষ্যতে কতটা সভ্য ভাবে বেড়ে উঠবে। এখাতটি দুর্বত্তদের দখলে গেলে দেশও অসভ্য ডাকাতদের দখলে যায়। বাংলাদেশ হলো তারই উদাহরণ।
৯.
চোর-ডাকাতকে কি কোন সভ্য ও ভদ্র মানুষ সন্মান করে? তাদের সন্মান করা তো অসভ্য চোর-ডাকাতদের কাজ। অথচ বাংলাদেশে ডাকাতদলের ভোট-ডাকাত সর্দারনীকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলে সন্মান করা হয়। দেশের কওমী হুজুররা তাকে কওমী জননী বলে। অথচ ইসলামের হুকুম হলো, এরূপ দুর্বৃত্তদের শুধু ঘৃনা নয়, নির্মূল করা। হুকুম হলো তাদের শাস্তি দেয়ার। সে অদম্য চেষ্টাটুকু না থাকলে বুঝতে হবে ঈমানদার হওয়াতে অনেক বাঁকি রয়ে গেছে।

১০.

সুরা ইমরানের ১১০ নম্বর আয়াতে বিশ্বমাঝে মুসলিমদের সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি বলা হয়েছে। তবে এজন্য নয় যে, তারা বেশী বেশী নামায-রোযা করে। উক্ত আয়াতে যে কারণে তাদেরকে সর্বশ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে তা হলো, তারা দুর্বৃত্তিকে নির্মূল করে এবং ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা দেয়। ফলে চোর-ডাকাত ও ভোট-ডাকাতদের পক্ষ নিলে কি সে মর্যাদা কখনো অর্জিত হয়?  

১১.
যারা কোর’আন থেকে শিক্ষা নেয় এবং অন্যদের শিক্ষা নিতে সাহায্য করে -তাঁরাই হলো শ্রেষ্ঠ মানব।–নবীজী (সাঃ)র হাদীস। কথা হলো, বাংলাদেশে এমন মানুষের সংখ্যা শতকরা ক’জন? কোর’আন ঠিক মত বুঝলে তো দেশে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা ও ডাকাত নির্মূলের লক্ষ্যে লাগাতর জিহাদ শুরু হতো।

১২.
“হে ঈমানদারগণ, তোমরা আমার ও তোমাদের শত্রুদের বন্ধু রূপে গ্রহণ করো না”-(সুরা মুমতেহানা আয়াত ১)। অথচ বাংলাদেশে মহান আল্লাহতায়ালার এ কোর’আনী হুকুমের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড বিদ্রোহ হচ্ছে। ভারতীয় সরকার আল্লাহ ও মুসলিমদের দুষমন। কাশ্মিরে তারা ধর্ষণ ও গণহত্যায় লিপ্ত।  ভারতের বিভিন্ন স্থানে তারা যেমন মুসলিমদের হত্যা করছে, তেমনি মসজিদ ধ্বংস করছে। মসজিদের জমিতে তারা মন্দির বানাচ্ছে। এরপরও তাদের সাথে কি বন্ধুত্ব করা যায়? সেটি তো হারাম। আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে যারা বিদ্রোহী একমাত্র তারাই এমনটি করতে পারে? তাই শুধু ভারত নয়, ভারতের সেবাদাস হাসিনাও মুসলিমদের শত্রু।


১৩.
শেখ হাসিনা ভারতের সাথে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব নিয়ে গর্বিতা। কিন্তু বন্ধুত্ব তো তখনই সম্ভব যখন বাংলাদেশের ন্যায্য পাওনাগুলি ভারত দিয়ে দেয়। অথচ ভারত শুধু নেয়াতে আগ্রহী, দেয়াতে নয়। এমন কি ভারতীয় মুসলিম নাগরিকদের বাংলাদেশী বলে বাংলাদেশে পাঠাতে চায়। ফলে হাসিনা যা প্রতিষ্ঠা দিয়েছে তা বন্ধুত্ব নয়, তা বরং নিরেট গোলামী।

১৪.
আদম (আ:)কে সিজদা করার একটি মাত্র হুকুম অমান্য করায় ইবলিস অভিশপ্ত শয়তানে পরিণত হয়।যারা শরিয়তের অসংখ্য হুকুম অমান্য করে দেশ ও দেশের আদালত চালায় -তারা যে ইবলিসের চেয়েও অধীক অভিশপ্ত তা নিয়ে কি সন্দেহ করা চলে। অথচ বাংলাদেশ সে অভিশপ্ত শয়তানের দলের হাতেই অধিকৃত। বাংলাদেশে গুম, খুন, চুরি-ডাকাতি ও ধর্ষনের রাজনীতিকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে মানবরূপী এ শয়তানেরাই।




বাংলাদেশের ইতিহাসে রাজাকার ও মু্ক্তিযোদ্ধা

কারা রাজাকার ও কারা মুক্তিযোদ্ধা?

একাত্তরে ভারত এক ঢিলে দুই পাখি মেরেছে। এক). পাকিস্তানকে ভেঙ্গেছে। দুই). বাংলাদেশকে গোলাম বানিয়েছে। এ পথেই ভারত বিপুল শক্তি অধিকারি হয়েছে। ফলে মনযোগ দিতে পারছে কাশ্মীর দখলে এবং ভারতের ২০ কোটি মুসলিমের কোমর ভাঙ্গাতে। ভাঙ্গার কাজের শেষ আছে। কিন্তু গোলাম বানানোর কাজের শেষ নাই; এটি লাগাতর অব্যাহত রাখার যুদ্ধ। গোলাম বানানোর পাশাপাশি এখানে রয়েছে শোষণের নেশাও। ফলে বাংলাদেশের মাটিতে ভারতের যুদ্ধের শেষ নাই। বস্তুতঃ ভারতের যুদ্ধটি বাংলাদেশকে অধীনত রাখার এক অবিরাম যুদ্ধ। একাত্তরে বাংলাদেশকে গোলাম বানানোর কাজ ভারত একা করেনি। সে গোলামী অব্যাহত রাখার যুদ্ধেও ভারত আজ একাকী নয়। আজ  যারা বাংলাদেশের নদীর পানি, সমুদ্রবন্দর, গ্যাস, করিডোর ভারতকে দিচ্ছে তারাই একাত্তরে ভারতীয় প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র নিয়ে ভারতের পক্ষে যুদ্ধে নেমেছিল। এরাই হলো একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা। ভারতের চলমান এ যুদ্ধে তাদের প্রয়োজনও তাই শেষ হয়নি। ভারতীয়দের একাত্তরের সে ষড়যন্ত্র অধিকাংশ বাঙালী টের না পেলেও কিছু বাঙালী শত ভাগ টের পেয়েছিল। তারাই সেদিন ভারতীয়দের মোকাবেলায় যুদ্ধে নেমেছিল। এরাই হলো একাত্তরের রাজাকার। প্যান-ইসলামিজম ও ভারতীয় আধিপত্য থেকে মুক্তির প্রতি আপোষহীনতার কারণে রাজাকারদের চিনতে ভারতীয় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিবাহিনী যেমন একাত্তরে ভূল করেনি, এখনো করছে না। ফলে ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কথা বলাটি আজও তাদের কাছে হত্যাযোগ্য অপরাধ রূপে গণ্য হচ্ছে। বুয়েটের আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে লাশ বানালো তো সে অপরাধেই।   

মিথ্যাচার, দূর্নীতি ও স্বৈরাচারের নাশকতাগুলি বিশাল। এগুলি কখনোই একাকী আসে না। আনে চেতনা, দর্শন ও নৈতিক রোগের মহামারি। তাতে মৃত্যু বরণ করে জনগণের বিবেক। বিনষ্ট হয় শিক্ষা ও সংস্কৃতি। মিথ্যা বলা বা মিথ্যা লেখাও তখন অভ্যাসে পরিণত হয়। দেশের ইতিহাসও তখন মিথ্যাচারে পূর্ণ হয়। এতে মৃত্যু ঘটে বিবেকের; প্রতিষ্ঠা পায় ব্যক্তিপূজা। ফিরাউনের ন্যায় দুর্বৃত্তগণও তখন ভগবানে পরিণত হয়। তাছাড়া শুধু শাসক রূপেই শুধু নয়, ইতিহাসের পাতায়ও স্বৈরচারী দুর্বৃত্তদের বাঁচার খায়েশটি বিশাল। এ কারণে বিস্তর মিথ্যাচার ঢুকে ইতিহাসে। একাত্তরের ইতিহাসের বিশাল অংশ জুড়ে তাই মুক্তিযুদ্ধের গুণকীর্তন। কিন্তু রাজাকারদের নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা নেই; উল্লেখ আছে স্রেফ ভিলেন রূপে। চিত্রিত হয়েছে পাকিস্তানের দালাল রূপে। কিন্তু দালালের কর্মে থাকে অর্থপ্রাপ্তির লোভ, এবং তাতে মনের সম্পর্ক থাকে না। প্রাণদানের স্পৃহাও তাতে  জাগে না। বাংলাভাষী হলেও প্রতিটি রাজাকার ছিল জন্মসূত্রে পাকিস্তানী; তারা মুক্তিবাহিনীর প্রতিপক্ষ রূপে দাঁড়িয়েছিল পাকিস্তানের গর্বিত ও নিষ্ঠাবান নাগরিক রূপে। কথা হলো, নিজ জন্মভূমির পক্ষে নামলে তাদেরকে কি দালাল বলা যায়? কিন্তু একাত্তরের ইতিহাসে রাজাকারের সে পরিচয়টি আলোচিত হয়নি। তাই আগামী প্রজন্মের জন্য প্রশ্ন থেকে যায়, কারা এ রাজাকার? কি ছিল তাদের মিশন? কেনই বা বাঙালী হয়েও তারা বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠায় প্রাণপনে বিরোধীতা করলো এবং রক্ত দিল? কি ছিল তাদের রাজনৈতিক দর্শন? কিসে তারা অনুপ্রাণিত হলো? শুধু আজ নয়,বহুশত বছর পরও এ প্রশ্নগুলি বাংলাদেশের ইতিহাসের পাঠকের মনকে আন্দোলিত করবে। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসে এসব প্রশ্নের উত্তর নাই। অথচ বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপ্রকৃতি বুঝতে হলে কারা রাজাকার এবং কারা মুক্তিযোদ্ধা এবং একাত্তরে কি ছিল তাদের চিন্তাচেতনা -তা নিয়ে  বস্তুনিষ্ট আলোচনা অতি গুরুত্বপূর্ণ। মিথ্যা প্রপাগান্ডা দিয়ে এ বিষয়টিকে আড়াল করলে দেশেরই ক্ষতি বাড়বে এবং লাভবান হবে শত্রুরা।   

রাজাকার ও মুক্তিযোদ্ধা –উভয়েই একাত্তরের গুরুত্বপূর্ণ দুটি পক্ষ। যে কোন যুদ্ধে দুটি পক্ষ থাকে, সেটি একাত্তরেও ছিল। ইতিহাসের অর্থ স্রেফ একটি পক্ষের ধারাবিবরণী নয়। একাত্তরের যুদ্ধটি ছিল রাজনীতির দুটি বিপরীত ধারা ও দুটি বিপরীত দর্শনের সংঘাত। প্রতিদেশেই রাজনীতি নিয়ে এরূপ নানা মত থাকে, নানা প্রতিপক্ষও থাকে। সেসব মত ও পথ নিয়ে লড়াইও থাকে। কারণ, দেশের কল্যাণ নিয়ে সবাই একই ভাবে ভাবে না। বিপরীতমুখি নানা ভাবনা যেমন ১৯৭১ সালে ছিল, তেমনি ১৯৪৭ সালেও ছিল। আজ যেমন আছে, তেমনি আজ থেকে শত বছর বা হাজার বছর পরও থাকবে। এর মধ্যে কেউ হারবে এবং কেউ জিতবে। ইতিহাসে কারো বিজয়ই চিরস্থায়ী হয় না। দিন বদলের সাথে সরকারেও পরিবর্তন আসে। কিন্তু কোন একটি পক্ষের পরাজয় বা বিদায় হলে সে পক্ষের ইতিহাসকে বিলুপ্ত করা যায় না। তাদের জন্যও ইতিহাসে স্থান ছেড়ে দিতে হয়। ১৯৪৭ সালে মুসলিম লীগ জিতেছিল, কিন্তু ১৯৭১ সালে তারা হেরেছে। বাংলাদেশের ইতিহাস পড়লে মনে হয় দেশটির ইতিহাসের শুরুটি ১৯৭১ থেকে; বড় জোর ১৯৫২ সাল থেকে। এ ইতিহাসে ১৯৪৭ সালের নায়কদের জন্য স্থান রাখা হয়নি। কারণ তা হলে কায়েদে আযম মুহম্মদ আলী জিন্নাহ, নবাব সলিমুল্লাহ, খাজা নাযিমুদ্দীন, আল্লামা ইকবাল, শেরে বাংলা ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা আকরাম খাঁ, নূরুল আমীন, মহম্মদ আলী বোগরা, মৌলভী তমিজউদ্দীন খান, আব্দুর সবুর খান, ফজলুল কাদের চৌধুরী  ন্যায় শত শত ব্যক্তিকে ইতিহাসে স্থান দিতে হয়। আর সেটি হলে ইতিহাসের বইয়ে শেখ মুজিবের ন্যায় ১৯৭১’য়ের নায়কদের জন্য স্থান বহুলাংশে কমে যায়। মুজিবের অনুসারিগণ সে ছাড় দিতে রাজী নয়। মুজিবের অনুসারিদের লড়াই তাই স্রেফ রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল নিয়ে নয়, ইতিহাসের দখলদারি নিয়েও। বাংলাদেশের ইতিহাস  তাদের হাতেই অধিকৃত। স্বৈরাচারী রাজনীতির এ হলো আরেক কুফল।

বাংলাদেশে পক্ষপাতদুষ্ট ইতিহাস রচনার কাজটি শুরু করেছে ভারতের সাহায্যপুষ্ট একাত্তরের বিজয়ী পক্ষ। ইতিহাস রচনার নামে তাদের কাছে গুরুত্ব পেয়েছে পাকিস্তানপন্থী ও ইসলামপন্থী নেতাদের গায়ে লাগাতর কালিমা লেপন। ফলে রাজাকারকে চিত্রিত করেছে যুদ্ধাপরাধি রূপে; এবং নিজেদেরকে চিত্রিত করেছে দেশের সর্বকালের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সন্তান রূপে। মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে কোন মানুষ খুন, ধর্ষণ, গৃহ-লুট বা অন্য কোন অপরাধ সংঘটিত হয়েছে -ইতিহাসে তার বিন্দুমাত্র বিবরণও নেই। লক্ষাধিক বিহারী, রাজাকার ও পাকিস্তানপন্থীদের মৃত্যু হয়েছে যেন আসমান থেকে বাজ পড়ায়। তাদের ঘরবাড়ি, ব্যাবসা-বাণিজ্য ও সহায়-সম্পদ লুট হয়েছে যেন কোন অজানা কারণে! বাংলাদেশের ইতিহাসে এসব প্রশ্নের উত্তর নাই। দেশের ইতিহাস তো এভাবেই পক্ষপাতদুষ্ট হয়, পরিত্যক্ত হয় এবং আঁস্তাকুড়ে গিয়ে পড়ে। প্রতিটি ব্যক্তির রাজনীতি, কর্ম ও আচরণ পরিচালিত হয় তার চিন্তা-চেতনা ও দর্শন থেকে। এমনকি অতিশয় দুর্বৃত্তও দুর্বৃত্তিতে অনুপ্রেরণা পায় জীবন-জগত নিয়ে তার বিশেষ ধ্যান-ধারণা থেকে। মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণার সে উৎসটি কি? রাজাকারগণই বা কোত্থেকে পেল সে চরম দুর্দিনে স্রোতের বিপরীতে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা? বাংলাদেশের ইতিহাসে সে সবেরও উত্তর নেই। কিন্তু সেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া কি এতোই কঠিন? ভিলেন রূপে নয়, রাজাকারদেরকে রাজাকার রূপে দেখলে সে উত্তরটি অতি সহজেই পাওয়া যেত।

 

লড়াইটি দর্শনের

১৯৭১’য়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দু’টি দর্শন প্রবল ভাবে কাজ করেছিল। একটি হলো প্যান-ইসলামীক মুসলিম ভ্রাতৃত্বের দর্শন-এ থেকেই জন্ম নিয়েছিল অখণ্ড পাকিস্তান বাঁচানোর চেতনা। এটিই হলো রাজাকারের চেতনা। অপরটি ছিল ভাষাভিত্তিক বাঙালী জাতীয়তাবাদী সেক্যুলার দর্শন। মুক্তিযোদ্ধাদের চেতনার উৎস হলো এটি। একাত্তরের ঘটনাবলীর যথার্থ বিশ্লেষণে এ দু’টি চেতনাকে অবশ্যই বুঝতে হবে এবং ঘটনার মূল্যায়নে সে দু’টিকে সামনে রাখতে হবে। নইলে বিচারে প্রচণ্ড অবিচার হবে। ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে কর্ম, আচরণ, রুচীবোধ ও রাজনীতিতে যে ব্যাপক পার্থক্য -তা তো এই চেতনার পার্থক্যের কারণেই; খাদ্য-পানীয়, শারীরিক বৈশিষ্ট বা জলবায়ুর কারণে নয়। তাই একই রূপ পানাহার ও জলবায়ুতে বেড়ে উঠে কেউ রাজাকার হয়েছে এবং কেউ মুক্তিযোদ্ধা হয়েছে। ব্যক্তি ক্ষণজন্মা, কিন্তু চেতনা বেঁচে থাকে হাজার হাজার বছর। তাই আজকের বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যেমন বেঁচে আছে, তেমনি বেঁচে আছে রাজাকারের চেতনাও। এ দু’টি চেতনা ১৯৭১য়ে যেমন ছিল, তেমনি একাত্তরের পূর্বে ১৯৪৭য়েও ছিল। তেমনি বহু শত বা হাজার বছর পরও থাকবে।

ব্যক্তির চরিত্র, চেতনা ও রাজনৈতিক নীতিমালার নির্মাণে যেটি কাজ করে সেটি হলো একটি জীবন-দর্শন। মানব জীবনের অতি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো এ দর্শন। দর্শন বেঁচে থাকে হাজার হাজার বছর ধরে। সেটি যদি হয় ইসলামী দর্শন, তবে তা তো অমর। তাই সমাজতন্ত্র ও কম্যুনিজমের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেলেও ইসলাম টিকে আছে এবং দিন দিন প্রবলতর হচ্ছে। ব্যক্তি তার দর্শন থেকেই কর্মে, ত্যাগে ও প্রাণদানে প্রেরণা পায়। রাজাকারের চেতনায় সে দর্শনটি ছিল ইসলামের। সে দর্শন থেকেই তারা পেয়েছিল প্যান-ইসলামী চেতনা; পেয়েছিল মুসলিম স্বার্থের প্রতি অঙ্গীকার। ফলে রাজাকারদের রাজনীতিতে ভাষা, বর্ণ বা আঞ্চলিকতা কোনরূপ গুরুত্ব পায়নি। ফলে একাত্তরে বাংলা ভাষার নামে যখন পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ গড়ার যুদ্ধ হচ্ছিল, তখন রাজাকারগণ সে লড়ায়ে যোগ দেয়নি। বরং সে সময় বহু হাজার বাঙালী রাজাকার পাকিস্তানের প্রতিরক্ষায় প্রাণ দিয়েছে। তারা মুজিব সরকারের জেল খেটেছে এবং মুক্তিবাহিনীর হাতে নির্মম অত্যাচারের শিকার হয়েছে। তাদের সে ত্যাগের পিছনে যে দর্শনটি কাজ করেছিল সেটি ছিল মুসলিম ভ্রাতৃত্বের দর্শন। সে দর্শনে ভাষা, বর্ণ, গোত্র বা ভূগোলভিত্তিক বিভেদের প্রাচীর গড়ার বৈধতা নেই।বরং বিভেদের দেয়াল ভাঙ্গাটি তাদের কাছে ইবাদতে পরিণত হয়েছে। এমন দর্শনের প্রতিষ্ঠায় তারা অর্থ, শ্রম ও রক্তও দিয়েছে।

রাজাকারের দর্শনের জন্মটি একাত্তরে নয়, সাতচল্লিশেও নয়। এ দর্শনের জন্ম তো তখন, যখন ইসলাম সমগ্র মানব জাতির জন্য মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে একমাত্র ধর্ম রূপে নির্ধারিত হয়েছিল। এ ধর্ম বিভেদের দেয়াল ভাঙ্গতে শেখায়। বিভক্তির সে দেয়াল ভেঙ্গেই আরব, ইরানী, তুর্ক, কুর্দ, মুর ও অন্যান্য ভাষাভাষী মুসলিম ইসলামের পতাকা তলে একতাবদ্ধ হয়েছিল এবং উম্মতে ওয়াহেদার জন্ম দিয়েছিল। এটিই তো ইসলামের রীতি। রাজাকারগণ ছিল সে রীতির অনুসারি। শুধু একাত্তরে নয়, সর্বকালে ও সর্বস্থানে সে রীতি নিয়ে বাঁচাই হলো প্রকৃত ঈমানদারী। ইসলামের এ দর্শন বাঙালী মুসলিমদের মাঝে লক্ষ লক্ষ নিষ্ঠাবান অনুসারি পাবে -সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? একাত্তরে তো সেটিই ঘটেছিল। একাত্তেরর এ সত্যটি আবিস্কারে বাঙালী জাতীয়তাবাদীগণ ব্যর্থ হয়েছে।

ব্যক্তির মন যা জানে না,তার চোখও সেটি দেখতে পায় না। চোখ তো তখনই দেখে যখন তার পিছনে আলোকিত মন কাজ করে।মনের অন্ধকারে তাই চোখও অন্ধ হয়। মহান আল্লাহতায়ালার কুদরত দেখতে হলে তাই জ্ঞানবান মন চাই।তাঁর সৃষ্ট বিশাল জগতে বসবাস করেও বেঈমানেরা তাই তাঁর কুদরত দেখতে ব্যর্থ হয়।অজ্ঞের পক্ষে তাই ঈমানদার হওয়া অসম্ভব।ইসলামে তাই জ্ঞানার্জন প্রথমে ফরজ করা হয়েছে, নামায-রোযা বা হজ-যাকাত নয়।একই কারণে ইসলামী চেতনাশূণ্য সেক্যুলারিস্টগণ তাই রাজাকারদের দর্শনের বলটি দেখতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম দেশ এবং সে সাথে নিজের দেশ বাঁচাতে যে ধর্মপ্রেমিক ও দেশপ্রেমিক মানুষগুলো অকাতরে প্রাণ দিল -তাদের কাছে তারা অর্থলোভী দালাল ও যুদ্ধাপরাধী মনে হয়েছে!  

 

ভারতের লক্ষ্যপূরণ

বাঙালী জাতীয়বাদীদের দর্শনটি ছিল ভাষা ও আঞ্চলিকতার নামে মুসলিমদের মাঝে বিভক্তির দেয়াল গড়ার দর্শন। এটি ছিল পাপের পথ। ইসলামে এমন বিভক্তি যেমন হারাম, তেমনি শরিয়তের আইনে দণ্ডনীয় ফৌজদারি অপরাধ। মুক্তিবাহিনীর সদস্যগণ ছিল বাঙালী জাতীয়তাবাদীর অনুসারি; তাদের কাছে প্যান-ইসলামীক মুসলিম ভাতৃত্বের চেতনাটি পরিত্যক্ত হয়। এমন নীতি কাফেরদের থেকে সমর্থণ পাবে –সেটি স্বাভাবিক; কিন্তু কোরঅআন-হাদীস বা নবীজীর সূন্নাহ থেকে নয়। তাই একাত্তরে মুক্তিবাহিনীর আশ্রয়দাতা, সাহায্যদাতা, প্রশিক্ষণদাতা ও একান্ত বন্ধু গণ্য হয় ভারতীয় কাফেরগণ, কোন মুসলিম দেশ নয়। ভারতীয় এজেন্ডা রাজাকরগণ বুঝতে পারলো, মুক্তিবাহিনীর নেতাকর্মীগণ তা ইচ্ছে করেই বুঝতে চাইনি। ভারতের লক্ষ্য ছিল, প্রধান শত্রু পাকিস্তানকে খন্ডিত ও দুর্বল করা। সে সাথে বিচ্ছিন্ন পূর্ব পাকিস্তানের সহায়-সম্পদ লুন্ঠন। ভারতীয়দের সে লুন্ঠনে বাংলাদেশ পরিণত হয় আন্তর্জাতিক অঙ্গণে ভিক্ষার তলাহীন ঝুলি। দুর্ভিক্ষে মরতে হয় বহু লক্ষ বাংলাদেশীকে। পরিতাপের বিষয় হলো, ভারতের সে লক্ষ্য পূরণে মুক্তিবাহিনীর সদস্যগণ তাদের থেকে অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ নেয়; এবং মুসলিম হত্যায় যুদ্ধে নামে। লক্ষাধিক অবাঙালী মুসলিমকেই শুধু নয়, হত্যা করা হয় হাজার হাজার বাঙালী মুসলিমকেও।

লক্ষণীয় হলো, বাংলাদেশের ইতিহাসে একাত্তরের ভারতীয় লুন্ঠন নিয়ে কোন কথা নেই। সেটি নিছক প্রভু ভারতকে খুশি করতে। ইতিহাসের বইয়ের বিশাল অংশ ব্যয় হয়েছে রাজাকারদের হত্যাযোগ্য প্রতিপক্ষ রূপে খাড়া করতে। ভারত চায়, বাঙালী মুসলিমগণ বিচ্ছিন্ন হোক উপমহাদেশের অবাঙালী মুসলিমদের থেকে। সেটি বুঝা যায় ভারত ও ভারতপন্থিদের প্রচারনার ধরণ দেখে। অথচ মহান আল্লাহতায়ালার কোর’আনী হুকুম হলো, এক মুসলিম অন্য মুসলিমের ভাই -তা যে ভাষা বা যে এলাকারই হোক। অন্য মুসলিমকে নিজের ভাই রূপে মান্যতা দেয়ার মধ্যেই ঈমানদারি। সেটি না হলে বিদ্রোহ হয় মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে। তাই নামায-রোযা পালন করেও এমন বিদ্রোহী ব্যক্তি ব্যর্থ হয় প্রকৃত মুসলিম হতে। অথচ সে ইসলামী চেতনা মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে ছিল না। ফলে অবাঙালী মাত্রই তাদের কাছে “ছাতুখোর” শত্রু –এমনকি হত্যাযোগ্য গণ্য হয়েছে। অথচ রাজাকারদের কাছে সেটি মনে হয়নি। যেমন সাতচল্লিশে মনে হয়নি, তেমনি একাত্তরেও নয়। এবং আজ নয়। বরং পাঞ্জাবী, বিহারী, পাঠান, সিন্ধি, বেলুচ তথা সকল ভাষার মুসলিমগণ গণ্য হয়েছে তার প্রাণপ্রিয় মুসলিম ভাই রূপে। কারণ, সেরূপ গণ্য করাটাই মহান আল্লাহতায়ালার হুকুম।-(সুরা হুজরাত, আয়াত ১০)। তাই ঈমানদার কি পারে তার পাঞ্জাবী, পাঠান বা বিহারীকে হত্যা করতে পারে?

অথচ একাত্তরে বহুলক্ষ অবাঙালীকে নিজেদের ঘর থেকে বের করে যেভাবে বস্তিতে বসানো হয়েছে এবং তাদের ঘরবাড়ী, ব্যবসাবাণিজ্য ও সহায়-সম্পদকে যেভাবে ছিনতাই করা হয়েছে -সেটি কোন মুসলিম সংস্কৃতি নয়। মানবতার সংস্কৃতিও নয়। এটি নিতান্তই মুক্তিযুদ্ধের বাঙালী জাতীয়তাবাদী সংস্কৃতি। এমন অপরাধ কর্মের গভীর স্বাদৃশ্য মেলে হিটলারের ফ্যাসিবাদের সাথে। ইসলামে এমন কর্ম শুধু হারামই নয়, শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ। সেটি গুরুতর যুদ্ধাপরাধ আন্তর্জাতিক আইনেও। এরূপ বর্বর জাতীয়তাবাদী চেতনার কারণেই জার্মানগণ লক্ষ লক্ষ ইহুদীদের গ্যাস চেম্বারে পাঠিয়ে জ্যান্ত হত্যা করেছে। মুজিব ও তার অনুসারিগণ সে বর্বর ফ্যাসিবাদের আবাদ বাড়িয়েছে বাংলাদেশে। বঙ্গিয় ভূমিতে ইসলাম আগমনের পর এরূপ বর্বর অসভ্যতা আর কোন কালেই প্রতিষ্ঠা পায়নি। একই অসভ্যতা নিয়ে আজ ইসলাম ও মুসলিম স্বার্থের প্রতি সমর্থন থাকার কারণে রাজপথে পিটিয়ে তাদের লাশের উপর নাচা হচ্ছে।  মুজিব ও তার অনুসারিগণ আর কোন কারণে না হোক, অন্ততঃ এ অসভ্যতার কারণে বাঙালীর ইতিহাসে শত শত বছর বেঁচে থাকবে। অথচ বাঙলার মুসলিম সংস্কৃতিতে এমন অসভ্যতার কি স্থান আছে? বরং এ মুসলিম সংস্কৃতি তো তুর্কি বীর ইখতিয়ার মহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী, ইয়েমেনি সুফিসাধক শাহ জালাল, আফগান বীর ঈসা খাঁ’দের ন্যায় নানা ভাষা ও নানা বর্ণের মুসলিমদের বাংলার বুকে আপন করে নেয়ার সংস্কৃতি।

মহান আল্লাহতায়ালা ব্যক্তিকে ভাষা,বর্ণ ও আঞ্চলিকতার উর্দ্ধে উঠতে নির্দেশ দেন। পবিত্র কোরআনে বহু বার ঘোষিত হয়েছে সে নির্দেশ। বলা হয়েছে, “আক্বীমু দ্বীন ওয়ালা তাতাফাররাকূ” –(সুরা শুরা,আয়াত ১৩)। অর্থঃ  দ্বীনকে প্রতিষ্ঠা করো এবং বিভক্ত হয়োনা। বলা হয়েছে, “ওয়া তাছিমু বি হাবলিল্লাহি জামিয়াঁও ওলা তাফাররাকু” -(সুরা আল ইমরান, আয়াত ১০৩)। অর্থঃ এবং শক্ত ভাবে আঁকড়ে ধরো আল্লাহর রশি তথা কোর’আনকে এবং বিভক্ত হয়োনা। তাই যে কোন মুসলিম দেশে ভাঙ্গা ও মুসলিমদের মাঝে বিভক্তির দেয়াল গড়ার যুদ্ধটি মূলতঃ মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে যুদ্ধ। এমন যুদ্ধে পৌত্তলিক কাফেরগণ অর্থ দিবে, অস্ত্র দিবে, প্রশিক্ষণ দিবে এবং নিজ খরচে প্রকাণ্ড যুদ্ধও লড়ে দিবে -সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? একাত্তরে তো ভারত তো সেটিই ঘটেছে। তাই মুজিবকে স্বাধীনতার ঘোষণাও দিতে হয়নি। মুক্তি বাহিনীকে একটি জেলা বা মহকুমাকে স্বাধীন করতে হয়নি। ভারত প্রকান্ড একটি যুদ্ধ নিজে লড়ে বাংলাদেশ বানিয়ে দিয়েছে। তাই বাংলাদেশের জন্মদাতা যে  ভারত তা নিয়ে কি কোন সন্দেহ থাকে? ভারতীয় কর্তাগণ তো সে কথাটিই বার বার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে এবং জন্মদাতা রূপে একটি পর একটি ছিনিয়ে নেয়ার অধিকার দাবী করছে।

মু’মিনের জীবনের এজেন্ডা তাই আল্লাহর প্রদর্শিত শরিয়ত প্রতিষ্ঠায় নিষ্ঠাবান হওয়া এবং বিভক্তি থেকে বাঁচা। ফলে ঈমানদার হওয়ার দায়বদ্ধতা শুধু নামায-রোযা, হজ-যাকাত পালন নয়, মুসলিমদের মাঝে ঐক্য গড়াও। কিন্তু বাঙালী জাতীয়তাবাদীদের এজেন্ডাটি ঐক্য নয়, বরং ভাষা, বর্ণ ও আঞ্চলিকতার পরিচয়ে বিভক্তির দেয়াল গড়া। ফলে বিভক্তির এ রাজনীতি কি আদৌ কোন মুসলিমের রাজনীতি হতে পারে? এটি তো মহাপাপ। এ পাপ ব্যক্তিকে জাহান্নামের আগুণে নেয়। ভাষা,বর্ণ ও আঞ্চলিকতার উর্দ্ধে উঠার কারণেই বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ বহু হাজার মাইল দূরের ভূমিতে জন্ম নেয়া মুহাম্মদ (সাঃ)কে তারা প্রাণপ্রিয় রাসূল ও তার প্রচারিত ধর্মকে নিজ ধর্ম রূপে গ্রহণ করতে পেরেছিল। নামে মুসলিম হলেও মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের মাঝে সে ইসলামী চেতনা ও সে ঈমানী দায়বদ্ধতা গুরুত্ব পায়নি। বাঙালী হওয়াটিই তাদের কাছে সবেচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অপরদিকে রাজাকারের জীবনে বিশ্ব-ভ্রাতৃত্বের ইসলামী চেতনাটি ধারাবাহিকতা পেয়েছিল। এ চেতনাটি ১৯৪৭’য়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালী মুসলিমের জীবনে এতোটাই প্রবল ছিল যে, ভারত থেকে প্রাণ বাঁচাতে আসা অবাঙালী মুসলিমদের জন্য ঢাকাসহ পূর্ব-পাকিস্তানের বহু নগরে পরিকল্পিত বাসস্থানের ব্যাবস্থা করা হয়েছিল। কারণ তারা ছিল বাংলার মুসলিম ভূমিতে মেহমান।ভারত থেকে প্রাণ বাঁচাতে আসা অসহায় অবাঙালীদেরকে সাহায্য করাকে তারা পবিত্র ইবাদত মনে করতো। ভারত থেকে আসা প্রায় ৭০ লাখ মুহাজিরদের প্রতি অভিন্ন ভালবাসা দেখানো হয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানেও। অথচ তেমন একটি মানবিক আচরণ মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের মাঝে একাত্তরে দেখা যায়নি। বরং তারা নেমেছে অবাঙালীদের বিরুদ্ধে হত্যা, ধর্ষণ ও লুণ্ঠনে। বাঙালী মুসলিমের ইতিহাসে একাত্তর তাই ইসলামী চেতনা ও চরিত্রের এক গভীর অধঃপতনের দিন। অবাঙালী মুসলিমের বিরুদ্ধে এরূপ নৃশংস আচরণ সমগ্র মুসলিম ইতিহাসের অতি বর্বর অধ্যায় রূপে বহুহাজার বছর বেঁচে থাকবে -তা নিয়ে কি কোন সন্দেহ আছে? 

 

বিদ্রোহ মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে

ঈমানদারকে শুধু ইবাদত নিয়ে বাঁচলে চলে না, তাকে বাঁচতে হয় পারস্পারিক মুসলিম ভাতৃত্বের অটুট বন্ধন নিয়েও। কারণ, সে ভাবে বাঁচতেই নির্দেশ দেয়া হয়েছে পবিত্র কোরআনে। ফলে ভাতৃত্বের সে বন্ধন নিয়ে বাঁচার মধ্যেই প্রকৃত ঈমানদারী। অন্য ভাষা ও অন্য বর্ণের মুসলিমও তার কাছে তখন প্রাণপ্রিয় ভাই গণ্য হয়। এমন চেতনার কারণেই অতীতে ইসলামী খেলাফত বাংলাদেশের চেয়ে শতগুণ বৃহৎ ভূমির উপর বিস্তার লাভ করেছিল; এবং সে বিশাল ভূমিতে ভাষা, বর্ণ ও আঞ্চলিকতার নামে দেয়াল গড়ে উঠেনি। সে ভূগোল বাঁচাতে দেশের অভ্যন্তরে সেনাবাহিনীকে যুদ্ধ করতে হয়নি –যেমনটি পাকিস্তান বাঁচাতে একাত্তরে হয়েছে। ঈমানের প্রকাশ তাই শুধু নামায-রোযা, হজ-যাকাতে নয়,বরং সেটির প্রবল প্রকাশ ঘটে প্যান-ইসলামীক ভাতৃত্ব, রাজনীতি ও ভূগোলের মাঝে। যে মুসলিম দেশে সেরূপ ভাতৃত্ব নাই, বুঝতে হবে সে দেশের নাগরিকদের অপূর্ণতা আছে মুসলিম রূপে বেড়ে উঠায়। মুসলিম ভাতৃত্বের বন্ধন ছিন্ন করা বা সে বন্ধনকে অস্বীকার করার অর্থ মুসলিম উম্মাহ থেকে বেরিয়ে যাওয়া। মুক্তিবাহিনীর বিদ্রোহ তাই শুধু পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ছিল না, ছিল মহান আল্লাহতায়ালার ঘোষিত নির্দেশমালার বিরুদ্ধেও। সেক্যুলার বাঙালী জাতীয়তাবাদীদের বিজয় শুধু এ নয় যে, পাকিস্তান ভেঙ্গে তারা বাংলাদেশে গড়তে পেরেছে। বরং তাদের সবচেয়ে বড় সাফল্যটি হলো, প্যান-ইসলামী ভ্রাতৃত্বের বিরুদ্ধে নিজেদের বিদ্রোহটি সফল করতে পেরেছে। ইখতিয়ার মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির হাতে বঙ্গ বিজয়ের পর বাংলার মাটিতে এটিই ছিল মহান আল্লাহতায়ালার কোরআনে ঘোষিত প্যান-ইসলামী নীতির বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম সফল বিদ্রোহ।

প্যান-ইসলামী চেতনার কারণেই বাঙালী মুসলিমের কাছে কায়েদে আজম মুহম্মদ আলী জিন্নাহ, আল্লামা ইকবাল, নবাবজাদা লিয়াকত আলী খানের মত অবাঙালী নেতারা ১৯৪৭ সালে আপনজন মনে হত। পূর্ব পাকিস্তানে তাদের নামে অনেক প্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠেছিল। কিন্তু  সেক্যুলার বাঙালী জাতীয়তাবাদে তেমন মুসলিম ভাতৃত্ব গড়ে তোলা অসম্ভব ছিল। বরং সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে তারা একটি ভাষা ভিত্তিক সীমারেখা টেনে দেয়, যারা সে সীমারেখা অতিক্রম করে তাদেরকে শত্রু গণ্য করা হয়। সাতচল্লিশের মুসলিম নেতৃবৃন্দ ও একাত্তরের রাজাকারেরা যে অভিন্ন চেতনার ছিল -সেটি বুঝতে ইসলামের শত্রুপক্ষ আদৌ ভুল করেনা। একারণেই মুক্তিযোদ্ধরা শুধু নিরস্ত্র রাজাকার হত্যাতেই আনন্দ পায়নি, আনন্দ পেয়েছে বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে ১৯৪৭-য়ের পাকিস্তান আন্দোলনের মুসলিম নেতাদের নাম মুছে ফেলতেও। তাদের কাছে বরং অতি আপনজন মনে হয়েছে গান্ধি, নেহেরু, ক্ষুদিরাম, সূর্যসেন, চিত্তরঞ্জন সুতোর, জেনারেল ম্যানেক শ’ ও জেনারেল অরোরা ন্যায় ভারতীয় ব্যক্তিত্ব। এমন এক অসুস্থ চেতনার কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিন্নাহ হল হয়ে গেছে সূর্য সেন হল এবং ইকবাল হল থেকে বিলুপ্ত হয়েছে মহান কবি আল্লামা ইকবালের নাম। অথচ বাংলার মানুষ যদি সাতচল্লিশে কায়েদে আজম, ইকবাল, লিয়াকত আলী খানদের বাদ দিয়ে গান্ধি, নেহেরু, সূর্যসেন, ক্ষুদিরামের পথ ধরতো তবে আজকের বাংলাদেশই প্রতিষ্ঠা পেত না। কাশ্মীরী মুসলিমদের ন্যায় তাদেরও তখন ভারতীয় সৈন্যদের হাতে প্রতিদিন হত্যার শিকার হতে হত এবং মুসলিম রমনীদের ধর্ষিতা হতে হত। হত্যাযোগ্য অপরাধ গণ্য হত গরু কোরবানী ও গরুর গোশতো ভক্ষণ। শত্রু-মিত্র নির্ণয়ে একটি চেতনা যে মানব মনে কতটা গভীর প্রভাব ফেলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারীরা হলো তার নজির। এ চেতনার ফলে আল্লাহর আইনের প্রতিষ্ঠার দাবী নিয়ে রাজপথে নামা দাড়ী-টুপিধারী বাঙালী যুবকটিও মুক্তিবাহিনীর কাছে হত্যাযোগ্য মনে হয়। এজন্য তাকে পাঞ্জাবী বা বিহারী হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।

ভারত কোন প্রতিবেশী জনগোষ্ঠীর স্বাধীন বাড়াতে অতীতে যুদ্ধ করেনি। সাহায্যও দেয়নি। একাত্তরেও সে লক্ষ্যে যুদ্ধ করেনি।  পাকিস্তান বিভক্ত করতে যুদ্ধ করলেও কাশ্মীরের স্বাধীনতা দিতে তারা রাজী নয়। ভারতের জনসংখ্যা ১৩০ কোটির বেশী। বাংলার মত প্রায় বিশটির চেয়ে অধীক ভাষা রয়েছে ভারতে। ভাষাগত সে ভিন্নতা নিয়ে সেদেশে বাংলাদেশের মত ২০টি স্বাধীন দেশ নির্মিত হতে পারতো। অথচ তেমন বিচ্ছিন্নতাবাদী ধারণা ভারতীয় হিন্দুদের মাথায় স্থান পায়নি। ১৯৪৭’য়ে যেমন নয়, আজও  নয়। নানা ভাষার হিন্দুরা ভাষার উর্দ্ধে উঠে ভারতব্যাপী একটি মাত্র রাষ্ট্র গড়ার কারণেই তারা আজ বিশ্বের বুকে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। বাঙালী মুসলিমগণ সেটি পারেনি। ক্ষুদ্রতর ও দুর্বলতর হওয়ার নেশায় কি সেটি সম্ভব? মুসলিম হওয়ার অর্থ তাই শুধু কোরআন পাঠ, নামাজ-রোযা ও হজ-যাকাত পালনও নয়। সেটি ভাষা, বর্ণ ও ভৌগলিকতার উর্দ্ধে উঠে অন্য ভাষা ও অন্য বর্ণের মুসলিমদের সাথে একাত্ব হওয়ার সামর্থ্য। এরূপ একতা  গড়া ইসলামে ফরজ তথা বাধ্যতামূলক। বিজয় ও ইজ্জত আসে তো এরূপ একতার পথেই। নইলে শক্তি লোপ পায়; বিলুপ্ত হয় ইজ্জতও। মুসলিম উম্মাহকে বিভক্ত এবং শক্তিহীন ও ই্জ্জতহীন করার এজেন্ডা তো ইসলামের শত্রুপক্ষের। একাত্তরে সে এজেন্ডা নিয়েই যুদ্ধে নেমেছিল আওয়ামী লীগ ও মুক্তিবাহিনী। মুজিবের এজেন্ডার সাথে ভারতের এজেন্ডাও তখন একাকার হয়ে যায়।

মুক্তিবাহিনীর পিছনে ভারতের অর্থদান, অস্ত্রদান ও প্রশিক্ষণদানের মতলবটি বুঝতে হলে ভারতের এজেন্ডাকে অবশ্যই বুঝতে হবে। ভারত তো চায় তার সীমান্ত্র ঘিরে দুর্বল ভূটান,নেপাল, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা পাক, শক্তিশালী পাকিস্তান নয়। অথচ একাত্তরের ইতিহাস নিয়ে বাংলাদেশে বহু বই লেখা হয়েছে। কিন্তু সেসব বইয়ে ভারতীয় সে এজেন্ডাকে আদৌ তুলে ধরা হয়নি। অথচ বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের বর্তমান ষড়যন্ত্র ও দখলদারি বুঝতে হলে সে বিষয়টি জানা অতি গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাস-বিজ্ঞানের গুরুত্ব এজন্যই এতো অধীক। সে জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও চেতনার সে পুষ্টি ছাত্ররা কখনোই অংক, বিজ্ঞান বা চিকিৎসা বিজ্ঞান থেকে পায়না। অথচ বাংলাদেশে জ্ঞানার্জনের সে ক্ষেত্রটিও দেশের দেশী ও বিদেশী শত্রুদের হাতে অধিকৃত। ফলে মারা পড়ছে বিবেক। এবং বিবেকের সে মহামারি  শুধু  ছাত্রদের মাঝে সীমিত নয়; ছড়িয়ে পড়েছে বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ, বিচারপতি ও রাজনীতিবিদদের মাঝেও। এ মৃত বিবেকের মানুষের মাঝে রম রমা হচ্ছে গুম, খুন, লুটপাট ও সন্ত্রাস-নির্ভর রাজনীতি। ফলে দেশে ভোট-ডাকাতি করে ক্ষমতায় বসলেও যেমন বিচার হয় না, তেমন বিচার হয় না কারা দেশের প্রকৃত  বন্ধু এবং কারা শত্রু তা নিয়েও।   

 




বাংলাদেশে ভারতীয় যুদ্ধ এবং রাজাকার ও মুক্তিযোদ্ধা প্রসঙ্গ

শেষ হয়নি একাত্তরের যুদ্ধ

শত্রুর যুদ্ধ কখনোই শেষ হয় না। শুধু কৌশল এবং রণাঙ্গন পাল্টায়। একাত্তরের ভারতীয় যুদ্ধটিও তাই একাত্তরে শেষ হয়নি। সে যুদ্ধ এখনো অবিরাম চলছে। ভারতীয় এজেন্ডাটি শুধু পাকিস্তান ভাঙ্গা ছিল না, ছিল বাংলাদেশের মেরুদন্ড ভাঙ্গাও। ভারত কখনোই চায়নি দেশটির দুই পাশে পারমানবিক শক্তির অধিকারি অপরাজেয় পাকিস্তানের উপস্থিতি। তাই চেয়েছে পশ্চিম সীমান্তে সম্ভব না হলেও অন্ততঃ পূর্ব সীমান্তে সামরিক শক্তিহীন এক গোলাম বাংলাদেশের সৃষ্টি। সে মহা সুযোগটি আসে একাত্তরে। ভারতের সৌভাগ্য হলো একান্ত কলাবোরেটর রূপে পেয়ে যায়, পাকিস্তানের কঠোর শত্রু মুজিবকেও। একাত্তরে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে ভারতীয় সীমাবাহিনীর যুদ্ধে ঝাপিয়ে এটিই ছিল মূল কারণ।  কিন্তু ভারতসেবী ফ্যাসিস্টগণ মুজিবের একদলীয় বাকশালী স্বৈরাচারকে যেমন শ্রেষ্ঠ গণতন্ত্র মনে করে এবং শেখ হাসিনার ২০১৮ সালের ভোট ডাকাতির নির্বাচনকে যেমন অতি স্বচ্ছ ও বৈধ নির্বাচন গণ্য করে, তেমনি একাত্তরে পূর্বপাকিস্তানের অভ্যন্তরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অনুপ্রবেশ ও লুটপাটকেও বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য ভারতের শ্রেষ্ঠ দান মনে করে।

তবে বাংলাদেশ সৃষ্টির ৪৮ বছর অতিক্রান্ত হলেও ভারতের দুর্ভাবনা শেষ হয়নি। বাংলাদেশের জনগণ এখনো সবাই মুজিব-হাসিনার ন্যায় ভারতের কাছে পূর্ণ আত্মসমর্পণ করেনি,বরং অধিকাংশ বাংলাদেশীই ভারত বিরোধী –সেটিই ভারতে কাছে এখনো গুরুতর দুর্ভাবনার বিষয়। মুজিবের দিন অকস্মাৎ শেষ হয়েছে। হাসিনাও যদি মুজিবের ন্যায় ইতিহাস থেকে হঠাৎ হারিয়ে যায় তবে বাংলাদেশের গলায় ভারতীয় গোলামীর রশিটির কী হবে? সে দুর্ভাবনাই ভারতীয় শাসক মহলে রাতের ঘুমে লাগাতর ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। বাংলাদেশের গলায় ভারতীয় গোলামীর রশিটা বাঁচাতেই ২০১৪ ও ২০১৮ সালের  ভোট ডাকাতির নির্বাচনে হাসিনার নির্বাচনকে বৈধ বলেছে। অতীতে মুজিবকে দিয়ে ২৫ সালা দাসচুক্তি স্বাক্ষর করিয়ে নিয়েছিল।  এখন চায়, হাসিনার মাধ্যমে বাংলাদেশীদের গলায় ভারতীয় গোলামীর রশিটি আরো শক্ত ভাবে বাঁধতে। চায়, বাংলাদেশের রাজনীতি, সংস্কৃতি, রাস্তাঘাট, অর্থনীতি, নদ-নদী ও সমুদ্র বন্দরের উপর কঠোর দখলদারি। চায়, একাত্তরে যেমন ভারতের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ নিয়ে হাজার হাজার বাঙালী ভারতীয় সেনা বাহিনীর কমান্ডের অধীনে যুদ্ধ করেছিল এবং হত্যা করেছিল ভারতীয় আধিপত্যবাদ-বিরোধী মুসলিমদের, ভারত আজও সেটিই চায়। তাই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে একাত্তরের চেতনাধারি মুক্তিযুদ্ধাদের প্রয়োজন একটু্‌ও কমেনি। বরং সে প্রয়োজন মেটাতে সরকারি প্রশ্রয়ে তাদের সংখ্যা বিপুল ভাবে বাড়ানো হয়েছে দেশের প্রতিটি অঙ্গণে। ভারতীয় ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে কথা বলার  অপরাধে এরাই বুয়েটে আবরার ফাহাদকে নির্মম ভাবে হত্যা করেছে। ভোট ডাকাতির মাধ্যমে নির্বাচিত হলে কী হবে, দিল্লির শাসক মহলে শেখ হাসিনার কদর এজন্যই এতো অধীক।

 

বাঁচতে হবে যুদ্ধ নিয়েই

লক্ষণীয় বিষয় হলো, একাত্তরের ন্যায় আজও যারা ভারতীয় আগ্রাসনের বিরোধী, তাদের জন্ম একাত্তরের পরে হলেও তাদেরকে এরা রাজাকার বলছে। ফলে মুক্তিযোদ্ধা ও রাজাকারের লড়াইটি কখনোই শেষ হচ্ছে না। বরং এটি নিশ্চিত, যতদিন পাশে ভারত আছে, ততদিন এ যুদ্ধও আছে। বাংলাদেশীদের বাঁচতে হবে প্রতিদিন সে যুদ্ধ নিয়েই। মেরুদণ্ড ভাঙ্গার লক্ষ্যে তারা বাংলাদেশকে খণ্ডিত করার চেষ্টাও করবে। তেমন একটি লক্ষ্য নিয়ে ভারত অতীতে চাকমা বিদ্রোহীদের নিজভূমিতে আশ্রয় দিয়েছে এবং গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্রও দিয়েছে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশ নিয়ে চিত্তরঞ্জন সুতারের ন্যায় যারা স্বাধীন বঙ্গভূমি গড়ার স্বপ্ন দেখে তারাও আশ্রয় পেয়েছে ভারতে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রকৃত লড়াই মূলত দু’টি চেতনার। নানা নামের নানা দল মূলতঃ এ রণাঙ্গনে সাইডশো মাত্র। একাত্তরে রাজাকার ও মুক্তিযোদ্ধার চরিত্রে -এ দুটি চেতনারাই প্রবল প্রকাশ পেয়েছিল। বহু বাংলাদেশী বিষয়টি না বুঝলেও ভারত সেটি ষোলআনা বুঝে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একাত্তরে ভারতের প্রতি সেবাদাস চরিত্র নিয়ে যে প্রবল বাঙালী সেক্যুলার পক্ষটি গড়ে উঠেছিল ভারত সরকার ও ভারতভক্ত সেক্যুলার বাংলাদেশীগণ চায় সেটি চিরকাল বাঁচিয়ে রাখতে। বাঙালী জাতীয়তাবাদী সেক্যুলারদের সে ভারতসেবী চেতনাটিকেই তার বলছে একাত্তরের চেতনা। বাংলাদেশের শিল্পে কোন বিনিয়োগ না করলে কি হবে, তারা শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে এ চেতনা বাঁচাতে। ভারতের আধিপত্যবাদী রাজনীতি বাঁচানোর এ বিশাল বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে অসংখ্য রাজনৈতিক ও সামাজিক দল এবং এনিজিওকে তারা বাংলাদেশে রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও মিডিয়ার ময়দানে নামিয়েছে। সে লক্ষ্য পূরণে শত শত পত্র-পত্রিকা, বহু শত নাট্যদল, বহু সাংস্কৃতিক দল, বহু টিভি চ্যানেল এক যোগে কাজ করছে। বাংলাদেশের সীমান্তে মোতায়েনকৃত ভারতীয় সেনাদের চেয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নিয়োজিত এসব এজেন্টদের সংখ্যা এজন্যই অধিক। উপরুন্ত, ভারত থেকে নিয়মিত আমদানী করা হচ্ছে বিপুল সংখ্যক সাংস্কৃতিক যোদ্ধা ও বই-পুস্তক। দেশের অভ্যন্তরে ভারতের পক্ষে মূল যুদ্ধটি লড়ছে তারাই। একাত্তরের বন্দুক যুদ্ধ থেমে গেলেও বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক যুদ্ধ এজন্যই থামেনি। যুদ্ধের প্রচণ্ড উত্তাপ তাই দেশের রাজনীতি, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিতে। ভারতের একাত্তরের যু্দ্ধের এটিই হলো ধারাবাহিকতা। শত্রুর যুদ্ধ তো এভাবেই যুগ যুগ নানা স্ট্রাটেজী নিয়ে নানা রণাঙ্গনে বেঁচে থাকে। এজন্যই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে টিপাই মুখ বাঁধ, ফারাক্কা বাঁধ, সমুদ্র বন্দরে অবাধ সুযোগ ও বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ট্রানজিটের পক্ষে কথা বলতে কোন ভারতীয় লাগে না। ভারতের পক্ষে সে যুদ্ধ সফল ভাবে লড়ার জন্য তাদের ট্রোজান হর্সরাই যথেষ্ট। বুয়েটের ছাত্র আবরার নিহত হলো তো তাদের হাতেই।

 

এজেন্ডা ক্ষতিসাধনে

ব্যক্তির ঈমানদারী তো ইসলামের বিজয়ে ও মুসলিমের কল্যাণে সে কতটা হিতকর বা কল্যাণকর -সেটি প্রমান করায়। ঈমানদারকে তাই প্রতি মুহুর্তে বাঁচতে হয় এ ভাবনা নিয়ে, ইসলামের বিশ্বব্যাপী বিজয়ে ও মুসলিমের কল্যাণে কীভাবে সে আরো অধীক কাজে লাগতে পারে? এমন ভাবনা নিয়েই ঈমানদার ব্যক্তি জিহাদের ময়দান খোঁজে। সে ভাবনা নিয়ে তারিক বিন যিয়াদ ছুটে গিয়েছিলেন স্পেনে; এবং স্থাপন করেছিলেন স্পেন ও পর্তুগাল নিয়ে এক মুসলিম সাম্রাজ্য। বিখ্যাত তুর্কী বীর ইখতিয়ার মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী বাংলার বুকে ছুটে এসেছিলেন। এভাবেই বখতিয়ার খিলজী বাংলার কোটি কোটি মুসলিমদের সবচেয়ে বড় কল্যাণটি করেছিলেন। নইলে আজ যারা মুসলিম,তাদের অনেকেই হিন্দু থেকে যেত। এবং গরু-বাছুর, শাপ-শকুন, নদ-নদী,পাহাড়-পর্বত ও মুর্তি পূজায় জীবন কাটিয়ে নিশ্চিত জাহান্নামের যাত্রী হতো।

মুসলিম ও ইসলামের কল্যাণে কিছু করাই তো ঈমানদারের কাজ। সে কাজে সে অর্থ দেয়, শ্রম দেয় এবং প্রয়োজনে প্রাণও দেয়। অপরদিকে মুসলিম ও ইসলামের জন্য অকল্যাণকর বা অহিতকর কিছু করা তো শয়তানের কাজ। প্রশ্ন হলো, ইসলাম ও মুসলিমের কোন কল্যাণের এজেন্ডা নিয়ে কি গঠিত হয়েছিল মুক্তিবাহিনী? ইসলাম ও মুসলিমের কল্যাণ কি ভারতের গর্ভে বা ভারতের সাহায্য নিয়ে সম্ভব? প্রশ্ন হলো, ভারতের মত একটি আগ্রাসী হিন্দু দেশ মুসলিমের কল্যাণের যুদ্ধ করবে বা একটি বাহিনী গড়ে তুলবে -সেটি কি ভাবা যায়? আজ পর্যন্ত কোথায়ও কি ভারত তেমন কর্ম করেছে?

সুলতান মুহাম্মদ ঘোরীর হাতে দিল্লি বিজয়ের পর উপমহাদেশের মুসলিম ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি ছিল পাকিস্তান সৃষ্টি। পাকিস্তান সৃষ্টির মধ্যে প্রতিষ্ঠা লাভ করে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ও সবচেয়ে শক্তিশালী মুসলিম রাষ্ট্র –যা এখন বেঁচে থাকলে লোক সংখ্যাটি হতো ৩৮ কোটি। এদেশটিকে খণ্ডিত করায় আগ্রহ ছিল সকল ইসলাম বিরোধী শক্তির। একাজে বাংলাদেশের ইসলাম বিরোধী শক্তি একাকী ছিল না, তাদের পাশে ছিল কাফের-শাসিত দেশ ভারত। ছিল ইসলামের দুষমন সোভিয়েত রাশিয়া। পলাশীর পরাজয়ের পর উপমহাদেশের মুসলিম ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ক্ষতিটি হয়েছে পাকিস্তানের বিভক্তির মধ্য দিয়ে। এবং বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্রের সর্ববৃহৎ জনগোষ্ঠি রূপে বাঙালী মুসলিমগণ বিশ্বরাজনীতিতে যে ভূমিকা রাখতে পারতো সেটিও বিনষ্ট হয়েছে। আর অপুরণীয় এ বিশাল ক্ষতির কারণ, বাঙালী সেক্যুলার নেতৃত্ব ও তাদের সৃষ্ট মুক্তিবাহিনী। এ বিভক্তির ফলে বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে সামরিক ভাবে পঙ্গু এবং রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভাবে ভারতের অধিকৃত একটি গোলাম রাষ্ট্রে। মুসলিম উম্মাহর সে বিশাল ক্ষতিটি নিয়ে প্রচণ্ড উৎসব হয় শুধু ভারতের হিন্দু শাসক মহলেই নয়, বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা মহলেও।  

একাত্তরে রাজাকারদের চেতনায় প্রবল ভাবে যা কাজ করেছিল তা হলো ভারতীয় ষড়যন্ত্র ও সামরিক আগ্রাসন থেকে সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানকে বাঁচানোর প্রেরণা। ভারতীয় প্রচারমাধ্যম বিপুল সংখ্যক বাঙালীদের বিভ্রান্ত করতে পারলেও রাজাকারদের বিভ্রান্ত করতে পারিনি। ভারতের মুসলিম বিরোধী ভূমিকাকে তারা যেমন ১৯৪৭’য়ে দেখেছে, তেমনি ১৯৭১’য়ের পূর্বে এবং পরও দেখেছে। তারা নিজেদের কল্যাণ নিয়ে যতটা ভাবে, তার চেয়ে বেশী ভাব মুসলিমদের অকল্যাণ নিয়ে। নিজেদের কল্যাণ নিয়ে ভাবলে তো দেশটিতে বিশ্বের সর্ববৃহৎ দরিদ্র জনগোষ্ঠির বাস হতো না। পাকিস্তানের জন্ম থেকে দেশটির অকল্যাণ বাড়াতে সব কিছুই তারা করেছে। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠারই শুধু বিরোধীতা করেনি, বিরোধীতা করেছে দেশটির বেঁচে থাকার বিরুদ্ধেও। সে শত্রুতা যে শুধু পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ছিল তা নয়, ছিল পূর্ব পাকিস্তানের বিদ্ধেও। পূর্ব পাকিস্তানীদের উপর মহবব্ত থাকলে কি তারা ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করতো। ভারতের আগ্রাসী আচরণটি দেখা গেছে কাশ্মীর, হায়দারাবাদ, মানভাদর ও সিকিমে। একাত্তরে এমন আগ্রাসী ভারতকে মুক্তিযোদ্ধাগণ আপন রূপে বরণ করে নেয়। অথচ ভারতও যে মুসলমানদের কল্যাণে কিছু করতে পারে রাজাকারগণ কখনোই বিশ্বাস করেনি। দেশটির শত্রুসুলভ আচরণ যেমন ১৯৪৭ ও ১৯৬৫’য়ে দেখা গেছে, তেমনি দেখা গেছে ১৯৭১’য়ে। মুসলিম কল্যাণে ভারতের কিছু করার আগ্রহ থাকলে সেটির শুরু হওয়া উচিত ছিল কল্যাণকর কিছু করার মধ্য দিয়ে; যুদ্ধ, যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু ও বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্রের ধ্বংসের মধ্য দিয়ে নয়।

 

রাজাকার ও মুক্তিযোদ্ধাঃ কী তাদের পরিচয়?

রাজাকার শব্দটি একটি ফার্সী শব্দ। ফার্সি থেকে এসেছে উর্দুতে। রাজাকার বলতে তাদেরকে বুঝায় যারা স্বেচ্ছা-প্রণোদিত হয়ে কোন যুদ্ধ বা কল্যাণমূলক কাজে অংশ নেয়। একাত্তরে তাদের সে মিশনটি ছিল, ভারতীয় ষড়যন্ত্র ও আগ্রাসন থেকে পাকিস্তানকে বাঁচানোর। পাকিস্তানে অবিচার ছিল, বঞ্চনা ছিল, জুলুমও ছিল। রাজনৈতিক অনাচারও ছিল। তবে সমাধান যে ছিল না -তা নয়। দেহ থাকলে যেমন রোগব্যাধীও থাকে। তেমনি বৃহৎ রাষ্ট্র থাকলে তাতে নানাবিধ সমস্যাও থাকে। শরীরের ভাঙ্গা হাড্ডিটি সারাতেও সময় লাগে। রাষ্ট্রের রোগ সারাতে সময় আরো বেশী লাগে। বহু দেশে এমন সমস্যা কয়েক যুগ ধরে চলে। যেমন পাকিস্তানের বয়সের চেয়ে অধিক কাল ধরে চলছে ইংল্যান্ডে আয়ারল্যান্ডের সমস্যা। কয়েক যুগ ধরে চলছে সূদানের দারফোরের সমস্যা। ভারত কাশ্মীরের সমস্যা বিগত ৬৫ বছরেও সমাধান করতে পারেনি। তবে স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টির দাবীটি একাত্তরের কয় মাস আগেও কেউ মুখে আনেনি। ১৯৭০’য়ের নির্বাচনেও এটি কোন ইস্যু ছিল না। শেখ মুজিব ও তার লাখ লাখ শ্রোতা মুক্তিযুদ্ধের শুরু মাত্র কয়েক মাস আগেও নির্বাচনী জনসভাগুলোতে পাকিস্তান জিন্দাবাদ স্লোগান দিয়েছে। সরকারের বিরুদ্ধে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার যে অভিযোগ -সেটির অস্তিত্ব মার্চের ১৯৭১’য়ের মার্চের একমাস আগেও ছিল না। অথচ এমন একটি অভিযোগ পাশ্ববর্তী মায়ানমারে দেড় দশক ধরে চলেছে। সেদেশে ১৯৯০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থী অং সাঙ সূচীর হাতে সামরিক জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তর না করে তাঁকে গৃহবন্দী করে। সে অপরাধে কি কেউ দেশভাঙ্গার জন্য ভারতীয় সাহায্য নিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়েছে? বরং মায়ানমারের স্বৈরাচারী সামরিক জান্তাদের সাথে ভারতের আচরণটি লক্ষ্য করার মত। সেদেশের সামরিক জান্তার সাথে ভারত শুরু থেকেই সদ্ভাব ও সহযোগিতা বজায় রেখেছে এবং পুরাদস্তুর বাণিজ্যও চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ভারত ও তার দোসররা নির্বাচন পরবর্তী সে সমস্যার সমাধানে পাকিস্তানকে আদৌ সময় দিতে রাজী ছিল না। সেটিকে বাহানা বানিয়ে ভারত দেশটির বিনাশে হাত দেয়। এটি ছিল অন্যদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের অতিশয় ন্যাক্কারজনক ঘটনা। মুক্তিযোদ্ধাদের মিশনটি ছিল সে ভারতীয় এজেন্ডাকে সফল করা। সে মিশনে তারা সফলও হয়।

দেশ বাঁচলেই দেশের রাজনীতি বাঁচে। বাঁচে নিজ নিজ ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে বেড়ে উঠার স্বাধীনতাও। দেশ ক্ষুদ্রতর হলে রাজনীতির অঙ্গণও ক্ষুদ্রতর হয়। দেশ তখন বিশ্বরাজনীতিতে গুরুত্ব হারায়। গণতন্ত্র মারা পড়লে সেটিকে আবার জন্ম দেয়া যায়, কিন্তু দেশ  হারিয়ে গেলে বা ক্ষুদ্রতর হলে শত বা হাজার বছরেও সেটিকে আর পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে অআনা যায় না। শত্রুরা সে জন্যই দেশের ভূগোলে হাত দেয়। তাই একাত্তরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু ছিল চিহ্নিত শত্রুর পরিকল্পিত হামলা থেকে বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম দেশটিকে বাঁচানোর দায়বদ্ধতা। এ দায়বদ্ধতাটি ছিল দেশের প্রতিটি ঈমানদারের উপর। এমন একটি চেতনার কারণে কোন ইসলামী দলের নেতাকর্মী ভারতের কোলে আশ্রয় নেয়নি, পাকিস্তান ভাঙ্গার কাজে অংশও নেয়নি।  বরং একাজটি ছিল তাদের যারা আজ বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেক্যুলার ও ইসলামের প্রতি অঙ্গিকারহীন রূপে পরিচিত। অপর দিকে গভীর এক ঈমানী দায়বদ্ধতায় নিজ নিজ সামর্থ্য নিয়ে প্রাণপনে ময়দানে নেমে আসে হাজার হাজার আত্মত্যাগী তরুণ। পাকিস্তানের এবং সে সাথে বাংলাদেশের ইতিহাসে এরাই হলো রাজাকার। তাদের অধিকাংশই ছিল স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। বহু হাজার ছিল মাদ্রাসার ছাত্র। অনেকে ছিল পাকিস্তানের অখণ্ডতায় বিশ্বাসী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মী ও সমর্থক। বাংলার হাজার বছরের মুসলিম ইতিহাসে বাংলাভাষী মানুষ নিজ রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষায় এভাবে কাফের সেনা বাহিনী ও তাদের দোসরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছে -সে ইতিহাস খুব একটা নেই। বরং ক্লাইভের ইংরেজ বাহিনী যখন বাংলা দখল করে নেয় তখন বাংলার কোন তরুণ একটি তীরও ছুড়েনি। কেউ প্রাণ দিয়েছে -সে নজিরও নেই। বরং অনেকে মুর্শিদাবাদের রাস্তার দুই পার্শ্বে হাজির হয়েছিল ব্রিটিশ বাহিনীর বিজয় উৎসব দেখতে। ফকির বিদ্রোহ ও মহান মুজাহিদ হাজী নেসার আলী তিতুমীরের প্রতিরোধ এসেছে অনেক পরে।

একাত্তরের বহু হাজার রাজাকার প্রাণ হারিয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা ও রাজাকার –এ দুই পক্ষের মাঝে সবচেয়ে বেশী প্রাণ হারিয়েছে এবং নির্যাতীত হয়েছে এই রাজাকারেরা। মুক্তিযোদ্ধাদের উপর যা কিছু হয়েছে তা লড়াইয়ের মাত্র ৯ মাস যুদ্ধ চলাকালে। কিন্তু রাজকারদের উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চলেছে একাত্তরের পরও। বরং তাদের উপর লাগাতর হামলা হচ্ছে বিগত ৪৮ বছর ধরে। সেটিকে অব্যাহত রাখারও  অবিরাম চেষ্টা চলছে। সে লক্ষ্যে বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকা ও ইতিহাসের বইয়ে রাজাকারদের বিরুদ্ধে শুধু গালিগালাজই নিক্ষিপ্ত হয়েছে। কিন্তু বাংলার মুসলিমদের কল্যাণে তাদেরও যে একটি রাজনৈতিক বিশ্বাস, দর্শন ও স্ট্রাটেজী ছিল -সে সত্যটিকে কোথাও উল্লেখ করা হয়নি। রাজাকারদের অধিকার দেয়া হয়নি তাদের চেতনা ও দর্শনের কথাগুলো লোক-সম্মুখে তুলে ধরার। অথচ সেটিও বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের ইতিহাস বাদ দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না।

 

রাজাকারের দর্শন ও মুক্তিযোদ্ধার দর্শন 

রাজকার ও মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে মুল পার্থক্যটি ভাষা বা বর্ণের নয়। সেটি দর্শনের। রাজাকারের কাছে যেটি গুরুত্ব পেয়েছিল সেটি হলো ভাষা ও অঞ্চলিকতার উর্দ্ধে উঠে মুসলিম উম্মাহর শক্তিবৃদ্ধিতে কাজ করা। পাকিস্তান ছিল বহু ভাষাভাষি একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের প্রতীক। আজও সেটি সমগ্র মুসলিম বিশ্বের মাঝে সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র। তাই সে রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষার দায়ভার শুধু পাঞ্জাবী, পাঠান, সিন্ধি ও বেলুচদের উপর ছিল না। বহু বাঙালী মুসলিমও সে দায়িত্ব পালনকে ফরজ ভেবেছে। কারণ বাঙালীগণ ছিল সে রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক। শেখ মুজিব তাদের আদর্শ ছিল না। গান্ধি, নেহেরু, ক্ষুদিরাম, সূর্য সেন বা প্রীতিলতাও নয়। তাদের সামনে অনুকরণীয় আদর্শ ছিলেন সাহাবায়ে কেরাম -যাদের শতকরা ৭০ ভাগের অধিক শহীদ হয়েছেন ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী উম্মাহ গড়ায়। তাদের দৃষ্টিতে বাঙালী মুসলিমের মূল কল্যাণটি বাঙালী রূপে বেড়ে উঠায় নয়, বরং ইসলামের বিজয়ে অঙ্গীকারটি হৃদয়ে ধারণ করে ঈমানদার রূপে বেড়ে উঠায়। সে কল্যাণিট অনন্ত আখেরাতেও। মহান আল্লাহতায়ালার কাছে হিসাব দিতে হবে ইসলাম ও মুসলিমের কল্যাণে কার কি অবদান সেটির। তাঁর মহান আদালতে কার কি ভাষা বা বর্ণ -সে প্রশ্ন অপ্রাসঙ্গিক। তাই ভাষার নামে রাষ্ট্র গড়ায় কোন কল্যাণ নেই। ইসলামে এটি ফরজ নয়, সেটি নবীজী (সাঃ)র সূন্নতও নয়। এমন রাষ্ট্র গড়ায় প্রাণ দিলে কেউ শহীদ হয় না। শহীদ হতে হলে লড়াইটি নির্ভেজাল আল্লাহতায়ালার দ্বীনপালন ও দ্বীন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে হতে হয়। হতে হয় মুসলিম উম্মাহ ও মুসলিম রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষায়। অথচ মুক্তিবাহিনী যে পথ ধরেছিল সেটি ছিল মুসলিম রাষ্ট্রকে ছোট করার তথা ক্ষতি সাধনের এবং এর মূল লক্ষ্য ছিল উপমহাদেশের বুকে ভারতের ন্যায় কাফের রাষ্ট্রের আধিপত্য বাড়ানো। তাই মুক্তিবাহিনীর গঠনে, প্রশিক্ষণে ও তাদের অস্ত্রদানে ভারত এতোটা আগ্রহী ছিল। ভারত তো পাকিস্তান ভাঙ্গার এমন একটি যুদ্ধ নিজ সৈন্য, নিজ অস্ত্র ও নিজ অর্থে ১৯৪৭ সাল থেকেই লড়ে দেয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল। পাকিস্তান ভাঙ্গার কাজে মুক্তিবাহিনীর কোন প্রয়োজনই  ছিল না। ভাষা বা বর্ণ-ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজে সাহাবায়ে কেরাম প্রাণ দান দূরে থাক, সামান্য শ্রম, সময় বা অর্থ দান করেছেন -সে প্রমাণ নেই। এরূপ ভাঙ্গার কাজ গুরুত্ব পেলে হাজার বছর আগেই অখণ্ড খেলাফত ভেঙ্গে বাংলাদেশের ন্যায় পঞ্চাশটিরও বেশী স্বাধীন রাষ্ট্র নির্মিত হতে পারতো।

একাত্তরে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতি ছিল মূলত দুই শিবিরে বিভক্ত। এক শিবিরে ছিল আওয়ামী লীগ, মস্কো ও চীনপন্থি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির দুই গ্রুপ (ন্যাপ), কম্যুনিষ্ট পার্টি -মূলত এ তিনটি সেক্যুলার দল। ইসলামের প্রতিষ্ঠা নিয়ে তাদের কোন অঙ্গীকার ছিল না। বরং তারা ছিল ইসলামের প্রতিপক্ষ শক্তি। পাকিস্তানকে তারা সাম্প্রদায়িক সৃষ্টি মনে করতো। ফলে তারা দেশটির ভাঙ্গার লড়ায়ে ভারতের সহযোগী হতে তাদের পথে কোন বাধা ছিল না। এ দলগুলির ছিল নিজ নিজ দলীয় ছাত্র সংগঠন। মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা ছিল এসব দলের ছাত্র সংগঠনেরর সদস্যরা। অপর শিবিরের দলগুলো হলো মুসলিম লীগের তিনটি মূল উপদল, জামায়াতে ইসলামী, নূরুল আমীন সাহেবে পাকিস্তান ডিমোক্রাটিক পার্টি (পিডিপি), নেজামে ইসলাম, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, কৃষম-শ্রমিক পার্টি এবং জমিয়তে আহলে হাদীস। এছাড়াও ছিল কিছু ছোট ছোটি দল। রাজাকারগণ মূলত আসে এসব দলগুলি থেকে। রাজাকারদের মাঝে বহু নির্দলীয় ব্যক্তিও ছিল। তারা ছিল বিভিন্ন পীরের মুরীদ, ছিল মাদ্রাসার নির্দলীয় ছাত্র। তাদের সবার কাছে পাকিস্তান ছিল স্বপ্নের দেশ; এবং দেশটিকে ভাবতো ভারতীয় আধিপত্য থেকে বাঁচার রক্ষাকবচ রূপে।

১৯৪৭’য়ের পূর্বে শেখ মুজিব নিজেও কলকাতায় থাকা কালে মুসলিম লীগের প্যান-ইসলামী দর্শনের স্রোতে কিছু কাল ভেসেছেন। কলকাতার রাজপথে লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তানও বলেছেন। কিন্তু ১৯৪৭’য়ের পর সে স্রোত কমে যাওয়ায় সেক্যুলার বাঙালী জাতীয়তাবাদের চড়ে তিনি আটকা পড়েন। এভাবে ছিটকে পড়েন পাকিস্তান সৃষ্টির মূল মিশন থেকে এবং যোগ দেন পাকিস্তানের শত্রু শিবিরে। বাস্তবতা হলো, যাদের মাঝে ইসলামী দর্শনের বলটি প্রবল, একমাত্র তারাই ইসলামের পক্ষে প্রবল স্রোত সৃষ্টি করে এবং সে স্রোতে শুধু নিজেরাই চলে না, অন্যদেরও ভাসিয়েও নেয়। ইসলামী দর্শন তো অমর। ফলে প্যান-ইসলামী দর্শনের উপর প্রতিষ্ঠা পাওয়ার মাত্র ২৩ বছরে পাকিস্তানের প্রয়োজনটি ফুরিয়ে যাবে -সেটি মুসলিম সন্তানেরা মেনে নেয় কি করে? ফলে পাকিস্তান ভাঙ্গার প্রজেক্ট ইসলামে অঙ্গীকারশূণ্য কম্যিউনিষ্ট, নাস্তিক, হিন্দু, বাঙালী জাতীয়তাবাদী, ভারতীয় এজেন্ট, ইহুদী এজেন্ট ও সেক্যুলারগণ মেনে নিলেও কোন রাজাকার মেনে নেয়নি। মুক্তিযু্দ্ধের চেতনাধারিদের থেকে রাজাকারদের মূল পার্থক্য বস্তুত এখানেই।

 

ভিন্নতা শত্রু-মিত্র চেনায়

কে শত্রু আর কে মিত্র –মানুষ সে ধারণাটি পায় তার দর্শন থেকে। তাই ইসলাম যাদেরকে শত্রু বা মিত্র রূপে চিহ্নিত করে, ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ, সেক্যুলারিজম ও সমাজতন্ত্র তা করে না। মুসলিমের শত্রু বা মিত্র আর বাঙালী জাতীয়তাবাদী সেক্যুলারিস্টদের শত্রু বা মিত্র -তাই এক নয়। এজন্যই বাঙালী জাতীয়তাবাদীদের কাছে বন্ধু রূপে গৃহীত হয় নাস্তিক সোসালিস্ট, কম্যিউনিস্ট এবং পৌত্তলিকরা। ফলে তাদের কাছে গুরুত্ব পেয়েছিল ভারতের ন্যায় ইসলামের শত্রুদের সাথে কোয়ালিশন গড়াটিও। ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে ভারতীয় হিন্দু প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, শিখ জেনারেল অরোরা, পারসিক জেনারেল মানেক শ’, ইহুদী জেনারেল জ্যাকব অতিশয় আপনজন মনে হয়েছে। এবং তাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এমনকি নিজ দেশ, নিজ ধর্ম ও নিজ ভাষার নিরস্ত্র রাজাকার হত্যাটিও বীর-সুলভ মনে হয়েছে। ১৯৭১য়ের ১৬ই ডিসেম্বরের পর হাজার হাজার নিরস্ত্র রাজাকারকে হত্যা করা হয়েছে তো এমন এক চেতনাতেই।

প্রতারণার স্বার্থে অতি দুর্বৃত্তদেরও ফেরেশতা সাজার আয়োজন দেখা যায়। সেটি যেমন তাদের কথাবার্তা ও বক্তৃতায়, তেমনি সাজগোজে। তবে ব্যক্তির মনের গোপন অভিলাষ ও তার আসল চরিত্রটি বুঝার মোক্ষম উপায়টি হলো তার নিকটতম বন্ধুদের দিকে তাকানো। কারণ বন্ধু নির্বাচনে সবাই তার মন ও মতের অতি কাছের লোকটিকে বেছে নেয়। তাই শেখ মুজিব বা তার বাঙালী জাতীয়তাবাদী সহচরদের চরিত্র ও তাদের রাজনীতির মূল এজেন্ডা বুঝতে হলে ভারতীয় নেতাদের রাজনৈতিক চরিত্র ও এজেন্ডা বুঝতে হবে। এজন্য মুজিবের লম্বা লম্বা বক্তৃতা শোনার প্রয়োজন নেই। রাজাকারগণ তাই মুজিবকে চিনেছিল তার ঘনিষ্টতম বন্ধু ভারত সরকারের আগ্রাসী আধিপত্যবাদ ও মুসলিম নির্যাতনের ইতিহাস থেকে। একাত্তরের পর ভারতের অবাধ লুণ্ঠন, তলাহীন ভিক্ষার ঝুলির অর্থনীতি, দুর্ভিক্ষে লক্ষ লক্ষ মানুষে মৃত্যু এবং অধিকৃত বাংলাদেশের চিত্রটিই তাদের সে ধারণাকে শতভাগ সঠিক প্রমাণিত করেছে। মানুষকে শুধু বিষাক্ত পোকামাকড় ও হিংস্র পশুদের চিনলে চলে না। রাজনীতির ময়দানের ভদ্রবেশী প্রতারকদেরও চিনতে হয়। নইলে দেশ অধিকৃত হয় ও তলাহীন ঝুলিতে পরিণত হয়। দেশে তখন দুর্ভিক্ষও নেমে আসে। গণতন্ত্রের বদলে তখন বাকশালী ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা পায়। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালী মুসলিমদের ব্যর্থতাটি এক্ষেত্রে প্রকট। সে বিশাল ব্যর্থতাটি মুক্তিযোদ্ধাদেরও। তারা যেমন শত্রুদের চিনতে পারিনি, তেমনি ব্যর্থ হয়েছে সত্যিকার বন্ধুদের চিনতেও। যে মুসলিম লীগ ১৯৪৭’য়ে অখণ্ড ভারত ভেঙ্গে স্বাধীনতা এনে দিল তাদেরকে বরং শত্রু মনে করেছে। পাশে আশ্রয় নেয়া অবাঙালী মুসলিমদের ভাই রূপে গ্রহণ করতেও ব্যর্থ হয়েছে। তারা বিভাজন গড়েছে স্রেফ ভাষার ভিত্তিতে। অবিঙালী মুসলিমদের বিরুদ্ধে ছড়ানো হয়েছে প্রচণ্ড ঘৃণাবোধে। অথচ এমন বিভক্তি ও ঘৃণাবোধ ইসলামে হারাম। এ মহাপাপ আযাব ডেকে আনে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানে ৬৫ লাখ ভারতীয় আশ্রয় পেয়েছিল। আশীর দশকে সোভিয়েত আগ্রাসনের পর পাকিস্তানে আশ্রয় পায় ৩০ লাখ আফগান। ক্ষুদ্র রাষ্ট্র লেবাননের জনসংখ্যার প্রায অর্ধেক হলো রিফিউজী। অথচ বাংলাদেশে কয়েক লাখ বিহারীর বসবাসের স্থান হয় না। তাদের ঘরবাড়ি কেড়ে নিয়ে তাদেরকে বস্তিতে পাঠানো হয়। শুরুতে সাগরে ভাসমান প্রাণ বাঁচাতে আসা রোহিঙ্গা মুসলিমগণও বাংলাদেশের উপকূলে নৌকা ভেড়ানোর অনুমতি দেয়নি হাসিনা সরকার। পরে দিতে বাধ্য হয়েছে স্রেফ আন্তর্জাতিক চাপে, মানবতার গুণে নয়। সেক্যুলার বাঙালীগণ মানবিক গুণাবলি নিয়ে বেড়ে উঠায় যে কতটা ব্যর্থ –সেটি বুঝতে এর পরও কি কিছু বাঁকি থাকে?

 

রাজাকারের স্বপ্ন ও মুক্তিযোদ্ধার স্বপ্ন

সবাই যেমন জীবনে একই লক্ষ্য নিয়ে বাঁচে না, তেমনি একই রূপ স্বপ্নও দেখে না। মানুষে মানুষে স্বপ্নের জগত জুড়ে রয়েছে বিশাল পার্থক্য। সে বিশাল পার্থক্যটি ছিল রাজাকার ও মুক্তিযোদ্ধার মাঝেও। রাজাকারের চেতনা-রাজ্যের সবটুকু জুড়ে যে বিরাট স্বপ্ন ছিল, সেটি বিশ্বশক্তি রূপে মুসলিম উম্মাহর উত্থানের। স্বপ্নটি ইসলামের পূর্ণ প্রতিষ্ঠার। সে জন্যই তারা বিশ্বের সর্ব বৃহৎ রাষ্ট্র পাকিস্তানকে ভারতীয় হামলা থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল। দেহে প্রাণ থাকা যেমন জীবনের লক্ষণ, তেমনি এরূপ শক্তিশালী মুসলিম রাষ্ট্রের নাগরিক রূপে বেড়ে উঠা বা বাঁচার স্বপ্নটিও ঈমানের লক্ষণ। আর প্রকৃত ঈমানদারের জীবনে শুধু এ স্বপ্নটুকুই থাকে না, সে স্বপ্নের বাস্তবায়নে প্রাণপন প্রচেষ্টাও থাকে। এজন্যই তো ঈমানদার মাত্রই আল্লাহর পথের রাজাকার তথা স্বেচ্ছাসেবী সৈনিক। এ কাজে তাকে ময়দানে নামতে কেউ বাধ্য করে না, বরং তারা নামে নিজ ঈমানী দায়বদ্ধতায়। আল্লাহর দ্বীনের এমন রাজাকার হলো প্রতিযুগের মুজাহিদগণ। রাজাকার ছিলেন তারাও যারা সাতচল্লিশে “লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান” ধ্বণিতে কংগ্রেস ও হিন্দুমহাসভার গুণ্ডাদের বিরুদ্ধে রাজপথে লড়েছেন। রাজাকার তাদেরও বলা হতো যারা ভারতের সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মুসলিম শাসনাধীন হায়দারাবাদের স্বাধীনতা বাঁচাতে যুদ্ধ লড়েছিল।

একাত্তরের রাজাকারগণ তাই মুসলিম ইতিহাসের একমাত্র রাজাকার নন। অতীতের ন্যায় এমন রাজাকার আজও অসংখ্য। এরাই আল্লাহর দ্বীনের বিজয় নিয়ে আজও স্বপ্ন দেখে। ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আজও তারা প্রতিরোধে নামে। এ সত্যটুকু বুঝতে শয়তান ভুল করে না। ভুল করে না শয়তানী শক্তির বাংলাদেশী সেবাদাসেরাও। তাই বাংলাদেশের রাজপথে যখন দাড়ি-টুপিধারীদের রাজাকার বলে লগি-বৈঠা নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয় তাতে বিস্ময়ের কিছু থাকে না। বিস্ময় তখনও জাগে না, যখন একাত্তরের পরে জন্ম নেয়া ইসলামী চেতনাধারী যুবককে রাজাকার বলে হত্যা করা হয়। বিস্ময় জাগে না, যখন একাত্তরে যুদ্ধে অংশ নেয়নি আশি বছরের এক বৃদ্ধ আলেমকে রাজাকার বলা হয় এবং তাকে হত্যা করা হয়। রাজাকারের সংজ্ঞা নিয়ে জ্ঞানশূণ্য ও চিন্তাশূণ্য মুসলিমদের সংশয় থাকতে পারে, কিন্তু সে সংশয় শয়তানের নেই। শয়তানের অনুসারিদেরও নেই। তাই রাজাকার চিনতে তারা ভুল করে না। শয়তানী শক্তির এজেন্টগণ যখন দেশের মাদ্রাসা-মসজিদ গুলোকে রাজাকার উৎপাদনের কারখানা বলে তখন তারা ভুল বলে না। কারণ এগুলোই লড়াকু মুজাহিদ তৈরীর কাজে মহান আল্লাহতায়ালার ইনস্টিটিউশন।

 

রক্ষা নাই যে বিচার থেকে

নবীজী (সাঃ)র হাদীস, “গুনাহ বা ক্ষতিকর কাজ হতে দেখলে ঈমানদারের দায়িত্ব হলো সে কাজ শক্তির বলে রুখা। শক্তি না থাকলে মুখের কথা দিয়ে প্রতিবাদ করা। আর সেটিও না থাকলে মন থেকে সেটিকে ঘৃণা করা। আর এ ঘৃণাটুকুও না থাকলে বুঝতে হবে, তার অন্তরে শরিষার দানা পরিমাণ ঈমানও নেই”। একটি মুসলিম দেশকে খন্ডিত করার চেয়ে জঘন্য খারাপ কাজ আর কি হতে পারে? মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে এর চেয়ে বড় ক্ষতিকর কাজই বা আর কি হতে পারে? দেশ খন্ডিত হওয়ায় যে দূর্বলতা বাড়ে, সেটি কি মাথাপিছু আয়ু বাড়িয়ে দূর করা যায়? কুয়েত, আবুধাবি, কাতার, সৌদি আরবের মাথাপিছু আয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও অধিক। কিন্তু তাতে কি শক্তি বেড়েছে? বেড়েছে কি প্রতিরক্ষার সামর্থ্য। শত্রুপক্ষ যখন কোন দেশকে দূর্বল করতে চায় তখন তারা সে দেশটির মানচিত্রে হাত দেয়। ভারত সেটি করেছিল পাকিস্তানের বিরদ্ধে। কোন ঈমানদার কি কাফের শক্তির হাতে মুসলিম উম্মাহর দেহ এভাবে টুকরো টুকরো হতে দেখে খুশি হতে পারে? খুশি হলে তার মনে যে শরিষার দানা পরিমাণ ঈমানও নাই -তা নিয়ে কি সন্দেহ থাকে? রাজাকারগণও তাই দর্শকের ভূমিকায় না থেকে ময়দানে নেমেছে। দেশের ভূগোলের উপর হামলা রুখতে সাহাবায়ে কেরাম জিহাদ করেছেন, দলে দলে শহীদও হয়েছেন। মুসলিম উম্মাহর অপুরণীয় ক্ষতি করতেই আরব বিশ্বকে খন্ডিত করেছে ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদী শক্তিবর্গ। অখণ্ড আরব ভূগোলকে ভেঙ্গে তারা বাইশ টুকরায় বিভক্ত করেছে। আরবদের এভাবে দূর্বল ও নির্জীব করার পরই প্রতিষ্ঠা করেছে ইসরাইল।

আল্লাহর কাছে প্রিয় এবং মুসলিমের বন্ধু হতে হলে তো তাকে মুসলিম ও ইসলামেরও বন্ধু হতে হয়। মুসলিম দেশের অখণ্ডতার হেফাজতে কাফেরদের বিরুদ্ধেও বীরদর্পে রুখে দাঁড়াতে হয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহর তায়ালার ঘোষণা,“হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহর সাহায্যকারি হয়ে যাও।..” আল্লাহর সাহায্যকারি হওয়ার অর্থ শুধু আমিও মুসলমান –এ টুকু বলা নয়। স্রেফ কিছু ইবাদত-বন্দেগী করাও নয়। আল্লাহপাক তার বান্দাহ থেকে বৃহ্ত্তর কিছু চান। সেটি ইসলামের প্রতিষ্ঠা ও মুসলিম ভূমির প্রতিরক্ষায় অঙ্গীকার ও কোরবানী। এটিই ছিল রাজাকারের জীবনে মিশন। তারা ফেরেশতা ছিল না, তাদের জীবনেও বহু ভূল-ত্রুটি ছিল। কিন্তু একাত্তরে তাদের জীবনের পাকিস্তান বাঁচানোর মিশনটি পুরাপুরি ইসলামী ছিল। অপরদিকে মুজিব ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারিরা ভারতের দেয়া রোডম্যাপকেই নিজেদের রাজনীতির রোডম্যাপে পরিণত করেছে। মুসলিম ভূমির প্রতিরক্ষার জন্য কিছু করার বদলে তারা সেটিকে ক্ষুদ্রতর করেছে। এভাবে প্রচণ্ড  খুশি ও শক্তি বাড়িয়েছে কাফেরদের। ভারত আজ যে বিশ্বশক্তি হওয়ার স্বপ্ন দেখে তার কারণ তো একাত্তরে তাদের বিজয়। কথা হলো, কাফেরদের বন্ধু হয়ে এবং তাদের মুখে হাঁসি বাড়িয়ে কি মহান আল্লাহতায়ালার কাছে প্রিয় হওয়া যায়? ফলে ইসলাম ও মুসলিম স্বার্থের বিরুদ্ধে তাদের কৃত নৃশংস অপরাধের বিচার বাংলাদেশের মাটিতে না হলেও মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে যে হবেই -তা নিয়ে কি কোন সন্দেহ আছে? তাদের সেদিন দাঁড়াতে হবে নরেন্দ্র মোদী এবং ইন্দিরা গান্ধির ন্যায় ভারতীয় কাফেরদের সাথে –যেমন তারা দাঁড়িয়েছিল একাত্তরে এবং দাঁড়াচ্ছে আজ। নবীজী (সাঃ)র হাদীসঃ এ দুনিয়ায় যাদের সাথে বন্ধুত্ব, পরকালে তাদের স্থান হবে তাদের সাথেই।  ৪/১১/২০১৯

 




দেশ নিয়ে ভাবনা-তিন

১.

নবীজী (সাঃ)র হাদীসঃ করুণাময় মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে দয়া ও মাগফিরাত লাভ ছাডা স্রেফ নিজের নেক আমলের বলে কেউ জান্নাত পাবে না। তবে আল্লাহতায়ালার দয়া ও মাগফিরাত পাওয়ার জন্যও কিছু শর্ত আছে। ব্যক্তিকে যেমন ঈমানদার হতে হয়, তেমনি বাঁচতে হয় তাঁর হুকুমের বিরুদ্ধে সর্বপ্রকার বিদ্রোহ থেকে। আল্লাহতায়ালার যে কোন হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ অসম্ভব করে তাঁর পক্ষ থেকে দয়া ও মাগফিরাত লাভ। বিদ্রোহ থেকে বাঁচার সাথে সাথে মহান আল্লাহতায়ালার অনুগত বান্দা রূপে তাঁর ইচ্ছা পূরণে বিনিয়োগ করতে হয় তাঁরই দেয়া জান ও মাল। আল্লাহতায়ালার ইচ্ছা পূরণের অর্থঃ দেশের আদালতে তাঁর সার্বভৌমত্ব ও শরিয়তী আইনের প্রয়োগ। সে সাথে ব্যক্তি, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতি অঙ্গণে সিরাতুল মুসতাকীমের তথা কোর’আনের বিধান মেনে চলা। পবিত্র কোর’আনের ঘোষণাঃ ইনিল হুকমু ইল্লা লিল্লাহ। অর্থঃ হুকুম তথা আইন দেয়ার অধিকার একমাত্র আল্লাহর। ঈমানদারের দায়িত্ব সে আইন মেনে চলা। মুসলিম জীবনে এগুলি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় –যা নির্ধারণ করে মুসলিম রূপে তার বাঁচা বা মরার বিষয়টি।    

আদালতে শরিয়তের আইন না মানার অর্থ মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট বিদ্রোহ। সেটি সিরাতুল মুসতাকীম থেকে চরম বিচ্যুতি। বিচ্যুতি নিয়ে কেউ জান্নাতে পৌঁছতে পারে না। তাই দেশে যত মসজিদ-মাদ্রাসাই থাকুক না কেন, আদালতে শরিয়তের বিধান না থাকলে বুঝতে হবে সে দেশের মানুষ আল্লাহর পথে তথা সিরাতুল মুস্তাকীমে নাই। শরিয়তের পথ ছাড়া যে পথ -সেটি মূলতঃ শয়তানের পথ। মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে অতি কঠোর হুশিয়ারি শুনানো হয়েছে সুরা মায়েদার ৪৪, ৪৫ ও ৪৭ নম্বর আয়াতে। বলা হয়েছে, (কোরআনে) নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী যারা বিচার-কাজ পরিচালনা করে না তারা কাফের…, তারা জালেম…. এবং তারা ফাসেক। কাফের ব্রিটিশদের হাতে অধিকৃত হওয়ার আগে বাংলা ও ভারতের মুসলিমদের মাঝে শরিয়ত না মানার বিপদটি অজানা ছিল না। ফলে সিরাজুদ্দৌলা ও মোগল শাসনের শেষ দিন পর্যন্ত দেশের সকল আদালতে শরিয়তি আইনের বিচার ছিল। কাফের ব্রিটিশেরা সেটি বিলুপ্ত করেছিল। ব্রিটিশ শাসনের বিলুপ্তি ঘটলেও সে শরিয়তী বিধানের আর প্রয়োগ হয়নি; এখনো রয়েছে কাফেরদের প্রবর্তিত কুফরি আইন। এটি সবারই জানা কথা, বাংলাদেশের আদালতে শরিয়তের আইন নেই। বাংলাদেশে নিজেদেরকে যারা মুসলিম রূপে দাবী করে তাদের সংখ্যাটি প্রায় ১৬ কোটি। কিন্তু ব্রিটিশ প্রবর্তিত কুফরি আইন সরিয়ে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠার সে আকুতি কই? কোথায় সে লড়াই? আদালতে কুফরি আইনের বিজয় নিয়ে কি মুসলিম রূপে বাঁচা যায়? যারা নিজেদের আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আশেক রূপে দাবী -এই কি তাদের আল্লাহপ্রেম ও রাসূলপ্রেমের নমুনা? কথা হলো, দেশের আদালত ও রাজনীতি কাফেরদের বিধান ও আইনের বিজয় বাড়িয়ে কি পরকালে মহান আল্লাহতায়ালার করুণা ও মাগফিরাত পাওয়া যাবে? তাই যারা পরকাল নিয়ে ভাবে, তাদের রাজনীতির বিষয়টি শুধু দেশে রাস্তাঘাট, চাকুরি-বাকুরি ও কল-কারখানা বৃদ্ধির বিষয়টি নয় বরং অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রূপে প্রাধান্য পায় মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে মাগফিরাত লাভের বিষয়টিও। কাফের ও মুসলিমের রাজনীতির মাঝে মূল ভিন্নতা বস্তুতঃ এক্ষেত্রটিতে।     

২.

ঈমান এবং মহান আল্লাহতায়ালার পথে জান-মালের বিনিয়োগ –মুমিন ব্যক্তির জীবনে এ দুটি বিষয় একত্রে চলে। ঈমান থাকলে আল্লাহতায়ালার পথে বিনিয়োগ স্বাভাবিক ভাবেই আসতে বাধ্য। যেমন উত্তাপ না থাকলে বুঝতে হয়, সেখানে কোন আগুণ নাই। তেমনি ব্যক্তির জীবনে আল্লাহতায়ালার পথে বিনিয়োগ না থাকলে বুঝতে হবে তার ঈমানের ভান্ডারটি শূণ্য। কারণ, ঈমান অনুযায়ী প্রতিটি মু’মিনকে প্রবল ভাবে বিশ্বাস করতে হয়, তাঁর জান-মাল তাঁর নিজের নয়। সেটি মহান আল্লাহতায়ালার কাছে বিক্রয়কৃত সম্পদ। ঈমানদার শুধু সে জান ও মালের আমানতদার মাত্র। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোর’আনে মহান আল্লাহতায়ালার নিজের ঘোষণাটি হলো: “নিশ্চয়ই আল্লাহ কিনে নিয়েছেন মুমিনদের জান ও মাল, এ মূল্যে যে তারা পাবে জান্নাত। ফলে তারা যুদ্ধ করে আল্লাহর পথে,তারা (ইসলামের শত্রুদের) হত্যা করে এবং নিজেরাও নিহত হয়….”(সুরা তাওবা, আয়াত ১১১)

 

উপরে উল্লেখিত বিক্রয়নামার শর্ত অনুযায়ী মুমিনের কাজ হলো, মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশিত পথে তাঁর কেনা জান ও মালকে ফেরত দেয়া। ফেরত দেয়ার সে পথটি হতে হবে তাঁরই নির্দেশিত পথে। সে পথটি হলো ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদের পথ। পবিত্র কোর’আনে সে বিষয়েও বার বার গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তাই ঈমানদার হওয়ার দাবী আছে অথচ মহান আল্লাহর পথে জানমালের বিনিয়োগ নাই –এমন হওয়াটি মুনাফিকের লক্ষণ। মুনাফিকদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের সবচেয়ে কঠোরতর আযাব।

৩.          

ঈমানের দাবী করাটি সহজ। বাংলাদেশে যারা সূদ-ঘুষ খায়, গুম-খুন ও ভোট-ডাকাতির রাজনীতি করে এবং শরিয়তের প্রতিষ্ঠায় অঙ্গিকারহীনতাই যাদের রাজনীতির মূল চরিত্র -সেসব সেক্যুলারিস্টগণও জোর গলায় নিজেদের ঈমানদার হওয়া দাবী করে। কিন্তু তারা কি আদৌ ঈমানদার?  ঈমানদার কাকে বলে -সে সংজ্ঞাটি দিয়েছেন খোদ মহান আল্লাহতায়ালা। এবং সেটি পবিত্র কোর’আনের সুরা হুজরাতের ১৫ নম্বর আয়াতে। বলা হয়েছে, “ঈমানদার একমাত্র তারাই যারা ঈমান আনলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর এবং অতঃপর মুক্ত হলো সর্বপ্রকার সংশয় থেকে এবং নিজেদের জান ও মাল নিয়ে জিহাদ করলো আল্লাহর রাস্তায়। (ঈমানের দাবীতে) এরাই হলো সত্যবাদী।” মহান আল্লাহতায়ালা এখানে জিহাদকে ঈমানের অবিচ্ছেদ্দ্য অঙ্গ রূপে ঘোষণা দিয়েছেন। অর্থাৎ যার জীবনে জিহাদ নাই তার মাঝে ঈমানও নাই।  

 

পবিত্র কোর’আনে ঘোষিত ঈমানের সে সংজ্ঞাটি নবীজী (সাঃ)র সাহাবাগণ বুঝেছিলেন। সে সংজ্ঞারই বাস্তব নজির রেখে গেছেন তাঁরা। তাই তাদের জীবনে শুধু নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাত ছিল না, ছিল জিহাদও। মহান আল্লাহতায়ালার পথে জান ও মালের বিনিয়োগ বাড়াতে কিছু পঙ্গু ছাড়া এমন কোন সাহাবা ছিলেন না যিনি জিহাদে নামেননি। সে জিহাদে সাহাবাদের শতকরা ৭০ ভাগের বেশী শহীদ হয়েছেন।

৪.

যারা শহীদ হয়, রোজ হাশরের বিচার দিনের অপেক্ষায় তাদের থাকতে হয় না। তাঁরা সরাসরি বিনা হিসাবে প্রবেশ করে জান্নাতে। পবিত্র কোর’আনে মহান রাব্বুল আ’লামিন এটিকেই মানব জীবনের সবচেয়ে বড় বিজয় রূপে আখ্যায়ীত করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আজ ক’জন মুসলিম সে মহা বিজয়ের পিছনে দৌড়াচ্ছে? বরং বাস্তবতা হলো, বেতন পেলে কাফের শক্তির চাকর-বাকর হওয়ার জন্য দুই পায়ে খাড়া এমন ব্যক্তির সংখ্যা কোটি কোটি। নিজেদের মুসলিম রূপে পরিচয় দিলে ইসলামের দুষমনদের জন্য তারা জান দিতেও রাজি। বিগত দুইটি বিশ্বযুদ্ধে তারা লাখে লাখে যোগ দিয়েছে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ বাহিনীতে। এবং সেটি মুসলিম ভূমিতে মুসলিম হত্যায় ও মুসলিম ভূমি অধিকৃত করার কাজে। তাদের মাঝে ছিলেন বাংলাদেশের জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম এবং জাতীয় বীর আতাউল গণি ওসমানি। এসবই ইতিহাস। ইসলামশূণ্য এ সেক্যুলার চেতনার অনুসারিরাই একাত্তরে কাফের অধিকৃত রাষ্ট্র ভারতে গিয়েছিল এবং ভারতীয় কাফেরদের অস্ত্র কাঁধে নিয়ে মুসলিম হত্যায় নেমেছিল। এবং আজও এরাই সমর্থন দিচ্ছে কাশ্মিরে ভারতীয় বাহিনীর গণহত্যা ও ধর্ষণকে।  বলছে সে হত্যা ও ধর্ষন ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এরাই আজ অসম্ভব করে রেখেছে বাংলাদেশে শরিয়ত প্রতিষ্ঠার ন্যায় ফরজ বিষয়কে। বাংলাদেশের মুসলিমদের অজ্ঞতা শুধু কোর’আন-হাদীস ও ইসলামের ইতিহাস নিয়ে নয়, বরং গভীর অজ্ঞতা হলো ইসলামের শত্রুদের চেনার ক্ষেত্রেও। এবং সে অজ্ঞতার কারণেই বা্ংলাদেশ অধিকৃত হয়েছে ইসলামের শত্রুদের হাতে।

৫.

লেবাননের জনসংখ্যা মাত্র ৫০ লাখ। কিন্তু সম্প্রতি লেবাননের রাস্তায় দিনের পর দিন লক্ষ লক্ষ মানুষের ঢল নেমেছিল। তাতেই পতন ঘটেছে প্রধানমন্ত্রী সা’দ হারিরী সরকারের। একই ভাবে সরকারের পতন ঘটেছে জর্জিয়া, সূদান ও আলজিরিয়ায়। ৫ মাস যাবত রাস্তায় আন্দোলন চলছে হংকংয়ে। বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি এবং ঢাকার জনসংখ্যা দেড় কোটি। বিশ লাখ লোক রাস্তায় নামলে ঢাকার সবগুলি রাস্তা মিছিলে পূর্ণ হয়ে যেত। ঢাকার সকল রাস্তায় কি মিছিল বন্ধ করা কি সম্ভব হতো। এরূপ মিছিল কয়েক সপ্তাহ ধরে চললে সরকার কি গদিতে থাকতে পারতো? কিন্তু প্রশ্ন হলো, অসভ্য স্বৈরাচার হটিয়ে সভ্য ভাবে বাঁচার সে রুচি বাংলাদেশীদের মাঝে কতটুকু?

৬.

আল্লাহতায়ালার পবিত্র কথাগুলো নিয়েই পবিত্র কোর’আন। মানব জাতির জন্য এটিই হলো সর্বশ্রেষ্ঠ দান। তার চেয়ে বড় বেয়াদব ও পথহারা আর কি কে হতে পারে, যে ব্যক্তি লেখাপড়া জানা সত্ত্বেও পবিত্র কোর’আন বুঝার কোন চেষ্টাই করলো না। প্রশ্ন হলো, এমন বেয়াদব এবং পথভ্রষ্ট ব্যক্তির দোয়া কি আল্লাহর দরবারে কখনো কবুল হয়? এরূপ বেয়াদবি এবং পথভ্রষ্টতা নিয়ে দোয়া কবুলের স্থান আরাফাতে গিয়ে কাঁদলেও কি দোয়া কবুল হয়? মহান আল্লাহতায়ালা তো তাদের দোয়া শুনেন যারা তাঁর নির্দেশে সাড়া দেয়। সে পরম  হুশিয়ারিটি এসেছে সুরা বাকারার ১৮৭ নম্বর আয়াতে।

৭.

আলু-পটলও মূল্য দিয়ে কিনতে হয়। জান্নাত কিনতে হয় নিজের যোগ্যতা, অর্থ ও রক্ত মহান আল্লাহর পথে জিহাদে বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে। তাই শুধু নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত এবং দোয়া-দরুদ নয়, সেরূপ নানা ইবাদতের সাথে জান্নাতের মূল্য পরিশোধে নবীজী (সাঃ)র প্রতিটি সাহাবাকে জিহাদের ময়দানে নামতে হয়েছে। যারা নামেনি তাদেরকে মুনাফিক বলা হয়েছে। অথচ সে মুনাফিকগণ নামাজ পড়েছে নবীজী (সাঃ)র পিছনে মসজিদে নববীর পবিত্র মেঝেতে।  

৮.

আল্লাহতায়ালার কাছে হিসাব দেয়ার আগে নিজের হিসাবটি নিজে নেয়া উচিত। নিজের হিসাবের খাতায় সবচেয়ে বেশী নেকী যোগ হয়, আল্লাহর রাস্তায় জান ও মালের বিনিয়োগের মাধ্যমে। ইসলামকে বিজয়ী করতে প্রতিটি সাহাবী তাই জিহাদে নেমেছেন এবং বেশীর ভাগ সাহাবা শহীদ হয়েছেন। প্রশ্ন হলো, শহীদ হওয়া দূরে থাক, আজ ক’জন মুসলিম ইসলামের পক্ষে কথা বলে? ইসলামের বিপক্ষ শক্তির সাথে আপোষ করা এবং তাদের জুলুমবাজীর সামনে নীরব থাকা কি নবীজী (সাঃ)র সূন্নত।  

৯.

প্রতিটি ব্যক্তির ভান্ডারে মহান আল্লাহতায়ালা-প্রদত্ত শ্রেষ্ঠ নিয়ামতটি হলো তার দৈহিক শক্তি ও বুদ্ধিমত্তা। এ দু’টি নেয়ামতের সুষ্ঠ বিনিয়োগে পৃথিবী পৃষ্ঠে নির্মিত হতে পারে উচ্চতর সভ্যতা, এবং প্রতিষ্ঠা পেতে পারে বিশ্বময় শান্তি। প্রাথমিক কালের মুসলিমগণ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার জন্ম দিতে পেরেছিলেন তো এ পথেই। বিছানায় পড়ে মৃত্যুতে আল্লাহর দেয়া শ্রেষ্ঠ সে নিয়ামতের অপচয় ঘটে। সাহাবাগণের বুদ্ধিমত্তা হলো, তারা নিয়ামতের সে অপচয় থেকে বাঁচায় অতি সচেনত ও সচেষ্ট ছিলেন। তাই তারা মহান আল্লাহতায়ালা-প্রদত্ত শ্রেষ্ঠ নিয়ামতগুলির যথাযত বিনিয়োগের মাধ্যমে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার খুঁজতেন। আজকের মুসলিমদের থেকে এক্ষেত্রটিতেই সবচেয়ে বড় পার্থক্য।

এ পার্থিব জীবনে মৃত্যু আছে, কিছু পরকালে মৃত্যু নাই। সাহাবাগণ সেটি বিশ্বাস করতেন এবং চাইতেন সে মৃত্যুহীন জীবনে নেয়ামত  ভরা জান্নাত।  তারা জানতেন জান্নাতের ন্যায় সে শ্রেষ্ঠ পুরস্কারটি শুধু দোয়া-দরুদ, নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাতে মেলে না। সেটি জানমালের কোরবানি চায়। তাই অধিকাংশ সাহাবা দোয়া-দরুদ, নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাতের পাশাপাশি জিহাদে নেমেছেন এবং জিহাদের ময়দানে ইসলামের শত্রুদের হত্যা করেছেন এবং নিজেরাও শহীদ হয়েছেন। এমনও নজির আছে, শহীদ হওয়ার জন্য শুধু নিজেই দোয়া করতেন না, এক সাহাবী আরেক সাহাবীকে সে জন্য দোয়া করতে অনুরোধ করতেন। সে চেতনা ও কোরবানীর কারণে মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে তারা চিত্রিত হয়েছেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব রূপে। অথচ বাংলাদেশে মুসলিমগণ সে চেতনা ও কোরবানীর পথ থেকে এতটাই দূরে সরেছে যে তারা দুর্বৃত্তিতে ৫ বার বিশ্বরেকর্ড গড়েছে। এবং নিজ দেশে মেন নিয়েছে ইসলামের শত্রুপক্ষের অধিকৃতিকে। এরপরও কি বাঙালী মুসলিমগণ আশা করে যে, পরকালে জান্নাত দ্বারা পুরস্কৃত হবে?

১০.

শহীদের রক্ত জীবিতদের ঈমানশূণ্যতা দূর করে। তাই যে দেশে যত বেশী শহীদের সংখ্যা, সে দেশে ততই সৃষ্টি হয় পোক্ত ঈমানদার। আর ঈমানদার হওয়ার অর্থই হলো শুধু নামায-রোযা নিয়ে বাঁচা নয়, আমৃত্যু জিহাদ নিয়ে বাঁচা। তাই, দেশে ইসলামের বিপক্ষ শক্তির বিজয় থাকবে অথচ ঈমানদারদের জীবনে জিহাদ থাকবে না -সেটি কি ভাবা যায়? এবং জিহাদের প্রাঙ্গণে মুসলিমগণ কখনোই একাকী থাকে না, তাদের সাথে থাকে খোদ মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর ফিরেশতারাও। আফগানিস্তানে তাই রাশিয়া ও আমেরিকার ন্যায় বিশ্বশক্তিও পরাজিত হয়েছে। প্রশ্ন হলো, ভোট-ডাকাত হাসিনা এবং তার প্রভু ভারত কি রাশিয়া ও আমেরিকার চেয়ে শক্তিশালী? দুর্বৃত্ত-মুক্ত সমাজ নির্মাণে প্রয়োজন শুধু শতভাগ বিশুদ্ধ জিহাদের। দুর্বৃত্তির নির্মূল এবং সুনীতির প্রতিষ্ঠায় এটিই তো মহান আল্লাহর হাতিয়ার। এটিই কি নবীজী (সাঃ)র সূন্নত নয়? জনগণের জীবনে জিহাদ না থাকার কুফলটি অতি বিশাল। তখন জনগণের জীবনে নেমে আসে সূদ, ঘুষ, গুম, হত্যা, অশ্লিলতা, ধর্ষণ এবং সন্ত্রাসের আযাব। তারই প্রকৃষ্ট নমুনা তো আজকের বাংলাদেশ। ৩/১১/২০১৯

 




দেশ নিয়ে ভাবনা-২

১.

শত কোটি টাকা দানের চেয়েও বড় সওয়াবের কাজটি হয় কাউকে জাহান্নামের আগুণ থেকে বাঁচানোতে। তবে এ কাজের জন্য চাই পবিত্র কোর’আনের গভীর জ্ঞান। ইসলামে তাই নামায়-রোযার আগে জ্ঞানার্জন ফরজ করা হয়েছে। তাই ঈমানদারের কাজ হলো লাগাতর সে লক্ষ্যে জ্ঞানের সামর্থ্য বাড়ানো। এটিই হলো মানব জীবনের সবচেয়ে বড় সামর্থ্য। নবীজী (সাঃ) বলেছেন, যার জীবনে দু’টি দিন অতিবাহিত হলো অথচ তার জ্ঞানের ভান্ডারে কোন বৃদ্ধি ঘটলো না -তার জন্য ধ্বংস।

জান্নাতের এক ইঞ্চি ভূমিও হিমালয়ের পাহাড় সমান সোনা দিয়েও কেনা যায় না। নবী-রাসূলগণ অর্থদানের জন্য দুনিয়াতে আসেননি। জাহান্নামের আগুণ থেকে বাঁচানোর উপকারটি করার জন্যই তারা পৃথিবীপৃষ্ঠে প্রেরিত হয়েছিলেন। পৃথিবী পৃষ্ঠে এ কাজটিই সর্বশ্রেষ্ঠ কাজ। ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হলে সে কাজটি করে রাষ্ট্রের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলি। ইসলামী রাষ্ট্রের এটিই হলো সবচেয়ে বড় কল্যাণ। এজন্যই নবীজী (সাঃ)র মদিনায় হিজরতের পর নিজের ঘর না ঘরে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। অথচ আজকের মুসলিমগণ ইসলামী রাষ্ঠ প্রতিষ্ঠা না করে স্রেফ মসজিদ-মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠায় সকল শক্তি নিয়োগ করছে। প্রতিটি মুসলিম ভূমিতে এভাবেই গাদ্দারি হচ্ছে নবীজী(সাঃ)র সর্বশ্রেষ্ঠ সূন্নতের সাথে। তাদের সে গাদ্দারির কারণেই শয়তান দখল জমিয়েছে মুসলিম দেশগুলিতে। দাড়ি রাখা বা টুপি মাথায় দেয়ার সূন্নত পালন না হলে এরূপ ভয়ংকর ক্ষতি হয় না, যা হয় ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা না দিলে                                                                                                       

অপরদিকে সবচেয়ে পাপের কাজ হলো কারো ঘরে চুরি-ডাকাতি করা নয়। বরং সেটি হলো কাউকে জাহান্নামের পথে ধাবিত করা। রাষ্ট্র ইসলাম বিরোধী শক্তির হাতে অধিকৃত হলে সে ভয়ানক গোনাহর কাজটি করে দেশের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলি এবং সে সাথে টিভি ও পত্র-পত্রিকাগুলি। তখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১৫-২০ বছর কাটানোর পরও কোর’আন বুঝার সামর্থ্য বাড়ে না।  একই রূপ ভয়ংকর ক্ষতিতর কাজটি করে দেশের ইসলামচ্যুৎ সেক্যুলারিস্ট বুদ্বিজীবীগণ।

তাই দেশ থেকে চুরি-ডাকাতি, মদজুয়া ও পতিতাবৃত্তি নির্মূল এবং মসজিদ-মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার চেয়েও অধীক সওয়াবের কাজটি হলো ইসলাম বিরোধী শক্তির হাত থেকে রাষ্ট্রকে মুক্ত করা। এবং পরিপূর্ণ ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা দেয়া। ইসলামে এটিই সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত। একেই বলা হয় জিহাদ। এ কাজে শত্রুর হাতে প্রাণ গেলে বিনা হিসাবে সাথে সাথে জান্নাতে প্রবেশ করার সৌভাগ্য হয়। পবিত্র কোর’আনে সে ওয়াদা বার বার দেয়া হয়েছে। এবং তাদের মৃত বলা হারাম করা হয়েছে। এ কাজের যথাযথ মর্যাদা নবীজী (সাঃ)র সাহাবাগণ বুঝেছিলেন। সে বুঝার মধ্যেই তো প্রকৃত ঈমানদারি। ফলে তাদের মধ্য থেকে শতকরা ৭০ ভাগ জিহাদের ময়দানে শহীদ হয়েছিলেন। অথচ আজকের মুসলিমদের মাঝে সে বুঝ ক’জনের? যারা নিজেদেরকে অআলেম বা আল্লামা মনে করেন তাদের মাঝেই বা ক’জনের? ফলে তারা বেছে নিয়েছে রোগে ভোগে বিছানায় মারা যাওয়াকে। ফলে শয়তানের অনুসারিগণ শুধু রাষ্ট্রের উপর নয়, তাদের ঘাড়ের উপরও চেয়ে বসেছে।     

২.

অসভ্য চোর-ডাকাত ও খুনি শাসকদের উপর খোদ নবীজী (সা:)র জ্ঞানগর্ভ ওয়াজও কাজ দেয়নি। পবিত্র কোর’আনের বাণীও তাদের দিলে আছড় করে না। দোয়া-দরুদেও তাদের নির্মূল করা যায় না। ফলে তাদের নির্মূলে নবীজী (সাঃ) ও তাঁর সাহাবাদেরও জিহাদে নামতে হয়েছে। দুর্বৃত্তদের শাসন নির্মূল করে তাঁকে ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণ করতে হয়েছে। এবং সে জিহাদে অধিকাংশ সাহাবাকে শহীদ হতে হয়েছে। শুধু মসজিদ-মাদ্রাসা গড়ে কি সভ্য সমাজ ও রাষ্ট্র গড়া যায়? সেটি সম্ভব হলে বাংলাদেশ দুর্বৃত্তে ৫ বার বিশ্ব-চ্যাম্পিয়ান না হয়ে সবচেয়ে দুর্নীতিমুক্ত সভ্য দেশে পরিণত হতো। কারণ দুনিয়ার আর কোথাও এতো মসজিদ-মাদ্রাসা নাই -যা বাংলাদেশে আছে।

৩.

নেপাল, মালদ্বীপ, শ্রীলংকা ও পাকিস্তানের ন্যায় বিশ্বের বহুদেশ সভ্য গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার পথে বহুদূর এগিয়ে গেছে। সেসব দেশের অনেক ব্যর্থতা থাকলেও এরূপ অসভ্যতা নাই যে, একজন রাতের ভোট-ডাকাতকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলে শ্রদ্ধা জানাতে হবে। তাদের বিশাল কৃতিত্ব যে অসভ্য স্বৈরাচারি শাসকদের তারা বিদায় দিতে সমর্থ হয়েছে। কিন্তু ১৭ কোটি বাংলাদেশী সে সামর্থ্য এখনো অর্জন করতে পারিনি। পোষাক রপ্তানী, চিংড়ি রপ্তানী ও মানব রপ্তানী বাড়িয়ে কি এ অসভ্যতা ঢাকা যায়?

৪.

কোন পাড়ায় চোর-ডাকাতের আধিপত্য থাকলে সে পাড়ায় ভদ্রলোকের বসবাস অসম্ভব হয়ে পড়ে।তেমনি রাষ্ট্র যখন চোর-ডাকাতদের দখলে যায় তখন নিরীহ আবরার ফাহাদের নির্মম ভাবে লাশ হতে হয়। তখন শুধু থানা বা জেলখানা গুলিই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলিও নির্যাতনের কেন্দ্রে পরিণত হয়।

৫.

সশস্ত্র ভোট-ডাকাতদের রুখার সামর্থ্য যখন নিরস্ত্র জনগণের থাকে না, পুলিশ এবং সেনাবাহিনীও যখন ডাকাতদের সঙ্গি হয় এবং বিচারকগণও  যখন ভোট-ডাকাতিকে আইনসিদ্ধ এবং ডাকাতদের সরকারকে বৈধ সরকার বলে -তখন নির্বাচনের মাধ্যমে ভোট-ডাকাতদের সরানো যাবে এমনটি যারা ভাবে তাদের মানসিক চিকিৎসার জন্য পাগলা গারদে ভর্তি করা উচিত।

৬.

ঈমানদারের লক্ষণ, সে প্রতিক্ষণ বাঁচে জাহান্নামের আগুণ থেকে বাঁচার চিন্তা নিয়ে। ফলে পাপ থেকে বাঁচা এবং ভাল কাজে তাড়াহুড়াটি তার মাঝে প্রবল। অপর দিকে বেঈমান বাঁচে আখেরাতকে ভূলে; ফলে সে পাপের পথে না্মে এবং চোর-ডাকাত ও ভোট-ডাকাত হয়।

৭.

গরুছাগলেরা ঘাস পেলেই খুশিতে মাথা নাড়ে, গলার রশিটা নিয়ে ভাবে না। যারা পশু চরিত্রের মানুষ তারা সরকারের চাকুরি পেলে খুশিতে নিরপরাধ মানুষদের ফাঁসিতে চড়ায় ও পিটিয়ে হত্যা করে। বাংলাদেশে এদের সংখ্যাটি বিশাল। এরাই দেশের মূল শত্রু। এদের কারণেই দেশ দুর্বৃত্তদের দখলে যায়। কোন সভ্য দেশে এমনটি ভাবা যায় না।

৮.

১৯৪৭’য়ে ভারতের পেট কেটে পাকিস্তানের জন্ম হয়েছিল পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ও সবচেয়ে শক্তিশালী মুসলিম  রাষ্ট্র রূপে বেড়ে উঠার জন্য। ভারতের গর্ব, একাত্তরে যুদ্ধ করে পাকিস্তান ভেঁঙ্গে গোলাম একটি বাংলাদেশ জন্ম দিতে পেরেছে। এবং এ গোলামীকেই হাসিনা ও তার দলের লোকেরা স্বাধীনতা বলে উৎসব করছে। ভারতের আরো গর্ব, কাশ্মিরকে গোলাম বানিয়ে রাখতে সেখানে বহু হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ৮ লাখ ভারতী সৈন্য রাখতে হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশে সে কাজটি করছে দেশটির ভোট-ডাকাত সরকার এবং সরকারের অনুগত সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনী। ফলে কাশ্মিরের গ্রামে ঢুকতে ভারতীয়রা ভয় পায়, কিন্তু বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে চলাচলে বা দেশটির সমুদ্রবন্দরগুলিতে পৌঁছতে ভারতের সে ঝুঁকি নাই। সেগুলি যেন ভারতেরই নিজস্ব সড়ক ও বন্দর।    

৯.

সবচেয়ে বড় ডাকাতি কারো গৃহে হানা দেয়া নয়। বরং ভোট ডাকাতির মাধ্যমে পুরা দেশের উপর ডাকাতি করা।বাংলাদেশ আজ এই ডাকাতদেরই দখলে।

১০.

দেশে খুন,গুম, ধর্ষণ ও স্বৈরশাসনের অসভ্যতা দেখেও যে ব্যক্তি নীরব থাকে, বুঝতে হবে সে নিজেও তাদের ন্যায় অপরাধী অথবা বিবেক শূণ্য। বাংলাদেশে এরূপ অপরাধী অথবা বিবেক শূণ্য মানুষের সংখ্যাটি অতি বিশাল। ফলে ৭০ লাখ জনসংখার হংকং’য়ে বা ৫০ লাখ জনসংখ্যার লেবাননে যেরূপ লক্ষ লক্ষ মানুষের দিনের পর দিন সরকার বিরোধী মিছিল হয় -সেটি ১৭ কোটি মানুষের বাংলাদেশে ভাবাও যায় না। অথচ হংকং বা লেবাননের জনগণের বিপদটি এমন নয় যে, তাদের দেশ বাংলাদেশের ন্যায় ভোট ডাকাতদের দখলে গেছে।  




দেশ নিয়ে ভাবনা-১

১.

একাত্তরে ভারত এক ঢিলে দুই পাখি মেরেছে। এক).পাকিস্তানকে ভেঁঙ্গেছে। দুই). বাংলাদেশকে গোলাম বানিয়েছে। এভাবে বিপুল ভাবে বেড়েছ ভারতের শক্তি এবং দুর্বল হয়েছে মুসলিমগণ। ভারতের কামান এখন ২০ কোটি মুসলিমদের বিরুদ্ধে।

ভারতীয় সে প্রকল্পের সাথে সহযোগিতার চেতনাই হলো একাত্তরের চেতনা। আজ সে চেতনাই নিয়েই কাজ করছে শেখ হাসিনা ও তার দলের লোকেরা। ফলে সমুদ্রবন্দর, করিডোর, নদীর পানি, গ্যাসসহ ভারত যাচ্ছে শেখ হাসিনা তাই দিচ্ছে। কারণ ভারতকে শক্তিশালী করার জন্য সেগুলি দেয়াকে শেখ হাসিনা অপরিহার্য মনে করে। জাতিসংঘের প্রস্তাব অনুযায়ী কাশ্মির সমস্যার সমাধান হতে হবে কাশ্মিরীদের রায়ের ভিত্তিতে। ভারত সে প্রস্তাব না মেনে গায়ের জোরে ভারত ভূক্ত করার জন্য সেখানে আগ্রাসন চালাচ্ছে। সেখানে গণহত্যা ও দমন প্রক্রিয়া চালাতে ভারত সেখানে ৮ লাখ সৈন্য সমাবেশ করেছে। বিশ্বের মুসলিমগণ কাশ্মিরীদের পক্ষে। কিন্তু ভোট-ডাকাত হাসিনা ভারতের পাশে দাঁড়িয়েছে। এভাবে মুসলিম স্বার্থের সাথে গাদ্দারি করে ভারতের পাশে দাঁড়ানোটাই  হলো একাত্তরের চেতনা। এ চেতনার যারা বিরোধী তারা শুধু একাত্তরের রাজাকারই নয়, আজকের এবং ভবিষ্যতের রাজাকারও।

২.
সভ্য শাসকেরা শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়ে ভাবে না, দারুন ভাবে মানব-উন্নয়ন তথা মানবের চরিত্রের উন্নয়ন নিয়ে। নইলে সভ্য সমাজ নির্মিত হয় না। অপর দিকে ডাকাত সর্দারের মূল ভাবনাটি নিজ দলে ডাকাতের সংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে। অসভ্য ভোট-ডাকাত সরকারর মনযোগটি তাই জনগণের চরিত্র ধ্বংস নিয়ে। কারণ, এ পথে দুর্বৃত্ত বৃদ্ধির সাথে সাথে তার সমর্থকও বাড়ে। সে প্রয়োজন মেটাতেই ভোট-ডাকাত হাসিনার অসভ্য সরকার পরিকল্পিত ভাবে দেশে চোর-ডাকাত-ধর্ষক ও সন্ত্রাসীদের সংখ্যায় বিপুল ভাবে বৃদ্ধি ঘটাচ্ছে।

৩.
ভোট ও মিছিলের অধিকার বৃটিশ ও পাকিস্তান আমলেও ছিল। তখনও নিরপেক্ষ নির্বাচন হয়েছে। পাকিস্তান আমলে শত শত মিছিল ও মিটিং করেছে মুজিব। কিন্তু ভোট-ডাকাত হাসিনা সে অধিকার বাংলাদেশীদের দিতে রাজী নয়। সে মৌল অধিকার নিষিদ্ধ করেছে নিজের অবৈধ গদি বাঁচাতে। এটিই হলো নিরেট অসভ্য শাসনের দুর্ভোগ।

 

৪.
দেশে আইনের শাসন থাকলে হাসিনাকে ভোট ডাকাতির অপরাধে জেলে যেতে হতো। হাসিনা তাই আইনের শাসনের বদলে তার দলের ক্যাডারদের শাসন প্রতিষ্ঠা
করেছে। শুধু পুলিশ বাহিনী নয়, আদালতেও ঢুকিয়েছে তার দলীয় ক্যাডারদের।
৫.

৫,

ভোট-ডাকাত হাসিনাকে মাননীয় বললে একজন দুর্বৃত্তকে সন্মান
করা হয়। এবং তাতে দুর্বৃত্তিকে বৈধতা দেয়া হয়। ইসলামে এটি হারাম। কোর’আন দুর্বৃত্তদের নির্মূলের হুকুম দেয়, সন্মান করতে নয়।

 

৬.
চোর-ডাকাত ক্ষমতায় গেলে পুলিশের কাজ হয় শাসক দলের খুনি ও চোর-ডাকাতদের পাহারা দেয়া। জনগণকে পাহারা দেয়ার গরজ তাদের থাকে না। নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাই জনগণকে চোর-ডাকাতদের সরকারকে হটাতে হয়। নইলে অসভ্যতা নিয়ে বাঁচতে হয়। এমন দেশে হাজার হাজার আবরার ফাহাদ লাশ হবে এবং নুসরত জাহানকে আগুণে পুড়িয়ে হত্যা করা হবে -সেটিই অতি স্বাভাবিক।

৭.
কোন পরিবারে চোর-ডাকাত জন্ম নিলে সে পরিবারের ইজ্জত থাকে না। তেমনি কোন দেশে হাসিনার ন্যায় ভোট-ডাকাত প্রধানমন্ত্রী হলে বিশ্বমাঝে সে দেশেরও ইজ্জত থাকে না। কারণ, বিশ্ববাসী অন্ধ নয়। তারা দেখে, কোন দেশে কারা ক্ষমতায়। চোর-ডাকাত ও ভোট-ডাকাত ক্ষমতায় গেলে বিশ্বব্যাপী সেটি খবর হয়। এমন একটি চেতনার কারণেই যাদের আত্মসম্মান আছে সেরূপ কোন সভ্য জনগণ কখনোই অসভ্য ভোট-ডাকাতকে নিজ দেশের প্রধানমন্ত্রি রূপে বরদাশত করে না। সে অসভ্য শাসন দিতে সভ্য জনগণ তাই যুদ্ধ করে।

 

৮.
বাংলাদেশে উন্নতি যা হচ্ছে সে কৃতিত্ব জনগণের। চোর-ডাকাতদের হাতে  দেশ  না গেলে আরো উন্নতি হতো। বাংলাদেশের জনগণ এক কালে শ্রেষ্ঠ বস্ত্রশিল্পের জন্ম দিয়েছিল। ভোট-ডাকাত হাসিনা যা বাড়িয়েছে তা হলো খুনি, চোর-ডাকাত ও ধর্ষকদের সংখ্যা।

৯.

বাংলাদেশে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) রয়েছে। হাসিনা ক্ষমতায় আসলো ভোট ডাকাতির ন্যায় বিশাল দুর্নীতি করে। কিন্ত সে দুর্নীতির বিচার কই? ভোট-ডাকাত হাসিনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন প্রমাণ করেছে এ সংস্থার কর্তাব্যক্তিগণ নিজেরা কতটা দুর্নীতিতে ডুবে আছে।

 

১০.
বাংলাদেশের জনগণের জন্য সবচেয়ে লজ্জার বিষয়টি হলো চোর-ডাকাত ও খুনিদের কাছে বিচার ভিক্ষা করতে হচ্ছে। সভ্যদেশে যাদের বসবাস হয় কারাগারে তারাই সমগ্র দেশকে কারাগারে পরিণত করেছে।




মিথ্যার সুনামি এবং দুর্বৃত্ত-অধিকৃত বাংলাদেশ

মিথ্যার নাশকতা

“মিথ্যা সকল পাপের মা”–এ উক্তিটি কোন সাধারণ বিজ্ঞজনের কথা নয়। বলেছেন, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব ও মহাজ্ঞানী হযরত মহম্মদ (সাঃ)। এ উক্তির মাঝে লুকিয়ে আছে দুর্বৃত্ত-মুক্ত সভ্য ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণের এক বিপ্লবী দর্শন। রাস্তাঘাট, কৃষি, কলকারখানা বা তাজমহল নির্মাণের চেয়ে অধীক গুরুত্বপূর্ণ হলো মানব-উন্নয়ন। সে জন্য অতি অপরিহার্য হলো ব্যক্তির জীবন থেকে মিথ্যা নির্মূল। অপরদিকে মিথ্যার সুনামিতে গড়ে উঠে এক অসভ্য ব্যক্তি ও রাষ্ট্র। তখন দেশ ইতিহাস গড়ে চুরিডাকাতি, ভোট-ডাকাতি, গুম-খুন, সন্ত্রাস ও ধর্ষণের ন্যায় নানারূপ দুর্বৃত্তিতে। এবং এরই আধুনিক উদাহরণ হলো বাংলাদেশ। মানব জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় নাশকতাটি কখনোই রোগ-জীবানুর হাতে ঘটেনি, ঘটেছে মিথ্যার সুনামীতে। সে নাশকতাটি দুনিয়াতেই শেষ হয় না, পরকালে জাহান্নামে টানে। যুগে যুগে এটিই শয়তান ও তার অনুসারিদের মিশন।

যে শক্তির বলে মহান নবীজী (সাঃ) সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার জন্ম দিতে সফল হয়েছিলেন -সেটি কোন সামরিক বল ছিল না। সেটি ছিল মুসলিমদের চারিত্রিক বল। সে চারিত্রিক বল সম্পন্ন ব্যবসায়ীদের দেখেই ইন্দোনেশিয়ার জনগণ দলে দলে মুসলিম হয়ে যায়। সে চারিত্রিক বলের কারণ, নবীজী (সাঃ) তাঁর অনুসারিদের মুক্তি দিয়েছিলেন মিথ্যা বলার পাপ থেকে। এবং অভ্যস্থ করতে পেরেছিলেন জীবনের প্রতি পদে সত্য বলায়। সমাজে সত্যবাদিতা এতটাই প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল যে, মৃত্যদন্ডপ্রাপ্ত আসামীকেও বিচারক জামিন দিতে ইতস্ততঃ করেনি -এ বিশ্বাসে যে, সে ব্যক্তি ফিরে এসে মৃত্যুদন্ড মাথা পেতে মেনে নিবে। মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির সত্যবাদীতার উপর প্রবল বিশ্বাসে তার পক্ষে আদালতে জামিন রূপে খাড়া হওয়া ব্যক্তিরও সেদিন অভাব হয়নি। ওয়াদা মাফিক আদালতে ফিরে এসে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামী প্রমাণ করেছেন, এ জীবনে মৃত্যু সহনীয়; কিন্তু অসহনীয় ছিল ওয়াদা ভঙ্গ করে মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে মিথ্যুক রূপ হাজির হওয়া। এসব ঘটনাগুলো আজও ইতিহাসে অম্লান হয়ে আছে।

ব্যক্তির চরিত্র ও গুণাগুণ বিচার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিচারটি হয় সে কতটা সত্যবাদী তা দেখে। সে বিষয়টি জানার জন্য কোন গবেষণার প্রয়োজন পড়ে না। সেটি বুঝা যায় মুখ থেকে উচ্চারিত উক্তির মাঝে। এক্ষেত্রে হযরত আলী (রাঃ)’র জ্ঞানগর্ভ একটি উক্তি হলো, “মানুষের ব্যক্তিত্ব তার জিহবাতে”। এর অর্থ, মানুষের ব্যক্তিত্ব তার দৈহিক বল, অর্থ-সম্পদ, গায়ের রং, বংশমর্যাদায় প্রকাশ পায় না। প্রকাশ পায়,  মুখ খুললেই। হযরত আলী (রাঃ) নবীজী (সাঃ)’র সাহাবাকুলে অতি জ্ঞানী রূপে গণ্য হতেন। নবীজী (সাঃ)র হাদীস, “আমি জ্ঞানের গৃহ এবং আলী সে গৃহের দরজা।” হযরত আলী (রাঃ)’র জ্ঞানের সে গভীরতাটি ধরা পড়ে তার রচিত কিতাব “নাহাজুল বালাগা”র মধ্যে। কথা হলো, ব্যক্তিত্বের অর্থ কি? ব্যক্তিত্ব হলো চরিত্র, জ্ঞান ও গুণের এমন এক মিশ্রন যার ভিত্তিতে গড়ে উঠে ব্যক্তির নিজস্ব এক পরিচয় যা তাকে অন্যদের থেকে পৃথক করে। তবে চরিত্রের নির্মাণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানটি হলো সত্যবাদিতা। স্রেফ ইট, বালি, লোহা ও সুড়কি দিয়ে ইমারাত গড়া যায় না। সে জন্য অপরিহার্য হলো সিমেন্ট। ব্যক্তির চরিত্রে তেমনি সিমেন্টের কাজ করে সত্যবাদীতে। মিথ্যাবাদীদের দৈহিক বল, মেধা, শ্রম, কর্মকুশলতা যতই থাক, তাদের যেমন চরিত্র থাকে না, তেমনি ব্যক্তিত্বও থাকে না। তাদের পক্ষে অতি সহজ হয় ব্যক্তিত্বহীন ও অপরাধী রূপে বেড়ে উঠা।

সত্যবাদীতা  ব্যক্তিকে লোভ-লালসায় হেলে পড়া থেকে বাঁচায়। অপরদিকে মিথ্যুকগণ স্বার্থ হাসিলের সুযোগ দেখলেই হেলে পড়ে। তাদের চরিত্রে কোন স্থায়ী রূপ থাকে না, তারা বহুরূপী হয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এরাই কখনো ফ্যাসিস্ট, কখনো জাতিয়তাবাদী, কখনো চীনপন্থি, কখনো ভারতপন্থি, আবার কখনো মার্কিনপন্থি হয়। কখনো আবার হজ্ব-ওমরায় যায়, মাথায় পটি বাধে, হাতে তাসবিহ নেয় এবং  তাবলিগের মজলিসেও হাজির  হয়।

ঈমানের প্রকাশ সত্যবাদীতায়

মানব সমাজে সর্বদাই দু’টি পক্ষঃ এক). সত্যের পক্ষ; দুই). মিথ্যা পক্ষ। ব্যক্তিকে সৎ, ধার্মিক ও দেশপ্রেমিক বানানোর লক্ষ্যে সর্বচেয়ে জরুরী হলো তাকে সত্যবাদি বানানো। সত্যবাদি হওয়াটাই হলো জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য এবং মানব জীবনে এটিই সবচেয়ে বড় বিপ্লব। তবে এ বিপ্লব কখনোই পানাহারে আসে না। এজন্য জরুরী হলো চেতনায় বিপ্লব। সে বিপ্লবের জন্য জরুরী হলো মহান আল্লাহতায়ালা এবং পরকালে বিচার দিনে জবাবদেহীতার উপর পূর্ণ ঈমান। ঈমানদারীর প্রকাশ যেমন সত্যবাদীতায়, বেঈমানীর প্রকাশ তেমনি মিথ্যাবাদীতায়। মানব তখনই সত্যাবাদি হয়, যখন সে বুঝতে পারে তার ঘাড়ে সর্বাবস্থায় ফেরশতা বসে আছে এবং তার প্রতিটি কথার উপর মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে লাগাতর নজরদারি আছে। সিসিটিভি বিকল হয়, কিন্তু নিয়োজিত ফেরেশতারা কখনোই দায়িত্ব পালনে ক্ষান্ত দেন না। ঈমানদারের মনে যে ভয়টি সব সময় কাজ করে তা হলো, মিথ্যা বলার অপরাধে তাকে পরকালে জবাব দিতে হবে। ফলে ঈমানদারের পক্ষে অসম্ভব হয় মিথ্যাচারি হ্ওয়া।

অথচ আল্লাহতায়ালার উপর ঈমান এবং পরকালে জবাবদেহীতার ভয় না থাকাতে সত্যবাদি হওয়া অসম্ভব হয় বেঈমানের পক্ষে। কে কতটা ঈমানশূণ্য, সে বিষয়টি অতি নিখুঁত ভাবে ধরা পড়ে কে কতটা মিথ্যা বললো তা থেকে। পরকালে জবাবদেহীতার ভয় না থাকাতে বেঈমানের কথা ও চরিত্রের উপর কোন লাগাম থাকে না। অথচ ঈমানদারের উপর সে লাগামটি হলো তার ঈমান এবং পরকালে জবাবদেহীতার ভয়।  তাই তাকে শুধু পানাহারে হারাম-হালালের বাছ-বিচার করলে চলে না। তাকে কোনটি সত্য কোনটি মিথ্যা সেদিকে নজর রেখে প্রতিটি বাক্য উচ্চারণ করতে হয়। গলায় রশি না থাকলে গরু যেখানে গাস পায়, সেখানেই মুখ দেয়। হারাম-হালালের বিচার সে করে না। তেমনি ঈমানশূণ্য ব্যক্তিও যেখানেই নিজের স্বার্থ হাসিলের সুযোগ দেখে সেখানে যা খুশি বলে এবং যা খুশি তা করে। তার পক্ষে তখন অসম্ভব হয় সৎ ও চরিত্রবান হওয়া। তাদের সামনে দুর্বৃত্তির সকল রাস্তা তখন খুলে যায়। এমন একটি মিথ্যাচারি জনগোষ্ঠি দুর্বৃত্তিতে বিশ্বব্যাপী রেকর্ড গড়ে।

সভ্য সমাজ নির্মাণে বড় বাধা দুর্বৃত্ত-অধিকৃত সরকার

রাষ্ট্রের বুক থেকে মিথ্যা এবং সে সাথে দুর্বৃত্ত নির্মূলের কাজটি স্রেফ পুলিশ দিয়ে হয় না, সেটি শুরু করতে হয় জনগণের মাঝে আল্লাহতায়ালার উপর ঈমান এবং পরকালে জবাবদেহীতার ভয়কে বদ্ধমূল করে।  এবং সে কাজে মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া কার্যকর হাতিয়ারটি হলো পবিত্র কোর’আন। তাই ইসলাম কবুলের প্রথম মুহুর্তে যে ইবাদতটি প্রথম ফরজ হয় সেটি হলো কোর’আনের জ্ঞানার্জন। মুসলিমদের উপর ৫ ওয়াক্ত নামায ফরজ হয়েছিল নবীজী (সাঃ)’র উপর নবুয়তের দায়িত্ব দেয়ার ১১ বছর পর। অথচ বাংলাদেশে পবিত্র কোর’আন থেকে জ্ঞানার্জনের ফরজ পালনে সবচেয়ে বড় বাধাটি সৃষ্টি করেছে সরকার। সরকারের শিক্ষানীতির কারণে বাংলাদেশের একজন ছাত্রকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা শেষ করতে হয় পবিত্র কোর’আন থেকে একটি আয়াত না বুঝেই। ফলে ছাত্রদের মনে কীরূপে গড়ে উঠবে আল্লাহর ভয়? কীভাবে গড়ে উঠবে সত্যবাদিতা ও চরিত্র? এতে কলেজ-বিশ্ববিদ্যলয়ে পরিণত হবে খুনি, ধর্ষক ও নানারূপ দুর্বৃত্ত উৎপাদনের কারখানায় –সেটি কি স্বাভাবিক নয়? বাংলাদেশের মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কাউন্সিল সম্প্রতি রিপোর্ট দিয়েছে, দেশে প্রতি বছর ৫ লাখের বেশী শিশুর জন্ম হয় অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ানের মাধ্যমে। যা হয় দেশের প্রাইভেট ক্লিনিক ও হাসপাতালগুলোতে। (সূত্রঃ প্রথম আলো, ১৮.১০.২০১৯)। আর তাতে বহু হাজার কোটি টাকা ডাকাতি হয়ে যায় জনগণের পকেট থেকে। মেধাবী ছাত্রগণ মেডেক্যাল কলেজে ঢুকে কীরূপ অর্থলোভী ডাকাতে পরিণত হয় এ হলো তার প্রমাণ। ইঞ্জিনয়ারিং ইউনিভার্সিটিতে ঢুকে কীরূপ খুনিতে পরিণত হয় সে প্রমাণ তো মিললো সম্প্রতি বুয়েটে আবরার হত্যার মধ্য দিয়ে। এসব দুর্বৃত্তদের হাতেই অধিকৃত বাংলাদেশের প্রশাসন, রাজনীতি, আইন-আদালত, বুদ্ধিবৃত্তি এবং সাংবাদিকতা। সভ্য মানব, সভ্য সমাজ ও সভ্য রাষ্ট্র নির্মাণের পথে সবচেয়ে বড় বাধা দুর্বৃত্তদের এ অধিকৃতি।

 

দেশ কি কবিরা গুনাহর আবাদভূমি?

প্রশ্ন হলো মিথ্যা ও মিথ্যুকের সংজ্ঞা কি? যা সত্য নয় সেরূপ প্রতিটি কথাই মিথ্যা। এবং যে ব্যক্তি সমাজে মিথ্যা রটায় সেই মিথ্যুক। শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনার অপরাধের তালিকাটি বিশাল। তবে সবচেয়ে বড় অপরাধটি হলো, তারা নিজেরা শুধু মিথ্যুক হয়নি, মিথ্যাচারি বানিয়েছে বাংলাদেশের বহু কোটি মানুষকে। শত শত মিথ্যার মাঝে যে মিথ্যাটি ছড়িয়ে শেখ মুজিব মিথ্যাচারিতায় বিশ্বরেকর্ড গড়েছে, সেটি হলো ১৯৭১’য়ে তিরিশ লাখ নিহতের মিথ্যা। অথচ একাত্তরের ৯ মাস যুদ্ধ কালে মুজিব বাংলাদেশে ছিলেন না। পাকিস্তানের জেল থেকে ফেরার পথে তিনি সে মিথ্যাটি বলেছিলেন লন্ডনে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে। সাংবাদিকের প্রশ্নটি ছিল, একাত্তরের যুদ্ধে বাংলাদেশে কতজন নিহত হয়েছে তা নিয়ে। সে প্রশ্নের উত্তরটি কোন ব্যক্তিরই জানার কথা ছিল নয়। কারণ জানতে হলে সে জন্য তো দেশব্যাপী জরিপ করতে হয়। না জেনে যা বলা হয়, সেটিই তো মিথ্যা। তাই যে ব্যক্তি সত্য বলায় আগ্রহী সে কেন মিথ্যুক হওয়ার ঝুঁকি নিবে? ফলে শেখ মুজিব সত্যবাদী হলে তার জবাবটি হতো এরূপঃ “এ মুহুর্তে সে সংখ্যা বলা যাবে না। একমা্ত্র দেশ ব্যাপী জরিপ করেই বলা যাবে কত জন নিহত হয়েছে।” কিন্তু মিথ্যাচারি মুজিবের সত্য কথা বলা নিয়ে কোন আগ্রহ ছিল না। ফলে বললেন ভিত্তিহীন একটি মিথ্যা। মিথ্যা রচনায় তথ্য লাগে না, জরিপের প্রয়োজন পড়ে না। বললেন, নিহত হয়েছে ৩০ লাখ। সেটি মিথ্যাটিই বাংলাদেশের ইতিহাসে ঠাঁই পেল।

প্রশ্ন হলো, যে মিথ্যা কথাটি বলে মুজিব মিথ্যাবাদিতায় ইতিহাস গড়লো, সে মিথ্যার কি কোন নিরপেক্ষ পরিমাপ হয়েছে? হয় নি। মিথ্যা বলা এবং মিথ্যাকে স্বীকৃতি দেয়া যখন সংস্কৃতিতে পরিণত হয়, তখন কে কতবড় মিথ্যা বল্লো -তা নিয়ে কোন বিচার বসে না। সে মিথ্যা নিয়ে্ও কোন চিন্তাভাবনা হয় না। বরং অপরাধ গণ্য হয় মিথ্যার বিরুদ্ধে খাড়া হওয়াটি। একাত্তরে বহু মানব নিহত হয়েছে। প্রতিটি হত্যাই অপরাধ। কিন্তু তিরিশ লাখ নয়, এক কোটি বা তার চেয়ে বেশী মানুষ নিহত হলেও মিথ্যা বলার নয় কবিরা গুনাহ জায়েজ হয় না। তিরিশ লাখের মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠা দেয়ার মধ্য দিয়ে কোটি কোটি মানুষ পরিণত হয়েছে মিথ্যুকে এবং বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে মিথ্যার ন্যায় কবিরা গুনাহ আবাদের উর্বর ভূমি। এবং অপরাধ গণ্য হয় এ মিথ্যাকে মিথ্যা বলা। অথচ সভ্য দেশে মিথ্যুক ব্যক্তি অযোগ্য গণ্য হয় যে কোন সরকারি চাকুরির জন্যে। কোন মন্ত্রী মিথ্যা বললে তার মন্ত্রীত্ব কেড়ে নেয়া হয়।  ইসলামের গৌরব যুগে মিথ্যাবাদিগণ অযোগ্য গণ্য হতো আদালতে সাক্ষিদানের জন্য; এবং অযোগ্য গণ্য হতো হাদীস বর্ণনার জন্য। নিষিদ্ধ ছিল মিথ্যুককে শিক্ষক বা মসজিদের ইমামের পদে বসানো। অথচ বাংলাদেশে মুজিব ও হাসিনার ন্যায় মিথ্যাবাদীও দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়! মিথ্যাবাদী মুজিবকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী রূপে প্রতিষ্ঠা দেয়ারও চেষ্টা হয়!        

তিরিশ লাখ নিহতের তথ্যটি যে কীরূপ প্রকান্ড মিথ্যা –সেটি সামান্য ভাবলে একজন প্রাইমারি স্কুলের ছাত্রও সহজে টের পাবে। কিন্তু বাংলাদেশে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর, পত্রিকার সম্পাদক বা পার্লামেন্টের সদস্যও এতবড় বিশাল মিথ্যা নিয়ে ভাবতে রাজী নয়, সে মিথ্যার বিরুদ্ধে মুখ খুলতেও রাজী নয়। মিথ্যার কাছে নীরবে আত্মসমর্পণেই তাদের আনন্দ। তিরিশ লাখের অর্থ তিন মিলিয়ন। একাত্তরে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি অর্থাৎ ৭৫ মিলিয়ন। যে কোন স্কুল ছাত্রও হিসাব করে বের করতে পারে, সাড়ে ৭ কোটির (৭৫ মিলিয়ন) মাঝে তিরিশ লাখ (তিন মিলিয়ন) মানুষের মৃত্যু হলে প্রতি ২৫ জনে একজনকে মারা যেতে হয়। যে গ্রামে ১ হাজার মানুষের বাস সে গ্রামে মারা যেতে হয় ৪০ জনকে। ঘটনাক্রমে সে গ্রামে কেউ মারা না গেলে পরবর্তী গ্রামটি যদি হয় ১ হাজার মানুষের বসবাস তবে সেখান থেকে মারা যেতে হবে কমপক্ষে ৮০ জনকে। যে থানায় ১ লাখ মানুষের বাস সেখানে মারা যেতে হবে ৪ হাজার মানুষকে। প্রতি থানায় ও প্রতি গ্রামে নিহতদের সংখ্যা এ হারে না হলে ৩০ লাখের সংখ্যা পূরণ হবে না।

তাছাড়া ৯ মাসে তিরিশ লাখ মানুষকে হত্যা করতে হলে প্রতিদিন গড়ে ১১, ১১১ জনকে হত্যা করতে হয়। ১৯৭১’য়ে বাংলাদেশ ছিল একটি গ্রামীন জনসংখ্যা অধ্যুষিত একটি দেশ যার প্রায় শতকরা ৮০ ভাগ জনগণই বাস করতো গ্রামে। সেনাবাহিনীর পক্ষে যেহেতু প্রায় ৭০ হাজার গ্রামের মাঝে ১০% গ্রামে পৌঁছাতে হলে নদীনালা, দ্বীপ, বিল, হাওর ও চরে পরিপূর্ণ ৭ হাজার গ্রামে পৌঁছতে হয়। সেটি কি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষে ৯ মাসে পৌঁছা সম্ভব ছিল? ফলে সহজেই ধারণা করা যায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী শতকরা ৯৫ ভাগ গ্রামেও পৌঁছতে পারিনি। ফলে তিরিশ লাখের বিপুল হত্যাকান্ডটি ঘটাতে হতো জেলা, মহকুমা বা উপজেলা শহরে। তখন পাড়ায় পাড়ায় অসংখ্য নারীকে ধর্ষিতা হতে হতো। এটি কি তাই বিশ্বাসযোগ্য? সে সময় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পাক-বাহিনীর প্রকৃত সৈন্য সংখ্যা ছিল প্রায় ৪৫ হাজার। -(সূত্রঃ জেনারেল নিয়াজীর লেখা বই  “Betrayal of East Pakistan”, ২০০১)। যুদ্ধবন্ধি রূপে যেসব পাকিস্তানীদের ভারতে নিয়ে যাওয়া হয় তাদের মধ্যে অর্ধেকই ছিল বেসামরিক ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্য। ৪৫ হাজার পাকিস্তানী সৈন্যের পক্ষে কি সম্ভব ছিল বিল-হাওর,নদী-নালা,দ্বীপ ও চরাভূমিতে পরিপূর্ণ একটি দেশের প্রায় ৭০ হাজার গ্রামে পৌছানো? প্রতিটি গ্রাম দূরে থাক প্রতিটি ইউনিয়নেও কি তারা যেতে পেরেছিল? প্রকৃত সত্য হল, যুদ্ধকালীন ৯ মাসে অধিকাংশ গ্রাম দূরে থাক, অধিকাংশ ইউনিয়নেও পাক বাহিনী পৌঁছতে পারিনি। প্রতিটি গ্রামে ও ইউনিয়নে গেলে সীমান্তে যুদ্ধ করলো কারা? কারা পাহারা দিল দেশের বিমান বন্দর, নদীবন্দর, সবগুলো জেলা-শহর ও রাজধানী?

জরুরী মানব-উন্নয়ন

৩০ লাখ মানুষের নিহত হওয়ার এ তথ্য বিশ্বের দরবারে গ্রহণযোগ্য হওয়া দূরে থাক, বিশ্বাসযোগ্য হতে পারেনি বহু ভারতীয় সামরিক অফিসারের কাছেও। ভারতীয় রাজনীতিবিদগণ তিরিশ লাখের পক্ষে যতই বলুক, যুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কোন কোন ভারতীয় জেনারেলদের কাছে এটি হাস্যকর মিথ্যা। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তাদের সে অভিমত একবার নয়, বহুবার প্রকাশ পেয়েছে। মিথ্যাচারিতায় মুজিব কন্যা হাসিনার রেকর্ডটিও কম নয়। হাসিনার মিথ্যাচার হলো, ২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বরের ভোট ডাকাতিকে তিনি সুষ্ঠ নির্বাচন বলেছেন। নির্বাচন সুষ্ঠ হলে কেউকি প্রদত্ত শতকরা শত ভাগ ভোট পায়। অথচ সেটি হাজার হাজার ভোট কেন্দ্রে হয়েছে। পরিতাপের বিষয় হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের সহস্রাধিক শিক্ষকও ভোট ডাকাতির সে নির্বাচনকে সুষ্ঠ বলেছে। মিথ্যুকগণ কোথায় পৌঁছেছে এ হলো তার নমুনা। কথা হলো, দেশে মশার আবাদ বাড়লো অথচ ম্যালেরিয়া ও ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়লো না –সেটি কি হয়? তেমনি দেশে মিথ্যাচারিতার সুনামি এলো অথচ দুর্বৃত্তির প্লাবন এলো না –সেটিও কি ভাবা যায়? মিথ্যা বেঁচে থাকলে, দেশবাসীর চেতনা ও চরিত্রের উপর তার নাশকতা্ও বাড়ে। তাতে দেশের উপর অধিকৃত বাড়ে দুর্বৃত্তদের। কারণ মিথ্যা ও দুর্বৃত্তি একত্র চলে। দুর্বৃত্ত-অধিকৃত দেশ তখন ইতিহাস গড়ে হত্যা, গুম, ধর্ষণ, ভোট-ডাকাতির নির্বাচন ও ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারে। মুজিব আমলে বাংলাদেশ যে ভাবে ভিক্ষার আন্তর্জাতিক ঝুলিতে পরিণত হলো বা এ শতাব্দীর শুরুতে দুর্বৃত্তে বিশ্বে পর পর ৫ বার বিশ্বরেকর্ড গড়লো –সেটির কারণ কি দেশের ভূমি বা জলবায়ু? কারণ তো মিথ্যাচার ও দুর্বৃত্তির সুনামী। কথা হলো, বস্ত্র রপ্তানি, চিংড়ি রপ্তানি ও মানব রপ্তানি বাড়িয়ে কি এ বিপদ থেকে মুক্তি মিলবে? মুক্তি মিলবে কি স্রেফ রাস্তাঘাট নির্মাণ ও অর্থনেতিক উন্নয়ন ঘটিয়ে? বরং এজন্য যা জরুরী তা হলো মানব-উন্নয়ন। মানব-উন্নয়নের জন্য যা জরুরী তা হলো শিক্ষা, সংস্কৃতি ও রাজনীতির অঙ্গণে মিথ্যচর্চার নির্মূল। এবং সে সাথে জরুরী হলো সত্যবাদী এবং দুর্বৃত্ত নির্মূলের লড়াকু সৈনিক রূপে জনগণকে গড়ে তোলা। ২০/১০/২০১৯

 




আবরার হত্যাঃ দায়মুক্ত কি শেখ হাসিনা?

দুর্বৃত্ত-অধিকৃত রাষ্ট্রঃ দুর্বৃত্তায়নের মূল হাতিয়ার

রাষ্ট্রই মানব সভ্যতার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। দুর্বৃত্তদের হাতে অধিকৃত হলে এটি পরিণত হয় দুর্বৃত্তায়নের ভয়ানক ও অপ্রতিরোধ্য হাতিয়ারে। তখন সুনামি শুরু হয় গুম, খুন, ধর্ষণসহ নানারূপ অত্যাচারের। সরকার প্রধানকে তাই শুধু শাসক হলে চলে না, নাগরিকদের জন্য দায়িত্বশীল অভিভাবক এবং অনুকরণীয় আদর্শও হতে হয়। কিন্তু যে ব্যক্তি ভোট-ডাকাতির মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী হন, তিনি কি করে অন্যদের জন্য চরিত্রের মডেল হতে পারেন। তিনি তো মডেল দুর্বৃত্তির। অথচ শাসকের আসনে বসেছেন খোদ নবীজী (সাঃ)। এটিই নবীজী (সাঃ)র শ্রেষ্ঠ সূন্নত। এভাবে তিনি শিক্ষ্যণীয় আদর্শ রেখে গেছেন মুসলিম রাষ্ট্রে শাসকের আসনে কে বসবে এবং কীভাবে শাসিত হবে দেশ। নবীজী (সাঃ)র ইন্তেকালের পর এ গুরুত্বপূর্ণ তাই শূন্য থাকেনি। দুর্বৃত্তদের হাতে অধিকৃতও হয়নি। বরং নবীজী (সাঃ)র পর সে আসনে বসেছেন নবীজী (সাঃ)র আদর্শের সবচেয়ে কাছের এবং মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ লোকগুলি। বাংলাদেশের চেয়ে ৫০ গুণ বৃহ্ৎ রাষ্ট্রের শাসক হয়েও একটি মাত্র উঠ এবং একজন মাত্র সহচরকে নিয়ে হযরত উমর (রাঃ) ৫০০ মাইলের বেশী পথ সফর করে সরকারি কাজে জেরুজালেম গেছেন। মধ্য রাতে বিছানায় না ঘুমিয়ে খাদ্যের বস্তা নিজ পিঠে টেনে দুস্থ্য মানুষের ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা নির্মিত  হয়েছিল এমন লোকদের দ্বারাই। অথচ বাংলাদেশে সরকারি উদ্যোগে আরবাবের ন্যায় বিবেকবান লোকদের বেঁচে থাকাটিই অসম্ভব করা হচ্ছে।

মুসলিমদের শুধু নামায-রোযা, দাড়ি-টুপি ও পোষাক-পরিচ্ছদের সূন্নত পালন করলে চলে না, রাজনীতির অঙ্গণে নবীজী (সাঃ)র প্রতিষ্ঠিত সূন্নতগুলিও পালন করতে হয়। নইলে সমাজ জীবনে অনিবার্য় হয় বিপর্যয়। শাসন ক্ষমতা যখন হালাকু, চেঙ্গিজ, হিটলার বা কোন ভোট-ডাকাতের হাতে  অধিকৃত হয় তখন যা অনিবার্য হয়ে উঠে তা হলো অন্য গোত্র, অন্য দল ও অন্য ধর্মের মানুষের উপর গণহত্যা,গণধর্ষণ ও গণনির্যাতন। বাংলাদেশের মূল সমস্যাটি এখানেই। ভোট-ডাকাতির অপরাধে যে দুর্বৃত্তের জেলে যাওয়া উচিত  ছিল -সে এখন প্রধানমন্ত্রী। তিনি প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন, এক লাশের বদলে দশ লাশ ফেলার রাজনীতি। ফলে বাংলাদেশের পথে ঘাটে -এমন কি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে, মানুষ লাশ হচ্ছে। ভোট-ডাকাত প্রধানমন্ত্রীর এমন নীতির ফলে যারা কোনদিন খুন করেনি তারাও নেতাকে খুশি করতে নৃশংস খুনিতে পরিণত হচ্ছে। সেটিই দেখা গেল বুয়েটে আবরার হত্যার মধ্য দিয়ে। বুয়েটের প্রতিটি ছাত্র্ই অতি মেধাবী। বুয়েটে ভর্তির আগে তাদের কেউই খুনি ছিল না। কিন্তু খুনি হয়েছে বুয়েটে ভর্তির পর। খুনি উৎপাদনে বুয়েট এ ক্ষেত্রে যে ইতিহাস গড়লো –বর্বরতায় তা কি কোন ডাকাত পল্লীর চেয়ে কম? খুনি হওয়ার সে প্রশিক্ষণ পেয়েছে বুয়েটে অধ্যয়নরত ছাত্রলীগের সিনিয়র নেতা-কর্মীদের হাত ধরে। প্রতি হলে টর্চার সেলসহ খুনি উৎপাদনের এ বিশাল কারখানাটি লাগাতর কাজ করেছে ভিসিসহ শত শত শিক্ষকের চোখের সামনে। এবং তারা সেটিকে দেখেও না দেখার ভান করেছে।

শেখ হাসিনার শুধু প্রধানমন্ত্রী নয়, তিনি আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছসেবক লীগের ন্যায় আওয়ামী ঘরানোর সকল সংগঠনের নেতাকর্মীদের রাজনৈতিক অভিভাবকও। ফলে রাজনৈতিক অঙ্গণে এসব সংগঠনের নেতাকর্মীগণ যা কিছু করে তাতে প্রতিফলন ঘটে খোদ শেখ হাসিনার রাজনৈতিক স্বপ্ন, নীতি ও আদর্শের। সে বিষয়টি সুস্পষ্ট করেছে আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার আসামী অনিক সরকার তার জবানবন্দীতে। আসামী অনিক সরকারও একজন মেধাবী ছাত্র। নটরড্যাম কলেজ থেকে পাস করে সে বুয়েটে ভর্তি হয়। ভর্তির আগে সে খুনি ছিল না। কিন্তু কি ভাবে খুনের আসামী হলো সে বিষয়টি তার জবানবন্দীতে বলেছে এভাবে, “সিনিয়র জুনিয়র যাই হোক, আমরা তাদের (সরকারের সাথে ভিন্নমত পোষণকারিদের) এভাবেই পেটাতাম। কিন্তু দুর্ঘটনাক্রমে আবরারের মৃত্যু হয়েছে। মতের সাথে না মিললে কাউকে পিটিয়ে বের করে দিতে পারলে ছাত্রলীগের হাই কমান্ড আমাদের প্রশংসা করতো। ছাত্রলীগের এ সিস্টেমই আমাদের নিষ্ঠুর বানিয়েছে।” (দৈনিক সংগ্রাম, ১৫.১০.২০১৯)। প্রশ্ন হলো, ছাত্রলীগের হাই কমান্ড কেন এরূপ নিষ্ঠুর নীতি নীচের ক্যাডারদের উপর চাপিয়ে দিত? এর উত্তর একটিই। ছাত্রলীগের হাই কমান্ড এমন নিষ্ঠুরতায় নামতো তাদের অভিভাবক শেখ হাসিনাকে খুশি করতে। কারণ হাসিনার নির্দেশ তো এক লাশের বদলে দশ লাশ ফেলার। হাসিনার কাছে ছাত্রদের চরিত্র গঠন গুরুত্ব পায়নি। বরং গুরত্ব পেয়েছে ছাত্রদের চরিত্র ধ্বংস করে হলেও নিজের গদির নিরাপত্তা দেয়াটি।

 

ছাত্র রাজনীতিঃ দুর্বৃত্তায়নের সরকারি হাতিয়ার

খুন, ধর্ষণ, সন্ত্রাস ও নির্যাতনে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের গলার রশি এভাবে ঢিল করে দেয়ারও একটি ইতিহাস আছে। পাকিস্তান আমল থেকেই রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের মূল হাতিয়ারটি হলো ছাত্র-রাজনীতি। তাই যারা সরকার হটাতে চায় বা সরকারে থাকতে চায় -ছাত্র রাজনীতিতে তাদের বিনিয়োগটি বিশাল। যে দেশে সামরিক বাহিনীর লোকেরা বার বার হাতিয়ার উঁচিয়ে ক্ষমতা দখল করে -তাদের তুষ্ট করতে রাজধানীর অভিজাত এলাকায় বড়  বড় প্লটের ব্যবস্থা করতে হয়ে। তাদের বিবিদের  জন্য ২৪ ঘন্টা গাড়ীর ব্যবস্থা করতে হয়। এবং বাড়ী নির্মাণের জন্য তাদেরকে অতি কম সূদে অর্থ জোগাতে হয়। দেশের খেদমত যেন একমাত্র তারাই করেন! পেশাদারি কাজের বাইরে নিজ দেশ দখলে ভারতীয় সেনাবাহিনী সেরূপ গুন্ডামী করে না বলেই তাদের সে সুযোগ-সুবিধা নেই। ফলে তাদের যেমন প্লট মেলে না, তেমনি স্ত্রীদের জন্য গাড়িও মেলে না। তাই সেদেশে স্কুটার বা মটর সাইকেলে চড়ে সেনা অফিসারদের পারিবারিক কাজ সারতে হয়।

দেশে গণতন্ত্রের মৃত্যু এবং স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠা পাওয়াতে ছাত্রনেতাদের এখন পোয়াবারো। একদিনে জনগণ যেমন শক্তিহীন হয়েছে, তেমনি ক্ষমতা ও কদর বেড়েছে ছাত্র নেতাদের। তাদের সুযোগ সুবিধা সেনাবাহিনীর চেয়েও অধীক। কারণ, প্রতিপক্ষ নির্মূলে ছাত্র সংগঠনের ক্যাডারদের ন্যায় সেনাসদস্যগণ আবাসিক হলগুলিতে গিয়ে অপারেশন চালাতে অক্ষম। তাছাড়া পিল খানায় ৫৬ সেনা অফিসারকে খুন করে সেনাবাহিনীর মেরুদন্ডই ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে। ফলে বড় বড় প্লটের বদলে তাদেরকে এখন ফ্লাট দিলেই চলে। কিন্তু কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সামর্থ্যটি এক্ষেত্রে বিশাল। যে কোন সময় সরকারের জন্য তারা বিপদ ঘটাতে পারে। তাই তাদের মনতুষ্টি করে চলতে হয় সরকারকে। এজন্যই লুটপাটের সকল দরজা তাদের জন্য খুলে দেয়া হয়েছে। ফলে অর্থ-উপার্জনের জন্য ছাত্রনেতাদের এখন আর রাত জেগে লেখাপড়া করা এবং পাশ করে চাকুরি করার ফিকির করতে হয় না। সেনাবাহিনীর অফিসারদের ঢাকায় এক খানি ফ্লাটের মালিক হতে ১০-২০ বছরের চাকুরি শেষ করতে হয়। অথচ ছাত্রলীগের নেতাগণ বহু বাড়ির মালিক হয় এবং বহু কোটি টাকার ব্যাংক ব্যালেন্স গড়ে তোলে ছাত্রাবস্থাতেই। এ ধরণের সুযোগ পেতে তাদের উপর অর্পিত দায়ভারটি হলো, ক্যাম্পাস থেকে সরকার বিরোধীদের নির্মূল। নির্মূলের সে প্রক্রিয়াতেই নৃশংস ভাবে নিহত হয়েছে আবরার ফাহাদ।

 

রাজনীতি খুনি উৎপাদনের

অধীক অর্থলাভ এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দের লোভে মেধাবী ছাত্ররা অতীতে মন দিয়ে লেখাপড়া করতো। পড়াশুনা শেষে ভাল চাকুরির খোঁজ করতো। দেশে ভাল চাকুরি না জুটলে বিদেশী পাড়ি জমানোর চেষ্টাও করতো। কিন্তু এখন সে রীতি পাল্টে গেছে। দেশের কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির সাথে সাথে ছাত্ররা দেখতে পায় বিপুল অংকের অর্থপ্রাপ্তির অবাধ সুযোগ। এখানেই ছাত্র লীগের নেতাকর্মীগণ ব্যস্ত নিজ দলের সৈন্য সংগ্রহে। তাদের নজরে পড়ে এসব মেধাবী ছাত্রগণ। সরকার দলীয় এ ছাত্র-সৈনিকদের নির্ধারিত কোন বেতন নাই। তবে যা আছে তা বেতনের চেয়েও অধীক। তাদের প্রতিপালনে সরকারি প্রজেক্টের নামে বরাদ্দ হয় বিপুল অর্থ। সে অর্থপ্রাপ্তির লোভে যারা কোনদিনও গুন্ডামী করেনি তারাই পরিণত হয় নৃশংস খুনিতে। তাদের দিয়েই গড়ে উঠে সরকারি দলের ক্যাডার বাহিনী। প্রতি হোস্টেলে গড়ে উঠে টর্চার সেল এবং প্রতিষ্ঠা পায় সন্ত্রাসের সংস্কৃতি। ফলে দেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আজ যে সন্ত্রাস ও খুনখারাবী – তার জন্য কি কোন ডাকাত-পাড়ার খুনিদের দায়ী করা যায়। দায়ী তো দেশের ভোট-ডাকাত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নিজের গদি বাঁচাতে যেমন ভোট ডাকাতিকে জায়েজ করেছেন, তেমনি বিরোধীদের নির্মূলে মেধাবী ছাত্রদেরও  নৃশংস খুনিতে পরিণত করেছেন। ফলে শহীদ আবরার হত্যার মামলায় কিছু লোককে শাস্তি দিলেই কি সমস্যার সমাধান হবে? এজন্য যা জরুরী তা হলো চোর-ডাকাত, সন্ত্রাসী ও খুনী উৎপাদনের যে রাজনীতি প্রতিষ্ঠা পেয়েছে তার নির্মূল। সে নির্মূলের কাজে যাকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়া উচিত সে ব্যক্তিটি হলেন দেশের ভোট-ডাকাত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশের সরকার প্রধান রূপে ভোট-ডাকাত গদিতে থাকলে অন্যরাও চোর-ডাকাত ও খুনি হতেই  উৎসাহ পাবে। কারণ, ভোট-ডাকাতি করে যদি দেশের মালিক-মোক্তার হওয়া যদি বৈধ হয়, তবে অন্যরাই বা সৎ হবে কেন?  

 

বিচারের নামে গদি বাঁচানোর রাজনীতি

সরকার খুনিদের বিচারে বাধ্য হচ্ছে স্রেফ গণরোষ দমনের লক্ষ্যে, দেশে খুন-গুম-সন্ত্রাস বন্ধ হোক সে লক্ষ্যে নয়। শহীদ আবরার খুন না হয়ে যদি আহত হতো তবে বিষয়টি হাসিনার কেশাগ্রও স্পর্শ করতো না। তখন আবরারের পিতামাতাকে গণভবনে ঢাকা হতো না। পত্রিকায় বড় জোর খবর হতো জঙ্গি শিবির কর্মীকে গণধোলাই দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করা হয়েছে। তখন সরকার ও সরকারি মিডিয়া তখন তৃপ্তির ঢেকুর কাটতো। অতীতে এভাবেই সরকারের নাকের ডগার উপর বসে শত শত ছাত্রকে পঙ্গু করা হয়েছে। শাপলা চত্ত্বরের শহীদদের ন্যায় আবরারের লাশ গুম করতে পারলেও কোন খবর হতো না। সে চেষ্টাও কি কম হয়েছে? পত্রিকায় প্রকাশ, খুনিরা পুলিশকে হোস্টেলে ঢুকতে না দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনকে দিয়ে লাশ গায়েবের চেষ্টাও করেছে। এ নৃশংস হত্যাকান্ডকে কি ভাবে ম্যানেজ করা যায় তা নিয়ে ভিসিকে ৩৬ ঘন্টা উপরের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলেছেন। সেসব কৌশল ব্যর্থ হওয়াতেই সরকার বিচারের দোহাই দিচ্ছে। অথচ খুনের বিচারে ভোট-ডাকাত সরকারের সামান্যতম আগ্রহ থাকলে শত শত মানুষ যে এ সরকার আমলে গুম-খুনের শিকার হয়েছে সেগুলিরও বিচার হতো। বিচার হতো ২০১৯ সালের ৬ই মে শাপলা চত্ত্বরে যে অসংখ মানুষকে খুন করা হলো তারও। বিচারের নামেও সরকার তার গদি বাঁচানোর রাজনীতি করে। শহীদ আবরারের বেলায় সে নাটকই শুরু হয়েছে। ১৭/১০/২০১৯        




শহীদ আবরারের লিগ্যাসি এবং বন্ধু নির্বাচনে হারাম চর্চা

ইতিহাসে স্থান পেল আবরার                                   

শহীদ আবরার দেশপ্রেম, বিবেকবোধ, দায়িত্ববোধ ও বিচা্রবোধের এক বিরল শিক্ষা রেখে গেল। সে উঠে এসেছিল কুষ্টিয়ার এক গ্রাম থেকে।সে ছিল বুয়েটের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। কিন্তু চেতনার যে মান সে দেখিয়ে গেল সেটি যারা বড় মাপের বুদ্ধিজীবী, লেখক, ভিসি, প্রফেসর, বিচারক, রাজনীতিবিদ রূপে গর্ববোধ করেন -তাদের মাঝে কতটুকু? অথচ বীরত্ব ও সাহস নিয়ে তাদের অনেকের বড়াই রয়েল বেঙ্গল  টাইগারের সমান। অথচ তারাও সরকারের ফ্যাসিবাদী বর্বরতার বিরুদ্ধে কানে কানে কথা বলতেও ভয় পায়। তারা ভাবে, দেয়ালেরও কান আছে, না জানি সরকারের গোয়েন্দারা গুম না করে দেয়। অথচ দেশজুড়া ভয়ের রাজত্বে সাহসী আবরার সেখানে ফেসবুকে প্রকাশ্যে স্টাটাস দিয়েছে। এরূপ স্টাটাস দেয়ার পরিণতি  কি হতে পারে তা কি খুনি কবলিত বিশ্ববিদ্যালয়ে বসবাস করার পরও শহীদ আবরার জানতো না? আবরারের মত মেধাবী ছাত্র সেটি অবশ্যই জানতো। জেনে বুঝেই সে শহীদ হওয়ার পথটি বেছে নিয়েছে।

আবরার শুধু মেধাবী ছিল না, ঈমানদারও ছিল। সে নিয়মিত নামায পড়তো এবং রোযাও রাখতো। সে এটিও জানতো ঈমানদার হতে হলে অবশ্যই সাহসী হতে হয়। কারণ ঈমান ও সাহস একত্রে চলে। এবং ভীরুতার সাথে চলে বেঈমানী। ভীরুগণ ঈমানের দাবী করে বটে, কিন্তু তারা সত্য কথা বলতে ভয়। ফলে কার্যতঃ তারা মুনাফিক হয়। মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর মহা নিয়ামত ভরা জান্নাত ভীরু-কাপুরুষদের দিয়ে ভরবেন –সেটি কি ভাবা যায়? জান্নাতের একটি বিশাল মূল্য আছে। কোরআনের ভাষায় পৃথিবী-পূর্ণ সোনা দিয়েও তা কেনা যায় না। জান্নাত তো তাদের জন্য যারা জান্নাতের মুল্যে মহান অল্লাহতায়ালার কাছে নিজেদের জীবন বিক্রয় করে। এবং একমাত্র সাহসীরাই নিজ জীবন দিয়ে সে মূল্য পরিশোধের সামর্থ্য রাখে। জান্নাত তো তেমন সাহসীদেরই পুরস্কৃত করার জন্য্। আবরার সে সাহসীদেরই একজন। অপরদিকে ভীরুতার শাস্তিটি বিশাল; সেটি অসম্ভব করে্ জান্নাতে পৌঁছা। তাই মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশঃ “তাদের ভয় করো না, আমাকে ভয় করো”। আবরার বিশাল কৃতিত্ব, সে ভীরুতার উর্ধ্বে উঠতে পেরেছিল। বুয়েটের সকল ছাত্রই মেধাবী। বহু হাজার ছাত্র বুয়েট প্রতিষ্ঠার পর থেকে পড়াশুনা করে বেড়িয়ে গেছে। গাছের ঝড়া পাতার ন্যায় অনেকেই পৃথিবী থেকে হারিয়েও গেছে। যারা বেঁচে আছে তারাও কিছু দিনের মধ্যে হারিয়ে যাবে। কিন্তু আবরার ব্যতিক্রম। সে ইতিহাসে বেঁচে থাকার পথ করে নিল। এবং সেটি মেধাবী হওয়ার জন্য নয়, বরং সাহসী ঈমানদার হওয়ার জন্য।

অনন্য শহীদ আবরার

আবরার অনন্য। এবং অনন্য হওয়ার কারণ, সে কোন দলের ক্যাডার নয়। বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলির বড় অপকর্মটি হলোঃ দলীয় কর্মীদের বিবেককে তারা শৃঙ্খলিত করে। শৃঙ্খলিত সে লোকদের যা বলতে বলা হয়, তারা তাই বলে। যেভাবে দেখতে বা শুনতে বলা সেই ভাবেই দেখে বা শুনে। এর বাইরে তারা ভাবতে, শুনতে বা দেখতে রাজী নয়। মানুষ যে স্বাধীন বিবেক নিয়ে বাঁচতে পারে বা স্বাধীন ভাবে মতামত ব্যক্ত করতে পারে -তা এ খাঁচার পাখিরা ভাবতেই পারে না। তাদের বাঁচাটি হলো, তাদের নিজ দলের স্বার্থের সুরক্ষা নিয়ে বাঁচা। কোন দলের সদস্য না হওয়াতে আবরারের পক্ষে সম্ভব হয়েছে দল, দলের নেতা বা দলীয় দর্শনের উর্ধ্বে উঠে ফেসবুকে স্টাটাস দেয়া। সে স্টাটাস দিয়েছে দেশের স্বার্থ্য বাঁচাতে। কথা বলেছে, বাংলাদেশের পানি, গ্যাস ও ভূমির উপর ভারতীয় আগ্রাসনের প্রতিবাদ জানাতে।

বাংলাদেশে আবরারের ন্যায় মেধাবী ছাত্র বহুলক্ষ। কিন্তু ক’জনের দৃষ্টিতে ধরা পড়েছে আগ্রাসী ভারতের সে কুটিল ষড়যন্ত্র? ক’জন সে আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছে বা ফেসবুকে স্টাটাস দিয়েছে? ক’জন তার মত নির্মম ভাবে শহীদ হয়েছে। এসব মেধাবীগণ অতি ব্যস্ত নিজেদের ক্যারিয়ার গড়া নিয়ে। নিজেদের স্বার্থ নিয়ে তারা এতটাই ব্যস্ত যে, দেশের স্বার্থ্ নিয়ে ভাবার সময় তাদের নাই। অন্যরা  যারা ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কথা বলে এবং লেখালেখি করে, তাদেরও আবরারের ন্যায় এতটা নিষ্ঠুর ও বেদনাদায়ক আঘাত সইতে হয়নি।  

সংকট আরো গভীরে

আবরারের জীবনে যা ঘটলো, তা কোন সামান্য ঘটনা নয়। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্ত্বরে চলমান নৃশংস বর্বরতার একটি খন্ড চিত্র মাত্র। এ নৃশংসতা শুধু বিশ্ববিদ্যায়ের চত্ত্বরেও সীমিত নয়, এ নৃশংসতা চলছে সমগ্র দেশ জুড়ে। এ সরকারের শাসনামলে শত শত মানুষ গুম হয়েছে এবং খুন হয়েছে। এবং সে খুন ও গুমের বিচার হয়নি। খুনিগণ থেকেছে বিচারের উর্দ্ধে। আবরারের উপর যে নৃশংস বর্বরতাটি ঘটলো তা চলমান খুন ও গুমের রাজনীতিরই ধারাবাহিকতা। যারা এ ফ্যাসিবাদী রাজনীতির নায়ক, তাদের কাছে নিরপরাধ মানুঁষের জীবনের কোন মূল্য নাই। তারা  ন্যায় বিচার পাক সেটিও তারা চায় না। তাই তারা সত্যকে ঢাকতে নানারূপ মিথ্যার জাল বুনছে। ইতিমধ্যেই তারা গুজব রটনা শুরু করেছে, আবরারের গায়ে কোন দাগ নাই। আবরারের থেথলে যাওয়া রক্তাত্ব পিঠের চিত্র যা ইতিমধ্যেই সোসাল মিডিয়াতে ছাপা হয়েছে -সেটিও তারা অস্বীকার করছে। আসামী পক্ষের উকিল বলছে, আবরারের দেহের দাগগুলো আঘাতের বদলে চর্ম রোগের কারণেও হতে পারে। কি বিস্ময়কর মিথ্যা! উভয় পক্ষের উকিলদের দায়িত্ব সুবিচারকে সুনিশ্চিত করা। বাধাগ্রস্ত করা নয়। কিন্তু সেটিই শুরু হয়েছে। অথচ ময়না তদন্তে বলা হয়েছে, আবরার তার দেহে প্রচণ্ড আঘাত ও অসহ্য বেদনার কারণে মারা গেছে। ন্যায় বিচারের শত্রুগণ নানারূপ মিথ্যা রটাচ্ছে আবরার হত্যার বিচারকে ব্যর্থ করা বা অপরাধীদের শাস্তিকে লঘু করার লক্ষ্যে। তারা তাঁকে শিবির কর্মী রূপেও চিত্রিত করার চেষ্টা করেছে। যেন শিবির কর্মীদের ন্যায় বিচার পাওয়ার অধিকার নেই। যেন তারা মারা যাবে আবরারের ন্যায় অসহ্য বেদনা নিয়ে। একমাত্র ফ্যাসীবাদী বর্বরতাই মানুষকে এতটা অসভ্য ও নৃশংস করতে পারে।  

তাছাড়া ন্যায় বিচার নিশ্চিত করার সামর্থ্য চোর-ডাকাতদের থাকে না। সে সামর্থ্য থাকে না ভোট-ডাকাতীর মাধ্যমে ক্ষমতায় বসা একটি অবৈধ সরকারেরও। দুর্বৃত্ত সরকারের কারণে বাংলাদেশের পুলিশ ও বিচার ব্যবস্থার ব্যর্থতাগুলিও অতি বিশাল। রাজনীতি এখন আর শুধু রাস্তার গুন্ডা ও রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের মাঝে সীমিত নেই, সেটি উঠে এসেছে আদালতেও। কাকে রিমান্ডে দেয়া হবে, কে শাস্তি পাবে এবং কে মুক্তি পাবে –বিচারকগণ সে ফয়সালাটি নেয় ভোট-ডাকাত সরকার প্রধানের মুখের দিকে তাকিয়ে। পুলিশও ক্ষমতাসীন দলের অনুমতি না পেলে খুনের তদন্তে নামে না, আসামীদেরও ধরে না। তাই আহত আবরারের দেহ সিঁড়িতে পড়ে থাকলেও পুলিশ সেখানে তদন্তে যায়নি। তাকে হাসপাতালে নিতে কোন এ্যামবুলেন্সও পাঠায়নি। কারণ, এসব করতে তো পুলিশকে রাজনৈতিক কর্তাদের থেকে অনুমতি নিতে হয়। অপরদিক বিচারকগণ পরিণত হয়েছে ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডারে। কাকে শাস্তি দেয়া হবে, কাকে নির্দোষ ঘোষণা দেয়া হবে -সে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা বিচারকদের নাই। তাই বহু খুনের মামলায় আদালতের বিচারকগণ এবং তদন্তকারি পুলিশগণ নিহতদের গায়ে আঘাতের কোন চি্হ্ন খুঁজে পায় না। এবং খুঁজে পায় না খুনিকে। খুনের কোন কারণও তারা খুঁজে পায় না। যেন মৃত ব্যক্তি খুনি ছাড়াই খুন হয়েছে। যেন সে নিজেই নিজেকে হত্যা করেছে! ফলে কারো কোন শাস্তিও হয় না। সরকারি দলের খুনিকে বাঁচাতে নিষেধাজ্ঞা থাকে খুজাখুজির বিরুদ্ধে। ফ্যাসীবাদ প্রতিষ্ঠা পেলে ন্যায্য বিচার ব্যবস্থা এভাবেই কবরস্থ হয়। বাংলাদেশে ন্যায্য বিচার কবরস্থ্ করার সে কাজটি ঘটেছে বহু  আগেই।

ঘৃনার সামর্থ্য অপরিহার্য কেন?     

সভ্য মানবদের জীবনে শুধু ভালবাসার বল থাকলে চলে না। থাকতে হয় মিথ্যাচার, দুর্বৃত্তি, গুম, হত্যা, জুলুম ও ধর্ষণের ন্যায় অপরাধের বিরুদ্ধে ঘৃণার সামর্থ্য। তাকে শুধু শান্তিবাদী হলে চলে না, অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধেও নামতে হয়। দুর্বৃত্ত নির্মূলের যুদ্ধে তাকে প্রাণও দিতে হয়। ইসলামের নবী (সাঃ)তো সেটিই শিখেয়ে গেছেন। পবিত্র কোর’আন দিয়েছে ভালবাসা ও ঘৃণার মানদন্ড। সে মানদন্ডে হারাম শুধু মদ্যপান, সূদ-ঘুষ ও শুকরের গোশত নয়। হারাম হলো দুর্বৃত্তদের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো এবং তাদের সাথে মিত্রতা গড়া। তাই দেশজুড়ে শহীদ আবরারের প্রতি যে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালবাসার জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে, সেটি শুধু আবরার কেন্দ্রীক হলে ভয়ানক ক্ষতি হয়। ফ্যাসীবাদের বিরুদ্ধে লড়াই তাতে ব্যর্থ হয়। ফ্যাসীবাদের নির্মূলে অপরিহার্য হলো, নেক কর্মের প্রতি ভালবাসার সাথে জুলুমের বিরুদ্ধে ঘৃণার সামর্থ্যকে তীব্রতর করা। কারণ, দুর্বৃত্তির বিরুদ্ধে ঘৃনার মাত্রাটি যাদের মাঝে প্রবল একমাত্র তারাই তার নির্মূলে জিহাদে নামে।  মহান আল্লাহতায়ালার কাছে প্রিয় হওয়ার জন্য এ দু’টি গুণই অতি জরুরী।

দুর্বৃত্তির বিরুদ্ধে ঘৃণার ন্যূনতম সামর্থ্য যার আছে, সে কি কখনো এক দুর্বৃত্ত ভোট-ডাকাতকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলতে পারে? এটি যেমন অনৈতীক। তেমনি ধর্মীয় ভাবে হারাম। এটি জঘন্য পাপাচার। সভ্য ও বিবেকবান মানুষ কখনোই লোহার কোদালকে সোনার গহনা বলে না। তাকে কোদালই বলে। নইলে মিথ্যাচার হয়। তেমনি ভোটডাকাতকে ভোটডাকাতই বলতে হয়। তাকে মাননীয় বললে দুর্বৃত্তিকে সন্মান দেখানোর কবীরা গুনাহ হয়। এ দ্বীনের সামান্য বিষয়টুকু বুঝার জন্যও কি সে সব হুজুরদের মাদ্রাসায় গিয়ে শিক্ষা নেয়ার প্রয়োজন পড়ে যারা দুর্বৃত্ত ভোট-ডাকাতকেও কওমী জননী বলে? সভ্য মানুষদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যটি হলো, শ্রদ্ধা ভরে তারা স্মরণ দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের যারা জীবন বিলিয়ে দেয় দেশের স্বার্থকে সুরক্ষা দিতে। সে সাথে মনে প্রাণে ঘৃণা করে সেসব অসভ্যদের যারা গুম-খুন-সন্ত্রাসের রাজনীতিকে প্রতিষ্ঠা দেয় এবং আগ্রাসী শত্রুর সাথে জোট বাধে। বাংলাদেশে এ দুটি পক্ষই রয়েছে। এক দিকে রয়েছে শহীদ আবরের মত নিরেট দেশপ্রেমীক। অপরদিকে রয়েছে বাকশালীদের ন্যায় মানবাধিকার এবং গণতন্ত্রের দুষমনেরা। 

হারাম হলো ভারতের সেবাদাসকে বাংলাদেশের বন্ধু বলা

তবে নানা রূপ দুর্বৃত্তির সাথে বাংলাদেশে যে হারাম কাজটি অতি ব্যাপক ভাবে হচ্ছে সেটি হলো এক অপরাধীকে বঙ্গবন্ধু বলার মধ্যদিয়ে। মুজিবের সবচেয়ে বড় পরিচয় গণতন্ত্রের হত্যাকারী বাকশালী রূপে। তাছাড়া মুজিবকে  বঙ্গবন্ধ খেতাবটি দেশের জনগণ দেয়নি। দিয়েছে মুজিবের বাকশালী ও রক্ষিবাহিনী চেতনার অনুসারিরা। তবে মুজিব শুধু গণতন্ত্র হত্যাকারিই ছিল না। তার হাতে নিহত হয়েছে ৩০ হাজারের বেশী রাজনৈতিক কর্মী। নিহত হয়েছে সিরাজ সিকদারের ন্যায় বহু রাজৈতিক নেতা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার অর্থ যদি পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্নতা হয়ে থাকে, তবে সেটি মুজিব আনেনি। মুক্তিবাহিনীও আনেনি। মুক্তিবাহিনী সমগ্র দেশ দূরে থাক একটি জেলাও স্বাধীন করতে পারিনি। একটি যুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্নতা এনে দিয়েছে ভারত। তবে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্নতা দিলেও বাংলাদেশের স্বাধীনতা মিলেনি। বরং দিয়েছে ভারতের অধিনস্ত গোলামী। মুজিব ছিল ভারতীয় ষড়যন্ত্রের আজ্ঞাবহ গোলাম মাত্র। তাই বাংলাদেশের আজকের বাস্তবতা বুঝতে হলে ভারতের মুসলিম বিরোধী ষড়যন্ত্রকে অবশ্যই বুঝতে হবে। আবরার সেটি বুঝেছিল বলেই সে ফেসবুকে স্টাটাস দিয়েছিল। আর সেটি ভারতের সেবাদাসদের গায়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। ভারতে নীতিতে কোনকালেই কোন অস্পষ্টতা ছিল না।এখনও নাই।  ভারতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে চলছে লাগাতর যুদ্ধ। চলছে হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের রাজনীতি। মুসলিমদের কষ্টকে অতিশয় যন্ত্রনাদায়ক করতে কাশ্মীরে চলছে লাগাত কার্ফিউ। ভারতে মুসলিমদের সংখ্যা শতকরা ১৫ ভাগ। অথচ চাকুরীতে তাদের সংখ্যা শতকার ৫ ভাগেরও কম। গরুর গোশতো খাওয়ার অভিযোগ এনে মুসলিমদের সেখানে রাস্তায় পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। ষড়যন্ত্র হচ্ছে, আসাম থেকে মুসলিম নির্মূলের। মাথার টুপি কেড়ে নিয়ে বাধ্য করা হচ্ছে, জয় শ্রীরাম বলতে। এ অবস্থায় কোন মুসলিম কি ভারতের পক্ষ নিতে পারে? সেটি করলে কি ঈমান থাকে? বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদের মূল রক্ষক ও অভিভাবক হলো ভারত। তাই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন তীব্রতর হলে জড়িয়ে পড়বে ভারত। এবং সে লড়াইয়ে বিজয়ী হতে হলে ভারতের ষড়যন্ত্র নিয়ে জনগণকে অবশ্যই অবহিত করতে হবে।  

ভারতের ন্যায় একটি কাফের রাষ্ট্রের সাথে মুসলিমদের সম্পর্ক কীরূপ হবে তা নিয়ে পবিত্র কোর’আনের নির্দেশনাগুলি অতি সুস্পষ্ট। তাদেরকে কখনোই বন্ধু রূপে গ্রহণ করা যেতে পারে না। আর পবিত্র কোর’আনে যা বলা হয়, ইসলামে সেটিই তো হারাম। পবিত্র কোর’আনে নির্দেশনা এসেছে এভাবেঃ “মু’মিনগণ যেন মু’মিনগণ ব্যতীত কাফেরদের বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে। যে ব্যক্তি সেরূপ করবে, তার সাথে আল্লাহর কোন সম্পর্ক থাকবে না। …।” –(সুরা আল ইমরান, আয়াত ২৮।) এ বিষয়ে তীব্র ভাবে হুশিয়ার করা হয়েছে নীচের আয়াতেঃ “হে মুমিনগণ! তোমরা আমার শত্রু এবং তোমাদের শত্রুদের বন্ধু রূপে গ্রহণ করো না…..।” –সুরা মুমতাহিনা, আয়াত ১)। আরো বলা হয়েছেঃ “(হে নবী) যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের শত্রুদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করে -এমন মানুষদের উপস্থিতি আপনি কখনোই তাদের মাঝে পাবেন না যারা আল্লাহ ও আখেরাতের উপর ঈমান রাখে….।” –সুরা মুজাদেলা, আয়াত ২২)। অর্থাৎ মুসলিম সমাজে কাফেরদের বন্ধুগণ শোভা পাবে সেটি মহান আল্লাহতায়ালার কাম্য নয়। অথচ বাংলাদেশে ভারতীয় কাফেরদের ঘনিষ্ট বন্ধুগণ শুধু শোভাই পায় না, বরং তারাই বাংলাদেশের ন্যায় একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রের হর্তাকর্তা।   

প্রশ্ন হলো, উপরুক্ত তিনটি কোর’আনী নির্দেশনার মাঝে কি কোন অস্পষ্টতা আছে? যা সুস্পষ্ট তা হলো, ঈমানদার ব্যক্তি কখনোই একই সাথে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ এবং ইসলামে অবিশ্বাসী কাফেরদের পক্ষ নিতে পারে না। তাকে অবশ্যই একটি পক্ষকে বেছে নিতে হয়। শেখ মুজিব এখানে ভারতীয় কাফেরদের বন্ধু রূপে গ্রহণ করেছে এবং সুস্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে মহান আল্লাহতায়ালা ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে। মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধ অবস্থান নেয়ার কারণে, শেখ মুজিব পবিত্র কোরআনের আয়াত সরিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রাম থেকে। নিষিদ্ধ করেছে সকল ইসলামী দলগুলিকে এবং সেসব দলের নেতাদের পাঠিয়েছে কারাগারে।। তার আমলে বাংলাদেশ হারিয়েছে বাংলাদেশের ভূমি বেরুবাড়ী, হারিয়েছে পদ্মার পানি। হারিয়েছে স্বাধীনতা। স্বাক্ষর করেছে ২৫ সালা দাসচুক্তি। দেশ পরিণত হয়েছে ভারতের গোলাম রাষ্ট্রে। হাসিনাও তার পিতার পথ ধরেছে। সে সংবিধান থেকে সরিয়েছে মহান আল্লাহতায়ার উপর আস্থার বানিকে। ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে ইসলামী ব্যক্তিদের। সে সাথে লাগাতর সমর্থণ দিয়ে যাচ্ছে কাশ্মীরের চলা ভারতে হত্যা,ধর্ষণ ও গুমের বর্বরতাকে। পদ্মা ও তিস্তার পানি আনতে  ব্যর্থ হলে কি হবে, সম্প্রতি হাসিনা চুক্তি স্বাক্ষর করে ফেনি নদীর পানি ভারতকে দিয়ে এসেছে। সীমান্তে বাংলাদেশী নাগরিকদের ভারত অপহরন করে নিয়ে গেলেও তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সাহস নাই বাংলাদেশ সরকারের। বাংলাদেশের পরিস্থিতি তাই গুরুতর। অক্টোপাসের ন্যায় ভারত চারদিক থেকে বাংলাদেশকে ঘিরে ধরেছে। তাই স্রেফ আবরার হত্যার বিচার হলেই দেশে শান্তি আসবে না। যারা দেশের স্বাধীনতা নিয়ে যারা ভাবে তাদেরকে আরো গভীরে হাত দিতে হবে। গুম, খুন, ধর্ষন, স্বৈরাচার ও বিচারহীনতার কালচার যারা প্রতিষ্ঠা দিয়েছে নির্মূল করতে হবে তাদেরও । ১৩.১০.২০১৯




নির্মূল হোক অসভ্য শাসন এবং প্রতিষ্ঠা পাক সভ্য রাজনীতি

কেন এ গা জ্বালা?

শহীদ আবরারের নৃশংস হত্যার বিরুদ্ধে ছাত্র ও জনগণ যখন দেশব্যাপী ক্ষেপে উঠেছে তখনই সরকারি মহলে শুরু হয়েছে গা জ্বালা। সে গা জ্বালা নিয়ে তারা আন্দোলনের বিরুদ্ধে শুরু করেছে মিথ্যা রটনা, অভিনয় ও ষড়যন্ত্র । জনগণের ক্ষোভকে তারা জামায়াত-শিবিরের ষড়যন্ত্র বলছে। প্রশ্ন হলো হত্যা ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আন্দোলন করা কি স্রেফ জাময়াত-শিবিরের কাজ?  প্রতিবাদের দায়িত্ব কি শুধু তাদের? ভোট-ডাকাত সরকারেরর তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেছেন, ছাত্রদল-শিবির আড়ালে বুয়েটের আন্দোলনে যুক্ত হয়েছে। তিনি আরো বলেছেন, ‘বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডকে পুঁজি করে কেউ যেন তাদের স্বার্থ হাসিল করতে না পারে। এই ঘটনা নিন্দনীয়, নৃশংস ও ন্যক্কারজনক।” হাছান মাহমুদের এরূপ কথার অর্থ কি? রাজনীতি করা এবং আন্দোলন করা দেশের প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। সে অধিকার যেমন সরকারি দলের নেতা-কর্মীদের আছে, তেমনই আছে জামায়াত-শিবির এবং বিএনপি-ছাত্রদলের। সে অধিকার আছে অন্য যে কোন বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের। আর আন্দোলন করতে হলে তো মাঠে নামতেই হয়। সরকার বিরোধীদের মাঠে নামা দেখে তাই সরকারি মহলে এতো গা জ্বালা কেন? তবে এ গা জ্বালার মূল কারণ, সরকারের ফ্যাসিবাদী মানস। গণতান্ত্রিক চেতনায় বিরোধীদের আন্দোলন বৈধ ও স্বাভাবিক মনে হয়। কিন্তু ফ্যাসিবাদে সেটি অসহ্য ও নির্মূল যোগ্য অপরাধ গণ্য হয়। তখন ঘটে শাপলা চত্ত্বরের গণহত্যা। অসংখ্য আবরারকেও তখন নৃশংস হত্যার শিকার হতে হয়।  

মিছিল-মিটিংয়ের অধিকার পানাহারেরর ন্যায় প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। অতীতে শত শত মিছিল-মিটিং করে আওয়ামী লীগ সে মৌলিক অধিকারের প্রয়োগ করেছে। আজকের বিরোধী দল সে অধীকারের প্রয়োগ করলে সেটিকে নিন্দনীয়, নৃশংস ও ন্যক্কারজনক বলা হবে কেন? অথচ সংবিধান সে মৌলিক অধিকার দানে দল বা ধর্ম ভেদে নাগরিকদের মাঝে কোন রূপ কম বা বেশীর তারতর্ম করে না। সে সাংবিধানিক অধিকার সরকারি দলের নেতাকর্মীদের যতটুকু, তা থেকে একটুও কম নয় বিরোধীদলের নেতাকর্মীদের। কিন্তু হাছান মাহমুদের ন্যায় ভোট-ডাকাতগণ সে সম-অধিকার অন্যদের দিতে রাজী নয়। তাদের কথা, সে অধিকারের সবটুকু একমাত্র তাদের। ফলে পাকিস্তানী আমল থেকে শুরু করে প্রতিটি সরকারের আমলে আওয়ামী লীগ মিটিং-মিছিল করার অধিকার ভোগ করলেও আজ সে অধিকার বিরোধী দলের কাউকে দিতে রাজী নয়। রাজপথে  জামায়াত-শিবির বা বিএনপি-ছাত্রদল দেখলে তাদের রাতের ঘুম হা্রাম হয়ে যায়। শুরু হয় গা জ্বালা। সে গা জ্বালাটিই ধরা পড়ে ভোট ডাকাত হাছান মাহমুদের বক্তব্যে -যা ছাপা হয়েছে দেশের পত্র-পত্রিকায়। বিগত দুটি নির্বাচনে এ ভোট-ডাকাতগণ জনগণের ভোটের অধিকার যেরূপ ছিনতাই করেছে, তেমনি ছিনতাই করতে চায় জনগণের আন্দোলনের অধিকার।

নৈতিক অবক্ষয় ও অপসংস্কৃতির সুনামি

কাউকে সন্মানিত বলার অর্থ তার পক্ষে সাক্ষ্য দেয়া। তাই সভ্য মানুষের ঈমানী দায়ভার হলো, সে সাক্ষ্য দিবে সত্য এবং ন্যায়ের পক্ষ্যে এবং অন্যায় ও দুর্বৃত্তির বিরুদ্ধে। এখানে স্খলন বা বিচ্যুতি হলে বুঝতে হবে তার ঈমানে রোগ রয়েছে। তাই চোর-ডাকাত ও ভোট-ডাকাতদেরকে মাননীয় বলা ধর্মীয় ভাবে ও নৈতীক ভাবে হারাম তথা নিষিদ্ধ। এরূপ নিষিদ্ধ কর্ম সমাজে অবাধে চলতে থাকলে ডাকাতির ন্যায় শাস্তিযোগ্য অপরাধও সমাজে সন্মানজনক পেশা রূপে প্রতিষ্ঠা পায়। ডাকাতও তখন সমাজে মাননীয় হয়। একই রূপ অপরাধ ঘটে, একজন পতিতাকে সতি-সাধ্বী ও পুতঃপবিত্র বলা হলে। তাতে যেমন সত্য-গোপন হয়, তেমনি গুরুতর গুনাহ হয় একজন অতি নিকৃষ্ট অপরাধীর পক্ষে সাক্ষি দেয়ার। এরূপ সাক্ষিদান শিক্ষিত ও বিবেকবান লোকদের পক্ষ থেকে হলে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয় এবং তাতে সমাজে দুর্বৃত্তদের ঘৃণার বদলে তাদের প্রতি সন্মান দেখানোর সংস্কৃতি নির্মিত হয়। তাই সেটি কবিরা গুনাহ। অথচ বাংলাদেশ সেরূপ কবিরা গুনাহই বেশী বেশী হচ্ছে। ফলে হাসিনার ন্যায় ভোট-ডাকাতও মাননীয় বলে সম্বোধিত হয়।

একই রূপ কবিরা গুনাহ হয়, ভারতের আজ্ঞাবহ গোলাম এবং গণতন্ত্র হত্যাকারী বাকশালী মুজিবকে বঙ্গবন্ধু বললে। কথা হলো, গণতন্ত্র হত্যাকারি ব্যক্তি দেশের ও জনগণের বন্ধু হয় কি করে? চোর-ডাকাতগণ মানুষকে নিঃস্ব করে আর্থিক ভাবে। আর গণতন্ত্রের শত্রুরা নিঃস্ব করে মানবাধিকার থেকে। তখন জনগণ হারায় ভোট দেয়া এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। অর্থের অভাবেও দিন চলে। কিন্তু স্বাধীনতা লুণ্ঠিত হলে জনগণ খাঁচায় বন্দী গোলামে পরিণত হয়। অধিকারহীন মানুষের পক্ষে তখন অসম্ভব হয় সভ্য মানুষ রূপে বাঁচা। স্বৈরাচারি শাসকেরা তাই মানবতার জঘন্যতম শত্রু। ইসলামে তাই অতিশয় নেক কর্ম হলো, এরূপ মানবতার শত্রু অপরাধীদেরকে ঘৃণা করা। সম্ভব হলে তাদের নির্মূল করা। ইসলামে সে নির্মূলের কাজটিই হলো পবিত্র জিহাদ। ব্যক্তির মাঝে ঘৃণার সে মাত্রাটি যতই গভীর হয়, ততই বাড়ে সওয়াব। আর গুরুতর পাপ হলো এরূপ অপরাধীকে সন্মান দেখানো। জনগণের এ পাপে জনপ্রিয়তা ও গ্রহনযোগ্যতা পায় পাপিষ্ট শয়তান। এবং সে সাথে হত্যাযোগ্য গণ্য আবরারের ন্যায় নিরীহ সত্যবাদীরা। সে পাপ থেকে বাঁচতেই সমাজের বিবেকমান এবং ঈমানদার মানুষেরা সচেতন ভাবেই ভোট-ডাকাত হাসিনার নামের আগে কোথাও মাননী্য় বলা থেকে বিরত থাকতে বাধ্য। একই ভাবে বিরত থাকতে বাধ্য বাকশালী মুজিবকে বঙ্গবন্ধু বলা থেকে। ব্যক্তির ঈমান তো এভাবেই শুধু নামায-রোযাতে নয়, কথার মধ্য দিয়েও প্রকাশ পায়। সেটি না হলে ঈমান মারা পড়তে বাধ্য।

শুধু নেক কাজকে ভাল বাসলেই সুশীল ও সভ্য হওয়া যায় না। বরং সে জন্য অর্জন করতে হয় চুরি-ডাকাতি, ধর্ষণ, গুম ও হত্যাকে মনের গভীর থেকে ঘৃণা করার সামর্থ্য। বেশ্যাবৃত্তি করে অর্থ-উপার্জনের ন্যায় ভোট ডাকাতি করে প্রধানমন্ত্রী হওয়াও যে অতিশয় ঘৃণ্য বিষয় –সে ধারণাটি অতি প্রবল হওয়া সুশীল ও সভ্য হওয়ার জন্য জরুরী। একমাত্র তখনই রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তিতে গড়ে উঠে সুস্থ্য সংস্কৃতি। দেশে তেমন একটি সুস্থ্য সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা পেলে ঘরের মেয়েরা কখনোই পতিতাবৃত্তিতে যোগ দেয়না। তখন সভ্য ঘরের সন্তানেরা ভোট-ডাকাতিতে নামে না। ভিতরে লালিত ঘৃণার কারণে তারা ভোট-ডাকাতকে কখনোই মাননীয়ও বলে না। ভোট-ডাকাত শেখ হাসিনাকে মাননীয় বললে এবং গণহত্যাকারি, রক্ষিবাহিনী দিয়ে ৩০ হাজার মানব হত্যাকারি এবং ভারতের গোলাম শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু বললে নির্মিত হয় ডাকাত পাড়ার অপসংস্কৃতি। অথচ বাংলাদেশে বিগত ৫০ বছর ধরে সে অপসংস্কৃতি গড়ে তোলার কাজটিই লাগাতর হয়েছে। সে অপসংস্কৃতি প্রবল ভাবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার কারণেই খুনিরা ছাত্রনেতা হয়, ভোট-ডাকাত হাসিনাও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী রূপে সন্মানিত হয় এবং গণতন্ত্রের শত্রু বাকশালী মুজিবও তখন বঙ্গবন্ধু রূপে চিত্রিত হয়। অথচ পৃথিবীর আর কোথাও ভোট-ডাকাত ও একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার ফ্যাসিস্টদের সন্মান দেখানোর এরূপ অসভ্যতা বেঁচে নাই। কিন্তু বাংলাদেশে সে অসভ্যতা প্রবল হওয়ার কারণে দেশ দুর্বৃত্তিতে পর পর ৫ বার বিশ্ব রেকর্ড গড়েছে। ইতিহাসে এ উপার্জন একমাত্র বাংলাদেশের। সেরূপ এক প্রবল অসভ্যতার কারণেই মুষ্টিমেয় ব্যতিক্রম ছাড়া দেশের সেনা অফিসার, সরকারি আমলা, আদালতের বিচারপতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, পত্রিকার সম্পাদক এবং বুদ্ধিজীবীগণও অতি নৃশংস দুর্বৃত্তদের ঘৃণা করার সামর্থ্য পুরাপুরি হারিয়ে ফেলেছে। এবং এ রকম একটি অবস্থার কারণেই দেশপ্রেম গণ্য হচ্ছে হত্যাযোগ্য অপরাধ রূপে। এবং আগ্রাসী ভারতের কাছে আত্মসমর্পণ গণ্য হচ্ছে স্বাধিনতা রূপে। একই কারণে হাসিনার ন্যায় ভোট-ডাকাতও ক্ষমতার টিকে থাকার সাহসই শুধু পাচ্ছে না, অনেকের কাছে মাননীয় রূপেও গণ্য হচ্ছে।

অভিনয় ও প্রতারণার জাল

সম্প্রতি সাংবাদিকদের সামনে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিত অভিনয় করছেন দেশের ভোট-ডাকাত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন অভিনয়ের কদরও আছে। কারণ, এমন অভিনয় দিয়ে জনগণকেও সহজে বিভ্রান্ত করা যায়। শেখ মুজিবও স্বাধীনতা, বহুদলীয় গণতন্ত্র এবং ৮ আনা সের চাউল খাওয়ানোর নামে অভিনয় করে ক্ষমতায় গিয়েছিল। এর পরের কাহিনী তো ইতিহাস। অভিনয়ের অংশ রূপেই শহীদ আবরারের পিতামাতাকে ভোট-ডাকাত হাসিনা তার অফিসে ডেকেছে। অথচ দুনিয়া থেকে আবরারকে যারা বিদায় দিল তারা তো হাসিনার দলেরই পোষা গুন্ডা। এর আগেও বহু আবরারকে তারা হত্যা করেছে হাসিনার ঘোষিত “এক লাশের বদলে ১০ লাশ ফেলা”র নীতি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে। তার হাতে গণহত্যা হয়েছে শাপলা চত্ত্বরে। শহীদ হয়েছে এবং ময়লার গাড়িত লাশ গায়েব হয়েছে হিফাজতে ইসলামের মুসল্লিদের।  পিলখানায় হত্যা করা হয়েছে ৫৬ জন সেনা অফিসারকে। মুজিবের ন্যায় হাসিনাও একই রূপ অভিনয় করছে গণতন্ত্রের নামে। ভোটের স্বাধীনতার কথা বলে উপহার দিয়েছে ভোটডাকাতি। বাকশালী মুজিবের ন্যায় হাসিনা রাজনৈতিক দলগুলোকে নিষিদ্ধ না করলেও নিষিদ্ধ করেছে তাদের রাজপথের রাজনীতি। এভাবে মুজিবের ন্যায় হাসিনাও প্রতিষ্ঠা দিয়েছে অভিনয় ও প্রতারণার এক দুষ্ট রাজনীতি।

ক’দিন আগে ভোট-ডাকাত হাসিনা অভিনয়ের ঢংয়ে সাংবাদিকদের সামনে বলেন, “আমরা তো সকল ব্যবস্থা নিয়েছি। অতএব আন্দোলন কোন?” ডাকাত হাসিনা এখানে ন্যাকা সেজেছেন। যেন তিনি বুঝেন না, আন্দোলন কেন হয়। আন্দোলন কি হয় স্রেফ একটি খুনের বিরুদ্ধে? আন্দোলন কি হয় কিছু খুনিকে ফাঁসিতে ঝুলানোর দাবি নিয়ে? দেশে তো প্রতিদিন বহু মানুষ খুন হয়। তাই একটি বা দশটি খুনের ঘটনা নিয়ে কি দেশ ব্যাপী কোন আন্দোলন গড়া যায়? আন্দোলন তো হয়, এমন এক জালেম সরকারের নির্মূলে যার নীতিই হলো খুন, গুম, ধর্ষণকে রাজনীতির হাতিয়ার ও কালচারে পরিণত করা। খুনের অপরাধে আসামীদের ফাঁসি হলেও তাই আন্দোলন থামে না। কারণ, আন্দোলন তো অসভ্য ও অত্যাচারি শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে -যা ফ্যাসিবাদকে ধারণ করে ত্রাসের রাজত্বের প্রতিষ্ঠা দেয়।  

অপর দিকে ভোট-ডাকাত হাসিনা ও তার অনুসারিগণ বলা শুরু করেছে, “আবরারের হত্যা নিয়ে রাজনীতি হচ্ছে।” কথা হলো আবরারে ত্যাকান্ডাটি কি পারিবারিক বিষয়? এটি কি টাকা-পয়সা বা জমিজমা সংক্রান্ত বিষয় যে তাতে রাজনীতি হবে না? আবরারকে হত্যা করা হয়েছে নিরেট রাজনৈতিক কারণে। সেটি ঘটেছে ফেসবুকে সরকারি নীতির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বক্তব্য দেয়ার কারণে। তাছাড়া রাজনীতি করা কি কোন নিষিদ্ধ কর্ম? সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্ত ও কর্মই তো রাজনৈতিক। সরকারের নিজের রাজনীতি যদি নিষিদ্ধ ও নিন্দনীয় না হয়, তবে অন্যদের রাজনীতি কেন নিষিদ্ধ ও নিন্দনীয় হবে? প্রশ্ন হলো, রাজনীতির বিরুদ্ধে যদি ভোট-ডাকাত হাসিনার এতই ক্ষোভ, তবে ছাত্রলীগর রাজনীতি যেভাবে সন্ত্রাস ও হত্যার নীতিতে পরিণত হয়েছে -সে রাজনীতি কেন বন্ধ করেন না? রাজনীতিকে ছাত্র লীগ কোন পর্যায়ে নিয়ে গেছে তা কি ভোট-ডাকাত হাসিনা বুঝে না? বুয়েটে যে হত্যাকান্ডটি ঘটালো সেটিই কি ছাত্রলীগের একমাত্র নৃশংস হত্যাকান্ড? এ ধরণের হত্যার ঘটনা বাংলাদেশে দুয়েকটি নয়, অসংখ্য বার ঘটিয়েছে ছাত্রলীগ। আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হওয়ার পর সারা দেশে এভাবে বহুশত ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। অনেকে গুম ও ধর্ষণের স্বীকার হয়েছে। ছাত্রলীগ এরূপ নৃশংসতার তান্ডব বহু বছর ধরে ঘটিয়ে আসছে। এরূপ নৃশংস অপরাধে সরকার এতদিন তাদেরকে পুরো লাইসেন্স দিয়েছিল। তাদের নীতি ছিল গায়ে ছাত্র শিবিরের ট্যাগ দিয়ে যে কোন ইসলামপ্রেমীকে মেরে ফেলা।

আবরার হত্যার পর ছাত্রগণ আজ জেগে উঠেছে। এরূপ নৃশংস হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ও আন্দোলন হবে -সেটিই তো অতি স্বাভাবিক ও সভ্য কর্ম। এবং না হওয়াটি অসভ্যতার আলামত। অথচ এরূপ প্রতিবাদ ভোট-ডাকাত অসভ্য সরকারের ভাল লাগেনি। ছাত্রদের এমন একটি বিবেকমান আন্দোলনকে তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ নিন্দনীয় ও ন্যক্কারজনক বলেছেন। কথা হলো, এতো বড়ো নৃশংস ঘটনার পরও ছাত্ররা নীরব থাকে কি করে? এরূপ মুহুর্তে নীরব থাকাটি তো চরম অসভ্যতা। সেরূপ নীরবতায় দেশে অসভ্যতার সুনামি শুরু হবে –সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? তখন প্রশ্রয় পায় অশুভ খুনিচক্র। তখন আবরারগণ লাশ হয়, নারীরা ধর্ষিতা হয় এবং বীভৎস গুম-খুনও রাজনীতির হাতিয়ারে পরিণত হয়। সে নৃশংস অসভ্যতা থেকে বাঁচাতে ছাত্র ও জনগণ আন্দোলেন নামবে -সেটিই তো স্বাভাবিক। সে আন্দোলনে শিবির, ছাত্রদল ও অন্যান্য ছাত্র সংগঠন ও রাজনৈতিক দল জড়িত হবে -সেটিই তো অতি প্রশংসনীয় বিষয়। একমাত্র এভাবেই তো দেশ ভোট-ডাকাত দুর্বৃত্তদের থেকে মুক্তি পেতে পারে। ১৫/১০/২০১৯