নির্বাচনে ভোট-ডাকাতির অসভ্যতা ও অতি পজেটিভ বিষয়

যে কোন বিবেকহীন নৃশংস স্বৈরাচারির ন্যায় শেখ হাসিনার ভাবনাটি ছিল নির্বাচনে স্রেফ তার নিজের ও নিজ দলের বিজয় নিয়ে। বিজয়টি ন্যায়ের পথে হলো, না অন্যায়ের পথে হলো, নির্বাচনে কতটা নৃশংস ভাবে ভোট ডাকাতি হলো এবং ভোট প্রয়োগ থেকে জনগণকে কতটা বঞ্চিত করা হলো – শেখ হাসিনার মাঝে সে ভাবনার লেশমাত্রও নাই। অথচ সে ভাবনার মাঝেই তো মানুষের নীতি-নৈতিকতা ও সভ্য বিবেকবোধ। সে ভাবনা না থাকাটাই তো চরম অসভ্যতা। এরূপ চরিত্রটি একান্তই ডাকাতদের। ডাকাতদের কাছে গৃহস্থের ঘর থেকে অর্থলুটটাই মূল। কতটা নৃশংসতা ও বর্বরতার সাথে ডাকাতি হলো, কতজন সে ডাকাতিতে মারা পড়লো -সে ভাবনা তাদের থাকে না।

তবে সাধারণ চোর-ডাকাতদের থেকে শেখ হাসিনা ও তার দলীয়  চোর-ডাকাতদের একটি বড় রকমের পার্থক্য সহজেই নজরে পড়ে। সেটি হলো, চোর-ডাকাতগণ যত খারাপ চরিত্রেরই হোক, তাদেরও মান-সন্মানের ভয়-ভাবনা থাকে। এজন্যই তারা রাতের আঁধারে নিজেদের পরিচয় অতি গোপন রেখে ডাকাতি  করে। কারণ, ডাকাতদেরও ছেলেমেয়ে, পরিবার পরিজন নিয়ে জনগণের মাঝে বসবাসের ভাবনা থাকে। শুধু পুলিশের ভয় নয়, নিজের পরিবারের লোকজন, আত্মীয়স্বজন এবং পাড়া-প্রতিবেশী কি বলবে সে লজ্জা-শরমও থাকে। এজন্য ডাকাতি করতে  গিয়ে ধরা পড়লে ডাকাতেরা লজ্জায় পারলে গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র চলে যায়। কিন্তু সে লজ্জা-শরম যেমন হাসিনার নাই, তেমনি তার দলের নেতাকর্মীদেরও নাই। নইলে মানুষের চোখের সামনে তারা কেন ভোট-ডাকাতিতে নামবে?

লজ্জা থাকার কারণ সম্প্রতি ঢাকার এক অভিজাত স্কুলের ছাত্রী নকল করতে গিয়ে ধরা পড়ায় আত্মহত্যা করেছে। কিন্তু লজ্জা না থাকার কারণে শেখ হাসিনার নৃশংস ডাকাতি শেষে উৎসব করেছে। যে পুলিশেরা তাকে ডাকাতির ফসল ঘরে তুলে দিয়েছে তাদের খুশি করতে ১২ই জানুয়ারি দেশের ৬৩৩টি থানার সবগুলিতে সরকারি খরচে বিশাল ভোজের আয়াজন করা হয়েছে। এবং কেন্দ্রীয় ভাবে ভোজের আয়োজন করা হয়েছে ঢাকার পুলিশ সদর দফতরে। এবং সেটি ১৩ই জানুয়ারিতে। ব্রিটিশ আমলে এবং পাকিস্তান আমলে জনগণের রাজস্বের অর্থে পুলিশদের এমন ভোজ কখনোই হয়নি। কারণ এভাবে ডাকাতির ফসল তারা কারো ঘরে তুলে দেয়নি। প্রশ্ন হলো, দেশের দরিদ্র জনগণ কি ডাকাতদের বিজয় ও বিজয় শেষে আনন্দ বাড়াতে রাজস্ব দেয়? পুলিশের প্রতি এরূপ বাড়তি  আদর কি ভোটডাকাতিতে তাদের সংশ্লিষ্টতাই প্রমাণ করে না?

সাধারণ ডাকাতগণ এভাবে ধরা পড়লে এরূপ উৎসব দূরে থাক, লজ্জায় গ্রামছাড়া হতো। কারণ, ডাকাতেরা ডাকাতি করলেও তাদের লজ্জা বলে কিছু থাকে। এজন্যই তারা রাতে লুকিয়ে, চেহারা ঢেকে ডাকাতি করে। কিন্তু শেখ হাসিনার সে লজ্জা-শরমের কোন বালাই নাই। অথচ নবীজী (সাঃ)র হাদীস, লজ্জা ঈমানের অর্ধেক। অর্থাৎ যার লজ্জা নাই, তার ঈমানও নাই। প্রশ্ন হলো, যে ব্যক্তি সামান্য ভোটের লাভ সামলাতে পারে না, তার হাতে দেশের স্বাধীনতা এবং দেশের লক্ষ লক্ষ কোটি টাকার সম্পদ নিরাপদ থাকবে কেমনে?

কিন্তু হাসিনা এবার ভোট-ডাকাতিতে হাতে নাতে ধরা পড়েছে। ভোটদান শুরুর আগেই ভোটের বাক্স ভরা হয়েছে। যেখানে ভরতে দেরী হয়েছে সেখানে দলীয় মাস্তানেরা ভোট কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে তাদের চোখের সামনে ভোটারদের নৌকায় সিল মারতে বাধ্য করেছে। ভোট কেন্দ্রে ধানের শীষের পোলিং এজেন্টকে ঢুকতে দেয়া হয়নি। ধানের শীষের পক্ষে কোথাও মিছিল হবে এবং পোষ্টার লাগানো হবে সে সুযোগও দেয়নি। শুধু তাই নয়, ধানের শীষের ভোট দেয়াটি ধরা পড়লে ভোটারকে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। নোয়াখালীতে ৪ সন্তানের এক মা’কে ধানের শীষে ভোট দেয়াতে ধর্ষণ করা হয়েছে। সে খবরটি পত্রিকাতে ছাপা হয়েছে। রাজশাহীর তানোরের কলমা গ্রামে ধানে শীষে বেশী ভোট পড়ায় সে গ্রামে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বন্ধ করা হয়েছে কৃষিক্ষেতে গভীর নল কূপের পানি। গ্রামের বাইরে বেরুলে মারধর করা হয়েছে।  খবরটি ছেপেছে ঢাকার ডেইলী স্টার। শেখ হাসিনা ও তার দলীয় কর্মীদের হাতে মানবতাবিরোধী এরূপ অসংখ্য অপরাধ ঘটেছে।

প্রশ্ন হলো, এরূপ ভয়ংকর ডাকাত ধরতে বিচার বিভাগীয় তদন্ত বা বিদেশী পর্যবেক্ষকদের সাক্ষীসাবুদের প্রয়জন পড়ে কি? দেশের কোটি কোটি মানুষ এ ডাকাতির সাক্ষী। প্রত্যক্ষ সাক্ষী কয়েক লাখ সরকারি কর্মচারি। এরূপ ডাকাতদের বিচার না করাটাই তো অসভ্যতা। অথচ হাসিনার কাজ হয়েছে সে অসভ্যতার সাথে নিজে জড়িত হওয়া এবং সেটিকে প্রবলতর করা। যুদ্ধাপরাধের বিচারের ধুয়া তুলেছে স্রেফ নিজের মানবাধীকার বিরোধী নৃশংস অপরাধকে আড়াল করতে।

দেশের নর-নারী, কিশোর-কিশোরী ও শিশুসহ সকল স্তুরের মানুষ জানতে পারলো শেখ হাসিনা কত নীচু মনের নৃশংস ডাকাত। কোন দেশের প্রধানমন্ত্রী যে এতোটা খারাপ হতে পারে সেটি হয়তো তারা কোনদিনই ভাবেনি। সাধারণত চোর-ডাকাতেরা গৃহস্থের সবকিছু লুটে নেয় না। গরু-বাছুর, তালাবাটি, ঘরের দরজা-জনালা খুলে নেয় না। কিন্ত শেখ হাসিনা ও তার সহযোগী ডাকাতেরা কোন কিছুই ছেড়ে দেয়নি, সবটাই নিজ পকেটে তুলে নিয়েছে। ফলে শেখ হাসিনা তার প্রতিদ্বন্দি বিএনপির প্রার্থীর জন্য কোন কোন ভোটকেন্দ্রে একটি ভোটও ছাড়েনি। হাসিনা গোপালগঞ্জ-৩ আসনে  ২ লাখ ২৯ হাজার ৫৩১ ভোট নিয়েছে। সেখানে বিএনপির এস এম জিলানী সকল ভোটকেন্দ্র মিলিয়ে পেয়েছেন মাত্র ১২৩ ভোট। কোন সুস্থ্য মানুষ কি এমনটি ভাবতে পারে? সুষ্ঠ ভাবে ভোট পড়লে কখনোই এমনটি হয় না; কিন্তু ভোটের উপর ডাকাতি হলে এমনটিই হয়।

তবে এ ভোট-ডাকাতির নির্বাচনের একটি বিশাল পজেটিভ দিক আছে। বিরোধী জোট হেরে গিয়ে প্রমাণ করেছে শেখ হাসিনা কত বড় নৃশংস অপরাধী এবং দেশের জন্য কতটা ভয়ংকর। এভাবে নগ্ন ভাবে শেখ হাসিনার কদর্য চেহারাটি দেশের আপামর মানুষের সামনে আসাটি জরুরী ছিল। এটি ঠিক, কিছু বেঈমান জাতের মানুষ চিরকালই গরু-ছাগলকে দেবতা মনে করে। অতীতে এজাতের চেতনাশূণ্যগণ ফেরাউনকেও ভগবান বলেছে। আওয়ামী লীগের মাঝে সে জাতের মানুষ অসংখ্য হলেও বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ সেরূপ নয়। হাসিনার চরিত্রটি তাদের সামনে আসাটি অতি জরুরী ছিল। ভাল হয়েছে যে, শেখ হাসিনা নিজেই তার কুৎসিত চরিত্র নিয়ে দেশবাসীর সামনে নিজে হাজির হয়েছে।

তিন শত সিটের মাঝে ১৬০ সিট দখলে নিলেও কি তাকে সরকার থেকে কেউ সরাতে পারতো? কিন্তু সেটি হলে তাতে  দীর্ঘস্থায়ী বিপদ বাড়তো দেশের স্বাধীনতার, গণতন্ত্রের ও ভবিষ্যতের। তাতে বিরোধী দলের কিছু সিট বাড়লেও তাতে ভয়ানক বিপদ বাড়তো দেশ ও দেশবাসীর। তাতে হাসিনার চরিত্রের কদর্যতাটি বিশ্বজুড়ে ঢাকা পড়তো। ঢাকা পড়তো ২০১৪ সালের ভোট ডাকাতির দুর্নাম। ঢাকা পড়তো তার গুম, খুন, চুরি-ডাকাতি এবং বিচারের নামে নিরপরাধ মানুষ হত্যার রাজনীতি। দেশের ইতিহাসের বইয়েও তার একটি সন্মানজনক স্থান থাকতো। কিন্তু মহান আল্লাহতায়ালা সেটি চাননি। তিনি চেয়েছেন, মানবতা বিরোধী এ ভয়ানক অপরাধীর মুখোশটি খুলে ফেলতে। যাতে মানুষ অদূর ভবিষ্যতে কাঠগড়ায় তুলে তার অপরাধের বিচার  করতে পারে। যাতে ইতিহাসের বইয়ে নিজের কুকর্ম নিয়ে মীর জাফরের ন্যায় হাজার হাজার বছর বেঁচে থাকে।

মহান আল্লাহতায়ালা যাকে বিশ্ববাসীর সামনে অপমানিত করতে চান তার স্বাভাবিক কাণ্ডজ্ঞানটুকু তিনি কেড়ে নেন। এমন কাণ্ডজ্ঞান-শূন্যতার কারণেই শেখ হাসিনা নিজেই নিজের বস্ত্র খুলে উলঙ্গ বেশে বিশ্ববাসীর সামনে হাজির হয়েছেন। নইলে ধানের শীষের প্রার্থীকে নিজ আসনে প্রায় তিন লাখ ভোটের মাঝে কেন ১২৩ ভোট দেয়ার ব্যবস্থা করবেন। প্রতিদ্বন্দী প্রার্থীকে এক লাখ বা ৫০ হাজার ভোট দিলেও তার বিজয় কি তাতে ঠেকে থাকতো? এভাবে নির্বাচনে শেখ হাসিনা জিতলেও তাতে বিরোধী দলগুলির ফায়দাটি হয়েছে বিশাল। হাসিনার আসল চরিত্রটি মানুষের সামনে তুলে ধরার কাজে তাদের নিজেদের আর মাঠে নামতে হচ্ছে না। অথচ হাজার হাজার জনসভা করে বা শত শত বই লেখে কি সে কাজটি করা সম্ভব হতো?

আওয়ামী লীগকে স্রেফ নির্বাচনে হারানোর মাঝে দেশের তেমন কল্যান নাই। কারণ তাতে হাসিনা ও তার দল হারলেও ক্যান্সার নির্মূল হতো না। অতীতে দলটি বহুবার হারলেও তার দেশ-ধ্বংসী বিষ বেঁচে আছে। বাংলাদেশের কল্যাণে যা জরুরী তা হলো বাকশালী ফ্যাসিবাদীদের আমূল নির্মূল। এ জন্য নির্বাচন নয়, অপরিহার্য হলো একটি প্রচণ্ড গণবিপ্লব –যা নির্মূল করে ছাড়বে এ ভয়ংকর অপরাধীদের। আর গণবিপ্লবের জন্য জরুরী হলো দেশের প্রতিটি নারী, শিশু, যুবক, যুবতীর মনে শেখ হাসিনার নৃশংস ডাকাত চরিত্রের নগ্ন রূপটিকে গভীর ভারে ক্ষুধিত করা। তবে সে কাজটি অতি প্রবল ভাবেই হয়েছে। এবং বিরোধী দলকে সেটি করতে হয়নি। বিরোধী দলের হাতে সে সামর্থ্যও ছিল না। অথচ শেখ হাসিনা ও তার দলের লোকজনই অতি সুচারু ভাবে এবং প্রবল ভাবে সে কাজটি করে দিয়েছে। এবারের নির্বাচনের এটিই হলো বিশাল পজিটিভ দিক। জনগণ ভোট ডাকাতির এ করুণ স্মৃতি আর কোন কালেই ভুলবে না। বাংলার ইতিহাস থেকেও তা আর কোন দিন হারিয়ে যাবে। জঘন্য অপরাধীদের তো এভাবেই মহান আল্লাহতায়ালা হাজার হাজার বছর বাঁচিয়ে রাখেন। ফিরাউন, নমরুদদের তাই ইতিহাস থেকে তিনি হারিয়ে যেতে দেননি।

এখন বিরোধী দলগুলির  কাজ হলো, জনগণের মনে জমাট বাধা সে গভীর ঘৃণাকে গণবিপ্লবে রূপ দেয়া।  তবে একাজে জনগণের নিজের দায়িত্বটিও কম নয়। দেশ কোন দল বা কোন নেতা-নেত্রীর নয়। দেশ সবার। তাই দেশ থেকে  চোর-ডাকাত তাড়ানোর দায়ভারটিও সবার। তাছাড়া দেশবাসী কতটা চোর-ডাকাত মুক্ত সভ্য পরিবেশে বসবাস করতে চায় সেটির পরিচয় মিলবে তো ডাকাত তাড়ানোর সে লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে। পাড়ায় আগুন লাগলে আগুণ তাড়ানোর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু থাকে না। তেমনি দেশ ডাকাতের দখলে গেলে ডাকাত নির্মূলের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু থাকে না।

রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “হে বিধাতা, সাত কোটি প্রাণীরে রেখেছো বাঙালী করে, মানুষ করোনি।” বাঙালী কতটা মানুষ রূপে বেড়ে উঠেছে এবার সে পরীক্ষা দেয়ার পালা। মুসলিম রূপে দায়িত্বটি তো আরো বেশী।  রাষ্ট্রপ্রধান রূপে যে আসনে বসেছেন খোদ নবীজী সাঃ সে আসনে হাসিনার মত এক ভোট ডাকাতকে মেনে নিলে ও তাকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বললে কি ঈমান থাকে? দেশ যখন চোর-ডাকাতদের দখলে গিয়েছিল তখন ডাকাত তাড়াতে নিজের কী ভূমিকা ছিল -রোজ হাশরের বিচার দিনে সে প্রশ্ন তো অবশ্যই উঠবে। শত্রুনির্মূলে নবীজী (সাঃ)র শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবা শহীদ হয়েছিলেন। অথচ বাংলাদেশে ক’জন তাদের অর্থ, শ্রম, সময় ও রক্তের কোরবানী দিচ্ছে ইসলামের শত্রু এবং মানবতার শত্রু নির্মূলে? ১০/০১/১৯

 




আওয়ামী শাসন এবং বিপর্যয়ের মুখে বাংলাদেশ

বিপর্যয়টি মুসলমান থাকা নিয়ে

বাংলাদেশ আজ ভয়ানক বিপর্যয়ের মুখে। সেটি শুধু রাজনৈতিক নয়। নয় নিছক সামরিক, শিক্ষা-সাংস্কৃতি, অর্থনীতি ও আইন-শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে। বরং সবচেয়ে বড় বিপর্যয়টি ঘটছে মুসলমানদের মুসলমান থাকা নিয়ে। আওয়ামী লীগ শুধু দেশের সরকার, পার্লামেন্ট, প্রশাসন বা রাজনীতির ময়দান দখল নিয়ে খুশি নয়, তারা প্রবল ভাবে দখলে নিচ্ছে সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ময়দানও। দখলদারি প্রতিষ্ঠা করছে মুসলমানদের ঈমানের ভূবনেও। আওয়ামী লীগ শুধু একটি রাজনৈতিক দল নয়, বরং আবির্ভুত হয়েছে রাজনৈতিক, সামাজিক ও আদর্শিক শক্তি রূপে। তারা এখন ইসলামেরও ব্যাখা দেওয়া শুরু করেছে। কোনটি জিহাদ আর কোনটি জিহাদ নয়, কোনটি ইসলাম-সম্মত আর কোনটি অনৈসালিক সে ব্যাখাও দেওয়া শুরু করেছে। তারা সে ব্যাখা দিচ্ছে ভারত ও মার্কিনীদের সাথে অভিন্নতা রেখে।

বাংলাদেশে এখন প্রচন্ড ভাবে অধিকৃত নিজদেশের ইসলামের বিপক্ষ শক্তির হাতে। তারা সে অধিকার পেয়েছে নির্বাচনের মাধমে। তাদের সে বিপুল বিজয়ে শুধু যে দেশের আভ্যন্তরীন ইসলামের বিপক্ষ শক্তিই খুশি হয়েছে তা নয়, খুশি হয়েছে ইসলাম-বিরোধী চিহ্নিত বিদেশী শক্তিও। প্রতিবেশী ভারত সরকার ও তার মিডিয়া সে খুশি গোপন রাখেনি। সরকারি ভাবে ভারত যে কতটা খুশি হয়েছে সেটি বুঝা যায় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রনব মুখার্জির বক্তব্য থেকে। প্রণব মুখার্জি বলেছেন, ভারত সরকার শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে কোন হুমকি আসলে ভারত নিশ্চুপ বসে থাকবে না। লক্ষ্যণীয় হলো, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে বাংলাদেশের মানুষ ইতিহাসের অতি কঠিন বিপদের মুখোমুখি হয়েছিল। ক্ষুদার্ত মানুষ তখন প্রাণ বাঁচাতে আস্তাকুড়ে উচ্ছিষ্ট খুঁজেছে, কুকুর বিড়ালের সাথে লড়াই করেছে, রাস্তায় বুমিও খেয়েছে। লজ্জা ঢাকতে তখন মহিলারা মাছধরা জাল পড়তে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু ভারত বাংলাদেশের সে বিপদের দিনে এগিয়ে আসেনি। কোন আর্থিক সাহায্যও পেশ করিনি। বরং দেশটির সীমান্ত ফুটো করে বিদেশ থেকে প্রাপ্ত খয়রাতী মাল টেনে নিয়েছে নিজ দেশে। মুজিব তখন কয়েক কোটি ছাপার কাজ দিয়েছিল ভারতের ছাপাখানায়। ভারত তখন তার চেয়ে বহুগুণ বেশী গুণ বেশী নোট ছেপে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে রশাতলে ডুবিয়ে দেয়। এভাবে বাড়িয়েছে বাংলাদেশের মানুষের যাতনা ও মৃত্যু। বাংলাদেশ পরিণত হয় আন্তর্জাতিক ভিক্ষার ঝুলি। বিশ বছরের যুদ্ধেও দরিদ্র আফগানিস্তানের ভাগ্যে এমন খেতাব জুটেনি। জুটেনি ভিয়েতনামের ভাগ্যেও। একটি দেশকে ভিক্ষার ঝুলিতে পরিণত হতে যে শুধু যুদ্ধ লাগে না, বরং লাগে অবিরাম শোষণও -সেটিই সেদিন বাংলাদেশে সত্য রূপে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। ভারত যে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের বন্ধু নয়, বরং রক্ষক হলো একটি বিশেষ পক্ষের, প্রনব মুখার্জি সেটিই প্রকাশ করেছে। তার সে বক্তব্যে এটিই প্রমাণ হয়েছে, বাংলাদেশে ভারতের নিজস্ব এজেন্ডা রয়েছে। এবং সে এজেন্ডারে বাস্তবায়নে ভারতের কাছে আওয়ামী লীগ যে অপরিহার্য প্রনব মুখার্জি সেদিকেই ইঙ্গিত করেছেন।

নিজেদের রাজনৈতিক দখলদারিটা স্থায়ী করতে আওয়ামী লীগ এখন বাংলাদেশের মানুষের মনের ভূবনে আমূল পরিবর্তন আনছে। ইসলামী সভ্যতার নির্মানে শুরুতে ইরান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ বিশাল ভূ-খন্ডটি এক সময় মুসলিম উম্মাহর একটি শক্তিশালী অংশ ছিল। খোলাফায়ে রাশেদার পর আরবগণ যথন ভাতৃঘাতি সংঘাতে লিপ্ত হয় তখন কোরআনের বড় বড় মোফাচ্ছের, বিজ্ঞানী, চিকিৎস্যক, কবি-সাহিত্যিক ও দার্শনিক জন্ম নেয় ইরানে। ইমাম আবু হানিফা, আব্দুল কাদের জিলানী, আল ফারাবী, আল রাজি, ইবনে সিনা, ইমাম আল গাজ্জালী, শেখ সাদী, মাওলানা রুমী সহ বহু প্রতিভার জন্ম ইরানে। তারা শুধু মুসলিম উম্মাহর গৌরব ছিল সমগ্র মুসলিম উম্মাহর। প্রখ্যাত সমাজ-বিজ্ঞানী ইবনে খুলদুনের অভিমত, ইসলামের উদ্ভব আরবে হলেও ইসলামি সভ্যতার নির্মান ঘটে ইরানে। আব্বাসী খলিফার দুর্বল সময়ে সে ইরানই বিচিছন্ন হয়ে মুসলিম উম্মাহ থেকে। আর সে বিচ্ছিন্নতাকে স্থায়ী রূপ দিতেই ইরানের জাতিয়তাবাদী শাসকেরা পাল্টে দেয় দেশটির ধর্মীয় চেতনা। জন্ম দেয় শিয়া মতবাদ। সাফাভী শাসকদের সে বলপূর্বক ধর্মীয় পরিবর্তনে লক্ষ লক্ষ সূন্নী মুসলমানকে হত্যা করা হয়। ফলে নিছক এক রাজনৈতিক প্রয়োজনে এককালের সূন্নী ইরান পরিণত হয় শিয়া রাষ্ট্রে। প্রতিবেশী মুসলিম রাষ্ট্র থেকে এভাবেই গড়া হয় ইরান ঘিরে বিভক্তির বিশাল প্রাচীর। ইরানীরা মুখে যাই বলুক আজও তারা সমগ্র মুসলিম উম্মাহ থেকে বস্তুতঃ পৃথক সে ঐতিহাসিক পৃক্ষাপটে। এদেশটির শিয়া শাসকেরা ইউরোপীয় শাসকদের সামরিক সহয়তা নিয়ে বার বার হামলা চালিয়েঠেছ উসমানিয়া খেলাফতের পূর্ব সীমান্তে। মুসলিম সেনাবাহিনী যখন সমগ্র বলকান, গ্রীস, ক্রিমিয়াসহ বিশাল পূর্ব ইউরোপ দখল করে অস্ট্রিয়ার রাজধানী অবরুদ্ধ করে ফেলে সেসময় ইরান বিশাল চাকু ঢুকিয়ে দেয় উসমানিয়া খেলাফতের পিঠে। পূর্ব সীমান্তে শুরু হয় শিয়া হামলা। মুসলিম সেনাদল তখন ভিয়েনা থেকে অবরোধ তুলে পিছু হটতে বাধ্য হয়। ইরানের সে হামলা না হয়ে ইউরোপের ইতিহাস হয়তো ভিন্ন ভাবে লিখিত হতো। সে সময় থেকেই ইরানের প্রতিভা ও সামর্থ নানা ভাবে ব্যয় হয়ে আসছে মুসলমানদের রক্ত ঝরাতে। সম্প্রতি আফগানিস্তান ও ইরাকে যে মার্কিন হামলা হলো তাতে সাহায্য ও সর্বাত্মক সমার্থণ দিয়েছে ইরান। এখন তারা সাহায্য দিচ্ছে ভারত ও পাশ্চাত্যের পাকিস্তান বিরোধী আগ্রাসনে। বাংলাদেশও একই ভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে উপমহাদেশে মুসলিম শক্তির উত্থান রুখবার কাজে। অথচ ১৯৪৭য়ে বাংলাদেশের মুসলমানদের কারণেই জন্ম নিয়েছিল বিশ্বের সর্ব বৃহৎ ও সবচেয়ে শক্তিশালী মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান। এ রাষ্ট্রটি গড়ায় যে সংগঠনটি কাজ করেছিল সেটি হলো মুসলিম লীগ। এবং সে মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা ঘটেছিল ঢাকায়। পাকিস্তান প্রস্তাবটিও উত্থাপন করেছিল বাংলার ফজলুল হক। কিন্তু পরবর্তিতে আওয়ামী লীগ আবির্ভুত হয় কাফের শক্তিবর্গের অতি বিশ্বস্ত মিত্ররূপে। তাদের কাছে ইসলাম ও মুসলিম স্বার্থের প্রতি অঙ্গিকারবদ্ধতা চিত্রিত হয় সাম্প্রদায়িকতা রূপে।এজন্যই তাদের বিজয়টি ভারতসহ সকল মুসলিম বিরোধী শক্তির কাছে এতটা উৎসব পরিণত হয়। এমন একটি ইসলাম বিরোধী চেতনার কারণে প্রতিবেশী দেশে হাজার হাজার মুসলিমকে পুড়িয়ে হত্যা বা সেদেশের মুসজিদ ধ্বংস করা হলেও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মুখে কোন প্রতিবাদের ধ্বনি উঠে না, প্রতিবাদে রাজপথেও নামে না। পত্রিকায় কোন বিবৃতিও দেয় না।

 

লক্ষ্য ইসলামি চেতনাবিনাশ 

ইসলামি চেতনা থেকে ভিন্নতর এক চেতনা-রাজ্য নির্মানেরই স্বার্থেই আওয়ামী লীগ সরকার তার সকল সামর্থ বিণিয়োগ করছে ইসলামি চেতনার বিনাশে। ইরানের স্বৈরাচারি শাসকেরা যেখানে রাষ্ট্রীয় অর্থে পরিচর্যা দিয়েছিল শিয়া ধর্মমতের, এরা শেখানে দিচ্ছে সেকুলার চেতনার। এজন্যই মুসলিম জনগণের দেওয়া রাজস্বের বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে নাচগাণ শেখানোর কাজে। অথচ ইসলামে নাচগান হারাম। কারণ মানুষের এ পার্থিব জীবন একটি পরীক্ষা কেন্দ্র। নারীপূরুষ এখানে ব্যস্ত তাদের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা দিতে। এ পরীক্ষায় ফেল করলে তারা কোন চাকুরি হারাবে বা ডিগ্রি পেতে ব্যর্থ হবে তা নয়। বরং পরিণতিটি হবে অতি ভয়ংকর। নিক্ষিপ্ত হবে জাহান্নামের দাউদাউ করে জ্বলা বিশাল আগুণে। পরীক্ষার কোন হলে কি নাচগানের আয়োজন চলে? তাই প্রকৃত মুসলমানদের হাতে ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা নির্মিত হলেও নাচগান পরিচর্যা পায়নি। যখন পেয়েছে তখন মুসলমান আর প্রকৃত মুসলমান থাকেনি। তারা পরিনত হয়েছে শয়তানের সেবকে। ইসলামের সত্যপথ থেকে মুসলমান তরুন-তরুনীদের বিভ্রান্ত করার কাজে নাচগান সব সময়ই একটি সফল হাতিয়ার। শয়তানী শক্তিবর্গ অতীতের ন্যায় আজও সেটি সর্বত্র প্রয়োগ করছে। বাংলাদেশে যতই বাড়ছে কাফেরদের পুজি বিণিয়োগ ততই বাড়ছে এ শয়তান হাতিয়ারটির ব্যাপক প্রয়োগ। কাফেরদের অর্থে এনজিওগুলি এখন নাচগানের চর্চাকে মাঠপর্যায়ে নিয়ে গেছে। পাপচর্চার এ ক্ষেত্রগুলো এখন প্রতিষ্ঠান বা ইনস্টিটিউশন রূপে গড়ে উঠেছে। ফলে এনজিওগুলোর প্রতিষ্ঠিত স্কুলের হাজার হাজার মেয়েরা এখন আর নেচেগেয়ে আনন্দ প্রকাশে কোনরূপ সংকোচ বোধ করে না। আর যেখানে নাচগাণ বাড়ে সেখানে বাড়ে মদ্যপান ও ব্যাভিচার। আর বাংলাদেশে সেগুলিও বাড়ছে সমান তালে। বেশ্যাবৃত্তি তাই এখন আর পতিতাপল্লিতে সীমাবদ্ধ নয়, সেটি উপচিয়ে আবাসিক মহল্লায় নেমে এসেছে। ফল দাড়িয়েছে এই ব্যভিচার এখানে সংক্রামিত করছে বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষকে। প্রায় দশ বছর আগের এক জরীপে প্রকাশ, বাংলাদেশের অর্ধেকের বেশী যুবক বিবাহের আগেই যৌন কর্মে লিপ্ত হয়। বাংলাদেশের ন্যায় একটি মুসলিম দেশের জন্য এটি এক ভয়াবহ খবর।

ইসলামি চেতনার বিনাশ যে কতটা মহামারি রূপ পেয়েছে এ হলো তার নজির। পাশ্চাত্য-করণের এটিই হলো স্বাভাবিক রূপ। পাশ্চাত্য দেশে এটি আর কোন হারাম কর্ম নয়, বরং স্বীকৃতি পেয়েছে বৈধ-কর্ম রূপে। তাদেরকে বলা হয় সেক্স-ওয়ার্কার। সে অভিন্ন পাশ্চাত্য মূল্যবোধই বিশ্বের কাফের শক্তিবর্গ এখন বাংলাদেশেও প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। সে লক্ষ্যেই শুরু করেছে সোসাল ইঞ্জিনীয়ারিং। একাজে লিপ্ত এমন কি জাতিসংঘও। ইঞ্জিনীয়ারগন এতকাল রাস্তাঘাট-ব্রিজ নির্মান করতো, আর এখন সোসাল ইঞ্জিনীয়ারীংয়ের নামে তারা তাদের অর্থ, মেধা ও প্রযুক্তির বিণিয়োগ করছে সেকুলার ধাঁচের সমাজ-সংস্কৃতি, চেতনা ও রাষ্ট্র নির্মানের। আর একাজে প্রথম প্রয়োজন হলো, জনগণের চেতনা রাজ্য থেকে ইসলামের অপসারণ। যাকে বলা হয় ডি-ইসলামাইজেশন। বাংলাদেশের বহু টিভি নেট-ওয়ার্ক, অসংখ্য পত্র-পত্রিকা, শত শত এনজিও কাজ করছে সে সোসাল ইঞ্জিনীয়ারিং প্রজেক্টের আঁওয়াতায়। ইসলামের নবজাগরণ প্রতিরোধের এটিই হলো তাদের মূল স্ট্রাটেজি। একাজে কাফের দেশ থেকে আসছে হাজার হাজার কোটি টাকার পুঁজি। আল্লাহর দ্বীনের প্রচার ও প্রসার রূখতে এটিই এখন কাফের শক্তিবর্গের সম্মিলিত গ্লোবাল স্ট্রাটেজী। এলক্ষ্যে তারা মুসলিম দেশের ইসলামে অঙ্গিকার-শূন্য দলগুলোর সাথে গড়ে তুলেছে কোয়ালিশন। বাংলাদেশের সরকার ও তার সহযোগী সেকুলার এনজিওগুলো হলো সে কোয়ালিশনেরই অংশ।

 

নারী রপ্তানীর অর্থনীতি

সরকারের ইসলামি চেতনা বিনাশের কাজ দ্রুত ফল দিচ্ছে। বাংলাদেশে ইসলামি চেতনাধারীদের নানা ভাবে হেয় করা বা নির্যাতন করা এখন তাই উৎসবকর্ম। রাজপথে তাদের লগি বৈঠা নিয়ে দাড়ি-টুপিধারিদের হত্যা করলেও পত্রিকার পাতায় সেটি নিন্দনীয় না হয়ে বরং প্রশংসনীয় হয়। এরই আরেক সফলতা হলো, বাংলাদেশ এখন বাজার ধরেছে নারী রপ্তানিতেও। দেশেটি এখন থাইল্যান্ড, ফিলিপাইনের ন্যায় দেশেল পথ ধরেছে। বিদেশী দুর্বৃত্তদের গৃহেই শুধু নয়, বাঙ্গালী পতিতাদের ভিড় বেড়ে চলেছে কোলকাতা, বোম্বাই ও করাচীর পতিতাপল্লিতেও। অর্থের পিছে দৌঁড়াতে থাকলেও সেটি যে কত দ্রুত জাহান্নামের পথে নিয়ে যায এ হলো তার নমুনা। অথচ বাংলাদেশের সেকুলারদের মূল এজেন্ডা হলো নরনারীদের অর্থের পিছে দৌড়াতে শেখানো, সত্যদ্বীন বা ইসলামের পিছে নয়। ইসলামের পিছে দৌড়ানোকে বরং তার মৌলবাদ বলে শুধু নিন্দনীয় নয়, নির্মূলযোগ্যও ঘোষণা করছে। জনগণের মন থেকে ইসলামি চেতনা বিলুপ্তির লক্ষ্যেই এখন ২১শে ফেব্রেয়ারি, ২৫ শে মার্চ, ১৬ই ডিসেম্বর, পহেলা বৈশাখ, রবীন্দ্র জয়ন্তির ন্যায় দিবসগুলি আর ঐ বিশেষ দিনে পালিত হয় না, পালিত হচ্ছে মাসাধিক কাল ব্যাপী। তখন ইসলামি চেতনা বিনাশের পাঠদানে পাঠশালা পরিণত হয় সারাদেশ। অথচ ইসলামের পরিচিতি বাড়াতে আওয়ামী লীগ একটি আলোচনা সভা বা সেমিনারের আয়োজন করেছে তার নজির নেই। অথচ এরাই বলে “আমরাও মুসলমান”। ইসলামি চেতনা বিনাশের কাজে রাষ্ট্রীয় পুঁজি বিণিয়োগের বিপুল পুঁজি বিণিয়োগ হচ্ছে বিশ্বের কাফের দেশগুলোর। সে পুঁজিতে দেশের নগর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জে বিপুল ভাবে ফুলে ফেঁপে উঠছে বাংলাদেশের হাজার হাজার এনজিও। কাফের রাষ্ট্রগুলোর ইসলাম-বিরোধী এজেন্ডা বাস্তবায়নে এরাই হলো তাদের ঘনিষ্ট মিত্রপক্ষ। সে অভিন্ন লক্ষ্য বাস্তবায়নে গড়ে তুলেছে এক নিরেট পার্টনারশিপ।

 

সাংস্কৃতিক আধিপত্য থেকে রাজনৈতিক আধিপত্য

আদর্শিক বা সাংস্কৃতিক আধিপত্যের পথ ধরেই আসে রাজনৈতিক আধিপত্য। তখন সে রাজনৈতিক আধিপত্য স্থাপনে শত্রু পক্ষের আর যুদ্ধ লড়তে হয়নি। শুরু থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ সকল সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের স্ট্রাটেজী ছিল অন্যদের অভ্যন্তরে নিজেদের সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক দ্বীপ গড়া। তুরস্ক, মিশর, পাকিস্তানসহ অধিকাংশ মুসলিম সে দ্বীপগুলো হলো ক্যান্টনমেন্ট, অফিসপাড়া, আদালত, পতিতালয় ও ব্যাংকিং সেক্টর। এগুলোর সীমান্ত পাশ্চাত্য চেতনা ও মূল্যবোধের সাথে একাকার। ইসলামের হারাম-হালালের বিধান এসব জাগায় অচল। তারাই এখন পাশ্চাত্যের কাফের শক্তির একনিষ্ঠ মিত্র। পাকিস্তানে তারাই হাজার হাজার মুসলমানদের হত্যা করছে অতিশয় আনন্দ চিত্তে। তুরস্কে তার স্কুলের মেয়েদের মাথায় রুমাল বাধতে দিতেও রাজী নয়। মিশরে এরা ইসলামপন্থিদের রাজনীতির ময়দানে আসতে দিতেও রাজী নয়। এখন তারা সেরূপ অভিন্ন দ্বীপ গড়ছে রাজনীতির অঙ্গনেও। আর বাংলাদেশের রাজনীতির আওয়ামী লীগ হলো তাদের সে দ্বীপ। একজন পশ্চিমা দুর্বৃত্ত বাংলাদেশের পতিতালয়ে যে সমাদার সেটি চেতনাগণ অভিন্নতার কারণেই। তেমনি এক অভিন্নতার কারণেই ভারতীয় নেতারাও অতি আপনজন রূপে গৃহীত হয় আওয়ামী লীগ নেতাদের আসরে। এ সম্পর্ক অতি গভীরতা পেয়েছিল আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবের আমলেই। ভারতীয় স্বার্থের সেবক রূপে দায়িত্ব-পালনের অঙ্গিকার নিয়ে ষাটের দশকেই তিনি আগড়তলা গিয়েছিলেন। ভারতীয় গুপ্তচর চিত্তরঞ্জন সুতোর বা কালিপদ বৈদ্যরা ছিলেন সে আমল থেকেই ছিলেন তারা ঘনিষ্ঠ সহচর। তিনিই ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিলেন বাংলাদেশের “তিন বিঘা” ভূমি । সীমান্ত বাণিজ্যের নামে তিনিই দেশের সীমান্ত তুলে দিয়েছিলেন, এবং এভাবে সুযোগ করে দিয়েছিলেন অবাধ লুণ্ঠনের। যার ফলে দুর্ভিক্ষ নেমে এসেছিল বাংলাদেশীদের জীবনে। তিনিই অনুমতি দিয়েছিল ফারাক্কা বাঁধ চালুর। এখন ভারত পরিকল্পনা নিচ্ছে ব্রম্মপুত্র নদীর উজানে “টিপাই বাধ” দেওয়ার। দখলে নিচ্ছে বঙ্গপোসাগরে জেগে উঠা তালপাট্টি দ্বীপ। ভারত বাংলাদেশের জন্য নেপালে যাওয়ার জন্য ২০-৩০ মাইলের করিডোর দিতে রাজি হচ্ছে না, অথচ বাংলাদেশের মাঝখান দিয়ে ৫০০ মাইলের করিডোর চায়। ভারতের মধ্য দিয়ে নেপাল ও ভূটানে যাওয়ার করিডোর বাংলাদেশের যতটা অপরিহার্য অবস্থা সেরূপ নয় ভারতের জন্য। ভারত তার পূর্বাঞ্চলে যেতে পারে তার নিজ ভূমির মধ্য দিয়ে। অথচ এরপর চাপ দি্চ্ছে সে করিডোর আদায়ে এবং আওয়ামী লীগ তা নিয়ে বিবেচনাও করছে।

 

আওয়ামী লীগের বিজয় ও বিপর্যয়ের কবলে বাংলাদেশ

আওয়ামী লীগের বিজয়ে বাংলাদেশের উপর বিপর্যয় আসছে নানা ভাবে। যখনই এ দলটি ক্ষমতায় গেছে তখনই বিপর্যয় এসেছে দেশের সেনাবাহিনীর উপর। মুজিব আমলে সেনাবাহিনীর চেয়ে বেশী গুরুত্ব পেয়েছিল রক্ষিবাহিনী। আওয়ামী লীগের এবারের বিজয়ে দেশের রাজধানীতে নিহত হলো ৫৭ জন সেনা অফিসার। রক্তাত্ব শত্রুতা সৃষ্টি হলো সেনাবাহিনী ও বিডিআরের মাঝে। পিলখানার রক্ত শুকালেও মনের মাঝে যে বিভক্তি ও ঘৃনা সৃষ্টি হলো সেটি কি দূর হবার? এখন কথা উঠছে বিডিআরের বিলুপ্তির। সরকার ভাবছে, বিডিআরের নাম ও লেবাস পাল্টিয়ে আরেকটি বাহিনী গড়ার। সরকারের ধারণা, সমস্যা শুধু বিডিআর নামটি নিয়ে। ভাবটা যেন, ফাইলপত্র ও অফিস আদালতের গা থেকে ‘বিডিআর’ নামটি বা তাদের লেবাসটি উঠে গিয়ে সেনা-অফিসারদের বুকে গুলি চালালিয়েছে। তাই আওয়ামী লীগ ‘বিডিআর’ নামটি ও তার লেবাসটি বিলূপ্ত করতে চায়। কিন্তু যারা গুলি চালালো, যারা সে হত্যাযজ্ঞে নেতৃত্ব দিল তাদের বিচারে অগ্রগতি কোথায়?

দুর্যোগ নেমেছে দেশের শিক্ষাঙ্গনে। চরদখলের ন্যায় সেখানে দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আওয়ামী ক্যাডার বাহিনীর। শুধু ভিসি বা প্রিন্সিলের অফিসেই নয়, দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আবাসিক হলগুলোর সিটগুলোর উপরও। আওয়ামী ক্যাডার বাহিনীর অনুমতি ছাড়া সেখানে কেউ থাকতে পারবে না। একই রূপ হাত পড়েছে দেশের কৃষি ও শিল্পাঙ্গনেও। সরকারের বাণিজ্যনীতির কারণে ভারত থেকে অবাধে ঢুকছে ভারতীয় নিম্মমানের সস্তাপন্য। ফলে বাজার হারাচ্ছে বাংলাদেশের নিজস্ব পণ্য। বাংলাদেশের কৃষকগণ তাই বাজার না পেয়ে রাস্তায় উপর তাদের দুধ ঢেলেছে। বন্ধ হয়েছে দেশের নিজস্ব সূতা তৈরীর কারখানা। হাত পড়েছে দেশের তাঁতীদের গায়েও। মুজিবামলেও এমনটিই ঘটেছিল। তখন দেশী কারখানায় তালা লাগানো শুরু হয়েছিল। আগুনে ভস্মিভূত হয়েছিল বহু পাটের গুদাম। ভিক্ষাবৃত্তি ছাড়া দেশের জন্য তখন আর রাস্তাই খোলা রাখা হয়নি।

 

আক্রোশ ইসলামের বিরুদ্ধে

তবে আওয়ামী সরকারের মূল আক্রোশ শুধু শিক্ষা, শিল্প, কৃষি বা সেনাবাহিনীর উপর নয়, বরং  সেটি ইসলাম ও তার মৌল-বিশ্বাসের প্রতি। এটিকেই তারা তাদের রাজনীতির মূল শত্রু ভাবে। ইসলামের সে বিশ্বাসকে মৌলবাদ বলে সেটির নির্মূলে তারা কোঁমড় বেধেছে। সম্প্রতি তারা উদ্যোগ নিয়েছে, দেশের শাসনতন্ত্র থেকে “সর্বশক্তি মহান আল্লাহর উপর আস্থা ও বিশ্বাস” কথাটি উচ্ছেদ করবে। এ উচ্ছেদ কাজে তারা দেশের সেকুলার আদালতকে হাতিয়ার রূপে বেছে নিচ্ছে। অতীতে দেশের সেকুলার আদালত থেকে এ রায় হাসিল করেছিল যে “সর্বশক্তি মহান আল্লাহর উপর আস্থা ও বিশ্বাস” কথাটি দেশের শাসতনন্ত্র বিরোধী। বিএনপি সরকার ঢাকা হাইকোর্টের সে রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করিছিল। কিন্তু বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে সে রায়টি এতটাই মনঃপুত হয়েছে যে সে রায়ের বিরুদ্ধে তারা আর আপিল করবে না। “সর্বশক্তি মহান আল্লাহর উপর আস্থা ও বিশ্বাস” কথাটি এমনিতেই বাতিল হয়ে যাবে। এভাবেই বাতিল হবে ইসলামের একটি মৌলিক বিশ্বাস। সরকার এখন উদ্যোগ নিয়েছে দেশের সেকুলার আদালতের সাহায্যেই তারা সংবিধান থেকে উচ্ছেদ করবে “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম”। বাংলাদেশের আদালতে ব্যভিচার কোন হারাম কর্ম নয় যদি সেটি দুইপক্ষের সম্মতিতে হয়। হারাম নয় সূদও। কিন্তু সে আদালতেই নিষিদ্ধ হলো “সর্বশক্তি মহান আল্লাহর উপর আস্থা ও বিশ্বাস”। এমন আদালত থেকে মুসলমান আর কি আশা করতে পারে? এজন্য তো কোরআনে শুধু নামায-রোযা-হজ-যাকাদের তাগিদ দেওয়া হয়নি। তাগিদ দেওয়া হয়েছে শরিয়ত ভিত্তিক আদালতের প্রতিষ্ঠায়। ইসলামে এটি অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জমিনের উপর কাফেরদের দখলদারীর বিলুপ্তি ও আল্লারহর সার্বভৌমত্বের প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ তো এ শরিয়ত প্রতিষ্ঠার কাজ। একাজে যার উদ্যোগ নাই মহান আল্লাহতায়ালা তাকে কাফের, জালেম ও ফাসেক এ তিনটি বিশেষণে আখ্যায়ীত করেছেন। সুত্রঃ সুরা মায়েদার পর পর তিনটি আয়াত (৪২,৪৩ ও ৪৪)। চোর-ডাকাত, ব্যাভিচারী, সূদখোর বা খুনীকেও কোরআনের কোথাও তিনি এভাবে আখ্যায়ীত করেননি। এ দায়িত্ব তাই শুধু মসজিদ-মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে সাধিত হতে পারে না। শরিয়তের প্রতিষ্ঠা এখানে অপরিহার্য। শয়তানের মূল শত্রুতাটিও মূলতঃ এখানে, নামায-রোযা-হজ-যাকাত নিয়ে নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের তাবত কাফের দেশ মুসলমানদের মসজিদ স্থাপনে বাধা দেয় না। বরং জমি ও অর্থ দিয়ে সাহায্যও করে। ব্রিটিশ সরকার এককালে ভারতে আলিয়া মাদ্রাসাও প্রতিষ্ঠা করেছে। হোটাইস হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইফতারির দাওয়াতও দেয়, ঈদের পূর্ণঃমিলনী করে। কিন্তু বিশ্বের কোথাও শরিয়ত প্রতিষ্ঠার সামান্য প্রমান পেলে তারা সেখানে তৎক্ষনাৎ যুদ্ধ শুরু করে। আফগানিস্তানে মার্কিন হামলার মূল কারণ তো এটিই। একই লক্ষে তারা এখান মিজাই মারছে পাকিস্তানের অভ্যন্তুরে। এবং কোয়াশিন গড়ছে পাকিস্তানের সেকুলার সরকার ও আর্মির সাথে।

সব গরুই যেমন ঘাস খায়, তেমনি সবদেশের সেকুলারদের আচরণ একই রূপ ইসলাম বিরোধী। তুরস্কের আদালতে কতজন ব্যাভিচারী বা সূদখোর দন্ডিত হয়েছে সে খবর নেই। কিন্তু সেদেশের একজন শিশুও আদালত থেকে মাথায় রুমাল বাধার অনুমতি পায়নি। রুমাল বাধা সেখানে অপরাধ। অথচ মহিলাদের মাথা না-ঢাকা বা বিপর্দা হওয়া হলো আল্লাহর বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট বিদ্রোহ। এমন বিদ্রোহীর নামায-রোযা কি কবুল হয়? কবুল হয় কি কোন দোয়া। সম্ভব হয় কি তার পক্ষে মুসলমান হওয়া? কারণ, মুসলমান হওয়ার অর্থই আল্লাহর প্রতিটি হুকুমের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য। আর বিদ্রোহীকে বলা হয় কাফের। আল্লাহর বিরুদ্ধে সে বিদ্রোহের সে ধ্বনিই এখন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে। এক প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগ সরকারের এ্যাটর্নি জেনারেল সম্প্রতি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” সংবিধানের কোন অংশই নয়। তার াভাষায় তাই সেটির সংবিধানে থাকার কোন অধিকারই নাই। যেখানে ইসলাম ও আল্লাহর নাম, তাদের কাছে সেটিই সাম্প্রদায়ীকতা। আল্লাহর উপর আস্থা তাদের কাছে যেমন সাম্প্রদায়িক কুসংস্কার, তেমনি প্রগতি-বিরোধীও। তাদের সাফ জবাব, এমন কুসংস্কার (?) ও প্রগতি-বিরোধী (?) বিশ্বাসকে তারা শাসনতন্ত্রে স্থান দিতে রাজি নয়। শুধু তাই নয়, তারা বাদ দিচ্ছে রাষ্ট্রীয় ধর্ম রূপে ইসলামকেও। কথা হলো, এমন কাজ কি কোন ঈমানদারের হতে পারে? মুসলমানের কাজ তো শুধু শাসনতন্ত্রে ইসলামকে রাষ্ট্রীয় ধর্ম রূপে ঘোষনা দেওয়া নয়, বরং দায়িত্ব হল আল্লাহর বিধানের পরিপূর্ণ প্রতিষ্ঠা করা। সে শুধু মুখেই আল্লাহু আকবর বলবে না, কর্মের মধ্য দিয়েও সে সাক্ষী দিবে। সেটি শুধু মসজিদে নয়, শাসতন্ত্রেও ধ্বণিত হবে। মার্কিনীরা ডলারের নোটের উপর বড় বড় হরফে লিখে “WE TRUST IN GOD” অর্থ আমরা আল্লাহর উপর আস্থা রাখি। আল্লাহর নির্দেশকে তারা কতটুকু মানে এখানে সেটি বড় কথা নয়, আল্লাহর প্রতি এটি তাদের ণ্যূনতম ভদ্রতা বা শালীনতা। কিন্তু মহান আল্লাহর সাথে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা সে শালীন আচরণটুকুও করতে রাজী নয়। আল্লাহর বিরুদ্ধে তাদের অশালীন ও অভদ্র আচরণের মাত্রা এতটাই তীব্র যে, আল্লাহর আইন তথা শরিয়তকে তারা বাংলাদেশের আদালত-গৃহে ঢুকতে রাজী নয়। এমন কি বরদাশত করতে রাজি নয় শাসনতন্ত্রে আল্লাহর নামকেও। আল্লাহর সাথে এর চেয়ে বড় অশালীন ও উদ্ধত আচরন আর কি হতে পারে? আরও লক্ষণীয়, আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নামের সাথে এমন অশালীন আচরনের পরও তা নিয়ে রাজপথে কোন প্রতিবাদ নেই, কোন আন্দোলন নাই। এরপরও কি একটি দেশের জনগণ আল্লাহর নেয়ামত পেতে পারে? এটি তো আযাবপ্রাপ্তির পথ। কোরআনে বর্নিত আদ-সামুদ গোত্র, বনি ইসরাইল ও মাদাইনের অধিবাসীদের অবাধ্যতা বা আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ কি এর চেয়েও গুরুতর ছিল। তাদের কাছে আল্লাহর সুস্পষ্ট কোরআন ছিল না যা বাংলাদেশীদের কাছে আছে। কিন্তু সে কোরআনী বিধানের প্রয়োগটি কোথায়?

 

মুসলিম হওয়ার দায়বদ্ধতা

মুসলিম হওয়ার সবচেয়ে দায়বদ্ধতা হলো, সে হবে আল্লাহর অতি অনুগত খলিফা বা প্রতিনিধি। রাষ্ট্রের প্রতিনিধির কাজ হলো রাষ্ট্রের আইনের সর্বত্র অনুসরণ ও প্রয়োগ। সে দায়িত্ব “আমিও মুসলমান” -শুধু এ কথা বলার মধ্য দিয়ে পালিত হয় না। আল্লাহর খলিফা বা প্রতিনিধি হওয়ার চেতনা মুসলিম মনে প্রচন্ড এক বিপ্লবী চেতনার জন্ম দেয়। সরকারের ডিসি, এসপি বা কমিশনার হওয়ার চেয়েও এ চেতনার শক্তি এবং দায়িত্ববোধ অনেক বেশী। কারণ সরকারের ডিসি, এসপি বা কমিশনার হওয়ায় কিছু বেতন বা বাড়ী-গাড়ী জুটে, বেহেশত পাওয়ার প্রতিশ্রুতি তো মেলে না। এমন এক চেতনা নিয়ে ঈমানদার যখন জায়নামাযে দাঁড়াবে তখন সে আনুগত্যে সেজদায় লুটিয়ে পড়বে। আর যখন সে রাজনীতিতে প্রবেশ করবে তখন আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও তাঁর আইন তথা শরিয়তকে প্রতিষ্ঠার কাজে নিজের জানমাল বিলিয়ে দিবে। নবীজীর শতকরা ৬০ ভাগ সাহাবা সে কাজে শুধু অর্থ ও শ্রম-দানই করেননি, প্রাণও দিয়েছেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীগণের বিপুল ভাগ নিজেদের মুসলমান রূপে দাবী করলেও সে বিণিয়োগটি কই? দায়িত্ব-পালন দূরে থাক, তারা এখন কোমড় বেঁধেছে সে দায়িত্বপালনের চেতনাকে বিলুপ্ত করায়। খেলাফতের দায়িত্বপালনের চেতনাকে তারা বলছে মৌলবাদ। বলছে রাজাকারের চেতনা। আর সে ইসলামি চেতনার বিলুপ্তি সাধনের চেতনাকে বলছে একাত্তরের চেতনা। মহান আল্লাহতায়ালার  সাথে এমন অশালীন ও অবাধ্য আচরণ কি ব্যক্তি ও জাতির জন্য কোন কল্যাণ ডেকে আনে? আল্লাহর বিরুদ্ধে মুজিবের অবাধ্য আচরণ সত্তরের দশকে বাংলাদেশের বুকে আযাব ডেকে এনেছিল। লক্ষ লক্ষ মানুষ তখন না খেয়ে বা প্রলয়ংকরি জলোচ্ছ্বাসে ভেসে গিয়ে মরেছে। আদ-সামুদ গোত্র, মাদানের অধিবাসী, নমরুদ বা ফিরাউনের বাহিনীরও এত লোকক্ষয় হয়নি যতটা বাংলাদেশের বুকে ঘটে যাওয়া সেসব প্রলয়ংকরি আযাবে। প্রচন্ড তান্ডব নেমে এসেছিল মুজিবের পরিবারের উপরও। এমন ঘটনা গাছের ঝরা-পাতা পড়ার ন্যায় মামূলী ব্যাপার ছিলনা। অথচ ঝরে পড়া পাতাটিও মাটিতে পড়ে আল্লাহর অনুমতি নিয়ে। আল্লাহর অনুমিত ছাড়া কোন সামুদ্রীক ঝড়ের কি সামর্থ আছে মানুষ হত্যা দূরে থাক গাছের একটি মরা পাতা ফেলার? মানুষ তো বাচে মরে তো আল্লাহর অনুমতি নিয়েই। প্রশ্ন হলো আওয়ামী লীগ নেতাদের কি সে বিশ্বাস আছে? আল্লাহর নিয়ামতকে নিয়ামত আর আযাবকে আযাব বলার সামর্থ সবার থাকে না। সে সামর্থ আসে একমাত্র ঈমানের বলে। সেটিই হলো ইসলামি চেতনা। সেকুলার চেতনায় সে সামর্থ নির্মিত হয় না। এজন্যই আল্লাহর আযাবকে তারা আযাব বলতে চায় না। বলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। আর এভাবে আযাবকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলে আল্লাহর কুদরতকেই তারা আড়াল করতে চায়। আড়াল করতে চায় আল্লাহর সাথে তাদের কৃত কদর্য আচরণকেও। অথচ ঈমানদার হওয়ার জন্য চেতনার এ সামর্থটুকু অতি ণ্যূনতম প্রয়োজন। এটুকু না থাকলে কি তাকে মুসলমান বলা যায়? আর তেমন একটি বিশ্বাস থাকলে কোন ব্যক্তি কি “সর্বশক্তি মহান আল্লাহর উপর আস্থা ও বিশ্বাস” এর ন্যায় কথাটি শাসতন্ত্র থেকে বিলুপ্তি করতে পারে? আওয়ামী ক্ষমতায় এসেছিল নতুন প্রতিশ্রুতিতে। কিন্তু কার্যতঃ তারা অনুসরণ করছে শেখ মুজিবের সেই পুরনো নীতিকেই। ফলে মুজিবী আমলের ন্যায় আজও চলছে আল্লাহর আযাবকে অতি দ্রুত নীচে নামিয়ে আনার কাজে। সে লক্ষ্যেই আজ তীব্রতা পাচ্ছে আল্লাহর প্রকাশ্য অবাধ্যতায়। ষড়যন্ত্র হচ্ছে ইসলাম ও ইসলামের অনুসারিদের বিরুদ্ধে। ইসলামপন্থিদের নির্মূলে আঁতাত গড়া হচ্ছে ইসলাম-বিরোধী কাফেরদের সাথে। ফলে বিপর্যয় যে অনিবার্য তা নিকে সামান্যতম সন্দেহ আছে? তবে কথা এহলো এ অবস্থায় দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কোন পথটি বেছে নিবে? আল্লাহর বিরুদ্ধে এমন বিদ্রোহের মুখে জনগণের নীরবতা কি আদৌ ঈমানদারীর লক্ষণ? আল্লাহর খফিফার দায়িত্ব কি এ বিদ্রোহের নীরব দর্শক হওয়া। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোন বিদ্রোহ হতে দেখলে কোন রাজকর্মচারি কি সেটি নীরবে দেখে? তাতে কি তার চাকরি থাকে? অথচ মুসলমানদের অপরাধ আজ এরচেয়েও গুরুতর। আল্লাহর খলিফা বা প্রতিনিধি হওয়া সত্ত্বেও মুসলমানগণ আল্লাহর বিরুদ্ধে পরিচালিত এ বিদ্রোহের মুখে নীরব বা নিরপেক্ষ থাকছে তা নয়, বরং ভোট দিচ্ছে, অর্থ দিচ্ছে, মেধা ও শ্রম দিচ্ছে সে বিদ্রোহী শক্তিটির পক্ষে। ফলে আযাব শুধু সরকারকে নয়, জনগণকেও যে ঘিরে ধরবে তা নিয়ে কি সামান্যতম সন্দেহ আছে। তখন শান্তি, সুখ, নিরাপত্তা বিদায় নেয় প্রতিটি ঘর থেকে। নিরাপত্তার খোজে মানুষ তখন ঘর ছেড়ে বনে জঙ্গলেও আশ্রয় নেয়। বাধ্য হয় দেশ ছাড়তেও। মুজিব আমলে তো সেটিই ঘটেছিল। আজও কি বাংলাদেশ অতি দ্রুততার সাথে সেদিকেও ধেয়ে চলছে না?

 




আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসের রাজনীতি

ডাকাতি ফ্যাসীবাদের 

আগুনের উত্তাপ আর কয়লার কালো রং কখনোই আলাদা হয় না। আওয়ামী লীগ থেকেও তেমনি আলাদা করা যায় না তার চরিত্র, ঐতিহ্য ও দলীয় সংস্কৃতি। সেটি যেমন গণতন্ত্র ধ্বংসের, তেমনি অটল ভারত-প্রেম এবং রাজনৈতিক সন্ত্রাসের। এবং সেটি দলটির জন্ম থেকেই। প্রতিদেশে প্রতিটি রাজনৈতিক দলেরই একটি আদর্শ থাকে। মানুষ সে আদর্শ বাস্তবায়নে দলবদ্ধ হয়,সে লক্ষে শ্রম দেয়,মেধা দেয়,অর্থ দেয় এবং প্রয়োজনে প্রাণও দেয়। সে লক্ষ্যে সমাজতন্ত্রিদের রয়েছে যেমন সমাজতান্ত্রিক দল, তেমনি ইসলামপন্থিদের রয়েছে ইসলামি দল। কিন্তু আওয়ামী লীগের আদর্শ কোনটি? দলের আদর্শ ধরা পড়ে দলের নীতি,কর্ম ও আচরণে। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা বহুকাল আগে,দলটি কয়েকবার ক্ষমতায়ও গেছে। ফলে গোপন থাকেনি তার নীতি,কর্ম ও আচরণ। আর তাতে প্রকাশ পেয়েছে আদর্শ। মুখে গণতন্ত্রের কথা বললেও আওয়ামী লীগের ইতিহাস,বহুদলীয় গণতন্ত্রকে কবরে পাঠানোর। রহিত করেছিলেন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। ক্ষমতায় বসেই শেখ মুজিব দেশবাসীর জন্য আইনসিদ্ধ মতবাদের একটি তালিকা বেঁধে দিয়েছিলের,সেটি ছিল জাতীয়তাবাদ,সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষবাদ। এর বাইরে কোন আদর্শ নিয়ে রাজনীতি করা বা ভিন্ন দল গড়াকে শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ ঘোষিত করেছিলেন। এমনকি আল্লাহর বেঁধে দেয়া একমাত্র আদর্শ ইসলামকে নিয়েও নয়। ফলে তার বাংলাদেশে কোন ইসলামী দল ছিল না।

ডাকাতদের অপরাধ, তারা অন্যের সম্পদ দখলে বা লুণ্ঠনে সন্ত্রাস করে,এবং সে সন্ত্রাসে অস্ত্র ব্যবহার করে। তাদের ডাকাতি ব্যক্তির বিরুদ্ধে। আর ফ্যাসীবাদের ডাকাতি হল দেশ এবং সমগ্র দেশবাসীর বিরুদ্ধে। তারা সন্ত্রাসে নামে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলে। ডাকাতের সন্ত্রাসে রাজনীতি নাই, ভণ্ডামীও নাই। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাদখলের সন্ত্রাসে রাজনীতি হল মূল হাতিয়ার। সন্ত্রাসের সাথে সেখানে রাজনীতি যেমন আছে তেমনি প্রতারণাও আছে।সে কারণেই ১৯৭০ সালের নির্বাচনে শেখ মুজিব আট আনা সের চাউল খাওয়ানার ওয়াদা করেছিলেন। ১৯৭২-৭৩-এ তলাহীন ঝুড়ি এবং ১৯৭৪-এ ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ উপহার দিলে কি হবে,সত্তরের নির্বাচনে তিনি সোনার বাংলা গড়ার প্রতিশ্রুতি শুনিয়েছিলেন। দেশ ও দেশবাসীর উপর ডাকাতিতে নির্বাচন,রাজপথের জনসভা এবং মিছিলও পরিনত হয় সন্তাসের শিকার। নির্বাচনের আগেই রাজপথের দখল নেওয়ার এটাই ফ্যাসীবাদী সনাতন কৌশল। হিটলার সেটি জার্মানীতে করেছিল। আর আওয়ামী লীগ সে কৌশলের প্রয়োগ করেছে অতীতের প্রতিটি নির্বাচনে। এ নিবন্ধে সে সন্ত্রাসের কিছু উদাহরণ দেয়া হবে। মুখে গণতন্ত্রের কথা বলে শেখ মুজিব যেমন একদলীয় বাকশালী স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠা করেছিল, তেমনি স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের কথা বলে তিনি ইতিহাস গড়েছিলেন ভারতের সাথে ২৫ সালা দাসচুক্তির। উন্নয়নের ওয়াদা দিয়ে ডেকে এনেছিলেন দেশীয় শিল্পে ধ্বংস, অর্থনৈতিক দুর্গতি ও ভয়ানক দুর্ভিক্ষ। ক্ষুদার্ত মানুষ তখন উচ্ছিষ্টের খোঁজে কুকুরের সাথে আস্তাকুঁড়ে প্রতিযোগিতায় নেমেছিল। মহিলারা তখন লজ্জা নিবারণে মাছধরা জাল পড়তে বাধ্য হয়েছিল। নবাব শায়েস্তা খানের আমলের “ধণে-ধানে পুষ্পেভরা” বাংলা তখন বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিত পেয়েছিল তলাহীন ভিক্ষার ঝুড়ি রূপে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই হল মুজিবামল। হাজার বছরের ইতিহাসে আর কোন আমলেই আন্তর্জাতিক অঙ্গণে দেশটির এত  অপমান জুটেনি।

 

শেখ মুজিবের বক্তৃতা ও রাস্তায় লগিবৈঠা 

শেখ মুজিব তাঁর শাসনামলে সকল রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করে একমাত্র দল বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগ (সংক্ষেপে বাকশাল) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। নিষিদ্ধ করেছিলেন সকল বিরোধী দলীয় পত্র-পত্রিকা। এমন একদলীয় শাসন,এমন সর্বনাশা দুর্ভিক্ষ এবং মতামত প্রকাশের উপর এমন কঠোর নিষেধাজ্ঞার ইতিহাস প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানে নাই। নেপাল এবং শ্রীলংকাতেও নাই। অথচ সে স্বৈরাচারি মুজিবই হল আওয়ামী লীগের শ্রেষ্ঠ নেতা ও শ্রেষ্ঠ আদর্শ। যারা ইসলামের প্রতিষ্ঠা চায় তারা কোরআন-হাদীসের চর্চা বাড়ায়। কারণ কোরআন-হাদীসের জ্ঞানে ইসলামের প্রতিষ্ঠায় মানুষ বেশী বেশী একনিষ্ঠ ও আত্মত্যাগী হয়। ডাকাত সর্দারের বার বার দীর্ঘ বক্তৃতা শুনে শিষ্যরা তেমনি বড় ডাকাত হয়। গণতন্ত্র-হত্যাকারি একজন বাকশালী নেতার বক্ততার ক্যাসেট হাজার বার শুনিয়েও কি তাই গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা বাড়ে? তখন তো বরং কর্মীরা উৎসাহ পায় লগি বৈঠা নিয়ে রাস্তায় মানুষ হত্যায়। এবং উৎসব বাড়ে অন্য দলের মিছিল-মিটিং পণ্ড করা বা যাত্রীভর্তি বাসে আগুণ ধরিয়ে নিরীহ মানুষ হত্যায়। এমন সহিংসতাও তখন শিষ্যদের কাছে গণতান্ত্রিক রাজনীতি মনে হয়ে। শেখ মুজিবের ৭ মার্চের ভাষণ হাজারো বার শুনিয়েও তাই দেশে রাজনৈতিক সহনশীলতা বাড়েনি। গণতন্ত্রও প্রতিষ্ঠা পায়নি। অন্যদের মাঝে দূরে থাক,খোদ আওয়ামী লীগ কর্মীদের জীবনেও তাতে নৈতিক বিপ্লব আসেনি। বরং বেড়েছে নীতিহীনতা এবং বিপর্যয়।

 

অজ্ঞতার বিপদ

বিষকে বিষরূপে জানাটা জীবন বাঁচানোর জন্য জরুরী। নইলে বিষ পানে প্রাণনাশ ঘটে। দেশকে বাঁচাতে হলেও তেমনি দেশের শত্রুদের চিনতে হয়। এক্ষেত্রে অজ্ঞতা হলে দেশের জন্য মহাবিপদ। আর সে অজ্ঞতা দূর করতে হলে রাজনীতিতে যাদের বিচরণ তাদের ইতিহাস জানাটি জরুরী। কারণ তারাই ঘুরেফিরে দেশের ড্রাইভেট সিটে বসে। চারিত্রিক গুণাগুণ, পেশাগত যোগ্যতা ও শারীরীক সুস্থ্যতা না জেনে কাউকে এমনকি বাসের বা ট্রেনের চালক করাতেও মহা বিপদ। নেশাখোর মদ্যপ,দায়িত্বজ্ঞানহীন দুর্বৃত্ত বা অন্ধ মানুষও তখন চালকের সিটে বসার সুযোগ পায়। এতে দুর্ঘটনায় প্রাণনাশ ঘটে যাত্রিদের। তাই অন্যান্য দলের সাথে আওয়ামী লীগের ইতিহাসকেও দেশবাসীর সামনে তুলে ধরার কাজটি অতি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আওয়ামী লীগ একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল। ক্ষমতায় গিয়েই শুধু নয়, ক্ষমতার বাইরে থেকেও দলটি দেশের জন্য অপূরণীয় ক্ষতির সামর্থ রাখে। তাই দেশের কল্যাণে অতি অপরিহার্য হল দলটির প্রকৃত পরিচয় জানা। এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে ক্ষতিটি হবে বিশাল। কিন্তু বাংলাদেশে সে কাজটিই যথার্থ ভাবে হয়নি। বরং যা হয়েছে তা হল,সুকৌশলে দলটির মূল চরিত্রটিকে গোপন করার। শেখ মুজিবের ১৯৭০-এ বিপুল নির্বাচনী বিজয় এবং ৭ই মার্চের জ্বালাময়ী ভাষনের বাইরেও দলটির বিশাল ইতিহাস আসে। বাংলাদেশী ছাত্রদের কাছে সে ইতিহাসটি জানা ইতিহাস-ভূগোল, ফিজিক্স-কেমিষ্ট্রী বা চিকিৎসা শাস্ত্রের জ্ঞান-লাভের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারণ স্রেফ ইতিহাস-ভূগোল, ফিজিক্স-কেমিষ্ট্রী,চিকিৎসা বা কারিগরি জ্ঞান বাড়িয়ে দেশকে বাঁচানো যাবে না। এমন কি রাস্তাঘাট,কলকারখানা,কৃষি উৎপাদন বা বিদেশে লোক রপ্তানি বাড়িয়েও নয়। দেশ বাঁচাতে হলে দেশের শত্রুদের চেনার বিকল্প নাই। তাছাড়া কারা দেশের শত্রু বা মীরজাফর -সে সত্যটি গোপন করা মহাপাপ। ইসলামে এটি কবিরা গুনাহ। কারণ তাদের না চেনার বিপদটি তো বিশাল। এমন জ্ঞানলাভের ক্ষেত্রে তাই কাযা নেই, কাফ্ফরাও নেই। বরং এ ক্ষেত্রে গাফলতি হলে জাতির জীবনে গোলামী নেমে আসে শত শত বছরের জন্য। এমন মহাপাপের কারণই ১৭৫৭ সালে বাংলার স্বাধীনতা লুণ্ঠিত হয়েছিল। আগ্রাসী ইংরেজদের হাতে সেদিন যে পরাজয়টি ঘটেছিল সেটি অর্থনিতক পশ্চাদপদতার কারণে নয়। সৈন্য সংখ্যার কমতির কারণেও নয়। এমনকি শিল্পে অনগ্রসরতার কারণেও নয়। বরং সে  সময় তো বিশ্বের বিস্ময়কর মসলিন শিল্প ছিল বাংলায়, যা রপ্তানী হত ইউরোপে। তখন সিরাজুদ্দৌলার সৈন্যসংখ্যা ছিল ইংরেজ সৈন্যের চেয়ে প্রায় দশগুণ বেশী। তাদের হাতে বড় বড় কামানও ছিল। কিন্তু সে বিশাল বাহিনী পরাজয় ঠেকাতে পারিনি। ১৭৫৭ সালের সে শোচনীয় পরাজয়টি ঘটেছিল দেশের মীরজাফরদের না চেনার কারণে। তাতে ফল দাঁড়িয়েছিল,মীর জাফরের ন্যায় জঘন্য বিশ্বাসঘাতককে সেদিন শাস্তি না দিয়ে দেশের সেনাপতি বানানো হয়েছিল।

নবাব সিরাজুদ্দৌলার ন্যায় শাসকদের অজ্ঞতায় মীর জাফরেরা যেমন সেনাপতি হয়,জনগণের অজ্ঞতায় তেমনি শত্রুরাওই তারা নেতা হওয়ার সুযোগ পায়। তাই জনগণকে অজ্ঞ রাখাতেই তাদের বিজয় ও আনন্দ। অজ্ঞতার বড় বিপদটি হল,একই গর্তে পা তখন বার বার পড়ে। তাই বাংলাদেশে ইতিহাস জ্ঞান ইচ্ছা করেই বাড়ানো হয়নি। সেটি যেমন সাম্রাজ্যবাদী শাসনের ব্রিটিশ আমলে, তেমনি আজ।ও। তাই বাংলাদেশীদের বিপদ ১৭৫৭ সালে পলাশীতে শেষ হয়নি। একাত্তরেও শেষ হয়নি। ২০১১ সালে এসেও শেষ হয়নি। ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫-এ সীমাহীন ভারতীয় লুন্ঠন,তলাহীন ভিক্ষার ঝুলির পরিচয়,১৯৭৪ সালে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ,মুজিবের হাতে গণতন্ত্র-হত্যা, রক্ষিবাহিনীর হাতে ৩০ হাজার বাংলাদেশী হত্যার ন্যায় ভয়াবহ ঘটনাগুলিও তো ঘটেছে একই কারণে। আজও  বাংলাদেশের রাজনীতি,অর্থনীতি,সংস্কৃতি এবং মিডিয়া যেভাবে আগ্রাসী ভারতের হাতে অধিকৃত, ছিনতাই হয়েছে যেভাবে তালপট্টি দ্বীপ,লুণ্ঠিত হচ্ছে যেভাবে পদ্মা,তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রের পানি এবং সীমান্তে তারকাঁটায় ঝুলে লাশ হচ্ছে যেভাবে মানুষ -সেগুলির কারণও কি ভিন্নতর?

বিষধর গোখরা শাপ বিছানায় নিয়ে ঘুমালে প্রাণ বাঁচে না। সে বিপদ থেকে বাঁচতে হলে চোখ খোলা রাখতে হয়। তেমনি চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও গণতন্ত্রহত্যাকারি,বিদেশী চর এবং ক্ষমতালিপ্সু ব্যক্তিকে বন্ধু মনে করে নেতা বানালে,এবং তাকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসালে দেশও বাঁচে না। তাই শ্রেষ্ঠ জ্ঞান স্রেফ বিষাক্ত মশামাছি,শাপ-বিচ্ছু,রোগজীবানূর জ্ঞান নয়; অতি গুরুত্বপূর্ণ হল সমাজের বিষধর শাপদের পরিচয়টি যথার্থ জানা। মশামাছি, শাপ-বিচ্ছু ও রোগজীবানূর আক্রমনে বহু হাজার লোক মারা গেলেও তাতে জাতি পরাজিত বা অধিকৃত হয় না। তলাহীন ভিক্ষার ঝুলিও হয় না। বিশ্বের বহুদেশে এমন মহামারি বহুবার এসেছে। কিন্তু ছদ্দবেশী শত্রুকে নেতা বানালে দেশ অধিকৃত হয়। মুজিব আমলে বাংলাদেশ ২৫ সালা দাসচুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিল এবং ভিক্ষার ঝুলি রূপে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পেয়েছিল তো এমন এক ব্যর্থতার কারণেই। এ বিপদ থেকে বাঁচার জন্য উন্নত স্বাধীন দেশগুলো শুধু কলকারখানা,হাসপাতাল,স্কুল-কলেজ,গবেষণাগার ও রাস্তাঘাট গড়ে না,শত শত কোটি টাকা ব্যায়ে ইতিহাস চর্চা ও নেতাদের আচরনবিধি জানার বিশাল বিশাল প্রতিষ্ঠানও গড়ে। তাদের পলিসির উপর গবেষণা করে। শত শত কোটি টাকা ইতিহাস নিয়ে বইও লেখে এবং জনগণের মাঝে সে জ্ঞানের চর্চাও বাড়ায়। হার্ভার্ড, কেম্ব্রিজ, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বিখ্যাত শুধু তাদের বিজ্ঞান-বিষয়ক গবেষণাগারের জন্য নয়, বরং ইতিহাস-বিষয়ক বিশাল বিশাল প্রতিষ্ঠানের কারণে। কিন্তু বাংলাদেশে সে কাজটি হয়নি। ফলে বাংলাদেশে মশামাছি,শাপ-বিচ্ছু,রোগজীবানূর আক্রমণে মানুষ মরা কমলেও বিপদ কমেনি। বরং ধ্বংসের দিকে দেশ দ্রুত ধেয়ে চলেছে আভ্রন্তরীণ শত্রুর কারণে।দেশ আজ  অধিকৃত এসব শত্রুদের হাতে।

 

সন্ত্রাস সংসদে ও রাজপথে

আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে যা ঐতিহাসিক সত্য তা হল,বাংলাদেশের ইতিহাসে এটাই একমাত্র দল যা গণতন্ত্রের নামে ক্ষমতায় গিয়ে গণতন্ত্রকেই দাফন করে এবং প্রতিষ্ঠা করে একদলীয় বাকশালী শাসন। স্বাধীন মতপ্রকাশকে তারা দণ্ডনীয় অপরাধে পরিনত করেছিল। বিরোধীদের দমনের কাজে হাতিয়ারে পরিনত করেছিল দেশের আদালত,বিচারক,পুলিশ ও প্রশাসনকে। সেটি যে শুধু মুজিবামলে তা নয়, যখনই দলটি ক্ষমতায় গেছে তখনই সে কাজটি করেছে। এমনকি অন্যদের উপর সন্ত্রাসে অতি নিষ্ঠুরতার পরিচয় দিয়েছে ক্ষমতার বাইরে থাকা কালেও। আওয়ামী লীগ তার সন্ত্রাসের রাজনীতি হঠাৎ শুরু করেনি। দশ-বিশ বছর আগেও নয়। বরং সেটির শুরু দলটির জন্ম থেকেই। এবং সন্ত্রাসের সে রাজনীতি শুধু মাঠকর্মী বা ক্যাডারদের হাতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সেটির হোতা ছিল মূল নেতারাই। তাছাড়া অন্যদলের জনসভা ও মিছিল পণ্ড করার মধ্যেও সে সন্ত্রাস সীমাবদ্ধ থাকেনি,বরং সন্ত্রাস হয়েছে খোদ সংসদ ভবনে। সে সন্ত্রাস যে শুধু হাতাহাতি বা মারপিঠেও সীমাবদ্ধ ছিল, তা নয়। গড়িয়েছে মানুষ খুণে। লগিবৈঠা নিয়ে কর্মীদের হাতে মানুষ খুনের আগেই নৃশংস নিষ্ঠুরতায় সেদিন পারঙ্গমতা দেখিয়েছিল দলটির সংসদীয় সদস্যরা। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের শরীক দল রূপে আওয়ামী লীগ সেদিন পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদে বিপুল সংখ্যক আসন পায়, কিন্তু তাদের সে বিজয়ে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বিজয়ী হয়নি, সংসদেরও গৌরব বাড়েনি। বরং দলটির দলীয় সাংসদদের মারের আঘাতে প্রাণ হারান তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের ডিপুটি স্পীকার জনাব শাহেদ আলী। সে খবর সেদিন বিশ্ববাসী জেনেছিল। আওয়ামী লীগের নেতাগণ এভাবে সেদিন চুনকালি লেপন করেছিল পাকিস্তানের মুখে এবং পথ করে দিয়েছিল সামরিক শাসনের।

আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মাওলানা ভাষানী। কিন্তু নিজের প্রতিষ্ঠিত দলে তিনি বেশী দিন থাকতে পারেননি। দ্বন্দ শুরু হয় আরেক নেতা জনাব সোহরাওয়ার্দীর সাথে। ভাষানী আওয়ামী লীগ ছেড়ে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) নামে নতুন দল গড়েন। ন্যাপ তখন আওয়ামী লীগের প্রবল প্রতিপক্ষ রূপে আত্মপ্রকাশ করে। ফলে আওয়ামী সন্ত্রাসের খড়গ পরে এ দলটির উপর। ১৯৫৭ সালের ২৫শে জুলাই মাওলানা ভাষানীর নেতৃত্বে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সমমনা বেশ কিছু নেতা ও কর্মী এক রাজনৈতিক সম্মেলনে মিলিত হয়েছিলেন ঢাকার রুপমহল সিনেমা হলে। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সে সভায় যোগ দেন খান আব্দুল ওয়ালী খান, মিয়া ইফতারখান উদ্দীনসহ বহু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তখন আওয়মী লীগ নেতা সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, আর পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান। আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি তখন শেখ মুজিব। সেসাথে তিনি মন্ত্রীও ছিলেন। জনসভা পণ্ড করার মূল দায়িত্ব ছিল তারই উপর। তখন বাসভর্তি গুণ্ডা এনে ন্যাপের সভা পণ্ড করা হয়। সে দিনটিতে পুলিশ বাহিনীর কার্যকলাপ ছিল আরো ন্যাক্কারজনক। হামলাকারি গুণ্ডাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা না নিয়ে তারাও বরং গুণ্ডাদের সাথে হামলায় যোগ দেয়। পাকিস্তানে ইতিহাসে সেটিই ছিল সরকারি দলের পক্ষ থেকে সর্বপ্রথম রাজনৈতিক সন্ত্রাস। বিরোধীদের পিটাতে সেদিন রক্ষিবাহিনীর প্রয়োজন পড়েনি, পুলিশকেই তারা সে কাজে ব্যবহার করেছিলেন। রুপমহল সিনেমা হলে হামলা সত্ত্বেও সে সভায় ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)এর জন্ম হয়। পরের দিন ২৬ শে জুলাই ছিল পল্টনে ন্যাপের জনসভা। মাওলানা ভাষানীসহ পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আগত নেতাদের সে জনসভায় ভাষন দেবার কথা। কিন্তু আওয়ামী লীগ সে জনসভা হতে দেয়নি। আওয়ামী লীগের গুণ্ডাবাহিনীর ঝটিকা বেগে সে জনসভার উপর হামলা করে। দক্ষিণে নবাবপুর রেলক্রসিং, উত্তরে পুরনো পল্টন, পশ্চিমে কার্জন হল এবং পশ্চিমে মতিঝিল এ বিস্তীর্ণ এলাকা এক কুরুক্ষেত্র পরিণত হয়। ভন্ডুল হয়ে যায় ভাষানীর জনসভা। সংসদীয় গণতন্ত্রের নামে এভাবেই গণতন্ত্র চর্চাকে সেদিন অসম্ভব করা হয়েছিল।

সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রধাণ স্ট্রাটেজী হয়,নির্বাচনের আগেই রাজপথে দলীয় দখলদারি প্রতিষ্ঠা করা। কৌশল হয়,অন্য কাউকে নির্বাচনী প্রচার চালাতে না দেয়া। তাদের এ লক্ষ্য পূরণে জামায়াতে ইসলামীকে তারা প্রধান শত্রু মনে করে। ফলে এ দলটির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাস ছিল আরো হিংসাত্মক ও গুরুতর। ১৯৭০ সালের ১৮ই জানুয়ারি পল্টন ময়দানে ছিল জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী জনসভা। সে জনসভায় মাওলানা মওদূদীর বক্তৃতা দেয়ার কথা। কিন্তু সে জনসভা আওয়ামী লীগের বিশাল গুণ্ডাবাহিনী হতে দেয়নি। হামলা চালিয়ে তিনজনকে সেদিন শহিদ করে, আহত করে কয়েক হাজার। দলীয় অফিসে বসে শেখ মুজিব নিজে বলেছিলেন, মাওলানা মওদূদী কিভাবে পল্টনে মিটিং করে সেটি দেখে নিব। মুজিবের সে কথা আমি সেদিন নিজ কানে শুনেছি। পরের রবিবার অর্থাৎ ২৫শে জানুয়ারি ছিল মুসলিম লীগের জনসভা। মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি জনাব ফজলুল কাদের চৌধুরীর বক্তৃতা দেয়ার কথা। আওয়ামী লীগের গুণ্ডারা সে জনসভাও হতে দেয়নি। সেদিনও পল্টন ময়দানে নিজে উপস্থিত থেকে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের ইটপাথর মারার সে দৃশ্য স্বচোখে দেখেছি। এর পরের রবিবার ছিল পহেলা ফেব্রেয়ারি। সেদিন পল্টন ময়দানে ছিল জনাব নূরূল আমীনের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানে ডিমোক্রাটিক পার্টির জনসভা। সেদিন পল্টন ময়দানের সে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন মৌলভি ফরিদ আহম্মদ, জনাব মাহমুদ আলী, আজিজুল হক নান্নাহ মিয়া, ইউসুফ আলী চৌধুরি মোহন মিয়া, এ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম খানসহ বহু নেতৃবৃন্দ। দলের নেতা জনাব নূরুল আমীন তখনও মঞ্চে আসেননি। আওয়ামী লীগ নেতারা সে জনসভাও হতে দেয়নি,শুরুতেই হামলা শুরু হয়। কোন কোন নেতার মাথার পাথর পড়ে,এমনকি জনসভা পণ্ড করার পর ফেরতগামী নেতাদের উপরও তারা হামলা হয়।

 

জিহাদ বনাম রাজনীতি

দেশ-সেবা,সমাজ-সেবা,জনসেবা তথা ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের কল্যানে কিছু করার মাধ্যম হল রাজনীতি। আত্মত্যাগী মানুষ এখানে মেধা দেয়, শ্রম দেয়, এমনকি প্রাণও দেয়। রাজনীতিকে আরবীতে বলা হয় ‘সিয়াসা’। কোরআন ও হাদীসে ‘সিয়াসা’র কোন উল্লেখ নাই। তবে যা আছে তা হল, ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে সর্বাত্মক আত্মনিয়োগের প্রেরণা। আছে ইক্বামতের দ্বীন তথা দ্বীনের প্রতিষ্ঠার কথা। আছে আল্লাহর কোরআনী বিধানের বিজয়ে অর্থদান,শ্রমদান এমনকি প্রাণদানের তাগিদ। ইসলামে এটি পবিত্র ইবাদত। এটি পবিত্র জিহাদ। মুসলমানের এটাই রাজনীতি। রাষ্ট্রে ও সমাজে আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব বা খেলাফতের দায়িত্ব পালন নিছক নামায-রোযা-হজ্ব-যাকাত পালনে হয় না। এ জন্য অপরিহার্য হল জিহাদে তথা আল্লাহর শরিয়তি বিধান প্রতিষ্ঠার রাজনীতিতে অংশগ্রহণ। নামায-রোযা-হজ্ব-যাকাত পালনে ব্যক্তির জীবনে আধ্যাত্মিকতা আসে। আসে তাকওয়া। আর সে তাকওয়াটি হল,আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে বাঁচার সার্বক্ষণিক চেতনা। এটি হল তাঁর হুকুম পালনে লাগাতর অঙ্গিকার। এমন তাকওয়া থেকেই মোমেন পায় আল্লাহর দ্বীনের পূর্ণ অনুসরণের প্রেরণা। ঈমানদারের কাজ হল,তাকওয়া-নির্ভর নিজের সে আধ্যাত্মিক পরিবর্তনকে স্রেফ মসজিদ বা নিজ-গৃহের মাঝে সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজ ও রাষ্ট্রের অঙ্গণে নিয়ে যাওয়া। ঈমানদারের রাজনীতি হল মূলত সে কাজেরই বাহন। পবিত্র কোরআনে ঈমানদারের মূল মিশন রূপে যা বর্ণনা করা হয়েছে তা হল, “আমারু বিল মারুফ”, “নেহী আনিল মুনকার” এবং লিইউযহিরাহু আলাদ্দীনি কুল্লিহী”। এর অর্থ ‍‍‌‌‍‍‍‍‍“ন্যায়ের আদেশ”‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍, “অন্যায়ের নির্মূল” এবং “সকল মতবাদ,আদর্শ ও ধর্মের উপর ইসলামের বিজয়”। নবীজী(সাঃ)র যুগে আজকের ন্যায় রাজনৈতিক দল ছিল না, রাজনীতিও ছিল না। ছিল জিহাদ। সে জিহাদে অর্ধেকের বেশী সাহাবী শহীদ হয়ে গেছে। তবে সেক্যুলারিষ্টদের কাছে জিহাদ নাই, শাহাদতও নাই। যা আছে তা হল ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে দল গড়া, দলাদলি করা, মিথ্যা ওয়াদা দিয়ে দলভারি করা এবং গদীর স্বার্থে সকল উপায়ে জনগণকে প্রতারণা করা। এটিই হল, মেকিয়াবেলীর “পলিটিক্স” তথা সেক্যুলার রাজনীতি।

 

সবচেয়ে বড় ডাকাতি  

মেহনত, ত্যাগস্বীকার বা লড়াই শুধু ঈমানদারগণই করে না। ডাকাতরাও রাত জাগে, মেহনত করে, এমনকি প্রাণও দেয়। ডাকাতরা হানা দেয় ব্যক্তির ঘরে বা দোকানে। কিন্তু প্রতিদেশে সবচেয়ে বড় ডাকাতি হয় দেশের রাজনীতির ময়দানে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করার লক্ষ্যে এখানে ময়দানে নামে দেশের সবচেয়ে দুর্ধষ্য ডাকাতরা। তাদের লক্ষ্য, সমগ্র রাষ্ট্রীয় সম্পদের উপর দখলদারি প্রতিষ্ঠিত করা। নৃশংসতায় এরা হিংস্র পশুকেও হার মানায়। মানব ইতিহাসে সবচেয়ে বড় রক্তপাত ঘটেছে তো এসব বড় বড় ডাকাতদের কারণে। বাংলাদেশেও সবচেয়ে বেশী রক্তপাত ঘটিয়েছে তারা। সেটি যেমন একাত্তরে,তেমনি আজও । নিজেদের গদি-দখলের সে প্রজেক্টকে বলেছে জনগণের অধিকার আদায়ের রাজনীতি। অথচ বাস্তবে সেটি ছিল জনগণকে অধিকারহীন করার ষড়যন্ত্র। তাই আওয়ামী লীগের বিজয়ে শেখ মুজিবের গদিলাভ সম্ভব হলেও ডাকাতি হয়েছে জনগণের মৌলিক অধিকারে, যা এমনকি ইয়াহিয়া বা আইয়ুবের আমলেও ঘটেনি। এটাই ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ডাকাতি। এতে লুট হয়েছে মৌলিক মানবিক অধিকার। সে লুটে রাজনীতিতে একচেটিয়া বাকশালী মনোপলি বেড়েছিল আওয়ামী লীগের। নিজেদের সে একচেটিয়া মনোপলি বাড়াতে প্রয়োজনে তারা বিদেশী ডাকাতদেরও ডেকে আনে। একাত্তরে ভারতীয় বাহিনীকে বাংলাদেশে ডেকে আনার প্রেক্ষাপট নির্মিত হয়েছিল তো এভাবেই। ফলে সেদিন বাংলাদেশের হাজার হাজার কোটি টাকার মালামাল এবং যুদ্ধাস্ত্র ভারতে ডাকাতি হয়ে যায়। ধ্বসিয়ে দেয় সীমান্ত তথা অর্থনীতির তলা। বিণিময়ে উপহার দেয় এক তলাহীন ভিখারী বাংলাদেশের। ডেকে আনে ভয়ানক দুর্ভিক্ষ,যাতে মৃত্যু ঘটে বহু লক্ষ বাংলাদেশীর। বিগত বহু শত বছরে বাংলাদেশের সকল ডাকাত এবং সকল হিংস্র পশু মিলেও এত মৃত্যু, এত দুঃখ ও এত অপমান উপহার দেয়নি যা ভারতীয় ডাকাত ও তার বাংলাদেশী বাকশালী সহযোগীরা একাত্তর থেকে পঁচাত্তর -এ চার বছরে দিয়েছে।

 

ডাকাতির চেয়েও নৃশংস

ডাকাতদের তবুও কিছু বিধিমালা থাকে। তারা দিবালোকে ডাকাতি করে না। যাত্রীভর্তি বাসেও আগুন দেয় না। বিত্তহীন গরীব মানুষকেও লুণ্ঠনের লক্ষ্য বানায় না। কিন্তু ক্ষমতালোভী রাজনৈতিক ডাকাতগণ নৃশংসতা ঘটায় দীবালোকে। তাদের নৃশংসতায় সবচেয়ে বেশী মারা পড়ে নিঃস্ব গরীবেরা।এবং ধনি হয় সবচেয়ে ধনিরা। তাছাড়া লোভটা যেখানে বিশাল নৃশংসতাও সেখানে বিকট। বাংলাদেশের আওয়ামী রাজনীতিতে সে নৃশংসতা যে কতটা প্রকট তার কিছু উদাহরণ দেয়া যাক। হরতাল বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। বহু দল বহু বছর ধরেই হরতাল করে আসছে। ব্রিটিশ এবং পাকিস্তানে আমলেও হরতাল হয়েছে। কিন্তু বাসে আগুণ দিয়ে যাত্রীদের হত্যা করা বা গায়ে পেট্রোল ঢেলে কাউকে পুড়িয়ে মারা এক ভয়াবহ নতুন নৃশংসতা। আর বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেটি আমদানী করেছিল আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীগণ তাদের নিজেদের ডাকা হরতালগুলোতে। আর তা নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতাদের মনে কোন অনুশোচনা নাই, আফসোসও নাই। ১৯৯৩ সালে যাত্রাবাড়ীতে আওয়ামী লীগের ডাকা হরতালের দিনে-দুপুরে বাসে আগুণ লাগিয়ে ১৮ জন যাত্রীকে পুড়িয়ে মারা হয়। ২০০৪ সালের ৪ই জুলাই ছিল আরেকটি হরতালের দিন। সেদিন শেরাটনের সামনে একটি দোতালা বাসে আগুণ দিয়ে হত্যা করা হয় ১০ জন নিরীহ বাসযাত্রীকে। ২০০৫ সালের ২১মে হরতালের দিনে আমির হোসেন নামক এক সিএনজি চালককের গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুণ দেয়। ২৫শে সে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সে মারা যায়। ২০০৫ সালে জানুয়ারি মাসে মিরপুর এক নম্বর সেকশনে হরতালের আগের রাতে হরতালের সমর্থণে একটি বাসকে লক্ষ করে বোমা ছুঁড়া হয়। কিন্তু বোমাটি পড়ে মফিজ নামক একজন রিকশাচালকের উপর। গার্মেন্ট শ্রমিক মফিজ ৮ সন্তানের সংসার চালাতে সে দিনে ফ্যাক্টরীতে কাজের পাশাপাশি রাতে রিকশা চালাতো। ঐ সময় সে বাচ্চাদের জন্য দুধ কিনতে রিকশা নিয়ে রাস্তায় বের হয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী তাঁকে আর দুধ কিনে তার ক্ষুদার্ত সন্তানদের কাছে ফিরতে দেয়নি। সে ফিরেছিলই ঠিকই,তবে লাশ হয়ে। ২০০৬ সালের ২৮শে অক্টোবর জামায়াতে ইসলামীর একটি মিছিলের উপর আওয়ামী লীগের কর্মীগণ গলি-বৈঠা নিয়ে হামলা করে। সে হামলায় নিহত হয় ৫ জন জামাতকর্মী, আহত হয় বহু শত। ২০০৫ সালের ৬ই ফেব্রেয়ারির হরতালে আশরাফ সিদ্দিকী নামক একজন পুলিশকে আওয়ামী লীগ কর্মীরা পিটিযে হত্যা করেছিল। ২০০৬ সালের ১৩ই নভেম্বর দৈনিক “প্রথম আলো” খবর ছাপে, “১৪ দলের অবরোধের প্রথম দিনে ১৫-২০টি গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্ণিসংযোগ হয়। সাভারে ৮টি গাড়ি ভাঙচুর হয়।” ২০০৪ সালের ৮ই জুন দৈনিক ইত্তেফাক রিপোর্ট ছাপে, “চার দলীয় সরকারের প্রথম তিন বছরে হরতালে ২৫টি বিআরটির বাস পোড়ানো হয়।” ২০০৬ সালের ৭ই ডিসেম্বর দৈনিক যায়যায় দিন প্রতিবেদন ছাপে, ১৩ দিনের অবরোধ ও সহিংস রাজনৈতিক কর্মসূচীতে ৭৭ জন মারা যায়, ২৮০০ আহত হয় এবং ১৮০০ পঙ্গু হয়। দেশের ক্ষতি হয় ৬ হাজার কোটি টাকা।

 

খুনিদের বাঁচাতে শেখ হাসিনা

স্বৈরাচারি দুর্বৃত্ত এরশাদ তখন ক্ষমতায়। তখন দেশের প্রধানমন্ত্রী জনাব আতাউর রহমান খান। এরশাদ বিরোধী আন্দোলন তখন বেগবান হওয়ার পথে। শেখ হাসিনাকে সে আন্দোলন থেকে দূরে সরানোর ষড়যন্ত্র আটে এরশাদ। লক্ষ্য,নিজের স্বৈরাচারকে শক্তিশালী ও দীর্ঘায়ীত করা। সে পরিকল্পনায় ধরা দেয় শেখ হাসিনা। বিণিময়ে এরশাদের কাছ আদায় করে নেয় বহু সুযোগ-সুবিধাও। দলীয় খুনিদের বাঁচাতে শেখ হাসিনা যে সুবিধাগুলো আদায় করেছিলেন তার একটি উদাহরণ দেয়া যাক। সে সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুইজন শিবির কর্মীকে নির্মম ভাবে হত্যা করে আওয়ামী লীগ সমর্থক ছাত্রলীগের কর্মীরা। ইটের উপর তাদের মাথা রেখে ইটদিয়ে মগজ থেথলে দেয়া হয়েছিল। দিনদুপুরে সংঘটিত সে নৃশংস হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অপরাধে আদালত কয়েকজন ছাত্রলীগ কর্মীকে শাস্তি দেয়। এমন দুর্বৃত্ত খুনিদের পক্ষ কি কোন সভ্য মানুষ নেয়। খুণিদের ঘৃণা করা তো মানুষের অতি মৌলিক মানবিক গুণ। কিন্তু সে সন্ত্রাসী খুণীদের পক্ষ নেয় শেখ হাসিনা। জনাব আতাউর রহমান খান তার স্মৃতীচারণ বইতে লিখেছেন, এরশাদের সাথে আলাপ করতে এসে শেখ হাসীনা দাবী তুললেন তিনি কোন আলাপই করবেন না যদি না শাস্তিপ্রাপ্ত উক্ত ছাত্রলীগ কর্মীদের মূক্তি দেয়া হয়। নিজদলীয় সন্ত্রাসী খুনিদের নিয়ন্ত্রনে রাখার সামর্থ শেখ হাসিনার ছিল না। সামর্থ ছিল না তাদের কৃত খুনের ন্যায় জঘন্য অপরাধকে ঘৃণা করার। তেমনি এরশাদের ছিল না শেখ হাসিনার দাবীর কাছে নত না হওয়ার মত নৈতীক মেরুদণ্ড। হাসিনার দাবীর মুখে স্বৈরাচারি এরশাদ সে সাজাপ্রাপ্ত খুণিদের মুক্তি দিয়েছিল। কারণ এরশাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল নিজ গদীর নিরাপত্তা,কে কোথায় খুণ হল বা সন্ত্রাস ঘটলো সেটি দমনে তার কোন আগ্রহ ছিল না। তার লক্ষ্য ছিল, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমন। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সন্ত্রাস যে কতটা প্রবল, শেখ হাসিনার কাছে নিজ দলের খুনিদেরকে খুণের শাস্তি থেকে বাঁচানোটা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ -এ হল তার প্রমাণ। নিজের পিতা ও পরিবারে অন্যদের খুনের বিচার নিয়ে তিনি আদালত বসিয়েছেন। কিন্তু বহু হাজার মানুষ যে প্রতি মাসে খুন হচ্ছে তাদের বিচার কই? তাঁর দৃষ্টিতে কি অন্যদের জীবনের কোন মূল্যই নেই। প্রধানমন্ত্রী রূপে তার দায়বদ্ধতা কি শুধু নিজ দল ও পরিবারেরর প্রতি? স্বজনহারা দুঃখী পরিবারের কি ন্যায় বিচার চাওয়ার কোন অধিকারই নাই? ফ্যাসীবাদী রাজনীতিতে অন্যদের বিচার চাওয়া দূরে থাকে বাচার অধিকারই দেয়া হয়না। হিটলারের ফ্যাসীবাদী শাসনে তাই গ্যাস চেম্বারে ৬০ লাখ ইহুদীদের বিনাবিচারে হত্যা করা হয়েছিল। মুজিবামলেও লাশ হয়েছিল ৩০ হাজার বিরোধী দলীয় কর্মী।, তাদের পরিবারগুলো হারিয়েছিল ন্যায় বিচার চাওয়ার অধিকার। শেখ হাসিনা তাঁর পিতার সে ফ্যাসীবাদী আদর্শকেই আজ  অনুসরণ করে চলেছেন।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে পুলিশ ও প্রশাসনের প্রধানতম নীতি হয়ে দাঁড়ায় দলীয় নেতা ও দুর্বত্তদের বাঁচানো। সে লক্ষ্য পুরনে শেখ মুজিবের প্রয়োজন পড়েছিল বিশাল রক্ষিবাহিনী গড়ে তোলার। আর আজ  সে অভিন্ন কাজটিই করছে পুলিশ,র‌্যাব,প্রশাসন,আদালত এবং আদালতের সরকারি উকিলগণ। তাদের কাজ হয়েছে জনগণের হাত থেকে সন্ত্রাসীদের প্রটেশকন দেয়া। আওয়ামী লীগ কর্মীগণ রাস্তায় মিছিল নিয়ে নামলে আগে পিছে পুলিশ বাহিনী তাদেরকে পাহারা দেয়। জনমানবহীন গভীর জঙ্গলে মানুষ খুণ বা ব্যাভিচার হলে শাস্তি হয় না। কারণ সেখানে পুলিশ নাই,আইন আদলত না। জঙ্গল তো পশুদের জন্য, লোকালয় ছেড়ে জঙ্গলে বসবাস করার বিপদ তাই ভয়ানক। কিন্তু জঙ্গলের আইনহীনতা নেমে এসেছে বাংলাদেশের জনপদে। ফলে খুন এবং ধর্ষণেও শাস্তি হয় না। খুণ, ধর্ষণ ও সন্ত্রাসে বনের পশুর ন্যায় দুর্বৃত্তদের এত নির্ভীক হওয়ার হেতু তো সেটাই। শেখ হাসিনা নব্বইয়ের দশকে যখন প্রথমবার ক্ষমতায় এসেছিলেন তথন জাহাঙ্গির বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রলীগ নেতা ধর্ষনে সেঞ্চুরীর উৎসব করেছিল। সে খবর পত্রপত্রিকায় বড় বড় হেডিংয়ে ছাপা হয়েছিল। যে কোন সভ্য দেশেই ধর্ষণ শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তাই সে নরপশুকে তিনি আদালতে তুলেননি,একদিনের জন্যও কোন রূপ শাস্তি দেননি। শেখ হাসিনার নীতি-নৈতিকতা ও বিচারের মানদণ্ড যে কতটা ভিন্ন এ হল তার নমুনা।

প্রশ্ন হল,অপরাধীর কৃত অপরাধের বিরুদ্ধে ঘৃনা না থাকলে কি তাকে শাস্তির দেয়ার আগ্রহ জন্মে? ডাকাত দলের সরদারের সেটি থাকে না। বরং ডাকাতদের মধ্যে কে কতটা নৃশংস ভাবে ডাকাতি করলো সেটিই বরং ডাকাত সর্দারের কাছে বেশী গুরুত্ব পায়। শেখ হাসিনার কাছে দলের সন্ত্রাসীদের কদর তো এজন্যই প্রবল। ফলে পুলিশের সামর্থ নাই তাদের আদালতে তোলার। একই অবস্থা ছিল শেখ মুজিবের। তাই মুজিবের আমলে কোটি কোটি টাকার রিলিফের কম্বল ও অন্যান্য মালামাল চুরি হয়েছে, কালোবাজারীদের হাতে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ ভারতে পাচার হয়েছে, ছাত্রলীগ নেতাদের হাতে বহু ছাত্র খুণ হয়েছে। কিন্তু সেসব অপরাধে কাউকে কি একদিনের জন্যও শাস্তি হয়েছে? বরং গাজী গোলাম মোস্তাফাদের মত হাজার হাজার দুর্বৃত্ত ছিল তাঁর নিত্যদের সহচর। তাদের কাউকে কি তিনি দল থেকে এক দিনের জন্যও বহিস্কার করেছেন? তাদের নিয়ে বরং দলীয় দফতর, দলীয় সভা,মন্ত্রীসভা ও প্রশাসন রমরমা করেছেন। এখন বরং ক্ষমতায় যাওয়াতে ছাত্র লীগ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের উপর সন্ত্রাসের দায়ভার কমেছে। সে কাজে নেমেছে পুলিশ ও র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটিলিয়নের বেতনভূক সেপাইরা। এক সময় অন্যদের রাজপথের মিছিল ও জনসভা পণ্ড করতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা নিজেরা ময়দানে নামতো,নেতা-কর্মীদের লগিবৈঠা নিয়ে পেটাতে। আর আজ  সে কাজে নামছে সরকারি প্রশাসন, পুলিশ ও র‌্যাব। রাজপথে তারা বিরোধী দলীয় নেতাদের যথেচ্ছাচারে লাঠিপেটা করছে, সংসদের এমপি এবং বিরোধী দলীয় চিপহুইপকে সম্প্রতি গায়ের কাপড় খুলে পিটিয়েছে,বুকের উপর পা তুলে পিষ্ঠ করছে পুলিশ। দেশ-বিদেশের পত্রপত্রিকায় সে ছবি ছাপাও হচ্ছে।

 

নৃশংস রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস

সম্প্রতি বহু পত্র-পত্রিকায় ছবি ছাপা হয়েছে,সরকার জামায়াত নেতাদের পায়ে দণ্ডবেড়ি পড়িয়েছে। এমন দণ্ডবেড়ি সাধারণত খুণি বা ডাকাতদের পড়ানো হয়। অথচ এ নেতারা কাউকে খুণ করেছেন বা কোথাও ডাকাতি করেছেন সে প্রমাণ নেই। এমনটি করা হয়েছে স্রেফ জনগণের চোখে তাদেরকে হেয় করা বা দৈহিক ও মানসিক ভাবে তাদেরকে নির্যাতিত করার লক্ষ্যে। একই উদ্দেশ্যে বিএনপি,ইসলামী ঐক্যজোট ও হিযবুত তাহরিরের কর্মীদেরও নিষ্ঠুর ভাবে পিটিয়েছে রাজপথে। অন্যদের কষ্ট দেয়ার মধ্যেই হাসিনা ও তার সরকারের আনন্দ। এটি নিছক নৈতিক রোগ নয়, ভয়ানক মানসিক রোগ। চিকিৎসাস্ত্রের ভাষায় এটি স্যাডিইজম। এমন মানসিক রোগের কারণে অন্যদের ঘর থেকে বের করে রাস্তায় টানার মধ্যে তাদের আনন্দ। সে আনন্দটি পাওয়ার লক্ষ্যেই শত শত বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা হয় এবং গ্রেফতারের পর জেল খানায় জঘন্য অপরাধীদের সাথে রাখা হয়।এবং পুলিশের হাতে সপ্তাহর পর সপ্তাহ রিমাণ্ডে দেয়া হয়। সে আনন্দটি পাওয়ার লক্ষ্যেই ধর্ষণে সেঞ্চুরির পর ছাত্রলীগ কর্মীরা উৎসব করে। শুধু গ্রেফতারকৃত নেতাকর্মীর দণ্ডবেড়ি নয়, এমনকি ধর্ষিতা নারীর সীমাহীন যাতনাও তাদের যে কতটা পুলক দেয় এ হল তার নজির। এমন এক নিষ্ঠুর আনন্দবোধ নিয়েই শেখ মুজিব সিরাজ সিকদার হত্যার পর দেশের সংসদে দাঁড়িয়ে তৃপ্তিভরে বলেছিলেন,“কোথায় আজ সিরাজ সিকদার?” বাংলাদেশের বিপদ, দেশ আজ  এরূপ ভয়ানক অপরাধীদের হাতে অধিকৃত। শুধু পদ্মা, মেঘনা বা তিস্তার পানি নয়, সমগ্র দেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়াতেই তাদের আনন্দ। সন্ত্রাস এখন আর স্রেফ দুর্বৃত্ত সন্ত্রাসীদের মনোপলি নয়,এটি এখন সরকারি প্রশাসনের হাতিয়ার। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের এ এক ভয়ংকর রূপ। শাসন ক্ষমতায় এর আগে আইয়ুব খান এসেছেন, ইয়াহিয়া খানও এসেছেন। মুজিবসহ বহু আওয়ামী লীগ নেতারা আগরতলা ষড়যন্ত্রের ন্যায় বহু গুরুতর অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন। কিন্তু তাদেরকে কি একদিনের জন্যও রিমাণ্ডে নিয়ে শারীরীক ভাবে অত্যাচার করা হয়েছে? কাউকে কি পায়ে দণ্ডবেড়ি পড়ানো হয়েছে? শেখ মুজিব তো জেলে প্রথম শ্রেনী পেয়েছেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ও একাত্তরে দেশোদ্রহী মামলার আসামী হওয়া সত্ত্বেও তার পায়ে দণ্ডবেড়ি পড়ানো দূরে থাক,পুলিশ কি একটি আঁচড়ও দিয়েছিল? অথচ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার মুখাকৃতিকে হিংস্র পশুবৎ করে সে ছবি দেশময় প্রচার করা হয়েছে। কিন্তু যে অপরাধ শেখ হাসিনা করছে তাঁকে আজ  কি বলা যাবে? সরকারি ভাবে এত খুণ,এত সন্ত্রাস ও এত দানবীয় নির্যাতনের পর শেখ হাসিনা ও তার সরকারকে মানবীয় বললে ইয়াহিয়া বা আইয়ুব খানকে কি বলা যাবে? ৩/১০/১১

 




আওয়ামী লীগের মানবহত্যা ও গণতন্ত্রহত্যার রাজনীতি

হত্যাপাগল স্বরাষ্টমন্ত্রী –

আওয়ামী লীগের রাজনীতির মূল এজেণ্ডাটি কি –তা নিয়ে এখনও কি কারো সন্দেহ আছে? সেটি দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা,অর্থনৈতীক উন্নয়ন বা জনকল্যাণ নয়। বরং সেটি যে কোন ভাবে ক্ষমতায় থাকা। এবং সে লক্ষ্যে রাজনৈতীক শত্রুদের নির্মূল। সেটির শুরু শেখ হাসিনা থেকে নয়,তার পিতা মুজিব থেকে। নিছক গদীতে থাকাটি নিশ্চিত করতে শেখ মুজিব গণতন্ত্রকেই কবরে পাঠিয়েছিলেন,এবং প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একদলীয় বাকশালী স্বৈরাচার। হত্যা করেছিলেন ৩০ হাজারের বেশী রাজনৈতীক নেতা-কর্মী। শেখ মুজিব দেশকে ভিক্ষার ঝুলি রূপে বিশ্বময় পরিচিত করেছিলেন। একমাত্র তার আমলেই মানুষ অভাবের তাড়নায় মাছধরা জাল পড়তে বাধ্য হয়েছিল। আজও  আওয়ামী লীগ মুজিবের সে দেশধ্বংসী নির্মূলের রাজনীতি থেকে বিন্দুমাত্র সরেনি। দেশে সন্ত্রাস বাড়ছে,বাড়ছে দ্রব্যমূল্য,বাড়ছে পানি-গ্যাস-বিদ্যুৎসংকট,বাড়ছে দূর্নীতি –কিন্তু তা নিয়ে সরকারের হুশ নেই। সরকারের নজর স্রেফ বিরোধীদের হত্যা,গুম ও নির্যাতন করায় এবং এভাবে গদীতে থাকায়। সে লক্ষ্যপুরণেই শেখ হাসিনা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানকে আস্তাকুরে ফেলেছে।

দেশে পুলিশ বাহিনী রয়েছে,র‌্যাব আছে,সেনাবাহিনীও আছে। কিন্তু তাদের দ্বারা রাজনৈতীক শত্রু-নির্মূলের এজেণ্ডাটি ইচ্ছামত পালিত না হওয়ায় আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নেতাদের ময়দানে নামতে বলেছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দীন খান আলমগীর প্রকাশ্য জনসভায় তাদের প্রতি জামায়াত-শিবির নির্মূলের নির্দেশ দিয়েছেন। প্রশ্ন হলো,নির্মূলের অর্থ কি? নির্মুলের অর্থ কাউকে আলিঙ্গণ বা চুম্বন করা নয়। বরং সেটি নিরেট হত্যা। এটি বুঝতে কি বেশী বিদ্যাবু্দ্ধি লাগে? এতদিন দেশে মশামাছি নির্মূলের অভিযান হতো। সে নির্মূলের অর্থ হতো কীটনাশক ঔষধ ছিটিয়ে মশামাছির হত্যা বা বিনাশ। আওয়ামী লীগের মন্ত্রীগণ আজ  যখন নির্মূলের ঘোষণা দেন তখন দেশ থেকে মশামাছি নির্মূলের কথা বুঝান না। বুঝান রাজনৈতীক শত্রু নির্মূলের। মুজিব আমলে সে শত্রু বলতে বুঝানো হতো জাসদ ও চীনপন্থি কম্যুনিস্টদের। আর এখন ইসলামপন্থিরা।

কোন সভ্যদেশে কোন মন্ত্রী বা রাজনৈতীক দলের কোন নেতা প্রতিপক্ষ নির্মূলের এমন প্রকাশ্য ঘোষণা দিবে সেটি কি ভাবা যায়? এখানে অপরাধ তো হত্যায় উৎসাহ দেয়ার। এটি তো রাজনৈতীক সন্ত্রাস। কোন সভ্য দেশে এ অপরাধে কারো রাজনীতির অধিকার দূরে থাক,তাকে তো নিশ্চিত জেলে যেতে হয়। অথচ মহিউদ্দীন খান আলমগীর এখনও মন্ত্রী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন নির্দেশে হ্ত্যাপাগল খুনীরা যখন রাস্তায় নেমে কাউকে খুন করে -তখন সে খুনের দায়ভার তো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর। যে দেশে সুস্থ্য আইন-আদালত আছে সে দেশে যে খুন করে তাকেই শুধু জেলে নেয়া হয় না,সে খুনের পিছনে যে গডফাদারটি উৎসাহ জোগায় তাকেও ডান্ডাবেরি পড়ানো হয়। সম্প্রতি নিহত বিশ্বজিৎ দাশের বড় ভাই মানিক দাশ সে মোটা বিষয়টি সহজেই বুঝতে পেরেছেন। তাই ঢাকায় এক সমাবেশে তিনি তাঁর ভাইয়ের খুনের অপরাধে স্বরাষ্টমন্ত্রীকে রিমান্ডে নেয়ার দাবী তুলেছেন।

রাজনৈতীক শত্রু নির্মূলের লক্ষ্যে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আজ থেকে তিরিশ বছর আগে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠন করেছিল। হত্যা বা নির্মূলের যে রাজনীতিটি সাধারণতঃ বনেজঙ্গলে লুকানো আন্ডারগ্রাউন্ড সন্ত্রাসীদের কাজ,আওয়ামী লীগ সে রাজনীতিকেই বাংলাদেশের প্রকাশ্য রাজপথে নামিয়ে আনে। ঢাকার রাজপথে সে সন্ত্রাসী রাজনীতির ভয়ংকর রূপটি দেশবাসী এবং সে সাথে বিশ্ববাসী দেখলো বিশ্বজিত দাশের নৃশংস হত্যার মধ্য দিয়ে। বিশ্বজিৎ অতীতের সকল নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছিল। সে একজন।হিন্দু। খুনিরা যে ছাত্রলীগের সেটি জানতো বলেই সে নিজের হিন্দু পরিচয়টি বার বার পেশ করেছে। হিন্দুরা যে আওয়ামী লীগের বিশ্বস্ত ভোটব্যাংক সেটি বিশ্বজিৎ তাদের জানিয়ে দিয়ে নিজের প্রাণ বাঁচাতে চেয়েছিল। নইলে সে মরণের মুহুর্তে তার মগজে সে যে হিন্দু সে পরিচয় দেয়ার খেয়াল আসবে কেন? কিন্তু তাতে তাঁর প্রাণ বাঁচেনি। হত্যাপাগল পশুরা কখনো কারো ধর্ম দেখে না,ছাত্রলীগের খুনিদের কাছে বিশ্বজিতের হিন্দুপরিচয়ও তাই গুরুত্ব পায়নি। খুনি তো অন্যকে খুণের আগে তার নিজের বিবেককে আগে খুন করে। বিবেক বেঁচে থাকলে কেউ কি রাজপথের নিরীহ মানুষকে খুন করে? আর ছাত্রলীগ যে এমন খুনীদের দিয়ে পরিপূর্ণ সেটি কি প্রমাণের অপেক্ষা রাখে? বাংলাদেশের হিন্দুদের জমিজমা ও তাদের মন্দিরের ভূমি কোন মাওলানা-মৌলভীর হাতে জবরদখল হয়নি। হয়েছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হাতে। সম্প্রতি রাজধানি ঢাকায় এক মন্দিরের বিশাল জমি আওয়ামী লীগ নেতাদের হাতে বেদখল হয়েছে,এবং সে বিষয়ে পত্রিকায় রিপোর্টও এসেছে। আওয়ামী লীগ যে শুধু হিন্দুদের নয়,কোন মানুষেরই বন্ধু হতে পারে না,সেটি বাংলাদেশে বহু মানুষ এখনও বুঝতে না পারলেও বিশ্বজিত প্রাণ দিয়ে বুঝে গেছে।

 

আওয়ামী লীগের খুনের রাজনীতি

প্রশ্ন হলো,ছাত্রলীগে এত খুনি ও এত সন্ত্রাসী কি করে সৃষ্টি হলো? মশা-মাছি হঠাৎ বেড়ে উঠে না,সে জন্য দূষিত পরিবেশ চাই। সন্ত্রাসের পরিচর্যাতেও তেমনি উপযোগী রাজনৈতীক সংস্কৃতি চাই। আওয়ামী লীগ সেটিই সৃষ্টি করেছে। চেঙ্গিস খাঁ ও হালাকু খাঁ দেশজয় ও লুন্ঠনের স্বার্থে তার গোত্রের হত্যাপাগল লোকদের নিয়ে ভয়ংকর এক সেনাবাহিনী গড়ে তুলেছিল। সে বাহিনীর লোকেরা বেড়ে উঠেছিল অতি রোগাগ্রস্ত চেতনা নিয়ে। ভয়ংকর নিষ্ঠুরতাই ছিল তাদের চরিত্রের প্রধান রূপ। লাখো লাখো নিরাপরাধ নারী-পুরুষ,শিশু-বৃদ্ধ মানুষকে সে বর্বর সৈনিকেরা আনন্দচিত্তে হত্যা করতে পারতো। হত্যার পর তাদের কর্তিত মাথা নিয়ে উৎসবও করতো। ঘরবাড়ি,মসজিদ-মাদ্রাসা ও লাইব্রেরীগুলোতে তারা আগুন দিত। বাগদাদ,সমরকন্দ,বোখারার ন্যায় মুসলিম সভ্যতার বিশাল বিশাল নগরগুলিকে তারা উৎসব ভরে ধ্বংস করেছে। এসব নগরীর লাখ লাখ নাগরিকদের তারা হত্যা করেছে। তবে চেতনার এ ভয়ংকর রোগে শুধু হালাকু-চেঙ্গিজ ও তার সেনাবাহিনীর লোকেরাই আক্রান্ত হয়নি। কলেরা-যক্ষা-এইড-য়ের সংক্রামক জীবাণূ সমাজ থেকে নির্মূল হয় না,নানা জনপদে তা বার বার ফিরে আসে। তেমনি সংক্রামক রুগ্ন চেতনাও মারা যায় না। হালাকু-চেঙ্গিজের চেতনাও তাই বহু দেশে বহু হালাকু-চেঙ্গিজ-হিটলারের জন্ম দিয়েছে। শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনারাও যে সে সংক্রামক চেতনায় ভয়ানক ভাবে আক্রান্ত সে প্রমাণ কি কম? তবে মুজিব ও হাসিনা তারা অনুসারিদের নিয়ে কোন ডাকাত দল গড়েননি,হালাকু চেঙ্গিজের ন্যায় কোন সেনাবাহিনীও গড়েননি। গড়েছেন রাজনৈতীক দল। সে দলটি হলো বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। লক্ষ্য,প্রতিপক্ষ বিরোধী দলগুলোর নিরস্ত্র নেতা-কর্মীদের নির্মূল করা এবং দেশের উপর দখলদারি প্রতিষ্ঠা করা। মুজিবের সন্ত্রাস থেকে মাওলানা ভাসানীর ন্যাপ যেমন রক্ষা পায়নি,রক্ষা পায়নি মুসলিম লীগও। রক্ষা পায়নি চীনপন্থি কম্যুনিস্টরা। তেমনি আজ  রক্ষা পাচ্ছে না জামায়াতে ইসলামি ও বিএনপির নেতা-কর্মীরা।

চেঙ্গিজ খাঁ ও হালাকু খাঁ’দের বিশাল সাম্রাজ্য স্থাপনের পিছনে কোন উন্নত আদর্শ ও ন্যায়নীতি ছিল না,ছিল হিংস্র পাশবিকতা। মুজিব ও তাঁর দল আওয়ামী লীগের রাজনৈতীক বিজয়ের পিছনেও কোন উন্নত আদর্শ ও ন্যায়নীতি নাই। শেখ মুজিবের রাজনীতি সবচেয়ে বড় বিজয়টি এসেছিল ১৯৭০ সালে নির্বাচনে। অথচ সেটি এসেছিল নিরেট ধোকাবাজি ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে। সে নির্বাচনে অন্য কোন দলকে মুজিব নির্বাচনি প্রচারে নামতেই দেয়নি। শুনিয়েছিলেন আট আনা সের চাল খাওয়ানার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি। পাকিস্তান আমলের পূর্ব পাকিস্তানকে তিনি শ্মশান বলেছিলেন,সে শ্মশানের বুকে তিনি বেহেশত নামিয়ে আনার ওয়াদা দিয়েছিলেন। অথচ বাস্তবে উপহার দিয়েছিলেন ভয়ানক দুর্ভিক্ষ -যাতে বহুলক্ষ মানুষের মৃত্যু ঘটেছিল। ওয়াদা দিয়েছিলেন বহুদলীয় পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রের। অথচ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একদলীয় বাকশালী স্বৈরাচার। দেশবাসীর সাথে ভন্ডামী আর কাকে বলে? আর তাঁর সন্ত্রাসী দুর্বৃত্তি? তিনি ১৯৭০ সালে ১৮ জানুয়ারিতে পল্টনে তাঁর দলীয় কর্মীরা জামায়াতে মিটিংয়ে হামলা করে তিনজন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করেছিল এবং আহত করেছিল শত শত নিরীহ মানুষ। এভাবে পন্ড করে দিয়েছিল জামায়াতের জনসভা। সে নির্বাচনি জনসভায় মাওলানা মওদূদীর বক্তৃতার কথা ছিল। ঐ একই স্থানে ২৫ জানুয়ারিতে জনসভা ছিল জনাব ফজলুল কাদের চৌধুরির নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগের। সেটিও হতে দেয়নি। সে ময়দানে নূরূল আমীন সাহেবের নেতৃত্বাধীন পিডিপির জনসভাও হতে দেয়নি। এই হলো আওয়ামী লীগের সংসদীয় গণতান্ত্রিক রাজনীতির নমুনা। দলটি ১৯৭০-য়ের নির্বাচনে একই রূপ সন্ত্রাস জারি রেখেছিল রাজধানীর বাইরেও। এভাবে কোন দলকেই তারা জনগণের কাছে যেতে দেয়নি।

যে কোন সভ্যদেশেই গণতন্ত্র হত্যা এক গুরুতর অপরাধ। প্রতিদেশে সে অপরাধে অপরাধীকে প্রাণদন্ড দেয়া হয়। বিলেতে গণতন্ত্র হত্যার অপরাধে দেশের রাজা প্রথম চার্লসকে সপ্তদশ শতাব্দীতে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল। গণতন্ত্রের হত্যাকারি হুসনী মোবারকে আজ  জেলে রাখা হয়েছে। নিষিদ্ধ করা হয়েছে তার দলকে। লিবিয়ার গাদ্দাফীকেও হত্যা করা হয়েছে। নিষিদ্ধ করা হয়েছে তার দলকে। তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট বিন আলীকে দেশ থেকে পলায়ন করে বাঁচতে হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে গণতন্ত্র হত্যাকারি শেখ মুজিব ও তার দলের শাস্তি হয়নি। ১৯৭৫ প্রাণ হারিয়ে সে অপরাধের শাস্তি থেকে মুজিব বেঁচে গিয়েছিলেন। মুজিব সেদিন মারা গেলেও আওয়ামী লীগ তাতে বেঁচে গিয়েছিল। নইলে সেদিন সে বাকশালী দুঃশাসনের শাস্তিস্বরূপ আওয়ামী লীগকে শিকড়শুদ্ধ নির্মূল হতে হতো। কিন্তু সেটি না হওয়ায় বিপদ বেড়েছে বাংলাদেশের জনগণের। গণতন্ত্রহত্যাকারি সে দলটি এখনও পুরোন শিকড় নিয়ে বেঁচে আছে এবং আজ  আবার বাকশালী স্বৈরাচার ফিরিয়ে আনার সুযোগ পেয়েছে। ফল দাঁড়িয়েছে,বাংলাদেশে আজ শুধু গণতান্ত্রিক স্বাধীনতাই বিপন্ন হয়নি,বিপন্ন হয়েছে জনগণের জানমালও। বিশ্বজিৎ খুন হয়েছে,ইলিয়াস আলী গুম হয়েছে এবং বহু জামায়াত-শিবিরকর্মী নিহত ও নির্যাতিত হচ্ছে তো সে বিপন্নতা নিয়েই।

 

আদালত এখন মেঠো আদালত

আওয়ামী আক্রমনের শিকার দেশের বিচার-আদালতও। কারণ স্বাধীন বিচার বাঁচলে দুর্বৃত্ত ও খুনিদের বাঁচাটি অসম্ভব হয়ে উঠে। তাই ডাকাত পাড়ায় ন্যায়-বিচারের সালিশ বসে না। বরং চলে ডাকাত-বিরোধীদের নির্মূলের আয়োজন। তেমন একটি লক্ষ্যকে সামনে নিয়েই আওয়ামী লীগ দেশের আদালতকে মেঠো আদালতে পরিণত করেছে। মেঠো আদালতের সে মডেলটি তারা খাড়া করেছিল নব্বইয়ের দশকে। নব্বইয়ের দশকে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল না। কিন্তু ক্ষমতার বাইরে থাকলেও রাজনৈতীক শত্রুনিধনের এজেণ্ডা থেকে তারা সরে দাড়ায়নি। সে এজেণ্ডা নিয়েই তারা সেদিন মাঠে আদালত বসিয়েছিল। সেটি সহরোয়ার্দি উদ্যানের মাঠে। এরূপ মেঠো আদালতে আসামীর বিরুদ্ধে যেমন বহু উকিল থাকে,তেমনি উকিলের চেয়েও পক্ষপাতদুষ্ট বহু বিচারক থাকে। কিন্তু থাকে না আসামীর পক্ষে কোন উকিল। থাকে না আদালতে আসামীর কথা বলার সুযোগ। তেমন একটি মেঠো আদালত নিয়েই আওয়ামী লীগের অহংকার। সে আদালতের মডেল নিয়ে তড়িঘড়ি করে যুদ্ধাপরাধী বিচারের নামে তারা আদালতের বাইরে আরেক আদালত গড়েছে। নাম দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল। এ আদালতে সাক্ষ্য দিতে এসে আদালতের সামনে থেকে পুলিশের হাতে সাক্ষীও হাইজ্যাক হয়ে গেছে। আজ  অবধি তার কোন সন্ধান মেলেনি। এই হলো বিচারের নমুনা!কোন কিছুকে আন্তর্জাতিক করতে হলে নিজ দেশের বাইরে অন্যদেশের লোকদের সাথেও তার সংশ্লিষ্টতা বাড়াতে হয়। ‘দি হেগ’-য়ে যে আন্তর্জাতিক আদালত রয়েছে তাতে নানা দেশের বিচারক যেমন আছে,তেমনি উকিলও আছে। কিন্তু বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক আদালতে সে সবের বালাই নাই। একজন ব্রিটিশ আইনবিদ এ আদালতে আসামী পক্ষের উকিল হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁকে অনুমতি দেয়া হয়নি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের নামে মস্করা আর কাকে বলে!

লক্ষণীয় হলো,নিজামূল হকের ন্যায় যেসব ব্যক্তিদের হাসিনা সরকার বিচারক রূপে বসিয়েছে তারা নব্বইয়ের দশকে সহরোয়ার্দি উদ্যানের মেঠো আদালেতের লোক। বিচারক পদে আসীন হলেও আসলে তারা আওয়ামী লীগের দলীয় ক্যাডার। যে আওয়ামী ক্যাডারগণ রাজপথে বিশ্বজিৎদের মত নিরীহ মানুষদের হত্যা করলো তারাই আজ  বিচারকের বেশে ঠান্ডা মাথায় নিরপরাধ মানুষ হত্যার ষড়যন্ত্র করছে। এ লক্ষ্য তাদের ভবিষ্যতের পরিকল্পনাটি আরো ভয়ানক। শুধু একটি বা দুটি গৃহে ডাকাতি করলে ডাকাতদের অস্তিত্ব বাঁচে না। চাই লাগাতর ডাকাতি। নিজেদের বাঁচার স্বার্থে ডাকাতিকে তারা তাই একটি পেশাগত ইন্সটিটিউশন রূপে বাঁচিয়ে রাখতে চায়। ইসলামপন্থিরা যে আওয়ামী লীগের চিরকালের শত্রু সেটি আওয়ামী লীগ বুঝে। ফলে শত্রুনিধনের সে প্রক্রিয়াকেও তারা যুগ যুগ চালু রাখতে চায়। তাই অধ্যাপক গোলাম আযম, মাওলানা দিলাওয়ার হোসেন সাঈদী বা মাওলানা নিজামীর মত লোকদের ফাঁসীতে ঝুলিয়েই তারা বিচারের কাজ শেষ করতে রাজি নয়। মানবাধিকার বিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনে নিজেদের সকল রাজনৈতীক শত্রুদের নির্মূলের এ ধারাকে তারা যুগ যুগ অব্যাহত রাখতে চায়। তাদের যুক্তি,একাত্তরের রাজাকারদের অনেকের মৃত্যু হলেও নতুন রাজাকার জন্ম নিচ্ছে। এ নতুন রাজাকারদেরও তার বিচার চায়। তাদের খুনের কাজে আদালতের বিচারকদের তারা ব্যবহার করতে চায়। আওয়ামী লীগের নেতাগণ তাদের সে হিংস্র অভিপ্রায়ের কথা গোপনও রাখেনি। আরো ঘোষণা দিয়েছে,স্রেফ জামায়াত নেতাদের বিচার নিয়ে তারা খুশি নয়,জামায়াতের সমর্থণ নিয়ে যারা ক্ষমতায় গিয়েছে তাদেরকেও তারা কাঠগড়ায় তুলবে। অর্থাৎ আদালতে তুলবে বিএনপির নেতাদেরও। তেমন একটি লক্ষ্য পূরণে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল নামের এ মেঠো আদালতকে তারা একটি প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে চায়।

কারা একাত্তরে অস্ত্র হাতে ময়দানে ছিল সেটি এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়,কারো এখন আওয়ামী লীগ ও তাদের প্রভু ভারতের বিরুদ্ধে কথা বলে এবং কারা শরিয়তের প্রতিষ্ঠা চায় সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। সেগুলি চিত্রিত হচ্ছে মানবতাবিরোধী অপরাধ রূপে। শাস্তিযোগ্য অপরাধ রূপে চিহ্নিত হচ্ছে ঘরে জিহাদ ও শরিয়তি বিধান বিষয়ক বই রাখাটিও। এ অপরাধে অপরাধীদের তালিকায় তারা দিন দিন নতুন নাম যোগ করতে থাকবে। এবং যাকে ইচ্ছা তাকে তারা কাঠগড়ায় তুলবে। আদালত এভাবে ব্যবহৃত নির্যাতনের হাতিয়ার রূপে। হিটলারের গ্যাস চেম্বারে গিয়ে ভস্ম হওয়ার জন্য কি ইহুদীদের অপরাধী হওয়ার প্রয়োজন পড়তো? বিশ্বজিৎকে নিহত হওয়ার জন্যও কি অপরাধী হতে হয়েছে? তেমনি আওয়ামী ক্যাডারদের আদালতে শাস্তি পাওয়ার জন্যও কি অপরাধী হওয়ার প্রয়োজন পড়বে? এসব মেঠো আদালতে রায় লেখা হয় গ্রেফতারের বহু আগেই,গ্রেফতার ও বিচারের মহড়া দেয়া হয় শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা পূরণের লক্ষ্যে। সরকার এমন আদালত থেকে শুধু একটি রায়ের জন্য পাগল,বিচারের জন্য নয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের প্রধান বিচারপতি নিজামূল হক ও ব্রাসেল্স-এ অবস্থানরত জিয়াউদ্দীনের মাঝের দীর্ঘ স্কাইপী আলোচনায় তো সে সত্যটিই বেরিয়ে এসেছে।

“আমার দেশ” পত্রিকাটি এক অতি সাহসী ও স্মরণীয় কাজ করেছে। সত্য গোপন করা ইসলামে হারাম। আর সেটি প্রকাশ করা অতি পূণ্যময় কাজ। আর “আমার দেশ” যে সত্যটি প্রকাশ করছে সেটি কোন মামূলী বিষয় নয়। বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার লাভের সাথে এটি জড়িত। “আমার দেশ” পত্রিকায় বিবরণটি ছাপা না হলে জনগণের সে গুরুত্বপূর্ণ সত্যটি অজানা থেকে যেত। নিজামূল হক নামের এই আওয়ামী ক্যাডারও তখন ইতিহাসে বিচারক রূপে স্বীকৃতি পেয়ে যেত এবং বহাল তবিয়তে থাকতো। প্রশ্ন হলো,বিচারকরূপী আওয়ামী লীগের এমন ক্যাডার কি শুধু নিজামূল হক একা? বাংলাদেশের আদালতগুলি তো তাদের দ্বারা এখন পরিপূর্ণ। এমন বিচারকদের কারণেই তো আদালতের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানটি বেআইনী ঘোষিত হয়ে গেলো। এবং আর গভীর রাজনৈতীক সংকটে গিয়ে পড়লো দেশ। সে রায়ের সাথে সুপ্রিম কোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুলের পকেটে চলে গেলে বাংলাদেশ সরকারের ত্রাণতহবিল থেকে বহু লক্ষ টাকা।

 

শেখ হাসিনার সন্ত্রাস

মুজিব মারা গেছে। কিন্তু মুজিবের গণতন্ত্র হত্যার চেতনাটি মরেনি। তা দারুন ভাবে বেঁচে আছে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও ক্যাডারদের মাঝে। বিরোধীদের নির্মূলের নীতিই ছিল মুজিবের রাজনীতি। সে নীতিটি যে আওয়ামী লীগে কতটা প্রকট,সেটি শুধু রাজপথে নিরীহ মানুষ হত্যাতেই প্রকাশ পাচ্ছে না। ফুটে উঠছে নেতাদের বক্তৃতা-বিবৃতিতেও। সারদা’র পুলিশ এ্যাকাডেমীতে প্রদত্ত এক বক্তৃতায় শেখ হাসিনা বলেছেন,“পুলিশ যেন ধৈর্যের সাথে জামায়াত-শিবিরকে প্রতিহত করে।” কিন্তু প্রশ্ন হলো,জামায়াত শিবিরকে কেন প্রতিহত করা হবে? তারা কি বাংলাদেশের নাগরিক নয়? রাজনীতির অধিকার কি তাদের মৌলিক মানবাধিকার নয়? সে অধিকারে হাত দেয়া তো সন্ত্রাস। অথচ সে সন্ত্রাসের রাজনীতিতে নেমেছেন শেখ হাসিনা। বাংলাদেশ কারো পিতার তালুক বা জমিদারি নয়। বাংলাদেশের মাটিতে শেখ হাসিনা ও তার দলের রাজনীতির যতটা অধিকার আছে, জামায়াত-শিবির কর্মীরও সে পরিমান অধিকার আছে। তা থেকে এক বিন্দু কম নয়। জামায়াত-শিবিরকে প্রতিহত করা ও নির্মূল করা যদি সুস্থ্য রাজনীতি হয়,তবে আওয়ামী লীগকে প্রতিহত করা ও নির্মূল করাও তো ন্যায্য রাজনীতি। এতে কি দেশে সংঘাত বাড়বে না? এমন প্রতিহত করার রাজনীতি কি কারো মানবাধিকারের উপর হামলা নয়? আর এমন হামলা কি শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ নয়? তাছাড়া রাজনীতিতে কোন দলকে প্রতিহত করার দায়িত্ব কেন পুলিশ নিবে? বরং পুলিশের দায়িত্ব হলো,যারা অন্যদের রাজনীতি প্রতিহত করার নামে তাদের মানবিক অধিকারে হাত দেয় তাদেরকে গ্রেফতার করা ও কোর্টে চালান দেয়া।

যে কোন দেশেই বিভিন্ন দলের মাঝে রাজনৈতীক লড়াই থাকে। তবে সেটি হতে হবে রাজনৈতীক ভাবে। পুলিশ দিয়ে নয়। দলীয় গুন্ডাদের দিয়েও নয়। সরকার কি জানে না যে দেশ আজ ভয়ানক বিপর্যয়ের মুখে। চোরদের হাতে দেশের শেয়ার বাজার থেকে ২০-৩০ হাজার কোটি টাকা চুরি হয়ে গেছে। হলমার্ক গ্রুফ একাই চুরি করে নিয়েছে সোনালী ব্যাংকের বহু হাজার কোটি টাকা। দূর্নীতির কারণে পদ্মা ব্রীজের কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। চোরদের দৌরাত্ম দেখে বিশ্বব্যাংক ঋণদান থেকে হাত গুটিয়ে নিয়েছে। হাজার হাজার মানুষ পথেঘাটে সন্ত্রাসীদের হাতে নিঃস্ব হচ্ছে,বহু হাজার মানুষ পথেঘাটে মারা যাচ্ছে,শত শত মহিলা ধর্ষিতাও হচ্ছে। অথচ প্রধানমন্ত্রী এনিয়ে পুলিশকে সক্রিয় হতে নসিহত করেননি। কারণ একটাই। তা হলো,এসব খুনি,সন্ত্রাসী,চোরডাকাত এবং ধর্ষকগণ প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতীক শত্রু নয়। তারা সরকারের ব্যর্থতার সমালোচকও নয়। আাওয়ামী লীগ সরকারের পদত্যাগ দাবী করে তারা রাস্তাতে নামে না,হরতালও করে না। ফলে তাদের দমন করাটি সরকারের প্রায়োরিটি নয়। কিন্তু যারা তাঁর অপশাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে রাস্তায় নামে, তিনি তাদের নির্মূল চান। এবং পুলিশকে নির্দেশ দিচ্ছেন তাদেরকে প্রতিহত করতে।

 

বিশ্বজিৎ দাশের খুনই কি প্রথম খুন?

বিশ্বজিৎকে নির্মম হত্যার পর ডেইলী স্টার,সমকাল,কালের কন্ঠ,মানবজমীণ,প্রথম আলোর ন্যায় আওয়ামী ঘরানার পত্রিকাগুলিও এরূপ নিষ্ঠুর হত্যার নিন্দা করেছে। তারাও বিচার দাবী করেছে। আওয়ামী রাজনীতির সমর্থক কলামিস্টদের অনেকে নিন্দা করে কলামও লিখেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো,বাংলাদেশের রাজনীতিতে কি এটাই প্রথম খুন? এই প্রথম যেন তাদের বিবেক মৃত অবস্থা থেকে জেগে উঠলো। এটি কি এজন্য যে বিশ্বজিৎ দাশ একজন হিন্দু? মুজিব আমলে হাজার হাজার মানুষ বিশ্বজিৎয়ের ন্যায় নিহত হয়েছে। হাজার হাজার নিহত হচ্ছে হাসিনার আমলে। কিন্তু কোন একটি খুনেরই কি বিচার হয়েছে? মুজিব আমলে যেমন হয়নি, হাসিনার আমলেও হচ্ছে না। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর জামায়াতের সমাবেশে হামলা করে ৬ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছিল। হত্যার পর আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা লাশের উপর নাচানাচি করেছিল। সে হত্যা কি বিশ্বজিৎ হত্যার চেয়ে কম নৃশংস ছিল? মিছিল করা মানবিক অধিকার। সে অধিকার খুনের মধ্য দিয়ে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছিল। তাই এ অপরাধ যেমন খুনের অপরাধ তেমনি মানাবাধিকার বিরোধী অপরাধ। কিন্তু আওয়ামী লীগের সে খুনিদের আজও  শাস্তি হয়নি। তা নিয়ে কোন মামলাও হয়নি। কিন্তু ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরে সে নৃশংস হত্যা নিয়ে কি আজকের ন্যায় পত্রপত্রিকায় এত লেখালেখি হয়েছিল? ছাপা হয়েছিল কি কোন ছবি? হয়েছিল কি এত টিভি টক শো? না হওয়ার কারণ কি এটি,নিহতরা হিন্দু ছিল না? এরশাদের শাসনামলে রাজশাহীর দুইজন শিবির কর্মীকে যেভাবে খুন করা হয়েছিল সেটি কি কম বীভৎস ও নিষ্ঠুর? শিবির কর্মীদের মাথা ইটের উপর রেখে অন্য ইট দিয়ে জোরে জোরে গুতিয়ে গুতিয়ে মাথার খুলি ভাঙ্গা হয়েছিল। আদালতে সে নৃশংস  খুনের বিচারও হয়েছিল। খুনিদের শাস্তিও হয়েছিল। কিন্তু সে খুনিদের শাস্তি ভোগ করতে হয়নি। সে গুরুতর অপরাধের শাস্তি দুর্বৃত্ত এরশাদকে দিয়ে শেখ হাসিনা মাফ করিয়ে নিয়েছিল। কিভাবে মাফ করিয়েছিল সে বিবরন দিয়েছেন এরশাদের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী আতাউর রহমান খান তার স্মৃতিচারণ মূলক বইতে। এরশাদ তখন তাঁর গদী বাঁচাতে মিত্র খুঁজছিল। মিত্র রূপে কাছে ভেড়াতে চাচ্ছিল শেখ হাসিনাকে। সে অছিলায় হাসিনাকে দাওয়াত করে প্রেসিডেন্টের অফিসে আনা হয়।আতাউর রহমান খান লিখেছেন,এরশাদের অফিসে ঢুকে শেখ হাসিনা গোঁ ধরলেন,রাজশাহীর শিবিরকর্মী হত্যার অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত খুনিদের প্রথমে শাস্তি মাফের ওয়াদা দিতে হবে,এবং সেটির পরই তিনি আলোচনায় বসবেন। এরশাদের কাছে তার গদীর স্বার্থটাই ছিল বড়। খুনিদের শাস্তি তার কাছে কোন বিবেচ্য বিষয়ই ছিল না। নিজেদের গদী বাঁচাতে এমন স্বৈরাচারিরা সাজাপ্রাপ্ত খুনিদের সাজা মাফ করতে যেমন রাজী,তেমনি প্রস্তুত হাজার হাজার খুনিকে রাস্তায় নামাতেও। এক্ষেত্রে স্বৈরাচারি এরশাদ,স্বৈরাচারি হাসিনা ও স্বৈরাচারি মুজিবের মাঝে কি কোন পার্থক্য আছে? স্বৈরাচারি আইয়ুবও উনসত্তরের গণ-আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে নিজের গদী বাঁচাতে শেখ মুজিবের উপর থেকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ন্যায় অতি সত্য মামলাটিও তুলে নিয়েছিলেন। এবং তাঁর ন্যায় এক দেশধ্বংসী ভয়ংকর অপরাধীকে রাজনীতি করার সুযোগ দিয়েছিলেন। পাকিস্তান বাঁচানোর চেয়ে আইয়ুব খানের কাছে গদী বাঁচানোই সেদিন বেশী গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

প্রতি পেশার লোকেরাই নিজ পেশায় সফলতা নিয়ে উৎসব করে। খুনের পর তাই উৎসব করে খুনিরা। পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে,বিশ্বজিৎয়ের হত্যার পরএ খুনিরা তাই উৎসব করেছে। বিশ্বজিৎয়ের রক্তে হাত রাঙিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতার জন্মদিনে খুনিরা সে রাতে নাচাচাচি করেছে। নব্বইয়ের দশকে জাহাঙ্গিরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতারা তেমনি এক উৎসব করেছিল। সেটি ছিল ধর্ষনে সেঞ্চুরির উৎসব। সে খবরও পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। সমগ্র মানব ইতিহাসে এ ছিল এক বিরল পৈশাচিক উৎসব। জঘন্য অপরাধীরও এমন রুচী সচারচর থাকে না। পতিতাপল্লিতে এমন উৎসব হয় না। কিন্তু এমন অপরাধীদের ভিড় আওয়ামী লীগে। তৎকালীন হাসিনা সরকারও সে জঘন্য অপরাধীদেরকে শাস্তি দেয়ার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেননি। তাকে খুঁজে তাঁর পুলিশ তাই গ্রেফতার করেনি।

অপরাধ কর্মের পর উৎসব করা –এটি ছাত্রলীগ বা যুবলীগ কর্মীদের ব্যক্তিগত বদ-অভ্যাস নয়,বরং এটিই আওয়ামী লীগের সংস্কৃতি। সে সংস্কৃতির গুরু খোদ শেখ মুজিব। সিরাজ সিকদারের হত্যার পর তাই শেখ মুজিব সংসদে দাঁড়িয়ে উৎসব-মুখর আনন্দ নিয়ে বলেছিলেন,“কোথায় আজ সিরাজ সিকদার?” আওয়ামী নেতাকর্মীদের মাঝে তেমনি এক উৎসব মুখরতা নিয়ে এসেছিল ১৯৭১য়ের ডিসেম্বরে ঢাকা স্টেডিয়ামে। সে উৎসবে হাতপা বাঁধা রাজকারদের বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করেছিল কাদের সিদ্দিক। বাংলাদেশের কোন লেখক,কোন সাংবাদিক বা কোন পত্রিকা সম্পাদকের চোখে সে নৃশংসতা সেদিন নৃশংসতা মনে হয়নি। অথচ কাদের সিদ্দিকীর হাতে রাজকার হত্যার সে উৎসবটি নৃশংস বর্বরতা রূপে ধরা পড়েছিল বিদেশী সাংবাদিকদের চোখে। টাইম ম্যাগাজিনসহ বিশ্বের বহু পত্রিকায় সে নির্মম হত্যাকান্ডের ছবি ছাপা হয়েছিল। সে বীভৎসতা সেদিন বিশ্বময় প্রচারও পেয়েছিল। আজ  যারা বিশ্বজিৎ হত্যার পর মানবতার বড় বড় বুলি আওড়াচ্ছেন তারাও সেদিন কাদের সিদ্দিকীর সে বর্বরতাকে নিয়ে উৎসব করেছিল।

ডাকাতের পল্লীতে অন্যায়কে অন্যায় এবং জুলুমকে জুলুম বলা যায় না। বরং সে সেখানে হয় নিষ্ঠুরতা ও বর্বরতা নিয়ে উৎসব। হিটলারের জামানায় গ্যাস চেম্বারে লক্ষ লক্ষ ইহুদীর মৃত্যুতেও জার্মানীতে তাই প্রতিবাদ হয়নি। প্রতিদেশে ফ্যাসিস্টরা একই ভাবে মানুষের বিবেককে হত্যা করে। বাঙালীর বিবেকে আওয়ামী লীগ যে কতটা পচন ধরিয়েছে আওয়ামী লীগ,যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীদের কর্ম ও আচরণ হলো তারই প্রমাণ। আজও  সে পচন নিয়ে বেঁচে আছে দলটির হাজার হাজার নেতা,কর্মী ও সমর্থক। বাংলাদেশ তো এসব দুর্বৃত্তদের কারণেই দুর্বৃত্তিতে বিশ্বে ৫ বার প্রথম হয়েছে।

 

খুনিরা কি শাস্তি পাবে?

বিশ্বজিৎয়ের হত্যার পর অনেকেই আজ  বিচার চাচ্ছে। বিচার চাইলেই কি বিচার পাওয়া যায়? জামগাছ থেকে আম পাওয়া যায় না। ফিরাউন-আবু লাহাব-আবু জেহেলদের সুবিচার সম্ভব হয়ে তাদের বিনাশের কেন প্রয়োজন দেখা দিল? ডাকাতদের বিরুদ্ধে বিচার শুরু বিচার শুরু হলে ডাকাত দল বাঁচে না। ডাকাত-সর্দারগণ তাই বিচারে আগ্রহী নয়। বরং কোন ডাকাত কোথাও বিপদে পড়লে ডাকাত-সরদারের দায়িত্ব হয় সে বিপদ থেকে তাকে উদ্ধার করা। চেঙ্গিজ খান কখনোই তার নৃশংস খুনি সৈনিকদের বিচার করেনি। হিটলারও করেনি। মুজিব-হাসিনাও করেনি। বরং উৎসাহ দিয়েছে বিরোধীদের নিধনে। অথচ তাদের আশে পাশে ভয়ানক অপরাধীদের  দিবারাত্র অবস্থান। পদ্মা-ব্রীজ নিয়ে দূর্নীতির সাথে সাবেক যোগযোগ মন্ত্রী আবুল হোসেন জড়িত সে প্রমাণ নানা মহল থেকে হাজির করলেও হাসিনা তার বিচার হতে দিতে রাজী নয়। চাপের মুখে দূদক মামলা রুজু করলেও সেটি করেছে আবুল হোসেনকে বাদ দিয়ে। কারণ,আবুল হোসেন দলের ক্যাডার। হাসিনার রাজনীতির বড় এজেণ্ডা হলো সাজাপ্রাপ্ত দলীয় ক্যাডারদের যে কোন ভাবে মুক্ত করানো। ভারতকে সে দেশের ভূমি,পদ্মার পানি বা দেশের মধ্যদিয়ে করিডোর দিতে রাজী। কিন্তু নিজদলের অপরাধীদের বাঁচাতে তাঁর নীতিতে কোন নড়চড় নেই। বাংলাদেশের আদালতে সাজা পেয়েছে এমন খুনিদের মধ্য থেকে ২৫ জনকে বিগত ৪০ বছরে প্রেসেডেন্টের পক্ষ থেকে ক্ষমা করা হয়েছে। সে ২৫ জনের মধ্যে ২১ জনকে ক্ষমা করা হয়েছে আওয়ামী লীগ শাসনামলে। কারণ, সাজপ্রাপ্তরা এসব খুনিরা হলো আওয়ামী লীগের ক্যাডার।

শেখ মুজিবের ন্যায় শেখ হাসিনাও জানে,আওয়ামী লীগের শক্তির উৎস দলের সুবোধ কর্মীরা নয়। বরং সেটি ফেনীর জয়নাল হাজারি,লক্ষিপুরের আবু তাহের,নারায়নগঞ্জের শামিম উসমান,ঢাকার ডা.ইকবালের মত হাজার হাজার সন্ত্রাসী খুনি। যে সন্ত্রাসী শক্তির বলে হালাকু-চেঙ্গিসের হাতে বিশাল ভূমি অধিকৃত হয়েছিল,সে সন্ত্রাসী শক্তির জোরেই বাংলাদেশে আজ  আওয়ামী লীগের হাতে অধিকৃত। নইলে দলটি বহু পূর্বে আবর্জনার স্তুপে গিয়ে পড়তো। ক্ষমতায় থাকা অবধি আওয়ামী লীগ তাই এ খুনের বিচার করবে না। মুজিবের শাসনামলে হাজার হাজার বিহারী নারীপুরুষকে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়েছে। বহু হাজার বিহার রমনীকে ধর্ষনও করা হয়েছে। বিহারীদের কয়েক লক্ষ ঘরবাড়ি ও দোকান-পাট আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা জবর দখল করে নিয়েছে। কোন সভ্য দেশে এমন অপরাধ হয় না। আজ  রামুতে বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে কৃত বাঙালীর অপরাধের বিরুদ্ধে কথা উঠছে,কিন্তু একাত্তরে বিহারীদের বিরুদ্ধে যে অকথ্য নির্যাতনটি হলো তার বিরুদ্ধে বাঙালীর প্রতিবাদ কৈ? গণদাবীর চাপে যদি বিশ্বজিৎ হত্যার বিচার হ্য়ও তবুও কি খুনিদের শাস্তি হবে? আদালতের পক্ষ থেকে তো বহু আওয়ামী লীগ কর্মীরই শাস্তি হয়েছে। কিন্তু সে শাস্তি প্রয়োগের সামর্থ কি আদালতের আছে? সেটি তো শেখ হাসিনার হাতে। তাঁর তাঁবেদার প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহামান তো দিবারাত্র অপেক্ষায় বসে আছেন এমন খুনিদের মুক্ত করে দিতে।

 

চেষ্টা কলংক ঢাকার

বাংলাদেশ ডাকাতপাড়া নয়,বর্বর দস্যুকবলিত হালাকু-চেঙ্গিজের দেশও নয়। দেশবাসী সবাই আওয়ামী লীগের ক্যাডারও নয়। এ দেশের বহু কোটি মানুষ মানবিক পরিচয় নিয়ে বাঁচতে চায়। আওয়ামী লীগের ভয় বেড়েছে মানবতাসম্পন্ন এসব মানুষদের নিয়ে। বিশ্বজিৎ হত্যার পর আওয়ামী লীগের ভাবমুর্তি যে দেশে-বিদেশে ড্রেনে গিয়ে পড়েছে সেটি দলটির অনেকেই টের পেয়েছে। পত্র-পত্রিকায় খুনিদের হামলার রক্তাত্ব ছবি ছাপার বিষয়টি বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক বিষয়। রাজনৈতীক খুনের এরূপ সচিত্র বিবরণ আর কখনো এভাবে সামনে আসেনি। এমন বীভংস বর্বরতার নিন্দা জানাতে বেশী মানবতা লাগে না। ফলে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের কান্ড দেখে আম-জনগণও ধিক্কার দিচ্ছে। মিডিয়ার এ সাহসী কর্ম শুধু খুনিদেরই নয়,আওয়ামী লীগ সরকারের আসল চেহারাও জনগণের সামনে জাহির করে দিয়েছে। আওয়ামী লীগের চরিত্রের উপর এখন আর কোন পর্দা নাই।

বিপদ বুঝে আওয়ামী লীগ এখন শুরু করেছে চুনকালি মাখা ভাবমুর্তির উপর হুয়াইটওয়াশের চেষ্টা। শুরু করেছে নতুন প্রপাগাণ্ডা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর ও প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ দাবি করেছেন,হামলাকারীরা ছাত্রলীগের কর্মী নন। অথচ তারা যে উভ্য়ই মিথ্যুক সেটির প্রমাণও এসেছে। খুনিরা যে ছাত্রলীগের কর্মী তা নিয়ে প্রথম আলো ১৫/১২/১২ তারিখে একটি বিশাল অনুসন্ধানী রিপোর্ট ছেপেছে। সেটির কিছু অংশ এরূপঃ “বিশ্বজিৎ দাশ হত্যার ঘটনায় মূল অভিযুক্তরা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী। কয়েকজনের পরিবার ও এলাকাবাসী এবং ছাত্রলীগের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য পাওয়া গেছে। জানা গেছে,বিশ্বজিৎ হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এইচ এম কিবরিয়ার পুরো পরিবারই আওয়ামী লীগের সমর্থক। গতকাল গ্রামের বাড়িতে গেলে কিবরিয়ার বাবা প্রথম আলোকে বলেন,আগে কোনো দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত না থাকলেও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর ছাত্রলীগের রাজনীতি শুরু করে কিবরিয়া। কিবরিয়ার বড় ভাই আসাদুজ্জামান শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। গ্রেপ্তারকৃত কাইয়ুম মিয়াও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের কর্মী। রাজন তালুকদারের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে বিশ্বজিৎ বেশি আহত হন বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের নেতারা। রাজন পুরো এলাকায়ই ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী হিসেবে পরিচিত।গতকাল গ্রামের লোকজন জানায়,রাজন ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী। এলাকায়ও দলের মিছিল-মিটিংয়ে সে অংশ নেয়।রাজনের বাবা প্রথম আলোকে বলেন,“রাজন ছাত্রলীগের রাজনীতি করে। সে বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়কের (সাবেক) কাছাকাছি থাকে।” একই কথা বলল গতকাল গ্রেপ্তার হওয়া সাইফুলের পরিবার। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ছাত্র সাইফুলের গ্রামের বাড়ি নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার চন্দনাবাড়ীর পূর্বপাড়ায়। সাইফুলের এলাকার সহপাঠীরা প্রথম আলোকে বলেন,জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর সাইফুল ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে।রাশেদুজ্জামান ওরফে শাওনের গ্রামের বাড়ি খুলনার পাইকগাছার নাছিরপুর গ্রামে। বাবা লুৎফর রহমান বলেন,“ঢাকায় যাওয়ার পরে ছাত্রলীগ করা শুরু করল।’ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র আবদুল্লাহ আল মামুনের গ্রামের বাড়ি দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার খলিলপুর সরদারপাড়ায়। আওয়ামী লীগের স্থানীয় কয়েকজন নেতা বলেন, মামুনকে তাঁরা ঢাকার ছাত্রলীগের একজন বড় নেতা হিসেবেই জানেন। চাপাতি দিয়ে বিশ্বজিৎকে কুপিয়েছে রফিকুল ইসলাম ওরফে শাকিল। তাঁর বাবা আনসার মিয়া বলেন,‘ঢাকায় রাজনীতিতে জড়িয়ে সে উচ্ছৃঙ্খল হয়ে পড়ে।’ মীর মো.নূরে আলম ওরফে লিমন রংপুরের পীরগাছা উপজেলার কৈকুড়ী ইউনিয়নের শুল্লিপাড়া গ্রামের মীর মো.নুরুল ইসলামের ছেলে। নুরুল ইসলাম বংশানুক্রমে আওয়ামী লীগের সমর্থক বলে তিনি জানান। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিশ্বজিৎ হত্যায় জড়িত যাঁদের নাম-ছবি গণমাধ্যমে এসেছে তাঁরা প্রত্যেকেই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের কর্মী।”

 

হেলেপড়া দেয়ালে শক্ত ধাক্কা

আওয়ামী লীগের দেয়াল এখন হেলে পড়েছে। এ দেয়াল গুড়িয়ে দেয়ার এখনই সময়। প্রয়োজন শুধু আরেকটি শক্ত ধাক্কার। দেরী হলে তারা আবার দেয়াল শক্ত করার সুযোগ পাবে। আওয়ামী লীগ শুধু জামায়াত-শিবিরের শত্রু নয়। স্রেফ বিএনপিরও নয়। হিযবুত তাহরীরেরও নয়। বরং তাদের শত্রুতা সমগ্র দেশবাসীর সাথে। গ্রামে হিংস্র বাঘ ঢুকলে বা গ্রামবাসীর ঘরে আগুণ লাগলে কি বিবাদ চলে? সবাইকে জোট বেঁধে তখন সে বাঘ বধ করতে হয় বা আগুণ থামাতে হয়। গ্রাম বাঁচলে গ্রামের রাজনীতিও বাঁচবে। তেমনি বিদেশীদের কোলে পুষ্ট স্বৈরাচারিদের হাত থেকে বাংলাদেশ বাঁচলে বাংলাদেশের রাজনীতিও বাঁচবে। বিপদের এ মুহুর্তে যে কোন বিবাদই বিপর্যয় আনবে। এ মহুর্তে প্রয়োজন হলো দল-মত নির্বিশেষে সকল দেশবাসীর মাঝে একতা। বাংলাদেশে এখন আওয়ামী লীগের দস্যুদের হানা পড়েছে। এ দস্যুদের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করতে না পারলে বহু বিশ্বজিৎকেই লাশ হতে হবে। বহু নিরীহ মানুষকে জেলের নির্যাতন পোহাতে হবে। বহু লোককেই গুম হতে হবে। বহু নিরীহ মানুষের ঘরবাড়ী ও দোকানপাটেও আগুণ লাগবে। এবং সমগ্র দেশ ভরে উঠবে প্রচন্ড অশান্তিতে।

তাছাড়া প্রতিটি ঈমানদারের একটি বাড়তি দায়িত্বও আছে। সেটি নিছক রাজনীতির নয়, বরং জিহাদের। আওয়ামী লীগ শুধু জুলুমবাজই নয়,তারা যে ইসলামের বিপক্ষ শক্তি সে সত্য তো তারা গোপন করিনি। আল্লাহ হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহই তাদের রাজনীতির মূল কথা। আল্লাহর পবিত্র শরিয়তী বিধানকে তারা আবর্জনার স্তুপে রাখতে চায়। অথচ প্রতিটি ঈমানদারের উপর ঈমানী দায়বদ্ধতা হলো সেটিকে দেশের আইন-আদালতে বসানোর। মু’মিন ব্যক্তি শুধু রুটি-রুজীর ধান্ধায় বাঁচে না। তাকে বাঁচতে হয় আল্লাহর দ্বীনের বিজয়ের সার্বক্ষণিক ভাবনা নিয়ে। ফলে এমন জালেম এবং আল্লাহর বিরুদ্ধে এমন বিদ্রোহীর বিরুদ্ধে জিহাদ যে খালেছ জিহাদ তা নিয়ে কি কোন সন্দেহ থাকে? বাংলাদেশের মুসলমানদের জন্য আজ বরং মহাসৌভাগ্যের দিন। সেটি এজন্য যে,জিহাদের পবিত্র অঙ্গণে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশের প্রতি ইঞ্চি ভূমি। জিহাদের পবিত্র ভূমির তালাশে তাকে এখন আর ফিলিস্তিন,সিরিয়া,কাশ্মির,চেচনিয়া,আরাকান বা আফগানিস্তানে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। সে ভূমি এখন তার পায়ের তলায়। হানাদার কুচক্রি শয়তান এখন তার হাতের নাগালে। হজে গিয়ে শয়তানের মুর্তিতে পাথর মারা থেকে এ সাক্ষাৎে শয়তানের মুখে আঘাত হানার সওয়াব কি কম? জিহাদের এ ময়দানে মোজাহিদগণ নামলে আল্লাহর ফিরেশতারাও যে নামবে সেটি তো সুনিশ্চিত। ফলে বিজয় যে এভাবে নিশ্চিত হবে তা নিয়েও কি সন্দেহ আছে? ১৬/১২/১২

 

 

 




আওয়ামী লীগের ঘৃণার রাজনীতি এবং সংঘাতের পথে বাংলাদেশ

নির্বাচনের পূর্বে আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের মূল লক্ষ্য ছিল, যেভাবেই হোক নির্বাচনী জয়। এজন্য তারা মিত্রতা গড়েছে সামরিক-বেসামরিক নানা পক্ষের সাথে। বিজয়ের পর এবার তাদের এজেন্ডা নিজেদের রাজনৈতিক দখলদারির স্থায়ী রূপ দেওয়া। সে লক্ষ্যে এখন তারা দখলদারি জমাতে চায় দেশবাসীর মনের ভূবনে। কারণ, একমাত্র চেতনার মানচিত্রের সাথেই স্থায়ী যোগসূত্র হলো রাজনৈতিক মানচিত্রের। এটি পাল্টে গেলে তাই পাল্টে যায় রাজনৈতিক মানচিত্রও। এজন্যই রাজনৈতিক বিজয়ের পর পরই প্রতিটি কৌশলি রাজনৈতিক পক্ষ্যই সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক বিজয়ে মনযোগী হয়। ইরানের জাতিয়তাবাদীরা ছিল এক্ষেত্রে অতি ধুরন্ধর। তারাই রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতার পর আদর্শিক ও ধর্মীয় বিচ্ছিন্নতাকে পাকাপোক্ত করে। ইতিহাস থেকে তার একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। ইসলামী সভ্যতার নির্মাণে শুরুতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ইরান।

এ বিশাল ভূ-খন্ডটি এক সময় মুসলিম উম্মাহর একটি শক্তিশালী অংশ ছিল। খোলাফায়ে রাশেদার পর আরবগণ যথন ভাতৃঘাতি সংঘাতে লিপ্ত হয় তখন কোরআনের বড় বড় মোফাচ্ছের, বিজ্ঞানী, চিকিৎস্যক, কবি-সাহিত্যিক ও দার্শনিক জন্ম নেয় ইরানে। ইমাম আবু হানিফা, আব্দুল কাদের জিলানী, আল ফারাবী, আল রাজি, ইবনে সিনা, ইমাম আল গাজ্জালী, শেখ সাদী, মাওলানা রুমীসহ বহু প্রতিভার জন্ম ইরানে। তারা শুধু ইরানের গৌরব ছিলেন না, গৌরব ছিলেন সমগ্র মুসলিম উম্মাহর। প্রখ্যাত সমাজ-বিজ্ঞানী ইবনে খুলদুনের মতে ইসলামের উদ্ভব আরবে হলেও ইসলামি সভ্যতার নির্মান ঘটে ইরানে। আব্বাসী খলিফার দূর্বল সময়ে সে ইরানই বিচ্ছিন্ন হয় মুসলিম উম্মাহ থেকে। বলা যায় মুসলিম ইতিহাসে ইরানই হলো জাতিয়তাবাদী বিচ্ছিন্নতার গুরু। ইরানী শাসকেরা সে বিচ্ছিন্নতাকে স্থায়ী রূপ দিতেই পাল্টে দিতে হাত দেয় সেদেশের মানুষের ধর্মীয় চেতনায়। জন্ম দেয় শিয়া মতবাদ। সাফাভী শাসকদের সে বলপূর্বক ধর্মীয় পরিবর্তনে লক্ষ লক্ষ সূন্নী মুসলমানকে হত্যা করা হয়। ফলে নিছক এক রাজনৈতিক প্রয়োজনে এককালের সূন্নী ইরান পরিণত হয় শিয়া রাষ্ট্রে। প্রতিবেশী মুসলিম রাষ্ট্র থেকে এভাবেই গড়া হয় ইরান ঘিরে বিভক্তির বিশাল প্রাচীর। মুসলিম উম্মাহর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ থেকে বিভক্তি গড়ে তোলার স্বার্থেই জন্ম দেয়া হয় এবং সে সাথে পরিচর্যা পায় তীব্র ঘৃণাবোধ। শিয়াদের সে ঘৃণা থেকে হযরত আবু বকর (রাঃ), হযরত উমর (রাঃ), হযরত উসমান (রাঃ), হযরত আয়েশা (রাঃ)র ন্যায় নবীজীর অতি প্রিয় ব্যক্তিরাও রেহাই পাননি। ইরানীরা মুখে যাই বলুক আজও তারা সমগ্র মুসলিম উম্মাহ থেকে বিচ্ছিন্ন সে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটেই। এভাবে সুযোগ হারিয়েছে মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্বদানে। কারণ বিচ্ছিন্নতাবাদী চেতনায় আর যাই হোক কোন কালেই কোন বৃহৎ জনগোষ্ঠির নেতা হওয়া সম্ভব নয়। তখন থেকেই ইরানে লোপ পায় প্যান-ইসলামিক চেতনা, এবং বেড়ে উঠে বর্ণবাদী চেতনা। সেসাথে বেড়ে উঠে মুসলিম উম্মাহর ক্ষতি সাধনের চেতনা। ক্ষতিসাধনের সে চেতনাতেই এদেশটির শিয়া শাসকেরা ইউরোপীয় শাসকদের সামরিক সহয়তা নিয়ে বার বার হামলা চালিয়ছে উসমানিয়া খেলাফতের পূর্ব সীমান্তে। মুসলিম সেনাবাহিনী যখন সমগ্র বলকান, গ্রীস, দক্ষিণ রাশিয়া, ক্রিমিয়াসহ বিশাল পূর্ব ইউরোপ দখল করে অস্ট্রিয়ার রাজধানী অবরুদ্ধ করে ফেলে সে সময় ইরান চাকু ঢুকিয়ে দেয় উসমানিয়া খেলাফতের পিঠে। ইতিহাসের সে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে পূর্ব সীমান্তে শুরু হয় শিয়া হামলা। মুসলিম সেনাদল তখন ভিয়েনা থেকে অবরোধ তুলে পিছু হটতে বাধ্য হয়। ইরানের সে হামলা না হলে ইউরোপের ইতিহাসই হয়তো ভিন্নভাবে রচিত হতো। সে সময় থেকেই ইরানের প্রতিভা ও সামর্থ্য নানা ভাবে ব্যয় হয়ে আসছে মুসলমানদের রক্ত ঝরাতে। সম্প্রতি আফগানিস্তান ও ইরাকে যে মার্কিন হামলা হলো তাতে সাহায্য ও সর্বাত্মক সমার্থণ দিয়েছে ইরান। এখন তারা সাহায্য দিচ্ছে ভারত ও পাশ্চাত্যের পাকিস্তান বিরোধী আগ্রাসনে। বাংলাদেশের বাঙ্গালী বর্ণবাদীরা আজ একই ভাবে সে মধ্যযুগীয় ইরানী বর্ণবাদীদের পথ ধরেছে। তারা নিজেরা বিচ্ছিন্ন হয়েছে উপমহাদশের অন্য মুসলমানদের থেকে। এবং সর্বোভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে উপমহাদেশে মুসলিম শক্তির উত্থান রুখবার কাজে। ইসলামি উম্মাহ থেকে তারা যে কতটা বিচ্ছিন্ন এবং ঘৃণা যে তাদের কতটা মজ্জাগত তারই প্রমাণ হলো, আজও পাকিস্তানের খন্ডিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখলে শুধু ভারতীয় কাফের বা ইসরাইলের ইহুদীরাই খুশি হয় না, আনন্দের বন্যা বইতে থাকে আওয়ামী মহলেও। অবাঙ্গালীদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সে ঘৃণা থেকে আল্লামা ইকবালের ন্যায় মহান কবিও রেহাই পাননি। অথচ আল্লামা ইকবাল ছিলেন মুসলিম উম্মাহর কবি। তিনি ছিলেন প্যান-ইসলামের কবি। মাতৃভাষা পাঞ্জাবী হওয়া সত্ত্বেও তিনি কবিতা লিখেছেন উর্দু ও ফার্সী ভাষায়। তার নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলের নাম ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ তার নাম সেখান থেকে মুছে দেয়। অথচ তিনি বাঙ্গালী মুসলমানদের কোন ক্ষতিই করেননি। জাতিয়তাবাদী চেতনা মানুষকে যে কতটা বিদ্বেষপূর্ণ ও বিবেকশূণ্য করে এ হলো তার নমুনা। এমন বিবেক শূণ্যতার কারণেই একজন ভিন্ন ভাষার বা ভিন্ন এলাকার নিরপরাধ মানুষও হত্যা করা বা তাকে তার বসত বাড়ী থেকে বের করে বা তার সম্পদের উপর দখল জমানো জাতিয়তাবাদীদের জন্য আদৌ অপরাধ মনে হয় না।

অথচ প্যান-ইসলামি চেতনা একটি জনগোষ্ঠিকে মুসলিম উম্মাহর কল্যাণে যে কতটা সৃষ্টিমুখি করে তারও প্রমাণ বাংলার মুসলমান। ১৯৪৭এ বাংলাদেশের মুসলমানদের কারণেই জন্ম নিয়েছিল বিশ্বের সর্ব বৃহৎ ও সবচেয়ে শক্তিশালী মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান। মুসলমানদের হাতে দিল্লী বিজয়ের পর এটিই ছিল ভারতের মুসলিম ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এ রাষ্ট্রটি গড়ায় যে সংগঠনটি কাজ করেছিল সেটি হলো মুসলিম লীগ। এবং সে মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা ঘটেছিল ঢাকায়। পাকিস্তান প্রস্তাবটিও উত্থাপন করেছিল বাংলার ফজলুল হক। কিন্তু পরবর্তিতে আওয়ামী লীগ আবির্ভুত হয় কাফের শক্তিবর্গের অতিবিশ্বস্ত মিত্ররূপে। তাদের কাছে ইসলাম ও মুসলিম স্বার্থের প্রতি অঙ্গিকারবদ্ধতা চিত্রিত হয় সাম্প্রদায়িকতা রূপে। এজন্যই তাদের প্রতিবারের নির্বাচনী বিজয় ভারতসহ সকল কাফের শক্তির কাছে এতটা উৎসবে পরিণত হয়। এমন একটি ইসলাম বিরোধী চেতনার কারণে প্রতিবেশী দেশে হাজার হাজার মুসলমানকে পুড়িয়ে হত্যা বা সেদেশের মুসজিদ ধ্বংস করা হলেও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মুখে কোন প্রতিবাদের ধ্বনি উঠে না, প্রতিবাদে রাজপথেও নামে না। পত্রিকায় বিবৃতিও দেয় না। প্যান-ইসলামি চেতনা থেকে এটি সম্পূর্ণ এক ভিন্নতর চেতনা। এমন চেতনার নির্মান হতে পারে একমাত্র প্যান-ইসলামি চেতনার বিনাশের পথ ধরেই। আওয়ামী লীগ সরকার তার সকল সামর্থ বিণিয়োগ করছে সে ইসলামি চেতনার বিনাশে। তারা এটিকে বলে রাজাকারের চেতনা। ইরানের স্বৈরাচারি শাসকেরা প্যান-ইসলামি চেতনার বিনাশে রাষ্ট্রীয় অর্থে পরিচর্যা দিয়েছিল ইরানী বর্ণবাদ ও শিয়া ধর্মমতের। আর আওয়ামী লীগ শেখাচ্ছে বাঙ্গালী জাতিয়তাবাদ ও ইসলাম-মূক্ত সেকুলার চেতনার। এলক্ষ্যে মুসলিম জনগণের দেওয়া রাজস্বের বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে নাচগান শেখানোর কাজে। অথচ ইসলামে নাচগান হারাম। কারণ, মানুষের এ পার্থিব জীবনকে পবিত্র কোরআনে আল্লাহপাক অভিহিত করেছেন একটি পরীক্ষাকেন্দ্র রূপে। নারীপুরুষ এখানে ব্যস্ত তাদের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা দিতে। এ পরীক্ষায় ফেল করলে তারা কোন চাকুরি হারাবে বা ডিগ্রি পেতে ব্যর্থ হবে তা নয়। বরং পরিণতিটি হবে ভয়ংকর। নিক্ষিপ্ত হবে জাহান্নামের আগুনে। পরীক্ষার হলে কি নাচগানের আয়োজন চলে? এমন একটি চেতনার কারণেই মুসলমানদের হাতে ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা নির্মিত হলেও নাচগান পরিচর্যা পায়নি। যখন পেয়েছে তখন মুসলমান আর প্রকৃত মুসলমান থাকেনি। পরিণত হয়েছে শয়তানের একনিষ্ঠ সেবকে। ইসলামের সত্যপথ থেকে মুসলমান তরুন-তরুনীদের বিভ্রান্ত করার কাজে নাচগান সব সময়ই একটি সফল হাতিয়ার। শয়তানী শক্তিবর্গ অতীতের ন্যায় আজও সেটি সর্বত্র প্রয়োগ করছে। এবং বাংলাদেশে আজ সেটি হচ্ছে অতি ব্যাপক ভাবে। কাফেরদের অর্থে এনজিওগুলি এখন নাচগানের চর্চাকে মাঠপর্যায়ে নিয়ে গেছে। অথচ ব্রিটিশদের শাসনামলেও এমনটি হয়নি। পাপচর্চার এ ক্ষেত্রগুলো এখন ইনস্টিটিউশন রূপে গড়ে উঠেছে। এনজিওদের প্রতিষ্ঠিত স্কুলের হাজার হাজার ছেলেমেয়েরা নেচেগেয়ে আনন্দ প্রকাশে এখন আর কোনরূপ সংকোচ বোধ করে না। যে লজ্জাকে ঈমানের অর্ধেক বলা হয়েছে সেটিকেই তারা বিদায় দিয়েছে ছোটদের শিশুমন থেকে। আর যেখানে নাচগান বাড়ে সেখানে মদ্যপান ও ব্যাভিচার বাড়বে সেটিই তো স্বাভাবিক। অনেকটা কান টানলে মাথা আসার মত। আর বাংলাদেশে সেগুলি তাই বাড়ছে অতি সমান তালে। বেশ্যাবৃত্তি তাই এখন আর পতিতাপল্লিতে সীমাবদ্ধ নয়, সেটি উপচিয়ে আবাসিক মহল্লায় ঢুকেছে। ফলে ব্যভিচারে সংক্রামিত হচ্ছে বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষকে। প্রায় দশ বছর আগের এক জরীপে প্রকাশ, বাংলাদেশের অর্ধেকের বেশী যুবক বিবাহের আগেই যৌন কর্মে লিপ্ত হয়। বাংলাদেশের ন্যায় একটি মুসলিম দেশের জন্য এর চেয়ে ভয়াবহ খবর আর কি হতে পারে? অথচ ইসলামের দুষমনদের জন্য এটি এক মহা-উৎসবের বিষয়। ডি-ইসলামাইজেশন যে কতটা সফল ভাবে হচ্ছে এ হলো তার বড় প্রমাণ।

পাশ্চাত্য দেশে কোন কুকর্মই এখন আর হারাম নয়। সেটি ব্যাভিচার হোক, সমকামিতা হোক বা মদ্যপান হোক। জায়েজ বলছে পুরুষের সাথে পুরুষের বিবাহকেও। পতিতাদের বলা হয় সেক্স-ওয়ার্কার। সে অভিন্ন পাশ্চাত্য মূল্যবোধই বিশ্বের কাফের শক্তিবর্গ এখন বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। পাশ্চাত্যের ভোগবাদী পাপাচারের কাছে খৃষ্টানধর্মের ধর্মীয় নেতা ও অনুসারিগণ যেমন আত্মসমর্পণ করেছে, তারা চায় ইসলামের অনুসারিগণ সেরূপ আত্মসমর্পণ করুক। এবং আত্মসমর্পণ না করাটাকে বলছে মৌলবাদ। সে মৌলবাদ নির্মূলের লক্ষ্যে তারা একদিকে যেমন শুরু করেছে সোশাল ইঞ্জিনীয়ারিং তেমনি অপরদিকে শুরু করেছে প্রকান্ড যুদ্ধ। ইঞ্জিনীয়াররা এতকাল রাস্তাঘাট, ব্রিজ ও কলকারখানা নির্মাণ করতো, আর এখন সোশাল ইঞ্জিনীয়ারীংয়ের নামে নিজেদের অর্থ, মেধা ও প্রযুক্তির বিণিয়োগ করছে সেকুলার ধাঁচের সমাজ-সংস্কৃতি, চেতনা ও রাষ্ট্র নির্মাণের কাজে। আর তাদের সে লক্ষ্যপুরণে অপরিহার্য গণ্য হচ্ছে, জনগণের চেতনা থেকে ইসলামের অপসারণ। যাকে বলা হয় ডি-ইসলামাইজেশন। বাংলাদেশের বহু টিভি নেটওয়ার্ক, অসংখ্য পত্র-পত্রিকা, শত শত এনজিও কাজ করছে সে সোশাল ইঞ্জিনীয়ারিং প্রজেক্টের আঁওতায়। ইসলামের নবজাগরণ প্রতিরোধের এটিই হলো তাদের মূল স্ট্রাটেজি। একাজে কাফের দেশ থেকে আসছে হাজার হাজার কোটি টাকার পুঁজি। আল্লাহর দ্বীনের প্রচার ও প্রতিষ্ঠা রূখতে এটিই এখন কাফের শক্তিবর্গের সম্মিলিত গ্লোবাল স্ট্রাটেজী। এলক্ষ্যে তারা মুসলিম দেশের ইসলামে অঙ্গিকার-শূন্য দলগুলোর সাথে গড়ে তুলেছে নিবিড় কোয়ালিশন। বাংলাদেশের সরকার ও তার সহযোগী সেকুলার এনজিওগুলো হলো সে কোয়ালিশনেরই অংশ। ইসলামি চেতনা বিনাশের কাজ ফলও দিচ্ছে। জনগণের সহযোগিতাও পাচ্ছে। বাংলাদেশে ইসলামি চেতনাধারীদের নানা ভাবে হেয় করা বা নির্যাতন করা এখন তাই গণ্য হচ্ছে উৎসবকর্ম রূপে। রাজপথে লগি-বৈঠা নিয়ে দাড়ি-টুপিধারিদের হত্যা করলেও পত্রিকার পাতায় তাই সেটি নিন্দনীয় না হয়ে বরং প্রশংসনীয় হয়। এরই আরেক সফলতা হলো, বাংলাদেশ এখন বাজার ধরেছে নারী রপ্তানিতেও। দেশেটি এখন থাইল্যান্ড, ফিলিপাইনের ন্যায় দেশের পথ ধরেছে। বিদেশী দুর্বৃত্তদের গৃহেই শুধু নয়, বাঙ্গালী পতিতাদের ভিড় বেড়ে চলেছে কোলকাতা, বোম্বাই ও করাচীর পতিতাপল্লিতেও। একাজ প্রথম শুরু করেছিল শেখ মুজিব। তিনি গৃহপরিচারিকার কাজ দিয়ে তেহরানে বহু শত মহিলাকে পাঠিয়েছিলেন। কথা হলো, বৃদ্ধ মহিলাকেও যেখানে ইসলামে একাকী হজ্বে যাওয়ার অনুমতি দেয়না সেখানে একজন যুবতি মহিলা অপরিচিত ব্যক্তির ঘরে গৃহপরিচারিকার কাজ নিয়ে বিদেশে যায় কি করে? অর্থের পিছে দৌঁড়াতে থাকলেও সেটি যে কত দ্রুত জাহান্নামের পথে নিয়ে যায এ হলো তার নমুনা। বাংলাদেশের সেকুলারদের মূল এজেন্ডা হলো নর-নারীদের অর্থের পিছে দৌড়াতে শেখানো, সত্যদ্বীন বা ইসলামের পিছে নয়। ইসলামের পিছে দৌড়ানোকে বরং মৌলবাদ বলে সেটিকে নির্মূলযোগ্যও বলছে। মাইক্রোক্রেডিটের ব্যবসায়ী এনজিওগুলো সূদকে ঘরে ঘরে প্রচলিত করেছে। এতবড় জঘন্য হারাম কাজ এমনকি ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ কাফেরদের শাসনামলেও এতটা ব্যপ্তি পায়নি। জনগণের মন থেকে ইসলামি চেতনা বিলুপ্তির লক্ষ্যেই এখন ২১শে ফেব্রেয়ারি, ২৫ শে মার্চ, ১৬ই ডিসেম্বর, পহেলা বৈশাখ, রবীন্দ্র জয়ন্তির ন্যায় দিবসগুলি এখন আর শুধু ঐ বিশেষ দিনে পালিত হয় না, পালিত হচ্ছে মাসাধিক কালব্যাপী।

ইসলামি চেতনা বিনাশের পাঠদানে এ মাসগুলোতে পাঠশালায় পরিণত হয় সারাদেশ। অথচ ইসলামের পরিচিতি বাড়াতে আওয়ামী লীগ একটি আলোচনা সভা বা একটি সেমিনারের আয়োজন করেছে সে নজির নেই। অথচ এরাই জোর গলায় বলে “আমরাও মুসলমান”। বাংলাদেশে ইসলামি চেতনা বিনাশের এ কাজে রাষ্ট্রীয় পুঁজির পাশাপাশি বিপুল পুঁজি বিণিয়োগ হচ্ছে কাফের দেশগুলোরও। সে পুঁজিতে দেশের নগর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জ জুড়ে ফুলে-ফেঁপে উঠছে বহু হাজার এনজিও। ইসলাম-বিরোধী এজেন্ডা বাস্তবায়নে তারা দেশী-বিদেশীদের সাথে গড়ে তুলেছে এক নিরেট পার্টনারশিপ।

আদর্শিক বা সাংস্কৃতিক আধিপত্যের পথ ধরেই আসে রাজনৈতিক আধিপত্য। একবার আদর্শিক বা সাংস্কৃতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হলে রাজনৈতিক আধিপত্য-স্থাপনে শত্রুপক্ষের কাছে যুদ্ধ-লড়াটা তখন অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। শুরু থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ সকল সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের স্ট্রাটেজী ছিল অন্যদেশের অভ্যন্তরে নিজেদের সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক দ্বীপ গড়া। তুরস্ক, মিশর, পাকিস্তানসহ অধিকাংশ মুসলিম দেশে সে দ্বীপগুলো হলো ক্যান্টনমেন্ট, অফিসপাড়া, আদালত, পতিতালয় ও ব্যাংকিং সেক্টর। এগুলোর সীমান্ত পাশ্চাত্য চেতনা ও মূল্যবোধের সাথে একাকার। ইসলামের হারাম-হালালের বিধান এসব জাগায় অচল। তারাই এখন পাশ্চাত্যের কাফের শক্তির একনিষ্ঠ মিত্র। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী তাই আজ নিজ দেশে হাজার হাজার মুসলমান হত্যা করছে অতিশয় আনন্দ-চিত্তে। তুরস্কে দেশের সৈনিকরা স্কুলের মেয়েদের মাথায় রুমাল বাধতে দিতেও রাজী নয়। মিশরে এরা রাজী নয় ইসলামপন্থিদের রাজনীতির ময়দানে আসতে দিতে। এখন পাশ্চাত্যের সেকুলারিস্টগণ সেরূপ অভিন্ন দ্বীপ গড়ছে রাজনীতির অঙ্গনেও। আর বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ হলো তাদের সে অভয় দ্বীপ। একজন পশ্চিমা দুর্বৃত্ত ব্যভিচারি বাংলাদেশের পতিতালয়ে বা মদের আসরে যে সমাদারটি পায় সেটি তো চেতনাগত অভিন্নতার কারণেই। তেমনি এক অভিন্নতার কারণেই ভারতীয় নেতারাও অতি আপনজন রূপে গৃহীত হয় আওয়ামী লীগ নেতাদের আসরে। আর ভারতের সাথে আওয়ামী লীগের সে গভীর সম্পর্কটি নতুন বিষয় নয়। সেটি গভীরতা পেয়েছিল আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবের আমলেই। ভারতীয় স্বার্থের সেবক রূপে দায়িত্ব-পালনের অঙ্গিকার নিয়ে তিনিই আগড়তলা গিয়েছিলেন। এবং সেটি ষাটের দশকে। ভারতীয় গুপ্তচর চিত্তরঞ্জন সুতোর বা কালিপদ বৈদ্যরা ছিলেন সে আমল থেকেই তার ঘনিষ্ঠ মিত্র। তিনিই ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিলেন বাংলাদেশের “তিন বিঘা” ভূমি । সীমান্ত বাণিজ্যের নামে তিনিই দেশের সীমান্ত তুলে দিয়েছিলেন, এবং এভাবে সুযোগ করে দিয়েছিলেন অবাধ লুণ্ঠনের। যার ফলে দুর্ভিক্ষ নেমে এসেছিল বাংলাদেশীদের জীবনে। তিনিই অনুমতি দিয়েছিল ফারাক্কা বাঁধ চালুর। এখন ভারত পরিকল্পনা নিচ্ছে ব্রম্মপুত্র নদীর উজানে “টিপাই বাধ” দেওয়ার। ফারাক্কার কারণে মরুভূমি হতে চলেছে উত্তর বঙ্গের বিশাল ভূ-ভাগ। এখন একই প্রক্রিয়ার শিকার হতে যাচ্ছে সিলেট বিভাগ। দখলে নিচ্ছে বঙ্গপোসাগরে জেগে উঠা তালপট্টি দ্বীপ। ভারত বাংলাদেশের জন্য নেপালে যাওয়ার জন্য ২০-৩০ মাইলের করিডোর দিতে রাজি হচ্ছে না, অথচ বাংলাদেশের মাঝখান দিয়ে ৫০০ মাইলের করিডোর চায়। ভারতের মধ্য দিয়ে নেপাল ও ভূটানে যাওয়ার করিডোর বাংলাদেশের যতটা অপরিহার্য সেরূপ অবস্থা ভারতের জন্য নয়। ভারত তার পূর্বাঞ্চলে যেতে পারে তার নিজ ভূমির মধ্য দিয়ে। অথচ এরপরও ভারত চাপ দিচ্ছে সে করিডোর আদায়ে এবং আওয়ামী লীগ সেটি বিবেচনাও করছে।

আওয়ামী লীগের বিজয়ে প্রতিবারেই বিপর্যয় এসেছে নানা ভাবে। প্রচন্ড বিপর্যয় এসেছে সেনাবাহিনীর উপরও। মুজিব আমলে সেনাবাহিনীর চেয়ে বেশী গুরুত্ব পেয়েছিল রক্ষিবাহিনী। আওয়ামী লীগের এবারের বিজয়ে দেশের রাজধানীতে নিহত হলো ৫৭ জন সেনা অফিসার। শত্রুতা সৃষ্টি হলো এবং অবিশ্বাস বাড়লো সেনাবাহিনী ও বিডিআরের মাঝে। পিলখানার রক্ত শুকালেও মনের মাঝে যে বিভক্তি ও ঘৃনা সৃষ্টি হলো সেটি কি দূর হবার? এতে কি দেশের প্রতিরক্ষা দৃঢ়তা পায়? এখন কথা উঠছে বিডিআরের বিলুপ্তির। সরকার ভাবছে, বিডিআরের নাম ও লেবাস পাল্টিয়ে আরেকটি বাহিনী গড়ার। সরকারের ধারণা, সমস্যা শুধু বিডিআর নামটি ও পোষাকটি নিয়ে। ভাবটা যেন, ফাইলপত্র ও অফিস আদালতের গা থেকে ‘বিডিআর’ নামটি বা তাদের লেবাসটি উঠে গিয়ে সেনা-অফিসারদের বুকে গুলি চালিয়েছে। তাই আওয়ামী লীগ সমাধান খুঁজছে ‘বিডিআর’ নামটি ও তার লেবাসটি বিলূপ্তির মাঝে। কিন্তু যারা গুলি চালালো, যারা সে হত্যাযজ্ঞে নেতৃত্ব দিল তাদের বিচারে অগ্রগতি কোথায়?

দুর্যোগ নেমেছে দেশের শিক্ষাঙ্গনেও। চরদখলের ন্যায় সেখানে দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আওয়ামী ক্যাডার বাহিনীর। শুধু ভিসি বা প্রিন্সিপালের অফিসেই নয়, দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আবাসিক হলগুলোর সিটগুলোর উপরও। আওয়ামী ক্যাডার বাহিনীর অনুমতি ছাড়া সেখানে কেউ থাকতে পারবে না। দলীয় নিয়ন্ত্রণ আসছে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রেও। লাশ হচ্ছে ছাত্ররা। ব্যাপক অবনতি ঘটেছে আইনশৃঙ্খলার। বাড়ছে চাঁদাবাজী, সন্ত্রাসী ও খুনখারাবী। একই রূপে হাত পড়েছে দেশের কৃষি ও শিল্পাঙ্গনেও। সরকারের বাণিজ্যনীতির কারণে ভারত থেকে অবাধে ঢুকছে ভারতীয় নিম্মমানের সস্তা পন্য। ফলে বাজার হারাচ্ছে বাংলাদেশের নিজস্ব পণ্য। কিছুদিন আগে তাই বাংলাদেশের কৃষকরা বাজার না পেয়ে রাস্তার উপর তাদের দুধ ঢেলেছে। সে ছবি টিভিতে দেখানো হয়েছে। দেশে বন্ধ হচ্ছে নিজস্ব সূতা তৈরীর কারখানা। হাত পড়েছে দেশের তাঁতীদের গায়েও। মুজিবামলেও এমনটিই ঘটেছিল। তখনও দেশী কারখানায় তালা লাগানো শুরু হয়েছিল। আগুনে ভস্মিভূত হয়েছিল বহু পাটের গুদাম। বাজারে প্লাবন এসেছিল তখন ভারতীয় পণ্যের। শিল্প-কৃষি-বাণিজ্য এভাবে একের পর এক বিধস্ত বা বেদখল হলে কি সে দেশের জনগণের কাছে ভিক্ষাবৃত্তি ছাড়া আর কোন রাস্তা খোলা থাকে? কথা হলো এভাবে কি একটি দেশের প্রতিষ্ঠা বাড়ে? বাড়ে কি সম্মান?

দেশের বিপর্যয় বাড়াতে আওয়ামী লীগ আরেকটি আত্মঘাতি পথও বেছে নিয়েছে। আর সেটি হলো রাজনৈতিক বিভক্তি ও ঘৃনার রাজনীতির। ইতিহাস থেকে খুঁজে খুঁজে তারা বিভক্তির সূত্র গুলো রাজনৈতিক ময়দানে নিয়ে আসছে। যুদ্ধ-অপরাধের মত ৩৮ বছরেরও পুরনো বিষয়কে তারা রাজনীতিতে টেনে আনছে। যারা ক’দিন আগে দিনদুপুরে নিহত ৫৭ জন সেনা-অফিসার হত্যার একটি সুষ্ঠ বিচার করতে হিমসিম খাচ্ছে, এবং এখন কোন আশার আলো দেখাতে পারছে না তারা আবার ৩৮ বছর পুরোন অপরাধের বিচার করবে। কান্ডজ্ঞান আছে এমন কোন ব্যক্তি কি সেটি বিশ্বাস করতে পারে? শেখ মুজিবের ২০ টাকা মণ দরে চাল খাওয়ানো বা শেখ হাসিনার প্রতি পরিবারে একজনের চাকুরিদানের ন্যায় নির্বাচনী ওয়াদার মতই এটি এক প্রকান্ড মিথ্যাচার। বিচার শুধু গলাবাজীতে হয় না, চাক্ষুষ প্রমাণ ও সাক্ষী-সাবুদও হাজির করতে হয়। অপরাধী কে অপরাধীরূপে প্রমাণের দায়িত্ব সরকারের। এবং বিচারকে গ্রহণযোগ্য করতে না পারলে নিজেদের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতাও যে আস্তাকুড়ে পড়বে সে খেয়াল কি তাদের আছে? ঘৃণার রাজনীতির শিকার হয়েছেন শেখ মুজিব নিজে ও তার পরিবার। সিরাজ সিকদারের হত্যার পর সংসদে তিনি ঘৃনা ও দম্ভভরে বলেছিলেন, “কোথায় আজ সিরাজ সিকদার?” কিন্তু সে কথা বলার পর তিনিও বেশী দিন বাঁচেননি। সিরাজ সিকদারের ন্যায় তিনিও লাশ হয়েছেন। কিন্তু মনে হচ্ছে আওয়ামী লীগ অতীতের ইতিহাসে থেকে কোন শিক্ষাই নেয়নি। তারা রাজনীতিতে জোয়ার দেখেছে ভাটাও দেখেছে। ভাটার সময় মুজিবের লাশ সিড়িতে পড়ে থাকলেও সে লাশ কেউ তুলতে এগুয়নি। ঘৃণা পেট্রোলের চেয়েও বিস্ফোরক। একবার সেটি ছড়িয়ে পড়লে সহজে সেটি থামে না। লক্ষ লক্ষ মানুষকে সেটি সাথে নিয়ে যায়। ইউরোপ এক সময় এ ঘৃণার কারণে দারুন ভাবে বিধ্বস্ত ও জনশুন্য হয়েছিল। তাই তারা নানা জাতিতে বিভক্ত ইউরোপকে এখন এক করতে ব্যস্ত। আরেকটি ধ্বংসযজ্ঞ তারা এড়াতে চায়। ইতিহাস থেকে যারা শিক্ষা নেয় তাদের আচরণটি এমনই হয়। আজকের ইরাক হলো আরেক দৃষ্টান্ত। অতিশয় ঘৃণার কারণে মানুষ সেখানে নিজেই পরিণত হচ্ছে বোমায়। ফেটে পড়ছে রাজপথে, মসজিদে ও বাজারে। পাঁচ লাখেরও বেশী মানুষের সেখানে মৃত্যু ঘটেছে। আরেক উদাহরন আলজেরিয়া।

রাজনীতি হলো একতা ও সম্পৃতি গড়ার নীতি। একমাত্র সে পথেই রাষ্ট্র সামনে এগোয়। দেশবাসীও নিজেদের মধ্যে সংহতি খুঁজে পায়। তাই যেদেশে রাজনীতি পরিপক্কতা পায় সেদেশের রাজনীতিতে একতা ও সম্পৃতি গুরুত্ব পায়। এবং লোপ পায় সংঘাত। হ্রাস পায় দল-উপদলের সংখ্যা। অন্য ভাষা, অন্য এলাকা ও অন্য নগরের মানুষকে রাজনৈতিক কর্মীরা তখন আপন করতে শেখে। কিন্তু আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা সে পথে চলতে রাজী নয়। শুরু থেকে ঘৃণা ও বিচ্ছিন্নতাই তাদের রাজনীতির মূল পুঁজি। মশামাছি যেমন নর্দমার নোংরা পানিতে বেঁচে থাকে, তেমনি এরাও বাঁচে ঘৃণার স্তুপে শিকড় ঢুকিয়ে। ফলে একতা, সৌহার্দ ও সম্পৃতির চর্চা তাদের হাতে বাড়বেই বা কেমন করে? পাকিস্তান আমলে অবাঙ্গালীদের ঘৃণা করাই ছিল তাদের রাজনীতির মূল পুঁজি, যোগ্যতা নয়। তাদের যোগ্যতা তো আজও ইতিহাস। মানুষ সেটি মুজিব আমলে যেমন স্বচোক্ষে দেখেছে তেমনি আজও দেখছে। তাদের এখনকার ঘৃণা দেশের ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে। তাছাড়া সাম্প্রতিক নির্বাচনী বিজয় প্রচন্ডভাবে তাদেরকে দাম্ভিকও করেছে। এতে তারা ধরাকে সরা জ্ঞান করছে। পেট্রোল ছিটানোর ন্যায় তারা শুধু ঘৃণাই ছড়িয়ে যাচ্ছে। লগিবৈঠা নিয়ে রাজপথে মুসল্লি হত্যা, যাত্রীভরা বাসে পেট্রোল বোমা মারা বা ইসলামপন্থিদের নির্মূলের হুমকি দেওয়া-সে ঘৃণার রাজনীতিরই ফসল। কিন্তু ভূলে যাচ্ছে, ঘৃণার যে বীজগুলি তারা অবিরাম ছিটাচ্ছে একসময় তা ফলবান বিশাল বৃক্ষে পরিণত হবে। এবং সে বিষবৃক্ষে শান্তি নয়, একমাত্র ঘৃণার বোমাই ফলবে। আর ঘৃণার সে বোমাগুলি একবার ফাটা শুরু করলে তাদের রাজনীতিই শুধু অসম্ভব হবে না, হাত পড়বে তাদের অস্তিত্বেও। সংঘাতটি আরো রক্তাত্ব হওয়ার নিশ্চিত কারণ হলো, এক পক্ষের কাছে সেটি পবিত্র জিহাদে পরিণত হবে। দেশ তখন আরেক ইরাক, আরেক আফগানিস্তান বা আলজেরিয়ায় পরিণত হবে। আওয়ামী লীগ কি জেনেবুঝে দেশকে সে দিকেই ধাবিত করছে?

 




আওয়ামী দুঃশাসনের দুই পর্বঃ  মুজিব-আমল ও হাসিনা-আমল

আওয়ামী দুঃশাসন ও হাসিনা বড়াই –

মানব চরিত্রে পরিবর্তন আসে তার দৈহীক গুণের কারণে নয়। জলবায়ু, ভূগোল বা সম্পদের গুণেও নয়। বরং ধ্যান­-ধারনা ও বিশ্বাসের কারণে। ধ্যান­-ধারনা ও বিশ্বাস পাল্টে গেলে তাই চরিত্রও পাল্টে যায়। নবী-রাসূলগণ তাই মানব চরিত্র পাল্টাতে তাদের বিশ্বাসে হাত দিয়েছেন। নবীজী (সাঃ)র  আমলে সাহবাদের চরিত্রে যে মহান বিপ্লব এসেছিল এবং যেভাবে নির্মিত হয়েছিল সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা -সেটি জীবন ও জগত নিয়ে তাদের বিশ্বাসে আমূল বিপ্লব আসার কারণে। সে বিশ্বাস পাল্টাতে কাজ করেছেন মহান আল্লাহর নাযিলকৃত ওহীর জ্ঞান নিয়ে। সে রূপ কোন ধ্যান-ধারণা ও জ্ঞানের বিপ্লব আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের জীবনে বিগত সত্তর বছরেও আসেনি। বরং তাদের সর্বাত্মক প্রয়াস পুরনো ও ব্যর্থ বিশ্বাসগুলোকে ধরে রাখায়। ফলে আওয়ামী লীগের বয়স বাড়লেও দলটির সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জীবনে কোনরূপ চারিত্রিক পরিবর্তন আসেনি। বরং বয়সের ভারে চোরডাকাতের জীবনে যেমন চুরিডাকাতিতে নৃশংস অভিজ্ঞতা আসে তেমনি নৃশৃংসতা এসেছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের জীবনেও। ফলে রাজনৈতীক সমাবেশ করা, মিছিল করা,পত্রিকা প্রকাশ করার ন্যায় জনগণের মৌলিক অধিকার হননে মুজিব যেরূপ বাকশালী একদলীয় শাসন চালু করেছিল, হাসিনা সেটি করছে বাকশাল চালু না করেই।

মুজিব দেশে লাল বাহিনী, রক্ষিবাহিনী, দলীয় স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী নামিয়ে তিরিশ-চল্লিশ হাজার মানুষ খুন করেছিল, কিন্তু ঢাকার রাজপথে একরাতে ৭ হাজার ৫ শত ৮৮ জন সেনা ও পুলিশ নামিয়ে শত শত মানুষ হত্যার ন্যায় নৃশংসতা দেখাতে ভয় পেয়েছিল। ফলে তার হাতে শাপলা চত্ত্বরের ন্যায় গণহত্যা হয়নি।কিন্তু শেখ হাসিনা সে গণহত্যাটি ঘটিয়েছে কোনরূপ দ্বিধাদ্বন্দ না করেই, এবং তেমন একটি ভয়ানক নৃশংসতার পরও হাসিনা বলছে সে রাতে কিছুই হয়নি। দূর্নীতিতে দেশ ছেয়ে গেছে,অথচ তারপরও হাসিনার বড়াই,দেশ তার আমলেই সবচেয়ে বেশী উন্নতি করেছে। দেশ যে কতটা দ্রুত দূর্নীতিতে ডুবে যাচ্ছে সেটির কিছুটা বিবরণ পাওয়া যায় সম্প্রতি শেখ হাসিনার প্রতি লেখা জনৈক লায়েকুজ্জামানের লেখা একটি খোলা চিঠিতে। সে চিঠি থেকে কিছুটা উদ্ধৃতি দেয়া যাকঃ “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, একটু খোঁজ-খবর নিয়ে দেখুন মন্ত্রী-এমপিরা কি করেছেন এলাকায়। .. তারা আচার-আচরণে, চলনে-বলনে কেবল আপনাকেই তুষ্ট রাখে বাক্যবাণে, কারণ আপনি হচ্ছেন তাদের কামাই-জামাই করার তাবিজ। ..বড় হচ্ছে মালপানি। বৃহত্তর ফরিদপুর থেকে নির্বাচিত একজন এমপি আগে ভাঙাচুরা একটা গাড়ি ব্যবহার করতেন, এখন তার দামি গাড়ি তিনটি। আগে থাকতেন ছোট্ট একটি ফ্ল্যাটে, এখন ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাটের মালিক। ওই এমপির নির্বাচনী এলাকার দলীয় কর্মীদের অভিযোগ, যারা টাকা নিয়ে আসেন তারা এমপির বাসার দোতলায় যেতে পারেন, যারা টাকা আনেন না তাদের ঠিকানা নিচে, তারা ওপরের তলায় পৌঁছতে পারেন না। ..চট্টগ্রামে বনকর্মীদের ত্রাহি অবস্থা, চেটেপুটে যারা খাচ্ছে তাদের কিছু বলার ক্ষমতা নেই বনকর্মীদের। এক ক্ষমতাধর মন্ত্রীর নিকট আত্মীয় তারা। হয়তো আপনার কাছে রিপোর্ট আছে অথবা নেই- কম করে হলেও ১০০ এমপিকে এলাকায় যেতে হয় হয়তো পুলিশ না হয় প্রাইভেট বাহিনী নিয়ে। ..কয়েক মাস আগে রাজশাহীর এক এমপিকে নিজের নির্বাচনী এলাকা থেকে ফিরতে হয়েছে দু’হাতে পিস্তলের গুলি ছুড়তে ছুড়তে। বিক্ষুব্ধ কর্মীদের রোষানল থেকে জীবন বাঁচাতে গুলি ছুড়ে পালাতে হয়েছে এমপিকে। এক কমিউনিস্ট মন্ত্রীর ভাগ্নে কিভাবে লুটে খাচ্ছে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ দুই দপ্তরের টেন্ডার- চোখ মেললেই তা দেখা যাবে। ওই কমিউনিস্ট মন্ত্রী ঢাকার প্লট বরাদ্দ দিচ্ছেন তার নির্বাচনী এলাকার নিকট আত্মীয়দের নামে। সরাসরি কোটার ওই প্লট পেতে অন্যরা গেলে তিনি বলে দেন প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশ লাগবে। বৃহত্তর ফরিদপুরের আরেক জাঁদরেল মন্ত্রীর সোনার ভাই তো এলাকায় মন্ত্রীর জনপ্রিয়তা তলানিতে এনে ঠেকিয়েছেন। জেলার সব কাজে মন্ত্রীর ভাইয়ের পার্সেন্টেজ লাগবে, কাজের আগে বাড়িতে তার ভাগের টাকা পৌঁছে দিতে হয়। মন্ত্রী আবার জনসভাতে ভাইয়ের প্রশংসা করে বলেন, এমন ভাই পাওয়া যায় কপাল ফেরে। নিশ্চুপ হয়ে যান কর্মীরা, ধমকের ভয়ে কেউ সত্য কথাটা বলেন না মন্ত্রীকে। দক্ষিণ-পশ্চিম এলাকার এক জেলা সদরের হায়ার করা একদা বাম নেতা এমপি তো বহাল তবিয়তে লুটে যাচ্ছেন তার দুই পুত্রধন আর এক মদের ব্যবসায়ী আওয়ামী লীগ নেতাকে সঙ্গে নিয়ে। ওই জেলার পাশে সীমান্ত এলাকার আরেক এমপি পুরো নির্বাচনী এলাকার টাকা রোজগারের সেক্টরগুলো তিন ভাগে ভাগ করে এক ভাগ রেখেছেন নিজের হাতে, অন্য দুই সেক্টরের একটি দিয়েছেন ছেলেকে, আরেকটি বউকে। উত্তরবঙ্গের এক মন্ত্রী মাঠে ছেড়ে দিয়েছেন তার ছেলেকে। টয়লেট নির্মাণের টেন্ডার হলেও তার ছেলে হাজির হয় সেখানে। দু’চারজন মন্ত্রী-এমপি বাদে বেশির ভাগেরই একই অবস্থা। এতো গেল কামাই রোজগারের দিক। এতো গেল এমপি-মন্ত্রীদের কথা। আপনার আশপাশ দিয়ে যারা আছেন তাদের খবর কি? নিজের এলাকায় তারা কত বিঘা জমি কিনেছেন, ক’টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান করেছেন একটু খবর নিলেই জানতে পারবেন ওই সব ফুটন্ত গোলাপের কথা, সর্বশেষ তারা বিসিএস নিয়োগে ডাক তুলেছেন ১০ লাখ করে। ওই সব হচ্ছে আপনার নাগের ডগায় বসে। আপনার আশপাশেই তারা টাকা বানানোর মেশিন বসিয়েছে”।

আওয়ামী যখনই ক্ষমতায় এসেছে তখন যে শুধু দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি সংকটে পড়ে তা নয়।প্রচন্ড ধস নেমে আসে দেশের প্রবাহমান ন্যায়নীতি, আচার-ব্যাবহার ও মূল্যবোধেও। ভয়ানক দুর্বৃ্ত্তিতে নামে তখন সমগ্র প্রশাসন। চোরডাকাতগণ তখন যেন প্রবল বল পায়। তাদের কারণে তখন ধস নামে দেশের শেয়ার বাজারে। সীমাহীন ডাকাতি শুরু হয় দেশের অর্থ ভান্ডারে। সন্ত্রাসীরা তখন দল বেঁধে প্রকাশ্য রাজপথে নেমে আসে। পুলিশ, র‌্যাব, বিজীবী তখন খুনিতে পরিণত হয়। হলমার্ক, ডিস্টিনী, বিসমিল্লাহ গ্রুপের ন্যায় কোম্পানীগুলো যেভাবে হাজার হাজার কোটি টাকা ডাকাতি করলো সেটি কি আর কোন আমলে হয়েছে? সরকারি চোর-ডাকাতদের কারণেই পদ্মাসেতুর বরাদ্দকৃতত ঋণ বাতিল হয়ে গেল। ফলে পিছিয়ে গেল পদ্মা সেতুর ন্যায় দেশের অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকল্প। এতে শুধু পদ্মা সেতু পিছিয়ে গেল না, বহু বছরের জন্য পিছিয়ে গেল সমগ্র দেশ। আমরা এমনিতেই বিশ্বের বহু দেশ থেকে নানা ভাবে পিছিয়ে আছি। এখন আর পিছিয়ে থাকার সময় আছে? এখন তো অতি দ্রুত সামনে এগুনোর সময়।কিন্তু বর্তমান সরকার সে এগিয়ে যাওয়াই অসম্ভব করে রেখেছে। দূর্নীতির দায়ে পদ্মা সেতু ভেস্তে গেলে কী হবে, সে দূর্নীতির দায়ে কারো কি কোন শাস্তি হয়েছে? বিশ্বব্যাংক এ নিয়ে বিশ্বব্যাপী হৈ চৈ করলেও হাসিনা সরকারের কি তাতে ঘুম ভেঙ্গেছে? বাংলাদেশ মতিঝিলের শাপলা চত্ত্বরে যেভাবে শত শত মানুষকে হত্যা করা হলো এবং গুম করা হলো অসংখ্য লাশ হলো সেটিই বা আর কোন কালে হয়েছে? আজ যেভাবে ইসলামপন্থিদের ধরে ধরে নির্যাতন করা হচ্ছে সেটি কি আবু জেহল ও আবু লাহাবের আমলের বর্বরতার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয় না? শতকরা ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে এটিই কি ইসলামপন্থিদের প্রাপ্য? বায়তুল মোকাররম মসজিদের গেটে পুলিশ তালা পর্যন্ত ঝুলিয়েছে, এভাবে মুসল্লিদের মসজিদের ঢুকতেও বাধা দেয়া হচ্ছে। কোন মুসলিম দেশে কি সেটি ভাবা যায়? সরকার পরিকল্পিত ভাবে দেশকে একটি সংঘাতের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

 

মিথ্যার সয়লাব ও বেইজ্জতি দেশবাসীর

আবহমান কাল থেকেই মানব জাতির মাঝে দুটি পক্ষ। একটি সত্যের, অপরটি মিথ্যার। নির্ভেজাল সত্যটি আসে মহান আল্লাহতায়ালা থেকে। সে সত্য থেকেই মানুষ পায় কোনটি ন্যায় এবং কোনটি অন্যায় তার একটি নির্ভূল ধারণা। সে ধারণাটি দৈহীক বলেও আসে না, কলকারখানায়ও আবিস্কৃত হয় না। মানব জাতিকে সত্যের সন্ধানটি দিতেই করুণাময় মহান আল্লাহতায়ালা এ পৃথিবীকে লক্ষাধিক নবী ও রাসূল পাঠিয়েছেন। সে মহাসত্য বিধানটি হলো ইসলাম। মানব জীবনে সবচেয়ে বড় কর্মটি হলো সে সত্যের অনুসরণ। এর চেয়ে বড় মহৎ কর্ম এ সংসারে দ্বিতীয়টি নাই। সে সত্য অনুসরণের ফলেই মু’মিন ব্যক্তি মৃত্যুর পর জান্নাত পায়। এবং এ পৃথিবীও নেক আমলে ভরে উঠে। এটিই ইসলামী মিশন। অপরদিকে শয়তান ও তার অনুসারিদের লক্ষ্য হলো ইসলামের সে কোরআনী সত্যকে সর্বভাবে প্রতিরোধ করা। সে কাজে তাদের মূল অস্ত্রটি হলো অসত্য তথা মিথ্যা। যারাই কোরআনী সত্যের অনুসারি নয়, তারাই মূলত শয়তানের অনুসারি। তাদের রাজনীতি, ধর্ম, সংস্কৃতি, ইতিহাস –সবকিছুই তখন হয়ে পড়ে মিথ্যা নির্ভর। সত্যের অনুসারিদের পরাজিত করতে তারা তখন মিথ্যাকে সর্বভাবে বলবান করে। নর্দমার কীট যেমন আবর্জনায় বেচে থাকে এরাও তেমনি মিথ্যার উপর বেঁচে থাকে। আল্লাহ প্রদত্ত সত্যের আলোকে নিভিয়ে দিতে শয়তানি পক্ষটি এজন্যই যুগে যুগে মিথ্যার জাল বিস্তার করেছে। আর মিথ্যার বিজয় এলে মিথ্যুক দুর্বৃত্তরাও তখন মর্যাদা পায়। সে মিথ্যার প্রবল জোয়ারের কারণেই নমরুদ ফিরাউন বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছে খোদা রূপে স্বীকৃত পেয়েছে। উপাস্য রূপে  স্বীকৃতি পেয়েছে কোটি কোটি গরুবাছুর, শাপশকুন, নদীনালা, পাহাড়-পর্বত ও প্রাণহীন মুর্তি। একই ভাবে মিথ্যার উপাস্যদের কাছে অতি নৃশংস খুনি ও স্বৈরাচারি শাসকেরা্ও রাষ্ট্রের নেতা, দেশের বন্ধু, জাতির পিতা এরূপ নানা খেতাবে ভুষিত হয়েছে। দেশে শয়তানের এ পক্ষটি ক্ষমতায় আসলে তাই সে দেশে মিথ্যার জোয়ার শুরু হওয়াটাই নিয়ম। বাংলাদেশ আজ সে জোয়ারেই প্লাবিত। কারণ, বাংলাদেশে আজ যারা ক্ষমতাসীন তারা ইসলামের পক্ষের শক্তি নয়। তাদের অবস্থান যে ইসলামের বিপক্ষে -সেটি তারা গোপনও রাখেনি। ইসলামের শরিয়তি বিধানের পরাজয় এবং ইসলামপন্থিদের হত্যা ও নির্যাতনের মাঝেই যে তাদের উৎসব -সেটিও তারা জাহির করছে বার বার। এদের কারণেই বাংলাদেশে আজ মিথ্যার প্রচন্ড সয়লাব। সে মিথ্যার কিছু উদাহরণ দেয়া যাক।

আওয়ামী সরকারের আবিস্কৃত মিথ্যার সংখ্যা অসংখ্য। সেটি যেমন মুজিব আমলে, তেমনি হাসিনার আমলে। মুজিবামলেই রচিত হয়েছিল একাত্তরে  তিরিশ লাখ নিহতের গাঁজাখোরি মিথ্যাটি। বলা হয়েছিল, বাংলা ভাষা ও বাঙালীর নির্মূলই হলো পাকিস্তান সরকারের মূল লক্ষ্য। মিথ্যাচারিরা স্বভাবতঃই বিবেকশূণ্য হয়। প্রকট মিথ্যাকে সত্য থেকে পার্থক্য করার জন্য যে কান্ডজ্ঞান লাগে সে কান্ডজ্ঞানের মৃত্যুটা এখানে জরুরী, নইলে গরুছাগলকে যেমন দেবতা বলা যায় না,তেমনি ফিরাউন-নমরুদকে ভগবান এবং মুজিবের ন্যায় বাকশালী গণশত্রুদের নেতা, পিতা বা বন্ধু বলার রূচি সৃষ্টি হয় না। বাংলাদেশের বুকে আওয়ামী শাসন মূলত সে মিথ্যার আবাদই বিপুল ভাবে বাড়িয়েছে। তাই নয় মাসে তিরিশ লাখ মানুষকে হত্যা করতে হলে যে প্রতিদিন ১১ হাজার মানূষ হত্যা করতে হয় সে হিসাব করার মত বিবেকটুকুও আওয়ামী বাকশালীদের ছিল না।

সম্প্রতি তারা আরেক মিথ্যা আবিস্কার করে বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। সেটি রানা প্লাজা ধসে যাওয়ার ১৭ দিন পর সে ধ্বংসস্তুপ থেকে রেশমাকে উদ্ধারের মধ্য দিয়ে। সত্য ঘটনা থেকে মানুষের নজর কাড়ার ক্ষেত্রে অলীক মিথ্যার সে সামর্থটি বিশাল। হাসিনা ও তার দলবল সেটি বুঝে,তাই তাদের দ্বারা ঘটে রেশমা কাহিনীর আবিস্কার। বিশ্ববাসীকে সে মিথ্যাটি তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। শুধু দেশবাসীর নয়, বিশ্ববাসীর নজরও সে ঘটনাটি কেড়ে নিয়েছিল। এভাবে সরকার প্রমাণ করতে চেয়েছিল তার সরকারের পরিচালিত উদ্ধার কাজটি কতই না চমৎকার ও সফল। সরকার তেমন একটি অহংকার নিয়েই তো উদ্ধারকাজে বিদেশীদের সহায়তা দানের প্রস্তাবকে ফিরিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু মিথ্যা দিয়ে অপরাধীদের যেমন কলংকমোচন হয় না,তেমনি সে পথে তাদের ইজ্জতও বাড়ে না। কারণ মিথ্যাকে বেশী দিন গোপন রাখা যায় না। রেশমা উদ্ধারের কাহিনীটি যে অলীক মিথ্যা ছিল -সেটি আজ আবিস্কৃত হয়েছে। আবিস্কৃত সে সত্যটি আজ বিশ্বব্যাপী বিপুল প্রচারও পাচ্ছে। লন্ডনের বহুল প্রচারিত ডেইলী মিরর তা নিয়ে এক নিবন্ধ ছেপেছে। সেরূপ খবর ছাপা হচ্ছে বিশ্বের অন্যান্য দেশেও। আর এতে কালিমা লেপন হচ্ছে শুধু শেখ হাসিনার মুখে নয়, বাংলাদেশীদের মুখেও। দেশে মশা মাছি ও গলিত আবর্জনার বাড়লে ম্যালেরিয়া,কলেরা ও টাইফয়েডের ন্যায় রোগভোগও বাড়ে। তাতে মানুষের মৃত্যুও বাড়ে। দুষিত পরিবেশে বসবাসের এটিই বিপদ। তেমনি আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেল অথচ বাকশালী স্বৈরাচার নেমে আসলো না,দেশের সম্পদ লুন্ঠিত হলো না বা পথে ঘাটে মানুষ লাশ হলো না –সেটি কি ভাবা যায়? গোখরা শাপ যেমন বিষ নিয়ে চলাফেরা করে,আওয়ামী লীগও তেমনি বেঁচে থাকে গণতন্ত্রধ্বংসী, অর্থনীতি ধ্বংসী তথা দেশধ্বংসী এক নাশকতামূলক চরিত্র নিয়ে। হাসিনার দুঃশাসন কি সেটিই প্রমাণ করছে না?

 

মুজিবী দুঃশাসনের দিনগুলি

মুজিবী দুঃশাসনের সে দিনগুলি বাংলাদেশের মানুষ আজ প্রায় ভূলতে বসেছে। অথচ আওয়ামী লীগ ও আজকের হাসিনা আমলের এ দুঃশাসন বুঝতে হলে মুজিবী দুঃশাসন বুঝাটি অতি জরুরী। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে ব্যর্থ হয় বলেই বোকাদের পা একই গর্তে বার বার পড়ে। অথচ নবীজী (সাঃ) বলেছেন, ঈমানদের পা কখনোই একই গর্তে বার বার পড়ে না। কারণ অতীত ইতিহাস থেকে তারা শিক্ষা নেয়। কিন্তু বাংলাদেশের মুসলমানদের ক্ষেত্রে সে জ্ঞানলাভটি ঘটেনি। ফলে একই গর্তে তাদের পা বার বার পড়ছে। ফলে তাদের জীবনে আওয়ামী দুঃশাসন বার বার নেমে আসছে। আওয়ামী নেতাকর্মীদের কাছে স্বর্ণযুগ হলো মুজিবামল। নবাব শায়েস্তা খাঁর আমল তাদের কাছে কিছুই না। মুজিবই হলো তাদের কাছে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী। কিন্তু কীরূপ ছিল সে মুজিবামল? মুজিবকে চিনতে হলে ইতিহাসের সে পাঠটি নেয়া অতি জরুরী। তবে সমস্যা হলো সে আমলের প্রকৃত চিত্রটি বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকায় মেলে না। সুপরিকল্পিত ভাবে সে বিবরণগুলি গায়েব করা হয়েছে। স্থান পেয়েছে শুধু মুজিব বন্দনা। কিন্তু সে ইতিহাসটি বেঁচে আছে বিদেশী পত্র-পত্রিকায়। এ নিবন্ধে সে আমলের বিদেশী পত্রিকা থেকেই কিছু উদাহরণ পেশ করা হবে। বাংলাদেশ সে সময় কোন ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-সাহিত্য,জ্ঞান-বিজ্ঞান বা খেলাধুলায় চমক সৃষ্টি করতে না পারলেও বিশ্বব্যাপী খবরের শিরোনাম হয়েছিল দুর্ভিক্ষ, দুর্নীতি, হত্যা, সন্ত্রাস, ব্যর্থ প্রশাসন ও স্বৈরাচারের দেশ হিসাবে।

১৯৭৪ সালের ৩০ শে মার্চ গার্ডিয়ান পত্রিকা লিখেছিল,“আলীমুদ্দিন ক্ষুধার্ত। সে ছেঁড়া ছাতা মেরামত করে। বলল, যেদিন বেশী কাজ মেলে,সেদিন এক বেলা ভাত খাই। যেদিন তেমন কাজ পাই না সেদিন ভাতের বদলে চাপাতি খাই। আর এমন অনেক দিন যায় যেদিন কিছুই খেতে পাই না।” তার দিকে এক নজর তাকালে বুঝা যায় সে সত্য কথাই বলছে। সবুজ লুঙ্গির নীচে তার পা দু’টিতে মাংস আছে বলে মনে হয় না। ঢাকার ৪০ মাইল উত্তরে মহকুমা শহর মানিকগঞ্জ। ১৫ হাজার লোকের বসতি। তাদের মধ্যে আলীমুদ্দিনের মত আরো অনেকে আছে। কোথাও একজন মোটা মানুষ চোখে পড়ে না। কালু বিশ্বাস বলল,“আমাদের মেয়েরা লজ্জায় বের হয় না-তারা নগ্ন।” আলীমুদ্দিনের কাহিনী গোটা মানিকগঞ্জের কাহিনী। বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের কাহিনী,শত শত শহর বন্দরের কাহিনী। এ পর্যন্ত বিদেশ থেকে ৫০ লাখ টনেরও বেশী খাদ্যশস্য বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু যাদের জন্য পাঠানো হয়েছে তারা পায়নি।”

 

আন্তর্জাতিক ভিক্ষার ঝুলি

১৯৭৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর তারিখে লন্ডনের নিউ স্টেট্সম্যান লিখেছিল,“বাংলাদেশ আজ বিপদজনক ভাবে অরাজকতার মুখোমুখি। লাখ লাখ লোক ক্ষুধার্ত। অনেকে না খেতে পেয়ে মারা যাচ্ছে। .. ক্ষুধার্ত মানুষের ভীড়ে ঢাকায় দম বন্ধ হয়ে আসে।.. বাংলাদেশ আজ দেউলিয়া। গত আঠার মাসে চালের দাম চারগুণ বেড়েছে। সরকারি কর্মচারিদের মাইনের সবটুকু চলে যায় খাদ্য-সামগ্রী কিনতে। আর গরীবরা থাকে অনাহারে। কিন্তু বিপদ যতই ঘনিয়ে আসছে শেখ মুজিব ততই মনগড়া জগতে আশ্রয় নিচ্ছেন। ভাবছেন, দেশের লোক এখনও তাঁকে ভালবাসে;সমস্ত মুসিবতের জন্য পাকিস্তানই দায়ী। আরো ভাবছেন,বাইরের দুনিয়া তাঁর সাহায্যে এগিয়ে আসবে এবং বাংলাদেশ উদ্ধার পাবে। নিছক দিবাস্বপ্ন.. দেশ যখন বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে,তখনও তিনি দিনের অর্ধেক ভাগ আওয়ামী লীগের চাইদের সাথে ঘরোয়া আলাপে কাটাচ্ছেন। .. তিনি আজ আত্মম্ভরিতার মধ্যে কয়েদী হয়ে চাটুকার ও পরগাছা পরিবেষ্টিত হয়ে আছেন।…সদ্য ফুলে-ফেঁপে ওঠা তরুণ বাঙালীরা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের শরাবখানায় ভীড় জমায়। তারা বেশ ভালই আছে। এরাই ছিল মুক্তিযোদ্ধা- বাংলাদেশের বীর বাহিনী। .. এরাই হচ্ছে আওয়ামী লীগের বাছাই করা পোষ্য। আওয়ামী লীগের ওপর তলায় যারা আছেন তারা আরো জঘন্য। .. শুনতে রূঢ় হলেও কিসিঞ্জার ঠিকই বলেছেনঃ “বাংলাদেশ একটা আন্তর্জাতিক ভিক্ষার ঝুলি।”

১৯৭৪ সালে ২রা অক্টোবর,লন্ডনের গার্ডিয়ান পত্রিকায় জেকুইস লেসলী লিখেছিলেন,“একজন মা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে,আর অসহায় দৃষ্টিতে তার মরণ-যন্ত্রণাকাতর চর্মসার শিশুটির দিকে তাকিয়ে আছে। বিশ্বাস হতে চায় না, তাই কথাটি বোঝাবার জন্য জোর দিয়ে মাথা নেড়ে একজন ইউরোপীয়ান বললেন, সকালে তিনি অফিসে যাচ্ছিলেন,এমন সময় এক ভিখারি এসে হাজির। কোলে তার মৃত শিশু। ..বহু বিদেশী পর্যবেক্ষক মনে করেন বর্তমান দুর্ভিক্ষের জন্য বর্তমান সরকারই দায়ী। “দুর্ভিক্ষ বন্যার ফল ততটা নয়,যতটা মজুতদারী চোরাচালানের ফল”-বললেন স্থানীয় একজন অর্থনীতিবিদ।.. প্রতি বছর যে চাউল চোরাচালন হয়ে (ভারতে) যায় তার পরিমাণ ১০ লাখ টন।”  ১৯৭৪ সালের ২৫ অক্টোবর হংকং থেকে প্রকাশিত ফার ইস্টার্ণ ইকোনমিক রিভিয়্যূ পত্রিকায় লরেন্স লিফসুলজ লিখেছিলেন,“সেপ্টেম্বর তৃতীয় সপ্তাহে হঠাৎ করে চাউলের দাম মণ প্রতি ৪০০ টাকায় উঠে গেল। অর্থাৎ তিন বছরে আগে -স্বাধীনতার পূর্বে যে দাম ছিল – এই দাম তার দশ গুণ। এই মূল্যবৃদ্ধিকে এভাবে তুলনা করা যায় যে,এক মার্কিন পরিবার তিন বছর আগে যে রুটি ৪০ সেন্ট দিয়ে কিনেছে,তা আজ কিনছে ৪ পাউন্ড দিয়ে। কালোবাজারী অর্থনীতির কারসাজিতেই এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটে।..২৩শে সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাওয়ার প্রাক্কালে শেখ মুজিব ঘোষণা করলেন,“প্রতি ইউনিয়নে একটি করে মোট ৪,৩০০ লঙ্গরখানা খোলা হবে।” প্রতি ইউনিয়নের জন্য রোজ বরাদ্দ হলো মাত্র দুমন ময়দা। যা এক হাজার লোকের প্রতিদিনের জন্য মাথাপিছু একটি রুটির জন্যও যথেষ্ট নয়।”

নিউয়র্ক টাইমস পত্রিকা ১৯৭৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর তারিখে লিখেছিল,“জনৈক কেবিনেট মন্ত্রীর কথা বলতে গিয়ে একজন বাংলাদেশী অর্থনীতিবিদ বললেন, “যুদ্ধের পর তাঁকে (ঐ মন্ত্রীকে) মাত্র দুই বাক্স বিদেশী সিগারেট দিলেই কাজ হাসিল হয়ে যেত,এখন দিতে হয় অন্ততঃ এক লাখ টাকা।” ব্যবসার পারমিট ও পরিত্যক্ত সম্পত্তি উদ্ধারের জন্য আওয়ামী লীগারদের ঘুষ দিতে হয়। সম্প্রতি জনৈক অবাঙালী শিল্পপতী ভারত থেকে ফিরে আসেন এবং শেখ মুজিবের কাছ থেকে তার পরিত্যক্ত ফার্মাসিউটিক্যাল কারখানাটি পুনরায় চাল করার অনুমোদন লাভ করেন। শেখ মুজিবের ভাগিনা শেখ মনি -যিনি ঐ কারখানাটি দখল করে আছেন-হুকুম জারি করলেন যে তাকে ৩০ হাজার ডলার দিতে হবে। শেখ মুজিবকে ভাল করে জানেন এমন একজন বাংলাদেশী আমাকে বললেন,“লোকজন তাকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করুক,এটা তিনি পছন্দ করেন। তাঁর আনুগত্য নিজের পরিবার ও আওয়ামী লীগের প্রতি। তিনি বিশ্বাসই করেন না যে, তারা দুর্নীতিবাজ হতে পারে কিংবা তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে।”

 

পথেঘাটে লাশ ও জালপড়া বাসন্তি

দেখা যাক,প্রখ্যাত তথ্য-অনুসন্ধানী সাংবাদিক জন পিলজার ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ সম্পর্কে কি বলেছিলেন। তিনি ১৯৭৪ সালের ১৭ই ডিসেম্বর লন্ডনের ডেইলী মিরর পত্রিকায় লিখেছেন,“একটি তিন বছরের শিশু -এত শুকনো যে মনে হলো যেন মায়ের পেটে থাকাকালীন অবস্থায় ফিরে গেছে। আমি তার হাতটা ধরলাম। মনে হলো তার চামড়া আমার আঙ্গুলে মোমের মত লেগে গেছে। এই দুর্ভিক্ষের আর একটি ভয়ঙ্কর পরিসংখ্যান এই যে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে ৫০ লাখ মহিলা আজ নগ্ন দেহ। পরিধেয় বস্ত্র বিক্রি করে তারা চাল কিনে খেয়েছে।” পিলজারের সে বক্তব্য এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সে অভিমতের প্রমাণ মেলে ইত্তেফাকের একটি রিপোর্টে। উত্তর বংগের এক জেলেপাড়ার বস্ত্রহীন বাসন্তি জাল পড়ে লজ্জা ঢেকেছিল। সে ছবি ইত্তেফাক ছেপেছিল। পিলজার আরো লিখেছেন,“সন্ধা ঘনিয়ে আসছে এবং গাড়ী আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম-এর লরীর পিছনে পিছনে চলেছে। এই সমিতি ঢাকার রাস্তা থেকে দুর্ভিক্ষের শেষ শিকারটিকে কুড়িয়ে তুলে নেয়। সমিতির ডাইরেক্টর ডাঃ আব্দুল ওয়াহিদ জানালেন,“স্বাভাবিক সময়ে আমরা হয়ত কয়েক জন ভিখারীর মৃতদেহ কুড়িয়ে থাকি। কিন্তু এখন মাসে অন্ততঃ ৬০০ লাশ কুড়াচ্ছি- সবই অনাহার জনিত মৃত্যু।”

লন্ডনের “ডেইলী টেলিগ্রাফ” ১৯৭৫ সালের ৬ই জানুয়ারি ছেপেছিল,“গ্রাম বাংলায় প্রচুর ফসল হওয়া সত্ত্বেও একটি ইসলামিক কল্যাণ সমিতি (আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম) গত মাসে ঢাকার রাস্তা,রেল স্টেশন ও হাসাপাতালগুলোর মর্গ থেকে মোট ৮৭৯টি মৃতদেহ কুড়িয়ে দাফন করেছে। এরা সবাই অনাহারে মরেছে। সমিতিটি ১৯৭৪ সালের শেষার্ধে ২৫৪৩টি লাশ কুড়িয়েছে- সবগুলি বেওয়ারিশ। এগুলোর মধ্যে দেড় হাজারেরও বেশী রাস্তা থেকে কুড়ানো। ডিসেম্বরের মৃতের সংখ্যা জুলাইয়ের সংখ্যার সাতগুণ।.. শেখ মুজিবকে আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বোঝা বলে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। ছোট-খাটো স্বজন প্রীতির ব্যাপারে তিনি ভারী আসক্তি দেখান। ফলে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া বাঁকী পড়ে থাকে।.. অধিকাংশ পর্যবেক্ষকদের বিশ্বাস,আর্থিক ও রাজনৈতিক সংকট রোধ করার কোন সুনির্দিষ্ট কার্যক্রম এ সরকারের নেই। রাজনৈতিক মহলো মনে করেন, মুজিব খুব শীঘ্রই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক বুনিয়াদ আরো নষ্ট করে দেবেন। তিনি নিজেকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করার পরিকল্পনা করছেন। ডেইলী টেলিগ্রাফের আশংকা সত্য প্রমাণিত হয়েছিল। শেখ মুজিব প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। জরুরী অবস্থা জারি করেছেন, আরো বেশী ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছেন। অবশেষে তাতেও খুশি হননি, সকল রাজনৈতিক দলগুলোকে নিষিদ্ধ করে তিনি একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করেছেন। আওয়ামী লীগ যাকে নিয়ে গর্ব করে, এ হলো তার অবদান।

১৯৭৫ সালের ২১শে মার্চ বিলেতের ব্রাডফোর্ডশায়র লিখেছিল,“বাংলাদেশ যেন বিরাট ভুল। একে যদি ভেঙ্গে-চুরে আবার ঠিক করা যেত। জাতিসংঘের তালিকায় বাংলাদেশ অতি গরীব দেশ। ১৯৭০ সালের শেষ দিকে যখন বন্যা ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে দেশের দক্ষিণ অঞ্চল ডুবে যায় তখন দুনিয়ার দৃষ্টি এ দেশের দিকে – অর্থাৎ তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের দিকে নিবদ্ধ হয়। রিলিফের বিরাট কাজ সবে শুরু হয়েছিল। এমনি সময়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আগুণ জ্বলে উঠল। –কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তাদের বিদ্রোহ যখন শুরু হলো,তখন জয়ের কোন সম্ভাবনাই ছিল না। একমাত্র ভারতের সাগ্রহ সামরিক হস্তক্ষেপের ফলেই স্বল্পস্থায়ী-কিন্তু ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী- যুদ্ধের পর পাকিস্তানের পরাজয় ঘটে এবং বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়।” পত্রিকাটি লিখেছে, “উড়োজাহাজ থেকে মনে হয়,যে কোন প্রধান শহরের ন্যায় রাজধানী ঢাকাতেও বহু আধুনিক অট্রালিকা আছে। কিন্তু বিমান বন্দরে অবতরণ করা মাত্রই সে ধারণা চুর্ণ-বিচুর্ণ হয়ে যায়। টার্মিনাল বিল্ডিং-এর রেলিং ঘেঁষে শত শত লোক সেখানে দাঁড়িয়ে আছে, কেননা তাদের অন্য কিছু করার নাই। আর যেহেতু বিমান বন্দর ভিক্ষা করবার জন্য বরাবরই উত্তম জায়গা।”

পত্রিকাটি আরো লিখেছে,”আমাকে বলা হয়েছে,অমুক গ্রামে কেউ গান গায়না। কেননা তারা কি গাইবে? আমি দেখেছি,একটি শিশু তার চোখে আগ্রহ নেই,গায়ে মাংস নেই। মাথায় চুল নাই। পায়ে জোর নাই। অতীতে তার আনন্দ ছিল না, বর্তমান সম্পর্কে তার সচেতনতা নাই এবং ভবিষ্যতে মৃত্যু ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারে না সে।” দেশে তখন প্রচণ্ড দুর্ভিক্ষ চলছিল। হাজার হাজার মানুষ তখন খাদ্যের অভাবে মারা যাচ্ছিল। মেক্সিকোর “একসেলসিয়র” পত্রিকার সাথে এক সাক্ষাৎকারে শেখ মুজিবকে যখন প্রশ্ন করা হলো, খাদ্যশস্যের অভাবের ফলে দেশে মৃত্যুর হার ভয়াবহ হতে পারে কিনা,শেখ মুজিব জবাব দিলেন,“এমন কোন আশংকা নেই।” প্রশ্ন করা হলো,“মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,পার্লামেন্টে বিরোধীদল বলেন যে,ইতিমধ্যেই ১৫ হাজার মানুষ মারা গেছে।” তিনি জবাব দিলেন,“তারা মিথ্যা বলেন।” তাঁকে বলা হলো,”ঢাকার বিদেশী মহলো মৃত্যু সংখ্যা আরও বেশী বলে উল্লেখ করেন।” শেখ মুজিব জবাব দিলেন,“তারা মিথ্যা বলেন।” প্রশ্ন করা হলো,দুর্নীতির কথা কি সত্য নয়? ভুখাদের জন্য প্রেরিত খাদ্য কি কালোবাজারে বিক্রী হয় না..? শেখ বললেন, “না। এর কোনটাই সত্য নয়।”(এন্টার প্রাইজ,রিভার সাইড,ক্যালিফোর্নিয়া, ২৯/০১/৭৫)।

বাংলাদেশ যে কতবড় মিথ্যাবাদী ও নিষ্ঠুর ব্যক্তির কবলে পড়েছিল এ হলো তার নমুনা। দেশে দুর্ভিক্ষ চলছে,সে দুর্ভিক্ষে হাজার মানুষ মরছে সেটি তিনি মানতে রাজী নন। দেশে কালোবাজারী চলছে,বিদেশ থেকে পাওয়া রিলিফের মাল সীমান্ত পথে ভারতে পাড়ী জমাচ্ছে এবং সীমাহীন দুর্নীতি চলছে সেটি বিশ্ববাসী মানলেও তিনি মানতে চাননি। অবশেষে পত্রিকাটি লিখেছে,“যে সব সমস্যা তার দেশকে বিপর্যস্ত করত সে সবের কোন জবাব না থাকায় শেখের একমাত্র জবাব হচ্ছে তাঁর নিজের একচ্ছত্র ক্ষমতা বৃদ্ধি। জনসাধারণের জন্য খাদ্য না হোক,তার অহমিকার খোরাক চাই।” (এন্টার প্রাইজ,রিভার সাইড, ক্যালিফোর্নিয়া,২৯/০১/৭৫)।

 

কবরে গেল গণতন্ত্র

শেখ মুজিব যখন বাকশাল প্রতিষ্ঠা করেন তখন লন্ডনের ডেইলী টেলিগ্রাফে পিটার গিল লিখেছিলেন,“বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর দেশ থেকে পার্লামেন্টারী গণতন্ত্রের শেষ চিহ্নটুকু লাথি মেরে ফেলে দিয়েছেন। গত শনিবার ঢাকার পার্লামেন্টের (মাত্র) এক ঘণ্টা স্থায়ী অধিবেশনে ক্ষমতাশীন আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে শেখ মুজিবকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেছে এবং একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁকে ক্ষমতা অর্পণ করেছে। অনেকটা নিঃশব্দে গণতন্ত্রের কবর দেয়া হয়েছে। বিরোধীদল দাবী করেছিল,এ ধরণের ব্যাপক শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তনের ব্যাপারে আলোচনার জন্য তিন দিন সময় দেয়া উচিত। জবাবে সরকার এক প্রস্তাব পাশ করলেন যে,এ ব্যাপারের কোন বিতর্ক চলবে না। .. শেখ মুজিব এম.পি.দের বললেন, পার্লামেন্টারী গণতন্ত্র ছিল “ঔপনিবেশিক শাসনের অবদান”। তিনি দেশের স্বাধীন আদালতকে “ঔপনিবেশিক ও দ্রুত বিচার ব্যাহতকারী” বলে অভিযুক্ত করলেন।” অথচ পাকিস্তান আমলে শেখ মুজিব ও তাঁর আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারী পদ্ধতির গণতন্ত্রের জন্য কতই না চিৎকার করেছেন। তখন পাকিস্তানে আইউবের প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির গণতন্ত্রই তো ছিল। গণতন্ত্রের নামে আওয়ামী লীগের পতাকা তলে যে কতটা মেরুদণ্ডহীন ও নীতিহীন মানুষের ভীড় জমেছিল সেটিও সেদিন প্রমাণিত হয়েছিল। এতদিন যারা গণতন্ত্রের জন্য মাঠঘাট প্রকম্পিত করত তারা সেদিন একদলীয় স্বৈরাচারি শাসন প্রবর্তনের কোন রূপ বিরোধীতাই করল না। বরং বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এতবড় গুরুতর বিষয়ে যখন সামান্য তিন দিনের আলোচনার দাবী উঠল তখন সেটিরও তারা বিরোধীতা করল। সামান্য এক ঘণ্টার মধ্যে এতবড় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিল। অথচ গণতান্ত্রিক দেশগুলিতে এক টাকা ট্যাক্স বৃদ্ধি হলে সে প্রসঙ্গেও বহু ঘণ্টা আলোচনা হয়। ভেড়ার পালের সব ভেড়া যেমন দল বেঁধে এবং কোন রুপ বিচার বিবেচনা না করে প্রথম ভেড়াটির অনুসরণ করে তারাও সেদিন তাই করেছিল। আওয়ামী লীগের গণতন্ত্রের দাবী যে কতটা মেকী,সেটির প্রমাণ তারা এভাবেই সেদিন দিয়েছিল। দলটির নেতাকর্মীরা সেদিন দলে দলে বাকশালে যোগ দিয়েছিল,এরকম একদলীয় স্বৈরচারি শাসন প্রতিষ্ঠায় তাদের বিবেকে সামান্যতম দংশনও হয়নি।

১৯৭৪ সালে ১৮ অক্টোবর বোষ্টনের ক্রিশ্চিয়ান সায়েন্স মনিটরে ডানিয়েল সাদারল্যান্ড লিখেছিলেন,“গত দুই মাসে যে ক্ষুধার্ত জনতা স্রোতের মত ঢাকায় প্রবেশ করেছে,তাদের মধ্যে সরকারের সমর্থক একজনও নেই। বন্যা আর খাদ্যাভাবের জন্য গ্রামাঞ্চল ছেড়ে এরা ক্রমেই রাজধানী ঢাকার রাস্তায় ভিক্ষাবৃত্তির আশ্রয় নিচ্ছে। কিন্তু মনে হচ্ছে সরকার এদেরকে রাজপথের ত্রিসীমানার মধ্যে ঢুকতে না দিতে বদ্ধপরিকর। এরই মধ্যে বেশ কিছু সংখ্যককে বন্দুকের ভয় দেখিয়ে ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানে সারাদিন দুই এক টুকরা রুটি খেতে পাওয়া যায, মাঝে মাঝে দুই-একটা পিঁয়াজ ও একটু-আধটু দুধ মেলে। ক্যাম্পে ঢুকলে আর বের হওয়া যায় না। “যে দেশে মানুষকে এমন খাঁচাবদ্ধ করে রাখা হয় সেটা কি ধরনের স্বাধীন দেশ”- ক্রোধের সাথে বলল ক্যাম্পবাসীদেরই একজন। ক্যাম্পের ব্লাকবোর্ডে খড়িমাটি দিয়ে জনৈক কর্মকর্তা আমার সুবিধার্থে প্রত্যেকের রুটি খাওয়ার সময়সূচির তালিকা লিখে রেখেছেন। “তালিকায় বিশ্বাস করবেন না”-ক্যাম্পের অনেকেই বলল। তারা অভিযোগ করল যে, রোজ তারা এক বেলা খেতে পায়- এক কি দুই টুকরা রুটি। কোন এক ক্যাম্পের জনৈক স্বেচ্ছাসেবক রিলিফকর্মী জানাল যে, “সরকারী কর্মচারীরা জনসাধারণের কোন তোয়াক্কা করে না। তারা বাইরের জগতে সরকারের মান বজায় রাখতে ব্যস্ত। এ কারণেই তারা লোকদেরকে রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে যাচেছ। বিদেশীরা ভুখা-জনতাকে রাস্তায় দেখুক এটা তারা চায় না।”

১৯৭৪ সালে ৩০ অক্টোবর লন্ডনের গার্ডিয়ান পত্রিকায় পিটার প্রেসটন লিখেছিলেন,“এই সেদিনের একটি ছবি বাংলাদেশের দৃশ্যপট তুলে ধরেছে। এক যুবতি মা -তার স্তন শুকিয়ে হাঁড়ে গিয়ে লেগেছে,ক্ষুধায় চোখ জ্বলছে – অনড় হয়ে পড়ে আছে ঢাকার কোন একটি শেডের নীচে,কচি মেয়েটি তার দেহের উপর বসে আছে গভীর নৈরাশ্যে। দু’জনাই মৃত্যুর পথযাত্রী। ছবিটি নতুন,কিন্তু চিরন্তন। স্বাধীনতার পর থেকে ঢাকা দুনিয়ার সবচেয়ে -কলিকাতার চেয়েও -বীভৎস শহরে পরিণত হয়েছে। সমস্ত বীভৎসতা সত্ত্বেও কোলকাতায় ভীড় করা মানুষের যেন প্রাণ আছে,ঢাকায় তার কিছুই নাই। ঢাকা নগরী যেন একটি বিরাট শরণার্থী-ক্যাম্প। একটি প্রাদেশিক শহর ঢাকা লাখ লাখ জীর্ণ কুটীর,নির্জীব মানুষ আর লঙ্গরখানায় মানুষের সারিতে ছেয়ে গেছে। গ্রামাঞ্চলে যখন খাদ্যাভাব দেখা দেয়,ভুখা মানুষ ঢাকার দিকে ছুটে আসে। ঢাকায় তাদের জন্য খাদ্য নেই। তারা খাদ্যের জন্য হাতড়ে বেড়ায়,অবশেষে মিলিয়ে যায়। গেল সপ্তাহে একটি মহলের মতে শুধুমাত্র ঢাকা শহরেই মাসে ৫০০ লোক অনাহারে মারা যাচ্ছে। এর বেশীও হতে পারে,কমও হতে পারে। নিশ্চিত করে বলার মত প্রশাসনিক যন্ত্র নাই।.. জন্মের পর পর বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সাহায্যের এক অভূতপূর্ব ফসল কুড়িয়েছিলঃ ৫০০ মিলিয়ন পাউন্ড। আজ সবই ফুরিয়ে গেছে। কোন চিহ্ন পর্যন্ত নেই। রাজনীতিবিদ, পর্যবেক্ষক, দাতব্য প্রতিষ্ঠান -সবাই একই যুক্তি পেশ করছে যা অপরাধকে নিরাপদ করছে, দায়িত্বকে করছে অকেজো। তাদের মোদ্দা যুক্তি হলো এই যে, বাংলাদেশের ঝুলিতে মারাত্মক ফুটো আছে। যত সাহায্য দেয়া হোক না কেন, দুর্নীতি, আলসেমী ও সরকারী আমলাদের আত্মঅহমিকার ফলে অপচয়ে ফুরিয়ে যাবে। বেশী দেয়া মানেই বেশী লোকসান।”

 

অরক্ষিত সীমান্ত

পাত্রের তলায় ফুটো থাকলে পাত্রের মালামাল বেড়িয়ে যায়,তবে তা বেশী দূর যায় না। আশে পাশের জায়গায় গিয়ে পড়ে। তেমনি বাংলাদেশের তলা দিয়ে বেড়িয়ে যাওয়া সম্পদ হাজার মাইল দূরের কোন দেশে গিয়ে উঠেনি,উঠেছিল প্রতিবেশী ভারতে। আর এ ফুটোগুলো গড়ায় ভারতীয় পরিকল্পনার কথা কি অস্বীকার করা যায়? পাকিস্তান আমলে ২৩ বছরে পাকিস্তান সরকারের সবচেয়ে বড় কাজ ছিল,সীমান্ত দিয়ে চোরাকারবারী বন্ধ করা। এ কাজে প্রয়োজনে পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যদের বসানো হত। অথচ শেখ মুজিব সীমান্ত দিয়ে চোরাকারবারি বন্ধ না করে ভারতের সাথে চুক্তি করে সীমান্ত জুড়ে বাণিজ্য শুরু করেন। এভাবে সীমান্ত বাণিজ্যের নামে দেশের তলায় শুধু ফুটো নয়,সে তলাটিই ধসিয়ে দিলেন। তলা দিয়ে হারিয়ে যাওয়া সম্পদ তখন ভারতে গিয়ে উঠল। ভারত বস্তুত তেমন একটি লক্ষ্য হাছিলের কথা ভেবেই সীমান্ত বাণিজ্যের প্রস্তাব করেছিল। অথচ পাকিস্তান আমলে ভারত এ সুবিধার কথা ভাবতেই পারেনি। অথচ মুজিব সেটাই বিনা দ্বিধায় ভারতের হাতে তুলে দিলেন। বাংলাদেশের বাজারে তখন আর রাতের আঁধারে চোরাচালানকারী পাঠানোর প্রয়োজন পড়েনি। দিন দুপুরে ট্রাক-ভর্তি করে বাংলাদেশের বাজার থেকে সম্পদ তুলে নিয়ে যায়। দুর্বৃত্তরা তখন পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত কলকারখানার যন্ত্রাংশ খুলে নামে মাত্র মূল্যে ভারতীয়দের হাতে তুলে দেয়। তলাহীন পাত্র থেকে পানি বেরুতে সময় লাগে না,তেমনি দেশের তলা ধসে গেলে সময় লাগে না সে দেশকে সম্পদহীন হতে। ভারতের সাথে সীমান্ত বাণিজ্যের দাড়িয়েছিল,ত্বরিৎ বেগে দুর্ভিক্ষ নেমে এসেছিল বাংলাদেশে। (নতুন সংস্করণ, ৩০/০৬/১৩)

 

 

 




অধিকৃত দেশ এবং দেশ বাঁচানোর জিহাদ

শত্রুর গ্রাসে দেশ

বাংলাদেশ আজ আর স্বাধীন দেশ নয়। দেশ অধিকৃত ইসলামের শত্রু, গণতন্ত্রের শত্রু, মানবতার শত্রু এবং চিহ্নিত বিদেশী শত্রুর ভয়ংকর জোগালদারদের হাতে। সাম্রাজ্যবাদী শত্রুদের হাত থেকে বাঙালী মুসলমানদের প্রকৃত স্বাধীনতা মেলে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগষ্টে। সে স্বাধীনতা শুধু ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের হাত থেকেই নয়,নব্য হিন্দুসাম্রাজ্য নির্মাণে দু’পায়ে খাড়া আগ্রাসী হিন্দুদের হাত থেকেও। বাঙালী মুসলমানদের সে স্বাধীনতাকে ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদী মহল শুরু থেকেই মেনে নেয়নি। কাশ্মীর,হায়দারাবাদ, গোয়া, মানভাদরের ন্যায় মুসলিম বাংলাকেও তারা ১৯৪৭ সালেই ভারত-ভূক্ত করতে চেয়েছিল। তারা তো চেয়েছিল অখন্ড ভারত। বাঙালী মুসলমানদের স্বাধীনতার সে মহান দিনটিকে ভারতীয় সাম্যাজ্যবাদী মহল আজও নিজেদের জন্য পরাজয়ের দিন মনে করে। ভারত মাতার দেহ খন্ডিত হওয়ার বেদনায় ভারতীয় হিন্দুগণ তো এখনও কাতর। তাদের স্বপ্ন তো সে খন্ডিত ভারতকে আবার একত্রিত করা। ভারতীয় বিদেশ নীতি, সামরিক নীতি ও স্বদেশ নীতির সেটি যে মোদ্দা কথা সেটি কি আজও কোন গোপন বিষয়? তাই ১৯৭১ য়ে পাকিস্তান ভাঙ্গাটি তাদের সে লক্ষ্য পূরণে প্রথম ধাপ মাত্র, শেষ ধাপ নয়। এজন্যই বাঙালী মুসলিমের স্মৃতি থেকে ভারত ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগষ্টকে ভূলিয়ে দিতে চায়। তবে সে লক্ষ্যটি শুধু ভারতীয়দের নয়, বাংলাদেশের বুকে ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদের জোগালদার ইসলামের ঘোরতর শত্রু আওয়ামী বাকশালী পক্ষটিরও। সে স্বাধীনতার বিরুদ্ধে উভয়ের পক্ষ থেকেও প্রচন্ড ষড়যন্ত্র শুরু হয় ১৯৪৭ সাল থেকেই।বাকশালি মুজিবের আগরতলা ষড়যন্ত্রের মূল পেক্ষপট তো সে ভারতসেবী এ ইসলাম বিরোধী চেতনা। তাই ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতা আন্দোলনের যারা মহান নেতা ছিলেন এবং ইসলাম ও মুসলিম স্বার্থের প্রতি যাদের প্রবল অঙ্গিকার ছিল তাদের স্মৃতিকে এ ভারতসেবী পক্ষটি নিজেদের রচিত ইতিহাসের বই থেকে বিলুপ্ত করেছে, অথবা ভিলেন রূপে খাড়া করেছে।

ভারতীয় হিন্দুদের প্রতি ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের অনুগ্রহ ও পৃষ্ঠপোষকতা ছিল বিশাল। অপর দিকে শোষণ ও নির্যাতনের যাঁতাকলে পড়ে মুসলমানগণ। হিন্দুদের খুশি করতেই আসাম ও পূর্ববঙ্গ নিয়ে গঠিত ১৯০৫ সালের ঢাকা কেন্দ্রীক নতুন প্রদেশকে ১৯১১ সালে ব্রিটিশ সরকার রদ করে দেয়। এটি ছিল স্রেফ কলকাতা কেন্দ্রীক বাঙালী হিন্দুদের কল্যাণে। প্রবল খুশিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তখন ব্রিটিশ রাজা পঞ্চম জর্জের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে কবিতা লেখেন। সে কবিতায় তিনি রাজা পঞ্চম জর্জকে “জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে ভারত-ভাগ্যবিধাতা! জয় হে,জয় হে,জয় হে,জয় জয় জয় জয় হে” বলে বিধাতার আসনে বসান। এই হলো রবীন্দ্রনাথের চেতনার মান। অথচ ভারতের বুকে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসন ছিল ছিল দস্যুবৃত্তির শাসন। বরং বহুলাংশে সে শাসন ছিল দস্যুবৃত্তির চেয়েও খারাপ। দস্যুরা সম্পদ লুন্ঠন করে, কিন্তু গৃহস্বামীর  হাত কেটে উপার্জনের সামর্থ কেটে নেয় না। অথচ সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশগণ সেটি করেছিল। বাঙালী মুসলিম তাঁতশিল্পীদের আঙুলকেটে তারা জগতবিখ্যাত মসলিন শিল্পকে ধ্বংস করেছিল। সেটি ছিল ব্রিটিশ বস্ত্র শিল্পকে বাজারে প্রতিদ্বন্দিহীন করার লক্ষ্যে।এমন জালেম সাম্রাজ্যবাদীদের বিধাতার আসনে বসানোর জন্য চেতনার পচনটি গভীর হওয়াটি জরুরী। কিন্তু গরুবাছুর,শাপশকুন বা পুতুলকে যারা ভগবানের আসনে বসাতে পারে তাদের সে মানসিক পচনটি কম? ব্রিটিশগণ আর যাই হোক গরুবাছুর বা শাপশকুন নয়। চেতনায় সে গভীর পচন নিয়ে রবীন্দ্রনাথ যেমন ব্রিটিশ রাজাকে বিধাতার আসনে বসিয়েছেন,তেমনি ভারতীয় কংগ্রেস নেতা মোহনদাস করম চাঁদ গান্ধি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ বাহিনীর জন্য সৈন্য সংগ্রহে নেমেছিলেন। সাম্রাজ্য রক্ষার সে যুদ্ধে ব্রিটিশকে বিজয়ী করতে ৭০ হাজারের বেশী ভারতীয় প্রাণও দিয়েছিল।

বঙ্গভঙ্গ রদের পর পূর্ব বাংলার মুসলমানদের মাঝে ব্রিটিশ বিরোধী প্রচন্ড ক্ষোভ। সে ক্ষোভকে প্রশমিত করতে ব্রিটিশ সরকার ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ওয়াদা দেয়। কিন্তু ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা পাক -কলকাতাকেন্দ্রীক হিন্দু কায়েমীস্বার্থপরগণ সেটিও চায়নি।পূর্ব বাংলার বুকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে তারা প্রচন্ড আন্দোলন গড়ে তোলে। ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা থেমে যায়। উচ্চ শিক্ষা বিস্তারের বিরুদ্ধে এমন ইতর আন্দোলন মানব ইতিহাসের আর কোথায়ও হয়েছে -সে নজির নেই। অথচ সেটি হয়েছে বাংলার বুকে। আরো বিস্ময়, কলকাতার রাজপথে সে ইতর বিক্ষোভে নেতৃত্ব দিয়েছেন খোদ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।অথচ সে রবীন্দ্রনাথের গানই আজ বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিত! বিবেকহীনতা আর কাকে বলে? বিবেকহীন এরূপ ব্যক্তিদেরকে সম্মান দিলে সে ভূমিতে কি বিবেকমান মানুষ সৃষ্টি হয়? বরং তাতে যা প্রবল ভাবে প্রতিষ্ঠা পায় তা হলো সত্যকে পরাজিত করা ও সত্যসেবী বিবেকমান মানুষদেব হত্যা করার পেক্ষাপট। এমন এক প্রেক্ষাপটেই বাংলাদেশ আজ ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে অধিকৃত।

ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের চেয়েও ভারতের হিন্দুগণ যে অধিক সাম্রাজ্যবাদী ও অধিক মুসলিম-বিরোধী -সে প্রমাণ শুধু ১৯৪৭য়ের পূর্বেই নয়,আজও তারা লাগাতর পেশ করে চলেছে। ফলে ১৯৪৭য়ের পর বিগত ৬০ বছরে ভারতীয় হিন্দুদের হাতে যত মুসলিম নিহত হয়েছে বা যত মুসলিম নারী ধর্ষিতা হয়েছে বা যত মসজিদ ও মাদ্রাসা ধ্বংস হয়েছে তা ব্রিটিশ শাসনের ১৯০ বছরে হয়নি। ভারতে প্রায় ২০ কোটি মুসলমানের বাস। বাংলাদেশ বা পাকিস্তানে এত মুসলমান নেই। অথচ ঢাকা, করাচী বা লাহোরের ন্যায় একটি মাত্র শহরে যত মুসলিম ডাক্তার, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী,ব্যবসায়ী, শিক্ষাবিদ,আলেম, কৃষিবিদ বা হিসাববিজ্ঞানী তা সমগ্র ভারতের মুসলমানদের মাঝে নাই। ভারতীয় মুসলমানদের যে কতটা পরিকল্পিত ভাবে দাবিয়ে রাখা হচ্ছে সেটি প্রমাণে কি এরপরও কোন দলীলের প্রয়োজন পড়ে? অথচ বাংলাদেশের আওয়ামী বাকশালীদের কাছে ভারতের এ মুসলিম বিরোধী নেতারাই হলো পুজণীয় ব্যক্তিত্ব। বাকশালী বুদ্ধিজীবীগণ তো ১৯৪৭ সালের পাকিস্তান সৃষ্টিকে মুসলমানদের জন্য অনাসৃষ্টি বলতে আজও উদগ্রীব। প্রশ্ন হলো,এমন গোলামী চেতনা নিয়ে কেউ  কি স্বাধীনতা, মানবতা,গণতন্ত্র, ইসলাম ও মুসলমানের বন্ধু হতে পারে?

 

রবীন্দ্রনাথের ব্যর্থতা ও বাকশালী নাশকতা

খোদ রবীন্দনাথের মনে বাঙালীর মানব সন্তান রূপে বেড়ে উঠা নিয়ে দারুন সংশয় ছিল। তাই বিধাতার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে তিনি কবিতা লিখেছেন, “হে বিধাতা! সাত কোটি প্রাণিরে রেখেছো বাঙালী করে, মানুষ করোনি।” প্রশ্ন হলো, কবি রবীন্দ্রনাথ নিজেও কি প্রকৃত মানব রূপে বেড়ে উঠতে পেরেছিলেন? সে ব্যর্থতা কি তার নিজেরও কম? সমাজের অতি নিষ্ঠুর চোর-ডাকাতেরাও শিক্ষাবিস্তারের বিরুদ্ধে কখনো মিছিল করে না। কারণ তারাও বুঝে,কারো বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধটি অর্থশূণ্য করা নয়, বরং শিক্ষাশূণ্য করা বা তাকে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা। শিক্ষাশূণ্য করার অর্থ তার তার বিবেক বা আত্মাকে হত্যা করা। তাতে অসম্ভব করা হয় মানুষ রূপে বেড়ে উঠার সামর্থ।চোর-ডাকাতেরা অর্থ কেড়ে নিলেও সে বিবেক হত্যার সে অপরাধে হাত বাড়ায় না। অথচ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তো সে অপরাধে অপরাধি। চেতনার মৃত্যু হলে ব্যক্তি যেমন প্রাণহীন পুতুল,ইতর গরুবাছুর ও বিষাক্ত শাপশকুনকে দেবতার আসনে বসায়,তেমনি ধর্ম ও দেশের ভয়ানক শত্রুকেও পুজনীয় ব্যক্তি রূপে মেনে নেয়। ইসলামের শত্রু ও মিথ্যার প্রচারকগণ তো সেটিই চায়। তখন নমরুদ-ফিরাউনের ন্যায় দুর্বৃত্তনগণও ভগবান রূপে স্বীকৃতি পায়। গণতন্ত্রের দাফনকারি,গণহত্যার নায়ক এবং বিদেশের সেবাদাসও তখন জাতির পিতা, জাতির নেতা বা বন্ধুর খেতাব পায়। রবীন্দ্রনাথের ন্যায় ব্যক্তিও তখন গুরুদেব গণ্য হয়। বাংলাদেশের বড় ব্যর্থতা ও কদর্যতা এ এখানেই। দেশের রাজনীতি, আদালত, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, প্রশাসন, সেনাবাহিনী, পুলিশ বিভাগ এমন বিবেকশূণ্য মানুষে পরিপূর্ণ! ফলে দেশে প্রবল ভাবে বেড়েছে দুর্বৃত্তি ও মিথ্যাচার। ধর্মকর্ম, নীতিনৈতীকতা ও শিক্ষা-সংস্কৃতিতে বাংলাদেশ দিন দিন দ্রুত পিছিয়ে পড়ার মূল কারণ তো এটিই। ফলে আজ থেকে শত বছর আগে বাঙালী মুসলমানের যে মান ছিল সেটি আজ কল্পনাও করা যায় না। বরং যেটি সহজ হয়েছে সেটি হলো দুর্বৃত্তিতে বিশ্বে বার বার প্রথম হওয়া। এবং সহজ হয়েছে ভোটডাকাতি, গণতন্ত্র হত্যা ও শাপলা চত্বরের গণহত্যা।

শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনার শাসন স্বচোখে দেখার পরও ইসলাম, গণতন্ত্র ও মানবতার বিরুদ্ধে তাদের শত্রুতা ও প্রচন্ড নাশকতা নিয়ে কি সন্দেহ চলে? সে গভীর শত্রুতা কি বাকশালী এ মহলটি আদৌ কোনদিন গোপন রেখেছে? আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহটি কাফেরগণ কখনোই গোপনে করে না, তারা তো সে বিদ্রোহটি ঢাকঢোল পিটিয়ে করে। এরূপ বিদ্রোহের মধ্যেই তো তাদের আনন্দ। শয়তান তো চায়, তার অনুসারিগণ এমন আনন্দের মাঝেই ডুবে থাক। শেখ মুজিবও তেমনি উৎসব ভরে গণতন্ত্র দাফন করে বাকশাল প্রতিষ্ঠা করেছিল। আল্লাহর শরিয়তের বিরুদ্ধে এ বাকশালীদের আজকের যুদ্ধটিও গোপন বিষয় নয়। কোরআনে বর্নিত পবিত্র শরিয়তী আইনের বিরুদ্ধে তাদের বিষোদগার:এ আইন নাকি মধ্যযুগীয় বর্বরতা! অতীতে মুসলিম ভূমিতে কোন কাফেরও কি আল্লাহর পবিত্র আইনের বিরুদ্ধে এমন বিষোদগারের সাহস দেখিয়েছে? অথচ বাংলাদেশের বুকে মহান আল্লাহতায়ালার পবিত্র বিধানের বিরুদ্ধে এমন বিষ উদগিরণ হচ্ছে আওয়ামী বাকশালীদের পক্ষ থেকে। মুরতাদ হওয়ার জন্য কি এটুকুই যথেষ্ঠ নয়? শুধু ইসলামের বিরুদ্ধে নয়, মানবতার বিরুদ্ধেও কি তাদের হিংস্র যুদ্ধটি লাগাতর নয়? শুধু মুসলিম রূপে নয়, স্বাধীন মানুষ রূপে বাঁচতে দিতেও তারা রাজি নয়। তাই গণতন্ত্র ও মানবতার বিরুদ্ধে পরিচালিত সে যুদ্ধে শেখ মুজিব ৩০-৪০ হাজার নাগরিককে হত্যা করেছিল। শেখ মুজিবের সে মিশনকে চালু রাখতেই শেখ হাসিনা ময়দানে নামিয়েছে দলীয় ক্যাডারদের পাশাপাশি র‌্যাব, বিজিবী, সেনাবাহিনী ও পুলিশ।ফলে সমগ্র বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে শাপলা চত্বরে।

 

শত্রুশক্রির পদতলে দেশ

আওয়ামী বাকশালীগণ যখনই ক্ষমতায় আসে তখনই মহা বিপর্যয় ঘটে। তখন যে শুধু গণতান্ত্রিক অধিকার ছিনতাই হয় তা নয়,হায়েনার হাত পড়ে দেশ ও দেশবাসীর ইজ্জতে। বিশ্ববাসীর সামনে বাংলাদেশের মুখ তখন কালিমালিপ্ত হয়।এবং দুর্ভোগ বাড়ে জনগণের।সেটি যেমন মুজিবের আমলে ঘটেছিল,তেমনি হাসিনার আমলেও।অথচ যে কোন দায়িত্বশীল সরকারের মূল কাজটি তো দেশের মুখ উজ্বল করা ও দেশবাসীর সুখশান্তি বাড়ানো। অথচ আওয়ামী বাকশালীদের সে ভাবনা নাই। আর সেটি থাকার কথাও নয়।কারণ তাদের রাজনীতির মূল এজেন্ডা,ভারতের আগ্রাসী রাজনীতির জোগালদারি। দেশের স্বাধীনতা সুরক্ষা যেমন নয়,দেশ ও দেশবাসীর ইজ্জত বাঁচানোও নয়।তাই ভারত যখন বাংলাদেশে চুরি-ডাকাতি করে তখন তাদের কাজ হয় সে লুন্ঠনে জোগালের কাজ করা।সেটি সুস্পষ্ট হয়ে যায় একাত্তরেই। ভারতীয় বাহিনীর ডাকাতি শুরু হয় ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বরে পূর্ব পাকিস্তানের উপর তাদের দখলদারি প্রতিষ্ঠার পরই। তখন ডাকাতির লক্ষ্যবস্তু ছিল পাকিস্তান আর্মির অব্যবহৃত হাজার হাজার কোটি টাকার অস্ত্র ও অবাঙালীদের মালিকাধীন শিল্পকারখানা ও তাদের গৃহের সহায় সম্পদ। সে ডাকাতির প্রতিবাদ করতে গিয়ে সামরিক বাহিনীর চাকুরি হারিয়েছিলেন এবং বন্দী হয়েছিলেন মেজর আব্দুল জলীল। অথচ বাকশালী জোগালেরা সেদিন টু’শব্দটি পর্যন্ত করেনি।বরং তাদের মুখে তখন প্রচন্ড ভারত-বন্দনা।সে বন্দনাটি এখনও অব্যাহত। আর যে ভাবনা থেকে জন্ম নেয় এমন ভারত-বন্দনা তাকেই তারা বলে একাত্তরের চেতনা।বাংলাদেশের ভূমি,নদ-নদী,সীমান্তু,সম্পদ,নারী-পুরুষ,গরুমহিষের উপর ভারতীয়দের পক্ষ থেকে ডাকাতি হলে এ চেতনাধারিরা প্রতিবাদ করে না।

এ জোগালদারদের ক্ষমতায় যাওয়া এবং ক্ষমতার মসনদকে টিকে থাকাটি সুনিশ্চিত করে ভারত।সেটি যেমন ১৯৭০, ১৯৭১ ও ২০০৮ সালে যেমন দেখা গেছে,তেমনি সেটি ২০১৪ সালেও  দেখা গেল।বাংলাদেশের বাইরে একমাত্র ভারতই তাদের নির্ভরযোগ্য মিত্র।জোগালদার পালার এ রাজনীতিতে ভারতের বিনিয়োগটি হাজার হাজার কোটি টাকার।আসামের দৈনিক নববার্তা লিখেছে,একমাত্র ২০০৮ সালের নির্বাচনেই ভারতের বিনিয়োগটি ছিল ৮০০ কোটি ভারতীয় রুপির।২০১৪ সালের নির্বাচনে প্রস্তাবিত বিনিয়োগটি ছিল ১০০০ কোটি রুপির।নির্বাচনের বাইরেও তাদের রয়েছে শত শত কোটির টাকার বিনিয়োগ। তবে এ হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগটি যে ভারতীয়দের নিজস্ব ভান্ডার থেকে আসছে তা নয়। ডাকাত সর্দার কখনই নিজের জমিজমা বিক্রি করে ডাকাত পালে না। সে অর্থটি আসে লুন্ঠিত মালামাল থেকে। একই রূপ কইয়ের তেলে কই ভাজার নীতি ভারতীয়দের।বাকশালী জোগালদারদের সহযোগিতায় ভারত পেয়েছে ১৬ কোটি মানুষের বিশাল বাজার।এর চেয়ে ক্ষুদ্রতর বাজারের উপর দখল নিতে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটেশেরা ৫ হাজার মাইল দূর থেকে বহু সাগর ও মহাসাগর পাড়ি দিয়ে এসেছিল। সে বাজার ধরে রাখতে যুদ্ধ করেছিল এবং সেসব যুদ্ধে জানমালের বিনিয়োগও করেছিল।

ভারতীয়দের কাছে বাংলাদেশের পরিচিতিটি আদৌ স্বাধীন দেশ রূপে নয়।তারা ভাবে,দেশটি তাদের নিজস্ব যুদ্ধের কামাই। ভাবে,তারা যুদ্ধ না করলে একাত্তরে বাংলাদেশের জন্মই হতো না।ফলে তাদের যুক্তি,জন্মসূত্রেই ভারতের কাছে বাংলাদেশ দায়বদ্ধ।এখন উচিত আজীবন ভারতের পদসেবা করে বাঁচা। সন্তান যেমন পিতাকে অস্বীকার করতে পারে না,বাংলাদেশও তেমনি পারে না ভারতকে অস্বীকার করতে।এমন ধারণাটি যে শুধু ভারতীয়দের -তা নয়। আওয়ামী বাকশালীদেরও।এমন কি বহু অ-আওয়ামীলীগারদেরও। তাই ভারতের কাছ থেকে ট্রানজিটের ফি নেয়াকে এরা বেয়াদবি মনে করে। কারণ পিতা থেকে তো আর ভাড়া আদায় করা যায় না।ভারত চায়,বাংলাদেশের রাজনীতির উপর দখলদারিটা এমন পদসেবী জোগালদারদের হাতেই চিরকাল থাকুক।

 

ডাকাতির নতুন অধ্যায়

লাগাতর ডাকাতি করাই ডাকাতদের স্বভাব। একটি বা দুটি ডাকাতি করে তারা ক্ষ্যান্ত দেয় না। নীরবে বসে থাকা তাদের স্বভাবও নয়। আওয়ামী বাকশালীদের হাতে বিগত ৫টি বছর ধরে বহু চুরি-ডাকাতি হয়েছে। দেশীয় ব্যাংক ডিঙ্গিয়ে এ ডাকাতেরা বিশ্বব্যাংকের ভান্ডারে হাত দিয়েছিল। আর তাতে পিছিয়ে গেল পদ্মা সেতুর ন্যায় দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্প।ভোট ডাকাতির পর্ব সম্প্রতি শেষ হলো।এবার শুরু হতে যাচ্ছে ডাকাতির নতুন পর্ব। সেটি আরো ৫ বছরের জন্য। তাই শুধু পদ্মা সেতু নয়,বহু কিছুই পিছিয়ে যাবে।থেকে যাবে সামনে চলা।সরকারে পক্ষ থেকে এখন বলা হচ্ছে,বিরোধী দলের সাথে আর কোন আলোচনা নয়। এখন ১৮ দলের বিরোধী দলকে আর বিরোধী দল বলতেও রাজী নয়।এখন বিরোধী দলের আসনে বসিয়েছে এরশাদের জাতীয় পার্টিকে।শেখ হাসিনা ১৮ দলীয় জোটের নেত্রীকে নসিহত করেছেন,আগামী ৫ বছরের জন্য ধৈয্য ধরতে হবে। অর্থাৎ চুরি-ডাকাতিতে বাকশালীদের নতুন করে আরো ৫টি বছরদিতে হবে। দেশজুড়া এ ডাকাতিতে শেখ হাসিনা যে বিদেশী ডাকাতদেরও ডেকে আনবে সে আলামতটিও প্রকট। ভারত এমন লুন্ঠনে দু’পায়ে খাড়া। যেমনটি বাংলাদেশে ভূমিতে তাদেরকে একাত্তরে দেখা গেছে। তাছাড়া যে দেশ দুর্বৃত্তিতে বিশ্বের ২ শত রাষ্ট্রকে হারিয়ে ৫বার প্রথম হয় সে দেশটি নিজেও যে এমন ডাকাতদের স্বর্গ ভূমি –তাতেও কি সন্দেহ আছে? এমন ডাকাতদের উপস্থিতি যেমন রাজনীতির ময়দানে,তেমনি প্রশাসন, পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনীতেও।

বাকশালী ডাকাতদের ডাকাতির লক্ষ্যটি স্রেফ গ্রামীন মানুষের অর্থভান্ডার নয়। ডাকাতির টার্গেট শুধু দেশী ব্যাংক,রাজস্ব-ভান্ডার,সরকারি টেন্ডার,সরকারি ভূমি,বিদেশী অনুদানের অর্থও নয়।আধুনিক ডাকাতদের ডাকাতির সবচেয়ে বড় টার্গেটটি হলো জনগণের ভোট।ভোট ডাকাতিতে সফল হলে ডাকাতদের হাতে অধিকৃত হয়ে যায় সমগ্র রাষ্ট্র।তখন রাষ্ট্রীয় সম্পদের উপর ডাকাতি সহজ হয়ে যায়।তখন সরকারি ডাকাত দলের উপর বন্ধ হয়ে যায় পুলিশ বাহিনী ও আদালতের উৎপাত। মঙ্গোলিয়ার ট্রাইবাল ডাকাতগণ চেঙ্গিজ খান ও হালাকু খানের নেতৃত্বে দুর্ধর্ষ ডাকাতদল গড়ে তুলেছিল।দেশের পর দেশ তারা দখল করেছিল।দখল শেষে ব্যাপক লুন্ঠনও করেছিল।সমরখন্দ,বোখারা,বাগদাদ,নেশাপুরের ন্যায় সমৃদ্ধ নগরগুলিকে শুধু তারা লুন্ঠনই করেনি,ধ্বংসও করেছে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরাও এদেশে ১৯০ বছর যাবত ডাকাতি করেছে। তাদের ডাকাতি বাংলাদেশে দুইবার দুর্ভিক্ষ ও সে দুর্ভিক্ষে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ডেকে এনেছে। দুর্ভিক্ষ ডেকে এনেছে মুজিব আমলের ডাকাতিও।বাংলাদেশের এসব ডাকাতগণও এখন আর গ্রাম্য ডাকাতদল গড়ে না। বরং গড়ে রাজনৈতিক ডাকাত দল।ডাকাতিতে তাদের প্রবল আগ্রহটি যেমন মুজিব আমলে প্রমাণিত হয়েছে,তেমনি এরশাদ ও হাসিনার আমলেও।

সন্ত্রাস ও লুন্ঠনের বাইরে ডাকাতদলের কাছে অন্যকোন এজেন্ডা থাকে না। সন্ত্রাস ও দেশলুন্ঠন ছাড়া হাসিনারও কোন বাড়তি এজেন্ডা নাই। নির্বাচনে সকল দল ও সকল জনগণের অংশ্রগহণ বাড়াতে হাসিনা সরকারের এজন্যই কোন আগ্রহ ছিল না। জনগণ যে ভোটদানে অংশ নিল না -তা নিয়ে শেখ হাসিনা ও তার দলীয় নেতাদের এ জন্যই কোন আফসোস নাই। বরং প্রচন্ড উল্লাস জাল বিজয় নিয়ে। বরং শেখ হাসিনা ৬/১/১৪ তারিখে সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছেন,“জনগণ যতটুকু ভোট দিয়েছে এতেই আমরা সন্তুষ্ট।” সফল ডাকাতি শেষে উল্লাস করাই ডাকাতদের স্বভাব।ডাকাতগণ তখন মনযোগ বাড়ায় ডাকাতিলদ্ধ সম্পদ ধরে রাখার কাজে। তেমনি হাসিনা সরকারেরও এজেন্ডা,ভোট ডাকাতির মাধ্যমে অর্জিত বিজয়কে যে কোন রূপে ধরে রাখা। ফলে কদর বেড়েছে যৌথ বাহিনীর। ক্ষমতায় টিকে থাকাকে বৈধ করতে তামাশার এ নির্বাচনকেও তারা বৈধ বলছে।কথা হলো ডাকাতেরাও কি কোন কালেও তাদের ডাকাতিকে অবৈধ বলে? ফেরত দেয় কি ডাকাতির মাল? তাছাড়া এ ভোট ডাকাতিকে মেনে নিলে দেশের উপর হাসিনার লাগাতর ডাকাতিকেও বৈধতা দিতে হবে। আর সেটি হলে দেশ যে শুধু মুজিবামলের ন্যায় তলাহীন ভিক্ষার ঝুলি হবে তা নয়,পুরা দেশই হয়তো হারিয়ে যাবে।

 

লক্ষ্য ইসলাম নির্মূল

বাংলাদেশ আজ যে ভয়ানক বিপর্যয় -সেটি হঠাৎ আসেনি। বরং সৃষ্ঠি করা হয়েছে একটি গ্রান্ড পরিকল্পনার অংশ রূপে। মূল পরিকল্পনাকারি এখানে বাকশালী জোগালদারেরা নয়, বরং সেটি ভারত। লক্ষ্য,বাংলাদেশের মেরুদন্ড চূর্ণ করা। লক্ষ্য, দক্ষিণ এশিয়ার পূর্ব প্রান্তে মুসলিম শক্তির উত্থাণকে চিরতরে প্রতিহত করা। একাজে একাত্তরের ন্যায় আওয়মী লীগ এবারও একা নয়। একাত্তরে পাকিস্তান ভেঙ্গে গেছে। কিন্তু ১৭টি কোটি বাঙালী মুসলমানের মাঝে জাগরণের সে সুপ্তশক্তি এখনও রয়ে গেছে। এতেই ইসলামের শত্রু শক্তির মাঝে প্রচন্ড দুর্ভাবনা। সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার বুকে বাঙালী মুসলমানরাই যে সবচেয়ে বৃহৎ জনশক্তি সেটি ইসলামের শত্রুপক্ষ ভূলে যায় কি করে? এ শক্তিই তো ১৯৪৭সালে পাকিস্তানের সৃষ্টিকে অনিবার্য করেছিল। বীজ থাকলে তো চারাই গজাবেই। পাকিস্তান ভেঙ্গে গেলেও ইসলামের বীজ তো রয়ে গেছে। তাই তারা এবার বাংলার বুক থেকে সে বীজ নির্মূলে হাত দিয়েছে। তাদের প্রচন্ড ভয়, সে বীজ থেকে না জানি ভারতের পূর্ব প্রান্তে আরেক পাকিস্তানের জন্ম হয়।তাই গুরুত্ব পেয়েছে তাফসির মহফিল বন্ধ ও  জিহাদ বিষয়ক বই বাজেয়াপ্ত করার পাশাপাশি আলেমদের ফাঁসিতে ঝুলানোর কাজ। তাই সে প্রকল্পের অংশ রূপেই টিভি, পত্র-পত্রিকা, ব্লগ, ফেসবুক যোগে লাগাতর হামলা হচ্ছে আল্লাহতায়ালা, তার রাসূল পাক (সাঃ) ও ইসলামের বিরুদ্ধে। ব্রিটিশ আমলেও ইসলামের বিরুদ্ধে এতবড় ষড়যন্ত্র হয়নি।

নির্বাচনের নামে ভোট ডাকাতি হলে তার পরিণতি যে কি হয় -সেটি কি হাসিনা জানতো না? শুধু হাসিনা নয়, তার প্রভু ভারতও সেটি জানতো। কিন্তু তাদের এজেন্ডা তো নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশকে একটি মহাবিপর্যয় উপহার দেয়া। গ্রামবাসীর ঘরে আগুন লাগাতে ডাকাতদের মনে দুঃখ জাগে না। ডাকাতদের হত্যায় যে গ্রামবাসী ধেয়ে আসে তাদের ঘরবাড়ির প্রতি ডাকাতদের দরদ থাকার কথা নয়। তাদের ঘরে আগুণ লাগাতে ডাকাতেরা বরং আনন্দিত হয়। শেখ হাসিনার অজানা নয় যে, সমগ্র বাংলাদেশ আজ  তার স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে উত্তাল। সে নিজে দেখেছে তার স্বৈরাচারি পিতা ও তার পরিবারের প্রতি দেশবাসীর আচরণ। দেখেছে স্বৈরাচারি শাসনের নির্মূল নিয়ে সে সময় দেশবাসীর উল্লাস। এমন কি আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আব্দুল মালেক উকিলও মুজিবের মৃত্যুতে বলেছিল “ফিরাউনের পতন হয়েছে।” ফলে দেশ ও দেশবাসীর জানমাল, শিল্প, বানিজ্য,অর্থনীতি ও শিক্ষা নিয়ে শেখ হাসিনার দরদ থাকবে এবং ধ্বংসের হাত থেকে সেগুলি বাঁচাতে তার সরকার এগিয়ে আসবে সেটি কি আশা করা যায়? নিজ দলের ভবিষ্যৎ নিয়েও কি তার ভাবনা আছে?  ফলে দেশের বর্তমান সংকটের চেয়েও জটিল সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান বিশ্বের অন্য কোন দেশে সম্ভব হলেও বাংলাদেশে সেটি যে অসম্ভব তা নিয়ে কি কোন সন্দেহ আছে? শেখ হাসিনা চাইলেও ভারত সেটি হতে দিবে না। সেরূপ একটি শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাধান ভারত একাত্তরেও হতে দেয়নি। ২০১৩ বা ২০১৪ সালেও নয়। কারণ সেটি হলে বাংলাদেশের মেরুদন্ড ভাঙ্গার কাজটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তাতে অপূর্ণ থেকে যাবে ভারতের ইসলাম-বিনাশী এজেন্ডা। বাংলাদেশের চলমান সংকট নিয়ে ভারত তাই আনন্দে ডুগডুগি বাজাচ্ছে।একাত্তরের পর ভারত ছিনিয়ে নিয়েছিল পাট ও  চায়ের বাজার। ছিনিয়ে নিয়েছিল বেরুবাড়ি এবং পদ্মা ও তিস্তার পানি। ছিনিয়ে নিয়েছিল হাজার হাজার কোটি টাকার পাকিস্তানী অস্ত্র। এবার ছিনিয়ে নিবে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের গার্মেন্টস ও চিংড়ি মাছের বাজার।ছিনিয়ে নিবে সুরমা ও কুশিয়ারার পানি। পুরাপুরি দখলে নিবে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার। সে সাথে ছিনিয়ে নিবে ইসলামের মৌল চেতনাও। ভারত বাংলাদেশকে বানাতে চায় আরেকটি কাশ্মীর। আরেকটি সিকিম। কুমিরের কাজ তো একের পর এক শিকার ধরা। শিকার ধরার সে রাজনীতিই হলো প্রতিবেশী রাষ্ট্রের প্রতি ভারতের বিদেশ নীতি। ভারত ইতিমধ্যেই কাশ্মীর,জুনাগড়,মানভাদর, হায়দারাবাদ,সিকিম পেটে পুরেছে। এখন চায় নতুন শিকার। সে নতুন শিকারটি  যে বাংলাদেশ -তা নিয়ে কি আদৌ কোন সন্দেহ আছে?

 

লাগাতর হোক জিহাদ

এমুহৃর্তে জনগণের দায়ভার বিশাল। ইসলামের শত্রুপক্ষটি সব সময়ই প্রতিবেশী ভারতে জামাই আদর পাবে। যেমনটি একাত্তরে পেয়েছিল। সে আদর হাসিনা ও তার পরিবার এখনও পায়। কিন্তু বাঙালী মুসলমানদের দেশতো মাত্র এক খানই। তাদের পালাবার স্থান নাই। আর শত্রুর হামলার মুখে পৃষ্ঠ প্রদর্শণ করা বা পালানো তো কবিরা গুনাহ। সে কবিরা গুনাহ তো জাহান্নামে নেয়। বাংলার প্রতিটি মুসলমানের উপর মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে বড় আমানত হলো এই বঙ্গভূমি। এ ভূমিতে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে তারা তো নিয়োগপ্রাপ্ত খলিফা। মুসলমানের ধর্ম তো অর্পিত আমানতের খেয়ানত নয়। সে কাজ তো মুনাফিকের। মুসলমানের দায়িত্ব হলো আল্লাহর ভূমিতে আল্লাহর দ্বীনের পূর্ণ বিজয়। কোন দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ মুসলিম অথচ সে দেশে শরিয়ত থাকবে না সেটি কি ভাবা যায়? সাহাবায়ে কেরামদের জীবনে একটি দিনও কি শরিয়তের আইনের প্রতিষ্ঠা ছাড়া অতিবাহিত হয়েছে? একাজে মুসলমান কি কখনোই আপোষ করে? তবে সে লক্ষ্যপূরণে প্রাথমিক দায়িত্ব হলো,অধিকৃত ভূমির উপর থেকে দুর্বৃত্তদের দখলদারি নির্মূল। মুসলিম ভূমিতে ইসলামের শত্রু পক্ষের বিজয় মেনে নিলে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষে থেকে অর্পিত আমানতের খেয়ানত হয়।আর আমানতের খেয়ানত যা অনিবার্য করে তা তো মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিশ্রুত আযাব। সে খেয়ানতের কারণেই বনী ইসরাইলের উপর প্রচন্ড আযাব এসেছিল। তাই মুসলিম ভূমি যেখানেই ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে অধিকৃত,জিহাদ সেখানে অনিবার্য হয়ে উঠে। এ জিহাদে কোন কাজা নাই। তাই যে অধিকৃত মুসলিম দেশে জিহাদ নেই সেদেশের মুসলমানগণ যে ইবাদতে ব্যর্থ হচ্ছে তা নিয়ে কি সন্দেহ থাকে? এমন ব্যর্থতা কি বাংলাদেশের মুসলমানদের কম?

শত্রুশক্তির হাত থেকে দেশরক্ষার দায়িত্বটি প্রতিটি নাগরিকের। এ দায়িত্ব স্রেফ কিছু ইসলামি সংগঠনের নেতাকর্মীর নয়।এ দায়িত্ব সবার। বাংলাদেশ আমাদেরকে কি দিয়েছে সেটি বড় কথা নয়।আমরা এদেশকে শত্রুশক্তির হাত থেকে বাঁচাতে ও আল্লাহর শরিয়ত প্রতিষ্ঠার কাজে কি করেছি সেটিই মূল। মহান আল্লাহর কাছে তা নিয়েই বিচার হবে।ইসলামের শত্রুপক্ষ আজ একতাবদ্ধ। ইসলামের নির্মূলে তাদের এজেন্ডা ও অঙ্গিকার সুস্পষ্ট। তাদের প্রস্তুতিও বিশাল। একতাবদ্ধ হওয়াটি তাদের কাছে রাজনীতির  প্রধান কৌশল। কিন্তু মুসলমানের কাছে সেটি ফরজ ইবাদত। এ ফরজ পালিত না হলে কঠিন গুনাহ হয়। তাদের এ লড়াই স্রেফ ক্ষমতা দখলের রাজনীতি নয়, বরং পবিত্র জিহাদ।

আওয়ামী বাকশালীরা যে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা রুখতে চায় তা নিয়ে কি কারো কোনরূপ সন্দেহ আছে? ফলে তারা যে ইসলামের শত্রুপক্ষ তা নিয়েও কি সামান্যতম সন্দেহ থাকে? আর এমন শত্রুশক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো তো শতকরা শতভাগ জিহাদ।শরিয়তের এমন আত্মস্বীকৃত শত্রুদের মুসলিম রাষ্ট্রের শাসক রূপে একদিনের জন্য মেনে নেয়া ও তাদের শাসনকে দৃর্ঘায়ীত করতে রাজস্ব দেয়া তো কবীরা গুনাহ। ইসলামের এ মৌলিক কথা বুঝতে কি বিরাট আলেম হওয়ার প্রয়োজন পড়ে? মুসলিম ভূমি ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে এরূপ অধিকৃত হওয়ার পরও যদি জিহাদ ফরজ না হয় তবে জিহাদ আর কবে ফরজ হবে? জিহাদের হুকুম কি তবে কোরআনের পৃষ্ঠাতে বন্দী থাকবে? আল্লাহর পথে জিহাদ মু’মিনের জীবনে দুটি পরিণতি দেয়। এক, বিজয়। দু্‌ই, শাহাদত। এছাড়া তৃতীয় কোন সম্ভাবনা আছে কি? আর এ দুটি পরিণতির কোনটি মু’মিনের কাছে অপছন্দের হতে পারে? যারা জিহাদ বিমুখ তাদের বিরুদ্ধে মহান আল্লাহতায়ালার হুশিয়ারিঃ “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের কি হলো যে যখন তোমাদেরকে আল্লাহর পথে অভিযানে বের হতে বলা হয় তখন তোমরা ভারাক্রান্ত হয়ে ভূতলে ঝুঁকে পড়? তোমরা কি আখিরাতের বদলে পার্থিব জীবনে পরিতুষ্ট? আখিরাতের তুলনায় পার্থিব জীবনের ভোগের উপকরণ তো অকিঞ্চিৎকর।” –(সুরা তাওবা আয়াত ৩৮)।

শাহদত দেয় মু’মিনে জীবনে সবচেয়ে বড় বিজয়। দেয় মৃত্যুহীন জীবন। দেয় কবরের আযাব ও রোয হাশরের বিচার থেকে মুক্তি। দেয় সরাসরি জান্নাতলাভ। মুসলমানগণ যখন একতাবদ্ধ হয়ে জিহাদে নামে তখন সে ময়দানে তারা একাকী থাকে না। তাদের সাথে থাকেন মহাশক্তিমান মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর অপরাজেয় ফেরশতা বাহিনী। বিশ্বের কোন শক্তির কি সামর্থ আছে সে শক্তিকে পরাজিত করার? ফলে বিজয় তখন অনিবার্য হয়ে উঠে। মুসলমানগণ যে আজ দেশে দেশে পরাজিত তার কারণ, সে জিহাদে তারা নিজেদের জানমালের বিনিয়োগ বাড়ায়নি। মসজিদে নামাযীদের ভিড় বাড়লেও জিহাদের ময়দান ফাঁকা। অথচ নবীজী (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামের আমলে ঘরবাড়ি ছেড়ে শত শত মাইল দূরের জিহাদের ময়দানে হাজির হতেন। আর আজ জিহাদের ময়দান ঘরের সামনে এসে হাজির হলেও তাতে লোকসমাগম নাই। অথচ মু’মিনের ঈমানের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি হয় জিহাদের ময়দানে, জায়নামাজে নয়।পবিত্র কোরআনে মহান  আল্লাহতায়ালা সে চরম ঘোষণাটি দিয়েছেন এভাবে, “তোমরা কি মনে করে নিয়েছো যে তোমরা (এমনিতেই) জান্নাতে প্রবেশ করবে? অথচ আল্লাহ তোমাদের কে জিহাদ করেছে আর কে ধৈর্য ধরেছে সেটি এখনো প্রকাশ করেননি?” –সুরা আল ইমরান আয়াত ১৪২)।

 

জিহাদঃ এক অনিবার্য পরীক্ষা

চাকুরি জীবনের যে কোন বিশাল প্রমোশনের জন্য অনিবার্য হয় পরীক্ষায় পাশ করা। আর মানবজীবনের সবচেয়ে বড় প্রমোশন তো হলো জান্নাতলাভ। সে বিশাল প্রমোশন কি মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে নির্ধারিত পরীক্ষাটিতে কৃতকার্য হওয়া ছাড়া সম্ভব? আর সে পরীক্ষাটি যে জিহাদের ময়দানে হয় সেটিও কি কোন গোপন? কিন্তু পরীক্ষার সে ময়দানে আজকের মুসলমানদের উপস্থিতি কই? সে পরীক্ষার ময়দানে হাজির হননি এমন কোন সাহাবীকে কি ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যাবে? তাঁরা শুধু হাজিরই হননি, শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবী তো শহীদ হয়ে গেছেন। অথচ আজকের মুসলমানদের শতকরা ৭০ জন দূরে থাক, একজনও কি শাহাদতের মর্যাদা পাচ্ছে? সেটি হলে বাংলাদেশের যে থানায় দুই লাখ মানুষের বববাস সে থানায় ২ হাজার মানুষ শহীদের মর্যাদা পেত। দেশের প্রতি জেলায় এমন জিহাদ শুরু হলে নির্মূল হতো আল্লাহর তাবত শত্রুগণ এবং প্রতিষ্ঠা পেত শরিয়তি বিধান। ১৩০ কোটি মুসলমান তখন বিশ্বশক্তি রূপে প্রতিষ্ঠা পেত।

তাই মুসলমানের দায়িত্ব স্রেফ নামায-রোযা, হজ-যাকাত পালন নয়,বরং জিহাদের কোরআনী হুকুম পালনে আপোষহীন হওয়া। নইলে চলমান লড়াইটি নিছক রাজনীতির সংঘাতই থেকে যাবে, সেটি পবিত্র জিহাদে পরিণত হবে না। রাজনীতির লড়াইয়ে ক্ষমতার রদবদল হয়, কিন্তু তাতে আল্লাহর দ্বীনের বিজয় আসে না।সরকারের পতন হলেও তাতে শরিয়তেরও প্রতিষ্ঠা ঘটে না। বাংলাদেশের রাজনীতিতে অতীতে বহু রক্ত ঝরেছে। বহুবার সরকারেরও পতন ঘটেছে। কিন্তু তাতে ইসলামের বিজয় আসেনি। সেটির কারণ, রাজনীতির লড়াই স্রেফ ক্ষমতা দখলের হিংস্র যুদ্ধ রূপেই থেকে গেছে। রাজনীতির সে যুদ্ধগুলো জিহাদে রূপ নেয়নি। ফলে তাতে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে সাহায্যও জুটেনি। ২০১৪সালের ৫ই জানুয়ারীতে বাংলাদেশে তো শুধু ভোট ডাকাতি হয়েছে। কিন্তু ইসলামের প্রতিষ্ঠা ও দেশ বাঁচানোর এ পবিত্র জিহাদে আত্মনিয়োগ না বাড়ালে আগামীতে সমগ্র দেশই ডাকাতি হয়ে যাবে। তাতে ইসলাম ধ্বংসের কাজ আরো ব্যাপকতর হবে। তখন ঈমান নিয়ে বাঁচা ও পূর্ণ ইসলাম পালনই বাংলাদেশে অসম্ভব হয়ে পড়বে। তাছাড়া মহান আল্লাহতায়ালার কাছে জিহাদবিমুখ ব্যর্থ বান্দা রূপে ভয়াবহ আযাব বাড়বে আখেরাতেও। ১১/০১/২০১৫

 




অপরাধীদের রাজনীতি ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার

অপরাধীদের রাজনীতি –

বাংলাদেশে অপরাধীদের বিচরন শুধু সন্ত্রাস, চুরিডাকাতি, খুণ-খারাবী বা ব্যভিচারীতে নয়, বরং পুলিশ, প্রশাসন, আদালত, ব্যবসা-বানিজ্য ও বুদ্ধিবৃ্ত্তিসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে। বস্তুতঃ সমগ্র দেশটিই অধিকৃত তাদের হাতে। তাদের সবচেয়ে বড় ভীড় দেশের রাজনীতিতে। অনেকের কাছেই রাজনীতি এখন আর নিঃস্বার্থ জনসেবার হাতিয়ার নয়, ব্যবহৃত হচ্ছে হীন স্বার্থ শিকারে। হিংস্র জীব যেমন শিকার শেষে বনে গিয়ে আশ্রয় নেয়, তেমনি বহু দুর্বৃত্ত অপরাধীরাও নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে বা কৃত অপরাধের শাস্তি এড়াতে রাজনীতিতে যোগ দেয়। অফিস-আদালত, সেনানিবাস, হাট-বাজার বা লোকালয়ে অপরাধ কর্ম সংঘটিত হলে সেটির তবুও বিচারের সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু রাজনীতিতে সে সম্ভাবনা নেই। কারণ, আদালত, সেক্রেটারিয়েট, ডাকাতপাড়া বা পথে ঘাটে দুষ্কর্মে লিপ্ত কোন অপরাধীকে পুলিশ ধরলে তার পক্ষে মিছিল হয় না, লগি বৈঠা নিয়ে তাকে বাঁচাতে কেউ যুদ্ধ শুরু করে না। অথচ কোন রাজনৈতিক নেতাকে দূর্নীতি বা কোন বিদেশী শক্তির গুপ্তচর বা এজেন্ট হওয়ার গুরুতর অভিযোগে ধরলেও তার বিচার করা অসম্ভব। বিচারের আগেই অপরাধী নেতাকে নির্দোষ ঘোষনা দেওয়া হয় রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে। এবং সে নেতার বিরুদ্ধে বিচারের যে কোন উদ্যোগকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা আখ্যা দিয়ে সরকার ও বিচারকদেরই উল্টো রাজপথে লাঠি দেখানো হয়।

পাকিস্তান আমলে তাই শেখ মুজিব এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় তাঁর সাথীদের বিচার করা সম্ভব হয়নি। অথচ অভিযুক্তরা যে ভারতের সাথে মিলে ষড়যন্ত্র করেছিল তা নিয়ে এখন আর বিতর্ক নেই। বরং সে ষড়যন্ত্রের সাথে সংশ্লিষ্টতা এখন গণ্য হচ্ছে আত্ম-গরিমার বিষয় রূপে। অথচ দেশের অখন্ডতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে শত্রুদেশের সাথে মিলে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হওয়া যে কোন সভ্য দেশেই মৃত্যদন্ড বা যাবৎ জীবন কারদন্ড হওয়ার মত মারাত্মক অপরাধ। বাংলাদেশের বহু লোকের কাছে আগরতলা ষড়যন্ত্রটি যত গৌরবময় কর্ম রূপেই গণ হোক না কেন, পাকিস্তান সরকারের কাছে সেটি ছিল দেশোদ্রোহ-মূলক জঘন্য অপরাধ। ভারত বা অন্য যে কোন দেশে এরূপ ষড়যন্ত্র হলে সেখানেও এটাকে ভিন্ন ভাবে দেখা হত না। কিন্তু পাকিস্তান সরকার সে অপরাধের বিচার করতে পারিনি। পাকিস্তানের আদালত শেখ মুজিবকে কাঠগড়ায় তুলেছিল ঠিকই কিন্তু বিচারের কাজ শেষ করতে পারিনি। আগরতলা ষড়যন্ত্রের সাথে সংশ্লিষ্টতা শেখ মুজিবকে কোন শাস্তি দেওয়া দূরে থাক, সেটিই তাকে হিরো বানিয়ে দেয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে অপরাধ কর্মের নায়কও যে কতটা বিশাল প্রতিষ্ঠা পায় এ হল তার নজির। আর এরূপ প্রতিষ্ঠাপ্রাপ্তরাই দেশের ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতিকে অপরাধীদের অভয় অরণ্যে পরিণত করেছে।

অর্থহরণ, নারীহরণ, দস্যূবৃত্তি ও দেশের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি যে কোন সমাজেই জঘন্য অপরাধ। তবে বড় অপরাধ হল, জনগণের মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক অধিকারের ন্যায় মৌলিক মানবিক অধিকার ছিনিয়ে নেওয়া।  এতে লুন্ঠিত হয় মানুষের মানবিক পরিচিতি ও মর্যাদা। ব্যক্তির জীবনে অতি মূল্যবান সম্পদ এটি। এ অধিকার অর্জনে রাষ্ট্রে বিশাল বিপ্লব আনতে হয়। মানুষ উপার্জন বাড়ায়, উন্নত সমাজ গড়ে এবং সভ্য রাষ্ট্র নির্মান করে তো সে মানবিক মর্যাদা বা অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনে। মানবতার মূল শত্রু হল তারাই যারা মানুষের স্বাধীন মানুষ রূপে মানুষের বাঁচার সে অধিকারই ছিনিয়ে নেয়। এ অপরাধ হল সমগ্র দেশবাসীর বিরুদ্ধে। ডাকাত দলের হামলায় কিছু লোকের ক্ষতি হলেও তাতে সমগ্র জাতি পিছিয়ে পড়ে না। কিন্তু স্বৈরাচারি শাসকেরা বিপর্যয় ডেকে আনে সমগ্র জাতির জীবনে। এরাই ইতিহাসের বড় ডাকাত। মানব জাতির যত ক্ষতি এসব দুর্বৃত্ত স্বৈরাচারিদের হাতে হয়েছে তা চোর-ডাকাতদের হাতে হয়নি। ইতিহাসের পৃষ্ঠায় এরাই স্থান পায় ঘৃন্য কুলাঙ্গার রূপে। যে কোন সভ্যদেশে সামরিক ক্যু ও সরকার বিরোধীদের রাজনৈতিক অধিকার হনন এ জন্যই অতি গুরুতর অপরাধ। এতে সভ্য সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মানের মূল লক্ষ্যই ব্যহত হয়ে যায়। দেশ তখন পরিণত হয় কারাগারে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতি অপরাধীদের অভয় অরণ্য হওয়ায় এমন অপরাধ কোন অপরাধই নয়। শেখ মুজিব গণতন্ত্র হরণ করেছেন, সকল বিরোধী দলকে নিষিদ্ধ করেছেন, সকল সরকার-বিরোধী পত্রিকার দফতরে তালা ঝুলিয়েছেন। তার আমলে নিহত হয়েছে প্রায় ৩০ হাজারের বেশী বিরোধী দলীয় রাজনৈতিক কর্মী। কোন কোন হত্যার পর প্রচন্ড দম্ভ দেখিয়েছেন শেখ মুজিব স্বয়ং নিজে। এমন কুরুচি সচারাচর কোন সভ্য মানুষের থাকে না। অথচ বন্দী সিরাজ সিকদারকে পুলিশি হেফাজতে হত্যা করার পর পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে “কোথায় আজ সিরাজ সিকদার?” বলে উল্লাস করেছেন। কাউকে বিনাবিচারে হত্যা করার অধিকার কোন ব্যক্তি বা সরকারেরই থাকে না। শেখ মুজিবেরও ছিল না। কিন্ত্র আওয়ামী লীগ শাসনামলে কারাধীন অবস্থায় শুধু সিরাজ সিকদারকেই হত্যা করা হয়নি, প্রাণ হারিয়েছেন মুসলিম লীগ সভাপতি জনাব ফজলুল কাদের চৌধুরি। শেখ মুজিবের দলীয় ক্যাডারদের হাতে নির্মম ভাবে নিহত হয়েছেন নেজামে ইসলামী নেতা মৌলভী ফরিদ আহম্মদসহ আরো অনেকে।

 

শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগের যুদ্ধাপরাধ

অপরাধ কর্ম প্রতি সভ্য বা অসভ্য সব সমাজেই ঘটে। তবে সভ্য সমাজের বৈশিষ্ঠ হল সে সমাজে অপরাধের বিচার হয়। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা পায়। অথচ অসভ্য সমাজে সেটি হয় না। এভাবেই ফুটে উঠে সভ্য সমাজ থেকে অসভ্য সমাজের পার্থক্য। অপরাধীর বিচারে সর্ব প্রথম যেটি জরুরী,  সেটি হল অপরাধকে ঘৃণা করা সামর্থ।  এবং সে সাথে অপরাধীকে নিছক অপরাধী হিসাবে দেখা। বিচারের আগে কে কোন দলের, কে কোন ভাষা বা বর্ণের অপরাধীর সে পরিচয়টি গুরুত্ব পেলে সুবিচারই অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাই সুবিচারের সামর্থ সবার থাকে না। এ জন্য চাই মানসিক, চারিত্রিক ও নৈতিক সুস্থ্যতা। স্বৈরাচারি শাসক, দুর্বৃত্ত বিচাররক, আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদী,  ঔপনিবেশিক লুটেরাদের সে সামর্থ থাকে না। তারা তো নিজেরাই ঘৃন্য অপরাধের নায়ক। তারা বরং ন্যয় বিচারকেই অসম্ভব করে তোলে। এরা শুধু প্রশাসন ও রাজনীতিকেই দখলে নেয় না, দখলে নেয় দেশের আদালতকেও। তাদের অন্যায় কর্মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী মানুষকেই তারা রাজনৈতিক শত্রু জ্ঞান করে এবং বিচার ছাড়াই তাদের হত্যা করে। সে হত্যাকে জাযেজ করার জন্য তারা বড়জোর মেঠো আদালত বসায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শেতাঙ্গ বর্ণবাদীরা সে দেশের কালো ও রেড ইন্ডিয়ানদের নির্মূলকে জায়েজ করার জন্য সেদেশে বহু হাজার মেঠো আদালত বসিয়েছে। একই মানসিকতার কারণে বাংলার মসলিন শিল্পের তাঁতীরা ঔপনিবেশিক ইংরেজদের কাছে শাস্তিযোগ্য অপরাধ গণ্য হয়েছে। তাদের সে অপরাধে হাতের আঙ্গুলও কাটা হয়েছে। দেশের শাসনক্ষমতা অপরাধীদের হাতে গেলে ন্যায় বিচার যে কতটা অসম্ভব হয়ে পড়ে এ হল তার সামান্য নমুনা।

একই রূপ অবস্থা শেখ মুজিব ও তার অনুসারি আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী-বুদ্ধিজীবীদের। আওয়ামী লীগ তৃতীয়বার ক্ষমতায় এসে সুবিচার প্রতিষ্ঠার বদলে সর্বপ্রথম তার নিজদলের শত শত নেতা-কর্মীদের উপর থেকে দায়েরকৃত মামলা তুলে নিয়েছে। এর মধ্যে বহু খুণের মামলাও রয়েছে। অথচ যে কোন দেশে কাউকে নির্দোষ বলে খালাস দেওয়ার সামর্থ কোন সরকারের থাকে না। সে অধিকার একমাত্র আদালতের। সে সাথে মামলার বন্যা শুরু হয়েছে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে। একই রূপ ঘটনা ঘটেছে সত্তরের দশকে আওয়ামী শাসনামলে। বহু হাজার বিহারী, হাজার হাজার রাজাকার , শত শত আলেম ও বহু হাজার বামপন্থি কর্মীকে বিনা বিচারে হত্যা করা হয়েছে। লুন্ঠিত হয়েছে তাদের ঘরবাড়ি ও সহায়সম্পদ। লুন্ঠিত হয়েছে রিলিফের মাল। অপরাধ কর্মের প্রচন্ড প্লাবন শুরু হয়েছিল মুজিব আমলে। কিন্তু শেখ মুজিব ও তাঁর স্বৈরাচারি সরকার অপরাধীদের বিরুদ্ধে কোন আইনগত ব্যবস্থাই নেয়নি।

হাজার হাজার মানুষের সামনে ঢাকা স্টেডিয়ামে কাদের সিদ্দিকী ৪ জন হাতপা বাঁধা রাজাকার হত্যা করেছে। আন্তর্জাতিক আইনে এভাবে বন্দীদের হত্যা যুদ্ধাপরাধ। কিন্তু আওয়ামী লীগ সে জঘন্য অপরাধটিকেও অপরাধ রূপে গণ্য করেনি। শেখ মুজিব সে অপরাধ কর্মকে প্রথমে অস্বীকার করেন, তারপর নিহতরা যেহেতু রাজাকার সেহেতু সেটিকে জায়েজ ঘোষনা দেন। এ বিষয়ে প্রামাণ্য দলীল এসেছে প্রখ্যাত ইটালীয়ান সাংবাদিক ওরিয়ানা ফালাসীর রিপোর্ট থেকে। তিনি লিখেছেন, “এরপর ১৮ই ডিসেম্বর হত্যাযজ্ঞ সম্পর্কে তার প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি রাগে ফেটে পড়েন। নিচের অংশটি আমার টেপ থেকে নেয়া। শেখ মুজিব: “ঢাকা স্টেডিয়ামে কোন ম্যাসাকার হয়নি। তুমি মিথ্যে বলছো।” ফালাসী: “ঢাকা স্টেডিয়ামে মুক্তিবাহিনীর দ্বারা সংঘটিত ঘটনাটি?”শেখ মুজিব: “ম্যাসাকার? হোয়াট ম্যাসাকার?”ফালাসী: “মি. প্রাইম মিনিস্টার, আমি মিথ্যাবাদী নই। সেখানে আরো সাংবাদিক ও প্রায় পনের হাজার লোকের সাথে আমি হত্যাকান্ড প্রত্যক্ষ করেছি। আমি চাইলে আমি আপনাকে তার ছবিও দেখাবো। আমার পত্রিকায় সে ছবি প্রকাশিত হয়েছে।”শেখ মুজিব: “মিথ্যাবাদী, ওরা মুক্তিবাহিনী নয়।”ফালাসী: “মি. প্রাইম মিনিস্টার, দয়া করে মিথ্যাবাদী শব্দটি আর উচ্চারণ করবেন না। তারা মুক্তিবাহিনী। তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছিল আব্দুল কাদের সিদ্দিকী এবং তারা ইউনিফর্ম পরা ছিল।”শেখ মুজিব: “তাহলে হয়তো ওরা রাজাকার ছিল যারা প্রতিরোধের বিরোধীতা করেছিল এবং কাদের সিদ্দিকী তাদের নির্মূল করতে বাধ্য হয়েছে।”ফালাসী: “মি. প্রাইম মিনিস্টার, ..কেউই প্রতিরোধের বিরোধীতা করেনি। তারা ভীতসন্ত্রস্ত ছিল। হাত পা বাঁধা থাকায় তারা নড়াচড়াও করতে পারছিল না।”শেখ মুজিব: “মিথ্যেবাদী।”ফালাসী: “শেষ বারের মতো বলছি, আমাকে মিথ্যেবাদী বলার অনুমতি আপনাকে দেবো না।” (ইন্টারভিউ উইথ হিস্টরী, ওরিয়ানী ফালাসী। – অনুবাদে  আনোয়ার হোসেন মঞ্জু)। এই হল শেখ মুজিবের মানসিকতা। এই হল আওয়ামী লীগ ঘোষিত সর্বকালের সেরা বাঙালীর মানবতা, নৈতিকতা, ন্যায়-অন্যায়বোধ ও চরিত্রের মান। তবে এটি শুধু শেখ মুজিবের একার মানসিকতা নয়, এ হল শেখ হাসিনাসহ সকল আওয়ামী নেতাকর্মীদের আসল রূপ। এরই ফল হল, যে অপরাধটি শুধু ওরিয়ানা ফালাসীর একার দৃষ্টিতে নয়, সমগ্র বিশ্বের বিবেকমান মানুষের দৃষ্টিতে ছিল জঘন্য যুদ্ধাপরাধ -তা শেখ মুজিবের কাছে আদৌ অপরাধ গণ্য হয়নি। বরং  গণ্য হয়েছে বীরত্বপূর্ণ কর্ম রূপে। এমন মানসিকতা নিয়ে বিনা বিচারে মানুষ হত্যাকে জায়েজ মনে করা যেতে পারে, কিন্তু সে মানসিকতা নিয়ে কি ন্যায় বিচারও প্রতিষ্ঠা করা যায়?

 

বিচারের নামে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নির্মূল

যে কোন অপরাধের ন্যায় যুদ্ধাপরাধের ন্যায্য বিচারেও কারো আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু তা নিয়ে আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের আদৌ কোন আগ্রহ ও যোগ্যতা আছে কি? আওয়ামী লীগ এর আগেও দুইবার ক্ষমতায় এসেছে। আগ্রহ থাকলে সে বিচার সত্তরের দশকেই মুজিব আমলে হত। অপরাধের আলামাত ৪০ বছর পর অক্ষত থাকার কথা নেয়। যে কোন যুদ্ধে দুইটি পক্ষ থাকে। প্রতি পক্ষেই কিছু অপরাধী লোকও থাকে। তারাই অপরাধ ঘটায়। বহু নিরপরাধ লোক তখন মারা যায়। সুবিচারে আগ্রহী হলে উভয় পক্ষের অপরাধীদেরই আদালতের কাঠগড়ায় তুলতে হয়। একাত্তরের সকল অপরাধ শুধু পাকিস্তানী সেনাবাহিনী করেছে সেটি ঠিক নয়। তা হলে হাজার হাজার বিহারীদের কারা হত্যা করল? কারাই বা বহুহাজার বন্দী রাজকার এবং হাজার হাজার পাকিস্তানপন্থি নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করল? তারা নিশ্চয় বজ্রপাতে বা কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগে মারা যায়নি। কারাই বা তাদের ঘরবাড়ি লুন্ঠন করল? বসনিয়া ও কসভোর যুদ্ধে বহু অপরাধ সংঘটিত হয়ছে। আন্তর্জাতিক আদালত সার্ব ও মুসলিম এ উভয় পক্ষের অপরাধীদের বিরুদ্ধে বিচারের ব্যবস্থা নিচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশে সেটি কই? বিচারের এই কি আন্তর্জাতিক মান? আন্তর্জাতিক আইনে যে কোন বন্দীকে হত্যা করা যুদ্ধাপরাধ। কিন্তু বিচারের নামে এ প্রহসনে বন্দী হত্যাকারিদের বিচারের কোন উদ্যোগই নেওয়া হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে নামে শুধু সরকার-বিরোধীদের বিচারের উদ্যোগ নিচ্ছে। বহু মানুষকে তারা সে উদ্দেশ্যে গ্রেফতারও করেছে। কিন্তু যেসব যুদ্ধাপরধারীরা আওয়ামী লীগে আশ্রয় নিয়েছে তাদের বিচারের উদ্যোগ কই? কাউকে বিচার করতে হলে তার বিরুদ্ধে সাক্ষী প্রমাণ আনতে হয়। হত্যার সাথে সরাসরি জড়িত সে প্রমাণ আনতে হয়। নিছক মুখের কথায় কারো হাজতে তোলা যায় না। কারণ এমন কথা যে কোন ব্যক্তি যে কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে বলতে পারে। কথা হল, যাদেরকে যুদ্ধাপরাধী বলা হচ্ছে তাদের কারো বিরুদ্ধে কি এমন ছবিসহ প্রমাণ আছে যে তারা রাইফেলের মাথার বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুচিয়ে মানুষ হত্যা করছে? থাকলে সরকারের সে ছবি প্রকাশ করা উচিত। এবং তার ভিত্তিতে বিচার হওয়া উচিত। কাদের সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে সে ছবি আছে।  বিদেশী পত্রিকা্য় সে ছবি ছাপা হয়েছে। সে ছবি বহু ওয়েব সাইটে এখন প্রামাণ্য দলীল রূপে শোভা পায়। ফলে যুদ্ধাপরাধারীদের বিচারে আওয়ামী লীগ সরকারের সামান্যতম আগ্রহ থাকলে সে বিচার কাদের সিদ্দিকীকে দিয়ে শুরু হওয়া উচিত ছিল।

আন্তর্জাতিক আইনে কাউকে জোরপূর্বক ঘর থেকে রাস্তায় নামিয়ে তার ঘর-বাড়ি ও সহায়-সম্পদ দখলে নেওয়া অপরাধ। যুদ্ধকালে ঘটলে সেটি ভয়ানক যুদ্ধাপরাধ। বাংলাদেশে সে অপরাধ যে কতটা বীভৎস ভাবে হয়েছে তার প্রমাণ হল, কয়েক লক্ষ বিহারীর হত্যাই শুধু নয়, তাদের সহায়-সম্বলহীন বস্তির জীবন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানীর পরাজয়ের পর সে দেশে হিটলারের নাজী পার্টির বহু লক্ষ নেতা-কর্মী ছিল। কিন্তু বিজয়ী ব্যক্তিরা তাদের ক’জনের ঘরবাড়ী দখলে নিয়েছে? খুন বা ডাকাতি করলে আদালতে শাস্তি হয়, কিন্তু তাই বলে কি অপরাধীর ঘরবাড়ী ছিনিয়ে নিয়ে তার স্ত্রী শিশু পুত্র-কণ্যাকে রাস্তায় নামানো যায়? এটি কি অমানবিকতা ও অপরাধ নয়? বিশ্বের কোন সভ্যদেশে কি এমন বিধান আছে? কিন্তু আওয়ামী লীগের কাছে এ অপরাধ কোন অপরাধই গন্য হয়নি। তাই জঘন্য অপরাধীদেরকে তাদের অন্যায় ভাবে দখল করা বিহারীদের ঘরবাড়ীর মালিকানা দিয়ে তারা পুরস্কৃত করেছে। কথা হল, এই যাদের ন্যায়বোধ, মূল্যবোধ, বিচারবোধ ও মানবতার মান, তারা যুদ্ধাপরাধ দূরে থাক, কোন বিচারেরই কি সামর্থ রাখে? কারণ, সে জন্য তো ন্যায়কে ন্যায় এবং অন্যায়কে অন্যায়কে অন্যায় বলার সামর্থটুকু তো দরকার?

 

নৃশংস অপরাধের রাজনীতি

অপরাধ শুধু যুদ্ধকালে ঘটে না। যুদ্ধ ছাড়াও প্রতিদেশে বহু মানুষ খুন হয়, বহু নারী ধর্ষিত হয়, বহু দোকানপাঠ ও ঘরবাড়ি লুন্ঠিতও হয়। অন্যদেশের তুলনায় বাংলাদেশে সেটি বরং প্রতিদিন বেশী বেশী হয়। দেশটি যে অপরাধীদের কতবড় অভয় অরণ্য তার প্রমাণ, অপরাধ কর্মে বাংলাদেশ বিশ্বের ২০০টির বেশী রাষ্ট্রকে হারিয়ে ৫ বার বিশ্বে প্রথম হয়েছে। মুজিব আমলে হাজার হাজার কোটি টাকার রিলিফের মালামাল লুন্ঠিত হয়েছে। লুণ্ঠনে লুন্ঠনে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করা হয়া হয়েছে। বিশ্বের দরবারে তলাহীন ভিক্ষার ঝুলির খেতাবও পেয়েছে। যে জমিতে গাছের চেয়ে আগাছারই ভিড় বেশী সে জমিতে আগাছা তুলতে বেগ পেতে হয় না। প্রশ্ন হল, যেখানে এত অপরাধী, তাদের মধ্য থেকে ক’জনের বিচার হয়েছে? আওয়ামী লীগ তৃতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর দুর্বৃত্তদের অপরাধ-কর্ম প্রতিবারের ন্যায় এবারও প্রচন্ড তীব্রতা পেয়েছে। তাদের দলীয় অপরাধীদের হাতে বেদখল হয়ে যাচ্ছে সরকারি খাস জমি, নদীর পাড়, রেলের জমি, বনভূমি, সমূদ্র সৈকত, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল। ডাকাতির শিকার হচ্ছে দেশের হাটবাজার। লুটপাঠ হয়ে যাচ্ছে রাস্তার পাশের সরকারি গাছ। অপরাধীদের বিচারে সরকারের সামান্যতম ইচ্ছা থাকলে এসব অপরাধকর্মের নায়কদের গ্রেফতার করা হত। তাদের আদালতে তোলা হত। কিন্তু মুজিব যেমন বিচার করেনি, তার কন্যা হাসিনাও করছে না। তাদের আগ্রহ অন্যত্র। তারা বরং এসব অপরাধীদের নিজ দলে স্থান করে দিচ্ছে। মুজিব আমলে শত শত এমন অপরাধীর মাঝে এক জঘন্য অপরাধী দুর্বৃত্তিতে আন্তর্জাতিক পরিচিতি পেয়েছিল। তার নাম গাজী গোলাম মোস্তাফা। সে ছিল ঢাকা শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং বাংলাদেশ রেড ক্রস সোসাইটির প্রধান। রিলিফের মাল লুটলাঠের মাধ্যমে সে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছিল। দেশী-বিদেশী পত্রিকায় তার কীর্তকলাপের বহু বিবরণও ছাপা হয়েছিল। কিন্তু সে জন্য তাকে একদিনের জন্যও আদালতে যেতে হয়নি, কোন জেল-জরিমানাও হয়নি। বরং সে সব সময়ই শেখ মুজিবের সমর্থণ পেয়েছে। ফলে কোন পুলিশ বা দূর্নীতি দমন বিভাগের কোন কর্মচারি তার কেশও স্পর্শ করতে পারিনি। আর এখন এমন গাজী গোলাম মোস্তাফার সংখ্যা আওয়ামী লীগে অসংখ্য।

আওয়ামী লীগ অপরাধীদের দ্বারা যে কতটা অধিকৃত, তাদের শাসনামলে অপরাধের জোয়ার যে কতটা তীব্রতা পায় এবং দলটির নেতৃবৃন্দ অপরাধীদের বিচার ও শাস্ত্রির ব্যাপারে যে কতটা উদাসীন তার কিছু উদাহরণ দেওয়া যাক। প্রথমে শেখ হাসিনার আমল থেকে। পরে তাঁর পিতার আমল থেকে।। ১০ই আগষ্ট, ২০১০ তারিখে “দৈনিক আমার দেশ” নিম্মের খবরটি ছেপেছে, “কুয়াকাটার শত শত একর সরকারি খাস জমি দখল প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর এবার প্রভাবশালী দখলদারদের মূল টার্গেট কুয়াকাটা সৈকতের মূল বেলাভূমি। এরই মধ্যে সমুদ্রের বালুকাবেলার মূল সৈকতে পিলার  পুঁতে পজিশন দখলে নিয়েছে  দখলদাররা। সমুদ্র তীরঘেঁষে ওয়াটার লেভেল এরিয়াজুড়ে তোলা হয়েছে অবৈধ স্থাপনা। সৈকত-লাগোয়া সরকারি খাস জমির ওপর ১৯৯৮ সালে ৫০ জেলে পরিবারের পুনর্বাসনের জন্য যে আদর্শ গ্রাম করা হয়েছিল, সেই জায়গাটিও কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রেখে দখল করা হয়েছে। অথচ কোটি কোটি টাকার জমি উদ্ধার কিংবা অবৈধ দখলদার উচ্ছেদের জন্য ভূমি প্রশাসন কিংবা বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। কুয়াকাটা ঘুরে দেখা গেছে, বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে বিভিন্ন হাউজিং কোম্পানিসহ এলাকার প্রভাবশালীরা যেন খাস জমি দখলের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। গড়ে উঠছে একের পর এক অবৈধ স্থাপনা। এখন দেদার দখল করা হচ্ছে সৈকতের বেলাভূমি। পর্যটকরা যে বিচে হাঁটাচলা করতেন, সেসব স্থানও দখল করে কাঁটাতারের বেড়া দেয়া হচ্ছে।”

দেশের রাজনীতি অপরাধী  চক্রের দ্বারা অধিকৃত হলে তখন শুধু প্রশাসনই দুর্বৃত্ত কবলিত হয় না্, তাদের দখলে যায় সমগ্র দেশ। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চল যে কতদ্রুত অপরাধীদের দখল যাচ্ছে তারও কিছু সাম্প্রতিক উদাহরণ দেওয়া যাক। “দৈনিক আমার দেশ” ১০ই আগষ্ট, ২০১০ তারিখে খবর ছেপেছে, “কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় এ মাসে ৫টি খুন, ৩টি অপহরণসহ একাধিক ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এখনও অপ্রতিরোধ্যভাবে চলছেই। এসব অপরাধ কর্মকাণ্ড ঘটলেও থানা পুলিশের তেমন কোনো ভূমিকা নেই। দৌলতপুর থানার ওসির ভূমিকা নিয়েও জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। আইন-শৃঙ্খলার অবনতির কারণে এ উপজেলার মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। .. গত ৩রা জুলাই হোগলবাড়িয়া ইউনিয়নের দাড়েরপাড়া গ্রামের একটি পাট ক্ষেত থেকে এ্যানি নামের এক শিশুকন্যার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। সন্ত্রাসীরা শিশুটিকে অপহরণের ৫ দিন পর মাটি খুঁড়ে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। ৬ জুলাই মাদক ব্যবসার অর্থ লেনদেনকে কেন্দ্র করে প্রাগপুর পশ্চিমপাড়া গ্রামে দু’দল মাদক ব্যবসায়ীর মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হয়। এ সময় বাড়িঘর ভাংচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। একই দিন ফিলিপনগর ইউনিয়নের লালদহ মাঠে বুলবুল ইসলাম নামের এক ব্যবসায়ী সন্ত্রাসী হামলায় গুরুতর আহত হন। ৭ জুলাই সকালে হোগলবাড়িয়া ইউনিয়নের তারাগুনিয়া মণ্ডলপাড়া গ্রাম থেকে গৃহবধূ রঙ্গিলা খাতুনের লাশ উদ্ধার করা হয়। ৮ জুলাই উপজেলার চরাঞ্চলে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা গ্রামবাসীর ওপর হামলা চালায় এবং গুলিবর্ষণ করে। এতে ১০ জন আহত হয়। ১৬ জুলাই রাতে গুলিবর্ষণ ও বোমা ফাটিয়ে আদাবাড়িয়া গ্রামের আলম হোসেনের ছেলে ব্যবসায়ী সুমনকে ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণের দাবিতে অপহরণ করে সন্ত্রাসীরা। এ ঘটনার একদিন পর ২ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে ওই ব্যবসায়ী ছাড়া পেলেও পুলিশ কোনো পদক্ষেপই নেয়নি বলে অপহৃতের পরিবারের অভিযোগ। একই দিন সকালে উপজেলার হোসেনাবাদ আকিজ বিড়ি ফ্যাক্টরিতে দু’দল শ্রমিকের মধ্যে সংঘর্ষ ও গোলাগুলি হলেও পুলিশ এ ব্যাপারে মামলা বা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। ১৮ জুলাই উপজেলার সদর ইউনিয়নের লাউবাড়িয়া ও চুয়ামল্লিকপাড়া গ্রামের ৩ বাড়ি থেকে হালের বলদসহ ৬টি গরু লুটের ঘটনা ঘটে। ২৩ জুলাই মরিচা ইউনিয়নের দুর্গম নতুনচরে এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে দুর্ধর্ষ ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এ সময় ডাকাতরা ২ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে। ২৪ জুলাই রাতে মরিচা ইউনিয়নের নতুনচর গ্রামে আসাদুল ইসলাম, শহিদুল, টিক্কা, বানেজ মণ্ডল, জহুরুল, ইব্রাহিম মণ্ডল ও আবদুল হান্নানের বাড়িতে গণডাকাতির ঘটনা ঘটে। ডাকাত দল এ সময় নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কারসহ ৫ লাখ টাকার মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। ২৯ জুলাই রাতে কিশোরীনগর পূর্বপাড়া গ্রাম থেকে মোশারফ হোসেনের ছেলে মত্স্য খামারি মাজেদুলকে ৩ লাখ টাকা মুক্তিপণের দাবিতে অপহরণ করে সন্ত্রাসীরা। ৩০ জুলাই সকালে খলিসাকুণ্ডি ইউনিয়নের পিপুলবাড়িয়া এলাকার একটি মাঠের ভেতর এখতিয়ার হোসেন খান নামের এক কৃষকের লাশ উদ্ধার করা হয়। ৩১ জুলাই ইউএনও’র নির্দেশ অমান্য করে পুলিশের সামনেই দৌলতপুর উপজেলার প্রভাবশালী ভূমিদস্যু মোহাম্মদ আলী উপজেলা পরিষদের উত্তর পাশে মানিকদিয়াড় সরকারি প্রাইমারি স্কুলের জমি দখল করে প্রাচীর নির্মাণ করে। সরকারি স্কুলের জমিতে অবৈধভাবে প্রাচীর নির্মাণ করার এ ঘটনায় ভুক্তভোগী এলাকাবাসী ভূমিদস্যু মোহাম্মদ আলীর বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠেন। ১ আগস্ট রিফায়েতপুর ইউনিয়নের ঝাউদিয়া নতুনপাড়া গ্রামে সাহারা খাতুন নামের স্বামী পরিত্যক্ত এক মহিলাকে কুপিয়ে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। সন্ত্রাসীদের বাধা দিতে গিয়ে তাদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে পপি নামের এক কলেজছাত্রী গুরুতর আহত হয়। ৪ আগস্ট চকবিলগাথুয়া গ্রামের পটল ক্ষেত থেকে চায়না খাতুন নামের এক গৃহবধূর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ হল শেখ হাসিনার আমলে অপরাধ দমন ও অপরাধীদের শাস্তির নজির।

এবারের উদাহরনটি শেখ হাসিনার পিতার আমল থেকে। ১৯৭৩ সালে দৈনিক ইত্তেফাকের কিছু খবরের শিরোনাম ছিলঃ “ঝিনাইদহে এক সপ্তাহে আটটি গুপ্তহত্যা”(০১/০৭/৭৩); “ঢাকা-আরিচা সড়কঃ সূর্য ডুবিলেই ডাকাতের ভয়” (০২/০৭/৭৩) “বরিশালে থানা অস্ত্রশালা লুটঃ ৪ ব্যক্তি নিহত” (৪/০৭/৭৩); “পুলিশ ফাঁড়ি আক্রান্তঃ সমুদয় অস্ত্রশস্ত্র লুট” (১২/০৭/৭৩); “লৌহজং থানা ও ব্যাঙ্ক লুট”(২৮/০৭/৭৩); “দুর্বৃত্তের ফ্রি স্টাইল” (০১/০৮/৭৩); “পুলিশ ফাঁড়ি ও বাজার লুটঃ লঞ্চ ও ট্রেনে ডাকাতি”(৩/০৮/৭৩); “এবার পাইকারীহারে ছিনতাইঃ সন্ধা হইলেই শ্মশান”(১১/০৮/৭৩);“চট্টগ্রামে ব্যাংক ডাকাতি,লালদীঘিতে গ্রেনেড চার্জে ১৮ জন আহত, পাথরঘাটায় রেঞ্জার অফিসের অস্ত্র লুট” (১৫/০৮/৭৩); “খুন ডাকাতি রাহাজানিঃ নোয়াখালীর নিত্যকার ঘটনা,জনমনে ভীতি” (১৬/০৮/৭৩); “২০ মাসে জামালপুরে ১৬১৮টি ডাকাতি ও হত্যাকান্ড” (১৭/১১/৭৩); “আরও একটি পুলিশক্যাম্প লুটঃ সুবেদরসহ ৩ জন পুলিশ অপহৃত” (১৩/০৭/৭৩);“যশোরে বাজার লুটঃ দুর্বৃত্তের গুলীতে ২০ জন আহত” (১৮/০৪/৭৪); “রাজশাহীতে ব্যাংক লুট” (২১/৪/৭৪)। এ হল মাত্র একটি পত্রিকার খবরের শিরোনাম। মুজিব আমলের পত্রিকাগুলো পড়লে চোখে পড়বে এরূপ হাজার হাজার ঘটনা ও বহু হাজার বিয়োগান্ত খবর। পাকিস্তানের ২৩ বছরের ইতিহাসে দুর্বৃত্তির যত না ঘটনা ঘটেছে মুজিবের ৪ বছরে তার চেয়ে বহু গুণ বেশী ঘটেছে। বাংলার হাজার বছরের ইতিহাসে “ভিক্ষার ঝুলী”-এ খেতাব জুটিনি, কিন্তু মুজিব সেটি অর্জন করেছেন। অথচ কিছু কাল আগেও গ্রামবাংলার অধিকাংশ মানুষের গৃহে কাঠের দরজা-জানালা ছিল না। ঘরের দরজায় চট বা চাটাই টানিয়ে অধিকাংশ মানুষ পরিবার পরিজন নিয়ে নিরাপদে রাত কাটাতো। কিন্তু মুজিব শুধু খাদ্যই নয়,সে নিরাপত্তাটুকুও কেড়ে নেন। নিরাপত্তান খোঁজে তাদেরকে ঘর ছেড়ে বন-জঙ্গলে আশ্রয় খুঁজতে হয়। থানা পুলিশ কি নিরাপত্তা দিবে? তারা নিজেরাই সেদিন ভুগেছিল চরম নিরাপত্তাহীনতায়। দুর্বত্তদের হাতে তখন বহু থানা লুট হয়েছিল। বহু পুলিশ অপহৃত এবং নিহতও হয়েছিল। মুজিবের নিজের দলীয় কর্মীদের সাথে তার নিজের পুত্রও নেমেছিল দুর্বৃত্তিতে। সে সময় দৈনিক পত্রিকায় খবর ছাপা হয়েছিলঃ “স্পেশাল পুলিশের সাথে গুলী বিনিময়ঃ প্রধানমন্ত্রীর তনয়সহ ৫ জন আহত”। মূল খবরটির ছাপা হয়েছিল এভাবেঃ “গত শনিবার রাত সাড়ে এগারোটায় ঢাকার কমলাপুর স্পেশাল পুলিশের সাথে এক সশস্ত্র সংঘর্ষে প্রধানমন্ত্রী তনয় শেখ কামাল,তার ৫ জন সাঙ্গপাঙ্গ ও একজন পুলিশ সার্জেন্ট গুলীবিদ্ধ হয়েছে। শেখ কামাল ও তার সঙ্গীদেরকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের নয়,দশ ও তেত্রিশনম্বর কেবিনে ভর্তি করা হয়েছে। আহত পুলিশ সার্জেন্ট জনাব শামীম কিবরিয়াকে ভর্তি করা হয়রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে।”-(গণকন্ঠ ১৯/১২/৭৩)।

 

আওয়ামী লীগ বদলায় না

দিন বদল হলেও আওয়ামী লীগ যে বদলায় না এ হল তার উদাহরণ। এমন এক দুর্বৃত্তকবলিত দলটি যুদ্ধাপরাধের বিচার করবে সেটি কি আশা করা যায়? তা এক অলীক স্বপ্ন। যাদের কাছে অপরাধই অপরাধ নয়, তারা অপরাধীদের খুঁজে বের করবে কি করে? তাদের একমাত্র এজেন্ডা নিজেদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্মূল করা। এবং সে নির্মূল প্রক্রিয়াকে জায়েজ করতে তারা প্রতিপক্ষকে অপরাধী রূপে চিত্রিত করতে চায় এবং গ্রেফতার করে আদালতে তুলতে চায়। তাই প্রকৃত অপরাধীদের দাপটে দেশবাসীর জীবনে অশান্তি বাড়লে কি হবে, পুলিশ ব্যস্ত মিথ্যা মামলা তৈরি করার কাজে। পুলিশের এখন এটিই সবচেয়ে বড় কাজ। ফলে মিথ্যা মামলা হচ্ছে শত শত নয়, হাজারে হাজার। যুদ্ধাপরাধীদের প্রকৃত বিচার তাদের কাছে কোন প্রসঙ্গই নয়। সেটি হলে একাত্তরে যারা যুদ্ধ করল সেই পাক-বাহিনীদের অফিসারদের তারা আদালতে তুলতো। অথচ তাদের কথা তারা এখন মুখেও আনে না। কারণ, পাকিস্তানী সেনা অফিসারগণ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয়। তারা তো চায়, রাজনীতির ময়দান থেকে শত্রুর নির্মূল। ফলে অপরাধ-কর্ম নির্মূল বা অপরাধীদের শাস্তি দেওয়া তাদের প্রায়োরিটি নয়। কারণ, অপরাধীরা জনগণের বা রাষ্ট্রের শত্রু হলেও আওয়ামী লীগের শত্রু নয়। তাই প্রশাসন হাজার হাজার জামাত-শিবির কর্মীকে গ্রেফতার করেছে এবং তাদের উপর শারিরীক ভাবে নির্যাতনও করছে, কিন্তু অপরাধের জোয়ার থেকে অপরাধীদের ধরে শাস্তি দিয়েছে সে নজির অতি সামান্যই। বরং তাদেরকে বিপুল ভাবে আশ্রয় দিচ্ছে নিজ দলে। কারণ, অপরাধী হলেও এসব সন্ত্রাসী দুর্বৃত্তদের দলীয় ক্যাডার হওয়ার সামর্থ প্রচুর। রাজপথে তারা বিরোধীদের অন্ততঃ লাশ বানাতে পারে। প্রধানমন্ত্রীরূপে  শেখ হাসিনার মূল কাজ হল, নিজদলীয় এসব খুণি-সন্ত্রাসীদের গায়ে সামান্য আঁচড়টিও লাগতে না দেওয়া। এবং পুলিশের কাজ হল, নীরবে দাঁড়িয়ে সরকারদলীয়দের অপরাধকর্মগুলোকে দেখা এবং প্রয়োজনে জনগণের হাত থেকে প্রটেকশন দেয়া।

আওয়ামী লীগের কাছে এখন মূল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। তারা এ দুটো দলকেই নির্মূল বা দুর্বল করতে চায়। শেখ মুজিব নিজে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অস্তিত্ব মেনে নিতে রাজী ছিলেন না। তিনি ছিলেন এক দেশ এক নেতার নীতিতেই বিশ্বাসী। সে বিশ্বাস তিনি সযন্তে ছড়িয়েছিলেন তাঁর দলীয় নেতা-কর্মীদের মাঝে। তাই একদলীয় বাকশাল করে গণতন্ত্রকেই আস্তাকুঁড়ে ফেলেছিলেন। শেখ হাসিনাও মুজিবের পথ ধরে চলেছেন। তবে একটু ভিন্ন ভাবে। একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার সাহস তাঁর নাই। সে সামর্থও নাই। কারণ এখন ১৯৭৪ সাল নয়। বিশ্বপরিস্থিতিও এখন ভিন্ন। তাছাড়া মুজিব আমলের ন্যায় ততটা সবল নয় তাঁর নিজের দল। দলীয় দুর্বলতার কারণে তাঁকে বাধ্য হতে হয়েছে অন্য ১৩টি দলের সাথে মিলে নির্বাচন করতে। তবে ষড়যন্ত্র, নির্যাতন ও মিথ্যা মামলা তৈরীর সামর্থ তার আছে। তাই শেখ হাসিনা একদলীয় বাকশালের বদলে আইন-আদালত ও প্রশাসনকে ব্যবহার করছেন বিরোধী দলের কোমর ভাঙ্গার কাজে। একদিকে বিএনপির বিরুদ্ধে মামলা আনছেন দূর্নীতির নামে, অপরদিকে ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে মামলা আনছেন যুদ্ধাপরাধের নামে। অথচ একাত্তরে শুধু জামায়াতে ইসলামীই পাকিস্তানের পক্ষে নেয়নি। বরং বেশীর ভাগ লোক ছিল জামায়াতে ইসলামীর বাইরের। তারা ছিলেন মুসলিম লীগ, পিডিপি, নিজামে ইসলামী, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, কৃষক-শ্রমিক পার্টি, পূর্ব পাকিস্তানের কম্যিউনিষ্ট পার্টি (আব্দুল হকের)সহ বহু রাজনৈতিক দলের। অনেকেই ছিলেন অরাজনৈতিক সমাজকর্মী, বুদ্ধিজীবী, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় পরিষদগুলীর নেতা। দেশের ক’জন আলেম বা মাদ্রাসার ক’জন ছাত্র সে সময় বাংলাদেশের পক্ষ নিয়েছিল? পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ নির্মানের প্রকল্পটি ছিল মূলতঃ দেশের বামপন্থি ও ভারতপন্থি সেকুলারিষ্টদের প্রকল্প। তারা একাত্তরে ভোট নেয় পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র নির্মানের প্রতিশ্রুতিতে। নির্বাচনে জেতার পর তারা এজেন্ডাই পাল্টে ফেলে। যারা ইসলামী চেতনা সর্মৃদ্ধ ছিলেন তারা সেদিন একটি মুসলিম দেশকে ভাঙ্গা হারাম মনে করত। যেমনটি আজও তারা ইরাক বা সূদানেরর খন্ডিত করার বিরোধী। তাদের সে সিদ্ধান্তের মধ্যে বাঙালীর স্বার্থহানী করার ভাবনা ছিল না। ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭১ অবধি কালকে তারা বাঙালীর পরাধীনতাও ভাবেননি। এমনকি মুজিবও ভাবেননি। বরং শেখ মুজিব নিজেও ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পাকিস্তানের অখন্ডতার পক্ষে কথা রেখেছিলেন দলীয় মেনিফেস্টোতে। নির্বাচনী জনসভাগুলোতে পাকিস্তান জিন্দাবাদ ধ্বণিও দিয়েছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে কোন জনসভাতেও কোন ঘোষনা তিনি দেননি। পঞ্চাশের দশকে তিনি মন্ত্রীও হয়েছেন। মুজিব নিজে পাকিস্তানের অখন্ডতার পক্ষে ইয়াহিয়া খানের লিগাল ফ্রেম ওয়ার্ক স্বাক্ষর করে নির্বাচন করেছেন। একাত্তরের ২২শে মার্চেও পশ্চিম পাকিস্তানের নেতাদের সাথে আলোচনায় বসেছেন অখন্ড পাকিস্তানে সরকার গঠনের উপায় বের করার লক্ষ্যে। তাই পাকিস্তানের পক্ষ নেওয়াকে কি অপরাধ বলা যায়? সেটি হলে সে অভিযোগে মুজিবেরও বিচার হওয়া উচিত।

 

এজেন্ডাঃ ইসলামপন্থিদের নির্মূল

এখন যুদ্ধাপরাধের নামে একাত্তরের পাকিস্তানপন্থিদের নির্মূলে শেখ হাসিনার এতটা উদ্যোগী হওয়ার মূল কারণ ভিন্ন। সেটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক। সেটি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নির্মূলের লক্ষ্যে। পাকিস্থানপন্থি অন্যান্য দলগুলি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ায় তারা আর এখন আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ নয়। কিন্তু জামায়াতে ইসলামীর অপরাধ, দলটি এখনও বেঁচে আছে। এবং রাজনৈতিক শক্তিও রাখে। ফলে সে আমলের পাকিস্তানপন্থি অনেকের সাথে আওয়ামী লীগ নেতাদের পারিবারীক আত্মীয়তা জমলেও তারা নির্যাতনে নেমেছে জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। তবে জামায়াতে ইসলামীর আরেক অপরাধ তারা একাত্তরে শুধু অখন্ড পাকিস্তানের পক্ষেই ছিল না, তারা ইসলামপন্থিও। এবং ইসলামপন্থি হওয়াটাই এখন তাদের মূল অপরাধ। কারণ আওয়ামী লীগ ও তার ভারতপন্থি সেকুলার মিত্ররা আর যাই হোক ইসলামী দলের অস্তিত্ব মেনে নিতে রাজী নয়। শেখ মুজিবও নিজেও রাজী ছিলেন না। ক্ষমতা হাতে পেয়েই সকল ইসলামীকে তিনি প্রথমে নিষিদ্ধ করেছিলেন। তাই আওয়ামী লীগের দুষমনদের তালিকায় শুধু জামায়াতে ইসলামীই নয়, যারাই ইসলামের চেতনাধারি ও ইসলামের বিজয়ী আগ্রহী তারা সবাই। তাই জেল-জুলুম ও নির্যাতন নেমে আসছে হিজবুত তাহরীর, আহলে হাদীস আন্দোলন ও অন্যান্য ইসলামী দলের কর্মীদের উপরও। এমনকি দাড়িটুপি ধারী সাধারণ মুসল্লীরাও অতীতে তাদের লগি-বৈঠা থেকে রেহাই পায়নি।

তবে ইসলামপন্থিদের নির্মূল এখন আর শুধু আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের স্ট্রাটেজী নয়। এমন এক আগ্রাসী স্ট্রাটেজী নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা যুদ্ধে নেমেছে আফগানিস্তান, ইরাক, ফিলিস্তিন, ইয়েমেন, আলজিরিয়া, সোমালিয়াসহ বহু মুসলিম দেশে। তাদের কাছে রাষ্ট্রের বুকে ইসলামের প্রতিষ্ঠার আওয়াজ উঠানোই অপরাধ। ইসলামের অবস্থান তারা মসজিদের জায়নামাজে মেনে নিতে রাজী, কিন্তু আদালত, প্রশাসন, শিক্ষা ও অর্থনীতিতে নয়। তালেবানদের মূল অপরাধ, ইসলামকে তারা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী। সেটি রুখতেই ৪০টি দেশের সৈন্য আফগানিস্তানে হাজির হয়েছে। এবং তাদের হাতে নিহত হয়েছে হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষ। তারা এখনও লাগাতর হত্যা-কর্ম চালিয়ে যাচ্ছে সেদেশের নিরীহ গ্রামবাসীর উপর। বোমা ফেলছে বিয়ের মহফিলে। বোমা ফেলছে পাকিস্তানের ইসলামপন্থিদের মাথায়। মার্কিনীরা বহু লক্ষ মানুষ হত্যা করেছে ইরাকে। বাংলাদেশেও আজ একই রূপ স্ট্রাটেজী নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে আওয়ামী লীগ। ইসলামবিরোধী এমন বিশ্বজোড়া আগ্রাসনে মার্কিনীদের মিত্র শুধু ভারত ও ইসরাইলই নয়, আওয়ামী লীগও। ফলে তাদের হাতে আইনের শাসন পদদলিত হলেও মার্কিন প্রশাসন ও তার মিত্রদের মুখে তা নিয়ে সামান্যতম প্রতিবাদ নাই। এতে বরং প্রচন্ড খুশি প্রতিবেশী ভারত। ভারত তো চায় কাশ্মিরের মুসলমানদের উপর ভারত যেটি করছে তেমন একটি যুদ্ধ লাগাতর শুরু হোক বাংলাদেশের ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে। কারণ বাংলাদেশে ইসলামের চেতনার উত্থানের ভয়ে ভারতীয় ততটাই বিচলিত যতটা বিচলিত কাশ্মীরে ও আফগানিস্তানে জিহাদের প্রচন্ডতায়। বাংলাদেশেও যে কোন সময় ইসলামের জোয়ার শুরু হতে পারে সে ভয়ে হারাম হয়ে গেছে তাদের ঘুম। সেটি বুঝা যায় ভারতীয় পত্র-পত্রিকা পড়লে। আওয়ামী লীগকে তারা ব্যবহার করছে সে জোয়ার রুখার যায়। তাই বাংলাদেশের পুলিশের কাজ হয়েছে ঘরে ঘরে হানা দিয়ে শুধু ইসলামপন্থি ছাত্রদের গ্রেফতার করা নয়, বরং জিহাদ বিষয়ক বই বাজেয়াপ্ত করাও। অথচ নামায-রোযার ন্যায় জিহাদ ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিধান। জীবনে নামায-রোযা না থাকলে যেমন কাউকে মুসলমান বলা যায় না, তেমনি মুসলমান যায় না জিহাদ না থাকলেও। জিহাদহীন মুসলমানকে নবীজী (সাঃ) মুনাফিক বলেছেন। নবীজীর আমলে জিহাদ করেননি এমন কোন সাহাবা পাওয়া যাবে কি? তাই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে বাংলাদেশে আজ যা কিছু ঘটছে সেটি কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং মুসলমানদের বিরুদ্ধে পরিচালিত গ্লোবাল যুদ্ধের এটি এক অবিচ্ছিন্ন ঘটনা।

 

বিদেশী শত্রুর ক্রীড়নক হাসিনা

তাই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার একটি বাহানা মাত্র। বিচার হবে কি হবে না সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়, যেটি অনিবার্য সেটি হল বাংলাদেশের ইসলামপন্থিদের উপর লাগাতর নির্যাতন। দিন দিন সেটি বরং তীব্রতর ও বর্বরতর হবে। সে ব্যাপারে শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগের নিজেরও কিছু করার নাই। সে বরং ইসলাম-দুষমন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির হাতের সামান্য ক্রীড়নক মাত্র। বল এখন মার্কিন-নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদী জোটের হাতে। আর বাংলাদেশে সে জোটের পক্ষ থেকে ইসলামপন্থিদের দমনের ভার পেয়েছে ভারত। একাত্তরেও তেমনই একটি অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল। আজকের মত তখনও রাজনৈতীক খেলার নিয়তন্ত্রণ চলে গিয়েছিল দিল্লির দরবারে। সে সময় শেখ মুজিবেরও কিছু করার ছিল না। জেনারেল ইয়াহিয়া খান যুদ্ধ পরিহারের জন্য তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান ভাঙ্গার প্রশ্নে রেফারেন্ডামের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধি সেটি নাকচ করে দিয়েছিলেন। সে আমলেও ভারতীয় স্ট্রাটেজীর বাস্তবায়ন ছাড়া আওয়ামী লীগের যেমন কোন এজেন্ডা ছিল না, আজও নাই। সে আমলে বেরুবাড়ী ভারতে হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। আজ দেওয়া হচ্ছে তালপট্টি। দেওয়া হচ্ছে বন্দর। সে সময় ফারাক্কা বাঁধের উজানে গঙ্গার পানি উত্তোলনের অধিকার দেওয়া হয়েছে। আজ দেওয়া হয়েছে টিপাইমুখ বাঁধের অধিকার। দেওয়া হচ্ছে ট্রানজিট। সে আমলে ইসলামী দলগুলোকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এবারও নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা হচ্ছে। মুজিব রক্ষিবাহিনী গড়েছিলেন। আর শেখ হাসিনা পুলিশ, র‌্যাব এবং আর্মিকেই রক্ষি বাহিনী বানিয়ে ছেড়েছে।

ভারতের এবারের আবদার, কাশ্মীরের মুসলমানদের বিরুদ্ধে ভারত যে যুদ্ধটি লড়ছে তেমন একটি প্রকান্ড যুদ্ধ শুরু হোক বাংলাদেশের ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে। তাই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে দেশ জুড়ে যে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও বীষ ছিটানো হয়েছে সেটি থামাবার পথ শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকারের হাতে নেই। সে ইচ্ছাও নেই। ইচ্ছা করেই পথ বন্ধ করা হয়েছে শান্তিপূর্ণ ভাবে দেশে ইসলামের বিজয় আনার। ফলে প্রশাসনিক দুর্বৃত্তদের আয়োজিত নির্বাচনে জিতে যারা এমপি বা মন্ত্রি হওয়ার মধ্য দিয়ে দেশে ইসলামের বিজয়ের স্বপ্ন দেখতেন তাদের এখন স্বপ্নভঙ্গ হওয়ার দিন। ইসলামের বিপক্ষ যে শয়তানি শক্তি নবীজী (সাঃ)র ন্যায় মানব-ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিকে ইসলামের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার কাজ শান্তিপূর্ণ ভাবে হতে দেয়নি সে পক্ষটি আজও হতে দিবে -সেটি কি আশা করা যায়? প্রতিবেশী ভারত সেটি মেনে নিবে সেটিই বা কীরূপে বিশ্বাস করা যায়? ইসলামের বিজয় অর্জন করতে হয় অর্থ, রক্ত, শ্রম, ছবর ও মেধার বিণিময়ে। আল্লাহপাকের পক্ষ থেকে কোরবানী পেশ ছাড়া ভিন্ন কোন পথ রাখাই হয়নি। ঈমানদারীর পরিক্ষা তো হয় এ পথেই। নবীজী (সাঃ) ও সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ)কেও সে অভিন্ন পথেই অগ্রসর হতে হয়েছে। প্রতি যুগে ঈমানদারীর পরীক্ষা তো এ পথেই হয়, নিছক ভোটদানের মধ্য দিয়ে নয়। ঈমানদারদের জন্য সে পরীক্ষাটিই বাংলাদেশে চরম ভাবে শুরু হয়ে গেছে। এখন প্রশ্ন হল, বাংলাদেশের ইসলামপন্থিরা এ পরীক্ষায় কীভাবে অংশ নেয়। আত্মসমর্পণ এখানে কোন পলিসি নয়, ভীরুতা বা নীরবতা হতে পারে না কোন স্ট্রাটেজী। আত্মসমর্পণ, ভীরুতা ও নীরবতায় সেটি অনিবার্য করে সেটি আল্লাহর আযাব –সেটি যেমন এ দুনিয়ায়, তেমনি আখেরাতে। ফলে বাংলাদেশের ইসলামপন্থিগণ এখন এক চরম পরীক্ষার মুখোমুখি। তবে কথা হল, কঠিন পরীক্ষা ছাড়া কি বড় রকমের কোন প্রমোশনও কি আশা করা যায়? আর ঈমানদারের জীবনে সে প্রমোশনটি তো আসে নিয়ামত ভরা জান্নাত প্রাপ্তির মধ্য দিয়ে। পরিস্থিতির মূল্যায়নে বাংলাদেশের ইসলামপন্থিদের তাই বোধোদয় হওয়া উচিত।

 




অধিকৃত বাংলাদেশ ও নতুন পরাধীনতা

অধিকৃতি ইসলামের শত্রুপক্ষের – 

বাংলাদেশের রাজনীতির নতুন বাস্তবতা হলো, দেশটি এখন আর মুসলিমদের হাতে নেই্। ইসলাম ও মুসলিম –এ দুটি শব্দ পরিত্যক্ত হয়েছে এদেশের মূল পরিচিতি থেকে। বাংলাদেশের উপর বর্তমান অধিকৃতিটি ইসলামের শত্রুপক্ষের। মুসলিম হওয়াটি তাদের কাছে কোন গুরুত্বই বহন করে না। তারা গর্বিত ভারতপন্থি সেক্যুলার বাঙালী জাতীয়তাবাদী রূপে। দেশ শাসনে তারা নিজেরাও স্বাধীন নয়, তাজউদ্দীনের প্রবাসী সরকারের ন্যায় তারাও দিবারাত্র খাটছে ভারতের এজেণ্ডা পালনে। তবে পার্থক্যটি হলো, তাজউদ্দীনের বসবাস ছিল কলকাতায়, আর হাসিনার অবস্থান ঢাকায়। পাকিস্তান আমলে যারা ছিল ভারতের ট্রোজান হর্স তথা গুপ্ত সৈনিক, একাত্তরের পর তারা অবতীর্ণ হয়েছে প্রকাশ্যে ময়দানে। তাদের কারণে ভারতের দখলদারিটি স্রেফ বাংলাদেশের রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক অঙ্গণে নয়; সেটি অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক,বুদ্ধিবৃত্তিক ও ধর্মীয় আক্বীদা-বিশ্বাসের ক্ষেত্রেও।ক্ষমতাসীন জোটটি যে ভারতপন্থি সেটি তারা গোপনও করে না। ফলে বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের পরিচিতি এখন ভারতীয় বলয়ভূক্ত একটি আশ্রীত দেশরূপে। ফলে বাংলাদেশে বুকে ভোট ডাকাতি বা শাপলা চত্ত্বরের ন্যায় গুরুতর অপরাধকর্ম ঘটলেও বিদেশীরা তা নিয়ে কিছু বলে না। তারা ভাবে এটি ভারতের আভ্যন্তরীণ বিষয়। তারা ভাবে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতেরও কিছু করার অধিকার আছে।

ভারতের আশ্রয়ে ও প্রশ্রয়ে বাংলাদেশের উপর ভারতেসবীদের অধিকৃতি প্রথমে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল একাত্তরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের যুদ্ধজয়ের ফলে। পরবর্তীতে তা বার বার নতুন জীবন পেয়েছে ভোট ডাকাতির মাধ্যমে। এ অধিকৃতির সাথে শুধু যে বাঙালী জাতীয়তাবাদী নেতাকর্মী ও সন্ত্রাসী ক্যাডারগণ জড়িত –তা নয়।বরং জড়িত দেশের প্রশাসন,পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, সেনাবাহিনী, বিচার ব্যবস্থা,নির্বাচনি কমিশন এবং মিডিয়া। কারণ, ভারতীয় পঞ্চম বাহিনী বা ট্রোজান হর্সদের অবস্থান শুধু দেশের রাজনীতির অঙ্গণে নয়, তাদের অবস্থান সর্বস্তরে ও সর্বপ্রতিষ্ঠানে। ভারত-বিরোধী নেতাকর্মীগণ তাই লাশ হয় শুধু লগি-বৈঠা ও পিস্তলধারী রাজনৈতিক ক্যাডারদের হাতে নয়, আদালতের বিচারকদের হাতেও। তাদের হাতে ভোট ডাকাতির নির্বাচনও সুষ্ঠ নির্বাচন রূপে বৈধতা পায়।শাপলা চত্ত্বরের হত্যাকাণ্ডে তাই রাজনৈতিক গুণ্ডাদের পাশে সেনাবাহিনীর সদস্যদেরও দেখা যায়। তাদের সাথে জড়িত রয়েছে বাংলাদেশের ভিতরে ও বাইরে কর্মরত ভারতীয় গুপ্তচরগণও -যারা কখনোই চায় না বাংলাদেশের বুকে জনগণের মৌলিক নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা পাক। সেটি চাইলে ভারত সরকার কি কখনো শেখ মুজিবের বাকশালী স্বৈরাচারকে সমর্থন দিত? সমর্থন দিত কি ভোট ডাকাতির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত শেখ হাসিনার সরকারকে? ভারত চায় না বাংলাদেশের স্বাধীনতা। চায় না, দেশটির জনগণ তাদের নিজ নিজ ধর্মকর্ম ও আক্বীদা-বিশ্বাস নিয়ে স্বাধীন ভাবে বেড়ে উঠুক। ইসলামের শত্রুপক্ষের সে ষড়যন্ত্র স্রেফ ১৯৭১ থেকে নয়, বরং ১৯৪৭ সাল থেকেই। তবে হাসিনার সৌভাগ্য হলো, তার পিতার ন্যায় তাকে আর চোরা পথে আগরতলায় গিয়ে ভারতীয় গুপ্তচরদের সাথে গোপন বৈঠক করতে হয় না, সে বৈঠকগুলি বসে বঙ্গভবনে বা গণভবনে।

মুসলিমদের কীভাবে দাবিয়ে রাখা যায় -সে বিষয়ে ভারতীয় শাসকগণ সিদ্ধহস্ত। সে কাজে তারা হাত পাকিয়েছে ভারত ও কাশ্মীরের মুসলিমদের বিরুদ্ধে নানারূপ নির্যাতনে নেমে। ভারতে মুসলিমদের সংখ্যা প্রায় ২০ কোটি -যা বাংলাদেশ বা পাকিস্তানে জনসংখ্যার চেয়ে অধীক। অথচ একমাত্র ঢাকা বা করাচী শহরে যতজন মুসলিম ডাক্তার, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, আইনবিদ, কৃষিবিদ, হিসাবরক্ষক, শিল্পপতি,প্রফেসর এবং সামরিক ও বেসামরিক অফিসার বসবাস করে এবং তাদের হাতে যত গাড়ী ও দালানকোঠা আছে তা সমগ্র ভারতের ২০ কোটি মুসলিমের নাই। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে অন্যান্য শহরের কথা তো বাদই রইলো। সেদেশে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের স্থাপিত সাচার কমিশনের রিপোর্ট, ভারতীয় মুসলিমদের অবস্থা সেদেশের অচ্ছুৎ নমশুদ্রদের চেয়েও খারাপ। শুধু অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই নয়, পরিকল্পিত ভাবে অসম্ভব করা হয়েছে ইসলামি শিক্ষালাভ, শরিয়ত পালন এবং পরিপূর্ণ মুসলিম রূপে তাদের বেড়ে উঠা।সে অভিন্ন প্রকল্পটি এখন বাংলাদেশের মুসলিমদের উপরও চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। প্রশ্ন হলো, মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তী বিধান পালন ছাড়া কি পরিপূর্ণ ইসলাম পালন সম্ভব? সে ব্যর্থতা নিয়ে কি সম্ভব,মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে সত্যিকার মুসলিম রূপে পরিচয় দেয়া? সেরূপ পরিচয় দানটি যে অসম্ভব সেটি সুস্পষ্ট করা হয়েছে পবিত্র কোরআনের এ ঘোষাণায়ঃ “যারা (কোরআনে) নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী বিচার কার্য পরিচালনা করে না তারা কাফের। –তারা জালেম। –তারা ফাসেক।”-(সুরা মায়েদা আয়াত ৪৪,৪৫,৪৭)। তাই নামায-রোযা পালনে যেমন আপোষ করে না, তেমনি আপোষ করে না শরিয়ত প্রতিষ্ঠায়।

ইখতিয়ার মহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির হাতে যখন বঙ্গ বিজয় হয় তখন বাংলার মুসলিম জনসংখ্যা যখন শতকরা ১০ ভাগও ছিল না।অথচ তখনও তিনি শরিয়ত ভিন্ন অন্য কোন আইনকে আদালতে স্থান দেননি। কারণ মুসলিমের কাছে শরিয়তী আইন ভিন্ন সব আইনই কুফরী আইন, ফলে মুসলিম ভূমিতে সেগুলি অবৈধ ও পরিতাজ্য। মুসলিম যেমন নিজ ঘরে মুর্তি রাখতে পারে না, তেমনি নিজ রাষ্ট্রে কুফরি আইনও রাখতে পারেনা। তাই কোন দেশে মুসলিমগণ শাসনক্ষমতা হাতে পেলে প্রথম দিন থেকেই নামায-রোযা, হজ-যাকাতের সাথে শরিয়তী আইনেরও প্রতিষ্ঠা শুরু করে। মুসলিম হওয়ার এটি এক অনিবার্য দায়বদ্ধতা। সেটি না করলে ঈমান থাকে না। আর ঈমান ভেঙ্গে গেলে কি ইবাদত কবুল হয়? কবুল হয় কি দোয়া-দরুদ? ওজু ভেঙ্গে গেলে যেমন নামায হয় না, তেমনি ঈমান ভেঙ্গে গেলে কোন ইবাদত ও দোয়াদরুদও কবুল হয় না। এমন কি হজের দিনে দোয়া কবুলের স্থান আরাফতের ময়দানে গিয়ে করলেও কবুল হয় না।ঈমানহীন,আমলহীন ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারহীন ব্যক্তিগণ যদি মুসলিম হওয়ার দাবী করে তবে তারা গণ্য হয় মুনাফিক রূপে। এমন ব্যক্তির নামায-রোযা, হজ্-যাকাত, দোয়াদরুদ তাকে মুনাফিফ হওয়া থেকে বাঁচাতে পারে না। ওহুদের যুদ্ধের সময় এমন মুনাফিকদের সংখ্যা ছিল শতকরা ৩০ ভাগ। মদিনায় মসজিদে নববীর জায়নামাজে তাদের চেতনা যায়নি। তারা ধরা পড়ে তখন যখন মুসলিম জীবনে ওহুদের যুদ্ধ এসে হাজির হয়। নবীজী (সাঃ) সে যুদ্ধে মদিনা থেকে এক হাজার সঙ্গি নিয়ে জিহাদের উদ্দেশ্যে রওনা দেন, কিন্তু তাদের মধ্য থেকে ৩০০ জন ছিটকে পড়ে। তখন ধরা পড়ে তাদের মুনাফেকী।নবীজী (সাঃ)র পিছনে নামায পড়ে এবং রোযা রেখেও তারা মুনাফিক হওয়া থেকে বাঁচেনি। বর্তমান সময়ে তাদের সংখ্যা যে বহুগুণ বেশী হবে তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে?

তাই যে সমাজে জিহাদ নেই সে সমাজে কে সাচ্চা ঈমানদার,আর কি মুনাফিক সেটি চেনার অন্য উপায় নেই। তখন মুসলিম সেজে ইসলাম ও মুসলিমের ভয়ানক ক্ষতি করাটা এরূপ দুর্বৃত্ত ভণ্ডদের জন্য সহজ হয়ে যায়। তারা তখন টুপিদাড়ি ও মাথায় কালো পট্টি বেঁধে মুসলিমদের ধোকা দেয়। এজন্যই তারা জিহাদের শত্রু। কারণ জিহাদ তাদের আসল চেহারা ফাঁস করে দেয়। জিহাদ বন্ধ করেতই এ দুর্বৃত্তগণ ইসলামের সর্বোচ্চ ইবাদতকে সন্ত্রাস বলে। বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলীতে ইসলামের বড় বড় ক্ষতিগুলো কাফেরদের দ্বারা হয়নি;হয়েছে এসব মুনাফিকদের হাতে। ভাষা, বর্ণ, আঞ্চলিকতার নামে মুসলিম বিশ্ব যেরূপ ৫৭টি দেশে বিভক্ত -সেটি কি নবীজী (সাঃ)র সূন্নত? এটি তো মুনাফিকদের কাজ। নবীজী (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামের যুগে তারা ছিল পরাজিত, কিন্তু এখন তারা বিজয়ী। ফলে বিপদ বেড়েছে ইসলাম ও মুসলিমের। ভাষা ও ভূগোলের নামে মুসলিমদের বিভক্ত রাখা এবং শরিয়তী বিধানকে পরাজিত রাখাই তাদের রাজনীতি। তারা সে বিজয়কে ধরে রাখার জন্য বিশ্বের তাবৎ কাফের শক্তির সাথে মৈত্রী গড়বে সেটাই কি স্বাভাবিক নয়? ব্যক্তির সাচ্চা ঈমানদারি ধরা পড়ে ইসলামের বিজয়ে আপোষহীন অঙ্গীকার থেকে। মুনাফিকদের জীবনে সে অঙ্গীকার থাকে না। এ কারণেই তারা দূরে থাকে জিহাদের ময়দান থেকে। কারণ জিহাদ জান ও মালের কোরবানী চায়, স্রেফ কথায় কাজ দেয় না। ফলে জান ও মাল বাঁচানো যাদের জীবনের মূল প্রজেক্ট,তারা পরিণত হয় জিহাদের শত্রুতে। তারা তখন জোট বাঁধে ইসলামের শত্রুপক্ষের বিজয়ে। এ পথেই তারা তাদের স্বার্থ দেখে। মহান আল্লাহতায়ালার কাছে মানব জাতির বিভাজনটি মূলতঃ তিন শ্রেণীতে। এক). ঈমানদার, দুই). কাফের, তিন). মুনাফিক।এবং মহান আল্লাহতায়ালার কাছে মুনাফিকগণ গণ্য হয় কাফেরদের চেয়েও অধীকতর নিকৃষ্ট জীব রূপে। মুনাফিকদের বিরুদ্ধে মহান আল্লাহতায়ালার ক্রোধ যে কঠোর -সেটি বুঝা যায় পবিত্র কোরআনের এ আয়াতেঃ “নিশ্চয়ই মুনাফিকদের অবস্থান হবে জাহান্নামের আগুনের সর্বনিম্ন স্তরে, তাদের জন্য জুটবে না কোন সাহায্যকারী।” –(সুরা নিসা,আয়াত ১৪৫)।তবে এ কোরআনী ঘোষণার মাঝে বিবেকমান মানুষের জন্য রয়েছে আরেকটি কঠোর হুশিয়ারি। সেটি হলো,পরকালে যাদের জন্য বরাদ্দ জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্থান,দুনিয়াতেও কি তারা কোন সম্মানজনক স্থান পায়? বরং বিশ্বমাঝে তারা অপমানিত ও অসম্মানিত হয় দুর্বৃত্তিতে বিশ্বরেকর্ড গড়ে।

মুসলিম সমাজে শরিয়তের গুরুত্বটি অপরিসীম। এছাড়া কোন মুসলিম সমাজ বা রাষ্ট গড়ে উঠতে পারে না। শরিয়ত প্রতিষ্ঠার বিষয়টি কোন জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাস নয়; নামায-রোযার ন্যায় এটি ইসলামের অতি মৌলিক ও মামূলী বিষয়। বরং শরিয়ত পালিত না হলে যে ইসলাম পালন হয় না -সেটিই হলো ইসলামের বুনিয়াদী বিশ্বাস। এমন একটি বিশ্বাসের কারণেই সিরাজদ্দৌলার আমলেও বাংলার প্রতিটি আদালতে শরিয়তী আইন ছিল। শরিয়তী আইন ছিল মোঘল শাসিত ভারতে। কিন্তু ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ কাফেরদের দখলদারী প্রতিষ্ঠার পর নির্মূল করা হয় শরিয়ত আইন।কাফেরদের হাতে অধিকৃত হওয়ার এটিই হলো সবচেয়ে বড় বিপদ। তখন অসম্ভব হয় দ্বীনপালন। ব্রিটিশগণ ভারতের জনসংখ্যার শতকরা একভাগও ছিল না, কিন্তু ভারত জুড়ে কুফরি ব্রিটিশ আইন প্রয়োগ করতে তারা কোনরূপ বিলম্ব করেনি। অথচ তাদের অনুসারি বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের দাবী,শরিয়তী আইন প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশের জনসংখ্যার শতকরা শতভাগ মুসলিম হতে হবে। অথচ নবীজী বা খলিফায়ে রাশেদার আমলে মুসলিম ভূমিতে কি শতকরা ৮০ ভাগ মুসলিম ছিল? অথচ বাংলাদেশে শতকরা ৯২ ভাগ মুসলিম। পরাধীনতার কুফলটি গভীর। বনের সিংহকে ২০ বছর খাঁচায় বন্দী রাখার পর দরজা খুলে দিলে সে খাঁচার বাইরে যায় না। স্বাধীন ভাবে বাঁচায় ও শিকার ধরায় তার রুচী থাকে না। গোলামী জীবন এভাবে শুধু বন্দী বাঘ বা সিংহের অভ্যাসেই পরিবর্তন আনে না, পরিবর্তন আনে মানব সন্তানের বিশ্বাস, অভ্যাস ও সংস্কৃতিতেও। অথচ কাফেরদের গোলামীর খাঁচায় বাঙালী মুসলিমদের জীবন কেটেছে ১৯০ বছর।বিশ্বর খুব কম মুসলিম জনগোষ্ঠির জীবনেই এত দীর্ঘকালীন কাফের শক্তির গোলামী এসেছে। দিল্লির মুসলিমগণ গোলাম হয়েছে বাঙলীদের ১০০ বছর পর ১৮৫৭ সালে। কাফেরদের জিন্দানে এরূপ দীর্ঘ গোলামীর ফলে বাঙালী মুসলিমের জীবনে বিলুপ্ত হয়েছে পূর্ণ মুসলিম রূপে বাঁচার রুচী এবং অভ্যাস।বিলুপ্ত হয়েছে ইসলামের সনাতন বিশ্বাস ও সংস্কৃতি। বরং চেতনার গভীরে ঢুকেছে কুফরির শিকড়। এবং বিলুপ্ত হয়েছে শরিয়ত প্রতিষ্ঠায় আগ্রহ। ফলে বিশ্বের কোনে কোনে আজ  যেখানে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা নিয়ে চলছে অদম্য জিহাদ, বাংলাদেশে মাদ্রাসার হুজুর বা মসজিদের ইমামগণ শরিয়ত প্রতিষ্ঠার কথা মুখে আনতে রাজী নয়। তারা ভাবেন নামায-রোযা, হজ-যাকাত,দোয়া-দরুদ ও তাসবিহ পাঠ এবং বড় জোর তাবলীগ জামায়াতের ইজতেমায় অংশ নেয়াই হলো ইসলাম। এবং ভাবেন, পরকালে তাতেই মুক্তি মিলবে। কথা হলো, শরিয়তকে দূরে সরিয়ে কি ঈমান বাঁচানো যায়? পালিত হয় কি মহান আল্লাহতায়ালার গোলামী। নবীজী ও তার সাহাবাদের জীবনে একটি দিনও কি শরিয়তী আইনের বাইরে কেটেছে? শরিয়তী আইনের প্রতিষ্ঠা বাড়াতে বার বার তাদেরকে জিহাদের ময়দানে নামতে হয়েছে;পেশ করতে হয়েছে অর্থ ও রক্তের কোরবানী।বাংলাদেশের জন্য আরেক বিপদ হলো,বাংলাদেশ থেকে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশগণ বিদায় হলেও বিদায় নেয়নি এদেশে জন্ম নেয়া তাদের মানসিক গোলাম।

 

ইবাদত যেখানে অপরাধ

কাফেরদের জিন্দানে গোলাম হওয়ার নাশকতাটি বিশাল। স্রেফ নামাজ-রোযা বা হজ-যাকাতের মাধ্যমে সে ঈমান-বিনাশী নাশকতা থেকে বাঁচা যায় না। নামাজ-রোযা,হজ-যাকাত ও দোয়াদরুদের সে সামর্থ্য থাকে না বলেই অধিকৃত জীবনের নাশকতা থেকে বাঁচতে ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রেসক্রিপশন হলো জিহাদ। জিহাদকে এজন্যই প্রতিটি ঈমানদারের উপর ফরজ করা হয়েছে। এরূপ জিহাদে জানমালের কোরবানীর চেয়ে মহান আল্লাহতায়ালার কাছে উত্তম নেককর্ম নেই। পবিত্র কোরআনের তাই ঘোষিত হয়েছে, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের ভালবাসেন যারা আল্লাহর রাস্তায় সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় সারি বেঁধে যুদ্ধ করে।” –(সুরা সাফ. আয়াত ৪)। অতএব যারা মহান আল্লাহতায়ালার ভালবাসা পেতে চান তাদের সামনে জিহাদ ভিন্ন অন্য রাস্তা নাই। এবং জিহাদের নির্দেশ পালনে যারা অনীহা দেখায় মহান আল্লাহতায়ালা তাদেরকে ঈমানের দাবীতে সাচ্চা বলতেও নারাজ। পবিত্র কোরআনে সে ঘোষনাটি এসেছে এভাবে, “একমাত্র তারাই মু’মিন যারা আল্লাহ ও তার রাসূলের উপর ঈমান আনে, অতঃপর আর কোনরূপ দ্বিধাদ্বন্দে ভোগে না এবং নিজেদের জান ও মাল দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে। (ঈমানের দাবীতে) তারাই সাচ্চা।”–(সুরা হুজরাত, আয়াত ১৫)।জিহাদ যে প্রতিটি ঈমানদারের উপর ফরজ এবং জিহাদ থেকে দূরে থাকা যে মুনাফেকীর লক্ষণ –অধিকাংশ মোফাচ্ছিরদের মতে এ আয়াতটি হলো তার সুস্পষ্ট দলিল। তাই ঈমানের দাবীতে কে কতটা সাচ্চা সেটি যাচাইয়ে মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশিত মাপকাঠিটি নামায-রোযা বা হজ-যাকাত নয়। বেশী বেশী দোয়াদরুদ পাঠও নয়। সেটি হলো জিহাদে জান ও মালের বিনিয়োগ। নামায-রোযা পালনে ও তাসবিহ পাঠে নবীজী (সাঃ)র সাহাবীদের জীবনে কোন রূপ কমতি ছিল না। কিন্তু এরপরও তারা শুধু নামাযী,রোযাদার বা হাজীই ছিলেন না, তাদের প্রত্যেকে সশস্ত্র যোদ্ধাও ছিলেন। সকল সঙ্গিদের রণাঙ্গনে হাজির করার ক্ষেত্রে সমগ্র মানব ইতিহাসে মহান নবীজী (সাঃ)র এটি এক অনন্য সাফল্য। বিশ্বের আর কোন নেতা কি তার অনুসারিদের সিকি ভাগকেও সশস্ত্র যোদ্ধা রূপে রণাঙ্গণে প্রাণদানে হাজির করতে পেরেছে? অথচ মহান নবীজী (সাঃ)র সাফল্য এক্ষেত্রে শতভাগ। জিহাদে ঈমানদারদের এরূপ আত্মদান ও অর্থদানের কারণেই মুসলিম ভূমি শত শত বছর যাবত বেঁচেছে কাফিরদের হাতে অধিকৃত হওয়া থেকে। মুসলিম ভূমিতো তখনই শত্রুর হাতে অধিকৃত হতে শুরু করে যখন তারা ধর্মপালনকে স্রেফ নামায-রোযা, হজ-যাকাত ও তাসবিহ পাঠে সীমিত করে। সে জিহাদী চেতনা বাংলাদেশের ন্যায় অধিকাংশ মুসলিম দেশে আজ  অনুপস্থিত। ফলে মুক্তি মিলছে না শত্রুপক্ষের অধিকৃতি থেকে।

স্বাধীনতার নামে অধিকাংশ মুসলিম দেশে যা চলছে তা হলো ইসলামের শত্রু শক্তির হাতে দীর্ঘ পরাধীনতারই ধারাবাহিকতা। সে অধিকৃতি যে এখনো শেষ হয়নি সেটি সুস্পষ্ট ভাবে বুঝা যায় মুসলিম দেশের আদালতগুলোর দিকে তাকালে। সেখানে পূর্ণ অধিকৃতি কুফুরী আইনের। দেশের উপর মুসলিমদের দখলদারির প্রমাণ কি মসজিদ-মাদ্রাসা ও নামাযীর সংখ্যা? ভারতের ন্যায় কাফের শাসিত দেশে কি মসজিদের সংখ্যা কি কম? নামাযীর সংখ্যাও কি নগন্য? সেটি তো বুঝা যায় দেশে সার্বভৌমত্ব কোন আইনের। ঈমানদার ব্যক্তি একজন কাফের থেকে ভিন্নতর পরিচয় পায় মহান আল্লাহতায়ালা উপর তার ঈমান ও আমলের কারণে। তেমনি একটি মুসলমিমদেশ কাফের দেশ থেকে ভিন্নতর পরিচয় পায় সেদেশে শরিয়তি আইনের প্রতিষ্ঠা থেকে। মহান আল্লাহতায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি ও নিয়োগপ্রাপ্ত খলিফা রূপে ঈমানদারকে শুধু নামায-রোযা, হজ-যাকাত ও তাসবিহ পাঠ করলে চলে না, তাকে অতি  গুরুত্বপূর্ণ অন্য যে দায়িত্বটি পালন করতে হয় তা হলো কোরআনে বর্নিত শরিয়তী আইনের প্রতিষ্ঠা। বস্তুত সে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে প্রকাশে ঘটে মহান রাব্বুল আলামীনের উপর সাচ্চা ঈমানের।সে সাচ্চা ঈমানের বলেই  ঈমানদার ব্যক্তি হাজির হয় জিহাদের ময়দানে।যার মধ্যে ঈমানের সে গভীরতা নাই সে ব্যক্তি সারা জীবন নামায-রোযায় কাটালেই কখনোই জিহাদে হাজির হয়না। জিহাদ মানব জীবনের শ্রেষ্ঠ ইবাদত। অন্য কোন ইবাদতে প্রাণ গেলে সরাসরি জান্নাত প্রাপ্তির নসিব হয়না। কিন্তু জিহাদে প্রাণ গেলে সে সুযোগ জুটে। নিহত হওয়ার পরও সে নতুন জীবন পায়। নবীজী (সাঃ)র সাহাবাগণ ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব। তাদের আমলে যত জিহাদ সংগঠিত হয়েছে তা আর কোন কালেই হয়নি। ফলে ইসলামের সমগ্র ইতিহাসে তারাই সবচেয়ে গর্বের। তাদের কর্মের উপর পবিত্র কোরআনে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন খোদ মহান আল্লাহতায়ালা। মহান আল্লাহতায়ালার কাছে এরূপ মহান মর্যাদা লাভের কারণ, ইসলামের প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় তাদের বিনিয়োগটি ছিল সর্বাধিক। মুসলিমগণ সেদিন বিশ্বশক্তির মর্যাদা পেয়েছে স্রেফ নামায-রোযা ও দোয়া-দরুদের বরকতে নয়, সে সাথে বিশাল বিনিয়োগটি ছিল জান ও মালের।কিন্তু বাংলাদেশীদের মাঝে কোথায় সে সাচ্চা ঈমানদারী? কোথায় সে শ্রেষ্ঠ ইবাদত পালনে আগ্রহ? ইসলামের বিজয়ে কোথায় সে জানমালের বিনিয়োগ? তারা তো অর্থ ও ভোট দিয়েছে, এমন কি প্রাণ দিয়েছে ইসলামের শত্রুপক্ষকে বিজয়ী করতে। এবং নিজ দেশের ভিতরে ডেকে এনেছে ভারতের ন্যায় একটি কাফের দেশকে। ইসলামের শত্রুশক্তির হাতে দেশ অধিকৃত হলে সাচ্চা ধর্মপালন যে কতটা অসম্ভব হয় তার প্রমাণ হলো বাংলাদেশ। ইবাদতও তখন নিয়ন্ত্রিত হয়। হক কথা বলা এবং জিহাদের ন্যায় ইসলামের শ্রেষ্ঠ ইবাদতটি তখন শাস্তিযোগ্য অপরাধে পরিণত হয়। বরং সিদ্ধ ও প্রশংসনীয় কর্ম হয় মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও ইসলামের শত্রুশক্তির বিজয়ে অর্থ, শ্রম ও মেধার বিনিয়োগ।

 

ভারতের স্বপ্ন পূরণের রাজনীতি

দেশ ইসলামের শত্রুপক্ষের দখলে গেলে যে বিপদগুলি আসে বাংলাদেশে তার সবগুলিই এসেছে। আরো বহু বিপদ যে এখনো আসার পথে পাইপ লাইনে রয়েছে –তা নিয়েও কি কোনরূপ সন্দেহ আছে? বাঙালী মুসলিমদের ব্যর্থতা অনেক। তবে বড় ব্যর্থতাটি হলো,তারা ব্যর্থ হয়েছে বাংলার মুসলিম ভূমিতে ইসলামের শত্রুপক্ষের অধিকৃতি রূখতে। অথচ মুসলিম ভূমিতে কাফের বাহিনীর হামলা হলে জিহাদ আর ফরজে কেফায়া থাকে, সেটি তখন ফরজে আইন হয়ে যায়। নামাযে কাজা চলে কিন্তু এ ফরজ পালনে কাজা চলে না। সে ফরজ পালনে ব্যর্থতা যেমন ১৭৫৭ সালে হয়েছে, তেমনি ১৯৭১’য়েও হয়েছে। যাদের জীবেন এরূপ ভয়ানক ব্যর্থতা, তাদের জীবনে কি আযাবের কোন শেষ সীমানা থাকে? এখন শুধু ব্যর্থতা নয়, শুরু হয়েছে বিদ্রোহের পর্ব। মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ এখন এমন পর্যায়ে পৌছেছে যে,দেশে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা দূরে থাক, যেখানেই ইসলাম ও মুসলিম –এ শব্দ দুটি আছে সেখানেই কাঁচি চালানো হচ্ছে। শুরু হয়েছে কাফের রাষ্ট্র ভারতের স্বপ্ন পূরণের রাজনীতি। ইসলাম ও মুসলিমের বিরুদ্ধে ভারতে যেটি ঘটেছে বা ঘটছে সেটিই এখন ঘটছে বাংলাদেশে। কারণ সেটি না হলে কি ভারতের স্বপ্ন পূরণ হয়। বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দু নামটি এখনো বহাল তবিয়তে আছে; কিন্তু আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম থেকে মুসলিম শব্দটি তারা কেটে ফেলেছে। যারা ইসলামের শত্রুপক্ষে সব দেশেই তারা একই চরিত্রের হয়।ভাষা, বর্ণ বা ভূগোলের নামে তাদের মাঝে বিভক্তির কোন দেয়াল থাকে না।তাই দেয়াল নাই বাংলাদেশ বা ভারতে বসবাসকারি ইসলামের শত্রুদের মাঝেও। বাংলাদেশ ও ভারতের মাঝে আজকের যে দেয়াল সেটির জন্ম একাত্তরে নয়। সেটি সেক্যুলার বাঙালী জাতীয়তাবাদীদেরও গড়া নয়। এটি নিরেট পাকিস্তানের লিগ্যাসী। এবং যা কিছু পাকিস্তানী সেগুলি বর্জন করাই সেক্যুলার বাঙালী জাতীয়তাবাদীদের রাজনীতি। ফলে তাদের দখলদারি দীর্ঘায়ীত হলে সেদিন বেশী দূরে নয় যখন পাকিস্তানের গড়া সে দেয়ালকেও তারা বিদায় দিবে। বাংলাদেশ তখন বিলুপ্ত হবে ভারতে কোলে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের প্রদেশ রূপে পূর্ব পাকিস্তানের যে মানচিত্রটি গড়ে উঠছিল তার পিছনে ছিল ভারতীয় হিন্দুদের থেকে ভিন্নতর একটি প্রবল চেতনা –তা পুষ্টি পেয়েছিল প্যান-ইসলামিক মুসলিম ভাতৃত্ব থেকে। মুজিব ও হাসিনার চেতনায় ইসলাম না থাকায় ১৯৪৭’য়ের সে মুসলিম চরিত্রটিও তাদের রাজনীতিতে নেই। বরং আছে ভারতীয় হিন্দুদের চেতনার সাথে অভিন্নতা। চেতনার সে অভিন্নতার কারণেই তারা ভারতীয় কায়দায় জাহাঙ্গীরনগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম থেকেও মুসলিম শব্দটি কেটে দিয়েছে। এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হল হয়ে গেছে সলিমুল্লাহ হল। এমন কি কাজী নজরুল ইসলামের নামের সাথে ইসলাম শব্দটিও তাদের সহ্য হয়নি। ফলে ঢাকার কাজী নজরুল ইসলাম কলেজ হয়ে গেছে নজরুল কলেজ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রামে কোরআনের আয়াত ছিল, সেটিও মুজিবামলে বিলুপ্ত করা হয়েছে। ইসলামের বিরুদ্ধ একই রূপ বৈরীতা নিয়ে শেখ হাসিনা সংবিধান থেকে বিলুপ্ত করেছেন মহান আল্লাহতায়ালার উপর আস্থার ঘোষণাটি। মুজিবের ন্যায় হাসিনার রাজনীতিতে্ও ইসলাম ও মুসলিমের বিরুদ্ধে শত্রুতা যে কতটা তীব্র তা কি এরপরও বুঝতে বাঁকি থাকে? সামান্য ঈমান থাকলে কোন মুসলিম কি এমন ইসলাম এ মুসলিম বিরোধী এজেণ্ডা নিয়ে রাজনীতি করে? শেখ মুজিবের ন্যায় শেখ হাসিনা ও তার অনুসারিদের লক্ষ্য,ভারতীয় শাসকচক্রকে খুশি করা।তারা ভাবে,ভারত খুশী হলেই তাদের গদী বাঁচবে। আর ভারতকে খুশী করতে হলে ভারতীয় এজেণ্ডাকে অবশ্যই নিজেদের এজেণ্ডা রূপে গ্রহণ করতে হবে। মুজিবকে এজন্যই ২৫ সালা দাসচুক্তি স্বাক্ষর করেত হয়েছিল। ছেড়ে দিতে হয়েছিল ফারাক্কায় পদ্মার পানি তূলে নেয়ার অধীকার। সীমান্ত বাণিজ্যের নামে ভারতীয় পণ্যের জন্য খুলে দিতে হয়েছিল দেশের সীমান্ত।

তবে হাসিনার কাছে ভারতের দাবীর তালিকাটি আরো বিশাল। ভারত শুধু বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে করিডোর নিয়ে খুশী নয়। ভারতের কাছে আরো গুরুতর ভয় রয়েছে। দেশটির প্রচণ্ড ভয় বাংলাদেশে ইসলামের উত্থান নিয়ে। এভয় ভারতীয় শাসক মহলের ঘুম কেড়ে নিয়েছে।মধ্যপাচ্যে ইসলামের উত্থান ঠ্যাকাতে সমগ্র পাশ্চাত্য শক্তি একজোট হয়েও হিমশীম খাচ্ছে। ভারতের ভয়, বাংলাদেশে ১৬ কোটি মুসলিমের জীবনে জোয়ার উঠলে সে জোয়ার ঠ্যাকানো কি ভারতের একার পক্ষে সম্ভব হবে? তখন অসম্ভব হবে বাংলাদেশে অভ্যন্তরে তার নিজের লোকদের বাঁচানো। ভারত জানে,বাঙালী মুসলিম জীবনে পাকিস্তানের পক্ষে জোয়ার উঠাতেই ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তি এড়ানো সম্ভব হয়নি। তাদের ভয়,বাঙালী মুসলিম আবার ইসলামের পতাকা নিয়ে জেগে উঠলে আবারো ভারতের মানচিত্রেও হাত পড়তে পারে। ফলে হাসিনার উপর চাপানো দায়ভারও বেড়েছে। ইসলাম ও মুসলিমের বিপক্ষে অবস্থান নেয়া ছাড়া শেখ হাসিনার সামনে ভিন্ন পথ নাই। ইসলামপন্থিদের দমনে ভারত সরকার বাংলাদেশের প্রশাসন, পুলিশ, র‌্যাব, সেনাবাহিনী ও বিজিবীকে ঠ্যাঙ্গারে হিসাবে ব্যবহার করতে চায়। ফলে ঢাকার শাপলা চত্ত্বরে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের হত্যা ও হত্যার পর তাদের লাশগুলো ময়লার গাড়িতে তুলে গায়েব করা এবং বিচারের নামে জামায়াত ও বিএনপি নেতাদের ফাঁসি দেয়ায় হাসিনা এতটা নির্মম। আর এতে শাবাস মিলছে ভারতের শাসক মহল থেকে।কাশ্মীরে ভারতীয় বাহিনী যে কাজটি করছে, দিল্লি সরকার চায় বাংলাদেশে সে কাজটি হাসিনা সরকারও করুক। বাংলাদেশ তাই আরেক কাশ্মীর। ইসলাম ও ইসলামপন্থিদের নির্মূলে হাসিনা এজন্যই এতোটা বেপরোয়া।তাছাড়া একাজে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতীয় পঞ্চম বাহিনীর লোক কি কম? তারা শুধু রাজনীতির ময়দানে নয়, তারা দলে ভারী দেশের মিডিয়া, পুলিশ, প্রশাসন, সেনাবাহিনী এমন কি বিচার ব্যবস্থাতেও। হাসিনা সরকারের এজেণ্ডা কোন গোপন বিষয় নয়। দেশের স্বার্থের চেয়ে তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের গদীর স্বার্থ ও ভারতীয় স্বপ্ন পূরণের স্বার্থ। দেশের স্বার্থ গুরুত্ব পেলে বহু খুন ও বহু হাজার কোটি টাকার ডাকাতির সাথে জড়িতদের অবশ্যই আদালতে তোলা হতো। কিন্তু তা না করে সরকার ব্যস্তু ইসলাম ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নির্মূলে।

 

নতুন পরাধীনতা

একাত্তরে ভিন্ন পতাকা মিললেও বাঙালী মুসলিমদের প্রকৃত আজাদী মেলেনি। বরং মিলেছে নতুন পরাধীনতা। যাদের হাতে বাংলাদেশ আজ অধিকৃত তারা সাধারণ চোর-ডাকাত,খুনি বা দুর্বৃত্ত নয়। তাদের অপরাধও সাধারণ অপরাধ নয়। তাদের অপরাধটি কোটি কোটি জনগণকে জাহান্নামের পথে টানার। এবং তাদের ঘোষিত যুদ্ধটি তাদের মহান অআল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে। এ অপরাধীদের সামর্থ্য বিশাল। সাধারণ চোর-ডাকাত, সন্ত্রাসী ও খুনিদের পকেটে থানা-পুলিশ, সেনাবাহিনী, আইন-আদালত, প্রশাসন ও দেশের রাজনীতি থাকে না। কিন্তু এ দুর্বৃত্তদের পূর্ণ দখলদারি সেগুলোর উপরও। তাছাড়া সাধারণ চোর-ডাকাতগণ জনগণের পকেটে হাত দিলেও তারা জনগণকে জাহন্নামের আগুনে টানে না। রাষ্ট্রের বুকে তারা কোরআনের তাফসির মহফিল নিষিদ্ধ করে না। আলেমদেরও কারাবন্দী করে না। তারা নিষিদ্ধ করে না জিহাদ বিষয়ক বই এবং জিহাদকে।কিন্তু যাদের হাতে আজ বাংলাদেশ অধিকৃত তারা এর সবগুলিই করে। স্বৈরাচারী শাসকদের গুণগান গাওয়ার জন্য কোনো কালেই এত ভাঁড়, এত চাটুকার, এত পত্র-পত্রিকা ও এত রেডিও-টিভি চ্যানেল ছিল না -যা রয়েছে বাংলাদেশের ন্যায় অধিকৃত রাষ্ট্রে। অন্ধকারাচ্ছন্ন জাহেল সমাজে শাপশকুন, পাহাড়-পর্বত, গরুবাছুর ও মুর্তিকে দেবতা বলার জন্য যেমন অসংখ্য ভক্ত ও পুরোহিত থাকে, বাংলাদেশেও তেমনি ক্ষমতাসীন দুর্বৃত্তদের প্রশংসা গাওয়ার জন্য রয়েছে হাজার হাজার রাজনৈতিক কর্মী, মিডিয়াকর্মী ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং সে সাথে বুদ্ধিজীবীর লেবাসে বিশাল এক পাল ভাঁড়। ধর্মের নামে জাহিলী আচার বাঁচাতে যেমন প্রতিষ্ঠা পায় হাজার হাজার পুঁজামণ্ডপ,বাংলাদেশের বুকেও তেমনি দুর্বৃত্তদের সে দখলদারি বাঁচাতে রাজস্বের অর্থে গড়ে তোলা হয়েছে শিক্ষা,সংস্কৃতি ও মিডিয়ার নামে বিশাল বিশাল সরকারি ও বেসরকারি অবকাঠামো। মণ্ডপ গড়া হয়েছে মুজিবের ন্যায় বাকশালী স্বৈরাচারির প্রতিকৃতিতে ফুল দেয়ার ও তার প্রশংসা গাওয়ার।গড়া হয়েছ অসংখ্য নাট্যশালা, নৃত্যশালা, মদ্যশালা ও পতিতাপল্লী। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে এরা দিবারাত্র খাটছে জনগণকে জাহান্নামের পথে টানার কাজে। এমন কাজে তারা একা নয়, তাদের পিছনে রয়েছে ভারতসহ ইসলামবিরোধী আন্তর্জাতিক কোয়ালিশন। বাংলাদেশীদের জীবনে তাই আজ  ভয়ানক দুর্দিন।

রোগজীবাণু দেহে ঢুকলে গায়ে জ্বর-ব্যাথা উঠে ও শরীর শয্যাশায়ী হয়। চিকিৎসা না হলে মৃত্যু ঘটে। তেমনি দুর্বৃত্তদের হাতে দেশ অধিকৃত হওয়ার বিপদও ভয়ানক। দেশে তখন চুরি-ডাকাতি, খুন-খারাবি, ধর্ষণ ও সর্বপ্রকারের পাপকর্ম বাড়ে। সরকারি চোর-ডাকাতদের থেকে দেশের সরকারি ব্যাংক ও কোষাগারও তখন রক্ষা পায় না। দুর্বৃত্তিতে দেশ তখন বার বার বিশ্বরেকর্ড গড়ে এবং ধাবিত হয় দ্রুত ধ্বংসের দিকে। এমন রাষ্ট্রের জনগণ বঞ্চিত হয় কোরআনী শিক্ষা, পরিশুদ্ধ সংস্কৃতি ও জান্নাতমুখি সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে। তখন অসম্ভব হয় শরিয়তী আইন পালনের ন্যায় ফরজ কাজ। তখন শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ গণ্য হয় ইসলামের সর্বোচ্চ ইবাদত জিহাদ এবং হক কথা বলা। ফিরাউন-নমরুদ যেমন নিজেদের অধিকৃত রাষ্ট্রে ইসলাম প্রচার নিষিদ্ধ করেছিল, তেমনি ইসলামের এ আধুনিক শত্রুগণও দখলকৃত রাষ্ট্রে শরিয়ত পালন ও জিহাদের ন্যায় ইসলামের ফরজ বিষয়গুলিও নিষিদ্ধ করে। এরূপ অধিকৃতির ভয়ানক বিপদটি হলোঃ রাষ্ট্রীয় জাহাজটি তখন জনগণকে জাহান্নামের দিকে নিতে চায়। একারণেই ইসলামে বড় নেককর্মটি স্রেফ ঘরের আগুন নিভানো নয়। স্রেফ ডাকাতদের হাত থেকে ব্যক্তি বা জনপদকে বাঁচানোও নয়।বরং সর্বশ্রেষ্ঠ নেককর্মটি হলো শত্রুপক্ষের দখলদারি থেকে রাষ্ট্রকে বাঁচানো। এ কাজটি স্রেফ অর্থ বা শ্রম চায় না, জানের কোরবানীও চায়। শয়তানী শক্তির দখলদারি থেকে রাষ্ট্র বাঁচলে দেশের কোটি কোটি মানুষ পথ পায় জাহান্নামের আগুণ থেকে বাঁচারও। বাঁচে দুর্বৃত্ত শাসনের দুর্বিসহ যাতনা থেকে।এমন বাঁচাটিই মুসলিম জনগণের আসল আজাদী। ইসলামে সে কাজ চিত্রিত হয়েছে পবিত্র জিহাদ রূপে। এরূপ পবিত্র কাজে যারা নিহত হয় তাদের মৃত বলা হারাম ঘোষণা করেছেন মহান আল্লাহতায়ালা। বলা হয়েছে তারা জীবিত;যদিও সাধারণ মানুষ তা অনুধাবন করে না। (সুরা বাকারা, আয়াত ১৫৪)।

বাংলাদেশের বুক থেকে ঔপনিবেশিক দুর্বৃত্তদের ১৯০ বছরের অধিকৃতি শেষ হয়েছিল ১৯৪৭য়ে। শেষ হয়েছে পর্তুগিজ ও মগদের দস্যুবৃত্তিও। কিন্তু শেষ হয়নি ইসলামবৈরী দেশী স্বৈরাচারি দুর্বৃত্তদের দখলদারি। বরং দিন দিন তা প্রবলতর হচ্ছে। স্বৈরাচারি শাসকদলের খুনিরা শুধু যে পথে ঘাটে মানুষ খুন করছে তা নয়; খুনের কাজে তারা জনগণের রাজস্বে পালিত পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, সেনাবাহিনী ও আদালতকেও ব্যবহার করছে। এভাবে তারা কইয়ের তেলে কই ভাজছে। দেশের ব্যাংক ও শেয়ার মার্কেট থেকে যারা হাজার হাজার কোটি টাকা ডাকাতি করে নিয়ে যায়,পুলিশ তাদের খুঁজে বের করে না। সে ডাকাতদের গ্রেফতার করে তাদেরকে আদালতেও তোলে না। ফলে তাদের শাস্তিও হয় না। কিন্তু শাস্তি হয়, এমন কি ফাঁসিতে ঝুলানো হয় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে। কারণ, সরকারের মূল লক্ষ্য রাজনৈতীক প্রতিপক্ষ নির্মূল। মুসলিম জীবনের মিশন ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের নির্মূল।মিশন, শরিয়তের প্রতিষ্ঠা। পবিত্র কোরআনে সেটি স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে বার বার। ফলে মুসলিম মাত্রই ইতিহাস গড়বে সকল প্রকার দুর্বৃত্তির নির্মূলে। অথচ বাংলাদেশ ইতিহাস গড়ছে উল্টোপথে চলায় তথা দুর্বৃত্তিতে।সমগ্র প্রশাসন পরিণত হয়েছে দুর্বৃত্তিকে প্রতিষ্ঠা দেয়ার হাতিয়ারে। প্রতি দেশেই কিছু চোর-ডাকাত ও নানাজাতের দুর্বৃত্ত থাকে। তাদের দমনের জন্য থাকে হাজার হাজার পুলিশ, গোয়েন্দা কর্মী ও আদালত। তাদের দমিত করার কাজটি যথার্থ ভাবে না হলে জনজীবনে আযাব ডেকে আনার জন্য সে মুষ্টিমেয় দুর্বৃত্তরাই যথেষ্ট। কিন্তু চোর-ডাকাত ও খুনীদের হাতে রাষ্ট্র অধিকৃত হলে রাষ্ট্রের প্রশাসন, পুলিশ এবং আদালতও তখন তাদের সহযোগী হয়ে পড়ে। তখন দুর্বৃত্তের পক্ষে দাঁড়ায় দেশের মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী এমন কি প্রেসিডেন্টও।তাদের সৃষ্ট আযাব তখন দুর্বিসহ হয়ে উঠে। দুর্বৃত্তিতে বিশ্ব রেকর্ড গড়াও তখন অতি  সহজ হয়ে যায়। বাংলাদেশে তো সেটিই হয়েছে। দেশটির ইতিহাস তাই কলংক গড়ার ইতিহাস। সেটি যেমন বাকশালী স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠার ও দুর্বৃত্তিতে ৫ বার বিশ্বচাম্পিয়ান হওয়ার, তেমনি তলাহীন ভিক্ষার ঝুলি হওয়ার। তেমনি ১৯৭৩-৭৪’য়ের দুর্ভিক্ষে লাখে লাখে মৃত্যু বরণের। বনে জঙ্গলের পশুপাখীও কোন কালে এভাবে না খেয়ে মারা পড়েনি যে ভাবে মারা পড়েছে মুজিবামলে। এভাবে বাঁচলে কি বিশ্বমাঝে ইজ্জত বাড়ে?

একাত্তরে পাকিস্তানকে পরাজিত করা নিয়ে বাংলাদেশ প্রতিবছর দুইবার উৎসব হয়। প্রতিবারই সেটি মাসব্যাপী; একবার মার্চে, আরেকবার ডিসেম্বরে।বাঙালীর সমগ্র ইতিহাসে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এ বিজয় চিহ্নিত হয় সবচেয়ে বড় গর্বের কাণ্ড রূপে। বিশ্বের বহুদেশই বহু যুদ্ধ জয় করেছে, বিশাল বিশাল সাম্রাজ্যও প্রতিষ্ঠা করেছে। কিন্তু বছরে মাসব্যাপী এরূপ উৎসব পালনের ইতিহাস একমাত্র বাঙালী জাতীয়তাবাদীদের। অথচ সে বিজয়টি তাদের নিজ বাহুবলে অর্জিত হয়নি। সেটি ছিল ভারতীয় সেনবাহিনীর একান্তই নিজস্ব বিজয়। যে পাকিস্তানকে পরাজয় করা নিয়ে এতো উৎসব সে পাকিস্তান এখন ৫৭টি মুসলিম দেশের মাঝে একমাত্র পারমানবিক বোমার অধিকারী এবং সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ। সেদেশে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে সংসদীয় গণতন্ত্র। অথচ বাংলাদেশের এখনো নিচে নামা শেষ হয়নি। বাংলাদেশ সৃষ্টির ৪৪ বছর পরও বাকশালী স্বৈরাচার থেকে মুক্তি মেলেনি। পাকিস্তান আমলে ১৯৫৪ সালে যে মানের নির্বাচন হয়েছিল,আজকের বাংলাদেশে তেমন একটি নির্বাচন নিতান্তই স্বপ্নের বিষয়। বাঙালী জাতীয়তাবাদীদের জন্য আরেকটি অতি অপ্রিয় সত্য কথা হলো, বিগত বহু হাজার বছরের ইতিহাসে বঙ্গীয় বদ্বীপের সকল চোর-ডাকাত মিলে যত সম্পদ লুণ্ঠন করেছে ও যত মানুষ হত্যা করেছে তার চেয়ে বেশী লুণ্ঠন ও বেশী হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে আওয়ামী লীগের ক্যাডারদের হাতে। একমাত্র মুজিব আমলে ৩০ হাজার মানুষকে বিনা বিচারে হত্যা করা হয়েছিল। বন্দী সিরাজ শিকদারকে বিচার বহির্ভূত ভাবে হত্যা করে মুজিব সংসদে দাড়িয়ে আস্ফালন করেছিলেন,“কোথায় আজ সিরাজ শিকদার?” তার আমলে সরকারি প্রশাসন, পুলিশ ও রক্ষিবাহিনী পরিণত হয়েছিল রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের হাতিয়ারে। লুণ্ঠনে লুণ্ঠনে সুজলা সুফলা দেশটিকে তখন তলাহীন ভিক্ষার ঝুলিতে পরিণত করা হয়েছিল। কাপড়ের অভাবে নারীগণ বাধ্য হয়েছিল মাছধরা জাল পড়তে। পূর্বকালে কোন সময় কি রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের কোষাগারে ডাকাতি হয়েছে? অথচ শেখ হাসিনার আমলে সেটিও অহরহ হচ্ছে। ডাকাত পাড়ায় ডাকাতদের বিচার হয় না, বাংলাদেশেও এসব ডাকাতদের তাই বিচার হয়নি।

দেশে রোগভোগের প্রচন্ড মহামারি দেখেই বুঝা যায়, রোগ-জীবাণু ও মশামাছির উপদ্রব কতটা প্রকট। তাতে প্রমান মেলে,পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিয়ে বাঁচায় জনগণ কতটা ব্যর্থ। তেমনি সমগ্র রাষ্ট্র জুড়ে দুর্নীতির সয়লাব দেখেই বলা যায়, দেশে দুর্বৃত্তরা কতটা বিজয়ী এবং দুর্বৃত্ত নির্মূলে দেশের সরকার ও জনগণ কতটা ব্যর্থ । দূর্বৃত্তিতে যে দেশ বিশ্বে ৫ বার প্রথম স্থান অধিকার করে সেদেশে দুর্বৃত্তদের শিকড় যে কতটা গভীর এবং দুর্বৃত্তদের সংখ্যা যে কত বিপুল –সেটি বুঝতে কি বেশী বিদ্যা-বুদ্ধি লাগে? দুর্বৃত্ত-অধিকৃত এমন রাষ্ট্রে কি সভ্য সমাজ নির্মিত হয়? প্রতিষ্ঠা পায় কি ন্যায়নীতি ও শান্তি?  বরং যা ব্যাপক ভাবে বাড়ে তা হলো লুণ্ঠন,সন্ত্রাস, ধর্ষণ ও খুন। বাড়ে উলঙ্গতা, অশ্লিলতা ও ব্যাভিচার। দুর্বৃত্তদের হাতে তেমন দখলদারির কারণে ডাকাতি হচ্ছে স্রেফ ব্যবসায়ী ও গৃহস্থের ঘরে নয়, রাষ্ট্রের অর্থভান্ডারেও। সরকারি দলের ডাকাতদের হাতে সরাকারি ব্যাংক, সরকারি প্রকল্প ও বিদেশীদের দেয়া ঋণের হাজার হাজার কোটি টাকা ডাকাতি হয়ে যাচ্ছে। রেহাই পাচ্ছে না তারাও যারা সরকারি চাকুরিতে নিয়োগ পেতে চায়। হাত পড়ছে তাদের  সবার পকেটে। ডাকাতদের এখন আর ডাকাত দল গড়তে হয় না। তারা বরং নির্ভয়ে সরকারি দলে যোগ দেয়। তাতে ডাকাতির পরিধি যেমন বাড়ে, তেমনি প্রটেকশনও বাড়ে। তখন গ্রামগঞ্জে নেমে জনগণের ঘরে হানা দেয়ার প্রয়োজন পড়ে না। রাজনৈতীক নেতাকর্মীর বেশে ডাকাতগণ তখন সরাসরি হাত দেয় হাজার হাজার কোটি টাকার সরকারি ভাণ্ডারে। এমন দুর্বৃত্ ডাকাতদের গায়ে হাত দেয়া দূরে থাক, জনগণ প্রাণভয়ে তাদের সম্ভ্রম করে চলে। নিরস্ত্র মানুষ সাহস পায় না ডাকাতদের বিরুদ্ধে সামান্য প্রতিবাদের। বাংলাদেশে এসব ডাকাতদের পুরা নিরাপত্তা দিতে ব্যস্ত দেশের পুলিশ বাহিনী, মন্ত্রী বাহিনী, সরকারি উকিল বাহিনী, র‌্যাব, বিজিবি, সেনাবাহিনী ও আদালতের বিচারকগণ। এতে ফল দাঁড়িয়েছে, যে দেশের মানুষ পকেটমারকে পিটিয়ে হত্যা করে,সেদেশের মানুষ স্টেট ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ডাকাতি হলেও প্রতিবাদ মিছিলে নামতে ভয় পায়।

 

দেশবাসী কি গরু-ছাগল?

বাংলাদেশের মূল সমস্যাটি দেশের ভূমি বা জলবায়ু নয়। বরং দেশের সরকার। দেশের জনগণকে সরকার মানুষ ভাবতেই রাজী নয়। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে যা কিছু হচ্ছে তা দেখে প্রশ্ন জাগে, শেখ হাসিনা ও সঙ্গিসাথিরা শুধু বাংলাদেশের জনগণকেই নয়,বিশ্ববাসীকেও কি গরু-ছাগলের চেয়ে বেশী কিছু ভাবে? গরু-ছাগলের সামনে লজ্জাশরমের চিন্তা থাকে না। তাদের সামনে উলঙ্গ হতে তাই ভাবনা জাগে না। বাংলাদেশের জনগণকে মানুষ ভাবলে শেখ হাসিনার সরকার যা করছে তাতে তার নিজেরই লজ্জা হতো। মনুষত্ব বিসর্জন দিলে সে শরমটুকুও থাকে না। পশুরা আরেক পশুর সামনে উলঙ্গ হয়ে চলাফেরা করে তো সে পশুত্বের কারণে। লজ্জা-শরম না থাকার কারণেই চোরেরা চুরি করে, সন্ত্রাসীর ডাকাতি করে এবং পতিতারা খরিদদারদের সামনে কাপড় খুলে। মানবরূপী এসব জীবগুলো মানব দেহ নিয়ে চলাফেরা করলেও আসলে তারা মানবতাশূণ্য। বাংলাদেশ সরকারের আজ যে সীমাহীন দুর্বৃত্তি তা কি কোন ভদ্রলোক ভাবতে পারে? এরূপ সততা ও ভদ্রতার জন্য কি দরবেশ হওয়া লাগে? পরকালে বিশ্বাস নেই এমন বহু নাস্তিকও স্রেফ লজ্জা-শরমের কারণে চুরি-ডাকাতি বা ব্যাভিচারে নামে না। মানুষকে তারা ধোকাও দেয় না। লোকলজ্জার ভয় এভাবে কোটি কোটি মানুষকে চুরি-ডাকাতি, ধোকাবাজী, ধর্ষন, অশ্লিলতা ও দেহব্যবসার পথ থেকে দূরে রাখে। এমন লজ্জাশীল মানুষেরা না খেয়ে মারা যেতে রাজী, কিন্তু পাপের পথে নামে না। কারো পকেটে তারা হাত দেয় না। কিন্তু লজ্জাশরম বিলুপ্ত হলে নানা প্রকারের দুর্বৃ্ত্তি তখন রীতিতে পরিণত হয়। শেখ হাসিনা ও তার সরকারের ক্ষেত্রে তো সেটিই হয়েছে।

দেশবাসীকে যারা গরু-ছাগল ভাবে তাদের মনের সে কুৎসিত ভাবটি প্রকাশ পায় তাদের কর্ম ও আচরনে। কর্মে ও আচরনে তারা অতি বেপরওয়া ও ভাবনাশূন্য হয়। কারণ,গরু-ছাগলের সামনে জবাবদেহীতার ভয় থাকে না। গরু-ছাগল প্রতিবাদী বা বিদ্রোহী হয় না।  তারা ভাবে, গরু-ছাগলের জন্মই তো জবাই হওয়ার জন্য। এমন একটি চেতনার কারণেই শাপলা চত্বরে শত শত নিরীহ মুসল্লীকে হত্যা ও আহত করার পরও শেখ হাসিনাও তাই জনসম্মুখে জবাব দেয়ার প্রয়োজন মনে করেনি। এবং তার সামান্যতম শরমও হয় না হত্যা ও গুমের রাজনীতি চালিয়ে যাওয়ায়। হাসিনার বিশ্বাস, দেশ-শাসনের বৈধ অধিকার একমাত্র তার ও তার পরিবারের। সে সাথে ভাবে, অধিকার রয়েছে যত্র তত্র মানব হত্যারও। তার আগে সে অধিকারের দাবীদার ছিল শেখ মুজিবও। সিরাজ শিকদার এবং সে সাথে প্রায় ৩০ হাজার মানব হত্যায় তিনি আদালতের ধার ধারেননি। এমন ভাবনা যে শুধু মুজিব ও মুজিবকন্যা হাসিনার –বিষয়টি তাও নয়। সে বিশ্বাসটি সকল মুজিব ভক্তদের। অতীতে নমরুদ এবং ফিরাউনের ভক্তগণও মনে করতো, তাদের স্বৈরাচারি প্রভুর অধিকারটি শুধু পুঁজা ও রাজস্ব পাওয়া নয়, বরং যাকে ইচ্ছা তাকে হত্যা করারও। হত্যা কর্মে তারা কখনোই বিচার-আচারের ধার ধারেনি। হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ও হযরত মূসা (আঃ)র ন্যায় মানব ইতিহাসের দুই শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির হত্যা প্রকল্পে এরূপ জাহেল জনগণ তাই নমরুদ ও ফিরাউনকে সমর্থণ করেছিল। হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ও হযরত মূসা (আঃ)কে তারা তাদের জন্মভূমিতে ইসলাম প্রচারের সুযোগ দেয়নি। সুযোগ দেয়নি বসবাসেরও। তাদেরকে তাই নানা দেশের পথে পথে ঘুরতে হয়েছে। নমরুদ ও ফিরাউনের ন্যায় প্রতিযুগের স্বৈরাচারিগণ এভাবেই নিজভক্ত দুর্বৃত্তদের প্রতিপালন করে। শেখ হাসিনা ও তার স্বৈরাচারি পিতা মুজিব সে কাজটিই বাংলাদেশে ব্যাপক ভাবে করেছেন। বাংলাদেশের এ মুজিবভক্ত দুর্বৃত্তরা ইসলামপন্থিদের যে শুধু নিজ দেশে বেঁচে থাকা অসম্ভব করছে তা নয়, ইসলামপন্থি নেতাদের বাংলার মাটিতে জানাজা ও কবর হতে দিতেও তাদের প্রবল অনিচ্ছা। সম্প্রতি (২০১৫ সালে) সে ঘোষণাটি দিয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের জনৈক মন্ত্রী। ইসলামপন্থিগণ বেঁচে থাকুক বা মৃত্যুর পর জানাজা পাক -সেটি হতে দিতে তারা রাজী নয়। অথচ এরূপ বর্বর ঘোষণাটি এমনকি নমরুদ ও ফিরাউনের পুঁজারীরাও দেয়নি।

শেখ হাসিনা যে দেশবাসীকে গরুছাগলের চেয়ে যে বেশী কিছু মনে করেন না সে প্রমাণটি নতুন করে দিলেন ২০১৪ সালের জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সম্মেলনে ১৮৫ জনের বিশাল বহর নিয়ে হাজির হয়ে। জাতিসংঘ দপ্তরটি কূটনীতির কেন্দ্র।১৮৫ জনের সে বিশাল দলের কি ছিল কূটনৈতীক লক্ষ্য? তিনি বিশাল দল নিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন নিউয়র্ক শহরের বিলাসবহুল হোটেলে। যেন প্রমোদভ্রমন;এবং সেটি জনগণের কষ্টার্জিত অর্থে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদী জাতিসংঘ গিয়েছিলেন ৬৯ জনের বহর নিয়ে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের সফরসঙ্গি ছিলেন মাত্র ১৪ জন। প্রশ্ন হলো, ভারত বা পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশের কূটনৈতীক কাজকর্মের পরিধি ও পরিমাণ কি অধিক? মূল পার্থক্যটি হলো, মোদী ও নওয়াজ শরীফ –উভয়েই নিজ দেশের জনগণকে গরু-ছাগল ভাবেন না। ফলে জনগণের সামনে তাদের জবাবদেহীতার ভয় আছে। অহেতুক কিছু করলে আগামী নির্বাচনে ভোট হারাবার ভয়ও আছে। সে সাথে লজ্জাবোধও আছে। কিন্তু সে ভয় হাসিনার নাই। নাই সে লজ্জাবোধও। মোদী ও নওয়াজ শরীফকে জনগণের ভোট নিয়ে ক্ষমতায় আসতে হয়। কিন্তু হাসিনার তো ভোটের প্রয়োজন পড়ে না। অর্ধেকের বেশী সিটে নির্বাচন না দিয়েও তিনি নির্বাচন জিতেন। হাসিনার প্রয়োজন তো বিশাল লাঠিয়াল বাহিনীর। তাদের খুশি করতেই হাসিনার প্রমোদ ভ্রমনের প্রয়োজনটি তাই নওয়াজ শরীফ ও নরেদ্র মোদীর চেয়ে অধিক। তাছাড়া এ বিশাল বাহিনীর প্রমোদ ভ্রমণে যে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে তার একটি মুদ্রাও হাসিনাকে দিতে হয়নি। সে অর্থ গেছে জনগণের পকেট থেকে। তাই এরূপ প্রমোদ ভ্রমণ বছরে একবার কেন, মাসে মাসে করলেই বা হাসিনার ক্ষতি কি? অথচ ১৮৫ জনের বিলাস ভ্রমনে যে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছে তা দিয়ে অনেকগুলি স্কুল বা হাসপাতাল গড়া যেত। কিন্তু স্বৈরাচারি শাসকদের মগজে কি সে ফিকির থাকে? তাদের ফিকির তো বেশী বেশী লুণ্ঠন এবং নিজেদের গদি বাঁচানো নিয়ে।

 

অস্ত্রের রাজনীতি

বাংলাদেশে মানবাধীকার, গণতন্ত্র, ভোট বা নির্বাচনের রাজনীতি এখন কবরে শায়ীত। শেখ হাসিনা চালু করেছেন নিরেট অস্ত্রের রাজনীতি। তার কাছে ভোট নয়, বন্দুকের নলই হলো ক্ষমতার মূল উৎস। শেখ হাসিনা তার পিতার পথ ধরেছেন। নির্বাচনের রাজনীতি নিষিদ্ধ করতেই শেখ মুজিব একদলীয় বাকশাল চালু করেছিলেন। অস্ত্রের এ রাজনীতিতে গুরুত্ব পায় অস্ত্রধারী দলীয় ক্যাডার, রক্ষিবাহিনী, র‌্যাব, পুলিশ, সেনাবাহিনী ও বিজিবি। এমন রাজনীতিতে যার হাতে বন্দুক নাই তার রাজনীতিও নেই। মুজিবের হাতে তাই শুধু বিরোধী দলীয় নেতাদের রাজনীতি মারা পড়েনি, আস্তাকুরেঁ গিয়ে আশ্রয় নিতে হয়েছিল তার নিজদলের বন্দুকহীন নেতাকর্মীদেরও। মুজিবের কাছে অস্ত্রধারী দলীয় ক্যাডার বা রক্ষিবাহিনীর কমান্ডারের যে গুরুত্ব ছিল তা দলের অস্ত্রহীন প্রবীন নেতাদের ছিল না। আস্তাকুঁরে যাওয়ার সে মর্মবেদনাটি ‌১৯৭৫ সালে ১৫ই আগষ্টে মুজিবের মৃত্যুর পর আওয়ামী লীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি আব্দুল মালেক উকিল অতি জোর গলায় প্রকাশ করেছিলেন। বলেছিলেন,“ফিরাউনের নিপাত হয়েছে।” দলের নেতাগণ সে মৃত ফিরাউনের জানাজাও পড়েনি। বরং খন্দোকার মুশতাকের সামনে গিয়ে সারিবদ্ধ হয়েছে তার মন্ত্রীসভায় যোগ দিতে। অস্ত্রের রাজনীতির এই হলো পরিনতি। কিন্তু শেখ হাসিনা তার পিতার ব্যর্থ রাজনীতি থেকে কোন শিক্ষাই নেননি। ফলে প্রবল প্রতাপে ফিরে গেছেন পিতার অস্ত্রের রাজনীতিতে। শিক্ষা নেয়নি আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতারাও। ফলে মুজিবামলের ন্যায় বেড়েছে রাজনৈতীক হত্যা, বেড়েছে গুম ও রিম্যান্ডে নিয়ে নির্যাতনের কৌশল। শেখ মুজিব আইয়ুবের কারাগারে নিরাপদে ছিলেন। তাকে গোয়েন্দা পুলিশের হাতে রিমান্ডে গিয়ে নির্যাতিত হতে হয়নি। তার গায়ে লাঠির বাড়ি দূরে থাক একটি আঁচড়ও লাগেনি। অথচ তিনি ছিলেন পাকিস্তান ধ্বংসী আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান আসামী। কিন্তু মুজিবের কারাগারে তার রাজনৈতীক শত্রুরা নিরাপত্তা পাননি। তাই মুসলিম লীগ নেতা ফজলুল কাদের চৌধুরিকে জেলের মধ্যে লাশ হতে হয়েছে। লাশ হতে হয়েছে সিরাজ সিকদারকে। লাশ হতে হয়েছে মুজিব-বিরোধী শিবিরের ৩০-৪০ হাজার রাজনৈতীক নেতা-কর্মীকে। হত্যা, খুন, গুম ও গণতান্ত্রিক অধিকার লুন্ঠনের মধ্যেই ছিল মুজিবের পরম আনন্দ। মুজিবের মানসিক রোগ “স্যাডিজম” প্রবল ভাবে বেঁচে আছে হাসিনার মাঝেও। এ রোগের প্রধান লক্ষণ, অন্যকে নিহত বা নির্যাতিত করার মধ্যেই নিজের আনন্দ। মুজিবের ন্যায় শেখ হাসিনাও তাই শুরু করেছেন “এক লাশের বদলে দশটি লাশ ফেলা”র রাজনীতি। দেশের মানুষ কি বলবে, বিশ্ববাসী কি ভাববে -তা নিয়ে শেখ মুজিবের কোনরূপ লোকলজ্জা ছিল না। তেমনি নাই মুজিব-কন্যা হাসিনারও।

ভোটের রাজনীতিকে বিদায় দেয়ার প্রয়োজনেই শেখ হাসিনা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রথাকে বিলুপ্ত করেছেন। কারণটি সুস্পষ্ট। নিজ দলের খেলোয়াড়কে রিফারি বানালে নিজের খেলোয়াড়দের পেনাল্টি থেকে বাঁচানো যায় এবং লাল কার্ড দেখানো যায় প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়কে। ভোট ডাকাতির নির্বাচনও তখন বৈধ নির্বাচনের সার্টিফিকেট পায়। এমন দলীয় রিফারি হলো নির্বাচনী কমিশনার। শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে নিযুক্ত রেফারি তো ইতিমধ্যেই লালকার্ড দেখিয়ে দিয়েছে জামায়াতে ইসলামীকে। ফলে তারা অধিকার হারিয়েছে রাজনৈতীক অংশগ্রহনের। নির্বাচন এখন প্রহসনের হাতিয়ার। তাই যে নির্বাচনে দেশের অর্ধেকের বেশী সিটে একজন মানুষও ভোট দিল না, এবং যে সব সিটে নির্বাচন হলো সে সব সিটেও শতকরা ৫ ভাগের বেশী ভোটার হাজিরই হলো না –তেমন এক প্রহসনের নির্বাচনের দোহাই দিয়ে শেখ হাসিনা আজ  ক্ষমতাসীন। দাবী করছেন তিনিই দেশের নির্বাচিত ও বৈধ প্রধানমন্ত্রী। চুরি-ডাকাতির অর্থকে নিজের অর্থ রূপে দাবি করতে চোর-ডাকাতের লজ্জা হয়না। তেমনি ভোটডাকাতির মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর সিটে বসতে শেখ হাসিনারও লজ্জা হয়না। এমন নির্লজ্জ প্রতারণাকারিদের থেকে কি আদৌ কল্যাণ আশা করা যায়? কোন বিবেকমান ভদ্র মানুষ কি এরূপ চুরি-ডাকাতিকে বৈধতা দেয়? গরু-ছাগল ও গাছপালা কখনোই চোর-ডাকাতের উপদ্রব নিয়ে ভাবে না। নির্বাচন নিয়েও ভাবে না। ভোট ডাকাতি হলেও তারা তাই প্রতিবাদ করে না। তাই হাসিনারও দাবী, দেশের গরু-ছাগল, গাছপালা ও উদ্ভিদগণ যেমন তার নির্বাচনি বিজয়কে নিঃশব্দে মেনে নিয়েছে,তেমনি জনগণেরও উচিত সে বিজয়কে মেনে নেয়া। কিন্তু সভ্য মানুষ তো এ নিয়ে ভাবে। এরূপ চিন্তাভাবনার মধ্যেই তো বিবেকবোধ ও মানবতা। তাই এমন ভোটারহীন ও ভোটহীন নির্বাচনকে একজন সভ্য নাগরিক নির্বাচন রূপে মেনে নেয় কি করে? এমন নির্বাচনকে বৈধতা দিলে চোর-ডাকাতদের কি শাস্তি দেয়ার বৈধতা থাকে? ভোট ডাকাতদের তুলনায় চোর-ডাকাতদের অপরাধ তো নগন্য। তারা কিছু মানুষের পকেটে হাত দিলেও সমগ্র দেশবাসীর অধিকার ছিনতাই করে না। দেশের রাজনীতি, পুলিশ, প্রশাসন, আদালত, সেনাবাহিনী, ব্যাংক ও রাজস্ব ভান্ডারের উপরও মালিকানা প্রতিষ্ঠা করে না।

 

লজ্জাহীনতার নাশকতা

মহান নবীজী (সাঃ) লজ্জাকে ঈমানের অর্ধেক বলেছেন। যার লজ্জা নেই, তার ঈমানও নাই। ফলে নির্লজ্জ ব্যক্তিদের চরিত্রও নাই। চরিত্রহীনদের সবচেয়ে বড় রোগটি এই লজ্জাহীনতা। মানুষ তাদের চোর-ডাকাত বলুক, চরিত্রহীন বা লম্পট বলুক, খুনি বা স্বৈরাচারি বলুক –তা নিয়ে এরূপ অপরাধীদের একটুও ভাবনা হয় না। ভাবনা নেই বলেই চুরিডাকাতি, ধোকাবাজি, মানুষ খুন ও লাম্পট্যে তাদের সামান্যতম লজ্জা হয় না। তাদেরা লজ্জা হয়না এবং বিবেকে দংশন হয় না স্বৈরাচারি শাসনেও। তারা যেমন খুন-খারাবি করতে পারে, তেমনি ধর্ষণে উৎসবও করতে পারে। লজ্জাশরমের কারণেই ভদ্র মানুষ সচারাচর কথা বা ওয়াদার হেরফের করে না। আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি মাথায় নিয়ে সে নিজ চরিত্রকে বাঁচায়, কথা ঠিক রাখে। হযরত আলী (রাঃ) বলেছেন, মানুষের ব্যক্তিত্ব তার জিহবায়। মানুষের অতি অমূল্য গুণ হলো এই ব্যক্তিত্ব। মানব চরিত্রের সবচেয়ে মূল্যবান এ অলংকারটি গড়ে উঠে ঈমানের উপর ভিত্তি করে। পরকালে মহান আল্লাহতায়ালার কাছে মহা পুরস্কারটি জুটবে সমূন্নত ব্যক্তিত্বের জন্য;সুঠাম ও শক্তিশালী দেহের জন্য নয়। সেরূপ ব্যক্তিত্ব ধোকাবাজ মিথ্যুকদের থাকে না। জিহবা দিয়ে কথা বলার সামর্থ্যটি মহান আল্লাহতায়ালা অন্য কোন জীবকে দেননি। মহান আল্লাহতায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টিরূপে সমগ্র সৃষ্টিকূলে মানবের যে মহান মর্যাদা তার অন্যতম কারণ এই জিহবা। মহান আল্লাহতায়ালার প্রশংসা, সত্যের পক্ষে সাক্ষি, হকের প্রচার ও মিথ্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রধানতম হাতিয়ার হলো জিহবা। এ জিহবা দিয়েই মু’মিন ব্যক্তি তার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ নেক কর্মগুলি করে। একারণেই স্বৈরাচারি শাসক মাত্রই জিহবার উপর নিয়ন্ত্রন বসায় এবং বাকস্বাধীনতা কেড়ে নেয়। এভাবেই মু’মিনদের তারা নিরস্ত্র করে।

অপর দিকে বেঈমানেরা বড় বড় গুনাহর কাজে ব্যবহার করে এই জিহবাকে। ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধে এই অস্ত্রটিকেই তারা অধিক ব্যবহার করে। জাহান্নামে যাওয়ার জন্য এজন্যই মানুষ-খুন, ধর্ষন বা চুরিডাকাতির প্রয়োজন পড়ে না। দেহের এ ক্ষুদ্র অঙ্গ দিয়েই সেটি সম্ভব। মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে অবিশ্বাস, বিদ্রোহ ও মিথ্যা উচ্চারনই সে জন্য যথেষ্ট। এ জিহবা দিয়েই দুর্বৃত্ত মানুষেরা দেশে গৃহযুদ্ধ, সংঘাত ও বিপুল রক্তপাত ডেকে আনে। একাত্তরে রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু করতে শেখ মুজিবকে তাই একটি তীরও ছুড়তে হয়নি। তাকে রণাঙ্গনেও থাকতে হয়নি। মহান নবীজী (সাঃ)র হাদীসঃ  যে দুটি অঙ্গের কারণে অধিকাংশ লোক জাহান্নামী হবে তার একটি হলো জিহবা, অপরটি হলো যৌনাঙ্গ। এ জিহবা দিয়েই মানুষ শুধু কোন ব্যক্তিকে নয়, সমগ্র জাতিকে ধোকা দেয় ও সে জাতির অস্তিত্বকে বিপন্ন করে। টানে জাহান্নামের পথে। এভাবে জাতির জীবনে ডেকে আনতে পারে ভয়ানক দুর্যোগ। শেখ মুজিব তো সেকাজটিই করেছেন। এই জিহবা দিয়েই তিনি সমগ্র দেশবাসীকে বার বার ধোকা দিয়েছেন, এবং অর্জন করেছেন রাজনৈতিক বিজয়। গণতন্ত্রের নামে বড় বড় বক্তৃতা দিয়ে ক্ষমতায় গিয়ে গণতন্ত্রকেই কবরে পাঠিয়েছিলেন। কেড়ে নিয়েছিলেন অন্যদের দলগড়া, মতপ্রকাশ ও রাজনীতির স্বাধীনতা। প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একদলীয় বাকশালী স্বৈরাচার। স্বাধীনতার কথা বলতেন, আর  ভারতের সাথে সই করেছিলেন ২৫ সালা গোলামী চুক্তি। সোনার বাংলা গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে উপহার দিয়েছিলেন ভয়ানক দুর্ভিক্ষ। দেশবাসীকে বিভ্রান্ত করার কাজে পিতার ন্যায় একই রূপে জিহবাকে ব্যবহার করছেন শেখ হাসিনা।

 

রোগটি ঈমানহীনতা

পশুর ক্ষেত্রে লজ্জাহীনতটি জন্মগত; সেটি চারিত্রিক দুর্বলতা নয়। ঈমানহীনতাও নয়। কিন্তু মানব লজ্জাহীন হয় ঈমানহীনতার কারণে। লজ্জা হলো ঈমানের অলংকার। মানব মনে যখনই ঈমানের বৃদ্ধি ঘটে, চরিত্র ও আচরণেও তখন বিপ্লব শুরু হয়। চারিত্রিক সে বিপ্লবে বাড়ে লজ্জাশীলতা। মহান নবাজী (সাঃ) ছিলেন মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ ঈমানদার ব্যক্তি;সে কারণে ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ লজ্জাশীল ব্যক্তিও। আরবের অসভ্য মানুষগুলো ইসলাম কবুলের সাথে সাথে তাই দ্রুত উলঙ্গতা, অশ্লিলতা ও লজ্জীহীনতা ছেড়ে মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার জন্ম দিতে পেরেছিলেন। এমন লজ্জাশীল মানুষগুলো কি মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে নির্লজ্জ হওয়ার কথা ভাবতে পারে? এমন ঈমানদারেরা দেশের সংবিধান থেকে মহান আল্লাহতায়ালার উপর আস্থার ঘোষণাটি সরায় কি করে? রুখে কি শরিয়তি আইনের প্রতিষ্ঠা? বাজেয়াপ্ত করে কি করে জিহাদ বিষয়ক বই? এগুলো তো বেঈমানির আলামত। অথচ মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে এরূপ বেঈমানি ও বিদ্রোহ নিয়েই শেখ হাসিনা ও তার সেক্যুলার মিত্রদের রাজনীতি। এমন বেঈমানি ও বিদ্রোহ নিয়ে রোজ হাশরের বিচার দিনে মহান আল্লাহতায়ালার সামনে একমাত্র নিরেট নির্লজ্জরাই দাঁড়ানোর সাহস করতে পারে। ঈমানদারির লক্ষণ তো হলো আল্লাহর প্রতিটি হুকুমের প্রতি সর্বাবস্থায় আনুগত্য এবং তাঁর শরিয়তি আইনের প্রতিষ্ঠা নিয়ে অটল আপোষহীনতা।

বেঈমানগণ যে কর্ম ও আচরণে গরু-ছাগলের চেয়েও নিকৃষ্টতর হতে পারে -সে ভাষ্যটি কোন বান্দার নয় বরং খোদ মহান আল্লাহতায়ালার।সে সুস্পষ্ট ঘোষণাটি এসেছে পবিত্র গ্রন্থ আল-কোরআনে। সেটি ব্যক্ত করতে পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালার ব্যবহৃত শব্দমালাটি হলো, “উলায়িকা কা আল আনয়াম, বাল হুম আদাল”। অর্থঃ “তারাই হলো গবাদি পশুর ন্যায়, বরং তার চেয়েও নিকৃষ্ট”। এরূপ বর্ণনার কারণটিও সহজে বোধগম্য। গরু-ছাগলেরা কখনোই মহান আল্লাহতায়ালার জমিনে তাঁর শরিয়তী আইন প্রতিষ্ঠার বিরোধীতা করে না। পশুরা কখনোই কাফের বা মুনাফিক হয় না। মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে তারা কখনোই বিদ্রোহ করে না। বরং সকল পশু, সকল কীটপতঙ্গ, সকল গাছাপালা এবং সকল সৃষ্টি মহান আল্লাহতায়ালার নামে নিয়মিত তাসবিহ পাঠ করে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা সে সাক্ষ্যটি বার বার দিয়েছেন এভাবে:“সাব্বাহা লিল্লাহি মা ফিস সামাওয়াতে ও মা ফিল আরদি”, এবং “ইউসাব্বিহু লিল্লাহি মা ফিস সামাওয়াতে ও মা ফিল আরদি।” অর্থ:“আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে তারা সবাই আল্লাহর তাসবিহ পাঠ করে”। ফলে পশু থেকে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব স্রেফ তাসবিহ পাঠে প্রমাণিত হয় না। মানুষ পশু নয়, বরং মহান আল্লাহতায়ালা খলিফা। তাই পশুর উপর মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারিত হয় মহান আল্লাহতায়ালার যোগ্য খলিফা রূপে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে।ঈমানদারের জীবনে সেটিই হলো মূল এজেণ্ডা। পশুর এজেণ্ডা সেটি নয়। খলিফা রূপে দায়িত্ব পালনের প্রধানতম বিষয়টি হলো ইসলামের বিজয় তথা শরিয়তের প্রতিষ্ঠা। সাহাবায়ে কেরামের জান ও মালের বেশীর ভাগ হয়েছে খেলাফতের সে দায়িত্ব পালনে। তাই শরিয়ত প্রতিষ্ঠার নিয়ে মানব সন্তানকে গরু-ছাগল, গাছপালা ও উদ্ভিদের ন্যায় নিরব ও নিষ্ক্রীয় হলে চলে না। স্রেফ দোয়াদরুদেও সে কাজ সমাধা হয় না। সাহাবায়ে কেরামের ন্যায় তাকেও শরিয়ত বিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামতে হয়।

অথচ বেঈমানদের জীবনে যেমন তাসবিহ পাঠে রুচি থাকে না, তেমনি রুচি থাকে না শরিয়ত প্রতিষ্ঠায়। তারা বরং যুদ্ধ শুরু করে শরিয়তের প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে। এমন শয়তানদের হাতে রাষ্ট্র অধিকৃত হলে মুসলিম জনগণ তখন ব্যর্থ হয় ইসলামি এজেণ্ডা নিয়ে বাঁচায়। ব্যর্থ হয়, প্রকৃত মুসলিম রূপে জীবন যাপনে। এমন অধিকৃত রাষ্ট্রে তখন বার বার আযাব নেমে আসে। পশুবৎ বেঈমানদের উদ্দেশ্যই পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “তাদের হৃদয় আছে কিন্তু তা দিয়ে তারা উপলদ্ধি করে না, তাদের চোখ আছে কিন্তু তা দিয়ে তারা দেখে না এবং তাদের কর্ণ আছে কিন্তু তা দিয়ে তারা শ্রবন করে না। এরাই হলো পশুর ন্যায়, বরং তার চেয়েও নি‌কৃষ্টতর; তারাই গাফেল” –(সুরা আ’রাফ আয়াত ১৭৯)। বেঈমান ব্যক্তিগণ শয়তানের পক্ষ নিবে এবং ইসলামের বিজয় রোধে যুদ্ধে নামবে –তাদের চরিত্রের এ ইতর রূপটি নিয়ে সর্বজ্ঞানী ও সর্বস্রষ্টা মহান আল্লাহতায়ালার চেয়ে আর কে বেশী জানে? আচরনে এরা যে পশুর চেয়েও নিকৃষ্টতর -পবিত্র কোরআনের সে বর্ণনা কি কখনো ভূল হতে পারে? পশুরা মুসলিম ভূমিকে খণ্ডিত করে না। আল্লাহতায়ালার দ্বীনের সৈনিকদের ফাঁসিতে ঝুলায় না;গুলি করে তাদের হত্যাও করে না। জনপদে বোমা বর্ষণও করে না। শরিয়তী বিধানের বিরুদ্ধে আওয়াজও তোলে না। বিশ্বের তাবৎ পশু মিলেও সমগ্র ইতিহাসে সাড়ে সাত কোটি মানুষকে হত্যা করেনি। কিন্তু পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট জীবরা সেরূপ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বিগত দুটি বিশ্বযুদ্ধেই। এরাই সিরিয়ার বুকে তিন লাখ নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করেছে। বহু লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছে আলজিরিয়া, ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান ও ইরাকে। সে হত্যাকাণ্ড এখনও অব্যাহত রয়েছে। গ্যাস চেম্বার, আবু গারিবের জেল,গোয়ান্তো নামো বে’য়ের কারাগার ও শাপলা চত্ত্বর তো মনুষ্যরূপী এরূপ নিকৃষ্ট জীবদেরই সৃষ্টি। মহান আল্লাহাতায়ালা তাদের চরিত্রের ইতর রূপটি বর্ণনায় যে কতটা নির্ভূল –এ হলো তারই প্রমাণ। আরো কথা হলো, খোদ মহান আল্লাহতায়ালা যাদেরকে পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট বলেছেন তাদের থেকে কি মনুষ্যসুলভ আচরন আশা করা যায়? করা যায় শান্তি ভিক্ষা? তাছাড়া শান্তি কি ভিক্ষার বিষয়? ইসলাম শান্তির ধর্ম। কিন্তু সে শান্তি অর্জনে শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবাকে শহীদ হতে হয়েছে। একই রূপ মূল্য দিয়ে মু’মিনদের কিনতে হয় জান্নাতের শান্তিও। বাংলাদেশের মানুষও শান্তি চায়। কিন্তু সেটি কি ইসলামের বিপক্ষ শক্তিকে ক্ষমতায় রেখে? সেটি কি ইসলামের পথ? এমন শত্রুপক্ষকে ক্ষমতায় রাখায় বিপদটি শুধু পার্থিব জীবনে নয়, বরং তাতে ভয়ানক বিপদ বাড়ে অনন্ত-অসীম আখেরাতের জীবনেও। কারণ, সুসভ্য সমাজের নির্মাণই শুধু নয়, ঈমানদার রূপে বেড়ে উঠাও তারা অসম্ভব করে। ২৮/০৩/২০১৬




অখণ্ড-ভারতের মোহ ও বাংলাদেশের অস্তিত্বের ভাবনা

আসন্ন কি আরেক বিপর্যয়? – 

বাংলাদেশী মুসলমানের চেতনার বিভ্রাট যে দিন দিন ভয়ানক রূপ নিচ্ছে সে প্রমাণ প্রচুর। রোগ নিয়ে জটিল পরীক্ষা-নিরীক্ষার তখনই প্রয়োজন হয় যখন সেটি দেহের মধ্যে লুকিয়ে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের মুসলমানের চেতনার রোগটি এখন আর লুকিয়ে নেই, বরং সর্ববিধ সিম্পটম নিয়ে তার উপস্থিতি জাহির করছে। জাতীয় জীবনে কোন রোগই -তা সে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা নৈতিক হোক, হঠাৎ আসে না। বাড়ে বহুকাল ধরে। ঝড় শুরু হওয়ার আগে থেকেই আকাশে যেমন কালো মেঘ জমতে শুরু করে তেমনি জাতির জীবনেও কালো মেঘ জমতে থাকে বিপর্যের বহু আগে থেকেই। কালো মেঘ দেখেও ঝড়ের আলামত টের না পাওয়াটি অজ্ঞতা। তেমনি মানব জীবনের ভয়ানক অজ্ঞতা হল, প্রচণ্ড বিচ্যুতি ও পথভ্রষ্টতার মধ্যে থেকেও তা নিয়ে বোধোদয় না হওয়া। এ অজ্ঞতা নিরক্ষরতার চেয়েও ভয়ানক। অথচ বাংলাদেশে সেটিই হচ্ছে। এমন অজ্ঞতা যে শুধু দেশের সেক্যিউলার রাজনৈতিক নেতা-কর্মী ও বুদ্ধিজীবীদের মাঝে বিরাজ করছে তা নয়, প্রকট রূপ ধারণ করেছে তাদের মাঝেও যারা নিজেদেরকে ধর্মভীরু মুসলিম ও ইসলামি আন্দোলনের কর্মী বা সমর্থক বলে দাবী করে।

কর্পুর যেমন দিন দিন হাওয়ায় হারিয়ে যায়, বাংলাদেশের মানুষের আক্বিদা ও আচরণ থেকে ইসলামী বিশ্বাস ও মূল্যবোধও যেন হাওয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে আজ থেকে ৫০ থেকে বছর আগে বাংলার মানুষ ইসলামের যতটা কাছে ছিল এখন ততটাই দূরে। তখন বিছমিল্লাহ বা আল্লাহর উপর আস্থা নিয়ে অন্ততঃ মুসলমানদের মাঝে বিরোধ ছিল না। অথচ এখন ঈমানের সে মৌল বিশ্বাসটি দেশের শাসনতন্ত্রে উল্লেখ করাও অসম্ভব হয়ে উঠেছে। ইসলাম থেকে বাংলাদেশের মানুষ যে কতদূর দূরে সরেছে এ হল তার নমুনা। আর এ অবস্থা সৃষ্টির জন্য যেটি সফল ভাবে কাজ করেছে সেটি সেক্যিউলার শিক্ষা ব্যবস্থা। এ শিক্ষা ব্যবস্থার মূল প্রবর্তক ছিল ব্রিটিশ শাসকেরা। এর মূল কাজটি মুসলমানদের ঈমান বা আল্লাহর উপর আস্থা বাড়ানো ছিল না, ছিল ইসলাম থেকে দ্রুত দূরে সরানো। মহান আল্লাহপাক ও তার রাসূল কি বললেন সেটি অতীতে যেমন গুরুত্ব পায়নি, এখনও পাচ্ছে না। বরং গুরুত্ব পাচ্ছে ডারউইন, ফ্রয়েড, মার্কস,এঙ্গেলস, ল্যাস্কী, রাসেল বা উইলসনের মত অমুসলিম ব্যক্তিবর্গ কি বললো সেটি। বিষ যেমন দেহের অভ্যন্তুরে ঢুকে দেহের প্রাণশক্তি বিনষ্ঠ করে, সেক্যিউলার শিক্ষা ব্যবস্থাও তেমনি বিনষ্ট করছে ঈমান। তাই আল্লাহর উপর আস্থা বিলুপ্ত করার লক্ষ্যে সেক্যিউলার ও নাস্তিকদের আর লাঠি ধরতে হচ্ছে না,দেশের শিক্ষ্যাব্যবস্থাই সেটি ত্বরিৎ সমাধা করছে। ফলে দেশে ৯০ ভাগ মুসলমান -এ পরিসংখ্যানটি নিছক বইয়ের পাতায় রয়ে যাচ্ছে; দেশবাসীর কাজ-কর্ম, ঈমান-আক্বীদা, নীতি-নৈতীকতায় নয়। বরং বাড়ছে মঙ্গল প্রদীপের কদর। এ শিক্ষা ব্যবস্থার ফলেই সফল ভাবে সমাধা হয়েছে কোট-কাছারি, আইন-আদালত, প্রশাসন ও রাজনীতি থেকে ইসলাম সরানোর কাজ। আল্লাহর দ্বীনটির এমন নিষ্ঠুর অবমাননা স্বচক্ষে দেখার পরও রুখে দাঁড়ানোর লোক দেশে শতকরা ২ জনও নাই। থাকলে ঢাকা শহরে শরিয়তের পক্ষে লক্ষ লক্ষ মানুষের মিছিল হত। আর শতকরা ৯০ জন মুসলমানের দেশের ইসলামের এরূপ পরাজয় ডেকে আনার জন্য ভারত, ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ তাবত ইসলামী বিরোধী শক্তির কাছে কদর বাড়ছে দেশের সেক্যিউলার রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও এনজিও কর্মীদের। ভূয়শী প্রশংসা পাচ্ছে ইসলামকে পরাজিত করার এ বাংলাদেশী মডেল। ফলে র‌্যাব বা পুলিশের হাতে ভয়ানক ভাবে মানবাধিকার লংঘিত হলেও তা নিয়ে পাশ্চাত্যে শাসকগণ নিন্দা দূরে থাক, মুখ খুলতেই রাজী নয়।

 

কুশিক্ষার বিপর্যয়

শূণ্যস্থান বলে এ জগতে কিছু নেই। শূণ্য স্থান থাকে না চেতনা রাজ্যেও। সুশিক্ষার ব্যবস্থা না হলে দেশবাসীর মনের ভূবন কুশিক্ষার দখলে যাবেই। তখন ইসলামের শত্রুপক্ষের বিজয়ে অর্থদান, শ্রমদান ও রক্তদানের কাজটি কুশিক্ষাপ্রাপ্ত জনগণই নিজ গরজে সমাধা করে দেয়। কুশিক্ষা তখন ইসলামকে পরাজিত করার কাজে সফল হাতিয়ার রূপে কাজ দেয়। একারণে যারা ইসলামের বিজয় চায় তারাও সর্ব প্রথম যেটিকে গুরুত্ব দেয় সেটি দেশবাসীর সুশিক্ষা। এবং বন্ধ করে দেয় কুশিক্ষার সকল প্রতিষ্ঠানকে। এরূপ কাজটি ছিল নবী-রাসূলদের। মুসলমানদের দায়ভার তো সে কাজকে চালু রাখা। মহান আল্লাহতায়ালাও তাঁর সর্বশেষ নবী (সাঃ)কে সর্বপ্রথম যে পয়গাম দিয়ে পাঠিয়েছিলেন তা নামায-রোযার নয়, বরং জ্ঞানার্জনের। সাম্প্রতিক কালে ইসলামী শিক্ষার গুরুত্ব এবং সেক্যিউলার শিক্ষার কুফল যারা সবচেয়ে বেশী বুঝেছিলেন তারা হল ইরানী আলেমেরা। মহম্মদ রেজা শাহের প্রতিষ্ঠিত দেশের সকল সেক্যিউলার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তিন বছরের জন্য তাঁরা বন্ধ রেখেছিলেন। কিন্তু ইসলামের নামে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা পেলেও দেশটির নেতাদের দ্বারা সেটি হয়নি। যারা ইসলামের পক্ষের শক্তি ছিল তারাও বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেননি, ফলে ইসলামী শিক্ষার প্রবর্তন নিয়ে আন্দোলনও করেননি। এরফলে বহাল তবিয়তে থেকে যায় ব্রিটিশের প্রবর্তিত সেক্যিউলা শিক্ষাব্যাবস্থা। পাশ্চাত্যের যৌন ফিল্ম এবং রাশিয়া ও চীনের সমাজতান্ত্রিক বই ও পত্র-পত্রিকা যাতে অবাধে প্রবেশ করতে পারে সেজন্য দেশের দরজা পুরাপুরি খুলে দেয়া হয়। যুবকদের চেতনায় মহামারি বাড়াতে এগুলোই পরবর্তীতে ভয়ানক জীবানূর কাজ করে। পাকিস্তান আমলে দেশের রেলস্টেশন ও লঞ্চঘাটগুলোকে সে জীবাণূ-ব্যবসায়ীদের হাতে লিজ দেয়া হয়েছিল। এভাবে দেশের এবং সেসাথে ইসলামের ঘরের শত্রু বাড়ানো হয়েছিল বিপুল হারে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে শুরু থেকেই যারা প্রবল বিরোধীতা করেছিল তারা হল সেক্যিউলার এবং সমাজতন্ত্রিরা। সমাজতন্ত্র মারা গেছে, কিন্তু মারা যাওয়ার আগে মরণ ছোবল মেরে যায় পাকিস্তানের বুকে।

পাকিস্তানে ছিল একটি আদর্শিক রাষ্ট্র যার ভিত্তি ছিল ইসলাম। ইসলামই ছিল পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মাঝে একমাত্র যোগসূত্র। এমন একটি আদর্শিক দেশের প্রতি সেক্যিউলার ও ইসলামবিরোধীদের দরদ থাকার কথা নয়। বরং এমন দেশে তাদের রাজনৈতিক মৃত্যু অনিবার্য। সেটি তারা বুঝতো বলেই দিবারাত্র খেটেছে দেশটির ত্বরিৎ ধ্বংসে। সেক্যিউলার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সেদিন যারা বের হয়েছেন তারা পাকিস্তানের বা ইসলামের পক্ষে লাঠি না ধরে নিজেদের শ্রম ও মেধার বিণিয়োগ করেছেন তার বিনাশে। ষাটের দশকে তারা লাঠি ধরেছিলেন সোভিয়েত রাশিয়া বা চীনের পক্ষে। আর এখন খাটছেন ভারতের স্বার্থ সংরক্ষণে। একটি উদাহরণ দেয়া যাক। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর সর্ব প্রথম যে বাঙালীকে পাকিস্তান সরকার বৃত্তি দিয়ে বিলেতে পাঠান তিনি হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক জনাব আব্দুর রাজ্জাক। অথচ এ আব্দুর রাজ্জাকই বিলেত থেকে ফিরে এসে যে কাজটি লাগাতর করেছেন তা হল পাকিস্তানের শিকড় কাটার কাজ। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে এরকম আব্দুব রাজ্জাক ছিলেন প্রচুর। এদেরই অনেকেই এখন খাটছেন ভারতের পক্ষে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এদের দ্বারাই ইসলাম-বিরোধীদের দুর্গে পরিণত হয়েছে। পাকিস্তান ভেঙ্গে গেলেও তাদের মিশন শেষ হয়নি। বাংলাদেশের ভুগোলের মধ্যেও তারা ১৯৪৭ য়ের গন্ধ টের পায়। আর যা কিছু পাকিস্তানী তাই তো তাদের কাছে ঘৃণ্য।

 

হিন্দুদের এজেণ্ডা ও মুসলমানের এজেণ্ডা

উপমহাদেশের রাজনীতিতে সবসময়ই দুটি পক্ষ ছিল। দুই পক্ষের দুটি ভিন্ন এজেণ্ডাও ছিল। ফলে ১৯৪৭ সালে রাষ্ট্র নির্মানের দুটি বিপরীত ধারাও ছিল। একটি ছিল অখণ্ড ভারত নির্মানের ধারা। এধারার নেতৃত্বে ছিল কংগ্রেসের হিন্দু নেতৃবৃন্দ। অপরটি ছিল প্যান-ইসলামিক মুসলিম ধারা। শেষাক্ত এ ধারাটির ফলেই জন্ম নেয় পাকিস্তান। পাকিস্তানের নির্মানের মূল ভিত্তি ছিল জিন্নাহর দেয়া দ্বি-জাতি তত্ত্ব, যার মূল কথা হলঃ চিন্তা-চেতনা,মন ও মনন,নাম ও নামকরণ,তাহজিব ও তামুদ্দুদের বিচারে মুসলমানগণ হল হিন্দুদের থেকে সম্পূর্ণ এক ভিন্ন জাতি। তাদের রাজনীতি ও রাষ্ট্র নির্মানে লক্ষ্য, ভিশন ও মিশন তাই এক ও অভিন্ন হতে পারে। তাই অখণ্ড ও সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু-ভারতের কাঠামোর মাঝে মুসলমানদের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও শরিয়ত অনুসরণের অভিলাষ পূরণ অসম্ভব। পৃথক ও স্বাধীন পাকিস্তান এ অভিলাষ পূরণে অপরিহার্য। হিন্দু কংগ্রেস ও ব্রিটিশ শাসকদের প্রচণ্ড বিরোধীতা সত্ত্বেও ১৯৪৭য়ে দ্বি-জাতির সে চেতনাই বিজয়ী হয় এবং প্রতিষ্ঠা পায় পাকিস্তান। কিন্তু অখণ্ড-ভারত নির্মানের হিন্দু নেতারা ১৯৪৭য়ের সে পরাজয়কে মেনে নেয়নি।সুযোগ খুঁজতে থাকে মুসলমানদের সে বিজয়কে উল্টিয়ে দেয়ার। সে সুযোগ আসে ১৯৭১য়ে। ১৯৭১য়ে তারা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সামরিক বিজয় লাভ করে দেশটির পূর্বাঞ্চলে। ফলে পাকিস্তানী চেতনার স্থলে এ অঞ্চলে আবার বেগবান হয় অখণ্ড ভারতের হিন্দু ধারা। তবে হিন্দুরা তাদের সে সাম্প্রদায়ীক প্রকল্পকে মুসলমানদের কাছে আকর্ষণীয় করতে গায়ে সেক্যিউলারিজমের লেবাস লাগায়। সেক্যিউলারিজমের মুসলিম বিরোধী আদিরূপটি নিয়ে বাংলাদেশের মুসলমানদের মনে প্রচণ্ড অজ্ঞতা থাকলেও সে অজ্ঞতা ভারতীয় মুসলমানদের নেই। বরং ভারতের মুসলিম শিশুরাও সেটি বুঝে। তারা সেটি বুঝেছে হিন্দুদের দ্বারা সংঘটিত মুসলিম বিরোধী অসংখ্য দাঙ্গায় সহায়-সম্পদ ও আপনজনদের হারিয়ে;চোখের সামনে মা-বোনদের ধর্ষিতা হতে দেখে। কিন্তু হিন্দু-ভারতের সে কুৎসিত ভয়ংকর রূপটি পর্দার আড়ালে রাখা হয়েছে বাংলাদেশের মুসলমানদের থেকে। বরং কুৎসিত রূপে চিত্রিত করা হয়েছে দেশের ইসলামপন্থি এবং একাত্তরের পাকিস্তানপন্থিদের। আর এভাবে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশীর মনে যেমন সৃষ্টি করা হয়েছে পাকিস্তান-বিরোধী প্রচণ্ড ঘৃনা,তেমনি লালন করা হয়েছে অখণ্ড ভারতের প্রতি মোহ। লাগাতর প্রচারণার ফলে বাংলাদেশী মুসলমানদের মনে এ বিশ্বাসও জন্ম নিয়েছে যে,পাকিস্তানের সৃষ্টিই ভূল ছিল এবং ভূল ছিল জিন্নাহর দ্বি-জাতি তত্ত্ব।

পাকিস্তানকে যারা অনর্থক অনাসৃষ্টি বলে তারা যে শুধু ভারতীয় কংগ্রেসের হিন্দু নেতৃবৃন্দ তা নয়। তাদের সাথে সুর মিলিযে একই কথা বলে বাংলাদেশের কম্যিউনিষ্ট,নাস্তিক,জাতিয়তাবাদী এবং মুসলিম নামধারি সেক্যিউলারিষ্টগণ। হিন্দু-মুসলিম মিলন ও অখণ্ড ভারতের পক্ষে নানা গূণগানের কথাও তারা বলে। ১৯৭১য়ে থেকে বাংলাদেশের সকল ছাত্র-ছাত্রী এবং জনগণ শুধু তাদের সে ক্যাসেটটিই লাগাতর শুনে আসছে। অথচ কেন যে বাংলার মুসলমানগণ ১৯৪৭ সালে বিপুল ভোটে পাকিস্তানের পক্ষ নিল সে কথা তারা বলে না।সে সময় শেখ মুজিব স্বয়ং কেন পাকিস্তানের পক্ষ নিলেন সে কথাও তারা বলে না। বরং বলে, পাকিস্তান সৃষ্টিই ভূল ছিল। তাদের সে নিরচ্ছিন্ন প্রচারণা কাজও দিয়েছে। ফল দাঁড়িয়েছে, এখন সে প্রচরণায় প্লাবনে ভেসে গেছে বহু ইসলামপন্থিরাও। ফলে তাদের সাথে সূর মিলিয়ে একই কথা বলা শুরু করেছে তারাও যারা নিজেদের ইসলামী আন্দোলনের নেতা-কর্মী বা সমর্থক বলে দাবী করেন। এদের অনেকে আবার খেলাফা প্রতিষ্ঠার কথাও বলেন। ভারতপন্থিদের সাথে তাঁরাও ভারতীয় বাহিনীর বিজয়ের দিনে উৎসবে নেমেছেন। বাংলাদেশে ইসলামি ধারার রাজনীতিতে এটি এক গুরুতর বিচ্যুতি, এবং এক বিশাল চেতনা-বিভ্রাট। তারা এখান যা বলেন একাত্তরের পূর্বে কোন ইসলামপন্থির মুখে তা কখনই শোনা যায়নি।

অমুসলিম পরিবেষ্ঠিত এক ক্ষুদ্র দেশে নিজেদের শিক্ষা-সংস্কৃতি ও ধর্ম নিয়ে বাঁচতে হলে চিন্তা-চেতনায় বলিষ্ঠ ইম্যুনিটি তথা প্রতিরোধ শক্তি চাই। রোগের বিরুদ্ধে মানব দেহে ভ্যাকসিন বা টিকা সে ইম্যুনিটিই বাড়ায়। তখন কলেরা,যক্ষা বা পলিওর মত ভয়ংকর রোগের মধ্যে থেকেও মানুষ নিরাপদে বাঁচতে পারে।কোরআনের জ্ঞান ও ইসলামের দর্শন মূলত ঈমানদারের চেতনায় সে ইম্যুনিটিই তীব্রতর করে। তখন উলঙ্গতা, অশ্লিলতা ও নানা রূপ কুফরির মাঝেও মুসলমানগণ ঈমান নিয়ে বাঁচতে পারে। হিজরতের আগে মক্কার মুসলমানগণ তো তেমন এক ইম্যুনিটির কারণেই বলিষ্ঠ ঈমান নিয়ে বেড়ে উঠেছিলেন। অথচ মুসলিম অধ্যুষিত সেক্যিউলার রাষ্ট্রগুলোতে ইম্যুউনিটি গড়ার সে কাজটি কঠিন। সাম্প্রদায়ীক বা মৌলবাদ আখ্যা দিয়ে সেটি বাংলাদেশের ন্যায় বহু দেশে অসম্ভব করা হয়েছে। মক্কার কাফের সমাজে নবীজীকে সে কাজ লুকিয়ে লুকিয়ে করতে হত। এমন প্রকাশ্যে নামায পড়াও বিপদজনক ছিল। দ্বীনের এ অপরিহার্য কাজের জন্য যে ব্যাপক অবকাঠামো দরকার সেটি যেমন কাফের অধ্যুষিত মক্কায় সম্ভব হয়নি, তেমনি কোন অমুসলিম রাষ্ট্রেও সম্ভব নয়। নবীজীকে তাই মদিনায় গিয়ে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছে। ইসলামী রাষ্ট্রের কাজ নিছক হাসপাতাল,রাস্তাঘাট বা  কলকারখানা নির্মান নয়। বরং সেটি হল,ঈমানদার রূপে বেড়ে উঠার উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করা;অনৈসলামের বিরুদ্ধে প্রতিটি নাগরিকের মনে ইম্যুউনিটি গড়ে তোলা। কোন রাষ্ট্রের এর চেয়ে কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজ নেই। খাদ্য-পানীয় তো বিশ্বের সবদেশেই জুটে।এমন কি পশুও না খেয়ে মরে না। কিন্তু মুসলিম মন ও মানস প্রকৃত নিরাপত্তা পায় এবং ঈমানী পরিচয় নিয়ে বেড়ে উঠে একমাত্র ইসলামি রাষ্ট্রে। ইসলাম রাষ্ট্র নির্মান তো এজন্যই ফরয। নইলে কুফরির বিশ্বব্যাপী স্রোতে হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই অধিক। তখন সে শুধু বেঁচে থাকে পৃতৃদত্ত মুসলিম নামটি নিয়ে, মুসলিম চরিত্র নিয়ে। সোভিয়েত রাশিয়ার কম্যুউনিস্ট কবলিত মুসলমানগণ তো বহুলাংশে হারিয়ে গেছে তো একারণেই। একই কারণে তারা হারিয়ে যাচ্ছে পাশ্চত্যের দেশগুলিতেও।

বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট একটি দেশ হলে কি হবে, ১৯৭১য়ে যে দর্শনের উপর দেশটি জন্ম নিয়েছিল তাতে মুসলিম রাষ্ট্রের কাঙ্খিত সে মূল কাজটিই গুরুত্ব হারিয়েছিল। বরং মাথায় তোলা হয়েছিল বাঙালী জাতিয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষবাদ। অথচ কোরআন ও সূন্নাহ মতে এ রাষ্ট্রের এ তিনটি মতবাদের বিশ্বাস করাই কুফরি। মুসলমান হওয়ার অর্থ ধর্ম-নিরপেক্ষ হওয়া নয়, বরং সর্ব-অবস্থায় ইসলামের পক্ষ নেয়া। এবং সে পক্ষ নেয়া অর্থ, ইসলামের বিজয়ে নিজের অর্থ, শ্রম ও রক্ত দেয়া। শতকরা ৬০ ভাগের বেশী সাহাবী তো সে কাজে শহিদ হয়েছেন। মুসলমান কখনও জাতীয়তাবাদী হয় না,হয় প্যান-ইসলামিক। সে তার পরিচয় ভাষা বা ভূগোল থেকে পায় না, বর্ণ বা গোত্র থেকেও নয়। পায় ঈমান থেকে। আর সমাজতন্ত্র? সেটি আজ  খোদ সোভিয়েত রাশিয়াতেই আবর্জনার স্তুপে গিয়ে পড়েছে। অথচ শেখ মুজিব সে আবর্জনাও মুসলমানদের মাথায় চাপিয়েছিলেন। এবং সে জন্য জনগণ থেকে কোন রায়ও নেননি। ১৯৭০য়ের নির্বাচনে এটি কোন ইস্যুও ছিল না। শেখ মুজিব বাঙালী মুসলমানদের মাথার উপর এ কুফরি মতবাদগুলি চাপিয়েছেন নিছক তার প্রভু দেশ ভারত ও রাশিয়াকে খুশি করার জন্য। তাঁর অপরাধ, একাত্তরের পর ছাত্র-ছাত্রীদের মনে কুফরি ধ্যান-ধারণা বিরুদ্ধে ভ্যাকসিন না দিয়ে বরং টিকা লাগিয়েছেন ইসলামের বিরুদ্ধে। আর সে অপরাধ কর্মটি করেছেন জনগণের দেয়া রাজস্বের টাকায়। এ ভাবে কঠিন করা হয়েছে বাংলাদেশী ছাত্র-ছাত্রীদের মনে ইসলামের মৌল শিক্ষার প্রবেশ। জিহাদ বা শরিয়তের প্রতিষ্ঠার ন্যায় ইসলামের এ মৌল বিষয়গুলো বাংলাদেশের মানুষের কাছে আজ  গ্রহন-যোগ্যতা পাচ্ছে না তো একারণেই। এবং নতুন প্রজন্ম পাচ্ছে না ইসলামিক ইম্যুউনিটি। ফলে জোয়ারের পানির ন্যায় তাদের চেতনায় ঢুকেছে হিন্দু রাজনীতির দর্শন -যার মূল কথাটি আজও অবিকল তাই যা তারা ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে বলতো। যে দেশটি ইসলামী নয় সেদেশে ইম্যুনিটি গড়ার সে ফরয কাজটি করে মসজিদ-মাদ্রাসা, আলেম-উলামা, ইসলামি সংগঠন,লেখক, বুদ্ধিজীবী ও চিন্তাশীল ব্যক্তিবর্গ। তাঁরা সেটি করেন কোরআন-হাদিস ও ইসলামী দর্শনের জ্ঞান বাড়িয়ে। নবীজী (সাঃ)র মক্কী জীবন তো সেটিরই সূন্নত পেশ করে। কিন্তু বাংলাদেশের সরকার যেমন সে কাজ করেনি, সঠিক ভাবে সেটি হয়নি আলেম-উলামাদের দ্বারাও। ইসলামি সংগঠনগুলো ব্যস্ত ক্যাডার-বৃদ্ধি,অর্থ-বৃদ্ধি ও ভোট-বৃদ্ধির কাজে, কোরআনের জ্ঞান ও ইসলামী দর্শন বাড়াতে নয়। তাদের অর্থের বেশীর ভাগ ব্যয় হয় দলীয় আমলা প্রতিপালনে। সে সাথে দেশের মসজিদ-মাদ্রাসাগুলোও অধিকৃত। সেখানে দখল জমিয়ে বসে আছে সেক্যিউলার মোড়ল-মাতবর, রাজনৈতিক ক্যাডার ও আলেমের লেবাস ধারী কিছু রাজনৈতিক বোধশূন্য ব্যক্তি। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বিপুল ভাবে বাড়লেও ইসলামের বিজয় বাড়ছে না। বরং মুসলমানদের চেতনা রাজ্যে দূষণ বাড়ছে ভয়ানক ভাবে। এমন এক দূষণ প্রক্রিয়াই ফলেই অখণ্ড ভারতের মোহ জেগে উঠছে এমন কি ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের মাঝেও।

১৯৭১য়ে বাংলাদেশের মাটিতে ভারতের যে বিশাল সামরিক বিজয় এসেছিল তাতে শুধু পাকিস্তানের ভূগোলই পাল্টে যায়নি,পাল্টে গেছে বাংলাদেশী মুসলমানদের মনের ভূগোলও। ১৬ই ডিসেম্বরের বিজয়-উৎসবের সাথে ভারত আরেকটি মহা-উৎসব করতে পারে চেতনা রাজ্যের এ বিশাল বিজয় নিয়ে। বাঙালী হিন্দুর যখন রেনেসাঁ,মুসলমানদের উপর এমন আদর্শিক বিজয় তারা তখনও পায়নি। ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে শেখ মুজিবের সবচেয়ে বড় অপরাধ হল,হিন্দুদের কোলে তিনি এরূপ একটি সহজ বিজয় তুলে দিয়েছেন। সামরিক বিজয় পরাজিত দেশে কখনই একাকী আসে না। সাথে আনে আদর্শিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক বিজয়ও। বাংলাদেশের ভূমিতে ভারতের বিশাল বিজয় তাই একাত্তরে এসে থেমে যায়নি। বিজয়ের পর বিজয় আসছে সর্বক্ষেত্রে। একাত্তরে তাদের লক্ষ্য শুধু পাকিস্তানের বিনাশ ছিল না, ছিল ইসলামী চেতনার বিনাশও। তাছাড়া তাদের এ যুদ্ধটি নিছক পাকিস্তানের বিরুদ্ধেও ছিল না, ছিল ইসলাম ও বাংলাদেশের ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধেও। পাকিস্তান-বিরোধী যুদ্ধটি শেষ হয়েছে একাত্তরেই। কিন্তু শেষ হয়নি বাংলাদেশের মাটি থেকে ইসলামপন্থিদের নির্মূলের কাজ। তাই ভারত তার পদলেহীদের দিয়ে যুদ্ধ-যুদ্ধ একটা অস্থির অবস্থা বজায় রেখেছে সেই ১৯৭১ থেকেই। তাছাড়া আওয়ামী লীগের আচরণ দেখেও বোঝা যায়, ভারতের পক্ষ থেকে বাঁকি কাজটি সমাধার মূল দায়িত্বটি পেয়েছে তারাই। বেছে বেছে ইসলামী সংগঠন নিষিদ্ধকরণ, ইসলামী নেতাদের বীনা বিচারে গ্রেফতার, মাদ্রাসার পাঠ্যসূচী ও মসজিদে খোতবার উপর নিয়ন্ত্রণ, অফিসে ও ঘরে ঘরে গিয়ে ইসলামী বই বাজেয়াপ্ত করা -ইত্যাদী নানা কর্মসূচী নিয়ে এগুচ্ছে তারা।

 

ভারতের বাংলাদেশ ভীতি

বাংলাদেশের ভূমিতে ভারতীয়দের এত তৎপরতার মূল কারণ,তাদের বাংলাদেশে ভীতি। ভয়ের সে মূল কারণটি হল ইসলাম। ভারতীয়রা বোঝে, ইসলামী দর্শন এবং কোরআনের জ্ঞানই যুগ যুগ ধরে জোগাতে পারে ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের শক্তি। অতীতে আফগান জনগণ যে শক্তির বলে ব্রিটিশ বাহিনী ও পরে সোভিয়েত বাহিনীকে পরাজিত করেছিল সেটি অস্ত্রবল নয়। অর্থবলও নয়। বরং সেটি ইসলামী চেতনার বলে। আজও তারা মার্কিনীদের পরাজয় করে চলেছে সে শক্তির বলেই। ১০ বছরের যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট ও তার ৪০টি মিত্রদেশকে বিন্দুমাত্র বিজয়ের কাছে ভিড়তে দেয়নি। আর বাংলাদেশীরা আফগানদের থেকে সংখ্যায় ৭ গুণ অধিক। এতবড় বিশাল জনশক্তির মাঝে ইসলামি চেতনার বিস্ফোরণ হলে তাতে কেঁপে উঠবে সমগ্র ভারত। বাংলাদেশের মূল শক্তি তার ভূগোল নয়, সম্পদও নয়। বরং এ জনশক্তি। আর এ জনশক্তির সাথে ইসলামের যোগ হলে জন্ম নিয়ে এক মহাশক্তি। মরুর নিঃস্ব আরবেরা তো বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয়েছিল এমন এক মিশ্রণ হওয়াতেই। ভারত তাই বাংলাদেশের মানুষকে কোরআনের জ্ঞান থেকে দূরে সরাতে চায়। আর একাজে ভারতের সুবিধা হল, আওয়ামী লীগকে তারা অতি আগ্রহী কলাবোরেটর রূপে পেয়েছে। বাঙালী হিন্দুদের চেয়েও এ কাজে তারা বেশী বিশ্বস্থ ও তাঁবেদার। ভারত সে সুযোগটির সদ্ব্যাবহার করতে চায়। একাত্তরের বিজয়কে যুগ যুগ ধরে রাখার স্বার্থে আওয়ামী লীগের কাঁধে লাগাতর বন্দুক রাখাটিকে তারা অপরিহার্যও ভাবে। তবে এলক্ষ্যে তারা যে শধু আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের উপরই পুঁজি বিণিয়োগ করছে তা নয়। তাদের স্ট্রাটেজী, সব ডিম এক ঝুড়িতে রাখা নয়। তাই বিশাল পুঁজি বিণিয়োগ করেছে দেশের মিডিয়া, সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যকর্মী, আলেম-উলামা, ছাত্রশিক্ষক, এমন কি ইসলামী দলগুলোর উপরও। সে হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রীকে তারা ভারতে পড়ার সুযোগও করে দেয়েছে। এখন বিপুল পুঁজি বিণিয়োগ করছে দেশের ইসলামী দলগুলোর নেতাকর্মী,বুদ্ধিজীবী ও মিডিয়ার উপর। ভারত জানে, তাদের হাত থেকে আওয়ামী লীগ হারিয়ে যাওয়ার নয়। ক্ষমতায় থাকার সার্থে এ দলটি নিজ গরজেই ভারতে পক্ষ নিবে।কারণ,ভারতে হাতে রয়েছে বাংলাদেশের হিন্দু ভোট। আছে বিশাল রাষ্ট্রীয় পুঁজি, আছে ভারত-প্রতিপালীত বিশাল মিডিয়া। নির্বাচনী জয়ের জন্য এগুলো জরুরী। তবে ভারত চায়,অন্যদেরও পক্ষে আনতে।

 

পাকিস্তান আমলের ব্যর্থতা

পাকিস্তান আমলের বড় ব্যর্থতাটি অর্থনৈতিক ছিল না। প্রশাসনিকও নয়। সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ছিল শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তির ক্ষেত্রে। সে সময় বহু বিশ্ববিদ্যালয়, বহু কলেজ-ক্যাডেট কলেজ, স্কুল, ক্যান্টনমেন্ট ও কলকারাখানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু ২৩ বছরে একখানি বইও এ নিয়ে লেখা হয়নি যে কেন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করা হল। ভারত তো ১৯৪৭ সালের আগে অখণ্ডই ছিল। কিন্তু কেন ভাঙ্গার প্রয়োজন দেখা দিল? ২৩ বছরেও এ প্রশ্নটির জবাব দেয়া হয়নি। বাংলাদেশের ছাত্ররা দেশে বিদেশে কত জীবজন্তু, লতা-পাতা, কবিতা-পুথির উপর গবেষণা করে, পিএইচডি ডিগ্রিও নেয়। কিন্তু অখণ্ড ভারত ভেঙ্গে কেন পাকিস্তান সৃষ্টি হল তা নিয়ে কোন গবেষণা করা হয়নি। তেমন কোন বইও লেখা হয়নি। আজ যে অখণ্ড ভারতের কথা বলা হচেছ এবং যেভাবে বাঙালী মুসলমানের মনে বাড়ছে অখণ্ড ভারতের মোহ, সেটি কখনই এতটা প্রতিষ্ঠা পেত না যদি সে সময় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা নিয়ে ছাত্রদের প্রকৃত ইতিহাস জানানো হত।রাতের অন্ধকারে সুবিধা হয় চোর-ডাকাত-দুর্বিত্তদের, তেমনি অজ্ঞতায় মহা সুবিধা পায় বিদেশী শত্রুরা। তখন জনপ্রিয়তা পায় তাদের ধোকাপূর্ণ বুলি এবং ক্ষতিকর ধ্যান-ধারণা। অখণ্ড ভারতের মোহ তো সে কারেণই বাড়ছে। ইসলামে অজ্ঞ থাকা তাই কবীরা গুনাহ।

“পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা না হলেই ভাল হত। অখণ্ড ভারতে মুসলমানরা মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক হত -এ বিশাল জনসংখ্যা শক্তিশালী মুসলিম শক্তির জন্ম ঘটাতো।” এরূপ নানা প্রশ্ন অনেকের। তাদের জিজ্ঞাসা,“পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় মুসলমানদের কোন কল্যাণটি হয়েছে?” কিন্তু প্রশ্ন হল,অখণ্ড ভারতে বসবাস হলে কি উপমহাদেশের মুসলমানগণ সত্যই শক্তিশালী হত? ভারতে বসবাসকারি প্রায় ২০ কোটি মুসলমানেরই বা কোন কল্যাণটি হয়েছে? বাংলাদেশে বা পাকিস্তানে যত মুসলমানের বাস তার চেয়ে বেশী মুসলমানের বাস ভারতে। কিন্তু ভারতে বসবাসরত মুসলমানদের শক্তি কতটা বেড়েছে? বরং বঞ্চনা সেখানে সর্বত্র।প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ভারতের সংখ্যালঘুদের প্রকৃত অবস্থা জানার জন্য কিছু বছর আগে একটি তদন্ত কমিশন ঘটনা করেছিলেন। সে তদন্ত কমিশনের রিপোর্টে যে তথ্যগুলো বেরিয়ে এসেছে তা করুণ। শিক্ষা ও চাকুরিতে মুসলমানদের অবস্থা ভারতের অচ্ছুত নমশুদ্রদের চেয়েও খারাপ। ১৯৪৭য়ে ভারতের মুসলমানদের যে অবস্থা ছিল তা থেকে তারা অনেক নিচে নেমেছে। অর্থনৈতিক বঞ্চনার পাশাপাশি তারা নিয়মিত মারা যাচ্ছে এবং লুটপাঠ ও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে মুসলিম-বিরোধী দাঙ্গায়। ভারতীয় জনসংখ্যার শতকরা প্রায় ১৫ ভাগ মুসলমান হলেও চাকুরিতে তাদের সংখ্যা শতকরা ৫ ভাগও নয়। পাকিস্তানের ব্যর্থতা অনেক। তবে দেশটির অর্জন কি এতই তুচ্ছ? পাকিস্তানের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালগুলিতে যত মুসলিম ছাত্র-ছাত্রী পড়াশুনা করে ভারতে মুসলিম ছাত্রদের সংখ্যা তার ৫০ ভাগের এক ভাগও নয়। অথচ একটি দেশের মানুষ কতটা সামনে এগুচ্ছে বা কীরূপ বুদ্ধিবৃত্তিক ও অর্থনৈতিক শক্তিসঞ্চয় করছে তা পরিমাপের একটি নির্ভরযোগ্য মাপকাঠি হল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংখ্যা। ভারতীয় মুসলমানদের মাঝে চাকুরিজীবী প্রফেশনালদের সংখ্যাও অনি নগন্য। পাকিস্তানের একমাত্র করাচী শহরে যত ডাক্তার, শিক্ষক, প্রকৌশলী,আইনবিদ,প্রফেসর, বিজ্ঞানী ও সামরিক অফিসারের বসবাস সমগ্র ভারতে মুসলমানদের মাঝে তা নেই। তাছাড়া পাকিস্তানে যতজন পারমাণবিক বিজ্ঞানী বা পদার্থ বিজ্ঞানীর বসবাস তা ভারতীয় মুসলমানের মাঝে দূরে থাক, ৫০টির বেশী মুসলিম দেশের মধ্যে আর কোন দেশেই নাই। সম্প্রতি ব্রিটিশ পত্রিকায় প্রকাশ, পাকিস্তানের আনবিক বোমার সংখ্যা ফ্রান্সের প্রায় সমকক্ষ। সমগ্র মুসলিম বিশ্বে একমাত্র তাদের হাতেই রয়েছে আনবিক বোমাধারি দূরপাল্লার মিজাইল যা ভারতীয় প্রযুক্তির চেয়ে অগ্রসর। একাত্তর থেকে পাকিস্তানে তাই অনেক সামনে এগিয়েছে। দেশটি আজও বেঁচে আছে সে সামরিক শক্তির জোরেই। নইলে ভারত ইতিমধ্যে আরো কয়েক টুকরোয় বিভক্ত করে ফেলতো। একাত্তরের পর ভারতীয় র’ সেটির পরিকল্পনাও এঁটেছিল। ভারতীয় সাংবাদিক অশোক রায়না তার বই “Inside RAW”য়ে সে বিষয়ে বিস্তর বিবরণ তুলে ধরেছেন।সামরিক শক্তির বিচারে পাকিস্তানই হল সমগ্র মুসলিম বিশ্বে সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ। আর এ কারণেই দেশটি তার জন্ম থেকেই সকল আন্তর্জাতিক ইসলাম-বিরোধী শক্তির টার্গেট। অখণ্ড ভারতে বসবাস করলে মুসলমানদের কি এরূপ শক্তি সঞ্চয়ের সুযোগ মিলতো? শক্তি সঞ্চয়ের জন্য তো নিজের পায়ের তলায় মাটি চাই, স্বাধীনতাও চাই। ভারতের মুসলমানদের কি সেটি আছে? বন্দীদের সংখ্যা জেলে যতই বৃদ্ধি পাক তাতে কি তাদের শক্তি বাড়ে?

বীজ সব জায়গায় গজায় না,বেড়েও উঠে না।বনেজঙ্গলে পড়লে গজালেও বেড়ে উঠে না। ভারতে মুসলিম প্রতিভা যে নাই তা নয়। প্রতিটি শিশুরই থাকে বিপুল সম্ভাবনা। কিন্তু ভারতে মুসলিম শিশুর বেড়ে উঠার অনুকূল পরিবেশই নাই। হিজরত এজন্যই ইসলামে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। মক্কার বন্দী জীবন ছেড়ে হিজরত এজন্যই আল্লাহপাক ফরয করেছিলেন। হিজরতের মাধ্যমেই তাঁরা সেদিন পেয়েছিলেন উর্বর ভূমিতে গিয়ে নিজ প্রতিভা নিয়ে বেড়ে উঠার সামর্থ। এর ফলে পেয়েছিলেন শক্তিশালী সভ্যতার নির্মান ও বিশ্বশক্তি রূপে মাথা তুলে দাঁড়ানোর সামর্থ। সাতচল্লিশের পর ভারত থেকে লক্ষ লক্ষ মুসলমান ভারত থেকে হিযরত করে পাকিস্তান গিয়েছিলেন এমন এক চেতনায়। তাছাড়া পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা অনর্থক গণ্য হলে শুধু পাকিস্তান নয়, স্বাংধীন বাংলাদেশের প্রয়োজনীতাও অনর্থক হয়ে দাঁড়ায়। তাই পাকিস্তানের সৃষ্টিকে অনর্থক বা অনাসৃষ্টি বলা বাংলাদেশের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে এক ভয়ংকর চিন্তা। বাংলাদেশ তার সমগ্র মানচিত্রটা পেয়েছে মূলত পাকিস্তান থেকে। বাংলাদেশীলা একাত্তরে বা তার পরে এ একইঞ্চি ভূমিও এ মানচিত্রে বাড়ায়নি। তাই বাংলাদেশী মুসলমানদের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল ১৯৪৭য়ে অর্জিত স্বাধীনতা। ১৯৭১য়ে এসে পাকিস্তান থেকে শুধু বিচ্ছিনতা জুটেছে, স্বাধীনতা নয়। ১৯৭১য়ের ১৬ই ডিসেম্বরকে স্বাধীনতা দিবস বললে তার পূর্বের পাকিস্তানী ২৩ বছরকে উপনিবেশিক বিদেশী শাসন বলে প্রমাণিত করতে হবে। কিন্তু সে পাকিস্তানী আমলকে উপনিবেশিক বিদেশী শাসনামল বললে কায়েদে আযমের মৃত্যুর পর ঢাকার খাজা নাযিম উদ্দিন পাকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধান হন কি করে? বগুড়ার মহম্মদ আলী এবং আওয়ামী লীগের সোহরোয়ার্দী প্রধানমন্ত্রীই বা হন কি করে? মিথ্যা কথায় হিসাব মিলানো যায় না। মিথ্যা কথা বলায় আওয়ামী লীগের নিদারুণ দায়বদ্ধতা আছে। সে দায়বদ্ধতা নিজেদের কৃত অপরাধকে গৌরবময় করার স্বার্থে। আরো দায়বদ্ধতা হল ভারতের আগ্রাসী চরিত্রকে আড়াল করার। কিন্তু যারা আওয়ামী লীগের সে অপরাধের সাথে জড়িত নয় এবং লিপ্ত নয় ভারতের লেজুড়বৃত্তিতে, অন্তত তাদের তো সত্য কথাগুলো নির্ভয়ে বলা উচিত।

বরং একাত্তরে যেটি জুটেছে সেটি হল, ভারতীয় প্রভাব বলয়ে প্রবেশ। ১৯৭১য়ের পর থেকে ভারত বাংলাদেশকে গণ্য করে তার প্রতিরক্ষা সীমানার অন্তভূক্ত একটি দেশ। যেমন হায়দারাবাদেরর নিযামের রাজ্য গন্য হত উপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকদের কাছে। হায়দারাবাদের নিযাম সে আমলে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি ছিলেন। অথচ ব্রিটিশ সরকার তাঁকে নিজদেশের প্রতিরক্ষায় দূরপাল্লার একখানি কামানও কিনতে দেয়নি। দেশটির মধ্য দিয়ে ট্রানজিট নিতে জালের মত রেল লাইন বসিয়েছিল। তাই ১৯৪৮ সালে ভারত-ভূক্ত করতে ভারতকে একটি বুলেটও ছুড়তে হয়নি। এক দুর্বল আশ্রিত রাষ্ট্রের অবকাঠামো ব্রিটিশেরা পূর্ব থেকেই সেদেশে নির্মান করে গিয়েছিল। বাংলাদেশেও তেমনি এক অবকাঠামো নির্মান করছে ভারত ও তার বাংলাদেশী সহযোগীরা। সেটি যেমন বুদ্ধিবৃত্তিক, তেমনি সাংস্কৃতিক ও সামরিক। একমাত্র অজ্ঞতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক মহাবিভ্রাটই এ বাস্তব অবস্থাটিকে ভুলিয়ে দিতে পারে। অথচ বাংলাদেশের ভারতপন্থিরা সে বুদ্ধিবৃত্তিক বিভ্রাটই বাড়িয়ে চলেছে। আর সে অজ্ঞতা ও বিভ্রাটের কারণেই ভারতের জালে আটকা বন্দীদশা নিয়েও আজ  ভারতপন্থি মহলে হচ্ছে মহাউৎসব।

 

জিন্নাহ নিয়ে বিতর্ক ও সাতচল্লিশের প্রজ্ঞা

পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাকে যেসব ইসলামপন্থি বা খেলাফতপন্থিরা বিরোধীতা করেন তারা সেটির পক্ষে দলিল খাড়া করতে গিয়ে বলেন, “কায়েদে আযম মুহম্মদ আলী জিন্নাহ ইসলামে নিষ্ঠাবান ছিলেন না।” কিন্তু কথা হল, আদালতে মামলা লড়তে গিয়ে কেউ কি উকিলের ধর্মজ্ঞানের খোঁজ নেন? বরং তাঁর উকালতির যোগ্যতা দেখেন। দেখেন, তিনি তাঁর মামলাটি জিতে দিতে পারবেন কিনা। ১৯৪৭য়ে ভারতীয় মুসলমানদের সামনে লক্ষ্য খেলাফত প্রতিষ্ঠা ছিল না,শরিয়তের প্রতিষ্ঠাও ছিল না। বরং ছিল এমন একটি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা যেখানে তারা স্বাধীন ভাবে বাঁচবার সুযোগ পাবে। সুযোগ পাবে ভবিষ্যতে সে দেশটিকে ইসলামের দুর্গ রূপে গড়ে তোলার। সে সময় প্রয়োজন ছিল ভারতীয় মুসলমানদের ঐক্য;সে সাথে প্রয়োজন ছিল এমন একজন নেতার যিনি সে ঐক্য গড়ে তোলার যোগ্যতা রাখেন। আরো প্রয়োজন ছিল, স্বাধীন পাকিস্তানের সে কেসটি ব্রিটিশ শাসকদের দরবারে বুদ্ধিমত্তার সাথে পেশ করার। ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়াটি বেওকুপি। প্রথমে স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা, তারপর সেটির ইসলামীকরণ। তথন শরিয়ত বা খেলাফত প্রতিষ্ঠার দাবী তুললে সেটির বিরুদ্ধে প্রবল বিরোধীতা আসতো ভারতীয় হিন্দুদের পক্ষ থেকে নয়, বরং ব্রিটিশের পক্ষ থেকে। যে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ উসমানিয়া খেলাফতকে ধ্বংস করলো তাদের শাসনাধীনে থেকে খেলাফত প্রতিষ্ঠার দাবী তুললে সেটি কি তারা মেনে নিত? তখন বরং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রকল্পই নর্দমায় গিয়ে পড়তো।

ব্রিটিশের আদালতে ভারতের মুসলমানদের মামলাটি কে সুন্দর ভাবে পেশ করতে পারবে সে প্রশ্নটি সেদিন অতি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তখন মুসলিম লীগ ছিল বহু ভাগে বিভক্ত। মুসলিম নেতাদের মাঝে তখন প্রতিটি প্রদেশে চলছিল প্রচণ্ড বিবাদ। বাংলায় ফজলুল হকের মত নেতা নিছক ক্ষমতার লোভে জোট বেঁধেছিলেনে হিন্দু মহাসভার মত প্রচণ্ড মুসলিম বিদ্বেষীদের সাথে,গড়েছিলেন শ্যামা-হক কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা। সবচেয়ে বেশী মুসলমানের বাস ছিল বাংলায়। কিন্তু তাঁরা সমগ্র ভারতের মুসলমানদের কি নেতৃত্ব দিবে,নিজেরাই লিপ্ত ছিল প্রচণ্ড কলহবিবাদে। ভারতের ইতিহাসে তখন ক্রান্তিলগ্ন। আগামী বহু শত বছরের জন্য তখন ভারতের নতুন ভৌগলিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নির্মিত হতে যাচ্ছে। কোন জাতিকে এমন  মুহুর্তের জন্য শত শত বছর অপেক্ষা করতে হয়। ব্রিটিশেরা তখন সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা ভারতের শাসনভার ভারতীয়দের হাতে ছেড়ে দিয়ে চলে যাবে। যদি ভারত সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের হাতে যায় তবে মহা বিপর্যয় নেমে আসবে ভারতের মুসলমানদের উপর। সংখ্যাগরিষ্ঠতার বলে তারা তখন যা ইচ্ছে তাই করার সুযোগ পাবে। এমনটি হলে মুসলমানদের জন্য তখন শুধু মনিব বদল ঘটবে, স্বাধীনতা আসবে না। বাংলার মুসলমানরা হিন্দু-মানস ও হিন্দু জমিদারদের নির্মম অত্যাচার ও শোষণ দেখেছে নিজ চোখে এবং নিজ ঘরের আঙিনায়। সেটির বিরুদ্ধে তবুও ব্রিটিশ আদালতে অভিযোগ তোলা যেত। কিন্তু সমগ্র ভারতের শাসন যদি হিন্দুদের হাতে যায় তখন দুর্বিসহ এক মহাবিপর্যয় নেমে আসবে ভারতীয় মুসলমানদের জীবনে। তাই হিন্দুদের হাতে রাষ্ট্রের শাসনভার গেলে তার পরিনতি যে ভয়াবহ হবে তা নিয়ে বাঙালী মুসলমানদের মধ্যে সামান্যতম সংশয়ও ছিল না। বাংলার মুসলমানদের মাঝে শিক্ষার হার তখন শতকরা ৭ ভাগও ছিল না। কিন্তু সে নিরক্ষরতা সত্বেও হিন্দু শাসনের ভয়ানক ভবিষ্যৎ আলামত টের পেতে ভূল করেনি। তাই গান্ধি বা নেহেরুকে তারা বন্ধু রূপে গ্রহণ করেননি। অথচ বাংলাদেশে আজ  বহু শত প্রফেসর, বহু বিচারপতি, বহু হাজার আইনজীবী, রাজনৈতিক নেতা ও বুদ্ধিজীবী। ১৯৪৭য়ে এদের সংখ্যা আজকের তুলনায় শত ভাগের এক ভাগও ছিল না। কিন্তু আজকের এ ডিগ্রিধারিরা যে কাণ্ডজ্ঞানের পরিচয় দিচ্ছেন বাংলার নিরক্ষর গ্রামীন জনগণ ১৯৪৭ সালে তার চেয়ে অধিক কাণ্ডজ্ঞানের পরিচয় দিয়েছিলেন। কাণ্ডজ্ঞান আসে বিবেকের সুস্থ্যতা, চিন্তাভাবনার সামর্থ, বাস্তব অভিজ্ঞতা ও নৈতিক সততা থেকে। নিছক সার্টিফিকেট থেকে নয়। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে না গিয়েও নবীজী (সাঃ)র সাহাবাগণ ছিলেন মুসলিম ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী। বিশ্ববিদ্যালয়ের কুশিক্ষা বরং মনের সে মহৎগুলো ধ্বংসও করে দিতে পারে। বাংলাদেশের আজকের শিক্ষাব্যবস্থা তো সে ধ্বংস প্রক্রিয়াকেই প্রকট ভাবে বাড়িয়েছে। দুর্নীতিগ্রস্ত বাংলাদেশ তো মূলত তাদেরই নিজ হাতের সৃষ্টি।

১৯৪৭ সালে বাংলার নিরক্ষর মানুষগুলো সেদিন তারা ভাষা ও আঞ্চলিক ক্ষুদ্রতার উর্ধ্বে উঠে এক অবাঙালী জিন্নাহকে নিজেদের নেতা রূপে গ্রহণ করেছিলেন, কোন ভারতীয় সেবাদাসকে নয়। গণতন্ত্রের হত্যাকারি কোন ফাসিষ্ট নেতাকেও নয়। এ এক অপূর্ব বিচক্ষণতা। নইলে সেদিন পাকিস্তানই প্রতিষ্ঠা পেত না।জনাব জিন্নাহ ছিলেন সর্বভারতে অন্যতম সেরা আইনজীবী। তাঁর ছিল মুসলিম স্বার্থের প্রতি অটুট অঙ্গিকার। সে অঙ্গিকারটি যখন তিনি কংগ্রেস করতেন তখনও দেখিয়েছেন। মুসলিম স্বার্থের সুরক্ষায় তিনিই ১৪ দফা পেশ করেছিলেন। মহান দার্শনিক আল্লামা ইকবালের দৃষ্টিতে জিন্নাহর সে গুণটি ধরা পড়েছিল বলেই তিনি তাঁকে ভারতের বিপর্যস্ত মুসলমানদের নেতৃত্বের দায়ভার নিতে অনুরোধ করেছিলেন। এ বিষয়টি হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী (রহঃ)ও বুঝতেন। তিনিও কংগ্রেসপন্থি জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের বিরোধীতার মুখে জিন্নাহর প্রতি সমর্থন দেয়ার জন্য ভারতীয় মুসলমানদের প্রতি আহবান জানিয়েছিলেন। সে সময় তাঁর মত সুন্দর করে ও বলিষ্ঠ ভাবে আর কে মুসলমানদের দাবীটি উত্থান করতে পেরেছিলেন? অখণ্ড ভারতপন্থিরা জিন্নাহর বিরোধীতা করবে সেটি স্বাভাবিক। কারণ সেটি তাদের রাজনীতির মূল বিষয়। ভারতের মদদপুষ্ট বাঙালীবাদীরাও তাঁকে ঘৃনা করবে সেটিও স্বাভাবিক। সেটি রাজনীতির বিষয় তাদের কাছেও। কিন্তু যারা ভারতীয় মুসলমানদের স্বাধীনতা ও কল্যাণ দেখতে চান তারাও কি জিন্নাহর মহান অবদানকে অস্বীকার করতে পারেন? তার নেতৃত্বেই গড়ে উঠে ছিল বিশ্বের সর্ব বৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র। তিনিই কি একমাত্র নেতা যিনি ভারতের সূন্নী-শিয়া, দেওবন্দী-বেরেলভী, বাঙালী-বিহারী, পাঞ্জাবী-পাঠান, সিন্ধি-বেলুচ তথা নানা ফেরকা ও নানা ভাষার মুসলমানদের একত্রিত করতে পেরেছিলেন। এটি ছিল এক বিশাল কাজ। একাজটি অন্য আর কার হাতে হয়েছে? কার হাতেই বা হওয়ার সম্ভাবনা ছিল? বহু নেতা ও বহু আলেম এমন মহান কাজে উদ্যোগ নেয়া দূরে থাক, আগ্রহ পর্যন্ত দেখাননি। ব্যস্ত থেকেছেন নিজেদের মাদ্রাসা বা হুজরা নিয়ে। সমগ্র ভারতের মুসলমানদের একতাবদ্ধ করা দূরে থাক, অধিকাংশ নেতা বা আলেমগণ তো নিজ ফেরকা¸ নিজ মজহাব বা নিজ প্রদেশের মুসলমানদের একতাবদ্ধ করার ক্ষেত্রেও তেমন যোগ্যতাই দেখাতে পারেননি। বরং ফেরকা ও মজহাবের নামে বাড়িয়েছেন বিভক্তি ও বিভেদ। অথচ বিভক্তি ও বিভেদ গড়া হারাম।

 

খাঁচার জীবন ও স্বপ্ন দেখার সামর্থ

খাঁচার পাখি বাসা বাঁধার চিন্তা করে না। খাবার খোঁজার চিন্তাও করে না। খাঁচার বন্দীদশায় সে সামর্থ থাকে না। ফলে সে ভাবনাও থাকে না। কিন্তু খাঁচার বাইরের স্বাধীন পাখিকে সে ভাবনা প্রতিমূহুর্তে করতে হয়। মুসলমান রাষ্ট্র গড়ে এজন্য নয় যে, সেখানে সে শুধু ঘর বাঁধবে, সন্তান পালন করবে ও ব্যবসা-বাণিজ্য করবে। বরং তাঁর দায়-ভার আরো বিশাল। সেটি ইসলামী রাষ্ট্র গড়া এবং সে রাষ্ট্রে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা করা। ঈমানদার হওয়ার এটিই তো মূল দায়ভার। এ দায়ভার পালন করতে গিয়েই মুসলমানগণ নিজ মাতৃভূমি থেকে হিজরত করে মদিনায় গিয়েছিলেন। এবং নিজ অর্থ, নিজ শ্রম ও নিজ রক্তের বিণিয়োগ ঘটিয়েছিলেন। নবীজী (সাঃ)র আমলে শতকরা ৬০ ভাগের বেশী সাহাবী শহীদ হয়েছেন সে দায়ভার পালনে। খাঁচার বন্দিদশা সিংহকে যেমন শিকার ধরার দায়ভার থেকে দূরে রাখে, তেমনি অমুসলিম দেশের বন্দিদশী মুসলমানকে ভুলিয়ে দেয় শরিয়ত প্রতিষ্ঠার দায়ভার। কেড়ে নেয় ইসলামী সমাজ ও সভ্যতার নির্মানের সামর্থ। তাই কোন অমুসলিমের দেশে ও অমুসলমানদের শাসনাধীনে শরিয়ত বা ইসলামী সভ্যতার প্রতিষ্ঠা ঘটেছে ইতিহাসে তার নজির নেই। তাই ব্রিটিশ ভারতের মুলমানরা সে পরাধীনতার দিনে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্টা দূরে থাক, তার স্বপ্নও দেখতে পারিনি। সে স্বপ্ন যেমন হোসেন আহম্মদ মাদানীর ন্যায় দেওবন্দি আলেমগণ দেখতে পারিনি, তেমনি মাওলানা মওদূদীও দেখতে পারিনি। তাবলিগ জামায়াতের মাওলানা ইলিয়াসও দেখতে পারেননি। তারা বড় জোর মসজিদ-মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা, বই লেখা, পত্রিকা প্রকাশ করা বা ওয়াজ-নসিহতের আয়োজন করতে পারতেন। কিন্তু  ইসলামের মিশন বা নবীজী (সাঃ)র সূন্নত শুধু এগুলো নয়। খাঁচার পরাধীনতার সবচেয়ে বড় কুফল হল, স্বাধীন জীবনের সে সাধই কেড়ে নেয়। কেড়ে নেয় লড়বার আগ্রহ। আনে স্থবিরতা। খাঁচার বাঘকে তাই ছেড়ে দিলেও সে খাঁচা ছেড়ে সহজে বেড়িয়ে আসতে চায় না। তাই যখন উপমহাদেশ থেকে ব্রিটিশের খাঁচা ভেঙ্গে বেরিয়ে আসার দিন ঘনিয়ে এল তখনও দেওবন্দী ওলামাদের অনেকে স্বাধীন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাকে মেনে নিতে পারিনি। তারা শুধু পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠার বিরোধীতাই করেনি, বরং হিন্দুদের অধীনে আরেক খাঁচায় ঢুকাটিকেই শ্রেয়তর মনে করলো। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠার পর সবচেয়ে বড় ফায়দাটি হল, ১৯৪৭য়ের ১৪ই আগষ্টের পর দেশটির বিশাল মূসলিম জনগোষ্ঠির স্বপ্নই পাল্টে গেল। ফলে যেসব দেওবন্দী আলেম বা জামায়াতে ইসলামীর যে সব নেতৃবৃন্দ পাকিস্তানে হিজরত করলেন তারা তখন স্বপ্ন দেখা শুরু করলেন ইসলামী রাষ্ট্র নির্মানের। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার এ হল প্রথম এবং সবচেযে বড় সুফল। দীর্ঘ গোলামী জীবনের পার এল এক মহা সুযোগ। জামায়াতে ইসলামের নেতারা তখন ব্রিটিশ শাসনাধীন গোলামী জীবনের দলীয় গঠনতন্ত্র তাড়াতাড়ি পাল্টিয়ে ফেললেন। সিদ্ধান্ত নিলেন পাকিস্তানের রাজনীতিতে অংশ নেয়ার এবং পাকিস্তানকে একটি ইসলামী রাষ্ট্র রূপে গড়ে তোলার। অপর দিকে ভারতের জামায়াত বা জমিয়তে উলামা হিন্দের অবস্থা? তারা এখনও কিছু মাদ্রাসা-মসজিদ গড়া, বই লেখা, ওয়াজ মহফিল করা নিয়ে ব্যস্ত। এর বাইরে স্বপ্ন দেখার সামর্থও তাদের সামান্য।

 

পাশ্চাত্যের পাকিস্তানভীতি?

কোনটি খাঁচার পাখি আর কোনটি বনের পাখি সেটি বুঝতেও বেশী বিদ্যাবুদ্ধি লাগে না। তেমনি কে স্বাধীন দেশের মুসলমান আর কে পরাধীন দেশের মুসলমান সেটিও বুঝতে বেগ পেতে হয় না। উভয়ের মাঝের ভিন্নতাটি দেহের নয়, পোষাক-পরিচ্ছদ বা খাদ্যের নয়, বরং চেতনার এবং সামর্থের। পাকিস্তান নিয়ে মার্কিনী সাম্রাজ্যবাদী মহল ও তার দোসররা বড় চিন্তিত। অথচ তাদের সে চিন্তা ভারতীয় মুসলমানদের নিয়ে নেই। খাঁচার বাঘকে নিয়ে কি কেউ চিন্তা করে? যত ভয় তো বনের মূক্ত বাঘকে নিয়ে। ফলে ইসলামের শত্রু পক্ষের চিন্তার কারণ, পাকিস্তানে জিহাদী চেতনা নিয়ে বেড়ে উঠা বিপুল সংখ্যক মানুষকে নিয়ে। তাদের সামর্থ তারা দেখেছে আফগানিস্তানের জিহাদে। আফগান মোজাহিদদের সাথে নিয়ে তারাই সোভিয়েত রাশিয়াকে পরাস্ত করে ছেড়েছে। তারাই গড়ে তুলেছিল আন্তর্জাতিক জিহাদ। সে লড়াইয়ে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করেছে অন্যান্য দেশের মুসলমানদের। তারই ফলে হাজার হাজার মুসলমান ছুটে এসেছে সূদুর আল-জিরিয়া, সৌদি আরব, মিশর, লিবিয়া, জর্দান, সিরিয়া থেকে। এটি ছিল এমন এক নিরেট জিহাদ যা নিয়ে কারো কোন সন্দেহ ছিল না। জিহাদটি ছিল সোভিয়েত নেতৃত্বাধীন কম্যিউনিষ্ট কাফের কোয়ালিশনের বিরুদ্ধে সম্মিলিত মুসলমানদের। কিন্তু প্রশ্ন হল, ক’জন ভারতীয় সে জিহাদে যোগ দিয়েছে? অথচ ভারত আলজিরিয়া, মিশর বা সৌদি আরবের ন্যায় আফগানিস্তান থেকে দূরের দেশ নয়। কিন্তু ভারত থেকে কেউ আসেনি। খাঁচায় বন্দী মানুষ সামনে মানুষ খুন হতে দেখেও তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা করে না। কারণ সে সামর্থও তাঁর থাকে না। ফলে কোন সাধারণ ভারতীয় মুসলমান দূরে থাক সেদেশের কোন বিখ্যাত আলেমের মাঝেও সে জিহাদী চেতনা জাগেনি। অথচ বহু হাজার সাধারণ পাকিস্তানীরা সে জিহাদে শহিদ হয়েছেন। শহিদ হয়েছেন এমনকি সেদেশের প্রেসিডেন্ট জেয়াউল হক। তাদের সে রক্ত ও কোরবানীর বরকতেই দুনিয়ার মানচিত্র থেকে সোভিয়েত রাশিয়া বিলুপ্ত হয়েছে। অথচ এর আগেও সোভিয়েত রাশিয়া হাঙ্গেরী ও চেকোস্লাভাকিয়ায় সামরিক আগ্রাসন চালিয়েছিল। দেশ দুটিকে দখলও করেছিল। কিন্তু সে সময় সোভিয়েত রাশিয়ার গায়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা বিপুল বিণিয়োগ সত্ত্বেও একটি আঁচড়ও কি কাটতে পেরেছে? কারণ সেখানে বহু মিত্র দেশ থাকলেও পাকিস্তান ছিল না।

পাকিস্তানের মাদ্রাসাগুলোতে যে ইসলামের চর্চা হয় সেখানে নামায-রোযা, হজ-যাকাতের পাশাপাশি জিহাদ আছে। শরিয়তের প্রতিষ্ঠার তাগিদও আছে। আর সে ইসলামী জ্ঞান চর্চায় যোগ দিচ্ছে বিশ্বের নানা দেশের যুবক। এখানেই মার্কিনীদের ভয়। তারা চায়, মুসলমানদের ইসলাম চর্চায় নামায-রোযা, হজ-যাকাত, বিয়ে-শাদী ও বিবি তালাকের মসলা থাকবে -সেটুকুই যথেষ্ট। কিন্তু শরিয়তের প্রতিষ্ঠা ও জিহাদ থাকবে এবং খেলাফতের প্রতিষ্ঠা থাকবে -সেটি হতে পারে না। ভারতে ব্রিটিশ শাসকরা তাদের দীর্ঘ শাসনামলে ইসলাম চর্চাকে এর বাইরে যেতে দেয়নি। মুসলমানদের স্বাধীন কোরআন চর্চাকে তারা মেনে নিতে পারে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা পাকিস্তানসহ সকল মুসলিম দেশের স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার সিলেবাসে সংশোধন আনতে চাপ দিচ্ছে। তারা জানে, জিহাদ থাকলে আগ্রাসী দেশের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধও থাকবে। জিহাদ শুরু হবে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা নিয়েও। শরিয়ত হল সেক্যিউলার আইন-আদালতের বিরুদ্ধে এক বিকল্প বিধান, এটি একটি বিকল্প মূল্যবোধ। অথচ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন পাশ্চাত্য তাদের আইন-আদালত ও মূল্যবোধের বিরুদ্ধে কোন বিকল্প বিধান মেনে নিতে চায় না। আফগানিস্তানে মার্কিনী হামলার মূল কারণ তো সেটাই। তারা বিশ্বটাকে একটি গ্লোবাল ভিলেজ মনে করে। চায়, সে গ্লোবাল ভিলেজে অভিন্ন পাশ্চাত্য মূল্যবোধ ও আাইনের প্রতিষ্ঠা। তাদের ব্যাভিচারী বা মদ্যপায়ী নাগরিকগণ কোন মুসলিম দেশে বেড়াতে গিয়ে শরিয়তি আইনের মুখে পড়ুক সেটি তারা মেনে নিতে পারেনা। মার্কিনীরা এজন্যই যে কোন দেশে ইসলামী শরিয়ত প্রতিষ্ঠার বিরোধী। তাদের অবস্থান তাই আল্লাহর বিরুদ্ধে। আর মার্কিনীরা যেটা পাকিস্তানে বা অন্যান্য মুসলিম দেশে চায়, ভারত সেটিই বাস্তবায়ন করছে তার খাঁচায় অন্তরীণ ভারতীয় মুসলমানদের উপর। ফলে ভারতীয় মুসলমানদের ইসলাম চর্চায় নামায-রোযা আছে, হজ-যাকাত এবং তাবলিগও আছে। কিন্তু শরিয়তের প্রতিষ্ঠার কোন ভাবনা নেই। জিহাদও নেই। ফলে এ এক অপূর্ণাঙ্গ ইসলাম। ভারত সরকার ইসলামের সে মডেলই আওয়ামী লীগারদের দিয়ে বাংলাদেশে বাস্তবায়ন করাতে চায়। বাংলাদেশের রাজপথে তাই শরিয়ত প্রতিষ্ঠার দাবী নিয়ে সড়কে মানুষ না নামলে কি হবে, লাগাতর বেড়ে চলেছে তাবলিগ জামাতের ইজতেমায় লোকের সমাগম। এটি ঠিক, পাকিস্তান আজও  একটি ইসলামী রাষ্ট্র রূপে প্রতিষ্ঠা পায়নি। তবে যা  প্রতিষ্ঠা পেয়েছে সেটিও কি বাংলাদেশে বা ভারতে কি ভাবা যায়? অন্য কোন মুসলিম দেশও কি এতটা এগিয়েছে। তুরস্কে তো মেয়েদের মাথায় উড়না পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে বা কর্মস্থলে যাওয়া নিষিদ্ধ। অপর দিকে ভারত? সেখানে মসজিদ বা মাদ্রাসা নির্মান করার সহজে অনুমতি মেলে না। ফলে দিল্লি, মোম্বাইয়ের ন্যায় অনেকে শহরে মানুষ জুম্মার নামায পড়ছে রাজপথে দাঁড়িয়ে। গরু কোরবানী নিষিদ্ধ করা হয়েছে বহু প্রদেশে। অনেক শহরে মাইকে আযানও দেওয়ার অনুমতিও নেই। এই হল ভারতীয় মুসলমানদের স্বাধীনতা।

পাকিস্তান প্রতিষ্টার কয়েক বছরের পর সমগ্র উলামা একত্রিত হয়ে ২২ দফা ইসলামী মূল নীতি অনুমোদন করে। আজও সেটি পাকিস্তানে শাসনতন্ত্রের মৌলিক অংশ যা ধাপে ধাপে শরিয়তের প্রতিষ্ঠাকে সরকারের উপর বাধ্যতামূলক করে রেখেছে। এবং অসম্ভব করে রখেছে শরিয়তের বিরুদ্ধে কোন আইন প্রণয়ন। ফলে পাকিস্তানে শরিয়ত পরিপূর্ণ ভাবে প্রতিষ্ঠিত না হলে কি হবে, সে সম্ভাবনা এখনও বিলুপ্ত হয়নি। প্রবর্তিত করেছে ব্লাফফেমী আইন।।আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে লিখলে বা বললে প্রাণদণ্ড হয়। অথচ ভারতে সেটি ভাবাও যায়। শরিয়তের প্রতিষ্ঠা নিয়ে স্বপ্নও দেখা যায় না। বিল্ডিং প্রতিষ্ঠা করতে হলে ভূমি চাই। পাকিস্তান মুসলমানদের জন্য সেই ভূমিটা দিয়েছে। তাই যতদিন পাকিস্তানে থাকবে সে সম্ভাবনাও থাকবে। অথচ বাংলাদেশে আজ শরিয়ত দূরে থাক, গঠনতন্ত্রে বিসমিল্লাহ রাখাই অসম্ভব হচ্ছে। অসম্ভব হয়েছে জিহাদের উপর বই প্রকাশ করা। জিহাদকে বলা হচ্ছে সন্ত্রাস। ইসলামী সংগঠনগুলোকে জিহাদী সংগঠন বলে তার নেতাদের জেলে ঢুকানো হচ্ছে। বাংলাদেশে প্রকৃত অবস্থা, রাজা যা করে সভাসদ করে শতগুণ। সভাসদরা নির্যাতনে বাড়াবাড়ি করে রাজার মন জুগানোর সার্থে। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা তাই ভারতীয়দের চেয়েও ভারতীয়। তারা ব্যস্ত ভারতীয় মনিবদের খুশি করা নিয়ে। ক্ষমতায় থাকার জন্য ভারতকে খুশি করাটিকে তারা অপরিহার্য মনে করে। তাই ভারতে হিজাব, ইসলামী সংগঠন বা ইসলাম চর্চার বিরুদ্ধে যা হচ্ছে, বাংলাদেশে হচ্ছে তার চেয়ে অনেক বেশী।

 

অরক্ষিত বাংলাদেশ

বাঘের পাল দ্বারা ঘেরাও হলে বিশাল হাতিও রেহাই পায় না। তাই যে জঙ্গলে বাঘের বাস সে জঙ্গলের হাতিরাও দল বেঁধে চলে। বাংলাদেশের বাস্তবতা হল, মুসলিম বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন এক দেশ। ঘেরাও হয়ে আছে আগ্রাসী হিন্দুদের দ্বারা। ফলে বাংলাদেশ এক অরক্ষিত দেশ। এদেশটির সীমাবদ্ধতা প্রচুর। যে কোন দেশের প্রতিরক্ষার খরচ বিশাল। আর ভারতের মত একটি বিশাল আগ্রাসী দেশের বিরুদ্ধে সে খরচ তো আরো বিশাল। এ বাস্তবতার দিকে খেয়াল রেখেই বাংলার তৎকালীন নেতা খাজা নাযিমউদ্দিন, সোহরোয়ার্দি, আকরাম খান প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগের পার্লামেন্টারী সভায় লোহোর প্রস্তাবে সংশোধনী এনেছিলেন এবং পাকিস্তানে যোগ দেবার পক্ষে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পূর্ব বাংলা এভাবেই পাকিস্তানে প্রবেশ করেছিল সেদেশের সবচেয়ে বড় প্রদেশে রূপে। অথচ এরূপ পাকিস্তানভূক্তিকেই আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা বলছে পাকিস্তানে উপনিবেশিক শাসন। নিরেট মিথ্যাচার আর কাকে বলে? কোন দেশে উপনিবেশিক শাসন গড়তে হলে যুদ্ধ লড়তে হয়। প্রয়োজন পড়ে মীর জাফরদের। প্রয়োজন পড়ে লর্ড ক্লাইভ ও পলাশির। প্রশ্ন হল, ১৯৪৭য়ে কে ছিল সেই মীর জাফর? কে ছিল ক্লাইভ? সে মীর জাফর কি ছিলেন সোহরোয়ার্দী? খাজা নাজিমুদ্দিন বা আকরাম খাঁ যারা বাংলাকে পাকিস্তান ভূক্ত করেছিলেন? আর উপনিবেশিক বাহিনীই বা কোথায়? মেজর জিয়া, মেজর সফিউল্লাহ, মেজর আব্দুল জলিল, মেজর খালিদ মোশার্রফ কি তবে সে উপনিবেশিক বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন? এটি এক নিরেট মিথ্যাচার।

১৯৪৭য়ে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠার পর দেশটির প্রধানতম সমস্যা ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার। সে সমস্যার সমাধানটি আদৌ বিভক্ত হওয়ার মধ্যে ছিল না। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেলে পাকিস্তানের বৃহত্তম প্রদেশ রূপে শুধু পাকিস্তানের রাজনীতিকে নয়, সমগ্র মুসলিম উম্মাহর রাজনীতিতে এবং সে সাথে বিশ্ব রাজনীতিতেও বাঙালী মুসলমানরা প্রভাব ফেলতে পারতো। কিন্তু শেখ মুজিব সে সুযোগ থেকেও তাদেরকে বঞ্চিত করেছেন। এটি তাঁর আরেক অপরাধ। তবে এক্ষেত্রে জনগণও নির্দোষ নয়। জনগণের অপরাধ, তারা নির্বাচিত করেছে গণতন্ত্র হত্যাকারি এক ফাসিস্টকে। শুধু যে ভোট দিয়েছে তা নয়, অর্থ এবং রক্তও দিয়েছে। সে সাথে পরম বন্ধু রূপে গ্রহণ করেছে ভারতীয়দের। অপর দিকে ভারতের মোহ শুধু একাত্তরে নয়, আজও  তা বেঁচে আছে সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে। সেটি গ্রাস করছে শুধু সেক্যিউলারদেরই নয়,বহু ইসলামপন্থিকেও। তাদের বিভ্রাট,ভারতের বিজয় এবং বাংলাদেশের উপর প্রতিষ্ঠিত ভারতের আধিপত্যকেও তারা নিজেদের বিজয় ও নিজেদের অর্জন বলে উৎসবও করছে। চিন্তা-চেতনার এ এক ভয়ানক আত্মঘাতি রূপ। রোগ না সারলে সেটি প্রতিদিন বাড়ে। তেমনি বাড়ে চেতনার রোগও। তাই যে রোগ এক সময় ভারতপন্থিদের ছিল সেটি এখন অন্যদেরও গ্রাস করছে। বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্বের বিরুদ্ধে এর চেয়ে ভয়ানক হুমকি আর কি হতে পারে? ০৭/০৬/২০১১