রাজনীতি যখন অপরাধের হাতিয়ার

একাকার অপরাধজগত ও রাজনীতি

ব্যক্তির ঈমান, বিবেক বা চেতনা দেখা যায় না। কিন্তু দেখা না গেলেও অজানা থাকে না। দেহের ত্রুটিকে পোষাকে ঢেকে রাখা গেলেও মনের রোগ লুকানো যায় না। সেটি দ্রুত প্রকাশ পায় ব্যক্তির কথা, কর্ম ও আচরনে। ধরা পড়ে ন্যায়কে ভালবাসা এবং অন্যায়কে ঘৃনা করার সামর্থের মধ্য দিয়ে। আল্লাহর আইনে মানুষ গুরুতর অপরাধি হয় ও জাহান্নামের যোগ্য হয় -শুধু মুর্তি পুজার কারণে নয়। আল্লাহর বিরুদ্ধে মানুষের এটাই একমাত্র গুরুতর অপরাধ নয়। বরং সবচেয় বড় অপরাধটি ঘটে আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বা অবাধ্যতার মধ্য দিয়ে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা তাদেরকে কাফের,জালেম ও ফাসেক বলে অভিহিত করে। সে অবাধ্যতার ঘটতে পারে “আমিরু বিল মারুফ ওয়া নেহী আনিল মুনকার” অর্থ “ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা করো এবং অন্যায়কে প্রতিহত করো” এ কোরআনী হুকুমের অমান্য করার মধ্য দিয়েও। মু’মিন শাসক তাই ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং অন্যায়ের প্রতিরোধে আপোষহীন হয়। ন্যায়-অন্যায়ের সে সংজ্ঞাটি আসে শরিয়ত থেকে। জনগণ ও সরকারের ঈমানদারি হলো সে শরিয়তের পূর্ণ প্রতিষ্ঠায়। একাজে নিষ্ঠা না থাকলে বুঝতে হবে,ভয়ানক রোগ আছে ঈমানদারিতে। বার বার হজ-ওমরাহ বা নামায-রোযার মধ্য দিয়ে মুসলিম সাজা যায়, কিন্তু প্রকৃত মুসলিম হওয়া যায় না। মুসলিম হওয়ার অর্থ তো, সর্বাবস্থায় মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিটি হুকুমের অনুগত হওয়া। এবং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায় নিষ্ঠাবান হওয়া। সে দায়ভার যেমন জনগণের, তেমনি সরকারের। বাংলাদেশের সরকারের পক্ষ থেকে মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে ভয়ানক বিদ্রোহ  ও গুরুতর অপরাধটি ঘটছে মূলতঃ এক্ষেত্রটিতে।

জঘন্য খুনি বা অপরাধী হওয়ার জন্য জরুরী নয় যে তাকে নিজ হাতে কাউকে খুন করতে হবে বা কোন অপরাধে জড়িত হতে হবে। স্বৈরাচারি ফিরাউন, হিটলার, শেখ মুজিব বা শেখ হাসিনা কাউকে নিজ হাতে কাউকে খুন করেছেন -সে প্রমাণ নেই। কিন্তু হাজার মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে তাদের শাসন আমলে। এরূপ শাসকগণের চরিত্র হলো, তারা শুধু শিরক, ব্যাভিচার, সূদ-ঘুষ ও নাস্তিকতাতেই বৃদ্ধি আনে না, দ্রুত প্রতিষ্ঠা বাড়ায় ভয়ানক অন্যায়েরও। তারা অসম্ভব করেন ন্যায় বিচারকে। বাংলাদেশে অহরহ সেটিই ঘটছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি কোন খুনের মামলা দ্রুত করার জন্য হুকুম দিয়েছেন সে প্রমান নেই, কিন্তু নাটোরের চাঞ্চল্যকর গামা হত্যা মামলায় ২০ ফাঁসির আসামিকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। ক্ষমা করে দিয়েছেন লক্ষ্মীপুরের অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম হত্যা মামলার ফাঁসির আসামি বিপ্লবকে। ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও আইনজীবী আবদুর রাজ্জাক হত্যা মামলার ফাঁসির আসামি উপজেলা ছাত্রলীগ সভাপতি আহসান হাবীব ওরফে টিটুকেও। 

অপরাধ বিচাররোধের

ডাকাত পাড়ায় কখনোই ডাকাতের বিচার বসে না। বরং ডাকাতির নৃশংসতা ডাকাতদের মাঝে প্রশংসিত হয়। সেখানে বরং নিরীহ মানুষের পকেটে হাত দেয়া হয়। তেমনি বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের সদস্যদের অপরাধ –তা যত ভয়ানকই হোক, তার নিয়ে বিচার বসেনা। অপরদিকে হাজার হাজার মামলা রুজু করে জেলে পাঠানো হয় হাজার হাজার বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মীদের। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের অপরাধীদের বিরুদ্ধে কয়েক হাজার মামলা করেছিল। সেগুলোও আদালতের মুখ দেখেনি, বরং ঢালাও ভাবে সেগুলো তুলে নেয়া হয়েছে। পুলিশ ও আদালত নিরপেক্ষ ভাবে কাজ করলে নিজদলীয় অপরাধীদের বিপদ। তাই অপরাধীদের দলীয় শাসন মজবুত করতে হলে অপরিহার্য হয় পুলিশ প্রশাসন  ও আদালতের গলায় রশি পড়ানো। এভাবে রুখতে হয় ন্যায়বিচারের। শেখ হাসীনা সেটি করেছেন তার পিতার দেখানো পথ ধরে। তিনি দেশের ৬৪টি জেলায় নিজ দলের প্রশাসক বসিয়েছেন যাতে তার দলের লোকেরা নিরাপত্তা পায়। তাই দেশে হাজার হাজার মানুষ খুণ হলে কিভাবে তাতে আওয়ামী লীগের কোন নেতার শাস্তি হয়নি। মুজিব আমলেও হয়নি। অথচ বহু স্থানে আাওয়ামী লীগ কর্মীরা বিরোধী দলীয় কর্মি ও নেতার খুণ ও গুম করার  সাথে জড়িত। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ কর্মীরা দিনের বেলায় অস্ত্র হাতে বিরোধীদের ধাওয়া করেছে। বহু ক্ষেত্রে হামলাকারিদের ছবিও পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। ।অথচ তাদের গ্রেফতারের জন্য পুলিশ তাদের পাড়ায় বা গৃহে একবারও তদন্তে যায়নি।

শেখ হাসিনা যখন ক্ষমতার বাইরে ছিলেন তখনও ন্যায় বিচারকে প্রতিহত করেছেন নানা ভাবে । আশির দশকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুইজন ছাত্রকে ছাত্রলীগ কর্মীরা নির্মম ভাবে হত্যা করেছিল। আদালতে তাদের বিচার হয়েছিল এবং শাস্তিও হয়েছিল। কিন্তু সে খুনের বিচার এবং খুনিদের সে শাস্তি তাঁর ভাল লাগেনি। এরশাদের সাথে যখন তাঁর প্রথম বৈঠক বসে তখন জিদ ধরেন, আলোচনার আগে শাস্তিপ্রাপ্তি খুনের আসামীদের মুক্তি দিতে হবে,নইলে কোন বৈঠক হবে না। তিনি যে ন্যায় বিচারের কতটা বিরোধী এবং খুনিদের মুক্ত করতে কতটা বদ্ধপরিকর -এ হলো তার নমুনা। দুর্বৃত্ত এরশাদেরও ন্যায়নীতি ও ন্যায়বিচারের প্রতি আগ্রহ ছিল না। তাঁর আগ্রহ ছিল শুধু নিজের গদীর দীর্ঘায়ু। তিনি ক্ষমতায় এসেছিলেন গণতন্ত্র হত্যার ন্যায় জঘন্য অপরাধ সংঘটিত করে। এমন অপরাধি কি খুনীর শাস্তিতে আপোষহীন হতে পারে? ফলে স্বৈরাচারি এরশাদ সেদিন শেখ হাসিনার দাবী মেনে নিয়ে খুনিদের মুক্তি দিয়েছিল। সে বিবরণ লিখেছেন সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী জনাব আতাউর  রহমান খান তাঁর স্মৃতিচারণ বইয়ে।

অপরাধীগণ শুধু ডাকাত পাড়ায় সীমাবদ্ধ থাকলে সমগ্র দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়না। কিন্তু তা দেশময় ছড়িয়ে পড়লে বিপন্ন হয় শান্তি-শৃঙ্খলা। আর সেটি ঘটে অপরাধীরা ক্ষমতায় গেলে। তখন দারোয়ান থেকে কর্তাব্যক্তি পর্যন্ত সমগ্র প্রশাসনই অপরাধী হয়ে উঠে। বাংলাদেশে সেটিই ঘটেছে। ফলে ডাকাতদের এখন আর দল গড়ে রাতের আঁধারে হাওর-বাওর, গ্রাম-গঞ্জ ঘুরে ডাকাতি করার ঝুকি নিতে হয় না। বরং তাতে থাকে গ্রামবাসীর প্রতিরোধে প্রাণনাশের সম্ভাবনা। তারা এখন আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগের সদস্য হয়ে দিন দুপুরে টেণ্ডার দখল করতে পারে। বনদখল, সরকারি জমি দখল, নদীদখল এবং চাঁদাবাজি করেও বিপুল অর্থ করতে পারে। এমন ডাকাতিতে যেমন অর্থলাভ প্রচুর, তেমনি সম্ভাবনা নেই প্রতিপক্ষের সামান্যতম প্রতিরোধের। বরং জুটে পুলিশ, র‌্যাব, সরকারি প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতাদের সার্বিক সমর্থন। সে সাথে বাড়ে রাজনৈতিক নেতা হওয়ার গৌরব। ফলে অপরাধী কাছে প্রবল আকর্ষন বাড়ছে এমন রাজনৈতিক পেশার। একারণেই পেশাদার অরাজনৈতিক ডাকাতদের সংখ্যা যেমন দিন দিন কমছে, তেমনি দ্রুত বেড়ে চলেছে রাজনৈতিক ডাকাতদের সংখ্যা। আর এভাবেই বাড়ছে দেশজুড়ে অপরাধীদের দখলদারি। অপরাধ জগৎ আর রাজনীতির জগৎ যেন একাকার হয়ে গেছে। ফলে সরকারি দলের কর্মীরা কোনরূপ ব্যবসা-বাণিজ্য বা চাকুরি না করেই বাড়ি-গাড়ি ও বিপুল অর্থের মালিক হচ্ছে।

 

লক্ষ্য পিতার রেকর্ড ভাঙ্গা

দৈনিক “আমার দেশ” য়ের পরিসংখ্যানঃ ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে মহাজোট ক্ষমতায় আসার পর তিন বছরে দেশে ১২ হাজারেরও বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। সে অনুযায়ী প্রতিদিন প্রায় ১১ জন করে খুন হয়েছেন। রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ৫৯২ জন এবং আহত হয়েছেন ৪০ হাজার ১৯০ জন। চলতি বছর ইউপি নির্বাচনী সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ৮৩ জন। তবে পুলিশ সদর দফতরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ১০ হাজার ৬শ’ উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০০৯ সালে ৪২১৯ জন ও ২০১০ সালে ৪৩১৫ জন। খুনসহ ডাকাতি, দুর্ধর্ষ চুরি, অপহরণ, নারী নির্যাতন, শিশু নির্যাতন, মাদক কেনাবেচাসহ ৫ লাখেরও বেশি অপরাধের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২০০৯ সালে ১ লাখ ৫৭ হাজার ১০৮টি, ২০১০ সালে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫৩৪টি ও চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে ১ লাখ ৩৭ হাজার অপরাধের ঘটনা ঘটে। গত তিন বছরে শুধু রাজধানী ঢাকায় ৫ হাজার ৫৭৬টি বেওয়ারিশ লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা অধিকার-এর তথ্য অনুযায়ী, সরকারের ২ বছর ১১ মাসে ৪ সাংবাদিক নিহত, ২৮০ সাংবাদিক আহত, ৮৮ জন লাঞ্ছিত ও ৯৫ জন হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন। পেশা গত দায়িত্ব পালনকালে ৪০ সাংবাদিকের ওপর হামলা, দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানসহ ৩ জনকে গ্রেফতার, ১ জন অপহৃত ও ২৬ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। 

দেশে যেভাবে হত্যা-গুম-সন্ত্রাস ও দূর্নীতি বাড়ছে তাতে মনে হয় শেখ হাসিনা গোঁ ধরেছেন তিনি তাঁর পিতার রেকর্ড ভাঙ্গবেনই। বাংলাদেশের অতীতের অন্যদলীয় যে কোন সরকার এ প্রতিযোগিতায় তার ধারে কাছেও আসতে পারবে না। তাঁর পিতার আমলে তিরিশ থেকে চল্লিশ হাজারের মত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল। গ্রেফতার হয়েছিল লক্ষাধিক মানুষ। হাজার হাজার মানুষকে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল। তবে যে হারে অপরাধ কাণ্ড চলছে তাতে শেখ হাসিনা আর দুই বছর ক্ষমতায় থাকলে নিজ পিতাকে অতিক্রম করে অপরাধ কর্মে রেকর্ড অতিক্রম করতে পারবেন। তবে অপরাধ জগতের একটি ক্ষেত্রে তিনি তাঁর পিতার রেকর্ডকে ইতিমধ্যে অতিক্রম করেছেন। সেটি শেয়ার বাজারের বিনাশ। তার পিতা শিয়ার বাজার বলতে কিছু গড়ে উঠতে দেননি। আর তিনি তার শাসনামলে দুইবার মড়ক লাগিয়েছেন। ১৯৯৬ সালে যখন প্রথম বার ক্ষমতায় এসেছিলেন, তখনও শেয়ার বাজারকে রশাতলে নিয়েছিলেন।

আদর্শঃ মুজিবের অপরাধের রাজনীতি                                                  
গণতান্ত্রিক শাসকের মূল কথা, নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হবে সংসদ। সে সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যগণ সরকার গঠন করবে। কিন্তু দেশের প্রশাসন ও আদালত কাজ করবে নিরপেক্ষ ভাবে। স্বৈরাচার থেকে গণতন্ত্রের এখানেই পার্থক্য। প্রশাসন ও আদালত -এ দুটি প্রতিষ্ঠানে সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হলে মৃত্যু ঘটে গণতন্ত্রের।  তখন প্রতিষ্ঠিত হয় দলীয় স্বৈরাচার। নির্বাচন তখন অর্থহীন হয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগের অপরাধ শুধু এ নয় যে, দলটির শাসনামলে দেশে হত্যা, গুম, সন্ত্রাস, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বৃদ্ধি পেয়েছিল। বরং গুরুতর অপরাধটি ঘটেছে গণতন্ত্র হত্যার মধ্য দিয়ে। গণতন্ত্র হত্যায় প্রতিপক্ষের নির্মূল সহজতর হয়। সহজতর হয় মানুষ হত্যা। স্বৈরাচারী শাসন অপরাধকর্মে যতটা আজাদী দেয়, গণতন্ত্র তা দেয় না। গণতন্ত্রে সরকারের দায়বদ্ধতা বাড়ে জনগণের কাছে। এমন ধরণের দায়বদ্ধতা নিয়ে শেখ মুজিবের কোন কালেই কোন আগ্রহ ছিল না। বাংলাদেশের ইতিহাসে শেখ মুজিব ও তার দলের অপরাধ বহু, তবে গুরুতর অপরাধ এই গণতন্ত্র হত্যা। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ আমলে যা ঘটেনি, পাকিস্তান আমলে যা ভাবা যায়নি, সেটিই ঘটেছে মুজিবামলে। পাকিস্তান আমলে মুজিব বহুবার জেলে গেছেন, কিন্তু কোনবারই তাঁকে ডাণ্ডাবেড়ি পড়ানো হয়নি। পুলিশী রিমাণ্ডে নিয়ে নির্যাতন করা হয়নি। কোন বারই তাকে লাশ হয়ে ফিরতে হয়নি। অথচ তাঁর উপর আগরতলা ষড়যন্ত্রের ন্যায় গুরুতর অভিযোগ ছিল। কিন্তু তার আমলে লাশ হয়ে ফিরেছেন শুধু মুসলিম লীগ নেতা ফজলুল কাদের চৌধুরি ও বামপন্থি সিরাজ শিকদারই নয়, বহু বহু হাজার রাজনৈতিক কর্মি।

ফ্যাসীবাদকে বুঝতে হলে বুঝতে হয় হিটলারকে। তেমনি আওয়ামী লীগের আজকের রাজনীতি বুঝতে হলে বুঝতে হবে শেখ মুজিবকে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আজ যা হচ্ছে তা মূলত মুজিবী আদর্শেরই বাস্তবায়ন। শেখ মুজিব নিজেকে গনতন্ত্রি বলে দাবী করতেন। কিন্তু সে গণতন্ত্রে অন্যদের প্রচার, দলগঠন ও  সভাসমিতি করার অধিকার ছিল না। তাদের উপর তিনি যে শুধু সরকারি পুলিশ বাহিনী লেলিয়ে দিয়েছেন তা নয়, সরকারি বাহিনীর সাথে একযোগে কাজ করে দলীয় গুণ্ডা বাহিনীও। পুলিশের সাথে তারাও অস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্যে রাজপথে নেমেছে। জনগণের রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নিয়েছিলেন একদলীয় বাকশালী সরকার গঠনের মাধ্যমে। তাঁর গণতন্ত্রে অন্যদের স্বাধীন ভাবে কথা বলা, লেখালেখি করা বা পত্রিকা বের করার অনুমতিও ছিল না। বন্ধ করেছিলেন সকল বিরোধী মতের পত্রিকা। সে গণতন্ত্রে  স্বাধীন আদালত ও প্রশাসন বলে কিছু ছিল না। প্রশাসন দখল করতে তিনি প্রতি জেলায় নিজ-দলীয় ব্যক্তিদের গভর্নর রূপে নিয়োগ দিয়েছিলেন। আদালত ও প্রশাসনকে ব্যবহার করেছেন দলীয় এজেণ্ডা বাস্তবায়নে। আদালত থেকে বিরোধী দলীয় নেতাদের জামিন পাওয়ার পথ বন্ধ করেছিলেন। তাঁর আমলে হাজার হাজার মানুষ বিনা বিচারে বছরের পর জেলে থেকেছেন, এবং আদালত অনেককে নিছক পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষ নেয়ায় দীর্ঘ কারাবাসের শাস্তি শুনিয়েছে। ইসলামের পক্ষ নেয়াও অপরাধ গণ্য হয়েছে।আর প্রকাশ্য রাজপথে ঘুরেছে আওয়ামী লীগ ও ছাত্র লীগের চিহ্নিত খুনিরা। আজও  আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আদর্শ ও গর্ব শেখ মুজিবের সে বাকশালী স্বৈরাচার নিয়েই। হিটলারের প্রতি শ্রদ্ধার অর্থ তার ফ্যাসীবাদের প্রতি শ্রদ্ধা, তখন হিটলারের ভক্তদের রাজনীতি পরিনত হয় অন্যদের উপর নির্যাতন ও নির্মূলের হাতিয়ার রূপে। নিষ্ঠুর অপরাধীদের হাতে তখন অধিকৃত হয় পুলিশ, প্রশাসন,আদালত ও মিডিয়া। তখন লক্ষ লক্ষ্ ইহুদীর নির্মূল এবং বিরোধী রাজনীতি নিষিদ্ধকরণও তখন উৎসবযোগ্য গণ্য হয়। ফলে শেখ মুজিবের প্রতি শ্রদ্ধার সাথে বাকশালী স্বৈরাচার,অপরাধীদের শাসন ও বিরোধী কর্মীদের উপর নির্যাতন ও হত্যা নেমে না আসলে সেটি মুজিবী আদর্শ হয় কি করে? মুজিবের ভক্ত হওয়ার জন্য মুজিবের ন্যায় শুধু পোষাক পড়ল চলে না, বিরোধীদের নির্মূলে ও তাদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে তার ন্যায় অপরাধীও হতে হয়। বাংলাদেশে আজ যে মুজিবী আদর্শের অনুসারিদের শাসন -তা নিয়ে কি কোন সন্দেহ আছে?

মুজিবী আদর্শের অনুসরণ বাড়বে অথচ অপরাধ বাড়বে না তা কি হয়?  সুন্দর মোড়কে মেকী জিনিষও মানুষের কাছে সহজে গছানো যায়। মুজিবের ন্যায় একজন অপরাধীর গায়ে “জাতির পিতা” ও “বঙ্গবন্ধু”র মোড়ক লাগানো হয়েছে সে একই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপূরণে। এটে আওয়ামী লীগের দলীয় স্ট্রাটেজী যা তারা বাংলাদেশের মানুষের ঘাড়ে চাপাতে সমর্থ হয়েছে। শেখ মুজিবকে “জাতির পিতা” ও “বঙ্গবন্ধু” করে তারা মুজিবের স্বৈরাচারি আদর্শকেই বাংলাদেশের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করতে সমর্থ হয়েছে। হিটলারকে নেতা রূপে কবুল করার কারণে তার নিষ্ঠুরতাও তাই কোটি কোটি জার্মানীর সমর্থণ পেয়েছিল। একই কারণে মুজিবের বাকশালী স্বৈরাচার যত অমানবিকই হোক বাংলাদেশে সেটিও অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। ফলে নির্বাচনে তাদের বিপুল বিজয়ও ঘটে। এবং সেটি তাঁকে “জাতির পিতা” ও “বঙ্গবন্ধু”র খেতাব দিয়ে জনগণের সামনে পেশ করার কারণে।

 

মূল লড়াইটি চেতনার মানচিত্রে

বাংলাদেশের বিপদ শুধু অপরাধীদের শাসন নয়, বরং বড় বিপদটি হলো বিপুল সংখ্যক মানুষের চেতনায় সে অপরাধীদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ। চেতনার এ এক ভয়ানক অসুস্থতা। এমন অসুস্থ্যতার কারণেই একজন মানুষ মানবতার ভয়ানক শত্রু ও প্রতিষ্ঠিত অপরাধীকেও “বন্ধু” বলতে পারে,এবং পুত্র না হয়েও তাকে “পিতা” বলে ভক্তি দেখাতে পারে। মুর্তিপুজা, লিঙ্গপুজা, গরুপুজা ও স্বর্পপুজা যত সনাতন অজ্ঞতা বা পাপাচারই হোক, দক্ষিণ এশিয়ার বুকে সে অজ্ঞতা বা পাপাচার নিয়ে কোটি কোটি মানুষ বেঁচে আছে –তা তো সে কারণেই। কোন ব্যক্তি যখন গরু,স্বর্প, মুর্তি ও লিঙ্গকে পুজা করে -তখন কি বুঝতে বাঁকি সে মানুষটির বিবেক বা চেতনা কতটা অসুস্থ্য? এমন গুরুতর অসুস্থ্যতা নিয়ে কি সে মানুষটি মহান আল্লাহতায়ার অস্তিত্বে বিশ্বাসী হতে পারে? সে কি ন্যায় ও সত্যের পক্ষ নিতে পারে? ইসলাম যত শ্রেষ্ঠই হোক তা কি এমন বিবেকশূণ্যদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়? পবিত্র কোরআনে এমন অসুস্থ্য বিবেকের মানুষদের মহান আল্লাহতায়ালা গবাদী পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট বলেছেন। গরুও আরেক গরুকে এবং স্বর্প আরেক  স্বর্পকে বা মুর্তিকে পুঁজা করে না। মানুষের বিবেক ও চেতনার মান পশু থেকেও যে কতটা নীচে নামতে পারে এ হলো তার নমুনা। হিটলারের মত অপরাধীরো ভোট পায় এবং ফিরাউনেরা ভগবান রূপে গণ্য হয়তো সে অসুস্থ্যতার কারণেই। মুজিবের ন্যায় স্বৈরাচারি অপরাধীকে যে মানুষটি “বন্ধু” ও “পিতা” বলে সম্মান দেখায়,এবং তাঁর আদর্শের প্রতিষ্ঠায় রাজনীতিতে নামে,তখন কি বুঝতে থাকে তার বিবেকের অসুস্থ্যতা কত প্রকট? এমন মানুষ যাত্রী ভর্তি বাসে আগুণ দিবে বা লগি বৈঠা নিয়ে রাজপথে মুসল্লিদের হত্যায় নামবে তাতে আর আশ্চর্যের কি আছে?

হিটলারের মৃত্যু হয়েছে,সে সাথে ফ্যাসবাদও জার্মানীতে কবরস্থ হয়েছে। হিটলারের ন্যায় অপরাধী সে দেশে আর সম্মান পায় না, বরং ঘরে ঘরে ধিকৃত হয়। এর ফলে বিদায় নিয়েছে তার অনুসারিদের শাসনও। কিন্তু বাংলাদেশে তেমনটি ঘটেনি। শেখ মুজিব বিদায় নিলেও তার স্বৈরাচারি দর্শন ও রাজনীতি আজও  বেঁচে আছে। বরং তাঁর অনুসারিদের হাতেই দেশ আজ  অধিকৃত। এর ফলে বেঁচে আছে আওয়ামী অপরাধীদের শাসনও। দেশের মূল পরাধীনতা তো এখানেই। ফলে দেশকে যারা অপরাধমূক্ত এবং সে সাথে পরাধীনতামূক্ত দেখতে চায় তাদের সামনে লড়াই শুধু রাজনৈতীক নয়, বরং মূল লড়াইটি আদর্শিক। লড়াইটি হতে হবে চেতনার মানচিত্রে। জনগণের মগজে বাড়াতে হবে মুজিবের বাকশালী স্বৈরাচারকে ঘৃনা করার সামর্থ্য। তখন আওয়ামী অপরাধীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জনগণ পাবে ইম্যুউনিটি বা প্রতিরোধের ক্ষমতা। “বঙ্গবন্ধু” বা “জাতির পিতা” বলে গণতন্ত্রের দুষমনকে সম্মান দেখালে চেতনায় সে মূক্তি ঘটে না, বরং ভয়ানক ভাবে বাড়ে অপরাধীদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও অধীনতা।মানুষের কথার মধ্য দিয়ে তার ঈমান কথা বলে। আল্লাহর উপর ঈমান এ অনুমতি দেয় না, যে ব্যক্তি ইসলামের প্রতিষ্ঠা রুখতে সকল ইসলামী দলকে নিষিদ্ধ করলো,কোরআনের শিক্ষাকে সংকুচিত করলো এবং মানবিক অধিকারকে সংকুচিত করলো তাকে সে “দেশের বন্ধু” বা “জাতির পিতা” রূপে মেনে নিবে।  সে তো বরং এমন ব্যক্তির বিরুদ্ধে লড়াইকে জিহাদ রূপে গণ্য করবে। ইসলামের জিহাদ শুধু কাফেরদের বিরুদ্ধে নয়, বরং সর্বপ্রকার অপরাধীদের বিরুদ্ধেও। কোরআনে বর্নিত “ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের উৎখ্যাত” হলো সে জিহাদের মূল কথা। মুসলমান হওয়ার এ এক অনিবার্য দায়বদ্ধতা। ১৬ কোটি মুসলমানের দেশে সে জিহাদ যে হয়নি তার প্রমাণ হলো অপরাধীদের এ শাসন। তাই এ ব্যর্থতা নিছক কোন ব্যক্তি বা দলের নয়, সেটি বাংলাদেশের ১৬ কোটি মুসলমানের।  ০৬/০১/২০১২

 

 

 




বাংলাদেশে অসভ্যদের শাসন ও বর্ধিষ্ণু কলংক

রাজত্ব অসভ্যদের

পৃথিবী পৃষ্টে প্রতি যুগে এবং প্রতি দেশে সভ্য ও অসভ্যদের উপস্থিতি ছিল। উভয়ের সুস্পষ্ট পরিচিতি এবং সংজ্ঞাও ছিল। সে মানদণ্ড নিয়েই প্রতি যুগে এবং প্রতি সমাজে কে সভ্য এবং কে অসভ্য -সে বিচারটি হয়। পশুরা অসভ্য ও ইতর। কারণ, আইন বা আইনের শাসন –এসব তারা কিছু বুঝে না। আইন থাকলেও তারা তা মানে না। সেখানে শাসন চলে যারা অধীক বলবান ও হিংস্রদের। ফলে যে পশুর দেহটি বিশাল, দাঁতগুলো ধারালো এবং নখরও দীর্ঘ -সে হয় ক্ষমতার মালিক। সিংহ তাই বনের রাজা। সে সমাজে দুর্বলেরা যেমন ক্ষমতাহীন, তেমনি নিরাপত্তাহীনও। অসভ্য বন্য জীবনে বাঁচার অধিকার, প্রতিবাদ ও ন্যায় বিচার লাভের অধিকার কারোই থাকে না। সে সমাজে দুর্বলরা বাঁচে সবলদের কৃপা নিয়ে এবং তাদের ক্ষুধা মেটাতে। এটিই জঙ্গলের রীতি ও অসভ্যতা। তেমন এক অসভ্য ও ইতর অবস্থা আধুনিক যুগেও যে কতটা বীভৎস রূপে প্রতিষ্ঠা পেতে পারে –আজকের বাংলাদেশ হলো তারই উদাহরণ।

সভ্য সমাজে প্রত্যেকের যেমন বৈধ পিতা থাকে, তেমনি গণতান্ত্রিক দেশে প্রতিটি সরকারের পিছনেও বৈধ ভোট থাকে। ফলে জারজ সন্তানের ন্যায় কোন জারজ সরকারের অস্তিত্ব কোন গণতান্ত্রিক দেশে ভাবা যায় না। সেটি অসভ্য স্বৈরাচারের প্রতীক। অথচ বাংলাদেশে সে অসভ্য স্বৈরাচারই চেপে বসেছে অতি নৃশংসতা নিয়ে। এবং সেটি ভোট-ডাকাত শেখ হাসিনার অবৈধ সরকারের নেতৃত্বে। ফলে দেশ ও দেশবাসীর ললাটে যোগ হয়েছে নতুন কলংক। অথচ সে কলংক প্রতিবেশী ভূটান বা নেপালের নেই। শ্রীলংকা ও পাকিস্তানেরও নাই। শেখ হাসিনা, তার দল আওয়ামী লীগের কাজ হয়েছে সে কলংককে শুধু স্থায়ী করা নয়, বরং সেটিকে দিন দিন আরো কুৎসিত করা। তবে আওয়ামী লীগের শাসনামলে  দেশের গায়ে এরূপ কলংকলেপন নতুন ঘটনা নয়। দলটির জন্ম থেকে এটিই তাদের লিগ্যাসি বা ঐতিহ্য। পাকিস্তান আমলেও সংসদের অভ্যন্তরে ডেপুটি স্পিকারকে তারা পিটিয়ে হত্যা করেছিল। শেখ মুজিবের হাতে সে কলংক বেড়েছিল শুধু গণতন্ত্র, বাক স্বাধীনতা ও আইনের শাসন কবর দেয়াতে নয়, বরং দেশকে ভিক্ষার তলাহীন ঝুড়ি এবং ভারতের অধীনস্থ্য এক গোলাম রাষ্ট্র বানোনার মাধ্যমে।   

বাংলাদেশের বুকে অতি শক্তিহীন, অধিকারহীন ও অসহায় হ.লো দেশের জনগণ। তাদের হাতে যেমন অস্ত্র নেই, তেমনি পুলিশ, সেনাবাহিনী, প্রশাসন এবং আইন-আদালতও নাই। প্রতিটি সভ্য সমাজে জান-মাল ও ইজ্জত নিয়ে বাঁচার অধিকার যেমন থাকে, তেমনি থাকে ন্যায় বিচার পাওয়ার অধিকার। সে অধিকার না থাকলে তাকে কি সভ্য সমাজ বলা যায়?  কিন্তু বাংলাদেশে এর কোনটাই নাই। আদালতে রায় লেখা হয় -সরকার যা চায় সেদিকে খেয়াল রেখে। যেমন আব্দুল কাদের মোল্লার জেলের রায়কে ফাঁসির রায়ে পরিবর্তন করা হয়েছে সরকারি দলের চাপে। তবে বাংলাদেশে এরূপ অসভ্যতা কোন স্বল্পকালীন বিষয় নয়, বরং  প্রতিদিন এবং প্রতিক্ষণের বিষয়। বন্য পশু থেকে তার পশুত্বকে কখনোই আলাদা করা যায় না। তেমনি জালেম সরকার থেকে আলাদা করা যায় না তার অসভ্য অপসংস্কৃতিকে । জালেম শাসকের রাজনীতি, প্রশাসন ও বিচার-আচার চলে বস্তুতঃ  সে অসভ্যতা নিয়েই।

তাই শেখ হাসিনা ও তার দলের অসভ্যতা শুধু ২০১৮ সালের ৩০’শে ডিসেম্বরের ভোট-ডাকাতি নয়। একাত্তরে লক্ষাধিক বিহারী হত্যা, হাজার হাজার রাজাকার হত্যা, মুজিবামলে ৩০ হাজার রাজনৈতিক নেতা-কর্মী হত্যা, শাপলা চত্ত্বরের গণহত্যা, চলন্ত বাসে আগুন দেয়া, লগি-বৈঠা নিয়ে রাজপথ রক্তাত্ব করা, ফাঁসিতে ঝুলিয়ে বিরোধীদলীয় নেতাদের হত্যা এবং বিরোধী দলীয় নেত্রীর বাসার সামনে বালির ট্রাক দিয়ে ঘেরাও করার বিষয়ও নয়। বরং সেটি হলো আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের প্রতিদিন ও প্রতিমুহুর্তের রাজনৈতিক নীতি ও সংস্কৃতি। ডেঙ্গুজ্বরের ভাইরাস যেমন প্রচণ্ড জ্বর, মাথা-ব্যাথা, রক্তপাত নিয়ে হাজির হয়, তেমনি রাজনীতির অঙ্গণে আওয়ামী লীগও হাজির হয় গুম, খুন, ধর্ষণ, সন্ত্রাস এবং ফ্যাসিবাদের জীবাণু নিয়ে।          

লজ্জাহীনতাও যেখানে অহংকার

সাধারণ চোর-ডাকাতদেরও কিছু লজ্জাশরম থাকে। তাই দিনে নয়, রাতের আঁধারে মুখে মুখোশ পড়ে চুরি-ডাকাতি করে। কিন্তু এ দিক দিয়ে হাসিনা ও তার দলের নেতাকর্মীগণ অসাধারণ; লজ্জাশরমের লেশমাত্রও নাই। ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষে চোখের সামনে প্রকাশ্যে ভোট ডাকাতিতে নামতে পেরেছে। নবীজী (সাঃ)র হাদীসঃ “লজ্জা হলো ঈমানের অর্ধেক”। ঈমান দেখা যায় না; কিন্তু প্রকাশ পায় লজ্জা-শরমের মাঝে। তাই যে ব্যক্তি প্রকাশ্যে চুরি-ডাকাতি, ভোট-ডাকাতি, সন্ত্রাস বা দেহব্যবসায় নামে -বুঝতে হবে তার ঈমানের ভান্ডারটি শূণ্য। এরা বাঁচে উগ্র বেঈমানি নিয়ে। সে বেঈমানি টুপি, কালো পট্টি, নামায-রোযা, হজ্ব বা উমরাহ করে ঢাকা যায় না। খুন, গুম,ধর্ষণ, ব্যাংক লুট, শেয়ার মার্কেট লুট, অর্থপাচার ও শত্রু রাষ্ট্রের সেবাদাস হওয়ার ন্যায় ভয়ানক অপরাধগুলিও তখন মামূলী ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।

তবে এরূপ লজ্জহীনতা স্রেফ হাসিনা বা দলীয় কর্মীদের মাঝ সীমিত নয়। বরং প্রকট দেশের প্রশাসন, পুলিশ, আদালত, সেনাবাহিনী ও মিডিয়ার মাঝেও। এরূপ লজ্জহীনতার মাঝেই জন্ম নেয় অসভ্য সংস্কৃতি; তখন চুরি-ডাকাতি, ভোট-ডাকাতি, গুম-খুন বা ধর্ষণ কোন অপরাধ গণ্য হয় না। বরং বৈধ ও সভ্য কর্ম মনে হয়। হাসিনা ও তার দলীয় নেতাকর্মীদের মাঝে তাই ২০১৮ সালের ভোট ডাকাতি নিয়ে কোন অপরাধবোধ নাই; বরং বড্ড উৎসব-মুখর। এ ঘৃণ্য অপরাধকেও তারা ন্যায় ও আইনসিদ্ধ মনে করে। চোর-ডাকাতদের হাতে দেশ শাসনের এখানেই মহা বিপদ। চুরিডাকাতি, খুন-ধর্ষণই তাদের মূল অপরাধ নয়, তারা হত্যা করে বিবেকবোধ ও মূল্যবোধকে। নির্মূল করে এমন কি নৃশংস অপরাধকেও ঘৃণা করার সামর্থ্য। ধ্বংস করে ঈমান। যুগে যুগে দুর্বৃত্ত ফিরাউনগণ এভাবেই সমাজে ভগবান রূপে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। বাকশালী মুজিব যে ভারতের সেবাদাস, নৃশংস খুনি এবং গণতন্ত্র হত্যাকারি –তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে? বামপন্থি নেতা সিরাজ শিকদারকে হত্যার পর সংসদে দাঁড়িয়ে শেখ মুজিব বলেছিল, কোথায় আজ সিরাজ শিকদার? শুধু তাই নয়, ৩০ হাজার বিরোধী দলীয় নেতাকর্মী হত্যা করে রক্ষি বাহিনীকে দিয়ে। কিন্তু সে অপরাধী মুজিব পেয়েছে জাতির  পিতা ও বঙ্গবন্ধুর খেতাব। সেটি সম্ভব হয়েছে বিপুল সংখ্যক মানুষের বিবেক মারা পড়াতে। সে অভিন্ন পথটি ধরেছে শেখ হাসিনাও। মুজিবের ন্যায় হাসিনাও চায় দেশ জুড়ে ঈমান ও বিবেক নাশের মহামারিটি তীব্রতর করতে। এজন্যই কোর’আনের তাফসিরের বিরুদ্ধে কড়াকড়ি আরোপ করেছে। নিষিদ্ধ করেছে পিস টিভি ও ইসলাম চ্যানেল। জিহাদ বিষয়ক বই এবং কোর’আনের তাফসির বাজেয়াপ্ত করার কাজে মহল্লায় পুলিশ নামিয়েছে।  কারণ, বিবেকের খাদ্য তো কোর’আনের জ্ঞান। কোর’আনের জ্ঞানশূণ্য মানুষেরা গরুর ন্যায় ইতর পশুকেও ভগবান বলে। পুংলিঙ্গকেও পূজা দেয়। এমন জাহেলগণ হাসিনাকে মহামান্য প্রধানমন্ত্রী রূপে সম্মান দিবে –তাতেই বা বিস্ময়ের কী? একারণেই হাসিনার সাফল্যটি এক্ষেত্রে বিশাল।  বহু লক্ষ মানুষ –যার মধ্যে আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা, সেনা অফিসার, আদালতের বিচারপতি এবং সংসদ সদস্য, তার মত ডাকাত সর্দারনীকেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলে সালাম দেয়। এমন কি মসজিদ-মাদ্রাসার বহু হাজার হুজুরও তাকে কওমী জননী বলে।

অথচ কোন সভ্য দেশে চোর-ডাকাত ও ভোট-ডাকাত সন্মান পাবে বা প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসবে -সেটি কি ভাবা যায়? ভাবা যায় কি ভোটমুক্ত কোন নির্বাচনের কথা? যে কোন সভ্য দেশের আইনেই ভোট-ডাকাতি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এমন কি বাংলাদেশের আইনেও। অথচ বাংলাদেশে সে ডাকাতি হয়েছে দশ-বিশটি কেন্দ্রে নয়; সমগ্র দেশজুড়ে। কিন্তু দেশের কোথাও তা নিয়ে কোন বিচার হয়নি এবং কারো কোন শাস্তি হয়নি। যেমন ভোট-ডাকাতি কোন অপরাধই নয়। অথচ হাজার হাজার গৃহস্থের গৃহে ডাকাতির চেয়ে এটি যে শতগুণ জঘন্য অপরাধ –তা নিয়ে কি বিতর্ক চলে? ঘরে ঘরে ডাকাতি হলে অর্থহানি হয় বটে, কিন্তু তাতে দেশবাসীর স্বাধীনতা লুণ্ঠিত হয় না। অথচ ভোট-ডাকাতিতে শুধু স্বাধীনতাই লুণ্ঠিত হয় না, লুণ্ঠিত হয় দেশের রাজস্বভান্ডার, ব্যাংক-বীমা, প্রশাসন ও আইন-আদালত। তখন আদালত  থেকে উধাও হয় আইনের শাসন, এবং বিচারে রায় লেখা হয় ডাকাতদের হুকুম মোতাবেক। নিরপরাধ মানুষকেও তখন ফাঁসিতে ঝুলতে হয়। তখন সরকার পায়, যাকে ইচ্ছা তাকে গুম, হত্যা এবং রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতনের অধিকার। ফলে তখন অসম্ভব হয় সভ্য ও স্বাধীন ভাবে জীবন যাপন। সব চেয়ে বড় কথা, এরূপ অসভ্য শাসনে দেশ ও দেশবাসীর কলংক বাড়ে বিশ্ব জুড়ে। এবং সে কলংক ইতিহাসের বই থেকে কখনো মুছে যায় না।     

 

শ্রেষ্ঠত্ব দুর্বৃত্ত নির্মূলে

দেশের কলংক শুধু সরকারের অপরাধের কারণে বাড়ে না, বাড়ে জনগণের ব্যর্থতার কারণেও। এক্ষেত্র বাংলাদেশের জনগণের ব্যর্থতাটি কি কম? যারা সভ্য ও ভদ্র তারা কি শুধু ভাত-মাছ খায়? তাদের বড় পরিচয়টি হলো, তারা অসভ্য, অভদ্র, চোর-ডাকাত ও সকল জাতের অপরাধীদেরকে ঘৃণা করে। মুসলিম জীবনে এটি অতি গুরুত্বপূর্ণ নেক আমল। মানুষের ঈমান, আমল ও চরিত্রের বড় পরীক্ষাটি হয় এখানে। এখানেই প্রকাশ পায় ঈমানের বল। অনেক চোর-ডাকাত, দেহব্যবসায়ী, সুদখোর, ঘুষখোরও হাজার টাকা দান করে। কিন্তু  অন্যায়কে ঘৃণা করার সামর্থ্য তাদের থাকে না। অথচ সে সামর্থ্য না থাকাতে সে নিজেও অসভ্য, অভদ্র এবং অপরাধী হয়। বড় বাড়ী, দামী পোষাক ও ক্ষমতার দাপট দিয়ে কি এ অসভ্যতা কখনো ঢাকা যায়? এরূপ অসভ্য ও অপরাধীদের পক্ষে অসম্ভব হয় ঈমানদার হওয়া। কারণ, ঈমানদারকে শুধু আল্লাহতায়ালা ও তাঁর রাসূলকে বিশ্বাস করলে চলে না। শুধু নামায-রোযা এবং হজ্ব-যাকাত পালন করলেও চলে না। তাঁকে বাঁচতে হয় যেমন অপরাধীদের বিরুদ্ধে ঘৃণার সামর্থ্য নিয়ে, তেমনি লড়তে হয় তাদের নির্মূল করার অঙ্গিকার নিয়েও। ঘৃণার সে সামর্থ্য এবং লড়াইয়ের সে অঙ্গিকার না থাকলে –এমন ব্যক্তি যেমন বেঈমান হয়, তেমনি অসভ্য এবং অপরাধী হয়। এরাই চোর-ডাকাত ও ভোট-ডাকাতদের দলে শামিল হয়। প্রশ্ন হলো, এরূপ অসভ্য অপরাধীদের দিয়ে কি মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর পবিত্র জান্নাত ভরবেন? তাদেরকে কি জান্নাতের ধারে কাছেও আসতে দিবেন?

বাংলাদেশে এরূপ অপরাধীদের সংখ্যাটি বিশাল। বিশ্বের অন্য যে কোন দেশের তুলনায় বিশাল বলেই বাংলাদেশ দুর্বৃত্তিতে পর পর ৫ বার বিশ্বে প্রথম হয়েছে। নইলে এতটা নীচে নামা মামূলী বিষয় ছিল না। সমগ্র মানব জাতির ইতিহাসে এরূপ অর্জনটি একমাত্র বাংলাদেশেরই। মুজিব আমলে এরূপ ডাকাতগণই এক কালের সুজলা সুফলা দেশকে বিশ্বব্যাপী তলাহীন ভিক্ষার ঝুলি রূপে পরিচিত করেছিল। যে রূপ নির্বাচন ২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হলো সেটিও কি বিশ্বের আর কোথাও হয়েছে? তবে এ কলংকটি কি শুধু শেখ মুজিব, শেখ হাসিনা ও তাদের দল আওয়ামী লীগের কামাই? দেশের প্রশাসন, পুলিশ, আদালত, সেনাবাহিনী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও মিডিয়াতে যে অসংখ্য অসভ্যদের উপস্থিতি – একাজ তো তাদেরও। হাসিনার ন্যায় প্রমাণিত ডাকাতকে ঘৃণা করা দূরে থাক, তারা বরং তার পক্ষে ডাকাতিও করছে। আজ্ঞাবহ লাখ লাখ ডাকাত থাকলে কি ডাকাত সর্দারনীকে স্বশরীরে ডাকাতীতে নামার প্রয়োজন পড়ে? তখন প্রয়োজন পড়ে হুকুমের। হুকুম পেলে নিজেরাই ডাকাতি করে তারা ডাকাতির মাল সর্দারনীর ঘরে পৌছে দেয়। ২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বর সমগ্র দেশজুড়ে যে ভোটডাকাতি হলো -সেটি তো এভাবেই হয়েছে। শাপলা চত্ত্বরের গণহত্যাটিও হয়েছিল এ খুনি ডাকাতদের হাতে।     

অপমান, অসভ্যতা এবং কলংক যেমন দুর্বৃত্তদের শাসন মেনে নেয়ায়, তেমনি শ্রেষ্ঠত্ব তাদের নির্মূলে। সুরা আল ইমরানের ১১০ আয়াতে মহান আল্লাহতায়ালা মুসলিমদের শ্রেষ্ঠ জাতি বলে অভিহিত করেছেন। সে বিশেষ মর্যাদাটি এজন্য নয় যে, তারা বেশী বেশী নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাত পালন করে। বরং এজন্য যে, তারা অন্যায়কে তথা অন্যায়ের নায়কদেরকে নির্মূল করে এবং ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা দেয়। অথচ বাংলাদেশীগণ নিজেদের মুসলিম রূপে পরিচয় দিলেও তারা এ পথে নাই। তারা চলছে সম্পূর্ণ বিপরীত এজেন্ডা নিয়ে। অতীতে মুসলিমগণ যে শুধু নিজেদের জন্মভূমি থেকে অপরাধীদেরকে নির্মূল করেছিলেন তা নয়, নির্মূল করেছিলেন এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের বহু দেশ থেকে। কারণ, ইসলামের এজেন্ডা কোন ভাষা বা ভূগোলের সীমারেখা দ্বারা সীমিত নয়। সেটি হলে কি তুর্কী বীর ইখতিয়ার মহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি বাংলা বিজয়ে আসতেন? আর না এলে ভয়ানক বিপদটি হতো বাংলার মুসলিমদের। তারা বঞ্চিত হতো ইসলাম থেকে। তখন ধর্মের নামে তারা মগ্ন হতো গরুপূজা, শর্পপূজা, মুর্তিপূজা ও লিঙ্গপূজা নিয়ে।

                                                                                                    

মাছি-চরিত্রের মানুষ ও নাশকতা

মহান আল্লাহতায়ালার ক্ষুদ্র দুটি সৃষ্টি হলো মাছি ও মৌ’মাছি।  এ দুটি ক্ষুদ্র প্রাণীর উল্লেখ রয়েছে পবিত্র কোর’আনেও। মৌ’মাছির নামে একটি সুরার নামকরণও করা হয়েছে। সেটি হলো সুরা নামল। পবিত্র কোর’আন কোন বিজ্ঞান বা জীব বিজ্ঞানের বই নয়; এটি হিদায়েতের গ্রন্থ। পবিত্র এ কিতাবে নানা জীবের উল্লেখ করা হয়েছে যাতে মানব তাদের জীবন থেকে হিদায়েত নেয়। প্রশ্ন হলো, মাছি ও মৌ’মাছি থেকে শিক্ষণীয় বিষয়টি কি? মৌ’মাছির জীবনে বাঁচার মূল মিশনটি হলো মানব কল্যাণ। সে লক্ষ্যে মৌ’মাছি আমৃত্যু মেহনত করে । এবং হাজার হাজার ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে মৌচাক গড়ে। তারা বাঁচে জামায়াতবদ্ধতা নিয়ে। মৌচাকের মধু মৌ’মাছি নিজে খায় না, মানুষকে খাওয়ায়। মানুষের জন্য মধুতে রয়েছে বহুমুখি কল্যাণ। শিক্ষণীয় আরেকটি বিষয় হলো, মৌ’মাছি কখনোই আবর্জনায় বসে না; খুঁজে ফুল। মৌ’মাছির ন্যায় ঈমানদারগণও তাই বর্জন করবে আবর্জনা, মানব কল্যাণে হবে নিবেদিত প্রাণ এবং বাঁচবে জামাতবদ্ধ এক সুশৃঙ্খল জীবন নিয়ে। একমাত্র তখনই দেশ কল্যাণ কর্মে ভরে উঠে।

অপর দিকে মাছি বাঁচে নানারূপ অকল্যাণ নিয়ে। সে কখনোই ফুলের উপর বসে না; খুঁজে দুর্গন্ধময় গলিত আবর্জনার স্তুপ। আবর্জনার মাঝেই  তার বসবাস ও বংশবিস্তার। রোগ-জীবাণু ছড়ানো এবং মানব বসতিকে বাসের অযোগ্য করাই তার আমৃত্যু মিশন। মাছি মালেরিয়া, ডেঙ্গু, কলেরা ও ডায়োরিয়ার ন্যায় বহু ভয়াবহ রোগের মহামারি ঘটায়। লক্ষণীয় হলো, সমাজে অবিকল মাছি-চরিত্র নিয়ে বাস করে চোর-ডাকাত, ভোট-ডাকাত, খুনি, ধর্ষক, ঘুষখোর, সূদখোর, দেহব্যবসায়ী তথা সমাজের সকল অসভ্য অপরাধীগণ। এরা পাপাচারের প্রতিষ্ঠান খুঁজে এবং সযত্নে দূরে থাকে মসজিদ, মাদ্রাসা, কোরআনের ক্লাস, ইসলামি সংগঠন থেকে। এমন কি অতীতে এরা নবী-রাসূলদের পাশেও ভিড়েনি। মশামাছির ন্যায় রাষ্ট্রের বুকে এদের বংশ বিস্তার ও দখলদারি বাড়লে, ভয়ানক বিপদ বাড়ে জনগণের। তখন গুম, খুন, ধর্ষণ ও সন্ত্রাসের রাজনীতি দেশের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। সভ্য সমাজের নির্মাণে এজন্যই মশামাছির নির্মূলের ন্যায় অতি গুরুত্বপূর্ণ হলো এ অসভ্য অপরাধীদের নির্মূল। ইসলামে এ নির্মূলের কাজটিই হলো পবিত্র জিহাদ। যে সমাজে এ জিহাদ নাই সে সমাজে রাস্তাঘাট, ক্ষেতখামার, ঘরবাড়ী, কলকারখানা বাড়লেও সভ্য রাষ্ট্র ও সভ্যতা নির্মিত হয় না। 

মশামাছি কখনোই তাদের কাঙ্খিত বাসস্থানটি চিনতে ভূল করে না। তেমনি ভূল করে না অপরাধীগণও। তারা খুঁজে অপরাধীদের হাতে অধিকৃত রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দল। বাংলাদেশের অপরাধীগণ তাই আওয়ামী লীগকে চিনতে কোন কালেই ভূল করেনি। সেটি মুজিব আমলে যেমন নয়, তেমনি হাসিনার আমলেও নয়। ফলে দেশজুড়ে লুটপাট ও ভোট-ডাকাতিতে মুজিব ও হাসিনার কোন কালেই লোক বলের অভাব হয়না। লোক বলের অভাব হয় না লগি-বৈঠা নিয়ে রাস্তায় দলীয় ক্যাডার নামাতে। মশামাছি কখনোই মৌ’মাছির সাথে মেশে না; তাদের থাকে নিজস্ব দল ও নিজস্ব রুচি। সে দল ও রুচি নিয়েই  তাদের চলাফেরা। একই রূপ চরিত্র অপরাধ জগতের নেতা-কর্মীদেরও। ফলে অতি নৃশংস অপরাধীদের ঘৃণার সামর্থ্য তাদের থাকে না। এটির কারণ, নৈতিক মৃত্যু। দেহ নিয়ে বাঁচলেও তারা নীতি-নৈতিকতা ও ঈমান নিয়ে বাঁচে না। এজন্যই প্রতিবেশী ভারতে মুসলিমগণ হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হলেও হাসিনা ও তার দলীয় নেতাকর্মীদে মুখে প্রতিবাদ নাই। বরং হাসিনার এজেন্ডা, অপরাধীদের সাথে বন্ধুত্ব মজবুত করা। গুজরাতে মুসলিম বিরোধী গণহত্যার নায়ক নরেন্দ্র মোদী এজন্যই হাসিনার এতো ঘনিষ্ট বন্ধু। মোদির ন্যায় খুনির সাথে মিতালী দৃঢ়তর করতে হাসিনা নিয়মিত আম ও পাঞ্জাবী পাঠায়। (মোদি সে কথাটি মিডিয়াকে বলেছে এবং যা প্রকাশও পেয়েছে।) খুনিকে ঘৃণা করার মত সামান্য বিবেকবোধ যার মধ্যে আছে -সে কি কখনো মোদির ন্যায় গণহত্যার নায়ককে বন্ধু রূপে গ্রহণ করতে পারে? বস্তুতঃ যারা শাপলা চত্ত্বরে গণহত্যা করতে পারে তারাই গুজরাতের গণহত্যার নায়কের বন্ধু হতে পারে।

 

অসভ্যতা অপরাধীদের নির্মূলে ব্যর্থতায়

চুরি-ডাকাতি, ভোট-ডাকাতি, খুন-গুম, ধর্ষণ, সন্ত্রাস তথা নানা রূপ অপরাধ কর্মে অংশ নেয়াটাই শুধু অপরাধ নয়, অপরাধ ও অসভ্যতা হলো সেরূপ অপরাধীদের মাথায় তুলে মান্যতা দেয়া। সে অসভ্য কাজটি হয় তাদেরকে প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, এমপি, নেতা বা প্রশাসনের কর্মকর্তা করার মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশে তো সেটিই হয়েছে। দুর্গন্ধময় আবর্জনাকে যারা আবর্জনার স্তুপে না ফেলে গৃহে জমা করে -তাদরকে কি সভ্য, ভদ্র বা সংস্কৃতবান বলা যায়? অসভ্যতাদের নির্মূল না করাটাই চরম অসভ্যতা। সমাজের সবচেয়ে ক্ষতিকর জীবগুলো শুধু মশামাছি নয়, চোর-ডাকাত, ভোট-ডাকাত, ধর্ষক এবং খুন-গুমের নায়কগণও। সভ্য সমাজে তাদেরকে গৃহের চাকর-বাকর বা রাস্তার ঝাড়ুদারও করা হয় না। তাদের পাঠানো হয় কারাগারে বা কবরস্থানে। অথচ বাংলাদেশে তাদেরকে মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী, এমপি তথা সরকারের উচ্চাসনে বসা হয়। তাদের নির্মূলে ইসলামের এজেন্ডাটি অতি সুস্পষ্ট। পবিত্র কোর’আন শুধু নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত ফরজ করতে নাযিল হয়নি; নাযিল হয়েছে শরিয়তের আইন প্রতিষ্ঠা দিতে। শরিয়তের আইন হলো অপরাধীদের নির্মূলে মহান আল্লাহপ্রদত্ত হাতিয়ার। এ হাতিয়ারের প্রয়োগ না হলে দেশ অপরাধীদের দখলে যায় এবং জোয়ার আসে অসভ্যতার। তাতে ব্যর্থ হয় ইসলামের মূল এজেন্ডা। তাই খোলেফায়ে রাশেদার আমলে একটি দিনও কি শরিয়তের আইন ছাড়া চলেছে? এমন কি ভারতে মুসলিম শাসনের শেষ দিন পর্যন্ত কাজির আদালতে শরিয়তের আইন প্রতিষ্ঠিত ছিল। সে আইন বিলুপ্ত করেছিল ইংরেজ কাফেরগণ। ইংরেজগণ শুধু ইসলামে অবিশ্বাসী ছিল না; বিশ্বব্যাপী আগ্রাসন, দস্যুবৃত্তি, খুন, বর্ণগত নির্মূল, ব্যাভিচার ও নানারূপ অপরাধ ছিল তাদের মজ্জাগত। তারা যে শরিয়তের বিলুপ্তি ঘটাবে -সেটিই ছিল স্বাভাবিক। তারা আইন বানিয়েছিল নিজেদের আগ্রাসন, কুফরি বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও অপরাধ কর্মগুলি বাঁচাতে। ফলে তাদের আইনে সাম্রাজ্যবাদি দস্যুবৃত্তি, বেশ্যাবৃত্তি, মানব খুন, অত্যাচার, জুয়া, মদ্যপানের ন্যায় নানারূপ অপরাধও বৈধতা পেয়েছে। বাংলাদেশে ইংরেজ শাসনের বিলুপ্তি ঘটেছে; কিন্তু বিলুপ্ত হয়নি তাদের দর্শন ও জীবনধারার অনুসারি সেক্যুলারিস্ট খলিফাদের শাসন। ফলে ইংরেজদের প্রণীত কুফরি আইন ও বিচারব্যবস্থা বাংলাদেশে আজও বেঁচে আছে; এবং আজও বহাল রয়েছে শরিয়তের বিলুপ্তি। বাঙালী মুসলিমদের ব্যর্থতা অনেক। তবে সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাটি হলো দেশে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা না দেয়া। শরিয়তের প্রতিষ্ঠা মুসলিম জীবনে এতোই গুরুত্বপূর্ণ যে পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালার সুস্পষ্ট হুশিয়ারিটি হলোঃ “আমার নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী যারা বিচার করে না তারা কাফের।…তারা জালেম। …তারা ফাসেক।” –(সুরা মায়েদা, আয়াত ৪৪,৪৫,৪৭)। মুসলিম রাষ্ট্রের মেরুদ্ন্ড হলো এই শরিয়ত; একমাত্র এটিই কাফের রাষ্ট্র থেকে তাকে পৃথক করে –মুসলিম জনসংখ্যা নয়। তাই শরিয়ত ছাড়া কি ইসলাম পালন হয়?

আদালতে শরিয়তের বিচার না থাকায় দেশবাসীর ক্ষয়ক্ষতির অংকটি হয় বিশাল। দেশের সকল চোর-ডাকাতদের চুরি-ডাকাতির ফলে দেশ ও দেশবাসীর এ যাবত যে ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে –ভোট-ডাকাতদের শাস্তি না দেয়াতে ক্ষতিটি হয়েছে তার চেয়ে বহুগুণ অধীক। ডাকাতি হয়ে গেছে সমগ্র দেশ। অথচ জনগণের দেয়া শত শত কোটি টাকার রাজস্বের অর্থ ব্যয় হয় বিশাল পুলিশ বাহিনী, সেনা বাহিনী, প্রশাসনিক বাহিনী এবং আদালতের বিচারক পালতে।  কিন্তু এ ভোট-ডাকাতি রুখতে ও ডাকাতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে তাদের অবদানটি শুণ্য। বরং তারা পরিণত হয়েছে ডাকাতদের লাঠিয়ালে। ইসলামে চুরির শাস্তি হলো হাত কেটে দেয়া। কিন্তু যারা সমগ্র দেশের উপর ডাকাতি করে তাদের শুধু হাত কাটলে কি ন্যায় বিচার হয়? সভ্য দেশে তাদের মৃত্যুদন্ড বা প্রাণদন্ড দেয়া হয়। কিন্তু সে বিচার ব্যবস্থা বাংলাদেশে নাই। ফলে বাংলাদেশে চোর-ডাকাতেরাই শাসকের আসনে জেঁকে বসেছে। এবং এসব চোর-ডাকাতদের বিরুদ্ধে কথা বলা শাস্তিযোগ্য অপরাধ গণ্য হচ্ছে এবং অপহরণ, হত্যা, গুম ও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে নিরপরাধ মানুষ।  

শেখ হাসিনার আদর্শ হলো তার পিতা শেখ মুজিব। কিন্তু তার ডাকাতিটাও কি কম নৃশংস ছিল?  তার ডাকাতিতে প্রাণ হারিয়েছিল গণতন্ত্র। জনগণ থেকে ভোট না নিয়েই নিজেকে তিনি আজীবনের জন্য প্রেসিডন্ট ঘোষণা দিয়েছিলেন। জনগণের ভোটের উপর ডাকাতিকে তিনি জায়েজ করিয়ে নিয়েছিলেন নিজ দলের কলাবোরেটরদের দিয়ে। নিষিদ্ধ করেছিলেন সকল বিরোধী দলগুলিকে। নিজে শত শত মিছিল-মিটিং করলেও তিনি কেড়ে নিয়েছিলেন বিরোধীদের মিছিল-মিটিং করা ও ভোট দানের স্বাধীনতা। নিষিদ্ধ করেছিলেন সকল বিরোধী দলীয় পত্রিকা। প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন এক দলীয় বাকশালী শাসক। সেটি ঘটেছিল ১৯৭৫ সালের ২৫শে জানুয়ারি। বাংলাদেশের ইতিহাসে এদিনটি ছিল আরেক    দেশ-ডাকাতির দিন। আওয়ামী লীগের শাসন মানেই ডাকাতদের শাসন। এবং ডাকাতগণই ছিল একাত্তরের নায়ক। তাদের হাতে ১৯৭০-য়ে জনগণের ভোটের উপর ডাকাতি করেছিল গণতন্ত্র ও স্বায়ত্বশাসনের মুখোশ পড়ে। একাত্তরের যুদ্ধ, মুজিবের হাত দিয়ে অর্জিত ভারতের গোলামী এবং সে সাথে বাংলাদেশের আজকের ফ্যাসিবাদী রাজনীতি –এসবই হলো সে বিশাল ডাকাতীর ধারাবাহিকতা। তাদের না জানলে অজানা থেকে যায় বাংলাদেশের ইতিহাস।

যারা গণতন্ত্রের শত্রু, তারা জনগণেরও শত্রু। শেখ হাসিনা তারই প্রমাণ। জনগণের বন্ধু হলে সে কি জনগণের ব্যালটের উপর ডাকাতি করতো? মিছিল-মিটিং ও কথা বলার স্বাধীনতা কেড়ে নিত? গুম-খুন ও সন্ত্রাসের রাজনীতি চালু করতো? যারা নিজেদের প্রতিষ্ঠা দিয়েছে ভোট-ডাকাত রূপে -তাদের থেকে এর চেয়ে সভ্য কিছু কি আশা করা যায়? ১৬/৬/২০১৯ তারিখে ২০ লাখ মানুষের মিছিল হয়েছে হংকং’য়ে। অথচ হংকং’য়ের জনসংখ্যা ঢাকার সিকি ভাগও নয়। কিন্তু সে রকম মিছিল ঢাকাতে অসম্ভব। কারণ, হংকং’য়ে ঢাকার ন্যায় অপরাধীদের শাসন নাই। জনগণ সেখানে মানবিক অধীকার নিয়ে বাঁচে। ফলে মিছিল-মিটিং ও বাক-স্বাধীনতা তাদের সংস্কৃতির অঙ্গ। অথচ  ঢাকায় সে রকম মিছিল হলে সেটি শাপলা চত্ত্বরের গণহত্যাতে পরিণত হতো। বাংলাদেশের মানুষ আর কতকাল এক ডাকাত সর্দারনীকে প্রধানমন্ত্রী রূপ সন্মান দেখাতে থাকবে? মানব রপ্তানি, পোষাক রপ্তানি, চিংড়ি রপ্তানি বাড়িয়ে বা দুয়েকটি ক্রিকেট ম্যাচ জিতে কি সে অপমান দূর করা যায়? বস্তুতঃ বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো এটি। এবং সে ব্যর্থতার কথা ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বব্যাপী।  

 

দুর্বৃত্ত শাসনের বড় নাশকতাটি

গরু-ছাগলেরা চোর-ডাকাত, ভোট-ডাকাত, খুনি, ধর্ষক ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে লড়াই করে না; তারা ঘাস পেলেই খুশি। অথচ সভ্য মানুষের আচরণটি ভিন্নতর। মহল্লায় চোর-ডাকাত ঢুকলে তাদের ধরা ও শাস্তি দেয়ার মধ্যেই মানবিক পরিচয়। সেটি না হলে দেশ অপরাধীদের দখলে যায় এবং অসভ্যতায় ভরে উঠে। এতে দেশ দ্রুত বাসের অযোগ্য হয়। কিন্তু স্বৈরাচারি শাসকগণ নিজেরাই যেহেতু অপরাধী, অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনগণের এ ঘৃণা ও প্রতিরোধকে তারা ভয় পায়। তারা চায়, গরুছাগলের ন্যায় জনগণও ভোজন-সর্বস্ব পশুতে পরিণত হোক এবং বিলুপ্ত হোক বিবেকবোধ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঘৃণাবোধ। চায়, জনগণ তাদের কু-কর্মে সহায়ক শক্তিতে পরিণত হোক। দুর্বৃত্তদের শাসনের এটিই সবচেয়ে বড় নাশকতা। তাদের শাসন দীর্ঘকাল চললে জনগণ পানাহারে বাঁচলেও বিবেকশূণ্য ও মানবতাশূণ্য হয়। তখন জনগণের গলায় গোলামীর রশি পড়িয়ে কিছুটা বেতন বাড়ায়। হাসিনার সরকারও তাই স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে বেতন বাড়িয়েছে। তাছাড়া বেতনের অর্থ তো আর তার নিজের পকেট থেকে আসছে না। গরু ঘাস পেলে যেমন লাঙ্গল টানে; মানব রূপী এরূপ আত্মসমর্পিত পশুগণও তেমনি বেতন পেলে সরকারি দলের ডাকাতে পরিণত হয়। তখন স্বৈরাচারি সরকার বাঁচাতে ভোট-ডাকাতি, গুম-খুন বা গণহত্যা চালাতেও তাদের মনে সামান্যতম দংশন হয় না।

পাকিস্তানের ন্যায় বাংলাদেশ ভারতের প্রতিদ্বন্দী একটি পারমানবিক শক্তি হতে পারিনি -বাংলাদেশের জন্য সেটিই মূল ব্যর্থতা নয়। দেশবাসীর সবচেয়ে কলংকজনক ব্যর্থতাটি হলো চোর-ডাকাত ও ভোট-ডাকাতদের ন্যায় অসভ্যদের শাসন নির্মূলের ব্যর্থতা। চোর-ডাকাত মাত্রই অসভ্য ও নৃশংস হয়। সভ্য জনগণ তাই সমাজ থেকে শুধু আবর্জনাই সরায় না, চোর-ডাকতদেরও সরায়। নইলে সভ্য ভাবে বাঁচাটি অসম্ভব হয়; সমাজ তখন কানায় কানায় পূর্ণ হয় অসভ্যতায়। অতীতে সে পথ ধরেই বাংলাদেশ দুর্বৃত্তিতে পাঁচ বার বিশ্ব রেকর্ড গড়েছে।  বাংলাদেশীদের সাম্প্রতিক কলংকটি হলো, তারা এক ডাকাত সর্দারনীকে প্রধানমন্ত্রী রূপে স্থান দিয়েছে। কোন সভ্য দেশে কোন কালেও কি এমনটি ঘটেছে?

বাংলাদেশীদের জন্য বিপদের আরো কারণ হলো, দেশটির অসভ্য ও অপরাধী শাসকগণ একাকী নয়। তাদের পিছনে রয়েছে আরেক ভয়ানক অপরাধী সরকার। সেটি ভারতের বিজিপি সরকার। ভারত তার নিজ দেশে মুসলিমদের বিরুদ্ধে লাগাতর যুদ্ধ শুরু করেছে। সেদেশে মুসলিমদের হত্যা করা, ঘরাড়ি থেকে বহিস্কার করা, তাদের গৃহে আগুণ দেয়া এবং মুসলিম নারীদের ধর্ষণ করা বস্তুতঃ সে যুদ্ধেরও অংশ। গরুর রশি হাতে দেখলে মুসলিমদের পিঠিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। মাথায় টুপি থাকলে টুপি কেড়ে  নিয়ে ‘জয় রামজি’ ও ‘পাকিস্তান মুর্দাবাদ’ বলতে বাধ্য করা হচ্ছে। এবং তাদের রাস্তায় পিটিয়ে  হত্যা করা হচ্ছে। মুসলিম নির্মূলের এ যুদ্ধে মূল সেনাপতি হলো নরেন্দ্র মোদি। মোদি তার শাসনমালে গুজরাতে ২০০২ সালে ২ হাজারের বেশী মুসলিমকে হত্যার ব্যবস্থা করে। মোদির লক্ষ্য, মুসলিমদের মুসলিম রূপে বাঁচাটিই অসম্ভব করা। কোন মুসলিম কি এমন খুনির বন্ধু হতে পারে?

পরকাল বাঁচানোর জিহাদ

খুনির বন্ধু হতে হলে তো তাকেও খুনি বা খুনের সমর্থক হতে হয়। হত্যা করতে হয় তার ঈমানকে। ঈমান শুধু ব্যক্তিকে নামায-রোযার ন্যায় ইবাদতেই উদ্বুদ্ধ করে না, বরং বিশ্বের নানা প্রান্তের মজলুম মুসলিমের প্রতি সহমর্মিতা নিয়ে বাঁচতে শেখায়। সে সহমর্মিতাই প্রমাণ করে সে মুসলিম উম্মাহর অংশ। দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হাত-পা দেহের ব্যাথা অনুভব করে না। তেমনি মুসলিম উম্মাহ থেকে বিচ্ছন্ন ব্যক্তিও অনুভব করে না অন্য মুসলিমের বেদনা। বেদনার সে অনুভুতিটি  আসে ঈমান থেকে। তাই কাশ্মীর, ফিলিস্তিন, মায়ানমার, ভারত বা অন্য যে কোন দেশের গুলিবিদ্ধ, ধর্ষিতা, অত্যাচারিত মুসলিমের বেদনা যদি কেউ হৃদয়ে অনুভব  না করে -তবে বুঝতে হবে সে ঈমানদার নয়। এমন ব্যক্তি বাঙালী, ভারতীয়, পাকিস্তানী, আরব  বা অন্য কিছু হতে পারে –কিন্তু সে মুসলিম নয়। সে বেদনা না থাকাটাই শত ভাগ প্রমাণ করে তার অন্তরে ঈমানের লেশ মাত্র নাই। অথচ ভারতে রাস্তায় নেমে সে বেদনার প্রকাশ করাটি যেমন শাস্তিযোগ্য অপরাধ, তেমনি অবস্থা বাংলাদেশেও। এভাবেই হাসিনা অসম্ভব করছে বাঙালী মুসলিমদের শুধু মুসলিম রূপে বাঁচা নয়, সভ্য মানুষ রূপে বাঁচাও। তাই বাংলাদেশের বুকে তার শাসন যতই দীর্ঘায়ীত হবে –বাংলাদেশীরা ততই পরিণত হবে গণতন্ত্রমুক্ত, ঈমানশূন্য ও মানবতাশূণ্য ভোজন-বিলাস জীবে। এভাবে তারা দূরে সরছে শুধু ইসলাম থেকে নয়, বরং মানবিক পরিচয় থেকেও। হাসিনা এভাবে বাঙালী মুসলিম জীবনে শুধু বিচ্যুতি ও কলংকই বাড়াচ্ছে না, ধাবিত করছে পরকালীন আযাবের দিকেও। তাই দেশ থেকে অসভ্য-অপরাধীদের শাসন নির্মূল স্রেফ রাজনীতির বিষয় নয়, এটি পরকাল বাঁচানোর জিহাদ। ১১/০৮/২০১৯




রবীন্দ্রনাথের পৌত্তলিক চেতনা এবং বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিত

সংক্রামক রবীন্দ্র-চেতনা

মানুষ শুধু তার দেহ নিয়ে বাঁচে না। বাঁচে তার চেতনা নিয়েও। সে চেতনাটি নিয়ে এ জীবন ও জগতের সর্বত্র তার বিচরণ। সেটি যেমন ধর্ম-কর্ম,রাজনীতি,সংস্কৃতি ও পোষাক-পরিচ্ছদে,তেমনি তার গদ্য,পদ্য,কথা ও গানে। কোন ব্যক্তিকে তার রুহ থেকে যেমন আলাদা করা যায় না,তেমনি আলাদা করা যায় না তার চেতনা থেকেও। মানুষ বেড়ে উঠে এবং তার মূল্যায়ন হয় সে চেতনার গুণে। ইসলামের পরিভাষায় সেটিই হলো তার ঈমান ও আক্বীদা। নামায-রোযা ও হজ-যাকাতের আগে রোজহাশরে আল্লাহর কাছে প্রথমে হিসাব হবে ঈমান ও আক্বীদার। এখানে অকৃতকার্য হলে পাশের আর কোন সম্ভবনাই নাই। শত বছরের ইবাদত দিয়েও সেটি পূরণ হওয়ার নয়। মানুষের ধর্ম,কর্ম,সংস্কৃতি ও আচরনে বিপ্লব আসে তো ঈমান ও আক্বীদের গুণে। এখানে ভেজাল থাকলে ব্যক্তির ইবাদতে বা চরিত্রেও পরিশুদ্ধি আসে না। শিরক তো সে মহাবিপদই ঘটায়। রবীন্দ্রনাথের একটি বিশ্বাস ও চেতনা ছিল। এবং সেটি পৌত্তলিকতার।সে চেতনাটি প্রবল ভাবে ছড়িয়ে আছে রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও গানে। তাঁর রচিত নাটক,ছোটগল্প ও গানে। আলোচ্য নিবন্ধে তাঁর “আমার সোনার বাংলা গান” থেকেই তার কিছু উদাহরণ দেয়া হবে।

যক্ষা,কলেরা ও এ্যাইডসের ন্যায় শারীরীক রোগই শুধু সংক্রামক নয়,বরং অতি সংক্রামক হলো চেতনার রোগ। বাংলাদেশের ভয়ানক বিপদটি মূলতঃ এখানেই। বাংলাদেশ ৫ বার বিশ্বের সবচেয়ে দূর্বৃত্ত কবলিত দেশের যে শিরোপা পেল বা সম্প্রতি বিশ্ববাংক থেকে দূর্নীতির যে অপমানকর সার্টিফিকেট পেল এবং সেসাথে পদ্মা সেতু ঋণ থেকে বঞ্চিত হলো -সেটি যক্ষা,কলেরা ও এ্যাইডসের ন্যায় দৈহীক ব্যাধির কারণে নয়। বরং ব্যাধিগ্রস্ত চেতনা ও চরিত্রের কারণে। চেতনা রোগাগ্রস্ত হয় ভ্রান্ত ধর্ম ও দর্শনে। মানব জীবনে এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কোন বিষয় নাই। বিষয়টি এতই গুরুত্বপূর্ণ যে একজন মুসলমানকে প্রতি নামাজের প্রতি রাকাতে সে ভ্রান্ত ধর্ম ও দর্শন থেকে বাঁচার জন্য দোয়া পাঠ করতে হয়। মহান আল্লাহর কাছে চাইতে হয় সিরাতুল মোস্তাকীম। সেটি সুরা ফাতেহা পাঠের মধ্য দিয়ে। অথচ এর বিপরীতে ছাত্র-শিক্ষক, নারী-পুরুষ সবার মধ্য রোগ ছড়ানো হচ্ছে রাষ্ট্রীয় খরচে। পৌত্তলিক চেতনায় বিশ্বের কোথাও উন্নত চরিত্র গড়ে উঠেছে বা উচ্চতর সভ্যতা নির্মিত হয় তার প্রমাণ নাই। সেটি তো আদিম জাহিলিয়াত তথা অজ্ঞতা ও পথভ্রষ্টতার পথ। ১৪০০ শত বছর আগেই নবীজী ও তার সাহাবাগণ আরবের বুকে এমন একটি চেতনার কবর রচনা করেছিলেন। অথচ তেমন একটি পৌত্তলিক চেতনাকে বাংলাদেশের বাঙালী জাতীয় সঙ্গিত রূপে মাথায় তুলেছে। রবীন্দ্রনাথের সংক্রামক পৌত্তলিক চেতনাটি ছড়ানো হচ্ছে তাঁর গানকে যেমন জাতীয় সঙ্গিত করে,তেমনি তাঁর রচিত গান,নাটক ও সাহিত্যকে জনগণের রাজস্বের অর্থে বিপুল ভাবে প্রচার করে। কোটি কোটি কণ্ঠে রবীন্দ্র সঙ্গিত গেয়ে এবং স্কুল-কলেজে তাঁর সাহিত্য পড়িয়ে যে কোন চারিত্রিক বা নৈতিক বিপ্লব আসে না এবং বাংলাদেশে যে বিগত ৪০ বছরেও আসেনি সেটি কি এখনও প্রমাণিত হয়নি?

মুসলমান হওয়ার প্রকৃত অর্থটি হলো প্রবল এক ঈমানী দায়বদ্ধতা নিয়ে বাঁচা। সে দায়বদ্ধতাটি প্রতি মুহুর্তের। বেঈমান থেকে ঈমানদারের মূল পার্থক্যটি এখানেই। বেঈমান ব্যক্তি মনের খুশিতে যা ইচ্ছা যেমন খেতে বা পান করতে পারে,তেমনি গাইতে, বলতে বা লিখতেও পারে। তার জীবনে কোন নিয়ন্ত্রন নাই।মহান আল্লাহর কাছে তার কোন দায়বদ্ধতার চেতনাও নাই। অথচ মু’মিনের জীবনে নিয়ন্ত্রন সর্বক্ষেত্রে। ঈমানের প্রথম আলামতটি শুরু হয় জিহ্ববার উপর নিয়ন্ত্রন থেকে। সে নিয়ন্ত্রনটি শুধু কালেমায়ে শাহাদত পাঠে সীমিত নয়। বরং সেটি তাঁর মুখ থেকে উচ্চারিত প্রতিটি বাক্যের উপর। তাই কোন ব্যক্তির কাফের হওয়ার জন্য মন্দিরে গিয়ে মুর্তিকে পুজা দেয়া প্রয়োজন পড়ে না। জ্বিনা,উলঙ্গতা,মদ্যপান বা সূদ-ঘুষে লিপ্ত হওয়ারও প্রয়োজন পড়ে না,বরং জিহ্ববা দিয়ে আল্লাহর অবাধ্যতামূলক কিছু বলা বা পৌত্তলিক চেতনাপূর্ণ কিছু উচ্চারণ করাই সে জন্য যথেষ্ট। তাই মু’মিন ব্যক্তিকে শুধু পানাহার,পোষাকপরিচ্ছদে বা ইবাদতে সতর্ক হলে চলে না,নিজের রচিত প্রতিটি গানে,কবিতায়,কথা বলায় বা লেখনিতেও লাগাতর সর্বদা সতর্ক থাকতে হয়। কাফের ব্যক্তি নোবেল প্রাইজ পেলেও তার জীবনে সে ঈমানী নিয়ন্ত্রন থাকে না। কারণ বড় কবি হওয়া বা নোবেল প্রাইজ পাওয়ার জন্য সেটি কোন শর্তও নয়। ইমরুল কায়েসে মত এক কাফেরও আরবের অতি বিখ্যাত কবি ছিল। কিন্তু সে ইমরুল কায়েস মুসলমানদের কাছে গুরুর মর্যাদা পায়নি। তাই কাফের বক্তি যত প্রতিভাবানই হোক তাঁর গানকে মুসলিম দেশের জাতীয় সঙ্গিত বানানো যায় না। কারণ তাতে সংক্রামিত হয় তার কুফরি চেতনা। অথচ বাংলাদেশে তো সে বিপদটি প্রকট ভাবে ঘটেছে।

জাতীয় সঙ্গিতের অর্থ শুধু ভাব,ভাষা,ছন্দ এবং আবেগের প্রকাশ নয়। বরং এর মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় জাতির সংখ্যাগরিষ্ট মানুষের আক্বিদা-বিশ্বাস,আশা-আকাঙ্খা,দর্শন,ভিশন ও মিশন। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন “আমার সোনার বাংলা” গানটি লিখেছিলেন তখন বাংলাদেশ বলে কোন স্বাধীন দেশ ছিল না,বরং বাংলা ছিল ভারতের একটি প্রদেশ। সে প্রদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ মুসলমান হলেও তাদের সংখ্যা শতকরা ৯০ ভাগ ছিল না।তাছাড়া রবীন্দ্রনাথ নিজেও সে গানটিতে বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আবেগ,দর্শন,চেতনা বা স্বপ্নের প্রকাশ ঘটাতে লেখেনি। সেটি যেমন তার লক্ষ্য ছিল না,সে লক্ষ্যে তাঁর প্রস্তুতিও ছিল না। বরং লিখেছেন একান্ত তাঁর নিজের ভাব ও আবেগের প্রকাশ ঘটাতে। ফলে সে গানে যা প্রকাশ পেয়েছে সেটি রবীন্দ্রনাথের একান্ত নিজের।বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের নয়।রবীন্দ্রনাথ মুসলমান ছিলেন না। ফলে বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের বিশ্বাস,দর্শন,স্বপ্ন,ভিশন ও মিশনের প্রতিনিধিত্ব করা বা সেগুলির প্রকাশ ঘটানোর সামর্থও তার ছিল না।

পৌত্তলিক রবীন্দ্র-চেতনা

পারিবারিক সূত্রে রবীন্দ্রনাথ ব্রাহ্ম হলেও কার্যতঃ ছিলেন পৌত্তলিক মুশরিক। আর এ জগতটাকে একজন মুসলমান যেভাবে দেখে,একজন পৌত্তলিক সেভাবে দেখে না। উভয়ের বিশ্বাস যেমন ভিন্ন,তেমনি চেতনার জগতটাও ভিন্ন। আর কবিতা ও গানে তো সে বিশ্বাসেরই প্রকাশ ঘটে।একজন মুসলমানের কাছে এ পৃথিবীর ভূমি,আলোবাতাস,মাঠঘাট,গাছপালা,ফুল-ফল,নদী-সমুদ্র এবং সেগুলির অপরূপ রূপ –এ সবকিছুই মহান আল্লাহর আয়াত বা নিদর্শন। এসব নিদর্শন দেখে সে মহান আল্লাহর কুদরত যে কত বিশাল সে ছবকটি পায়। ফলে স্রষ্টার এ অপরূপ সৃষ্টিকূল দেখে মু’মিন ব্যক্তি সেগুলিকে ভগবান বা মা বলে বন্দনা করে না,বরং হামদ ও নাত গায় সেগুলির সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহর।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর “আমার সোনার বাংলা” গানটিতে লিখেছেন:

আমার সোনার বাংলা,

আমি তোমায় ভালবাসি।

চিরদিন তোমার আকাশ,

তোমার বাতাস

আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি।

ও মা,

ফাগুনে তোর আমের বনে

ঘ্রানে পাগল করে–

মরি হায়, হায় রে

ও মা,

অঘ্রানে তোর ভরা খেতে,

আমি কি দেখেছি মধুর হাসি।।

কি শোভা কি ছায়া গো,

কি স্নেহ কি মায়া গো–

কি আঁচল বিছায়েছ

বটের মূলে,

নদীর কূলে কূলে।

মা, তোর মুখের বাণী

আমার কানে লাগে

সুধার মতো–

মরি হায়, হায় রে

মা, তোর বদনখানি মলিন হলে

আমি নয়ন জলে ভাসি।।

রবীন্দ্রনাথের এ গানে ভাব আছে, ভাষা আছে, ছন্দও আছে। কিন্তু এর বাইরেও এমন কিছু আছে যা একজন মুসলমানের ঈমানের সাথে সাংঘর্ষিক। এ গানে তিনি বন্দনা গেয়েছেন বাংলার ভূমির,এবং সে ভূমির আলো-বাতাস,নদীর কূল,ধানের ক্ষেত,আমবাগান ও বটমূলের। কিন্তু যে মহান আল্লাহতায়ালা সেগুলির স্রষ্টা,সমগ্র গানে একটি বারের জন্যও তাঁর বন্দনা দূরে থাক তাঁর নামের উল্লেখ পর্যন্ত নাই।একজন পৌত্তলিকের জন্য এটিই স্বভাবজাত। পৌত্তলিকের এখানেই মূল সমস্যা। এখানে পৌত্তলিকের ভয়ানক অপরাধটি হলো নানা দেবদেবী ও নানা সৃষ্টির নানা রূপ বন্দনার মাঝে মহান আল্লাহকে ভূলিয়ে দেয়ার। এটিই তার শিরক। এবং এজন্যই সে মুশরিক। মহান আল্লাহর বান্দার বহু বড় বড় গোনাহ মাফ করে দিবেন কিন্তু শিরকের গুনাহ কখনই মাফ করবেন না। নবীজী (সাঃ) সে হুশিয়ারিটি বহুবার শুনিয়েছেন। পৌত্তলিক ব্যক্তিটি তার মনের গহীন অন্ধকারের কারণে এ পৃথিবীপৃষ্ঠে অসংখ্য সৃষ্টি দেখতে পেলেও সে সৃষ্টিকূলের মহান স্রষ্টাকে খুঁজে পায় না। রবীন্দ্রনাথও সে সীমাবদ্ধতার উর্দ্ধে উঠতে পারেননি। তাছাড়া গদ্য,পদ্য কবিতা ও গানের মধ্য দিয়ে ব্যক্তির মুখ বা জিহবা কথা বলে না বরং কথা বলে তার চেতনা বা বিশ্বাস। ফলে সে কবিতা ও গানে ব্যক্তির আক্বিদা বা ধর্মীয় বিশ্বাস ধরা পড়ে। তাই “আমার সোনার বাংলা” গানে যে চেতনাটির প্রকাশ ঘটেছে সেটি পৌত্তলিক রবীন্দ্রনাথের। কোন মুসলমানের নয়। গানে ইসলামী চেতনার প্রকাশের সামর্থ থাকলে তো রবীন্দ্রনাথ মুসলমান হয়ে যেতেন। পৌত্তলিক চেতনা নিয়েই একজন পৌত্তলিক কবি কবিতা ও গান লিখবেন বা সাহিত্যচর্চা করবেন সেটিই তো স্বাভাবিক। এমন একটি চেতনার কারণেই পৌত্তলিক ব্যক্তি শাপ-শকুন,গরু, বানর-হনুমান,নদ-নদী,বৃক্ষ,পাহাড়-পর্বতকে উপাস্য রূপে মেনে নেয় এবং তার বন্দনাও গায়।এ গানের ছত্রে ছত্রে তেমন একটি পৌত্তলিক চেতনারই প্রবল প্রকাশ ঘটেছে রবীন্দ্রনাথের কলমে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানে তাঁর নিজ চেতনার সাথে আদৌ গাদ্দারি করেননি। কিন্তু ইসলামি চেতনার সাথে একজন মুসলমানের গাদ্দারি তখনই শুরু হয় যখন পৌত্তলিক চেতনার এ গানকে মনের মাধুরি মিশিয়ে সে গাওয়া শুরু করে।

আমার সোনার বাংলা গানের প্রেক্ষাপট

“আমার সোনার বাংলা” গানটি রচনার একটি ঐতিহাসিক পেক্ষাপট আছে। গানটি রচিত হয়েছিল ১৯০৫ সালের পর। বাংলা দ্বিখণ্ডিত হয় ১৯০৫ সালে। পশ্চিম বঙ্গের তুলনায় অর্থনীতি ও শিক্ষাদীক্ষায় অতি পশ্চাদপদ ছিল পূর্ব বঙ্গ। পূর্ববঙ্গের সম্পদে দ্রুত শ্রীবৃদ্ধি ঘটছিল কোলকাতার। শুধু প্রশাসনই নয়,শিক্ষা ও শিল্প গড়ে উঠছিল শুধু কোলকাতাকে কেন্দ্র করে। মুসলমানদের দাবী ছিল বাংলাকে বিভক্ত করা হোক এবং পূর্ববঙ্গের রাজধানি করা হোক ঢাকাকে। সে দাবীর ভিত্তিতে ভারতের তৎকালীন ভাইস রয় লর্ড কার্জন পূর্ব বঙ্গ ও আসামকে নিযে একটি আলাদা প্রদেশ গঠিত করেন। এ নতুন প্রদেশের রাজধানী রূপে গৃহীত হয় ঢাকা নগরী। শহরটি রাতারাতি জেলা শহর থেকে রাজধানী শহরে পরিণত হয়। তখন ঢাকায় কার্জন হলসহ বেশ কিছু নতুন প্রশাসনিক ইমারত এবং হাই কোর্ট ভবন নির্মিত হয়। নির্মিত হয় কিছু প্রশস্ত রাজপথ। প্রদেশটি ছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ। বাংলার এবং সে সাথে আসামের মুসলমানদের মাঝে আসে নতুন রাজনৈতিক প্রত্যয়। ১৯০৬ সালে গঠিত হয় মুসলিম লীগ যা শুধু বাংলার মুসলমানদের জন্যই নয়, সমগ্র ভারতীয় মুসলমানদের মাঝে সৃষ্টি করে নতুন আত্মবিশ্বাস ও রাজনৈতিক চেতনা। মুসলমানদের এ রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং কোলকাতাকে ছেড়ে ঢাকার এ মর্যাদা-বৃদ্ধি কোলকাতার বাঙালী বাবুদের ভাল লাগেনি।কবি রবীন্দ্রনাথেরও ভাল লাগেনি। পূর্ব বাংলা পশ্চাদপদ মুসলমানদের প্রতি অগ্রসর বাঙালী হিন্দুদের কোন দরদ না থাকলেও খণ্ডিত বাংলার প্রতি তখন তাদের দরদ উপচিয়ে পড়ে। বাংলার মাঠঘাট,আলোবাতাস,জলবায়ু,বৃক্ষরাজী ও ফলমূলের প্রতি আবেগ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ লেখেন এ গান। তাই এ গানের একটি রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল। সেটি বাংলার বিভক্তির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা। বাঙালী হিন্দুরা তখন অখণ্ড বঙ্গের দাবী নিয়ে রাজপথে নামে। ১৯১১ সালে ব্রিটিশ রাজা পঞ্চম জর্জ ভারত ভ্রমনে আসেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ভারত উপলক্ষে “জনগণ মনোঅধিনায়ক ভারত ভাগ্যবিধাতা” নামে কবিতা লেখেন। ভারতের সেটিই আজ জাতীয় সঙ্গিত।

রবীন্দ্রনাথ ও  বাঙালী হিন্দুদের সে দাবী রাজা পঞ্চম জর্জ মেনে নেন এবং আবার বাংলা একীভূত হয়। প্রচণ্ড ক্ষোভ ও হতাশা নেমে আসে পূর্ব বঙ্গের মুসলমানদের মাঝে। বিক্ষুদ্ধ এ মুসলমানদের শান্ত করতে ভারতের ব্রিটিশ সরকার তখন ঢাকাতে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দেয়।কিন্তু সেটিও কোলকাতার বাঙালী বাবুদের ভাল লাগেনি। তার মধ্যেও তারা কোলকাতার শ্রীহানীর কারণ খুঁজে পায়। ফলে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধেও বাঙালী বাবুগণ তখন রাজপথে নামেন। খোদ রবীন্দ্রনাথে মিছিলে নেমেছিলেন কোলকাতার সড়কে। এই হলো রবীন্দ্র মানস। সে সাথে বাঙালী হিন্দুর মানস। আর সে মানসকে নিয়ে রচিত সঙ্গিত এখন বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিত।

আজকের শতকরা ৯১ ভাগ মুসলমানের বাংলাদেশ রবীন্দ্রনাথের আমলের অবিভক্ত বাংলা যেমন নয়,তেমনি দেশটি ভারতভূক্তও নয়। রবীন্দ্রনাথের অবিভক্ত বাংলায় মুসলমানদের সংখ্যা শতকরা ৫৫ ভাগের বেশী ছিল না। সে আমলের বাংলা ঢাকাকেন্দ্রীকও ছিল না। এখন এটি এক ভিন্ন চরিত্রের বাংলাদেশ -যে দেশে রবীন্দ্রনাথ একদিনের জন্যও বাস করেননি। কোনদিনও তিনি এদেশের নাগরিক ছিলেন না। এদেশের স্বাধীনতার কথা তিনি যেমন শোনেননি,তেমনি এ দেশের শতকরা ৯১ ভাগ মুসলমানদের নিয়ে তিনি কোন স্বপ্নও দেখেননি। ফলে বাংলাদেশের মানুষের চাওয়া-পাওয়া,স্বাধীনতা বা স্বপ্নের প্রতিনিধিত্ব করা কি তাঁর পক্ষে সম্ভব? তাছাড়া এ সঙ্গিতটি সে উদ্দেশ্যে লেখাও হয়নি। জাতীয় সঙ্গিত নির্বাচনের বিষয়টি দোকান থেকে ‘রেডিমেড’ সার্ট কেনার ন্যায় নয়। এটিকে বরং বিশেষ রুচী,বিশেষ আকাঙ্খা,বিশেষ প্রয়োজন মেটাতে অতি বিশেষ গুণের ‘tailor made’ হতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিত নির্বাচনের ক্ষেত্রে সে সতর্কতা অবলম্বন করা হয়নি। বরং এখানে গুরুত্ব পেয়েছে রবীন্দ্রভক্তি ও রবীন্দ্রপুঁজার মানসিকতা।

বড় ব্যর্থতা ও বড় বিদ্রোহ

বাংলাদেশের মুসলমানদের বড় ব্যর্থতা এবং সে সাথে মহান আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহটি শুধু এ নয় যে,তারা রাষ্ট্রের বুকে সূদী ব্যাংক,পতিতাপল্লি,মদের দোকান,অশ্লিল ছায়াছবি এবং দেশের আদালতে কুফরি আইনকে আইনগত বৈধতা দিয়েছে এবং মেনে নিয়েছে। আরেক বড় ব্যর্থতা এবং মহান আল্লাহর বিরুদ্ধে আরেক বড় বিদ্রোহ হলো জাতীয় সঙ্গিত রূপে গেয়ে চলেছে রবীন্দ্রনাথের পৌত্তলিক চেতনাপুষ্ট এ গানটিকে। যারা বেঈমান ও বিদ্রোহী হয় তাদের সে বেঈমানী ও বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে জীবনের সর্বক্ষেত্রেই। সেটি যেমন দেশের আইন-আদালতে কুফরি আইন অনুসরণে এবং রাষ্ট্রে পতিতাপল্লি ও সূদী ব্যংক বহাল রাখার মধ্যে,তেমনি মনের আবেগ ও মাধুারি মিশিয়ে জাতীয় সঙ্গিত রূপে পৌত্তলিক চেতনা সমৃদ্ধ গান গাওয়াতেও। মহান আল্লাহর সাথে তাদের সে বেঈমান-সুলভ গাদ্দারিটা তখন শুধু রাজনীতিতে সীমিত থাকে না,বরং সর্বক্ষেত্রেই সেটি ধরা পড়ে। মুসলিম সংহতির বুকে কুড়াল মারা এবং মুসলিম রাষ্ট্রের বিনাশের ন্যায় হারাম কাজটিও তখন এমন বিদ্রোহীদের কাছে উৎসবে পরিণত হয়। তাছাড়া বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিত রূপে এ গানটিকে যে শেখ মুজিব ও তাঁর দলবল নির্বাচন করেছিলেন ইসলামে সাথে তাদের গাদ্দারি কি কম পরিচিত? বাংলাদেশে ইসলামের নামে দলবদ্ধ হওয়া এবং ইসলামের শরিয়তী আইনের প্রতিষ্ঠার রাজনীতিকে মুজিব সাংবিধানিক ভাবে নিষিদ্ধ করেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রামে কোরআনের আয়াত এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ইসলাম ও মুসলিম শব্দগুলি তাঁর কাছে বরদাশত হয় হয়নি। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রাম থেকে যেমন কোরআনের আয়াতকে সরিয়েছেন,তেমনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম থেকে ইসলাম ও মুসলিম শব্দগুলিও সরিয়েছেন। তাই তাঁর হাতে সলিমুল্লাহ মুসলিম হল হয়ে যায় সলিমুল্লাহ হল। জাহিঙ্গরনগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে যায় জাহ্ঙ্গিরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং নজরুল ইসলাম কলেজ হয় নজরুল কলেজ। মুজিবের কাছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ পেয়েছিল ভারতকে খুশি করা,আল্লাহকে খুশি করা নয়।

ইসলামের বিরুদ্ধে মুজিবের শুরু করা সে যুদ্ধটি এখন চালিয়ে যাচ্ছে তার কন্যা শেখ হাসিনা ও দলীয় কর্মীরা। এক্ষেত্রে ব্রিটিশ বা ভারতের হিন্দু কাফেরদের থেকেও তারা বেশী ইসলাম বিদ্বেষী। ব্রিটিশ ও হিন্দু ভারতে মুসলমানদের উপর ইসলামের নামে দল গড়ায় নিষেদ্ধাজ্ঞা কোন কালেই ছিল না এবং আজও  নাই। মুসলিম লীগ, জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ, জামায়াতে ইসলামীসহ বহু মুসলিম প্রতিষ্ঠান ভারতে আজও বেঁচে আছে মুসলিম নাম নিয়ে।অথচ মুজিব বেঁচে থাকতে সে অধিকার বাংলাদেশের মুসলমানদের তিনি দেননি। মুজিব ও তাঁর অনুসারিদের চেতনা যে সিক্ত ছিল রবীন্দ্রনাথের পৌত্তলিক চেতনায় -সেটি কি এ গানের নির্বাচন থেকেই সুস্পষ্ট নয়?

গুরুত্ব পায়নি মহান আল্লাহর নির্দেশ ও নবীজী (সাঃ)র সূন্নত

নবীজীর আমলেও আরব দেশে বিস্তৃত ভূমি,চন্দ্র-সূর্য্য ও আকাশ-বাতাস ছিল। সে ভূমিতেও মাঠ-ঘাট,ফুল-ফল ও বৃক্ষরাজিও ছিল। কিন্তু মহান নবীজী (সাঃ) কোন সময়ও কি সেগুলিকে মা বলে সম্বোধন করেছেন? বরং আজীবন হামদ-নাত ও প্রশংসা গীত গেয়েছেন সে সৃষ্টিকূলের মহান স্রষ্টার। আল্লাহর অনুগত বান্দাহ রূপে মুসলমানের বড় দায়িত্ব হলো আল্লাহর নামকে সর্বত্র প্রবল ভাবে প্রকাশ করা বা বড় করা। হেদায়াতপ্রাপ্তির চেয়ে ব্যক্তির জীবনে মহান আল্লাহর বড় নেয়ামত নেই। পথভ্রষ্ট হওয়ার চেয়ে এ জীবনে বড় ব্যর্থতাও নেই। হেদায়াত প্রাপ্তির শুকরিয়া জানাতে ঈমানদার ব্যক্তি আমৃত্যু তাই আল্লাহর মহিমা প্রকাশ করে। এ জন্য সর্বত্র আল্লাহু আকবর বলে। পবিত্র কোরআনে সেটির নির্দেশও রয়েছে। বলা হয়েছে,“তোমাদের হেদায়েত দান করার দরুন তোমরা আল্লাহর নামে তাকবির বল (অর্থাৎ আল্লাহ যে মহিমাময় সর্বশ্রেষ্ঠ সেটি মুখ দিয়ে প্রকাশ কর), যাতে তোমরা এভাবে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পার।” –সুরা বাকারা, আয়াত ১৮৫। তাই মুসলমান “আল্লাহু আকবর” বলে শুধু জায়নামাজে তাকবির ধ্বণি দেয় না,রাজপথের মিছিলে বা জনসভাতেও দেয়। রাজনীতি,অর্থনীতি সংস্কৃতি,শিক্ষাদীক্ষা,কবিতা ও গানেও বলে। এটি শুধু তাঁর রাজনৈতিক শ্লোগান নয়, বরং ইবাদত। মুসলমান তাই কোথাও সমবেত হলে “জয় বাংলা” বা “জয় হিন্দ” বলে না বরং সর্বশক্তিতে গগন কাঁপিয়ে “নারায়ে তাকবীর আল্লাহু আকবার” বলে।একজন মুসলমান তো এভাবেই একজন কাফের বা মুনাফিক থেকে ভিন্ন পরিচয় নিয়ে ধর্মকর্ম,রাজনীতি ও সংস্কৃতি চর্চা করে।কিন্তু বাংলাদেশের সেক্যুলার পক্ষের বড় সাফল্য হলো ইসলামের সে বিশুদ্ধ চেতনাকে বহুলাংশে তারা বিলুপ্ত করতে সমর্থ হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের রাজনীতি,শিক্ষা-সংস্কৃতি ও অর্থনীতিতে প্রতিনিয়ত যে জয়ধ্বণিটি ঘোষিত হয় সেটি মহান আল্লাহর নয়,বরং শয়তানি বিধানের।

ব্যক্তির নাম থেকেই তার ধর্ম,চেতনা ও বিশ্বাসের পরিচয় জানা যায়। এ পরিচয়টুকু জানার জন্য তখন আর বাড়তি প্রশ্নের প্রয়োজন পড়ে না। সে নামটি আজীবন তার ধর্ম বা বিশ্বাসের পক্ষে সাইনবোর্ড রূপে কাজ করে। তেমনি জাতির জীবনে হলো জাতীয় সঙ্গিত। জাতীয় সঙ্গিত থেকেই পরিচয় মেলে জাতির ধর্মীয় বিশ্বাস ও চেতনার। তাই নাস্তিকের ও আস্তিকের ধর্মীয়,রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবন যেমন এক হয় না,তেমনি এক হয় না জাতীয় সঙ্গিতও। বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিতটি নির্বাচনের একটি ইতিহাস আছে। সেটি গৃহীত হয়েছিল পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ সৃষ্টির পর। যারা এ সঙ্গিতটিকে গ্রহণ করেছিল তারা ছিল বাঙালী জাতিয়তাবাদী সেক্যুলার। তাদের চেতনায় ও রাজনীতিতে ইসলামের কোন প্রভাব ছিল না। বরং তারা ইতিহাসে পরিচিতি পেয়েছে ভারতপ্রীতি,রবীন্দ্রপ্রীতি,এবং ইসলামি চেতনার নির্মূলে আপোষহীনতার কারণে। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতিও শেখ মুজিবের কোন শ্রদ্ধাবোধ ছিল না।তিনি যে শুধু রাজনীতিতে স্বৈরাচারি ছিলেন তা নয়।বরং প্রচণ্ড স্বৈরাচারি ছিলেন বুদ্ধিবৃত্তি ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও। তাই দেশের উপর তিনি শুধু একদলীয় বাকশালই চাপিয়ে দেননি,বরং সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ধর্মীয় বিশ্বাসকে উপেক্ষা করে চাপিয়ে দিয়েছেন পৌত্তলিক সংস্কৃতির আগ্রাসনও। রবীন্দ্রনাথের “আমার সোনার বাংলা” গানটিকে জাতীয় সঙ্গিত রূপে চাপানো হয়েছে তেমন এক স্বৈরাচারি মানসিকতা থেকে।

গুরুত্ব পায়নি বাঙালী মুসলমানের স্বপ্ন

প্রতিটি দেশের শুধু একটি রাজনৈতিক,ভৌগলিক ও ভাষাগত পরিচয়ই থাকে না,সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিচয়ও থাকে।জনগণের চেতনায় যেমন সুনির্দ্দিষ্ট দর্শন থাকে,তেমনি সে দর্শনের আলোকে রাজনৈতিক স্বপ্নও থাকে।সভ্যতা নির্মানের সে দেশের জনগণের একটি গুরুতর দায়বদ্ধতাও থাকে। সে বিচারে প্রতিটি দেশই অনন্য।সে অনন্য বৈশিষ্ঠের কারণেই আজকের বাংলাদেশ পশ্চিম বাংলা থেকে ভিন্ন। এবং সে ভিন্নতার ফলেই পশ্চিম বাংলার ন্যায় বাংলাদেশ ভারতের অংশ নয়।পশ্চিম বাংলার সাথে বাংলাদেশের পার্থক্যটি এখানে ভূমি,জলবায়ু বা আলোবাতাসের নয়,বরং দর্শন এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের ভিশন ও মিশনের। পার্থক্যটি ভিন্ন স্বপ্ন নিয়ে বাঁচার। সে ভিন্ন স্বপ্নের কারণেই ১৯৪৭য়ে পশ্চিম বাংলার হিন্দুগণ যখন ভারতে যোগ দেয় তখন পূর্ব বাংলার মুসলমানগণ অতি সচেতন ভাবেই বাঙালী হিন্দুদের সাথে প্রতিবেশী ভারতে যায়নি। গিয়েছে পাকিস্তানে। সাতচল্লিশের সে ভাবনার সাথে দেশের ৯০% ভাগ মুসলমানের সমর্থণ ছিল। ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় হোক শেখ মুজিবও সেদিন সে ভাবনার সাথে একাত্ম হয়েছিলেন। প্রতিবেশী বাঙালী হিন্দুদের সাথে না গিয়ে তারা তখন ১২০০ মাইল দূরের অবাঙালী পশ্চিম পাকিস্তানীদের সাথে গেছে।সেটি এক অনস্বীকার্য ইতিহাস।

বাঙালী মুসলমানদের যে প্রতিবেশী হিন্দুদের থেকে যে ভিন্নতর পরিচয় ও স্বপ্ন ছিল সেটি তাই ইতিহাসের গোপন বিষয় নয়। বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিত রচিত হতে হবে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সে বিশিষ্ঠ পরিচয় ও স্বপ্নগুলো তুলে ধরতে এবং প্রবলতর করতে। এমন সঙ্গিতের প্রতিটি শব্দ ও প্রতিটি উচ্চারণ থেকে প্রতিটি নাগরিক তখন পাবে নতুন প্রত্যয় ও নতুন প্রেরণা। পাবে স্বপ্নের সে পথটিতে অবিরাম টিকে থাকার মানসিক বল। কিন্তু জাতীয় সঙ্গিতের নির্বাচনে বাংলাদেশের মুসলমানদের সে ভিন্নতর পরিচয়কে মেনে নেয়া হয়নি। এ সঙ্গিতে যে সুর,যে দর্শন,যে বর্ণনা এবং যে আকুতি ধ্বণিত হয়েছে সেটি কোন মুসলমানের নয়,সেটি নিতান্তই একজন পৌত্তলিকের। এমন সঙ্গিত থেকে মুসলমান অনুপ্রেরণা না পেয়ে পায় চরম পথভ্রষ্টতা। পায় শিরকের ছবক। যে ভ্রষ্টতার কারণে পৌত্তলিক মানুষটি বিষধর সাপকে দেবতা রূপে গ্রহণ করার অনুপ্রেরণা পায়,তেমনি এ সঙ্গিত পাঠকারি বাংলাদেশীও উৎসাহ পায় ভারতের ন্যায় একটি শত্রুদেশকে বন্ধু রূপে গ্রহণ করায়।

স্ট্রাটেজী ভারতীয় অধিকৃতির

ভারত থেকে আলাদা মানচিত্র নিয়ে বাংলাদেশ বেড়ে উঠুক ভারত সেটি ১৯৪৭য়ে যেমন চায়নি,আজও  চায় না। ভারতের এ আগ্রাসী নীতি শুধু অধিকৃত কাশ্মির, হায়দারাবাদ,গোয়া,মানভাদড় বা সিকিমের ক্ষেত্রে নয়,বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও। কাশ্মিরে ভারত যে ৭ লাখ সৈন্যের বিশাল বাহিনী মোতায়েন করেছে সেটি সেখানে গণতন্ত্র বা অর্থনীতি বাড়াতে নয়। বরং ভারতের অধিকৃতি নিশ্চিত করতে। ভারত একাত্তরে যে বিশাল সামরিক বাহিনী নিয়োজিত করেছিল এবং যেরূপ আজ মোতায়েন করে রেখেছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক,সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ময়দানে লক্ষ লক্ষ অনুগত এজেন্ট সেটিও বাংলাদেশে স্বাধীনতা বা গণতন্ত্র বাড়াতে নয়। কাশ্মিরে ভারতের বিপদটি হলো সেখানে তারা কাশ্মিরীদের মধ্য থেকে এতটা সেবাদাস এজেন্ট পায়নি যতটা পেয়েছে বাংলাদেশে। ফলে এক কোটি মানুষের কাশ্মির দখলে রাখতে হাজার হাজার কোটি রুপি ব্যয়ে পাঞ্জাব,রাজস্থান,বিহার,গুজরাত,মহারাষ্ট্র,উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশসহ ভারতের অন্যান্য প্রদেশ থেকে ৭ লাখ সৈন্য সংগ্রহ করতে হয়েছে। সে সাত লাখ সৈন্যের পানাহার, চলাচল ও লজিস্টিকের পিছনে প্রতি বছর বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে বহু হাজার কোটি রুপি। অথচ সাড়ে সাত কোটি মানুষের পূর্ব পাকিস্তানে একাত্তরে এক লাখ পাকিস্তানী সৈন্যও ছিল না। কাশ্মিরে এক লাখ ভারতীয় সৈন্য পালতে যত অর্থ ব্যয় হয় তা দিয়ে বাংলাদেশে অন্ততঃ দশ লাখ দালাল পালা সম্ভব। এজন্যই বাংলাদেশের রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি,মিডিয়া,প্রশাসন,সেনাবাহিনী,পুলিশ বাহিনী,শিক্ষাঙ্গণ,সংস্কৃতি ও আদালত প্রাঙ্গণে এত ভারতীয় দালালের ছড়াছড়ি।বাংলাদেশের মাটি এক্ষেত্রে অতি উর্বর। সে উর্বরতা বাড়িয়েছে বাঙালী জাতীয়তাবাদী সেকুলারিস্টগণ। বাংলাদেশে আওয়ামী-বাকশালী দাসদের কারণে ভারত অতি অল্প খরচে ১৬ কোটি মানুষের বাংলাদেশকে অধিকৃত রাখতে পেরেছে। ফলে বাংলাদেশের বুক চিরে করিডোর নিতে বা দেশের সমূদ্রবন্দর ও নদীবন্দরের উপর দখল নিতে ভারতকে একটি তীরও ছুড়তে হয়নি।

জাতীয় সঙ্গিতের রাজনৈতীক এজেন্ডা

গলিত আবর্জনার স্তুপে যেমন অসংখ্য মশামাছি রাতারাতি বেড়ে উঠে তেমনি সেক্যুলারিজমের মাঝে বিপুল ভাবে বেড়ে উঠে ইসলামের দুষমনেরা। তখন সর্বত্র জুড়ে কিলবিল করে ভারতসেবী, মার্কিনসেবী, ইসরাইলসেবী দাস চরিত্রের ঘৃণীত জীব। তখন আন্তর্জাতিক অঙ্গণে বাড়ে ইসলামের শত্রুপক্ষের সাথে রাজনৈতিক মিত্রতা। তাই ১৯৭১য়ে আওয়ামী বাকশালীরা মুসলিম দেশে কোন বন্ধু খুঁজে না পেলে কি হবে,মুসলিম নিধনকারি ভারত ও সোভিয়েত রাশিয়ায় তারা প্রচুর মিত্র খুঁজে পেয়েছে।অথচ দালালের আবাদ বাড়াতে কাশ্মিরে ভারত সে উর্বরতা পায়নি। কারণ, সেখানে রয়েছে প্রবল ইসলামী চেতনা। গড়ে উঠেছে  ভারত বিরোধী প্রচণ্ড বিদ্রোহ। ফলে বাংলাদেশের উপর দিয়ে ভারত যত সহজে নিরাপদ করিডোর এবং সমুদ্রবন্দর ও নৌবন্দর ব্যবহারের সুযোগ নিয়েছে,কাশ্মিরে ৭ লাখ সৈন্য মোতায়েন করেও যানবাহন চলাচলে সে নিরাপত্তা পায়নি। সে নিরাপত্তা পাচ্ছে না কোন শহরে বা গ্রামে। অথচ বাংলাদেশে তারা বাংলাদেশীদের চেয়েও পাচ্ছে অধিক নিরাপত্তা। ভারতীয় সীমান্তরক্ষির হাতে বাংলাদেশীরা অহরহ লাশ হলেও বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতীয়দের সে বিপদ নাই। বিপুল সংখ্যক সেক্যুলারিস্টদের চেতনা-রাজ্য ইতিমধ্যেই ভারতের হাতে অধিকৃত। অখন্ড ভারতের বাইরে বাংলাদেশের আলাদা মানচিত্রকে যে গান্ধি, নেহেরু বা রবীন্দ্রনাথ শুরু থেকেই বিরোধীতা করেছিল তারা বরং এ ভারতভক্তদের কাছে পুঁজনীয়।

রবীন্দ্রনাথ ১৯০৫ সালে বাংলার বিভক্তিকে মেনে নেননি। মেনে নেননি ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকেও। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধীতায় তিনি রাজপথে নেমেছেন। কারণে তাতে মুসলমানদের কল্যাণের সম্ভাবনা ছিল।বাংলার অখণ্ড ভূগোল ১৯০৫ সালে তাঁর কাছে তখন পুঁজনীয় ছিল। “আমার সোনার বাংলা” গানটি লেখা হয়েছে তেমনি এক চেতনা নিয়ে। কিন্তু সে অখণ্ড ভূগোলকে রবীন্দ্রভক্ত বাঙালী হিন্দুগণই ১৯৪৭য়ে বিভক্ত করে। ১৯০৫য়ে বাংলাকে অখণ্ড রাখা এবং ১৯৪৭য়ে আবার খণ্ডিত করার মধ্যে তাদের রাজনীতি ছিল। সে রাজনীতির মূল লক্ষ্য হলো বাংলার এ ভূখণ্ডে বাঙালী হিন্দুর স্বার্থ সংরক্ষণ।তেমনি একটি আগ্রাসী রাজনীতি আছে রবীন্দ্রনাথের “আমার সোনার বাংলা” গানটির পৌত্তলিক চেতনাকে বাংলাদেশের মানুষের উপর চাপিয়ে দেয়ায়।সে রাজনৈতিক লক্ষটি হলো,যে অখণ্ড বাংলার চেতনা নিয়ে ১৯০৫ সালে গানটি লেখা হয়েছিল সে দিকে ফিরিয়ে নেয়ার।

পৌত্তলিকতার আগ্রাসন ও সংকট

বাঙালী মুসলমানের চেতনা রাজ্যে ভারতের পক্ষে প্রবল অধিকৃতি জমানোর কাজটি করেছে সেক্যুলার বাঙালী বুদ্ধিজীবীরা। ইমারত একবার নির্মিত হলে সেটিকে খাড়া রাখার খরচ অনেক কমে যায়। এমন চেতনা নির্মাণের কাজে ভারতের বিনিয়োগ ১৯৪৭ থেকেই। সেক্যুলার বাংলাদেশ নির্মাণের পর এখন ভারতের সে খরচ বিপুল ভাবে কমেছে। এখন সে কাজে ব্যয় হচ্ছে বাংলাদেশের মুসলমানদের নিজেদের রাজস্বের পুঁজি। ভারতের লক্ষ্য,নিজেদের সে প্রতিষ্ঠিত অধিকৃতিকে লাগাতর বজায় রাখা। বাংলাদেশের উপর ভারতের দখলদারিটি শুধু সামরিক, রাজনৈতিক বা অর্থনতিক নয়,বরং সাংস্কৃতিক।সে অধিকৃতিরই প্রতীক হলো জাতীয় সঙ্গিত রূপে চাপিয়ে দেয়া পৌত্তলিক রবীন্দ্রনাথের গান। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন অখণ্ড ভারতের ধ্বজাধারি। সে অখণ্ড ভারতের চেতনা থেকেই ভারত থেকে মুসলিম নির্মূলের প্রবক্তা মারাঠী শিবাজীকে তিনি জাতীয় বীরের মর্যাদা দিয়েছেন। শিবাজীকে বন্দনা করে তিনি কবিতাও লিখেছেন। গান্ধীকে পরামর্শ দিয়েছেন হিন্দিকে ভারতের রাষ্ট্র ভাষা করতে। এখন সে রবীন্দ্রনাথকে ভারত ব্যবহার করছে বাংলাদেশের উপর সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য স্থাপনের যোগসূত্র রূপে। এজন্যই বাংলাদেশে রবীন্দ্রচর্চা ও রবীন্দ্রঅর্চনা বাড়াতে ভারত সরকার ও আওয়ামী লীগ সরকারের এত বিনিয়োগ। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের রাজস্বের অর্থে বাংলা এ্যাকাডেমীর কাজ হয়েছে প্রতিবছর পৌত্তলিক রবীন্দ্রনাথের উপর শত শত বই প্রকাশ করা। অথচ ইসলামের মহান নবীজী(সাঃ)এবং মানব-ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মানুষটির উপর কি এর দশ ভাগের এক ভাগ বই ছাপানোরও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে?

বাংলাদেশের শিশু-সন্তান ও নাগরিকের বিরুদ্ধে বড় জুলুমটি নিছক রাজনৈতিক,প্রশাসনিক বা অর্থনৈতিক নয়। বরং সেটি আদর্শিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক। সে জুলুমের অংশ রূপেই একজন পৌত্তলিকের রচিত সঙ্গিতকে বাংলাদেশের মুসলমান নারীপুরুষ ও শিশুদের দিনের পর দিন জাতীয় সঙ্গিত রূপে গাইতে হচেছ,এবং ফলে তারা ব্যর্থ হচ্ছে জীবনের সে স্মরণীয় মুহুর্তগুলোতে মহান আল্লাহকে স্মরণ করতে। শয়তান তো এভাবেই মানুষের মনের ভূবনে অধিকৃতি জমায়। এবং পথভ্রষ্টতা বাড়ায় মহান আল্লাহর প্রদর্শিত সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে। জাতীয় সঙ্গিত পাঠের নামে এভাবেই পরিকল্পিত ভাবে ইসলামের মূল আক্বিদা ও শিক্ষা-সংস্কৃতি থেকে ছাত্র-ছাত্রী,শিক্ষক-সেনা এবং সাধারণ মানুষকে দূরে হটানো হচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিই শুধু নয়,সাধারণ মানুষের চেতনার মানচিত্রও যে অভিন্ন ভাষা ও অভিন্ন সাহিত্যের নামে পৌত্তলিক হিন্দুদের হাতে অধিকৃত এ হল তার নমুনা। বাঙালী মুসলমানের চেতনায় ইসলাম তার সনাতন রূপ নিয়ে বেঁচে থাকলে পৌত্তলিক রবীন্দ্রনাথের এ গান কি বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিত রূপে গ্রহণযোগ্যতা পেত?

বস্তুতঃ সাহিত্য এবং সে সাথে জাতীয় সঙ্গিত পরিনত হয়েছে ঈমান ধ্বংসের এক নীরব হাতিয়ারে। ফলে পথভ্রষ্টতা বাড়ছে শুধু ধর্মপালনে নয়,বরং দেশের রাজনীতি, সংস্কৃতি, আইন-আদালত ও প্রশাসনে।বাঙালী মুসলমানের জীবনে এভাবেই বাড়ছে মহাসংকট। দিন দিন বাড়ছে নবীজী (সাঃ)র আমলের সনাতন ইসলামের সাথে সাধারণ মানুষের দুরুত্ব। সে সাথে প্রবলতর হচ্ছে রাজনীতি,সংস্কৃতি ও প্রশাসনসহ দেশের সর্বত্র ইসলামের শত্রু পক্ষের অধিকৃতি।ফলে দেশ গড়ছে দূর্নীতিতে বিশ্ব রেকর্ড।বাড়ছে দুনিয়াব্যাপী দুর্নাম ও অপমান। ইসলামি রাষ্ট্র,আল্লাহর সার্বভৌমত্ব,শরিয়তি আইন, মুসলিম উম্মাহর একতা,প্যান-ইসলামিক মুসলিম ভ্রাতৃত্ব এবং জিহাদ –ইসলামের এসব মৌলিক বিষয়গুলো চিত্রিত হচ্ছে সন্ত্রাসী চেতনা রূপে। প্রতিবেশী রোহিঙ্গা মুসলমানেরা হত্যা,ধর্ষণ,নির্যাতন থেকে প্রাণ বাঁচাতে এসেও বাংলাদেশে আশ্রয় পাচ্ছে না। একটি মুসলিম দেশের মুসলিম জনগোষ্ঠির এর চেয়ে বড় অধঃপতন ও বিপর্যয় আর কি  হতে পারে? মহান আল্লাহর দরবারে মূক্তিই বা মিলবে কীরূপে? ১৫/০৭/২০১২

 




প্রিয়া সাহার স্পর্ধা ও নতজানু বাংলাদেশ সরকার

অপরাধ মিথ্যা দোষারোপের

দেশের বিরুদ্ধে ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ, বিদ্রোহ বা নাশকতা শুধু অস্ত্র দিয়ে হয় না; সেটি হয় কথা বা লেখনীর সাহায্যেও। মানব ইতিহাসে বড় বড় নাশকতাগুলো ঘটেছে এভাবে। তাই যে কোন সভ্য দেশে সেরূপ ক্ষতিকর কথা ও লেখনীর জন্য অপরাধী ব্যক্তিকে আদালতে তোলা হয় এবং গুরুতর শাস্তিও হয়। প্রিয়া সাহার গুরুতর অপরাধটি হলো, তিনি বিদেশের মাটিতে এক বিশাল গণহত্যার অভিযোগ তুলে বাংলাদেশকে বিদেশের আদালতে অপরাধী রূপে খাড়া করেছেন এবং সে সাথে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে বিচারও চেয়েছেন। সেটি করে তিনি বস্তুতঃ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে একটি বিদেশী শক্তিকে হস্তক্ষেপের দাওয়াত দিয়েছেন। এটি এক গুরুতর শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ভারতে বা অন্য কোন দেশের বিরুদ্ধে এমনটি হলে তার বিরুদ্ধে গুরুতর শাস্তির ব্যবস্থা হতো। রাস্তায় প্রতিবাদি মিছিল শুরু হতো। বাংলাদেশ পৃথিবী পৃষ্টে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র রূপে স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত; দেশটিতে রয়েছে আইন-আদালত। দেশের কোন নাগরিকদের বিরুদ্ধে কোন অপরাধ ঘটলে, যে কোন নাগরিকের দায়িত্ব হলো তা নিয়ে দেশের আদালতে বিচার প্রার্থণা করা। তা নিয়ে বিতর্কের আয়োজন হতে পারতো সংসদেও। দেশের সাংবাদিক বা বুদ্ধিজীবী মহলেও এ নিয়ে আলোচনা বা লেখালেখি আলোচনা হতে  পারতো। কিন্তু সোটি না করে প্রিয়া সাহা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে অভিযোগ দায়ের করেছেন। যেন বাংলাদেশ মার্কিন সরকারের তালুক, এবং বিচারক ডোনাল্ড ট্রাম্প।  

প্রিয়া সাহার আরেক গুরুতর অপরাধ, দেশের জন্য অতিশয় ক্ষতিকর ভিত্তিহীন মিথ্যা কথা তিনি বলেছেন। অথচ মিথ্যা কথা বলা কোন মামূলী বিষয় নয়, যে কোন সভ্য দেশের আইনেই তা শাস্তিযোগ্য গুরুতর অপরাধ। অস্ত্রের সাহায্যে দেহহত্যা হয়। আর মিথ্যার সাহায্যে হত্যা করা হয় জ্ঞান, শ্রম, মেধা ও অর্থের বিনিয়োগে অর্জিত ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদাকে। এভাবে ব্যক্তির বেঁচে থাকার আনন্দকেই নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়। মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তি বিধানে মিথ্যা কথা বলা তাই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কারো বিরুদ্ধে ব্যাভিচারের মিথ্যা অভিযোগ আনার শাস্তিটি তাই ব্যাভিচারে লিপ্ত হওয়ার শাস্তির সমান। অবিবাহিত হলে তাকে তখন ১০০টি চাবুকের আঘাত প্রকাশ্যে কোন ময়দানে খেতে হয়। বিবাহিত হলে তাকে পাথর মেরে হত্যা করা হয়। মিথ্যার সাহায্যে একই রূপ ভয়ানক ক্ষতি হতে পারে দেশের বিরুদ্ধেও। মিথ্যুকের শাস্তি দেয়াটি তাই যে কোন সভ্য সমাজেরই রীতি। কিন্তু মিথ্যুকদের হাতে অধিকৃত দেশে কি সেটি সম্ভব? এ দেশে ক্ষমতায় টিকে থাকার মাধ্যমই তো হলো মিথ্যা নির্বাচন। মিথ্যার মাধ্যেম নিরেট ভোট-ডাকাতির নির্বাচনকেও সুষ্ঠ নির্বাচন বলা হয়। মিথ্যচর্চা দেশটিতে রাজনৈতিক কালচারে পরিণত হয়েছে। ফলে শাস্তি না দিয়ে মিথ্যুকদের ক্ষমতায় বসানোই নীতিতে পরিণত হয়ে পড়েছে। সেটি জেনেই প্রিয়া সাহা অতি লাগামহীন মিথ্যা কথাটি অতি নির্ভয়ে বলেছেন।   

কি বলেছেন প্রিয়া সাহা?

ঢাকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কল্যাণে হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে সরাসরি কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন প্রিয়া সাহা। সুযোগ পেয়ে তিনি যা বলেছেন -সেটির ভিডিও বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়েছে। অতএব লুকানোর সুযোগ নাই। তিনি অভিযোগ তুলেছেন, বাংলাদেশ থেকে ৩ কোটি ৭০ লাখ সংখ্যালঘু নাগরিককে গায়েব করা হয়েছে। বলেছেন, “আমরা দেশ ছাড়তে চাই না, সেখানে বাঁচতে চাই। আমাদের সাহায্য করুণ।” ৩ কোটি ৭০ লাখ সংখ্যালঘু নাগরিকের গায়েব হওয়ার বিষয়ে নিজের শিশুসুলভ অজ্ঞতা নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রিয়া সাহার কাছে জানতে চান, কারা তাদেরকে গায়েব করলো? প্রিয়া সাহা বলেন, সেটি করেছে মুসলিম মৌলবাদীরা। সে সাথে তিনি আরো বলেন, তারা সেটি করেছে সরকারি প্রটেকশনে। প্রিয়া সাহার অভিযোগ করেন, তারা সব সময়ই সরকারি প্রটেকশন পায়। সে সাথে এটিও উল্লেখ করেন, তার নিজের বাড়ীও জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে।

৩ কোটি ৭০ লাখ সংখ্যালঘু গায়েব হওয়ার বিষয়টি এক বিশাল গণহত্যার বিষয়।  স্পেন থেকে মুসলিম নির্মূল, আমেরিকা থেকে রেড ইন্ডিয়ান নির্মূল এবং অস্ট্রেলিয়া থেকে অ্যাব অরিজিনদের নির্মূলের পর আধুনিক বিশ্বে কোথাও এমন নির্মূলের ঘটনা ঘটেনি। এমনকি হিটলারের আমলে জার্মানীতেও ইহুদীদের এরূপ বিশাল সংখ্যায় নির্মূল হতে হয়নি। এমন কি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও এত মানুষ মারা যাযনি। ইরাক, আফগানিস্তান ও সিরিয়াতে যে প্রায় বিশ বছর ধরে যুদ্ধ হচ্ছে তাতেও এতো লোকের প্রাণহানি হয়নি। নব্বইয়ের দশকে আফ্রিকার রুয়ান্ডাতে ১০ লাখ মানুষকে হত্যা করা হয়। তাতেই সেটি নৃশংস বর্বরতার ইতিহাস হয়ে আজও বেঁচে আছে। ফলে বাংলাদেশে এত মানুষ গায়েব হলে বিশ্বজুড়ে অবশ্যই এক বিশাল খবর হতে পারতো। বাংলাদেশের সরকার তখন একটি জেনোসাইডাল সরকার রূপে পরিচিতি পেত। কিন্তু সেটি হয়নি। ডোনাল্ড ট্রাম্পেরও সেটি জানা ছিল না। ফলে বিস্ময়ে তাকে প্রিয়া সাহাকে জিজ্ঞাসা করতে হয়েছে। অথচ এতবড় নির্মূলের কাজ কোথাও ঘটলে শুধু ডোনাল্ড ট্রাম্প কেন, বিশ্বের প্রতিটি শিক্ষিত মানুষ –এমন কি স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরাও সেটি জানতো। ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেও একজন প্রমাণিত মিথ্যাবাদি। কিন্তু তার কাছেও প্রিয়া সাহার মিথ্যাটি বিস্ময়কর মনে হয়েছে।

মতলবটি রাজনৈতিক

প্রিয়া সাহার লক্ষ্য শুধু ৩ কোটি ৭০ লাখ সংখ্যালঘুর গায়েব হওয়ার কথাটি তুলে ধরা ছিল না। সে সাথে উদ্দেশ্য ছিল বাঙালী মুসলিমদের খুনের আসামী রূপে খাড়া করাও। বাংলাদেশের রাজনীতিতে দু’টি পক্ষ। একটি ভারতসেবী পক্ষ; অপরটি বাংলাদেশসেবী পক্ষ। প্রিয়া সাহা যেহেতু ভারতসেবী শিবিরের, তাই তার উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে একটি সন্ত্রাসী দেশ এবং বাংলাদেশের ভারত বিরোধী দেশপ্রেমিক পক্ষকে সন্ত্রাসী পক্ষ রূপে মার্কিন কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরা। তিনি ধারণা করেছিলেন, সন্ত্রসবিরোধী যুদ্ধের নামে মার্কিনীদের যে মুসলিম বিরোধী যুদ্ধ চলছে, এভাবে তাদের যুদ্ধে মিত্র হওয়া যাবে।  বিরোধে শিবিরে থাকা কালে শেখ হাসিনা ও শাহরিয়ার কবিরেরাও একই কাজ করেছে। শেখ হাসিনা থেকে অনুপ্রানিত হয়েই যে প্রিয়া সাহা এমন ভিত্তিহীন কথাটি বলেছেন, সেটি নিজ বক্তব্যের পক্ষে সাফাই রূপে নিজের পক্ষ থেকে ছাড়া ভিডিওতে তিনি বলেছেন। ট্রাম্পের কাছে পেশকরা নালিশে তার অভিযোগ ছিল, এ নির্মূলকরণ প্রক্রিয়াটি ঘটেছে দেশের মুসলিম মৌলবাদীদের হাতে। তার আরো অভিযোগ, মৌলবাদীগণ সবসময়ই পেয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা।  প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশে মুসলিম মৌলবাদী কারা? নিশ্চয়ই জামায়াতে ইসলামী, হিফাজতে ইসলাম এবং মসজিদ-মাদ্রাসার হুজুর ও ছাত্রগণ। কথা হলো, কারা তাদেরকে দিল কথিত সরকারি প্রটেকশন? নিশ্চয়ই প্রিয়া সাহা বুঝাতে চেয়েছেন, সেটি আওয়ামী লীগের সরকার নয়, আওয়ামী লীগের মিত্র জাতীয় পার্টির সরকারও নয়। বরং সেটি বিএনপি’র সরকার।

 

এ ভূয়া তথ্যের ভিত্তি কোথায়?

প্রশ্ন হলো,  বাংলাদেশে কি কোন কালেও ৩ কোটি ৭০ লাখ সংখ্যালঘু ছিল? সেটি যেমন আজ নাই, তেমনি আজ থেকে ৭০ বছর আগেও ছিল না। ফলে যা ছিল না তা গায়েব হলো কি করে? ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে সৃষ্টিকালে দেশটির সর্বোমোট জনসংখ্যা ছিল  সাড়ে সাত কোটি। অপর দিকে ১৯৪৭ সালে যখন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা পায় তখনও পূর্ব পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যা তিন কোটি ৭০ লাখ ছিল না। ফলে প্রশ্ন হলো, ১৯৪৭ সালে পূর্ব পাকিস্তানে বসবাসকারি সংখ্যালঘুদের থেকে ৩ কোটি ৭০ লাখ গায়েব হয় কি করে? গায়েব হলে বর্তমানের সংখ্যালঘু জনসংখ্যা এক কোটি ৮০ লাখ হয় কি করে?

আরো প্রশ্ন হলো,  কিভাব গায়েব করা হলো ৩ কোটি ৭০ লাখ মানুষ? হিটলার তার দেশের কয়েক লাখ ইহুদী হত্যা করতে গ্যাস চেম্বারের ন্যায় বিশাল বিশাল প্লান্ট নির্মাণ করেছিল। মানব হত্যা তখন এক ইন্ডাস্ট্রিতে পরিণত হয়েছিল। ভারত থেকে মুসলিম নির্মূল করতে দেশটি হিন্দু গুণ্ডারাও গড়ে তুলেছে এক দেশজ প্রক্রিয়া। সে প্রক্রিয়ার অধীনে শত শত দাঙ্গা করছে। এমন এক দাঙ্গায় গুজরাতে ২ হাজার মুসলিম নর-নারীকে হত্যা করা হয়। ১০ লাখ রোহিঙ্গা নির্মূল করতে মায়ানমার সরকারকে কয়েক হাজার মুসলিম গ্রামে হাজার হাজার সৈন্য নামাতে হয়েছে। ক্ষেপিয়ে দিতে হয়েছে স্থানীয় বৌদ্ধদের। তাদের দিয়ে রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়ীতে আগুণ দিতে হয়েছে। ফলে মুসলিমদের মাঝে তখন শুরু হয়েছে নীরবে দেশ ছাড়ার পালা। কথা হলো, বাংলাদেশে সেরূপ নির্মূল প্রক্রিয়া কোথায় এবং কীরূপে অনুষ্ঠিত হলো? গুজরাতের ন্যায় দাঙ্গা কি বাংলাদেশে কোথাও কোন কালে হয়েছে? তবে কি মুসলিম মৌলবাদীরা এতবড় নির্মূলকর্ম গোপনে সাধন করেছে? এতবড় নির্মূলের কাজ কি গোপনে হয়? ৩ কোটি ৭০ লাখ নির্মূল হলে তাদের লাশ এবং হাড্ডিগুলোই বা কোথায় গেল? তেমন ভয়াবহ কিছু হলে একজন হিন্দুও কি বাংলাদেশে বসবাস করতো? সেটি হলো প্রতিবাদ উঠতো ভারত সরকারের মুখ থেকেও। বাংলাদেশে কোথাও কোন মন্দির ভাঙ্গা হলে তা নিয়ে হিন্দুস্থান প্রবল প্রতিক্রিয়া দেখায়। সেদেশর পত্রিকায় ও মিডিয়ায় লেখার ঝড় বইতে শুরু করে। কিন্তু এ অবধি নরেন্দ্র মোদীর সরকারও কি এমন অভিযোগ করেছে -যা প্রিয়া সাহার মুখে শোনা গেল? তাছাড়া বিদেশী দূতাবাসের যেসব দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ ঢাকাতে বসে আছেন -তারাও কি কখনো এমন অভিযোগ এনেছে?     

একা নয় প্রিয়া সাহা

প্রিয়া সাহার কথায় যেটি সুস্পষ্ট প্রকাশ পেয়েছে সেটি হলো, মুসলিমদের রাষ্ট্র, আচার ও ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি গভীর ঘৃণা। এরূপ ঘৃণা নিয়েই ১৯৪৭ সালে সে সময়ের প্রিয়া সাহাগণ বাঙালী মুসলিমদের সঙ্গ ছেড়ে অবাঙালীদের সাথে ভারত মাতার দেহে লীন হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূরণ বিষয় বেরিয়ে এসেছে। সেটি হলো, প্রতিটি মুসলিম দেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের কর্মচারীদের মূল কাজটি হলো এরূপ মুসলিম বিদ্বেষীদের তন্ন তন্ন করে খোঁজা এবং ইসলামের বিরুদ্ধে নিজেদের চলমান যুদ্ধে সৈনিক রূপে রিক্রুট করা। প্রিয়া সাহা তেমনি এক আন্তর্জাতিক কোয়ালিশনের সৈনিক।

তাই প্রিয়া সাহা এক নয়। তাদের বাহিনীতে লোকের সংখ্যা অনেক। তারা লড়ছে মজবুত বিদেশী খুঁটির জোরে। তাদের পিছনে যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তেমনি ভারতের মোদি সরকার। তাই প্রিয়া সাহার মাথার একটি চুল ছেঁড়ার সামর্থ্যও হাসিনার নাই। ঢাকার আদালতে প্রিয়া সাহার বিরুদ্ধে মামলা উঠেছিল; বিচারকগণ তা খারিজ করে দিয়েছে। হাসিনার পক্ষ থেকে নির্দেশ এসেছে তার বিরুদ্ধে কোন মামলা না নেয়ার। হাসিনা যাদের প্রতি গোলামী নিয়ে ক্ষমতায় আছে, প্রিয়া সাহা তাদেরই আপন লোক। গোলামগণ তাই তাদের বিরুদ্ধে অসহায়। প্রিয়া সাহা যে তাদের আপনজন সে বিশ্বাসটি বাড়াতেই ঢাকাস্থ্য মার্কিন দূতাবাসের পক্ষ থেকে তাকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে সাক্ষাতের জন্য পাঠানো হয়েছিল। তাই হোয়াইট হাউসের উগ্র মুসলিম বিরোধী পরিবেশে নিজের মুসলিম বিরোধী তীব্র ঘৃণাটি তিনি অতি সাবলিল ভাবেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সামনে প্রকাশ করতে পেরেছেন। এক শৃগাল আরেক শৃগাল দেখলে যেমন হাঁক ছাড়ে, তেমনি অবস্থা হয়েছিল প্রিয়া সাহার। যে তীব্র ঘৃণা নিয়ে ভারতের বিজেপী’র খুনিরা রাজপথে মুসলিমদের পিটিয়ে হত্যা করছে, সে ঘৃণা নিয়েই সেদিন বাংলাদেশের মুসলিমদের হোয়াইট হাউসের ঘনিষ্ট পরিবেশে খুনি রূপে পেশ করেছেন। প্রশ্ন হলো, এতো ঘৃণা নিয়ে তারা এদেশে বাস করে কি করে? সরকারি অফিস আদালতে চাকুরিই বা করে কি করে?

প্রিয়া সাহার কথা থেকে বুঝা যায়, প্রতিবেশী মুসলিমদের এরা সুস্থ্য ও হৃদয়শীল মানুষ ভাবতেও রাজী নয়। অথচ ভারতে মুসলিমদের সাথে যে নির্মম আচরণটি হচ্ছে সেটি কি তারা দেখে না? তা নিয়ে কি তারা একটুও ভাবে না? ভাবলে সেটি কেন সেদিন ট্রাম্পের সামনে বললো না? ভারতে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ১৫%। অথচ সরকারিতে তারা ৫% ভাগেরও কম। গরুর গোশতো খাওয়ার অভিযোগে তাদের রাজপথে পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। মুসলিম নির্মূলের দাঙ্গা হচ্ছে বার বার। শুধু ঘরবাড়ি নয়, তাদের মসজিদগুলিও নির্মূল করা হচ্ছে। মুসল্লীদের মাথার টুপি কেড়ে নিয়ে “রামজি কি জয়” বলতে বাধ্য করা হচ্ছে। অপর দিকে বাংলাদেশে তারা যে কতো রকম সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে -তারা কি সেটি দেখে না? বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, দেশে সংখ্যালঘুদের সংখ্যা ৯.৫%, কিন্তু সরকারি চাকুরিতে তারা ২৫%। প্রশ্ন হলো, তারা কি চায়? তারা কি চায় ভারতের ন্যায় বাংলাদেশ থেকেও মুসলিম নির্মূল? চায় কি সে নির্মূল-কাজে মার্কিন বাহিনীকে ডেকে আনতে? চায় কি বাংলাদেশকে হিন্দু রাষ্ট্র বানাতে? ২৫/০৭/২০১৯

 

 




ভোট-ডাকাতদের অসভ্য অধিকৃতিঃ জনগণ কি বাঁচবে আত্মসমর্পণ নিয়ে?

অপরাধঃ নৃশংস দেশ ডাকাতির

বাংলার মানুষ দেশটির সমগ্র ইতিহাসে দুইবার ভয়াবহ অপরাধকর্মের শিকার হয়েছে। প্রথমবার সেটি ঘটে ১৭৫৭ সালে ঔপনিবেশিক ইংরেজ ডাকাতদের হাতে। তাতে বাংলার স্বাধীনতার উপরই শুধু ডাকাতি হয়নি, ডাকাতিতে নিঃস্ব হয়ে গেছে দেশের রাজভাণ্ডার, গ্রামে-গঞ্জে জনগণের অর্থভাণ্ডার এবং কৃষিভাণ্ডার। তাতে নেমে আসে ১১৭৬ সালের ভয়ানক দুর্ভিক্ষ -তাতে মারা যায় দেশটির এক-তৃতীয়াংশ জনগণ। দ্বিতীয়বার ভয়ানক অপরাধকর্মটি ঘটে ২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বরে। সেটি ঘটে দেশীয় ডাকাতদের হাতে। তাতে ডাকাতির খপ্পরে পড়ে সমগ্র দেশ; ডাকাতির শিকার হয় প্রতিটি প্রাপ্ত-বয়াস্কা নর-নারী। সেদিনটিতে ছিনতাই হয়ে যায় দেশের ভাগ্য নির্ধারণে জনগণের স্বাধীনতা। সে নৃশংস ভোট-ডাকাতির ফলে জনগণ পরিণত হয় ডাকাতদের হাতে জিম্মি দর্শকে। দেশের রাজস্বভাণ্ডার, বিদেশ থেকে পাওয়া লোনের অর্থ, সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক ও বীমা কোম্পানী, সরকারি জায়গাজমি এবং বনভূমির উপর পূর্ণ-দখলদারি প্রতিষ্ঠিত হয় ক্ষমতাসীন ডাকাতদের।

বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণীয় ঘটনারূপে এ বর্বর ঘটনাও যুগ যুগ বেঁচে থাকবে যে, ২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বর দেশে একটি সংসদীয় নির্বাচন হয়েছিল। সে নির্বাচনের বিজয়ী হওয়ার দাবী নিয়ে শেখ হাসিনা আজ প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে সংসদীয় নির্বাচনের দোহাই দিয়ে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় অধিষ্টিত -সেটি যে আদৌ কোন নির্বাচন ছিল না তা নিয়ে কি কোন সন্দেহ আছে? নির্বাচন সুষ্ঠ হওয়ার শর্ত হলো তাতে প্রতিফলন ঘটতে হবে জনগণের রায়ের। কিন্তু সে নির্বাচনে সেটি হয়নি। বরং তাতে প্রকাশ পেয়েছে স্রেফ ভোট-ডাকাতদের ইচ্ছার। সেদিনের সে বিশাল ভোট-ডাকাতির অপরাধটি আজ দলিল-দস্তাবেজ নিয়ে দিনের আলোয় প্রকাশ পাচ্ছে। সেরূপ এক অকাঠ্য প্রমাণ ২৩/০৭/১৯ তারিখে দৈনিক প্রথম আলো প্রকাশ করেছে; এবং সেটি সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)’য়ের পক্ষ থেকে প্রকাশিত রিপোর্টের বরাত দিয়ে।

গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে ভোট-ডাকাতির সে নগ্ন চিত্রটি হলোঃ ১). ১ হাজার ২৮৫টি ভোট কেন্দ্রে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে কোনো ভোটই পড়েনি; ২). ধানের শীষ ১ শতাংশের কম ভোট পেয়েছে ৬ হাজার ৭৫টি কেন্দ্রে; ৩). বিএনপি জোটের প্রার্থীরা ১ শতাংশ ভোট পেয়েছেন ৩ হাজার ৫০১টি কেন্দ্রে এবং ৪). ২ শতাংশ ভোট পেয়েছেন ২ হাজার ৫৩৫টি কেন্দ্রে। ৪০ হাজার ১৫৫টি কেন্দ্রের ফলাফল বিশ্লেষণ করে সুজন বলছে, অধিকাংশ কেন্দ্রেই নৌকা ও ধানের শীষের ভোটের পার্থক্যটি অস্বাভাবিক। তাদের অভিমত হলো, যে কোন বিচারে নির্বাচনের ফলাফলটি বিস্ময়কর। বিএনপির প্রার্থীগণ দেশের কোন একটি কেন্দ্রে শূণ্য ভোট পাবে বা প্রদত্ত ভোটের মধ্যে মাত্র থেকে ২ শতাংশ ভোট পাবে সেটি কি বিশ্বাসযোগ্য? কিন্তু সে অবিশ্বাস্য কাণ্ডটিই সেদিন ঘটেছে নির্বাচনের নামে। এরূপ বিস্ময়কর কাণ্ড একমা্ত্র ডাকাতির মাধ্যমেই সম্ভব, কোন নির্বাচনে নয়। ডাকাতির মাধ্যমে নিঃস্ব মানুষও মুহুর্তের মধ্যে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়; এবং বহু কোটি টাকার মালিক মুহুর্তের মধ্যে নিঃস্ব ভিখারীতে পরিণত হয়। গত নির্বাচনে সেটিই করা হয়েছে অতি পরিকল্পিত ভাবে। আওয়ামী লীগ ও তার মিত্র দলগুলি সেদিন পরিণিত হয়েছিল এক ভয়াবহ ডাকাত দলে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এ বর্বরতাও যুগ যুগ বেঁচে থাকবে।       

নির্বাচনের পরদিন ৩১ ডিসেম্বর বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিভিন্ন আসনের ফলাফলে নৌকা প্রতীকের বিপরীতে ধানের শীষের যে ভোট পড়েছে, সেটি বিস্ময়কর। অনেক আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী যত ভোট পেয়েছেন, বিএনপির প্রার্থী তার মাত্র ১০ ভাগের ১ ভাগ ভোট পেয়েছেন বলে নির্বাচন কমিশনের ফলাফলে দেখানো হয়। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপির প্রার্থীদের অভিযোগ, এমনটি সম্ভব হয়েছে ভোটের আগের রাতে নৌকায় সিল দিয়ে ব্যালট বাক্স ভর্তি করার কারণে। কয়েকটি আসনের ভোট পর্যালোচনা করে বিবিসি তার প্রতিবেদনে বলে, সিরাজগঞ্জ-২ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন বিএনপির রুমানা মাহমুদ ও আওয়ামী লীগের হাবিবে মিল্লাত। হাবিবে মিল্লাত পেয়েছেন ২ লাখ ৯৪ হাজার ৮০৫ ভোট। অন্যদিকে রুমানা মাহমুদ পেয়েছেন মাত্র ১৩ হাজার ৭২৮ ভোট। অর্থাৎ বিএনপির চেয়ে আওয়ামী লীগ ২ লাখ ৮১ হাজার ৭৭ ভোট বেশি পেয়েছে। অথচ এ আসনে ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির রুমানা মাহমুদ প্রায় ১ লাখ ২৮ হাজার ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন।

নরসিংদী-২ আসনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান ১৯৯১ সাল থেকে পরপর তিনটি নির্বাচনে জয়ী হন। ২০০৮ সালে এ আসনে বিএনপি পরাজিত হলেও আবদুল মঈন খান ৭০ হাজারের বেশি ভোট পেয়েছিলেন। কিন্তু বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী এবারের নির্বাচনে তিনি পেয়েছেন মাত্র ৭ হাজার ১০০ ভোট। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের প্রার্থী পেয়েছেন প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার ভোট। সিলেট-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। অথচ মাত্র কয়েক মাস আগে অনুষ্ঠিত সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে বিএনপির প্রার্থী জয়লাভ করেছেন। সিলেট-১ আসনটিতে অধিকাংশ ভোটার সিলেট মহানগর এলাকায় বসবাস করেন। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে একই জায়গায় বিএনপির প্রার্থী কীভাবে এত বিশাল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হলেন, সেটি অনেকের কাছে বিস্ময়কর ঠেকেছে। ৩ জানুয়ারি প্রথম আলো রিপোর্ট করে, ভোটের ব্যবধানে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে এবারের নির্বাচন। চট্টগ্রামের ১৬টি আসনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট যেখানে ৮৫ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছে, সেখানে বিএনপি জোট পেয়েছে মাত্র ১০ শতাংশ ভোট। অথচ এর আগের নির্বাচনগুলোতে এই দুই দলের ভোট ছিল প্রায় সমান। ২০০৮ সালে নবম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জোট চট্টগ্রামের ১৬টি আসনের মধ্যে ৪টিতে জিতেছিল। সেবার তারা চট্টগ্রামে ৪৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। আওয়ামী লীগ জোট জিতেছিল ১১টি আসনে। তাদের ভোট ছিল ৪৬ দশমিক ১৫ শতাংশ। একাদশ সংসদ নির্বাচনে ওই ১৬টি আসনেই আওয়ামী লীগ ও তার জোটের প্রার্থীরা জয়ী হন। এবার আওয়ামী লীগ জোট মোট প্রদত্ত ভোটের ৮৫ দশমিক ১৮ শতাংশ ভোট পায়। অন্যদিকে ১৬টি আসনে বিএনপি জোটের প্রার্থীরা পেয়েছেন প্রদত্ত ভোটের ১০ দশমিক ৩৯ শতাংশ ভোট। জামানত হারিয়েছেন ১০ জন প্রার্থী।

নির্বাচন কমিশন কেন্দ্র-ভিত্তিক  ফলাফল প্রকাশ করেছে। সেটি পর্যালোচনা করে সুজন বলছে, ৭৫টি আসনের ৫৮৬টি কেন্দ্রে যতগুলো বৈধ ভোট পড়েছে, তার সবগুলোই পেয়েছে নৌকা মার্কার প্রার্থীরা। এসব কেন্দ্রে ধানের শীষ কিংবা অন্য প্রার্থী কোন ভোটই পাননি। সুজন তুলে ধরেছে, চট্টগ্রাম-১০ আসনের কথা। এই আসনে গণসংহতি আন্দোলনের সৈয়দ মারুফ হাসান রুমী শূন্য ভোট পেয়েছেন। সেটি জানিয়েছিলেন রিটার্নিং অফিসার। কিন্তু নির্বাচন কমিশন থেকে কাশিত কেন্দ্র-ভিত্তিক ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, তিনি ২৪৩ ভোট পেয়েছেন। সেটি জানিয়েছে সুজন।সুজনের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ১০৩ টি আসনের ২১৩টি কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছে। এ বিষয়টিও কি বিশ্বাসযোগ্য?এরূপ শতভাগ ভোট তো তখনই পড়ে যখন ভোট দিতে ভোটারকে আসতে হয় না, সে কাজটি করে রাতের আঁধারে বসে ডাকাতেরা।

মীর জাফর সুলভ ভূমিকা নির্বাচনি কমিশনের

বাংলাদেশের রাজনীতিতে চোর-ডাকাত ও ভোট-ডাকাতদের মত অপরাধীদের সংখ্যাটি বিশাল। ফলে নির্বাচনে ভোট ডাকাতি হওয়ার সম্ভাবনাটিও বিশাল। কিন্তু ডাকাত ধরার দায়িত্ব তো নির্বাচনি কমিশনের। সে কাজে তাকে সহায়তা দেয়ার কাজে নিয়োজিত ছিল দেশের বহু লক্ষ সামরিক ও বেসামরিক মানুষের জনবল। যাতে ছিল প্রশাসনিক কর্মকর্তা, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর লোকেরা। তবে দলে লোকবল থাকলেই চলে না, নির্বাচনি কর্তাব্যক্তির ডাকাত ধরার যুদ্ধে আপোষহীন ইচ্ছাও থাকতে হয়। বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে মীর জাফরের ন্যায় ময়দানে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকলে যুদ্ধ জয় না। নির্বাচন কমিশনার বস্তুতঃ সেটিই করেছেন।  চোখের সামনে ডাকাতি হলেও ডাকাত ধরায় তিনি কোন সদিচ্ছা দেখাননি। বরং ডাকাত না ধরে তিনি ডাকাতির কাজটি নিরাপদে করতে দিয়েছেন। এবং এভাবে দেশবাসীকে উপহার দিয়েছেন ভোট-ডাকাতির নির্বাচন।

সুষ্ঠ নির্বাচন এবং ডাকাতির নির্বাচনের ফলাফলের মাঝে পার্থক্যটি যে কতটা বিস্ময়কর বা অস্বাভাবিক হতে পারে –৩০শে ডিসেম্বরের নির্বাচনটি ছিল তারই প্রমাণ। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদাও সাংবাদিকদের একথা বলতে বাধ্য হয়েছেন যে, বিভিন্ন কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়া স্বাভাবিক  ঘটনা নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কীরূপে ঘটলো সে অস্বাভাবিক ঘটনা? শত ভাগ ভোট বিশেষ একটি দলের পক্ষে পড়া যে স্বাভাবিক নয় –এটুকু বললেই কি নির্বাচনি কমিশনারের দায়িত্ব শেষ হয়? তাঁর দায়িত্ব কি স্রেফ ফলাফল ঘোষণা করা? ভোট কেন্দ্রগুলিতে কেন এবং কীরূপে এরূপ অস্বাভাবিক ফলাফল ঘটলো –সে বিষয়ে তদন্তের দায়িত্বটি তো জনগণের নয়। বিরোধী দলেরও নয়। বরং সে দায়িত্ব তো নির্বাচনি কমিশনারের। সে কাজের জন্যই তিনি বেতন পান। অথচ সে সাংবিধানিক দায়িত্বটি তিনি ইচ্ছা করেই এড়িয়ে গেছেন –যেন নির্বাচনে অনিয়মের কিছুই ঘটেনি। তার সে নিষ্ক্রিয়তার মধ্যেও একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল –যেমনটি ছিল মীর জাফরের। সেটি ছিল আওয়ামী লীগের ঘরে নির্বাচনি বিজয়কে পৌঁছে দেয়া।

গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন যে আদৌ সঠিক ভাবে হয়নি তা নিয়ে কারো মনেই কোন রূপ সন্দেহ থাকার কথা নয়। সুজনের রিপোর্ট সেটিই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। ভোট-ডাকাতির অপরাধকে শেখ হাসিনা আদৌ লুকাতে পারেনি। ভোট ডাকাতি যে বিশাল ভাবে হয়েছে সে প্রমাণ বিপুল ভাবে চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। ভোটকেন্দ্রে নিয়োজিত কর্মকর্তাগণ যেমন সেগুলি নিজ চোখে দেখেছে। তেমনি টের পেয়েছে জনগণও। তাছাড়া যত চেষ্টাই হোক, অপরাধীরা কখনোই তাদের অপরাধের আলামত পুরাপুরি লুকাতে পারে না।

ভোট-ডাকাতরাও জানে তাদের ডাকাতি কতটা ব্যাপক ও নৃশংস ভাবে হয়েছে। কিন্তু সেটি তারা কখনোই স্বীকার করে না; সেটি করে ডাকাতের মাল ঘরে রাখার স্বার্থ্যে। ডাকাতেরা তাই শুধু অতি জালেম ও নৃশংসই হয় না, অতিশয় মিথ্যাবাদীও হয়। তাই সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগের নেতাগণ বলছে, ধানের শীষের প্রার্থীদের শূণ্য ভোট পাওয়ার কারণ, বিএনপি-নেতৃত্বাধীন জোট নির্বাচন বয়কট করেছে এবং তাদের ভোটারগণ ভোটই দিতে আসেনি।

কে দিবে অপরাধীদের শাস্তি?

২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বর বাংলাদেশের মাটিতে যে ভয়ংকর অপরাধ ঘটে গেছে এবং তাতে দেশ যে ডাকাতদের হাতে অধীকৃত হয়েছে -তা নিয়ে কি সামান্যতম সন্দেহ আছে? সভ্য ও সুশীল সমাজের আলামত হলো সেখানে প্রতিষ্ঠা পায় আইনের শাসন এবং কার্যকর হয় অপরাধীদের শাস্তি দেয়ার রীতি। সেটি না থাকাটিই জঙ্গলের অসভ্যতা। সভ্য মানুষের পরিচয় তাই শুধু পোষাক-পরিচ্ছদ, পানাহারে বা গৃহনির্মাণে ধরা পড়ে না। স্রেফ টুপি-দাড়ি ও নামায-রোযাতেও ধরা পড়ে না। ধরা পড়ে অপরাধীদের নির্মূলের আয়োজন দেখে। তাছাড়া মশামাছি নির্মূলে ব্যর্থ হলে তার আযাবটিও কি কম? তখন রোগব্যাধীর মহামারিতেই লক্ষ লক্ষ মানুষকে অকালে মরতে হয়। তেমনটি ঘটে অপরাধীদের নির্মূলে ব্যর্থ হলে। তখন চোর-ডাকাত, খুনি, ধর্ষকগণও দেশের নেতা, পিতা, বন্ধু ও শাসকের পরিচয় নিয়ে ঘাড়ের উপর চেপে বসে। তখন পথে ঘাটে নিরপরাধ মানুষকে গুম, খুণ ও ধর্ষিত হতে হয়। তখন বিচারের নামে কারাবাসে বা ফাঁসিতে ঝুলেও মরতে হয়। বাংলাদেশে তো অবিকল সেটিই হচ্ছে্।

অপরাধীদের নির্মূলে মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশনামাও কি কম গুরুত্বপূর্ণ? পবিত্র কোরআনে সুরা ইমরানের ১১০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহতায়ালা মুসলিমদের সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি রূপে ঘোষণা দিয়েছেন। এবং কেন তাদের প্রাপ্য এ বিশেষ মর্যাদাটি, সেটিও তিনি উক্ত আয়াতে উল্লেখ করেছেন। এ বিশেষ মর্যাদার কারণ এ নয় যে, মুসলিমেরা বেশী বেশী নামায-রোযা পালন করে, হজ্বে যায় বা দান-খয়রাত করে। বরং সে কারণটি হলো, তারা ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা দেয় এবং রাষ্ট্রের বুক থেকে নির্মূল করে অপরাধীদের। অথচ বাংলাদেশে হচ্ছে উল্টোটি। যারা চোর-ডাকাত ও ভোট-ডাকাত এবং যারা খুন-গুম-সন্ত্রাসের রাজনীতির হোতা -তাদেরকে নির্মূল না করে শাসক রূপে মেনে নেয়া হচ্ছে। এমন কি বিচার চাওয়া হচ্ছে চোর-ডাকাতদের কাছে! তাদেরকে মহামান্যও বলা হচ্ছে। চোর-ডাকাতদের এভাবে মাথায় তোলার কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের প্রায় দুই শতটি রাষ্ট্রকে হারিয়ে দুর্নীতিতে ৫ বার প্রথম হয়েছে। এ হলো অপরাধীদের মেনে নেয়া এবং অপরাধ পরিচর্যা দেয়ার ফল। তারা অপরাধে বেঈমান কাফেরদেরও হার মানিয়েছে! এ জগতজোড়া ব্যর্থতা নিয়ে তারা পরকালেই বা মুখ দেখাবে কী করে?

গত নির্বাচনে অতি কুৎসিত ও অস্বাভাবিক কাণ্ডটি ঘটিয়েছে নির্বাচনি কমিশনার নিজে। এটি নিজেই শাস্তিযোগ্য এক বিশাল অপরাধ। সেটি হলো, শতভাগ ভোট পড়া যে একমাত্র ভোট-ডাকাতিতেই সম্ভব –সেটি অন্যরা বুঝলেও তা নিয়ে তিনি কোন কথাই বলেননি। বরং সে অস্বাভাবিক ডাকাতির নির্বাচনকে তিনি সুষ্ঠ নির্বাচন বলে চালিয়ে দিয়েছেন। এবং এভাবে তিনি ভোট-ডাকাতদের হাতে বিজয় তুলে দিলেন। এটি যে তার সাংবিধানিক দায়িত্বের সাথে চরম গাদ্দারি -সেটি বুঝার সামর্থ্য কি তার আছে? বিবিসির সাংবাদিক ও কোটি কোটি সাধারণ মানুষ সেটি টের পেলেও তিনি নিজে টের না পাওয়ার ভান করেছেন। এটি হলো এক চরম বিবেকশূণ্যতা। এমন বিবেকশূণ্য মানুষেরা চোখের সামনে ডাকাতি হতে দেখেও সেটি না দেখার ভান করে। বরং ডাকাতকে বাঁচাতে ডাকাতদের পক্ষ নেয়।

নিজের দায়িত্ব এড়াতে নির্বাচনি কমিশনার বলেছেন, নির্বাচনকালীন অথবা গেজেট প্রকাশের আগে কেউ যদি সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ করতো, তবে নির্বাচনকমিশন তা তদন্ত করে দেখতো। তার কথা, যে বিষয়ে কেউ অভিযোগ করেনি বা কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আসেনি, গেজেট নোটিফিকেশন করার পরে আর কিছু করার থাকে না। এমন অস্বাভাবিক কথা একমাত্র চরম দায়িত্বহীন ব্যক্তিরাই বলতে পারে। কথা হলো, তার অবস্থান ছিল অপরাধের ঘটনাস্থলে এবং অপরাধীদের মাঝে। সংঘটিত অপরাধকে নিজ চোখে দেখার যে সুযোগ তার হয়েছে সেটি দেশের অন্য কোন ব্যক্তির ভাগ্যে জুটেনি। কিন্তু তিনি দেখেও না দেখার ভান করেছেন। এটিও কি কম অপরাধ।

কথা হলো, অপরাধ কি কখনোই তামাদি হয়? যত দেরীতেই হোক অপরাধীকে শাস্তি দেয়াই সভ্য সমাজের রীতি। চুরি-ডাকাতি বা খুনের সাথে জড়িত অপরাধীগণ ১০ বা ২০ বছর পরে ধরা পড়লেও তাদেরকে শাস্তি পেতে হয়। তাছাড়া কোথাও চুরি-ডাকাতি বা হত্যার ঘটনা ঘটলে অপরাধীদের ধরার কাজটি দুয়েক দিনের মধ্যেই শেষ করতে হবে -সেটি কি কোন সভ্য আইন-আদালতের বিধান? বরং সুবিচার নিশ্চিত করার স্বার্থে অপরাধীদের ধরার কাজে ইতি টানা যায় না, বরং বছরের পর বছর লেগে থাকতে হয়। অতীতে এমন কি বাংলাদেশেও দেখা গেছে নির্বাচিত হওয়ার দুই-তিন বছর পরও বিজয়ী প্রার্থীর বিজয়কে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।

জনগণ কি বাঁচবে আত্মসমর্পণ নিয়ে?

চোর-ডাকাতদের ধরার কাজটি তো রাষ্ট্রের। রাষ্ট্রকে তাই বাদী হয়ে আসামীদের ধরতে হয় এবং তাদের শাস্তিও দিতে হয়। জনগণ রাষ্ট্র থেকে ঘরবাড়ি ও পানাহার চায় না, চায় সুবিচার। এজন্যই জনগণ সরকারকে রাজস্ব দেয়। কিন্তু গত নির্বাচনে নির্বাচনির কমিশন সে দায়িত্বটি আদৌ পালন করেনি। বরং পাশে দাড়িয়েছে ডাকাতদের। ফলে দেশ অধিকৃত হয়েছে ভয়ানক ভোট-ডাকাতদের হাতে। কোন সভ্য দেশেই ডাকাতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ বা ক্ষমতার মালিক কোনদিনই কোন ডাকাত হতে পারে না। সেটি দশ বছর বা বিশ বছর পরে হলেও। যে দেশে আইন-আদালত আছে সেদেশের নিয়ম তো এটাই, স্রেফ ডাকাতির মাল ফেরত নিলেই বিচার শেষ হয় না। ডাকাতি করার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিও ডাকাতদের দিতে হয়। কিন্তু সে সভ্য কাজটি কি বাংলাদেশের চলমান অসভ্য প্রেক্ষাপটে সম্ভব?

ডাকাতদের হাতে যখন দেশ অধিকৃত হয়, তখন তাদের হাতে অধিকৃত হয় দেশের আইন-আদালতও। কাদেরকে আদালতের কাঠগড়ায় তোলা হবে এবং বিচারের নামে শাস্তি দেয়া হবে -সে হুকুমটিও তখন ডাকাতদের পক্ষ থেকে আসে। তখন বিচারের নামে শাস্তি দেয়া হয় সরকার বিরোধীদের। তাই এমন আদালত থেকে বিচার চাওয়াটিও চরম বুদ্ধিহীনতা। বিচারের দায়িত্ব তখন জনগণকে নিতে হয়। তাছাড়া ডাকাতগণ ডাকাতির মাল কখনোই স্বেচ্ছায় ফেরত দেয়। আদায় করে নিতে হয়। ফেরত নেয়ার সে কাজটি অতি ব্যয়বহুল। সে কাজ তাই দায়িত্বশীল প্রতিটি সভ্য রাষ্ট্রের। কিন্তু সেরূপ সভ্য রাষ্ট্র কখনোই স্রেফ জনগণের রাজস্ব দানে বা ভোট দানে গড়ে উঠে না। একাজে ব্যয় হয় জনগণের অর্থ, রক্ত, শ্রম ও মেধা। ইসলামে এটি সর্বোচ্চ ইবাদত তথা জিহাদ; এ পথেই অপরাধীদের শাসন নির্মূল হয় এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা পায়। তখন নির্মিত  হয় উচ্চতর সভ্যতা। এটিই নবী-রাসূলদের পথ। মুসলিমদের হাতে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা নির্মিত হয়েছিল তো এ পথেই।

নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাতের ন্যায় সকল ইবাদতের কাজ হলো এরূপ সর্বোচ্চ ইবাদতের জন্য ঈমানদার তৈরি করা। এ পবিত্র কাজে যারা প্রাণ দেয় তারা পায় বিনা হিসাবে জান্নাত। পবিত্র কোরআনে সে প্রতিশ্রুতি এসেছে বার বার। নবীজী (সাঃ)র সাহাবাগণ সেটি বুঝতেন এবং তার উপর আমলও করতেন। ফলে এ পবিত্র জিহাদে শতকরা ৭০ ভাগেরও বেশী সাহাবা শহীদ হয়েছেন। যাদের মাঝে সে বিনিয়োগ নাই, তাদেরকে বাঁচতে হয় চোর-ডাকাতদের কাছে নীরব আত্মসমর্পণ নিয়ে। চোর-ডাকাতগণ তখন মাথায় উঠে এবং জনগণের অর্থে তারা বিরামহীন বিজয়োৎসবও করে। তখন অসম্ভব হয় সিরাতুল মুস্তাকীমে চলা। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের জনগণ কি বাঁচবে ভোট-ডাকাতদের কাছে এরূপ অসভ্য আত্মসমর্পণ নিয়ে?  ২৪/০৭/২০১৯




রক্তাত্ব বাংলাদেশঃ জনগণ কি আঙ্গুল চুষতে থাকবে?

 লাশ ফেলার রাজনীতি

বাংলাদেশে এখন লাশ ফেলার রাজনীতি ও প্রশাসন। পুলিশের গুলিতে বিগত ফেব্রেয়ারি ও মার্চ -এ দুটি মাসেই নিহত হয়েছে ২০০ জনের বেশী নিরপরাধ নিরীহ মানুষ। হত্যা করা হয়েছে মায়ের কোলের শিশু ও গৃহিনী নারীকেও। অতীতে কখনোই আন্দোলন দমাতে এভাবে শিশু ও নারীদের হত্যা করা হয়নি। গত ২৯/৩/১৩ তারিখে কোন হরতাল ছাড়াই এক দিনে নিহত হয়েছে ৭ জন। তাদের মধ্যে ৩ জন নিহত হয়েছে চাপাঁইনবাবগঞ্জ,২ জন সিরাজগঞ্জে এবং ২ জন খুলনায়। গত ২৮শে ফেব্রেয়ারির এক দিনে হত্যা করা হয়েছে ৭০ জনকে।পাকিস্তান আমলের সমগ্র ২৩ বছরে সব মিলে পুলিশের গুলিতে রাজপথে এত মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। স্বৈরাচারি এরশাদের আমলে একদিনে ২জন নিহত হয়েছিল। আর তাতেই “চারিদিকে দেখি লাশের মিছিল” নামে গণসঙ্গিত লেখা হয়েছিল। লেখা হয়েছিল “ঝরাও রক্ত,ছড়াও রক্ত,যত খুশী তুমি পার;রাজপথে আজ জনতা জেগেছে,যত খুশী তুমি মার।” আওয়ামী লীগ কর্মী ও বামপন্থিরা সেদিন সে গান আর হারিমোনিয়াম নিয়ে রাজপথে নেমেছিল। অথচ আজ  এত খুন,কিন্তু সে খুনের বিরুদ্ধে বামপন্থিরা শুধু নীরবই নয়,খুন নিয়ে তারা বরং উৎসব করছে। তারা চায়,আরো খুন আরো লাশ। লাশের রক্তমাংস নিয়ে তারা সকাল বিকাল নাশতা করতে চায়।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রেয়ারিতে ঢাকায় নিহত হয়েছিল ৪ জন। আর তাতে আব্দুল গাফফার চৌধুরি গান লিখেছিলেন “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রেয়ারি,আমি কি ভূলিতে পারি?” আজও  সে গানটি ফেব্রেয়ারি মাস এলেই গাওয়া শুরু হয়। আব্দুল গাফফার চৌধুরি আজও বেঁচে আছেন। কিন্তু তিনি আজ  নীরব কেন? আজ  ৪ জন নয়,২০০ জনের বেশী শহীদের রক্তে লালে লাল হয়ে গেছে সমগ্র বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মানুষ কি এত শহীদের রক্ত ভূলতে পারে? কিন্তু আব্দুল গাফফার চৌধুরি আজ  ২০০ জন শহীদের রক্তকে শুধু ভূলেই যাননি,বরং তিনি কলম ধরেছেন খুনিদের পক্ষে। এই হলো আব্দুল গাফফার চৌধুরিদের বিবেক! তবে একুশে ফেব্রেয়ারির গানও তিনি বিবেক নিয়ে লেখেননি। লিখেছেন আওয়ামী রাজনীতি নিয়ে। লক্ষ্য ছিল ৪ নিহতের লাশ নিয়ে তৎকালীন মুসলিম লীগের সরকারকে নাকানি চুবানি দেয়া। নিহতদের রক্ত নিয়ে তিনি সেদিন যেমন রাজনীতি করেছেন,আজও  করছেন। এজন্যই তার কলমে তাই এত খুন এত রক্তপাতের বিরুদ্ধে নিন্দাবাদ উঠে না।

 

খুনিদের সর্দার রূপে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

হত্যার চেয়ে বর্বর অপরাধ এ ভূপৃষ্টে আর কি হতে পারে? সরকারের বড় দায়িত্ব হলো মানুষের জানমালের নিরপত্তা দেয়া।কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার নিরাপত্তা দেয়ার পরিবর্তে বেছে নিয়েছে নিরস্ত্র মানুষ-হত্যা।সে জন্যই পুলিশকে দিয়েছে প্রতিবাদী মানুষকে দেখা মাত্র গুলির নির্দেশ।  সভ্য দেশে এরূপ গুলি চালনোর ক্ষমতা পুলিশের সেপাই দূরে থাক অফিসারদেরও থাকে না। এমন কি বাংলাদেশেও বহু খুনের জঘন্য অপরাধীকে জেলা জজ ফাঁসীতে ঝুলাতে পারে না। সে জন্য হাই কোর্ট থেকে তারা রায়ের পক্ষে অনুমোদন নিতে হয়। অথচ বাংলাদেশের পুলিশ পাখি শিকারের ন্যায় মানুষ শিকার করছে। গত ২৯/০৩/১৩ তারিখে সাংবাদিকগণ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী মহিউদ্দীন খান আলমগীরকে জিজ্ঞেস করেন,পুলিশ কেন নির্বিচারে এত মানুষকে হত্যা করছে? হত্যাপাগল পুলিশের পক্ষ নিয়ে তিনি পাল্টা জিজ্ঞেস করেছেন,পুলিশ কি তবে আঙ্গুল চুষবে? অর্থাৎ তিনি বুঝাতে চেয়েছেন,অসংখ্য মানুষ হত্যা করে পুলিশ ঠিক কাজই করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী এখানে আবির্ভুত হয়েছেন জঙ্গলের বাদশাহ বা খুনিদের সর্দার রূপে,কোন সভ্যদেশের দায়িত্বশীল মন্ত্রী রূপে নয়।কথা হলো,কোন সভ্য দেশে এভাবে বিনাবিচারে মানুষ খুন কি সরকারের নীতি হতে পারে?

অথচ পুলিশের উপর জনতার পক্ষ থেকে কেউ গুলি ছুড়েছে সে প্রমাণ আজ অবধি নাই।বড় জোর কেউ পাথর মেরেছে। সে পাথর থেকে বাঁচার জন্য তাদের মাথায় হেলমেট ছিল।বুকে বর্ম ছিল। জনগণকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ ক্যাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করতে পারতো। সভ্যদেশে বড়জোর পানির কামান ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এভাবে জনতার উপর গুলি বর্ষণের কথা কি ভাবা যায়? নির্বিচারে মানুষ হত্যাকে সরকার যে কতটা সহজ ভাবে নিয়েছে এ হলো তার নমুনা। মানুষ হত্যা করে খুনি সন্ত্রাসীরা। পুলিশের দায়িত্ব হলো জনগণকে তাদের হাত থেকে নিরাপত্তা দেয়া। অথচ আজ পুলিশ নিজেই পরিণত হয়েছে ভয়ানক খুনিতে।আর সে খুনি বাহিনীর সর্দারে পরিণত হয়েছে দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী এবং সে সাথে প্রধানমন্ত্রী। স্বরাষ্ট মন্ত্রীর ভাষায় পুলিশ আজ  আর নীরবে আঙ্গুল চুষছে না বরং অগণিত মানুষকে পথেঘাটে লাশ করছে। অথচ যখন পুলিশের সামনে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের ক্যাডারগণ প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে ঘুরে,বিশ্বজিৎ দাশের ন্যায় নিরীহ মানুষকে কুপিয়ে কুপিয়ে লাশ করে তখন কিন্তু পুলিশ ঠিকই নীরবে দাড়িয়ে আঙ্গুলই চুষে। এবং তখনও আঙ্গুল চুষে যখন সরকারি দলের দুর্বৃত্তগণ শেয়ার মার্কেট,ব্যাংক,সরকারি রাজস্বভান্ডার থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ডাকাতি করে।এবং যেসব ডাকাত মন্ত্রীদের দূর্নীতির কারণে পদ্মাসেতু প্রকল্প বানচাল হয়ে গেল পুলিশ কিন্তু তাদের গায়ে একটি আঁচড়ও দেয়নি। অথচ তাদের সকল মুরোদ ও সকল বীরত্ব নিরস্ত্র ও নিরীহ জনগণের বিরুদ্ধে।

 

গণদুষমন রূপে সরকার ও পুলিশ

সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অধিকার জনগণের মৌলিক অধিকার। সে অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। সে দায়িত্ব পালনে সরকারের চাকর রূপে নয়,জনগণের প্রহরী রূপে কাজ করে পুলিশ। এবং পুলিশের কাজ শুধু চোর-ডাকাত-খুনিদের থেকেই জনগণকে পাহারা দেয়া নয়,বরং দুর্বৃত্ত মন্ত্রী ও প্রশাসনের হাত থেকে পাহারা দেয়াও।তাই যে কোন সভ্যদেশে পুলিশ শুধু চোরডাকাতদেরই নয়, দুর্বৃত্ত মন্ত্রী ও প্রশাসনের কর্মকতাদেরও হাজতে তোলে। কিন্তু বাংলাদেশে সেটি হচ্ছে না। এখানে পুলিশ পরিণত হয়েছে নিছক সরকারের পাহারাদার চাকরে। পুলিশ আবির্ভূত হয়েছে হিংস্র গণশত্রুর বেশে। তাই সরকারের বিরোধীদের পক্ষ থেকে যখনই রাজপথে কোন মিছিল বা জনসভা হয় তখন পুলিশের কাজ হয় সে মিছিলে ত্বরিৎ জমা হয়ে সমবেত জনগণকে লাঠি পেটা করা,তাদের উপর ক্যাঁদানে গ্যাস ছুড়া ও গুলিবর্ষণ করা। সে সাথে দিবারাত্র পাহারা দেয় শুধু মন্ত্রীদেরই নয়,সরকারের সমর্থকদের প্রতিটি মিছিল ও সমাবেশকে। সেটিই দেখা গেল শাহবাগের সমাবেশে। সরকার পুলিশকে দিয়ে শুধু সমাবেশের পাহারাদারির ব্যবস্থাই করেনি,স্কুলে স্কুলে নির্দেশ দিয়ে ছাত্র-ছাত্রী সাপ্লাইয়ের ব্যবস্থা যেমন করেছে তেমনি নিয়মিত খাদ্যপানীয় সরবরাহ করেছে। অথচ পত্রিকায় ও টিভিতে বার বার খবর দেয়া হচ্ছে,এবং ছবিও ছাপা হচ্ছে,পুলিশ জামায়াত-শিবিরের কর্মীদের গ্রেফতার করছে বিভিন্ন মিটিং থেকে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হচ্ছে, নেতাকর্মীরা সেখানে গোপন মিটিংয়ে জমা হয়েছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো,প্রকাশ্যে বা গোপনে জমা হওয়া কি মৌলিক নাগরিক অধিকার নয়? এমন মিটিং করা কি দেশের আইন বা সাংবিধান বিরোধী? এমন বহু গোপন ও প্রকাশ্য মিটিং তো সরকারি দল আওয়ামী লীগও করছে। জামায়াত ও শিবির কর্মীদের মিটিং যদি দন্ডনীয় হয়,তবে তো দন্ডনীয় হবে আওয়ামী লীগের মিটিংও। কিন্তু পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে না কেন? অথচ জামায়াত ও শিবির কর্মীদের গ্রেফতার করে পুলিশ ও সরকার এখানে সংবিধান বিরোধী ও প্রচলিত আইনবিরোধী কাজ করছে। দেশের আদালতের দায়িত্ব ছিল এমন অপরাধে সরকারের দায়িত্বশীলদের হাজতে তোলা ও শাস্তি দেয়া। কিন্তু আদালত সে কাজ করেনি। বরং এখানে আদালতও পরিণত হয়েছে সরকারের আজ্ঞাবহ সেবাদাসে।

কোন ডাকাত সর্দারই একাকী ডাকাতি করতে পারে না। যে কোন ডাকাতি হামলার জন্য তাকেও ডাকাত দল গড়তে হয়। তেমনি কোন দুর্বৃত্ত স্বৈরাচারিও কোন দেশে একাকী তার দুর্বৃত্ত স্বৈরাচারি শাসন চালাতে পারে না। সেকাজের জন্য শুধু রাজনৈতীক দল হলেই চলে না। বরং রাজনৈতীক ক্যাডারদের পাশাপাশি আজ্ঞাবহ একপাল দুর্বৃত্ত পুলিশ,দুর্বৃত্ত প্রশাসক বাহিনী ও দুর্বৃত্ত বিচারকও পালতে হয়। ফিরাউন,হালাকু,চেঙ্গিস ও হিটলারের আমলে যে শুধু দেশের রাজপ্রাসাদ দৃর্বৃত্ত কবলিত হয়েছিল তা নয়,দুর্বৃত্তদের দিয়ে পূর্ণ করা হয়েছিল দেশের প্রশাসন,পুলিশ ও আদালতেও। ডাকাত সর্দার যেমন এক পাল ডাকাত নিয়ে পথে নামে,এরাও তেমনি এক পাল পুলিশ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নিয়ে চলাফেরা করে। রাষ্ট্রের সবগুলো প্রতিষ্ঠানে আজ্ঞাবহ এরূপ দুর্বৃত্তদের বসানোর কারণেই স্বৈরাচারি শাসককে কোন কুকর্মই নিজ হাতে করতে হয় না। সে কাজ তার আজ্ঞাবহ দুর্বৃত্তগণই অতি সুচারু ভাবে সমাধান করে। ফলে আগে রাজনৈতীক বিরোধীদের হত্যায় আওয়ামী লীগকর্মীদের যেভাবে লগিবৈঠা,চাপাতি ও কুড়াল নিয়ে রাজপথে নামতে হতো,এখন সে কাজের দায়িত্ব নিয়েছে দেশের প্রশাসন,পুলিশ ও আদালত। ফলে বিগত চার বছরের শাসনে যতজন বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মী আওয়ামী লীগের কর্মীদের হাতে মারা গেছে তার চেয়ে বহুগুণ মারা গেছে পুলিশের হাতে। নিরপরাধ মানুষকে রিম্যান্ডে নিয়ে পা থেকে মাথা অবধি নির্যাতন করা এখন একটি শিল্পে পরিণত হয়েছে। সাধারণ ডাকাতগণ তাদের লুন্ঠন কর্মে পুলিশী প্রটেকশন পায়না। জনগণের হাতে তাই বহু ডাকাতকে মারা পড়তে হয়। কিন্তু পুলিশী প্রটেকশন পাচ্ছে আওয়ামী ডাকাতগণ। তারা তাই নিশ্চিন্তে হাত দিয়েছে দেশের সমুদয় সম্পদ লুন্ঠনে। ফলে দেশের রাজস্ব-ভান্ডার,ব্যাংক,শিল্পপ্রতিষ্ঠান কোন কিছুই আজ  নিরাপত্তা পাচ্ছে না।

 

দেশ অধিকৃত অপরাধিদের হাতে

দেশ আজ পুরাপুরি আওয়ামী দুর্বৃত্তদের হাতে অধিকৃত। দুর্বৃত্তরা কখনোই জনগণের সম্মতি নিয়ে পকেটে হাত দেয় না। তাদের মতামতের তোয়াক্কাও করে না। বরং তারা সেটি করে গায়ের জোরে। ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদী শক্তির হাতে বাংলাদেশ যখন অধিকৃত হয়েছিল তখন সে অধিকৃতি বাঁচিয়ে রাখার জন্য জন-সমর্থণ বা জনগণের রায়কে তারা গুরুত্ব দেয়নি। বরং সে অধিকৃতি বাঁচাতে যেমন আজ্ঞাবহ পুলিশ ও সামরিক বাহিনী গড়ে তুলেছিল,তেমনি তাঁবেদার প্রশাসন ও আদালতও গড়ে তুলেছিল। যুগে যুগে গণ-শত্রুগণ এভাবে তাদের সাহয়্য নিয়েই শত শত বছর শাসন করেছে। নিরাপরাধ মানুষকে তারা যেমন ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে,তেমনি হাজার হাজার মানুষকে কারাবন্দীও করেছে। আওয়ামী লীগ জানে,তাদের জন-সমর্থন তলায় ঠেকেছে।সুষ্ঠ নির্বাচন হলে তাদের ভরাডুবি হবে।সে খবরটি তাদের অভিভাবক ভারতও জানে। তাই জেনে বুঝেই তারা সাম্রজ্যবাদীদের অনুসৃত সনাতন কৌশলটি বেছে নিয়েছে। বেছে নিয়েছে গণ-নির্যাতনের পথ। সে লক্ষ্যেই দেশের পুলিশ বাহিনী,প্রশাসন ও আদালতে বেছে বেছে তাদের প্রতি অনুগতদের নিয়োগ দিয়েছে। হাইকোর্টের বিচারপতি রূপে সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী সামসুদ্দিন মানিকসহ অনেকের নিয়োগ কি সেটিই প্রমাণ করে না? আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ন্যায় একটি আদালত গড়ে তুলেছে এমন বিচারকদের দিয়ে। সে সাথে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কাজও নিজ হাতে নিয়েছে।বাংলাদেশের মত দেশে সরকারি প্রশাসন হাতে থাকলে কাউকে কি নির্বাচনে পরাজিত করা সম্ভব? ক্ষমতায় থাকাকালে দুর্বৃত্ত এরশাদকেও তাই কেউ নির্বাচনে হারাতে পারিনি।আওয়ামী লীগ সেটি জানে।তাই তারা তত্তাবধাক সরকারের পদ্ধতিটি বাতিল করে দিয়েছে আজ্ঞাবহ বিচারকদের দিয়ে।

স্বৈরাচারি শাসন কখনোই ভোট নিয়ে বাঁচে না। বাঁচে বাহুবল ও নির্যাতনী শক্তির জোরে। আওয়ামী সরকারের এজেন্ডা তাই জনসেবা বা জনসমর্থন নয়,বরং লুন্ঠন। আর লুন্ঠনের জন্য অনিবার্য হয়ে পড়ে নাগরিক নির্যাতন। সেটি যেমন গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিয়ে,তেমনি জানমালের নিরাপত্তা কেড়ে নিয়ে। বনেজঙ্গলে তবু পশু হামলা থেকে বাঁচা যায়,কিন্ত বাংলাদেশের পুলিশ,ডিবি ও র‌্যাব থেকে বাঁচা কঠিন। এসব সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলি যে কত নৃশংস অপরাধিদের হাতে অধিকৃত হয়ে পড়েছে তার একটি বেদনাদায়ক বিবরণ ছেপেছে দৈনিক “আমার দেশ” তার ৩১শে মার্চ তারিখের সংখ্যায়। সাধারণ মানুষ আজকাল রাজপথ থেকে খুনি,সন্ত্রাসী বা ডাকাতদের হাতে ছিনতাই বা উধাও হচ্ছে না। ছিনতাই হচ্ছে,ছিনতাইয়ের পর নির্যাতিত হচ্ছে এবং নির্যাতনের পর লাশ হয়ে ফিরছে পুলিশ,ডিবি এবং র‌্যাবের হাতে। সম্প্রতি বিনাকারণে গ্রেফতার হওয়ার পর রিমান্ডে অকথ্য নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক মাওলানা শেখ নূরে আলম হামিদী। ডিবি পুলিশের নির্যাতনে মাথা থেকে পা পর্যন্ত তার শরীরের কোনো অংশই রক্ষা পায়নি। কারাগারে অসুস্থ হলেও তিনি চিকিৎসা পাননি। দেশের হাসপাতালও যে কতটা দুর্বৃত্তকবলিত সে প্রমাণও তিনি পেয়েছেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎকরা তাকে প্রেসক্রিপশন দিলেও ওষুধ দেয়া হয়নি।সাধারণ মানুষের উপর নির্যাতনে পুলিশ যে কতটা আওয়ামী দুর্বৃত্তদের সহযোগী ও পার্টনার সে প্রমাণও তিনি পেয়েছেন। ২২শে ফেব্রুয়ারি কাঁটাবন মসজিদ থেকে আটকের পর হামিদীসহ তার সঙ্গে থাকা আরও চারজনকে শাহবাগিদের কাছে নির্যাতনের জন্য ছেড়ে দিয়ছিল পুলিশ। ২৫ দিন কারাভোগের পর ব্রিটিশ সরকারসহ বিভিন্ন মহলের হস্তক্ষেপে জেল থেকে মুক্ত হলেও পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেননি তিনি।এখনও তিনি সিলেটের একটি হাসপাতালে চিকিৎধীন আছেন।

মাওলানা হামিদীর সাথে যে বর্বরতাটি ঘটেছে,আওয়ামী লীগের প্রকৃত চরিত্র বুঝার জন্য সেটুকুই যথেষ্ট। এজন্য ইতিহাসের বই পাঠের প্রয়োজন নেই। তাছাড়া ইতিহাসের বইয়েও তো বিকৃত করা হয়েছে। দৈনিক “আমার দেশ” যে বিবরণটি ছেপেছে এখানে সেটিই তুলে ধরা হলো। মাওলানা হামিদীর বাড়ি বৃহত্তর সিলেটে মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলের হামিদনগরের বরুণায়। তার বাবা বরুণার পীরসাহেব মাওলানা শায়খ খলীলুর রহমান হামিদী। তিনি অরাজনৈতিক ধর্মীয় সংগঠন আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলামের আমির এবং বরুণা মাদরাসার প্রিন্সিপাল ও শায়খুল হাদিস। মাওলানা হামিদী ইসলামিক স্টাডিজে মাস্টার্স ডিগ্রি শেষ করে বরুণা মাদরাসায় শিক্ষকতা করেছেন এবং ১৯৯৯ সালে লন্ডন যান। সেখানে আনঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম সেন্টারের অধীনে মসজিদ,মাদরাসা,বয়স্ক শিক্ষা,স্যানিটেশন,অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস,মেডিকেল সেন্টার,মাদকাসক্ত পুনর্বাসনসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সেবামূলক কর্যক্রম পরিচালনা করেন। হেফাজতে ইসলাম ইউকের পক্ষ থেকে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার অনুদান গরিব-অসহায়দের মাঝে বিতরণ করা হয়—বাংলাদেশের যে কোনো দুর্যোগ মুহূর্তে জনগণের পাশে দাঁড়ায়। ঘূর্ণিঝড়, সিডর, বন্যা ও শীতকালে অসহায়দের পাশে থাকে হেফাজতে ইসলাম।

মাওলানা হামিদী বরুণায় ১৫ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিতে জানুয়ারি মাসে লন্ডন থেকে দেশে আসেন। প্রতি বছরই বরুণায় এ সম্মেলন হয়ে থাকে। লক্ষাধিক মানুষের সমাগম হয় এ মাহফিলে। এ সম্মেলনে বিদেশ থেকে যারা এসেছিলেন, তাদের বিমানে তুলে দিতেই ঢাকায় আসেন তিনি,আর এসেই গ্রেফতার হন। মাওলানা হামিদী এসব ঘটনা আমার দেশ-এর কাছে তুলে ধরে বলেন, “মাহফিলে যুক্তরাজ্য,যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা,ভারত,অস্ট্রেলিয়াসহ অনেক দেশ থেকে মেহমান এসেছিলেন। তাদের পৌঁছে দিতে ঢাকায় আসি। ২১ ফেব্রুয়ারি তাদের ফ্লাইট ছিল। আমি, আমার ভাগ্নে হাফিজ আহমদ বিন কাসেম,আহমদ জুবায়ের জুয়েল, হুসাইন আহমদ খানসহ চারজন ঢাকায় আসি তাদের পৌঁছে দিতে। উত্তরায় একটি হোটেলে রাতে ছিলাম। ২২ ফেব্রুয়ারি নিউমার্কেটে যাই কেনাকাটার জন্য। পথে আমরা কাঁটাবন মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করতে যাই। নামাজ শুরুর সামান্য আগে আমরা চারজন মসজিদে প্রবেশ করি। তিনি বলেন,নামাজ শেষ হতে না হতেই মসজিদের ভেতর টিয়ারশেল ও গুলিবর্ষণ শুরু করে পুলিশ। আমাদের চোখ জ্বলছিল। অজুখানায় গিয়ে চোখে পানি দিলাম। গ্যাসের এতই তেজ যে চোখে ঠিকভাবে দেখছিলাম না। নিচে নেমে আসার মুহূর্তে হঠাৎ একজন লোক আমার পাঞ্জাবি খামচে ধরে টান দিয়ে ছিঁড়ে ফেলে; ছিঁড়ে ফেলে পাগড়ি। এ সময় টুপি পড়ে গেল। তখন আমিও ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে ঘুষি মারলাম। তখনও আমি বুঝতে পারিনি যে,সে সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একজন সদস্য। এরপর পুলিশ আমাদের ওপর হামলা করলো। পিটিয়ে আহত করে আমাদের টেনে হিঁচড়ে বাইরে বের করে আনল। হ্যান্ডকাফ পরাল। হাঁটিয়ে শাহবাগের দিকে নিয়ে যেতে লাগল। আমি তাদের বারবার বললাম,আমি ব্রিটিশ নাগরিক। দেশে বেড়াতে এসেছি। কিন্তু তারা কোনো কথাই শুনল না। শাহবাগ মঞ্চের কাছে নিয়ে গেল। জামায়াত-শিবির আখ্যায়িত করে আমাদের সেখানকার লোকদের হাতে তুলে দিল গণধোলাইয়ের জন্য। শাহবাগিরা আমাদের দিকে তেড়ে এলো। আমাদের কিছু না করতে শাহবাগিদের আমি বারণ করলাম। তারা আমাদের আর মারতে সাহস পেল না। আমাদের গালাগাল এবং ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করল। আমাদের গাড়িটিও পুলিশ শাহবাগে নিয়ে এলো। পুলিশের সামনে মঞ্চের লোকরা সেটি ভেঙে ফেলল।”

মাওলানা শেখ নূরে আলম হামিদী আরো বলেন,“তারপর আমাদের শাহবাগ থানায় নিয়ে যাওয়া হলো। এশা পর্যন্ত সেখানে রাখল। আমার পায়ে যেখানে গুলি লেগেছিল, সেখান থেকে রক্ত ঝরছিল। আমি একপর্যায়ে অসুস্থ হয়ে পড়লাম। আমাদের খাবার পানিও দেয়া হলো না। আসর, মাগরিব ও এশার নামাজের জন্য অজুর পানিও দেয়া হলো না। দিতে বললে পুলিশ জানাল,জামায়াত-শিবিরের লোকজনকে কিছু দেয়া হবে না। তিনি অভিযোগ করেন,শাহবাগ থানায় জমা নেয়া পাউন্ড ছাড়া লক্ষাধিক টাকা এখনও পাইনি। গাড়িটিও ফেরত দেয়া হয়নি। তিনি বলেন,সেদিন রাতে ডিবি অফিসে নিয়ে গেল। আমার ভাগ্নের চোখ বেঁধে প্রথমে তাকে একটি রুমে নিয়ে যাওয়া হলো। তার জন্ম পবিত্র মক্কায়।সে কোরআনে হাফেজ এবং একজন নামকরা কারি। পরে আমাকেও চোখ বেঁধে একটি রুমে নেয়া হলো। ডিবি পুলিশের কয়েকজন মিলে আমাকে লাঠি দিয়ে পেটালো। রাতে ডিবি গারদে রাখলো। সেখানে থাকা অবস্থায় আমি সকালের দিকে অজ্ঞান হয়ে পড়ি। আমাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। পরে শাহবাগ থানায় আনা হলো। কিন্তু প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ওষুধ দিল না। জামায়াত-শিবির, ভাংচুর,ককটেল বিস্ফোরণ প্রভৃতি অভিযোগে মামলা দেয়া হলো। এরপর সেখান থেকে চালান দেয়া হলো আদালতে। দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করল আদালত। থানায় নিয়ে রিমান্ডের নামে নির্যাতন করল। পা থেকে মাথা পর্যন্ত শরীরের কোনো জায়গা বাকি রাখেনি পেটাতে। পেটানোর সময় থানার লোকরা বলত,গোপালগঞ্জের টাইগার।শেখ হাসিনার খুব কাছের লোক। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ডিবিতে নেয়ার পর আমার কাছে থাকা আনুমানিক ২৯ হাজার টাকা, ২টি মোবাইল, ক্রেডিট কার্ডসহ সবকিছু সেখানকার একজন এসআই জমা নেন। তিনি ক্রেডিট কার্ড থেকে কয়েকবার শপিং করেছেন, জানতে পেরেছি স্টেটমেন্ট সংগ্রহ করে। কিন্তু মুক্তি পাওয়ার পর টাকাসহ কোনো কিছুই আর ফেরত দেয়া হয়নি।”

 

অপরাধে ডুবন্ত দেশঃ দায়িত্বহীন পুলিশ!

শেখ হাসিনার শাসানামলে দেশ যে কতটা চোর-ডাকাত কবলিত এবং দেশবাসীর সম্পদ যে কতটা অরক্ষিত তারও একটি রিপোর্ট ছেপেছে দৈনিক মানব জমিন তার ৩১শে মার্চ ২০১৩ তারিখ সংখ্যায়। তা থেকে উদ্ধতি দেয়া যাকঃ “হলমার্ক, ডেসটিনি, ইউনিপেটুইউ, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, আইসিএল -মাত্র এ কয়টি প্রতিষ্ঠানই লুটে নিয়েছে ১৭ হাজার কোটি টাকা। পদ্মা সেতুর নকশা কেলেংকারি করে রাজস্বের ১১৬ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে হাসীনার অতি কাছের সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী আবুল হোসেন। পদ্মা সেতুর নকশা চুড়ান্ত অনুমোদন না করেই এ অর্থ হাতিয়ে নেয়া হয়। লুন্ঠিত অর্থ চলে গেছে ইউকে,ইউএসএ,কানাডার মত দেশে, দুদক সে প্রমানও পেয়েছে। হলমার্ক ও তার সাথে সংশ্লিষ্ট ৫টি প্রতিষ্ঠান লুটেছে ৩,৬০০ কোটি টাকা। হলমার্ক সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখাকে ভিত্তি করে ১৮টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা থেকে এলসি জালিয়াতি ও ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে ডাকাতি করেছে ২,৬৮৫ কোটি টাকা। ডেসটিনি লুটেছে ৩,৩০০ কোটি টাকা। মাল্টি লেভেল মার্কিটিং কোম্পানি লুটেছে ৩,৭০০ কোটি টাকা। অস্তিত্বহীন আবাসন প্রকল্পের কথা প্রচার করে গ্রাহকদের ১৫০০ কোটি হাতিয়ে লাপাত্তা হয়েছে ম্যাক্সিম গ্রুপের এমডি হাবিবুর রহমান। তার সে লুটের কাজে সহযোগিতা করেছে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড.আলাউদ্দীন এবং ফরিদপুর-১ এর এমপি আব্দুর রহমান। লুন্ঠিত এ ১৭ হাজার কোটি টাকার একটি কানা কড়িও সরকার উদ্ধার করতে পারিনি।” কথা হলো,এসব দুর্বৃত্ত ডাকাতগণ যখন দিনের পর দিন,বছরের পর বছর ধরে হাজার হাজার কোটি ডাকাতি করছিল তখন সরকারের পুলিশ, ডিবি, দুদক, প্রশাসনিক কর্মকতা ও মন্ত্রীগণ কি করছিল? তারা কি তখন বসে বসে আঙ্গুল চুষেনি? অথচ এখন তারাই বিরোধীদলের নেতাকর্মি ও সাধারণ মুছল্লিদের শান্তিপূর্ণ মিছিল ও সমাবেশ ভন্ডুল করতে সর্বশক্তি নিয়ে নেমেছে। এ থেকে কি প্রমানিত হয়? জনগণের রাজস্বের অর্থে প্রতিপালিত এসব প্রতিষ্ঠানের মূল কাজটি জনগণের জানমাল পাহারা দেয়া নয়,বরং সেটি হলো সরকারের গদি পাহারা দেয়া। আর একটি অজনপ্রিয় দুর্বৃত্ত সরকারের গদি পাহারা দেয়ার কাজ কি এতই সহজ? পুলিশের কাজ এখন শুধু শুধু হাসিনা ও তাঁর মন্ত্রীদের পাহারা দেয়া নয়,বরং জেলা,থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে আওয়ামী ক্যাডারদের জানমাল ও বাড়ীঘর পাহারা দেয়াও। পুলিশ,ডিবি,দুদক ও প্রশাসনিক কর্মকতাদের সব সময় তো সে কাজেই শেষ হয়ে যায়। জনগণের জানমালের পাহারা দেয়ার ফুরসত কোথায়? সামর্থই বা কোথায়? সরকার তাই পুলিশের এজেন্ডা থেকেই সেটি বাদ দিয়ে দিয়েছে।তাই যতদিন এ সরকার ক্ষমতায় থাকবে ততদিন শুধু জনগণের জানমালই শুধু বিপদে পড়বে না,বিপদে পড়বে দেশও।অথচ এ গণশত্রুদের বেতন জোগাতে হবে জনগণকেই।

 

জনগণ কি আঙ্গুল চুষবে?

দেশ আজ ধ্বংসের মুখে। তবে এ মুহুর্তে আওয়ামী লীগের নিপাতও অনিবার্য। ১৯৭৫ সালে স্বৈরাচারি মুজিব নিজে মরে গেলেও তার দল বেঁচে যায়। কিন্তু এবার শেখ হাসিনা বেঁচে গেলেও তার দল যে বাঁচছে না সেটি সুনিশ্চিত। এতবড় দুর্বৃত্তকবলিত একটি দলকে বাঁচিয়ে রাখার চেয়ে বড় দুর্বৃত্তি দেশে আর কি হতে পারে? কিছু বিষাক্ত গোখরা বা কিছু হিংস্র নেকড়েকে বাঁচানোর মধ্যে দেশের এত বড় অকল্যাণ নাই। তাতে দেশ ধ্বংস হয় না। কিন্তু আওয়ামী লীগের মত একটি দল বাঁচলে অসম্ভব করবে শুধু গণতন্ত্রকেই নয়,স্বাধীন দেশরূপে বাংলাদেশের বেঁচে থাকাটিও। তাছাড়া তাদের মূল এজেন্ডাটি শুধু গণতন্ত্র ও দেশধ্বংস নয়,বরং ইসলাম ও মুসলিম স্বার্থের উপর আঘাত হানাটিও। সুখের বিষয় যে,বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ সেটি বুঝতে শুরু করেছে,ফলে বিপুল সংখ্যায় তারা ময়দানে নেমে এসেছে। এতবড় গণবিস্ফোরণ আউয়ুব বা মুজিবের বিরুদ্ধে হয়নি,এরশাদের বিরুদ্ধেও হয়নি। আগের কোন গণ-আন্দোলনে হাজার হাজার মানুষ কাফনের কাপড় পড়ে ময়দানে নামেনি। হাজার হাজার নারীও ঝাঁটা নিয়েও রাস্তায় নামেনি।দেশের কোথাও পূর্বে এরূপ লক্ষ লক্ষ মুসল্লির সমাবেশও হয়নি। সরকারের বিরুদ্ধে মানুষ এতটাই ক্ষিপ্ত যে হরতালের ডাক দিলেই মানুষ স্বতস্ফুর্ত ভাবে সেটি পালন করে। এ আন্দোলন তাই শুধু ছাত্র আন্দোলন বা রাজনৈতীক আন্দোলন নয়।এ আন্দোলন ছাত্র-অছাত্র,রাজনৈতীক-অরাজনৈতীক,নারী-পুরুষ, শহুরে ও গ্রামীন তথা সকল মানুষের আন্দোলন। ফলে হাসিনার বুঝতে বাঁকি নাই,তার দুঃশাসনের শেষ দিনটি আজ  ঘনিয়ে এসেছে। স্বৈরাচারি শাসকের নিজের কুরসি ছাড়া অন্য কিছুর উপর দরদ থাকে না। ফলে দেশ ধ্বংস হলেও তাতে তাদের আপত্তি থাকে না। পতনের মুখে সিরিয়ার বর্তমান স্বৈরাচারি শাসক বাশার আল আসাদ তাই নিজ দেশের জনগণের উপর লাগাতর বিমান হামলা করছে। প্রশ্ন হলো,এ অবস্থায় বাংলাদেশের জনগণ কি করবে? তারা কি বসে বসে আঙ্গুল চুষবে? সরকার তো সেটিই চায়।সরকার চায় দেশের ইসলামপন্থিগণ নিজেদের ভিন্ন ধর্মীয় ফেরকাগত বিশ্বাস নিয়ে বিভেদে লিপ্ত হোক এবং সে সুযোগে তারা আরো কিছুকাল শাসন ও শোষনের সুযোগ পাক। অতীতে ব্রিটিশ শাসকগণ তেমন একটি উদ্দেশ্য নিয়েই কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার ন্যায় বহু মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত করেছিল। তেমনি একটি লক্ষ্য নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারও আলেমদের উপর অর্থবিনিয়োগ করছে। বহুদিনের ফেরকাগত বিরোধকে তীব্রতর করতে আলেমের লেবাসধারি কিছু পথভ্রষ্ট ব্যক্তিকে ময়দানেও নামিয়েছে।

 

একতা ছাড়া পথ নেই এবং লড়াই ছাড়া মুক্তি নাই

ঘরে আগুন লাগলে বা দেশে যুদ্ধ শুরু হলে সে যুদ্ধে দেশকে বাঁচানোর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোন কাজ থাকে না। দেশ বাঁচলেই নানা দলের নানা রাজনীতি থাকে। তাছাড়া ইস্যু এখানে শুধু দেশের স্বাধীনতা ও রাজনীতি বাঁচানো নয়,বরং ইসলাম বাঁচানো। সরকার শুধু দেশেরই শত্রু নয়।তাদের দুষমনি স্রেফ জামায়াতে ইসলাম,ইসলামী ছাত্রশিবির,হিজবুত তাহরির বা বিএনপির বিরুদ্ধে নয়। তারা ইসলামেরও ঘোরতর শত্রু। সে শত্রুটা যে কতটা প্রকট সেটি প্রমান করেছে সংবিধান থেকে আল্লাহর উপর আস্থার কথাটি বিলুপ্ত করে। কোন কাগজে আল্লাহর নাম লেখা থাকলে কোন ঈমানদারকে আল্লাহর সে পবিত্র নাম মুছে দেয়ার সাহস রাখে? বরং সে কাগজকে সে সম্মান করে। অথচ আওয়ামী লীগ সংবিধান থেকে আল্লাহর উপর আস্থার বানিটি মুছে দিয়ে মহা বেঈমানি করেছে। আল্লাহর বিরুদ্ধে তাদের অবস্থানটি তারা আরো সুস্পষ্ট করেছে যারা নাস্তিক,মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর মহান রাসূলের বিরুদ্ধে যারা অকথ্য ভাষায় ইন্টারনেট-ব্লগে গালিগালাজ করেছে তাদের সাথে জোট বাঁধার মধ্য দিয়ে। তারা জোট বেঁধেছে ভারতের সাথেও। ফলে এ সরকারের উপর আল্লাহর অভিসম্পাত ও আযাব অনিবার্য। তাই এমুহুর্তে চাই সকল ঈমানদারদের মাঝে একতা। দলগত,ফেরকাগত বা আদর্শগত বিরোধ নিয়ে বিভক্ত থাকলে তা কেবল আযাবই নামিয়ে আনবে। এমন বিভক্তির বিরুদ্ধে মহান আল্লাহতায়ালার হুশিয়ারিটি অতি কঠোর। পবিত্র কোরআনে তিনি বলেছেন,“তোমরা তাদের মত হয়ো না যারা আল্লাহর পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট ঘোষণা আসার পরও পরস্পরে বিভক্ত হলো ও মতবিরোধ সৃষ্টি করলো।এবং তাদের জন্য রয়েছে বিশাল আযাব।” –(সুরা আল ইমরান,আয়াত ১০৫)। মুসলমানদের জন্য বিভক্তি তাই কোন গ্রহনযোগ্য পথ হতে পারে না। নিষিদ্ধ পথ হলো এটি। লড়াই ছাড়া যেমন মুক্তি নাই, তেমনি একতা ছাড়াও কোন পথ নাই। পবিত্র কোরআনে তাই বলা হয়েছে, “তোমরা সকলে মিলে আল্লাহর রশি তথা কোরআনকে দৃঢ় ভাবে আঁকড়ে ধরো এবং পরস্পরে বিচ্ছিন্ন হয়ো না” –(সুরা আল ইমরান,আয়াত ১০৪)। একতার পথ বেয়েই আসে মহান আল্লাহর সাহায্য এবং বিজয়। তাছাড়া দেশের সকল শয়তানি শক্তি আজ  একতাবদ্ধ। অথচ একতাবদ্ধ হওয়াটি তাদের কাছে ধর্ম নয়। এটি নিছক তাদের রাজনীতি। ইসলামে বিরুদ্ধে তাদের এ একতা পরকালে ভয়ানক আযাবই বাড়াবে। অথচ মুসলমানের কাছে একাতাবদ্ধ হওয়াটি নিছক রাজনীতি নয়,এটি তার ঈমানদারি। একতার মধ্য দিয়েই ঘটে আল্লাহর প্রতি আনুগত্য। এবং এ পথেই আসে আখেরাতের মহাকল্যাণ। তাই শুধু দেশ বাঁচাতে নয়,আখেরাত বাঁচাতেও এ মুহুর্তে একতাবদ্ধ হওয়া ছাড়া মু’মিনের সামনে ভিন্ন পথ আছে কি? ৩১/০৩/১৩

 




বাংলাদেশে মিথ্যাচারিদের শাসন এবং শেখ মুজিব ও হাসিনার প্রাপ্য শাস্তি

শেখ মুজিবের মিথ্যাচার

২০১৩ সালের ৫ই মে শাপলা চত্ত্বরে নৃশংস হত্যাযজ্ঞের পর মানবাধিকার সংস্থা “অধিকার” এর প্রধান আদিলুর রহমান খানকে সরকার গ্রেফতার করা হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে সরকারের পক্ষ থেকে অভিযোগ ছিল,শাপলা চত্ত্বরে সরকারি বাহিনীর হাতে শাহাদতপ্রাপ্ত হেফাজতে ইসলামের কর্মীদের বিষয়ে সংস্থাটি নাকি মিথ্যা তথ্য দিয়েছিল। “অধিকার” য়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, তাদের হাতে ৬১জন শহীদের নামধাম আছে যাদের সেদিন হত্যা করা হয়েছিল।আওয়ামী লীগ সরকার বলছে,“অধিকার” বিকৃত তথ্য দিয়েছে এবং সেটি বাংলাদেশের “তথ্য প্রযুক্তি আইন ২০০৬” অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই আইন মোতাবেক ভূল তথ্য প্রচারের শাস্তি পূর্বে ১০ বছর জেলের বিধান ছিল। কিন্তু সরকার সেটি সম্প্রতি বাড়িয়ে ন্যূনতম শাস্তি ৭ বছর এবং সর্বোচ্চ শাস্তি ১৪ বছর করেছে। ফলে এ অপরাধে আদিলুর রহমানকে শেখ হাসিনার সরকার আদালতে শাস্তির ব্যবস্থা করেছিল।

কথা হলো, মিথ্যা কথা বলাটি সেদিন শাস্তি যোগ্য  অপরাধ রূপে চিহ্নত হয়েছিল। কিন্তু মিথ্যা বলায় আওয়ামী লীগ নেতাদের যে জুরি নাই  সে প্রমাণ তো প্রচুর। মিথ্যা তথ্য দেয়া যদি বাংলাদেশের আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হয়, তবে সে অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত শেখ মুজিব ও তার কন্যা শেখ হাসিনার। কারণ,বাংলাদেশের  ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মিথ্যা তথ্যটি যিনি দিয়েছেন তিনি অন্য কেউ নন, সে ব্যক্তিটি খোদ শেখ মুজিব।তেমনি মুজিবের ন্যায় বহু বিকট মিথ্যার জন্ম দিয়েছেন শেখ হাসিনা। মুজিবের প্রকান্ড মিথ্যাচারটি হলো একাত্তরে ৩০ লাখ মানুষের নিহত হওয়ার তথ্যটি। আর হাসিনার মিথ্যাচারটি হলো শাপলা চত্ত্বরে নৃশংস হত্যাকান্ডের পরও ৫ই মে কোন গোলাগোলি হয়নি,কেউ নিহত হয়নি এবং হেফাজত কর্মীদের গায়ে রঙ মেখে মৃতের অভিনয় বলার তথ্যটি। বাংলার সমগ্র ইতিহাসে এতবড় মিথ্যা কথা কেউ কি কখনো বলেছে? মিথ্যা উচ্চারণ সব সময়ই পাপ, সবসময়ই সেটি শাস্তি যোগ্য অপরাধ। মজলুমের বিরুদ্ধে মিথ্যা বলা যেমন অপরাধ, তেমনি অপরাধ হলো জালেমের বিরুদ্ধে মিথ্যা বলাও।আর সবচেয়ে বড় শাস্তি তো তার প্রাপ্য যে সবচেয়ে বড় মিথ্যাটি বলে।

মিথ্যাচারিদের আরেক অপরাধ,জনগণকে তারা বিবেকহীন করে।সেটি জনগণের মনে মিথ্যার আবাদ বাড়িয়ে। আগাছার আবাদ বৃদ্ধিতে জমির উর্বরতা যেমন বিলুপ্ত হয়,তেমনি মিথ্যার প্রকোপে অসম্ভব হয় মানব মনে সত্যের বীজ বেড়ে উঠার।এমন মিথ্যুকদের আল্লাহতায়ালা হেদায়েত দেননা। মিথ্যাচারিরা তাই বঞ্চিত হয় ইসলামের বরকত থেকে। বিবেকহীন ও দুর্বৃত্ত হওয়াটাই তাদের রীতি। তাই সত্যকে কবুল করার ক্ষেত্রে তারা সামর্থহীন হয়। একারণেই ঈমানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে নাশকতাটি ঘটায় মিথ্যাচারিতা। শয়তানের এটিই সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। শুধু ফিরাউন বা নমরুদ নয়,সাপ-শকুন, গরুছাগল ও মুর্তিরাও  কোটি কোটি মানুষের কাছে ভগবান রূপে গণ্য হয়েছে তো এরূপ মিথ্যাচারিদের প্রচারের কারণে। একই ভাবে শেখ মুজিব ও তার দল আওয়ামী লীগও কোটি কোটি মানুষকে বিবেকহীন করেছে। আওয়ামী বড় অপরাধটি তাই শুধু ভারতের দাসত্ব প্রতিষ্ঠা নয়, স্বৈরাচারি শাসনও নয়। বরং সেটি মিথ্যার প্রতিষ্ঠা। দেশে তিরিশ লাখের মিথ্যা তথ্যটির প্রচার তো সে কারণে এতটা বলবান।

মুজিবের তিরিশ লাখের মিথ্যাচার

তিরিশ লাখের অর্থ তিন মিলিয়ন। একাত্তরে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি অর্থাৎ ৭৫ মিলিয়ন। যে কোন স্কুল ছাত্রও হিসাব করে বের করতে পারে,সাড়ে ৭ কোটির (৭৫ মিলিয়ন)মাঝে তিরিশ লাখ (তিন মিলিয়ন) মানুষের মৃত্যু হলে প্রতি ২৫ জনের মাঝে একজনকে মারা যেতে হয়। যে গ্রামে ১ হাজার মানুষের বাস সে গ্রামে মারা যেতে হয় ৪০ জনকে। ঘটনাক্রমে সে গ্রামে সেনাবাহিনীর প্রবেশ না ঘটলে এবং তাদের হাতে কেউ মারা না গেলে পরবর্তী গ্রামটি যদি হয় ১ হাজার মানুষের তবে সেখান থেকে মারা যেতে হবে কমপক্ষে ৮০ জনকে। যে থানায় ১ লাখ মানুষের বাস সেখানে মারা যেতে হবে ৪ হাজার মানুষকে। প্রতি থানায় ও প্রতি গ্রামে মৃত্যুর সংখ্যা এ হারে না হলে ৩০ লাখের সংখ্যা পূরণ হবে না। তাছাড়া ৯ মাসে তিরিশ লাখ মানুষকে হত্যা করতে হলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে প্রতিদিন গড়ে ১১,১১১ জনকে হত্যা করতে হয়। সে সংখ্যাটি কোন একটি দিন পূরণ করতে ব্যর্থ হলে পরের দিন বেশী করে হত্যা করে তা পূরণ করতে হতো। সে সময় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পাক-বাহিনীর প্রকৃত সৈন্য সংখ্যা ছিল প্রায় ৪৫  হাজার। -(সূত্রঃ জেনারেল নিয়াজী রচিত বিট্রায়াল অব ইস্ট পাকিস্তান নামক বই,২০০১)।যুদ্ধবন্ধী রূপে যেসব পাকিস্তানীদের ভারতে নিয়ে যাওয়া হয় তাদের মধ্যে অনেকে ছিল বেসামরিক অবাঙালী ও তাদের পরিবারের সদস্য।

প্রশ্ন হলো,৪৫ হাজার পাকিস্তানী সৈন্যের পক্ষে কি সম্ভব ছিল বিল-হাওর,নদী-নালা,দ্বীপ ও চরাভূমিতে পরিপূর্ণ একটি দেশের প্রায় ৭০ হাজার গ্রামে পৌছানো? প্রায় ৭০ হাজার গ্রামের মাঝে ১০ হাজার গ্রামেও কি সেনা বাহিনী পৌঁছতে পেরেছে? প্রতিটি গ্রাম দূরে থাক প্রতিটি ইউনিয়নেও কি তারা যেতে পেরেছিল? অধিকাংশ গ্রামে তখন গাড়ী চলার মত রাস্তা ছিল না।অধিকাংশ গ্রামের অবস্থান নদীর পাড়েও নয় যে তারা লঞ্চ বা নৌকা যোগে সেখানে পৌঁছতে পারতো। ফলে তিরিশ লাখ নিহতের হিসাব মিটাতে হলে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা পড়তে হয় জেলা ও উপজেলা শহরে। কিন্তু কোন জেলা বা উপজেলা শহরে ১০ হাজার বাঙালী কি মারা গেছে? তাই মুজিবের তিরিশ লাখ যে গাঁজাখোরী মিথ্যা সেটি প্রমান করা কি এতই কঠিন? সে মিথ্যা তথ্য দেয়ার জন্য বাংলাদেশের মাটিতে সর্বপ্রথম যে ব্যক্তির বিচার হওয়া উচিত এবং সে বিচারে কঠোর শাস্তি হওয়া উচিত তিনি হলেন শেখ মুজিব। মুজিবের অপরাধ শুধু এ নয় যে তিনি মিথ্যাচারি ছিলেন। বরং বহু কোটি মানুষকে তিনি মিথ্যাচারি বানিয়ে গেছেন। বাংলাদেশে একাত্তরে তিরিখ নিহত হওয়ার তথ্যটি বাজার পেয়েছে তার কারণেই। তাছাড়া মিথ্যাচারিতা শুধু শয়তানের জন্য দরজাই খুলে দেয় না।সে সাথে আল্লাহর আযাবও ডেকে আনে। তাই বাংলাদেশের তথ্য প্রযুক্তি আইন মোতাবেক সর্বপ্রথম তারই মরণোত্তর শাস্তি হওয়া উচিত। এতবড় মিথ্যা তথ্য দেয়ার পরও যদি শাস্তি না হয় তবে মিথ্যা বলা যে শাস্তি যোগ্য অপরাধ সেটি প্রমাণ হয় কি করে? তখন এরূপ অপরাধে অন্য কাউকে আদালতে তোলার কি আদৌ কোন যৌক্তিকতা থাকে?

 

হাসিনার লাশের দৌড় মারার কিচ্ছা
একই রূপ ভয়ংকর মিথ্যা তথ্য দেয়ার অভিযোগে কাঠগড়ায় তোলা উচিত শেখ হাসিনার।  সে মিথ্যা তথ্যটি তিনি দিয়েছেন ১৯শে জুন সংসদে দাঁড়িয়ে। আজ এটি প্রমাণিত সত্য যে,গত ৫ মে, ২০১৩ তারিখে রাতে হেফাজতে ইসলামের লক্ষাধিক নেতাকর্মীকে শাপলা চত্ত্বর থেকে সরানোর সময়ে নৃশংস গোলাগোলি হয়েছিল। তাতে হাজার হাজার মানুষ হতাহত হয়েছিল, এবং রক্তের স্রোতে ভেসে গিয়েছিল মতিঝিলের রাজপথ। সে নৃশংসতার অসংখ্য ভিডিও চিত্র আজ দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে আছে। কিন্তু শেখ হাসিনা বলেছেন,“সেই (৫ মে) দিন কোনো গোলাগুলি বা সেরকম কোনো ঘটনাই ঘটেনি। তারা সেখানে গায়ে লাল রঙ মেখে পড়ে ছিল। পরে পুলিশ যখন তাদের ধরে টান দেয়, দেখা গেল উঠে দৌড়াচ্ছে। দেখা গেল লাশ দৌড় মারল।” -(দৈনিক আমার দেশ ২০/০৬/১৩)। ৫ মে’র রাতের নৃশংসতা নিয়ে এ অবধি সরকারি দল, র‌্যাব,পুলিশ ও বিজিবীর পক্ষ থেকে বহু ব্যক্তি বহু মিথ্যা ভাষণ রেখেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, হাসিনা যে মিথ্যাচার করলেন এতবড় মিথ্যা কথা কি আজ অবধি কেউ কি বলেছে?

সে কালো রাতে যে নৃশংস বর্বরতাটি ঘটেছে তার ভূক্তভোগী ও সাক্ষি শুধু হেফাজতে ইসলামের লক্ষাধিক নেতাকর্মীই নন, বরং প্রত্যক্ষদর্শী হলো শত শত মিডিয়া কর্মী ও সাধারণ মানুষ। তাছাড়া এ নৃশংসতার শত শত ভিডিও চিত্রও রয়েছে। এবং বিশ্বব্যাপী তা ছড়িয়ে পড়েছে। কোন সজ্ঞান ও সুস্থ্য মানুষ কি সে সচিত্র প্রমাণগুলো অস্বীকার করতে পারে? একাত্তরের ২৫ মার্চের ঘটনা নিয়ে লাগামহীন গুজব সৃষ্টি করা চলে, কারণ তার কোন ভিডিও প্রমাণ চিত্র নেই। কিন্তু সে অবকাশ ৫ মে’র ঘটনা নিয়ে নেই। অথচ শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীগণ সে রাতের বর্বরতার ধারণকৃত ভিডিও চিত্রগুলো অস্বীকার করে চলছেন। শেখ হাসিনার এরূপ বিষোদগার কি কেবল মিথ্যাচার? বরং নিহত ও আহত হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষের সাথে এক নিষ্ঠুর বিদ্রুপও। একমাত্র মানসিক ভাবে অসুস্থ্য মানুষই এমন মিথ্যচারি ও বিদ্রুপকারি হতে পারে। শুধু তাই নয়, শেখ হাসিনা উল্টো মিথ্যাচারিতার গুরুতর অভিযোগ এনেছেন বিরোধী দলের বিরুদ্ধে। মিথ্যাচারি ও অপরাধী প্রমাণের চেষ্টা করেছেন হেফাজতে ইসলামের ধর্মপ্রাণ নেতাকর্মীদের। তাদের চরিত্রহনন করতে গিয়ে তিনি ধর্মের দোহাইও দিয়েছেন। মিথ্যা কথা বলা মহাপাপ ও ধর্মবিরোধী – উলামাদের প্রতি সে নসিহতও করেছেন। শেখ হাসিনা বলেছেন,“অথচ তারা (বিরোধী দল) ১ লাখ ২ হাজার গুলি,হাজার হাজার লাশের কথা বলে বেড়াচ্ছে।এ ধরনের আজেবাজে মিথ্যাচার করে দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। ধর্মের নামে এই অসত্য কথা বলে কোন ধরনের ইসলাম পালন তা আমি জানি না।” -(দৈনিক আমার দেশ ২০/০৬/১৩)

হাসিনা যে শাপলা চত্ত্বরের হত্যাকান্ড নিয়ে মিথ্যা তথ্য দিয়েছে সেটি সরকারি প্রেসনোটও প্রমাণ করেছে। হতাহতের প্রকৃত সংখ্যাটি প্রেসনোটে গোপন করার চেষ্টা করা হলেও প্রেসনোট এতটুকু বলতে বাধ্য হয়েছে যে,সেখানে হত্যাকান্ড ঘটেছে এবং বলেছে,ঐদিন ১১ জনের মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং লাশ দেখা গেছে শাপলা চত্ত্বরের মঞ্চের পাশে। ফলে প্রেসনোটেই প্রমাণিত হয়েছে হাসিনা মিথ্যা তথ্য দিয়েছে। হাসিনার দেয়া ভাষ্য মতে “সেই (৫ মে) দিন কোনো গোলাগুলি বা সেরকম কোনো ঘটনাই ঘটেনি। তারা সেখানে গায়ে লাল রঙ মেখে পড়ে ছিল। পরে পুলিশ যখন তাদের ধরে টান দেয়,দেখা গেল উঠে দৌড়াচ্ছে।দেখা গেল লাশ দৌড় মারল”- এ তথ্যটি ডাহা মিথ্যা ও বানাওয়াট। বরং প্রকৃত সত্যটি হলো,সেদিন প্রচন্ড গোলাগোলি হয়েছিল। গোলাগোলিতে হাজার হাজার মানুষ হতাহত হয়েছে। শহীদ হওয়া ব্যক্তিদের লাশগুলো সেদিন হাসিনার কথা মত দৌড় মারেনি,বরং সেখানেই রক্তাত্ব নিথর দেহ নিয়ে পড়ে ছিল। সরকারি প্রেসনোট দাতারাও সে লাশগুলো দেখেছে। অনেক দেখেছে সে লাশগুলোকে ময়লার গাড়িতে তুলতে। অতএব এরূপ উদ্ভট মিথ্যা তথ্য দেয়ার জন্য শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ তথ্যপ্রযুক্তির আইনে বিচার ও সে বিচারে সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত।

 

হামলা ৭ হাজার ৫ শত ৮৮ জন সৈনিকের

শেখ হাসিনা যে মিথ্যা তথ্য দিয়েছে সে প্রমাণটি শুধু হেফাজতকর্মীরা দেইনি। দিয়েছে বহু সাংবাদিকও। ১২ই মে তারিখে দৈনিক যুগান্তর রিপোর্ট করে,পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবীর ৭ হাজার ৫ শত ৮৮ জন এ হামলায় অংশ নিয়েছিল। হামলাকারিদের মধ্যে ১৩০০ জন এসেছিল র‌্যাব থেকে। ৫,৭১২ জন এসেছিল পুলিশ বাহিনী থেকে এবং ৫৭৬ জন এসেছিল বিজিবী থেকে। তখন শাপলা চত্ত্বরের আশেপাশে শান্তিপূর্ণ ভাবে অবস্থান নিয়ে বসে ছিল লক্ষাধিক মুসল্লি। যাদের অনেকে সে সময় তাহাজ্জুদের নামায পড়ছিলেন, কেউ বা যিকির করছিলেন, কেউ বা সারাদিন সরকারি গুন্ডা বাহিনীর হামলা মোকাবেলা করে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। হামলা শুরু হয় রাত আড়াইটার সময় এবং তিন দিক দিয়ে। দৈনিক যুগান্তর লিখেছে, সমগ্র এলাকাটি সে সময় বন্দুকের গুলি, টিয়ারগ্যাসের শেল ও ধোয়াতে পূর্ণ হয়ে যায়। পত্রিকাটি বিবরণ দিয়েছে, হামলাকারি এ বিশাল বাহিনীর নেতৃত্ব দেয় র‌্যাবের ইন্টেলিজেন্স প্রধান লে.কর্নেল জিয়াউল হাসান, র‌্যাব-১০ এর কমান্ডার লে.কর্নেল ইমরান, র‌্যাব-৩ এর কমান্ডার মেজর শাব্বির এবং র‌্যাব ডাইরেক্টর লে.কর্নেল কিসমত হায়াত, র‌্যাব ডাইরেক্টর কামরুল আহসান এবং বিজিবী অফিসার কর্নেল ইয়াহিয়া আযম।। সেপাইদের পাশে হামলাতে অংশ নেয় ৫জন কমান্ডো অফিসার। শত্রু দেশের বিরুদ্ধে পরিচালিত কোন প্রকান্ড সীমান্ত যুদ্ধের যেমন কোড নাম থাকে তেমনি কোড নাম ছিল জনগণের বিরুদ্ধে পরিচালিত এ সেনা যুদ্ধেরও। তবে একটি নয়,একাধিক। র‌্যাব এ যুদ্ধের নাম দিয়েছিল “অপারেশন ফ্লাশআউট”। আর বিজিবী নাম দিয়েছিল “ক্যাপচার শাপলা”।

 

একাত্তরের ৯ মাসের যুদ্ধের ভারত ও পাকিস্তানের কোন পক্ষই সীমান্ত যুদ্ধের কোন একটি একক সেক্টরে ৭ হাজার ৫ শত ৮৮ জন সৈন্য নিয়ে হামলা করেনি। অথচ এক শাপলা চত্তরের ন্যায় আধা মাইলের কম জায়গায় সৈন্য নামানো হয়েছিল ৭ হাজার ৫ শত ৮৮ জন। বাংলাদেশের বিগত হাজার বছরের ইতিহাসে এতবড় হামলা এবং এক রাতে এত মৃত্যু কোন কালেই হয়নি। ইখতিয়ার মহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির হাতে যখন আজকের বাংলাদেশের চেয়ে বৃহত্তর বাংলা বিজিত হয় তখনও এতবড় হামলা এবং এত মৃত্যু হয়নি।সে হামলাটি হয়েছিল মাত্র ১৭ জন সৈনিক নিয়ে। প্রশ্ন হলো, হাসিনার কথা মত শাপলা চত্ত্বরে যদি কোন কিছু না হয়ে থাকে তবে কেন এত সৈন্য,এত পুলিশ,এত র‌্যাব ও এত অফিসার সেখানে হাজির হয়েছিল? তবে কি তারা শাপলা চত্ত্বরে ঘোড়ার ঘাস কাটতে জমা হয়েছিল?

গত ২৯ই আগষ্ট চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির জনসভায় শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমার চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। আমি শুধু আপনাদের জন্য কাজ করি। আমার বাবা এ দেশের দুঃখী মানুষের জন্য সারা জীবন কাজ করেছেন।” এটি কি কম মিথ্যাচার? চাওয়া-পাওয়ার কিছু নাই বলার পর একই জনসভায় তিনি জনগণের কাছে নৌকায় ভোট চেয়েছেন।চাতুরি আর কাকে বলে? হাসিনা চান নিরংকুশ ক্ষমতা। চান লুটপাটের নিরংকুশ স্বাধীনতা। তার পিতাও চাইতেন নিরংকুশ ক্ষমতা। নিছক ক্ষমতা লাভের স্বার্থেই তিনি একাত্তরে ভয়ানক যুদ্ধ ডেকে এনেছিলেন। জনগণকে তিনি গণতন্ত্র, অর্থনৈতীক উন্নয়ন, স্বাধীনতার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অথচ মুজিবের কাছে কোন কালেই এসব গুরুত্ব পায়নি। গুরুত্ব পেয়েছে শুধু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নিজ হাতে নেয়ার বিষয়টি। সে লক্ষ্যে তিনি এমনকি ভারতের ন্যায় বিদেশী শক্তির সাথে হাত মিলিয়েছেন। এবং ভারতীয় সেনা বাহিনীকে বাংলাদেশের মাটিতে ডেকে আনেন।

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা আজীবন নিজ হাতে রাখার স্বার্থেই মুজিব  গণতন্ত্রকে কবরে পাঠিয়ে একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এবং বাকস্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছিলেন জনগণের মুখ থেকে। গড়ে তুলেছিলেন নিজের সাঙ্গপাঙ্গদের দূর্নীতির রাজত্ব। সে দূর্নীতির কারণেই তার শাসনামলে নেমে এসেছিল ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। কয়েক লাখ দুঃখী মানুষকে তিনি মৃত্যুর হাতে তুলে দিয়েছিলেন। সৃষ্টি হয়েছিল অসংখ্য জাল পড়া বাসন্তি। বাংলাদেশের গরীব মানুষদের জন্য এই ছিল মুজিবের দান। শেখ হাসিনাও চান তার পিতার ন্যায় নিরংকুশ প্রশাসনিক ক্ষমতা। চান লুটপাটের নিরংকুশ অধিকার। তারা শাসনামলে ইতিমধ্যেই রাষ্টীয় ব্যাংকগুলো থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়ে গেছে। বহু হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে দেশের শেয়ার মার্কেট থেকে। লুটপাট হচ্ছে রাষ্ট্রীয় প্রকল্পের বাজেট থেকে। লুটপাটের সে রাজত্ব নিজ হাতে রাখার স্বার্থেই তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রথাকে বিলুপ্ত করে নির্বাচন পরিচালনার দায়দায়িত্ব নিজ হাতে রাখার ব্যবস্থা করেছেন। অথচ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ইস্যুটি ছিল বহু আন্দোলনের পর একটি মীমাংসিত বিষয়। সে ইস্যুকে আবার বিতর্কিত করে দেশকে তিনি এক রক্তাক্ষয়ী সংঘাতের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। এমন একটি আন্দোলনে জনগণের জানমালের কোরবানীর সাথে দেশের অর্থনৈতীক ক্ষয়ক্ষতি কি কম। তিনি নিজে জানেন¸বাংলাদেশের মত দেশে নির্বাচন পরিচালনার ক্ষমতা কোন দলীয় সরকারের হাতে থাকলে সে দলকে নির্বাচনে পরাজিত করা দুরুহ। সে কারণেই নির্বাচনে পরাজিত করা সম্ভব হয়নি এমনকি স্বৈরাচারি এরশাদের ন্যায় জনপ্রিয়তাহীন এক চিহ্নিত দুর্বৃত্তকেও।শেখ হাসিনা নিজেও সেটি বুঝতেন। তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবীতে তিনি নিজেও আন্দোলন করেছিলেন। অথচ আজ নিজের বিজয়কে সুনিশ্চিত করার স্বার্থে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রথাকে তিনি বিলুপ্ত করলেন এবং নির্বাচন অনুষ্ঠানের কর্তৃত্ব নিজ হাতে নিলেন।বিরোধী দল কি এতই বোকা যে তার এ কুটকৌশল তারা বুঝে না? তিনি নিজে যখন দলীয় সরকারকে অতীতে মেনে নেননি, অন্যরাই বা কেন মেনে নিবে? লুটের লোভ তার মাঝে এতই অধিক যে,১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর বিদায়পর্বে তিনি প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত বাসভবনকে নিজ নামে লিখে নেয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। অথচ আজ  বলছেন তিনি পাওয়ার জন্য রাজনীতি করেন না। এসব মিথ্যাচারিতা নিয়েও তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হওয়া উচিত।

 

মিথ্যাচারিতায় বাংলাদেশের বিচারকগণ

শুধু মুজিব বা হাসিনার বিরুদ্ধে নয়, তথ্য প্রযুক্তি আইনে বিচার হওয়া উচিত এবং সে বিচারে শাস্তি হওয়া উচিত বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের বিচারকদেরও। মিথ্যাচারিতায় তারা নতুন মাত্রার সংযোগ ঘটিয়েছেন। উদাহরণ দেয়া যাক। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের বিচারকগণ মাওলানা আবুল কালাম আযাদের বিরুদ্ধে প্রদত্ত রায়ের তৃতীয় পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ১৯৭১ সালে পাকিস্তান আর্মি ৩০ লাখ মানুষকে হত্যা করেছে। তারা আরো লিখেছেন, পাক আর্মির হাতে ৪ লাখ নারী ধর্ষিতা হয়েছে। তিরিশ লাখের মিথ্যাচার নিয়ে এ নিবন্ধে পূর্বে আলোচনা হয়েছে। প্রশ্ন ৪ লাখ ধর্ষণের সংখ্যা নিয়ে। তাদের দেয়া এ তথ্যটিও যে কতটা মিথ্যাপূর্ণ সেটি কি প্রমাণ করা এতই কঠিন? একাত্তরে বাংলাদেশের পরিবারগুলোতে গড় সদ্স্য সংখ্যা ছিল প্রায় ৪জন। ফলে সাড়ে সাত কোটি মানুষের দেশে প্রায় ১ কোটি ৮৭ লাখ ৫০ হাজার পরিবার ছিল। এদের মাঝে ৪ লাখ ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে গড়ে প্রতি ৪৭টি পরিবারের মাঝে অন্তত একটি পরিবারে ধর্ষিতা মহিলা থাকার কথা।যে গ্রামে ২০০টি পরিবারে বাস সে গ্রামে কমপক্ষে ৪টি পরিবারে ধর্ষিতা নারী থাকতে হবে। সে গ্রামে আর্মির প্রবেশ না ঘটলে পাশের গ্রাম থেকে কমপক্ষে ৮ টি পরিবারে ধর্ষিতা নারী থাকতে হবে, নইলে ৪ লাখ ধর্ষিতার সংখ্যা পুরণ হবে না। একাত্তরে বাংলাদেশের শতকরা ৮০ ভাগ মানুষই গ্রামে বাস করতো। আর সেনা বাহিনীর পক্ষে প্রায় ৭০ হাজার গ্রামের মাঝে ১০ হাজার গ্রামেও কি পৌছা সম্ভব হয়েছে? ফলে সহজেই ধারণা করা যায়, দেশের শতকরা প্রায় ৭০ ভাগ পরিবারের জীবনের পাক বাহিনীর সাক্ষাৎ মেলেনি। তাই ৪ লাখ ধর্ষণের ঘটনা ঘটতে হলে সেগুলো বেশী বেশী হতে হবে জেলা ও উপজেলা শহরে বা সীমান্তবর্তি গ্রামগুলোতে –যেখানে সেনাবাহিনীর লোকদের অবস্থান ছিল বেশী।ফলে ধর্ষিতা পরিবারের সংখ্যা সেখানে প্রতি ৪৭য়ে একজন নয়, বরং অনেক বেশী হারে হওয়ার কথা।  প্রতি ১০ বা ২০টি পরিবারে কমপক্ষে একজন ধর্ষিতা নারী থাকার কথা। কিন্তু সেটি কি বিশ্বাসযোগ্য?

প্রশ্ন হলো, যুদ্ধের ময়দানে যারা শত্রুর সামনে দাঁড়িয়ে প্রাণ বাজি রেখে যুদ্ধ করে তাদের মনে কি ধর্ষণের কামনা জাগে? তাদের প্রতিটি মুহুর্তের ব্যস্ততা তো প্রাণ বাঁচিয়ে শত্রুকে ঘায়েল করার। সে ব্যস্ততার মাঝে মনের গভীরে বার বার উঁকি মারে পরিবারের আপনজনদের স্মৃতি। একাত্তরের ৯ মাসে ৪ লাখ ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে প্রতিদিন গড়ে ২৭৩টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটতে হয়। এটি কি বিশ্বাসযোগ্য? দেশে একটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটলেই তো সেটি বিশাল খবর হয়। ধর্ষণ নিয়ে এমন ধারণা একমাত্র তাদের মগজেই আসে যারা জীবনে কোন দিনই কোন রণাঙ্গনে যুদ্ধে নামেনি। অথচ সে বিশাল মিথ্যা তথ্যটি নিজেদের রায়ে সংযোজিত করলো ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের বিচারকগণ। প্রশ্ন হলো, এটি কি কম শাস্তিযোগ্য অপরাধ? বিচারদের শপথ নিতে হয়,তারা সদা সত্য কথা বলবেন ও ন্যায়ের পক্ষে থাকবেন এবং কখনোই মিথ্যা বলবেন না। তাই বিচারের রায়ে যে কোন মিথ্যা বলাটি শপথভঙ্গ করার মত গুরুতর অপরাধ। এমন অপরাধে বিচার-আচার অবিচারে পূর্ণ হয়। আওয়ামী বাকশালীদের পক্ষে থেকে প্রচারিত মিথ্যার পক্ষে কলম ধরা বা লাঠি ধরার সামর্থ এসব বিচারকদের বিশাল। কিন্তু সত্যের পক্ষ নেয়ার সামর্থও কি তাদের আছে? কারণ সে জন্য তো সত্য-মিথ্যার তারতম্য করার ন্যূনতম সামর্থটুকু থাকতে হয়। ন্যায়-অন্যায় নিয়ে বিবেচনার সামর্থ একজন সাধারণ মানুষের যতটা থাকে তাদের তো সে সামর্থটি অনেক বেশী থাকতে হয়। কিন্তু তারা নিজেরাই যদি মিথ্যার স্রোতে ভেসে যান তবে তারা ন্যায় বিচার করবেন কীরূপে? কিন্তু সে সামর্থ থাকলে কি তারা একাত্তরে ৩০ লাখ খুন আর ৪ লাখে ধর্ষণের মিথ্যা তথ্যটি নিজেদের রায়ে উল্লেখ করতে পারেন? বাংলাদেশের আদালতগুলো কাদের দ্বারা অধিকৃত সেটি কি এরপরও বুঝতে বাঁকি থাকে?

 

শাস্তি হোক সকল মিথ্যাচারির

মিথ্যাই সব পাপের মূল। মিথ্যা পরিত্যাগ করলে অন্যসব পাপ পরিত্যাগ করাও তখন সহজ হয়ে যায়। নবীজী (সাঃ) এটিকে সর্বপাপের মা বলে আখ্যায়ীত করেছেন। পাপ ও দুর্বৃত্তির জন্ম হয় মিথ্যার গর্ভ থেকেই। মিথ্যাচারিদের কারণেই সত্যবাদী সৎ লোকদের রাজনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও ধর্মকর্ম কঠিন হয়ে পড়ে। তখন পরাজিত হয় আল্লাহর শরিয়তি বিধান। মিথ্যাবাদীদের লড়াই তো শয়তানের রাজনীতির বিজয় আনার। শয়তান তো তাদের ঘাড়েই সওয়ার হয়ে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজ পরিচালনা করে। মুজিব ও হাসিনার রাজনীতির প্রতি দেশী-বিদেশী কাফেরদের এজন্যই তো এত সমর্থন। অথচ নবীজী (সাঃ)র জীবনে লাগাতর জিহাদটি ছিল আল্লাহর জমিনকে মিথ্যাচারিদের দখলদারি থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে। রাজনীতি, সংস্কৃতি, প্রশাসন ও বিচার-আচারের উপর মিথ্যাচারিদের যে দেশে যত বেশী দখলদারি,সে দেশ দুর্বৃত্তিতে ততই বিশ্বরেকর্ড গড়ে। বাংলাদেশ যে দুর্বৃত্তিতে বিশ্বে  ৫ বার প্রথম হওয়ার রেকর্ড গড়েছে সেটি দেশের ভূপ্রকৃতি বা জলবায়ুর কারণে নয়, বরং দেশের রাজনীতি, প্রশাসন, ব্যাবসা-বাণিজ্য ও আইন-অদালত মিথ্যাচারিদের হাতে অধিকৃত হওয়ায়।তাই দুর্বৃত্তি ও অপরাধ দমনের স্বার্থে প্রতিটি সভ্য দেশেই মিথ্যাকথন শাস্তি যোগ্য অপরাধ রূপে গণ্য হয়। কিন্তু বাংলাদেশে আজ অবধি কাউকে কি শুধু মিথ্যা বলার জন্য আদালতে তোলা হয়েছে? কারো কি একদিনের জন্যও জেল হয়েছে? কোন মন্ত্রী বা এমপিগণ কি তাদের চাকুরি বা পদমর্যাদা হারিয়েছে? বরং ঘটেছে উল্টোটি। বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর মিথ্যাচারিকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী রূপে প্রতিষ্ঠা দেয়া হচ্ছে। এভাবে কি দেশ থেকে মিথ্যার নির্মূল হয়? নির্মূল হয় কি দুর্বৃত্তি?

জনাব আদিলুর রহমান খানকে হাজতে তোলা হয়েছে এজন্য নয় যে,তিনি মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন। বরং এ জন্য যে,”অধিকার”এর দেয়া তথ্যে প্রমাণিত হয়েছে যে,হাসিনা ভয়ানক মিথ্যাচারি।এতে ক্রোধ গিয়ে পড়েছে আদিলুর রহমানের উপর। জনাব আদিলুর রহমান খান যদি সরকারের হাসিনার সাথে সুর মিলিয়ে বলতেন,শাপলা চত্ত্বরে কোনরূপ গুলি চলেনি এবং সেখানে কেউ মারাও যায়নি তবে তাকে যে পুরস্কৃত করা হতো -তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে? বাংলাদেশে এরূপ মিথ্যাচারিদের বিচরন শুধু দেশের রাজনীতি ও প্রশাসন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নয়,বরং সেটি দেশের আদলতগুলোতেও। দেশের কল্যাণ তাই শুধু চোর-ডাকাত ও খুনি-লম্পটদের শাস্তি দেয়াতে নয়, বরং এৃসব মিথ্যাচারিদের শাস্তি দেয়াতেও। বাংলাদেশে সে কাজটি যত দ্রুত শুরু হয় ততই দেশের মঙ্গল। এবং সেটির শুরু হওয়া উচিত শেখ মুজিব ও হাসিনাকে আদালতের কাঠগড়ায় খাড়া করার মধ্য দিয়ে। তাতে অন্যরাও তখন উচিত শিক্ষা পেত। মিথ্যাবলাও যে শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ সেৃটি সাধারণ মানুষও তখন বুঝতে পারতো। ৩১/০৮/২০১৩

                                                  




যে ভয়ানক অপরাধ ও ভ্রষ্টতাটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে

মূল ইঞ্জিনটি রাজনীতি-

জাতীয় জীবনে মূল ইঞ্জিনটি হলো রাজনীতি। এ ইঞ্জিনই জাতিকে সামনে টানে। জাতির সামনে চলাটি কোন পথে হবে এবং বৈষয়ীক, নৈতিক ও সার্বিক মানবিক উন্নয়নের পথে দেশ কতটা এগুবে -সেটি নির্ভর করে এ ইঞ্জিনের চালকদের উপর। কোন একটি জাতির ব্যর্থতা দেখে নিশ্চিত বলা যায়, সে জাতির রাজনৈতিক নেতারা সঠিক ভাবে কাজ করেনি। আর বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মূলতঃ সেটিই ঘটেছে। একটি দেশের উন্নয়ন বা সুখ-সমৃদ্ধির জন্য সে দেশের জলবায়ু, আবহাওয়া বা প্রাকৃতিক সম্পদে বিপ্লব আসাটি জরুরী নয়। বরং বিপ্লব আনতে হয় নেতৃত্বে এবং সেদেশের রাজনীতিতে। রাজনীতির মাধ্যমে সাধারণ মানুষ পায় পথ-নির্দেশনা, রাজনৈতিক নেতাদের মাঝে পায় অনুকরণীয় মডেল খুজে পায়। আলেকজান্ডারের আমলে গ্রীস যখন বিশ্বশক্তি রূপে আত্মপ্রকাশ তখন গ্রীসের জলবায়ু, আবহাওয়া বা প্রাকৃতিক সম্পদে কোন পরিবর্তন আসেনি। পরিবর্তন এসেছিল রাজনৈতিক নেতৃত্বে। তেমনি আরবের মুসলমানেরা যখন বিশ্বের প্রধান শক্তি রূপে আত্মপ্রকাশ করল তখন আরবের জলবায়ু, আবহাওয়া বা প্রাকৃতিক সম্পদে কোন বিপ্লব আসেনি। বরং বিপ্লব এসেছিল নেতৃত্বে ও রাজনীতিতে।

রাজনীতি হল সমাজসেবা ও সমাজ বিপ্লবের সর্বশ্রেষ্ঠ মাধ্যম। মুসলিম সমাজে এ কাজ করেছেন ইসলামের মহান নবী এবং তাঁর শ্রেষ্ঠতম সাহাবীগণ। সরাষ্ট্রপ্রধানের আসনে দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিকে বসানো তাই নবীজী (সাঃ)র সূন্নত। এ আসনে বসেছেন খোদ নবীজী (সাঃ)। নবীজী (সাঃ)র ওফাতের পর বসেছেন শ্রেষ্ঠ সাহাবাগণ। তাঁরা ছিলেন এমন সাহাবা যারা জীবদ্দশাতেই জান্নাতের সুসংবাদ পেয়েছিলেন। নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত পালনের পাশাপাশি যারা আল্লাহর রাস্তায় নিজের সময়, মেধা ও জানমাল কোরবান করতে দু’পায়ে খাড়া এ কাজটি মূলতঃ তাদের। কিন্তু সমাজসেবার এ মাধ্যমটি যদি ক্ষমতালিপ্সু ও স্বার্থশিকারী দুর্বৃত্তদের হাতে হাইজ্যাক হযে যায় তখন সে জাতির পতন, পরাজয় বা বিশ্বজোড়া অপমান সৃষ্টির জন্য কি কোন বিদেশী শত্রুর প্রয়োজন পড়ে? ঝাড়ুদার হতে হলেও সততা লাগে, নইলে রাস্তা থেকে আবর্জনা দূর হয় না। আর রাজনীতিবিদদের মূল দায়িত্ব হল রাষ্ট্র ও সমাজ থেকে আবর্জনারূপী দুর্বৃত্তদের সরানো। সে সাথে সুনীতির প্রতিষ্ঠা। কোরআনের ভাষায় “আমারু বিল মারুফ” এবং “নেহী আনিল মুনকার”। অর্থাৎ ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং অন্যায়ের নির্মূল। মহান আল্লাহতায়ালা সে কাজের প্রতি অতিশয় গুরুত্ব দিয়ে পবিত্র কোরআনে নির্দেশ দিয়েছেনঃ “তোমাদের মধ্যে অবশ্যই এমন একদল মানুষ থাকতে হবে যারা কল্যাণের পথে মানুষকে ডাকবে এবং ন্যায়ের নির্দেশ দিবে ও অন্যায়ের পথ থেকে রুখবে, এবং তারাই হল সফলকাম”। -সুরা আল-ইমরান, আয়াত ১০৪। আর এটাই তো মুসলমানের রাজনীতির মূল মিশন। নিছক নামায-রোযার মধ্য দিয়ে কি মহান আল্লাহর নির্দেশিত এ হুকুমটি পালন হয়? মেলে কি সফলতা?

রাজনীতিঃ ইমানদারের পবিত্র মিশন

তাই আল্লাহতায়ালার কাছে যারা সফল হিসাবে গণ্য হতে চায় তারা নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাতের পাশাপাশি এ পবিত্র কাজকে জীবনের মিশন রূপে বেছে নেয়। তাই রাজনীতিতে অংশ নেওয়া, এবং সে কাজে অর্থদান, শ্রমদান এমনকি প্রাণদান প্রকৃত ঈমানদারদের কাজ। অথচ বাংলাদেশের অবস্থা ভিন্নতর। দেশটির লাখ লাখ মসজিদ ভরতে নামাযীর অভাব হয় না। লক্ষ লক্ষ মানুষ এ দেশে রোযা রাখে। বহু হাজার মানুষ প্রতিবছর হজ্ব করে। বহু লক্ষ মানুষ প্রতিদিন কোরআন তেলাওয়াতও করে। অথচ ন্যায়ের পথে মানুষকে ডাকছে ক’জন? ক’জন সমাজ ও রাষ্ট্রের বুকে ন্যায়ের নির্দেশ দিচ্ছে? দুর্বৃত্ত মানুষদের রুখছেই বা ক’জন? অথচ রাজনীতিতে দেশের নামাজীরা যে অংশ নিচ্ছে না তা নয়। বরং তারাই সারি বেধে ভোট দিয়ে ইসলাম বিরোধীদের বিজয়ী করছে।

নবীজী(সাঃ)র আমলে বহু লক্ষ মসজিদ ছিল না, কোটি কোটি নামায়ীও ছিল না। সংখ্যায সামান্য সংখ্যক হয়েও তাঁরা আরব ভূমি থেকে দূর্নীতি ও দুর্বত্তদের নির্মূল করেছিলেন। নির্মূল করেছিলেন আবু লাহাব ও আবু জেহেলদের মত ইসলাম বিরোধী সকল নেতাদের। অথচ বাংলাদেশে ঘটেছে উল্টেটি। দেশটির সংখ্যাগরিষ্ট মুসলমানদের হাতে দুর্বৃত্ত ও ইসলাম-বিরোধী রাজনৈতিক নেতারা শুধু বিপুল ভোটে নির্বাচিত ও প্রতিপালিতই হয় না, প্রতিরক্ষাও পায়। বিপুল গণসমর্থণ নিয়ে এরা নেতা হয়, মন্ত্রী হয়, প্রশসনের কর্মকর্তাও হয়। দেশটির রাজনীতির ময়দানটি অধিকৃত হয়ে গেছে অতি দুষ্ট ও দুর্বত্ত প্রকৃতির লোকদের হাতে। অথচ যে দেশে আইনের শাসন আছে সে দেশে দূর্নীতিবাজদের পক্ষে নেতা হওয়া দূরে থাক, রাস্তার ঝাড়ুদার হওয়াও অসম্ভব। দূর্নীতিবাজদের দিয়ে রাস্তার ময়লা তোলার কাজটি যথার্থভাবে হয় না। কারণ খুটেঁ খুটেঁ ময়লা তোলার কাজেও অতি নিষ্ঠাবান ও দায়িত্বশীল হওয়াটি জরুরী। অথচ জাতীয় জীবনে প্রকৃত আবর্জনা হল এ দূর্নীতিবাজেরা, তাই প্রতিদেশেই তাদের স্থান হয় কারাগারে। আবর্জনার ন্যায় তাদেরও স্থান হওয়া উচিত আস্তাকুঁড়ে।

দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে ইসলাম অতি কঠোর ও আপোষহীন। যারা চুরি করে কোরআন তাদের হাত কেটে দিতে বলে। বাংলাদেশের ব্যর্থতা এজন্য নয় যে, দেশটিতে সম্পদের কমতি রয়েছে বা দেশের ভূগোল বা জলবায়ু প্রতিকূল। ব্যর্থতার জন্য মূলতঃ দায়ী দেশের রাজনীতি। কারণ, বাংলাদেশে যে রাজনীতির চর্চা হচ্ছে সেটি আল্লাহতায়ালার প্রদর্শিত পথ বেয়ে এগুচ্ছে না। মহান আল্লাহতায়ালার প্রদর্শিত সে সরল পথটি হল সিরাতুল মোস্তাকিম, যা প্রকাশ পেয়েছে পবিত্র কোরআন ও নবীজী (সাঃ)র সূন্নাহতে। আর এ সিরাতুল মোস্তাকিম শুধু নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত, ইবাদত-বন্দেগীর পথই দেখায় না। দেখায় সুস্থ্য রাজনীতি, আইন-আদালত, শিক্ষা-সংস্কৃতি এবং অর্থনীতির পথও। আল্লাহর প্রদর্শিত পথ অনুসরণ না করে রাষ্ট্র, সমাজ বা পরিবারে শান্তি আসবে এরূপ বিশ্বাস করাই তো কুফরি তথা ঈমান-বিরুদ্ধ। এটি শিরক। তাই প্রশ্ন, এমন বিশ্বাস নিয়ে কেউ কি মুসলমান থাকতে পারে? আল্লাহর প্রদর্শিত পথ তথা ইসলাম ছাড়া শান্তি ও সমৃদ্ধি সম্ভব হলে তো ইসলামের প্রয়োজনই ফুরিয়ে যায়। অথচ তেমন একটি প্রচন্ড ইসলাম বিরোধী চেতনার প্রতিফলন ঘটছে বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও আইন-আদালতে। এ ক্ষেত্রগুলোতে ইসলামের প্রয়োজনই অনুভব করা হচ্ছে না। ইসলাম সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে নিছক মসজিদে ও কিছু পরিবারে। ফলে সমগ্র রাষ্ট্র জুড়ে বাড়ছে সূদ, পতিতাবৃত্তি, ব্যভিচার, ঘুষ, চুরি-ডাকাতি, সন্ত্রাস ও মদ্যপানের ন্যায় সর্ববিধ হারাম কাজ।

ভ্রষ্টতা ও অপরাধ যেখানে নীতি

ইসলামের আগমন শুধু ব্যক্তির আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধির লক্ষ্যে হয়নি, বরং সেটি সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিশুদ্ধির লক্ষ্যেও। তাই মুসলিম জীবনে অপরিহার্য হল এ ক্ষেত্রগুলিতেও সিরাতুল মোস্তাকিমের অনুসরণ। আল্লাহর প্রদর্শিত পথ তথা সিরাতুল মুস্তাকিম থেকে সামান্য বিচ্যুতিই তো পথভ্রষ্টতা। অথচ বাংলাদেশের রাজনীতিতে যেটি ঘটছে সেটি সিরাতুল মুস্তাকিম থেকে সামান্য বিচ্যুতি নয়, পুরাপুরি অগ্রাহ্য ও উপেক্ষা করা হচ্ছে সে পথকেই। মৌলবাদ বলে পরিহার করা হচ্ছে সে পথের অনুসরণকে। ইসলামের প্রতি এমন আচরনকে শুধু ভ্রষ্টতা বললে ভূল হবে, বরং এটি হল আল্লাহর বিরুদ্ধে পরিপূর্ণ বিদ্রোহ। আর সে বিদ্রোহই প্রকাশ পাচ্ছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে। মুষ্টিমেয় ইসলামি দল ছাড়া বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলো আল্লাহর প্রদর্শিত সে সিরাতুল মুস্তাকিমের অনুসরণ দূরে থাক, সেটির প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করে না। আল্লাহর বিরুদ্ধে এটি কি সীমাহীন ঔদ্ধতা। এমন আচরণের তুলনা চলে চিকিৎস্যক ও তার দেওয়া চিকিৎসার বিরুদ্ধে মরনাপন্ন রোগীর ঔদ্ধতার সাথে। এরাই রাজনীতিকে পরিণত হয়েছে লুটপাঠ, শোষন এবং আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ারে। রাজনৈতিক দলের বহু লক্ষ কর্মী ও নেতা, সামরিক বাহিনীর শত শত অফিসার, শত শত সরকারি আমলা, হাজার হাজার ধনি ব্যবসায়ী ও ধর্মব্যবসায়ীসহ নানা জাতের সুযোগ সন্ধানীরা নেমেছে এ পেশাতে। কোন ডাকাত দলে বা সন্তাসী দলে এত দুর্বৃত্ত ও ধোকাবাজের সমাবেশ ঘটেনি যা ঘটেছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে। দুর্বত্তদের যারা যত বেশী দলে ভেড়াতে পারে তারাই বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে প্রভাবশালী ও প্রতাপশালী। রাজনীতির নামে রাস্তায় লগিবৈঠা দিয়ে পিঠিয়ে মানুষ হত্যা বা যাত্রীভর্তি বাসে আগুণ দেওয়া এমন রাজনৈতিক কর্মী ও নেতাদের কাছে কোন অপরাধই নয়। বরং ক্ষমতায় যাওয়ার লক্ষ্যে সেটিকে তারা অপরিহার্য মনে করে। বাংলাদেশের ইতিহাস এমন বর্বর ও বীভৎস অপরাধ কর্মে ভরপুর। খুণোখুণির ঘটনা ঘটেছে এমনকি সংসদেও।

গণতন্ত্রের নামে দেশে বার বার নির্বাচন হয়। কিন্ত এরূপ নির্বাচন শতবার হলেও তাতে কি সৎ ও যোগ্য মানুষের নির্বাচন সম্ভব? মিথ্যা ওয়াদা ও ধোকাবাজীর উপর যে দেশে নিয়ন্ত্রণ নেই, সে দেশে কি দুর্বৃত্তদের পরাজিত করা যায়? নির্বাচন তাদের সামনে বরং রাস্তা খুলে দেয়। নির্বাচনের মাধ্যমেই তারা জয়ী হয়, এবং দখলে নেয় দেশের প্রশাসন, শিল্প, আইন-আদালতসহ সকল গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। ফলে বাংলাদেশে বার বার নির্বাচন হলেও শোষন, লুটপাঠ, দুবৃত্তি ও দূর্নীতি থেকে দেশবাসীর মূক্তি মিলছে না। বরং দিন দিন তা বেড়েই চলেছে। রাজনৈতিক নেতারা ভ্রষ্ট চরিত্রের হলে কোন জাতিই সুপথ পায় না। তখন বিভ্রান্তি নেমে আসে সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বত্র জুড়ে। গাড়ীর সকল যাত্রী মাতাল হলেও গাড়ী গন্তব্যে পৌছে। কিন্তু চালক মাতল হলে যাত্রীগণ সবাই দরবেশ হলেও গাড়ী পথ হারায়। ইঞ্জিণ গভীর খাদে গিয়ে পড়লে তখন খাদে পড়তে হয় সমগ্র ট্রেন ও ট্রেনের সকল যাত্রীদের। রাজনীতি বিপথগামীদের হাতে পড়ার এটিই বিপদ।

রাজনীতিঃ পবিত্র জিহাদ

তাই জাতীয় জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন ইস্যু হল, রাজনীতির ভ্রষ্টতা দূর করা। ইসলামে এটি জিহাদ। নবীজীর আমলে মুসলমানদের সবচেয়ে বেশী কোরবানী পেশ করতে হয়েছে রাজনীতির ময়দানের আবর্জনা সরাতে। সে সমাজেও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের প্রতিরোধের পথে বড় বাধা রূপে কাজ করছিল আবু লাহাব, আবু জেহলের মত দুর্বৃত্ত নেতারা। এসব দুর্বৃত্তদের সরাতে যত লড়াই ও রক্তক্ষয় হয়েছে সমাজে নামায-রোয়া, হজ্ব-যাকাত বা অন্য কোন বিধান প্রতিষ্ঠা করতে তা হয়নি। মুসলমানের বাঁচার মধ্যে যেমন লক্ষ্য থাকে, তেমনি লক্ষ্য থাকে প্রতিটি কর্মের মধ্যেও। ইসলামী পরিভাষায় সেটিই হল নিয়ত। আর সে নিয়তের কারণেই মুসলমানের প্রতিটি কর্ম -তা যত ক্ষুদ্রই হোক- ইবাদতে পরিণত হয়। কিন্তু কথা হল বাংলাদেশের রাজনীতির সে লক্ষ্যটি কি? রাজনীতির মূল ইস্যু বা এজেন্ডা কি শুধু সরকার পরিবর্তন? এটি কি নিছক নির্বাচন? লক্ষ্য কি শুধু রাস্তাঘাট, অফিস-আদালত ও কলকারাখানা নির্মান? অথবা পণ্য বা মানব রপ্তানীতে বৃদ্ধি? বাংলাদেশে এ অবধি নির্বাচন ও সে সাথে সরকার পরিবর্তন হয়েছে বহুবার। নানা দল নানা এজেন্ডা নিয়ে ক্ষমতায় গেছে। কিন্তু দেশ কতটুকু সামনে এগিয়েছে? জনগণের জীবনে উচ্চতর মানবিক মূল্যবোধই বা কতটুকু প্রতিষ্ঠা পেয়েছে?

তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো এ জন্য দরিদ্র নয় যে, সেখানে সম্পদের অভাব। বরং দারিদ্র্যের কারণ, সে সব প্রাকৃতিক সম্পদে তারা অতি কমই মূল্য সংযোজন করতে পারে। তারা যেমন ব্যর্থ নিজেদের মূল্য বাড়াতে, তেমনি ব্যর্থ খনিজ বা প্রাকৃতিক সম্পদের মূল্য বাড়াতে। এটিই তাদের সবচেয়ে বড় অক্ষমতা। একটি দেশের প্রাচুর্য্য তো বাড়ে সে দেশে মানব ও প্রাকৃতিক সম্পদের উপর কতটুকু মূল্য সংযোজন হল তার উপর। পাট, তূলা, চা, কফি, তেল, গ্যাস, তামা, কপার, ইউরেনিয়াম, বক্সাইট, টিনের ন্যায় অধিকাংশ কৃষি ও খনিজ সম্পদের উৎস হল তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো। কিন্তু এ সম্পদের কারণে বেশী লাভবান হয়েছে পাশ্চাত্য। কারণ এসব কৃষি ও খণিজ সম্পদের উপর সিংহভাগ মূল্য সংযোজন হয়েছে পাশ্চাত্য দেশগুলির কারখানায়। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো রয়ে গেছে কাঁচামাল বা খনিজ সম্পদের জোগানদার রূপে। পাশ্চাত্য দেশের কোম্পানীগুলোর কারণেই আফ্রিকার কোকো সারা দুনিয়ার মানুষের কাছে চকলেট হিসাবে প্রচুর সমাদার পাচ্ছে। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ নানা ব্রান্ডের চকলেটের পিছনে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচও করছে। এভাবে চকলেট বিক্রি করে ধনী হয়েছে পাশ্চাত্য কোম্পানীগুলো। অথচ প্রচন্ড অনাহারে ভুগছে কোকা উৎপাদনকারি আফ্রিকার দেশগুলো। একই ভাবে তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারি দেশগুলোর চেয়ে বেশী অর্থ কামিয়েছে পাশ্চাত্যের তেল ও গ্রাস কোম্পানীগুলি।

শ্রেষ্ঠ নেক কর্মঃ মূল্য-সংযোজন

মূল্য সংযোজনের ফায়দাটি বিশাল। মানব জীবনে এ পথেই আসে পরিশুদ্ধি। এ ছাড়া সামনে এগুনোর পথ নেই। তাই যারা ব্যবসা বুঝে তারা একত্রে হলে চেষ্টা করে কারখানা খোলার। কারণ, কারখানা হল মূল্য সংযোজনের অংগন। তবে জাতি সবচেয়ে বেশী লাভবান হয় যখন সে মূল্য সংযোজন হয় মানুষের উপর। কারণ মানুষই হল আল্লাহর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। তেলের বা সোনার মূল্য শত গুণ বাড়লেও সেটি কি গুণবান মানুষের সমান হতে পারে? মানুষের উপর মূল্য সংযোজন হলে সে মানুষটি তখন মহৎ গুণে বেড়ে উঠে। সে মানুষটির তখন সামর্থ বাড়ে প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদের মূল্য সংযোজনের। এ পথেই আসে ব্যক্তির জীবনে পরিশুদ্ধি। এজন্যই শিল্পোন্নত দেশগুলো শিক্ষাখাতে তথা মানব সম্পদের উন্নয়নে এত ব্যয় করে।

মানুষের মূল্য বৃদ্ধি বা গুণ বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা বা উদ্যোগ নেওয়া এজন্যই ইসলামে এত গুরুত্বপূর্ণ। এটি ফরজ। ইসলামে তাই মসজিদ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার সওয়াব সবচেয়ে বেশী। কারণ এ প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজই হল মানুষকে মহত্তর গুণ নিয়ে বেড়ে উঠায় সর্বপ্রকার সহায়তা দেওয়া। মানুষ তখন ফেরেশতাদের চেয়েও মহান ও সৃষ্টিশীল হয়। তখন বহুগুণে সমৃদ্ধ হয় সমাজ ও রাষ্ট্র। এমন রাষ্ট্রের বুকেই নির্মিত হয় উচ্চতর সভ্যতা। মানুষ গড়ার এ মহান কাজটিই এ জন্যই তো মুসলমানের রাজনীতির মূল এজেন্ডা। তখন রাজনীতির মূল লক্ষ্য হয়, মানুষকে জান্নাতের যোগ্য করে গড়ে তোলা। এমন মানুষের গুণেই আল্লাহর সাহায্য ও শান্তি নেমে আসে ধরাপৃষ্টে। নবীজী (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামের আমলে সেটিই হযেছিল। ইসলামে এমন রাজনীতি এজন্যই শ্রেষ্ঠ ইবাদত। কিন্তু বাংলাদেশে সে সৃষ্টিশীল রাজনীতি হয়নি। এজন্যই দেশটি অতীতে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পেয়েছে তলাহীন ভিক্ষার ঝুলি ও সর্বাধিক দূর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্র রূপে।

প্রতি দেশেই রাজনীতির মূল ইস্যু নির্ধারিত হয় জনগণের ধর্ম, জীবনদর্শন, মূল্যবোধ, সংস্কৃতি এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রয়োজনবোধ থেকে। তাই পূঁজিবাদী ও সমাজবাদী দেশের রাজনৈতিক এজেন্ডা এক নয়। তেমনি এক নয় মুসলিম ও অমুসলিম দেশের রাজনৈতিক এজেন্ডা। ব্যক্তির অন্তরে বা চেতনায় লালিত আদর্শ বা বিশ্বাস শুধু তার ধর্ম-কর্ম, ইবাদত-বন্দেগী, খাদ্য-পানীয়ের ব্যাপারেই নিয়ম বেঁধে দেয় না, নির্ধারিত করে দেয় তার জীবনের মূল কাজটিও। তা থেকেই নির্ধারিত হয় মুসলমানের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক এজেন্ডা। তাই ইসলামের গৌরব যুগে আরবের কাফেরদের এজেন্ডা ও মুসলিমদের এজেন্ডা এক ছিল না। মুসলিমদের বিজয়ী হওয়াতে সমাজ থেকে শুধু মূর্তিগুলোই অপসারিত হয়নি। অপসারিত হয়েছিল তাদের প্রচলিত সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক রীতিনীতি ও মূল্যবোধ। অপসারিত হয়েছিল ইসলাম বিরোধী নেতৃত্ব। কারণ, একটি মুসলিম সমাজ কখনই অমুসলিম বা সেকুলার মূল্যবোধ ও নেতৃত্বের অধীনে গড়ে উঠতে পারে না। এবং এগুতে পারে না কাঙ্খিত লক্ষ্যে। যেমন প্লেনের ইঞ্জিন নিয়ে কোন রেল গাড়ী সামনে এগুতে পারে না। রাজনীতি যেমন জাতির ইঞ্জিন, তেমনি সে ইঞ্জিনের জ্বালানী শক্তি হল উচ্চতরদর্শন বা ফিলোসফি। মুসলমানদের ক্ষেত্রে সেটি হল ইসলাম তথা কোরআনী দর্শন। যে রাজনীতিতে দর্শন নেই, সে রাজনীতিতে গতি সৃষ্টি হয় না সামনে চলার। তখন নেমে আসে জগদ্দল পাথরের ন্যায় স্থবিরতা। স্রোতহীন জলাশয়ে যেমন মশামাছি বাড়ে, তেমনি দর্শন-শূণ্য স্থবির রাজনীতিতে বৃদ্ধি ঘটে দর্শনশুন্য দুর্বৃ্ত্ত কীটদের। সেটিরই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বাংলাদেশের রাজনীতি।

পরিশুদ্ধি আসে দর্শনের গুণে

নবীজী(সাঃ)র আমলে আরবের স্থবির ও পাপাচার-পূর্ণ জীবনে মানবিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে যে প্রচন্ড বিপ্লব ও গতি সৃষ্টি হয়েছিল তার কারণ, রাজনীতির ইঞ্জিন তখন আল্লাহপ্রদত্ত দর্শন পেয়েছিল। অথচ সে প্রচন্ড শক্তি থেকে দারুন ভাবে বঞ্চিত হচ্ছে বাংলাদেশের আজকের রাজনীতি। এবং সেটি সেকুলারিজমের নামে। দেশটিতে রাজনীতি, অর্থনীতি ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ইসলাম ও আল্লাহর নাম নেওয়া অনেকের কাছেই সাম্প্রদায়ীকতা। দাবী উঠেছে ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধ করার। স্বৈরাচারি আওয়ামী-বাকশালী আমলে নিষিদ্ধ হয়েছিল ইসলামের নামে রাজনীতির সে মৌলিক নাগরিক অধিকার। সরকারি মহলে নিষিদ্ধ হয়েছিল বিসমিল্লাহ। অপসারিত হয়েছিল সরকারি প্রতিষ্ঠানের মনোগ্রোম থেকে কোরআন ও আল্লাহর নাম। এভাবে দর্শনশূণ্য হয়েছিল মুজিবামলের রাজনীতি। এবং প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল মুজিব-বন্দনা। ফল দাড়িয়েছিল, সবচেযে বড় ও দ্রুত ধ্বংস নেমেছিল নীতি-নৈতিকতা, আইন-শৃঙ্খলা ও অর্থনীতিতে। সৃষ্টি হয়েছিল ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। প্রাণ হারিয়েছিল লক্ষ লক্ষ মানুষই শুধু নয়, দেশের স্বাধীনতা, মানবতা ও ণ্যূনতম মানবিক অধিকার। তখন ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের পায়ের তলায় পিষ্ট হযেছিল দেশের সার্বভৌমত্ব। গণতন্ত্র ও মানবতার সে কবরের উপর প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল মুজিবের একদলীয় বাকশালী স্বৈরাচার।

এখন আবার সেক্যুলার মহলে দাবী উঠেছে, ইসলামের নামে রাজনীতি নিষিদ্ধ করার। কথা হল, এরূপ দাবী উঠানোর হেতু কি? কারণ একটিই, আর তা হল বাংলাদেশকে নীচে নামানোর কাজকে আবার তীব্রতর করা। ইসলামী দর্শন, আইন ও মূল্যবোধের পরাজয়ের মধ্যেই তাদের আনন্দ। এটিই শয়তানের এজেন্ডা। রাজনীতির ইঞ্জিনকে দর্শন-শূণ্য করা এজন্যই শয়তানের অনুসারিদের মূল লক্ষ্য। তাদের পৌত্তলিক প্রভু ভারতও বাংলাদেশে সেটিই চায়। হাসিনার ক্ষমতায় আসাতে সে এজেন্ডাই আবার বলবান হয়েছে। সত্তরের দশকেও তারা সেটিই করেছিল। দাবীটিও এসেছে সেই একই আওয়ামী বাকশালীদের পক্ষ থেকে। এর কারণ, তাদের ইসলামভীতি এবং ইসলামের বিরুদ্ধে শত্রুতা।

তাদের ভয়ের আরো কারণ, বাংলাদেশের ৯০%ভাগ নাগরিক মুসলমান। দেশটিতে বাড়ছে ইসলামী জ্ঞানচর্চা এবং সে সাথে প্রবলতর হচ্ছে ইসলামী চেতনা। ফলে বাড়ছে ইসলামপন্থিদের রাজনৈতিক শক্তি। আর ইসলামের বিজয় মানেই শরিয়তী আইনের প্রতিষ্ঠা। ইসলামের বিজয় মানে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতিতে ইসলামী বিধানের পূর্ণ-প্রয়োগ এবং সেকুলার মূল্যবোধ ও রীতি-নীতির বিলুপ্তি। তখন রাজনৈতিক পরাজয় ও বিলুপ্তি ঘটবে দেশের ইসলাম বিরোধী শক্তির রাজনীতির। আর এ কারণেই বাংলাদেশের আওয়ামী-বাকশালী সেকুলার মহলটির মনে ঢুকেছে প্রবল ইসলাম ভীতি। নিজেদের জন্য তেমন একটি পরাজয় মেনে নিতে রাজী নয়। তাই সে চুড়ান্ত লড়াইটি শুরু হওয়ার আগেই ইসলামের নামে দেশের ইসলামপন্থি জনগণকে সংগঠিত হওয়াটিকেই নিষিদ্ধ করতে চায়। আর সংগঠিত না হতে পারলে ইসলামপন্থিগণ তখন সে লড়াই বা করবে কি করে? একাকী কারো পক্ষেই বড় কিছু করা সম্ভব নয়। রাজনীতির ক্ষেত্রে তো নয়ই। আওয়ামী-বাকশালী সেকুলারদের পরাজয় করাটি তখন তাদের সাধ্য এবং সে সাথে স্বপ্নেরও বাইরে থেকে যাবে। আর এভাবে সহজেই নিশ্চিত হবে দেশের রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানে তাদের বর্তমানের বিজয়ী অবস্থাকে ধরে রাখা। ইসলামপন্থিগণ যাতে শক্তি সঞ্চয় করতে পারে সে জন্য এখন থেকেই তাদের বিরুদ্ধে নির্মূলের হুমকী দেয়। এমন একটি রাজনৈতিক লক্ষ্য কাফের বা ইসলামের চিহ্নিত দূষমনদের জন্য অস্বাভাবিক নয়, নতুনও নয়। কিন্তু প্রশ্ন হল, যে দেশের শতকরা ৯০ ভাগ মুসলমান সে দেশে এমন ইসলাম-নির্মূলকরণ রাজনীতি বাজার পায় কি করে? ২৫/১০/২০০৮; নতুন সংস্করণ ২১/০৭/২০১৯

 

 




মেঠো আদালত যখন উচ্চ-আদালতে

আওয়ামী নৃশংসতা ও অধিকৃত আদালত  

দেশে সরকারি আদালত থাকতে আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী  সংগঠনগুলো আদালত বসিয়েছিল উম্মুক্ত ময়দানে। বিচারক রূপে হাজির করেছিল তাদের দলীয় নেতা-কর্মী ও তাদের রাজনীতির হাজার হাজার সমর্থকদের। লক্ষ্য ছিল, একাত্তরে যেসব আলেম-উলামা ও ইসলামপন্থি নেতাকর্মী পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল তাদেরকে ফাঁসিতে চড়িয়ে হত্যা করা। তাদেরকে বিরুদ্ধে হ্ত্যা বা খুনের নেশাটি আওয়ামী বাকশালী চক্রের বহুদিনের। একাত্তরের যুদ্ধে পাকিস্তানের পরাজয়ের পর বহুহাজার আলেম ও ইসলামী আন্দোলনের বহুহাজার নেতাকর্মীকে তারা খুন করিছিল কোররূপ বিচার না করেই। তখন নিরস্ত্র রাজাকারদের বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করাটি ছিল আওয়ামী ক্যাডারদের রীতি। ১৮ই ডিসেম্বর ঢাকা স্টেডিয়ামে হাত-পা বাঁধা কয়েকজন রাজাকারকে কাদের সিদ্দিকী যেভাবে বেয়োনেট দিয়ে হত্যা করে সে বীভৎস চিত্রটি বহুদেশের পত্রপত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছিল। সে খুনের চিত্রটি দেখে প্রখ্যাত সাংবাদিক ওরিয়ানী ফালাচী লিখেছিলেন,“মুক্তিবাহিনী বেয়োনেট দিয়ে যেরূপ হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে তা প্রত্যক্ষ করার পর এ রকম সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছিলাম,এই ঘৃন্য নগরীতে আমি আর পা রাখবো না।” আওয়ামী বাকশালীরা নৃশংস ভাবে হত্যা করেছিল ভারতীয় হিন্দুদের আক্রমণ থেকে প্রাণ বাঁচাতে আসা বহুহাজার অবাঙালীকেও।অবাঙালীদের ঘরবাড়ি থেকে উৎখাত করে তাদেরকে রাস্তায় নামানো হয়।

একাত্তরে শাপলা চত্বর পরিণত হয়েছিল বাংলাদেশের প্রতিটি নগরবন্দর। বহু স্থানে আলেমদের ছিন্ন মাথা নিয়ে আওয়ামী লীগের ক্যাডার ও তাদের সেক্যুলার মিত্রগণ ফুটবলও খেলেছে।বাংলার মাটিতে প্রকৃত যুদ্ধাপরাধ তো ছিল সে হত্যাকান্ডগুলো। কিন্তু সে অপরাধের বিচার আজও হয়নি।শাপলা চত্বরে গণহত্যার পর শেখ হাসিনা বলেছে সেখানে কোন মানুষ খুন হয়নি।লাশগোপন ও রাজপথে রক্ত ধোয়ার পর এখন গোপন করা হচ্ছে তাদের বর্বর কর্মগুলো। সুকৌশলে গোপন করেছে তাদের একাত্তরের বর্বরতাগুলো।বরং নিজেদের ভয়ংকর অপরাধগুলো ঢাকতে তারা রটিয়েছে তিরিশ লাখ বাঙালী হত্যার কিচ্ছা। তারপরও মহান আল্লাহর মেহেরবানিতে বহুআলেম ও ইসলামি দলের বহু নেতাকর্মী সে যাত্রায় বেঁচে যায়।কিন্তু তাদের সেই বেঁচে যাওয়াটি ভারতপন্থি আওয়ামী বাকশালি চক্র ও তাদের সেক্যুলারিস্ট ও সোসালিস্ট মিত্রদের কাছে অসহ্য।তাই বেঁচে যাওয়াদের নির্মূলে বহু বছর আগে থেকেই তারা নির্মূল কমিটি বানিয়েছে। নির্মূলের তেমন একটি লক্ষ্যকে সামনে রেখেই নব্বইয়ের দশকে ঢাকার সহরোওয়ার্দি উদ্দানে তারা মেঠো আদালতও বসিয়েছে। সে আদালতে বহু ইসলামপন্থি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ফাঁসির রায়ও দিয়েছে।কিন্তু সে রায় বাস্তবায়নের ক্ষমতা সে মেঠো আদালতের ছিল না। ফলে সে বাসনা-পূরণও হয়নি। সে রায় বাস্তবায়নে জন্য জরুরী ছিল বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের উপর দখলদারি প্রতিষ্ঠা। সে দখলদারিটি প্রতিষ্ঠা পায় ২০০৮ সালে নির্বাচনে, এবং সেটি  আওয়ামী বাকশালিদের বিজয়ের পর। আজ বাংলাদেশের উচ্চ আদালত মুলত তাদের হাতেই অধিকৃত।ফলে যে রায় সহরোয়ার্দি উদ্দানের মেঠো আদালতে ঘোষিত হয়েছিল বা ঘোষিত হয়েছে শাহবাগের মঞ্চ থেকেই তাই এখন ঘোষিত হচ্ছে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের পক্ষ থেকে। পার্থক্য হলো, বিচারের নামে সরকারি খরচে একটি প্রহসন ঘটানো হচ্ছে।  

কোন মুসলিম দেশে শুধু মসজিদ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করলে ইসলাম বাঁচে না। ইসলাম বাঁচাতে হলে দেশের শাসন ক্ষমতা ও আদালতের উপর ইসলামের দখলদারি প্রতিষ্ঠা করতে হয়। প্রতিষ্ঠা করতে হয় আইনে শাসন এবং প্রণয়োন করতে হয় কোরআনে বর্নিত মহান আল্লাহর শরিয়তি আইন। নবীজী (সাঃ) সেটি নিজে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। সাহাবায়ে কেরাম নবীজী (সাঃ)র সে প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতিকে জীবিত রেখেছেন। প্রতি যুগের ও প্রতিস্থানের মুসলমানদের উপর সেটি বাধ্যতামূলক। নইলে তার মুসলমান থাকাটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়।নেমে আসে আযাব। মহান আল্লাহ অনন্ত অসীম কালেও পুরোন বা সেকেলে হন না,তেমনি পুরনো বা সেকেলে হয় না তাঁর দেয়া পবিত্র আইন।। বহু লক্ষ বা বহু কোটি বছরও সেটি থাকবে শাশ্বত ও সতেজ। তাই মুসলমান হওয়ার অর্থ পবিত্র কোরআনে ঘোষিত সে আইনের নিছক তেলাওয়াত নয়,বরং সে আইনের পূর্ণপ্রয়োগ।সে আইনর অনুসরণ তাই পশ্চাদপদতা নয়।বরং সেটি হলো শ্বাশত আধুনিকতা। জান্নাতের পথে সেটিই হলো প্রকৃত পথপরিক্রমা। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে “আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী যারা বিচার-আচার করে না তারা কাফের, …তারা জালেম, … তারা ফাসেক। -(সুরা মায়েদা আয়াত ৪৪-৪৭)। কিন্তু বাংলাদেশের যে আইন অনুসারে বিচার হয় সেটি আল্লাহর নাযিলকৃত শরিয়তী আইন নয়,বরং ইংরেজদের প্রতিষ্ঠিত কফুরি আইন।। এ আইনে জ্বিনাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়। অপরাধ নয় মদ্যপান, সূদ খাওয়া বা মিথ্যা বলার ন্যায় বহু জঘন্য অপরাধ। বাংলাদেশের মুসলমানদের এখানেই সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।খাদ্য,শিল্প বা বিজ্ঞানে ব্যর্থতা নিয়ে আল্লাহর দরবারে প্রশ্ন উঠবে না,কিন্তু প্রশ্ন হবে শরিয়তে প্রয়োগে এ ব্যর্থতা জন্য।

১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে পরাজয়ের পর ঔপনিবেশিক ইংরেজদের হাতে শুধু বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার ন্যায় বিশাল মুসলিম শাসিত ভূমিই অধিকৃত হয়নি,বরং অধিকৃত হয়েছিল দেশের শরিয়তভিত্তিক আদালতও। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশের সে সামরিক অধিকৃতি থেকে রাষ্ট্র মূক্তি পেলেও মুক্তি পায়নি দেশের আদালত। দেশের আদালত এখনো পুরাপুরি অধিকৃত ব্রিটিশ বিচার ব্যবস্থা ও তাদের মানসিক গোলামদের হাতে।আদালতে বিচারও হয় ব্রিটিশের আইন অনুসারে।আল্লাহর আইন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এ দেশে আস্তাকুরে গিয়ে পড়েছে।আদালতের পাশাপাশি দেশের রাজনীতি,প্রশাসন,সামরিক ছাউনিগুলিও এখন অধিকৃত ইসলামের বিপক্ষ শক্তির হাতে।আ।ল্লাহর শরিয়তি আইনকে পরাজিত রাখার মধ্যেই তাদের আনন্দ।সেটিই তাদের রাজনীতি। বরং তাদের প্রচন্ড উৎসব ইসলামপন্থিদের ফাঁসি দেয়ার মধ্যে।

ইসলামের বিপক্ষ শক্তির শত্রুতাটি যে শুধু জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে –তা নয়। মতিঝিলের শাপলা চত্বরে যে শত শত মানুষকে নিহত ও আহত করা হলো তার কি জামায়াত-শিবির কর্মী? ইসলামের বিপক্ষ শক্তির কাছে হত্যাযোগ্য হওয়ার জন্য জামায়াতে ইসলামের নেতা বা কর্মী হওয়াটি জরুরী নয়। গায়ে ইসলামি লেবাস এবং ইসলামের প্রতিষ্ঠায় অঙ্গিকার থাকাটিই তাদের কাছে হত্যাযোগ্য হওয়ার জন্য যথেষ্ঠ।বাংলাদেশের ইসলামের বিপক্ষ শক্তির কাছে এটি অজানা নয় যে,একাত্তরে পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ সৃষ্টি ছিল একমাত্র সেক্যুলারিস্ট, সোসালিস্ট ও ন্যাশনালিস্টদের প্রকল্প। তার সাথে দেশের ইসলামপন্থি কোন দল সংশ্লিষ্ট ছিল না। সে সময় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বহু ইসলামি দল ছিল,বহুহাজার আলেমও ছিল। কিন্তু চোখে পড়ার মত বিষয়টি হলো,কোন ইসলামি দল ও কোন আলেমই পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ সৃষ্টিকে সমর্থন করেনি। কোন মুসলিম দেশও তাদের সেক্যুলারিস্টদের সে দেশভাঙ্গার কাঝে সমর্থন করেনি।আরো লক্ষণীয় হলো,স্বাধীন দেশ রূপে সে সময় কোন মুসলিম দেশই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি।স্বীকৃতি দিয়েছে ভারত,রাশিয়া ও ভূটানের ন্যায় কিছু অমুসলিম দেশ। আলেমগণ তখন দলমত নির্বিশেষে ফতোয়া দিয়েছেন,মুসলিম দেশ ভাঙ্গা কবিরা গুনাহ। ফলে সে কবিরা গুনাহর ন্যায় হারাম কাজে অংশ নেয়া তাদের কাছে অচিন্তনীয় হয়ে পড়ে।তাদের কেউ তাই একাত্তরে ভারতে যাই নাই,ভারতের অস্ত্র নিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধেও নামেনি। এসবই একাত্তরে ইতিহাস।

বাংলাদেশের সেক্যুলারিস্ট, সোসালিস্ট ও ন্যাশনালিস্টদের স্মৃতিতে ইসলামপন্থিদের সে ভূমিকার কথাটি এখনো বেঁচে আছে। ফলে তাদের দৃষ্টিতে ইসলামপন্থি হওয়ার অর্থই হলো পাকিস্তানপন্থি রাজাকার হওয়া। সে ধারণা নিয়েই জামায়াতের ইসলামীর সাথে সংশ্লিষ্ট নয় এরূপ বহু হাজার আলেমকে একাত্তরে দেশের ভারতপন্থি সেক্যুলারিস্ট,সোসালিস্ট ও ন্যাশনালিস্টগণ হত্যা করে। এবং সেরূপ হত্যাকান্ড আজও  যেরূপ ঘটাতে চায়, তেমনি ভবিষ্যতেও ঘটাতে চায়।ইসলামের বিরুদ্ধে এমন একটি লাগাতর যুদ্ধাবস্থাকে তারা বলে একাত্তরের চেতনা।তেমন একটি চেতনা বাংলাদেশের সেক্যুলারিস্টদের মাঝে বেঁচে থাকার কারণে ইসলামপন্থিদের নির্মূলে কে জামায়াত বা শিবির কর্মী,আর কে হেফাজতে ইসলামের কর্মী -তা নিয়ে তারা কোনরূপ বাছবিচার করে না।

খেলোয়াড় সবাই অভিন্ন টিমের

আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসীর রায় ঘোষনা করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি মুজাম্মিল হোসেন। সাথে আরো যে চারজন বিচারপতি ছিলেন তারা হলেন সুরেন্দ্র কুমার সিনহা,এমএ ওহাব মিয়া,সাইয়েদ মাহমুদ হোসেন এবং সামসুদ্দিন চৌধুরি মানিক। এদের মধ্যে একজন বিচারক ফাঁসির রায়ের সাথে দ্বিমত প্রকাশ করেছেন। প্রশ্ন হলো, যারা ফাঁসির রায় দিল তাদের পরিচয়টি বিচারক রূপে হলেও ইসলামপন্থিদের যারা রাজপথে পিটিয়ে বা গুলি করে হত্যা করে তাদের বিচারবোধ থেকে কি আদৌ ভিন্নতর? এটি আর কোন গোপন বিষয় নয় যে, আওয়ামী লীগ প্রশাসন,বিচার বিভাগ,সেনাবাহিনী,পুলিশ বাহিনী ও র‌্যাবসহ সরকারের প্রতিটি বিভাগই নিজেদের দলীয় লোক দ্বারা ঢেলে সাজিয়েছে।ফলে যে যেখানে আছে সবাই আওয়ামী লীগের পক্ষে খেলছে। প্রতিটি স্বৈরাচারি সরকারের এটিই রীতি। তাই সেটি যেমন হিটলার করেছিল,তেমনি নমরুদ ফিরাউন,হালাকু-চেঙ্গিজও করেছিল।ফলে তাদের হাতে সে সময় যে লক্ষ লক্ষ মানুষ খুন হতো তার একজনকেও বর্বর শাসকদের নিজ হাতে খুন করতে হয়নি। তাদের অনুগত পুলিশ বাহিনী,সেনাবাহিনী ও আদালতের বিচারকগণই সে কাজটি অতি সুচারু ভাবে সমাধা করতো। বাংলাদেশেও তো সেটিই হচ্ছে। তাই বাংলাদেশে ইসলামপন্থিগণ খুন হচ্ছে শুধু আওয়ামী লীগ,ছাত্র লীগ ও যুবলীগের গুন্ডাদের হাতে নয়,খুন হচ্ছে সেনাবাহিনী,বিজিবী,র‌্যাব ও পুলিশের হাতেও। এমন এক পরিস্থিতে ইসলামপন্থিগণ খুন হবে বিচারপতিদের রায়ে -তাতেই বা বিস্ময়ের কি আছে? শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের হাজার হাজার কর্মীকে হতাহত করার কাজে তাই আওয়ামী লীগ,ছাত্র লীগ ও যুবলীগের গুন্ডাদের বন্দুক হাতে মাঠে নামতে হয়নি। সেখানে কোন বন্যপশুর হামলাও হয়নি। বরং গণহত্যার সে কাজটি অতি দক্ষতার সাথে সুচারু ভাবে সম্পাদন করেছে সেনাবাহিনী,বিজিবী,র‌্যাব ও পুলিশের লোকেরা।এখন এটি প্রমাণিত যে,পুলিশ,র‌্যাব ও বিজিবীর ন্যায় আদালতের বিচারকগণও সে অভিন্ন টিমেরই খেলোয়াড়। এবং সে টিমটি খোদ আওয়ামী লীগের। ছাত্রলীগের ক্যাডারগণ বিশ্বজিতের খুনে যেরূপ নৃশংস ছিল,পুলিশ,র‌্যাব ও বিজিবী সদস্যগণ কি শাপলা চত্বরের গণহত্যায় কম নৃশংস ছিল?

ফিরাউনের দরবারে তিনজন যাদুকর এসেছিল হযরত মুসা (সাঃ)র সাথে প্রতিযোগিতা দিতে। কিন্তু তারা প্রতিযোগিতায় হেরে গিয়ে বুঝতে পারে হযরত মুসা (সাঃ) আল্লাহর সত্যিকার নবী। তারা তিনজনই সাথে সাথে ঈমান আনে ও মুসলমান হয়ে যায়। আর সেটিই ছিল ফিরাউনের কাছে মৃত্যুদন্ড পাওয়ার মত অপরাধ। সে অপরাধে তিন নিরপরাধ ব্যক্তিকে ফিরাউন নৃশংস ভাবে হত্যা করে। লক্ষ লক্ষ মানুষকে গ্যাস চেম্বারে ডুকিয়ে হত্যা করে হিটলার। তাদেরও কোন অপরাধ করার প্রয়োজন পরেনি। তাদের গ্যাসচেম্বারে পাঠানোর জন্য তাদের ধর্মীয় ও রাজনৈতীক বিশ্বাসই হিটলারের কাছে যথেষ্ট ছিল। হিটলারকে তাদের কাউকে নিজ হাতে খুন করতে হয়নি।বরং সে কাজের জন্য হাজার হাজার খুনি তার সেনাবাহিনী,পুলিশ বাহিনী,বিচারকবাহিনী,দলীয় কর্মীবাহিনীতে সবসময় প্রস্তুত ছিল। ফুটবলের টিমের সব খেলোয়াড়ই একই লক্ষে খেলে। সেটিকে বলা হয় টিমস্পিরিট। সেরূপ টিমস্পিরিট নিয়ে কাজ করে স্বৈরাচারি শাসকদলের কর্মীরা। তেমনি শেখ হাসিনাও তার দলের কর্মীদের শুধু রাজপথে লগি বৈঠা ও অস্ত্র হাতে মোতায়েন করেনি।প্রশাসন,বিচারব্যবস্থা,পুলিশ,সেনাবাহিনীসহ সরকারের নানা স্তরে ও নানা বিভাগে বসিয়েছে।তারা একই লক্ষ নিয়ে কাজও করছে।তাই যারা হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে হাজার হাজার মানুষের রক্তে শাপলা চত্বরকে লালে লাল করলো তাদের একজনকে আওয়ামী লীগ,ছাত্রলীগ বা যুব লীগ থেকে আসতে হয়নি।এসেছিল আর্মি, পুলিশ,র‌্যাব ও বিজিবী থেকে। সে রিপোর্ট এসেছে দৈনিক যুগান্তরে। ১২ই মে তারিখে দৈনিক যুগান্তর রিপোর্ট করে,পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবীর ৭ হাজার ৫ শত ৮৮ জন এ হামলায় অংশ নিয়েছিল। হামলাকারিদের মধ্যে ১৩০০ জন এসেছিল র‌্যাব থেকে। ৫,৭১২ জন এসেছিল পুলিশ বাহিনী থেকে এবং ৫৭৬ জন এসেছিল বিজিবী থেকে।

ন্যায় বিচারে সামর্থ্য কতটুকু?

আওয়ামী টিমের সদস্যদের মুখের ভাষা ও সুর সর্বত্র একই। তাই যে মিথ্যাচারটি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীগণ দলীয় অফিসে বসে বা জনসভায় উচ্চারন করে, সেটি তাদের দলীয় ক্যাডারগণ আদালতের বিচারক রূপেও করে। যেমন মাওলানা আবুল কালাম আযাদের বিরুদ্ধে রায়ে বিচারকগণ তাদের ১১২ পৃষ্ঠার রায়ের তৃতীয় পৃষ্ঠায় লিখেছেন একাত্তরে তিরিশ লাখ মানুষ হত্যা ও চার লাখ নারী ধর্ষিতা হওয়ার কথা। তাদের বিচারবোধ ও মিথ্যাচার যে আওয়ামী লীগ ও ছাত্র লীগের বস্তির গুন্ডা বা খুনিদের থেকে আদৌও ভিন্নতর নয় -এ হলো তার নমুনা। অথচ তিরিশ লাখ নিহত ও ৪ লাখ নারীর ধর্ষণের মিথ্যাটি যে ভয়ানক মিথ্যা সেটি বুঝে উঠা কি এতই কঠিন? তিরিশ লাখের অর্থ তিন মিলিয়ন। একাত্তরে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি অর্থাৎ ৭৫ মিলিয়ন। যে কোন স্কুল ছাত্রও হিসাব করে বের করতে পারে,সাড়ে ৭ কোটির (৭৫ মিলিয়ন)মাঝে তিরিশ লাখ (তিন মিলিয়ন) মানুষের মৃত্যু হলে প্রতি ২৫ জনের মাঝে একজনকে মারা যেতে হয়। যে গ্রামে ১ হাজার মানুষের বাস সে গ্রামে মারা যেতে হয় ৪০ জনকে। ঘটনাক্রমে সে গ্রামে সেনাবাহিনীর প্রবেশ না ঘটলে এবং তাদের হাতে কেউ মারা না গেলে পরবর্তী গ্রামটি যদি হয় ১ হাজার মানুষের তবে সেখান থেকে মারা যেতে হবে কমপক্ষে ৮০ জনকে। যে থানায় ১ লাখ মানুষের বাস সেখানে মারা যেতে হবে ৪ হাজার মানুষকে। প্রতি থানায় ও প্রতি গ্রামে মৃত্যুর সংখ্যা এ হারে না হলে ৩০ লাখের সংখ্যা পূরণ হবে না। তাছাড়া ৯ মাসে তিরিশ লাখ মানুষকে হত্যা করতে হলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে প্রতিদিন গড়ে ১১,১১১ জনকে হত্যা করতে হয়। সে সংখ্যাটি কোন একটি দিন পূরণ করতে ব্যর্থ হলে পরের দিন বেশী করে হত্যা করে তা পূরণ করতে হতো। সে সময় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পাক-বাহিনীর প্রকৃত সৈন্য সংখ্যা ছিল প্রায় ৪৫  হাজার। -(সূত্রঃ জেনারেল নিয়াজী রচিত বিট্রায়াল অব ইস্ট পাকিস্তান নামক বই,২০০১)।যুদ্ধবন্ধী রূপে যেসব পাকিস্তানীদের ভারতে নিয়ে যাওয়া হয় তাদের মধ্যে অনেকে ছিল বেসামরিক অবাঙালী ও তাদের পরিবারের সদস্য। প্রশ্ন হলো,৪৫ হাজার পাকিস্তানী সৈন্যের পক্ষে কি সম্ভব ছিল বিল-হাওর,নদী-নালা,দ্বীপ ও চরাভূমিতে পরিপূর্ণ একটি দেশের প্রায় ৭০ হাজার গ্রামে পৌছানো? প্রায় ৭০ হাজার গ্রামের মাঝে ১০ হাজার গ্রামেও কি সেনা বাহিনী পৌঁছতে পেরেছে? প্রতিটি গ্রাম দূরে থাক প্রতিটি ইউনিয়নেও কি তারা যেতে পেরেছিল? অধিকাংশ গ্রামে তখন গাড়ী চলার মত রাস্তা ছিল না।অধিকাংশ গ্রামের অবস্থান নদীর পাড়েও নয় যে তারা লঞ্চ বা নৌকা যোগে সেখানে পৌঁছতে পারতো। ফলে তিরিশ লাখ নিহতের হিসাব মিটাতে হলে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা পড়তে হয় জেলা ও উপজেলা শহরে। কিন্তু কোন জেলা বা উপজেলা শহরে ১০ হাজার বাঙালী কি মারা গেছে? তাই মুজিবের তিরিশ লাখ যে গাঁজাখোরী মিথ্যা সেটি প্রমান করা কি এতই কঠিন?

প্রশ্ন বিচারকদের রায়ে ৪ লাখ ধর্ষণের সংখ্যা নিয়েও। তাদের দেয়া এ তথ্যটিও যে কতটা মিথ্যাপূর্ণ সেটি কি প্রমাণ করা এতই কঠিন? একাত্তরে বাংলাদেশের পরিবারগুলোতে গড় সদ্স্য সংখ্যা ছিল প্রায় ৪জন। ফলে সাড়ে সাত কোটি মানুষের দেশে প্রায় ১ কোটি ৮৭ লাখ ৫০ হাজার পরিবার ছিল।এদের মাঝে ৪ লাখ ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে গড়ে প্রতি ৪৭টি পরিবারের মাঝে অন্তত একটি পরিবারে ধর্ষিতা মহিলা থাকার কথা।যে গ্রামে ২০০টি পরিবারে বাস সে গ্রামে কমপক্ষে ৪টি পরিবারে ধর্ষিতা নারী থাকতে হবে। সে গ্রামে আর্মির প্রবেশ না ঘটলে পাশের গ্রাম থেকে কমপক্ষে ৮ টি পরিবারে ধর্ষিতা নারী থাকতে হবে, নইলে ৪ লাখ ধর্ষিতার সংখ্যা পুরণ হবে না। একাত্তরে বাংলাদেশের শতকরা ৮০ ভাগ মানুষই গ্রামে বাস করতো। আর সেনা বাহিনীর পক্ষে প্রায় ৭০ হাজার গ্রামের মাঝে ১০ হাজার গ্রামেও কি পৌছা সম্ভব হয়েছে? ফলে সহজেই ধারণা করা যায়, দেশের শতকরা প্রায় ৭০ ভাগ পরিবারের জীবনের পাক বাহিনীর সাক্ষাৎ মেলেনি। তাই ৪ লাখ ধর্ষণের ঘটনা ঘটতে হলে সেগুলো বেশী বেশী হতে হবে জেলা ও উপজেলা শহরে বা সীমান্তবর্তি গ্রামগুলোতে –যেখানে সেনাবাহিনীর লোকদের অবস্থান ছিল বেশী।ফলে ধর্ষিতা পরিবারের সংখ্যা সেখানে প্রতি ৪৭য়ে একজন নয়, বরং অনেক বেশী হারে হওয়ার কথা।  প্রতি ১০ বা ২০টি পরিবারে কমপক্ষে একজন ধর্ষিতা নারী থাকার কথা। কিন্তু সেটি কি বিশ্বাসযোগ্য?

সুবিচার না করাই যাদের নীতি

ডাকাতপাড়ায় কোন ডাকাতের খুন বা ধর্ষণ নিয়ে বিচার হয় না। তাদের কাজ তো নিরপরাধ মানুষ হত্যা,তাদের সর্বস্ব লুট করা, বিচার করা নয়। ন্যায় বিচার তাদের দর্শনে নাই। তাই শাপলা চত্বরে যে এত নিরীহ মানুষ খুন হলো সে খুনের অপরাধে কি একজনকেও হাসিনার পুলিশ বাহিনী গ্রেফতার করেছে? কোনদিনও কি আদালতে এ গণহত্যার বিচার বসবে? মুজিব আমলে ৩০-৪০ হাজার মানুষ খুন হয়েছিল। কিন্তু শেখ মুজিব কি সে খুনের অপরাধিদের কাউকে কি আদালতে খাড়া করেছে? করিনি। নিজে বরং সিরাজ শিকদারের খুন নিয়ে পার্লামেন্টে কোথায় আজ  সিরাজ শিকদার বলে উল্লাস করেছে। হাসিনার সরকারেরও মূল কাজ হয়েছে তার দলের খুনিদের পরিচর্যা ও প্রতিরক্ষা দেয়া। তাই আওয়ামী লীগ,ছাত্রলীগ ও যুব লীগের কেউ খুন করলে বা ডাকাতি করলে তার বিচার হয় না। বিচারে যদি কারো শাস্তি হয়ে যায় তবে সরকারর মূল কাজ হয় তাদের মাফ করে দেয়া।এরূপ বহু খুনিকে দেশের আওয়ামী প্রেসিডেন্ট মাফ করে দিয়েছেন। কিছুদিন আগে চট্টগ্রামে টেন্ডার নিয়ে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের মাঝে বন্দুক যুদ্ধ হয় ও ২ জন খুনও হয়।খুনে আসামী ছিল সাইফুল আলম ওরফে মিলন নামের ছাত্রলীগের এক কেন্দ্রীয় নেতা। সরকারে তাকে জামিনে খালাস দিয়েছে। কদিন আগে যাত্রাবাড়িতে ৭-৮ জন খুনি এক গৃহে ঢুকে পিতামাতার সামনে তাদের একমাত্র পুত্রকে হত্যা করে। কিন্তু সে খুনের আসামীদের গ্রেফতারে পুলিশের কোন তৎরতা নাই,কোন সফলতাও নাই। অথচ রাজপথে পুলিশের বিশাল ঢল নামে জামায়াত-শিবির বা বিএনপির মিছিল বের হলে। তাই পুলিশের কাজ হয়েছে স্রেফ হাসিনার সরকারকে প্রটেকশন দেয়া। খুনিদের ধরা নয়।

মুজিবের প্রধান অপরাধ

মানব চরিত্রের সবচেয়ে বড় বদগুণটি হলো তার মিথ্যাচারিতা।মিথ্যাচারিতা থেকেই জন্ম নেয় সকল প্রকার পাপ। নবীজী (সাঃ) তাই মিথাচারিতাকে সকল পাপের মা বলেছেন। মিথ্যাচারি মানুষকে মহান আল্লাহতায়ালা কখনো হেদায়েত দেননা। মহান আল্লাহর সে সর্বশ্রেষ্ঠ রহমতটুকু পেতে হলে মানুষকে তাই মিথ্যাবাদিতা ছাড়তে হয়। অপর দিকে সত্যবাদীতা থেকেই জন্ম নেয় সকল নেক কর্ম। মুসলমান হওয়ার জন্য তাই প্রাথমিক শর্তটি হলো সত্যবাদী হওয়া। শরিয়তের বিধান হলো কোন মিথ্যাবাদীকে আদালতের বিচারক দূরে থাক সাক্ষিও করা যাবে না। কারণ তাতে অসম্ভব হয় ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা। অপরদিকে শয়তান বেছে বেছে সমাজের মিথ্যাবাদীদের ঘাড়ে সওয়ার হয়। মিথ্যাচারিদেরকেই সে নিজের সৈনিক রূপে গড়ে তোলে। মানুষ জাতির সমগ্র ইতিহাসটি মূলত সত্য ও মিথ্যার লাগাতর দ্বন্দ। তাই কোন দেশে শয়তানের পক্ষের শক্তি যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হাতে পায় তখন তারা দেশবাসীকে মিথ্যাচারি করার সর্বাত্মক চেষ্টা করে। কারণ তাতে বিপন্ন হয় তাদের ঈমান রূপে বেড়ে উঠার সামর্থ।মিথ্যাচারি বৃদ্ধির সাথে বাড়ে শয়তানী শক্তির লোকবল।

মুজিবের বড় অপরাধ তাই এ নয় যে,সে ৩০-৪০ হাজার মানুষ খুন করেছিল বা দেশে গণতন্ত্র হত্যা করে বাকশালী স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠা করেছিল বা ভারতের গোলামী বা ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ উপহার দিয়েছিল। বরং তার সবচেয়ে বড় অপরাধ সে দেশের মানুষকে মিথ্যাচারি বানানোর সর্বাত্মক ব্যবস্থা করেছিল। কারণ সে নিজে ছিল বাঙালীর সমগ্র ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মিথ্যাচারি। একাত্তরের তিরিশ লাখ নিহত এবং তিন লাখ বা চার লাখ নারী ধর্ষিতার মিথ্যাচারটি তারই রটানো। আর তার অনুসারীদের কাজ হয়েছে সে মিথ্যাচারকে সমগ্র দেশবাসীর মাঝে প্রতিষ্ঠা দেয়া। মুজিব আমল থেকেই দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও  সকল সরকারি মিডিয়া পরিণত হয়েছে মিথ্যুক তৈরী ও মিথ্যাছড়ানোর ইন্ডাস্ট্রিতে। মুজিব যে তিরিশ লাখের মিথ্যা উচ্চারন করেছিল এগুলির কাজ হয়েছে সে মিথ্যাকে বলবান করা। দেশ আজ  এমন বিবেকহীন মিথ্যুকদের হাতেই অধিকৃত। শুধু সাক্ষি রূপে নয়,বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারক পদেও তারা আজ  অধিষ্ঠিত।

মুজিব মিথ্যা বলাকে অপরাধ বা দোষের ভাবতো না।বরং সেটি ছিল তার রাজনীতির শিল্পকলা। মিথ্যাকে দোষের ভাবে না তার অনুসারিগণও। তাই আদালতে দাঁড়িয়ে তার অনুসারিরা মিথ্যা সাক্ষি দিতে দুপায়ে খাড়া। যে আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগ বা যুবলীগ কর্মীরা রাজপথে চাপাতি বা লগিবৈঠা নিয়ে নিরপরাধ মানুষ খুন করতে পারে এবং খুনের পর উৎসব করতে পারে তারা আদালতে দাঁড়িয়ে রাজনৈতীক বিরোধীদের বিরুদ্ধে স্বচোখে খুন করতে দেখেছি বা র্ষণ করতে দেখেছি -এরূপ মিথ্যা শিক্ষা দিবে তাতে কি আশ্চার্যের কিছু আছে? বিচারকদেরও কি সে সামর্থটুকু আছে যে তারা সে মিথ্যাসাক্ষিকে মিথ্যুক বলে সনাক্ত করবে এবং বিচারের নথি থেকে বিদায় দিবে? বরং তারা নিজেরাও তো সাক্ষিদের চেয়েও বহুগুণ বেশী মিথ্যা বক্তব্য দিয়েছে তাদের রায়ে। নইলে একাত্তরে তিরিশ লাখ খুন ও চার লাখ ধর্ষণের এত বড় বিশাল মিথ্যাটি বিচারের রায়ে লেখেন কি করে?

আদালতের নাম নিয়েও কি কম মিথ্যাচার? এটি কোন বিচারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল? আর্ন্তজাতিক হতে হলে তাতে অন্য জাতির লোকদের উপস্থিতি থাকাটি জরুরী। তার একটি আন্তর্জাতিক মানও লাগে। বিচারক ও আইনজীবীদের কেউ কি বিদেশী। আইনও কি আন্তর্জাতিক? ধোকাবাজি আর কাকে বলে? বিদেশী ব্যারিস্টারগণ এ আদালতে আইনজীবী রূপে যোগ দিতে চেয়েছিল কিন্তু তাদের আসতে দেয়া হয়নি। আদালতের বিচারকগণদের উপর অর্পিত মূল দায়িত্বটি ছিল জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় শোনানো যা জনৈক বিচারক স্কাইপী সংলাপে তার বন্ধুর কাছে উল্লেখও করেছেন। এখন তো সে রায়ই শোনানো হচ্ছে। তাই বিচার যে নিরেট প্রহসন মুলক তা নিয়ে কি আদৌ কোন সন্দেহ আছে?

 

মেঠো আদালত বসছে কোর্ট ভবনে

আদালতের বিচারকগণ কোন অপরাধই নিজ চোখে দেখে না। বিচারে রায় প্রদানে সেটি শর্তও নয়। সাক্ষীর প্রদত্ত সাক্ষ্যের ভিত্তিতে তারা যে কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধেই রায় দিতে পারে।তাই কোন আসামীকে ফাঁসীতে ঝুলানোর জন্য খুনের ঘটনা না ঘটলেও চলে। বরং সে জন্য যা জরুরী তা হলো,এমন কয়েকজন মিথ্যুক সাক্ষী যারা আদালতে বলবে যে আমরা আসামীকে খুন করতে দেখেছি। বিচারের নামে ভয়ানক অবিচার তো এভাবেই হয়। বিচারে তো বেশী কিছু লাগে না।লাগে,অপরাধ কর্মটি যে আসামীর হাতে ঘটেছে তা নিয়ে প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী। সাক্ষী পেলে আসামীকে সহজেই ফাঁসিতে লটকানো যায়। বাংলাদেশে তো বহু মিথ্যা সাক্ষী ভাড়াতে পাওয়া যায়। অর্থ দিলে তারা আদালতে দাঁড়িযে শেখানো মিথ্যা বুলি তোতা পাখির ন্যায় অনর্গল বলবে দেশে কি তেমন মানুষ কম? অপর দিকে সরকার তো প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খুলেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে সাক্ষীদের মিথ্যা সাক্ষদানের সামর্থ বাড়ানোর কাজে।এক্ষেত্রে বিচারকদের জন্য যে যোগ্যতাটি অতি অপরিহার্য তা হলো প্রদত্ত মিথ্যা সাক্ষ্য থেকে সত্যকে সনাক্ত করার সামর্থ। কিন্তু সে যোগ্যতা কি বাংলাদেশের আদালতের বিচারকদের আছে? তারা তো তিরিশ লাখ নিহত আর চার লাখ ধর্ষনের ন্যায় বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মিথ্যাকেও মিথ্যা রূপে সনাক্ত করতে ব্যর্থ। ফলে আদালতে প্রদত্ত সুক্ষ মিথ্যাকে তারা সনাক্ত করবে কীরূপে? সে সামর্থ থাকলে কি তারা একাত্তরে তিরিশ লাখ নিহত ৪ লাখ ধর্ষিতার মিথ্যাটি তারা বিচারের রায়ে লিখতে পারতেন? আওয়ামী লীগের পক্ষে লাঠি ধরার সামর্থ তাদের যে বিস্তর সেটি তারা দেখিয়ে দিয়েছে।

জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে রায় তো দেয়া হচ্ছে রাজপথ থেকে। জনাব আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল যাবতজীবন কারাদন্ডের রায় শুনিয়েছিল। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ,ছাত্রলীগ ও তাদের মিত্রদের সে রায় পছন্দ হয়নি। তাই শাহবাগে লাগাতর মিটিং শুরু হলো এ দাবী নিয়ে যে তাকে অবশ্যই ফাঁসি দিতে হবে।সংসদ তো শাহবাগীদের দাবির সাথে সংহতি প্রকাশ করে আইন পাল্টালো। মামলাকে সরকার সুপ্রিম কোর্টে নিল। সুপ্রিম কোর্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের বিচারকদের রায়কে ভূল সাব্যস্ত করে সে রায়টিই দিল যে রায়ের দাবিটি শাহবাগের মঞ্চ থেকে তোলা হয়েছিল এবং ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে একই রূপ রায় ঘোষিত হয়েছিল সহরোয়ার্দি উদ্যানের মেঠো আদালত থেকে। দেশের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিগণ মেটো আদালতের কাছে যে কতটা আত্মসমর্পিত এ হলো তার নজির।

আজ  যারা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের সাথে জড়িত তারাই নব্বইয়ের দশকে সহরোয়ার্দি উদ্দানে গণ-আদালতের নামে মেঠো আদালত বসিয়েছিল। তাদের কারণেই সহরোয়ার্দি উদ্দানের সে মেঠো আদালতটি এখন আর মাঠে নাই,সেটি এখন বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট ভবনে এসে বসেছে। ফলে শুধু আব্দুল কাদের মোল্লাকে নয়,আরো বহু নিরপরাধ মানুষকেই যে ফাঁসিতে লটকানোর ব্যবস্থা করা হবে তা নিয়ে কি সামান্যতম সন্দেহ আছে? তখন রাজপথে দলীয় গুন্ডাদের দ্বারা মানুষ হত্যার প্রয়োজনটি কমবে। সে কাজটি বিচারকগণই করেবে। আওয়ামী বাকশালীরা তো সেটিই চায়। প্রশ্ন হলো,দেশের প্রশাসন ও আদালত ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে অধিকৃত হলে কি সুবিচার আশা করা যায়? আশা করা যায় না বলেই তো মহান আল্লাহতায়ালা আদালতের অঙ্গনে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা ও ইসলামের বিপক্ষ শক্তির নির্মূলকে অপরিহার্য করেছেন।নইলে মুসলমানের রাষ্ট্র ইসলামি রাষ্ট্র হয় না। ইসলাম যে শান্তির ধর্ম সেটি শুধু কিতাবেই থেকে যায়। দেশ তখন অবিচারপূর্ণ হয়ে উঠে। বাংলাদেশ তো তেমনই এক দেশ। ২০/০৯/২০১৩

 

 




এক বাকশালী বুদ্ধিজীবীর অসভ্য মানস ও রণহুংকার প্রসঙ্গ

এটি কি বুদ্ধিজীবী বা শিক্ষকের ভাষা?

হযরত আলী (রাঃ)র মহামূল্যবান বহু উক্তির মাঝে আরেকটি অতি মূল্যবান উক্তি হলোঃ “মানুষের ব্যক্তিত্ব তার জিহবাতে”। অর্থাৎ যখন সে জিহ্বা নড়ায় তখন প্রকাশ পায় তার ব্যক্তিত্ব । তাই  সভ্য বা অসভ্য মানুষের পরিচয়টি দেহের অবয়বে ও পোষাকপরিচ্ছদে ধরা পড়ে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিতেও নয়। ধরা পড়ে মুখের কথা ও লেখনিতে। লেখনির মধ্য দিয়েই কথা বলে ব্যক্তির চেতনা ও ঈমান। মানব ইতিহাসে ভয়ানক অপরাধগুলি শুধু মারণাস্ত্র দিয়ে হয়নি, হয়েছে মুখের ভাষা ও লেখনি দিয়ে। অপরদিকে কথা ও লেখনি দিয়েই সংঘটিত হয়েছে সত্যপ্রচার, সত্য-প্রতিষ্ঠা ও মিথ্যার প্রতিরোধের ন্যায় বড় বড় মহান কাজ। জান্নাত লাভের মূল কাজটির শুরুও তো হয় মুখের কথা দিয়েই। সেটি মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর রাসূল ও তাঁর কিতাবের প্রতি বিশ্বাসভরা কালেমা পাঠ করে। তেমনি জাহান্নামে পৌঁছার জন্য জিহ্বার পাপই যথেষ্ট। দেহের এই ক্ষুদ্র অঙ্গ দিয়েই জঘন্য পাপীরা মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঘোষণা দেয়। আল্লাহতায়ালা, তাঁর রাসূল ও তাঁর দ্বীনকে অস্বীকার করা, অপমান করা বা গালী দেয়ার ন্যায় অপরাধে কি কোন মারাণাস্ত্র লাগে? মুখের কথা ও লেখনি তো সেজন্য যথেষ্ট। তাই রোজ হাশরের বিচার দিনে পাল্লায় তোলা হবে ব্যক্তির কথা ও লেখনিকেও। এমন কি সভ্যদেশের আদালতেও শুধু অস্ত্র ও অর্থের ব্যবহারটাই বিচারে আনা হয় না, বিচারে আনা হয় মুখের ভাষা ও লেখনির প্রয়োগকেও।

মিথ্যাচার ও অশ্রাব্য গালিগালাজ কখনোই চরিত্রের অলংকার নয়। সেটি বরং নিখুঁত পরিমাপ দেয় সে কতটা অসভ্য, ইতর ও অপরাধী। সকল অপরাধের শুরু হয় মিথ্যাচার ও গালিগালাজ দিয়ে। মানব ইতিহাসের বড় বড় বিপর্যয়ের কারণগুলি নিছক যুদ্ধবিগ্রহ, হত্যা, চুরি-ডাকাতি ও ব্যাভিচার নয়। বরং বহু বিপর্যেয়ের কারণ মিথ্যাচার। এবং সত্য-পরায়ন মানুষদের চরিত্র হনন। সত্যকে বেড়ে উঠা ও তার প্রতিষ্ঠাকে তো এভাবেই রুখা হয়। মহান নবীজী (সাঃ)র বিরুদ্ধে মক্কার কাফেরগণ তো সে দুষ্কর্মটিই বেশী বেশী করেছে। মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ এ মানুষটিকে তারা পাগল, যাদুকর, মিথ্যাচারি, সমাজের শৃঙ্খলা ভঙ্গকারি বলে গালিগালাজ করেছে। আজকের কাফের ফাসেক ও মুনাফিকদেরও তো সেটাই রীতি। এরূপ মিথ্যাচারিদের কারণেই সামাজিক শান্তি লংঘিত হয় এবং সাধারণ মানুষও সত্যের সৈনিকদের বিরুদ্ধে সংহিস হয়ে উঠে। নবী-রাসূলের বিরুদ্ধে তো সেটিই ঘটেছে। নবীজী (সাঃ) এজন্যই মিথ্যাচারকে সকল পাপের মা বলেছেন। অস্ত্রে দেহ খুন হয়, আর মিথ্যাচারে খুন হয় চরিত্র। সেটি হয় কথা ও লেখনীর মধ্য দিয়ে। তাই রাষ্ট্রে শুধু চুরি-ডাকাতি, হত্যা ও ধর্ষণ রোধে আইন থাকলে চলে না, কঠোর আইন থাকতে হয় মিথ্যাচারির শাস্তি বিধানেও। মহান আল্লাহতায়ালার বিধানে এটি ভয়ানক অপরাধ। এজন্যই হত্যা, চুরি-ডাকাতি বা ব্যভিচারীর শাস্তির পাশাপাশি পবিত্র কোরআনে চরিত্র হননকারি মিথ্যাচারীর বিরুদ্ধেও কঠোর শাস্তি ঘোষিত হয়েছে।

 

মুন্তাসির মামুনের অপরাধ

সম্প্রতি এক গুরুতর অপরাধ করেছেন আওয়ামী ঘরানার প্রথম সারির বুদ্ধিজীবী মুন্তাসির মামুন। তার একটি প্রবন্ধ গত ৩১ অক্টোবর তারিখে দৈনিক জনকন্ঠে ছাপা হয়েছে। মানসিক ভাবে তিনি যে কতটা অসুস্থ্য ও অপরাধী -সেটিই প্রকাশ পেয়েছে তার সে প্রবন্ধে। উক্ত নিবন্ধে বেরিয়ে এসেছে তার অপরাধী মনের বিষাক্ত আবর্জনা। গোখরা সাপের ন্যায় তার অসুস্থ্য মনটি কানায় কানায় বিষপূর্ণ। তবে সে বিষ শুধু ইসলাম ও বাংলাদেশের ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে নয়, বিএনপিসহ সকল বিরোধী দলের বিরুদ্ধেও। উক্ত প্রবন্ধে তিনি জামায়াত-বিএনপি নেতাকর্মীদের “পাকি জারজ” বলেছেন। এটি কি কোন সভ্য মানুষের ভাষা? কোন শিক্ষিত মানুষ কি এরূপ ভাষায় কথা বলে? এতো অতি অসভ্য ও ইতর মানুষের ভাষা। প্রশ্ন হলো এরূপ ব্যক্তি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক হয় কি করে?

অথচ এ সত্য কি অস্বীকারের উপায় আছে, বাংলাদেশের ইতিহাসে পথঘাটে মানুষের লাশ তখনই বেশী বেশী পড়ে যখন দেশের রাজনীতি আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের হাতে যায়। সেটি যেমন মুজিবামলে দেখা গেছে, তেমনি হাসিনার আমলেও। মুজিবের রক্ষিবাহিনীর হাতে মারা গেছে ৩০—৪০ হাজারের বেশী নিরীহ মানুষ। শাপলা চত্বরের সমাবেশে হাসিনা সরকারের হাতে হতাহত হয়েছে বহুহাজার। র‌্যাব, পুলিশ, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ ক্যাডারদের হাতে প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছে। বহুনেতা ইতিমধ্যে খুন হয়েছেন, গুম হয়েছেন এবং এখনো হচ্ছেন। কিন্তু কোন হত্যার কি বিচার হয়েছে? হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধেও মুন্তাসির মামূনের দারুন ক্ষোভ। ক্ষোভের কারণ, বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর কথিত  অত্যাচারের  নাকি বিচার হয়নি। আরো অভিযোগ, শেখ হাসিনা কেন সরকার বিরোধীদের এখনো কেন নির্মূল করেনি। তার অভিযোগ, নির্মূলের সুযোগ ছিল, কিন্তু হাসিনা তা থেকে ফায়দা উঠায়নি। নিবদ্ধটিতে লিখেছেন,“দশ ট্রাক অস্ত্র মামলা, শেখ হাসিনাকে গ্রেনেড ছুড়ে হত্যার প্রচেষ্টা, রমনা পার্কে বোমা মেরে হত্যা কোনটার বিচারই আওয়ামী লীগ সম্পন্ন করতে পারেনি নেতৃত্বের অদূরদর্শিতা ও অদক্ষতার জন্য।” জামায়াত ও বিএনপি নির্মূলে শেখ হাসিনার সরকারের সে ব্যর্থতার ক্ষোভ তাকে এতটা পাগল করে ফেলেছে যে ন্যূনতম ভদ্রতার ভাষাও তিনি হারিয়ে ফেলেছেন। তাদেরকে তিনি এতকাল রাজাকার বলতেন। এবার “পাকি জারজ” বলেছেন। বিরোধী দল নাকি রাজনীতি করছে শুধু আওয়ামী লীগ সরকারের ব্যর্থতার কারণেই। তিনি লিখেছেন,“বেগম খালেদা জিয়া বাঙালীদের ওপর যে অত্যাচার চালিয়েছিলেন, যে যন্ত্রণা দিয়েছিলেন তার কোন সুরাহা আওয়ামী লীগ করেনি। করলে আজ জামায়াত-বিএনপি গণতন্ত্রবিরোধী “পাকি জারজ”দের রাজনীতি করতে পারত না।” এই হলো মুন্তাসির মামূনের ভাষা!

শরিয়তের বিধান অনুযায়ী ব্যাভিচারের শাস্তি হলো পাথর মেরে হত্যা -যদি সে ব্যাভিচারি ব্যক্তিটি বিবাহিত হয়। অবিবাহিত হলে সে শাস্তিটি প্রকাশ্য জনসমাবেশে পিঠের উপর ১০০টি চাবুক। জ্বিনার শাস্তির ন্যায় কাউকে ব্যাভিচারের মিথ্যা অপবাদ দেয়ার শাস্তিও কঠোর। তাকেও জনতার সমাবেশে পিঠে ৮০টি চাবুক মারা হয়।এটিই মহান আল্লাহতায়ালার বিধান যা পবিত্র কোরআনে ঘোষিত হয়েছে। ইসলামি পরিভাষায় এটিই হলো হদুদ। এরূপ কঠোর শাস্তির কারণে রক্ষা পায় নিরাপরাধ মানুষের চরিত্র। মহা-অকল্যাণ এ বিধানের অবাধ্যতায়। সমাজে তখন আযাব নেমে আসে। আল্লাহর নাযিলকৃত এ বিধানকে যারা অনুসরণ করে না পবিত্র কোরআনে তাদেরকে কাফির, ফাসিক ও যালিম বলা হয়েছে। ঘোষিত হয়েছে “আল্লাহ যে বিধান দিয়েছেন তা দিয়ে যারা (বিচারের) হুকুম দেয় না তারাই কাফের।… তারাই যালিম। …তারাই ফাসিক বা দুর্বৃত্ত।–(সুরা মায়েদা আয়াত ৪৪, ৪৫ ও ৪৭)। কোন প্রকৃত ঈমানদার কি মহান আল্লাহর এ সুস্পষ্ট কোরআনী হুকুমের অবাধ্য হতে পারে? হতে পারে কি তার শরিয়তি বিধান প্রতিষ্ঠায় অমনযোগী?

মুন্তাসির মামূনের অপরাধ, বিএনপি ও জামায়াতের লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মীকে তিনি “পাকি জারজ” বলে তাদের পিতামাতার বিরুদ্ধে ব্যভিচারের গুরুতর মিথ্যা আরোপ করেছেন। উক্ত নিবন্ধে এ গালিটি একবার নয় কয়েকবার দিয়েছেন। জারজেরা তো ব্যভিচারের ফসল। মুন্তাসির মামূনের একার পক্ষে বিএনপি ও জামায়াতের লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মীর জন্ম-ইতিহাস জানা সম্ভব নয়। ফলে না জেনে তিনি নিরেট মিথ্যাচার করেছেন। একজনের বিরুদ্ধে জ্বিনা বা ব্যভিচারের মিথ্যা অভিযোগ তুললে তাকে ৮০টি চাবুক খেতে হয়।এক্ষেত্রে মুন্তাসির মামূনের পাওনা তো বহুলক্ষ চাবুকের আঘাত। কারণ তিনি মিথ্যা অপবাদ দিয়েছেন বহুলক্ষ নিরাপরাধ মানুষের বিরুদ্ধে। এরূপ ভয়ানক মিথ্যাচারির শাস্তি শুধু শরিয়তের বিধানই দেয় না, শাস্তি রয়েছে যে কোন সভ্য দেশের আইনেও। প্রশ্ন হলো এতবড় অপরাধী শাস্তি না পেলে বাংলাদেশের আদালতের আর কোন অপরাধীর শাস্তি দেয়ার অধিকার থাকে কি?

 

অপরিহার্য হলো শরিয়তের প্রতিষ্ঠা

সভ্য মানুষ যেখানে যায় সেখানে গায়ের বস্ত্রটি পরিধান করে যায়। নইলে তাকে বিবস্ত্র বা নগ্ন বলা হয়। তেমনি ধর্মপরায়ন মানুষও সর্বত্র ধর্ম নিয়েই চলাফেরা করে। নইলে তাকে অধার্মিক বা পাপাচারি বলা হয়। মুসলমানের ধর্ম শুধু নামায-রোযা ও হজ-যাকাত পালন নয়, শরিয়তের বিধান পালনও। তাই ইখতিয়ার বিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজি যথন বাংলা বিজয় করেন তখন তিনি শুধু নামায-রোযা, হজ-যাকাতের বিধানই আনেননি,এনেছিলেন শরিয়তের বিধানও।বাংলায় মুসলিম শাসনের প্রথম দিন থেকেই আদালতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল সে কোরআনি আইন। নবাব সিরাজুদ্দৌলার শাসন অবধি সে আইন বলবত ছিল। শরিয়তের বিধান প্রতিষ্ঠার জন্য কোন দেশেই শতকরা শতভাগ মানুষের মুসলমান হওয়ার প্রয়োজন নেই। নবীজী (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামের আমলে খোদ আরবেও মুসলমানদের সংখ্যা সে অবস্থায় পৌঁছেনি। সেরূপ অবস্থা উমাইয়া বা আব্বাসীয় আমলেও ছিল না। মুসলমানদের মাঝে বহু অমুসলমানও ছিল। তাই বলে কি শরিয়তের প্রতিষ্ঠা বন্ধ ছিল? বাংলাদেশে অমুসলমানদের সংখ্যা শতকরা ১০ জনের চেয়ে কম। অথচ মিশর, ইরাক, সিরিয়ার বহু মুসলিম দেশে অমুসলিম জনসংখ্যা শতকরা ১০ জনের অধিক। লেবাননে এক-তৃতীয়াংশ। হাজার বছর আগে সে সংখ্যা আরো বেশী ছিল। শরিয়তের প্রতিষ্ঠা কি তাতে বন্ধ থেকেছে? মুসলমানেরা যে দেশই জয় করেছে প্রথম দিন থেকেই সেখানে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা করেছে। নামায-রোযা পালনের ন্যায় প্রতিটি মুসলমানের ঘাড়ে এটিও এক অলঙ্ঘনীয় দায়বদ্ধতা।

মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের অপরাধটি শুধু এ নয় যে তারা এদেশের বুক থেকে মুসলিম শাসনকে অপসারিত করেছে। বরং মুসলিম বিরোধী ভয়ানক অপরাধটি হলো, এদেশের আদালতে থেকে শরিয়তি শাসনকেও বিলুপ্ত করেছে। সে স্থলে প্রতিষ্ঠা করেছে নিজেদের কুফরি আইন। আর বাংলাদেশের সেক্যুলারিস্টদের অপরাধটি হলো, ব্রিটিশের সে কুফরি আইনকেই আজ অবধি বলবৎ রেখেছে। শরিয়ত আইনী প্রতিষ্ঠা না করে ইসলামের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদীদের কৃত অপরাধকেই তারা শাসতান্ত্রিক বৈধতা দিয়েছে। ইসলামের বিরুদ্ধে এর চেয়ে বড় গাদ্দারি আর কি হতে পারে? আর জনগণের অপরাধ হলো, শরিয়তের প্রতিষ্ঠাবিরোধী রাজনৈতীক দল ও ব্যক্তিদেরকেই তারা বার বার নির্বাচিত করছে। ফলে বাংলাদেশের ন্যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশে আল্লাহর দ্বীনের পরাজয়ের জন্য সরকার ও জনগণ উভয়ই দায়ী। এ অপরাধের দায়ভার নিয়ে কি আল্লাহর সামনে তাদের দাঁড়াতে হবে না? সে ভাবনাই বা ক’জনের? শরিয়তের প্রতিষ্ঠা না থাকায় বাংলাদেশের ন্যায় একটি মুসলিম দেশে শাস্তি যোগ্য অপরাধের সংজ্ঞাই পাল্টে গেছে। পাল্টে গেছে আদালতের সংস্কৃতিও। ফলে মিথ্যাচার ও জ্বিনা-ব্যাভিচারের ন্যায় ভয়ানক অপরাধগুলোও বাংলাদেশের আদালতে শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়। এতে দ্রুত বেড়ে চলেছে অপরাধীদের সংখ্যা। আর এ অপরাধীদের হাতেই অধিকৃত আজ বাংলাদেশের সরকার, প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মিডিয়া ও আদালতসহ দেশের সকল প্রতিষ্ঠান। মুন্তাসির মামূন তো তাদেরই একজন। এতবড় ভয়ানক অপরাধীরা শাস্তি না পেলে খুনি, চোর-ডাকাত ও অন্যান্য অপরাধীদের শাস্তি হবে কীরূপে?

মুন্তাসির মামূনদের ন্যায় ব্যক্তিগণ যে দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সে দেশটি দুর্বৃত্তে বার বার বিশ্বরেকর্ড গড়বে সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? কারণ এরূপ শিক্ষক থেকে ছাত্র ভাল কিছু শিখবে কি? এমন দেশের পথেঘাটে লগিবৈঠা, পিস্তল ও বোমাধারিদের সংখ্যা বাড়বে এবং তাদের হাতে মানুষ খুন হবে, গুম হবে ও নারীরা ধর্ষিতা হবে সেটিই তো স্বাভাবিক। আওয়ামী লীগ, ছাত্র লীগ ও তাদের মিত্র সংগঠনে তো এমন সহিংস জীবের সংখ্যা অসংখ্য। হাসিনার প্রথমবার ক্ষমতায় আসায় জাহাঙ্গির নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন এক দুর্বৃত্ত ধর্ষনে সেঞ্চুরির উৎসব করেছিল। সে উৎসবের খবর বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকাতেও ছাপা হয়েছিল। হাসিনা সে দুর্বৃত্তের কোন বিচার করেনি। পুলিশ তার খোঁজে কোখাও তদন্তের প্রয়োজন বোধ করেনি। অথচ পুলিশের ব্যস্ততার অন্ত নেই ইসলামপন্থিদের গ্রেফতার ও ইসলামবিষয়ক বই বাজেয়াপ্ত করায়। এ কারণেই আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় যায় তখনই পথে ঘাটে লাশ পড়া শুরু হয়। লাগাতর গুম হওয়া শুরু হয় বিরোধী দলীয় শিবিরে। লুন্ঠিত হয় ব্যাংক ও শেয়ার বাজার। সেটি যেমন মুজিব আমলে হয়েছে তেমনি হাসিনার আমলেও হচ্ছে।

তবে বাংলাদেশের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে বিপদের বড় কারণ, অপরাধপ্রবন হিংস্রতা শুধু আওয়ামী লীগের মাঠকর্মীদের মাঝেই প্রকট নয়। হিংস্রতায় আক্তান্ত শুধু মুন্তাসির মামূনের ন্যায় আওয়ামী শিবিরে দুয়েকজন গুরুই নয়।এমন ইতর ও অসভ্য মুন্তাসির মামূনদের সংখ্যা আওয়ামী লীগ শিবিরে হাজার হাজার। এদের সংখ্যা তাদের মাঝে যে কত বেশী সেটি বুঝা যায় ইন্টারনেটে গিয়ে একটু ঘাঁটাঘাঁটি করলেই। নানা ওয়েবসাইট ও ব্লগে এরা দেশের বিবেকমান ও রুচিশীল লেখকদের এমন অশালীন ভাষায় গালীগালাজ করে যা কোন সভ্য মানুষ ভাবতেও পারে না। তখন বুঝা যায় জামায়াত-শিবির-বিএনপি নেতাকর্মীদেরকে জারজ বলাটিও শুধু মুন্তাসির মামূনের একার অসভ্যতা নয়। বাংলাদেশে স্বাধীন বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার পথে এরাই বড় বাধা। আবর্জনার স্তুপে যেমন আশেপাশের সকল মশামাছি জমা হয়, আওয়ামী লীগেও তেমনি জমা হয়েছে দেশের বেশীর ভাগ অসভ্য ও ইতর মানুষ।

 

যে অসভ্যতা আওয়ামী লীগের নিজস্ব

উপমহাদেশের রাজনীতিতে সংঘাত এই প্রথম নয়। প্রথম নয় মুসলিম ইতিহাসেও। নবীজী (সাঃ)র আমলে যে রক্তাত্ব লড়াইয়ে শুরু তখনও কোন সাহাবীকে কেউ জারজ বলে গালী দেয়নি। রক্তাক্ষয়ী সংঘাত হয়েছে ১৯৪৭ সালে ভারত ভেঙ্গে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠান করতে গিয়েও। সে সংঘাতে বহু লক্ষ মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে। হিন্দু ও মুসলিম উভয় পক্ষের লক্ষ লক্ষ মানুষকে নিজেদের ভিটামাটি ত্যাগ করে সীমান্ত অতিক্রম করতে হয়েছে। কিন্তু সে সময় কি কেউ কাউকে জারজ বলে গালি দিয়েছে? কংগ্রেসের কোন হিন্দু নেতাও কি কোন মুসলিম লীগের নেতাকর্মীকে সে অসভ্য ভাষায় গালি দিয়েছে? পাকিস্তানের বিরোধী হলেও সে কাফের নেতারা মুন্তাসির মামূনের ন্যায় এতটা ইতর ও অসভ্য ছিল না। সভ্য মানুষেরা সভ্য ভাষায় মননশীল যু্ক্তি দিয়ে লড়াই করে। অশ্রাভ্য ভাষায় গালিগালাজ দিয়ে নয়। পাকিস্তান নিয়ে হিন্দুদের বিরোধ থাকলেও মুসলিম লীগের নেতাকর্মীদের জন্মের বৈধতা নিয়ে কোনকালেই তারা কোন প্রশ্ন তোলেনি। সেটি রাজনীতির বিষয়ও নয়। কিন্তু মশামাছি তো আবর্জনা খোঁজে। ফলে যে ইতর ও অসভ্য মানস নিয়ে মুন্তাসির মামূন ও তার আওয়ামী বন্ধুরা গালিগালাজ করে সেটি একান্তই তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি।তারা সেটি পেয়েছে আওয়ামী লীগের দলীয় সংস্কৃতি থেকে। ১৪ শত বছরের মুসলিম ইতিহাসে এত ইতর স্বভাবের মানুষেরা মুসলিম দেশের রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি ও শিক্ষাকতায় নামেনি। ফলে দুর্বৃত্তিতে বিশ্বে ৫ বার প্রথম হওয়ার যে রেকর্ডটি বাংলাদেশ গড়লো সেটিও সমগ্র মুসলিম বিশ্বের ১৪ শত বছরের ইতিহাসে এই প্রথম।

ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে হিংস্র ও ভয়ানক শত্রু হলো মুনাফিকরা। তারা নিজেদের মুসলমান বলে জাহির করে শুধু নিজেদের আসল চেহারা গোপন রাখার লক্ষ্যে। ইসলামের ক্ষতি সাধনই তাদের মূল উদ্দেশ্য। এরাই ঘরের শত্রু। এরা নামাযে হাজির হয়, হজ করে, মাথায় টুপি পড়ে বা কালো পট্টি বাঁধে শুধু জনগণকে ধোকা দেয়ার জন্য। আজ দেশে দেশে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ক্ষতিগুলো হচ্ছে এরূপ মুনাফিকদের হাতে। কোন মুসলিম দেশে আল্লাহর শরিয়তের প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে রাস্তায় নামার সাহস কি কোন হিন্দুর আছে? অথচ সে কাজ অনায়াসে করছে মুনাফিকরা। আল্লাহর দ্বীনের প্রতিষ্ঠাকামীদের বিরুদ্ধে তাদের সুস্পষ্ট অবস্থান। কোন মুসলিম ভূমি কাফেরদের হাতে অধিকৃত বা খন্ডিত হলে আনন্দে তারা ডুগডুগি বাজায়। আরাকানের মজলুম মুসলমানদের জন্য তাদের মনে যেমন কোন স্থান নেই তেমনি সামান্যতম দরদ নাই ভারত বা কাশ্মিরের অসহায় মুসলমানদের জন্যও। আজ এরাই বাংলাদেশের মাটিতে একাত্তরের ন্যায় ভারতের আরেকটি আগ্রাসন মনেপ্রাণে চায়।এবং সেটি তাদের মনের গোপন বিষয়ও নয়। ইসলামপন্থিদের দ্রুত বেড়ে উঠাতে তারা ভীতু। তারা জানে, নিজ শক্তিতে ইসলামপন্থিদের পরাজয় করার সামর্থ তাদের নেই। ফলে তারা আতংকিত। সেজন্যই প্রতিবেশী কাফের দেশে তারা মিত্র খুঁজছে, যেমনটি একাত্তরে করেছিল।

 

মুন্তাসির মামূন নিজেই একটি রোগ

মুন্তাসির মামূন নিজেই একটি রোগ। এ রোগ ভয়ানক সংক্রামকও। শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, বাংলাদেশের পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবির ও সেনাবাহিনীর বহু সদস্য এ রোগে আক্রান্ত। আক্রান্ত মুন্তাসির মামূন, শাহরিয়ার কবিরের ন্যায় অসংখ্য আওয়ামী ঘরানার বুদ্ধিজীবী ও মিডিয়া কর্মী। এক কালে কলেরায় বাংলাদেশের গ্রামগুলি মানব শুণ্য হতো। আর এ রোগে দেশ মানবশূণ্য না হলেও মানবতা শূণ্য হচ্ছে। লাশ পড়ছে শাপলা চত্বরে। এ রোগের আক্রমণে শুধু জামায়াত শিবির, হেফাজত বা বিএনপির নেতাকর্মীরাই লাশ হয় না। লাশ হয় বিশ্বজিতেরাও। বাংলাদেশ দুর্বৃত্তিতে বিশ্বরেকর্ড গড়ে, যাত্রীভর্তি বাসে আগুণ দেয়া হয়, লগিবৈঠা দিয়ে  মানুষ খুনের উৎসব হয়, হরতালের দিনে পথচারিকে উলঙ্গ করা হয় এবং ধর্ষণে সেঞ্চুরি হয় তো এ রোগের প্রকোপেই। এ রোগের এরূপ প্রাদুর্ভাব নিয়ে কোন সভ্য নাগরিক কি নীরব থাকতে পারে? এ রোগের একমাত্র ঔষধ শরিয়তি আইন। এটিই মহান রাব্বুল আলামীনের দেয়া চিকিৎসা। শরিয়তের আইনই মক্কার কাফেরদের পূর্ণ আরোগ্য দিয়েছিল। বাংলাদেশের রোগাগ্রস্তদের জন্যও ভিন্ন চিকিৎসা নেই।

মুন্তাসির মামূনের প্রচন্ড আক্রোশ ইসলামের বিরুদ্ধে। তিনি তো তার রোগ নিয়েই বাঁচতে চান। তাই শরিয়তের আইনের বিরুদ্ধে তার প্রচন্ড আক্রমণ। মুন্তাসির মামুনের অভিযোগ বাংলাদেশের মানুষের বিরুদ্ধেও। তার অভিযোগ,“এ দেশের মানুষ তো আবার কথায় কথায় ইসলামের কথা তোলে। ইসলামের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়- ক্ষমতার জন্য রসুল (দ) ওফাতের পর থেকে তার প্রাণের আত্মীয়-স্বজন একে অপরের বিরুদ্ধে লড়েছে, বাবা ছেলেকে ছেলে বাবাকে হত্যা করেছে।” কতবড় মিথ্যাচারি এই মুন্তাসির মামূন! তার মিথ্যাচার এখানে নবীজী (সাঃ)র আত্মীয় স্বজনদের বিরুদ্ধেও। প্রশ্ন, নবীজী (সাঃ)র কোন আত্মীয়টি তাঁর পিতাকে স্রেফ ক্ষমতার জন্য হত্যা করেছে? রণাঙ্গনে কোন পিতা, পুত্র বা ভাই ইসলামের বিজয় রুখতে অস্ত্র ধরলে তাকে নিস্তার দেয়া ইসলামের শিক্ষা নয়। সেটিই তো ঈমানদারি। বাংলাদেশের বহু মুসলিম পরিবারে যেমন অসংখ্য ইসলাম-দুষমণ ঘৃণ্য জীব জন্ম নিয়েছে তেমনি আরব, ইরান, আফগানিস্তানসহ বিশ্বের প্রতিদেশেই অসংখ্য মুনাফিক ও খুনি জন্ম নিয়েছে। অতীতে পয়গম্বরদের পরিবারেও সেটি হয়েছে। সে জন্য কি ইসলামকে দায়ী করা যায়? তাছাড়া ঘন ঘন ইসলামের নাম নেয়া, আল্লাহকে স্মরণ করা তো মু’মিনের যিকর। সে যিকরের হুকুম তো এসেছে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে। মুন্তাসির মামুনদের রাজনীতিতে যেমন কথায় কথায় একাত্তর, মুক্তিযুদ্ধ, মুজিব,আওয়ামী লীগ, ভারত, গান্ধি, রবীন্দ্রনাথ, সেক্যুলারিজম ও জাতিয়তাবাদের যিকর তেমনি মুসলমানের রাজনীতিতে বেশী বেশী আল্লাহ ও তাঁর শরিয়ত প্রতিষ্ঠার যিকর। এর মধ্যেই তো মু’মিনের ঈমানদারি।

ভয় অস্তিত্ব বিলুপ্তির

মুন্তাসির মামূনের মনে প্রচন্ড ভয়। সে ভয়টি নিজের ও তার সমমনাদের নির্মূলের। সে ভয়টি অমূলকও নয়। কারণ ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষ আজ যতটা মারমুখী তা পূর্বে আর কোন সময়ই এতটা তীব্র ছিল না। সে ভয় নিয়েই তিনি লিখেছেন,“আওয়ামী লীগ যদি হারে তা’হলে আওয়ামী লীগ, সমর্থক, হিন্দু এবং যুদ্ধাপরাধী নিয়ে যারা কাজ করছেন তাদের সবাইকে নিকেশ করে দেয়া হবে।” সে ভয়টি কতটা বাস্তব সেটি প্রমাণ করতে গিয়ে লিখেছেন, “এই লেখা যখন লিখছি তখন খবর পেলাম শাহরিয়ার কবিরের, সাংবাদিক জুলফিকার আলী মানিকের বাসায় বোমা রেখে যাওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকতেই এই অবস্থা। না থাকলে কি হতো তা অনুমেয়।” এ ভয় শুধু মুন্তাসির মামূনের একার নয়, সমগ্র আওয়ামী শিবির জুড়ে। তাদের ভয়, ১৯৭৫য়ে ১৫ই আগষ্টের ঝড়ে শুধু মুজিব পরিবার বিধস্ত হয়েছিল। এবার শিকড় উপড়ে যাবে সমগ্র আওয়ামী লীগ ও তার নেতাকর্মীদের। অপরাধীদের অপরাধ অন্যরা না পুরাপুরি না জানলেও তারা নিজেরা জানে। ফলে তাদের নিজের মনে থাকে সে অপরাধ থেকে বাঁচার ভয়। চোরডাকাতের মনে এজন্য থাকে সবসময় ধরা পড়ার ভয়। খুনিরা তো সে ভয় নিয়ে আত্মগোপন থাকে এবং রাস্তায় নামে না। ইসলাম, মুসলমান ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ভয়ংকর অপরাধগুলি অন্যরা যতটা জানে তার চেয়ে বেশী জানে তারা নিজেরা। তাই আওয়ামী লীগের কাছে মূল ইস্যুটি এখন আর তত্ত্বাবধায় সরকারের বিষয় নয় বরং নিজেদের অস্তিত্ব বাঁচানোর। আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায়ের নেতাদের মগজে এ ভয়টি এতই তীব্র যে নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় সরকারের দাবী মেনে নেয়াটি গণ্য হচ্ছে নিজেদের মৃত্যু ডেকে আনা। তাই জীবন বাঁচানোর স্বার্থে তারা চায় যে কোন মূল্যে ও যে কোন ভাবে আওয়ামী লীগের বিজয়। চায় দেশের পুলিশ ও সেনাবাহিনীর উপর নিজেদের নিয়ন্ত্রন। এ বিষয়ে কোন ছাড় দিতে তারা রাজি নয়।

হুংকার চুড়ান্ত যুদ্ধের

মুন্তাসির মামূন কোন আপোষ চান না। কারণটিও অনুমেয়। বিরোধী দলের সাথে আপোষ যে হাসিনার পরাজয়কেই ত্বরান্বিত করবে সেটি তিনি বুঝেন। তিনি জানেন, নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় অসম্ভব। ফলে মতলবটি হলো, সহিংস পথে ক্ষমতায় টিকে থাকা। সেটি যুদ্ধের পথে হলেও। তার হিসাব-নিকাশে আওয়ামী লীগারদের সামনে প্রাণ বাঁচানোর এটিই একমাত্র পথ। তাই লিখেছেন, “আমরা বলব, সংবিধান অনুযায়ী যদি তারা নির্বাচন ইচ্ছুক হয় ভাল কথা না হলে সেই আলোচনায় সময় নষ্ট না করাই উচিত। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষেরও রাস্তাঘাটে প্রতিরোধে প্রস্তুত থাকা বাঞ্ছনীয়। সুশীলদের অনেকে বলেন, সমঝোতা না হলে গৃহযুদ্ধ হবে। …যদি দাঙ্গা হাঙ্গামা হয়, হবে। তাতে আমাদের অনেকেই মারা যাব, তাতে কি আছে? … মৃত্যু তো নির্দিষ্ট এবং একমাত্র সত্য। কিন্তু এক বারের মতো ফয়সালা হয়ে যাক।“

মুন্তাসির মামূন চান আরেকটি যুদ্ধ সত্বর শুরু হোক। এটিকে বলছেন একাত্তরের অসমাপ্ত যুদ্ধ। লক্ষ্য, একাত্তরে যাদের হত্যার সুযোগ হয়নি তাদেরকে হত্যা করা। আরো লক্ষ্য হলো, সে হত্যাকান্ডে ভারতের সেনাবাহিনীকে সম্পৃক্ত করা। ইতিমধ্যে মুন্তাসির মামূনেরই সতীর্থ কলামিস্ট সুদিব ভৌমিক ভারতের “টাইমস অব ইন্ডিয়া”য় ১/১১/১৩ তারিখে প্রকাশিত এক নিবন্ধে ভারতের প্রতি সম্ভাব্য সকল উপায়ে হস্তক্ষেপের আহবান জানিয়েছেন। নইলে বাংলাদেশে ভারতের স্বার্থ বিপদে পড়বে সে কথাটিও সে নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন। ভারতের স্বার্থের মাঝেই আওয়ামী ঘরানার এসব বুদ্ধিজীবীরা যে নিজেদের স্বার্থ দেখে সে বিষয়টিও সে নিবন্ধে গোপন থাকেনি।

জমিতে চাষ না দিলে আগাছা জন্মে। কৃষকের লাঙ্গল তাই আগাছা নির্মূলের হাতিয়ার। একই ভাবে আল্লাহর শরিয়তি বিধানটি আগাছা নির্মূল করে সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে। তাই আল্লাহর শরিয়তি আইন স্রেফ কিতাবে লিপিবদ্ধ থাকার বিষয় নয়। সেটির প্রয়োগ শুধু জরুরীই নয়, অপরিহার্য। আজ বাংলাদেশে ইসলামের দুষমন ভয়ানক অপরাধিরা বেড়ে উঠেছে তো শরিয়তের প্রতিষ্ঠা না থাকাতেই। নবীজী ও খোলাফায়ে রাশেদার সময় মুনাফিরা যে ষড়যন্ত্রটি লুকিয়ে লুকিয়ে করতো এখন তারা সেটি করছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে বসে। এবং প্রকাশ্যে ও বীরদর্পে। গর্তের বিষাক্ত শাপগুলো আজ বাইরে বেরিয়ে এসেছে। সংবিধান থেকে আল্লাহর নাম সরানোর সাহস কি কোন হিন্দুর আছে? আছে কি কোরআনের তাফসির মাহফিল বন্ধ করার সাহস? কিন্তু সে সাহস আছে বাংলাদেশের মুনাফিকদের। কারণ তাদের হাতে রয়েছে নিজেদের মুসলিম পরিচয়ের ঢাল। আছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা।

মুনাফিকদের মুনাফিক বলাই মহান আল্লাহর সূন্নত, মুসলমান বলা নয়। মুসলমান পরিচয় পেতে হলে রাসূলের সাহাবীদের ন্যায় ইসলামের ঝান্ডা নিজ কাঁধে তুলে নিতে হয়। আল্লাহর শরিয়তের প্রতিষ্ঠায় ও ইসলামের বিজয়ে নির্ভয়ে কথা বলতে হয়। অর্থ,শ্রম ও মেধার বিপুল বিণিয়োগও করতে হয়। প্রয়োজনে অস্ত্র হাতে রণাঙ্গনে হাজির হতে হয়। এসবই নবীজীর সূন্নত। সাহাবাগণ তো সে পথেই ইসলামের বিজয় এনেছেন। যারা সংবিধান থেকে আল্লাহর উপর আস্থার বানি সরায় এবং আদালতে শরিয়তের প্রতিষ্ঠাকে অসম্ভব করে তাদেরকে মুসলমান বলা কি আল্লাহর সূন্নত? ইসলামের চিহ্নিত এসব শত্রুদেরকে মুসলমান বললে যারা ইসলামের বিজয় আনতে লড়াই করে ও শহীদ হয় তাদেরকে কি বলা যাবে? পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা কত সুন্দর করেই না মুনাফিকদের চিত্রটা তুলে ধরেছেন। বলেছেন,“তারা নিজেদের (আল্লাহ ও রাসূলের উপর বিশ্বাসী হওয়ার) শপথকে ঢাল রূপে ব্যবহার করে, অতঃপর মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে বিপথগামি করে। তারা যা করে তা কতই না নিকৃষ্ট!” –(সুরা সুরা মুনাফিকুন, আয়াত ২)। মুন্তাসির মামূনেরা তো সেটিই করছেন। তারা নিজেদের মুসলমান বলে জাহির করে, কিন্তু সেটি ইসলামের পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য নয়। ইসলামের গৌরববৃদ্ধি বা শরিয়ত প্রতিষ্ঠার জন্যও নয়। বরং ইসলামের পথ থেকে মুসলমানদের দূরে সরানোর লক্ষ্যে। কোরআনের তাফসির মহফিলের উপর নিষেধাজ্ঞা, ইসলামি টিভি চ্যানেল বন্ধ, আলেমদের লাঠিপেটা, গ্রেফতারি ও হত্যা, মসজিদ-মাদ্রাসার উপর হামলা, ইসলামি বই বাজেয়াপ্ত –এসব কি কোন কাফিরের হাতে হয়েছে?

ইস্যু স্রেফ নির্দলীয় সরকার নয়

বাংলাদেশে সংকটের মূল কারণটি এ নয় যে, দেশটি আজ স্বৈরাচার কবলিত। বরং সেটি হলো, দেশের রাজনীতি, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসনসহ সকল প্রতিষ্ঠান আজ ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে অধিকৃত। ইসলামের বিজয় ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠা রুখাই তাদের মূল কাজ। তাই ঈমানদারদের সামনে মূল ইস্যূটি স্রেফ নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন নয়। এরূপ নির্বাচন পূর্বেও একাধিকবার হয়েছে। কিন্তু তাতে কি দেশ আবর্জনা মুক্ত হয়েছে? মূল ইস্যুটি দেশের উপর থেকে ইসলামের শত্রুপক্ষের দখলদারি নির্মূল। এটি এক দীর্ঘকালীন লড়াই। এ লড়াইযে জানমালের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হবে। কারণ ক্ষয়ক্ষতি বাড়ানোর লক্ষ্যে শত্রুপক্ষের প্রস্তুতিও বিশাল। তাছাড়া বাংলাদেশে ইসলামের বিজয় রুখতে বিদেশী শত্রুরাও নিজেদের বিনিয়োগ বাড়াতে চায়, যেমনটি আফগানিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে করছে। ভারত তো ইতিমধ্যেই হাজার কোটি টাকা বাজেট ঘোষণা করেছে।

তবে মু’মিনের পক্ষে মহান আল্লাহতায়ালা। তাঁর অপার শক্তির সামনে সেসব শক্তি কোন শক্তিই নয়। ফিরাউনের বিশাল বাহিনী যখন বনি ইসরাইলের নিরস্ত্র মানুষদের ধাওয়া করেছিল তখন সামনে ছিল সমূদ্র আর পিছনে ছিল বিশাল সেনাদল। অনেকেই ভেবেছিল, এবার নিস্তার নেই। কিন্তু হযরত মূসা (আঃ)বলেছিলেন, ভয় নেই, আমাদের সাথে আল্লাহ আছেন। সেদিন ফিরাউনের বিশাল বাহিনী বনি ইসরাইলের কাউকেই কোন ক্ষতি করতে পারিনি। সে বিশাল শত্রুবাহিনীর কাউকেই মহান আল্লাহতায়ালা জীবন্ত ঘরে ফেরার সুযোগ দেননি। সবাইকে সমূদ্রে ডুবিয়ে হত্যা করেছিলেন। একই ভাবে নমরুদের খপ্পর থেকে তিনি হযরত ইব্রাহীম (আঃ)কে রক্ষা করেছিলেন। তেমনি খন্দকের যুদ্ধে আরবের সকল গোত্রের সম্মিলিত হামলার মুখে রক্ষা করেছিলেন মদিনার ক্ষুদ্র মুসলিম বসতিকে। মহান আল্লাহতায়ালা নিরস্ত্র ও দুর্বল ঈমানদারকে তো এভাবেই বিজয়ী করেন। কিন্তু এরূপ সাহায্য কি স্রেফ নির্দলীয় সরকার বা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে জোটে?সে জন্য লড়াইকে আল্লাহর দ্বীনের বিজয়ের পথে এগিয়ে নিতে হয়।লড়াই তো তখনই খালেছ জিহাদে পরিণত হয়। মুসলমানের কাজ তো খালেছ নিয়তে মহান আল্লাহতায়ালার পরিপূর্ণ গোলামে পরিণত হওয়া। এবং তাঁর দ্বীনের বিজয়ে আত্মনিয়োগ করা। তখন বাকি জিম্মাদারিটা খোদ মহান আল্লাহতায়ালা নিজ হাতে নিয়ে নেন।

হাসিনা ফিরাউনের চেয়ে বেশী শক্তিশালী নয়। বাংলাদেশের মুসলিমও বনি ইসরাইলের চেয়েও দুর্বল নয়। এ মুহুর্তে মূল দায়িত্বটি হলো, এ লড়াইকে স্রেফ আল্লাহর রাস্তায় বিশুদ্ধ জিহাদে পরিনত করা। মু’মিনের জীবনে জিহাদ ছাড়া কোন লড়াই নাই, জিহাদ ছাড়া কোন রাজনীতিও নাই। নিয়তের এ ক্ষেত্রটুকুতে ভেজাল থাকলে পরকালে কোন ফসল তোলা যাবে না। তেমনি একালেও আল্লাহর সাহায্য জুটবে না। সেক্যুলার চেতনায় এমনি একটি বিশুদ্ধ জিহাদ কি সম্ভব? সেক্যুলারিজম তো পরকালের ভাবনাকেই ভূলিয়ে দেয়। সেক্যুলারিজমের আভিধানিক অর্থ তো ইহজাগতিকতা। পরকালের ভাবনা এখানে অপ্রাসঙ্গিক।  সে জন্য তো চাই রাজনৈতিক আন্দোলনের পরিপূর্ণ ইসলামিকরণ। একমাত্র বিশুদ্ধ জিহাদেই প্রতি মুহুর্তের শ্রম, প্রতিটি কথা, প্রতিটি লেখনি, প্রতিবিন্দু রক্ত ও প্রতিটি অর্থদান পরকালে বিশাল পুরস্কার দেয়। তথন আন্দোলন ব্যর্থ হলেও কোরবানী ব্যর্থ হয় না। জানমালের সে কোরবানিই অনিবার্য করবে জান্নাতপ্রাপ্তি। নইলে হাজির হতে হবে জাহান্নামে। এ নিয়ে কি কোন সন্দেহ আছে? পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা তো সে হুশিয়ারিই বার বার শুনিয়েছেন। ০৩/১১/২০১৩