কোর’আন বুঝায় ব্যর্থতা ও তার পরিণাম

ডাক্তারী বই বুঝতে অতি অপরিহার্য হলো, বইয়ের ভাষা, জীববিদ্যা, মানব শরীরের এ্যানাটমি, ফিজিওলজি, বায়োকেমিস্ট্রিসহ বহু বিষয়ের জ্ঞান। তেমনি কোর’আন বুঝার জন্য শুধু আরবী ভাষা জানলেই চলে না। কোর’আন বুঝার সামর্থ্য বাড়াতে অতি জরুরী হলো, ইতিহাস, দর্শন, সমাজবিজ্ঞান, এবং কোর’আন নাযিল কালে আরবদের মাঝে প্রচলিত রীতি-নীতি, সাহিত্য ও সংস্কৃতিসহ বহু বিষয়ের জ্ঞান। অথচ বাংলাদেশের মত দেশগুলিতে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থায় জ্ঞানদানের ক্ষেত্রটি অতি সীমিত। গুরত্ব পায়নি ইতিহাস, দর্শন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞানের ন্যায় অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর শিক্ষাদান। ফলে লক্ষ লক্ষ ছাত্র সেখান থেকে সার্টিফিকেট নিয়ে বের হলেও কোর’আনের উপর উন্নত মানের তাফসির-কারক সৃষ্টি হচ্ছে না। বাংলা ভাষায় যেসব তাফসির গ্রন্থ্ বাজারে পাওয়া যায় –সেগুলির অধিকাংশই উর্দু বা আরবি ভাষা থেকে অনুদিত। বাংলাদেশের মাদ্রাসা শিক্ষার এ এক বিশাল ব্যর্থতা।

অথচ পবিত্র কোর’আন বুঝার সামর্থ্য না থাকলে “আব্‌দ”, “ইবাদত”, “আব্দুল্লাহ’ “ইবাদুর রাহমান”য়ের ন্যায় পবিত্র কোর’আনে ব্যবহৃত অতি গুরুত্বপূর্ণ বহু পরিভাষাই বুঝতে দারুন ভূল হয়। এতে অজ্ঞতা থেকে যায় প্রকৃত ইসলাম নিয়ে। তখন অসম্ভব হয় প্রকৃত মুসলিম রূপে বেড়ে উঠা। “আব্‌দ”য়ের অর্থ গোলাম এবং “ইবাদত”য়ের অর্থ গোলামী। মুসলিম হওয়ার দায়বদ্ধতা হলো তাকে বাঁচতে হয় মহান আল্লাহতায়ালার একনিষ্ঠ “গোলাম”য়ের পরিচিতি এবং ইবাদত তথা গোলামীর দায়ভার নিয়ে। কিন্তু কীরূপ হবে গোলামের সে পরিচিতিটি এবং কীরূপ হবে সে গোলামী? কোথা থেকে জানবে সে প্রকৃত গোলাম ও গোলামীর পরিচিতি? শুধু কোর’আনের হাফিজ বা ক্বারী হলে সে পরিচিতি বুঝা বা চেনা যায় না। এবং সে পরিচিতি নিয়ে বেড়েও উঠাও যায় না। অথচ বিষয়টি এতই গুরুত্বপূর্ণ যে এখানে ভূল হলে ভূল হবে মুসলিম রূপে বাঁচায়। ফলে ব্যর্থতা জুটবে পরকালে। আবদ (গোলাম) ও ইবাদত (গোলামী)’র সঠিক অর্থ বুঝতে হলে নবীজী (সাঃ)র সমকালীন সময় থেকে এর অর্থ  বুঝতে হবে। এ শব্দ দু’টির অর্থ বাংলাদেশের বা আধুনিক আরব দেশগুলির প্রেক্ষাপটে বুঝলে তার প্রকৃত অর্থ জানায় যেমন ভূল হবে, তেমনি মুসলিম রূপে বাঁচাতেই প্রচণ্ড বিচ্যুতি আসবে।

 

নবীজীর যুগে আরবের বহু ঘরে গোলাম ছিল এবং তাদের সর্বজন স্বীকৃত একটি পরিচিতিও ছিল। গোলামকে বাঁচতে হতো তার মনিবের প্রতিটি হুকুমের প্রতি পূর্ণ-আনুগত্য নিয়ে। মনিবের এজেন্ডা পূরণে শুধু ঘরসংসার ও ক্ষেতখামারে কাজ করাই যথেষ্ট ছিল না, মনিবের নির্দেশে তার শত্রুদের বিরুদ্ধে সর্বসামর্থ্য দিয়ে যুদ্ধেও নামতে হতো। সে যুদ্ধে প্রয়োজনে প্রাণও দিতে হতো। মনিবের কোন হুকুমের অবাধ্যতার শাস্তি স্বরূপ তাকে যদি মনিব আগুণের অঙ্গারের উপর শুইয়ে রাখতো, হত্যা করতো বা জীবিত কবর দিত -তবুও তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কোনরূপ অধীকার গোলামের ছিল না। সমাজে তা নিয়ে প্রতিবাদও উঠতো না। কারণ সেটিই ছিল তৎকালীন সমাজের রীতি। তাই হয়রত সুমাইয়া ও তাঁর স্বামী হযরত ইয়াছিরকে যখন তাঁদের কাফের মনিব ইসলাম কবুলের শাস্তি স্বরূপ নির্মম ভাবে হত্যা করে তখন সমাজে কোন প্রতিবাদ উঠেনি। হযরত খাব্বাবকে যখন তাঁর মালিক মক্কার লোকালয়ে আগুণের অঙ্গারের উপর শুইয়ে রেখেছিল তখনও কোন প্রতিবাদ উঠেনি। অথচ গোলাম নয় এমন কোন মানুষকে হত্যা করলে সে আরবের বুকেই তৎকালে যুদ্ধ শুরু হতো। তখন গোলামদের হাটেবাজারে কেনাবেচা হতো এবং তাদের উচ্চ মূল্যও ছিল। মনিবের কাছে বিক্রয় হওয়ার কারণেই তাদের বাঁচতে হতো মালিকের প্রতি দায়বদ্ধতা নিয়ে। কিন্তু আধুনিক যুগে গোলামের সে পরিচয়টি বেঁচে নাই। গোলাম এখন আল ক্রীতদাস নয়, ফলে মনিবের হুকুম না মানলে বড় জোর চাকুরি যায়, কিন্তু নিহত হতে হয় না। ফলে আজকের যুগের বিরাজমান এ ধারণা নিয়ে কোরআন “আবদ” ও “ইবাদত”য়ের  যে ধারণা পেশ করেছে সেটি বুঝা অসম্ভব।

 

নবীজী (সাঃ)র যুগে ক্রীতদাস বা গোলামের জীবনে গোলামীর যে সার্বক্ষণিক এক দায়বদ্ধতা ছিল তেমন এক দায়বদ্ধতা নিয়ে বাঁচতে হয় মহান আল্লাহতায়ালার বান্দাহ বা গোলামকে। প্রকৃত অর্থে কেউ ঈমান আনলে মহান আল্লাহতায়ালা সে ব্যক্তির সাথে তাঁর জানমাল কিনে নেয়ার একটি পবিত্র চুক্তি সমাধা করেন। বিক্রয়কৃত গোলাম রূপে তাঁকে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট করে দেয়া কিছু কাজও করতে হয়। সেটিই অতি সুস্পষ্ট ভাবে বর্নীত হয়েছে সুরা তাওবার ১১১ নং আয়াতে। বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই আল্লাহ মু’মিনদের থেকে ক্রয় করে নিয়েছেন তাদের জান ও মাল এই মূল্যে যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত। (আর ক্রয়কৃত গোলাম রূপে) তাঁরা যুদ্ধ করে আল্লাহতায়ালার রাস্তায়; অতঃপর তাঁরা হত্যা করে (ইসলামের শত্রুদের) এবং নিজেরা্ও (শত্রুদের হাতে) নিহত হয়। আল্লাহর সে প্রতিশ্রুত ওয়াদাটির সত্যতা বর্ণীত হয়েছে তাওরাত, ইঞ্জিল ও কোর’আনে। আর প্রতিশ্রুতি রক্ষায় আল্লাহর চেয়ে কে শ্রেষ্ঠতর? অতএব তোমরা উৎফুল্ল হও মহান আল্লাহতায়ালার সাথে কৃত এ ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তিতে। আর এটিই তো হলো সর্বশ্রেষ্ঠ সাফল্য।”

মহান আল্লাহতায়ালার ক্রয়কৃত গোলাম রূপে ঈমানদারের দায়িত্ব তাই শুধু নামায-রোযা আদায় নয়,বরং সে দায়ভারটি আরো বিশাল। সেটি হলো মহান প্রভুর প্রতিটি হুকুমের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য। অবাধ্যতা হলে সে কাফেরে পরিণত হয়। তাই ঈমানদার কখনোই নিজে সার্বভৌম শাসক হতে পারে না। বরং তাঁর দায়িত্ব হয়, মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়তক প্রতিষ্ঠা দেয়া। সেক্যুলারিস্ট, ন্যাশনালিস্ট ও স্বৈরাচারি শাসকদের ক্ষমতায় বসিয়ে সে কাজ সম্ভব নয় বলেই অনিবার্য হয়ে উঠে যুদ্ধ। মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়তের প্রতিষ্ঠাকে নিশ্চিত করতে মহান নবীজী (সাঃ) এবং তাঁর সাহাবাগণও তাই যুদ্ধ এড়াতে পারেননি। বরং তিনি নিজে যেমন গুরুতর আহত হয়েছেন, তেমনি তাঁর সাহাবাদের শতকরা ৭০ ভাগের  বেশী শহীদ হয়েছেন। শরিয়ত প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, মুসলিমগণ বিশ্বশক্তির মর্যাদা পেয়েছে এবং দেশে দেশে ইসলামের বিজয় ছড়িয়ে পড়েছে তো তাদের সে কোরবানীর ফলেই।

 

কিন্তু এক্ষেত্রে আজকের মুসলিমদের ব্যর্থতাটি বিশাল। তারা ব্যর্থ হয়েছে “আবদ” ও “ইবাদত”র অর্থ বুঝতে। তাদের ইবাদত সীমিত হয়ে আছে নামায-রোযা, হজ-যাকাতের ন্যায় কিছু আনুষ্ঠিকতার মাঝে। রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, যুদ্ধবিগ্রহ, আইন প্রণয়ন ও বিচার-আচারের অঙ্গণে সে যেন স্বাধীন ও সার্বভৌম।   অথচ এরূপ স্বাধীন ও সার্বভৌম হওয়াটাই কুফরি। মুসলিমের দায়িত্ব এখানে খেলাফতের তথা গোলামসুলভ প্রতিনিধিত্বের। কোর’আন বুঝায় ব্যর্থতার কারণেই হাফিজ, ক্বারী, মাদ্রাসার শিক্ষক বা মসজিদের ইমাম হওয়া সহজ হয়েছে; কিন্তু অতি কঠিন হয়েছে আল্লাহতায়ালার কাছে বিক্রয়কৃত গোলাম হওয়াটি।  ফলে মুসলিম দেশগুলিতে শরিয়তের বিলুপ্তি এবং ইসলামের আত্মস্বীকৃত শত্রুদের বিজয় যেমন আজ এক নিরেট বাস্তবতা, তেমনি আরেক বাস্তবতা হলো আল্লাহর কাছে বিক্রয়কৃত গোলাম রূপে বেড়ে উঠতে মুসলিমদের ব্যর্থতা। বরং তারা নিজেদের শ্রম, মেধা ও জানমাল বিক্রয় করছে ইসলামের শত্রুদের বিজয়কে বাঁচিয়ে রাখতে। এদের কারণেই মুসলিম দেশগুলিতে প্রশাসন, পুলিশ, সেনাবাহিনী, মিডিয়া এবং রাজনৈতীক দল চালাতে ইসলামের ঘোরতর শত্রুদেরও লোকবলের অভাব হয় না। বিপুল লোকবল পাচ্ছে চোর-ডাকাত, ভোট-ডাকাত এবং গুম-খুনের রাজনীতির অপরাধী নেতা-নেত্রীগণও। ঔপনিবেশিক শাসন আমলে এমনকি ইউরোপীয় কাফেরদের কাছেও তারা নিজেদের বিক্রয় করেছে অতি সস্তা মূল্যে। পরিতাপের বিষয় হলো, কোর’আন বুঝায় গভীর ব্যর্থতার কারণে এরাও মুসলিম সমাজে মুসলিম রূপে পরিচিতি পায়।  মুসলিমদের সবচেয়ে ব্যর্থতা তাই কৃষি, অর্থনীতি, বা ব্যবসা-বাণিজ্যে নয়, বরং সেটি হলো কোর’আন বুঝায়। মহান আল্লাহতায়ালা তার নবীকে দিকে যেখান থেকে ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণের কাজটি শুরু করেছিলেন সেটিই আজ গুরুত্ব হারিয়েছে মুসলিম দেশগুলিতে। ফলে ব্যর্থতা শুধু দুনিয়াতেই বাড়ছে না, ভয়াবহ ব্যর্থতা অপেক্ষা করছে আখেরাতেও। এবং সেটি অনন্ত-অসীম কালের জন্য। ০২/০৭/২০‌৯  

 




ঈদ কেন মানব সভ্যতার সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসব?

উৎসবটি মহান আল্লাহতায়ালা-প্রদত্ত-

পৃথিবীর নানা দেশে নানা ধর্মের ও নানা জাতির মানুষের মাঝে শত শত বছর ধরে চলে আসছে বিচিত্র উৎসব। কিন্তু সে সব উৎসব থেকে ঈদ যে অনন্য ও শ্রেষ্ঠতর তা নিয়ে কি সামান্যতম সন্দেহ আছে? সামান্যতম সন্দেহ চলে কি মহান আল্লাহতায়ালার হিকমত, প্রজ্ঞা ও তাঁর প্রদত্ত বিধানগুলির কল্যাণধর্মীতা নিয়ে? আল্লাহতায়ালার প্রতিটি সৃষ্টির মধ্যেই তাঁর অসীম কুদরতের পরিচয়। ধরা পড়ে মানব কল্যাণে মহান আল্লাহর মহা আয়োজন। ঈদ সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসব হওয়ার কারণ,এটি কোন মানুষের আবিস্কৃত উৎসব নয়। এটি এসেছে মহান আল্লাহতায়ালা থেকে।মানব সভ্যতার সর্বশেষ্ঠ উৎসব হওয়ার জন্য এই একটি মাত্র কারণই যথেষ্ঠ। ঈদের সে সর্বাঙ্গ সুন্দর বিধান,সেটি যে কোন বিবেকবান ও সুস্থ্য চেতনার মানুষের চোখে ধরা পড়তে বাধ্য। আলোচ্য নিবন্ধের সেটিই আলোচ্য বিষয়। কিন্তু তা নিয়ে অবিশ্বাস থাকতে পারে একমাত্র তাদের যাদের অবিশ্বাস আল্লাহতায়ালার অস্তিত্ব, তাঁর প্রজ্ঞা ও তার অপার সৃষ্টি ক্ষমতা নিয়ে। এখানে সমস্যা তাদের অসুস্থ্য বিবেকের,ঈদ উৎসবের নয়।এমন মানসিক অসুস্থ্যতার কারণে তারা যেমন ইসলামের ইবাদতের বিধানের মধ্যে কোন শ্রেষ্ঠত্ব খুঁজে পায়না তেমনি পায়না মুসলমানদের ঈদ উৎসবের মাঝেও।

ঈমানদারের জীবন চলে মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশিত সিরাতুল মোস্তাকীম বেয়ে। এ পথে চলায় মুসলমানের জীবনে যেমন প্রচুর ত্যাগ-তিতীক্ষা ও জান-মালের কোরবানী আছে, তেমনি খুশিও আছে। দুঃখ-বেদনার সাথে উৎসবও আছে। তবে সে উৎসবে মোহচ্ছন্নতা নাই, আছে পবিত্রতা। মুসলিম বিশ্বের ঘরে ঘরে ঈদ তাই পবিত্র উৎসব বা খুশি বয়ে আনে। এমন খুশির দিন সারা বছরে মাত্র দু’টি। একটি ঈদুল ফিতর, এবং অপরটি ঈদুল আযহা। এ খুশির দিন দু’টিতে প্রতিটি মুসলিম দেশ নতুন ভাবে সাজে। কিন্তু কেন এ খুশি বা উৎসব? খুশি বা উৎসব তো আসে বিশাল বিজয় বা বড় কিছু অর্জনের পর। কিন্তু কি সে বিজয় বা অর্জন, যার জন্য মুসলমানেরা ঘরে ঘরে ঈদের খুশি করবে? অন্য ধর্ম বা অন্য জাতির উৎসব ইসলামের এ উৎসবের পার্থক্য কোথায়? ঈদের শ্রেষ্ঠত্বই বা কি? কেনই বা দিন দু’টি মানব-সংস্কৃতিতে অনন্য? ইসলাম শান্তি ও কল্যাণের ধর্ম, কিন্তু এ উৎসবে শান্তি ও কল্যাণই বা কি? খৃষ্টান,বৌদ্ধ ও শিখ ধর্মের অনুসারিরা তাদের ধর্মের প্রচারকদের জন্ম বা মৃত্যু দিবসকে উৎসবের দিনে পরিণত করেছে,কিন্তু ইসলাম সেটি করেনি। অন্যদের উৎসবগুলির দিনক্ষণ ও উপলক্ষ তাদের মনগড়া,কিন্তু ঈদের উৎসব ও তার দিনক্ষণ নির্ধারিত হয়েছে মহান আল্লাহ থেকে। তিনি যেমন পবিত্র কোরআন দিয়েছেন এবং নামায-রোযা,হজ-যাকাতের বিধান দিয়েছেন,তেমনি এ উৎসবটিও দিয়েছেন। উৎসবের পরিকল্পনায় ও উদযাপনের যে বিধানটি মহান আল্লাহতায়ালা থেকে আসে তাতে কি কোন ত্রুটি থাকতে পারে?

মুসলমানদের এ দুটি উৎসবের পেক্ষাপট যেমন ভিন্ন,তেমনি ভিন্ন তার লক্ষ্যও। এ দুটি উৎসবের কোনটিই কোন বিখ্যাত ব্যক্তির জন্মদিবস উদযাপনের লক্ষ্যে যেমন নয় তেমনি বছরের সুন্দরতম কোন দিনকে মহামান্বিত করার লক্ষ্যেও নয়। উভয় উৎসবই নির্ধারিত হয়েছে মহান আল্লাহর অনুগত গোলাম রূপে তাঁর বান্দাহ কতটা সফল বা বিজয়ী হলো সে বিষয়টিকে সামনে রেখে। এদিক দিয়ে মানব জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে সফল এবং বিজয়ী ব্যক্তিটি হলেন হযরত ইব্রাহীম (আঃ)। তিনি বিস্ময়কর প্রজ্ঞা দেখিয়েছেন কোন বৈজ্ঞানিক আবিস্কারে নয়,বরং মহা সত্যের আবিস্কারে। এবং সফলতা দেখিয়েছেন সে সত্যের আপোষহীন অনুসরণে। তিনি খুঁজে পেয়েছেন মহান আল্লাহকে। মানব জাতির ইতিহাসে এরচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ আবিস্কার আছে কি? বৈজ্ঞানিক আবিস্কারে ব্যর্থতার কারণে কেউ জাহান্নামে যাবে না, জাহান্নামে যাবে সত্য আবিস্কারে ব্যর্থতার কারণে। কি আল্লাহর উপর অটল বিশ্বাসে,কি ইবাদতে, কি হিজরতে, কি আত্মত্যাগে – আল্লাহর প্রতিটি হুকুমে তিনি নিষ্ঠার সাথে লাব্বায়েক বলেছেন। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর সে নিষ্ঠাকে নিয়ে বার বার গর্ব করেছেন। আল্লাহর নির্দেশে তিনি নিজ জন্মস্থান ছেড়ে নানা দেশের পথে পথে ঘুরেছেন। স্ত্রী হাজেরা এবং শিশুপুত্র ঈসমাইলকে যখন জনমানব শূণ্য মক্কার বুকে ছেড়ে আসার নির্দেশ এসেছে তখনও তিনি নিজের ও নিজ-পরিবারের স্বার্থকে গুরুত্ব দেননি। বরং গুরুত্ব দিয়েছেন মহান আল্লাহর ইচ্ছাকে। ফলে আল্লাহতায়ালার সে নির্দেশের জবাবে তিনি ত্বরিৎ লাব্বায়েক বলেছেন। রাব্বুল আলামীনকে খুশি করতে নিজ পুত্র ঈসমাইলকে কোরবানী করতে তাঁর গলায় ছুড়িও চালিয়েছেন। নিজ খেয়াল-খুশি ও নিজ প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে মানব জাতির ইতিহাসে এটাই হলো সবচেয়ে বড় বিজয়। আল্লাহপাক তাঁর এ বিজয়ে এতই খুশি হয়েছিলেন যে তাঁর সে বিজয়কে তিনি মানবজাতির উৎসবে পরিণত করেছেন। এবং সেটি ক্বিয়ামত অবধি। মুসলমান হওয়ার অর্থ মূলতঃ মহান আল্লাহর প্রতি হুকুমে লাব্বায়েক তথা “আমি হাজির বা প্রস্তুত” বলার ধর্ম। দ্বীনে ইব্রাহীমের এটিই মূল শিক্ষা। মুসলিম নামটিও তাঁরই দেয়া। হযরত ইব্রাহীম (আঃ)র মূল কৃতিত্বটি হলো,খেয়ালখুশি ও প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে আল্লাহর উপর ঈমানকে তিনি বিজয়ী করেছেন। সে অটল ঈমান কে ব্যক্ত করেছিলেন এভাবে,“নিশ্চয়ই আমার নামায,আমার কোরবাণী,আমার বেঁচে থাকা এবং আমার মৃত্যুবরণ –সবকিছুই আল্লাহর জন্য।” মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর সে প্রদীপ্ত উচ্চারণকে এতটাই পছন্দ করেছেন যে পবিত্র কোরআনে নিজ কথাগুলোর পাশে হযরত ইব্রাহীমের সে কথাগুলোকেও ক্বিয়ামত অবধি মানবজাতির জন্য শিক্ষণীয় করেছেন। মানব ইতিহাসে এর চেয়ে বড় বিজয় আর কি হতে পাররে? এ বিজয় সামরিক বিজয় নয়,শারিরীক শক্তি বা কুশলতার বিজয়ও নয়,বরং কুফরির উপর ঈমানের।হযরত ইব্রাহীম হলেন মুসলিম উম্মাহর পিতা। ঈদুল আজহার দিনে বিশ্বের মুসলমানগণ বস্তুতঃ পিতার সে বিজয়কে নিয়ে উৎসবই করে না,বরং তার আদর্শের সাথে একাত্মতাও জাহির করে। এর চেয়ে পবিত্র উৎসব আর কি হতে পারে?

 উৎসব প্রবৃত্তির উপর ঈমানের বিজয় নিয়ে

অপর দিকে ঈদুল ফিতর হাজির হয় বিজয়ের আরেক প্রেক্ষাপটে। সেটি মাসব্যাপী আত্মসংযম, আত্মপরিসুদ্ধি, ও আল্লাহতে আত্মসমর্পণের। উৎসব আসে মাহে রামাদ্বানের মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ শেষে। অন্য মাসে পানাহারের ন্যায় বহু কিছুই হালাল, কিন্তু সেগুলির বহু কিছুই রোযা কালীন সময়ে হারাম। ঈমানদার হওয়ার শর্তই হলো হারাম-হালাল নিয়ে আল্লাহর প্রতিটি হুকুমের কাছে আত্মসমর্পণ করা। সেটি জীবনের প্রতি মুহুর্তে। “শুনলাম এবং মেনে নিলাম” –থাকতে হবে এমন এক সদাপ্রস্তুত চেতনা। তেমন একটি চেতনার কারণে মু’মিন ব্যক্তি একান্ত নিভৃতেও কিছু খায় না। তীব্র ক্ষুধা বা প্রচণ্ড তৃষ্ণার মুখেও খাদ্য বা পাণীয় মুখে দেয় না। লোক দেখাতে মানুষ নামায পড়তে পারে,অর্থদান করতে পারে,এমন কি হজও করতে পারে। কিন্তু লোক দেখানোর সে লোভ কি একান্ত গোপনে কিছু খাওয়া থেকে বিরত রাখতে পারে? এক্ষেত্রে যেটি কাজ করে তা হলো আল্লাহর ভয় তথা তাকওয়া। নামায-রোযা, হজ-যাকাতের ন্যায় ইসলামে যত ইবাদত তার লক্ষ্য মাত্র একটিই। তা হলো ঈমানদারের জীবনে তাকওয়া বৃদ্ধি। প্রশ্ন হলো তাকওয়ার অর্থ কি? তাকওয়া হলো, জীবন যাপনের প্রতি পদে মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিটি হুকুম ও তাঁর প্রদর্শিত সিরাতুল মুস্তাকীম মেনে চলার গভীর তাড়না। সে সাথে সে প্রদর্শিত পথ থেকে বিচ্যুতির প্রচণ্ড ভয়। যার মধ্যে মহান আল্লাহতায়ালার হুকুম মেনে চলার তাড়না নাই এবং তাঁর প্রদর্শিত পথ থেকে বিচ্যুত হওয়ার ভয়ও নেই, তার মধ্যে যে বিন্দুমাত্র তাকওয়াও নাই –তা নিয়ে কি সন্দেহ থাকে? মহান আল্লাহতায়ালার কাজে কোরবানীর রক্ত বা গোশতো পৌঁছে না, রুকু-সিজদাও পৌঁছে না। পৌঁছে এই তাকওয়া। ব্যক্তির প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা তো এটাই যে সে তার সকল বুদ্ধিবল ও অর্থবলকে তাকওয়ার বল বাড়াতে ব্যয় করবে। এটিই আখেরাতের মুদ্রা। ব্যক্তির জীবনে তাকওয়া সুস্পষ্ট দেখা যায়, -যেমন দেখা যায় মুর্তিপূজা, ব্যক্তি পূজা, চুরি-ডাকাতি ও সন্ত্রাসীর ন্যায় দুবৃত্তি। যে ব্যক্তি ঘুষ খায়, সূদ খায়, সূদ দেয়, মিথ্যা কথা বলে, রাস্তায় বেপর্দা চলে, চুরি-ডাকাতি ও সন্ত্রাসী করে এবং দেশে শরিয়ত, হুদুদ, খেলাফত ও জিহাদের বিরুদ্ধে  রাজনীতি করে -সে ব্যক্তির মাঝে কি সামান্যতম তাকওয়া আছে? সে তো মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর দ্বীনের দুষমন। সে যদি সারা বছর রাজা রাখে, শত শত গরুবাছুর কোরবানী করে বা প্রতি বছর হজ্ব করে -তাতে কি তাকওয়ার প্রমাণ মেলে? তাতে কি পাপ মোচন হয়? বরং সে ব্যক্তিই তো তাকওয়ার অধিকারী বা প্রকৃত মুত্তাকী যে মাসভর রামাদ্বানের রোযা রাখে এবং আল্লাহর প্রতিটি হুকুমকে মেনে চলে । সেই বস্তুতঃ বিজয়ী। এ বিজয় লোভ-লালসা ও প্রবৃত্তির খায়েশাতের উপর তাকওয়ার বিজয়। মুমিনের জীবনে ঈদুল ফিতর আসে সে বিজয়ের উৎসব নিয়ে।

ঈদুল ফিতরের গুরুত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব বুঝতে হলে রোযার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বুঝা জরুরী। এবং ঈদুল আযহার গুরুত্ব বুঝতে হলে বুঝতে হয় হযরত ইব্রাহীম (আ:)র জীবনের মিশন। ব্যক্তির সে সমঝ-বুঝই ঈদকে ইবাদতে পরিণত করে; এবং জনগণের জীবনে জন্ম দেয় গভীর সাংস্কৃতিক বিপ্লবের। নইলে ঈদ অর্থশূণ্য থেকে যায়। নামাযের ন্যায় রোযারও মূল লক্ষ্য হলো, মুসলমানদের মনে তাকওয়া বা আল্লাহভীতি সৃষ্টি। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে,“হে ঈমানদারগণ রোযা তোমাদের উপর ফরয করা হয়েছে, যেমন ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর যেন তোমরা তাকওয়া তথা আল্লাহর ভয় অর্জন করতে পার।”- সুরা বাকারা, আয়াত ১৮৩)। আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত,মাগফেরাত এবং আখেরাতে নাজাত প্রাপ্তির জন্য অপরিহার্য হলো এই তাকওয়া। জান্নাতে প্রবেশের এটিই হলো মূল চাবি। তাকওয়া হলো মু’মিনের মনে আল্লাহর কাছে জবাবদেহীর সার্বক্ষণিক এমন এক জাগ্রত চেতনা যা তাকে প্রতিদিন ও প্রতিক্ষণে আল্লাহর প্রতিটি হুকুমের আজ্ঞাবহ গোলামে পরিণত করে। ফলে ঈমানদারের প্রতিটি দিন ও প্রতিটি মুহুর্ত কাটে আল্লাহর প্রতি হুকুমের আনুগত্য নিয়ে। সেটি প্রকাশ পায় তার কথা,কর্ম ও আচরণে। আর আল্লাহর যে কোন হুকুমের আনুগত্যই তো ইবাদত। তাই ঈমানদারের ইবাদত শুধু নামায-রোযা,হজ-যাকাতে সীমাবদ্ধ থাকে না,সে তো সর্বক্ষণের আবেদ। এরূপ তাকওয়াকে মু’মিনের জীবনে স্থায়ী তথা সার্বক্ষণিক করাই রামাদ্বানের রোযার মূল লক্ষ্য। মু’মিনের ঈমান তখন দৃশ্যমান হয় তাঁর ধর্ম-কর্ম,আচার-আচারণ,ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজনীতি,সংস্কৃতি, যুদ্ধবিগ্রহ তথা জীবনের সর্বাঙ্গ জুড়ে। এভাবে রোযা আল্লাহর গোলামীকে ব্যক্তির জীবনে চির অভ্যাসে পরিনত করে। তখন সে আল্লাহর গোলাম শুধু নামাযে নয়,শুধু রোযা বা হজকালীন সময়ে নয় বরং সর্বক্ষণে এবং সর্বক্ষেত্রে। এটিই হলো মু’মিনের জীবনে সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন। সে তখন পরিণত হয় মহান আল্লাহর সেনাদলের সার্বক্ষণিক সৈনিকে। মাহে রামাদ্বান তাই ইসলামের অতিগুরুত্বপূর্ণ ট্রেনিংয়ের মাস। ট্রেনিং পর্বের শিক্ষাগ্রহণে যারা কৃতকার্য হয় তাদের নিয়ে ট্রেনিং শেষে যেমন সমাপনি উৎসব হয় তেমনটি আছে ইসলামেও। ঈদুল ফিতরের উৎসব তো সেটাই।

রামাদ্বানের এ পবিত্র মাসটিতে তাকওয়া অর্জনে যারা সফল হয়, সেসব মোত্তাকীদের জন্য এ মাসটিতে রয়েছে বিশাল সুখবর। তাদের জন্য মহান আল্লাহতায়ালা খুলে দেন রহমত,মাগফেরাত এবং নাজাতের দ্বার। এ মাসেই রয়েছে লায়লাতুল ক্বদর যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। এ পবিত্র মাসে যারা রোযা রাখে, তারাবিহ নামায পড়ে, নানাবিধ নফল ইবাদত করে এবং মিথ্যা-ইর্ষা-কুৎসা-গিবত ও নানাবিধ খারাপ কর্ম থেকে বাঁচে এবং লায়লাতুল ক্বদরের রাতে মহান আল্লাহতায়ালা থেকে মাগফেরাতের সুযোগ নেয়, এ মাস তাদের জন্য বয়ে আনে জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য। এ পবিত্র মাসের ইবাদতের বরকতে মাফ হয়ে যায় অতীত জীবনের সকল গুনাহ। এবং বিপুল সমৃদ্ধি আসে ঈমানে। মু’মিনের জীবনে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কি হতে পারে? ব্যবসায়ীক লাভ,পেশাদারি সাফল্য,বিপুল অর্থপ্রাপ্তি বা কর্ম জীবনের অন্য কোন সফলতায় কি এমন অর্জন ঘটে? এমন সফলতা খুশি বয়ে আনবে সেটিই কি যথার্থ নয়? আল্লাহতায়ালাও চান,তাঁর অনুগত বান্দারা জীবনের এ বিশাল অর্জনের পর উৎসব করুক। সেই জন্যই তিনি ঈদুল ফিতরের বিধান দিয়েছেন।

রামাদ্বান হলো প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মাস। যুদ্ধজযের পর যোদ্ধারা যেমন মহাধুমধামে উৎসব করে, ঈমানদারেরাও তেমনি প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধজয়ের পর উৎসব করে। ঈদুল ফিতরে ঘটে সে উৎসবেরই আয়াজন। তবে এ পবিত্র মাসটিতে যারা রোযা রাখেনি এবং তাকওয়া অর্জন করেনি, প্রকৃত অর্থেই তারা ব্যর্থ। এ পবিত্র মাসটিতে নিজেদের বিদ্রোহী প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তারা অংশই নেয়নি। ফলে তারা বিজয়ী হবে কীরূপে? বরং পরাজিত ক্ষুধা,যৌনতা,অশ্লিলতা তথা অবাধ্য প্রবৃত্তির কাছে। ঈদুল ফিতরের উৎসবের দিনে এমন পরাজিত ব্যক্তিদের জন্য খুশির কিছু নেই। এদিন তো তাদের জন্য মাতমের। তারা তো মহান আল্লাহর অবাধ্য বান্দাহ। এরূপ অবাধ্যতা তো কুফরি। তাদের সে অবাধ্যতা বিমূর্ত হয় শুধু রামাদ্বানে নয়, বরং বছরের অপর ১১টি মাসেও। রামাদ্বানের এ ব্যর্থতা তাদের জীবনে দুঃখময় বিপর্যয় ডেকে আনে। এমন বিপর্যয় নিয়ে তারা উৎসব করে কি করে? নবীজী (সাঃ) তাই তাদের জন্য বলেছেন,“মাহে রামাদ্বানে যারা রোযা রাখেনি তাদের জন্য এ ঈদ খুশির নয়, বরং বড়ই অখুশির।”

আনন্দ যেখানে সার্বজনীন

ইসলামের কল্যাণের ধর্ম। কল্যাণ চায় ব্যক্তির সাথে সমষ্ঠিরও। কল্যাণ চায় সমাজের ধনী-দরিদ্র সর্বশ্রেণীর মানুষের। তাই উৎসবের মাঝেও সে কল্যাণ-চেতনা থেকে ঈমানদারদের বিচ্যুতির অবকাশ নেই। এ দিনে সমাজের সচ্ছল মানুষেরা আনন্দ করবে করবে আর অভাবী মানুষেরা সে আনন্দ নীরবে দেখবে সে বিধান ইসলামে নাই। ঈদের আনন্দ এখানে সার্বজনীন। খুশির এ দিনটিতে কল্যাণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে সমাজের অভাবগ্রস্থ দুঃখী মানুষেরও। অনাথ-ইয়াতিম-দুস্থ্য মানুষেরাও যাতে ঈদের খুশিতে সামিল হতে পারে সে জন্য ঈদের জামায়াতে শামিল হওয়ার পূর্বে তাদের হাতে ফিতরার টাকা পৌঁছে দিতে হয় প্রতিটি স্বচ্ছল মুসলমানকে। নবীজী (সাঃ) হাদীস,যে ব্যক্তি ফিতরা না দিয়ে ঈদের নামাযে হাজির হয় তার রোযা আল্লাহর আরশের নীচে শূণ্যে ভাসতে থাকে। তাই রোযা কবুলের শর্ত হলো ঈদের নামাযে হাজির হওয়ার পূর্বে পরিববারে প্রতিটি সদস্যের মাথাপিছু ফিতরা আদায় করা। এটি গরীবের হক,ধনীর দান বা কৃপা নয়। সমাজের অভাবগ্রস্থদের খুঁজে বের করার দায়িত্ব এখানে প্রতিটি স্বচ্ছল ব্যক্তির। সম্পদ লাভের সাথে সাথে মু’মিনের ঘাড়ে এ এক বাড়তি দায়িত্ব। গরীবেরা এসে তার দরওয়াজায় ধর্ণা দিবে এবং ফিতরা ভিক্ষা করবে সেটি ইসলামের বিধান নয়। এমন বিধানে গরীবের প্রচ্ণ্ড অসম্মান হয়। এভাবে গরীবের অসম্মান বাড়িয়ে কি ঈদের খুশি হয়? নির্মিত হয় কি সামাজিক সংহতি? প্রতিষ্ঠা পায় কি শান্তি? ইসলাম ভিক্ষাবৃত্তির সংস্কৃতি গড়ে না, গড়ে দানের সংস্কৃতি। ইসলাম তাই ধনীকে বরং গরীবের দরজায় ছুটতে বলে। খলিফা হযরত উমর (রাঃ) তাই আটার বস্তা নিজের কাঁধে চাপিয়ে ক্ষুদার্ত মানুষের ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন। সম্পদ-লাভ এভাবেই মু’মিনের জীবনে অহংকার না বাড়িয়ে দায়িত্ববোধ বাড়ায়। অর্থ এভাবেই তাঁকে পরীক্ষার মুখে ফেলে। ইসলাম চায় সমাজের ধনী-দরিদ্র সর্বস্তরের মানুষের মাঝে সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় মজবুত একতা। দানখয়রাত এবং গরীবের কল্যাণ চিন্তা সে একতার নির্মাণে সিমেন্টের কাজ করে। দুস্থ দরিদ্র জনগণ তখন সমাজের হৃদয়বান স্বচ্ছলব্যক্তিদের আপন ভাবতে শেখে। শোষন-নির্ভর পুঁজিবাদী দেশে ধনী-দরিদ্রের যে বিশাল বিভাজন ও বিভেদ সেটি রাজনৈতীক লড়াই ও রক্তক্ষয়ী শ্রেণীযুদ্ধের জন্ম দেয়্, কিন্তু ইসলামী সমাজে সেটি ঘটে না। বরং সমাজের ধনী ব্যক্তিগণ বুঝে,অর্থসম্পদ তাদের উপর মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত আমানত। যেরূপ পবিত্র আমানত হলো তার নিজ জীবন। মু’মিনের দায়িত্ব হলো, অর্পিত এ আমানতকে আল্লাহরই নির্দেশিত পথে ব্যয় করা। নইলে প্রচণ্ড খেয়ানত হয়। আর সে খেয়ানত ইহকালে আযাব এবং পরকালে জাহান্নাম ডেকে আনে। তাই মু’মিন ব্যক্তি সম্পদশালী হলে জীবন যাপনে স্বেচ্ছাচারি হয় না,এবং স্বেচ্ছাচারি হয়না সম্পদের ব্যয়েও। আর এমন একটি আত্মসচেতন ও আত্মসমর্পিত চেতনার কারণেই বাংলাদেশের মত একটি দরিদ্র দেশেও ঈদুল ফিতরের উৎসবে বহু শতকোটি টাকা ধনীর পকেট থেকে গরীবের ঘরে গিয়ে পৌঁছে। ফিতরার অর্থের সাথে যোগ হয় বহু শত কোটি টাকার যাকাতের অর্থ। ফলে আনন্দের ছোয়া লাগে লক্ষ লক্ষ গরীব মানুষের ঘরে। মুসলিম সমাজে এমন অর্থ হস্তান্তরের ফলে ক্রয় ক্ষমতা বাড়ে বহু কোটি দরিদ্র মানুষের। ফলে রক্ত-সঞ্চালন হয় অর্থনীতিতে। মুসলিম দেশ তো এই ভাবেই সামাজিক কল্যাণ ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথে এগুয়। একই ভাবে ঈদুল আযহার দিনে হাজার হাজার টন কোরবানীর গোশত বিতরণ হয় মুসলমানদের ঘরে। আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার ফলে মক্কা থেকে কোরবানীর গোশত গিয়ে পৌছে বহু হাজার মাইল দূরের শত শত ইয়াতিম খানা,উদ্বাস্তু শিবির ও দুস্থ্য পল্লীতে। অর্থাভাবে বা পুষ্টির অভাবে মুসলিম প্রাণ হারাবে সেটি একারণেই অভাবনীয়। এবং সেটি ঘটলে বুঝতে হবে,সে সমাজ যে শুধু বিবেকশূণ্য তাই নয়, ইসলামশূণ্যও। ইসলামের প্রাথমিক যুগে যাকাতের অর্থ নেয়ার লোক পাওয়া যেত না মদিনাতে। অর্থের সুষ্ঠ বণ্ঠন হলে প্রতি সমাজেই তেমনটি ঘটে। অভাব, দুর্ভিক্ষ ও অনাহারে মৃত্যু তো সামাজিক অবিচার,অর্থনৈতিক শোষণ,রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্বৃত্তির ফল। অতীতে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ নেমে এসেছে তো এগুলির ফলে। একই কারণে,দুনিয়ার সবচেয়ে সম্পদশালী দেশ হওয়া সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বহু নগরীতে বহু দুস্থ্য মানুষের বাস।

অনন্য উৎসব সমগ্র মানবসংস্কৃতিতে

প্রতি ধর্মে এবং প্রতি জাতির জীবনেই উৎসব আছে। আনন্দ প্রকাশের নানা দিনক্ষণ,পর্ব এবং উপলক্ষও আছে। কিন্তু ইসলামের ঈদে যেরূপ সার্বজনীন কল্যাণ চিন্তা আছে সেটি কি অন্য ধর্মে আছে? ইসলামের ন্যায় অন্য কোন ধর্মে ধনীদের উপর দরিদ্রদের জন্য অর্থদান বাধ্যতামূলক? খৃষ্টান ধর্মে সবচেয়ে বড় উৎসব হলো ক্রীসমাস। এ উৎসবে বিপুল সাজ-সজ্জার আয়োজন আছে,বিস্তর অর্থব্যয়ও আছে। কিন্তু সে উৎসবে যাকাত-ফিতরার ন্যায় গরীব মানুষের অর্থদানের নির্দেশ নেই। ক্রীসমাসের দিনে যে ভোজের আয়োজনের করা হয় সেগুলি নিতান্তই পারিবারীক। তাতে বিপুল আয়োজন হয় খাদ্য ও পানীয়ের। মদ্যপান হয়, নাচগানও হয়। বিপুল আদান-প্রদান হয় উপহারের। কিন্তু সে উৎসবে দরিদ্র মানুষের কি ভাগ আছে? সেসব পারিবারীক ভোজে এবং উপহারের আদান প্রদানে পরিবারের বাইরের মানুষের কোন অধিকার নেই। তাছাড়া ক্রীসমাসের উৎসবে প্রকৃতির উপর নাশকতাই কি কম? কোটি কোটি গাছ কেটে ঘরে ঘরে ক্রীসমাস ট্রি সাজানো হয়। উৎসবের পর সে সবুজ গাছগুলোকে আবর্জনার স্তুপে ফেলা হয়।একই ভাবে বিপুল তছরুপ হয় পুঁজা উৎসবে। শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে ও হাজার হাজার মুর্তি নির্মাতার বহু শ্রমে গড়া হয় হাজার হাজার মুর্তি। কিন্তু এত শ্রম,এত অর্থ,এত কাট-মাটি ও রংয়ে গড়া মুর্তিগুলি অবশেষে পানিতে ফেলা হয়। এতে দূষিত হয় নদী ও জলাশয়ের পানি। ভারতীয় হিন্দুদের বড় উৎসব হলো দেয়ালী। সেখানেও কি নাশকতা কম? শত শত কোটি টাকা ব্যয় হয় বৈদ্যুতিক বাতিতে শহরগুলি সাজাতে। বিপুল অর্থ ব্যয় হয় আতশ বাজীতে। তাতে যেমন পরিবেশদূষণ ঘটে,তেমনি মাঝে মাঝে ভয়ানক দূর্ঘটনাও ঘটে। অথচ এত অর্থব্যয়ের মাঝে গরীবের অর্থদানের কোন ব্যবস্থা নাই। পুজার মন্ডপে আয়োজিত হয় হিন্দি ফিল্মি গান ও অশ্লিল নাচ। ফলে পবিত্রতা কোথায়? কোন আয়োজন তো তখনই পবিত্রতা পায় যখন সেটি একমাত্র মহানস্রষ্টাকে খুশি করার উদ্দেশ্যে আয়োজিত হয়। এবং যিকর হয় তাঁর পবিত্র নামের। কিন্তু যেখানে ফিল্মি গান ও নাচের অশ্লিলতা সেখানে কি পবিত্রতা থাকে? ইসলামের ঈদে কি এমন অপচয়, এমন নাচগান ও অশ্লিলতার আয়োজন আছে? বর্ষবরণ,বসন্তবরণ,জাতীয় দিবস উপলক্ষে দেশে যে উৎসব হয় তাতেও কী গরীব মানুষের কোন কল্যাণ চিন্তা থাকে? থাকে কি পবিত্রতা?

অথচ ঈদের উৎসবের শুরু আতশবাজি বা উলুধ্বনির মধ্য দিয়ে নয়। এতে নাচগান যেমন নেই, তেমন মদ্যপানও নেই। বরং দিনের শুরুটি হয় অজু-গোছলের মধ্য দিয়ে। পরিবারের সবাই পরিধান করে উত্তম পোষাক। পাঠ করা হয় মহান আল্লাহর নামে তাকবীর। এভাবে দিনের শুরু থেকেই প্রাধান্য পায় পবিত্রতা। মহল্লার ঈদগাহে বা মসজিদে সে হাজির হয় আল্লাহর নামে তাকবীর দিতে দিতে। এদিনটিতে বিশাল জামায়াতে নামায হয়, খোতবাহ হয় এবং আল্লাহর দরবারে সমবেত দোয়া হয়। দোয়া শেষে একে অপরের সাথে কোলাকুলি হয়। এরপর শুরু হয় প্রতিবেশীর গৃহে ঈদের শুভেচ্ছা-সাক্ষাতের পালা। ঈদের এ দিনটিতে ঘরের দরওয়াজা সবার জন্য খোলা। কারো গৃহে মেহমান হওয়ার জন্য এ দিনে কোন দাওয়াতের প্রয়োজন পড়ে না। আত্মীয় হওয়ারও প্রয়োজন পড়ে না। মহল্লার যে কেউ যে কোন গৃহে কুশল বিনিময়ে হাজির হতে পারে। এরূপ নির্মল আয়োজন কি অন্য ধর্মে আছে? ইসলাম যেমন জামায়াতবদ্ধ ভাবে নামায আদায়ের উপর গুরুত্ব দেয়,তেমনি জামায়াতবদ্ধতা ও সমাজবদ্ধতার গুরুত্ব দেয় উৎসব পালনেও। ঈদের দিন বেশী বেশী মানুষের সাথে দেখা হবে, কুশল বিনিময় হবে এবং কোলাকোলি হবে –তেমনি একটি লক্ষ সামনে রেখে নবীজী (সাঃ) সূন্নত হলো ঈদগাহের নামাযে এক পথ দিয়ে যাওয়া এবং অন্য পথ দিয়ে ফেরার।

ঈদ দেয় মিশন নিয়ে বাঁচার নব প্রত্যয়

অনর্থক গাছ কাটা দূরে থাক,গাছের একটি ডাল ভাঙ্গা বা পাতা ছেড়াও ইসলামে হারাম। ফলে কোটি কোটি বৃক্ষ নিধন করে উৎসব পালন কীরূপে ধর্মীয় কর্ম রূপে গণ্য হতে পারে? অপর দিকে মদ্যপান এবং নাচ-গান ব্যক্তির মন থেকে আল্লাহর স্মরণকে বিলুপ্ত করে। বিনষ্ট করে সত্যসন্ধানী মানুষের ধ্যানমগ্নতা,এবং বিচ্যুতি আনে সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে। অন্য বহুজাতির উৎসবে যেমন মদ্যপান আছে তেমনি নাচগাণ এবং অশ্লিলতাও আছে। ফলে প্রচণ্ডতা পথভ্রষ্টতাও আছে। শয়তান সরাসরি আল্লাহকে অস্বীকার করতে বলে না,মুর্তিকেও পুজা করতে বলে না। হযরত আদম (আঃ)কে ইবলিস কখনই এমন অবাধ্য হতে বলেনি। কিন্তু মিথ্যা প্রলোভনে সে ভূলিয়ে দিয়েছিল মহান আল্লাহর দেয়া নির্দেশকে। ভুলিয়ে দেয় আল্লাহর স্মরণ ও আনুগত্য। মদ্যপান ও নাচ-গান তো সেটিই করে। ফলে মুসলমানের উৎসবে যেমন নাচগান নাই, তেমনি মদ্যপানও নাই। কোনরূপ অশ্লিলতাও নাই। সকল প্রকার ভেদা-ভেদ ভূলে এক জামায়াতে নামায পড়া এবং অন্যকে বুকে জড়িয়ে আলিঙ্গন করা,নিজঘরে প্রতিবেশীকে আপ্যয়ন করা হলো ইসলামের সংস্কৃতি। এমন আলিঙ্গণে ও আপ্যায়নে ধনী-দরিদ্র,আমির-উমরাহ,শাসক-প্রজার মাঝে কোন দুরত্ব রাখার সুযোগ নাই। বরং সবাইকে একই সমতলে খাড়া করে। এবং বিলুপ্ত করে বর্ণভেদ, গোত্রভেদ ও শ্রেণীভেদের বিভক্তি। উচ্চতর সমাজ নির্মাণে অপরিহার্য হলো মানুষে মানুষে এমন ভাতৃত্ব ও সৌহার্দ। সভ্যতর ও সমৃদ্ধতর সমাজ নির্মাণে এমন ভাতৃত্ব হলো সবচেয়ে বড় পুঁজি তথা সোস্যাল ক্যাপিটাল। মুসলমানের জীবনে এটিই তো মহান মিশন। মিশন এখানে বিভক্তির দেওয়াল ভাঙ্গার। প্রকৃত মুসলমান ঈদের উৎসবমুখর দিনেও সে পবিত্র মিশন ভূলে না। বরং সে মিশন নিয়ে বাঁচায় পায় নব প্রত্যয়। সমগ্র মানবসংস্কৃতিতে এমন পবিত্র ও সৃষ্টিশীল উৎসব কি দ্বিতীয়টি আছে? (তৃতীয় সংস্করণ, ২৫/০৭/১৪, দ্বিতীয় সংস্করণ ২/০৮/১৩), প্রথম সংস্করণ ১৭/০৮/১২ (২৯শে রামাদ্বান, ১৪৩৩)।




The Objective of Ramadan & the Muslims’ Failure

Assigned role and the failure

Significance of Ramadan can only be fully understood with the proper understanding of the purpose of human creation. The sole objective of Ramadan is to make believers intensely focussed cum engaged to that Divine objective; and such a relentless adherence to that objective is indeed the true expression of true iman. Those who stay away from Ramadan can’t think of that. Allah SWT made it clear vis-à-vis His vision on human creation even before the creation of the first human. Men and women are created with the sole purpose that they would work as His khalifa on earth. Khalifa is a Qur’anic jargon; and it has a special meaning and context. The term khalifa is used to mean Allah SWT’s viceroy on earth. It applies to all men and women of all colours and ethnicities. It is indeed the highest designation and honour that a man or woman can expect from his Creator. On the other hand, the Creator can delegate such a job of the greatest responsibility and honour only to those who are highly competent and trustworthy. In fact, Islam’s obligatory rituals like five time prayer, month-long fasting, haj and zakat are prescribed only to generate such competence and trust in believers.

Allah SWT used the narrative “khalifa” in the gathering of the angels to express His vision prior to the human creation. In the Islamic history, kahalifa has another connotation: to mean the prophet’s representative after his death -working on his behalf as the ruler of the Muslim ummah. But for a lay man or a woman, the title delegates a binding responsibility to everyone. It is to work as Allah SWT’s viceroy in the midst of billions of other creations. Hence, such a designation on behalf of the Almighty Creator tells a lot about the role that a Muslim must play in this world. Passing every moment on life with deep sense of such responsibility is indeed the expression of true faith (iman).  Man and woman can attain the greatest honour both here and in the hereafter only through fulfilling such a role; and any betrayal of such role can only bring the promised disgrace in this world and take to the hellfire in the hereafter.

The term “khalifa” has other connotation. A khalifa can never be sovereign; can work only as the representative or viceroy of a sovereign ruler. The problems start when these khalifas turn sovereign and treacherous against their Almighty Employer. Autocracy is incompatible with Islam; this is indeed treachery against Allah SWT. Such treacherous viceroys always deserve the severest punishment. Allah SWT keeps His hellfire ready for such rebels –as revealed in the holy Qur’an. It is indeed the major crime of the today’s Muslims that they are not playing their role as His viceroy. They have replaced Allah SWT’s sovereignty by their own sovereignty. Even in countries where the elected parliament or President has replaced dictators, the same crime of claiming sovereignty is being committed by such elected institutions. Raising an army of faithful khalifas is immensely importance in any kingdom; it is also important in Allah SWT’s kingdom. The British kings or queens ruled their occupied lands like India through such khalifas -called viceroys. These khalifas were known for their constant submission to the British crown. They were ready to do everything for the Crown, even would sacrifice their life in wars to protect the British interests. Shaitan too has such khalifas and has production sites in every nook and corner to train such khalifas. These satanic institutions train them to make them perfect performer of the assigned jobs. Allah SWT too, wants to bring the glory of Islam through His khalifas. Ramadan indeed raises and trains such an army for His cause. 

 Humans have different colours, creeds and ethnicities. But they are indeed divided into two broad categories: either they belong to khalifatullah (viceroy of Allah) or to khalifatus shaitan (viceroy of Shaitan). They also follow two different roadmaps with two different destinations: the siratul mustakeem (siratul mustaqeem) toward heaven and the siratul duallins (deviant path) towards hell. In any political arena, the form two warring brands of parties: hizbullah (the party of Allah) and hizbushshaitan (the party of Shaitan). In the hereafter, these two brands of people will have two different labels too: as’habul jannat (the dwellers of haven) and as’habun nar (the dwellers of hellfire). Hizbullah, hizbushshaitan, as’habul jannat and as’habun nar: these are all Qur’anic vocabularies to carry a distinctive massage for the whole mankind. In the holy Qur’an, there is no third category of people, nor does there exist any third type of abode. All states, societies and are indeed the constant battlefield of the two warring groups of khalifas. In such context of constant warfare, the month of Ramadan has a special significance. It provides the month-long intensive training schedule to raise the combative army of Allah. Shaitan has his own network of institutions: these are clubs, pubs, casinos, prostitutions, secular education, secular army, media and bureaucracy to raise his own army. Such institutions work day and night to distract people away from the siratul mustaqeem –as shown in the holy Quran.

The duty of Allah’s khalifa is huge -as huge is the reward in return. Witnessing the oneness of Allah (SWT), performing obligatory rituals like five time prayers, fasting in Ramadan, doing haj and giving charity must help Muslims grow up as Allah SWT’s khalifa: but these are not end in itself. A true Muslims’ journey does not end in such rituals. One can play the true role of khalifa only through full engagement in His way with all possible physical, intellectual and monetary potentials. It even needs full readiness to sacrifice his life; and the early days’ Muslims are the perfect example. In return, Allah SWT promises them the unending pleasure in the paradise. To grow such Muslims, it needs Divine institutions and curriculum. The month-long fasting in Ramadan is indeed the part of such Divine curriculum.

 

Taqwa: the sole objective

The sole objective of fasting is to generate taqwa. Allah SWT revealed, “O you who believe! Fasting is prescribed to you as it was prescribed to those before you, that you may attain taqwa” -(Sura Baqara: verse 183). To put more emphasis on it, Allah SWT has also revealed, “O you who believe! Fear Allah as He should be feared, and do not die except in a state of Muslim (who surrenders fully to Allah)”–(Sura Al-Imran: verse 102). In the above verse, Allah SWT has asked to attain appropriate level of taqwa; and also warned not to die without being a Muslims i.e. without being in a state of full surrender to Allah SWT’s orders. Hence it appears that taqwa is a key to enter jannah.  

 

The question arises: what is taqwa? Taqwa is commonly understood to be the fear of Allah SWT. But what is the nature of such fear? Human beings fear so many things. They fear death, disease, financial loss, physical harm and loss of dignity, etc. Is it such fear? Such fear comes automatically to every soul. It does not need any Divine warning. Here taqwa has special meaning. It is the fear of disobedience to Allah SWT’s commands. It is the fear of failing in akhera. It is fear of deviating from the siratul mustaqeem. When a man drives his car in a motor war he is constantly attentive to his correct driving. He understands that a slight deviation from the motor way would cause catastrophic disaster. For such disaster, it does not a minute, few seconds are enough. Hence, for every second of his journey, he is very mindful. This is his taqwa as a driver. And as a believer, he must show the same amount of awareness to adhere to every segment of the Qur’anic road-map. Muslim must pass every day and night with the full remembrance of his duty to Allah and constantly following His sharia. His personal, familial, political, judicial, cultural and economic life must comply with the Qur’anic guidance. Any amount of disobedience to such guidance only subscribes to his disbelief and disobedience against Allah SWT. These are punishable crimes. He will be made accountable for such crimes in the day of judgement. Taqwa is the fear of such failing in the Day of Judgement. It is fear of failing to grow up as full Muslim. It is fear of failing to work as anserullah. It is fear of failing to discharge duties as khalifatullah. It is fear of failing to be the part of hizbullah.    

 

How to build taqwa?

Mere belief in Allah (SWT) is not enough to build taqwa. Even before the birth of Prophet Muhammad (pbuh), many people had the name like Abd Allah which means slave of Allah (SWT). But such naming did not make them Muslim, neither raise any taqwa in their heart. Mere zikr or remembrance of Allah (SWT) is not enough either. Millions of people recite tasbih (praises) and do zikr. Thousands of sufi khanqas are doing such tasbih and zikr day and night. But how much taqwa are being built through such tasbih and zikr? To build taqwa, Allah (SWT) has His own prescription. The prescription comes in the following verse: “O humans! Engage in ibadah to your Lord Who has created you and those before you so that you can attain taqwa” -(Sura Baqara, verse 21).

But what is the meaning of ibadah? Ibadah is an Islamic jargon which means full submission to the Lord Who is the sole creator of the whole universe. It is a total slavery. While the Qur’an was being revealed, ibadah or slavery was not a new word. The contemporary Arabs knew the full implication of becoming an abed (slave). It used to be considered a live-long fulltime engagement to the master. The slaves had no liberty to satisfy their own wish. They had only to fulfil their master’s wish. Any amount of disobedience against the master was a serious offence. The master had the full right even to kill the rebellious slave. In those days, such punishment couldn’t be challenged in any court. Allah SWT wants such lifelong fulltime total commitment from His believer too. In return, He promises the endless bounties of the heaven. And the earlier Muslims fulfilled Allah (SWT)’s wish, indeed they were such perfect slave. Generating Taqwa is the prime goal of all sorts of ibada. Worshipping Allah SWT any form is a gateway towards acquiring taqwa. Hence, the verse has other implied message: ibada that does not enhance taqwa cannot be called as ibada. In such context, Ramadan has special place in Muslim life.  Since it increases the level of ibada, the chances are quite high that it will also increase the level taqwa.

Ibadah not only needs sincere intention, but also investment of time, energy, wealth, intelligence and even life. The value of ibadah depends on the degree of the investment; and taqwa develops in proportion to the level of investment. Salah, fasting and haj need invest of time, energy and money, but does not cost one’s dearest life. But jihad in the way of Allah SWT needs full readiness to sacrifice life. Hence the highest amount of taqwa is build up in the field of jihad, and not in mosque, madrasa and sufi khanqa. This is why, the companions of the prophet (pbuh) attains the highest level of taqwa. They showed their all-time readiness to sacrifice their lives. In fact more than 70 % of them become martyr. Hence in martyrdom, the level of taqwa is so high that Allah SWT will honour them with direct access to heaven without any accountability. In countries where there exist no jihad; the people suffer from serious crisis of taqwa. Such people make records in corruption.            

 

 

The engine of revolution

Taqwa doesn’t survive silently in a believer’s soul, rather shows forceful expression through the actions and the behaviour. It works as an engine of moral, cultural and political revolution. Establishment of an Islamic state by the early days’ of Islam was indeed the manifestation of taqwa. If a Muslim fails to engage in such revolution, then it raises doubt his taqwa. Taqwa propels believing men and women to strongly adhere to the Qur’anic guidance, hence generates full compliance with sharia. Therefore, presence of non-sharia law in a Muslim country is an incompatible anomaly. It is indeed a display of blatant disbelief. Absence of sharia in a country gives an accurate estimate that how far its inhabitants have deviated from the Divine roadmap. It is a clear betrayal of Allah SWT’s objective. A true believer can’t think of it: jihad instantly starts against such betrayal of Allah SWT. On the contrary, taqwa creates a strong urge in believers’ heart and mind to search for more Qur’anic orders and the prophetic traditions to comply with.  His vigilant mind stays fearful that some of commandments of Allah SWT may remain unpractised. Any non-compliance with the sharia law only exposes the hypocrisy. In the holy Qur’an, in sura Maida, Allah SWT has labelled them kafir, fasik and jalem. Such non-compliance was non-existent in early days’ Muslims.

Taqwa has other forceful expressions. It inspires people to move beyond the ethnic, linguistic and geographic boundaries to embrace their fellow brothers in Islam and emerge as united political force. Hence dismantling the divisive boundaries of so-called nation states becomes a non-negotiable political agenda of the true believers. It becomes the part of their iman. Such pan-Islamic brotherhood was the most common ingredient of Muslims’ politics in the early days, and made them the number one world power. Creating and continuing the divisions can only add humiliation –which is the major problem of the Muslims today. With such divisions, no amount of prayers will help them add any glory.

All over the world, millions of Muslims are fasting in Ramadan. Crores of people are attending five times daily prayers. Millions are performing haj. But where is taqwa? Taqwa must be visible in Muslim life through the full practise of Islam’s own systems. But where is the compliance with the Islamic systems? Out of 57 Muslim countries, Allah SWT’s sharia law does not exit even in one! Allah SWT has warned the Muslims not to be divided. But remaining divided has been the Muslims’ politics and culture. Instead of having any remorse, in fact, the Muslims are very proud of such division. They celebrate the creation of such division in the name of ethnic, tribal, linguistic and geographical nation states. Khelafa has been dismantled about 90 years ago by the hand of the secularist and nationalists enemies of Islam. But how many of the fasting men and women pay any heed to resurrection of this very fundamental Muslim institution? Khelafa also collapsed once in the past under the barbaric attack of Mongols on Baghdad. In the absence of khalifa, there was no jumma prayer in those days. The contemporary Muslims came to the forefront to resurrect this basic Muslim institution. But the present day Muslims have fully forgotten their duty and are happy with living in tiny nation states. The issue of khelafa and the Muslimhing unity are no matter in their life! 

 

The most difficult task

Reconstructing human belief, behaviour and character has been always the most difficult task in human history. It is a huge job, needs to higher human and moral quality. Even thugs and murders like colonialists could build empires and bring industrial revolutions. But they utterly failed to bring any moral revolution.  It needs not only Allah SWT’s guidance, but also His persistence assistance. Human beings can grow up in billions, but very few are capable to grow up as true human. This is why the world is infested with blood-letting criminals, aggressors, occupiers and ethnic cleansers. In the past, Allah SWT had to send thousands of prophets with guidance to bring them to the right path. Calling the deviating people to the right path is Allah SWT’s own mission. “Inn alinal huda”: Certainly Muslims assigned mission: it brought moral and spiritual failure. The outcome is catastrophic. Civilisation fails, true religion get corrupted, humans become devils and the planet gets covered with human flesh and blood only due to such moral failure. Only in the last two World Wars, 75 million people were killed. And such killing machines are still active in different parts of the world. Moreover, such failure brings Divine punishment; both here and in the hereafter.

Humans are created with body and soul. Like human body, soul too needs regular feeding and training. Otherwise souls cannot survive to meet the enlightened human standard, rather becomes the nest of the Shatan and his ugly aspirations. And the nourishing feed for the soul comes only from the Divine knowledge and deep contemplation (tafaqquh). And the holy Qur’an is the source of such Divine knowledge. Hence the journey of Islam did not start with salah, fasting or haj, but with Divine knowledge –the revelation of the holy Quran. And here is the significance of holy month of Ramadan. It is attached to the most important event of human history. The greatest gift of Allah SWT came to the mankind in this holy month. The Qur’an shows the siratul mustaqeem. It is the rope of Allah SWT to connect the people with His guidance. And the month of Ramadan executes the Divine training to connect the true believers to their Great Lord, and provides the nourishing feed to their thirsty souls.

 

Human mind is very forgetful, as well as very ungrateful. Even many people forget their parents and show them ingratitude when they grow up as adult. They even forget their Creator too. As if the whole universe is created without a Creator. The holy Qur’an depicts revealing stories of such ugly forgetfulness and ingratitude. The story of Bani Israel is a perfect example. Allah SWT rescued the people of Bani Israel from Pharaohs’ killing machine. He made a wide dry road in the middle of the sea to give them quick escape route.  They were given shelter in Sinai desert under the canopy of thick cloud. Manna and salwa came down from the sky to feed them. They did not need to work for many years. But still they were very quick to forget the blessing of Allah SWT and made idol of a cow object of worship.

 

To keep humans the Divine path is not an easy job. Mere attendance to the church or synagogue weekly is not enough to do the job. Islam addresses the issue by intensive program around the year. It brings people five times a day to the mosque, takes them to the haj and makes giving charity to the poor as an obligation. It has also prescribes jihad. In the holy month of Ramadan, such training gets more intense. Along with month-long fasting, this blessed month brings the regular spiritual feeding in other ways. It arranges long recitation of holy Qur’an in tarabih prayer and also encourages understanding of Qur’an individually. Islam thus imprints the Qur’anic knowledge and its Divine road map in the believers’ heart. Moreover, this month has the blessed night of lailatul qadr –better than 1000 nights.

 

The betrayal

Despite all the blessings and intensive trainings, the Muslims still show betrayal of the assigned mission. They have failed to discharge their duty as Allah SWT’s viceroy. But it is not the failure of Islam and its Divine prescriptions, rather the institutional failure of the Muslims countries. The recitation of holy Qur’an, the five times daily prayers, fasting in Ramadan and haj cannot achieve the goal on their own. It needs all inclusive institutional supports. Islamisation of people and the Islamisation of state are mutually contributory. One develops with the contribution from the other. It also needs to dismantle all elements of Satanic army and the devices that distract people from the siratul mustaqeem. It needs the full mobilisation of all societal, state and religious institutions to put their collective energy to keep the people in the right track. It also needs to destroy all the wrong tracks that are built to take people to the hellfire. Healthy living is impossible with the lethal bugs inside.  Hence the prophet (pbuh) of Islam and the rightly guided khalifas did not allow any Satanic institutions to function inside the Islamic state. The prophets expelled all the Jewish people from the vicinity of Medina for their stubborn opposition to the Islamic state. But afterwards, the Muslims rulers became engaged only to protect their own rule. Rather they turned against Islam.

 

Building Islamic state and Islamisation of the state institutions are not fanaticism –as labelled by the enemies, rather an indispensable Islamic need. To create and protect such a state, Jihad becomes an obligatory duty. A Muslim man or woman cannot fully practise Islam without the support of such state and state institutions. All state and non-state institutions must work together to spread Islam and protect the Muslims. It is so important that the prophet of Islam (pbuh) and his companions had to make heaviest sacrifices to make such a state. But such state and state institutions are non-existent today. Rather in most cases, these states and their institutions are working against Islam. Here lies the main difference between the early days’ Muslims and the Muslims of today. It also displays the greatest failing of the modern days’ Muslims.  Hence, the Muslims are defenceless and Islam lost its past glory.  

 

Allah SWT revealed not only the prayer rules, but also prescribed the judicial, political, economic and cultural rules. Sharia is Islam’s judicial system and khilafa is its political system. And it has also a distinctive economic system which forbids usury, bribery, hording, trafficking, gambling, monopoly, oligopoly and capitalistic exploitation of the workers and the consumers. The Islam had its distinctive culture to. It forbids free mixing of sexes, extramarital sex, exhibitionism, obscenity, adultery, pornography and displaying any sort of vulgarity. It strongly prescribes strong family bondage, marital bondage, hijab, respect of elders and love for the youngsters. But, how much of these Islamic prescriptions are being practised in Muslim countries? Millions of Muslims keep fast and offer prayers with all such forbidden practices in their midst. Keeping intact the brothel houses, clubs, casinos and other institutions of sin have been the part of their economy. To make more money, the Muslim countries are inviting the sex-tourists from abroad to make use of their sea shores and the tourist spots. Thousands of non-government and government organisations are working in Bangladesh, Pakistan, Afghanistan, Indonesia, Malaysia and other Muslim countries to teach the Muslim boys and girls how to dance, sing and entertain others. Is it the display of taqwa? What can be more betrayal of Allah SWT’s command? Only Shaitan and his friends can be happy with such projects of distracting the Muslim children from Islam.

 

The disease

Every disease has its underlying cause and the pathology. The absence of sharia, khelafa, Muslim unity, Islamic culture, Islamic education and Islamic economy is the proof of the catastrophic disease that has engulfed the whole Muslim world. These are the symptoms. But the real cause lies in the absence of Qur’anic knowledge and non-adherence to its teachings. The holy Qur’an is only recited, but not understood. Once it was a book of guidance, now it is a book of mere recitation. The present day Muslims study and take guidance from the books written by the kuffars. Those who have already decided not to take any guidance from Qur’an, do they feel any need to understand the holy Qur’an? The roadmap they are currently following in their politics, judiciary, culture, education, economy is not the same as was in the days of prophet (pbuh). Hence, the consequence is not the same either. They brought glory, and raised the finest civilisation on earth. But today’s Muslim are adding only the disgrace. They spread Islam. But now, they spread corruption. Recitation of the holy Qur’an, five times daily prayers, fasting in Ramadan, haj and giving charity have turned only rituals, and generate little taqwa. This is the real problem of the Muslims. So, Ramadan is coming and going, but the Muslims seldom move any further with the sole purpose of their creation. 16/07/14; edited 29.05. 2019.      

 




আধ্যাত্মিক বিপ্লব কেন ও কীরূপে?

অপরিহার্য কেন আধ্যাত্মিক বিপ্লব?

“আধ্যাত্মিকতা” বলতে আমরা কি বুঝি? কেনই বা অপরিহার্য “আধ্যাত্মিক বিপ্লব”? এবং কীরূপে সম্ভব এ বিপ্লব? এরূপ বিপ্লব না হলেই বা ক্ষতি কি? এ প্রশ্নগুলো অতি গুরুত্বপূর্ণ।এবং অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ হলো তাদের জন্য যারা এ বাঁচার মাঝে সার্বিক সাফল্য চায় এবং মৃত্যুর পর জান্নাত পেতে চায়। “আধ্যান” শব্দের বাংলা আভিধানিক অর্থ হলো স্মরণ বা চিন্তন।“আধ্যাত্মিক” শব্দটির মাঝে “আত্মা”র সাথে মিশ্রণ ঘটেছে “আধ্যান” শব্দের।ব্যক্তির মনে মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণে লাগাতর ধ্যানমগ্নতাই হলো আধ্যাত্মিকতা।আরবী ভাষায় মনের এরূপ অবস্থাকে বলা হয় যিকর। যিকরের মাঝেই আত্মার পুষ্টি। পশুর জীবনে সে যিকর থাকে না বলেই সে পশু। মানুষ পশু বা তার চেয়েও নীচু পর্যায়ে পৌঁছে যদি সে যিকর ও ফিকর না থাকে।এখানে ফিকরের অর্থ হলো গভীর চিন্তাশীলতা।আরবীতে এরূপ চিন্তাশীলতা বলা হয় তাফাক্কু,তায়াক্কুল ও তাদাব্বুর। নবীজী (সাঃ) চিন্তাশীলতাকে উচ্চমানের ইবাদত বলেছেন।পবিত্র কোরআনে আ’’ফালা তাফাক্কারুন,আ’’ফালা তাদাব্বারুন,আ’’ফালা তা’ক্বীলূন বলে সে চিন্তাশীলতায় বার বার তাগিদ দেয়া হয়েছে।

আধ্যাত্মিক বিপ্লবের অর্থ মানব মনে মহান আল্লাহতায়ালার যিকর ও ফিকরে বিশাল প্লাবন আনা। সে যিকর ও ফিকর তখন ব্যক্তির মনে সীমিত থাকে না,বরং কূল উপচানো জোয়ারের ন্যায় তা নেমে আসে ব্যক্তির কথা,কর্ম,লিখনি,আচরণ,রাজনীতি,সংস্কৃতি,অর্থনীতি,ব্যবসা-বাণিজ্য ও যুদ্ধবিগ্রহে।ব্যক্তির চেতনারাজ্যের এ বিশাল বিপ্লব তখন মহাবিপ্লব আনে পরিবার,সমাজ ও রাষ্ট্র জুড়ে।তখন পাল্টে যায় দেশের শিক্ষা-সংস্কৃতি,রাজনীতি ও মূল্যবোধ।তখন নির্মিত হয় উচ্চতর সভ্যতা।নবীজী (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামের আমলে তো সেটিই হয়েছিল।মানব ইতিহাসে এটিই হলো সর্বশ্রেষ্ঠ বিপ্লব।এ বিপ্লবটি ছিল বস্তুত মানব শিশুকে মানবতাসম্পন্ন প্রকৃত মানব রূপে গড়ে তোলার।ফলে এ বিপ্লব ব্যর্থ হওয়ার বিপদটি বিশাল। তখন মানব শিশুর পক্ষে মানব রূপে বেড়ে উঠাটি ব্যহত হয়।তখন সভ্যতার বদলে বাড়ে অসভ্যতা।শান্তির বদলে বাড়ে অশান্তি।

মহান আল্লাহতায়ালা চান,তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ এ মানব সৃষ্টি জৈবিক বা দৈহিক পরিচয়ের বাইরেও প্রবল এক নৈতিক ও আধ্যাত্মিক বল নিয়ে বেড়ে উঠুক। দৈহিক বলে মানব থেকে বাঘ-ভালুক-হাতি-সিংহ বহুগুণ শক্তিশালী। কচ্ছপও মানুষের চেয়ে বেশী দিন বাঁচে। মানুষের প্রকৃত গৌরব ও চ্যালেঞ্জটি বাঘ-ভালুকের ন্যায় শক্তি নিয়ে বাঁচা নয়,কচ্ছপের ন্যায় দীর্ঘ কাল বাঁচাও নয়। বরং নৈতিক গুণ নিয়ে বাঁচায়। মানবের শ্রেষ্ঠত্ব উচ্চতর সভ্যতা নির্মানের লক্ষ্য নিয়ে বাঁচায়। মু’মিনের জীবনে সেটাই মূল মিশন। সে মিশন ভূলে মানব যখনই নিছক পানাহার ও আনন্দ-উল্লাস নিয়ে বাঁচায় ব্যস্ত হয়েছে তখনই পশু থেকে মানুষের পার্থক্যটিও বিলুপ্ত হয়েছে। এরূপ পশুবৎ মানুষটি মর্যাদা হারায় মহান আল্লাহর কাছেও।সমাজে এরূপ মানুষের সংখ্যা বাড়লে আল্লাহর রহমত না এসে তখন আযাব আসে।

তাই আধ্যাত্মিক বিপ্লব অপরিহার্য শুধু ওলি-আউলিয়া,পীর-দরবেশদের জন্য নয়,এটি অপরিহার্য হলো প্রতিটি নারী-পুরুষ,বালক-বৃদ্ধেরও। কারণ,মহান আল্লাহতায়ালার সাথে আত্মিক বন্ধনটি অর্জিত না হলে বান্দার মুসলিম বা ঈমানদার হওয়াটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। শুধু মু’মিন হওয়ার জন্য নয়,মানব শিশুকে এমনকি মানব রূপে বেড়ে উঠার জন্যও সেটি অপরিহার্য।ব্যক্তির জীবনে এ বিপ্লবটি না এলে শুরু হয় আগাতর নীচে নামা। নীচে নামা মানুষটি তখন বর্বরতা ও হিংস্রতায় হিংস্র পশুকেও হার মানায়।আজ অবধি দেশে দেশে রাজনৈতিক ও সামরিক বিপ্লব কম হয়নি। সে সব বিপ্লবে মানুষের জানমালের ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ানটি অতি বিশাল। কিন্তু তাতে শান্তি বাড়েনি, প্রতিষ্ঠা পায়নি মানবতাও।মানব জাতির ব্যর্থতাটি এক্ষেত্রে অতি বেদনাদায়ক। পৃথিবী পৃষ্ঠে সবচেয়ে বড় বড় হিংস্র তান্ডবগুলি কোন বন্য পশুদের দ্বারা ঘটেনি।প্লাবন,ঘূর্ণিঝড়,সুনামী,মহামারি বা ভূমিকম্পেও হয়নি।ভয়াবহ যুদ্ধ,বিশ্বযুদ্ধ,গণহত্যা,এথনিক ক্লিন্জিং,উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের ন্যায় বীভৎস কান্ডগুলি ঘটেছে মানবতাশূণ্য বা আধ্যাত্মিকতাশূণ্য মানব-পশুদের হাতে।কম্যুনিস্টদের বিপ্লবে বহু লক্ষ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে রাশিয়া ও চীনে। এবং ২০ লাখের বেশী মানুষ মারা গেছে ক্যাম্পুচিয়ায়। সাড়ে সাত কোটি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে মাত্র দুটি বিশ্ব যুদ্ধে। অথচ ইতিহাস জুড়ে এরূপ ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের সংখ্যা দুয়েক শত নয়,বরং বড় হাজার। তাছাড়া এরূপ মানব পশুদের পাপাচারের কারণে পৃথিবী পৃষ্ঠে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে ভয়ানক আযাব নেমে আসার বিপদটিও বিশাল।

 

ইতিহাসের অনন্য বিপ্লব

প্রাথমিক যুগের মুসলিমদের সফলতার মূল কারণটি কৃষি,শিল্প বা কারিগরি বিপ্লব নয়। বরং বিশাল মাপের আধ্যাত্মিক বিপ্লব।সে বিপ্লবের ফলে মানুষ বেড়ে উঠেছিল মহামানব রূপে।বলা হয়,অধিকতর ক্ষমতা মানুষকে অধিক অত্যাচারি,দুর্নীতিপরায়ন ও আরামপ্রিয় করে। ফিরাউন-নমরুদের ন্যায় স্বৈরাচারি শাসকগণ তার উদাহরণ।কিন্তু আধ্যাত্মিক বিপ্লব ক্ষমতাধর মানুষেকেও অতিশয় বিনয়ী ও মাটির মানুষে পরিণত করে।মানুষের চিন্তা,চেতনা,চরিত্র ও কর্ম যে তখন কতটা পাল্টে যায় তার একটি উদাহরণ দেয়া যাক।খলিফা হযরত উমরা (রাঃ) ছিলেন তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রটির প্রধান। তাঁর আমলে মুসলিমগণ তৎকালীন দুটি বিশ্বশক্তি রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যকে পরাজিত করে প্রধান বিশ্বশক্তি রূপে আত্মপ্রকাশ করে। তার আমলের একটি মাত্র প্রদেশ বালাদে শাম (সিরিয়া)ভেঙ্গে সৃষ্টি হয়েছে আজ কের ৫টি রাষ্ট্র সিরিয়া,লেবানন, জর্দান, ইসরাইল ও ফিলিস্তিন।থানার দারগো বা গ্রামের মাতবরও রাস্তায় সচারচর একাকী হাঁটে না,সেটিকে তারা হীনতা বা অপমান ভাবে।অথচ সে বিশাল রাষ্ট্রটির শাসক মদিনা থেকে জেরুজালেমের দীর্ঘ ৬ শত মাইল পথ সফর করেছেন মাত্র একজন খাদেম ও একটি মাত্র উঠ নিয়ে। পালাক্রমে খাদেমকে উঠের উপর বসিয়ে তিনি নিজ হাতে উঠের রশি টেনেছেন। যখন তাদের যাত্রা জেরুজালেমের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে তখন ছিল হযরতের উমর (রাঃ)র রশি ধরে উঠের সামনে চলার পালা। প্রজাদের কল্যাণে তিনি এতটাই বিভোর থাকতেন যে মাঝ রাতে কাঁধে আটার বস্তা বহন করে ক্ষুদার্ত মানুষের ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন। সাবেক কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাস হযরত বিলাল (রাঃ)কে তিনি শ্রদ্ধাভরে সম্বোধন করতেন “সাইয়েদুনা বিলাল” অর্থাৎ “আমাদের নেতা বেলাল” রূপে।কারণ সত্যদ্বীনকে চেনার ব্যাপারে হযরত বেলাল (রাঃ) হযরত উমর (রাঃ)এর চেয়ে অগ্রণী ছিলেন এবং অকথ্য নির্যাতনও তাকে ইসলাম থেকে বিচ্যুৎ করতে পারেনি। অথচ সম্ভ্রান্ত আরব সর্দারের পিঠে চাবুক মেরে শাস্তি দিতে তিনি ইতস্ততঃ করেননি। এই ছিল হযরত উমরের আধ্যাত্মিকতা। মহান আল্লাহতায়ালার ভয় হৃদয়ে স্থান পেলে অন্য সবকিছুর ভয় তখন বিদায় নেয়।কাকে অধীক সন্মান দিতে হবে সেটি তিনি শিখেছিলেন খোদ মহান আল্লাহতায়ালার ঘোষনা থেকে।পবিত্র কোরআনের ঘোষণাঃ “ইন্না আকরামাকুম ইন্দাল্লাহি আতকাকুম” -সুরা হুজরাত আয়াত ১৩)।অর্থঃ নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে সে-ই সর্বধিক সম্ভ্রান্ত যে সর্বাধিক তাকওয়া সম্পন্ন।” তাকওয়ার গুণে সে সমাজে তাই বেলালের মত সমাজের দরিদ্র ও দুর্বলেরা সেদিন অতি সন্মানিত হয়েছেন।সমগ্র ইতিহাসে কোন অমুসলিম রাজা বা শাসক কি একটি দিন,একটি ঘন্টা বা একটি মিনিটের জন্যও এরূপ নজির সৃষ্টি করতে পেরেছে? অথচ এই হযরত উমর (রাঃ)ই নবীজী (সাঃ)র হত্যায় অস্ত্রহাতে রাস্তায় নেমেছিলেন।ইসলাম কবুলের ফলে তিনি এক ভিন্ন মানুষে পরিণত হয়েছিলেন।

 

কীরূপে আধ্যাত্মিক বিপ্লব?

সমাজ বিপ্লবে ইসলামের অবদান শুধু বিশালই নয়,অতূলনীয়ও।কোন ভূ-খন্ডে ইসলাম প্রতিষ্ঠা পেলে পরিবার ও রাষ্ট্র তখন মহামানব গড়ার ইন্ডাস্ট্রিতে পরিণত হয়।অথচ শয়তানি শক্তির হাতে রাষ্ট্র অধিকৃত হলে পরিণতিটি হয় সম্পূর্ণ বিপরীত।তখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলি পরিনত হয় মানুষরূপী হিংস্রজীবের উৎপাদন-কেন্দ্রে। ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান,ইরাকে যারা লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করলো বা অতীতে যারা রক্তক্ষয়ী ক্রসেড ও বিশ্বযুদ্ধের জন্ম দিয়েছিল তারা জঙ্গলে বেড়ে উঠেনি,বেড়ে উঠেছিল এরূপ রাষ্ট্রীয় ইন্ডাস্ট্রি থেকেই।অথচ রাষ্ট্র সম্পূর্ণ ভিন্নতর ও কল্যাণকর পরিচয় পেয়েছিল নবীজী (সাঃ)ও খোলাফায় রাশেদার আমলে।সে রাষ্ট্রে গড়ে উঠেছিল অসংখ্য উমর।ফলে সম্ভব হয়েছিল ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার নির্মাণ।তখন রাষ্ট্র পরিণত হয়েছিল আধ্যাত্মিক বিপ্লবের হাতিয়ারে। কত সাধু-সন্যাসীই তো আধ্যাত্মিকতার নামে জঙ্গলে গিয়ে বসবাস করে। হাজার হাজার সুফি-দরবেশ হুজরা,খানকা বা দরগায় গিয়ে আশ্রয় নেয়। কিন্তু তাদের হাতে বিশ্বের কোথাও কি আধ্যাত্মিক বিপ্লব এসেছে? সে সন্যাস ব্রতে নির্মত হয়েছে কি উচ্চতর কোন সভ্যতা? যে ভারতে বহুলক্ষ সাধু-সন্যাসীর বাস সে দেশটিতে বহুকোটি দরিদ্র ও অনগ্রসর মানুষ তো অচ্ছুৎই রয়ে গেছে।অচ্ছুৎদের ঘৃণা করা সন্যাসব্রতে অপরাধ গণ্য হয়না বরং ধর্মীয় কর্ম রূপে বৈধতা পায়।তাই সংসারত্যাগী সাধু-সন্যাসী প্রতিপালন বা আধ্যাত্মিকতার নামে খানকা,হুজরা বা দরগাহ গড়া মহান আল্লাহতায়ালার রীতি নয়,নবীজী (সাঃ)রও সূন্নত নয়।ইসলামের গৌরব যুগে এসব ছিল না।মুসলিম উম্মহর জীবনে ঈমানের স্রোত যখন গতি হারায় তখন আধ্যাত্মিকতার নামে এসব আবর্জনা জমতে শুরু করে।

মহান আল্লাহতায়ালার সাথে নিজ আত্মার বন্ধনটি গভীরতর করার মাঝেই আধ্যাত্মিক বিপ্লব।সে বিপ্লবে গুরুত্ব পায় পার্থিব স্বার্থের বদলে আখেরাতের স্বার্থ।গুরুত্ব পায়,আল্লাহ সুবহানা ওয়া’তায়ালা যা চান বা পছন্দ করেন সেটিকেই নিজ জীবনে প্রায়োরিটি দেয়া।মনের সে বিপ্লবটি অন্ধকার বনে-জঙ্গলে হয় না,জ্ঞানচর্চাহীন সুফিখানকা,পীরের মাজার বা হুজরাতেও হয় না। সে জন্য চাই ওহীর জ্ঞানে আলোকিত মন।সে আলোকিত মনের সৃষ্টিতে ইসলামের নিজস্ব প্রতিষ্ঠানটি হলো মসজিদ ওহীর জ্ঞান বিতরণে পৃথিবী পৃষ্ঠে মহান আল্লাহতায়ালার এটিই একমাত্র আলোকিত ঘর বা ইন্সটিটিউশন।মহান আল্লাহতায়ালার সৈনিকদের জন্য প্রতি জনপদে এটিই মূল প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। মুসলিমগণ যখন বড় বড় যুদ্ধজয় করেছে এবং জ্ঞানচর্চয় বিপ্লব এনেছে তখন মসজিদ ছাড়া তাদের কোন সেনানীবাস ছিল না।কোন বিশ্ববিদ্যালয়ও ছিল না। মসজিদের জায়-নামাজেই ঘটে মু’মিনের জীবনে সবচেয়ে বড় আত্মবিপ্লব।সে বিপ্লবটি ঘটে কোরআনী জ্ঞানে আত্মস্থ হওয়ায় এবং ইবাদতের মাঝে ধ্যানমগ্ন হওয়ায়।

 

মূল অস্ত্রটি কোর’আন

আধ্যাত্মিকতার পথে ঈমানদারের মূল যুদ্ধটি হয় তার নিজ নফস ও খায়েশাতের বিরুদ্ধে।এ যুদ্ধে তরবারি বা গোলাবারুদের ব্যবহার চলে না।অস্ত্রটি এখানে আল কোর’আন। পবিত্র কোর’আনই হলো মহান আল্লাহতায়ালার সাথে বান্দাহর একমাত্র যোগসুত্র। কোর’আনের মাধ্যমেই মহান আল্লাহতায়ালা বান্দাহর সাথে কথা বলেন এবং তাঁর অন্তরে ওহীর ইলম (জ্ঞান) ও হিকমা (প্রজ্ঞা) ঢেলে দেন। নাফসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে এটিই মুমিনের মূল হাতিয়ার।নামাজের শ্রেষ্ঠ অংশটি তাই রুকু-সিজদা নয়, বরং দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দীর্ঘক্ষণ কোরআন পাঠ।বার বার কোরআন পাঠের মাধ্যমে সে তার বিদ্রোহী নফসে হত্যা করে। নবুয়তের প্রথম সাড়ে এগারো বছর ৫ ওয়াক্ত নামাজ ও সে নামাজে আজকের ন্যায় রুকু-সিজদা ছিল না,ছিল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দীর্ঘরাত ব্যাপী কোরআন তেলাওয়াত। তারাবীর নামাযে নফসের বিরুদ্ধে সে অস্ত্রটির প্রয়োগ আরো দীর্ঘকালীন হয়।মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশঃ “জাহিদু বিহি জিহাদান কবিরা” অর্থঃ “এ দিয়ে (অর্থাৎ কোরআন দিয়ে)বড় জিহাদের যুদ্ধটি চালিয়ে যাও।” রোযা মু’মিনের মনে মহান আল্লাহতায়ালার যিকর বা স্মরণকে পুরা দিবাভাগে জারি রাখে,রাতে সে সংযোগটি আরো গভীরতর হয়।এবং সেটি তারাবীতে কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে।কিন্তু যে ব্যক্তিটি কোরআনের কথাগুলোই বুঝলো না,বা বুঝলেও তাতে ধ্যানমগ্ন হলো না -তার মনে আধ্যাত্মিকতা বাড়বে কেমনে? ঈমানদারের আধ্যাত্মিকতার মূল কেন্দ্রবিন্দুটি হলো কোরআন। মহান রাসূলে পাক (সাঃ)এর ভাষাই পবিত্র কোরআনই হলো যিকরুল্লাহিল হাকীম (প্রজ্ঞাপূর্ণ আল্লাহর যিকর),হাবলুল্লাহিল মাতিন (আল্লাহর মজবুত রশি)ও সিরাতুল মুস্তাকীম (জান্নাতের পথে সরল রাস্তা)।তাই কোরআন থেকে দূর থাকার অর্থ আল্লাহ রাব্বুল আ’’লামীনের যিকর,তাঁর মজবুত রশি ও তাঁর প্রদর্শিত জান্নাতের পথ থেকে দূরে থাকা। এমন দূরে থাকায় আধ্যাত্মিকতা হাওয়ায় হারিয়ে যায়।

মু’মিনের আলোকিত মনে যে চেতনাটি সর্বক্ষণ কাজ করে সেটি মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে জবাবদেহীতার দায়ভার।সে চেতনাটিই তাকে প্রতি পদে পথ দেখায়। জাহেলদের অন্ধকার মনে সে জবাবদেহীতার ভাবনা থাকে না,ফলে সিরাতুল মুস্তাকীমে চলায় যেমন আগ্রহ থাকে না,তেমনি সে পথটি পাওয়ার সম্ভাবনাও থাকে না।জাহেলদের থাকে পার্থিব স্বার্থসিদ্ধির প্রবল তাড়না।ফলে থাকে প্রচন্ড পথভ্রষ্টতা।অপর দিকে মু’মিনের জীবনে প্রতিক্ষণের মূল ভাবনাটি জাহান্নামের আগুণ থেকে বাঁচার।এটিই মু’মিনের তাকওয়া।এখানে ধ্যানমগ্নতাটি প্রতিদিন ও প্রতিক্ষণ মহান আল্লাহতায়ালার একান্ত আজ্ঞাবহ গোলাম রূপে বাঁচার;এবং সে সাথে সাথে তাঁরই রাস্তায় প্রাণ বিলিয়ে দেয়ার আকুতি।

“ইসলাম” এর আভিধানিক অর্থ আত্মসমর্পণ।আত্মসমর্পণটি এখানে মহান আল্লাহতায়ালার সর্বহুকুমের প্রতি।এমন আত্মসমর্পিত ব্যক্তিকেই বলা হয় মুসলমান।পবিত্র কোরআনে “উদখুলু ফিস সিলমে কা’আফ্ফা” অর্থঃ “ইসলামে পরিপূর্ণ রূপে দাখিল হয়ে যাও” বলে মহান আল্লাহতায়ালা মূলত সে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণই চেয়েছেন।ফলে ঈমানদারের  বুদ্ধিবৃত্তি,রাজনীতি,সংস্কৃতি,অর্থনীতি,ব্যবসা-বাণিজ্য তথা প্রতিটি কর্ম,চিন্তা ও আচরনের মাঝেই আসে ইসলাম তথা আত্মসমর্পণ।এবং সেটি না আসাটিই বেঈমানি।এরূপ আত্মসমর্পনের মাঝেই মু’মিনের আধ্যাত্মিকতা।দেশের রাজনীতি,সংস্কৃতি,অর্থনীতি ও প্রশাসনের অঙ্গণকে ইসলামচ্যুৎ সেক্যুলারিস্টদের হাতে সমর্পিত করে খানাকা,হুজরা বা দরগায় আশ্রয় নেয়াটি ঈমানদারি নয়,বরং গাদ্দারি।আল্লাহর দ্বীনের কোন আধ্যাত্মিক সৈনিক রাষ্ট্রের কোন একটি অঙ্গণেও আল্লাহর দ্বীনের পরাজয় মেনে নেয় না।প্রকৃত ঈমানদার ঝান্ডা উড়ানোর জন্য দেশ স্বাধীন করে না।ভাষা বা জাতির গর্ব বাড়াতেও যুদ্ধ করে না। অর্থ ও রক্ত ব্যয় করে এবং দেশ স্বাধীন করে স্রেফ আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়তি বিধান প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে।এপথেই মেলে জান্নাত।এখানেই মু’মিনের আল্লাহপ্রেম ও ঈমানদারি।তাদের বন্ধনটি ভাষা,বর্ণ,ভূগোল বা জাতিগত পরিচয় নিয়ে নয়।বরং সেটি রাব্বুল আলামীনের সাথে। সালাউদ্দীন আইয়ুবী তাই কুর্দি হয়েও স্বাধীন কুর্দিস্থান প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ করেননি।বরং আরব,,তুর্ক,কুর্দ সবাইকে সাথে নিয়ে তিনি যুদ্ধ করেছেন মুসলিম উম্মাহর স্বাধীনতা ও সংহতি বাঁচাতে। তাঁর মনে কাজ করেছে আল্লাহপ্রেম ও আধ্যাত্মিকতা।সে আল্লাহপ্রেম ও আধ্যাত্মিকতা নিয়ে মু’মিনগণ জন্মভূমি থেকে হাজার মাইল দূরে গিয়ে জিহাদ করে এবং শহীদ হয়।আল্লাহতায়ালার রাস্তায় শহীদ হওয়ার মাঝেই তাঁরা জীবনের সর্বোচ্চ সফলতা দেখে। ইসলাম বহু হাজার মাইল দূরের বাংলাদেশে পৌঁছেছে তো এমন চেতনাধারিদের ত্যাগের বিনিময়েই।এমন এক আধ্যাত্মিক বিপ্লবের কারণে যুদ্ধের ময়দানে মৃত্যুমুখি আহত ও পীপাসার্ত সৈনিকটি মুখের কাছে পানি পেয়েও পাশের অপর আহত সৈনিককে তা দিতে অনুরোধ করে।আত্মপ্রেমের স্থলে আল্লাহপ্রেম প্রবলতর হলে আচরণ এভাবেই পাল্টে যায়।কিন্তু মুসলমানদের মাঝে সে চেতনার আজ মৃত্যু ঘটেছে। ফলে থেমে গেছে ইসলামের প্রসার;এবং সে সাথে বিলুপ্ত হয়েছে মুসলমানদের শক্তি ও ইজ্জত। তারা ইতিহাস গড়ছে বরং দুর্বৃত্তি ও বিভক্তিতে।

নবীজী (সাঃ)র সাহাবাদের হাতে পীরামিড বা তাজমহল নির্মিত হয়নি।চাঁদের বুকে পা রাখার স্বপ্নও তাঁরা দেখেননি।তাদের জীবনে মূল সাধনাটি ছিল আল্লাহপ্রেমী হওয়ার। মনে ব্যাকুলতা ছিল মহান আল্লাহতায়ার কাছে কোন কর্মটি অতি পছন্দের সেটি জানার এবং প্রচন্ড তাড়না ছিল সে কর্মে প্রাণ বিলিয়ে দেয়ার।ফলে তাদের আগ্রহ বেড়েছিল জিহাদে ও শহীদ হওয়াতে। এর চেয়ে বড় আধ্যাত্মিকতা আর কি হতে পারে? আধ্যাত্মিকতার সে বিপ্লব এসেছিল সাহাবায়ে কেরামদের জীবনে। মহান আল্লাহতায়ালার গর্ব তো এমন মানুষদের নিয়ে।ফেরেশতাদের দরবারে তিনি তাদের প্রশংসা করেন।এরূপ আধ্যাত্মিক ব্যক্তিগণই শয়তান ও তার অনুচরদের মূল শত্রু। ফলে শয়তানি শক্তি চায় না,পৃথিবীর কোন প্রান্তে এমন আধ্যাত্মিক মানব নির্মাণের ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠুক এবং মুসলিমগণ বেড়ে উঠুক জিহাদের সংস্কৃতি নিয়ে। এজন্যই ইসলামি রাষ্ট্র নির্মাণের বিরুদ্ধে তাদের এতো ক্রোধ এবং বিশ্বজুড়ে গড়েছে বিশাল কোয়ালিশন।পৃথিবীর যেখানেই ইসলামি রাষ্ট্র নির্মাণের প্রচেষ্ঠা সেখানেই শুরু হয় এ শয়তানি কোয়ালিশনের বিমান হামলা। তাদের বোমা বর্ষণে নিহত হয়েছে সিরিয়া ও ইরাকের হাজার হাজার নিরপরাধ নারী,শিশু ও বৃদ্ধ।বিধ্স্ত হয়েছে হাজার হাজার ঘরবাড়ি। তারা চায়,১৩০ কোটির বেশী মুসলমান বাস করুক ইসলামি রাষ্ট্র ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠা ছাড়াই। অথচ মুসলমানদের জনসংখ্যা যখন বাংলাদেশের একটি জেলার সমানও ছিল না তখনও কি ইসলামি রাষ্ট্র,খেলাফত ও শরিয়ত ছাড়া তাদের একটি দিন বা একটি ঘন্টাও অতিক্রান্ত হয়েছে?

 

আধ্যাত্মিকতার পরিচয় কীরূপে?


দেশে আধ্যাত্মিকতা কতটা বাড়লো সেটি সুফি-দরবেশ,সুফি খানকাহ,মাজার ও পীর-মুরীদের সংখ্যা দিয়ে নির্ণীত হয় না।সুফি খানকাহগুলোর যিকর,ওজিফা পাঠ ও দরবেশী গানেও সেটি ধরা পড়ে না।বরং সঠিক ভাবে ধরা পড়ে মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের প্রতি আত্মসমর্পণ কীরূপ,কতটা প্রতিষ্ঠা পেল শরিয়তি বিধান,কতটা সংঘটিত হলো জিহাদ,কতজন শহীদ হলো সে জিহাদে এবং কতটা নির্মূল হলো শয়তানি শক্তির বিদ্রোহ -তা দিয়ে।যে দেশের রাজনীতি,শিক্ষা-সংস্কৃতি,অর্থনীতি,প্রশাসন,আইন-আদালত জুড়ে মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনের পরাজয় এবং বিজয় ইসলামের শত্রুপক্ষের -সে দেশের মানুষের আবার কিসের আধ্যাত্মিকতা? তাদের ঈমানদারিই বা কোথায়? বিদ্রোহ বা অবাধ্যতার মাঝে কি আধ্যাত্মিকতা বাঁচে? আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ ও শহীদ হওয়ার মাঝেই আধ্যাত্মিকতা তথা মহান আল্লাহতায়ালার সাথে বন্ধনের পরমতম প্রকাশ।জিহাদে তো তারাই যায় যাদের অন্তরের গভীরে মহান প্রভুর সাথে বন্ধনের টানটি প্রবল।শহীদ তো তারাই হয় যারা তাঁর সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়তি বিধানের বিজয় আনতে শুধু শ্রম,মেধা,অর্থ ও সময়ই বিনিয়োগ করে না,নিজের প্রাণও বিলিয়ে দেয়। শুধু চেতনা-রাজ্যে নয়,তাদের কর্মজীবনের সবটুকু জুড়ে থাকে মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণ।সে প্রতি মুহুর্ত বাঁচে মহান আল্লাহতায়ালার খলিফা রূপে নিজ দায়বদ্ধতা নিয়ে। যার মধ্যে এ দায়বদ্ধতা নেই সে ব্যক্তি যত বড় সুফি বা সাধক রূপেই পরিচিত পাক না কেন,আদৌ কি তাকে আধ্যাত্মিক বলা যায়? মু’মিনের যিকর কি স্রেফ মহান আল্লাহতায়ালার নামের যিকর? সেটি তো তাঁর প্রতি দায়বদ্ধতার স্মরণ।মু’মিনের জীবনে এ যিকর প্রায় প্রতি মুহুর্তের।এদের নিয়েই মহান আল্লাহতায়ালা বলেছেন,“(এরা হলো তারা)যারা দাঁড়িয়ে,বসে ও শায়িত অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে,এবং চিন্তা করে আসমান-জমিনের সৃষ্টি নিয়ে..”) সুরা আল ইমরান,আয়াত ১৯১)।যিকর ও আধ্যাত্মিকতার এটিই তো প্রকৃত রূপ।আল্লাহতায়ালার প্রতি এরূপ গভীর প্রেম নিয়ে কোন ব্যক্তি কি মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনের অপমান বা পরাজয় সইতে পারে? তাই যে দেশে জনগণের মাঝে আধ্যাত্মিকতা প্রকট,শয়তানি শক্তির দখলদারি বিরুদ্ধে জিহাদও সে দেশে প্রবলতর।তাই নবীজী(সাঃ)র এমন কোন সাহাবা ছিলেন না যিনি জিহাদে যোগ দেননি।অর্ধেকের বেশী সাহাবী শহীদও হয়েছেন।

বিশ্বে আজ মুসলিমদের সংখ্যা বেড়েছে।বিপুল ভাবে বেড়েছে নামাযী ও মসজিদের সংখ্যাও। বেড়েছে সুফি-দরবেশ ও তাদের মুরীদদের সংখ্যাও।এবং আধ্যাত্মিকতার নামে বেড়েছে সুফি তরিকা,খানকাহ,ওরশ এবং ওজিফা পাঠের বিশাল বিশাল আয়োজনও।বেড়েছে ভক্তিগান,গজল, কাউয়ালী ও মারেফতি গান।কিন্তু এতো আয়োজনের মাঝে কতটুকু বেড়েছে আধ্যত্মিকতা বা আল্লাহপ্রেম? কতটুকু বেড়েছে জিহাদে সুফিদের সংশ্লিষ্টতা? কতটুকু প্রতিষ্ঠা পেয়েছে শরিয়ত? বরং মুসলিম বিশ্বজুড়ে যা বেড়েছে তা হলো আল্লাহর দ্বীনের পরাজয়। মুসলিম দেশগুলি আজ  দেশী ও বিদেশী শত্রুদের হাতে অধিকৃত;এবং প্রতিষ্ঠা পেয়েছে কুফরি আইন-আদালত।চোখের সামনে মহান আল্লাহতায়ার দ্বীন ও তাঁর শরিয়তি বিধানের এরূপ পরাজয় দেখেও যে ব্যক্তিটি রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমায় এবং সে পরাজয় রুখতে জিহাদে নামে না বা জিহাদের প্রস্তুতিও নেয় না এবং জনগণের সামনে জিহাদের গুরুত্বও তুলে ধরে না -সে ব্যক্তি যতবড় সুফি,পীর,দরবেশ,পীরে কামেল বা আল্লামা বলে খ্যাতি পাক না কেন,তার মধ্যে যে বিন্দুমাত্র আল্লাহপ্রেম বা আধ্যাত্মিকতা নাই -তা নিয়ে কি সন্দেহ চলে? আধ্যাত্মিকতার দাবীতে এরূপ জিহাদবিমুখ ব্যক্তিগণ যে ভণ্ড –সে সাক্ষ্যটি এসেছে খোদ নবীজী (সাঃ) থেকে। নবীজী (সাঃ)র প্রসিদ্ধ হাদীসঃ যে ব্যক্তিটি জিহাদে যোগ দিল না এবং জীবনে কোন দিন জিহাদের নিয়েতও করলো না -সে ব্যক্তিটির মৃত্যু ঘটে মুনাফিক রূপে। এ ভন্ডামী দাড়ি-টুপি ও দরবেশী লেবাস দিয়ে কি লুকানো যায়?

 

আধ্যাত্মিক বিপ্লবে ব্যর্থতা

ঈমানদারের জীবনে নামায,রোযা,হজ,যাকাত ও কোরআন পাঠের ন্যায় যত ইবাদত -তার মূল লক্ষ্যটি ইবাদতকারির জীবনে আধ্যাত্মিক বিপ্লব।ইবাদত যত গভীরতর হয় এ বিপ্লবও ততই প্রবলতর হয়।আধ্যাত্মিক বিপ্লব এলে চারিত্রিক,রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিপ্লব তখন অনিবার্য হয়ে উঠে,আগুণ জ্বললে যেমন উত্তাপ অনিবার্য।ইবাদত কতটা সফল তা পরিমাপের মূল মাপকাঠিটি হলো ব্যক্তির জীবনে এই আধ্যাত্মিক বিপ্লব।নামায-রোযা-হজ-যাকাত পালন ও কোরআন পাঠে যদি সে বিপ্লবই না আসে তবে বুঝতে হবে সেগুলি প্রকৃত ইবাদত নয়,নিছক রসম-রেওয়াজ। ইবাদতের অর্থ তো মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিটি হুকুমের প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ।প্রতিদিন ৫ বার মসজিদে ডেকে নামায তো সে আত্মসমর্পণের প্রশিক্ষণই দেয়। যে ইবাদতে কোরআনী আনুগত্য বা আত্মসমর্পণ সৃষ্টি হয় না -তা কি আদৌ ইবাদত? যে ব্যক্তির আত্মসমর্পণ এমন আইনের প্রতি যে আইনে সূদ,ঘুষ ও পতিতাবৃত্তির ন্যায় জ্বিনাও সিদ্ধ -সে ব্যক্তির ইবাদতকে কি ঈমানদারি বলা যাবে? নামায-রোযা তো নবীজী (সাঃ)র আমলে মুনাফিকগণও পালন করেছে,এমনকি নবীজী (সাঃ)র পিছনে তারা নামাযও আদায় করেছে।কিন্তু সে ইবাদতে মহান আল্লাহতায়ালার সাথে তাদের আত্মিক সম্পর্কটি বাড়েনি। ফলে বাড়েনি আধ্যাত্মিকতাও।বরং যা বেড়েছে তা হলো রাব্বুল আ’’লামীনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও গাদ্দারি।

পশু বাঁচে তার জৈবিক সত্বা নিয়ে,সে বাঁচায় আধ্যাত্মিকতা নেই। সত্যকে চেনা বা বুঝার ব্যাপারে পশুর কান,চোখ ও ক্বালব কোন সাহায্যই করে না। ব্যক্তির জীবনেও একই রূপ অবস্থা সৃষ্টি হয় ঈমানশূন্যতা ও তাকওয়াশূণ্যতার কারণে।তবে পার্থক্য হলো,পশুর জীবনে অজ্ঞতা থাকলেও আল্লাহতায়ালার দ্বীনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বা অবাধ্যতা নেই।কিন্তু সে বিদ্রোহ ও অবাধ্যতা আছে মানব পশুদের মাঝে। এমন মানব পশুদের নিয়ে মহান আল্লাহতায়ালার ভাষ্যঃ“…তাদের হৃদয় আছে কিন্তু তা দিয়ে অনুভব করে না,তাদের চোখ কাছে কিন্তু তা দিয়ে দেখে না,তাদের কান আছে কিন্তু তা দ্বারা শোনে না। তারা চতুষ্পদ পশুর মত,বরং তাদের চেয়েও নিকৃষ্টতর।এরাই হলো গাফেল।”–(সুরা আরাফ আয়াত ১৭৯)।প্রশ্ন হলোঃ মহান আল্লাহতায়ালা কি তাঁর পবিত্র জান্নাত এমন চেতনাশূণ্য পশুদের দিয়ে ভরবেন?

দেহ নিয়ে বেঁচে থাকাকে নিশ্চিত করতে মহান আল্লাহতায়ালা পৃথিবী পৃষ্টে নানারূপ পানাহারের ব্যবস্থা করেছেন।আর আত্মার খাদ্য জোগাতে একাধিক কিতাব নাযিল করেছেন।এবং সে সাথে লক্ষাধিক নবীরাসূল পাঠিয়েছেন,এবং তাদের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ওহীর জ্ঞান দিয়েছেন। মানব রূপে বেড়ে উঠার ক্ষেত্রে এ হলো অতি অপরিহার্য প্রয়োজন। সে প্রয়োজন পূরণে পবিত্র কোরআন হলো সর্বশেষ কিতাব।সে অর্পিত মিশন পালনে পবিত্র কোরআনের সামর্থটিও গোপন বিষয় নয়। বস্তুতঃ সমগ্র মানব ইতিহাসে পরিশুদ্ধ আত্মার সবচেয়ে অধিক ও সবচেয়ে সবল মানুষ গড়ে উঠেছে পবিত্র কোরআনের বদৌলতে।মানব জাতির কল্যাণে এটিই হলো মহান আল্লাহতায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ দান।এ দান না পেলে মানুষের পক্ষে মানবিক পরিচয় নিয়ে বেড়ে উঠা কোন কালেই সম্ভব হতো না,তখন মানুষ বাঁচতো নিছক পশু রূপে।

মহান আল্লাহতায়ালার কাছে সর্বশ্রেষ্ঠ দানের মাসটি হলো রামাদ্বান।এবং সর্বশ্রেষ্ঠ সে দানটি হলো আল কোরআন। সে দানকে সম্মানিত করতেই তিনি রামাদ্বানে মাসব্যাপি রোযা ফরয করেছেন।এবং দান করেছেন লায়লাতুল ক্বাদর –যা হাজার মাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠতর।বহু গুণ বাড়িয়েছেন এ মাসে সম্পাদিত প্রতিটি নেক কর্মের সওয়াব। এভাবে বুঝিয়েছেন,মানব জাতির জন্য কত বড় গুরুত্বপূর্ণ দান হলো আল কোরআন। প্রশ্ন হলো,পবিত্র কোরআন নাযিল হওয়ার মাস হওয়ার কারণে যে মাসকে মহান আল্লাহতায়ালা এভাবে সন্মানিত করলেন,মুসলিমগণ নিজেরা সে কোরআনকে কতটা সন্মানিত করছে? সেটি কি অর্থ না বুঝে বার বার খতমে তেলাওয়াতের মাধ্যমে? কোরআন হিদায়েতের গ্রন্থ। না বুঝে পড়ায় কি হিদায়েত জুটে? কোরআন নাযিল হয়েছিল সিরাতুল মুস্তাকিম দেখাতে।কিন্তু সে সিরাতুল মুস্তাকীমের অনুসরণই বা কতটুকু? অনুসরণের জন্য তো সে পথের জ্ঞানটি জরুরী। সিরাতুল মুস্তাকিমের অনুসরণ হলে তো মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা পেত। গড়ে উঠতো ইসলামি খেলাফত।প্রতিষ্ঠা পেত শরিয়তি বিধান।বহুরাষ্ট্রে বিভক্তির বদলে প্রতিষ্ঠা পেত অখন্ডিত ভূগোল। কিন্তু সেটি হয়নি।অথচ এসবই তো সিরাতুল মুস্তাকীমের অবিচ্ছেদ্দ অংশ।সে অংশগুলির প্রতিটিতে পা না রাখলে কি সিরাতুল মুস্তাকীমে চলা যায়? বরং যা প্রতিষ্ঠা পেয়েছে তা তো মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। মুসলিম দেশগুলির শাসনতন্ত্র এবং আইন-কানুন ও আদালত হলো সে বিদ্রোহের দলীল। এরূপ বিদ্রোহ বা অবাধ্যতায় মধ্য দিয়ে কি মাহে রামাদ্বানের সন্মান হয়?

 

অধিকৃতি শয়তানের

মহান আল্লাহতায়ালার যিকর বা স্মরণ থেকে দূরে সরার বিপদটি তো ভয়ানক। তখন নিজের উপর অনিবার্য রূপে নিয়োগপ্রাপ্তি ঘটে শয়তানের। তখন সে ব্যক্তির চেতনা অধিকৃত হয় শয়তান ও শয়তানের সৃষ্ঠ ধ্যান-ধারণায়।এটি এক ভয়ানক শাস্তি। এ শাস্তির পরিণামে অসম্ভব হয় হিদায়েত লাভ ও জান্নাত লাভ। মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে সে শাস্তির প্রতিশ্রুতিটি এসেছে এভাবেঃ “এবং যে ব্যক্তি রহমানের স্মরণ থেকে দূরে সরলো তার তার উপর আমরা অবশ্যই নিয়োগ দেই শয়তানের এবং সে তখন তার সঙ্গিতে পরিণত হয়।এবং নিশ্চিত ভাবে তারা তাদেরকে (কোরআনে প্রদর্শিত)পথ থেকে বিচ্যুত করে,অথচ তারা ভাবে তারা সত্যপথ প্রাপ্ত।” –(সুরা যুখরুফ আয়াত ৩৬-৩৭)।আল্লাহর স্মরণ থেকে বিস্মৃত হওয়ার বিপদ যে কত ভয়াবহ -আজকের মুসলিমগণ তো তারই নজির।মুসলিম দেশে যারা ন্যাশনালিজম,ট্রাইবালিজম,সেক্যুলারিজম,লিবারালিজম,মার্কসবাদ,পুঁজিবাদ ও অন্যান্য ইসলামবিরোধী মতবাদের জয়গানে মত্ত তারা তো মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণ ও তাঁর প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে দূরে সরা লোক। তাদের গলায় তো শয়তানের রশি। তাদের বু্দ্ধিবৃত্তি, রাজনীতি,সংস্কৃতি,অর্থনীতি ও আইন-আদালতের অঙ্গণ তো অনৈসলামি ধ্যানধারণা দ্বারা অধিকৃত। এবং তারা নিজেরা পরিণত হয়েছে ইসলামের আন্তর্জাতিক শত্রুপক্ষের কোয়ালিশন-পার্টনারে। তারা ব্যস্ত শত্রুর অস্ত্র নিয়ে মুসলিম দেশগুলিতে মুসলিম নিধনে ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠা রোধে।

 

বড় বাধাটি অজ্ঞতা

মানবতা নিয়ে বেড়ে উঠার পথে সবচেয়ে বড় বাধাটি হলো অজ্ঞতা।এটি বিশাল বাধা আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রেও।পানাহার ছাড়া দেহ বাঁচে না;জ্ঞান ছাড়া তেমনি বাঁচে না ঈমান।তবে সে জ্ঞান কৃষি,পশুপালন,অর্থনীতি,শিল্প বা বিজ্ঞানের জ্ঞান নয়।সেটি হলো পবিত্র ওহীর জ্ঞান।ওহীর জ্ঞানের সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ উৎস হলো পবিত্র কোরআন।একমাত্র কোরআনী জ্ঞানই মানুষকে সিরাতুল মুস্তাকীম চিনতে সাহায্য করে এবং জান্নাতে পৌঁছায়।মহান আল্লাহতায়ালার সাথে মজবুত আধ্যাত্মিক সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে একমাত্র এটিই তাঁর রশি।পবিত্র কোরআনে হুকুম দেয়া হয়েছে এ রশিকে মজবুত ভাবে আঁকড়ে ধরার। এবং বলা হয়েছে,যে এ রশিকে আঁকড়ে ধরলো সেই সিরাতুল মুস্তাকীম তথা জান্নাতের পথ পেল।কোরআনের সাহায্যেই মহাজ্ঞানী রাব্বুল আলামীন ব্যক্তির আত্মায় সরাসরি ওহীর বানি পৌঁছিয়ে দেন।আত্মা তখন হিদায়েত পায় এবং ওহীর জ্ঞানে সমৃদ্ধ হয়।ঈমানদারের আত্মা এভাবেই পুষ্টি পায় এবং আধ্যাত্মিক বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত হয়।যে মনে ওহীর জ্ঞান নেই,বুঝতে হবে সে মনে আধ্যাত্মিকতাও নাই।

সমাজে কে জাহেল আর কে আলোকপ্রাপ্ত -সেটি নির্ণয়ের মহান আল্লাহতায়ালা নিজের মাপকাঠিটি হলো এই ওহীর জ্ঞান। এ জ্ঞানের অভাবে একজন নবেল প্রাইজ বিজয়ী বিজ্ঞানীও জাহেল হতে পারে,জাহান্নামের যাত্রীও হতে পারে।অতীতে যারা পিরামিডের ন্যায বিস্ময়কর ইমারাত গড়েছে তারা বিদ্যাবুদ্ধি কম ছিল না। কিন্তু তারপরও তাদেরকে জাহেল বা অজ্ঞ বলা হয়েছে,জাহান্নামের বাসিন্দাও বলা হয়েছে।ওহীর জ্ঞানের অভাবে জাহেলদের জীবনে আধ্যাত্মিকতা থাকে না;যা থাকে তা হলো সিরাতুল মোস্তাকীম থেকে পথভ্রষ্টতা।থাকে জাহান্নামের পথে চলার নেশাগ্রস্ততা।জাহান্নামের পথে চলায় প্রতি পদে পথ চিনে চলার প্রয়োজন পড়ে না।জাহেলদের ধর্মে জ্ঞানার্জন তাই ফরজ নয়।অথচ সিরাতুল মুস্তাকীমে প্রতিপদে পা ফেলতে হয় কোরআনি জ্ঞানের আলোয় পথ চিনে। নইলে বিচ্যুতি বা পথভ্রষ্টতা অনিবার্য। ইসলামের শুরুটি তাই কোরআন নাযিল দিয়ে।গাড়ি যেমন মুহুর্তের ভূলে খাদে গিয়ে পড়তে পারে,ব্যক্তিও তেমনি পথভ্রষ্টতার শিকার হতে পারে।আধ্যাত্মিকতার খোঁজে ভন্ড পীর-ফকির-দরবেশের আসরে গিয়ে পৌছার ঘটনাও তাই কম নয়।

মুসলিমের জীবনে মুল ফিকর বা ধ্যানমগ্নতাটি পথভ্রষ্টতা থেকে বাঁচার।এমন ধ্যানমগ্নতা থেকেই জন্ম নেয় মু’মিনের আধ্যাত্মিকতা।দরবেশী বেশভূষা এখানে গুরুত্বহীন।ধ্যানমগ্নতা এখানে সর্বাবস্থায় সিরাতুল মুস্তাকীমে অবিচল থাকার।ঈমানদার ব্যক্তি কৃষক,শ্রমিক,বিজ্ঞানী,প্রশাসক,বিচারক,ছাত্র-শিক্ষক,রাজনীতিবিদ হলেও সে বাঁচে এ ধ্যানমগ্নতা নিয়ে।এমন আধ্যাত্মিকতায় সমাজ ও রাষ্ট্র অতি দ্রুত সভ্যতর হয়।সমাজে তখন অনাবিল শান্তি নেমে আসে। সাহাবাদের আমলে তো সেটিই হয়েছিল।জীবনের মুল পরীক্ষাটি হয় যেমন আধ্যাত্মিকতা নিয়ে বাঁচায়।অথচ মানব জাতির সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাটি ঘটে এক্ষেত্রে।ব্যর্থতার এ মহাবিপদ থেকে বাঁচাতেই মহান আল্লাহতায়ালা ওহীর জ্ঞানার্জন প্রত্যেক নরনারীর উপর ফরজ করেছেন এবং লক্ষাধিক নবীরাসূল পাঠিয়ে সাহায্যও করেছেন।সফল তো তারাই যারা সে নেয়ামত থেকে ফায়দা নিয়েছে। মুসলিমের জ্ঞানার্জনের এ পর্বটি স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি লাভে শেষ হয় না।বরং সে জ্ঞানার্জনের ধারাকে বিরামহীন করতে পব্ত্রি কোরআনের সাথে সে সম্পর্কটি অটুট রাখতে হয়।এবং সেটি কবরে পৌছার পূর্বপর্যন্ত। তাই নবী পাক (সাঃ)এর নির্দেশঃ “উতলুবুল ইলম মিনাল মাহদে ইলাল লাহাদ”। অর্থঃ “দোলনা থেকে কবর অবধি জ্ঞানার্জন করো”। মুসলমানের তাই শুধু স্রেফ মুর্তিপুজা বা নাস্তিকতার বিপদ থেকে বাঁচা নয়,বরং অজ্ঞতার পাপ থেকে বাঁচাও।

 

বিষয় আত্মিক রোগমুক্তির

ব্যক্তির জীবনে অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ হলো আত্মিক রোগমুক্তি।আত্মিক রোগমুক্তির উপরই নির্ভর করে ব্যক্তির আত্মিক পরিশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক ভাবে বেড়ে উঠা। অর্থাৎ মানবিক পরিচয় নিয়ে বাঁচা। আত্মার সে রোগমুক্তিতে রয়েছে মহান আল্লাহতায়ালার নির্ভূল চিকিৎসা ব্যবস্থা।পবিত্র কোরআনের ঘোষণা,“হে মানব!তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালকের নিকট থেকে এসেছে নসিহত,এসেছে তোমাদের অন্তরে যে রোগ আছে তার আরোগ্য।এবং যারা মু’মিন তাদের জন্য এসেছে হেদায়েত এবং রহমত।”–(সুরা ইউনুস, আয়াত ৫৭)।বলা হয়েছে,“উম্মীদের মধ্য থেকে তিনি একজন রাসূল পাঠিয়েছেন যিনি তাদেরকে তাঁর আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করে শোনান,(এভাবে)তাদেরকে পবিত্র করেন,এবং তাদেরকে শিক্ষা দেন কিতাব ও হিকমত। ইতিপূর্বে তো এরাই ছিল ঘোরতর বিভ্রান্তিতে।-(সুরা জুমুয়া,আয়াত ২)। অর্থাৎ কোরআন তেলাওয়াত ও কোরআনের জ্ঞান আত্মস্থ করার মধ্য দিয়ে আসে পবিত্রতা,আসে প্রকৃত শিক্ষা ও প্রজ্ঞা।যে কারণে পবিত্র কোরআন মহান আল্লাহতায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ দান ও আধ্যাত্মিক রোগমুক্তির উপায় -সেটি বুঝার জন্য উপরুক্ত দুটি আয়াতই যথেষ্ট।পবিত্র কোরআনের জ্ঞান ছাড়া আধ্যাত্মিক বিপ্লব দূরে থাক,উচ্চতর মানব ও মানবিক সভ্যতাও গড়া অসম্ভব। মু’মিনের দায়িত্ব হলো,আল্লাহতায়ালার নেয়ামতপূর্ণ ভাণ্ডার থেকে ফায়দা নেয়া।

পশুর জীবনে ওয়াজ-নসিহতের মূল্য থাকে না।কারণ,পশুত্বের উর্দ্ধে উঠে মহান কিছু হওয়া তার লক্ষ্য নয়।সে মিশনটি তো মানুষের। মানুষকে বনজঙ্গলের গুহায় ইতর ভাবে বসবাসের জন্য সৃষ্টি করা হয়নি।বরং তাকে গড়া হয়েছে জান্নাতের উপযোগী হওয়ার জন্য।সে জন্য চাই আত্মায় পরিশুদ্ধি।পরিশুদ্ধির কাজে সহায়তা দানের দায়িত্বটি মহান আল্লাহতায়ালা নিজ হাতে নিয়েছেন।দেহে যেমন রোগ আসে,তেমনি মনেও বার বার বক্রতা ও বিভ্রান্তি আসে।সুস্থ্যতা নিয়ে বাঁচার জন্য চাই সে বিভ্রান্তি ও বক্রতা থেকে দ্রুত আরোগ্য।সে জন্য চাই প্রতিপদে হিদায়াত।হিদায়েতের সে জিম্মাদারি মহান স্রষ্টার।সে লক্ষ্য পূরণেই নায়িল হয়েছে পবিত্র কোরআন।তাই মহান আল্লাহতায়ালার ঘোষণাঃ “ইন্না আলায়নাল হুদা” অর্থঃ “নিশ্চয়ই পথ দেখানোর দায়িত্ব আমার।” –(সুরা লাইল)।বলা হয়েছে,“এটি (কোরআন) মানব জাতির জন্য সুস্পষ্ট বর্ণনা;এবং মুত্তাকীদের জন্য হিদায়েত ও নসিহত। -(সুরা ইমরান আয়াত ১৩৮)।

ইসলামের প্রথম দিকে মুসলিম জীবনে যখন নামায-রোযা,হ্জ-যাকাত ছিল না এবং কোন স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ও ছিল না তখনও মুসলিম ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ মুসলমান সৃষ্টি হয়েছে এই কোরআনের গুণে। ইসলামের প্রথম শহীদ হলেন হযরত সুমাইয়া (রাঃ) ও তাঁর স্বামী হযরত ইয়াছের (রাঃ)র। মক্কার কাফেরদের নির্মম অত্যাচার তাঁরা নীরবে সয়ে গেছেন,এবং শহীদ হয়ে গেছেন। কিন্তু আল্লাহর দ্বীন থেকে এক বিন্দু্ও তাঁরা সরেননি। মাদ্রাসা বা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে না গিয়েও তাঁরা পেয়েছেন সত্যকে চেনার জ্ঞান।তাকওয়া এবং তাজকিয়ায়ে নাফস তথা আত্মার পরশুদ্ধির এর চেয়ে বড় নমুনা আর কি হতে পারে? আজকের উচ্চ ডিগ্রিধারিগণ পায় কি সে সামর্থ? বিপদের মুহুর্তে তাঁরা পেয়েছেন মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে পবিত্র কোরআনে বর্নিত নসিহত ও হেদায়াত।মুসলমানদের জীবনে নামায-রোযা-হজ-যাকাত বেড়েছে,নফল ইবাদতও বেড়েছে এবং বিপুল ভাবে বেড়েছে মসজিদ মাদ্রাসা।কিন্তু বাড়েনি কোরআনের জ্ঞান। আল্লাহতায়ালা প্রদত্ত নসিহত,হেদায়েত ও জ্ঞানের বাণীগুলোকে যেভাবে নবী (সাঃ)র যুগে আস্তে আস্তে অন্তরের গভীরে ভাল ভাবে বসিয়ে দেয়ার কাজটি হয়েছিল -আজকের মুসলিম সমাজে তা হচ্ছে না।

“কোরআনকে আমি সহজ করে করেছি উপদেশ গ্রহণের জন্য,উপদেশ গ্রহণকারি কেউ আছে কী?” সুরা ক্বামারে মহান আল্লাহতায়ালা এ প্রশ্নটি একবার নয়,৪ বার রেখেছেন।মহান করুণাময়ের প্রত্যাশা,যে পবিত্র কোরআনে করীমকে তিনি সহজ করে নাযিল করেছেন তা থেকে মানব জাতি প্রতিকর্মে উপদেশ নিবে এবং পরিণামে জান্নাত পাবে। জাহান্নামের আগুণ থেকে বাঁচার এছাড়া কি ভিন্ন পথ আছে? কোরআন থেকে উপদেশ নেয়ার বিষয়টি এতই গুরুত্বপূর্ণ যে সেটি বুঝাতে একই সুরায় প্রশ্নটি তিনি ৪ বার রেখেছেন।চিন্তাশীল মানুষের অন্তরে ধাক্কা দেয়ার জন্য কি এটিই যথেষ্ট নয়? অথচ অন্যদের কথা দূরে থাক,খোদ মুসলমানেরা করুণাময় মহান আল্লাহতায়ালার ডাকে সাড়া দেয়নি।মুসলিম ঘরে কোরআন তেলাওয়াত হয় স্রেফ সওয়াব হাসিলের আশায়,হিদায়েত লাভ বা শিক্ষা লাভে নয়।প্রশ্ন হলো,হিদায়েত লাভ না হলে সওয়াব লাভ কীরূপ হবে? আরবী ভাষায় “সওয়াব” হলো বোনাস বা পুরস্কার,হিদায়েত নয়।বোনাস বা পুরস্কার তো তারাই পায় যারা প্রভুর হুকুমের আজ্ঞাবহ ও নিষ্টাবান,অবাধ্য বা বিদ্রোহীদের তা জুটে না। অবাধ্য বা বিদ্রোহীগণ বহিস্কৃত করা হয় এবং শাস্তিও দেয়া হয়।যারা কোরআন থেকে কোন হিদায়েতই নিল না,শরিয়তের প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে যাদের লাগাতর যুদ্ধ,এবং যাদের রাজনীতি,সংস্কৃতি,পোষাক-পরিচ্ছদ ও আচরণের মাঝে বিদ্রোহের সুর –মহান আল্লাহতায়ালা কি তাদেরকে স্রেফ কোরআন তেলাওয়াতের কারণে সওয়াব দিবেন তথা পুরস্কৃত করবেন?

কোরআনের কথাগুলো যে ব্যক্তি বুঝলোই না -তা থেকে সে ব্যক্তি হিদায়েত পাবে কীরূপে? ওহীর জ্ঞানকে সে নিজ মনের গভীরে বসাবেই বা কি করে? কোরআন না বুঝার কারণে তখন ব্যক্তির লাগাতর দুরত্ব বৃদ্ধি পায় খোদ মহান আল্লাহতায়ালা থেকে।এবং তখন বাড়ে পথভ্রষ্টতা।তাতে অসম্ভব হয় ইসলাম থেকে কল্যাণ লাভ।এবং অসম্ভব হয় আল্লাহতায়ালার সাহায্য লাভ।যে ব্যক্তি মহান আল্লাহতায়ালা থেকে এভাবে দুরে সরলো এবং যিকরশূণ্য হলো,তার মন ও মনন যে শয়তানের দ্বারা অধিকৃতি হবে সেটিই তো কোরআনে ঘোষিত মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিশ্রুতি।ফলে পৃথিবীতে মুসলিমের সংখ্যা বাড়লেও ইসলামের প্রতিষ্ঠার বাড়ছে না।বরং বাড়ছে ভিতরে ও বাইলে শয়তানি শক্তির বিজয়।অথচ আল্লাহতায়ালা ও তাঁর পবিত্র কোরআনের সাথে সংযোগ বাড়াতে প্রাথমিক যুগের অনারব মুসলিমগণ নিজেদের মাতৃভাষাকে পরিত্যাগ করে আরবী ভাষাকে গ্রহণ করেছিল।সে আমলে কোরআনের ভাষা শেখাটি এতটাই সহজ প্রমাণিত হয়েছে যে ভাষা শিখতে মিশর,সূদান,মরক্কো,তিউনিসিয়া, আলজিরিয়া,লিবিয়া,মৌরতানিয়া,সিরিয়া,ইরাকসহ বিশাল এলাকার জনগণকে স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হয়নি।

 

সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাটি

মানব জাতির সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাটি কৃষি,শিল্প,বিজ্ঞান বা ব্যবসা-বাণিজ্যে নয়।বরং সে ভয়ানক ব্যর্থতাটি আধ্যাত্মিকতায়।সভ্যতার নামে যুগে যুগে যা বেড়েছে তা সভ্যতা নয়,বরং নিদারুন অসভ্যতা। ইতিহাসে সে উদাহরনও কি কম? প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার বড় বড় পিরামিড এবং ইউরোপীয় সভ্যতার বিশাল বিশাল শহর ও শিল্পস্থাপনা তো সে অসভ্যতারই প্রতীক।পিরামিড গড়তে পাথর চাপায় মারা গেছে হাজার হাজার দাসশ্রমিক।পিরামিডগুলো তো সেটিই স্মরণ করিয়ে দেয়। ইউরোপীয়দের জৌলুস বাড়াতে এশিয়া-আফ্রিকা ও আমিরিকার কোটি কোটি মানুষকে ঔপনিবেশিক শাসনের নিষ্ঠুর নির্যাতন সইতে হয়েছে।তাদের পরিচালিত ইথনিক ক্লিন্জিংয়ে প্রায় নির্মূল হয়ে গেছে আমিরিকার রেড ইন্ডিয়ান,অস্ট্রেলিয়ার অ্যাব-অরিজিন ও নিউজিল্যান্ডের আদিবাসি মাউরী জনগণ।গরু-ছাগলের ন্যায় হাটে তুলে বেচা-বিক্রি করা হয়েছে লক্ষ লক্ষ আফ্রিকানদের। ব্রিটিশ পণ্যের কাটতি বাড়াতে বাংলার মসলিন শিল্পিদের হাতের আঙ্গুল কাটা হয়েছে।পাশ্চাত্য অসভ্যতার আরেক অসভ্য সৃষ্টি হলো ইসরাইল।ফিলিস্তিনের আদিবাসীদের নির্মূলের মধ্য দিয়ে তারা প্রতিষ্ঠা করেছে অতি আগ্রাসী ও বর্ণবাদি রাষ্ট্র ইসরাইল।পাশ্চাত্য সভ্যতার অতি ভয়ংকর দুটি উপহার হলো দুটি বিশ্বযুদ্ধ।সাড়ে ৭ কোটি মানুষ হত্যার পাশাপাশি এ দুটি বিশ্বযুদ্ধে যে পরিমান সম্পদ হানি করেছে তা দিয়ে সমগ্র বিশ্বের মানুষ বহুযুগ বিনাশ্রমে আরাম-আয়াশে কাটাতে পারতো।এত সম্পদহানি অতীতে কোন ভূমিকম্প,সুনামী বা ঘূনিঝড়ে হয়নি।হালাকু চেঙ্গিজের বর্বরতাকে এ ধ্বংসযজ্ঞ ম্লান করে দিয়েছে।তবে বিনাশের সে বর্বর ধারা দুটি বিশ্বযুদ্ধে শেষ হয়নি।ভিয়েতনাম,আফগানিস্তান ও ইরাকে আগ্রাসন ও ধ্বংসযজ্ঞ হলো নতুন সংযোজন। প্রাণনাশী ও সম্পদবিনাশী যুদ্ধবিগ্রহের সে পাশ্চাত্য ধারা আজও  অব্যাহত রয়েছে।যুদ্ধের ঘোষণা না দিয়েও চলছে ড্রোন হামলায় হত্যাকান্ড।মানবহত্যাকে পাশ্চাত্য সভ্যতার ধারকেরা এভাবে এক বিশাল শিল্পে পরিণত করেছে।তারা চালু করেছে গোয়ান্তানামো বে ও আবু গারিবের সংস্কৃতি। জুয়া,মদ্যপান,অশ্লিলতা,পর্ণগ্রাফীর সাথে ফিরিয়ে এনেছে সমকামীতার ন্যায় আদিম পাপাচার। এগুলিকে সভ্যতা ও আধুনিকতা বললে অসভ্যতা আর কাকে বলা যাবে?

পশুর বল তার দেহে,সেখানে কোন আধ্যাত্মিকতা থাকে না।তেমনি আধ্যাত্মিক থাকে না কাফেরদের যুদ্ধবিগ্রহ ও বিপ্লবেও।ফলে সেসব যুদ্ধ-বিগ্রহ ও বিপ্লবে জানমালের স্রেফ ক্ষয়ক্ষতিই বেড়েছে।তাতে বড়জোর বহুদেশের সরকার ও মানচিত্র পাল্টে গেছে।কিন্তু তাতে মানুষের চরিত্র পাল্টায়নি,শান্তিও আসেনি।মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণ বা আধ্যাত্মিকতা নিয়ে বেড়ে না উঠলে মানুষ যে কতটা ধ্বংসমুখি ও জাহান্নামমুখি হয় –এ হলো তার উদাহরণ।তাই মানব-ইতিহাসের বড় শিক্ষাঃ স্রেফ যুদ্ধবিগ্রহ ও বিপ্লবে শান্তি বা কল্যাণ নাই।আখেরাতেও কোন কল্যাণ নাই।যেগুণটি মানুষকে অন্য জীবজন্তু ও সৃষ্টিকূল থেকে শ্রেষ্ঠতর দেয় সেটি তার দৈহিক বল নয়,সেটি আধ্যাত্মিক গুণ।মানবসমাজ একমাত্র তখনই মানবিক পরিচয় পায় ও শান্তির সন্ধান পায় যখন সে আধ্যাত্মিক শক্তির বৃদ্ধি ঘটে।

ব্যক্তির জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মহৎ ও বিপ্লবটি গুণটি হলো তাকওয়া।এ গুণটি যেমন ব্যক্তির জীবনে আলোকিত বিপ্লব আনে,তেমনি মহান আল্লাহতায়ালার চলার পথে তীব্র গতিময়তা আনে। সে গতিময়তা বিপ্লব আনে উম্মাহর জীবনেও। সমাজ ও সভ্যতা তখন সামনে এগুয়। নইলে জীবন পরিণত হয় সকাল থেকে সন্ধা,সন্ধা থেকে সকাল –এরূপ বৃত্তাকারে ঘূর্ণায়মান এক গতিহীন জীবনে। প্রাচীন অজ্ঞতা,উলঙ্গতা,পাপাচার ও সমকামিতার ন্যায় নানা পাপাচার তখন সমাজে বার বার ফিরে আসে।এ কারণেই প্রাচীন জাহিলিয়াত তো পাশ্চাত্য সভ্যতায় আবার ফিরে এসেছে।তাছাড়া ইবাদত কবুলের শর্ত হলো তাকওয়া। নামায-রোযা,হজ-যাকাত তো বহু মানুষই আদায় করে।প্রতি বছর বহু লক্ষ মানুষ দেয় পশু কোরবানী।কিন্তু সবার ইবাদত বা কোরবানী কি কবুল হয়? কোরবানী দিয়েছিলেন হযরত আদম (আঃ)এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিল।হাবিলের কোরবানী কবুল হয়েছিল কিন্তু কবুল হয়নি কাবিলের। কারণ কাবুলের কোরবানীতে তাকওয়া ছিল না।বরং ছিল অবাধ্যতা।সে অবাধ্যতার কারণেই সে তার ভাই হাবিলকেও খুন করে।শুধু আমল কবুল নয়,পাপ মোচনেও তাকওয়ার বিকল্প নেই। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে,“যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করলো (তথা তাকওয়ার অধিকারি হলো)তাঁর পাপ তিনি মোচন করে দিবেন।”–(সুরা তালাক,আয়াত ৫)।তাকওয়ার বলেই ব্যক্তি পায় আল্লাহর প্রতিটি হুকুমে লাব্বায়েক তথা আমি হাজির বলার সামর্থ।সেটি যেমন নামায-রোযা,হজ-যাকাত পালনের ক্ষেত্রে তেমনি রাষ্ট্র জুড়ে শরিয়তি বিধান,সূদমূক্ত অর্থনীতি ও দুর্বৃত্তমুক্ত প্রশাসন প্রতিষ্টার ক্ষেত্রে। যার মধ্যে মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমে লাব্বায়েক বলার সে সামর্থ নাই,বুঝতে হবে তার মধ্যে তাকওয়াও নাই। এমন ব্যক্তিগণ মুখে যাই বলুক কার্যত তারা আল্লাহর অবাধ্য ও বিদ্রোহী। এমন বিদ্রোহের পরও কি তাদের ঈমান যাচায়ে বিরাট পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন আছে।এমন বিদ্রোহীদের কারণেই মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তি বিধান খোদ মুসলিম দেশে আস্তাকুঁড়ে গিয়ে পড়েছে।সূদ,জুয়া,অশ্লিলতা,পতিতাবৃত্তির ন্যায় নানারূপ অপরাধ কর্ম তখন সরকারি প্রশাসন,পুলিশ ও আদালতের প্রটেকশন পায়।অধিকাংশ মুসলিম দেশ বস্তুত অধিকৃত এরূপ বিদ্রোহীদের হাতেই।

 

নাশকতা শয়তানের

মহান আল্লাহতায়ালা চান,তাঁর গড়া সুন্দর পৃথিবীটি পরিশুদ্ধ ও উচ্চতর গুণের মানবে পূর্ণ হোক। তিনি চান,প্রতিটি মানব শিশু নিয়ামতপূর্ণ জান্নাতের বাসিন্দা হওয়ার যোগ্যতা নিয়ে বেড়ে উঠুক,এবং নির্মূল হোক এ ধরাধামে দুর্বৃত্তদের আধিপত্য ও দুর্বৃত্তকরণের প্রক্রিয়া। নির্মিত হোক মানবতায় পরিপূর্ণ এক মহান সভ্যতা। তবে সে কাজে অপরিহার্য হলো নৈতিক ও আধ্যাত্মিক বিপ্লব। সেটি যেমন ব্যক্তির জীবনে,তেমনি পরিবার,সমাজ ও রাষ্ট্র জুড়ে।সে লক্ষ্য পূরণেই মহান আল্লাহতায়ালা লক্ষাধিক নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন,তেমনি নাযিল করেছেন ৪ খানি ধর্মীয় গ্রন্থ। সে ধারায় পবিত্র কোরআন হলো সর্বশেষ কিতাব। কিন্তু মহান আল্লাহতায়ালার সে আয়োজনের বিরুদ্ধে শয়তানের আয়োজনটিও বিশাল। মুসলিম রাষ্ট্রগুলি মূলত শয়তানি শক্তির হাতেই অধিকৃত। তাদের হাতে রয়েছে ইসলামি চেতনা বিনাশী অসংখ্য রাজনৈতিক,সাংস্কৃতিক,সামাজিক,অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রতিষ্ঠান। সকল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ব্যবহৃত হচ্ছে ইসলামের বিরুদ্ধে হাতিয়ার রূপে।সংকুচিত হয়েছে কোরআন শিক্ষা। অপর দিখে বিনিয়োগ বেড়েছে গান-বাজনা,খেলাধুলা,নাটক,টিভি,সিনেমা,সাহিত্য ও পত্র-পত্রিকায়। প্রতি জনপদে গড়া হয়েছে মদ্যশালা,নাট্যশালা,সিনেমা হল,পতিতাপল্লি,সূদী ব্যাংক,ক্লাব-ক্যাসিনো গড়া হয়। লক্ষ্য,সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে বিচ্যুত করা ও পাপের পথে টানা।তখন কি সম্ভব আধ্যাত্মিক ভাবে বেড়ে উঠা?

 

শয়তানের হাতিয়ার

মানব জীবনে মহামূল্যবান সম্পদটি হলো সময়।মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে এটি এক মহামূল্য আমানত।সে আমানতের বড় খেয়ানত হয় অপচয়ে। মৃত্যু ঘনিয়ে এলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়েও এক মুহুর্ত সময় বাড়ানো যায় না। অর্থ অপচয়কারিকে শয়তানের ভাই বলা হয়েছে। কিন্তু যারা মহামূল্য সময় অপচয় করে তাদেরকে কি বলা যাবে? মহান আল্লাহতায়ালার কাছে কি এ অপচয়ের হিসাব দিতে হবে না? অথচ বিনোদনের নামে এরূপ বিশাল অপচয়কে জাতীয় সংস্কৃতিতে পরিণত করা হয়েছে।আল্লাহতায়ালার স্মরণ ও তাকওয়া বিনাশে শয়তানের হাতিয়ার বহু। সেগুলি যেমন নাচ-গান,যাত্রা ও কুসাহিত্য,তেমনি হলো খেলাধুলা।খেলায় বা খেলা দেখায় যে মন বিভোর সে মনে কি পরকালের ভয়-ভাবনা থাকে? থাকে কি আল্লাহতায়ালার যিকর। যিকরশূণ্য সে মন তখন অধিকৃত হয় শয়তানের হাতে। ফলে নামাযের ওয়াক্ত অতিক্রান্ত হলেও উঠার হুশ থাকে না। শয়তান তো এভাবেই মহান আল্লাহতায়ালা ভয় ও তাঁর স্মরণকে বিলুপ্ত করে।শত শত কোটি ঘন্টা এভাবেই বিনোদনের নামে হারিয়ে যায়। মুসলিম উম্মাহর জীবনে প্রতিবছর এ অপচয়ের পরিমান বহু ট্রিলিয়ন ঘন্টা।এর সিকি সময় দ্বীনের দাওয়াত ও জিহাদে ব্যয় হলে মুসলিম বিশ্ব থেকে বহু পূর্বেই শত্রুশক্তির দখলদারি বিলুপ্ত হতো এবং ইসলাম আবির্ভূত হতো বিশ্বশক্তি রূপে।পার্থিব জীবন তো পরীক্ষা কাল।মহান আল্লাহতায়ালার ঘোষণা,“(তিনিই সেই আল্লাহ)যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন যাতে পরীক্ষা করতে পারেন তোমাদের মধ্যে কর্মে কে উত্তম।”–(সুরা মুলক আয়াত ২)।প্রশ্ন হলো,পরীক্ষা দিতে বসে কেউ কি বিনোদনে ব্যস্ত হয়? বিনোদনে কি ধ্যানমগ্নতা সম্ভব? সম্ভব কি আধ্যাত্মিক উন্নয়ন? অথচ শয়তান সেটিই চায়। শয়তানি শক্তির হাতে ব্যক্তি,সমাজ ও রাষ্ট্র অধিকৃত হওয়ার সবচেয়ে বড় বিপদটি তো এখানেই।

 

অপরিহার্য কেন রাষ্টবিপ্লব?

আধ্যাত্মিক বিপ্লবের জন্য যা অতি অপরিহার্য তা হলো ইসলামি রাষ্ট্র বিপ্লব। আত্মার খোরাক যেমন বন-জঙ্গলে মেলে না,তেমনি শয়তানের অধিকৃত অনৈসলামিক রাষ্ট্রেও মেলে না।রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ রাস্তাঘাট,শিল্পকারখানা বা হাসপাতাল গড়া নয়। বাঘ-ভালুক থেকে বাঁচানোও নয়; বরং অতিগুরুত্বপূর্ণ কাজটি জনগণকে জাহান্নামের আগুণ থেকে বাঁচানো। মানব জীবনে এটিই সবচেয়ে বড় বাঁচা।নইলে অনন্ত অসীম কালের জন্য ঘর হয় জাহান্নামের আগুণে। সে সাথে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো,সিরাতুল মুস্তাকীমে তথা জান্নাতের পথে টানার। এটিও বিশাল শ্রমসাধ্য ও ব্যয়সাধ্য কাজ। জাহান্নামের আগুণ থেকে জনগণকে বাঁচানো ও জান্নাতের পথ দেখানোর কাজটি মূলত নবীরাসূলদের কাজ। নবী-রাসূলদের অবর্তমানে সে কাজটি নিজ দায়িত্বে নেয় ইসলামি রাষ্ট্র। ইসলামি রাষ্ট্রের অবর্তমানে সে কাজ ব্যক্তি ও পরিবারের পক্ষে অতি কঠিন হয়ে পড়ে। ইসলামি রাষ্ট্র নির্মাণ ও সে রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা এজন্যই মু’মিনদের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। একাজে  ব্শেীর ভাগ নবীজী (সাঃ)র সাহাবা শহীদ হয়ে গেছেন। অথচ শয়তানি শক্তির মিশন হলো,একাজে মুসলমানদের নির্লিপ্ত করা।

ইসলামের মহান নবীজী (সাঃ) শুধু কোরআন-হাদীস রেখে যাননি,জনগণকে জান্নাতের পথে নিতে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রও রেখে যান। প্রতিটি ঈমানদারের দায়িত্ব শুধু নামায-রোযা ও হজ-যাকাত পালন নয়, বরং সে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠায় ও প্রতিরক্ষায় আমৃত্যু সৈনিক হয়ে যাওয়া।এটিই নবীজী (সাঃ)র পক্ষ থেকে খেলাফত তথা প্রতিনিধিত্বের দায়ভার। এ রাষ্ট্রের পাহারায় এক মুহুর্ত ব্যয় করাকে নবীজী (সাঃ) সারা রাতের নফল ইবাদতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলেছেন। শত্রুর হামলার মুকে প্রতিরক্ষার কাজকে জিহাদের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। এ ইবাদতে প্রাণ গেলে তাঁকে মৃত বলাকে মহান আল্লাহতায়ালা হারাম করে দিয়েছেন। এমন শহীদদের জন্য তিনি সরাসরি জান্নাতে প্রবেশের বিধান রেখেছেন। আজকের মুসলমানদের বড় ব্যর্থতা নামাযী,রোযাদার বা হাজি হওয়াতে নয়,মসজিদ-মাদ্রাসা গড়াতেও নয়,বরং আল্লাহর দ্বীনের মুজাহিদ হওয়াতে। বিলুপ্ত ঘটেছে আল্লাহর পথে জিহাদ ও খেলাফতের। এবং যেদিন থেকে বিলুপ্ত হয়েছে খেলাফত, সেদিন থেকেই মুসলিম দেশগুলি অধিকৃত হতে শুরুকরেছে ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে। বিচ্যুতি বেড়েছে সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে। এবং বিলুপ্ত হয়েছে ইসলামের শরিয়তি বিধান। আর শরিয়ত পালন না হলে কি ইসলাম পালন হয়? মহান আল্লাহতায়ালার হুশিয়ারিঃ “মান লাম ইয়াহকুম বিমা আনাযাল্লাহু ফা উলায়িকা হুমুল কাফিরুন, …হুমুল যালিমুন, …হুমুল ফাসিকুন” অর্থ আল্লাহ যে বিধান নাযিল করেছেন তা অনুযায়ী যারা বিচার ফয়সালা করে না তারাই কাফির, ….তারাই যালিম, ….তারাই ফাসিক।” –সুরা মায়েদা আয়াত ৪৪, ৪৫, ৪৭)। কাফির,যালিম ও ফাসিক হওয়ার জন্য কি তাই মুর্তিপুজারি,অগ্নিপুজারি বা নাস্তিক হওয়ার প্রয়োজন পড়ে? দেশের বিচার কাজ থেকে মহান আল্লাহর নাযিলকৃত শরিয়তি বিধানের অপসারণই যথেষ্ঠ।অজ্ঞতা অবাধ্যতাই বাড়াই।জাহিলিয়াতের এটিই তো খাসলত।মুসলিম দেশে তাই বেড়েছে শরিয়তের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। ঔপনিবেশিক শাসনের বদৌলতে মুসলমানদের চেতনা রাজ্যে ঘন মেঘের ন্যায় ছেয়ে আছে জাহিলিয়াত।সে মেঘ দিন দিন আরো ঘনিভূত হচ্ছে। অথচ স্রেফ সাহাবায়ে কেরামের সময় নয়,এমন কি ঔপনিবেশিক কাফরদের হাতে অধিকৃত হওয়ার পুর্বে মুসলিম দেশগুলিতে কি এমন একটি দিনও অতিক্রান্ত হয়েছে যখন আদালতে শরিয়তি আইন ছিল না? ইসলামি রাষ্ট্র নির্মিত না হলে ইসলাম পালন এভাবেই অসম্ভব হয় এবং জনগণ ইসলাম থেকে দুরে সবে।তখন মুসলিম দেশে বৃদ্ধি পায় মুসলিম নামধারি কট্টোর কাফের,জালেম ও ফাসেকদের সংখ্যা। ইসলামের প্রচার ও প্রতিষ্ঠা নিয়ে তখন খোদ মুসলিম দেশে জিহাদ করতে হয়!

মানুষের চিন্তা-চেতনা,আচার-আচরণ,কর্ম ও সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনা মামুলী বিষয় নয়। অন্যের বিরুদ্ধে দূরে থাক,একাকী এমন কি নিজের নফসের বিরুদ্ধে জিহাদে বিজয় লাভও অনেক সময় অসম্ভব হয়ে পড়ে। অনৈসলামিক রাষ্ট্রে এমনকি নিজ পরিবারে সদস্যদের উপর নিয়ন্ত্রন রাখা ও তাদেরকে ইসলামের পথে রাখা অতি কঠিন।অতীতে ব্যর্থ হয়েছেন এমন কি নবীও।আজ  ব্যর্থ হচ্ছেন অনেক আলেম পরিবার। কারণ শয়তান ও নিজ নফসের বিরুদ্ধে জিহাদের মূল হাতিয়ারটি হলো আল কোরআনের গভীর জ্ঞান।কিন্তু সে জ্ঞান কি অনৈসলামি রাষ্ট্রের স্কুল-কলেজ,মিডিয়া বা সাহিত্যে মেলে? সেগুলি বরং শিশুমনকে ইম্যুনাইজড করে ইসলামের বিরুদ্ধে। বীজ থেকে চারা বৃক্ষ রূপে বেড়ে উঠার জন্যও তো অনুকুল পরিবেশ চায়, বীজ ঝোপঝাড়ে পড়লে তা বেড়ে উঠে না।তাই পবিত্র কোরআনের হাজার হাজার কপি কাফের অধ্যুষিত দেশে পাওয়া গেলেও তা থেকে সচারাচর মুজাহিদ গড়ে উঠে না।এজন্যই কাফের দেশে বসবাস কোন কালেই জায়েজ বিবেচিত হয়নি। বরং উৎসাহ দেয়া হয়েছে হিজরতের।ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে কোন মুসলিম রাষ্ট্র অধিকৃত হলে একই রূপ বিপদ ঘটে সেদেশেও। সে রাষ্ট্রে তখন অসম্ভব বা দুঃসাধ্য হয় ইসলাম পালন ও আধ্যাত্মিক বিপ্লব। তখন রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠান কাজ করে আল্লাহর স্মরণকে ভূলিয়ে দেয়ার কাজে। অন্যসব নবী-রাসূলদের তূলনায় মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)র সাফল্যের বড় কারণ,তাঁর হাতে রাষ্ট্র ছিল। তাঁর মহান নেতৃত্বে রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান জনগণকে সিরাতুল মুস্তাকীমের পথে রাখতে সাহায্য করেছিল। সে ধারা অব্যাহত থাকে এবং রাষ্ট্র বলবান হয় খেলাফতে রাশেদার আমলে।ফলে অতিদ্রুত ইসলামের বিস্তার ঘটে সমগ্র বিশ্বজুড়ে।

বাস-যাত্রীদের সবাই যদি মাতাল বা পাগল হয় তবুও সে বাস গন্তব্যস্থলে পৌছে -যদি সে বাসটির ড্রাইভার সুস্থ্য ও সঠিক থাকে। কিন্তু ড্রাইভার মাতাল বা পাগল হলে যাত্রীদের দোয়া-দরুদ পাঠও কাজ দেয় না।একই অবস্থা হয়েছে ইসলামি শত্রুপক্ষের হাতে অধিকৃত মুসলিম রাষ্ট্রগুলির অবস্থা। ক্ষমতালোভী সরকারগুলি দেশে দেশে ইসলাম পালন অসম্ভব করেছে।এভাবে অসম্ভব করে তুলেছে জান্নাতের পথে চলা।এদের কারণেই মুসলিম রাষ্ট্রগুলি আজ  সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে বিচ্যুত। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কাজ হয়েছে,ব্যক্তির মনের ভূবন থেকে মহান আল্লাহর স্মরণকেই বিলুপ্ত করা। কম্যুনিস্ট শাসনামলে সোভিয়েত রাশিয়ায় হাজার হাজার মসজিদকে ঘোড়ার আস্তাবল বানানো হয়েছে। চীনের সিনজিয়াং প্রদেশে উইগুর মুসলমানদের উপর রোযা রাখায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। জিহাদ বিষয়ক বই বাজেয়াপ্ত করছে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার। সন্ত্রাস রূপে চিত্রিত হচ্ছে নবীজী (সাঃ)প্রদর্শিত সিরাতুল মুস্তাকীমে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা। ইসলামের শত্রুপক্ষ নবীজী (সাঃ)র এ ইসলাম মেনে নিতে রাজী নয়। নবীজী (সাঃ)র ইসলাম রুখতে তারা আন্তর্জাতিক কাফের কোয়াশিনের সাথে জোট বেঁধেছে। ইসলাম বলতে ক্ষমতাসীন দুর্বৃত্তগণ সেটিই বুঝে যা তারা নিজেরা পালন করে। মুসলিম দেশগুলির মূল সমস্যা তো ইসলামের শত্রুদের হাতে এরূপ অধিকৃতি। অথচ জনগণ সে অধিকৃতি থেকে মুক্তির জিহাদ না করে দোয়াদরুদ পাঠে দায়িত্ব সারছে!দেশের ড্রাইভিং সিট থেকে দুর্বৃত্তদের সরানোর জিহাদে তারা অংশ নিতে রাজি নয়।এ পথে কি মহান আল্লাহর সাহায্য মেলে? আখেরাতেও কি মুক্তি মিলবে?

 

ঘরের শত্রু

সিরাতুল মুস্তাকীমের পথটি স্রেফ নামায-রোযা,হজ-যাকাতের পথ নয়;এ পথে যেমন জিহাদ আছে,তেমনি ইসলামি খেলাফতও আছে। আছে শরিয়তের পূর্ণ প্রতিষ্ঠাও।ব্যক্তির জীবনে আধ্যত্মিক বিপ্লব এলে প্রতি পদে আসে আল্লাহর দ্বীনের পূণ অনুসরণ।সে খোঁজে কোথায় হারাম-হালালের নির্দেশ।খোঁজে কোথায় জিহাদের ময়দান।সেখানে সে নিজ খরচে গিয়ে হাজির হয়। আফগানিস্তানের জিহাদে তো এভাবেই হাজার হাজার সাচ্চা মুজাহিদ বিশ্বের নানা প্রান্তর থেকে গিয়ে হাজির হয়েছিল,এবং সোভিয়েত রাশিয়ার ন্যায় একটি বিশ্বশক্তিকে পরাস্ত করেছিল। এবং আজ  জমা হচ্ছে সিরিয়ায়। দ্বীন পালনে সামান্য আপোষও এমন মুজাহিদদের কাছে অচিন্তনীয়।আল্লাহপ্রেমী এমন ব্যক্তি সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে এক বিন্দু সরতে রাজী হয় না। সে শুধু নামাযের প্রতি রাকাতে “এহদিনাস সিরাতুল মুস্তাকীম” বলে মনের আর্জি পেশ করে না,বরং জীবনের প্রতি পদে সে পথে চলায় সিরিয়াস ও নিষ্ঠাবান হয়।সিরাতুল মুস্তাকীমে চলায় প্রতি মুহুর্তে এরূপ নিষ্ঠাবান থাকাটাই তো প্রকৃত ঈমানদারি। এটিই তো মু’মিনের জীবনে সত্যিকার তাকওয়া।ঈমানদারের মনে এরূপ তাকওয়া বৃদ্ধিই তো নামায-রোযা ও হজ-যাকাতের ন্যায় ইবাদতের মূল লক্ষ্য।

নামাযে দাঁড়িয়ে “সিরাতুল মুস্তাকীম” চাওয়া আর রাজনীতির ময়দানে নেমে ইসলামি রাষ্ট্র,খেলাফত,জিহাদ ও শরিয়তের বিরোধীতা করা তো সুস্পষ্ট মুনাফেকী। এটি তো মহান আল্লাহতায়ালার সাথে গাদ্দারি;এবং তাঁর হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ।এ অপরাধ তো ইসলামের শত্রু-শিবিরে ফিরে যাওয়ার অপরাধ।যারা এভাবে ইসলামে বিরোধীতায় নামে পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা তাদেরকে শুধু মুনাফিক বলেননি,মুরতাদও বলেছেন।খোলাফায়ে রাশেদার যুগে মুরতাদের শাস্তি দেয়া হতো প্রাণদণ্ড দিয়ে।পাপের যে ফসল সাহাবায়ে কেরামের যুগে ফলেছে,আজ  যে তা শতগুণ বেশী ফলবে তা নিয়ে কি সন্দেহ আাছে? মুসলিম দেশগুলি তো তাদের হাতেই আজ  অধিকৃত। নামে মুসলমান হলেও ইসলাম ও তার শরিয়তি বিধানকে পরাজিত দেখার মধ্যেই এদের আনন্দ। আজকের মুসলিমদের মূল জিহাদটি তাই ভিন্ দেশী কাফেরদের বিরুদ্ধে নয়,বরং স্বদেশী এ মুরতাদদের বিরুদ্ধে।

 

আত্মবিপ্লব ও বিজয় যে পথে

দেহে বর্জ জমা হলে শরীর বাঁচে না।বর্জের সাথে তাই আপোষ চলে না। মুসলিম সমাজের আজকের স্বাস্থ্যহীনতা ও শক্তিহীনতার মূলকারণ তো ভিতরে জমা এ বিশাল বর্জ।মুসলিম নাম ধারণ করে এরাই ইসলাম ও মুসলমানদের ক্ষতি সাধনে ব্যস্ত। এরা শুধু ইসলামি রাষ্ট্রবিপ্লবের শত্রু নয়,তারা শত্রু মুসলিম মানসে আধ্যাত্মিক বিপ্লবেরও। ইসলামের বিরুদ্ধে শত্রুতা নিয়েই কোরআন চর্চায় তারা বাধা দেয়। নিয়ন্ত্রন করে মসজিদে কোরআন শিক্ষা ও জুম’আর খোতবা। এভাবে নানা ভাবে তারা অসম্ভব করেছে সিরাতুল মুস্তাকীমে চলা। আজকের মুসলমানদের বড় ব্যর্থতা শুধু ঈমান নিয়ে বেড়ে উঠায় নয়,ইসলামের এ ঘরের শত্রুদের চেনাতেও।বরং এ শত্রুদের কাছে আত্মসমর্পণই তাদের রাজনীতি ও সংস্কৃতি। এবং এরূপ আত্মসমর্পণকে বলে প্রজ্ঞা! ফলে জঘন্য এ শত্রুদের থাবা পড়েছে সর্বত্র। এমনকি চেতনার যে ভূবনে বীজ পড়বে সে ক্ষেত্রটিতেও। ফলে সমাজ বিপ্লব বা রাষ্ট্রবিপ্লব আর কি হবে,আত্মবিপ্লবও সম্ভব হচ্ছে না। মহান আল্লাহতায়ালা কি এমন মানুষদের ভাগ্য পরিবর্তন করেন? কারণ যারা নিজ অবস্থার পরিবর্তন করে না তাদের পবিবর্তন করাটি তো তাঁর সূন্নত নয়। পবিত্র কোরআনে তাঁর ঘোষণাঃ “নিশ্চয়ই আল্লাহ কোন জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ না তারা তাদের নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।”–(সুরা রা’দ আয়াত ১১)।জাতির ভাগ্য পরিবর্তনের মূল দায়ভারটি তাই বান্দার।তবে সে পরিবর্তনে যারা নিয়েত বাঁধে এবং আত্মরিক ভাবে সচেষ্ট হয়,তাদের পথ দেখানোর দায়িত্বটি মহান আল্লাহতায়ালা নিজ দায়িত্বে নেন। পরম করুণাময়ের পক্ষ থেকে সে ঘোষণাটি এসেছে এভাবে,“যারা আমার পথে আত্মনিয়োগ করে আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার পথে পথ দেখাবো।নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মপরায়ণদের সাথে আছেন।”–(সুরা আনকাবুত আয়াত ৬৯)। তিনি তাদের বিজয়ও দেন। বিজয় নিশ্চিত করতে তাদের সাহায্যে হাজার হাজার ফেরেশতাও পাঠান।

আখেরাতে প্রতি ব্যক্তিই তার নিজ সামর্থের বিনিয়োগের প্রতিদান পায়।কাফের থেকে মু’মিনের পার্থক্যটি সৃষ্টি হয় মূলত বিনিয়োগের এ ক্ষেত্রটিতে। কাফেরের লড়াই শয়তানের পথে। প্রতিদানে পায় জাহান্নাম। আর মু’মিন তার অর্থ,শ্রম,সময়,মেধা ও রক্তের বিনিয়োগটি করে মহান আল্লাহতায়ালার পথে। মহান আল্লাহতায়ালার পথে অবিরাম আত্মনিয়োগই মু’মিনের আধ্যাত্মিকতা। আর আত্ম-উন্নয়নে যে বিনিয়োগ সেটিই তো বিনিয়োগের সর্বোত্তম ক্ষেত্র। আত্ম-উন্নয়নের তাগিদে মু’মিন তখন ওহীর জ্ঞানের আমৃত্যু ছাত্রে পরিণত হয়।ফলে তার জীবনে পর পর দু’টি দিন কখনোই একই রূপ হয় না, জ্ঞানের রাজ্যে সে প্রতি দিন উপরে উঠে। লড়াকু মুজাহিদ সে শত্রুর বিরুদ্ধে আমৃত্যু জিহাদে। এভাবেই মু’মিনের জীবনে প্রতিক্ষণ কাটে এবাদতে। আসে আত্ম-পরিসুদ্ধি। সাহাবায়ে কেরাম তো আত্ম-উন্নয়ন ও আত্ম-পরিসুদ্ধির এ পথ ধরেই সমগ্র মুসলিম ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ আলেম ও শ্রেষ্ট মুজাহিদে পরিণত হয়েছিলেন। আল্লাহর দরবারে নিজের মূল্যমান ও মর্যাদা বাড়ানোর এটিই তো শ্রেষ্ঠ মাধ্যম।প্রতিটি মু’মিন তো এভাবেই রাষ্ট্রীয় বিপ্লবের পাওয়ার হাউসে পরিণত হয়। কোন দেশে যখন কোটি কোটি এরূপ পাওয়ার হাউস সে দেশ কি কখনো শত্রুশক্তির হাতে অধিকৃত হয়? রেকর্ড গড়ে কি দুর্বৃত্তিতে? সে দেশ তো বরং অবিরাম বিজয় আনে ও গৌরবের উচ্চ শিখরে পৌঁছে। সাহাবায়ে কেরামদের যুগে বিশাল ভূ-ভাগ জুড়ে রাষ্ট্রবিপ্লব এসেছিল এবং মুসলিম রাষ্ট্রটি বিশ্বশক্তির মর্যদা পেয়েছিল তো এমন আত্মবিপ্লবীদের দ্বারাই। মহান আল্লাহতায়ালার কাছেও তারা প্রিয় হতে পেরেছিলেন।আজও  কি সে লক্ষ্যে পৌছার ভিন্ন পথ আছে? ১০/৭/২০১৫




রোযার কাঙ্খিত ভূমিকা ও  মুসলিমদের ব্যর্থতা

আধ্যাত্মীক বিপ্লব ও রাষ্ট্রীয় বিপ্লব এবং রোযা

মানব জাতির ইহলৌকিক ও পারলৌকিক সাফল্যের জন্য আধ্যাত্মীক বিপ্লব যেমন জরুরী,তেমনি অপরিহার্য হলো রাষ্ট্রীয় বিপ্লব। পাখির দুটি ডানা সবল না হলে যেমন উড়তে পারে না তেমনি আধ্যাত্মীক বিপ্লব ও রাষ্ট্রীয় বিপ্লব –এ দুটি বিপ্লব একত্রে না হলে উচ্চতর সভ্যতাও নির্মিত হয় না। অর্জিত হয় না ইসলামের মূল লক্ষ্য।রাষ্ট্রের বুকে শয়তানের অধিকৃতি মেনে নিয়ে কি ইসলাম পালন হয়? আসে কি আধ্যাত্মীক উন্নয়ন? নবীজী এ দুটি বিপ্লব একত্রে পরিচালিত করে সমগ্র মানব জাতির সামনে অনুকরণীয় সূন্নত রেখে গেছেন। দ্বিমুখি এ বিপ্লবের পথ বেয়ে তিনি যেমন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ অসংখ্য মানব গড়ে গেছেন,তেমনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতাও গড়ে গেছেন। যারা রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার কাজ থেকে নিজেদেরকে দূরে রেখে স্রেফ মসজিদ-মাদ্রাসা,পীরের মাজার¸সুফী খানকা বা হুজরায় বসে আধ্যাত্মীক বিপ্লব ও সে সাথে দুই জাহানের কল্যাণ ভাবেন তারা কি নবীজী (সাঃ)র সে সূন্নত থেকে আদৌ শিক্ষা নিয়েছে? তাদের দ্বারা কোথাও কি আল্লাহর শরিয়তি বিধান বিজয়ী হয়েছে? নির্মিত হয়েছে কি ইসলামি রাষ্ট্র ও সভ্যতা? এসেছে কি আধ্যাত্মীক উন্নয়ন? বরং তাতে আধ্যাত্মীকতার নামে মুসলিম জীবনে এনেছে নবীজী (সাঃ)র প্রদর্শিত সিরাতুল মোস্তাকীম থেকে বিশাল বিচ্যুতি ও ভ্রষ্টতা। অপর দিকে আধ্যাত্মীক বিপ্লবকে গুরুত্ব না দিয়ে যারা শুধু ইসলামের নামে রাজনৈতীক দল ও রাজনৈতীক বিপ্লব নিয়ে ভাবেন তাদের দ্বারাই বা ইসলামি রাষ্ট্র নির্মানে কতটুকু সফলতা এসেছে? এবং কতটুকু এসেছে চারিত্রিক বিপ্লব? তারাও কি নবীজী(সাঃ)র সূন্নতকে পুরাপুরি আঁকড়ে ধরতে পেরেছে?

ইসলামে আধ্যাত্মীক বিপ্লব ও রাষ্ট্রীয় বিপ্লব –এ উভয় বিপ্লবই সমান গুরুত্বপূর্ণ। কোনটাই পরিহারের উপায় নাই। বরং একটি আরেকটির পরিপুরক। আধ্যাত্মীক মানুষ সৃষ্টি ছাড়া যেমন ইসলামি রাষ্ট্র নির্মান সম্ভব নয়,তেমনি ইসলামি রাষ্ট্র ছাড়া আধ্যাত্মীক বিপ্লবের জন্য উপযোগী শিক্ষা-সংস্কৃতি ও পরিবেশ সৃষ্টি করা অসম্ভব। রাষ্ট্র ইসলামি না হলে তখন সে রাষ্ট্র স্বভাবতই অধিকৃত হয় শয়তানের খলিফাদের হাতে। তখন সে রাষ্ট্র জুড়ে গড়ে উঠে আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সংগঠিত করার শত শত সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।সূদী ব্যাংক,মদ্যশালা,পতিতাপল্লি,জুয়া, নাচ-গানের আসর ও অশ্লিল সিনেমা-নাটক –শয়তানের এরূপ হাজারো প্রকল্প তখন রাতদিন কাজ করে জনগণের মন থেকে তাকওয়া ও আধ্যাত্মীকতা বিলুপ্ত করার কাজে।তাই ইসলামের ইতিহাসের বড় বড় আধ্যাত্মীক ব্যক্তিগণ কাফের রাষ্ট্রে গড়ে উঠেনি।বৃক্ষও বেড়ে উঠার জন্য নিয়মিত পরিচর্যা চায়।তেমনি পরিচর্যা অপরিহার্য হলো তাকওয়া ও আধ্যাত্মীকতা-সম্পন্ন মানুষ গড়ায়।সেটি কি কাফের কবলিত রাষ্ট্রে সম্ভব? সম্ভব নয় বলেই নবীজী (সাঃ)কে বহু অর্থ, বহু শ্রম ও বহু রক্ত ব্যয়ে ইসলামি রাষ্ট্র গড়তে হয়েছে। আধ্যাত্মীক মানব সৃষ্টির লক্ষ্যে ইসলামে যেমন কোরআনের জ্ঞানার্জন,নামায-রোযা,হজ-যাকাত ও তাহাজ্জুদের বিধান আছে,তেমনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের কাজে জিহাদকেও ফরজ করা হয়েছে।বরং মুসলমানদের সবচেয়ে বেশী অর্থ,বেশী রক্ত,বেশী মেধা ও বেশী শ্রমের বিনিয়োগ হয়েছে ইসলামের শত্রু শক্তির দখলদারি থেকে রাষ্ট্রকে মুক্ত করার কাজে।শতকরা ৬০ ভাগের বেশী সাহাবী সে কাজে শহীদ হয়েছেন।বদরের যুদ্ধের ন্যায় বড় বড় বহু যুদ্ধ হয়েছে রোযার মাসে।

যে কোন রাষ্ট্রীয় বিপ্লবের জন্য বিপ্লবের শুরুটি ব্যক্তির হৃদয়ে হওয়া জরুরী। রোযা সে কাজটি করে ব্যক্তির জীবনে আধ্যাত্মীক বিপ্লব এনে।সে বিপ্লব তখন প্রবল বিপ্লব আনে ব্যক্তির কর্ম, আচরণ,সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে। ইসলামি রাষ্ট্র নির্মানে তখন সৃষ্টি হয় যোগ্য জনবল। রোযা গড়ে আল্লাহর সাথে বান্দাহর নিবীড় সম্পর্ক।সে সম্পর্কের ফলে মু’মিনের আপোষহীন অঙ্গিকার বাড়ে মহান আল্লাহর জমিনে আল্লাহর হুকুম প্রতিষ্ঠায়। পানাহার-বিহীন কষ্টকর ইবাদতটি মু’মিনের জীবনে এভাবেই নীরবে বিপ্লবে আনে। মু’মিন ব্যক্তি ক্ষুধা-পিপাসার বেদনা নীরবে সয় শুধু মহান আল্লাহকে খুশি করার জন্য। মহান আল্লাহ বলেন,রোযাদার রোযা রাখে শুধু আমার উদ্দেশ্যে,আমিই তাকে পুরস্কৃত করবো।-(হাদীস)।নামায ও হজ-যাকাতে ব্যক্তির মাঝে রিয়াকারি বা প্রদর্শনীর ভাব থাকাটি স্বাভাবিক।বহু সূদখোর,ঘুষখোর ও ব্যভিচারী দুর্বৃত্তরাও তাই ঠাটবাট করে নামাজে হাজির হয়।তেমনি বহু স্বৈরাচারি খুনি শাসকও বার বার হজ-ওমরা করে।তাই রাষ্ট্রে ও সমাজে কতটা আধ্যাত্মীকতা বাড়লো সেটির বিচার নামাযীর বা হাজীর সংখ্যা দিয়ে হয় না।মসজিদ-মাদ্রাসা গণনা করে বা দাড়ি টুপিধারিদের সংখ্যা দেখেও হয় না। বরং সেটি বুঝা যায় সে রাষ্ট্রে কতজন কতটা নফল রোযা রাখলো,রাত জেগে জেগে কতজন তাহাজ্জুদ পড়লো,কোরআনের জ্ঞানে কতটা সমৃদ্ধি আসলো,কতজন সে জ্ঞান নিয়ে দেশেবিদেশে দাওয়াতি কাজে নামলো এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে কতজন জানমালের কোরবানী পেশ করলো -সে সংখ্যা দিয়ে।নবীজী (সাঃ)র আমলে সে আধ্যাত্মীকতা এতটাই প্রবল ছিল যে সাহাবীগণ দিনের পর দিন নফল রোযা রাখতেন। দিবাভাগের অনেকাংশ যেমন নবীজী (সাঃ)র সান্নিধ্যে কোরআনের জ্ঞানার্জনে কাটিয়ে দিতেন,রাতের বেশীর ভাগ কাটাতেন তাহাজ্জুদে।আর পাহাড়-পর্বত অতিক্রম করে নানা জনপদের মানুষের কাছে আল্লাহর বানি পৌঁছে দিয়েছেন। আধ্যাত্মীকতার উত্তাপতো তো স্রেফ মু’মিনের ব্যক্তিজীবনে আবদ্ধ থাকে না। আগুনের উত্তাপ যেমন চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে তেমনি ছড়িয়ে পড়ে ব্যক্তির আধ্যাত্মীকতাও। সে আধ্যাত্মীকতার উত্তাপ তখন রাষ্ট্রের বুকে প্রবল বিপ্লব আনে।তখন বিলুপ্ত হয় রাষ্ট্রের বুকে শয়তানি শক্তির দখলদারি। এবং প্রতিষ্ঠা পায় আল্লাহর শরিয়তি নিজাম। ইসলামি রাষ্ট্র বিপ্লবের এটিই তো রোডম্যাপ।

 

আধ্যাত্মীক বিপ্লব জন্ম দেয় রাষ্ট্রীয় বিপ্লবের

প্রতিটি বক্তিই সমাজের বুকে নিজ নিজ পরিচয় নিয়ে চলা ফেরা করে।সে পরিচয়ের গুণেই ব্যক্তি নিজে এক আত্মপরিচয় পায়। তার চেতনা,কর্ম,আচরণ ও ব্যক্তিত্ব তখন এক বিশেষ গুণে গড়ে উঠে।রাজা,রাজপুত্র,দাসপুত্র,ভিখারি,চোর-ডাকাত –এরাই সবাই মানব সন্তান। কিন্তু সমাজে এদের পরিচয় যেমন ভিন্ন,তেমনি ভিন্ন হলো তাদের আত্মপরিচয়,আচরণ,ব্যক্তিত্ব ও মূল্যবোধ।রাষ্ট্রের বুকে শাসকের খলিফাগণ বিশেষ এক মর্যাদা,ব্যক্তিত্ব ও দায়িত্ববোধের অধিকারি হয় তো সে বিশেষ পরিচয়ের কারণেই। প্রশ্ন হলো মুসলমানের সে পরিচয়টি কি? সে পরিচিতিটি হলো মহান আল্লাহতায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি ও দায়িত্বপ্রাপ্ত খলিফার।সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি ও মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত খলিফা হওয়ার ধারণাটি আত্মসচেতন মু’মিনের চেতনায় একটি বিশেষ মর্যাদা,চেতনা,ব্যক্তিত্ব ও দায়িত্ববোধ দেয়। মু’মিনের আধ্যাত্মীকতার মূল ভিত্তি হলো মহান আল্লাহপ্রদত্ত সে পরিচয়। জেলা বা থানা পর্যায়ে যারা সরকারের খলিফা বা প্রশাসক তাদের আমলনামার মূল্যায়ন হয় তারা দায়িত্বপালনে কতটা সফল তা থেকে। সে মূল্যায়নের ভিত্তিতেই তাদের প্রমোশন বা ডিমোশন হয়। তেমনি পরকালে ব্যক্তির আমলনামার হিসাব হবে আল্লাহর খলিফা রূপে ব্যক্তি কতটা সক্রিয় ছিল সেটির। সে বিচারে ফয়সালা হবে সে জান্নাতের যোগ্য না জাহান্নামের। কৃষক,শ্রমিক,ব্যবসায়ী বা চিকিৎস্যক বা অন্য কোন পেশাদারি হওয়ার প্রশ্ন সেদিন গুরুত্ব পাবে না। রোজ হাশরের বিচার দিনের সে ভয়টি ঈমানদার ব্যক্তিকে প্রতি মুহুর্তে মনযোগী করে আল্লাহর খলিফা রূপে আপোষহীন দায়িত্বপালনে। আল্লাহর সান্নিধ্যে আল্লাহর সফল প্রতিনিধি রূপে পৌঁছার তীব্র কামনাটি তাকে রাষ্ট্রীয় বিপ্লবে বিপ্লবী করে তোলে। এভাবেই আধ্যাত্মীক বিপ্লব রাষ্ট্রীয় বিপ্লবের জন্ম দেয়। তাই নবীজী (সাঃ)র প্রতিজন সাহাবাই ছিলেন আমৃত্যু বিপ্লবী। ফলে বিপ্লব এসেছিল বিশাল ভূভাগ জুড়ে।

সরকারের খলিফা রূপে দায়িত্বপ্রাপ্ত জেলা বা থানা প্রশাসকগণ সরকারের বিরুদ্ধে কোনরূপ বিদ্রোহ ও অবাধ্যতা সহ্য করে না। সেটি করলে তাদের চাকুরি থাকে না। তেমনি মহান আল্লাহর বিরুদ্ধে অবাধ্যতা ও তার হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সহ্য করে না আল্লাহর খলিফাগণও। তেমন প্রকাশ্য বিদ্রোহকে সহ্য করাটি গণ্য হয় গাদ্দারি রূপে। অথচ আজ কের মুসলমানদের পক্ষ থেকে সে গাদ্দারিটা কি কম? মহান আল্লাহর শরিয়তি হুকুম অমান্য হচ্ছে বাংলাদেশের ন্যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশে। আল্লাহর শরিয়তি বিধানকে আস্তাকুঁরে ফেলা হয়েছে। আদালতে বিচার হচ্ছে কাফেরদের প্রণীত আইনে। সে আইনে জ্বিনাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়। কিন্তু মুসলমানদের মাঝে তা নিয়ে প্রতিবাদ কই? অথচ হযরত আবু বকর (রাঃ) তাঁর খেলাফত কালে যারা যাকাত দিতে অস্বীকার করেছিল তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ শুরু করেছিলেন।প্রশ্ন হলো,মহান আল্লাহর শরিয়তের ইজ্জত রক্ষার দায়িত্ববোধ কি শুধু খলিফা হযরত আবু বকর (রাঃ)এর? সে দায়িত্ব তো আল্লাহর খলিফা রূপে প্রতিটি ঈমানদারের। যার মধ্যে সে অবাধ্যতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ নাই তার মুখে আল্লাহর নামের জপ যতই হোক,যতই শোভা পাক দাড়িটুপি,যতই পালিত হোক হজ-ওমরাহ -তার মধ্যে যে আধ্যাত্মীকতা নাই তা নিয়ে কি সামান্যতম সন্দেহ আছে?

খেলাফতের এক গুরু দায়িত্ব দিয়েই মহান আল্লাহতায়ালা মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছিলেন। খেলাফতের সে দায়িত্ব পাওয়ার কারণেই মানবসৃষ্টি ফেরেশতাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। নিজের এ খলিফাদের আদি পিতা হযরত আদম (আঃ)কে সৃষ্টি করে তাই মহান আল্লাহতায়ালা ফেরশতাদের প্রতি নির্দেশ দিয়েছিলেন তাঁকে সিজদা করতে। পার্থিব জীবনে তাঁর এ খলিফাগণ বিফল হোক এবং ‍আখেরাতের জীবনে জাহান্নামের আগুনে গিয়ে পড়ুক সেটি পরম করুণাময় মহান আল্লাহর কাম্য হতে পারে?‍‍‌‌‌‌‌‌‍‍‍‍‍‍ তিনি তো চান তার মানবসৃষ্টির সামগ্রিক সাফল্য -সেটি যেমন ‍‌‌পার্থিব জীবনে,তেমনি পরকালীন জীবনে। তিনি চান তাঁর প্রতিটি মানব শিশু ঈমানদার রূপে বেড়ে উঠুক। নিজের এ সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি ও খলিফার প্রতি মহান আল্লাহতায়ালার মহব্বত এতই গভীর যে তাদের জন্য যেমন ফুলেফলে শস্যে ভরা সুন্দরতম পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন তেমনি আখেরাতে বসবাসের জন্য অফুরুন্ত নিয়ামতভরা জান্নাত সৃষ্টি করেছেন। এবং সেটি অনন্ত অসীম কালের জন্য।সে জান্নাতপ্রাপ্তির পথ প্রদর্শন করতেই লক্ষাধিক নবীরাসূল পাঠিয়েছেন এবং কিতাব নাযিল করেছেন। মহান রাব্বুল আলামীনের সাথে মু’মিনের আধ্যাত্মীক সংযোগের মূল ভিত্তি তো সে কিতাব ও নবী-রাসূল। কিন্তু ইবলিস শয়তান মানুষের সে শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নেয়নি। আল্লাহর হুকুম অমান্য করে সেদিন সে  আদম (আঃ)কে সেজদাও করেনি। মানুষের বিরুদ্ধে তার শত্রুতা চিরকালের। সে চায়না মানুষ সিরাতুল মোস্তাকীম বেয়ে পথ চলুক এবং মহানিয়ামত ভরা জান্নাতে গিয়ে পৌছুক। তাই পথভ্রষ্ট করাই তার এজেন্ডা।খেলাফতের দায়িত্বপালনে ঈমানদারকে তাই মানব-দুষমন এ শয়তান ও তার বাহিনীর এজেন্ডাকেও বুঝতে হবে।

 

খেলাফতের দায়ভার ও রাষ্ট্রবিপ্লবের লড়াই

ঈমানদারের চেতনায় যে ধারণাটি সদাসর্বদা কাজ করে তা হলো,এ পৃথিবী পৃষ্ঠে তার নিয়োগটি কোন রাজা-বাদশাহ,প্রেসিডেন্ট,প্রধানমন্ত্রী,দলনেতা বা পীরের খলিফা রূপে নয়।পরকালে তাদের থেকে মু’মিনের চাওয়া-পাওয়ারও কিছু নাই। সে তো নিয়োগপ্রাপ্ত খলিফা মহান আল্লাহতায়ালার। খলিফার সে দায়িত্ব পালনের কাজটি সুচারু ভাবে আদায় হলে পরকালে তার যে পুরস্কার মিলবে তা পৃথিবীর সকল চাকুরিজীবীর বেতনের অর্থ দিয়েও কেনা যাবে না। জান্নাতের এক ইঞ্চি ভূমি কেনা যাবে না সকল রাজা-বাদশাহর সমুদয় সম্পদ দিয়েও। পরকালে আল্লাহতায়ালা তার খলিফাদের এমন জান্নাতের দ্বার উম্মুক্ত করে স্বাগত জানাবেন। মানব জীবনে এর চেয়ে মহামর্যাদাকর প্রাপ্তি আর কি হতে পারে? তাই ইহকালে ও পরকালে মু’মিনের প্রকৃত মর্যাদা তো মহান আল্লাহর খলিফা রূপে দায়িত্ব পালনের মাঝে। সে মহামর্যাদাকর দায়িত্ব পালনে প্রকৃত মু’মিন যে প্রয়োজনে সর্বস্ব বিলিয়ে দিবে সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? সে দায়িত্ব পালনের কাজটি যথার্থ না হলে শাস্তিও কি কম? সে তখন শয়তানের খলিফা হয়ে যায়। তখন তার বাসস্থান হয় জাহান্নামে।

আল্লাহর খলিফা হওয়ার এরূপ মহান পরিচয়টি মু’মিনের চেতনায় বদ্ধমূল হওয়ায় প্রচন্ড বিপ্লব আসে তার মগজে। সে বিপ্লবের ফলে পবিত্রতা শুরু হয় তার কর্ম ও আচরণে।তখন সে শুধু নেক আমলের সুযোগ খুঁজে। সদা সতর্ক হয় প্রতিটি গুনাহ থেকে বাঁচার। সৃষ্টি হয় প্রচণ্ড আল্লাহমুখিতা।তখন আল্লাহর রাস্তায় জানমালের কোরবানী পেশ করার সুযোগটি তার কাছে বিপদ নয়,আশির্বাদ মনে হয়। সে তখন আল্লাহর রাস্তায় মূলবান কিছু পেশ করা এমনকি শহীদ হওয়ার রাস্তা খুঁজে। এটিই তো মু’মিনের তাকওয়া। আল্লাহর ভূমি তে আল্লাহর দ্বীনের বিজয় আসে তো এমন তাকওয়া-সম্পন্ন মানুষের কারণে। ফলে অনিবার্য হয়ে উঠে ইসলামি বিপ্লব।

 

সবচেয়ে বড় অজ্ঞতা প্রসঙ্গে

মানব জীবনের সবচেয়ে বড় অজ্ঞতা ও মুর্খতা হলো মানুষের মূল পরিচয় ও দায়িত্বটি না জেনে বসবাস করা।কোন অফিসে নিজের দায়িত্বটি না জেনে চাকুরি করার ন্যায় এ এক চরম দায়িত্বহীনতা।এমন অজ্ঞতায় মানুষ ব্যর্থ হয় মানবিক পরিচয় নিয়ে বেড়ে উঠতে। তখন ব্যর্থ হয় আল্লাহর খলিফা রূপে দায়িত্বপালনে। নবী-রাসূলদের মূল মিশনটি ছিল,সে অজ্ঞতা থেকে মানুষকে মুক্তি দেয়া এবং তাদেরকে মুল পরিচয় ও দায়িত্বের কথাটি স্মরণ করিয়ে দেয়া। সে সাথে আল্লাহপ্রদত্ত খলিফার পরিচয় নিয়ে বেড়ে উঠতে সাহায্য করা। অথচ কোটি কোটি মানুষের জীবনে বছরের পর বছর কাটছে,এবং মৃত্যু ঘটছে সে পরিচয়টি না জেনেই।এ ব্যর্থতা যেমন ব্যক্তির,তেমনি রাষ্ট্রেরও।রাষ্ট্রের মূল কাজটি নিছক রাস্তাঘাট,স্কুল-কলেজ ও কল-কারখানা গড়া নয়। বরং মানুষকে তার মূল পরিচয়টি ও জীবনের মূল মিশনটি নিয়ে সচেতন করা। কাফের রাষ্ট্রে সে মূল কাজটি হয় না। তেমনি সেক্যুলারিস্টদের দ্বারা অধিকৃত মুসলিম রাষ্ট্রেও সেটি হয় না। অনৈসলামিক রাষ্ট্রের মূল বিপদটি তো এখানেই।তাই ইসলামি রাষ্ট্র গড়ার চেয়ে অধিক নেক আমল দ্বিতীয়টি নেই। একাজ তো কোটি কোটি মানুষকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর। ইসলামি রাষ্ট্র নির্মানের জিহাদ এজন্যই ইসলামে শ্রেষ্ঠ ইবাদত।রাজনীতির লড়াইয়ে অংশ নেয়া এজন্যই নবীজী (সাঃ)র শ্রেষ্ঠ সূন্নত। সব মানুষেরই মৃত্যু আছে। কিন্তু মৃত্যু নেই তাদের যারা ইসলামি রাষ্ট্র নির্মানের সে জিহাদে শহীদ হয়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা তাদেরকে মৃত বলতে বার বার নিষেধ করেছেন। শাহাদতের পরও যে তাদের খাদ্যপানীয় দেয়া হয় সে ঘোষণাটিও এসেছে পবিত্র কোরআনে।

 

ঈমানদারের মিশন ও শয়তানের মিশন এবং রোযা

শয়তানের মূল এজেন্ডাটি হলো, মানব জাতির জন্য জান্নাতের পথে চলাটি অসম্ভব করা। আদি পিতা আদম (আঃ) এবং বিবি হাওয়াকে জান্নাত থেকে বের করার মধ্য দিয়েই শয়তানের এজেন্ডা শেষ হয়নি। বরং সে দুষমনিটা লাগাতর। মানব সন্তানেরা যাতে আবার জান্নাতে ফিরে যেতে না পারে -সেটিই শয়তান ও তার অনুসারিদের সর্বদেশে এবং সর্বসময়ে মূল লক্ষ্য। আর জান্নাতের পথ থেকে দূরে রাখার সহজতম উপায় হলো পৃথিবীপৃষ্টে পূর্ণতর ইসলাম-পালন অসম্ভব করা। সে লক্ষ্যটি পূরণ হয় ইসলামী রাষ্ট্রের অনুপস্থিতিতে। তখন অসম্ভব হয় শরিয়ত, হুদুদ, শুরা, খেলাফত, মুসলিম ঐক্য ও জিহাদের ন্যায় ইসলামের মৌল বিধানগুলি মেনে চলা। তখন অসম্ভব হয় পূর্ণ মুসলিম রূপে বাঁচা।সেজন্যই শয়তানী শক্তি পৃথিবীর কোথাও ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা হতে দিতে রাজী নয়। মুসলিম রাষ্ট্রে রাস্তাঘাট, কল-কারখানা, পশুপালন, কৃষিখাত ও দালানকোঠায় বিপুল সমৃদ্ধি এলেও তাতে শয়তানের কোন আপত্তি নেই। কারণ তাতে জাহান্নামের পথে নেয়ার শয়তানী প্রকল্পে কোন ব্যাঘাত ঘটেনা। কিন্তু ব্যাঘাত ঘটে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পেলে। তখন বিলুপ্ত হয় শয়তানী প্রকল্প। তাই পূর্ণ মুসলিম হওয়ার অর্থই হলো শয়তানের পক্ষ থেকে অনিবার্য লড়াইয়ের মুখোমুখি হওয়া। নবীজী (সাঃ)র ন্যায় মহামানব হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু নবীজীকেও সে লড়াই লড়তে হয়েছে।এবং যেখানেই লাগাতর লড়াই, সেখানেই চাই লাগাতর প্রশিক্ষণ। মুসলিম জীবনে প্রশিক্ষণের পর্বটি তাই আমৃত্যু। নামায-রোযা-হজ্ব-যাকাত তো ঈমানদারের জীবনে সে প্রশিক্ষণই পেশ করে। সে সাথে চাই ঈমান ও তাকওয়ার বল। এবং সে বলটি আসে পবিত্র কোরআনের জ্ঞান থেকে। তাই কোরআনের জ্ঞান ছাড়া প্রকৃত ঈমানদার গড়ে তোলা যেমন অসম্ভব, তেমনি অসম্ভব হলো ইসলামী রাষ্ট্র গড়া। তখন ঘরে ঘরে গড়ে উঠে ইসলামচ্যুৎ মানুষ এবং দেশের রাজনীতিতে বিজয়ী হয় শয়তানী পক্ষ। ফলে পরাজিত হয় ইসলাম। বাংলাদেশে ন্যায় মুসলিম দেশগুলিতে তো সেটিই হয়েছে। আর তাতে উৎসব বেড়েছে শয়তানের মহলে।

 

যে পরীক্ষা অনিবার্য

সমগ্র সৃষ্টিকূলে মানব যে সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি সে প্রমাণটি ঈমানদারকে লাগাতর দিতে হয়। সেটি তার চিন্তা-চেতনা,কর্ম ও আচরণের মধ্য দিয়ে। তাকে প্রমাণ পেশ করতে হয়,মহান আল্লাহর খলিফা রূপে দায়িত্ব পালনে সে কতটা তৎপর ও আন্তরিক।খেলাফতের দায়িত্ব পালনের কাজটি তাকে করতে হয় সর্ব-সামর্থ্য দিয়ে। আমৃত্যু সে মিশন নিয়ে বাঁচায় অনিবার্য হয়ে পড়ে শ্রম,মেধা ও জান-মালের কোরবানী। অপরিহার্য হয় ছবর।পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালার ঘোষণা “তোমরা কি ধারণা যে এমনিতেই জান্নাতে প্রবেশ করবে? অথচ আল্লাহ এখনও দেখেন নাই তোমাদের মধ্যে কারা জিহাদ করেছে এবং কারা ধৈয্যশীল।”-সুরা আল-ইমরান আয়াত ১৪২)।নবী-রাসূলগণ ও তাদের সাহাবাগণ তাই আজীবন জিহাদ করে গেছেন।জিহাদ হলো সিরাতুল মোস্তাকীমের অবিচ্ছিন্ন অংশ। তাই জিহাদ থেকে দূরে থাকার অর্থ সিরাতুল মোস্তাকীম থেকে দূরে থাকা। তখন অসম্ভব হয় জান্নাতপ্রাপ্তি। মুসলিম রাষ্ট্রের মুল কাজটি হলো জনগণের সামনে ইসলামের এ চিত্রটি তুলে ধরা এবং এমন চেতনাসর্বস্ব ঈমানদার গড়া। অথচ সেক্যুলার রাষ্ট্রের কাজ হয় ইসলামের সে চিত্রকে গোপন করা। তাই সেক্যুলারিস্ট কবলিত রাষ্ট্রে মর্দেমুমিন মোজাহিদ না গড়ে মশামাছির ন্যায় বিপুল সংখ্যায় বৃদ্ধি পায় দুর্বৃত্ত। মৃত্যু ঘটে ন্যায়নীতি ও মানবতার।দুর্বৃত্তদের দখলে যায় তখন সমগ্র রাষ্ট্র।এমন অধিকৃত রাষ্ট্রে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলি তখন জনগণকে জাহান্নামের দিকে টানে।রাষ্ট্র তখন সবচেয়ে বিপদজনক প্রতিষ্ঠানে পরিনত হয়। পরিণত হয় মানব-শত্রু শয়তানের হাতিয়ারে।

মানব জাতির সবচেয়ে বড় বড় ক্ষতিগুলো কোন কালেই বন্যপশুর হাতে হয়নি। হয়েছে রাষ্ট্রের হাতে। তখন শুধু হাজার মানুষের প্রাণহানীই হয় না, ঈমানহানিও হয়। ফলে সবচেয়ে বড় ক্ষতিটি হয় পরকালে। ইহকালে এ শয়তানি শাসকগণ বড় জোর জেল জুলুম বা প্রাণ নাশ করে। কিন্তু শয়তানের হাতে অধিকৃত এ রাষ্ট্রগুলির মূল কাজ তো শুধু প্রাণনাশ, জেলজুলুম বা অর্থ লুটপাঠ নয়। সেটি তো কোটি কোটি মানুষকে জাহান্নামের পৌছে দেয়ার ব্যবস্থা করা। এবং সে জাহান্নামে অনন্ত অসীম কালের জন্য থাকার ব্যবস্থা করা। মানুষের এতবড় ক্ষতি কি কোন বন্য পশু করতে পারে? আর এটিই তো শয়তানের মিশন।বাংলাদেশের মত অধিকাংশ মুসলিম দেশে তো সে মিশনের পতাকাধারিরাই বিজয়ী। ফিরাউন ও নমরুদের ন্যায় দুর্বৃত্ত শাসকগণ যে কাজগুলো অতীতে করেছে,আজ সে কাজগুলোই করছে আধুনিক রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের বুকে শয়তানের প্রতিষ্ঠানগুলি যেমন অসংখ্য,সেসব প্রতিষ্ঠানে শয়তানের খলিফা গড়ার প্রশিক্ষণও লাগাতর। আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও অবাধ্যতা কে তীব্রতর করাই এগুলোর মূল কাজ। এসব দুর্বৃত্ত শাসকদের হাতে হাজার মানুষ যেমন লাশ হচ্ছে তেমনি তাদের পাপাচারের রাজনীতি,শিক্ষানীতি,সংস্কৃতি,প্রশাসন,অর্থনীতি ও বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে কোটি কোটি নারী,শিশু ও সাধারণত মানুষকে জাহান্নামের দিকেও ধাবিত করা হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশের মুসলমানগণ নিজেদের ও নিজেদের শিশু সন্তানদের সে বিপদটিই নীরবে দেখছে।সামান্যতম ইসলামি জ্ঞান ও চেতনা থাকলে কি এ বিপদ থেকে বাঁচার তাগিদে বহু আগে থেকেই জিহাদ শুরু হতো না?

অথচ জাহান্নামের ভয়াবহ আগুণ থেকে রক্ষা করতেই মহান আল্লাহতায়ালা যুগে যুগে লক্ষাধিক নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন।হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) হলেন এ লক্ষ্যে আল্লাহতায়ালার সর্বশেষ রাসূল।এবং পবিত্র কোরআন হলো সর্বশেষ হেদায়েতের গ্রন্থ। আল্লাহতায়ালার নির্দেশিত বিধান ও নবীজী(সাঃ)র সূন্নত হলো রাষ্টকে শয়তানের অধিকৃতি থেকে মুক্ত করা এবং সে রাষ্ট্রে ইসলামের নিজস্ব রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। এবং সেসব প্রতিষ্ঠানে জান্নাতে উপযোগী মানুষ গড়ায় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। এটিই নবীরাসূল ও তাদের অনুসারিদের শ্রেষ্ঠ সূন্নত। এবং এটিই আল্লাহর নির্দেশিত সূন্নত। তাই মুসলমান হওয়ার সাথে সাথে স্রেফ নামের পরিবর্তন হয় না,মু’মিনের জীবনে লাগাতর যুদ্ধও শুরু হয়।এমন কাজের জন্য জরুরী হলো এমন কিছু ধ্যানমগ্ন মানুষ যাদের একমাত্র ধ্যান শুধু আল্লাহর কাছে প্রতি মুহুর্তে প্রিয়তর হওয়ার ভাবনা। আর রোযা তো দিবারাত্র সে ধ্যানমগ্নতাই বাড়ায়। রাষ্ট্র বিপ্লবের জিহাদে রোযার প্রশিক্ষণ তাই অপরিহার্য।

 

রোযা গড়ে যিকরের সংস্কৃতি

ঈমানদারের মূল শক্তি ঈমান ও তাকওয়ার বল।সে শক্তিই তাকে জান্নাতে পৌছায়। ঈমান ও তাকওয়ার অভাবে বিস্ময়কর আবিস্কারকরগণও অতীতে জাহান্নামমুখি হয়েছে।অতীতের ন্যায় জাহান্নামমুখি হচ্ছে আজকের প্রতিভাধর আবিস্কারকগণও।তাই পবিত্র কোরআনে হুশিয়ারি:“হে ঈমানদারগণ,তোমরা আল্লাহকে ভয় করো যেরূপ তাঁকে ভয় করা উচিত। এবং মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরন করো না।” –(সুরা ইমরান, আয়াত ১০২)। তাকওয়া হলো সেই ভয় যা মানুষকে প্রতিক্ষণ ও প্রতিকর্মে আল্লাহর প্রতিটি হুকুমে অনুগত করে। অনুগত করে তাঁর প্রদর্শিত সিরাতুল মোস্তাকীমে চলায় এবং দূরে রাখে প্রতিটি অবাধ্যতা থেকে। তাকওয়া সমৃদ্ধ মু’মিনের জীবনে প্রতিক্ষণ চলে আল্লাহর যিকর বা স্মরণ। সে স্মরণ শুধু আল্লাহর নামের জপ নয়,বরং নিজ জীবনে আল্লাহর প্রতিটি নির্দেশ কতটা নিখুঁত ভাবে পালিত হলো সে ফিকর। মহান আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে কতটা দূরে থাকা হলো এবং তাঁর দ্বীনকে বিজয়ী করার কাজে নিজের পক্ষ থেক কোথায় কি কি আরো করণীয় -দিবারাত্রের সে ভাবনা। ঈমানদারের জীবনে এভাবেই শুরু হয় এক বিরামহীন হিসাব-নিকাশ। যার জীবনে সে হিসাব-নিকাশ নাই,বুঝতে হবে তার জীবনে পরকালে জবাবদেহীর ভয়ও নাই। এরূপ নিকাশ নিকাশের ভয়ে খলিফা হযরত উমর (রাঃ)ছিলেন সদাসর্বদা অস্থির। রাতের আঁধারে তিনি না ঘুমিয়ে বরং মদিনারা রাস্তায় রাস্তায় টহল দিতেন। খোঁজ নিতেন কোন গৃহে কোন ব্যক্তি শোকে-দুঃখে কাতরাচ্ছি কিনা। সে অস্থিরতায় তিনি ভৃত্যুকে উঠের পিঠে চড়িয়ে নিজে রশি ধরে জেরুজালেমের পথে শতাধিক মাইল হেঠেছেন। নিজ কর্মের হিসাব নিকাশ নিয়ে তার অমর বানিটি হলোঃ “আল্লাহর কাছে হিসাব দেয়ার আগে নিজেই নিজের হিসাবটি নাও।”

মু’মিনের যিকর ও ফিকর তাই শুধু জায়নামাযে সীমিত থাকে না,বরং নীরবে কাজ করে তার সমগ্র চেতনা,কর্ম ও আচরণে সর্বমুহুর্ত জুড়ে।এমন যিকরের ফলে মু’মিনের প্রতিক্ষণ কাটে ইবাদতে। নবীজীর (সাঃ)র হাদীসঃ “আফজালুর ইবাদত তাফাক্কু” অর্থঃ শ্রেষ্ঠ ইবাদত হলো চিন্তাভাবনা। কোরআন পাঠ ও নামায-রোযার ন্যায় ইবাদত তো এরূপ যিকর ও ফিকরকেই বলবান করে। তখন মু’মিনের চেতনা রাজ্যে আসে আল্লাহর দ্বীনের বিজয়ে তথা শরিয়তের প্রতিষ্ঠায় নিজের জানমাল বিলিয়ে দেয়ার প্রেরণা। আসে সার্বক্ষণিক চিন্তামগ্নতা। তাই মু’মিনের চিন্তামগ্নতা সাধু-সন্নাসীর বনবাসের ধ্যান নয়।পীর বা সুফির অলস জপমালাও নয়। বরং অনলস এক সমাজ বিপ্লবীর প্রতিক্ষণের জিহাদী ভাবনা। সে লাগাতর ভাবে আল্লাহর দ্বীনকে বিশ্বময় বিজয়ী করা নিয়ে।এমন ব্যক্তিরাই তো আল্লাহর ওলী বা বন্ধুতে পরিণত হয়।আল্লাহতায়ালার ওয়াদা,তিনি তাঁদেরকে অন্ধকার থেকে আলোকে নিয়ে আসেন।এমন যিকিরকারিকে মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর আরশে বসেও স্মরণ করেন। এটি তাঁর প্রতিশ্রুত ওয়াদা। তাই পবিত্র কোরআনের ঘোষণা,“অতঃপর তোমরা আমাকে স্মরণ করো আমিও তোমাকে স্মরণ করবো।”–(সুরা বাকারা)। আর ওয়াদা পালনে আল্লাহতায়ালার চেয়ে আর কে উত্তম? আর রোযা হলো মু’মিনের দিনভর ও রাতভরের যিকর। এটিই সবচেয়ে দীর্ঘ যিকর। ফলে দীর্ঘ এ যিকিরের ফলে সেও স্থান পায় মহান আল্লাহর স্মৃতিতে।

মহান আল্লাহতায়ালার কাছে মু’মিনের এরূপ যিকর যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ সে বর্ননাটি বার বার এসেছে পবিত্র কোরআনে। যার জীবনে আল্লাহর যিকর ও তাঁর দ্বীনকে বিজয়ী করার ফিকর নাই তার উপর সওয়ার হয় শয়তান। আর শয়তান তাকে জাহান্নামের পথে ধাবিত করে। সে কঠোর হুশিযারিটিও এসেছে পবিত্র কোরআনে। বলা হয়েছে,“এবং যারাই করুণাময়ের যিকর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল তাদের উপর আমরা শয়তানকে নিয়োজিত করে দেই এবং সে তার সহচরে পরিণত হয়। এবং তারা (শয়তান) তাদেরকে সত্য পথ থেকে ফিরিয়ে দেয়। অথচ (সে পথভ্রষ্টতার পরও) তারা ভাবে তারা হেদায়েতপ্রাপ্ত।”–(সুরা জুখরুফে,আয়াত ৩৬ ও ৩৭)। মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এটি এক ভয়ংকর হুশিয়ারি। ফলে যে ব্যক্তির জীবনে আল্লাহর যিকর নাই, তার ঘাড়ে শয়তান যে নিশ্চিত ভাবেই চেপে বসবে এবং শয়তান যে তাকে অনিবার্য ভাবেই পথভ্রষ্ট করবে সেটিও মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিশ্রুতি।এর চেয়ে বড় শাস্তি আর কি হতে পারে? তখন সে ব্যক্তিকে তার ঘাড়ে বসা শয়তানটি সূদের পথ,ঘুষের পথ,চুরি-ডাকাতির পথ,বেপর্দাগী ও ব্যাভিচারির পথে ধাবিত করে। আল্লাহর অবাধ্যতার পথে চলা তার জন্য তখন অতি সহজ হয়ে যায়। সে তখন শয়তানের সার্বক্ষণিক সৈনিকে পরিণত করে। বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশগুলোতে এ শয়তানের সৈনিকেরাই কি আল্লাহর শরিয়তি বিধানের প্রতিষ্ঠাকে অসম্ভব করে রাখেনি?

 

মুমিনের জীবনে যিকর ও আধ্যাত্মীকতা

মু’মিনের সালাম-কালাম,রাজনীতি-অর্থনীতি,সাহিত্য-সংস্কৃতি,আচার-আচরণ তথা সবকিছুর মধ্যে থাকে আল্লাহর যিকর। সর্বক্ষণ চলে আল্লাহর প্রিয় হওয়ার সর্বাত্মক সাধনা। মু’মিনের জীবনে এভাবেই অনিবার্য হয় আধ্যাত্মীক বিপ্লব। ফলে মুমিনের রাজনীতি ও সংস্কৃতি আল্লাহবিমুখ বা সেক্যুলার না হয়ে যিকরের রাজনীতি ও যিকরের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। রাজপথের মিছিলে মু’মিনের মুখ থেকে তাই জয় বাংলা,জয় হিন্দ বা জয় আরবের শ্লোগান বেরুয় নয়।বরং গগন কাঁপানো আওয়াজ উঠে “আল্লাহু আকবর।”। যার জীবনে এমন যিকির আছে সে কি সংবিধান থেকে আল্লাহর উপর আস্থার বানি বিলুপ্ত করতে পারে? বরং সে তো কঠোর শপথ নেয় রাষ্ট্রের সর্বত্র জুড়ে আল্লাহর শরিয়তি আইন প্রতিষ্ঠার। ব্যাংকে বসে সে তখন সূদ খায় না,অফিসে বসে সে ঘুষ খায় না এবং সংসদে বা মাঠে ময়দানে দাঁড়িয়ে শরিয়তের বিরুদ্ধে সে বক্তৃতাও দেয় না। এজন্যই কোন মু’মিন ব্যক্তি ইতিহাসের কোন কালেই সেক্যুলারিস্ট,সোসালিস্ট ও জাতিয়তাবাদী হয়নি। কখনোই সে কাফের শক্তির অস্ত্র কাঁধে নিয়ে যুদ্ধ করেনি। কাফেরদের খুশি করতে কোন মুসলিম ভূমিকে খন্ডিতও করেনি। বরং অকাতরে অর্থ ও রক্ত দিয়েছে ইসলামের বিজয়ে এবং মুসলিম রাষ্ট্রের ভূগোল বাড়াতে।

রোযা আনে এক মাসের ধ্যানমগ্নতা। সেটি শুধু তার সেহরী,ইফতারি ও তারাবিহতে নয়। বরং যখনই ক্ষুধা,পিপাসা ও যৌনতার মোহ,তখনই তীব্রতর হয় আল্লাহর স্মরণ বা যিকর। বস্তুত নামায-রোযা, হজ-যাকাতের ন্যায় প্রতিটি ইবাদতের মূল লক্ষ্যই হলো মু’মিনের জীবনে সে যিকরকে জাগ্রত রাখা। মুমিনের উঠাবসা, চলাফেরা, কাজকর্ম ও বিশ্রামে সর্বত্রই চলে আ্ল্লাহর যিকর। পবিত্র কোরআনে  নামাযকেও যিকর বলা হয়েছে। যিকর বলা হয়েছে পবিত্র কোরআনকেও। এ বিষয়ে কোরআনের আয়াতঃ “ইন্না নাহনু নাজ্জালনা যিকরা ওয়া ইন্না লাহু হাফিজুন”। -(সুরা হিজর আয়াত ৯)। পবিত্র কোরআনকেও বলা হযেছে যিকর। মহান আল্লাহর ভাষায়, “আল কোরআনু যিয যিকর” অর্থঃ কোরআনে হচ্ছে যিকর-সর্বস্ব। -(সুরা ছোয়াদ আয়াত ১)। যারা জ্ঞানী ঈমানদার তাদেরকে বলা হয়েছে আহলুয যিকর অর্থাৎ যারা যিকর করে। তাদের সম্মানে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “অতঃপর তোমরা যদি না জেনে থাক তবে যারা যিকর করে তাদেরকে জিজ্ঞাসা করো।” –(সুরা নাহল, আয়াত ৪৩)। এবং সমগ্র ইবাদতের মাঝে রোযাই হলো সবচেয়ে দীর্ঘকালীন যিকর। নামাযের যিকর নামায-কালীন কয়েক মিনিটের। হজের যিকর জিল হজ মাসের মাত্র সামান্য কয়েকটি দিনের। এবং হজের সে যিকর দরিদ্র মানুষের জীবনে আসে না। কিন্তু রোযার যিকর রমযানের সমগ্র মাস ধরে ও প্রতিটি সাবালক নরনারীর জীবনে। রোযা এভাবে আল্লাহর যিকরকে মু’মিনের জীবনে বছরের বাঁকি মাসগুলোর জন্য অভ্যাসে পরিণত করে।

 

যে নাশকতা সেক্যুলারিজমে

আল্লাহর যিকরকে ভূলিয়ে দেয়ার লক্ষ্যে শয়তানের আয়োজনটি বিশাল। সে আয়োজন বাড়াতে শয়তানী শক্তি গড়ে তুলেছে সেক্যুলার রাজনীতি,সেক্যুলার শিক্ষা-সংস্কৃতি ও সাহিত্য। সেক্যুলারিজমের মূল কথাঃ আল্লাহর যিকর বা স্মরণের স্থান রাজনীতি নয়,সাহিত্য ও শিক্ষা-সংস্কৃতিও নয়।সেক্যুলারিস্টদের দাবী,আল্লাহর যিকরকে জায়নামাজে রেখে রাজনীতিতে আসতে হবে। সেক্যুলারিস্টগণ এভাবেই মুসলমানের রাজনীতিকে যিকরশূন্য করে। আর রাজনীতি হলো রাষ্ট্র ও সমাজের ইঞ্জিন। রাজনীতি যখন যিকরশূন্য হয় তখন যিকরশূণ্য হয় দেশের শিক্ষা-সংস্কৃতি, আইন-আদালত, অর্থনীতি ও প্রশাসন। তখনে রাষ্ট্রের প্রতি স্থলে পরাজিত হয় ইসলাম। ব্যক্তি আল্লাহর যিকর শূন্য হলে তার উপর যেমন শয়তান চেপে বসে তেমনি রাষ্ট্রের রাজনীতি, সংস্কৃতি,প্রশাসন ও আইন-আদালত যিকরশূণ্য হলে রাষ্ট্রের সমগ্র অস্তিত্ব জুড়ে চেপে বসে শয়তান। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ তো তেমনি এক শয়তান অধিকৃত দেশ। ফলে দেশটির রাজপথে নিহত ও আহত হচ্ছে টুপিধারি মুসল্লি। সংবিধান থেকে বিলুপ্ত হচ্ছে আল্লাহর নাম। নিষিদ্ধ হচ্ছে তাফসির মাহফিল। এবং বাজেয়াপ্ত হচ্ছে ইসলামি বই। এবং বাংলাদেশের উপর নেমে আসছে মহান আল্লাহর প্রতিশ্রুত আযাব। মুসলমানের ঈমান-আমল ও মুসলিম দেশের বিরুদ্ধে এভাবেই ঘটে সেক্যুলারিজমের জঘন্য নাশকতা।সেক্যুলারিজম এজন্যই হারাম।বিষপানে দেহের মৃত্যু ঘটে, আর সেক্যুলারিজমে মৃত্যু ঘটে ঈমান-আক্বীদার। তাই মুসলমান যেমন মুর্তিপুজারি,গো-পুজারি ও নাস্তিক হতে পারে না,তেমনি সেক্যুলারিস্টও হতে পারে না।

সেক্যুলারিজম মুসলিম ভূমিতে শয়তানের বিজয়কেই সুনিশ্চিত করে। মুসলমানদের আজকের বিভক্তি,মুসলিম ভূমিতে শত্রুশক্তির বিজয় ও দুর্বৃত্তিতে মুসলিম দেশগুলোর বার বার বিশ্ব রেকর্ড কি শয়তানের সে বিজয়ই প্রমাণ করে না? অথচ ঈমান ও তাকওয়া গভীরতর হলে নির্মূল হয় সেক্যুলারিজম।মু’মিনের তাকওয়া শুধু মুর্তিপুজার বিরুদ্ধেই যু্দ্ধ করে না,যুদ্ধ করে সেক্যুলারিজমের বিরুদ্ধেও। অথচ বাংলাদেশের ন্যায় অধিকাংশ মুসলিম ভূমিতে সেক্যুলারিজম নির্মূল হয়নি।বরং প্রবলতর হয়েছে। সেক্যুলারিজমের প্রভাবে মানুষ রোযা রেখেও অতিশয় ভোগবাদী ও বস্তুবাদী হয়। ফলে রোযার মাসেও সেক্যুলারিস্ট রোযাদাররা দ্রব্যমূল্য বাড়ায় এবং বাসের ভাড়া ও ঘুষের রেটে বৃদ্ধি ঘটায়। লক্ষ লক্ষ রোযাদার সেক্যেুলারিস্টদের পক্ষে ভোট দেয়,অর্থ দেয়, শ্রম দেয় এবং প্রয়োজনে রাজপথে তাদের পক্ষে অস্ত্রও ধরে। সেটি যেমন বাংলাদেশে তেমনি মিশর, সিরিয়াসহ বহু দেশে। ফলে গত ২৬/০৭/১৩ তারিখে ১২০ জন রোযাদার লাশ হলো কায়রোর রাজপথে। লাশ হচ্ছে বাংলাদেশেও।

মুসলিম দেশগুলিতে কোটি কোটি মানুষের রোযা-তারাবিহ সত্ত্বেও তাকওয়া ও আধ্যাত্মীকতা যে বাড়েনি সেটি কি এরপরও বুঝতে বাঁকি থাকে? কোটি কোটি মুসলমানের ইবাদত তাদের জীবনে বিপুল আনুষ্ঠিকতা বাড়ালেও মহান আল্লাহর কাছে জবাবদেহীতার ভয় বাড়াতে পারিনি।এখানেই রোযার ব্যর্থতা। ইবাদতের এমন ব্যর্থতা কি সাহাবাদের জামানায় কল্পনা করা যেত? তবে এ ব্যর্থতাটি রোযার নয়। বরং ব্যর্থতা এখানে রোযার মূল দর্শনটি না বুঝার।স্রেফ কোরআনের বার বার তেলাওয়াতে মগজে বিপ্লব আসে না। সেজন্য কোরআনের জ্ঞানের সাথে আত্মার গভীর সংযোগটি জরুরী। ঘুমুন্ত বা পথহারা বিবেক তো একমাত্র সে জ্ঞানেই জেগে উঠে। শুধু মুখ ঠোট ও জিহ্বার সংযোগে সেটি সম্ভব নয়। তেমনি রোযার মাসে স্রেফ পানাহার বন্ধ রাখায় চেতনায় ও আমলে বিপ্লব আসে না। সে জন্য চাই মহান আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণের যিকর ও ধানমগ্নতা।কিন্তু সেক্যুলার ব্যক্তির জীবনে তো সেটি আসে না। তার ধ্যানমগ্নতা শুধু ভোগের আয়োজন বৃদ্ধিতে। ফলে রোযার মাসে সে সূদ খাবে,ঘুষ খাবে,দ্রব্যমূল্য বাড়াবে এবং নানা ভাবে অন্যের পকেটে হাত দিবে সেটিই তো স্বাভাবিক। সেক্যুলারিজমের বিষ পানে ঈমান যে বাঁচে না এ তো তারই প্রমাণ।রোযা তখন নিছক আনুষ্ঠিকতায় পরিণত হয়। -(২৭/০৭/২০১৩) পরিবর্ধিত (১১/০৫/২০১৯)।

 

 




আধ্যাত্মিক বিপ্লবে রোযা

আয়োজন সর্বশ্রেষ্ঠ প্রশিক্ষণের

আধ্যাত্মিকতার অর্থ সংসারত্যাগী বৈরাগ্য নয়,পানাহার পরিত্যাগও নয়। বরং সর্বাবস্থায় মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণ ও পরকালে জবাবদেহীতার ভয়।স্মরণ এখানে মহান আল্লাহতায়ালার প্রতি ঈমানি দায়বদ্ধতার। ইসলামে এটিই যিকর। জবাবদেহীতা হলো নিজের আমলনামাহ নিয়ে মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে খাড়া হওয়ার।ভয় সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে বিচ্যুতি ও জাহান্নামের আগুণে পড়ার। এরূপ ভয়ই ব্যক্তিকে প্রতিপদে পাপাচার থেকে বাঁচায় এবং জান্নাতমুখি করে। তখন তার চথচলাটি সবসময় সিরাতুল মুস্তাকীমে হয়।মানব জীবনের এটিই সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন।ঈমান ও আমলের ক্ষেত্রে সর্বশ্রেষ্ঠ বিপ্লবও। এরূপ আধ্যাত্মিক বিপ্লবে রোযার ভূমিকাটি বিশাল ও অনন্য। সমগ্র মানব ইতিহাসে এটিই সর্বশ্রেষ্ঠ প্রশিক্ষণ।মাসব্যাপী এ প্রশিক্ষণের মূল আয়োজক এখানে খোদ মহান আল্লাহতায়ালা।লক্ষ্য,মানব মনে তাকওয়া বৃদ্ধি।তাকওয়ার অর্থ ভয়। মানব চরিত্রের এটিই সর্বশ্রেষ্ঠ গুণ। ভয় এখানে মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে অবাধ্যতার এবং সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে বিচ্যুত হওয়ার। ভয়,মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে জবাবদেহীতার।

মানব সৃষ্টি নিয়ে মহান আল্লাহতায়ালার নিজের ঘোষনাটি হলো,“ওমা খালাকতুল জিন্নাহ ওয়াল ইনসানা ইল্লা লিইয়াবুদুন” –(সুরা জারিয়া,আয়াত ৫৬)। অর্থঃ “এবং আমি জ্বিন ও ইনসানকে এছাড়া অন্য কোন কারণে সৃষ্টি করেনি যে তারা আমার ইবাদত করবে।” অতএব প্রতিটি নরনারীর উপর অর্পিত মূল দায়ভারটি হলো সর্বাবস্থায় মহান আল্লাহতায়ালার সে অভিপ্রায়টি পূরণে তথা তাঁর ইবাদতে লেগে থাকা।মু’মিনের জীবনে সবচেয়ে বড় যিকর তো সর্বাবস্থায় ইবাদত আদায়ের ফিকর। সে তখন পরিপূর্ণ একাত্ম হবে কোরআনে ঘোষিত সে মিশনের সাথেঃ “নিশ্চয়ই আমার সালাত, আমার কোরবানি, আমার বেচেথাকা ও মৃত্যু রাব্বুল আলামিনের জন্য।” মানব জীবনের সবচেয়ে বড় ক্ষতি ও সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাটি হলো ইবাদতে তথা আল্লাহতায়ালার হুকুম পালনে ব্যর্থতা।ব্যবসা-বানিজ্য,রাজনীতি বা পেশাদারিতে বিশাল সফলতা দিয়ে সে ব্যর্থতার ক্ষতি পরকালে পোষানা যাবে না। ইবাদতের যে ব্যক্তি যতটা সফল,এ জীবনে বাঁচাটিও তার জন্য ততটা সার্থক। এজন্যই শহীদগণ মহান আল্লাহর দরবারে শ্রেষ্ঠ। তাদের ইবাদতের মানই ভিন্ন। আল্লাহর রাস্তায় তারা নিজের প্রিয় জীবনকেও বিলিয়ে দেয়।পৃথিবী পৃষ্ঠে মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীন বিজয়ী হয়,শরিয়ত প্রতিষ্ঠা পায় এবং শত্রুর হামলা থেকে মুসলিম ভূমি প্রতিরক্ষা পায় তো এরূপ শহীদদের কোরবানীতে;জিহাদবিমুখ কোটি কোটি নামাযী,রোযাদার,হাজি,সুফি,দরবেশ,আলেম ও আল্লামাদের কারণে নয়। মহান আল্লাহতায়ালা শহীদদের জীবনে তাই কবরের আযাব,আলমে বারযাখ,পুল সিরাত রাখেননি। রোজ-হাশরের বিচার দিনের জন্য তাদের একটি দিন বা মুহুর্তও অপেক্ষায় থাকতে হয় না। শহীদ হওয়ার সাথে সাথে মহান আল্লাহতায়ালা তাদের জন্য জান্নাতের দরওয়াজা খুলে দেন ও অফুরন্ত নেয়ামতের ভান্ডার পেশ করেন।পবিত্র কোরআনে সে বর্ণনা কি কম?

মানব জীবনে সর্বশ্রেষ্ঠ প্রশিক্ষণ তো তাই যা ব্যক্তির জীবনে সর্বোত্তম ইবাদতের সামর্থ বাড়ায়।রোযার প্রশিক্ষণ এক্ষেত্রে অনন্য। মহান আল্লাহতায়ালার ইবাদতে মধ্যে থাকার অর্থ হলো মহান আল্লাহতায়ালার যিকরের মধ্যে থাকা। নামাযকেও তাই পবিত্র কোরআনে যিকর বলা হয়েছে। যিকর বলা হয়েছে কোরআন পাঠকেও। রোযাদারের মনে সে যিকর থাকে মাসব্যাপী। রোযাতে মু’মিনের যিকর হয় শুধু মন দিয়ে নয়,দেহ দিয়েও।সারা দিনের রোযাতে যে যিকর -তারই ধারাবাহিকতা চলে তারাবির নামায,সেহরী ও ইফতারিতে।খাদ্য-পানীয় দেখলে রোযাদারের মনে সে যিকর বা স্মরণ আরো বেড়ে যায়।যিকরের সবচেয়ে বড় ফায়দাটি হলোঃ মু’মিনের যিকরের জবাবে মহান আল্লাহতায়ালা নিজেও তাকে স্মরণ করেন। পবিত্র কোরআনে সে প্রতিশ্রুতিটি এসেছে এভাবেঃ “ফাযকুরুনি আযকুরকুম”।অর্থঃ তোমরা আমার যিকর করো,আমিও তোমাদের যিকর করবো।-(সুরা বাকারা)।হাদীসে পাকে বর্ণিত হয়েছেঃ মহান রাব্বুল আলামীন তার যিকরকারি মু’মিন বান্দাদের স্মরণ করেন ফেরেশতাদের মজলিসে।এভাবে বান্দার সাথে বাড়ে মহান রাব্বুল আলামীনের সরাসরি সংযোগ।মু’মিনের জীবনে এটি এক বিশাল অর্জন। এমন সংযোগে পুষ্টি পায় ব্যক্তির আত্মা।রোযা সে পুষ্টি জোগায় পুরা একটি মাস ধরে।পাঁচ ওয়াক্ত নামাযে বা যাকাতে দীর্ঘকাল লাগে না।ফলে দীর্ঘকালীন সংযোগও গড়ে উঠে না। হজে দীর্ঘকাল লাগলেও রোযার মত প্রতিবছর আসেনা।মহান রাব্বুল আলামীনের সাথে আত্মিক সংযোগটিই মু’মিনের জীবনে আধ্যাত্মিকতা।এরূপ আধ্যাত্মিক বিপ্লবে রোযার ভূমিকাটি অনন্য।রোযা মাসব্যাপী ফরজ করে মহান আল্লাহতায়ালা এভাবে তার বান্দাকে পুরা এক মাস তাঁর নিজ স্মরনে থাকার ফুরসত দিয়েছেন।অন্য কোন ইবাদতে সে দীর্ঘকালীন সুযোগটি নেই।এভাবে মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণে থাকার অর্থই হলো,লাগাতর তাঁর করুণা লাভ ও মাগফেরাত লাভ।রোযা এভাবে মানব জীবনে মহাকল্যাণের সুযোগ করে দেয়। সুফি দরবেশদের মাজারে বা খানকাতে কি সে সুযোগ জুটে? মহান নবীজী (সাঃ)তাই এ মহাকল্যাণময় মাসটির প্রস্তুতি এক মাস পূর্ব থেকেই নেয়া শুরু করতেন।যে ব্যক্তি এ মাসটি হাতে পেয়েও তা থেকে লাভবান হলো না তার জন্য এটিকে এক ভয়ানক ব্যর্থতা বলে অভিহিত করেছেন।এ ব্যর্থতা কি বছরের অন্য কোন মাসের ইবাদতে পূরণ করা সম্ভব?

 

বাড়ায় আধ্যাত্মীক সংযোগ

তাযকিয়ায়ে নাফস বা আধ্যাত্মীক উৎকর্ষের জন্য নির্জনে ধ্যানমগ্ন হওয়াটি জরুরী। হাদীসে বলা হয়েছে,শ্রেষ্ঠ ইবাদত হলো চিন্তা-ভাবনা করা।কারণ,চিন্তা-ভাবনার মাধ্যমেই তো মহান আল্লাহতায়ালার সাথে ব্যক্তির আধ্যাত্মীক সংযোগটি বাড়ে।যারা চিন্তা-ভাবনা করে না পবিত্র কোরআনে তাদেরকে পশু বলে অভিহিত করা হয়েছে।সেটি একবার নয়,বহুবার। ভাবনা শূণ্য মন মহান আল্লাহতায়ালার কাছে এতটাই অপছন্দের যে আফালা তাফাক্কারুন (কেন চিন্তাভাবনা করো না?),আফালা তাদাব্বারুন (কেন গভীর ভাবে মনোনিবিষ্ট করোনা?),আফালা তাক্বিলূন (কেন আক্বলকে কাজে লাগাও না?)–এরূপ প্রশ্ন পবিত্র কোরআনে তিনি বার বার রেখেছেন। নবুয়ত প্রাপ্তির পূর্বে নবীজীও নির্জনে চিন্তা-ভাবনার লক্ষ্যে হিরা পর্বতের গুহায় ছুটে যেতেন। ঘর-সংসার ছেড়ে অনেকেই জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু বনজঙ্গল নিরাপদ নয়,সেখানে থাকে হিংস্র পশু ও বিষাক্ত কীট-পতঙ্গের কামড়ে প্রাণনাশের আশংকা। ফলে সেখানে নেয়া মহান আল্লাহতায়ালার রীতি নয়,বান্দাকে তিনি নিজ ঘরের পবিত্র ও নিরাপদ আশ্রয়ে ডাকেন। সেটি যেমন প্রতিদিন ৫ ওয়াক্ত নামাযে ও তারাবিতে,তেমনি রামাদ্বানের ই’তিক্বাফে। ই’তেক্বাফে মু’মিন পায় ঘর-সংসার ও কাজকর্ম থেকে দূরে সরে নির্জনে আল্লাহকে ডাকার সুযোগ। এভাবে মু’মিন পায় একাকী আত্মসমালোচনা ও আত্ম-উপলদ্ধির ফুরসত।পায় বেশী বেশী নফল নামায,কোরআন পাঠ ও কোরআনের আয়াতগুলোর উপর একক মনে ভাববার সুযোগ। রমাদ্বানে এভাবেই বাড়ে তাকওয়া ও তাজকিয়ায়ে নাফস। হজে গিয়ে ক্বাবার তাওয়াফ এবং আরাফা,মিনা ও মোজদালিফায় অবস্থানও সে সুযোগ দেয়। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে “নিশ্চয়ই নামায অন্যায় কর্ম ও অশ্লিলতা থেকে দূরে রাখে।” কথা হলো,অন্যায় ও অশ্লিলতা থেকে যে ব্যক্তি দূরে থাকে তাঁর কাছে কি পাপ বা অপবিত্রতা আসতে পারে? পাপের পথে যাত্রা শুরু হয় তো অশ্লিলতা ও অন্যায় কর্মের মধ্য দিয়ে।

ইবাদত দর্শনীয় হলে তাতে রিয়াকারির সুযোগ থাকে।রিয়াকারি তো শিরক।ফলে এমন লোক দেখানো ইবাদতে বাড়ে আযাব। নামায,হজ ও যাকাত নির্জনে হয় না,অন্যরাও তা দেখতে পায়। যাকাত দিলে যে ব্যক্তি যাকাতের অর্থ পায় সে ব্যক্তি তা টের পায়। যে ঘরে নামায পড়া হয় সে ঘরের অন্যরা বাসিন্দা সেটি দেখে। হজও ঘটে প্রকাশ্যে। ফলে এরূপ প্রকাশ্য ইবাদতে লোকদেখানো ভাবটাও আসতে পারে। কিন্তু রোযা দর্শনীয় নয়,পালিত হয় গোপনে। গোপনে পানাহার করলে সেটি কে দেখবে? কিন্তু রোযাদার সেটি করে না একমাত্র আল্লাহর ভয়ে। মহান আল্লাহ তাই বলেন,“রোযা আমার জন্য,আমিই তার পুরস্কার দিব।”-সহীহ আল বোখারী ও মুসলিম। ক্ষুদার্ত এবং পীপাসার্ত ব্যক্তির পানাহারের ভাবনা স্মরণ করিয়ে দেয় সে রোযা আছে। তখন তার মনে জাগে মহান আল্লাহর ভয়। মু’মিনের জীবনে সে ভয়টুকুই তো প্রকৃত তাকওয়া এবং মহান আল্লাহর যিকর। রামাদ্বানের একমাস ব্যাপী রোযার মধ্য দিয়ে সে ভয় ও যিকর মু’মিনের জীবনে অভ্যাসে পরিণত হয়। বছরের বাকী সময়টা চলে সে অভ্যাসের উপর। রোযা এভাবেই মানুষের প্রবৃত্তির গলায় লাগাম পড়িয়ে দেয়। একবার গলায় লাগাম নিয়ে চলতে অভ্যস্থ হলে পরে আর সেরূপ চলতে অসুবিধা হয় না। রোযা তো মাসব্যাপী সে অভ্যাসই গড়ে। সে অভ্যাস নিয়ে বাঁকি ১১ মাস কাটিয়ে দেয়া তার জন্য সহজ হয়ে যায়। ইমাম আল গাজ্জালী (রহঃ)বলেন,রোযাদারের উচিত দিনে না ঘুমিয়ে বরং জেগে ক্ষুধা ও পীপাসার কষ্ট অনুভব করা। এরূপ কষ্টে থাকার মধ্যেই বাড়ে আধ্যাত্মিকতা। ঘুমিয়ে থাকলে সে সুযোগ মেলে না।

 

আঘাত শয়তানী হাতিয়ারগুলির উপর

রোযা আঘাত হানে শয়তানের মূল হাতিয়ারগুলির উপর। সে হাতিয়ারগুলি হলো পানাহারের মোহ,অশ্লিলতা ও যৌনতার লিপ্সা,অহেতুক কথা এবং কুৎসা ও গীবত রটনার নেশা। মানব জীবনে বড় বড় পাপকর্মগুলো তো ঘটে প্রবৃত্তির এরূপ নেশাগ্রস্ততা থেকে। এরূপ নেশাগ্রস্ত মানুষেরা মূলত শয়তানের দ্বারা অধিকৃত। কুৎসা ও গীবত মানব সমাজের পারস্পারিক বন্ধন থেকে সিমেন্ট খুলে দেয়। ফলে সমাজে কলহ-বিবাদ ও সংঘাত বাড়ে। দেহের ক্ষুধা বা প্রবৃত্তির নেশা জীবনের চালিকা শক্তি হলে সে জীবনে আধ্যাত্মিকতা স্থান পায় না। মানব তখন পশুতে পরিণত হয়। আধ্যাত্মিক বিপ্লবের মূল চাবিটি হলো এরূপ জৈবিক প্রবৃত্তিগুলির উপর নিয়ন্ত্রন। রোযা এক মাস এগুলিকে দাবীয়ে রাখে। রোযা নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করে ক্রোধ,ইর্ষা ও মনের লাগামহীন খায়েশাতের উপর।রোযাদারের চোখ,জবান,কান,হাতপা এবং হৃদয়ের চাওয়া-পাওয়াও তখন আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পিত হয়। রোযাদারের জীবনে এভাবেই আসে আধ্যাত্মিক বিপ্লব। কিন্তু যার জীবনে সে বিপ্লব ঘটে না তার রোযা অকেজো বা ব্যর্থ হয়ে যায়। নবীজী (সাঃ)র হাদীসঃ “যে ব্যক্তি রমযানে মিথ্যা ও গুনাহ পরিত্যাগ করতে পারলো না আল্লাহতায়ালা তার পানাহার পরিত্যাগও চান না।” -সহিহ আল বোখারি। এমন ব্যর্থ রোযাদারদের সম্মদ্ধে নবীজী (সাঃ) বলেছেন,“রোযা থেকে অনেকে শুধু ক্ষুধা ও পীপাসা ছাড়া আর কিছুই অর্জন করে না।”

মহান আল্লাহতায়ালা মানব জাতির কল্যাণে শুধু কোরআনই নাযিল করেননি,কোরআনের আলোকে মানুষ গড়ার জন্য বিস্তারিত এক ম্যানুয়্যাল বা প্রশিক্ষণের পদ্ধতিও দিয়েছেন।নামায-রোযা-হজ-যাকাত তো সে প্রশিক্ষণেরই অংশ। তবে প্রশিক্ষণের সবচেয়ে বড় আয়োজন রামাদ্বানে।এ প্রশিক্ষণ আধ্যাত্মিক শক্তি বৃদ্ধির,প্রবৃত্তির উপর আত্মার পূর্ণ নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠার। কোন বিপ্লবই নিছক কোন বিপ্লবী দর্শনের গুণে প্রতিষ্ঠা পায় না।সে জন্য লোকবল চাই,সংগঠন চাই,রাষ্ট্র চাই এবং বিপ্লবী লোক গড়ার লাগাতর প্রশিক্ষণও চাই। চাই,মানুষের ভিতর থেকে আমূল পরিবর্তন। তবে শুধু নামায-রোযা-হজ-যাকাতের মধ্যেই সে প্রক্রিয়া সীমিত নয়,বরং সে মহান বিপ্লবের লক্ষ্যে মসজিদ-মাদ্রাসার পাশাপাশি সকল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পূর্ণ সংশ্লিষ্টতার নির্দেশও রয়েছে।সেরূপ সংশ্লিষ্টতা দেখা গেছে মহান নবীজী (সাঃ)ও সাহাবায়ে কেরামের যুগে।ধর্মকর্ম ও ইসলামি জ্ঞান বিতরনের কাজ তখন মসজিদ-মাদ্রাসায় সীমিত থাকেনি। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলিও তাতে সংশ্লিষ্ট হয়েছে। ফলে সে সময় অতি দ্রুত মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার নির্মান সেদিন সম্ভব হয়েছিল।কিন্তু পরবর্তীতে সে প্রক্রিয়া বিলুপ্ত হয়েছে,বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলিকে ইসলামের প্রতিপক্ষ রূপে খাড়া করা হয়েছে। ফলে তখন থেকেই শুরু হয়েছে মুসলমানদের নীচে নামা।এবং আজও  সে ধারা অব্যাহত রয়েছে।

উচ্চতর মানব নিছক মানব ঘরে জন্ম নেয়া বা উন্নত পানাহার ও আলোবাতাসের কারণে গড়ে উঠে না। এমনকি আলেম বা দরবেশের ঘরে জন্ম নেয়াতেও সে সম্ভাবনাটি বাড়ে না। সে জন্য চাই নিবীড় প্রশিক্ষণ। এমন প্রশিক্ষণ অন্য জীবজন্তু বা কীটপতঙ্গের জীবনে প্রয়োজন পড়ে না। বাঘ জন্মের পর থেকেই বাঘ। কিন্তু মানুষকে মানবিক পরিচয় পেতে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের দীর্ঘ স্তর অতিক্রম করতে হয়। শিক্ষা লাভের সে স্তরগুলি বাধাগ্রস্ত হলে মানুষ রূপে বেড়ে উঠাতেই ছেদ পড়ে। পাপুয়া নিউগিনি বা আন্দামানের দ্বীপে বহু মানব সন্তান আজও  পশুর ন্যায় জঙ্গলের গুহায় উলঙ্গ ভাবে বাঁচে মূলতঃ শিক্ষার সে প্রক্রিয়া পাড়ি না দেয়ার কারণে। অথচ অন্য মানুষদের থেকে দৈহীক ভাবে তাদের মাঝে কোন ভিন্নতা নেই। এমন কি যারা নিছক বাঁচার স্বার্থে বাঁচে তেমন মানুষরূপী বহু ভদ্রবেশী পশুও আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণ লাভের গুরুত্ব বুঝে না। এরাই অস্ত্র হাতে পেলে পশুর চেয়েও হিংস্রতর হয়ে উঠে। বিগত দুটি বিশ্বযুদ্ধে এদের হাতেই সাড়ে সাত কোটি মানুষের মৃত্যু। সকল পশুকুলও এত মানুষের হত্যা করতে পেরেছে? যেসব ধর্ম বা মতবাদগুলি উচ্চতর মানব বা সভ্যতা নির্মাণের স্বপ্ন দেখে না সেসব ধর্ম ও মতবাদের অনুসারিদের কাছেও ধর্মীয় শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ গুরুত্ব পায় না। অথচ ইসলামে রয়েছে ওহীর জ্ঞান বিতরণের বিশাল গুরুত্ব ও আয়োজন। নামায-রোযা, হজ-যাকাত ফরজ করার আগে ফরজ করা হয়েছে কোরআনের জ্ঞানার্জনকে।কোরআন নাযিল শুরু হয়েছে “ইকরা” অর্থ পড় দিয়ে।মানব চরিত্রে বিপ্লবের মূল এবং প্রধান হাতিয়ারটি হলো ওহীর জ্ঞান।জ্ঞানের সাথে চাই,মহান আল্লাহর নির্দেশিত প্রশিক্ষণ।মহান আল্লাহতায়ালা তাই মানব চরিত্রে বিপ্লব আনার কাজকে শুধু ওহীর জ্ঞানদানের মাঝে সীমিত রাখেননি।দিয়েছেন,নামায-রোযা,হজ-যাকাতের ন্যায় ইবাদতের বিধান।ডাক্তার,ইঞ্জিনীয়ার,বিজ্ঞানী বা অন্য কোন পেশাদার হওয়ার জন্য ছাত্রকে শুধু বই পড়লে চলে না তাকে সে পেশায় বছরের পর বছর প্রশিক্ষনও নিতে হয়।কিন্তু মুসলমান রূপে গড়ে তোলার কাজ তো বিশাল। একাজটি পেশাদারি দক্ষতার বিষয় নয়।পেশাদার ডাক্তার বা ইঞ্জিনীয়ার তো অতি ব্যভিচারি ও মদ্যপায়ী এক দৃর্বৃত্তও হতে পারে।পেশাদারি ট্রেনিংয়ের লক্ষ্য স্রেফ ডাক্তার বা ইঞ্জিনীয়ার গড়া;ধর্ম বা দর্শন শেখানো নয়,নীতিবান মানব গড়াও নয়।কিন্তু মুসলমান হ্ওযার জন্য চাই ঈমান-আক্বীদা,চেতনা-চরিত্র ও কর্ম জুড়ে এক আমূল বিপ্লব।ফলে এখানে শুধু জ্ঞান হলে চলে না,চাই অবিরাম ধ্যানমগ্নতা (যিকর),চাই সিরাতুল মুস্তাকীমের চলার আগ্রহ, চাই পরকালে মহান আল্লাহতায়ালার কাছে জবাবদেহীতার ভয় (তাকওয়া।

কার্ল মার্কসের “ডাস ক্যাপিটাল” ও “কম্যুনিষ্ট পার্টির মেনিফেস্টো” আজ থেকে শত বছর আগে যেমন ছিল তেমনি আজও আছে।কিন্তু কম্যুনিজম প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পূর্বের ন্যায় উদ্বুদ্ধ লোক নাই,সংগঠন নাই এবং মানুষের মনকে আন্দোলিত করার মত প্রশিক্ষণও নাই।ফলে কোন দেশে কম্যুনিষ্ট বিপ্লবও নাই। ফলে পুঁজিবাদের বিপরীতে কম্যুনিজম আজ আর তাই কোন শক্তিই নয়।কম্যুনিষ্টদের লক্ষ্য সর্বমুখি ছিল না,ছিল সীমিত।তারা চেয়েছিল উংপাদনের প্রক্রিয়া ও সম্পদের বন্টনে বিপ্লব। চেয়েছিল ভূমি ও কলকারখানার উপর শ্রমিকের মালিকানা প্রতিষ্ঠা। মানুষের আধ্যাত্মিক,নৈতীক ও চারিত্রিক বিপ্লব নিয়ে তাদের মাথা ব্যাথা ছিল না।ভাবনা ছিল না নাগরিকগণ পরকালে জান্নাত পাবে,না জাহান্নাম পাবে -তা নিয়েও। কিন্তু এরপরও সে সীমিত লক্ষ্যের বিপ্লবের জন্যও তাদেরকে নিজস্ব ধারার বিপুল সংখ্যক মানুষ গড়তে হয়েছে।দেশে দেশে কম্যুনিষ্ট পার্টি গড়তে হয়েছে এবং কম্যুনিজমের প্রচারে বিশাল সাহিত্যও গড়ে তুলতে হয়েছে। সে সাথে রাশিয়ার মত বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ দেশের উপর দখলদারি প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছে। সে দখলদারির ফলে কম্যুনিজম রাতারাতি বিশ্বশক্তিতে পরিনত হয়।এবং যখন সে রাষ্ট্র হাতছাড়া হয়েছে তখন বিলুপ্ত হয়েছে বিশ্বশক্তির সে মর্যাদা। একই ভাবে ইসলাম শক্তিহীন হয়েছে মুসলিম ভূমিগুলি দেশী ও বিদেশী শত্রুদের হাতে অধিকৃত হওয়ায়।শত্রুশক্তির দখলকারির কারণে সবচেয়ে বড় ক্ষতিটি হয়েছে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে।পরিকল্পিত ভাবে বন্ধ করা হয়েছে মুসলিম জীবনে ইসলামি শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক বিপ্লবের প্রশিক্ষণ।বরং রাষ্ট্রের সকল সামর্থের বিনিয়োগ হচ্ছে মুসলমানদের ইসলাম থেকে দূরে সরানোর কাজে। ফলে মুসলমানের সংখ্যা বাড়লেও ইসলামের প্রতিষ্ঠা বাড়েনি। মুসলমনাদের শক্তি ও ইজ্জতও বাড়েনি।

 

মহান আল্লাহতায়র ভিশন

মানবসৃষ্টি নিয়ে মহান আল্লাহতায়ালার নিজস্ব ভিশন রয়েছে। রোযার মাসব্যাপী প্রশিক্ষণের গুরুত্ব বুঝতে হলে মহান আল্লাহতায়ালার সে মহান ভিশনটি অবশ্য বুঝতে হবে। সে ভিশনটি এতই গুরুত্বপূর্ণ যে সেটি পূরণে মুসলমানদের জন্য তিনি একটি মিশনও নির্ধারিত করে দিয়েছেন। তাদের জন্য লাগাতর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন।শুধু রোযা নয়,নামায-হজ-যাকাতও সে প্রশিক্ষণের অংশ। পবিত্র কোরআনে তাঁর সে ভিশনটি তিনি বার ঘোষিত হয়েছে।সেটি  “লিহুযহিরাহু আলাদ্দীনি কুল্লিহি” অর্থাৎ সকল ধর্ম ও মতাদর্শের উপর তাঁর দ্বীনের বিজয়। বিজয় আনার কাজে ঈমানদারগণ তাঁর খলিফা রূপে কাজ করবে সেটিই মহান আল্লাহতায়ালার প্রত্যাশা। রোযা ফরয করার লক্ষ্যে মহান আল্লাহতায়ালা মাত্র দুটি আয়াত নাযিল করেছেন সেটি সুরা বাকারার ১৮৩ ও ১৮৫ নম্বর আয়াত। তাতেই বিশ্বের শত কোটির বেশী মানুষ রোযা রাখে। কিন্তু ইসলামকে বিশ্বব্যাপী বিজয়ী করার লক্ষ্যে মহান আল্লাহর যে নির্দেশ সেটি পূরণে মুসলিমদের মাঝে সে আয়োজন কই?

মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর ভিশন পূরণে মু’মিনের জীবনে যে মিশনটি নির্ধারণ করে দিয়েছেন সেটি হলোঃ ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের নির্মূল। পবিত্র কোরআনের ভাষায় সেটি “আ’’মিরু বিল মারুফ ওয়া নেহি আনিল মুনকার”। এ কাজ যেমন বিশাল,তেমনি এ কাজের পুরস্কারও বিশাল। একাজ চায় জানমালের বিশাল বিনিয়োগ।সাহাবাদের বেশীর ভাগ এ কাজে শহীদ হয়ে গেছেন। এ মিশন পালনে মু’মিনদের সামর্থ বাড়াতে মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশিত প্রস্তুতি এবং প্রশিক্ষণের আয়োজনও বিশাল। পবিত্র কোরআনের ছত্রে ছত্রে সে প্রস্তুতির তাগিদ। এবং সে প্রস্তুতির শুরুটি কোরআন বুঝার মধ্য দিয়ে। মু’মিন রূপে বেড়ে উঠার এটিই ফাউন্ডেশন বা ভিত্তিমূল। এখানে ব্যর্থ হলে মিশনের বাঁকি কাজেও সে ব্যর্থ হতে বাধ্য।মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশিত সিরাতুল মুস্তাকীমে চলায় পবিত্র কোরআন হলো রোডম্যাপ। এ রোডম্যাপই জান্নাতের পথ দেখায়। ফলে সে কোরআনি রোডম্যাপের জ্ঞান ছাড়া পথ চলা যে নিশ্চিত ভ্রান্ত পথে হবে এবং জাহান্নামে পৌঁছাবে -তা নিয়ে কি সন্দেহ চলে? কোরআন বুঝার এ ব্যর্থতা ব্যক্তিকে যে জাহেলে পরিণত করে ও জাহান্নামের আযাব ডেকে –সেটি যেমন নবীজী (সাঃ)র আমলে যেমন সত্য ছিল তেমনি আজও তো সত্য। আধুনিক যুগের জাহেলগণ বৈজ্ঞানিক আবিস্কারে চমক সৃষ্টি করতে পারে, চাঁদেও নামতে পারে,কিন্তু ওহীর জ্ঞানের অজ্ঞতায় তারা কি আদিম জাহেলদের থেকে আদৌ ভিন্নতর? এরূপ জাহেলগণ নবেল প্রাইজ পেলেও কি মহান আল্লাহতায়ার ভিশন পূরণে সহায়ক হতে পারে? পবিত্র জান্নাতে কি এমন জাহেলগণ কোন কালেও প্রবেশাধিকার পাবে?

অন্য কোন ধর্মে সর্বাত্মক রাষ্ট্রীয় বিপ্লবের কোন ধারণা নাই,কর্মসূচীও নাই। ফলে ইসলামের ন্যায় অন্য ধর্মে প্রশিক্ষণ বা প্রস্তুতির আয়োজনও নাই। ইসলাম এজন্যই অনন্য। অন্যধর্মে ধর্মগ্রন্থ পাঠ করা বাধ্যতামূলক নয়; গীর্জা,মন্দির বা মঠের মন্ত্রপাঠ সাধারণ খৃষ্টান,হিন্দু ও বৌদ্ধকে না জানলেও চলে। তাদের পক্ষ থেকে গীর্জার পাদ্রী,মন্দিরের ঠাকুর বা মঠের ভিক্ষুকগণ করলেই চলে।ফলে অন্যকোন ধর্মগ্রন্থে কেউ হাফেজ হয় না। অথচ পবিত্র কোরআন শিক্ষা করা,কিছু সুরা মুখস্থ করা,আলেম হওয়া এবং নিজের ইবাদত নিজে করা প্রতিটি মুসলমানের উপর ফরজ। নইলে মুসলমান হওয়াই অসম্ভব হয়ে পড়ে। ইসলাম ব্যক্তিকে তার নিজ নিজ কাজকর্ম,শয়ন বা বিশ্রাম থেকে উঠিয়ে প্রত্যহ ৫ বার মসজিদে নামাযে ডাকে।অন্য ধর্মগুলি দিনে ৫ বার কেন,একবারও ডাকে না। অন্য কোন ধর্মে মাসভর রোযার ন্যায় প্রশিক্ষণের আয়োজনও নাই।নিজ-কষ্টে উপার্জিত অর্থ থেকে যাকাত,ফিতরা,ওশর ও সাদকা রূপে অন্যদের ভাগ দিতেও বলে না।বহুশত বা বহুহাজার মাইল অতিক্রম করে হজে যেতেও নির্দেশ দেয় না। ভাষা,বর্ণ,ভৌগলিকতা ও আঞ্চলিকতার নামে গড়া বিভক্তির দেয়ালগুলো ভেঙ্গে কাঁধে কাঁধে মিলিয়ে সিসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় বিশ্বভ্রাত্বের বন্ধন গড়ার যে কঠোর নির্দেশটি ইসলাম দেয়,অন্য ধর্ম সেটিও দেয় না।ভিশন যত উন্নত হয়,মিশন ও প্রশিক্ষণের মাত্রাও তত উন্নত হয়।ইসলামের যা কিছু মহান তার মূলে তো মহান রাব্বুল আলামীন ও তাঁর পবিত্র গ্রন্থ আল-কোরআন।। তাই ইসলামের সাথে কি অন্য কোন ধর্মের তূলনা হয়? ফলে ইসলাম যে মাপের চারিত্রিক ও আধ্যাত্মিক বিপ্লব আনে সেটি কি অন্য ধর্মের অনুসারিগণ কল্পনা করতে পারে?

মাহে রামাদ্বানের ন্যায় বছরের আর কোন মাসেই এত কোরআন তেলাওয়াতের আয়োজন নাই। এ মাসে খতম তারাবিহ হয় মসজিদে মসজিদে। ইসলামের ইতিহাসে হযরত উমর (রাঃ)এর কল্যাণময় অবদান অনেক।বহু নেক কর্মের মাঝে তাঁর আরেক বিশাল নেক কর্ম হলো,তারাবীর নামাযকে তিনি জামাতে পড়ার রেওয়াজটি চালু করেন। ফলে মুসলমানগণ অন্তুতঃ বছরে একবার পুরা কোরআনপাকের আবৃত্তি শুনতে পায়। অথচ বহু কোটি মুসলিমের জীবনে নিজ উদ্যেোগে সেটি কি সারা জীবনে একবারও ঘটে? সে আমলে সেটি ছিল অসম্ভব। বর্তমান যুগে অতি সহজ হলো একখন্ড কোরআন সংগ্রহ করা।অনেক সময় বিনমূলেও মেলে। কিন্তু সে আমলে সে সুযোগ ছিল না। প্রথমবার মাত্র ৪ খন্ড কোরআন সংকলিত হয় হযরত উসমান (রাঃ)র আমলে। তখন পবিত্র কোরআন ছিল হাফিজদের স্মৃতিতে। জ্ঞানের এ সর্বশ্রেষ্ঠ ভান্ডারের সাথে সাধারণ মানুষের সংযোগের আয়োজনটি শুরু হয় তারাবিতে কোরআন খতমের মধ্য দিয়ে।অন্য কোন ধর্মে সাধারন মানুষের মাঝে কি ধর্মীয় জ্ঞান বিতরণের এরূপ আয়োজন আছে? নবীজী (আঃ)ও সাহাবায়ে কেরামদের যুগে এমনকি ফজর,মাগরিব ও এশার নামাযেও দীর্ঘ ছুরা পাঠ করা হতো। যারা কোরআনের ভাষা বুঝে তাদের জন্য এ হলো বিশাল নেয়ামত।ইসলামের প্রাথমিক যুগে সাধারণ মানুষ এভাবে ওহীর জ্ঞান পেয়েছে ইমামের তেলাওয়াত থেকে,মাদ্রাসা বা মকতব থেকে নয়। জ্ঞানের রাজ্যে বিপ্লবে ও সমাজ পরিবর্তনে তেলাওয়াতের গুরুত্ব তাই বিশাল। আজও আরব বিশ্বে ইসলামের পক্ষে যে ব্যাপক সাড়া পড়েছে তার মূলে তো দেশের প্রতি কোণে ব্যাপক কোরআন তেলাওয়াত। মানব মনকে আন্দোলিত করতে ও এক আমূল বিপ্লবে দীক্ষা দেয়ার ক্ষেত্রে কোরআনের সামর্থ তো অতূলনীয়। বীজ সর্বত্র ছিটালে কিছু বীজ যে উর্বর ভূমিতে পড়বে ও বিশাল বৃক্ষের জন্ম দিবে -তা নিয়ে কি কোন সন্দেহ আছে? কোরআনের তেলাওয়াতও তাই আরবী ভাষীদের মাঝে বিপুল কাজ দিচ্ছে।রামাদ্বানের তারাবি তো সে কাজটিই করে মাসভর।

 

যে ব্যর্থতা মুসলিমের

মাহে রামাদ্বান কোরআন নাযিলের মাস। মানব জাতির ইতিহাসে এটিই সর্বশ্রেষ্ঠ ও সবচেয়ে কল্যাণকর ঘটনা। এ মাসে মহান আল্লাহতায়ালার নিজের কথাগুলো তাঁর বান্দাহর কাছে নেমে এসেছে। জান্নাতের পথে পথচলার এটিই তো একমাত্র পথ। এ পথ না পাওয়ার অর্থ তো নিশ্চিত জাহান্নামের আগুণে গিয়ে পৌঁছা।তাতে এ জীবনে সমগ্র বাঁচাটাই ভয়ানক আযাবের কারণ হয়। মানব ইতিহাসে কোরআন নাযিল তাই মামূলী বিষয় নয়। মহান আল্লাহতায়ালা এ পবিত্র ও অতি গুরুত্বপূর্ণ মাসকে সম্মানিত করেছেন এক মাস রোযা ফরজ করে। সম্মানিত করেছেন হাজার মাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠ লায়লাতুল ক্বদর দিয়ে।সে সাথে এ মাসে পালনকৃত প্রতিটি ইবাদতের ফজিলত বহুগুণ বাড়িয়ে।এভাবে মহান রাব্বুল আলামীন প্রমাণ করেছেন,মাহে রামাদ্বানের গুরুত্ব তাঁর কাছে কত বেশী। কিন্তু প্রশ্ন হলো,এ মাসের সন্মানে বিশ্ব-মুসলিমের নিজেদের আয়োজনটি কতটুকু? সেটি কি স্রেফ না বুঝে বার বার কোরআন খতমে? কিন্তু কোরআনের নাযিলের মূল উদ্দেশ্যটি বার বার কোরআন খতম? এ মাসটি হলো কোরআন থেকে শিক্ষা নেয়া এবং কোরআনের নির্দেশিত পথে চলার মাস। কিন্তু কোথায় সে পথ অনুসরণে আগ্রহ? মুসলমানদের জীবনে এখানেই ঘটছে সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা -যা তাদের অন্য সকল ব্যর্থতার কারণ।এটি গুরুতর অপরাধও।

আজকের মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাটি কৃষি বা শিল্পে নয়। সম্পদের আহরনেও নয়। বরং সেটি মহান আল্লাহতায়ালার সবচেয়ে বড় নিয়ামত থেকে হিদায়েত লাভে।ফলে তারা আজ ভয়াবহ পথভ্রষ্টতার শিকার। রামাদ্বানের তারাবি নামাজে মসজিদে মসজিদে কোরআন খতম করা হয়। কিন্তু ক’জন সারা জীবনে একবারও এ মহান গ্রন্থটিকে শুরু থেকে শেষ অবধি একবার অর্থসহ পড়েছে? ডাক্তারি, ইঞ্জিনীয়ারিং ও কৃষিবিদ্যার ন্যায় জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি শাখাতেই রয়েছে অসংখ্য বই। কিন্তু কখনই কি সেগুলি অর্থ না বুঝে পড়া হয়? কোন শিক্ষকই কি ছাত্রকে সেরূপ তেলাওয়াতে পরামর্শ দেয়? না বুঝে কিতাব পাঠেও পরীক্ষায় কাজ দিবে –এমন কথা বললে সে শিক্ষককে কেউ কি মানসিক ভাবে সুস্থ্য বলবে? অথচ আলেমদের পক্ষ থেকে এমন ছবক দেয়া হচ্ছে না বুঝে কোরআন পাঠের ক্ষেত্রে!তারা বলছে,এতে পরাকালে সওয়াব মিলবে। শিশুও কোন বই না বুঝে পাঠ করে না। কিন্তু আজকের প্রাপ্ত বয়স্ক মুসলমানরা পবিত্র কোরআন না বুঝে পাঠ করে।ভাল মুসলমান গড়ে তোলার জন্য তো চাই কোরআনের গভীর জ্ঞান,এবং প্রতিক্ষেত্রে সে জ্ঞানের প্রয়োগ। কিন্তু পবিত্র কোরআনের সাথে সেটি ঘটছে না।শুধু তেলাওয়াতই হচ্ছে,কিন্তু জ্ঞানলাভ হচ্ছে না।ফলে কোরআনের পাঠক বাড়ছে,আলেম নয়।এখানেই সংঘটিত হচ্ছে মানব জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অপরাধ।ওহীর জ্ঞানের অজ্ঞতা ও ধর্মের নামে নানা রূপ মিথ্যা দিয়ে হত্যা করা হচ্ছে বিবেককে। সংঘটিত হচ্ছে মহান আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামতের সাথে সবচেয়ে বড় গাদ্দারি। কেউ কেউ কোরআন তেলাওয়াতকে বেছে বেছে কিছু ছুরার মধ্যে সীমিত রাখছে। ফলে গুরুত্ব হারাচ্ছে সমগ্র কোরআন। প্রেসক্রিপশনের কোন একটি ঔষধকেও কি বাদ দেয়া যায়? তাতে কি রোগ সারে? মহান আল্লাহর হেদায়েতের বানি তো ছড়িয়ে রয়েছে তো সমগ্র কোরআন জুড়ে। ফলে কোন একটি সুরা বা কোন একটি আয়াতকেও কি বাদ দেয়ার সুযোগ আছে?

মুসলিম দেশগুলোতে আজ সবচেয়ে বড় অভাব কোরআনী জ্ঞানের।সাহাবাদের আমল থেকে আজকের মুসলমানদের মূল পার্থক্যটি বস্তুত এখানে। সেদিন এমন কোন সাহাবা ছিলেন না যিনি কোরআনের জ্ঞানার্জনকে গুরুত্ব দেননি।দীর্ঘ মরুর বুক অতিক্রম করে অতি কষ্টে তারা নবীজী (সাঃ)র দরবারে বার বার ছুটে এসেছেন কোরআনের একটি আয়াত বা নবীজী(সাঃ)র একটি হাদীস শোনার জন্য। ফলে সবাই গড়ে উঠেছিলেন আলেম রূপে। বিগত ১৪ শত বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আলেম তো তারাই। আর সত্যিকার আলেম হলে সে তো মহান আল্লাহতায়ালার রাস্তায় প্রকৃত মুজাহিদও হয়।কারণ গাড়ীর দুটি চাকার ন্যায় ইলম ও জিহাদ তো একত্রে চলে। তাদের কারণেই ইসলাম সেদিন বিজয়ী বিশ্বশক্তি রূপে আত্মপ্রকাশ করেছিল।অথচ আজ অধিকাংশ মুসলমানই পরিণত হয়েছে নিরেট জাহেলে। অথচ জিহাদহীন ও আমলহীন আলেমে। সেটি টের পাওয়া যায় জাহিলিয়াত যুগের ন্যায় ইসলাম থেকে দূরে সরার মাঝে। গোত্রপুজা, জাতিপুজা,ভাষাপুজা, মদ-জুয়া, সুদ-ঘুষ ও অশ্লিলতার ন্যায় জাহিলিয়াত যুগের নানা পাপাচার তাদের ঘাড়ে চেপে বসেছে। জাহেল মানুষের কাছে অজ্ঞতাকে ধরে রাখা এবং অজ্ঞতার পথে পথ চলাই তাদের সংস্কৃতি। ফলে মূল্য পাচ্ছে না মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ আল-কোরআন থেকে শিক্ষালাভ।

 

ব্যর্থতা রোযার নয়

রোযা বার বার ফিরে এলেও আধ্যাত্মিক বিপ্লব আসছে কতটুকু? মুসলিমেরা আজ  ইতিহাস গড়ছে দুর্বৃত্তি,ব্যর্থতা ও লাগাতর পরাজয়ে। এগুলি কি আধ্যাত্মিক বিপ্লবের লক্ষণ? পরিশুদ্ধ ও তাকওয়াসমৃদ্ধ মানুষ গড়ার ক্ষেত্রে মাসব্যাপী রোযা যে কতটা ব্যর্থ হচ্ছে -এ হলো তার নমুনা। তবে এখানে ব্যর্থতাটি রোযার নয়। বরং ব্যর্থতা তাদের যারা রামাদ্বানে রোযা রাখাকেই শুধু গুরুত্ব দিচ্ছে এবং ব্যর্থ হচ্ছে ঈমানদার রূপে বেড়ে উঠতে। তাছাড়া কোরআনী জ্ঞানের অজ্ঞতা নিয়ে কি ঈমানদার হওয়া যায়? ইসলাম ও কোরআনী জ্ঞানের এ বিশাল অজ্ঞতা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় বড় ডিগ্রিতে দূর হচ্ছে না। তবে মুসলিম বিশ্বজুড়ে আজ যে হাজার হাজার স্কুল,কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় সেগুলি কোরআনী জ্ঞানের অজ্ঞতা দূরীকরণের জন্য প্রতিষ্ঠিতও হয়নি।বরং এগুলি পরিণত হয়েছে মুসলিম ছাত্রছাত্রীদের ইসলাম থেকে দূরে সরানোর বিশাল ইন্ডাস্ট্রিতে। মুসলিম মনে আধ্যাত্মিক বিপ্লবকে বলা হচ্ছে মৌলবাদ বা সন্ত্রাসী চেতনা রূপে। প্রতিটি মুসলিম দেশে সরকারি উদ্যোগে চলছে সেক্যুলাইরেজশন এবং ডি-ইসলাইজেশন প্রজেক্ট। একই লক্ষ্যে বিদেশীদের অর্থায়নে মাঠে নেমেছে হাজার হাজার এনজিও ও তাদের বহুলক্ষ ক্যাডার। নবীজী (সাঃ)র যুগের ইসলামে ফিরে যাওয়ার আগ্রহটি চিত্রিত হচ্ছে দণ্ডনীয় অপরাধ রূপে। এমন একটি ইসলামবৈরী ধারণা নিয়েই সুপরিকল্পিত ভাবে বিলুপ্ত করা হচ্ছে কোরআনী জ্ঞানের ক্ষুধা। এটির শুরু মুসলিম বিশ্বে ঔপনিবেশিক কাফের শাসনের শুরু থেকে;এবং বর্তমান সেক্যুলারিস্ট শাসকদের কাজ হয়েছে কাফেরদের প্রবর্তিত সে ধারাকেই আরো বলবান করা। ফলে নিজ ঘরে একাধিক কোরআন শরীফ থাকলেও বড় বড় ডিগ্রিধারি মুসলিম সন্তানদের মনে সেটি বুঝে পড়াতে আগ্রহ জাগছে না। ফলে কোনটি সিরাতুল মুস্তাকিম আর কোনটি সিরাতুশ শায়তান –সেটি বুঝার সামর্থই অধিকাংশ মুসলিমের নাই।রোযা রাখছে,তারাবি পড়ছে,ফিতরা দিচ্ছে,ঈদের জামায়াতে হাজির হচ্ছে সে অবুঝ ও বেহুশ অবস্থা নিয়েই।শরিয়তের পথ ছেড়ে তারা যে পথটি ধরেছে সেটি যে কুফরির পথ –সে জ্ঞানই বা ক’জনের  পতিতাবৃত্তি,ব্যাভিচার,অশ্লিলতা,মদ্যপান,জুয়া,ঘুষ ও সূদিব্যংকের ন্যায় নানারূপ হারামকর্মও তাই মুসলিম দেশে আইনগত বৈধতা পেয়েছে। ইহুদী-খৃষ্টানদের ন্যায় তারা নিজেরাই পরিণত হয়েছে পথভ্রষ্ট দোয়াল্লিনে।আর পথভ্রষ্টদের উপর আযাব নাযিলই তো মহান আল্লাহতায়ালার সূন্নত।আজকের মুসলমানদের উপর সে আযাব কি কম? মুসলিম দেশগুলি যেরূপ দেশী ও বিদেশী শত্রুদের হাতে অধিকৃত,দেশে দেশে ঝরছে যেরূপ মুসলিমের রক্ত,লক্ষ লক্ষ যেভাবে উদ্বাস্তু হচ্ছে এবং দেশ ছাড়তে গিয়ে সাগরে ভাসছে –তা কি রহতের আলামত?

প্রশ্ন হলো,আদৌ সফল হচ্ছে কি মাহে রামাদ্বান? অর্জিত হচ্ছে কি আধ্যাত্মিক বিপ্লব? অথচ সে বিপ্লবের লক্ষ্যে মাসটি হলো মহান আল্লাহতায়ালার প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউশন।আধ্যাত্মিক বিপ্লবে রামাদ্বানের রোযা যেখানে বিশাল সাফল্য দেখিয়েছিল তখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সমূহ সে প্রশিক্ষণ প্রকল্পের সাথে একাত্ম ছিল।রাষ্ট্রের বিশাল প্রশাসনিক অবকাঠামো,রাজনীতি,সংস্কৃতি,মিডিয়া ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি যেখানে কাজ করে ইসলাম থেকে জনগণকে দূরে সরানোর কাজে সেখানে কি মাহে রামাদ্বানের এ প্রশিক্ষণ আধ্যাত্মিক বিপ্লব অর্জনে সফল হতে পারে? তাকওয়া বাড়ানোর লক্ষ্যে সুরা বাকারার যে আয়াতটিতে রোযা ফরয ঘোষিত হয়েছে সে আয়াতটির মূল লক্ষ্যবস্তু ছিল ঈমানদারগন। কিন্তু যারা ধরেছে জাহিলিয়াতের পথ,শরিয়তের প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে প্রতিরোধই যাদের রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তি -তাদের উপর কি রোযার কার্যকারিতা থাকে? ঔষধ মৃত মানুষদের উপর কাজ করে না। তেমনি রোযাও কাজ করে না ঈমানশূর্ণ জাহেলদের উপর। কোটি কোটি মানুষের মাসব্যাপী রোযাপালন তাই ব্যর্থ হচ্ছে আধ্যাত্মিক বিপ্লব আনতে। ব্যর্থ হচ্ছে মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনের বিজয় আনতে।বাংলাদেশে যত মানুষ রোযা রাখে ও তারাবিহ নামায পড়ে তা বিশ্বের শতকরা ৯৫% ভাগ দেশে নাই। কিন্তু দেশটি দুর্বৃত্তিতে বিশ্বের সবাইকে অতিক্রম করে ৫ বার প্রথম হয়েছে। ক্ষমতালোভী দুর্বৃত্ত স্বৈরাচারিদের হাতে এমন দেশ অধিকৃত হবে এবং দেশের সরকার নৌকায় ভাসা ও প্রাণ বাঁচাতে আসা রোহিঙ্গা মুসলিমদের নৌকাগুলাকে সমূদ্রতীর থেকে আবার সমূদ্রে ফিরে যেতে বাধ্য করবে,ভারত থেকে আশ্রয় নেয়া বিহারীদের বাড়ি-ঘর,দোকান-পাট কেড়ে নিয়ে তাদের বস্তিতে পাঠাবে এবং শত শত নিরস্ত্র মুসল্লিদের রাজপথে হতাহত করে লাশগুলোর ময়লা গাড়িতে গায়েব করবে -সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? জনগণের তাকওয়া যখন নীচে নামে তখন কি সেদেশে এর চেয়ে ভিন্ন কিছু আসা করা যায়? তখন নামাযী ও রোযাদার হয়েও এরূপ কোটি কোটি মুসলিম যে দেশের উপর ইসলাম বিরোধীদের এ বর্বর অধিকৃতি সয়ে যাবে -সেটিও কি স্বাভাবিক নয়।

 

রোযার মাসটি জিহাদের মাসও

আধ্যাত্মিকতার শুরুটি নামায-রোযা দিয়ে হলেও চুড়ান্ত পর্যায়টি হলো জিহাদ। মহান আল্লাহতায়ালা সাথে আত্মিক সংযোগ মজবুত হলে বান্দা তখন তাঁর রাস্তায় শধু অর্থ,শ্রম ও মেধা নয় নিজের প্রাণও পেশ করে। সে তখন জিহাদের ময়দান খোঁজে। বদরের যুদ্ধ হয়েছিল রোযার মাসে।এ মাসটিতে ঘটেছিল মক্কা বিজয়। সেদিনের মুসলমানগণ শুধু নামায-রোযা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন না,প্রবল বিক্রমে জিহাদও করেছেন।মহান আল্লাহতায়ালার অধিকৃত ভূমি তো এভাবেই শয়তানী শক্তির কবজা থেকে মূক্ত হয়েছে এবং বিশাল ভূ-ভাগ জুড়ে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে শরিয়তি আইন।।নামায-রোযা,হজ-যাকাত,কোরআন পাঠের ন্যায় প্রতিটি ইবাদতের লক্ষ্য তো মু’মিনের জীবনে আধ্যাত্মিক বিপ্লব আনা।ইসলামের প্রাথমিক যুগে তো সেটিই হয়েছিল। তাদের মাঝে তখন প্রবল তাড়ানা ছিল জিহাদের নিত্য-নতুন ফ্রন্ট খোলার। এখানে কাজ করতো মহান আল্লাহতায়ালার অধিকৃত ভূমিকে মূক্ত করার চেতনা। সে চেতনা নিয়ে তূর্কী বীর ইখতিয়ার মহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী হাজার হাজার মাইল দূর থেকে বাংলাতেও ছুটে এসেছেন। হিন্দু রাজা দাহিরের নির্যাতন থেকে হিন্দুদের বাঁচাতে মুহম্মদ বিন কাসিম সুদূর ইরাক থেকে এসে সিন্ধুর জমিনে জিহাদ করেছেন।

অথচ রাজা দাহিরের চেয়েও নিষ্ঠুর শাসক বসে আছে বাংলাদেশে। তার হাতে নির্যাতিত ও নিহত হচ্ছে খোদ মুসলমানেরা। বাংলাদেশে আজ ১৫ কোটি মুসলমান। দেশটিতে লাখ লাখ আলেম ও মসজিদের ইমাম এবং কোটি কোটি নামাযী ও রোযাদার।অথচ দেশটি অধিকৃত ইসলামের শত্রুশক্তির হাতে।শরিয়ত প্রতিষ্ঠার পক্ষে কথা বলাও দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু কোথায় বিন কাসিমের মত মোজাহিদ? কোথায় সে জিহাদ? কোটি কোটি রোযাদারের তাকওয়ার এই কি নমুনা? এই কি আধ্যাত্মিকতা? আধ্যাত্মিকতার অর্থঃ অধীনতা একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালার।এবং গোলামী একমাত্র তাঁরই হুকুমের।এরূপ আধ্যাত্মিকতায় তো মু’মিনের জীবনে জীহাদও এসে যায়।অথচ আজকের কোটি কোটি মুসলমানের জীবনে সে অধীনতা তো স্বৈরাচারি শাসকের। এমন পরাধীনতা নিয়ে নিয়ে কি মহান আল্লাহতায়ালার অধীন হওয়া যায়? অথচ মুসলিম শব্দের অর্থঃ মহান আল্লাহতায়ালার কাছে পূর্ণ আত্মসমর্পিত অধীনতা।সে আত্মসমর্পণ নিয়ে সেকালের মুসলমানগণ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা নির্মাণ করতে পেরেছিলেন। অথচ বাংলাদেশে নির্মিত হচ্ছে দুর্বৃত্তিতে প্রথম হওয়ার রেকর্ড।অথচ প্রতিটি দুর্বৃত্তি বা দূর্নীতি হলো মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। ফলে যে দেশ দুর্বৃত্তিতে প্রথম হয় সে দেশটি প্রথম হয় মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহতেও। এ নিয়ে কি বিতর্ক চলে? কোটি কোটি মানুষের নামায-রোযার এই কি অর্জন? ব্যর্থতার এরূপ বিশ্বরেকর্ড নিয়ে মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে কি মাগফেরাত জুটবে? বিচার দিনে জুটবে কি নবীজী(সাঃ)র সুপারিশ? কোন ন্যায়বিচারক কি কখনো দুর্বৃত্তদের পক্ষ নেয়?

 

মু’মিনের জীবনে ইঞ্জিন

মহান আল্লাহতায়ালার ঘোষণা,“নিশ্চয়ই যারা ঈমান আনলো ও ন্যায় কাজ করলো তারাই পৃথিবীপৃষ্ঠে শ্রেষ্ঠ।”–(সুরা বাইয়্যানাহ,আয়াত ৭)।ঈমান ও নেক আমলের এটিই তো কাঙ্খিত ফল। গাড়ি না চললে বুঝতে হবে ইঞ্জিনে সমস্যা আছে। তেমনি ইবাদতকারির উন্নত চরিত্র সৃষ্টি না হলে বুঝতে হবে নিদারুন সমস্যা আছে তার ঈমান ও আমলে। ঈমান ও আমলে সফল হওয়ার জন্য অতি অপরিহার্য হলো ওহীর জ্ঞান। মু’মিনের জীবনে সেটিই তো মূল ইঞ্জিন। তবে ওহীর জ্ঞানার্জনে যা অপরিহার্য তা হলো অর্থ বুঝে কোরআন পাঠ অথবা সুযোগ্য আলেমের সাহচর্যে থেকে পবিত্র কোরআনের গভীর জ্ঞানলাভ।পবিত্র কোরআনের ঘোষণাঃ“ইন্নামা ইয়াখশাল্লাহা মিন ইবাদিহিল উলামায়ু” অর্থঃ বান্দাকুলের মাঝে একমাত্র আলেমগণই আমাকে ভয় করে” –(সুরা ফাতির,আয়াত ২৮) মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে এটি এক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা;এবং সে সাথে ঈমানের মূল রোগের ডায়াগনসিস।যারা প্রকৃত ঈমানদার রূপে বেড়ে উঠতে চায় তাদের জন্য এ আয়াতে রয়েছে অতিশয় সতর্কবানী। ঈমানদার বা মুসলমান হওয়ার জন্য অতি অপরিহার্য হলো মহান আল্লাহতায়ালার ভয়।এ ভয়ই হলো মু’মিনের তাকওয়া। যাদের মনে সে ভয় নাই,আল্লাহর অবাধ্য বা বিদ্রোহী হওয়াটা তাদের জন্য অতি সহজ হয়ে পড়ে। মুসলিম বিশ্ব জুড়ে মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব ও শরিয়তের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের মূল কারণ তো নামধারি মুসলমানদের ভয়শূণ্য মন।মুসলিম দেশগুলিতে আজ যারা শরিয়তের প্রতিষ্ঠা রুখছে এবং শরিয়তের প্রতিষ্ঠাকামীদের হত্যা করছে বা তাদেরকে কারারুদ্ধ করছে তারা কাফের বা মুশরিক নয়।কাফের দেশের নাগরিকও নয়। বরং নিজ দেশের মুসলিম নামধারি এসব বিদ্রোহীরা। অথচ তাদেরও অনেকে নামায পড়ে,রোযা রাখে এবং হজও আদায় করে।অনেকে ইসলামি লেবাসও পরিধান করে। উপরুক্ত আয়াতটির মাধ্যমে মহান আল্লাহতায়ালা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন কোরআনী জ্ঞানের অজ্ঞতা নিয়ে নামাযী,রোযাদার বা হাজির বেশ ধরা সম্ভব,কিন্তু তাকওয়াসম্পন্ন মু’মিন হওয়া অসম্ভব।জাহেলদের রোযাপালন,নামায আদায়,হজ পালন তো এজন্যই ব্যর্থ হয়। তাদের জীবনে বার বার রামাদ্বান এলেও কি কোন কল্যাণ হয়? এবং কল্যাণ যে হচ্ছে না -তা নিয়েও সন্দেহ জাগে? দ্বিতীয় সংস্করণ:২৯/০৬/২০১৫(১২ই রামাদ্বান ১৪৩৫);প্রথম সংস্করণ:১১/০৮/১২ (২৩শে রামাদ্বান ১৪৩৩)

 




কোর’আন না বুঝে পড়ার বিপদ

কোর’আনের জ্ঞান কেন অপরিহার্য?

পশুর ন্যায় দেহ নিয়ে বাঁচার জন্য আলো-বাতাস এবং খাদ্য-পানীয় হলেই চলে। কিন্তু মুসলিম রূপে বেড়ে উঠার জন্য বাড়তি প্রয়োজনটি হলো, পবিত্র কোর’আনের জ্ঞান। মুসলিম রূপে বেড়ে উঠাটি নিশ্চিত করতে মহান আল্লাহতায়ালা তাই কোর’আনের জ্ঞানার্জন শুধু মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষক, মসজিদের ইমাম বা মোল্লা-মৌলভীদের উপর ফরজ করেননি, ফরজ করেছেন প্রতিটি নরনারীর উপর। কারণ, একের পানাহারে কি অন্য জন বাঁচে না; দেহ বাঁচাতে সবাইকেই নিয়মিত পানাহার করতে হয়। তেমনি ঈমান বাঁচাতে সবাইকে নিয়মিত কোর’আনের জ্ঞানার্জন করতে হয়। মুসলিম রূপে বেড়ে উঠার জন্য জ্ঞানী হওয়াটি কতটা জরুরী -সে বিষয়ে মহান আল্লাহতায়ালার নিজের ঘোষণাটি অতি গুরুত্বপূর্ণ। সেটি হলো, “ইন্নামা ইয়াখশাল্লাহা মিন ইবাদিহি ওলামা”। অর্থঃ “বান্দাহদের মাঝে একমাত্র  (কোরআনের জ্ঞানে) জ্ঞানীরাই আল্লাহকে ভয় করে। জ্ঞানদানকে নিশ্চিত করতেই মহান আল্লাহতায়ালা যেমন নবীজী (সাঃ)কে রাসূল রূপে নিয়োগ দিয়েছেন, তেমনি তাঁর উপর পবিত্র কোর’আনও নাযিল করেছেন। মুসলিম হওয়ার জন্য তাই অপরিহার্য হলো, জ্ঞানদানের যে প্রক্রিয়া কোর’আন নাযিলের মাধ্যেম শুরু হয়েছিল তার সাথে সম্পৃক্ত হওয়া।

তাছাড়া চেতনা ও চরিত্রের অঙ্গণে বিপ্লবটি আসে জ্ঞানের গুণে; খাদ্য-পানীয়, বংশ, সম্পদ বা দেহের গুণে নয়। সে জ্ঞানের গুণেই জাহেলী যুগের অসভ্য আরবগণ মানব ইতিহাসের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানবে পরিণত হয়েছিলেন। পবিত্র কোরআনই হলো মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে মানব জাতির  জন্য সর্বশ্রষ্ঠ দান। এ পৃথিবীতে মহান আল্লাহতায়ালার সৃষ্টির সংখ্যা বহু বিলিয়ন। কিন্তু কোন সৃষ্টিই মহান আল্লাহতায়ালার পরিচয়টি পেশ করে না; তাঁর ইচ্ছা-অনিচ্ছার বিষয়টিও মানবকে জানায় না। মানব থেকে মহান স্রষ্টার প্রত্যাশা কি –অতি গুরুত্বপূর্ণ সে বিষয়টিও বলে না। অথচ সে বিষযগুলো নির্ভূল ভাবে তুলে ধরে একমা্ত্র পবিত্র কোরআন, এবং সেটি মহান আল্লাহতায়ালার নিজের ভাষায়। ফলে মানবসৃষ্টির জন্য এর চেয়ে অধীক গুরুত্বপূর্ণ দান আর কি হতে পারে? এ জ্ঞানের অনুপস্থিতির পরিনাম তো ভয়াবহ; মানব তখন গরু, শাপ, পাহাড়-পর্বত, চন্দ্রসূর্যকেও ভগবান রূপে গ্রহণ করে। তখন অনিবার্য হয় অনন্ত-অসীম কালের জন্য জাহান্নামের আগুণ। ফলে মহান আল্লাহতায়ালার সাথে যারা সম্পর্ক মজবুত করতে চায়, চায় জান্নাতে পৌঁছার সিরাতুল মুস্তাকীম -তাদের সামনে তাঁর পবিত্র ইচ্ছা সাথে পুরাপুরি সম্পৃক্ত হওয়া ছাড়া বিকল্প পথ আছে কি? সে লক্ষ্যে অনিবার্য হলো, মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে কি বলা হয়েছে সেটি তাঁর নিজের কিতাব থেকেই সরাসরি জানা। ফলে মানব জীবনে এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিতীয় কোন কাজ আছে কি?

 

ভয়ংকর ক্ষতি কেন না বুঝে তেলাওয়াতে?

প্রতিটি ব্যক্তিকেই আমৃত্যু পথ চলতে হয়। সেটি যেমন আক্বিদা-বিশ্বাস, ধর্মকর্ম ও ইবাদতের ক্ষেত্রে, তেমনি রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, আইন-আদালত, অর্থনীতি, যুদ্ধ-বিগ্রহসহ জীবনের সর্বক্ষেত্রে। সে পথচলাটি সঠিক পথে হওয়ার জন্য চাই প্রতি পদে সঠিক পথনির্দেশনা। নইলে অনিবার্য হয়, জাহান্নামে পৌঁছা। সে সঠিক পথনির্দেশনাটি দেয় পবিত্র কোর’আন। এজন্যই মহান আল্লাহতায়ালা সুরা বাকারার দ্বিতীয় আয়াতেই পবিত্র কোরাআনকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন “হুদাল লিন্নাস” তথা মানবের জন্য পথনির্দেশনা রূপে। না বুঝে কোর’আন তেলাওয়াতে কিছু সুর ও কিছু আওয়াজ সৃষ্টি হয় বটে, কিন্তু তাতে জ্ঞানলাভ যেমন ঘটে না, তেমনি পথনির্দেশনাও জুটে না। সিলেবাসের বই না বুঝে পড়লে কি পরীক্ষায় পাশ জুটে? অথচ মানব জীবনে পরীক্ষাটি তো প্রতি পদে। জান্নাতে পৌছতে হলে অপরিহার্য হলো এসব পরীক্ষায় পাশ করা। এবং পাশের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান লাভ ঘটে একমাত্র পবিত্র কোর’আন থেকে। মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে এটিই হলো তাঁর সিলেবাসভূক্ত একমাত্র গ্রন্থ। না বুঝে কোর’আন তেলাওয়াতে যেমন জ্ঞানলাভ হয় না, তেমনি হিদায়েত লাভও হয় না। ফলে ব্যক্তির জীবনে তা ভয়ানক বিপদ ঘটায়। সে অজ্ঞতা যেমন ভ্রষ্টতা দেয়, তেমনি জাহান্নামেও নেয়।

কোরআনের জ্ঞানার্জন কতটা গুরুত্বপূর্ণ -সেটি বুঝা যায় এ বিষয়টিকে মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশাবলীর তালিকায় সর্বোচ্চ শিখরে দেখে। নবীজী (সাঃ)’র প্রতি তাঁর প্রথম হুকুমটি নামায-রোযা, হজ-যাকাতের ছিল না। মদ্যপান, জুয়ার ন্যায় নানারূপ পাপাচারের বিরুদ্ধেও ছিল না। মসজিদ গড়ারও ছিল না। সে হুকুমটি হলো “ইকরা” অথা পড়ার। পড়তে বলার অর্থ এখানে জ্ঞান লাভ করতে বলা। এখানে মহান আল্লাহতায়ালার উদ্দেশ্যটি যেমন নিজের পবিত্র ইচ্ছা, ভিশন ও মিশনটি নিজের ভাষায় বর্ণনা করা, তেমনি তার সাথে তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টিকে একাত্ম করা। এ বিষয়টি কোন মামূলী বিষয় নয়; বরং প্রতিটি মানব সন্তানের জন্য এটিই হলো তাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ, মহাপ্রভু মহান স্রষ্টার সাথে তার সৃষ্টির সংযোগ ঘটে তো এ বিষয়টি বুঝার মধ্য দিয়ে। বুঝতে ব্যর্থ হলে যা বৃদ্ধি পায় তা হলো মহান আল্লাহতায়ালার ইচ্ছা, ভিশন ও মিশনের সাথে বিচ্ছিন্নতা। সে বিচ্ছিন্নতা ব্যক্তিকে শয়তানের দলে হাজির করে এবং জাহান্নামে নিয়ে পৌঁছায়। একমাত্র পবিত্র কোর’আনের মধ্যেই মহান আল্লাহতায়ালা স্বয়ং হাজির হয়েছেন তাঁর নিজের ইচ্ছা, ভিশন ও মিশনের সুস্পষ্ট ঘোষণা নিয়ে। এ বিষয়ে সম্যক জ্ঞান-লাভ ঘটে তো অর্থ বুঝে পবিত্র কোর’আন পাঠের মধ্য দিয়ে। যে ব্যক্তি কোর’আন না বুঝে শুধু তেলাওয়াত করলো -সে তার রবের ইচ্ছা, ভিশন ও মিশনকে জানবে কেমনে? তাঁর সাথে একাত্মই বা হবে কি করে?  কোর’আনকে বলা হয় “হাবলিল্লাহ” অর্থাৎ আল্লাহর রশি। এ রশির এক প্রান্তে মহান আল্লাহতায়ালা এবং অপর প্রান্তটি পৃথিবীপৃষ্ঠে পবিত্র কোর’আনের মাঝে। ফলে যারাই আঁকড়ে ধরলো মহান আল্লাহতায়ালার এ রশিকে, তারাই আঁকড়ে ধরলো তাঁর দ্বীনকে। এবং এ রশি বেয়েই তারা পৌঁছে জান্নাতে।

কোর’আনের জ্ঞান হলো মহান আল্লাহতায়ালা-প্রদত্ত পবিত্র আলো যা আলোয় ঝলমল করে ঈমানদার ব্যক্তির মনের ভূবনকে। একমাত্র এ আলোতেই দেখা যায় সিরাতুল মুস্তাকীম। যার মধ্যে সে আলো নাই -তার জীবন ঘন অন্ধকারময়। মনের সে অন্ধকারে অসম্ভব হয় সিরাতুল মুস্তাকীম খুঁজে পাওয়া। জ্ঞানের সে আলোকিত রাজ্যে ব্যক্তির প্রবেশ ঘটে একমাত্র বুঝে কোর’আন পাঠের মধ্য দিয়ে। কোর’আন না বুঝে পড়া বা কোর’আনে চুমু খাওয়াতে জ্ঞানের সে আলোকিত ভূবনে প্রবেশ ঘটে না। ফলে তাতে মনের অন্ধকারও দূর হয় না। এমন ব্যক্তি তখন পথ খোঁজে পীরের মাজারে, ভণ্ড পীরের দরবারে, স্বৈরাচারীর দফতরে, সেক্যুলার দর্শন ও রাজনীতে। না বুঝে কোর’আন পাঠের ফলে ব্যক্তি এভাবেই বঞ্চিত হয় মহান আল্লাহর সবচেয়ে বড় নিয়ামত থেকে। ফলে এর চেয়ে বড় ক্ষতি ব্যক্তির জীবনে আর কি হতে পারে? না বুঝে কোর’আন পাঠের ফলে বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট হওয়ার রোগটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশেও মহামারি রূপে দেখা দেয়। তখন দেশে বাজার পায় চোর-ডাকাত, ভোট-ডাকাত, ধর্মচ্যুৎ রাজনীতিবিদ, ভণ্ডপীর এবং ফেরকাবাজ মোল্লা-মৌলভীগণ –যেমনটি বাংলাদেশে ঘটেছে। বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট হওয়ার কারণে এমন কি দেশের আলেম বা আল্লামা নামধারীগণও ইসলামের ঘোরতর শত্রুদেরকে নেতা রূপে কবুল করে।

অথচ কোর’আনের জ্ঞান বিপ্লব আনে জীবন ও জগত নিয়ে ব্যক্তির দর্শনে। এমন ব্যক্তি তখন সিরাতুল মুস্তাকীম পায়। প্রাথমিক যুগের মুসলিমগণ প্রমাণ করেছেন, মুসলিমদের বিজয় ও ইজ্জতের সঠিক পথটি হলো পবিত্র কোরআনের জ্ঞান নিয়ে বেড়ে উঠাতে। এবং সে জ্ঞান থেকে দূরে সরাতে বাড়ে পরাজয় ও অপমান। শুধু এ দুনিয়ায় নয়, আখেরাতেও। ফলে শয়তানের মূল এজেন্ডাটি মুসলিমদের নামায-রোযা ও হজ-যাকাত থেকে দূরে সরানো নয়। মসজিদ-মাদ্রাসা ভাঙ্গাও নয়। বরং সেটি হলো কোরআনের জ্ঞান থেকে দূরে সরানো। শয়তান সে কাজটি করে না বুঝে কোর’আন তেলাওয়াতের ছবক দিয়ে। শয়তান এ কাজে সমাজের বুকে নিজের আসল চেহারা নিয়ে নামে না, নামে ধর্মের লেবাস পড়ে। নামে শয়তানের সে এজেন্ডা মুসলিম দেশগুলিতে যে কতটা সফলতা পেয়েছে তা বুঝা যায়, না বুঝে পবিত্র কোরআন পাঠের বিশাল আয়োজন দেখে। বুঝা যায় নবীজী (সাঃ)র ইসলাম -যাতে ছিল শরিয়ত, হুদুদ, খেলাফত, জিহাদ ও ইসলামী রাষ্ট্র, তার বিলুপ্তি দেখে। বুঝা যায়, ফেরকা, মজহাব ও তরিকার নামে মুসলিমদের মাঝে বিভক্তি দেখে। ফলে দেশে দেশে শয়তানের শিবিরে আজ বিজয় উৎসব। শয়তানের বিজয়ের বড় আলামতটি হলো, সমগ্র পৃথিবীতে পবিত্র কোরআনই হলো একমাত্র কিতাব যা না বুঝে পড়া হয় এবং সেরূপ পড়াকে সওয়াবের কাজ মনে করা হয়। মহান আল্লাহতায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ এ নিয়ামতের সাথে এর চেয়ে বড় অবমাননা আর কি হতে পারে?

 

তেলাওয়াতের অর্থঃ বুঝা ও অনুসরণ করা

কেম্ব্রিজের শিক্ষক, আরবী ভাষার পন্ডিত ও প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন ডক্টর আকরাম নদভির মত হলো, “কোর’আন না বুঝে তেলাওয়াতে কোন ছওয়াব নাই।” উনার কথা, যারা বলে কোরআন না বুঝে পড়লেও সওয়ার আছে তারা আসলে ‘পড়া’ শব্দটির অর্থই জানে না। পড়ার অর্থ শুধু কোন বাক্য জিহ্বা ও ঠোঠ দিয়ে বিড়বিড় করে উচ্চারন করা নয়। বরং পড়ার সাথে সেটির অর্থ বুঝা। আকরাম নদভির উক্ত অভিমতটির ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। শেখ নদভির আরো যুক্তি হলো, হাদীসে আছে মসজিদে আসার পথে প্রতি কদমে ছওয়াব আছে। তবে সে সওয়াবে জন্য মসজিদে আসতে হবে নামাযের জন্য। স্রেফ মসজিদে আসার জন্য কোন ছওয়াব নাই। দিনে হাজার বার মসজিদের দিকে দৌড়ালেও কোন ছওয়াব নাই। তেমনি কোর’আন পড়ার ক্ষেত্রে ছওয়াব তখনই মিলবে যখন মহান আল্লাহতায়ালার পবিত্র কালাম বুঝাব জন্য ও তার উপর আমলের জন্য পড়া হয়। অতীতে সাহাবগণ তো সেটিই করেছেন। এমন পড়ার মধ্য দিয়েই তো ইলম সৃষ্টি হয় এবং বান্দা আলেমে পরিণত হয়। না বুঝে হাজার হাজার বার পড়লেই বা কি লাভ? এতে মনের জাহিলিয়াত তথা অজ্ঞতা যেমন দূর হয় না, তেমনি হিদায়েত লাভও হয় না। ফলে এমন কোর’আন পাঠে ছওয়াব জুটবে কেমনে? এতে যেমন সময় নষ্ট হয়, তেমনি বাঁচা হয় অজ্ঞতা নিয়ে। বাংলাদেশে তো সেটিই হচ্ছে। 

কোন শিক্ষক যদি তার ছাত্রকে কোন একটি বই পড়ে আসতে বলে তার অর্থ হলো সেটি বুঝে আসতে বলা। সর্বযুগে এবং সর্বদেশে এটিই পড়ার সর্বজন গৃহীত অর্থ। সব দেশের শিক্ষকগণই শুধুই নয়, ছাত্রগণও সেটিই বুঝে। তবে বাংলাদেশের অসংখ্য মোল্লা-মৌলভী পড়ার সে অর্থটি মানতে রাজী নন। তারা নবীজী (সাঃ)র একটি হাদীটির উদ্ধৃতি দেন যাতে বলা হয়েছে, কোর’আন তেলাওয়াতে প্রতি হরফে ১০টি নেকী আছে। অথচ নবীজী (সাঃ) এ হাদীসটিতে এমন কথাটি বলেননি যে না বুঝে তেলাওয়াতেও ছওয়াব আছে। নবীজী (সাঃ) নিশ্চয়ই জানতেন, এ দুনিয়ায় কেউই কোন বই না বুঝে পড়ে না। এমন কি শিশুও যে বই বুঝে না, সে বই কখনো পড়ে না। অতএব পবিত্র কোর’আনের ক্ষেত্রে পড়ার অর্থ না বুঝে পড়া শামিল হবে কেন?  তাছাড়া আরবী ভাষাতে তেলাওয়াতে দু’টি অর্থ। এক). কোন কিছু পাঠ করা। দুই). কোন কিছু অনুসরণ করা। (সূত্রঃ Arabic English Dictionary for Advanced Learners; J.G. Hava)। পবিত্র কোর’আনে তেলাওয়াত শব্দটি এ দু’টি অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। তেলাওয়াত শব্দটির অর্থ যে অনুসরণ সেটির প্রয়োগ হয়েছে সুরা আশ শামসের দ্বিতীয় আয়াতে। বলা হয়েছে, “ওয়াল কামারি এযা তালাহা।”  অর্থ:  “এবং চন্দ্র, যখন অনুসরণ করে সেটিকে (সূর্যকে)”।

 

প্রকৃত কল্যাণ বুঝা ও অনুসরণে

কোরআন না বুঝে পড়লে অজ্ঞতা তথা জাহিলিয়াত দূর হয় না। অজ্ঞতার কুফল তো ভয়ানক। তাতে সিরাতুল মুস্তাকীম চেনা যায় না; ফলে তা প্রতি পদে পথভ্রষ্টতা দেয়। খাওয়ার অর্থ কোন কিছু মুখে ভরা ও হজম করা। তেমনি কিছু পড়ার অর্থ বা কোন কিছু শোনার লক্ষ্য জ্ঞান লাভ করা। অজ্ঞ বা জাহেল থাকা কবিরা গুনাহ। কারণ অজ্ঞতা সিরাতুল মুস্তাকীমে চলা অসম্ভব করে। না বুঝে কোরআন পড়লে জাহিলিয়াত দূর হয় না এবং তাতে জ্ঞানার্জনের ফরজ আদায় হয় না। প্রশ্ন হলো, যে কোরআন পাঠে অজ্ঞতা দূর হয় না, সিরাতুল মুস্তাকীমও জুটে না -তাতে সওয়াব হয় কি করে?’ কোর’আন বুঝা যে অতি গুরুত্বপূর্ণ সেটি পবিত্র কোরঅআনে বার বার বলা হয়েছে। যেমন সুরা যুমারের বলা হয়েছে, “আমি এই কোর’আনে মানুষের জন্য সব দৃষ্টান্তই বর্ণনা করেছি যাতে তারা বুঝতে পারে।” তাছাড়া পবিত্র কোরআনের কোথায় কি বলা হয়েছে যে তোমরা ছওয়াবের জন্য কোরআন পড়? ছওয়াব গুরুত্বপূর্ণ না হিদায়েত গুরুত্বপূর্ণ? হিদায়েত পাওয়ার অর্থ সিরাতুল মুস্তাকীম পাওয়া। হিদায়েত না পেলে জাহান্নাম অনিবার্য। অপর দিকে তেলাওয়াতের সওয়াব না পেলে গুনাহ হয় না। তাছাডা কোরআন দোয়ার বই নয়। আল্লাহ তায়ালা কোরআনকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন হিদায়েতের কিতাব বলে। হিদায়েত পেতে হলে হিদায়েতের সে বানিকে বুঝে পড়তে হয়। না বুঝে হাজার বার তেলাওয়াত করেও কি হিদায়েত জুটে?

সুরা কা’ফে নবীজী (সা:)কে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে, “ফাযাক্কির বিল কোর’আন”। অর্থঃ কোরআনের সাহায্যে মানুষকে সাবধান করো। নির্দেশ এখানে কোরআনের জ্ঞান দিয়ে সাবধান করা। তরবারির শক্তি যেমন তার ধারে, কিতাবের শক্তি হলো জ্ঞানে। যা পড়া হলো বা শোনানো হলো তা না বুঝে ব্যক্তি সাবধান হবে কীরূপে? বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ কোরআনের ভাষা বুঝে না। তবে সে জন্য কি কোরআন না বুঝা জায়েজ হয়ে যাবে?” সুরা হাদিদের ১৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহতায়ালার ঘোষণা: “আমি নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আমার আয়াতকে সুস্পস্ট ভাবে প্রকাশ করেছি যাতে তোমরা তোমাদের আকলকে কাজে লাগাতে পার (অর্থাৎ বুঝতে পার)।” মহান আল্লাহতায়ালার হুকুম এখানে কোরআনের আয়াতকে বুঝার। সে কাজে নির্দেশ হলো আকল তথা বুদ্ধিকে কাজে লাগানোর। না বুঝে কোর’আন পাঠে তাই মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের অবাধ্যতা হয়। কথা হলো, প্রতিটি অবাধ্যতাই কবিরা গুনাহ, তাতে সওয়াব হয় কি করে? নিজের স্বার্থ উদ্ধারে মানুষ তার আকলকে দিবারাত্র কাজে লাগাতে ব্যস্ত। সে কাজে বিদেশী ভাষাও শেখে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা শাখায় বছরের বছর কাটিয়ে দেয়। বিদেশেও পাড়ি জমায়। ১৫ থেকে ২০ বছর ব্যয় করে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করতে। এভাবে সামর্থ্য বাড়ায় বিদেশী ভাষা শিখতে। অথচ কোর’আন বুঝার প্রশ্ন উঠলেই অভাব দেখা দেয় সময় ও সামর্থ্যে। অথচ মানুষ তো পুরস্কার পায় কোর’আন বুঝার কাজে সামর্থ্য বাড়ানোর কাজে। কোর’আন বুঝে পড়ার কাজে প্রতি হরফে এজন্যই তো ১০টি নেকী।

পবিত্র কোর’আন বুঝাটি এতই গুরুত্বপূর্ণ যে সুরা ক্বামারে এ বিষয়টির উপর গুরুত্ব দিয়ে ৪টি আয়াত নাযিল করা হয়েছে। সে আয়াতগুলিতে নাযিল হয়েছে অতি হৃদয়স্পর্শি ভাষায়। সরাসরি পাঠকের কাছে মহান আল্লাহতায়ালা প্রশ্ন রেখেছেন, “আমি কোর’আনকে বুঝার জন্য সহজ করে নাযিল করেছি। (তোমাদের মাঝে) আছে কি কেউ, যে বুঝতে চায় (এ কোর’আনকে)?” –(সুরা ক্বামার, আয়াত ১৭, ২২, ৩২, ৪০)। বার বার ঘোষিত এ আয়াতে যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি উপর মহাজ্ঞানী মহান আল্লাহতায়ালা জোর দিয়েছেন তা হলো, কোর’আনকে তিনি সহজ করে নাযিল করেছেন এজন্য যে পাঠক তা বুঝবে। অতএব মানুষের দায়িত্ব হলো, তারা যেন কোর’আনকে বুঝে পড়ে এবং তা থেকে শিক্ষা নেয়। সে সাথে এ ঘোষণাও দিয়েছেন, তিনি দেখতে চান কারা তার কিতাব বুঝতে আগ্রহী। অতএর যারা মনে করে কোর’আন না বুঝে পড়লেও মহান আল্লাহতায়ালা খুশি হন এবং তাতে ছওয়াব দেন -তাদের ধারণা যে কতটা ভ্রান্ত এ আয়াত হলো তারই প্রমাণ।

পবিত্র কোর’আন নাযিলের লক্ষ্য কি? সেটি তো পথ দেখানো। বার বার বিভিন্ন সুরায় সেটি বলা হয়েছে। সুরা হাদিদের ৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “তিনি সেই মহান সত্ত্বা যিনি তার বান্দার উপর স্পষ্ট ভাবে বর্ণিত আয়াত নাযিল করেছেন যাতে তোমাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে আসতে পারেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের জন্য দয়াময় এবং রহমতপূর্ণ।” মানব জীবনের সবচেয়ে বড় ইস্যুটি পানাহারে বাঁচা নয়; বরং সেটি হলো সঠিক পথে তথা সিরাতুল মুস্তাকীমের পথে বাঁচা। নইলে ব্যক্তির দীর্ঘায়ু অধীক ইন্ধন সংগ্রহ করে জাহান্নামের জন্য। এজন্যই প্রতিটি ব্যক্তির জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দোয়াটি হলো “ইহদিনাস সিরাতুল মুস্তাকীম” অর্থাৎ সিরাতুল মুস্তাকীম চাওয়ার দোয়া। এবং জান্নাতে পৌঁছার সে সিরাতুল মুস্তাকীমটি হলো পবিত্র কোরআন। সিরাতুল মুস্তাকীম পেতে হলে তাই বার বার পড়তে হবে পবিত্র কোরআন এবং সেটি অর্থ বুঝে।

 

ষড়যন্ত্র আল্লাহতায়ালার মিশনকে ব্যর্থ করার

যখনই কোর’আন শুনতে বা পড়তে বলা হয়েছে -তার অর্থ হলো তা থেকে হিদায়েত নেয়া। যে ব্যক্তি হিদায়েতের বদলে শুধু ছওয়াব খুঁজলো -সে তো কোরআনের মূল লক্ষ্যের সাথে খেয়ানত করলো। এতে ব্যর্থ হয় মহান আল্লাহতায়ালার মিশন; এবং বিজয়ী হয় শয়তানের মিশন। অথচ বাংলাদেশে সেটিই হচ্ছে। শয়তান ও তার অনুসারিগণ চায়, মানুষ কোর’আন বুঝা ও তা থেকে শিক্ষা নেয়া থেকে দূরে থাক। এটি হলো মহান আল্লাহতায়ালার পবিত্র মিশনকে ব্যর্থ করার ষড়যন্ত্র। ঈমানদারের জন্য পবিত্র কোরআনের প্রতিটি বাক্যে ম্যাসেজ বা পথের নির্দেশনা আছে। না বুঝে পড়লে সে সুর পায়, কিন্তু পথ পায় না। না বুঝে কোরআন পড়লে জাহালত তথা অজ্ঞতা দূর হয় না। ফলে সে জাহেলের পক্ষে ঈমানদার হওয়া অসম্ভব হয়। ফলে সে পথভ্রষ্ট হয় এবং দোজখমুখি হয়। এ মহা বিপদ থেকে বাঁচাতেই কুর’আনের বুঝা প্রতিটি নরনারীর উপর ফরজ করেছেন। এ ফরজ পালিত না হলে কোন কাফ্ফারা আদায়ের পথও নাই। কাফফারা দিতে হয় জাহান্নামের আগুণে পৌঁছার মধ্য দিয়ে।

তাছাড়া ঈমানের খাদ্য হলো কোর’আনের জ্ঞান। এখানে অপুষ্টি দেখা দিলে ঈমানরে মৃত্যু ঘটে। সুরা আনফালের দ্বিতীয় আয়াতে সে বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে এভাবে, “মু’মিন তো একমাত্র তারাই যাদের অবস্থা এমন, যখন তাদের সামনে আল্লাহর নামের স্মরণ হয় তখন তাদের মন ভয়ে কেঁপে উঠে। এবং যখন তাদের সামনে তাঁর আয়াতকে তেলাওয়াত করে শোনানো হয় তখন তাদের ঈমান বেড়ে যায়। এবং তাঁরা তাদের রবের উপর ভরসা করে।” প্রশ্ন হলো, কোন বাক্যের অর্থ না বুঝলে তাতে কি মনের উপর তার কোন আছড় হয়? আছড় তো হয় বুঝার কারণে। ফলে না বুঝে পড়ায় ব্যক্তির রুহ ব্যর্থ হয় তার পুষ্টি পেতে। কোর’আনী জ্ঞানের পুষ্টিতে ঈমানকে বলবান করার তাগিদে মিশর, সিরিয়া, ইরাক, সূদান, মরক্কো, আলজিরিয়া, লিবিয়া, তিউনিসিয়া, মালি, মৌরতানিয়া এরূপ প্রায় ২০টি দেশের জনগণ মুসলিম হওয়ার সাথে সাথে তাদের মাতৃভাষাকে কবরে পাঠিয়ে কোর’আনের ভাষাকে নিজেদের ভাষা রূপে গ্রহণ করে। অথচ বাংলাদেশের ন্যায় দেশগুলিতে চলছে কোর’আন বুঝা থেকে দূরে রাখার শয়তানি চক্রান্ত। না বুঝে পড়াকেও ছওয়াবের কাজ বলা হচ্ছে।      

 

পথভ্রষ্টতা যে কারণে অনিবার্য হয়

অজানা পথে পথচলায় সঠিক ম্যাপ চাই। নইলে অসম্ভব হয়, সঠিক পথে পথ চলা। তখন অনিবার্য হয় পথভ্রষ্টতা। তবে এখানে পথচলাটি এক শহর থেকে অন্য শহরে গমনের নয়। বরং সেটি দুনিয়ার এ জীবন থেকে জান্নাতে পৌঁছার। ফলে যাত্রাপথটি নির্ভূল হওয়ার গুরুত্বটি অপরিসীম। তার উপর নির্ভর করে মানব জীবনের বাঁচার প্রকৃত সফলতা। নইলে পথভ্রষ্ট মানুষটি জাহান্নামে গিয়ে পৌঁছে। তখন জীবনের সমগ্র বাঁচাটিই অনন্ত-অসীম কালের জন্য দুঃখের কামাইয়ে পরিণত হয়। মানব জাতির মূল ব্যর্থতা কৃষি, শিল্প বা বিজ্ঞানে নয়। বরং সেটি হলো সঠিক পথে জীবন চালানোর। মহান আল্লাহতায়ালা মানব জাতিকে বৈজ্ঞানিক আবিস্কারের বিস্ময়কর সামর্থ্য দিয়েছেন। কিন্তু সিরাতুল মুস্তাকীম পথ আবিস্কারের ক্ষমতাটি দেননি। এ বিষয়টি তিনি নিজ হাতে রেখেছনে। তাই সুরা লাইলে ঘোষণা দিয়েছেন, “ইন্না আলায়নাল হুদা” অর্থঃ “নিশ্চয়ই (মানুষকে) পথ দেখানোর দায়িত্বটি আমার।”

সে দায়িত্ব পালনের তাগিদেই তিনি লক্ষাধিক নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন এবং নাযিল করেছেন আসমানি কিতাব। পবিত্র কোর’আন হলো এ সিলসিলার সর্বশেষ কিতাব এবং নবীজী (সাঃ) হলেন সর্বশেষ রাসূল। এবং সিরাতুল মুস্তাকীমে চলার স্যাটেলাইট নেভিগেশন ম্যাপ হলো পবিত্র কোরআন। তবে সে ম্যাপটি শুধু কাছে থাকলেই চলে না। সেটিকে বুঝতে হয়, এবং পদে পদে অনুসরণও করতে হয়। যে ব্যক্তি জান্নাতে পৌঁছতে চায় তার সর্বক্ষণের ফিকর হয়, কি করে পবিত্র কোরআন থেকে প্রতি পদে দিক-নির্দেশনা নেয়া যায়। এবং কি করে বাঁচা যায় পথভ্রষ্টতা থেকে। ঈমানদারের এরূপ সার্বক্ষণিক ফিকরই হলো তাকওয়া। সে গভীর তাকওয়ার তাগিদে সে তখন কোর’আনের ভাষা শেখে। এবং পবিত্র কোর’আনের প্রতিটি আয়াত বুঝবারও চেষ্টা করে। মুসলিমদের গৌরব কালে মুসলিমদের মাঝে তো  সে তাড়নাটাই প্রবল রূপে দেখা গেছে। কিন্তু যে ব্যক্তি না বুঝে তেলাওয়াত করে, সে ব্যক্তি ব্যর্থ হয় সে পথে চলতে। তখন ব্যর্থ হয় মহান আল্লাহতায়ালার এজেন্ডা। এবং বিজয়ী হয় শয়তানের এজেন্ডা। তাই শয়তান ও তার অনুসারিরা চায়, মানুষ হাজার বার কোর’আন পড়ুক, কিন্তু তা যেন না বুঝে পড়ে। এতে সফল হয় মানব সন্তানদের দিয়ে জাহান্নাম পূরণ করার শয়তানী প্রকল্প। ৪/৪/২০১৯




মুসলিম জীবনে যুদ্ধ ও অরক্ষিত দুর্গ

অনিবার্য যে লড়াই মুসলিম জীবনে

মুসলিম জীবনে লড়াই অনিবার্য। কারণে এ পৃথিবীতে সত্যিকারেরর ঈমানদার ছাড়া সবাই ইসলামের নির্মূল চায়। শত্রুদের মাঝে কোয়ালিশনটি বিশ্বজুড়ে। ইসলামের অনুসারি নারী-পুরুষ এবং শিশুরাও তাই হত্যার টার্গেট হয়। নামাজরত মুসল্লীদেরও হত্যা করা হয় মসজিদে ঢুকে –যেমনটি ১৫ই মার্চ নিউজিল্যান্ড হলো। এর আগে ইহুদীদের হাতে হয়েছে ফিলিস্তানে। এমনকি মুসলিম দেশেও হচ্ছে। ২০১৩ সালে শত শত মুসল্লীকে হত্যা করা হয়েছে ঢাকার শাপলা চত্ত্বরে। শান্তির বার্তাবাহী নবীজী (সাঃ)কেও তাই ইসলাম ও মুসলিম অস্তিত্ব বাঁচাতে অসংখ্য যুদ্ধের মোকাবেলা করতে হয়েছে। সুরক্ষিত দুর্গ ও সে দুর্গের লড়াকু সৈনিক ছাড়া ইসলামের অস্তিত্ব ও সুরক্ষা অসম্ভব। স্রেফ ইসলামের প্রচার ও নামায-রোযার ন্যায় ইবাদতের মাধ্যমে ইসলাম ও মুসলিমদের বাঁচানো যায় না। মুসলিম রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বও সুরক্ষা পায় না। এজন্যই ইসলামে সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত হলো জিহাদ। তবে জিহাদকে লাগাতর বাঁচিয়ে রাখার জন্যও ইসলামী অবকাঠামো চাই। চাই দুর্গ। চাই প্রশিক্ষণ। চাই লাগাতর রিক্রুটমেন্ট। প্রতিটি শাসকই রাজ্য-শাসনে শুধু প্রাসাদ গড়ে না, সুরক্ষিত দুর্গ, থানা,কোট-কাছারি,কারাগার, অস্ত্রাগার,বিদ্যালয়, সচিবালয়সহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠানও গড়ে। এগুলি হল রাজ্যশাসনের অবকাঠামো। সার্বভৌমত্বের সুরক্ষায় অতি অপরিহার্য হল এগুলি। এগুলি হাতছাড়া হলে শাসন-কাজ চলে না, সরকারও বাঁচে না। একই কারণে বিশ্বের স্রষ্টা এবং প্রকৃত শাসক মহান আল্লাহতায়ালার তেমনি একটি স্ট্রাটেজী রয়েছে। তিনি শুধু সর্বশক্তিমান প্রভুই নন, সর্বশ্রেষ্ঠ আইন প্রনেতাও। তাঁর সে প্রনীত আইনই ইসলামে শরিয়তরূপে পরিচিত। মহান আল্লাহতায়ালার কাম্য শুধু ‌এ নয়, মানুষ শুধু তার উদ্দেশ্যে নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত পালন করবে এবং তার শরিয়ত অবহেলিত হবে। তিনি চান, সমগ্র বিশ্বজুড়ে সে আইনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠা। যেমন তাঁর প্রিয় রাসূল হযরত মহম্মদ (সাঃ) প্রতিষ্ঠা  করেছিলেন। এটিই তো নবীজী (সাঃ)র লিগ্যাসী। মুসলিম রূপে বাঁচতে হলে এ লিগাসী নিয়ে বাঁচা ছাড়া ভিন্ন পথ নেই।

তাঁর নিজের সৃষ্ট পৃথিবী শয়তানের অনুসারিদের হাতে অধিকৃত হোক এবং ইসলাম ভিন্ন অন্য কোন বিধান, ধর্ম, মতবাদ বা দর্শন প্রতিষ্ঠা পাক -সেটি মহান আল্লাহতায়ালার কাম্য নয়। তাছাড়া তাতে মানবের কল্যাণও নেই। মানুষের সফলতা ও কল্যাণ একমাত্র মহান আল্লাহর আনুগত্যে। অবাধ্যতায় যেটি অনিবার্য হয় সেটি অশা্ন্তি। সে অবাধ্যতা ব্যক্তি বা সমাজ জীবনে নামিয়ে আনে মহা-আযাব। সে অশান্তি শুধু দুনিয়ার জীবনেই শেষ হয় না, আযাবের পথে ব্যক্তি জাহান্নামে গিয়ে পৌঁছায়। আল্লাহতায়ালা চান, মানুষ বেড়ে উঠুক তাঁর অনুগত বান্দাহ রূপে। এবং সে আনুগত্যের প্রমাণ করুক আল্লাহর সে বিধানের প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। সেটির প্রতিষ্ঠায় অনাগ্রহ বা বিরুদ্ধাচারণের অপরাধ সারা জীবন নামায-রোযা পালন করেও দূর করা যায় না। সেটি গণ্য হয় আল্লাহর বিরুদ্ধে প্রকান্ড বিদ্রোহ বা অবাধ্যতা রূপে। যা শুধু আযাবেই বৃদ্ধি ঘটায়। এমন অবাধ্যতায় একমাত্র শয়তান ও তার অনুসারি কাফেরগণই খুশি হতে পারে। আল্লাহতায়ালা তাঁর দ্বীনের প্রতিষ্ঠার মহান কাজটি একমাত্র মানুষের জন্য নির্ধারিত করে রেখেছেন, ফেরেশতাদের জন্য নয়।  শরিয়তী বিধানের প্রতিষ্ঠার কাজটি যে কত গুরুত্বপূর্ণ সটি বুঝা যায় পবিত্র কোরআন পাঠে। বলা হয়েছে, “তিনিই সেই মহান আল্লাহ যিনি সঠিক পথনির্দেশনা ও সত্য দ্বীনসহ রাসূল পাঠিয়েছেন যেন তাঁর দ্বীন (অর্থাৎ ইসলামী বিধান)সকল ধর্ম ও সকল মতের উপর বিজয়ী হয়। যদিও সেটি কাফেরদের কাছে অতি অপছন্দের।”- সুরা সাফ। মহান আল্লাহর এ মহান অভিপ্রায়টি পবিত্র কোরআনে একবার নয়, তিনবার ঘোষিত হয়েছে। এবং অবিকল অভিন্ন ভাষায়।

 

ইসলামের দুর্গ: আল্লাহর ঘর

মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনের সুরক্ষায় তাঁর নিজের প্রতিষ্ঠানটি হল মসজিদ। জমিনের উপর এটিই আল্লাহর একমাত্র ঘর। এটিই ইসলামের দুর্গ। এমন একটি দুগের্র নির্মান যে ইসলামে কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটির প্রথম স্বাক্ষর রাখেন মুসলমানদের আদি পিতা হযরত ইবরাহীম খলিলুল্লাহ(আঃ)। তিনি মক্কায় তাঁর শিশু পুত্র ঈসমাইলকে সাথে নিয়ে ক্বাবা গড়েছিলেন। মানবের হাতে এ পৃথিবীতে বহু হাজার বছর ধরে বহু বিস্ময়কর কীর্তিই নির্মিত হয়েছে। কিন্তু হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পুত্র ইসমাইলকে সাথে নিয়ে কাঁচা মাটির ইট দিয়ে যে ক্ষুদ্র ঘরটি নির্মান করেছিলেন সেটিই হল এ দুনিয়ায় মানবকুলের সর্বশ্রেষ্ঠ ইন্সটিটিউশন। কারণ এটি গড়কার মুলে যে মহান লক্ষ্য ছিল তেমন একটি লক্ষ্য বিস্ময়কর পিরামিড বা তাজমহলের নির্মাণে মধ্য ছিল না। “মানুষের কর্মের মূল্যমান নির্ধারণ হয় তার নিয়েত থেকে।” –হাদীস। নবীজীর হাজার হাজার হাদীস ঘেঁটে ইমাম বোখারী (রহঃ) ঈমানদারের নিত্যদিনের বাঁচার সাথে সম্পৃক্ত এর চেয়ে মূল্যবান আর কোন হাদীস খুঁজে পাননি। এ পবিত্র হাদীসটি তিনি বর্নীত করেছেন অমিরুল মোমেনীন হযরত উমর ফারুক (রাঃ) থেকে। ইমাম বোখারী (রহঃ) সেটিকে তিনি স্থান দিয়েছেন তাঁর সংকলিত হাদীস গ্রন্থের শুরুতে। যে ব্যক্তি নিজের ঘর না গড়ে সর্ব-সামর্থ্য দিয়ে আল্লাহর দ্বীনের বিজয়ে আল্লাহর ঘর গড়েন তার চেয়ে নিয়তে আর কে শ্রেষ্ঠ হতে পারে? মৃতের কবরে উপর বছরে পর বছর ধরে বিপুল অর্থবল, লোকবল ও মেধা ব্যয়ে তাজমহল বা পিরামিডের নির্মাণে মানব-সমাজের কোন কল্যাণটি হয়েছে? অথচ ক্বাবার কল্যাণ হলো, কোটি কোটি মানুষের জীবনে বছরের পর বছর ধরে সত্যের পথে পথ চলায় দিক-নির্দেশনা দিচেছ। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষ সেখানে এসে লাব্বায়েক বলছে এবং আল্লাহর হুকুমের প্রতি আনুগত্যের শপথ নিচ্ছে। মহান আল্লাহতায়ালা মানুষের আর কোন সৃষ্টিতে এতটা খুশি হননি যা হয়েছিলেন এ ক্বাবার নির্মানে। বিণিময়ে সর্বকালে ও সমগ্র জাহানে এ ঘরটিকে তিনি সবচেয়ে সম্মানিত ঘর রূপে প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন। সামর্থ্যবান লোকদের উপর এ ঘরে অন্ততঃ একবার হাজিরা দেওয়াকে বাধ্যতামূলক করেছেন। এ বিশ্বে বহু অর্থ ব্যয়ে বহু প্রাসাদ এবং বহু ঘর নির্মিত হয়েছে, কিন্তু কোন ঘরের কি এত সম্মান আছে?

নিয়েতের শ্রেষ্ঠত্ব একটি কর্মকে যে কতটা শ্রেষ্ঠত্ব দেয় ক্বাবা হল তার এক উজ্বল দৃষ্টান্ত। হযরত ইবরাহীম (আঃ)র সমগ্র বাঁচার মধ্যেই অতি শ্রেষ্ঠতর  ও পবিত্রতর নিয়েত ছিল। সেটি সর্বাবস্থায় একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যেই বাঁচার নিয়েত। সে নিয়েতের প্রকাশ বা প্রতিফলন ঘটতো তাঁর প্রতিটি কর্মে ও উচ্চারণে। ঈমানদারের নিয়তটি কীরূপ হবে সেটি শিখিয়েছেন খোদ মহান আল্লাহতায়ালা। নবীজী (সাঃ)কে সে নিয়েতটি বলে দেয়া হয়েছে এভাবেঃ “ক্বোল,ইন্নাস সালাতি ওয়া নুসুকি ওয়া মাহহিয়া ও মামাতি লিল্লাহে রাব্বিল আলামিন।”  অর্থ: “বলো হে মহম্মদ, নিশ্চয়ই আমার নামায, আমার ত্যাগ ও কোরবানী, আমার জীবন-ধারণ ও মরণ একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যেই।” এমন একটি নিয়েত নিয়ে বেঁচেছিলেন হযরত ইবরাহীম (আঃ) এবং নির্মাণ করেছিলেন ক্বাবা। একই রূপ নিয়েতের প্রকাশ ঘটেছিল নবীজীর হাতে মদীনায় মসজিদে নববীর নির্মানে। মহান নবীজী (সাঃ) মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের পর নিজের ঘর না গড়ে মসজিদ গড়েছিলেন। মহান আল্লাহতায়ালা নবীজীর নির্মিত এ মসজিদটিকেও এতটাই পছন্দ করেছেন যে ক্বাবার পর ইসলামের দ্বিতীয় সম্মানিত ঘর রূপে সেটিকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। মসজিদের নির্মানে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ও হযরত মহম্মদ (আঃ) যে আদর্শ স্থাপন করেছেন আজও মুসলমানদের কাছে সেটিই শ্রেষ্ঠতম আদর্শ। আল্লাহর দ্বীনের প্রচার বা প্রতিষ্ঠার নির্ভেজাল নিয়েতে মসজিদ নির্মিত হলে একমাত্র তখনই প্রকৃত আল্লাহর ঘরে পরিণত হবে। নইলে সেটি ফিতনা সৃষ্টির ঘরে পরিণত হয়। মদিনার বুকে মুনাফিকদের গড়া মসজিদে জ্বিরার ন্যায় তেমন একটি ঘরে নবীজী(সাঃ)র নির্দেশে আগুণ দেওয়া হয়েছিল।

 

অরক্ষিত দুর্গ

মসজিদ যেমন মহান আল্লাহর দুর্গ, প্রতিটি নামাযী হলো তেমনি আল্লাহতায়ালার সৈনিক। তাঁরা লড়াই করে আল্লাহর রাস্তায়। মসজিদের কাজ শুধু নামাযের আয়োজন নয়, জিহাদের আয়োজনও। জনৈক তুর্কি কবি তাই লিখেছেন, “মসজিদ আমাদের দুর্গ, মিনার আমাদের বেয়োনেট, গম্বুজ হল ঢাল আর মসজিদের মুসল্লীরা আমাদের সৈনিক।” কবিতার এ চরণ ক’টি এক জনসভাতে বলাতে তুরস্কের বর্তমান প্রধানমন্ত্রি জনাব রজব তৈয়ব আরদোগানকে জেলে যেতে হয়েছিল। ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল জেনারেল ও সৈনিকের জন্ম হয়েছে মসজিদের এ জায়নামায থেকে। যোদ্ধার বড় হাতিয়ার তার অস্ত্র নয়, বরং তার আত্মবল ও আত্মত্যাগের স্পৃহা। আর সেটিই বেশী গড়ে উঠে এ জায়নামাজে। মসজিদ নববীর দুর্গ থেকে যতজন বিখ্যাত জেনারেল ও সৈনিক জন্ম নিয়েছেন তা কি পরবর্তিকালে হাজার বছরেও সম্ভব হয়েছে? রাষ্ট্র, পরিবার ও ব্যক্তির মাঝে মসজিদই হল সংযোগস্থল। খোলাফায়ে রাশেদার আমলে খলিফা স্বয়ং রাজধানীর মসজিদে ইমামের দায়িত্ব পালন করতেন। প্রাদেশিক গভর্নরগণ তেমনি ইমামের দায়িত্ব পালন করতেন প্রাদেশিক নগরীতে। নগর শাসকগণ সে দায়িত্ব পালন করতেন নিজ নিজ শহরে।  

আজ মুসলিম রাষ্ট্রের সংখ্যা বেড়েছে, জনসংখ্যাও বেড়েছে। বেড়েছে সেনানীবাস ও সৈন্যসংখ্যা। কিন্তু তারা বিজয় দুরে থাক কোন পরাজয়ও কি রুখতে পেরেছে? রুখতে পেরেছে কি ফিলিস্তিন, ইরাক, আফগানিস্তান, কাশ্মীরসহ কোন মুসলিম ভূমিতে মুসলিম নিধন? পারিনি। কারণ, ইসলামের আসল দুর্গ মসজিদের মেঝেতে সৈনিক গড়ার সে কাজ বহু আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। মসজিদ নির্মানের মাঝে আল্লাহর দ্বীনের প্রচার, প্রতিষ্ঠা ও বিজয়ের কোন নিয়েতই নেই। আল্লাহর এ দুর্গগুলিকে পরিকল্পিত ভাবে পরিণত করা হয়েছে নেহাত নামায-ঘরে। এখানে নামায পড়া হয়, কিন্তু নামাযের বাইরেও নামাযীর যে বহু কিছু করণীয় রয়েছে সে শিক্ষা দেয়া হয় সামান্যই। মুসলিম ভূমি একের পর এক অধিকৃত হলেও নেই ভূভজিহাদের অনুপ্রেরণা ও তালিম। জুম্মাহর খোতবায় সেটি কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই নয়। ফলে কাফের শক্তির হামলার মুখে প্রতিরোধে যুদ্ধে নামা যে ফরয সে শিক্ষাটি নামাযীরা সেখানে পায় না। ফলে ১৭৫৭ সালে বা্ংলা যখন ইংরেজ কাফেরদের হাতে অধিকৃত হলো তখন মসজিদগুলো থেকে কোন জিহাদই সংগঠিত হয়নি। একই অবস্থা অন্যান্য মুসলিম দেশেও। অথচ বিশাল বিশাল মসজিদের নির্মানে মুসলমানদের অর্থব্যয়, শ্রমব্যয় ও মেধাব্যয় কম হয়নি। বরং এতটাই অধিক হয়েছে যে মসজিদগুলো পরিণত হয়েছে দর্শনীয় স্থানে। এরই প্রমাণ, উমাইয়া, আব্বাসীয়, মোঘল, মুর ও উসমানীয় বাদশাহদের মসজিদগুলো পরিণত হয়েছে প্রশিদ্ধ পর্যটন কেন্দ্রে। মুজাহিদশূণ্য হয়েছে মসজিদের মেঝে। ফলে একের পর এক মুসলিম রাষ্ট্র পরাজিত ও অধিকৃত হয়েছে শত্রুদের হাতে।

আজও একই অবস্থা। নিজ দেশে বা প্রতিবেশী দেশে আল্লাহর শরিয়তি বিধানের পরাজিত দশা দেখে নামাযীদের মাঝে সংগ্রামের চেতনা জাগে না। দেশে দেশে মুসলিম নারী-পুরুষ নিহত, নির্যাতিত বা ধর্ষিত হতে দেখেও তাদের মনে জিহাদের জজবা জেগে উঠা দুরে থাক, মজলুমদের জন্য সহানুভূতিও জাগে না। এরই উদাহরণ, গাজায় ফিলিস্তিনীদের মাথার উপর যখন ইসরাইলের শত শত বোমা বর্ষিত হয় তখন সহায়তায় কোন ভিনদেশী মুসলিম সেখানে ছুটে যায়নি। বরং মিশর তার গাজা সীমান্তে আরোপিত পাহারাদারিকে আরো মজবুত করেছে যেন আহত উদ্বাস্তুরা প্রাণ বাঁচাতে মিশরে পৌঁছতে না পারে। মিশর সরকারের দায়বদ্ধতা যেন ইসরাইলীদের নিরাপত্তা বিধান,ইসলাম বা মুসলমানদের নয়। একই অবস্থা জর্দানসহ অন্যান্য আরবদেশের। একই অবস্থা বাংলাদেশেও। ফলে বার্মার স্বৈরাচারি সামরিক সরকারের হাতে নির্যাতিত রোহিঙ্গা মুসলমানরা বাংলাদেশে নিরাপদ আশ্রয় পায় না। বরং হামলা হয়েছে তাদের উদ্বাস্তু শিবিরে। আশ্রয় পায় না হতভাগ্য অবাঙ্গালীরাও। যুগের পর যুগ ধরে তারা বস্তিতে থাকছে। এনিয়ে কোন নামাযীর মনেও কি দংশন হয়? এই হল মুসলমানদের ঈমানের মান?

নবীজী (সাঃ) মসজিদের যে মডেল খাড়া করেছিলেন সেটি কি শেখায়? সেটি হল, রাষ্ট্র বা সমাজে ইসলামের মূল বুনিয়াদ বা ফাউন্ডেশন হল মসজিদ। আল্লাহর দ্বীনের বিশাল বৃক্ষ এখান থেকেই শত দিকে শত শাখায় বিকশিত হয়। দ্বীনের চেরাগ এখানেই প্রথম জ্বলে এবং অসত্য ও আঁধারের মাঝে মহল্লার মানুষকে সত্য-ন্যায়ের পথ দেখিয়ে থাকে। আল কোরআন যেমন আল্লাহর কেতাব, মসজিদ তেমনি আল্লাহর ঘর। অসত্য ও আঁধারের মাঝে একটি প্রজ্বলিত আলো, অপরটি সে পবিত্র আলোরই সমুন্নতকারী আলোঘর। তাই আল্লাহর নবী (সাঃ) যেমন আল্লাহর কেতাব কোরআন নিয়ে এসেছেন তেমনি আল্লাহর ঘরও গড়েছেন। তিনি যেমন আল্লাহ-প্রদত্ত জ্ঞান পেয়েছেন, তেমনি সে জ্ঞানের প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রজুড়ে মসজিদ ভিত্তিক এক ব্যাপক অবকাঠামোও গড়েছেন। এটিই নবীজী(সাঃ)র মহান সূন্নত যা সমাজ ও রাষ্ট্রজুড়ে বিপ্লব এনেছিল। কিন্তু আজকের অবস্থা ভিন্নতর। সমগ্র মুসলিম বিশ্ব জুড়ে আজ গভীর অন্ধকার। মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর রাজনীতি ও প্রশাসন গেছে দুর্বৃত্তদের হাতে। বিদেশী কাফেরদের হাতে একের পর এক অধিকৃত হচ্ছে মুসলিম ভূমি। অন্ধকার কবলিত একটি জনপদকে দেখে অন্ততঃ এ কথা নিশ্চিত বলা যায়, সেখানে কোন বাতিই জ্বালানো হয়নি। তেমনি যে রাষ্ট্র জুড়ে দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তির জয়জয়াকার এবং আল্লাহর শরিয়তী বিধান বিতাড়িত আইন-আদালত থেকে, সে রাষ্ট্রে আল্লাহর দুর্গ যে বিধ্বস্ত তা নিয়ে কি কোন সন্দেহ থাকে?

সুরক্ষিত দুর্গ ছাড়া যে শাসনের সুরক্ষা হয় না তা প্রতি শাসকই বুঝে। বুঝে আল্লাহর অবাধ্য শয়তানি শক্তিও। তাই দুর্গ বা রাজকয় প্রাসাদ গড়া শুধু অতীত কালের নমরুদ বা ফিরাউনের কাজ নয়। বরং প্রতি যুগের ফিরাউন ও নমরুদেরা সেটিই করছে। তাদের হাতেই যুগে যুগে গড়ে উঠেছে অসংখ্য রাজপ্রাসাদ ও দুর্গ। আজও প্রতি দেশে রাজধানি থেকে শুরু করে দূরের নির্ভৃত পল্লি অবধি গড়ে উঠা যে বিশাল প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো সেটি তো একটি বিশেষ গোষ্ঠির স্বার্থ,সংস্কৃতি ও জীবনদর্শনের হেফাজতে। সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশেরা এক কালে তাদের  শাসন ও শোষনকে সুদৃঢ় করতে শুধু নিজ দেশে নয়,বিশ্বের বহু দেশে বহু দুর্গ ও বহু প্রতিষ্ঠান নির্মান করেছে। মাকিন সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠি ও তাদের ন্যাটো মিত্ররা সে অভিন্ন লক্ষে পৃথিবীর নানা দেশে শত শত দুর্গ করে সুদৃঢ় অবস্থান নিয়েছে।

জাপান,কোরিয়া,ফিলিপাইন,জার্মান,ব্রিটেন,ইরাক,আফগানিস্তানসহ বহুদেশে বহু লক্ষ সৈন্যও মোতায়েন করেছ। আফগানিস্তানে তেমনি এক আধিপত্যকামী অবকাঠামো নির্মানে সাম্রাজ্যবাদী মার্কিনীরা বিপুল অর্থব্যয় করছে। তাদের লক্ষ্য শুধু পুঁজিবাদী শাসন ও শোষণ প্রক্রিয়াকে হেফাজত করা নয়,বরং পাশ্চাত্যের সেকুলার ধ্যান-ধারণা, সংস্কৃতি ও সভ্যতার প্রতিষ্ঠা এবং প্রতিরক্ষা দেওয়া। আন্তর্জাতিক ভাবে বিস্তৃত সে অবকাঠামো গড়ায় যারা বাধা দেয় তাদেরকে তারা শত্রুর তালিকায় রাখে। এমনকি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধও শুরু করে। ইরাকে ও আফগানিস্তানে মার্কিন হামলার মূল কারণ তো সেটিই। তাদের আগ্রাসনের লক্ষ্য শুধু কোন দেশের ভূগোল নয়। হামলার লক্ষ্য শুধু তাদের নিজ দেশের সীমান্তের সুরক্ষাও নয়। বরং সেটি হলো তাদের দর্শন, সংস্কৃতি ও জীবন-দর্শনের সুরক্ষা। আর এক্ষেত্রে তারা শত্রু জ্ঞান করে ইসলামকে। কারণ একমাত্র ইসলামই চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছে তাদের সৃষ্ট মতবাদকে সম্পূর্ণ ভূয়া ও প্রতারণামূলক বলে। হযরত মূসা (আঃ)র কোন রাজ্য ছিল না, কোন লোক লস্করও ছিল না। কিন্তু ছিল একটি নির্ভূল ধর্ম ও দর্শন। ছিল একটি ভিন্ন জীবনপদ্ধতি ও সংস্কৃতি। সেটিই চ্যালেঞ্জ ছুড়েছিল ফিরাউনের ধর্ম, জীবন-দর্শন ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে। আর তাতেই ফিরাউন তার বিশাল লোকলস্কর নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল হযরত মূসা (আঃ) ও তাঁর লোকদের উপর। আজও যারা ইসলামের প্রতিষ্ঠা চায় তাদের কোন রাষ্ট্র নাই, তাই কোন রাষ্ট্রীয় সীমান্ত বা সেনানীবাসও নেই। কিন্তু সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে আল্লাহদ্রোহী শক্তি তাদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। তবে শত্রুর এ আগ্রাসী হামলার সফল প্রতিরোধ গড়ে উঠতে পারে মসজিদ থেকে। পারসিক ও রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে জিহাদ গড়ে উঠেছিল এখান থেকেই। 

 

মসজিদে কেন হামলা?

বিশ্বের মুসলমানগণ আজ সংখ্যায় প্রায় দেড় শত কোটি হওয়া সত্ত্বেও পরাজিত। তাদের এ পরাজয় ইসলামের প্রতিষ্ঠায়। পরাজয়, নিজ জীবনে ইসলামের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণে। আর এ পরাজয়ই সকল পরাজয়ের মা। তবে এ পরাজয়ের কারণ এ নয় যে, ইসলামের মূল উৎস কোরআন মুসলিম সমাজ থেকে বিলুপ্ত বা বিকৃত হয়েছে। বরং এজন্য যে দ্বীনের মূল দুর্গ বা প্রতিষ্ঠানগুলি আজ বিধ্বস্ত বা অকার্যকর। আর সবচেয়ে অকার্যকর প্রতিষ্ঠানটি হলো মসজিদ। মসজিদে নববী থেকে আজকের এসব মসজিদের পার্থক্য বিশাল। কোন বিদেশী শত্রু-শক্তি যখন কোন দেশকে আক্রমণ করে তখন প্রথম হামলাতেই সে দেশের সেনানীবাস, বিমান-ঘাঁটি, নৌ-ঘাঁটি, রাস্তাঘাট, ব্রিজসহ আভ্যন্তরীণ অবকাঠামোকে তারা ধ্বংস করে দেয়। কারণ যে কোন হামলার বিরুদ্ধে প্ররিরোধ গড়ে উঠে সেখান থেকেই। এগুলো ধ্বংস হলে সে দেশের প্রতিরোধের সামর্থ এমনিতেই লোপ পায়। একই কারণে শত্রুশক্তি ইসলামের শক্তিবিনাশে আল্লাহর দুর্গ মসজিদকে ধ্বংস করে। সোভিয়েত রাশিয়ায় কমিউনিষ্ট বিপ্লব বিজয়ী হওয়ার সাথে সাথে বন্ধ করে দেওয়া হয় সে দেশের হাজার হাজার মসজিদ। আর মুসলিম দেশগুলির সেকুলার ও স্বৈরাচারি সরকারগুলো মসজিদে তালা না লাগালেও ব্যবস্থা নিয়েছে যেন সেগুলো মসজিদে নববীর আদর্শে গড়ে না উঠে। তাই নবীজী(সাঃ)র মসজিদে রাজনীতি চর্চা ও শত্রুর বিরুদ্ধে জিহাদের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও আজকের মসজিদগুলোতে তা নিষিদ্ধ।

আজও পাশ্চাত্য দেশগুলিতে মসজিদ নির্মানের বিরুদ্ধে নানা বাধা আসছে মূলতঃ সে কারণেই। এসব দেশে অমুসলিমদের মনে প্রচন্ড ইসলাম ভীতি জেগেছে মসজিদের সংখ্যাবৃদ্ধিতে। তারা জানে, মুসলমান জন্মসূত্রে ইসলামের মৌল শিক্ষাগুলো শিখে না। সেটি শেখে মসজিদ-মাদ্রাসা থেকে। এ যুগে মাদ্রাসা মসজিদ থেকে পৃথক হলেও নবীজী (সাঃ)র যুগে জ্ঞানচর্চার সে কাজটি হত মসজিদের জায়নামাযে। নামায-রোযার চেয়ে জ্ঞানচর্চাকে সে কালে কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়নি। অথচ কাফের দেশে সে সুযোগ থাকে না। দেশের প্রজাদের কে কি খাবে তার উপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কোন দেশের সরকারই মাথা ঘামায় না। কারণ, খাদ্যের সাথে সম্পর্ক ব্যক্তির দেহের বলের। প্রজাদের দেহের গুণে কোন দেশেই কোন সরকারের পতন হয় না। সেটি ঘটে জনগণের মনের গুণের কারণে। মনের গুণই ব্যক্তিকে প্রচন্ড বিদ্রোহী করে তোলে। মার্কস ও লেলিনের লিখনী সেগুণটিই বাড়িয়েছিল রাশিয়ার কম্যুনিষ্টদের। তাই একজন ছাত্র কি শিখবে এবং কি শিখবে না সেটি নির্ধারণ করে দেয় প্রতিটি সরকার। মার্কিনীরা সে কাজে হাত দিয়েছে সমগ্র মুসলিম জুড়ে। কাফের বা সেকুলারিষ্টদের শাসিত দেশে সরকারি উদ্যোগে ইসলামর জ্ঞানার্জনের সুযোগ সামান্যই। সে জ্ঞান-বিতরনের দায়িত্ব নিতান্তই আল্লাহর ঘর মসজিদের। সেটি ছাত্র ও অছাত্র –উভয়ের মাঝে। মসজিদই সিমেন্ট লাগায় জায়নামাজে হাজির মুসলমানদের মাঝে, তাদের মাঝে গড়ে তোলে সীসাঢালা দেওয়ালসম ঐক্য। অমুসলিম দেশে ইসলামি বিপ্লব বা মুসলিম সভ্যতার নির্মানে মসজিদের ভূমিকা এজন্যই অতি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সে মসজিদই যখন নিষ্ক্রীয় ও প্রাণহীন হয় তখন মুসলমান সন্তানদের কি প্রকৃত মুসলমান রূপে বেড়ে উঠার সম্ভাবনা থাকে? আজকের মুসলমানদের সামনে এটি এক প্রকট সমস্যা। চিন্তা-চেতনায় কোন ব্যক্তি যতই ইসলামি হোক না কেন,পরিবার, রাষ্ট্র ও মসজিদের ন্যায় প্রতিষ্ঠানগুলো যদি সঠিক ভাবে কাজ না করে তবে তার পক্ষে প্রকৃত মুসলমান রূপে বেড়ে উঠা বা দায়িত্বপালন করা অসম্ভব। অসম্ভব হয়  অনৈসলামি পরিবেশে তার সন্তানদের প্রকৃত মুসলিম রূপে বেড়ে উঠাকে সুনিশ্চিত করা। আর এরূপ এক বৈরী পরিবেশে কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখে মসজিদ।

 

অবহেলিত দুর্গ

মসজিদের মূল শক্তি বিপুল সংখ্যায় নয়। বিশাল আয়তন বা সৌন্দর্যেও নয়। বরং মূল শক্তি হল ইসলামের মৌলিক শিক্ষা। এবং সে শিক্ষার শিক্ষক হল মসজিদের ইমাম। ইসলামের শিক্ষাকে তি্নিই জনগণের মাঝে পৌঁছে দেন। সাধারণ মুসলমানদের সামনে তিনিই অণুকরণীয় আদর্শ। তাই ইমাম অযোগ্য হলে মসজিদও নিষ্ক্রীয় বা শক্তিহীন হতে বাধ্য। মসজিদের ইমামের আসনে বসেছিলেন স্বয়ং নবীজী (সাঃ)। তাই যারা সে আসনে বসেন সে বিষয়টি তাদের স্মরণে রাখা উচিত। তাদের কর্ম বা আচরণ পরিচালিত হওয়া নবীজী (সাঃ)র সে আদর্শ থেকেই। আজ  মসজিদের সংখ্যা বেড়েছে। জৌলুসও বেড়েছে। কিন্তু যেটি বাড়েনি সেটি হল মসজিদের শক্তি। বেড়ে না উঠার কারণ, সেখানে প্রতিষ্ঠা পায়নি নবীজী (সাঃ)র সূন্নত। ইসলামের প্রচারে নবীজী নির্যাতন সইছেন,গালী খেয়েছেন। নিজের অর্থ খরচ করে তায়েফের ন্যায় দুর্বৃত্তকবলিত জনপদে গিয়েছেন এবং সেখানে পাথর খেয়ে রক্তাত্ব হয়েছেন। ইমামের আসনে বসে নবীজী (সাঃ) জনগণ থেকে অর্থ নিয়েছেন সে নজির নেই। একই আদর্শ তাঁর মহান সাহাবাদের। অথচ বাঁচার স্বার্থে অর্থের প্রয়োজন তো তাঁদেরও ছিল। অর্থ উপার্জনে তার অন্য কোন হালাল উপায় বেছে নিয়েছেন, ইমামতি নয়। কিন্তু আজকের ইমামদের মাঝে সে সূন্নত কোথায়? ইমামতি আজ অর্থ-উপার্জনের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। ওয়াজের বিণিময়ে তারা অর্থ নেন। ধর্ম নিয়ে এর চেয়ে নগ্ন ব্যবসা আর কি হতে পারে? অথচ এটিকেও তারা জায়েজ করে নিয়েছেন। আজকের ইমামেরা নবীজী (সাঃ)র আদর্শে নিজেদেরকে না বদলিয়ে বরং নবীজী (সাঃ)র শিক্ষাকেই বদলিয়ে দিয়েছেন। আল্লামা ইকবাল এমন আলেমদের বিষয়েই বলেছেন, “খোদ বদলতে নেহী, কোরআন কো বদল দেতে হেঁ।” অর্থঃ এরা নিজেরা বদলায় না, বদলে দেয় কোরআনের শিক্ষাকে। নবীজীর (সাঃ) যুগে মুসলমানেরা নিজ খরচে অস্ত্র গড়ে নিজের উঠ,নিজের ঘোড়া ও নিজ-খাদ্যসম্ভার নিয়ে শত শত মাইল দূরে যুদ্ধে যেতেন। সাহাবাগণ নিজ নিজ খরচে দ্বীনের প্রচারে নামতেন। অথচ আজ  অবস্থা এমন, নিজ খরচে শত মাইল দূরের জিহাদে যাওয়া দুরে থাক, নিজ গ্রামে বা নিজ মহল্লার মসজিদে বিনা বেতনে নামায পড়ানোর লোকই জুটেনা। এরূপ অবস্থায় কি মুসলিম দেশের কোন কল্যাণ বা বিজয় আশা করা যায়? আর এই যখন ইমামদের আদর্শ তখন সাধারণ মুসলমানদের মাঝে ইসলামের প্রচার, প্রসার বা প্রতিষ্ঠা বাড়বে কেমনে?

আল্লাহতায়ালার দুর্গের এ এক নিদারুন করুণ অবস্থা। অথচ নবীজীর আমলে মসজিদ ছাড়া মুসলমানদের কোন সেনানীবাস ছিল না। কোন শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ-কেন্দ্রও ছিল না। তখন জিহাদের সিদ্ধান্ত ও প্রস্তুতির জন্য মুসলমানদের কোন সচিবালয়ও ছিল না। ছিল মসজিদ। কিন্তু মসজিদ সেকাজ থেকে আজ ইস্তাফা দিয়েছে। মসজিদগুলোর এরূপ করুণ অবস্থার পাশাপাশি শয়তানী  প্রতিষ্ঠানগুলোর আজ রমরমা অবস্থা। সেকুলার টিভি,সেকুলার পত্রপত্রিকা,নাটকপাড়া, সিনেমা হল, মদ্যশালা, জুয়া ও নাচের আসরে আজ  প্রচন্ড জৌলুস। শয়তানী শক্তিবর্গ তাদের প্রতিষ্ঠানগুলির সংখ্যাই শুধু বাড়ায়নি,নগর-বন্দর ও গ্রাম-গঞ্জে সেগুলির প্রসারও বাড়িয়েছে। অথচ মুসলিম শিবিরে বেহাল অবস্থা। তাদের হুশই নেই। কোথায় তাদের কোথায় দুর্বলতা, কি ভাবে তাদের শক্তি বাড়াতে হবে –সে ভাবনাও নাই। অনেকে ভাবছে, দেশে শিল্প, কল-কারখানা, রাস্তাঘাট ও চাষাবাদ বাড়ালেই দেশের ইজ্জত বাড়বে। অথচ মুসলমানের প্রকৃত ই্জ্জত শিল্প, রাস্তাঘাট ও চাষাবাদের উন্নয়নে নয়, বরং প্রকৃত মুসলমান রূপে বাঁচা ও বেড়ে উঠার মধ্যে। পাশ্চাত্য দেশের মানুষ শিল্প,বিজ্ঞান ও চাষাবাদে বিপুল উন্নয়ন করেছে। কিন্তু মানুষ রূপে বেড়ে উঠাতে তাদের সফলতা কতটুকু? দুইটি বিশ্বযুদ্ধে ৬ কোটির বেশী মানব হত্যা, হিরোশিমা ও নাগাসাকীতে আনবিক বোমার প্রয়োগ, ইরাক ও আফগানিস্তানে অবিরাম মানব হত্যা –এগুলি কি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় না যে, মানুষ রূপে বেড়ে উঠাতেই তাদের চরম ব্যর্থতা?  ফিরাউনদের বিস্ময়কর পিরামিড দেখে তাদের অনুসরণের হেতু নেই। কারণ ফিরাউনেরা পিরামিড গড়তে পারলেও ব্যর্থ হয়েছে মানুষ গড়তে। এক্ষেত্রে ব্যর্থতাও বিস্ময়কর। পিরামিড গড়ার কাজেই হাজার হাজার মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে। মানবিক গুণের আকাল যে কতটা গভীর ছিল সেটি কি এ থেকে প্রমাণিত হয় না? অনুরূপ অবস্থা পাশ্চাত্য সভ্যতা ও জীবন-দর্শনের ক্ষেত্রেও। সভ্যতার বিচার হয়, একটি মানুষ কতটা গুণাগুণ নিয়ে বেড়ে উঠলো তা থেকে। কলকারখানা, রাস্তাঘাট বা যান্ত্রিকতার গুণাগুণ দিয়ে নয়। মানুষ যদি আন্তর্জাতিক আগ্রাসী, খুণি বা লুটেরাতে পরিণত হয় তবে তাকে কি মানুষ বলা যায়? অথচ পাশ্চাত্য সভ্যতার ক্ষেত্রে সেটিই হয়েছে। উপনিবেশবাদ, পুঁজিবাদ, আন্তর্জাতিক দস্যুতা ও সন্ত্রাস এবং দেশে দেশে আদিবাসী নির্মূল পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্দ অঙ্গে পরিণত হয়েছে। আজকের মুসলমানরাও একই ভাবে ব্যর্থ হচ্ছে উন্নত মানুষ রূপে বেড়ে উঠায়। এটিই তাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। দারিদ্র্য, দুর্নীতি বা সন্ত্রাস এ ব্যর্থতার মূল কারণ নয়, বরং সিম্পটম মাত্র। মূল কারণ, তারা ব্যর্থ হয়েছে ইসলামের পূর্ণ অনুসরণে। এ ব্যর্থতা বেড়েছে মসজিদের জায়নামাজে ইসলামের সঠিক চর্চা না হওয়ায়। নবীজী (সাঃ)র শিক্ষা ও আদর্শ আর কোথাও এতটা পদদলিত হয়নি যতটা হয়েছে মসজিদে মিম্বরে ও মেঝেতে। এবং সেটি খোদ মসজিদের ইমাম ও মুসল্লিদের হাতে। ০৪/০৭/২০১০; নতুন সংস্করণ ২৪/০৩/২০১৯

 




কোরআনী জ্ঞানের অপরিহার্যতা 

জনগণের জীবনে রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, চারিত্রিক ও নৈতীক বিপ্লবের পূর্বে যে বিপ্লবটি অপরিহার্য তা হলো চেতনা-রাজ্যে কোর’আনী জ্ঞানের গভীর বিপ্লব। এটিই মহান আল্লাহতায়ালার পবিত্র সূন্নত। নবীজী (সাঃ)কে তাই সর্বপ্রথম নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত বা জিহাদ দিয়ে ইসলামী রাষ্ট্র গড়ার কাজ শুরু করতে বলেননি। বরং তাঁকে প্রথম যে নির্দেশটি দিয়েছেন তা হলো “ইকরা” তথা পড় অর্থাৎ জ্ঞানার্জনে মগ্ন হওয়ার। নবীজী (সাঃ)কে বলা হয়েছে, রাতের অর্ধেকাংশ বা এক-তৃতীয়াংশ ধীরে ধীরে পবিত্র কোরআন পাঠে কাটিয়ে দিতে –যেমনটি বর্ণিত হয়েছে সুরা মুজাম্মিলে। পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরজ করা হয়েছে নবুয়ত লাভের দীর্ঘ  এগারো বছর পর। রোযা, হজ্ব, যাকাত ও জিহাদ ফরজ হয়েছে তারও পর। ঘোড়ার আগে গাড়ি জোড়া যায় না। তাই কোর’আনের জ্ঞানে আলোকিত করার পূর্বে যারা ইসলামী রাষ্ট্র গড়ার লড়াই শুরু করেন -তারা বস্তুতঃ ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়তে চান। তাতে শুধু রক্তক্ষয়ই বাড়ে, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়না।

ইসলামের গৌরব যুগে মুসলিমদের মাঝে পবিত্র কোরআনের জ্ঞানার্জনের আগ্রহটি  এতই প্রবল ছিল যে, তারা নিজেদের মাতৃভাষাকে দাফন করে আরবী ভাষাকে গ্রহণ করেছিল। ফলে ইরাক, সিরিয়া, মিশর, মরক্বো, আলজিরিয়া, লিবিয়া, মালি, সূদানের দেশের জনগণ আরব না হয়েও আরবে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু আজ অবস্থাটি ভিন্ন। পবিত্র কোরআন থেকে মুসলিমদের দূরে রাখার ষড়যন্ত্রটি ছিল কাফের ব্রিটিশ শাসকদের। তাদের ভয় ছিল, মুসলিমগণ কোরআন বুঝলে তারা জানতে পারবে শরিয়তের আইন প্রতিষ্ঠা ছাড়া মুসলিম হওয়া যায় না। তারা জানবে, মুসলিমদের উপর ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা দেয়া ও প্রতিক্ষা দেয়া ফরজ। এবং এ লক্ষ্যে জিহাদ হলো সর্বোচ্চ ইবাদত। ফলে এমন জ্ঞানের প্রচার হলে বিপদে পড়তো ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন। ফলে তাদের প্রকল্প ছিল মুসলিমদের কোর’আন থেকে দূরে রাখা। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখেই তারা ময়দানে নামায় মোল্লা-মৌলভীদের –যারা বলতে শুরু করে কোরআন তেলাওয়াতেই অনেক সওয়াব, বুঝার দরকার নেই। এ প্রসঙ্গে তারা নবীজীর একটি হাদীসের উল্লেখ করে। সেটি হলো, নবীজী (সাঃ) বলেছেনঃ পবিত্র কোরআনের একটি অক্ষর যে পড়বে সে ব্যক্তি দশটি নেকী পাবে। প্রশ্ন হলো, নবীজী (সাঃ) কি না বুঝে পড়তে বলেছেন? কোন সুস্থ্য ব্যক্তি কি এমন কথা বলতে পারে? খাওয়ার অর্থ খাদ্যকে গলাধঃকরণ করা এবং হজম করা; নইলে সেটিকে খাওয়া বলা যায় না। তেমনি কোন কিছু না বুঝলে কি পড়া হয়? তাছাড়া বহু আয়াত নাজিল হয়েছে পবিত্র কোরআন যাতে বুঝে পড়া হয় -সেটির উপর তাগিদ দিয়ে।

একটি জাতিকে শিক্ষিত করার কাজটি অতিশয় বিশাল। এটিই রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত। এটিকে ইসলামে পবিত্র ইবাদতের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। ইহকালে ও আখেরাতে ব্যক্তির প্রকৃত সফলতাটি নির্ভর করে এখাতের উপর। জনগণ কতটা মুসলিম রূপে বেড়ে উঠবে সেটি নির্ভর করে জ্ঞানদানের এ আয়োজনের উপর। এজন্য চাই, লক্ষ লক্ষ শিক্ষক। চাই, লক্ষ লক্ষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। চাই, প্রতি মহল্লায় পবিত্র কোর’আন শিক্ষার আয়োজন। প্রতিটি মসজিদকে এ জন্য মাদ্রাসায় পরিণত হতে হয়।  এজন্য প্রতি মুসলিমকে হয় শিক্ষক অথবা ছাত্র হতে হয় –যেমনটি নবীজী (সাঃ) বলেছেন। (হাদীসঃ মুসলিম জীবনের দুই অবস্থা। হয় সে শিক্ষক, না হয় ছাত্র।) কিন্তু বাংলাদেশে এটিই সবচেয়ে ব্যর্থ খাত।  ছাত্রগণ স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরুচ্ছে পবিত্র কোর’আনের একটি আয়াত না বুঝেই।

দেশের হাজার হাজার মাদ্রাসা থেকে যারা বেরুচ্ছে তারাও স্রেফ নিজেদের ঘর-সংসার ও রুটিরুজী নিয়ে ব্যস্ত। দেশের রাজনৈতিক ও সমাজ বিপ্লবের অঙ্গণে দায়িত্ব পালন থেকে তারা বহু দূরে। নিজেদর সার্টিফিকেট আদায় বা বেতন বৃদ্ধির জন্য তারা দলে দলে রাস্তায় নামলেও ইসলামী রাষ্ট্র ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠা নিয়ে তাদের কোন ভাবনা নাই। আন্দোলনও নাই। আদালতে মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তি বিধানের বদলে কুফরি আইনকে প্রতিষ্ঠা দিলে বা সেটিকে মেনে নিলে যে মুসলিম থাকা যায় না -সে হুশই বা মাদ্রাসায় শিক্ষিতদের মাঝে ক’জনের? সে হুশ থাকলে তো তারা রাস্তায় নেমে আসতো। রাষ্ট্রপ্রধানের যে আসনে খোদ নবীজী (সাঃ) বসেছেন সে আসনে কোন ভোট-চোর, ভোট-ডাকাত ও গুম-খুনের রাজনীতির অনৈসলামিক ব্যক্তিকে বসতে দিলে যে নবীজী (সাঃ)র সূন্নত বাঁচে না এবং জনগণের ইসলাম নিয়ে বেড়ে উঠাটিও সুনিশ্চিত হয় না –সে হুশই বা ক’জনের?

 

 

 

 

 




তাবলিগ জামাতের ইসলাম কি কোরআনের ইসলাম?

শুরুটি কীভাবে?

তাবলিগ জামাতের শুরু ১৯২৬ সালে উত্তর ভারতের মেওয়াত নামক এলাকা থেকে। মেওয়াত হলো দিল্লির দক্ষিণে হরিয়ানার একটি এলাকা। পূর্বে এলাকাটি পূর্ব পাঞ্জাবের অন্তর্ভূক্ত ছিল। তাবলিগ জামাতের ধারণা,লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও কর্মপদ্ধতি রচনা করেন মাওলানা মুহাম্মদ ইলিয়াস। ইনি ছিলেন উত্তর ভারতের শাহরানপুরের মাযহারুল উলুম মাদ্রাসার শিক্ষক। তিনি ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করেন দেওবন্দ মাদ্রাসায়। এদিক দিয়ে বলা যায়,তাবলিগ জামাত হলো দেওবন্দী আন্দোলনের একটি শাখা। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশের হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা হারানোর পর মুসলমানগণ শুধু শক্তিহীনই হয়নি,ধর্মীয়,সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ভাবে প্রাণহীনও হয়ে পড়ে। লোপ পায় তাদের আত্মবিশ্বাস;চেপে বসে নিদারুন হতাশা,বিভক্তি ও বিশৃঙ্খলা। অপর দিকে প্রাণশক্তির নবজোয়ার শুরু হয় হিন্দুদের মাঝে। ব্রিটিশ শাসকদের পার্টনার রূপে তারা শাসকশক্তির কাছাকাছি পৌঁছার সুয়োগ পায়,ফলে শিক্ষা,অর্থনীতি,রাজনীতি ও প্রশাসনে তারা দ্রুত এগিয়ে যায়। পায় নবশক্তি।

হিন্দুরা তখন এতটাই আত্মবিশ্বাসী হয়ে পড়ে যে তাদের মাঝে প্রবলতর হয় মুসলমানদেরকে হিন্দু ধর্মে ফিরিয়ে নেওয়ার আগ্রহ। সে লক্ষ্যে হিন্দুদের মাঝে “শুদ্ধি” ও “সংগঠন” নামে দুটি আন্দোলন শুরু হয়। বিশেষ করে সেসব এলাকায় যেখানে ইসলামের শিক্ষা এবং সংস্কৃতি ততটা মজবুত ভিত্তি গড়ে তুলতে পারিনি। শুদ্ধি আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল ভারতীয়দের মাঝে হিন্দু ধর্মের পূণর্জাগরন এবং যারা অহিন্দু -বিশেষ করে যারা হিন্দুধর্ম থেকে ইসলাম কবুল করেছে তাদেরকে পুনরায় হিন্দু ধর্মে ফিরিয়ে আনা। আর “সংগঠন” আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল হিন্দুদের মাঝে আত্মবিশ্বাস,আত্মশক্তি ও আভ্যন্তরীন বন্ধনকে আরো মজবুত করা। সে সময় ভারতের নানা অঞ্চলে এমন অনেক মুসলিম সম্প্রদায়ের বসবাস ছিল যারা হিন্দু ধর্ম থেকে ইসলাম ধর্মে প্রবেশ করেছিল বটে কিন্তু ইসলামের বুনিয়াদী শিক্ষা লাভের তেমন সুযোগ তাদের জীবনে ঘটেনি,বরং হিন্দু ধর্ম ও সংস্কৃতির অনেক প্রথাই তাদের মাঝে রয়ে গিয়েছিল। মেওয়াতে মিওয়ো নামক এক রাজপুত সম্প্রদায় ছিল যাদের অনেকেই মুসলমান হয়েছিল। কিন্তু শুদ্ধি আন্দোলনের ফলে তাদের অনেকেই আবার হিন্দুধর্মে ফিরে যায়। এতে হিন্দুদের মাঝে আরো বেশী বেশী মুসলমানদের হিন্দু বানানোর ইচ্ছাটি আরো প্রকটতর হয়। মুসলমানদের জন্য এ ছিল বিপদজনক অবস্থা। সে সাথে চলছিল ইংরেজ পাদ্রীদের ব্যাপক তৎপরতা। ইংরেজদের হাতে রাজ্য হারানোর পর এবার ঘনিয়ে আসে ধর্ম হারানোর ভয়। হিন্দু ও খৃষ্টান হওয়া থেকে মুসলমানদের বাঁচানোর তাগিদেই মাওলানা মুহাম্মদ ইলিয়াস ১৯২৬ সালে হজ থেকে ফিরে আসার পর “তাহরিকে ঈমান” নামে এক আন্দোলন শুরু করেন। তবে কিছুদিনের মধ্যে তিনি সে আন্দোলনকে মেওয়াত থেকে দিল্লির নিযামুদ্দীন এলাকায় স্থানান্তর করেন। তখন থেকে আজও  দিল্লিই তাবলিগ জামাতের প্রাণকেন্দ্র। শুরুতে তাদের শ্লোগান ছিল,“আ্যায় মুসলমান, মুসলমান বনো” অর্থঃ “হে মুসলমানেরা মুসলমান হও”। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তাবলিগজামাতের প্রসার ঘটে অতি দ্রুত,মাত্র ১৫ বছর পর ১৯৪১ সালের নভেম্বরে ইজতেমায় যোগ দেয় ২৫ হাজারের বেশী  লোক। সে সময়ের প্রেক্ষাপটে এ সংখ্যা ছিল অতি বিশাল। বর্তমানে তাবলিগ জামাতের কাজ বিশ্বের ১০০টিরও বেশী দেশে। তাবলিগীদের সবচেয়ে বড় ইজতেমা হয় ঢাকায়। দাবী করা হয়,ঢাকার বিশ্ব ইজতেমাতে তিরিশ লাখের বেশী লোকের জমায়েত হয়। লক্ষ লক্ষ লোকের ইজতেমা হয় ভারত,পাকিস্তান,মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের নানা দেশে।

 

বিচ্যুতি সিরাতুল মোস্তাকীম থেকে

কিন্তু প্রশ্ন হলো,তাবলিগ জামাত ইসলামের যে চিত্রটি পেশ করছে সেটি কি নবীজী (সাঃ)র ইসলাম? পবিত্র কোরআন কি এ ইসলামের শিক্ষা দেয়? যে কোন মুসলমানের জন্য এটি এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। নবীজী (সাঃ) কীরূপ ইসলামের প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করেছেন সেটি কোন বিজ্ঞ জনেরই অজানা থাকার কথা নয়। ইসলামের সে পরিচয়টি যেমন সহীহ হাদীসগ্রন্থে পাওয়া যায়,তেমনি বিষদভাবে বিদ্যমান ইতিহাস গ্রন্থেও। তাছাড়া আল্লাহতায়ালা কীরূপ ইসলামের প্রচার ও প্রতিষ্ঠা চায় সেটিও কারো দৃষ্টির আড়ালে নয়,পবিত্র কোরাআনে সে ইসলামও বিশুদ্ধ ভাবে সুরক্ষিত। পবিত্র কোরআন আজও  সে একই কথা শোনায় যা শুনিয়েছিল নবীপাক(সাঃ) এবং সাহাবায়ে কেরামদের। ইসলামের নামে যত বিপ্লব,যত আন্দোলন এবং যত জামাতের উদ্ভব হবে তা কতটা সঠিক সেটির যথার্থতা বিচার হতে হবে পবিত্র কোরআন ও হাদীসের আলোকে। কিন্তু প্রশ্ন হলো,তাবলিগ জামাত নিয়ে সে বিচার কতটা হয়েছে? হয়ে থাকলে এ জামাতটি কতটা উত্তির্ণ হয়েছে সে বিচারে? বস্তুত সে বিচার তেমন হয়নি। বরং অহরহ যা ঘটছে তা হলো,বিপুল সংখ্যক জনতা এ জামাতে শামিল হচ্ছে কোনরূপ বিচার-বিবেচনা না করেই। অনেকেই মনে করছে এটিই হলো নবীজী (সাঃ)র আমলের ইসলাম,এবং সে চেতনায় তাবলিগ জামায়াতের কাজে ও ইজতেমায় যোগ দেয়াকে অতিশয় ছওয়াবের কাজ মনে করছে। বিভ্রান্তি এ পর্যন্ত গড়িয়েছে যে, বিশ্ব-ইজতেমায় যোগ দেয়াকে গরীব মানুষের হজ রূপে চিত্রিত করা হচ্ছে। অথচ হজের বিকল্প একমাত্র হজই। কোন ইজতেমা তার সাথে তূলনীয় হতে পারে না। তাবলিগ জামাতের ফলে মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় ক্ষতিটি হচ্ছে অন্যভাবে। গাশত, চিল্লাহ ও বিশ্ব ইজতামাতে শরীক হওয়ার মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষ পাচ্ছে ধর্ম পালনের এক গভীর আত্মতৃপ্তি। যারা ধর্মপ্রাণ খৃষ্টান তারা প্রতি রবিবার গীর্জায় হাজির হয়,অতি তন্ময় হয়ে ঈশ্বরের প্রতি ভক্তিভরে গান গায়। তেমনি ইহুদীরা প্রতি শনিবার সিনেগগে গিয়ে মাথা ঝুলিয়ে ঝুলিয়ে তাওরোত পাঠ করে। তাতেই ভাবে তারা বড় ধর্ম কর্ম পালন করছে। এরূপ ধর্মপালনকারিদের কাছে কোন কালেই ইসলাম তেমন বিবেচনায় আসেনি। যারা ইসলাম কবুল করেছে তাদের অধিকাংশই ছিল এদের থেকে ভিন্ন চরিত্রের লোক।তাদের মধ্যে ছিল ধর্মপালনের এমন ভ্রান্ত আত্মতৃপ্তি ছিল না। তাই মদিনা ও মক্কার কাফেরগণ দলে দলে ইসলাম কবুল করলেও আহলে কিতাব হওয়ার দাবীদার ইহুদীদের মধ্য থেকে খুব কম সংখ্যকই মুসলমান হয়েছে। ভক্তিবাদী গান দিয়ে চৈতন্য দেব ভারতের বুকে বিশেষ করে বাংলার বুকে ইসলামের জোয়ার অতি সফল ভাবে রুখে দিয়েছিল। একই কারণে দেশে দেশে মহান নবীজী (সাঃ) এবং তার সাহাবাগণ যে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করে গেছেন সে ইসলামের প্রতিষ্ঠায় বড় বাধার কারণ হয়ে দাড়িয়েছে এই তাবলিগ জামাত। বাংলাদেশ বা পাকিস্তানে একজন স্কুলের ছাত্র যত সহজে ইসলাম প্রতিষ্ঠার জিহাদে যোগ দিতে পারে সেটি অসম্ভব হয়ে পড়ে তাবলিগ জামাতের একজন বুজুর্গ ব্যক্তির পক্ষে।

প্রতিধর্মেই বিশাল বিভ্রান্তি দেখা দেয় সে ধর্মের ব্যাখ্যা নিয়ে। ধর্মের অনুসারিরা তখন নানা ফিরকায় বিভক্ত হয়ে যায় এবং পরস্পরে রক্তক্ষয়ী লড়াইও শুরু করে। এজন্যই মহান আল্লাহতায়ালা যখনই কোন কিতাব অবতীর্ণ করেছেন তখনই সে কিতাবের ব্যাখাদাতা রূপে রাসূলও প্রেরণ করেছেন। এভাবে ব্যাখ্যা দানের দায়িত্ব কোন ব্যক্তি,পীর,বুজুর্গ,সুফি বা মুর্শিদের উপর ছেড়ে দেননি। আল কোরআনের মূল ব্যাখাদাতা তাই খোদ নবীজী (সাঃ)। ইসলামকে শিখতে হলে তাই সরাসরি নবীজী (সাঃ)র জীবন থেকে শিখতে হবে। আল কোরআনের ইসলামই হলো নবী করীম (সাঃ)এর ইসলাম। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেছেন, নবী করীম (সাঃ) ছিলেন আল কোরআনের জীবন্ত রূপ। মহান আল্লাহর রাসূল রূপে নবীজী(সাঃ)র উপর মূল দায়িত্বটি ছিল পবিত্র কোরআনের সে ইসলামকে মানুষের কাছে অবিকৃত অবস্থায় পৌঁছে দেয়া। ইসলামের যে চিত্রকে আল্লাহতায়ালা দেখতে চান নবীজী (সাঃ) সে চিত্রটিই নিজের কর্ম,আচরন এবং ইবাদতের মাধ্যমে জনসম্মুখে তুলে ধরেছেন। নবীজী (সাঃ) সে কাজে সফলও হয়েছেন। এদিক দিয়ে নবীজী (সাঃ)র পূর্ণ সফলতার সার্টিফিকেট এসেছে মহান আল্লাহতায়ালা থেকে। বিদায় হজে আরাফার ময়দানে সে সাক্ষ্য দিয়েছেন সমবেত সাহাবাগণও। মহান আল্লাহতায়ালা নবীজী (সাঃ)কে বলেছেন সমগ্র মানুষ জাতির জন্য “উসওয়াতুন হাসানা” তথা উত্তম আদর্শ। তাঁর চলার পথটি হলো একমাত্র সিরাতুল মোস্তাকীম। মুসলমানের অতি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো,ধর্মের নামে অন্যদের পক্ষ থেকে যা কিছু পেশ করা হয় সেগুলিকে বিনাবিচারে কবুল করে নেয়া নয়,বরং নবীজী(সাঃ)র ইসলামের সাথে সেগুলোকে গভীর ভাবে মিলিয়ে দেখা। যা কিছু নবীজী (সাঃ)র সূন্নতের বিপরীত সেগুলোকে বর্জন করা এবং যা কিছু সূন্নতের অনুরূপ সেগুলোকে কবুল করা। কিন্তু তাবলিগ জামাতের কর্মীদের মাঝে পবিত্র কোরআন ও নবীজী (সাঃ)র জীবন থেকে শিক্ষা নেয়ার আগ্রহ সামান্যই। বরং তাদের কাছে গুরুত্ব পেয়েছে তাবলিগ জামাতের নিজস্ব বই ফাজায়েল আমল ।

মানুষের বুদ্ধিমত্তার চরম পরীক্ষাটি খাদ্য-পানীয়, জীবনসঙ্গি ও পোষাক-পরিচ্ছদ বেছে নেয়ার ক্ষেত্রে ঘটে না। এমনকি পশুও বোঝে কোনটি তার জন্য সুখাদ্য এবং কোথায় থাকতে আহারের সন্ধানে ছুটতে। সাইবেরিয়ার পাখিরা তাই বহু হাজার মাইল দূর থেকে উড়ে আসে বাংলাদেশে। বরং জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি হয় পথচলার সঠিক পথটি বেছে নেয়ার ক্ষেত্রে। কে পরকালে মহা পুরস্কারটি পাবে সে পরীক্ষার শুরুটি হয় সঠিক পথ বেছে নেওয়ার সে সামর্থ থেকে। অথচ এ ক্ষেত্রেই অধিকাংশ মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় ভূলটি হয়। কোন মানুষই সজ্ঞানে পচা খাদ্য গ্রহণ করে না,অথচ ধর্মের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত অজ্ঞতা ও বিভ্রান্তিকে বহু পণ্ডিত ও পিএইচডি ধারীও বিনা বিচেচনায় গ্রহণ করে। চন্দ্র-সূর্য, মুর্তি,গরু-বাছুড়,শাপ-শকুন,নদ-নদী,পাহাড়-পর্বত,এমনকি পুলিঙ্গও যেভাবে কোটি কোটি মানুষের পুঁজা পায় –তা তো এ চিন্তাশূণ্যতা,অজ্ঞতা ও বিভ্রান্তির কারণে। একই কারণে সিরাতুল মোস্তাকীম থেকে যুগে যুগে ভয়ানক বিচ্যুতি ঘটেছে শুধু অতীতের নবীরাসূলদের উম্মতদের মাঝেই নয়,মুসলমানদের মাঝেও। আল্লাহর দ্বীন এবং তাঁর শরিয়তী বিধান মূলত সে কারণেই আজ  মুসলিম দেশসমুহে পরাজিত ও অবহেলিত। এমন এক পরাজিত অবস্থায় ময়দানে নেমেছিল তাবলিগ জামাত। কিন্তু নবীজী(সাঃ) এবং তাঁর সহাবায়ে কেরাম যে সিরাতুল মোস্তাকীম দিয়ে পথ চলেছেন তাবলিগ জামাতের পথ তা থেকে যে বহু দূরে,সেটি ইতিহাসের যে কোন পাঠকের চোখেই ধরা পড়তে বাধ্য। তারা পথ গড়েছেন নিজেদের মনের মত করে,কোরআন-হাদীসের শিক্ষা এখানে গুরুত্ব পায়নি। ফলে রাসূলে পাক (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামের জীবনে যে ভাবে কোরআনী জ্ঞান,হিযরত,জিহাদ,ইসলামী রাষ্ট্র,শরিয়তের প্রতিষ্টা ও শাহাদত এসেছিল তারা এ ধারে কাছেও নেই। য়ভ ভা

সিরাতুল মোস্তাকীম আবিস্কারের বিষয় নয়,বরং মহান আল্লাহর এটি দান। মূলতঃ এটিই তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ দান। দুখ-যাতনা, জুলুম-নর্যাতন এবং অসত্য-অবিচার মানব জাতির ইতিহাসে সব সময়ই ছিল।তা থেকে মুক্তির পথ আবিস্কারে মানব জাতির ইতিহাসে বহু নেতা,বহু দার্শনিক,বহু ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব বহু ধ্যান, বহু গবেষণা এবং বহু প্রচেষ্ঠা করেছেন। বহু ধর্ম,বহু মতবাদ, বহু দর্শনও আবিস্কৃত হয়েছে। কিন্তু সেগুলি শুধু বিচ্যুতি এবং বিপর্যয়ই বাড়িয়েছে। কিন্তু এ বিভ্রান্তি ও বিচ্যুতির মাঝে ইসলামের পথটি দেখিয়েছেন খোদ আল্লাহতায়ালা। আল্লাহর সে পথনির্দেশটি ওহি রূপে বয়ে এনেছেন হযরত জিবরাইল (আঃ)।এটিই পবিত্র কোরআনের পথ। হযরত ইব্রাহীম, হযরত, মূসা, হযরত ঈসাসহ অতীতের সকল নবী-রাসূলের পথও ছিল এটি।এ পথটি সনাক্ত করা এবং সে পথে টিকে থাকার মধ্যেই ঘটে মানুষ জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা।এ পথ খুঁজে পেতে যারা ব্যর্থ হয়, তাদের সকল প্রতিভা, প্রচেষ্টা ও ধর্মকর্ম -এমন কি এ জীবনে বাঁচাটাই ব্যর্থ হয়। পবিত্র কোরআনে তাই বলা হয়েছেঃ “বল (হে মুহাম্মদ)! আমি কি তোমাদের বলে দিব,কর্মের দিক দিয়ে কে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত? তারা হলো সেসব ব্যক্তি যারা নিজেদের সকল প্রয়াস-প্রচেষ্ঠা নিঃশেষ করেছে নিজেদের পার্থিব জীবনের (সুখ-স্বাচ্ছন্দের)জন্য এবং মনে করে কর্মজীবনে তারা কত সফল!” –(সুরা কাহাফ,আয়াত ১০৩-১০৪)।

এ জীবনে সিরাতুল মোস্তাকীমটি পাওয়াটাই জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া। সে পথের জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থণা করাটিই সর্বশ্রেষ্ঠ প্রার্থণা। এবং সর্বশ্রেষ্ঠ সে প্রার্থণাটি শিখেয়েছেন মহান আল্লাহতায়ালা খোদ নিজে। তবে আল্লাহতায়ালার হিকমত শুধু এ দোয়াটি শেখানোর মধ্যে সীমিত নয়, সেটির পাঠকে বাধ্যতামূলকও করেছেন নামাযের প্রতি রাকাতে। প্রতি নামাযীকে তাই “ইহদিনাস সিরাতুল মোস্তাকীম” (“হে আল্লাহ! সিরাতুল মোস্তাকীমে পরিচালিত কর”) তেলাওয়াত করতে হয় প্রতি রাকাতে। মহান রাব্বুল আলামীনের শেখানো শ্রেষ্ঠ এ দোয়াটি ব্যক্তিকে তার জীবনের মূল এজেণ্ডা বলে দেয়। এভাবে আগ্রহ জন্মায় সে এজেণ্ডাটি নিয়ে বেঁচে থাকায়। এটি তখন চলার পথে কম্পাস রূপে কাজ করে এবং ধাবিত করে সফলতার দিকে – শুধু এ দুনিয়ায় নয়,আখেরাতেও।

 

তাকওয়া যেখানে বিচ্যুতির ভয়

সিরাতুল মোস্তাকীমের পথটি শুধু নামায-রোযা,হজ-যাকাত ও কালেমা পাঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সীমাবদ্ধ নয় মসজিদের চার দেয়ালের মাঝেও। বরং এ দীর্ঘ পথটি দুনিয়ার এ ক্ষণস্থায়ী মঞ্জিল থেকে জান্নাত অবধি বিস্তৃত। ঈমানদারের জীবনে সিরাতুল মোস্তাকীমের পথে পথচলাটি কালেমায়ে শাহাদাত পাঠের মধ্য দিয়ে শুরু হয়, এর পর আসে নামায-রোযা ও হজ-যাকাত।আসে কোরআনের জ্ঞানলাভ,আসে হিজরত। আসে লাগাতর জিহাদ। আসে সে জিহাদে শ্রম, সময়, অর্থ ও রক্তের কোরবানী। সে জিহাদের পথ ধরে ঘটে ইসলামি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা,আসে সে ইসলামী রাষ্ট্রে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা। এগুলো হলো সিরাতুল মোস্তাকীমের বিভিন্ন পর্যায় ও বিভিন্ন মাইল ফলক। ইসলামের পথে পথচলা কতটা সঠিক হচ্ছে সেটি বিচারের জন্য প্রতিক্ষণে পথচারিকে সে মাইল ফলকগুলোকে কোরআনের সাথে মিলিয়ে দেখতে হয়। গাড়ি চালনায় চালককে যেমন প্রতিক্ষণ পথের দিকে চেয়ে গাড়ি চালাতে হয় তেমনি মু’মিন ব্যক্তিকে সারাক্ষণ নজর রাখতে হয় সিরাতুল মোস্তাকিমের দিকে।ঈমানদারের জীবনে বস্তুত সেটিই হলো প্রকৃত তাকওয়া। তাকওয়ার অর্থ ভয়। এখানে সে ভয়টি মূলত সিরাতুল মোস্তাকীম হারানোর। তাই সুরা ফাতেহাতে শুধু সিরাতুল মোস্তাকীমের জন্যই দোয়া করতে শেখানো হয়নি,সে সাতে শেখানো হয়েছে পথহারানো থেকে বাঁচার দোয়াও। বিভ্রান্তি ও পথভ্রষ্টতার পথ মানুষকে জাহান্নামে টানে,এবং সেটি আসে তাকওয়ার অভাবে। সিরাতুল মোস্তাকীমে উদাসীন ব্যক্তিটির কাছে তখন পপপতঅর্থ না বুঝে কোরআন তেলাওয়াতও ধর্মকর্ম মনে হয়। অথচ কোন শিশুও অর্থ না বুঝে কোন বই পড়েনা।

সঠিক পথে চলা নিয়ে যার আগ্রহ নেই,তার কাছে কি রোড ম্যাপ বোঝার প্রয়োজন পড়ে? পবিত্র কোরআনের সাথে এমন উদ্ভট আচরণের কারণ এটাই।এমন মানুষ তো পথ চলে পীর,হুজুর,মুর্শেদ,মাওলানা, গুরু ও রাজনৈতিক নেতাদের বাতলানো পথ দিয়ে। সমগ্র মুসলিম বিশ্ব ভরে গেছে এমন ব্যক্তিদের নিয়ে। ফলে তারা যে পথ বেয়ে চলছে সে পথে কোরআনী জ্ঞান নেই;নেই হিজরত,নেই জিহাদ এবং নেই ইসলামের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় আগ্রহ। নবীজী (সাঃ) এবং তার সাহাবায়ে কেরাম থেকে এ হলো সম্পূর্ণ এক ভিন্নতর জীবন। ফলে এ পথকে কি সিরাতুল মোস্তাকীম বলা যায়? সিরাতুল মোস্তাকীমে চলার সামর্থ একমাত্র সত্যিকার ঈমানদারগণেরই থাকে। সে সামর্থ যেমন কাফের ও মুনাফিকগণের থাকে না,তেমনি কোরআনে জ্ঞানে অজ্ঞদেরও থাকে না। কারণ কোরআন-হাদীসের জ্ঞান ছাড়া সে পথ চেনা যেমন অসম্ভব,তেমনি সে পথে টিকে থাকাও অসম্ভব। তাই ইসলামে শুধু নামায-রোযা ফরয নয়, ফরয জ্ঞানার্জনও। কোরআনে বর্ণিত বান্দাহর উপর মহান আল্লাহর অর্পিত খেলাফতের যে মহান দায়িত্ব তা নিয়ে অজ্ঞ থাকাটি কবিরা গুনাহ। সে কবিরা গুনাহ থেকে আরো বহু জাতের গুনাহ জন্ম নেয়। জ্ঞানার্জন  জ্ঞানার্জন,নামায-রোযা ও হজ-যাকাতের পাশাপাশি জানমালের কোরবানীও চায়। কিন্তু যে পথে কোরআনী জ্ঞান নেই,যে পথে ঘরবাড়ী ছেড়ে দেশত্যাগের কথা নেই,নেই ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং জিহাদ,নেই শরিয়তের প্রতিষ্ঠা এবং জানমালের কোরবানী -সে পথে মিথ্যাবাদী রাজনীতিবিদ,ঘুষখোর কর্মচারি,দুর্বৃত্ত ও সন্ত্রাসী ব্যাক্তিরাও বিপুল সংখ্যায় হাজির হয়। তাই দেখা যায়,বাংলাদেশে আল্লাহর আইনের প্রতিষ্ঠার পক্ষে ভোট দেয়া বা সে দাবী নিয়ে রাস্তায় নামার লোক না থাকলে কি হবে,তাবলিগ জামায়াতের ইজতেমায় হাজির হয় ৩০-৪০ লাখ মানুষ। আরো লক্ষণীয় হলো,যে জালেম শক্তি দেশের ইসলামপন্থি দলগুলোকে রাজপথে মিছিল করতে দিতে রাজী নয় তারাই তাবলিগ জামাতের ইজতেমায় রক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়।

 

কোরআনী মিশন ও তাবলিগ মিশন

মহান আল্লাহতায়ালার ঘোষণাঃ “তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত,তোমাদের আবির্ভাব ঘটানো হয়েছে সমগ্র মানবজাতির জন্য।তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দাও এবং অন্যায় নির্মূল করো এবং আল্লাহর উপর বিশ্বাস করো..।” –(সুরা আল ইমরান, আয়াত ১১০)।এটি হলো পবিত্র কোরআনের অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি আয়াত। যে বিষয়টি এ আয়াতে গুরুত্ব পেয়েছে তা হলো সুবিচারের প্রতিষ্টা ও অবিচারের মূলোৎপাটন। এতে ঘোষিত হয়েছে মুসলিম জীবনের ভিশন ও মিশন স্টেটমেন্ট। ভিশনটি হলো সর্বজাতির মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মতের মর্যাদা লাভ। আর মিশনটি হলো ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের নির্মূল। ভিশন তো ব্যক্তির জীবনে এমন এক স্বপ্ন -যা অর্জনে সে তার সমগ্র সামর্থকে নিয়োজিত করে। আর মিশন হলো মূলত সে ভিশনে পৌছার কর্মকৌশল। আল্লাহ নির্দেশিত সে ভিশন ও মিশন নিয়ে বাঁচতে হলে ঈমানদারের জীবনে কি করণীয় সেটিই ঘোষিত হয়েছে পূর্বে উল্লেখিত সুরা নিসার ১৩৫ নম্বর ও সুরা মায়েদার ৮ নম্বর আয়াতে। এ দুটি আয়াতে মহান আল্লাহর পক্ষে ও ন্যায় বিচারের প্রতিষ্ঠায় দাঁড়াতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

মু’মিনের প্রতি মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশঃ “হে ঈমানদারগণ!তোমরা সুবিচারের প্রতিষ্ঠাকারি রূপে দাঁড়িয়ে যাও এবং আল্লাহর পক্ষে নিজেকে সাক্ষি রূপে পেশ করো –যদিও সে সাক্ষ্যটি তোমাদের নিজের বা তোমাদের পিতমাতা ও নিকটজনদের বিপক্ষে যায়;এবং সে দরিদ্র হোক বা ধনি হোক -আল্লাহই তাদের জন্য যথেষ্ট। অতএব সুবিচার প্রতিষ্ঠায় নিজ-প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না। যদি তোমরা বক্রতা অবলম্বন করো বা পশ্চাৎপদ হও তবে নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা তোমাদের সমস্ত কর্মের পূর্ণ খবর রাখেন।”–(সুরা নিসা,আয়াত ১৩৫)। একই রূপ নির্দেশ দেয়া হয়েছে সুরা মায়েদায়।সেখানে বলা হয়েছে,“হে ঈমানদারগণ!তোমরা আল্লাহর জন্য খাড়া হয়ে যাও,সুবিচারের জন্য সাক্ষি রূপে দাড়িয়ে যাও।”-(সুরা মায়েদা আয়াত ৮)।প্রকৃত মুসলমান তাই শুধু জায়নামাযে খাড়া হয় না। শুধু রোযা বা হজ পালন করে না।বরং সর্বশক্তি দিয়ে খাড়া হয় মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষে। সে খাড়া হয় তাঁর দ্বীনের বিজয়ে। সে বিজয়টি আনতে যেমন নিজের শক্তি ও মেধার বিনিয়োগ করে,তেমনি অস্ত্রনিয়ে যুদ্ধও লড়ে।প্রয়োজনে প্রাণেরও কোরবানী দেয়। সাহাবায়ে কেরামের মাঝে এ কোরবানি পেশে প্রবল প্রতিযোগিতাও দেখা দিত। প্রতিযোগিতা দেখা দিত জিহাদের ময়দানে সামনের কাতারে থাকা নিয়ে। মহান আল্লাহর কাছে মু’মিনের মর্যাদা বাড়ে তো তার দ্বীনের পক্ষে এরূপ খাড়া হওয়ার কারণেই। সে ব্যক্তিটি তখন স্বীকৃতি পায় তাঁর নিজ সেনাদলের সৈনিক রূপে।দায়িত্বপালনে নিহত হলে এমন ব্যক্তি পায় শহীদের মর্যাদা। আল্লাহতায়ালা এমন শহীদদের দেন মৃত্যুহীন জীবন। দেন বিনা হিসাবে জা্ন্নাত লাভের প্রতিশ্রুতি।

যে দেশে ঈমানদারের সংখ্যা বাড়ে সে দেশে শরিয়তের প্রতিষ্ঠায় মোজাহিদদের সংখ্যাও বিপুল ভাবে বাড়বে –সেটিই কাঙ্খিত। সেটি না হলে বুঝতে হবে প্রকৃত ঈমানদার রূপে বেড়ে উঠায় দেশবাসীর মাঝে বিরাট সমস্যা আছে। সমগ্র মানবকূলে মুসলমান যে শ্রেষ্ঠ তা তো সে মিশন পালনের বরকতেই। মুসলান হওয়ার অর্থই মহান আল্লাহর পক্ষ নেয়া। আল্লাহর পক্ষে খাড়া হওয়ার অর্থ,শুধু তাঁর নাম ও দ্বীনকে বিশ্বময় প্রচার করার কাজে নামা নয়। বরং তাঁর শরিয়তি বিধানকে বিজয়ী করা। আর শরিয়তের প্রতিষ্ঠার মাঝেই তো ইনসাফ ও ন্যায় বিচারের প্রতিষ্ঠা। রাষ্ট্রের বুকে রাজার ক্ষমতা বা সার্বভৌমত্বের প্রমাণ তো তার আইন বা হুকুমের প্রতিষ্ঠায়। রাজার নির্দেশিত আইন বা হুকুমনামাহ যদি ডাস্টবিনে গিয়ে পড়ে তবে কি তার ইজ্জত থাকে? তেমনি জমিনের উপর মহান আল্লাহর সার্বভৌমত্ব তো তাঁর নির্দেশিত শরিয়তের  প্রতিষ্ঠায়।তাই শুধু সাহাবাদের যুগেই নয়,মুসলিম দেশে ইউরোপীয় কাফেরদের শাসন প্রতিষ্ঠার পূর্ব পর্যন্ত প্রতিটি মুসলিম দেশে আইন বলতে বুঝাতো শরিয়তি আইন। তাছাড়া শরিয়তের বিধান প্রতিষ্ঠা না পেলে কি ন্যায় বিচারের প্রতিষ্ঠা সম্ভব? শরিয়তের প্রতিষ্ঠা ছাড়া সুবিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব -সেটি বিশ্বাস করাই তো হারাম। সেটি সম্ভব হলে শরিয়তি বিধানের প্রয়োজনীয়তাটি কি? সেটি বিশ্বাস করলে পরম অবিশ্বাস ও অবজ্ঞা করা হয় মহান আল্লাহতায়ালার কোরআনী বিধানের প্রতি।সেরূপ অবিশ্বাস ও অবজ্ঞার কারণে অবিশ্বাসী ব্যক্তিটি কাফেরে পরিনত হয়। কিন্তু সে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা নিয়ে তাবলিগ জামায়াতের লোকদের সে আগ্রহটি কোথায়? তাছাড়া শরিয়ত প্রতিষ্ঠা করতে হলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নিতে হয়। সেটি যেমন শুধু দোয়া দরুদে সম্ভব নয়, তেমনি ইজতেমায় লাখ লাখ লোকের সংখ্যা বাড়িয়েও নয়। তখন তো অপরিহার্য হয় মানব সভ্যতার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান তথা রাষ্ট্রের উপর দখলদারি প্রতিষ্ঠা করা এবং সকল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে সুবিচারের প্রতিষ্ঠায় ও অন্যাযের নির্মূলে কাজে লাগানো। নবীজী (সাঃ) হিজরতের পর কোন রূপ বিলম্ব না করে সাথে সাথে রাষ্ট্র গড়েছেন এবং রাষ্ট্র-প্রধান হয়েছিলেন তো এমন দায়িত্ববোধ নিয়েই। নবীজী(সাঃ)র সে সূন্নতটিকে শক্ত ভাবে ধরে রেখেছিলেন খোলাফায়ে রাশেদা। ফলে যাদের জীবনে রাজনীতি নেই এবং রাষ্ট্রের বুকে ইসলাম প্রতিষ্ঠার আগ্রহও নাই তারা আলেম, আল্লামা বা বুজুর্গ রূপে যতই পরিচিতি পান, তারা যে নবীজী (সাঃ)র সূন্নত থেকে দূরে তা নিয়ে কি সন্দেহ থাকে? অথচ বাংলাদেশে বহু আলেম,বহু নামাযী ও রোযাদার বেড়ে উঠেছে সে জাহিলিয়াত বা অজ্ঞতা নিয়ে।তাদের জীবনে আল্লাহর দ্বীনের পক্ষে সাক্ষিদানে যেমন আগ্রহ নেই,তেমনি আগ্রহ নেই ইসলামের পক্ষের শক্তির হাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দেয়ায় এবং শরিয়তের প্রতিষ্ঠায়। দেশের আদালতে শরিয়তি বিধান পরিত্যক্ত হলেও তাদের জীবনে তা নিয়ে মাতম উঠে না। বাংলার একটি জেলায় যত মসজিদ-মাদ্রাসা আছে নবীজীর আমলে বা সাহাবায়ে কেরামের আমলে সমগ্র মুসলিম রাষ্ট্রে তা ছিল না। প্রতিবছর টঙ্গিতে যতবড় ইজতেমা হয়,নবীজী(সাঃ) নিজে তার দশভাগের একভাগ ইজতেমাও দেখে যেতে পারেননি। সাহাবায়ে কেরামও পারেননি। কিন্তু সেদিন ইসলামের বিজয় এসেছিল। আজ ইজতেমায় লোক বৃদ্ধি বাড়লেও সে সাথে বেড়েছে পরাজয় ও কলংক। কারণ,প্রতিটি মুসলমান সেদিন খাড়া হয়েছিলেন মহান আল্লাহর শরিয়তি বিধানের প্রতিষ্ঠায়। সে কাজে জান-মালের বিপুল কোরবানীও দিয়েছিলেন।

 

নবীজী (সাঃ)র পথ ও তাবলিগীদের পথ

তাবলিগ জামায়াতের মূল আগ্রহটি নামাযে ও আখেরী মোনাজাতে লোকের সংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে। অথচ সেরূপ আগ্রহ সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে ইসলামের শত্রুপক্ষের দখলদারি মুক্ত করা নিয়ে যেমন নাই, তেমনি নাই শরিয়তের প্রতিষ্ঠা নিয়েও। টঙ্গির ইজতেমায় প্রতি বছর ২০ বা ৩০ লাখ লোকের জমায়েত হয়। এরা নামাজে খাড়া হয়, মোনাজাতেও অংশ নেয়। কিন্তু তাদের ক’জন জীবনে একবারও খাড়া হয়েছে অন্যায়ের নির্মূল ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায়? ইসলামের বিজয় আনতে নবীজী(সাঃ) ও তাঁর সাহাবাগণ কাফেরদের হত্যা করেছেন। কিন্তু তাবলিগগণ কি ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে তীর বা পাথর ছুঁড়া দূরে থাক, একটি কথাও কি বলেছে? দৃর্বৃত্তরা যে দুর্বৃত্ত -সে সাক্ষ্য দিতেই বা ক’জন খাড়া হয়েছে? বরং যারা বিশ্ব ইজতেমায় জমা হয় তাদের অনেকে তো খাড়া হয়েছে নির্বাচনে ইসলামের শত্রুপক্ষের সমর্থনে। ক্ষুদ্র আগাছা নির্মূলেও তো শক্তি চাই। অন্যায়ের নির্মূল এবং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা তো শুধু চাইলেই হয় না, সে জন্য তো দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে লড়াই চাই। অথচ সমাজ ও রাষ্ট্রজুড়ে তো তাদেরই দখলদারি। দুর্বৃত্তদের এমন এক দখলদারি তো নবীজী(সাঃ)র সময় সমগ্র আরব জুড়ে ছিল। সে দখলদারি নির্মূল করতে সাহাবায়ে কেরামকে নামায-রোযার পাশাপাশি লাগাতর জিহাদেও নামতে হয়েছে। শতকরা ৭০ থেকে ৮০ ভাগ সাহাবীকে শহীদও হতে হয়েছে। কিন্তু আজ দৃর্বৃত্তদের নির্মূলে ক’জন জিহাদে যোগ দিচ্ছে? আল্লাহর শরিয়তের প্রতিষ্ঠার মধ্যেই যে একমাত্র সুবিচার ও শান্তি –সে সাক্ষ্যই তাদের ক’জন দিচ্ছে? বরং যে দেশে ২০ বা ৩০ লক্ষ লোক ইজতেমায় জমা হচ্ছে সে দেশটিই অন্যায় ও অবিচারে ৫ বার বিশ্বরেকর্ড গড়েছে। দেশটির উপর এখনও ইসলামের শত্রুপক্ষের প্রবল দখলদারি। মুসল্লিরা লাশ হচ্ছে রাজপথে। বাজেয়াপ্ত হচ্ছে ইসলামি বই। নিষিদ্ধ হয়েছে তাফসির মাহফিল। বাংলাদেশের আদালতে এখনও ঔপনিবেশিক কাফেরদের প্রণীত কুফরি আইন। সে আইন সূদ যেমন হালাল, তেমনি পতিতাবৃত্তির ন্যায় ব্যাভিচারিতাও আইনসিদ্ধ। শরিয়ত প্রতিষ্ঠার লড়াই চিহ্নিত হচ্ছে সন্ত্রাস রূপে। অথচ এ নিয়ে তাবলিগ জামায়াতের মাঝে কোন মাতম নাই। পাপাচারের নির্মূলে কোন অঙ্গিকারও নাই। শত শত মুসল্লিরা লাশ হলেও তা নিয়ে তাদের ইজতেমায় দোয়া পর্যন্ত করা হয় না। ফলে তাবলিগ জামায়াতের ইজতেমায় লোকের সংখ্যা বৃদ্ধিতে মুসলিম উম্মাহর কল্যাণটি কোথায়? বাড়ছে কি তাতে শরিয়ত প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা? প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে কি মহান আল্লাহর সর্বময় সার্বভৌমত্ব?

সুস্থ্য-মানুষ মাত্রই চেতনায় একটি স্পষ্ট মানচিত্র ও রোডম্যাপ নিয়ে পথে নামে। পাগলের সেটি থাকে না বলেই সে পাগল। চলার পথ দেখেই বুঝা যায় সে মানুষের গন্তব্যটি কোন মুখি। নাস্তিক ও আস্তিক,কাফের ও মু’মিন, সেক্যুলারিস্ট ও ইসলামিস্টদের পথ চলা তাই একই পথে হয় না। তাছাড়া নিজ মনে যে শহরে যাওয়ার ভাবনা নেই,সে শহরের অলিগলি নিয়ে কেউ ভাবে না। কিন্তু তাবলিগ জামাত তো জান্নাতে যাওয়ার কথা বলে। ফলে সেখানে পৌছার রাস্তা নিয়ে চিন্তাভাবনাটিও তাদের কাছে গুরুত্ব পাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তাদের অনুসৃত সে পথে সিরাতুল মোস্তাকীমের পরিচিত আলামতগুলো কোথায়? তাবলীগ জামাতের কর্মসূচীতে আছে গাশত,আছে চিল্লাহ,আছে ফাজায়েলে আমল থেকে পাঠ,আছে ইজতেমা। আছে তাবলীগের নামে বিদেশ গমন। প্রশ্ন হলো নবীজী (সাঃ)র ইসলামের কি এসব ছিল? তিনি কোথায় গাশত বা চিল্লাহতে বেরিয়েছিলেন? বেরুলে হাদীসে তার উদাহরণ কই? কোথায় তিনি দোয়ার ইজতেমা বসিয়েছেন? নিজ দেশে কাফের শক্তির নির্মূল এবং ইসলামের পূর্ণ-বিজয়ের পূর্বে নবীজী (সাঃ) কখনই বিদেশে ইসলামের প্রচারে লোক পাঠাননি। অন্য দেশে যখন গিয়েছেন তখন গেছেন সেনাবাহিনী নিয়ে। লক্ষ্য ছিল,সে দেশে আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী শক্তির নির্মূল এবং সত্যের পথ থেকে সকল প্রকার বাধা সরিয়ে দেয়া। সেটি নবুয়ত লাভের ১৮ বছর পর। অমুসলিম দেশে যাওয়ার আগে যেটি গুরুত্ব পেয়েছিল সেটি মুসলিম দেশে পরিপূর্ণ ইসলামী বিপ্লব। একমাত্র সেটি সমাধা হওয়ার পরই তিনি বিদেশের দিকে নজর দিয়েছেন। কিন্তু তাবলিগনেতাগণ নবীজী (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামের সে নীতি থেকে কোন শিক্ষাই গ্রহণ করেনি। নিজ দেশের জনগণ দুর্বৃত্তি তথা নানারূপ পাপাচারে যখন বিশ্বরেকর্ড গড়ছে,তখন দেশের তাবলীগীগণ লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ইউরোপ ও আমেরিকায় বিশাল বিশাল জামাত নিয়ে যাচ্ছেন। যে বাতি তার নিজ ঘরে অন্ধকার সরাতে পারিনি,সেটি কি হাজার হাজার মাইল দূরের অন্য এক মহাদেশে বা দেশে আলো দিতে পারে? বিদেশীদের কাছে এটি কি বিদ্রুপ ও হাসির খোরাক রূপে গণ্য হয় না? নিজ দেশের মানুষের ধর্ম,ভাষা,সংস্কৃতি,দর্শন ও চারিত্রিক রোগের সাথে যেরূপ পরিচিতি,সেটি কি বিদেশীদের সাথে থাকে? ফলে নিজ দেশে দাওয়াতের সামর্থ কি অধিক থাকা স্বাভাবিক নয়? দূরের দেশে গিয়ে কি সেটি সম্ভব?

 

অপরিহার্য হলো মডেল চরিত্র

মানুষের সামনে দ্বীনকে তুলে ধরার বড় হাতিয়ার বয়ান বা বক্তৃতা নয়,সেটি আমল । নবীজী (সাঃ) বড় বড় এজেতেমা বা মহফিল করেননি। দীর্ঘ বক্তৃতাও দেননি। জোর দিয়েছেন আমলে। নবীজী (সাঃ)র হিকমত হলো,উত্তম চরিত্রের মানুষ গড়া এবং সে সাথে কোরআনী শিক্ষার উপর সমাজ গড়া। এ ভাবে সফল জীবনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করা। সে সুন্দর ইসলামী সমাজ দেখে মানুষ তখন দলে দলে ইসলাম কবুল করে। এটাই তো ইতিহাসের শিক্ষা। মদীনের ন্যায় কয়েক হাজার মানুষের এক ক্ষুদ্র জনপদে ইসলামী রাষ্ট্র গড়া সেদিন তিরিশ-চল্লিশ লাখ নিয়ে বছর বছর ইজতেমা করার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গণ্য হয়েছিল। এটিই ইসলামের তাবলীগ ও প্রতিষ্ঠার পথ। কোরআন শুধু আল্লাহর বিধান নিয়ে হাজির হয়নি,সে বিধানের সর্বশ্রেষ্ঠ মডেল নিয়েও হাজির হয়েছে। নবীজী (সাঃ) ও সাহাবাদের আমলে তো সেটাই ঘটেছিল। ফলে ইসলাম গ্রহণে সেদিন জোয়ার শুরু হয়েছিল। আজ  সে বিধান আছে কিন্তু সে মডেল নাই। ফলে সে ইসলামের প্রতি সে জোয়ারও নাই। বরং শুরু হয়েছে ইসলাম থেকে দূরে সরার জোয়ার। আজকের মুসলমানদের এটিই সবচেয়ে দুর্বল দিক।

মুসলমানদের উপর আল্লাহর সাহায্য স্রেফ দোয়ার ডাকে আসে না। আসে আল্লাহর প্রদর্শিত সিরাতুল মোস্তাকীমটি সুন্দর ভাবে আঁকড়ে ধরার উপর ভিত্তি করে। ফলে দোয়ার বিশ্ব ইজতেমায় ৩০-৪০ লাখের কান্নাকাটিতেও কোন বিজয় আসছে না, মুসলিম ভূমিতে কোন শান্তিও আসছে না। বরং আধিপত্য বাড়ছে কাফের, ফাসেক, মুশরিক, মুনাফিকসহ নানারূপ দুর্বৃত্তদের। অথচ এ দোয়ার মহফিলে চমক আনার জন্যই তাবলিগজামাতের মহা আয়োজন, নবী (সাঃ) প্রদর্শিত সিরাতুল মোস্তাকীম আঁকড়ে ধরায় নয়। তাদের মধ্যে আরেক বিচ্যুতি ঘটেছে তাবলীগের কাজকে শুধু মুসলমানদের মাঝে সীমিত রাখায়। এটিও নবীজী (সাঃ)র সূন্নতের খেলাফ। ইসলাম শুধু মুসলমানদের ভালো মুসলমান বানানোর জন্য আসেনি, বরং এসেছে অমুসলমানদের মাঝে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে দেয়ার জন্যও। একাজে তারা আল্লাহর খলিফা। মুসলমান হওয়ার এ এক বিশাল দায়বদ্ধতা। রাজা দাহিরের অত্যাচারি শাসন থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সিন্ধু দেশের স্থানীয় হিন্দুরা বসরার মুসলিম শাসকের কাছে সাহায্যের আবেদন করেছিল। মুসলিম সৈনিকেরা তাদের মূক্তি দিতে শুধু ওয়াজ-নসিহত পেশ করেনি,অর্থ,শ্রম,সময় ও রক্তের বিনিয়োগ করেছিল। ইসলামের প্রসার তো ঘটেছিল এভাবেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো,অমুসলমানদের প্রতি তাবলিগজামায়াতের সে অঙ্গিকারটি কোথায়? বিনিয়োগটাই বা কি? তাদের ব্যস্ততা শুধু মুসলমানদের নামাযী বানানোর মাঝে। সেটিও কোরআনী জ্ঞানের প্রতি জোর না দিয়ে। অমুসলমানদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌছানোর জন্য প্রচেষ্ঠা কই? প্রতিবেশী হিন্দু,বৌদ্ধ বা খৃষ্টানদের মহল্লায় কি তারা দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে কখনো গাশতে নামেন? অথচ নবীজী(সাঃ) ও সাহাবীগণ আজীবন কাফেরদের কাছে দ্বীনের দাওয়াত দিয়েছেন। তাদের সে মেহনতের বরকতেই মদিনা থেকে বহু হাজার মাইল দুরের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশীরা আজ মুসলিম। তাই প্রশ্ন,নবীজী(সাঃ)র সে মহান আমলটি তাদের কাছে গুরুত্ব হারালো কেন? আজ কি অমুসলমানদের সংখ্যা কম?

 

আগ্রহ নেই সিরাতুল মুস্তাকীম বুঝায়

মহান আল্লাহতায়ালা চান,ঈমানদারগণ তাঁর পবিত্র কোরআন বোঝায় আত্মনিয়োগ করুক। কারণ আল্লাহর এ কিতাবটি হলো এ জীবনে পথচলার একমাত্র রোড ম্যাপ। আল্লাহতায়ালা মানুষের কল্যাণ চান। আর সে কল্যাণ আসতে পারে এ রোডম্যাপের নির্ভূল অনুসরণের মধ্য দিয়ে। তাই এটি শুধু নিছক তেলাওয়াতের কিতাব নয়, গভীর অনুধাবনের কিতাবও। অর্থ না বোঝে তেলাওয়াত হলে কখনই সে কিতাবের অনুসরণ হয় না। অনুধাবনের আগ্রহ বাড়াতে মহান আল্লাহতায়ালা তাই “আফালাতাফাক্কারুন”,“আফালা তাদাব্বারুন” “আফালা তা’ক্বিলুন” সে প্রশ্নগুলো পব্ত্রি কোরআনে রেখেছেন। এর অর্থ হলো কোরআনকে নিয়ে তোমরা কেন চিন্তাভাবনা করোনা,কেন গভীর মননিবেশ করোনা, কেন বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগাও না? যে কোন কিতাবের ন্যায় কোরআনের অনুসরণের জন্যও চাই কোরআনের জ্ঞান। এ জ্ঞানার্জন ছাড়া অসম্ভব হলো হিদায়েত লাভ। তাই মুসলমান হওয়ার অর্থই হলো,কোরআন বোঝার সামর্থ অর্জন। এটি ঠিক, আরবী ভাষায় জ্ঞানশূণ্য ব্যক্তির সে সামর্থ থাকা সম্ভব নয়। কিন্তু সে সামর্থ বাড়ানোর প্রচেষ্ঠা কই? সে লক্ষ্যে প্রচেষ্ঠা চালানো তো ফরজ। এটি পবিত্র ইবাদত। বুঝার সামর্থ নাই বলে শুধু তেলাওয়াত নিয়ে খুশি থাকা তো ফরজ আদায় না করার গুনাহ। হাশর দিনে কি এ গাফলতির হিসাব দিতে হবে না? সামর্থ বাড়াতে মিসর, ইরাক,সিরিয়া,লেবানন,মরক্কো,লিবিয়া,সূদান,তিউনিসিয়া,আলজিরিয়াসহ বহু অনারব দেশের মানুষ তাদের মাতৃভাষা ভূলে কোরআনের ভাষাকে গ্রহণ করেছিলেন।

কিন্তু তাবলিগজামায়াতের কর্মীদের মাঝে সে সামর্থ অর্জনে আগ্রহ কই? কোরআন বোঝা আর ফাজায়েলে আমল থেকে পাঠ করা কি এক জিনিষ? কোরআনের বিকল্প একমাত্র কোরআনই। ফাজায়েলে আমল –এমন কি শুধু হাদীসের কিতাব পড়েও কোরআন বোঝার কাজ চলে না। মুসলমানদের মাঝে প্রায় দুইশত বছর যাবত একমাত্র কোরআন ছাড়া আর কোন কিতাবই ছিল না। হাদীসের কিতাব এসেছে এর অনেক পর। ফিকাহর কিতাব এসেছে আরো পরে। প্রাথমিক যুগের মুসলমানগণ তখন একমাত্র কোরআন থেকেই হিদায়েত লাভ করতেন,একই সুরাকে তারা বার বার পড়তেন যতক্ষণ না সেটির পূর্ণ উপলদ্ধি ও জ্ঞান তাদের মধ্যে সৃষ্টি না হতো। নামাযের মধ্যে ও বাইরে এ কিতাব থেকে তেলাওয়াতে তারা দীর্ঘক্ষণ কাটিয়ে দিতেন। একে অপরের সাক্ষাতে তারা কোরআনের আয়াত শুনিয়ে দিতেন। আল্লাহর এ কিতাব তারা এত বেশী বেশী পড়তেন যে বিপুল সংখ্যক সাহাবা হাফেজে কোরআনে পরিনত হয়েছিলেন। পুরা কোরআনে হাফিজ না হলেও শত শত আয়াত মুখস্থ্য ছিল অধিকাংশ সাহাবার। মুসলিম ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষগুলো তৈরী হয়েছে বস্তুতঃ সে সময়েই। তাদের জীবনে নামায-রোযা,হজ-যাকাত যেমন ছিল,তেমনি ছিল অমুসলমানদের মাঝে দ্বীনের তাবলিগ।ছিল জিহাদ। ইসলামী শরিয়তি বিধান ছাড়া অন্য কোন বিধানের কথা তখন কল্পনাও করা যেত না। আজ  কিতাবের সংখ্যা যেমন বেড়েছে,তেমনি বেড়েছে কোরআনের উপর তাফসিরের সংখ্যাও।বেড়েছে ফাজায়েলে আ’মালের ন্যায় নানা বইয়ের লাগাতর চর্চাও। কিন্তু সে সাথে বেড়েছে সিরাতুল মোস্তকীম থেকে ভয়ানক বিচ্যুতি। সে সময় ইসলামের বিজয় এসেছিল দেশে দেশে। আর আজ  ইসলামী বিধান পরাজিত খোদ মুসলিম দেশগুলিতে। পবিত্র কোরআনের জ্ঞানলাভের বিষয়টি অবহেলিত হলে মুসলমানদের বিচ্যুতি ও পতন যে কতটা ভয়ংকর হয় আজকের মুসলমানগণ হলো তারই সর্বাধুনিক নমুনা। এমন বিচ্যুতির উদাহরণ দিতে মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে বনি ইসরাইলের কাহিনী বার বার তুলে ধরেছেন। কিন্তু আজ  মুসলমানরা নিজেরাই বড় উদাহরন। অতীতে বহু মুসলিম ইতিহাসে বহু বিচ্যুতি ঘটেছে। কিন্তু এখন সে পুরনো বিচ্যুতির স্থলে আসছে নতুন বিচ্যুতি ও ভ্রষ্টতা। আর এরূপ নতুন ভ্রষ্টতা যখন বাজার পায়,তখন মুসলমানদের গৌরব বাড়ে না বরং পরাজয়ই গভীরতর হয়। তাবলিগজামায়াতও তাই কোন নতুন বিজয় বা গৌরব আনতে পারিনি। অথচ বিশ্ব ইজতেমায় প্রতিবছর লোকের সমাগম বেড়েই চলেছে। সেখানে হজের চেয়েও বেশী লোক জমায়েত হচ্ছে। কিন্তু তাতে কি বাংলাদেশে ইসলামের প্রতিষ্ঠা বেড়েছে? মুক্তি মেলেছে কি ৫ বার বিশ্বের সবচেয়ে দুর্বৃত্তকবলিত দেশের অমর্যাদা থেকে?

ঈমান বাড়লে আল্লাহর শরিয়তি বিধান প্রতিষ্ঠায় প্রচেষ্ঠাও শুরু হয়। উনানের আগুন আর তার উত্তাপ একসাথে বাড়ে। যেখানে উত্তাপ নাই সেখানে আগুণও যে নাই সেটি প্রমাণের জন্য গবেষণা লাগে না। ঈমানের সাথে তেমনি জিহাদ বাড়ে। ঈমান ও জিহাদ -একে অপরের অবিচ্ছেদ্দ অঙ্গ; ঈমান হলো বীজ,আর জিহাদ হলো তার বৃক্ষ। বৃক্ষের মাঝে বীজ যেমন একাকার তেমনি জিহাদের মাঝে ঈমানও একাকার। উভয়কে পৃথক করা অসম্ভব। এজন্যই ইসলামের আরকান গুলির মাঝে জিহাদকে পৃথক রুকন বা খুঁটি রুখে দেখানোর প্রয়োজন পড়েনি। সে জীবনে জিহাদ নাই, বুঝতে হবে সে জীবনে ঈমানও নাই। তাই নবীজী (সাঃ)র যুগে এমন কোন মুসলমান ছিল কি যার মধ্যে জিহাদ ছিল না? সে জিহাদে বহু হাজার সাহাবা জানমালের কোরবানী দিয়েছেন। মদিনার ন্যায় এক গ্রাম থেকে যতজন সাহাবা সেদিন শহীদ হয়েছেন বাংলাদেশে কোটি কোটি মানুষ বিগত হাজার বছরেও তত শহীদ সৃষ্টি হয়নি। যারা জিহাদের ময়দানে সেদিন শহীদ হওয়ার সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হয়েছেন সেটি ঘটেছে মহান আল্লাহর ইচ্ছায়, শাহাদত লাভে তাদের প্রস্তুতির কমতির কারণে নয়। তাদের সে কোরবানীতে সেদিন মানব জাতির ইতিহাস পাল্টে গিয়েছিল। বাংলাদেশের ১৫ কোটি মুসলমানের হাতে আজ অবধি ইসলামের কোন বিজয় না এলেও আরবের কয়েক হাজার মুসলমানদের হাতে বিশাল ভূ-ভাগ জুড়ে ইসলাম বিজয়ী হয়েছিল। তখন মুসলমানগণ পরিণত হয়েছিল বিশ্বশক্তিতে। শহিদগণ এবং যুদ্ধরত মোজাহিদগণই তো আল্লাহর সাহায্য নামিয়ে আনে। তখন তাদের সাথে জিহাদে যোগ দেয় ফেরেশতারা। নবীজী (সাঃ) বলেছেন,“আল্লাহর কাছে তাঁর একজন  মু’মিন বান্দাহর অন্যায় ভাবে নিহত হওয়াটি সমগ্র পৃথিবী মুছে যাওয়ার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ।” -(ইবনে মাজাহ)। আল্লাহতায়ালার কাছে তার পথে জিহাদরত মু’মিনরা যে কত প্রিয় এ হলো তার নমুনা। কিন্তু সমস্যা হলো, তাবলিগজামাতের নেতাকর্মীগণ সাহাবাদের দীর্ঘ নামায-রোযা ও দোয়া-দরুদ নিয়ে বিষদ আলোচনা করলেও জিহাদ বিষয়ক কোরআনের আয়াত এবং নবীজীর হাদীস তেমন বলে না। সাহাবায়ে কেরামের জানমালের কোরবানীর ইতিহাস নিয়েও তেমন আলোচনা করে না।

 

সমস্যা ভিশনে

১৯২৬ সাল থেকে ২০১২ সাল –এ দীর্ঘ ৮৬ বছরে তাবলিগজামায়াতের লক্ষ লক্ষ কর্মী বেড়েছে কিন্তু তাতে ইসলামের শক্তি কতটুকু বেড়েছে? ঢাকা,লাহোর বা দিল্লিতে তারা যেরূপ লক্ষ লক্ষ মানুষের ইজতেমা হয় তা স্থানীয় কোন রাজনৈতিক দলই করতে পারে না। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলির যে ক্ষমতা, সে ক্ষমতা কি তাবলিগজামায়াতের আাছে?  রাজনৈতিক দলগুলো এত বড় বড় সভা না করতে পারলেও বহুদেশের রাজনীতি, ভুগোল ও সংস্কৃতি পাল্টিয়ে দিয়েছে। সাহাবাগণও পাল্টিয়ে দিয়েছিলেন তৎকালীন বিশ্ব-মানচিত্রের বিরাট অংশের রাজনীতি,ধর্ম ও সংস্কৃতি। মানব সমাজে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হলো রাষ্ট্র;রাষ্ট্রের সহযোগীতা ছাড়া সমাজে কোন গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনই সম্ভব নয়। নবীজী (সাঃ) তাই রাষ্ট্র ক্ষমতাকে নিজ হাতে নিয়েছিলেন। হযরত আবু বকর (রাঃ),হযরত ওমর(রাঃ),হযরত ওসমান(রাঃ)এবং হযরত আলী(রাঃ)র ন্যায় মহান সাহাবীগণও রাষ্ট্র ক্ষমতা হাতে নিয়েছিলেন। কিন্তু তাবলিগ জামাত রাষ্ট্রের সে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাকে মানতে রাজী নন। তাদের কথা,মানুষ তাবলিগজামায়াতে শামিল হলেই মুসলমানদের ঈমান ও একীন বেড়ে যাবে। রাষ্ট্রের সকল সমস্যার তখন সমাধান হবে। সমাজ পরিবর্তনের প্রক্রিয়া ও রাষ্ট্রের ক্ষমতা নিয়ে তাবলিগজামায়াতের নেতাকর্মীদের ধারণা যে কতটা অজ্ঞতাপ্রসূত এ হলো তার প্রমাণ।

তবে তাবলিগজামায়াতের মূল সমস্যাটি নিছক কোরআনী জ্ঞান,নবীজী(সাঃ)সূন্নত,সাহাবাদের জীবন-ইতিহাস এবং সমাজ পরিবর্তনের প্রক্রিয়া নিয়ে বিভ্রান্তির মধ্যে সীমিত নয়। সে সমস্যটি প্রকট তাদের ভিশনে। ভিশন হলো ভবিষ্যতের সমাজ, রাষ্ট্র ও পৃথিবীকে কীরূপে দেখতে চায় তার এক মানসচিত্র।শয়তানী শক্তিও তেমন এক ভিশন নিয়ে রাজনীতি করে। রাজনীতির বিজয়ে তারা যুদ্ধ করে এবং প্রাণও দেয়। তাবলিগজামাতের ভিশনে ইসলামী রাষ্ট্র যেমন নাই,তেমনি শরিয়তের প্রতিষ্ঠাও নাই। সে লক্ষ্য অর্জনে জ্ঞানার্জন ও সামর্থ-অর্জনের চেষ্টাও নাই। ফলে তাদের জীবনে কোরআনে নির্দেশিত জিহাদও নাই। তাদের চেতনাগত বিচ্যুতি এতটাই প্রকট যে, গাশত,চিল্লাহ এবং ইজতেমায় যাওয়াকে তারা জিহাদ বলছে। অথচ তাবলীগ যেমন তাবলীগ, নামায যেমন নামায, তেমনি জিহাদ হলো জিহাদ। জিহাদের বিকল্প একমাত্র জিহাদই। একটির সাথে অপরটির মিশ্রণ চলে না। জিহাদে আল্লাহর দ্বীনের বিজয়ে শুধু জান-মালের বিনিয়োগের বিষয়টি আসে না,প্রাণদানের বিষয়টিও আসে। আসে শত্রুর অস্ত্রের সামনে দাঁড়ানোর বিষয়টিও। যে কোন আমলের ন্যায় এখানেও আমলের মূল্যায়ন হয় ব্যক্তির নিয়ত থেকে। কথা হলো,কোন তাবলীগ কর্মী কি এমন নিয়েত নিয়ে কোন কালেও কি কোন শত্রুর সামনে দাঁড়িয়েছে? চেয়েছে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ইসলামের পক্ষের শক্তির বিজয়? মুসলিম ভূমি আজ  বিশ্বের নানা প্রান্তে ইসলামের বিপক্ষ শক্তির হাতে অধিকৃত। শরিয়তি বিধান গিয়ে পড়েছে আস্তাকুঁড়ে। আইন-আদালত, প্রশাসন,ব্যাংক,শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে চলছে আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। কাশ্মীর, আফগানিস্তান, ফিলিস্তিন, চেচনিয়াসহ নানা দেশে চলছে কাফের শক্তির অধিকৃতি থেকে মুক্তির জিহাদ। কিন্তু সে সব জিহাদে কি কোন তাবলিগকর্মী যোগ দিয়েছে? এমনকি তাবলীগ জামায়াতের যখন জন্ম, ভারতভূমিতে তখন ছিল ঔপনিবেশিক কাফের শক্তির শাসন। সাধারণ মুসলমানগণও সেদিন সে শাসন থেকে মুক্তির জন্য লড়াই করেছে। সে লড়াইয়ে তাবলিগ জামাত কি কোন ভূমিকা রেখেছে? বরং সত্য হলো,ভূমিকা রাখা দূরে থাক,সেটি তাদের কাছে কোন গুরুত্বই পায়নি। এমন এক দায়িত্বশূণ্যতা থেকে জিহাদ নিয়েও তারা সম্পূর্ণ এক মনগড়া এক ব্যাখ্যা খাড়া করেছে। ফাজায়েলে আ’মাল কিতাবে ১২৬ পৃষ্ঠায় ভারতের এক আলেম হযরত মাওলানা ইদ্রিছ আনছারীর উর্দু কিতাব “মেরী নামায” হতে সংগৃহীত নামাজের কতিপয় অংশের ফজীলত বর্ণনা করতে গিয়ে ক্বেয়াম সম্বন্ধে বলা হয়েছে,“নামায সর্বশ্রেষ্ঠ জেহাদ”।

 

বিশ্ববাসী নিয়ে মহান আল্লাহতায়ালার নিজস্ব অভিপ্রায় কি সেটি সুস্পষ্ট ভাবে তুলে ধরেছে পবিত্র কোরআন। সেটি হলো,বিশ্বের সকল ধর্মের উপর ইসলামের বিজয়। এটিই হলো আল্লাহর ভিশন। সে ভিশনের সাথে একাত্ম হওয়াই মু’মিনের মিশন। নবীজী (সাঃ) ও তাঁর সাহাবাগণ শুরু থেকেই আল্লাহর সে ভিশনকে নিজেদের ভিশন ও মিশন বানিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু সেটি কি গাশত,চিল্লাহ,ইজতেমার মধ্য দিয়ে সম্ভব? সে ভিশন পূরণে হাজার হাজার সাহাবা শুধু অর্থ, শ্রম ও সময়ই দেননি,প্রাণও দিয়েছেন। নবীজী (সাঃ)নিজেও আহত হয়েছিলেন। কিন্তু সে চেতনা তাবলিগ জামাতের লোকদের মাঝে কই? তাবলীগ জামাত মানুষকে মূলতঃ নামাজের দিকে ডাকে। কিন্তু কোরআন বলে আল্লাহর দিকে ডাকতে। মাথা টানলে যেমন কান এমনিতেই আসে তেমনি আল্লাহর দিকে ডাকলে শুধু নামায আসে না, সকল প্রকার ইবাদতই আসে। আসে জিহাদও। ইসলামে প্রবেশের অর্থ পরিপূর্ণ ইসলামে প্রবেশ। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে,“উদখুলু ফি সিলমে কাফ্ফা”। অর্থঃ প্রবেশ করো পরিপূর্ণ ভাবে ইসলামে। তাই তাবলীগের যথার্থ অর্থ শুধু নামাজের দিকে ডাকা নয়,ইসলামী রাষ্ট্র-সমাজ-সংস্কৃতি,বিচার-ব্যবস্থা ও অর্থনীতির দিকে ডাকাও। এবং ইসলামের সে পরিপূর্ণ বিধান প্রতিষ্ঠায় জিহাদে ডাকাও।

 

অবহেলিত কোরআন

মসজিদে মসজিদে প্রতিদিন মাগরিব বা এশার নামায শেষে বসে তাবলিগ জামায়াতের বৈঠক। সে বৈঠকে পবিত্র কোরআন থেকে পাঠ হয় না। বরং “ফাজায়েলে আমাল” থেকে কিছু অংশ পড়ে শুনানো হয়। প্রশ্ন হলো, কোরআনের স্থলে ফাজায়েলে আমলের কেন এত গুরুত্ব? পবিত্র কোরআন হলো আল্লাহপাকের কালাম, দাওয়াতের যে শক্তি ও হিকমত সেখানে আছে তা কি কোন মানুষের কিতাবে থাকতে পারে? পবিত্র কোরআনের সে মহাশক্তিকে আল্লাহতায়ালা বর্ণনা দিয়েছেন এ ভাবে,“প্রকৃত মু’মিন তো তারাই যাদের অন্তর আল্লাহর নাম শোনার সাথে সাথে কেঁপে উঠে। এবং যখন তাঁর আয়াত পড়ে শোনানো হয় তখন তাদের ঈমান বেড়ে যায়। -(সুরা আনফাল, আয়াত ২)। হযরত উমরের ন্যায় হত্যাপাগল কঠোর মানুষটিও কোরআনের আয়াত পাঠ করতে শুনে আল্লাহরে ভয়ে শিহরে উঠেছেন। সে ভয় নিয়ে নবীজী (সাঃ)র কাছে ছুটে গেছেন এবং ইসলাম কবুল করেছেন। আর এমনটি শুধু হযরত উমরের ক্ষেত্রে ঘটেনি। বহু কঠোর হৃদয় কাফেরদের ক্ষেত্রেও ঘটেছে। এবং সেটি আজও ঘটছে। আজও  যারা  ইসলাম কবুল করছে তাদেরও কথা,তারা ইসলাম কবুল করেছে কোরআন পাঠের পর। আজকের মুসলমানগণ মেঘের ন্যায় ইসলামের সামনে দাঁড়িয়েছে,এবং আড়াল করেছে ইসলামের মূল পরিচয়কে। কিন্তু কোরআন তার বিশুদ্ধ রূপ নিয়ে বিদ্যমান। কোরআন নিজেই এক বিস্ময়কর মোজেজা। পৃথিবীর বুকে একমাত্র এই কোরআনই হলো মহান আল্লাহর নিজস্ব ভাষায় নিজের কথা। আল্লাহর সে কিতাবকে বাদ দিয়ে ফাজায়েলে আ’মালের গুরুত্ব দেয়া কি ঈমান-সম্মত? বিবেক-সম্মতই বা কি করে বলা যায়? নবীজীর আমলে এই একটি মাত্র কিতাব ছাড়া অন্য কোন গ্রন্থই ছিল না। হাদীস গ্রন্থ লেখা হয়েছে তো নবীজী (সাঃ)র ওফাতের প্রায় ২শত বছর পর। কোরআন বুঝার তাগিদে বহু দেশের মানুষ মাতৃভাষা পরিত্যাগ করে আরবী ভাষা শিখেছে।অথচ তাবলিগ জামাত তাদের বৈঠকে সে কোরআন থেকে ছবক নেয় না। ছবক নেয় একজন মানুষের লেখা বই থেকে। পবিত্র কোরআনের সাথে এর চেয়ে বড় অবহেলা আর কি হতে পারে?

 

জিহাদের মর্যাদা হনন

এ বিষয়টি আজ  প্রমাণিত, হাদীসের নামে বহু হাজার মিথ্যা বা জাল হাদীস বিভিন্ন কিতাবে ঢুকানো হয়েছে। তবে কোনটি জাল হাদীস এবং কোনটি জাল হাদীস সে যাচাইয়ের মাধ্যম হলো পবিত্র কোরআন। যে বিষয়ে পবিত্র কোরআনে সুস্পষ্ট বক্তব্য রয়েছে তার সাথে সাংঘর্ষিক কোন হাদীসই সহীহ হতে পারে না। অথচ তাবলিগজামাতের প্রকাশিত “ফাজায়েলে আ’মাল”য়ে বহু হাদীস আছে যেগুলির সাথে পবিত্র কোরআনের কোন মিল নেই। কিছু উদাহরণ দেয়া যাক। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে জিহাদকে মু’মিনের জীবনে অনিবার্য বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, শুধু ঈমান এনেছি এ কথা বললেই কাউকে ছেড়ে দেয়া হবে না। আল্লাহতায়ালা দেখতে চান কারা সে দাবীতে সত্যবাদী এবং কারা মিথ্যুক। যেমন সুরা আনকাবুতে বলা হয়েছে, “মানুষ কি মনে করে যে, “আমরা ঈমান এনেছি একথা বললেই তাদের পরীক্ষা না করেই অব্যাহতি দেয়া হবে। আমি তো তাদের পূর্ববর্তীদেরকেও পরীক্ষা করেছিলাম। আল্লাহ অবশ্যই প্রকাশ করে দিবেন কারা (ঈমানের দাবীতে) সত্যবাদী এবং কারা মিথ্যাবাদী।” -(আয়াত ২-৩)। সুরা আল­ –ইমরানে বলা হয়েছে, “তোমরা কি মনে কর যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে, যখন আল্লাহ তোমাদের মধ্যে কে  জিহাদ করেছে এবং কে ধৈর্যশীল তাহা এখনও প্রকাশ করেন নাই।” –(আয়াত ১৪২)। অর্থাৎ মু’মিনের ঈমানের প্রকৃত পরীক্ষাটি শুধু কালেমা পাঠে বা নামায-রোযা আদায়ে ঘটে না। সেটি ঘটে জিহাদে। পবিত্র কোরআনে সে অনিবার্য পরীক্ষার কথা বহুবার বলা হয়েছে। বহুবার বলা হয়েছে আল্লাহর পথে শহীদদের উচ্চ মর্যাদার কথা। শহীদদের মর্যাদাগুলো হলোঃ তাদের সমস্ত গুনাহগুলোকে মাফ করে দেয়া হবে। তারা বিনা বিচারে জান্নাতে প্রবেশ করবেন। তাদেরকে মৃত বলতে নিষেধ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, তারা জীবিত এবং তারা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে রিযিকপ্রাপ্ত হন। অথচ শহীদদের মর্যাদা কমাতে গিয়ে ফাজায়েলে আ’’মাল পুস্তকের ৫২ পৃষ্ঠায় আবু হোরায়রা (রাঃ)র স্বপ্ন থেকে প্রাপ্ত একটি চিত্রের বর্ননা দেয়া হয়েছে। হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) বলেন, “কোন এক গোত্রে দুইজন সাহাবী (হবে দুইজন ব্যক্তি) একত্রে ইসলাম গ্রহণ করেন। তন্মধ্যে একজন জিহাদে শরীক হয়ে শহীদ হন। অপরজন এক বৎসর পর এন্তেকাল করেন। আমি স্বপ্নে দেখলাম,যিনি এক বৎসর পর এন্তেকাল করেন তিনি শহীদের আগেই জান্নাতে প্রবেশ করলেন। এতে আমি আশ্চার্যান্বিত হলাম ও হুজুর (ছঃ)এর নিকট ঘটনা প্রকাশ করলাম। অথবা অন্য কেউ হুজুরের নিকট প্রকাশ করেন। হুজুর (ছঃ) উত্তর করলেন,যে ব্যক্তি পরে মারা গেল তার পূণ্য কি তোমরা দেখতে পাওনা যে, কত বেশী পেয়ে গেল? পূর্ণ একটি রমজানের রোজা ও ছয় হাজার রাকাতের অধিক নামায তাহার আমল নামায় বৃদ্ধি পেয়ে গেল।” অন্য এক হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়ে আরো বলা হয়েছে, “আবু দাউদ শরীফে অন্য দুইজন সাহাবীর কথা উল্লেখ আছে যাদের মৃত্যুর ব্যবধান ছিল মাত্র ৮ দিন,তবুও যিনি পরে এন্তকাল করেন,তিনিই প্রথমে বেহেস্তে প্রবেশ করেন।” তার প্রথমে বেহস্তে প্রবেশের কারণ রূপে তার ৮ দিনের নামাযকে চিহ্নিত করা হয়েছে। (উল্লেখ্য, ফাজায়েলে আমালের উদ্ধৃতিগুলোকে সাধু ভাষার স্থলে চলতিতে রূপান্তরীত করা হয়েছে)।

 

ফাজায়েলে আমালের উদ্ভট বয়ান

ফাজায়েলে আ’মালের মূল লেখক মাওলানা মাওলানা জাকারিয়া (রহঃ) এবং অনুবাদক মাওলানা ছাখাওয়াত উল্লাহ। কিতাবখানি তাবলিগ জামাত বাংলাদেশের আহলে শুরার বুজুর্গগণ কর্তৃক অনুমোদিত এবং তাবলিগফাউন্ডেশন ও তাবলিগকতুবখানা, ৫০ বাংলাবাজার ঢাকা ১১০০ কর্তৃক প্রকাশিত (ফেব্রেয়ারী, ২০০৫ সংস্করন)। এ পুস্তকে ইসলামের কীরূপ চিত্র পেশ করা হয় এবং ধর্মের নামে পাঠককে কীরূপ কাজে উৎসাহ দেয়া হয় সেটির কিছু উদাহরন তুলে ধরা যাক।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “ফাযাক্কের বিল কোরআন”। অর্থাৎ কোরআনের সাহায্যে মানুষকে স্মরণ করাও। অর্থাৎ সাবধান করো। মহান আল্লাহতায়ালার ভাষায় পবিত্র কোরআন হলো,“হুদাল্লিল মুত্তাকীন” “সিরাতুল মোস্তাকীম” এবং “হাবলিল্লাহিল মাতিন”। বলা হয়েছে “মাই ইয়াতাছিম বিল্লাহ, ফাক্বাদ হুদিয়া ইলা সিরাতিম মোস্তাকীম” অর্থঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহকে দৃঢ়ভাবে অবলম্বন করলো সেই সিরাতুল মোস্তাকীম তখা সোজা পথে পরিচালিত হলো।” -(সুরা আল ইমরান¸আয়াত ১০১)। এরপরও কি এ বিষয়টি বুঝতে বাঁকী থাকে,কোরআন হলো মুসলমানের জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে। মুসলমানের ইবাদত, পরিবার,রাষ্ট্র, সমাজ ও সংস্কৃতি সবকিছু আবর্তিত হয় কোরআনকে কেন্দ্র করে। কিন্তু “ফাজায়েলে আমাল”য়ে আল্লাহ কি বললেন সেটির তেমন উল্লেখ নেই,বরং কোন হুজুর বা কোন সুফি কি বললেন সেটিরই ছড়াছড়ি। মানুষকে হুশিয়ার করা হচ্ছে সুফিদের বা হুজুরদের বক্তব্য শুনিয়ে। মানুষের কাছে কোরআনের নির্দেশ পৌছানোর গরজ এখানে সামান্যই। ফাজায়েলে আ’মালের ৪ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে “কারো যদি দ্বীনের একটি মাত্র কথাও জানা থাকে উহা অন্যের নিকট পৌছাতে হবে।” কিন্ত সেটি কার কথা? সেটি কি হুজুরদের কথা না আল্লাহর কথা? কিন্তু কথা হলো,মহান আল্লাহর কথা যদি জানা ও বোঝারই চেষ্টা না হয় তবে সে অন্যের কাছে সে তা পৌঁছাবে কি করে?  অন্যদের কাছে পৌছানো দূরে থাক, মসজিদে মসজিদে নামায শেষে তাবলিগজামায়াতের যে বৈঠক বসে সেখানেও কি কোরআন খুলে তার অর্থ বোঝার চেষ্টা করা হয়? সেখানে তো হুজুরদের বই প্রাধান্য পায়, আল্লাহর কিতাব নয়।

আল্লাহতায়ালার কাছে এটি প্রচণ্ড অপছন্দের যে, মানুষ তাঁর নাযিলকৃত কিতাবকে শুধু সওয়াবের উদ্দেশ্যে পড়বে,আর জীবনযাপন,ঘর-সংসার,ধর্মকর্ম,পোষাক-পরিচ্ছদ,শিক্ষা-সংস্কৃতি,বিচার-আচার,অর্থনীতি, প্রশাসন, এমন কি দ্বীনের তাবলীগের ক্ষেত্রে নসিহত ও নির্দেশনা নিবে অন্য কোন কিতাব বা নেতা থেকে। নসিহতের জন্য তাবলিগ জামাত এখানে বেছে নিয়েছে “ফাজায়েলে আমাল”। এটি বস্তুত মহান আল্লাহর কিতাবের প্রতি চরম অবমাননা। এমন আচরণে রাব্বুল আলামীন কখনই খুশি হতে পারেন না। মহান আল্লাহ তাঁর ক্ষোভের প্রকাশ ঘটিয়েছেন এভাবে, “তোমাদের নিকট কি কোন কিতাব আছে যা তোমরা পাঠ কর? তাতে কি তোমরা তাই পাও যা তোমরা পছন্দ কর?” –(সুরা কালাম, আয়াত ৩৭-৩৮)। তাবলিগকর্মীগণ ফাজায়েলে আ’মাল থেকে বস্তুত সেটিই পায়,যা তাদের মন চায়। তারা পায়, তাবলিগমিশন চালানোর নতুন প্রেরণা। কোরআন থেকে সেটি পায় না বলেই কোরআন নিয়ে তারা বৈঠক করে না,সে গ্রন্থ থেকে নসিহত লাভের চেষ্টাও করে না। কোরআন বাদ দিয়ে অন্য কিতাব থেকে নসিহত নেয়ায় যে প্রচণ্ড আগ্রহ বাড়বে সেটি কোরআন নাযিলের সময়ই মহান রাব্বুল আলামীন জানতেন। কারণ সেটি “আলেমুল গায়েব” মহান আল্লাহর অজানা থাকার কথাও নয়। অনুরূপ কিছু হলে সেটি যে আল্লাহতায়ালার ক্ষোভের কারণ হবে সেটিও তিনি পবিত্র কোরআনে গোপন রাখেননি। সুরা কালামের উপরুক্ত দুটি আয়াত হলো তার নমুনা।

“ফাজায়েলে আমল” বইতে বলা হয়েছে, সবচেয়ে উত্তম যিকর হলো পবিত্র কোরআনের তেলাওয়াত যে কোন জিকর হইতে শ্রেষ্ঠ। -(পৃষ্ঠা ১৫৫)। একথাও বলা হয়েছে, শ্রেষ্ঠ তেলাওয়াত হলো কোরআন বুঝে তেলাওয়াত। পৃষ্ঠা ১৩৪য়ে একটি প্রশিদ্ধ হাদীসের উল্লেখও করা হয়েছে। হাদীসটি হযরত ওসমান (রাঃ)থেকে উদ্ধৃত। হুজুর পাক (সাঃ) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তি সর্বশ্রেষ্ঠ, যিনি কোরআন শরীফ স্বয়ং শিখেয়েছেন এবং অপরকে শিক্ষা দিয়েছেন। ১৩৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণীত একটি হাদীস। যাতে বলা হয়েছে,“কোরআনে পারদর্শী তাহারা ঐসব ফেরেস্তাদের অন্তর্ভূক্ত যাহারা মহা পূর্ণবান এবং (আল্লাহর হুকুমে) লেখার কাজে লিপ্ত।” ১৫৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে তিরমিযী শরিফের একটি হাদীস। হাদীসটি হলো,“হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, যার মধ্যে কোরআনের কোন শিক্ষা নাই সে ঘর বিরান সমতূল্য।” ১৮১ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছেঃ হযরত আবু জর (রাঃ) বলেন, হুজুর পাক (ছঃ) এরশাদ করেন, হে আবু জর! তুমি যদি সকল বেলায় গিয়া কালামুল্লাহ শরীফ হইতে একটি আয়াতও শিক্ষা কর তবে একশত রাকাত নফল পড়া হইতেও উহা উত্তম। আর ঐ সময় যদি এলেমের একটি অধ্যায় শিক্ষা কর, চাই উহার উপর আমল করা হউক বা না করা হোক তবে উহা হাজার রাকাত নফল পড়া হইতেও উত্তম।” কথা হলো তাবলিগ জামাত কি এর উপর বিশ্বাস করে? তাবলিগ জামাতের জোর তো ফাজায়েলে আলম শিক্ষার প্রতি। তারা নামায শেষের বৈঠকগুলোতে কখনও কি কোরআন হাতে নিয়ে তা থেকে পাঠ করে শুনায়? মুসলমানের শ্রেষ্ঠ কল্যাণ করার যদি কারো আগ্রহ থাকে তবে তার উচিত মুসলমানদের মাঝে কোরআন বোঝার সামর্থ সৃষ্টি করা। সে জন্য আরবী ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা করা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তাবলিগ জামায়াতের লক্ষ লক্ষ লোক, কিনন্তু তাদের ক’জনের সে সামর্থ? সে সামর্থ বাড়ানো্রই বা উদ্যোগ কোথায়? আর সে সামর্থ বাড়লে কি দ্বীনের প্রতি মানুষকে ডাকার সামর্থ বাড়তো না? তারা যা বলে তা কি করে? অথচ পবিত্র কোরআন পাকে বলা হয়েছে, আল্লাহর কাছে বড়ই অপছন্দের হলো তোমার যা বলো তা করো না।-(সুরা সাফ)।“ফাজায়েলে আমল”য়ে বার বার আলেমদের সম্মান দেখানোর কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু সচারাচার দেখা যায়,বৈঠকে এমন একজনকে নসিহত পেশের জন্য খাড়া করে দেয় যিনি আলেম নন।

 

অবান্তর কেচ্ছা-কাহিনী

হযরত আলী (রাঃ) বলেছেন, ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব তার জিহ্ববাতে। অর্থাৎ তার বিশ্বাসযোগ্যতা তার কথায়। তেমনি একটি বইয়ের বিশ্বাস যোগ্যতা তার তথ্য ও বক্তব্যের বিররণীতে। তাই বক্তাকে যেমন তার কথায় সত্যবাদী হতে হয় তেমনি লেখককে সত্যবাদী হতে হয় তার লিখনীতে। তাই আজগুবি তথ্যদিয়ে একটি বইয়ের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ানো যায় না। এদিক দিয়ে ফাজায়েলে আ’মালের কিছু বক্তব্যের সত্যতা নিয়ে বিচার করা যাক। পুস্তকটির ১৭৭ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে,“হযরত ওসমান (রাঃ) কোন কোন সময় বেতেরের একটি রাকাতে পুরা কোরআন শরীফ শেষ করিয়া ফেলতেন।” ১৭৭ তেই  বলা হয়েছে, জনৈক শায়েক হানায়ী বলেন,“আমি একরাতে দুই খতম আরও দশ পারা কোরআন পড়েছি। যদি ইচ্ছা করতাম তৃতীয় খতমও শেষ করতে পারতাম।” মানছুর বিন জাযান চাশতের নামাজে এক খতম এবং জোহর হইতে আছর পর্যন্ত অন্য এক খতম করিতেন। বলা হয়েছে, “এবনুল কাতেব (রহঃ) দৈনিক আটবার কোরআন খতম করতেন।” কথা হলো, এমন দাবী কি বিশ্বাসযোগ্য? কোন সুস্থ্য মানুষ কি এমন কথা বিশ্বাস করেতে পারে? আর যদি এরূপ অসম্ভব কর্ম সম্ভবও হয় তবুও কি সেটি প্রশংসাযোগ্য? খোদ ফাজায়েলে আ’মালেরই ১৭৭-১৭৮ পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে,“হুজুর পাক(সাঃ)বলেছেন,তিন দিনের কম সময়ে কোরআন খতম করলে চিন্তা-ফিকির করে পড়া যায় না।” এক্ষেত্রে প্রশ্ন হলো, নবীজী (সাঃ)র কথার উপর যদি তাদের সামান্যতম শ্রদ্ধা থাকে তবে দৈনিক আটবার বা রাতে দুই বার খতমের কাহিনীকে এত গুরুত্ব দিয়ে প্রচার কেন? এতে কি নবীজী(সাঃ)র নসিহতের প্রতি অসম্মান ও অবাধ্যতা হয় না?

ফাজায়েলে আ’মালের ১০২ পৃষ্ঠাতে লেখা হয়েছে:“শেখ আব্দুল ওয়াহেদ (রহঃ) একজন বিখ্যাত ছুফী ছিলেন। তিনি বলেন “একদা রাত্রি বেলায় নিদ্রা বশতঃ আমার রাত্রিকালীন তাছবীহ ও অজিফা পড়তে পারলাম না। স্বপ্ন যোগে আমি সবুজ রং-এর রেশমী পোষাক পরিহিতা এক পরমা সুন্দরী বালিকাকে দেখলাম। আপাদমস্তক তার তাছবীহ পাঠে রত ছিল। সে আমাকে বললো আমাকে পাওয়ার জন্য চেষ্টা কর,আমি তোমাকে লাভ করবার চেষ্টায় আছি। অতঃপর সে কয়েকটি হৃদয়গ্রাহী কবিতা পাঠ করলো। তারপর তিনি নিদ্রা হতে উঠে কছম করলেন যে, জীবনে তিনি আর কখনো ঘুমাবেন না। কথিত আছে, চল্লিশ বৎসর যাবৎ তিনি এশার অজু দ্বারা ফজরের নামায পড়েছেন।” কথা হলো, এমন উদ্ধৃতি থেকে কি প্রকাশ পেল? কোন মু’মিনের ইবাদতে এটি যথার্থ নিয়ত? মুসলমান নামায পড়ে কি বেহেশতের কোন রমনীকে খুশি করার জন্য? বা তাকে পাওয়ার জন্য? প্রশ্ন হলো, কোন মুসলমানের এমন আমল কি কখনো আল্লাহর কাছে গ্রহণ যোগ্য হতে পারে? মুসলমানের নামায-রোযা,হজ-যাকাত,জীবন-মরণ এবং জিহাদ –সবকিছুর লক্ষ্য তো একমাত্র আল্লাহতায়ালার উদ্দেশ্যে। ঈমানদারের ইবাদত-বন্দেগীর নিয়ত কখনই বেহেশতের কোন রমনী পাওয়ার জন্য নয়। সেটি লক্ষ্য হলে কি সেটি ইবাদত রূপে গণ্য হয়? উক্ত সুফি চল্লিশ বছর যাবৎ এশার অজু দ্বারা ফজরের নামায পড়েছেন সেটিও কি কোন সুস্থ্য মানুষের আচরণ? সেটি কি বিশ্বাসযোগ্য? তার কি কোন বৈবাহিক জীবন ছিল না? ৪০ বছর ধরে কোন রাতেই কি এশা থেকে ফজর অবধি এ দীর্ঘ সময়ে পেশাব-পায়খানারও প্রয়োজন পড়েনি? আর এমন নফল ইবাদতে তিনি দ্বীনের কি মহান কল্যাণটি করেছেন? এটি কার সূন্নত? নবীজী (সাঃ) কি নিজেও কখনো এমনটি করেছেন বা অন্যদের এরূপ করতে নির্দেশ দিয়েছেন? আরো প্রশ্ন হলো,সারা রাত ধরে নফল নামায পড়লে তিনি দিনে কি করেছেন? দিবাভাগ তিনি নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে কাটিয়েছেন। ৪০ বছর এভাবে দিনে ঘুমালে তার রুজি-রোজগারের কি অবস্থা হয়েছে? রাত হলো বিশ্রামের,আর দিন হলো কর্মের। এটিই ফিতরাত। নবীজী ও সাহাবায়ে কেরাম দিবাভাগে যেমন রোজগারে নেমেছেন,তেমনি শত শত সৎকর্ম করেছেন। জিহাদও করেছেন। সারা রাত জাগলে দিনে কি কখনও কোন নেক আমালের ফুরসত পেয়েছিলেন? তাছাড়া জমিদার পুত্র না হলে নিশ্চয়ই তাকে জীবন বাঁচাতে ভিক্ষায় নামতে হয়েছে।

তাবলিগজামায়াতের মাঝে অবান্তর ও উদ্ভট বক্তব্যের চর্চা যে কতটা প্রকট তার আরো কিছু উদাহরণ দেয়া যাক। ফাজায়েলে আ’মালে ১০২ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছেঃ “শেখ আব্দুল ওয়াহেদ (রহঃ) একজন বিখ্যাত ছুফী ছিলেন। কথিত আছে তিনি চল্লিশ বৎসর যাবত তিনি এশার অজু দ্বারা ফজরের নামায পড়েছেন।” ১০৭ পৃষ্ঠায় এসেছেঃ “বাকী বিন মোখাল্লেদ (রহঃ) তাহাজ্জুদ ও বেতেরের তের রাকাত নামাজে কোরআন শরীফ খতম করতেন।” ১০৭ পৃষ্ঠায় লিখেছেঃ “ছায়ীদ বিন মাছাইয়েব (রহঃ) পঞ্চাশ বৎসর যাবত ও আবুল মোতামের (রহঃ) চল্লিশ বৎসর যাবত একই অজু দ্বারা এশা ও ফজরের নামায পড়েছেন।”  ১০৫ পৃষ্ঠায় এসেছেঃ “এক সৈয়দ সাহেব সম্বন্ধে বর্ণিত আছে,বার দিন পর্যন্ত একই অজুতে সমস্ত নামায আদায় করিয়াছেন এবং ক্রমাগত পনের বৎসর যাবত শোবার সুযোগ হয় নাই।” প্রশ্ন হলো,বার দিন একই অজুতে নামায! গাজাতে দম দিলেও মানুষ পুরাপুরি জ্ঞানশূণ্য হয় না। কিন্তু এখানে তো পুরাপুরি জ্ঞানশূণ্যতা! ধর্মশূণ্যতাও কি কম? বার দিন ধরে ঐ ব্যক্তির একবারও পায়খানা-প্রশ্রাবের প্রয়োজন পড়েনি? আরো বিস্ময়ের বিষয় হলো, বছরের পর বছর ধরে মসজিদের মেঝেতে বহু মানুষের সামনে “ফাজায়েলে আমাল” এই বইটি পাঠ করা হয়। এতবড় অবান্তর কথা কি কারো নজরে পড়েনি? এখানে অন্ধত্ব চোখের নয়, বরং অন্তরের। তাই বার বার পড়ার পরও তাদের অন্ধ মন তা দেখতে পায়নি। উক্ত বইয়ের ১২১ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, “হজরত জয়নুল আবেদীন (রহঃ) দৈনিক এক হাজার রাকাত নামায পড়তেন। বাড়ীতে বা ছফরে কোন অবস্থায় তাহার ব্যতিক্রম হত না।” প্রশ্ন হলো প্রতি রাকাতে কমপক্ষে এক মিনিট সময় লাগলে এক হাজার রাকাত নামায পড়তে হলে ১৬ ঘন্টার বেশী সময় লাগার কথা। ২৪ ঘন্টা মধ্যে ১৬ ঘন্টা নামাজে কাটালে বাঁকী কাজকর্ম কখন করলেন?

উদ্ভট কথাবার্তার আরেক ফিরিস্তি বর্নিত হয়েছে ১২২ পৃষ্ঠায়। বলা হয়েছে,“হযরত ওয়ায়েছ করনী  (রহঃ)বিখ্যাত বুজুর্গ ও তায়েবী ছিলেন। কোন কোন সময় সারা রাত্রি রুকুর হালাতে আবার কোন কোন সময় সিজদার অবস্থায় কাটাইয়া দিতেন।” কথা হলো, সারা রাত্র রুকু বা সিজদার হালতে থাকা কি আদৌ সম্ভব? ১২৪ পৃষ্ঠায় লিখিত হয়েছেঃ “বাহাজাতুন্নুফুছ গ্রন্থে বর্ণিত আছে, জনৈক বুজুর্গের সহিত এক ব্যক্তি সাক্ষাৎ করতে গেল। বুজুর্গ নামায শেষ করে নফলে লিপ্ত হলেন এবং আছর পর্যন্ত নফল পড়তে থাকেন। তারপর আছর পড়ে আবার জিকিরে মশগুল হলেন। আগন্তক বসে এন্তেজার করতে থাকে। তিনি মাগরিব পর্যন্ত জিকিরে মশগুল হন। তারপর এশা পড়িয়া ফজর পর্যন্ত জিকিরে কাটান। ফজরের নামাজান্তে জিকির ও অজিফা আদায় করতে করতে তাহার চোখে একটু তন্দ্রা আসলো। ক্ষণেক পরেই চক্ষু মলতে মলতে উঠে বসলেন এবং তওবা এস্তেগফার করতে করতে এ দোয়া পড়লেনঃ (অর্থ) “আল্লাহর নিকট পানাহ চাচ্ছি ঐ চক্ষু হতে যাহ ঘুমিয়ে তৃপ্ত হয় না।” নবীজী (সাঃ) দ্বীনের সে সিরাতুল মোস্তাকীম দেখিয়ে গেছেন এবং যে পথে নবীজী (সাঃ) নিজেও চলেছেন, সে পথের কোথাও কি এমন বর্ণনা আছে? সূফীগণ ধর্ম-কর্মের নামে এরূপ পথ নিজেরা আবিস্কার করে নিয়েছেন। আর তাবলিগ জামাত সেগুলোকেই তাদের সিলেবাসে অন্তর্ভূক্ত করেছেন। ফাজায়েলে আ’মাল যেন সে সিলেবাসেরই কিতাব। নবীজী (সাঃ)র হাদীস হলো,দ্বীনের ব্যাপারে প্রতিটি আবিস্কারই ফলো বিদয়াত।এবং বিদয়াতের পথ হলো মূলত জাহান্নামের পথ।

 

আল্লাহতায়ালার এজেণ্ডা ও তাবলিগএজেণ্ডা

রাতে এরূপ নফল নামায পড়ায় ও জিকিরে প্রচুর সওয়াব আছে বটে, তবে না পড়লেও কোন গুনাহ নেই। বেশী বেশী সওয়াবের কাজে তো তখনই কল্যাণ যখন গুনাহর কাজ থেকে বাঁচার একটি ব্যবস্থা হয়। এবং গুনাহর কাজ থেকে বাঁচার রাস্তা হলো ফরয আদায়। এবং গুরুত্বপূর্ণ ফরয হলো সমাজ ও রাষ্ট্রে আল্লাহর খলিফা রূপে দায়িত্বপালন। সেটি এক্বামতে দ্বীনের দায়িত্ব। একাজের মধ্যদিয়েই সমগ্র বিশ্ববাসীর উপর মুসলমানদের শ্রেষ্ঠত্ব। এক্বামতে দ্বীনের যে কোন প্রচেষ্টাই হলো আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ। জিহাদে আত্মনিয়োগের মধ্য দিয়েই  ঈমানদারীর আসল পরীক্ষা হয়। ঈমানদারের দাবীতে মানুষ যে প্রচণ্ড ভণ্ড হতে পারে সে প্রমাণ তো প্রচুর। সে ভণ্ডরা নবীজী (সাঃ)র যুগে যেমন ছিল, আজও  আছে। সে ভণ্ডামি ও ঈমানের নামে আত্ম-প্রবঞ্চনা দূর করতেই মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে প্রকৃত ঈমানদারের সংজ্ঞা ও মান ঠিক করে দিয়েছেন। মু’মিনের দায়িত্ব হলো সে সংজ্ঞা ও মানের সাথে নিজের কর্মকে মিলিয়ে দেখা। পবিত্র কোরআন হলো এক্ষেত্রে মহান আল্লাহর দেয়া মিযান বা দাড়িপাল্লা -যা দিয়ে যে কোন ব্যক্তি তার ঈমানদারি ও কর্মের ওজন করতে পারে। প্রকৃত ঈমানদারের সংজ্ঞাটি বেঁধে দেয়া হয়েছে এভাবেঃ “একমাত্র তারাই মু’মিন যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান আনে, এরপর আর সন্দেহ পোষন করে না এবং জীবন ও সম্পদ দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করে, তারাই (ঈমানদারির ব্যাপারি) সত্যবাদী।–(সুরা হুজরাত, আয়াত ১৫)। উপরুক্ত আয়াতে বলা হয়েছে, শুধু আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর অটল বিশ্বাসকে মু’মিন হওয়ার জন্য যথেষ্ঠ নয়। বরং শর্ত আরোপ করা হয়েছে,সে বিশ্বাসে কোন রূপ সংশয় রাখা যাবে না এবং বিশ্বাসের সাথে অবশ্যই জান ও মালের জিহাদ থাকতে হবে। নবীজী (সাঃ)র হাদীসে ইসলামের ৫টি খুঁটির কথা বলা হয়েছে। সে খুঁটিগুলির মাঝে ঈমান,নামায, রোযা, হজ ও যাকাত আছে,কিন্তু জিহাদ নেই। কিন্তু উপরের আয়াতে,প্রকৃত মু’মিন হওয়ার জন্য ঈমানের সাথে জিহাদের সংমিশ্রন ঘটানো হয়েছে। এভাবে ৫টি খুটিঁর মাঝে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খুঁটিটিকে ঈমান ও জিহাদের সম্মিলিত খুঁটি রূপে খাড়া করা হয়েছে।

মুসলমানদের কাজ মানুষকে শুধু নামাযে ডাকা নয়, বরং নামাযের সাথে সকল প্রকার ভাল কাজে ডাকা। তাছাড়া জনগণকে নির্দেশ দিতে হবে সৎ কাজে এবং রুখতে হবে খারাপ কাজ থেকে। আল্লাহর দরবারে সফলকাম হওয়ার জন্য এগুলোকে অপরিহার্য বলা হয়েছে। নির্দেশ দেয়া হয়েছেঃ “তোমাদের মধ্যে অবশ্যই একটি দল থাকতে যারা মানুষকে ভাল কাজে ডাকবে এবং ন্যায় কাজের নির্দেশ দিবে এবং খারাপ কাজ থেকে রুখবে। (প্রকৃত পক্ষে)তারাই তো সফলকাম। -(সুরা আল ইমরান,আয়াত ১০৪)। কিন্তু যেখানেই মানুষকে নির্দেশ দেয়া এবং তাদেরকে কোন কর্ম থেকে রুখবার প্রশ্ন এসে যায় সেখানে শক্তির প্রয়োজনীতাও দেখা দেয়। স্বৈরাচারি দুর্বৃত্তগণ তাদের অধিকৃত দেশে কোন সৎকাজে কাজে আদেশ বা অন্যায় কর্ম রুখবার নির্দেশ দেয়ার অধিকার দেয়া দূরে থাক, সত্য প্রচারের সুযোগটুকু দিতেও তো রাজী নয়। নবীজী(সাঃ) তাঁর ১৩ বছরের মক্কার জীবনে কি সে সুযোগ পেয়েছিলেন? ন্যায় কাজে আদেশ এবং অন্যায় কাজ থেকে রুখবার সুযোগও পাননি। কারণ, সে জন্য তাঁর হাতে রাজনৈতিক শক্তি ছিল না। কিন্তু সেগুলি তিনি মদিনায় গিয়ে করতে পেরেছিলেন। কারণ সেখানে তিনি ছিলেন রাষ্ট্রপ্রধান। একই কাজ তাঁর থেকে প্রাপ্ত অথোরিটির বলে সাহাবাগণও করতেনরই এমন অধিকার অন্যদের দেয় না। সেটি আইনগত অথোরিটির বিষয়।

সকল মানুষের মাঝে মুসলমানদের আল্লাহতায়ালা শ্রেষ্ঠ মানুষ রূপে চিত্রিত করেছেন। সেটি তাদের বর্ণ,ভাষা বা ভৌগলিক কারণে নয়। বরং তাদের জীবনের মিশন, ভিশন, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও কর্মের কারণে। আর সেটি হলো,তারা বাঁচবে শুধু নিজেদের কল্যাণে নয়,সমগ্র বিশ্ববাসীর কল্যানে। বিশ্ববাসীর কল্যাণ সাধনের মাঝেই তাদের নিজেদের কল্যাণ। তাদেরকে তারা ন্যায় কাজের হুকুম দিবে ও অন্যায় থেকে রুখবে এবং আল্লাহকে বিশ্বাস করবে।বলা হয়েছেঃ “তোমরাই হচ্ছো সবার মাঝে শ্রেষ্ঠ উম্মত; তোমাদের আবির্ভাব ঘটানো হয়েছে সমগ্র মানব জাতির (কল্যাণের) জন্য; তোমরা ন্যায় কাজের হুকুম দিবে, অন্যায় থেকে মানুষকে রুখবে এবং আল্লাহকে বিশ্বাস করো।” –(সুরা আল ইমরান আয়াত ১১০)। অমুসলমানদেরকে দাওয়াতের গণ্ডির বাইরে রাখাটি তাই ঈমানদারি নয়। বরং সেটি হলে তা হবে মহান আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। নবীজী (সাঃ) আজীবন কাফেরদের কাছে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন, এভাবে উপরুক্ত আয়াতে ঘোষিত হুকুমের প্রয়োগ করে গেছেন। কিন্তু সেটি উপেক্ষিত হচ্ছে তাবলিগজামাতের কাছে। উপেক্ষা করছে অধিকাংশ মুসলমানেরাও।

 

প্রয়োজন জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানো

সমস্যা হলো,ন্যায়ের আদেশ এবং অন্যায়ের প্রতিরোধ নিয়ে তাবলিগজামাতের নেতাকর্মীদের মাথা ব্যাথা নেই। তাদের আনন্দ বরং দেশে দেশে গাশত,চিল্লাহ,ফাজায়েলে আ’মাল পাঠ এবং বড় বড় ইজতেমা নিয়ে। ফলে দূর্নীতি ও দুষ্কর্মে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ন্যায় মুসলিম দেশগুলো পরিপূর্ণ হলে তা নিয়েও তাদের কোন দুশ্চিন্তা নেই। ১৯২৬ সালে ভারতে দুর্বল ঈমানের মুসলমানদের হিন্দু হওয়া থেকে বাঁচাতে তাবলিগজামাতের জন্ম হয়েছিল। কিন্তু মুসলমানদের প্রয়োজন তো তার চেয়ে অনেক বেশী। সেটি নিছক হিন্দু হওয়া থেকে বাঁচা নয়, বরং জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচা। হয়তো কিছু দোয়া-দরুদ শিখিয়ে বা গাশতে ও চিল্লাহ নামিয়ে অনেককেই হিন্দু হওয়া থেকে বাঁচানো যাবে। কিন্তু তা দিয়ে কি জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানো যাবে? হিন্দু হওয়া থেকে বাঁচা আর জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচা এক কথা নয়। আজকের ১৫০ কোটি মুসলমানের ক’জন হিন্দু হচ্ছে? তাদের সমস্যা তো পরিপূর্ণ মুসলমান না হওয়ায়। সমস্যা তো নবীজী (সাঃ)র সূন্নত মোতাবেক ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা না করায়। সমস্যা ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের নির্মূলে আত্মত্যাগী মোজাহিদ না হওয়ায়। আর এজন্য যা জরুরী তা হলো, কোরআনের জ্ঞানে নিজে আলোকিত হওয়া এবং সে সাথে অন্যদেরও আলোকিত করা। তাই মুসলমান শুধু অন্যদের নামাযে ডাকার জন্য বাঁচে না। লক্ষ্য শুধু নিজেদের নামায-রোযা-হজ-যাকাত আদায় বা গাশত,চিল্লাহ,কিতাব-পাঠ বা ইজতেমায় অংশ নেয়াও নয়। বরং তারা যেমন নিজেরা জাহান্নামের আগুণ থেকে বাঁচতে চায় তেমনি বিশ্ববাসীকেও বাঁচাতে চায়। একাজে তাদের অবলম্বন হলো পূর্ণ কোরআন।

আল্লাহতায়ালা চান,সকল প্রকার মিথ্যা,অন্যায় ও জুলুমের নির্মূল। চান তাঁর কোরআনী বিধানের বিশ্বব্যাপী বিজয়। একমাত্র এ বিধানটি বিজয়ী হলেই বিজয়ী হবে মানবতা। তখন প্রতিষ্ঠা পাবে বিশ্বশান্তি। মানব জাতির কল্যাণে কোরআনী বিধানের প্রতিষ্ঠা তাই মহান আল্লাহতায়ালার মূল এজেণ্ডা। সে বিজয় তিনি তাঁর কুদরত বলে নিমিষে সমাধা করতে পারতেন। হাজার হাজার মাইল ব্যাপী সুনামী যেমন আনতে পারেন,তেমনি ইসলামের বিজয়ও আনতে পারেন। কিন্তু তিনি চান, সে বিজয় আসুক মুসলমানদের হাত দিয়ে। এখানে ইস্যু ঈমানদারদের পরীক্ষা। আল্লাহর খলিফা রূপে মু’মিনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব এখানেই। আল্লাহর চান,মু’মিনের মেধা,শ্রম,অর্থ ও প্রাণের বিনিয়োগ হলো আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ। জিহাদের মাধ্যমে মু’মিন মূলত আল্লাহর এজেণ্ডার সাথে একাত্ম হয়। ঈমানের সবচেয়ে চুড়ান্ত পরীক্ষাটি হয় এখানেই। পরক্ষা হয়,কে দুনিয়াবী সুখস্বাচ্ছন্দের জন্য বাঁচে আর কে পরকালের সফলতার জন্য বাঁচে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে,“হে ঈমানদারগণ! তোমদের কি হয়েছে যে তোমদেরকে যখন বলা হয় আল্লাহর রাস্তায় বের হও তখন তোমরা ভারাক্রান্ত হয়ে মাটি আঁকড়ে থাক! তোমরা কি আখেরাতের বদলে দুনিয়ার জীবন নিয়েই পরিতুষ্ট? কিন্তু আখিরাতের তুলনায় দুনিয়ায় ভোগের সামগ্রী তো অতি সামান্যই। -(সুরা তাওবাহ,আয়াত ৩৮)। আজকের মুসলমানদের দ্বারা এ দায়িত্ব পালিত হয়নি বলেই আল্লাহর দ্বীন আজ দেশে দেশে পরাজিত,এবং মুসলিম দেশগুলিতে বিজয়ের বেশে সমাসীন হলো শয়তানী বিধান।

 

সমস্যা ঈমানশূন্যতার

তাবলিগ জামাত সর্বদা ঈমান-এক্বীনের কথা বলে। এ দুটিকে মজবুত করার কথাও বলে। কিন্তু কতটুকু সফল হয়েছে এ লক্ষ্যে? সামনে অন্যায় ও জুলুম হতে দেখলে ঈমানদারের দায়িত্ব হলো সামর্থ থাকলে হাত দিয়ে সেটি রুখা। হাতে শক্তি না থাকলে সেটি মুখ দিয়ে নিষেধ করা। সে সামর্থটি না থাকলে সে অন্যায়কে অন্তর দিয়ে ঘৃণা করা। আর এ ঘৃনাটুকু হলো সবচেয়ে কমজোর ঈমানের লক্ষণ। কিন্ত্র সমাজে ও রাষ্ট্রে সবচেয়ে বড় অপরাধটি ব্যক্তির উপর রাহাজানি নয়,দোকানপাঠ বা গৃহের উপর ডাকাতিও নয়। বরং সেটি হলো রাষ্ট্রের উপর ডাকাতি। কোন দেশে এমন কি শত শত ব্যক্তি, গৃহ বা দোকানের উপর ডাকাতি হলেও তাতে জাতি ধ্বংস হয় না। এমন ডাকাতি তো সবদেশেই ঘটে। কিন্তু জাতীয় জীবনে ধ্বংস,পরাজয় ও অপমান নেমে আসে যখন দেশ অধিকৃত হয় রাজনৈতিক দস্যুদের হাতে। মুসলিম উম্মাহর আজকের দুর্দশা তো এমন ডাকাতদের কারণেই। তাদের কাছে রাজনীতি নিছক ছদ্দবেশী ভনিতা। তারা শুধু রাষ্ট্রীয় তহবিলের উপর ডাকাতি করে না,জনগণের পকেটেও হাতে দেয়। হাত দেয় বিদেশ থেকে প্রাপ্ত সাহায্যের অর্থের উপরও। এসব রাজনৈতীক দস্যুদের স্বৈরাচারি শাসন ও লুন্ঠনের ফলে ১৫০ কোটির অধিক মুসলমান আজ  শক্তিহীন। ইসরাইলের ৪০ লাখ ইহুদীর যে শক্তি আছে সেটিও তাদের নেই। অতীতে এসব ডাকাতরাই লুটের সম্পদ দিয়ে তাজমহল,পিরামিড ও অসংখ্য প্রাসাদ গড়েছে। অধিকৃত মুসলিম ভূমিতে নিজেদের দখলদারি টিকিয়ে রাখার স্বার্থে তারা গড়ে তুলেছে সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামরিক অবকাঠামো।

 

মহান আল্লাহর শরিয়তি বিধানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় শত্রু হলো এসব রাজনৈতিক দস্যুরা;কারণ শরিয়তের প্রতিষ্ঠায় তাদের স্বৈরাচারি সম্ভোগে যেমন ছেদ পড়ে,তেমনি তাদের হাতও কাটা পড়ে। সামর্থ থাকলে ঈমানদারের উপর ফরজ হলো,এ দুর্বৃত্ত ডাকাতদের সর্বশক্তি দিয়ে রুখা। তাদের কাজ শুধু রাতে দোয়া-দরুদ ও নফল নামায আদায় নয়,এসব ডাকাত তাড়ানোও। নবীজী (সা)র আমলে এসব ডাকাতরা বার বার মুসলিম ভূমি দখলে নেয়ার চেষ্টা করেছে। বদর,ওহুদ, খন্দক, হুনায়ুনের যুদ্ধে তারা সর্বশক্তি নিয়ে হাজির হয়েছিল। সে আমলে মুসলমানদের সবচেয়ে বেশী অর্থ,শ্রম ও রক্তের ব্যয় ঘটেছে এ ডাকাতদের নির্মূল করতে। মু’মিনের দায়িত্ব,লড়াইয়ের শক্তি যদি না থাকে কথার সাহায্যে প্রতিবাদ করা। সে সামর্থ্যটুকুও না থাকলে তার উচিত এ ডাকাতদের মনেপ্রাণে ঘৃণা করা। হাদীসে পাকে বলা হয়েছে, এ ঘৃণাটুকু হচ্ছে ঈমানের সর্বনিম্ম পর্যায়। ঘৃণা না থাকার অর্থ ঈমানশূন্যতা। তবে প্রশ্ন হলো, এসব রাজনৈতিক ডাকাতদের দলে ভিড়ে যারা তাদের পক্ষে লড়াই করে,বা তাদেরকে ভোট দিয়ে বিজয়ী করে তাদেরকে কি বলা যাবে? তাপমাত্র নীচে নামতে থাকলে সেটি শূণ্যে এসে থেমে যায় না, শূণ্যেরও নীচে নামতে পারে। তেমনি শূণ্যের নীচে নামতে পারে ঈমানও। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের ঘৃণা করার বদলে তাদেরকে যারা ভোট দিয়ে বিজয়ী করে তারা কি সে শ্রেণীর নয়?

 

উল্লাস দুষমনদের

প্রশ্ন হলো,মুসলিম ভূমির অধিকৃত অবস্থা ও আল্লাহর শরিয়তের পরাজয় নিয়ে তাবলিগ জামাতের নেতাকর্মীদের কি দুঃখ্যবোধ আছে? যে দস্যুদের হাতে মুসলিম ভূমি আজ  অধিকৃত এবং যারা অসম্ভব করে রেখেছে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা -সে আগ্রাসী দস্যুদের বিরুদ্ধে কি তাদের কোন প্রতিবাদ আছে? মুসলমানদের আজকের বিশ্বজুড়া পরাজয়ই একমাত্র গ্লানি নয়, মুসলমানরা আজ লাশ হচ্ছে আফগানিস্তান, কাশ্মীর,ফিলিস্তিনসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে। দেশে দেশে মুসলিম রমনীরা ধর্ষিতাও হচ্ছে। এমন পরাজয় ও অপমানের মাঝে তারা কিসসা শুনাচ্ছেন কোন সুফি কত রাকাত নফল নামায পড়েছেন বা কতরাত না ঘুমিয়ে কাটিয়েছেন সেটির। অথচ মুসলিম ভূমি ইসলামের বিপক্ষ শক্তির হাতে অধিকৃত হলে এবং ূভআল্লাহর শরিয়তী বিধান অপসারিত হলে মুসলমানদের উপর ফরজ হয়ে পড়ে সে ভূমি মূক্ত করায় এবং সেখানে শরিয়তের প্রতিষ্ঠায় সর্বশক্তি নিয়ে আত্মনিয়োগ করায়। ঈমানদারি শুধু আল্লাহর উপর বিশ্বাস নয়,তাঁর কোরআনী বিধানের ন্যায্যতা ও শ্রেষ্ঠতার উপর বিশ্বাসও। অপরদিকে কুফরি শুধু মুর্তিপুজা নয়। সেটি শুধু বিদ্রোহী শয়তানের আনুগত্যও নয়। বরং সেটি আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের উপর প্রতিষ্ঠিত সকল নেতৃত্ব, শাসনতন্ত্র,আইন-আদালত,ব্যাংক-বীমা এবং শিক্ষা-সংস্কৃতিকে মেনে নেয়াও। নবীজীর আমলে ঈমানদারগণ শুধু কাফেরদেরই নির্মূল করেনি, বর্জন করেছিল তাদের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক প্রথাকেই। তারা  শুধু আল্লাহতায়ালা ও তাঁর কিতাব ও রাসূলকেই মেনে নেননি। মেনে নিয়েছিলেন তাঁর দেয়া শরিয়তি বিধানকেও। সে বিধানের প্রতিষ্ঠায় তাদেরকে জানমালের বিপুল কোরবানীও পেশ করতে হয়েছিল।

নবীজী (সাঃ)শুধু কোরআন পাঠ,নামায-রোযা,হজ-যাকাত,দান-খয়রাত ও নফল ইবাদতের সূন্নতই রেখে যাননি,রেখে গেছেন রাষ্ট্র পরিচালনা,রাষ্ট্রে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা,বিচার-কাজ, যুদ্ধ-বিগ্রহ এবং নিজ হাতে শত্রু-নিধনের সূন্নতও। সাহাবায়ে কেরাম তো সেগুলোকেও আঁকড়ে ধরেছিলেন। নানা বিভ্রান্তির মাঝে সে সূন্নতগুলো আজও  সিরাতুল মোস্তাকীমের পথ দেখায়। কিন্তু তাবলিগজামাতের নেতাকর্মীদের মাঝে সে সূন্নতগুলো নিয়ে চিন্তা-ফিকর কই? চিন্তুা-ফিকির যে নাই সেটি ধরা পড়ে যেমন তাদের বক্তব্যে,তেমনি কর্মে। দেশের রাজনৈতীক পরিবর্তন নিয়ে তাদের সামান্যতম আগ্রহ নেই। আগ্রহ নেই ইসলামের শত্রুপক্ষের দখলদারি থেকে দখলদারি মুক্তির। তাদের দাবী, রাজনীতিতে অংশ গ্রহণ না এনেই তারা রাষ্ট্রে পরিবর্তন আনবেন! সেটি আনবেন জনগণের ঈমান-একীন ঠিক করে। কথ হলো, এমন কাণ্ড কি মানব-ইতিহাসের কোথাও কি ঘটেছে? রাষ্ট্র পবিচালনা হলো নবীজীর (সাঃ) জীবনে সবচেয়ে দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী সূন্নত। এ সূন্নত সামান্যক্ষণের খুশবা মাখা, মেছওয়াক করা বা কুলুফ লাগানোর নয়। মুসলমানদের সর্বাধীক অর্থক্ষয়,রক্তক্ষয় ও জীবনক্ষয় হয়েছে এ সূন্নতকে ধরে রাখতে। সে সূন্নত ধরে রেখেছিলেন খোলাফায়ে রাশেদা। ইসলামের শত্রুদের সাথে মুসলমানদের মূল যুদ্ধটি এক্ষেত্রে। আজও  মুসলিম বিশ্বের কোনে কোনে যে রক্তক্ষয়ী জিহাদ চলছে সেটি তো দেশী-বিদেশী দুষমনর হাত থেকে অধিকৃত মুসলিম ভূমিকে মূক্ত করার লক্ষ্যে।অথচ তাবলিগজামাতের নীতি অনুসৃত হলে বিলুপ্ত হবে আফগানিস্তান,কাশ্মীর,ফিলিস্তিন,ইরাক,চেচনিয়াসহ নানা মুসলিম দেশ থেকে চলমান জিহাদও। এতে শত শত বছরের জন্য শত্রুর দখলে চলে যাবে মুসলিম ভূমি। তখন শুধু বেঁচে থাকবে গাশত,চিল্লাহ,ইজতেমা এবং ফাজায়েলে আমলের কিসসা পাঠ। ইসলামের শত্রুদের তখন আর কোন প্রতিদ্বন্দিই থাকবে না। এতে বিজয় ও প্রচণ্ড উল্লাস বাড়বে শত্রু শিবিরে।মুসলমানদের আজ যে পরাজিত অবস্থা তখন সেটি আরো তীব্রতর,গভীরতর ও দীর্ঘতর হবে। এজন্যই কি ফ্যাসিস্ট,সেক্যুলারিস্ট,সোসালিস্ট,ন্যাশনালিস্ট,আগ্রাসী ভারত,ইসরাইল ও পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদী মহলসহ তাবত ইসলাম বিরোধী মহল তাদের ইসলাম নিয়ে এত খুশি? ১৮/০২/১২,দ্বিতীয় সংস্করণ ২৫/০১/২০১৩।