শেখ মুজিবের লিগ্যাসী ও মহাসংকটে বাংলাদেশ

আওয়ামী রাজনীতির নাশকতা

প্রত্যেক নেতাই তার অনুসারিদের জন্য লিগ্যাসী তথা অনুকরণীয় শিক্ষা রেখে যায়। সে লিগ্যাসী বেঁচে থাকে অনুসারিদের রাজনীতি, সংস্কৃতি ও আচার-আচরণে। তেমন এক লিগ্যাসী শেখ মুজিবও রেখে গেছেন। বাংলাদেশে আজ  যে আওয়ামী-বাকশালীদের দুঃশাসন চলছে তার শুরু শেখ হাসিনা থেকে নয়, আজকের আওয়ামী লীগও নয়; বরং এর শুরু শেখ মুজিরেব হাতে। আজও  তা চলছে মুজিবের ঐতিহ্য ধরে। আওয়ামী লীগের সর্বসময়ের ভাবনা সে মুজিবী ঐতিহ্য আঁকড়ে থাকায়। গাছ যেমন শিকড় থেকে শক্তি সঞ্চয় করে আজকের আওয়ামী লীগও তেমনি বল পাচ্ছে সে মুজিবী ঐতিহ্য থেকে। রোগব্যাধী ও ক্যান্সার সব সময়ই একই রূপ সিম্পটম নিয়ে হাজির হয়। যক্ষা আজ থেকে দশ বছর আগে যেরূপ উপসর্গ নিয়ে হাজির হতো আজও সেরূপই আসে। আগামীতেও একই ভাবে আসবে। বাংলাদেশের ইতিহাসে আওয়ামী লীগ এক ভয়ানক রোগ। ফলে দলটি যখনই ক্ষমতায় আসে তখন একাকী আসে না,সাথে আনে তার স্বভাবজাত সিম্পটমও। আনে ভয়ানক আযাব। সে আযাবের কারণে ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫’য়ে যেরূপ ভয়ানক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছিল,দেশটির সমগ্র ইতিহাসে আর কোন কালেই তেমনটি ঘটেনি। তাতে যে শুধু গণতন্ত্র, সুশাসন, মৌলিক মানবিক অধিকার মারা গিয়েছিল তা নয়, বরং ভয়ানক দুর্ভিক্ষ ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসে মারা পড়েছিল লক্ষাধিক মানুষ। দলটির ২০০৮-য়ের বিজয় এবং ২০১৪ ও ২০১৮ সালের ভোট-ডাকাতির নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য কল্যাণ বয়ে আনেনি, বরং নামিয়ে এনেছে হত্যা-গুম-ধর্ষণ-সন্ত্রাস ও জেল-জুলুমের এক ভয়ানক দুঃশাসন।

যক্ষা-কলেরার ন্যায় কোন সংক্রামক রোগ-ব্যাধীকে বুঝতে হলে প্রথমে তার জীবাণুকে সনাক্ত করতে হয়। তেমনি আওয়ামী লীগের দুঃশাসন বুঝতে হলে বুঝতে হয় তার মূল জীবাণুকে। আর সে ঘাতক জীবাণুটি হলো শেখ মুজিব নিজে। এবং সেটি আজও  বেঁচে আছে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মাঝে। প্রতিটি বিধ্বংসী জীবাণুরই নাশকতা থাকে,মুজিবের ক্ষেত্রে সে নাশকতাটি হলো তাঁর বিনাশী রাজনৈতিক চেতনা। সে চেতনা শুধু চরিত্রেরই বিনাশ ঘটায় না,দেশ ও দেশের সংস্কৃতিরও বিনাশ ঘটায়। সে মুজিবী চেতনায় আনন্দ ও উৎসব দেশ ভাঙ্গাতে,গড়াতে নয়। সর্ববৃহৎ মুসালিম রাষ্ট্র পাকিস্তান ভাঙ্গাতে তারা যেমন বিপুল আনন্দ পেয়েছে,এখন আনন্দ পাছে বাংলাদেশের বিনাশে। সে মুজিবী নাশকতার বাংলাদেশে প্রথম প্রকাশ ঘটেছিল তাঁর বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তরের দুঃশাসনে। কোন দেশপ্রেমিক নেতাই দেশের এক ইঞ্চি ভূমি শত্রুর হাতে তুলে দেয়ে না। অথচ মুজিব আনন্দ চিত্তে বাংলাদেশের ভূমি বেরুবাড়ি ইউনিয়ন ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিল। মুজিবের মৃত্যু ঘটেছে, কিন্তু তাঁর সে ঘাতক রাজনীতি মারা পড়েনি। বরং আজও  সে রাজনীতি অবিকল বেঁচে আছে তাঁর কন্যা শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের রাজনীতির মাঝে।

১৯৭৫য়ে মুজিবের মৃত্যু এবং ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬-অবধি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা থেকে তাঁর দলের দূরে থাকার ফলে মুজিবের স্বপ্নের সে রাজনীতি ও তাঁর কুকীর্তিগূলো আত্মভোলা বাঙালীদের অনেকেই ভূলে গিয়েছিল। ইতিমধ্যে অনেকেই ভূলে গিয়েছিল তাঁর একদলীয় বাকশালী স্বৈরাচার,দলীয় ক্যাডারদের সন্ত্রাস,রক্ষিবাহিনীর অত্যাচার,ইসলামি শিক্ষা ও রাজনীতি-বিরোধী নীতি,সীমাহীন ভারতীয় লুণ্ঠন,১৯৭৪য়ের ভয়ানক দুর্ভিক্ষ,সে দুর্ভিক্ষে লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যু এবং অসংখ্য জালপড়া বাসন্তির কথা। সে স্মৃতি প্রবীনদের মাঝে কিছুটা বেঁচে থাকলেও নতুন প্রজন্মের তা জানার সুযোগ জুটেনি। এতে প্রচণ্ড লাভ হয়েছিল শেখ মুজিবের। তিনি অনেকের মনে বেঁচে ছিলেন নিজে যা নন তার চেয়েও এক বিশাল পরিচয় নিয়ে। কিন্তু আজ আবার সে মুজিবী শাসনের সে স্মৃতি বাংলাদেশে নেমে এসেছে ভয়ানক তাণ্ডব নিয়ে। ফলে সুযোগ মিলেছে আওয়ামী-বাকশালীদের চরিত্রকে পুনরায় দেখার।

 

মুজিবের অপরাধ

মুজিবের অপরাধের তালিকাটি বিশাল। তাঁর বিশ্বাসঘাতকতা শুধু গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে নয়।সেটি বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্ব ও ইজ্জতের বিরুদ্ধেও। তিনি বিশ্বমাঝে বাংলাদেশের অপমান বাড়িয়েছেন নানা ভাবে। শায়েস্তাখানের সমৃদ্ধ বাংলাদেশকে তিনি বিশ্বের দরবারে ভিক্ষার তলাহীন ঝুলি রূপে পরিচিত করেছেন। তিনিই সর্বপ্রথম কেড়ে নিয়েছিলেন বাকস্বাধীনতা এবং বন্ধ করেছিলেন সকল বিরোধী পত্রিকা। গণতন্ত্রকে তিনি কবরস্থানে পাঠিয়েছিলেন এবং উপহার দিয়েছিলেন প্রকাণ্ড দুর্ভিক্ষের। দেশের ভূমি বেরুবাড়ি তুলে দেয়ার পাশাপাশি ভারতকে দিয়েছিলেন পদ্মার উপর ফারাক্কা বাঁধ দিয়ে পানি তুলে নেয়ার অধিকার। দেশকে তিনি পরিণত করেছিলেন ২৫ সালা দাসচুক্তিতে আবদ্ধ ভারতের আজ্ঞাবহ এক করদ রাজ্যে। আওয়ামী ‍‌‌‌লীগের দুঃশাসন নিয়ে ‌‍‍‍‌‌‌‍‌‌‌‌‌‍‍‍‍‍‌‌‌‌‌‌জনাব বদরুদ্দিন উমর লিখেছেন,“একাত্তরের ‍‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍যুদ্ধকালীন ৯ মাস ছাড়া পাকিস্তান আমলের কোন কালেই অবস্থা এতটা খারাপ ছিল না যা আওয়ামী শাসনামলে হয়েছে।”

শেখ মুজিব ১৯৭০’য়ের নির্বাচনে ভোট নিয়েছিলেন বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে,কিন্তু ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে সে বহুদলীয় গণতন্ত্রকে তিনি কবরস্থানে পাঠিয়েছিলেন। গণতন্ত্রের সাথে এতবড় গাদ্দারি ও দুষমনি পাকিস্তানী আমলে যেমন হয়নি,ঔপনিবেশিক শাসনামলেও হয়নি। পাকিস্তানী আমলে যেমন আওয়ামী লীগ ছিল, তেমনি মুজিবের রাজনীতিও ছিল। ছিল আওয়ামী লীগের দলীয় পত্রিকা ইত্তেফাক। সে সময় ভারতের সাথে আগরতলা ষড়যন্ত্র করেও তিনি পাড় পেয়ে গিয়েছিলেন। ব্রিটিশ আমলেও মুসলিম লীগ ও কংগ্রেসের ব্রিটিশ-বিরোধী রাজনীতি ছিল। কিন্তু মুজিবের শাসনামলে সেসব ছিল না; বিরোধী দলের জন্য কোনরূপ স্থান ছেড়ে দিতে রাজী ছিলেন না। গণতন্ত্র বলতে তিনি বুঝতেন তাঁর নিজদলের স্বৈরশাসন। বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের জন্য জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে বেঁচে থাকাই তিনি কঠিন করেছিলেন। তাদের সায়েস্তা করতে তিনি পুলিশ ও তাঁর দলীয় সন্ত্রাসী বাহিনীর বা্ইরেও সেনা বাহিনীর ন্যায় বিশাল এক রক্ষিবাহিনী গড়েছিলেন। তাদের দিয়ে তিনি প্রায় তিরিশ হাজার রাজনৈতিক কর্মীদের হত্যার ব্যবস্থা করেছিলেন।

 

বিশ্বাসঘাতকতা ইসলামের বিরুদ্ধে

মুজিবের বিশ্বাসঘাতকতা ইসলামের সাথেও কম ছিল না। ১৯৭০য়ের নির্বাচনে তিনি ভোট নিয়েছিলেন এ ওয়াদা দিয়ে যে,তাঁর দল ক্ষমতায় গেলে ইসলাম বিরোধী কোন আইন প্রণয়ন করবে না।-(সূত্রঃ আওয়ামী লীগের ১৯৭০’য়ের নির্বাচনি মেনিফেস্টো)। অথচ ক্ষমতায় যাওয়ার আগেই তিনি প্রকাণ্ড হারাম কাজ করলেন একটি মুসলিম দেশে ভেঙ্গে। আর ক্ষমতায় গিয়েই নিষিদ্ধ করলেন ইসলাম প্রতিষ্ঠার নামে সংগঠিত হওয়াকে। ইসলামী চেতনার  বিরুদ্ধে এর চেযে বড় গাদ্দারি ও বিশ্বাসঘাতকতা আর কি হতে পারে? মুসলিম হওয়ার অর্থই হলো ইসলামের প্রতিষ্ঠায় সর্বতোভাবে সচেষ্ট হওয়া এবং মুসলিমদের শক্তিবৃদ্ধিতে আত্মনিয়োগ করা। শক্তিবৃদ্ধির কাজে মুসলিমগণ যে সে শুধু সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তিই বাড়াবে তা নয়, তারা দেশের ভূগোলও বাড়াবে। সে কাজে অর্থ দিবে, শ্রম দিবে এবং মেধা দিবে। প্রয়োজনে রক্ত তথা প্রাণও দিবে। স্বয়ং নবীজী (সাঃ)এবং তারা সাহাবীগণ তো সেটাই করেছিলেন। শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবা সে মিশন নিয়ে শহীদ হয়েছেন। ইসলামের প্রসার এবং মুসলিম রাষ্ট্রের ভূগোল ও শক্তিবৃদ্ধির সে তাগিদ নিয়েই তুর্কি যুবক ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি বাংলার বুকে এসেছিলেন বহু হাজার মাইল দূর থেকে। অথচ মুজিব চলেছেন উল্টোপথে। মুসলিমদের রাষ্ট্রকে ক্ষুদ্রতর করা, মুসলিম রাষ্ট্রের অর্থনীতি ধ্বংস করা এবং সে রাষ্ট্রে ইসলামের প্রতিষ্ঠাকে প্রতিহত করার মিশন নিয়ে রাজনীতিতে নেমেছিলেন শেখ মুজিব। অথচ এরূপ কাজ কোন মুসলিমের হতে  পারে না, দেশে দেশে এরূপ কাজ করে ইবলিস শয়তান ও তার এজেন্টগণ। এতে অপরাধ আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও যুদ্ধ ঘোষণার। কারণ মুসলিম রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও মালিকানা একমাত্র মহান আল্লাহর; শাসকগণ প্রতিনিধি মাত্র। “লা তাফারাক্কু” অর্থ পরস্পরে বিভক্ত হয়োনা –এটি মহান আল্লাহর হুকুম। তাই কোন মুসলিম রাষ্ট্রের মুসলিম নাগরিক দেশভাঙ্গায় যুদ্ধে নামবে সেটি ভাবা যায় না। তাই একাত্তরে কোন আলেম বা ইসলামী দলের কোন কর্মী পাকিস্তান ভাঙ্গায় অংশ নেয়নি। কোন মুসলিম রাষ্ট্রও একাজে সহায়তা দেয়নি। সেটি ছিল নিতান্তুই ইসলামি চেতনাশূণ্য সোসালিস্ট, ন্যাশলিস্ট, ‌সেক্যুলারিস্ট ও হিন্দুদের প্রজেক্ট। প্রকৃত ঈমানদারগণ এটিকে সেদিন কবিরা গুনাহ ভেবেছে। বরং এ দেশ বাঁচানোকে তারা জিহাদ ভেবেছে। অথচ াবাভাআলসে বিদ্রোহ ও  যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন স্বয়ং মুজিব। এভাবে আবির্ভূত হয়েছিলেন শয়তানের এজেন্ট রূপে। ইসলাম-দুষমণ ভারতীয় সরকার এজন্যই এতটা প্রাণখুলে মুজিবকে সহায়তা দিয়েছিল।

ক্ষমতালাভের পর মুজিব কম্যুনিষ্টদেরও রাজনৈতীক অধিকার দিয়েছিলেন। দলগড়া এবং সংগঠিত হওয়ার অধিকার দিয়েছিলেন ক্যাপিটালিস্ট,ন্যাশনালিস্ট,সেক্যুলারিস্ট এবং হিন্দু-বৌদ্ধ-খৃষ্টানদেরও। কিন্তু সে অধিকার তিনি দেশের ইসলামপন্থিদের দেননি। ইসলামপন্থিদের উপর এমন কঠোর নিয়ন্ত্রণ এমনকি ব্রিটিশ শাসনামলেও ছিল না। তিনি কোরআনের আয়াত সরিয়েছেন রেডিও-টিভি ও বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাবোরর্ডের মনোগ্রাম থেকে। যেসব প্রতিষ্ঠানের নামে ইসলাম ও মুসলিম শব্দ দেখেছেন তিনি সে দু’টি শব্দও সরিয়ে দিয়েছেন। ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রাম থেকে “ইকরা বিসমে রাব্বিকা” শব্দটিও সরিয়ে দিয়েছেন। আজ একই পলিসি নিয়ে রাজনীতিতে নেমেছেন তাঁর কন্যা শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনা সংবিধান থেকে “আল্লাহর উপর আস্থা”র প্রকাশটি বিলুপ্ত করেছেন। অথচ প্রতি কর্মে ও প্রতি পদে আল্লাহর উপর আস্থাটি ঈমানের স্বতঃস্ফুর্ত প্রকাশ।আগুণ যেমন উত্তাপ দিবেই, মু’মিনের ঈমান তেমনি মহান আল্লাহর উপর আস্থার প্রকাশ ঘটাবেই। মু’মিন ব্যক্তি তাই কথায় কথায় ইনশাল্লাহ বলে। মুসলমানদের সংবিধানে তাই “আল্লাহর উপর আস্থা”র কথাটিও থাকে। কিন্তু আওয়ামী-বাকশালীদের সেটি সহ্য হয়নি।

 

ব্যর্থতা শত্রু-মিত্র চেনায়

ধর্ম নিয়ে বাঁচতে হলে জরুরী হয় অধর্মকে জানা। নইলে ধর্ম বাঁচে না। হালালের সাথে হারামের বিধান জানা এজন্যই ইসলামে ফরজ। সমাজে চোর-ডাকাত-ঘুষখোর-ব্যাভিচারিদের চেনা ও তাদের শাস্তিদানের কাজটি যথার্থ না হলে সে সমাজে বসবাস অসম্ভব হয়ে পড়ে। রাজনীতিতেও তেমনি ফরজ হলো ইসলাম,দেশ ও গণতন্ত্রের শত্রুদেরও জানা এবং জনগণের সামনে তাদেরকে পরিচিত করে দেয়া। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি না নিয়েও প্রাণে বাঁচা যায়, কিন্তু কে শত্রু আার কে মিত্র -এ জ্ঞানটুকু না থাকলে দেশ তখন রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের হাতে অধিকৃত হয়। জনগণকে তাই শুধু নামায-রোযার মাসলা-মাসায়েল,অক্ষর জ্ঞান বা পাটিগণিতের হিসাব-নিকাশ শেখালে চলে না। রাজনৈতিক জ্ঞানদানও জরুরী। সমাজের আবু লাহাব,আবু জেহলদের ন্যায় দুর্বৃত্তদেরও চিনতে হয়। অথচ বাংলাদেশে সে জ্ঞানলাভ ও জ্ঞানদানের কাজটিই হয়নি। এ দায়িত্বটি ছিল দেশের লেখক, বুদ্ধিজীবী, আলেম সমাজ ও রাজনীতিবিদদের। কিন্তু তারা সে দায়িত্বপালনে ব্যর্থ হয়েছেন। দেশ ও জনগণের শত্রুমিত্র চেনায় প্রচণ্ড ফাঁকি রয়ে গেছে। ফলে দেশ,গণতন্ত্র ও ইসলামের চরম শত্রুগণ ঢুকে পড়েছে দেশের রাজনীতি ও প্রশাসনে। বাংলাদেশ আজ  বিষাক্ত শাপদের হাতে তাই কুক্ষিগত।দেশ ও দেশের জনগণ এখন এদের হাতে আষ্টেপৌড়ে আবদ্ধ। এদের বিষাক্ত ছোবলে বিষাক্ত হয়ে উঠেছে সমগ্র প্রশাসন।

 

শত্রুপক্ষের বিনিয়োগ ও বিজয়

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামে শত্রুপক্ষ বহুদূর এগিয়ে গেছে। দেশের রাজনীতিতে তারাই বিজয়ী পক্ষ। মুজিব তার শাসনামলে এতটা প্রতিষ্ঠা পাননি, যতটা প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন আজ । হাজার হাজার মন্দিরের পুরাহিতগণ দিবারাত্র খাটলে শাপ-শকুন ও গরু-বাছুড়ের ন্যায় জানোয়ারকেও ভগবান রূপে প্রতিষ্টা দেয়া য়ায়। পুরুষের লিঙ্গকেও পুজনীয় করা যায়। এভাবে পরাজিত করা যায় মহান আল্লাহর দ্বীনকে।শয়তানের বিপুল সংখ্যক এজেন্ট তো দিবারাত্র একাজটিই করে। হিটলার, মুসোলিনি,বুশ, ব্লেয়ারের ন্যায় নিষ্ঠুরগণও তো এভাবে নেতারূপে স্বীকৃতি পেয়েছে। বাংলাদেশে তো সেটিই ঘটেছে। ফলে দেশে ১৫ কোটি মুসলমান থাকতে মহান আল্লাহর শরিয়তী বিধান আস্তাকুঁড়ে গিয়ে পড়েছে। আর আদালতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে কাফেরদের রচিত আইন। -যে আইনে সূদ নিষিদ্ধ নয়। নিষিদ্ধ নয় পতিতাবৃত্তি। বরং এ আইন মোতাবেক রাষ্ট্রীয় ভাবে প্রহরা দেয়া হয় সূদী ব্যংক ও পতিতাপল্লিকে। শেখ মুজিবের ন্যায় ইসলামবিরোধী, মানবতাবিরোধী ও গণতন্ত্রহত্যাকারি নিষ্ঠুর স্বৈরাচারি ব্যক্তি তো প্রতিষ্ঠা পেয়েছে সে পথেই। এবং আজ  তাঁর প্রতিষ্ঠা বাড়াতে আদালতের বিচারকদেরও লাঠিয়াল রূপে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাঁকে স্বাধীনতার ঘোষক ও জাতির পিতা বলতে হবে –এরূপ হুকুম জারি করা হচ্ছে এখন আদালতের কক্ষ থেকে। অথচ বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তরের শাসনামলে এমনটি ছিল না। তখন কেউ তাকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী বলেনি। তাঁর প্রতি সম্মান দেখানোর হুকুম দিয়ে আদালত থেকেও সেদিন ফরমান জারি হয়নি।

 

বিজয়ী শয়তানের এজেন্ডা

মানুষ মাত্রই স্বপ্ন দেখে। প্রতেক্যের জীবনে নিজেকে নিয়ে এবং দেশকে নিয়ে কিছু ভাবনাও থাকে। জীবন ও জগত নিয়ে কাফের যেমন স্বপ্ন দেখে, তেমনি ঈমানদারও স্বপ্ন দেখে। তবে ঈমানদার ও বেঈমানের স্বপ্ন কখনো এক নয়। স্বপ্ন বা ভাবনার মধ্যেই ব্যক্তির আসল পরিচয়। এখানে পরিচয় মেলে যেমন ঈমানদারির, তেমনি বেঈমানীরও। স্বপ্ন ও ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় রাজনীতির। তাই স্বপ্ন ও ভাবনা না থাকলে ব্যক্তির রাজনীতি থাকে না। পশুর সেটি থাকে না বলে পশুর পরিচয় নিছক পশু রূপে। পশুর আস্তাবলে তাই রাজনীতির জন্ম হয়না। বস্তুতঃ রাজনীতি হলো মানুষের স্বপ্ন পূরণের হাতিয়ার। সে স্বপ্ন পূরণে ব্যক্তি যেমন কর্মে নামে,তেমনি রাজনীতিতেও আত্মনিয়োগ করে। সময়,শ্রম,অর্থ,মেধার পাশাপাশি এমনকি নিজের জীবনও বিণিয়োগ করে। মুসলমান তো সে স্বপ্ন পূরণে শহীদও হয়। শহীদের রক্ত এখানে শক্তিশালী অস্ত্র হিসাবে কাজ করে। মহান আল্লাহর কাছে ব্যক্তির শহীদ হওয়াটাই তাঁর জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন। কারণ ব্যক্তি এখানে প্রাণ দেয় ব্যবসা বা সম্পত্তি বাড়াতে নয়,বরং আল্লাহর দ্বীনের বিজয় বাড়াতে। ফলে মহান আল্লাহর কাছে এর চেয়ে বড় নেককর্ম নেই। এমন নেককর্মের বিনিময়ে মু’মিন ব্যক্তিটি রেহাই পাবে আখেরাতে বিচারের কাঠগড়ায় জবাবদেহী থেকে। অথচ সে বিচার থেকে অন্যকারো এত সহজে রেহাই নেই।

মু’মিনের জীবনে এখানে যে স্বপ্ন বা ভাবনাটি কাজ করে সেটি আল্লাহর দ্বীনের বিজয়ের ভাবনা। এখানে আল্লাহর এজেণ্ডার সাথে মু’মিন তাঁর নিজের বাঁচার এজেণ্ডাকে এক করে ফেলে। সে তখন পরিণত হয় হিজবুল্লাহ বা আল্লাহর বাহিনীর মুজাহিদ। তার জীবনে শুরু করে জিহাদ। মহান আল্লাহর সে সর্বকালীন এজেণ্ডাটি ঘোষিত হয়েছে এভাবেঃ “তিনিই সেই মহান আল্লাহ যিনি সঠিক পথ ও সত্যদ্বীনসহ রাসূলকে প্রেরণ করেছেন এ জন্য যে তাঁর দ্বীন যেন সকল ধর্ম ও মতের উপর বিজয়ী হয়।” সুরা সাফ আয়াত ৯, সুরা তাওবাহ আয়াত ৩৩, সুরা ফাতহ আয়াত ২৮)। তাই আল্লাহর দ্বীনকে ন্যাশনালিজম, ক্যাপিটালিজম, সোসালিজম,সেক্যুলারিজম,হিন্দুধর্ম, খৃষ্টানধর্ম ও অন্য কোন ধর্মের উপর বিজয়ী করার জিহাদটি কোন মৌলবাদী রাজনৈতিক দলের বা কোন মৌলানা-মৌলভীর এজেণ্ডা নয়। বরং সেটি খোদ মহান আল্লাহর। ঈমানদার হওয়ার শর্ত্বই হলো মহান আল্লাহর সে এজেণ্ডার সাথে পুরাপুারি একাত্ব হয়ে যাওয়া। সে এজেণ্ডার যে কোন বিরোধীতাই কুফরি বা বেঈমানী। এমন বিরোধীতা মূলত শয়তানের কাজ। অথচ তেমন বিরোধীতায় নেমেছিলেন শেখ মুজিব। শেখ হাসিনা ও তার বাহিনীর হাতে আজও সেটাই হলো মুজিবের লিগ্যাসী।

 

দখলদারি শয়তানের

শয়তান মানুষকে শুধু নামায-রোযা থেকে বিচ্যুত করে না,বরং তার মূল টার্গেটটি রাজনৈতীক অঙ্গনের উপর দখলদারি। কারণ যে কোন জনগণ বা উম্মাহ শক্তি পায় তার রাজনীতি থেকে। শয়তানী শক্তির হাতে রাজনীতির ময়দানটি অধিকৃত হলে ধর্মপালন ও মসজিদ-মাদ্রাসার উপরও তার দখলদারি প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন মুসলিম দেশকে খণ্ডিত করা বা মসজিদ-মাদ্রাসাগুলোকে আস্তাবল বানানো বা সেগুলোকে জিহাদ-শূণ্য করার কাজ সহজতর হয়ে যায়। তখন অতি সহজ হয় ইসলামকে পরাজিত করা এবং মুসলমানদের শক্তিহীন করার কাজ। তাই পুঁজিবাদী,জাতীয়তাবাদী,সমাজবাদী ও ঔপনিবেশিক শয়তানী শক্তি যখনই সুযোগ পেয়েছে তখন মসজিদ-মাদ্রাসা ভাঙ্গায় মনযোগী না হয়ে প্রথমে সেদেশের রাজনৈতিক ক্ষমতা হাতে নিয়েছে,এরপর হাত দিয়েছে ধর্মপালনে। তাই শয়তানের অনুচরদের দখলদারিতে মুসলমানদের রাজনৈতিক মানচিত্রে যেমন ধ্বসে গেছে,তেমনি বিনষ্ট হয়ে গেছে ধর্মীয় বিশ্বাস তথা চেতনার মানচিত্রও। বিনষ্ট হয়েছে ইসলামের সর্বোচ্চ ইবাদত জিহাদ। মুসলিম ভূমিতে তারা নিজেরা আবির্ভূত হয়েছে সাক্ষাৎ শয়তান রূপে। এরূপ ছদ্দবেশী শয়তানদের কারণে ভারত ও ইসরাইলের রাজনৈতিক ভূগোল দিন দিন বাড়তে থাকলেও অখণ্ড আরবভূমি ভেঙ্গে ২২টি রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে। এদের হাতে পাকিস্তান ভেঙ্গে গেছে, সূদানও ভেঙ্গে গেছে। ইরাক ও আফগানিস্তানও ভাঙ্গার পথে। অবশিষ্ঠ পাকিস্তানের উপরও লাগাতর হামলা হচ্ছে। এভাবে দিন দিন আনন্দ বাড়ছে এবং সে সাথে শক্তি বাড়ছে শয়তানী শক্তির। আর শয়তানের শক্তিবৃদ্ধির সে উৎসবকে মুসলিম নামধারি শয়তানের এজেন্টগণও নিজেদের উৎসবে পরিণত করেছে।শয়তানের এজেণ্ডাকে নিজদের এজেণ্ডা রূপে গ্রহণ করে বাংলাদেশে তাদের পক্ষে লড়াইটি লড়ছে সেক্যুলার রাজনৈতিক দলের কর্মিবাহিনী ও বুদ্ধিজীবীরা। দেশের মসজিদ-মাদ্রাসা ভাঙ্গা নিয়ে তারা এতটা উৎসাহী নয়,বরং মূল উৎসাহটি ছলচাতুরিতে রাজনৈতীক অঙ্গন দখলে নেয়ায়। লক্ষ্য,মহান আল্লাহর এজেণ্ডাকে ব্যর্থ করে দেয়া।

ঈমানদারের তাকওয়া হলো,শয়তানের সে এজেণ্ডা থেকে সতর্কতার সাথে সর্ব-অবস্থায় দূরে থাকা। সেটি যেমন ধর্ম,অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে,তেমনি রাজনীতিতেও।শয়তানের মূল শয়তানিটি ধরা পড়ে তার রাজনীতিতে,তেমনি রাজনীতিতে ধরা পড়ে ঈমানদারের প্রকৃত ঈমানদারি। নামায-রোযা,হজ-যাকাতে মুনাফেকিটা তেমন ধরা পড়ে না,কারণ শয়তান তার ঝান্ডা বা এজেণ্ডা নিয়ে নামাযের কাতারে বা রোযায় হাজির হয় না। কিন্তু হাজির হয় রাজনীতিতে। ফলে রাজনীতিতে শুরু হয় প্রচণ্ড মুনাফেকি ও বিদ্রোহ। শুরু হয় ঈমানদার সাজার ছদ্দবেশ। ফলে নির্বাচন কালে রাজনীতিতে বাড়ে টুপি,তসবিহ ও মাথায় কালো পট্টি বা রুমাল বাধার কদর।বাড়ে পীরের ওরস,তাবলিগী এজতেমায় ও দরবেশের দরগায় হাজিরা দেয়ার আগ্রহ। ইসলামের স্বঘোষিত শত্রুরাও তখন ধার্মিক সাজে।

 

বন্ধু গণ্য হচ্ছে আল্লাহর শত্রু

ব্যক্তির চেতনা, চরিত্র, রুচিবোধ ও জীবনবোধের সঠিক পরিচয় মেলে তার বন্ধুদের দেখে। সমাজে বা রাজনীতিতে সে ব্যক্তিটি নানা রূপে সাজলেও বন্ধুটিকে বেছে নেয় একান্ত নিজের মত করে। নইলেন্ধুত্ব জমে না। তেল ও পানি যেমন মিশে না,দুই ভিন্ন চরিত্রের মানুষের মাঝেও তেমনি বন্ধুত্ব জমে না। দুর্বৃত্তরা এজন্যই কোন চরিত্রবান ভালো মানুষকে বন্ধু রূপে গ্রহণ করে না। মদ্যপায়ীরা মদ্যপায়ীদের, ব্যাভিচারিরা ব্যাভিচারীদের এবং ইসলামের শত্রুরা ইসলামের শত্রুদের বন্ধু রূপে গ্রহণ করে তো একারণেই। তাই কে কাকে বন্ধু বা শত্রু রূপে গ্রহণ করলো সেটি সামান্য বিষয় নয়,বরং মানব জীবনের অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর মধ্য দিয়ে দিয়ে ধরা পড়ে ব্যক্তির প্রকৃত ঈমানদারি ও কুফরি। বিষয়টি এতই গুরুত্বপূর্ণ যে পবিত্র কোরআন হালাল-হারামের পাশাপাশি কাকে বন্ধু রূপে গ্রহণ করতে হবে সে বিষয়েও সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে। বলা হয়েছে,“মু’মিনগণ যেন ঈমানদারদের বাদ দিয়ে কাফেরদেরকে বন্ধরূপে গ্রহণ না করে। যে কেউ এরূপ করবে তার সাথে আল্লাহর কোন সম্পর্ক থাকবে না।” -(সুরা আল ইমরান,আয়াত ২৮)।মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এটি এক মহা হুশিয়ারি। আল্লাহর সাথে বান্দাহর সম্পর্ক থাকবে কি থাকবে না তা নির্ধারিত হবে বন্ধু রূপে সে কাদেরকে গ্রহণ করলো তার উপর। তাই ঈমানদার ব্যক্তি অতি সতর্ক হয়ে যায় বন্ধুরূপে কাউকে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে। তাই মুজিবকে চেনার মোক্ষম উপায় তার মাঠের বক্তৃতা নয়। বড় বড় বুলিও নয়। বরং সে জন্য নজর দিতে হবে তাঁর বন্ধুদের প্রতি।

আল্লাহর হুশিয়ারি মুজিবের কাছে গুরুত্ব পায়নি, গুরুত্ব পেয়েছে যে কোন ভাবে ক্ষমতায় যাওয়া। তাতে দেশ ও দেশবাসীর জানমালের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হোক তা নিয়ে কোন ভাবনা ছিল না। ক্ষমতালাভের সে লক্ষ্য নিয়েই তিনি ভারতের ন্যায় শত্রু দেশের সাথে শেখ মুজিব আগরতলা ষড়যন্ত্র করেছেন। তিনি অতি ঘনিষ্ট বন্ধু রূপে বেছে নিয়েছেন মনিসিং,ফনিভূষন মজুমদার ,চিত্তরঞ্জন সুতোর,কালিপদ বৈদ্য, মনরঞ্জন ধর,ইন্দিরা গান্ধির মত ব্যক্তিদের। তাদের সাথে যেমন রাজনীতি করেছেন,তেমনি তাদের পরামর্শ মত দেশও চালিয়েছেন। বাংলাদেশের ইসলামপন্থিদের কাছে মুজিবের এ গোপন ষড়যন্ত্র গোপন থাকেনি। তাই দেশের  হাজার হাজার আলেমের মধ্য থেকে কোন প্রসিদ্ধ আলেমই তার কাছে ভিড়েনি। মুজিব নিজেও কোন আলেমকে কাছে ডাকেননি। কাউকে কোন গুরুত্বপূর্ণ পদও দেননি। বিশ্বে ৫০ টির বেশী মুসলিম রাষ্ট্র,কিন্তু কারো সাথেই মুজিবের বন্ধুত্ব জমেনি। অথচ বন্ধুত্ব জমেছে ভারত ও সোভিয়েত রাশিয়ার ন্যায় মুসলিম-দুষমন দেশের সাথে। এরপরও কি বুঝতে বাঁকি থাকে তিনি কোন পক্ষের লোক? গণতন্ত্র ও স্বাধীনতাকে মুজিব শুরুতেই আস্তুাকুঁরে ফেলে ছিলেন। স্বাধীনতার বদলে এনেছেন পরাধীনতা। স্বাধীনতা দিয়েছেন নিজ পরিবার, নিজ দল ও নিজপ্রভু ভারতকে।  সন্ত্রাস ও লুন্ঠনে তাদেরকে দেয়া স্বাধীনতাটি ছিল সীমাহীন। মুজিব শাসনামলে সে স্বাধীনতার প্রয়োগ এতটাই হয়েছে যে তাতে ১৯৭৪ সালে দেশে ভয়ানক দুর্ভিক্ষ নেমে এসেছে। এবং সে দুর্ভিক্ষের মাধ্যমের লক্ষাধিক মানুষের জীবনে মৃত্যু ডেকে আনার ব্যবস্থা করেছেন। কুকুর শৃগালের মত মানুষ মরেছে তখন পথে ঘাটে। ৩০ হাজারের বেশী মানুষকে হত্যা করেছেন রক্ষিবাহিনী দিয়ে। একাত্তরের যুদ্ধেও এত মানুষের মৃত্যু ঘটেনি।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে “ইন্নাদিনা ইন্দাল্লাহেল ইসলাম”।  অর্থঃ নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে একমাত্র গৃহীত ধর্ম হলো ইসলাম। এর অর্থ দাঁড়ায় ইসলাম ছাড়া অন্য ধর্মকে ধর্ম বলাই মহাপাপ। এ পাপ ব্যক্তিকে কাফেরে পরিনত করে। অথচ বিশ্বজুড়ে ধর্মের নামে এ ধর্মই প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। তেমনি ধোকাবাজি হয়েছে গণতন্ত্রের সাথে। মুর্তিপুঁজা, শাপপুঁজা, গরুপুঁজা ও লিঙ্গপুঁজার ন্যায় চরম অধর্ম  যেমন ভারতে ধর্মরূপে  স্বীকৃত, তেমনি বাংলাদেশে পরাধীনতাকে প্রচার পেয়েছে স্বাধীনতা বলে। স্বাধীনতার নামে পাকিস্তান আমলে এতবড় ধাপ্পাবাজি হয়নি। পাকিস্তান আমলের সে স্বাধীনতা যেমন মুসলিম লীগ নেতাকর্মীদের জন্য ছিল তেমনি আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য দলের জন্যও ছিল। তাই মুজিবকে সেদিন গুম করা হয়নি, রিমান্ডে নিয়ে পুলিশী নির্যাতন করা হয়নি, এবং তাকে ডান্ডাবেরিও পড়ানো হয়নি। বরং জেলে তাকে প্রথম শ্রেণী দেয়া হয়েছে। অথচ আজকের পরাধীন বাংলাদেশে সেটি বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের জন্য ভাবাও যায় না।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে,“আল্লাহতায়ালা ঈমানদারের বন্ধু,এবং তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে যান। আর যারা কাফের তাদের বন্ধু হলো শয়তান। শয়তান তাদেরকে আলো থেকে অন্ধকারে নিয়ে যায়।” –(সুরা বাকারা আয়াত ২৫৭)।ঈমানদার হওয়ার পুরস্কার ও মর্যদা তাই বিশাল। সে মহা পুরস্কার ও মর্যাদাটি হলো মহান আল্লাহর বন্ধু হয়ে যাওয়ার। আল্লাহর বন্ধু হওয়ার বরকতেই মু’মিনের জীবনে আসে আলোময় সত্যপথ। সে আলোময় পথ বেয়ে মু’মিনের জীবনে জুটে জান্নাত। অপর দিকে বেঈমান তথা ইসলামের বিপক্ষ শক্তি হওয়ার শাস্তি ও অমর্যাদাটিও বিশাল। সেটি শয়তানের বন্ধু হওয়ার। তখন তার জীবন জুড়ে আসে গভীর অন্ধকার। অন্ধকারের পথ বেয়ে সে জুটে জাহান্নামে।

তবে মুজিব নিজেই শুধু শয়তানের পথে যাননি,টেনেছেন সমগ্র বাংলাদেশকেও।সেটি বাংলাদেশের মাটিতে ইসলামের শরিয়তী বিধানের প্রতিষ্ঠা রুখে। একাজে তিনি ভারতের কাফের সরকারকে বন্ধু রূপে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি নিষিদ্ধ করেছিলেন সকল ইসলামি দলকে,এবং সীমিত করেছিলেন ইসলামচর্চাকে। “ইসলাম” ও “মুসলিম” এ দু’টি শব্দকে তিনি সরিয়েছিলেন বাংলাদেশের নানা প্রতিষ্ঠান থেকে। তাই প্রশ্ন হলো,ইসলামের এরূপ বিরুদ্ধাচারনের পরও কি কোন ব্যক্তি আল্লাহর বন্ধু হতে পারে? এরূপ কাজ তো শয়তানের ও তার বন্ধুর। প্রশ্ন হলো,শয়তানের এরূপ একনিষ্ট বন্ধুকে কোন ঈমানদার কি নিজের বন্ধু রূপে গ্রহণ পারে? সে ব্যক্তিটি কি হতে পারে ১৫ কোটি মুসলিম অধ্যুষিত বাংলার বন্ধূ তথা বঙ্গবন্ধু? সেটি বললে বা মেনে নিলে কি ঈমান থাকে? সমাজের আবু লাহাবেদের ন্যায় ইসলামের প্রতিষ্ঠা-বিরোধীদের “বন্ধু” বা “জাতির পিতা” বলা ইসলামের শিক্ষা নয়,নবীজী (সাঃ)র সূন্নতও নয়। বরং তার বিরুদ্ধে “ধ্বংস হোক” বলাই তো মহান আল্লাহর সূন্নত। “সুরা লাহাব”য়ে আবু লাহাবের বিরুদ্ধে সে স্লোগানটি শুনিয়েছেন খোদ মহান আল্লাহতায়ালা। ঈমানদারের দায়িত্ব তাই মহান আল্লাহর সে সূন্নতকে নিষ্ঠার সাথে পালন করা। তাছাড়া মুজিব ও তাঁর দলের অপরাধ কি আবু লাহাবের চেয়ে কম? আবু লাহাব মক্কার ন্যায় এক ক্ষুদ্র জনপদে ইসলামের প্রসার ও প্রতিষ্ঠা রুখতে চেষ্টা করেছিল। আর মুজিব আল্লাহর শরিয়তি বিধানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীর বেশে দাঁড়িয়েছিল বাংলাদেশের ন্যায় এক বিশাল জনগোষ্ঠির দেশে।

হিন্দু ধর্মে বিশ্বাসী ব্যক্তিটি মাটির পুতুল,শাপ-শকুন ও গরু-বাছুড়কে ভগবান বলবে এবং সেগুলোকে ভক্তি ভরে পুজা দিবে সেটিই স্বাভাবিক। কারণ সেটাই তার ধর্ম। তেমনি আল্লাহর শরিয়তি বিধানের বিরুদ্ধে শত্রুতা যে আওয়ামী-বাকশালীদের রাজনীতির মূল লক্ষ্য,তারা শেখ মুজিবকে “জাতির পিতা” বা “বঙ্গবন্ধু” বলবে সেটিও স্বাভাবিক। কারণ শেখ মুজিব ও তাঁর অনুসারিগণ ইসলামের প্রতি অঙ্গিকার নিয়ে তারা রাজনীতি করে না এবং সে দাবীও তারা করে না। বরং ইসলামের প্রতিপক্ষ হ্ওয়াটাই তাদের মিশন। ফলে ইসলাম-বিনাশী সে রাজনীতির সে নেতাটিকে তারা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী বলবে তাতে আর বিস্ময় কিসের? গরু-বাছুড়,শাপ-শকুন ও মুর্তি যদি নোবেলপ্রাইজ বিজয়ী কোন হিন্দু থেকে পুঁজা পায় তাতে কি অবাক হওয়ার কিছু থাকে? তেমনি আওয়ামী বাকশালীদের কাছে শেখ মুজিবও যদি শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালীর খেতাব পায় তাতেই বা বিস্ময়ের কি? কিন্তু যাদের মনে সামান্যতম ঈমান আছে,এবং সে ঈমানের বরকতে নামায-কালাম পড়ে এবং আল্লাহর দ্বীনের প্রতিষ্ঠায় সামান্য অঙ্গিকারও রাখে তারাও যদি এমন ব্যক্তিকে বঙ্গবন্ধু বা জাতির পিতা বলে তবে তার চেয়ে বিস্মযের আর কি থাকতে পারে? ইসলামের শরিয়তি বিধানের প্রতিষ্ঠা রুখা তো শয়তানের এজেণ্ডা। অথচ সে এজেণ্ডা নিয়ে রাজনীতি করেছেন শেখ মুজিব ও তার দল আওয়ামী লীগ। ফলে তাকে বন্ধু বা নেতা বললে কি ঈমান থাকে?

 

শয়তানকে খুশি করার রাজনীতি

পাপ শুধু পুতুল পুজা,শর্পপুজা বা গরুপুজা নয়,বরং মহাপাপ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলো যারা ইসলামের শরিয়ত প্রতিষ্ঠার রাজনীতির যারা বিরোধী তাদের সম্মান দেখানো,তাদের ভোট দেয়া বা তাদের পক্ষ নেয়া। এ অপরাধ তো খোদ আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনার। কোরআনের ভাষায় এরা হলো “মুফছেদ ফিল আরদ”  তথা জমিনের উপর ফ্যাসাদসৃষ্টি। মহান আল্লাহতায়ালা এমন ফ্যাসাদকে মানবহত্যার চেয়েও জঘন্য ক্ষতিকর বলেছেন। খলিফায়ে রাশেদার যুগে এ অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হতো। অথচ বিস্ময়ের বিষয় বাংলাদেশের মত একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশে সে পাপ এবং সে অপরাধটি হচ্ছে অহরহ। আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও বিদ্রোহ হচ্ছে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির সর্বত্র জুড়ে। দেশটিতে পতিতাবৃত্তির ন্যায় প্রকাশ্য ব্যভিচারকেই শুধু আইনগত বৈধতাই দেয়া হয়নি,বৈধতা ও প্রতিষ্ঠা দেয়া হয়েছে সূদী ব্যাংক ও মদের ব্যবসাকে। প্রবল ভাবে প্রতিষ্ঠা দেয়া হয়েছে শরিয়ত-বিরোধী সেক্যুলার রাজনীতিকে। অপরদিকে অসম্ভব করা হয়েছে ইসলামপন্থিদের রাজনীতিকে। কোন ঈমানদার-অধ্যুষিত দেশে কি এটা ভাবা যায়? অথচ একটি মুসলিম দেশে হওয়া উচিত ছিল এর উল্টোটি। ইসলাম বিরোধী এমন রাজনীতিতে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যায় দেশ এবং শয়তানই খুশি হতে পারে। আর আওয়ামী লীগের রাজনীতি তো শয়তানকে খুশি করার রাজনীতি। সেটি শুধু আজ নয়, বাংলাদেশের জন্মের পূর্ব থেকেই।

 

অসহ্য দেশের মানচিত্র

তবে ভারতের করদ রাজ্য বা “ভিক্ষার তলাহীন ঝুলি”তে পরিণত করাই আওয়ামী-বাকশালীদের একমাত্র এজেন্ডা নয়। কারণ ভারতের এটাই একমাত্র লক্ষ্য নয়। ভারত চায় আরো বড় কাজ। সেটি বাংলাদেশের মাটি থেকে ইসলামে সরানোর। ভারতের পেটের মধ্যে ১৬ কোটি মানুষের মৌলবাদী বাংলাদেশের অবস্থান ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকী। এতে পেটের মধ্যে টাইম বোমা নিয়ে ঘুমানোর বিপদ। বাংলাদেশে ইসলামি চেতনা বেড়ে উঠলে যখন তখন এ বোমা বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। ফলে ভারত চায় এ বোমাকে বারুদমূক্ত করতে। আর সে বারুদ হলো মৌল ইসলাম। ফলে ভারত চায় ডি-ইসলামাইজেশন। অর্থাৎ চায় ইসলাম থেকে দূরে সরাতে। এবং সেটি কালচারাল কনভার্শনের মাধ্যমে।

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে র‌্যাডক্লিফ রোয়েদাদ বাংলার মাঠ-ঘাট ও গ্রাম-গঞ্জ দিয়ে এঁকেবেঁকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের যে মানচিত্রটি এঁকেছিল তার মধ্যে যেটি ফুটে উঠেছিল সেটি বাংলা ভাষা, অখন্ড বাংলা বা ভাষাভিত্তিক বাঙালী জাতির চিত্র নয়,বরং সে চিত্রটি দুই বাংলার দুই ভিন্ন সাংস্কৃতিক বিভাজনের। তাই বাংলাদেশের দেহে আজ ও ১৯৪৭য়ের পাকিস্তানের ছাপ,সে ছাপটি সাংস্কৃতিক ভিন্নতার। এবং সে ভিন্নতার মূলে ইসলাম। সাতচল্লিশে পাকিস্তান গড়ে উঠেছিল শুধু অর্থনৈতিক প্রয়োজনে নয়,বরং উপমহাদেশের মুসলমানদের প্রচণ্ডতর এক ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রয়োজনে। মুজিব সে পাকিস্তানী প্রজেক্টকে দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্বপাকিস্তানী নাগরিকদের জন্য অসম্ভব করে দিয়েছেন। একাত্তরের পর সে প্রয়োজন মেটানো এখন অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ভারতের মুসলমানদের ন্যায় আজ একই বিপর্যয়ে পড়েছে বাংলাদেশের মুসলমান। মুসলিম বিরোধী সাম্প্রদায়ীক ভারতীয় হিন্দুদের কাছে মুজিব এজন্যই এতটা প্রিয়।

ভারতের কাছে আজও  অতি অসহ্য হলো বাংলাদেশের ১৯৪৭-য়ের এ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মানচিত্র। ভারত একাত্তরে এদেশের ভূগোলের উপর সামরিক দখলদারি পেলেও সে সাংস্কৃতিক মানচিত্র বিলোপ করতে পারিনি। স্বাধীন দেশ রূপে বাংলাদেশের বেঁচে থাকার শক্তির মূল উৎস্যটি পশ্চিম বাংলা বা ভারত থেকে ভিন্নতর এ সাংস্কৃতিক এ মানচিত্র। তাই শত্রুর নজর পড়েছে বাংলাদেশের এই সাংস্কৃতিক মানচিত্রের দিকে। শত্রুপক্ষ সেটির বিলোপ চায়,এবং সেটি বাংলাদেশের মানুষকে ইসলাম থেকে দূরে সরানোর মাধ্যমে। এজন্যই ভারতের বিনিয়োগ প্রচণ্ড ভাবে বেড়েছে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ময়দানে।

 

সবচেয়ে বড় বিপদ

শেখ মুজিব ভারতের হাতে দেশের ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক মানচিত্র তুলে দিয়েছিলেন। শেখ হাসিনা তুলে দিচ্ছে দেশবাসীর চেতনার মানচিত্র। ফলে শয়তানী শক্তির হাতে দ্রুত অধিকৃত হচ্ছে দেশের ধর্ম ও শিক্ষা-সংস্কৃতির অঙ্গন। বাংলার সুলতানি যুগে ইসলামের দ্রুত প্রসার রোধে চৈতন্যদেবের উদ্ভব ঘটিয়েছিল। তার ভক্তি-মূলক গান মানুষকে ইসলাম থেকে দ্রুত আড়াল করেছিল। একই লক্ষ্যে বাংলাদেশে আনা হচ্ছে রবীন্দ্রনাথকে। চৈতন্যদেবের ন্যায় তাকেও এক মহাদেব রূপে প্রতিষ্ঠা দেয়া হচ্ছে। এটি এখন আওয়ামী লীগ ও ভারতের যৌথ প্রজেক্ট। একাজে ভারত থেকে শত শত কোটি টাকার অর্থই শুধু আসছে না,হাজার হাজার সাংস্কৃতিক সৈন্যও আসছে। ফলে বাড়ছে ভারতের সাংস্কৃতিক দখলদারি। ১৫ কোটি মুসলমানদের রাজস্বের অর্থে কোরআন-হাদীস ও নবীচরিত ছাপার ব্যবস্থা না হলে কি হবে,প্রতিবছর শত শত বই ছাপা হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের উপর। বাড়ছে রবীন্দ্রসঙ্গিতের বছর-ব্যাপী আয়োজন। এতে ভ্রষ্টতা বাড়ছে দেশের নতুন প্রজন্মের মাঝে। ধর্মান্তর না হলেও এতে বিপুল ভাবে ঘটছে কালচারাল কনভার্শন। ফলে আজ  থেকে ৫০ বছরদেশবাসীর জন্য মুসলমান থাকাটি যতটা সহজ ছিল আজ  ততটাই কঠিন হয়ে পড়ছে। বাংলাদেশের জন্য এটিই আজ  সবচেয়ে বড় বিপদ। ০৭/০৫/১২, নতুন সংস্করণ ৩০.০৬.১৯

 




যে কারণে হত্যা করা হলো প্রেসিডেন্ট মুহম্মদ মুরসীকে

মিশরে এবার ফিরাউনের দিন

অতীতের ফিরাউন যদি মিশরের শাসন ক্ষমতায় আবার ফিরে আসতো তবে ইসলামের বিজয় নিয়ে যারা স্বপ্ন দেখে তাদের উপর অনিবার্য হতো এক অসহনীয় দুর্দিন। যে ভয়াবহ বিপদ নেমে এসেছিল হযরত মূসা (সাঃ) ও তার ক্‌ওম বনি ইসরাইলের উপর –সেরূপ বিপদের মুখে পড়তে হতো তাদেরও। নির্মম ভাবে তাদের নির্মূল করা হতো এবং বাঁচিয়ে রাখা হতো কেবল নির্যাতনে নির্যাতনে তাদের বাঁকি জীবনকে অতিষ্ট করার লক্ষ্যে। তবে ফিরাউন যেটি করতো সেটি নিখুঁত ভাবে করছে মিশরের স্বৈরাচারি শাসক জেনারেল আব্দুল ফাতাহ আল-সিসি। বরং সে আদিম বর্বরতায় যোগ হয়েছে আধুনিক নৃশংসতা। তার সরকারের হাতেই জেল খানায় নিহত হলো মিশরের ইতিহাসে সর্বপ্রথম নির্বাচিত সিভিলিয়ান প্রেসিডেন্ট ডক্টর মুহম্মদ মুরসী। উল্লেখ্য হলো, সরকারের পক্ষ থেকে সাঁজানো একটি মামলায় বহু আগেই প্রেসিডেন্ট মুরসীকে প্রাণদন্ড দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সে প্রাণদন্ড কার্যকর করতে জেনারেল সিসির সরকার ভয় পাচ্ছিল। ভয় ছিল, প্রাণদন্ড পরিকল্পিত হত্যাকান্ড রূপে চিত্রিত হওয়ার। অবশেষে তাঁকে অন্যপথে বিদায় দেয়া হলো। সেটি হার্ট এ্যাটাকের লেবেল এঁটে দিয়ে।

স্বৈরাচারি শাসকদের হাতে এমন পরিকল্পিত হত্যাকান্ড বিরল নয়, বরং অতি স্বাভাবিক। শুধু মিশরে নয়, মুসলিম বিশ্বের যেসব দেশ ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক কাফেরদের হাতে অধিকৃত হয়েছিল তাব সবগুলিতে একই রূপ বীভৎসতা। এ দেশগুলিতে ইসলামে সবচেয়ে নৃশংস দুষমনেরা কোন পতিতা পল্লিতে জন্ম নেয়নি, বরং তারা বেড়ে উঠেছে সামরিক বাহিনীর ছাউনীতে বা সেক্যুলারিস্টদের ঘরে। ইসলামের বিজয় বা গৌরববৃদ্ধি তাদের ধাতে সয় না। এসব দেশের সামরিক বাহিনীর যারা রোল মডেল বা তারকা-চরিত্র তাদের সামরিক জীবন শুরু হয়েছিল দেশের স্বাধীনতার সুরক্ষায় নয়, বরং সেটি ছিল কাফেরদের শাসনকে মুসলিম দেশে বলবান ও দীর্ঘায়ীত করার লক্ষ্যে। যেমন পাকিস্তানের জেনারেল আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান, টিক্কা খান, নিয়াজীর ন্যায় ব্যক্তিগণ। একই উদ্দেশ্য নিয়ে বাংলাদেশে সেনাবাহিনীর জেনারেল আতাউল গণি ওসমানীও ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিল। ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে সামরিক বাহিনীর সেক্যুলারিস্টদের সবচেয়ে বড় অপরাধটি হলো অবিভক্ত ভারতের নানাভাষী মুসলিমদের প্যান-ইসলামিক পাকিস্তান প্রজেক্টকে ব্যর্থ করে দেয়ায়। এমন কি তারা বার বার বাধাগ্রস্ত করেছে পাকিস্তানে এবং পরবর্তী কালে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ধারার শাসন প্রক্রিয়া।

নৃশংস নাশকতাটি সেক্যুলারিস্টদের

মুসলিম দেশে সামরিক বাহিনীর ক্যান্টনমেন্টগুলো হলো ইউরোপীয় কাফের সংস্কৃতির অতি সুরক্ষিত দ্বীপ। নিজদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের ইসলামী সংস্কৃতির সেখানে প্রবেশাধীকার নাই – বিশেষ করে সেদেশগুলিতে যেগুলি ইউরোপীয় কাফেরদের কলোনী ছিল। এ সেক্যুলার শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে গড়ে উঠা অফিসারগণ ইসলাম থেকে এতটাই বিচ্ছিন্ন যে মসজিদ-মাদ্রাসার উপর বোমা ফেলতেও এরা ইতস্ততঃ করে না -যেমনটি হয়েছে ইসলামাবাদের লাল মসজিদ ও হাফসা মাদ্রাসার উপর। এদের প্রাণ কাঁপে না নৃশংস গণহত্যাতেও। সেক্যুলারিজমের আভিধানিক অর্থ ইহজাগতিকতা। অতি ইহজাগতিকতার কারণেই সেক্যুলারিস্টদের মাঝে বিলুপ্ত হয় আখেরাতের ভয়। দেশের প্রতিরক্ষা কি দিবে, তারা বরং ইহজাগতিক সম্ভোগ বাড়াতে দখলে নেয় নিজ দেশের অতি মূল্যবান আবাসিক এলাকাগুলি। একই রোগ পাকিস্তান আর্মির ভগ্নাংশ ও সে অভিন্ন সেক্যুলার সংস্কৃতির ধারক বাংলাদেশ সেনাবাহিনীরও।

যে কোন মুসলিম রাষ্ট্র ভাঙ্গাই কবিরা গুনাহ তথা হারাম। তাতে কুফরি তথা অবাধ্যতা হয় মহান আল্লাহতায়ালার সে অলংঘনীয় কোরাআনী নির্দেশের যাতে বলা হয়েছে তোমরা বিভক্ত হয়ো না। বাংলাদেশের ইতিহাস একাত্তরে শেষ হয়নি। বহুশত পরও মুসলিম দেশ ভাঙ্গার ন্যায় হারাম কাজের বিচার ইসলামপ্রেমী মহলে বার বার বসবে। তখন সে বিচার রুখতে সেক্যুলারিস্ট সন্ত্রাসীরা থাকবে না। তবে সবচেয়ে চুড়ান্ত ও ভয়ানক বিচারটি হবে আখেরাতে। মুসলিম দেশের প্রতিইঞ্চি ভূগোল বাড়াতে অতীতে বহুরক্ত ব্যয় হয়েছে। এবং সে মুসলিম ভূগোলকে খন্ডিত করার কাজটি নিজ খরচে করে দিতে রাজী কাফেরগণ। ভারত তাই পাকিস্তান ভেঙ্গে দিতে ১৯৪৭ থেকেই দু’পায়ে খাড়া ছিল। তারা শুধু কলাবোরেটরদের অপেক্ষায় ছিল। সেটি জোটে ১৯৭১’য়ে। সে কাজে সর্বপ্রথম এগিয়ে আসে সামরিক ও অসামরিক অঙ্গণের বাঙালী সেক্যুলারিস্টগণ। তাই স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে, ভারতের ন্যায় কাফের দেশের কোলে গিয়ে উঠতে এবং কাফেরদের অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ নিয়ে যুদ্ধ করতে বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের মাঝে কোন ইতস্ততা দেখা যায়নি। ইসলামী চেতনাশূণ্য সেক্যুলার সেনাসদস্যগণই ২০১৩ সালের ৬ই মে শাপলা চত্ত্বরে বীরদর্পে হিফাজতে ইসলামের শত শত মুসল্লিদের নিষ্ঠুর ভাবে হ্ত্যা করেছে এবং জানাজা ছাড়াই তাদের লাশ ময়লা ফেলার গাড়িতে তুলে গায়েব করে দিয়েছে।  অতীতে এ সেক্যুলার সেনাবাহিনী যেমন অতি  বর্বর স্বৈরাশাসকদের জন্ম দিয়েছে, তেমনি বর্তমানে কাজ করছে ভোট-ডাকাত স্বৈরশাসকের বিশ্বস্ত পাহারাদার রূপে।

মুসলিম বিশ্বে সামরিক সরকারগুলির  ইসলাম বিরোধী নির্মম নিষ্ঠুরতাগুলি বুঝতে হলে সামরিক বাহিনীর অতি রেডিক্যাল সেক্যুলার আদর্শিক প্রেক্ষাপটকে অবশ্যই সামনে রাখতে হবে। ম্যালেরিয়া সবদেশে একই রূপ সিম্পটম নিয়ে হাজির হয়। তেমনি অবস্থা চেতনার রোগেরও। ফলে ইসলামী চেতনা শূণ্য সেক্যুলারিস্টদের চরিত্র সবদেশে একই রূপ নৃশংস হয়। সে গভীর রোগই আজ প্রকট ভাবে পাচ্ছে মিশরে। মিশরের ইতিহাসে অতি কট্টোর ইসলাম বিরোধী সামরিক ব্যক্তিত্ব ছিল কর্নেল জামাল আব্দুন নাসের। ইনিও বন্দুকের জোরে সিসির ন্যায় মিশরের প্রেসিডেন্ট হন। আর সব সেক্যুলারিস্টদেরই মূল দুষমনিটি ইসলামের বিরুদ্ধে। ইবলিস কোথাও ক্ষমতা হাতে পেলে যা করে -এরাও অবিকল তাই করে। ইসলামের বিরুদ্ধে জামাল আব্দুন নাসেরের দুষমনি এতটাই প্রকট ছিল যে, সাইয়েদ কুতুবের ন্যায় বিশ্ববিখ্যাত মোফাচ্ছের এবং “ফি জালালিল কোর’আন’এর ন্যায় প্রসিদ্ধ তাফসিরের রচিয়েতাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করেছিল। হত্যা করেছে আব্দুল কাদের আওদাসহ আরো অনেক বিখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদকে। আব্দুন নাসেরের পথ ধরেছে মিশরের বর্তমান স্বৈরশাসক প্রেসিডেন্ট আবুল ফাতাহ আল-সিসি। আব্দুন নাসেরের পাশে দাঁড়িয়েছিল সোভিয়েত রাশিয়া। স্বৈরাচারি সিসিকে সমর্থন দিচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় শাসকগণ ও ইসরা্‌ইল।

মিশরের সামরিক বাহিনীর অফিসারগণ এতটাই কট্টোর ইসলামবিরোধী যে ইসলাপন্থিদের সরকারে স্থান দেয়া দূরে থাক, তাদেরকে কোনরূপ মানবিক অধীকার দিতেও রাজী নয়। সেটিই প্রকট ভাবে প্রকাশ পেল ডক্টর মুরসীর হত্যার মধ্য দিয়ে। তাদের কাছে অসহ্য ছিল ডক্টর মুহম্মদ মুরসীর ন্যায় অতি ইসলামী ব্যক্তির নির্বাচনী বিজয়কে মেনে নেয়া। ফলে তাঁর নির্বচনি বিজয়ের পরই  ষড়যন্ত্র শুরু হয় অপসারণের। ক্ষেত্র তৈরী করে থাকে রাজপথে এবং রাজপথের বাইরে। অর্থ বিতরণ হয় রাজপথের বিক্ষোভে লোক বাড়াতে। বিজিনেস সিন্ডকেটকে উসকানো হয় দ্রব্যমূল্য বাড়াতে। তার বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলা হয় মিশরের সেক্যুলার মিডিয়াকে। সে কাজে বিপুল অর্থ নিয়ে এগিয়ে আসে মধ্যপ্রাচ্যের গণতন্ত্রের ঘোরতর শত্রু সৌদি আরব ও আরব আমিরাত। আন্তর্জাতিক অঙ্গণে বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলির সরকারগুলিকে প্রেসিডেন্ট মুরসির বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলতে সক্রিয় হয় ইসরাইল। কারণ, মুরসী একাত্মতা ঘোষণা করেন গাজার অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনীদের সাথে। ইসরাইলের কাছে সেটি ছিল অসহ্য।

 

নিরস্ত্র প্রতিবাদ এবং পবিত্র জিহাদ যেখানে সন্ত্রাস  

ইসলামের শত্রুপক্ষ সন্ত্রাসের  সংজ্ঞাই পাল্টে দিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও তাদের মিত্র পক্ষ সন্ত্রাসের যে সংজ্ঞা দিয়েছে সেটিই গ্রহণ করেছে মুসলিম দেশগুলির সেক্যুলারিস্টগণ। সে সংজ্ঞা মতে ইসলামের বিজয় বা শরিয়তের প্রতিষ্ঠার লক্ষে খাড়া হওয়াটিই সন্ত্রাস। সন্ত্রাস রূপে চিত্রিত হয় মার্কিনী বা ইসরাইলী অধিকৃতির বিরুদ্ধে কথা বলা। এমন কি সন্ত্রাস হলো মিশরের সিসি, বাংলাদেশের হাসিনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজাদের ফ্যাসিবাদী অধিকৃতির বিরুদ্ধে নিরস্ত্র মানুষের কথা বলাও। সে বিকৃত সংজ্ঞার প্রয়োগ হয়েছে প্রেসিডেন্ট মুরসী এবং তার দল ইখওয়ানুল মুসলিমের বিরুদ্ধে।

গাজা বা অধিকৃত ফিলিস্তিনের যে কোন অংশকে উম্মুক্ত জেলখানার চেয়ে অধীক মর্যাদা দিতে ইসরাইল ও তার মনিব মার্কিন যুক্তরাষ্ট কখনোই রাজী নয়। সে অবস্থা পরিবর্তনের যে কোন উদ্যোগই চিহ্নিত হয় সন্ত্রাস রূপে। প্রেসিডেন্ট মুরসীর আগে গাজাকে উম্মুক্ত জেল খানায় পরিণত করার কাজে ইসরাইলকে পূর্ণ সহায়তা দিয়েছে মিশরের হোসনী মোবারকের স্বৈরাচারি সরকার। ইসরাইলের এজেন্ডা পূরণে গাজার দক্ষিণ সীমান্ত পাহারা দিত মিশরের সেনাবাহিনী। ইসরাইলের পক্ষ থেকে আরোপিত বিধানটি ছিল, মরতে হলে জেলখানার মধ্যেই মরতে হবে; পালানোর রাস্তা দেয়া যাবে না। তেমনি এক করুণ অবস্থা ছিল গাজাবাসীর। তাই গাজার উপর অতীতে যখন অবিরাম বোমা বর্ষণ হয়েছে তখন আহত গাজাবাসীদেরও মিশরীয় সেনাবাহিনী মিশরে ঢুকতে দেয়নি। এরূপ কঠোর পাহারাদারি কাজে হোসনী মোবারকের সরকার অর্থ পেত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে।

কিন্তু মুহম্মদ মুরসীর প্রেসিডেন্ট হওয়াতে চিত্রই পাল্টে যায়। তিনি খুলে দেন মিশরের সাথে গাজার সীমান্ত।  মিশরের এমন স্বাধীন নীতি ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ছিল অতি অসহ্য। ইসরাইল এটিকে তার নিরাপত্তার প্রতি হুমকি মনে করে। ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়াটিই বড় কথা নয়, নির্বাচিত হলেও সন্ত্রাসী রূপে গণ্য হতে হয় যদি অবস্থান তাদের স্বার্থের পক্ষে না হয়। তাদের বিচারে সন্ত্রাসী হওয়ার জন্য অস্ত্র হাতে নেয়ার প্রয়োজন পড়ে না, ইসলাম ও ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলাই যথেষ্ট। ইখওয়ানুল মুসলিমুন এজন্যই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সন্ত্রাসী সংগঠন রূপে গণ্য হয়। সন্ত্রাসী গণ্য হয়েছে খোদ প্রেসিডেন্ট মুরসী। ফলে জেনারেল সিসি যখন মিশরের ইতিহাসের একমাত্র নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুরসীকে সামরিক শক্তির জোরে সরিয়ে দেয় তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার ইউরোপীয় মিত্রগণ সেটিকে সমর্থণ করে। এবং তাতে উল্লাস জাহির করে ইসরাইল।

সিসির সে অবৈধ ও অন্যায় সামরিক ক্যু’র বিরুদ্ধে রাজপথে অবস্থান নিয়েছিল মিশরের লক্ষ লক্ষ মানুষ। কিন্তু সামরিক সরকারের কাছে নিরস্ত্র মানুষের শান্তিপূর্ণ সে বিক্ষোভও সহ্য হয়নি –যেমন হাসিনার কাছে সহ্য হয়নি শাপলা চত্ত্বরে মুসল্লীদের শান্তিপূর্ণ অবস্থান। বিক্ষোভ থামাতে সামরিক বাহিনী রক্তাত্ব করেছিল মিশরের রাজপথ। ২০১৩ সালে ১৪ই আগষ্ট কায়রোর রাবা আল আদাবিয়া স্কোয়ারে দেড় হাজার থেকে দুই হাজার নিরস্ত্র নারীপুরুষকে কয়েক মিনিটের মধ্যে মেশিন গান ও কামান দেগে হত্যা করেছিল জেনারেল আবুল ফাতাহ সিসির সামরিক সরকার। এতবড় গণহত্যায় সাথে জড়িতদের কারোই কোন বিচার হয়নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার ইউরোপীয় মিত্রদের মহলেও সে নৃশংস হত্যাকাণ্ড নিন্দিত হয়নি। যেন ইসলামপন্থি হলে তাদেরকে হত্যা করা কোন অপরাধই নয়। ফলে যে নৃশংস দমন প্রক্রিয়া ও হত্যাকান্ড চলছে সৌদি আরব, সিরিয়া ও আরব আমিরাতে, অবিকল সেটিই চলছে মিশরে। 

ইসলামপন্থিদের বেঁচে থাকাটিও অসহনীয়

কারারুদ্ধ প্রেসিডেন্ট মুরসিকে হত্যা করায় শুধু মিশরের ইসলাম বিরোধী সেক্যুলার স্বৈরাচারি চক্রই খুশি হয়নি, খুশি হয়েছে সৌদি আরব, আরব আমিরাত এবং ইসরাইলের শাসক মহলও। খুশি হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের ন্যায় পাশ্চত্য দেশগুলোর সরকারগুলিও। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছে এ কথা ভেবে, শত্রু বিদায় হলো। প্রেসিডেন্ট মুরসী ছিলেন মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামী জাগরণের আদি সংগঠন ইখওয়ানুল মুসলিমের নেতা। যুদ্ধাংদেহী কাফের দেশগুলির কোনটিই চায়না কোন দেশে কোন ইসলামী সংগঠন ক্ষমতায় বসুক –তা যত সংখ্যাগরিষ্ট ভোটেই হোক। এমন কি জেলের মধ্যে তাদের বেঁচে থাকাটিও তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। জেনারেল আবুল ফাতাহ আল সিসি, শেখ হাসিনা, কিং সালমানের ন্যায় প্রচণ্ড স্বৈরাচারি ফ্যাসিষ্টদের শাসনকে তারা সমর্থন দিতে রাজী, কিন্তু কোন ইসলামী দলের গণতান্ত্রিক বিজয়কে নয়। তাই নব্বইয়ের দশকে আলজিরিয়ায় ইসলামপন্থিদের বিজয় রুখতে তারা সামরিক বাহিনীর ক্ষমতাদখলকে সমর্থন দিয়েছে। এবং তারা মেনে নেয়নি ফিলিস্তিনের নির্বাচনে হামাসের বিশাল নির্বাচনি বিজয়কে। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে ইসলামপন্থিদের বিজয় দূরে থাক করারুদ্ধ অবস্থায় তাদের বেঁচে থাকাও যে তারা মেনে নিতে রাজী নয় –প্রেসিডেন্ট মুরসীর অপসারন এবং বন্দী অবস্থায় তার হত্যা সেটিই নতুন করে প্রমাণ করলো।    

আরব বিশ্বে স্বৈরাচারি জালেম শাসকদের মূল সাহায্যদাতা হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ইংলান্ড, জার্মান মত পাশ্চত্য দেশগুলি। এরাই মুসলিম বিশ্বে গণতন্ত্রের মূল শত্রু। তারা জানে স্বৈরাচারি শাসন বিলুপ্ত হলে রাজৈনতিক ক্ষমতা যাবে ইসলামপন্থিদের হাতে। তাতে বিশ্বব্যাপী উত্থান হবে ইসলামের। পাশ্চাত্য সেটি হতে দিতে রাজী নয়। আরব বিশ্বকে ২০ টুকরোর অধীক খণ্ডে বিভক্ত করেছে সে উত্থানকে রুখতে। ইসলামের উত্থান রুখার লক্ষ্যে পাশ্চাত্যের কাফের শক্তিবর্গের নির্ভরযোগ্য সাহায্যকারি হলো এসব স্বৈরাচারি শাসকগণ। তাদের প্রতিশ্রুতি পেয়েই স্বৈরাচারি শাসকগণ অতি নৃশংস হত্যাকান্ড করতেও পিছপা হয়না। এদের হাতেই নিহত হতে হলো সৌদি আরবের প্রখ্যাত লেখক ও কলামিস্ট জামাল খাসোগীকে। তাঁর দেহকে ইলেকট্রিক করাত দিয়ে টুকরো টুকরো করে কেটে অ্যাসিডে গুলিয়ে ড্রেনে মধ্যে গায়েব করা হয়েছিল। তাঁর অপরাধ, তিনি ছিলেন সৌদি সরকারের সমলোচক। তাঁর সে হত্যাকান্ড মার্কিনী যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের কাছে অপরাধ গণ্য হয়নি। বরং ইসলামের উত্থান রুখতে এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে হত্যাকান্ডে দক্ষতা ও নৃশংসতা দেখাতে পারলে ইসলামের এ আন্তর্জাতিক শত্রুপক্ষ প্রয়োজনীয় অস্ত্র এবং অর্থ দিতেও রাজী। তারই নমুনা, ইয়েমেনে সেরূপ এক নৃশংস হত্যাকান্ড চালিয়ে যেতে বিপুল অস্ত্র পাচ্ছে সৌদি আরব। আন্তর্জাতিক মহলে সে নৃশংসতার বিরুদ্ধে নিন্দা জানানোরও উপায় নেই। তাদের অধিকৃতি সেসব মহলেও। মিশর থেকে ইসলামপন্থিদের নির্মূলে জেনারেল আল-সিসির সরকার যেরূপ লাগামহীন যুদ্ধে নেমেছে তাতেও তারা সর্বপ্রকার সাহায্য দিচ্ছে। এখন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের গলা টিপে হত্যায় হাত বাড়িয়েছে লিবিয়া এবং সুদানে। সে কাজে তাকে সহায়তা দিচ্ছে সৌদি আরব, আরব আমিরাতসহ গণতন্ত্রবিরোধী আন্তর্জাতিক চক্র। বস্তুতঃ প্রেসিডেন্ট মুরসী হত্যাকান্ডটি স্রেফ কোন ব্যক্তি বিশেষের হত্যা নয়, এটি মধ্যপ্রাচ্যে গণতন্ত্র হত্যার একটি সুদূরপ্রসারি ষড়যন্ত্র। এ ষড়যন্ত্রের মূল লক্ষ্য মুসলিম বিশ্বে ইসলামের বিজয়কে প্রতিহত করা। তাই এর সাথে শুধু জেনারেল সিসির সরকার জড়িত  নয়, জড়িত তার আন্তর্জাতিক মিত্রগণও। ১৯/৬/২০১৯  




মানসিক রোগীর হাতে দেশ হাইজ্যাকের বিপদ এবং বিপন্ন বাংলাদেশ

মানসিক রোগীর নৃশংসতা

মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি যে কীরূপ ভয়াবহ বিপদ ঘটাতে পারে তারই প্রমাণ হলো, ২০১৫ সালে জার্মান উইঙ্গস বিমান কোম্পানীর ১৪৯ যাত্রীর করুণ মৃত্যু। এটি ছিল পরিকল্পিত হত্যাকান্ড। ঘটনাটি বিশ্বময় প্রচার পায়। জার্মান চিকিৎস্যকের কাছ থেকে প্রমাণ মেলে, বিমানের কো-পাইলট এ্যাড্রিয়াস লুবিটজ ছিল মানসিক রোগী। সে রীতিমত মানসিক রোগের চিকিৎস্যা নিত। তার রোগটি ছিল ডিপ্রেশন। ডিপ্রেশনের কারন,যে মেয়ে বান্ধবীকে সে বিয়ে করার স্বপ্ন দেখেছিল সে তার সঙ্গ ত্যাগ করে। সঙ্গি হারানোর বেদনায় লুবিটজ এতটাই বিমর্ষ হয়ে পড়ে যে তার মগজে আত্মহত্যার চিন্তাও বার বার হানা দিতে শুরু করে।অবশেষে সে আত্মহত্যার পথই বেছে নেয়। তবে সাথে ১৪৯ বিমান যাত্রীকে সাথে নিয়ে -যার মধ্যে ছিল বেশ কিছু স্কুল ছাত্র যারা জার্মানী থেকে স্পেনে শিক্ষা সফরে গিয়েছিল। যার নিজের জীবন বাঁচানোর ভাবনা নেই,তার কাছে কি অন্যদের জীবন বাঁচানোর বিষয়টি গুরুত্ব পায়? কো-পাইলট এ্যাড্রিয়াস লুবিটজ’য়ের কাছে তাই কে শিশু,কে বালক,কে নারী বা কে নিরীহ যাত্রী -সে ভাবনা গুরুত্ব পায়নি।তার লক্ষ্যটি ছিল নিজের মৃত্যুর সাথে অন্যদের মৃত্যু ও দুঃখকেও বাড়িয়ে দেয়া।

দৈহীক বিকলাঙ্গতায় রোগীর ভাল কাজের সামর্থ্য যেমন লোপ পায়,তেমনি লোপ পায় ক্ষতির সামর্থ্যও। কিন্তু মানসিক বিকলাঙ্গতায় অন্যকে ক্ষতি করা -এমনকি হত্যা করার শারিরীক সামর্থ্যটি পুরাপুরি থেকে যায়। ফলে তারা সমাজে চলাফেরা করে ভয়ানক হিংস্র জীব রূপে। তাদের হিংস্রতা অনেক সময় হিংস্র পশুকেও হার মানায়। এককালে এমন মানসিক রোগীদেরকে তাই মানসিক হাসপাতালে বন্দী রাখা হতো।চিকিৎস্যা শাস্ত্রের উন্নতির কারণে এখন তাদেরকে নিজ ঘরে চিকিৎস্যা দেয়া হয়। ফলে তারা সমাজে স্বাধীন ভাবে বসবাসের সাথে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে চাকুরি-বাকুরিও করে। কিন্ত্র সমস্যা সৃষ্টি হয় নিয়মিত চিকিৎসা নেয়া নিয়ে। কলেরা, ম্যালেরিয়া বা নিউমোনিয়ার রোগী চিকিৎসা নিলে যেরুপ পুরাপুরি সুস্থ্য হয়ে উঠে মানসিক রোগীদের ক্ষেত্রে সেটি ঘটে না। এরূপ মানসিক রোগভোগ তো আজীবনের। চিকিৎসাও তাই নিতে হয় আজীবন। কিন্তু সমস্যা হলে মানসিক রোগীদের নিয়মিত চিকিৎসা নেয়ার আগ্রহ থাকে না। চিকিৎসার গুরুত্ব বোঝার সামর্থও তাদের লোপ পায়। ফলে তারা সমাজে বাস করে ভয়ানক রোগ নিয়েই। এমনি এক রোগ হলো ডিপ্রেশন। ডিপ্রেশনের রোগীদের জীবন বড়ই নিরানন্দ। জীবনে আনন্দ বা সুখবোধ তাদের থাকে না। বাইরের রূপটি যতই চাকচিক্যের হোক,তাদের মনের গভীরে সব সময়ই বিষন্নতার ভাব। আর অন্যদের জন্য এখানেই বিপদ। যারা জীবনে সুখ পায় না তারা বরং অপরের সুখে আরো বিমর্ষ ও ইর্ষাকাতর হয়।অন্যদের আনন্দঘন জীবন দেখে তাদের দুঃখের মাত্রাটি আরো বেড়ে যায়। এমন মুহুর্তে অন্যকে দুঃখ দেয়া বা আঘাত দেয়ার মধ্যে তারা তৃপ্তি খুঁজে পায়। চিকিৎস্যা শাস্ত্রের ভাষায় এটিই হলো স্যাডিজম। সমাজে এরূপ মানসিক রোগীরাই চোর-ডাকাত ও সন্ত্রাসী হয়,এবং নানারূপ অপরাধ জগতে ঢুকে। এবং রাজনীতির অঙ্গণে তারা প্রচন্ড স্বৈরাচারি, অত্যাচারি ও গণহত্যার নায়ক হয়।জার্মান উইঙ্গস কোম্পানীর যে বিমানটি ডিপ্রেশের রোগী এ্যাড্রিয়াস লুবিটজ চালনা করছিল সে বিমানের ১৪৯ জন যাত্রীদের অনেকেই ছিল টুরিস্ট -যারা স্পেনে গিয়েছিল তাদের আপনজনকে নিয়ে প্রমোদ ভ্রমনে। তাদের মাঝেও প্রচুর আনন্দ ছিল। বিমানে ছিল জার্মান স্কুলের কিছু আনন্দমুখর তরুন ছাত্র। বিমানের মধ্যে তাদের আনন্দধ্বনি নিশ্চয়ই লুবিটজের বিমর্ষ মনকে আরো বিষিয়ে তোলে।ফলে শুধু নিজের আত্মহননের নেশাই বাড়েনি,বেড়েছে অন্যদের জীবননাশের নেশাও। সে নৃশংস ঘটনাটিই সে ঘটালো বিমান বিধ্বস্ত করে। আরো বিপদ হলো,দৈহীক পঙ্গুত্ব যেরূপ সচরাচর চোখে ধরা পড়ে,মানসিক পঙ্গুত্বটি সে রূপ ধরা পড়ে না। মনের গভীরে রোগটি লুকিয়ে রাখা যায়। হিংস্র বাঘ-ভালুক থেকে মানুষ তাই সাবধান হতে পারলেও পাশের অসুস্থ্য ও হিংস্র মানুষ থেকে সাবধান থাকার সুযোগ থাকে না। কো-পাইলট এ্যাড্রিয়াস লুবিটজের রোগটি তাই জার্মান উইঙ্গস বিমান কোম্পানির কর্তৃপক্ষ টের পায়নি। টের পায়নি তার সহকর্মী পাইলটও। তাই অবাধ সুযোগ পায় শুধু নিজের আত্মহত্যার নয়,বরং যাত্রীভর্তি বিমান নিয়ে ফান্সের আল্পস পর্বতমালায় গিয়ে আঘাত হানার।ফলে জার্মানীর বনের সকল হিংস্র পশুগুলি বিগত শত বছরে যত মানুষ হত্যা করতে পারিনি, লুবিটজ একাই তা করে দেখালো।

মানসিক রোগীর রাজনৈতিক নৃশংসতা

মানসিক রোগীরা যে শুধু বিমানের পাইলট হওয়ার সুযোগ পায় তা নয়,সুযোগ পায় এমনকি দেশের রাজা,প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্ট হওয়ারও। তাদের পাইলট হওয়াতে বড় জোর কয়েক শত যাত্রীর জীবননাশ হয়,কিন্তু দেশের শাসক হওয়াতে প্রাননাশ হয় লক্ষ লক্ষ মানুষের। তারা আবির্ভুত হয় নৃশংস স্বৈরাচারি শাসক রূপে। তখন দেশে যুদ্ধ বা গৃহযুদ্ধ শুরু করে। আত্মঘাতি সে শাসকের হাতে তখন রাষ্ট্রের পুরা সেনাবাহিনী,পুলিশ,আদালত,প্রশাসন ও রাজনৈতিক ক্যাডার বাহিনী আত্মহননের নৃশংস হাতিয়ারে পরিণত হয়। বাংলাদেশে শেখ হাসিনার হাতে দেশ অধিকৃত হওয়ায় অবিকল সেটিই ঘটেছে। তাছাড়া শেখ হাসিনার মানসিক রোগটি তো প্রকট। যে বেদনার কারণে জার্মান কো-পাইলট লুবিটজ ডিপ্রিশনের রোগী সেটি শধু তার প্রেমিকা হারানোর। কিন্তু হাসিনা গভীর বেদনাটি হলো তারা পিতা,মাতা,ভাইসহ পুরা পরিবার হারানোর। তার অফিস,তার গৃহ,তার জীবনযাপনের প্রতিটি অঙ্গণ প্রাণহারানো সে আপন জনদের ছবিতে পরিপূর্ণ। ফলে নিদারুন দুঃখ নিয়েই তার বসবাস। প্রতিমুহুর্তে তার মগজে যা হানা দেয় তা হলো তার মৃত আপনজনদের স্মৃতি। এমন স্মৃতি যদি শেখ হাসিনার মনে ভয়ানক মানসিক রোগের জন্ম না দেয় তবে বুঝতে হবে সে হয় উদ্ভিদ বা গরুছাগল,স্বাভাবিক মানুষ নয়।উদ্ভিদ বা গরু-ছাগলের পাশে আপন কেউ জবাই হলেও প্রতিক্রিয়া হয় না। গরু তখনও অবিরাম ঘাষ খায়,উদ্ভিদ তখনও শান্ত থাকে। কিন্তু মানুষ তো প্রতিশোধ পরায়ন হয়। এমন প্রতিশোধ পরায়ন মানুষের সুস্থ বিচারবোধ থাকে না। আপনজন হারানো এমন বিপর্যস্ত মানুষটি দেশের কোন গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকলে জনস্বার্থে যে কোন সভ্যদেশে তাকে তৎক্ষনাৎ কাজ থেকে অব্যাহতি দিয়ে ঘরে পাঠিয়ে দেয়া হয়,এমন মানষিক রোগবিশেষজ্ঞের দায়িত্বে রাখা হয়।

বাংলাদেশের মানুষের সামনে ভয়ানক বিপদের কারণ,দেশটির পাইলটের সিটে এখন শেখ হাসিনার ন্যায় প্রতিশোধকামী এক ভয়ানক মানসিক রোগী।তাছাড়া শেখ হাসিনার মানসিক রোগটি কি এখনও কোন গোপন বিষয়? প্রতিটি রোগেরই সিম্পটম আছে,এবং সে সিম্পটম থেকেই সনাক্ত হয় তার রোগ। নিউমোনিয়া বা ম্যালেরিয়া হলে শরীরে তাপ উঠবেই। তেমনি মানসিক ভাবে কেউ অসুস্থ্য হলে তার আচরণও লক্ষণীয় রূপে পাল্টে যাবেই। সে তখন স্বাভাবিক ও সুস্থ্য আচরনের সামর্থ হারায়। হারায় বিচারবোধও। পাগলের রোগ নির্ণয়ে তাই ল্যাবরেটরিতে পাঠানো লাগে না। স্কুলের শিশুরাও সেটি বুঝে। ঢাকার শাপলা চত্বরে হিফাজতে ইসলামের নিরস্ত্র জমায়েত রুখতে যে নেত্রী হাজার হাজার সৈনিক,ট্যাংক,গোলাবারুদ ও মেশিন গান পাঠাতে পারে ও হাজার হাজার মানুষকে হতাহত করতে পারে সে কি মানসিক ভাবে আদৌ সুস্থ্য? মানব ইতিহাসের কোন কালেই কি কোন সুস্থ্য নেতার পক্ষ থেকে এমন ঘটনা ঘটেছে? নয় মাসের যুদ্ধ ছাড়া পাকিস্তান আমলের ২৩ বছরের রাজনীতিতে যত লাশ পড়েছে তার চেয়ে বেশী লাশ পড়েছে শাপলা চত্বরে ২০১৩ সালে ৫ই মে’র ভয়াল রাতে। সেটি এই অসুস্থ্যতার কারণে। দলীয় কর্মীদের লগি-বৈঠা নিয়ে কর্মীদের রাস্তায় নামতে বলা এবং এক লাশের বদলে দশ লাশ ফেলতে বলা কি মানসিক সুস্থ্যতার লক্ষণ? যে ব্যক্তি দেশের বিরোধী দলগুলোর অফিসে তালা ঝুলাতে পারে এবং বিরোধী দলীয় নেত্রীর গৃহের সামনে বালুভর্তি ট্রাক পাঠাতে পারে তার মানসিক অসুস্থ্যতা নিয়ে কি সন্দেহ জাগে? যে নির্বাচনে শতকরা ৫ ভাগ মানুষও অংশ নিল না সেটিকে যে ব্যক্তি সুষ্ঠ নির্বাচন বা গণতন্ত্র বলে -তার বিচার ক্ষমতা যে পূর্ণভাবে লোপ পেয়েছে তা নিয়েও কি সন্দেহ জাগে? মানসিক রোগের এরূপ অসংখ্য লক্ষণ নিয়ে শেখ হাসিনা বাংলাদেশে রাজনৈতিক অঙ্গনে দিনের পর অঘটন ঘটিয়ে চলেছে। যে ব্যক্তির বসবাস হওয়া উচিত ছিল কোন মানসিক হাসপাতালে,সে এখন বাংলাদেশ সরকারের ড্রাইভিং সিটে। পুরাদেশ তাই হাইজ্যাক হয়ে গেছে তার মত ক্রদ্ধ পাগলীর হাতে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বর্তমান বিপর্যয় ও হানাহানি মূল কারণ,শেখ হাসিনার এ ভয়ানক মানসিক অসুস্থ্যতা। এমন মানসিক অসুস্থ্যতা নিয়ে আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা নবীজী (সাঃ)র চাচা এবং ওহুদ যুদ্ধের সেনাপতি হযরত হামযা (রাঃ)র কলিজা চিবিয়েছিল।হিন্দার মানসিক অসুস্থ্যতার কারণ,হাসিনার মত সেও সে তার পিতা ও ভাইকে হারিয়েছিল। এবং সেটি এক বছর আগে সংঘটিত বদরের যুদ্ধে। তার পিতার মৃত্যু ঘটেছিল হযরত হামযা (রাঃ)র হাতে।

মটিভ ভারতীয় স্বার্থের পাহারাদারি

বাংলাদেশের রাজনীতিতে হিন্দার বেশে আবির্ভূত হয়েছে শেখ হাসিনা।তার রাজনীতির মূল অভিপ্রায় দেশের ইসলামপন্থি নেতাদের ফাঁসিতে ঝুলানো। কারণ,প্রধান ইসলামপন্থি দল জামায়াতে ইসলামিই অতীতে তাকে প্রধানমন্ত্রী হতে বাধা দিয়েছে এবং ভবিষ্যতেও তার রাজনীতির মূল বাধা হয়ে থাকবে। তাই ইসলামি নেতাদেরকে লাশে পরিণত করা তার রাজনৈতিক লক্ষ্য। স্বৈর শাসনের আমলে শুধু যে গণতন্ত্রের মৃত্যু ঘটে তা নয়,কবরে যায় ন্যায়বিচারও। শেখ হাসিনার আক্রোশ শুধু ১৯৭৫য়ের বিপ্লবের নায়কদের বিরুদ্ধে নয়,সেটি বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের বিরুদ্ধেও। আক্রোশ এমনকি তার নিজ দলের নেতাদের বিরুদ্ধেও।জনগণের বিরুদ্ধে হাসিনার আক্রোশের কারণ,তার পিতার মৃত্যুর দিনটিতে তারা রাস্তায় শোক মিছিল করেনি। জানাযা বা গাযেবানা জানাজাও পড়েনি। বরং রাস্তায় নেমে প্রচন্ড আনন্দ করেছে,মিষ্টি বিতরনও করেছে। আর দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে আক্রোশের কারণ,তারা তার পিতার লাশকে সিঁড়িতে ফেলে খোন্দকার মোশতাকের মন্ত্রীসভার মন্ত্রী হতে ভিড় করেছে।আরো ক্ষোভ,শেখ মুজিবের মৃত্যুতে যে আব্দুল মালিক উকিল বলেছিলেন “ফিরাউনের মৃত্যু হয়েছে” তাকে তারা দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি বানিয়েছে। ফলে শেখ হাসিনার গভীর ষড়যন্ত্র খোদ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধেও। যারা সাডিস্ট তারা ব্যক্তি জীবনে বড্ড দুঃখী। তারা কারোই সুখ সহ্য করতে পারে না। তারা চায় অন্যরাও তাদের ন্যায় গভীর দুঃখে হাবুডুবু খাক। সে রোগটাই হাসিনার মুল রোগ। আর সেটিই ভয়াবহ অকল্যাণ এনেছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে। ডিপ্রেশন রোগী সর্বদাই আত্মমুখি হয়। তার ভাবনা শুধু তার নিজের সুখ বিবর্জিত জীবন নিয়ে। সমাজ ও দেশের কল্যাণের ভাবনা তার থাকে না। তাই শেখ হাসিনাও তাই আত্মমুখি,তার রাজনীতির মূল অঙ্গিকার একমাত্র তার নিজের ও নিজ পরিবারের প্রতি। স্বৈরাচারিদের সেটিই চিরাচরিত রীতি। শেখ হাসিনা তাই পরিকল্পিত ভাবেই বাংলাদেশের মাটিতে আওয়ামী লীগের সাধারণ নেতাকর্মীদের ভবিষ্যতে শান্তিতে বেঁচে থাকায় অসম্ভব করছে। ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিব মারা গেলেও তার দল বেঁচে গিয়েছিল। কিন্তু শেখ হাসিনা ক্ষমতা থেকে অপসারিত হলে এবার মারা পড়বে খোদ আওয়ামী লীগ ও তার বহু নেতাকর্মী। পুলিশী প্রটেকশন না পেলে তার কোন মন্ত্রী কি রাস্তায় একাকী চলাচল করতে পারে? শেখ হাসিনারও কি সে সাহস আছে? হিটলারের মৃত্যুর পর তার দল বাঁচেনি,তার দলের নেতৃবৃন্দও বাঁচেনি। অনুরূপ পরিণতি যে আওয়ামী বাকশালীদের জন্যও অপেক্ষা করছে তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে? স্বৈরাচারি শাসকদের সাথে তো সেটিই ঘটে।

আওয়ামী বাকশালীদের জন্য এখন বসন্ত কাল। কিন্তু এরূপ বসন্তকাল কি চিরকাল থাকে? আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা না বুঝলেও সেটি তাদের অভিভাবক ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থা ও দিল্লির শাসক চক্র বুঝে। তাই নির্বাচনে যে কোন মূলে তারা শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় রাখতে চায়।তাই তাদের লক্ষ্য,বাকশালীদের এ বসন্তকালকে বাঁচিয়ে রাখা। বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও যে ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদের শত্রু আছে -সেটি ভারতের অজানা নয়। ভারতের লক্ষ্য,হাসিনাকে দিয়ে ভারতীয় আধিপত্যাবদের যারা বিরোধী তাদের দ্রুত নির্মূল। এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদ-বিরোধী রাজনীতিকে দ্রুত নেতাশূণ্য করা –বিশেষ করে দেশের ইসলামপন্থি শিবিরে। সে সাথে দেশকে দ্রুত ডি-ইসলামাইজড করা। তাই নির্বাচনে কেউ ভোট দিক বা না দিক -সেটি ভারতীয়দের কাছে আদৌ কোন প্রশ্ন নয়।তারা নির্বাচনের তোয়াক্কা করে না। তারা চায়, বাংলাদেশের সরকারে যে ব্যক্তিটি ক্ষমতায় থাকবে সে ব্যক্তিকে অবশ্যই ভারতের অনুগত দাস হতে হবে। ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবের মৃত্যুর পর হাসিনাকে সে উদ্দেশ্যেই দিল্লিতে রেখে নিজ দায়িত্বে প্রতিপালন করেছে এবং গভীর ভাবে পোষ মানিয়েছে। এখন ভারত তাকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে চায় নিছক নিজ স্বার্থে। লক্ষ্য,হাসিনাকে দিয়ে ভারত-বিরোধীদের নির্মূলে সমগ্র রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের ব্যবহার। বাংলাদেশ দুর্বল হলেই তো তাদের লাভ। এবং শক্তি বাড়লেই তাদের ক্ষতি। বাংলাদেশ ১৬ কোটি মানুষের দেশ। ১৪শত বছর পূর্বের মদীনার ন্যায় এটি সামান্য গ্রাম নয়,বরং বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম রাষ্ট্র। মদীনা থেকে যদি বিশ্বের প্রধান বিশ্বশক্তির উদ্ভব ঘটতে পারে, আড়াই কোটি মানুষের দেশ আফগানিস্তানও যদি সোভিয়েত রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে হারাতে পারে তবে বাংলাদেশই বা দুর্বল কিসে? ভারতের এখানেই ভয়। তাই শুধু পাকিস্তানের নয়,বাংলাদেশের কোমর ভাঙ্গাও ভারতের মূল নীতি। সেটির প্রমাণ মেলে একাত্তরেই। বাংলাদেশকে দুর্বল করতেই ১৯৭১য়ে তারা বাংলাদেশ লুন্ঠনে নামে।সে সময় ঢাকা, চট্রগ্রাম,কুমিল্লা,যশোর,বগুড়া ও সৈয়দপুরের ক্যান্টনমেন্টে তীরধনুক ছিল না,ছিল হাজার হাজার কোটি টাকার অস্ত্র যা মাত্র ১৭ দিনের যুদ্ধে প্রায় পুরাটাই অব্যবহৃত রয়ে গিয়েছিল। সে অস্ত্র কেনায় বেশীর ভাগ অর্থ জুগিয়েছিল পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক বাঙালী মুসলমানগণ। অথচ ভারতীয় সেনাবাহিনী সে অস্ত্র বাংলাদেশে রেখে যায়নি। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বরের পর বাংলাদেশ ভারতের কাছে স্বাধীন দেশ রূপেও গণ্য হয়নি -এ হলো তারই প্রমাণ। বরং গণ্য হয়েছে অধিকৃত দেশ রূপে,আর পূর্ব পাকিস্তানের যুদ্ধাস্ত্র গণ্য হয়েছে গণিমতের মাল রূপে। ভারতীয়গণ তাই সমুদয় অস্ত্রই নিজ দেশে নিয়ে যায়। অথচ সে অস্ত্র লুন্ঠন নিয়ে হাসিনা কোন অভিযোগ তোলে না। শেখ মুজিবও তা নিয়ে কোন কালে অভিযোগ তোলেনি। মেজর আব্দুল জলিল তা নিয়ে প্রতিবাদ করায় সেনাবাহিনীর চাকুরি হারিয়েছিলেন। ভারতের রাজনৈতিক লক্ষ্যের সাথে হাসিনা ও তার পিতার রাজনৈতিক লক্ষ্যটিও যে এক ও অভিন্ন –এ হলো তার প্রমাণ।

পরিকল্পনা দেশধ্বংসের

আত্মহননেও পরিকল্পনা লাগে। তেমনি দেশধ্বংসেও পরিকল্পনা লাগে। সেরূপ পরিকল্পনা শেখ হাসিনার বহু। সে পরিকল্পনার অংশ রূপেই শেখ হাসিনা বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প পদ্মা সেতুর নির্মানকে বহু বছরের জন্য পিছিয়ে দেয়। অথচ বিশ্বব্যাংক থেকে পদ্মাসেতুর জন্য বিশাল অংকের অর্থ বরাদ্দ হয়েছিল আজ থেকে ২০১০ সালে । এতদিনে সে সেতুর উপর দিয়ে যান চলাচল শুরু হয়ে যেত। দেশে অশান্তি ও গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতিও সৃষ্টি করা হচ্ছে অতি পরিকল্পিত ভাবে। শেখ মুজিবও পরিকল্পিত ভাবে দেশকে তলাহীন ঝুড়ি বানিয়েছিল। সে পরিকল্পনার অংশ রূপে দেশের সীমানা ও দেশী বাজার ভারতের জন্য খুলে দেয়। শুরু হয় অর্থপাচার,পণ্যপাচার ও পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত কলকারখানার যন্ত্রপাচার। এমনকি পাচার হয়ে যায় বিদেশীদের দেয়া রিলিফের সামগ্রীও। একাত্তরের আগে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানিকারক দেশে ছিল পাকিস্তান। সে পাট উৎপাদিত হতো তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে। ভারতকে হারিয়ে বিশ্ববাজারে সে অবস্থায় পৌছতে পাকিস্তান সরকারকে বহু বছর লেগেছিল। কিন্তু সে অবস্থান থেকে দ্রুত নীচে নামাতে মুজিব ও তার মোড়ল ভারতেরও বিশাল পরিকল্পনা ছিল। সেটি ছিল আদমজীর ন্যায় বিশাল বিশাল জুটমিলগুলোতে তালা ঝুলানো ও পাটের গুদামগুলিতে আগুন দেয়া। এতে ফল দাঁড়ালো,বিশ্বের সবচেয়ে বড় পাট রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হলো ভারত। এমন ষড়যন্ত্র লাগাতর চললে কি দেশের অর্থনীতি বাঁচে? জনগণের জীবনও কি বাঁচে? মুজিব আমলে তাই বাংলাদেশের অর্থনীতি বাঁচেনি। বরং সৃষ্টি হয়েছে ভয়ানক দুর্ভিক্ষ। একাত্তরের যুদ্ধেও এতো মানুষের মৃত্যু হয়নি যা হয়েছে মুজিবের সৃষ্ট দুর্ভিক্ষে। নারীরা সে সময লজ্জা নিবারণে মাছধরা জাল পড়তে বাধ্য হয়েছিল। অথচ সেরূপ অবস্থা পাকিস্তান আমলে যুদ্ধকালীন ৯ মাসেও সৃষ্টি হয়নি। অথচ সেটিই ছিল শেখ মুজিবের গড়া স্বপ্নের সোনার বাংলা! মুজিবের গড়া সে বাংলা নিয়ে শেখ হাসিনার আজও কত গর্ব! মুজিবের দুঃশাসন ১৯৭৫য়ে শেষ হয়ছে। কিন্তু আজও  শেষ হয়নি তার অসমাপ্ত মিশন। এবং শেষ হয়নি ভারতীয়দের বাংলাদেশ বিধ্বংসী ষড়যন্ত্রও। সে ষড়যন্ত্রকে পূর্ণতা দেয়া নিয়েই তো ভারতের সাথে শেখ হাসিনার কোয়ালিশন।

চালকের রুমে তালা

শেখ হাসিনার যেমন তার সফল ভোট ডাকাতি নিয়ে গভীর ভাবে তৃপ্ত,তেমনি তৃপ্ত তার অভিভাবক দেশ ভারতও। ডাকাতিলব্ধ দেশের পাইলটের সিটটি এখন হাসিনা ছাড়তে নারাজ। জার্মান বিমান চালক এ্যাড্রিয়াস লুবিটজ ভিতর থেকে চালকের রুমে তালা লাগিয়ে দিয়েছিল। মূল পাইলট বহু চেষ্টা করেও সে রুমে ঢুকতে পারিনি। যাত্রীভর্তি বিমান নিয়ে তাই সে সুযোগ পেয়েছে আল্পস পর্বতে আঘাত হানার। হাসিনাও তেমনি দেশের রাজনীতির কন্ট্রোল রুমে তালা লাগিয়ে দিয়েছে।যাকে ইচ্ছা তাকে ফাঁসি দিচ্ছে,যাকে ইচ্ছা তাকে ঘর থেকে উঠিয়ে নিয়ে গুম করে দিচ্ছে বা ক্রসফায়ারে দিয়ে হত্যা করছে। রাজনীতির ময়দানে বিরোধী দলগুলোর জন্য সামান্যতম স্থান ছাড়তেও রাজী নয়। স্বাধীন মিডিয়াকে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল,আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা,এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল,আন্তর্জাতিক হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ন্যায় বহু প্রতিষ্ঠানের কেউই তার পাইলটের সিটে প্রবেশাধিকার পাচ্ছে না। আত্মঘাতি পাইলটের ন্যায় সে দেশবাসীর প্রাণহননে নেমেছে। জার্মান কো-পাইলট লুবিটজ শুধু একটি বিমানকে প্রাণহননের হাতিয়ার বানিয়েছিল,আর শেখ হাসিনা দেশের পুলিশ,র‌্যাব,বিজিবি,আইন-আদালত ও পুরা প্রশাসনকে প্রাণহনের হাতিয়ারে পরিণত করেছে।জনগণের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেয়ার এটিই হলো নৃশংস স্বৈরাচারিতদের চিরাচরিত কৌশল। স্বজন হারানোর এমন প্রেক্ষাপটেই অতীতে নৃশংস চেঙ্গিজ খান ও হালাকু খানের জন্ম হয়েছে,এবং তাতে ভয়ানক গণহত্যা নেমে এসেছে পৃথিবীর বিশাল ভূ-ভাগ জুড়ে।তখন ধ্বংসপুরিতে পরিণত হয়েছে বাগদাদ,নিশাপুর, সমরকন্দ,বোখারার ন্যায় বহু সমৃদ্ধ নগরী।

 

জনগণের কি করণীয়?

জনগণের দায়ভারটি শুধু মানসিক রোগীদের হাত থেকে বিমানকে বা ট্রেনকে বাঁচানো নয়,দেশকে বাঁচানোও। এজন্য তাদেরকে শুধু হিংস্র বাঘ-ভালুককে চিনলে চলে না। চিনতে হয় হিংস্র মানসিক রোগীগুলোকেও। নইলে স্রেফ ক্ষমতায় যাওয়ার স্বার্থে তারা দেশে ভয়াবহ যুদ্ধ শুরু করতে পারে। দেশও পরাধীন ও খন্ডিত হতে পারে। ১৯৭১য়ে তো সেটিই হয়েছিল। বাংলাদেশের মানুষের বড় ব্যর্থতাটি মূলতঃ হিংস্র মানুষ চেনার ক্ষেত্রে।সে ব্যর্থতা যেমন ১৯৭০ নির্বাচনে হয়েছে,তেমনি ২০০৮ সালের নির্বাচনেও হয়েছে। যে মুজিব সিরাজ শিকদারকে হত্যার পর সংসদে দাড়িয়ে উল্লাস ভরে বলতে পারে,“কোথায় আজ সিরাজ শিকদার” বা কয়েক মিনিটে বহুদলীয় গণতন্ত্রকে কবরে পাঠিয়ে একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠা করতে পারে তার মানসিক অসুস্থ্যতা কি কম?  স্বৈরাচারি মুজিবের হাতে দেশ তো পুরাপুরি হাইজ্যাক হয়ে গিয়েছিল ১৯৭০য়ে নির্বাচনি বিজয়ের সাথে সাথেই। অবশেষে দেশ রক্ষা পায় ১৯৭৫ সালে এবং ফিরে আসে আবার মানবাধিকার। কিন্তু দেশ পুণরায় হাইজ্যাক হয়েছে আরেক হিংস্র মানসিক রোগীর হাতে। সেটি তারই কন্যার হাতে। প্রশ্ন,এখন করণীয় কী? করণীয় সেটাই যা জার্মান উইঙ্গসের হাইজ্যাককৃত বিমানের মূল পাইলট করেছিল। ব্লাক বকসের তথ্য থেকে জানা যায়,সে কুড়াল দিয়ে ককপিটের দরজা ভেঙ্গে ভিতরে ঢুকতে চেয়েছিল। চেয়েছিল বিমান চালানোর ড্রাইভিং সিট থেকে লুবিটজকে সরাতে এবং বিমান চালানোর দায়ভার নিজে নিতে। কিন্তু ইতিমধ্যে বড্ড দেরী হয়ে গিয়েছিল। বিপদের এরূপ মুহুর্তে সামান্য দেরী হলে এভাবেই ভয়ানক মৃত্যু নেমে আসে। ১৬ কোটি মানুষের বাংলাদেশও আজ  হাইজ্যাকের শিকার। ফলে ভয়ানক বিপদগ্রস্ত হলো ১৬ কোটি মানুষ। এ জিম্মিদশা থেকে মুক্তি দিতে হলে জনগণের দায়িত্ব হলো,যত শীঘ্র সম্ভব শেখ হাসিনাকে ক্ষমতার আসন থেকে সরানো। বিলম্ব হলে ভয়াবহ বিপদ নেমে আসবে সমগ্র বাংলাদেশীদের জীবনে। ইসলামে জিহাদের গুরুত্ব তো এজন্যই সর্বাধীক।কারণ,এরূপ বিপদ থেকে একমাত্র মু’মিনের জিহাদই রক্ষা করতে পারে।

নামায-রোযা,হজ-যাকাত মানব মনে মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণকে জাগরিত রাখার অতি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু হাইজ্যাককারিদের হাত থেকে নামায-রোযা,হজ-যাকাত বা দোয়া-দরুদ যেমন প্রাণ বাঁচায় না,তেমনি দেশও বাঁচায় না। বাঁচায় না দেশের স্বাধীনতাও। এবং প্রতিষ্ঠা আনে না মহান আল্লাহতায়ালার বিধানের। বাংলাদেশের কোটি মানুষের নামায-রোযা এবং তাবলিগী ইস্তেমার লক্ষ লক্ষ মানুষের দোয়াতে তাই স্বৈরাচারি জালেম শাসকের মসনদ একটুও হেলেনি। এরূপ পথ তাই ইসলামের নয়, নবীজী (সাঃ)র সূন্নতও নয়। জালেম শাসকের নির্মূলে মহান আল্লাহতায়ালার প্রেসক্রিপশন হলো জিহাদ। খোদ নবীজী (সাঃ)কেই তাই জায়নামায ছেড়ে জিহাদের ময়দানে নামতে হযেছে। নামায-রোযা,হজ-যাকাতে জানের কোরবানি নেই।অথচ জানের সে বিশাল কোরবানি আছে জিহাদে। আর ইবাদতের কদর তো বাড়ে কোরবানির বিশালতায়। জিহাদ এজন্যই ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত। একমাত্র এ ইবাদতটি পালনে প্রাণ গেলে বিনা হিসাবে তৎক্ষনাৎ জান্নাতপ্রাপ্তির গ্যারান্টি মেলে। তখন কবরের আযাব,রোজহাশরের ভয়,পুলসিরাতের বিপদ –এর কোনটাই থাকে না। থাকে না আলমে বারযাখে হাজার হাজার বছর অপেক্ষায় থাকায় পালা। মৃত্যুর পরপরই মহান রাব্বুল আলামীন তাঁর এ মহান সৈনিককে জান্নাত দিয়ে পুরস্কৃত করেন। দেন অতুলনীয় খাদ্যসম্ভার। জিহাদ এবং জিহাদের ময়দানে শাহাদত তাই মু’মিনের জীবনে সবচেয়ে বেশী কাঙ্খিত। মহান সাহাবায়ে কেরামদের কাছে সবচেয়ে পছন্দের পথ ছিল তাই জিহাদ ও জিহাদের ময়দানে শাহাদত লাভ। শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবা তাই আল্লাহর পথে জিহাদে শহীদ হয়েছেন। মুসলিম দেশগুলিতে ইসলাম আজ  যেরূপ পরাজিত তার কারণ মসজিদ-মাদ্রাসার কমতি নয়, বরং জিহাদের অনুপস্থিতি। যারা সরাসরি জান্নাতে পৌঁছার পথ খোঁজে,তারা সবাই প্রতিনিয়ত জিহাদের ময়দান খোঁজে।তাই বিশ্বের চলমান বিশুদ্ধ জিহাদের ময়দানগুলিতে নানা দেশ ও নানা ভাষার মানুষের এত ভিড়। বাংলাদেশে আজ যে শয়তানী শক্তির অধিকৃতি তা থেকে মুক্তির এটিই একমাত্র পথ। বিগত ১৪শত বছরের ইতিহাসে জালেম শাসকের নির্মূলে কোনকালেই এ ছাড়া ভিন্ন পথ ছিল না।গতানুগতিক রাজনীতির পথে যে মুক্তি নাই -সেটি ইতিমধ্যে প্রমানিত হয়ে গেছে। বাংলাদেশে এ যাবত বহু আন্দোলন হয়েছে। তাতে কেবল জান ও মালের খরচ বেড়েছে। এবং বহু সরকারের পতনও হয়েছে। কিন্তু তাতে কি ইসলামের প্রতিষ্ঠা এক শতাংশও বেড়েছে? জুটেছে কি স্বাধীনতা। বেড়েছে কি শান্তি? বরং এসব আন্দোলনে শক্তিশালী হয়েছে ইসলামের শত্রুপক্ষ। একাত্তরে বিরাট যুদ্ধ হলো,অথচ দেশ অধিকৃত হলো কাফের শত্রু শক্তির হাতে। এবং ক্ষমতায় বসলো গণতন্ত্রের ভয়ানক শত্রু।এতে কবরে গেল মত প্রকাশ ও দল গঠনের স্বাধীনতা।সে সাথে কবরে গেল দলীয় রক্ষিবাহিনীর হাতে ৩০ হাজারের বেশী মানুষ।

তাছাড়া স্রেফ নির্বাচন,ভোটদান,জনসভা,মিছিল,হরতাল বা অবরোধ পালনের মধ্য দিয়ে কি জিহাদ পালিত হয়? পালিত হয় কি পরিপূর্ণ ইসলাম। তাতে থাকে কি মহান আল্লাহতায়ালার রাস্তায় জান কোরবানির প্রেরণা? এগুলি কি নবীজী (সাঃ)র দেখানো পথ? জিহাদ হবে স্রেফ মহান আল্লাহতায়ালার রাস্তায়। জিহাদের লক্ষ্য স্রেফ কোন ইসলামি দলকে নির্বাচনে বিজয়ী করা নয়। সংসদে কিছু দলীয় ব্যক্তির সদস্য পদ পাওয়াও নয়। নিছক কোন ইসলামপন্থি ব্যক্তির মুক্তি নিয়ে আন্দোলনও নয়। লক্ষ্য এখানে বিশাল। সেটি হলো সকল প্রকার দুর্বৃত্ত ও ইসলামের শত্রুপক্ষের নির্মূল এবং সে সাথে মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়তি বিধানের পরিপূর্ণ প্রতিষ্ঠা। মু’মিনের অর্থদান,শ্রমদান ও আত্মদান এ জিহাদে অপরিহার্য। এছাড়া অন্য কোন কর্মসূচি কি কোন কালে মুসলিমের জীবনে অধিক গুরুত্ব পেতে পারে? ১২/০৪/২০১৫

 

 




Murder of President Morsi & Death of Democracy in Egypt

The premeditated murder

Allowing an ill person to die in prison without medical care is itself a homicidal crime. Such death is never called natural death, rather a deliberate murder. It is indeed a horrendous punishable crime; those who are responsible for it must face the punishment. Such a crime has exactly been committed against Dr Muhammad Morsi by Egypt’s brutal dictator President Abbel Fattah al-Sisi. In 2013, within one year of the election, al-Sisi removed Dr Muhammad Morsi from the Presidency by a military coup. So, al-Sisi committed another punishable crime by removing the country’s first and the only elected President to grab power for himself.

Dr Morsi was known for diabetes and liver disease which required regular investigation and treatment. Any criminal negligence could only precipitate his premature death. It was his basic human right to have the necessary medical care. The Egyptian law and the international law make it an obligatory duty of the Egyptian government to provide such care. But an established killer doesn’t care about the legal obligation. Otherwise how could he make a coup and kill the people? Hence deprivation of Dr Morsi’s medical care became a reality. Thus, he was forced to die without the treatment. Whereas, his treatment need was so crucial that once he collapsed in his prison cage inside the court because of low blood sugar. In fact, an enemy like al-Sisi could only ignore the treatment and wished his early death. 

 

The pure evil

One can seldom expect any kindness, morality or humanity from a proven mass-murderer, let alone medical care. Al-Sisi deployed the Army to massacre about 1,500 people in Raba al-Adawiya square in Cairo on 14th August in 2013. Whoever luckily survived were put in prisons only to suffer further thuggish torture – both physically and mentally. The fake courts were staged to put people on death penalty in mass. The western government didn’t show any interest to stop such brutality of this new Pharaoh. In fact, none of the western governments showed any appetite to look into this massive gruesome cruelty. Rather, the western leaders were seen to rub their shoulders with these brutal killer in Washington, Paris, Rome, Berlin and many other western capitals. Thus they stay complicit in the crime by supporting al-Sisi to practise his worst fascism against the Egyptian opposition. Only a British MP named Crispin Blunt -the ex-head of the House of Commons’ Selects Committee on Foreign Affairs, agreed to make a short visit in 2018 to Egypt –only while he was approached by Dr Morsi’s helpless family. The family were desperate to know what is going on to Dr Morsi’ health. Al-Sisi was not ready to give such an opportunity to the family or any native Egyptian. The cruelty, inhumanity and immorality of al-Sisi is so extreme that Dr Morsi was allowed to see his family only three times in almost 6 years period.

At the end, Mr Blunt could tell some bare truths in his report on horrendous sufferings of Dr Morsi. He found that Dr Morsi was being deprived of necessary medical care -as entitled as per Egyptian and International law. Mr Blunt predicted that Dr Morsi will die prematurely if he continues to suffer such dire deprivation of the medical care. The Conservative British Government of Theresa May didn’t take any heed from such a highly alarming report, rather preferred to sell more arms to feed al-Sisi’s killing machine. The other leaders of the western governments that lecture on human rights and higher values continued to do the same. Whereas, if the report was timely and properly pursued, Dr Morsi would have survived the easily preventable death from diabetes and its complication. Since the Islamists are considered foes by the Islamophobic west, the western leaders too, like their friend al-Sisi, wished Dr Morsi’s quick death and not a cure. As a result, Dr Morsi had no option but to face a premeditated murder. Whereas the same western leaders embrace the Marxist YPG of Syria and the leftist Mujahedin-e-Khalq of Iran –who have been involved in the terrorist killings of thousands, as friends of the west to promote their agenda in the Muslim World.   
 

The disease & the pathology

While deciding the political priority in the developing countries –especially in the Muslim countries, the western leaders drop issues like humanity, morality, liberty, rule of law and democratic values deep into the bins. They stand only for their selfish whims and strategic interests. Therefore, while supporting the killer regime of al-Sisi in Egypt or the brutal autocrats of Saudi Arabia, UAE, Bahrain and others, the morality, humanity and other higher values do not work. Rather, these killer regimes look perfectly compatible with their own western imperialistic ideas and values. However, these are only the symptoms of the western disease; the real disease with its inherent pathology lies much deeper. The disease is radical secularism that kills people’s faith, spirituality and accountability in the hereafter. And the hidden pathology lies in the absence of faith in Allah –the Almighty Creator and the lack of sense of accountability in the hereafter. Such an evil pathology could prompt people to generate evil ideologies to commit and sanctify even the worst crimes. So the west –the birth place of secularism, could give birth to toxic ideologies like racism, nationalism, colonialism, apartheidism, imperialism, slavery, ethnic cleansing and even genocide –which have always been incompatible with any Divine faith of the east. They could also do the gruesome practice of these evil ideologies and could manufacture even two World Wars to kill more than 75 million people. They even could drop nuclear bombs without any moral remorse.

During the colonial occupation, the European secularists with their moral diseases moved from the birth place to the occupied lands in the east –birth place of all Divine religions. As a result, they could disseminate the western disease to the eastern people –especially among those who closely worked with them and received their secular education and training. So the worst and the most brutal people in the Muslim world are born neither in robbers’ dens nor in brothels’ wombs, but in the military cantonments and in secular institutions.

In the Muslim lands, the Army cantonments worked as the most fortified cultural islands of the radical secularists and gave zero access to Islamic ideology and culture. So they could emerge as the worst enemy of Islam in Muslim lands. In almost every Muslim country, they have proven to be fully incompatible with ideology of Islam and could be close friend of the imperialists. For example, those who are considered the role model in Pakistan Army -like General Ayyub, Yahiya, Tikka, Niazi didn’t join the Army to serve the Muslims or Islam, but to defend and strengthen the British occupation of the Muslim lands. In 1947, the colonial occupation ended in Indian subcontinent, but the secular belief and culture continued to thrive in the protected and secluded premises of the military cantonments. So the ideologically incompatible military elites trained in the secular cantonments could successfully dismantle the Islamic project of the Indian Muslims in Pakistan. And in 1971, because of their political incompetence they could also dismember the united Pakistan.

Any physical disease like malaria or pneumonia shows similar symptoms all over the world. The same is true with the moral disease. So, the Army raised by the colonial occupiers are showing the same enmity against Islam in Pakistan, Bangladesh, Egypt, Syria, Sudan, Algeria, Libya and other Muslim countries. In Egypt, their toxic venom against Islam and Muslim Brotherhood has made dark pages of extreme barbarity in the Muslim history. The secularist Army dictator Jamal Abdun Naser hanged one of the greatest son of Egypt like Sayid Qutb –the writer of one of the greatest tafseers of the holy Qur’an. And now al-Sisi executing the same barbarity against the current Islamists. In Syria, the Army has turned to be the worst forces of destruction. In Algeria, the Army generals could indeed metamorphose the whole holy Jihad of the Algerian Muslims against the French occupiers into radical secularism cum nationalism. And in Sudan, the Army has badly lost its war against the secessionists of the South, but has launched its brutal war against its own people.

 

Al-Sisi’s crimes & the western complicity

Only because of radical secularism, the western leaders could easily justify their support for all worst crimes of al-Sisi. Because, such an evil ideology disconnect people from any moral obligation and accountability. Because of that, they could also forget al-Sisi’s gruesome crime that he committed while dislodging the legitimate President Dr Morsi. In the past, because of the same immorality, the western war lords and leaders could easily justify and sanctify the colonial occupation, genocidal killing, ethnic cleansing, slave trading and other worst crimes in the occupied lands.

President Donald Trump recently mentioned al-Sisi as a great President doing great jobs against the terrorists. Such appeasement and appreciation for al-Sissi indeed tells a lot about his own moral disease. It exposes his own complicity in the crime through his political and moral endorsement. Such narratives give an expression to the selfish political and economic agenda of the western powers. Of course, al Sisi is doing good jobs for the USA and Israel, but not for the common Egyptians and democracy. He is indeed an Egyptian replica of Adolf Hitter to do all reprisals against his own people. The western leaders call him a force of stability. But what stability? Stability through mass killing? Stability through fake judiciary and election. Such narratives indeed fully exposes the western hypocrisy and complicity in crimes. Whereas al-Sisi has proven to be the perfect model of inhumanity, brutality, extreme fascism in the Middle East. President Trump’s appreciation shows how they prefer the brutal dictators to dismantle the democratic institutions in the Muslim countries. Like President Trump, other western leaders too, conveniently forget the facts that more than 60 thousands political prisoners are languishing in Egyptian jails in dire prison conditions.

Al-Sisi is not working alone. He is indeed showcasing all evil forces in the Middle East. He is fighting an unending war not only for himself but also for all anti-democratic and imperialistic forces of the whole Middle East. This is why, his war is rapidly expanding to Libya, Sudan and other neighbouring countries too. This is why he enjoys the support of a bigger global coalition. Unlike the old pharaoh, this new pharaoh is enjoying the full support of the Jews. The USA, Israel, the UK, France, King of Saudi Arabia, Shaikh of UAE, ruler of Bahrain and other autocrats of the Muslim World are also the part of the coalition. In fact, the death of Dr Morsi gave an opportunity to expose their true faces and motives. 20.06.2019




ভারতীয় নির্বাচনঃ বিশাল বিজয় অপরাধীদের

অপরাধীদের নিরংকুশ বিজয়

২০১৯ সালের ভারতীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনে নিরংকুশ বিজয় জুটলো ভয়ানক অপরাধীদের। তাদের বিজয়ে ভারতের ২০ কোটি মুসলিম এবং বহু কোটি খৃষ্টান ও তথাকথিত দলিত বা অচ্ছুৎদের জীবনে যে দ্রুত দুর্গতি নেমে আসবে -তা নিয়ে সন্দেহ অতি সামান্যই। জোরদার হবে আসাম থেকে ৪০ লাখ মানুষের গায়ে বাংলাদেশীর লেবেল লাগিয়ে যে দেশত্যাগে বাধ্য করার ন্যায় বহুবিধ মুসলিম বিরোধী উদ্যোগ। সে নৃশংসতা ছড়িয়ে পড়বে পশ্চিম বাংলাতেও। কিন্তু তাতে পরিনামে ক্ষতিগ্রস্ত হবে যে খোদ ভারত -তা নিয়েও কি কোন সন্দেহ আছে? অপরাধীদের বিজয়ে কোন দেশই লাভবান হয়না। বরং বাড়ে অপরাধ কর্ম ও অশান্তি। তাছাড়া বিজয়ী অপরাধীগণ যে ভয়ানক অপরাধী -সে বিষয়টি কোন গোপনীয় বিষয় নয়। নরেন্দ্র মোদী ও তার সেনাপতি অমিত শাহের হাতই শুধু গুজরাতের মুসলিম রক্তে রঞ্জিত নয়, রক্তের গন্ধ আসে আরো অনেক বিজয়ী এমপি ও মন্ত্রীদের গা থেকেও। নিছক অহিন্দু হওয়ার অজুহাতে যে দেশের ২০ কোটি মানুষকে –যা জার্মান, ইংল্যান্ড বা ফান্সের জনসংখার তিনগুণের অধীক, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গণ থেকে পরিকল্পিত ভাবে দূরে রাখা হয়, সে দেশে কল্যাণকর কিছু কি আশা করা যায়? কল্যাণমুখি সরকারের কাজ তো ধর্ম, বর্ণ, ভাষা ও জাত-পাতের উর্দ্ধে উঠে দেশের বেকার নাগরিকদের কাজ দেয়া, কর্মক্ষেত্র থেকে দূরে রাখা নয়। অথচ ভারতে ২০ কোটি মুসলিমদের অবহেলিত রাখাই হলো সরকারি নীতি।

ভারতীয়গণ অতীতের ইতিহাস থেকে কোন শিক্ষাই নেয়নি। প্রায় দেড় শত বছর আগে বাংলার হিন্দুদের জীবনেও রেনাসাঁ এসেছিল। কিন্তু পরিণামে সে রেনাসাঁ বাঙালী হিন্দুদের তেমন কোন কল্যাণ দেয়নি। কারণ, হিন্দুরা নিজেদের কল্যাণ চেয়েছিল প্রতিবেশী মুসলিমদের অকল্যাণ ঘটিয়ে। তারা এগিয়ে যেত চেয়েছিল শিক্ষা-দীক্ষা, চাকুরি-বাকুরি ও অর্থনীতিতে , মুসলিমদের বাদ দিয়েই। তাদের সে অপরাধের কারণেই ১৯৪৭’য়ে বাংলা বিভক্ত হয়েছে। এবং বাঙালী হিন্দুরা শুধু ভারতীয় রাজনীতিতেই প্রভাব হারায়নি, প্রভাব হারিয়েছে নিজ প্রদেশ পশ্চিম বাংলাতেও। এবারের নির্বাচনের পর পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতার বানার্জির আশংকা, গুজরাতের উগ্রবাদী হিন্দুদের খুনোখুনি ও মুসলিম নিপীড়নের রাজনীতি শুরু হতে যাচ্ছে খোদ পশ্চিম বাংলায়।

মমতার বানার্জির আশংকাটি আদৌ ভিত্তিহীন নয়। এবারের সংসদ নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজিপি)’র সবচেয়ে বড় বিজয়টি এসেছে পশ্চিম বাংলায়। ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিজপি পেয়েছিল রাজ্যের ৪২টি লোকসভা আসনের মাঝে মাত্র ২টি; এবার পেয়েছে ১৮টি। এ বিশাল বিজয়ে বলীয়ান হয়ে বিজিপি ইতিমধ্যেই কলকাতাসহ পশ্চিম বাংলার নানা শহরে রাজনৈতিক পরিবেশ লাগাতর অশান্ত ও উত্তপ্ত করে চলেছে। অরাজকতার দোহাই দিয়ে ষড়যন্ত্র চলছে মমতা বানার্জীর সরকারকে হটিয়ে কেন্দ্রীয় শাসন বলবৎ করার। তাছাড়া বিজিপি কোন রাজ্যে শক্তিশালী হলে সে রাজ্যে যা দ্রুত বিনষ্ট হয় তা হলো সাম্প্রদায়িক সম্পৃতি ও শান্তির পরিবেশ। ছিটানো হয় ঘৃনার পে্ট্রোল। সৃষ্টি হয় যে কোন মুহুর্তে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আগুন জ্বলে উঠার উপযোগী পরিবেশ। মোদীর শাসনামলে এমনটিই হয়েছে গুজরাতে, এবং আজ তা হতে যাচ্ছে উত্তর প্রদেশে। উত্তর প্রদেশে ঘরে গরুর গোশতো রাখার সন্দেহে মুসলিমদের পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। হত্যা করা হচ্ছে গরু-ব্যবসায়ীদের। ভারতীয় মুসলিমদের প্রাণের মূল্য গরুর চেয়েও নীচে নেমেছে। সরকারের প্রায়োরিটি যতটা গরুর নিরাপত্তা দিতে, সেটি নেই মুসলিমের জান-মাল ও ইজ্জত বাঁচাতে। অবস্থা এতটাই নাজুক যে, মুসলিম মায়েরা টুপি মাথায় দিয়ে সন্তানদের মসজিদে পাঠাতে ভয় পায়। আশংকা এখানে বজরং দল বা আরএসএস গুন্ডাদের হাতে পথে নিহত হওয়ার। তেমন একটি মুসলিম বিরোধী সন্ত্রাসের হাওয়াই বেগবান হচ্ছে পশ্চিম বাংলায়। তবে পশ্চিম বাংলায় খুনোখুনি শুরু হলে সেটি যে শুধু যে পশ্চিম বাংলা সীমিত থাকবে না -তা বিশাল পরিবর্তন আনতে পারে সমগ্র পূর্ব-ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রে। ভারতে ২০ কোটি মুসলিমের নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্বটি মূলতঃ ভারত সরকারের। কিন্তু ভারত তাতে ব্যর্থ হলে ২০ কোটি মুসলিম কি তবে বিলীন হয়ে যাবে? প্রতিবেশী রূপে সুস্থ্য আচরণে হিন্দুগণ ব্যর্থ হলে তাদের জন্য পৃথক ভূমির দাবী তখন অনিবার্য হয়ে উঠবে। এ ২০ কোটি মুসলিম বাংলাদেশ বা পাকিস্তান থেকে গিয়ে সেখানে ঘর বাঁধেনি। আসমান থেকেও তারা নাযিল হয়। জন্মসূত্রে তারা ভারতীয়; ফলে ভারত ভূমিতেই নিরাপদ বাসস্থান পাওয়াটি যে তাদের বৈধ মানবিক অধিকার -সেটি কি অস্বীকারের উপায় আছে?        

 

মৃত গণতন্ত্র এবং বিজয় ফ্যাসিবাদের

শিক্ষা, সংস্কৃতি, দর্শন, নীতি-নৈতিকতা ও মূল্যবোধে জনগণের স্তরে বিপ্লব না এলে নির্বাচনে বিপুল ভাবে বিজয়ী হয় চোর-ডাকাত, ভোট-ডাকাত, খুনি, ধর্ষক ও সন্ত্রাসীর ন্যায় ভয়ানক অপরাধীরা। তখন স্বৈরাচারি খুনিরা শুধু এমপি বা মন্ত্রী হয় না, বরং দেশের নেতা, পিতা, বন্ধু রূপে প্রতিষ্ঠা পায়। এর উদাহরণ শুধু বাংলাদেশ নয়, বরং সবচেয়ে বড় উদাহরণটি হলো ভারত। গণতন্ত্রের নামে সেখানে শুরু হয়েছে হিন্দু মেজরটির বর্বর স্বৈর শাসন। ডাকাত আরেক ডাকাতকে কখনোই নিন্দা করে না। ফলে বাংলাদেশে শেখ হাসিনা ভোটচুরি, ভোটডাকাতি এবং গুম-খুন ও সন্ত্রাসের যে রাজনীতি প্রতিষ্ঠা দিয়েছে তা বিপুল প্রশংসিত হচ্ছে ভারতীয় শাসক মহলে। মোদীর শাসনামলে ভারতের অর্থনীতিতে কোন উন্নয়ন ঘটেনি, বরং বেড়েছে বেকারত্ব এবং এসেছে অর্থনৈতিক মন্দা। ঋণের দায়ভারে আত্মহত্যা করছে হাজার গরীব কৃষক। অথচ এরপরও এবারের নির্বাচনে বিজেপি’র বিজয়টি ২০১৪ সালের বিজয়ের চেয়েও বিশাল। এর কারণ, মোদী অর্থনীতিতে উন্নতি আনতে না পারলেও এনেছে উগ্র হিন্দুত্বের জোয়ার। ভারতের ন্যায় দেশগুলোতে অর্থনীতির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ধর্ম –সেটি হিন্দু ধর্ম। এরই ফল হলো, ৫৪৩ সিটের পার্লামেন্টে ২০১৪ সালে বিজিপি পেয়েছিল ২৮২ সিট এবং এবার পেয়েছে ৩০৩ সিট। ২০১৪ সালে পেয়েছিল ৩১.৩% ভোট এবং এবার পেয়েছে ৩৭.৪%।

গণতন্ত্রকে যদি বলা হয় জনগণের ভোটে যোগ্যবানদের নির্বাচনের প্রক্রিয়া -তবে এ নির্বাচনে গণতন্ত্র শুধু পরাজিতই হয়নি, তার মৃত্যু হয়েছে। বিজয়ী হয়েছে নিরেট ফ্যাসিবাদ। ভারতের রাজনীতি অধিকৃত হয়েছে ভয়ানক খুনি ও অপরাধীদের হাতে। এরই প্রমাণ, নরেন্দ্র মোদীর মন্ত্রিসভায় এবার যারা স্থান পেল তাদের মাঝে বিভিন্ন ধরনের ফৌজদারি অপরাধে বিচারাধীন আসামি হলো ৩৯ শতাংশ। গতবারে তাদের সংখ্যা ছিল ৩১ শতাংশ। বিজয়ীদের মধ্যে ২০১ এমপি এমন যারা নানারূপ অপরাধের আসামি। ভারতীয় গবেষণা সংস্থা এডিআর’য়ের মতে মন্ত্রিসভার ৫৭ সদস্যের মাঝে ২২ জনের বিরুদ্ধেই ফৌজদারি মামলা আছে। বিষয়টি কোন গোপন বিষয়ও নয়। অপরাধ জগত থেকে আসা এসব মন্ত্রীরা নির্বাচন কমিশনে দেওয়া হলফনামাতে তারা নিজেরাই উল্লেখ করেছিল যে, ফৌজদারি মামলায় তারা আসামী। কিন্তু তাতে তাদের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া বা বিপুল ভোটে বিজয়ী হওয়াতে কোন বাধা পড়েনি। তাদের মধ্যে ১৬ জন হলো এমন অপরাধী যারা খুন ও ধর্ষণের ন্যায় গুরুতর অপরাধের আসামী। আদালতে সাতটি মামলা আছে এমন ব্যক্তিও মন্ত্রী হয়েছেন। নবনিযুক্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর বিরুদ্ধে রয়েছে চারটি মামলা।

এবারের নির্বাচনী যুদ্ধে নরেন্দ্র মোদীর মূল সেনাপতি ছিল অপরাধ জগতের অমিত শাহ। মোদীর ন্যায় অমিত শাহের বাড়ীও  গুজরাতে। তাদের উভয়ের হাতই শিক্ত হয়েছে ২০০২ সালে গণহত্যার শিকার মজলুম মুসলিমদের রক্তে। মুখ খুললে এখনো রক্তের গন্ধ বেরুয় তাদের মুখ থেকে। দুর্বৃত্তি বিপুল সমৃদ্ধি দিয়েছে তাদের সম্পদে। ২০১২ সালে নির্বাচনী হলফনামায় অমিত শাহ তার পরিবারের  সম্পদ দেখিয়েছিল ১২ কোটি ভারতীয় রুপি। ২০১৯ সালে দেখিয়েছে ৩৯ কোটি। ৭ বছের তার সম্পদে বেড়েছে ২৭ কোটি রুপি। এত বিপুল অর্থ আকাশ থেকে পড়েনি, বরং তা হলো অপরাধের কামাই। ভারতে অতি দ্রুত ধনি হওয়ার সহজ ব্যবসাটি হলো সরকারি দলে যোগ দেয়া। এ ব্যবসায় কোন পুঁজি লাগে না, লাগে স্রেফ সন্ত্রাসের সামর্থ্য। সে সামর্থ্য থাকলে  রাজনৈতিক পদ এবং ক্ষমতা -উভয়ই জুটে।

ডাকাত দলে সবচেয়ে নৃশংস ডাকাতকে সর্দার করা হয়, তেমনি সন্ত্রাসের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসীকে। সন্ত্রাসের সে সামর্থ্য না থাকলে স্থান জুটে ভোটারের কাতারে, মন্ত্রী বা এমপি রূপে না। এক কালের “টি বয়” নরেন্দ্র মোদীর কপাল খুলে তখন যখন বিজেপি নেতা লাল কৃষ্ণ আদভানীর নেতৃত্বে হিন্দুত্বের জোয়ার শুরু হয়। মোদি আদবানীর দৃষ্টি কেড়েছিল ১৯৯২ সালে। সেটি গুজরাত থেকে হাজার হাজার উগ্র হিন্দুদের অযোধ্যা নিয়ে ঐতিহাসিক বাবরী মসজিদ গুড়িয়ে দেয়ার কাজে নিয়ে। বাবরী মসজিদ ধ্বংসে মোদী ছিল আদভানীর অন্যতম সেনাপতি। বাবরী মসজিদ ভাঙ্গার পুরস্কার স্বরূপ বিজিপির পক্ষ থেকে মোদিকে দেয়া হয় গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রীর পদটি। গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী পদে বসার পরই তার নেতৃত্বে শুরু হয় আরেক নৃশংস পর্ব। সেটি গুজরাতের মুসলিমদের উপর হত্যা, ধর্ষণ ও তাদের ঘরবাড়ী ও দোকানে আগুণ দেয়ার প্রক্রিয়া। ২০০২ সালে শুরু হয় মুসলিম নির্মূলের গণহত্যা। মুখ্যমন্ত্রী রূপে সে সময় মোদীর উপর মূল দায়িত্বটি ছিল পুলিশকে নিষ্ক্রীয় রেখে হত্যা, ধর্ষণ এবং ব্যবসায় আগুণ দেয়ার কাজে হিন্দু গুন্ডাদের পর্যাপ্ত সময় দেয়া। সে নিধনযজ্ঞে মৃত্যু ঘটে ২ হাজারের বেশী নরনারী ও শিশুর। পুড়িয়ে ছাই করা হয় বহু হাজার মুসলিমের গৃহ ও দোকানপাট। যে সব আশ্রয়কেন্দ্রগুলিতে গৃহহীন অসহায় মুসলিমগণ স্থান নিয়েছিল মোদী সেগুলিও বন্ধ করে দেয়। সেগুলি চিহ্নিত হয়েছিল শিশু উৎপাদনের কারখানা রূপে।

 

খুন-ধর্ষণের বিচারে অনুমতি নিতে হবে অপরাধী থেকে!    

অপরাধীদের বিপুল বিজয়ে পরিস্থিতি এতটাই পাল্টে গেছে যে, কোন খুনি বা ধর্ষকের বিচারের আগে সে অপরাধী থেকে প্রথমে অনুমতি নিতে হবে। কারণ তারাই মন্ত্রী ও এমপি। গুজরাতে মুসলিম দলন প্রক্রিয়া এবং ২০০২ সালে মুসলিম গণহত্যার কাজে নরেন্দ্র মোদীকে যে অমিত শাহ সর্বপ্রকার সহায়তা দিয়েছিল সেই এখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হাতে থাকে আইন শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব। গুজরাতে যখন মুসলিমদের হত্যা ও তাদের ঘরাড়ী পোড়ানোর কাজ মহা ধুমধামে চলছিল তখন সে হত্যাযজ্ঞ থামাতে পুলিশ বাহিনী কোন দায়িত্ব পালন করেনি। বরং যেসব পুলিশ অফিসারগণ নিজ উদ্যোগে দাঙ্গা থামাতে তৎপর হয়েছিল তাদেরকে শাস্তি দেয়া হয়েছিল অন্যত্র বদলী করে। যাদের নেতৃত্বে সেদিন গুজরাতে গণহত্যা পরিচালিত হয়েছিল তাদের হাতেই এখন ভারতের শাসন ভার। ফলে গুজরাত হয় এখন সমগ্র ভারত। আসাম থেকে তাই ৪০ লাখ মুসলিমের বিতাড়নের ষড়যন্ত্র। স্মরণীয় হলো, কলকাতায় মুসলিম এলাকার মধ্য দিয়ে এবার এক নির্বাচনি মিছিল নেতৃত্ব দিয়েছিল অমিত শাহ। সে মিছিল থেকে অকথ্য ভাষায় দু’পাশের মুসলিমদের উদ্দ্যশ্য করে গালি গালাজ করা হয়। অসহায় মুসলিমেরা সেদিন সে অকথ্য গালিগালাজ মুখ বুজে সহ্য  করেছে। প্রতিক্রিয়া দেখালে সেদিনই শুরু হতো মুসলিম নিধনমুখি দাঙ্গা।

নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের ৯ দিন পর নরেন্দ্র মোদি শ্রীলঙ্কায় যান। লক্ষ্য ছিল, চার্চের উপর সাম্প্রতিক হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত খ্রিষ্টানদের প্রতি সহানুভূতি জানানো। এটি ছিল নির্লজ্জ ভন্ডামী। মোদি কি ভূলে গেছে ভারতীয় খৃষ্টানদের উপর তার নিজ দলের নেতাকর্মীদের নৃশংস হত্যাকান্ডের কথা? মোদির মন্ত্রীসভায় স্থান পেয়েছে উড়িষ্যার হি্ন্দু চরমপন্থিদের নেতা প্রতাপ চন্দ্র সারাঙ্গী। প্রতাপ সারাঙ্গী সাতটি ফৌজদারি মামলার আসামি। সে হলো আরএসএস-বিজেপি রাজনৈতিক গোষ্ঠির সবচেয়ে আক্রমণাত্মক সংগঠন বজরং দল উড়িষ্যার রাজ্যের সভাপতি। এই দলের কর্মীরাই ১৯৯৯ সালে উড়িষ্যায় অস্ট্রেলিয়ান খ্রিষ্টান যাজক গ্রাহাম স্টেইনকে দুই ছেলেসহ ঘুমন্ত অবস্থায় পুড়িয়ে হত্যা করে।এরূপ এক বীভৎস খুনের সাথে জড়িত হওয়া সত্ত্বেও প্রতাপের রাজনীতির সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠায় কোন ছেদ পড়েনি।  ২০০২ সালে ‘বজরং দল’, ‘দুর্গাবাহিনী’ এবং ‘বিশ্ব হিন্দু পরিষদ’ মিলে উড়িষ্যার বিধানসভা ভবনের যে হামলা করে, তাতেও নেতৃত্বে ছিল প্রতাপ সারাঙ্গীর। সে সময় তাকে আটকও করা হয়েছিল। অথচ এ খুনি প্রতাপকে একটি নয় দুটি দপ্তরের মন্ত্রী করা হয়েছে। বিজেপির কর্মীদের কাছে সে হলো ‘উড়িষ্যার মোদি। সন্ত্রাস ও খুনের সামর্থ্য থাকলে বিজিপিতে যে কীরূপ মূল্য মেল -প্রতাপ হলো তারই প্রমাণ।

তবে নৃশংস অপরাধের সাথে জড়িত হওয়ার কাহিনী কারো কারো জীবনে অমিত শাহ ও প্রতাপ চন্দ্রের চেয়েও অধীকতর বর্বর ও নৃশংস। তাদেরই একজন হলো ভূপালের প্রাগ্য ঠাকুর। এখনো তাকে মন্ত্রী করা হয়নি। তবে প্রতাপ চন্দ্রের মন্ত্রিত্ব পাওয়াতে রাস্তা খুলে গেল প্রাগ্য ঠাকুরের পথ। ২০০৮-এর সেপ্টেম্বরে ভারতজুড়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে স্থানে স্থানে যে লাগাতর বোমা হামলা চালানো হয় তার মূল আয়োজক ছিল প্রাগ্য ঠাকুর। কোথাও কোথাও আবার মুসলিমবিরোধী দাঙ্গায় হিন্দুদের উসকে দিতে হিন্দু স্থাপনার উপরও সন্ত্রাসী হামলা চালানো হয়। ঘটনাস্থলে পাওয়া গেছে হামলার কাজে ব্যবহৃত প্রাগ্যের মোটরসাইকেলও। পুলিশী তদন্তে প্রাগ্যের সংশ্লিষ্টতা ধরা পড়ে ‘রাষ্ট্রীয় জাগরণ মঞ্চ’, ‘অভিনব ভারত’ ইত্যাদি নামে বহু গোপন হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সাথে। বহুহত্যার সাথে জড়িত এ সন্ত্রাসীকে বিজিপি ভূপাল আসনে প্রার্থী রূপে খাড়া করে। মধ্যপ্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী দ্বিগবিজয় সিংকে প্রায় চার লাখ ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে বিজয়ী হয় প্রাগ্য ঠাকুর।

ভোটের মধ্য দিয়ে ভোটারের মন কথা বলে। প্রাগ্য ঠাকুর, অমিত শাহ প্রতাপ সারাঙ্গীর মত অপরাধীদের বিপুল ভোটে বিজয়ে প্রমাণ মেলে ভারতীয় ভোটারদের অন্তরে মুসলিম বিদ্বেষী রূপটি কতটা প্রকট। এমন বিষাক্ত মনের ভোটারদের মাঝে কি গণতন্ত্র বাঁচে? বাঁচে কি মানবিক সভ্যতা? এরূপ দেশে সহজেই সন্ত্রাসী দল গড়া যায়, কিন্তু সভ্য গণতান্ত্রিক সরকারও কি গড়া যায়?  নির্বাচনী প্রচারকালে গান্ধীর হত্যাকারীকে নাথুরাম গড়সে’কে প্রাগ্য ঠাকুর প্রকাশ্যেই দেশপ্রেমিক রূপে অভিহিত করেছে। কিন্তু তার সে উক্তি বিজিপি’র কাছে আপত্তিকর মনে হয়নি। ফলে দলীয় প্রার্থী পদ থেকে তাকে প্রত্যাহারও করেনি। আর সন্ত্রাসে তার জড়িত থাকার বিষয়? প্রাগ্যের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসের অভিযোগকে মিথ্যা বলছে বিজিপি প্রধান অমিত শাহ। আরো বিস্ময়ের বিষয় হলো, প্রাগ্য ঠাকুরের বিরুদ্ধে প্রধান তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা হেমন্ত কারকারে’কে রহস্যমূলক ভাবে প্রাণ দিতে হয়েছে। প্রাগ্যের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তদন্তে নামায় তাকেও প্রাণ হারাতে হয় সন্ত্রাসী হামলায়।

ভারতীয় গবেষণা সংস্থা এডিআর’য়ের রিপোর্ট মতে লোকসভায় নির্বাচিত এমপি’দের মাঝে ২৩৩ জনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের মামলা রয়েছে। গত সংসদের চেয়ে এ সংখ্যাটি ১৪ শতাংশ বেশি। এখন বিষয়টি সুনিশ্চিত যে, আগামী দিনে ভারতের নীতি নির্ধারণ করবে নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ, প্রতাপ চন্দ্র, প্রাগ্য ঠাকুরের মত ভয়ানক অপরাধীরা। প্রশ্ন হলো, উগ্রবাদিদের হাতে অধিকৃত ভারতের ভবিষ্যৎ চেহারাটি যে কতটা হিংসাত্মক হবে -তা নিয়ে অনুমান করাটি কি আদৌ কঠিন? ভারতীয় জনসংখ্যার ১৫ শতাংশ মুসলিম। সরকারি চাকুরিতে তাদের সংখ্যা শতকরা ৫ ভাগও নয়। উত্তর প্রদেশে প্রায় ৫ কোটি মুসলিমের বাস। কিন্তু বিগত পার্লামেন্টে তাদের মধ্য দিকে একজনও এমপি হতে পারেনি। এবার ২০ কোটি মুসলিমের মধ্য থেকে এমপি’র সংখ্যা মাত্র ২৫ জন। ঢাকা, করাচী বা লাহোরের মত একটি শহরে যত জন মুসলিম ডাক্তার, ইঞ্জিনীয়ার, উকিল, সরকারি অফিসার, পুলিশ অফিসারের বাস ভারতের ২০ কোটি মুসলিমের মাঝে তার সিকি ভাগও নেই। এরূপ অন্যায় ও অনাচারের বিরুদ্ধে কথা বললে বলা হয় মুসলিমের পক্ষে পক্ষপাতিত্ব। বলা হয় মুসলিম তোষণ। সেটিকে চিত্রিত করা হচ্ছে অপরাধ রূপে। মানবতা তো পশুত্ব নিয়ে বাঁচে না, সেজন্য মানবিক পরিচয়টি তো অপরিহার্য। কিন্তু ভারতীয় রাজনীতিতে সে মানবিক রূপটি এখন মৃত। আর মানবতার মৃত্য হলে নরহত্যা, নারী-ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও যে উৎসবে পরিণত হবে সেটিই তো স্বাভাবিক। উৎসবের সে প্রচণ্ড রূপটি দেখা যায় মুসলিম গণহত্যামুখি দাঙ্গাগুলিতে।

 

শুরুটি বহু আগে থেকেই                    

তবে ভারত জুড়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যেরূপ হত্যা, ধর্ষণ, নিপীড়ন ও পথেঘাটে দাড়ি টেনে অপমান করার যে অভিযান চলছে -সেটি হঠাৎ করে শুরু হয়নি। শুরুটি শত বছর আগে থেকে। ভারত আজকের এ অবস্থায় পৌঁছেছে সংঘবদ্ধ পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির ফলে। এরূপ একটি অবস্থা সৃষ্টিতে লাগাতর কাজ করেছে বহু হিন্দু বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ, ধর্মগুরু ও মিডিয়া কর্মী। ভারতে উগ্র হিন্দুত্ববাদী জাগরণ ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণার বাণী নিয়ে সর্বপ্রথম যে ব্যক্তিটি রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তির অঙ্গণ উত্তপ্ত করেন তিনি হলেন বিনায়ক দামোদর সাভারকার। তার চিন্তাধারায় পুষ্ট হয়ে ভারত জুড়ে প্রতিষ্ঠা পায় আরএসএস, হিন্দু মহাসভা, জনসংঘ এবং আজকের বিজিপি। নরেন্দ্র মোদীর রাজনীতির শুরু হয় আরএসএস থেকে। সাভারকারই জোরে জোরে বলা শুরু করেন, “হিন্দুদের মূল শত্রু হলো মুসলিম, ইংরেজগণ নয়। -(সূত্রঃ (Jaffrelot (2009). Hindu Nationalism: A Reader. Princeton University Press. pp. 14–15, 86–93. ISBN 1-4008-2803-1) প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তিনি হিন্দুদেরকে ইংরেজদের পক্ষে যুদ্ধে যোগ দিতেও উৎসাহ দেন। এবং অধিকৃত আরব ভূমিতে ইংরেজদের হাতে ইসরাইল প্রতিষ্ঠিত হলে সেটিকেও তিনি সমর্থণ দেন। কংগ্রেসের ব্রিটিশ বিরোধী “ভারত ছাড়” আন্দোলনেরও তিনি বিরোধীতা করেন। তিনিই বলেন, “যেসব মুসলিম ভারতের পুলিশ ও সেনাবাহিনী রয়েছে তারা হলো ” traitors” তথা  গাদ্দার। ভারত সরকারকে তিনি পরামর্শ দেন সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং সরকারি প্রশাসনে মুসলিমদের সংখ্যা কমাতে। নিষিদ্ধ করতে বলেন মুসলিমদের অস্ত্র কারখানার মালিক বা শ্রমিক হওয়া থেকে। -(সূত্রঃ McKean, Lise (1996), Divine Enterprise: Gurus and the Hindu Nationalist Movement, University of Chicago Press, ISBN 97-0-226-56009-0)

সাভারকারের পর হিন্দুত্ববাদী উগ্রতার আরেক তারকা হলো মাধব সদাশিব গোয়ালকার। সাভারকারের ন্যায় গোয়ালকারও ছিল মারাঠী। ১৯৩৮ সালে হিন্দুভারতের যে রূপরেখাটি তিনি পেশ করেন তা হলো নিম্নরূপ: “The non-Hindu people of Hindustan must either adopt Hindu culture and language, must learn and respect and hold in reverence the Hindu religion, must entertain no idea but of those of glorification of the Hindu race and culture…..In a word, they must cease to be foreigners, or may stay in the country wholly subordinated to the Hindu nation, claiming nothing, deserving no privileges, far less any preferential treatment—not even citizens’ rights.” (“Pakistan and a World in Disorder—A Grand Strategy for the Twenty-First Century”, p.78)।

 

গোয়ালকারের কথা, “হিন্দুস্থানের অহিন্দুদের অবশ্যই হিন্দু সংস্কৃতি ও হিন্দু ভাষাকে গ্রহন করতে হবে। তাদেরকে অবশ্যই শিখতে হবে এবং ভক্তি করতে হবে হিন্দু ধর্মকে। হিন্দু বর্ণ ও হিন্দু সংস্কৃতির জয়কীর্তন ছাড়া অন্য কোন চেতনাকে তারা প্রশ্রয় দিতে পারবে না। তারা কিছু দাবীও করতেও পারবে না –এমনি মৌলিক নাগরিক অধিকারও নয়।” হিন্দু ভারত নিয়ে সাভারকার ও গোয়ালকারের এটিই হলো সেই রূপরেখা যা আজ কোন কিতাবে বন্দি নয়; বরং সেটির বাস্তবায়নে নেমেছে বিজিপি, আরএসএস, বজরং দল, শিব সেনা, বিশ্ব হিন্দু পরিষদের ন্যায় অসংখ্য সংগঠন। তাদের ভারতে  মুসলিমদের কোন স্থান নেই। হিটলারের ন্যায় তারাও রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে গণতন্ত্র ও নির্বাচনকে ব্যবহার করছে স্রেফ মই রূপে। কিন্তু তাদের আসল পথটি হলো ফ্যাসিবাদের। তাদের কাছে তাই অনুকরণীয় বীর পুরুষ হলো জার্মানীর হিটলার ও ইতালীর মুসোলিনী–যা সুস্পষ্ট সাভারকারের লেখাতে। জার্মান ইহুদীদের যে স্থানে বসিয়ে হিটলার তাদের নির্মূলে নেমেছিল, ভারতীয় মুসলিমদের জন্য বরাদ্দকৃত স্থানটিও হলো সেটি। তবে হিটলারে নৃশংস নীতি থেকে শিক্ষা নিলেও তারা শিক্ষা নেয়নি তার ভয়াবহ পরিণতি থেকে। সামরিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে হিটলারের জার্মানী ছিল বিশ্বশক্তি। তা সত্ত্বেও হিটলারের ফ্যাসিবাদ জার্মানীকে যা দিয়েছে তা হলো নিদারুন পরাজয়, নৃশংস বর্বরতা ও বীভৎস ধ্বংসযজ্ঞ। প্রশ্ন হলো, বিজিপির ফ্যাসিবাদ ভারতকেও কি ভিন্ন কিছু দিবে? ১৪/০৬/২০১৯




মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফর ও ভারতীয় স্ট্রাটেজী

মনমোহন সিংয়ের সফর ও আতংক বাংলাদেশে

ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং আগামী ৬-৭ সেপ্টম্বর -এ দুই দিনের জন্য বাংলাদেশ সফরে আসছেন। আশা করা হচ্ছে তাঁর এ সফর কালে ট্রানজিট, পানিবন্টন, সমূদ্রসীমা, মাইগ্রেশন, ছিটমহল ইত্যাদী বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে এবং চুক্তিও সাক্ষরিত হবে। মনমোহনের এ আগমন নিয়ে আনন্দ বইছে বাংলাদেশের ভারতপন্থি রাজনৈতিক শিবিরে। অপর দিকে আতংক বাড়ছে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশীর মাঝে। তাদের ভয়, তাঁর এ সফরে হয়তো বাংলাদেশের আরো কিছু ভূমি, আরো কিছু সম্পদ এবং আরো কিছু স্বার্থ আবারো লুন্ঠিত হবে! পাকানো হবে হয়তো নতুন ষড়যন্ত্র। হয়তো বাংলাদেশীদের গলায় পরানো হবে আরো কিছু নতুন শিকল। তবে এমন ভয় অমূলকও নয়। কারণ, ভারতের সাথে তাদের পূর্বের অভিজ্ঞতাগুলো আদৌ সুখের নয়। এ অবধি দেশটির সাথে বাংলাদেশের যত চুক্তিই হয়েছে তার সবগুলিতেই বাংলাদেশের লোকসান ছাড়া কোন লাভ হয়নি।

শেখ হাসিনার প্রথমবার ক্ষমতায় আসাতে ১৯৯৬ সালে চুক্তি হয়েছিল গঙ্গার পানিবন্টন নিয়ে। তাতে পদ্মায় পানি বাড়িনি। সে চুক্তি যে কতটা ব্যর্থ এবং বাংলাদেশের জন্য যে কতটা ক্ষতিকর সেটি বোঝার জন্য গভীর গবেষণার প্রয়োজন নেই, কলকাতায় ভাগিরথির তীরে একবার দাঁড়ালেই টের পাওয়া যায়। আমি সেটি নিজে চোখে দেখিছি। ফারাক্কায় বাঁধ দিয়ে পানি তুলে নিয়ে বৈশাখ-জৈষ্ঠের খড়া মৌসুমেও ভাগিরথিতে আনা হয়েছে কূল উপচানো থৈ থৈ পানির জোয়ার। সে পানিতে কলকাতা বন্দরে সমূদ্রগ্রামী জাহাজও চলে। আর পদ্মার বুকে তখন ধুধু করা ধুসর বালি। জাহাজ দূরে থাক, নৌকা চালানোও কঠিন। এ বাঁধের ফলে দ্রুত মরুভূমি হতে চলেছে সমগ্র উত্তর বঙ্গ। বাংলাদেশের জলবায়ু ও ভূপ্রকৃতির উপর ফারাক্কার বাঁধ যে মরণছোবল হানছে সে তথ্য বেরিয়ে আসে এমনকি বিশ্বব্যাংকসহ বহু আন্তর্জাতিক সংস্থার গবেষণা রিপোর্টে। কিন্তু হাসিনা সরকার ও আওয়ামী লীগ নেতা-নেত্রীদের তা নিয়ে দূশ্চিন্তা নেই। তারা বরং গর্ব ভরে উৎসব করে সে পানিচুক্তির সফলতা নিয়ে।

ভারত বাঁধ দিতে শুরু করেছে ব্রহ্মপুত্র নদীর উজানে টিপাইমুখে। এটি আন্তর্জাতিক নদী আইনের পরিপন্থি। ভাটির দেশ বাংলাদেশ, ফলে বাংলাদেশের অনুমতি না নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক নদীর উপর উজানে ভারতের বাঁধ নির্মানের অধিকার নেই। অথচ ভারত বাঁধ নির্মান শুরু করেছে অনুমতি না নিয়েই। কিন্তু তা নিয়ে হাসিনা সরকারের মুখে কোন প্রতিবাদ নেই। অতীতে তাঁর পিতার পক্ষ থেকেও প্রতিবাদ উঠেনি ফারাক্কা বাঁধ নিয়ে। অথচ বাংলাদেশের দেশপ্রেমিকদের চোখে এনিয়ে ঘুম নেই। গর্দানে রক্তনালী চেপে ধরলে তাতে ত্বরিৎ প্রাণনাশ ঘটে। কারণ এতে বাধাপ্রাপ্ত হয় মগজের রক্ত প্রবাহ। তেমনি নদীর পানি প্রবাহ বন্ধ হলে মারা পড়ে সে দেশের ভূ-প্রকৃতি। এবং পাল্টে যায় জলবায়ু। দেশ তখন মরুভূমি হয়। সীমান্ত রক্ষার ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ তাই দেশের নদীগুলির পানির প্রবাহ রক্ষা করা। তাই কোন দেশের দেশপ্রেমিক সরকার শুধু দেশের মানুষ বা সীমান্ত বাঁচাতে যুদ্ধ করে না, যুদ্ধ করে নদী বাঁচাতেও। অথচ তা নিয়ে কোন ভাবনা নেই বর্তমান সরকারের। বরং শেখ হাসীনাসহ দেশের তাবত ভারত-ভক্ত রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীগণ ভারতের সাথে বন্ধুত্বকে বিশাল অর্জন বলে অভিহিত করছেন। বছর দুয়েক আগে তাদেরই কয়েকজন টিপাইমুখ দেখতে ভারতে গিয়েছিলেন। ফিরে এসে বলেছিলেন, টিপাইমুখ বাঁধের ফলে বাংলাদেশ লাভবান হবে। তাতে নাকি সুরমা, কুশিয়ারা ও মেঘনায় পানি থৈ থৈ করবে। শেখ মুজিবও এমন এক অন্ধ ভারত-ভক্তি নিয়ে ভেবেছিলেন, ফারাক্কার ফলে বাংলাদেশের ক্ষতি হবে না। একই রূপ ধারণা নিয়ে তিনি ভারতের সাথে সীমান্ত-বানিজ্য চুক্তি করেছিলেন। বলেছিলেন, এতে ভারত ও বাংলাদেশ –উভয় দেশের বাণিজ্য বাড়বে। এবং বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সমৃদ্ধি আসবে। কিন্তু বাস্তবে সেটি হয়নি। ভারতের বাণিজ্য বিপুল ভাবে বাড়লেও দ্রুত সম্পদ পাচার হয়েছে বাংলাদেশের। ফলে এসেছিল ভয়াবহ দুভিক্ষ। তাতে লক্ষ লক্ষ মানুষ না খেয়ে মারা গিয়েছিল। মহিলারা কাপড়ের অভাবে ঝাল পড়তে বাধ্য হয়েছিল।

হাসিনা সরকারের কাজ হয়েছে তাঁর পিতার স্মৃতিকে শুধু জ্যান্ত করা নয়, বরং ব্যর্থ রূপে প্রমাণিত তাঁর নীতিগুলোকেও পুনরায় চালু করা। মুর্তিপুঁজা, গরুপুঁজা, লিঙ্গপুঁজা, স্বর্পপুঁজার ন্যায় নানা রূপ আদিম অজ্ঞতা ধর্মের নামে বেঁচে আছে বাপদাদার অজ্ঞতার প্রতি এমন অতিভক্তির কারণেই। তাই বাংলাদেশের সংবিধানে আবর্জনার স্তুপ থেকে ফিরে এসেছে সমাজতন্ত্র ও সেক্যুলারিজম। আবার শুরু করা হয়েছে ভারতের সাথে আত্মঘাতী সীমান্ত বাণিজ্য। তবে এবার সেটি শুধু সীমান্ত বানিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, সমগ্র দেশই এখন ভারতীয় বাজার।

ক্ষুদ্র মনের মানুষের বিশাল দেশ

বাংলাদেশীদের দুর্ভাগ্য, প্রতিবেশী রূপে তারা বৃহৎ দেশ পেয়েছে বটে কিন্তু বড় মনের প্রতিবেশী পাইনি। বনের বাঘ-ভালুক যেমন আশেপাশের জীবগুলোকে নিজের খাদ্য মনে করে এবং যখন তখন সেগুলো আহার করাকে নিজের অধিকার ভাবে, তেমনি অবস্থা ভারতের। পাড়ায় বাঘের আগমন তাই কোন সুখবর আনে না। দিল্লির সাথে তাজউদ্দিনের ৭ দফা চুক্তি এবং শেখ মুজিবের ২৫ দফা চুক্তি, সীমান্ত বাণিজ্যচুক্তি ও ১৯৭৪ সালের সীমান্ত চুক্তিসহ অন্যান্য বহু বিষয়ে ভারতের সে আগ্রাসী চরিত্রকেই অতি নগ্ন ভাবে প্রকাশ করেছে। ভারতের স্বার্থপর ছোট মনের প্রথম প্রকাশ ঘটে যখন একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বরের বিজযের পর পাকিস্তান আর্মির অব্যবহৃত হাজার কোটি টাকার অস্ত্র নিজ দেশে যায়। পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ ছিল পূর্ব পাকিস্তানী। ফলে সে অস্ত্র কেনায় বাংলাদেশের জনগণের রাজস্বের বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছিল। ভারতের এ কাণ্ডটি ছিল নিতান্তই রুচিহীন এবং অবাক করার মত বিষয়।

শেখ মুজিব ১৯৭৪ সালে ইন্দিরা গান্ধির সাথে সীমান্ত চুক্তি করে বাংলাদেশের নিজস্ব ভূমি দক্ষিণ বেরুবাড়ী এবং সে ভূমি-সংলগ্ন ছিট মহল ভারতকে দিয়ে দেন। প্রতিদানে আঙ্গরপোতা ও দহগ্রাম -এ দুটি ছিটমহলকে বাংলাদেশের সাথে সংযোগ করতে বাংলাদেশ পাবে ভারত থেকে তিন বিঘা আয়তনের একটি প্লট। চুক্তির পর পরই ভারত বেরুবাড়ীকে নিজ দেশের সীমানাভূক্ত করে নেয়। পরিবর্তন আনে নিজ দেশের মানচিত্রে। এবং সংশোধন আনে সংবিধানে। কিন্তু বাংলাদেশকে ভারত তার প্রাপ্য তিন বিঘা জমি আজও দেয়নি। ভারতের সমস্যা, দেশটির সংবিধানে অন্যের ভূমি গ্রাস করার বিধান আছে, সে লক্ষ্যে সংবিধান সংশোধন করার অনুমতিও আছে, কিন্তু নিজ দেশের এক ইঞ্চি ভূমিকেও বিচ্ছিন্ন করার অনুমতি নাই। তাই কাশ্মির, নিজামের হায়দারাবাদ, মানভাদর এবং সিকিমকে ভারতভূক্ত করতে ভারতীয়দের কোন অসুবিধা হয়নি। অসাংবিধানিকও মনে হয়নি। কিন্তু প্রচণ্ড সাংবিধানিক বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়, বাংলাদেশকে মাত্র তিন বিঘা জমি দিতে। অথচ বাংলাদেশের জন্য এ প্লটটি হল অতি গুরুত্বপূর্ণ। এটি প্রয়োজন মানবিক প্রয়োজনে। অঙ্গরপোতা ও দহগ্রাম -এ দুটি ছিটমহলের ২০ হাজার মানুষের বসবাস ভারতের অভ্যন্তরে, বাংলাদেশের মূল ভূ-খণ্ডের সাথে যোগাযোগের এ তিন বিঘা জমিটিই হল একমাত্র সংযোগ লাইন। ভারতীয়দের কথা, তাদের সংবিধানে তিন বিঘা দূরে থাক এক ইঞ্চি জমি দেয়ারও বিধান নেই। ভাবটা এমন, তারা দিতে চাইলেও সংবিধান দিতে দিচেছ না। প্রশ্ন হল, এই যদি সাংবিধানিক আইন হয়, তবে কেন চুক্তি করা হল? তাছাড়া ভারতীয় সংবিধান যে সংশোধিত হয়নি তা তো নয়, এ অবধি বহু কারণে বহু বার সেটি সংশোধিতও হয়েছে। কিন্তু সেটি সম্পূর্ণ অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে তিন বিঘা জমির ক্ষেত্রে!

 

ভারতীয়দের চেয়েও ভারতীয়

ভারতীয়দের চেয়েও ভারতীয় -এমন বহু ব্যক্তির বসবাস বাংলাদেশে। বিশেষ করে রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তিতে। এমন কি দেশের শীর্ষ পর্যায়ে। বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষার চেয়ে ভারতীয় স্বার্থের সেবাটাই তাদের কাছে বড়। সম্প্রতি তেমন এক উদাহরন পেশ করলেন শেখ হাসিনা। ভারত মাত্র তিন বিঘা জমি বাংলাদেশকে দিতে রাজী হয়নি। অথচ শেখ হাসিনা সিলেট-মেঘালয় সীমান্তের তামাবিল এলাকার ২৬১ একর বাংলাদেশী ভূমি ভারতকে দিয়ে দিয়েছেন। এতবড় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে সংসদে কোন বিতর্ক হয়নি। বিরোধী দল বা অন্য কারো সাথে তা নিয়ে পরামর্শও করা হয়নি। নিজের জমি বা পৈতীক সম্পত্তি দিতে কারো অনুমতি লাগে না, পরামর্শও লাগে না। যাকে ইচ্ছা তাকে দেয়া যায়। বাংলাদেশের ২৬১ একর ভূমিকে শেখ হাসিনা যেন সেটাই ভেবেছেন। অথচ এ জমির মালিক শেখ হাসিনা নন, বরং দেশ। সরকার নির্বাচিত হয় দেশের ভূ-খণ্ড হেফাজতের জন্য, বিলিয়ে দেয়ার জন্য নয়।

তাছাড়া তামাবিলের এ ভূমি নিয়ে কোন কালেই কোন বিতর্ক ছিল না। ১৯৫৮ সালে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী জওহারলাল নেহেরু এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ফিরোজ খান নূনের মাঝে দুই দেশের সীমান্ত ও ছিটমহল নিয়ে আলোচনা হয় এবং আলোচনা শেষে সীমান্ত চুক্তিও হয়। সে সময়ও সিলেটের তামাবিল সীমান্ত নিয়ে কোন কথা উঠেনি। অথচ সেটি বিতর্কিত করা হয় আওয়ামী লীগ আমলে। বিতর্ক পাকিয়ে সে ভূমি অবশেষে ছিনিয়েও নেয়া হল। গর্তের কীটও জানে কখন বাইরে বেরুতে হয় এবং কখন খাবার খুঁজতে হয়। তেমনি ভারতও জানে, স্বার্থ উদ্ধারের মোক্ষম সময় কোনটি। তাই যে দাবী পাকিস্তান আমলে উঠলো না, এমন কি যে দাবী বাংলাদেশের অন্য কোন সরকারের আমলেও উঠলো না, সে দাবী উঠলো আওয়ামী লীগ শাসনামলে। এবং সেটি পুরণও হয়ে গেল। অথচ তামাবিল এলাকা দখলের জন্য ২০০১ সালের ১৫-১৬ এপ্রিল তারিখে এক ব্যাটেলিয়ন বিএসএফ সৈন্য নিয়ে ভারত হামলা করে। বাংলাদেশের বিডিআর জোয়ানেরা সে হামলা প্রতিহত করে নিজেদের রক্ত দিয়ে। তারা ২১ জন বিএসএফ সৈন্যকে হত্যা করে এবং নিজেরা হারায় দুইজন সাথীকে। কিন্তু ২০১১ সালে এসে ভারতকে সে ভূমি পেতে কোনরূপ যুদ্ধ করতে হল না। ভারতের হাতে সেটি তুলে দিয়েছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রশ্ন হল, বিডিআর জোয়ানরা যে দেশপ্রেম দেখাতে পেরেছে সে দেশপ্রেম তাঁর মধ্যে কৈ?

স্বার্থসিদ্ধির রাজনীতি ও বিবেকহীনতা

১৯৭৪ চুক্তি স্বাক্ষরের ১৮ বছর পর ১৯৯২ সালে এসে তিন বিঘা করিডোরটি ভারত খুলতে রাজি হয়। সেটিও দিনে মাত্র কয়েক ঘন্টার জন্য, এবং সেটি লিজের ভিত্তিতে। ভারত-বাংলাদেশের সীমান্ত ৪,০৯৮ কিলোমিটার দীর্ঘ। এ সীমান্তের নানা স্থান দিয়ে চোরা পথে দিবারাত্র মানুষ পারাপার হয়। সেটি রুখবার সামর্থ ভারতের কোন কালেই ছিল না। আজও নেই। কিন্তু তিন বিঘার করিডোরটি নিয়ন্ত্রন করেছে অতি কঠোর ভাবে। নির্ধারিত সময় বাদে পারাপারের কোন উপায় নেই। অথচ অঙ্গরপোতা ও দহগ্রামের ২০ হাজার বাংলাদেশীর ট্রানজিটের প্রয়োজনটি কয়েক ঘন্টার নয়। সেখানে কোন হাসপাতাল নেই, থানা এবং কোট-কাছারিও নেই। এসবের জন্য দিবারাত্র যে কোন সময় জরুরী প্রয়োজন দেখা দেয়। সে প্রয়োজন মেটাতে বাংলাদেশের মূলভূমিতে আসতে হয়। কিন্তু তাদের জন্য ভারত সে সুযোগ দিতে রাজি নয়। নেহাযেত এক অমানবিক অবস্থা। অবরুদ্ধ এলাকার ছেলেমেয়েদের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগও নেই। অথচ ভারতীয়দের বিবেক তাতে গলেনি। বিএসএফ সেখানে দিবারাত্র পাহারা দেয়। করিডোরটি যেন তাদের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি!

অথচ বাংলাদেশের উপর তাদের দাবীটি বিশাল। তিনবিঘার করিডোরটি দিবারাত্র খোলা রাখাকে ভারতীয়রা নিজ নিরাপত্তার প্রতি হুমকি ভাবে। অথচ তারাই বাংলাদেশের পশ্চিম সীমান্ত থেকে পূর্ব সীমান্ত পর্যন্ত শত শত মাইলের ট্রানজিট চায়। ট্রানজিট চায় চট্রগ্রাম ও চালনা বন্দরে যানবাহন নিয়ে পৌঁছার জন্যও। এবং সেটি বছরের প্রতি দিন, প্রতি রাত ও প্রতি মুহুর্তের জন্য। একটি নয়, কয়েকটি রুট দিয়ে। শুধু স্থলে পথে নয়, নৌ-পথেও। এই হল ভারতীয়দের বিবেক ও চেতনার মান! এমন বিবেকহীন স্বার্থপর প্রতিবেশীর সাথে ইচ্ছা করলেই কি বন্ধুত্ব গড়া যায়? পাকিস্তান পারেনি। শ্রীলংকা পারেনি। নেপাল এবং ভূটানও পারছে না। ভারত বন্ধুত্ব চায় না, চায় প্রতিবেশীর আত্মবিসর্জন বা আত্মসমর্পণ। আত্মবিসর্জনের পথ ধরে সিকিম ভারতের বুকে গুম হয়ে গেছে। আর মুজিব ধরেছিল আত্মসমর্পনের পথ। হাসিনার কাছে আজও সেটিই অনুকরণীয় মডেল। ফলে ভারত যা চায় তা পেতে তাদের মুজিব আমলেও যেমন অসুবিধা হয়নি। হাসিনার আমলেও হচ্ছে না। তাই মুজিব দিয়েছিল দক্ষিণ বেরুবাড়ী ইউনিয়ন, আর হাসিনা দিল তামাবিলের ২৬১ একর ভূমি। মুজিব দিয়েছিল ফারাক্কার অনুমোদন, আর হাসিনা দিচ্ছে টিপাইমুখের বাঁধের অনুমোদন। তবে এমন আত্মসমর্পণ ছাড়া তাদের সামনে ভিন্নতর পথও খোলা নেই। এমন আত্মসমর্পণে তারা প্রচণ্ডভাবে দায়বদ্ধও। ভারত সে আত্মসমর্পণটি ক্রয় করেছে বিপুল বিণিয়োগের মাধ্যমে। সেটি শুধু একাত্তরের যুদ্ধে নয়, তার পূর্বে এবং পরেও। পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশের সৃষ্টি যে ভারতের বিশাল বিনিয়োগের ফল –তা নিয়ে ভারতপন্থি বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদদের মনে সন্দেহ নাই। তারা জানে, শেখ মুজিবের বক্তৃতায় বাংলাদেশে স্বাধীন হয়নি। মুক্তিবাহিনীর দ্বারা কিছু ব্রিজ ভাঙ্গা বা কিছু পাকসেনা ও রাজাকার নিধনের ফলেও হয়নি। এমন বহু বক্তৃতা ও বহু ভারতীয় সৈন্য হত্যা বিগত ৬০ বছর ধরে উলফার বিদ্রোহী ও কাশ্মীরের মোজাহিদদের দ্বারা হচ্ছে। কিন্তু তাতে কি তাদের স্বাধীনতা এসেছে? বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে হাজার হাজার ভারতী সৈন্যের যুদ্ধ ও তাদের প্রাণদানের বিনিময়ে -সেটি শুধু ভারতের দাবী নয়, ভারতপন্থি বাংলাদেশী বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদদের দাবীও। সে কথাটি তারা মাঝে মধ্যে স্মরণও করিয়ে দেয়। ভারত-বিরোধীতাকে তারা ভারতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা বা নিমক-হারামী বলে তো সে যুক্তিতেই। তাই বাংলাদেশের ভূমি বিলিয়ে দিয়ে শেখ মুজিব বা শেখ হাসীনা যেটি করছেন সেটি শুধু তাদের আত্মসমর্পিত নীতি নয়, বরং নিমক হালালীও। অন্যের নিমক খেয়ে রাজনীতি করলে এ ছাড়া ভিন্ন পথ আছে কি?

লক্ষ্য রাজনৈতিক ও সামরিক

মনমোহন সিংয়ের সফরে কতগুলি চুক্তি সাক্ষরিত হবে সেটি বড় বিষয় নয়। সেসব চুক্তি শেখ হাসিনার কিছুদিন আগের দিল্লি সফর কালেও সাক্ষরিত হতে পারতো। এ সফরের আসল লক্ষ্য রাজনৈতিক ও সামরিক। পাড়ার বড় সন্ত্রাসীটি নিজ দলীয় ছোট সন্ত্রাসীর গৃহে সময় সময় দিনে-দুপুরে পদধুলি দেয়। লক্ষ্য খোশআলাপ বা পানাহার নয়, বরং তার কাছে সে যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ সে খবর জানিয়ে দেয়া। এবং সে হুশিয়ারিও দেয়া, তার বিরুদ্ধে কিছু হলে নিস্তার নেই। মনমোহন সিং তাই নিছক পাড়া বেড়াতে বা পানাহারে আসছেন না। স্রেফ খোশআলাপ বা চুক্তি সই করতেও নয়। দ্বি-পাক্ষিক বাণিজ্য, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, ট্রানজিট, সীমান্ত চুক্তি ইত্যাদির নামে এ সফর অনুষ্ঠিত হলেও আসল লক্ষ্য, হাসীনা বিরোধীদের হুশিয়ার করে দেয়া। আওয়ামী লীগ সরকারের সাথে রাজনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা কি করে আরো বেশী বাড়ানো যায় তা নিয়ে নতুন রাস্তা বের করা। নিজেদের প্রতিষ্ঠিত পুতুল সরকার ও সৈন্যদের মনবল বাড়াতে ইরাক ও আফগানিস্তানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীরাও বার বার সফর করেন। মনমোহন সিং আসছেন শেখ হাসিনা মনবল বাড়াতে, সে সাথে বাংলাদেশের বিরোধীদলীয় নেতা-কর্মীদের স্পষ্ট ভাবে জানিয়ে দিতে যে, শেখ হাসিনার সরকার একা নন। বস্তুত ভারত তাঁকে যে কতটা ভালবাসে এবং তাঁর পিছনে যে কতটা শক্ত ভাবে অবস্থান নিয়েছে সেটি জানিয়ে দেয়াই এ সফরের মূল উদ্দেশ্য। এমন একটি হুশিয়ারি কিছু দিন আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখার্জিও শুনিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে কিছু হলে ভারত এবার বসে থাকবে না।

শেখ হাসিনা ভালই জানেন, তাঁর ক্ষমতার উৎস জনগণ নয়। দেশের আর্মি, পুলিশ বা র‌্যাবও নয়। বরং ভারত। তাছাড়া বাংলাদেশে ক্ষমতায় থাকার জন্য জনসমর্থন কোন ফ্যাক্টরও নয়। জনগণের সমর্থন না নিয়েও যে এক যুগ ক্ষমতায় থাকা যায় সেটি দেখিয়ে গেছেন সাজাপ্রাপ্ত দুর্বৃত্ত এরশাদ। আর ব্রিটেশেরা থেকে গেছে ১৯০ বছর।

 হাসিনার ক্ষমতালিপ্সা ও আশাহত বিদেশী বন্ধুরা

সম্প্রতি লন্ডনের প্রখ্যাত সাপ্তাহিক পত্রিকা ইকোনমিষ্ট কিছু সত্য কথা প্রকাশ করেছে। সেটি হল, বিগত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয় ভারতের বিপুল অর্থ ও সমর্থনের বলে। এ হল ঢাকাস্থ কূটনৈতীক মহলের ভিতরের কথা। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারটি আদৌ কোন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল না, নিরপেক্ষ তো নয়ই। বরং ছিল ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বিদেশীদের চাপিয়ে দেয়া একটি পক্ষপাতদুষ্ট সরকার। এসেছিল একটি ষড়যন্ত্রকে প্রতিষ্ঠা দিতে। সে কথা এখন আর কোন গোপন বিষয় নয়। সে ষড়যন্ত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল ব্রিটিশ সরকারও। ফলে বিলেতের রক্ষণশীল পত্রিকা “ইকোনমিষ্ট”এর সে খবর অজানা থাকার কথা নয়। সে ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত ছিল মার্কিন সরকারও। এসব বিদেশী সরকারগুলো সম্প্রতি মুখ খুলেছে এ জন্য নয় যে তারা বিরোধী দলগুলির পক্ষে। মূল কারণটি, শেখ হাসিনাকে যে কারণে তারা ক্ষমতায় এনেছিল এবং তাকে রাজনীতির যে রোড ম্যাপ দেয়া হয়েছিল তা থেকে তিনি বার বার বিচ্যুত হচ্ছেন। এতেই তাদের গোস্বা।

পাশ্চাত্যের নির্দেশিত রোডে ম্যাপে বাংলাদেশে ইসলামের জাগরণ ও প্রতিষ্ঠা রুখতে যা কিছু করনীয় সে সবের পূর্ণ অনুমতি থাকলেও তাদের নিজস্ব লোকদের গায়ে হাত পড়ুক সেটি তারা কখনই চাইনি। ফলে শেখ হাসীনার সরকার যখন ইসলামপান্থিদের রাজপথে পিটাচ্ছিল বা গ্রেফতার করে নির্যাতন করছিল তখন তারা মুখ খুলেনি। কিন্তু এখন খুলছে। তাদের কথা, শেখ হাসিনা ও তাঁর দলের লোকরাই তাদের একমাত্র লোক নন। বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির মাঠে তাদের আরো বহু টিম রয়েছে। সে সব টিমে বহু গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ও আছে। বহু অর্থ ও বহু যত্নে গৃহপালিত এনজিও কর্তাব্যক্তিগণ হলেন সেসব খেলোয়াড়দেরই অন্যতম। পাশ্চাত্যের কথা, শেখ হাসিনার সরকারকে চলতে হবে তাদেরকেও সাথে নিয়ে।

কিন্তু সমস্যা হল, শেখ মুজিবের যেমন ব্যক্তিগত এজেণ্ডা ছিল, তেমন এজেণ্ডা রয়েছে শেখ হাসিনারও। শেখ মুজিবের বাকশালী হওয়ার পিছনে কাজ করেছিল তাঁর প্রচণ্ড ক্ষমতালিপ্সা। সে লিপ্সা পূরণে অন্যরা এগিয়ে না আসলেও ভারত এগিয়ে এসেছিল। ফলে তিনি আশ্রয় নিয়েছিলেন ভারতের কোলে। এর ফলে তাঁর এক কালের বহু ভক্তরাই দূরে সরিয়েছিল। এমনকি তাদের হাতে তাঁকে নিহতও হতে হয়েছিল। রক্তের একই জিন প্রভাব ফেলছে শেখ হাসিনার উপরও। ক্ষমতার অতি অদম্য লিপ্সা শেখ হাসিনারও। সে লিপ্সা পূরণে ব্রিটিশ ও মার্কিনীরা গত নির্বাচনে সাহায্য দিলেও ভারত ছাড়া এখন আর কেউ সাহায্য দিচ্ছে না। ফলে তাঁকেও উঠতে হচ্ছে একমাত্র ভারতের কোলে। তাছাড়া তার কিছু অদ্ভুদ বিশ্বাসও আছে। সে বিশ্বাস অনুযায়ী বাংলার হাজার বছরের ইতিহাসে শেখ মুজিবের চেয় শ্রেষ্ঠতর কেউ যেমন নেই, তেমনি আজকের বাংলাদেশেও শেখ হাসিানার শ্রেষ্ঠতর কেউ নেই। অনুরূপ বিশ্বাস তাঁর দলের ক্যাডারদেরও। তাই বাংলাদেশে কাউকে যদি নবেল প্রাইজ দিতে হয় তবে সেটি তাকেই দিতে হবে। তার দলীয় ক্যাডার বাংলাদেশের এ্যাটর্নি জেনারেল তো সেটি প্রকাশ্যে বলেছেন।

শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী ক্যাডারদের কাছে ডক্টর ইউনুসের বড় অপরাধ, তাঁর নবেল প্রাইজ প্রাপ্তি। এজন্যই তিনি শেখ হাসিনা ও তাঁর ভক্তদের কাছে ঘৃনার পাত্র। ডক্টর ইউনূসকে তাঁর প্রতিষ্ঠিত গ্রামীন ব্যাংক থেকে হঠিয়ে অপদস্থ করা হল, তেমনি এক ঘৃনার কারণেই। মার্কিন প্রশাসন এ নিয়ে খুশি নয়। খুশি নয় ব্রিটিশসহ ইউরোপীয় সরকারগুলিও। কারণ, ডক্টর ইউনুস তাদের অতি ঘনিষ্ট লোক। তাঁর সাথে তাদের সহযোগিতার ইতিহাস দীর্ঘদিনের। তাদের প্রত্যাশা ছিল এবং সে সাথে অনুমতিও ছিল, আওয়ামী লীগ সরকার শুধু ইসলাম পন্থিদেরও নির্মূল করবে। কিন্তু সে সীমানা অতিক্রম করে হাত তুলেছে ডক্টর ইউনূসের উপরও। হিলারি ক্লিন্টন তাই বাধ্য হয়ে শেখ হাসিনাকে জানিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন, কীভাবে তাঁকে ক্ষমতায় আনা হয়েছে। ব্রিটিশের একই রূপ ক্ষোভ। ডক্টর ইউনূসের সম্প্রতি বিলেতে আগমন এবং ‘গার্ডিয়ান’সহ লন্ডনের নামকরা পত্রিকায় গুলোতে যে ভাবে তাঁর বক্তব্যকে তুলে ধরা হয়েছে তাতেই প্রমাণ মেলে ব্রিটিশ সরকার হাসিনা সরকারের উপর কীরূপ বিক্ষুব্ধ। এতটাই বিক্ষুব্ধ যে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রীসহ বহুমন্ত্রী লন্ডনে এসেছিলেন তারেক জিয়াসহ আরো কিছু ব্যক্তিকে বাংলাদেশে নিয়ে বিচার করতে, কিন্তু তারা কোন পাত্তাই পাননি। হাসিনা সরকার তাই আন্তর্জাতিক ভাবে অতি বিচ্ছিন্ন সরকার, যেমনটি ছিল শেখ মুজিবের সরকার। মুজিবের সে নিঃসঙ্গতার কারণে বাংলাদেশে যখন ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ নেমে আসে তখন কোন বিদেশী সরকার এগিয়ে আসেনি। বর্তমান সরকারের এরূপ নিঃসঙ্গ অবস্থায় মনমোহনের বাংলাদেশ সফর তাই অতি গুরুত্বপূর্ণ। নিঃসঙ্গ শেখ হাসিনার পাশে ভারত যে প্রবল ভাবে আছে সেটি জানিয়ে দেয়ার এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। প্রয়োজনীয় সময়ও। নিঃসঙ্গ মুজিবকে সাহস জোগাতে এক সময় ইন্দিরা গান্ধিও ঢাকায় ছুটে এসেছিলেন।

ভারতীয় বিনিয়োগ ও স্বার্থসিদ্ধি

হাসিনাকে নিয়ে পাশ্চাত্য সরকার সমূহের যে মূল্যায়ন তা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন মুল্যায়ন ভারতের। ভারত চায় শেখ মুজিব ও তার পরিবারের ইমেজকে প্রবলতর করতে। বিদেশীদের কাছে মুজিব পরিচিত ছিলেন একজন ব্যর্থ রাষ্ট্রনায়ক রূপে। তার আমলের বাংলাদেশকে তারা বলেছেন “ভিক্ষার ঝুলি”। অথচ ভারতের কাছে সে আমলটিই ছিল সবচেয়ে স্বর্ণযুগ। সে বিশ্বাস আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদেরও। এত বড় মতের মিল অন্য কোন দেশের নেতাদের সাথে নেই। ভারতের এমন বিশ্বস্থ বন্ধু অন্য কোন দেশে নাই। এবং সেটির পিছনে মুজিব পরিবার। ভারতের কাছে মুজিব পরিবার তাই মূল্যবান এ্যাসেট। এজন্যই মুজিব পরিবার ও ভারতের শাসক ইন্দিরা গান্ধী পরিবারের যোগসূত্র মজবুত করা তাদের অন্যতম লক্ষ্য। সে লক্ষ্য পূরণেই সম্প্রতি বাংলাদেশে সফর করতে এসেছিলেন সোনিয়া গান্ধী। তারা জানে, ভারতীয় স্বার্থের এতবড় সেবক ভারত আর কোন কালেই পায়নি। ভারতের স্বার্থে যে কোন ভারতীয়র চেয়েও মুজিবের অবদানটি ছিল অনেক বড়। ১৯৪৭-এর পূর্বে ভারতীয় হিন্দুরা চায়নি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা পাক। ১৯৪৭-এর পর চায়নি দেশটি বেঁচে থাক। পাকিস্তান ভাঙ্গতে তাদের লাগাতর ষড়যন্ত্র চলে ১৯৪৭ সাল থেকেই। ১৯৬৫ সালে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে যুদ্ধ লড়েও সে চেষ্টা সফল হয়নি। সেটি সফল হয় ১৯৭১ সালে। এবং সেটি মুজিবের কারণে। ফলে খণ্ডিত হয় তাদের প্রধানতম শত্রু পাকিস্তান। এতবড় কৃতজ্ঞতার কথা ভারত ভূলে কিভাবে?

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সীমান্তে লক্ষ লক্ষ সৈন্য রাখতে ভারতের হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হত। এখন সে ব্যায়ভার নেই। তবে সে অর্থ বাঁচিয়ে ভারত যে শুধু তার অর্থনীতি মজবুত করছে তা নয়। বরং বিপুল ভাবে বিনিয়োগ করছে প্রতিবেশগুলোর দেশের রাজনীতিতেও। সে বিনিয়োগের অংশ রূপেই গত নির্বাচনের শেখ হাসিনার বিপুল অর্থপ্রাপ্তি ঘটেছিল। বস্তুত বাংলাদেশে ভারতের মূল বিনিয়োগটি কখনই দেশের কৃষি বা শিল্পের ন্যায় অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ছিল না। আজ যেমন নয়, তেমনি অতীতেও নয়। বরং ১৯৪৭ সাল থেকেই সেটি ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অভ্যন্তরে বিপুল হারে রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিবৃক্তিক তাঁবেদার পালনে। এরাই আজ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতীয় স্বার্থের বড় পাহারাদার। এরাই গঙ্গার পানি-বন্টন চুক্তিকে সফল চুক্তি বলে উৎসব করে। এবং টিপাইমুখ বাঁধের ফলে সুরমা, কুশিয়ারা ও মেঘনায় পানি থৈ থৈ করবে সে কিসসাও শোনায়। এরাই ভারতীয় সাংস্কৃতিক শিল্পি ও বুদ্ধিজীবীদের সাথে গলা জড়িয়ে বন্ধুত্ব ও সম্পৃতির ঐক্যতান ধরে।

ভারত সরকার কোন খয়রাতি প্রতিষ্ঠান নয়। প্রতিটি বিনিয়োগ থেকে মুনাফা তোলাই সেদেশের সরকার সমুহের সরকারি দায়িত্ব। তেমনি মুনাফা তুলছে বাংলাদেশের গত নির্বাচনে তাদের কৃত বিশাল বিনিয়োগ থেকেও। সে বিনিয়োগেরও ফল রূপে শেখ হাসিনা থেকে বিনা যুদ্ধে ভারত বাংলাদেশের ২৬১ একর জমি ছিনেয়ে নিল। এখন নিচ্ছে ট্রানজিট। নিচ্ছে সীমান্ত বাণিজ্যের সুযোগ। ভারত তার একাত্তরের বিনিয়োগ থেকেও একই ভাবে বিপুল মুনাফা তুলেছে। সূদে-আসলে তাদের মুনাফা তোলার সুযোগ দিতে গিয়ে বাংলাদেশের মানুষ সেদিন লাখে লাখে না খেয়ে মরেছে।

ভারতীয়দের ইসলামভীতি

ভারতীয়দের মনে ধরেছে প্রচণ্ড ইসলামভীতি। তারা দেখছে, মুসলিম বিশ্ব জুড়ে ইসলামের পক্ষে দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে জোয়ার। মানুষ ফিরছে ইসলামের দিকে। তাদের ভয়, ইসলামের প্রতি এরূপ প্রবল আগ্রহই বাংলাদেশীদেরকে ভারত বিরোধী করবে। এতকাল একাত্তরের ঘটনা নিয়ে বিচার বসেছে সেক্যুলার চিন্তার মডেল নিয়ে। এতে অপরাধী গণ্য হচ্ছে ইসলামপন্থিরা আর মহত্তর রূপে চিত্রিত হচ্ছে ভারত ও ভারতপন্থিদের ভূমিকা। সেক্যুলার মডেলে ব্যাভিচারও প্রেম মনে হয়। একাত্তরের মূল্যায়নে ইসলামী মডেল গুরুত্ব পেলে ভারত ও ভারতপন্থিরা গণ্য হবে ঘৃণ্য শত্রু রূপে। ভারত ও ভারতপন্থিরা তাই ইসলামকে ভয় পায়।  তাদের ভয়, দেশটি তখন ইসলামের বিপ্লবের দেশে পরিনত হবে। সে ভয়ের কথা ১৯৭২-য়েই প্রকাশ করেছিলেন ভারতের বিজেপী নেতা ও প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী। সে ভয়ের কথা সম্প্রতি প্রকাশ করেছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। তাঁর কথায় বাংলাদেশের ২৫% জনগণ ইসলামী মৌলবাদী সংগঠনের সমর্থক। তাঁর কাছে এ চিত্রটি অতি ভয়ংকর। এমন জনসমর্থন তো পাকিস্তানের মৌলবাদী সংগঠনগুলোরও নাই। ফলে বাংলাদেশের যে চিত্রটি মনমোহন সিংয়ের চিত্তকে সর্বদা আচ্ছন্ন করেছে তা দেশের চলমান স্বৈরাচারি শাসন নয়। ভেঙ্গে পড়া আইনশৃঙ্খলা বা সন্ত্রাসও নয়। সীমান্তের চোরাচালান বা ভারতের সাথে শত শত কোটি টাকার বাণিজ্যিক ঘাটতিও নয়।ারতেভাভভভারততত বরং মৌলবাদী সংগঠনের প্রতি ২৫% ভাগ জনসমর্থনের এ চিত্র। পাকিস্তানের আনবিক বোমার চেয়েও ভারতের জন্য এটি বিপদজনক। ভারত জানে, বিশ্বশক্তির মঞ্চ থেকে সোভিয়েত রাশিয়াকে যে শক্তি বিদায় দিল সেটি ন্যাটোর সামরিক জোট নয়। মার্কিনীদের  পারমানকি অস্ত্রও নয়। বরং আফগানিস্তানের মৌলবাদী দরিদ্র মুসলমানেরা। ইসলাম তাদেরকে অপরাজেয় শক্তিতে পরিণত করেছে। ভারতের ভয়, বাংলাদেশের মানুষও আজ সেদিকেই ধাবিত হচ্ছে। ইসলামের এ জাগরণকে কি ভাবে কীভাবে রুখা যায় সেটিই যে এ সফরে অত্যাধিক গুরুত্ব পাবে তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে?

রাজনীতিতে সংঘাত ও ভারতীয় ইন্ধন

বাংলাদেশে ভারতের প্রধান আগ্রহটি ব্যবসা বানিজ্য নয়, পানিবন্টন বা সীমান্ত নিয়ন্ত্রনও নয়। বরং সেটি বাংলাদেশের রাজনীতি। ভারতীয়দের কাছে তাদের নিজ দেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতির চেয়ে এটি কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বাংলাদেশের রাজনীতির প্রতি তাদের এত আগ্রহের কারণ, দেশটির ভৌগলিক অবস্থান এবং ১৬ কোটি জনগণ। বাংলাদেশের এ বিশাল জনগণ ভারতের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ হলে বিপর্যয়ের মুখে পড়বে ভারতের প্রতিরক্ষা। বিপর্যস্ত হবে ভারতের উত্তরপূর্ব সীমান্তের ৭ টি প্রদেশে ভারতীয় শাসন। সেখানে এখন রীতিমত যুদ্ধ চলছে, মোতায়েন রয়েছে তিন লাখের বেশী ভারতীয় সৈন্য। অবরুদ্ধ গাজার ১৫ লাখ ফিলিস্তিনী দুশ্চিন্তায় ফেলেছে মধ্যপ্রাচ্যর সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ ইসরাইলকে। বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৫ লাখ নয়, ১৬ কোটি|

ভারত চায় বাংলাদেশকে যে কোন ভাবে নিজ প্রভাব বলয়ের মধ্যে ধরে রাখতে। বাংলাদেশকে ভারত নিজ ভূগোলের বহির্ভূত কোন বিদেশী স্বাধীন ভূমি ভাবে না। ভাবে, নিজ প্রতিরক্ষা সীমানার অন্তর্ভূক্ত একটি এলাকা রূপে। ভারতীয়দের কাছে অজানা নয়, ভারত বিরোধী ক্ষোভ শুধু উত্তর-পূর্ব সীমান্তের ৭টি প্রদেশে সীমিত নয়, সেটি প্রবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও। ভারতের ভয়, এ ক্ষোভ দ্রুত দমিত না হলে বাংলাদেশীরা মিত্র হতে পারে ওপারের বিদ্রোহীদের। তখন ভারত বিরোধী অভিন্ন রণাঙ্গনের অংশে পরিনত হবে বাংলাদেশও। তাই ভারতের স্ট্রাটেজী, উত্তর-পূর্ব সীমান্তের ৭টি প্রদেশে যুদ্ধ জিততে হলে সে যুদ্ধ জিততে হবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও। আর বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সে যুদ্ধের দায়ভার দিতে চায় শেখ হাসিনা ও তার সরকারকে। তাই হাসিনার জন্য ভারত সরকারের সাহায্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশী গুরুত্বপূর্ণ হল ভারতের কাছে হাসিনার গুরুত্ব। এ জন্যই বাংলাদেশের রাজনীতিতে বাড়ছে সংঘাত ও উত্তাপ। যেন একটা যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব। তাই এ উত্তাপপূর্ণ রাজনীতির জন্য দায়ী শুধু শেখ হাসীনা ও তাঁর দলীয় সরকার নয়, বরং বেশী দায়ী ভারত। কারণ, ভারতের চানক্য নীতির মূল কথা, প্রতিবেশী দেশে বিভেদ ও সংঘাত সৃষ্টি করে তাকে দুর্বল কর, অবশেষে দখল কর। ভারতীয় মদদে সেটি যেমন ১৯৭৪ সালে সিকিমে হয়েছিল, তেমনি ১৯৭১-এ পাকিস্তানেও হয়েছিল। দীর্ঘকাল ধরে শ্রীলংকা ও নেপালেও হয়েছে। আর আজ সেটিই হচ্ছে বাংলাদেশে।

ভারতীয় ড্রোন

ভারতের উত্তর-পূর্ব সীমান্তের ৭টি প্রদেশের যুদ্ধ চলছে বিগত প্রায় ৫০ বছরেরও বেশী কাল ধরে। থামার কোন নামই নিচ্ছে না। বরং দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে। এর মধ্যে ভারতের বিরুদ্ধে চীনও জড়িয়ে পড়েছে। ফলে আফগানিস্তানের যেমন মার্কিনীদের পরাজয় অত্যাসন্ন, তেমনি উত্তরপূর্ব সীমান্তের রাজ্যগুলিতে পরাজয় ঘনিয়ে আসছে ভারতীয়দেরও। কোন যুদ্ধই কোন দেশের পক্ষে এখন আর একাকী লড়া সম্ভব নয়। পারছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যায় বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী। তারা ৪০টির বেশী দেশকে এনেছে আফগানিস্তানে। এরপরও হিমসিম খাচ্ছে। ভারতও তার যুদ্ধে পার্টনার চায়। বাংলাদেশকে টানছে একারণেই। ভারত চায়, বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে নিরাপদ ট্রানজিট যা উত্তর-পূর্ব সীমান্তের ৭টি প্রদেশে সৈন্য ও রশদ পৌঁছতে দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এভাবে ভারতের স্ট্রাটেজী হল, চলমান যুদ্ধের সাথে বাংলাদেশকে সরাসরি সম্পৃক্ত করা। আফগানিস্তানের যু্দ্ধে একই ভাবে পাকিস্তানকে টেনেছে মার্কিনীরা। এবং সেটি শুরু হয়েছিল জেনারেল পারভেজ মোশাররফের আমলে। তবে মার্কিনীদের সাথে জেনারেল মোশাররফ যতটা জড়িয়েছিল, বর্তমান জারদারী সরকার জড়িয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশী। মোশাররফকে সরিয়ে বেনজির ভূট্টোর পিপল’স পার্টি ক্ষমতায় আসার সুযোগ পেয়েছিল মার্কিনীদের সাথে তালবান বিরোধী যুদ্ধে আরো নিবীড় পার্টনার হওয়ার শর্তে। তেমন পার্টনারশিপে বেনজির ভূট্ট্রো রাজী হওয়াতেই জেনারেল মোশাররফকে সরতে হয়েছে। মোশাররফ ড্রোন হামলার সুযোগ দেয়নি, অথচ সে সুযোগ লাগাতর দিচ্ছে জারদারী সরকার। সোয়াতে বা ওয়াজিরস্থানে পাক বাহিনীর হামলা শুরুতে হয়নি, কিন্তু জারদারীর আমলে হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। মার্কিনী প্ররোচনায় পাকিস্তান এখন সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে নিজ দেশের তালেবানদের বিরুদ্ধেও। ফলে সমগ্র পাকিস্তান পরিনত হয়েছে রণাঙ্গণে।

 

ইসলামের জাগরণ রুখতে মার্কিনীরা যা কিছু আফগানিস্তানে করছে বাংলাদেশে সেটিই করতে চায় ভারত। এক্ষেত্রে ভারত সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পার্টনার। মোলবাদী নির্মূলে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে চলছে মার্কিনীদের ড্রোন হামলা। অপর দিকে ভারতও বসে নাই। হাসিনা সরকার নিজেই পরিনত হয়েছে ভারতীয় ড্রোনে। ভারত এ জোট সরকারকে ক্ষমতায় আনায় সর্বাত্মক সহায়তা দিয়েছে এরূপ একটি লক্ষ্যেকে সামনে রেখেই। ফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে উলফা নেতাদের উপর আঘাত হানতে ভারতকে মার্কিনীদের মত ড্রোন হামলা করতে হচ্ছে না। ইসলামপন্থিদের ধরতেও তাদের ময়দানে নামতে হচ্ছে না। সে কাজ শেখ হাসিনা নিজেই করছেন। পূর্ব রনাঙ্গণের বহু বিদ্রোহী এবং বহু ইসলামপন্থি এখন বাংলাদেশের জেলে। বাংলাদেশ এভাবে জড়িত হয়ে পড়ছে এক অঘোষিত যুদ্ধে। আর এমন যুদ্ধ শুরু হলে কি সহজে থামে? মার্কিনীরা শত চেষ্টা করেও গত ১০ বছরে আফগানিস্তানে থামাতে পারছে না। এরপর যখন ট্রানজিট দিয়ে ভারতীয় রশদ ও সৈন্য পারাপার শুরু হবে তখন তার উপর বিদ্রোহীদের যে হামলা হবে সে কথা কে হলফ করে বলতে পারে? সেরূপ হামলা শুরু হলে হামলাকারিদের উপর ভারতীয় ড্রোনের হামলাও যে শুরু হবে তা নিয়েও কি সন্দেহ আছে? আজ বিএসএফের গুলিতে সীমান্তে বাংলাদেশী লাশ হচ্ছে। তখন নিরপরাধ মানুষ বিপুল সংখ্যায় লাশ হবে দেশের অভ্যন্তরে, যেমনটি হচ্ছে পাকিস্তানে। তখন ভারত বিরোধীতা বিস্ফোরণে পরিণত হবে, এবং সেটি সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে।

অকার্যকর হচ্ছে নির্বাচন

এ যুদ্ধে শেখ হাসিনা ও তাঁর দলকে অবিরাম সংশ্লিষ্ট রাখার স্বার্থেই ভারত অন্য কোন দলীয় বা সামরিক সরকারকে বাংলাদেশে দেখতে রাজী নয়। তাই ভারতের মূল স্ট্রাটেজী, শেখ হাসিনাকে যে করেই হোক দীর্ঘকাল ক্ষমতায় রাখা। এজন্য পরিকল্পিত ভাবে অকার্যকর করা হচ্ছে গণতান্ত্রিক নির্বাচনকে। কাশ্মিরে জনসমর্থনহীন গোলাম মুহাম্মদ বখশী সরকারকে ১১ বছর ক্ষমতায় রেখে নেহেরু সরকার যেমন কাশ্মিরের স্বাধীনতা আন্দোলনকে দমন করেছিল তেমন নীতি এখান বাংলাদেশকে ঘিরেও। অথচ নির্বাচনের নামে কাশ্মিরেও বার বার নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচন হয়েছে জনপ্রিয় কাশ্মিরী নেতাকর্মীদের বছরের পর বছর কারারুদ্ধ করে। ফলে পুতুল বখশি সরকারকে কেউই হারাতে পারিনি। যেমন আফগানিস্তানের কারজাইকেও কেউ নির্বাচনে হারাতে পারছে না। অধিকৃত দেশে এমন সাঁজানো নির্বাচন ঘটানোয় ভারতের অভিজ্ঞতা তাই বিশাল। শেখ হাসিনা ভারতের সে অভিজ্ঞতাকে যে কাজে লাগাবে তা নিয়েও কি কোন সন্দেহ আছে? বরং ভারতীয় অভিজ্ঞতার প্রয়োগ জোরেশোরে শুরুও হয়ে গেছে। ফলে অসম্ভব হয়ে উঠছে অভঅঅসম্ভব নিদদিনির্বাচনের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে হটানো। যেমন অসম্ভব করা হয়েছিল শেখ মুজিবের ক্ষেত্রে। বিরোধী দলীয় নেতাদের বিরুদ্ধে পুলিশি হামলা, মামলা ও কারারুদ্ধ করার যে ব্যাপক তৎপরতা – সেটি তো সে লক্ষ্যেই।

মনমোহন সিংয়ের এ সফরে অনেক কিছুরই আয়োজন হবে। অনেক বড় বড় কথা হবে, অনেক চুক্তিও হবে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অলিখিত চুক্তিটি হবে শেখ হাসিনাকে কি করে দীর্ঘকাল ক্ষমতায় রাখা যায় তা নিয়ে। তেমনি একটি পরিকল্পনা শেখ মুজিবকে নিয়েও হয়েছিল। কিন্তু সেটি পণ্ড হয়ে যায়। মুজিবকে বাঁচানোর সে ব্যর্থতা নিয়ে ভারতীয় র’ এবং দিল্লির শাসক মহলে আজও মাতম হয়। এবার তারা চায়, আরো হুশিয়ার হয়ে এবং আরো সুক্ষ পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হতে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিলুপ্তি, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে ইসলামপন্থিদের গ্রেফতার ও তাদের উপর নির্যাতন, সংবিধানের ১৫ম সংশোধন –এসব মূলত সে ভারতীয় প্রজেক্টেরই অংশ বিশেষ। তাই সন্দেহ নেই, মনমোহন সিংয়ের এ সফর শেখ হাসিনা ও তার সরকারের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অতি গুরুত্বপূর্ণ ভারতের জন্যও। তবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য এ সফরে যে কোন কল্যাণই নেই, বরং সম্ভাবনা বাড়বে দেশের রাজনীতি আরো সংঘাতপূর্ণ ও রক্তাত্ব হওয়ার -তা নিয়ে কি কোন সন্দেহ আছে? ১৬/০৮/১১

 




মজলুম রোহিঙ্গা মুসলিম এবং শেখ হাসিনার অমনুষ্যনীতি

শেখ হাসিনার অমনুষ্যনীতি

শেখ হাসিনার রাজনীতি, বিদেশনীতি ও শাসননীতি যে কতটা বিবেকবর্জিত ও অমানবিক সেটি কি কোন গোপন বিষয়? বহুবার বহু বীভৎস্যতা নিয়ে সেটি ইতিমধ্যে প্রকাশ পেয়েছে। একটি লাশের বদলে দশটি লাশ ফেলার রাজনীতি,লগি-বৈঠা নিয়ে বিরোধী দলীয় কর্মীদের হত্যা,যাত্রী ভর্তি বাসে আগুণ,লেখক-সাংবাদিক-আলেম ও বিরোধী দলীয় নেতাদের গুম-খুণ ও গ্রেফতারি –এমন কার্যকলাপকে কি সুস্থ্য ও বিবেকমান মানুষের রাজনীতি বলা যায়? অথচ এরূপ অমনুষ্যনীতিই হলো শেখ হাসিনার রাজনীতি। সে নীতিরই পুনঃরায় প্রকাশ ঘটলো মজলুল রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্যে। গতকাল ২৭/০৭/১২ তারিখে আল -জাজিরা ইংরেজী টিভি চ্যানেলের সাথে সাক্ষাতকারে তিনি যা বলেছেন সেটি যেমন হৃদয়শূণ্য তেমনি মানবতাশূন্য। তিনি বলেছেন,রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশে কোন স্থান নাই।যুক্তি দেখিয়েছেন,বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ,অতএব রোহিঙ্গাদের জন্য আশ্রয় দেয়ার প্রশ্নই উঠে না। তিনি বলেছেন,“সমস্যাটি মায়ানমারের।অতএব বিদেশীদের উচিত,এ নিয়ে বাংলাদেশের উপর চাপ সৃষ্টি না করে মায়ানমারের উপর চাপ সৃষ্টি করা।”

আল -জাজিরার সাংবাদিকের প্রশ্ন ছিল,“হত্যা ও নির্যাতন থেকে প্রাণের ভয়ে রোহিঙ্গা মুসলমানেরা যখন বাংলাদেশে প্রবেশ করতে চেষ্টা করছিল তখন বাংলাদেশের কোষ্টাল গার্ডগণ তাদের ঢুকতে দেয়নি,এবং বলপূর্ব্বক তাদেরকে মায়ানমারে প্রবেশে বাধ্য করেছিল। এটি কি অমানবিক নয়?” জবাবে হাসিনা বলেন,“না,এটি সঠিক নয়। বাংলাদেশের কোষ্টাল গার্ডগণ রোহিঙ্গাদের সাথে কোনরূপ অমানবিক আচরণ করেনি,তাদেরকে বরং খাদ্য, পানীয় ও ঔষধ দিয়েছে এবং মায়ানবারে ফেরত যাওয়ার ব্যাপারে রাজী করেছে।” উক্ত সাংবাদিক প্রশ্ন করেন,“আপনার সরকার কি মায়ানমারে সরকারের সাথে রোহিঙ্গাদের এ সংকট নিয়ে কোন রূপ যোগাযোগ করেছে? জবাবে বলেন,“হাঁ আমরা যোগযোগ করেছি”। সে যোগাযোগে মায়ানমার সরকারের কাছে তাঁর সরকারের কি দাবী ছিল সেটি না বলে শেখ হাসিনা কার্যতঃ মায়ানমার সরকারের মুখপাত্রে পরিণত হন এবং বলেন, “মায়ানমার সরকার সমস্যার সমাধারে চেষ্টা করছে। অবস্থার উন্নতি ঘটেছে এবং উদ্বাস্তু আসাও বন্ধ হয়েছে।” আল জাজিরার সাংবাদিক তার এ জবাবে বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করেন,“প্রধানমন্ত্রি আপনি এসব বিশ্বাস করেন?” শেখ হাসিনার মুখে এ প্রশ্নের কোন জবাব ছিল না। তিনি বরং বিব্রত হন এবং নীরব হয়ে যান। মায়ানমার সরকারের নীতি যে পরিবর্তন হয়েছে তার প্রমাণ কোথায়? ক’দিন আগেই সেদেশের প্রেসিডেন্ট সকল রোহিঙ্গাদের তার দেশে থেকে অপসারণের দাবী করেছেন।

আল জাজিরার সাথে সাক্ষাতকারে শেখ হাসিনার মূল যুক্তিটি ছিল,বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ অতএব রোহিঙ্গাদের জন্য দেশটিতে জায়গা কোথায়? কিন্তু সমস্যা কি জনবহুল হওয়া নিয়ে? সমস্যা তো হৃদয়হীনতায়। কাউকে বিপদে জায়গা দেয়ার জন্য ঘরের জায়গাটির চেয়ে বড় প্রয়োজন হলো মনের জায়গার। মনে জায়গা না থাকলে দেশ বিশাল হলেও তখন বিপদগ্রস্তের জন্য কোন জায়গা থাকে না। আজ থেকে ৫০ বছর আগে বাংলাদেশের জনসংখ্যা আজকের তুলনায় অর্ধেকও ছিল না। কিন্তু তখনও দেশে অভাব ছিল। প্রচণ্ডতা দারিদ্রতা ছিল। সর্বক্ষেত্রে নানারূপ পশ্চাদপদতা ছিলও। দেশে তখনও দুর্ভিক্ষ আসতো। কিন্তু সে অভাবের দিনেও বাংলার মানুষ ভারত থেকে প্রাণ বাঁচাতে আসা লক্ষ লক্ষ মুসলমানদের জন্য জায়গা করে দিয়েছে। কারণ তখন জনগণ ও সরকারের মনে তাদের জন্য বিশাল জায়গা ছিল। অথচ শেখ মুজিব ও তার দলের কারণে বাংলাদেশ শুধু ভিক্ষার তলাহীন ঝুড়ি রূপেই বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পায়নি, রাজনীতিতেও প্রতিষ্ঠা দিয়েছে প্রকট ভিক্ষুক-সংস্কৃতি। ফলে বাংলাদেশের আওয়ামী সরকার শুধু হাত পেতে নিতেই জানে, দিতে নয়। রোহিঙ্গাদের প্রবেশের বিরুদ্ধে এজন্যই তারা সীমান্তে কোষ্টাল গার্ড বসেয়েছে।

বাস্তবতা হলো,মানুষ শুধু পেট নিয়ে আসে না,বরং বিস্ময়কর মেধা এবং কর্মক্ষম হাত-পা নিয়েও আসে।মেধার কারণে বিশ্বের জনসংখ্যা বিগত শত বছরে বহুগুণ বাড়লেও তার চেয়েও বেশী বেড়েছে সম্পদ। ফলে আজ থেকে হাজার বছর আগে বিশ্বের স্বল্পসংখ্যক মানুষ যে রূপ বাস করতো সে তুলনায় বহুগুণ বেশী প্রাচুয্য নিয়ে বাস করে আজকের মানুষ। তাছাড়া মানুষের পানাহারের দায়িত্ব তো মহান আল্লাহর। কোন ব্যক্তিই তার রেযেক ছাড়া জন্ম নেয় না। ঈমানদারের তো এটিই বিশ্বাস। সে বিশ্বাস না থাকলে তাকে কি মুসলমান বলা যায়? কিন্তু শেখ হাসিনা যে চেতনা নিয়ে কথা বলেছেন সেখানে সে ঈমান কোথায়? বাংলাদেশে প্রতিবছর বহু লক্ষ লোক জন্মসূত্রে যোগ দিচ্ছে। আজ থেকে ৩০ বছর পর বাংলাদেশের জনসংখ্যা আজকের তুলনায় দ্বিগুণ হবে। ৬০ বছর পর হয়তো ৪ গুণ হবে। জনসংখ্যা তো এভাবেই বাড়ে। তখন কি বাংলাদেশের মানুষ খাদ্যাভাবে ও স্থানাভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাবে? দ্বিগুণ বা চারগুণ জনসংখ্যার দায়ভার তো বাংলাদেশকেই সেদিন বইতে হবে। ইনশাল্লাহ তারা শুধু বেঁচেই থাঁকবে না উন্নতিও করবে। বাংলাদেশের প্রধান সম্পদ পাট নয়,চা বা চিংড়ি মাছ নয়। গার্মেন্টস বা পশুচর্মও নয়। বরং সেটি দেশের জনগণ। আল্লাহর এ শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিকে আপদ বা বোঝা বললে শুধু সে শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিরই  অপমান হয় না,বরং চরম অবমাননা হয় মহান স্রষ্টা মহান আল্লাহর। শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকার আল্লাহর বিরুদ্ধে সে অবমাননার রাজনীতিই করে চলেছে। তাছাড়া প্রাণ বাঁচাতে আসা কোন মানুষই প্রতিবেশীর ঘরে আজীবন বসবাসের জন্য আসে না। আশ্রয় চায় সীমিত সময়ের জন্য। বিপদ কেটে গেলে তারা দ্রুত নিজ ঘরে ফিরে যায়। কারণ প্রতিবেশীর ঘর তা যত ভালই হোক, কখনোই নিজ ঘরের মত হয় না। তারা তো চায় তা তাদের নিজ ঘরটি দ্রুত আবার বাসের যোগ্য হোক। তাই আশ্রয়দাতা প্রতিবেশী দেশগুলির লক্ষ্য হয়,উদ্বাস্তুদের নিজ ঘরে ফিরে যাওয়ার মত একটি পরিস্থিতি দ্রুত সৃষ্টি করা। রাজনীতি তো এভাবেই মানবিক পরিচয় পায়।

হাতছাড়া হলো মহাসুযোগ

বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের মান-মর্যাদা ইতিমধ্যেই তলায় ঠেকেছে। শেখ হাসিনার পিতার আমলে বাংলাদেশ পরিচিতি পেয়েছিল ভিক্ষার তলাহীন ঝুলি রূপে। আওয়ামী লীগ তখন ইতিহাস গড়েছিল ব্যাপক দূর্নীতি এবং ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ সৃষ্টিতে। শেখ হাসিনার আমলে বাংলাদেশ আবার মুজিব আমলের সে পুরোন পরিচিতি ফিরে পেয়েছে। দেশটি এখন আবার বিশ্বের অতি দূর্নীতিগ্রস্ত দেশ। সম্প্রতি সরকারি দলের ভয়ানক দূর্নীতির কারণে পদ্মা সেতু নির্মাণে বরাদ্দকৃত ঋণও বাতিল করে দিল বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য সাহায্যদানকারি সংস্থা। ঠিক এ মূহুর্তে রোহিঙ্গা বিষয়ে মানবতা ও মানবিক অধিকারের পক্ষ নিয়ে মাথা উঁচু করে বিশ্ব মাঝে দাঁড়ানোর সুযোগ এসেছিল বাংলাদেশের। যে গৃহে ১০ জন মানুষের ভাত পাক হয় সে গৃহে ২ জন মেহমান খাওয়াতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। যে বাংলাদেশের জনগণ ১৬ কোটি মানুষের আহার জোগাতে পারে তারা কি মায়ানমার থেকে প্রাণ বাঁচাতে আসা এক বা দুই লাখ মানুষকে কয়েকটি মাস বা বছর খাওয়াতে পারতো না? ইমেজ সৃষ্টির এমন সুযোগ ফি বছর আসে না। আসে মাঝে মধ্যে। কিন্তু জাতির নীতি-নৈতিকতা ও মান-মর্যাদার পরীক্ষা এর মধ্য দিয়েই হয়ে যায়। কিন্তু বাংলাদেশ সে পরীক্ষায় দারুণ ভাবে ফেল করেছে। তাছাড়া রোহিঙ্গা সংকট যেহেতু একটি আন্তর্জাতিক বিষয়, তাদের বসবাস ও পানাহারের খরচ জোগাতে জাতিসংঘ এবং অসংখ্য আন্তর্জাতিক সংস্থা এগিয়ে আসতো। পাকিস্তানে ৩০ লাখ আফগান যখন আশ্রয় নিয়েছে তখন তাদের সাহায্যে দেশটিতে হাজার হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক সাহায্যও এসেছে। বিদেশীরা তো আর বিপর্যস্ত মানুষকে সমুদ্রে বা আকাশে ভাসমান রেখে খাওয়াতে পারে না? এমন দুর্যোগ মুহুর্তে প্রতিবেশী দেশকে উদ্বাস্তুদের জন্য শুধু মাথাগোঁজার জায়গা দিতে হয়,বাঁকি দায়ভার অন্যরা নিয়ে নেয়। সে সুযোগটুকুই বাংলাদেশ সরকার দেয়নি। বাংলাদেশ নিয়ে এজন্যই আন্তর্জাতিক মহলের প্রচণ্ড হতাশা।

হাসিনা সরকারের বড় অপরাধ, মজলুমের পক্ষ নেয়ার জন্য যে নৈতীক বল দরকার সেটি এ সরকার দেখাতে পারেননি। নৈতীক বল তো আসে সুনীতি থেকে। যাদের বিশ্বজুড়া পরিচিতি দুর্নীতিবাজ রূপে,সেরূপ একটি সরকারের পক্ষে সেটি থাকার কথাও নয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নীতি হওয়া উচিত ছিল, প্রাণে বাঁচতে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে মায়ানমার সরকারের উপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করা। একাজে বাংলাদেশে সরকার বিশ্বের অধিকাংশ দেশের সমর্থণ পেত। সমর্থণ পেত প্রায় ৬০টি মুসলিম দেশের। তখন ১৬ কোটি মানুষের বাংলাদেশ একটি শান্তিকামী ও মানবতাবাদী দেশ রূপে একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তি রূপে আত্মপ্রকাশের সুযোগ পেত। কিন্তু শেখ হাসীনার সরকার সে পথে এগুয়নি। বরং বেছে নিয়েছে অমানবিক বিবেকশূণ্যতার পথ। বাংলাদেশ যে স্রেফ জনসংখ্যাতেই বেড়েছে,মানবতায় নয় -সেটিই শেখ হাসিনার সরকার বিশ্ববাসীর সামনে পুণঃরায় প্রকাশ করে দিল।

তবে শেখ হাসিনার সরকার শুধু যে অমানবিক তাই নয়, প্রচণ্ড আহাম্মকও। সেটি প্রকাশ করে দিল সরকারের মন্ত্রীরা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিপুমনি এবং আওয়ামী লীগ সরকারের বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ নেতৃবৃন্দ রোহিঙ্গাদের নির্মূল প্রক্রিয়াকে বাংলাদেশের জামায়াত-শিবিরের কাণ্ড বলে চিত্রিত করেছে। শুধু মানবিক গুণ নয়, ইতিহাস-জ্ঞানও যে নেহায়েত কম সেটিও কি এর পর বুঝতে বাঁকী থাকে? রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নির্মূল প্রক্রিয়ার যখন শুরু,তখন বাংলাদেশে জামায়াত বা শিবির বলে কিছু ছিল না। বার্মিজ জাতিয়তাবাদীদের হাতে রোহিঙ্গাদের নির্মূল প্রক্রিয়া শুরু হয় শতাধিক বছর আগে। থেমে থেমে লাগাতর চলছে সে নিধন প্রক্রিয়া। ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডটি ঘটে ১৯৪২ সালে। তখন চলছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। মায়ানমারের ব্রিটিশ শাসকগণ তখন জাপানীদের হাতে মার খাচ্ছিল। সে অরাজক পরিস্থিতিতে বার্মিজগণ তখন নির্মূলকর্মে নামে। ১৯৪২ সালের ২৮শে মার্চ তারিখে ৫,০০০ রোহিঙ্গা মুসলমানকে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়। এর পর চলতে থাকে থেমে থেমে মুসলিম নিধন। এরূপ নির্মূল প্রক্রিয়ার ফলে মায়ানামারে বৌদ্ধ জনসংখ্যা বাড়লেও এ এলাকায় মুসলিম রোহিঙ্গাদের সংখ্যা বাড়েনি। বরং সেখানে বৃদ্ধি পেয়েছে রাখাইন সম্প্রদায়ের মারমুখো বৌদ্ধদের সংখ্যা। বিভিন্ন সূত্রে প্রকাশ,রোহিঙ্গা মুসলমানদের সংখ্যা বহু বছর আগে প্রায় দশ লাখ ছিল। কিন্তু সে সংখ্যা এখন ৮ লাখের বেশী নয়। লাগাতর এ নির্যাতন থেকে বাঁচতে প্রায় তিনি লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশে। প্রায় ২৪ হাজার আশ্রয় নিয়েছে মালয়েশিয়ায়।বহু রোহিঙ্গা মুসলমান বহু কষ্টে দূরবর্তী থাইল্যান্ড,ভারত,ব্রুনাই,সৌদি আরব এবং পাকিস্তানেও আশ্রয় নিয়েছে। শেখ হাসিনা বা দিপুমনি কি এরপরও বলবেন,রোহিঙ্গা নির্মূলের এ দীর্ঘ প্রক্রিয়াটি জামায়াত-শিবিরের কাণ্ড?

আলোড়িত বিশ্ব এবং অনড় হাসিনা

রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত এ নির্মূল প্রক্রিয়া শেখ হাসিনা ও তার আওয়ামী মহলে কোন বিবেকবোধ জাগ্রত না করলে কি হবে,বিশ্বের বহুদেশে তা ইতিমধ্যেই যথেষ্ট আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এমনকি ভারতের মত একটি অমুসলিম দেশে বহু গুরুত্বপূর্ণ অমুসলিম রাজনৈতিক নেতারা রাজধানী দিল্লির রাজপথে নেমে এসেছেন। পত্রিকায় প্রকাশ,দিল্লিস্থ্ মায়ানমারের দূতাবাসের সামনে ভারতের সমাজবাদী দল,ইউনাইটেড জনতা দল, সিপিআই, ইন্ডিয়ান ন্যাশন্যাশ লীগের নেতারা রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হত্যাকাণ্ড বন্ধের দাবীতে ধর্না দিয়েছেন। তাঁরা প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের উপর চাপ দিচ্ছেন,এ গণহত্যা দমনে তার সরকার যেন উদ্যোগ নেয়। গত ২৭/০৭/১২ তারিখে জুম্মার নামায শেষে হাজার হাজার মানুষের বিশাল মিছিল হয়েছে মায়ানমার থেকে বহু দূরে তেহরানের রাজপথে। অথচ ঢাকায় তার অর্ধেক মানুষের মিছিলও এ অবধি হয়নি। হাজার হাজার মানুষের ঢল নেমেছিল করাচীর রাজপথে। মিছিল হয়েছে পাকিস্তানের অন্যান্য শহরে। এ গণহত্যা ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে তুমুল লেখালেখি হয়েছে নবজাগরিত মিশরসহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সকল দেশের পত্র-পত্রিকায়। সুস্থ্য দেহে ক্ষুদ্র মাছি বসলেও সবল হাতখানি তেড়ে আসে। কিন্তু অসাড় দেহে জোরে ধাক্কা লাগালেও তা খাড়া হয় না। রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে বাংলাদেশের সরকারের নীরবতাই প্রমাণ করে বিবেকে কতটা অসুস্থ্য এ সরকারের কর্তব্যক্তিরা।

মায়ানামার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নয়। রাশিয়া বা চীনও নয়। দীর্ঘকাল সামরিক স্বৈরাচার কবলিত একটি অনুন্নত দেশ। গণতন্ত্র,ব্যক্তি-স্বাধিনতা ও দেশের সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে মায়ানমার সরকারের পরিচালিত যুদ্ধটি নতুন কিছু নয়। এ নিয়ে মায়ানমারের সরকার ইতিমধ্যেই পৃথিবী জুড়ে বহু বদনাম কুড়িয়েছে। কারেন বিদ্রোহসহ বহু বিদ্রোহ বহু যুগ ধরে চলছে মায়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে। এমন একটি বহুল পরিচিত অমানবিক সরকারের বিরুদ্ধে অতি সহজেই বাংলাদেশে সরকার একটি বলিষ্ঠ ভূমিকা নিতে পারতো। বিশ্বপরিস্থিতি ও আঞ্চলিক পরিস্থিতি বাংলাদেশের পক্ষে ছিল। মজলুম রোহিঙ্গাদের পক্ষে দাঁড়ালে বিশ্বের বহুদেশ ও বহুসংস্থা বাংলাদেশকে বাহবা দিত। বাংলাদেশে যে প্রায় ৩ লাখ রোহিঙ্গা এতকাল বসবাস করছে তাদেরও ফেরত পাঠানোর জন্য চাপ সৃষ্টির জন্য এটি ছিল মোক্ষম সময়। কিন্তু হাসিনা সরকার সে পথে এগুয়নি। বরং ধরেছে ভিন্ন পথ। সেটি মানবতা-বিরোধী পথ। ফল দাড়িয়েছে, শেখ হাসিনার মগজের সুস্থ্যতাই নিয়ে বিদেশী সাংবাদিকের সন্দেহ জেগেছে। আল-জাজিরার সাংবাদিকের প্রশ্নে তো সে সংশয়ই ফুটে উঠেছে।

 

রাজনীতি যেখানে ছাগলনীতি

গরু-ছাগলের একটি নীতি আছে।সেটি স্রেফ জৈবীক ভাবে বাঁচা। এমন বাঁচার মধ্যে পাশের প্রতিবেশীর প্রতি কোন কল্যাণ-চিন্তা থাকেনা। কোন নীতিবোধ বা দাযিত্বশীলতাও থাকে না। পশু তো এজন্যই পশু। এজন্যই পশু থেকে কোনরূপ মানবিক আচরণ আশা করা যায় না। গরু-ছাগলের বিশাল পাল থেকে একটিকে ধরে নিয়ে চোখের সামনে গলায় ছুড়ি চালালেও তাতে গরু-ছাগলের ঘাস-পাতা খাওয়ায় ছেদ পড়ে না। পবিত্র কোরআনে ঈমানহীন মানুষকে শুধু পশু নয়,পশুর চেয়েও অধম বলা হয়েছে। প্রতিবেশীর বেদনায় বহু মানুষও যে পশুর মতই বেদনাহীন হয় সে প্রমাণ কি কম? শেখ হাসিনা ও তাঁর দল আওয়ামী লীগের সেটিই হলো নীতি। তাই রোহিঙ্গা মুসলমানদের যতই জবাই করা হোক বা তাদের নারীদের যতই ধর্ষণ করা হোক ও তাদের ঘরবাড়ীতে যতই আগুণ দেয়া হোক, তাতে শেখ হাসিনা ও তার অনুসারিদের মনে সামান্যতম দংশনও হয় না। গুজরাতে যখন তিন হাজারের বেশী মুসলিম নারী-শিশু-বৃদ্ধকে হত্যা করা হলো,এবং মুসলিম বস্তিতে আগুণ দেয়া হলো,তখনও আওয়ামী শিবিরে তাই কোন প্রতিবাদ উঠেনি। প্রতিবাদ তখনও উঠেনি যখন উগ্র হিন্দুরা অযোধ্যায় বাবরী মসজিদকে উৎসবভরে ধ্বংস করে। তখনও আওয়ামী তখনও নিন্দায় রাস্তায় নামেনি যখন ১৯৮৩ সালে আসামের নেলীতে ৫০০০ মুসলমানদের একদিনে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়। অথচ তা নিয়ে সেদিন সমগ্র মুসলিম বিশ্বে আলোড়ন উঠেছিল। এই তো ক’দিন আগে আসামের কোকরাজরে মুসলমানদের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ড পরিচালিত হলো। কিন্তু তার বিরুদ্ধেও কি আওয়ামী লীগ নেতাদের পক্ষ থেকে কোন কিছু বলা হয়েছে? কাশ্মীরের মুসলমান দীর্ঘ ৬০ বছর ধরে হত্যা,ধর্ষণ ও জেলজুলুমের মধ্যে আছে কিন্তু তা নিয়ে কি আওয়ামী লীগ কোন দিনও কি কোন প্রতিবাদ করেছে? অথচ বাংলাদেশে কোন হিন্দু বা বৌদ্ধদের গায়ে আঁচড় লাগলে তা নিয়ে ফিল্ম বানিয়ে শাহরিয়ার কবিরের ন্যায় আওয়ামী ঘরানার ক্যাডারগণ তা বিশ্বময় প্রচার করে।তাদের দায়বদ্ধতা যে কোথায় এরপরও কি বুঝতে বাঁকি থাকে?

 

মায়ানমার সরকারের ফ্যাসীবাদী স্ট্রাটেজী

জাতিসংঘের ধারণা অনুযায়ী সাম্প্রতিক হামলাতে ৫০ থেকে ৯০ হাজার রোহিঙ্গা মুসলমান নিজেদের ঘরবাড়ী থেকে স্থানচ্যুত হয়েছে। তবে ঘরবাড়ি থেকে রোহিঙ্গাদের উচ্ছেদ করাটাই মায়ানমার সরকারের একমাত্র অপরাধ নয়। হিউমান রাইট্স ওয়াচের মতে তাদেরকে দাস-শ্রমিক রূপে কাজ করতেও বাধ্য করা হচ্ছে। বিয়েশাদী করতে তাদেরকে সরকার থেকে অনুমতি নিতে হয়।পত্রিকায় প্রকাশ,সন্তানের সংখ্যা অনুর্দ্ধ দুই জন রাখতেও তাদের উপর চাপ দেয়া হয়। দেশের এক স্থান থেকে অন্যস্থানে যেতেও তাদেরকে সরকার থেকে অনুমতি নিতে হয়। আরো গুরুতর বিষয় হলো,রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সহিংস পলিসির নেতৃত্ব দিচ্ছে বৌদ্ধ পুরোহিতগণ। তারা রোহিঙ্গাদের কালা ও বর্বর রূপে আরোহিত করছে। অথচ তারা ভূলে গেছে বৌদ্ধধর্মের প্রতিষ্ঠিতা বিহারের গৌতম বুদ্ধও শ্বেতাঙ্গ বা গৌর বর্ণের ছিলেন না। বিভিন্ন এনজিও সূত্রে প্রকাশ,রোহিঙ্গাদের কাছে ত্রাণ পৌঁছতেও এ বৌদ্ধ পুরোহিতগণ বাধা দিচ্ছে। রোহিঙ্গা-অধ্যুষিত এলাকার বিভিন্ন রাস্তায় ও স্থাপনায় তারা পোষ্টার এঁটে দিয়েছে এ হুশিয়ারি জানিয়ে যে,রোহিঙ্গাদের সাথে যেন কোনরূপ সংশ্রব না রাখা হয় এবং তাদের কোনরূপ সাহায্য করা না হয়।

তবে রোহিঙ্গা নিমূল প্রক্রিয়ায় শীর্ষে রয়েছে সেদেশের সরকার। গত ১৯/৭/১২ মায়ানমারের প্রেসিডেন্ট থেন সেইন বলেছেন,“রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানের একমাত্র পথ হলো তাদেরকে সকলকে মায়ানমার থেকে সরিয়ে নিয়ে কোন তৃতীয় দেশে বা জাতিসংঘের তত্বাবধানে কোন ত্রান শিবিরে রাখা।” অতি সহজ সমাধান! তিনি যে কতটা অসুস্থ্য চেতনার জীব,তা কি এর পরও বুঝতে বাঁকি থাকে? যারা কট্টোর বর্ণবাদী বা জাতিয়তাবাদী তারা এরূপ নির্মূল প্রক্রিয়ার বাইরে কোন কিছু যেন ভাবতেই পারে না। এমন এক চেতনা নিয়েই হিটলার জার্মানীতে বসবাসরত ইহুদীদের গ্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে তাদের নির্মূলের পরিকল্পনা নিয়েছিল। আর বাঙালী জাতিয়তাবাদীরা একাত্তরে বিহারী সমস্যার সমাধান করতে চেয়েছিল তাদেরকে হত্যা করে বা তাদেরকে পাকিস্তানে পাঠিয়ে দিয়ে। হাজার হাজার বিহারীকে তখন উৎসবভরে হত্যাও করা হয়েছিল এবং উৎখাত করা হয়েছিল তাদের ঘরবাড়ী ও ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে। ঘরবাড়ী হারানো সে হাজার হাজার বিহারীরা বিগত ৬০ বছরের বেশী কাল ধরে বস্তিতে বসবাস করে সে বর্ণবাদী বাঙালীদের অমনুষ্যনীতিরই সাক্ষর বহন করছে। আর আজ সে অভিন্ন অমুনষ্যনীতির শিকার হচ্ছে রোহিঙ্গা মুসলমানরা।এখানেও কারণ অভিন্ন। সেটি ভাষা ও বর্ণভিত্তিক কট্টোর জাতিয়তাবাদী ফ্যাসিবাদ। মায়ানমারে সেটি বার্মিজ জাতিয়তাবাদ। তাদের কথা,মায়ানমার শুধু বার্মিজদের জন্য,এখানে অবার্মিজ রোহিঙ্গাদের কোন স্থান নেই। কিন্তু কথা হলো, যে মায়ানমারে শত শত বছর ধরে রোহিঙ্গারা বসবাস করলো তারা যদি সে মায়ানমারে স্থান না পায় তবে অন্যরা কেন তাদেরকে স্থান দিবে? তারা দেখে না যে পাশ্ববর্তী মালয়েশিয়ার জনসংখ্যার শতকরা প্রায় ৪০ ভাগ হলো তারা যারা সে দেশে গিয়েছিল চীন ও দক্ষিণ ভারত থেকে। তাদেরকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিল ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকেরা। মালয়েশিয়া থেকে ব্রিটিশ শাসকেরা চলে গেছে, কিন্তু চাইনিজ এবং ভারতীয় তামিলদের কি সেদেশ থেকে নির্মূল করা হয়েছে? বহু লক্ষ ভারতীয় ও চাইনিজ ছড়িয়ে আছে আফ্রিকা, ইউরোপ এবং আমেরিকার বহুদেশে। নানা ভাষা, নানা বর্ণ ও নানা ধর্মের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপস্থিতি বিশ্বের প্রতিদেশে। তারা সেসব দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও পালন করছে। এটিই যে কোন সুস্থ্য সমাজের নীতি। কিন্তু রোহিঙ্গাদের সে অধিকার দিতে রাজী নয় মায়ানমার সরকার। অথচ মিয়ানমারের মুসলমানদের বসবাস শত শত বছর পূর্ব থেকে। আরাকানে এক সময় সুলতানি শাসনও ছিল। দীর্ঘকাল ধরে বাংলা ভাষা চর্চা পেয়েছে আরাকান রাজ্যসভায়। কবি আলাওল ছিলেন আরাকান রাজ্যসভার সভাকবি। মায়ানমারে মুসলমানদের এ দীর্ঘ উপস্থিতি ও ঐত্হ্যকে মায়ানমারে বর্ণবাদীরা নির্মূল করতে চায়। কথা হলো এতবড় ভয়ানক অপরাধের বিরুদ্ধে নিন্দা করতে কি বিশাল মানবতা লাগে?

শেখ হাসিনার আদর্শিক আত্মীয়

কোন দেশের জাতীয়তাবাদী ফ্যাসিস্টদের নিন্দা করার মত নৈতীক বল অপরদেশের ফ্যাসিষ্টদের থাকে না। তাদের মধ্যেও একটি আদর্শিক বন্ধন থাকে। তাই জার্মানীতে যখন ইহুদীদেরকে হাজারে হাজার গ্যাস চেম্বারে পাঠানো হচ্ছিল সে নৃশংসতার নিন্দা বিশ্বের কোন জাতিয়তাবাদী বা বর্ণবাদীরা করেনি। বরং বহু ভারতীয় ও বাঙালী জাতিয়তাবাদীরা তো হিটলারের ন্যায় সে বর্বর ব্যক্তিটির সাথে বন্ধুত্বও গড়েছে। লক্ষণীয় হলো, মায়ানমারের বর্ণবাদী প্রেসিডেন্ট থেন সেইন ও তার সহিংস অনুসারিদের সাথে শেখ হাসিনা ও তাঁর রাজনৈতিক ক্যাডারদের ভাষাগত পার্থক্য থাকলেও আদর্শিক পার্থক্য নাই। বরং আদর্শিক দিক দিয়ে তারা বরং পরস্পরের ঘনিষ্ট আত্মীয়। যে অপরাধটি শেখ মুজিবের ফ্যাসীবাদী ক্যাডারগণ অতীতে বিহারীদের সাথে করেছে এবং আজ করছে তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে, সেটিই তো বার্মিজ ফ্যাসিষ্টগণ করছে রোহিঙ্গা মুসলমানদের সাথে। ফলে কোন নৈতীক বল নিয়ে শেখ হাসিনা বার্মিজ নৃশংসতার নিন্দা করবে? বরং শেখ হাসিনা ও তার মন্ত্রীরা পরিণত হয়েছে মায়ানমার সরকারের নির্লজ্জ স্তাবকে। তারা মায়ানমার সরকারকে দায়ী না করে বরং দায়ী করেছেন বাংলাদেশের ইসলামপন্থিদের। মায়ানমারে রোহিঙ্গাদের জন্য অবস্থার উন্নতি হয়েছে সে সার্টিফিকেটও দিয়েছেন শেখ হাসিনা। আল জাজিরা টিভির সাথে সাক্ষাতকারে তো শেখ হাসিনা সেটিই বলেছেন। কথা হলো,মায়ানমারে যদি অবস্থার উন্নতি হয়েই থাকে তবে কেন বাংলাদেশে তিন লাখ রোহিঙ্গা মুসলমানের অবস্থান? তাদেরকে কেন সেখান থেকে ফেরত পাঠানো হচ্ছে না?  ৩০/০৭/১২

শেখ হাসিনার অমনুষ্যনীতি

শেখ হাসিনার রাজনীতি, বিদেশনীতি ও শাসননীতি যে কতটা বিবেকবর্জিত ও অমানবিক সেটি কি কোন গোপন বিষয়? বহুবার বহু বীভৎস্যতা নিয়ে সেটি ইতিমধ্যে প্রকাশ পেয়েছে। একটি লাশের বদলে দশটি লাশ ফেলার রাজনীতি,লগি-বৈঠা নিয়ে বিরোধী দলীয় কর্মীদের হত্যা,যাত্রী ভর্তি বাসে আগুণ,লেখক-সাংবাদিক-আলেম ও বিরোধী দলীয় নেতাদের গুম-খুণ ও গ্রেফতারি –এমন কার্যকলাপকে কি সুস্থ্য ও বিবেকমান মানুষের রাজনীতি বলা যায়? অথচ এরূপ অমনুষ্যনীতিই হলো শেখ হাসিনার রাজনীতি। সে নীতিরই পুনঃরায় প্রকাশ ঘটলো মজলুল রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্যে। গতকাল ২৭/০৭/১২ তারিখে আল -জাজিরা ইংরেজী টিভি চ্যানেলের সাথে সাক্ষাতকারে তিনি যা বলেছেন সেটি যেমন হৃদয়শূণ্য তেমনি মানবতাশূন্য। তিনি বলেছেন,রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশে কোন স্থান নাই।যুক্তি দেখিয়েছেন,বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ,অতএব রোহিঙ্গাদের জন্য আশ্রয় দেয়ার প্রশ্নই উঠে না। তিনি বলেছেন,“সমস্যাটি মায়ানমারের।অতএব বিদেশীদের উচিত,এ নিয়ে বাংলাদেশের উপর চাপ সৃষ্টি না করে মায়ানমারের উপর চাপ সৃষ্টি করা।”

 

আল -জাজিরার সাংবাদিকের প্রশ্ন ছিল,“হত্যা ও নির্যাতন থেকে প্রাণের ভয়ে রোহিঙ্গা মুসলমানেরা যখন বাংলাদেশে প্রবেশ করতে চেষ্টা করছিল তখন বাংলাদেশের কোষ্টাল গার্ডগণ তাদের ঢুকতে দেয়নি,এবং বলপূর্ব্বক তাদেরকে মায়ানমারে প্রবেশে বাধ্য করেছিল। এটি কি অমানবিক নয়?” জবাবে হাসিনা বলেন,“না,এটি সঠিক নয়। বাংলাদেশের কোষ্টাল গার্ডগণ রোহিঙ্গাদের সাথে কোনরূপ অমানবিক আচরণ করেনি,তাদেরকে বরং খাদ্য, পানীয় ও ঔষধ দিয়েছে এবং মায়ানবারে ফেরত যাওয়ার ব্যাপারে রাজী করেছে।” উক্ত সাংবাদিক প্রশ্ন করেন,“আপনার সরকার কি মায়ানমারে সরকারের সাথে রোহিঙ্গাদের এ সংকট নিয়ে কোন রূপ যোগাযোগ করেছে? জবাবে বলেন,“হাঁ আমরা যোগযোগ করেছি”। সে যোগাযোগে মায়ানমার সরকারের কাছে তাঁর সরকারের কি দাবী ছিল সেটি না বলে শেখ হাসিনা কার্যতঃ মায়ানমার সরকারের মুখপাত্রে পরিণত হন এবং বলেন, “মায়ানমার সরকার সমস্যার সমাধারে চেষ্টা করছে। অবস্থার উন্নতি ঘটেছে এবং উদ্বাস্তু আসাও বন্ধ হয়েছে।” আল জাজিরার সাংবাদিক তার এ জবাবে বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করেন,“প্রধানমন্ত্রি আপনি এসব বিশ্বাস করেন?” শেখ হাসিনার মুখে এ প্রশ্নের কোন জবাব ছিল না। তিনি বরং বিব্রত হন এবং নীরব হয়ে যান। মায়ানমার সরকারের নীতি যে পরিবর্তন হয়েছে তার প্রমাণ কোথায়? ক’দিন আগেই সেদেশের প্রেসিডেন্ট সকল রোহিঙ্গাদের তার দেশে থেকে অপসারণের দাবী করেছেন।

 

আল জাজিরার সাথে সাক্ষাতকারে শেখ হাসিনার মূল যুক্তিটি ছিল,বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ অতএব রোহিঙ্গাদের জন্য দেশটিতে জায়গা কোথায়? কিন্তু সমস্যা কি জনবহুল হওয়া নিয়ে? সমস্যা তো হৃদয়হীনতায়। কাউকে বিপদে জায়গা দেয়ার জন্য ঘরের জায়গাটির চেয়ে বড় প্রয়োজন হলো মনের জায়গার। মনে জায়গা না থাকলে দেশ বিশাল হলেও তখন বিপদগ্রস্তের জন্য কোন জায়গা থাকে না। আজ থেকে ৫০ বছর আগে বাংলাদেশের জনসংখ্যা আজকের তুলনায় অর্ধেকও ছিল না। কিন্তু তখনও দেশে অভাব ছিল। প্রচণ্ডতা দারিদ্রতা ছিল। সর্বক্ষেত্রে নানারূপ পশ্চাদপদতা ছিলও। দেশে তখনও দুর্ভিক্ষ আসতো। কিন্তু সে অভাবের দিনেও বাংলার মানুষ ভারত থেকে প্রাণ বাঁচাতে আসা লক্ষ লক্ষ মুসলমানদের জন্য জায়গা করে দিয়েছে। কারণ তখন জনগণ ও সরকারের মনে তাদের জন্য বিশাল জায়গা ছিল। অথচ শেখ মুজিব ও তার দলের কারণে বাংলাদেশ শুধু ভিক্ষার তলাহীন ঝুড়ি রূপেই বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পায়নি, রাজনীতিতেও প্রতিষ্ঠা দিয়েছে প্রকট ভিক্ষুক-সংস্কৃতি। ফলে বাংলাদেশের আওয়ামী সরকার শুধু হাত পেতে নিতেই জানে, দিতে নয়। রোহিঙ্গাদের প্রবেশের বিরুদ্ধে এজন্যই তারা সীমান্তে কোষ্টাল গার্ড বসেয়েছে।

 

বাস্তবতা হলো,মানুষ শুধু পেট নিয়ে আসে না,বরং বিস্ময়কর মেধা এবং কর্মক্ষম হাত-পা নিয়েও আসে।মেধার কারণে বিশ্বের জনসংখ্যা বিগত শত বছরে বহুগুণ বাড়লেও তার চেয়েও বেশী বেড়েছে সম্পদ। ফলে আজ থেকে হাজার বছর আগে বিশ্বের স্বল্পসংখ্যক মানুষ যে রূপ বাস করতো সে তুলনায় বহুগুণ বেশী প্রাচুয্য নিয়ে বাস করে আজকের মানুষ। তাছাড়া মানুষের পানাহারের দায়িত্ব তো মহান আল্লাহর। কোন ব্যক্তিই তার রেযেক ছাড়া জন্ম নেয় না। ঈমানদারের তো এটিই বিশ্বাস। সে বিশ্বাস না থাকলে তাকে কি মুসলমান বলা যায়? কিন্তু শেখ হাসিনা যে চেতনা নিয়ে কথা বলেছেন সেখানে সে ঈমান কোথায়? বাংলাদেশে প্রতিবছর বহু লক্ষ লোক জন্মসূত্রে যোগ দিচ্ছে। আজ থেকে ৩০ বছর পর বাংলাদেশের জনসংখ্যা আজকের তুলনায় দ্বিগুণ হবে। ৬০ বছর পর হয়তো ৪ গুণ হবে। জনসংখ্যা তো এভাবেই বাড়ে। তখন কি বাংলাদেশের মানুষ খাদ্যাভাবে ও স্থানাভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাবে? দ্বিগুণ বা চারগুণ জনসংখ্যার দায়ভার তো বাংলাদেশকেই সেদিন বইতে হবে। ইনশাল্লাহ তারা শুধু বেঁচেই থাঁকবে না উন্নতিও করবে। বাংলাদেশের প্রধান সম্পদ পাট নয়,চা বা চিংড়ি মাছ নয়। গার্মেন্টস বা পশুচর্মও নয়। বরং সেটি দেশের জনগণ। আল্লাহর এ শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিকে আপদ বা বোঝা বললে শুধু সে শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিরই  অপমান হয় না,বরং চরম অবমাননা হয় মহান স্রষ্টা মহান আল্লাহর। শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকার আল্লাহর বিরুদ্ধে সে অবমাননার রাজনীতিই করে চলেছে। তাছাড়া প্রাণ বাঁচাতে আসা কোন মানুষই প্রতিবেশীর ঘরে আজীবন বসবাসের জন্য আসে না। আশ্রয় চায় সীমিত সময়ের জন্য। বিপদ কেটে গেলে তারা দ্রুত নিজ ঘরে ফিরে যায়। কারণ প্রতিবেশীর ঘর তা যত ভালই হোক, কখনোই নিজ ঘরের মত হয় না। তারা তো চায় তা তাদের নিজ ঘরটি দ্রুত আবার বাসের যোগ্য হোক। তাই আশ্রয়দাতা প্রতিবেশী দেশগুলির লক্ষ্য হয়,উদ্বাস্তুদের নিজ ঘরে ফিরে যাওয়ার মত একটি পরিস্থিতি দ্রুত সৃষ্টি করা। রাজনীতি তো এভাবেই মানবিক পরিচয় পায়।

 

হাতছাড়া হলো মহাসুযোগ

বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের মান-মর্যাদা ইতিমধ্যেই তলায় ঠেকেছে। শেখ হাসিনার পিতার আমলে বাংলাদেশ পরিচিতি পেয়েছিল ভিক্ষার তলাহীন ঝুলি রূপে। আওয়ামী লীগ তখন ইতিহাস গড়েছিল ব্যাপক দূর্নীতি এবং ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ সৃষ্টিতে। শেখ হাসিনার আমলে বাংলাদেশ আবার মুজিব আমলের সে পুরোন পরিচিতি ফিরে পেয়েছে। দেশটি এখন আবার বিশ্বের অতি দূর্নীতিগ্রস্ত দেশ। সম্প্রতি সরকারি দলের ভয়ানক দূর্নীতির কারণে পদ্মা সেতু নির্মাণে বরাদ্দকৃত ঋণও বাতিল করে দিল বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য সাহায্যদানকারি সংস্থা। ঠিক এ মূহুর্তে রোহিঙ্গা বিষয়ে মানবতা ও মানবিক অধিকারের পক্ষ নিয়ে মাথা উঁচু করে বিশ্ব মাঝে দাঁড়ানোর সুযোগ এসেছিল বাংলাদেশের। যে গৃহে ১০ জন মানুষের ভাত পাক হয় সে গৃহে ২ জন মেহমান খাওয়াতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। যে বাংলাদেশের জনগণ ১৬ কোটি মানুষের আহার জোগাতে পারে তারা কি মায়ানমার থেকে প্রাণ বাঁচাতে আসা এক বা দুই লাখ মানুষকে কয়েকটি মাস বা বছর খাওয়াতে পারতো না? ইমেজ সৃষ্টির এমন সুযোগ ফি বছর আসে না। আসে মাঝে মধ্যে। কিন্তু জাতির নীতি-নৈতিকতা ও মান-মর্যাদার পরীক্ষা এর মধ্য দিয়েই হয়ে যায়। কিন্তু বাংলাদেশ সে পরীক্ষায় দারুণ ভাবে ফেল করেছে। তাছাড়া রোহিঙ্গা সংকট যেহেতু একটি আন্তর্জাতিক বিষয়, তাদের বসবাস ও পানাহারের খরচ জোগাতে জাতিসংঘ এবং অসংখ্য আন্তর্জাতিক সংস্থা এগিয়ে আসতো। পাকিস্তানে ৩০ লাখ আফগান যখন আশ্রয় নিয়েছে তখন তাদের সাহায্যে দেশটিতে হাজার হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক সাহায্যও এসেছে। বিদেশীরা তো আর বিপর্যস্ত মানুষকে সমুদ্রে বা আকাশে ভাসমান রেখে খাওয়াতে পারে না? এমন দুর্যোগ মুহুর্তে প্রতিবেশী দেশকে উদ্বাস্তুদের জন্য শুধু মাথাগোঁজার জায়গা দিতে হয়,বাঁকি দায়ভার অন্যরা নিয়ে নেয়। সে সুযোগটুকুই বাংলাদেশ সরকার দেয়নি। বাংলাদেশ নিয়ে এজন্যই আন্তর্জাতিক মহলের প্রচণ্ড হতাশা।

 

হাসিনা সরকারের বড় অপরাধ, মজলুমের পক্ষ নেয়ার জন্য যে নৈতীক বল দরকার সেটি এ সরকার দেখাতে পারেননি। নৈতীক বল তো আসে সুনীতি থেকে। যাদের বিশ্বজুড়া পরিচিতি দুর্নীতিবাজ রূপে,সেরূপ একটি সরকারের পক্ষে সেটি থাকার কথাও নয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নীতি হওয়া উচিত ছিল, প্রাণে বাঁচতে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে মায়ানমার সরকারের উপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করা। একাজে বাংলাদেশে সরকার বিশ্বের অধিকাংশ দেশের সমর্থণ পেত। সমর্থণ পেত প্রায় ৬০টি মুসলিম দেশের। তখন ১৬ কোটি মানুষের বাংলাদেশ একটি শান্তিকামী ও মানবতাবাদী দেশ রূপে একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তি রূপে আত্মপ্রকাশের সুযোগ পেত। কিন্তু শেখ হাসীনার সরকার সে পথে এগুয়নি। বরং বেছে নিয়েছে অমানবিক বিবেকশূণ্যতার পথ। বাংলাদেশ যে স্রেফ জনসংখ্যাতেই বেড়েছে,মানবতায় নয় -সেটিই শেখ হাসিনার সরকার বিশ্ববাসীর সামনে পুণঃরায় প্রকাশ করে দিল।

 

তবে শেখ হাসিনার সরকার শুধু যে অমানবিক তাই নয়, প্রচণ্ড আহাম্মকও। সেটি প্রকাশ করে দিল সরকারের মন্ত্রীরা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিপুমনি এবং আওয়ামী লীগ সরকারের বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ নেতৃবৃন্দ রোহিঙ্গাদের নির্মূল প্রক্রিয়াকে বাংলাদেশের জামায়াত-শিবিরের কাণ্ড বলে চিত্রিত করেছে। শুধু মানবিক গুণ নয়, ইতিহাস-জ্ঞানও যে নেহায়েত কম সেটিও কি এর পর বুঝতে বাঁকী থাকে? রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নির্মূল প্রক্রিয়ার যখন শুরু,তখন বাংলাদেশে জামায়াত বা শিবির বলে কিছু ছিল না। বার্মিজ জাতিয়তাবাদীদের হাতে রোহিঙ্গাদের নির্মূল প্রক্রিয়া শুরু হয় শতাধিক বছর আগে। থেমে থেমে লাগাতর চলছে সে নিধন প্রক্রিয়া। ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডটি ঘটে ১৯৪২ সালে। তখন চলছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। মায়ানমারের ব্রিটিশ শাসকগণ তখন জাপানীদের হাতে মার খাচ্ছিল। সে অরাজক পরিস্থিতিতে বার্মিজগণ তখন নির্মূলকর্মে নামে। ১৯৪২ সালের ২৮শে মার্চ তারিখে ৫,০০০ রোহিঙ্গা মুসলমানকে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়। এর পর চলতে থাকে থেমে থেমে মুসলিম নিধন। এরূপ নির্মূল প্রক্রিয়ার ফলে মায়ানামারে বৌদ্ধ জনসংখ্যা বাড়লেও এ এলাকায় মুসলিম রোহিঙ্গাদের সংখ্যা বাড়েনি। বরং সেখানে বৃদ্ধি পেয়েছে রাখাইন সম্প্রদায়ের মারমুখো বৌদ্ধদের সংখ্যা। বিভিন্ন সূত্রে প্রকাশ,রোহিঙ্গা মুসলমানদের সংখ্যা বহু বছর আগে প্রায় দশ লাখ ছিল। কিন্তু সে সংখ্যা এখন ৮ লাখের বেশী নয়। লাগাতর এ নির্যাতন থেকে বাঁচতে প্রায় তিনি লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশে। প্রায় ২৪ হাজার আশ্রয় নিয়েছে মালয়েশিয়ায়।বহু রোহিঙ্গা মুসলমান বহু কষ্টে দূরবর্তী থাইল্যান্ড,ভারত,ব্রুনাই,সৌদি আরব এবং পাকিস্তানেও আশ্রয় নিয়েছে। শেখ হাসিনা বা দিপুমনি কি এরপরও বলবেন,রোহিঙ্গা নির্মূলের এ দীর্ঘ প্রক্রিয়াটি জামায়াত-শিবিরের কাণ্ড?

 

আলোড়িত বিশ্ব এবং অনড় হাসিনা

রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত এ নির্মূল প্রক্রিয়া শেখ হাসিনা ও তার আওয়ামী মহলে কোন বিবেকবোধ জাগ্রত না করলে কি হবে,বিশ্বের বহুদেশে তা ইতিমধ্যেই যথেষ্ট আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এমনকি ভারতের মত একটি অমুসলিম দেশে বহু গুরুত্বপূর্ণ অমুসলিম রাজনৈতিক নেতারা রাজধানী দিল্লির রাজপথে নেমে এসেছেন। পত্রিকায় প্রকাশ,দিল্লিস্থ্ মায়ানমারের দূতাবাসের সামনে ভারতের সমাজবাদী দল,ইউনাইটেড জনতা দল, সিপিআই, ইন্ডিয়ান ন্যাশন্যাশ লীগের নেতারা রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হত্যাকাণ্ড বন্ধের দাবীতে ধর্না দিয়েছেন। তাঁরা প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের উপর চাপ দিচ্ছেন,এ গণহত্যা দমনে তার সরকার যেন উদ্যোগ নেয়। গত ২৭/০৭/১২ তারিখে জুম্মার নামায শেষে হাজার হাজার মানুষের বিশাল মিছিল হয়েছে মায়ানমার থেকে বহু দূরে তেহরানের রাজপথে। অথচ ঢাকায় তার অর্ধেক মানুষের মিছিলও এ অবধি হয়নি। হাজার হাজার মানুষের ঢল নেমেছিল করাচীর রাজপথে। মিছিল হয়েছে পাকিস্তানের অন্যান্য শহরে। এ গণহত্যা ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে তুমুল লেখালেখি হয়েছে নবজাগরিত মিশরসহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সকল দেশের পত্র-পত্রিকায়। সুস্থ্য দেহে ক্ষুদ্র মাছি বসলেও সবল হাতখানি তেড়ে আসে। কিন্তু অসাড় দেহে জোরে ধাক্কা লাগালেও তা খাড়া হয় না। রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে বাংলাদেশের সরকারের নীরবতাই প্রমাণ করে বিবেকে কতটা অসুস্থ্য এ সরকারের কর্তব্যক্তিরা।

 

মায়ানামার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নয়। রাশিয়া বা চীনও নয়। দীর্ঘকাল সামরিক স্বৈরাচার কবলিত একটি অনুন্নত দেশ। গণতন্ত্র,ব্যক্তি-স্বাধিনতা ও দেশের সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে মায়ানমার সরকারের পরিচালিত যুদ্ধটি নতুন কিছু নয়। এ নিয়ে মায়ানমারের সরকার ইতিমধ্যেই পৃথিবী জুড়ে বহু বদনাম কুড়িয়েছে। কারেন বিদ্রোহসহ বহু বিদ্রোহ বহু যুগ ধরে চলছে মায়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে। এমন একটি বহুল পরিচিত অমানবিক সরকারের বিরুদ্ধে অতি সহজেই বাংলাদেশে সরকার একটি বলিষ্ঠ ভূমিকা নিতে পারতো। বিশ্বপরিস্থিতি ও আঞ্চলিক পরিস্থিতি বাংলাদেশের পক্ষে ছিল। মজলুম রোহিঙ্গাদের পক্ষে দাঁড়ালে বিশ্বের বহুদেশ ও বহুসংস্থা বাংলাদেশকে বাহবা দিত। বাংলাদেশে যে প্রায় ৩ লাখ রোহিঙ্গা এতকাল বসবাস করছে তাদেরও ফেরত পাঠানোর জন্য চাপ সৃষ্টির জন্য এটি ছিল মোক্ষম সময়। কিন্তু হাসিনা সরকার সে পথে এগুয়নি। বরং ধরেছে ভিন্ন পথ। সেটি মানবতা-বিরোধী পথ। ফল দাড়িয়েছে, শেখ হাসিনার মগজের সুস্থ্যতাই নিয়ে বিদেশী সাংবাদিকের সন্দেহ জেগেছে। আল-জাজিরার সাংবাদিকের প্রশ্নে তো সে সংশয়ই ফুটে উঠেছে।

 

রাজনীতি যেখানে ছাগলনীতি

গরু-ছাগলের একটি নীতি আছে।সেটি স্রেফ জৈবীক ভাবে বাঁচা। এমন বাঁচার মধ্যে পাশের প্রতিবেশীর প্রতি কোন কল্যাণ-চিন্তা থাকেনা। কোন নীতিবোধ বা দাযিত্বশীলতাও থাকে না। পশু তো এজন্যই পশু। এজন্যই পশু থেকে কোনরূপ মানবিক আচরণ আশা করা যায় না। গরু-ছাগলের বিশাল পাল থেকে একটিকে ধরে নিয়ে চোখের সামনে গলায় ছুড়ি চালালেও তাতে গরু-ছাগলের ঘাস-পাতা খাওয়ায় ছেদ পড়ে না। পবিত্র কোরআনে ঈমানহীন মানুষকে শুধু পশু নয়,পশুর চেয়েও অধম বলা হয়েছে। প্রতিবেশীর বেদনায় বহু মানুষও যে পশুর মতই বেদনাহীন হয় সে প্রমাণ কি কম? শেখ হাসিনা ও তাঁর দল আওয়ামী লীগের সেটিই হলো নীতি। তাই রোহিঙ্গা মুসলমানদের যতই জবাই করা হোক বা তাদের নারীদের যতই ধর্ষণ করা হোক ও তাদের ঘরবাড়ীতে যতই আগুণ দেয়া হোক, তাতে শেখ হাসিনা ও তার অনুসারিদের মনে সামান্যতম দংশনও হয় না। গুজরাতে যখন তিন হাজারের বেশী মুসলিম নারী-শিশু-বৃদ্ধকে হত্যা করা হলো,এবং মুসলিম বস্তিতে আগুণ দেয়া হলো,তখনও আওয়ামী শিবিরে তাই কোন প্রতিবাদ উঠেনি। প্রতিবাদ তখনও উঠেনি যখন উগ্র হিন্দুরা অযোধ্যায় বাবরী মসজিদকে উৎসবভরে ধ্বংস করে। তখনও আওয়ামী তখনও নিন্দায় রাস্তায় নামেনি যখন ১৯৮৩ সালে আসামের নেলীতে ৫০০০ মুসলমানদের একদিনে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়। অথচ তা নিয়ে সেদিন সমগ্র মুসলিম বিশ্বে আলোড়ন উঠেছিল। এই তো ক’দিন আগে আসামের কোকরাজরে মুসলমানদের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ড পরিচালিত হলো। কিন্তু তার বিরুদ্ধেও কি আওয়ামী লীগ নেতাদের পক্ষ থেকে কোন কিছু বলা হয়েছে? কাশ্মীরের মুসলমান দীর্ঘ ৬০ বছর ধরে হত্যা,ধর্ষণ ও জেলজুলুমের মধ্যে আছে কিন্তু তা নিয়ে কি আওয়ামী লীগ কোন দিনও কি কোন প্রতিবাদ করেছে? অথচ বাংলাদেশে কোন হিন্দু বা বৌদ্ধদের গায়ে আঁচড় লাগলে তা নিয়ে ফিল্ম বানিয়ে শাহরিয়ার কবিরের ন্যায় আওয়ামী ঘরানার ক্যাডারগণ তা বিশ্বময় প্রচার করে।তাদের দায়বদ্ধতা যে কোথায় এরপরও কি বুঝতে বাঁকি থাকে?

 

মায়ানমার সরকারের ফ্যাসীবাদী স্ট্রাটেজী

জাতিসংঘের ধারণা অনুযায়ী সাম্প্রতিক হামলাতে ৫০ থেকে ৯০ হাজার রোহিঙ্গা মুসলমান নিজেদের ঘরবাড়ী থেকে স্থানচ্যুত হয়েছে। তবে ঘরবাড়ি থেকে রোহিঙ্গাদের উচ্ছেদ করাটাই মায়ানমার সরকারের একমাত্র অপরাধ নয়। হিউমান রাইট্স ওয়াচের মতে তাদেরকে দাস-শ্রমিক রূপে কাজ করতেও বাধ্য করা হচ্ছে। বিয়েশাদী করতে তাদেরকে সরকার থেকে অনুমতি নিতে হয়।পত্রিকায় প্রকাশ,সন্তানের সংখ্যা অনুর্দ্ধ দুই জন রাখতেও তাদের উপর চাপ দেয়া হয়। দেশের এক স্থান থেকে অন্যস্থানে যেতেও তাদেরকে সরকার থেকে অনুমতি নিতে হয়। আরো গুরুতর বিষয় হলো,রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সহিংস পলিসির নেতৃত্ব দিচ্ছে বৌদ্ধ পুরোহিতগণ। তারা রোহিঙ্গাদের কালা ও বর্বর রূপে আরোহিত করছে। অথচ তারা ভূলে গেছে বৌদ্ধধর্মের প্রতিষ্ঠিতা বিহারের গৌতম বুদ্ধও শ্বেতাঙ্গ বা গৌর বর্ণের ছিলেন না। বিভিন্ন এনজিও সূত্রে প্রকাশ,রোহিঙ্গাদের কাছে ত্রাণ পৌঁছতেও এ বৌদ্ধ পুরোহিতগণ বাধা দিচ্ছে। রোহিঙ্গা-অধ্যুষিত এলাকার বিভিন্ন রাস্তায় ও স্থাপনায় তারা পোষ্টার এঁটে দিয়েছে এ হুশিয়ারি জানিয়ে যে,রোহিঙ্গাদের সাথে যেন কোনরূপ সংশ্রব না রাখা হয় এবং তাদের কোনরূপ সাহায্য করা না হয়।

 

তবে রোহিঙ্গা নিমূল প্রক্রিয়ায় শীর্ষে রয়েছে সেদেশের সরকার। গত ১৯/৭/১২ মায়ানমারের প্রেসিডেন্ট থেন সেইন বলেছেন,“রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানের একমাত্র পথ হলো তাদেরকে সকলকে মায়ানমার থেকে সরিয়ে নিয়ে কোন তৃতীয় দেশে বা জাতিসংঘের তত্বাবধানে কোন ত্রান শিবিরে রাখা।” অতি সহজ সমাধান! তিনি যে কতটা অসুস্থ্য চেতনার জীব,তা কি এর পরও বুঝতে বাঁকি থাকে? যারা কট্টোর বর্ণবাদী বা জাতিয়তাবাদী তারা এরূপ নির্মূল প্রক্রিয়ার বাইরে কোন কিছু যেন ভাবতেই পারে না। এমন এক চেতনা নিয়েই হিটলার জার্মানীতে বসবাসরত ইহুদীদের গ্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে তাদের নির্মূলের পরিকল্পনা নিয়েছিল। আর বাঙালী জাতিয়তাবাদীরা একাত্তরে বিহারী সমস্যার সমাধান করতে চেয়েছিল তাদেরকে হত্যা করে বা তাদেরকে পাকিস্তানে পাঠিয়ে দিয়ে। হাজার হাজার বিহারীকে তখন উৎসবভরে হত্যাও করা হয়েছিল এবং উৎখাত করা হয়েছিল তাদের ঘরবাড়ী ও ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে। ঘরবাড়ী হারানো সে হাজার হাজার বিহারীরা বিগত ৬০ বছরের বেশী কাল ধরে বস্তিতে বসবাস করে সে বর্ণবাদী বাঙালীদের অমনুষ্যনীতিরই সাক্ষর বহন করছে। আর আজ সে অভিন্ন অমুনষ্যনীতির শিকার হচ্ছে রোহিঙ্গা মুসলমানরা।এখানেও কারণ অভিন্ন। সেটি ভাষা ও বর্ণভিত্তিক কট্টোর জাতিয়তাবাদী ফ্যাসিবাদ। মায়ানমারে সেটি বার্মিজ জাতিয়তাবাদ। তাদের কথা,মায়ানমার শুধু বার্মিজদের জন্য,এখানে অবার্মিজ রোহিঙ্গাদের কোন স্থান নেই। কিন্তু কথা হলো, যে মায়ানমারে শত শত বছর ধরে রোহিঙ্গারা বসবাস করলো তারা যদি সে মায়ানমারে স্থান না পায় তবে অন্যরা কেন তাদেরকে স্থান দিবে? তারা দেখে না যে পাশ্ববর্তী মালয়েশিয়ার জনসংখ্যার শতকরা প্রায় ৪০ ভাগ হলো তারা যারা সে দেশে গিয়েছিল চীন ও দক্ষিণ ভারত থেকে। তাদেরকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিল ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকেরা। মালয়েশিয়া থেকে ব্রিটিশ শাসকেরা চলে গেছে, কিন্তু চাইনিজ এবং ভারতীয় তামিলদের কি সেদেশ থেকে নির্মূল করা হয়েছে? বহু লক্ষ ভারতীয় ও চাইনিজ ছড়িয়ে আছে আফ্রিকা, ইউরোপ এবং আমেরিকার বহুদেশে। নানা ভাষা, নানা বর্ণ ও নানা ধর্মের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপস্থিতি বিশ্বের প্রতিদেশে। তারা সেসব দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও পালন করছে। এটিই যে কোন সুস্থ্য সমাজের নীতি। কিন্তু রোহিঙ্গাদের সে অধিকার দিতে রাজী নয় মায়ানমার সরকার। অথচ মিয়ানমারের মুসলমানদের বসবাস শত শত বছর পূর্ব থেকে। আরাকানে এক সময় সুলতানি শাসনও ছিল। দীর্ঘকাল ধরে বাংলা ভাষা চর্চা পেয়েছে আরাকান রাজ্যসভায়। কবি আলাওল ছিলেন আরাকান রাজ্যসভার সভাকবি। মায়ানমারে মুসলমানদের এ দীর্ঘ উপস্থিতি ও ঐত্হ্যকে মায়ানমারে বর্ণবাদীরা নির্মূল করতে চায়। কথা হলো এতবড় ভয়ানক অপরাধের বিরুদ্ধে নিন্দা করতে কি বিশাল মানবতা লাগে?

 

শেখ হাসিনার আদর্শিক আত্মীয়

কোন দেশের জাতীয়তাবাদী ফ্যাসিস্টদের নিন্দা করার মত নৈতীক বল অপরদেশের ফ্যাসিষ্টদের থাকে না। তাদের মধ্যেও একটি আদর্শিক বন্ধন থাকে। তাই জার্মানীতে যখন ইহুদীদেরকে হাজারে হাজার গ্যাস চেম্বারে পাঠানো হচ্ছিল সে নৃশংসতার নিন্দা বিশ্বের কোন জাতিয়তাবাদী বা বর্ণবাদীরা করেনি। বরং বহু ভারতীয় ও বাঙালী জাতিয়তাবাদীরা তো হিটলারের ন্যায় সে বর্বর ব্যক্তিটির সাথে বন্ধুত্বও গড়েছে। লক্ষণীয় হলো, মায়ানমারের বর্ণবাদী প্রেসিডেন্ট থেন সেইন ও তার সহিংস অনুসারিদের সাথে শেখ হাসিনা ও তাঁর রাজনৈতিক ক্যাডারদের ভাষাগত পার্থক্য থাকলেও আদর্শিক পার্থক্য নাই। বরং আদর্শিক দিক দিয়ে তারা বরং পরস্পরের ঘনিষ্ট আত্মীয়। যে অপরাধটি শেখ মুজিবের ফ্যাসীবাদী ক্যাডারগণ অতীতে বিহারীদের সাথে করেছে এবং আজ করছে তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে, সেটিই তো বার্মিজ ফ্যাসিষ্টগণ করছে রোহিঙ্গা মুসলমানদের সাথে। ফলে কোন নৈতীক বল নিয়ে শেখ হাসিনা বার্মিজ নৃশংসতার নিন্দা করবে? বরং শেখ হাসিনা ও তার মন্ত্রীরা পরিণত হয়েছে মায়ানমার সরকারের নির্লজ্জ স্তাবকে। তারা মায়ানমার সরকারকে দায়ী না করে বরং দায়ী করেছেন বাংলাদেশের ইসলামপন্থিদের। মায়ানমারে রোহিঙ্গাদের জন্য অবস্থার উন্নতি হয়েছে সে সার্টিফিকেটও দিয়েছেন শেখ হাসিনা। আল জাজিরা টিভির সাথে সাক্ষাতকারে তো শেখ হাসিনা সেটিই বলেছেন। কথা হলো,মায়ানমারে যদি অবস্থার উন্নতি হয়েই থাকে তবে কেন বাংলাদেশে তিন লাখ রোহিঙ্গা মুসলমানের অবস্থান? তাদেরকে কেন সেখান থেকে ফেরত পাঠানো হচ্ছে না?  ৩০/০৭/১২

 




মানবিক সংকটে বাংলাদেশ

সংকট বিবেকহীনতার

বাংলাদেশের মূল সংকটটি স্রেফ রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক বা প্রশাসনিক নয়। ব্যর্থতা নিছক গণতন্ত্রেরও নয়। বরং মূল সংকটটি মানবিক। সমস্যা এখানে বিবেকহীনতার। কঠিন রোগ যেমন নানাবিধ সিম্পটম নিয়ে উপস্থিতি জানিয়ে দেয়,বাঙালীর বিবেকহীনতাও তেমনি বহুবিধ ব্যর্থতা নিয়ে বিশ্বময় প্রচার পাচ্ছে। দেশটির হাজার হাজার বিবেকহীন সন্ত্রাসী যেমন আনাচে কানাচে মানুষ খুন,টেন্ডার দখল,বিশ্ববিদ্যালয়ের হলদখল,রাস্তার গাছকাটা,নদীদখল,বনদখল,জমিদখলের রাজত্ব কায়েম করেছে,তেমনি সেপাইরা (ফেব্রেয়ারি ২০১১ সালে) হত্যা করেছে ৫৭ জন সামরিক অফিসারকে। এরূপ বিবেকহীনতায় সাধারণ নাগরিকগণও কম নয়।অপরাধ সনাক্ত না করে নিছক সন্দেহের বশে নিরীহ মানুষদের পিটিয়ে হত্যা করছে,যেমন ঢাকার গাবতলির কাছে আমিনবাজারে কিছুদিন আগে ৬ জন ছাত্রকে হত্যা করা হলো। এরূপ বিবেকহীনতা কোন সভ্যদেশে হয়না,কিন্তু বাংলাদেশে বার বার হয়।

দেশের রাজনীতি ও প্রশাসন অধিকৃত হয়েছে একই রূপ বিবেকহীন ব্যক্তিদের হাতে। ফলে সমগ্র দেশজুড়ে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে সরকারি তহবিল তছরুফ,ঘুষ,ধোকাবাজি ও ফাঁকিবাজির রাজত্ব। আবর্জনা নির্মূলে আপোষ চলে না,আবর্জনা আবর্জনাই। তেমনি আপোষহীন হতে হয় অপরাধীদের নির্মূলেও। অপরাধীদের নির্মূলে সবচেয়ে বড় দায়িত্বটি হলো দেশের বিচার বিভাগ ও পুলিশের। অথচ সে কাজে তারা ব্যবহৃত হচ্ছে না। বরং সরকারের কাজ হয়েছে,এদুটি প্রতিষ্ঠানকে দলীয় স্বার্থে লাঠিয়াল রূপে ব্যবহার করা। পুলিশ এবং বিচার বিভাগ নিয়ে সরকার নেমেছে নিজেদের রাজনৈতিক শত্রু নির্মূলে। ফলে দেশ ও জনগণের প্রকৃত শত্রুদের দিকে নজর দেবার সময় তাদের নাই। গদীর আয়ু দীর্ঘ করা ছাড়া সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রায়োরিটি নাই। সরকারের সমালোচনা চিহ্নিত হচ্ছে গুরুতর অপরাধ রূপে,ফলে প্রকৃত অপরাধীরা পেয়েছে মূক্ত ময়দান। সরকারি দল জানে,বিচার ও পুলিশ বিভাগে ভাল লোক বসালে দলীয় স্বার্থে তাদেরকে ব্যবহার করা যাবে না। তাতে ঘনিয়ে আসবে তাদের নিজেদের বিপদ। ফলে এ দুটি বিভাগে পরিকল্পিত ভাবে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে দলীয় ক্যাডারদের। অপরদিকে দেশের প্রেসিডেন্টের প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে আদালতের সাজাপ্রাপ্ত নিজদলের খুনিদের বাঁচানো। আর আইনমন্ত্রী তুলে নিচ্ছে সরকারি দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত হাজার হাজার মামলা। ফলে দেশ থেকে অপরাধ নির্মূল না হয়ে বরং দিন দিন সেটি প্রকটতর হচ্ছে। ফলে দেশ দ্রুত বসবাসের অযোগ্য হয়ে যাচ্ছে। আর জনগণের নৈতিকতা ও মূল্যবোধ? সংকট এক্ষেত্রে এতটাই গুরুতর যে বিপুল সংখ্যক জনগণ শুধু চিহ্নিত দুর্বৃত্তদের ভোটই দেয় না,বরং আগ্রহভরে তাদের পক্ষে মিছিল করে,লাঠি ধরে এবং তাদের বিজয় নিয়ে উৎসবও করে।

বাংলাদেশে যে কোন উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো এই বিবেকহীনতা। যে কোন উন্নয়ন-কাজে পুঁজি চাই। গাছ যেমন মাটি ছাড়া জন্মায় না,অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নও পুঁজি ছাড়া গড়ে উঠে না। তবে সে পুঁজি স্রেফ অর্থ-সম্পদ নয়। অর্থ-সম্পদের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো মানব-সম্পদ। অর্থনীতির ভাষায় একেই বলা হয় সোসাল ক্যাপিটাল বা সামাজিক পুঁজি। এশিয়া ও আফ্রিকার বহুদেশই প্রাকৃতিক সম্পদে অতি সমৃদ্ধ। কিন্তু সেসব দেশে শিল্প-বিপ্লব আসেনি। সামাজিক ও রাজনৈতিক বিপ্লবও আসেনি। বিপুল সম্পদ সত্ত্বেও এশিয়া-আফ্রিকার বহুদেশ এখনও দান-খয়রাত নির্ভর। অথচ বিপ্লব এসেছে প্রাকৃতিক সম্পদে দরিদ্র দেশে। ইংল্যান্ড,জার্মান,জাপান ও কোরিয়া তার উত্তম উদাহরণ। এসব দেশে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিপ্লবের কারণ উন্নত সোসাল ক্যাপিটাল তথা মানবিক উন্নয়ন। মানব-উন্নয়ন ছাড়া অর্থনৈতিক,সামাজিক ও রাজনৈতিক উন্নয়ন আসে না –এটাই ইতিহাসের শিক্ষা। অথচ বাংলাদেশে সে কাজটিই হয়নি।

সবচেয়ে বড় অপরাধ

প্রতি সমাজেই কিছু রোগাগ্রস্ত মানুষ থাকে। তবে বিপর্যয় ঘটে যখন সে রোগ মহামারি রূপে সর্বস্তরে দেখা দেয়। বাংলাদেশে সে ভয়াবহ মহামারিটা ঘটেছে বিবেকের রাজ্যে। বরং দেশ আজ  অধিকৃত হয়েছে অসুস্থ বিবেকের মানুষদের হাতে। শেখ মুজিব ও তাঁর দলের সবচেয়ে বড় অপরাধটি গণতন্ত্র হত্যা ও বাকশালী স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠা নয়। বরং সেটি হলো,অমানবিক বা বিবেকহীনতার রাজনীতি। মানুষের বিবেক বা মানবতা অনাহারে মারা যায না। রোগজীবাণূ বা পোকামাকড়ের কামড়েও মারা যায় না। বরং মারা যায় মগজে মিথ্যা বাসা বাঁধাতে। মানবতার সবচেয়ে বড় দূষমণটি হিংস্রপশু বা রোগজীবানূ নয়,বরং সেটি মিথ্যাচার। মিথ্যাচারের কারণে আল্লাহর আযাব নেমে আসে। পবিত্র কোরআনে তাই বলা হয়েছে, “ফাসিরু ফিল আরদে,ফানজুর কাইফা কানা আকিবাতুল মোকাজ্জাবীন”। অর্থঃ অতঃপর জমিনে ভ্রমন করো এবং দেখ মিথ্যাবাদীদের কি পরিনাম হয়েছিল। মহান আল্লাহর আযাব নামিয়ে আনার জন্য তাই মুর্তিপুজারি বা নাস্তিক হওয়ার প্রয়োজন নেই। সে জন্য মিথ্যাচর্চাই যথেষ্ঠ। ঈমানদারদের বড়যুদ্ধটি তাই মিথ্যার বিরুদ্ধে। লড়াই এখানে কোরআনী সত্যকে প্রতিষ্ঠা করায়। অথচ শেখ মুজিবের রাজনীতির মূল ভিত্তিই ছিল মিথ্যার উপর,এবং সে মিথ্যাকে তিনি বিপুল ভাবে বিজয়ীও করেছেন।

কিন্তু কি ছিল শেখ মুজিবের সে মিথ্যা? কোন একক মিথ্যা নয়,শেখ মুজিব বহু মিথ্যার জনক। তার মুখে উচ্চারিত মিথ্যাটি স্রেফ তিরিশ লাখের মৃত্যু ও দুই লাখের ধর্ষণ নয়। ভারত বাংলাদেশের বন্ধু,পূর্ব পাকিস্তান পাকিস্তানের উপনিবেশ,পাকিস্তানীরা বাঙালীর শত্রু,বাকশালই গণতন্ত্র এবং বাংলাদেশের মুক্তি জাতিয়তাবাদ,সেক্যুলারিজম ও সমাজতন্ত্র –শুধু এগুলিও নয়। বরং মুজিবের বড় মিথ্যাটি উচ্চারিত হয়েছিল মহান আল্লাহ ও তাঁর দ্বীন ইসলামের বিরুদ্ধে। ইসলামের প্রতিষ্ঠায় আপোষহীন অঙ্গিকার ও সে লক্ষ্যে কোরবানীই হলো মানবের সর্বশ্রেষ্ঠ গুণ। সে গুণের বলেই মানুষ মহান আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কার জান্নাত পায়। অথচ তেমন অঙ্গিকারকে শেখ মুজিব সাম্প্রদায়িকতা বলেছেন। সে মিথ্যা নিয়ে তিনি মহান আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধেও নেমেছিলেন। সে যুদ্ধের অংশ হিসাবেই শরিয়ত প্রতিষ্ঠার রাজনীতি বা সে লক্ষ্যে দলগড়াকে তিনিই প্রথম বাংলাদেশের মাটিতে আইন করে নিষিদ্ধ করেছেন। এমন নিষেধাঙ্গা পাকিস্তান আমলে ছিল না,এমনকি ব্রিটিশ আমলেও ছিল না।পাকিস্তান আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়,ঢাকা শিক্ষাবোর্ড,রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মনোগ্রামে কোরআনের আয়াত ছিল। কিন্তু শেখ মুজিবের কাছে সেটি সহ্য হয়নি। সে সব স্থান থেকে সে আয়াতগুলি তিনি বিলুপ্ত করেছিলেন। বিষ দেহ হত্যা করে,আর মিথ্যা হত্যা করে বিবেককে। আর মুজিব দেশে মিথ্যার প্রবল প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে হত্যা করেছেন বাঙালীর বিবেককে। আর বিবেকের মৃত্যু হলে সে বিবেক ফিরাউনকে খোদা বলে মেনে নেয়, মুর্তিকে ভগবান বলে এবং মিথ্যুক বলে হযরত মূসা (সাঃ)র ন্যায় মহান নবীকে। তখন সে গরু-ছাগল,শাপ-শকুন,পাহাড়-পর্বত, নদনদী এমনকি লিঙ্গকেও পুজা দেয়।

মুজিবের কাছে অতি প্রয়োজনীয় ছিল মিথ্যার প্রচার ও প্রতিষ্ঠা। সেটি তাঁর রাজনৈতিক স্বার্থে।তাঁর অনুসারিরা তাই শুধু তিরিশ লাখ নিহত ও দুই লাখ ধর্ষণের বিষয়টিই প্রতিষ্ঠা করেননি,বরং নিজেকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালীর ন্যায় আরেক মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠার চেষ্ঠা করেছে। সে সাথে চরিত্র-হনন করেছে দেশের ইসলামপন্থিদের। হিরোইন ব্যবসায়ীরা চায় মানুষ অধিক সংখ্যায় নেশাগ্রস্ত হোক। কারণ তাতে হিরোইনের কাটতে বাড়ে। তেমনি স্বৈরাচারি দুর্বৃত্তরাও চায় মানুষ বিবেকহীন হোক। তাতে তাদের দুঃশাসনও শ্রেষ্ঠ শাসন রূপে নন্দিত হয়। স্বৈরাচারিদের রাজনীতিতে মিথ্যাচর্চা এবং মিথ্যাচর্চার পথ ধরে জনগণের বিবেকহত্যা তো এজন্যই এতটা প্রায়োরিটি পায়। মুজিবের স্বৈরাচারি দুঃশাসন আওয়ামী বাকশালীদের কাছে শ্রেষ্ঠ শাসন তো তেমন বিবেকহীনতার কারণেই। কোন দেশ কখনই খরা,প্লাবন,রোগ-ভোগ বা যুদ্ধ-বিগ্রহে তলাহীন হয় না। বাংলাদেশে খরা,প্লাবন ও রোগের মহামারি বহুবার এসেছে। কিন্তু তাতে দেশ কোনকালেই ভিক্ষার ঝুড়ি হয়নি,বিশ্বজোড়া অপমানও জুটেনি -যেমনটি মুজিবামলে হয়েছে। বহুদেশ বছরের পর বছর যুদ্ধ করেও তলাহীন হয়না। সেটি হলে প্রকাণ্ড দুটি ব্শ্বিযুদ্ধের পর ইউরোপে ভয়ানক দুর্ভিক্ষ হতো এবং বহুলক্ষ মানুষ সে দুর্ভিক্ষে মারা যেত। কিন্ত সেটি হয়নি। বরং দেশ তলাহীন হয় বিবেকহীনতায়। তখন পুকুরচুরি হয় অফিসে অফিসে এবং সেটি হয় সমগ্র দেশজুড়ে।

নর্দমার কীটগুলো যদি নর্দমার মধ্যেই কিলবিল করে তবে তাতে বিপদ দেখা দেয় না। কিন্তু ড্রেন উপচিয়ে সেগুলো যখন গৃহে প্রবেশ করে তখন মহামারি শুরু হয়। তেমনি বিবেকহীন মানুষগুলো ডাকাতপাড়া,পতিতাপল্লি,বন-জঙ্গল বা কারাগারে সীমাবদ্ধ থাকলে তাতে দেশে বিপর্যয় আসে না। কিন্তু দেশের রাজনীতি,প্রশাসন ও আইন-আদালত যখন তাদের হাতে অধিকৃত হয়,তখন দেশ দ্রুত বিশ্বরেকর্ড গড়ে দুর্বৃত্তিতে। তখন খোদ রাষ্ট্র পরিণত হয় অপরাধের অবাধ ক্ষেত্র। হিটলারের একার অপরাধ জার্মানীর সকল অপরাধীর সম্মিলিত অপরাধের চেয়েও অধিক। কারণ,হিটলার দেশের রাজনীতি,প্রশাসন, আদালত ও সেনাবাহিনীকে ভয়ানক অপরাধীদের হাতে তুলে দিয়েছিল। হত্যাকান্ডকে প্রচণ্ডতর করতে হাজার হাজার খুনিদের জন্য দরওয়াজা খুলে দিয়েছিল। তাদের হাতে ভয়ানক অস্ত্রও তুলে দিয়েছিল। সমগ্র রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো ও উপায়-উপকরণ পরিণত হয়েছিল নির্যাতন ও আগ্রাসনের হাতিয়ারে। জাহান্নামের রাস্তা গড়েছিল সমগ্র রাষ্ট্র জুড়ে,এমনকি সেটিকে বর্ধিত করেছিল প্রতিবেশী দেশেও। নমরুদ-ফিরাউন, হালাকু-চেঙ্গিজসহ সকল কাফের শাসকদের তো সেটিই মূল অপরাধ। অপর দিকে হযরত মুহম্মদ (সাঃ)এর একার নেক-আমল  কোটি কোটি মানুষের নেক আমলের চেয়েও অধিক। কারণ তিনি জাহান্নামের রাস্তা বন্ধ করে জান্নাতমুখি সিরাতুল মুস্তাকিম গড়েছিলেন রাষ্ট্রের সমগ্র প্রশস্ততা নিয়ে। নির্মূল করেছিলেন দুর্বৃত্ত মানুষদের বেড়ে উঠার ঘাঁটিগুলো। নবীজী (সাঃ)র নেক আমলের ফলেই অসংখ্য মানুষ যেমন বিগত ১৪ শত অবধি জান্নাতের পথ পেয়েছে,তেমনি অনাগত ভবিষ্যতেও পেতে থাকবে। হযরত মুহম্মদ (সাঃ) তো এ জন্যই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। এত বড় কাজ অন্য কোন নবী বা রাসূলের দ্বারা হয়নি। মুসলমান হওয়ার অর্থ হলো,নবীজীর সে আদর্শকে গ্রহণ করা। তার সে মিশনকে নিজের মিশন রূপে গ্রহণ করা। মহান আল্লাহতায়ালা বলেছেন,“তোমরাই হলে শ্রেষ্টতম উম্মত, তোমাদের উত্থান ঘটানো হয়েছে সমগ্র মানব জাতির জন্য। তোমরা নির্দেশ দিবে ন্যায় কর্মের এবং ফিরিয়ে রাখবে অন্যায় কর্ম থেকে। এবং আল্লাহকে বিশ্বাস করবে।” –(সুরা ইমরান, আয়াত ১১০)। তাই শ্রেষ্ঠতম উম্মত হওয়ার পথটি নিছক নামায-রোযা ও হজ-যাকাতে সীমিত নয়। বরং সেটি ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের নির্মূলে জিহাদী মিশন নিয়ে বাঁচা। নামায-রোযা,হজ-যাকাত মূলত সেরূপ বাঁচাতে ঈমানী শক্তি জোগায়। তাই নিছক রাজনীতির লক্ষ্যে মুসলমান রাজনীতি করে না। জাতিয়তাবাদ,সমাজবাদ,সেক্যুলারিজম ও অন্যকোন মতবাদের প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেও রাজনীতি করে না।বরং মু’মিনের রাজনীতি হলো সমাজকে পবিত্র ও সমৃদ্ধ করার রাজনীতি। এরূপ রাজনীতিকে ইসলামে জিহাদের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। এ রাজনীতিতে প্রাণ গেলে শাহাদত লাভ এবং বীনা বিচারে জান্নাত লাভ ঘটে। এরূপ বিশাল পুরস্কার অন্য কোন নেক কাজে নেই।

যে ভ্রষ্টতা বাঁচার মিশনে

মানুষ মাত্রই কোন মিশন নিয়ে বাঁচে – হয় সেটি আল্লাহর আনুগত্যের নতুবা বিদ্রোহের। চোর-ডাকাতদের জীবনেও মিশন থাকে -সেটি আল্লাহর অবাধ্যতার তথা পাপের। এ পথ শয়তানের। মহান আল্লাহর নির্দেশিত মিশনটি হলো “আমারু বিল মা’রুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার” অর্থঃ “ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের প্রতিরোধ”। মুসলমান সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি স্রেফ এ মিশনাট নিয়ে বাঁচার কারণে। এ মিশন থেকে দূরে সরার অর্থ সিরাতুল মোস্তাকিম থেকে বিচ্যুত হওয়া এবং ভ্রষ্টতার শয়তানি পথকে বেছে নেয়া। এমন পথভ্রষ্ট ব্যক্তি তখন শয়তানের মিশন নিয়ে অগ্রসর হয়। দেশে এমন পথভ্রষ্ট ব্যক্তিদের সংখ্যা বাড়লে প্লাবন আসে দুর্বৃত্তির। তাই যে কোন রাষ্ট্র বা সমাজে সবচেয়ে বড় দুর্বৃত্তি হলো সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে অন্যদের দূরে সরানো। সেটি যেমন ব্যক্তির দ্বারা হতে পারে, তেমনি রাষ্ট্রের দ্বারাও হতে পারে। পথভ্রষ্ট করার কাজে রাষ্ট্র জড়িত হলে তখন সে বিদ্রোহের সাথে সকল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো জড়িত হয়। তখন রাষ্ট্রের লক্ষ লক্ষ লোক-লস্কর সে কাজে নিয়োজিত হয়। রেডিও-টিভি ও পত্র-পত্রিকা তখন শয়তানের কণ্ঠে পরিণত হয়। দেশ তখন দুর্বৃত্তির পথে দ্রুত এগুয়,এমনকি দুর্বৃত্তিতে দ্রুত বিশ্বরেকর্ডও গড়ে। দূর্বৃত্তিতে বাংলাদেশের বিশ্বে ৫ বার প্রথম হওয়ার কারণটি এ নয় যে, দুর্বৃত্তরা দেশের মাঠঘাট,গ্রাম-গঞ্জ ও বনজঙ্গল দখলে নিয়েছে। বরং তাদের দখলে গেছে দেশের রাজনীতি,পুলিশ,প্রশাসন,আইন-আদালত, রেডিও-টিভি ও বুদ্ধিবৃত্তি। নামাযের সময় হলে প্রতিটি মুসলমানকে নামায পড়তে হয়। এবং রোযার মাস এলে রোযা রাখতে হয। নইলে সে কাফের হয়। এখানে কোন অস্পষ্টতা বা আপোষ নেই। তেমনি কোন মুসলমান যখনই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হাতে পায় তখন তার দায়িত্ব হয় ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের প্রতিরোধ। সেটি না করলে তাকে কি মুসলমান বলা যায়? অথচ শেখ মুজিব ও তাঁর দল করেছে উল্টোটি। গাজী গোলাম মোস্তাফার (মুজিবামলে ঢাকা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং বাংলাদেশ রেডক্রসের সভাপতি ছিলেন এবং রিলিফের মাল লুণ্ঠনে তার দুর্নীতি বিশ্বময় প্রচার পেয়েছিল) মত হাজার হাজার দূর্নীতিপরায়ন অপরাধীদের জন্য তিনি রাস্তা অবাধ খুলে দিয়েছেন। ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণ দূরে থাক,ইসলামের নামে সংগঠিত হওয়াকেও মুজিব আইন করে নিষিদ্ধ করেছিলেন। দলীয় ক্যাডারদের নিয়ে তিনি রক্ষিবাহিনী গড়েছিলেন,এবং তাদের হাতে তিনি অস্ত্র তুলে দিয়েছিলেন। আর এখন সে মুজিবী নীতির অনুসরণ করছেন তাঁর কণ্যা শেখ হাসিনা ও বাকশালীরা অনুসারিরা। তবে পার্থক্য হলো,এখন মুজিবের সে রক্ষিবাহিনীটি নেই। সে কাজটি করছে সশস্ত্র দলীয় ক্যাডারগণ –সেটি যেমন পুলিশ ও র‌্যাবের পোষাকে তেমনি সাদা পোষাকে।

ধর্ম পালনে কোন জবরদস্তি নেই। ইচ্ছা করলে কেই কাফের হতে পারে,মুনাফিকও হতে পারে। আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা শেখ মুজিব ও তাঁর অনুসারিদেরও ছিল। কিন্তু অন্যদের ইসলামী রাষ্ট্র নির্মানের মিশন থেকে রুখার কোন অধীকার তাঁর ছিল না। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হাতে পেয়ে সে গর্হিত কাজে তিনি বল প্রয়োগ করেছেন। এখানে তিনি যুদ্ধ করেছেন মহান আল্লাহর বিরুদ্ধে। শরিয়তের বিধানে এটি গুরুতর অপরাধ। মুসলিম রাষ্ট্রে এমন অপরাধ সরকার প্রধানের দ্বারা হলে তখন দ্রুত নীচে নামে সমগ্র দেশ। মুজিবের সে ভূমিকার কারণেই বাংলাদেশের অর্জনটি অতি অপমানকর। দেশটির হাজারো বছরের ইতিহাসে এমন ব্যর্থতার নজির নেই। বরং অতীতে শায়েস্তাখানের বাংলাদেশ রেকর্ড গড়েছিল শান্তি ও সমৃদ্ধিতে। অথচ মুজিব দেশটিকে তলাহীন ঝুড়িতে পরিণত করেছেন। শুধু অর্থনীতিতে নয়,নীতি-নৈতিকতা ও মূল্যবোধের ক্ষেত্রেও। চোর-ডাকাত বাংলাদেশের মাটিতে আজকের ন্যায় শত বছর আগেও ছিল। তাদের হাতে প্রতিবছর বহু শত বাড়ি লুটপাটও হয়েছে। কিন্তু তাতে দুর্বৃত্তিতে বিশ্বরেকর্ড গড়ার অপমান জুটেনি। মুজিবের একার অপরাধ এজন্যই বাংলাদেশের ইতিহাসের সকল অপরাধীদের চেয়েও অধিক। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আজকের অপরাধীরা অগ্রসর হয়েছে বস্তুতঃ তাঁর ঐতিহ্য ধরেই। অগ্রসর হচ্ছেন শেখ হাসিনাও। আজকের ব্যর্থতাও মূলত মুজিব আমলের ব্যর্থতারই ধারাবাহিকতা। কথা হলো, এরূপ ব্যর্থতা নিয়ে কোন জাতি কি সভ্যরূপে বাঁচতে পারে? একবার নয়,হাজার বার নির্বাচন হলেও কি এ সমস্যার সমাধান হবে? বিবেকহীনতা ও নীতিহীনতার সমাধান তো নির্বাচন নয়।

বাঙালীর ব্যর্থতা ও রবীন্দ্রনাথ

বাঙালীর মানুষ রূপে বেড়ে উঠার ব্যর্থতাটি প্রকট ভাবে ধরা পড়েছিল রবীন্দ্রনাথের চোখে। সে ব্যর্থতা নিয়ে তিনি কবিতা লিখেছিলেন,“হে বিধাতা, সাত কোটি প্রাণীরে রেখেছো বাঙালী করে,মানুষ করোনি।” উপরুক্ত কবিতার চরণে বাঙালীর যে পরিচয়টি রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে ধরা পড়েছিল সেটি নিছক প্রাণী রুপে,মানুষ রূপে নয়। বাঙালীর ব্যর্থতার জন্য রবীন্দ্রনাথ মহান আল্লাহ রাব্বুল-আলামীনকে দায়ী করেছেন। রবীন্দ্রনাথ অমুসলমান ছিলেন,তাঁর নিজের অপরাধটিও এখানে কম নয়। তাঁর সে অপরাধটি সম্ভবতঃ অজ্ঞতাপ্রসূত। রবীন্দ্রনাথের ন্যায় একজন অমুসলমানের পক্ষে স্রষ্ঠার মানবসৃষ্ঠির রহস্য এবং সে সাথে মানবের সামর্থ জানা থাকার কথা নয়। সেটি জানতে হলে মহান আল্লাহর নিজের ভাষ্যটি জানা চাই, সেজন্য পবিত্র কোরআনের জ্ঞান চাই। মহান আল্লাহতায়ালা বাঙালীদেরকেও অন্যান্য মানুষের ন্যায় শ্রেষ্ঠ-সৃষ্টি রূপে সৃষ্টি করেছিলেন। মহৎ গুণে মহামানব বা ফেরেশতা-তূল্য হওয়ার সামর্থ যেমন তার আছে,তেমনি পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট জীবে পরিণত হওয়ার স্বাধীনতাও আছে। বাঙালী বেছে নিয়েছে নীচে নামার পথটি। ফলে এ ব্যর্থতার জন্য পরম করুণাময় মহান আল্লাহকে দায়ী করাটি শুধু অজ্ঞতাই নয়, চরম অকৃতজ্ঞতাও।

বাঙালীরর মানুষ হওয়ার ব্যর্থতা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ এ রায়টি দিয়েছিলেন আজ  থেকে প্রায় শত বছরের বেশী কাল আগে। যাদের ব্যর্থতা নিয়ে আফসোস করেছিলেন তারা ছিলেন বাঙালী হিন্দু। সেকালে বাঙালী বলতে শুধু বাঙালী হিন্দুদেরই বুঝানো হতো। মুসলমানগণ গণ্য হতো স্রেফ মুসলমান রূপে। হিন্দু মানসের সে চিত্রটি ফুটে উঠেছে এমনকি শরৎচন্দ্রের লেখাতেও।শরৎচন্দ্র লিখেছিলেন,“আজ  আমাদের পাড়ায় বাঙালী ও মুসলমানদের মাঝে খেলা।” শ্রী নীরদ চন্দ্র চৌধুরি বাঙালী হিন্দুদেরকে চিত্রিত করেছেন আত্মঘাতি রূপে।কিন্তু যে বাঙালী হিন্দুদের ব্যর্থতা নিয়ে শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও শ্রী নীরদ চন্দ্র চৌধুরি আফসোস করেছেন তাদের সফলতা সেদিন কম ছিল না। তারাই বাংলায় জাগরন এনেছিলেন। বাংলার হিন্দুদের সে জাগরন উপমহাদেশের ইতিহাসে “বাঙালী রেনেসাঁ” নামে পরিচিত। সমগ্র ভারতের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন ব্যানার্জি,চ্যাটার্জি,বোস,বসু,ঘোষদের ন্যায় বাঙালী হিন্দুর লেখা বই পড়ানো হত। উপমহাদেশের অন্যান্য প্রদেশের মানুষ ছিল তাদের তুলনায় শিক্ষা,সাহিত্য,বিজ্ঞান ও রাজনীতিতে অনেক পিছনে। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশগণ তাদের ভারত শাসনের কাজে প্রশাসনের যে লৌহ-কাঠামো গড়ে তুলেছিল তা এই বাঙালী বাবুদের নিয়েই।

প্রশ্ন হলো, রবীন্দ্রনাথ আজ বেঁচে থাকলে কি বলতেন? সেদিন আর যাই হোক বাঙালী দুর্বৃত্তিতে ৫ বার বিশ্ব রেকর্ড গড়েনি। গণতন্ত্রের নামে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে একদলীয় বাকশালী স্বৈরাচার কায়েম করেনি। কেড়ে নেয়া হয়নি বিরোধীদের কথা বলা বা স্বাধীন ভাবে লেখালেখি করার স্বাধীনতা। পক্ষি-শিকারের ন্যায় বহু হাজার বিরোধীদলীয় কর্মীদের রক্ষিবাহিনীর দ্বারা হত্যা করা হয়নি। হরতালের নামে যাত্রিভর্তি বাসে আগুণ দেয়নি বা লগি বৈঠা নিয়ে রাস্তায় সেদিন মানুষ খুণ হয়নি। নিজ দেশের ৫৭ জন সামরিক অফিসারকে হত্যা করে তাদের মৃতদেহকে বিকৃত করে পায়খানার ড্রেনেও ফেলেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ধর্ষণে সেঞ্চুরীই হয়নি –যেমনটি জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আওয়ীমী লীগের অনুগত ছাত্রলীগ কর্মীদের দ্বারা হয়েছে। সেদিন বিদেশের পতিতাপল্লিতে ও ব্যাভিচারিদের গৃহে ভোগ্যপণ্যের ন্যায় ব্যবহারে হাজার হাজার বাঙালী নারী চালানও হয়নি। রবীন্দ্রনাথ সেদিন বাঙালীর মানুষ হওয়ার ব্যর্থতা নিয়ে আফসোস করেছেন। মুসলমান না হওয়ার কারণে ব্যর্থ মানুষদের সম্পর্কে মহান আল্লাহতায়ালার নিজের রায়টি কি -তা তিনি জানতেন না। মহান আল্লাহতায়ালা এরূপ ব্যর্থ মানুষদের সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে অতি কঠিন কথা শুনিয়েছেন। বলেছেন,“উলায়িকা কা’আল আনয়াম,বাল হুম আদাল” অর্থঃ তারা হলো গবাদী পশুর ন্যায়,বরং তার চেয়েও নিকৃষ্ট। উপরুক্ত আয়াতে মহান আল্লাহতায়ালা বুঝাতে চেয়েছেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে যারা বিশ্বাস করে না এবং তাঁর প্রদর্শিত সিরাতুল মুস্তাকীম বেয়ে যারা পথ চলে না তারা শুধু পশুর ন্যায়ই নয়,ব্যর্থ হয় পশুসুলভ গুণাবলী পেতেও। যারা দুর্বৃত্তির পথে চলায় অন্যসব পাপীষ্ঠদের হারিয়ে বিশ্বে ৫ বার প্রথম হতে পারে, নীচে নামার সে যাত্রা-পথে তাদেরকে আর কে হারাতে পারে?

শিকার ধরার পর নিহতের লাশটি কোন পশুই ড্রেনে ফেলে না। ধর্ষণে পশুরা সেঞ্চুরিও করে না। এক লাশের বদলে বিপক্ষের দশ লাশ ফেলে না। যাত্রীভর্তি বাসে আগুণ দেয় না। পশুরা শিকার ধরে শুধু বেঁচে থাকার স্বার্থে, ক্ষুধা মিটে গেলে অন্য শিকার ধরে না। তাই জঙ্গলে গাদাগাদি করে লাশ পড়ে থাকে না। কিন্তু যুদ্ধ ছাড়াই বাংলাদেশে লাশের ছড়াছড়ি। শেখ মুজিব একাই তার শাসানামলে বহু হাজার লাশ ফেলেছিলেন। শেখ হাসিনা নিজেও লাশ ফেলার রাজনীতি করছেন জোরেশোরে। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন এক লাশের বদলে দশ লাশ ফেলার। শত শত লাশ ফেলেছে জাসদ ও তার গণবাহিনী। সর্বহারার রাজনীতির নামে বহু হাজার লাশ ফেলছে মার্কসবাদী সন্ত্রাসীরা। পিলখানায় ৫৭জন অফিসারকে লাশ বানিয়েছে সেপাইরা। বার বার লাশ পড়ছে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। বহুবার সেটি হচ্ছে রাজনৈতিক মিছিলে। বহু মানুষ মারা যাচ্ছে বাসের চাকায় পিষ্ঠ হয়ে। পত্রিকায় প্রকাশ,বাংলাদেশে প্রতিদিন লাশ হচ্ছে দশ জনের বেশী। বাংলাদেশের ইতিহাসে এ এক গ্লানিকর ব্যর্থতা। কিন্তু বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকায়,টিভি আলোচনায়,নাটকে ও সিনেমায় বা পাঠ্যপুস্তকে এ ব্যর্থতার কোন আলোচনা নেই। বরং এসব ব্যর্থতা চেপে রেখে দেশকে যারা তলাহীন ভিক্ষার ঝুলিতে পরিনত করলো বা বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ বানালো তাদেরকে বাংলার ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ রূপে চিত্রিত করা হচ্ছে। সমাজে যখন দুর্বৃত্ত বা পাপাচারিরা বিজয়ী হয় তখন তাদের দুর্বৃত্তি ও পাপাচারের নিন্দা হয় না,বরং প্রশংসিত হয়। ডাকাতপাড়ায় এজন্যই ডাকাতি কর্মের নিন্দা হয় না। পতিতাপল্লিতে তেমনি নিন্দিত হয় না ব্যাভিচার। পাপাচার-কবলিত সমাজে পাপাচারের নেতা-নেত্রীগণ বরং বীর বা বীরঙ্গনা রূপে চিত্রিত হয়। নমরুদ,ফেরাউন,আবু জেহেল ও আবু লাহাবের মত দুর্বৃত্তগণ তো সে কারণেই নিজ নিজ দুর্বৃত্তকবলিত সমাজে নেতা রূপে গৃহীত হয়েছে। একই কারণে বাংলাদেশে নেতৃত্বের আসন পেয়েছে ইসলামবিরোধী দুর্বৃত্ত নেতাকর্মী ও বুদ্ধিজীবীগণ। শুধু রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানই তাদের দখলে যায়নি,দখলে গেছে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও স্কুল-কলেজের শ্রেণীকক্ষগুলোও। ইতিহাসের পাঠ্য বইগুলোতে তাই দুর্বৃত্ত নেতাদের কুকীর্তিগুলোকে গৌরবময় করে দেখানো হয়।

অরণ্যের অরাজকতা

জঙ্গলে কেউ নিহত হলে খুনির শাস্তি হয় না। সেখানে আদালত নাই। বিচারক,উকিল এবং পুলিশও নেই। এক পশু আরেক পশুকে ধরিয়ে দেয় না,সাক্ষিও দেয় না। একই রূপ অরণ্যের অরাজকতা নেমে এসেছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশে বহুশত আদালত আছে। বহুহাজার পুলিশ,হাজার হাজার উকিল এবং বহুশত বিচারকও আছে। তাদের পালতে রাজস্বের বিশাল অর্থ ব্যয় হয়। কিন্তু তাদের সামর্থটি কোথায়? সাম্প্রতিক এক রিপোর্টে প্রকাশ, দেশে প্রতিদিন এগারো জন খুন হয়। কিন্তু দেশের আদালতগুলোর সবগুলো মিলে দিনে একজন খুনিরও কি শাস্তি দিতে পারছে? বিচার হচ্ছে রাজনৈতিক প্রয়োজনে। খুনি,চোর-ডাকাত ও সন্ত্রাসীগণ জনগণের শত্রু,কিন্তু তারা সরকারের শত্রু নয়। ফলে তাদের বিচার নিয়ে সরকারের মাথাব্যথা নেই। পুলিশ এবং আদালত ব্যস্ত সরকার বিরোধীদের দমনে। প্রকৃত খুনিরা তাই অভয় অরণ্য পেয়েছে বাংলাদেশকে। পিলখানা হত্যাকান্ডের খুনিদের গ্রেফতারে সরকার ঘটনার দিন কোন উদ্যোগই নেয়নি। ফলে দিন-দুপুরে রাজধানীর মধ্য দিয়ে শত শত খুনি অনায়াসে পালিয়ে যেতে পেরেছে, যেন খেলা দেখে ফিরছে। দুষ্টের দমন,ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠা এবং শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় আগ্রহ আছে এমন কোন দায়িত্বশীল সরকার কি অপরাধীদের গ্রেফতারে এতটা নিস্পৃহ থাকতে পারে? পাশেই ক্যান্টনমেন্ট,সেনাবাহিনীকে বললেও তারা সমগ্র পিলখানা ঘিরে ফিলতে পারতো। সরকার নিজের গদিরক্ষায় সেনাবাহিনীর সহায়তা নেয়, কিন্তু ৫৭ জন সেনা অফিসারদের বাঁচানোর জন্য সেনাবাহিনীর সহায়তা নেয়নি। দায়িত্বহীনতা আর কাকে বলে? অথচ বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের ধরপাকড়ে সরকারের কোন আলসেমী নেই। নানা বাহানায় তাদের জেলে তোলা হচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলাও দায়ের হচ্ছে। সরকারের বিশেষ আক্রোশ ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে। একাত্তরে অস্ত্র ধরেছে,কাউকে খুন করেছে বা ধর্ষণ করেছে সে প্রমাণ পুলিশের কাছে নাই এমন ব্যক্তিদের ধরে সরকার কাঠগড়ায় তুলছে। তাদের বিচারে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে আদালত গড়ছে এবং বিচারক ও উকিলদের নিয়োগ দিচ্ছে। পুলিশ, প্রশাসন ও বিচারকগণের ব্যস্ততা তাদের ত্বরিৎ শাস্তি দেয়া নিয়ে। অথচ আজ যারা রাস্তায় প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে নামছে,দিনদুপুরে মানুষ খুণ করছে,যাদের ছবি পত্রিকায় ছাপাও হচ্ছে,তাদের গ্রেফতার নিয়ে সরকারের কোন আগ্রহই নেই। সরকারের প্রায়োরিটি কোথায় সেটি বুঝতে কি এরপরও কিছু বাঁকি থাকে?

ডাকাতদের দস্যুতায় অনেকের ক্ষয়ক্ষতি হলেও তাতে জাতি বিপাকে পড়ে না। কিন্তু জাতি সংকটে পড়ে যদি রাষ্ট্র ছিনতাই হয়।অথচ বাংলাদেশ সেরূপ ছিনতাইকারীদের মুখে বার বার পড়ছে। এসব ছিনতাইকারিরা কখনো বা সেনাবাহিনীর,কখনো বা রাজনৈতিক বাহিনীর লোক। কখনো বা ছিনতাই হয়েছে ভোটের মাধ্যমে,কখনো বা হয়েছে অস্ত্রের মাধ্যমে। যেমন বাকশালী মুজিব এসেছিল ভোটের মাধ্যমে। অপরদিকে স্বৈরাচারি এরশাদ এসেছিল অস্ত্র হাতে নিয়ে। কিন্তু মানবাধিকার পদদলনে ও গণতন্ত্র হত্যায় উভয়ের সন্ত্রাস ও স্বৈরাচার কি কোন পার্থক্য রাখে? মুজিব কেড়ে নিয়েছিলেন বাকস্বাধীনতা এবং হত্যা করেছিলেন গণতন্ত্র। অথচ মানুষের ন্যূনতম মানবাধিকার শুরুই হয় কথা বলার অধিকার থেকে। সে অধিকারটুকু কেড়ে নেয়ার অর্থ হলো মানুষকে মানবতাশূণ্য করা। তিনি লুণ্ঠন করেছিলেন সভাসমিতি ও পত্রিকা প্রকাশের স্বাধীনতা, এবং প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বাকশাল। একই অপরাধ করেছিল এরশাদ। মুজিবের বাকশালী দর্শন এবং এরশাদের সামরিক স্বৈরাচারি দর্শনে কোন পার্থক্য নাই বলেই ২০০৮ সালে তারা আবার একাকার হয়ে গেছে। জাসদ ও জাসদের গণবাহিনীর সন্ত্রাসও ভিন্ন ছিল না মুজিব এবং এরশাদের সন্ত্রাস থেকে। পিলখানায় যেরূপ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে তার চেয়েও ভয়ানক হত্যাকান্ড শুরু করেছিল কর্নেল তাহের,হাসানূল হক ইনু,আব্দুর রব,সিরাজুল আলম খান –এসব জাসদ নেতারা। সেপাহীদের বিল্পবের নামে পরিকল্পনা ছিল সেনাবাহিনী নির্মূলের। বহু অফিসারকে তারা হত্যাও করেছিল। গণবাহিনী গঠন করে হত্যা করেছিল বহু হাজার মানুষকে। এতবড় অপরাধের পরও তাদেরকের বিচারের মুখোমুখি হতে হয়নি। বরং এরশাদের আমলে জাসদ গৃহপালীত বিরোধী দলের মর্যাদা পায়। আর আজ  শামিল করে নেয়া হয়েছে সরকারে। এরা সবাই একই ঝাঁকের কৈ,ফলে আজ ঝাঁকের কৈ ঝাঁকে মিশে গেছে।

বেড়েছে মাছিচরিত্রের মানুষ

কোন স্থান কতটা অস্বাস্থ্যকর সেটি পরিমাপের সবচেয়ে সহজ মাপকাঠি হলো,সেখানে আবর্জনা বা মলমূত্র ফেললে কত দ্রুত কতটা মাছি উড়ে এসে বসে তা দেখে। পরিচ্ছন্ন পরিবেশে আবর্জনা ফেললেও তাতে মাছি বসে না। কারণ, পরিচ্ছন্ন পরিবেশে মশামাছি জন্ম নেয় না। মশামাছি বেড়ে উঠার স্থানগুলোই নির্মূল করা হয়। অথচ সেগুলি পরিচর্যা পায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে। তেমনি দুর্বৃত্তকবলিত সমাজে বিপুল ভাবে বেড়ে উঠে দুর্বৃত্তরা,এবং তারা সারিবদ্ধ হয় দুর্বৃত্ত নেতাদের পিছনে। রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় প্রশাসন পরিণত হয় তাদের অধিকৃত প্রতিষ্ঠানে। অথচ উন্নত সমাজে কঠিন হয়ে পড়ে দুর্বৃত্তদের বেড়ে উঠা। নির্মূল করা হয় দুর্বৃত্তদের প্রতিষ্ঠান। ফলে উন্নত সমাজে দুর্বৃত্ত স্বৈরাচারিগণ ভোট পায় না। সাহাবাদের আমলের ইসলামি রাষ্ট্রে আবু জেহল ও আবু লাহাবের মত দুর্বৃত্তরা তাই বাজার পায়নি। বস্তুত একটি রাষ্ট্র কত্টা মানবতাশূণ্য ও দুর্বৃত্তকবলিত সেটি বুঝার জন্য শুধু পতিতাপল্লি বা ডাকাত পাড়ার দিকে তাকানোর দরকার পড়ে না। প্রেসিডেন্ট ভবন,প্রধানমন্ত্রী ভবন বা মন্ত্রীপাড়ার দিকে নজর দিলেই সেটি স্পষ্ট বুঝা যায়। বুঝা যায় প্রশাসনের দিকে তাকালে। সেটি আরো বুঝা যায় নির্বাচনে দুর্বৃত্ত প্রার্থীগণ কতটা ভোট পায় তা দেখে। দেহের তাপমাত্রা মাপার জন্য যেমন থার্মোমিটার,তেমনি একটি দেশের মানুষ মানবিক বা নৈতিক পরিচয়ে কতটা পিছিয়ে আছে সেটি মাপার মাপকাঠি হলো দূর্নীতি। যে দেশ দুর্নীতিতে বিশ্বে ৫ বার প্রথম হয় সে দেশের নৈতিকতার দুরবস্থা বুঝতে কি অন্ধেরও অসুবিধা হয়? বাংলাদেশের মানুষ নিজেদের সে নৈতিক পরিচয়টি একবার নয় পর পর পাঁচবার বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিয়েছে।

বাংলাদেশের মূল সমস্যা ভূমি,ভুগোল বা জলবায়ু নয়,বরং মাছি চরিত্রের মানুষ। এদের সংখ্যা বিপুল। দিন দিন সে সংখ্যা আরো দ্রুত বাড়ছে। আবর্জনার দিকে ছুটে যাওয়া থেকে মাছিকে রুখা যায় না,তেমনি মাছি চরিত্রের মানুষদের রুখা যায় না লোভ-লালসা ও স্বার্থশিকার থেকে। এরশাদের মত প্রমাণিত স্বৈরাচারি,দন্ডিত অপরাধী এবং চরিত্রহীন ব্যক্তি যেভাবে ৫ সিট নির্বাচিত হয় তাতে কি বুঝতে বাঁকি থাকে বাংলাদেশের মুল সমস্যাটি কোথায়? প্রশ্ন হলো,আজ  যদি মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে কোন রাসূল কোরআনের শরিয়তি বিধান নিয়ে বাংলাদেশে হাজির হতেন তবে ক’জন তাঁকে সমর্থণ করতো? ক’জন তাঁর দলকে বিজয়ী করতো? ক’জন শরিয়তের পক্ষ নিত? আজ কোন নবী-রাসূল নেই,কিন্তু মহান আল্লাহতায়ালার সে কোরআনী শরিয়ত তো রয়ে গেছে। সে শরিয়তি বিধানের প্রতিষ্ঠাই বা ক’জন সমর্থণ করছে? দেশের আদালতে তো বিজয়ী হয়ে আছে ব্রিটিশের কুফরি বিধান। মুসলমান রূপে বাংলাদেশীদের এ কি বিশাল ব্যর্থতা নয়? সে ব্যর্থতা নিয়েই বা হুশ ক’জনের? এ ব্যর্থতা নিয়ে কেউ কি পরকালে সফলতা পাবে?

বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকা,টিভি,গল্প-উপন্যাস ও স্কুল-কলেজের পাঠ্যপুস্তকে ভুয়সী প্রশংসা করা হয় একাত্তরের চেতনার ধারকদের। সে চেতানধারীদের জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান রূপে জাহির করা হয়। কিন্তু সে বিশেষ চেতনাধারি ব্যক্তিবর্গ কারা? কি তাদের চরিত্র? বাংলাদেশের ইতিহাসে কে প্রথম গণতন্ত্র হত্যাকারি? কে বাকশালী স্বৈরাচারের প্রতিষ্ঠাতা? কে ভারতের সাথে ২৫ সালা দাসচুক্তি করে? কার আমলে ভয়ানক দুর্ভিক্ষ নেমে আসে যাতে বহু লক্ষ মানুষ খাদ্যাভাবে মারা যায়? ৭ই নভেম্বরে সিপাহী বিপ্লবের নামে যারা সেনাবাহিনীর অফিসারদের হত্যা শুরু করেছিল তারাই বা কারা? রক্ষিবাহিনী, গণবাহিনী, সর্বহারা পার্টির নামে হাজার হাজার মানুষকে নৃশংস ভাবে কারা হত্যা করেছে? স্বৈরাচারি এরশাদের আমলে কারা গৃহপালিত বিরোধী দল সেজে গণতন্ত্রের সাথে মস্করা করেছে? কারা জেনারেল এরশাদ ও জেনারেল মঈনকে সমর্থণ করেছে? বাংলাদেশের ইতিহাসে এ বিষয়গুলো অতি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু স্কুল-কলেজের পাঠ্যপুস্তকে এগুলো আলোচিত হয়নি। দেশবিদেশের ভূগোল,জলবায়ু,জীবজন্তু বা কীটপতঙ্গের জীবনী পড়ানোর চেয়ে এ বিশেষ বাঙালী জীবদের প্রকৃত ইতিহাস পড়ানো কি বেশী গুরুত্বপূর্ণ নয়? শাপকে শাপ,বিষকে বিষ রূপে না চিনলে বাঁচাটি নিরাপদ হয় না। তেমনি জাতির দুর্বৃত্তদের না চিনলে জাতিরও কল্যাণ হয় না। হিটলার,হালাকু,চেঙ্গিজ ও মীরজাফরদেরকে মহামানব রূপে চিত্রিত করা শুরু হলে সে জাতির সাধারণ মানুষও তাদেরকে অনুকরণীয় মডেল চরিত্র রূপে গ্রহণ করে। ছাত্ররা তখন তাদের মত হওয়াকে জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন ভাবে। দেশের সরকার, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মিডিয়ার পক্ষ থেকে বিষাক্ত শাপকে ভগবান রূপে কীর্তন গাওয়া শুরু হলে সাধারণ মানুষ তখন শাপকে পুঁজা দেয়া শুরু করে। বাংলাদেশে সে কাজটি প্রচণ্ড ভাবে হয়েছে। ফলে গণতন্ত্র-হত্যাকারিও জাতির পিতা রূপে গৃহীত হয়েছে। এবং বিপুল ভোট পায় তাঁর অনুসারিরা। সমগ্র পৃথিবীতে সবচেয়ে দূর্নীতিগ্রস্ত দেশ হওয়ার যে অপমানটি বাংলাদেশের জুটেছে,সেটি ভূমি বা জলবায়ুর কারণে নয়। বরং সে জন্য দায়ী দেশবাসীর রুগ্ন চেতনা-চরিত্র ও মূল্যবোধ। সে রুগ্নতাটি এসেছে রুগ্ন চরিত্রের মানুষদের মডেল চরিত্র রূপে গ্রহণ করার কারণে। একাত্তরের চেতনাধারীরা এভাবে জাতির গলায় বিশ্বজোড়া অপমানের মালা পড়িয়ে দিয়েছে।

রুগ্নতা সর্বস্তরে

ব্যক্তির রুগ্নতা গোপন থাকে না। শ্বাসকষ্ট,জ্বর,দুর্বলতা বা পঙ্গুত্ব নিয়ে সেটি সবার সামনে হাজির হয়। জাতির রুগ্নতা তেমনি ধরা পড়ে বিবেকহীনতা,নীতিহীনতা,অপরাধ-প্রবনতা,মিথ্যাচার,স্বৈরাচার,সন্ত্রাস ও নানারূপ দুর্বৃত্তির মধ্য দিয়ে। বাঙালীর জীবনে সে রুগ্নতা আজ  ভয়ানক রূপ ধারণ করেছে। সেনাবাহিনীর ৫৭ জন অফিসারকে যেভাবে খুন করা হলো সেটি নিজেই কোন রোগ নয়,বরং বিবেকে বেড়ে উঠা ভয়ানক অসুস্থ্যতার লক্ষণ। অফিসারগণ কি অপরাধ করেছিল যে তাদেরকে খুন করে এবং দেহকে বিকৃত করে লাশগুলোকে পায়খানার নর্দমাতে ফেলতে হবে? বিগত দুই বিশ্বযুদ্ধে বহু কোটি মানুষেরই মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু কোন রণাঙ্গণেই এত অফিসারকে একদিনে প্রাণ দিতে হয়নি। কোন শত্রু অফিসারকে লাশ হয়ে পায়খানার ড্রেনেও যেতে হয়নি। শত্রু বাহিনীর অফিসারের লাশের সাথে এমন অবমাননা হিটলারের সৈন্যরাও করেনি। বস্তুতঃ পিলখানায় সেদিন শুধু লাশকে ড্রেনে ফেলা হয়নি,ড্রেনে ফেলা হয়েছে মানবতাকে। আর সেটি কোন দুর্বৃত্ত ডাকাতদের হাতে নয়। বরং তাদের হাতে যারা প্রতিদিন দেশবাসীর রাজস্বের অর্থে প্রশিক্ষণ পেয়েছে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা সুরক্ষিত করার লক্ষ্যে। খুণ,রাহাজানি বা সন্ত্রাসের ন্যায় জঘন্য অপরাধ কোন ভদ্র লোকালয়ে হলে বিপদগ্রস্তদের সাহায্যে সাধারণ মানুষ এগিয়ে আসে। মানুষ খুন,ছিনতাই বা ধর্ষণ গরু-ছাগলের সামনে হলে তাদের ঘাস-পাতা খাওয়ায় ছেদ পড়ে না। উদ্ধারে তারা এগিয়েও আসে না। তেমনি অবস্থা হয়েছিল সেদিন ঢাকায়। রাজধানীর কেন্দ্রে বহু ঘন্টা ধরে খুন,ধর্ষণ ও লুটতরাজ চললেও কোন নিরাপত্তা বাহিনীই সেদিন এগিয়ে আসেনি। সরকারও কোন উদ্যোগ নেয়নি। বরং খুনিদের সাথে সরকার নিস্ফল আলোচনায় বসেছে। এই হলো বাংলাদেশের সরকারের পরিচয়। সরকার তার কুৎসিত চরিত্র সেদিন আড়াল করতে পারিনি। এমন একটি সরকার থেকে জনগণ আর কি আশা করতে পারে?

 

আরো লক্ষণীয় হলো,এমন বিবেকহীনতা যে শুধু পিলখানায় ঘটেছে তা নয়। এমন অপরাধ যে কিছু সেপাই,কিছু দুর্বৃত্ত সন্ত্রাসী এবং কিছু রাজনৈতিক ক্যাডারদের হাতে ঘটছে তাও নয়।বরং একই রূপ বিবেকহীনতা বিরাজ করছে তাদের মাঝেও যাদের হাতে অধিকৃত দেশের প্রেসিডেন্ট ভবন,প্রধানমন্ত্রী ভবন ও সংসদ ভবন। তাদের হাতে যে শুধু মানুষ হত্যা হয়েছে বা হচ্ছে তা নয়,বরং পদদলিত হয়েছে এবং হচ্ছে ন্যূনতম মানবিক অধিকারও। এক্ষেত্রে ইতিহাসের সাক্ষ্যটি বড়ই করুণ এবং শিক্ষাপ্রদ। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী রূপে যাকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা হচ্ছে তাঁরই হাতে সংঘটিত হয়েছে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবেচেয়ে জঘন্য অপরাধ,তাঁর হাতে নিহত হয়েছে গণতন্ত্র এবং প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাকশালী স্বৈরাচার। জনগণের সামনে নেতাগণই হলো আদর্শ,তাদের কাছ থেকে কর্মীগণ পায় রাজনীতির দর্শন, রীতিনীতি ও সংস্কৃতি। গণতান্ত্রিক রাজনীতির রীতিনীতি ও সংস্কৃতি তাই স্বৈরাচারি নেতা থেকে শেখা যায় না। খোদ দলীয় নেতাটি যখন বিরোধীদলের রাজনীতিকে নিষিদ্ধ করেন,তখন তার দলের কর্মীগণ তো বিরোধীদের বেঁচে থাকাটিই অসম্ভব করে। বাংলাদেশে তো সেটাই ঘটছে। মুজিব-অনুসারিদের হাতে একারণেই ঢাকার রাস্তায় দাড়ি-টুপিধারিদের লগি-বৈঠা নিয়ে পিটিয়ে হত্যার মত ঘটনা ঘটেছে।

খুনিদের পক্ষ নেয়ার রুচি ভদ্রলোকের থাকে না,সেরূপ রুচি তো খুনিদের।।যে কোন সভ্য দেশে সভ্য মানুষ মাত্রই খুনিদের শাস্তি চায়। এজন্যই জনগণের রাজস্বের বিপুল অর্থব্যয়ে আদালত বসে। সরকারের প্রধানতম দায়িত্ব আদালতের বিচারকে দ্রুত,সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ করা।কিন্তু সেরূপ রুচি বাংলাদেশের বর্তমান প্রেসিডেন্টের যেমন নাই,প্রধানমন্ত্রীরও নাই। তাই খুনের মামলায় শাস্তিপ্রাপ্ত বহু অপরাধীর শাস্তি প্রেসিডেন্ট মাফ করে দিয়েছেন। আর শেখ হাসিনা তো এক লাশের বদলে দশটি লাশ ফেলতে বলেন। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাজাপ্রাপ্ত খুনীর শাস্তি মাফ করতে বাধ্য করেছিলেন স্বৈরাচারি এরশাদকে। কারণ সাজাপ্রাপ্ত খুনিরা ছিল তার দলের ছাত্রকর্মী। আশির দশকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ইটের উপর মাথা রেখে ইট দিয়ে মাথা থেথলিয়ে হত্যা করেছিল ইসলামী ছাত্রশিবিরের দুইজন কর্মীকে। আদালতে সে অপরাধ প্রমানিত হয়েছিল এবং খুনিদের শাস্তিও হয়েছিল। কিন্তু শেখ হাসিনার কাছে সে শাস্তি পছন্দ হয়নি। খুনিদের প্রতি শেখ হাসিনার দরদের সে ইতিহাস এবং তাদের মুক্তি নিয়ে তাঁর আপোষহীন আব্দারের কাহিনী লিখেছেন সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী জনাব আতাউর রহমান খান তাঁর আত্মকথা-মূলক বইতে। খুনিদের মাফ না করলে আলোচনায় বসবেন না -সেটিই ছিল শেখ হাসিনার আবদার। আওয়ামী বাকশালীদের সে বিবেকহীনতা শুধু শেখ মুজিব বা শেখ হাসিনার একার নয়। সে বিবেকহীনতা নিয়ে বেড়ে উঠেছে তাদের বিশাল কর্মীবাহিনী। তারই ফল,আগুন দেয়া হয়েছে যাত্রীভর্তি বাসে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্ররা বার বার লাশ হচ্ছে। মানুষ খুন হচ্ছে রাজপথে।একই রূপ নৃশংস বিবেকহীনতা একাত্তরে দেখা গেছে বিহারীদের বিরুদ্ধে। হাজার হাজার বিহারীকে যেমন হত্যা করা হয়েছে,তেমনি তাদের ঘরবাড়ী,দোকানপাঠ ও ব্যবসা-বাণিজ্যকে আত্মসাৎ করা হযেছে। সে বর্বরতার বিরুদ্ধে জনগণের মধ্য থেকে যেমন প্রতিবাদ উঠেনি,তেমনি প্রতিবাদ উঠেনি বুদ্ধিজীবীদের মধ্য থেকেও। অথচ যে কোন সভ্যদেশে সেটি কাঙ্খিত। একাত্তরের যুদ্ধের তান্ডব ১৬ই ডিসেম্বরে শেষ হয়েছে। কিন্তু শেষ হয়নি একাত্তরের চেতনার বাঙালী তান্ডব। নর্দমার পাশে বস্তিতে বাস করে সেটিরই স্বাক্ষর বিগত ৪০ বছরেরও বেশী কাল ধরে বিহারীরা বহন করছে। তবে রোগের ভাইরাস শুধু রুগ্নব্যক্তির দেহে সীমিত থাকে না,সেটি দ্রুত অন্যদের দেহেও প্রবেশ করে। রোগ তো এভাবেই ভয়ানক মহামারি ঘটায়। সেটি ঘটে মানবিক বা চারিত্রিক রোগের ক্ষেত্রেও। বাংলাদেশের মানবিক সমস্যাটিতে তাই শুধু পেশাদার খুনি বা সন্ত্রাসীদের রোগ নয়,বরং তাতে প্রবলভাবে আক্রান্ত সমগ্র দেশ। বাংলাদেশের সমস্যা কোথায় সেটি কি এরপরও বুঝতে বাঁকি থাকে?  ০৭/০৪/২০১২

 




সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিং ও সাংস্কৃতিক কনভার্শন

সভ্যতার সংঘাত ও সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিং

ইঞ্জিনিয়ারিং শব্দটি এতকাল ব্যবহৃত হয়েছে প্রকৌশল বিজ্ঞান বুঝাতে।গৃহউন্নয়ন,কলকারখানা¸রাস্তাঘাট,ব্রিজ,অস্ত্র,যন্ত্র,যানবাহন,কম্পিউটার,স্পেসসায়েন্স ইত্যাদীর উন্নয়নের ইঞ্জিনিয়ারিং বিদ্যার অবদান অপরিসীম। যান্ত্রিক সভ্যতার বিস্ময়কর উন্নয়নের মূলে বস্তুত এই ইঞ্জিনিয়ারিং। এক্ষেত্রে অগ্রগতির ফলে বিগত একশত বছরে বিজ্ঞান যতটা সামনে এগিয়েছে তা মানব ইতিহাসের বিগত বহু হাজার বছরেও এগুয়নি। সবচেয়ে দ্রুত এগিয়েছে বিগত ৫০ বছরে। বলা যায়,পৃথিবীতে যত বিজ্ঞানী আজ  জীবিত আছে,ইতিহাসের সমগ্র বাঁকি সময়ে হয়তো তার সিকি ভাগও জন্ম নেয়নি। তবে যান্ত্রিক উন্নয়ন বিস্ময়কর গতিতে ঘটলেও চেতনা,মূল্যবোধ, সংস্কৃতি ও বাঁচবার রুচিবোধে মানুষ সামান্যই সামনে এগিয়েছে। অর্থাৎ মানবিক ও সামাজিক উন্নয়ন সে হারে হয়নি। বরং শঠতা,শোষণ,উলঙ্গতা,অশ্লিলতা,সন্ত্রাস,আগ্রাসন,জাতিভেদ ও বর্ণভেদের ন্যায় বহু অসভ্যতা বেঁচে আছে তার আদিম কদর্যতা নিয়ে।

জ্ঞান-বিজ্ঞানের সীমা-সরহাদ নেই। আলোবাতাসের ন্যায় এটিও উদার। ফলে যে দেশে ও যে নগরে বিজ্ঞানের আগমন ঘটে সেখানে একই রূপ সুফল বয়ে আনে।পৃথিবী জুড়ে যান্ত্রিক উন্নয়নে এভাবেই মিল সৃষ্টি হয়। ফলে সব দেশের মটরগাড়ি,রেলগাড়ি,উড়ো জাহাজ ও ডুবো জাহাজ একই ভাবে নির্মিত হয় এবং চিকিৎসা পদ্ধতি,গৃহনির্মান ও সড়ক নির্মাণ পদ্ধতিও একই ধারায় চলে। কিন্তু সে মিলটি মানুষের ধর্ম,চিন্তা-চেতনা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে হয়নি। বরং চিন্তা-চেতনা, ধর্ম ও সংস্কৃতির মানচিত্রটি নানা জনে ও নানা জনপদে ভিন্ন ভিন্ন। পাশ্চাত্যের একজন বিজ্ঞানী যেরূপ মদ্যশালায় গিয়ে মদ পান করে বা হিন্দু বিজ্ঞানী যেরূপ শাপশকুন ও মুর্তিকে পুজা দেয়,কোন মুসলিম বিজ্ঞানী সেটি করেনা। ধর্ম, রুচিবোধ ও সংস্কৃতি নিয়ে তাদের ধারণাগুলিও ভিন্ন। আর সে ভিন্নতা থেকেই জন্ম নেয় পরস্পরে ঘৃনা এবং ঘৃনা থেকে শুরু হয় সংঘাত। সে ঘৃনা থেকেই মসজিদ, মসজিদের আযান বা মুসলিম রমনীর হিজাবের ন্যায় মুসলিম সংস্কৃতির বহু কিছুই পাশ্চাত্যের বহু দেশে অসহনীয় হয়ে পড়েছে। সে অসহনীয় চেতনার কারণেই পাশ্চাত্যের দেশগুলিতে মসজিদের আযান মসজিদের বাইরে আসতে দেয়া হয়না এবং দণ্ডনীয় অপরাধ রূপে ঘোষিত হয় মুসলিম মহিলার হিজাব। ফ্রান্সের ন্যায় পাশ্চাত্য সভ্যতার কেন্দ্রভূমিতে তো সেটিই হয়েছে। একটি দেশের জনগণ কি ধরণের আইন-আদালতকে গ্রহন করবে সেটি তাদের নিজস্ব ব্যাপার। এখানেই দেশটির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব। নামায-রোযা,হজ-যাকাতের ন্যায় শরিয়ত প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে প্রতিটি মুসলিম দায়বদ্ধ মহান আল্লাহর কাছে। এখানে কোন বিদ্রোহ বা অবাধ্যতা চলে না। অথচ সে অধিকার মুসলিম নাগরিকদের দেয়া হচ্ছে না। শরিয়তের প্রতিষ্ঠা রুখতে আফগানিস্তানের ন্যায় মুসলিম দেশ অধিকৃত হচ্ছে, মুসলিম ভূমিতে লাগাতর ড্রোন হামলাও হচ্ছে। হামলাটি কোন একটি দেশে সীমিত নয়, বরং হামলা হচ্ছে বহু দেশের বহু জনপদে। বলা যায় তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছে নতুন কৌশল নিয়ে। প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ৫ বছরের বেশী স্থায়ী হয়নি। কিন্তু মুসলমানদের বিরুদ্ধে শুরু করা যুদ্ধটির বয়স দশ বছরের বেশী হলেও শেষ হওয়ার নাম নিচ্ছে না। মার্কিন প্রফেসর হান্টিংটন এটিকে বলেছেন “ক্লাশ অব সিভিলাইজেশন” তথা সভ্যতার লড়াই। তবে সে সংঘাতে প্রফেসর হান্টিংটন দুটি প্রধান প্রতিদ্বন্দি পক্ষকে সনাক্ত করেছেন,একটি পাশ্চাত্য সভ্যতা এবং অপরটি ইসলাম।পাশ্চাত্য চায়,এ সংঘাতে তাদের নিজেদের বিজয়। সভ্যতার সে লড়াইটি যে শুধু সামরিক তা নয়,বরং লাগাতর লড়াইটি হচ্ছে সাংস্কৃতিক ময়দানে। মুসলিম উম্মাহর ঈমান ও কোমর ভাঙ্গার এ যুদ্ধটি চলছে কোনরূপ গোলাবারুদের শব্দ ছাড়াই। এ যুদ্ধের হাতিয়ার হলো সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিং,এবং লক্ষ্য কালচারাল কনভার্শন।

প্রত্যেকেই কোন না কোন ভাবে বেঁচে থাকে ও জীবন কাটায়;বেঁচে থাকার সে প্রক্রিয়াটি হলো তার সংস্কৃতি। সবাই একই ভাবে বাঁচে না,জীবনও কাটায় না। ফলে সবার সংস্কৃতিও এক নয়। সমাজ পাল্টাতে হলে সে সংস্কৃতিও পাল্টাতে হয়। এখানে পরিবর্তনটি শুরু হয় চেতনা থেকে।  ধর্ম,দর্শন ও নীতিবাক্য এখানে ইঞ্জিনের কাজ করে। সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ক্ষেত্রে দর্শন ও ধর্মের ভূমিকা তাই চুড়ান্ত। প্রাচীন প্রস্তর যুগের মানুষ যেরূপ জীবজন্তুর সাথে উলঙ্গ ভাবে বনে বাসে করে তার কারণ সেখানে কোন ধর্ম বা দর্শন কাজ করেনি। তাই ধর্ম ও দর্শন বই-পুস্তক,মসজিদ-মাদ্রাসা ও ক্লাসরুমে সীমিত থাকলে উচ্চতর সমাজ বা সভ্যতা নির্মিত হয় না। সেগুলির প্রকাশ ঘটাতে হয় মানুষের চেতনা-চরিত্র,মূল্যবোধ,পোষাক-পরিচ্ছদ,সামাজিকতা,রুচি,আচরণ ও কর্মের মধ্যে। তখন ঘটে সাংস্কৃতিক কনভার্শন এবং সেটিকে বেগমান করতেই প্রয়োজন পড়ে সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের তথা প্রকৌশলি পরিকল্পনার।

 

ইসলামি সভ্যতার নির্মান ও সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিং

ইসলাম মানবিক উন্নয়ন চায়,সে উন্নয়নের মধ্য দিয়ে বিশ্বজনীন সভ্যতার নির্মান চায়। এটিই ইসলামের ভিশন। ফলে নামায-রোযা,হজ-যাকাতের বাইরেও ইসলাম নিজ সংস্কৃতির প্রসার ও প্রতিষ্ঠা চায়। সংস্কৃতির দুটি ধারা,একটি আল্লাহর আনুগত্যের,অপরটি বিদ্রোহের। সন্ত্রাসী,মদ্যপায়ী ব্যাভিচারি ও পতিতার সংস্কৃতিতে যেটি প্রকাশ পায় সেটি আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের চেতনা। অথচ মুসলিম সংস্কৃতির মূলে কাজ করে ইবাদতের স্পিরিট। ইবাদতের বিধানটি কাজ করে আল্লাহর অনুগত সুশৃঙ্খল মানুষ গড়ার হাতিয়ার রূপে। ফলে এ সংস্কৃতি আসে পবিত্রতা। ইসলামের লক্ষ্য তাই শুধু ধর্মান্তর নয়,সাংস্কৃতিক কনভার্শনও। যে কোন সভ্যতার নির্মানে অপরিহার্য হলো এই সাংস্কৃতিক কনভার্শন। সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিষয়টি তাই শুধু পাশ্চাত্যে বিষয় নয়,ইসলামেরও। বরং পরিকল্পিত সমাজ বিপ্লবের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী প্রস্তুতি,ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো হলো ইসলামের। ইসলামের ইবাদত তাই শুধু ব্যক্তি-জীবনে সীমিত নয়,বরং ইবাদতকে সর্বব্যাপী করার লক্ষ্যে গড়ে তোলা হয়েছে সামাজিক,রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক অবকাঠামো। আল্লাহর খলিফা রূপে প্রতিটি মুসলমানের নিয়োগপ্রাপ্তি,মহল্লায় মহল্লায় মসজিদ নির্মান, ইসলামি রাষ্ট্র-নির্মান ও হজ-ওমরাহর বিধান তো সে অবকাঠামো। ব্রিজ, রাস্তাঘাট ও সামরিক স্থাপনার ন্যায় সাংস্কৃতিক অবকাঠামোও প্রতিরক্ষা চায়,সে সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই জিহাদ আল্লাহর নির্দেশিত পবিত্র ইন্সটিউশন।তাই যে সমাজে জিহাদ নেই সে সমাজে ইসলামি শরিয়ত যেমন বাঁচে না,তেমনি ইসলামি সংস্কৃতিও বাঁচে না।

সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কাজে নেতৃত্বের দায়িত্ব যেমন আল্লাহর ঘর মসজিদের,তেমনি ইসলামি রাষ্ট্রের। নামায সংঘটিত করাই মসজিদের মূল কাজ নয়,লক্ষ্য এখানে নামাযীদের সাস্কৃতিক কনভার্শনও। তেমনি রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলের কাজও শুধু রাস্তাঘাট গড়া বা অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়। বরং সেটি পরিপূর্ণ ইসলামি সভ্যতার নির্মান। আল্লাহর মিশন এখানে সরকারের মিশন হয়ে যায়। সে মিশনটি হলো কোরআনে বর্ণিত “লি ইউযহিরাহু আলা দ্বীনে কুল্লিহি” অর্থাৎ পৃথিবীর সকল ধর্ম ও মতাদর্শের উপর ইসলামের বিজয়ের। ইসলামে এজন্যই সার্বভৌম শাসকের কোন ধারণা নেই,বরং সে ধারণাটি খেলাফতের তথা মহান আল্লাহর প্রতিনিধিত্বের। ব্যক্তি,মসজিদ ও রাষ্ট্র সবই এখানে মহান আল্লাহর মিশন নিয়ে একাকার হয়ে কাজ করে। গ্রামের দরিদ্র ঈমানদার ব্যক্তিটির মিশন আর রাষ্ট্রের শক্তিধর শাসকের মিশনে কোন পার্থক্য নাই। সবাই এখানে একই রণাঙ্গনে এক ও অভিন্ন মিশন নিয়ে জিহাদ লড়ে। সে রণাঙ্গনে সমগ্র উম্মাহ নেমে আসে।

মুসলমান হওয়ার অর্থ হলো সভ্যতা নির্মাণের সে দায়ভার কাঁধে নেয়া। সে মিশনে জড়িত হওয়াটিই মু’মিনের সংস্কৃতি। এমন এক সর্বাত্মক অংশগ্রহণের কারণেই উচ্চতর সভ্যতার নির্মানে সমগ্র মানব ইতিহাসে সবচেয়ে বেশী সফলতা দেখিয়েছে ইসলাম। মানবতার কথা,নারীপুরুষের সমতার কথা,শোষনমুক্তির কথা,ইনসাফের কথা,দাসমূক্তির কথা এবং ধনীদরিদ্রের পার্থক্য দূরীকরণের কথা –এ সব বড় বড় কথা অতীতে বহু ব্যক্তি, বহু ধর্ম ও বহু মতবাদ নানা ভাবে বলেছে। কিন্তু একমাত্র ইসলামই সেগুলি বাস্তবে পরিণত করেছে। ইসলাম দাসমূক্তিকে শ্রেষ্ঠ ধর্মকর্মে পরিণত হয়েছে। সমতার বিধান? রাষ্ট্রের খলিফা আটার বস্তা নিজের কাঁধে তুলে অন্নহীনের ঘরে পৌছে দিয়েছেন এবং চাকরকে উঠের পিঠে চড়িয়ে নিজে উঠের রশি ধরে টেনেছেন। ইসলামের এ বিস্ময়কর সফলতার কারণ,ইসলাম শুধু ধর্মে পরিবর্তন আনে না, সাংস্কৃতিক কনভার্শনও আনে। আমূল বিপ্লব আনে বাঁচার সংস্কৃতিতে। ইসলামি রাষ্ট্র ও সভ্যতার মূল শক্তি তো এখানেই। কিন্তু বাংলাদেশের ন্যায় যেসব দেশে ইসলামি রাষ্ট্র ও সভ্যতা নির্মিত হয়নি সেখানে দোষটি ইসলামের নয়। বরং এখানে প্রচণ্ড অসম্পূর্ণতা রয়ে গেছে সাংস্কৃতিক কনভার্শনে। ইসলামকে মানুষ নিছক নামায-রোযা, হজ-যাকাতের বিধানকে কবুল করলেও তার সংস্কৃতিকে কবুল করেনি। বরং মানুষ বেড়ে উঠেছে জাহেলী যুগের দুর্বৃত্তি,সন্ত্রাস,ব্যভিচার ও মিথ্যাচার নিয়ে।দুর্বৃত্তিতে তার বিশ্বের দুই শতটির বেশী রাষ্ট্রকে ৫ বার হারিয়েও দিয়েছে। এটি কি কম বীভৎসতা! জাহিলী যুগের আরবগণ কি এর চেয়েও নীচে ছিল? বাংলাদেশের মুসলমানদের এখানেই বড় ব্যর্থতা। আর সে ব্যর্থতা থেকে আজ হাজারো ব্যর্থতা অসংখ্য ডালপালা নিয়ে গজিয়েছে।

ইসলাম-কবুলের অর্থ ব্যক্তির মনে কোরআনী সত্যের বীজ-রোপন। আর সংস্কৃতি হলো সে বীজ থেকে পত্র-পল্লব, ফুল ও ফলে সুশোভিত বিশাল বৃক্ষ। বিশাল বৃক্ষের বেড়ে উঠাকে নিশ্চিত করতে যেমন লাগাতর পরিচর্যা চাই, তেমনি সাংস্কৃতিক কনভার্শনের জন্যও চাই লাগাতর সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিং। মুসলিম রাষ্ট্র ও মসজিদ-মাদ্রাসার বড় দায়িত্ব হলো সে সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিংকে নিশ্চিত করা। পাশ্চাত্য দেশবাসী একটি নির্দিষ্ট মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি নিয়ে বাঁচে। সে মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি বাঁচিয়ে রাখতে বহু লক্ষ মদ্যশালা, নৃত্যশালা, ক্লাব,ক্যাসিনো, পতিতাপল্লি সেখানে বছরের প্রতিদিন কাজ করছে। সেগুলির পাশে কাজ হাজার হাজার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, অসংখ্য পত্র-পত্রিকা ও টিভি চ্যানেল। সে পাশ্চাত্য সংস্কৃতিকেই তারা বিশ্বময় করতে  চায়। কারণ তাদের বাঁচাটি এখন আর শুধু নিজ দেশে সীমিত নয়। তাদের অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমরনীতির কোন সীমান-সরহাদ নাই। সেটি বিশ্বব্যাপী। সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রয়োজনে অন্যদেশে তাদের বছরের পর বছর কাটাতে হয়। আফগানিস্তান ও ইরাকে লক্ষাধিক মার্কিনী ও ইউরোপীয়রা অবস্থান নিয়ে আছে দশ বছরেরও বেশী কাল ধরে। মাছ যেমন পানি ছাড়া বাঁচে না, মানুষ তো তেমন নিজ সংস্কৃতি ছাড়া বাঁচে না। তারা যেখানে যায় সেখানে শুধু পানাহার চায় না, মদ, জুয়া, ব্যাভিচার, সমকামিতার ন্যায় আরো বহু কিছু চায়। তাই মুসলিম দেশে তাদের বাঁচাটি দুরুহ হয়ে পড়েছে। ফলে নিজ সংস্কৃতির প্রসারে তারা সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিং নেমেছে। মুসলমানদের ধর্মান্তর না ঘটাতে পারলেও তারা চায় তাদের কালচারাল কনভার্শন। সে কাজে হাতিয়ার রূপে ব্যবহার করছে জাতিসংঘকে। জাতিসংঘ ব্যক্তি-স্বাধীনতা, নারী-স্বাধীনতা, পেশার স্বাধীনতার নামে একটি বিধিমালা তৈরী করেছে। সে বিধামালা অনুসারে সমকামিতার ন্যায় ভয়ানক পাপকর্ম যেমন অন্যায় ও অবৈধ নয়, তেমনি অবৈধ নয় ব্যভিচারও। পতিতাদেরকে বলছে সেক্স ওয়ার্কার। মদ্যপান, জুয়াও তাদের কাছে কোন অপরাধ-কর্ম নয়। মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির এই যে পাশ্চাত্যের সংজ্ঞা, সেটিকে তারা অন্যদেশের উপর চাপিয়ে দিতে চায়। না মানলে সে অবাধ্য রাষ্ট্রটির উপর অপরোধ আরোপ করছে, কোথাও কোথাও ড্রোন হামলাও হচ্ছে। সে সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অংশ রূপে বাংলাদেশের মহিলাদের যেমন রাস্তায় মাটি কাটা বা গাছ পাহারায় নিয়োজিত করছে,তেমনি আফগানিস্তানের পর্দানশিন মহিলাদের বেপর্দা করে তাদের নাচ-গান শেখাচ্ছে ও হাতে হারমনিয়াম তুলে দিচ্ছে।

বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশে ইসলামের অগ্রগতি শুধু ধর্মান্তরে সীমিত রয়ে গেছে। সাংস্কৃতিক কনভার্শনের কাজ সফল ভাবে হয়নি। ফলে ইসলামের সভ্যতার নির্মানে অংশ নেয়াটি জনগণের জীবন সংস্কৃতিতে পরিণত হয়নি। বরং অপরিচিত রয়ে গেছে নবীজী(সাঃ)র ইসলাম। নবীজী (সাঃ)র ইসলাম তাদের অনেকের কাছে জঙ্গি ইসলাম মনে হয়। ফলে আরব, ইরান, তুরস্ক ও আফগানিস্তানের জনগণের ইসলাম কবুলের সাথে সাথে সেসব দেশে ইসলাম যেভাবে বিশ্বশক্তি ও সভ্যতা রূপে আবির্ভুত হয়েছিল সেটি বাংলাদেশে হয়নি। এদেশে অন্যদের ইসলাম-কবুল যেমন থেমে গেছে, তেমনি থেমে গেছে ইসলামের সাংস্কৃতিক কনভার্শনও। বরং স্রোত উল্টো দিকে প্রবাহিত হতে শুরু করেছে। মুসলমান দীক্ষা নিচ্ছে অনৈসলামিক ধ্যান-ধারণা ও সংস্কৃতিতে। সোসাল ইঞ্জিনীয়ারীং হচ্ছে ইসলাম থেকে লোকদের দূরে সরানোর কাছে। মঙ্গলপ্রদীপ ও জীবযন্তুর মুর্তি নিয়ে মিছিল হচ্ছে, মুসলিম মহিলারা সিঁধুর লাগাচ্ছে এবং প্রবলতর হচ্ছে অশ্লিলতা। হিন্দু সংস্কৃতি থেকে মুসলমানদের যে ভিন্নতা ছিল সেটি দ্রুত বিলুপ্ত হচ্ছে।

 

নতুন স্ট্রাটেজী

মুসলমানদের খৃষ্টান,ইহুদী বা হিন্দু বানানো এখন আর শত্রু পক্ষের ইস্যু নয়,ইস্যু হলো সাংস্কৃতিক কনভার্শন। তারা এখন স্ট্রাটেজী নিয়েছে ইসলাম থেকে দূরে সরাতে।মুসলিম দেশগুলিতে আজকের প্রচারকগণ গীর্জার পাদ্রী নন,সবাই খৃষ্টানও নন। এসব প্রচারকদের অনেকে যেমন স্বদেশী,তেমনি মুসলমান-নামধারীও। ধর্মের প্রচারকও না হলেও তারা একটি মতের প্রচারক। সে মতবাদটি সেক্যুলারিজম। তারা আল্লাহ-রাসূল বা মুসলমানের ধর্মীয় বিশ্বাসে সরাসরি হামলা করে না। তাদের লড়াইটি সংস্কৃতির ময়দানে। সংস্কৃতি শুধু গান-বাজনা,পোষাক-পরিচ্ছদ বা সাহিত্য নয়,বরং মানুষ যে ভাবে বাঁচে এবং যে রুচি ও মূল্যবোধ নিয়ে বেড়ে উঠে সেটি। জীবন-ধারণের সে প্রক্রিয়ায় তথা সংস্কৃতিতে এতকাল যা প্রভাব রেখেছে তা হলো ধর্ম। তাই ধর্ম পাল্টে গেলে সংস্কৃতিও পাল্টে যায়। আরবের মানুষ যখন ইসলাম কবুল করে তখন তাদের গায়ের রং,দেহের গড়ন বা ভাষা পাল্টে যায়নি। পাল্টে যায় তাদের সংস্কৃতি। ইসলামের পূর্বে মদ্যপান, উলঙ্গ নাচগান ও ব্যাভিচার না হলে তাদের উৎসব হতো না। সে সংস্কৃতিতে পথিককে লুন্ঠন করা,কণ্যাসন্তানকে দাফন করা,মানুষকে ক্রীতদাস বানানো এবং পশুর ন্যায় মানুষকে হাটে তোলা গর্হিত কর্ম গণ্য হত না। বরং এসব ছিল আবহমান আরব সংস্কৃতি।

ঈমান ব্যক্তির অন্তরের বিষয়,সেটি চোখে দেখা যায় না। তবে ঈমান ধরা পড়ে তার বাইরের রূপে। ধরা পড়ে তার কর্ম ও সংস্কৃতিতে। জ্ঞানবান হওয়ার মধ্য দিয়ে যেমন সেটির শুরু,তেমনি লাগাতর ইবাদতের মধ্য দিয়ে সে সংস্কৃতির পরিশুদ্ধি। তাই যার জীবনে ঈমান ও ইবাদত নাই,তার জীবনে উচ্চতর সংস্কৃতিও নাই্।সমাজ ও সংস্কৃতিতে এভাবেই ইসলাম আনে পরিশুদ্ধি। ইসলামের এটাই হলো সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিং। পরিকল্পিত ইঞ্জিনিয়ারিং ছাড়া কোন সুন্দর গৃহ বা শহর গড়ে উঠে না। আধুনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বদৌলতেই দুর্গন্ধময় বস্তি থেকে সুশ্রী নগর নির্মিত হয়। তেমনি সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিং ছাড়া সুন্দর ও সভ্যতর সমাজ গড়ে উঠে না। ইসলামে কালচারাল কনভার্শন এজন্যই গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ধর্মান্তরের মধ্যে ইসলামের প্রচার সীমিত থাকলে তাতে ইসলামী সমাজ,রাষ্ট্র ও সভ্যতার নির্মাণ ঘটে না। ইসলামের প্রচার বহুদেশে হয়েছে, কোটি কোটি মানুষ ইসলাম কবুলও করেছে। কিন্তু সবদেশে সবার সাংস্কৃতিক কনভার্শনটি ঠিক মত হয়নি। ইসলাম কবুলের পরও যদি বেপর্দা ভাবে চলে,যদি মাথা নুইয়ে সালাম করে বা ইসলামে অঙ্গিকারশূণ্য ব্যক্তিকে ভোট দেয়,তবে বুঝতে হবে ইসলাম কবুল করলেও তার সাংস্কৃতিক কনভার্শনটি হয়নি। সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে সে ব্যক্তি হিন্দু বা অমুসলিমই রয়ে গেছে। বাংলাদেশসহ বহু মুসলিম দেশে সে সমস্যাটি প্রকট। বাংলাদেশে ইসলামের প্রচার হয়েছে প্রধানতঃ সুফিদের দ্বারা। নবীজী (সাঃ) এবং তাঁর সাহাবায়ে কেরাম যে ইসলাম পেশ করেছিলেন এসব সুফিগণ সে ইসলাম দেখেননি। সে ইসলামের জ্ঞানলাভ যেমন ঘটেনি, তেমনি সে ইসলামের পূর্ণ প্রকাশও তাদের জীবন ঘটেনি। তারা বেড়ে উঠেছেন পীরের খানকায়, কোন ইসলামি রাষ্ট্রে নয়। ফলে অপূর্ণাঙ্গতা রয়ে গেছে তাদের বেড়ে উঠায়। তাদের জীবনে ইসলামের জিহাদ এবং রাজনীতি যেমন ছিল না,তেমনি ইসলামের সংস্কৃতিও পুরাপুরি ছিল না। ফলে তাদের হাতে যেসব হিন্দু ইসলাম কবুল করেন তারা ইসলামের সংস্কৃতির পূর্ণ পরিচয় পায়নি।অথচ ইসলাম কবুলের অর্থ পুরোপুরি ইসলামে প্রবেশ। কোরআনে নির্দেশ এসেছে,“উদখুলু ফি সিলমে কা’ফ্ফা” অর্থঃ “তোমরা ইসলামে পুরিপুরি প্রবেশ করো”। অর্থাৎ ইবাদত-বন্দেগী,অর্থনীতি,সংস্কৃতি,রাজনীতির কোন অংশকেই ইসলামের বাইরে রাখা যাবে না।

 

পাশ্চাত্য বেঁচে আছে সেক্যুলার সংস্কৃতি নিয়ে

পাশ্চাত্য সভ্যতা আজ  খৃষ্টান ধর্ম বা অন্য কোন ধর্ম নিয়ে বেঁচে নাই,বেঁচে আছে একটি সংস্কৃতি নিয়ে। খৃষ্টান ধর্ম পাশ্চাত্য দেশগুলিতে প্রভাব হারিয়েছে অনেক আগেই। এখানে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে নানা উপাদান নিয়ে। তাতে যেমন প্রাগ-খৃষ্টান যুগের ইউরোপীয় প্যাগানিজম রয়েছে,তেমনি গ্রীক ও রোমান সভ্যতার সংস্কৃতি আছে,তেমনি খৃষ্টানধর্মের কিছু প্রভাবও আছে। তবে এখানে মূল সুরটি সেক্যুলারিজমের তথা ইহজাগতিক সুখসম্ভোগের। ইংরাজীতে যাকে বলা হয় হেডোনিজম। সে সুখ সম্ভোগের তাগিদে পাশ্চাত্য শুধু মদ্যপান,অশ্লিলতা ও উলঙ্গতাকে হালাল করে নেয়নি জায়েজ করে নিয়েছে সমকামিতার ন্যায় আদিম অসভ্যতাকেও। হিন্দু ধর্মের কোন শরিয়ত বা আইনী বিধান নেয়,ফলে এ ধর্মটিও বেঁচে আছে আবহমান এক সনাতন সংস্কৃতি নিয়ে। সাংস্কৃতিক সে আচার এবং ধর্মীয় আচার এখানে একাকার হয়ে গেছে,উভয়ে মিলে হিন্দু সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে। তেমনি খৃষ্টান ধর্মেও হালাল-হারামের কোন বিধান নেই। এটিও পরিনত হয়েছে এক সাংস্কৃতিক শক্তিতে। পাশ্চাত্য চায় সে সংস্কৃতির পৃথিবীব্যাপী প্রতিষ্ঠা। সে লক্ষ্যে তারা দেশে দেশে সাংস্কৃতিক কনভার্শনে মনযোগ দিয়েছে। এবং চালাচ্ছে সোসাল ইঞ্জিনীয়ারীং। পাশ্চাত্যের অর্থে প্রতিপালীত হাজার হাজার এনজিও কাজ করছে বস্তুত সে লক্ষ্যে।

শুরুতে মুসলিম দেশগুলিতে ঔপনিবেশিক খৃষ্টানদের লক্ষ্য শুধু লুণ্ঠন ছিল না। রাজনৈতিক প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠার সাথে খৃষ্টান ধর্মের প্রচারও ছিল। তখন হাজার হাজার খৃষ্টান-পাদ্রী ধর্মের প্রচার নিয়ে গ্রামে-গঞ্জে ঘুরেছে।তাদের সে প্রচেষ্ঠা ফিলিপাইন,পাপুয়া নিউগিনি,ফিজি,পূর্ব-তিমুর,নাগাল্যান্ড,মিজোরামের অমুসলিমদের মাঝে সফলতা মিললেও বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশে ১৯০ বছরের শাসনেও সে সফলতা মিলেনি।মুসলমানদের তারা ইসলাম থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় ধর্মচ্যুৎ করতে পারেনি।তাদের হাতে বহু মুসলিম দেশ অধিকৃত হয়েছে,অজ্ঞতা ও অশিক্ষাও বেড়েছে,কিন্তু তাদের অবস্থা এতটা পচেনি যে খৃষ্টান ধর্ম,বৌদ্ধ ধর্ম বা হিন্দু ধর্মের ন্যায় অন্য কোন ধর্ম তারা কবুল করবে। কয়লা থেকে স্বর্ণ, মলমুত্র থেকে মধুকে পৃথক করতে বিদ্যাবুদ্ধি লাগে না।অজ্ঞতা,ভ্রষ্টতা ও মিথ্যাচারপূর্ণ ধর্মগুলি থেকে ইসলামের শ্রেষ্ঠতা বুঝতেও বেশী বুদ্ধি লাগেনি। গ্রামের মুর্খ মুসলমানেরাও সেটি বুঝে। ফলে হিন্দু ধর্মের গরু-ছাগল,শাপ-শকুন,পাহাড়-পর্বত ও পুলিঙ্গ পুজনীয় হওয়ার ন্যায় প্রকাণ্ড মিথ্যাটি যেমন তাদের কাছে মিথ্যা রূপে ধরা পড়েছে তেমনি ধরা পড়েছে খৃষ্টান ধর্মের হযরত ঈসার ঈশ্বর হওয়া এবং সে ঈশ্বরের শুলে চড়ে মারা যাওয়ার মিথ্যাটিও। ধর্মের নামে এরূপ মিথ্যাচার তাই তারা মেনে নেয়নি।

 

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সমস্যা

বাংলাদেশের মূল সমস্যাটি নিছক অর্থনৈতিক নয়,বরং সেটি সাংস্কৃতিক। সে সাংস্কৃতিক সমস্যার কারণেই অসম্ভব হয়ে পড়েছে সুস্থ্য ও সভ্যমানুষ রূপে বেড়ে উঠায়। সে অসুস্থতা ধরা পড়ছে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও প্রশাসনিক দূর্নীতিতে। ধরা পড়ছে দ্রুত বর্ধিষ্ণু অশ্লিতা ও পাপাচারে। ইসলাম শুধু আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর বিশ্বাস বাড়ায়না। মানুষকে শুধু মসজিদমুখিই করেনা। বরং মানবতা,শ্লিলতা,পবিত্রতা যোগ করে তাদের বাঁচাতে। কিন্তু বাংলাদেশে সেটি ঘটেনি। এখানেই বাংলাদেশের বড় ব্যর্থতা।

সংস্কৃতির নির্মানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানটি হলো জ্ঞান। এই জ্ঞানের কারণেই মুর্খ বাউল,শ্মশানবাসী কাপালিক,জটাধর সাধু এবং জ্ঞানবান ঈমানদারের সংস্কৃতি এক হয় না। ইসলামে জ্ঞানার্জন এজন্যই ফরয। এবং অজ্ঞ থাকাই সবচেয়ে বড় পাপ। জ্ঞানার্জন ছাড়া ব্যক্তির জীবনে সত্যপথ প্রাপ্তি যেমন অসম্ভব,তেমনি সংস্কৃতির নির্মানও অসম্ভব। তবে সে জ্ঞানার্জনে বিশ্ববিদ্যালয় সহায়ক হলেও,ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে অধিক সংখ্যক বিজ্ঞ ব্যক্তি তৈরী হয়েছেন সে সময়ে যখন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ই ছিল না। অপরদিকে বাংলাদেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ইতিহাস গড়েছে বিভ্রান্ত,পথভ্রষ্ট ও দুর্বৃত্ত সৃষ্টিতে। বাংলাদেশকে যারা ৫ বার পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশে পরিণত করলো তারা গ্রামের মূর্খ রাখাল নয়,বরং কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারি ব্যক্তিবর্গ।তারা দেশের কদর্যতা বাড়িয়েছে দেশবাসীকে পথভ্রষ্ট করার মধ্য দিয়ে।

একমাত্র কোরআনী জ্ঞান থেকেই ব্যক্তি পায় পায় শ্লিল ও অশ্লিল,পবিত্রতা ও অপবিত্রতা চেনার সামর্থ। পায় সিরাতুল মোস্তাকীম। অন্যথায় জীবন মিথ্যাচারে পূর্ণ হয়ে উঠে। কোরআনকে এজন্যই মহান আল্লাহতায়ালা হুদা বা ফোরকান রূপে চিত্রিত করেছেন। হুদা’র অর্থ পথ প্রদর্শক আর ফোরকান হলো সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য সৃষ্টিকারি। মুসলমানের সংস্কৃতি এজন্যই খৃষ্টান, হিন্দু, শিখ বা প্রকৃতি পুজারির সংস্কৃতি থেকে ভিন্ন। তবে কতটা ভিন্ন তার উদাহরণ দেয়া যাক। ইসলামে পবিত্র-অপবিত্রতার যে সুস্পষ্ট বিধান তাতে মলমূত্রের ন্যায় গরুর গোবরও অপবিত্র। তাই কাপড়ে গোবর লাগলে তার পবিত্রতা থাকে না। কিন্তু হিন্দুধর্মে সেটি ভিন্ন। গোবর লাগানোটাই এ ধর্মে পবিত্রতা। অপবিত্র আসে বরং হিন্দুর ঘরে মুসলমান আসন নিলে। গোবর দিয়ে লেপে তখন তাতে পবিত্রতা আনা হয়। গান-বাজনা ও নৃত্য ছাড়া হিন্দুদের পুজা হয় না। অথচ ইসলামে সেটিও ভ্রষ্টতা। সিরাতুল মোস্তাকিমে চলায় গান-বাজনা ও নৃত্য যেমন অমনোযোগী করে,তেমনি ভ্রষ্টতাও বাড়ায়।

 

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অধিকৃতি

বাংলাদেশের ন্যায় অধিকাংশ মুসলিম দেশের আজকের বড় সমস্যা এ নয় যে,দেশগুলি শত্রুর হাতে সামরিক ভাবে অধিকৃত হয়েছে। বরং বড় সমস্যা এবং সে সাথে ভয়ানক বিপদের কারণ,দেশগুলির সাংস্কৃতিক সীমান্ত বিলুপ্ত হয়েছে এবং তা অধিকৃত হয়েছে ইসলামের শত্রুপক্ষের দ্বারা। দেশের রাজনৈতিক সীমান্ত বিলুপ্ত না হলেও মুসলিম দেশগুলির সংস্কৃতির মানচিত্র শত্রুপক্ষের দখলে গেছে। ফলে এদেশগুলিতেও সেগুলিই অহরহ হচ্ছে যা কাফের কবলিত একটি দেশে হয়ে থাকে। মুসলিম দেশের সংস্কৃতিও পরিনত হয়েছে মানুষকে আল্লাহর অবাধ্য রূপে গড়া তোলার ইন্সটিটিউশনে। পতিতাপল্লি, নাচের আসর, সিনেমা হল,মদ্যশালাই তাদের একমাত্র প্রতিষ্ঠান নয়,বরং গড়া হচ্ছে এবং নতুন ভাবে আবিস্কার করা হচ্ছে আরো বহু সাংস্কৃতিক আচারকে। মুর্তিপুজাকে বাঁচিয়ে রাখতে যেমন হাজারো মন্দির,তেমনি পাচাচার ও ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বাঁচিয়ে রাখতেও গড়া হয়েছে নানা আচার। এসব হলো শয়তানের সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিং। লক্ষ্য, শয়তানের আচারে কালচারাল কনভার্শন। এলক্ষ্যেই পহেলা বৈশাখ,ভালবাসা দিবস, থার্টি ফাষ্ট নাইট ইত্যাদি নানা দিবসকে বাঙালীর মুসলমানের জীবনে জুড়ে দেয়া হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের হাজার হাজার মুসলিম সন্তান মসজিদে না গিয়ে হিন্দুদের ন্যায় গেরুয়া পোষাক পড়ছে,মঙ্গলপ্রদীপ হাতে নিয়ে শোভাযাত্রা করছে, কপালে তীলক পড়ছে,অশ্লিল নাচগানও করছে। এসব হলো মানুষকে পথভ্রষ্ট ও পাপাচারি বানানোর কৌশল। এরাই বাংলাদেশের ন্যায় প্রতি দেশে শয়তানের পক্ষে লড়াকু সৈনিক,এবং তাদের  যুদ্ধাংদেহী রূপ শরিয়তের প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে।

অনৈসলামিক দেশে বসবাসের বড় বিপদটি খাদ্যাভাব নয়,রোগভোগ বা স্বাস্থ্যহানীও নয়। বরং সেটি সিরাতুল মোস্তাকিম সহজে খুঁজে না পাওয়ার। কারণ রাষ্ট্র,সমাজ ও পরিবার জুড়ে তখন যা প্রবলতর হয় তা সত্যচ্যুতির তথা পথভ্রষ্টতার। ইসলামী রাষ্ট্রের মূল দায়িত্বটি আল্লাহর রাস্তায় চলার সিরাতুল মোস্তাকীমটি জনসম্মুখে তুলে ধরা। কাফের রাষ্টনায়কগণ করে তার উল্টোটি। জনগণের দৃষ্টি থেকে তারা সমাজে সিরাতুল মুস্তাকীমকে লুকায়।কুফর শব্দের আভিধানিক অর্থও লুকানো। তারা বরং পথভ্রষ্টতার পথ গড়ে, এবং সে পথগুলি জাহান্নামের দিকে টানে।বিভ্রান্তির সে ভিড়ে হারিয়ে যায় সিরাতুল মোস্তাকীম। সে সমাজে দর্শন,বিজ্ঞান,ধর্ম,সাহিত্য ও সংস্কৃতির নামে জাহান্নামের ব্যবসায়ীগণ মোড়ে মোড়ে দোকান সাজিয়ে বসে,এবং অন্যদেরও সে পথে ডাকে। বাংলাদেশে শত শত পতিতাপল্লি,শত শত সূদিব্যাংক, হাজার হাজার এনজিও,বহু হাজার সাংস্কৃতিক সংস্থা,হাজার হাজার সিনেমা হল,মদের দোকান তো সে কাজটাই করছে। এমন একটি সমাজে প্রতি পদে পা ফেলতে হয় অতি সতর্কতার সাথে। নইলে পা জাহান্নামের গর্তে গিয়ে পড়ে।

মদ-জুয়া,নাচের আসর,পতিতাপল্লি,সূদীব্যাংক,সেক্যুলার শিক্ষা ও রাষ্ট্র ছাড়া যেমন প্রাশ্চাত্য সংস্কৃতি বাঁচে না,তেমনি নবীজী(সাঃ)র শিক্ষা অনুযায়ী রাষ্ট্র,সমাজ,মসজিদ-মাদ্রাসা ও আইন-আদালত কাজ না করলে ইসলামি সংস্কৃতিও বাঁচেনা। অথচ বাংলাদেশে এ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলি অধিকৃত হয়েছে ইসলামের বিপক্ষ শক্তির হাতে। যারা এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা তারা নামে মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও ইসলামের বিজয় নিয়ে তাদের কোন অঙ্গিকার নাই। ভাবনাও নাই। বরং তেমন একটি আগ্রহ থাকাটাই তাদের কাছে ফৌজদারি অপরাধ। এমন আগ্রহী ব্যক্তিকে তারা চিহ্নিত করে মৌলবাদী সন্ত্রাসী রূপে। তাদের নির্মূলে বরং তারা চিহ্নিত কাফেরদের সাথে কোয়ালিশন গড়ে।

 

অনৈসলামিক রাষ্ট্রের বিপদ ও ঈমানী দায়ভার

ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে বড় নেয়ামতটি হলো,সেখানে স্পষ্টতর হয় সিরাতুল মোস্তাকীম। এবং বন্ধ করা হয় জাহান্নামের পথ। এমন রাষ্ট্রের বরকতে কোটি কোটি মানুষ বাঁচে জাহান্নামের আগুণ থেকে। ইসলামী রাষ্ট্র নির্মান এজন্যই মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নেককর্ম। একাজে সামান্য সময় ব্যয়ও সারারাত তাহাজ্জুদ নামায পড়ার চেয়েও শ্রেষ্ঠ। -(হাদীস)। মহান আল্লাহর কাছে তার মর্যাদা “আনসারুল্লাহ”র তথা আল্লাহর সাহায্যকারির। একাজে তার শত্রুর হাতে তার মৃত্যু হলে সে পাবে শহীদের মর্যাদা। পাবে বিনা বিচারে জান্নাত। মু’মিনের এ মেহনত ও কোরবানীর বরকতেই বিজয়ী হয় আল্লাহর দ্বীন এবং গড়ে উঠে শ্রেষ্ঠতর সভ্যতা। একারণেই শয়তানী শক্তির সবচেয়ে বড় প্রজেক্ট হলো রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকে অসম্ভব করা। সে শয়তানী প্রজেক্ট নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেমেছে বহু রাজনৈতিক দল,বিদেশীদের অর্থে কাজ করছে বহু হাজার এনজিও। দেশটির জন্মকালে ইসলামের প্রতিষ্ঠা যেমন লক্ষ্য ছিল না। তেমনি আজও  নয়। ইসলামের প্রতি অঙ্গিকারকে রাষ্ট্রীয় ভাবে নিন্দিত হচ্ছে সাম্প্রদায়িকতা রূপে। সাংস্কৃতিক কনভার্শনের কাজে বিনিয়োগ হয়েছে ভারতসহ বহু কাফের দেশের শত শত কোটি টাকা। সে বিনিয়োগ ফলও দিয়েছে। সে বিনিয়োগের কারণে,পাকিস্তানের ২৩ বছরে যত দুর্বৃত্ত এবং ইসলামের যত শত্রু তৈরী হয়েছিল বাংলাদেশে গত ৪০ বছরে হয়েছে তার চেয়ে শতগুণ বেশী। ফলে কঠিন হয়ে পড়েছে আল্লাহর শরিয়তি বিধান প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া। দেশ দুর্বৃত্তিতে বিশ্বে পর পর ৫বার প্রথম হওয়ার মূল কারণ তো শয়তানী শক্তির এ বিশাল বিনিয়োগ। শয়তানী শক্তির সে বিনিয়োগ আজ যে শুধু অব্যাহত রয়েছে তা নয়,বরং বহুগুণ বৃদ্ধিও পেয়েছে। বাংলাদেশের মুসলমানদের ভয়ানক বিপদ বস্তুত এখানেই।

ইসলামি চরিত্রের নির্মান যেমন জঙ্গলে সম্ভব নয়, তেমনি পীরের খানকায়, মসজিদে বা নিজগৃহে নিছক কোরআন-হাদীস পাঠের মধ্য দিয়েও সম্ভব নয়। মুসলমানের ঈমান-আক্বীদা কখনই অনৈসলামিক সাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে উঠে না। সে জন্য ইসলামি রাষ্ট্র ও জিহাদী সংস্কৃতি চাই। সাহাবায়ে কেরাম,তাবে ও তাবে-তাবেয়ীগণ মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মানুষ রূপে গড়ে উঠেছিলেন তো ইসলামি রাষ্ট্র এবং সে রাষ্ট্রে জিহাদী সংস্কৃতির কারণেই। মুসলমানদের অর্থ,রক্ত,সময় ও সামর্থের সবচেয়ে বেশী ভাগ ব্যয় হয়েছে তো ইসলামি রাষ্ট্র ও ইসলামি শিক্ষা-সংস্কৃতির নির্মানে। নামায রোযার পালন তো কাফের দেশেও সম্ভব। কিন্তু ইসলামী শরিয়ত ও ইসলামী সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠা ও পরিচর্যাও কি অমুসলিম দেশে সম্ভব? সম্ভব নয় বলেই মুসলমানদের জীবনে হিযরত আসে। সে সাথে জিহাদও আসে। অতীতের ন্যায় আজকের মুসলমানদের উপরও একই দায়ভার। মহান আল্লাহর খলিফা রূপে এটাই একজন ঈমানদারের উপর সবচেয়ে বড় দায়ভার। এ লড়ায়ে সবাইকে ময়দানে নেমে আসতে হয়। এবং লড়াইয়ের শুরুটি কোরআনী জ্ঞানের তরবারী দিয়ে। জ্ঞানার্জনকে এজন্যই নামায-রোযার আগে ফরয করা হয়েছে।

কিন্তু বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশে সে ফরয পালনের আয়োজন কোথায়? অনেকেই জ্ঞানার্জন করছে নিছক রুটিরুজির তালাশে, ফরয আদায় এখানে লক্ষ্য নয়। প্রচন্ড বিচ্যুতি এখানে জ্ঞানার্জনের নিয়তে। ফলে লোভি,শঠ,ধুর্ত ও মিথ্যাচারি ব্যক্তি এ শিক্ষার বদলে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ঘুষখোর,ডাকাত বা সন্ত্রাসীতে পরিনত হচ্ছে। এমন জ্ঞানচর্চায় রুটি-রুজী জুটছে ঠিকই,কিন্তু জ্ঞানার্জনের ফরয আদায় হচ্ছে না। ফলে দেশে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বাড়লেও জিহাদের ময়দানে লোকবল বাড়ছে না। ফলে বিপ্লব আসছে না সমাজ ও রাষ্ট্রে। বাংলাদেশের মুসলমানদের জন্য এটি এক বিপদজনক দিক। আগ্রাসী শত্রুর হামলার মুখে অরক্ষিত শুধু দেশটির রাজনৈতিক সীমান্তুই নয়,বরং প্রচন্ড ভাবে অরক্ষিত দেশের সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক সীমান্তও। ফলে ইসলামের মুল শিক্ষা ও সংস্কৃতিই দেশবাসীর কাছে সবচেয়ে অপরিচিত থেকে যাচ্ছে। অজ্ঞতার বসে শত্রুর সংস্কৃতিকেই শুধু আপন করে নিচ্ছে না,আপন করে নিচ্ছে তাদের ইসলামবিনাশী রাজনৈতিক এজেণ্ডাও।এবং মুসলিম হত্যায় হাতে তুলে নিচ্ছে শত্রুর হাতিয়ার। দেশ তাই দ্রুত অধিকৃত হচ্ছে শত্রুদের হাতে। সেটি যেমন সামরিক,অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভাবে,তেমনি সাংস্কৃতিক ভাবেও। শত্রুর সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিং ও সাংস্কৃতিক কনভার্শন এভাবেই বাংলাদেশের ন্যায় একটি মুসলিম দেশে তাদের বিজয়কে সহজসাধ্য ও কম ব্যয়বহুল করে তুলেছে। সে সাথে ভয়ানক ভাবে বাড়িয়ে তুলেছে দেশবাসীর আখেরাতের বিপদও। তাই আজকের লড়াইটি নিছক রাজনৈতিক নয়।স্রেফ অর্থনৈতিকও নয়।সেটি যেমন শত্রুর হাত থেকে দখলদারি মুক্তির,তেমনি ইসলামি রাষ্ট্র ও সংস্কৃতি নির্মানের। ২৮/০৪/১২

 




ঈদ কেন মানব সভ্যতার সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসব?

উৎসবটি মহান আল্লাহতায়ালা-প্রদত্ত-

পৃথিবীর নানা দেশে নানা ধর্মের ও নানা জাতির মানুষের মাঝে শত শত বছর ধরে চলে আসছে বিচিত্র উৎসব। কিন্তু সে সব উৎসব থেকে ঈদ যে অনন্য ও শ্রেষ্ঠতর তা নিয়ে কি সামান্যতম সন্দেহ আছে? সামান্যতম সন্দেহ চলে কি মহান আল্লাহতায়ালার হিকমত, প্রজ্ঞা ও তাঁর প্রদত্ত বিধানগুলির কল্যাণধর্মীতা নিয়ে? আল্লাহতায়ালার প্রতিটি সৃষ্টির মধ্যেই তাঁর অসীম কুদরতের পরিচয়। ধরা পড়ে মানব কল্যাণে মহান আল্লাহর মহা আয়োজন। ঈদ সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসব হওয়ার কারণ,এটি কোন মানুষের আবিস্কৃত উৎসব নয়। এটি এসেছে মহান আল্লাহতায়ালা থেকে।মানব সভ্যতার সর্বশেষ্ঠ উৎসব হওয়ার জন্য এই একটি মাত্র কারণই যথেষ্ঠ। ঈদের সে সর্বাঙ্গ সুন্দর বিধান,সেটি যে কোন বিবেকবান ও সুস্থ্য চেতনার মানুষের চোখে ধরা পড়তে বাধ্য। আলোচ্য নিবন্ধের সেটিই আলোচ্য বিষয়। কিন্তু তা নিয়ে অবিশ্বাস থাকতে পারে একমাত্র তাদের যাদের অবিশ্বাস আল্লাহতায়ালার অস্তিত্ব, তাঁর প্রজ্ঞা ও তার অপার সৃষ্টি ক্ষমতা নিয়ে। এখানে সমস্যা তাদের অসুস্থ্য বিবেকের,ঈদ উৎসবের নয়।এমন মানসিক অসুস্থ্যতার কারণে তারা যেমন ইসলামের ইবাদতের বিধানের মধ্যে কোন শ্রেষ্ঠত্ব খুঁজে পায়না তেমনি পায়না মুসলমানদের ঈদ উৎসবের মাঝেও।

ঈমানদারের জীবন চলে মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশিত সিরাতুল মোস্তাকীম বেয়ে। এ পথে চলায় মুসলমানের জীবনে যেমন প্রচুর ত্যাগ-তিতীক্ষা ও জান-মালের কোরবানী আছে, তেমনি খুশিও আছে। দুঃখ-বেদনার সাথে উৎসবও আছে। তবে সে উৎসবে মোহচ্ছন্নতা নাই, আছে পবিত্রতা। মুসলিম বিশ্বের ঘরে ঘরে ঈদ তাই পবিত্র উৎসব বা খুশি বয়ে আনে। এমন খুশির দিন সারা বছরে মাত্র দু’টি। একটি ঈদুল ফিতর, এবং অপরটি ঈদুল আযহা। এ খুশির দিন দু’টিতে প্রতিটি মুসলিম দেশ নতুন ভাবে সাজে। কিন্তু কেন এ খুশি বা উৎসব? খুশি বা উৎসব তো আসে বিশাল বিজয় বা বড় কিছু অর্জনের পর। কিন্তু কি সে বিজয় বা অর্জন, যার জন্য মুসলমানেরা ঘরে ঘরে ঈদের খুশি করবে? অন্য ধর্ম বা অন্য জাতির উৎসব ইসলামের এ উৎসবের পার্থক্য কোথায়? ঈদের শ্রেষ্ঠত্বই বা কি? কেনই বা দিন দু’টি মানব-সংস্কৃতিতে অনন্য? ইসলাম শান্তি ও কল্যাণের ধর্ম, কিন্তু এ উৎসবে শান্তি ও কল্যাণই বা কি? খৃষ্টান,বৌদ্ধ ও শিখ ধর্মের অনুসারিরা তাদের ধর্মের প্রচারকদের জন্ম বা মৃত্যু দিবসকে উৎসবের দিনে পরিণত করেছে,কিন্তু ইসলাম সেটি করেনি। অন্যদের উৎসবগুলির দিনক্ষণ ও উপলক্ষ তাদের মনগড়া,কিন্তু ঈদের উৎসব ও তার দিনক্ষণ নির্ধারিত হয়েছে মহান আল্লাহ থেকে। তিনি যেমন পবিত্র কোরআন দিয়েছেন এবং নামায-রোযা,হজ-যাকাতের বিধান দিয়েছেন,তেমনি এ উৎসবটিও দিয়েছেন। উৎসবের পরিকল্পনায় ও উদযাপনের যে বিধানটি মহান আল্লাহতায়ালা থেকে আসে তাতে কি কোন ত্রুটি থাকতে পারে?

মুসলমানদের এ দুটি উৎসবের পেক্ষাপট যেমন ভিন্ন,তেমনি ভিন্ন তার লক্ষ্যও। এ দুটি উৎসবের কোনটিই কোন বিখ্যাত ব্যক্তির জন্মদিবস উদযাপনের লক্ষ্যে যেমন নয় তেমনি বছরের সুন্দরতম কোন দিনকে মহামান্বিত করার লক্ষ্যেও নয়। উভয় উৎসবই নির্ধারিত হয়েছে মহান আল্লাহর অনুগত গোলাম রূপে তাঁর বান্দাহ কতটা সফল বা বিজয়ী হলো সে বিষয়টিকে সামনে রেখে। এদিক দিয়ে মানব জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে সফল এবং বিজয়ী ব্যক্তিটি হলেন হযরত ইব্রাহীম (আঃ)। তিনি বিস্ময়কর প্রজ্ঞা দেখিয়েছেন কোন বৈজ্ঞানিক আবিস্কারে নয়,বরং মহা সত্যের আবিস্কারে। এবং সফলতা দেখিয়েছেন সে সত্যের আপোষহীন অনুসরণে। তিনি খুঁজে পেয়েছেন মহান আল্লাহকে। মানব জাতির ইতিহাসে এরচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ আবিস্কার আছে কি? বৈজ্ঞানিক আবিস্কারে ব্যর্থতার কারণে কেউ জাহান্নামে যাবে না, জাহান্নামে যাবে সত্য আবিস্কারে ব্যর্থতার কারণে। কি আল্লাহর উপর অটল বিশ্বাসে,কি ইবাদতে, কি হিজরতে, কি আত্মত্যাগে – আল্লাহর প্রতিটি হুকুমে তিনি নিষ্ঠার সাথে লাব্বায়েক বলেছেন। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর সে নিষ্ঠাকে নিয়ে বার বার গর্ব করেছেন। আল্লাহর নির্দেশে তিনি নিজ জন্মস্থান ছেড়ে নানা দেশের পথে পথে ঘুরেছেন। স্ত্রী হাজেরা এবং শিশুপুত্র ঈসমাইলকে যখন জনমানব শূণ্য মক্কার বুকে ছেড়ে আসার নির্দেশ এসেছে তখনও তিনি নিজের ও নিজ-পরিবারের স্বার্থকে গুরুত্ব দেননি। বরং গুরুত্ব দিয়েছেন মহান আল্লাহর ইচ্ছাকে। ফলে আল্লাহতায়ালার সে নির্দেশের জবাবে তিনি ত্বরিৎ লাব্বায়েক বলেছেন। রাব্বুল আলামীনকে খুশি করতে নিজ পুত্র ঈসমাইলকে কোরবানী করতে তাঁর গলায় ছুড়িও চালিয়েছেন। নিজ খেয়াল-খুশি ও নিজ প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে মানব জাতির ইতিহাসে এটাই হলো সবচেয়ে বড় বিজয়। আল্লাহপাক তাঁর এ বিজয়ে এতই খুশি হয়েছিলেন যে তাঁর সে বিজয়কে তিনি মানবজাতির উৎসবে পরিণত করেছেন। এবং সেটি ক্বিয়ামত অবধি। মুসলমান হওয়ার অর্থ মূলতঃ মহান আল্লাহর প্রতি হুকুমে লাব্বায়েক তথা “আমি হাজির বা প্রস্তুত” বলার ধর্ম। দ্বীনে ইব্রাহীমের এটিই মূল শিক্ষা। মুসলিম নামটিও তাঁরই দেয়া। হযরত ইব্রাহীম (আঃ)র মূল কৃতিত্বটি হলো,খেয়ালখুশি ও প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে আল্লাহর উপর ঈমানকে তিনি বিজয়ী করেছেন। সে অটল ঈমান কে ব্যক্ত করেছিলেন এভাবে,“নিশ্চয়ই আমার নামায,আমার কোরবাণী,আমার বেঁচে থাকা এবং আমার মৃত্যুবরণ –সবকিছুই আল্লাহর জন্য।” মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর সে প্রদীপ্ত উচ্চারণকে এতটাই পছন্দ করেছেন যে পবিত্র কোরআনে নিজ কথাগুলোর পাশে হযরত ইব্রাহীমের সে কথাগুলোকেও ক্বিয়ামত অবধি মানবজাতির জন্য শিক্ষণীয় করেছেন। মানব ইতিহাসে এর চেয়ে বড় বিজয় আর কি হতে পাররে? এ বিজয় সামরিক বিজয় নয়,শারিরীক শক্তি বা কুশলতার বিজয়ও নয়,বরং কুফরির উপর ঈমানের।হযরত ইব্রাহীম হলেন মুসলিম উম্মাহর পিতা। ঈদুল আজহার দিনে বিশ্বের মুসলমানগণ বস্তুতঃ পিতার সে বিজয়কে নিয়ে উৎসবই করে না,বরং তার আদর্শের সাথে একাত্মতাও জাহির করে। এর চেয়ে পবিত্র উৎসব আর কি হতে পারে?

 উৎসব প্রবৃত্তির উপর ঈমানের বিজয় নিয়ে

অপর দিকে ঈদুল ফিতর হাজির হয় বিজয়ের আরেক প্রেক্ষাপটে। সেটি মাসব্যাপী আত্মসংযম, আত্মপরিসুদ্ধি, ও আল্লাহতে আত্মসমর্পণের। উৎসব আসে মাহে রামাদ্বানের মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ শেষে। অন্য মাসে পানাহারের ন্যায় বহু কিছুই হালাল, কিন্তু সেগুলির বহু কিছুই রোযা কালীন সময়ে হারাম। ঈমানদার হওয়ার শর্তই হলো হারাম-হালাল নিয়ে আল্লাহর প্রতিটি হুকুমের কাছে আত্মসমর্পণ করা। সেটি জীবনের প্রতি মুহুর্তে। “শুনলাম এবং মেনে নিলাম” –থাকতে হবে এমন এক সদাপ্রস্তুত চেতনা। তেমন একটি চেতনার কারণে মু’মিন ব্যক্তি একান্ত নিভৃতেও কিছু খায় না। তীব্র ক্ষুধা বা প্রচণ্ড তৃষ্ণার মুখেও খাদ্য বা পাণীয় মুখে দেয় না। লোক দেখাতে মানুষ নামায পড়তে পারে,অর্থদান করতে পারে,এমন কি হজও করতে পারে। কিন্তু লোক দেখানোর সে লোভ কি একান্ত গোপনে কিছু খাওয়া থেকে বিরত রাখতে পারে? এক্ষেত্রে যেটি কাজ করে তা হলো আল্লাহর ভয় তথা তাকওয়া। নামায-রোযা, হজ-যাকাতের ন্যায় ইসলামে যত ইবাদত তার লক্ষ্য মাত্র একটিই। তা হলো ঈমানদারের জীবনে তাকওয়া বৃদ্ধি। প্রশ্ন হলো তাকওয়ার অর্থ কি? তাকওয়া হলো, জীবন যাপনের প্রতি পদে মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিটি হুকুম ও তাঁর প্রদর্শিত সিরাতুল মুস্তাকীম মেনে চলার গভীর তাড়না। সে সাথে সে প্রদর্শিত পথ থেকে বিচ্যুতির প্রচণ্ড ভয়। যার মধ্যে মহান আল্লাহতায়ালার হুকুম মেনে চলার তাড়না নাই এবং তাঁর প্রদর্শিত পথ থেকে বিচ্যুত হওয়ার ভয়ও নেই, তার মধ্যে যে বিন্দুমাত্র তাকওয়াও নাই –তা নিয়ে কি সন্দেহ থাকে? মহান আল্লাহতায়ালার কাজে কোরবানীর রক্ত বা গোশতো পৌঁছে না, রুকু-সিজদাও পৌঁছে না। পৌঁছে এই তাকওয়া। ব্যক্তির প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা তো এটাই যে সে তার সকল বুদ্ধিবল ও অর্থবলকে তাকওয়ার বল বাড়াতে ব্যয় করবে। এটিই আখেরাতের মুদ্রা। ব্যক্তির জীবনে তাকওয়া সুস্পষ্ট দেখা যায়, -যেমন দেখা যায় মুর্তিপূজা, ব্যক্তি পূজা, চুরি-ডাকাতি ও সন্ত্রাসীর ন্যায় দুবৃত্তি। যে ব্যক্তি ঘুষ খায়, সূদ খায়, সূদ দেয়, মিথ্যা কথা বলে, রাস্তায় বেপর্দা চলে, চুরি-ডাকাতি ও সন্ত্রাসী করে এবং দেশে শরিয়ত, হুদুদ, খেলাফত ও জিহাদের বিরুদ্ধে  রাজনীতি করে -সে ব্যক্তির মাঝে কি সামান্যতম তাকওয়া আছে? সে তো মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর দ্বীনের দুষমন। সে যদি সারা বছর রাজা রাখে, শত শত গরুবাছুর কোরবানী করে বা প্রতি বছর হজ্ব করে -তাতে কি তাকওয়ার প্রমাণ মেলে? তাতে কি পাপ মোচন হয়? বরং সে ব্যক্তিই তো তাকওয়ার অধিকারী বা প্রকৃত মুত্তাকী যে মাসভর রামাদ্বানের রোযা রাখে এবং আল্লাহর প্রতিটি হুকুমকে মেনে চলে । সেই বস্তুতঃ বিজয়ী। এ বিজয় লোভ-লালসা ও প্রবৃত্তির খায়েশাতের উপর তাকওয়ার বিজয়। মুমিনের জীবনে ঈদুল ফিতর আসে সে বিজয়ের উৎসব নিয়ে।

ঈদুল ফিতরের গুরুত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব বুঝতে হলে রোযার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বুঝা জরুরী। এবং ঈদুল আযহার গুরুত্ব বুঝতে হলে বুঝতে হয় হযরত ইব্রাহীম (আ:)র জীবনের মিশন। ব্যক্তির সে সমঝ-বুঝই ঈদকে ইবাদতে পরিণত করে; এবং জনগণের জীবনে জন্ম দেয় গভীর সাংস্কৃতিক বিপ্লবের। নইলে ঈদ অর্থশূণ্য থেকে যায়। নামাযের ন্যায় রোযারও মূল লক্ষ্য হলো, মুসলমানদের মনে তাকওয়া বা আল্লাহভীতি সৃষ্টি। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে,“হে ঈমানদারগণ রোযা তোমাদের উপর ফরয করা হয়েছে, যেমন ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর যেন তোমরা তাকওয়া তথা আল্লাহর ভয় অর্জন করতে পার।”- সুরা বাকারা, আয়াত ১৮৩)। আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত,মাগফেরাত এবং আখেরাতে নাজাত প্রাপ্তির জন্য অপরিহার্য হলো এই তাকওয়া। জান্নাতে প্রবেশের এটিই হলো মূল চাবি। তাকওয়া হলো মু’মিনের মনে আল্লাহর কাছে জবাবদেহীর সার্বক্ষণিক এমন এক জাগ্রত চেতনা যা তাকে প্রতিদিন ও প্রতিক্ষণে আল্লাহর প্রতিটি হুকুমের আজ্ঞাবহ গোলামে পরিণত করে। ফলে ঈমানদারের প্রতিটি দিন ও প্রতিটি মুহুর্ত কাটে আল্লাহর প্রতি হুকুমের আনুগত্য নিয়ে। সেটি প্রকাশ পায় তার কথা,কর্ম ও আচরণে। আর আল্লাহর যে কোন হুকুমের আনুগত্যই তো ইবাদত। তাই ঈমানদারের ইবাদত শুধু নামায-রোযা,হজ-যাকাতে সীমাবদ্ধ থাকে না,সে তো সর্বক্ষণের আবেদ। এরূপ তাকওয়াকে মু’মিনের জীবনে স্থায়ী তথা সার্বক্ষণিক করাই রামাদ্বানের রোযার মূল লক্ষ্য। মু’মিনের ঈমান তখন দৃশ্যমান হয় তাঁর ধর্ম-কর্ম,আচার-আচারণ,ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজনীতি,সংস্কৃতি, যুদ্ধবিগ্রহ তথা জীবনের সর্বাঙ্গ জুড়ে। এভাবে রোযা আল্লাহর গোলামীকে ব্যক্তির জীবনে চির অভ্যাসে পরিনত করে। তখন সে আল্লাহর গোলাম শুধু নামাযে নয়,শুধু রোযা বা হজকালীন সময়ে নয় বরং সর্বক্ষণে এবং সর্বক্ষেত্রে। এটিই হলো মু’মিনের জীবনে সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন। সে তখন পরিণত হয় মহান আল্লাহর সেনাদলের সার্বক্ষণিক সৈনিকে। মাহে রামাদ্বান তাই ইসলামের অতিগুরুত্বপূর্ণ ট্রেনিংয়ের মাস। ট্রেনিং পর্বের শিক্ষাগ্রহণে যারা কৃতকার্য হয় তাদের নিয়ে ট্রেনিং শেষে যেমন সমাপনি উৎসব হয় তেমনটি আছে ইসলামেও। ঈদুল ফিতরের উৎসব তো সেটাই।

রামাদ্বানের এ পবিত্র মাসটিতে তাকওয়া অর্জনে যারা সফল হয়, সেসব মোত্তাকীদের জন্য এ মাসটিতে রয়েছে বিশাল সুখবর। তাদের জন্য মহান আল্লাহতায়ালা খুলে দেন রহমত,মাগফেরাত এবং নাজাতের দ্বার। এ মাসেই রয়েছে লায়লাতুল ক্বদর যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। এ পবিত্র মাসে যারা রোযা রাখে, তারাবিহ নামায পড়ে, নানাবিধ নফল ইবাদত করে এবং মিথ্যা-ইর্ষা-কুৎসা-গিবত ও নানাবিধ খারাপ কর্ম থেকে বাঁচে এবং লায়লাতুল ক্বদরের রাতে মহান আল্লাহতায়ালা থেকে মাগফেরাতের সুযোগ নেয়, এ মাস তাদের জন্য বয়ে আনে জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য। এ পবিত্র মাসের ইবাদতের বরকতে মাফ হয়ে যায় অতীত জীবনের সকল গুনাহ। এবং বিপুল সমৃদ্ধি আসে ঈমানে। মু’মিনের জীবনে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কি হতে পারে? ব্যবসায়ীক লাভ,পেশাদারি সাফল্য,বিপুল অর্থপ্রাপ্তি বা কর্ম জীবনের অন্য কোন সফলতায় কি এমন অর্জন ঘটে? এমন সফলতা খুশি বয়ে আনবে সেটিই কি যথার্থ নয়? আল্লাহতায়ালাও চান,তাঁর অনুগত বান্দারা জীবনের এ বিশাল অর্জনের পর উৎসব করুক। সেই জন্যই তিনি ঈদুল ফিতরের বিধান দিয়েছেন।

রামাদ্বান হলো প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মাস। যুদ্ধজযের পর যোদ্ধারা যেমন মহাধুমধামে উৎসব করে, ঈমানদারেরাও তেমনি প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধজয়ের পর উৎসব করে। ঈদুল ফিতরে ঘটে সে উৎসবেরই আয়াজন। তবে এ পবিত্র মাসটিতে যারা রোযা রাখেনি এবং তাকওয়া অর্জন করেনি, প্রকৃত অর্থেই তারা ব্যর্থ। এ পবিত্র মাসটিতে নিজেদের বিদ্রোহী প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তারা অংশই নেয়নি। ফলে তারা বিজয়ী হবে কীরূপে? বরং পরাজিত ক্ষুধা,যৌনতা,অশ্লিলতা তথা অবাধ্য প্রবৃত্তির কাছে। ঈদুল ফিতরের উৎসবের দিনে এমন পরাজিত ব্যক্তিদের জন্য খুশির কিছু নেই। এদিন তো তাদের জন্য মাতমের। তারা তো মহান আল্লাহর অবাধ্য বান্দাহ। এরূপ অবাধ্যতা তো কুফরি। তাদের সে অবাধ্যতা বিমূর্ত হয় শুধু রামাদ্বানে নয়, বরং বছরের অপর ১১টি মাসেও। রামাদ্বানের এ ব্যর্থতা তাদের জীবনে দুঃখময় বিপর্যয় ডেকে আনে। এমন বিপর্যয় নিয়ে তারা উৎসব করে কি করে? নবীজী (সাঃ) তাই তাদের জন্য বলেছেন,“মাহে রামাদ্বানে যারা রোযা রাখেনি তাদের জন্য এ ঈদ খুশির নয়, বরং বড়ই অখুশির।”

আনন্দ যেখানে সার্বজনীন

ইসলামের কল্যাণের ধর্ম। কল্যাণ চায় ব্যক্তির সাথে সমষ্ঠিরও। কল্যাণ চায় সমাজের ধনী-দরিদ্র সর্বশ্রেণীর মানুষের। তাই উৎসবের মাঝেও সে কল্যাণ-চেতনা থেকে ঈমানদারদের বিচ্যুতির অবকাশ নেই। এ দিনে সমাজের সচ্ছল মানুষেরা আনন্দ করবে করবে আর অভাবী মানুষেরা সে আনন্দ নীরবে দেখবে সে বিধান ইসলামে নাই। ঈদের আনন্দ এখানে সার্বজনীন। খুশির এ দিনটিতে কল্যাণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে সমাজের অভাবগ্রস্থ দুঃখী মানুষেরও। অনাথ-ইয়াতিম-দুস্থ্য মানুষেরাও যাতে ঈদের খুশিতে সামিল হতে পারে সে জন্য ঈদের জামায়াতে শামিল হওয়ার পূর্বে তাদের হাতে ফিতরার টাকা পৌঁছে দিতে হয় প্রতিটি স্বচ্ছল মুসলমানকে। নবীজী (সাঃ) হাদীস,যে ব্যক্তি ফিতরা না দিয়ে ঈদের নামাযে হাজির হয় তার রোযা আল্লাহর আরশের নীচে শূণ্যে ভাসতে থাকে। তাই রোযা কবুলের শর্ত হলো ঈদের নামাযে হাজির হওয়ার পূর্বে পরিববারে প্রতিটি সদস্যের মাথাপিছু ফিতরা আদায় করা। এটি গরীবের হক,ধনীর দান বা কৃপা নয়। সমাজের অভাবগ্রস্থদের খুঁজে বের করার দায়িত্ব এখানে প্রতিটি স্বচ্ছল ব্যক্তির। সম্পদ লাভের সাথে সাথে মু’মিনের ঘাড়ে এ এক বাড়তি দায়িত্ব। গরীবেরা এসে তার দরওয়াজায় ধর্ণা দিবে এবং ফিতরা ভিক্ষা করবে সেটি ইসলামের বিধান নয়। এমন বিধানে গরীবের প্রচ্ণ্ড অসম্মান হয়। এভাবে গরীবের অসম্মান বাড়িয়ে কি ঈদের খুশি হয়? নির্মিত হয় কি সামাজিক সংহতি? প্রতিষ্ঠা পায় কি শান্তি? ইসলাম ভিক্ষাবৃত্তির সংস্কৃতি গড়ে না, গড়ে দানের সংস্কৃতি। ইসলাম তাই ধনীকে বরং গরীবের দরজায় ছুটতে বলে। খলিফা হযরত উমর (রাঃ) তাই আটার বস্তা নিজের কাঁধে চাপিয়ে ক্ষুদার্ত মানুষের ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন। সম্পদ-লাভ এভাবেই মু’মিনের জীবনে অহংকার না বাড়িয়ে দায়িত্ববোধ বাড়ায়। অর্থ এভাবেই তাঁকে পরীক্ষার মুখে ফেলে। ইসলাম চায় সমাজের ধনী-দরিদ্র সর্বস্তরের মানুষের মাঝে সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় মজবুত একতা। দানখয়রাত এবং গরীবের কল্যাণ চিন্তা সে একতার নির্মাণে সিমেন্টের কাজ করে। দুস্থ দরিদ্র জনগণ তখন সমাজের হৃদয়বান স্বচ্ছলব্যক্তিদের আপন ভাবতে শেখে। শোষন-নির্ভর পুঁজিবাদী দেশে ধনী-দরিদ্রের যে বিশাল বিভাজন ও বিভেদ সেটি রাজনৈতীক লড়াই ও রক্তক্ষয়ী শ্রেণীযুদ্ধের জন্ম দেয়্, কিন্তু ইসলামী সমাজে সেটি ঘটে না। বরং সমাজের ধনী ব্যক্তিগণ বুঝে,অর্থসম্পদ তাদের উপর মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত আমানত। যেরূপ পবিত্র আমানত হলো তার নিজ জীবন। মু’মিনের দায়িত্ব হলো, অর্পিত এ আমানতকে আল্লাহরই নির্দেশিত পথে ব্যয় করা। নইলে প্রচণ্ড খেয়ানত হয়। আর সে খেয়ানত ইহকালে আযাব এবং পরকালে জাহান্নাম ডেকে আনে। তাই মু’মিন ব্যক্তি সম্পদশালী হলে জীবন যাপনে স্বেচ্ছাচারি হয় না,এবং স্বেচ্ছাচারি হয়না সম্পদের ব্যয়েও। আর এমন একটি আত্মসচেতন ও আত্মসমর্পিত চেতনার কারণেই বাংলাদেশের মত একটি দরিদ্র দেশেও ঈদুল ফিতরের উৎসবে বহু শতকোটি টাকা ধনীর পকেট থেকে গরীবের ঘরে গিয়ে পৌঁছে। ফিতরার অর্থের সাথে যোগ হয় বহু শত কোটি টাকার যাকাতের অর্থ। ফলে আনন্দের ছোয়া লাগে লক্ষ লক্ষ গরীব মানুষের ঘরে। মুসলিম সমাজে এমন অর্থ হস্তান্তরের ফলে ক্রয় ক্ষমতা বাড়ে বহু কোটি দরিদ্র মানুষের। ফলে রক্ত-সঞ্চালন হয় অর্থনীতিতে। মুসলিম দেশ তো এই ভাবেই সামাজিক কল্যাণ ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথে এগুয়। একই ভাবে ঈদুল আযহার দিনে হাজার হাজার টন কোরবানীর গোশত বিতরণ হয় মুসলমানদের ঘরে। আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার ফলে মক্কা থেকে কোরবানীর গোশত গিয়ে পৌছে বহু হাজার মাইল দূরের শত শত ইয়াতিম খানা,উদ্বাস্তু শিবির ও দুস্থ্য পল্লীতে। অর্থাভাবে বা পুষ্টির অভাবে মুসলিম প্রাণ হারাবে সেটি একারণেই অভাবনীয়। এবং সেটি ঘটলে বুঝতে হবে,সে সমাজ যে শুধু বিবেকশূণ্য তাই নয়, ইসলামশূণ্যও। ইসলামের প্রাথমিক যুগে যাকাতের অর্থ নেয়ার লোক পাওয়া যেত না মদিনাতে। অর্থের সুষ্ঠ বণ্ঠন হলে প্রতি সমাজেই তেমনটি ঘটে। অভাব, দুর্ভিক্ষ ও অনাহারে মৃত্যু তো সামাজিক অবিচার,অর্থনৈতিক শোষণ,রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্বৃত্তির ফল। অতীতে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ নেমে এসেছে তো এগুলির ফলে। একই কারণে,দুনিয়ার সবচেয়ে সম্পদশালী দেশ হওয়া সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বহু নগরীতে বহু দুস্থ্য মানুষের বাস।

অনন্য উৎসব সমগ্র মানবসংস্কৃতিতে

প্রতি ধর্মে এবং প্রতি জাতির জীবনেই উৎসব আছে। আনন্দ প্রকাশের নানা দিনক্ষণ,পর্ব এবং উপলক্ষও আছে। কিন্তু ইসলামের ঈদে যেরূপ সার্বজনীন কল্যাণ চিন্তা আছে সেটি কি অন্য ধর্মে আছে? ইসলামের ন্যায় অন্য কোন ধর্মে ধনীদের উপর দরিদ্রদের জন্য অর্থদান বাধ্যতামূলক? খৃষ্টান ধর্মে সবচেয়ে বড় উৎসব হলো ক্রীসমাস। এ উৎসবে বিপুল সাজ-সজ্জার আয়োজন আছে,বিস্তর অর্থব্যয়ও আছে। কিন্তু সে উৎসবে যাকাত-ফিতরার ন্যায় গরীব মানুষের অর্থদানের নির্দেশ নেই। ক্রীসমাসের দিনে যে ভোজের আয়োজনের করা হয় সেগুলি নিতান্তই পারিবারীক। তাতে বিপুল আয়োজন হয় খাদ্য ও পানীয়ের। মদ্যপান হয়, নাচগানও হয়। বিপুল আদান-প্রদান হয় উপহারের। কিন্তু সে উৎসবে দরিদ্র মানুষের কি ভাগ আছে? সেসব পারিবারীক ভোজে এবং উপহারের আদান প্রদানে পরিবারের বাইরের মানুষের কোন অধিকার নেই। তাছাড়া ক্রীসমাসের উৎসবে প্রকৃতির উপর নাশকতাই কি কম? কোটি কোটি গাছ কেটে ঘরে ঘরে ক্রীসমাস ট্রি সাজানো হয়। উৎসবের পর সে সবুজ গাছগুলোকে আবর্জনার স্তুপে ফেলা হয়।একই ভাবে বিপুল তছরুপ হয় পুঁজা উৎসবে। শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে ও হাজার হাজার মুর্তি নির্মাতার বহু শ্রমে গড়া হয় হাজার হাজার মুর্তি। কিন্তু এত শ্রম,এত অর্থ,এত কাট-মাটি ও রংয়ে গড়া মুর্তিগুলি অবশেষে পানিতে ফেলা হয়। এতে দূষিত হয় নদী ও জলাশয়ের পানি। ভারতীয় হিন্দুদের বড় উৎসব হলো দেয়ালী। সেখানেও কি নাশকতা কম? শত শত কোটি টাকা ব্যয় হয় বৈদ্যুতিক বাতিতে শহরগুলি সাজাতে। বিপুল অর্থ ব্যয় হয় আতশ বাজীতে। তাতে যেমন পরিবেশদূষণ ঘটে,তেমনি মাঝে মাঝে ভয়ানক দূর্ঘটনাও ঘটে। অথচ এত অর্থব্যয়ের মাঝে গরীবের অর্থদানের কোন ব্যবস্থা নাই। পুজার মন্ডপে আয়োজিত হয় হিন্দি ফিল্মি গান ও অশ্লিল নাচ। ফলে পবিত্রতা কোথায়? কোন আয়োজন তো তখনই পবিত্রতা পায় যখন সেটি একমাত্র মহানস্রষ্টাকে খুশি করার উদ্দেশ্যে আয়োজিত হয়। এবং যিকর হয় তাঁর পবিত্র নামের। কিন্তু যেখানে ফিল্মি গান ও নাচের অশ্লিলতা সেখানে কি পবিত্রতা থাকে? ইসলামের ঈদে কি এমন অপচয়, এমন নাচগান ও অশ্লিলতার আয়োজন আছে? বর্ষবরণ,বসন্তবরণ,জাতীয় দিবস উপলক্ষে দেশে যে উৎসব হয় তাতেও কী গরীব মানুষের কোন কল্যাণ চিন্তা থাকে? থাকে কি পবিত্রতা?

অথচ ঈদের উৎসবের শুরু আতশবাজি বা উলুধ্বনির মধ্য দিয়ে নয়। এতে নাচগান যেমন নেই, তেমন মদ্যপানও নেই। বরং দিনের শুরুটি হয় অজু-গোছলের মধ্য দিয়ে। পরিবারের সবাই পরিধান করে উত্তম পোষাক। পাঠ করা হয় মহান আল্লাহর নামে তাকবীর। এভাবে দিনের শুরু থেকেই প্রাধান্য পায় পবিত্রতা। মহল্লার ঈদগাহে বা মসজিদে সে হাজির হয় আল্লাহর নামে তাকবীর দিতে দিতে। এদিনটিতে বিশাল জামায়াতে নামায হয়, খোতবাহ হয় এবং আল্লাহর দরবারে সমবেত দোয়া হয়। দোয়া শেষে একে অপরের সাথে কোলাকুলি হয়। এরপর শুরু হয় প্রতিবেশীর গৃহে ঈদের শুভেচ্ছা-সাক্ষাতের পালা। ঈদের এ দিনটিতে ঘরের দরওয়াজা সবার জন্য খোলা। কারো গৃহে মেহমান হওয়ার জন্য এ দিনে কোন দাওয়াতের প্রয়োজন পড়ে না। আত্মীয় হওয়ারও প্রয়োজন পড়ে না। মহল্লার যে কেউ যে কোন গৃহে কুশল বিনিময়ে হাজির হতে পারে। এরূপ নির্মল আয়োজন কি অন্য ধর্মে আছে? ইসলাম যেমন জামায়াতবদ্ধ ভাবে নামায আদায়ের উপর গুরুত্ব দেয়,তেমনি জামায়াতবদ্ধতা ও সমাজবদ্ধতার গুরুত্ব দেয় উৎসব পালনেও। ঈদের দিন বেশী বেশী মানুষের সাথে দেখা হবে, কুশল বিনিময় হবে এবং কোলাকোলি হবে –তেমনি একটি লক্ষ সামনে রেখে নবীজী (সাঃ) সূন্নত হলো ঈদগাহের নামাযে এক পথ দিয়ে যাওয়া এবং অন্য পথ দিয়ে ফেরার।

ঈদ দেয় মিশন নিয়ে বাঁচার নব প্রত্যয়

অনর্থক গাছ কাটা দূরে থাক,গাছের একটি ডাল ভাঙ্গা বা পাতা ছেড়াও ইসলামে হারাম। ফলে কোটি কোটি বৃক্ষ নিধন করে উৎসব পালন কীরূপে ধর্মীয় কর্ম রূপে গণ্য হতে পারে? অপর দিকে মদ্যপান এবং নাচ-গান ব্যক্তির মন থেকে আল্লাহর স্মরণকে বিলুপ্ত করে। বিনষ্ট করে সত্যসন্ধানী মানুষের ধ্যানমগ্নতা,এবং বিচ্যুতি আনে সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে। অন্য বহুজাতির উৎসবে যেমন মদ্যপান আছে তেমনি নাচগাণ এবং অশ্লিলতাও আছে। ফলে প্রচণ্ডতা পথভ্রষ্টতাও আছে। শয়তান সরাসরি আল্লাহকে অস্বীকার করতে বলে না,মুর্তিকেও পুজা করতে বলে না। হযরত আদম (আঃ)কে ইবলিস কখনই এমন অবাধ্য হতে বলেনি। কিন্তু মিথ্যা প্রলোভনে সে ভূলিয়ে দিয়েছিল মহান আল্লাহর দেয়া নির্দেশকে। ভুলিয়ে দেয় আল্লাহর স্মরণ ও আনুগত্য। মদ্যপান ও নাচ-গান তো সেটিই করে। ফলে মুসলমানের উৎসবে যেমন নাচগান নাই, তেমনি মদ্যপানও নাই। কোনরূপ অশ্লিলতাও নাই। সকল প্রকার ভেদা-ভেদ ভূলে এক জামায়াতে নামায পড়া এবং অন্যকে বুকে জড়িয়ে আলিঙ্গন করা,নিজঘরে প্রতিবেশীকে আপ্যয়ন করা হলো ইসলামের সংস্কৃতি। এমন আলিঙ্গণে ও আপ্যায়নে ধনী-দরিদ্র,আমির-উমরাহ,শাসক-প্রজার মাঝে কোন দুরত্ব রাখার সুযোগ নাই। বরং সবাইকে একই সমতলে খাড়া করে। এবং বিলুপ্ত করে বর্ণভেদ, গোত্রভেদ ও শ্রেণীভেদের বিভক্তি। উচ্চতর সমাজ নির্মাণে অপরিহার্য হলো মানুষে মানুষে এমন ভাতৃত্ব ও সৌহার্দ। সভ্যতর ও সমৃদ্ধতর সমাজ নির্মাণে এমন ভাতৃত্ব হলো সবচেয়ে বড় পুঁজি তথা সোস্যাল ক্যাপিটাল। মুসলমানের জীবনে এটিই তো মহান মিশন। মিশন এখানে বিভক্তির দেওয়াল ভাঙ্গার। প্রকৃত মুসলমান ঈদের উৎসবমুখর দিনেও সে পবিত্র মিশন ভূলে না। বরং সে মিশন নিয়ে বাঁচায় পায় নব প্রত্যয়। সমগ্র মানবসংস্কৃতিতে এমন পবিত্র ও সৃষ্টিশীল উৎসব কি দ্বিতীয়টি আছে? (তৃতীয় সংস্করণ, ২৫/০৭/১৪, দ্বিতীয় সংস্করণ ২/০৮/১৩), প্রথম সংস্করণ ১৭/০৮/১২ (২৯শে রামাদ্বান, ১৪৩৩)।