ভারতের আগ্রাসন-স্ট্রাটেজী এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা প্রসঙ্গ

ভোট-ডাকাতদের প্রশংসায় ভারত

ভারতের শাসক মহলে যে বিষয়টি প্রচণ্ড ভাবে কাজ করে তা হলো ইসলাম ও মুসলিম ভীতি। বাংলাদেশের শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ যেহুতু মুসলিম, ফলে ভারতীয়দের মনে সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশ ভীতিও। সে ভয়ের ভিত্তিতেই প্রণীত হয় বাংলাদেশ প্রসঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্র নীতি, সামরিক নীতি, বাণিজ্য নীতি, মিডিয়া নীতি এবং সীমান্ত নীতি। বাংলাদেশে কতটা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেল, জনগণ কতটা ন্যায় বিচার ও নাগরিক অধিকার পেল, মিডিয়া কতটা স্বাধীনতা পেল -সেগুলি ভারতের কাছে আদৌ বিবেচ্য বিষয়ই নয়। বরং তাদের কাছে যা গুরুত্ব পায় তা হলো, বাংলাদেশের মুসলিম জনগণকে কতটা দাবিয়ে রাখা হলো, ইসলামের উত্থানকে কতটা প্রতিহত করা হলো এবং হিন্দুদের কতটা উপরে তোলা হলো -সেগুলি। সে এজেন্ডা বাস্তবায়নে ভারত চায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিশ্বস্থ্য ও অনুগত কলাবরেটর। ভারতের সে এজেন্ডা পালনে অনুগত কলাবরেটর রূপে কাজ করছে শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগ। সেটি ১৯৭১ সাল থেকে নয়, বরং তার বহু আগে থেকেই। অন্য কোন দল ভারতের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। ভারত তার কাঙ্খিত লক্ষ্য পূরণে সব সময়ই চায়, বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতা আওয়ামী লীগের হাতে থাকুক। আওয়ামী লীগের বিজয় কি ভাবে হলো -সে ভাবনা ভারতের নাই। সে বিজয় যদি ভোট ডাকাতির মাধ্যমে হয় -ভারত তাতেও খুশি এবং সেটি কি স্বচ্ছ নির্বাচন বলে প্রচার ও করে বা শাপলা চত্ত্বরের গণহত্যার ন্যায় বার বার গণহত্যাও করে -ভারত তাতেও সমর্থন দিবে। এমন কি সমর্থনও করবে। এজন্যই ২০১৪ ও ২০১৮ সালের ভোট-ডাকাতি ভারতীয় শাসক মহলে প্রশংসা কুড়িয়েছে।  সেরূপ পলিসি ভারত একাত্তর থেকেই প্রয়োগ করে আসছে। ফলে তাদের কাছে মুজিবের একদলীয় বাকশালী অসভ্যতাও গ্রহন যোগ্য হয়েছে। গ্রহণ যোগ্য গণ্য হয়েছে লক্ষাধিক বিহারী হত্যা এবং তাদের ঘর-বাড়ি, ব্যবসা-বানিজ্য দখলের অসভ্যতা। গ্রহনযোগ্য হয়েছে ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে অধিকৃত থাকা কালে হাজার হাজার কোটি টাকার অস্ত্র ও সম্পদের লুটপাট। যেমন আজ গ্রহণযোগ্য হচ্ছে মায়ানমার সরকারের রোহিঙ্গা নির্মূলের অসভ্যতা।   

শেখ হাসিনা ও তার পিতা শেখ মুজিব ভারতকে যতটা সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে -তা অন্য যে কোন স্বাধীন দেশ থেকে পেতে ভারতকে রীতিমত যুদ্ধ করতে হতো। অথবা সে দেশের অর্থনীতিতে বিশাল অংকের বিনিয়োগ করতে হতো। যেরূপ পশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলি ও জাপানকে বন্ধু রূপে পেতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশাল বিনিয়োগ করেছে বিধ্বস্ত সে দেশগুলির পুনঃনির্মাণে। কিন্তু ভারত যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে সেরূপ কিছুই করেনি। অথচ বাংলাদেশ থেকে স্বার্থ উদ্ধার করেছে কোনরূপ অর্থব্যয় না করেই। কারণ তারা জানে, চাকর-বাকরদের থেকে কিছু পেতে বিনিয়োগ করতে হয় না, এজন্য কিছু উচ্ছিষ্ট ব্যয়ই যথেষ্ঠ। ভারতীয় বর্ণ হিন্দুরা শেখ মুজিব, শেখ হাসিনা বা কোন বাঙালী মুসলিমকে কোনকালেই কি চাকর-বাকরের চেয়ে বেশী কিছু ভেবেছে? ব্রিটিশ শাসনের শেষ দিকে অবহেলিত বাঙালী মুসলিমগণ যখন অবিভক্ত বাংলার শাসকে পরিণত হলো, তখনই তারা মনের দুঃখে বাংলার বিভক্তি চাইলো এবং অবাঙালী হিন্দু ভারতে যোগ দিল। 

ভারত বাংলাদেশের সমুদ্র বন্দরগুলি ব্যবহারের অধিকার নিয়েছে এবং বুকের উপর করিডোর নিয়েছে কোনরূপ রোড ট্যাক্স বা ট্রানজিট ফি না দিয়েই। কারণ, চাকর-বাকরের ভিটার উপর দিয়ে হাটতে জমিদারকে কোন ফি দিতে হয় না। কৃতজ্ঞতাও জাহির করতে হয় না। বরং কথায় কথায় চাকর-বাকরদের গালি বা ধমকি দেয়াটি জমিদারের অধিকার। তাই শেখ মুজিবের শাসনামলে ভারত বাংলাদেশ থেকে বেরুবাড়ি ছিনিয়ে নিয়েছে প্রতিশ্রুত তিন বিঘা করিডোর না দিয়েই। গঙ্গার ও তিস্তার পানি নিয়েছে, কুশিয়ারা ও সুরমার পানিতেও হাত দিচ্ছে। এবং লাগাতর ধমকি দিচ্ছে প্রতিবেশী আসাম ও পশ্চিম বাংলা থেকে বাঙালী মুসলিমদের বাংলাদেশে পাঠানোর। অপর দিকে ভারতকে খুশি করার খাতিরে উত্তর-পূর্ব ভারতের স্বাধীনতাকামী  মজলুম জনগণের মুক্তিযুদ্ধের সাথে শেখ হাসিনা ও তার দলের গাদ্দারিটা কি কম? সেটি একমাত্র ভারতকে খুশি করার লক্ষ্যে। অথচ বাংলাদেশের সাথে এ বিশাল এলাকার মুক্তিকামী মানুষের কোন কালেই কোন শত্রুতা ছিল না। বরং তারা বাংলাদেশের মিত্র ও বাংলাদেশী পণ্যের বিশাল বাজার হতে পারতো।

ভারতের একমাত্র বিনিয়োগ বাংলাদেশের রাজনীতি, সংস্কৃতি ও মিডিয়াতে। সেটি দেশের প্রচার, প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান  ও সেনাবাহিনীতে ভারতসেবী বিশাল দাসবাহিনী গড়ে তোলার স্বার্থে। এ বিনিয়োগের মূল লক্ষ্য, ইসলাম ও মুসলিমের বিরুদ্ধে ভারতের নাশকতাকে তীব্রতর করা। ভারতের এ বিনিয়োগে এক দিকে যেমন সীমাহীন স্বাধীনতা বেড়েছে ভারতসেবী দাসদের, তেমনি পরাধীনতা বেড়েছে বাংলাদেশের জনগণের। এর ফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মুসলিমদের পিটাতে একাত্তরের ন্যায় ভারতকে তার নিজের সেনাবাহিনী নামাতে হচ্ছে না। সেটি অতি নৃশংস ভাবেই করছে প্রতিপালিত দাসরাই। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই ভারতের মূল স্ট্রাটেজী হলো, বাংলাদেশের বুকে ভারতীয় দাসদের শাসনকে প্রতিষ্ঠা দেয়া এবং সেটিকে দীর্ঘায়ীত  করা। সেরূপ এক দাস-শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই ভারত একাত্তরে যুদ্ধ লড়েছিল। সে যুদ্ধটির মূল লক্ষ্য পূর্ব সীমান্তে পাকিস্তানের ন্যায় আরেক স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠা ছিল না। বাঙালী মুসলিমদের গণতান্ত্রিক অধিকার দেয়াও ছিল না। বরং লক্ষ্য ছিল, ভারতসেবী শেখ মুজিব ও তার দলকে মুসলিম ও ইসলাম দলনে পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়া।এবং সেটি জনগণের স্বাধীনতাকে পদদলিত করে। শেখ মুজিবের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু মৃত্যু হয়নি ভারতের আগ্রাসী নীতির। ফলে মুজিবের ন্যায় শেখ হাসিনাও পাচ্ছে গণতন্ত্র হত্যা ও ফ্যাসিবাদি স্বৈরাচারে ভারতের পক্ষ থেকে পূর্ণ সহযোগিতা। এজন্যই ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের ভোট-ডাকাতিকে সমর্থণ দিতে ভারত বিলম্ব করেনি।

সাম্রাজ্যবাদি শক্তি মাত্রই জনগণের বলকে নিজের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ মনে করে। ভারতও তেমনি বিপদ মনে করে বাঙালী মুসলিমের  বর্ধিষ্ণ শক্তিকে। এজন্যই ভারতের পলিসি হলো, বাংলাদেশের জনগণকে যে কোন মূল্যে দ্রুত শক্তিহীন করা। সেটি স্বৈরাচারি শাসন চাপিয়ে এবং জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে। গণতন্ত্র হত্যায় ভারতের বিনিয়োগটি এজন্যই বিশাল। সেরূপ বিনিয়োগ দেখা গেছে যেমন ২০০৮ সালের নির্বাচনে তেমনি অন্যান্য নির্বাচনেও। আসামের দৈনিক নববার্তা পত্রিকাটি গত ২১/১০/২০১৩ তারিখে প্রথম পৃষ্ঠায় এ মর্মে লিড খবর ছাপে যে,হাসিনাকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার জন্য ২০১৪ সালের নির্বাচনে ভারত এক হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে। উক্ত পত্রিকায় ভাস্কর দেব আরো রিপোর্ট করে, ভারত গত ২০০৮ সনের নির্বাচনে ৮ শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছিল। বলা হয়, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতি নির্বাচনেই ভারত বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে। তবে ২০১৮ সালে ভারতকে পূজি বিনিয়োগ করতে হয়নি। কারণ, ভোট-ডাকাতিতে পূজি লাগে না, লাগে অস্ত্রধারি ডাকাত। শেখ হাসিনা সে ডাকাতদের সংগ্রহ করেছে দেশের পুলিশ ও সেনাবাহিনী থেকে। ডাকাতিতে সহায়তা দিয়েছে দেশের প্রশাসন ও নির্বাচনি কমিশন।

 

ভয় মুসলিম বাংলাদেশ নিয়ে

প্রশ্ন হলো, আওয়ামী লীগের পিছনে ভারতের এরূপ বিনিয়োগের হেতু কি? হেতু, স্বাধীন মুসলিম-বাংলাদেশ ভীতি। ভারত ভয় পায় বাংলাদেশের ১৬ কোটি মুসলিমের ইসলামের মৌল বিশ্বাস নিয়ে বেড়ে উঠা নিয়ে। ইতিহাসের ছাত্র মাত্রই জানে, ১৯৪৭’য়ে হিন্দুদের অখন্ড ভারত নির্মাণের স্বপ্নকে যারা ধুলিতে মিশিয়ে দিয়েছিল তারা পাঞ্জাব, সিন্ধু, সীমান্ত প্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ, বিহার বা অন্যকোন প্রদেশের মুসলিম নয়, তারা ছিল বাঙালী মুসলিম। ১৯০৬ সালে ঢাকায় মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা থেকে ১৯৪০ সালে লাহোরে পাকিস্তান প্রস্তাব-পাশ ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলন পর্যন্ত প্রতিটি পর্বে তারাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। সে চুড়ান্ত সময়ে মুসলিম লীগের মূল দুর্গটি ছিল বাংলায়। আজও সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার বুকে যে ভূখন্ডটিতে সবচেয়ে বেশী মুসলিমের বাস সেটিও পাঞ্জাব, সিন্ধু, আফগানিস্তান নয়, বরং সেটি বাংলাদেশ। আর যেখানে এত মুসলমানের বাস সেখানে ইসলামের জাগরণের ভয় থেকেই যায়। কারণ ঘুম যত দীর্ঘই হোক, সেটি ঘুম; মৃত্যু নয়। একসময় সে ঘুম ভেঙ্গে যায়। বাংলার মুসলিমগণ সাতচল্লিশে জেগে উঠেছিল। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর আবার ঘুমিয়ে পড়িছিল। আর সে ঘুমের ঘোরেই ভারতীয় বাহিনী বাংলাদেশে ঢুকে তার দাসদের সহায়তায় বিরাট সর্বনাশটি করেছিল। কিন্তু বাংলার মুসলিমগণ যে আবার জেগে উঠতে উদগ্রীব -সে আলামত তো প্রচুর। আর তাতেই প্রচণ্ড ভয় ধরেছে ভারতীয়দের মনে।

বাংলার মুসলিমদের সাতচল্লিশের জিহাদটি ছিল উপমহাদেশের অন্যান্য এলাকার মুসলিমদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার। কারণ, প্রাসাদ গড়তে যেমন বৃহৎ ভূমি লাগে, তেমনি সভ্যতা গড়তে লাগে বিরাট একটি রাষ্ট্র এবং সে রাষ্ট্রে নানা বর্ণ, নানা অঞ্চল ও নানা ভাষার মানুষের বৃহৎ জনগোষ্ঠি। এ সামর্থ্য একক বাংলাভাষীদের থাকার কথা নয়। এজন্যই  মুসলিমকে শুধু নানা বর্ণ ও নানা ভাষার মানুষের সাথে একই জায়নামাজে  দাঁড়িয়ে নামায পড়ার সামর্থ্য থাকলে চলে না, একত্রে অখণ্ড এক রাষ্ট্র গড়ার সামর্থ্যও থাকতে হয়। একই কারণে প্রাথমিক যুগের মুসলিমদের মক্কা-মদিনা বা হেজাজের ক্ষুদ্র গন্ডি পেরিয়ে বিশাল এক দেশ গড়তে হয়েছে। সাতচল্লিশের সে জিহাদটি ছিল দু’টি বৃহৎ শক্তির বিরুদ্ধে। একদিকে ছিল সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ বিশ্বশক্তি, অপর দিকে ছিল আগ্রাসী বর্ণ হিন্দুশক্তি। মূল লক্ষ্যটি ছিল, বিশ্ব-রাজনীতিতে মুসলমানদের হৃত গৌরবকে আবার ফিরিয়ে আনা। বাঙালী মুসলিমদের পক্ষে একাকী ভাবে সে যুদ্ধে বিজয় সম্ভব ছিল না। উপমহাদেশের মুসলিমদের সম্মিলিত প্রচেষ্ঠার ফলেই সেদিন হিন্দু ও ব্রিটিশ -এ উভয়শক্তির বিরোধীতার সত্ত্বেও জন্ম নিয়েছিল বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান। ভারত শুরু থেকে সে বৃহৎ পাকিস্তানকে মেনে নিতে পারিনি; তেমনি মেনে নিতে পারছে না পাকিস্তান ভেঙ্গে জন্ম নেয়া বাংলাদেশকে। তাদের ভয়, না জানি এটিই আরেক পাকিস্তানে পরিণত হয়। কারণ বাংলার ভূমি ও জনসংখ্যা ইসরাইলের চেয়ে ক্ষুদ্রতর নয়। ভারতের ভয়ের আরো কারণ, একাত্তরে পূর্ব পাকিস্তান বাংলাদেশে পরিণত হলেও বাঙালী মুসলিমের মন থেকে ইসলাম বিলুপ্ত হয়নি। বরং দিন দিন সে ইসলামী চেতনা আরো বলবান হচ্ছে। সে সাথে প্রবলতর হচ্ছে ভারতের পূর্ব প্রান্তে ইসলামি শক্তি রূপে বেড়ে উঠার সাধ। আর তাতেই ভয় তীব্রতর হচ্ছে আগ্রাসী ভারতীয়দের মনে। সেটি আঁচ করা যায় ভারতীয় পত্র-পত্রিকায় সেদেশের রাজনৈতীক নেতা, বুদ্ধিজীবী ও কলামিস্টদের লেখা পড়লে। আর এতে ভারতের কাছে কদর বাড়ছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বেড়ে উঠা দেশটির ঘরের শত্রুদের। 

 

ভারতীয়দের “আপনজন” ও “পশ্চিমবঙ্গের মেয়ে হাসিনা”

ভারতের জন্য অপরিহার্য হলো, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নিজ স্বার্থের বিশ্বস্থ পাহারাদার। সেটি না হলে পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ সৃষ্টিতে ভারতের যুদ্ধ ও বিনিয়োগের মুল উদ্দেশ্যই বানচল হয়ে যায়। তাতে বিপদে পড়বে পূর্ব সীমান্তে ভারতের নিরাপত্তা। তবে পাহারাদারীর কাজে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীগণ যে ভারতের আপনজন -সে সাক্ষ্যটি এসেছে ভারতীয় রাজনীতির অন্যতম এক নীতিনির্ধারকের মুখ থেকে। তিনি হলেন ভারতের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শ্রী সুশীলকুমার শিন্দে। শেখ হাসিনার ভারতপ্রেমে তিনি এতটাই মোহিত হন যে, এক অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনাকে তিনি “ভারতের আপনজন’ এবং “যেন পশ্চিমবঙ্গের মেয়ে” রূপে আখ্যায়ীত করেছেন। সে খবরটি ছেপেছিল কোলকাতার দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা তার ২০১৩ সালের ৭ই নভেম্বর সংখ্যায়। সুশীলকুমার শিন্দে এ কথাটি বলেছেন পাঞ্জাবের আট্টারি-ওয়াঘা সীমান্তের ধাঁচে বেনাপোল-পেট্রাপোল সীমান্তে জয়েন্ট রিট্রিট সেরিমনির সূচনা পর্বের এক সমাবেশে।

প্রতিটি বিনিয়োগের পিছনেই থাকে মুনাফা লাভের আশা। মুনাফা লাভের সম্ভাবনা না থাকলে একটি টাকা ও একটি মুহুর্তও কেউ বিনিয়োগ করে না। আর বাংলাদেশে ভারতের বিনিয়োগটি কোনকালেই খয়রাত ছিল না। খয়রাত ছিল না একাত্তরের যুদ্ধে ভারতীয়দের বিপুল অর্থ ও রক্তের বিনিয়োগও। তবে বাংলাদেশ থেকে ভারতের মুনাফা তোলার মাত্রাটি অত্যাধিক বেড়ে যায় যখন শাসনক্ষমতা আওয়ামী লীগের হাতে যায়। ২০০৮ সালে হাসিনার ক্ষমতায় আসাতে ভারত যে প্রচুর মুনাফা তুলেছে সে সাক্ষ্যটি এসেছে খোদ ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শ্রী শিন্দের মুখ থেকে। বাংলাদেশ থেকে তারা এতই নিয়েছিল যে তাতে সাধ জেগেছিল কিছু প্রতিদান দেয়ার। তবে সেটি বাংলাদেশের জনগণকে নয়, সেটি খোদ হাসিনাকে। সে প্রতিদানটি দিতে চায় তাকে ২০১৪ সালে পুণরায় ক্ষমতায় বসানোর মধ্যদিয়ে। সে লক্ষ্যেই বাংলাদেশের ২০১৪ সালের নির্বাচনে ভারতের বিনিয়োগ ছিল এক হাজার কোটি রুপি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শিন্দের ভাষায়ঃ “পাঁচ বছরে হাসিনার আমলে ঢাকা ভারতকে যে ভাবে সহযোগিতা করেছে, তার প্রতিদান দিতে নয়াদিল্লিও বদ্ধপরিকর”। তাছাড়া আগামী নির্বাচন শুধু বাংলাদেশীদের জন্যই নয়, ভারতীয়দের কাছেও অতি গুরুত্বপূর্ণ। সে অভিমতটি সে সময় এসেছে ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থা RAW’য়ের বাংলাদেশ ইনচার্জ ও সিনিয়র অফিসার শ্রী বিবেকানন্দ থেকে। তিনিও জানিয়েছেন, বাংলাদেশের ২০১৪ সালের নির্বাচন ভারতের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ। আর নির্বাচনের গুরুত্ব বাড়লে তাতে ভারতীয়দের বিনিয়োগও যে বাড়বে সেটিই তো স্বাভাবিক।

 

আত্মতৃপ্তি ভারতসেবীর

দাসদের জীবনে বড় চাওয়া-পাওয়াটি হলো মনিব থেকে নিষ্ঠাবান দাস রূপে স্বীকৃতি লাভ। সে স্বীকৃতিটুকু পাওয়ার মাঝেই তারা জীবনের সার্থকতা ভাবে। “দারোগা মোরে কইছে চাচি আমি কি আর মানুষ আছি”–এমন এক দাসসুলভ আত্মতৃপ্তি ফুটে উঠেছে বেনাপোল-পেট্রাপোল সীমান্তের জয়েন্ট রিট্রিট উৎসবে উপস্থিত বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীরের কথায়। গত ৬/১১/১৩ তারিখে অনুষ্ঠিত সে সেমিনারে ভারতের স্বরাষ্ট্র সুশীলকুমার শিন্দে যখন শেখ হাসিনাকে “ভারতের আপনজন’ এবং “যেন পশ্চিমবঙ্গের মেয়ে” আখ্যায়ীত করেন তখন করতালি দিয়ে সে কথাকে স্বাগত জানিয়েছেন মহিউদ্দিন খান আলমগীর। তিনি তার নিজের বক্তৃতাতে ভূয়সী প্রশংসা করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহের। ভারত-বাংলাদেশের বন্ধুত্বকে ‘চিরায়ত’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, এ জন্য আমরা গর্বিত। সে সময় সুশীলকুমার শিন্দে বলেন,“দু’দেশের বন্ধুত্বের কথা বলতে গেলে শেখ হাসিনাজির কথা বলতেই হয়। আমার তো মনে হয়, উনি যেন এই বাংলারই মেয়ে। আমাদের অত্যন্ত আপনজন।” শিন্দের নিজের কথায়, “বাংলাদেশের মাটিতে আশ্রয় নেওয়া এদেশের জঙ্গি সংগঠনগুলিকে উচ্ছেদ করার ক্ষেত্রে হাসিনা সরকারের ভূমিকা প্রশংসনীয়। ভারত নিশ্চয়ই তার প্রতিদান দেবে।”

শ্রী শিন্দের কথায় বুঝা যায়, শেখ হাসিনার উপর ভারতীয় নেতাদের এত খুশির কারণ, বাংলাদেশের মাটিতে ইসলামপন্থিদের নির্মূলে তার নির্মম নৃশংসতা। ভারতীয় সেনাবাহিনী কাশ্মীরের মুসলিমদের সাথে যেরূপ আচরণ করতে ভয় পায়, শেখ হাসিনা তার চেয়েও নৃশংসতর আচরণ করেছে ইসলামপন্থিদের সাথে। ইসলামপন্থিদের নির্মূল-কর্মে আদালতকেও ব্যবহার করা হচ্ছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে যে আদালত বসানো হয়েছে -সেটি তো সে লক্ষ্যেই। সে অপরাধ কর্মে হাসিনা ঢাল হিসাবে ব্যবহার করছে নিজের মুসলিম নামের পরিচিতি। তিনি বলে থাকেন, আমিও মুসলমান। দাবি করেন, সকালে নাকি কোরআনে পড়ে কাজ শুরু করেন। প্রশ্ন হলো, অন্তরে সামান্য ঈমান থাকলে কেউ কি মুসল্লীদের উপর গুলি চালাতে পারে? সংবিধান থেকে বিলুপ্ত করে কি আল্লাহর উপর আস্থার বানী? নিষিদ্ধ করতে পারে কি তাফসির মহফিল? সে কি বিরোধীতা করে মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তী বিধান প্রতিষ্ঠার? অথচ হাসিনা তো এর সবগুলিই করছেন। এদের সম্পর্কেই পবিত্র কোরআনে মহান রাব্বুল আ’লামীন বলেছেন, “তারা নিজেদের মুসলিম হওয়ার অঙ্গিকারটিকে ঢাল রূপে ব্যবহার করে। অথচ তারা আল্লাহর রাস্তা থেকে (মানুষকে) দূরে হটায়। কতই না নিকৃষ্ট হলো তারা যা করে সে কাজগুলি।”-(সুরা মুনাফিকুন আয়াত ২)।

বাংলাদেশের সীমান্তে আগামীতে যদি কোন বিদেশী সেনাবাহিনীর আগ্রাসন হয় তবে সেটি ১২ শত মাইল দূরের পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দ্বারা হবে না। বাংলাদেশের শিশুরাও সেটি বুঝে। বাংলাদেশের উপর আজ যাদের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য সেটিও পাকিস্তানের নয়, সেটি ভারতের। বাংলাদেশের সীমান্তে আজ যারা ভারতীয় বিএসএফের গুলিতে মারা যাচ্ছে তারা পাকিস্তানী সীমান্ত প্রহরী নয়, তারা ভারতীয়। এবং ভারতীয়দের সে হামলার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের রাজপথে ও মিডিয়াতে যারা প্রতিবাদমুখর তারাও আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের কেউ নয়। তারা হলো বাংলাদেশের ইসলামি জনতা। ভারতীয়দের ভাষায় এরাই হলো বাংলাদেশের ইসলামি মৌলবাদী শক্তি। ভারত নিজের অপরাধগুলি দেখতে চায় না,বরং মৌলবাদী রূপে গালি দেয় তাদের যারা ভারতের সে আগ্রাসী নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে। ভারতীয়রা চায়, সিকিমের ন্যায় বাংলাদেশও ভারতের বুকে লীন হয়ে যাক। চায়,বাংলাদেশের মানুষ শেখ মুজিব, হাসিনা ও আওয়ামী ঘরানার রাজনৈতীক নেতাকর্মী ও বুদ্ধিজীবীর ন্যায় দাসসুলভ চরিত্র নিয়ে বেড়ে উঠুক। এ দাসদের বিশ্বাস, দাসসুলভ এ আত্মসমর্পণটি হলো ভারতের একাত্তরের ভূমিকার জন্য তাদের দায়বদ্ধতা। কিন্তু সেটি হচ্ছে না দেখেই ভারত প্রচন্ড বিক্ষুব্ধ। সে সাথে প্রচন্ড ভীত বাংলাদেশের বুকে প্রতিবাদী মানুষের বিপুল উত্থান দেখে।

 

দাস-শাসনের কবলে বাংলাদেশে 

ইসলামের উত্থানের ফলে শুধু বাংলাদেশের রাজনীতিতে নয়, ভারতের রাজনীতিতেও যে ভূমিকম্প শুরু হবে তা ভারতীয় নেতারা বুঝে। কারণ ভারতে রয়েছে ২০ কোটি মুসলমানের বাস -যা সমগ্র বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম জনগোষ্ঠি। তাদের হিসাবে প্রতিটি মুসলিমই হলো সুপ্ত টাইম বোমা। সময়মত ও সুযোগমত তা বিস্ফোরিত হতে বিলম্ব করে না। তাছাড়া রাজনৈতীক জাগরণটি প্রচন্ড ছোঁয়াছেও। তাই যে বিপ্লব তিউনিসিয়ায় শুরু হয়েছিল তাই মিশর, লিবিয়া, ইয়েমেন, জর্দান, বাহরাইন ও সিরিয়ায় কাঁপন ধরিয়েছে। সম্প্রতি কাঁপন ধরিয়েছে আলজিরিয়ায়। ঠোঁট উড়ে গেলে দাঁতেও বাতাস লাগে। তাই বাংলাদেশে ভারত সেবী দাসশক্তির দুর্গ বিলুপ্ত হলে ভারতেও তার আছড় পড়বে। ইসলামের জোয়ার নিয়ে ভারত এজন্যই চিন্তিত। ভারতীয় নেতারা তাই বার বার বলছে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামপন্থিরা বিজয়ী হলে তা পাল্টে দিবে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি। তখন সে বিপ্লব আঘাত হানবে শুধু ভারতে নয়, রোহিঙ্গার মুসলিম ভূমিতেও। ভারত চীনকে সে কথা বলে সে দেশের নেতাদের ইসলামের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে উস্কানি দিচ্ছে। এজন্যই ভারত  চায়, বাংলাদেশের মুসলিমদেরকে যে কোন মূল্যে ইসলাম থেকে দূরে রাখতে। চায়, ইসলামপন্থিদের নির্মূল। সে লক্ষ্যে চায়, ইসলাম বিরোধীদের অব্যাহত শাসন। ভারতীয় শাসকচক্রের বাংলাদেশ বিষয়ক নীতির সেটিই মূল কথা। সে লক্ষ্যে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের বিনিয়োগটি এজন্যই এত বিশাল।

তবে আওয়ামী লীগের জন্য ভারত থেকে অর্থ সাহায্যের প্রয়োজন কমেছে। দলটির হাতে এখন বাংলাদেশের রাজস্ব-ভাণ্ডার। তবে এখন জরুরী হলো, বিশ্বের দরবারের দিল্লির কুটনৈতিক সাপোর্ট এবং নিজ দেশে ভারতীয় গোয়েন্দাদের লাগাতর তদারকি। তবে এরূপ সাপোর্ট ভারত দিয়ে আসছে ১৯৭১ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিজয়ের পর থেকেই। প্রতিদানে ভারত পাচ্ছে আনুগত্য। ভারতের প্রতি আনুগত্য নিয়েই শেখ মুজিব ইসলামপন্থিদের রাজনীতিকে নিষিদ্ধ করেছিলেন; এবং জেলে তুলেছিলেন তাদের নেতা-কর্মীদের। শাসনতন্ত্রে মূলনীতি রূপে স্থান দেয়া হয়েছিল সমাজতন্ত্র, বাঙালী জাতিয়তাবাদ ও সেক্যেুলারিজমের ইসলাম বিরোধী মতবাদকে। অথচ ১৯৭০য়ের নির্বাচনে সেগুলি কোন নির্বাচনি ইস্যু ছিল না। অথচ সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগণের ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে এর চেয়ে বড় গাদ্দারি আর কি হতে পারে?

মুসলিম হওয়ার ঈমানী দায়বদ্ধতা হলো, ইসলামের প্রতিষ্ঠায় আমৃত্যু নিষ্ঠাবান হওয়া। এখানে আপোষ হলে কেউ মুসলিম থাকে না। অথচ মুজিব সেটিকে ফৌজদারি অপরাধে পরিণত করেছিলেন। ইসলামি দলের বহু নেতাকর্মীদের সেদিন নৃশংস ভাবে হত্যা করা হয়েছিল। বাংলার সমগ্র ইতিহাসে ইসলামের এমন ঘরের শত্রু পূর্বে কোন কালেই দেখা যায়নি। দেখা যায়নি এরূপ গণতন্ত্রের শত্রুও। এমন কি আইয়ুব খানের আমলেও বহু রাজনৈতীক দল ছিল। খোদ আওয়ামী লীগও তখন বেঁচে ছিল। অথচ ইসলামের এবং সে সাথে গণতন্ত্রের এতো বড় দুষমণ হলো আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের কাছে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী। যে শাসনতন্ত্রে গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতাকে দাফন করা হয়েছিল এবং প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল একদলীয় বাকশালীয় স্বৈরাচার, সেটিই চিত্রিত হয় সেরা শাসতন্ত্র রূপে। এটি তো মৃত বিবেকের আলামত; জীবিত বিবেক নিয়ে কেউ কি এমনটি বিশ্বাস করতে পারে?  অপর দিকে ভারতীয় নেতারা মুখে গণতন্ত্রের কথা বললেও মুজিবের ন্যায় গণতন্ত্রের এতবড় শত্রুকে সমর্থণ দিতে বিন্দুমাত্র লজ্জাবোধ করেনি। বরং আজ একই কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে শেখ হাসিনা। হাসিনাকে দিয়ে কোরআনের তাফসির মহফিলগুলো যেমন বন্ধ করা হয়েছে, তেমনি বাজেয়াপ্ত কর হচ্ছে ইসলাম বিষয়ক বইপুস্তক।ইসলামপন্থিদের দলনে ব্যবহৃত হচ্ছে দেশের আদালত। আদালতের নতজানু বিচারকগণ কেড়ে নিয়েছে জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন ইসলামী দলের নেতাকর্মীদের প্রাণ।

তবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতীয় শাসক চক্র তার সেবাদাসদের দিয়ে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও যুদ্ধাবস্থার  জন্ম দিয়েছে -তা কি সহজে শেষ হবার? যুদ্ধ বা রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু করাটি সহজ, কিন্তু শেষ করাটি আর আক্রমনকারির নিজের হাতে থাকে না। আফগানিস্তানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে যুদ্ধ ২০০১ সালে শুরু করেছিল তা বিগত ১৮ বছরেও শেষ হয়নি। শত চেষ্টা করেও তা শেষ করতে পারছে ন। ইরাকে যে যুদ্ধ ২০০৩ সালে শুরু করেছিল তাও শেষ হয়নি। বরং ছড়িয়ে পড়েছে শুধু সিরিয়া, ইয়েমেন ও মিশরে নয়, আফ্রিকাতেও। ভারতও তার নিজের যুদ্ধ কাশ্মীরে বিগত ৪০ বছরেও যেমন শেষ করতে পারিনি। শেষ করতে পারছে না  উত্তর-পূর্ব ভারতেও। বরং দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে।  ভারতের জন্য বিপদের কারণ হলো, বাংলাদেশ ৮০ লাখ মানুষের কাশ্মীর নয়। সাড়ে তিন কোটি মানুষের আফগানিস্তানও নয়। বাংলাদেশ ১৭ কোটি মানুষের দেশ। এবং ভারতও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে শক্তিশালী নয়। যে চোর-ডাকাত, ভোট-ডাকাতদের ঘাড়ে বন্দুক রেখে ভারত এ যুদ্ধ জিতছে চাচ্ছে সেটিও কি সফল হবার? যুদ্ধের বিশাল সুফলটি হলো, তা জনগণের ঘুম ভাঙ্গিয়ে  দেয়। তাই যেদেশ যুদ্ধাবস্থা থাকে সে দেশের জনগণও সর্বদা জাগ্রত থাকে। হাজার হাজার নতুন লড়াকু যোদ্ধা তখন রণাঙ্গণে নেমে আসে। মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বেশী শক্তি বেড়েছে তো তখন যখন তারা লাগাতর যুদ্ধাবস্থায় ছিল। ভারতের  জন্য বিপদের আরো কারণ, অনুগত চোর-ডাকাত ও ভোট-ডাকাতদের দিয়ে ইচ্ছামত চুরি-ডাকাতিতে করিয়ে নেয়া যায়, কিন্তু তাদের দিয়ে কি কোন  যুদ্ধজয় সম্ভব? একাত্তরে এজন্যই ভারতকে নিজে যুদ্ধে নামতে হয়েছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ভারতের কি একাত্তরের ন্যায় আরেক যুদ্ধ লড়ার সামর্থ্য আছে? কারণ, যুগই শুধু পাল্টে যায়নি, ইতিমধ্যে মানুষও পাল্টে গেছে। ক্ষমতায় থাকতে বাকশালীদের ভোট-ডাকাতিতে নামতে হয় তো সে পাল্টে যাওয়া মানুষের কারণে। প্রথম সংস্করণ ১৭/১১/১৩, দ্বিতীয় সংস্করণ ৩০/০৩/২০১৯

 




স্বাধীনতা হরণের ভারতীয় স্ট্রাটেজী এবং চ্যালেঞ্জের মুখে বাঙালী মুসলিম

লুন্ঠিত স্বাধীনতা

একাত্তরে ভারতের যুদ্ধজয়টি বিশাল বিজয় দিয়েছে ভারতীয়দের। গুম-খুন ও ভোটডাকাতির ন্যায় ভয়ানক অপরাধের স্বাধীনতা দিয়েছে ভারতের মদদপুষ্ট আওয়ামী বাকশালীদেরও। কিন্তু কতটুকু স্বাধীনতা দিয়েছে বাংলাদেশীদের? স্বাধীনতার অর্থ গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে বাঁচার স্বাধীনতা। সে স্বাধীনতার আঁওতায় আসে রাজনৈতিক দল গড়া, কথা বলা, লেখালেখি করা, মিছিল-মিটিং করা ও ইচ্ছামত ভোটদানের স্বাধীনতা। কিন্তু ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এর কোনটাই দেয়নি। সে অধিকার না থাকলে তাকে কি স্বাধীনতা বলা যায়? সেটি তো নিরেট পরাধীনতা। সে স্বাধীনতা শেখ মুজিব যেমন দেয়নি, শেখ হাসিনাও দিচ্ছে না। বরং যা দিয়েছে এবং এখনও দিচ্ছে -তা হলো ফ্যাসিবাদি বর্বরতা। মুজিব ১৯৭১’য়েই ইসলামপন্থিদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা কেড়ে নেয়। এবং পরে সকল দলের স্বাধীনতাই কেড়ে নেয় একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠা করে। মুজিবের প্রতিষ্ঠিত রক্ষি বাহিনী কেড়ে নেয় প্রায় ৩০ হাজার মানুষের বেঁচে থাকার স্বাধীনতা। মুজিব ও হাসিনা উভয়েই নিজেদের গদি বাঁচাতে বেছে নিয়েছে ভোট ডাকাতির পথ। স্বাধীন ভাবে কথা বললে বা লিখলে গুম-খুন ও রিমান্ডে গিয়ে নৃশংস নির্যাতনের শিকার হতে হয়। কথা হলো, এরূপ অধিকারহীনতাকে স্বাধীনতা বললে পরাধীনতা কাকে বলে? যে স্বাধীনতা ১৯৪৭’য়ে মিলেছিল, সেটি কি ১৯৭১’য়ে মিলেছে? পরাধীনতার এ নৃশংস জনককে স্বাধীনতার জনক বললে যা প্রতিষ্ঠা পায় তা হলো বিকট মিথ্যা। অথচ ইতিহাস চর্চার নামে বাংলাদেশে সে বিকট মিথ্যাকে প্রকট করা হয়েছে।   

মুজিবের একদলীয় শাসনের অবসানের পর যখনই স্বাধীন ভাবে বাঁচার চেষ্টা হয়েছে, তখনই ভারত সেটিকে সন্দেহের চোখে দেখেছে এবং তা চিত্রিত হয়েছে ভারত-বিরোধীতা রূপে। ভারতের সাবেক প্রেসেডেন্ট প্রনব মুখার্জির ভাষায় সেরূপ স্বাধীনতা নিয়ে বাঁচাটি হলো, ভারতের radar’য়ের ছত্রছায়া থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা। প্রনব মুখার্জি হুংকার দিয়েছেন, বাংলাদেশকে ভবিষ্যতে সে সুযোগ দেয়া হবে না। প্রশ্ন হলো, তবে কি বাংলাদেশকে বাঁচতে হবে ভারতের radar’য়ের ছত্রছায়ায়? এবং বাঁচতে হবে কি ভারতের সমর্থনপুষ্ট ভোটডাকাতিকে মেনে নিয়ে? এটিই কি একাত্তরের অর্জন? জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার বিলুপ্ত হলে বিলুপ্ত হয় স্বাধীনতা। তখন যা প্রতিষ্ঠা পায় সেটি হলো পরাধীনতা। ভারত তো সেটিই চায়। ভারত নিজের সে ইচ্ছাটি বাস্তবায়ন করেছে শেখ মুজিব, শেখ হাসিনা ও তাদের দল আওয়ামী লীগের গোলামী-সুলভ সহযোগিতা নিয়ে। হাসিনা নিজের সে ভারতসেবী গোলামীকে চিত্রিত করে ভারতের একাত্তরের ভূমিকার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দায়বদ্ধতা রূপে। যুক্তিটি এমন, ভারত যেহেতু জন্মের সাথে জড়িত, বাংলাদেশকে বাঁচতে হবে ভারতের প্রতি বিরামহীন গোলামী নিয়েই। বস্তুতঃ এটিই মুজিব-তাজুদ্দীনের চেতনা -যা থেকে জন্ম নিয়েছিল মুজিবেব ২৫ দফা ও তাজুদ্দীনের ৭ দফা গোলামী চুক্তি। প্রশ্ন হলো, চেতনায় এরূপ গোলামী নিয়ে কি স্বাধীনতা বাঁচানো যায়?

 

কারণঃ ইসলামভীতি

ভারতের এরূপ স্বাধীনতা বিরোধী নীতির মূল কারণ ইসলামভীতি। এখানে ভয়টি হলো, জনগণ স্বাধীনতা পেলে ইসলামের বিজয়ী হবে এবং মুসলিমগণ আবার বিশ্বশক্তি রূপে বেড়ে উঠবে। পরাধীনতা তো জনগণকে শক্তিহীন করার মোক্ষম হাতিয়ার। তাই ভারত ও তার সেবাদাসদের লক্ষ্য, জনগণের পরাধীনতাকেই দীর্ঘায়ু দেয়া। বিগত ২০১৩ সালের ৮ই নভেম্বর তারিখে দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় দিল্লিতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ প্রসঙ্গে একটি আলোচনা সভার খবর ছেপে ছিল। সে আলোচনাতে যে বিষয়টি প্রকট ভাবে ফুটে উঠেছিল তা হলো ভারতীয় রাজনৈতীক নেতা ও বুদ্ধিজীবীদের প্রচণ্ড ইসলামভীতি। সে সভায় ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শ্যাম শরণ এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত দুই সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি ও পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, বাংলাদেশ এখন যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সেখানে মৌলবাদের মোকাবিলাই তাদের রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা ঠিকমতো করতে না পারলে কয়েক বছর ধরে উন্নয়নের যে ধারা অব্যাহত আছে, তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার এ অঞ্চলও অশান্ত হয়ে উঠবে।“দ্য সোসাইটি ফর পলিসি স্টাডিজ” আয়োজিত এ গোলটেবিল আলোচনায় বাংলাদেশ থেকেও কয়েকজন যোগ দেন। বাংলাদেশের ২০১৪ সালের নির্বাচন ঘিরে যে রাজনৈতিক বিতর্ক ও অচলাবস্থা, তাকে কেন্দ্র করে ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং ধর্মীয় মৌলবাদের ক্রমে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার বিষয়গুলো এ আলোচনায় প্রাধান্য পায়। দৈনিক প্রথম আলো লিখেছে,বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ ও আবুল বারকাত মনে করেন,বাংলাদেশের গণতন্ত্রী, শান্তিপ্রিয় ও ধর্মনিরপেক্ষ মানুষের কাছে বাংলাদেশে মৌলবাদের উত্থানই এ মুহূর্তের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বীণা সিক্রি মনে করেন, জামায়াত ও হেফাজত বাংলাদেশে অস্থিরতা আনতে চাইছে, তারা জঙ্গি ইসলামি শাসন কায়েম করতে চায়। সে জন্য তারা মানুষকে ভীতসন্ত্রস্ত করে রাখতে চায়। তাদের অভিযোগ, বিএনপির শাসনামলেও জামায়াত এ কাজই করেছে। আলোচনায় এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের মনোভাবের প্রসঙ্গও। পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তী মনে করেন,আমেরিকা যেভাবে জামায়াতকে নরম মৌলবাদী বলে মনে করে, তা বিপজ্জনক।মৌলবাদ নরম বা কঠোর হয় কি না, সে প্রশ্ন ছাপিয়ে বড় হয়ে ওঠে মার্কিন মনোভাব। সে বিষয়ে পিনাকরঞ্জন মনে করেন, বাংলাদেশে জামায়াতের ধারক-বাহক বিএনপি যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মদদ পাচ্ছে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে যখনই বেড়েছে ইসলামি জনতার সমাবেশ এবং ধ্বনিত হয়েছে “নারায়ে তাকবীর,আল্লাহু আকবর” তখনই কাঁপন শুরু হয়েছে ভারতীয় শিবিরে। এটিকেই তারা বলছে মৌলবাদের উত্থান। এবং উল্লেখ্য হলো, মৌলবাদী মাত্রই তাদের কাছে সন্ত্রাসী। এখন এটি সুস্পষ্ট, ভারতীয়দের ঘুম হারাম করার জন্য আনবিক বোমার প্রয়োজন নাই, রাজপথে “আল্লাহু আকবর” ধ্বনিই যথেষ্ট। এ ধ্বনির মাঝেই তারা সন্ত্রাসের গন্ধ পায়। বোমার চেয়েও যে এ ধ্বনি শক্তিশালী -সেটিও বার বার প্রমাণিত হয়েছে। ফিরাউন ও তার বিশাল বাহিনীর মনে ভয় ধরাতে তাই বোমা লাগেনি; সেটি শক্তিটি ছিল মুসা (আঃ)র তাওহীদের দাওয়াত। পৌত্তলিক ভারতীয়গণও তাই আতংকিত “আল্লাহু আকবর”য়ের ভয়ে। আওয়ামী লীগের নৌকার তলা যে ধ্বসে গেছে এবং সেটি যে আর ভাসানো সম্ভব নয় -সেটি ভারতীয় নেতারাও বুঝে। ফলে বেড়েছে তাদের দুর্ভাবনাও। ১৯৭৫’য়ের ১৫ই আগষ্টে মুজিবের বাকশালী স্বৈরাচার নিপাতের পর এতবড় দুর্ভাবনায় ভারত এর আগে কখনোই পড়ে নাই। সে দুর্ভাবনা নিয়েই তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মিষ্টার মনমোহন সিং বৈঠক করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সাথে। ভারতের ন্যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্যটি হলো মুসলিম দেশগুলিতে ইসলামের জাগরণ ঠ্যাকানো; গণতন্ত্র বাঁচানা বা মানবাধীকার প্রতিষ্ঠা দেয়া নিয়ে তাদের কোন আগ্রহ নেই। নইলে গণতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচিত মিশরের প্রথম প্রেসিডেন্ট ডক্টর মহম্মদ মুরসীর বিরুদ্ধে সামরিক অভ্যুত্থানকে কেন সমর্থন দিবে? কেনই আলজিরিয়ার নির্বাচনে ইসলামপন্থিদের বিজয় নস্যাৎ করতে সামরিক বাহিনীর ক্যুদেতা’কে সমর্থন দিবে? 

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীগণও টের পেয়েছে, নিরপেক্ষ নির্বাচনে তাদের বিজয় অসম্ভব। ক্ষমতায় থাকার জন্য একটিই পথ; সেটি ভোট-ডাকাতির পথ। শেখ হাসিনা এজন্যই বেছে নিয়েছে গুম, খুন, সন্ত্রাস ও ভোট ডাকাতির পথ। ভারতীয়দের ন্যায় মার্কিনীরাও বুঝে ফেলেছে, কোন নিরপেক্ষ নির্বাচনেই হাসিনাকে বিজয়ী করা আর সম্ভব নয়। খুনি হাসিনাকে এমুহুর্তে ক্ষমতায় রাখতে হলে তাদের নিজেদেরকে বা ভারতকে অস্ত্র ধরতে হবে। অথবা হাসিনার ভোট-ডাকাতিকে সমর্থন দিতে হবে। মার্কিনীদের সমস্যা, বাংলাদেশের মাটিতে ইসলামের বিজয় রোধে নিজেদের যুদ্ধ করার সামর্থ্য নাই। আফগানিস্তান ও ইরাকের দীর্ঘ যুদ্ধ তাদেরকে কাহিল করে ফেলেছে। এতটা কাহিল তারা অতীতের দু’টি বিশ্বযুদ্ধেও হয়নি। বাংলাদেশে সে কাজে যেমন হাসিনাকে চায়, তেমনি তার পাশে ভারতকেও চায়। কিন্তু ভারতের সমস্যাটিও কম নয়। দেশটির সেনাবাহিনী দুইটি বৃহৎ অভ্যন্তরীন যুদ্ধে দীর্ঘকালীন যাবত লিপ্ত। একটি কাশ্মিরে,অপরটি বাংলাদেশের উত্তরপূর্বে অবস্থিত ৭টি রাজ্য জুড়ে। এ দুটি এলাকা পরিণত হয়েছে ভারতের জন্য ভিয়েতনামে। বহু অর্থ ও বহু রক্ত ব্যয়েও ভারত সরকার সে যুদ্ধ শেষ করতে পারিনি। অথচ একাত্তরে পূর্বপাকিস্তানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর যে সৈন্য-সংখ্যা ছিল তার চেয়ে সাত গুণ অধীক ভারতীয় সৈন্যের অবস্থান কাশ্মীরে। অথচ কাশ্মিরের জনসংখ্যা মাত্র ৮০ লাখ। ফলে ১৬ কোটি মানুষের বাংলাদেশে ভারত সৈন্য নামাবে কোন সাহসে? অথচ “বিডিনিউজ-২৪” এর সুদীব ভৌমিক টাইমস অব ইন্ডিয়া’য় প্রকাশিত এক নিবন্ধে ভারতীয়দের প্রতি তেমন একটি যুদ্ধেরই দাওয়াত দিয়েছেন। তবে ভারত সরকারের কৌশলটি হলো, বাংলাদেশের সেনাবাহিনীকে গণতন্ত্রের নির্মূলে যুদ্ধে নামানো। সে কাজে রাজী করানোর জন্য তাদের সামনে মূলা ঝুলানো হয়েছে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষি বাহিনীতে চাকুরির। ২০১৩ সালে শাপলা চত্ত্বরের গণহত্যায় সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণ এবং ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে ভোট-ডাকাতিতে সহযোগিতা দিয়ে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী প্রমাণ করেছে তারা বাকশালী স্বৈরাচারকে সুরক্ষা দেয়ার কাজে হাজির।  

শত্রুপক্ষে সেক্যুলারিস্টগণ

উপমহাদেশের রাজনীতিতে ভূমিকম্প সৃষ্টির সামর্থ্য বাঙালী মুসলিমদের যে আছে সেটি বহু বাংলাদেশী না বুঝলেও ভারতীয়রা বুঝেছে। এজন্যই বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিশাল অংকের ভারতীয় বিনিয়োগ। ভারতের বর্তমান কৌশলটি হলো, বাংলাদেশীদের কাঁধে অস্ত্র রেখে নিজের যুদ্ধটি লড়া। এক্ষেত্রে ভারত মিত্র রূপে ব্যবহার করছে দেশের সেক্যুলারিস্টদের। এরাই বাংলাদেশের ঘরের শত্রু। সেক্যুলারিস্টগণই হলো প্রতিটি মুসলিম দেশে ইসলামের সবচেয়ে বড়শত্রু হলো। মুসলিম দেশে ইসলামের বিরুদ্ধে বড় বড় অপরাধগুলো কাফেরদের দ্বারা হচ্ছে না। বরং হচ্ছে মুসলিম নামধারি এসব সেক্যুলারিস্টদের হাতে। এরাই মুসলিম বিশ্বের বিশাল মানচিত্রকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র টুকরোয় বিভক্তি করা নিয়ে বিজয় উৎসব করে। মুসলিমদের উপর যেখানেই আঘাত, সেখানেই তাদের উৎসব। তাই শাপলা চত্ত্বরে হাজার হাজার মানুষকে হতাহত করা হলেও বাংলাদেশের সেক্যুলারিস্টদের মনে সেদিন কোন দংশন হয়নি।বরং বিপুল আনন্দে তারা উৎসব করেছে। তেমনি বিবেকহীনতা মিশরের সেক্যুলারিস্টদেরও। কায়রোর রাজপথে সামরিক বাহিনী যখন মুসলিম ব্রাদারহুডের সহস্রাধিক কর্মীকে হত্যা করে তখন সে নৃশংস হত্যাকান্ডকে তারা সমর্থণ করেছে। একই চিত্র পাকিস্তানেও। জেনারেল মোশাররফের শাসনামলে ইসলামাবাদের লাল মসজিদের আঙিনায় শত শত ছাত্রীদের উপর সেনাবাহিনী গুলি চালায় ও তাদের হত্যা করে। আর সে নৃশংসতাকেও সমর্থণ দিয়েছে সেদেশের সেক্যুলারিস্টগণ। ইসলামের উত্থান রুখতে এমন কোন হীনকর্ম নাই যা এরা করে না।

ইউরোপ,আমেরিকা বা ভারতে বসবাসকালে এসব সেক্যুলারিস্টদের চেতনায় নিজ নিজ মাতৃভাষা, নিজ সংস্কৃতি, নিজ বর্ণ ও নিজ গোত্রভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ার কোন ভাবনা উদয় হয় না। বরং নিজ ভাষা ও নিজ স্বাতন্ত্রতা ভূলে আলো-পটলের ন্যায় সেখানকার সাংস্কৃতিক মেল্টিং পটে হারিয়ে যাওয়াতেই তাদের আনন্দ। অথচ কোন বৃহৎ মুসলিম দেশে বসবাস কালে তাদের কাছে সবচেয়ে বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়ায় নিজ ভাষা, নিজ বর্ণ ও নিজ গোত্রভিত্তিক রাজনীতি বাঁচানোর এজেন্ডা। অন্যভাষী মুসলিমগণ তাদের কাছে তখন হত্যাযোগ্য শত্রু গণ্য হয়। পাকিস্তান আমলে বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের কাছে অসম্ভব গণ্য হয়েছিল অবাঙালী পাকিস্তানীদের সাথে একরাষ্ট্রে বসবাস করা। অথচ তাদের সে সমস্যাটি দেখা দেয় না ভারতে বসবাসকারি বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের সাথে বসবাসে। সেটি ইউরোপ-আমেরিকাতেও হয় না। কারণ তাদের দুষমনিটা ভারতের বিরুদ্ধে যেমন নয়, তেমনি পাশ্চাত্য সভ্যতার বিরুদ্ধেও নয়। তাদের শত্রুতা তো ইসলাম ও মুসলিম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। ক্ষুদ্রতা নিয়ে বেড়ে উঠার উগ্র নেশাগ্রস্ততার কারণেই এসব সেক্যুলারিস্টদের হাতে উসমানিয়া খেলাফত, পাকিস্তান ও আরব ভূমির সুবিশাল ভৌগোলিক মানচিত্র টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। রাষ্ট্রীয় সীমারেখার নামে গড়ে উঠেছে বিভক্তির দুর্ভেদ্য প্রাচীর। আর এতে দারুন ভাবে শক্তিহীন হয়েছে মুসলিম উম্মাহ।

 

গাদ্দারি ইসলামের মৌল বিশ্বাসের সাথে

মুসলিম-রাষ্ট্র-নাশক ভয়ানক জীবদের অবস্থান শুধু যে মুসলিম দেশের সেক্যুলার দলগুলিতে -তা নয়। তাদের উপস্থিতি তথাকথিত বহু ইসলামি দলেও। নইলে সেসব ইসলামী দলেই বা কেন মুসলিম রাষ্ট্রবিনাশের দিবসগুলিতে বর্ণাঢ্য মিছিল ও বিজয়-উৎসব হবে? মুসলিমদের মাঝে বিভক্তি গড়া যেমন হারাম, তেমনি হারাম হলো বিভক্তির দিনগুলিতে উৎসব করা। তাতে শক্তিশালী হয় জাতীয়তাবাদ ও সেক্যুলারিজম। এমন উৎসবে প্রকাশ পায় বাতিল মতাদর্শের প্রতি তাদের আত্মসমর্পন। প্রশ্ন হলো, সে হুশটি কি এসব ইসলামী দলের নেতাকর্মীদের নেই? তারা কি জানা না, দেশ বাঁচানোর লক্ষ্যে প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধটি হয় বুদ্ধিবৃত্তিক ময়দানে? কিন্তু সে বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধে অংশ নেয়ার সামর্থ্য কি এরূপ আত্মসমর্পিতদের থাকে? এমন বিভ্রান্তদের দিয়ে কি দেশের স্বাধীনতা বাঁচানো যায়? নবীজী (সাঃ) এবং তাঁর সাহাবাগণ কি স্রেফ নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত, তাসবিহ-তাহলিলের শিক্ষা রেখে গেছেন? ভাষা, বর্ণ বা আঞ্চলিকতার নামে মুসলিমদের মাঝে আজকের ন্যায় বিভক্তির দেয়াল কি সাহাবায়ে কেরামের আমলে ছিল? ছিল কি উমাইয়া ও আব্বাসীয় আমলে? সূদ,জুয়া, কুফরি আদালত ও পতিতাপল্লির ন্যায় হারাম কাজের পাশাপাশি মুসলিম ভূমিতে এরূপ বিভক্তির সীমারেখাগুলো তো ঔপনিবেশিক কাফেরদের শাসনের সৃষ্টি। আজ সেগুলি বেঁচে থাকে কি করে? প্রকৃত ঈমানদারের অন্তরে তো এরূপ বিভক্তি নিয়ে মাতম হওয়া উচিত, উৎসব নয়। কারণ এরূপ বিভক্তির দেয়াল ইসলামে হারাম। প্রকৃত ঈমানদার তো অংশ নিবে এসব হারাম সীমান্ত ভেঙ্গে উম্মতে ওহেদা গড়ার জিহাদে।

মুসলিম রাজনীতির মূল কথা, ইসলামের প্রতিষ্ঠা বাড়ানো এবং সে সাথে মুসলমানের শক্তিবৃদ্ধি। তখন রাজনীতি স্রেফ রাজনীতি থাকে না, পবিত্র জিহাদে পরিণত হয়। যুগে যুগে মুসলিম মুজাহিদগণ তো সে কাজেই জিহাদ করেছেন এবং সে জিহাদে শহীদও হয়েছেন। কিছু ব্যক্তির মদ্যপানে বা ব্যাভিচারে মুসলিম উম্মাহর এতো বড় ক্ষতি হয় না যা হয়, মুসলিম ভুগোল খন্ডিত হলে। এমন বিভক্তি তো শত্রু শিবিরে উৎসব আনে। ১৬ ডিসেম্বর তো এ জন্যই ভারতীয়দের কাছে এতটা উৎসবযোগ্য। অতীতে মুসলিম রাষ্ট্রে ইজিদ বিন মোয়াবিয়া ও হাজ্জাজ বিন ইউসুফের ন্যায় বহু বর্বর ও জালেম শাসক এসেছে। কিন্তু সে জন্য কি সে যুগের মুসলিমগণ মুসলিম ভূগোলে হাত দিয়েছে? খাবারের প্লেটে পোকামাকড় বসার কারণে প্লেট ভেঙ্গে ফেলাটি শিশু সুলভ পাগলামী। সুস্থ্য বিবেকের প্রকাশ তো সে প্লেট পরিস্কার করায়। তেমনি কোন মুসলিম দেশ বর্বর শাসক দ্বারা অধিকৃত হলে ইসলামের বিধান হলো, সে শাসকের নির্মূলে জিহাদ করা। কিন্তু ভয়ানক অপরাধ হলো, সে শাসকের কারণে মুসলিম দেশকে বিভক্ত করা। অতীতে দেশের বৃহৎ মানচিত্র গড়তে যে বিশাল রক্ত ব্যয় হয়েছে –একজন ঈমানদার সে ইতিহাস ভূলে যায় কি করে? তাছাড়া পবিত্র কোরআনে “পরস্পরে বিভক্ত হয়ো না” বলে সে হারাম বিভক্তির বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট নির্দেশও রয়েছে।এজন্যই একাত্তরে কোন একটি ইসলামী দল এবং কোন একজন আলেমও পাকিস্তান ভাঙ্গাকে সমর্থন করেনি। সমর্থন করেনি কোন এক মুসলিম দেশও। সেটি ছিল নিতান্তই ভারত ও তার সেক্যুলারিস্ট দালালদের প্রজেক্ট।

অথচ মুসলিম দেশের সেক্যুলারিস্টগণ সে হারাম কাজটি বেশী বেশী করেছে এবং ভূলিয়ে দিয়েছে সে কোরআনী ফরমান।সেটি যেমন মুসলিম দেশের নগরবন্দরে সূদী ব্যাংক ও ব্যভিচার পল্লি নির্মানের ক্ষেত্রে,তেমনি বৃহৎ মুসলিম ভূগোল ভেঙ্গে ফেলার ক্ষেত্রে। একাত্তরে তো সেটিই হয়েছে। আর যেসব ইসলাম-দুষমন ব্যক্তি সেসব হারাম কাজে নেতৃত্ব দিয়েছে তাদেরকে জাতির পিতা বলে মাথায়ও তুলেছে। এদের কারণেই মুসলিম উম্মাহ আজ ৫৫টির বেশী টুকরায় বিভক্ত। আর সেক্যুলার সেনাবাহিনীর কাজ হয়েছে সে হারাম সীমান্তগুলীকে পাহারা দেয়া।ফলে অসম্ভব হয়ে পড়েছে বিভক্তির প্রাচীর ভেঙ্গে মুসলিম বিশ্বের ভৌগলিক সংহতি প্রতিষ্ঠা এবং বিশ্বশক্তি রূপে মুসলমানদের উত্থান।ভারতের সেক্যুলারিস্ট হিন্দুগণ অন্ততঃ ভাষা, বর্ণ ও আঞ্চলিকতার নামে এমন বিভক্তির পথে এগুয়নি। মুসলমান নামধারি ব্যক্তি ইসলামে অঙ্গিকারহীন তথা মুনাফিক হলে সে যে পৌত্তলিক কাফেরদের চেয়েও নীচে নামতে পারে এ হলো তার প্রমাণ। মহান আল্লাহতায়ালা এজন্যই জাহান্নামে তাদের স্থান দিবেন কাফেরদেরও নীচে।–(হাদীস)। এরাই দেশে দেশে ইসলামের আন্তর্জাতিক শত্রুপক্ষের সবচেয়ে বড় মিত্র। ভারত এদের কাঁধে বন্দুক রেখেই বাংলাদেশে ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ লড়তে চায়।

 

শত্রুর ঘাঁটি অভ্যন্তরে

কোন মুসলিম দেশে ইসলামের অভ্যুত্থান দেখা দিলে সেক্যুলারিস্টদের কাজ হয় রাজনীতিতে সেনাবাহিনীকে ডেকে আনা। কারণ চিন্তা-চেতনায় তারাই সেক্যুলারিষ্টদের সবচেয়ে বিশ্বস্থ্য মিত্র। বাংলাদেশের সেক্যুলারিস্টগণও সম্ভবত সে পথেই এগুবে। আলজেরিয়ার নির্বাচনে ইসলামপন্থিগণ যখন বিশাল ভাবে বিজয়ী হচ্ছিল তখনই সে বিজয় রুখতে নৃশংস সামরিক জান্তাদের ক্ষমতা দখলে ডেকে আনা হয়। আর সামরিক অভ্যুত্থান হলে তো রক্তপাতও অনিবার্য হয়ে উঠে। আলজিরিয়ায় লক্ষাধিক মানুষের জীবন নাশ হয়েছে সে অভ্যুত্থানসৃষ্ট গৃহযুদ্ধে। আর সামরিক বাহিনী তো এরূপ ক্ষমতা দখলের কাজে দু’পায়ে খাড়া। মুসলিম দেশগুলিতে তাদের অপরাধের তালিকাটি বিশাল। এরাই গণতন্ত্র ও ইসলামের শত্রু।

বস্তুতঃ মুসলিম দেশগুলিতে সেক্যুলারিস্টদের সবচেয়ে শক্তিশালী ও সুরক্ষিত ঘাঁটিটি কোন রাজনৈতীক দল নয়। পতিতাপল্লি, মদ্যশালা বা ক্লাব-ক্যাসিনাও নয় বরং সেটি হলো সামরিক বাহনী। ক্যান্টনমেন্টগুলো হলো মুসলিম দেশের মাঝে অনৈসলামিক ধ্যানধারণা ও সংস্কৃতির সুরক্ষিত দ্বীপ। ইসলাম ও নিজ দেশের মুসলিম সংস্কৃতি নিজেই এখানে বিদেশী। ট্রেনিংয়ের নামে পাশ্চাত্য দেশ থেকে সামরিক অফিসারগণ যতটা পায় সামরিক প্রশিক্ষণ তার চেয়ে বহুগুণ বেশী পায় মগজ ধোলাই। ট্রেনিং শেষে ফিরে আসে তারা কাজ করে শত্রুশক্তির বিশ্বস্থ্য মিত্ররূপে। মুসলিম দেশগুলোতে এরাই হলো বিদেশী শত্রুদের বিশ্বস্থ্য সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতীক বন্ধু। উসমানিয়া খেলাফতের পতন তখন থেকেই শুরু হয় যখন প্রশিক্ষণের জন্য অফিসারদের পশ্চিমা দেশে পাঠানো শুরু হয়। এশিয়া-আফ্রিকার কোথাও সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বিপদে পড়লে আজও তাদেরই ডাক পড়ে। এদের কারণেই ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান থেকে ইংরেজগণ বিতাড়িত হলেও পাক-সেনাবাহিনীতে মদ্যপান ও ব্যাভিচার বেঁচেছিল আর বহু দশক। এরাই বার বার দখলে নিয়েছে পাকিস্তানকে এবং দেশটিকে ইসলামী রাষ্ট্র বানানোর প্রজেক্ট বানচাল করে দিয়েছে। কামাল পাশার নেতৃত্বে এরাই খেলাফতের ন্যায় ইসলামের অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে বিলুপ্ত করেছে। তুরস্কের নির্বাচিত ও জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী আদনান মেন্দারেসকে সেদেশের সেনাবাহিনীই ফাঁসীতে ঝুলিয়ে হত্যা করেছিল। ইসলামী চেতনার প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দীন আরবাকানকে এরা শুধু তাঁর পদ থেকেই হটায়নি, তার জন্য রাজনীতিও নিষিদ্ধ করেছে। মিশরের ইতিহাসের সর্বপ্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ড.মুরসীকে এরাই বন্দী করে রেখেছে। এবং রাজপথে হত্যা করছে তার সমর্থকদের।

ভারতের আগ্রাসী স্ট্রাটেজী

বাংলাদেশের বুকে ইসলামকে বিজয়ী করার জিহাদে জেগে উঠার সুযোগটি প্রতি মুহুর্তের। তা থেকে দূরে থাকার অর্থ মহান আল্লাহতায়ালার ইচ্ছা ও মিশনের সাথে সুস্পষ্ট গাদ্দারি। তাছাড়া দেশের সেক্যুলারিস্টদের ইসলাম বিরোধী কদর্য অপরাধী চরিত্রের কোন কিছুই কি এখন গোপন বিষয়? সেটি তো প্রমাণিত। সাধারণত জনগণও এ অপরাধীদের গ্রাস থেকে মুক্তি পেতে চায়। তাদেরকে আবর্জনার স্তুপে ফেলার এখনই মোক্ষম সময়। কিন্তু ভারত তাদের বন্ধুদের এ অবস্থায় দেখতে রাজি নয়। কারণ, তাতে ভারতের নিজের স্বার্থহানি। তাই সে সুযোগ বিনষ্ট করতে শুধু আওয়ামী লীগের কাঁধে নয়, সেনাবাহিনীর কাঁধেও অস্ত্র রেখে ভারত তার নিজের যুদ্ধটি লড়তে চায়। ভারতের বিনিয়োগ তাই শুধু তাদের রাজনৈতীক ও সাংস্কৃতিক সেপাইদের পিছনে নয়, সেনাবাহিনীর অফিসারদের পিছনেও। সাবেক স্বৈরশাসক জেনারেল মঈনকে দিল্লিতে ডেকে নিয়ে ভারত সরকার কি শুধু ঘোড়া উপহার দিয়েছিল? আরো কি কি দিয়েছিল সেটি জেনারেল মঈন ও তার সহচরগণই ভাল জানে।শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসেছিল তো সে বিনিয়োগের ফলেই।

তাছাড়া বাংলাদেশের সেনাবাহিনীতে ভারতের নতজানু সেবাদাস কি শুধু জেনারেল মঈন ছিল? সেটি হলে তো বুঝতে হবে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অবস্থানরত হাজার হাজার ভারতীয় গোয়েন্দাদের দিবারাত্রের কাজ শুধু ঘোড়ার ঘাস কাটা। ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর রুচি ও নৃশংসতা যে কতটা গভীর সেটি তো ধরা পড়ে শাপলা চত্বরে হাজার হাজার সৈন্যের সমাবেশ ও নিরস্ত্র মুসল্লিদের উপর লক্ষাধিক রাউন্ড গুলি বর্ষণ। তাছাড়া সে নৃশংসতা লাগাতর প্রমাণ করছে র‌্যাবের অফিসার ও সেপাহীরাও। তারাই তো বাড়ীতে বাড়ীতে গিয়ে ইসলামি বই বাজেয়াপ্ত করছে। হানা দিচ্ছে হিজাবী ছাত্রীদের পাঠচক্রে। হানা দিচ্ছে বিভিন্ন ইসলামি সংগঠনের অফিসে। তাছাড়া শেখ হাসিনা তার বিগত ৫ বছরের শাসনে শুধু পুলিশ, RAB ও সেনাবাহিনীকে সাঁজিয়েছে ইসলামপন্থিদের দমনের গ্রান্ড স্ট্রাটেজীকে সামনে রেখেই। এবং অবৈধ সরকার জনগণকে বাধ্য করছে সে হারাম কাজে রাজস্ব জোগাতে।

ভারতের লক্ষ্য বাংলাদেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা নয়, দেশটির স্বাধীনতা নয়। দেশটির অর্থনৈতীক উন্নয়নও নয়। গণতন্ত্রের প্রতি সামান্যতম আগ্রহ থাকলে তবে কেন গণতন্ত্র হত্যাকারি বাকশালী মুজিবের প্রতি এত প্রশংসা? ২০১৪ ও ২০১৮ সালের ভোট ডাকাতির পরও কেন শেখ হাসিনার প্রতি সমর্থণ? বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতি আগ্রহ থাকলে তবে কেন ৭ দফা ও ২৫ দফা দাসচুক্তি করবে? আর বাংলাদেশের অর্থনৈতীক উন্নয়ন? বাংলাদেশের অর্থনৈতীক উন্নয়নের বড় শত্রু হলো ভারত। সেটি প্রমাণিত হয় ১৯৭১’য়ে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরপরই। পাত্রের তলা ধ্বসে গেলে সে পাত্রে যত কিছুই ঢালা হোক না কেন তা বেরিয়ে যায়। দেশের ক্ষেত্রে সে তলাটি হলো দেশের সীমান্ত। সুরক্ষিত সীমান্তই দেশের সম্পদ নিজ দেশে ধরে রাখে। তাই শুধু যুদ্ধকালে নয়, প্রতিদেশে রীতি হলো প্রতি দিনের প্রতিটি মুহুর্ত সীমান্ত পাহারা দেয়া। একাজে বিরতি চলে না। কিন্তু ভারত সে অবিরাম পাহারাদারি বাংলাদেশ সীমান্তে হতে দেয়নি। মুজিবামলে সীমান্ত বাণিজ্যের নামে পাকিস্তান আমলের সে সুরক্ষিত সীমান্তই বিলুপ্ত করেছিল। আর হাসিনা বিলুপ্ত করেছে বিডিআর। মুজিবের কু-কুর্মের ফলে পাকিস্তান আমলের সোনারূপা,কাঁসাপিতল,কলকারখানার যন্ত্রপাতিই শুধু নয়,বিদেশীদের দেয়া রিলিফের মাল এবং কাঁচা পাটও ভারতের বাজারে গিয়ে উঠে। বাংলাদেশ হারায় পাকিস্তান আমলের অর্জিত বিশ্বের সর্ববৃহৎ পাট ও পাটবস্ত্র উৎপাদনকারি দেশের মর্যাদা। সেটি ছিনতাই হয় ভারতের হাতে। বাংলাদেশের ললাটে জুটে বিশ্বের তলাহীন ভিক্ষার ঝুলি হওয়ার অপমান। সে সময় শুরু হয় শত শত কোটি টাকার জাল নোট ছেপে বাংলাদেশের অর্থনীতি বিনাশের ষড়যন্ত্র।ফলে আসে অর্থনৈতীক মড়ক ও দুর্ভিক্ষ। তাতে মৃত্যু হয় বহু লক্ষ বাংলাদেশীর। এ সবই হলো ভারত ও তার দাসশাসকদের অপরাধ।

ভারতের এবারের লক্ষ্য শুধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা খর্ব করা নয়। নিছক অর্থনৈতীক বিনাশও নয়। মূল লক্ষ্যটি হলো যে কোন মূল্যে ইসলামের জাগরণ রুখা। কারণ,তারা জানে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ ভারতের জন্য কোন চ্যালেঞ্জ নয়।অর্থনৈতীক ময়দানেও বাংলাদেশ ভারতের প্রতিদ্বন্দী নয়। কিন্তু উপমহাদেশের রাজনীতিতে অপ্রতিরোধ্য বিপ্লব আনতে পারে ইসলামি বাংলাদেশ।সে সামর্থ বাংলাদেশের রয়েছে। কারণ সে জন্য অর্থবল লাগে না। আনবিক বোমাও লাগে না। লাগে ঈমানের বল। লাগে জিহাদ। আফগানিস্তানের আড়াই কোটি মানুষের জিহাদ বিশ্বের সর্ববৃহৎ রাষ্ট্র সোভিয়েত রাশিয়ার ভূগোলকে গুড়িয়ে দিয়েছে। কেড়ে নিয়েছে দেশটির বিশ্বশক্তির মর্যাদা। স্বাধীনতা দিয়েছে ৬টি মুসলিম দেশকে। ধ্বস নামিয়েছে মার্কিন অর্থনীতিতেও। সে তুলনায় বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষ কি কম? ভারত কি সোভিয়েত রাশিয়া বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে শক্তিশালী?

যে চ্যালেঞ্জের মুখে বাঙালী মুসলিম

মুসলিম হওয়ার অর্থ স্রেফ নামাযী বা রোযাদার হওয়া নয়, আল্লাহর দ্বীনের লড়াকু মুজাহিদ হওয়াও। নামায-রোযার পাশে তাঁকে আমৃত্যু জিহাদ নিয়েও বাঁচতে হয়। এটি তো নবীজী (সাঃ)র শ্রেষ্ঠ সূন্নত। সাহাবাদের জীবনে সে সূন্নত ছিল বলেই শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবী শহীদ হয়েছেন। বাংলাদেশের মাটিতে ইসলাম ও মুসলিমদের যাত্রা শুরু হয়েছিল ইখতিয়ার মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির মাত্র ১৭ জন মুজাহিদ দিয়ে। এখন তো দেশটিতে স্বঘোষিত মুসলিমদের সংখ্যা ১৬ কোটি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তাদের মাঝে মুজাহিদদের সংখ্যা ক’জন? প্রশ্ন হলো, আল্লাহর দ্বীনের বিজয়ে মুজাহিদ না হলে কি মুসলিম হওয়া যায়? ফলে যে যুদ্ধ সাহাবীদের জীবনে এসেছিল, সে যুদ্ধ অধিকৃত বাংলাদেশের বাঙালি মুসলিমদের জীবনে আসবে না সেটিই বা কীরূপে সম্ভব? তাছাড়া ইসলামকে পরাজিত রাখার লক্ষ্যে এ মুসলিম ভূমিতে শত্রুশক্তির লড়াই তো লাগাতর। শত্রুর লাগাতর হামলার মুখে নীরব ও জিহাদ বিমুখ নিষ্কৃয় থাকাটি কি ঈমানদারি?

বাংলাদেশের মাটিতে যারা মুসলিম রূপে বাঁচতে চায় ও ইসলামের বিজয় চায় -তাদের দায়ভারটি বিশাল। স্রেফ লাখ লাখ মসজিদ-মাদ্রাসা গড়ার মধ্য দিয়ে সে দায়ভার পালিত হবে না। ঘরে হাতি ঢুকলে যেমন সব কিছু তছ নছ করে দেয়, তেমনি রাষ্ট্র শয়তানী শক্তির হাতে পড়লে লাখ লাখ মসজিদ-মাদ্রাসার কাজ অতি সহজেই ব্যর্থ করে দেয়। তখন মাদ্রাসার ছাত্রদের পৌত্তলিক রবীন্দ্রনাথের শিরকপূর্ণ গান গেতে বাধ্য হতে হয়। নিষিদ্ধ হয় পবিত্র কোরআনের তাফসির। নিয়ন্ত্রিত হয় জুম্মার খোতবা। কেউ শরিয়তের প্রতিষ্ঠা চাইলে তাকে সন্ত্রাসী বলে হত্যা করা হয়। এজন্যই রাষ্ট্র ও তার বিশাল সামরিক ও প্রশাসনিক অবকাঠামো শয়তানী শক্তির হাতে থাকতে দেয়াটি হারাম। সে অধিকৃতি থেকে মুক্তি দিতেই ইসলামী রাষ্ট্র গড়ার জিহাদ মুসলিমদের উপর ফরজ হয়ে যায়। সে ফরজ পালনে মহান নবীজী (সাঃ) নিজে ইসলামী রাষ্ট্র গড়েছেন এবং সে রাষ্ট্রের প্রধান হয়েছেন। সে রাষ্ট্রের শক্তি ও প্রতিরক্ষা বাড়াতে শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবী শহীদ হয়েছেন। কুফরি রাষ্ট্রের সে মহাবিপদ থেকে মুক্তি দিতেই ইখতিয়ার মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী হাজার হাজার মাইল দূর থেকে বাংলায় ছুটে এসেছিলেন। বাংলার মানুষের এত বড় কল্যাণ কি আর কেউ করেছে? বাংলার মুসলিম ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি তো তিনিই। কিন্তু সে মুসলিম রাষ্ট্র এখন আবার অধিকৃত ইসলামের শত্রু শক্তির হাতে। তারা অসম্ভব করে রেখেছে নবীজী (সাঃ)র প্রতিষ্ঠিত ইসলামে -যাতে ছিল ইসলামী রাষ্ট্র, শুরা, শরিয়ত, হুদুদ, প্যান-ইসলামিক মুসলিম ঐক্য এবং জিহাদ। এ পরাজিত অবস্থায় মুসলিমগণ কি স্রেফ দোয়া-দরুদ পাঠের মধ্যেই নিজেদের দায়িত্ব সারবে?

নামাযের বিকল্প যেমন স্রেফ নামায, তেমনি জিহাদের বিকল্প স্রেফ জিহাদ এবং ইসলামী রাষ্ট্রের বিকল্প একমাত্র ইসলামী রাষ্ট্রই। মুসলিমদের তাই শুধু নামায-রোযার হাকিকত বুঝলে চলে না, বুঝতে হয় শত্রুর লক্ষ্য ও স্ট্রাটেজীকেও। বাঁচতে হয় সে শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ বা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে। বাংলাদেশের বুকে সে প্রবল শত্রুটি হলো আধিপত্যবাদী ভারত ও তার দোসরগণ। তাই বাঙালি মুসলিমের লড়াই স্রেফ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রতিষ্ঠা নিয়ে নয়। নিছক আওয়ামী বাকশালীদের নির্মূলও নয়। বরং লড়াই এখানে সরাসরি ভারত ও তার পদসেবী সৈনিকদের বিরুদ্ধে। আর ভারতের সে সৈনিকদের অবস্থান শুধু সীমান্তের ওপারে নয়,বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও।

 

জিহাদ কেন অনিবার্য?

মুসলিম দেশ ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে অধিকৃত হলে বা সে দেশের উপর হামলা হলে জিহাদ সেখানে ফরজে আইন তথা সবার উপর বাধ্যতামূলক হয়। দেশের প্রতিটি নাগরিকই তখন যোদ্ধা। সমগ্র দেশ তখন ক্যান্টনমেন্ট। সে যুদ্ধে যোগ না দেয়াটি তখন মুনাফেকি। মু’মিনের জীবনে ইসলাম শুধু নামায-রোযা,হজ-যাকাত আনে না, লাগাতর জিহাদও আনে। জিহাদ এখানে ইসলামের সনাতন স্ট্রাটেজী। কোরআনের ছত্রে ছত্রে রয়েছে সে জিহাদের তাগিদ।বলা হয়েছে, “তোমাদের প্রস্তুতি কম হোক বা বেশী হোক অভিযানে বেরিয়ে পড়, জিহাদ করো আল্লাহর রাস্তায় নিজেদের সম্পদ ও প্রাণ দিয়ে।এটিই তোমাদের জন্য কল্যাণকর যদি তোমরা জানতে।”-(সুরা তাওবা আয়াত ৪১)। এ আয়াতে বিশাল প্রস্তুতির অপেক্ষায় কালক্ষেপনের সুযোগ দেয়া হয়নি। বিশেষ করে তখন যখন মুসলিম ভূমি ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে অধিকৃত। মুসলমানদের প্রস্তুতির কমতি মহান আল্লাহতায়ালা তখন ফেরেশতাদের দিয়ে পূরণ করেন। আর এটিই তো সিরাতুল মুস্তাকীম যা মু’মিনকে জান্নাতে নিয়ে পৌঁছায়। যে পথে জিহাদ নেই তাকে কি তাই সিরাতুল মুস্তাকীম বলা যায়? জিহাদহীন সে পথে চলে কি জান্নাতপ্রাপ্তির কল্পনা করা যায়? নবীজী (সাঃ)র আমলে তো তেমন এক সিরাতুল মুস্তাকীমের পথেই লাগাতর জিহাদ শুরু হয়েছিল। সে সময় ইসলাম কবুলের অর্থ শুধু নামাযের জামায়াতে হাজির হওয়া ছিল না, জিহাদের ময়দানে হাজির হওয়াও। যার মধ্যে জিহাদ নাই এবং সে জিহাদে জানমালের কোরবানীর কোন নিয়েতও নেই,নবীজী (সাঃ)তাকে মুনাফিক বলেছেন।

তাই মু’মিনের জীবনে জিহাদের অংশগ্রহণ এক অনিবার্য দায়বদ্ধতা। কারণ সে তো আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্রয়কৃত দাস। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে,“নিশ্চয়ই আল্লাহ মু’মিনদের থেকে তাঁর জীবন ও সম্পদ ক্রয় করে নিয়েছেন জান্নাতের বিনিময়ে।তাঁরা আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করে এবং (সে পথে তারা শত্রুদের) নিধন করে এবং নিজেরাও নিহত হয়।তাওরাত,ইঞ্জিল ও কোরআনে এ বিষয়ে তাদের দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে।নিজ প্রতিজ্ঞা পালনে আর কে আল্লাহ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর? তোমরা আল্লাহর সাথে যে সওদা করেছো তার জন্য আনন্দ প্রকাশ করো,কারণ এটিই তো মহাসাফল্য।”-(সুরা তাওবা আয়াত ১১১)।তাই ঈমানদারির প্রকৃত পরিচয় এবং সে সাথে এ জীবনে সাফল্যের পথ শুধু কালেমায়ে শাহাদত পাঠ নয়।স্রেফ নামায-রোযা আদায়ও নয়। বরং সেটি হলো মহান আল্লাহর রাস্তায় নিজের জান ও মালের কোরবানীতে চুক্তিবদ্ধ হওয়া। এটিই মানব জীবনের শ্রেষ্ঠ বাণিজ্য।এবং সেটি মহান আল্লাহর সাথে। মানব জীবনে প্রকৃত সফলতা আসে তো এ পথেই। মহান আল্লাহতায়ালার এ ঘোষণাটির উপর যার ঈমান আছে,তার জীবনে জিহাদ এবং সে জিহাদে জানমালের কোরবানীর জজবাটি তাই অনিবার্য কারণেই সৃষ্টি হয়। তাই জিহাদ যেমন মৌলবাদ নয়, তেমনি চরমপন্থি সন্ত্রাসও নয়। বরং মু’মিনের জীবনে এটিই হলো ইসলামের স্বাভাবিক প্রকাশ।

সে জিহাদের ঢেউই বাংলাদেশে এসে পৌঁছেছিল আজ থেকে ৮ শত বছরেরও বেশী কাল আগে। এবং সে জিহাদের বরকতেই মুক্ত হয়েছিল আজকের চেয়েও বিশাল ও অখন্ড বাংলা। কিন্তু ১৭ জন মুজাহিদের হাতে যে বাংলা সেদিন স্বাধীন হয়েছিল তা এখন অধিকৃত ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে। যাদের হাতে শুধু শরিয়তি বিধানই নয়, সংবিধানে ঘোষিত আল্লাহতায়ালার উপর আস্থার বানীও বিলুপ্ত করা হয়েছে। নিষিদ্ধ করা হয়েছে তাফসির মাহফিলে, গুলি চালানো হয়েছে ঢাকার রাস্তায় অবস্থান নেয়া নিরস্ত্র মুসল্লিদের উপর। শহীদ মুসল্লিদের লাশ ফেলা হয়েছে ময়লার গাড়িতে! এদেশের শাসনতন্ত্রে সূদ নিষিদ্ধ নয়। নিষিদ্ধ নয় পতিতাবৃত্তির ন্যায় জ্বিনার বানিজ্যও। কিন্তু নিষিদ্ধ করা হয়েছে শরিয়ত প্রতিষ্ঠার অঙ্গিকার নিয়ে রাজনৈতীক সংগঠন করা।সে অপরাধে তখন নিষিদ্ধ করা হয় সে দলের নিবন্ধন। জেলে তোলা হয় সে দলের নেতাদের। এসবই আজ হচ্ছে ১৬ কোটি মুসলমানের সামনে। বাঙালী মুসলমানের জীবনে এর চেয়ে বড় পরাজয় ও এর চেয়ে বড় লজ্জার আর কি হতে পারে? বাংলাদেশের ন্যায় একটি অধিকৃত মুসলিম দেশে জিহাদ থাকবে না তা কি কোন মুসলিম ভাবতে পারে? সেরূপ ভাবলে কি কেউ মুসলমান থাকে? প্রথম সংস্করণ ১৭/১১/১৩, দ্বিতীয় সংস্করণ ২৮/০৩/২০১৯

 

 




ভারতের টিপাইমুখ বাঁধ এবং পানিযুদ্ধের মুখে বাংলাদেশ

ভারত বিশাল বাঁধ দিচ্ছে বরাক নদীর উপর। এ বরাক নদীই বাংলাদেশের অমলশীদ নামক জায়গায় সুরমা ও কুশিয়ারা নদীতে বিভক্ত হয়েছে। আবার আজমেরী গঞ্জে এসে একত্রিত হয়ে মেঘনা নদীর জন্ম দিয়েছে। যৌথ পানি কমিশনের সাবেক বাংলাদেশী সদস্য তৌহিদ আনোয়ার খান বলেন, সুরমা ও কুশিয়ারার পানি প্রবাহের মূল উৎস হলো বারাক নদী। তার মতে বরাক নদীর পানির শতকরা প্রায় ৮০ ভাগ পায় কুশিয়ারা, আর প্রায় ২০ ভাগ পায় সুরমা। সিলেটের জকিগঞ্জ সীমান্ত থেকে ১০০ কি.মি. উজানে এ নদীর উপরই টিপাইমুখ জায়গায় নির্মিত হচ্ছে বাঁধ। এ বাঁধ শেষ হবে ২০১২ সালে। উজানে বাঁধ দিলে স্বভাবতই ভাটির নদী পানি পায় না। এটুকু শুধু স্কুলের ছাত্র নয়, নিরক্ষর মানুষও বুঝে। কারণ এটুকু বুঝবার জন্য সামান্য কান্ডজ্ঞানই যথেষ্ট। কিন্তু বুঝতে রাজী নয়, আওয়ামী লীগের দলীয় নেতৃবৃন্দ ও আওয়ামী ঘরানার সরকারি কর্মকর্তাগণ।

সেটিরই প্রমাণ মিলছে আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ ও সরকারি কর্মকর্তাদের দেওয়া সাম্প্রতিক বক্তব্যে। সম্প্রতি তেমনি এক বক্তব্য দিয়েছেন, যৌথ নদী কমিশনের বাংলাদেশী সদস্য মীর সাজ্জাদ হোসেন। হাসিনা সরকার টিপাই মুখ বাঁধ পরিদর্শনের জন্য ১০ সদস্যের যে কমিটি গঠন করেছে তিনি সে দলের একমাত্র বিশেষজ্ঞ তথা টেকনিক্যাল পার্সন। সফরকারি এ দলটির নেতৃত্বে থাকবেন একনিষ্ঠ ভারতপন্থি আওয়ামী লীগ নেতা জনাব আব্দুর রাজ্জাক। “দৈনিক আমার দেশ”এর (২৮শে জুন, ২০০৯) সাথে সাক্ষাতকারে মীর সাজ্জাদ হোসেন বলেছেন,
“বরাক নদী থেকে মাত্র শতকরা ১ ভাগ পানি কুশিয়ারাতে আসে, এবং সুরমা একটুও পায়না। তার মতে ব্রক্ষ্মপুত্রের শতকরা ৭০ভাগ পানি এসে নদী দু’টিকে সচল রেখেছে।” তিনি আরো বলেছেন, “টিপাই বাঁধ” নির্মিত হলে বর্ষা মৌসুমে সিলেটের উত্তর-পূর্বাঞ্চল বন্যার কবলে পড়বে না। তার যুক্তি হল, বাঁধ নির্মিত হলে পলিমাটি জমবে না, লবণাক্ত পানিও প্রবেশ করবে না এবং ফসলী জমিও নষ্ট হবে না। এতে নৌ-চলাচল বাড়বে। উক্ত সাক্ষাৎকারে জনাব মীর হোসেন এটাও বলেছেন যে, টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ হলে কুশিয়ারা ও সুরমায় পানি থৈ থৈ করবে। 

কথা হল, শেখ হাসিনার পছন্দের পানি-বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিটি যেসব কথা বলছেন তা কি তিনি বুঝেসুঝে বললেন? বাংলাদেশে ভারতীয় স্বার্থের সরকারি উকিল তথা ভারতীয় হাইকমিশনার শ্রী পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তিও সম্ভবতঃ এমন যুক্তি দেখাতে লজ্জা পাবেন। অপর দিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রি ডাঃ দীপুমনি সম্প্রতি বলেছেন, আওয়ামী লীগের আমলে পানি চুক্তির ফলে বাংলাদেশ গঙ্গার ন্যায্য পানি পাচ্ছে। অথচ বাংলাদেশী কর্মকর্তাগণ বলছেন অন্য কথা। তারা বলছেন, ভারত পানির প্রাপ্য হিস্যা না দিয়ে অনেক কম দিচ্ছে। কথা হলো ডাঃ দীপুমনিও কি জেনেশুনে এরূপ কথা বলছেন? প্রশ্ন হলো, দীপুমনির ন্যায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং মীর সাজ্জাদ হোসেনের মত পানি বিশেষজ্ঞদের দিয়ে বাংলাদেশী টিম গঠন করলে ভারতীয় টিমে কোন খেলোয়াড়ের প্রয়োজন আছে কি? বাংলাদেশের স্বার্থরক্ষার কাজে এমন ব্যক্তিদেরকে ভারতে পাঠালে কি দেশের স্বার্থ বাঁচবে? কথা হলো, এমন সব ব্যক্তি বাংলাদেশে থাকতে ঢাকায় ভারতীয় দূতের প্রয়োজন আছে কি? ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশনার পিনক রঞ্জন বলছেন, টিপাইমুখ বাঁধ একটি পানিবিদ্যুৎ প্রকল্প, এতে নদীর পানি কমানো হবে না। শ্রী পিনক রঞ্জনের সে কথা আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ শুধু মেনেই নেয়নি, বরং বাড়িয়ে বলছে এ বাঁধের ফলে বাংলাদেশের নদীতে পানির পরিমাণ বাড়বে। বলছে, এ বাঁধ ফারাক্কা নয়, তাই এ বাঁধে পানি বেড়ে ভাটীর সুরমা-কুশিয়ারা-মেঘনাতে পানির থৈ থৈ অবস্থা সৃষ্টি হবে। 

কথা হল, বরাক নদীর শতকরা এক ভাগ পানি যদি কুশিয়ারা পায় তবে বাঁকী ৯৯ভাগ পানি কোথায় যায়? আর এ বাঁধের ফলে সিলেটের বন্যাই যদি থেমে যায় তবে প্রশ্ন, বরাক নদীর শতকরা এক ভাগ পানি ঠেকিয়েই কি সে পানি দিয়ে কি ভারতে বিদ্যূতের রমরমা অবস্থা সৃষ্টি করা হবে? আরো প্রশ্ন হল, সিলেট জেলার বন্যার কারণ কি বরাকের শতকরা এক ভাগ পানি? তাহলে যে স্থানে বারাকের বাঁকী ৯৯ ভাগ পানি যাচ্ছে সেখানে বন্যার কি অবস্থা? তাছাড়া বাঁধ দিলে পলিমাটি আসা বন্ধ হবে, সুরমা-কুশিয়ারায় পানি থৈ থৈ করবে এবং নদী দুটিতে নৌ-চলাচল বাড়বে সেটিই বা কীরূপে সম্ভব? নদীর উজানে বাধ দিলে কি ভাটিতে থৈ থৈ পানি হয়? ফারাক্কা বাঁধের ফলে পানির থৈ থৈ অবস্থা ভাগিরথিতে, পদ্মায় নয়। পদ্মায় তো হাঁটু পানি। সে পানিতে জাহাজ দূরে থাক বার মাস নৌকাও চলে না। অথচ ভাগিরতীতে বার মাস জাহাজ চলে। আন্তর্জাতিক মানের বন্দরও গড়ে উঠতে পারে। পদ্মার পানি অন্যায় ভাবে তুলে নেওয়ায় রমরমা হয়েছে কোলকাতা বন্দর। ভারত যে গঙ্গার পানি বন্টনে ন্যায্য আচরণ করেনি বরং ভয়ানক বঞ্চনা করেছে -সেটি বুঝবার জন্য গবেষণার প্রয়োজন নেই। একনজর ভাগিরথি ও পদ্মা দেখাটাই যথেষ্ট। পদ্মা ও ভাগিরথি দু’টো নদীই আমি স্বচক্ষে দেখেছি। প্রতিবেশী দেশের প্রতি ভারত সরকারের আচরণ যে কতটা নিষ্ঠুর ও বিবেকশূণ্য, এবং কতটা ন্যায়বিচার ও মানবতা-শূণ্য তার বড় স্বাক্ষী হল এই কানায় কানায় থৈ থৈ করা ভাগিরথি নদী আর শুকিয়ে যাওয়া পদ্মা। পদ্মার বুকে পানির চেয়ে বালিরই আধিক্য। গ্রীষ্মে ধু ধু করে এর সমগ্র বুক। অথচ আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ও করাচীর রাস্তায় আজও পাটের গন্ধ খুজেঁ বেড়ালেও, ভাগীরথিতে পদ্মার পানির গন্ধ পায় না। পদ্মার করুণ চেহারাও তাদের নজরে পড়ে না। বরং দাবী করে পদ্মা ন্যায্য পানি পাচ্ছে! 

বাংলাদেশের সীমান্ত ও সীমান্তে বসবাস করা নিরীহ মানুষ ও গরুবাছুড়ই শুধু ভারতীয় সন্ত্রাসের শিকার নয়, প্রচন্ড সন্ত্রাসের শিকার হলো এর নদ-নদী, প্রকৃতি, জলবায়ু, উদ্ভিদ ও পশু-পাখিসহ প্রতিটি জীব। লন্ডনের টেমস নদীতে বহু হাজার বছর আগে পানির যে প্রবাহ ছিল এবং কানায় কানায় যেভাবে পূর্ণ হতো -এখনও তাই হয়। বার্মার ইরাবতি, ইউরোপের দানিয়ুব, ব্রাজিলের আমাজন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপির আজও সে হাজার বছরের পুরনো থৈ থৈ রূপ। অথচ আজ থেকে মাত্র ৫০ বছর আগে পদ্মার যে প্রমত্তা প্রবাহ ছিল এখন সেটি বিলুপ্ত। গোয়ালন্দের ন্যায় দিবারাত্র মুখর বহু নদীবন্দর এখন বিলুপ্ত। এর বুক চিরে এখন আর হাজার হাজার নৌকা পাল তুলে ইলিশ মাছ ধরে না। স্টীমারও চলে না। যে পদ্মা হাজার হাজার বছর ধরে বাংলায় বেঁচে ছিল সেটি ফারাক্কার মরণ ছোবলে সহসাই মারা গেছে। পদ্মার পরিচয় মিলবে এখন শুধু অতীত ইতিহাস, উপন্যাস, ছোটগল্প ও কিছু প্রবীণ ব্যক্তিদের স্মৃতীতে। কারণ- টেমস, ইরাবতি, দানিয়ুব বা আমাজানের উপর কোন দূর্বৃত্ত সন্ত্রাসীর থাবা পড়েনি। নির্মিত হয়নি কোন ফারাক্কা। দস্যূতার শিকার হয়নি এর পানি। দেশে দেশে প্রকৃতি তো এভাবেই অক্ষত থাকে। প্রকৃতির উপর এটিই তো মানব জাতির দায়বদ্ধতা। অথচ আগ্রাসী প্রতিবেশীর কারণে বাংলাদেশে সেটি সম্ভব হয়নি। ফলে সমগ্র বিশ্বে সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের দেশ হলো বাংলাদেশে। বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে ভারতের অপরাধ অনেক, তবে সেগুলির মাঝে এটিই হলো অন্যতম বড় অপরাধ। 

ভারত সরকারের ন্যায় বাংলাদেশ সরকারও জনগণের নজর থেকে যা গোপন রেখেছে সেটি হল, টিপাইমুখ থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে কাছাড় জেলার ফুলেরতল নামক স্থানে যে আরেকটি প্রকান্ড বাঁধ দিচ্ছে সেটির কথা। সে বাঁধটি দেওয়া হচ্ছে সেচ প্রকল্পের অংশ রূপে। সে বাঁধের উজানে পানির যে বিশাল জলাশয় গড়া হচ্ছে সেখানে পানি আসমান থেকে নামবে না। নেওয়া হবে টিপাই বাঁধের উজান থেকে। ফলে বরাকের পানিপ্রবাহ থেকে যে পানি এতকাল সুরমা-কুশিয়ারা পেত সেটি আর পাবে না। ভারত যখন ফারাক্কায় বাঁধ দিচ্ছিল তখনও বলেছিল, বাঁধের লক্ষ্য নিছক ভাগিরথিতে কিছু পানি দিয়ে কোলকাতার বন্দরকে সচল করা। কিন্তু পরবর্তীতে পদ্মার পানি দিয়ে শুধু কোলকাতার বন্দরকে সচল করা হয়নি, সবুজ করা হয়েছে মধ্য-ভারতের বহু শত মাইল দূরের মরুভূমিকেও। এভাবে বঞ্চিত করা হয়েছে একান্ত পদ্মা পাড়ে বসবাসকারি বাংলাদেশের মানুষকে। বরং তাদেরকে উপহার দেওয়া হয়েছে ভয়াবহ মরুভূমিকরণ প্রক্রিয়া। অথচ এমন আচরণ শুধু প্রকৃতির সাথেই দূষমনি নয়, এ দূষমনি আন্তর্জাতিক আইন বিরুদ্ধেও। অওয়ামী নেতৃবৃন্দ শিশু নয় যে তার একথা বুঝে না। কিন্তু বেশী মনযোগী নিজেদের ক্ষমতার মসনদকে টিকিয়ে রাখতে। আর এ জন্য ভারতের সাহায্যপ্রাপ্তিকে তারা অপরিহার্য ভাবে। মীর জাফরও শিশু ছিল না। আহম্মকও ছিল না। জানতো, লর্ড ক্লাইভের বাহিনীর বিরুদ্ধে পলাশীতে যুদ্ধ না করার অর্থ বাংলার স্বাধীন অস্তিত্ব বিলুপ্ত হওয়া। কিন্তু তারপরও সে যুদ্ধ করেনি। বাংলার স্বাধীনতা তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। গুরুত্বপূর্ণ ছিল, পুতুল শাসক রূপে হলেও কিছুদিনের জন্য মসনদে বসা। আার এজন্যই সে ইংরেজদের মন যুগিয়ে চলাকে বাংলার স্বাধীনতার চেয়ে বেশী গুরুত্ব দিত। 

১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ সরকার ও ভারত সরকারের মধ্যে এ মর্মে চুক্তি হয় যে, দুইদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত কোন নদীর উপর কোন কিছু করতে হলে অপর দেশের অনুমতি নিতে হবে। এটি হল চুক্তির ৬ নং ধারা। টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণে ভারত বাংলাদেশের সাথে আলোপ-আলোচনা না করে স্পষ্টতঃ সে ধারা লংঘন করেছে। বরাক-সুরমা-কুশিয়ারর সম্মিলিত দৈর্ঘ্য হল ৯৪৬ কিলোমিটার, আর এর মধ্যে ৬৬৯ কিলোমিটারই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে। তাছাড়া ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় এ পার্বত্য এলাকাটি জনবিরল। এর ফলে এ নদীর পানির উপর নির্ভরশীল ভারতীয়দের তুলনায় বাংলাদেশীদের সংখ্যা ১০ গুণেরও বেশী। ফলে বরাক নদীর পানির উপর অধিক অধিকার বাংলাদেশের। অথচ ভারত বাংলাদেশকে সে ন্যায্য অধিকার দিতে রাজী নয়। সম্পদের লুন্ঠনে লুন্ঠনকারি সন্ত্রাসী কখনই প্রকৃত মালিকের অনুমতি নেওয়ার ধার ধারে না। ভারতও তেমনি বাঁধ দিতে বা নদী থেকে পানি তুলে নিতে অনুমতি নেয়নি বাংলাদেশের। সেটি যেমন ফারাক্কার ক্ষেত্রে ঘটেছে, তেমনি ঘটছে টিপাইমুখের ক্ষেত্রেও। এ বাঁধ নির্মাণের মধ্য দিয়ে ভারত ২০০৪ সালে জার্মানীর বার্লিনে স্বাক্ষরিত আন্তর্জাতিক পানিচুক্তিও লংঘন করেছে। সে চুক্তি মোতাবেক কোন দেশেরই আন্তর্জাতিক নদীর পানি তুলে নিয়ে অন্যদেশের ভূ-প্রকৃতিই পাল্টে দেওয়ার অধিকার নেই। অথচ ভারত সে আন্তর্জাতিক চুক্তিও লংঘন করেছে। বাংলাদেশকে না জানিয়ে সবকিছুই তারা লুকিয়ে লুকিয়ে করছে। সাবেক পানি সম্পদ মন্ত্রী জনাব হাফিজ উদ্দীন বলেন, বাংলাদেশ-ভারত যৌথ পানি কমিশনের মিটিংয়ে ২০০৩ এবং ২০০৫ সালে বাংলাদেশ সরকার ভারতকে টিপাইমুখ বাঁধের উপাত্ত তথা ডাটা দিতে বলে। কিন্তু ভারত তা দেয়নি। একই কাজ করেছে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ কালেও। 

টিপাইমুখ বাঁধের ফলে ভয়ানক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে বাংলাদেশের বিপুল এলাকা বিশেষ করে বৃহত্তর সিলেট জেলা এবং বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চল। শুকিয়ে যাবে সুরমা ও কুশিয়ারা ও এদু’টির ৬০টির মত ছোট ছোট শাখা নদী। পানির অভাবে বিপন্ন হবে চাষাবাদ, পশুপালন, মৎসপালন, নৌ-চলাচল ও গাছপালা। ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাবে আরো গভীরে। ফলে নলকুপের পানিতে বাড়বে আর্সেনিকের মাত্রা। যেমনটি ফারাক্কার কারণে হয়েছে উত্তর বাংলার বিশাল এলাকা জুড়ে। ফলে পানিপানের ফলে বাড়বে আর্সেনিকের ন্যায় বিষাক্ত বিষপান। আর এরূপ বিষপানে ব্যাপকভাবে বাড়বে মানব দেহে ক্যান্সার। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ধারণা, মানবজাতির ইতিহাসে এইডসের চেয়েও মহামারি হবে বাংলাদেশের এ আর্সেনিকজনিত ক্যান্সার। নদীতে পানি না থাকায় এ নদীগুলো বেয়ে সমুদ্রের নোনা পানি উপরে উঠা শুরু করবে এবং তা প্রবেশ করবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে। আর এতে বিপন্ন হবে চাষাবাদ। 

তবে শুধু পানিসংকট, স্বাস্থ্যসংকট বা কৃষিসংকটই নয়, বাংলাদেশে বিশেষ করে সিলেট্ জেলার লোকদের উপর ভয়ংকর বিপর্যয় আসবে অন্যভাবে। টিপাইমুখ বাঁধের উচ্চতা হবে ১৮০ মিটার। এবং পানি ধরবে ১৫,৯০০ মিলিয়ন কিউবিক মিটার। বাঁধটি যে এলাকাতে নির্মিত হচ্ছে সে এলাকাটি ভূমিকম্পের জন্য অতি পরিচিত। বিগত একশত বছরে সেখানে বহু ভূমিকম্প হয়েছে। ভারতের ইউনিভার্সিটি অব মনিপুরের অধ্যাপক ড. সয়বাম ইবোতম্বি সম্প্রতি এক নিবন্ধে বলেছেন, এ এলাকার ভূ-গর্ভে ভাজপূর্ণ স্তর রয়েছে। তার মতে এমন ভূ-প্রকৃতি সম্পন্ন এলাকায় ঘন ঘন ভূমিকম্প হয়। আর সে ভূমিকম্পে ফাটল সৃষ্টি হবে এ বাঁধে। এবং ভেঙ্গে যেতে পারে এ বাঁধ। তখন বাঁধের উজানের বিশাল লেকের পানির স্রোতে সৃষ্টি হবে সর্বনাশা এক প্লাবন যা কযেক মিনিটেই তলিয়ে দিবে সমগ্র সিলেট। তখন সে প্লাবনের পানিতে ভেসে যাবে বহু মানুষ ও সম্পদ। ফারাক্কা বাধের উজানে অতিরিক্ত পানি অন্যদিকে গড়ে যাবার জন্য ভাগিরথি আছে। আসে-পাশের সমতল ভূমিও আছে। কিন্তু টিপাইমুখে তা নেই। ফলে বছরের পর বছর ধরে জমাকৃত সে পানিতে প্রলয় এলে সেটি সিলেটবাসীর মাথার উপরই পড়বে। 

সন্ত্রাসী হামলায় স্বচ্ছল পরিবারও নিমিষে নিঃশেষ হয়। তেমনি নদীর উপর সন্ত্রাসে দ্রুত বিবর্ণ হয় দেশের জলবায়ু ও ভূ-প্রকৃতিসহ সমগ্র দেশ। একাত্তরের পর বাংলাদেশের অর্থনীতির উপরই শধু নয়, দেশটির প্রাকৃতিক সম্পদের উপরও ভারতীয় সন্ত্রাস ও লুটতরাজ চরম আকার ধারণ করেছে। আইয়ুব খান বাঙ্গালী ছিলেন না। কিন্তু যখন ফারাক্কা নির্মিত হচ্ছিল তখন তিনি প্রকাশ্যে হুমকি দিয়েছিলেন, “এ বাঁধটি চালু করলে আমরা বোমা মেরে উড়িয়ে দিব।” এবং সে হুমকী কাজও দিয়েছিল। তাই এ বাধেঁর পরিকল্পনা ১৯৫১ সালে শুরু হলেও ভারত সরকারকে পাকিস্তান ভাঙ্গা অবধি অপেক্ষা করতে হয়েছে। এজন্য আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনতে বিস্তর পুঁজিও বিণিয়োগ করতে হয়েছে। এজন্য একাত্তরে হাজার হজার সৈন্যের রক্তক্ষয় ও বহু হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকান্ড একখানি যুদ্ধও লড়তে হয়েছে। 

ফাঁরাক্কা বাধের নির্মাণ ছিল আন্তর্জাতিক আইনের বিরোধী। অথচ সে অন্যায় ও অবৈধ বাঁধকে জায়েজ করে দেয় শেখ মুজিব। তুলে নিতে দেয় ভারতীতের ইচ্ছামাফিক পানি। শেখ মুজিব শুধু পানির উপর ভারতীয় দস্যুতাকেই বৈধতা দেয়নি, বৈধতা দিয়েছিল দেশের সম্পদ লুন্ঠনেও। সীমান্ত বাণিজ্যের নামে তিনি বর্ডার খুলে দেন। পাত্রের তলায় ফুটো থাকলে সে পাত্রে পানি অবিরাম ঢাললেও তাতে পানি থাকে না। আর বর্ডার হলো একটি দেশের তলা। বাংলাদেশের সে তলা প্রায় ৪ হাজার মাইলব্যাপী। আর মুজিব সীমান্ত বাণিজ্যের নামে সীমান্ত খুলে দিয়ে তলাটিই ধ্বসিয়ে দিয়েছিলেন। এর ফলে বাংলাদেশ তখন বিশ্বব্যাপী পরিচিত পেয়েছিল তলাহীন ঝুড়ি রূপে। পাকিস্তান আমলে পশ্চিম পাকিস্তানী সেপাহী ও অফিসারেরা যতটা যত্ন সহকারে সীমান্তের হেফাজত করেছিল আওয়ামী লীগ সেটিও করিনি। সীমান্ত রক্ষার সে গুরুত্বও অনুভব করেনি। এভাবেই আওয়ামী লীগ তার শাসনামলে দেশবাসীর জন্য উপহার দিয়েছিল বাংলার ইতিহাসের ভয়ংকর দুর্ভিক্ষ। অথচ নির্বাচনে ওয়াদা দিয়েছিল ২০ টাকা মণ দরে চাউল খাওয়ানোর। 

বাংলাদেশের এবারের নির্বাচনেও ভারতের বিণিয়োগ ছিল বিশাল। ভারত সরকার কোন খয়রাতি প্রতিষ্ঠান নয় যে নিঃস্বার্থভাবে অর্থদান করবে। বরং তাদের প্রতিটি বিণিয়োগের পিছনে থাকে বিস্তর মুনাফা তোলার চেতনা। সেটি যেমন মুজিব আমলে ছিল, তেমনি এ আমলেও। এক্ষেত্রে ভারতের টার্গেট মুলতঃ পাঁচটি ক্ষেত্রে। একই রূপ ভারতীয় স্ট্রাটেজী ছিল মুজিবের আমলেও। সেগুলো হলোঃ 

এক) বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীর মেরুদন্ড দারুণ ভাবে ভেঙ্গে দেওয়া যাতে আর মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে। মুজিব আমলে আর্মিকে দূর্বল করে রক্ষিবাহিনী গড়া হয়েছিল সে কারণেই। এবং কেনা হয় নি কোন ট্যাংক ও বিমান। খয়রাত হিসাবে কয়েক খানি ট্যাংক জুটেছিল মিশর থেকে। এমনকি পাকিস্তানের ফেলে যাওয়া বিপুল অস্ত্রশস্ত্রও বাংলাদেশে রাখা হয়নি। আর এখন শুরু হয়েছে সেনা অফিসার নিধন ও সেনা অফিসারদের বহিস্কার। সৃষ্টি করা হয়েছে সেনাবাহিনীর সাথে বিডিআরের সংঘাত। 

দুই) বাংলাদেশের নদীগুলো থেকে পানি সম্পদ লুন্ঠন করে দেশটির ভূ-প্রকৃতি ও ভূগোলকে বিপন্ন করা। তাই ফারাক্কার বাঁধটি যেমন শেষ বাঁধ ছিল না, তেমনি শেষ বাঁধ নয় টিপাইমুখ বাঁধও। ফারাক্কা বাঁধ দিয়ে পদ্মার পানি অপহরণ শেখ মুজিবকে দিয়ে জায়েজ করিয়ে নিয়েছিল। এবারের আওয়ামী লীগ সরকারকে দিয়ে জায়েজ করে নিবে সুরমা-কুশিয়ারার পানি লুন্ঠনও। 

তিন) বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ভারতের পূর্বাঞ্চলে যাওয়া জন্য ট্রানজিটের সুযোগ হাসিল করা। বিগত সরকারগুলি সে সুযোগ দেয়নি। এবার তারা এশিয়ান হাইওয়ের ছদ্দবেশে সে সুযোগ আদায় করে ছাড়বে। 

চার) বাংলাদেশের শিল্প-বাণিজ্য বিশেষ করে গার্মেন্টস শিল্পকে ধ্বংস করা। মুজিবামলে তারা পাট ও বস্ত্র শিল্পকে পরিকল্পিত ভাবে ধ্বংস করেছিল এবং ধরাশায়ী করেছিল বাংলাদেশের অর্থনীতিকে। এভাবে বিশ্বব্যাপী ভিক্ষাবৃত্তি পরিণত হয়েছিল দেশের অর্থনীতি। তলাহীন ভিক্ষার ঝুলির খেতাব জুটেছিল তো একারণেই। তখন একের এর এক পরিকল্পিত ভাবে পাটের গুদামে আগুন দেওয়া এবং পাট ও বস্ত্রকলগুলোর যন্ত্রাংশ খুলে ভারতে নেওয়া হয়। একইভাবে আবার শুরু হয়েছে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলি লুট করা ও সেগুলিতে আগুন দেওয়ার কাজ। 

পাঁচ) দেশের ইসলামি রাজনৈতিক শক্তির উত্থানকে নির্মূল করা। মুজিব আমলে যেসব প্রতিষ্ঠানের নামে ইসলাম ছিল বা মনোগ্রামে কোরআনের আয়াত ছিল তা বিলুপ্ত করা হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রাম থেকে কোরআনের আয়াত তুলে দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে প্রকান্ড আকারের মূর্তি বসানো হয়েছিল। কাজি নজরুল ইসলামের গা থেকেও ইসলাম খসিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তাই নজরুলে ইসলাম কলেজ হয়ে যায় নজরুল কলেজ। যুদ্ধাপরাধি বিচারের নামে দেশের ইসলামপন্থিদের গ্রেফতার ও তাদের উপর নির্যাতের মূল হেতু তো এখানেই। অপর দিকে তসলিমা নাসরিনদের ন্যায় ইসলামের ঘোরতর দূষমণদের আবার দেশে ফিরে আসার সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে। লক্ষ্যণীয় যে, মুজিবামলে ভারত এ ৫টি ক্ষেত্রে যেরূপ দ্রুত সফলতা পেয়েছিল, আজও একই রূপ সফলতা পাচ্ছে। ভারত গত নির্বাচনে বিপুল পুজি বিণিয়োগ করেছে। এখন তাদের মুনাফা তোলার পালা। 

আওয়ামী লীগ তার রাজনীতির জোয়ার দেখেছে, ভাটাও দেখেছে। কিন্তু লক্ষ্যণীয় হল, তা থেকে সামান্যতম শিক্ষাও নেয়নি। ফলে দলটির উপর বিপর্যয়ও নেমে আসছে বার বার। অতীতের ন্যায় এখন এটাই ভেবেছে, তারা যেহেতু নির্বাচিত সেহেতু যা ইচ্ছে তাই করার ক্ষমতা তাদের রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ সিকিম নয় যে, নির্বাচিত লেন্দুপ দর্জিদেরকে সংসদে দাঁড়িয়ে নিজদেশের সার্বভৌমত্ব বিলিয়ে দিতে দিবে এবং বিলিন হতে দিবে ভারতের মাঝে। এটি আর গোপন বিষয় নয় যে, ভারতের প্রতি আওয়ামী লীগের প্রচন্ড দায়বদ্ধতা আছে। কারণ ভারত একাত্তরে তার নিজ ভূমিতে কয়েক লক্ষ আওয়ামী নেতাকর্মীকে প্রচুর আদর-যত্নে আপ্যায়ন করেছিল। নেতাদেরকে কোলকাতার হোটেলে মহা-ধুমধামে জীবনযাপনের সুযোগ দিয়েছিল। এসব নেতারা বিপুল সাহায্য পেয়েছে একাত্তরের পরও। ১৯৭৫এর পট পরিবর্তনের পর শেখ হাসিনা নিজেও ভারতের দিলখোলা মেহমানদারি পেয়েছেন। এভাবে আওয়ামী লীগের প্রতি ভারতের প্রচন্ড অঙ্গিকার কখনই গোপন থাকেনি। সে অঙ্গিকার এখনও অটুট। এজন্যই সম্প্রতি ভারতীয় মন্ত্রি শ্রী প্রণব মুখার্জি বলেছেন, এবার আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে কিছু হলে ভারত বসে থাকবে না। তার এ হুমকি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে, এটি বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে সুস্পষ্ট হস্তক্ষেপ। আওয়ামী সরকারের উচিত ছিল প্রণব মুখার্জির এমন উদ্ধত বক্তব্যের বিরুদ্ধে বিবৃতি দেওয়া। কিন্তু তারা তা দেয়নি। কারণ তাদেরও তো নিমকহালালীর ব্যাপার আছে। ফলে বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে ভারতীয় হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে তারা প্রতিবাদ জানায় কি করে? একই রূপ নিমকহালালী করতে গিয়ে শেখ মুজিব ফারাক্কার পানি ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিলেন, খুলে দিয়েছিলেন সীমান্ত। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ফেলে যাওয়া শত শত কোটি টাকার অস্ত্রশস্ত্র ভারতে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। সঁপে দিয়েছিলেন বেরুবাড়ি। একইভাবে হাসিনা সরকারও তুলে দিবে সুরমা-কুশিয়ারার পানি। এতে বাংলাদেশ মরুভূমি হলে তাদের কি ক্ষতি? মুজিবামলে দেশের ভুখা মানুষ ডাস্টবীনের উচ্ছিষ্ঠ, লতাপাতা, এমনকি বমিও খেয়েছে। তখন অভাবের তাড়নায় মানুষ জাল পড়তে বাধ্য হয়েছিল। অথচ সে দূর্দিনেও সমৃদ্ধি ও আনন্দ বেড়েছিল আওয়ামী নেতাদের। 

টিপাইমুখ বাঁধ বাংলাদেশের মানুষের জন্য এক মহা পরীক্ষা নিয়ে হাজির। জালেমের কাছে নতি স্বীকারে কোন কল্যাণ নেই, গর্বেরও কিছু নেই। আত্মসর্পণের এ পথ ভয়ানক অকল্যাণ ও অপমানের। বিশ্ব আজ দারুনভাবে সন্ত্রাসকবলিত। আর সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী হল আগ্রাসী বৃহৎ রাষ্ট্রগুলো। তাদের সন্ত্রাসের কারণে আজ অধিকৃত ও লুন্ঠিত দূর্বল দেশগুলোর তেল, গ্যাস ও পানি সম্পদ। এ অধিকার জমাতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রকান্ড সন্ত্রাসী যুদ্ধ লড়লো আফিগানিস্তান ও ইরাকে। একই কারণে অধিকৃত হয়েছে ফিলিস্তিন ও কাশ্মির। একইভাবে অধিকৃত ও লুন্ঠিত হয়েছে পদ্মার পানি এবং আজ অধিকৃত ও লুন্ঠিত হতে যাচ্ছে সুরমা ও কুশিয়ারার পানি। অথচ পানিই বাংলাদেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। এ পানির সাথেই রয়েছে বাংলার মানুষের মনের ও দেহের সম্পর্ক। এ সম্পদ লুন্ঠিত হলে বাংলাদেশীদের প্রাণে বাঁচাই দায় হবে। এতদিন ভুমি নিয়ে যুদ্ধ হয়েছে, বহু যুদ্ধ তেল নিয়েও হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আগামীদিনের যুদ্ধগুলি হবে পানি নিয়ে এবং বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রকান্ড সে যুদ্ধ ভারত শুরুই করে দিয়েছে। আমরা সে যুদ্ধে পরাজিত হয়েছি পদ্মায়, এখন পরাজিত হতে চলেছি সুরমা ও কুশিয়ারায়। প্রশ্ন হল, বাংলাদেশীরা কি এভাবে পরাজিতই হতে থাকবে? আমরা কি ভিয়েতনামীদের চেয়েও দূর্বল? আর ভারত কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও শক্তিশালী? তবে এক্ষেত্রে প্রশ্ন হল, এমন একটি যুদ্ধ কি আওয়ালীগের নেতৃত্বে সম্ভব? যুদ্ধ দূরে থাক, সামান্য প্রতিবাদেও কি তাদের আগ্রহ আছে? শেখ মুজিব শত শত জনসভা করেছেন। সে সব জনসভায় উচ্চারণ করেছেন বহু লক্ষ বাক্য। কিন্তু একটি বাক্যও কি মরন বাঁধ ফারাক্কার বিরুদ্ধে উচ্চারণ করেছেন? করেন নি। কারণ ভারতের বিরুদ্ধে কথা বলা ছিল তার রাজনীতির নিষিদ্ধ ক্ষেত্র। তেমনি এক অবিকল অভিন্ন ভূমিকায় নেমেছেন শেখ মুজিবের কন্যা শেখ হাসিনা। ফলে টিপাইমুখ নিয়ে হাসিনা সরকার প্রতিবাদ করবে সেটি কি আশা করা যায়? তার দলের নেতারা তো প্রশংসায় নেমেছে। ভারত যা বলছে সেটিকেই আওয়ামী লীগ জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য করার চেষ্টায় নেমেছে। এজন্যই বলছে, টিপাই বাঁধ দিলে সুরমা-কুশিয়ারায় পানি থৈ থৈ করবে। শেখ মুজিব একই রূপ স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন বাংলার মানুষকে। বলেছিলেন, ভারতের সাথে সীমান্ত বাণিজ্য শুরু হলে দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা হবে। কিন্তু বাস্তবে সেটি হয়নি। বরং নেমে এসেছিল ভয়াবহ দূর্ভিক্ষ। শেখ হাসিনা তার নিজের সন্তানদের আমেরিকায় পাঠিয়েছেন। ফলে সমগ্র বাংলাদেশ মরুভূমি হয়ে গেলেও তাতে তার নিজ প্রজন্মের ক্ষতির সম্ভাবনা আছে কি? নেই। তাই পানি-সমস্যাটি শেখ হাসিনার নিজের সমস্যা নয়, এটি নিতান্তই জনগণের। ফলে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ আসতে হবে জনগণের স্তর থেকেই। আজকের বাংলাদেশীদের সামনে বস্তুতঃ এটিই হল বড় পরীক্ষা। এখানে পরীক্ষা হবে তারা কতটা মাথা উঁচু করে বাঁচতে চায় সেটির। পরীক্ষা হবে স্বাধীন জাতি রূপে বাঁচবার প্রকৃত সামর্থের।

 

 




বাঙালী মুসলিম আর কত নীচে নামবে?

২৬শে মার্চের দু’টি বিশেষ খবর হলোঃ এক): মসজিদের মাঝে মাদ্রাসার ছাত্র ও মুসল্লীদের গলায় পৌত্তলিক রবীন্দ্র নাথের “আমারা সোনার বাংলা” গানটি গাওয়ার ভিডিও। এ ভি্ডিও ভাইরাল হয়েছে। আজ অবধি বাংলাদেশের কোন মসজিদে এমন গর্হিত কাজ হয়নি। এমনকি ভারতের ন্যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ কাফেরদের দেশেও এ অবধি কোন পৌত্তলিকের লেখা গান মসজিদে গাওয়া হয়নি। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন কলংকজনক সংযোজন। অথচ রবীন্দ্রনাথের এ গানটিতে রয়েছে প্রকট শিরক তথা পৌত্তলিকতা। পতিতা পল্লী, সূদী ব্যাংক এবং মদের দোকান যেমন বহাল তবিয়তে বাংলাদেশে বেঁচে আছে, তেমনি এ পৌত্তলিক গানও বাজার পেয়েছে দেশের জাতীয় সঙ্গিত রূপে। মুসলিমদের মাঝে জায়েজ দেশপ্রেম আছে। কিন্তু দেশকে মা বলা এবং বন্দনা দেয়াটি পৌত্তলিক হিন্দুদের সংস্কৃতি। সে পৌত্তলিকতাও এখন আল্লাহতায়ালার ঘরে ঢুকলো। ইসলাম থেকে দূরে সরানোর ভারতীয় প্রজেক্ট যে কতটা সফল হচ্ছে এ হলো তার নজির। রাষ্ট্রের শাসন ক্ষমতা ইসলামবিরোধীদের হাতে গেলে লক্ষ লক্ষ মসজিদ-মাদ্রাসা গড়েও যে ইসলামের মৌল বিশ্বাসকে বাঁচানো যায় না -এ হলো তারই প্রমাণ। তাই ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন সঁপে দেয়াটি হারাম। এবং পবিত্র জিহাদ হলো তাদের হাত থেকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ছিনিয়ে নেয়া। সেটিই নবীজী (সাঃ)র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যয়বহুল সূন্নত। সে সূন্নত প্রতিষ্ঠা করতে নবীজী বহু যুদ্ধ করেছেন এবং নিজে রাষ্ট্রপ্রধান হয়েছেন। সে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ও প্রতিরক্ষা দিতে শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবীকে শহীদ হতে হয়েছে। পরিতাপের বিষয় হলো, যে আসনে খোদ নবীজী (সাঃ) বসেছেন, বাংলাদেশে সে আসনটি অধিকৃত হয়েছে একজন প্রমাণিত ভোট-ডাকাতের হাতে। ফলে আল্লাহতায়ালার ঘরে পৌত্তলিক রবীন্দ্রনাথে গান গাওয়া হবে তাতেই বা বিস্ময়ের কি?  

দুই):  ২৬শে মার্চ উপলক্ষে শিবিরের মিছিল। বাংলাদেশে ইসলামপন্থি দলের সংখ্যা অনেক। শিবিরের নেতাকর্মীগণও নিজেদের ইসলামপন্থি রূপে পরিচয় দেয়। কিন্তু শিবির যে ভাবে এদিনে মিছিল বের করে তা অন্য কোন ইসলামী দল বের করে না। তার হেতু কি? মুসলিম বিশ্বে বিশাল ভূগোলের দেশগুলি ভেঙ্গে ছোট ছোট বহু দেশ গড়ার কাজ বহু হয়েছে। দেশগুলির সংখ্যা এখন ৫৭। হযরত উমর (রাঃ) এর খেলাফত কালে সিরিয়া বা শাম নামে যে একটি প্রদেশ ছিল সেটি ভেঙ্গে ৫টি দেশ গড়া হয়েছে। বিশাল উসমানিয়া খেলাফত ভাঙ্গা হয়েছে। আরব ভূ-খণ্ড ভেঙ্গে ২০টিরও বেশী দেশ সৃষ্টি হয়েছে। মনে রাখতে হবে, মুসলিম দেশগুলিতে যা হয় তাই ইসলামী নয়। বহু কিছুই হয় নিরেট কাফের ও তাদের সেবাদাসদের হাতে এবং তাদের স্বার্থপূরণে। 

লক্ষণীয় হলো, খেলাফত ভাঙ্গা এবং আরব ভূ-খণ্ড ভাঙ্গার সাথে কোন ইসলামপন্থি দল জড়িত ছিল না। মুসলিম দেশ  ভাঙ্গার অর্থই হলো মুসলিম উম্মাহর মেরুদণ্ড ভাঙ্গা। পবিত্র কোরআনে এরূপ বিভক্তির বিরুদ্ধে চরম হুশিয়ারি দেয়া হয়েছে। বিভক্ত হলে আযাব যে অনিবার্য -সে হুশিয়ারি শোনানো হয়েছে সুরা আল-ইমরানের ১০৫ নম্বর আয়াতে। তাই যাদের  মধ্যে কোরআনের জ্ঞান আছে তারা কখনোই এ পাপের পথে নামেনি।  ঘর বাঁধলে সে ঘরে ঈঁদুর ঢুকবে, সে ঈদুরের গর্তে গোখরা শাপ ঢুকবে সেটি অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু চরম নির্বুদ্ধিতা হলো শাপ না মেরে ঘরকে জ্বালিয়ে দেয়া। সেটি শত্রুর কাজ। তেমনি দেশের শাসন ক্ষমতা থেকে দুর্বৃত্ত শাসককে না হটিয়ে দেশভাঙ্গাটিও নির্বুদ্ধিতা।  মুসলিম বিশ্বে দেশ ভাঙ্গার কাজটি হয়েছে ঔপনিবেশিক কাফের শক্তির নেতৃত্বে এবং তাদেরই সামরিক মদদে। তারা সেটি করেছে মুসলিম উম্মহর দুর্বলতা বাড়াতে এবং নিজেদের শাসন ও শোষনের অবকাঠামো গড়ে তোলার স্বার্থে। ইসরাইল প্রতিষ্ঠা পেয়েছে সে দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে। বিদেশী কাফেরদের সাথে কাধে কাঁধ কাজ করেছে ইসলামে অঙ্গিকারহীন নানা ভাষা ও নানা গোত্রের জাতীয়তাবাদী ও গোত্রবাদী সেক্যুলারিস্টগণ। কোন ইসলামপন্থি ব্যক্তি বা দল এর সাথে জড়িত ছিল না। বরং তারা নিজ নিজ সামর্থ্য  দিয়ে সে ভাঙ্গার কাজের তীব্র বিরোধীতা করেছে। কারণ, ইসলামে মুসলিম দেশ ভাঙ্গা হারাম। এবং ফরজ হলো মুসলিম ভূমির একতাকে টিকিয়ে রাখা।

একই কারণে কিছু বিরল ব্যতিক্রম ছাড়া ১৯৭১ সালে কোন ইসলামী দল, কোন পীর সাহেব বা কোন আলেম বা মাদ্রাসার কোন শিক্ষক পাকিস্তান ভাঙ্গাকে সমর্থন দেয়নি। একাত্তরে তারা হেরেছে এবং জিতেছে হিন্দুদের সাথে ইসলাম থেকে দূরে সরা ভারতপন্থি, রুশপন্থি, চীনপন্থি সেক্যুলারিস্টগণ। ফলে তাদের এ বিজয় নিয়ে কোন ইসলামপন্থি  দল উৎসব করে না। কিন্তু ২৬শে মার্চ ও ১৬ই ডিসেম্বর এলেই জামায়াত-শিবির দেশের সেক্যুলারিস্টদের সাথে প্রতিযোগিতা দিয়ে রাস্তায় মিছিল বের করে। এটিই বলে দেয়, ইসলামের আদর্শ থেকে তারা কতটা দূরে সরেছে। যদি তাদের মধ্য কোরআনের জ্ঞান থাকতো তবে উৎসব নয়, এদিনে তারা মাতম করতো। বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্রের এবং সে সাথে পারমানবিক শক্তির সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠি রূপে বিশ্ব রাজনীতিতে বাঙালী মুসলিমগণ যে প্রভাব ফেলতে পারতো -তা কি পোষাক রপ্তানি, চিংড়ি রপ্তানি ও শ্রমিক রপ্তানি করে সম্ভব? ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে এরূপ পরাজয়ের দিন তো বহু। তাছাড়া্ আজ যে বাকশালী দুর্বৃত্তদের হাতে বাঙালী মুসলিমের ভোট ছিনতাই হয়েছে অবিকল তাদের হাতেই কি একাত্তরের নেতৃত্ব ছিল না? এরূপ দুর্বৃত্ত সেক্যুলারিস্টদের বিজয়ের দিনে উৎসবমুখর  মিছিল করা তো সেক্যুলারাইজেশনের লক্ষণ। এখানে লক্ষ্য, আল্লাহতায়ালাকে খুশি করা নয় বরং সেটি ভারত ও ভারতসেবী সেক্যুলারিস্টদের খুশি করা। এবং সেটি তাদের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর তাগিদে। অথচ ঈমানদার তো রাজনীতি করে মহান আল্লাহতায়ালার কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে। পরাজয় তো পয়গম্বরদের জীবনেও এসেছে; তবে ইসলামের মৌল শিক্ষা থেকে বিচ্যুতি আসবে কেন?

তেমনি মসজিদের মধ্যে যারা ২৬শে মার্চ উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথের গান গাচ্ছে সেটিও দেশের সেক্যুলার শাসকগোষ্ঠিকে খুশি করার তাগিদে। হাসিনাকে খুশি করার তাগিদে তারা ইতিমধ্যেই তাকে “কওমীর জননী” উপাধি দিয়েছে। লক্ষ্য, দুনিয়াদারির স্বার্থ হাসিল। ইতিমধ্যেই তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির প্রতিশ্রুতি পেয়েছে। মূলা ঝুলানো হয়েছে মাদ্রাসায় অনুদানের। কথা হলো, সে খুশিতে কি মসজিদের মধ্যে পৌত্তলিকের লেখা গান গাইতে হবে? এই কি ঈমানের মান? এতো সস্তায় ঈমান বিক্রি?  অথচ কারো রেযেকই সরকার দেয় না, রেযেক আসে একমা্ত্র মহান আল্লাহতায়ালা থেকে। এ ঈমানটুকু না থাকলে কি কাউকে মুসলিম বলা যায়? কিন্তু কোথায় সে ঈমান? ঈমানদারের প্রতিটি কথা ও কাজ তো হবে আল্লাহকে খুশি করার লক্ষ্যে। প্রকৃত ঈমানদার এ কারণেই আল্লাহমুখি হয়, সরকারমুখি হয় না।

বাংলাদেশের সেক্যুলারিস্টগণ বহু আগেই বহু  নীচে নেমেছে এবং বাংলাদেশের মুখে কালিমা লেপন করেছে। তারা তো ইতিহাস গড়েছে ভোটডাকাতির নির্বাচনে বিশ্বরেকর্ড গড়ে। সেটি যেমন ২০‌১৪ সালে, তেমনি ২০১৮তে। এ শতাব্দীর শুরুতে তারা রেকর্ড গড়েছিল দুর্নীতিতে বিশ্বে ৫ বার প্রথম হয়ে। সত্তরের দশকে তারা ইতিহাস গড়েছিল দেশকে ভিক্ষার তলাহীন ঝুড়ি বানিয়ে। আর আজ মোল্লা-মৌলভী এবং তথাকথিত ইসলামপন্থিরা ইতিহাস গড়ছে ইসলামের মৌল শিক্ষা থেকে দূরে সরে। তাদের এ বিচ্যুতির কারণেই নবীজী (সাঃ)’র ইসলাম -যাতে ছিল ইসলামী রাষ্ট্র, শরিয়ত, হুদুদ, শুরা, জিহাদ, প্যান-ইসলামিক মুসলিম ঐক্য বাংলাদেশে বেঁচে নাই। সামর্থ্য হারিয়েছে অন্য ভাষা ও অন্য এলাকার মুসলিমদের ভাই বলার সামর্থ্য। তারা বেঁচে আছে নিজেদের নেতা ও হুজুরদের আবিস্কার করা ইসলাম নিয়ে। এবং বেঁচে আছে ভাষা, এলাকা, গোত্র, ফিরকা, মজহাব, তরিকার নামে বিভক্তির দেয়াল গড়া নিয়ে। আর এভাবেই বিজয়ের আনন্দ বাড়াচ্ছে শয়তানের শিবিরে। ২৮/৩/২০১৯  

         




বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের স্নায়ুযুদ্ধ

যুদ্ধের শুরু সাতচল্লিশ থেকেই

যুদ্ধ শুধু গোলাবারুদে হয় না। অতি আগ্রাসী ও দেশধ্বংসী যুদ্ধ হয় গোলাবারুদ ছাড়াই। পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোকে পাশ্চাত্যের পুঁজিবাদী শক্তির প্রভাব বলয়ে বন্দী করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় মিত্রদের একটি গোলাও ছুঁড়তে হয়নি। সেটি সম্ভব হয়েছে স্নায়ুযুদ্ধের ময়দানে বিশাল বিজয়ের ফলে। এটি এক শীতলযুদ্ধ। এখানে জয়-পরাজয় হয় অতি নীরবে। পূর্ব ইউরোপের এ দেশগুলো মার্কিন স্বার্থের এতটাই তাঁবেদারে পরিণত হয়েছে যে,পোলান্ড, আলবানিয়াসহ কয়েকটি দেশের সৈন্যরা আফগানিস্তান ও ইরাকে মার্কিন সৈন্যদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধও লড়েছে। স্নায়ু যুদ্ধ লড়তে হলে প্রয়োজন পড়ে বিশাল গুপ্তচর বাহিনীর,এবং সে সাথে সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও মিডিয়া সৈনিকের।ভারত সে যুদ্ধটি বাঙ্গালীর চেতনা রাজ্যে ১৯৪৭থেকেই লড়ে আসছে।তখন সে যুদ্ধের লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানের বিনাশ। আর এখন লক্ষ্য, বাংলাদেশের বিনাশ। গোলাবারুদের যুদ্ধে দেশ দখল হয়। আর স্নায়ুযুদ্ধে অধিকৃত হয় শত্রুদেশের জনগণের মনের ভূগোল। পরাজিত নাগরিকগণ তখন মানসিক গোলামে পরিণত হয়।

স্নায়ু যুদ্ধে ভারতের বিজয়টি বিশাল। ভারতের হাতে পাকিস্তানে পরাজয়ের শুরুটি মূলতঃ স্নায়ুযুদ্ধের ময়দানে। ভারত কাশ্মীর, হায়দারাবাদ ও সিকিমের ন্যায় পূর্ব পাকিস্তানের মানচিত্র দখলে নিতে না পারলেও পূর্ণ দখলদারি প্রতিষ্ঠা করেছিল শেখ মুজিব, তাজুদ্দীনসহ আওয়ামী নেতা-কর্মীদের মনের মানচিত্রে। একাত্তরের বহু আগেই এভাবে অধিকৃত হয় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের লক্ষ লক্ষ ছাত্র-শিক্ষক,সাংস্কৃতিক কর্মী  ও বুদ্ধিজীবীর মনের ভূবন।অথচ ব্রিটিশ আমলে বাঙালী মুসলমানের মনের জগতে প্রবল ভাবে বেড়ে উঠেছিল প্যান-ইসলামিক চেতনা, মুসলিম ভাতৃত্ব ও ইসলামের বিজয়ে গভীর অঙ্গিকার।এবং উচ্চারিত হতো “নারায়ে তকবীর,আল্লাহু আকবর” ধ্বনি।বাংলাই ছিল সে সময় ভারতের বুকে মুসলিম জাগরণের মূল ঘাঁটি। ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান খেলাফত বাঁচাতে এই বাংলার বুকেই গড়ে উঠেছিল ইতিহাসের সর্বপ্রথম গণআন্দোলন “খেলাফত আন্দোলন”। প্যান-ইসলামিক সে চেতনা নিয়ে তারা অবাঙালী মুসলমানদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাকিস্তান আন্দোলন করেছে এবং বিজয়ীও হয়েছে।সৃষ্টি হয়েছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান –যার সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক ছিল বাংলাভাষী। কিন্তু ভারত-পরিচালিত স্নায়ুযুদ্ধের প্রকোপে সে চেতনার অচিরেই মৃত্যু ঘটে। ভারতীয় হিন্দুদের দখলে যায় লক্ষ লক্ষ বাঙালী মুসলমানের চেতনা রাজ্য। ফলে অবাঙালী মুসলমানের চেয়ে তখন বেশী আপন হতে শুরু করে ভারতের অবাঙালী কাফের। তেমন একটি আদর্শিক পরাজয়ের কারণেই ভারতের কোলে আশ্রয় নিতে মুজিব ও তার অনুসারিদের বিন্দুমাত্র শরম হয়নি। নিজদেশের ফজলুল হক,সহরোয়ার্দী, নাজিমুদ্দীনের চেয়ে ভারতের গান্ধি, নেহেরুর চেতনাই তাদের কাছে আপন মনে হয়। আর মন যে দিকে যায়, দেহও সেদিকে যায়। একাত্তরে তাই ভারতের অস্ত্র নিয়ে নবদিক্ষিত এ সেক্যুলারিস্টরা ভারতীয় এজেন্ডা পূরণে রণাঙ্গণে নেমেছিল। সাতচল্লিশের বাঙালী মুসলমানদের চেতনা ও বিশ্বাসের সাথে একাত্তরে এসে এভাবেই ঘটে সবচেয়ে বড় গাদ্দারি। এবং সেটি মুজিবের নেতৃত্বে। শেখ হাসিনাসহ আজকের আওয়ামী বাকশালীদের চেতনার রাজ্যে আজও সে ভারতীয় দখলদারিটি প্রকট। দেশ অধিকৃত হলে সে দেশের নদীর পানি ইচ্ছামত তুলে নেয়া যায়। বুকের উপর দিয়ে ইচ্ছামত ট্রানজিটও নেয়া যায়। বাজারও দখলে নেয়া যায়। ইচ্ছামত সম্পদ-লুট ও শিল্প-ধ্বংসও তখন সহজ হয়। মানুষ মারতে দুর্ভিক্ষও সৃষ্টি করা যায়। ভারত তো বাংলাদেশে সেগুলিই করছে। সেটি যেমন মুজিব আমলে, তেমনি হাসিনার আমলে।

শত্রুর যুদ্ধ কখনোই শেষ হয়। শুধু রণাঙ্গন ও কৌশল পাল্টায় মাত্র। রণকৌশল রূপেই ভারত এখন গোলাবারুদ ব্যবহার না করে শুরু করেছে ব্যাপক প্রচারণা যুদ্ধ। স্নায়ু যুদ্ধের মূল অস্ত্রটি হলো প্রচার। আর ভারত সে অস্ত্রের সংখ্যা বিপুল হারে বাড়িয়েছে। একাত্তরের আগে ছিল শুধু কলকাতা ও আগরতলা থেকে আকাশবানীর বেতার প্রচারণা। আর এখন বাংলাদেশের সীমান্ত ঘিরে অসংখ্য ভারতীয় চ্যানেল। বাংলাদেশের মানুষ যত না বাংলাদেশী চ্যানেল দেখে তার চেয়ে বেশী দেখে ভারতীয় চ্যানেল। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতপন্থিদের পত্রিকাও অসংখ্য। এসব পত্রিকা বহু কলামিস্ট ভারতীয়দের চেয়েও অধিক ভারতীয়। তাছাড়া তাদের পত্রিকায় ভারতীয় কলামিস্টগণও লিখছে মূক্তহাতে।একাত্তরের আগে সেটি ছিল না। ভারতের এ স্নায়ু যুদ্ধটি যে শুধু বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের চেতনায় দখলদারি প্রতিষ্ঠা করেছে তা নয়, আঘাত হেনেছে কিছু কিছু ইসলামি দলের দুর্গেও। ফলে অধিকৃত হচ্ছে বহু ইসলামপন্থির মনের ভূবনও। তাই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের সামরিক বিজয় নিয়ে তারাও বিজয় মিছিল করে।  ভারতের বিজয়ের এ ধারা আরো কিছু কাল চলতে থাকলে সে দিন আর বেশী দূরে নয় যখন ১৯৪৭ সালের পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা ও আজকের পৃথক বাংলাদেশ তাদের কাছে অপ্রয়োজনীয় মনে হবে। অখন্ড ভারতের মোহে তখন তারাও ভারতীয়দের সাথে গলা মিলিয়ে “জয়হিন্দ” স্লোগান তুলবে। জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের অনুসারিরা তো ভারতীয় কংগ্রেসের সাথে একই মঞ্চে সে অখন্ড ভারতের জিকির ১৯৪৭ সালের আগে থেকেই দিয়ে আসছে।

ভারত একাত্তরে তার সশস্ত্র বাহিনীকে তুলে নিলেও স্নায়ুযুদ্ধের সৈনিকদের তুলে নেয়নি। বরং তাদের সংখ্যা বিপুল ভাবে বাড়িয়েছে। বাংলাদেশের প্রতিটি শহর,প্রতিটি থানা ও প্রতিটি ইউনিয়নে এখন ভারতীয় গুপ্তচর।ভারতপন্থি হাজার হাজার সৈনিকের অবস্থান যেমন বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকা ও টিভিতে, তেমনি প্রশাসন,শিক্ষাসংস্কৃতি, সামরিক ও বেসামরিক বাহিনীতে। এ সৈনিকদের প্রতিপালনে ও তাদের বিজয়ী করতে ভারত বিপুল অর্থও ব্যয় করছে। এমন কি ভারতীয় পত্রিকায় প্রকাশ, এবার আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করতে ভারতের বিনিয়োগ ১০০ কোটি রুপী। গত নির্বাচনে ছিল ৮০০ কোটি রুপী। এত বিনিয়োগের কারণ, ভারতীয় বর্ণহিন্দুদের উচ্চাশা। তারা চায় বিশ্বশক্তির মর্যাদা। সে লক্ষ্যে চাই বৃহৎ ভূগোল, চাই শত্রুমূক্ত দক্ষিণ এশিয়া।এজন্যই ১৯৪৭ সালে ভারত ভেঙ্গে পাকিস্তানের সৃষ্টি তাদের পছন্দ হয়নি। শুরু থেকে তাই দেশটির অস্তিত্বকেও তারা মেনে নিতে পারিনি।কারণ তাতে ভারতের ভূগোলই শুধু ছোট হয়নি, জনসংখ্যারও এক-তৃতীয়াংশ তখন বেরিয়ে গিয়েছিল।

ভারতের লক্ষ্য এখন দ্বিমুখী। এক, সুযোগ পেলেই ভূগোল বাড়ানো। দুই, প্রভাব বাড়ানো। ভূগোল বাড়াতে গিয়েই দখল করে নিয়েছে কাশ্মীর, হায়দারাবাদ, জুনাগড়, মানভাদর ও সিকিম। যে দেশগুলোকে ভারত এখনও গিলতে পারিনি, চায় তাদের উপর প্রভাব বাড়াতে। ভারত চায়,নিজ সীমান্ত ঘিরে সিকিম, ভুটান, নেপাল, শ্রীলংকার ন্যায় শক্তিহীন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দেশ।চায় সেসব দেশে নিজ-পণ্যের উম্মুক্ত বাজার। সেটি যেমন শিল্পপণ্যের,তেমনি সাংস্কৃতিক পণ্যের। পাকিস্তান এখন পারমানবিক অস্ত্রধারি একটি দেশ। সেটি ভারতের পছন্দ হয়নি। দেশটি আরো টুকরো করা তাই ভারতীয় বিদেশ নীতি। বাংলাদেশ ১৬ কোটি মানুষের দেশ। ফলে সম্ভাবনা রয়েছে পাকিস্তানের ন্যায় এক শক্তিশালী বাংলাদেশ উদ্ভবের। কিন্তু সেটি ভারতের পছন্দ নয়। ফলে বাংলাদেশকে পঙ্গু করাও ভারতের স্ট্রাটেজী। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের স্নায়ুযুদ্ধের মূল হেতু তো সেটিই।   

 

ভারতীয়দের ইসলাম-আতংক

গত ২৮/১১/১৩ তারিখে কলকাতার দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা বাংলাদেশের উপর একটি রিপোর্ট ছেপেছে। রিপোর্টটি লিখেছেন নয়াদিল্লি থেকে জনৈক অগ্নি রায়। রিপোর্টটি পড়ে মনে হয়, এটি কোন সাংবাদিকের হাতে মাঠ-পর্যায় থেকে সংগৃহীত রিপোর্ট নয়। বরং লেখা হয়েছে ভারতীয় গোয়েন্দাদের সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে। উক্ত রিপোর্টে বলা হয়েছেঃ “ব্যাপক হিংসার ছক রয়েছে জামায়াতের,দিল্লির চিন্তা বাড়িয়ে নতুন রিপোর্ট বিদেশ মন্ত্রকের হাতে এসেছে। তাতে বলা হযেছে, ভোটের আগে বাংলাদেশে হিংসা ও নাশকতার বন্যা বইয়ে দেওয়ার জন্য তোড়জোড় করেছে জামায়াতে ইসলামি। এজন্য বিশাল তহবিল গড়া হয়েছে। আরো বলা হয়েছে, “শুধু জামায়াতই নয়,সন্ত্রাস-নাশকতার কাজে সঙ্গে রয়েছে বাংলাদেশের আনাচে কানাচে গোপনে বেড়ে ওঠা অন্তত ১০৮টি মৌলবাদী জঙ্গি সংগঠন। সাউস ব্লকের দুশ্চিন্তা আরও বাড়িয়ে,রিপোর্টে একথাও বলা হচ্ছে, রাস্তায় লড়ার জন্য কিশোরদের নিয়ে বিশেষ একটি কর্মীবাহিনী গড়া হচ্ছে। এদের মধ্যে বাছাই করা একটি অংশকে ফিদায়েঁ (তথা শহীদ) হওয়ার মতো মানসিক প্রশিক্ষণও দেয়া হচ্ছে।”

হিন্দু-মৌলবাদ ও হিন্দু-সন্ত্রাসের দেশ ভারত। সে সন্ত্রাসের শিকার হলো সেদেশের সংখ্যালঘু মুসলমানেরা। মুসলিম নির্মূল ও তাদের সহায়-সম্পদ ধ্বংস বা দখলে নেওয়াই দেশটির হিন্দু রাজনীতির সংস্কৃতি। সে সংস্কৃতির ধারায় ভারতীয় হিন্দুদের জীবনে যেমন প্রতিবছর বহুবার পুঁজা-পার্বণ আসে,তেমনি রক্তক্ষয়ী দাঙ্গাও আসে। মাত্র মাস খানেক আগে উত্তর প্রদেশের মুজাফ্ফর নগর জেলায় ঘটে গেল ভয়াবহ মুসলিম বিরোধী দাঙ্গা। সে দাঙ্গায় হত্যা করা হয়েছে বহু মুসলিম নারীপুরুষ ও শিশুকে। দগ্ধিভূত করা হয়েছে বহু ঘরবাড়ী ও দোকান পাঠ। বহু হাজার মুসলিম পরিবার নিজ ঘরবাড়ী ছাড়া উদ্বাস্তু। তারা আশ্রয় নিয়েছে প্রদেশের অন্য জেলায় বা অন্য নগরীতে। তারা নিজ গ্রাম ও নিজ বাড়ীতে ফিরতে পারছে না। না ফেরার কারণ,নিজ গ্রাম ও নিজ ঘরে ফিরলেই দেখতে পাবে,তাদের ভাই-বোন,পিতা-মাতা ও সন্তানদের যারা হত্যা করেছে এবং তাদের ঘরবাড়ী ও দোকানপাঠ জ্বালিয়েছে,তাদের সামনে তারাই বুকফুলিয়ে হাঁটছে। এত অপমান নিয়ে বাঁচাটি কি কখনো সুখের হয়? সরকার তাদের জানমালের কোন নিরাপত্তা দিতে পারছে না।

জঙ্গলে আগুন লাগলে সে আগুণ থামানোর কেউ থাকে না। হাজার হাজার গাছপালা ছারখার করার পর সেটি নিজে নিজেই থামে। তেমনি মানব অধ্যুষিত আরেক জঙ্গল হলো ভারত। গত ১৫ মার্চ ২০১৯’য়ে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের দু’টি মসজিদে ৫০ মুসলিমকে হত্যা করা হয়। ঘটনার সাথে সাথে দেশের প্রধানমন্ত্রী সেখানে ছুটে গেছেন। শহরে পুলিশ নামানো হয়। মুসলিমদের কাছে গিয়ে তিনি সমবেদনা জানান। কিন্তু ভারেত সে সবের বালাই নাই। একবার মুসলিম বিরোধী দাঙ্গা দেশটিতে শুরু হলে সেখানে দাঙ্গাও থামানোর কেউ থাকে না। বহু শত নারীপুরুষ হত্যা ও বহুহাজার ঘরবাড়ি পোড়ানোর পর সেটি থামে। তাই যখন দিন-দুপুরে ভারতের ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদটির ধ্বংসে হাজার হাজার মানুষ লিপ্ত হয় তখন সে বর্বর কাজটি রুখার কেউ ছিল না। ভারতের কোন মন্ত্রী,প্রশাসনের কোন কর্মকর্তা বা কোন রাজনৈতিক নেতাই সে ধ্বংসকর্মকে প্রশংসনীয় কর্ম বলে বিবৃতি দেননি।কিন্তু তারপরও সে বর্বর কর্মটি রুখার জন্য সমগ্র ভারতে কেউ ছিল না। সেটি দিনভর ঘটেছে অসংখ্য পুলিশ,প্রশাসনের হাজার হাজার কর্মকর্তা ও লক্ষ লক্ষ রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের চোখের সামনে। টিভির দৌলতে মসজিদ ধ্বংসের সে চিত্রটি দেখেছে প্রায় সমগ্র ভারতবাসী। স্বচোখে দেখেছেন তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরসীমা রাও। কিন্তু কেউ কোন উদ্যোগ নেননি সেটি থামানোর।দিনের আলোয় পুলিশ সেদিন কোন অপরাধীকে খুঁজে পায়নি।একই অবস্থা হয়েছে গুজরাতের মুসলিম বিরোধী নিধন যজ্ঞে। যখন সেখানে মুসলিমদের হত্যা, তাদের ঘরবাড়ী এই হলো ভারতের প্রকৃত অবস্থা।

 

ভয় শক্তিশালী বাংলাদেশের

নিজদেশের ভয়ানক সন্ত্রাসীদের নিয়ে দৈনিক আনন্দবাজারের কোন মাথা ব্যথা নেই। কারণ,হিন্দু সন্ত্রাসীদের হাতে মুসলমানদের জানমালের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হলেও তাতে ভারতের সেক্যুরিটির কোন সমস্যা হয় না। আনন্দবাজারের ভাবনা তো ভারতের বিশ্বশক্তি রূপে বেড়ে উঠা নিয়ে।মুসলমানদের নিরাপত্তা ড্রেনে গিয়ে পড়লেও তা নিয়ে তাদের সামান্যতম ক্ষোভ নেই। তারা বরং ভারতের বিপদ দেখে প্রতিবেশী দেশে ইসলামের জাগরণ দেখে। সেটি যেমন আফগানিস্তানে। তেমনি পাকিস্তানে ও বাংলাদেশে। তাই এসব দেশে ইসলাম রুখতে তাদের অর্থ, অস্ত্র ও মেধার বিনিয়োগও বিশাল। আফগানিস্তানে তালেবানদের বিজয় রুখতে তারা  মার্কিন হানাদার বাহিনীর সাথে কাঁধে কাঁধ যোগ দিয়েছে। সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের নিজদেশে এনে প্রশিক্ষণও দিচ্ছে। ইসলাম রুখার সে গরজ নিয়েই বাংলাদেশে তারা আওয়ামী লীগ,জাতীয়পার্টি ও বামপন্থিদের পিছনে বিপুল বিনিয়োগ করছে। এবং তাদেরকে ইসলামের বিরুদ্ধে এক মঞ্চে এনে খাড়া করেছে।

বাংলাদেশে ইসলামপন্থিদের শক্তি বাড়লে তাতে ভারতের অভ্যন্তরে অনুপ্রবেশ বাড়বে, এবং দেশটির নিজস্ব রাজনীতিতে অশান্তি বাড়বে -বিশেষ করে পাশ্চবর্তী পশ্চিমবঙ্গ,সেটি নিয়ে ভারত সরকার আতংকিত। আতংক আনন্দবাজারেরও। রিপোর্টটি পড়ে মনে হয়, ইসলামের এমন একটি জাগরণ নিয়ে ভারত যেন ভাবতেই পারিনি। আজ থেকে ৫ বছর আগে তাদের কল্পনাতেও সেটি আসেনি। তারা ভাবে,বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল হলো আওয়ামী লীগ। কলেকৌশলে ক্ষমতাদখল এবং বাহুবলে রাজপথ দখলে নেয়ার সামর্থ যেন একমাত্র তাদেরই। ভারতীয় পত্রপত্রিকা ও নীতি নির্ধারকদের সে ধারণাটি আরো প্রবলতর হয়েছিল শাহবাগ মোড়ে গণজাগরণ মঞ্চের আয়োজন থেকে। কিন্তু বাংলাদেশের  রাজনীতিতে তারা ছিল হঠাৎ সৃষ্ট বুদবুদ। এবং তারা বেড়ে উঠেছিল সরকারি আয়োজনে। কিন্তু বাংলাদেশে রাজনীতির টেবিল উল্টে গেছে। সৃষ্টি হয়েছে নতুন বাস্তবতা। গণজাগরণ মঞ্চের নেতারা এখন দেশের কোথাও প্রকাশ্যে ঘুরাফেরা করার সামর্থ রাখেনা।  সে সামর্থ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীগণের নেই। তাদের নামতে হয় পুলিশের পাহারাদারিতে। মফস্বলের নেতারা তো বহু আগে থেকেই নিজ নিজ এলাকা ছেড়ে ঢাকায় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। বাংলাদেশের মত ১৬ কোটি মানুষের একটি দেশে একাকী কোন সংগঠনের পক্ষে দেশব্যাপী হরতাল করে দেশকে অচল করে দেয়া যা তা ব্যাপার নয়। কিন্তু সে সামর্থ যে জামায়াতের আছে, এমনকি ছাত্র শিবিরেরও আছে, সে প্রমাণটিও বার বার মেলেছে। আর সেটি আতংকিত করেছে যেমন দৈনিক আনন্দবাজারকে, তেমনি ভারতীয় প্রশাসনকে।

 

ভ্রষ্ট ভারতীয় বিচারবোধ

আনন্দবাজারের ভ্রান্তিটা হলো, ইসলামের পক্ষে বাংলাদেশের জনগণের মাঝে যে বিপুল জনসমর্থণ আছে সেটি তারা দেখতে পায়নি। আর সে অন্ধত্বটি তাদের মনের। মন যা জানে না,চোখ কি তা দেখতে পায়? আওয়ামী বাকশালীদের ন্যায় তারাও জামায়াত-শিবিরকে স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি মনে করে। যারা একাত্তরে বাংলাদেশ সৃষ্টির বিরোধীতা করলো তারা বাংলাদেশের রাজনীতিতে শক্তিশালী দলে পরিণত হবে সেটি তারা ভাবতেই পারিনি। তবে একাত্তরে পাকিস্তান ভাঙ্গার বিরোধীতা করার অর্থ যে বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্বের বিরোধীতা করা নয় –তা নিয়ে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মনে কোন দ্বিধা-দ্বন্দ নেই। এমন একটি অটল বিশ্বাসের কারণেই একাত্তরের রাজাকারদের জনগণ ভোট দেয়,তাদেরকে মন্ত্রী রূপে বরণও করে নেয়। তাই শাহ আজীজুর রহমানকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী,আব্দুর রহমান বিশ্বাস বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট এবং সালাউদ্দীন কাদের চোধুরি ও আব্দুল আলীমদের মত ব্যক্তিদের মন্ত্রীরূপে মেনে নিতে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষদের কোনরূপ অসুবিধা হয়নি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তাতেও কোন রূপ ব্যাঘাত ঘটেনি। অথচ ভারত ও ভারতের প্রতি অনুগতদের পক্ষে তাদেরকে মেনে নেয়াটি অসম্ভব। তাদের বিজয়ে তারা বরং নিজেদের নিরাপত্তার প্রতি হুমকি দেখে। তাই এখন ষড়যন্ত্র চলছে তাদেরকে আওয়ামী সেবাদাসদের দিয়ে তাদেরকে ফাঁসীতে ঝুলিয়ে হত্যার। তাদের দৃষ্টিতে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি রূপে গণ্য হওয়ার জন্য শর্ত হলো,ভারতপন্থি হওয়া,একাত্তরে পাকিস্তান ভাঙ্গার পক্ষ নেয়া এবং সর্বদা ইসলামের বিপক্ষে অবস্থান নেয়া। আর এমন একটি ধারণার কারণে একাত্তরে যারা অখন্ড পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করেছিল,তারা যদি আজ  বাংলাদেশের স্বাধীনতা রক্ষায় প্রাণদানও করে তবু্ও আওয়ামী বাকশালীগণ তাদেরকে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি রূপে গণ্য করতে রাজী নয়। অনুরূপ বিচার ভারতীয়দেরও। জামায়াত ও শিবিবের বহুসদস্যের জন্ম একাত্তরের পর। তাদের জীবনে পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করার যেমন সুযোগই জুটিনি, তেমনি সুযোগ মেলেনি পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ সৃষ্টির কাজে অংশ নেয়ারও। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুরক্ষায় তারা যদি আজ জানমালের কোরবানীও দেয়,তবুও চিত্রিত হচ্ছে স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি রূপে। তাদের কথা, ইসলামি চেতনাধারি কোন ব্যক্তি বা দলই একাত্তরে পাকিস্তান ভাঙ্গা ও বাংলাদেশ সৃষ্টির পক্ষ নেয়নি। এ কাজ তো ছিল আওয়ামী সেক্যুলার ও সোসালিস্টদের কাজ। ফলে আজ তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি হয় কি করে? আর একাত্তরে যারা স্বাধীনতার শত্রু পক্ষে ছিল তারা জনসমর্থণ পাবে সেটি কি বিশ্বাস করা যায়? তাদের ডাকে দেশে হরতাল হবে সেটিই বা কি করে মেনে নেয়া যায়? ফলে তাদের হিসাব মেলে না? প্রশ্ন হলো,ইসলাম বিরোধী এমন রুগ্ন মানসিকতা নিয়ে কি হিসাব মেলানো যায়?

তবে জনগণ ঠিকই বুঝেছে,একাত্তরে পাকিস্তানের বিভক্তিকে যারা সমর্থণ করেনি তাদের সে চেতনা ও বিচারবোধটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা-বিরোধী ছিল না। এজন্যই সংসদ নির্বাচনে শাহ আজিজুর রহমান, খান আব্দুস সবুর খান, সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরি, আব্দুল আলীমের ন্যায় বহু ব্যক্তিকে জনগণ বিপুল ভোটে বার বার নির্বাচিত করেছে। এবং পরাজিত করেছে বহু মুক্তিযোদ্ধাদের। ভারত ও আওয়ামী বাকশালীদের কাছে তাদের সে বিজয় ভাল না লাগলেও সেটিই বাস্তবতা। তাছাড়া কোন দলের জনপ্রিয়তা কি সব সময় এক রকম থাকে? আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তাও যে চিরকাল বেঁচে থাকবে,সেটিও কি ভাবা যায়? মানুষের চাওয়া-পাওয়াতেও তো দিন দিন পরিবর্তন আসে। দিন বদলের সাথে সাথে তাই রাজনীতিও বদলে যায়।তখন নতুন নতুন দল জনপ্রিয়তা পায়।

 

বাকশালীদের কুকর্ম

আওয়ামী লীগ এখন গণধিকৃত। সেটির কারণ, হাসিনার সীমাহীন স্বৈরাচার এবং রাষ্ট্রের উপর আওয়ামী বাকশালীদের সীমাহীন ডাকাতি। ২০১৪ এবং ২০১৮’য়ের ভোট ডাকাতির পর জনগণের মনে সে ঘৃণা আরো বেড়েছে। তাদের স্বৈরাচারের ফলে অসম্ভব হয়েছে বিরোধী দলগুলির পক্ষে রাজপথে সভা-সমাবেশ করা। জামায়াত-শিবিরের নেতাদের উপর চলছে নির্যাতন। আওয়ামী বাকশালীদের লাগাতর ডাকাতি থেকে দেশের শেয়ার বাজার, রাষ্ট্রীয় ব্যাংক, সরকারি প্রকল্পের টেন্ডার, খাসজমি, এমন কি বিশ্বব্যাংকের ঋণের টাকা -কোন কিছুই রেহাই পায়নি। কোন দেশের জনগণ কি এমন ডাকাতদের ভোট দেয়? আওয়ামী লীগও সেটি বুঝে। এজন্যই নির্বাচনে বিজয়ী করার জন্য প্রয়োজন পড়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিলুপ্তি এবং সে সাথে একটি ষড়যন্ত্রের নির্বাচন। কিন্তু ভারত বাংলাদেশের রাজনীতির এ নতুন বাস্তবতাটি বুঝতে রাজী নয়, মেনে নিতেও রাজী নয়। মেকী জনপ্রিয়তার দোহাই দিয়ে আওয়ামী লীগের পুনঃনির্বাচনকে তারা জায়েজ বলতে চায়। আর সে ষড়যন্ত্রমূলক বিজয় রুখাটাই বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যারাই সে লক্ষ্যে আপোষহীন দৃঢ়তা নিয়ে ময়দানে নামছে জনগণ তাদেরকেই স্বতঃস্ফুর্ত সমর্থণ দিচ্ছে। আওয়ামী বাকশালীদের ক্ষমতা থেকে নামানোর বিষয়টি জামায়াত-শিবিরের কাছে নিছক রাজনীতির বিষয় নয়, সেটি তাদের অস্তিত্ব বাঁচানোর বিষয়। ফলে তারা স্বৈরাচার-বিরোধী সংগ্রামে আপোষহীন হবে এবং  সে লক্ষ্যে ত্যাগী হবে সেটি বাংলাদেশের জনগণও বুঝে। ফলে তাদের জনসমর্থণ যেমন বাড়ছে, তাদের ডাকে স্বতঃস্ফুর্ত হরতালও হচ্ছে।

গ্রামে ডাকাত পড়লে দলমত নির্বিশেষে হাতের কাছে যা পায় তা নিয়ে সবাই রাস্তায় নামে। তেমনি দেশ ডাকাতদের কবলে পড়লে তখন সমগ্র দেশবাসী রাস্তায় নেমে আসে। বাংলাদেশে তো সেটিই হয়েছে। তাই দেশে আজ “হাসিনা হঠাও” আন্দোলনের নামে যা কিছু হচ্ছে তার পিছনে যে শুধু জামায়াতে ইসলামী বা ছাত্র শিবির রয়েছে সেটি বললে ভূল বলা হবে। এর পিছনে রয়েছে প্রায় সমগ্র জনগণ। কিন্তু আনন্দবাজারের সাংবাদিকের চোখে সে চিত্র ধরা পড়েনি। ধরা পড়েনি ভারতীয় গোয়েন্দা বাহিনীর চোখেও। বরং সবকিছুর মধ্যে তারা শুধু জামায়াতে ইসলামী ও শিবির দেখতে পায়। এর কারণ ইসলাম-ভীতি। তারা জানে নির্বাচনে সেক্যুলারিস্টদের বিজয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আসবে না। তাতে ভারতের জন্য কোন সমস্যাও দেখা দিবে না। কিন্তু রাজনীতির হিসাব নিকাশ পুরাপুরি পাল্টে যাবে যদি ইসলামী পক্ষের শক্তি বিজয়ী হয়। এজন্যই ইসলামপন্থিদের রুখতে সকল ভারতপন্থি সেক্যুলারিস্ট ও স্বৈরাচারিদের উপর চাপ পড়ে। এরশাদও তাই ষড়যন্ত্রের নির্বাচনে যোগ দেয়। ৪ই ডিসেম্বর ডেইলি স্টার খবর ছেপেছে,“এরশাদ বলেছেন ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং তাকে জামায়াত-শিবিরের বিজয় রোধে নির্বাচনে অংশ নিতে চাপ দেয়।” কথিত সে ভারতীয় চাপের কারণে এরশাদের লোকেরা মন্ত্রী সভায় যোগ দেয় এবং নির্বাচনে প্রার্থী হতে কাগজপত্রও জমা দেয়। পানি পানে গরুর ইচ্ছা না থাকলে নদীরে ধারে জোর করে টেনে নিলেও গরু পানিতে মুখ লাগায় না। কিন্তু এরশাদের মধ্য সে দৃঢ়তাটুকুও নেই। নীতিহীনতা ও মেরুদন্ডহীনতা আর কাকে বলে?  ভারতের সৌভাগ্য যে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন নীতিহীন ও মেরুদন্ডহীনদের সংখ্যা অসংখ্য। ফলে ভারতের পক্ষে কাজ করতে রাজী এমন লোকের অভাব হচ্ছে না।

বাংলাদেশে ইসলামের পক্ষের শক্তিগুলির শক্তি সঞ্চয়ের কারণ যেমন আওয়ামী বাকশালীদের সীমাহীন স্বৈরাচার, দূর্নীতি ও দুঃশাসন, তেমনি ভারতের আধিপত্যবাদী ভূমিকা। ঘরে আগুন লাগলে যারা সে আগুন থামানো জিহাদের নামবে তারা তো জনপ্রিয়তা পাবেই। আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের কারণে বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে ভারত-অধিকৃত একটি করদ রাজ্যে। যারাই এ অধিকৃতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলবে তারাই তো দেশের জনপ্রিয় শক্তি। সেটিই তো স্বাভাবিক। তারাই হবে গণধিকৃত যারা পক্ষ নিবে ভারতীয় দখলদারির। আফগানিস্তান যখন সোভিয়েত রাশিয়ার দ্বারা অধিকৃত হলো তখন যারা সে সোভিয়েত আগ্রাসনের পক্ষ নিয়েছিল তারাই আফগানদের মাঝে এবং সে সাথে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে সবচেয়ে ঘৃনীত শক্তিতে পরিণত হয়েছিল। এরূপ বর্বর আগ্রাসনকে সমর্থণ করার কারণে শুধু আফগানিস্তানে নয়, সমগ্র বিশ্বজুড়ে বামপন্থিদের জনপ্রিয়তায় ব্যাপক ধ্বস নামে। অপর দিকে লড়াকু মুজাহিদদের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে উঠে। একই অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশে।

আনন্দবাজার লিখেছেঃ জামায়াতের পরিকল্পনা কার্যকর হলে একধাক্কায় (ভারতে) অনুপ্রবেশ বেড়ে যাবে। সেই সঙ্গে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ হয়ে ভারতে সন্ত্রাস আমদানির ঘটনাও বেড়ে যেতে পার। এর ফলে সবচেয়ে বেশী ধাক্কা লাগবে বাংলাদেশ-সংলগ্ন রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে।” দৈনিক আনন্দবাজার এ রিপোর্টে হিংসা ছড়ানোর জন্য জামায়াতে ইসলামিকে দায়ী করেছে। অথচ বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে সবচেয়ে সহিংসতা ঘটেছে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবী ও সশস্ত্র ছাত্রলীগ ক্যাডারদের হাতে। মাত্র বিগত কয়েকটি মাসেই ২৫০ বিরোধী নেতাকর্মী খুন করা হয়েছে। হাজার হাজার নিরীহ মানুষ রাজপথে আহত হয়েছে। মুসল্লিদের রক্তে রক্তলাল করা হয়েছে শাপলা চত্বর। কিন্তু আনন্দবাজার এ নিয়ে নীরব। আনন্দবাজার লিখেছে, আদালত জামায়াতে ইসলামি নিবন্ধন কেড়ে নিয়েছে। ফলে নিজেদের প্রতীক নিয়ে জামায়াত নেতাগণ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করতে পারবে না। তবে নিবন্ধন কেড়ে নেয়া যে অন্যায় সেটি আনন্দবাজার বলতে রাজী নয়। যেন দেশ শুধু আওয়ামী বাকশালীদের। অথচ গণতান্ত্রিক দেশে রাজনীতির অধিকার তো সবার। কারা স্বাধীনতার শত্রু,আর কারা মিত্র -সেটি বিচার করার দায়িত্ব তো ভোটারদের। অথচ জনগণের কাছ থেকে সে ক্ষমতা ছিনিয়ে নিয়েছে হাসিনা সরকারের নিয়োগপ্রাপ্ত নির্বাচনি কমিশন ও আদালতের অনুগত বিচারকগণ।বাংলাদেশের আদালত অতীতে স্বৈরাচারি জেনারেলদের সামরিক অভ্যুর্থাণকেও ন্যায্য ও সংবিধানসম্মত বলে রায় দিয়েছে। অথচ নিষিদ্ধ ও সংবিধান বিরোধী রূপে ঘোষণা দিয়েছে ইসলামের প্রতি অঙ্গিকার নিয়ে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলিকে।

 

আরোপিত যুদ্ধ

আনন্দবাজারের গভীর উদ্বেগ বাংলাদেশে বিপুল হারে মসজিদ-মাদ্রাসা,জিহাদী সংগঠন ও ইসলামি ব্যাংকের ন্যায় প্রতিষ্ঠান বেড়ে উঠা নিয়ে।এ দুশ্চিন্তা আওয়ামী বাকশালীদেরও। বাংলাদেশ হিন্দুসংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ নয়,এটি শতকরা ৯২ভাগ মুসলমানের দেশ। ফলে ভারতীয়গণ যদি ভেবে থাকেন,এখানে মন্দির,মন্ডপ বা রামকৃষ্ণ মিশনের ন্যায় প্রতিষ্ঠান বাড়বে তবে তারা স্বপ্নের জগতে আছে।এদেশে মসজিদ-মাদ্রাসা বাড়বে,ইসলামি সংগঠন বাড়বে,তেমনি ইসলামি ব্যাংক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানও বাড়বে।বাড়বে ইসলাম প্রতিষ্ঠার অঙ্গিকার নিয়ে অসংখ্য রাজনৈতীক দল ও সেগুলির কর্মীবাহিনী।বেগবান হবে শরিয়ত প্রতিষ্ঠার আন্দোলনও। কারণ সেটি না হলে মুসলমানের ঈমান বাঁচেনা। অতএব এ নিয়ে আনন্দবাজার বা ভারতীয় কর্তৃপক্ষের দুশ্চিন্তা বাড়লে তাতে বাংলাদেশের করণীয় কি থাকতে পারে? বাংলাদেশের জনগণ তো ভারতে শরিয়ত প্রতিষ্ঠার দাবি করে না। ভারতীয় হিন্দুমৌলবাদীদের নির্মূলে সেদেশের অভ্যন্তরে যুদ্ধেও নামছে না। তবে ভারত কেন বাংলাদেশে ইসলামি শক্তির বিজয় রুখতে ষড়যন্ত্র পাকায়?

বাংলাদেশের মানুষ যদি বাকশালী স্বৈরাচারের নির্মূল চায়,সেটি তো তাদের মৌলিক মানবিক অধিকার। তারা যদি ইসলামি শরিয়তের প্রতিষ্ঠা চায়,সেটিও তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার। সে অধিকারকে খর্ব করার কোন উদ্যোগ নেয়া হলে তাতে যা অনিবার্য হবে সেটি হলো যুদ্ধ। প্রতিবেশী রূপে ভারতের দায়িত্ব হলো,বাংলাদেশের মানুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছার প্রতি সম্মান দেখানো। সে সম্মানটুকু না দেখালে ভারত বাংলাদেশে বন্ধু পাবে কীরূপে? দু’দেশের মাঝে সুসম্পর্ক ও শান্তিপূর্ণ সহ-অব্স্থানই বা কীরূপে গড়ে উঠবে? ভারত যে বাংলাদেশের সাথে শান্তি নয় বরং যুদ্ধাবস্থা চায়,আনন্দবাজারের রিপোর্টটি কি সেটিরই আলামত নয়? ভারতীয় কামানগুলো বাংলাদেশের উপর গোলাবর্ষণ না করলেও অবিরাম গোলা বর্ষণ করে যাচ্ছে ভারতীয় পত্রিকাগুলো। সেটি বাংলাদেশের মানুষের চেতনার ভূমিতে। স্মায়ু-যুদ্ধ কালে তো সেটিই ঘটে।বাংলাদেশ তো আজ এমন এক লাগাতর যুদ্ধেরই শিকার।এমন যুদ্ধে কোন ঈমানদার কি নীরব ও নিষ্ক্রীয় থাকতে পারে? তাতে কি তার ঈমান বাঁচে? প্রথম সংস্করণ ০৫/১২/১৩ দ্বিতীয় সংস্করণ ২৭/০৩/২০১৯

 




বাংলাদেশের বিরুদ্ধে এত ষড়যন্ত্র কেন?

গত ২রা জুলাই, ২০০৩, লন্ডনের দৈনিক গার্ডিয়ান পত্রিকায় বাংলাদেশের উপর জনৈক সাংবাদিক জন ভিডলের লেখা একটি প্রতিবেদন ছেপেছে। প্রতিবেদনটির সারকথা হলো, এক) বাংলাদেশে ইসলামী মৌলবাদের উত্থান ঘটেছে। তারা শিক্ষা, বিচার, আইন, চিকিৎসা, বিশ্ববিদ্যালয় ও নানা প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অনুপ্রবেশ করছে। এমনকি দুইটি মন্ত্রনালয়ের উপরও দখল জমিয়েছে। দুই). ক্ষমতাসীন দলের কর্মী ও মৌলবাদীরা সংখ্যালঘু মহিলাদের ধর্ষণ করছে ও তাদের উপর নানা ভাবে নির্যাতন করছে। তিন). প্রাণ বাঁচাতে সংখ্যালঘুরা দেশ ছেড়ে ভারতে পাড়ী জমাচ্ছে। অভিযোগের সাথে চারটি খবরও ছেপেছে। প্রথমটি পার্বা দেলুয়া নামক গ্রামে জনৈক পূর্ণীমা রাণীর উপর গণধর্ষনের খবর। বলা হয়েছে, ঘটনাটি ঘটেছিল ১৮ মাস আগে। দ্বিতীয়টি ফাহিনজানা নামক গ্রামে ২০০ জন মৌলবাদীর দ্বারা ১০টি খৃষ্টান বাড়ী-লুন্ঠন। তৃতীয়টি ঢাকার অদূরে কামালপুরে কতিপয় গুন্ডাকতৃক অর্থের দাবীতে খৃষ্টানদের মারধর।  চতুর্থটি দেউতলা বাজারে হিন্দুদের দেশত্যাগে ভীতিপ্রদর্শন। কোন জেলায় বা কোন থানায় পার্বা দেলুয়া ও ফাহিনজানা গ্রাম বা কোথায় সে দেউতলা বাজার রিপোর্টে সে কথা উল্লেখ করা হয়নি। শেষোক্ত তিনটি ঘটনার ক্ষেত্রে উল্লেখ করা হয়নি কোন দিন, সন ও তারিখ। ফলে সাংবাদিকতার জন্য যেগুলো অতিশয় জরুরী সেগুলিও পূরণ করা হয়নি। ফলে অন্য কোন ব্যক্তির পক্ষে এ রিপোর্টের সত্যতা নিয়ে তদন্তের রাস্তাও খোলা রাখা হয়নি।

অভিযোগ এনেছেন, গত দুই বছরে হাজার হাজার সংখ্যালঘু বাংলাদেশী সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে চলে গেছে।  এতে নাকি বাংলাদেশের সংখ্যালঘু জনসংখ্যা দ্রুত হ্রাস পেয়েছে এবং নাটকিয় ভাবে বেড়েছে মুসলিম জনসংখ্যা। এর পক্ষে তিনি ঢাকা স্ট্যাটিসটিক্সের কথা বলেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কি সে ঢাকা স্ট্যাটিসটিক্স? বাংলাদেশে এমন কিছুর অস্তিত্ব আছে কি? জনসংখ্যার বৃদ্ধি ও হ্রাস নিয়ে নির্ভরযোগ্য হিসাব দিয়ে থাকে প্রতি ১০ বছর পর অনুষ্ঠিত দেশের জনসংখ্যা গণনা বা সেন্সাস। বিগত সেন্সাসে সংখ্যালঘু হ্রাসের এমন বিষয় ধরা পড়েনি যা জন ভিডল বলেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশ থেকে যাওয়া মানুষের সংখ্যা এমনকি ভারত থেকেও পাওয়া সম্ভব নয়। কারণ হিসাবে বলেছেন, ভারত নাকি তেমন তথ্য প্রকাশ করবে না। এটিও কি বিশ্বাস যোগ্য? যে ভারত মুসলমানদের বাংলাদেশে পুশ-ইন করার জন্য সদা ব্যস্ত এবং ফুঁলিয়ে ফাঁফিয়ে নানা তথ্য প্রায়ই প্রকাশ করে থাকে, তারা এমন বিপুল হিন্দু জনসংখ্যা স্থানান্তরের কথা কেন বলবে না যার জন্য বাংলাদেশ হিন্দু শূণ্য হতে যা্েচছ? জন ভিডলে বৃটিশ সরকারকেও তিরস্কার করেছেন। সেটির কারণ, বাংলাদেশকে রাজনৈতিক নিপীড়নমূক্ত দেশরূপে বৃটিশ সরকারের সাম্প্রতিক ঘোষণা। লক্ষনীয় হলো, বাংলাদেশের এ সুনাম আওয়ামী সরকারের আমলে ছিল না। বরং আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় এসেছে তখনই গণতন্ত্র বিপন্ন হয়েছে। মানুষ জেল-জুলুম, হত্যা ও সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে। সে আওয়ামী সন্ত্রাস ও নির্যাতন থেকে বাঁচাতে বহু বাংলাদেশীকে বৃটেনে রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পরিস্থিতি বর্তমানে বদলে যাওয়ায় বৃটেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘোষণা দিয়েছে, আর কোন বাংলাদেশীকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেয়া হবে না। বাংলাদেশের এটি এক বিরাট অর্জন, কিন্তু আওয়ামী প্রতিপক্ষ সহজ ভাবে মেনে নিতে পারছে না। সেটিরও প্রকাশ ঘটেছে এ নিবন্ধে।

এ নিয়ে দ্বিমত নেই যে সন্ত্রাস বাংলাদেশের প্রধানতম সমস্যা। প্রতিটি নাগরিক সন্ত্রাসের হাতে জিম্মি। কিন্তু প্রচন্ড আপত্তি রয়েছে গার্ডিয়ান যে ভাবে সেটিকে চিত্রিত করেছে তা নিয়ে। সন্ত্রাসীরা সর্বার্থেই দূর্বৃত্ত। ধর্ম নিয়ে তারা বাচবিচার করে না, তাদের লক্ষ্য এলাকায় প্রতিপত্তি, অর্থলাভ ও নারী-সম্ভোগ। হিংস্র পশু যেমন মানুষের ধর্ম দেখে আক্রমন করে না এরাও তেমনি হিন্দু মুসলিম বাছবিচার করে হানা দেয় না। অথচ গার্ডিয়ানের সংবাদদাতা এসব দূর্বৃত্তদের  উপরও একটি ধর্মীয় পরিচয় এঁটে দিয়েছেন। সন্ত্রাসীদের ইসলামী মৌলবাদী বলে চিত্রিত করেছেন। সন্ত্রাসের অপরাধে এ অবধি বহু মানুষ বাংলাদেশের আদালতে দন্ডিতও হয়েছে। কিন্তু তাদের মধ্যে ক’জন ইসলামী দলের সদস্য বা মৌলবাদী সে তথ্য তিনি দেননি। সন্ত্রাসের কবলে প্রতিবছর যে হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে তাদেরই বা ক’জন সংঘালঘু? বরং সংখ্যালঘুদের বেছে বেছে যে দেশে নির্মূল করা হচ্ছে ও তাদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করা হচ্ছে সেটি যে বাংলাদেশ নয়, বরং ভারত সে তথ্য তিনি উল্লেখ করেনি। গার্ডিয়ান সংবাদদাতার এ রিপোর্টকে শুধু অপপ্রচার বা পক্ষপাতদুষ্টতা বলে ভূল হবে, বরং এটি এক জঘন্য ষড়যন্ত্র। গার্ডিয়ানের সাংবাদিক জনকন্ঠ সম্পাদক তোয়াব খানের নাম নিয়েছেন। আরো যাদের নাম নিয়েছেন তারা হলেন আওয়ামী ঘরানার অতি পরিচিত বুদ্ধিজীবী এবং সাউথ-ইস্ট এশিয়া ইউনিয়ন এ্যাগেনেষ্ট ফান্ডামেন্টালিজমের সভাপতি কবির চৌধূরী, ’হটলাইন বাংলাদেশ’এর পরিচালক রোজালিন কোষ্টা এবং আওয়ামী উলামা লীগ নেতা আব্দুল আওয়াল। এভাবে নিজের বক্তব্য প্রমাণ করতে জন ভিডাল যেসব সাক্ষীসাবুদ হাজির করেছেন তারা সবাই পক্ষপাত দুষ্ট। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গণে এরা একটি বিশেষ মহলের চিহ্নিত ব্যক্তি। কোন আদালতে এমন ব্যক্তিদের মতামত গৃহীত হতে পারে না। পানি ঘোলা করে মাছ ধরার খায়েশ পুরন করতে আওয়ামী লীগ এ সব মত্লববাজ ব্যক্তিদের ময়দানে নামাবে সেটিই স্বাভাবিক। এ লক্ষেই গড়ে তোলা হয়েছে বিদেশী সাংবাদিকের সাথে এ আওয়ামী বুদ্ধিজীবীদের যোগসাজেশ। বিগত নির্বাচনকে অগ্রহনযোগ্য করার লক্ষ্যেও এ মহলটি বাংলার বদলে ইংরাজীতে বই লিখে বিদেশীদের কাছে বিতরনের ব্যবস্থা করেছিল। ফলে তাদের রাজনীতিতে বাংলাদেশের মানুষের চেয়ে বিদেশী প্রভূদের গুরুত্ব যে অধিক সেটি কি প্রমাণিত হয় না? আর একটি দেশের বিরুদ্ধে এটি কি কম ষড়যন্ত্র? অথচ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারদলীয় কর্মীদের দ্বারা ধর্ষণে সেঞ্চুরির উৎসব হয়েছে, থানার অভ্যন্তরে নারী ধর্ষিত ও খুন হয়েছে, রাজপথে নারীকে বিবস্ত্র করা হয়েছে। মসজিদে, মাদ্রাসায় এবং পত্রিকা অফিসে হামলা হয়েছে। জয়নাল হাজারীদের মত আওয়ামী সন্ত্রাসীদের ভয়ে মানুষ ঘর থেকে বছরের পর বছর পালিয়ে বেড়িয়েছি। জনসভায় দাঁড়িয়ে শেখ হাসিনা একটির বদলে দশটি লাশ ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন। লাঠি দেখানো হয়েছে আদালতকে। সিরাজ সিকদারের মত জেলবন্দীকে হত্যা করে পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে আওয়ামী নেতা শেখ মুজিব বলেছিলেন, ”কোথায় আজ সিরাজ সিকদার?’  হাজার হাজার বিরোধী কর্মীদের হত্যা করতে রক্ষী বাহিনী নামানো হয়েছে। এ সবই সন্ত্রাসের ইতিহাস। এবং হয়েছে আওয়ামী নেতাদের আশ্রয়ে ও প্রশ্রয়ে। বাংলাদেশ জুড়ে আজ যে সন্ত্রাসের আধিপত্য সেটির শুরু হয়েছিলতো এভাবেই।

বাংলাদেশে সন্ত্রাসের শিকড় এতই গভীরে পৌছেছে যে সেনাবাহিনী নামিয়েও নির্মূল করা যায়নি। সন্ত্রাসীদের হাতে বহু মানুষ প্রতিনিয়ত আহত ও নিহত হচ্ছে। ধর্ষিত হচ্ছে নারী। এ সন্ত্রাসের শিকার মুসলমান যেমন হচ্ছে তেমনি কিছু অমুসলমানও হ্েচছ। তবে অধিকাংশই মুসলমান। কিন্তু সে সত্যটি গার্ডিয়ান ছাপেনি। সাংবাদিকের আসল মতলব তাই দেশের আইনশৃঙ্খলা বা জননিরাপত্তা নয়।  মূল উদ্দেশ্য অন্যত্র। নিবন্ধের বাঁকি অংশে তা প্রকাশ পেয়েছে। আর সেটি হলো ইসলাম ভীতি এবং সে ভীতি থেকে প্রসুত ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। এরও গভীরে রয়েছে ইসলামের উত্থান রোধকল্পে বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার ষড়যন্ত্র। সংবাদদাতা জন ভিডাল ইসলামপন্থি একটি দলের নাম নিয়ে লিখেছেন যে দলটি বাংলাদেশের গ্রামীণ এলাকায় দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করছে। দলটির অগ্রগতিকে তিনি দেখেছেন শরিয়ত প্রতিষ্ঠার পূর্বাভাস রূপে। ফলে এ ইসলামি দলটির অগ্রগতিকে জন ভিডাল সাংবাদিক-সূলভ নিরপেক্ষ দৃষ্টি দিয়ে দেখেননি, দেখেছেন ইসলামের শত্রুর দৃষ্টি নিয়ে। ইসলামের বিরুদ্ধে তিনি তার নিজ মনের বিষাক্ত বিষের প্রকাশ ঘটিয়েছেন একজন বাংলাদেশী আইনজ্ঞের জবান দিয়ে। উক্ত আইনজ্ঞ নাকি বলেছেন, ”দেশে একটি নিরব বিপ্লব হতে চলেছে। আমরা অন্ধকার যুগের দিকে ফিরে যাচ্ছি।” অর্থাৎ ইসলামের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের স্বতঃস্ফুর্ত আগ্রহকে তিনি দেখেছেন আদিম বর্বরতার প্রতি আগ্রহরূপে। ইসলামের প্রতি এরূপ শত্রুতা-সূলভ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে একজন সাংবাদিক কি কখনও নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ট হতে পারে? জন ভিডালের এখানেই ব^্যর্থতা। তিনি আভির্ভূত হয়েছেন ইসলামের প্রতিপক্ষ এক রাজনৈতিক কর্মী রূপে। ভিড়ে গেছেন তোওয়াব খান ও কবির চৌধুরিদের দলে। তার এ নিবদ্ধের মূল সূত্র যে তারাই সেটিও তিনি গোপন রাখেননি। সাংবাদিকতার লেবাসে তিনি কলম ধরেছেন বাংলাদেশে ইসলামের সম্ভাব্য উত্থান রুখতে। ফলে এ নিবন্ধের লক্ষ্য, মার্কিন নেতৃত্বে মুসলমানদের বিরুদ্ধে দেশে দেশে যে ক্রসেড শুরু হয়েছে সে ক্রসেডে বাংলাদেশকেও একটি টার্গেট রাষ্ট্র রূপে চিহ্নিত করা। তিনি বৃটিশ সরকারকে উস্কিয়েছেন যেন বিষয়টিকে গুরুতর বিষয় রূপে গ্রহণ করে। লক্ষণীয় যে এ বিষয়ে তার ও আওয়ামী লীগের লক্ষ্য অভিন্ন। ইসলামের বিরুদ্ধে এ ক্রুসেডে আওয়ামী লীগ মার্কিনীদের ঘনিষ্ট মিত্র হতে যে আগ্রহী তা জানিয়ে পুস্তক প্রকাশ করে মার্কিন প্রশাসনের কাছে পৌঁছিয়েছে। তারা জানিয়েছে বাংলাদেশ তালেবান কবলিত হচ্ছে। সেটি রুখতে হলে তাদের সহয়তা ছাড়া উপায় নেই এবং সে সহয়তা তারা দিতেও প্রস্তুত। তবে সে জন্য তাদের দাবী তাদেরকে ক্ষমতায় বসাতে হবে। ক্ষমতার বাইরে থেকেও কি করে ইসলামের উত্থানরোধে পাশ্চাত্যের সহায়তা করা যায় সে লক্ষ্যকে সামনে রেখেই আওয়ামী বুদ্ধিজীবী বাহিনী কবির চৌধুরির নেতৃত্বে ’সাউথ-ইস্ট এশিয়া ইউনিয়ন এ্যাগেনষ্ট ফান্ডামেন্টালিজম’ নামে এনজিও খুলে ময়দানে নেমেছেন। ফলে জন ভিডল যে প্রজেক্ট নিয়ে সাংবাদিকতা করছেন সেটি তার একার নয়। বরং এ রিপোর্টে যেটি প্রকাশ পেয়েছে সেটি হলো আন্তর্জাতিক ইসলামের শত্রু মহলের সাথে তাদের কোয়ালিশনের বিষয়টি। আর এ কারণেই হংকংয়ের ’ফার ইষ্টার্ন ইকনমিষ্ট রিভিউ’, লন্ডনের গার্ডিয়ান বা বিভিন্ন ভারতীয় পত্রিকায় বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যে নিবন্ধগুলো ছাপা হয় তার সাথে এ বাহিনীর ঘনিষ্ট যোগসূত্র লক্ষ্য করা যায়।

জন ভিডাল তার নিবন্ধে জামায়াতে ইসলামের দুই জনকে কেন মন্ত্রী করা হলো সেটিকে আক্রমনের বিষয়ে পরিণত করেছেন। অথচ জামায়াতের দুই জন মন্ত্রী হয়েছেন গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে, কোন সামরিক বা স্বৈরাচারি সরকারের হাত ধরে নয়। এটি নিছক এ কারণে যে বিগত নির্বাচনে এ দলটি গণরায় অর্জন করেছিল। গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের  প্রতি জন ভিডালের সামান্যতম আগ্রহ থাকলে এটি কি আদৌ সমালোচনার বিষয় হতো? জামায়াত থেকে দুই জন কেন সমগ্র মন্ত্রী পরিষদই গঠিত হতে পারে যদি সে লক্ষ্যে তারা প্রয়োজনীয জনসমর্থন পায়। কিন্ত দুই জন মন্ত্রীকে যারা কবুল করতে পারছে না তারা কি সেটি মেনে নিবে? অথচ যে কোন দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের হক রয়েছে নিজ বিশ্বাস ও আশা-আকাংখা নিয়ে বেড়ে উঠার। সে হক বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষেরও। কিন্তু সেটি দেশী ও বিদেশী ইসলাম বিরোধী মহল মানতে রাজি নয়। এটি ঠিক যে বাংলাদেশের মানুষ ইসলামের দিকে আকৃষ্ট হচ্ছে। এবং সেটি শুধু বাংলাদেশের একার ব্যাপার নয়, একই ভাবে আকৃষ্ট হচ্ছে সমগ্র মুসলিম বিশ্বজুড়ে। এটি সুনিশ্চিত যে ইসলাম-প্রেমী মানুষের ক্রমর্বধমান গণজোয়ারে ধর্মে অঙ্গিকারহীন সেকুলার গোষ্টি ভেসে যাবে এবং প্রতিটি মুসলিম দেশই তারা আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। কথা হলো একটি জনগোষ্ঠী এ ভাবে ধর্মে আকৃষ্ট হবে এবং নিজেদের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে তার প্রতিফলন ঘটাবে সেটি তো তাদের মৌলিক মানবিক অধিকার। সে অধিকার তো জন্মগত। পাশ্চাত্যের মানুষ যদি মদ্যপান, ব্যভিচার, উলঙ্গতা ও সমকামিতার ন্যায় আদিম পাপাচার নিয়ে বাঁচাকে নিজেদের মৌলিক অধিকার ভাবে তবে মুসলমানদেরও অধিকার রয়েছে ইসলামী বিশ্বাস ও তার শরিয়ত-সংস্কৃতি নিয়ে বাঁচার। এটিই হতে হবে আন্তর্জাতিক রাজনীতির ’রুল অব দি গেম’ তথা মূলনীতি। কিন্তু সমস্যা হলো পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রসমূহ সে মূল নীতি মানতে রাজি নয়। তারা শুধু নিজ পণ্যের বাজারই চায় না, চায় তাদের আদর্শ, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের প্রসারও। তাদের কাছে সেটিই গ্রহনযোগ্য যা তাদের সামগ্রিক আধিপত্য বিস্তারে সহায়ক। এজন্য গণতন্ত্র হত্যাই শুধু নয়, একটি ব্যাপক বিধ্বংসী যুদ্ধ চাপিয়ে দিতেও রাজি। ইরাক ও আফগানিস্তানে নিরাপরাধ মানুষ হত্যাকে একারণেই এরা স্পোর্টসে পরিণত করেছে। আলজেরিয়ার নির্বাচনে ইসলামপন্থিদের বিজয়কে রুখতে এজন্যই এরা একটি বর্বর সামারিক অভ্যূত্থাণকে উস্কিয়ে দিয়েছিল। প্রশ্ন হলো, এরা কি গণতন্ত্রের বন্ধূ হতে পারে? বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের ইসলামপন্থি মন্ত্রীদের নিয়ে জন ভিডলের যে আপত্তি তার মূল কারণ কি এ মানসিকতা নয়?

বিশ্বের তাবত মুসলমানদের কাছে একটি বিষয় এখন পরিস্কার। গার্ডিয়ানে জন ভিডল যেটি লিখেছেন সেটি তার একার কথা নয়। মর্কিন আধিপত্যবাদীদের বক্তব্যকেই তিনি তুলে ধরেছেন মাত্র। লিখেছেনও আধিপত্যবাদী এ্যারোগ্যান্স বা উদ্ধতা নিয়ে। বাংলাদেশে কে মন্ত্রী হবার যোগ্য সে বিষয়ে জন ভিডলে যেভাবে নাক গলিয়েছেন সেটি সে এ্যারোগ্যান্সেরই প্রকাশ। মন্ত্রী কাদেরকে করা যাবে বা যাবে না সেটিই শুধু নয়, বাংলাদেশের ন্যায় দেশে কি রূপ আইন হবে, নারীরা কি ভাবে পোশাক পড়বে, বাচ্চাদের কি শেখানো হবে সেটিও তারা নির্ধারণ করতে চায়। মার্কিন নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন এখন আর শুধু দেশ দখল নিয়ে খুশি নয়। খুশি নয় ম্যাগডোনাল্ড বা কোকাকোলার বাজার-করণ নিয়ে। তাদের দাবী তাদের সংস্কৃতি, রূচিরোধ, মূল্যবোধ ও পাচাচারকে  বিনা প্রতিবাদে গ্রহন করতে হবে। তাদের রুচী, আইনকানুন ও সংস্কৃতির বিপরীত যা কিছু তা স্বয়ং মহান আল্লাহর কাছ থেকে আসলেও বা নবীদের সূন্নত হলেও সেটিকে তারা বর্বরতা বলবে। সে সাথে সেগুলি পরিহারের দাবীও তুলবে। যেমনটি করছে ইসলামি শিক্ষা ও শরিয়তের বিরূদ্ধে। আফগানিস্তান, ইরাকসহ যেখানেই তারা দখল জমিয়েছে সেখানেই শরিয়তের শাসনকে অসম্ভব করে তুলছে। এমন কি সে দেশের সংখ্যাগরিষ্ট মানুষ চাইলেও।   আফগানিস্তান দখলের পর তারা সে বিষয়টি অতিস্পষ্ট ভাবে ঘোষণা করেছে। পাশ্চাত্য শুধূ তাদের সামরিক আধিপত্যকেই বিশ্বময় করতে চায় না, বিশ্বময় করতে চায় তাদের মদ্যপান, উলঙ্গতা, ব্যাভিচার ও সমকামিতার ন্যায় নানাবিধ পাপাচারকেও। এগুলিকে বলছে গ্লোবাল ভ্যালুজ। চায়, বিশ্ববাসীর মূল্যবোধে পরিণত করতে। লক্ষ্যনীয় হলো পাশ্চাত্যের এ উদ্ধতাপূর্ণ দাবীকে মেনে নেওয়ার জন্য প্রতিটি মুসলিম দেশ তাঁবেদার ও দাসচেতনার কিছু মানুষও পেয়েছে। এরাই এনজিও বা রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করে মার্কিন সেবাদাস রুপে কাজও শুরু করেছে। অপর দিকে যারাই এ মার্কিন এরোগ্যান্সের বিরুদ্ধে মাথা তুলছে তাদেরকে সন্ত্রাসী আখ্যায়ীত করে তাদের বিরুদ্ধে সকল বিধ্বংসী মারণাস্ত্র ব্যবহার করছে। অপর দিকে লাঠিয়াল রূপে মাঠে নামাচ্ছে হামিদ কারজাইদের মত নব্য মীরজাফরদের। ফলে শুধু আফগানিস্তান, ইরাক, ফিলিস্তিন বা আলজেরিয়াই নয়, প্রতিটি মুসলিম দেশের রাজিনীতি এদের কারণে সংঘাতপূর্ণ হতে চলেছে। আর শান্তিপূর্ণ ভাবে সামনে এগুনোই অসম্ভব করে তুলছে। বাংলাদেশ তাই এর ব্যতিক্রম নয়। ফলে ষড়যন্ত্র নিছক গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের সরকারের বিরুদ্ধেই নয় বরং দেশটির সংখ্যাগরিষ্ট মানুষের আশা-আকাঙ্খা ও ধর্মীয় ঈমান-আক্বিদার বিরুদ্ধেও। বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার এটিই সবচেয়ে ভয়ানক ষড়যন্ত্র।

তবে এ ষড়যন্ত্রের শুরু আজ নয়, বরং দেশটির জন্মলগ্ন থেকেই। ষড়যন্ত্রটি শুধু একটি মাত্র ক্ষেত্রেও নয়। বরং সর্ব ক্ষেত্রে। এবং জন ভিডল এ কাজে একা নন। বাংলাদেশকে ব্যর্থরাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষে ইসলাম বিরোধী স্রামাজ্যবাদী পাশ্চাতের পাশাপাশি প্রধানতম ও প্রবলতম পক্ষ হলো ভারত। ১৯৭১ এ বাংলাদেশের সৃষ্টিতে ভারত এ জন্য যুদ্ধ করেনি যে তার পূর্ব সীমান্তে আণবিক শক্তিধর আরেক পাকিস্তানের উদ্ভব হবে। বুঝতে হবে এ যুদ্ধ ছিল ভারতের একান্তই নিজস্ব যুদ্ধ যা ১৯৬৫তে অসম্পূর্ণ ছিল। বস্তুতঃ একাত্তরের যুদ্ধে নানা ছলে বাংলাদেশ থেকে দেশটি সহায়তা নিয়েছে মাত্র। ভারত বাংলাদেশের স্বাধিনতার জন্য যুদ্ধ লড়েছে বা আজও স্বাধিনতার পক্ষে একথাটি যে কতটা অসত্য সেটি ভারত নিজেই প্রমাণ করেছে। এবং সেটি করেছে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নানাবিধ ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে। প্রমান করছে বাংলাদেশের সীমান্তের উপর বার বার হামলা করে। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের এ অব্যাহত ষড়যন্ত্রকে বুঝতে হলে আমাদের অতীত ইতিহাসকে অবশ্যই জানতে হবে। কারণ সে অতীতেই প্রথীত রয়েছে আজকের ষড়যন্ত্রের শিকড়। ইতিহাসের নিরেট সত্য হলো, পূর্ব বাংলার মুসলমানদের জীবনে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত শুরু হয় তখন যখন তারা বৃটিশের ১৯০ বছরের ঔপনিবেশিক শাসন ও অখন্ড ভারতের আসন্ন শৃঙ্খল ভেঙ্গে যাত্রা শুরু করে। সেটি ঘটে ১৯৪৭ এ। তবে সে শৃঙ্খল মুক্তি ভারতের ১৫ কোটি মুসলমানের জীবণে ঘটেনি। ফলে ১৯৪৭এর স্বাধীনতার গুরুত্ব বুঝতে হলে অধুনা ভারতের ১৫ কোটি মুসলমানের অবস্থার দিকে তাকাতে হবে যা বাংলাদেশের মুসলমানদের জন্যও হতে পারতো যদি তারা ১৯৪৭ সালে সঠিক সিদ্ধান্ত না নিত। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭০ মাত্র এ ২৩ বছরে বাংলার তৎকালীন সাড়ে সাত কোটি মানুষ যে সংখ্যক ডাক্তার, ইঞ্জিনীয়ার, কৃষিবিদ, আইনবিদ, শিক্ষক, প্রফেসর  ও সরকারি চাকুরিজীবী তৈরী করে ভারতের মুসলমান তার ২০ ভাগের এক ভাগও করতে পারিনি। অথচ তারা ছিল সংখ্যায় দ্বিগুণ। ঔপনিবেশিক শাসনামলে তারা যে তিমিরে ছিল এখনও সে তিমিরেই রয়ে গেছে। সে দূর্দশারই এক করুণ চিত্র প্রকাশ পেয়েছে টাইম ম্যাগাজিনের পরিচালিত এক সাম্প্রতিক সমীক্ষায়। তাতে প্রকাশ পেয়েছে, ভারতের হিন্দুদের মাথা পিছু বাৎসরিক গড় আয় ৪৬১ ডলার এবং মুসলমানদের ১০৯ ডলার। অর্থাৎ মুসলমানদের মাথাপিছু আয় হিন্দুদের আয়ের সিকি ভাগের কম। অথচ বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু বাৎসরিক গড় আয় প্রায় ৪০০ ডলার অর্থাৎ ভারতের মুসলমানদের প্রায় চারগুণ। মুসলমানদের জনসংখ্যা ভারতের জনসংখ্যার শতকরা ১৩ ভাগ হওয়া সত্বেও সরকারি চাকুরিজীবীদের মধ্যে তাদের সংখ্যা মাত্র ৩ ভাগ। ১৯৪৭ এর পর এ অবধি দাঙ্গায় নিহত হয়েছে প্রায় ১০ লাখ মানুষ যার অধিকাংশই মুসলমান। মুসলমানদেরকে দরিদ্র, দলিত ও নির্যাতিত রাখার ভারতীয় প্রজেক্ট যে কতটা নির্মম ও নিষ্ঠুর এ পরিসংখ্যান সেটিই চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। ১৯৪৭ সালের নেতাদের দুরদৃষ্টির কারণে বাংলার মুসলমানেরা সে নিঃস্বকরণ, দলিতকরণ ও নির্মূলকরণ প্রক্রিয়া থেকে মুক্তি পায়। কিন্তু ১৯৭১ য়ের মেরুদন্ডহীন ও ভারতের প্রতি নতজানু আওয়ামী নেতৃত্ব তাদেরকে সে সুযোগ করে দেয়। কোন মুসলিম দেশে অমুসলিম বাহিনীকে আমন্ত্রণের মত জঘন্য হারাম কাজটিও অনুষ্ঠিত হলো এ দাস-নেতৃত্বের হাতে। ফলে পুণরায় হিংস্র হায়েনার কবলে পড়লো বাংলাদেশের মুসলমনেরা। যে প্রক্রিয়ায় ভারতের মুসলমানদের মেরুদন্ড চূর্ণকরা করা হচ্ছে সে একই প্রক্রিয়া শুরু হলো বাংলাদেশে। ১৯৪৭ য়ে উন্নতির যে ধারা শুরু হয়েছিল সেটি পশ্চিম পাকিস্তানে অব্যাহত থাকায় তারা তিন-তিনটি প্রকান্ড যুদ্ধের পরও আণবিক শক্তির অধিকারি মুসলিম বিশ্বের এক নাম্বার রাষ্ট্রে পরিণত হলো আর বাংলাদেশ পরিণত  হলো ভিক্ষার তলাহীন ঝুড়িতে অর্থাৎ মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে তলার রাষ্ট্রটিতে। সুজলা সুফলা বাংলায়ও দুর্ভীক্ষ সৃষ্টিতে নয়া ইতিহাস রচিত হলো। সৃষ্টি হলো অসংখ্য জাল পড়া বাসন্তি। ডাস্টবিনে উচ্ছিষ্ট খাবারের তালাশে ক্ষুদার্ত মানুেষরা কুকুরের সাথে প্রতিযোগিতায় নামলো। বাংলার সমগ্র অতীতে  ইতিহাসে এ ঘটনা বিরল। অর্থনৈতিক মেরুদন্ডকে স্থায়ী ভাবে বিচূর্ণ করার লক্ষ্যে একাত্তরে সামরিক দখলদারির শুরুতেই ভারত দেশটির শিল্প, অর্থনীতি ও শিক্ষার মত গুরত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোকে বিধ্বস্ত করে দেয়। হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ লুন্ঠন করে সেগুলি ভারতে নিয়ে যায়। সীমান্ত বাণিজ্যের নামে বিলুপ্ত করে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সীমান্ত। ফলে অর্থনৈতিক ভাবে দেশটি তলাহীন পাত্রে পরিণত হয়। বিদেশ থেকে প্রাপ্ত সাহায্য-সামগ্রীও চলে যায় ভারতে। সমগ্র সীমান্ত জুড়ে শুরু হয় চোরাকারবারি। দেশ পরিণত হয় ভারতীয় পণ্যের একচ্ছত্র বাজারে। ফলে ধ্বংস হয় দেশীয় শিল্প এবং বিপর্যস্ত হয় অর্থনীতি। তাঁবেদার রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও অনুগত লাঠিয়াল ছাত্রবাহিনী ও অনুগত শিক্ষকদের দিয়ে বিধ্বস্ত করে সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থাকে। বাংলাদেশে সিস্টেম লসের এটিই সবচেয়ে বড় খাত। কথা হলো, এভা্েব কি স্বাধীনতা বাঁচে? নিরাপত্তা পায় কি জনগণ? রক্ষা পায় কি অর্থনীতি? বস্তুতঃ স্বাধীনতা, অর্থনীতি ও জনগণ কোনটাই সেদিন বাঁচেনি। স্বাধিনতার নামে উপহার দেওয়া হয় নয়া পরাধিনতা। দূর্ভীক্ষে মৃত্যু ঘটানো হয় বহু লক্ষ মানুষের। রক্ষীবাহিনীর হাতে মৃত্যু ঘটে তিরিশ হাজারের বেশী রাজনৈতিক কর্মীর। তবে এখানেই শেষ নয়। বাংলাদেশের কোমর ভাঙ্গার কাজ এখনও শেষ হয়নি। দেশটির ভবিষ্যত বিপন্ন করতে তারা এখন নতুন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। ফারাক্কা বাঁধ দিয়ে দেশটির বিরাট ভূ-ভাগ বিপর্যস্ত করার পর এবার ফারাক্কার চেয়েও ক্ষতিকর পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে। প্রণয়ন  করেছে ব্রম্মপুত্র, সুরমা, কুশিয়ারাসহ ভারত থেকে আসা সকল নদীর উৎসমুখে বাঁধ দিয়ে পানি অপসরণের ১২৪ বিলিয়ন ডলারের প্রজেক্ট। এত দিন পানির যে প্রধানতম ধারাটি বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল সেটিই নিয়ে যাবে মধ্য, পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারতে। এতে বিপর্যস্ত হবে বাংলাদেশের কৃষি শুধু নয় বরং সমগ্র ভূপ্রকৃতি, জলবায়ু, প্রকৃত অর্থে দেশটির সমগ্র অস্তিত্ব।

বাংলাদেশের ভবিষ্যত নিয়ে যারা ভাবে বা দেশের উন্নয়নে যারা উদ্যোগ নিতে চায় তাদের অন্ততঃ এ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে হবে। কারণ, কারা শত্রু আর কারা মিত্র সে বিষয়টি একমাত্র ইতিহাস থেকেই অর্জিত হতে পারে। বুঝতে হবে, অর্থনৈতিক পঙ্গুসাধনই ভারতীয় ষড়যন্ত্রের একমাত্র লক্ষ্য নয়। এ পঙ্গুত্বকে স্থায়ী করতে তারা দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক পঙ্গুত্বকেও অনিবার্য করতে চায়। কারণ জাতির জীবনে এটিই তো ইঞ্জিন। ফলে বাংলাদেশের অন্য কোন ক্ষেত্রে ভারতীয় পুঁজির বিনিয়োগ না হলেও বিস্তর বিনিয়োগ হয়েছে বুদ্ধিবৃত্তিÍ ক্ষেত্রগুলোতে। মিডিয়া, সাহিত্য, শিক্ষাঙ্গণ ও বুদ্ধিবৃত্তির অন্যান্য ক্ষেত্রজুড়ে ভারতীয় সেবাদাসদের রমরমা অবস্থান তো একারণেই। ফলে নিজেদের শোষণ ও ষড়যন্ত্রের পক্ষেও ভারত বাংলাদেশে বিপুল সমর্থক পাচ্ছে। তাদের পক্ষে কলম ধরছে বহু সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবী। এরা যে কতটা বিবেক শূণ্য এবং দেশপ্রেম-শূণ্য তার প্রমাণ, বাংলাদেশের ইজ্জতহানীর কাজকে তারা নিজেদের ব্যবসায় পরিণত করছে। তারা শুধু জন ভিডেলের মত সাংবাদিকদের কাজে মিথ্যা বয়ানই দেয়নি, বানোয়াট ভিডিও বানিয়ে বিদেশে পাচারেরও চেষ্টা করেছে। লক্ষণীয় হলো,  মুজিব আমলের তলাহীন ঝুড়ির অবস্থান থেকে বাংলাদেশে যতই উপরে উঠছে ততই বাড়ছে তাদের ষড়যন্ত্র। একারণেই বাংলাদেশ আজ দ্বিমুখী ষড়যন্ত্র। একটি তার ভূগোল ও ভূপ্রকৃতির বিরুদ্ধে এবং অপরটি রাজনৈতিক ও ধর্মীয় স্বাধিনতা নিয়ে বেড়ে উঠার বিরুদ্ধে। উভয়টির অভিন্ন লক্ষ্য হলো, বাংলাদেশকে দ্রুত ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করা। আর এ লক্ষ্যে এক দিকে যেমন কবির চৌধুরীর মত ব্যক্তিদের এনজিওগুলি বিদেশী শত্রুদের সাথে কোয়ালিশন গড়েছে, তেমনি রাজনৈতিক ময়দানেও ক্রসেডারদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছে বিশাল পঞ্চম বাহিনী। বাংলাদেশ তের কোটি মানুষের একটি দেশ। জনশক্তির গুণেই দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে। সম্পদে এটি আফগানিস্তানের চেয়ে যেমন দূর্বল নয়, তেমনি শক্তিহীনও নয়। অথচ রাশিয়ার মত বৃহৎ শক্তির পতন হয়েছে এ নিঃস্ব আফগানীদের হাতেই। হাজার হাজার আণবিক বোমা ও ব্যালিস্টিক মিজাইল এদেশটিকে পরাজয় থেকে বাঁচাতে পারিনি। সে ভয় অন্যদের যে নাই তা নয়। আছে বলেই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে এত ষড়যন্ত্র। তাই দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ইসলামে অঙ্গিকার নিয়ে এত আক্রোশ। ইসলাম দিতে পারে প্রতিরোধের দূর্দমনীয় সাহস। দিতে পারে উন্নততর সভ্যতার নির্মাণের অপ্রতিরোধ্য জজ্বা। তাই একদিকে যেমন চলছে তের কোটি মানুষকে ইসলামে অঙ্গিকার-শূণ্য করার প্রচেষ্টা তেমনি চলছে পানিশূণ্য করে মারার ষড়যন্ত্র। এ লক্ষ্যে এ মুহুর্তে বাঁচার পথ মাত্র একটিই তা হলো আল্লাহর উপর বিশ্বাসকে তীব্রতর করা। বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষকে শক্তিতে পরিণত করা। এবং ইসলামের বিজয়ে অঙ্গিকারবদ্ধ করা। একমাত্র এ পথেই আল্লাহর সাহায্য প্রাপ্তি ত্বরান্বিত হতে পারে। আল্লাহতে অঙ্গিকার তীব্রতর হওয়ার কারণেই ফিরাউনের ধ্বংসে হযরত মূসা (সাঃ)কে য্দ্ধুও করতে হয়নি। এ কাজ আল্লাহপাক স্বয়ং নিজ হাতে নিয়েছিলেন। মুসলমানের কাজ নিছক আল্লাহর সাহায্যকারি হয়ে যাওয়া। আর মহান আল্লাহতো এমন সাহায্যকারিদের সাহায্য করতে সদাপ্রস্তুত। আল্লাহর সাহায্যের বদৌলতে বাংলাদেশের চেয়েও দরিদ্র অবস্থান থেকে মুসলমানেরা বিশ্বের প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়েছিল। আমরা যে এখনও সাহায্য পাচিছ না তার কারণ আল্লাহর একনিষ্ঠ সাহায্যকারি রূপে নিজেদের পেশ করতে পারিনি। বুঝতে হবে শত্রুর কাছে আত্মাসমপর্ণে মূক্তি নেই। মুজিব ভারতের কাছে পরিপূর্ণ ভাবে আত্মসমর্পন করেছিলেন। ভারতকে খুশী করতে গিয়ে ইসলামের চর্চা ও ইসলামের প্রতিষ্ঠাকে সাংবিধানিক ভাবে নিষিদ্ধ করেছিলেন। স্বাক্ষর করেছিলেন ২৫ সালা দাস-চুক্তি। সমগ্র সীমান্তকে ভারতীয় পণ্যের জন্য উম্মূক্ত করেছিলেন এবং ভারতীয়দের হাতে তুলে দিয়েছিলেন বাংলাদেশের ভূমি বেরুবাড়ী। কিন্তু তাতেও ভারতীয় নিষ্ঠুর শোষণ ও শোষণজনিত দূর্ভীক্ষ থেকে বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ বাঁচেনি। ফলে চিহ্নিত শত্রুর কাছে আত্মসমপর্ণের পথ শুধু অপমানেরই নয়, বিনাশেরও। আত্মসমর্পন বাড়াতে হবে একমাত্র আল্লাহতে। আর এটি মুসলমানের ঈমানী বাধ্যবাধকতাও। বাংলাদেশকে বাঁচাতে হলে প্রতিটি বাংলাদেশীর মনে এ বিশ্বাসকে দৃঢ়তর করতে হবে। আর এ বিশ্বাস বা ঈমানই তো মুসলমানের শক্তির মূল উৎস। এবং একমাত্র এ বিশ্বাসই পারে বহু মুখী এ ষড়যন্ত্র থেকে বাংলাদেশকে বাঁচাতে। প্রতিটি জীবিত দেহকে যেমন কোটি কোটি জীবানূর বিরুদ্ধে মোকাবেলা করেই বেঁচে থাকতে হয় তেমনি প্রতিটি উন্নয়নকামি জাতিকেও বাঁচতে হয় শত্রুর অবিরাম ষড়যন্ত্রকে মোকাবেলা করেই। সত্যতো এটাই, মুসলমানেরা তাদের সমগ্র ইতিহাসে তখনই সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল যখন তাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশী ষড়যন্ত্র ও হামলা হয়েছে। নবী (সাঃ)এর ১০ বছরের মদীনা জীবনে যতগুলো হামলা ও ষড়যন্ত্র মোকাবেলা  করতে হয়েছে বাংলাদেশীরা তা বিগত কয়েক শত বছরেও করেনি। কিন্তু তাতে কি তাদের প্রতিষ্ঠা বেড়েছে। জাতি যে জন্য ধ্বংস ও পরাজিত হয় সেটি হলো প্রতিরোধে আগ্রহ না থাকায়। বাংলাদেশের মুসলমানদের জীবনে প্রতিরোধের সামর্থ্য ও আগ্রহ বৃদ্ধিই আজকের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। নইলে পরাজয়ই যে আমাদের নিয়তিতে পরিণত হবে সে বিষয়ে সন্দেহ  আছে কি? (২৩/০৮/২০০৩)

(এ নিবন্ধটি মূল পেপাররূপে পেশ করা হয় ২৪শে আগষ্ট ২০০৩ সালে বাংলাদেশ ডেভলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (বিডিআই) আয়োজিত লন্ডনের ’টয়েনবি হল’ এর সুধী সমাবেশে)

 




বাংলাদেশে দেশধ্বংসী রাজনীতি

রাজনীতিঃ গুরুত্ব ও ব্যর্থতার ভয়াবহতা

রাজনীতি যেমন দেশগড়ার অপরিহার্য হাতিয়ার, তেমনি হতে পারে দেশধ্বংসেরও। নানা বর্ণ,নানা ভাষা ও নানা অঞ্চলে বিভক্ত মানুষের মাঝে রাজনৈতিক দলগুলি যেমন সুদৃঢ় বন্ধন গড়তে পারে, তেমনি এ অস্ত্রের সাহায্যে দেশবাসীর মাঝে রক্তক্ষয়ী সংঘাতেরও জন্ম দিতে পারে। কলকারখানা, রাস্তাঘাট, ক্ষেতখামার বা শিল্পকলায় ব্যর্থতার কারণে দেশ দুর্বল হয় বটে তবে ইতিহাস থেকে হারিয়ে যায় না। দেশ বিধ্বস্ত হয় এবং রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে হারিয়ে যায় বিধ্বংসী রাজনীতির কারণে। একশত বছর পূর্বের ঐক্যবদ্ধ উসমানিয়া খেলাফতের মানচিত্র আজ  ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে। আরবদের এক ভাষা,এক ধর্ম ও এক বর্ণের ভূমি আজ  ২২ টুকরায় বিভক্ত এবং তার অনেকেগুলিই এখন বিদেশী শত্রুর পদানত এবং রক্তাত্ত্ব। বিধ্বংসী রাজনীতির কারণে আরবদের ১৪ শত বছরের পূর্বের বিশ্বশক্তির ইজ্জত যেমন লুণ্ঠিত হয়েছে তেমনি ঘাড়ে চেপেছে পরাজয়, পরাধীনতা এবং অপমান। তেমনি ১৭৫৭ সালের বাংলা যেমন নেই,১৯৪৭ সালের পাকিস্তানও নাই। আগামীতেও আজকের বহুদেশ যে মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে তা নিয়েও কি সন্দেহ আাছে?

এরিস্টোটল মানুষকে সংজ্ঞায়ীত করেছেন “পলিটিক্যাল এ্যানিমাল” বা রাজনৈতিক জীব রূপে। পশুর মধ্যে রাজনীতি নেই। রাষ্ট্র ও সমাজ নিয়ে ভাবনাও নেই। আছে শুধু জৈবিক ভাবে বাঁচা ও বংশবিস্তার, এবং সে লক্ষ্যে আছে স্রেফ পানাহার ও যৌন প্রেরণা। অথচ রাজনীতির মাঝে থাকে নিজেকে নিয়ে বাঁচার পাশাপাশি সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্বকে নিয়ে ভাবনা। মানুষ পশু থেকে ভিন্নতর ও উচ্চতর পরিচয় পায়,এবং সমাজ ও সভ্যতা গড়ে তোলে বস্তুত এই রাজনৈতিক চেতনার কারণে। এখানে কাজ করে কল্যাণ-কর্মের পাশাপাশি সর্বপ্রকার অকল্যাণ থেকে দেশ ও দেশবাসীকে রক্ষা করার ভাবনা। মানুষ স্রেফ মানুষ রূপে বাঁচে না। সে বাঁচে হয় ঈমানদার রূপে অথবা বেঈমান রূপে। মানবজাতির এ বিভক্তিটি হাবিল ও কাবিল থেকে। একটি আল্লাহর আনুগত্যের,অপরটি আল্লাহর অবাধ্যতার। এক দল বাঁচে “ফি সাবিলিল্লাহ” তথা আল্লাহর পথে,আরেক দল বাচেঁ “ফি সাবিলিশ শায়তান” তথা শয়তানের পথে। এভাবে কাজ করে রাজনীতির দুটি ভিন্ন ধারা এবং দুটি ভিন্ন এজেন্ডা। নিজ নিজ ধারায় বাঁচতে গিয়ে তারা যেমন অর্থ, শ্রম ও মেধা দেয়,তেমনি প্রাণও দেয়। তবে মুসলমান বাঁচে এরিস্টোটলের সংজ্ঞায়ীত রাজনৈতিক পশু হিসাবে নয়,বরং আল্লাহতে আত্মসমর্পিত ঈমানদার বান্দাহ বা গোলাম রূপে। আর সে আত্মসমর্পিত মুসলিম পরিচয়টির কারণে তাঁর রাজনীতিতে আসে বিপ্লবী পরিবর্তন। এমন বিপ্লবী মানুষদের কারণেই সমাজ ও রাষ্ট্রজুড়ে ঘটে মহাবিপ্লব। কোন পথে কল্যাণ এবং কোন পথে অকল্যাণ –সে বিষয়ে মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশনাকে সে প্রতিপদে মেনে নেয়। তখন সে অন্যদের ন্যায় শুধু রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ে না,বরং সে রাষ্ট্র ও সমাজকে আল্লাহর নির্দেশিত বিধানের উপর প্রতিষ্ঠিত করে। এখানে ঘটে ঈমানদারের সর্ববিধ সামর্থের বিনিয়োগ। একাজে সে অর্থ দেয়, শ্রম দেয়, মেধা দেয়, এমনকি প্রাণও দেয়। তাঁর এ রাজনীতি তখন রূপ নেয় পবিত্র “জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ”য়। একারণেই মুসলমানের জীবনে এরিস্টোটলের রাজনৈতিক পশুত্ব যেমন নাই,তেমনি মেকিয়াবেলীর রাজনৈতিক ছলচাতুরিও নেই,বরং আছে আল্লাহর নির্দেশিত পথে ব্যক্তি,সমাজ ও রাষ্ট্রকে পরিচালিত করার পবিত্র জিহাদ। মুসলমান হওয়ার অর্থই হল এ পবিত্র জিহাদের সাথে আমৃত্যু সম্পৃক্ততা। কিন্তু রাজনীতিতে বেঈমানি যখন প্রবলতর হয় তখন বিলুপ্ত হয় আল্লাহতে আত্মসমর্পণের সে চেতনা। রাজনীতি তখন পরিণত হয় ক্ষমতাদখলের হাতিয়ারে। রাষ্ট্র ও সমাজ জুড়ে তখন প্রতিষ্ঠা পায় স্বার্থসিদ্ধির প্রকল্প এবং পরাজিত হয় আল্লাহর শরিয়ত। সবচেয়ে বড় বেঈমানী এবং আল্লাহর বিরুদ্ধে বড় বিদ্রোহটা ঘটে মূলত এক্ষেত্রে।এবং বাংলাদেশের রাজনীতির এটিই প্রবলতর দিক।

 

সফলতা শ্রেষ্ঠতর মানব সৃষ্টিতে

একটি জাতি কতটা বিপুল সংখ্যক মানুষকে এমন কল্যাণধর্মী চেতনা নিয়ে রাজনীতিতে আত্মনিয়োগে উদ্বুদ্ধ করতে পারলো তার উপর নির্ভর করে সে জাতি কতটা মানবিক ভাবে বেড়ে উঠবে এবং কতটা উচ্চতর সভ্যতা নির্মাণ করবে সে বিষয়টি। এক্ষেত্রে ইসলামের শেষ নবী(সাঃ)র সফলতা ছিল প্রায় শতভাগ। তিনি রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিককে তাদের সর্ববিধ সামর্থ নিয়ে রাজনীতির ময়দানে নামাতে পেরেছিলেন। সমগ্র মানব ইতিহাসে এমন ঘটনা আর কোন কালেই ঘটেনি। ফলে কোন কালে এতবড় সভ্যতাও নির্মিত হয়নি। সে সভ্যতার অলংকার পিরামিড ছিল না,বড় বড়া প্রাসাদ বা তাজমহলও ছিল না। ছিল বিপুল সংখ্যায় সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ সৃষ্টির। সে রাজনীতিতে সাহাবাদের সংশ্লিষ্টতা শুধু নবীজী (সাঃ)র প্রতি মৌখিক সমর্থণ­­-দান বা তাঁর প্রতি নির্বাচনী ভোটদান ছিল না;বরং সেটি ছিল অর্থ,শ্রম, সময় এবং প্রাণদানের মধ্য দিয়ে। আবু বকর (রাঃ)এর মত অনেক সাহাবী তাদের জীবনের সমগ্র সঞ্চয় নিয়ে ময়দানে হাজির হয়েছিলেন। বদর,ওহুদ,খন্দক,হুনায়ুন ও তাবুকের ন্যায় প্রতিটি জিহাদে প্রাণদানের ব্রত নিয়ে হাজির হয়েছিলেন সাহাবাদের প্রায় সবাই। সে ধারা অব্যাহত ছিল নবীজী (সাঃ)র মৃত্যুর পরও। তাবুকের যুদ্ধে শামিল হতে ব্যর্থ হয়েছিলেন মাত্র তিনজন সাহাবী। সে ব্যর্থতার কারণটি ইসলামের মিশনের সাথে তাদের বিরুদ্ধচারণ ছিল না,বরং ছিল অলসতা ও গাফলতি। সে জন্য তারা চরম অনুতপ্তও হয়েছিলেন। কিন্তু সে ব্যর্থতার জন্য তাঁরা সামাজিক বয়কটের মুখে পড়েছিলেন রাষ্ট্রের সমগ্র নাগরিকদের পক্ষ থেকে। সে আত্ম-বিনিয়োগ ও কোরবানীর কারণেই রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের ন্যায় দুই বিশাল বিশ্বশক্তির পরাজয় ঘটিয়ে মুসলমানগণ সেদিন প্রধানতম বিশ্বশক্তি রূপে আবির্ভুত হয়েছিল এবং জন্ম দিয়েছিল সমগ্র মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা।

দেশবাসীর কল্যাণ নিয়ে এমন ভাবনা ও আত্মনিয়োগ পশুর থাকে না। ফলে মানুষের মাঝে আজীবন বসবাস হলেও মানুষ থেকে পশুর বিশাল পার্থক্যটি থেকেই যায়। তবে এমন পশুত্ব নিয়ে সমাজে বসবাস করে বিপুল সংখ্যক মানুষও। দেশ ও দেশবাসীর কল্যাণ নিয়ে তাদের কোন ভাবনা নাই,অঙ্গিকার ও আত্মনিয়োগও নাই। দেশ শত্রু শক্তির হাতে অধিকৃত হলে গরু-ভেড়া যেমন দুশ্চিন্তায় পড়ে না বা ঘাস খাওয়ায় বিরতি দেয় না,এরাও তেমনি নিজের নিত্যদিনের কাজকর্ম ফেলে প্রতিরোধে নামে না। পরাজয় নিয়ে তাদের দুঃখবোধ থাকে না, বিবেকে দংশনও হয় না। তাই পলাশী যুদ্ধে বিজয়ের পর ইংরেজ বাহিনী যখন মুর্শিদাবাদে বিজয় মিছিল করেছিল,সে বিজয় মিছিল দেখতে এমন চরিত্রের মানুষেরা সেখানে কাতার বেঁধেছিল। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশের হাতে দেশ অধিকৃত হলেও তা নিয়ে তাদের মনে দুঃখবোধ জাগেনি। অথচ দেশবাসীর কল্যাণে আত্মনিয়োগ ইসলামে ফরজ। ব্যক্তি শুধু এ জীবনে নয়,পরকালেও সফলতা পায় এমন আত্মনিয়োগের কারণে। মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে কল্যাণকর্মে আত্মনিয়োগের সে নির্দেশটি এসেছে এভাবে,“তোমাদের মধ্য থেকে অবশ্যই একটি দল থাকতে হবে যারা মানুষকে কল্যাণের দিকে ডাকবে এবং ন্যায়-কর্মের নির্দেশ দিবে এবং অন্যায়কে রুখবে।এবং তারাই হলো প্রকৃত সফলকাম।”–(সুরা আল ইমরান,আয়াত ১০৪)। আর এখানেই মুসলমানের রাজনীতির মূল প্রেরণা। কোরআনে নির্দেশিত “অন্যায়ের নির্মূল এবং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা” হলো তার রাজনীতির মূল কথা। কল্যাণমুখি ইসলামি রাষ্ট্রের নির্মান ঘটে মূলত এপথ ধরেই।

 

যে ভয়াবহতা দেশধ্বংসের রাজনীতিতে 

বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলের সংখ্যা শতাধিক। দলগুলির সাথে জড়িত বহু লক্ষ নেতা-কর্মী ও সমর্থক। দলের পক্ষে তারা প্রচরণা করে,মিছিল-মিটিং করে,অর্থ দেয়,ভোট দেয়,প্রয়োজনে লড়াই করে এবং রক্তও দেয়।বাংলাদেশের সমগ্র ইতিহাসে আর কোন কালেই এত দল জন্ম নেয়নি,এত বিপুল সংখ্যক মানুষও রাজনীতিতে অংশ নেয়নি। কিন্তু প্রশ্ন হলো,এত বিপুল সংখ্যক মানুষের সংশ্লিষ্টতায় রাজনীতি কতটুকু সৃষ্টিশীল হয়েছে? দেশ এবং দেশবাসীরই বা কতটুকু কল্যাণ হয়েছে? আল্লাহতায়ালা ঈমানদারদের জন্য “অন্যয়ের নির্মূল এবং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা”র যে এজেণ্ডা বেঁধে দিয়েছেন সেটাই বা কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে? কতটা নির্মূল ঘটেছে দুর্বৃত্তি ও অন্যায়ের? দুর্নীতিতে ৫ বার বিশ্বে প্রথম হওয়ার মাধ্যমে কি এটাই প্রমানিত হয় না যে,এক্ষেত্রে ব্যর্থতা বিশাল। অথচ জনকল্যাণের এটাই সর্বোশ্রেষ্ঠ মাধ্যম। দেশবাসীর নীতি-নৈতিকতা,শিক্ষা-সংস্কৃতি,আইন-আদালত,স্বাস্থ্য,কৃষি,শিল্প,বাণিজ্য,বিজ্ঞান ও রাস্তাঘাটসহ সবকিছু নিয়ন্ত্রিত হয় রাজনীতির অঙ্গন থেকে। ফলে রাজনীতি দুর্বৃত্তদের হাতে অধিকৃত হলে তাতে দেশ ও দেশবাসীর সবচেয়ে বড় অকল্যাণটি ঘটে। তাই রাজনীতিবিদদের কাজ শুধু দল গড়া বা দলাদলি করা নয়। নিছক নির্বাচনে অংশ নেয়া বা নির্বাচনে শেষে সরকার গঠন করাও নয়। বরং লক্ষ্য,দেশের কল্যাণে সম্ভাব্য সবকিছু করা। রাজনীতির সফলতা যাচাই হয়,সে লক্ষ্য অর্জনে রাজনীতি কতটা সফল হলো তা থেকে।

রাজনীতি কোন ব্যক্তি,পরিবার বা দলের মালিকানাধীন ব্যবসা নয়,বরং এর সাথে জড়িত সমগ্র রাষ্ট্র। ওতপ্রোত ভাবে জড়িত রাষ্ট্রে বসবাসরত প্রতিটি নাগরিক। গাড়ীর অযোগ্য চালক যেমন যাত্রীদের গন্তব্যস্থলে না পৌছিয়ে মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করে। তেমনি ভয়ানক অঘটন ঘটে যখন রাষ্ট্র কোন অযোগ্য ও দুর্বৃত্তের হাতে পড়ে। বিশ্বের বহু দেশের মানুষ এখনও যেরূপ আদিম অশিক্ষা,অজ্ঞতা ও বর্বরতা নিয়ে বসবাস করে সেটি তো রাজনৈতিক ব্যর্থতার কারণে। মানব ইতিহাসের বড় বড় বিপর্যয়গুলো বন্য পশু হামলায় হয়নি,খড়া-প্লাবন ও ভূমিকম্প-সুনামীতেও ঘটেনি। ঘটেছে অতি দুর্বৃত্ত মানুষের হাতে রাজনীতি যাওয়াতে। এরাই মানব ইতিহাসে উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও বর্ণবাদের জন্ম দিয়েছে। হালাকু-চেঙ্গিজ, হিটলার-মুসোলীনি ও বুশ-ব্লেয়ারের ন্যায় ভয়ংকর মানুষের আবির্ভাব ঘটেছে রাজনীতির ময়দান থেকে। এমন দুর্বৃত্তরাই মানব জাতিকে অতীতে বহু হাজার যুদ্ধ উপহার দিয়েছে। বিগত শতাব্দীতে দুটি বিশ্বযুদ্ধ বাঁধিয়ে তারা সাত কোটির বেশী মানুষকে হত্যা করেছে। সম্প্রতি লক্ষ লক্ষ মানুষ হত্যা করেছে এবং এখনও করছে আফগানিস্তান,ইরাক,কাশ্মীর,ফিলিস্তিনসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে। বাংলাদেশে এরাই একাত্তরে যুদ্ধ,চুয়াত্তরে দুর্ভিক্ষ,পঁচাত্তরে বাকশালী স্বৈরাচার ডেকে এনেছে। এবং আজ  উপহার দিচ্ছে লগি-বৈঠার রাজনীতি,র‌্যাব-পুলিশের সন্ত্রাস,মিথ্যামামলা,এবং মামলার নামে রিমাণ্ড ও ডান্ডাবেরীর নির্যাতন। মীরজাফরদের হাতে রাজনীতি যাওয়াতে অতীতে স্বাধীনতা বিলুপ্ত হয়েছে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার,আর আজ লু্ণ্ঠিত হচ্ছে পদ্মা-তিস্তা-মেঘনার পানি,এবং অধিকৃত হচ্ছে বাংলাদেশের পণ্যের বাজার,রাস্তাঘাট ও বন্দর। এভাবে রাজনীতি পরিণত হয়েছে দেশকে শত্রুর হাতে তুলে দেয়ার হাতিয়ারে। এমন রাজনীতির কারণে বাংলার স্বাধীনতা লুণ্ঠনে অতীতে আগ্রাসী শত্রুকে যুদ্ধ লড়তে হয়নি,তেমনি আজও  লড়তে হচ্ছে না।

 

সৃষ্টিশীল রাজনীতি 

অথচ সৃষ্টিশীল ভাল মনুষদের হাতে রাজনীতি গেলে দেশে শান্তি-সমৃদ্ধি ও কল্যাণের প্লাবন শুরু হয়। গড়ে উঠে উচ্চতর সভ্যতা।মানুষের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিশীলতা কৃষি,শিষ্প,স্থাপত্য বা বিজ্ঞানের আবিস্কারে নয়,বরং সেটি উচ্চতর মানুষ সৃষ্টিতে। আখেরাতে মানুষ মহান আল্লাহতায়ালা থেকে মহাপুরস্কার পাবে এ শিল্পে আত্মনিয়োগের জন্য,তাজমহল বা পিরামিড গড়ার জন্য নয়।কল্যাণমুখি রাজনীতিবিদদের কাজ,সে সৃষ্টিশীলতার প্রতি দেশবাসীকে অঙ্গিকারবদ্ধ ও আত্মনিবেদিত করা;এবং তাদের সে সৃষ্টিশীলতায় সমৃদ্ধি আনা। আর মানুষ গড়ার সে মহান সৃষ্টিশীলতা ও শিল্পটি স্কুল-কলেজে বা ল্যাবরেটরিতে শেখা যায় না। কোন বুদ্ধিজীবী বা তাদের সৃষ্ট ইজম বা মতবাদ থেকেও নয়।সেটি সম্ভব হলে পাশ্চত্যের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে হিটলার, মুসোলীনি, বুশ, ব্লেয়ারের ন্যায় ভয়ংকর যুদ্ধাপরাধী বের হতো না। উপনিবেশবাদ,পুঁজিবাদ,সাম্রাজ্যবাদ,বস্তুবাদ,সমাজতন্ত্র ও কম্যুউনিজমের ন্যায় মানবতাধ্বংসী মতবাদও জন্ম নিত না। সে জ্ঞানের উৎস মাত্র একটিই এবং তিনি মহান আল্লাহ। উচ্চতর মানুষ গড়ার সে শিল্পটি হাতে-কলমে শেখাতেই মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর শ্রেষ্ঠ মানুষদের দুনিয়ার বুকে নবী-রাসূল করে পাঠিয়েছেন। নবী-রাসূলদের শেখাতে ফেরেশতাদের পাঠিয়েছেন। আর পথ দেখানোর একাজটি তো একমাত্র মহান আল্লাহর। পবিত্র কোরআনে তাই বর্নিত হয়েছে “ইন্না আলাইনাল হুদা”। অর্থঃ পথ দেখানোর দায়িত্ব একমাত্র আমার। -(সুরা লাইল)। এভাবে মানুষ পেয়েছে সঠিক পথ। মানব জাতির জন্য এটিই হলো মহান আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ দান।

মুসলিম রাজনীতির মূল এজেণ্ডা হলো শয়তানের পথ থেকে মানুষকে বাঁচানো, এবং আল্লাহর প্রদর্শিত পথ বেয়ে চলতে তাকে সাহায্য করা। তখন ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র পায় সিরাতুল মোস্তাকিম। ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় কল্যাণটি তো এভাবেই ঘটে। তখন কল্যাণময় কর্মে ভরে উঠে সমগ্র সমাজ ও পরিবার। এভাবে নির্মিত হয় উচ্চতর সভ্যতা। ইসলামি রাষ্ট্রের বড় নিয়ামত তো এটাই। বস্তুতঃ নবীজী (সাঃ)ও তাঁর মহান সাহাবাদের ন্যায় ব্যক্তির হাতে রাজনীতি যাওয়াতেই মানব জাতির ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা নির্মিত হয়েছিল। ঈমানদারের কাজ তাই শুধু নবীজী (সাঃ) থেকে নামায-রোযা-হজ-যাকাত শেখা নয়,বরং রাষ্ট্র ও সমাজকে তাঁর অনুসৃত পথে সঠিক ভাবে পরিচালিত করতে শেখা। মুসলমানের রাজনীতির গুণাগুণ যাচাই হয় নবীজী (সাঃ)র সে নীতি কতটা অনুসৃত হলো তা থেকে। আর একমাত্র এপথেই মুসলমানের রাষ্ট্র খোলাফায়ে রাশেদার আদর্শে গড়ে উঠে।

 

অকল্যাণের রাজনীতি

কোন অফিস-আদালতেই সবার মান-মর্যাদা সমান হয় না। মর্যাদা নির্ধারিত হয় অর্পিত দায়িত্বের গুণে। মানুষ তেমনি সমগ্র সৃষ্টিকুলে আল্লাহতায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টির মর্যাদাটি পেয়েছে তার উপর অর্পিত দায়ভারের কারণে। সে দায়ভারটি আল্লাহ খলিফা রূপে দায়িত্বপালনের। আর সে দায়িত্বপালন জায়নামায়ে বসে তসবিহ পাঠে যেমন হয় না। তেমনি মাসভর রোযা পালনেও হয় না। বরং সেটি পালিত হয় রাষ্ট্রের বুকে আল্লাহর আইনের বিজয় আনার মধ্য দিয়ে। নামায-রোযা-হজ-যাকাত তো ব্যক্তির মাঝে সে বিপ্লবেরই দায়িত্ব-সচেতনা বাড়ায়। বাড়ায় ত্যাগস্বীকারের সামর্থ। ইসলামে এটাই তাকওয়া। ঈমানদারের জীবনে সে দায়ভারটি স্পষ্টতর করতেই মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন,“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর সাহায্যকারি হয়ে যাও।” –(সুরা সাফ,আয়াত ১৪)। বলা হয়েছে “তোমরা কখনই প্রকৃত কল্যাণটি পাবে না যতক্ষণ না তোমাদের সবচেয়ে প্রিয় বস্তুটি আল্লাহর রাস্তায় খরচ না করছো” –(সুরা আল ইমরান,আয়াত ৯২ )। ফলে দল গড়া ঈমানদারের জীবনে নেশা নয়,পেশাও নয়। রাজনৈতিক কোন এজেণ্ডাও নয়। বরং এটি অবশ্য পালনীয় একটি ফরজ। সে দলটির লক্ষ্য ক্ষমতাদখলের রাজনীতি যেমন নয়,তেমনি দলাদলি বাড়ানোও নয়।দল গঠনের উদ্দেশ্য মুসলমানদের একতাবদ্ধ করা,বিভক্ত করা নয়। দলের নামে দলাদলি বা বিভক্তি গড়া অতি নিকৃষ্ট হারাম। দলের উদ্দেশ্য নিজ ভাষা,নিজ গোত্র ও নিজ বর্ণের নামে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও সে রাষ্ট্রের গৌরব বৃদ্ধিও নয়। বরং সে দল গড়বে একমাত্র ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং অন্যায়ের প্রতিরোধে। দল গড়বে বিশ্বব্যাপী ইসলামের বিজয় আনতে।

রাজনীতিতে মুসলমানের লক্ষ্য,মহান আল্লাহর অভিপ্রায়পূরণ। মহান আল্লাহর সে অভিপ্রায়টি ঘোষিত হয়েছে এভাবে,“তিনিই সেই মহান আল্লাহ যিনি হেদায়েত ও সত্যদ্বীনসহ রাসূলকে পাঠিয়েছেন যাতে সকল মত ও ধর্মের উপর বিজয়ী হতে পারে। যদিও সেটি মুশরিকদের জন্য অপছন্দের।” -(সুরা সাফ, আয়াত ৯)। পবিত্র কোরআনে এমন ঘোষণা একবার নয়,তিনবার এসেছে। এখানেই ঈমানদারের রাজনীতির পিছনে মূল দর্শন। মহান আল্লাহর সে ঘোষিত অভিপ্রায়ের সাথে সম্পৃক্ততার এ রাজনীতি তখন ঈমানদারের জীবনে বাঁচার মূল প্রেরণা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে মুসলমান সেক্যুলার হয় না। জাতিয়তাবাদী বা সমাজতন্ত্রিও হয় না। বরং আত্মত্যাগী মুজাহিদ হয়,এবং নির্ভেজাল জিহাদে পরিণত হয় তাঁর রাজনীতি। জিহাদের এ রাজনীতিতে প্রাণদান তখন শহিদের মর্যাদা আনে। অথচ বাংলাদেশের রাজনীতি মুসলমানদের জীবনে এখানেই এনেছে সবচেয়ে বড় বিচ্যুতি ও বিপর্যয়। সেক্যুলার এ রাজনীতি বাড়িয়েছে সিরাতুল মোস্তাকিম থেকে ভয়ানক পথভ্রষ্টতা। জনগণকে যে তারা মুর্তিপুজায় ফিরিয়ে নিয়েছে তা নয়। বরং লক্ষ্যচ্যুত করেছে বাঁচার মূল প্রেরণা ও উদ্দেশ্যে থেকে।বাংলাদেশের রাজনীতিতে জনগণের জীবনে এখানেই ঘটেছে সবচেয়ে বড় অকল্যাণ।

 

অধিকৃত রাষ্ট্র

রাজনীতির সফলতার মাপকাঠি এ নয় যে, দেশে কতটা পিরামিড,প্রাসাদ বা তাজমহল নির্মিত হলো। অতীতে বহু বর্বর দুর্বৃত্ত শাসকও এসবের নির্মাণে বিস্ময়কর সফলতা দেখিয়েছে। সেগুলোর নির্মানে হাজার মানুষ যেমন পাথর চাপা পড়ে মরেছে,তেমনি কষ্টার্জিত সম্পদের বিশাল অপচয়ও হয়েছে। অথচ তা দিয়ে কোটি কোটি মানুষের খাদ্য,বস্ত্র,বাসস্থান ও শিক্ষার ব্যবস্থা হতে পারতো। সমৃদ্ধ হতে পারতো সভ্যতা। সভ্যতার বিচারে মহান আল্লাহতায়ালার মানদণ্ড ভিন্ন। তিনি দেখতে চান,রাষ্ট্রের বুক থেকে কতটা অন্যায় ও পাপাচার নির্মূল হলো, কতটা প্রতিষ্ঠা পেল ন্যায়নীতি,সুবিচার ও সৎকর্ম। এবং কতটা বিজয় আসলো তাঁর দ্বীনের। যুগে যুগে মানবের সবচেয়ে বড় অকল্যাণটি ঘটেছে সমাজে অন্যায় ও অবিচার ব্যাপকতর হওয়ার ফলে। তাই গুরুত্বপূর্ণ ধর্মকর্ম হলো সেসব অন্যায় ও অবিচারকে প্রতিরোধ করা। সে সাথে আল্লাহর প্রদর্শিত ন্যায় ও সৎকর্মকে ব্যাপক ভাবে প্রতিষ্ঠা দেয়া। সে দায়িত্বটি প্রতিটি ব্যক্তির। সে দায়িত্ব পালন শুধূ সারাক্ষণ জায়নামাযে কাটালে বা সারা জীবন রোযা রাখলে হয়না। সেটি হয় না মহল্লায় মহল্লায় অসংখ্য মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মানেও। অন্যায়ের বিলুপ্তিতে সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী হাতিয়ার হলো রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের হাতেই আইন-আদালত,পুলিশ, প্রশাসন ও বিচার ব্যবস্থা। তাই অন্যায়ের রোধে ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রের উপর দখলদারিটি নিতে হয়,ব্যবহার করতে হয় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে। মহান নবীজী (সাঃ)র এটাই মহান সূন্নত। কল্যাণকর রাষ্ট্র নির্মানের স্বার্থেই তিনি নিজ ঘরবাড়ী ছেড়ে মদিনায় হিযরত করেছেন। নামায-রোযা তো গুহাতে বসেও চলে। কিন্তু তাতে রাষ্ট্র নির্মিত হয় না, ইসলামি সভ্যতাও গড়ে উঠে না। ফলে বিশ্বশক্তি রূপে ইসলামের প্রতিষ্ঠাও ঘটে না। কল্যাণকর রাষ্ট্রের নির্মানে নবীজী (সাঃ) সাহাবাদের নিয়ে বার বার সশস্ত্র জিহাদে নেমেছেন,সেসব জিহাদে প্রায় ৬০% সাহাবী শহিদ হয়েছেন। এত অর্থ, এত শ্রম ও রক্তের এতবড় কোরবানী মসজিদ-মাদ্রাসার নির্মানে হয়নি। কৃষি বা শিল্পে সমৃদ্ধি আনতেও নয়।অথচ বাংলাদেশে রাষ্ট্র ও তার প্রতিষ্ঠানসমূহ অধিকৃত ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে। মহান আল্লাহর শরিয়তি বিধানের প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে তারা ততটাই উগ্র যতটা উগ্র একজন পৌত্তলিক কাফের ও ইহুদী-নাছারা।

 

অধিকৃতি দুর্বৃত্তদের

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ব্যর্থতা কোন একক ক্ষেত্রে নয়,বরং সর্বক্ষেত্রে। এবং সেগুলি বিশাল বিশাল আকারে। সে ব্যর্থতা শুধু দারিদ্র্যতা ও বেকারত্বে নয়। রাস্তা-ঘাটের দুরাব্স্থা বা সার, পানি ও বিদ্যুতের অভাবেও নয়। সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাটি ঘটেছে অন্যায়ের নির্মূলে এবং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে। এ ব্যর্থতার কারণেই দেশটি দুর্বৃত্তিতে ৫ বার বিশ্বরেকর্ড গড়েছে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর মানুষ সৃষ্টির সফলতা পরিমাপের যে মানদ্ণ্ড নির্ধারণ করে দিয়েছেন সে অনুসারে বাংলাদেশের অর্জন শূণ্য। ক্ষমতাসীন সরকার ও প্রশাসন দেশকে যে কতটা নীচে নামিয়েছে এ হলো তার প্রমাণ। দেশের জন্য এটি এক লজ্জাজনক রেকর্ড -শুধু বিশ্ববাসীর সামনে নয়, মহান আল্লাহতায়ালার সামনেও। সর্বদ্রষ্টা মহান আল্লাহর দৃষ্টি থেকে কি এ ব্যর্থতা লুকানো যায়? তবে এ ব্যর্থতাটি শুধু ইসলামে অঙ্গিকারশূণ্য সেক্যুলারদের নয়,ঈমানদাররূপে পরিচয় দানকারীদেরও। তারা ব্যস্ত থেকেছে স্রেফ মসজিদ-মাদ্রাসা গড়ায়। অথচ তাদেরই চোখের সামনে রাষ্ট্রের দখল চলে গেছে শয়তানী শক্তির হাতে। তাদের পক্ষ থেকে এ দখলদারির বিরুদ্ধে কোন প্রতিরোধ উঠেনি,প্রতিবাদও উঠেনি।অথচ শয়তানী শক্তি মসজিদের দখল নিতে এতটা উৎসাহী নয়,সেখানে মুর্তি রাখা নিয়েও তাদের আগ্রহ নেই। বরং তারা তো মসজিদের নির্মানে ভূমি ও অর্থ দিতেও রাজী। এমনকি হোয়াইট হাউসেও তারা জায়নামাজ পেড়ে দেয় এবং ইফতারিও পেশ করে। তারা তো চায় রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের উপর নিজেদের দখলদারির প্রতিষ্ঠা। রাষ্ট্রকে তারা নিরংকুশ ব্যবহার করতে চায় ন্যায়ের প্রতিরোধ এবং অন্যায়ের প্রতিষ্ঠায়। সেখানে রুখতে চায় শরিয়তের প্রতিষ্ঠা। রাষ্ট্র থেকে বিদায় দিতে চায় মহান আল্লাহর বিধানের কর্তৃত্ব। নির্মম বাস্তবতা হলো, মুসলিম রাষ্ট্রসমূহ আজ  প্রবল ভাবে অধিকৃত এসব শয়তানি শক্তির হাতে। এবং সে শয়তানী শক্তির হাতে বাংলাদেশ যে কতটা অধিকৃত তার প্রমাণ মেলে দেশের নগরে-বন্দরে পতিতাপল্লি,সূদী ব্যংক,মদের দোকান,মদ্যশালা সেক্যুলার আইন-আদালত,সন্ত্রাস ও দূর্নীতির প্রবল প্রতিষ্ঠা দেখে।

দেশটির ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তির অন্যতম কাজ হয়েছে, নিজদলীয় অভিযুক্তদের আদালতের বিচার থেকে বাঁচানো। সে সাথে সাজাপ্রাপ্ত অপরাধীদের সাজা থেকে মুক্ত করে দেয়া। সাজাপ্রাপ্ত খুনীদেরকে ছেড়ে দিচ্ছেন খোদ প্রেসিডেন্ট নিজে। সংবিধানে তিনি শক্তিহীন হলে কি হবে,এ ক্ষমতা থাকে দেয়া হয়েছে নিজ দলীয় অপরাধীদের বাঁচাতে। দেশের বিচার বিভাগের কাজ হয়েছে সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত শত শত অপরাধের মামলাগুলোকে বেছে বেছে খারিজ করা,এবং সে সাথে জেল-হাজতে তোলা বিরোধী দলীয় কর্মীদের। ১৯৯৮ সালে জসিমউদ্দীন মানিক নামে জাহাঙ্গির নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রলীগ নেতা ধর্ষণে সেঞ্চুরী করেছিল।এবং তা নিয়ে সে নিজ দলীয় কর্মীদের নিয়ে ক্যাম্পাসে উৎসবও করেছিল। অপরাধ কর্মে নিজের পারঙ্গমতা নিয়ে সবাই উৎসব করে না। এর জন্য চাই প্রচণ্ড রকমের বিবেকশূণ্য এক বিকৃত মানসিকতা যা অপরাধীকে তার জঘন্য অপরাধকেও অপরাধ রূপে গণ্য করতে বাধা দেয়। জঘন্য অপরাধের পরও তখন সে হাস্যময় চিত্তে জনসম্মুখে আসে। যেরূপ উদ্ধতা নিয়ে এ জঘন্য অপরাধীটি জন-সম্মুখে উৎসব করেছিল সেটি শুধু বাংলাদেশের ইতিহাসে নয়,মানবজাতির ইতিহাসেও বিরল। ডাকাতও তার অপরাধ লূকাতে অপরাধগুলো রাতের আধারে করে। কিন্তু এ অপরাধীর সে লজ্জাশরম ছিল না।রাজনীতির নামে দেশে যে কতটা গভীর ভাবে দুর্বৃত্তায়ন ঘটিয়েছে এ হলো তার প্রমাণ।

কোন রাষ্ট্রে সভ্যতার মান নির্ধারণ হয় সে রাষ্ট্রে অপরাধ কর্ম কতটা ব্যাপক ভাবে হয় এবং অপরাধীর বিচার কতটা সুষ্ঠ ভাবে হয় তা থেকে। বনে জঙ্গলে পশুদের মাঝে কে ধর্ষিতা হলো বা কে খুণ হলো সেটি কেউ দেখে না। তা নিয়ে বিচারও হয় না। তাই সেটি পশু সমাজ। তবে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো,সে বিচার বাংলাদেশেও হয়নি। অথচ এমন অপরাধের বিচার বসাতে বড় রকমের ধার্মিক বা অতি মানবিক হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। সামান্য কিছু মানবিক মূল্যবোধ থাকলেই যে কোন সরকার এমন অপরাধীর বিচারে আপোষহীন হয়। কিন্তু সে সামান্য মানবিক মূল্যবোধের পরিচয় সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পেশ করতে পারেননি। কথা হলো, মানবিক মূল্যবোধের বিচারে এতটা নীচে না নামলে কি দূর্বৃত্তিতে বিশ্ব রেকর্ড গড়া যায়?

শেখ হাসিনা বরং তাঁর কর্মীদের প্রতি নির্দেশ দিয়েছিলেন, একটি লাশের বদলে দশটি লাশ ফেলার। এমন লাশ ফেলার ব্রত নিয়ে তার দলীয় কর্মীরা লগি-বৈঠা নিয়ে ময়দানে নেমেছিল এবং ঢাকার রাস্তায় বহু লাশও ফেলেছিল। তাঁর দলের কর্মীরা যাত্রী ভর্তি বাসে আগুণও দিয়েছিল। এভাবে নিছক রাজনিতক প্রয়োজনে ব্যাপক দুর্বৃত্তায়ন হয়েছে রাজনীতিতে। শেখ হাসিনা নিজেকে মুসলমান রূপে দাবী করেন। তিনি যে নামায পড়েন সে ঘোষণাটিও তিনি জনসভায় দিয়ে থাকেন। কিন্তু এটি কি কোন নামাযী মুসলমানের কাজ? মুসলমান হওয়ার অর্থ তো প্রতিপদে মহান আল্লাহতায়লার প্রতিটি হুকুম মেনে চলা। সে হুকুমের সামান্য অবাধ্যতাই হলো কুফুরি। সে অবাধ্যতা ব্যক্তিকে কাফেরে পরিনত করে। মহান আল্লাহর হুকুম তো হলো, অন্যায়ের নির্মূল এবং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা। এক লাশের বদলে দশ লাশ ফেলা বা লগি-বৈঠা নিয়ে রাস্তায় নামা নয়। ধর্ষণে সেঞ্চুরিকারীকে বিচার থেকে রেহাই দেয়াও নয়। আর খুণ বা অন্যায়ের হুকুম দিলে কি অন্যায়ের নির্মূল হয়? বাংলাদেশে অন্যায় ও অবিচার ব্যাপক ভাবে বেড়েছে রাজনৈতীক মঞ্চ থেকে অপরাধীদের প্রশ্রয় ও আশ্রয় দেয়ার কারণে। বেছে বেছে ভয়ানক অপরাধীদের এখানে রাজনীতিতে নামানো হয়েছে স্রেফ দলীয় লাঠিয়াল রূপে তাদের ব্যবহার করার লক্ষ্যে। বাংলাদেশের সকল ডাকাত সর্দার মিলেও এত অপরাধীদের অপরাধ জগতে নামাতে পারিনি যা নামিয়েছে শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনার ন্যায় আওয়মী লীগ নেতারা। তাদের হাতে রাজস্বের শত শত কোটি টাকা যেমন অতীতে ডাকাতি হয়েছে,এখনও হচ্ছে। ডাকাতি হয়ে যাচ্ছে রাস্তা ও বনভূমির গাছ,নদীর পাড়,সরকারি খাসজমি এবং বিদেশী ঋণের অর্থ। সরকারি দলের পক্ষ থেকে এমন দুর্বৃত্তি এখন আর কোন গোপন বিষয় নয়। এ খবর বিশ্বের নানা প্রান্তে পৌঁছে গেছে। তাই ক্ষমতাসীন দলের ডাকাতদের হাত থেকে পদ্মাসেতুর ঋণের অর্থ বাঁচাতে বিশ্ববাংক তার বরাদ্দকৃত ঋণই বাতিল করে দিয়েছে। মুজিব আমলেও এমনটিই ঘটেছিল। তখন বিশ্ববাসী বাংলাদেশকে ভিক্ষা দিতেও অনীহা দেখাতো। তখন বাংলাদেশকে তারা তলাহীন ভিক্ষার ঝুলি বলতো। ভিক্ষা দিলে সে ভিক্ষা থলিতে থাকবে না সে ভয় তাদের মধ্যে তখন প্রবল ভাবে ছিল। দুর্ভিক্ষে সে সময় লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ঘটেছিল। সেটিও কোন পেশাদার ডাকাত দলের কাণ্ড ছিল না,ঘটেছিল এ রাজনৈতিক ডাকাতদের লুণ্ঠনের ফলে।

 

বিভক্তির হাতিয়ার

মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে শুধু একতা প্রতিষ্ঠার হুকুমটিই আসেনি, এসেছে বিভক্তির বিরুদ্ধে কঠোর হুশিয়ারিও। একতাবদ্ধ হওয়া ইসলামে ফরজ এবং বিভ্ক্ত হওয়া হারাম। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “তোমরা আল্লাহর রশি তথা কোরআনকে আঁকড়ে ধরো এবং পরস্পরে বিচ্ছিন্ন হয়ো না।” –(সুরা আল ইমরান, আয়াত ১০৩)। তবে মুসলমানের সে একতা শুধু জায়নামাযে কাতারবদ্ধ হওয়ার একতা নয়। স্রেফ জায়নামাযে কাতার বাঁধলে কি শয়তানী শক্তিকে পরাজিত করা যায়? তাতে কি আল্লাহর দ্বীনের বিজয় আসে? এজন্য একতাকে জায়নামায়ের বাইরে রাজনীতির ময়দানেও নিয়ে যেতে হয়। মসজিদের মেঝেতে একত্রিত হয় একটি গ্রাম বা মহল্লার মানুষ। আর রাজনীতির ময়দানে একত্রিত হয় সমগ্র দেশের মানুষ। নানা ভাষা, নানা বর্ণ ও নানা মজহাবের মানুষ এখানে একতাবদ্ধ হয়। রাজনৈতিক দল এভাবে জনগণের মাঝে একতা গড়তে শক্তিশালী মাধ্যম রূপ কাজ করে।ভারতের মুসলমানেরা এক সময় বাংলা,বিহার,আসাম,পাঞ্জাব,সিন্ধূ,গুজরাত,উত্তর প্রদেশ,মধ্যপ্রদেশ,সীমান্ত প্রদেশ,বিলুচিস্তান এরূপ নানা প্রদেশে ও নানা ভাষায় বিভক্ত ছিল। একতার রাজনীতি তাদেরকে প্রছণ্ড ভাবে শক্তিশালী করেছিল। সে একতার বলেই ১৯৪৭ সালে বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট পাকিস্তানের সৃষ্টি হয়েছিল।অপরদিকে বিভক্তির কারণে বিশাল আরব ভূমি আজ শক্তিহীন ও ইজ্জতহীন।

রাজনীতির এ হাতিয়ারটি বাংলাদেশে ব্যবহৃত হয়েছে জনগণের মাঝে ঘৃণা ও বিভক্তি ছড়ানোর কাজে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য কোন দেশে ও কোন সমাজে নেই? এমন বিভক্তির মাঝে একতা গড়ার মহান শিল্পটি হলো রাজনীতি। বিভক্ত জনগণকে এটি শান্তিপূর্ণ ভাবে একত্রে বসবাস করতে শেখায়। তাই যে দেশে রাজনীতিতে পরিপক্কতা আসে সে দেশে রাজনৈতিক দলের সংখ্যাই শুধু  কমে না,সংঘাতও কমে যায়। বাংলাদেশ শতাধিক রাজনৈতিক দল দেখে নিশ্চিত বলা যায়, একতা গড়ার সে ফরজ এ সমাজে পালিত হয়নি। নবীজী (সাঃ)র আমলে আউস ও খাজরাজ গোত্রের বহু শত বছরের সংঘাত বিলুপ্ত হয়েছিল এবং তারা সিসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় মজবুত উম্মাহতে পরিনত হয়েছিল। ইতিহাসের নানা বাঁকে নানা বিষয়ে যে কোন দেশেই মতপার্থক্য হয়।তাতে সংঘাত আসে এবং জাতীয় জীবনে ক্ষত সৃষ্টি হয়। এবং প্রচুর রক্তপাতও ঘটে। বিজ্ঞ রাজনীতিবিদদের কাজ হলো সে ক্ষতগুলোকে শুকানোর ব্যবস্থা করা। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে ঘটছে উল্টোটি। বহু বছরের পুরোন জখমগুলোকে আজ  শুধু তাজাই করা হচ্ছে না,তাতে মরিচও লাগানো হচ্ছে। ১৯৪৭ সালে বহু লক্ষ মানুষ পাকিস্তান সৃষ্টির বিরোধীতা করেছিল। কিন্তু সে কারণে কাউকে জেলে নেয়া হয়নি, কারো পায়ে ডাণ্ডাবেড়ীও পড়ানো হয়নি। সেদিন কংগ্রেসী নেতারাও পাকিস্তানের সংসদে বসার সুযোগ পেয়েছে। সাতচল্লিশের নেতাদের এ ছিল রাজনৈতিক পরিপক্কতা। অথচ আজ ১৯৭১এ বাংলাদেশ সৃষ্টির বিরোধীতার জন্য তাদের যুদ্ধাপরাধী রূপে চিত্রিত করা হচ্ছে,সে অপরাধে তাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ৪০ বছরেরও বেশী কাল পর আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছে। বস্তুতঃ সরকারের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে,বিভক্তির সূত্রকে আবিস্কার করা এবং সম্ভাব্য সকল উপায়ে সে বিভক্তিকে সংঘাতে রূপ দেয়া।এবং সে সাথে বিভক্তির সে আগুণে লাগাতর পেট্রোল ঢালা।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতাসীনদের মূল লক্ষ্য,কি করে দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকা যায়। স্বাধীনতা, আইনশৃঙ্খলা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা নাগরিক অধিকার নিয়ে তাদের কোন মাথা ব্যথা নাই। একমাত্র মাথাব্যথা নিজেদের শাসন ক্ষমতাকে নিশ্চিত করা। সেটি নিশ্চিত করতেই আওয়ামী লীগের রাজনীতিকেরা একাত্তরে ভারতের সাথে ৭ দফা চুক্তি করে দেশটির জন্মের আগেই তাকে শৃঙ্খলিত করেছিল। এরপর ২৫ সালা চুক্রি করে সে বন্দীদশাকে দীর্ঘায়ীত করেছিল। জনগণকে শৃঙ্খলিত করেছে একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠা করে। পদ্মার পানি লুণ্ঠিত হচ্ছে, আজ  লুণ্ঠিত হতে যাচ্ছে সুরমা, কুশিয়ারা, মেঘনা, তিস্তার পানি, কিন্তু তাতে ক্ষমতাসীনদের মাথা ব্যথা নেই। তারা দেশের বাজার তুলে দিয়েছে ভারতীয়দের হাতে। ভারতের জন্য দিয়েছে দেশের মধ্যভাগ দিয়ে করিডোর। দিয়েছে চট্টগ্রাম এবং চালনা বন্দরে ট্রানজিট সুবিধা। সরকারের মাথাব্যাথা বিরোধীদলীয় নেতাদের বিরুদ্ধে রাজপথে হামলা, মামলা এবং মামলার নামে বছরের পর বছর কারারুদ্ধ করে রাখা। রাজনীতি পরিনত হয়েছে স্বার্থ উদ্ধারের হাতিয়ারে।

 

কেন এ বিধ্বংসী রূপ?

ইসলামের বড় শিক্ষা এবং সে সাথে নবীজীর বড় সূন্নত হলো,রাষ্ট্র পরিচালনার এ দায়িত্বটি পাবে রাষ্ট্রের সবচেয়ে আল্লাহভীরু যোগ্যতম ব্যক্তিটি। এটিই গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা খোলাফায়ে রাশেদারও। ইসলামের বিজযের এ ছাড়া বিকল্প রাস্তা নেই। ঈমানদারদের বড় দায়িত্বটি হলো দেশের শাসক রূপে যোগ্য ব্যক্তির নির্বাচনের বিষয়টিকে সুনিশ্চিত করা। নবীজী (সাঃ)র ওফাতের পর সাহাবায়ে কেরাম তার মৃতদেহের দাফনের কাজ স্থগিত রেখে প্রথমে খলিফা নির্বাচনের কাজটি সমাধা করেছিলেন। কারণ এখানে গাফলতি হলে বিপর্যয় অনিবার্য। অথচ বাংলাদেশের রাজনীতিতে সে কাজটি যথার্থ ভাবে হয়নি। মহান আল্লাহর সাথে এখানেই প্রকাশ পায় মোমেনের প্রকৃত ঈমানদারি। মুনাফিকরা নামায-রোযা পালন করে বটে, কিন্তু আল্লাহর দ্বীনের বিজয়ে তারা ত্যাগ স্বীকারে রাজী নয়। খোদ নবীজী (সাঃ)র যুগে এমন নামাযীরাই বরং ইসলামের বিজয় রুখতে মক্কার কাফের আর ইহুদীদের সাথে ষড়যন্ত্র পাকিয়েছিল। এরাই ওহুদের যুদ্ধে নবীজী (সাঃ)র বাহিনী থেকে দূরে সরেছিল।সে কাজ এরাই ইসলামের বিপক্ষ শক্তি। নামে মুসলমান হলেও তাদের রাজনীতির মূল এজেণ্ডা,দেশে শরিয়তের প্রতিষ্ঠাকে রুখা,ইসলামী শিক্ষাকে সংকুচিত করা এবং ইসলামের পক্ষের শক্তিকে নির্মূল করা। অতীতে এরাই ভারতীয় আগ্রাসীদের সাথে কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে একাকার হয়ে গিয়েছিল এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তাদেরকে ডেকে এনেছিল। আর আজ জোট বাঁধছে মার্কিন নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশনে। আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ নিছক জ্বিনা-ব্যাভিচারি বা সূদখোরী নয়, বরং বড় বিদ্রোহ ও গাদ্দারী হলো রাষ্ট্র পরিচালনার এ দায়িত্বটি আল্লাহর অবাধ্যদের হাতে তুলে দেয়া। অথচ বাংলাদেশের রাজনীতিতে সে গাদ্দারীটাই বেশী বেশী হচ্ছে অহরহ। মুসলিম দেশে রাষ্ট্রপ্রধানের আসনে বসেছেন খোদ রাসূলুল্লাহ (সাঃ)।এ আসনে কি তাই আল্লাহর অবাধ্য ও বিদ্রোহীকে বসানো যায়? অথচ বাংলাদেশে বিপুল ভাবে অর্থদান,শ্রম দান বা ভোটদানের ঘটনা হচ্ছে এ বিদ্রোহীদের বিজয়ী করার লক্ষ্যে।

ইসলাম শুধু নামায-রোযা-হজ-যাকাতের সবকই দেয় না,শিক্ষা দেয় কি করে রাষ্ট্রের ন্যায় অতি গুরুত্বপূর্ণ এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠাটিকে আল্লাহর দ্বীনের প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় কাজে লাগাতে হয়।নবীজী (সাঃ)র এটিই বড় সূন্নত। মুসলমানদের ঈমানী দায়িত্ব নিছক নিজ দেশের সীমানা,নিজ গৃহ ও নিজ ব্যবসা বা মসজিদ-মাদ্রাসা পাহারা দেয়া নয়।বরং বড় দায়িত্বটি হলো এ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে শয়তানী শক্তির হাত থেকে রক্ষা করা। কারণ এ প্রতিষ্ঠানটি একবার হাতছাড়া হলে অতি দ্রুত সমগ্র রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্টানই শয়তানের সর্বগ্রাসী হাতিয়ারে পরিণত হয়। দ্বীনের পরাজয় তখন আর শুধু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ থাকে না,পরাজিত হয় খোদ মসজিদ-মাদ্রাসার অভ্যন্তরেও। শয়তান তখন শুধু ব্যক্তির কাঁধে ভর করে মানুষকে বিভ্রান্ত করে না,বরং সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পথভ্রষ্ট করে সমগ্র জাতিকে। তখন নামাযী জনগণের রাজস্বের অর্থে সমগ্র রাষ্ট্র জুড়ে পথভ্রষ্টতার বড় বড় রাজপথ নির্মিত হয়। এবং কঠিন করে দেয়া হয় সিরাতুল মোস্তাকীমে চলা। তখন দেশজুড়ে গড়ে সিরাতুল মোস্তাকিমের বদলে উঠে সিরাতুশ শয়তান তথা শয়তানের পথ। বাংলাদেশে এজন্যই বেপর্দাগী,মদ-গাঁজা-হিরোইন,নাচগান,পতিতা,সুদ-ঘুষ ও নানারূপ দুর্বৃত্তি নিয়ে জীবন যাপন করা সহজ। অথচ বিপদজনক হয়ে দাড়িয়েছে ঘরে জিহাদী বই রাখা,রাজপথে শরিয়তের পক্ষে আওয়াজ তোলা,হিজাব করা এবং সূদ-ঘুষ এড়িয়ে জীবন যাপন করা।

ইসলামের বিপক্ষ শক্তির হাতে রাষ্ট্র অধিকৃত হলে কঠিন হয় জনগণকে পথভ্রষ্টতা থেকে বাঁচানো। তখন হাজার হাজার মসজিদ-মাদ্রাসা গড়েও সে কাজে সফলতা আসে না। অথচ রাষ্ট্র ইসলামি হলে মুসলমানদেরকে দ্বীনের পথে রাখার কাজ সহজতর হয়। সমগ্র রাষ্ট্র তখন ইবাদতগাহ ও মাদ্রাসায় পরিনত হয়। মাদ্রাসা রূপে কাজ করে রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশের একটি জেলায় আজ যতগুলি মাদ্রাসা ও মসজিদ আছে খোলাফায়ে রাশেদার আমলে তা ছিল না। কিন্তু সে আমলে ইসলামের বিজয় এসেছিল বিশাল ভূখণ্ড জুড়ে। মুসলমানেরা তখন বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয়েছিল। মহান নবীজী (সাঃ)রাষ্ট্রের গুরুত্ব বুঝতেন। আর নবীজী (সাঃ) তো সেটিই বুঝতেন যা মহাজ্ঞানী মহান রাব্বুল আলামীন তাঁকে ওহী মারফত বুঝাতেন বা জ্ঞানদান করতেন। ফলে তাঁর উপলদ্ধিতে সামান্যতম ত্রুটি ছিল না। সেই সমোঝ-বুঝের কারণে মহান নবীজী (সাঃ) তার কর্মকে শুধু দ্বীনের দাওয়াতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি শুধু মসজিদই গড়েননি,বরং রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানও গড়েছেন। অথচ সে সময় মদীনা ও মক্কাতে কোন রাষ্ট্র ছিল না। কোন রূপ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানও ছিল না। শয়তানী শক্তির কাছে রাষ্ট্রের সে গুরুত্ব সেদিন অজানা ছিল না। ফলে কাফের শক্তির সম্মিলিত হামলা হয়েছে মদীনার উপর। রাষ্ট্র বাঁচাতে যুদ্ধ হয়েছে তৎকালীন বিশ্বশক্তি রোমানদের সাথে। সেকালে মুসলমানদের জানমালের সবচেয়ে বড় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ ও সেটিকে শক্তিশালী করতে। শতকরা প্রায় ৭০ ভাগের বেশী সাহাবা তাতে শহীদ হয়েছেন। অথচ আজকের মুসলমানেরা নবীজীর সে সূন্নত যেমন ভূলেছে, তেমনি ভূলেছে রাষ্ট্র নির্মান ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দখলে রাখার সে হিকমতকেও। অনেকে এটিকে দুনিয়াদারিও বলছে। আর তাতে বিজয় ও আনন্দ বাড়ছে শয়তানের শিবিরে। আজকের মুসলমানদের বড় ব্যর্থতা ও বিপর্যয় মূলত এখানেই। তাদের ব্যর্থতার কারণে রাষ্ট্র আজ  শয়তানী শক্তির কাছে অধিকৃত। অথচ মানুষের সবচেয়ে বড় দুষমন হলো শয়্তান। শয়তান ব্যক্তিকে শুধু তার মৃত্যু-পরবর্তী আখেরাতের জীবনকেই জাহান্নামে টানে না,জাহান্নাম গড়ে তোলে এ পার্থিব জগতেও। ফলে রাষ্ট্র পরিণত হয় অশান্তি ও অনাসৃষ্টির হাতিয়ারে। বাংলাদেশের রাজনীতির বিধ্বংসী রূপ এজন্যই এতটা প্রকট। ০৩/১২/১১

 




বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ব্যর্থতা ও ইমেজ সংকট

শুরু থেকেই ইমেজ-সংকট

যে কোন স্বাধীন দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শুধু তার স্বরাষ্ট্র নীতি, প্রশাসন, শিক্ষা-সংস্কৃতি এবং শিল্প-বাণিজ্য নয়, বরং অতি গুরুত্বপূর্ণ হল তার পররাষ্ট্র নীতি। ব্যক্তির ক্ষেত্রে যেমন তার ব্যক্তিত্ব, রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গণে তার ভাবমুর্তি বা ইমেজ। আর সেটিই তুলে ধরে তার পররাষ্ট্র নীতি। কোন দেশের নেতাই তার স্কুল-কলেজ, ক্ষেতখামার বা কলকারখানা নিয়ে অন্যদেশে হাজির হয় না, বরং হাজির হয় তার পররাষ্ট্র নীতি নিয়ে। সে নীতি নিয়েই সে বিদেশীদের মুখোমুখি দাঁড়ায়, কথা বলে এবং বন্ধুত্ব গড়ে। একটি দেশের রাষ্ট্রীয় মেরুদণ্ড কতটা মজবুত সেটিই এখানে ধরা পড়ে। দাস ও মনিব -উভযে মনুষ্য প্রাণী হলেও, উভয়ের মুখের ভাষা ও দেহের ভাষা এক নয়। কে দাস আর কে মনিব -সে পার্থক্যটি বুঝতে তাই শিশুরও বেগ পেতে হয় না। তেমনি সুস্পষ্ট পার্থক্য বুঝা যায়, কোনটি স্বাধীন দেশ আর কোনটি পরাধীন। বাংলাদেশের বড় ব্যর্থতা এখানেই। মেরুদণ্ড সম্পন্ন একটি স্বাধীন দেশের পরিচয় নিয়ে দেশটি এখনও বিশ্বমাঝে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারিনি। এক্ষেত্রে ব্যর্থতা বিশাল, এবং সেটি ১৯৭১ থেকেই।

বাংলাদেশের যে পরিচয়টি তার জন্ম থেকে বিশ্ববাসীর মগজে বদ্ধমূল হয়েছে তা হল, দেশটি পৃথক মানচিত্র পেয়েছে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতীয় বাহিনীর সামরিক বিজয়ের প্রেক্ষিতে। ভারতের হাতে এর জন্ম, ভারতের পেটে এর অবস্থান এবং ভারতের পেটের মধ্যেই এর স্বাধীনতা -বাংলাদেশের এ পরিচয়টিই শুধু ভারত নয়, ভারত-অনুগত বাংলাদেশী রাজনৈতিক নেতা ও বুদ্ধিজীবীরাও বিশ্ববাসীর সামনে সেটি তুলে ধরে। এবং এ যুক্ত দেখিয়েই প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বৃদ্ধির বিরুদ্ধেও যুক্তি পেশ করে। শেখ মুজিবও সে পরিচিতিটাই পাকাপোক্ত করেছিলেন ভারতের সাথে ২৫ সালা চুক্তি করে। ফল দাঁড়িয়েছে, বাংলাদেশের মনিব আছে, কিন্তু বন্ধু নাই। কারণ অন্যের ঘরে হানা দিয়ে কে তার আশ্রিতের সাথে বন্ধুত্ব করতে চায়? এজন্যই কাশ্মীরের মুসলিমদের রক্তাত্ব স্বাধীনতা সংগ্রাম নিয়ে নিজস্ব কোন নীতি নাই। বরং নীতি তাই যা ভারত সরকারের নীতি। বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের জন্য এটি শুধু ব্যর্থতার বিষয়ই নয়, প্রচণ্ড অপমানের বিষয়ও। এভাবে দেশের জন্য সৃষ্টি করেছে প্রচণ্ড এক ইমেজ সংকট। খোন্দকার মোশতাক ও জেনারেল জিয়া সে পরিচয় থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সফল হননি। বরং তাদেরকেই রাজনীতির অঙ্গণ থেকে বিলুপ্ত হতে হয়েছে। আজ মুজিব নেই। কিন্তু তাঁর আওয়ামী লীগ আছে, কণ্যা ও আত্মীয়স্বজন আছে, ভারত-সেবী বিশাল বুদ্বিজীবী বাহিনীও আছে। ফলে প্রবল ভাবে বেঁচে আছে ভারতসেবী নীতিটিও। ফলে বাংলাদেশ আজও অগ্রসর হচ্ছে পররাষ্ট্র নীতির সে নতজানু ধারা নিয়েই।

 

অধিকৃত বাংলাদেশ

ব্যক্তি ও তার পরিবারকে যেমন বহু মানুষের মাঝে বসবাস করতে হয়, রাষ্ট্রকেও তেমনি বাঁচতে হয় বহু রাষ্ট্রের মাঝে। সেখানে যেখানে চরম শত্রু আছে তেমনি পরম মিত্রও আছে। বেঁচে থাকার স্বার্থে কোনটি খাদ্য আর কোনটি অখাদ্য শুধু সেটুকু জানলে চলে না, কে শত্রু আর কে মিত্র সেটুকুও সঠিক ভাবে জানতে হয়। সমাজে বন্ধুহীন হওয়াতে নিরাপত্তা বাড়ে না। বন্ধু মনে করে বাঘের পিঠে সওয়ার হলেও নিস্তার মেলে না। পররাষ্ট্র নীতির মূল কাজ হল, কে শত্রু আর কে মিত্র -সেটিই প্রথমে সনাক্ত করা এবং সে অনুযায়ী দেশের নীতি নির্ধারণ করা। তাই পররাষ্ট্রনীতির কাজ দেশে দেশে স্রেফ দূতাবাস খুলা নয়, বরং নিজদেশের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও অর্থনীতিকে সম্ভাব্য সকল উপায়ে সুরক্ষিত করা। পরাধীন দেশের সে ভাবনা থাকে না। তাই তার পররাষ্ট্র নীতিও থাকে না। যাদের স্বাধীন দেশই নেই তাদের আবার পররাষ্ট্রনীতি কিসের? একারণেই দাস বা কারারুদ্ধ ব্যক্তির পারিবারিক বা সামাজিক জীবন থাকে না। কারারুদ্ধ ব্যক্তির অধীনতা কেবল কাজ-কর্ম ও চলাফেরায় নয়, বরং জেলের বাইরে গিয়ে বন্ধুত্ব গড়ার ক্ষেত্রেও। তেমনি অবস্থা পরাধীন রাষ্ট্রের। উপনিবেশিক শাসনামালেও ভারতের বিশাল ভূগোল ছিল। বিশাল জনসংখ্যা এবং বিপুল ঐশ্বর্যও ছিল। কিন্তু পররাষ্ট্রনীতি ছিল না। কারণ, ভারত তখন পরাধীন। ফলে ভারতের পররাষ্ট্র নীতিটি ছিল ব্রিটিশের জাতীয় বিষয়, ভারতের নয়। কিন্তু ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্ত হয়ে যখন দুটি দেশ -মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পাকিস্তান ও হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতের জন্ম হয়, তখন থেকেই দুটি দেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতিও জন্ম নেয়। তবে সম্পন্ন দুটি ধারায়। দুটি দেশ একই উপমহাদেশে এবং একই জলবায়ুতে বসবাস করলেও তাদের শত্রু-মিত্র এক ছিল না। ফলে এক ছিল না তাদের পররাষ্ট্রনীতিও। বাংলাদেশ তখন ছিল পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশ পূর্ব-পাকিস্তান। ১৯৭১ সালে উপমহাদেশের ভূগোলে আবার পরিবর্তন আসে। এ পরিবর্তনের পর পাকিস্তান ও ভারতের পররাষ্ট্রনীতি পরিবর্তন না আসলেও ১৮০ ডিগ্রি পাল্টে যায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি। পাল্টে যায় বাংলাদেশের ভাবমুর্তিও।

উনিশ শ’ একাত্তরে পূর্ব-রণাঙ্গণে পাকিস্তান আর্মির শোচনীয় পরাজয় ঘটেছিল ভারতীয় আর্মির হাতে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের সে বিজয়ের ফলেই জন্ম নেয় বাংলাদেশ। সে যুদ্ধে ভারতীয় বাহিনীর সাথে মুক্তিবাহিনীরও বহ হাজার সদস্য লড়েছিল। কিন্তু ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের দলীলটি ঢাকায় স্বাক্ষরিত হলেও সে দলীলে কোন বাংলাদেশীর স্বাক্ষর ছিল না। সে অনুষ্ঠানে শেখ মুজিব যেমন ছিলেন না, তেমনি ছিলেন না মূক্তিবাহিনীর সেনাপতি। সেখানে ছিল দুটি পক্ষঃ বিজয়ী ভারত এবং পরাজিত পাকিস্তান। ভারতের পক্ষে স্বাক্ষর করেন জেনারেল অরোরা এবং পাকিস্তানের পক্ষে জেনারেল নিয়াজী। সেদিন সে দলীল স্বাক্ষরের খবরটিই বিশ্ববাসীর কাছে একমাত্র খবর ছিল না। সেদিন পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান আর্মির পরাজয় ঘটেছিল বটে, কিন্তু তাতে বিদেশী সৈন্য থেকে বাংলাদেশের মূক্তি ঘটেনি। বিদেশী ভারতীয় সেনাবাহিনী কর্তৃক সেদিনই পুরাপুরি অধিকৃত হয়েছিল এদেশ। এ খবরটিও সেদিন বিশ্বব্যাপী প্রচার পেয়েছিল। নিজ-গৃহের অভ্যন্তরে অন্যদের ডাকা নিজেই বিশাল অসম্মান। ভারতের বিজয়ে বাংলাদেশের উপর থেকে পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব বিলুপ্ত হলেও তাতে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়নি। দেশের সীমান্তের উপর বাংলাদেশের কোন নিয়ন্ত্রনই ছিল না। সে সামর্থ্যও তখন বাংলাদেশের ছিল না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ভারত মুখে স্বীকার করলেও নিজ দেশের সীমান্ত ও ভূ-খণ্ডের উপর সে স্বাধীনতার প্রয়োগ বাংলাদেশীদের হাতে হতে দেয়নি। বরং সে নিয়ন্ত্রনটি ছিল পূর্ণ ভাবে ভারতের। ফলে পাকিস্তান আর্মি যেসব বিমান, হেলিকপ্টার, ট্যাংক, কামান, অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ রেখে যায় সেগুলো বাংলাদেশকে সরকার দখলে নিতে দেয়নি। ভারতীয় সেনাবাহিনী সেগুলো নিয়ে যায় ভারতে। সে সাথে নিয়ে যায় কলকারখানার শত শত কোটি টাকার যন্ত্রপাতি। এমন কি সেনানিবাসের ঘরে ঘরে যে টিভি, ফ্রিজ, বৈদ্যুতিক পাখা ছিল সেগুলিও ভারতীয় লুন্ঠন থেকে রেহাই পায়নি। একাত্তরে বাংলাদেশের ভুমির উপর বাংলাদেশের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা হলে কি ভারতের হাতে কি এরূপ লুটপাট হতো? মুজিব সরকার সে লুন্ঠনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদও করেনি। প্রতিবাদ করতে গিয়ে চাকুরি হারিয়েছেন এবং কারাবন্দি হয়েছেন মেজর আব্দুল জলিল। অথচ এসব অস্ত্র ও মালামালের বৈধ মালিক ছিল বাংলাদেশ। পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক হিসাবে বাংলাদেশীরাই এসব অস্ত্র কিনতে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ অবধি রাজস্ব জুগিয়েছে। মাওলানা ভাষানী বলতেন, ভারত পাকিস্তান আর্মির ৯৩ হাজার কোটি টাকার অস্ত্র ভারতে নিয়ে যায়। বাংলাদেশীরা তাদের নিজ অর্থে কেনা অস্ত্র থেকে কোন হিস্যা না পেয়ে আবার শূণ্য থেকে শুরু করতে বাধ্য হয়। এভাবেই কোমড় ভেঙ্গে দেয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর। ভারতীয়দের কাছে এই ছিল সেদিন বাংলাদেশের স্বাধীনতার মর্যাদা ও মূল্যায়ন।  

 

গোলামীর দাসখত

বাংলাদেশের প্রতি আগ্রাসী ভারতীয়দের আচরণে নতুন কিছু ছিল না; নতুন মাত্রা পেয়েছিল মাত্র। আওয়ামী লীগের নেতাদের কাছে সেটি অজানাও ছিল না। মাদাসক্তগণ তাদের নেশার বস্তুটি পেতে ঘরের অমূল্য সম্পদও তুচ্ছ মূল্যে বিক্রয় করে। তেমন অবিকল অভিন্ন আচরণ কনর ক্ষমতালোভী রাজনৈতিক নেতাগণও। মীর জাফর তো সে লিপ্সাতেই দেশের স্বাধীনতা বেঁচেছিল। ভারতীয় লোলুপ দৃষ্টি ও ষড়যন্ত্রের কথা শেখ মুজিব ষাটের দশক থেকেই জানতেন। তাজউদ্দিনও জানতেন। এরপরও শেখ মুজিব আগরতলা ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত হয়েছিলেন। পাকিস্তানের আদালতে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তিনি সে অভিযোগকে মিথ্যা বললেও পরবর্তীতে সে ষড়যন্ত্রের সাথে সংশ্লিষ্টতা নিয়ে গর্ব করা হয়েছে। ভারতীয় স্বার্থের সেবাটি আওয়ামী লীগের কাছে কতটা গুরুত্ব পায় -সেটি ধরা পড়ে ভারতের সাথে অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের ৭ দফা দাস চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন। সে দফাগুলো ছিল নিম্নরূপঃ এক). ভারতীয় সমরবিদদের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশে আধা সামরিক বাহিনী গঠন করা হবে। গুরত্বের দিক হতে এবং অস্ত্রশস্ত্রে ও সংখ্যায় এই বাহিনী বাংলাদেশের মূল সামরিক বাহিনী হইততে বড় ও তাৎপর্যপূর্ণ হবে। (এ চুক্তির আলোকেই পরবর্তিতে গড়ে তোলা হয় রক্ষী বাহিনী। এবং ভারতীয় সে নিল নকশা অনুযায়ী মুজিবামলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্য কোন টাংক বা কামান কেনা হয়নি, সেনাবাহিনীকে মজবুত করার জন্য কোন ব্যবস্থাই নেয়া হয়নি। অথচ সে দূর্দিনে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছে রক্ষিবাহিনীকে শক্তিশালী করতে।) দুই). ভারত হতে সমরোপকরণ ক্রয় করতে হবে এবং ভারতীয় সমরবিদদের পরামর্শানুযায়ী তা করতে হবে। ৩). ভারতীয় পরামর্শেই বাংলাদেশের বহিঃবাণিজ্য কর্মসূচী নির্ধারণ করতে হবে। ৪). বাংলাদেশের বাৎসরিক ও পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ভারতীয় পরিকল্পনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। ৫). বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতির অনুরূপ হতে হবে। ৬). ভারত-বাংলাদেশ চুক্তিগুলি অনুযায়ী ভারত যে কোন সময় যে কোন সংখ্যায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারবে এবং বাধাদানকারী শক্তিকে চুরমার করে অগ্রসর হতে পারবে। -(সূত্রঃ অলি আহাদ, জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫-১৯৭৫, বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি লিঃ, ১২৫ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০)।

১৯৭১য়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনী যুদ্ধ কোন স্বাধীন ও শক্তিশালী বাংলাদেশ সৃষ্টির লক্ষে ছিল না। বরং এক্ষেত্রে ভারতের লক্ষ্য ছিল দ্বিমুখী। এক). ভারতের প্রধান শত্রু পাকিস্তানের বিনাশ। দুই). ভারতের আজ্ঞাবহ এক দুর্বল বাংলাদেশের সৃষ্টি। ভারতের পূর্ব সীমান্তে পাকিস্তানের ন্যায় আরেক শক্তিশালী স্বাধীন দেশ গড়ে উঠুক সেটি ভারতের কাম্য ছিল না। এটি ছিল ভারতের সূদুরপ্রসারি প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেটি যেমন ১৯৭১য়ের পূর্বে ছিল, তেমনি একাত্তরেও ছিল। আজও সেটিই তাদের নীতি। ভারত এক্ষেত্রে কোনরূপ গোপনীয়তা রক্ষার প্রয়োজনও অনুভব করেনি। কারণ কসাই যখন তার অবোধ ছাগলটির গলায় চাকু চালাতে টেনে নেয় তখন সে ধারালো চাকুটি লুকানোর প্রয়োজনীয়তা দেখে না। আওয়ামী লীগের নেতাদের নির্বু্দ্ধিতার কারণে ভারতের পক্ষ থেকে তাদের মূল্যায়নও এ থেকে ভিন্নতর ছিল না। আওয়ামী লীগ নেতাদের ভারত তাই নিজ অভিপ্রায় জানিয়ে দিতে কোন রূপ সংকোচ বা লজ্জাবোধ করিনি। ভারত সেটি জানিয়ে দিয়েছিল একাত্তরের যুদ্ধে তাদের নিজেদের অর্থ ও রক্ত বিণিয়োগের বহু আগেই। অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী জনাব তাজউদ্দিনের সাথে সাক্ষরিত ৭ দফা চুক্তিটি হল সেটিরই প্রমাণ। ভারতের অতি ভাগ্যবান যে, একাত্তরে তারা আওয়ামী লীগের নেতাদের ন্যায় মেরুদণ্ডহীন নতজানু ব্যক্তিদেরকে বাংলাদেশের প্রতিনিধি রূপে পেয়েছিল। বিশ্বের খুব কম দেশই এ সুযোগটি এত সহজে কেও পায়। কোন স্বাধীন দেশের স্বাধীনচেতা রাজনৈতিক নেতা কি এরূপ দাসখতে স্বাক্ষর দেয়? কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতারা সেটিতে শুধু স্বাক্ষর করেনি, তা নিয়ে উৎসবও করেছে। ভারত সরকারের কুটিল বুদ্ধিমত্তা হল, তারা সে সুযোগ থেকে পুরা ফায়দা তুলতে সামান্যতম ভূল যেমন করেনি, তেমনি দেরীও করেনি। তাজউদ্দিনের পর একই রূপ ফায়দা লুটেছে শেখ মুজিব থেকেও। তাজউদ্দিন আহম্মদ যে চুক্তিগুলো স্বাক্ষর করেছিলেন সেগুলোই সামান্য কিছু পরিমার্জিত করে শেখ মুজিব থেকে স্বাক্ষর করিয়ে নিয়েছিল ২৫ সালা চুক্তি। বাংলাদেশের ইতিহাসে সে কালো ঘটনাটি ঘটে ১৯৭২ সালের ১৯ই মার্চ ঢাকার বঙ্গভবনে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বাংলাদেশ সফর কালে। আওয়ামী লীগ এটিকে ঘটা করে সহযোগিতা ও শান্তিচুক্তি বলে আত্মপ্রসাদ জাহির করলেও সেদিনের সকল বিরোধী দল তাকে ‘দাসত্ব চুক্তি’ বলে আখ্যায়ীত করেছিল। শেখ মুজিব আগরতলায় ষড়যন্ত্র করেছিলেন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। আর বঙ্গভবনে বসে যে চুক্তিটি তিনি স্বাক্ষর করেছিলেন সেটি ছিল খোদ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে।

 

নতজানু নীতির ধারাবাহিকতা

শেখ মুজিবের মৃত্যু হয়েছে, কিন্তু তাঁর অনুসারিরা ভারতের প্রতি তার সে অনুসৃত নতজানু নীতিকে এখনও অনুকরণীয় আদর্শ মনে করে। ফলে ভারতকে নানা ছুতায় নিজ দেশে ডেকে আনার নেশাই আজও আওয়ামী লীগের দলীয় নীতি। যখনই নিজেদের সামর্থে কুলাবে না, ভারতকে তারা ডাক দিবে তেমনই একটি চুক্তি করেছিলেন শেখ মুজিব। শেখ হাসিনার নীতিও সেটাই। সেটিরই প্রমাণ মেলে উইকি লিক্স কর্তৃক প্রকাশিত একট্ গোপন তথ্য থেকে। উইকি লিক্স প্রকাশ করেছে, পিলখানায় সামরিক অফিসার হত্যার পর শেখ হাসিনা ভারতের হস্তক্ষেপের জন্য ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রী শ্রী প্রণব মুখার্জির কাছে অনুরোধ করেছিলেন। আর প্রণব মুখার্জি তাতে সম্মতিও জানিয়েছিলেন। কথা হল, পিল খানায় সামরিক অফিসার হত্যার বিষয়টি ছিল বাংলাদেশের সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ বিষয়। এনিয়ে ভারতীয় হস্তক্ষেপ আহবান করার যৌক্তিকতাটি কি? এতে কি দেশের মর্যাদা বাড়ে? হয় কি স্বাধীনতার হেফাজত? ভারতের প্রতি এমন এক নতজানু চরিত্রের কারণেই বাংলাদেশের মধ্য ট্রানজিট দিতে শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকারের আপত্তি হয় না। বাংলাদেশের পররাষ্টনীতির এ এক ভয়ংকর দিক। পিলখানায় সামরিক অফিসার হত্যার পর ভারতের সাবেক সেনা প্রধান জেনারেল শঙ্কর রায় চৌধুরী ২০০৯ সালের ২৪ মার্চ ভারতীয় পত্রিকা ‘এশিয়ান এজ’য়ে দেয়া সাক্ষাতকারটি াভএ ক্ষেত্রে স্মরণীয়। তিনি বলেছিলেন, “বাংলাদেশে খুবই সহজে এবং বার বার নয়াদিল্লীর ‘রাডার’ থেকে সরে যায়। পিলখানা হত্যাকাণ্ডার পর আর তা হতে দেয়া হবে না।” এব্যাপারে তিনি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকে হুশিয়ার করে বলেন, সরকারকে এ ব্যাপারে যথাযোগ্য ব্যবস্থা নিতে হবে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারতীয় আগ্রাসনের আশংকা যে কতটা তীব্র সেটি কি এর পরও বুঝতে বাঁকি থাকে?

বাংলাদেশ সৃষ্টির পর দেশটির পরারাষ্ট্রনীতি নিয়ন্ত্রন করত ভারত। বাংলাদেশ কোন দেশের সাথে বন্ধুত্ব করবে, কোন দেশের নেতা বাংলাদেশে সফরে আসবে এবং শেখ মুজিব কোথায় রাষ্ট্রীয় সফরে যাবেন সেটিও নির্ধারিত করতো ভারত। এ বিষয়টি অন্যদের কাছেও গোপন ছিল না। এজন্যই বাংলাদেশ সৃষ্টির সাথে সাথে স্বাধীন দেশ রূপে ভূটান ও ভারত স্বীকৃতি দিলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনসহ বহুদেশ স্বীকৃতি দেয়নি। স্বীকৃতি দেয়নি তুরস্ক, ইরান, সৌদিআরব, ইন্দোনেশিয়ার ন্যায় অধিকাংশ মুসলিম দেশও। ফলে দেরী হয় জাতিসংঘে ঢুকতেও। অথচ ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর তেমনটি ঘটেনি। প্রথম দিন থেকেই দেশটি একটি স্বাধীন দেশ রূপে বিশ্বের সকল মুসলিম ও অমুসলিম দেশের স্বীকৃতি পায়। সম্মানও পায়। জেলখানার বন্দীদশা থেকে বেরুলে যেমন জেলগেটে আপনজনেরা গলা জড়িয়ে মোবারকবাদ জানায়, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের ভাগ্যে সেটিই জুটেছিল। অথচ জেলে ঢুকলে সেটি জুটে না। শেখ মুজিবের বড় অপরাধ, বাংলাদেশকে তিনি ভারতের অধীনত এক গোলাম রাষ্ট্রে পরিণত করেছিলেন। ২৫ সালা চুক্তির নামে বাংলাদেশের গলায় গোলামীর সে শিকলটাই তিনি পড়িয়েছিলেন।    

 

পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো হলঃ এক). অন্য দেশের সাথে সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে নিজ দেশের স্বাধীনতার সুরক্ষাকে প্রাধান্য দেয়া; দুই). অন্য দেশের সাথে বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে গুরুত্ব দেয়া; তিন). চিহ্নিত শত্রুর সম্ভাব্য হামলা ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে অন্যান্য দেশকে সাথে নিয়ে মজবুত প্রতিরক্ষা গড়ে তোলা। এলক্ষ্যে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও বন্ধনকে ব্যবহার করা; চার).আঞ্চলিক শান্তির পাশাপাশি বিশ্বশান্তির পরিবেশ সৃষ্টি করা। পাঁচ). পরাধীন বা অধিকৃত দেশের মজলুল মানুষের স্বাধীনতার লড়য়ে সহযোগিতা করা। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর বাইরেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। বাংলাদেশের পরিচয় শুধু একটি স্বাধীন দেশ হিসাবে নয়। দেশটির বাড়তি কিছু বৈশিষ্ঠও রয়েছে, পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে যা অগ্রাহ্য হবার নয়। সেগুলো হলঃ ১). বাংলাদেশে একটি মুসলিম দেশ; জনসংখ্যা বিচারে মুসলিম বিশ্বে তার অবস্থান তৃতীয়; ২). বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ায়; এবং ৩). বাংলাদেশ এশিয়া মহাদেশের একটি দেশ।

ব্যক্তি যেমন তার নিজস্ব ব্যক্তিত্ব ও পরিচয়কে সাথে নিয়ে চলাফেরা করে, তেমনি রাষ্ট্রও। অন্যদেশের সাথে বন্ধুত্ব গড়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ তার এ পরিচয়কে অস্বীকার করতে পারে না। কিন্তু শুরু থেকেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতির বড় ব্যর্থতা হল, বাংলাদেশ সে পরিচয় নিয়ে বিশ্ব মাঝে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারিনি। মুজিব বাংলাদেশের বলিষ্ঠ মুসলিম পরিচয়টাকে লুকাতে চেয়েছিলেন। ব্যক্তির নামের মধ্য দিয়েই প্রকাশ পায় সে মুসলমান না অমুসলমান। তেমনি একটি দেশের শাসনতন্ত্রেও প্রকাশ পায় দেশবাসীর বিশ্বাস ও প্রায়োরিটি। ব্যক্তির বিশ্বাসগত ঈমানী পরিচয়টিই হল তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়। সেটি শুধু আল্লাহর দরবারেই নয়, বান্দার দরবারেও। শুধু বিয়ে-শাদীর বিষয়েই নয়, মেলামেশা, খানাপিনা, এমন কি একত্রে কাজ-কর্ম করার ক্ষেত্রেও। কোন হিন্দু এ পরিচয়টি না জেনে কাউকে বন্ধু রূপে গ্রহণ করা দূরে থাক, তাকে ঘরেই তুলবে না। তার সাথে একত্রে পানাহারও করবে না। বিদেশীরাও তাই সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে দেশের পরিচয়টি জানতে চায়। কোন দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যখন সমাজতন্ত্রি, কম্যুনিষ্ট, মুসলমান বা খৃষ্টান হয় তখন সেটি তারা শাসনতন্ত্রে বা আইনে লিপিবদ্ধ করতে ভূলে না। এটি লিখে বিশ্ববাসীর সামনে ঘোষণা দিয়ে দেয় সে কাদেরকে বন্ধু রূপে গ্রহন করতে প্রাধান্য দিবে। সোভিয়েত রাশিয়া, চীন, কিউবা, উত্তর কোরিয়ার মত দেশগুলো যেমন শাসনতন্ত্রে নিজেদের পরিচয় সমাজতন্ত্রি রূপে লেখেছে তেমনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার ডলারের নোটের উপর We trust in God লিখতে ভূলেনি। বিলেতে রয়েছে ব্লাসফেমী আইন যা যীশু খৃষ্ট ও বাইবেলে বর্নিত গডের প্রোটেকশন দেয়। জাতীয় পতাকায় তারা ক্রস চিহ্নকে রেখেছে। এবং ভারত তুলে ধরেছে অশোকার ত্রিশুল মুর্তিকে। একই কারণে পাকিস্তান তার জন্ম থেকেই তার নামের সাথে ইসলামি প্রজাতন্ত্র লিখে আসছে। এভাবে প্রতিটি দেশের নেতারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশবাসীর প্রবল বিশ্বাস ও চেতনার বিষয়টি বিশ্ববাসীর সামনে নানা ভাবে তুলে ধরেন।

শেখ মুজিব লুকাতে পারেননি ইসলামের সাথে তার গাদ্দারি। তিনি বাংলাদেশের শাসনতন্ত্রে দেশবাসীর মূল পরিচয়কেই বিকৃত করেছেন। মুসলিম রাষ্ট্র রূপে তুলে ধরাকে তিনি সাম্প্রদায়ীক গণ্য করেছেন, বরং ললাটে এঁটে দিয়েছেন তাঁর মনগড়া সেক্যুলারিজম, সমাজতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের লেবেল। অথচ এগুলোর উপর ঈমান আনাই ইসলামে হারাম। ইসলামের প্রতি অঙ্গিকারহীনতার কারণে ভারতের সাথে যতটা একাত্ম হতে পেরেছেন তেমনটি মুসলিম বিশ্বের সাথে পারেননি। তাই ১৯৭৪ সালে যখন সকল মুসলিম দেশের রাষ্ট্র প্রধানদের সম্মেলন লাহোরে অনুষ্ঠিত হয় তখন সেখানে যেতেও প্রথমতঃ গরিমসি করেছেন, অবশেষে গেছেন অনেকটা অনাগ্রহ নিয়েই। তাকে নিতে জনা্ব ভূট্টোকে আসতে হয়েছিল। নীতির ক্ষেত্রে তার মেরুদণ্ডহীনতাও ছিল প্রকট। তাই যখন যেমন হাওয়া বইছে তখন তিনি সে হাওয়ায় শিকড়হীন লতাপাতার ন্যায় ভেসেছেন। তাই চল্লিশের দশকে তিনে ভেসে গেছেছেন মুসলিম লীগের পাকিস্তান আন্দোলনের সাথে। ষাটের দশকে এসে ভেসেছেন ভারতীয় কংগ্রেসের দর্শনে। আবার সত্তরের দশকে এসে রাশিয়ান ধারার সমাজতান্ত্রিক হওয়ার চেষ্টা করেছেন। আর এতে জগাখিচুড়ি বেঁধেছে পররাষ্ট্রনীতিতে। আন্তর্জাতিক মহলে তিনি কোন বলিষ্ঠ ও স্বকীয় ব্যক্তিত্ব নিয়ে হাজির হতে পারেননি।    

 

ভারতের কু-মতলব ও স্বাধীনতার ব্যয়ভার

স্বাধীন ভাবে বাঁচবার অধিকার প্রতিটি দেশের নাগরিকেরই ন্যূনতম অধিকার। এখানে কোন আপোষ চলে না। পররাষ্ট্রনীতির এটি প্রধানতম বিষয়। এ অধিকার যেমন ভারতের রয়েছে, তেমনি পাকিস্তান, শ্রীলংকা, নেপাল এবং বাংলাদেশেরও রয়েছে। বাংলাদেশকে স্বাধীন দেশ রূপ মেনে নিলে এ অধিকারও বাংলাদেশকে ষোল আনা দিতে হবে। নিজের নিরাপত্তা মজবুত করতে যে কোন দেশের বন্ধু খোঁজারও পূর্ণ অধিকার রয়েছে। এটি অধিকারটি স্বাধীনতার সাথে জড়িত। সে বন্ধু দেশটি বিশ্বের যে কোন দেশই হোক, ভারতের তাতে নারাজ হওয়ার কিছু নেই। বাংলাদেশ মিজাইল বা যুদ্ধবিমান কিনলে ভারতের নাখোশ হবার কিছু নেই। নাখোশ হলে বুঝতে হবে বাংলাদেশকে নিয়ে ভারতের কু-মতলব রয়েছে। মতলব রয়েছে অভ্যন্তরীন বিষয়ে হস্তক্ষেপের। অথচ ভারত বাংলাদেশের সে অধিকার দিতে রাজী নয়। তাই মুখ ভার করে বসে বাংলাদেশ যুদ্ধ বিমান ও যুদ্ধ জাহাজ কিনলে। তাই এরশাদ আমলে বাংলাদেশ যখন চীন থেকে কয়েক খানি বিমান কেনেছিল তখন না নিয়ে ভারতে অসন্তোষের ঝড় উঠেছিল।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, প্রতিবেশীর মুখের দিকে চেয়ে নীতি নির্ধারণ করলে তাতে স্বাধীনতা বাঁচে না। স্বাধীনতার শর্ত, এখানে অধীনতা নিজের, বিদেশীদের নয়। তাই প্রতিবেশীর আচরণ কি হবে, তা নিযে কোন স্বাধীন দেশের সরকার বসে থাকে না। ঘর গড়তে হলে সে ঘরে যেমন ছাদ দিতে হয় তেমনি মজবুত বেড়া এবং দেয়ালও দিতে হয়। নইলে নিরাপত্তা মেলে না। ইজ্জতও বাঁচে না। পানাহারে আপোষ চললেও ঘরের বেড়া ও দেয়াল গড়ায় কেউ কি তাই আপোষ করে? বরং কে কতটা ইজ্জত-সচেতন তা তো ধরা পড়ে তার ঘরের বেড়া ও দেয়াল দেখে। তেমনি প্রতিরক্ষা বাহিনীর ক্ষেত্রেও। এ জন্যই প্রতিটি দেশকে তার প্রতিরক্ষাকে মজবুত করতে হয়। মানুষের সবচেয়ে বড় ব্যয় হয় তার নিজের ও পরিবারের ইজ্জত বাঁচাতে। এজন্য তাকে শুধু অর্থ নয়, প্রাণও দিতে হয়। এটিই ইজ্জত নিয়ে বাঁচার ব্যয়ভার। যার মধ্যে সে ব্যায়ভার বহনের ইচ্ছা নেই, বা সামর্থ্য নেই -এ সমাজে তার ইজ্জতও নেই। সেটি স্বাধীনতার প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রেও। বিদেশের বাজারে শুধু বস্ত্র, মাছ ও মানব রপ্তানী করে কি ইজ্জত বাড়ানো যায়? বিভিন্ন জাতি লাখে লাখে প্রাণ দেয়, হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যয়ে মজবুত বাহিনী গড়ে তোলে তো সে কারণেই। প্রতিরক্ষার সে সামর্থ্য না থাকলে সেদেশের স্বাধীনতাও সংকুচিত না হয়ে পারে না। অথচ ভারতের প্রতি নতজানু আওয়ামী লীগ নেতাদের রাজনীতিতে সে ভাবনা নেই। তাদের কথা, ভারত বিশাল দেশ। ভারতের সাথে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষার সামর্থ্য নেই। ফলে তাদের কাছে প্রতিরক্ষায় অর্থব্যয় হল অর্থের অপচয়। খাঁচার পাখি যেমন খাঁচার বাইরে যাওয়ার কথা ভাবতে পারে না, তেমনি এরাও ভাবতে পারে না ভারতীয় আধিপত্যবাদ-মূক্ত আজাদ জীবনের। এখন তারা ব্যস্ত স্বাধীনতার সংজ্ঞা পাল্টাতে, খাঁচার পরাধীন জীবনকেই তারা স্বাধীনতা বলে সংজ্ঞায়ীত করছে। এবং তা নিয়ে উৎসবও করছে। অথচ বাংলাদেশ ভিয়েতনামের চেয়ে যেমন দুর্বল নয়, আর ভারতও মার্কিন যুক্তরাষ্টের চেয়ে শক্তিশালী নয়। কিন্তু সে সত্যটিও নতজানু ভারতসেবীরা ভূলিয়ে দিচ্ছে।  

 

তলাহীন ঝুড়ি ও অরক্ষিত স্বাধীনতা

অনেক সময় দুর্বল ও ব্যর্থ পররাষ্ট্রনীতি থেকে জন্ম নেয় পরাধীনতা। আবার সফল পররাষ্ট্রনীতি বহু ক্ষুদ্র দেশেও স্বাধীনতার আনন্দ বয়ে আনে। সুইজারল্যান্ড ভৌগলিক ভাবে ক্ষুদ্র। সামরিক দিক দিয়েও দুর্বল। কিন্তু প্রতিবেশী দেশগুলির প্রবল সামরিক শক্তির মাঝেও দেশটি স্বাধীনতা বজায় রাখতে পেরেছে। এবং সেটি তার সফল পররাষ্ট্রনীতির কারণে। বাংলাদেশ সুইজারল্যান্ডের চেয়ে দুর্বল নয়। স্থলভূমি দ্বারা ঘেরাও নয়। জনশক্তিতে বিশাল, রয়েছে প্রায় ১৬ কোটি মানুষের বিশাল অর্থনৈতিক বাজার। কিন্তু যেটি নাই সেটি হল সফল প্রতিরক্ষানীতির সাথে শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতি। শেখ মুজিব যে শিকল বাংলাদেশের গলায় পড়িয়েছেন সেটি থেকে এখনও বেরিয়ে আসা সম্ভব হয়নি। সফল পররাষ্ট্রনীতি গড়তে হলে প্রতিবেশী দেশের পররাষ্ট্রনীতি বুঝতে হয়। যেখানে বাঘ বা ডাকাতের বাস সেখানে ঘর বাঁধতে হলে বাড়তি সতর্কতা চাই। বেদীনীদের ন্যায় ঝুপড়ি বাঁধলে সেখানে নিরাপত্তা মেলে না। আর ঘর বাঁধার প্রবল বাসনা থাকলে সরঞ্জামের অভাব হয় না। এজন্য নিয়েতটি জরুরী। অথচ বাংলাদেশের ভারতপন্থিরা দেশবাসীকে প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে নিয়তশূণ্য করে ফেলেছে। পাকিস্তান তার বিপদটি ১৯৪৭ সালে তার জন্ম থেকে বুঝেছিল বলেই আজ পারমাণবিক শক্তি। অথচ শেখ মুজিব ও তার সহচরগণ প্রতিবেশী ভারতের ব্যাপারে মূল্যায়নেই ব্যর্থ হয়েছেন। বাংলাদেশ যে বাঘের পল্লিতে বাস করে সেটি তিনি বুঝতেও ভুলে গেছেন। এ বাঘের পেটে সিকিম গেছে। কাশ্মির গেছে। হায়দারাবাদ এবং মানভাদরও গেছে। বাংলাদেশও যায় যায়। এটি তিনি বুঝতেই পারেননি। বরং মুজিব ছিলেন অন্য জগতে। ভারতীয় নেতাগণ বাংলাদেশে নিষ্ঠুর লুন্ঠন করলে কি হবে, মুজিবের কাছে তারা মহা-মানব রূপেই গণ্য হয়েছে। ফলে সীমান্তকে সুরক্ষিত করার বদলে তিনি সেটিকে উদার ভাবে খুলে দিয়েছেন। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত হতে বিশ মাইলের মধ্যে অবস্থিত এলাকায় অবাধ বাণিজ্য প্রচলনের মানসে ১৯৭২ সালের ২৭শে মার্চ তিনি একটি চুক্তি সম্পাদন করেন। এ চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের সীমান্ত জুড়ে প্রতিষ্ঠিত হয় ভারতীয় বাজার। পাত্রের তলা যেমন সে পাত্রে পানি ধরে রাখে, সীমান্তও তেমনি দেশের সম্পদ ধরে রাখে। আর এ চুক্তির মাধ্যমে শেখ মুজিব বাংলাদেশের তলাটিই ধ্বসিয়ে দেন। ফলে দেশীয় সম্পদ, এমন কি বিদেশীদের দেয়া বহু হাজার কোটি টাকার রিফিলের মালও তখন আর দেশে থাকেনি। বরং ত্বরিৎ বেগে পৌঁছে গেছে ভারতের বাজারে। যে ভিক্ষুকের পাত্রে তলা থাকে না তাকে অন্যরা ভিক্ষা দিতেও অনিহী দেখায়। কারণ, দাতার ভয় দানের টাকাটিও ড্রেনে গিয়ে পড়বে। মুজিব আমলে তাই অনীহা জেগেছিল বহু দাতা দেশের মনেও। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী হেনরী কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে তলাহীন ভিক্ষার ঝুলি রূপে অভিহিত করেছিলেন তো সে ক্ষোভ নিয়েই।

পররাষ্ট্রনীতিকে দেশের অর্থনীতি থেকে পৃথক করা যায় না। দেশের বাণিজ্য বাড়াতে তথা অর্থনীতি মজবুত করার লক্ষ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রীরা তাই দেশে দেশে ঘুরেন। বাংলাদেশের ন্যায় একটি দরিদ্র দেশে প্রাক্তন মার্কিন প্রেসেডেন্ট বিল ক্লিন্টন এসেছেন মার্কিন কোম্পানীর জন্য বাজার খুঁজতে। কিন্তু বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতি এক্ষেত্রেও চরম ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। বিদেশে দূতাবাসের সংখ্যা বাড়লেও বাজার বাড়েনি। বরং হারিয়েছে প্রচুর। ব্যর্থ পররাষ্ট্র নীতির কারণে পাটজাত পণ্যের প্রতিষ্ঠিত বাজার হারিয়েছে সেই সত্তরের দশকেই। পাকিস্তান আমলে বহু কষ্টে গড়া সে বাজার সহজেই দখল করে নিছে ভারত। তারই ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশে বহু পাটকল বন্ধ হয়ে গেছে। বিশ্বের সর্ববৃহৎ পাটকল আদমজী জুটমিলকেও সে মড়ক থেকে বাঁচানো যায়নি। অথচ সফল পররাষ্ট্রনীতির কারণে বাণিজ্য বেড়েছে ভারতের। সেদেশের মৃত পাটকলগুলো নবজীবন পেয়েছে। আর চা শিল্পের দশা? আজ বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে এক চা আমদানিকারক দেশে!

 

বিনাযুদ্ধে বেরবাড়ী

শত্রুমিত্র চিনতে শেখ মুজিবের নিজের ব্যর্থতা যে কতটা প্রকট ছিল তার একটা উদাহরণ দেয়া যাক। তিনি বাংলাদেশের ক্যারেন্সী নোট ছাপানোর দায়িত্ব দেন ভারত সরকারের উপর। যে পরিমান নোট ছাপতে দিয়েছিল তার চেয়ে বহু শত কোটি টাকার বেশী নোট ছেপে ভারত তা কালো বাজারীদের হাতে ছাড়ে। আর তা দিয়ে বাংলাদেশে যা কিছু মূল্যবান সম্পদ পাকিস্তানের ২৩ বছরে আনা হয়েছিল সে সম্পদও পানির দামে কিনে ভারতে নিয়ে যায়। পাচার হয়ে যায় বিপুল পরিমাণ খাদ্য সম্পদও। পাকিস্তান আমলে টাকার দাম ভারতীয় রূপীর চেয়ে শক্তিশালী ছিল। কিন্তু কালো টাকার প্রকোপে সেটি ভারতীয় রূপীর অর্ধেকে নেমে আসে। ভারতীয় লুন্ঠনের ফলেই শুরু হয় ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ, বহু লক্ষ লোক তাতে না খেয়ে মারা যায়। বস্ত্রের অভাবে মহিলারা সে সময় ঝাল পড়তেও বাধ্য হয়েছিল। এই হল একটি দেশের ব্যর্থ পররাষ্ট্র নীতির ভয়াবহ পরিনতি যা শুধু বিশ্বজুড়া অপমানই অর্জন করেনি, দেশবাসীকে নিদারুন দারিদ্র্য এবং মৃত্যুও উপহার দিয়েছে। ভারত মুখে যাই বলুক, বাংলাদেশের অর্থনীতি ধ্বংস করতে দেশটি যে কতটা বদ্ধপরিকর সে প্রমাণ কম? এমনকি ভারতীয় জেনারেল ম্যানেক শ ভারতের এরূপ লুণ্ঠন-নীতির কঠোর ভাষায় নিন্দা করেছেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের দৃষ্টিতে সে লুন্ঠন ধরা পড়েনি। নিজ দেশে এমন একটি নতজানু অভ্যন্তরীণ শক্তি থাকতে শত্রু-দেশকে কি দেশ-দখল, বাজার-দখল, মিডিয়া-দখলে একটি বুলেট ছুড়ারও প্রয়োজন পড়ে। তাই একটি গুলি না ছুড়েই ছিনিয়ে নিয়েছে বাংলাদেশে অবিচ্চেদ্য অঙ্গ বেরবাড়ী। ১৯৭৪ সালে শেখ মুজিব নিজে দিল্লি গিয়ে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর পদযুগলে সে ভূমি অর্পন করে এসেছিলেন। আর শেখ মুজিব কণ্যা শেখ হাসিনার নীতি? শেখ মুজিব তবুও ট্রানজিট দেননি, কিন্তু তিনি সেটিও দিয়ে দিয়েছেন। শেখ মুজিব ভারতীয় পণ্যের জন্য সীমান্ত থেকে ২০ মাইল এলাকা ছেড়ে দিয়েছিলেন, আর শেখ হাসিনা পুরা দেশই দিয়েছেন।  

 

ব্যর্থ পররাষ্ট্রনীতি ও বন্ধুহীন বাংলাদেশ

আধুনিক কালে কোন দেশে দূর্ভিক্ষে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যাওয়ার বিষয়টি খুবই অস্বাভাবিক। নেহায়েত জন-মানব শূণ্য মরুভূমি বা বনেজঙ্গলে বাস না করলে কেউ সাধারণত না খেয়ে মারা যায় না। এমন কি কুকুর বিড়ালও নয়। মানব সমাজে সব সময়ই কিছু বিবেকমান মানুষ থাক। মারা যাওয়ার আগেই তাই প্রতিবেশী বন্ধুজনেরা খাদ্য নিয়ে হাজির হয়। সভ্য মানব সমাজের এটিই রীতি। যখন না খেয়ে মানুষ মারা যায়, তখন বুঝতে হবে সমাজে সে পরিবারের আপন লোক বলে কেউ নাই। থাকলেও যিনি পরিবারের প্রধান তিনি আপনজনদের কাছে পরিবারের দূরাবস্থার কথা সঠিক ভাবে পৌঁছাতে পারেননি। তাই যে দেশে দুর্ভিক্ষে মানুষ মারা যায়, বুঝতে হবে সেদেশের মানুষের উপর নিশ্চয়ই কোন দায়িত্বহীন, মায়ামমতাহীন কোন অযোগ্য, নিষ্ঠুর ও দূর্নীতিপরায়ন শাসক চেপে বসেছে। দুনিয়ার যত দেশেই যত দুর্ভিক্ষ হয়েছে তার মূল কারণ খাদ্যাভাব ততটা ছিল না, যতটা ছিল সরকারের ব্যর্থতা। বাংলাদেশে মুজিবামলে সেটাই হয়েছিল। অথচ বাংলাদেশে যখন ভয়াবহ দূর্ভীক্ষ, মধ্যপ্রাচ্যে তখন অভূতপূর্ব প্রাচুর্য্য। ১৯৭৩ সালের আরব- ইসরাইল যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব ইসরাইলের পক্ষ নেয়। এর প্রতিবাদে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি তেলের দাম ১০ ডলার থেকে ৪০ ডলারে নিয়ে যায়। ফলে সেখানে শুরু হয় অর্থের সয়লাব। সৃষ্টি হয়, লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থা নের সুযোগ। লক্ষ লক্ষ পাকিস্তানী, ভারতী, শ্রীলংকান, মিশরী, সূদানী, এমনকি ফিলিপাইনীরাও সে শ্রম বাজার থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা উপার্জন করেছে। কিন্তু বাংলাদেশীরা সেখানে যেতে পারিনি। বাংলাদেশী যাবে কি করে, তাদের জন্য তখনও সেসব দেশের দরজাই খোলা হয়নি। কারণ তখনও সৌদিআরব, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, আরব আমিরাত ও ওমানের মত দেশগুলা বাংলাদেশকে স্বাধীন দেশরূপে স্বীকৃতিই দেয়নি। বাংলাদেশ তখনও মুজিবের নেতৃত্বে ভারতের কোলে বসা। মুজিবের কন্ঠে তখন ভারত-বন্দনার কীর্তন। এবং মুখে সমাজতন্ত্রের বুলি। অথচ সমাজতন্ত্র বা কম্যিউনিজমকে তখন মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলির রক্ষণশীল জনগণ মুর্তিপুজার ন্যায়ই ঘৃনা করে। মুজিবের এরূপ ভারত-বন্দনা দেখে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো তখনও বাংলাদেশকে স্বাধীন দেশ রূপে ভাবতেও সংশয়ে পড়তো। ফলে বাংলাদেশের নাগরিকগণ শুধু চাকরির সুযোগ থেকেই বঞ্চিত হয়নি, বঞ্চিত হয়েছে দুর্ভিক্ষ কালে মুসলিম দেশের অর্থনৈতিক সাহায্য থেকেও। অথচ ঠিক সে সময়ই যুদ্ধ বিধ্বস্ত পাকিস্তান একটি প্রকাণ্ড যুদ্ধের পরও অতি দ্রুত সমৃদ্ধির দিকে এগুয়। তাদের মাথা পিছু আয় দ্রুত ভারতের দেড়গুণ হয়ে যায়। জনশক্তি রপ্তানীর মাধ্যমে পাকিস্তান সরকার সে সময় এত বিপুল পরিমান বিদেশী মূদ্রা অর্জন করে যে, গোপন পারমাণবিক প্রকল্প নিয়ে সামনে এগুণোর কাজ তখনই সেদেশে বেগবান হয়। দেশটি নতুন ভাবে গড়ে তোলে তার সামরিক বাহিনী। পাকিস্তানের শহর ও গ্রামগুলোতে দ্রুত বাড়তে থাকে আধুনিক ঘরবাড়ী। অথচ আর বাংলাদেশের মানুষ তখন মরছে না খেয়ে। লজ্জা নিবারণে পড়ছে মাছধরা জাল। যে দেশের নেতার ইসলামী দেশ রূপে পরিচয় দিতেই অনীহা, সেদেশটি মুসলিম দেশে থেকে স্বীকৃতি বা সহানুভুতিই বা পায় কেমনে? বাংলাদেশেীরা বস্তুত মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে ঢুকার সুযোগ পায় শেখ মুজিবের মৃত্যুর পর। দেরীতে যাওয়ার ফলে ভাল বেতনের চাকুরিতে ঢুকাও তাদের জন্য তখন অসম্ভব হয়ে পড়ে, সেগুলো ইতিমধ্যেই পাকিস্তানী, মিশরী ও ভারতীয়দের কাছে হাতছাড়া হয়ে যায়। তাই শেখ মুজিবের সরকার যে শুধু স্বরাষ্ট্র, শিল্প, শিক্ষা, কৃষি ও বাণিজ্য ক্ষেত্রে ব্যর্থতা উপহার দিয়েছে তা নয়, উপহার দিয়েছে অতি ব্যর্থ পররাষ্ট্র নীতিও। সে ব্যর্থতাগুলোই বাড়িয়েছে যেমন দারিদ্র্য, তেমনি বিশ্বজুড়া অপমান।

 

ইতিহাস বিকৃতির অপরাধ এবং একই গর্তে বার বার

অথচ আজ বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতা থেকে ব্যর্থতার সে বিষয়গুলোই অতি ক্ষিপ্রতার সাথে লুকানো হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। অথচ একটি দেশের জনগণ সবচেয়ে বড় শিক্ষাটি পায় তার ব্যর্থতা থেকে। আগুণে হাত দেওয়ার পর সে বেদনাটি শিশুও বুঝে। সেটি এক চরম অভিজ্ঞতা। এ অভিজ্ঞতার কারণই শিশু আর কখনও আগুণে হাতে দেয় না। শত শত বই পড়েও সে অভিজ্ঞতাটি মেলে না। বাংলাদেশের ব্যর্থতার ইতিহাস থেকেও শিখবার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও তেমনি অনেক। সে বাস্তব বিষয়গুলো বিশ্বের কোন সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ও ক্লাস রুমে শেখাতে অসমর্থ। কারণ সে ব্যাপারে পূর্ব-অভিজ্ঞতা সেখানকার শিক্ষকদেরও নাই। একারণে বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ বরং বাংলাদেশের মত দেশের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিতে ব্যস্ত। যুগ যুগ ধরে বহু পিএইচডি থিসিস লেখা হবে এ নিয়ে। তাদের গবেষণার বিষয়, শায়েস্তা খানের বাংলাদেশ কীভাবে তলাহীন ভিক্ষা ঝুলিতে পরিণত হল? কীভাবেই বা দূর্নীতে বিশ্বে ৫ বার প্রথম স্থান অধিকার করলো? কেনই বা দেশটিতে ১৯৭৪য়ে ভয়ানক দুর্ভিক্ষ নেমে এল? এমন ধরণের গবেষণা করেই তো অর্মত্য সেন নবেল প্রাইজ পেলেন।

আওয়ামী লীগের অপরাধ অনেক। তবে দলটির অন্যতম বড় অপরাধ হল, অতীতের ব্যর্থতাগুলো থেকে শিক্ষা নেয়া থেকে দেশবাসীকে তারা বঞ্চিত করছে। আর সেটি লাগাতর ইতিহাস বিকৃতির মাধ্যমে। নিজেদের কদর্য ইমেজ ঢাকতে তারা নিজেদের ব্যর্থতাগুলোকে গৌরবময় করেছে। খুনী যেমন প্রাণ বাঁচাতে লাশকে গোপন করে, এরাও তেমনি ১৯৭১য়ের ৭ দফা চুক্তি, ১৯৭২য়ের ২৫ সালা দাসচুক্তি, ১৯৭৪ য়ের দুর্ভিক্ষ, ১৯৭৫ য়ের বাকশাল ও গণতন্ত্র হত্যা, সংবিধানের ৪র্থ সংশোধনী, চল্লিশ হাজার বিরোধীদলীয় কর্মী হ্ত্যা, ভারতের হাতে বেরুবাড়ি তুলে দেয়া –এরূপ জঘন্য অপরাধগুলোকেও দাফন করতে চায়। বহুলাংশে সে কাজে তারা সফলও হয়েছে। ফলে যে ব্যর্থতার করুন ইতিহাস বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মকে ভবিষ্যতে আলোর পথ দেখাতে পারতো সেটিও আজ অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে দেশবাসীর পা একই গর্তে বার বার পড়ছে। ভয়ানক অপরাধী ও অতি অযোগ্য মানুষেরা বার বার চেপে বসছে। ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের ভোট ডাকাতির মাধ্যমে প্রমাণিত হলো দেশ কতটা অপরাধীদের হাতে অধিকৃত। এ অধিকৃতির কারণেই দেশ ছুটে চলেছে দ্রুত বিপর্যয়ের দিকে। একটি দেশের জন্য এর চেয়ে ভয়ংকর বিপদের কারণ আর কি হতে পারে? প্রথম সংস্করণ ১৯/০৬/১১; দ্বিতীয় সংস্করণ ২৭/০৩/২০১৯




অরক্ষিত বাংলাদেশ ও অর্জিত পরাধীনতা

অর্জিত পরাধীনতা

একাত্তরের পর বাংলাদেশের ভূমি, সম্পদ ও জনগণ যে কতটা অরক্ষিত সেটি বুঝতে কি প্রমানের প্রয়োজন আছে? ২৩ বছরের পাকিস্তান আমলে যে দাবীগুলো ভারতীয় নেতাগণ মুখে আনতে সাহস পায়নি সেগুলি এখন মুজিবামলে আদায় করে ছাড়ছে। পাকিস্তান আমলে তারা বেরুবাড়ির দাবী করেনি, কিন্তু একাত্তরে শুধু দাবিই করেনি, ছিনিয়েও নিয়েছে। এবং সেটি মুজিবের হাত দিয়ে। প্রতিদানে কথা ছিল তিন বিঘা করিডোর বাংলাদেশকে দিবে। কিন্তু সেটি দিতে ৪০ বছরের বেশীকাল যাবত টালবাহানা করেছে। টালবাহানা করেছে আঙরপোতা, দহগ্রামের ন্যায় বহু বাংলাদেশী ছিটমহল দিতে। ভারত সেগুলিতে যাওয়ার করিডোর দিতে গড়িমসি করলে কি হবে, এখন বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে করিডোর আদায় করে নিল। সেটি নিল প্রতিবেশীর প্রতি পারস্পরিক সহযোগিতার দোহাই দিয়ে। অথচ এমন সহযোগিতা কোন কালেই ভারত প্রতিবেশীকে দেয়নি। ষাটের দশকে পাকিস্তান সরকার তার পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের সাথে যোগাযোগের স্বার্থে করিডোর চেয়েছিল। সেটিকে তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী জওয়ারলাল নেহেরু একটি অদ্ভুদ দেশের অদ্ভুত আব্দার বলে মস্করা করেছিলেন। বলেছিলেন, ভারতের নিরাপত্তার প্রতি এমন ট্রানজিট হবে মারাত্মক হুমকি। শুধু তাই নয়, একাত্তরে ভারতীয় ভূমির উপর দিয়ে তৎকালীন পাকিস্তানের পিআইয়ের বেসামরিক বাণিজ্য বিমান উড়তে দেয়নি। এমন কি শ্রীলংকার উপর চাপ দিয়েছিল যাতে পাকিস্তানী বেসামরিক বিমানকে কোন জ্বালানী তেল না দেয়। বাংলাদেশের সাথেই কি আচরন ভিন্নতর? একাত্তরের যুদ্ধে চট্টগ্রাম বন্দরে কয়েকটি জাহাজ ডুবিয়ে দেয়া হয়। ফলে গুরুতর ব্যাঘাত ঘটছিল বন্দরে মালামাল বোঝাই ও উত্তোলনের কাজে। এতে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি প্রচন্ড ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। দেশে তখন দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি। ছিল নিতান্তই দুঃসময়। বাংলাদেশের জন্য চট্রগ্রাম বন্দরটিই ছিল মূল বন্দর। এমন দুঃসময়ে অন্য কেউ নয়, ভারতের অতি বন্ধুভাজন শেখ মুজিব অনুমতি চেয়েছিলেন অন্ততঃ ৬ মাসের জন্য কোলকাতার বন্দর ব্যবহারের। তখন ভারত সরকার জবাবে বলেছিল ৬ মাস কেন ৬ ঘন্টার জন্যও বাংলাদেশকে এ সুবিধা দেয়া যাবে না। এটিকেও নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করেছিল। প্রতিবেশী সুলভ সহযোগিতার বুলি তখন নর্দমায় স্থান পেয়েছিল। এমনকি শেখ মুজিবকেও ভারত আজ্ঞাবহ এক সেবাদাস ভৃত্যের চেয়ে বেশী কিছু ভাবেনি। ভৃত্যকে দিয়ে ইচ্ছামত কাজ করিয়ে নেওয়া যায়, কিন্তু তার আব্দারও কি মেনে নেওয়া যায়? এসবই একাত্তরের অর্জন।

প্রতিবেশীর প্রতি ভারতের এরূপ বৈরী আচরন নিত্যদিনের। প্রতিবেশী নেপাল ও ভূটানের সাথে বাণিজ্য চলাচল সহজতর করার জন্য ১৭ কিলোমিটারের ট্রানজিট চেয়েছিল বাংলাদেশ। নেপাল চেয়েছিল মংলা বন্দর ব্যবহারের লক্ষ্যে ভারতের উপর দিয়ে মালবাহি ট্রাক চলাচলের ট্রানজিট। ভারত সে দাবি মানেনি। অথচ সে ভারতই নিল বাংলাদেশের উপর দিয়ে প্রায় ছয় শত মাইলের করিডোর। ফলে বুঝতে কি বাঁকি থাকে, পারস্পারিক সহযোগিতা বলতে ভারত যেটি বুঝে সেটি হলো যে কোন প্রকারে নিজের সুবিধা আদায়। প্রতিবেশীর সুবিধাদান নয়। কথা হলো, বাংলাদেশের জন্য ১৭ কিলোমিটারের ট্রানজিট যদি ভারতের জন্য নিরাপত্তা-সংকট সৃষ্টি করে তবে সে যুক্তি তো বাংলাদেশের জন্যও খাটে। তাছাড়া বাংলাদেশের নিরাপত্তার বিরুদ্ধে ভারতের সৃষ্ট ষড়যন্ত্র নতুন নয়। ১৯৭৫ সালে মুজিব নিহত হওয়ার পর কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্ব অনেক আওয়ামী লীগ ক্যাডার ভারতে আশ্রয় নেয়। বাংলাদেশের সীমান্তে তারা সন্ত্রাসী হামলাও শুরু করে। তাদের হামলায় বহু বাংলাদেশী নিরীহ নাগরিক নিহতও হয়। ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থাগুলি তাদেরকে যে শুধু অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়েছে তাই নয়, নিজ ভূমিকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ব্যবহারেরও পূর্ণ সুযোগ দিয়েছে। আওয়ামী লীগের টিকেট পিরোজপুর থেকে দুই-দুইবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য চিত্তরঞ্জন সুতার ভারতে গিয়ে স্বাধীন বঙ্গভূমি আন্দোলন গড়ে তুলেছে সত্তরের দশক থেকেই। ভারত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত এসব সন্ত্রাসীদের বাংলাদেশের হাতে তুলে দেয়া দূরে থাক তাদেরকে নিজভূমি ব্যবহারের পূর্ণ সুযোগ দিয়েছে। এসব কি প্রতিবেশী-সুলভ আচরণ? অথচ সে ভারতই দাবি তুলেছে আসামের উলফা নেতাদের ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার। হাসিনা সরকার তাদেরকে ভারতের হাতে তুলেও দিচ্ছে। অথচ কাদের সিদ্দিকী ও চিত্তরঞ্জন সুতারের ন্যায় উলফা নেতাদের ভাগ্যে বাংলাদেশের মাটিতে জামাই আদর জুটেনি। ঘাঁটি নির্মান, সামরিক প্রশিক্ষণ ও বাংলাদেশের ভূমি থেকে প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে হামলা পরিচালনার সুযোগও জুটেনি। বরং জুটেছে জেল।

 

ষড়যন্ত্র ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার

বাংলাদেশের উপর দিয়ে ভারতের করিডোর যে কতটা আত্মঘাতি এবং কিভাবে সেটি বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিনত করবে সে বিষয়টিও ভাববার বিষয়। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব সীমান্ত জুড়ে মেঘালয়, আসাম, ত্রিপুরা, অরুনাচল, মনিপুর, নাগাল্যান্ড ও মিজোরাম -ভারতের এ সাতটি প্রদেশ। এ রাজ্যগুলির জন্য এমন কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট রয়েছে যা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এক). সমগ্র এলাকার আয়তন বাংলাদেশের চেয়েও বৃহৎ অথচ অতি জনবিরল। দুই) সমগ্র এলাকাটিতে হিন্দুরা সংখ্যালঘিষ্ট। ফলে হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ নিয়ে সমগ্র উপমহদেশে যে রাজনৈতিক সংঘাত ও উত্তাপ এ এলাকায় সেটি নেই। ফলে এখানে বাংলাদেশ পেতে পারে বন্ধুসুলভ প্রতিবেশী যা তিন দিক দিয়ে ভারত দ্বারা পরিবেষ্ঠিত বাংলাদেশের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব -এ দুই দিকের সীমান্ত অতি সহজেই নিরাপত্তা পেতে পারে এ এলাকায় বন্ধু সুলভ কোন সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে। অপরদিকে নিরাপত্তা চরম ভাবে বিঘ্নিত হতে পারে যদি কোন কারণে তাদের সাথে বৈরীতা সৃষ্টি হয়। তাই এ এলাকার রাজনীতির গতিপ্রকৃতির সাথে সম্পর্ক রাখাটি বাংলাদেশের কাছে অতি গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তান যেমন আফগানিস্তানের রাজনীতি  থেকে হাত গুটাতে পারে না তেমনি বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয় এ বিশাল এলাকার রাজনীতি থেকে দূরে থাকা। যেহেতু এ এলাকায় চলছে প্রকাণ্ড এক জনযুদ্ধ তাই তাদের সাথে শত্রুতা সৃষ্টি করা হবে আত্মঘাতি।  অথচ ভারত চায়, বাংলাদেশকে তাদের বিরুদ্ধে খাড়া করতে। তিন). একমাত্র ব্রিটিশ আমল ছাড়া এলাকাটি কখনই ভারতের অন্তর্ভূক্ত ছিল না, এমনকি প্রতাপশালী মুঘল আমলেও নয়। হিন্দু আমলে তো নয়ই। মুর্শিদ কুলি খাঁ যখন বাংলার সুবেদার তথা গভর্নর, তখন তিনি একবার আসাম দখলের চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু সে দখলদারি বেশী দিন টিকিনি। আসামসহ ৭টি প্রদেশের ভূমি ভারতভূক্ত হয় ব্রিটিশ আমলের একেবারে শেষ দিকে। ভারতীয়করণ প্রক্রিয়া সেজন্যই এখানে ততটা সফলতা পায়নি। এবং গণভিত্তি পায়নি ভারতপন্থি রাজনৈতিক দলগুলি। চার). সমগ্র এলাকাটি শিল্পে অনুন্নত এবং নানাবিধ বৈষম্যের শিকার। অথচ এলাকাটি প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ। ভারতের সিংহভাগ তেল, চা, টিম্বার এ এলাকাতে উৎপন্ন হয়। অথচ চা ও তেল কোম্মানীগুলোর হেড-অফিসগুলো কোলকাতায়। কাঁচামালের রপ্তানীকারক প্রতিষ্ঠানগুলিও এলাকার বাইরের। ফলে রাজস্ব আয় থেকে এ এলাকার রাজ্যগুলি বঞ্চিত হচ্ছে শুরু থেকেই। শিল্পোন্নত রাজ্য ও শহরগুলো অনেক দূরে হওয়ায় পণ্যপরিহন ব্যয়ও অধিক। ফলে সহজে ও সস্তায় পণ্য পেতে পারে একমাত্র উৎস বাংলাদেশ থেকেই। ভারতকে করিডোর দিলে সে বাণিজ্যিক সুযোগ হাতছাড়া হতে বাধ্য। পাঁচ) যুদ্ধাবস্থায় অতি গুরুত্বপূর্ণ হল নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা। কিন্ত এ এলাকায় সে সুযোগ ভারতের নেই। ভারতের সাথে এ এলাকার সংযোগের একমাত্র পথ হল পার্বত্যভূমি ও বৈরী জনবসতি অধ্যুষিত এলাকার মধ্য অবস্থিত ১৭ কিলোমিটার চওড়া করিডোর। এ করিডোরে স্থাপিত রেল ও সড়ক পথের কোনটাই নিরাপদ নয়। ইতিমধ্যে গেরিলা হামলায় শত শত সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তির সেখানে প্রাণনাশ হয়েছে। ছয়). নৃতাত্বিক দিক দিকে এ এলাকার মানুষ মাঙ্গোলিয়। ফলে মূল ভারতের অন্য যে কোন শহরে বা প্রদেশে পা রাখলেই একজন নাগা, মিজো বা মনিপুরি চিহ্নিত হয় বিদেশী রূপে। তারা যে ভারতী নয় সেটি বুঝিয়ে দেয়ার জন্য এ ভিন্নতাই যথেষ্ট। এ ভিন্নতার জন্যই সেখানে স্বাধীন হওয়ার জন্য মুক্তিযুদ্ধ চলছে বিগত প্রায় ৭০ বছর ধরে। ভারতীয় বাহিনীর অবিরাম রক্ত ঝরছে এলাকায়। বহু চুক্তি, বহু সমঝোতা, বহু নির্বাচন হয়েছে কিন্তু স্বাধীনতার সে যুদ্ধ থামেনি। ফলে বাড়ছে ভারতের অর্থনীতির উপর চাপ। সমগ্র এলাকা হয়ে পড়েছে ভারতের জন্য ভিয়েতনাম। যে কোন সময় অবস্থা আরো গুরতর রূপ নিতে পারে। আফগানিস্থানে একই রূপ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল রাশিয়ার জন্য। সে অর্থনৈতিক রক্তশূণ্যতার কারনে বিশাল দেহী রাশিয়ার মানচিত্র ভেঙ্গে বহু রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল। ভারত রাশিয়ার চেয়ে শক্তিশালী নয়। তেমনি স্বাধীনতার লক্ষ্যে এ এলাকার মানুষের অঙ্গিকার, আত্মত্যাগ এবং ক্ষমতাও নগণ্য নয়। ফলে এ সংঘাত থামার নয়। ভারত চায় এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে। কিন্তু ভারতের কাছে সংকট মুক্তির সে রাস্তা খুব একটা খোলা নাই।

ভারত করিডোর চাচ্ছে পণ্য-পরিবহন ও আভ্যন্তরীণ যোগাযোগের দোহাই দিয়ে। বিষয়টি কি আসলেই তাই? মেঘালয়, ত্রিপুরা, অরুনাচল, মনিপুর, নাগাল্যান্ড ও মিজোরামের সমুদয় জনসংখ্যা ঢাকা জেলার জনসংখ্যার চেয়েও কম। এমন ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠির জন্য পণ্যসরবরাহ বা লোক-চলাচলের জন্য এত কি প্রয়োজন পড়লো যে তার জন্য অন্য একটি প্রতিবেশী দেশের মধ্য দিয়ে করিডোর চাইতে হবে? সেখানে এক বিলিয়ন ডলার বিণিয়োগ করতে হবে? যখন তাদের নিজের দেশের মধ্য দিয়েই ১৭ কিলোমিটারের প্রশস্ত করিডোর রয়েছে। বাংলাদেশের বিগত সরকারগুলো দেশের আভ্যন্তরীণ সড়কের দুরবস্থার কথা জানিয়ে এতকাল পাশ কাটানোর চেষ্টা করেছে। এবার ভারত বলছে তারা সড়কের উন্নয়নে বাংলাদেশকে দুই বিলিয়ন ডলার লোন দিতে রাজী। এবার বাংলাদেশ যাবে কোথায়? অথচ এই এক বিলিয়ন ডলার দিয়ে ভারত তার ১৭ মাইল প্রশস্ত করিডোর দিয়ে একটি নয়, ডজনের বেশী রেল ও সড়ক পথ নির্মাণ করতে পারতো। এলাকায় নির্মিত হতে পারে বহু বিমান বন্দর। ভারতের সে দিকে খেয়াল নাই, দাবী তুলেছে বাংলাদেশের মাঝ খান দিয়ে যাওয়ার পথ চাই-ই। যেন কর্তার তোগলোকি আব্দার। গ্রামের রাস্তা ঘুরে যাওয়ায় রুচি নেই, অন্যের শোবার ঘরের ভিতর দিয়ে যেতেই হবে। গ্রামের ঝোপঝাড়ের পাশ দিয়ে রাস্তায় পথ চলতে অত্যাচারি কর্তার ভয় হয়। কারণ তার কুর্মের কারণে শত্রুর সংখ্যা অসংখ্য। না জানি কখন কে হামলা করে বসে। একই ভয় চেপে বসেছে ভারতীয়দের মাথায়। সমগ্র উত্তরপূর্ব ভারতের স্বাধীনতাকামী জনগণের কাছে তারা চিহ্নিত হয়েছে উপনিবেশিক ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী রূপে। তারা চায় ভারতীয় শাসন থেকে আশু মুক্তি। এ লক্ষে জানবাজি রেখে তারা যুদ্ধে নেমেছে। ফলে ভারতের জন্য অবস্থা অতি বেগতিক হয়ে পড়েছে। একদিকে কাশ্মীরের মুক্তিযুদ্ধ দমনে যেমন ছয় লাখেরও বেশী ভারতীয় সৈন্য অন্তহীন এক যুদ্ধে আটকা পড়ে আছে তেমনি তিন লাখের বেশী সৈন্য যুদ্ধে লিপ্ত উত্তর-পূর্ব এ ভারতে। যুদ্ধাবস্থায় অতিগুরুত্বপূর্ণ হলো নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা। ফলে যতই এ যুদ্ধ তীব্রতর হচ্ছে ততই প্রয়োজন বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে করিডোরের। করিডোর নিতান্তই সামরিক প্রয়োজনে তা নিয়ে কি কোন সন্দেহ আছে? আর বাংলাদেশের জন্য শংকার কারণ মূলত এখানেই। ভারত তার চলমান রক্তাত্ব যুদ্ধে বাংলাদেশকেও জড়াতে চায়। এবং সে সাথে কিছু গুরুতর দায়িত্বও চাপাতে চায়। কারো ঘরের মধ্য দিয়ে পথ চললে সে পথে কিছু ঘটলো সহজেই সেটির দায়-দায়িত্ব ঘরের মালিকের ঘাড়ে চাপানো যায়। তার বিরুদ্ধে আদালতে ফৌজদারি মামলাও দায়ের করা যায়। কিন্তু বিজন মাঠ বা ঝোপঝাড়ের পাশে সেটি ঘটলে আসামী খুঁজে পাওয়াই দায়। ভারত এজন্যই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ৬ শত মাইলের করিডোর এবং সে করিডোরের নিরাপত্তার দায়-দায়িত্ব বাংলাদেশের কাঁধে চাপাতে চায়। তখন এ পথে ভারতীয়দের উপর হামলা হলে বাংলাদেশকে সহজেই একটি ব্যর্থ দেশ এবং সে সাথে সন্ত্রাসী দেশ রূপে আখ্যায়ীত করে আন্তর্জাতিক মহলে নাস্তানাবুদ করা যাবে। সে সাথে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতীয় সামরিক হস্তক্ষেপকে ন্যায়সঙ্গত বলার বাহানাও পাওয়া যাবে।

 

যে হামলা অনিবার্য

প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের অভ্যন্তর দিয়ে ভারতীয় যানবাহন চলা শুরু হলে সেগুলির উপর হামলার সম্ভাবনা কি কম? ভারতীয় বাহিনী কাশ্মীরের মুসলমানদের উপর নিষ্ঠুর বর্বরতা চালিয়ে যাচ্ছে দীর্ঘ ৬০ বছর যাবত। এক লাখের বেশী কাশ্মীরীকে সেখানে হত্যা করা হয়েছে, বহু হাজার মুসলিম নারী হয়েছে ধর্ষিতা। এখনও সে হত্যাকান্ড ও ধর্ষন চলছে অবিরাম ভাবে। জাতিসংঘের কাছে ভারত সরকার ১৯৪৮ সালে ওয়াদা করেছিল কাশ্মীরীদের ভাগ্য নির্ধারণে সেখানে গণভোট অনুষ্ঠিত করার অনুমতি দিবে। জাতিসংঘ নিরাপত্ত পরিষদ এ্যাডমিরাল নিমিটস্ এর উপর দায়িত্ব দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতিও শুরু হয়েছিল। কিন্তু ভারত সে প্রতিশ্রুতি রাখেনি। এবং সেটি নিছক গায়ের জোরে। এভাবে কাশ্মীরীদের ঠেলে দেওয়া হয়েছে রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধের পথে। অপর দিকে ভারত জুড়ে মুসলিম হত্যা, ধর্ষণ, ঘরবাড়ীতে আগুণ, এমনকি মসজিদ ভাঙ্গার কাজ হয় অতি ধুমধামে ও উৎসবভরে। অযোধ্যায় বাবরী মসজিদ ভাঙ্গার কাজ হয়েছে হাজার পুলিশের সামনে দিন-দুপুরে। হাজার হাজার সন্ত্রাসী হিন্দুদের দ্বারা ঐতিহাসিক এ মসজিদটি যখন নিশ্চিহ্ন হচ্ছিল তখন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নরসীমা রাও, বিরোধী দলীয় নেতা বাজপেয়ী এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তাগণ সম্ভবতঃ আনন্দ ও উৎসবভরে ডুগডুগি বাজাচ্ছিলেন। এটি ছিল বড় মাপের একটি ঐতিহাসিক অপরাধ। অথচ এ অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ভারত সরকারের কোন পুলিশ কোন অপরাধীকেই গ্রেফতার করেনি। আদালতে কারো কোন জেল-জরিমানাও হয়নি। ভাবটা যেন, সেদেশে কোন অপরাধই ঘটেনি। ভারতীয়দের মানবতাবোধ ও মূল্যবোধের এটিই প্রকৃত অবস্থা। এমন একটি দেশ থেকে কি সুস্থ্য পররাষ্টনীতি আশা করা যায়? দেশটিতে দাঙ্গার নামে হাজার হাজার মুসলমানকে জ্বালিয়ে মারার উৎসব হয় বার বার। সাম্প্রতিক কালে আহমেদাবাদে যে মুসলিম গণহত্যা হল সংখ্যালঘূদের বিরুদ্ধে তেমন কান্ড পাকিস্তানের ৬০ বছরের জীবনে একবারও হয়নি। বাংলাদেশের ৪৫ বছরের জীবনেও হয়নি।

 

কংগ্রেস নেতা মাওলানা আবুল কালাম আযাদ লিখেছিলেন, ‘‘আফ্রিকার কোন জঙ্গলে কোন মুসলমান সৈনিকের পায়ে যদি কাঁটাবিদ্ধ হয় আর সে কাঁটার ব্যাথা যদি তুমি হৃদয়ে অনুভব না কর তবে খোদার কসম তুমি মুসলমান নও।” –(সুত্রঃ মাওলানা আবুল কালাম আযাদ রচনাবলী, প্রকাশক: ইসলামী ফাউন্ডেশন, ঢাকা)। এমন চেতনা মাওলানা আবুল কালাম আযাদের একার নয়, এটিই ইসলামের বিশ্ব-ভাতৃত্বের কথা। যার মধ্যে এ চেতনা নাই তার মধ্যে ঈমানও নাই। বাস্তবতা হল, বাংলাদেশে যেমন সেকুলারিজমের জোয়ারে ভাসা ভারতপন্থি বহু ক্যাডার আছে, তেমনি প্যান-ইসলামের চেতনায় উজ্জিবীতত বহু লক্ষ মুসলমানও আছে। করিডোরের পথে সাক্ষাৎ চোখের সামনে তথা হাতের সামনে মুসলিম হত্যাকারি ও মসজিদ ধ্বংসকারি ভারতীয় সৈনিকদের কাছে পেয়ে এদের কেউ কেউ যে তাদের উপর বীরবিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়বে না সে গ্যারান্টি কে দেবে? তাছাড়া ১৯৪৭ সালে বাংলার মুসলমানগণ যে স্বাধীন পাকিস্তানের জন্ম দিয়েছিলেন তা নিজ বাংলার বাঙালী হিন্দুদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নয়, বরং অবাঙালী মুসলমানদের সাথে কাঁধ মিলিয়ে। সে চেতনা ছিল প্যান ইসলামের। সেটি কি এতটাই ঠুনকো যে আওয়ামী বাকশালীদের ভারতমুখি মিথ্যা প্রচারনায় এত সহজে মারা মরবে? চেতনাকে শক্তির জোরে দাবিয়ে রাখা যায়, হত্যা করা যায় না। আর ইসলামি চেতনাকে তো নয়ই। ভারত সেটি জানে, তাই বাংলাদেশ নিয়ে তাদের প্রচণ্ড ভয়।

তাছাড়া বাংলাদেশীদের প্রতি ভারতীয় সৈনিকদের আচরণটাই কি কম উস্কানিমূলক? প্রতি বছরে বহু শত বাংলাদেশী নাগরিককে ভারতীয় বর্ডার সিকুরিটি ফোর্স তথা বিএসএফ হত্যা করছে। তারকাটার বেড়ায় ঝুলিয়ে রাখা হয় তাদের লাশ। এবং এর কোন প্রতিকার কোন বাংলাদেশী পায়নি। নিরীহ মানুষের এমন হত্যাকান্ড বিএসএফ পাকিস্তান সীমান্তে বিগত ৬০ বছরেও ঘটাতে পারিনি। এমনকি নেপাল বা ভূটান সীমান্তেও হয়নি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ভারত সরকারের কাছে যে কতটা মূল্যহীন ও তুচ্ছ এবং দেশের জনগণ যে কতটা অরক্ষিত -সেটি বোঝানোর জন্য এ তথ্যটিই কি যথেষ্ট নয়? বহুবার তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কয়েক কিলোমিটার ঢুকে হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে। ইচ্ছামত গরুবাছুড়ও ধরে নিয়ে গেছে। বাঁধ দিয়ে সীমান্তের ৫৪টি যৌথ নদীর পানি তুলে নিয়েছে বাংলাদেশের মতামতের তোয়াক্কা না করেই। ফারাক্কা নির্মান করেছে এবং পদ্মার পানি তুলে নিয়েছে এক তরফা ভাবেই। টিপাইমুখ বাধ দিয়ে সুরমা ও কুশিয়ারার এবং তিস্তার উপর উজানে বাঁধ দিয়ে বাংলাদেশকে পানিশূণ্য করার ষড়যন্ত্র করছে। এদের মুখে আবার প্রতিবেশী মূলক সহযোগিতার ভাষা?

  

অধিকৃত বাংলাদেশ

ভারতের আগ্রাসী ভূমিকার কারণ ভারতবিরোধী চেতনা এখন বাংলাদেশের ঘরে ঘরে। বেতনভোগী কয়েক হাজার র’এর এজেন্ট দিয়ে এমন চেতনাধারিদের দমন অসম্ভব। সেটি ভারতও বুঝে। তাই চায়, বাংলাদেশ সরকার ভারত বিরোধীদের শায়েস্তা করতে বিশ্বস্ত ও অনুগত ঠ্যাঙ্গারের ভূমিকা নিক। শেখ হাসিনার সরকার সে ভূমিকাই বিশ্বস্ততার সাথে পালন করছে দেশের শত শত ইসলামপন্থি নেতা কর্মীদের গ্রেফতার ও নির্যাতন এবং ইসলামী বইপুস্তক বাজয়াপ্ত করার মধ্য দিয়ে। অথচ এটি কি কখনো কোন মুসলমানের এজেণ্ডা হতে পারে? শেখ হাসিনার সরকার রীতিমত যুদ্ধ শুরু করেছে দেশের ইসলামপন্থিদের নির্মূলে। সেটি শুধু জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে নয়, সকল ইসলামী দলের বিরুদ্ধেই। কে বা কোন দল একাত্তরে অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল সেটি তাদের কাছে বড় কথা নয়, বরং কারা এখন ইসলামের পক্ষ নিচ্ছে সেটিই তাদের বিবেচনায় মূল। এবং তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধেও নামছে। আওয়ামী বাকশালী পক্ষটি এমন একটি যুদ্ধের হুংকার বহু দিন থেকে দিয়ে আসছিল এবং এখন সেটি শুরুও হয়ে গেছে। বাংলাদেশের ঘাড়ে এভাবেই চাপানো হয়েছে একটি অঘোষিত ভারতীয় যুদ্ধ। এ যুদ্ধের ব্যয়ভার যেমন ভারতীয়রা বহন করছে, তেমনি কমাণ্ডও তাদের হাতে। বাংলাদেশ বস্তুত এ পক্ষটির হাতেই আজ  অধিকৃত।

হাসিনা জনগণের সমর্থণ নিয়ে ক্ষমতায় আসেনি। জনপ্রিয়তা হারানো নিয়েও তার কোন দুর্ভাবনা নেই। সে দুর্ভাবনা ও দায়ভারটি বরং ভারতীয়দের। শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হলে আওয়ামী লীগের চেয়েও বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হবে ভারত। তখন বিপদে পড়বে ভারতের প্রায় বহু বিলিয়ন ডলারের বিশাল বাজার। বিপদে পড়বে উত্তর-পূর্ব ভারতে তাদের যুদ্ধ।  চট্টগ্রাম বন্দরে আটককৃত ১০ট্রাক অস্ত্র নিয়ে হাসিনা সরকার প্রমাণ করে ছেড়েছে তাঁর সরকার ভারতীয়দের কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। বলা হচ্ছে, সে ১০ট্রাক চীনা অস্ত্র আনা হয়েছিল উলফা বিদ্রোহীদের হাতে পৌছানোর জন্য। হাসিনা ক্ষমতাচ্যুৎ হলে ভবিষ্যতে ১০ ট্রাক নয় আরো বেশী অস্ত্র যে বিদ্রোহীদের হাতে পৌছবে তা নিয়ে কি ভারতীয়দের মনে কোন সন্দেহ আছে? ভারতীয় নেতারা কি এতই শিশু যে তারা সেটি বুঝে না? তাই ভারত চায়, শেখ হাসিনার আওয়ামী-বাকশালী সরকার শুধু ক্ষমতায় থাকুক তাই নয়, বরং ভারতের সাথে উলফা বিরোধী যুদ্ধে পুরাপুরি সংশ্লিষ্ট হোক। এ যুদ্ধে যোগ দিক সক্রিয় পার্টনার রূপে, যেমনটি দিয়েছিল একাত্তরে।

 

লড়াই দেশ ও ঈমান বাঁচানোর

একাত্তরে যুদ্ধ থেকে ৯ মাসে মুক্তি মিললেও এবারে সেটি মিলছে না। বরং বাংলাদেশীদের কাঁধে চাপানো হচ্ছে এমন এক লাগাতর যুদ্ধ যা সহজে শেষ হবার নয়। তাছাড়া এ যুদ্ধটি আদৌ তাদের নিজেদের যুদ্ধ নয়। বরং সর্ব অর্থেই ভারতীয় এবং সেটি ভারতের স্বার্থ সংরক্ষণের।একাত্তরের যুদ্ধে ভারতের যে উদ্দেশ্য অসম্পূর্ণ থেকে যায়, ভারত এবার কোমর বেঁধেছে সেটিই পুরণ করতে। তাই ভারতের লক্ষ্য শুধু করিডোর লাভ নয়। সীমান্ত চুক্তি, সীমান্ত বাণিজ্য বা রাস্তাঘাট নির্মানে কিছু বিনিয়োগও নয়ও। বরং তার চেয়ে ব্যাপক ও সূদুর প্রসারী। সেটি যেমন দেশের ইসলামি চেতনার নির্মূল ও ইসলামপন্থি দেশপ্রেমিকদের কোমর ভাঙ্গার,তেমনি দেশটির উপর পরিপূর্ণ অধিকৃতি জমানোর। মি. ভার্মার ন্যায় ভারতীয় বুদ্ধিজীবীরা সে অভিলাষের কথা গোপন রাখেনি, তেমনি গোপন রাখছেন না বহু ভারতীয় রাজনৈতিক নেতাও। বিজেপির এক কেন্দ্রীয় নেতা তো সিলেট থেকে খুলনা বরাবর বাংলাদেশের অর্ধেক দখল করে নেয়ার দাবীও তুলেছেন। শরিয়তের প্রতিষ্ঠা, জিহাদের ন্যায় ইসলামের মৌল শিক্ষার প্রচারের উপর নিষেধাজ্ঞা এবং ইসলামী সংগঠনগুলির নেতাকর্মীদের উপর নির্যাতন দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে। বস্তুতঃ এসবই করা হচ্ছে ভারতীয় স্ট্রাটেজীর অবিচ্ছেদ্দ অংশ রূপে। বাংলাদেশীদের সামনে লড়াই এখন তাই শুধু গণতন্ত্র উদ্ধারের নয় বরং তার চেয়েও গুরুতর। সেটি দেশ বাঁচানোর। এবং সে সাথে ঈমান ও ইসলাম বাঁচানোর। ১১/০৬/২০১৫; নতুন সংস্করণ ২৬/০৩/২০১৯

 

 




ভারতের জন্য করিডোর এবং বাংলাদেশের আত্মঘাত

বিশাল বিজয় ভারতের

ভারত যা চায় সেটি সহজেই পায়। কিন্তু বাংলাদেশ যা চায় সেটি পায় না। ভারত তাই করিডোর পেল, কিন্তু বাংলাদেশ পানি পায়নি। প্রভু রাষ্ট্র ও গোলাম রাষ্ট্রের মাঝে এটিই মূল পার্থক্য। একাত্তরে ভারতের সামরিক বিজয়ের পর থেকে এটিই হলো বাংলাদেশের জন্য নতুন বাস্তবতা। বাংলাদেশের এ অসহয়তা বুঝার জন্য তাই কি বেশী গবেষণার প্রয়োজন আছে? দীর্ঘদিন যাবত বাংলাদেশ তিস্তা নদীর ন্যয্য হিস্যা দাবী করে আসছে। কিন্তু আজও তা জুটেনি। ন্যয্য হিস্যা জুটেনি পদ্মার পানিরও। পানির অভাবে বাংলাদেশ আজ দ্রুত মরুভূমি হতে যাচ্ছে। অথচ কলকাতার হুগলি নদীতে ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে পদ্মার পানি তুলে নেয়াতে বার মাস পাড় উপচানো জোয়ার। পদ্মা নদীতে নৌকা চলে না, কিন্তু হুগলী নদীতে সমুদ্রগামী জাহাজ চলে। হাসিনা সরকার তাতেই খুশি। বাংলাদেশকে ন্যয্য পাওনা দেয়া নিয়ে ভারত সরকারের কারোই কোন মাথা ব্যথা নেই। দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকার বলছে, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সম্মতি ছাড়া পানি সমস্যার কোন সমাধান হবে না। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে পশ্চিমবঙ্গের প্রাদেশিক সরকারকে একত্রে বসাবে কে? পানি সমস্যার সমাধান নিয়ে মোদীর সাথে মমতা  বানার্জিকে একবারও একত্রে বসানো যায়নি। কিন্তু করিডোর আদায়ে নরেন্দ্র মোদীর আগেই পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ঢাকায় এসেছে। কারণ গরজটি এখানে কিছু দেয়া ছিল না। সেটি ছিল করিডোরের ন্যায় বাংলাদেশ থেকে বিশাল কিছু নেয়া।

ভারত যা শুরু থেকে চেয়ে এসেছে তা সহজেই পেয়েছে। অথচ এর আগে ভারত তা নিতে পারিনি। হেতু কি? কারণটি অতি সহজ। বাংলাদেশে থেকে কিছু সহজে আদায় করতে ভারতের জন্য সবচেয়ে মোক্ষম সময়  ২০১৪’য়ের ভোট ডাকাতির পরবর্তী কালীন সময়। সে নির্বাচনে শেখ হাসিনা ও তার মিত্রগণ জনগণের ভোট নিয়ে ক্ষমতায় আসেনি। শতকরা ৫% ভোটকেন্দ্রে যায়নি। অর্ধেক সিটে একটি ভোটও ঢালা হয়নি। তবে ভোট ডাকাতি বাংলাদেশ বিশ্বরেকর্ড করেছে ২০১৮ সালের সংসদীয় নির্বাচনে। ভোটারগণ ভোট কেন্দ্রে গিয়েও ভোট দিতে পারেনি। তাদের ব্যালট পেপার ছিনতাই হয়ে যায় আগের রাতেই। ফলে যে কোন বিচারে হাসিনার সরকার একটি অবৈধ সরকার। এমন ডাকাত সরকার জনগণে সাহায্য ও সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় থাকে না, নির্ভরশীল হয় পড়ে বিদেশীদের উপর। শেখ হাসিনার সে নির্ভরশীলতাটি প্রতিবেশীর ভারতের উপর। এমন একটি ভারত-নির্ভর সরকারের পক্ষে ভারতীয় দাবীর বিরুদ্ধে না বলার সামর্থ হাসিনার নেই। সেটি শেখ মুজিবের বা তাজুদ্দীনের ও ছিল না। ভারত সেটি জানে। ভারত তাই মুজিবকে দিয়ে ২৫ সালা দাসচুক্তি এবং তাজুদ্দীনকে দিয়ে ৭ দফা গোলামী নামা লিখিয়ে নেয়। এবং হাসিনা থেকে বাংলাদেশের বুক চিরে করিডোর নিতেও দেনদরবার করতে হয়নি। গোলামীর শিকল পড়াতে পারলে যে কোন দিকে ই্চ্ছামত টানা যায় – ভারত সেটিই প্রমাণ করলো।   

বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ভারত করিডোর নিয়ছে যেমন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রয়োজনে, তেমনি সামরিক ও নিরাপত্তার প্রয়োজনে।বাংলাদেশের বুকের উপর দিয়ে ভারতের করিডোর নেয়ার বিষয়টি বুঝতে হলে বুঝতে হবে দেশটির উচ্চবর্ণ ব্রাহ্মনদের আসমুদ্র-হিমাচল ব্যাপী এক হিন্দু সাম্রাজ্য গড়ার আগ্রাসী মানসিকতাকে। নিজ দেশের দরিদ্র মানুষদের প্রতি এসব বর্ণবাদী আগ্রাসী হিন্দুদের কোন দরদ নেই। তারা বেছে বেছে সেখানেই বিনিয়োগ বাড়ায় যা তাদের সে আগ্রাসী অভিলাষ পুরণে জরুরী। আর সেচিত্রটিই ফুটে উঠে বাংলাদেশের প্রতি তাদের বিদেশ নীতি ও স্ট্রাটেজীতে। বাংলাদেশ একটি দরিদ্র দেশ। এদেশের উন্নয়নে বহু দূরবর্তী দেশের পূঁজিপতিও বিনিয়োগ করেছে। পাকিস্তান আমলে বিনিয়োগ করেছে আদমজী, দাউদ, বাওয়ানী, ইস্পাহানী, আমিনের ন্যায় বহু অবাঙালীও। কিন্তু বাংলাদেশের মাটিতে ভারতীয়দের বিনিয়োগ যে ছিল না তা নয়। তবে সেটি কখনই শিল্প বা অর্থনীতিতে নয়, ছিল রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও মিডিয়ার  ময়দানে। ভারত আজও বিনিয়োগের সে ধারাই অব্যাহত রেখেছে।  ফলে বাংলাদেশের মাটিতে ভারতীয় শিল্প-পণ্য উৎপাদিত না হলে কি হবে, সংখ্যায় বিপুল ভাবে বেড়েছে ভারত-ভক্ত ও ভারতীয় স্বার্থের সেবাদাস।

                                                                                                                                         

ভারতের যুদ্ধে বাংলাদেশ

বাংলাদেশের মাটিতে ভারতের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ ছিল একাত্তরের যু্দ্ধে। সেটি ছিল যেমন বিপুল অর্থের, তেমনি রক্তেরও। ৪ হাজারের বেশী ভারতীয় সৈনিক এ যুদ্ধে মারা যায়। এ বিষয়টি অস্বীকারের উপায় নেই,ভারতীয়দের সে বিনিয়োগ না হলে বাংলাদেশ সৃষ্টিই হত না। তবে ভারতের সে বিনিয়োগ কি ছিল বাংলাদেশের স্বার্থে? ভারত কোন বিদেশীদের স্বাধীনতার স্বার্থে কখনো কি একটি তীরও ছুঁড়েছে? একটি পয়সাও কি ব্যয় করেছে? বরং ভারতের ইতিহাস তো অন্যদেশে সামরিক আগ্রাসন ও স্বাধীনতা লুন্ঠনের। সে লুন্ঠনের শিকার কাশ্মির, সিকিম, মানভাদর, হায়দারাবাদের স্বাধীনতা। ভারতীয়দের কাছে একাত্তরের যুদ্ধটি ছিল শতকরা শতভাগ ভারতীয় যুদ্ধ। তাই সে যুদ্ধের ঘোষণা যেমন শেখ মুজিব থেকে আসেনি, তেমনি কোন বাংলাদেশী জেনারেলের পক্ষ থেকেও আসেনি। আরো সত্য হলো, একাত্তে সে যুদ্ধের কমাণ্ড শেখ মুজিব বা তার অনুসারিদের হাতেও ছিল না। ভারতীয় অর্থ, নেতৃত্ব ও পরিকল্পনা দ্বারা পরিচালিত এ যুদ্ধটি ছিল সর্বক্ষেত্রেই একটি ভারতীয় যুদ্ধ। মুজিব স্বাধিনতার ঘোষনা দিল কি দিল না, মূক্তি বাহিনী যুদ্ধ করলো কি করলো না – ভারত সে অপেক্ষায় ছিল না। এ যুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিল ভারতীয় ভূমি থেকে,এবং ভারতীয় জেনারেলদের নেতৃত্বে। সে যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে ভারতীয় সেনানিবাস, বহু লক্ষ ভারতীয় সৈন্য এবং বহু ভারতীয় বিমান, কামান, ট্যাংক এবং গোলাবারুদ। বরং ভারতীয়দের সফলতা হলো, বহুদিনের কাঙ্খিত একান্ত নিজদের যুদ্ধটিকে তারা মুক্তিযুদ্ধ রূপে বাংলাদেশীদের ঘাড়ে চাপাতে সমর্থ হয়েছিল। মুক্তিবাহিনীকে তারা নিজ অর্থে গড়ে তুলেছিল স্রেফ নিজস্ব প্রয়োজনে। তারা সেদিন কইয়ের তেলে কই ভেজেছিল। বিশ্ববাসীর কাছেও সে সত্যটি কখনই গোপন থাকেনি। বরং সেটি প্রকাণ্ড ভাবে প্রকাশ পায় যখন পাকিস্তানী সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করে শুধুমাত্র ভারতীয় সেনাবাহিনীর জেনারেলদের কাছে, কোন বাংলাদেশী জেনারেল বা মুক্তি যোদ্ধার কোন কমাণ্ডারের কাছে নয়। আরো প্রকাশ পায়, যখন পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর ফেলে যাওয়া বিপুল পরিমান যুদ্ধাস্ত্র যখন ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়। একাত্তরে সে যুদ্ধটি যদি বাংলাদেশীদের দ্বারা বাংলাদেশের যুদ্ধ হত তবে পাকিস্তানের ফেলে যাওয়া বিপুল যুদ্ধাস্ত্র ভারতে যায় কি করে? পাকিস্তানী যুদ্ধবন্দীদেরকেই বা কেন ভারতে নেয়া হবে? এসব বিষয়গুলো বুঝার সামর্থ কি ভারতের সেবাদাসদের আছে?

একাত্তরে ভারতের অর্থ, রক্ত, শ্রম ও মেধার বিনিয়োগটি ভারতের কোন খয়রাতি প্রকল্পও ছিল না, ছিল তাঁর নিজ সাম্রাজ্য বিস্তারের অনিবার্য প্রয়োজনে। ছিল পাকিস্তান ভাঙ্গার লক্ষে। এবং সে সাথে সামরিক দিক দিয়ে পঙ্গু, রাজনৈতিক ভাবে অধিকৃত এবং অর্থনৈতিক দিক দিয়ে ভারতনির্ভর এক বাংলাদেশ সৃষ্টির। এমন একটা যুদ্ধ নিজ খরচে লড়ার জন্য ভারত ১৯৪৭ সাল থেকেই দুপায়ে খাড়া ছিল। ভারত পাকিস্তানের সৃষ্টি যেমন চাইনি, তেমনি দেশটি বেঁচে থাকুক সেটিও চায়নি। তাই ভারতের সে বিনিয়োগটি যেমন একাত্তরে শুরু হয়নি, তেমনি একাত্তরে শেষও হয়নি। সেটির শুরু হয়েছিল সাতচল্লিশে, এবং চলছে আজও। তবে চলছে ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে ও ভিন্ন ভিন্ন রণাঙ্গনে। বিশেষ করে সে সব খাতে যা আঞ্চলিক শক্তি রূপে প্রতিষ্ঠা লাভের জন্য তারা জরুরী মনে করে। করিডোর হল তেমনই এক গুরুত্বপূর্ণ খাত। তাই ভারত সরকারের পক্ষ থেকে করিডোরের দাবী, চট্রগ্রাম ও চালনা বন্দরসহ বাংলাদেশের নৌ ও বিমান বন্দর ব্যবহারের দাবি, বাংলাদেশের মিডিয়া খাতে ভারতীয়দের বিনিয়োগ, শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে আওয়াম লীগ ও তার মিত্রদের লাগাতর প্রতিপালন –এবিষয়গুলো বুঝতে হলে ভারতের সে আগ্রাসী মনভাব ও সামরিক প্রয়োজনটি অবশ্যই বুঝতে হবে। তখন সুস্পষ্ট হবে, যে দুই বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ নিয়ে ভারত এগিয়ে আসছে সেটিও কোন খয়রাতি প্রজেক্ট নয়। ভারত এর চেয়ে অনেক বেশী বিনিয়োগ করে তার পূর্ব সীমান্তের সামরিক বাহিনীর পিছনে। বাংলাদেশের মাটিতে ভারতের এ বিনিয়োগ আসছে দেশটির সে আগ্রাসী স্ট্রাটেজীর অবিচ্ছিন্ন অংশ রূপে। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশীদের যে যাই বলুক,ভারতীয়দের মাঝে এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে কোন অস্পষ্টতা নেই। সেটি তার খোলাখোলী ভাবেই বলে। এবং সেটিই ফুটে উঠেছে “ইন্ডিয়ান ডিফেন্স রিভিউ” জার্নালের সম্পাদক মি. ভরত ভার্মার লেখা এক নিবন্ধে। এ প্রবন্ধে মি. ভার্মার সে নিবদ্ধ থেকে উদ্বৃতি দিয়ে বিষয়টি আরো সুস্পষ্ট করা হবে। তবে এ নিয়ে কোন রূপ রাখঢাক নাই তাদের সহযোগী বাংলাদেশী আওয়ামী বাকশালীদের মনেও। তারাও চায় বাঙালীর জীবনে একাত্তর বার বার ফিরে আসুক। এবং বাঙালী আবার লিপ্ত হোক ভারতীয়দের নেতৃত্বে এবং ভারতীয়দের অস্ত্র নিয়ে আরেকটি যুদ্ধে।

 

ভারত চায় আগ্রাসনের অবকাঠামো

বিশ্ব রাজনীতিতে যে অবস্থান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের, ভারত সেটিই হতে চায় সমগ্র এশিয়ার বুকে। আর সে অবস্থায় পৌঁছতে হলে অন্যদেশের অভ্যন্তরে শুধু দালাল বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদ প্রতিপালন করলে চলে না। আগ্রাসনকে বিজয়ী ও স্থায়ী করতে নিজেদের বিশাল দূতাবাস, ঘাঁটি,সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনায় স্পাই নেটওয়ার্কের পাশাপাশি সেনা ও রশদ সরবরাহের অবকাঠামোও গড়ে তুলতে হয়। প্রয়োজনে সামরিক আগ্রাসনও চালাতে হয়। শুধু হামিদ কারজাইদের মত ব্যক্তিদের কারণে আফগানিস্তান মার্কিনীদের হাতে অধিকৃত হয়নি। এলক্ষে ঘাঁটি, বন্দর ও সড়ক নির্মানও করতে হয়েছে। অবিরাম গতিতে রক্তক্ষয়ী একটি যুদ্ধও চালিয়ে যেতে হচ্ছে। ভারতও তেমনি শুধু শেখ মুজিব, শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের প্রতিপালন নিয়ে খুশি নয়। পাকিস্তান ভাঙ্গার ভারতীয় প্রজেক্ট শুধু আগরতলা ষড়যন্ত্রের মাঝে সীমাবদ্ধ রাখলে তা কখনই সফল হত না। এ জন্য ভারতকে নিজের বিশাল বাহিনী নিয়ে একাত্তরে প্রকান্ড একটি যুদ্ধও লড়তে হয়েছে।

এটি এখন আর লুকানো বিষয় নয়, ২০০৮ সালের নির্বাচনে ভারত শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছিল তার অনুগত পক্ষকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে। সে তথ্যটিই বিশ্বময় ফাঁস করে দিয়েছে ব্রিটিশ প্রভাবশালী পত্রিকা ইকোনমিস্ট। তবে ভারতের এ বিনিয়োগ শুধু ২০০৮ সালে নয়, প্রতি নির্বাচনেই। যেমন ১৯৭০ সালের নির্বাচনে, তেমনি ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের নির্বাচনেও। তবে শুধু নির্বাচনী বিনিয়োগের মধ্য দিয়েই ভারতের আসল লক্ষ্য পূরণ হওয়ার নয়। ভারত ভাল ভাবেই জানে, শুধু নিজ দেশের সেনবাহিনীতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে বাংলাদেশের উপর আধিপত্য বিস্তার সম্ভব নয়। সে জন্য চাই,বাংলাদেশের রাজনীতি, মিডিয়া, বুদ্ধিবৃত্তি ও যোগাযোগসহ নানা ক্ষেত্রে লাগাতর বিনিয়োগ। তাছাড়া তাদের কাছে যুদ্ধ আগামী দিনের কোন বিষয় নয়,বরং প্রতি দিনের। দেশটি এক আগ্রাসী যুদ্ধে লিপ্ত তার জন্ম থেকেই। উত্তর-পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিম -এ দুই প্রান্তে দুটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের শুরু আজ থেকে প্রায় ৭০ বছর আগে। এখন তা অবিরাম গতিতে চলছে। ভারতে বহু সরকার ক্ষমতায় এসেছে, বিদায়ও নিয়েছে। কিন্তু সে যুদ্ধ দুটি থামার নামই নিচ্ছে না। ভারতের উত্তর-পূর্ব সীমান্তে চলমান যুদ্ধের প্রতিবেশী দেশ হল বাংলাদেশ। পাকিস্তানকে সংশ্লিষ্ট করা ছাড়া আফগান যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্টের পক্ষে বিজয় দূরে থাক টিকে থাকাই যেমন অসম্ভব তেমনি অবস্থা ভারতের জন্য বাংলাদেশের সংশ্লিষ্টতা। পাকিস্তানের রাজনীতি, মিডিয়া, সামরিক বাহিনী ও যুদ্ধ-অবকাঠামোতে এ কারণেই মার্কিনীদের বিশাল বিনিয়োগ। জেনারেল  মোশাররফকে হটিয়ে পিপলস পার্টিকে ক্ষমতায় বসানোর মূল কারণ ছিল মার্কিনীদের সে যুদ্ধে পাকিস্তানীদের শামিল করার বিষয়টিকে নিশ্চিত করা। একই কারণে উত্তর-পূর্বের রণাঙ্গণে ভারত অপরিহার্য মনে করে বাংলাদেশকে সম্পৃক্ত করা।সে লক্ষেই বাংলাদেশের রাজনীতি, মিডিয়া, বুদ্ধিবৃত্তিতে ভারতের এত বিনিয়োগ। “শেখ হাসীনার ফারাক্কার পানিচুক্তিতে পদ্মায় পানি বেড়েছে বা টিপাইমুখ বাঁধের ফলে সুরমা, কুশিয়ারা ও মেঘনায় পানি থৈ থৈ করবে, বা একাত্তরের হাতিয়ার গর্জে উঠুক আরেকবার” –বাংলাদেশী বুদ্ধিজীবীরা তো এমন কথা বলে সে পুঁজি বিনিয়োগের ফলেই। একাত্তরের হাতিয়ার যে ছিল ভারতীয় হাতিয়ার সে কথা কি অস্বীকারের উপায় আছে? এবং সে হাতিয়ার নির্মিত হয়েছে যে স্রেফ ভারতীয় বিজয় ও ভারতীয় আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে তা নিয়েও কি কোন বিতর্ক আছে?

 

ভারতীয়দের ভয় ও স্ট্রাটেজী

সাম্রাজ্য বিস্তারে ভারতের যেমন স্বপ্ন আছে, তেমনি ভয়ও আছে। দেশটির সাম্রাজ্য-লিপ্সু নেতাদের মাঝে যেমন রয়েছে প্রচণ্ড পাকিস্তানভীতি ও ইসলামভীতি, তেমনি রয়েছে চীনভীতিও। চীন দ্রুত অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিসঞ্চয় করছে। প্রতিবেশী নেপালও এখন চীনের পক্ষে।  মধ্য ভারতের কয়েকটি প্রদেশে জুড়ে লড়াই করে চলেছে হাজার হাজার মাওবাদী বিপ্লবী। প্রাক্তন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ভাষায় মাওবাদীদের এ যুদ্ধই ভারতীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে বর্তমান কালের সবচেয়ে বড় হুমকি। অপরদিকে পাকিস্তানও এখন আর একাত্তরের দুর্বল পাকিস্তান নয়। তার হাতে এখন পারমাণবিক বোমা। রয়েছে দূরপাল্লার শত শত মিজাইল। রয়েছে হাজার হাজার আত্মত্যাগী ইসলামী বোমারু যোদ্ধা – যাদের মাত্র কয়েকজন মোম্বাই শহরকে কয়েকদিনের জন্য অচল করে দিয়েছিল। ১৯৪৮, ১৯৬৫ এবং ১৯৭১-এর যুদ্ধের কারণে অসম্ভব ও অচিন্তনীয় হয়ে পড়েছে পাকিস্তানের সাথে দেশটির বন্ধুত্ব। সম্প্রতি আফগানিস্তানে মার্কিনীদের সাথে ভারতের সহযোগী ভূমিকা ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানীদের সে ঘৃনা আরো তীব্রতর করছে। তাছাড়া লাগাতর যুদ্ধ চলছে কাশ্মীরে। সে যুদ্ধ থামার নাম নিচ্ছে না। কাশ্মিরী যুবকদের মধ্য থেকে বিলুপ্ত হয়েছে। তারই প্রমান, গত ফেব্রেয়ারি (২০১৯) এক কাশ্মিরে যুবকের হাতে ৪০ জন সেনা সদস্যের মৃত্যু।  ভারতের পক্ষে বিজয় সেখানে অসাধ্য হয়ে উঠছে। সে সত্যটি ভারতীয় সমরবিদদের কাছেও দিন দিন স্পষ্টতর হচ্ছে। বিজয় একই ভাবে অসাধ্য হয়ে উঠছে উত্তরপূর্ব সীমান্তের প্রদেশগুলির যুদ্ধেও। ভারতের আরো ভয়, আফগানিস্তানের যুদ্ধেও মার্কিনীদের অনুগত সরকার দ্রুত পরাজিত হতে চলেছে। ফলে তাদের আশংকা, দেশটি পুনরায় দখলে যাচ্ছে তালেবানদের হাতে -যারা পাকিস্তানের মিত্র। ভারতীয়দের ভয়,তালেবানগণ কাবুলের উপর বিজয় অর্জনের পর মনযোগী হবে ভারত থেক কাশ্মীর আজাদ করতে। কাশ্মীরের মজলুল মুসলমানদের দুর্দশায় আফগানিস্তানের সেকুলার নেতৃবৃন্দ নিশ্চুপ থাকলেও ধর্মপ্রাণ তালেবানগণ সেটি সইবে না। বরং তাদের পক্ষে যুদ্ধ লড়াটি তারা ধর্মীয় ফরজ জ্ঞান করবে। সে সাথে ভারতীয়দের আতংক ধরেছে দেশটির উত্তর-পূর্ব সীমান্তের যুদ্ধে চীনের ক্রমঃবর্ধমান আগ্রহ দেখে।

ভারতীয়দের ভয়ের আরো কারণ, উত্তর-পূর্ব সীমান্তের ৭টি প্রদেশ তিনদিক দিয়েই শত্রু দ্বারা ঘেরাও। প্রদেশগুলি মূল ভারতের সাথে সংযুক্ত মাত্র ১৭ মাইল চওড়া শিলিগুড়ি করিডোর দিয়ে। মুরগির ঘাড়ের ন্যায় সরু এ করিডোরটি চীন যে কোন সময় বন্ধ করে দিতে পারে। বন্ধ করতে পারে পূর্ব সীমান্তের বিদ্রোহী বিচ্ছিন্ততাবাদীরাও। ভারতীয়দের সে ভয় ও আতংকের ভাবই প্রকাশ পেয়েছে মি. ভরত ভার্মার প্রবন্ধে। তবে তার লেখায় শুরুতে যেটি প্রকাশ পেয়েছে তা হলো আগ্রাসী ভারতীয়দের নিজ অভিলাষের কথা। তিনি লিখেছেন, “India has the potential to be to Asia, what America is to the world… Possibly India is the only country in Asia that boasts of the potential to occupy the strategic high ground gradually being vacated by the retreating western forces, provided it develops offensive orientation at the political level. অর্থঃ “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে মর্যাদা অর্জন করেছে সমগ্র পৃথিবীতে, ভারতের সামর্থ রয়েছে এশিয়ার বুকে সে অবস্থায় পৌঁছার।… সম্ভবতঃ ভারতই এশিয়ার একমাত্র দেশ যার সামর্থ রয়েছে পিছেহঠা পশ্চিমা শক্তিবর্গের ফেলে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ স্ট্রাটেজিক ক্ষেত্রগুলো দখলের। তবে সেটি সম্ভব হবে যদি দেশটি রাজনীতির ময়দানে আক্রমণাত্মক ছকে নিজেকে গড়ে তোলে।”

কোন বৃহৎ শক্তির একার পক্ষেই এখন আর বিশ্ব-রাজনীতি নিজ নিয়ন্ত্রনে রাখা সম্ভব নয়। একাজ অতি ব্যয়বহুল। আফগানিস্তানকে কবজায় রাখার বিপুল খরচ সোভিয়েত রাশিয়াকে শুধু পরাজিতই করেনি, টুকরো টুকরো করে ফেলেছে। তেমনি ইরাক ও আফগানিস্তান দখলদারির খরচ বিপাকে ফেলেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে। দেশটি আজ চীনের চেয়েও দুর্বল অর্থনৈতিক ভাবে। ফলে বিজয় দূরে থাক, তাদেরকে পিছু হটার রাস্তা খুঁজতে বাধ্য হতে হয়েছে। ভারতের খায়েশ, তারা সে শূণ্যস্থান দখলে নিবে। আর সে জন্য তারা এখন আগ্রাসী স্ট্রাটেজী নিয়ে এগুচ্ছে। অথচ একটি এশিয়ান শক্তি হওয়ার খরচও কম নয়। তবে এমন বাতিক শুধু হঠকারিই করে না, বিবেকশূণ্যও করে। তাই বিশ্বের সর্বাধিক দরিদ্র মানুষের বসবাস ভারতে হলে কি হবে, দেশটির বাতিক উঠেছে শত শত কোটি টাকার অস্ত্র কেনার। এবং প্রস্তুতি নিচ্ছে পাকিস্তান ও চীনের বিরুদ্ধে একটি প্রকান্ড যুদ্ধের। এ জন্যই প্রয়োজন পড়েছে বাংলাদেশের অভ্যন্তর দিয়ে করিডোরের। কারণ, ভারতীয় সমরবিদদের বিবেচনায় শিলিগুরি সরু করিডোরটি আদৌও নিরাপদ নয়। সম্ভব নয় এ পথ দিয়ে কোন যুদ্ধকালীন সময়ে ভারতের পূর্ব সীমান্তে লাগাতর রশদ সরবরাহ। সংকীর্ন এ গিরিপথের উপর ভরসা করে দীর্ঘকাল ব্যাপী কোন যুদ্ধ পরিচালনা অসম্ভব। ভারতীদের আতংক যে এ নিয়ে কতটা প্রকট সে বিবরণও পাওয়া যায় মি. ভার্মার লেখায়। তিনি লিখেছেন, “Beijing is likely to para-drop a division of its Special Forces inside the Siliguri Corridor to sever the Northeast. There will be simultaneous attacks in other parts of the border and linkup with the Special Forces holding the Siliguri Corridor will be selected. All these will take place under the nuclear overhang. In concert Islamabad will activate the second front to unhook Kashmir by making offensive moves across the IB in the plains… Meanwhile the fifth columnists supporting these external forces will unleash mayhem inside. অর্থঃ “বেইজিং উত্তর-পূর্ব অঞ্চলকে বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যে শিলিগুরি করিডোরে এক ডিভিশন স্পেশাল ফোর্সকে প্যারাসুট যোগে নামাতে পারে। শিলিগুরি করিডোরের উপর স্পেশাল ফোর্সের দখলদারি বলবৎ রাখার জন্য সে সময় সীমান্তের অন্যান্য ক্ষেত্রেও একযোগে হামলা হতে পারে। সব কিছুই হবে এমন এক সময় যখন আনবিক বোমার ভয়ও মাথার উপর ঝুলতে থাকবে। এরই সাথে তাল মিলিয়ে কাশ্মীরকে বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যে ইসলামাবাদ কতৃপক্ষ আন্তর্জাতিক সীমান্ত বরাবর দ্বিতীয় রণাঙ্গণ খুলবে। দেশের অভ্যন্তরে একই সময় চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে পঞ্চম বাহিনীর লোকেরা।”

ভারতীয়দের মাথাব্যাথা শুধু শিলিগুড়ি, কাশ্মির বা আভ্যন্তরীন মাওবাদীদের নিয়ে নয়, আতংক বেড়েছে আফগানিস্তানকে নিয়েও। ভয়ের বড় কারণ, একমাত্র ব্রিটেশদের হামলা বাদে দিল্লি অভিমুখে অতীতের সবগুলি হামলা হয়েছে আফগানিস্তানের মধ্য দিয়ে। আর আফগানিস্তানের মধ্য দিয়ে প্রসারিত হল মধ্য এশিয়ার দেশগুলির যাওয়ার রাস্তা। সে আফগানিস্তান আজ দখলে যাচ্ছে পাকিস্তানপন্থি তালেবানদের হাতে! ভারতীয় এটি ভাবতেও ভয় হয়। মি. ভার্মা লিখেছেন, “With Afghanistan being abandoned by the West, Islamabad will craft a strategy to take over Kabul with the help of Islamic fundamentalist groups. The Taliban will initially concentrate on unravelling a soft target like India in concert with Beijing -Islamabad -Kabul or Chinese Communists- Pakistan Army- Irregular Forces axis.” অর্থঃ পশ্চিমা শক্তিবর্গ যখন আফগানিস্তান ছেড়ে চলে যাবে তখন ইসলামাবাদ কর্তৃপক্ষ ইসলামী মৌলবাদীদের সাথে মিলে পরিকল্পনা নিবে কাবুল দখলের। তালেবানগণ তখন বেইজিং-ইসলামাবাদ-কাবুল অথবা চীনা কম্যুনিষ্ট-পাকিস্তান সেনাবাহিনী-অনিয়মিত সৈন্য –এরূপ অক্ষীয় জোটের সাহায্য নিয়ে শুরুতে ভারতের ন্যায় সহজ টারগেটের উপর আঘাত হানতে মনযোগী হবে।”

ভারতীয়দের দৃষ্টিতে বাংলাদেশ ভারতের সীমান্ত প্রতিরক্ষা সীমানার বাইরের কোন দেশ নয়। বাংলাদেশকে সে পরিকল্পিত প্রতিরক্ষা বুহ্যের বাইরের দেশ ধরলে ভারতের জন্য কোন মজবুত ডিফেন্স স্ট্রাটেজী গড়ে তোলাই অসম্ভব। সেটি ভারত হাড়ে হাড়ে বুঝেছে ১৯৬২ সালে যখন চীনের সাথে ভারতের যুদ্ধ হয়। সে যুদ্ধে ভারত চরম ভাবে পরাজিত হয়। চীনের বিশাল বাহিনীর মোকাবেলায় ভারত প্রয়োজনীয় সংখ্যক সৈন্যসমাবেশই করতে পারেনি। কারণ সেরূপ রাস্তাই ভারতের জন্য সে সময় ছিল না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়ে ভারত তখন পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের উপর চাপ দিয়েছিল যাতে পূর্ব পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে সৈন্য সমাবেশের সুযোগ দেয়। কিন্তু আইয়ুব খান সে চাপের কাছে নতি স্বীকার করেননি। কিন্তু একাত্তরে পাকিস্তানের পরাজয়ের পর ভারতের সামনে সম্ভাবনার রাস্তা খুলে যায়। এশিয়ায় প্রভূত্ব বিস্তারে ভারত আজ যে স্বপ্ন দেখছে সেটি মুলতঃ একাত্তরের বিজয়ের ফলশ্রুতিতেই।

 

বৈধতা দেয়া হলো সামরিক হস্তক্ষেপের

কাউকে নিজ ঘরে দাওয়াত দিলে তাকে নিরাপত্তাও দিতে হয়। মেহমানদারির এ এক মহা দায়ভার। নিজ গৃহে অন্যের উপর হামলা হলে সেটি আর তখন আভ্যন্তরীণ বিষয় থাকে না। তাকে বাঁচাতে অন্যরা তখন ঘরে ঢুকার বৈধতা পায়। তাছাড়া শত শত মাইল ব্যাপী করিডোরে শত শত ভারতীয় যানবাহন ও হাজার হাজার ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা দেয়ার দায়ভার কি এতই সহজ? পাকিস্তান, ইরাক, আফগানিস্তান, ইয়েমেনসহ বিশ্বের বহু দুর্বল দেশে নিজেদের নিরাপত্তার দায়ভার মার্কিনীরা নিজ হাতে তুলে নিয়েছে। এখন সেসব দেশে মার্কিনীরা লাগাতর ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। ফলে ভারতকে করিডোর দেয়ার ফলে সে করিডোরে চলমান ভারতীয় যানবাহনের উপর হামলা হলে তখন নিরাপত্তার দায়ভারও ভারতীয়রা নিজ হাতে নিতে চাইবে। তখন বাংলাদেশে ভারতীয় সৈন্য সমাবেশ যেমন বাড়বে, তেমনি বাড়বে তাদের উপর হামলাও। এর ফলে তীব্রতর হবে যুদ্ধও। এভাবেই বাংলাদেশের কাঁধে চাপবে ভারতের যুদ্ধ।

ভারত জানে, করিডোর দিলে ভারতের যুদ্ধে বাংলাদেশকে নামানো সহজতর হবে। কারণ করিডোর দিয়ে চলমান ভারতীয় যানের উপর হামলা রোধে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাহিনী তখন সীমান্ত ছেড়ে কামানের নলগুলি নিজ দেশের জনগণের দিকে তাক করতে বাধ্য হবে। দেশটি তখন পরিণত হবে আরেক ইরাক,আরেক আফগানিস্থান বা কাশ্মীরে। করিডোরে চলমান ভারতীয় যানবাহনের উপর হামলা হলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতীয় হস্তক্ষেপও বাড়বে। বাড়বে ভারতীয় সৈন্য সমাবেশও। কারণ, ভারতীয় যানবাহন ও নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হলে ভারত নিশ্চিয়ই চুপচাপ বসে থাকবে? ভারত তখন বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র আখ্যা দিয়ে নিজেদের যানবাহন ও নাগরিকদের নিরাপত্তা নিজ হাতে নিতে আগ্রহী হবে। যে অজুহাতে মার্কিনী বাহিনী পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ঢুকে যাকে ইচ্ছা তাকে গ্রেফতার করছে বা হত্যা করছে, এবং যখন তখন ড্রোন হামলা করছে, সেটিই যে ভারত বাংলাদেশের অভ্যন্তরে করবে তা নিয়ে কি কোন সন্দেহ আছে? ভারতীয় বিএসএফ যেটি বাংলাদেশের সীমান্তে করছে সেটিই করবে দেশের ভিতরে ঢুকে। ভারতীয় বাহিনীর সে কাজে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার ও তার পশ্চিমা মিত্রগণও যে ভারতকে অকুণ্ঠ সমর্থন দিবে -তা নিয়েও কি কোন সংশয় আছে?  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তো ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে, ভারত দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক শক্তি রূপে দায়িত্ব পালন করুক। অর্থাৎ আফগানিস্তান এবং ইরাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যা কিছু করছে সেটিই ভারত বাংলাদেশ এবং পাশ্বর্ব্তী অন্যান্য দেশে পালন করুক। ভারত একই ভাবে মার্কিনীদের পাশে দাড়িয়েছে আফগানিস্তানে। বরং ভারতের আব্দার, মার্কিন বাহিনী যেন পুরাপুরি আফগানিস্তান ত্যাগ না করে।

ভারতের বিদেশ নীতিতে সম্প্রতি আরেক উপসর্গ যোগ হয়েছে। ভারতের যে কোন শহরে বোমা বিস্ফোরণ হলে তদন্ত শুরুর আগেই ভারত সরকার পাকিস্তানীদের পাশাপাশি বাংলাদেশীদের দায়ী করে বিবৃতি দিচ্ছে। যেন এমন একটি বিবৃতি প্রচারের জন্য পূর্ব থেকেই প্রস্তুত থাকে। কিন্তু এ অবধি এমন কাজে বাংলাদেশীদের জড়িত থাকার পক্ষে আজ অবধি কোন প্রমান তারা পেশ করতে পারিনি। এমন অপপ্রচারের লক্ষ্য একটিই। করিডোরসহ ভারত যে সুবিধাগুলো চায় সেগুলি আদায়ে এভাবে প্রচন্ড চাপসৃষ্টি করা। ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতির এটিই হলো এখন মূল স্ট্রাটেজী। লক্ষ্যনীয় হল, সেদেশে বার বার সরকার পরিবর্তন হলেও বাংলাদেশের প্রতি তাদের এ নীতিতে কোন পরিবর্তন নেই। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য বিপদ বাড়বে যদি এ লড়ায়ে বালাদেশ ভারতের পক্ষ নেয়। পণ্যের পাশাপাশি সৈন্য ও সামরিক রশদ তখন রণাঙ্গণে গিয়ে পৌঁছবে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে। ফলে পূর্ব এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে প্রতিপক্ষ রূপে চিহ্নিত হবে বাংলাদেশ। আজ অবধি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যারা একটি তীরও ছুঁড়েনি তারাই পরিণত হবে পরম শত্রুরূপে। তখন সসস্ত্র হামলার লক্ষ্যে পরিণত হবে বাংলাদেশের সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনা। তখন অশান্ত হয়ে উঠবে দেশের হাজার মাইল ব্যাপী উত্তর ও পূর্ব সীমান্ত। অহেতুক এক রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে বাংলাদেশ। কথা হলো, যে গেরিলা যোদ্ধাদের মোকাবিলা করতে গিয়ে বিশাল ভারতীয় বাহিনীই হিমসিম খাচ্ছে সেখানে বাংলাদেশের মত দেশ কি সফলতা পাবে? তখন বাংলাদেশের সম্ভাব্য বিচ্ছিন্নতাবাদীরা বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা বিদ্রোহীগণ বন্ধু ও নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পাবে এ এলাকায়। এ কারণেই বাংলাদেশের জন্য অতিশয় আত্মঘাতি হলো ভারতের জন্য ট্রানজিট দান।

 

খাল কাটা হলো কুমির আনতে

খাল কাটলে কুমির আসাবেই। সেটি শুধু স্বাভাবিকই নয়, অনিবার্যও। অথচ বাংলাদেশ সরকার সে পথেই এগুলো। করিডোর দেয়াতে আগ্রাসী শক্তির পদচারণা হবেই। এখন শুধু মালবাহী ভারতীয় ট্রাকই আসবে না, সৈন্যবাহী যানও আসবে। তাদের বাঁচাতে ড্রোন হামলাও হবে। বাংলাদেশ প্রকৃত অর্থেই তখন ভারতের এক অধিকৃত দেশে পরিনত হবে। ফলে আজকের আফগানিস্তান ও কাশ্মীরের যে অধিকৃত দশা সেটি বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ঘটবে। এবং সে পরাধীনতাকে স্বাধীনতা বলার মত লোকের অভাব যেমন আফগানিস্তান ও কাশ্মীরে হয়নি, তেমনি বাংলাদেশেও হবে না। “ফারাক্কার পানিচুক্তির ফলে বাংলাদেশ লাভবান হয়েছে”, “টিপাই মুখ বাঁধ দেয়াতে সুরমা, কুশিয়ারা ও মেঘনায় পানি থৈ থৈ করবে” এবং “ভারতকে করিডোর দিলে হাজার হাজার কোটি টাকার অর্থ লাভ হবে” এমন কথা বলার লোক কি বাংলাদেশে কম? তারাই সেদিন ভারতের পক্ষে তাদের গলা জড়িয়ে প্রশংসা গীত গাইবে।

আরো লক্ষ্যণীয় হলো, বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী এ এলাকাটিতে ভূ-রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিবর্তন হচ্ছে অতি দ্রুতগতিতে। মেঘালায়, মিজোরাম ও ন্যাগাল্যান্ড রাজ্যগুলি ইতিমধ্যেই পরিণত হয়েছে খৃষ্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্যে। খৃষ্টান ধর্ম জোরে সোরে প্রচার পাচ্ছে পাশ্ববর্তী প্রদেশগুলিতেও। ফিলিপাইনের পর সমগ্র এশিয়ায় এটিই এখন সর্ববৃহৎ খৃষ্টান অধ্যুষিত এলাকা। তাছাড়া ভারতীয় সংখ্যাগরিষ্ট হিন্দুদের আচরণে এ ধর্মমতের অনুসারিরাও অতি অতিষ্ট। উগ্র হিন্দুদের কাছে হিন্দু ধর্ম ছাড়া অন্য ধর্মে দীক্ষা নেওয়া এক অমার্জনীয় অপরাধ। ফলে অতি জোরদার হচেছ খৃষ্টান অধ্যুষিত এলাকা নিয়ে একটি অখন্ড খৃষ্টান রাষ্ট্র নির্মানের ধারণা। পশ্চিমা খৃষ্টান জগতে এমন রাষ্ট্রের পক্ষে আগ্রহ দিন দিন বাড়বে সেটিই স্বাভাবিক। ইন্দোনেশিয়া থেকে পূর্ব তিমুরকে আলাদা করার পিছনে যে যুক্তি দেখানো হয়েছিল সে যুক্তির প্রয়োগ হবে ভারতের বিরুদ্ধেও। ফলে খৃষ্টান জগত এবং চীনের ন্যায় বৃহৎ শক্তিবর্গও তখন নিজ নিজ স্বার্থে স্বাধীনতাকামীদের পক্ষ নিবে।

এ অবস্থায় ভারতের পক্ষ নেওয়ার খেসারত দিতে হবে অন্যান্য আঞ্চলিক ও বৃহৎ শক্তির বিরাগ-ভাজন হয়ে। বাংলাদেশের জন্য সেটি হবে আত্মঘাতি। কিন্তু ভারতের জন্য চরম সুখের বিষয়টি হল, বাংলাদেশের মানুষের গলায় এ ঘাতক ফাঁসটি তাকে নিজে পড়িয়ে দিতে হচ্ছে না। দেশবাসীর গলায় সে ফাঁসটি পড়ানোর দায়িত্ব নিয়েছে বাংলাদেশের সরকার নিজে। ভারতীয়দের সৌভাগ্য যে, সে কাজে তারা একটি সেবাদাস সরকারও পেয়ে গেছে। এ মুহুর্তে ভারত সরকারের কাজ হয়েছে, সে পরিকল্পিত ফাঁসটি এ নতজানু সরকারের হাতে তুলে দেওয়া। একাত্তরের যুদ্ধের ফসল যেভাবে তারা নিজেরা ঘরে তুলেছিল,তারা একই কৌশল নিয়ে এগুচ্ছে এবারও। একাত্তরের যুদ্ধ শেষে তারা বাংলাদেশীদের উপহার দিয়েছিল স্বাধীনতার নামে ভারতের পদানত একদলীয় একটি বাকশালী সরকার, রক্ষিবাহিনীর নৃশংসতা, “ভিক্ষার তলাহীন ঝুড়ি” এবং ভয়ানক দুর্ভিক্ষ। উনিশ শ’ সত্তরের নির্বাচন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে হলেও দেশবাসীর ভাগ্যে সে গণতন্ত্র জুটেনি। সে নির্বাচনে যারা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন তার বাংলাদেশীদের ভবিষ্যত নিয়ে একাত্তরে একদিনের জন্যও কোন বৈঠকে বসেননি। তারা স্বাধীনতার ঘোষনা যেমন দেননি, তেমনি একাত্তরের যুদ্ধের ঘোষণা ও সে যুদ্ধের পরিচালনাও করেননি। সবই করেছে ভারত সরকার, ভারতীয় পার্লামেন্ট, ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থা ও সেনাবাহিনী। মুজিবামলে গণতন্ত্রকেই বধ করা হয়েছিল শেখ মুজিবের স্বৈরাচারি বাকশালী শাসনকে স্থায়ীরূপ দিতে। একই ভাবে গণতন্ত্র অকার্যকর করা হয়েছে ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর  থেকে; এবং আজও সে ধারা চলছে। বিরোধী দলীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের গ্রেফতার এবং তাদের উপর অত্যাচার, এমন কি সংসদ সদস্যদের রাজপথে পিটানো এখন রাজনীতির সংস্কৃতিতে পরিণত করা হয়েছে। অধিকৃত রাষ্ট্রে গণতন্ত্র থাকে না; বরং যা বিকট ভাবে শোভা পায় তা হলো গোলামীর শিকল। সে গোলামীরই আলামত হলো বাংলাদেশে ভিতর দিয়ে ভারতের করিডোর। ২৬/০৩/২০১৯