চুড়ান্ত বিপর্যয়ের মুখে বাংলাদেশ

দেশ অধিকৃত দুর্বৃত্তদের হাতে

বাংলাদেশের ব্যর্থতা দ্রুত বিপর্যয়ের শেষ প্রান্তের দিকে ধাবিত হচ্ছে। দেশে একটি সরকার আছে। সংসদ ও প্রশাসন আছে। বিশাল পুলিশ বাহিনী, সেনাবাহিনী এবং বিচার ব্যবস্থাও আছে। কিন্তু যা নাই তা হলো সুশাসন, সুবিচার ও আইনশৃঙ্খলা। দেশ যে আজ কতটা বিপর্যয়ের শিকার সেটা বোঝার জন্য কি বড় রকমের কান্ডজ্ঞানের প্রয়োজন আছে? উনানের পাশে দাড়িয়ে আগুনের উত্তাপ বুঝতে কি বিদ্যাবুদ্ধি লাগে? অন্ধ,বধির ও বোবারাও সেটি টের পায়। জখম পেকে গেলে ফিনকি দিয়ে যেমন পুঁজ বেরুয়,তেমনি পচনের আলামত বেরিয়ে আসছে বাংলাদেশের সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতির গভীর থেকে। মুজিব আমলে ব্যর্থতা এতটাই প্রচণ্ডতা পেয়েছিল যে বাংলাদেশ বিশ্বময় পরিচিতি পেয়েছিল ভিক্ষার তলাহীন ঝুড়ি রূপে। মুজিবামল শেষ হলেও বাংলাদেশে তার সুস্থ্যতা আর কোন কালেই ফিরে পায়নি। যে বীজ তিনি রোপন করেছিলেন এবং যে লিগ্যাসী তিনি ছেড়ে গেছেন তা এখন বটবৃক্ষের ন্যায় বিশাল আকার ধারণ করেছে। ফলে দেশ ৫ বার রেকর্ড করেছে পৃথিবীর সবচেয়ে দূর্নীতিগ্রস্ত দেশরূপে। যে রোগ মুজিবামলে শুরু হয়েছিল সেটি না সারিয়ে এ অবধি তার উপর বার বার শুধু চুনকামই হয়েছে।আসল রোগ সারানোর ব্যবস্থা হয়নি। দেশে এখন শুধু বড় রকমের গযব আসতেই বাঁকি।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা, দেশটি অধিকৃত দুর্বৃত্তদের হাতে। সে দখলদারিটি শুধু রাস্তাঘাট ও  অফিস-আদালতে নয়,বরং দেশটির প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে। তবে সমস্যা হলো এসব ভয়ানক দুর্বৃত্তদের গায়ে আঁচড় দেবার সামর্থ কারো নাই। এদের হাতেই অসহায় ভাবে জিম্মি হলো দেশের অসহায় জনগণ। ইতিহাসে এভাবেই নানা রাষ্ট্র বার বার অধিকৃত হয়েছে। নমরুদ, ফিরাউন, হিটলার, মুসোলিনি, স্টালিনের রাজ্যে তারাই ছিল সে সময়ের সবচেয়ে ভয়ানক দুর্বৃত্ত। কিন্তু তাদের কোন বিচার হয়নি। তাদের বরং নতশিরে মান্য করতে বাধ্য হতো জনগণ। ফিরাউনের মত দুর্বৃত্তকে মিশরবাসীদের ভগবান বলতে হতো। কিন্তু ফিরাউনের বিচারে অপরাধী চিহ্নিত হয়েছিলেন তিন যাদুকর যারা হযরত মূসা (আঃ)র সাথে প্রতিযোগীতায় নেমে বুঝতে পেরেছিল হযরত মূসা (সাঃ) তাদের মত যাদুকর নন বরং আল্লাহর মহান নবী। আর সেটি বুঝে তাঁরা সাথে সাথে হযরত মূসা (সাঃ)র আল্লাহর উপর ঈমান এনেছিলেন। কিন্তু ঈমান আনার কারণে তাদের হাত-পা গুলি একটার পর একটা কাটা হয়েছিল। বিচারের নামে এটাই হলো কাফেরদের রীতি।

মুজিবামলে বাংলাদেশে মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় দুষমন কোন সন্ত্রাসী দল ছিল না,বরং ছিলেন খোদ শেখ মুজিব। তিনিই সকল রাজনৈতিক দল ও সকল বিরোধী পত্রিকা নিষিদ্ধ করে একদলীয় বাকশাল গঠন করেছিলেন। যে কোন সভ্যদেশেই গণতন্ত্রের দুষমনকে মানবতার সবচেয়ে বড় দুষমন বলা হয়। কারণ, অর্থ বা মালামাল ছিনতাইয়ের চেয়ে অনেক বড় ছিনতাই হলো জনগণের অধিকার ছিনতাই। কারণ তাতে ছিনতাই হয় কথা বলার স্বাধিনতা, লেখার স্বাধীনতা, সংগঠিত হওয়ার স্বাধীনতা এবং ধর্মপালনের স্বাধিনতা। অর্থাৎ অসম্ভব করে তোলা হয় প্রকৃত ঈমানদার রূপে বেঁচে থাকা ও বেড়ে উঠাটি। তাই জাতি কখনোই চোর-ডাকাত বা সন্ত্রাসীদের ছিনতাইয়ে বিপর্যয়ে পড়ে না, ধ্বংসও হয় না। বরং অতি বিপর্যয়ে পড়ে স্বৈরাচারি শাসকদের কারণে। তাই মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ছিনতাইকারি বা সন্ত্রাসী হলো স্বৈরাচারি শাসকগণ। এরা দখলদারি প্রতিষ্ঠা করে এমনকি সাধারণ জনগণের চিন্তার ভূবনেও। এমন দখল জমানোর কারণেই ফিরাউনের ন্যায় দুর্বৃত্তরা জনগণের কাছে নিজেদেরকে ভগবান রূপে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিল। একই ভাবে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় স্বৈরাচারিটি তার অনুগত মানসিক গোলামদের দ্বারা চিত্রিত হচ্ছে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালী রূপে। স্বৈরাচারি শাসকেরা স্বাধীন মানুষের এতটাই দুষমন যে,বাকস্বাধীনতা,রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং ধর্ম পালনের স্বাধীনতা নিয়ে তাদের বাঁচতে দিতে রাজী নয়। তাই তাদের শাসনামলে চোর-ডাকাতদের জেলে তোলা না হলেও কারারুদ্ধে করা হয় মানবাধিকার নিয়ে বাঁচতে চাওয়া মানুষদের। এরাই দেশকে দূর্নীতির শিখরে পৌছে দেয়। বাংলাদেশের আজ  যে দুরাবস্থা তার মূল কারণটি দেশের ভূগোল বা জলবায়ু নয়। দরিদ্র কৃষক-শ্রমিক-তাঁতীও নয়। বরং দুর্বৃত্ত শাসক ও তাদের সহচরগণ যাদের তান্ডব শুরু হয়েছিল শেখ মুজিবের স্বৈরাচারি শাসন থেকে।

 

আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ছিনতাই

বাংলাদেশ সরকারের অপরাধ অনেক। তবে তাদের সবচেয়ে বড় অপরাধটি হলো,তারা ছিনতাই করেছে মহান আ্ল্লাহর সার্বভৌম অধিকার। সে অধিকারটি এ পৃথিবী পৃষ্ঠে শরিয়ত প্রতিষ্ঠার। এই একটি মাত্র অপরাধই আল্লাহর আযাব নামিয়ে আনার জন্য যথেষ্ট। তবে বাংলাদেশে সে আযাব যে আসছে না তা নয়। আসছে নানারূপে। আল্লাহর আযাব কি শুধু জলোচ্ছ্বাস বা ভূমিকম্প? দুর্বৃত্ত শাসকদের দুর্বিসহ দুঃশাসন কি কম আযাব? তাছাড়া মানুষ পথে ঘাটে যেভাবে গুম হচ্ছে, লাশ হচ্ছে, ধর্ষিতা হচ্ছে এবং ছিনতাই হচ্ছে –সেগুলিকেও কি আল্লাহর রহমত বলা যাবে? এমন কঠিন আযাবই বা আর ক’টি দেশে আছে?

আল্লাহর অধিকার ছিনতাই করেছিল ফিরাউন ও নমরুদ। পৃথিবী পৃষ্টে এটাই হলো সবচেয়ে বড় ছিনতাই,সে সাথে সবচেয়ে বড় অপরাধও। অন্য অপরাধগুলো শুরু হয় এ অপরাধের পথ ধরে। বিশ্বের সকল স্বৈরাচারিগণ এ পথ ধরেই অগ্রসর হয়। মহান আল্লাহতায়ালা মানুষকে সার্বভৌম করে সৃষ্টি করেননি, সৃষ্টি করেছেন তাঁর খলিফা বা প্রতিনিধি করে। সার্বভৌম হওয়ার অর্থ নিজ খেয়ালখুশি মাফিক নতুন আইন রচনার অধিকার এবং সে সাথে আদালতের আঁওতা থেকে নিজেকে মূক্ত রাখার অধিকার। ফিরাউন-নমরুদ যেমন নিজের ইচ্ছামত আইন দিয়েছে,তেমনি অন্যদের বিচারও করেছে। সে সাথে নিজেদেরকে আদালতের উর্ধ্বে রেখেছে। সার্বভৌম হওয়ার অর্থ তাই আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত সীমারেখাকে অতিক্রম করা। ইসলামের পরিভাষায় সীমানা অতিক্রমের এ বিদ্রোহ হলো কুফরি। এমন বিদ্রোহীদেরকেই ইসলামে কাফের বলা হয়।

অথচ খেলাফতের ধারণা বাদ দিয়ে নিজেদেরকে বিচারের বাইরে রাখাকে বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট,প্রধানমন্ত্রী,সংসদের স্পিকার এবং আদালতের বিচারকগণ নিজেদের সাংবিধানিক অধিকার রূপে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাই তাদের অপরাধ নিয়ে দেশে  কোন বিচার বসে না। বাংলাদেশে এবং সে সাথে আধুনিক গণতন্ত্রে এটাই হলো সবচেয়ে বড় অবাধ্যতা ও পাপ। কথা হলো, যে গণতন্ত্রে মহান রাব্বুল আলামীনের শরিয়তি আইন প্রতিষ্ঠার সার্বভৌম অধিকারটি ছিনতাই হয় সে গণতন্ত্রে বিশ্বাস রাখাই তো কুফারি। কুফরির এ পাপ কি পুতুল পুঁজার চেয়ে কম? আল্লাহর শরিয়ত ছাড়া ন্যায় বিচার সম্ভব –এমনটি বিশ্বাস করলে কি ঈমান থাকে? সেটি সম্ভব হলে পবিত্র কোরআন নাযিলের প্রয়োজনটি কি? এমন গণতন্ত্রে ক্ষমতাশীল দলের সন্ত্রাসী,ছিনতাইকারি ও খুণিদেরই বিচার থেকে দূরে রাখা হয়। তাই পঞ্চাশের দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদে সংসদ সদস্যদের হাতে ডিপুটি স্পিকার নিহত হলেও তা নিয়ে কোন পুলিশী তদন্ত হয়নি,তা নিয়ে বিচারও বসেনি। সংসদের বুকে সেদিন জঙ্গলের অরাজকতা নেমে এসেছিল।

শেখ মুজিবের আমলে পুলিশী নিরাপত্তায় থাকা অবস্থায় নিহত হয়েছিলেন সিরাজ শিকদার। সিরাজ শিকদারের মৃত্যুর পর সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি বলেছিলেন, “কোথায় আজ সিরাজ শিকদার?” অর্থাৎ কিভাবে সিরাজ শিকদার মারা হয়েছিলেন তা শেখ মুজিব জানতেন এবং তাঁর মৃত্যুতে তিনি যে আনন্দিত হয়েছিল সেটিও সেদিন গোপন থাকেনি। ফলে সে হত্যাটি আত্মহত্যা ছিল না, বরং তাতে সুস্পষ্ট একটি মটিভ ছিল। যে কোন সভ্যদেশে এমন হত্যার বিচার হয়। ইসলামে এমন বিচার না করাটাই মহা পাপ। কিন্তু বাংলাদেশে সে বিচার হয়নি। বিচার হয়নি বর্তমান রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের। যদিও বিপুল অর্থ পাওয়া গেছে সেই গাড়ীতে যে গাড়ীতে তিনি স্বয়ং যাচ্ছিলেন।

অথচ যে ইসলামে বাংলাদেশের মুসলমানেরা বিশ্বাসী সে ইসলামে প্রতিটি অপরাধীর বিচার করা ফরয। সে বিচার কারো মুখের দিকে তাকিয়ে হয়, বিচার হয় অপরাধের দিকে তাকিয়ে। ইসলাম শুধু নামায-রোযা-হজ-যাকাতের বিধান দেয় না,হুকুম দেয় ন্যায় বিচারেরও। সে জন্য শরিয়তি বিধানও দেয়। তাই শরিয়তি বিধান পালন ছাড়া ইসলাম পালন হয়না। তাই ইসলামে মানুষের সার্বভৌম হওয়ার ধারণাটি যেমন নাই, তেমনি নাই কোন শাসক,সাংসদ বা বিচারককে বিচারের উর্দ্ধে রাখার সুযোগ। ন্যায়-বিচার শুধু যে রোজহাশরের বিষয় তা নয়, ইহকালের বিষয়ও। বিচার না হলে অপরাধীদের ধরা পড়ার সুযোগটি কোথায়? দেশে শান্তিই বা প্রতিষ্ঠিত হয় কীরূপে? তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো,বাংলাদেশের সরকার, সংসদ সসদস্যগণ ও আদালতের বিচারকগণ নিজেদেরকে বিচার থেকে নিরাপদ দূরত্বে রাখলেও তারা অন্যদের বিচার নিয়ে প্রচণ্ড আগ্রহী। এসব বিচারে তাদের মূল আগ্রহটি ন্যায়-বিচার নিয়ে নেই,বরং বিপক্ষকে ঘায়েল করা নিয়ে। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার খাতিরে একসময় যাদেরকে রাস্তায় লগিবৈঠা নিয়ে পেটাতো, এখন তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধী হওযার অভিযোগে এনে যুদ্ধের ৪০ বছর পর আদালতে তুলেছে।

বাংলাদেশে বিচারব্যবস্থা যে ভয়ানক ভাবে বিপন্ন সেটি এখন আর কোন গোপন বিষয় নয়। বাংলাদেশের কৃষি,শিল্পে যত না রোগ, তার চেয়ে বেশী রোগ এখন দেশের আইন-আদালতে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে দেশ যে রকম বিপর্যয়ের মুখে সেটি কোন চোর-ডাকাতদের সৃষ্ট নয়,দেশের দুর্বৃত্তকবলিত প্রশাসনেরও নয়। বরং সেটি আদালতের সৃষ্টি। যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির অধীনে পর পর কয়েকটি নির্বাচন হলো এবং দেশ ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হতে যাচ্ছিল তা দেশের আদালত এক কলমের খোঁচায় অস্থিতিশীল করে দিল। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় দুর্যোগটি সৃষ্টি হয়েছে এ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যু নিয়ে।পাকিস্তানের রাজনীতিকে পঞ্চাশের দশকে সবচেয়ে বড় অস্থিতিশীল করেছিল তৎকালীন প্রধান বিচারপতি জাস্টিস মুনির। নির্বাচিত গণপরিষদ বাতিলের স্বৈরাচারি হুকুমকে তিনি আইনসিদ্ধ বলেছিলেন। অথচ করাচী হাইকোর্ট গণপরিষদ ভেঙ্গে দেয়াকে বেআইনী বলে রায় দিয়েছিল। জাস্টিস মুনিরের সে রায়ের মধ্য দিয়ে সেদিন যে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়েছিল,পাকিস্তান আর কোন কালেই সে অস্থিতিশীলতা থেকে মুক্তি পায়নি। অথচ গণপরিষদ তখন শাসনতন্ত্র তৈরীর অনেক কাছাকাছি পৌছে গিয়েছিল। পাকিস্তানের সকল চোরডাকাত ও অন্যান্য অপরাধীরা মিলেও দেশটির এতবড় ক্ষতি করিনি, যা করেছে আদালতের এ রায়টি। বাংলাদেশও কি আজ সেদিকেই ধাবিত হচ্ছে?

তত্ত্বাবধাক সরকারের বিরুদ্ধে রায়টি দিয়েছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারাপতি জনাব খায়রুল হক। তবে খবর হলো,ইনিই সেই বিচারপতি যিনি প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে ১০ লক্ষ টাকা ত্রান নিয়েছেন।(সূত্র- দৈনিক আমার দেশ,৩০/৫/১১)। তিনি যে কতটা অসহায় তার প্রমাণ হলো প্রধানমন্ত্রীর ত্রান-তহবিল থেকে নেয়া দশ লক্ষ টাকার এ ভিক্ষা। ভিখারী মানুষকে দিয়ে মসজিদের ইমামতি চালানোর বিধান ইসলামে নেই। তাকে কোন দায়িত্বশীল পদে বসানোরও কোন নির্দেশ নাই। কারণ নবীজী (সাঃ) বলেছেন দারিদ্র্যতা মানুষকে কুফরি তথা আল্লাহর হুকুমের অবাধ্যতার কাছে পৌঁছে দেয়। বেড়া ভেঙ্গে ফসল খাওয়ার তাড়নাটি অন্য ছাগলের চেয়ে ক্ষুদার্ত ছাগলেরই বেশী। তেমনি অবস্থা ভিখারী মানুষেরও। তাই যে ব্যক্তি ত্রাণতহবিল থেকে অর্থ নেয় তাকে কি দেশের প্রধান বিচারক করা যায়? তাতে কি নিরপেক্ষ বিচার আশা করা যায়? অথচ বাংলাদেশে সেটিই হয়েছে।

রহস্যময় হলো, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের পূর্ণ রায়টি এখনও প্রকাশিত হয়নি।রায়টি ঘোষণার ১৫ দিনের মাথায় ২০১১ সালের ১৭ মে বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক প্রধান বিচারপতির পদ থেকে অবসরে যান। এখনও এ মামলার লিখিত রায় প্রকাশ হয়নি। এরই মধ্যে বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয় বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক গত ২৯ মার্চ রায় লেখা শেষ করে আপিল বিভাগে জমা দিয়েছেন। এখনও রায়টি প্রকাশিত না হওয়ায় তিনি বিস্মিত হয়েছেন বলে প্রকাশিত সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে। এ প্রেক্ষিতে সুপ্রিমকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী সাবেক বিচারপতি টিএইচ খান সাংবাদিকদের বলেন, খায়রুল হকের এ বক্তব্যে আইনজীবী হিসেবে আমরা বিস্মিত হয়েছি। কারণ, সাংবিধানিক পদে যারা দায়িত্ব পালন করেন, পদে বসার আগে তাদের একটি শপথ নিতে হয়। দায়িত্ব পালনকালীন তারা শপথ অনুযায়ী কাজ করতে বাধ্য। পদ থেকে অবসরে যাওয়ার পর আর শপথের বাধ্যবাধকতা থাকে না। অবসরে যাওয়ার পর সাধারণ নাগরিকের কাতারে চলে আসেন। শপথের আওতা থেকে বের হয়ে সাধারণ নাগরিকে পরিণত হওয়া কোনো ব্যক্তি রায় লিখতে পারেন না। বিচরপতি এবিএম খায়রুল হক যেদিন চাকরি থেকে অবসরে গেছেন সেদিন থেকে সাধারণ নাগরিক। তিনি আর শপথের মধ্যে নেই। এ অবস্থায় এক বছর ধরে নিজের মতো করে রায় লিখেছেন। এ রায় কারও কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তার লেখা রায়ের সঙ্গে অন্য কোনো কর্মরত বিচারপতি একমত বা দ্বিমত করেও স্বাক্ষর দিতে পারেন না। বিচারপতি টিএইচ খান বলেন, আমাদের সংবিধান, আপিল বিভাগের রুলস কোথায়ও বলা নেই অবসরের পর বিচারপতিরা রায় লিখতে পারবেন এবং রায়ে স্বাক্ষর করতে পারবেন। অবসরের পর কেউ রায় লিখলে বা রায়ে স্বাক্ষর করলে সেটা বৈধ হবে না। রাজনৈতিক গরজে অনেক কিছুই রাতারাতি করা হয়। শেখ মুজিব তাই কয়েক মিনিটে বাংলাদেশের বহুদলীয় গণতান্ত্রিক সংবিধানকে পাল্টিয়ে একদলীয় বাকশালী সংবিধানে পরিণত করেছিলেন। একই কাজ করেছেন সাবেক বিচারপতি জনাব এবিএম খায়রুল হক। তাড়াহুড়ায় তিনি পুরা রায়টিও লেখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। এই হলো বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার হাল।

 

বিচারকদের বিরুদ্ধে সংসদ স্পিকার

আদালতের বিচারকদের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন সংসদের স্পিকার জনাব আব্দুল হামিদ। আদালতের বিরুদ্ধে জনগণকে তিনি প্রতিরোধ গড়ে তোলার হুমকিও দিয়েছেন। সড়ক ভবন নিয়ে উচ্চ আদালতের একটি রায়কে কেন্দ্র করে ২৯ মে জাতীয় সংসদের স্পিকার অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ বলেন,“আদালত নিরপেক্ষ ও স্বাধীন। কিন্তু দেশের মানুষের বিচারের ক্ষেত্রে বছরের পর বছর লেগে যাবে আর নিজেদের বিষয় বলে বিচার বিভাগ ঝটপট সিদ্ধান্ত নেবেন,এটা ভালো দেখায় না। কেবল নিজেদের বিষয়টি দেখলে সরকার কীভাবে চলবে? সরকারকেও সহযোগিতা করতে হবে।” (সূত্রঃ আমার দেশ, ১০/০৬/১২)। বুঝা যাচ্ছে স্পিকার জনাব অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ আদালতের বিচার নিয়ে খুশি নন। আদালতের বিরুদ্ধে তাঁর অভিযোগ,আদালত নিজের বিষয়ের বিচারগুলো খুব তড়িঘড়ি করে,কিন্তু জনগণের বিরুদ্ধে বিচারগুলোর নিষ্পত্তিতে বছরের পর বছর লাগিয়ে দেয়। আদালতের বিচারকদের বিরুদ্ধে এ এক বিরাট অভিযোগ। এমন অভিযোগ বিচারকদের ন্যায়পরায়না, নিরপেক্ষতা ও কাণ্ডজ্ঞানের বিরুদ্ধে। বিচারকদের শুধু নিজেদের বিষয়টি দেখলে চলে না, নিরপেক্ষতার সাথে দেখতে হয় অন্যদের বিষয়গুলো। এমন সামর্থ বিচারক হওয়ার জন্য ন্যূনতম সামর্থ, সেটি না থাকলে কারো পক্ষে আদালতে বিচারক রূপে বসার অধিকার থাকে না। বিচারকগণের যে সে যোগ্যতা নাই সে অভিযোগ এনেছেন দেশের সংসদের স্পিকার এ্যাডভোকেট জনাব আব্দুল হামিদ।

ছাগলের গলায় রশি বাঁধতে হয়।নইলে সে সীমা অতিক্রম করে এবং অপরের ক্ষেত খায়। মানুষও ছাগলের চেয়ে কম অবাধ্য নয়। সুযোগ পেলেই সে সীমা অতিক্রম করে। সেটি যেমন সাধারণ মানুষের বেলায় তেমনি দেশের প্রেসিডেন্ট, মন্ত্রী,সংসদ সদস্য এবং আদালতের বিচারকদের বেলায়। তাই মন্ত্রীর গাড়ীতে যেমন লক্ষ লক্ষ টাকা পাওয়া যায়,তেমনি দেশের প্রধান বিচারপতির তহবিলে ত্রাণতহবিল থেকে নেয়া ১০ লক্ষ টাকা পাওয়া যায়। মুজিবের মৃত্যুর পর তার গৃহেও তাই বিপুল অর্থ পাওয়া গিয়েছিল। রাশি রাশি অর্থ পাওয়া গিয়েছিল প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট এরশাদের সরকারি গৃহেও। প্রেসিডেন্ট,প্রধানমন্ত্রী ও বিচারকদের বিচারের উর্দ্ধে রাখলে এমনটিই হয়। ইসলামে তাই কাউকে যেমন সার্বভৌম রাখা হয়নি,তেমনি বিচারের উর্ধ্বেও রাখা হয়নি। বরং কোন মানুষকে এরূপ সার্বভৌম রাখাটা আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে বড় বিদ্রোহ।

 

স্পিকারের বিরুদ্ধে বিচারক

আদালতের বিরুদ্ধে স্পিকার আব্দুল হামিদের অভিযোগটি যে গুরুতর সেটি বুঝা যায় বিচারপতি শামসুদ্দিন আহমদ চৌধুরীর প্রতিক্রিয়ায়। তিনি জনাব আব্দুল হামিদের মন্তব্যের কঠোর নিন্দা করেছেন। বিচারকদের বিরুদ্ধে এমন কথা কোন সাধারণ নাগরিক বললে ইতিমধ্যে হয়তো তাকে জেলে উঠতে হতো। দৈনিক আমার দেশের সম্পাদককে এর চেয়ে কম গুরুতর কথা বলায় কয়েকমাস জেলের ভাত খেতে হয়েছে।এবার যিনি বলেছেন তিনি যে শুধু স্পিকার তাই নন,সরকারি দলের প্রভাবশালী সদস্যও। স্পিকারের বক্তব্য গোচরে আনলে বিচারপতি শামসুদ্দিন আহমদ চৌধুরী যা বলেন তার সারসংক্ষেপ হলো,এটা হলো রাষ্ট্রদ্রোহিতা। স্পিকারের বিরুদ্ধে তিনি অভিযোগ এনেছেন,সুপ্রিমকোর্টের বিরুদ্ধে তিনি জনগণকে উসকানি দিয়েছেন এবং তাঁর বক্তব্য আদালত অবমাননাকর। তিনি একথাও বলেছেন, স্পিকার তাঁর পদের মর্যাদা রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছেন,ওই পদে থাকার অধিকার তাঁর নেই। স্পিকারের মন্তব্য আনপ্রিসিডেন্টেড। উক্ত বিচারক স্পিকারকে নসিহত করেছেন,তিনি একজন আইনজীবী,তার আর অ্যাডভোকেট পদ ব্যবহার করা উচিত নয়। এবং বলেছেন,স্পিকারের বিচার বিভাগ সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। স্পিকার তার অজ্ঞতা দেখিয়েছেন। একজন স্পিকার এত অজ্ঞ হতে পারেন, তা আমরা ভাবতে পারি না। স্পিকারের বক্তব্য শুধু অজ্ঞতাই নয়,তার বক্তব্য অমার্জনীয়। স্পিকার সংসদের প্রতীক,ওই প্রতীক হতে হলে যোগ্যতা থাকতে হয়। পড়ালেখা জানতে হয়। এটা হলো অল্পবিদ্যা ভয়ঙ্কর। (সূত্রঃ আমার দেশ, ১০/০৬/১২)। এখানে প্রশ্ন হলো,আইন-আদলত নিয়ে জ্ঞানের ব্যাপারে সংসদের স্পিকার যদি মুর্খ রূপে চিত্রিত হন এবং সেটি দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারক কর্তৃক,তবে তিনি বা কীরূপে সদস্যরূপে স্পিকার রূপে বহাল থাকেন? তারও কি পদত্যাগ করা উচিত নয়? সংসদ দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান,সে প্রতিষ্ঠানের প্রধান যদি আদালতের বিচারে অযোগ্য লোক হয়,তবে কি দেশ চলে?

 

তলির বেড়াল লাফিয়ে বের হয়েছে

অবশ্য বিচারপতি শামসুদ্দিন আহমদ চৌধুরীর বক্তব্যের পর প্রচণ্ড বিক্ষুব্ধ হয়েছেন সংসদ সদস্যরা। রাগের মাথায় অতি মিথ্যাবাদীরাই অনেক সময় সত্য কথা বলে। আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যদের ক্ষেত্রে সেটিই ঘটেছে। এবার আওয়ামী লীগের থলির বিড়াল লাফিয়ে বেড়িয়ে এসেছে। আওয়ামী লীগের হাতে আদালত যে দারুন দলীয় করণের শিকার হয়েছে সেটি অন্যরা এতকাল বলে এসছে। এখন সেটি আওয়ামী লীগের এমপিরাই বলা শুরু করেছেন। তারা বলেন,শামসুদ্দিন আহমদ চৌধুরী মানিক হাইকোর্টের বিচারপতি হয়েছেন আওয়ামী লীগ সরকারের দয়ায়। কোনো লিখিত পরীক্ষা ও যোগ্যতা ছাড়াই তিনি বিচারপতি হয়েছেন। আওয়ামী লীগ সরকার গত আমলে এ লোককে যোগ্যতা ছাড়া এবং পরীক্ষা ছাড়া হাইকোর্টের বিচারক নিয়োগ করেছে। এ ব্যক্তি বিচারক হওয়ার পর সারাদেশের সচিব,আইজিসহ যত ভদ্রলোক আছেন তাদের সামান্য কারণে হাইকোর্টে ডেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রেখে বেইজ্জতি করেন। এ বিচারপতি সেই ব্যক্তি-যিনি বিমানে সামনের আসনে বসার জন্য বিমানের এমডিকে হাইকোর্টে ডেকে বেইজ্জতি করেছেন। এই ব্যক্তি মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত। তিনি কোনো সুস্থ মানুষ নন।(সূত্রঃ আমার দেশ, ১০/০৬/১২)। আরো বলেছেন, শামসুদ্দিন মানিক ভাগ্যবান। আমাদের আবদুল মতিন খসরু আইনমন্ত্রী থাকাকালে তাকে বিচারক করেছেন। বিএনপি তাকে কনফার্ম করেনি। আমরা এবার ক্ষমতায় আসার পর তাকে কনফার্ম করেছি। তিনি আজ আমাদের বিরুদ্ধে,পার্লামেন্টের বিরুদ্ধে মন্তব্য করছেন। আরো বলেন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময় আমরাই স্লোগান তুলেছিলাম, “বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা আজ জেগেছে সেই জনতা”। এ স্লোগানে প্রতিরোধ গড়ার পর আগরতলা মামলার প্রধান বিচারপতি লুঙ্গি পরে পালিয়ে গিয়েছিলেন। তারা বলেন, শামসুদ্দিন মানিক একজন স্যাডিস্ট। তিনি মানুষকে অপমান করে মজা পান। তা না হলে একজন ট্রাফিক পুলিশ, যিনি হয়তো তাকে দেখেননি, স্যালুট না দেয়ায় গাড়ি থেকে নেমে তাকে কানে ধরে উঠবস করিয়েছেন। ইত্যাদি। (সূত্রঃ আমার দেশ, ১০/০৬/১২)। কথা হলো, আওয়ামী লীগ নেতাদের এসব কথা যদি সত্য হয় তবে বিচারপতি শামসুদ্দিন মানিক মানসিক ভাবে অতি অসুস্থ্য ব্যক্তি। এমন অসুস্থ্যতা তো কলেরা-টাইফয়েডের মত হঠাৎ হয় না। নিশ্চয়ই এ রোগে তিনি বহু কাল ধরে ভুগছেন। আদলতে এমন ব্যক্তি স্থান পেল কি করে? এ অপকর্মটি কি খোদ আওয়ামী লীগের নয়?

যে বিচারপতির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ নেতাদের এত অভিযোগ,তারাই তাকে যোগ্যতা যাচাই না করে দেশের উচ্চ আদালতের বিচারপতি রূপে নিয়োগ দিয়েছিল। কারণ, জনাব শামসুদ্দিন মানিক ছিলেন বেশীর লবির লোক,লন্ডনে এসে তিনি ঘাদানিকের সভায় যোগ দিয়েছেন। আওয়ামী লীগ নেতার তখন বাহবা দিয়েছে। ন্যায় বিচারে যে আওয়ামী লীগের সামান্যতম আগ্রহ নাই তার প্রমাণ এই শামসুদ্দিন মানিক। দেশের প্রশসনে ও আদালতে তাদের বসানো এমন মানিকদের সংখ্যা কি কম? আদালতকে অতীতে তারাই লাঠি দেখিয়েছে।জনাব নাসিম মন্ত্রী থাকা কালে হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে বস্তিবাসী ও তাদের বস্তি পাঠিয়েছিলেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা সত্য ছিল সে কথা এখন তারা নিজেরাই বলে। সে ষড়যন্ত্রের সুষ্ঠবিচারের অধিকার সে সময়ের আদালতের ছিল। অথচ সে মামলার বিচারকদের বিরুদ্ধে হুমকী দেয়া হয়েছিল এবং সে হুমকীর ফলে বিচারক পালিয়েছিল সে কথাও তারা আজ বলছে। ন্যায় বিচার নিয়ে আওয়ামী লীগের ভীতি যে কতটা বিকট তাদের এরূপ কথাবার্তা কি সেটাই প্রমাণ করে না?

কথা নিছক শামসুদ্দিন মানিককের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের ক্ষোভ নিয়ে নয়,বরং ন্যায় বিচারের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান নিয়ে। প্রশ্ন তাদের মানসিকতা নিয়ে। তারা বিচারপতি শামসুদ্দিন মানিকের বিরুদ্ধে কথা বললেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে দেয়া বিচারপতি খায়রুলের হকে রায় নিয়ে কথা বলেন না। সে রায় যেহেতু তাদের পক্ষে গেছে তারা তাই তাঁর রায়কে ঐতিহাসিকও বলেছেন। আওয়ামী লীগের লক্ষ্য দেশের ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা যেমন নয় তেমনি সুশাসন প্রতিষ্ঠাও নয়। তাদের লক্ষ্য যে কোন ভাবে ক্ষমতা দখল। কিন্তু সেটিও এখন বিপদে পড়েছে। কারণ, নিজেদের অবাধ্য ও ক্ষুদার্ত নেতাকর্মীগণই তাদের ফসল লুটেখাওয়া শুরু করেছে। তাদের রোগটা তাই বাইরের নয়,নিতান্তই ভিতরের। দেহে পচন ধরলে তখন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোও আর ঠিক মত কাজ করেনা। আওয়ামী লীগ সে ভয়ানক পচনের শিকার। তাই দিন দিন দলের বিড়ম্বনা বাড়ছে। তবে যে জীবাণূ তারা বহন করছে সেটির মহামারি থেকে কি দেশ বাঁচবে? ১০/০৬/১২

 




গণতন্ত্রের কবর ও সন্ত্রাসে আওয়ামী মনোপলি

নগ্ন বেশে সরকার

নির্বাচন নিয়ে শেখ হাসিনার ভাবনা নাই। ভাবনা নাই জনগণের কাছে জবাবদেহীতা নিয়েও। জনগণ কি ভাববে বা আন্তর্জাতিক মহলে দেশ কতটা কলংকিত হবে -সেদিকেও সামান্যতম ভ্রুক্ষেপ নাই। মুজিবের আমলে দেশ তলাহীন ভিক্ষার ঝুলি রূপে পৃথিবী ব্যাপী প্রচার পেয়েছিল। কিন্তু তাতে মুজিব ও তার অনুসারিদের একটুও লজ্জা হয়নি। বরং সে অপমান নিয়ে আজও  আওয়ামী বাকশালীদের অহংকার। লোকলজ্জা লোক পেলে কোন কুকর্মতেই বিবেকের পক্ষ থেকে বাধা থাকে না। নির্বাচনের নামে প্রহসন, যৌথবাহিনী ও অস্ত্রধারি দলীয় গুন্ডাদের দিয়ে শত শত বিরোধী নেতাকর্মীদের গুম,হত্যা ও নির্যাতনে শেখ হাসিনা ও দলীয় কর্মীদের বিবেকে সামান্যতম দংশনও হয় না। যেন দেশে কিছুই হয়নি।মহান নবীজী (সাঃ) তাই লজ্জাকে ঈমানের অর্ধেক বলেছেন। এর অর্থ দাঁড়ায়, যার লজ্জা নাই তার ঈমানও নাই। আর ঈমান না থাকলে তার জন্য ফাসেক, জালেম বা কাফের হওয়া সহজ হয়ে যায়।

সরকার জনগণকে গাছপালা বা গরু-ছাগলের চেয়ে বেশী কিছু ভাবছে না। একই রোগ সব স্বৈরাচারির। তাদের ধারণা, গরু-ছাগলের জন্মই তো জবাই হওয়ার জন্য। তাই হিটলার ও স্টালিনের ন্যায় স্বৈরাচারিরা গ্যাস চেম্বার বা ফায়ারিং স্কোয়ার্ডে দিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছে। ফিরাউন বনিইসরাইলের প্রতিটি পুরুষ শিশুকে হত্যা করতো। হাসিনাও তেমনি নিরপরাধ মানুষদের ক্রস ফায়ারে দিচ্ছে। একই কাজ করেছে তার পিতা শেখ মুজিব। তারা জানে,গাছপালা ও গরু-ছাগলের সামনে সন্ত্রাস করলে বা ঘরবাড়িতে আগুন দিলে প্রতিবাদ উঠে না। কাপড় খুললেও ধিক্কার দেয় না।দেশ যেন গভীর জঙ্গল। জঙ্গলে লাশ পড়লে বিচার হয়না। তেমনি শত শত লাশ পড়লেও বাংলাদেশে কারো বিচার হয় না,শাস্তিও হয় না। শাপলা চত্বরে এত নিরীহ মুসল্লির প্রাণ গেল,কিন্তু কোন খুনির গায়ে কি কোন আঁচড় লেগেছে? একদিনের জন্যও কি কারো কারাবাস হয়েছে? হাসিনা ও তার বাকশালী সহকর্মীরা শুধু গণতন্ত্রকেই কবর দেয়নি,কবর দিয়েছে নিজেদের বিবেককেও।চোরডাকাত, খুনি ও পতিতারা বিবেক ও লজ্জা-শরম নিয়ে রাস্তায় নামে না। বিবেক ও লজ্জা-শরম নিয়ে রাজনীতিতে নামেনি শেখ হাসিনা ও তার আওয়ামী সহযোগীরা। একই রূপ অবস্থা ছিল হাসিনার পিতা মুজিবের। সামান্যতম বিবেক ও লজ্জা-শরম থাকলে কি মুজিবের হাতে গণতন্ত্র নিহত হত? প্রতিষ্ঠিত হত কি বাকশালী স্বৈরাচার? নিহত হত কি ৪০ হাজার মানুষ? স্বাক্ষরিত হত কি ভারতের সাথে ২৫ সালা দাসচুক্তি? দেশ হারাতো কি বেরুবাড়ী? মুজিবের আমলে ৩০-৪০ হাজার মানুষ নিহত হলেও সে হত্যার অপরাধে একদিনের জন্যও কারো জেল হয়নি। ইতিহাসের আরেক শিক্ষা,নানা প্রকার জীবজন্তুর ন্যায় বিবেকহীন মনুষ্যরূপী জীবের সংখ্যা কোন কালেই কম ছিল না। ফলে ফিরাউন-নমরুদদের ন্যায় হিংস্র স্বৈরাচারিদের ভগবান বলার মত বিবেকহীন লোকের অভাব কোন কালেই হয়নি।তাই অভাব নেই শেখ মুজিব ও হাসিনার ন্যায় স্বৈরাচারিদের পদসেবা নেয়ার মত লোকেরও। যেদেশের কোটি কোটি মানুষ শাপশকুন ও গরুবাছুরকে দেবতা বলে পুজা দেয় সে দেশের বহু কোটি মানুষ এসব স্বৈরাচারিদের নেতা বা পিতা বলবে -তাতেই বা বিস্ময়ের কি? এজন্যই তো মুজিব ও হাসিনার জনসভায় লক্ষ লক্ষ মানুষের জনসমুদ্র হয়।

 

বিবেকধ্বংসী নাশকতা

প্রাণনাশী শুধু রোগজীবাণূই নয়,বরং ভয়ংকর নাশকতা বিবেকহীন রাজনীতিবিদদের। রোগজীবাণূ প্রাণ নাশ ঘটায়,আর বিবেকহীন রাজনীতিবিদেরা বিনাশ ঘটায় বিবেকের। কারণ সেটি তাদের জন্য অপরিহার্য। কারণ বিবেক বিনাশের কাজটি যথার্থ ভাবে না হলে জনগণের কাতার থেকে উপাসনা জুটে না। যুগে যুগে নমরুদ-ফিরাউনরা তাই সুস্থ্য বিবেকবোধ ও সঠিক ধর্মচিন্তা নিয়ে মানুষকে বেড়ে উঠতে দেয়নি। হযরত ইব্রাহীম (আঃ)কে নমরুদ তাই আগুনে নিক্ষেপ করেছিল। আর ফিরাউন ধাওয়া করেছিল হযরত মূসা (আঃ)এর পিছনে। স্বৈরাচারের জেলে যেতে হয়েছে ইমাম আবু হানিফা (রহঃ),ইমাম মালেক (রহঃ),ইমাম হাম্বলী (রহঃ)র মত মহান ব্যক্তিদের। মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনের বিরুদ্ধে স্বৈরাচারি শাসকেরা এভাবেই যুগে যুগে চ্যালেঞ্জ খাড়া করেছে। ইসলাম নিয়ে বাঁচতে হলে স্বৈরাচার নির্মূল তাই অনিবার্য হয়ে পড়ে। এজন্যই ইসলামে বড় ইবাদত হলো স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে জিহাদ।এ জিহাদে প্রাণ গেলে মহান আল্লাহতায়ালা নিহত ব্যক্তিকে মৃত্যুহীন জান্নাত দেন।

বিবেকহীন রাজনীতিবিদদের কারণেই নৈতিক মহামারি লেগেছে বাংলাদেশের প্রশাসন,পুলিশ ও আদালতে। ফলে আজ থেকে ৫০ বছর আগের পাকিস্তান আমলে রাজনীতি,আদালত, প্রশাসন ও পুলিশে যে বিবেকবোধ দেখা যেত সেটি আজ কল্পনাই করা যায় না। ভয়াবহ বিবেকহীনতার কারণে পুলিশ,র‌্যাব ও বিজিবী এখন আর মিছিল থামাতে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে না। লাঠিচার্জও করে না।বরং সরাসরি গুলি চালায়।লাঠিচার্জ বা গ্রেফতারে নয়,লাশ ফেলাতেই তাদের আনন্দ।আরো আনন্দ পায় বিরোধীদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিতে বা বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে দিতে। ফলে বেশুমার মানুষ আজ  যত্রতত্র লাশ হচ্ছে। বাংলাদেশের পুলিশ ও র‌্যাব পরিণত হয়েছে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ খুনি বাহিনীতে। একমাত্র মিশর ও সিরিয়ার সেনাবাহিনী ও পুলিশের সাথেই তাদের তুলনা চলে। পাকিস্তান আমলের ২৩ বছরে পুলিশের হাতে ২৩ জন মানুষও নিহত হয়নি। ১৯৫২ সালের ২১ই ফেব্রেয়ারিতে মাত্র ৩ জন মারা গিয়েছিল। অথচ সেটিই ইতিহাস হয়ে গিয়েছিল।তাতেই সরকার পরিবর্তন হয়েছিল।৩ জনের হত্যাকে নিয়ে পাকিস্তানের বাঙালীরা সেদিন থেকে “আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রেয়ারি,আমি কি ভূলিতে পারি” বলে গান গাওয়া শুরু করেছিল। আজও  সে গান গা্ওয়া শেষ হয়নি।অথচ আজ এক দিনে ৩ জন নয়,৩ শত খুন হয়। সমগ্র দেশ এখন শাপলা চ্ত্বর। কিন্তু তা নিয়ে আওয়ামী ঘরানার আব্দুল গাফফারদের গলায় আজ  আর বেদনাশিক্ত গান আসে না। বরং আসে আনন্দ-উৎসব। আব্দুল গাফফারদের হাতে রচিত হয় খুনি হাসিনার পক্ষে অসংখ্য প্রশংসাগীত। একটি দেশে বিবেকের মৃত্যূ যে কতটা ভয়ানক হতে পারে এ হলো তার নজির।

১৯৫২ সালের ২১ই ফেব্রেয়ারিতে মাত্র ৩ জন মারা যাওয়ার পর তৎকালীন পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক মুখ্যমন্ত্রী জনাব নুরুল আমীন নিহত পরিবারের কাছে মাফ চেয়ে দুঃখ ভারাক্রান্ত গলায় বেতার ভাষণ দিয়েছিলেন।তিনি নিজে যে পুলিশকে গুলিচালনোর হুকুম দেননি এবং সে খুনের সাথে যে তিনি নিজে জড়িত ছিলেন না,সে কৈফিয়তটিও জনগণের সামনে বার বার দিয়েছিলেন। অথচ আজ  পুলিশ,র‌্যাব ও বিজিবীর হাতে শত শত মানুষ খুন হচ্ছে। কিন্তু সে খুন নিয়ে হাসিনার মুখে কোন অনুশোচনা নেই। বরং আছে প্রচন্ড আত্মতৃপ্তি। সে আত্মতৃপ্তি নিয়ে “লাশরা পুলিশের তাড়া খেড়ে উঠে দৌড়িয়েছে” সে কৌতুকও তিনি শোনান। এক খুনের বদলে তিনি ১০ খুনের হুমকি দেন। তেমনি এক অপরাধি চেতনা নিয়ে শাপলা চত্বরের শহীদদের লাশ ময়লার গাড়িতে তোলা হয়ছে। গণতন্ত্রের হায়াত মওত নিয়েও হাসিনার সামান্যতম ভাবনা নেই। সে ভাবনা হাসিনার পিতা শেখ মুজিবেরও ছিল না।মুজিব তাই বহুদলীয় গণতন্ত্রকে কবরে পাঠিয়ে একদলীয় বাকশাল কায়েম করেছিল।এবং সকল বিরোধী দলকে নিষিদ্ধ ও সকল বেসরকারি পত্রপত্রিকার অফিসে তালা ঝুলিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার উৎসব করেছিল।

 

সংকট লজ্জাহীনতার

চোর-ডাকাত ও পতিতাদের ন্যায় গণতন্ত্রের শত্রুদের হায়া-শরম থাকে না। ফলে কাপড় খুলে তারা রাস্তায় নামতে পারে। সামান্য লজ্জাশরম থাকলে মানুষ কি এমন অপরাধে নামে? সব যুগে ও সব দেশেই একই অবস্থা। গণতন্ত্র হত্যা,পত্রিকার অফিসে তালা লাগানো ও বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের হত্যায় যেমন মুজিব ও হাসিনার লজ্জা হয়নি,তেমনি হচ্ছে না মিশরের স্বৈরাচারি শাসকদের।লজ্জাহীনতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে,মিশরের সামরিক বাহিনী নিজেই আগামী নির্বাচন লড়তে যাচ্ছে। অন্য কোন বেসামরিক ব্যক্তিকে নয়,সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল সিসিকে তারা প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী খাড়া করেছে। সমগ্র দেশ এখন সেনা বাহিনীর হাতে অধিকৃত। বিরোধী দলের নেতাকর্মীগণ এখন কারারুদ্ধ। তারা শুধু বেশরমই নয়,কত বড় বেপরওয়া যে, সেনাবাহিনীর প্রধান সিসি ও তার সমর্থকগণ এরূপ সামরিক অধিকৃতিকে বলছে তাহরির স্কোয়ার থেকে শুরু হওয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবেরর ধারাবাহিকতা। ড. মুরসীর আমলে নাকি গণতন্ত্র হাইজ্যাক হয়েছিল,এখন তারা পথে এনেছে। মিথ্যাচার আর কাকে বলে! জেনারেল সিসির পক্ষে প্রচার চালাতে বাধ্য করেছে সে দেশের সকল টিভি চ্যানেল ও পত্রপত্রিকাগুলোকে।সেনাবাহিনীর কাছে যে কোন নিরপেক্ষ প্রচারনাই অসহ্য। প্রচারনা হতে হবে শুধু তাদের পক্ষে। তাই আল -জাজিরার সাংবাদিকদের সন্ত্রাসী বলে জেলে তুলেছে। নিরেট তাঁবেদার ও পাহারাদারে পরিণত করেছে দেশের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও বিচারকগণ। সেনাবাহিনী এক রাতে কায়রোর এক ময়দানে হাজারের বেশী নিরস্ত্র মানুষ হত্যা করেছে। অথচ এরপরও নিজেদেরকে তারা গণতন্ত্রি বলছে।এবং এরূপ নৃশংস হত্যাকান্ডকে বলছে আইনের শাসন। অপর দিকে জেলে তুলেছে ও হত্যা মামলার আসামী বানিয়েছে সেদেশের ইতিহাসের সর্বপ্রথম নির্বাচিত প্রেসেডেন্ট ড.মুরসীকে। সন্ত্রাসী দল বলে নিষিদ্ধ করেছে মুরসীর দল ইখওয়ানুল মুসলিমুনকে। এরূপ স্বৈরাচারি কুকর্মে জেনারেল সিসির লজ্জা-শরমে একটুও বাধেনি। যেমন বাধছে না শেখ হাসিনারও। ফলে তার কাছে ৫ই জানুয়ারির ভূয়া নির্বাচন গণ্য হচ্ছে গণতন্ত্রের বিজয় রূপে। শতকরা ৫ জন ভোট না দিলে কি হবে,সে নির্বাচনকে বৈধ বলে আরো ৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পক্ষে যুক্তি পেশ করছে।

 

সন্ত্রাসে মনোপলি

সব স্বৈরাচারি শাসকেরাই সন্ত্রাস,লুটতরাজ ও খুন-খারাবীতে নিজেদের নিরংকুশ মনোপলি চায়। এককালে একই রূপ মনোপলি ছিল ব্রিটিশ,স্পানিশ,ডাচ ও পর্তুগীজসহ সকল সাম্রাজ্যবাদী উপনিবেশিক শক্তির। অধিকৃত দেশগুলিতে নিজেদের সে হিংস্র মনোপলিকে বলতো আইনের শাসন। ভারত যখন তাদের হাতে অধিকৃত,এ দেশের নাগরিকদেরকে নিজ বাড়ীতে তীর-ধনুক,তলোয়ার রাখাকেও তারা সন্ত্রাস বলতো। সে অপরাধে তাদেরকে জেলেও তুলতো। আর নিজেরা নির্বিচারে লক্ষ লক্ষ মানুষকে খুন করতো। খুন করে লাশকে বাজারে,নদীর ঘাটে বা লোকালয়ে উঁচু খুঁটিতে লটকিয়ে রাখাটি তাদের কৌশল ছিল। লক্ষ্য, সাধারণ মানুষকে ভীতু সন্ত্রস্ত করা। তাদের সন্ত্রাসে আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ানগণ প্রায় নির্মূল হয়ে গেছে। প্রায় নির্মূল হয়ে গেছে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের আদিবাসীগণ। বাংলাদেশের বুকে সন্ত্রাসে একই রূপ মনোপলি হলো আওয়ামী লীগের। ফলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একই ভাবে শুরু হয়েছে রাজনৈতীক শত্রু নির্মূলকরণ। ডাকাত সর্দার যেমন ডাকাতীর স্বার্থে অন্যান্য ছোটখাটো ঢাকাতদের সাথে নেয়,শেখ হাসিনাও তেমনি এরশাদের ন্যায় আরো কিছু স্বৈরাচারিকে সাথে নিয়েছে।

সন্ত্রাসীরা কখনোই নিরস্ত্র মানুষের কাকুতি-মিনতি বা নসিহতে কান দেয় না। এমন কি নবী-রাসূলদের মত মহান ব্যক্তিদের নসিহত্ও তাদের উপর কোন আছড় করেনি।তাদের নজর তো নিরস্ত্র নরনারীর পকেট ও ইজ্জতের দিকে। জনগণকে নিরস্ত্র ও প্রতিরোধহীন দেখাতেই তাদের আনন্দ। তারা বরং নিরস্ত্র মানুষের অসহায় অবস্থাকে উপভোগ করে। তারা তো চায় সারা জীবন তাদের সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম থাকুক। নমরুদ-ফিরাউনের ন্যায় মুজিব যেমন সেটি চেয়েছিল, হাসিনাও সেটি চায়। সেটি শুধু হাজার হাজার নয়,লক্ষ লক্ষ মানুষের রক্তপাতের মধ্য দিয়ে হলেও। কাশ্মীরে লক্ষাধিক মানুষের লাশ পড়লেও ভারতীয় স্বৈরাচার দখলদারি সেখানে ছাড়েনি। ভারত তার অনুগতদের দিয়ে আজ যে অধিকৃতি বাংলাদেশের উপর প্রতিষ্ঠা করেছে সেটি শুধু রাজপথের কিছু মিটিং-মিছিল,কিছু ধর্মঘট ও কিছু অবরোধের মধ্য দিয়ে শেষ হওয়ার নয়। সিরিয়ার হাফেজ আল আসাদ বা ক্যাম্বাডিয়ার সাবেক কম্যুনিস্ট শাসক পলপটের চেয়ে হাসিনা কম ক্ষমতা লিপ্সু নয়। পলপট সরকারের হাতে সে দেশের সিকি ভাগ মানুষ নিহত হয়েছিল। নিহতদের সংখ্যা ছিল ২০ লাখের বেশী। অপর দিকে স্বৈরাচারি আসাদের হাতে ইতিমধ্যে নিহত হয়েছে ১ লাখ ৩০ হাজার নিরস্ত্র মানুষ।

 

লড়াই জান্নাত ক্রয়ে

স্বৈরাচারিরা কখনোই কোন দেশে একাকী আসে না। শুধু গণতন্ত্র হত্যা ও চুরি-ডাকাতিই তাদের একমাত্র হত্যা নয়। তাদের বড় অপরাধ যেমন মানব হত্যা,তেমনি ধর্ম ও সভ্যতার হত্যা। ফিরাউন,নমরুদের ন্যায় ইসলামের বড়শত্রু চিরকালই ছিল স্বৈরাচারিরা।আজ যেমন সেটি মিশরে,তেমনি সিরিয়া ও বাংলাদেশে। বাংলাদেশে সে হত্যার পর্বটি শুরু হয়েছে মাত্র। তাই হাসিনার স্বৈরাচারি সরকার যতই দীর্ঘায়ু পাবে ততই বাড়বে খরচের বিশাল অংক। একারণেই কোন সভ্য মানুষ এরূপ স্বৈরাচারি সরকারকে মেনে নিতে পারে না। সমগ্র ইতিহাসে মানবের জানমালের সবচেয়ে বড় খরচটি বনের হিংস্র পশু তাড়াতে হয়নি। বরং সেটি হয়েছে মানুষ রূপী এ হিংস্র জীবদের তাড়াতে। মহান আল্লাহতায়ালা দ্বীনের এ শত্রুদের তাই পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট বলেছেন। তাদের নির্মূলে নবীজীর আমলে শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবাকে শহীদ হতে হয়েছে।

 

যে কোন নির্মান কাজই বিপুল বিনিয়োগ চায়। উচ্চতর সভ্যতা নির্মানের চেয়ে ব্যয়বহুল নির্মান কাজ মানব ইতিহাসে আর কিছু আছে কি? এ কাজ তো মুসলমানদের বিশ্বশক্তি রূপে দাঁড় করানোর। ঈমানদার তো সে বিপুল ব্যয়ের মধ্য দিয়েই জান্নাত ক্রয় করে। মহান আল্লাহতায়ালা এর চেয়ে সহজ কোন রাস্তা মু’মিনের জন্য খোলাও রাখেননি। বাংলাদেশে বর্তমান লড়াই তাই স্রেফ গণতন্ত্র বাঁচানোর নয়,বরং মানুষের জানমাল ও ইসলাম বাঁচানোর।মু’মিনের জীবনে এ লড়াই জান্নাত ক্রয়ের। দেশে দেশে মুসলমানদের মাঝে সে লড়াই আজ তীব্রতর হচ্ছে।বহু গাফেল মুসলমান সেটি না বুঝলেও শয়তানি শক্তি সেটি বুঝতে পেরেছে।হাসিনার পিছনে ভারতসহ সকল কাফের শক্তির বিনিয়োগ তো সে কারণেই এত অধিক। ৮/২/১৪

 

 




কেন এত ষড়যন্ত্র বাংলাদেশের বিরুদ্ধে?

খেলা কি হাসিনার হাতে?

বাংলাদেশের রাজনীতির খেলা এখন আর শেখ হাসিনার হাতে নেই। রাজনীতির ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কোনকালেই চাকর-বাকরের হাতে থাকে না। এমনকি একাত্তরেও আওয়ামী রাজনীতি শেখ মুজিব বা দলের হাতে ছিল না। সেটিই সব সময়ই ছিল তার মনিব দিল্লির শাসকচক্রের হাতে। মুজিব রাজনীতির খেলা খেলেছে স্রেফ ভারতের শাসকচক্রের অনুগত সেবাদাস রূপে। সে কাজটি মুজিব বাংলাদেশ সৃষ্টির বহু পূর্ব থেকেই করে আসছিল এবং সেটি চালিয়ে গেছে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্টে মৃত্যু অবধি। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ যে শতভাগ সত্য ছিল সেটি আওয়ামী লীগ নেতা ও সে মামলার অপর আসামী লে.কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) শওকত আলী এবং অন্যন্যরাও স্বীকার করেছেন।ফলে ১৯৬৯ সালে গণআন্দোলনের চাপে পাকিস্তান সরকার মুজিবের বিরুদ্ধে আানা মামলা তুলে নিতে বাধ্য হলেও মনিবের পক্ষ থেকে অর্পিত মিশন থেকে মুজিব এক ইঞ্চিও সরেনি। তাই আওয়ামী রাজনীতির ড্রাইভিং সিটে সবসময়ই ছিল দিল্লির শাসকচক্র। তাই মুজিব ১৯৭১য়ের ২৫শে মার্চ পাকিস্তানের জেলে গেলেও আওয়ামী লীগের ভারতসেবী রাজনীতির গাড়ি এক দিনের জন্যও থেমে থাকেনি। মুজিবের মুখ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ারও প্রয়োজন পড়েনি। সে গাড়ি ভারতের কাঙ্খিত লক্ষ্যের দিকে চলাটি অব্যাহত রেখেছে। পাকিস্তান সরকার অনেক দেরীতে হলেও সেটি বুঝেছিল। তাই ১৯৭১ য়ের সেপ্টম্বরের দিকে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার প্রশ্নে রেফারেন্ডামের প্রস্তাব দিয়েছিল। আওয়ামী লীগ ১৯৭০ সালের নির্বাচনটি লড়েছে প্রাদেশিক সায়ত্বশাসনের প্রতিশ্রুতিতে পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র তৈরীর দাবী নিয়ে। তাই সে নির্বাচনের আওযামী লীগের বিজয়টি স্বাধীনতার পক্ষের দলীল হতে পারে না। তাই একটি রিফারেন্ডামের প্রস্তাব দিয়ে ইয়াহিয়া খান দূত পাঠায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির কাছে। কিন্তু ইন্দিরা সে প্রস্তাব অস্বীকার করে। কারণ, সোভিয়েত রাশির সাহা্য্যের প্রতিশ্রুতি পেয়ে ভারতের লক্ষ্য শুধু পাকিস্তান ভাঙ্গা ছিল না। লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের মেরুদন্ড ভাঙ্গাও। তেমন একটি ধ্বংসাত্মক অভিসন্ধির কারণে যুদ্ধ ও যুদ্ধপরবর্তীকালে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতীয় সৈন্যদের প্রবেশ ও লুটতরাজ অপরিহার্য ছিল। এমন একটি লক্ষ্য নিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের যুদ্ধের প্রস্তুতি সেপ্টম্বরের মধ্যেই বহুদূর এগিয়ে নিয়েছিল। ফলে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার প্রস্তাব মেনে নিলে সেটি সম্ভব হতো না। ভারত বুঝেছিল, উপমহাদেশের মুসলিম শক্তি গুড়িয়ে দেয়ার এবং সে সাথে তাদের বেইজ্জতি করার এটিই মোক্ষম সময়। মুসলিম শক্তির এক ডানা ছিল যেমন পাকিস্তান, অপর ডানাটি ছিল বাংলাদেশ। ইন্দিরার পরিকল্পনা ছিল বাংলাদেশকে একটি তলাহীন ভিক্ষার ঝুলি বানানো। দেশকে একটি দুর্ভিক্ষ উপহার দেয়া। সীমান্ত-বাণিজ্যের নামে দেশের সীমান্ত বিলুপ্ত করা।

 

কেন এত ষড়যন্ত্র বাংলাদেশের বিরুদ্ধে?
১৯৭১এর যুদ্ধে বড় ক্ষতিটা পাকিস্তানের হয়নি। সেটি হয়েছে বাংলাদেশের। যুদ্ধের কারণে পাকিস্তান তলাহীন ভিক্ষার থলি হয়নি। সে দেশে দুর্ভিক্ষ নেমে আসেনি। লক্ষ লক্ষ মানুষ পাকিস্তানে না খেয়ে মারা যায়নি। পাকিস্তানের কোন বস্তিতে জালপড়া বাসন্তিও সৃষ্টি হয়নি। অথচ দুর্ভিক্ষ এসেছে এবং জালপড়া বাসন্তি সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশে। কারণ, বাংলাদেশের মাটিতে ভারত শুধু যুদ্ধ করেনি, ভয়ানক দস্যুবৃত্তিও করেছে। প্রশ্ন হলো, বাঙালী মুসলমানদের বিরুদ্ধে ভারতের কেন এত আক্রোশ? ইন্দিরার অজানা ছিল না, ১৯৪৬ ও ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের পক্ষে মূল যুদ্ধটি করাচী বা লাহোরে হয়নি। সে যুদ্ধটি লড়া হয় অবিভক্ত বাংলার রাজধানি কলকাতায়। সেটি ১৯৪৬ সালের ২৩ আগষ্ট মুসলিম লীগের ডাইরেক্ট এ্যাকশন দিবসে। কলকাতার গড়ের মাঠের মিছিল থেকে ফেরার পথে বহু হাজার বাঙালী মুসলিম সেদিন হিন্দু গুন্ডাদের হাতে প্রাণ দিয়েছিল। সে রক্তের বন্যায় ভেসে য়ায় কংগ্রেসের অবিভক্ত ভারত সৃষ্টির স্বপ্ন। শতকরা ৯৬% বাঙালী মুসলমান পাকিস্তানের পক্ষে ভোট দেয়। অথচ পাঞ্জাব, সিন্ধু ও সীমান্ত প্রদেশের মুসলমানগণ পাকিস্তান প্রকল্পের পক্ষে এরূপ সমর্থণ দেয়নি।

বাঙালী মুসলমানদের মেরুদন্ড চূর্ণ করা ও তাদের শাস্তি দেয়ার ভারতীয় অভিপ্রায়টি ছিল অতি চাতুর্যপূণ্য ও প্রতিহিংসাপরায়ণ। সেটি শুধু সীমাহীন লুন্ঠনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি তলাহীন ভিক্ষার ঝুলি বানানো নয়। স্রেফ একটি ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ উপহার দেয়াও নয়। সেটি শুধু বাংলাদেশের সীমান্ত বিলোপও নয়্। বরং সেটি ছিল, যে ঢাকা শহরে পাকিস্তানের জন্মদাতা মুসলিম লীগের জন্ম হয়েছিল সে শহরের বুকে সমগ্র মুসলিম ইতিহাসের সবচেয়ে কলংকজনক নাটকটি মঞ্চস্থ করা। সেটি বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্রের হাজার হাজার সৈন্যের আত্মসমর্পণের নাটকযা লজ্জাজনক ছিল শুধু পাকিস্তানের জন্যই নয় সমগ্র বিশ্বের মুসলমানদের ন্যও। ১৯৭১য়ে ১৫ই আগষ্ট তারিখেই পাকিস্তানের সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণের যুদ্ধ প্রস্তুত ছিল। কিন্তু দিল্লির শাসকচক্র চাচ্ছিল পাকিস্তানের পরাজয় ও বেইজ্জতির মহড়াটি বিশাল আকারে হোক। চাচ্ছিল, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মাঝের সৃষ্ট ঘৃনাটি গভীরতর হোক। তেমন একটি নাটকের টির জন্যই নির্ধারিত হয় ঢাকার রেসকোর্স ময়দান। সেখানে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করা হয় একজন ইহুদীর কাছে। উল্লেখ্য তখন ভারতের ইস্টার্ন কমান্ডের চিফ অব স্টাফ ছিলেন মেজর জেনারেল জে এফ আর জেকব। তিনি ছিলেন একজন ইহুদী। ভারতের সে কুৎসিত মানসিকতার বর্ণনা দিয়েছেনে ভারতীয় সাংবাদিক কুলদীপ নায়ার ঢাকার ডেইলি স্টার পত্রিকায় Beyond the Lines শিরোনামায প্রকাশিত তাঁর নিবন্ধে। মিস্টার নায়ার লিখেছেন, একাত্তরের ১৫ ডিসেম্বরই পাকিস্তান সেনাবাহিনী ভারতীয় বাহিনীর কাছে অস্ত্রসমর্পণের জন্য প্রস্তুত থাকার পরও এবং সেভাবে প্রক্রিয়া শুরুর পরও বিষয়টি ঘটে ২৪ ঘণ্টা পরে এবং নজিরবিহীনভাবে খোলা মাঠে। কেন এটা ঘটেছিল? এ সম্পর্কে তখনকার ভারতীয় ইস্টার্ন কমান্ডের চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল জে এফ আর জেকব সাংবাদিক মি. কুলদিপ নায়ারকে জানাচ্ছেন, New Delhi wanted to humiliate Islamabad by showing that Muslim country had laid down arms before a Jew.  অর্থঃ নয়া দিল্লি চাচ্ছিল ইসলামাবাদকে অপদস্ত করতে, সেটি এ প্রদর্শনীর মাধ্যমে যে একটি মুসলিম দেশ একজন ইহুদীর কাছে অস্ত্র সমর্পণ করেছে। ঢাকা শহরটি অন্য কোন কারণে না হোক, অন্তত একটি কারণে সমগ্র বিশ্বের মুসলিম ইতিহাসে কিয়ামত অবধি বেঁচে থাকবে। সেটি বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম দেশের সেনাবাহিনীর বেইজ্জতি করার ভূমি রূপে। অথচ সে দেশটির সৃষ্টিতে বাঙালী মুসলমানদের অবদানটাই ছিল সর্বাধিক।

 

যে বেইজ্জতি মুক্তিবাহিনীর

১৯৭১এর ১৬ ডিসেম্বরে মুক্তিবাহিনীর অপমানটিও কি কম ছিল? যুদ্ধ হলো বাংলাদেশের মাটিতে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনটি মুক্তিবাহিনীর সদস্যগণ নিজেদের নিজস্ব অর্জন মনে করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো,পাকিস্তানের সেনা বাহিনী কি মুক্তিবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে? ভারতের অর্থে ও ভারতের ক্যাম্পে ভারতের ভাত-পানি খেয়ে গড়ে উঠা মুক্তিবাহিনীকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী কোন গুরুত্বই দেয়নি। তাদের কাছে তাই আত্মসমর্পণও করেনি। আত্মসমর্পণ করেছে মুক্তিবাহিনীর মনিবের কাছে। বাংলাদেশ থেকে তাদের যুদ্ধবন্দীদের ফিরিয়ে নিতেও পাকিস্তান সরকার বাংলাদেশ সরকারের সাথে আলাপ-আলোচনা করার প্রয়োজনও বোধ করেনি। সেটিও তারা করেছে দিল্লি সরকারর সাথে। ফলে বাংলাদেশ সরকার যে ১৯৫ জন পাকিস্তানী সেনা সদস্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের যে অভিযোগ্টি এনেছিল,সে অভিযুক্তদের কেশাগ্র স্পর্শের সুযোগও পায়নি। বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাজার হাজার কোটি টাকার অস্ত্রশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাদের চোখের সামনে দিয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনী লুটে নিয়ে যায়। পাকিস্তানের জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ পূর্ব পাকিস্তানী হওয়ায় সে অস্ত্র কেনায় অধিকাংশ অর্থ জোগাতে হযেছে বাংলাদেশীদের। অতএব সে অস্ত্র বাংলাদেশে রাখার বৈধ অধিকার ছিল বাংলাদেশর। কিন্তু ভারত সেটি চায়নি। মনিবের সে অস্ত্র লুটের কান্ডটি নীরবে দেখা ছাড়া আওয়ামী বাকশালী পক্ষটি কি কিছু করতে পেরেছিল? তাছাড়া কিছু করার আগ্রহও কি ছিল? ভারতীয় সরকার এ নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের সাথে সামান্যতম আলোচনার প্রয়োজনও বোধ করেনি। মনিবরা কি কখনো চাকরবাকরের অনুমতি নেয়? বা তাদের সাথে পরামর্শ করে? দিল্লির শাসকদের মনভাব কি আজও ভিন্নতর? ফলে দিল্লিস্থ মনিবগণ আজও যা চাচ্ছে বাংলাদেশকে তাই দিতে হচ্ছে। সেটি দেশের অভ্যন্তর দিয়ে করিডোর হোক, তিস্তা বা পদ্মার পানি তুলে নেয়া হোক বা টিপাইমুখে বাধ নির্মান হোক।

 

ভারতের মুসলিম ভীতি

পাকিস্তান ভাঙ্গা ও দেশটির মেরুদন্ড দুর্বল করার পর ভারতের লক্ষ্য এবার বাংলাদেশের মেরুদন্ড ধ্বংসিয়ে দেয়া। তাদের বিশ্বাস,বাংলাদেশ স্বাধীন ভাবে বেড়ে উঠার সুযোগ পেলে দেশটি বহু ভাষা, বহু বর্ণ ও বহু গোত্রে বিভক্ত পাকি্স্তানের চেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র রূপে বেড়ে উঠার সুযোগ পাবে। তাছাড়া বাংলাদেশ,পশ্চিম বাংলা, আসাম ও রোহিঙ্গাদের নিয়ে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম জনগোষ্ঠির বসবাস এ অঞ্চলে। তাদের মাঝে রয়েছে ভাষাগত,বর্ণগত সংহতি। নেই শিয়াসূন্নীর বিভেদ। অতীতে বিশ্বশক্তি রূপে মুসলমানদের যে উত্থান সেটি সুজলা-সুফলা বিশাল কোন সমৃদ্ধ ভূমি থেকে হয়নি। হয়েছিল জনবিরল নিঃস্ব মরুর বুক থেকে। এদিক দিয়ে বাংলাদেশ কম কিসে? জনবহুল মুসলিম দেশ হওয়াটাই শত্রুর নজরে পড়ার জন্য যথেষ্ঠ ছিল। তাছাড়া আজ ১৬ কোটি মুসলমানের যে বাংলাদেশ সেটি ইখতিয়ার বিন বখতিয়ার খিলজির নেতৃত্বে ১৭ জন মুসলিম মোজাহিদের বিজয়ের দান। এখন ভারতের সীমান্তে দন্ডায়মান ১৭ জন তুর্কি মুসলমান নয়,বরং ১৬ কোটি মুসলমান। বহুকোটি মুসলমানের বাস ভারতের অভ্যন্তরেও। ভারতীয়দের মনে তাই প্রচন্ড মুসলিম ভীতি। এমন মুসলিম ভীতির কারণে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের আচরন তাই বন্ধুত্বপূর্ণ হওয়ার আশা নাই। ব্রিটিশদের হাতে দেশটি অধিকৃত হওয়ার ফলে ব্রিটিশের প্রশ্রয়ে সে সম্পর্ক পরিণত হয় চাকর ও মনিবের সম্পর্কে। চাকর-বাকরকে বেঁচে থাকার অধিকার দেয়া হলেও তাদেরকে কি স্বাধীন ভাবে বেড়ে উঠার সুযোগও দেয়া হয়? সুযোগ দেয়া যায় কি শিক্ষাদীক্ষার?

ব্রিটিশের প্রতিপালনে বাঙালী হিন্দুর জীবনে রেনেসাঁ এসেছে। কিন্তু বাঙালী হিন্দুর সে রেনেসাঁ মুসলমানের জীবনে প্রচন্ড দুঃখ ও নাশকতা বাড়িয়েছে। তখন বাঙালী মুসলমানের কাঁধে চেপেছে দুটি জোয়াল। একটি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শত্রুদের। অপরটি হিন্দু জমিদার ও মহাজনদের। বাঙালী মুসলমানের বেড়ে উঠার সে সুযোগ কেড়ে নিতেই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে চলছে লাগাতর ষড়যন্ত্র। সেটি ১৯৪৭ সালের পূর্ব থেকেই। ১৯০৫ সালে বাংলার হিন্দুগণ আন্দোলন করেছে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে। কারণ তাতে তারা বাংলার মুসলমানদের কল্যাণ দেখেছিল। এমন কি ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধেও তারা কলকাতায় বড় বড় মিছিল হয়েছে।সে মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। মানব ইতিহাসের আর কোথায়ও কি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়েছে? কিন্তু সেটি হয়েছে কলকাতার রাস্তায়। এমন একটি কদর্য আন্দোলনের জন্য বিবেকের পচনটা যে কত গভীর হওয়া দরকার -সেটি বুঝে উঠা কি এতই কঠিন? এমন গভীর ঘৃনা ও বিদ্বেষের কারণেই বাঙালী মুসলমানদের সংখ্যানুপাতে সরকারি চাকুরিতে প্রবেশের যে ন্যায্য দাবিটি দেশবন্ধ চিত্তরঞ্জন দাশ মেনে নিয়েছিলেন সেটিও কলকাতার হিন্দু বাবুগণ মেনে নেয়নি। এমন এক বৈরী মানসিকতা আজও  বেঁচে আছে ভারতের আগ্রাসী হিন্দুদের মনে। ফলে তা অসম্ভব করেছে বাংলাদেশের সাথে ভারতের প্রতিবেশীসুলভ সুসম্পর্ক গড়ে উঠাকে। কোন ভদ্রলোক কি প্রতিবেশীর ঘরের পাশ দিয়ে কাঁটাতারের বেড়া দেয়? এটি তো প্রতিবেশীকে চোর-ডাকাত ভাবার লক্ষণ। কোন ভদ্র প্রতিবেশী দেশ কি লাশ ঝুলিয়ে রাখে সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়ায়? কেড়ে নেয় কি নদীর পানি? নদীমুখে দেয় কি বাঁধ। ভারতীয়দের মনের কুৎসিত চিত্রটি কি এরপরও গোপন থাকে? বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আজ যা কিছু ঘটছে সেটি তো পুরনো ষড়যন্ত্রেরই ধারাবাহিকতা। তাছাড়া বিশ্বব্যাপী ইসলামের জোয়ার দেখে ইসলামের শত্রুপক্ষ তো আরো আতংকিত। বাংলাদেশে ইসলাম জোয়ার রুখা তাই ভারতীয়দের কাছে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার চেয়েও গুরুত্বপুর্ণ। তাই বাংলাদেশের নির্বাচনে পুঁজি বিনিয়োগ ও নির্বাচনের ফলাফলটি পক্ষে আনা ভারতীয়দের কাছে আনবিক বোমা বা দূরপল্লার মিজহাইল বানানোর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। এ কাজে ভারতীয়গণ বিশ্বস্থ মিত্র রূপে বেছে নিয়েছে আওয়ামী বাকশালীদের।একাত্তরে যাদেরকে সাথে নিয়ে ভারত পাকিস্তান ভেঙ্গেছিল,তাদেরকে সাথে নিয়েই আজ তারা বাংলাদেশের মেরুদন্ড ধ্বংসে নেমেছে। লক্ষ্য এখানে ইসলাম নির্মূলও। বাংলাদেশে গণতন্ত্র আজে কবরে শায়ীত এবং ভোট-ডাকাতেরা ক্ষমতাসীন তা তো ভারতীয় ষড়যন্ত্রের ফলে। চাকর-বাকরেরা কখনোই মনিবের চরিত্র নিয়ে ভাবে না। ব্যাভিচারি দুর্বৃত্ত মনিবও চাকরবাকরদের কাছে প্রনামযোগ্য মহাপ্রভু গণ্য হয়। এমন চাকরবাকরদের কাছে ফিরাউন তো ভগবান রূপে স্বীকৃতি পেয়েছে। ভারতীয়দের আগ্রাসী কদর্য চরিত্রও তাই আওয়ামী বাকশালীদের নজরে পড়ছে  না।তাই কোন ভারতীয় নেতা বা নেত্রী বাংলাদেশে এলে যেন চাকরপাড়ায় মহোৎসব শুরু হয়।

 

লড়াই ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে 
বাংলাদেশের মাটিতে আজ যে লড়াই চলছে সেটি নিছক নিরপেক্ষ নির্বাচন ও গণত্ন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই নয়। এটি দেশের স্বাধীনতার বাঁচনোর লড়াই। লড়াই এখানে ইসলাম নিয়ে বেড়ে উঠার। তাই হামলা যে গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে হচ্ছে তা নয়। হামলা হচ্ছে ইসলামের নির্মূল কল্পেও। তাই এ যুদ্ধটি স্রেফ শত্রুশক্তির চাকরবাকরদের সাথে নয়। মুল যুদ্ধটি বরং আওয়ামী বাকশালীদের মনিব ভারতের বিরুদ্ধে। ভারতও সেটি বুঝে। তারাও জানে একাত্তরের ন্যায় এবারের যুদ্ধটিও তাদের নিজেদেরই লড়তে হবে। তাই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের বিনিয়োগটিও বিশাল। ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থা রয়ে এজেন্টগণ এখন আর শুধু রাজধানিতে বসে নাই। তারা প্রতিটি থানা ও প্রতিটি ইউনিয়নে পৌঁছে গেছে। হিন্দুদের বসিয়েছে পুলিশ বিভাগ, বিচার বিভাগ ও প্রশাসনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে। ভারত এখন তার বাকশলী চাকর-বাকরদের উপর ভরসা করছে না। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসিয়েছে তাদের নিজেদের লোকদের। তাই শুধু রাজপথের মিছিল বা অবরোধে সহজে বিজয় আসবে না। স্বাধীনভাবে বাঁচার যুদ্ধটি আরো রক্তাত্ব হতে বাধ্য। স্বাধীন ভাবে বাঁচতে হলে যুদ্ধ করেই বাঁচতে হয়। স্বাধীনতার মূল্য তো এভাবেই দিতে হয়। আর এ যুদ্ধের শুরুটি আজ  থেকে নয়। ১৯৪৭য়ের পূর্ব থেকেই। বৃহৎ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মিত্র খুঁজতে হয়। সে সত্যটি ১৯৪৭য়ের পূর্বে শেরে বাংলা ফজলুল হক,খাজা নাযিমউদ্দিন,হোসেন সহরোয়ার্দি, নুরুল আমীন, আকরাম খাঁর মত বাংলার মুসলিম নেতাগণ বুঝেছিলেন। তারা তারা সে যুদ্ধে সহযোদ্ধা পেতে অন্যান্য ভারতীয় মুসলমানদেরকে সাথে মৈত্রী গড়েছিলেন এবং তাদের সাথে নিয়ে স্বাধীনতার যুদ্ধ লড়েছিলেন। ইসলামে এমন ঐক্য ফরজ। ফলে এটি ছিল সে কালের নেতাদের স্রেফ রাজনৈতিক প্রজ্ঞাই নয়, ঈমানী দায়ভারও। কিন্তু সে প্রজ্ঞা ও ঈমানীদায়ভার কি তাদের থেকে আশা করা যায় যারা শত্রুশক্তির চাকরবাকর হওয়াকেই জীবনের মূল লক্ষ্য বানিয়ে নেয়? কাশ্মিরের শেখ আব্দুল্লাহর মাঝে সে প্রজ্ঞা ও ঈমান ছিল না বলেই কাশ্মির স্থান পেয়েছে ভারতের পেটে। একই কারণে শেখ মুজিব বাংলাদেশকে গোলাম রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। তাই মুজিব স্বাক্ষর করেছিল ভারতের সাথে ২৫ সালা দাসচুক্তি।

স্বাধীন ভাবে বাঁচার বর্তমান যুদ্ধটি বাঙালী মুসলিমদের এখন একাকীই লড়তে হবে। এ লড়াই থেকে পিছুহটার সুযোগ নেই। পিছু হটলে কাশ্মির, সিকিম ও হায়দারাবাদের ন্যায় ভারতের পেটে হজম হয়ে যেতে হবে। ভারতের দাসদের শাসন থেকে মুক্তির এ লড়াইটি দীর্ঘ ও রক্তাত্ব হতে বাধ্য। কিছু দিনের হরতাল ও অবরোধে কোন দেশেই স্বাধীনতা আসেনি।বাংলাদেশেও আসবে না। লড়াই কোন দেশবাসীকে দুর্বল করে না। বরং শক্তিশালী করে। জীবতদের চেতনা তো উর্বরতা পায় শহীদের রক্তে। তখন বেড়ে উঠে ঈমান। তাই যে দেশে শহীদের রক্ত নেই সে দেশে মুসলমানদের চেতনা তো মৃত। মুসলমানগণ একমাত্র তখনই বিশ্বশক্তি ছিল যখন তাদের জীবনে লাগাতর জিহাদ ছিল। নবীজী (সাঃ) ৭০ শতাংশ সাহাবী সে জিহাদে শহীদ হয়েছেন। দুর্বলতা ও পরাজয় আসে তো জিহাদ না থাকার কারণে। বাংলাদেশের জনগণকে এ সহজ সত্যটি অবশ্যই বুঝতে হবে।স্বাধীনতার মূল্য বিশাল। ইসলামের আদর্শ নিয়ে বেড়ে উঠার খরচও বিশাল। এ খরচ স্রেফ ভোট দিয়ে নয়,প্রচুর প্রাণের রক্ত দিয়ে পরিশোধ করতে হয়। কাশ্মিরে এক লাখের বেশী মানুষ প্রাণ দিয়েছে,সিরিয়ায় প্রাণ দিয়েছে প্রায় ২ লাখ মানুষ। কিন্তু এখনও বিজয় জুটিনি। কিন্তু তারা যুদ্ধ ছাড়তে রাজি নয়। তাই আরো রক্ত দিচ্ছে। গাজার মাত্র ১০ লাখ মানুষ যুদ্ধ লড়ে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের সর্ববৃহৎ সামরিক শক্তি ইসরাইলের বিরুদ্ধে। প্রশ্ন হলো,বাংলাদেশ কি গাজার চেয়েও দুর্বল? ভারত কি ইসরাইলের চেয়েও শক্তিশালী?

 

মূল ইস্যু মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্যকারি হওয়া

শত্রুর বিরুদ্ধে চলমান এ যুদ্ধে জিতলে হলে মহাশক্তিশালী মহান আল্লাহতায়ালাকে অবশ্যই পক্ষে আনতে হবে। এছাড়া বিজয়ের কোন পথ নাই। সম্ভাবনাও নাই। আর মহান আল্লাহতায়ালা পক্ষে থাকলে ভারত কেন,কোন বিশ্বশক্তিও কি তখন হারাতে পারে? ১৭ জন মোজাহিদের পক্ষেও তখন অবিভক্ত বাংলার ন্যায় বিশাল দেশজয়ও তখন সহজ হয়ে যায়। যুদ্ধে বিজয় আসে তো একমাত্র মহান আল্লাহ থেকেই। কিন্তু আজকের মুসমানগণ আল্লাহতায়ালাকে পক্ষ আনার বদলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ নানা জাতের কাফের শক্তিকে পক্ষে আনার ফিকিরে ব্যস্ত। সে চেষ্ঠায় নেমেছে এমন কি অনেক ইসলামি দলও। তারা বিজয় ছিনিয়ে আনতে চায় নিজ নিজ ছল-চাতুরি, প্রচার কৌশল ও বাহুবলে। তাদের আগ্রহ নাই মহান আল্লাহতায়ালার এজেন্ডা বাস্তবায়নে। আগ্রহ নাই আল্লাহতায়ালার দলের সদস্য হওয়ার। ফলে এসব আালেম-উলামা ও ইসলামি দলের নেতা-কর্মীদের মুখে শরিয়ত প্রতিষ্ঠার কথা যেমন নেই, তেমনি নেই খেলাফত ও জিহাদের কথাও। এরা যে শুধু ভারতের ভয়ে ভীতু তা নয়,বরং আধমরা তো তাদের চাকরবাকরদের ভয়েও। বিস্মযের বিষয়,এরা আবার জান্নাত লাভের কামনা রাখে! প্রশ্ন হলো,মহান আল্লাহতায়ালা কি তাঁর পবিত্র জান্নাতে ভীরু ও কাপুরুষদের প্রবেশাধিকার দিবেন?

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালার ঘোষণা, ওয়া মা নাসরু ইল্লা মিন ইনদিল্লাহ,ইন্নাল্লাহা আজিজুন হাকীম। অর্থঃ বিজয় আসে একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকে,নিশ্চয়ই আল্লাহ অতি পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাবান।– (সুরা আনফাল আয়াত ১০)।অতীতে যত পরাজয় এসেছে তা তো মহান আল্লাহর এজেন্ডার সাথে গাদ্দারির ফলে। মুসলমানগণ ব্যর্থ হয়েছে নির্ভেজাল ইসলামের পক্ষে এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি যাতে মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্য লাভ অনিবার্য হয়ে যায়। মহান আল্লাহতায়ালাকে পক্ষে আনার পথ তো অতি সহজ। সে পথের কথা তো পবিত্র কোরআনে বার বার শোনানো হয়েছে। নির্দেশ দেয়া হয়েছে,হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর সাহায্যকারি হয়ে যাও। সুরা সাফ আয়াত ১৪)। বলা হয়েছে, তোমরা আমাকে সাহায্য করো, আমিও তোমাদেরকে সাহায্য করবো। সুস্পষ্ট নির্দেশ এসেছে জিহাদের। বলা হয়েছে তোমাদের প্রস্তুতি হালকা হোক অথবা ভারী হোক,বেরিযে পড়ো অভিযানে।এবং জিহাদ করো তোমাদের সম্পদ ও জান দিয়ে। এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর যদি তোমরা বুঝতে। (সুরা তাওবা আয়াত ৪১)।

 

মুসলমানগণ যখন সেক্যুলার রাজনীতির নেতাকর্মী ও সেপাহীতে পরিণত হয় তখন কি তারা মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্য আশা করতে পারে? তখন তো আসে গযব। ঈমানদারের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু তাই স্রেফ নামাযী বা রোযাদার হওয়া নয়। হজ-ওমরা পালনও নয়। এমন ইবাদত তো লক্ষ লক্ষ মুনাফিকও করে। খোদ নবীজী (সাঃ) আমলে এমন মুনাফিকদের সংখ্যা কি কম ছিল? ওহুদের যুদ্ধের সময় তারা ছিল প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। আজ যে তাদের সংখ্যা কত বিপুল তা অনুমান করা কি এতই কঠিন? ঈমানদারের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুটি হলো একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালার সার্বক্ষণিক সাহায্যকারি হয়ে যাওয়া এবং তাঁর রাস্তায় লাগাতর জিহাদ করা। পরকালে জান্নাত লাভের এটিই তো একমাত্র রাস্তা। কি ভাবে মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্যকারি হতে হয় ও তার রাস্তায় জিহাদ করতে হয় সেটি মহান নবীজী (সাঃ) স্বহস্তে দেখিয়ে গেছেন। দেখিয়ে গেছেন নবীজী(সাঃ)র মহান সাহাবাগণও। সে পথটি হলো,রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি অঙ্গণে মহান আল্লাহতায়ালার নিষ্ঠাবান খলিফা রূপে দায়িত্ব পালন করা এবং তাঁর সার্বভৌমত্ব ও শরিয়ত প্রতিষ্ঠায় জিহাদরত দলটির সাথে সংশ্লিষ্ট থাকা। মহান আল্লাহতায়ালা তো একমাত্র এমন দলকেই সাহায্য করার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।  তাঁর ফেরেশতা বাহিনী তাদের সাহায্যে যুদ্ধে যোগ দিতে সদাপ্রস্তুত। এনিয়ে কি সামান্যতম সন্দেহ চলে? ৭/৩/১৫

 

 




কোন দিকে যাচ্ছে বাংলাদেশ?

চাকর-বাকরের দেশ?

স্বাধীনতা ও অর্থোপার্জনের নামে বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে সস্তা চাকর-বাকরের দেশে। মহিলাদের একাকী হজে যাওয়ার অনুমতি নাই। ইসলামে এমন কাজ সুস্পষ্ট হারাম। হজে যেতে হলে মহিলাদের জন্য সাথে চাই স্বামী,পিতা,পুত্র,ভাই বা অন্য কোন মোহরাম পুরুষ -যার সাথে বিবাহ হারাম। অথচ বাংলাদেশের সরকার হাজার হাজার মাইল দূরের দেশে চাকরানীর কাজে নারী-রপ্তানি করছে। সম্প্রতি পত্রিকায় প্রকাশ,সৌদি আরব সরকার বাংলাদেশ থেকে ঘরের কাজের জন্য বহু হাজার নারী শ্রমিক নিবে। সরকার এতে বাহবা নিচ্ছে নিজেদের পররাষ্ট্র নীতির বিশাল সফলতা রূপে।অথচ এমন কাজ বাংলার মুসলিম ইতিহাসে অতীতে কোন কালেই ঘটেনি। প্রতিটি মুসলিম দেশে এরূপ নারী রপ্তানি প্রতিটি যুগেই হারাম গণ্য হয়েছে। কিন্তু এমন হারাম কাজটি প্রথম শুরু করেন শেখ মুজিব। বহুশত নারীকে মুজিবের শাসনামলে গৃহভৃত্য বা চাকরানীর কাজে ইরানে রপ্তানি করা হয়েছিল। ইসলামের মৌল বিধি-বিধান নিয়ে মুজিব যে কতটা জাহেল তথা অজ্ঞ ছিল এ হলো তার নজির। এমন জাহেল লোককে কোন ক্ষুদ্র মসজিদেরও কি ইমাম বা নেতা করা যায়? এমন ব্যক্তি কোন মুসলিম দেশের ইমাম বা নেতা হয় কি করে? রাষ্ট্রপ্রধানের আসনে বসেছেন খোদ নবীজী (সাঃ)। তাঁর ইন্তেকালের পর সে আসনে বসেছেন খোলাফায়ে রাশেদার ন্যায় শ্রেষ্ঠ সাহাবীগণ। এটিই তো ইসলামের রীতি। সে আসনে কি তাই ইসলামে অঙ্গিকারশূণ্য জাহেল ব্যক্তিকে বসানো যায়? তাতে কি ইসলাম ও মুসলমানদের কোন কল্যাণ হয়? এমন কাজ হতে দেয়া যে হারাম -সেটি বুঝার জন্য কি পন্ডিত হওয়ার প্রয়োজন পড়ে? সে জন্য সামান্য ঈমান ও কান্ডজ্ঞানই কি যথেষ্ট নয়? বাংলাদেশের জনগণের মাঝে সে ঈমান ও কান্ডজ্ঞান কই? ঈমানদারের কাজ শুধু হিংস্র জন্তুজানোয়ারদের চেনা নয়,তাকে ইসলামের শত্রুদেরও চিনতে হয়। মুসলিমকে প্রতিমুহুর্ত বাঁচতে হয় সে জ্ঞানটুকু নিয়ে। নইলে মুসলমান ও ইসলামের যে ভয়ানক ক্ষতি হয়।এক্ষেত্রে ব্যর্থতার কারণেই বাংলাদেশ আজ  ভয়ানক ক্ষতিরই শিকার।

অন্য দেশে ও অন্যের ঘরে যে চাকরানীর দিবারাত্র বসবাস -সে ঘরে কি উক্ত চাকরানীর ইজ্জত-আবরু, মানসন্মান ও জীবনের নিরাপত্তা থাকে? অথচ বাংলাদেশের সরকারের তা নিয়ে ভাবনা নাই। মুজিবের ন্যায় হাসিনারও ভাবনা মহিলাদের ইজ্জত-আবরু ও জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে নয়। হাসিনা চায়,দেশের রপ্তানি আয় বৃদ্ধি। তাই চিংড়ি মাছ, গার্মেন্টেস ও পাটজাত দ্রব্যের সাথে শুরু হয়েছে নারী রপ্তানিও। লক্ষ্য, বৈদেশিক অর্থে দেশের ধনিদের জীবনে আরো জৌলুস আনা। তাতে ইসলামের শরিয়তি বিধান আবর্জনায় যাক, বিদেশীদের গৃহে নারীর সম্ভ্রম লুন্ঠিত হোক ও নির্যাতিত হোক -তাতে সরকারের ভ্রুক্ষেপ নাই। সরকারের চাই বেশী বেশী বিদেশী মুদ্রা। অর্থের লোভ মানুষকে এভাবেই জাহান্নামে টানে। বিদেশে নারী রপ্তানিতে পাকিস্তান আজ্ও নামেনি। দরিদ্র আফগানিস্তানও নামেনি। এমনকি ভারতের দরিদ্র মুসলমানগণও এরূপ পাপের পথে রাখেনি। অথচ অর্থলাভের নেশায় বাংলাদেশের সরকার এমন কাজে এতটাই উতাল যে হারাম-হালাল নিয়ে ভাবনার সময় নেই। শরিয়তের বিধান শুনিয়ে কি এমন পাগল পাপীদের ঠেকানা যায়? ঠেকানো গেলে কি বাংলাদেশে শত শত পতিতাপল্লি গড়ে উঠতো?

 

দেশ দাস-শাসনের  কবলে

পতিতারা তাদের ব্যাভিচারের অর্জন থেকে সরকারকে রাজস্ব দেয়। মদ্যপায়ীরা রাজস্ব দেয় তাদের মদের বোতলের উপর। তেমন রাজস্বের লোভে সরকার নিজেও মাতাল। রাজস্ব লাভের প্রতি এমন নেশাগ্রস্ততা ছিল কাফের ব্রিটিশ শাসকদের। তারাই পতিতাবৃত্তি, জুয়া ও মদ্যপানের ন্যায় বহুবিধ পাপাচারকে ভারতের বুকে বাজারজাত করেছিল। সরকারের চোখে এটি লাগাতর এক লাভের খাত, আদৌ লোকসান নাই। সাম্রাজ্যবাদি ব্রিটিশগণ চলে গেছে। কিন্তু রেখে গেছে তাদের আদর্শিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দাসদের। তাদের হাতে এ আদিম পাপাচার বাংলাদেশের মাটিতে শুধু যে ব্যবসারূপে বেঁচে আছে তা নয়, অতিশয় লাভজনক হওয়ার কারণে বিপুল বিস্তারও পেয়েছে। বেশী বেশী রাজস্ব লাভের নেশায় সরকার বরং এরূপ পাপাচারকে দিবারাত্র পাহারা দেয়। দেশে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে সরকারের মাথাব্যাথা নেই। বরং খোদ পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবির হাতে মারা যাচ্ছে সাধারণ মানুষ। অথচ দেশের পতিতাপল্লি, মদের দোকান ও জুয়ার আড্ডাগুলোকে পুলিশ নিয়মিত পাহারা দেয়া হয় -যাতে সে পাপ অবাধ ও নিরাপদ বাজার পায়। সরকারের উচ্চ শিখরে হারাম-হালালের বিধান ও পবিত্র কোরআনে বর্ণিত সিরাতুল মোস্তাকীম পরিত্যক্ত হলে সরকারের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান বা ইনস্টিটিউশন জনগণকে জাহান্নামে টানার কাজে যে কতটা ভয়ানক হাতিয়ারে পরিণত হয় -বাংলাদেশ হলো তারই নজির। বিপদের আরো কারণ, পাপের পথে টানার সে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান বা ইনস্টিটিউশনগুলো কাজ করছে জনগণের রাজস্বের অর্থে। শয়তানী শক্তি এভাবেই প্রতি দেশে কইয়ের তেলে কই ভাজে।

ব্যাভিচার, মদ্যপান, জুয়ার ন্যায় পাপাচারগুলো হলো সেক্যুলারিজমের প্রধানতম প্রতীক। একটি দেশে সেক্যুলারিজম কতটা প্রবল সেটি বুঝা যায় সে দেশে ব্যাভিচার, মদ্যপান, জুয়ার ন্যায় পাপাচারগুলোর বিস্তার দেখে। কারণ, সেক্যুলারিজমের মূল কথাঃ পার্থিব জীবনে পরিতৃপ্তি। পার্থিব সম্ভোগের সে পাপপূর্ণ আয়োজনে পরকালের ভাবনা ও মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে জবাবদেহীতার ধারণা সেকেলে বা ধর্মান্ধতা গন্য হয়। যে সমাজে সেক্যুলারিজম প্রবলতর হয়, সে সমাজে মশামাছির ন্যায় বেড়ে উঠে পাপীরাও। পাপাচারের পূর্ণ আজাদী ছাড়া সেক্যুলারিজম বাঁচে না। তাই ব্যাভিচার, সমকামীতা, নগ্নতার প্রদর্শণ ও মাতলামি সেক্যুলার দেশগুলিতে কোন অপরাধই নয়। বরং সেটিই তাদের সংস্কৃতি। পাপাচারের সে সংস্কৃতি বাঁচাতে বাংলাদেশের সরকার দিবারাত্র পুলিশ প্রহরার ব্যবস্থা করেছে। পাপচার বিস্তারের এ প্রজেক্টে জনগণের সংশ্লিষ্টতা বাড়াতে দেশের শতকরা ৯১ ভাগ মুসলমানকে রাজস্ব জুটাতে বাধ্য করা হচ্ছে। সেক্যুলার রাষ্ট্রে পাপাচারি নেতা ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাগণ শুধু নিজেরাই জাহান্নামের পথে চলে না, জনগণকেও সে পথে টানে। কারণ রাষ্ট্র নামক গাড়িটির ড্রাইভিং সিটে তো তারাই। ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে রাষ্ট্র অধিকৃত হওয়ার মূল বিপদ তো এখানেই।ইসলামের এ শত্রুপক্ষের রাষ্ট্র বাঁচানো এজন্যই পবিত্রতম জিহাদ।

 

জিহাদ কেন অনিবার্য? 


সেক্যুলারিজমের বিপরীতে ইসলাম সম্পূর্ণ ভিন্ন দর্শন, ভিন্ন শিক্ষা ও ভিন্ন সংস্কৃতি দেয়। তা থেকে জন্ম নেয় মুসলিম জীবনে ভিন্ন ধরণের রাজনীতি। মুমিনের জীবনে রাজনীতি তখন পরিণতি হয় আমৃত্যু জিহাদে। নামায-রোযা, হজ-যাকাতই মুমিনের জীবনে একমাত্র ইবাদত নয়। সে ইবাদতের সাথে যে মিশনটিকে মহান আল্লাহতায়ালা প্রতিটি ঈমানদারের উপর ফরজ করেছেন সেটি হলো মিরু বিল মারুফ ওয়া নেহী আনিল মুনকার অর্থঃ ন্যায়ের নির্দেশ ও অন্যায়ের নির্মূল। পাপাচারের নির্মূলের এ কাজটি স্রেফ ওয়াজ-নসিহতে হয় না। মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে যে দুর্বৃত্তদের সশস্ত্র বিদ্রোহ, তারা ওয়াজ নসিহতে পাপাচার ছাড়েনা। পাপীরা বরং তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে যারা তাদের পাপাচারে বাধা সৃষ্টি করে। বাংলাদেশে সেক্যুলারদের রাজনীতিতে এজন্যই ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে নির্মূলের সুর। সে নির্মূল-প্রকল্প থেকে বাঁচতে ও রাষ্ট্র থেকে পাপ নির্মূলের মিশনে মুমিনের জীবনে তখন অনিবার্য কারণেই জিহাদ এসে যায়। বস্তুত জিহাদই হলো মহান আল্লাহতায়ালার শত্রুদের নির্মূলে তাঁর নিজের নির্দেশিত মূল প্রকল্প। তাই যে ভূমিতে মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশমান্যাকারি ঈমানদার থাকবে সে ভূমিতে জিহাদী প্রকল্পও থাকবে। ফলে সে জিহাদ যেমন মহান নবীজী (সাঃ)র জীবনে এসেছিল, তেমনি সাহাবায়ে কেরামের জীবনেও এসেছিল। দুর্বৃত্তির বিরুদ্ধে বিরামহীন জিহাদের কারণেই মুসলিম সমাজে ব্যভিচার, সমকামীতা, নগ্নতা ও মাতলামির ন্যায় পাপচার বাঁচে না। সেগুলি নবীজী (সাঃ)র যেমন আমলে বাঁচেনি, তেমনি সাহাবায়ে কেরামের আমলেও বাঁচেনি। কিন্তু আজ সেরূপ পাপাচার যে শুধু বেঁচে আছে তাই নয়, দিন দিন তা বলবানও হচ্ছে। বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে আগে মঙ্গলপ্রদীপ, থার্টিফাস্ট নাইট, হোলী উৎসব, ভ্যালেন্টাইন দিবস, একুশের মিছিল, বর্ষবরণের রীতি ছিল না। এগুলো হলো মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণ ও সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে জনগণকে দূরে রাখার শয়তানি প্রকল্প। দেশে জিহাদ না থাকলে শয়তানের প্রকল্প ও প্রতিষ্ঠান যে বিপুল ভাবে বাড়ে বাংলাদেশ হলো তারই দৃষ্টান্ত।

ঈমানদারির দায়ভার শুধু মহান আল্লাহতায়ালার অনুসরণ নয়, বরং নবীজী (সাঃ)র অনুসরণও। পবিত্র কোরআনে আতীয়ুল্লাহ (আল্লাহর অনুসরণ)এর সাথে আতীয়ুররাসূল (রাসূলের অনুসরণ)এর নির্দেশটি পবিত্র কোরআনে বার বার এসেছে। তবে রাসূলে পাকের অনুসরণের অর্থ এ নয় যে, নবীজী (সাঃ) যেভাবে নামায-রোযা, হজ-যাকাত পালন করতেন সে ভাবে শুধু সেগুলিই পালন করবে। বরং এটিও ফরজ যে, নবীজী (সাঃ) যেরূপ রাষ্ট্র, সমাজ, আইন-কানূন, সংস্কৃতি ও সভ্যতা গড়ে তুলেছিলেন সে মডেল অনুযায়ী আজও রাষ্ট্র, সমাজ, আইন-কানূন, সংস্কৃতি ও সভ্যতাও গড়ে তুলবে। একাজে ব্যর্থ হলে কি মুসলমানের ঈমানদারি বেঁচে থাকে? অথচ আজকের মুসলমানদের ব্যর্থতা এক্ষেত্রে বিশাল। শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাষ্ট্র, আইন-আদালত ও সভ্যতা গড়ার ক্ষেত্রে আজকের মুসলমানগণ নবীজী (সাঃ)র অনুসৃত নীতি থেকে শিক্ষা নিচ্ছে না। তারা অনুসরণ করছে পাশ্চাত্য দেশের পাপাচারপূর্ণ সেক্যুলার সমাজকে। ফলে তাদের রাষ্ট্র, সমাজ, আইন-কানূন, সংস্কৃতি ও সভ্যতায় ঈমানদারি ধরা পড়ে না। বরং যা ধরা পড়ে তা হলো মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। আজকের মুসলমানদের এটিই মূল রোগ।

 

মূল রোগঃ পথভ্রষ্টতা

বাংলাদেশের মুসলমানদের মূল ব্যাধিটি কৃষি, শিল্প, পশু-পালন বা ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে নয়। বরং সেটি সিরাতুল মোস্তাকীম থেকে ছিটকে পড়ার। অথচ পথভ্রষ্টতা থেকে বাঁচা ও প্রতি মুহুর্তে সিরাতুল মোস্তাকীমে টিকে থেকে গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা মানব জীবনে দ্বিতীয়টি নেই। জীবনের সে মূল এজেন্ডায় মুমিনকে প্রতি মুহুর্তে মনযোগী রাখতেই নামাযের প্রতি রাকাতে সুরা ফাতেহা পাঠকে মহান আল্লাহতায়ালা বাধ্যতামূলক করেছেন। প্রশ্ন হলো, সুরা ফাতেহার মূল প্রতিপাদ্য বিষয়টি কি? এটি একটি দোয়া। মানুষের জীবনে মূল এজেন্ডাটি ধরা পড়ে এ দোয়ায়। এজেন্ডা যদি হয় চাকুরি-বাকুরি ও ব্যবসা-বাণিজ্যতে সফল হওয়া বা সন্তানলাভ, তবে দোয়াতে সেটি ধরা করে। মহান আল্লাহতায়ালার কাছে প্রতিনিয়ত সে সফলাতর জন্য দোয়া করে। তবে মানুষ জীবনে সবচেয়ে বড় ভূলটি হয় জীবনের সে গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডাটি বেছে নিতে। ব্যক্তিকে সে সঠিক এজেন্ডা শেখাতেই নাযিল হয়েছে সুরা ফাতেহা। মহান আল্লাহতায়ালা সেটি শিখিয়েছেন একটি দোয়ার মাধ্যমে। এ দোয়াতে রয়েছে সিরাতুল মোস্তাকম তথা জান্নাতে পৌছার সরল রাস্তা পাওয়ার আকুল আকুতি। সে সাথে রয়েছে যারা গযবপ্রাপ্ত ও যারা পথভ্রষ্ট তাদের অনুসৃত পথ থেকে বাঁচার গভীর আর্জি। মুমিনকে প্রতি মুহুর্তে সে আকুতি ও সে আর্জি নিয়ে বাঁচতে হয়। প্রতি মুহুর্তের বাঁচার মধ্যে সে আকুতি ও সে আর্জিকে বদ্ধমূল করতেই ৫ ওয়াক্ত নামাযের প্রতি রাকাতে সুরা ফাতেহা পাঠকে তিনি বাধ্যতামূলক করেছেন। অথচ প্রতি রাকাতে সে পবিত্র দোয়াটি পাঠ করলেও বাংলাদেশের মুসলমানগণ আগ্রহ হারিয়েছে সিরাতুল মোস্তাকীমে পথ চলায়। আগ্রহ হারিয়েছে অভিশপ্ত কাফেরদের অনুসৃত গযবের পথ থেকে দূরে থাকার ক্ষেত্রেও। সেটির প্রমাণ মেলে তাদের রাষ্ট্র, সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতি থেকে। সিরাতুল মোস্তাকীমে চলায় সামান্যতম আগ্রহ থাকলে তারা কি বিদেশে নারী রপ্তানির কথা ভাবতো? আইন-আদালত থেকে কি বিলুপ্ত হতো শরিয়তি বিধান? বাংলাদেশ কি বার বার চিত্রিত হতো বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশরূপে? পথচলাটি সিরাতুল মুস্তাকীমে হলে মুসলমানের জীবনে নামায-রোযা, হজ-যাকাতই শুধু আসতো না, সে সাথে আসতো জিহাদ, শরিয়ত, খেলাফত ও একতা। তখন আগ্রহ বাড়তো পতিতাবৃত্তি, মদ-জুয়া, সূদ-ঘুষের শয়তানি পথ থেকে দূরে থাকার আগ্রহ। বাংলাদেশের সরকার ও জনগণ যে নবী-প্রদর্শিত সিরাতুল মোস্তাকীমে নাই সেটি বুঝার জন্য কি বড় মাপের আলেম হওয়ার প্রয়োজন পড়ে? অথচ এ গুরুতর বিষয় নিয়ে বাংলাদেশের আলেমদের মাঝে মাথাব্যাথা নেই। তারা ব্যস্ত নিজ পরিবারের রটিরুজি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। অথচ সাহাবায়ে কেরামের সামনে শরিয়তের বিরুদ্ধে এমন বিদ্রোহ হলে তৎক্ষাজিহাদ শুরু হয়ে যেত। শুধু সাধারণ জনগণ নয়, আলেমগণও যে মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশিত মিশন থেকে যে কতদূরে ছিটকে পড়েছে সেটি বুঝতে কি এরপরও কিছু বাঁকি থাকে?

হারাম-হালালের বিধানকে মুজিব যেমন পাত্তা দেয়নি,পাত্তা দিচ্ছে না হাসিনাও। স্বৈরাচারিদের কাছে শুধু জনগণের ভোটের অধিকার ও মৌলিক মানবাধিকারই কবরে যায় না। কবরে পাঠানো হয় খোদ মহান আল্লাহতায়ালার বিধানকেও। শরিয়তি বিধানের সাথে তখন মাটিচাপা পড়ে গরীব নাগরিকগণও। অতীত কালে মিশরে স্বৈরাচারি ফিরাউনদের কবরের উপর পিরামিড বানাতে গিয়ে হাজার হাজার দাস শ্রমিককে পাথরচাপা পড়ে প্রাণ দিতে হয়েছে। এ যুগেও কি সেটি কম হচ্ছে? এমন ফিরাউনের সংখ্যা কি বাংলাদেশে কম? এসব আধুনিক ফিরাউনদের হাতে রাজ্য না থাকলেও আছে মানুষ দাস বানানোর নিষ্ঠুর হাতিয়ার। তাদের জন্যও চাই প্রাসাদ নির্মাণের লক্ষ্যে বিশাল অংকের অর্থ। আর সেটির জন্য চাই সস্তায় বস্ত্র রপ্তানি করে বিপুল অংকের বিদেশী মূল্য। সে লক্ষ্য পূরণে শত শত নারীকে গার্মেন্টস ফাক্টরিতে আগুণে পুড়ে লাশ হতে হচ্ছে। রানা প্লাজার ন্যায় ধ্বসেপড়া বিল্ডিংয়ের তলায় বহু নারিকে জীবন্ত দাফনও হতে হচ্ছে। ফিরাউনদের কাছে গরীবদের ইজ্জতের বিষয়টি কোন কালেই গুরুত্ব পায়নি। গুরুত্ব পায়নি তাদের প্রাণে বাঁচার বিষয়টিও। তারা তো চায়, তাদের জৌলুস বাড়াতে এসব চাকর-বাকরেরা আগুণে পুড়বে, মাটি চাপা পড়বে, ইজ্জত-সম্ভ্রম বিলাবে ও বস্তিতে বস্তিতে কোনরূপে অস্তিত্ব নিয়ে বেঁচে থাকবে।

 

ধ্বংসের গর্তে দেশ

যে শ্রমিকের কর্মস্থল চামড়ার কারখানায়, কাঁচা চামড়ার তীব্র গন্ধও সে টের পায় না। অথচ সে গন্ধ অন্যরা বহু দূর থেকে টের পায়। তেমনি অবস্থা বাংলাদেশের জনগণের। দেশ যে ডুবছে -সেটি তারা বুঝতেই পারছে না। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্য নিউয়র্ক টাইমস পত্রিকাটি সম্পাদকীয় লিখেছে বাংলাদেশে অন দ্য ব্রিংক অর্থাৎ বাংলাদেশ ধ্বংসের কেনারায়। শুধু দ্য নিউয়র্ক টাইমস নয়, নানা দেশের সরকার ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাও সেটি টের পাচ্ছে। আগুনের জ্বলন্ত শিখা দেখার পরও সেখানে যে আগুন জ্বলছে সেটি বুঝতে কি পন্ডিত হওয়া লাগে? চোখ-কান থাকলেই সেটি বুঝা যায়। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের কর্তাব্যক্তিদের যে চোখকানা আছে -সেটি কি বিশ্বাস করা যায়? অথচ আসল সত্যটি হলো্, দ্য নিউয়র্ক টাইমস পত্রিকার সম্পাদকীয়তে যা লেখা হয়েছে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি তার চেয়েও ভয়ানক। দেশটি আজ শুধু ধ্বংসের কেনারায় নয়, ঢুকে পড়েছে ধ্বংসের গভীর গর্তে। সে সত্যটি বাংলাদেশের যে কোন নাগরিকেরই বুঝার কথা। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের কর্ণধার কর্তাব্যক্তিগণ সেটি টের পাচ্ছে না। তারা বলছে দেশ ঠিকমতই চলছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের এফ.বি.সি.সি.আই এর সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিনের উক্তি পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। তার কথা, গত ৪৪ দিনের হরতাল ও অবরোধে এক লাখ কোটি টাকার বেশী ক্ষতি হয়েছে।

দেশ যে অবরোধের শিকার, বহু মানুষ যে প্রতিদিন লাশ হচ্ছে এবং দেশে যে গুরুতর যুদ্ধাবস্থা সেটি দেশের স্বৈরাচারি সরকার মানতে রাজী নয়। অন্ধ চালকের ন্যায় তারা বরং দ্রুত ধেয়ে চলেছে ধ্বংসের দিকে। পবিত্র কোরআনে মহাজ্ঞানী আল্লাহতায়ালা এমন লোকদেরই অন্ধ ও বধির বলেছেন। আবু জেহল ও আবু লাহাবদের মত লোকদের চোখ ও কান কি ছিল না? তারা বরং নিজেদের বুদ্ধিমান ও চৌকশ মনে করতো। তারপরও মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে তাদেরকে অন্ধ ও বধির বলে অভিহিত করা হয়েছে। মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের জন্য শাস্তিটি হলো, তারা আচরন করবে অন্ধ ও বধিরের ন্যায়। গাড়ীর ড্রাইভিং সিটে বন্ধ ও বধিরদের বসানোর বিপদ ভয়াবহ। তেমনি দেশবাসীর জন্য ভয়াবহ বিপদের কারণ  হলো, দেশের ড্রাইভিং সিটে ইসলামের শত্রুদের বসানো। সেটি হলে দেশের জন্য শুধু আযাবই ধেয়ে আসে। আর বাংলাদেশে সেটিই হয়েছে। কারণ, আল্লাহর দ্বীনের শত্রুদের সাহায্য করা বা তাদের দৃষ্টিদান ও বিবেকদান মহান আল্লাহতায়ালার সূন্নত নয়। বাংলাদেশের আওয়ামী বাকশালীদের অপরাধ অনেক। তাদের অযোগ্যতাও বহুবিধ। কিন্তু পরিস্থিতির ভয়াবহতা নিয়ে যে অজ্ঞতা -সেটিই এ সরকারের সবচেয়ে বড় অযোগ্যতা। এমন অযোগ্যতা নিয়েই হাসিনার পিতা শেখ মুজিব একাত্তরে বাংলাদেশীদের জন্য একটি ভয়ানক যুদ্ধ উপহার দিয়েছিল।এবং ডেকে এনেছিল দুর্ভিক্ষ ও তলাহীন ভিক্ষার পরিচয়।

 




বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতীয় বিনিয়োগ ও আওয়ামী নাশকতা

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিভক্তির শুরু ১৯৭১ থেকে নয়, আরো অতীতে। উপমহাদেশে বহু পূর্ব থেকেই মুসলিম রাজনীতির দু’টি ধারা। একটি ইসলামের প্রতি অঙ্গিকারের। অপরটি ইসলামের প্রতি অঙ্গিকার বিলুপ্ত করে ভারতীয় হিন্দু আধিপত্যের প্রতি আনুগত্যের ধারা। এ শেষাক্ত ধারা ছিল ভারতীয় কংগ্রেসের। ১৯৪৭ সালে এ দু’টি ধারা ভারত ও পাকিস্তান -এ দুটি ভিন্ন দেশের জন্ম দেয়। মুজিবের কোয়ালিশন গড়ে উঠে কংগ্রেসী ধারার সাথে। আর তারই ফলে বাংলার ইতিহাসে নেমে আসে রক্তাত্ব একাত্তর। ভারত বিশাল বাহিনী নিয়ে দাঁড়ায় মুজিবের পাশে। ভারতকে একাত্তরে যারা বন্ধু রূপে গ্রহণ করতে পারেনি তারা আজও পারছে না। তারা পারেনি ১৯৪৭ সালেও। আর এদের সংখ্যা বাংলাদেশে আজও কম নয়। বরং যতই বাড়ছে ভারতের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ভূ-প্রাকৃতিক আগ্রাসন ততই এরা দলে ভারী হচ্ছে। দেশটিতে এভাবেই মেরুকরণ হয়েছে প্রচন্ডভাবে। ফলে দেশ এগিয়ে চলছে সংঘাতের দিকে। ভারতের লক্ষ্য শুধু পাকিস্তানকেই দূর্বল করা নয়। বিনাশ করতে চায় উপমহাদেশের মুসলিম জাগরণকেও। তাই বাবরী মসজিদের ন্যায় মসজিদগুলো জমিনে মিশিয়ে দেওয়াই আগ্রাসী ভারতীয়দের একমাত্র লক্ষ্য নয়, গুড়িয়ে দিতে চায় প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তিও। সে লক্ষ্যে পাকিস্তানকে খন্তিত করাই ভারতের একমাত্র স্ট্রাটেজী ছিল না, স্ট্রাটেজী হলো বাংলাদেশকে তলাহীন করাও। একাত্তরের পর ভারতীয় বাহিনী যে ব্যাপক লুটপাট করেছিল ও শিল্পকে ধ্বংস করেছিল তার মূল কারণ তো ছিল সেটাই। অপরদিকে পাকিস্তানকে খন্ডিত করার মধ্য দিয়েই আওয়ামী রাজনীতি শেষ হয়নি। পরবর্তী স্ট্রাটেজী, বাংলাদেশের জনগণকে ইসলামে অঙ্গিকারহীন করা। ফলে ভারতের কাছে আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের প্রয়োজনীয়তাও ফুরিয়ে যায়নি। একারণেই উভয়ের মাঝে গড়ে উঠেছে দীর্ঘকালীন কোয়ালিশন। আওয়ামী লীগ তাই একাত্তরে যেমন ভারতের পার্টনার ছিল, এখনও পার্টনার।  

বাংলাদেশে আজ যে বিভক্তি তা নিয়ে ইতিহাস-বিকৃতি হয়েছে বিচিত্র ভাবে। বিকৃত সে ইতিহাসের ভাষ্য হলো, মুষ্টিমেয় কিছু রাজাকার ছাড়া সবাই একাত্তরে পাকিস্তান ভাঙ্গার পক্ষে ছিল। কিন্তু প্রকৃত সত্য কি তাই? শেখ মুজিব সেদিন বাঙ্গালী জাতীয়তার জোয়ার সৃ্ষ্টি করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু সবাই সে জোয়ারে ভেসে যায়নি। আওয়ামী লীগের বিপক্ষে শুধু রাজাকারগণই ছিল না, ছিল এক বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিপক্ষও। পাকিস্তান খন্ডিত হওয়াতে বাংলার মুসলমানদেরই শুধু নয়, বিশ্বের মুসলমানদেরও যে অপুরণীয় শক্তিহানী হবে সেটি যে শুধু ইসলামী দলের নেতাকর্মী, উলামা ও রাজাকারগণ অনুধাবন করেছিলেন তা নয়। তাদের পাশাপাশি সে সময়ের বহু প্রথম সারির বুদ্ধিজীবীরাও বুঝতে পেরেছিলেন। তাদের যু্ক্তি ছিল, পাকিস্তানে সমস্যা আছে, সমাধানের রাস্তাও আছে। পাত্রে ময়লা ধরলে ধুয়ে মুছে সেটি পরিস্কার করাই বুদ্ধিমত্তা, ভেঙ্গে ফেলা নয়। পাত্রে ময়লা ধরার ন্যায় দেশে দুর্বৃত্তরাও শাসক হয়। বিশ্বের প্রতিদেশেই সেটি হয়ে। প্রকৃত বুদ্ধিমানদের কাজ দুর্বৃত্ত তাড়ানো, দেশ ভাঙ্গা নয়। বাহাদুরী তো গড়াতে, ভাঙ্গাতে নয়। দেশের সীমান্ত এক মাইল বাড়াতে হলেও প্রকান্ড যুদ্ধ লড়তে হয়। ফলে দেশ ভেঙ্গে উৎসব করা তো আহাম্মকদের কাজ। তাছাড়া মুসলিম রাষ্ট্র ভাঙ্গার কাজে কি একটি তীর ছুড়ারও প্রয়োজন আছে? একাজ করার জন্য অতীতের ন্যায় আজও কি শত্রুর অভাব আছে? ভাঙ্গার আওয়াজ উঠালে বহু কাফের রাষ্ট্র সেটি নিজ খরচে করে দিতে দুই পায়ে খাড়া। কুয়েত, কাতার, আবুধাবি, দুবাই, বাহরাইনের মত তথাকথিত স্বাধীন দেশ সৃষ্টি করতে কি আরবদের অর্থব্যয়, শ্রমব্যয় বা রক্তব্যয় হয়েছে? কারও একটি তীরও কি ছুঁড়তে হয়েছে? মুসলমানদের শক্তিহীন করা, ইসরাইলের নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করা এবং আরবদের তেল সম্পদকে লুন্ঠন করার স্বার্থে পাশ্চাত্য দেশগুলো নিজ খরচে এ দেশগুলোকে সৃষ্টি করেছে। শুধু ভাঙ্গা কেন, পাকিস্তানের জন্ম বন্ধ করার জন্য ভারতীয় আধিপত্যবাদীদের চেষ্টা কি কম ছিল? একারণেই পাকিস্তান ভাঙ্গার যুদ্ধে আওয়ামী লীগকে একটি টাকাও ব্যয় করতে হয়নি। নিজ খরচে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রও খুলতে হয়নি। কোন অস্ত্রও কিনতে হয়নি। ভারতই সে কাজ নিজ খরচে ও নিজ উদ্যোগে করে দিয়েছে। এমন সহজ সত্যটি একাত্তরে অনেকেই বুঝতেন। ফলে তারা পাকিস্তানের বিরাজমান সমস্যার সমাধানে ভারতের মত একটি চিহ্নিত শত্রুদেশের হস্তক্ষেপ চাননি। চাননি ভারতীয় বাহিনীর বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ। তারা চাইতেন শান্তিপূর্ণ ভাবে একটি নিস্পতির, এবং কখনই সেটি পাকিস্তানেকে বিভক্ত করে নয়। পাকিস্তানের সংহতির পক্ষে আলেমদের মাঝে সে সময় যারা প্রথম সারিতে ছিলেন তারা হলেন কিশোরগঞ্জের প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন মাওলানা আতাহার আলী, চট্টগ্রামের প্রখ্যাত আলেম মাওলানা সিদ্দিক আহম্মদ, ঢাকার প্রখ্যাত মাওলানা মোস্তাফা আল মাদানী, লালবাগ মাদ্রাসার মাওলানা মোহাম্মদ উল্লাহ হাফেজজী হুজুর, পীর মোহসীন উদ্দিন দুদু মিয়া, শর্শিনার পীর আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহ এবং তার অনুসারিরা। পক্ষ নিয়েছে বাংলাদেশের প্রায় সকল গণ্যমান্য আলেম। সে সময় কোন প্রসিদ্ধ আলেম পাকিস্তান ভাঙ্গার পক্ষ নিয়েছে এ প্রমাণ নেই। তাদের যু্ক্তিটি ছিল, একটি মুসলিম দেশ ভাঙ্গলে মুসলিম উম্মাহর শক্তিহানী হয়। আর মুসলিম উম্মাহর শক্তিহানী তো কবিরা গুনাহ। একাজ তো কাফেরদের। অথচ বাংলাদেশের সেকুলারিষ্টদের কাছে মহান আল্লাহতায়ালা বা তাঁর রাসূল (সাঃ) কি বললেন সেটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। কোনটি কুফরি ও কোনটি জায়েজ সেটিও তাদের কাছে বিচার্য বিষয় ছিল না। এসব গুরুতর বিষয় গুরুত্ব পায়নি সেসব স্বৈরাচারি আরবদের কাছেও যারা অখন্ড আরব ভূখন্ড বিশেরও বেশী টুকরায় বিভক্ত করতে সাম্রাজ্যবাদী কাফের শক্তিকে সাহায্য করেছে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিবর্গ আজও এসব শাসকদের সবচেয়ে বড় রক্ষক। একইভাবে মুজিব ও তাঁর অনুসারিদের রক্ষকের ভূমিকা নিয়েছে ভারত।

শুধু আলেম, ইসলামী দলগুলীর নেতাকর্মী ও রাজাকারগণই নয়, তাদের সাথে অখন্ড পাকিস্তানের পক্ষ নিযেছিলেন বহু বুদ্ধিজীবীও। অথচ সে প্রকট সত্যটিকে আজ ভূলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। যে মিথ্যাটি আজ জোরে শোরে বলা হচ্ছে তা হলো, পাকিস্তানের বিভক্তির বিরোধী করেছিল মুষ্টিমেয় রাজাকার। অতএব কিছু উদাহরণ দেওয়া যাক। সে সময় ৫৫ জন কবি, শিল্পি ও বুদ্ধিজীবী একটি বিবৃতি দেন। তাতে পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশী হস্তক্ষেপের বিরোধীতা ও নিন্দা করা হয়। এতে স্বাক্ষর করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন, নাট্যকার ও লেখক প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে বিভাগের প্রধান এম, কবীর, মনস্তত্ত্ব বিভাগের প্রধান ড. মীর ফখরুজ্জামান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের রিডার ড. কাজী দীন মোহাম্মদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সিনিয়র লেকচারার ও নাট্যকার নুরুল মোমেন, কবি আহসান হাবীব, চিত্র পরিচালক খান আতাউর রহমান, গায়িকা শাহনাজ বেগম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র লেকচেরার ও নাট্যকার আশকার ইবনে শাইখ, গায়িকা ফরিদা ইয়াসমিন, পল্লী গীতির গায়ক আব্দুল হালিম, চিত্র পরিচালক এ. এইচ. চৌধুরি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের রিডার ড. মোহর আলী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রধান মুনীর চৌধুরী, বাংলা উন্নয়ন বোর্ডের ড. আশরাফ সিদ্দিকী, গায়ক খোন্দকার ফারুক আহমদ, গায়ক এস, এ, হাদী গায়িকা নীনা হামিদ, গায়িকা লায়লা আর্জুমান্দ বানু, শামশুল হুদা চৌধুরী (জিয়া ক্যাবিনেটের মন্ত্রী এবং এরশাদ সরকারের পার্লামেন্ট স্পীকার), গায়ীকা সাবিনা ইয়াসমীন, গায়িকা ফেরদৌসী রহমান, গায়ক মোস্তাফা জামান আব্বাসী, ছোটগল্পকার সরদার জয়েদ উদ্দীন, লেখক সৈয়দ মুর্তুজা আলী, কবি তালিম হোসেন, ছোটগল্পকার শাহেদ আলী, মাসিক মাহে নও সম্পাদক কবি আব্দুস সাত্তার, নাট্যকার ফররুখ শীয়র, কবি ফররুখ আহম্মদ, পাকিস্তান অবজারভার (আজকের বাংলাদেশে অবজারভার) পত্রিকার সম্পাদক আব্দুল সালাম, অধুনা বিলুপ্ত ঢাকার মর্নিং নিউজ পত্রিকার সম্পাদক এস, জি, এম বদরুদ্দীন, দৈনিক পাকিস্তান (পরবর্তী কালের দৈনিক বাংলা)সম্পাদক আবুল কালাম সামসুদ্দীন, অভিনেতা ও চিত্র পরিচালক ফতেহ লোহানী, কবি হেমায়েত হোসেন, লেখক আকবর উদ্দীন, লেখক আকবর হোসেন, লেখক কাজী আফসার উদ্দীন আহমেদ, লেখক ও সাংবাদিক সানাউল্লাহ নূরী, লেখক ও কবি শাসসুল হক, লেখক সরদার ফজলুল করিম, গায়িকা ফওজিয়া খান প্রমুখ।– (সুত্রঃ দৈনিক পাকিস্তান (অধুনালিপ্ত দৈনিক বাংলার পাকিস্তান আমলের নাম), ১৭ই মে, ১৯৭১ সাল)।

বিবৃতিতে উল্লিখিত স্বাক্ষরকারীগণ বলেন, “পাকিস্তানী শাসন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আমাদের নিজস্ব অভাব-অভিযোগ রয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আমাদের যেটা প্রাপ্য সেটা না পেয়ে আমরা অসুখী। আমাদের এই অসন্তোষ আমরা প্রকাশ করেছি একই রাষ্ট্র কাঠামোর আওতায় পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ব্যাপক স্বায়ত্বশাসনের পক্ষে ভোট দিয়ে। কিন্তু আওয়ামী লীগের চরমপন্থিরা এই সহজ সরল আইনসঙ্গত দাবীকে একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণার দাবীতে রুপান্তরিত করায় আমরা হতাশ ও দুঃখিত হয়েছি। আমরা কখনও এটা চাইনি, ফলে যা ঘটেছে আমরা তাতে হতাশ ও দুঃখিত হয়েছি। বাঙালী হিন্দু বিশেষ করে কোলকাতার মারোয়াড়ীদের আধিপত্য ও শোষণ এড়ানোর জন্যেই আমরা বাংলার মুসলমানেরা প্রথমে ১৯০৫ সালে ব্রিটিশ রাজত্বকালে পৃথক পূর্ববাংলা প্রদেশ গঠনের সিদ্ধান্ত নেই। এবং আবার ১৯৪৭ সালে ভোটের মাধ্যমেই পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রদেশের মুসলিম ভাইদের সাথে যুক্ত হওয়ার সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। উক্ত সিদ্ধান্তে অনুতপ্ত হওয়ার আমাদের কোন কারণ নেই। পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু প্রদেশ হিসেবে সারা পাকিস্তানকে শাসন করার অধিকার আমাদের আছে। আর সেটা আয়ত্তের মধ্যেই এসে গিয়েছিল। ঠিক তখনই চরমপন্থিদের দুরাশায় পেয়ে বসল এবং তারা জাতীয় অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে তুলল। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া দেশে সাধারণ নির্বাচন দিলেন। ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া আলোচনাকালে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া আওয়ামী লীগকে সংখ্যাগুরু দল হিসাবে অভিনন্দন জানিয়েছেন। কিন্তু উল্টোটাই ঘটে গেল এবং নেমে এল জাতীয় দুর্যোগ। .. কিন্তু আমরা আমাদের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে কোন বড় রকমের হস্তক্ষেপের বিরোধীতা ও নিন্দা করছি।” 

সে সময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পক্ষ থেকেও পত্রিকায় আরেকটি বিবৃতি ছাপা হয়। তারা বলেন, “আমরা নিম্নস্বাক্ষরকারী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ পাকিস্তানের সাম্প্রতিক ঘটনায় গভীর বেদনা বোধ করছি। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস যে, ভারতীয় যুদ্ধবাজ যারা মুসলমানদের স্বতন্ত্র আবাসভূমি হিসেবে পাকিস্তান সৃষ্টিকে কখনো গ্রহণ করেনি প্রধানত তাদের চক্রান্তের ফলেই এটা হয়েছে। …আমরা আমাদের প্রিয় স্বদেশ ভূমির সংহতি এবং অখন্ডতা রক্ষার জন্য আমাদের সেনাবাহিনীর সময়োচিত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রশংসা করছি।.. আমরা দেশের সংহতি ও অখন্ডতা বিপন্ন করার জন্য চরমপন্থিদের অপপ্রয়াসের নিন্দা করছি। বহির্বিশ্বের চোখে পাকিস্তানের মর্যদা হ্রাস ও পাকিস্তানকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করার অপচেষ্টা এবং সীমান্তে সশস্ত্র অনুপ্রবেশকারী পাঠিয়ে আমাদের ঘরোয়া ব্যাপারে ভারতীয় হস্তক্ষেপের আমরা নিন্দা করছি। আমরা ভারতের ভিত্তিহীন ও দুরভিসন্ধিমূলক প্রচারণার নিন্দা করছি। ভারতীয় বেতারে প্রচারিত একটি খবরের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে। উক্ত খবরে বলা হয়েছে যে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ধ্বংস করে দিয়েছে। আমরা দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করছি, এটা নির্লজ্জ মিথ্যা প্রচারণা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণের সকল ভবন অক্ষত অবস্থায় রয়েছে এবং কোন ভবনের কোনরূপ ক্ষতিসাধন হয়নি। আমরা দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করি, বর্তমান মুহুর্তে সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন আমাদের সকলের মধ্যে ঐক্য ও শৃঙ্খলা। আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রেখে আমরা বর্তমান সংকট হতে মুক্ত হতে পারব।” বিবৃতিটিতে স্বাক্ষর করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত ভিসি এবং আইন ফ্যাকাল্টির ডিন ইউ, এন, সিদ্দিকী, ইতিহাস বিভাগের প্রধান ও সাবেক ভিসি ড. আব্দুল করিম, সমাজ বিজ্ঞানের ডিন ড. এম, বদরুজ্জা, ইসলামের ইতিহাস বিভাগের লেকচেরার মোহাম্মদ ইনামুল হক, রাষ্ট্র বিজ্ঞানের প্রধান ড. রফিকুল ইসলাম চৌধুরী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের রিডার মোঃ আনিসুজ্জামান, ইংরাজী বিভাগের সিনিয়র লেকচেরার খোন্দকার রেজাউর রহমান, রাষ্টবিজ্ঞানের লেকচেরার সৈয়দ কামাল মোস্তফা, রাষ্টবিজ্ঞানের লেকচেরার এম, এ, জিন্নাহ, ইতিহাসের সিনিয়র লেকচেরার রফিউদ্দীন, রসায়ন বিভাগের প্রধান এ, কে, এম, আহমদ, সমাজ বিজ্ঞানের সিনিয়র লেকচেরার রুহুল আমীন, বাণিজ্য বিভাগের প্রধান মোঃ আলী ইমদাদ খান, ইতিহাসের সিনিয়র লেকচেরার হোসেন মোঃ ফজলে দাইয়ান, বাংলা বিভাগের সিনিয়র লেকচেরার মোঃ দিলওয়ার হোসেন, সংখ্যাতত্ত্বের সিনিয়র লেকচেরার আব্দুর রশিদ, ইতিহাস বিভাগের রিডার মুকাদ্দাসুর রহমান, ইতিহাসের লেকচেরার আহসানুল কবীর, অর্থনীতি বিভাগের লেকচারার শাহ মোঃ হুজ্জাতুল ইসলাম, ইংরাজী বিভাগের প্রধান মোহম্মদ আলী, পদার্থ বিভাগের রিডার এজাজ আহমেদ, গণিতের লেকচারার জনাব এস, এম, হোসেন, গণিত বিভাগের রিডার জেড, এইচ চৌধুরী, সংখ্যাতত্ত্বের জনাব হাতেম আলী হাওলাদার, বাংলা বিভাগের রিডার ড. মোঃ আব্দুল আওয়াল, বাংলা বিভাগের সিনিয়র লেকচারার মোঃ মনিরুজ্জামান, বাংলা বিভাগের সিনিয়র লেকচারার মোঃ মনিরুজ্জামান হায়াত (লেখক হায়াত মাহমুদ), ইতিহাস বিভাগের গবেষণা সহকারী আব্দুস সায়ীদ, অর্থনীতির লেকচারার মোহাম্মদ মোস্তাফা, ইতিহাসের লেকচারার সুলতানা নিজাম, ইতিহাসের রিডার ড. জাকিউদ্দীন আহমদ এবং ফাইন আর্টের লেকচেরার আব্দুর রশীদ হায়দার। -(সুত্রঃ দৈনিক পাকিস্তান, ২৭শে জুন, ১৯৭১)

সেকুলার চেতনার বুদ্ধিজীবীগণও তখন বসে থাকেনি। আওয়ামী ক্যাডারদের সশস্ত্র যুদ্ধের প্রতি সর্বাত্মক সমর্থণ নিয়ে তারা এগিয়ে আসেন। তাদের মিশন হয়, যেভাবেই হোক পাকিস্তানের আশু ধ্বংস। ভারত, রাশিয়াসহ যে কোন দেশের সাহায্য লাভও তাদের কাছে অতি কাম্য হয়ে দাঁড়ায়। তাদেরই ক’জন হলেনঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আবু সায়ীদ চৌধুরী, বাংলার অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান, অধ্যাপক ড. মাযহারুল ইসলাম, ড. এ, আর, মল্লিক, কবি আল মাহমুদ, রণেশ দাস গুপ্ত, অধ্যাপক ড. এবনে গোলাম সামাদ, আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী, শওকত ওসমান, আসাদ চৌধুরী, সরোয়ার মুর্শেদ। এদের অনেকে ভারতেও পাড়ি জমান।             

দেখা যাক, সে সেময় যেসব রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ অখন্ড পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিলেন তাদের দর্শন ও উদ্দেশ্যটি কি ছিল? আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী-বুদ্ধিজীবীগণ তাদেরকে চিত্রিত করেছে পাকিস্তানের দালাল রূপে। কিন্তু তারা কি সত্যই দালাল ছিলেন? দালালের সংজ্ঞা কি? দালাল তাদেরকে বলা হয়, যারা কাজ করে অন্যের স্বার্থে। এবং সেটা করে অর্থলাভ বা সুবিধা লাভের আশায়। কিন্তু যারা সেদিন পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিলেন তারা তো বিদেশের স্বার্থে কাজ করেননি। পাকিস্তান তাদের কাছে বিদেশ ছিল না, ছিল একান্ত নিজেদের দেশ। তারা কাজ করেছেন সে দেশটির স্বার্থে যে দেশটিকে তারা ১৯৪৬ সালে ভোট দিয়ে নিজেরা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এ দেশটির একতা ও সংহতি রক্ষার শপথ নিয়ে এমনকি শেখ মুজিবও অতীতে মন্ত্রী হয়েছেন। এমনকি সে অঙ্গিকার ব্যক্ত করে শেখ মুজিব ১৯৭০ সনের নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। নির্বাচনী ভাষণে পাকিস্তান জিন্দাবাদ ধ্বনিও দিয়েছেন। তাদের অপরাধ (?) শুধু এ হতে পারে, মুজিবের ন্যায় তারা সে অঙ্গিকারের সাথে গাদ্দারী করেননি। বরং অখন্ড পাকিস্তানের মধ্যে তারা নিজেদের কল্যাণ ও সে সাথে বিশ্ব-মুসলিমের কল্যাণ দেখেছেন। আর অর্থ লাভের বিষয়? তারা তো বরং পাকিস্তানের প্রতিরক্ষায় এবং ভারতের মোকাবেলায় নিজেদের মেধা, শ্রম এমনকি প্রাণদানে হাজির হয়েছিলেন। সে চেতনা নিয়ে হাজার হাজার রাজাকার শহীদও হয়েছেন। কোন দালাল কি কারো খাতিরে প্রাণ দেয়? দেখা যাক, সে সময়ে পাকিস্তানপন্থি নেতাদের নিজেদের অভিমত কি ছিল। পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ অবজারভার পত্রিকার মালিক জনাব হামিদুল হক চৌধুরী ১৯৭১ সালের ৬ই এপ্রিলে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, ‘ভারতীয় প্রচরণার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করা এবং তার দ্বারা একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে এদেশের অস্তিত্ব বিলোপ করে নিজস্ব সম্প্রসারণবাদী মনোভাব চরিতার্থ করা। এ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য এবং বিশ্বকে বিভ্রান্ত করার জন্য তারা তাদের সকল প্রচার মাধ্যমের দ্বারা বিশ্ববাসীর নিকট হাজার হাজার নরহত্যা ও বোমাবর্ষণের ফলে শহর ধ্বংসের ভিত্তিহীন অভিযোগ প্রচার করছে।”-(সুত্রঃ একাত্তরের ঘাতক ও দালালেরা কে কোথায়?)। ১৯৭১ সালের ৬ই এপ্রিলে দেওয়া এক বিবৃতিতে জনাব শাহ আজিজুর রহমান (বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী) বলেন, “প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া প্রবল উৎকন্ঠার সঙ্গে রাজনৈতিক দলসমূহের অধিকতর স্বাধীনতা প্রদান পূর্বক দেশে পূর্ণ ও বাধাহীন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেন। … আওয়ামী লীগ এই সুযোগের ভূল অর্থ করে বল প্রয়োগের … মাধ্যমে নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসাবে জয়লাভ করে নিজেদের খেয়ালখুশীতে দেশ শাসনের দাবী করে এবং এভাবেই অহমিকা, অধৈর্য এবং ঔদ্ধত্যের ফলে নিজেদের ভাসিয়ে দেয়। …আমি সাম্রাজ্যবাদী ভারতের দুরভিসন্ধি নস্যাৎ করার উদ্দেশ্যে দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীকে সাহায্য করার জন্য জনগণের প্রতি আবেদন জানাচ্ছি।”-(সুত্রঃ একাত্তরের ঘাতক ও দালালেরা কে কোথায়?)। পূর্ব পাকিস্তান মাদ্রাসা শিক্ষক সমিতির সভাপতি মাওলানা আব্দুল মান্নান ১৯৭১ য়ের ২৭ শে এপ্রিল এক বিবৃতিতে বলেন, “সশস্ত্র অনুপ্রবেশকারী ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমূলে উচ্ছেদ করার উদ্দেশ্যে পূর্ব পাকিস্তানের দেশপ্রেমিক জনগণ আজ জেহাদের জোশে আগাইয় আসিয়াছে।” -(সুত্রঃ একাত্তরের ঘাতক ও দালালেরা কে কোথায়?)। পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর আমীর জনাব গোলাম আযম এক বিবৃতিতে বলেন, “পূর্ব পাকিস্তানীরা পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী ভারতকে ছিনিমিনি খেলতে দেব না। … পূর্ব পাকিস্তানীরা কখনই হিন্দু ভারতের দ্বারা প্রভাবিত হবে না। ভারতীয়রা কি মনে করেছে যে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের এতদূর অধঃপতন হয়েছে যে তারা ভারতকে তাদের বন্ধু ভাববে।” –(দৈনিক সংগ্রাম, ৮ই এপ্রিল, ১৯৭১)। পাকিস্তান ডেমোক্রাটিক পার্টির সভাপতি এবং পুর্ব পাকিস্তানের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী জনাব নুরুল আমীন বলেন, “পাকিস্তান সৃষ্টির জন্য আমরা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ এবং ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছি এবং সে সংগ্রামে জয়ী হয়েছি। আজও পাকিস্তানের অখন্ডতা রক্ষার জন্য আমাদের বিরুদ্ধে শক্তির মোকাবেলা করতে হবে। -(দৈনিক পাকিস্তান, ১৬ই আগষ্ট, ১৯৭১)। পাকিস্তান ডিমোক্রাটিক পার্টির সহসভাপতি ও প্রখ্যাত পার্লামেন্টারীয়ান জনাব মৌলবী ফরিদ আহমদ বলেন, “পাকিস্তানকে খন্তিত করা এবং মুসলমানদের হিন্দু-ব্রাহ্মণ্য ফ্যাসীবাদীদের ক্রীতদাসে পরিণত করার ভারতীয় চক্রান্ত বর্তমানে নিরপেক্ষ বিশ্ববাসীর কাছে সুস্পষ্ট হয়ে গেছে।… একমাত্র ইসলামের নামে এদেশের সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাস ভারতীয় এজেন্টরা তথাকথিত সাংস্কৃতিক বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের নামে এমন জঘন্য কাজ সম্পাদনে সক্ষম হয়েছে যা করতে হিটলারের ঘাতকদের বর্বরতাও লজ্জা পাবে। (সম্ভবতঃ এখানে তিনি ১লা মার্চ থেকে ২০ শে এপ্রিল পর্যন্ত দেশ আওয়ামী লীগ ক্যাডারদের দখলে থাকার সময় অবাঙ্গালীদের উপর যে গণহত্যা, ধর্ষণ ও লুটতরাজ নেমে আসে সেটি বুঝিয়েছেন)-(দৈনিক পাকিস্তান ১৬ই আগষ্ট, ১৯৭১)। মুসলিম লীগ নেতা এবং পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সাবেক স্পীকার জনাব ফজলুল কাদের চৌধুরী বলেন, “জাতি আজ তার সংক্ষিপ্ত ইতিহাসের মারাত্মক সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। ..পূর্ব পাকিস্তানের শতকরা ৯৬ জন লোক পাকিস্তানের জন্য ভোট দিয়েছিল …ভারতীয় এজেন্টদের দ্বারা পরিচালিত তথাকথিত বাংলাদেশ বেতার থেকে দিনরাত তাঁর ও অন্যান্য মুসলিম লীগ নেতার মৃত্যুদন্ডের কথা তারস্বরে ঘোষণা করা হচ্ছে। …পাকিস্তানের জন্য সংগ্রাম করে যাব। কারণ পাকিস্তানই যদি না থাকে তাহলে অধিকারের জন্য সংগ্রামের অবকাশ কোথায়?”-(দৈনিক পাকিস্তান, ১৮ই জুলাই, ১৯৭১)।  

কথা হলো, যারা এমন এক প্রবল চেতনা নিয়ে পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিলেন তাদেরকে কি বিদেশীদের দালাল বলা যায়? তারা যদি দালালী করেই থাকেন তবে সেটি করেছেন তাদের নিজস্ব চেতনা-বিশ্বাস ও স্বার্থের সাথে। তারা লড়াই করেছিলেন এবং প্রাণ দিয়েছিলেন নিজদেশের প্রতিরক্ষায়। আজও একই চেতনা নিয়ে তারা কাজ করছেন বাংলাদেশে। দু’টি ভিন্ন চেতনা আবার সেদিনের মত মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশে। তাই বাংলাদেশে বিভক্তির রাজনীতি একাত্তরে শেষ হয়নি। শেষ হয়নি ভারতীয় আগ্রাসনও। বাংলাদেশের আজকের সমস্যা মূলতঃ ভারতপন্থিদের সৃষ্টি। তবে খেলা এখন বাংলাদেশের ঘরে নেই। বাংলাদেশ চাইলেও সেটি থামানোর সামর্থ তার নেই। নিয়ন্ত্রন নেই এমনকি আওয়ামী লীগেরও। বরং এ দলটি নিজেই খেলছে ভারতের ক্রীড়নক হিসাবে। একাত্তরেও একই অবস্থা ছিল। মুজিবের হাত থেকে খেলা আগেই ভারত নিয়ে নিয়েছিল। ফলে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ও ভূট্টোর সাথে আলোপ আলোচনার সময় মুজিব শুধু তাই বলেছে যখন যা ভারত তাঁকে বলতে বলেছে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধেই ইতিমধ্যেই যুদ্ধ শুরু হয়েছিল ঢাকার রাজপথে। অবশেষে বাকি খেলার পুরা দায়িত্ব ভারতকে দিয়ে জেনে বুঝে মুজিব পাকিস্তানের জেলে গিয়ে উঠেন। মুজিবনগর সরকার নামে যে পুতুল সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তার সামান্যই সামর্থ ছিল ভারতকে প্রভাবিত করার। বরং সে সরকার নিজের অস্তিত্ব নির্ভর করছিল ভারত সরকারের করুণার উপর।  

ভারতের  স্ট্রাটেজী হলো, বাংলাদেশকে একটি দূর্বল রাষ্ট্র রূপে কোন মত বাঁচিয়ে রাখা। কারণ, ভারতের জন্য এটি এক রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা। একাত্তরের যুদ্ধে ভারত বিপুল অর্থ বিণিয়োগ করেছিল এবং তার হাজার হাজার সৈন্য প্রাণ দিয়েছিল সেটিও ছিল এ লক্ষেই। একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী বাংলাদেশ নির্মাণে ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল -সেটি কিছু বাংলাদেশী বেওকুফ বিশ্বাস করলেও কোন ভারতীয় বিশ্বাস করেনি। তারা বুঝে, বাংলাদেশ সবল হওয়ার মধ্যেই ভারতের বিপদ। তখন বল পাবে ভারতীয় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ৭টি রাজ্যের বিদ্রোহীরা। বল পাবে ভারতের প্রায় ২০ কোটি মুসলিম। ভারতের কাছে সেটি অসহনীয়। তাই আরেক পাকিস্তানকে কখনই তারা ভারতের পূর্ব সীমান্তে বেড়ে উঠতে দিবে না। এ নিয়ে তাদের আপোষ নেই। এজন্যই প্রতিদিনের পানাহারের ন্যায় তাদের কাছে অতি অপরিহার্য হলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিবাদ ও সংঘাত টিকিয়ে রাখা। তাই বিভক্তির সূত্রগুলো খুঁজে খুঁজে বের করে তাকে তারা অবিরাম পরিচর্যা দিচ্ছে। তাই একাত্তরের বিবাদ ও বিভক্তি বিলুপ্ত হওয়ার নয়। বরং দিন দিন সেটি প্রবলভাবে বেড়ে উঠছে। তাই মুজিব যা নিয়ে আর এগুনোর সাহস পায়নি, সে একাত্তর নিয়ে তার কন্যা তার হাজার হাজার রাজনৈতিক বিরোধীদের উপর আবার পুলিশী হয়রানী ও দলীয় নির্যাতন চাপিয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতীয় বিশাল পুঁজি বিণিয়োগের মূল হেতু তো এখানেই। তবে ভারত এবার সব ডিম এক থলিতে রাখেনি। বিস্তর পুঁজি বিণিয়োগ হয়েছে আওয়ামী লীগের বাইরেও। সেটি বোঝা যায় মিডিয়া ও এনজিও জগতের দিকে তাকালে। মুজিব আমলেও এত পত্রিকা ও এত বুদ্ধিজীবী ভারতের পক্ষ নেয়নি যা আজ নিচ্ছে। এরাই আজ আরেকটি যুদ্ধের প্রেক্ষাপট তৈরী করছে। সেটি পত্র-পত্রিকা ও টিভির মাধ্যমে ঘৃণার বীজ ছড়িয়ে। তাদের পক্ষ থেকেই বার বার দাবী উঠছে, “শুরু হোক আরেক একাত্তর” এবং “আবার গর্জে উঠুক একাত্তরের হাতিয়ার”। কথা হলো, একাত্তরের এক যুদ্ধই বাংলাদেশকে তলাহীন ভিক্ষার ঝুলিতে পরিণত করেছিল, আরেক যুদ্ধের ব্যয়ভার বহনের সামর্থ কি বাংলাদেশের আছে? তাছাড়া আরেক যুদ্ধ শুরু হলে সেটি কি নয় মাসে শেষ হবে? সেটি হবে গৃহযুদ্ধ। আর গৃহযুদ্ধে কোন পক্ষ জিতে না, হারে সমগ্র দেশ। সেটি হবে বাংলাদেশের জন্য বড় আত্মঘাত। ভারত তো সেটাই চায়। ভারতের লক্ষ্যই হলো মুসলমানদের বিভক্ত করা এবং শাসন করা। যে কোন শত্রুর এটিই হলো অভিন্ন স্ট্রাটেজী। আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে বিজয়ী করার চেয়ে এটিই তাদের কাছে বেশী গুরুত্বপূর্ণ। বরং আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করার লক্ষ্যও সেটিই যাতে এ বিভক্তিকে আরো দীর্ঘজীবী ও প্রবলতর করা যায়।  

বাংলাদেশীদের  মাঝে বিভক্তি গড়ার সবচেয়ে বড় কাজটি করছে মিডিয়া। ভারতের পক্ষে আজকের বুদ্ধিবৃত্তিক মূল যুদ্ধটি করছে তারাই। আর আওয়ামী লীগের ন্যায় ভারতপন্থি দলগুলীর মূল কাজ হয়েছে সে বিভক্তিকে একটি রাজনৈতিক সংঘাতে রূপ দেওয়া। কারণ, এ পথেই বাড়ে ভারতের অর্থলাভ ও রাজনৈতিক সাহায্যলাভ। তাই বাংলাদেশের অধিকাংশ মিডিয়া ও ভারতপন্থি দলগুলো এক ও অভিন্ন লক্ষ্যে কাজ করছে। ইসলামপন্থি এবং একাত্তরের পাকিস্তানপন্থিদের বিরুদ্ধে ভারতপন্থিদের আজকের আক্রমণ এজন্যই আজ নতুন মাত্রা পাচ্ছে। ফলে যে রাজনৈতিক বিভক্তি ও সংঘাতের আগুন জ্বলে উঠেছিল একাত্তরে, ৪০ বছর পর আজও সেটি নিভছে না। একাত্তরে তাদের কামানের মুখ ছিল পাকিস্তানের দিকে, কিন্ত এবারের রণাঙ্গণে পাকিস্তান নেই। কামানের নল এবার খোদ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। একাত্তরের চেতনার এটিই মরণছোবল। এমন একটি মাস্টার প্লান নিয়ে ভারত ১৯৪৭ থেকেই ময়দানে নেমেছিল। একাত্তরে সেটি অর্ধেক সফল হয়েছিল। এবার সফল করতে চায় বাঁকিটুকু।




বাংদেশের রাজনীতিতে রক্তপাত ও নাশকতা

রক্তপাত কোনদেশেই সৌহার্দ, সম্পৃতি ও একতা গড়ে না। শান্তিও আনে না। যা গড়ে তা হলো পরস্পরের মাঝে গভীর ঘৃনা, বিভক্তি ও সে সাথে নতুন নতুন রক্তপাতের প্রেক্ষাপট। রক্তের স্মৃতি সহজে মুছে না, বরং সেটি বেঁচে থাকে যুগ যুগ ধরে। এবং গভীরতর করে ঘৃনা। রক্তের স্মৃতি ধরেই জাহেলী যুগের আরবগণ একই যুদ্ধ চালিয়ে যেত শত শত বছর ধরে। রাজনীতিতে রক্তাক্ষয়ী পথ তাই প্রজ্ঞাবান নেতাগণ এড়িয়ে চলেন। বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান গড়তে তাই কোন রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধ লড়তে হয়নি। অথচ মুজিব জেনেশুনেই ভয়ানক রক্তপাতের পথ বেছে নেয়। তবে তাতে মুজিবের স্বার্থ যাই থাক, ভারতে স্বার্থ ছিল বিরাট। পাকিস্তান সৃষ্টির শুরু থেকেই ভারতের লক্ষ্য ছিল, নানা ভাষার ও নানা অঞ্চলের মুসলমানদের মাঝে তীব্রতর ঘৃনা ও বিভেদ সৃষ্টি হোক। আর সে ঘৃনায় ভেঙ্গে যাক উপমহাদেশের মুসলমানদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল পাকিস্তান। এ লক্ষ্যে মুজিবের উপরের অর্পিত দায়িত্ব ছিল পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ভারতীয় বাহিনীর ঢুকার উপযোগী প্রেক্ষাপট তৈরী করা। তবে মুসলমানদের মাঝে ঘৃণা ও বিভক্তিকে তীব্রতর ও স্থায়ী করার স্বার্থে মুজিব ও তার সমর্থকগণ শুধু পাকিস্তান ভাঙ্গা নিয়েই খুশি ছিল না। তাদের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় নিরস্ত্র পাকিস্তানপন্থিদের হত্যা, তাদের উপর নির্মম নির্যাতন, তাদের সম্পদ লুট, বাড়ী দখল ও তাদের বিরুদ্ধে লাগাতর ঘৃনা সৃষ্টির মাধ্যমে পরিস্থিতিকে আরো বিষাক্ত ও বীভৎস করা।

একাত্তরের যুদ্ধ শেষ হলেও তাই ঘৃণার আগুন ইচ্ছা করেই থামতে দেওয়া হয়নি। বরং সে ঘৃনাকে তীব্রতর করা হয়েছে শুধু একাত্তরের পাকিস্তানপন্থিদের বিরুদ্ধেই নয়, আজকের ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধেও। মুজিবের সে সিদ্ধান্তের কারণেই বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রথম পৃষ্ঠা থেকে শুরু করে প্রায় অধিকাংশ পৃষ্ঠাই রক্তাত্ব। অসংখ্য মানুষ এতে নিহত হয়েছে, বহু নারী ধর্ষিতা হয়েছে এবং লুন্ঠিত হয়েছে লক্ষ লক্ষ ঘর-বাড়ী ও দোকানপাট। সে ঘৃনার আগুন শুধু বাংলাদেশের হাজার হাজার মানুষের জীবনই কেড়ে নেয়নি, কেড়ে নিয়েছে মুজিরেব নিজের জীবনও। বাঁচেনি তাঁর নিজের পরিবার। জীবন কেড়ে নিয়েছে জিয়াউর রহমানসহ আরো অনেকের। আজ সে আগুনেই অবিরাম পেট্রোল ঢালা হচ্ছে। ফলে মৃত্যুও অবিরাম হানা দিচ্ছে বাংলাদেশের আনাচে কাঁনাচে। ফলে দেশ দ্রুত এগিয়ে চলেছে আরেক ভয়াবহ বিভক্তি ও রক্তক্ষরণের দিকে।  

রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের শান্তিপূর্ণ মাধ্যম হলো নির্বাচন। পাকিস্তানে সত্তরের নির্বাচন হয়েছিল তেমনি একটি লক্ষ্যকে সামনে রেখে। অথচ যাদের লক্ষ্যই ছিল, পাকিস্তানের বিনাশ তাদের কাছে কি এমন নির্বাচনের কোন গুরুত্ব থাকে? তাই সত্তরের নির্বাচন মুজিবের কাছে ছিল বাহানা মাত্র। নির্বাচনকে তিনি মোক্ষম অস্ত্র রূপে ব্যাবহার করেন পাকিস্তানপন্থি ও ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে সারা দেশ জুড়ে মনে বিষ ছড়ানোর কাজে। পাকিস্তানের বিনাশে মুজিবের লড়াইয়ের শুরু একাত্তর থেকে নয়, শুরু হয়েছিল ১৯৪৭ সাল থেকে –সেটি ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারিতে পাকিস্তানের জেল থেকে ফেরার পর সোহরোওয়ার্দী ময়দানের জনসভায় দম্ভভরে তিনি বলেছিলেন। সে জন্য ভারতের সাথে তাঁর আগরতলা ষড়যন্ত্র চুক্তি হয়েছিল বহু আগেই। সে কাঙ্খিত লক্ষে পৌছবার জন্য প্রয়োজন ছিল জনসমর্থন। প্রয়োজন ছিল, পাকিস্তান ও পাকিস্তানপন্থিদের বিরুদ্ধে মানুষের মগজকে এতটা ঘৃণাপূর্ণ করা যেন বিনা দ্বিধায় তারা তাদেরকে হত্যা করতে পারে এবং লুণ্ঠন করতে পারে তাদের সহায়-সম্পদ। কোন পরিবারকে শিশুসন্তান ও মহিলাসহ বসতবাড়ি থেকে গাছতলায় নামানোর মত কুৎসিত মানসিকতা সবার থাকে না। এমন নৃশংসতা এমনকি নিষ্ঠুর চোর-ডাকাতদেরও থাকে না। তারাও হাতের কাছে যা পায় তা নিয়েই ভেগে যায়, বসতঘর বা দোকানপাটের উপর দখলদারি নেয়না। কিন্তু মুজিবের সমর্থকদের নিষ্ঠুরতা ছিল বহুগুণ বীভৎস ও বর্বর। তাদের সংখ্যা দুয়েক হাজার ছিল না, ছিল বহু লক্ষ। তারা বহু লক্ষ বিহারী ও পাকিস্তানপন্থিদের রাস্তায় নামিয়ে তাদের ঘরবাড়ীর উপর দখল নিয়েছে। কবজা করে নিয়েছে তাদের ব্যবসাবাণিজ্য। তারই ফলশ্রুতিতে বহু লক্ষ বিহারী বাংলাদেশের বহু শহরে আজও বস্তিতে বাস করে। আর শেখ মুজিব তাদের পুরস্কৃত করেছেন সে অপরাধের আইনি বৈধতা দিয়ে। ফল দাঁড়ালো, বাংলাদেশের হাজারো বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ানক দস্যুবৃত্তির ইতিহাস সৃষ্টি হলো, অথচ তা নিয়ে বাংলাদেশের আদালতে কোন বিচারই বসলো না, কারো শাস্তিও হলো না। বাংলাদেশ যে পরবর্তীতে দুর্বৃত্তিতে বিশ্বের প্রায় দুই শতটি দেশকে পিছনে ফেলে বার বার শিরোপা পেয়েছে তার প্রস্তুতির কাজটি মূলতঃ সে সময়েই হয়েছে। যারা সে সময় বিহারী বা পাকিস্তানপন্থিদের সম্পদে হাত দিয়েছে তারাই পরবর্তীতে দেশের সম্পদে হাত দিচ্ছে।  

শেখ মুজিবকে  জনসমর্থণ পেতেও বেগ পেতে হয়নি। সত্তরের নির্বাচনে তিনি ২০টাকা মণ দরে চাউল খাওয়াবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন সোনার বাংলার। যে দেশের মানুষের ঘরে শত শত বছর ধরে টিন নেই, ঘরে দরজা নেই, দু’বেলা খাবার নেই, সেদেশের মানুষ এমন প্রতিশ্রুতি পেলে মুজিবকে ভোট দিবে না সেটি কি ভাবা যায়? পরবর্তীতে এ সব প্রতিশ্রুতিই মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। বিশ টাকা মন চাউলের পরিবর্তে শেখ মুজিবের উপহার ছিল দূর্ভিক্ষ। দেশ পরিণত হয়েছিল তলাহীন ভিক্ষার ঝুলিতে। মহিলারা কাপড়ের অভাবে মাছধরা জাল পড়তে বাধ্য হয়েছিল। দুর্বৃত্ত ও ধোকাবাজদের কাছে নির্বাচন যে কতটা মারাত্মক হাতিয়ার রূপে ব্যবহৃত হতে পারে সত্তরের নির্বাচনে সেটিই প্রমাণিত হয়েছিল। নির্বাচন শেষে পাকিস্তানের সংবিধান তৈরী বা দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়া -এসব নিয়ে শেখ মুজিবের কোন মাথা-ব্যাথা ছিল না। বরং প্রবল আগ্রহ ছিল এবং সে সাথে পরিকল্পিত স্ট্রাটেজীও ছিল, কি করে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ডেকে আনার উপযোগী প্রেক্ষাপট তৈরী করা যায়। তাকে সে মোক্ষম সুযোগটিই দেয় নির্বাচন। শেখ মুজিব নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল নিছক পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে ষড়যন্ত্রের ফাঁদে ফেলার জন্য। সে লক্ষ্যে তিনি সফলও হয়েছিলেন। ইয়াহিয়া খানকে বলেছিলেন, আমি মুসলিম লীগ করে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় অংশ নিয়েছি। আমি কি করে পাকিস্তান ভাঙ্গতে পারি। টোপ ফেলেছিলেন, বিজয়ী হলে ইয়াহিয়া খানকে প্রেসিডেন্ট বানাবেন। আর ইয়াহিয়া খান তাকে বিশ্বাস করেছিলেন। আর মৃত্যুর আগে তিনি বলে গেছেন, মুজিব কে বিশ্বাস করেই তিনি বড় ভূল করেছেন। এসব কথা আজ আর কোন গোপন বিষয় নয়। বাংলাদেশীদের ন্যায় সাধারণ পাকিস্তানীরাও সেটি জানে। ফলে বাংলাদেশীদের কাছে মুজিব যেরূপেই চিত্রিত হোন না কেন, পাকিস্তানীদের কাছে মুজিব চিত্রিত হয়েছেন একজন বিশ্বাসভঙ্গকারী গাদ্দার রূপে। এমনকি ভারতসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের মুসলমানদের কাছেও মুজিব কোন ভাল পরিচয় পাননি। কারণ, একটি মুসলিম দেশ বিভক্ত হোক সেটি কোন মুসলমান চায় না। আজকের বিপর্যস্ত ইরাক ও সুদান খন্ডিত হোক – সেটি কি কোন মুসলমান কামনা করে? ফলে সেদিন পাকিস্তানের বিভক্তিও তারা চায়নি। ভারতের ন্যায় একটি কাফের রাষ্ট্রের হাতে ৯০ হাজার মুসলমান বন্দী হোক সেটিও কোন মুসলমানের কাছে আনন্দদায়ক ছিল না। ফলে ভারতের সাহায্য নিয়ে বাংলাদেশের সৃষ্টি বিশ্বের মুসলমানেরা সুনজরে দেখেনি। ফলে শেখ মুজিব ঘৃনীত হয়েছেন সমগ্র মুসলিম বিশ্বজুড়ে। সেদিন তিনি চিত্রিত হয়েছিলেন হিন্দুপ্রধান ভারতের এজেন্ট রূপে। এজন্যই বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন দেশরূপে স্বীকৃতি দিতে মুসলিম দেশগুলো ইতস্ততঃ করেছে। বরং তাদের সহানুভূতি ও সহমর্মিতা গিয়ে পড়ে পরাজিত পাকিস্তানের প্রতি। সত্তরের দশকের প্রথম দিকে ইসরাইলের পৃষ্ঠপোষক পশ্চিমা বিশ্বকে শায়েস্তা করতে আরব দেশগুলোর চাপে ওপেক হঠাৎ তেলের দাম বাড়িয়ে দেয়। ফলে সৌদিআরব, ইরান, কুয়েত, দুবাই, বাহরাইন, কাতারের মত দেশে সৃষ্টি হয় বিপুল অর্থভান্ডার। শুরু হয় ব্যপক উন্নয়ন কাজ এবং সৃষ্টি হয় লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ। আরব দেশগুলো তখন গভীর সহানুভুতি নিয়ে চাকুরীর দোয়ার বিশেষ ভাবে খুলে দেয় সামরিক ভাবে পরাজিত ও মানসিক ভাবে আহত পাকিস্তানীদের জন্য। বাঁধ ভাঙ্গা জোয়ারের ন্যায় লক্ষ লক্ষ পাকিস্তানী তখন সেখানে গিয়ে হাজির হয়। অথচ মুজিবের নেতৃত্বে ভারতের একটি তাঁবেদার সরকারের কারণে সে শ্রম-বাজারে ঢুকা অসম্ভব হয় বাংলাদেশীদের জন্য। বাংলাদেশীদের জন্য দরজা খোলা দূরে থাক, আরবদেশগুলো তখনও বাংলাদেশকে স্বীকৃতিই দেয়নি। একাত্তরের যুদ্ধ শুধু দেশে নয় বিদেশেও কীরূপ বিদ্বেষ ও ঘৃণা বাড়িয়েছিল এ হলো তার নমুনা। অপর দিকে একাত্তরের যুদ্ধ শেষে সাহায্য দেয়া শুরু হয়ে পাকিস্তানে। পাকিস্তানের বন্ধুরাষ্ট্রগুলো ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দেশটির অখন্ডতা বাঁচাতে প্রত্যক্ষ্ ভাবে সাহায্য করতে না পারলেও যুদ্ধ শেষে আর্থিক ভাবে পুষিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। ফলে যুদ্ধে পাকিস্তানের যা ক্ষতি হয়েছিল তার চেয়ে বহুগুণ বেশী পেয়েছিল বন্ধু রাষ্ট্রগুলো থেকে। অপরদিকে ভারত সাহায্য না করে মনযোগী হয় বাংলাদেশে যা কিছু সম্পদ ছিল তা ত্বড়িৎ লুন্ঠনে। সীমান্ত বাণিজ্যের নামে শুরু হয় বাংলাদেশের সীমান্তজুড়ে অর্থনৈতিক ফুটো সৃষ্টির কাজ। এভাবে দেশটির তলা ধ্বসিয়ে দেয়। ফলে অসম্ভব হয়ে পড়ে বিদেশ থেকে প্রাপ্ত রিলিফের মালামাল ধরে রাখাও। এরূপ অবস্থা দেখে হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে “তলাহীন ভিক্ষার ঝুলি” আখ্যা দিয়েছিলেন। এ খেতাবে বাংলাদেশ তখন পরিচিতি পায় বিশ্ব জুড়ে। এভাবেই নেমে আসে ভয়ানক দুর্ভীক্ষ। ফলে ১৯৪৭য়ে যে বিশাল বৈষম্য নিয়ে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান যাত্রা শুরু হয়েছিল তা পাকিস্তানের ২৩ বছরে অনেকটা কমে আসলেও মুজিব শাসনে দুই দেশের মধ্যে সেটি আবার দ্রুত বেড়ে যায়। মুজিবের নেতৃত্বে বাংলাদেশ তখন দ্রুত ধাবিত হয় দূর্ভীক্ষ ও “তলাহীন ভিক্ষার ঝুড়ি” হতে, আর পাকিস্তান ধাবিত হয় বিশ্বের সপ্তম আণবিক শক্তি হতে।  

বাংলাদেশ আজ বিভক্ত শুধু রাজনৈতিক ভাবেই নয়, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং আদর্শিক ভাবেও। এক শিবিরে অবস্থান নিয়েছে ভারত-ভক্ত ইসলাম-বিরোধী পক্ষ, অপর শিবিরে তাদের বিরোধীরা। দুই পক্ষের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলী যে ভিন্ন তাই নয়, ভিন্ন তাদের নেতা, বীর, কবি-সাহিত্যিক ও গর্বের বিষয়গুলোও। সে ভিন্নতা প্রকাশ পায় তাদের রাজনৈতিক শ্লোগানেই শুধু নয়, বরং তাদের ছেলেমেয়েদের নামকরণ, পোশাকপরিচ্ছদ ও রীতি-নীতির মধ্যেও। একপক্ষ ভালবাসে তাদের সন্তানদের নাম হোক এবং সে সাথে মহান আদর্শ হোক আবু বকর, ওমর, আলী, ওসমান, হাসান, হোসেন, খালেদ, খাদিজা, ফাতিমা ও সুমাইয়া। অপর পক্ষের অতি পছন্দীয় নাম হলো জয়, পুতুল, আকাশ, বাতাস, সাগর, সমুদ্র ইত্যাদী। একদলের কাছে বীর হলো সূর্য সেন, প্রীতিলতা ও ক্ষুদিরাম, আর অনুপ্রেরণার উৎস লালন ফকির ও রবীন্দ্রনাথ সাহিত্য। অপর পক্ষটি অনুপ্রেরণা পায় পবিত্র কোরআন-হাদীস ও ইসলামী দর্শন থেকে। সাধারণতঃ এমন গভীর বিভক্তি গড়ে উঠে যুদ্ধরত দু’টি জাতির মাঝে। আর যুদ্ধ না থাকলে, এমন বিভক্তি যুদ্ধকেই অনিবার্য করে তুলে। অথচ বাংলাদেশে এমন বিভক্তি পাকিস্তান আমলে ছিল না। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ আমলেও ছিল না। বাংলায় মুসলিম জাগরণ এসেছিল উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দুই দশকে, হিন্দুদের মাঝে নবজাগরণে শুরুর প্রায় দুই দশক পরেই। সে জাগরণের মূল সূর ছিল ঐক্য। সে ঐক্যই বাংলার রাজনীতিতে তাদের বিজয় এনে দিয়েছিল, এবং সেটি প্রতিপত্তিশালী হিন্দুদের বিরুদ্ধে। সে ঐক্যে ঈর্ষান্বীত হয়েছিল এমন কি হিন্দুরাও। বাংলায় প্রথম সংসদীয় নির্বাচন হয় ১৯৩৭ সালে। এরপর হয় ১৯৪৬ সালে। দুই নির্বাচনেই মুসলমানগণই বিজয়ী হয়। তখন বাংলার জনসংখ্যার প্রায় শতকরা ৪৫ জন ছিল হিন্দু। শিক্ষাদীক্ষা, ব্যবসাবাণিজ্য ও ধনসম্পদে তারা ছিল মুসলমানদের থেকে বহুগুণ এগিয়ে। কোলকাতার প্রায় ৭০ ভাগ বাসিন্দাই ছিল তারা। কিন্তু এরপরও মুসলমানগণ ১৯৩৭ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত এক যুগের বেশী কাল ধরে অখন্ড বাংলার রাজধানী কোলকাতায় প্রধানমন্ত্রীর আসনে কোন হিন্দুকে বসতে দেয়নি। অথচ আজ বাংলাদেশের জনসংখ্যার শতকরা ৯০জন মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও দেশটি পরিণত হয়েছে ভারতের আজ্ঞাবহ এক তাঁবেদার রাষ্ট্রে। তখন বাংলার মুসলমানদের দুইটি প্রধান দল ছিল। একটি ছিল মুসলিম লীগ এবং অপরটি ছিল শেরে বাংলার নেতৃত্বাধীন কৃষক-প্রজা পার্টি। তাদের মাঝে রাজনৈতিক বিরোধ থাকলেও মুসলমানদের কল্যাণের মাঝে ঐক্যও ছিল। কংগ্রেস ছিল মূলতঃ হিন্দুদের দল, যদিও তাতে কিছু সেকুলার মুসলমানও ছিল। ১৯৩৭ সালে মুসলিম লীগ ও কৃষক-প্রজা পার্টি মিলে প্রথমে কোয়ালিশন সরকার গঠন করে, পরবর্তীতে মুসলিম লীগের পতাকা তলে একীভূত হয়ে যায়। নেতাগণ তখন একতার গুরুত্ব বুঝেছিলেন, এবং বুঝেছিলেন বিভক্তির কুফলগুলোও। শুধু বাংলার মুসলমান নয়, একতার গুরুত্ব অনুধাবন করেছিলেন উপমহাদেশের মুসলমানগনও। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মূলতঃ সে একতার বলেই। আজকের মত এত বিভক্তি এবং হিন্দু সম্প্রসারণবাদীদের প্রতি এত আনুগত্য থাকলে বাংলাদেশ সেদিন আরেক কাশ্মির হতো। মুসলমানদের সে ঐক্য দেখে হিন্দুরা টের পায়, বাংলার উপর তাদের আধিপত্যের দিন শেষ। সে হতাশা থেকেই আধিপত্যবাদী হিন্দুগণ অখন্ড বাংলাকে খন্ডিত করার দাবী তোলে। দাবী তোলে হিন্দুসংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিম বাংলাকে ভারতভূক্ত করার।  

পাকিস্তান আমলেও অবস্থা এতটা খারাপ ছিল না। দেশে তখনও বহু দল ছিল। তাদের মাঝেও নানা বিরোধ এবং বিতন্ডা ছিল। কিন্তু সে বিরোধ সত্ত্বেও বিভিন্ন দলের সদস্যরা পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে একসাথে বসেছে। নানা বিষয়ে তখন গোলটেবিল বৈঠকও হয়েছে। নেতারা একে অপরের মুখ দেখেনি বা মাসের পর মাস লাগাতর সংসদ-বর্জন করেছে, এমন ইতিহাস তখন নির্মিত হয়নি। কিন্তু সে ইতিহাস লাগাতর নির্মিত হচ্ছে বাংলাদেশে। দেশটিতে রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই হলো, বিভক্তি ও বিবাদকে গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী করা। বিভক্তির রাজনীতি শুধু দেশই ভাঙ্গে না, বিভক্ত করে জনগণকেও। তখন বাড়ে ঘৃণা, বাড়ে প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার জজবা। ঘৃণার বশে তখন আগুন ধরে রক্তে। এটাই হলো একাত্তরের চেতনা। ইসলামী চেতনায় একতা গড়া ফরজ। এটা ইবাদত। আর একাত্তরের চেতনায় জরুরী হলো বিভেদ ও বিভক্তি। ১৯৭১ য়ের ১৬ই ডিসেম্বরে অখন্ড পাকিস্তানের মৃত্যু ঘটেছে। কিন্তু ঘৃনা বেঁচে আছে। তাই বেঁচে আছে সে ঘৃনা নিয়ে প্রতিপক্ষ হত্যার নেশাও। তাই যে ঘৃনা নিয়ে তখন আওয়ামী ক্যাডার, মুক্তি বাহিনী সদস্য, মুজিব বাহিনী, সেনা-সদস্যগণ পাক-সেনা ও পাকিস্তান-পন্থিদের হত্যায় নেমেছিল সে ঘৃনা নিয়েই পরে তারা একে অপরকে হত্যা করেছে। তাদের এখনকার গবেষণা, সে ঘৃনাকে কি করে যুগ যুগ বাঁচিয়ে রাখা যায় তা নিয়ে। ফলে বাংলাদেশের বিপর্যয় বাড়াতে বিদেশী শত্রুকে একটি তীরও ছুড়তে হচ্ছে না।  

অথচ স্বাধীনতা আন্দোলন যে কোন দেশেই জনগণের মাঝে প্রবল একতার জন্ম দেয়। সে একতার বলেই ক্ষুদ্র দেশ প্রবল শত্রুর কবল থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনে। স্বাধীনতা এমনকি পশু-পাখিরাও পছন্দ করে। কিন্তু বাংলাদেশে তেমন একতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং একাত্তরের লড়াই থেকেই বিভক্তির শুরু। ফলে শুরু দেশটির দূর্বলতারও। প্রায় ১২০০ মাইলে বিভক্ত দূর্বল পাকিস্তানকে খন্ডিত করতে বিশাল ভারতীয় বাহিনীর প্রয়োজন পড়েছিল। অথচ আফগানিস্তানে রাশিয়া বা ভিয়েতনামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যায় বিশ্বশক্তিকে পরাজিত করতে অন্য দেশের যুদ্ধ করার প্রয়োজন পড়েনি। একাত্তর নিয়ে বাংলাদেশে যে বিভাজন গড়ে উঠেছিল সে বিভাজনই আজ দিন দিন গভীরতর হচ্ছে। ফলে দেশ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে আরেক সংঘাতের দিকে। বিবদমান দু’পক্ষের দর্শন ও শ্লোগান দিন দিন আরো উগ্রমূ্র্তি ধারণ করছে। শেখ মুজিবকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী বলে একাত্তরের পূর্বে বা পরে কেউ দাবী করতো না। কিন্তু এখন সে দাবী উচ্চকন্ঠে করছে। এবং ভারতকে বলা হচ্ছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বন্ধু। ভারত না হলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না সে কথাও তারা নিঃসংকোচে বলে। তারা দাবী করে, একাত্তরের ভূমিকার জন্য প্রতিটি বাংলাদেশীর দায়িত্ব হলো ভারতের প্রতি আজীবন কৃতজ্ঞ থাকা। একথাগুলো সত্তরের দশকেও কেউ বলেনি, কিন্তু এখন অনেকেই বলছে। তারা বলে, টিঁপাই মুখ বাঁধ দেওয়া হলে মেঘনায় পানির প্লাবন বইবে। বেরুবাড়িকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার সময় অন্ততঃ তিন বিঘা করিডোর বাংলাদেশের হাতে দেওয়ার দাবী তুলেছিল, এখন সেটিও আর মুখে আনে না। বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে এরাই বরং ভারতকে ট্রানজিট দিতে চায়। ভারতের প্রতি শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগ নেতাদের এমন একটি ধারণা নিছক একাত্তরে নয়, সেটির জন্ম হয়েছিল বহু পূর্ব থেকেই। তবে একাত্তরের পূর্বে শেখ মুজিব নিজেও সে কথাগুলো প্রকাশ্যে বলার সাহস পাননি। আর এখন সে কথাগুলোই জনসম্মুখে জোরেশোরে বলা হয়ে। এখন ভারতের প্রতি আত্মসমর্পণ ও আনুগত্যের নীতিই হলো তাদের রাজনীতির মূল সূর। একাত্তরের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটাই হলো সবচেয়ে বড় গুণগত পরিবর্তন। তবে আওয়ামী লীগের ন্যায় ভারতমুখী দলগুলোর নেতারা তাদের মনের সব কথা শুরুতে খুলে বলে না, বরং সেটি প্রকাশ করে আস্তে আস্তে। তাই ১৯৬৮ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাকে তারা মিথ্যা বললেও এখন আর তা বলে না। বরং তা নিয়ে এখন গর্ব করে।  

মানুষের ভাগ্যবদলের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর ভারতপন্থি জোটের আসল কাজ এখন মানুষের ঈমান বদল। তাদের লক্ষ্য, সাংস্কৃতিক কনভার্শন। কারণ তারা বুঝে, মানুষের মন ও রাজনীতি শুধু ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে নিয়ন্ত্রিত হয় না, নিয়ন্ত্রিত হয় তার সাংস্কৃতিক অভ্যাস থেকেও। যার আসক্তি নাচগান ও স্বেচ্ছাচারি জীবন-উপভোগে, তার রাজনীতিতে ইসলাম ও মুসলমানের কল্যাণ-চিন্তা গুরুত্ব পায় না। সে বরং এ দেশ ভারত হলেই খুশি। কারণ সে সুযোগ সেদেশেই বেশী। তাই ভারতীয় হিন্দুদের স্ট্রাটেজী মুসলমানদের হিন্দু করা নয়, বরং সেকুলার সংস্কৃতিতে অভ্যস্থ করা। এভাবে ডি-ইসলামাইজড করা। সংস্কৃতি চর্চার নামে ভারতভক্তরা বাংলাদেশে সেটিই ব্যাপকতর করছে। এমন কনভার্শনের মাধ্যমে বাংলাদেশীদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিশ্বাস এবং কর্মসূচীকে আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা ভারতের পছন্দসই করতে চায়। এ পথে বড় বাঁধা হলো ইসলাম। ১৯৪৭ সালে ভারত ভেঙ্গে যে কারণে পাকিস্তানে সৃষ্টি হয়েছিল এবং পূর্ব বাংলার মানুষ পশ্চিম বাংলার সাথে ভারতে না গিয়ে পাকিস্তানে যোগ দিয়েছিল সেটি ভাষা, গায়ের রং বা ভূগোল ছিল না, সেটি ছিল ইসলাম। এখন সে ইসলামকেই তারা জনগণের চেতনা থেকে সরাতে চায়। রাজনীতিতে ইসলামের অনুসরণকে বলছে সাম্প্রদায়িকতা। বলছে অনাকাঙ্খিত। ফলে তাদের ধারণা, ইসলামী চেতনা বিলুপ্ত হলে বা দূর্বল হলে সবল হবে ভারতের সাথে সম্পর্ক। এজন্যই তারা বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানে শত শত মাঠকর্মী নামিয়েছে, পত্র-পত্রিকা ও টিভি চালু করেছে ইসলামী চেতনার বিনাশে। তারা ভেবেছে, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন ধর্মমতের ন্যায় ইসলাম একটি ধর্মমাত্র। তাই ভাবছে, অন্যদের ন্যায় মুসলমানগণও ভারতে লীন হয়ে যাবে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পূর্বে ভারতীয় মুসলমানদের প্রতি এটিই ছিল কংগ্রেসী নেতা ও হিন্দু বুদ্ধিজীবীদের নসিহত। মুসলমানগণ যে অন্যদের ন্যায় হিন্দুদের সাথে মিশে যায়নি সেটিকেই মুসলমানদের সবচেয়ে বড় অপরাধ মনে করতো। আজ সে একই নসিহত নিয়ে ময়দানে নেমেছে একাত্তরের চেতনার পক্ষটি। ভারতীয় হিন্দুদের ন্যায় তাদের মুখেও আজ রবীন্দ্র সঙ্গীত, হাতে মঙ্গলঘট এবং রাজনীতিতে ভারতের প্রতি আনুগত্য।  

মানুষের ব্যক্তিত্বের ন্যায় তার রাজনীতির বিষয়টিও গোপন থাকে না। ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটে ব্যক্তির কথা, কর্ম ও আচরণে। তেমনি রাজনীতি প্রকাশ পায় তার নীতি, কর্মসূচী ও মিত্রদের দেখে। তাই মুজিবের রাজনৈতিক গোপন মতলবটি অনেকের কাছে অজানা থাকলেও বহু লোক সেটি শুরু থেকেই জানতো। প্রায অর্ধশত বছর পর আওয়ামী লীগের নেতাগণ আজ আগরতলা ষড়যন্ত্রের সাথে শেখ মুজিবের সংশ্লিষ্ঠতাকে একশভাগ সত্য বলছেন। কিন্তু সেটি শুরু থেকেই সত্য জানতেন বহু মানুষ। মুজিবের ফ্যাসীবাদী চরিত্রও তাদের কাছে অজানা ছিল না। তারা সেটি দেখেছে ১৯৭০ সালে নির্বাচনকালে অন্যদলের নির্বাচনী সভা পন্ড করার মধ্যে, তেমনি দেখেছে তার আগে ও পরে। এমন একজন ফ্যাসীবাদী বিদেশী চর যে দেশের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের রক্ষক হবে সেটি অসংখ্য মানুষ বিশ্বাস করেনি। যারা বিশ্বাস করেননি তারাই পরে শতভাগ সঠিক প্রমাণিত হয়েছেন। আর এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী প্রজ্ঞা দেখিয়েছেন ইসলামপন্থিগণ। ১৯৭০ এর নির্বাচনে হারলেও তাঁরা জিতেছেন সত্যবিচার ও দেশের শত্রু-মিত্র চেনায়। মুজিবের ন্যায় বিদেশীর তাঁবেদার, মানবাধিকারের শত্রু এবং মিথ্যাবাদীর ভন্ডামী ধরতে তাঁরা আদৌ ভূল করেননি। আর সে প্রজ্ঞার কারণেই স্বাধীনতার নামে তারা ভারতের ন্যায় আগ্রাসী শক্তির কোলে গিয়ে উঠেনি। জোয়ারে ভাসার ন্যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের স্রোতে তারা ভেসে যাননি। আগামী দিনের ইতিহাসে ইসলামপন্থি ও পাকিস্তানপন্থি নেতা-কর্মী ও বুদ্ধিজীবীগন অন্ততঃ সে প্রজ্ঞার জন্য যুগ যুগ ধরে প্রশংসিত হবেন। তবে এমন প্রজ্ঞা তাদের মাঝেই স্বাভাবিক যারা কোরআনী জ্ঞানের সাথে পরিচিত। কারণ, “সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ভূল করে না” এমন তত্ত্বকথায় তাদের বিশ্বাস নেই। পবিত্র কোরআনে মহাজ্ঞানী আল্লাহতায়ালা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বিচারবোধের যে মূল্যায়ন করেছেন সেটি আদৌ সুখদায়ক নয়। এ বিষয়ে মহান আল্লাহর রায় হলো, ‘আকছারাহুম কা’ফিরুন’ (তাদের অধিকাংশই কাফির), ‘আকছারাহুম ফাসিকুন’ (অর্থঃ তাদের অধিকাংশই দুর্বৃত্ত), ‘আকছারাহুম গাফিলুন’ (তাদের অধিকাংশই গাফেল), ‘আকছারাহুম লা’ইয়াশকুরুন’ (তাদের অধিকাংশই শোকর আদায় করে না), ‘আকছারাহুম লা’ইয়ালামুন’ (তাদের অধিকাংশই জানে না)। একটি সেকুলার সমাজের এই হলো অধিকাংশের অবস্থা। অধিকাংশ মানুষের ভোটে বিজয়ী হওয়া এজন্যই খুনি, ব্যভিচারী ও অতিশয় দুর্বৃত্তদের জন্যও অসম্ভব নয়। বিপুল ভোটে বিজয়ী দুর্বৃত্তকে তাই দেশ-ধ্বংস, ঈমান-ধ্বংস, অর্থনীতি-ধ্বংস, স্বাধীনতা ও স্বার্বভৌত্বের বিনাশ, বাকশাল-প্রতিষ্ঠা ও নাগরিক অধিকারের বিলোপ –এমন কার্যক্রমের অধিকার দেওয়া যায় না। কারণ, এমন কাজ যেমন ইসলাম-বিরুদ্ধ তেমনি মানবতা-বিরুদ্ধও। এমন কুকর্ম নির্বাচনে জায়েজ হয় না। একাত্তরে পাকিস্তানপন্থিগণ এজন্যই মুজিবের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল।  

সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে তাই কে ভাল আর কে জঘন্য দুর্বৃত্ত সে বিচার হয় না। শেখ মুজিবই তার একমাত্র উদাহরণ নয়। নির্বাচনের মাধ্যমেই হিটলারের ন্যায় মানব-ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্য স্বৈরাচারির উদ্ভব ঘটেছিল। বেড়ে উঠেছে ফ্যাসীবাদ। মানব হত্যাকে দ্রুততর ও সহজতর করতে সে গ্যাস চেম্বার নির্মাণ করেছিল। এজন্যই বিশ্বের কোন আদালতে ভোটের জোরে বিচার-আচার হয় না। ভোটে বিজয়ী হওয়ার কারণেই মুজিব ও তার দল দেশকে একটি যুদ্ধ উপহার দিবে, দেশকে ভারতের গোলাম রাষ্ট্রে পরিণত করবে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কেড়ে নিবে -মুজিবকে সে অধিকার দিতে বিপুল সংখ্যক মানুষ রাজী ছিল না। বিপুল ভোটে বিজয়ী হিটলারকে সরাতে বিশ্ববাসীর জন্য একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়েছিল। মুজিব তেমনি একটি যুদ্ধ অনিবার্য করে তুলে পাকিস্তানেও। যারা মুজিবের ভারতপ্রীতি এবং তার ফ্যাসীবাদী চরিত্রের সাথে পরিচিত ছিল তাঁরা একাত্তরে তাঁকে বিশ্বাস করেনি, আজও করছে না। ফলে একাত্তর থেকেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুরু হয় গভীর বিভক্তি। ইউরোপের সৌভাগ্য যে হিটলারের নাৎসী দল ও তার ফ্যাসীবাদ কবরস্থ হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য যে আওয়ামী লীগ ও তারা মুজিবী ফ্যাসীবাদ এখনও বেঁচে আছে। তারা ক্ষমতাসীনও হচ্ছে। ফলে প্রবল ভাবে বাড়ছে আত্মঘাতী বিভক্তিও।  

 




একাত্তরের আত্মঘাত ও আজকের বাংলাদেশ

বাঙালী মুসলমানের জীবনে একাত্তর

নামায-রোযা,হজ-যাকাতে যেমন ফরজ,ওয়াজেব ও সূন্নত আছে,তেমনি ফরজ,ওয়াজেব ও সূন্নত আছে রাজনীতিতেও।আছে বহু হারাম বিষয়ও।অন্যদের কাছে রাজনীতি ক্ষমতাদখলের হাতিয়ার। ফলে সে রাজনীতিতে যেমন মিথ্যাচার ও ভন্ডামী আছে,তেমনি সন্ত্রাস ও ভোটডাকাতিও আছে।আছে শত্রুদেশকে নিজ দেশের অভ্যন্তরে ডেকে আনার ষড়যন্ত্র।বাংলাদেশে সেটি যেমন একাত্তরে ঘটেছে,তেমনি আজও হচ্ছে।কিন্তু ঈমানদারের কাছে রাজনীতি হলো ব্যক্তি,সমাজ ও রাষ্ট্রকে ইসলামিকরণের ইবাদত। তাই এটি পবিত্র জিহাদ। এ জিহাদে যেমন অর্থ,শ্রম,সময় ও মেধার বিনিয়োগ আছে,তেমনি রক্তের বিনিয়োগও আছে। সমগ্র মানব জাতির জন্য ইবাদতের রাজনীতির সে পবিত্র সূন্নত প্রতিষ্ঠা করতেই নবীজী (সাঃ) নিজে আমৃত্যু রাষ্ট্র-প্রধান থেকেছেন। এটিই নবীজী (সাঃ)র শ্রেষ্ঠ সূন্নত। এ সূন্নত পালনে অর্থ, সময়, মেধা ও প্রাণের বিনিয়োগ হয়। এ পথেই আসে ইসলামের বিজয়। তাই নবীজী (সাঃ) যে আসনে বসেছেন সে আসনে কি চোর-ডাকাত, ভোট-ডাকাত ও দুর্বৃত্তদের বসানো যায়? দেশের শাসনক্ষমতা এমন দুর্বৃত্তদের হাতে অধিকৃত হলে তাদের সরানো প্রতিটি ঈমানদারের উপর ফরজ হয়ে যায়। সে ফরজ পালনই হলো ইসলামে জিহাদ। এ জিহাদে অংশগ্রহণই হলো ইসলামে শ্রেষ্ঠ ইবাদত। এ ইবাদত পালিত না হলে তখন নবীজী (সাঃ)র শিক্ষাও পালিত হয়না। শত্রুর হাতে শুধু পরাজয়ই আসে না, আসে মহান আল্লাহতায়ার পক্ষ থেকে আযাব।

প্রতি পেশা,প্রতি কর্ম ও প্রতি আচরনে পথ দেখায় পবিত্র কোরআন।কিন্তু বেঈমানেরা সে পথে চলতে রাজি নয়। তারা চায় নিজেদের স্বৈরাচারি সার্থসিদ্ধি। এবং সে সার্থপরতার কারণেই তারা দেশের সংবিধা, শিক্ষা-সংস্কৃতি,অর্থনীতি,আইন-আদালত, প্রশাসন,পুলিশ ও সেনাদফতরের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গনে মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশাবলির প্রবেশাধিকার দিতেও রাজি নয়। অথচ মু’মিনের ঈমানদারি হলো,ইসলামের প্রতিটি বিধান মেনে চলায়। তাই শুধু নামায-রোযা,হজ-যাকাতে ফরজ-ওয়াজেব মানলে চলে না,ফরজ-ওয়াজেব এবং নবীজী (সাঃ) সূন্নতগুলি মানতে হয় রাজনীতিতেও। এ ক্ষেত্রে অবহেলা বা বিদ্রোহ হলে অনিবার্য হয় অনন্ত-অসীম কালের জন্য জাহান্নামের আগুণে পৌঁছা।

মাত্র একটি হুকুম অমান্য করায় অভিশপ্ত শয়তানে পরিণত হয় এককালে ইবাদত-বন্দেগীতে মশগুল থাকা ইবলিস। তাই রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গণে মহান আল্লাহতায়ালা কোন একটি হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘটলে নামাযী মুসলমানও তখন ঘৃন্য শয়তান বা মুনাফিকে পরিণত হয়। ঈমানদার ব্যক্তির জীবনে প্রতিক্ষণের ভাবনা তাই প্রতিপদে পবিত্র কোরআনে বর্নিত বিধানের অনুসরণের –সেটি রাজনীতিতে হোক বা শিক্ষা-সংস্কৃতি বা আইন-আদালতে হোক। প্রদর্শিত সে পথটি হলো সিরাতুল মোস্তাকীম। এখানে অবাধ্য বা বিদ্রোহী হলে ঈমান থাকে না। অন্য কোন সফলতাই এমন ব্যক্তিকে জাহান্নামে পৌঁছা থেকে বাঁচাতে পারে না। এটিই ঈমানদারের জীবনে প্রতি মুহুর্তেই পরীক্ষা। জান্নাতপ্রাপ্তি তো ঘটে সে পরীক্ষায় পাশের মধ্য দিয়ে। মহান আল্লাহতায়ালার সে ঘোষণাটি এসেছে এভাবে,“মানুষ কি ভেবে নিয়েছে যে ঈমান এনেছি এ কথা বললেই তাকে ছেড়ে দেয়া হবে এবং পরীক্ষা করা হবে না? আমরা তো তাদের পূর্ববতীদেরও অবশ্যই পরীক্ষা করেছি এবং জেনে নিয়েছি ঈমানের দাবিতে কারা সাচ্চা এবং কারা মিথ্যাবাদি।” –(সুরা আনকাবুত, আয়াত ২-৩)। জীবনের পড় পরীক্ষাটি হয় রাজনীতিতে। এখানে নিরপেক্ষ থাকার উপায় নাই, তাকে একটি পক্ষকে সমর্থণ দিতেই হয়। ফলে ধরা পড়ে সে কোন পক্ষে দাঁড়ালো,ভোট দিল বা অস্ত্র ধরলো। বাঙালী মুসলমানের জীবনে একাত্তর এসেছিল তেমনি এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা পর্ব নিয়ে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সে পরীক্ষায় বাঙালী মুসলমানগণ কতটা সফল হয়েছিল?

বাঙালী মুসলমানের একাত্তরের পাকিস্তান ভাঙ্গার যুদ্ধজয়টি দেশ-বিদেশের জাতিয়তাবাদি,সমাজবাদি,সাম্রাজ্যবাদি,মুর্তিপূজারি,গো-পূজারি,ইহুদী-খৃষ্টান ও নাস্তিকদের কাছে অতি প্রশংসিত।প্রতিবছর সে বিজয় নিয়ে বাংলাদেশে যেমন উৎসব হয়,তেমনি উৎসব হয় ভারতেও। এই একটি মাত্র উৎসবই কাফেরদের সাথে তারা একত্রে করা। প্রশ্ন হলো,মহান আল্লাহতায়ালার কাছেও কি বাঙালী মুসলমানের একাত্তরের কর্মটি শ্রেষ্ঠ কর্ম রূপে বিবেচিত হবে? একাত্তর নিয়ে বহু বই লেখা হয়েছে,বহু আলোচনাও হয়েছে। কিন্তু একাত্তরের সে পরীক্ষাপর্বে মহান আল্লাহতায়ালার বিধান কতটুকু মানা হয়েছে -সে বিচার কি কখনো হয়েছে? তা নিয়ে লেখা হয়েছে কি কোন বই? অথচ আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দরবারে সে বিচার অবশ্যই বসবে।মুসলমানকে সেদিন শুধু নামায-রোযার হিসাব দিলেই চলবে না,রাজনীতি ও যুদ্ধবিগ্রহে তার নিজস্ব ভূমিকারও হিসাব দিতে হবে। কারণ,মহান আল্লাহতায়ালার কাছে রাজনীতির গুরুত্বটি অপরিসীম।জীবন ও জগত নিয়ে ব্যক্তির ধ্যান-ধারনাগুলি কীরূপ এবং আসলে সে কোন পক্ষের লাঠিয়াল -সেটি জায়নামাজে প্রকাশ পায় না। প্রকাশ পায় রাজনীতিতে। মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তি বিধানের প্রতি সে কতটা অনুগত বা বিদ্রোহী সেটিরও প্রকাশ ঘটে রাজনীতিতে। তাই রাজনীতির বিজয়ী পক্ষই নির্ধারণ করে দেশের শিক্ষা-সংস্কৃতি,রাষ্ট্রীয় নীতি,অর্থনীতি,আইন-আদালত কোন দিকে পরিচালিত হবে। রাজনীতিই নিয়ন্ত্রণ আনে ধর্মের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার উপর। মহান রাব্বুল আ’লামীন তাই মানব জাতির এরূপ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নীরব থাকেন কীরূপে? তাই তাঁর যুদ্ধটি স্রেফ মুর্তিপূজারি,অগ্নিপূজারি,দেব-দেবীপূজারি বা নাস্তিকদের বিরুদ্ধে নয়,বরং ফিরাউন-নমরুদদের ন্যায় রাজনীতির কর্ণধারদের বিরুদ্ধেও। নিজেদের এবং সেসাথে অন্যদের জীবনকে যারা সিরাতুল মোস্তাকীমে পরিচালিত করতে চায়,রাজনীতির নিয়ন্ত্রনকে স্বহস্তে নেয়া ছাড়া তাদের সামনে তাই কোন বিকল্প পথ নেই। খোদ নবীজী (সাঃ)ও তাঁর মহান খলিফাদের এ জন্যই রাষ্ট্রনায়কের আসনে বসতে হয়েছে।রাষ্ট্রের ড্রাইভিং সিটে বসা ও নেতৃত্বের দায়ভার স্বহস্তে নেয়া তাই নবীজী (সাঃ)র মহান সূন্নত। ইসলামের জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয় এ সূন্নত পালনের মধ্য দিয়ে। মহান নবীজী (সাঃ)র সাহাবাদের জানমালের বেশীর ভাগ ব্যয় হয়েছে সে সূন্নত পালনে। ইসলামে এটি পবিত্রতম জিহাদ। রাজনীতির ময়দানে ঈমানদার ব্যক্তি তাই নীরব দর্শক নয়,তার অবস্থান বরং প্রথম সারিতে।

 

বিকল্প নাই ঐক্য ও সামরিক বলের

রাজনীতিতে মূল ফরজটি হলো অসত্য ও অন্যায়ের নির্মূল এবং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা। হারাম হলো যারা শরিয়তের প্রতিষ্ঠা বিরোধী এবং মুসলিম উম্মাহর ঐক্য বিরোধী তাদের সমর্থণ করা ও তাদের ভোট দেয়া বা তাদের পক্ষে যুদ্ধ করা। কিন্তু রাজনীতির ফরজ পালন কি এতই সহজ? বিশ্ব তো অধিকৃত আল্লাহর শত্রুপক্ষের হাতে;এবং পরাজিত মহান আল্লাহতায়ালার কোরআনি বিধান ও তার সার্বভৌমত্ব। কোন একক ভাষা ও একক দেশের মুসলমানদের পক্ষে কি সম্ভব আল্লাহর দ্বীনের  শত্রুদের পরাজিত করা? নানা ভাষা ও নানা বর্ণের শত্রুগণ তো গড়েছে আন্তর্জাতিক কোয়ালিশন। ইরাক ও আফগানিস্তান দখলে রাখতে এ কোয়ালিশন পাঠিয়েছিল ৪০টি দেশের সেনাবাহিনী। মুসলমানগণ কি তাই ভাষার নামে,ভূগোলের নামে বা বর্ণের নামে বিভক্ত হতে পারে? বিভক্তি কোন কালেই বিজয়,গৌরব ও স্বাধীনতা আনে না। আনে পরাধীনতা। ইসলামে ভাষা বা বর্ণভিত্তিক বিভক্তির জাতিয়তাবাদি রাজনীতি তো কবিরা গুনাহ। অথচ এ কবিরা গুনাহর রাজনীতিই ১৯৭১ সালে বিজয়ী হয় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে। আর সে বিজয় নিয়ে আজ উৎসবও হয়।ভাষাভিত্তিক রাজনীতি করে বাংলার মুসলমানদের পক্ষে কি একাকী সম্ভব ছিল ১৯৪৭য়ে স্বাধীনতা অর্জন? ভারতের বাঙালী,গুজরাটি,মারাঠি,বিহারি,পাঞ্জাবী, তামিল,কাশ্মিরী ও আসামী হিন্দুগণ ভাষার ভেদাভেদ ভূলে মুসলমানদের বিরুদ্ধে আজও একতাবদ্ধ,তারা একতাবদ্ধ ছিল ১৯৪৭য়েও। অথচ রাজনীতির ময়দানের এরূপ একতাবদ্ধ হওয়াটি হিন্দুদের উপর ধর্মীয় ভাবে ফরজ নয়। কিন্তু অনিবার্য ফরজ হলো মুসলমানদের উপর। একাকী স্বাধীনতার পথ ধরতে গিয়ে কাশ্মিরের শেখ আব্দুল্লাহ যা অর্জন করেছে তা হলো ভারতের পদতলে অধীনতা। স্বাধীনতা ও সম্মান কি আছে বিশেরও বেশী টুকরায় বিভক্ত আরব মুসলমানদের? বাংলার মুসলমানদের ১৯৪৭য়ের সৌভাগ্যটি হলো,কাশ্মিরি নেতা শেখ আব্দুল্লাহর ন্যায় ভাষা বা প্রদেশের নামে তারা উপমহাদেশের অন্যভাষাভাষী মুসলমানদের থেকে বিচ্ছিনন্ন হয়নি। বরং তাদের সাথে কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করেছে। নইলে বাংলাদেশও পরিণত হতো ভারতের পদতলে পিষ্ট আরেক কাশ্মিরে।

মুসলমান হওয়ার চ্যালেঞ্জটি তো বিশাল। মু’মিনের জীবনে আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধটি তো অনিবার্য। শয়তান ও তার অধিপত্যবাদি কোয়ালিশনের বিরুদ্ধে লড়াই এখানে প্রতি দিনের।যে মুসলমানের জীবনে সে যুদ্ধটি নাই,বুঝতে হবে তার ঈমান ও মুসলমান হওয়া নিয়েই বিশাল শূণ্যতা আছে। ইসলামের শত্রুপক্ষ কি চায়,নবীজী (সাঃ)র ইসলামের ন্যায় যে ইসলামে শরিয়ত আছে,জিহাদ আছে এবং খেলাফত আছে তা নিয়ে মুসলমানগণ বেড়ে উঠুক? তারা কি চায় বিশ্বের কোন এক ইঞ্চি ভূমিতেও শরিয়ত প্রতিষ্ঠা পাক? তারা তো বিশ্বকে একটি গ্লোবাল ভিলেজ রূপে দেখে। সে ভিলেজে মদ্যপায়ী,ব্যভিচারি,সমকামী,গো-পূজারি,মুর্তিপূজারি ও নাস্তিকদের জন্য পর্যাপ্ত স্থান ছেড়ে দিতে তারা রাজী। কিন্তু নবীজী (সাঃ)র যুগের ইসলাম নিয়ে যারা বাঁচতে চায় তাদের জন্য কি সামান্যতম স্থানও ছেড়ে দেয়? বরং তাদের বিরুদ্ধে তো নির্মূলের ধ্বনি। সেটি শুধু বাংলাদেশে নয়,প্রতি দেশেই। মু’মিনের জীবনে সমগ্র বিশ্বটাই তাই রণাঙ্গন।এ রণাঙ্গণে একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালার অবস্থানটি তাদের  পক্ষে। যুদ্ধরত মু’মিনদেরকে তিনি গ্রহণ করেছেন নিজ বাহিনী তথা হিযবুল্লাহ রূপে। আর তার নিজ বাহিনীর লোকদের কি তিনি জাহান্নামের আগুণে ফেলতে পারেন? মু’মিনের জীবনে এর চেয়ে বড় অর্জন আর কি হতে পারে?

 

মহান আল্লাহতায়ালার কাছে অতি প্রিয় হলো,যুদ্ধরত মুজাহিদগণ যুদ্ধ করবে সীসাঢালা প্রাচীরসম একতা নিয়ে। তাঁর নিজবাহিনীর মাঝে অনৈক্য তাঁর অতি অপছন্দের। পবিত্র কোরআনে সেটি ঘোষিত হয়েছে এভাবেঃ “নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা তাদেরকে ভালবাসেন যারা তাঁর রাস্তায় যুদ্ধ করে এমন কাতারবদ্ধ ভাবে যেন তারা সীসাঢালা প্রাচীর।” –(সুরা সাফ,আয়াত ৪)। মুসলমানের জীবনে একতা তাই অনিবার্য কারণেই এসে যায়। সেটি যেমন সমাজ জীবনে,তেমনি দেশের রাজনীতি ও বিশ্বরাজনীতির মঞ্চে। যেখানে অনৈক্য, বুঝতে হবে সেখানে ঈমানে রোগ রয়েছে। অনৈক্যের অর্থই মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে অবাধ্যতা।অথচ আজ  সে অবাধ্যতাই মুসলিম বিশ্বে জোয়ারের জলের ন্যায় ছেয়ে আছে। মুসলিম জাহান আজ ৫৭ টুকুরোয় বিভক্ত। ক্ষুদ্র ও দুর্বল রাষ্ট্রের কি স্বাধীনতা থাকে? থাকে কি নিজ দেশে শিক্ষা-সংস্কৃতি,অর্থনীতি,আইন-আদালত ও প্রশাসনে আল্লাহতায়ালার প্রদর্শিত পথ মেনে চলার স্বাধীনতা? ইসলামের শত্রুপক্ষ তো চায় বিশ্বের প্রায় দেড় শত কোটি মুসলমান বেঁচে থাকুক ইসলামকে বাদ দিয়ে। এক্ষেত্রে তাদের সামনে উত্তম মডেল হলো বাংলাদেশসহ মুসলিম দেশের ডি-ইসলামাইজড সেক্যুলারিস্টগণ। এ অবাধ্যদের জীবনে মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশের প্রতি আত্মসমর্পণ নেই। নেই শরিয়তের প্রতি বিশ্বাস। নেই জিহাদ ও ইসলামের প্রতিষ্ঠায় সামান্যতম অঙ্গিকার।যা আছে তা হলো ইসলামের প্রচার ও প্রসার রোধে লাগাতর ষড়যন্ত্র। আছে দুর্বৃত্তি। আছে ইসলামপন্থিদের নির্মূলে সর্বাত্মক যুদ্ধ। কিন্তু এরপরও তাদের দাবী,তারা মুসলিম।আফগানিস্তান দখলের পর জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাবুলে দাঁড়িয়ে বলেন,“শরিয়তি আইনকে আফগানিস্তানে ফিরে আসতে দেয়া হবে না।” মুসলিম ভূমিতে দাঁড়িয়ে এ কথা বলার সাহস একজন কাফের পায় কোত্থেকে? আফগানিস্তানের আাইন কীরূপ হবে সেটি কি জার্মান বা অন্য কোন কাফের দেশ থেকে অনুমতি নেয়ার বিষয়? ইসলামের শত্রুগণ কি আব্বাসীয়,উমাইয়া বা উসমানিয়া খেলাফতের আমলে এমন আস্ফলন উচ্চারণ করতে পেরেছিল? অথচ তখনও তো তারা সেটিই চাইতো। প্রশ্ন হলো,শরিয়ত ছাড়া কি ইসলাম পালন হয়? পবিত্র কোরআনের মহান আল্লাহতায়ালার ঘোষণা,“আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী যারা বিচার করে না তারাই কাফের,..তারাই জালেম,..তারাোই ফাসেক। -(সুরা মায়েদা,আয়াত ৪৪,৪৫,৪৭)।

 

কেন এ পতন?

রাষ্ট্রের শক্তি ও সামর্থ বিশাল। এটিকে নিয়ন্ত্রনে না রাখলে পাগলা হাতির ন্যায় তছনছ করে দিতে পারে ধর্ম ও সভ্য জীবন-যাপনের সকল আয়োজন।আজকের বাংলাদেশে তো তারই উদাহরণ।দেশ অধিকৃত হয়েছে ভয়ংকর চোর-ডাকাতদের হাতে। ফলে বিপন্ন শুধু ইসলামই নয়, মানুষের জানমাল এবং ইজ্জত-আবরুও। আল্লাহর দ্বীন পালন কি শুধু মসজিদ-মাদ্রাসার সংখ্যা বাড়িয়ে চলে? সেটি সম্ভব হলে নবীজী (সাঃ)ও তাঁর সাহাবায়ে কেরামের জীবনে কেন এত যুদ্ধ? কেনই বা তাদেরকে রাষ্ট্রনায়কের আসনে বসতে হলো? নবীজী (সাঃ)র জীবনের বড় শিক্ষাঃ ইসলামের পূর্ণ প্রতিষ্ঠার জন্য চাই রাষ্ট্রীয় শক্তির পূর্ণ ব্যবহার। চাই রাজনৈতিক ও সামরিক বল। ছোট্ট এক টুকরো ভূমির উপর কি বিশাল দুর্গ গড়া যায়? শ্রেষ্ঠ সভ্যতার নমুনা রূপে বিশ্বমাঝে মাথা তুলে দাঁড়াবার জন্য তো চাই বিশাল মানচিত্র। চাই নানা ভাষা ও নানা বর্ণের মানুষের মাঝে গভীর একতা। নবীজী (সাঃ) তাই দ্রুত ইসলামি রাষ্ট্রের সীমানা বাড়াতে মনোযোগী হয়েছিলেন। ইসলামি রাষ্ট্রের সীমানা বাড়াতে তাঁকে রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ লড়তে হয়েছে।এবং মৃত্যুর আগে সাহাবাদের নসিহত করেছেন রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানি কন্সটান্টিনোপল দখল করতে। এটি ছিল নবীজী (সাঃ)র স্ট্রাটেজিক ভিশন। মুসলমানদের জানমালের সবচেয়ে বড় কোরবানি হয়েছে তো মুসলিম রাষ্ট্রের শক্তি বাড়াতে। পরিপূর্ণ দ্বীন পালন, সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার নির্মাণ ও বিশ্বমাঝে সুমহান মর্যাদায় মাথা তুলে দাড়ানোর সামর্থ সৃষ্টি হয়েছে তো এভাবেই। আজও  মুসলমানদের সামনে এটিই নবীজী (সাঃ)র মহান সূন্নত। অথচ আজ বেহাল অবস্থা। যে আসনে বসেছেন মহান নবীজী (সাঃ) ও তাঁর খলিফাগণ সে পবিত্র আসনে বসেছে চোরডাকাত ও কাফের শক্তির সেবাদাসেরা। খেলাফতের আওতাধীন সে বিশাল ভূগোল যেমন নাই,সে সামরিক বলও নাই। বিলুপ্ত হয়েছে মহান আল্লাহর শরিয়ত প্রতিষ্ঠার সামর্থ। মুসলমানদের পতনের শুরু তো তখন থেকে যখন আলেমগণ রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও সংস্কারকে বাদ দিয়ে স্রেফ মসজিদ ও মাদ্রাসার চার দেয়ালের মাঝে নিজেদের কর্মকে সীমিত করেছে। পতনের মূল কারণ,সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি রূপে বেড়ে উঠার ক্ষেত্রে মহান নবীজী (সাঃ) যে সূন্নত রেখে যান সেটির প্রতি গুরুত্ব না দেয়া। শরিয়তের প্রতিষ্ঠায় জিহাদে অংশ নেয়া দূরে থাক,আলেম-উলামা ও মুফতিগণ আজ জিহাদের কথা মুখে আনতে ভয় পান। না জানি সন্ত্রাসী রূপে চিহ্নিত হতে হয়।অথচ ঔপনিবেশিক ইউরোপীয় কাফের শক্তির হাতে অধিকৃত হওয়ার পূর্বে শরিয়তই ছিল সমগ্র মুসলিম বিশ্বের আইন।।

 

মুসলিম রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা,সংহতি ও ভূগোল বৃদ্ধি ইসলাম ধর্মে অতি পবিত্র ইবাদত। মুসলমান এ কাজে যেমন অর্থ দেয়,তেমনি প্রাণও দেয়। হযরত আবু বকর (রাঃ) তার ঘরের সমুদয় সম্পদ নবীজী (সাঃ)র সামনে এনে পেশ করেছিলেন। অন্যান্য সাহাবাদের অবদানও ছিল বিশাল। মু’মিনের অর্থদান ও আত্মদানে মুসলিম ভূমিতে শুধু মসজিদ-মাদ্রাসার সংখ্যাই বাড়ে না,সে সাথে বিলুপ্ত হয় দুর্বৃত্তদের শাসন এবং প্রতিষ্ঠা পায় মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তি বিধান পালনের উপযোগী পরিবেশ। যে দেশে জিহাদ নাই সে দেশে সেরূপ পরিবেশ গড়ে উঠে না। বরং ঘাড়ে চাপে চোর-ডাকাতগণ। বাংলাদেশে অবিকল সেটিই হয়েছে। মুসলমানদের গৌরব কালে মুসলমানদের জানমাল,শ্রম ও মেধার বেশীর ভাগ ব্যয় হয়েছে জিহাদে,ফলে নির্মিত হয়েছে সর্বকালে সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা। কে মু’মিন আর কে মুনাফিক -সেটিও কোন কালে মসজিদের জায়নামাজে ধরা পড়েনি। ধরা পড়েছে জিহাদে। ওহুদের যুদ্ধের সময় নবীজী (সাঃ)র বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল মাত্র এক হাজার। কিন্তু তাদের মধ্যে ৩০০ জন তথা শতকরা ৩০ ভাগই ছিল মুনাফিক যারা নবীজী (সাঃ)র জিহাদী কাফেলা থেকে সিটকে পড়ে। তারা যে শুধু নিজেদের মুসলমান রূপে দাবী করতো তা নয়,মহান নবীজী (সাঃ)র পিছনে দিনের পর দিন নামাযও পড়েছে। জিহাদ এভাবেই সাচ্চা মু’মিনদের বাছাইয়ে ফিল্টারের কাজ করে।মুখোশ খুলে যাবে এ ভয়ে মুনাফিকগণ তাই ফিল্টারের মধ্য দিয়ে যেতে ভয় পায়। এদের পক্ষ থেকে জিহাদের বিরুদ্ধে এজন্যই এত প্রচারণা। তারা তো চায়,মুসলিম সমাজদেহে লুকিয়ে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ লড়তে।

 

মুসলমানগণ জনসংখ্যায় আজ  বিশাল। কিন্তু কোথায় সে সামরিক ও রাজনৈতিক বল? কোথায় সে ইজ্জত? শক্তি ও ইজ্জত তো বাড়ে অর্থত্যাগ ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে। ১৫০ কোটি মুসলমানের জীবনে যদি সেরূপ বিনিয়োগ না থাকে তবে কি শক্তি ও ইজ্জত থাকে? রাজনৈতিক বল বাড়াতে যেমন চাই আত্মত্যাগী বিশাল জনবল,তেমনি চাই বিশাল ভূগোল। বিশাল ভূগোলের কারণেই ভারতের সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি আজ বিশাল। অথচ ভারতে বাস করে বিশ্বের সর্বাধিক দরিদ্র মানুষ। ক্ষুদ্র কাতার-কুয়েত-দুবাই কি মাথাপিছু আয় ভারতের চেয়ে ৫০ গুণ বাড়িয়েও সেরূপ সামরিক ও রাজনৈতিক বল পাবে? মুসলিম উম্মাহর সামরিক ও রাজনৈতিক বল বাড়াতেই ইখতিয়ার মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির ন্যায় মহান তুর্কি বীর বাংলার বুকে ছুটে এসেছিলেন। তেমনি এক মহান লক্ষ্যকে সামনে নিয়ে উপমদেশের মুসলমানগণ নানা ভাষা, নানা প্রদেশ ও নানা বর্ণের ভেদাভেদ ভূলে বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের জন্ম দেয়। সেটাই ছিল সাতচল্লিশের লিগ্যাসি। এর মূলে ছিল প্যান-ইসলামিক চেতনা। কিন্তু ইসলামের শত্রুপক্ষের কাছে পাকিস্তানের জন্ম শুরু থেকেই পছন্দ হয়নি।হিন্দু,খৃষ্টান, ইহুদী,নাস্তিক,বামপন্থি এরা কেউই পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাকে মেনে নিতে পারিনি। কারণ ইসলাম ও মুসলমানের শক্তি ও গৌরববৃদ্ধিতে তারা কেউই খুশি নয়, বরং সেটিকে হুমকি মনে করে। ফল দেশটির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয় ১৯৪৭ থেকেই। সে ষড়যন্ত্রের সাথে নিজেকে জড়িত করেন শেখ মুজিবও। তাই ষড়যন্ত্রের রাজনীতিই ছিল তার রাজনীতি। পাকিস্তানের জেল থেকে ফেরার পর সহরোয়ার্দি উদ্দ্যানের প্রথম সভায় শেখ মুজিব সে ষড়যন্ত্রের কথাটি ব্যক্ত করতে দ্বিধা করেননি। (এ নিবন্ধের লেখক সে বক্তৃতাটি নিজ কানে শুনেছেন।)মুজিবে বক্তৃতার ভাষাটি ছিল এরূপঃ “বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের শুরু একাত্তর থেকে নয়,উনিশ শ’ সাতচল্লিশ থেকেই”। ১৯৪৭য়ে শুরু করা সে ষড়যন্ত্রটি সফল হয় ১৯৭১য়ে। তখন ভারতীয় বাহিনীর পদতলে মৃত্যু ঘটে তৎকালীন বিশ্বের সর্ববৃবহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের।অথচ পাকিস্তানের সৃষ্টিতে বাংলার মুসলমানদের ভূমিকা ছিল উপমহাদেশের আর যে কোন ভাষার মুসলমানদের চেয়ে অধীক। তারাই ছিল দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক। বিশাল স্বর্ণখন্ডকে যে ব্যক্তি মামূলী পাথর মনে করে তারা কাছে সে স্বর্ণখন্ডটি হারিয়ে যাওয়ায় দুঃখ জাগে না।তার জীবনে জীর্ণকুঠিরের বাসও তাই শেষ হয়না। তেমনি এক গভীর অজ্ঞতার কারণে বিশাল খেলাফত ভূমি ভেঙ্গে যাওয়াতে মুসলমানদের জীবনে দুঃখ জাগেনি। দুঃখবোধ হয়নি পলাশীর প্রান্তরে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার স্বাধীনতা অস্ত যাওয়াতেও। বরং ইংরেজ বাহিনীর বিজয় উৎসব দেখতে হাজার হাজার মানুষ রাজধানী মুশিদাবাদের সড়কের দু’পাশে ভিড় জমিয়েছে।সে অসুস্থ্য চেতনার কারণে বাংলার বুকে ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে বড় রকমের জিহাদও হয়নি। বাঙালী মুসলমানদের জীবনে একই রূপ অজ্ঞতা পুণরায় দেখা দেয় ১৯৭১য়ে। ফলে কাফেদের বিজয় উৎসবও তাদের নিজেদের উৎসবে পরিণত হয়েছে। ঢাকার রাস্তায় ভারতীয় সেনাদের অনুপ্রবেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ সেদিন দুপাশে দাঁড়িয়ে প্রচন্ড বিজয়-উল্লাস করেছে। ১৯৭০য়ে নির্বাচনে শেখ মুজিবের বিশাল সাফল্যের বড় কারণ,ভারতের সাথে ষড়যন্ত্রের সে গোপন বিষয়টি তিনি গোপন রাখতে সমর্থ হয়েছেন। জনগণ জানলে কি তার মত ভারতীয় চর ও ষড়যন্ত্রকারিকে ১৯৭০য়ের নির্বাচনে ভোট দিত? বাংলার মুসলমানদের বড় ব্যর্থতা,তারা একাত্তরে ইসলামের মূল শত্রুদের চিনতে ভয়ানক ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। ঘুমের ঘোরে বিষাক্ত গোখরা শাপকে গলায় পেঁচিয়ে নেয়ার বিপদ তো ভয়াবহ। একাত্তরে সেটিই ঘটেছে। সে ভূলের পরিনাম হলো,আজ  শুধু পদ্মা,তিস্তা,সুরমার পানি নয়,বাংলাদেশের স্বাধীনতা অস্তিত্বেও আজ  টান পড়েছে। বাংলাদেশে আজ  যে যুদ্ধাবস্থা তা তো একাত্তরের যুদ্ধেরই ধারাবাহিকতা।

 

নবীজী(সাঃ)র লিগ্যাসি

লিগ্যাসি ইংরেজী শব্দ।বিখ্যাত ব্যক্তিদের অবদান তাদের মৃত্যুর পরও বহুকাল বেঁচে থাকে। তেমনি বেঁচে থাকে বিশাল কোন ঐতিহাসিক ঘটনার সুফল বা কুফলগুলোও। ইতিহাসে এভাবে যা বেঁচে থাকে তাকেই বলা হয় লিগ্যাসি। মানব ইতিহাসে ইসলাম ও তার সর্বশেষ নবী মুহম্মদ (সাঃ)র লিগ্যাসিটি বিশাল। সেটি মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ গড়ার ও সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা নির্মানের। তিনি ও তাঁর সাহাবাগণ ইতিহাস গড়েন মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিটি হুকুম পালনে।  নবীজী (সাঃ)র লিগ্যাসি হলো নানা বর্ণ,নানা ভাষা ও নানা ভূ-খন্ডের মানুষের মাঝে গভীর ভাতৃত্ব গড়ার। শুধ ধর্মীয় বলেই নয়,রাজনৈতিক ও সামরিক বলেও তিনি মুসলমানদের শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছে দিয়ে যান। তাই মুর্তিপূজা,নাস্তিকতা ও নানারূপ পাচাচার থেকে মুক্তিদানই নবীজী (সাঃ)র একমাত্র সাফল্য নয়,মুক্তি দিয়েছেন ভাষাপূজা,বর্ণপূজা,গোত্রপূজা ও জাতিপূজা থেকেও। অথচ সেগুলোই ছিল আরবের বুকে বহু শত বছর যাবৎ রক্তাক্ষয়ীর যুদ্ধের মূল কারণ। এভাবে নবীজী (সাঃ) মুক্তি দিয়েছেন বিশাল আকারের প্রাণহানি ও সম্পদহানি থেকেও।ফলে পারস্যের সালমান ফারসী (রাঃ),আফ্রিকার বেলাল(রাঃ),রোমের সোহায়েব (রাঃ)এর সাথে আরবের আবু বকর (রাঃ),উমর(রাঃ)বা আলী (রাঃ)র কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে কাজে কোনরূপ সমস্যা দেখা দেয়নি।সমগ্র মুসলিম ইতিহাসে একমাত্র সে সময়টিই ছিল সবচেয়ে গৌরবের।একমাত্র তখনই বড় বড় বিজয় এসেছে এবং নির্মিত হয়েছে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ সভ্যতা। ঈমানের দায়বদ্ধতা হলো নবীজী (সাঃ)র সে শিক্ষা ও লিগ্যাসি নিয়ে বাঁচা।

 

শয়তানের লিগ্যাসি ও একাত্তর

মানব সমাজে শয়তানও বেঁচে আছে তার লিগ্যাসি নিয়ে। শয়তানের লিগ্যাসিটি হলো মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও অবাধ্যতা।বাংলাদেশে যারা একাত্তরের চেতানার ধারক তাদের রাজনীতি,সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিতে মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে সে বিদ্রোহটি প্রকট। তাদের জীবনে শয়তানে সূন্নত (সূন্নত শব্দের অর্থ ট্রাডিশন)। ফলে ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে নির্মূলের সুর তাদের রাজনীতিতে। তাদের কাছে ইসলামের সংস্কৃতি,খেলাফত ও শরিয়ত চিত্রিত হয় মধ্যযুগীয় বর্বরতা রূপে।শয়তান শুধু মুর্তিপূজায় ডাকে না।ডাকে গোত্রপূজা,বর্ণপূজা,শ্রেণীপূজা,ভাষাপূজা,দলপূজা,দেশপূজা ও জাতিপূজার দিকেও। এরূপ ডাকার কাজে শয়তানের যেমন নিজস্ব পুরোহিত বাহিনী আছে,তেমনি বিপুল সংখ্যক পূজামন্ডপও আছে। আছে বিশাল প্রশাসনিক অবকাঠামোও। তারাও ডাকে ভাষাপূজা ও ভাষাভিত্তিক জাতি-পূজা’র দিকে। তথাকথিত শহীদ মিনারের নামে ভাষাপূজার বেদীমূলগুলো গড়া হয়েছে সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে। মন্দিরে হাজিরা দেয়ার ন্যায় পূজার এ মন্ডপগুলিতেও নগ্নপদে হাজির হতে হয়। নবীজী (সাঃ)র যুগে আরব জাহেলদের মাঝে যে শুধু মুর্তিপূজা ছিল –তা নয়। ছিল গোত্রপূজা,বর্ণপূজা ও জাতিপূজার পুরনো ঐতিহ্যও। তাদের রাজনীতিতেও ছিল ঈমানদারদের বিরুদ্ধে নির্মূলের সুর। জাহেলী যুগে গোত্র বা বর্ণের নামে যুদ্ধ একবার শুরু হলে সেটি আর থামতো না। পূর্বপুরুষদের শুরু করা যুদ্ধগুলিকে তাদের সন্তানেরাও বছরের পর বছর চালিয়ে যেত। বাংলাদেশের ইসলামবিরোধীগণও বেঁচে আছে শয়তানের সে লিগ্যাসি নিয়ে।ফলে তাদের রাজনীতিতে এখনো বেঁচে আছে ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে নির্মূলের যুদ্ধ।

 

একাত্তরের লিগ্যাসি হলো উম্মাহর বিভক্তি ও মুসলিম শক্তিকে ক্ষুদ্রতর করার। তাই একাত্তরে ভারতের যুদ্ধজয়ে শুধু পাকিস্তান দুর্বল হয়নি। দুর্বল হয়েছে সমগ্র মুসলিম উম্মাহ। দুর্বল হয়েছে বাংলাদেশের মুসলমানগণও। সে সাথে প্রচন্ড আশাহত হয়েছে ভারতের মুসলমানগণ। একাত্তরের পর দারুন ভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বাংলাদেশের মুসলমানদের মুসলমান রূপে বেড়ে উঠার কাজটি। এবং বেগবান হয়েছে মুসলিম সন্তানদের ইসলাম থেকে দূরে সরানোর কাজ। একাজে দেশের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে হাতিয়ার রূপে। রাজনীতিতে ইসলামের শত্রুপক্ষ এতটাই প্রবল যে,ইসলামপন্থিদের জন্য সামান্য স্থান ছেড়ে দিতেও তারা রাজি নয়। আগ্রাসনের শিকার হয়েছে বাংলার মুসলিম সংস্কৃতি। এবং মুসলমান বিচ্যুৎ হচ্ছে জীবনের মূল মিশন থেকে।তবে ইসলামের শত্রুপক্ষের মূল স্ট্রাটেজীটি স্রেফ মুসলিম সন্তানদের ইসলাম থেকে দূরে সরানো নয়,বরং মুসলিম রাষ্ট্রগুলি ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর করা এবং সে ক্ষুদ্য মানচিত্রকে যুগ যুগ  বাঁচিয়ে রাখা। মুসলিম উম্মাহকে শক্তিহীন রাখার এটাই শয়তানি স্ট্রাটিজী। সে স্ট্রাটেজীর অংশ রূপেই অখন্ড আরব ভূমিকে বিশেরও বেশী টুকরোয় বিভক্ত করা হয়েছে। তাই একাত্তরে পাকিস্তান ভাঙ্গার কাজটি শেখ মুজিবের একার ছিল না। প্রকল্পটি একক ভাবে শুধু ভারতেরও ছিল না। ভারতকে যে শুধু ইসরাইল অস্ত্র জুগিয়েছে তাও নয়। বরং এ প্রকল্পটি হাতে নিয়েছিল ইসলামের শত্রুপক্ষের আন্তর্জাতিক কোয়ালিশন;এবং সেটি পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই। পাকিস্তানের মুল অপরাধটি এ ছিল না যে,দেশটিতে স্বৈরাচার বা বৈষম্য ছিল। বরং বর্বরতম স্বৈরাচারের শিকার তো আজকের বাংলাদেশ এবং বেশী বৈষম্য তো ভারতে।

 

গৌরব ভাঙ্গাতে নেই

ইসলামে অতিশয় ছওয়াবের কাজ হলো সৃষ্টিশীলতা। মুসলমানের গৌরব তাই গড়াতে,ভাঙ্গাতে নয়।ইসলামে অতি নিন্দনীয় হারাম কাজ হলো কোন কিছু ভাঙ্গা। অকারণে গাছের একটি ডাল ভাঙ্গাও হারাম। তেমনি অতিশয় হারাম কর্ম হলো মুসলিম দেশের ভূগোল ভাঙ্গা। এজন্যই তো মুসলিম দেশভাঙ্গা নিয়ে শয়তানের অনুসারিদের এত উৎসব। তাই ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান গড়াটি সমগ্র মুসলিম বিশ্ব জুড়ে যতটা প্রশংসা কুড়িয়েছে, ১৯৭১য়ে পাকিস্তান ভাঙ্গাটি সে প্রশংসা পায়নি। অনেকে বরং চোখের পানিও ফেলেছে। (লেখক সে বর্ণনা শুনেছেন ভারত ও আফ্রিকার মুসলিমদের থেকে।) মুসলিম দেশ ভাঙ্গার এ কর্মটি বরং আনন্দের প্রচন্ড হিল্লোল তুলেছে ভারতের ন্যায় কাফের দেশগুলোতে। কলকাতার রাস্তায় সেদিন মিষ্টি বিতরণ হয়েছে। এবং কাফের দেশগুলিই পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন বাংলাদেশকে স্বাধীন দেশ রূপে ত্বরিৎ স্বীকৃতি দিয়েছে,কোন মুসলিম দেশ নয়। মুসলিম দেশের ভাঙ্গন রোধে সীমান্তের এক মুহুর্তের পাহারাদারিকে নবীজী (সাঃ) সারা রাতের নফল ইবাদতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ বলেছেন। এমন একটি চেতনা কারণে সময়ের তালে মুসলমানদের বিপুল সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটলেও মুসলিম দেশের ভূগোলে ভাঙ্গন আসেনি। অথচ ভাষা,বর্ণ ও আঞ্চলিকতার নামে বহু দেশে বিভক্ত হয়েছে ইউরোপ।দেশগুলি বছরের পর বছর রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধেও লিপ্ত থেকেছে।এর বিপরীত,মুসলমানদের ইতিহাস হলো বিভক্তির দেয়াল ভাঙ্গার।দেয়াল ভাঙ্গার মধ্য দিয়েই আরব,ইরানী,তুর্কি,কুর্দি,মুর,বার্বার ও অন্যান্য ভাষার মুসলমানগণ ইউরোপের চেয়ে কয়েকগুণ বৃহৎ ভূখন্ড জুড়ে অভিন্ন উম্মাহ ও এক বিশাল রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে।

 

ভাতৃত্ব,সৌহার্দ-সম্পৃতি ও একতা মুসলিম উম্মাহর জীবনে একাকী আসে না,সাথে আনে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুত সাহায্যও।যুদ্ধের ময়দানে তাদের সাহায্যে এমন কি বিপুল সংখ্যয় ফেরেশতাগণও নেমে আসেন।সে সাহায্যের বরকতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মুসলিম বাহিনী বিজয়ী হয়েছে বিশাল বিশাল শত্রু বাহিনীর উপর। পরাজিত করছে পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যের ন্যায় দুই বিশ্বশক্তিকে। অনৈক্যে বিজয় জুটেনা,দেশও বাঁচে না।অনৈক্যে যা জুটে তা হলো অপমানকর পরাজয় ও গোলামী। এবং আনে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে কঠিন আযাব। সে আযাবের অংশ রূপেই লক্ষ লক্ষ মুসলমান গণহত্যার শিকার হয়। শহরের পর শহর তখন ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়।এবং দেশ অধিকৃত হয় শত্রুবাহিনীর হাতে।সেটি যেমন হালাকু-চেঙ্গিজের হাতে ঘটেছে,তেমনি ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদিদের হাতেও ঘটেছে।

 

ঈমানদারীর দায়বদ্ধতা

মুসলমানকে শুধু নামায-রোযা,হজ-যাকাত পালনের সামর্থ অর্জন করলে চলে না। তাকে নিজ ভাষা,নিজ বর্ণ ও নিজ জন্মভূমির বাইরের লোকদের সাথেও শান্তিপূর্ণ বসবাসের সামর্থ অর্জন করতে হয়।সে সামর্থ হিন্দুদের আছে। ভারত তার দৃষ্টান্ত। ইহুদীদেরও আছে। সে দৃষ্টান্তু ইসরাইল। পাশ্চাত্যেরও আছে। সে দৃষ্টান্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট। নানা ভাষার ও নানা বর্ণের মানুষ যেমন ভারতে,তেমনি ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একত্রে এক ভূগোলে বসবাস করে। কিন্তু সে সামর্থ নেই মুসলমানদের। তারা বেছে নিয়েছে ভাষা ও বর্ণের নামে ভিন্ন ভিন্ন দেশ গড়ার পথ।অথচ রাজনৈতিক একতা কাফেরদের ধর্মে ফরজ নয়। কিন্তু অন্য দেশ,অন্য ভাষা ও অন্য বর্ণের মুসলমানকে মুমিন ব্যক্তির ভাই বলে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন খোদ মহান আল্লাহতায়ালা। প্রতিটি মুমিনের উপর ঈমানী দায়বদ্ধতা হলো মহান আল্লাহতায়ালা কর্তৃক নির্ধারিত সে পবিত্র ভাতৃত্বের সম্পর্কের প্রতি সম্মান দেখানো। নইলে অবমাননা হয় খোদ মহান আল্লাহতায়ালার। সে ফরজটি ১৯৪৭ সালে পালিত হয়েছিল, কিন্তু ১৯৭১য়ে পালিত হয়নি। বরং অবাধ্যতা হয়েছে। ভিন্ ভাষা,ভিন্ বর্ণ ও ভিন্ জাতীয়তার নামে মুসলমান ভাইয়ের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা ও বিভক্তিটা স্থায়ী করার লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় সীমানার নামে দেয়াল খাড়া করা কি ঈমানদারি? নিজ গৃহে ভাইয়ের প্রবেশ রুখতে কি দেয়াল গড়া যায়? ইসরাইল বা ভারতের ন্যায় শত্রুদেশ এমন দেয়াল গড়তে পারে। কিন্তু সে দেয়াল মুসলমান দেশ গড়ে কি করে? খেলাফতের যুগে সেরূপ দেয়াল ছিল না। ফলে সে বিশাল মুসলিম খেলাফতের যে কোন প্রান্ত থেকে মক্কা-মদিনা বা অন্য কোন শহরে পৌঁছতে ভিসার প্রয়োজন পড়তো না। মুসাফিরের মুসলমান পরিচিতিটাই সে জন্য যথেষ্ট ছিল।

 

ভিন্ন ভিন্ন ভাষার নামে বিভিন্ন রাষ্ট্র ও সেগুলীর নামে বিভক্তির সীমান্তরেখাগুলি হলো মুসলিম ইতিহাসের সবচেয়ে ক্ষতিকর বিদ’য়াত।এটি প্রাচীন জাহিলিয়াত। আত্মবিনাশী এ বিদ’য়াতকে বাঁচাতে গড়া হয়েছে শত শত কোটি ডলার ব্যয়ে বিশাল বিশাল সামরিক বাহিনী। শুরু হয়েছে ভিসার প্রচলন। আর আলেমদের অপরাধ হলো,ছোটখাটো বিদ’য়াত নিয়ে উচ্চকন্ঠ হলেও এরূপ বিধ্বংসী বিদ’য়াত নিয়ে তাদের মুখে কোন কথা নেই। ঈমানের রোগ নির্ণয়ে মাপকাঠি অনেক। তবে রোগটি নির্ভূল ভাবে ধরা পড়ে অন্য ভাষা,অন্য দেশ ও অন্য বর্ণের মুসলমানকে নিজ ভাই রূপে আলিঙ্গণের অসামর্থতায়।কারণ,সেজন্য তো চাই ঈমানে পর্যাপ্ত বল।চাই বর্ণবাদ ও জাতীয়তাবাদের উর্দ্ধে উঠার সামর্থ।বাঙালী মুসলমানদের ঈমানের সে অসামর্থতা ধরা পড়েছে একাত্তরে। স্রেফ ভাষা,বর্ণ ও জন্মস্থান ভিন্ন হওয়ার কারণে একাত্তরে হাজার হাজার বিহারীকে বাংলার বুকে হত্যা করা হয়েছে। ধর্ষিতা হয়েছে তাদের নারীরা। জীবিতদেরকে রাস্তায় নামিয়ে তাদের ঘরবাড়ি ও ব্যবসা-বাণিজ্যকেও দখলে নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশে বিহারী বস্তিগুলো সে অপরাধের সাক্ষিরূপে এখনো বেঁচে আছে। এরূপ রোগ নিয়ে ইউরোপীয়রা বিশ্বের নানা দেশে বর্ণ ও জাতিগত নির্মূলে নেমেছে।নির্মূলের পর সেখানে নিজেদের কলোনি গড়েছে। আর বাংলাদেশের বুকে বহু দুর্বৃত্ত বাঙালী নেমেছে বিহারী মহল্লায়।বাংলাদেশের সরকার এসব  দুর্বৃত্তদের পুরস্কৃত করেছে তাদের দখলকৃত ঘরবাড়ি ও দোকানপাঠের উপর মালিকানার সনদ দিয়ে।

 

বড় লক্ষাধিক নবীরাসূল একসাথে প্রেরিত হলেও তাদের মাঝে কি কোন বিরোধ হতো? তাদের মাঝে কি ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্র ও সেসব রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষার নামে সীমানা গড়া হতো? এক্ষেত্রে আজকের মুসলমানদের ব্যর্থতাটি বিশাল।শুধু নামায-রোযার মধ্য দিয়ে কি এ ব্যর্থতার আযাব এড়ানো যায়? এরূপ ব্যর্থতা নিয়ে কি মহান আল্লাহতায়ালার কাছে প্রিয় বান্দা হওয়া যায়? অনৈক্য ও বিভক্তি যে কতটা সর্বনাশা -সেটি বুঝতে কি ইতিহাস পাঠের প্রয়োজন পড়ে? প্রমাণ তো মুসলমানগণ নিজেরাই। বিশ্বে তাদের সংখ্যা বেড়েছে। বেড়েছে মুসলিম রাষ্ট্রও।কিন্তু তাতে কি তাদের শক্তি,সামর্থ ও প্রতিরক্ষা বেড়েছে? বেড়েছে কি স্বাধীনতা ও মান-ইজ্জত? সংখ্যায় প্রায় দেড় শত কোটি হওয়া সত্ত্বেও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদসহ বিশ্বের কোন প্রতিষ্ঠানেই কি তারা সাড়ে ৫ কোটি ব্রিটিশ বা ৬ কোটি ফরাসীদের সামনে কি সমান অধীকার নিয়ে দাঁড়াতে পারে?

 

অর্জিত আযাব

এরূপ ব্পির্যয় ও অপমান থেকে বাঁচাতেই মহান আল্লাহতায়ালা শুধু চুরি-ডাকাতি,মদ-জুয়া,ব্যাভিচার ও মিথ্যাচারকে হারাম করেননি,হারাম করেছেন ভাষা,বর্ণ,গায়ের রং,আঞ্চলিকতা নিয়ে মুসলিম ভূগোলকে বিভক্ত করার রাজনীতি।পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালার হুশিয়ারি,“সবাই মিলে তোমরা আঁকড়ে ধরো আল্লাহর রশিকে,এবং পরস্পরে বিভক্ত হয়োনা।” –(সুরা আল ইমরান অয়াত ১০৩)। এভাবে তিনি কঠোর ভাবে সাবধান করেছেন অনৈক্য থেকে বাঁচতে। আরো হুশিয়ার করেছেন এ বলে,“তোমারা তাদের মত হয়োনা,যারা সুস্পষ্ট নির্দেশ আসার পরও বিভক্ত হয়,এবং ভেদাভেদ গড়ে। এদের জন্যই নির্দিষ্ট রয়েছে বিশাল আযাব।” –(সুরা আল ইমরান আয়াত ১০৫)। উপরুক্ত প্রথম আয়াতটিতে পবিত্র কোরআন চিহ্নিত হয়েছে আল্লাহর রশি রূপে। মুসলমানদের উপর ফরজ হলো,জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে আল্লাহর এ রশিকে আঁকড়ে ধরা ও বিভক্তি থেকে বাঁচা। দ্বিতীয় আয়াতটিতে স্পষ্ট হুশিয়ারি হলো,আল্লাহতায়ালার আযাব নামিয়ে আনার জন্য মুর্তিপূজারি বা নাস্তিক হওয়ার প্রয়োজন নেই। সে জন্য মহান আল্লাহতায়ালার রশিকে পরিত্যাগ করা ও নিজেদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টিই যথেষ্টে। বিভক্তির চুড়ান্ত রূপটি হলো বিভক্ত রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রগুলির নামে গড়ে উঠা দেয়াল। বিগত বহু শত বছর যাবত মুসলিম চেতনায় মহান আল্লাহতায়ালার এ হুশিয়ারিটি মুসলমানদের মাঝে এতটাই প্রকট ভাবে বেঁচেছিল যে মুসলিম জনগণ কখনোই মুসলিম ভূখন্ডকে বিভক্ত করার কাজে অংশ নেয়নি। ভাষা,  বর্ণ,অঞ্চলের নামে দেশও গড়া হয়নি। এমন কি ১৯৭১য়েও কোন ইসলামি দলগুলির কোন নেতাকর্মী,কোন আলেম বা কোন পীর-মাশায়েখ পাকিস্তান ভাঙ্গাকে সমর্থণ করেনি। সে লক্ষে তারা ভারতে যায়নি এবং অস্ত্রও ধরেনি।

 

বাংলাদেশের মুসলমানগণ আজ  ভয়ানক আযাবের গ্রাসে। দেশে আজ যুদ্ধাবস্থা। তবে এ আযাব তাদের স্বহাতে অর্জিত। যে পাপের কারণে এ আযাব তাদেরকে ঘিরে ধরেছে সেটির শুরু আজ নয়,বরং একাত্তর থেকেই। একাত্তরে যাদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে তাদের কাছে মহান রাব্বুল আলামীনের উপরুক্ত হুশিয়ারিটি আদৌ গুরুত্ব পায়নি। তাদের হাতে আল্লাহর রশিটি যেমন ছিল না,তেমনি ছিল না মুসলিম উম্মাহর একতা,সংহতি ও কল্যাণেরর ভাবনা। তারা তো ধরেছে ভারতের রশি। ভারতের রশির টানেই তারা দিল্লিতে গিয়ে পৌঁছে। সে রশি দিয়েই শেখ মুজিব ও তার অনুসারিগণ বাংলাদেশকে ভারতের দাসত্বের জালে আবদ্ধ করে। বাঙালী মুসলমানের স্বাধীনতার কথা তাদের কাছে একটু্ও গুরুত্ব পায়নি। গুরুত্ব পায়নি মুসলিম উম্মাহর ইজ্জত-আবরুর কথাও। সেটি গুরুত্ব পেলে কি মুজিব ভারতের সাথে ২৫ সালা দাসচুক্তি স্বাক্ষর করতো। ভারতীয় কাফেরদের অস্ত্র কাঁধে নিয়ে মুজিবের অনুসারিরা ভারতের সাম্রাজ্যবাদি আধিপত্যকে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার বুকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। ভারতীয়দের চেয়েও এসব আওয়ামী বাকশালীগণ যে বেশী ভারতীয় সেটির প্রমাণ তো তারা এভাবেই দিয়েছে। ভারত এজন্যই বাংলাদেশের বুকে তাদের এ বিশ্বস্থ্য দাসদের চিরকাল ক্ষমতায় রাখতে চায়।এবং নির্মূল করতে চায় তাদের যারা ভারতের অধীনতা থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করতে চায়। ফলে বর্তমান অবৈধ সরকারের ভোট-ডাকাতি যত কদর্য কর্ম রূপেই হোক,ভারত সেটিকে শতভাগ বৈধতা দেয়। ক্ষমতা থেকে উৎখাত হলে এ দাসগণ যে ইতিহাসের আবর্জণায় যাবে তা নিয়ে কি ভারতীয়দের মনেও কোন সন্দেহ আছে? আধিপত্যবাদি দেশ তো অন্যদেশের অভ্যন্তরে এমন দাসদেরই খোঁজে। ভারতের কাছে মুজিব ও তার বাকশালী সহরচদের কদর তো এজন্যই এত অধীক। স্বাধীনচেতা মানুষদের তারা বরং শত্রু জ্ঞান করে। ফলে বাংলাদেশে বুকে তাদের বিরুদ্ধে নির্মূলের এতো আয়োজন।শুধু র’য়ের এজেন্ট, র‌্যাব,পুলিশ,বিজিবি ও দলীয় গুন্ডাবাহিনীই শুধু নয়,আদালতের বিচারকদেরও এ নির্মূল কাজে ময়দানে নামানো হয়েছে।পদসেবী এ দাসদের ক্ষমতায় রাখতে ভারত বরং একাত্তরের ন্যায় আরেকটি যুদ্ধ করে দিতেও রাজী। সাম্রাজ্যবাদিদের সেটিই তো চিরাচরিত রীতি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের দাসদের ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে সেরূপ যুদ্ধ বিশ্বের নানা দেশে লড়ছে। ভারত সেরূপ যুদ্ধ বাংলাদেশে লড়বে তাতেই বা বিস্ময়ের কি? এ সহজ বিষয়টুকু বুঝার জন্য কি পন্ডিত হওয়ার প্রয়োজন পড়ে? ০৪/০৪/২০১৫

 

 




পৌত্তলিক রবীন্দ্রনাথ, ঈমানবিনাশী জাতীয় সঙ্গিত ও বাঙালী মুসলিমের আত্মসমর্পণ

যে মহাপাপ কথা ও গানে

সমাজে বড় বড় অপরাধগুলি শুধু খুন,ব্যভিচার বা চুরিডাকাতি নয়।গুরুতর অপরাধ ঘটে মুখের কথায় ও গানে। যে ব্যক্তি মুখে মহান আল্লাহতায়ালাকে অস্বীকার করে বা তাঁর কোন হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঘোষণা দেয় -তাকে কি জাহান্নামে প্রবেশের জন্য খুন,বলাৎকার বা চুরি-ডাকাতিতে নামার প্রয়োজন পড়ে? বিদ্রোহের ঘোষণাটি মুখে মাত্র একবার দেয়াই সে জন্য যথেষ্ঠ। অভিশপ্ত শয়তানে পরিণত হতে ইবাদতে মশগুল ইবলিসকে তাই হত্যা বা ব্যভিচারে নামতে হয়নি। মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া একটি মাত্র হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহই তাকে লানতপ্রাপ্ত করেছে।সে হুকুমটি ছিল হযরত আদম (আঃ)কে সেজদার।তাই বক্তৃতায় কি বলা হয়, সঙ্গিতে কি গাওয়া হয় বা সাহিত্যের নামে কি লেখা হয় -সেটি অতি গুরুত্বপূর্ণ। তা রেকর্ড হয় এবং তা নিয়ে বিচার বসবে রোজ হাশরের বিচার দিনে। মু’মিন ব্যক্তিকে তাই শুধু উপার্জন বা খাদ্য-পানীয়’র ক্ষেত্রে হারাম-হালাম দেখলে চলে না। কথাবার্তা বা লেখালেখির ক্ষেত্রেও অতি সতর্ক হতে হয়।নবীজী(সাঃ)র হাদীসঃ অধিকাংশ মানুষ জাহান্নামে যাবে জিহ্বা ও যৌনাঙ্গের দ্বারা কৃত অপরাধের কারণে। তেমনি বহু মানুষ জান্নাতেও যাবে সত্য দ্বীনের পক্ষে সাক্ষি দেয়ার কারণে। ফিরাউনের দরবারে যে কয়েকজন যাদুকর হযরত মূসা (আঃ)র সাথে প্রতিযোগিতায় এসে হেরে গিয়ে মুসলমান হয়েছিলেন তারা জীবনে এক ওয়াক্ত নামায বা রোযা পালনের সুযোগ পাননি। “মুসা (আঃ)র রবের উপর ঈমান আনলাম” –তাদের মুখ থেকে উচ্চারিত এই একটি মাত্র বাক্যই তাদেরকে সরাসরি জান্নাতবাসী করেছে। ঈমানের প্রবল প্রকাশ ঘটেছিল তাদের সে উচ্চারণে। ঈমানের সে প্রকাশ ফিরাউনের কাছে সহ্য হয়নি, তাই তাদের হাত-পা কেটে নির্মম হত্যার হুকুম দেয়। মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষে সাক্ষদানে তারা এতই অটল ছিলেন যে,সে নির্মম হত্যাকান্ডও তাদের একবিন্দু বিচলিত করতে পারেনি। তাদের এ সাহসী উচ্চারনে মহান আল্লাহতায়ালা এতোটাই খুশি হয়েছিলেন যে পবিত্র কোরআনের একাধিক স্থানে নিজ কালামের পাশে তাদের সে ঘোষণাকেও লিপিবদ্ধ করেছেন, এবং ক্বিয়ামত অবধি মানব জাতির জন্য শিক্ষ্যণীয় করেছেন।

ঈমান বন্দুকের গুলি বা মিজাইলে মারা পড়ে না। ঈমানের মৃত্যু তখন ঘনিয়ে আসে যখন গান,সঙ্গিত বা সাহিত্যের নামে চেতনার ভূবনে লাগাতর বিষ ঢালা হয়। শয়তান বিষ পান করানোর সে কাজটাই মহা ধুমধামে করে নানারূপ গীত, গান,স্লোক ও মিথ্যা ধর্মগ্রন্থ পাঠ করানোর মধ্য দিয়ে। সে লক্ষ্যে বিশ্বজুড়ে শয়তানের লক্ষ লক্ষ পুরোহিত, মন্দির ও পূজামন্ডপ এবং হাজারো গান। বাংলার বুকে ইসলামের যখন প্রচন্ড জোয়ার,সে জোয়ার ঠেকাতে শয়তান যে অস্ত্রটি বেছে নিয়েছিল সেটিও কোন আধুনিক মারণাস্ত্র ছিল না। সেটি ছিল ভাববাদী গান।ইসলামের প্রসার রুখতে ভাববাদী গান ও হাতে বাদ্যযন্ত্র নিয়ে তখন মাঠে নেমেছিল চৈতন্য দেব। তার গানের আবেগ এতোটাই প্রবল ছিল যে, বাংলার বুকে হিন্দুদের মুসলমান হওয়ার জোয়ার দ্রুত থেমে যায়। ফলে কোটি কোটি ইসলামের আলোয় আলোকিত হতে ব্যর্থ হয়,থেকে যায় সনাতন জাহিলিয়াতের অন্ধকারে। বাংলাদেশের বুকে শয়তানের স্ট্রাটেজী আজও  অভিন্ন। তবে শয়তানের উদ্দেশ্য, হিন্দুদের মুসলমান হওয়া রুখা নয়।বরং সেটি মুসলমানদেরকে ইসলাম থেকে দূরে সরানো তথা ডি-ইসলামাইজেশন। সে কাজে শয়তান সৈনিক হিসাবে পেয়েছে আধুনিক মুর্তিপুজারি রবীন্দ্রনাথকে।

 

একাত্তরের আত্মসমর্পণ

বাঙালী মুসলমানদের চেতনায় ঈমানবিনাশী বিষ ঢালার কাজ যে পূর্বে হয়নি -তা নয়। সে কাজের শুরু প্রবল  হয়েছিল ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের আমলে। সেটি উগ্র পৌত্তলিক সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্রের “বন্দেমাতরম’ গান গাওয়ার মাধ্যমে। বাঙালী হিন্দুগন সে গানকে অবিভক্ত বাংলার সকল স্কুলে জাতীয় সঙ্গিতের মর্যাদা দেয়। কিন্তু বাঙালী মুসলিমগণ শত্রুদের সে ঈমানবিনাশী ষড়য্ন্ত্রের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ফলে সে প্রকল্প সেদিন ব্যর্থ হয়। বাঙালী মুসলিমদের সেদিনের সাফল্যের কারণ, মুসলিম রাজনীতির নেতৃত্ব মুজিবের ন্যায় ভারতীয় স্বার্থের সেবাদাসদের হাতে বন্দী ছিল না। বাঙালী মুসলিমগণ হিন্দু আধিপত্যের কাছে সেদিন আত্মসমর্পিতও ছিল। বরং তাদের চেতনার ভূমিতে সেদিন ছিল ইসলামের প্রতি গভীর অঙ্গিকার। সেদিন তারা বন্ধুহীনও ছিল না। তাদের পাশে ছিল দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য ভাষাভাষি বহু কোটি মুসলমান। কিন্তু ১৯৭১য়ে বাংলার রাজনীতির চিত্রই পাল্টে যায়। দেশ অধিকৃত হয় লক্ষাধিক ভারতীয় সৈন্যদের হাতে। এবং বাংলাদেশের রাজনীতির অঙ্গণ তখন অধিকৃত হয় ইসলামি চেতনাশূণ্য ও ইসলামচ্যুত সেক্যুলারিস্টদের হাতে। ভারতের প্রতি তখন বাড়ে সীমাহীন আত্মসমর্পণ। ভারতের অর্থে ও স্বার্থে প্রতিপালিত এ সেবাদাসদের অঙ্গিকারটি ভারতের প্রতি এতোই গভীর যে,একাত্তরের যুদ্ধে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বহু হাজার কোটি টাকার যুদ্ধাস্ত্র ভারতের হাতে ডাকাতি হওয়াতেও তাদের মনে সামান্যতম দুঃখবোদ জাগেনি। সে ডাকাতি রোধে তারা কোন চেষ্টাও করেনি।অথচ সে অস্ত্র কেনায় বাংলাদেশের জনগণের অর্থ ছিল।  তারা রুখেনি দেশের কলকারাখানার যন্ত্রপাতি লুন্ঠনও। বরং লুন্ঠনকে বাধাবিপত্তিহীন করতে সীমান্ত বাণিজ্যের নামে তারা বিলুপ্ত করে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সীমান্তও। ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গণে দেশ দ্রুত পরিণত হয় তলাহীন ভিক্ষার পাত্রে। ১৯৭৪ য়ে নেমে আসে ভয়ানক দুর্ভিক্ষ। আত্মসমর্পণের পর কি আর নিজের ইচ্ছা চলে? তখন তো প্রভুর ইচ্ছাই মেনে নিতে হয়। একাত্তরে ভারতের যুদ্ধজয়ের পর তেমনি একটি পরাজিত অবস্থা নেমে আসে বাংলার মুসলিম জীবনে।

দাসদের জীবনে কোনকালেই স্বাধীনতা আসে না।তারা তো বাঁচে আমৃত্যু পরাধীনতা নিয়ে। সে পরাধীনতাটি বরং গভীরতর হয় চেতনার ভূবনে। একাত্তর-পরবর্তী ভারতীয় দখলদারি ও তাদের ডাকাতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস ভারতীয় আশ্রয়ে প্রতিপালীত এহেন বাংলাদেশী দাসদের ছিল না। ফলে ভারত যা চেয়েছে সেটিই তারা অনায়াসে করতে পেরেছে। স্কুলে কি গাইতে হবে, কি পড়তে হবে সেটিও নির্ধারিত করে দেয় ভারত। শাসতন্ত্রের মূলনীতিগুলিও তারা নির্ধারণ করে দেয়। নিষিদ্ধ করে দেয় ইসলামপন্থিদের রাজনীতি। অথচ ১৯৭০য়ের নির্বাচনি মেনিফেস্টোতে মুজিব একটি বারের জন্যও এমন কথা উল্লেখ করেনি। এবং ইসলামপন্থি দলগুলো নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে জনগণের রায়ও নেয়নি। পরাধীন ব্রিটিশ আমলে ইসলামের শত্রুগণ “বন্দেমাতরম” গানটি গিলাতে না পারলেও একাত্তরের পর তারা “আমরা সোনার বাংলা”কে গিলাতে পেরেছে। রবীন্দ্রনাথ নিজেও তার জীবদ্দশাতে নিজের কোন গান বাঙালী মুসলমানদের এভাবে গিলাতে পারেনি যা পেরেছে একাত্তরের পর। ইসলামের শত্রুদের এটিই হলো একাত্তরের বড় অর্জন। প্রশ্ন হলো,ভাব ও ভাবনায় রবীন্দ্রনাথের “আামার  সোনার বাংলা” আর বঙ্কিমচন্দ্রের “বন্দেমাতরম” গানের মাঝে পার্থক্য কতটুকু? উভয় গানেই দেশ মাতৃতূল্য, সে সাথে পূজনীয়। ফলে উভয় গানের মূলেই রয়েছে অভিন্ন পৌত্তলিকতা। এমন গান কি কোন মুসলমান গাইতে পারে? বাংলাদেশের মুসলমানদের যারা ঈমানশূন্য ও ইসলামশূন্য দেখতে চায়,এ গান নিয়ে তাদের আগ্রহটি তাই গভীর। এরা দেখতে চায় পৌত্তলিকতার জয়জয়াকর। ফলে যাদের কাছে চৈতন্য দেব পূজনীয়, তাদের কাছে পূজনীয় রবীন্দ্রনাথও। মুসলমানের ঈমান ধ্বংসে যাদের আগ্রহটি প্রবল, একমাত্র তারাই এমন গানকে মুসলমানদের উপর চাপিয়ে দিবে।এ গানটি জাতীয় সঙ্গিত রূপে নির্বাচনে বিবেচনায় আনা হয়েছে আওয়ামী লীগ ও তার ভারতীয় মিত্রদের সেক্যুলার ও হিন্দুয়ানী মানদন্ড। তাদের সে মানদন্ডে রবীন্দ্রনাথ দেবতুল্য গণ্য হয়েছেন। ফলে তার গানকে তারা তীব্র ভক্তিভরে জাতীয় সঙ্গিতের মর্যাদা দিয়েছেন। ইসলাম কি বলে -সেটি আদৌ সেদিন বিবেচনায় আনা হয়নি। কিন্তু প্রশ্ন হলো সেক্যুলার মানদন্ডে যা কিছু হালাল,সেগুলি কি ইসলামি মানদন্ডেও জায়েজ? জ্বিনা সেক্যুলার মানদন্ডে কোন অপরাধই নয় -যদি সে ব্যাভিচারে সংশ্লিষ্ট নারী ও পুরুষের সম্মতি থাকে। অথচ ইসলামে রয়েছে বিবাহিত ব্যাভিচারীদের প্রস্তরাঘাতে প্রাণনাশের বিধান। আর অবিবাহিতের জন্য রয়েছে প্রকাশ্য লোকসম্মুখে ৮০টি বেত্রাঘাতের শাস্তি। ঈমানদার হওয়ার দায়বদ্ধতা শুধু নামায-রোযা, হজ-যাকাত পালন নয়,মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তি বিধানের কাছে পূর্ণ আত্মসমর্পণ।সেক্যুলারিস্টদের জীবনে সে আত্মসমর্পণ নাই,বরং প্রতিপদে প্রকাশ পায় বিদ্রোহ। এবং সে বিদ্রোহটি মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তি হুকুমের বিরুদ্ধে। তাদের সে অবাধ্য চেতনাটিই ধরা পড়েছে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিত নির্বাচনের ক্ষেত্রে।

একাত্তরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রবেশ বাঙালী মুসলমানদের স্বাধীনতা বা ঈমান বাড়ানোর স্বার্থে ঘটেনি। সেটি হয়েছে ভারতীয় আধিপত্য বাড়াতে। সে আধিপত্যটি শুধু রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গণে নয়,সংস্কৃতি,ধর্ম ও আদর্শের ক্ষেত্রেও। মহান আল্লাহতায়ালা তো চান প্রতিটি মুসলমান বেড়ে উঠুক তাঁর প্রতি অটুট ঈমান নিয়ে। ঈমানে বৃদ্ধি ঘটানোর প্রয়োজনেই মহান আল্লাহ-রাব্বুল আলামীনের রয়েছে নিজস্ব সিলেবাস। সেটি পবিত্র কোরআনের জ্ঞান বাড়িয়ে। মু’মিনদের উপর অর্থ বুঝে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতকে তিনি বাধ্যতামূলক করেছেন।সেটি ফরজটি যেমন প্রতিদিন ৫ ওয়াক্ত নামাযের প্রতি রাকাতে কোরআন পাঠে,তেমনি নামাযের বাইরেও। ঈমানের বৃদ্ধিতে কোরআন পাঠের গুরুত্ব যে কত অধীক -সেটি বর্ণীত হয়েছে পবিত্র কোরআনে। বলা হয়েছে “মুসলমান তো একমাত্র তারাই যাদের হৃদয় আল্লাহর নাম স্মরণ হওয়া মাত্রই ভয়ে কেঁপে উঠে এবং যখন তাদের কাছে কোরআনের আয়াত পড়ে শোনানো হয় তখন তাদের ঈমান বেড়ে যায় এবং তারা আল্লাহর উপর নির্ভরশীল।” -(সুরা আনফাল আয়াত ২)। মহান আল্লাহতায়ালার এ প্রকল্পকে বানচাল করতে শয়তানেরও রয়েছে নিজস্ব স্ট্রাটেজী। রয়েছে নিজস্ব সিলেবাস। শয়তান চায়,ঈমানের বিনাশ। চায়, মানব মন থেকে আল্লাহর স্মরণকে ভূলিয়ে দিতে। এ জন্য চায়, মানুষকে কোরআন থেকে দূরে টানতে। কোরআনের পাঠ নিষিদ্ধ করে বা সংকুচিত করে শয়তান তার নিজস্ব পাঠ্যসূচী গড়ে তোলে নাচ-গান ও খেলাধুলা দিয়ে। কোরপাঠের বদলে তখন গুরুত্ব পায় চৈতন্যদেব, বঙ্কীমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের ন্যায় পৌত্তলিকদের রচিত কবিতা, গান ও সাহিত্য। এভাবে শয়তান বাড়ায় মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে লাগাতর অবাধ্যতা। তাই ইসলামের শত্রুগণ কোরআন পাঠের বদলে তারা রবীন্দ্র-সঙ্গিত পাঠকে বাধ্যতামূলক করেছে। সেটি শুধু দেশের স্কুলগুলিতেই নয়,এমনকি ধর্মীয় মাদ্রাসাগুলোতেও। এমন কি জাতীয় সংসদের অধিবেশনসহ সকল সামরিক ও বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানেও।

 

রবীন্দ্রচেতনার নাশকতা

মানুষ শুধু তার দেহ নিয়ে বাঁচে না। বাঁচে তার চেতনা নিয়েও। সে সুস্থ্য চেতনাটির কারণেই মানব শিশু তার মানবিক পরিচয়টি পায়। সে চেতনাটি সাথে নিয়েই সর্বত্র তার বিচরণ। সেটি যেমন ধর্ম-কর্ম,রাজনীতি,সংস্কৃতি ও পোষাক-পরিচ্ছদে,তেমনি তার গদ্য,পদ্য,কথা ও গানে। মানুষ বেড়ে উঠে এবং তার মূল্যায়ন হয় সে চেতনাটির গুণে। ইসলামের পরিভাষায় সেটিই হলো তার ঈমান ও আক্বীদা। নামায-রোযা ও হজ-যাকাতের আগে মৃত্যর পর প্রথমে হিসাব হবে ঈমান ও আক্বীদার। সেটি কবরে যাওয়ার পরপরই। এখানে অকৃতকার্য হলে রোযহাশরের বিচারেও কি পাশের সম্ভবনা থাকে? শত বছরের ইবাদত দিয়েও সেটি কি পূরণ হওয়ার? মানুষের ধর্ম,কর্ম,সংস্কৃতি ও আচরনে বিপ্লব আসে ঈমান ও আক্বীদের গুণে। চেতনায় রোগ থাকলে কি ব্যক্তির ইবাদতে বা চরিত্রে পরিশুদ্ধি আসে? শিরক তো সে মহাবিপদটাই ঘটায়। শিরক হলো মহান আল্লাহর সার্বভৌম ক্ষমতার সাথে কাউকে শরীক করা। ইসলামের মহা সত্যটি হলো, মহান আল্লাহতায়ালার নিজ রাজ্যে কেউ তাঁর অংশীদার নয়। অথচ শিরক হলো তাঁর একচ্ছত্র রাজত্বে অংশীদারিত্ব আরোপ। মুশরিকগণ তো সেটিই করে। মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে অন্যসব পাপ মাফ হতে পারে,কিন্তু মাফ হয়না শিরকের পাপ।অথচ রবীন্দ্রনাথ তার সাহিত্যে সে শিরকের বীজই ছড়িয়েছেন। শিরকের সে চেতনাটি প্রবল ভাবে ছড়িয়ে আছে তার রচিত কবিতা,নাটক,ছোটগল্প ও গানে। রবীন্দ্রনাথ তাই গুরুতর অপরাধী। তার সে অপরাধটি মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে। লক্ষণীয় হলো, যখন থেকে বাংলাদেশের বুকে রবীন্দ্র সাহিত্যের প্রসার বেড়েছে তখন থেকেই প্রচন্ড অবাধ্যতা শুরু হয়েছে বাংলার মুসলমানদের মাঝে। এবং তখন থেকে শুরু হয়েছে বাঙালী মুসলমানদের ইসলাম থেকে দূরে সরা। ইসলাম থেকে দূরে সরার কাজটি যে কতটা গভীর ভাবে হয়েছে সে প্রমাণ কি আজ কম? সেটির প্রবল প্রকাশ পেয়েছে ২০১৩ ৫ই মে তারিখে ঢাকার শাপলা চত্বরে। মুসলিম সমাজে অতি সন্মানিত ব্যক্তি হলেন আলেম, হাফেজ ও মসজিদের ইমামগণ। কারণে প্রতি সমাজে তারাই নবীজী (সাঃ) প্রতিনিধি। তাদের হত্যা করা, হত্যাকরে লাশ ড্রেনে ফেলা বা ময়লার গাড়িতে ফেলার কাজ কি কোন মুসলমানের হতে পারে? একাজ তো নিরেট শয়তানদের। কারণ নবীজী (সাঃ) প্রতিনিধিদের সাথে শয়তানের যুদ্ধটি শুধু আদিকালেরই নয়, অনাগত কালেরও। ইসলামের শত্রুরূপে গণ্য হবে ও গণরোষে পড়বে -সে ভয়ে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ আমলে বিদেশী কাফেরগণও তাই আলেম-উলামা ও হাফেজে কোরআনদের গায়ে এরূপ নৃশংস ভাবে হাত দেয়নি। এমনকি ফিরাউনও হযরত মূসা (আঃ) ও তার অনুসারি ইহুদীদের সাথে এমন নিষ্ঠুরতা দেখায়নি। হযরত মূসা (আঃ) যখন ফিরাউনের সাথে বিতর্ক করেছেন তখন ফিরাউন দেশের বড় বড় যাদুকর ডেকে তার সাথে প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে। কিন্তু মুসা (আঃ)কে হত্যা করে তার লাশ ময়লার গাড়িতে তূলেনি। কিন্তু বাংলাদেশে হাসিনার ন্যায় রবীন্দ্রচেতনার ধারকেরা ইতিহাসের সে বর্বরতম কাণ্ডটি ২০১৩ সালে ঢাকার শাপলা চত্বরে করেছে দেশের শত শত আলেম, হাফেজ ও মসজিদের ইমামদের সাথে। শুধু ইসলাম থেকে দূরে সরানোর ক্ষেত্রেই নয়, ইসলাম ও মুসলমানদের শত্রু রূপে গড়ে তুলতে পৌত্তলিক রবীন্দ্রচেতনা যে বাংলার বুকে কতটা সফল হয়েছে এ হলো তার নমুনা। বাংলার মুসলিম পরিবারে কোনকালেই এরূপ বিপুল সংখ্যায় এমন নৃশংস দুর্বৃত্তদের উৎপাদন ঘটেনি। শয়তান এরূপ বাকশালী দুর্বুত্তদের বাম্পার উৎপাদন নিয়ে বিশ্বের কোনে কোনে গিয়ে নিঃসন্দেহে গর্ব করতে পারে। এমন দেশ বিশ্বের দরবারে বার বার দুর্বৃত্তিতে প্রথম হবে তা নিয়েও কি সন্দেহ থাকে? অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নাশকতার পাশাপাশি এ হলো রবীন্দ্রভক্ত ভারতসেবী বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের নৈতিক ও সাংস্কৃতিক নাশকতা।

 

মানব জীবনে ভয়ানক বিপদের কারণ হলো পথভ্রষ্টতা। মহান আল্লাহতায়ালার প্রদর্শিত পথ থেকে পথভ্রষ্টতাই পরকালে জাহান্নামের আগুণপ্রাপ্তিকে অনিবার্য করে। একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালার রহমতই এ বিপদ থেকে মানুষকে বাঁচাতে পারে। সে রহমত লাভের দোয়াই মানব জীবনের সবচেয়ে বড় দোয়া। প্রতি নামাজের প্রতি রাকাতে মহান আল্লাহতায়ালা তাই বিধিবদ্ধ করে দিয়েছেন সে বিশেষ দোয়া পাঠের বিধান। সে দোয়াটি যেমন ভ্রষ্টতা থেকে বাঁচার, তেমনি সিরাতুল মোস্তাকীম প্রাপ্তির। সে অতি গুরুত্বপূর্ণ দোয়াটি শেখানো হয়েছে সুরা ফাতেহা’তে। এ দোয়াটি শুধু নামাযে নয়, বরং ঈমানদারকে প্রতিদিন ও প্রতিক্ষণ বাঁচতে হয়ে এ দোয়ার আকুতি নিয়ে। অথচ সে দোয়ার দর্শনটি গুরুত্ব পায়নি বাংলাদেশের শিক্ষানীতিতে। বরং ছাত্র-শিক্ষক, নারী-পুরুষদেরকে পথ ভ্রষ্ট করার কাজটি হচ্ছে রাষ্ট্রীয় খরচে। আর ছাত্রদের পথভ্রষ্ট করার সে প্রকল্পে তাই গুরুত্ব পেয়েছে রবীন্দ্রসঙ্গিত। সে প্রকল্পকে প্রবলতর করার লক্ষ্যে প্রয়োজন পড়েছে একটি বিশাল রবীন্দ বিশ্ববিদ্যালয়ের –হাসিনা যার ভিত্তি প্রস্তর রাখলেন সিরাজগঞ্জে।  পৌত্তলিক চেতনায় বিশ্বের কোথাও উন্নত চরিত্র গড়ে উঠেছে বা উচ্চতর সভ্যতা নির্মিত হয় তার প্রমাণ নাই। সেটি তো আদিম জাহিলিয়াত তথা অজ্ঞতা ও পথভ্রষ্টতার পথ। এমন অজ্ঞতায় মানুষ নিষ্ঠুর হয়, অসভ্য হয় ও অশালীন হয়। এমন জাহিলিয়াতের কারণে ভারতে হিন্দুগণ মৃত স্বামীর চিতায় তার স্ত্রীকেও পুড়িয়ে মেরেছে। সে জাহিলিয়াতের কারণেই জাহেল রবীন্দ্রনাথ সে সতিদাহের প্রশংসায় কবিতা লেখেছেন। একই রূপ অজ্ঞতা ও অসভ্যতার কারণে ঢাকার বুকে রবীন্দ্রভক্তরা প্রকাশ্য রাজপথে নারীর শ্লীলতাহানিতে নামে। ১৪০০ শত বছর আগেই নবীজী ও তার সাহাবাগণ আরবের বুকে এমন একটি জাহেলিয়াতের কবর রচনা করেছিলেন। অথচ তেমন একটি পৌত্তলিক চেতনাকে বাংলাদেশের বাঙালীগণ জাতীয় সঙ্গিত রূপে মাথায় তুলেছে। রবীন্দ্রনাথের সংক্রামক পৌত্তলিক চেতনাটি ছড়ানো হচ্ছে যেমন তাঁর গানকে জাতীয় সঙ্গিত করে,তেমনি তাঁর রচিত গান,নাটক ও সাহিত্যকে জনগণের রাজস্বের অর্থে বিপুল ভাবে প্রচার করে। কোটি কোটি কণ্ঠে রবীন্দ্র সঙ্গিত গেয়ে এবং স্কুল-কলেজে তাঁর সাহিত্য পড়িয়ে যে চারিত্রিক বা নৈতিক বিপ্লব আসে না এবং বাংলাদেশে যে বিগত ৪০ বছরেও আসেনি সেটি কি এখনও প্রমাণিত হয়নি?

মুসলমান হওয়ার প্রকৃত অর্থটি হলো প্রবল এক ঈমানী দায়বদ্ধতা নিয়ে বাঁচা। সে দায়বদ্ধতাটি প্রতি মুহুর্তের। বেঈমান থেকে ঈমানদারের মূল পার্থক্যটি এখানেই। বেঈমান ব্যক্তি মনের খুশিতে যা ইচ্ছা যেমন খেতে বা পান করতে পারে,তেমনি গাইতে, বলতে বা লিখতেও পারে। তার জীবনে কোন নিয়ন্ত্রন নাই।মহান আল্লাহর কাছে তার কোন দায়বদ্ধতার চেতনাও নাই। অথচ মু’মিনের জীবনে নিয়ন্ত্রন সর্বক্ষেত্রে। ঈমানদারকে প্রতিপদে অনুসরণ করতে হয় সিরাতুল মুস্তাকীমকে। ঈমানের প্রথম আলামতটি শুরু হয় জিহ্ববার উপর নিয়ন্ত্রন থেকে। সে নিয়ন্ত্রনটি শুধু কালেমায়ে শাহাদত পাঠে সীমিত নয়। বরং সেটি তাঁর মুখ থেকে উচ্চারিত প্রতিটি কথার উপর। তাই জাহান্নামের বাসিন্দা হওয়ার জন্য মন্দিরে গিয়ে মুর্তিপূজার প্রয়োজন পড়ে না। জ্বিনা,উলঙ্গতা,মদ্যপান বা সূদ-ঘুষে লিপ্ত হওয়ারও প্রয়োজন পড়ে না।বরং জিহ্ববা দিয়ে আল্লাহর অবাধ্যতামূলক কিছু বলা বা পৌত্তলিক চেতনাপূর্ণ কিছু উচ্চারণ করাই সে জন্য যথেষ্ট। তাই মু’মিন ব্যক্তিকে শুধু পানাহার,পোষাকপরিচ্ছদে বা ইবাদতে সতর্ক হলে চলে না, বরং প্রতিটি কথা, প্রতিটি গান, প্রতিটি কবিতা ও প্রতিটি লেখনিতেও সদা সতর্ক থাকতে হয়। কাফের ব্যক্তি নোবেল প্রাইজ পেলেও তার জীবনে সে ঈমানী নিয়ন্ত্রন থাকে না। কারণ বড় কবি হওয়া বা নোবেল প্রাইজ পাওয়ার জন্য সেটি কোন শর্ত নয়। ইমরুল কায়েসে মত জাহেলিয়াত যুগের একজন কাফেরও আরবের অতি বিখ্যাত কবি ছিল। কিন্তু সে ইমরুল কায়েস মুসলমানদের কাছে গুরু রূপে স্বীকৃতি পায়নি। তাই কাফের বক্তি যত প্রতিভাবানই হোক তাঁর গানকে মুসলিম দেশের জাতীয় সঙ্গিত বানানো যায় না। কারণ তাতে সংক্রামিত হয় তার কুফরি চেতনা। অথচ বাংলাদেশে তো সে বিপদটি প্রকট ভাবে ঘটেছে।

জাতীয় সঙ্গিতের অর্থ শুধু ভাব,ভাষা,ছন্দ এবং আবেগের প্রকাশ নয়। বরং এর মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় সংখ্যাগরিষ্ট দেশবাসীর ঈমান-আক্বিদা,আশা-আকাঙ্খা,দর্শন,ভিশন ও মিশন। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন “আমার সোনার বাংলা” গানটি লিখেছিলেন তখন বাংলাদেশ বলে কোন স্বাধীন দেশ ছিল না,বরং বাংলা ছিল ভারতের একটি প্রদেশ। সে প্রদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ মুসলমান হলেও তাদের সংখ্যা আজকের ন্যায় শতকরা ৯২ ভাগ ছিল না।তাছাড়া রবীন্দ্রনাথ নিজেও সে গানটিতে বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আবেগ,দর্শন,চেতনা বা স্বপ্নের প্রকাশ ঘটাতে লেখেনি। সেটি যেমন তার লক্ষ্য ছিল না, ফলে সে লক্ষ্যে তাঁর প্রস্তুতিও ছিল না। পৌত্তলিকগণ সব সময়ই নতুন উপাস্য চায়। যাদের কাছে গরুবাছুড়, শাপশকুনও উপাস্য, তাদের কাছে নবেল বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ তো বিশাল। তাই রবীন্দ্রপূজারি পৌত্তলিকগণ রবীন্দ্রনাথকে পূজনীয় করেছে নিজেদের সে পৌত্তলিক চেতনাকে বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে। মনের সে পৌত্তলিক ক্ষুধা নিবারণেই “আমার সোনার বাংলা” গানকে বাংলাদেশে জাতীয় সঙ্গিতের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। ভারতে সে মর্যাদাটি পেয়েছে বঙ্কিমচন্দ্রের “বন্দেমাতরম” গানটি। সে গান গাইতে ভারতের মুসলমানদের বাধ্য করা হলেও এরূপ পৌত্তলিক গান কেন বাংলাদেশের মুসলমানগণ গাইবে?

 

পৌত্তলিক রবীন্দ্রনাথ ও তার সোনার বাংলা

পারিবারিক সূত্রে রবীন্দ্রনাথ ব্রাহ্ম হলেও কার্যতঃ ছিলেন পৌত্তলিক মুশরিক। এ জগতটাকে একজন মুসলমান যেভাবে দেখে, কোন পৌত্তলিকই সেভাবে দেখে না। উভয়ের ধর্মীয় বিশ্বাস যেমন ভিন্ন, তেমনি চেতনার জগতটাও ভিন্ন। আর কবিতা ও গানে তো সে বিশ্বাসেরই প্রকাশ ঘটে।একজন মুসলমানের কাছে এ পৃথিবীর ভূমি,আলোবাতাস,মাঠঘাট,গাছপালা,ফুল-ফল,নদী-সমুদ্র এবং সেগুলির অপরূপ রূপ –সবকিছুই মহান আল্লাহর আয়াত বা নিদর্শন। এসব নিদর্শন দেখে সে মহান আল্লাহর কুদরত যে কত বিশাল সে ছবকটি পায়। ফলে স্রষ্টার এ অপরূপ সৃষ্টিকূল দেখে মু’মিন ব্যক্তি সেগুলিকে ভগবান বা মা বলে বন্দনা করে না,বরং হামদ ও নাত গায় সেগুলির সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহতায়ালার।অথচ রবীন্দ্রনাথের চোখে বাংলার অপরূপ রূপ ধরা পড়লেও মহান আল্লাহতায়ালার সর্বময় অস্তিত্ব ধরা পড়েনি। এখানেই রবীন্দ্রনাথের অজ্ঞতা ও দৃষ্টির সীমাবদ্ধতা।

 

রবীন্দ্রনাথ তাঁর “আমার সোনার বাংলা” গানটিতে লিখেছেন:

আমার সোনার বাংলা,

আমি তোমায় ভালবাসি।

চিরদিন তোমার আকাশ,

তোমার বাতাস

আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি।

ও মা, ফাগুনে তোর আমের বনে

ঘ্রানে পাগল করে–

মরি হায়, হায় রে

ও মা, অঘ্রানে তোর ভরা খেতে,

আমি কি দেখেছি মধুর হাসি।।

কি শোভা কি ছায়া গো,

কি স্নেহ কি মায়া গো–

কি আঁচল বিছায়েছ

বটের মূলে,

নদীর কূলে কূলে।

মা, তোর মুখের বাণী

আমার কানে লাগে

সুধার মতো–

মরি হায়, হায় রে

মা, তোর বদনখানি মলিন হলে

আমি নয়ন জলে ভাসি।।

রবীন্দ্রনাথের এ গানে প্রচুর ভাব আছে, ভাষা আছে, ছন্দও আছে। কিন্তু এর বাইরেও এমন কিছু আছে যা একজন মুসলমানের ঈমানের সাথে প্রচন্ড সাংঘর্ষিক। এ গানে তিনি বন্দনা গেয়েছেন বাংলার ভূমির,এবং সে ভূমির আলো-বাতাস,নদীর কূল,ধানের ক্ষেত,আমবাগান ও বটমূলের। দেশকে তিনি মা বলেছেন; বিস্তৃত মাঠঘাট,নদীর পাড় ও বটমূলকে সে মা দেবীর আঁচল রূপে দেখেছেন।গানটিতে ধ্বনিত হয়েছে সে মা দেবীর প্রতি নয়ন ভাসানো বন্দনা। কিন্তু যে মহান আল্লাহতায়ালা সেগুলির স্রষ্টা,সমগ্র গানে একটি বারের জন্যও তাঁর বন্দনা দূরে থাক তাঁর নামের উল্লেখ পর্যন্ত নাই।একজন পৌত্তলিকের জন্য এটিই স্বভাবজাত। পৌত্তলিকের এখানেই মূল সমস্যা। এখানে পৌত্তলিকের ভয়ানক অপরাধটি হলো নানা দেবদেবী ও নানা সৃষ্টির নানা রূপ বন্দনার মাঝে মহান আল্লাহতায়ালাকে ভূলে থাকার। মানব জীবনের এটিই সবচেয়ে ঘৃণ্য কর্ম। মহাসত্যময় মহান আল্লাহতায়ালাকে অস্বীকারের এটিই সবচেয়ে জঘণ্যতম শয়তানি কৌশল। এটিই শিরক। এবং এজন্যই সে মুশরিক। মহান আল্লাহর বান্দার বহু বড় বড় গোনাহ মাফ করে দিবেন কিন্তু শিরকের গুনাহ কখনোই মাফ করবেন না। নবীজী (সাঃ) সে হুশিয়ারিটি বহুবার শুনিয়েছেন।

পৌত্তলিক ব্যক্তিটি তার মনে গহীন অন্ধকারের কারণে এ পৃথিবীপৃষ্ঠে অসংখ্য সৃষ্টি দেখতে পেলেও সে সৃষ্টিকূলের মহান স্রষ্টাকে খুঁজে পায় না। রবীন্দ্রনাথও সে সীমাবদ্ধতার উর্দ্ধে উঠতে পারেননি। তাছাড়া গদ্য,পদ্য কবিতা ও গানের মধ্য দিয়ে ব্যক্তির মুখ বা জিহবা কথা বলে না,কথা বলে তার চেতনা বা বিশ্বাস। ফলে সে কবিতা ও গানে ব্যক্তির আক্বিদা বা ধর্মীয় বিশ্বাস ধরা পড়ে। তাই “আমার সোনার বাংলা” গানে যে চেতনাটির প্রকাশ ঘটেছে সেটি পৌত্তলিক রবীন্দ্রনাথের। কোন মুসলমানের নয়। গানে ইসলামী চেতনার প্রকাশের সামর্থ থাকলে তো রবীন্দ্রনাথ মুসলমান হয়ে যেতেন। পৌত্তলিক চেতনা নিয়েই একজন পৌত্তলিক কবি কবিতা ও গান লিখবেন বা সাহিত্যচর্চা করবেন সেটিই তো স্বাভাবিক। এমন একটি চেতনার কারণেই পৌত্তলিক ব্যক্তি শাপ-শকুন,গরু, বানর-হনুমান,নদ-নদী,বৃক্ষ,পাহাড়-পর্বতকে উপাস্য রূপে মেনে নেয় এবং তার বন্দনাও গায়। “আমার সোনার বাংলা” গানের ছত্রে ছত্রে তেমন একটি পৌত্তলিক চেতনারই প্রবল প্রকাশ ঘটেছে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানে তাঁর নিজ চেতনার সাথে আদৌ গাদ্দারি করেননি। কিন্তু ইসলামি চেতনার সাথে এবং সে সাথে মহান আল্লাহতায়ালার সাথে একজন মুসলমানের গাদ্দারি তথা বিশ্বাসঘাতকতা তখনই শুরু হয় যখন পৌত্তলিক চেতনার এ গানকে মনের মাধুরি মিশিয়ে গাওয়া শুরু করে। বাংলাদেশে রবীন্দ্রভক্তদের মূল প্রকল্প হলো বিপুল সংখ্যায় এরূপ গাদ্দার উৎপাদন।এবং সে লক্ষ্য সাধনে তারা যে বিপুল সফলতা পেয়েছে তা নিয়েও কি সন্দেহ আছে? মুসলিম নামধারি এরূপ গাদ্দারদের কারণে আল্লাহর শরিয়তি বিধান আজও পরাজিত। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠের দেশে এটি কি কম অপমানের?

 

সোনার বাংলার প্রেক্ষাপট

“আমার সোনার বাংলা” গানটি রচনার একটি ঐতিহাসিক পেক্ষাপট আছে। গানটি রচিত হয়েছিল ১৯০৫ সালের পর। বাংলা দ্বিখণ্ডিত হয় ১৯০৫ সালে। পশ্চিম বঙ্গের তুলনায় অর্থনীতি ও শিক্ষাদীক্ষায় অতি পশ্চাদপদ ছিল পূর্ব বঙ্গ। পূর্ববঙ্গের সম্পদে দ্রুত শ্রীবৃদ্ধি ঘটেছিল কলকাতার। সে শহরের শতকরা ৮০ ভাগ বাসিন্দাই ছিল হিন্দু। শুধু প্রশাসনই নয়,বাংলার শিক্ষা ও শিল্প গড়ে উঠছিল স্রেফ কলকাতাকে কেন্দ্র করে। মুসলমানদের দাবী ছিল বাংলাকে বিভক্ত করা হোক এবং পূর্ববঙ্গের রাজধানি করা হোক ঢাকাকে। সে দাবীর ভিত্তিতে ভারতের তৎকালীন ভাইস রয় লর্ড কার্জন পূর্ব বঙ্গ ও আসামকে নিয়ে একটি আলাদা প্রদেশ গঠন  করেন। এ নতুন প্রদেশের রাজধানী রূপে গৃহীত হয় ঢাকা নগরী। শহরটি রাতারাতি জেলা শহর থেকে রাজধানী শহরে পরিণত হয়। তখন ঢাকায় কার্জন হলসহ বেশ কিছু নতুন প্রশাসনিক ইমারত এবং হাই কোর্ট ভবন নির্মিত হয়। নির্মিত হয় কিছু প্রশস্ত রাজপথ। নতুন এ প্রদেশটি ছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ। বাংলার এবং সে সাথে আসামের মুসলমানদের মাঝে সৃষ্টি হয় তখন নতুন রাজনৈতিক প্রত্যয়। সে প্রত্যয় নিয়ে ১৯০৬ সালে ঢাকার বুকে গঠিত হয় মুসলিম লীগ যা শুধু বাংলার মুসলমানদের জন্যই নয়, সমগ্র ভারতীয় মুসলমানদের মাঝে সৃষ্টি করে নতুন আত্মবিশ্বাস ও রাজনৈতিক চেতনা। মুসলমানদের এ রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং কলকাতা ছেড়ে ঢাকার এ মর্যাদা-বৃদ্ধি কলকাতার বাঙালী বাবুদের ভাল লাগেনি। কবি রবীন্দ্রনাথেরও ভাল লাগেনি। অথচ বাঙালী মুসলমানগণ সে বিভক্তিকে নিজেদের জন্য কল্যাণকর মনে করে। তারা এটিকে কলকাতাকেন্দ্রীক হিন্দু আধিপত্য থেকে মুক্তি রূপে দেখে। বাংলা বিভক্তির বিরুদ্ধে বর্ণ হিন্দুদের পক্ষ থেকে শুরু হয় সন্ত্রাসী আন্দোলন। সে সন্ত্রাস ছিল উগ্র হিন্দু সাম্প্রদায়িক চেতনায় পরিপুষ্ট। সন্ত্রাসীরা মন্দিরে গিয়ে শপথ নিত। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সে সন্ত্রাসী আন্দোলনের ঘোরতর সমর্থক। সে সন্ত্রাসের পক্ষে প্রয়োজন ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক অস্ত্রের। সে অস্ত্র জোগাতেই রবীন্দ্রনাথ যুদ্ধে নামেন তার কবিতা, গান ও উপন্যাস নিয়ে। এ প্রেক্ষাপটেই রচিত হয় “আমার সোনার বাংলা” গান।

“আমার সোনার বাংলা” গানে যা প্রকাশ পেয়েছে সেটি রবীন্দ্রনাথের একান্তই সাম্প্রদায়িক হিন্দু চেতনার,বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় চেতনা সে গানে স্থান পায়নি। রবীন্দ্রনাথ মুসলমান ছিলেন না। ফলে বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের বিশ্বাস,দর্শন,স্বপ্ন,ভিশন ও মিশনের প্রতিনিধিত্ব করার ইচ্ছা যেমন ছিল না, তেমনি সেগুলির প্রকাশ ঘটানোর সামর্থও তার ছিল না। পূর্ব বাংলা পশ্চাদপদ মুসলমানদের প্রতি অগ্রসর বাঙালী হিন্দুদের কোন দরদ না থাকলেও বাংলার প্রতি তখন তাদের দরদ উপচিয়ে পড়ে। বাংলার মাঠঘাট,আলোবাতাস,জলবায়ু,বৃক্ষরাজী ও ফলমূলের প্রতি আবেগ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ লেখেন এ গান। এ গানের একটি রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল। সেটি স্বাধীনতা ছিল না, বরং ছিল বাংলার বিভক্তির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা। ব্রিটিশদের থেকে স্বাধীনতার বদলে বাঙালী হিন্দুদের রাজনীতির মূল বিষয়টি হয়ে দাঁড়ায় বঙ্গভঙ্গ রদের দাবী।ব্রিটিশ শাসকদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন রবীন্দ্রনাথ।াভ ১৯১১ সালে ব্রিটিশ রাজা পঞ্চম জর্জ ভারত ভ্রমনে আসেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ভারত উপলক্ষে “জনগণ মনোঅধিনায়ক ভারত ভাগ্যবিধাতা” নামে কবিতা লেখেন। সেটিই আজ ভারতের জাতীয় সঙ্গিত। রবীন্দ্রনাথ ও  বাঙালী হিন্দুদের সে দাবী রাজা পঞ্চম জর্জ মেনে নেন এবং আবার বাংলা একীভূত হয়। প্রচণ্ড ক্ষোভ ও হতাশা নেমে আসে পূর্ব বঙ্গের মুসলমানদের মাঝে। বিক্ষুদ্ধ এ মুসলমানদের শান্ত করতে ভারতের ব্রিটিশ সরকার তখন ঢাকাতে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দেয়।কিন্তু সেটিও কলকাতার বাঙালী বাবুদের ভাল লাগেনি। তার মধ্যেও তারা কলকাতার শ্রীহানীর কারণ খুঁজে পায়। ফলে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধেও বাঙালী বাবুগণ তখন বিক্ষোভে রাজপথে নামেন। মিছিলে নেমেছিলেন খোদ রবীন্দ্রনাথও।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা রোধে কলকাতার গড়ের মাঠে অনুষ্ঠিত হয় জনসভা। সে জনসভাতেও সভাপতিত্ব করেন রবীন্দ্রনাথ। এই হলো রবীন্দ্র মানস। সে সাথে বাঙালী হিন্দুর মানস। মুসলিম বিদ্বেষ নিয়ে রচিত রবীন্দ্রনাথের সে গানটিই এখন বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিত।

আজকের শতকরা ৯১ ভাগ মুসলমানের বাংলাদেশ রবীন্দ্রনাথের আমলের অবিভক্ত বাংলা যেমন নয়,তেমনি দেশটি ভারতভূক্তও নয়। রবীন্দ্রনাথের অবিভক্ত বাংলায় মুসলমানদের সংখ্যা শতকরা ৫৫ ভাগের বেশী ছিল না। সে আমলের বাংলা ঢাকাকেন্দ্রীকও ছিল না। এখন এটি এক ভিন্ন চরিত্রের বাংলাদেশ -যে দেশে রবীন্দ্রনাথ একদিনের জন্যও বাস করেননি। কোনদিনও তিনি এদেশের নাগরিক ছিলেন না। এদেশের স্বাধীনতার কথা তিনি যেমন শোনেননি,তেমনি এ দেশের শতকরা ৯২ ভাগ মুসলমানদের নিয়ে তিনি কোন স্বপ্নও দেখেননি। ফলে বাংলাদেশের মানুষের চাওয়া-পাওয়া,স্বাধীনতা বা স্বপ্নের প্রতিনিধিত্ব করা কি তাঁর পক্ষে সম্ভব? সবচেয়ে বড় কথা,এ সঙ্গিতটি সে উদ্দেশ্যে লেখাও হয়নি। জাতীয় সঙ্গিত নির্বাচনের বিষয়টি দোকান থেকে ‘রেডিমেড’ সার্ট কেনার ন্যায় নয়। এটিকে বরং বিশেষ রুচী,বিশেষ আকাঙ্খা,বিশেষ প্রয়োজন মেটাতে অতি বিশেষ গুণের ‘tailor made’ হতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিত নির্বাচনের ক্ষেত্রে সে সতর্কতা অবলম্বন করা হয়নি। বরং এখানে গুরুত্ব পেয়েছে রবীন্দ্রভক্তি ও রবীন্দ্রপূজার মানসিকতা।

 

বাঙালী মুসলিমের আত্মসমর্পণ

আত্মসমর্পণের পর আর এ অধিকার থাকে না,কি খাবে বা কি পান করবে সে সিন্ধান্ত নেয়ার। প্রভু যা খাওয়ায় বা পান করায় সেটিই মেনে নিতে হয়। এমন কি বিষ পান করানো হলেও সেটির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সাহস থাকে না। তখন অধিকার থাকে না জাতীয় সঙ্গিত রূপে কি গাওয়া হবে সে সিদ্ধান্ত নেয়ার। শেখ মুজিব ও তার অনুসারিদের মূল কাজটি হয় সে আত্মসমর্পণে নেতৃত্ব দেয়া। তাদের কারণেই বাঙালী মুসলিম জীবনে নিদারুন আত্মসমর্পণ নেমে আসে ১৯৭১ য়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে অধিকৃত হওয়ার পর। আত্মসমর্পিত ব্যক্তি শুধু স্বাধীনতাই হারায় না, নিজ সম্পদের উপর দখলদারিও হারায়। নিজের কষ্টার্জিত সম্পদও তখন প্রভুর সম্পদে পরিণত হয়। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ফেলে যাওয়া হাজার হাজার কোটি টাকার অস্ত্রও তাই ভারতীয় সম্পদে পরিণত হয়। ভারতের সম্পদের পরিণত হয় বাংলাদেশী কলকারখানার কলকবজাও। ভারতীয় সম্পদে পরিণত হয় বাংলাদেশের নদীর পানি, রাস্তাঘাট ও নদ-নদী।তাই ভারতের আগ্রাসী হাত পড়েছে পদ্ম-তিস্তা-সুরমা-কুশিয়ারের পানির উপর। বাংলাদেশের বুক চিরে এপার-ওপার যাওয়ার করিডোরও ছিনিয়ে এনেছে। পাকিস্তান আমলের ২৩ বছরে ভারত কি সেরূপ অধিকার একদিনের জন্যও পেয়েছে? ১৯৭২য়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তর থেকে ভারত তার সেনাবাহিনীকে তুলে নিলেও হাজার হাজার সশস্ত্র চরও রাজনৈতিক এজেন্টদের তুলে নেয়নি। বরং দেশ এখন সে এজেন্টদেরই জবরদখলে। গণতন্ত্র ও নিরপেক্ষ নির্বাচনকে কবরে পাঠানো হয়েছে মূলত ভারতীয় এজেন্টদের এ জবরদখলকে স্থায়ী রূপ দেয়ার জন্য। ইংরেজগণ তাদের ১৯০ বছরের শাসনের গণদাবীর পরওয়া করেনি। তারা শাসন করেছে খলিফাদের মাধ্যমে;এবং সেটি হাজার হাজার মাইল দূর থেকে। ভারতীয়রাও দিল্লি বসে সেটিই চায়। সে জন্য তারাও আত্মসমর্পিত খলিফা। সে খলিফা প্রতিপালনে চায়,পৌত্তলিক চেতনার চাষাবাদ। সেটি বাড়াতেই প্রয়োজন পড়েছে রবীন্দ্র সঙ্গিত ও রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের। তাছাড়া শত্রু শক্তির কাছে আত্মসমর্পণে কি স্বাধীনতা মেলে? তাই স্বাধীনতা যেমন মুজিব আমলে মেলেনি, হাসিনা আমলেও নয়। একাত্তরের মূল অর্জনটি তো এই আত্মসমর্পণ। ভারতসেবী বাকশালীদের কাজ হয়েছে সে আত্মসমর্পণকে দীর্ঘায়ু দেয়া। কিন্তু সমস্যা হলো, রবীন্দ্রসঙ্গিতের বিষ পানে যাদের মগজ নেশাগ্রস্ত, তারা সে সত্যটি বোঝে?

ইসলামের শত্রুদের কাছে বাঙালী মুসলমানের আত্মসমর্পণের বড় প্রমাণ শুধু এ নয়, ইসলাম বিরোধী শাসনতন্ত্র, সূদী ব্যাংক,পতিতাপল্লি, জুয়া, মদের দোকান,অশ্লিল ছায়াছবি এবং আদালতে কুফরি আইনকে তারা বিনাযুদ্ধে মেনে নিয়েছে। আরো জোরালো প্রমাণ হলো, জাতীয় সঙ্গিত রূপে গেয়ে চলেছে পৌত্তলিক চেতনাপুষ্ট রবীন্দ্রসঙ্গিতকে। এরূপ আত্মসমর্পণে যা বাড়ে তা হলো মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও বেঈমানি।সে বিদ্রোহ ও বেঈমানি তখন ছড়িয়ে পড়ে জীবনের প্রতিক্ষেত্রে।ইসলামের সাথে গাদ্দারিটা তখন শুধু রাজনীতিতে সীমিত থাকে না। সেটি জাহির হয় যেমন আইন-আদালতে কুফরি আইন অনুসরণে, তেমনি পতিতাপল্লি ও সূদী ব্যংক বহাল রাখার মধ্যে।সে বিদ্রোহেরই প্রবল প্রকাশ ঘটে মনের মাধুারি মিশিয়ে পৌত্তলিকতা সমৃদ্ধ গান গাওয়াতে। মুসলিম সংহতির বুকে কুড়াল মারা এবং মুসলিম রাষ্ট্র বিনাশের ন্যায় হারাম কাজটিও তখন উৎসবযোগ্য গণ্য হয়।শেখ মুজিব ও তাঁর অনুসারিদের জীবনে মূল মিশনটি মূলত ভারতের পক্ষে সে যুদ্ধটি লাগাতর চালিয়ে যাওয়া।সেটি স্রেফ ১৯৭১ থেকে নয়, ১৯৪৭ সাল থেকেই্। ইসলামের বিরুদ্ধে তাদের ন্যায় আত্মসমর্পিতদের গাদ্দারি কি কম? ইসলামের নামে দলবদ্ধ হওয়া এবং ইসলামের শরিয়তী আইনের প্রতিষ্ঠার রাজনীতিকে মুজিব সাংবিধানিক ভাবে নিষিদ্ধ করেন। বেছে বেছে বিলুপ্ত করেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মনোগ্রাম ও নাম থেকে কোরআনের আয়াত এবং ইসলাম ও মুসলিম শব্দগুলি।ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রাম থেকে বিলুপ্ত হয় পবিত্র কোরআনের আয়াত। সলিমুল্লাহ মুসলিম হল হয়ে যায় সলিমুল্লাহ হল। জাহিঙ্গরনগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে যায় জাহ্ঙ্গিরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং নজরুল ইসলাম কলেজ হয় নজরুল কলেজ।

 

সাইনবোর্ড পৌত্তলিকতার

নবীজীর আমলেও আরব দেশে বিস্তৃত ভূমি,চন্দ্র-সূর্য্য ও আকাশ-বাতাস ছিল। সে ভূমিতেও মাঠ-ঘাট,ফুল-ফল ও বৃক্ষরাজি ছিল। কিন্তু মহান নবীজী (সাঃ) কি সেগুলিকে কখনো মা বলে সম্বোধন করেছেন? বরং আজীবন হামদ-নাত ও প্রশংসা গীত গেয়েছেন সে সৃষ্টিকূলের মহান স্রষ্টার। আল্লাহর অনুগত বান্দাহ রূপে মুসলমানের বড় দায়িত্ব হলো আল্লাহর নামকে সর্বত্র প্রবল ভাবে প্রকাশ করা বা বড় করা। কোন দেশ, ভূমি, ভাষা বা বর্ণকে যেমন নয়,তেমনি কোন ব্যক্তি বা জীবজন্তুকেও নয়। পৌত্তলিকদের থেকে ঈমানদারের এখানেই বড় পার্থক্য। এ জীবনে হেদায়াতপ্রাপ্তির চেয়ে মহান আল্লাহর বড় নেয়ামত নেই। তেমনি পথভ্রষ্ট হওয়ার চেয়ে বড় ব্যর্থতাও নেই। হেদায়াত প্রাপ্তির শুকরিয়া জানাতে ঈমানদার ব্যক্তি তাই আমৃত্যু আল্লাহর মহিমা প্রকাশ করে। এ জন্য সর্বত্র আল্লাহু আকবর বলে। এবং সেটির নির্দেশ রয়েছে পবিত্র কোরআনে। বলা হয়েছে,“তোমাদের হেদায়েত দান করার দরুন তোমরা আল্লাহর নামে তাকবির বল (অর্থাৎ আল্লাহ যে মহিমাময় সর্বশ্রেষ্ঠ সেটি মুখ দিয়ে প্রকাশ কর), যাতে তোমরা এভাবে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পার।” –(সুরা বাকারা, আয়াত ১৮৫)। তাই “আল্লাহু আকবর” বলে মুসলমান শুধু জায়নামাজে তাকবির দেয় না, রাজপথের মিছিলে বা জনসভাতেও দেয়। রাজনীতি,অর্থনীতি সংস্কৃতি,শিক্ষাদীক্ষা,কবিতা ও গানেও সে “আল্লাহু আকবর” বলে। এটি শুধু তাঁর রাজনৈতিক শ্লোগান নয়, বরং ইবাদত। মুসলমান তাই কোথাও সমবেত হলে “জয় বাংলা” বা “জয় হিন্দ” বলে না বরং সর্বশক্তিতে গগন কাঁপিয়ে “নারায়ে তাকবীর আল্লাহু আকবার” বলে। একজন মুসলমান তো এভাবেই একজন কাফের বা মুনাফিক থেকে ভিন্ন পরিচয় নিয়ে ধর্মকর্ম, রাজনীতি ও সংস্কৃতি চর্চা করে। পৌত্তলিকগণ সেটি পারে না। বাংলাদেশের সেক্যুলার পক্ষের বড় সাফল্য হলো ইসলামের সে বিশুদ্ধ চেতনাকে বহুলাংশে তারা বিলুপ্ত করতে সমর্থ হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের শাসনতন্ত্র, শিক্ষা-সংস্কৃতি, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে প্রতিনিয়ত যে জয়ধ্বণিটি ঘোষিত হয় সেটি মহান আল্লাহর নয়,বরং শয়তানি বিধানের।

ভগবান দাস আর আব্দুল্লাহ –এ দুটি শুধু ভিন্ন নাম নয়, বরং দুটি ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতীক। ব্যক্তির নাম থেকে এভাবেই তার ধর্ম, চেতনা ও বিশ্বাসের পরিচয় জানা যায়। সে পরিচয়টুকু জানার জন্য তাই কোন বাড়তি প্রশ্নের প্রয়োজন পড়ে না। ব্যক্তির নাম তাই আজীবন তার নিজ ধর্ম বা বিশ্বাসের পক্ষে সাইনবোর্ড রূপে কাজ করে। তেমনি জাতির জীবনে সাইন বোর্ড হলো জাতীয় সঙ্গিত। জাতীয় সঙ্গিত থেকেই পরিচয় মেলে জাতির ধর্মীয় বিশ্বাস ও চেতনার। তাই নাস্তিকের ও আস্তিকের ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবন যেমন এক হয় না, তেমনি এক হয় না জাতীয় সঙ্গিতও। বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিত থেকে দেশবাসীর যে পরিচয়টি মেলে সেটি কি কোন তৌহিদী মুসলিমের? সে পরিচয়টি রবীন্দ্রনাথের ন্যায় নিষ্ঠাবান পৌত্তলিকের।তাছাড়া এ গানটি জাতীয় সঙ্গিত রূপে নির্বাচনের একটি ইতিহাস আছে। সেটি গৃহীত হয়েছিল পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ সৃষ্টির পর। যারা এ সঙ্গিতটিকে গ্রহণ করেছিল তারা ছিল বাঙালী জাতিয়তাবাদী সেক্যুলার। তাদের চেতনায় ও রাজনীতিতে ইসলামের কোন প্রভাব ছিল না। বরং তারা ইতিহাসে পরিচিতি পেয়েছে ভারতপ্রীতি, রবীন্দ্রপ্রীতি,এবং ইসলামি চেতনা নির্মূলে আপোষহীনতার কারণে। লগি বৈঠা দিয়ে ইসলামপন্থিদের হত্যা,তাদের বিরুদ্ধে  মিথ্যা মামলা এনে ফাঁসিতে ঝুলানো এবং হত্যার পর তাদের লাশ ময়লার গাড়িতে তুলে গায়েব করাই তাদের রাজনীতি। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতিও শ্রদ্ধা দেখানো তাদের রীতি নয়। সেরূপ শ্রদ্ধাবোধ ছিল না মুজিবেরও। মুজিব যে শুধু রাজনীতিতে স্বৈরাচারি ছিলেন তা নয়,প্রচণ্ড স্বৈরাচারি ছিলেন বুদ্ধিবৃত্তি ও সংস্কৃতির অঙ্গণেও। দেশের উপর তিনি শুধু একদলীয় বাকশালই চাপিয়ে দেননি, চাপিয়েছেন সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ধর্মীয় বিশ্বাসকে উপেক্ষা করে পৌত্তলিক সংস্কৃতির আগ্রাসন। জাতীয় সঙ্গিত রূপে রবীন্দ্রনাথের “আমার সোনার বাংলা” গানটিকে চাপানো হয়েছে তেমন এক স্বৈরাচারি মানসিকতা থেকে। এক্ষেত্রে ভারতীয় বর্ণ হিন্দুদের থেকে তার চেতনাটি আদৌ ভিন্নতর ছিল না।

 

আকুতি নিষ্ঠবান পৌত্তলিকের

প্রতিটি দেশের শুধু রাজনৈতিক,ভৌগলিক ও ভাষাগত পরিচয়ই থাকে না, থাকে সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিচয়ও। জনগণের চেতনায় যেমন সুনির্দ্দিষ্ট দর্শন থাকে, তেমনি সে দর্শনের আলোকে রাজনৈতিক স্বপ্নও থাকে। সে স্বপ্ন নিয়ে বেড়ে উঠায় জনগণের কাঁধে গুরুতর দায়বদ্ধতাও থাকে। সে বিচারে প্রতিটি দেশই অনন্য। সে অনন্য বৈশিষ্ঠের কারণেই আজকের বাংলাদেশ পশ্চিম বাংলা থেকে ভিন্ন। সে ভিন্নতার কারণেই পশ্চিম বাংলার ন্যায় বাংলাদেশ ভারতের অংশ নয়। পশ্চিম বাংলার সাথে বাংলাদেশের পার্থক্যটি ভূমি,জলবায়ু বা আলোবাতাসের নয়,সেটি দর্শন এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের ভিশন ও মিশনের। পার্থক্যটি ভিন্ন স্বপ্ন নিয়ে বাঁচার। সে ভিন্ন স্বপ্নের কারণেই ১৯৪৭য়ে পশ্চিম বাংলার হিন্দুগণ যখন ভারতে যোগ দেয় তখন পূর্ব বাংলার মুসলমানগণ অতি সচেতন ভাবেই বাঙালী হিন্দুদের সাথে প্রতিবেশী ভারতে যায়নি। গিয়েছে পাকিস্তানে। সাতচল্লিশের সে ভাবনার সাথে পূর্ব বাংলার ৯৬% ভাগ মুসলমানের সমর্থণ ছিল। ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় হোক শেখ মুজিবও সেদিন সে ভাবনার সাথে একাত্ম হয়েছিলেন। প্রতিবেশী বাঙালী হিন্দুদের সাথে না গিয়ে তারা তখন ১২০০ মাইল দূরের অবাঙালী পশ্চিম পাকিস্তানীদের সাথে গেছে। আজও  সেটি ঐতিহাসিক সত্য।

 

প্রতিবেশী হিন্দুদের থেকে বাঙালী মুসলমানদের যে ভিন্নতর পরিচয় ও স্বপ্ন ছিল সেটি ইতিহাসের কোন গোপন বিষয় নয়। বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিত রচিত হতে হবে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সে বিশিষ্ঠ পরিচয় ও স্বপ্নগুলো তুলে ধরতে এবং প্রবলতর করতে। এমন সঙ্গিতের প্রতিটি শব্দ ও প্রতিটি উচ্চারণ থেকে প্রতিটি নাগরিক তখন পাবে নতুন প্রত্যয় ও নতুন প্রেরণা। পাবে স্বপ্নের সে পথটিতে অবিরাম টিকে থাকার মানসিক বল। কিন্তু জাতীয় সঙ্গিতের নির্বাচনে বাংলাদেশের মুসলমানদের সে ভিন্নতর পরিচয়কে মেনে নেয়া হয়নি। এ সঙ্গিতে যে সুর, যে দর্শন,যে বর্ণনা এবং যে আকুতি ধ্বণিত হয়েছে সেটি কোন মুসলমানের নয়, সেটি নিতান্তই একজন নিষ্ঠবান পৌত্তলিকের। এমন সঙ্গিত থেকে কোন মুসলিমই অনুপ্রেরণা পেতে পারে না, বরং পায় পথভ্রষ্টতা। পায় শিরকের ছবক। পায় জাহান্নামের পথ। যে ভ্রষ্টতার কারণে পৌত্তলিক মানুষটি বিষধর সাপকেও দেবতা রূপে গ্রহণ করার অনুপ্রেরণা পায়, এ সঙ্গিত পাঠকারি বাংলাদেশীও তেমনি উৎসাহ পায় ভারতের ন্যায় একটি শত্রুদেশকে বন্ধু রূপে গ্রহণ করার।হিন্দুস্থান চায়,বাংলাদেশের ১৯৪৭য়ের পরিচয়টি বিলুপ্ত হোক। চায় নির্মিত হোক ইসলামচ্যুত এক নতুন প্রজন্ম নিয়ে এক নতুন বাংলাদেশ। সে নতুন বাংলাদেশের ভারতভূক্তিটা হলো তাদের আসল উদ্দেশ্য। বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের রাজনীতি বুঝতে হলে ভারতের এ অভিপ্রায়কে অবশ্যই বুঝতে হবে। ইসলামি চেতনা প্রবলতর হয় এমন কোন গানকে ভারত ও তার চাকর-বাকরেরা এজন্যই জাতীয় সঙ্গিত করতে দেয়নি।

 

অধিকৃতি ভারতের

ভারতের আগ্রাসী নীতিটি শুধু অধিকৃত কাশ্মির, হায়দারাবাদ,গোয়া,মানভাদড় বা সিকিমের ক্ষেত্রে নয়,বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও। কাশ্মিরে ভারত যে ৬ লাখ সৈন্যের বিশাল বাহিনী মোতায়েন করেছে সেটি সেখানে গণতন্ত্র বা অর্থনীতি বাড়াতে নয়। বরং ভারতের অধিকৃতি নিশ্চিত করতে। ভারত একাত্তরে বাংলাদেশে যে বিশাল সামরিক বাহিনী নিয়োজিত করেছিল এবং আজ ও যেরূপ লক্ষ লক্ষ এজেন্ট মোতায়েন করে রেখেছে সেটিও কি বাংলাদেশের রাজনৈতিক,সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ময়দানে বাংলাদেশে স্বাধীনতা বা গণতন্ত্র বাড়াতে? কাশ্মিরে ভারতের বিপদটি হলো,কাশ্মিরীদের মধ্য থেকে এতটা সেবাদাস এজেন্ট পায়নি যতটা পেয়েছে বাংলাদেশে। ফলে এক কোটি মানুষের কাশ্মির দখলে রাখতে হাজার হাজার কোটি রুপি ব্যয়ে পাঞ্জাব,রাজস্থান,বিহার,গুজরাত,মহারাষ্ট্র,উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশসহ ভারতের অন্যান্য প্রদেশ থেকে ৬ লাখ সৈন্য সংগ্রহ করতে হয়েছে। সে ৬ লাখ সৈন্যের পানাহার, চলাচল ও লজিস্টিকের পিছনে প্রতি বছর বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে বহু হাজার কোটি রুপি। অথচ সাড়ে সাত কোটি মানুষের পূর্ব পাকিস্তানে এমনকি একাত্তরের যুদ্ধকালেও ৬০ হাজার পাকিস্তানী সৈন্য ছিল না। কাশ্মিরে এক লাখ ভারতীয় সৈন্য পালতে যত অর্থ ব্যয় হয় তা দিয়ে বাংলাদেশে অন্ততঃ দশ লাখ দালাল পালা সম্ভব। এজন্যই বাংলাদেশের রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি,মিডিয়া,প্রশাসন,সেনাবাহিনী,পুলিশ বাহিনী,শিক্ষাঙ্গণ,সংস্কৃতি ও আদালত প্রাঙ্গণে ভারতীয় দাসদের এত ছড়াছড়ি। বাংলাদেশের মাটি এক্ষেত্রে অতি উর্বর। সে উর্বরতা বাড়িয়েছে বাঙালী জাতীয়তাবাদী সেকুলারিস্টগণ। ভারতের দাস হওয়াতেই তাদের গর্ব। বাংলাদেশে বাকশালী দাসদের কারণে ভারত অতি অল্প খরচে ১৬ কোটি মানুষের বাংলাদেশকে দখলে রাখতে পেরেছে। ফলে বাংলাদেশের বুক চিরে করিডোর নিতে বা দেশের সমূদ্রবন্দর ও নদীবন্দরের উপর দখল নিতে ভারতকে একটি তীরও ছুড়তে হয়নি।

 

রবীন্দ্রসঙ্গিতের রাজনৈতিক এজেন্ডা

জাতীয় সঙ্গীত কোন সাধারণ গান নয়।এর একটি সাংস্কৃতিক,রাজনৈতিক ও দর্শনগত এজেন্ডা থাকে। তাতে দেশবাসীর মিশন ও ভিশনের ঘোষণাও থাকে। তেমন একটি এজেন্ডা নিয়েই কবি রবীন্দ্রনাথ এ গানটি রচনা করেছিলেন। সেটি অখন্ড বাংলার উপর হিন্দু দর্শন, হিন্দু সংস্কৃতি ও হিন্দু রাজনীতির দখলদারি। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের আশ্রয় ও প্রশ্রয়ে তাদের সে দখলদারি বেড়েছিলও প্রচুর। কিন্তু সে দখলদারি নির্মূলের সম্ভাবনা বাড়ে ১৯৪৭ সালে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলা পাকিস্তানে যোগ দিবে –সে সম্ভাবনা তখন বৃদ্ধি পায়। সমগ্র অখন্ড বাংলা পাকিস্তানে যোগ দিবে -সেটি তাদের কাছে ছিল অসহনীয়। ফলে হিন্দুদের রাজনৈতিক এজেন্ডাই তখন পাল্টে যায়। অখন্ড বাংলার বদলে তখন শুরু হয় বঙ্গভঙ্গের দাবী। ফলে বাঙালী হিন্দুগণ ১৯৪৭ সালে রবীন্দ্রনাথের “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভাল বাসি” গানটি আর গায়নি। কিন্তু ১৯৭১য়ের পাকিস্তান ভেঙ্গে যাওয়ার পর তাদের এজেন্ডা আবার পাল্টে যায়। ভারতীয় হিন্দুদের রাজনীতিতে আবার ফিরে এসেছে “অখন্ড বাংলা”র গড়ার প্রকল্প। কারণ অখন্ড বাংলা গড়লে সে বাংলার পক্ষে এখন আর পাকিস্তানে যোগ দেয়ার সুযোগ নাই। বরং সম্ভাবনা বেড়েছে পশ্চিম বাংলার সাথে যুক্ত হয়ে ভারত ভুক্ত হওয়ার। তাতে ভারত পাবে বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের উপর সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ। তাতে বাড়বে ভারতের সামরিক ও সামরিক শক্তি। এ সুযোগটি পেতে অতীতে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশগণ পৃথিবীর অন্যপ্রান্ত থেকে বাংলার বুকে এসে যুদ্ধ করেছে। তাই এতো কাছে থেকে ভারত সে সুযোগ ছাড়ে কেমনে?‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌ তবে সে জন্য শর্ত হলো,বাংলাদেশীদের চেতনার মানচিত্রে পরিবর্তন। চেতনাগত পবিবর্তনের লক্ষ্যেই পুণরায় প্রয়োজন পড়েছে অবিভক্ত বাংলার পক্ষে আবেগ সৃষ্টির। ফলে কদর বেড়েছে রবীন্দ্রনাথের “সোনার বাংলা” গানের। চেতনার সে উপযোগী ক্ষেত্র নির্মাণের লক্ষ্যেই ১৯৭১য়ের পর থেকে আবার শুরু হয়েছে বাংলাদেশের স্কুল-কলেজসহ সকল প্রতিষ্ঠান ও মিডিয়ায় “আমার সোনার বাংলা গান” গাওয়া। সে সাথে জোরে শোরে শুরু হয়েছে বাঙালী মুসলমানদের ইসলাম থেকে দূরে সরানোর নানা রূপ প্রকল্প।

 

কোন যুদ্ধই স্রেফ সামরিক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রকান্ড যুদ্ধ চলে বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানেও। ১৯৭১য়ের সামরিক যুদ্ধটি শেষ হয়েছে, কিন্তু তীব্র ভাবে এখনো চলছে বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধ। ভারতয় হামলার লক্ষ্য শুধু পাকিস্তান ভাঙ্গা ছিল না। তারা তো চায় অখন্ড ভারত নির্মাণ। পাকিস্তান ভাঙ্গার মধ্য দিয়ে ভারত এক ধাপ এগিয়েছে,কিন্তু মূল লক্ষ্য এখনো অর্জিত হয়নি। ভারতের বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধের লক্ষ্য,বাঙালী মুসলিমের আদর্শিক ভূবনে পরিবর্তন আনা।কারণ,পূর্ব বাংলার মুসলমানগণ ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান ভূক্ত হয় পশ্চিম পাকিস্তানীদের সাথে ভাষা, বর্ণ বা আঞ্চলিক বন্ধনের কারণে নয়।সেটি সম্ভব হয়েছিল প্যান-ইসলামি মুসলিম ভাতৃত্বের কারণে। ইসলাম এজন্যই ভারতীয় আদর্শিক যুদ্ধের মূল টার্গেট।১৯৭১য়ে সামরিক বিজয়ের পর ইসলামি চেতনা বিনাশের ভারতীয় প্রজেক্ট বহুদূর এগিয়ে গেছে। ১৯৪৭য়ে শতকরা ৯৬ ভাগ বাঙালী মুসলিম পাকিস্তানে যোগ দেয়ার পক্ষে ছিল। অথচ চিত্রটি এখন ভিন্ন। মনের মাধুরি মিশিয়ে যারা রবীন্দ্রনাথের “আমার সোনার বাংলা” গায় তাদের অনেকেই ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টিকে অনাসৃষ্টি মনে করে। তাদের সামনে ১৯৪৭ এলে তারা পাকিস্তানে যোগ দেয়ার পক্ষে ভোট দিত না। ভারত তাই বিজয়ী হচ্ছে বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধেও। নতুন প্রজন্ম ভূলে গেছে ১৯৪৭-পূর্ব বাঙালী মুসলমানদের দুরাবস্থার কথা। তখন বাংলার শহরে ও গ্রামে শতকরা ৯৫ ভাগ দালানকোঠা ও ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠানের মালিক ছিল হিন্দুরা। শহর এলাকার শতকরা ৮৫ ভাগের বেশী জমিজমার মালিক ছিল তারা। সরকারি চাকুরীতে মুসলমানদের সংখ্যা শতকরা ৫ ভাগও ছিল না। ভারতের মুসলমানগণ এখনো সে একই অবস্থায় রয়ে গেছে। অথচ পাকিস্তান সৃষ্টির পর তাদের ভাগ্যই পাল্টে যায়। ১৯৪৭য়ের পর একমাত্র ঢাকা শহরে যত মুসলিম ডাক্তার, ইঞ্জিনীয়ার, শিক্ষক, উকিল, বিজ্ঞানী ও শিল্পপতি গড়ে উঠেছে তা ভারতের প্রায় ২০ কোটি মুসলমানের মাঝেও সৃষ্টি হয়নি। করাচী, লাহোর, ইসলামাবাদ, পেশাওয়ার, কোয়েটার ন্যায় শহরগুলোতে মুসলমানদের হাতে যে পরিমাণ সম্পদ জমা হয়েছে এবং যতজন মুসলিম ডাক্তার, ইঞ্জিনীয়ার, শিক্ষক, উকিল, বিজ্ঞানী ও শিল্পপতি গড়ে উঠেছে সেটি কি ভারতীয় মুসলমানগণ কি কল্পনা করতে পারে? পাকিস্তান আজ ভারতের সমকক্ষ আনবিক শক্তিধারি একটি দেশ। অথচ ভারতীয় মুসলমানদের সংখ্যা পাকিস্তানের জনসংখ্যার চেয়ে অধীক। তবে মগজ ধোলাইয়ের পর বিস্ময়কর মোজেজাও আর কাজ দেয় না। ফিরাউনের প্রজাগণ তাই মূসা (আঃ) এর মোজেজা দেখেও ফিরাউনের দাসত্ব ছেড়ে ইসলাম কবুল করেনি। একই রূপ অবস্থা বাংলাদেশে মুজিব অনুসারিদের। তারা ইতিহাসের সত্য বিষয়গুলোও মানতে রাজী নয়। এরূপ বিবেকশূণ্য সেবাদাসদের আবাদ বাড়াতে ভারত বাংলাদেশে যে উর্বরতা পেয়েছে সেটি তারা অধিকৃত কাশ্মিরে কোন কালেই পায়নি। কারণ, বাংলার তুলনায় কাশ্মিরে রয়েছে প্রবল ইসলামী চেতনা। সে চেতনার কারণে সেখানে গড়ে উঠেছে ভারত বিরোধী বিদ্রোহ। ফলে বাংলাদেশের উপর দিয়ে ভারত যত সহজে যোগাযোগের নিরাপদ করিডোর পায়,কাশ্মিরে ৬ লাখ সৈন্য মোতায়েন করেও সে সুযোগ পায়নি। নিরাপত্তা পাচ্ছে না কাশ্মিরের কোন শহরে বা গ্রামে। অথচ ভারতীয় সীমান্তরক্ষির হাতে বাংলাদেশীরা অহরহ লাশ হলেও বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতীয়দের সে বিপদ নাই। বিপুল সংখ্যক সেক্যুলারিস্টদের চেতনা-রাজ্য ইতিমধ্যেই অখন্ড ভারতের চেতনা দ্বারা অধিকৃত। এরূপ অবস্থা আরো কিছুকাল চলতে থাকলে বাংলাদেশের ভারতভূক্তির জন্য ভারতকে একটি গুলিও ছুড়তে হবে না। ভারত তো সেটিই চায়।

 

আত্মসমর্পণে কি আখেরাত বাঁচবে?

বাঙালী মুসলিমের চেতনা রাজ্যে ভারতীয় দখলাদারিকে স্থায়ী রূপ দেয়ার দায়িত্ব নিয়েছে সেক্যুলার বাঙালী বুদ্ধিজীবীগণ।এরা হচ্ছে ভারতের পক্ষে খাঁচার ঘুঘু।এদের কাজ,অন্যদেরও খাঁচায় বন্দী হতে আহবান করা। এরূপ ভারতসেবী সাংস্কৃতিক সৈন্য গড়ে তোলার কাজে ভারতের বিনিয়োগটি ১৯৪৭ সাল থেকেই। ১৯৭১য়ে বাংলাদেশ সৃষ্টির পর ভারতের সে খরচটি বিপুল ভাবে কমেছে। ইসলাম থেকে দূরে সরানোর কাজে এখন ব্যয় হচ্ছে বাংলাদেশী মুসলিমের নিজস্ব রাজস্বের পুঁজি। ভারতের বর্তমান স্ট্রাটেজী হলো,একাত্তরে অর্জিত অধিকৃতিকে যে কোন ভাবেই হোক লাগাতর ধরে রাখা। বাংলাদেশের উপর ভারতের দখলদারিটি শুধু সামরিক, রাজনৈতিক বা অর্থনতিক নয়,বরং সাংস্কৃতিক। সে সাংস্কৃতিক অধিকৃতিরই প্রতীক হলো জাতীয় সঙ্গিত রূপে চাপিয়ে দেয়া পৌত্তলিক রবীন্দ্রনাথের গান। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন অখণ্ড হিন্দু ভারতের ধ্বজাধারি। সে অখণ্ড হিন্দু ভারতের চেতনা থেকেই ভারত থেকে মুসলিম নির্মূলের প্রবক্তা মারাঠী শিবাজীকে তিনি জাতীয় বীরের মর্যাদা দিয়েছেন। শিবাজীকে বন্দনা করে তিনি কবিতাও লিখেছেন। এখন সে রবীন্দ্রনাথকে ভারত ব্যবহার করছে বাংলাদেশের উপর সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য স্থাপনের যোগসূত্র রূপে। এজন্যই বাংলাদেশে রবীন্দ্রচর্চা ও রবীন্দ্রঅর্চনা বাড়াতে ভারত সরকার ও আওয়ামী লীগ সরকারের এত বিনিয়োগ। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের রাজস্বের অর্থে বাংলা এ্যাকাডেমীর কাজ হয়েছে প্রতিবছর পৌত্তলিক রবীন্দ্রনাথের উপর শত শত বই প্রকাশ করা। অথচ ইসলামের মহান নবীজী(সাঃ)এবং মানব-ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মানুষটির উপর কি এর দশ ভাগের এক ভাগ বই ছাপানোরও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে?

জনগণের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকারের সবচেয়ে বড় অপরাধটি রাজনৈতিক,প্রশাসনিক বা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নয়। সেটি ঘটভে চেতনা বা বুদ্ধিবৃত্তির অঙ্গণে।অপরাধটি এখানে জনগণকে জাহান্নামের আগুণে পৌছানোর। অথচ সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্বটি রাস্তাঘাট,ব্রিজ,কলকারখানা বা হাসপাতাল গড়া নয়,বরং জাহান্নামের আগুণ থেকে নাগরিকদের বাঁচানো। এবং সেটি সম্ভব জান্নাতের পথ তথা সিরাতুল মুস্তাকীমটি চিনতে এবং সে পথে পথচলায় লাগাতর সহয়তা দেয়ার মধ্য দিয়ে।ইসলামে এটি এক বিশাল ইবাদত এবং প্রতিটি শাসকের উপর এটি এক বিশাল দায়ভার।এ দায়িত্ব পালনের কাজটি সঠিক হলে মহান আল্লাহর দরবারে সে শাসক মহামর্যাদায় ভূষিত হন। এবং কিভাবে পালন করতে হয় খোদ নবীজী (সাঃ) দেশ শাসনের সে গুরু দায়ভার নিজ কাঁধে নিয়ে শিখিয়ে গেছেন।শাসকদের জন্য আজও  মহান নবীজী (সাঃ)র মহান সূন্নত।দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছেন খোলাফায়ে রাশেদার ন্যায় মহান সাহাবায়ে কেরামগণ। কিন্তু বাংলাদেশে সে দায়ভার পালিত। কারণ, শাসকের সে পবিত্র পদটি অধিকৃত হয়েছে ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে। এরা আবির্ভুত হয়েছে স্বার্থশিকারি চোর-ডাকাত রূপে। ক্ষমতালোভী এ সেক্যুলারিস্টদের মূল মিশনটি হলো,কোরআনে প্রদর্শিত সিরাতুল মুস্তাকীমকেই জনগণের দৃশ্যপট থেকে বিলুপ্ত করা এবং জাহান্নামে পৌঁছাটি সহজতর করা।সে লক্ষেই তাদের সেক্যুলার রাজনীতি ও শিক্ষানীতি। সে লক্ষ্যেই নৃত্য-গীত, মদ-জুয়া ও পতিতাপল্লির সংস্কৃতি। সে লক্ষ্যেই দেশ জুড়ে গড়া হচ্ছে শত শত নাট্যশালা ও সিনেমা হল।সে অভিন্ন লক্ষ্যেই এক পৌত্তলিকের রচিত সঙ্গিতকে জাতীয় সঙ্গিত রূপে গাইতে বা শুনতে জনগণকে বাধ্য করা হচ্ছে।এভাবে অধিকৃত হয়ে আছে জনগণের মনের ভূবন। জনগণের অধিকৃত সে মন বাধ্য হচ্ছে মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণ থেকে দূরে থাকতে।

অথচ মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণ থেকে দূরে থাকার বিপদটি তো ভয়াবহ। তখন সে ব্যক্তির উপর তার নিজের নিয়ন্ত্রণ থাকে না। তার সঙ্গিরূপে তখন নিয়োগ দেয়া হয় অভিশপ্ত শয়তানের। সে ঘোষণাটি এসেছে পবিত্র কোরআনে। বলা হয়েছে, “যে কেউ রহমানের স্মরণ থেকে দূরে সরবে তার উপর নিয়োগ দেয়া হবে শয়তানের, সে তার সঙ্গি হবে।” –(সুরা জুখরুফ আয়াত ৩৬)।ফলে রবীন্দ্র সঙ্গিত গাওয়ার অর্থ শুধু গান গাওয়া নয়।এর অর্থ,দেশবন্দনার মাঝে মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণ থেকে ভূলে থাকা। ফলে তার পরিণতিটি ভয়াবহ। এখানে মহাবিপদটি সঙ্গি রূপে শয়তানকে নিজ ঘাড়ে বসিয়ে নেয়ার। জনগণের কাঁধে শয়তান বসিয়ে দেয়ার সে ভয়ানক পাপের কাজটিই করছে বাংলাদেশের সরকার। সরকারের নীতির কারণেই দিন দিন শয়তানের অধিকৃতি বাড়ছে দেশবাসীর মনের ভূবনে। আর তাতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গণই শুধু নয়, জনগণের চেতনার মানচিত্রও অধিকৃত হয়ে যাচ্ছে পৌত্তলিক হিন্দুদের হাতে।এভাবে জাতীয় সঙ্গিত পরিনত হয়েছে জনগণের ঈমান ধ্বংস ও জাহান্নামে পৌছানোর নীরব হাতিয়ারে। প্রশ্ন হলো,এ অব্স্থায় কি আত্মসমর্পণ চলে? তাতে কি পরকাল বাঁচে? ১০/০৫/২০১৫

 




শত্রুশক্তির যুদ্ধ ও ইসলাম বিনাশী নাশকতা

শেষ হয়নি যুদ্ধ

বাংলার বুকে ইসলামের শত্রুশক্তির যুদ্ধ শেষ হয়নি। বরং দিন দিন  তীব্রতর হচ্ছে। যুদ্ধটির শুরু আজ নয়; সূচনা ১৭৫৭ সালে। নবাব সিরাজুদ্দৌলার বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী কাফের শক্তির গোলাবারুদের যুদ্ধ পলাশীতে শেষ হলেও শেষ হয়নি ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে তাদের মূল যুদ্ধটি। সে যুদ্ধটি বরং লাগাতর চলছে দেশের আদর্শিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক অঙ্গণে। দেশের আইন-আদালত থেকে সাম্রাজ্যবাদি শত্রুশক্তি যেরূপ ইসলামের শরিয়তি বিধানকে বিলুপ্ত করেছিল এবং অসম্ভব রেখেছিল মুসলিম শক্তির উত্থানকে, আজও সেটিই তাদের মূল এজেন্ডা। তাই ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশের ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান হলেও আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক সে যুদ্ধটি এখনো শেষ হয়নি। শুধু বাংলাদেশে নয়, সমগ্র মুসলিম বিশ্বজুড়ে সেটিই ইসলামের শত্রুপক্ষের মূল যুদ্ধ। এ যুদ্ধে তাদের শত্রুর নিষ্ঠাবান দাস সৈনিক রূপে খাটছে ব্রিটিশ প্রনীত সেক্যুলার শিক্ষা ব্যবস্থায় গড়ে উঠা রাজনৈতিক, সামরিক, প্রশাসনিক ও বিচার বিভাগীয় বিশাল কর্মীবাহিনী। রাজনৈতিক শক্তি রূপে মুসলিমদের উত্থানকে ইংরেজগণ যেরূপ তাদের ১৯০ বছরের শাসনামলে রুখেছিল এবং দূরে রেখেছিল ইসলামের শরিয়তি বিধানকে – ইসলামের সেরূপ একটি পরাজিত অবস্থা বলবৎ রাখাই তাদের উপর শত্রুপক্ষের পক্ষ থেকে অর্পিত মূল দায়ভার। এ কারণেই পাশ্চাত্যের কাফেরদের ন্যায় তারাও সর্বভাবে ইসলামের বিজয়কে রুখতে চায়। দেশের সেনানীবাস, সিভিল প্রশাসন, জুডিশীয়ারী, অফিসার্স ক্লাব ও মন্ত্রীপাড়ার ন্যায় গুরুত্বপূ্র্ণ স্থানগুলি আজও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির সুরক্ষিত দ্বীপ। সে সাথে প্রশিক্ষণ ক্ষেত্রও। সেসব অধিকৃত সামরিক ও প্রশাসনিক ঘাঁটিতে বাংলার সাধারণ জনগণের মুসলিম রীতি-নীতি ও সংস্কৃতি দেখতে পাওয়া যায় না। কারো কারো জীবনে নামাজ-রোযা থাকলেও সেখানে প্রবেশ নিষিদ্ধ নবীর যুগের ইসলামের -যাতে রয়েছে শরিয়ত, খেলাফত, জিহাদ এবং ভাষা ও বর্ণের নামে গড়ে উঠা দেয়াল ভাঙ্গার বিধান। ইংরেজদের প্রস্থানের বহুবছর পরও তাই বাংলার মুসলিম ভূমিতে আজও বহাল তবিয়তে বেচেঁ আছে তাদের প্রতিষ্ঠিত দেহব্যবসা, জুয়া, সূদী ব্যাংকের ন্যায় নানারূপ হারাম কর্ম। রাজনীতি, সংস্কৃতি ও জীবনযাপনের নানা ক্ষেত্রে মহান আল্লাহতায়ালা ও আখেরাতের ভয়কে ভূলিয়ে দেয়াই ইসলামবিরোধী এ দখলদার দেশী শক্তির মূল কাজ। ফলে শতকরা ৯২ ভাগ মুসলিমের দেশে মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশিত শরিয়তি বিধানকে পরাজিত রাখতে ও ইসলামপন্থিরদের হত্যায় বিদেশী কাফের শক্তিকে ময়দানে নামতে হয় না। সে কাজটি নিষ্ঠুরতার সাথে সমাধা করে পাশ্চত্য-পূজারী বাঙালীগণ। ঢাকার শাপলা চত্ত্বরের গণহত্যার ন্যায় নিষ্ঠুর গণহত্যাগুলিতেও তাই কোন বিদেশী কাফেরকে  নামতে হয়নি। একাত্তরের গণহত্যাও ছিল দিল্লি, মস্কো, চীন ও পাশ্চাত্যের অনুসারি ইসলামের শত্রুপক্ষের নিজস্ব কাণ্ড –যাদের হাতে মারা গিয়েছিল অগণিত বাঙালী ও অবাঙালী মুসলমি।

কোন মুসলিম ভূমিতে কাফের শক্তির বিজয়ের নাশকতাটি এমনিতেই বিশাল। কিন্তু সে অধিকৃতি যদি ১৯০ বছরের হয় তবে সে নাশকতাটি ভয়ংকর রূপ নেয়। বাঙালী মুসলিমের জীবনে ক্ষতির সে অংকটি তাই বিশাল। এ কারণেই নবীজী (সাঃ)র যুগের কোরআনী ইসলাম থেকে বাঙালী মুসলিমদের অবস্থানটি বহু দূরে। নবীজী (সাঃ)র ইসলামে কাফের শক্তির অধিকৃতির বিরুদ্ধে জিহাদ ছিল, শরিয়তের পূর্ণ প্রতিষ্ঠা ছিল এবং নানা বর্ণ ও নানা ভাষার মুসলিমদের মাঝে সীসাঢালা প্রাচীরসম এসকতা ছিল। কিন্তু বাংলাদেশে সে ইসলামের প্রতিষ্ঠা চিহ্নিত হয় সন্ত্রাস বা জঙ্গিবাদ রূপে। নবীজী(সাঃ)র প্রবর্তিত সে কোরআনী ইসলামের তারা নির্মূল চায়। তাদের ইচ্ছা, মুসলিম বেঁচে থাক নবীজী (সাঃ)র ইসলামকে বাদ দিয়ে। এবং গ্রহণ করুক জাতীয়তাবাদ, বর্ণবাদ, ফেরকাবাদ, স্বৈরাচার ও সেক্যুলারিজমের ন্যায়  নানারূপ পথভ্রষ্টতা। ইসলামের যে বিকৃত রূপকে তারা মেনে নিতে বলছে তাতে রয়েছে শরিয়তের বদলে ব্রিটিশদের প্রণীত কুফরি আইন। তাতে আছে সূদী ব্যাংক, দেহব্যবসা, সূদ–ঘুষ, মদজুয়া, বেপর্দা ও নাচগানের ন্যায় নানারূপ কবিরা গুনাহ ও পাপাচারের আইনগত বৈধতা। প্রকৃত ইসলামের সাথে সম্পর্কচ্যুৎ এমন ভণ্ড মুসলিম গড়ে তোলার লক্ষ্যে তারা যেমন মাদ্রাস গড়েছে, তেমনি গড়েছে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ও। সে সাথে ময়দানে নামিয়েছে মুসলিম নামধারী দালাল শ্রেণীর সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী। মুসলিম ভূমিতে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকার লক্ষ লক্ষ সৈনিক পেয়েছে বস্তুত ইসলামি চেতনা বিনাশী এরূপ প্রকল্প সফল হওয়ার ফলে। দুর্বৃত্তিতে বাংলাদেশ যেরূপ বার বার বিশ্বরেকর্ড গড়েছে এবং আদালতে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা যেরূপ অসম্ভব হয়েছে -তা মূলতঃ তাদের প্রবর্তীত সে বিকৃত ইসলাম ও মানসিক গোলামদের শাসন দীর্ঘকাল বেঁচে থাকার কারণে।

 

শত্রুর যুদ্ধ শেষ হয়না

ইসলাম ও মুসলিমের বিরুদ্ধে শত্রুর যুদ্ধ কখনোই শেষ হয়না; অস্ত্র ও কৌশল পাল্টায় মাত্র। সময় ও সুযোগ বুঝে তারা গড়ে নতুন কোয়ালিশন; এবং সংগ্রহ করে নতুন সৈনিক। তাই শেষ হয়নি ইসলাম নির্মূলে শয়তান ও তার অনুসারিদের মূল যুদ্ধটিও। বাংলাদেশ তো তাদর হাতেই অধিকৃত। অধিকৃত এ ভূমিতে তাই শরিয়তের প্রতিষ্ঠা, সিরাতুল মুস্তাকীমে চলা, বিভক্তির দেয়াল ভাঙ্গা এবং সে পবিত্র লক্ষ্যে জিহাদে লিপ্ত হওয়াটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সেটি যেমন কাফের ব্রিটিশদের আমলে ছিল, তেমনি আজও। এমন অধিকৃত দেশে বাক স্বাধীনতা, লেখালেখীর স্বাধীনতা, ধর্মশিক্ষা ও ধর্ম পালনের স্বাধীনতার দাবি করাটাই সন্ত্রাস। স্বাধীনতা নাই সিরাতুল মুস্তাকীমে চলার। সিরাতুল মুস্তাকীমে চলার পথ তো শরিয়তের প্রতিষ্ঠাসহ ইসলামের পূর্ণ বিজয় ও পূর্ণ ইসলাম পালনের পথ। সেটি তো আল্লাহর জমিনে তাঁর দ্বীনের বিজয়ে অর্থ, শ্রম, মেধা ও প্রাণদানের পথ। গভীর জঙ্গলে কি মহাসড়ক গড়া যায়? সে জন্য তো জঙ্গল কেটে পথ করতে হয়। সিরাতুল মুস্তাকীম গড়তেও তেমনি অপরিহার্য হলো কুফরি শাসনের নির্মূল। অথচ অন্ধকারের পূজারীগণ সেটি হতে দিতে রাজী নয়। সমাজের নমরুদ-ফিরাউন-আবু জেহলগণ সর্বশক্তি দিয়ে সে কাজে বাধা দেয়। অথচ জাহিলিয়াতের সে অন্ধকার না সরালে কি ইসলাম পালন হয়? সে যুগের জাহিলিয়াতে ছিল পৌত্তলিকতা, অজ্ঞতা, নানারূপ দুবৃত্তি ও ট্রাইবাইলিজম। আর আজকের জাহিলিয়াতটি হলো জাতীয়তাবাদ, পুঁজিবাদ, স্বৈরাচারী ফ্যাসিবাদ ও সেক্যুলারিজমের। ইসলামের নির্মূলে এ নব্য জাহিলিয়াত আদিম জাহিলিয়াতের চেয়ে কম যুদ্ধাংদেহী ও কম নৃশংস নয়। প্রতি যুগেই ইসলাম পালনের পথটি তাই জাহিলিয়াত নির্মূলের পথ; তথা লাগাতর জিহাদের পথ। যার জীবনে সে জিহাদ নাই, বুঝতে হবে সে ব্যক্তির জীবনে কোরআনী ইসলামও নাই। মুসলিম জীবনে এরূপ জিহাদ না থাকলে সে মুসলিমদের রাষ্ট্রে কি ইসলাম বাঁচে? সে রাষ্ট্রে বরং প্রবল প্লাবন আসে জাহিলিয়াতের; এবং সেসাথে নানারূপ দুর্বৃত্তি ও পাপাচারের। বাংলাদেশ হলো তারই নমুনা। বাংলাদেশের একটি থানায় যত মুসলিমের বাস নবীজী (সাঃ)র  প্রতিষ্ঠিত মুসলিম রাষ্ট্রে সে সংখ্যক মুসলিম ছিল না। কিন্তু জাহিলিয়াত ও দুর্বৃত্তির বিরুদ্ধে মহান নবীজী (সাঃ) ও তাঁর সাহাবায়ে কেরামের জীবনে আমৃত্যু জিহাদ এসেছিল। ফলে সমগ্র আরব ভূমি থেকে নির্মূল হয়েছিল দুর্বৃত্তদের আধিপত্য; এবং দেশে দেশে বিজয়ী শক্তিরূপে আাবির্ভুত হয়েছিল ইসলাম। তখন জনগণ পেয়েছিল সিরাতুল মুস্তাকীমে চলার স্বাধীনতা। অথচ নমরুদ, ফিরাউন ও আবু জেহলদের যুগে সে স্বাধীনতা ছিল না। অজ্ঞতার বিরুদ্ধে নবীদের আওয়াজ তোলাটিও তখন হত্যাযোগ্য সন্ত্রাস গণ্য হত। একই অবস্থা বাংলাদেশেও। দেশটির স্বৈরাচারি শাসকদের কাছে নবীদের সে পবিত্র সূন্নত নিয়ে বাঁচাটি গণ্য হয় সন্ত্রাস রূপে।

 

মানবের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা

মানবের উপর অর্পিত মিশনটি স্রেফ নামায-রোযা এবং হজ-যাকাত পালন নয়। স্রেফ তাসবিহও পাঠ নয়। বিশ্বজগতের সকল সৃষ্টিই  মহান আল্লাহতায়ালার নামে তাসবিহ পাঠ করে। “ইউসাব্বিহু লিল্লাহি মা ফিস সামাওয়াতি ওয়া মা ফিল আরদি” এবং “সাব্বাহা লিল্লাহি মা ফিস সামাওয়াতি ওয়া মা ফিল আরদি” –পবিত্র কোরআনে এরূপ বাক্য বার বার ব্যবহার করে মহান আল্লাহতায়ালা সে সত্যটি বার বার ব্যক্ত করেছেন। তাই স্রেফ তাসবিহ পাঠের মাধ্যমে পাহাড়-পর্বত, জন্তু-জানোয়ার, কীটপতঙ্গ, গাছপালা ও উদ্ভিদ থেকে কোন মানব সন্তানই শ্রেষ্ঠতর হতে পারে না। মানবের জন্য শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের সে পথটি ভিন্নতর। সেটি হলো, পৃথিবী জুড়ে মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব ও শরিয়তের  প্রতিষ্ঠা। সেটি পৃথিবী জুড়ে ইসলামের বিজয়ে আত্মনিয়োগ। ঈমানদারের জীবনে মূল মিশনটি তাই মহান আল্লাহতায়ালার ভিশনের সাথে একাত্ম হওয়া। পবিত্র কোরআনে বর্নিত মহান আল্লাহতায়ালার সে ভিশনটি হলো, “লি’ইয়ুযহিরাহু আলা দ্দীনে কুল্লিহী” অর্থঃ “সকল দ্বীনের উপর ইসলামের বিজয়”। সে নির্ধারিত মিশন পালনে একজন ব্যক্তি কতটা সফল হলো, তাতেই নির্ধারিত হয় জন্তু-জানোয়ার, কীটপতঙ্গ,গাছপালা ও উদ্ভিদ থেকে তার শ্রেষ্ঠতর মর্যাদা। দায়িত্ব এখানে খেলাফতের।

মানবসৃষ্টির প্রকৃত মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব তাই মহান আল্লাহতায়ালার খলিফা বা প্রতিনিধি রূপে দায়িত্ব  পালনের মাঝে। সাহাবাগণ মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করতে পেরছিলেন খেলাফতের সে গুরু দায়িত্বটি সুষ্ঠভাবে পালনের মাধ্যমে। সে কাজে তারা নিজেদের জীবনের শ্রেষ্ঠতর অর্জন ব্যয় করেছেন; শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবী শহীদ হয়েছেন। ব্যক্তির প্রতিটি সামর্থ্য তা অর্থনৈতিক, দৈহীক বা বুদ্ধিবৃত্তিক হোক –সবই মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া আমানত। ব্যক্তির প্রকৃত ঈমানদারি হলো, মহামূল্য সে আমানতকে মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনের বিজয়ে বিনিয়োগ করবে। নইলে ভয়ানক খয়ানত হয় যা আযাব ডেকে আনে। সাহাবাদের সে বিনিয়োগটি ছিল বিশাল; তাতে ইসলামের অনুসারিগণ বিশ্বশক্তির মর্যাদা পেয়েছিল। অথচ সেরূপ বিনিয়োগে আজকের মুসলিমগণ ব্যর্থ হয়েছে। ফলে বেড়েছে ইসলামের পরাজয়। বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশগুলিতে আমানতের বিনিয়োগ হয়েছে মূলতঃ জাতীয়তাবাদ, সমাজবাদ, সেক্যুলারিজম ও স্বৈরাচারের ন্যায় নানারূপ  ভ্রষ্টতাকে বিজয়ী করতে।   বিনিয়োগ সীমিত রেখেছে স্রেফ নামায-রোযা ও  তাসবিহ পাঠে। অথচ তাসবিহ পাঠ যত লক্ষ বারই হোক -তাতে মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া বিশাল সামর্থ্যের বিনিয়োগ ঘটেনা। ফলে শ্রেষ্ঠত্বের প্রকাশও ঘটে না। গবাদী পশুর মিশন শরিয়তের প্রতিষ্ঠা নয়,খলিফা হওয়াও নয়। সেটি তো কৃষকের হাল টানা, দুধ দেয়া, পরিধেয় জুতা বা খাবার টেবিলে কোর্মা-কাবাব রূপে হাজির হওয়া। পশুগণ সে মিশন পালনে ব্যর্থ হচ্ছে না। কিন্তু মানুষ ব্যর্থ হচ্ছে তার উপর অর্পিত মিশন পালনে। কাফের ও মুনাফিকগণ এজন্যই পশুরও অধম। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা সে সত্যটিও তুলে ধরেছেন। বলা হয়েছে, “বাল হুম আদাল’ অর্থঃ তারা (পশুর) চেয়েও নিকৃষ্ট।  পশু, কীটপতঙ্গ বা গাছপালা তাই জাহান্নামে যাবে না, কিন্তু জাহান্নামের খোরাক হবে অবাধ্য ও বিদ্রোহী মানব।

বিশাল বিজয় শত্রুপক্ষের

শরিয়ত প্রতিষ্ঠার বিষয়টি উগ্রবাদ নয়, সন্ত্রাসও নয়। এটি নামায-রোযার ন্যায় ইসলামের অতি অপরিহার্য বিষয়। নামায-রোযা ছাড়া যেমন মুসলিম হওয়া যায় না, তেমনি ইসলামের বিজয় ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠায় জান ও মালের বিনিয়োগ ছাড়াও মুসলিম থাকা যায় না। রাষ্ট্রটি মুসলিম না অমুসলিমের সেটি বুঝা যায় সে রাষ্ট্রে শাসকের অঙ্গীকার ও আদালতে আইনের স্বরূপ দেখে। তাই ঔপনিবেশিক শাসনামলে ভারতের পরিচয় ছিল ব্রিটিশ ভারত, মুসলিম ভারত রূপে নয় –যদিও সে সময় ব্রিটশদের সংখ্যা প্রতি লাখে একজনও ছিল না। সেটিই স্বাভাবিক ছিল। অপর দিকে বাংলার বুকে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার সাথে সাথে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল শরিয়তী আইনের শাসন। অথচ সে সময় দেশটির মুসলিম জনসংখ্যা আজকের ন্যায় শতকরা ৯২ ভাগ ছিল না। এমনকি সিকিভাগও ছিল না। মুসলিম জনসংখ্যা কম হলেও খিলজী আমল, সুলতানী আমল, মোঘল আমল বা নবাবী আমলে ছিল শরিয়তী আইন। ফলে পরিচয় পায় মুসলিম আমল রূপে। ভারত থেকে শরিয়তি আইন বিলুপ্ত হয় ব্রিটিশ কাফেরদের শাসন প্রতিষ্ঠার পর। ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে অধিকৃত হওয়ার এটিই হলো সবচেয়ে বড় বিপদ। তখন অসম্ভব হয় ইসলামের মৌল বিধানগুলি মেনে চলা।

ঔপনিবেশিক কাফেরদের শাসন শেষ হয়েছে। কিন্তু শেষ হয়নি তাদের গড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ইসলামের শত্রুপক্ষের শাসন। ঔপনিবেশিক আমলের সেক্যুলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কারণে ইসলামের শত্রু বিপুল ভাবে বেড়েছে নিজ ভূমিতে। অতীতে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা রোধে মুসলিম জনগণের পক্ষ থেকে কোনরূপ বিরোধীতা হয়নি। মুসলিম কি কখনো নামায-রোযার প্রতিষ্ঠার বিরোধীতায় রাস্তায় নামে? তাতে কি তার ঈমান থাকে? তেমনি শরিয়তি আইনের প্রতিষ্ঠার বিরোধীতা কি কোন মুসলিমের নীতি হতে পারে? অথচ সেটিই হচ্ছে বাংলাদেশে! শরিয়তি আইনের নির্মূলে এক কালে যা ছিল সাম্রাজ্যবাদি শাসকদের নীতি, সে অভিন্ন নীতি নিয়ে দেশ শাসন করছে বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশের স্বৈরাচারি শাসকগণ। নিজেদের মুসলিম রূপে পরিচয় দিলেও দেশের রাজনীতি, আদালত, শিক্ষাসংস্কৃতিতে তারা ইসলামের জন্য সামান্যতম স্থানও ছেড়ে দিতে তারা রাজী নয়। বরং কাফেরদের অর্থ, অস্ত্র ও এজেন্ডা নিয়ে দেশে-বিদেশে যুদ্ধ করতে রাজি। বাংলার ন্যায় মুসলিম ভূমি এরূপ ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে অধিকৃত হওয়ায় কঠিন হয়ে পড়ছে জান্নাতের পথে চলা।

 

বিজয় শত্রুপক্ষের

বাংলাদেশে ইসলামের শত্রুপক্ষের বিজয়টি বিশাল। ইসলামের বিজয় বা উত্থানকে তারা সফল ভাবেই রুখতে পেরেছে। এবং অব্যাহত রাখতে পেরেছে ব্রিটিশদের প্রবর্তিত কুফরি আইনের শাসন। দেশটির জনসংখ্যার শতকরা ৯২ ভাগ নিজেদেরকে মুসলিম রূপে দাবী করলে কি হবে, ধর্মের নামে দেশে যা পালিত হয় তার সাথে নবীজী (সাঃ)র ইসলামের মিলের চেয়ে অমিলই প্রচুর। দেশটিতে আজও পৌত্তলিকতা বেঁচে আছে তার আদিম সনাতন পরিচয় নিয়ে। কিন্তু এ মুসলিম ভূমিতে নবীজী (সাঃ)র ইসলাম তার পরিচয়টি হারিয়ে ফেলেছে বহু আগেই। এবং বেঁচে নাই কোরআনে বর্নিত জিহাদ, শরিয়ত, হদুদ ও খেলাফতের ধারণা। ফলে পবিত্র কোরআনের সনাতন ইসলাম বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশী অপরিচিত। ইসলাম থেকে দূরে সরা জনগণ অতি আনন্দ চিত্তে বরণ করে নিয়েছে বর্ষবরণ, বসন্তবরণ, মঙ্গল প্রদীপসহ নানারূপ পৌত্তলিক সংস্কৃতিকে। লক্ষ লক্ষ মুসলিম সন্তান হাজির হচ্ছে এমন কি পূজামন্ডপে।

ইসলামের এ বিশাল পরাজয় নিয়ে দেশের লক্ষ লক্ষ আলেমও নিরব, যেন এ পরাজয়কে নিশ্চুপ মেনে নেয়া ছাড়া তাদেরও কিছু করার নাই। মসজিদ ও মাদ্রাসায় চাকুরির মাঝে সীমিত তাদের জীবন।  কোরআনকে তারা পড়তে পারে -সে জ্ঞানকেই তারা সামান্য মূল্যে ঘরে ঘরে ও মসজিদে মসজিদে বিক্রি করে বেড়াচ্ছে। শরিয়তী বিধানকে যেভাবে আঁস্তাকুড়ে ফেলা হয়েছে তা নিয়েও এসব আলেমদের মাঝে সামান্যতম মাতম উঠে না। শরিয়তের পুণঃপ্রতিষ্ঠা নিয়ে তাদের নেই সামান্যতম আগ্রহ। শরিয়ত পালন ছাড়া যে ইসলাম পালন হয়না -সে হুশও কি তাদের মাঝে বেঁচে আছে? ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে দেশ অধিকৃত হলে তখন জিহাদ আর ফরজে কেফায়া থাকে না, ফরজে আইনে পরিণত হয়। প্রতিটি মুসলিমকে তখন লড়াইয়ে নামতে হয়। তাদের মাঝে কতটুকু বেঁচে আছে ইসলামের সে মৌলিক জ্ঞানটুকু? ফলে ইসলামের শত্রুশক্তির অধিকৃতি মোচনের কোন প্রচেষ্ঠাও নেই। ইসলামকে তারা নিজেদের পছন্দ মত বানিয়ে নিয়েছে; এবং নিজেরা যা করছে সেটিকেই তারা খাঁটি ইসলাম বলছে। ঘরে ঘরে পবিত্র কোরআনকে রাখা হয় স্রেফ না বুঝে তেলাওয়াতের জন্য; মহান আল্লাহতায়ালা কি বলেছেন সেটি জানা বা অনুসরণের জন্য নয়।

নবীজী (সাঃ)র যুগে ইসলাম বলতে যা বুঝাতো তাতে ছিল রাষ্ট্রের উপর একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব; রাজা, জনগণ বা জনগণের নির্বাচিত পার্লামেন্টের নয়। শাসকের পরিচয় ছিল নবীজী (সাঃ)র খলিফা বা প্রতিনিধি রূপে; জনগণের উপর নিজের খেয়াল-খুশিকে চাপিয়ে দেয়ার অধিকার শাসকের ছিল না। আইনের উৎস ছিল পবিত্র কোরআন ও সূন্নাহ; ফলে দেশের আদালত কখনোই দেশের শাসকদের বা নির্বাচিত সদস্যদের প্রণীত আইনের হাতে অধিকৃত হয়নি। সূদ, ঘুষ, মদ, জুয়া সন্ত্রাস, চুরি-ডাকাতি ও দেহব্যবসা চিহ্নিত হতো শাস্তিযোগ্য জঘন্য অপরাধ রূপে। ফলে রাষ্ট্রের বুক থেকে সে পাপ ও পাপাচারের পথগুলোও নির্মূল হয়েছিল। অথচ বাংলাদেশ আজ ভয়ানক অপরাধীদের হাতে অধিকৃত। এদের চরিত্র, এরা শুধু স্বৈরাচারি ও চরম দুর্বৃত্তই নয়; ইসলামের প্রতিষ্ঠা প্রতিরোধে এরা আপোষহীনও। ফলে সরকার ও দখলদার রাজনৈতিক দলের রাজনৈতিক এজেন্ডাও সুস্পষ্ট। দেশের ক্রমবর্ধমান গুম-খুন, চুরি –ডাকাতি, শেয়ারমার্কেট লুট, ব্যাংক লুট নিয়ে তাদের কোন মাথা ব্যাথা নেই। তারা যেহেতু নিজেরাই অপরাধী, অপরাধীদের নির্মূল তাদের লক্ষ্য নয়। তারা চায় নিজেদের রাজনৈতিক শত্রুদের নির্মূল ও নিজেদের গদীর দীর্ঘায়ু। তারা নির্মূল করেত চায় তাদের যারা ইসলামের বিজয় চায়। নির্মূলের সে কাজটি সহজ করতেই তারা দেশের সকল ইসলাম বিরোধী ব্যক্তি, দল ও দুর্বৃত্তদের পক্ষে টেনেছে। এসব দুর্বৃত্তদের কেউ কেউ খুনের অপরাধে আদালতে প্রাণদণ্ড পেলেও দেশের সরকার ও প্রেসিডেন্টের কাজ হয়েছে তাদের প্রাণদণ্ডকে মাফ করে দেয়া।

শাসনতন্ত্রে শয়তানের এজেন্ডা

রাজা, জনগণ বা পার্লামেন্টের সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারি হওয়ার ধারণা  পবিত্র কোরআনে নাই। তাই সেরূপ কোন ধারণার অস্তিত্ব নবীজী (সাঃ)র যুগে ছিল না। এরূপ প্রতিটি ধারণাই কুফরি। শাসকগণ কাজ করতেন নবীজী(সাঃ)র খলিফা রূপে। সার্বভৌমত্ব দাবী করার অর্থ মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা। সে কাজ কাফেরদের। দেশে দেশে সেরূপ যুদ্ধ বস্তুত শয়তানের খলিফাদের। অথচ তেমন একটি যুদ্ধ ঘোষিত হয়েছে বাংলাদেশের শাসনতন্ত্রে। এভাবে শাসনতন্ত্র ব্যাহৃত হচ্ছে শয়তানের এজেন্ডা পূরণে। নবীজী (সাঃ)র আমলে ইবাদত বলতে বুঝাতো নামায-রোযা, হজ-যাকাত পালনের সাথে সাথে পবিত্র কোরআনে ঘোষিত মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিটি হুকুমের প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ এবং নবীজী (সাঃ)র সূন্নতের পূর্ণ অনুসরণ। ফলে মু’মিনের জীবনে অনিবার্য রূপে দেখা দিত ইসলামের বিজয়ে জিহাদে অংশগ্রহণ। তখন শুরু হত কোরআনে নাযিলকৃত মহান আল্লাহতায়ালার পবিত্র বানী আত্মস্থ করার ধ্যানমগ্নতা; ঈমানদারের প্রয়াস তাই স্রেফ তেলাওয়াতে সীমিত ছিল না। সে সাথে ছিল কোরআনের বানীকে দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে দেয়ার তাড়াহুড়া। ঘরে ঘরে ছিল নিজ জান ও মাল নিয়ে ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে সার্বক্ষণিক জিহাদের প্রস্তুতি। সেসব জিহাদে সাহাবগণ শুধু সঞ্চয়ের সিংহভাগই বিলিয়ে দেননি, শহীদও হয়েছেন। মুসলিমগণ তো সে পথ ধরেই বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে সে সনাতন ইসলামকে তার বিশুদ্ধ পরিচয় নিয়ে বাঁচতে দেয়া হয়নি। নবীজী (সাঃ)র ইসলামে যেরূপ শরিয়ত, খেলাফত, জিহাদ ও অন্য ভাষা বা অন্য বর্ণের মুসলিমদের সাথে একাত্ম হওয়ার আকুল আগ্রহ ছিল, বাঙালী মুসলিমের ইসলামে তার কোনটাই নাই। সে সনাতন ইসলাম ছেড়েছে দেশের আলেমগণও। রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি অঙ্গণে ইসলামের এ পরাজয় নিয়ে তাদের মাঝে কোন মাতম নেই।

বাংলাদেশের মাটিতে সবচেয়ে বড় ভণ্ডামীটি  হচ্ছে ইসলামের নামে। ইসলাম বেঁচে আছে স্রেফ মুষ্টিমেয় কিছু লোকের টুপি-দাঁড়ি, দোয়া-দরুদ ও নামায-রোযার মাঝে। সবচেয়ে বড় নেককর্ম রূপে গণ্য হয় কোরআন পাঠ, দরুদ পাঠ ও মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণ। সে তালিকায় ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের নির্মূল যেমন নাই, তেমনি নাই শরিয়তের প্রতিষ্ঠা নিয়ে কোন আগ্রহ। অথচ মহান আল্লাহতায়ালার কাছে মুসলিম উম্মাহর শ্রেষ্ঠতর হওয়ার কারণ, ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায় ও অন্যায়ের নির্মূলে আত্মনিয়োগ। -(সুরা আল ইমরান, আয়াত ১১০)। অথচ পবিত্র কোরআনের সে কথা ভূলে তারা বাঁচছে সম্পূর্ণ বিপরীত মিশন নিয়ে। সেটি মিথ্যা ও অন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং সত্য ও ন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। তেমন একটি মিশনের কারণেই বাংলাদেশ দূর্নীতিতে বিশ্বে ৫ বার বিশ্বরেকর্ড গড়েছে। তাদের কাছে গুরুত্ব হারিয়েছে কোরআন বুঝা ও নবী-আদর্শের প্রতিষ্ঠা। মহান আল্লাহতায়ালাকে মুখে প্রভু রূপে স্বীকার করা হলেও রাষ্ট্রের উপর তাঁর কোন প্রভুত্ব বা সার্বভৌমত্ব নাই। সেটির প্রতিষ্ঠা নিয়েও কোন আগ্রহ নাই। আইন-আদালতে প্রবেশধাধিকার নাই পবিত্র শরিয়তী আইনের। কোন মুসলিম দেশে কি সেটি ভাবা যায়? সাহাবায়ে কেরামের সময় শয়তানী শক্তি কি মুসলিম ভূমিতে এরূপ বিজয়ের কথা কল্পনা করতে পেরেছে? দেশে পতিতাদের দেহব্যবসার আইনগত বৈধতা আছে। বৈধতা আছে সূদখোর, ঘুষখোর ও জুয়ারীদের নিজ নিজ হারাম কাজ চালিয়ে যাওয়ার। দেশে নাচগানের অশ্লীল আসর জমানোও অপরাধ নয়। জনগণের অর্থে প্রতিপালিত পুলিশ এসব পাপাচারীদের সারাক্ষণ নিরাপত্তা দেয়। দেশে রাজনীতিতে পূর্ণ আজাদী রয়েছে নাস্তিক, সোসালিস্ট, সেক্যুলারিস্ট, ন্যাশনালিস্ট –তথা সকল প্রকার ইসলামবিরোধীদের। কিন্তু সন্ত্রাস রূপে চিহ্নিত হয় মহান আল্লাহতায়ালার আইনের প্রতিষ্ঠার দাবী নিয়ে ময়দানে নামা। ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হত্যাকাণ্ডকে বলা হয় আইনের শাসন। সেরূপ নির্মূলকরণকে বৈধতা দিতে আরো নতুন আইন প্রণোয়ন করা হচ্ছে। আইন প্রণোয়নের মূল লক্ষ্য, এখানে স্বৈরাচারি সরকারকে নিরাপত্তা দেয়া, সে সাথে ইসলামের প্রতিষ্ঠাকে প্রতিরোধ করা। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে সরকারের কোন ভাবনা নাই। ফিরাউন, নমরুদ, হালাকু-চেঙ্গিজ ও হিটলারের আমলেও একই রূপ আইনের শাসন ছিল। সে আইনে সরকার বিরোধীদের গ্রেফতার করা, নির্যাতন করা ও হত্যা করা ছিল রীতিমত আইনসিদ্ধ কাজ গণ্য হত। অনুরূপ অবস্থা চেপে বসেছে বাংলাদেশের বুকেও। দেশের পুলিশ, আদালত ও প্রশাসনের কাজ হয়েছে সে আইনকে প্রতিষ্ঠা দেয়া। সরকারি দলের দুর্বৃত্তেদর হাতে দেশের ব্যাংকগুলো থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুণ্ঠিত হচ্ছে, হাজার হাজার মহিলা ধর্ষিতা হচ্ছে এবং নিহত হয়েছ শত শত মানুষ। গুম হয়েছে বহু বিরোধী দলীয় নেতাকর্মী। কিন্তু এরূপ ভয়ানক অপরাধের নায়কদের কি এ অবধি গ্রেফতার করা হয়েছে? দেয়া হয়েছে কি শাস্তি। অপরাধের নায়ক যেহেতু সরকারি দলের নেতাকর্মী, তাদের তাই গ্রেফতার করা হয় না। কিন্তু  হত্যাযোগ্য অপরাধ হলো ইসলামের পক্ষে রাস্তায় বিক্ষোভে যোগ দেয়া বা সত্য কথা বলা। নিরস্ত্র মানুষের বিক্ষোভ দমনে ২০১৩ সালের ৫ মে’র রাতে শাপলা চত্ত্বরে তাই সেনাবাহিনী নামানো হয়েছিল এবং হেফাজতে ইসলামের শত শত নিরীহ মানুষকে লাশ করে গায়েব করা হয়েছিল।

দখলদারী শয়তানের সাহায্যকারীদের

ভাষা, বর্ণ, গোত্র ও অঞ্চলের নামে মানব জাতি শত শত রাষ্ট্র ও গোত্রে বিভক্ত হলেও মহান আল্লাহতায়ালার কাছে আসল বিভাজনটি মূলতঃ দ্বি-ভাগে। এক). আনসারুল্লাহ অর্থাৎ মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্যকারি দল, দুই). আনসারুশ শায়তান অর্থাৎ শয়তানের সাহায্যকারি দল। মহান আল্লাহতায়ালার বিচারে তৃতীয় কোন দল নাই। মুসলিম হওয়ার অর্থই হলো মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্যকারি হয়ে যাওয়া। লক্ষ্য, ইসলামের বিজয়। মুসলিম নর-নারীর উপর সেটি ফরজ। কারণ সেটি হতে মহান আল্লাহতায়ালা সুস্পষ্ট নির্দেশ এসেছে পবিত্র কোরআনে। সে নির্দেশটি এসেছে সুরা সা’ফ’এর ১৪ নম্বর আয়াতে। হুকুম এসেছে, “হে ঈমানদারগণ, আল্লাহর আনসার (সাহায্যকারি) হয়ে যাও”। পবিত্র কোরআনে ঘোষিত এ হুকুমের অবাধ্যতা হলো সুস্পষ্ট কুফরী। মহান আল্লাহতায়ালা সাহায্যকারি  হওয়ার অর্থ, তাঁর  ভিশন বা ইচ্ছা পূরণে সাহায্যকারি হয়ে যাওয়া। এটিই তো নবীজীবনের মূল শিক্ষা। সাহাবায়ে কেরাম তো নবীজীবনের সে শিক্ষাকেই জীবনের মিশন বানিয়ে নিয়েছিলেন। ফলে বিশাল ভূ-ভাগ জুড়ে বিজয়ী হয়েছিল ইসলাম; এবং  প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল  শরিয়ত। যারা মহান আল্লাহতায়ালা সাহায্যকারি  হতে ব্যর্থ, তাদের সামনে শয়তানের সাহায্যকারি হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। তাদের নামায-রোযা ও হজ-যাকাতে তাই মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীন বিজয়ী হয় না। আর তারই উদাহরণ হলো বাংলাদেশ। তাই বাংলাদেশে মসজিদ, মাদ্রাসা ও নামাজীর সংখ্যা বাড়লেও তাতে ইসলামের বিজয় না বেড়ে দাপট বেড়েছে ইসলামের শত্রুপক্ষের। দেশের সরকার পরিণত হয়েছে শয়তানের সাহায্যকারি বাড়াতে। এবং সে কাজে তাদের সহযোগিতা বাড়ছে ভারতসহ বিশ্বের তাবত কাফের শক্তির সাথে।

যারা মহান আল্লাহতায়ালার উপর বিশ্বাসী তারা আত্মসমর্পণ করে তাঁর প্রতিটি হুকুমের কাছে। এ আত্মসমর্পণ নিয়ে তারা কোন রূপ দ্বিধাদ্বন্দে ভোগে না। আনসারুল্লাহ হওয়ার কোরআনী হুকুমটি তারা শুধু পাঠই করে  না, নিজ জীবনের মূল মিশনেও পরিণত করে। অপর দিকে যারা মহান আল্লাহতায়ালাতে অবিশ্বাসী, তাদের আগ্রহ থাকে না মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্যকারি হতে। বরং সে হুকুমের বিরুদ্ধে তারা বিদ্রোহী হয় ও যুদ্ধে নামে। পবিত্র কোরআনে এরাই চিহ্নিত হয়েছে কাফের রূপে। কাফেরদের এ বিদ্রোহে কোন কপটতা বা প্রতারণা নাই। অথচ সে কপটতা বা প্রতারণা ধরা পড়ে মুনাফিকদের জীবনে। মুসলিম রূপে পরিচয় দেয়া সত্ত্বেও মুনাফিকদের যুদ্ধটি মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীন ও তাঁর শরিয়তের বিরুদ্ধে। পবিত্র কোরআনে এ বিষয়গুলো নিয়ে বার বার আলোচনা হয়েছে –যাতে মানুষ তার মৃত্যুর পূর্বে কোন দলে অবস্থান সেটি জানতে ভূল না করে। মুসলিমদের বিরুদ্ধে শত্রুতায় ও নাশকতায় মুনাফিকদের জুড়ি নাই। ইসলামের বিজয় তাদের কাছে অসহ্য। নবীজীর যুগে এরাই নব্য মুসলিম রাষ্ট্রের নির্মূলে কাফের ও ইহুদীদের সাথে কোয়ালিশন গড়েছিল। প্রতি মুসলিম দেশে শয়তানের সাহায্যকারিদের সেটিই সনাতন নীতি। সে অভিন্ন নীতি বাংলাদেশেও। তবে পার্থক্য হলো, মদিনার মুনাফিকগণ ছিল পরাজিত। অথচ তারা হলো বিজয়ী। ফলে মদিনার মুনাফিকদের ন্যায় ইসলামের শত্রুপক্ষ তথা কাফেরদের সাথে তারা গোপনে জোট বাঁধে না। তারা সেটি প্রকাশ্যেই করে। নিজেদেরকে আনসারুল্লাহ  বা ইসলামের পক্ষের শক্তি রূপেও তারা দাবী করে না। শরিয়তের প্রতিষ্ঠা প্রতিরোধ ও ইসলামের পক্ষের শক্তির নির্মূল যে তাদের রাজনীতির প্রধানতম লক্ষ্য -সেটিও তারা খোলাখোলি বলে। তাদের কারণেই দেশটিতে ইসলামের বিজয় ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠা রুখতে কোন কাফের শক্তিকে ময়দানে নামতে হচ্ছে না। সেটি তারা নিজেরাই করছে। প্রতিটি মুসলিম দেশে এরাই ইসলাম ও মুসলিমের ঘরের শত্রু। নিজেদের মুসলিম রূপে পরিচয় দেয়ার যে ভণ্ডামী -সে জন্য তাদের জাহান্নামের শাস্তিটা হবে কাফেরদের চেয়েও অধীক। পবিত্র কোরআনে তাই বলা হয়েছে, এরূপ মুনাফিকদের অবস্থান হবে জাহান্নামের সবচেয়ে নীচের স্তরে।

মহান নবীজী (সাঃ)র যুগে এরূপ নিকৃষ্ট জীব তথা মুনাফিকদের সংখ্যা নগন্য ছিল না। ওহুদের যুদ্ধের সময় সে সংখ্যা ছিল প্রায় শতকরা ৩০ ভাগ। সে পরিসংখ্যানটি ধরা পড়ে তখন যখন নবীজী (সাঃ) মাত্র এক হাজার সৈন্য নিয়ে মদিনা থেকে ওহুদের যুদ্ধে বের হন। তখন মুনাফিকদের ৩০০ জন সে বাহনী থেকে বেরিয়ে যায়। মুনাফিকদের চেনা ও আলাদা করার ব্যাপারে জিহাদ এভাবেই ছাঁকুনীর কাজ করে। এসব মুনাফিকগণ নবীজী (সাঃ)র পিছনে নামায পড়তো, রোযা-হজ-ওমরাহও পালন করতো। কিন্তু গোপনে গোপনে এরাই ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বিনাশে ইহুদী ও কাফেরদের সাথে কোয়ালিশন গড়েছিল। এমন মুনাফিক আজও বেঁচে আছে প্রতিটি মুসলিম দেশে, এবং বিশাল সংখ্যা নিয়ে।  নবীজী (সাঃ)র যুগে সংখ্যায় কম ও পরাজিত হওয়ায় তারা লুকিয়ে লুকিয়ে ষড়যন্ত্র করতো। কিন্তু বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলিতে তারা সংখ্যায় বিশাল, সে সাথে বিপুল ভাবে বিজয়ীও। ইসলামের বিরুদ্ধে এরা এতটাই উগ্র ও উদ্ধত যে ইসলামের শত্রুপক্ষের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তারা প্রকাশ্যে যুদ্ধে নামে। বঙ্গীয় এ ভূমিতে তাদেরকে ১৭৫৭’য়ে দেখা গেছে ইংরেজদের সাথে; ১৯৭১’য়ে দেখা গেছে ভারতীয়দের সাথে। আজ দেখা যায় মুসলিম বিরোধী আন্তর্জাতিক কোয়ালিশনের সাথে। নবীজী (সাঃ)র যুগে এরূপ প্রকাশ্যে যুদ্ধ নামার সাহস মুনাফিকগণ পায়নি।

সংকটে পড়েছে পরকালীন মুক্তি

ইসলামের যে শত্রুপক্ষের হাতে বাংলাদেশ আজ অধিকৃত, তারা দেশের রাজনীতি, প্রশাসন, সংবিধান, শিক্ষা-সংস্কৃতি, সেনাবাহিনী ও আইন-আদালতের ন্যায় অঙ্গণে ইসলাম ও ইসলামপন্থিদের জন্য সামান্যতম স্থান ছেড়ে  দিতে রাজী নয়। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে একমাত্র তাদেরই স্থান দেয়, যারা সমাজে পরিচিত মুর্তিপূজারী কাফের, নাস্তিক, সেক্যুলারিস্ট ও সোসালিস্ট রূপে। তাদের মনের ভূবনের সবটুকু দখল করে আছে ইসলাম প্রসঙ্গে নিজেদের মনগড়া ধারণা। পবিত্র কোরআনের ব্যাখ্যা হতে হবে তাদের মনপুত, নইলে সেটির প্রচার হতে দিতে তারা রাজী নয়। যে সব বইয়ে জিহাদ বিষয়ক আয়াতের উল্লেখ আছে – সেগুলিকে তারা সন্ত্রাসের বই রূপে চিহ্নিত করে। ঘরে বা দোকানে সে সব বই রাখা বা সেগুলি পাঠ করাকে তারা দণ্ডনীয় অপরাধ গণ্য করে। মসজিদে নামায পাঠ, দরুদ পড়া বা রোযা পালন নিয়ে তাদের আপত্তি নাই; কিন্তু নবীজী (সাঃ)র যুগের ন্যায় সমাজ ও রাষ্ট্রের পূর্ণ ইসলামীকরণ হতে দিতে তারা রাজী নয়। ইসলামীকরণের সে স্বপ্ন দেখাটিই তাদের কাছে অপরাধ। যারা সে স্বপ্ন দেখে তাদের বিরুদ্ধে দেয় নির্মূলের হুংকার। ফলে বাংলার মুসলিম ভূমিতে অসম্ভব হয়েছে নবীজী (সাঃ)র সে সব গুরুত্বপূর্ণ সূন্নতের অনুসরণ যাতে ছিল তাঁর রাজনীতি, প্রশাসন, জিহাদ ও শরিয়ত পালন। এভাবে অসম্ভব করা হয়েছে পরিপূর্ণ মুসলিম রূপে বেড়ে উঠা। বাঙালী মুসলিমের জীবনে এটিই হলো সবচেয়ে বড় সংকট। এভাবে সংকটে পড়েছে তাদের পরকালীন মুক্তি।

গুরুতর এ সংকটের কারণ, ঈমানদারীর দায়ভারটি স্রেফ নামায-রোযা, হজ-যাকাত ও তাসবিহ-তাহলিল নিয়ে বাঁচা নয়। বরং সেটি পরিপূর্ণ মুসলিম রূপে বাঁচা। এখানে কোন আপোষ চলে না। কাফের হওয়ার জন্য মহান আল্লাহতায়ালার একটি মাত্র হুকুম অমান্য করাই যথেষ্ট। প্রকৃত মুসলিম হওয়ার জন্য অপরিহার্য হলো,  মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিটি হুকুমের কাছে পূর্ণ আত্মসমর্পণ। একটি মাত্র হুকুম অমান্য করায় ইবলিস পাপীষ্ট শয়তানে পরিণত হয়েছে। অথচ মহান আল্লাহতায়ালার বহু হুকুম অমান্য করায় বাধ্য করছে বাংলাদেশের সরকার। পবিত্র কোরআনে ঘোষণা, “আমার নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী যারা বিচারের কাজ করে না তারা কাফের। ..তারাই জালেম। … তারাই ফাসেক।” –(সুরা মায়েদা, আয়াত ৪৪, ৪৫ ও ৪৬)।  কিন্তু বাংলাদেশে কি মহান আল্লাহতায়ালার এ হুকুম মান্য করা সম্ভব? সে জন্য তো রাষ্ট্রের আদালতে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা চাই। কোন অনৈসলামিক দেশে বসবাসের বড় বিপদ তো এটিই। সে বিপদ থেকে বাঁচতে ঈমানদার ব্যক্তি নিজ দেশ ছেড়ে ইসলামী দেশে হিজরত করে। অথচ সে বিপদটাই প্রকট রূপে বেড়েছে বাংলাদেশের ন্যায় একটি মুসলিম দেশে। বাংলাদেশে ইসলাম বিরোধী শক্তির এটিই হলো সবচেয়ে বড় নাশকতা। এটিই তাদের পরিকল্পিত ডি-ইসলামাইজেশন প্রজেক্ট। তাদের লক্ষ্য, মুসলিম জনগণকে মহান আল্লাহতায়ালার হুকুম পালন থেকে জোর পূর্বক দূরে রাখা। নবীজী (সাঃ)র ইসলাম থেকে এভাবে দূরে সরিয়ে তাদেরকে ভণ্ড মুসলিমে পরিণত করা। নামায-রোযা, হজ-যাকাতে অংশ নিয়েও মিথ্যা বলা, সূদ-ঘুষ খাওয়া, সেক্যুলার রাজনীতি ও শরিয়তি আইনের প্রতিষ্ঠা বিরুদ্ধে লাঠি ধরাও তখন এ ভণ্ডদের জন্য সহজ হয়ে যায়। বাংলাদেশে এবং সে সাথে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে, ভয়ানক ক্ষতিটি হয়েছে এরূপ অনৈসলামিক শাসকদের হাতে। বিগত হাজার বছরে খুব কম সংখ্যক মুসলিমই খৃষ্টান, বৌদ্ধ বা হিন্দু ধর্মে দীক্ষা নিয়েছে। কিন্তু তাদের মাঝে ইসলামের অনুসরণে প্রচন্ড ভাবে নিষ্ক্রীয় হয়েছে বিপুল সংখ্যায়। ইসলাম থেকে দূরে সরা এরূপ মুসলিমগণ ইসলাম নির্মূল করার যুদ্ধে দলে দলে হাত মিলিয়েছে শত্রুপক্ষের সাথে। ফলে বিগত কয়েক শত বছরে মুসলিমদের সংখ্যা বহুগুণ বাড়লেও শক্তি বাড়েনি। সম্মানও বাড়েনি। বরং বেড়েছে উপর্যুপরি পরাজয়। এদের কারণেই মুসলিম উম্মাহ আজ বিভক্ত। এবং আইন-আদালত থেকে নির্বাসিত হয়েছে মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তী আইন। এভাবে নবীজী (সাঃ)র ইসলাম অজানা ও অপরিচিত রয়ে গেছে খোদ মুসলিম দেশগুলিতে। মুসলিমের জীবনে সবচেয়ে বড় ইবাদত তাই নামায-রোযা, হজ-যাকাত, তাসবিহ-তাহলিল নয়। এরূপ ইবাদত নবীজী (সাঃ)র যুগে মুনাফিকগণও করতো। আজ কোটি কোটি বাঙালী মুসলিমও সেটি করে। বরং সে পবিত্র ইবাদতটি হলো এমন জিহাদ যা রাষ্ট্রের বুক থেকে সেসব  দুর্বৃত্ত শাসকদের নির্মূল করে যারা এ পৃথিবী পৃষ্ঠে মহান আল্লাহতায়ালার হুকুম পালনকে অসম্ভব করে। যারা সে কাজে প্রাণ দেয় তারা পায় বীনা হিসাবে জান্নাত। অন্য কোন ইবাদতে কি সেটি জুটে? করুণাময়ের দরবারে শহীদদের এরূপ বিশাল মর্যাদার কারণ, তাদের কারণেই মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীন বিজয়ী হয়; প্রতিষ্ঠা পায় শরিয়ত। এবং বাড়ে বিশ্বজুড়ে মুসলিমের শক্তি ও গৌরব। নবীজী (সাঃ)র সাহাবাগণ তো সে পথে অর্থ, শ্রম, মেধা ও প্রাণদানের মধ্য দিয়েই মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করেছিলেন। কিন্তু যে বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের ইতিহাস তলাহীন ভিক্ষার ঝুলি ও দুর্নীতিতে বিশ্বে শিরোপা লাভে -তাদের কি এ মহান মিশনে আগ্রহ থাকে? বাঙালী মুসলিমের বিপদের মূল কারণ, দেশ তো সে দুর্বৃত্তদের হাতেই জিম্মি।

 




শত্রুর আরোপিত সাংস্কৃতিক যুদ্ধ ও অরক্ষিত বাংলাদেশ

ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদী কোয়ালিশনের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধটি নিছক সামরিক বা রাজনৈতিক নয়। বরং সে যুদ্ধটি প্রবল ভাবে হচ্ছে প্রতিটি মুসলিম দেশের সাংস্কৃতিক ময়দানে। সাংস্কৃতিক যুদ্ধের তেমনি একটি উত্তপ্ত রণাঙ্গণ হলো বাংলাদেশে। পাশ্চাত্যের সে কোয়ালিশনে যোগ দিয়েছে আরেক আগ্রাসী দেশ ভারত। ইসলাম ও মুসলিম বিরোধী্ পাশ্চাত্য এজেন্ডার সাথে ভারতীয় এজেন্ডা এক্ষেত্রে এক ও অভিন্ন। শত্রুপক্ষের এ কোয়ালিশন আফগানিস্তান,ইরাক বা ফিলিস্তিনের মুসলমানদের বিরুদ্ধে আজ যা কিছু করছে, ভারত অবিকল সেটিই করছে বিগত ৬০ বছরের বেশী কাল ধরে করছে অধিকৃত কাশ্মীরের অসহায় মুসলমানদের সাথে। বাংলাদেশের রণাঙ্গনে এ পক্ষটি অতি-উৎসাহী সহযোদ্ধা রূপে পেয়েছে দেশটির বিপুল সংখ্যক সেকুলার রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, সাংস্কৃতিক ক্যাডার, শিক্ষক-বুদ্ধিজীবী, লেখক-সাংবাদিক, এবং বহু সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা।

বিশ্ব-রাজনীতির অঙ্গণ থেকে সোভিয়েত রাশিয়ার বিদায়ের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভেবেছিল তাদের পথের কাঁটা এবার দূর হলো। আধিপত্য বিস্তৃত হবে এবার বিশ্বজুড়ে। কিন্তু সেটি হয়নি। আফগানিস্তান ও ইরাকের মত দুইটি দেশ দখলে রাখতেই তাদের হিমশিম খেতে হচেছ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ন্যায় মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ শেষ হতে ৫ বছর লেগেছিল। কিন্তু বিগত ১৭ বছর যুদ্ধ লড়েও মার্কিন নেতৃত্বাধীন ৪০টিরও বেশী দেশের কোয়ালিশ বাহিনী আফগানিস্তানে বিজয় আনতে পারিনি। বরং দ্রুত এগিয়ে চলেছে পরাজয়ের দিকে। এখন তারা জান বাঁচিয়ে পালাবার রাস্তা খুঁজছে। তালেবানদের সাথেও তারা বার বার আলোচনায় বসেছে। দেড় বছরের মধ্য সকল সৈন্য অপসারণে বাধ্য হচ্ছে। পাশ্চাত্যের কাছে এখন এটি সুস্পষ্ট, আফগানিস্তান, ইরাক, ফিলিস্তিন, লেবানন, সোমালিয়ার মত ক্ষুদ্র দেশগুলো দখল করা এবং সেগুলোকে কন্ট্রোলে রাখার সামার্থ্য তাদের নেই। যে প্রতিরোধের মুখে তারা হারতে বসেছে সেটির মূল হাতিয়ার অত্যাধিক যুদ্ধাস্ত্র নয়, জনবল বা অর্থবলও নয়। বরং সেটি কোরআনী দর্শন ও ইসলামের সনাতন জিহাদী সংস্কৃতি। এ দর্শন ও সংস্কৃতিই মুসলমানের জন্য আত্মসমর্পণকে অসম্ভব ও অচিন্তনীয় করে তুলেছে। বরং অতি কাম্য গণ্য হচ্ছে আগ্রাসী শত্রুর বিরুদ্ধে আমৃত্যু লড়াই ও শাহাদত। এমন চেতনা এবং এমন সংস্কৃতির বলেই এক কালের মুসলমানেরা রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের ন্যায় দুটি বিশ্বশক্তিকে পরাজিত করেছিল। এ যুগেও তারা বিশ্বের সর্ববৃহৎ রাষ্ট্র ও বিশ্বশক্তি রাশিয়াকে পরাজিত করেছে। এবং এখন গলা চেপে ধরেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। কামান, বোমা ও যুদ্ধবিমানের বলে গণহত্যা চালানো যায়। নগর-বন্দরও ধ্বংস করা যায়। কিন্তু সে কামানে বা গোলায় কি দর্শন ও সংস্কৃতির বিনাশও সম্ভব? বরং তাদের আগ্রাসন ও গণহত্যায় প্রতিরোধের সে দর্শন ও সংস্কৃতিই দিন দিন আরো বলবান হচ্ছে।

 

কোন মার্কিনীকে রণাঙ্গণে রাখতে মাথাপিছু প্রায় ১০ লাখ ডলার খরচ হয়। অথচ মুসলমানরা হাজির হচ্ছে নিজ খরচে। তারা শুধু স্বেচ্ছাই অর্থই দিচ্ছে না, প্রাণও দিচ্ছে। অবস্থা বেগতিক দেখে পাশ্চাত্য এখন ভিন্ন স্ট্রাটেজী নিয়েছে। সেটি শুধু গণহত্যা নয়। নিছক নগর-বন্দর, ঘরবাড়ী এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের বিনাশও নয়। বরং সেটি ইসলামি দর্শন ও সংস্কৃতি ধ্বংসের। তাই শুরু করেছে প্রকান্ড আকারের সাংস্কৃতিক যুদ্ধ। নতুন এ স্ট্রাটেজীর আলোকে ইরাক ও আফগানিস্তানে তারা শুধু মানুষ হত্যাই করছে না,ঈমান হত্যাতে তৎপরহয়েছে। এবং সেটি শুধু আফগানিস্তান ও ইরাকে সীমিত নয়। বাংলাদেশের ন্যায় প্রতিটি মুসলিম দেশই এখন একই রূপ সাংস্কৃতিক যুদ্ধের শিকার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের লক্ষ্য, মুসলমানদের জীবন থেকে জিহাদের সংস্কৃতি বিলুপ্ত করা। সে লক্ষ্যে ইসলামি আদর্শকে ভূলিয়ে দেওয়া। তেমন এক স্ট্রাটেজী নিয়ে ব্রিটিশগণ ভারতে আলিয়া মাদ্রাসা খুলেছিল। আর এখন সে কাজে বাংলাদেশে ব্যবহার করতে চায় জনগণের অর্থে প্রতিষ্ঠিত স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়। সে সাথে ইসলামের বিরুদ্ধে শুরু হয়েছে ব্যাপক মিথ্যা-প্রপাগান্ডা। বলতে চায়, ইসলাম এ যুগে অচল। শরিয়তকে বলছে মানবতা বিরোধী। সে প্রপাগান্ডাকে ব্যাপকতর করতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে বহু টিভি চ্যানেল, অসংখ্য পত্র-পত্রিকা এবং হাজার হাজার এনজিও। এদের সম্মিলিত প্রচেষ্ঠা হলো, নবীজী (সাঃ)র আমলের ইসলামকে জনগণের মন থেকে ভূলিয়ে দেওয়া। অথচ ইসলাম থেকে নামায-রোযাকে যেমন আলাদা করা যায় না, তেমনি আলাদা করা যায় না জিহাদকেও। পবিত্র কোরআনে জিহাদে অংশ নেওয়ার নির্দেশ এসেছে বার বার। সে সব জিহাদে অর্ধেকের বেশী সাহাবা শহীদ হয়েছেন। নবীজী (সাঃ) নিজে রক্তাক্ষয়ী বহুযুদ্ধ লড়েছেন বহুবার। ইসলামের বহু শত্রুকে হত্যা এবং বনু কুরাইজা ও বনু নাযির ন্যায় ইহুদী বস্তিকে নির্মূল করা হয়েছে তাঁরই নির্দেশে। অথচ নবীজী (সাঃ)র সে আপোষহীন নীতি ও ইসলামের সে সংগ্রামী ইতিহাসকে তারা সুপরিকল্পিত ভাবে আড়াল করতে চায়। নামায-রোযা, হজ-যাকাতের বাইরেও শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি, প্রশাসন, প্রতিরক্ষা ও আইন-আদলতের সংস্কারে ঈমানদারের যে গুরুতর দায়ভার রয়েছে সেটিকেও ভূলিয়ে দিতে চায়।

ইসলামের আক্বিদা-বিশ্বাস ও জিহাদী সংস্কৃতি আজ এভাবেই দেশে দেশে শত্রুপক্ষের হামলার শিকার। তাদের লক্ষ্য, মহান আল্লাহর কোরআনী নির্দেশের বিরুদ্ধে মুসলমানদেরকে বিদ্রোহী করা। বাংলাদেশের মুসলমানদের জন্য বিপদের কারণ হলো, এরূপ হামলার মুখে দেশটির ভৌগলিক সীমান্তের ন্যায় সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক সীমান্তও আজ অরক্ষিত। অথচ মুসলমানদের দায়িত্ব শুধু দেশের সীমান্ত পাহারা দেওয়া নয়। বরং অতিগুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো, চেতনার রাজ্য পাহারা দেওয়া। এবং সেটি সুস্থ্য ঈমান-আক্বিদা ও ইসলামি সংস্কৃতি গড়ে তোলার স্বার্থে। সীমান্ত পাহারায় অবহেলা হলে অনিবার্য হয় পরাজয় ও গোলামী। তখন বিপন্ন হয় জানমাল ও ইজ্জত-আবরু। যেমনটি ১৯৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে হয়েছিল। সে পরাজয়ের ফলেই মুসলমানদের জীবনে নেমে এসেছিল ১৯০ বছরের ঔপনিবেশিক শাসনের দাসত্ব। একই রূপ ভয়ানক পরিণতি নেমে আসে সাংস্কৃতিক ময়দান অরক্ষিত হলে। তখন অসম্ভব হয় সুস্থ্য ঈমান-আক্বিদা নিয়ে বেড়ে উঠা। আর মুসলমানের কাছে জানমালের চেয়ে ঈমান ও আক্বিদার গুরুত্ব কি কম? ঈমান নিয়ে বাঁচা অসম্ভব হলে অর্থহীন হয় জীবনে বাঁচাটাই। সে বাঁচা তখন অনিবার্য করে জাহান্নামের আযাব। ভৌগলিক সীমান্তকে সুরক্ষিত করার চেয়েও তাই গুরুত্বপূর্ণ হলো ঈমান-আক্বিদার এ সীমান্তকে সুরক্ষিত করা। কারণ শয়তানী শক্তির সবচেয়ে বিনাশী হামলা হয় চেতনার এ মানচিত্রে। এটি অধিকৃত হলে দেশ দখল অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। প্রতিটি ঈমানদারকে তাই সে হামলার বিরুদ্ধে লাগাতর জিহাদ করতে হয়। সশস্ত্র যুদ্ধের রণাঙ্গন থেকে অন্ধ-বধির বা পঙ্গু ব্যক্তির নিষ্কৃতি আছে। কিন্তু চেতনার মানচিত্রে শয়তানী শক্তির আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক হামলার বিরুদ্ধে যে লাগাতর জিহাদ তা থেকে সামান্য ক্ষণের নিষ্কৃতি নেই। এ জিহাদকেই ইসলামে ‌জিহাদে আকবর বা শ্রেষ্ঠ জিহাদ বলা হয়েছে। রাজনৈতিক বা সামরিক ক্ষেত্রের লড়াইটি আসে তার পড়ে। বদর, ওহুদ ও খন্দকের যুদ্ধের আগে তেরটি বছর ধরে এ জিহাদ লাগাতর চলেছে মক্কায়। মুসলমানের চেতনা রাজ্যের ময়দানকে সুরক্ষিত রাখার স্বার্থেই অপরিহার্য হলো মুসলিম ভূমির ভৌগলিক মানিচিত্রকে সুরক্ষিত করা।

শুধু ঘরবাঁধা, চাষাবাদ করা বা কলকারখানা গড়াই একটি জনগোষ্টির বেঁচে থাকার জন্য সবকিছু নয়। শুধু পনাহারে জীবন বাঁচে বটে, তাতে ঈমান বাঁচে না। এমন বাঁচার মধ্য দিয়ে সিরাতুল মোস্তাকিমও জোটে না। তখন যা জুটে তা হলো পথভ্রষ্টতা। সে পথভ্রষ্টতায় বিপদাপন্ন হয় শুধু পার্থিব জীবনটাই নয়, অনন্ত অসীম কালের আখেরাতের জীবনও। ইহকাল ও পরকাল বাঁচাতে এজন্যই একজন চিন্তাশীল মানুষকে বেড়ে উঠতে হয় জীবন-বিধান, মূল্যবোধ, জীবন ও জগত নিয়ে একটি সঠিক ধারণা নিয়ে। মুসলমানের কাছে সে জীবন-বিধান হলো ইসলাম। আর নিত্যদিনের বাঁচবার সে প্রক্রিয়া হলো ইসলামী সংস্কৃতি। নামায-রোযা, হজ-যাকাত এবং জিহাদ হলো একজন ঈমানদারের ইবাদতের প্রক্রিয়া। আর সংস্কৃতি হলো এ জগতে বাঁচবার বা জীবনধারনের প্রক্রিয়া। ইসলামি পরিভাষায় এ প্রক্রিয়া হলো তাহজিব। আরবী ভাষায় তাহজিবের অর্থ হলো, ব্যক্তির কর্ম,রুচী, আচার-আচারণ, পোষাক-পরিচ্ছদ ও সার্বিক জীবন যাপনের প্রক্রিয়ায় পরিশুদ্ধি করণের প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মানুষ রিফাইনড হয় তথা সুন্দরতম হয়। দিন দিন সুন্দরতম হয় তার রুচীবোধ, আচার-আচরণ, কাজকর্ম ও চরিত্র। তাই মুসলমানের ইবাদত ও সংস্কৃতি -এ দুটোকে পৃথক করা যায় না। উভয়ের মধ্যেই প্রকাশ পায় আল্লাহতায়ালার কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়া গভীর প্রেরণা ও প্রচেষ্টা। পাখি যেমন তার দুটো ডানার একটিকে হারালে উড়তে পারে না, ঈমানদারও তেমনি আল্লাহর ইবাদত ও ইসলামী সংস্কৃতিও একটি হারালে মুসলমান রূপে বেড়ে উঠতে পারে না। তাই মুসলমানগণ যেখানে রাষ্ট্র গড়েছে সেখানে শুধু মসজিদ-মাদ্রাসাই গড়েনি, ইসলামি সংস্কৃতিও গড়েছে। একটির পরিশুদ্ধি ও শক্তি আসে অপরটি থেকে। মোমেনের মূল্যবোধ, রুচী্বোধ, পানাহার, পোষাকপরিচ্ছদ, অপরের প্রতি ভালবাসার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় তার আল্লাহভীরুতা। অন্যের কল্যাণে সচেষ্ট হয় স্বার্থ চেতনায় নয়, বরং আল্লাহর কাছে প্রিয়তর হওয়ার চেতনায়। এ হলো তার সংস্কৃতি। এমন সংস্কৃতি থেকে সে পায় ইবাদতের স্পিরিট। ঈমানদারে চিন্তুা ও কর্মে এভাবেই আসে পবিত্রতা -যা একজন কাফের বা মোনাফিকের জীবনে কল্পনাও করা যায় না। মুসলিম সমাজে এভাবেই আসে শান্তি, শৃঙ্খলা ও শ্লিলতা। অথচ সেকুলার সমাজে সেটি আসে না। সেকুলার সমাজে যেটি প্রবলতর হয় সেটি পার্থিব স্বার্থ হাসিলের প্রেরণা। মানুষ এখানে জীবনের উপভোগে স্বেচ্ছাচারি হয়। সে স্বেচ্ছারকে তারা ব্যক্তি-স্বাধীনতার লেবাস পড়িয়ে জায়েজ করে নিতে চায়। সেকুলার সমাজে পতিতাবৃত্তি, ব্যভিচার, সমকামিতা, অশ্লিলতা, মদ্যপাণের ন্যায় নানাবিধ পাপাচার বৈধ্যতা পায় তো জীবন উপভোগের এমন স্বেচ্ছাচারি প্রেরণা থেকেই। ফলে সেকুলারিজম যেখানে প্রবলতর হয় সেখানে পাপাচারেও প্লাবন আসে।

অথচ মুসলমান ইবাদতে প্রেরণাও পায় তার সংস্কৃতি থেকে। ফলে স্কুল-কলেজ বা মাদ্রাসায় না গিয়েও মুসলিম সমাজে বসবাসকারি যুবক তাই মসজিদে যায়, নামায পড়ে, রোযা রাখে এবং মানুষের কল্যাণ সাধ্যমত চেষ্টাও করে। সীমান্তের প্রতিরক্ষায় বা শরিয়তের প্রতিষ্ঠায় জিহাদের ময়দানেও হাজির হয়। একাজে শুধু শ্রম-সময়-মেধা নয়, জানমালের কোরবানীও দেয়। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বা মাদ্রাসার ডিগ্রিধারি না হয়েও নিজেকে বাঁচায় বেপর্দা, ব্যাভিচার, অশ্লিলতা,চুরি-ডাকাতি, সন্ত্রাস-কর্ম ও নানা বিধ পাপাচার থেকে। প্রাথমিক কালের মুসলমানগণ যে মানব-ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সভ্যতার জন্ম দিতে পেরেছিলেন সেটি এজন্য নয় যে সেদিন বড় বড় কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বা মাদ্রাসা ছিল। বরং তখন প্রতিটি ঘর পরিণত হয়েছিল শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠান। সমগ্র রাষ্ট্র জুড়ে গড়ে উঠেছিল ইসলামী সংস্কৃতির বিশুদ্ধকরণ প্রক্রিয়া। সে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সেদিনের মুসলমানেরা উন্নত মানব রূপে বেড়ে উঠতে পেরেছিলেন।

বাংলাদেশের ন্যায় অধিকাংশ মুসলিম দেশের আজকের বড় সমস্যা এ নয় যে, দেশগুলি অধিকৃত হয়েছে। বরং সবচেয়ে বড় সমস্যা এবং সে সাথে ভয়ানক বিপদের কারণ হলো,দেশগুলির সাংস্কৃতিক সীমান্ত বিলুপ্ত হয়েছে এবং তা অধিকৃত হয়েছে ইসলামের শত্রুপক্ষের দ্বারা। দেশের সীমান্ত বিলুপ্ত না হলেও মুসলিম দেশগুলির সংস্কৃতির ময়দান শত্রু পক্ষের দখলে গেছে। ফলে এদেশগুলিতেও তাই হচ্ছে যা কাফের কবলিত একটি দেশে হয়ে থাকে। মুসলিম দেশের সংস্কৃতিও পরিনত হয়েছে মানুষকে আল্লাহর অবাধ্য রূপে গড়া তোলার ইন্সটিটিউশনে। এর ফলে বাংলাদেশের হাজার হাজার মুসলিম সন্তান মসজিদে না গিয়ে হিন্দুদের ন্যায় মঙ্গলপ্রদীপ হাতে নিয়ে শোভাযাত্রা করছে। কপালে তীলক পড়ছে, নাচগানও করছে। যুদ্ধাংদেহী রূপ তাদের শরিয়তের প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে।

ব্যক্তির জীবনে প্রতিটি পাপ, প্রতিটি দুর্বৃত্তি, আল্লাহর হুকুমের প্রতিটি অবাধ্যতাই হলো আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। সে বিদ্রোহ ও অবাধ্যতা প্রকাশ পায় বেপর্দা, ব্যাভিচার, অশ্লিলতা, মদ্যপান, মাদকাশক্তি, সন্ত্রাস, দূর্নীতি ইত্যাদীর ব্যাপক বৃদ্ধিতে। জাতীয় জীবনে সেটি প্রকাশ পায় দেশে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা, সূদমূক্ত ব্যাংক ও অর্থনীতি প্রতিষ্ঠিত না হওয়ার মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের মত একটি মুসলিম দেশ আল্লাহর বিরুদ্ধে সে বিদ্রোহে সমগ্র বিশ্বমাঝে একবার নয়, ৫ বার শিরোপে পেয়েছে। সে বিদ্রোহ ঘটেছে আল্লাহ-প্রদির্শিত সুনীতির স্থলে দূর্নীতির মধ্য দিয়ে। এরূপ বার বার শিরোপা লাভই বলে দেয় দেশটির মানুষের জীবনযাত্রার প্রক্রিয়া বা সংস্কৃতি কতটা অসুস্থ্য ও বিদ্রোহাত্মক।

ব্যক্তির সংস্কৃতির পরিচয় মেলে কীভাবে পোষাক-পরিচ্ছদ পড়লো বা পানাহার করলো তা থেকে নয়। বরং কীরূপ দর্শন বা চেতনা নিয়ে সে বাঁচলো তা থেকে। সংস্কৃতির মূল উপাদান হলো এটি। দর্শনই মানুষকে পশু থেকে পৃথক করে। নাচগান পশুপাখিও করে। কিন্তু তাতে কোন দর্শন থাকে না। তাই পশুপাখির নাচে-গানে কোন সমাজই সভ্যতর হয় না, সেখানে সভ্যতাও নির্মিত হয় না। তাই যে সমাজের সংস্কৃতি যতটা দর্শন-শূন্য সমাজ ততটাই মানবতা বর্জিত। সে সমাজ তখন ধাবিত হয় পশুত্বের দিকে। দর্শনই নির্ধারণ করে দেয় কে কীভাবে বাঁচবে, কীভাবে পানাহার করবে, কীভাবে জীবন যাপন করবে বা উৎসব করবে সেটি। চেতনার এ ভিন্নতার কারণেই একজন পতিতা, ঘুষখোর, সন্ত্রাসী এবং দুর্বৃত্তের বাঁচার ধরণ,পোষাক-পরিচ্ছদ, পানাহার ও উৎসবের ধরণ ঈমানদারের মত হয় না। মুসলমানের সংস্কৃতি এজন্যই অবিশ্বাসী বা কাফেরের সংস্কৃতি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। একটি বিশেষ বিশ্বাস বা দর্শন জন্ম দেয় একটি বিশেষ রুচী ও সে রুচীভিত্তিক অভ্যাস। সে অভ্যাসের কারণেই ব্যক্তি বেড়ে উঠে সে সংস্কৃতির মানুষ রূপে। সংস্কৃতি এভাবেই সমাজে নীরবে কাজ করে। মুসলিম সমাজ থেকে সৎ নামাযী ও রোযাদারের পাশাপাশী আপোষহীন মোজাহিদ বের হয়ে আসে তা তো সংস্কৃতির সে ইন্সটিটিউশন সক্রিয় থাকার কারণেই। যেখানে সেটি নেই, বুঝতে হবে সেখানে সে পূণ্যময় সংস্কৃতিও নাই।

মুসলমানদের শক্তির মূল উৎস তেল-গ্যাস নয়, জনশক্তিও নয়। সে শক্তি হলো কোরআন ভিত্তিক দর্শন ও সে দর্শন-ভিত্তিক সংস্কৃতি। এজন্যই শত্রুপক্ষের আগ্রাসনের শিকার শুধু মুসলিম দেশের ভূগোল নয়, বরং মূল টার্গেট হলো ইসলামি দর্শন ও সংস্কৃতি। তাই পাশ্চাত্য শক্তিবর্গ বাংলাদেশের মত দেশে বোমা বা যুদ্ধ বিমান নিয়ে হাজির হয়নি। হাজির হয়েছে সাংস্কৃতিক প্রকল্প নিয়ে। বাংলাদেশের হাজার হাজার এনজিওর উপর দায়িত্ব পড়েছে সে প্রকল্পকে কার্যকর করা। দেশের সংস্কৃতিকে তারা এভাবে ইসলামের শিক্ষা ও দর্শন থেকে মূ্ক্ত করতে চাচ্ছে। রাস্তায় মাটি কাটা ও তূত গাছ পাহাড়া দেওয়াকে মহিলার ক্ষমতায়ন বলে এসব এনজিওগুলো তাদেরকে বেপর্দা হতে বাধ্য করছে। অপর দিকে মাইক্রোক্রেডিটের নামে সাধারণ মানুষকে সূদ দিতে ও সূদ খেতেও অভ্যস্থ করছে। অথচ সূদ খাওয়া বা সূদ দেওয়া –উভয়ই হলো আল্লাহতায়ালার বিধানের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট বিদ্রোহ। ডক্টর ইউনুসকে পাশ্চাত্য মহল নোবেল প্রাইজ দিয়েছে। সেটি এজন্য নয় যে, বাংলাদেশ থেকে তিনি দারিদ্র্য নির্মূল করেছেন। বরং দেশে যতই বাড়ছে গ্রামীন ব্যাংক, ব্রাক বা সূদ ভিত্তিক মাইক্রোক্রেডিট এনজিওর শাখা ততই বাড়ছে দারিদ্র্য। ডক্টর ইউনুস নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন এজন্য যে, আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে বিদ্রোহ করতে তিনি অসামান্য সাফল্য দেখিয়েছেন।

ইসলামের বিরুদ্ধে পাশ্চাত্যের চলমান যুদ্ধের মূল এজেন্ডা কি সেটি বুঝা যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের আফগানিস্তান দখল ও সেখানে চলমান কার্যক্রম থেকে। পাশ্চাত্য শক্তিবর্গ সেখানে মুসলিম সংস্কৃতির বিনাশে হাত দিয়েছে। আফগানিস্তানের অপরাধ, অতীতে দেশটির জনগণ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও সোভিয়েত সাম্রাজ্যবাদের ন্যায় দুটি বিশ্বশক্তিকে পরাজিত করেছে। এবং সেটি কোন জনশক্তি, সামরিক শক্তি বা অর্থনৈতিক শক্তির বলে নয়, বরং ইসলামি দর্শন ও সে দর্শন-নির্ভর আপোষহীন জিহাদী সংস্কৃতির কারণে। সে অভিন্ন দর্শন ও দর্শনভিত্তিক সংস্কৃতির বলেই তারা আজ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার মিত্রদের পরাজিত করতে চলেছে। ফলে পাশ্চাত্য শক্তিবর্গ সে দর্শন ও সে দর্শন-ভিত্তিক সংস্কৃতির নির্মূলে করতে চায়। এবং সে বিনাশী কর্মের পাশাপাশি বিপুল বিণিয়োগ করছে সেদেশে সেকুলার দর্শন ও সেকুলার সংস্কৃতির নির্মানে। এটিকে তারা বলছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বা অবকাঠামোর নির্মান। পরিকল্পিত ভাবে গড়ে তুলছে অসংখ্য সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। এগুলোর কাজ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা আজ যা করছে সেগুলোকেই অব্যাহত রাখা।

বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মিশরের মত দেশে অতীতে এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সফলতা পেয়েছিল ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকেরা। এদেশগুলির উপর তাদের দীর্ঘ শাসনমামলে তেমন কোন শিল্প কলকারখানা বা প্রযুক্তি গড়ে না উঠলেও তারা সেসব দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে সেকুলার করেছিল। ফলে এনেছে সাংস্কৃতিক জীবনে প্রচন্ড বিচ্যুতি ও বিভ্রান্তি। সেকুলারলিজমের অভিধানিক অর্থ হলো ইহজাগতিকতা। সেকুলারিজমের অর্থ, ব্যক্তি তার কাজ-কর্ম, অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে প্রেরণা পাবে ইহজাগতিক আনন্দ-উপভোগের তাগিদ থেকে, ধর্ম থেকে নয়। এ উপভোগ বাড়াতেই সে নাচবে, গাইবে, বেপর্দা হবে, অশ্লিল নাটক ও ছায়াছবি দেখবে। সে মদ্যপান করবে এবং ব্যাভিচারিতেও লিপ্ত হবে। উপার্জন বাড়াতে সে সূদ খাবে এবং ঘুষও খাবে। এগুলো ছাড়া তাদের এ পার্থিব জীবন আনন্দময় হয় কি করে? তাই সেকুলারিজম বাড়লে এগুলো বাড়বে অনিবার্য কারণেই। অপর দিকে ধর্মের প্রতি আসক্তিকে বলেছে মৌলবাদী পশ্চাদ-পদতা ও গোঁড়ামী।

মুসলিম দেশে এমন চেতনা ও এমন সংস্কৃতির বৃদ্ধি পেলে জনগণের মন থেকে আল্লাহতায়ালার ভয়ই বিলুপ্ত হয়। মুসলমানগণ তখন ভূলে যায় নিজেদের ঈমানী দায়বদ্ধতা। বরং বাড়ে মহান আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের প্রবনতা। ফলে বাংলাদেশ, মিশর, পাকিস্তান বা তুরস্কের মত দেশে আল্লাহর আইন তথা শরিয়ত প্রতিষ্ঠা রুখতে কোন কাফেরকে অস্ত্র ধরতে হয়নি। সেকাজের জন্য বরং মুসলিম নামধারি সেকুলারগণই যথেষ্ঠ করিৎকর্মা প্রমাণিত হয়েছে। ইসলামের জাগরণ ও মুসলিম শক্তির উত্থান রুখার লক্ষ্যে আজও দেশে দেশে পাশ্চত্যের অনুগত দাস গড়ে তোলার এটিই সফল মডেল। মার্কিন দখলদার বাহিনী সেটিরই বাস্তবায়ন করছে আফগানিস্তানে। এ স্ট্রাটেজীক কৌশলটির পারঙ্গমতা নিয়ে ব্রিটিশ শাসকচক্রের মনে কোন রূপ সন্দেহ ছিল না। যেখানে অধিকার জমিয়েছে সেখানেই এরূপ সেকুলারদেরকেই সযত্নে গড়ে তুলেছে। তাদের সংখ্যা পর্যাপ্ত সংখ্যায় বাড়াতে যেখানে দেরী হয়েছে সেদেশের স্বাধীনতা দিতেও তারা বিলম্ব করেছে। সে ব্রিটিশ পলিসির পরিচয়টি মেলে মিশরে ব্রিটিশ শাসনের প্রতিনিধি লর্ড ক্রোমারের লেখা থেকে। তিনি লিথেছেন, “কোন ব্রিটিশ উপনিবেশকে স্বাধীনতা দেওয়ার প্রশ্নই উঠেনা যতক্ষণ না সে দেশে এমন এক সেকুলার শ্রেণী গড়ে উঠে যারা চিন্তা-চেতনায় হবে ব্রিটিশের অনুরূপ।” ব্রিটিশ পলিসি যে এক্ষেত্রে কতটা ফলপ্রসু হয়েছে তার প্রমাণ মিলে বাংলাদেশের মত সাবেক ব্রিটিশ উপনিবেশগুলোর প্রশাসন, রাজনীতি, সেনাবাহিনী ও বিচার ব্যবস্থায় সেকুলার ব্যক্তিদের প্রবল আধিপত্য দেখে। আজও আইন-আদালতে ব্রিটেশের প্রবর্তিত পেনাল কোড। বাংলাদেশের সেকুলার সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাগণ মুসলিম দেশের জনগণের রাজস্বের অর্থে প্রতিপালিত হলে কি হবে, দেশে যারা শরিয়ত বা আল্লাহর আইনের প্রতিষ্ঠা চায় তাদেরকে তারা ব্রিটিশদের ন্যায়ই শত্রু মনে করে। আর বিশ্বস্থ্য আপনজন মনে করে ভিন্ দেশী কাফেরদের। এদের কারণেই অধিকৃত  মুসলিম দেশে হামিদ কারজাইয়ের মত দাস পেতে ইসলামের শত্রুপক্ষের কোন বেগ পেতে হয় না।

ইসলামি দর্শন থেকে দূরে সরানো এবং মগজে সেকুলার চেতনার পরিচর্যা দেওয়ার লক্ষে বাংলাদেশের মত দেশে সেকুলার দিনক্ষণকে ইতিহাস থেকে খুঁজে বের করে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দিচ্ছে। এরই উদাহরণ, বাংলাদেশের মত দেশে বসন্তবরণ বা নববর্ষের দিন উদযাপন। নবীজীর হাদীস, মুসলমানের জীবনে বছরে দুটি উৎসব। একটি ঈদুল ফিতর, এবং অপরটি ঈদুল আদহা বা কোরবানীর ঈদ। বাংলার মুসলমানগণ এ দুটো দিনই এতদিন ধুমধামে উদযাপন করে আসছে। বাংলার মুসলমানদের জীবনে নববর্ষের উৎসব কোন কালেই গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। এর কারণ, তাদের ভিন্নতর বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি যা একজন কাফের বা সেকুলার থেকে ভিন্ন। মুসলমানের জীবনে সে ভিন্নতর মূল্যায়ন আসে এ জীবন নিয়ে মহান আল্লাহর নিজস্ব মূল্যায়ন থেকে। এ বিষয়ে মহান আল্লাহর নিজস্ব ঘোষণাটি হলো, “তিনিই (আল্লাহতায়ালা) জীবন ও মৃত্যুকে সৃষ্টি করেছেন যেন পরীক্ষা করতে পারেন তোমাদের মধ্যে কে কর্মে উত্তম।” -সুরা মুলুক। অর্থাৎ মানুষের জন্য এ পার্থিব জীবন পরীক্ষার হল মাত্র। পরীক্ষার হলে বসে কেউ কি নাচগান করে না। উৎসবও বসায় না। নাচগান বা উৎসবের আয়োজন তো পরীক্ষার হলে মনযোগী হওয়াই অসম্ভব করে তোলে। এব্যাপারে নবীজীর হাদীস, “পানি যেমন শস্য উৎপাদন করে, গানও তেমনি মুনাফেকি উৎপন্ন করে।” প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের হাতে মুসলমানদের শক্তি ও মর্যাদা বাড়লেও নাচগান বাড়েনি। সংস্কৃতির নামে এগুলো শুরু হলে যেটি বাড়ে তা হলো পথভ্রষ্টতা। তখন সিরাতুল মোস্তাকিমে পথচলাই অসম্ভব হয়ে উঠে। তাই এগুলো শয়তানের স্ট্রাটেজী হতে পারে, কোন মুসলমানের নয়।

নতুন বছর, নতুন মাস, নতুন দিন নবীজী(সাঃ)র আমলেও ছিল। কিন্তু তা নিয়ে তিনি নিজে যেমন কোনদিন উৎসব করেননি, সাহাবাগণও করেননি। অথচ তারাই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা ও সংস্কৃতি গড়তে পেরেছিলেন। নবীজী (সাঃ) ও সাহাবাগান এ ব্যাপারে অতিশয় মনযোগী ছিলেন যেন শিক্ষা ও সংস্কৃতির নামে সমাজ বা রাষ্ট্রে এমন কিছুর চর্চা না হয় যাতে সিরাতুল মোস্তাকিমে চলাই অসম্ভব হয়। এবং মনযোগে ছেদ পড়ে ধর্মের পথে পথচলায়। ড্রাইভিং সিটে বসে নাচগানে মত্ত হলে সঠিক ভাবে গাড়ী চালানো যায়? এতে বিচ্যুতি ও বিপদ তো অনিবার্য। অবিকল সেটি ঘটে জীবন চালোনার ক্ষেত্রেও। নবীজী(সাঃ)র আমলে সংস্কৃতির নামে আনন্দ উপভোগের প্রতি এত আকর্ষণ ছিল না বলেই সিরাতুল মোস্তাকিমে চলা তাদের জন্য সহজতর হয়েছিল। বরং তারা জন্ম দিয়েছিলেন মানব-ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম সংস্কৃতির। সে সংস্কৃতির প্রভাবে একজন ভৃত্যও খলিফার সাথে পালাক্রমে উঠের পিঠে চড়েছেন। এবং খলিফা ভৃত্যকে উঠের পিঠে বসিয়ে নিজে রশি ধরে টেনেছেন। সমগ্র মানব ইতিহাসে এর কোন তুলনা নেই। অথচ বাংলাদেশে আজ সংস্কৃতির নামে কি হচ্ছে? ২০১০ সালে এপ্রিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা নববর্ষের কনসার্টে কী ঘটলো? যৌন ক্ষুধায় অতি উদভ্রান্ত অসংখ্য হায়েনা কি সেদিন নারীদের উপর ঝাপিয়ে পড়িনি? অসংখ্য নারী কি সেদিন লাঞ্ছিত হয়নি? কিছুদিন আগে ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে ব্যান্ড সঙ্গীতের আসরে কী ঘটলো? শত শত নারী কি সেদিন ধর্ষিতা হয়েছিল শত শত নারী। এটিই কি বাঙালী সংস্কৃতি? দেশের সেকুলার পক্ষ এমন সংস্কৃতির উৎকর্ষতা চায়?

নববর্ষ উদযাপনের নামে নারী-পুরুষদের মুখে উলকি কেটে বা নানান সাজে একত্রে রাস্তায় নামানোর রীতি কোন মুসলিম সংস্কৃতি নয়। বাঙালীর সংস্কৃতিও নয়। এমনকি বাঙালী হিন্দুদেরও নয়। নববর্ষে নামে বাংলায় বড়জোর কিছু হালখাতার অনুষ্ঠান হতো। কিন্তু কোন কালেই এদিনে কনসার্ট গানের আয়োজন বসেনি। জন্তু-জানোয়ারের প্রতিকৃতি নিয়ে মিছিলও হয়নি। পাশ্চাত্যেও নববর্ষের দিনে এমন উৎসব দিনভর হয় না। বাংলাদেশে এগুলীর এত আগমন ঘটেছে নিছক রাজনৈতিক ও আদর্শিক কারণে। যুদ্ধজয়ের লক্ষ্যে অনেক সময় নতুন প্রযুক্তির যুদ্ধাস্ত্র সৈনিকদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। অনেক সময় তাতে বিজয়ও আসে। মুসলমানদের বিরুদ্ধে পরিচালিত এ সাংস্কৃতিক যুদ্ধে সংস্কৃতির নামে এসব অভিনব আয়োজন বাড়ানো হয়েছে তেমনি এক ত্বড়িৎ বিজয়ের লক্ষ্যে। তাদের লক্ষ্য নাচ-গান, কনসার্টের নামে জনগণকে ইসলাম থেকে দূরে সরানো। বিপুল সংখ্যক নারী-পুরুষ নিয়ে নতুন ঢংযের এসব আয়োজন বাড়ানো হয়েছে তেমনি এক ষড়যন্ত্রমূলক প্রয়োজনে। পাশ্চাত্যের যুবক-যুবতীদের ধর্ম থেকে দূরে টানার প্রয়োজন নেই। জন্ম থেকেই তারা ধর্ম থেকে দূরে। নাচগান, মদ, অশ্লিলতা, উলঙ্গতা ও ব্যভিচারের মধ্য দিয়েই তাদের বেড়ে উঠা। তাই নববর্ষের নামে তাদের মাঝে এ সবে অভ্যস্থ করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু সেটির প্রয়োজন রয়েছে বাংলাদেশে। সেটি ধর্ম থেকে ও নিজেদের সংস্কৃতি থেকে দূরে সরানোর লক্ষ্যে। এসবের চর্চা বাড়াতে কাজ করছে প্রচুর দেশী-বিদেশী এনজিও। এমন অনুষ্ঠানে বিপুল অর্থ ব্যয়ও হচ্ছে। এবং সে অর্থ আসছে বিদেশীদের ভান্ডার থেকে। এভাবে নারীপুরুষের অবাধ মেলামেশার পাশপাশি অশ্লিলতারও সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এবং লুপ্ত করা হচেছ ব্যভিচার ও অশ্লিলতাকে ঘৃণা করার অভ্যাস, -যা পাশ্চাত্য থেকে বহু আগেই বিলুপ্ত হয়েছে।

শুধু বাংলাদেশে নয়, অন্যান্য মুসলিম দেশেও এরূপ নববর্ষ পালনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অধিকাংশ পাশ্চাত্য দেশ বিপুল অংকের অর্থ সাহায্য দিচ্ছে। ইরানী-আফগানী-কিরগিজী-কুর্দীদের নওরোজ উৎসবের দিনে প্রেসিডেন্ট ওবামা বিশেষ বানীও দিয়েছে। তবে নববর্ষের নামে বাংলাদেশে ইসলামের শত্রুপক্ষের বিণিয়োগের মাত্রাটি আরো বিচিত্র ও ব্যাপক। এখানে বানী নয়, আসছে বিপুল বিণিয়োগ। কারণ, বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৫ কোটি। আফগানিস্তানের চেয়ে প্রায় ৫ গুণ। জনসংখ্যার ৯০% ভাগ মুসলমান, যাদের আপনজনেররা ছড়িয়ে আছে ব্শ্বিজুড়ে। ফলে এদেশে ইসলামের দর্শন প্রচার পেলে তা ছড়িয়ে পড়বে বিশ্বময়। এ বিশাল জনগণকে ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে সেকুলার সংস্কৃতিতে বশ করানো তাদের কাছে তাই অতিগুরুত্বপূর্ণ। তারা চায় এ পৃথিবীটা একটি মেল্টিং পটে পরিণত হোক। আলু-পটল, পেঁয়াজ-মরিচ যেমন চুলার তাপে কড়াইয়ে একাকার হয়ে যায়, তেমনি বিশ্বের সব সংস্কৃতির মানুষ একক সংস্কৃতির মানুষের পরিণত হোক। এভাবে নির্মিত হোক গ্লোবাল ভিলেজ। আর সে গ্লোবাল ভিলেজের সংস্কৃতি হবে পাশ্চাত্যের সেকুলার সংস্কৃতি। এজন্যই বাংলাদেশে নারী-পুরুষকে ভ্যালেন্টাইন ডে, বর্ষপালন,মদ্যপান, অশ্লিল নাচ, পাশ্চাত্য ধাঁচের কনসার্টে অভ্যস্থ করায় এসব এনজিওদের এত আগ্রহ। তারা চায় তাদের সাংস্কৃতিক সীমানা বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশের প্রতি বসতঘরের মধ্যেও বিস্তৃত হোক। তাই বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সীমানা আজ বিলুপ্ত।

কিন্তু আরো বিপদের কারণ, এতবড় গুরুতর বিষয় নিয়ে ক’জনের দুশ্চিন্তা? কোন পরিবারে কেউ মৃত্যুশর্যায় পড়লে সে পরিবারে দুশ্চিন্তার অন্ত থাকে না। আর শয্যাশায়ী সমগ্র বাংলাদেশ ও তার সংস্কৃতি। অথচ ক’জন আলেম, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ,শিক্ষাবিদ ও লেখক এ বিষয় নিয়ে উদ্বিগ্ন। ক’জন মুখ খুলেছেন বা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন? ১৭৫৭ সাল থেকে বাংলার মুসলমান কি সামান্যতমও সামনে এগিয়েছে? তখন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ব্রিটিশের দখলদারি। অস্তমিত হয়েছিল বাংলার মুসলমানদের স্বাধীনতা। কিন্তু সে পরাধীনতা বিরুদ্ধে কোন জনপদে, কোন গ্রাম-গঞ্জে কোন রূপ প্রতিরোধ বা বিদ্রোহের ধ্বনি উঠেছিল -সে প্রমাণ নেই। বরং যে যার কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ততা থেকেছে। দেশের স্বাধীনতা নিয়ে কিছু ভাবা বা কিছু করার প্রয়োজনীয়তা কেউ অনুভব করেনি। অথচ শত্রুর হামলার মুখে প্রতিরোধের এ দায়ভার প্রতিটি মুসলমানের। এ কাজ শুধু বেতনভোগী সৈনিকের নয়। প্রতিটি নাগরিকের। ইসলামে এটি জিহাদ। মুসলমানদের গৌরব কালে এজন্য কোন সেনানীবাস ছিল না। প্রতিটি গৃহই ছিল সেনানীবাস। প্রতিটি যুদ্ধে মানুষ স্বেচ্ছায় সেখান থেকে যুদ্ধে গিয়ে হাজির হয়েছে। অথচ আজ সেনানীবাস বেড়েছে অথচ হামলার মুখে কোন প্রতিরোধ নেই। জিহাদ নেই দেশের সাংস্কৃতিক সীমানার রক্ষার কাজেও।

সাংস্কৃতিক সীমানা রক্ষার লড়ায়ে পরাজিত হলে পরাজিত হতে হয় ঈমান-আক্বীদা রক্ষার লড়ায়েও। কারণ, মুসলমানে ঈমান-আক্বীদা কখন অনৈসলামিক সাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে উঠে না। মাছের জন্য যেমন পানি চাই, ঈমান নিয়ে বাঁচার জন্যও তেমনি ইসলামি রাষ্ট্র ও ইসলামি সংস্কৃতি চাই। মুসলমান তাই শুধু কোরআন পাঠ ও নামায-রোযা আদায় শুধু করেনি, ইসলামি রাষ্ট্র এবং সে রাষ্ট্রে শরিয়ত ও ইসলামি সংস্কৃতিরও প্রতিষ্ঠা করেছে। মুসলমানদের অর্থ, রক্ত, সময় ও সামর্থের সবচেয়ে বেশী ভাগ ব্যয় হয়েছে তো ইসলামি রাষ্ট্র ও ইসলামি শিক্ষা-সংস্কৃতির নির্মানে। নামায রোযার পালন তো কাফের দেশেও সম্ভব। কিন্তু ইসলামী শরিয়ত ও ইসলামী সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠা ও পরিচর্যা তথা ইসলামী বিধানের পূর্ণ পালন কি অমুসলিম দেশে সম্ভব? অতীতের ন্যায় আজকের মুসলমানদের উপরও একই দায়ভার। সেটি শুধু কলম-সৈনিকের নয়, প্রতিটি আলেম, প্রতিটি শিক্ষক, প্রতিটি ছাত্র ও প্রতিটি নাগরিকের উপরও। এ লড়ায়ে তাদেরকেও ময়দানে নেমে আসতে হবে। এবং এ লড়াই হতে হবে কোরআনী জ্ঞানের তরবারী দ্বারা। নবীজী (সাঃ)র যুগে সেটিই হয়েছে। ইসলামে জ্ঞানার্জনকে এজন্যই নামায-রোযার আগে ফরয করা হয়েছে। কিন্তু সে ফরয পালনের আয়োজনই বা কোথায়? অনেকেই জ্ঞানার্জন করছেন নিছক রুটিরুজির তালাশে। ফরয আদায়ের লক্ষে নয়। প্রচন্ড শূণ্যতা ও বিচ্যুতি রয়েছে জ্ঞানার্জনের নিয়তেই। ফলে সে জ্ঞানচর্চায় তাদের রুটি-রুজী জুটছে ঠিকই, কিন্তু সে জ্ঞানার্জনে ফরয আদায় হচ্ছে না। এবং জিহাদের ময়দানে বাড়ছে না লোকবল। বাংলাদেশের মুসলমানদের জন্য এটি এক বিপদজনক দিক। আগ্রাসী শত্রুর হামলার মুখে অরক্ষিত শুধু দেশটির রাজনৈতিক সীমান্তুই নয়, বরং প্রচন্ড ভাবে অরক্ষিত দেশের সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক সীমান্তও। দেশ তাই দ্রুত ধেয়ে চলেছে সর্বমুখি পরাজয় ও প্রচন্ড বিপর্যের দিকে।