দেশের শিক্ষাঙ্গণ ও শিক্ষানীতির নাশকতা

ইন্ডাস্ট্রি দুর্বৃত্ত উৎপাদনের

শিক্ষাঙ্গণ শুধু জ্ঞানের বিকাশই ঘটায় না; জন্ম দেয় অসত্য-অজ্ঞতা, ঘৃণা-বিদ্বেষ এবং মানবতাধ্বংসী ভয়ানক রুগ্ন ধারণারও। এগুলি পরিণত হতে পারে দুর্বৃত্ত উৎপাদনের বিশাল বিশাল ইন্ডাস্ট্রিতে। স্বৈরাচার, ফ্যসিবাদ, বর্ণবাদ, জাতিয়তাবাদ, উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ এবং কম্যুনিজমের ন্যায় মানবতা-নাশক মতবাদগুলির জন্ম কোন কালেই বনজঙ্গলে হয়নি, বরং হয়েছে শিক্ষাঙ্গনে। এবং এ মতবাদগুলির নাশকতা বিষাক্ত রোগ-জীবাণু ও সুনামী-ভূমিকম্পের চেয়েও অধীক। মানব জাতির সমগ্র ইতিহাসে সবচেয়ে বেশী লোকক্ষয় রোগজীবাণু বা সুনামী-ভূমিকম্পের হাতে হয়নি। সেটি হয়েছে শিক্ষাঙ্গণে বেড়ে উঠা মানবরূপী ভয়ানক দানবদের হাতে। বিগত দুটি বিশ্বযুদ্ধেই তারা সাড়ে সাত কোটি মানুষকে হত্যা করেছে এবং শত শত নগর-বন্দরকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছে। ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদী শাসনকে প্রতিষ্ঠা দিতে এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোতে যারা গতহত্যা ও গণনির্মূলে নেতৃত্ব দিয়েছে তারাও কোন গুহাবাসী ছিল না; তারা শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ পেয়েছে অক্সফোর্ড, কেম্ব্রিজ ও হার্ভাডের ন্যায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। ভারতের বুকে যে কোটি কোটি মানুষ গরুছাগল, শাপ-পেঁচা, পাহাড়-পর্বত ও মুর্তিকে দেবতা মনে করে, তারা কি কোন বন-জঙ্গলের বাসিন্দা? তাদের অনেকে তো কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী। ডিগ্রি নেয়া এবং জ্ঞানী ও বিবেকমান হওয়া যে এক নয় –তার প্রমাণ তো এ নৃশংসতার ইতিহাস।

 

বা্ংলাদেশের ইতিহাসেও এরূপ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাশকতা কি কম? যারা শাপলা চত্ত্বরে মুসল্লিদের উপর গণহত্যা ঘটালো -এরা কি বনে জঙ্গলে বেড়ে উঠেছে? এরাও বেড়ে উঠেছে দেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং সামরিক ও পুলিশ এ্যাকাডেমিগুলিতে। ক’মাস আগে এদেরই দলবদ্ধ ভাবে দেখা গেছে নিরাপদ সড়কের দাবীতে রাস্তায় নামা যায় কিশোরীদের উপর যৌন সন্ত্রাসে। এরাই থার্টি ফার্স্ট নাইটে রাস্তায় নারীদের বিবস্ত্র করে লালসা পূরণ করে। এদেরই একজন নব্বইয়ের দশকে জাহাঙ্গির নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণে সেঞ্চুরীর উৎসব করেছিল। তখন দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন শেখ হাসিনা। একজন নারী সাংবাদিককে চরিত্রহীন বলায় ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেনকে জেলে ঢুকানো হয়েছে। এবং সেটি নারীর সম্ভ্রম রক্ষার নামে। অথচ হাসিনা ধর্ষণে সেঞ্চুরীকারি ছাত্রলীগ নেতাকে শাস্তি না দিয়ে নিরাপদে বিদেশে পাড়ি জমাতে দিয়েছিল।

নাশকতা ঐক্য বিনাশে

ইসলামের মৌলিক চেতনা বিনাশেও কি সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থার নাশকতা কি কম? ইসলাম অতি মৌলিক শিক্ষাটি স্রেফ মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান আনা নয়; বরং ভাষা, বর্ণ, ভূগোল বা অঞ্চলের উর্দ্ধে উঠে মুসলিমদের মাঝে ভাতৃত্বের বন্ধন গড়া। সে সাথে বাধ্যতামূলক হলো মুসলিমদের মাঝে অনৈক্যকে ঘৃণা করা এবং পরিহার করা। নামায-রোযার ন্যায় এটিও ফরজ। পবিত্র কোরআনে মুসলিমদের মাঝে সীসাঢালা অটুল দেয়াল গড়ার হুকুমটি এসেছে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে। সেটি সুরা সাফের ৪ নম্বর আয়াতে। আর যেখানে মহান আল্লাহতায়ালার হুকুম, সেটি অমান্য করলে কি ঈমান থাকে? তাই ভাষা,বর্ণ, অঞ্চলের নামে মুসলিমদের মাঝে বিভক্তি গড়াটি মদপান, জ্বিনা ও মানব হত্যার ন্যায় হারাম। মুসলিমদের মাঝে বিভক্তি গড়লে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে আযাব যে অনিবার্য হয় –সে হুশিয়ারিটিও শোনানো হয়েছে। সে ঘোষণাটি এসেছে সুরা ইমরানের ১০৫ নম্বর আয়াতে। মুসলিমদের উপর আযাবের সে আলামত কি আজ কম?

অথচ ভাষার নামে শুধু বিভক্তি গড়া নয়, বরং খুনোখুনি ও অবাঙালীদের নির্মূল করাটি হলো বাঙালী জাতীয়তাবাদী রাজনীতির মূল কথা। এদিক দিয়ে তাদের ঘনিষ্ট আদর্শিক আত্মীয় হলো মায়ানমারের অসভ্য বার্মীজগণ। জাতীয়তাবাদী এ নৃশংস বর্বরগণ রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে গণহত্যা, ধর্ষণ ও বর্ণবাদী নির্মূলে নেমেছে। একই রূপ জাতীয়তাবাদী বর্বরতায় বাংলার মাটিতে সবচেয়ে অসভ্য কর্মটি ঘটেছে একাত্তরে। তখন হত্যা, ধর্ষণ ও লুণ্ঠনের শিকার হয়েছিল কয়েক লক্ষ বিহারী মুসলিম। তারা ভারত থেকে প্রাণ বাঁচাতে পূর্ব পাকিস্তানে আশ্রয় নিয়েছিল। ব্যক্তির দৈহিক দুর্বলতা জানিয়ে দেয়, তার খাদ্যে পুষ্টির মান ভাল নয়। তেমনি ব্যক্তির চরিত্রহীনতা জানিয়ে দেয়, তার শিক্ষায় রয়েছে প্রচুর কুশিক্ষা। বাংলাদেশ দুর্নীতিতে বিশ্বে ৫ বার শীর্ষ স্থান পেয়েছে তো কুশিক্ষার কারণেই।

বাংলাদেশে সেক্যুলার শিক্ষা নীতির মূল নাশকতাটি স্রেফ এ নয়, এটি বিলুপ্ত করতে পেরেছে মুসলিম মগজ থেকে প্যান-ইসলামিক চেতনা। বরং কেড়ে নিয়েছে নৃশংস বর্বরতাকে ঘৃণা করার সামর্থ্য। কেড়ে নিয়েছে সুনীতি নিয়ে বেড়ে উঠার ঈমানী বল। এজন্যই বাংলা সাহিত্যে বিহারীদের বিরুদ্ধে সংগঠিত নৃশংসতার কোন বিবরণ নেই। লেখা হচ্ছে না শাপলা চত্ত্বরের গণহত্যার বিরুদ্ধেও। একই কারণে বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গণে ধর্ষণে সেঞ্চুরি করার বিষয়টিও ইতিহাস থেকে হারিয়ে গেছে। দেহে একবার রোগ দেখা দিলে বুদ্ধিমান ব্যক্তি তা সারা জীবন মনে রাখে এবং তা থেকে বাঁচার জন্য সব সময় সতর্ক থাকে। বিবেকমান জনগোষ্ঠিও তেমনি নিজদের ইতিহাসের কালো অধ্যায়গুলি ভুলে যায় না, বরং বাঁচিয়ে রাখে তা থেকে ভবিষ্যতে বাঁচার আশায়। নইলে আত্মভোলা সে জনগণের জীবনে বাকশালী স্বৈরাচার ও শাপলা চত্ত্বরের গণহত্যার ন্যায় নৃশংসতাগুলো নিত্যনৈমিত্তিক হয় দাঁড়ায়।

সুশিক্ষা শুধু ঈমানই বাড়ায় না, ঈমানদারদের মাঝে সিমেন্টও লাগায়। ফলে গড়ে উঠে অটুট ঐক্য। অপর দিকে কুশিক্ষা বাড়ায় বিভেদ ও অনৈক্য। গড়ে তোলে বিভক্তির দেয়াল। মুসলিমদের মাঝে অনৈক্য দেখে অন্ততঃ এ বিষয়টি নিশ্চিত বলা যায়, তাদের মাঝে সুশিক্ষা নাই। অথচ সুশিক্ষার কারণেই ইসলামের গৌরবকালে আরব, কুর্দী, তুর্কী, ইরানী ও আফ্রিকান মুসলিমগণ নিজেদের ভাষা ও বর্ণের কথা ভূলে একতাবদ্ধ উম্মাহর জন্ম দিয়েছিল। কিন্ত ইসলামি শিক্ষা থেকে যখনই তারা দূরে সরেছে, তখন শুধু বিভক্তিই বাড়েনি, পরাজয় এবং অপমানও বেড়েছে। একতা ছাড়া অসম্ভব, ইসলামি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। অসম্ভব হয়, শরিয়ত, হুদুদ, একতা ও খেলাফার ন্যায় ইসলামের মূল বিধানগুলির প্রতিষ্ঠা। ব্যর্থ হয়, ইসলামের মূল এজেন্ডার বাস্তবায়ন। যাদের মধ্যে ঈমান আছে তারা শুধু ভিন্ ভাষা, ভিন্ বর্ণ ও ভিন্ এলাকার ঈমানদার মানুষদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এক জামাতে শুধু নামাযই পড়ে না; তারা রাষ্ট্র গড়ে এবং একই রণাঙ্গনে যুদ্ধও করে। এটিই তো ঈমানের লক্ষণ। সে ঈমানের কারণে বাঙালী, পাঞ্জাবী, বিহারী, সিন্ধি, পাঠান, গুজরাতি ও অন্যান্য ভাষার মুসলিমগণ একত্রে মিলে ১৯৪৭’য়ে বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল। সে অভিন্ন চেতনার কারণেই ১৯৭১’য়ে কোন আলেম, পীর বা কোন ইসলামী দল পাকিস্তান ভাঙ্গাকে সমর্থণ করেনি। তাদের কেউ ভারতে গিয়ে সামরিক প্রশিক্ষণও নেয়নি।

ঈমান ও একতার প্রতি আগ্রহ সব সময়ই একত্রে চলে। ঈমান বিলুপ্ত হলে একতাও বিলুপ্ত হয়। তখন ভাষা,বর্ণ ও ভূগোলের নামে বিভক্তির অসংখ্য দেয়াল গড়ে উঠে। জাতীয় রাষ্ট্রের নামে সে বিভক্তির দেয়ালকে সুরক্ষা দেয়া তখন দেশপ্রেম গণ্য হয়। প্রশ্ন হলো, বিভক্তির দেয়াল এবং সে বিভক্তি নিয়ে উৎসব কি ঈমানের লক্ষণ? বরং প্রকৃত ঈমানদারের মনে এরূপ বিভক্তি নিয়ে মাতম উঠবে -সেটিই তো স্বাভাবিক। কিন্তু আজ সে মাতম নাই, বিভক্তি নিয়ে দুঃখবোধও নাই। অথচ মুসলিম জাহানে যখন কোন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না, তখনও একজন নিরক্ষর মুসলিম একতার গুরুত্ব বুঝতো। তাই তখন আরব,ইরানী, তুর্কী, কুর্দী, আফ্রিকান মুসলিম একত্রে যুদ্ধ করেছে। অথচ আজ সেটি অসম্ভব। শিক্ষাব্যবস্থা সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে যে কতটা দূরে সরিয়েছে –এ হলো তার প্রমাণ।

নাশকতা চিন্তাশূণ্যতার

জ্ঞানের অর্থ শুধু তথ্য,তত্ত্ব,উপাত্ত,গদ্যপদ্য,পরিসংখ্যান বা কিসসা-কাহিনী জানা নয়,বরং নানা বিষয় নিয়ে চিন্তা-ভাবনা এবং সে চিন্তা-ভাবনা থেকে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সামর্থ্য। কোরআনের নানা স্থানে নানা ভাবে মহান আল্লাহতায়ালা মানুষকে চিন্তা-ভাবনায় উৎসাহিত করেছেন। প্রতিটি জীবজন্তু,প্রতিটি উদ্ভিদ,প্রতিটি পাহাড়-পর্বত,প্রতিটি নদীনালা,আকাশের প্রতিটি নক্ষত্র,প্রকৃতির প্রতিটি দৃশ্যপটই মহান আল্লাহর মূল্যবান আয়াত। কোরআনের ভাষায় তা হলো “আয়াতিল লি উলিল আলবাব” অর্থ চিন্তাশীল মানুষের জন্য নিদর্শন। বিদ্যাশিক্ষার কাজ মূলতঃ মহান আল্লাহর সে আয়াতগুলো থেকে শিক্ষা গ্রহণের সামর্থ্য সৃষ্টি। মানুষের মনে সে আয়াতগুলি বহুভাবে বহুকথা বলে। কোনটি সরব ভাবে,কোনটি নীরব ভাবে। ব্যক্তির চক্ষু,কর্ণ,বিবেকের সামনে এগুলো লাগাতর সাক্ষ্য দেয় সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহর অপার অসীম কুদরতের। বিদ্যাশিক্ষার কাজ হলো সে সাক্ষ্য বুঝতে ও আল্লাহর পক্ষে সাক্ষ্যদানে সামর্থ্য সৃষ্টি করা। সে সামর্থ্য অর্জনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি লাগে না। সেজন্য যা জরুরী তা হলো চিন্তার সামর্থ্য। ইসলামে চিন্তাকে তাই শ্রেষ্ঠ ইবাদত বলা হয়েছে। চিন্তাশিল মনই হলো জ্ঞানের সবচেয়ে বড় পাওয়ার হাউস। চিন্তার বলে আল্লাহর অসংখ্য আয়াত থেকে শিক্ষা নেয়ার যে সামর্থ্য গড়ে উঠে তার গুণে মানব ইতিহাসের বহু নিরক্ষর ব্যক্তিও বিখ্যাত দার্শনিকে পরিণত হয়েছে। অথচ সে সামর্থ্য না থাকায় বহু পিএইচডি ধারিও প্রচণ্ড আহম্মকে পরিণত হয়।বাংলাদেশে তো এমন আহম্মকদের কাছে গরুছাগল ও শাপশকুন যেমন ভগবান মনে হয় তেমনি বঙ্গশত্রু,গণশত্রু এবং অতি স্বৈরাচারি দুর্বৃত্তরাও মহমানব বন্ধু মনে হয়। চিন্তাশূণ্যতার এটিই হলো নাশকতা।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় শুধু এমন আহম্মকের সংখ্যাই বাড়েনি, ভয়ানক দুর্বৃত্তের সংখ্যাও বেড়েছে। এ শিক্ষার কাজ হয়েছে,শুধু চিন্তার সামর্থ্য কেড়ে নেয়া নয়,কোরআনের সাথে সম্পর্ককে ছিন্ন করারও। পারিবারিক বা সাংস্কৃতিক সূত্রে কোরআনের সাথে যদি কোনরূপ সম্পর্ক গড়েও উঠে,বাংলাদেশের শিক্ষার কাজ হয়েছে সে সম্পর্ক বহাল রাখাকে কঠিন করে দেয়া। শিক্ষাব্যবস্থার কাজ হয়েছে ছাত্রদের ইবাদতের সামর্থ্য কেড়ে নেয়া,এবং সে সামর্থ্য যাতে গড়ে না উঠে তার ব্যবস্থা করা। মুসলিম শিশুর জীবনে ভ্যালু এ্যাড বা মূল্য সংযোজন না করে বরং পারিবারিক বা সাংস্কৃতিক সূত্রে সংযোজিত মূল্যও কেড়ে নিচেছ। ফলে কৃষকের সুবোধ পুত্রটি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ব্যাভিচারি,ধর্ষক,চোরডাকাত ও সন্ত্রাসী খুনি হয়ে বের হচ্ছে। এবং এরাই রাজপথে আল্লাহর শরিয়তী বিধানের বিরুদ্ধে সৈনিক রূপে নামছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামের বিপক্ষে আজ যে বিপুল বাহিনী এবং পথেঘাটে,অফিস-আদালত,ব্যবসা-বাণিজ্যে যে অসংখ্যক দুর্বৃত্ত -তারা কি কাফেরদের ঘরে, মন্দিরে বা বনেজঙ্গেলে বেড়ে উঠেছে? তারা তো বেড়ে উঠেছে দেশী স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

দুর্গ ইসলামের শত্রুপক্ষের

অজ্ঞ লোকদের সহজেই বিভ্রান্ত করা যায়। কিন্তু জ্ঞানী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে কি সেটি অসম্ভব। বাংলাদেশে ইসলাম বিরোধীদের শক্তির মূল উৎসটি হলো, কোরআন থেকে জ্ঞানলাভে অসমর্থ জনগণ। তারা চায়, জনগণের ইসলাম নিয়ে অজ্ঞতা দীর্ঘায়ু পাক। চায়, সেটি আরো গভীরতর হোক। কোরআনী জ্ঞানের এজন্যই তারা মহাশত্রু। পবিত্র কোরআনের জ্ঞান বাড়লে সে জ্ঞান শক্তি জোগায় ঈমান নিয়ে বেড়ে উঠায়। তারা ইসলামের বিজয়ে তখন আপোষহীন হয়। শরিয়ত প্রতিষ্ঠার আন্দোলন তখন বিপুল সংখ্যায় আপোষহীন মোজাহিদ পায়। এখানেই ইসলামের শত্রু পক্ষের ভয়। সে ভয় নিয়েই য়ভয়। ভয়। আরবী ভাষা এবং সে সাথে কোরআনের চর্চা রুখা হচ্ছে ইসলামের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একটি কৌশল রূপে।

দেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলি পরিণত হয়েছে ইসলামের শত্রু পক্ষের মূল দুর্গে। মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া শরিয়তি আইন প্রতিষ্ঠা নিয়ে রাজপথে নামলে তার বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে যারা হামলা করে তারা কোন মন্দির,গীর্জা বা বনজঙ্গল থেকে আসে না। বরং আসে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রাঙ্গণ থেকেই। অথচ এগুলির নির্মানে ব্যয় ধর্মপ্রাণ মুসলিম নাগরিকদের দেয়া রাজস্বের অর্থ। প্রশ্ন হলো, শিক্ষার নামে মুসলিমগণ কি এভাবে নিজ ধর্ম,নিজ ঈমান,সর্বোপরি মহান আল্লাহতায়ালার শত্রু পালনে অর্থ জোগাতে থাকবে? মেনে চলবে কি শিক্ষাঙ্গণের উপর ইসলামের শত্রুপক্ষের এ দখলদারি?




বাঙালী হিন্দুর রেনেসাঁ ও নাশকতা

রেনাসাঁ না আত্মঘাত

বাংলার হিন্দুদের মাঝে যেমন জাগরন এসেছে, তেমনি প্রচন্ড আত্মঘাত এবং নাশকতাও এসেছে। বাঙালী হিন্দুরা তাদের এ জাগরনকে বলে বাঙালীর রেনেসাঁ। কিন্তু সে রেনেসাঁ কি সমগ্র বাঙালীর? তাদের আত্মঘাতটি এসেছে জাগরণের ঠিক পরপরই। এবং তাদের হাত দিয়ে নাশকতাটি ঘটেছে এবং এখনও ঘটছে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালী মুসলমানদের বিরুদ্ধে। ঘটনার পরম্পরা দেখে মনে হয়, জাগরনটি যেন এসেছিল তাদেরকে আত্মঘাতের দিকে দ্রুত ঠেলে দেবার জন্যই। বাঙালী হিন্দুর সে আত্মঘাতটি ষোল কলায় পূর্ণ হয় ১৯৪৭ সালে বাংলার দেহ খন্ডিত করার মধ্য দিয়ে। ফলে বাংলা নিয়ে বাঙালী হিন্দুদের যে বিশাল স্বপ্ন ছিল তা যেন হটাৎ মারা যায়। ফলে ইউরোপীয় রেনেসাঁ যেমন ইউরোপীয়দের শিক্ষা, শিল্প, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে লাগাতর উন্নয়ন আনে এবং তাদেরকে বিশ্বশক্তিতে পরিনত করে, বাঙালী হিন্দুর জীবনে সেটি ঘটেনি। কিছুটা বেড়ে উঠার পর তাদের বেড়ে উঠাটি হঠাৎ থেমে যায়। বিশ্বমাঝে দূরে থাক, এমনকি ভারতীয় রাজনীতি, অর্থনীতি ও শিক্ষা-সংস্কৃতিতেও তারা গুরুত্বপূর্ণ শক্তিও হতে পারেনি।

তবে তাদের আত্মঘাতটি নীরব আত্মহত্যা ছিল না, প্রচন্ড নাশকতা ঘটিয়েছে বাঙালী মুসলমানদের বিরুদ্ধে এবং বিপন্ন করেছে বাঙালী মুসলমানের মুসলমান রূপে বেড়ে উঠাটি। বিশ্বের সর্ব বৃহৎ মুসলিম দেশের সংখ্যাগরিষ্ট জনগণ রূপে শুধু মুসলিম বিশ্বের রাজনীতিতেই নয়, বিশ্বরাজনীতিতেও যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারতো সেটি মারা পড়ে একাত্তরে। অথচ উনবিংশ শতাব্দী ও বিংশ শতাব্দীর শুরুতে শিক্ষা, সাহিত্য ও বিজ্ঞানে বাঙালী হিন্দুর অর্জনটি কম ছিল না। কিন্তু এখন সেটি নিছক ইতিহাস। রবীন্দ্রনাথ নিয়ে বাঙালী হিন্দুর প্রচন্ড গর্ব, কিন্তু তার বিশাল সাহিত্যে বাঙালীর জাগরন বেগবান না হয়ে বরং আত্মঘাত বাড়ায়। বলা হয়, বাঙালীর রেনেসাঁ শুরু হয় রাজা রামমোহন থেকে। আর রবীন্দ্রনাথের মরদেহের সাথে সেটিও শশ্মান ঘাটে গিয়ে পৌঁছে। তাই রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্ম বাঙালীর গর্ব বাড়ালেও আত্মঘাত থেকে বাঁচাতে পারেনি। মৃত্যু যখন কোন ঘাতকের পক্ষ থেকে আসে তখন সেটি হত্যাকান্ড। আর যখন সেটি নিজ হাতের কামাই, তখন সেটি আত্মঘাত বা আত্মহত্যা। আর বাঙালীর হিন্দুদের জীবনে দ্বিতীয়টিই এসেছিল। এবং সে আত্মঘাতের ঘটনাটি শ্রী নিরোদ চন্দ্র চৌধুরীর চোখেও ধরা পড়েছিল। তবে নীরদ বাবুর ভূল হল, তিনি সেটিকে হিন্দু বাঙালীর আত্মঘাত না বলে তাঁর লিখিত “আত্মঘাতি বাঙালী” বইতে বাঙালীর আত্মঘাত বলেছেন। সম্ভবত তিনি সেটি ইচ্ছাকৃত ভাবেই বলেছেন। কারণ শরৎচন্দ্র চ্যাটার্জীর মত তিনিও হয়ত বাঙালী বলতে শুধু বাঙালী হিন্দুদেরই বোঝাতেন। যেমন শরৎচন্দ্র লিখেছেন, “আমাদের স্কুলে বাঙালী ও মুসলমানদের মাঝে খেলা।”

 

হিন্দুচেতনায় মুসলিম বিদ্বেষ

বাংলার ইতিহাসে বড় সত্যটি হল, এ দেশে ইসলামের আগমন ও মুসলিম শাসনকে হিন্দুরা কখনই মেনে নিতে পারিনি। তেল আর পানি যেমন একত্রে মেশে না, তেমনি বাংলার হিন্দু ও মুসলমানগণ ৮ শত বছরের বেশী কাল পাশাপাশি বসবাস করলেও তাদের মাঝে সৌহাদ্য-সম্প্রীতি গড়ে উঠেনি। মুসলমানগণ হিন্দুদের কাছে ম্লেছ, মোছলা, যবন, নেড়ে এবং বহিরাগতই রয়ে গেছে। সেটি যেমন বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের মত প্রথম সারির হিন্দু সাহিত্যিকের লেখায়, তেমনি সাধারণ হিন্দুদের চেতনায়। ঘৃনাপূর্ন হিন্দু-মনের বেদনায়ক সে স্মৃতীটি বাংলার মুসলমানদের ঘরে ঘরে। তারই ক্ষুদ্র চিত্র সম্প্রতি তুলে ধরেছেন বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক জনাব আসাফউদ্দৌলাহ। ঢাকায় আয়োজিত আলোচনা সভায় স্মৃতীচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, “পড়তাম ফরিপুর জেলা স্কুলে। কোনদিন ক্লাসে দ্বিতীয় ছাড়া প্রথম হতে পারিনি। প্রথম হলাম ১৯৪৮ সালে। হিন্দু শিক্ষকদের কাছে আমরা ছিলাম মোছলা। পাজামা পড়তাম বলে বলতো দোনালা। আমার নাম আসাফউদ্দৌলাহ, অথচ হিন্দুরা সে নামে না ডেকে বলতো ফসফসা। হিন্দু বন্ধুদের বাসায় গিয়েছি এবং একবার ভূলে বই ফেলে আসি। বই আনতে গিয়ে দেখি আমার বন্ধুর মা তীব্র ভাষায় গালী-গালাজ করছে। বলছে সব অপবিত্র হয়ে গেছে। আমি যেখানে বসেছিলাম সে জায়গা ও সে চেয়ার পানি ঢেলে ধুচ্ছে। হাফইয়ার্লী পরীক্ষার খাতায় বাবরকে ভারতের শ্রেষ্ঠ শাসক লেখেছিলাম। কেন চন্দ্রগুপ্ত, সমুদ্রগুপ্ত বা অশোক লিখলাম না সে অপরাধে আমাকে বেঞ্চের উপর দাঁড়াতে বলা হয়েছে। পিয়নকে দিয়ে হাতের তালুতে বেতের ঘা মারা হয়েছে।” (সূত্রঃ বক্তৃতার ইউটিউব ভিডিও)। হিন্দু মনে ঘৃনার মাত্রাটা এতটাই অধিক ছিল যে, মুসলমানদের পৃতৃদত্ত নামটাকেও তারা সঠিক ভাবে বলতো না। কোলকাতার হিন্দু পত্রিকাগুলো প্রখ্যাত মুসলিম লীগ নেতা ও দৈনিক আজাদ পত্রিকা সম্পাদক জনাব মাওলানা আকরাম খাকে বলতো আক্রমণ খাঁ। আরেক নেতা জনাব হোসেন শহীদ সোহরোয়ার্দীকে বলতো সুরাবর্দী।

 

প্রতিবেশীকে বিকৃত নামে ডাকা, গালী দেয়া বা ঘৃনা করা ভদ্রতা নয়, সুরুচীর ও সুশীল মনের পরিচয়ও নয়। বিশেষ করে সে প্রতিবেশীকে, যার সাথে একই গ্রাম-গঞ্জ ও মাঠ-ঘাট, একই আলো-বাতাস, একই নদী-পুকুর, একই স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, একই রাস্তাঘাট ও হাট-বাজার ভাগাভাগি করে বসবাস করতে হয়। অথচ হিন্দু মনে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃনার মাত্রাটি এতটাই অধিক ছিল যে, কোন মুসলমান হিন্দুঘরে পা রাখলে গঙ্গাজল ও গোবর ছিটিয়ে সে স্থান পবিত্র করত। সে চিত্রটি চোখে পড়ে রবীন্দ্রনাথের লেখা “গোরা” উপন্যাসেও। প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে এমন ঘৃণা এবং এমন বিদ্বেষের নজির বিশ্বের আর কোন দেশে নাই। যার সাথে একত্রে বসবাস তার বিরুদ্ধে এমন ঘৃনা কি সে রাষ্ট্রে বা সমাজে শান্তি আনে? বরং তাতে তীব্রতর ও রক্তাত্ব হয় বিভক্তি ও সংঘাত। আরো বিপদ হল, ঘৃনার সে বীজকে বাঙালী হিন্দুরা শুধু বাংলাতে সীমাবদ্ধ রাখেনি, ছড়িয়ে দিয়েছে সমগ্র ভারত জুড়ে। আর প্রতিবেশীর প্রতি ঘৃনা যখন প্রবলতর হয়, তখন তাদের প্রতি সহানুভুতি, সুবিচার বা কল্যাণ প্রুতিষ্ঠার বিষয়টি গুরুত্ব পায় না। বরং তাদের ঠকানো বা শোষন করাটাই সামাজিক নীতি, রাজনীতি ও অর্থনীতি হয়ে দাঁড়ায়। ফলে যে ঘৃনার উপর ভিত্তি করে মুসলমানদের শোষণ ও বঞ্চনার প্রক্রিয়া বাংলাতে শুরু হয়েছিল সেটিই এখন সমগ্র ভারত জুড়ে। বাংলার হিন্দু জমিদারগণ মারা গেছেন। কিন্তু তাদের অবিচারটি বেঁচে আছে খোদ ভারত সরকারের নীতিতে। ফলে অত্যাচারি জমিদারগণ মুসলমান প্রজার সাথে করতো সেটিই হচ্ছে সমগ্র ভারতের প্রশাসনে। ভারতে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় শতকরা ১৫ ভাগ। অথচ প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং কর্তৃক স্থাপিত তদন্ত কমিটির রিপোর্টে প্রকাশ পেয়েছে, সরকারি চাকুরিতে তাদের সংখ্যা শতকরা ৩ ভাগও নয়, বড় চাকুরিতে দূরে থাক ছোট চাকুরিতে তাদের স্থান নেই। বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার তারা সর্বত্র। শুধু মাত্র ঢাকা, লাহোর বা করাচীর মত একটি শহরে যতজন মুসলমান ডাক্তার, ইঞ্জিনীয়ার, ব্যবসায়ী, বিচারক, আইনজ্ঞ, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বাস করে সমগ্র ভারতে ২০ কোটি মুসলমানের মধ্যেও তা নেই। ভারতীয় মুসলমানদের বিরুদ্ধে হিন্দুদের বিবেকহীন অবিচার ও নাশকতা যে কতটা গভীর সেটি বোঝার জন্য কি এ পরিসংখ্যানটিই যথেষ্ট নয়? আরো ভয়ানক বিবেকহীনহতা হল, এটি যে প্রচন্ড অন্যায় ও অবিচার সেটিও আজকের ভারতে রাজনীতির কোন বড় বিষয় নয়। ফলে প্রতিকারেরও কোন উদ্যোগ নেই। দুর্বৃত্তি, অবিচার ও অনাচার প্রতি সমাজেও ঘটে। কিন্তু সভ্য সমাজের পরিচয় হল, সে দুর্বৃত্তি ও অনাচার অপরাধ রুপে চিত্রিত হয় এবং তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উঠে এবং প্রতিকারেরও ব্যবস্থা হয়। কিন্তু ভারতে হচ্ছে তার উল্টোটি। দিন দিন শুধু অবিচারই বাড়ছে না, অবিচারের সাথে মুসলমানের জানমাল ও ইজ্জতের উপরও হাত পড়ছে। বার বার দাঙ্গা বাধিয়ে মুসলিম-হত্যা হচ্ছে, তাদের নারীরা ধর্ষিতা হচ্ছে, মসজিদও ধ্বংস করা হচ্ছে। আজ থেকে শত বছর আগে বাবরী মসজিদের ন্যায় কোন ঐতিহাসিক মসজিদকে গুড়িয়ে দেয়া হয়নি। অথচ এখন সেটি হচ্ছে। এবং অতি উৎসবভরে হচ্ছে। সেটি চিত্রিত হচ্ছে না কোন অপরাধ রূপে। আর সেজন্য কারো কোন শাস্তিও হয়নি।

 

ইংরেজপ্রাতি ও মুসলিম বিরোধীতা

অথচ মুসলিম শাসকগণ হিন্দুদের শুধু প্রশাসনিক আমলা, জমিদার, হিসাবরক্ষক, তালুকদারই পদেই বসায়নি, তাদেরকে মন্ত্রী এবং সেনাপতির পদেও বসিয়েছে। মোঘল বাদশাহদের ন্যায় নবার সিরাজুদ্দৌলার গুরুত্বপূর্ণ সেনাপতিও ছিলেন হিন্দু। মুসলিম শাসনামলে দেশে হিন্দু-মুসলমানের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে –সে ইতিহাস বিরল। কিন্তু তাতেও হিন্দু মনে মুসলিম বিদ্বেষ ও ঘৃনার মাত্রা বিন্দুমাত্র কমেনি। বরং সে বিদ্বেষ এতটাই প্রবল ছিল যে, মুসলমানদের চরম শত্রুদের তারা পরম বন্ধু রূপে গ্রহন করেছে। তাদের মাঝে তখন কাজ করেছে শত্রুর বন্ধুকে বন্ধু রূপে গ্রহন করার নীতি। তাই প্রতিবেশী বাঙালী মুসলমানদের বাঙালী হিন্দুগণ বন্ধু হিসাবে গ্রহণ না করতে পারলে কি হবে, বহু হাজার মাইল দূরের অন্য এক মহাদেশ থেকে আগত অবাঙালী ও অহিন্দু ইংরেজদের তারা বিস্বস্ত বন্ধু রূপে গ্রহণ করেছে। ইংরেজের যে গুণটি তাদেরকে আকৃষ্ট করেছে তা হল তাদের মুসলিম-বিনাশী নীতি। একই ভাষা ও একই ভূখন্ডে বসবাসকারি বাঙালী মুসলমানদের প্রতি এই হল তাদের বাঙালীত্বের নমুনা। মুসলমানদের মুসলমান হওয়াটাই তাদের কাছে অপরাধ হয়েছে। ফলে পল্লির নিরীহ কৃষক প্রজাটিও হিন্দু জমিদারের অত্যাচার ও শোষন থেকে নিষ্কৃতি পায়নি। মুখের দাড়ীর জন্যও তাকে খাজনা দিয়ে হয়েছে। মুসলিম-বিরোধীতা বাঙালী হিন্দুর মনে এতটা প্রবল ভাবে বাসা বেঁধেছিল যে যখনই কোন কিছুতে মুসলমানের কল্যাণ দেখেছে তখনই প্রাণপনে সেটির বিরোধীতা করেছে। সেটি ১৯০৫য়ের বঙ্গভঙ্গ হোক, বা ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হোক, বা ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা হোক, বা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর দেশটির টিকে থাকার বিষয় হোক। এমন বীষপূর্ণ চেতনার কারণেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে খোদ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কোলকাতার রাস্তায় মিছিল করেছেন।

 

প্রফেসর হান্টিংটন তাঁর “Clush of Civilisation” বইতে সভ্যতার অনিবার্য সংঘাতের কথা বলেছেন। সে সংঘাত ইসলামী সভ্যতার সাথে পাশ্চাত্য সভ্যতার। তাঁর পরামর্শ, সে লড়াইয়ে জিততে হলে পাশ্চত্য শক্তিকে হিন্দুভারত ও রাশিয়াসহ বিশ্বের অন্যান্য শক্তির সাথে কোয়ালিশন গড়তে হবে। হান্টিংটনের মতে মুসলিম সভ্যতাই পাশ্চাত্যের খৃষ্টান সভ্যতার মূল প্রতিদ্বন্দী। এ পরামর্শটি তিনি এমন এক সময় দিয়েছেন যখন মুসলমানগণ পরাজিত, বিভক্ত ও অধঃপতিত; এবং মুসলিম রাষ্ট্রগুলির অধিকাংশই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে পাশ্চাত্য শক্তির হাতে অধিকৃত। কিন্তু ১৭৫৭ সালে বাংলায় ইংরেজ সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা যখন শুরু হয় তখন মুসলমানদের অবস্থা আজকের মত দুর্বল ছিল না। মুসলমানগণ তখনও প্রধানতম বিশ্বশক্তি। ১৭৫৭ সালে ব্রিটিশরা বিশ্বশক্তি হওয়া দূরে থাক, উল্লেখযোগ্য সামরিক শক্তিও ছিল না। পলাশীর যুদ্ধে সিরাজুদ্দৌলার পরাজয় ঘটে নিতান্তই প্রাসাদ ষড়ন্ত্রের ফলে, দুর্বল সামরিক শক্তির কারণে নয়। তখনও বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা ছাড়া প্রায় সমগ্র ভারত মুসলমানদের হাতে। উসমানিয়া খেলাফতের দখলে তখনও গ্রীস, বুলগিরিয়া, বসনিয়া, সার্বিয়া, সাইপ্রাস, মেসিডোনিয়া, ক্রিমিয়া, আলবেনিয়াসহ ইউরোপের বিশাল ভূ-ভাগ। ইরান, আফগাসিস্তান তখনও শক্তিশালী স্বাধীন রাষ্ট্র। ঠিক এমন অবস্থায় বাংলা থেকে শুরু হয় ব্রিটিশ শক্তির মুসলিম ভূমিতে আগ্রাসন। সভ্যতার সংঘাতটি শুরু হয় বস্তুত তখন থেকেই। প্রফেসর হান্টিংটন যে পরামর্শটি আজ দিচ্ছেন, ইংরেজগণ সেটির প্রয়োগ করেছে আজ থেকে প্রায় তিন শত বছর আগেই। তারা জানতো, মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিজয় অর্জন ও সে বিজয় ধরে রাখা তাদের একার পক্ষে অসম্ভব। ফলে শুরুতেই তারা বিশ্বস্ত পার্টনার খুঁজতে থাকে। পার্টনার তাঁরা পেয়েও যায়। মুসলিমদের মধ্য থেকে মীর জাফরদের ন্যায় মুষ্টিমেয় কিছু বিশ্বাসঘাতকপেলেও তাঁদের মূল পার্টনার ছিল বাংলার হিন্দুরা।

 

হিন্দুবাঙালীর সাহিত্যচর্চা ও বাংলার অন্ধকার যুগ

বাঙ্গালী হিন্দুর মন যে কতটা বিষপূর্ণ ও প্রতিহিংসাপূর্ণ ছিল সেটির বহিঃপ্রকাশ ঘটে ইংরেজ আমলে রচিত তাদের সাহিত্যে। সেটি যেমন প্রকাশ পায় বঙ্কিমচন্দ্র, ঈশ্বচন্দ্রগুপ্ত, নবীনচন্দ্র, হেমচন্দ্রের মত প্রচন্ড মুসলিম বিদ্বেষী সাহিত্যিকদের লেখায়, তেমনি প্রকাশ পায় রবীন্দ্র ও শরৎ-সাহিত্যেও। শুধু সাহিত্যে নয়, প্রচন্ড মুসলিম বিদ্বেষ ফুটে উঠে বাঙালী হিন্দুর শিক্ষাব্যবস্থা, পত্র-পত্রিকা, রাজনীতি ও অর্থনীতিতেও। অথচ এই আমলটিই হল বাঙালী হিন্দুদের সবচেয়ে আলোকিত ও সবচেয়ে গৌরবের। তাজ্জবের বিষয়, এ আমলে বাংলার হিন্দুদের মাঝে পাশ্চাত্যের শিক্ষা, সাহিত্য ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসার ঘটলেও তাদের মনের বিদ্বেষপূর্ণ কুৎসিত অন্ধকারটি এতে দূর হয়নি। বরং বেড়েছে বহুগুণ। এদিক দিয়ে বলা যায়, বাঙালীর ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে অন্ধকার যুগ। সে সময় যতই বেড়েছে হিন্দুর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন, ততই বেড়েছে তাদের মনে মুসলিম বিদ্বেষ। হিন্দু-মুসলিমের ধর্ম ও মতের অমিলগুলো শত শত বছরের। কিন্তু কোন কালেই হিন্দুদের কবিতা, গান, প্রবন্ধ, উপন্যাস ও ছড়ায় মুসলমানদের বিরুদ্ধে এত ঘৃণা, এত গালী, এত মিথ্যাচার এতটা তীব্র ভাবে ভাবে প্রকাশ পায়নি, যা পেয়েছে তথাকথিত এ রেনেসাঁ আমলে। মুসলিম বিরোধী প্রচারে হঠাৎ এমন জোয়ার সৃষ্টির অন্যতম কারণ ইংরেজদের পক্ষ থেকে দেয়া উস্কানী। শুরু থেকেই ইংরেজদের নীতি ছিল devide and rule অর্থাৎ ভাগ কর এবং শাসন কর। নিজেদেরকে সেক্যিউলার রূপে দাবী করলেও তারা এখানে বিভেদের রেখাটি টেনেছে ধর্মের নামে। আর ভাগাভাগীটা তো তখনই তীব্রতর রূপ নেয় যখন সেটি প্রতিষ্ঠিত হয় গভীর ঘৃনার উপর। হিন্দু-মুসলিমের এ ভাগাভাগীটা না হলে মুষ্টিমেয় ইংরেজের পক্ষে কি ভারত শাসন সম্ভব হত? ভারতে ব্রিটিশে শাসনের প্রতিরক্ষায় এত ইংরেজ লাঠি ধরেনি বা কলম ধরেনি যত হিন্দু বাঙালী ধরেছে। এখানে হিন্দুর মনে যে বিষয়টি প্রবল ভাবে কাজ করেছে সেটি হল, মুসলিম ভীতি ও মুসলমানদের থেকে প্রতিশোধ নেয়ার ইচ্ছা। এমন এক ভীতিপূর্ণ ও প্রতিশোধ-পরায়ন মানসিক অবস্থার কারণেই ইংরেজ শাসন তাদের কাছে আশির্বাদ মনে হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তসহ অধিকাংশ হিন্দুদের সাহিত্যে সে সুরটি প্রবল।

 

হিন্দুদের মনে মুসলিম বিরোধী ঘৃণা সৃষ্টির মূল দায়িত্বটি পালন করে ইংরেজ ওরিয়েন্টালিস্ট তথা প্রাচ্যবিদগণ। সেটি মিথ্যা ইতিহাস রচানার মাধ্যমে। গবেষণার নামে বিকৃত ইতিহাস লেখা তখন সাম্রাজ্যবাদীদের হাতিয়ারে পরিণত হয়। এসব ইংরেজ ওরিয়েন্টালিস্টগণ হিন্দুদের মনে এ বিশ্বাসটি বদ্ধমূল করে যে, অতীতে তাদের সভ্যতা ছিল এবং সে সভ্যতা স্বর্ণোজ্বলও ছিল। আরো বলে, সেটি ধ্বংস করেছে বহিরাগত মুসলিম শাসকেরা। মুসলমানগণ এভাবে চিত্রিত হয় হিন্দুদের পরম শত্রু রূপে। এসব ওরিয়েন্টালিস্টদের লেখা সেসব বই বগলে করে আধুনিক হিন্দু লেখকগণ সভা-সমিতি করেছে এবং সেগুলির সাথে আরো রং চং মেখে সারা ভারতের হিন্দুদের ঘরে পৌঁছে দিয়েছে। নিজেদের পূর্বপুরুষদের যদি অন্য দেশের প্রফেসর এসে রাজপুত্র এবং এক গৌরবজনক সভ্যতার নির্মাতা বলে তবে কার না ভাল লাগে? তখন সে সার্টিফিকেট হাতে নিয়ে সে তো নাচতে শুরু করবে। ভারতীয় হিন্দুদের সেটিই হয়েছিল। অথচ মুসলমানগণ যখন বাংলা দখল করে তখন এদেশে পিরামিডের ন্যায় কোন পিরামিড, চীনের দেয়ালের ন্যায় কোন দেয়াল বা ব্যাবিলিয়নের উদ্যানের ন্যায় কোন উদ্যান পায়নি। তখন ভারতে দিল্লি, লাহোর বা আগ্রার ন্যায় কোন শহর বা তাজমহলের ন্যায় কোন সৌধও ছিল না। ফলে সেগুলো ধ্বংস করার প্রয়োজন দেখা দেয় কি করে? বরং ছিল কিছু মন্দির যা ভারতের নানা স্থানে এখনও দাঁড়িয়ে আছে। বাবরী মসজিদকে যেভাবে গুড়িয়ে দেয়া হয়েছে সেরূপে মন্দিরগুলোকে তারা ধ্বংস করেনি।

 

মিথ্যা অভিযোগ খাড়া করতে কোন গবেষণা লাগে না, সেটি উৎপাদিত হয় মিথ্যুকের মগজে। আর সে কাজে ওরিয়েন্টালিস্টদের মগজের উর্বরতা কম ছিল না। শুধু  বাংলা বা ভারতে নয়, ইংরেজগণ যেখানেই গেছে সেখানেই বিভক্ত সৃষ্টির এ কাজটি অতি সুচারু ভাবে করেছে। তাতে ফল দাড়িয়েছে, যে জনগণ শান্তিপূর্ণ ভাবে শত শত বছর পাশাপাশি বসবাস করেছে তাদের পক্ষে একত্রে এক ভূখন্ডে বসবাস করাই অসম্ভব হয়ে পড়ে। গবেষণার নামে বই লেখে আরবদের ক্ষেপিয়েছে তুর্কী ও ইরানীদের বিরুদ্ধে, আবার ইরানী ও তুর্কীদের ক্ষেপিয়েছে আরবদের বিরুদ্ধে। অপরদিকে তুর্কী, কুর্দী ও ইরানীদের থেকে দূরে টানার পর আরবদেরকেও তারা একতাবদ্ধ থাকতে দেয়নি। তাদের মধ্যে বিভেদ গড়েছে গোত্র ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভূ-ভন্ডের নামে। মধ্যপ্রাচ্য আজ যে ২২টুকরায় বিভক্ত সেটি তো সাম্রাজ্যবাদী ঔপনিবেশিকদের সৃষ্ট। তারা নিজেদের সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ দেখেছে অন্যদের বিভক্ত রাখার মধ্যে।

 

যে যুদ্ধ পলাশীতে শেষ হয়নি

শত্রু দেশের আগ্রাসনটি নিছক রণাঙ্গণে সীমাবদ্ধ থাকে না, সেটি হাজির হয় সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় আগ্রাসন নিয়েও। মুসলমানদের বিরুদ্ধে ইংরেজদের লড়াইটি তাই পলাশীর ময়দানে শেষ হয়নি। বরং সেটি আরো তীব্রতর হয়েছে শিক্ষা, সংস্কৃতি, ধর্ম ও অর্থনীতির ময়দানে। সে লড়াইটি তীব্রতর করতে বাংলায় এবং পরে ভারতে তারা শুধু সামরিক সেনা ছাউনিই গড়েনি, গড়েছে শিক্ষা, ধর্ম, গবেষণা ও সংস্কৃতির নামে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান। তাই সৈনিকদের পাশা বহু প্রফেসর ও গবেষকও এনেছে। তাই ঔপনিবেশিক ব্রিটিশরা একদিকে যেমন ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ গড়ে এদেশের হিন্দুদের ব্রিটিশরাজ রক্ষার সামরিক প্রশিক্ষণ দিযেছে, তেমনি এসিয়াটিক সোসাইটি গড়ে গবেষণার নামে হিন্দুদের মন মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিষাক্ত করার লক্ষ্যে বইয়ের পর বই লিখেছে। শুধু সামরিক শক্তির জোরে কোন শক্তিই কোন দেশকে বেশী দিন ধরে রাখতে পারে না। শক্ত ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে গাছ যেমন মজবুত শিকড় গড়ে, সরকারও তেমনি দেশের জনগণের গভীরে ধর্মীয় সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংযোগ গড়ে। এই মজবুত সংযোগটির কারণেই ভারতে মুসলিম শাসন সাড়ে ছয়শত সাল টিকে থাকে। ইংরেজদের কাছেও এদেশে সাম্রাজ্য স্থাপনের লক্ষ্যটি নিছক কিছু বছরের জন্য ছিল না, ছিল শত শত বছরের জন্য। তারা জানতো, নব প্রতিষ্ঠিত এ সাম্রাজ্যের আয়ু বাড়াতে হলে শুধু দেশের ভূগোলে নয়, মনের ভূগোলেও অধিকার জমাতে হবে। এদেশবাসীর মধ্য থেকে প্রচুর সংখ্যক দালাল বা কলাবোরেটর গড়ে তুলতে হবে। কয়েক হাজার প্রবাসী ইংরেজদের দ্বারা এ বিশাল ভারত দীর্ঘকাল অধিকারে রাখা অসম্ভব ছিল। এ লক্ষ্যে ধর্মান্তর যেমন জরুরী, তেমনি জরুরী বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক কনর্ভাশন। তারা এটাও জানতো, কলাবোরেটর বা সহযোগী খোঁজার কাজটি করতে হবে হিন্দুদের মাঝে। মুসলমানদের মাঝে সেটি অসম্ভব। ইংরেজগণ তাদের থেকেই রাজ্য ছিনিয়ে নিয়েছিল, যার ফলে তাদের ভাগ্যে নেমে আসে দুর্বিসহ দুর্যোগ। ফলে মুসলমানদের কাছে তারা ছিল তাদের স্বাধীনতা, ধর্ম, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির দুষমন। মুসলিম মনে ইংরেজদের হাতে এ পরাজয়ের বেদনাটি ছিল প্রতিদিন ও প্রতি মুহুর্তের। ব্রিটিশরা সেটি বুঝত। ফলে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের বিস্তার ও সেটি প্রতিরক্ষার বিরুদ্ধে মুসলমানদেরকেই মূল শত্রু ভাবতো। এবং নির্ভরযোগ্য পার্টনার ভাবতো হিন্দুদের। কৃষক তার গরুকে ঘাস দেয়ে যাতে সে লাঙল টানতে পারে। তেমনি ইংরেজগণও শিক্ষার নামে তাদের কলাবোরেটরদের সামর্থ বাড়িয়েছে -যাতে শাসন ও লুন্ঠনে প্রবল সহায়তা দেয়। এজন্যই মুসলমানদের শিক্ষিত করায় তাদের কোন আগ্রহ ছিল না। ফলে রাজ্য বিস্তারের পাশাপাশি তাদের কাছে গুরুত্ব পায় হিন্দুদের মাঝে ইংরেজী ভাষা, ইংরেজের দর্শন, সাহিত্য ও সংস্কৃতির দ্রুত বিস্তার। এবং প্রণীত করে সুপরিকল্পিত এক শিক্ষানীতি। ভারতে এমন একটি শিক্ষানীতির উদ্দেশ্য ব্যাখা করতে গিয়ে লর্ড ম্যাকলে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, “ব্রিটিশ সরকার ভারতে এমন এক শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করবে যার মাধ্যমে এমন একদল ভারতীয় সৃষ্টি হবে যারা শুধু রক্তে-মাংসে হবে ভারতীয়, কিন্তু চিন্তা-চেতনা, মন ও মননে হবে ব্রিটিশ।” অর্থাৎ ব্রিটিশের সেবক। সে স্ট্রাটেজীকে সামনে রেখে ময়দানে নামে উইলিয়াম কেরীর ন্যায় বহু পাদ্রী। প্রতিষ্টিত হয় শ্রীরাম পুর কলেজ, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ, সংস্কৃত কলেজ, হিন্দু কলেজ  ও কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। গড়ে তোলা হয় ছাপা খানা। প্রকাশনা শুরু হয় বহু পত্র-পত্রিকার। লক্ষ্য, বাংলার হিন্দুদেরকে তাদের প্রতিবেশী মুসলমানদের থেকে আলাদা করে মন ও মননে, চেতনা ও দর্শনে ভিন্ন তাদের কাছের মানুষ রূপে গড়ে তোলা। বাংলার হিন্দুদের মাঝে তখন সাজ সাজ রব, বিশেষ করে বর্ণ হিন্দুদের মাঝে। প্রশাসন, বিচার ও শিক্ষা থেকে মুসলমানদের পরিকল্পিত ভাবে হঠিয়ে হিন্দুদের জন্য বিশাল শূণ্যস্থান সৃষ্টি করা হয়। তাদের জন্য সষ্টি করা হয় অর্থ উপার্জনের বিপুল সুযোগও সৃষ্টি করা হয়। ইষ্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানীর কেরানী, এজেন্ট ও ঠিকাদার, ব্রিটিশ সরকারের রাজস্ব কালেক্টর, আদালতের মুন্সেফ-ম্যাজিস্টেট বা উকিল, ব্রিটিশ গুপ্তচর সংস্থার এজেন্ট -এগুলো হয়ে দাঁড়ায় সে কালের বাঙ্গালী হিন্দুদের কাছে অতি আকর্ষণীয় পেশা। বঙ্কিম চন্দ্রের ন্যায় প্রথম সারির লেখকদের জীবনের সিংহভাগ কেটেছে ব্রিটিশ সরকারের রাজস্ব কালেক্টর রূপে। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত কোলকাতা থেকে পত্রিকা বের করেছেন যার মূল কাজ ছিল ইংরেজদের বন্দনা করা, মুসলিম চরিত্রে কালীমা লেপন করা, আর ব্রিটিশ সেবায় হিন্দুদের অনুপ্রাণিত করা। রবীন্দ্রনাথের পূর্বপুরুষদের জীবন কেটেছে ইষ্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানী ও ব্রিটিশ সরকারের অতি বিশ্বাসভাজন এজেন্ট রূপে। এধরণের শত শত তাঁবেদার হিন্দুদের অর্থনৈতিক ভিত্তিটা আরো মজবুত করতে তাদের হাতে তুলে দেয়া হয় জমিদারি। সারা বাংলার গ্রামে গঞ্জে ব্রিটিশের পক্ষে লাঠিয়ালের মূল দায়িত্বটা পালন করেছে তারাই। মুষ্টিমেয় ব্রিটিশদের তাই রাজ্য শাসনে গ্রামে গ্রামে নামতে হয়নি, বরং তাদের কাজ হয় বড় বড় শহরে বসে শুধু নির্দেশ দেয়া। এভাবে ব্রিটিশ সরকার গড়ে তোলে সুবিধাভোগী ও স্বার্থপর এক কলাবোরেটর শ্রেনীর বিশাল নেটওয়ার্ক।

 

ব্রিটিশ শোষন ও বিধ্বস্ত মুসলিম অর্থনীতি

কোম্পানীর লক্ষ্য ব্যবসায়ী মুনাফা লাভ। কোন খয়রাতি কাজকর্ম বা জনকল্যাণ এর লক্ষ্য নয়। ইষ্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানী মুনাফা বাড়াতেই ভারতে এসেছে, এবং ভারতে এসে নতুন নতুন রাজ্য জয় করেছে। সে সব রাজ্যে দুর্গ গড়েছে নিছক শোষনভিত্তিক সে বাণিজ্যিক প্রজেক্টের অঙ্গ রূপে। কোম্পনী জনগণ থেকে উচ্চহারে রাজস্ব নিয়েছে সে শোষন ও শাসন প্রক্রিয়াকে তীব্রতর করতে। এভাবেই মুনাফা বাড়িয়েছে এবং মুনাফার সে অর্থ বিলেতে ব্রিটিশ সরকার ও কোম্পানীর শেয়ার হোল্ডারদের হাতে পৌছে দিয়েছে। বাংলাদেশে ব্রিটিশ শাসন তাই সর্বার্থেই ছিল এক সাম্রাজ্যবাদী ঔপনিবেশিক শাসন। তবে তাদের সে শাসনের যতটা না ছিল ব্যবসায়ীক মুনাফা তার ছেলে বেশী ছিল দস্যৃবৃত্তিকি লুন্ঠন। তাদের সে সীমাহীন লুন্ঠনের ফলেই বাংলা জয়ের কিছু কাল পরই ১৭৭০ সালে ভয়ানক দুর্ভিক্ষ ডেকে আনে যাতে দেশের এক-তৃতীয়াংশ জনগণ মারা যায়। ইতিহাসের সেটিই ছিয়াত্তরের মনন্তর রূপে পরিচিত। ব্রিটিশ শাসকেরা বাংলার উপর আরেকটি দুর্ভিক্ষ উপহার দেয় ১৯৪৪ সালে। এবং সেটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে। তখন সামরিক বিজয়টাই তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, জনগণকে দুর্ভিক্ষে বাঁচানো নয়। শেষাক্ত এ দুর্ভিক্ষেও লক্ষ লক্ষ বাঙালীর মৃত্যু ঘটে। তাছাড়া তাদের ভয়াবহ শোষনের ফলে  অধিকাংশ মুসলিম পরিবারে ফি বছর অনাহার লেগেই থাকতো। ফলে অতি উচ্চ ছিল শিশু মৃত্যুর হার। ফলে বাংলায় ব্রিটিশের ১৯০ বছরের ঔপনিবেশিক শাসনে মুসলিম জনসংখ্যায় খুব কমই বৃদ্ধি পেয়েছে। বৃদ্ধি ঘটেছে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর।

 

অথচ সাড়ে পাঁচ শত বছরের মুসলিম শাসনে কোন দুর্ভিক্ষ বাংলায় বা ভারতে একটি বারও আসেনি। বরং শায়েস্তাখানের আমলে খাদ্যপণ্যের সস্তা মূল্য বিশ্বে রেকর্ড গড়েছিল। বাংলায় বা ভারতে মুসলিম শাসনকে তাই কোন অবস্থাতেই ঔপনিবেশিক শাসন বলা যায় না। সাম্রাজ্যবাদী বিদেশী শাসনও নয়। মুসলিমগণ এদেশে কখনই ব্যবসায়ীক লক্ষ্যে বা লুন্ঠনের স্বার্থে সাম্রাজ্য স্থাপন করেনি। এদেশে আর্য ও অনার্য বহু জাতির মানুষ যেমন বাংলার বাইরে থেকে এসে এদেশে মিশে গেছে তেমনি মিশে গেছে মুসলমানগণও। আর বেশীর ভাগ মুসলমান তো বাংলার আদিবাসী, তারা মুসলমান হয়েছে ইসলাম কবুলের মাধ্যমে। তারা যা কিছু গড়েছে তা বাংলাতেই গড়েছে। এখানকার সম্পদ নিয়ে ব্রিটিশগণ যেমন বিলেতে নগর-বন্দর গড়েছে, তেমন কোন নগর বন্দর বাংলার কোন মুসলিম শাসক বাংলার বাইরে গড়েনি। ঢাকা, সোনার গাঁ, গৌড়, মূর্শিদাবাদ, বাগের হাট ও উত্তর বঙ্গে যা কিছু ঐতিহাসীক কৃর্তি তা তো মুসলমানদেরই গড়া। অথচ হিন্দু রাজাও এদেশ বহুকাল শাসন করেছে। কিন্তু তাদের সে নিদর্শন গুলো কোথায়? তাছাড়া এদেশের উপর বর্গী হামলা, মগ হামলা, মারাঠা হামলা ও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যারা প্রাণ দিয়েছে তারা তো মুসলমানেরাই। পলাশী রণাঙ্গন, তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা, মজনু শাহের ফকির বিদ্রোহ বা দুদূ মিয়ার ফারায়েজী আন্দোলন –সর্বত্র তো তারাই। অথচ ব্রিটিশ আমলে হিন্দুদের দ্বারা ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদী শক্তির তাঁবেদারীর যে ইতিহাস নির্মিত হল সেটিকে বলা হচ্ছে বাংলার রেনেসাঁ যুগ। ইংরেজ শাসন চিত্রিত হচ্ছে আশির্বাদ রূপে। আর মুসলিম শাসনামলকে বলা হচ্ছে অন্ধকার যুগ বলে!

 

ব্রিটিশের বিভাজন নীতি ও বাঙালী হিন্দু বুদ্ধিজীবীর বিষ-উদগিরণ

বঙ্কিমচন্দ্র, ঈশ্বরচন্দ্র, হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রবীন্দ্রনাথ ও অন্যান্যরা তাদের সাহিত্যে যে মুসলিম বিরোধী বিষ উদগিরণ করেছেন সেটি বাংলার সমাজ ও আলোবাতাস থেকে উদ্ভুত হলে তার নমুনা মধ্য যুগের বা আদি যুগের সাহিত্যেও পাওয়া যেত। কিন্তু তা নেই। তাদের মগজে ঘৃনাপূর্ণ মিথ্যার বিষটি ঢুকিয়েছিল বস্তুত ইংরেজগণ। তারাই প্রথম আবিস্কার করে, ভারতের মুসলিম শাসন শুধু ধ্বংস, বঞ্চনা, নিপীড়ন ও শোষণ ছাড়া আর কিছুই দেয়নি। বলেছে, মন্দির ভেঙ্গে তার উপর মসজিদ গড়েছে। তাদের লেখনিতে শিবাজীর চরিত্র অংকিত হয়েছে হিন্দু জাগরনের এক মহান ও আদর্শনীয় বীর রূপে, আর মোঘল বাদশা আওরঙ্গজীব চিত্রিত হয়েছেন কুৎসিত ভিলেন রূপে। বাংলায় হিন্দুদের বাস মুসলমানদের চেয়ে অধিক কাল ধরে। অথচ তাদের ব্যর্থতা হল, সমগ্র ইতিহাস ঘেঁটে একজন হিন্দুকেও বের করতে পারে যিনি স্বাধীনতার লড়াইয়ে বাংলার মানুষের সামনে আদর্শ হিসাবে চিত্রিত হতে পারেন। তেমন চরিত্রের তালাশে বঙ্কিম ও মাইকেল মধুসূদন যেমন ব্যর্থ হয়েছেন, রবীন্দ্রনাথও ব্যর্থ হয়েছেন। সে এক বিশাল শূন্যতা। রবীন্দ্রনাথকে তাই অবাঙালী শিবাজীকে হিরো রূপে পেশ করতে হয়েছে। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর “শিবাজী উৎসব” কবিতায় শিবাজীর বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে লিখেছেন,

“হে রাজ-তপস্বী বীর, তোমার সে উদার ভাবনা

বিধর ভান্ডারে

সঞ্চিত হইয়া গেছে, কাল কভু তার এক কণা

পারে হরিবারে?

তোমার সে প্রাণোৎসর্গ, স্বদেশ-লকক্ষীর পূজাঘরে

সে সত্য সাধন,

কে জানিত, হয়ে গেছে চির যুগ-যুগান্তর ওরে

ভারতের ধন।”

এই হল রবীন্দ্রনাথের বিচার বোধ। এই হল রবীন্দ্র মানস ও চেতনা! তবে এটি শুধু রবীন্দ্রনাথের চেতনার সমস্যা নয়, এটিই মূল সংকট ছিল বাঙালীর রেনেসাঁর কর্ণধারদের। কিছু দালানকোঠা ও কলকারখানা গড়া, কিছু ডিগ্রিধারি মানুষ গড়া, কিছু কবিতা-উপন্যাস লেখা, রাজনীতিতে কিছু আলোড়ন তোলাই একটি জাতির জীবনে জাগরণ আনার জন্য যথেষ্ট নয়। এরূপ বিশাল কাজের জন্য উন্নতর একটি দর্শনও লাগে। সে দর্শনটিই আনে জনগণের চেতনা রাজ্যে বিপ্লব। কিন্তু বাংলার হিন্দুগণ সে দর্শনের খোঁজ পায়নি। ফলে তাদের মনের রাজ্যে বিপ্লবও আসেনি। বরং ঘোর অন্ধকারই রযে গেছে। রামমোহন রায় ও দ্বারকানাথ সে দর্শনের খোঁজে হিন্দুর পৌত্তলিকতা ছেড়ে একাশ্বরবাদী ব্রাহ্ম ধর্মের প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন। মধুসূদন দত্ত খৃষ্টান হয়ে গেছেন। কিছু বঙ্কিমচন্দ্র, স্বামী বিবেকানন্দ, অরবিন্দো ঘোষেরা হিন্দুদের আবার সনাতন পৌত্তলিকার দিকে ফিরেয়ে এনেছেন। ফলে হিন্দুদের আবার ফিরিয়ে নিয়েছেন সে স্থানটিতে যেখান থেকে রাম মোহন, দ্বারকানাথ ও তাদের সাথীরা যাত্রা শুরু করেছিলেন। এরই ফল হল, রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর সন্তানেরাও আর সে ব্রাহ্ম ধর্মে স্থির থাকতে পারেননি, ফিরে গেছেন হিন্দু পৌত্তলিকতায়। রবীন্দ্রনাথ এমন এক কট্টর হিন্দু হওয়ার কারণেই শিবাজীকে হিরো বানিয়েছেন। আর শিবাজীর মত একজন দস্যু চরিত্রের মানুষ যখন হিরো হয় তখন কি সে জাগরণ বেঁচে থাকে? আর এটিই বাংলার হিন্দুর রেনেসাঁর আদর্শিক ও নৈতীক সংকট। এমন সংকট খোদ রেনেসাঁরই মৃত্যু ঘটায়। বাঙালী হিন্দুর রেনেসাঁও তাই বাঁচেনি।

 

দেখা যাক, রবীন্দ্র নাথ যাকে “হে রাজস্বী বীর” বলে মুগ্ধ মনে কবিতা লিখেছেন তার প্রকৃত পরিচয়টি কি? রবীন্দ্র মানস ও তাঁর চেতনাকে বুঝতে হলে শিবাজীকেও বুঝেতে হবে। এতে বুঝা যাবে রবীন্দ্রনাথভক্তদের রাজনৈতীক এজেন্ডা। প্রশ্ন হল, তিনি কি আদৌ বীর ছিলেন? শিবাজীর পরিচয় হল, মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবকে তিনি ব্যস্ত রেখেছিলেন মারাঠা অঞ্চলে লুকিয়ে থেকে অতর্কিত হামলার মধ্য দিয়ে। সম্মুখ সমরে আসার সামর্থ তার ছিল না। যুদ্ধে একবার পরাজিত ও বন্দী হওয়ার পর ফন্দি করে লুকিয়ে পালিয়েছিলেন। আরেক বার সম্রাট আওরঙ্গজেব সেনাপতি আফজাল খাঁর নেতৃত্বে ১০ হাজার সৈন্যের এক বাহিনীকে তার বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। যুদ্ধের বদলে আলোচনায় ডেকে আফজাল খাঁকে তিনি হত্যা করেন। সেটি ছিল কাপুরুষিত হত্যা। সে সময় আফজাল খাঁ তাকে ইসলামী  উদারতায় আলিঙ্গনে বুকে টেনে নিয়েছিলেন। সে মুহুর্তে তার বাঁ হাতে লুকানো “বাঘের নখ” দিয়ে তার দেহ ছিন্ন করেন। অথচ এ নিরেট কাপুরুষতা বীরতূল্য গণ্য হয়েছে রবীন্দ্রনাথের কাছে, যা নিয়ে বিশাল এক কবিতাও লিখেছেন। এ হল রবীন্দ্রনাথের বিবেচনা ও মানবতার মান! রবীন্দ্রনাথ বরং সে সব ঐতিহাসিকদেরও নিন্দা করেছেন যাদের দৃষ্টিতে শিবাজী ছিলেন এক বর্বর দস্যু। রবীন্দ্রনাথ তাঁদেরকে মিথ্যাময়ী বলেছেন, এবং তাঁদের বিদ্রুপ করে লিখেছেন,

“বিদেশীর ইতিবৃত্ত দস্যু বলে করে পরিহাস

অট্টহাস্য রবে…

তব পুণ্য চেষ্টা যত তস্করের নিস্ফল প্রয়াস

এই জানে সবে।

অয়ি ইতিবৃত্ত কথা, ক্ষান্তু করো মুখর ভাষণ

ওগো মিথ্যাময়ী,

তোমার লিখন- ‘পরে বিধাতার অব্যর্থ লিখন

হবে আজি জয়ী।

যাহা মরিবার নহে তাহারে কেমনে চাপা দিবে

তব ব্যঙ্গ বাণী

যে তপস্যা সত্য তারে কেহ বাধা দিবে না ত্রিদিবে

নিশ্চয় সে জানি।”

 

ঐতিহাসিক ডঃ রমেশ চন্দ্র মজুমদার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রসঙ্গে লিখেছেনঃ “হিন্দু জাতীয়তা জ্ঞান বহু হিন্দু লেখকের চিত্তে বাসা বেঁধেছিল, যদিও স্বজ্ঞানে তাঁদের অনেকেই কখনই এর উপস্থিতি স্বীকার করবেন না। এর প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হচ্ছে, ভারতের শ্রেষ্ঠ কবি রবীন্দ্রনাথ যাঁর পৃথিবীখ্যাত আন্তর্জাতিক মানবিকতাকে সাম্প্রদায়িক দৃ্ষ্টভঙ্গীর সঙ্গে কিছুতেই সুসংগত করা যায় না। তবুও বাস্তব সত্য এই যে, তাঁর কবিতাসমূহ শুধুমাত্র শিখ, রাজপুত ও মারাঠাকুলের বীরবৃন্দের গৌরব ও মাহাত্মেই অনুপ্রাণিত হয়েছে, কোনও মুসলিম বীরের মহিমা কীর্তনে তিনি কখনও একচ্ছত্রও লেখেননি –যদিও তাদের অসংখ্যই ভারতে আবির্ভূত হয়েছে। এ থেকেএ প্রমাণিত হয় উনিশ শতকী বাংলার জাতীয়তা জ্ঞানের উৎসমূল কোথায় ছিল।” –(সূত্রঃ Dr. Romesh Chandra Majumder, History of Bengal, p 203.)

 

ব্রিটিশের বাঙালী কলাবোরেটর

বাঙালী হিন্দুর রেনেসাঁ যুগে সবচেয়ে ঘৃণ্য যে কাজটি হয়েছে তা হল, ইংরেজদের কলাবোরেটর রূপে তাদের যোগদান। সমগ্র উপমহাদেশে তারাই সর্বপ্রথম এ পেশায় নামে। কয়েক ডজন নবেল প্রাইজ দিয়েও কি বাঙালীর এ কলংক ঢাকা যাবে? তখন ব্রিটিশ ভারতের প্রশাসনে দুই ধরনের বাবু দেখা যেত। এক, গোরা বা শ্বেতাঙ্গ বাবু, দুই, বাঙালী বাবু। বাঙালী বাবুদের ইংরেজ-সেবা শুধু প্রশাসনে সীমাবদ্ধ থাকেনি এবং শুধু বাংলাতেও সীমাবদ্ধ রাখেনি। প্রশাসনের পাশে সাহিত্যেও সেটি প্রবল ভাবে প্রকাশ পায়। বাংলার সীমান্ত ডিঙ্গিয়ে তা ছড়িয়ে পড়ে বিহার, আসাম, উড়িষ্যা, মধ্যপ্রদেশ, উত্তর প্রদেশ, পাঞ্জাব, রাজস্থান, গুজরাতসহ ভারতের অন্যান্য প্রদেশে। শিকারী যেমন শিকারী ঘুঘুকে দিয়ে ঘুঘু ধরে, তেমনি ইংরেজগণও বাঙালী হিন্দুদের দিয়ে সমগ্র ভারতের অন্যান্য প্রদেশের হিন্দুদেরও তাঁবেদারে পরিণত করে। ইংরেজ সেবার যে আদর্শ রবীন্দ্র-পরিবার ও বঙ্কিমচন্দ্র স্থাপন করেন, সেটিই ভারতীয় হিন্দুদের আদর্শে পরিণত হয়। ফল হল, এমনকি কংগ্রেস নেতা করম চাঁদ গান্ধিও প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশের পক্ষে যুদ্ধে যোগদান ও প্রাণদানের পক্ষে নিজ প্রদেশ গুজরাতে সৈন্য সংগ্রহে নেমেছিলেন।

 

বাঙালী হিন্দু ও ভারতীয় রাজনীতিতে উগ্র-হিন্দুবাদ

বাঙালী হিন্দুদের অপরাধ শুধু নয় যে, মুসলিম বিরোধী বিদ্বেষ ছড়িয়ে বাংলার সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতিকে তারা বিষাক্ত করেছে। তারা বিষাক্ত করেছে ভারতের অন্যান্য প্রদেশের হিন্দুদের মনও। ইংরেজ ওরিয়েন্টালিস্টগণ মুসলিম বিদ্বেষপূণ মিথ্যা দিয়ে যেসব ইতিহাস রচনা করে, সেগুলি সর্বপ্রথম গলধঃকরণ করে বাঙালী হিন্দুগণ। পরে তারা সেগুলির সাথে নিজ মনের আবেগ মিশিয়ে নিজেরাও ইতিহাস লেখে এবং তা সমগ্র ভারতে ছড়িয়ে দেয়। বস্তুত এসব হিন্দু বাঙালীদের লেখা বইগুলোই বহুকাল যাবত পঠিত হয়ে আসছে সারা ভারতের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যবই রূপে। অহিন্দু ও অভারতীয় ইংরেজ ওরিয়েন্টালিস্টদের লেখা ইতিহাসের স্থলে সে বইগুলোর বাড়তি সুবিধাটি হল, বাঙালী হিন্দুদের হাতে রচিত হওয়ার সেগুলো ভারতের অন্য এলাকার হিন্দুদের কাছে সহজে বিশ্বাসযোগ্যতা পায়। সে সময়ের ইতিহাসে আরেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হল, সাম্প্রদায়িক বুদ্ধিবৃত্তির পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক রাজনীতির শুরুও এই বাংলা থেকে।সেটিও এ বর্ণহিন্দুদের হাতে। সেটির মূল নায়ক ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্রপাধ্যায়। তিনি প্রথম বাঙালী জাগরণের কথা বললেও পরবর্তীতে সর্বভারতীয় হিন্দু জাগরণের অবতারে পরিণত হন। তার উপন্যাস আনন্দমঠ সে জাগরণের বানি নিয়ে প্রথমে বাংলায় এবং পরে সমগ্র ভারতে হিন্দু জাতিয়তাবাদী জাগরণ আনে। তার গান বন্দেমাতরমের মধ্য দিয়ে বিমুর্ত হয় হিন্দু রেনেসাঁর মূল সুর। কংগ্রেস সে গানকে ভারতের জাতীয় সংগীত রূপে।

 

এতো গেল সাহিত্যিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক ময়দানে উগ্র সাম্প্রদায়িকতার কথা। রাজনৈতীক ময়দানেও মুসলিম বিরোধী উগ্র হিন্দু সাম্প্রদায়ীকতার জন্মও বাঙালী হিন্দু বাবুদের হাতে। ভারতে আজ ভারতীয় বিজেপীর যে মুসলিম বিরোধী প্রচন্ড সাম্প্রদায়ীক রাজনীতি সেটিও বালঠ্যাকারের মহারাষ্ট্রে বা নরেন্দ্র মোদীর গুজরাতে জন্ম নেয়নি। অযোধ্যাতেও জন্ম নেয়নি। জন্ম নিয়েছে বাঙালী বাবুদের দ্বারা বাংলায়। আজকের যে বিজিপি, সেটিই শুরুতে ছিল হিন্দু মহাসভা। আর হিন্দু মহাসভার জন্ম কলকাতায়, এবং এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি। তিনি ছিলেন বাঙালী, এবং কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আশুতোষ মুখার্জির পুত্র। তিনি নিজেও ১৯৩৪ থেকে ১৯৩৮ অবধি কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন।  আততায়ী হাতে গান্ধীর মৃত্যু হলে দোষ বর্তায় হিন্দু মহাসভার উপর। সে দুর্নাম থেকে বাঁচার তাগিদে তিনি নতুন দল গড়েন ভারতীয় জনসংঘ যা পরবর্তীতে নাম পরিবর্তন করে হয় ভারতীয় জনতা পার্টি, সংক্ষেপে বিজেপী। বার বার নাম পরিবর্তন হলেও এ দলের মুসলিম বিদ্বেষপূর্ণ কট্টর সাম্প্রদায়ীক নীতির বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি।  তাই ভারতের মুসলিম নিধনের রাজনীতির সূত্রপাত আহমেদাবাদ, মোম্বাই বা মিরাটে হয়নি, হয়েছিল হিন্দু রেনেসাঁর জন্মভূমি কোলকাতায়। এ রাজনীতির শুরু বস্তির গুন্ডা বা ধর্ষনারী দুর্বৃত্তদের হাতেও নয়, বরং হযেছে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাঙালী উপাচার্যের হাত দিয়ে। সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রাপ্ত মানুষের মনও কতটা যে বীষাক্ত ও প্রতিহিংসাপূর্ণ করতে পারে এ হল তার নমুনা। শ্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি ১৯৪১ সালে হিন্দুদের এক জনসভায় বলেছিলেন, মুসলমানরা যদি পাকিস্তান চায় তবে তাদের তল্পিতল্পা বেঁধে ভারত ত্যাগ করা উচিত।–(BLCP, 1941)। পাকিস্তানের জন্ম ও তার বেঁচে থাকাটি তাঁর মত হিন্দুনেতাদের কাছে যে কতটা অসহ্য ছিল এ হল তার নমুনা। তাঁর কাছে অসহ্য হল ভারতে মুসলমানদের বসবাসও। বাবরী মসজিদ ধ্বংসের মধ্য দিয়ে ইতিহাস গড়েছেন বিজেপী নেতা লাল কৃষ্ণ আদভানী। বিজিপির আরেক নেতা নরেন্দ্র মোদী ইতিহাস গড়েছেন গুজরাতে মুসলিম হত্যায় নেতৃত্ব দিয়ে। তবে যে শহরে মুসলিম হত্যা রাজনৈতীক আচার রূপে সর্বপ্রথম যাত্রা শুরু করে সেটিও অন্য কোন শহর নয়, সেটি বাঙালী হিন্দুদের শহর কোলকাতা। আহমেদাবাদ, মুম্বাই, মুরাদাবাদ, বিহার ও ভারতের অন্যান্য স্থানের দাঙ্গাগুলো তো এসেছে বাঙ্গালী বাবুদের সৃষ্ট ১৯৪৬ সালে কোলকাতার দাঙ্গাটির পর।

 

মুসলিম নিধনের সুত্রপাতে কলকাতা

কোলকাতার হিন্দুদের মন যে কতটা মুসলিমবিদ্বেষপূর্ণ ও দাঙ্গাপাগল সেটিরও প্রকাশ ঘটেছিল ১৯৪৬ সালের দাঙ্গায়। সে দাঙ্গার কিছু নিজ চোখে-দেখা ভয়াবহ অবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক বাঙালী প্রফেসর ড. তপন রায় চৌধুরী তার “বাঙাল নামা” বইতে। প্রফেসর ড.তপন রায়চৌধুরি লিখেছেন, “নিজের চোখে দেখা ঘটনার বিবরণে ফিরে যাই। হস্টেলের বারান্দা থেকে দেখতে পেলাম রাস্তার ওপারে আগুন জ্বলছে। বুঝলাম ব্যাপারটা আমার চেনা মহাপুরুষদেরই মহান কীর্তি। হস্টেলের ছাদে উঠে দেখলাম –আগুন শুধু আমাদের পাড়ায় না, যতদূর চোখ যায় সর্বত্র আকাশ লালে লাল। তিন দি্ন তিন রাত কলকাতার পথে ঘাটে পিশাচনৃত্য চলে। … দাঙ্গার প্রথম ধাক্কা থামবার পর বিপজ্জনক এলাকায় যেসব বন্ধুবান্ধব আত্মীয়স্বজন ছিলেন, তাঁদের খোঁজ নিতে বের হই। প্রথমেই গেলাম মুন্নুজন হলে। ..নিরঙ্কুশ হিন্দু পাড়ার মধ্যে ওদের হস্টেল। তবে ভদ্র বাঙালি পাড়া। সুতরাং প্রথমটায় কিছু দুশ্চিন্তা করিনি। কিন্তু দাঙ্গা শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে শিক্ষিত বাঙালির রুচি-সংস্কৃতির যেসব নমুনা দেখলাম, তাতে সন্দেহ হল যে, মুন্নুজান হলবাসিনী আমার বন্ধুদের গিয়ে আর জীবিত দেখবো না। …হোস্টেলের কাছে পৌঁছে যে দৃশ্য দেখলাম তাতে ভয়ে আমার বাক্যরোধ হল। বাড়ীটার সামনে রাস্তায় কিছু ভাঙা স্যুটকেস আর পোড়া বইপত্র ছড়ানো। বাড়িটা খাঁ খাঁ করছে। ফুটপথে এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়েছিলেন। বললেন – একটু আগে পুলিশের গাড়ি এসে মেয়েদের নিয়ে গেছে।…শুনলাম ১৬ই আগষ্ট বেলা এগারোটা নাগাদ একদল সশস্ত্র লোক হঠাৎ হুড়মুড় করে হস্টেলে ঢুকে পড়ে। প্রথমে তারা অশ্রাব্য গালিগালাজ করে যার মূল বক্তব্য –মুসলমান স্ত্রীলোক আর রাস্তার গণিকার মধ্যে কোনও তফাৎ নেই। …হামলাকারিরা অধিকাংশই ছিলেন ভদ্রশ্রেণীর মানুষ এবং তাঁদের কেউ কেউ ওঁদের বিশেষ পরিচিত, পাড়ার দাদা। ” –(তপন রায়চৌধুরী, ২০০৭)। তিনি আরো লিখেছেন, “খুনজখম বলাৎকারের কাহিনী চারি দিক থেকে আসতে থাকে। …বীভৎস সব কাহিনী রটিয়ে কিছু লোক এক ধরনের বিকৃত আনন্দ পায়। তার চেয়েও অবাক হলাম যখন দেখলাম কয়েকজন তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত লোক মুসলমানদের উপর নানা অত্যাচারের সত্যি বা কল্পিত কাহিনি বলে বা শুনে বিশেষ আনন্দ পাচ্ছেন। এঁদের মধ্যে দু-তিনজন রীতিমত বিখ্যাত লোক। প্রয়াত এক পন্ডিত ব্যক্তি, যাঁর নাম শুনলে অনেক নিষ্ঠাবান হিন্দু এখনও যুক্তকরে প্রণাম জানায়, তাঁকে এবং সমবেত অধ্যাপকদের কাছে নিকাশিপাড়ার মুসলমান বস্তি পোড়ানোর কাহিনি বলা হচ্ছিল। যিনি বলছিলেন তিনি প্রত্যক্ষদর্শী এবং বিশ্বাসযোগ্য লোক। বেড়া আগুন দিয়ে বস্তিবাসীদের পুড়িয়ে মারা হয়। একজনও নাকি পালাতে পারিনি। ছেলেটি বলছিল, কয়েকটি শিশুকে আগুনের বেড়া টপকে তাদের মায়েরা আক্রমণকারীদের হাতে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, যাতে ওদের প্রাণগুলি বাঁচে। বাচ্চাগুলিকে নির্দ্বিধায় আবার আগুনে ছুঁড়ে দেওয়া হয়। আমরা শুনেছিলাম, এই কুকীর্তির নায়ক কিছু বিহারী কালোয়ার। তাই ভয়াবহ বর্ণনাটি শুনে সুশোভনবাবু মন্তব্য করেন, “এর মধ্যে নিশ্চয়ই বাঙালি ছেলেরা ছিল না?” শুনে সেই পন্ডিতপ্রবর গর্জে উঠলেন, “কেন, বাঙালি ছেলেদের গায়ে কি পুরুষের রক্ত নেই?” –(তপন রায়চৌধুরী, ২০০৭)।

 

বাংলার হিন্দুদের এই হল চেতনার মান ও বিবেক বোধ। বাংলা বিভক্ত হয় মূলত এমনি এক বিষাক্ত মনের প্রেক্ষাপেট।  তাই বাংলা বিভক্ত হয়েছিল ১৯৪৭ সালের বহু আগেই, ১৯৪৭ সালে সেটি আন্তর্জাতিক পরিচিতি ও স্বীকৃতি পায় মাত্র। রেনেসাঁর নামে বাংলার হিন্দুদের মাঝে যেটি আত্মপুজা ও মুসলিম ঘৃনার চর্চা শুরু হয়েছিল সেটিই ধাবিত করে এক মহা আত্মঘাতে। সেখানে গুরুত্ব পায় মুসলমানদের পিছনে ফেলে হিন্দুদের দ্রুত এগিয়ে চলা। পাশাপাশি দুটো গাছ জন্ম নিলে একটি অপরটির জন্য কিছু জায়গা ছেড়ে দেয়, প্রয়োজনে দুটি গাছই দুই পাশে হেলে যায়। কিন্তু হিন্দুগণ মুসলমানদের জন্য কোন স্থান ছেড়ে দিতে রাজী ছিল না। তারা দখল নিতে চেয়েছিল অর্থনীতি, রাজনীতি, শিক্ষা ও প্রশাসনের সবটুকু জুড়ে। অথচ তখন অবিভক্ত বাংলার মুসলিম জনসংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৫%। একটি দেশের ৪৫% ভাগ মানুষ তার ৫৫% ভাগ মানুষকে পিছনে ফেলে সামনে এগুয় কি করে? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আজ বিশ্বশক্তি। কিন্তু তাদের বেড়ে উঠার পিছনে বড় কারণটি হল, দেশটি সাদা-কালা, ইউরোপীয়-অইউরোপীয় সকল নাগরিককে বেড়ে উঠার জন্য স্থান করে দিয়েছে। কিন্তু বাংলায় সেটি হয়নি। বাঙালী হিন্দুদের সেরূপ উদারতাই ছিল না। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ মুসলমানদের জন্য সরকারি চাকুরিতে কিছু স্থান ছেড়ে দেয়ার জন্য হিন্দুদের সামনে সুপারিশ রেখেছিলেন, কিন্তু সেটিও তাদের পছন্দ হয়নি। প্রশ্ন হল, দুটি সম্প্রদায়ের মাঝে এত ঘৃনা, এত অবিশ্বাস ও এত বঞ্চনা বিরাজ করলে সে দেশ কি সামনে এগুতে পারে? এটিতো সংঘাত ও আত্মঘাতের পথ।

 

হিন্দু রেনাসাঁর নায়কঃ তাদের দর্শন ও কীর্তি

দেখা যাক, বাংলায় হিন্দু জাগরণের নায়ক কারা ছিলেন? কী ছিল তাদের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় দর্শন? এ জাগরনের শুরু রাজা মোহন থেকে এবং শেষ হ্য় রবীন্দ্রনাথে। এর সময়কাল উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশক অবধি। প্রশ্ন হল, এ জাগরনকে কি আদৌ রেনেসাঁ বলা যায়? রেনাসাঁর অর্থ পুণঃজাগরণ। এ শব্দটির প্রথম প্রয়োগ হয় ষোড়ক ও শপ্তদশ শতকের ইউরোপে যে জাগরন শুরু হয় সেটি বোঝাতে। গ্রীক ও রোমানদের হাতে খৃষ্টের জন্মের আগে ইউরোপ এবং পশ্চিম এশিয়ার বিশাল ভূ-ভাগ জুড়ে সাম্রাজ্য গড়ে উঠে। তাদের হাতেই প্রতিষ্ঠা ঘটে পাশ্চাত্য সভ্যতার। ইউরোপের জাগরনটি ছিল মূলতঃ সেটির পুণঃজন্ম ঘটানোর। আজকের পাশ্চাত্য সভ্যতাকেও বলা হয় সে গ্রীকো-রোমান সভ্যতারই পরম্পরা রূপ। কিন্তু বা্ংলায় হিন্দুদের মাঝে যে জাগরন আসে সেটিকে রেনেসাঁ বললে মেনে নিতে হয় বাংলার হিন্দুদের দ্বারা এর পূর্বেও একবার সভ্যতা নির্মিত হয়েছিল। অর্থাৎ তাদের হাতেও বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল। কিন্তু বাঙালী হিন্দুর ইতিহাসে সেরূপ জাগরন বা সাম্যাজ্য নির্মাণের প্রমাণ কোথায়? সেটি কি সেন রাজাদের আমল? সেনা রাজারা হিন্দু হলেও তারা বাঙালী ছিল না। এসেছিল ভারতের কর্নাটাকা থেকে। সেনদের পূর্বে তো ছিল বৌদ্ধ পাল রাজবংশ। বস্তুত উনবিংশ শতাব্দীর এ বাঙালী হিন্দুর জাগরন যেমন রেনেসাঁ ছিল না, তেমনি সমগ্র বাংলারও ছিল না। এটি ছিল বাংলার সংখ্যালঘু বর্ণহিন্দু সম্প্রদায়ের জাগরন, এমনকি সমগ্র হিন্দুদেরও নয়। কারণ বাংলার সংখ্যাগরিষ্ট জনগণ তো আজকের ন্যায় সেদিনও ছিল মুসলমান। সে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদেরকে যখন বাংলার কোন জাগরন থেকে বাদ রাখা হয় সেটিকে কি সমগ্র বাংলার রেনেসাঁ বলা যায়?

 

বাংলায় হিন্দু জাগরণের নামে যা কিছু ঘটেছে সেটির মূলে যারা ছিলেন তারা হলেন রাজা রামমোহন রায়, রবীন্দ্রনাথের দাদা দ্বারকনাথ ঠাকুর, কেশব চন্দ্র সেন, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমান দত্ত, রামতনু লাহিড়ীর ন্যায় ব্যক্তিবর্গ। শুরুতে যে দর্শনটা কাজ দেয় সেটিও হিন্দু দর্শন ছিল না। ছিল ব্রাহ্মসমাজের নব আবিস্কৃত ধর্ম যা ছিল পৌত্তলিকতা বিরোধী। রাজা রামমোহন রায় ছিলেন সে ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রধান প্রবক্তা। তাঁর পৌত্তলিকতা বিরোধী সে ধারণাটি আসে ইসলাম ও খৃষ্টান ধর্মের প্রভাব থেকে। মাইকেল মধুসূদনের মত অনেকেই যেমন খৃষ্টান ধর্মে দীক্ষা নিয়েছেন তেমনি রাজা রামমোহন রায়, দ্বারকনাথ ঠাকুর, কেশব চন্দ্র সেনের মত অনেকেই খৃষ্টান ধর্মে দীক্ষা না নিলেও হিন্দুদের সনাতন পৌত্তলিকতাকে বর্জন করেছিল। তবে কোলকাতা ভিত্তিক বুদ্ধিজীবীদের মাঝে এক ঈশ্বর ভিত্তিক ব্রাহ্ম ধর্ম আলোড়ন তুলতে সমর্থ হলেও সাধারন হিন্দুদের মাঝে সে ধর্মের তেমন বিস্তার ঘটেনি। তারা ব্যর্থ হয়েছে ধর্মীয় ইন্সটিটিউশন গড়ে তুলতে। তবে তাদের মূল সমাস্যটি হল তাদের যেমন কোন পয়গম্বর ছিল না, তেমনি কোন ধর্মীয় গ্রন্থও ছিল না। শুধু চিন্তাভাবনা, বুদ্ধিবৃত্তি বা ইনটেলেকচুয়ালিজমের উপর ভিত্তি করে ধর্ম প্রতিষ্ঠা পায় না। ফলে ব্রাহ্ম ধর্ম ব্যর্থ হয়েছে দীর্ঘকাল বেঁচে থাকতে¸ এবং রবীন্দ্রনাথের মত ব্রাহ্মরা তাই অবশেষে মিশে গেছেন পুরোন হিন্দুধর্মের মূল দেহে। এর পর আসেন বঙ্কিমচন্দ্র, হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র, দ্বিজেন্দ্রলাল, দ্বীনবন্ধু মিত্র, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্রের মত সাহিত্যিক। সাহিত্যের পাশাপাশি হিন্দু ধর্মের পুণর্জাগরনের বাণী নিয়ে হাজির হাজির হন বিপিন চন্দ্র পাল, স্বামী বিবেকানন্দ ও অরবিন্দু ঘোষ।  বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এগিয়ে আসেন জগতিশ চন্দ্র বোস ও সত্যন্দ্র নাথ বোস। রাজনীতিতে আসেন সুরেন্দ্র নাথ ব্যানার্জী, চিত্তরঞ্জন দাশ, সুভাষ বোস এবং শরৎ বোস। এভাবেই শুরু হয় তথাকথিত রেনেসাঁ। এটি বাংলায় শুরু হলেও বাংলার সংখ্যাগরিষ্ট মুসলমানদের এতে কোন প্রতিনিধিত্ব ছিল না।

 

যে কোন জাগরণেরই একটি উচ্চতর মানবিক লক্ষ্য থাকে। অজ্ঞতা, পশ্চাদপদতা ও কুসংস্কারের বদলে মানবতা তখন নতুন প্রাণ পায়। রেনেসাঁকে তখনই প্রকৃত রেনেসাঁ বা পুনঃজন্ম বলা যায়। কিন্তু সে বাঙলার হিন্দু রেনেসাঁর মানবতার মান কতটুকু ছিল? রবীন্দ্র নাথ যখন কবিতা লেখা শুরু করেছেন বাঙালীর তথাকথিত রেনেসাঁ তখন মধ্য গগনে। অথচ তখনও বাংলায় সতিদাহের নামে বিধবা রমনীদের চিতায় জ্বলতে হচেছ। রবীন্দ্রনাথের কবিতায় সেটি প্রশংসিত হয় বিধবার আত্মদান রূপে। তিনি সেটির প্রতি শ্রদ্ধাভরে উৎসাহ দিয়ে লিখেছেন,

“জ্বল জ্বল চিতা দ্বিগুণ দ্বিগুণ

পরান সপিবে বিধবা বালা।

জ্বলুক জ্বলুক চিতার আগুন

জুড়াবে এখনি প্রাণের জ্বালা।”

 

সতিদাহ প্রথাকে আইন করে বিলুপ্ত করে ব্রিটিশ সরকার। বিধবা হিন্দু রমনীদের বাঁচানো নিয়ে কবিতা বা প্রবন্ধ না লিখলেও রবীন্দ্রনাথের নজর পরে তাদের গো’ দেবতা বাঁচানোর দিকে। তখন সে গো’ দেবতা বাঁচানোর মিশন নিয়ে ময়দানে নামেন শিবাজীর আরেক ভক্ত মহারাষ্ট্রের সাম্প্রদায়িক নেতা তিলক। তিনি ১৮৯৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেন “গোরক্ষিণী সভা”। তখন গরু বাঁচাতে গিয়ে তখন ভারত জুড়ে শুরু হয় মুসলিম হত্যা। রবীন্দ্রনাথও তিলকের এ মিশনে একাত্ম হন এবং তাঁর জমিদারী এলাকায় গরু কোরবানী নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। এই হল, হিন্দু বাঙালীর রেনেসাঁ চেতনা। ঐতিহাসিক নীরদ চৌধুরী তাই লিখেছেন, “রামমোহন থেকে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত সকলেই জীবনব্যাপী সাধনা করেছেন একটি মাত্র সমন্বয় সাধনের, আর সেটি সমন্বয়টি হিন্দু ও ইউরোপীয় চিন্তাধারার। ইসলামী ভাবধারা ও ট্রাডিশন তাঁদের চেতনাবৃত্তকে কখনও্ স্পর্শ করেনি। -(সূত্র, Nirod Chandra Chowdhury, Autobiography of an Unknown Indian, p 196.) ইংরেজদের শাসন প্রতিষ্ঠার পরও এদেশে ইংরেজী ভাষার পাশাপাশি আরবী, ফারসী, হিন্দি, সংস্কৃত ভাষার ন্যায় ভাষাচর্চা ছিল। কিন্তু রাজা রামমোহন রায়ের মত বাঙালীদের সেটি পছন্দ হয়নি। তারা জোর দেয় আরবী ফার্সী বর্জন করে সরকারকে ইংরেজী চর্চার উপর গুরুত্ব দিতে। রাজা রাম মোহন রায় যখন লন্ডন যান সেখানে গিয়েও সেটিই ব্রিটিশ সরকারকে বোঝান। অথচ ভারতীয় মুসলমানদের ধর্ম ও সংস্কৃতির ভাষা ছিল আরবী ও ফারসী। মুসলিম নর-নারীদের উপর জ্ঞান শিক্ষা এ জন্য ফরয নয় যে তা থেকে ব্যবসা-বাণিজ্যে ও চাকুরিতে সুবিধা হবে। বরং এ জন্য যে, শিক্ষার মাধ্যমে এ জীবন ও জগতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্যটিকে জানার সুযো্গ মিলবে। সুযোগ মিলবে মহান আল্লাহর হিদায়েতের বাণীটি জানার। সুযোগ মিলবে ইসলামী সংস্কৃতি নিয়ে বেড়ে উঠার। একমাত্র তখনই সে শিক্ষার মাধ্যমে মানব জীবনের সবচেয়ে বড় উপকারটি হয়। একজন মুসলমানের জীবনে শিক্ষার প্রয়োজন ও শিক্ষাবিষয়ক মূল দর্শনটির মোদ্দা কথা তো এটাই। তাই সে প্রয়োজনটি না মিটলে  সে শিক্ষালাভে অনাগ্রহ জাগাটাই স্বাভাবিক। ব্রিটিশদের প্রণীত শিক্ষানীতিতে মুসলমানদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রয়োজন মেটানোর বিষয়টিকে পরিকল্পিত ভাবে বাদ দেয়া হয়। বরং গুরুত্ব পায় ব্রিটিশের কেরানী, সেপাই, ট্যাক্স কালেক্টর, ম্যাজিস্টেট তথা সদা অনুগত দাসসৃষ্টির বিষয়টি। ফলে হাতিয়ারে পরিনত হয় ব্রিটিশের কলাবোরেটর বা দালাল সৃষ্টির। তাই আত্মসন্মানবোধ সম্পন্ন কোন মুসলমান কি এমন শিক্ষায় আগ্রহী হতে পারে?

 

ব্রিটিশ এজেন্ডা ও হিন্দু মানস

ব্রিটিশ সাম্রাজীবাদীরা ভারতবাসীদের শিক্ষিত করার জন্য এদেশে আসেনি। আসেনি এদেশে বসবাসের জন্যও। ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানী বা ব্রিটিশ সরকার কোন খয়রাতি প্রতিষ্ঠানও ছিল না। তাদের দায়বদ্ধতা ভারতবাসীর প্রতিও ছিল না, ছিল কোম্পানীর ব্রিটিশ শেয়ার হোল্ডারদের প্রতি। ফলে তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য হয়, বাণিজ্যের নামে অধিকতর শোষন ও লুন্ঠন। শোষণ ও লুন্ঠনের কাজটি তীব্রতর করার স্বার্থেই তারা কোম্পানীর কাজকে শুধু ব্যবসার মধ্যে সীমিত রাখেনি। আত্মনিয়োগ করে রাজ্যজয় ও রাজ্যশাসনে। এজন্যই যে কোন সংজ্ঞায় তারা ছিল ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদী। সুশিক্ষায় ও সুস্থ্য চেতনায় কোন মানুষই এরূপ ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদীর গোলামী মেনে নিতে পারে না। তাদের সেবকও হতে পারে। বরং সুশিক্ষিত ব্যক্তি মাত্রই তাদের শত্রু হবে ও তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হবে সেটাই স্বাভাবিক। যে কোন সুস্থ্য মানুষের ন্যায় ইংরেজরাও এ সত্যটি বুঝতো। ইংরেজগণ তাই সুশিক্ষার বিস্তার ঘটিয়ে নিজ শত্রুদের শক্তিবৃদ্ধি ঘটাবে সেটি কি বিশ্বাস করা যায়? শিক্ষার লক্ষ্য যদি হয় শত্রুর সাম্রাজ্যবাদী দখলদারীকে মজবুত করার হাতিয়ার তবে তার সাথে কি কোন স্বদেশপ্রেমিক শামিল হতে পারে? এখানেই হিন্দু-মানসের সাথে তৎকালীন মুসলিম-মানসের মূল পার্থক্য। হিন্দুরা ব্রিটিশদের শত্রু ভাবতো না, বরং ভাবতো ভগবানের প্রেরিত মূক্তিদাতা। সেটি ধরা পড়ে হিন্দুদের রচিত সাহিত্যে। বৃটিশ রাজকে ‘জন-গণ-মনঅধিনায়ক, জয় হে’ বলে রবীন্দ্রনাথ স্তুতিমূলক কবিতা লিখেছেন। শরৎচন্দ্র তার “পথের দাবী” উপন্যাসে ইংরেজদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ সেটি পছন্দ করেননি। নিন্দা জানিয়ে তিনি শরৎচন্দ্রকে চিঠি দিয়েছেন। লিখেছিলেন, “কল্যাণীয়েষু, তোমার পথের দাবী পড়া শেষ করেছি। বইখানি উত্তেজক। অর্থাৎ ইংরেজদের শাসনের বিরুদ্ধে পাঠকের মনকে অপ্রসন্ন করে তোলে। …ইংরেজ রাজ ক্ষমা করবেন এই জোরের উপরেই ইংরেজ রাজকে আমরা নিন্দা করি এটাতে পৌরুষ নেই। আমি নানা দেশে ঘুরে এলুম। আমার যে অভিজ্ঞতা হয়েছে তাতে এই দেখলাম একমাত্র ইংরেজ গবর্নমেন্ট ছাড়া স্বদেশী বা বিদেশী প্রজার বাক্যে বা ব্যবহারে বিরুদ্ধতা আর কোন গভর্নমেন্ট এতটা ধৈর্য্যের সঙ্গে সহ্য করে না।– ইতি তোমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তারিখ ৭/৩/১৩৩৩।  –(সূত্রঃ শ্রী শিশির কর)।

 

শরৎচন্দ্রের কাছে লেখা রবীন্দ্রনাথের এ চিঠিতে যে পোষমানা চেতনার প্রকাশ ঘটেছে সেটি শুধু রবীন্দ্রনাথের একার ছিল না। এমন একটি উপলব্ধি ছিল সে আমলের অধিকাংশ শিক্ষিত হিন্দুদের। আর এখানেই ব্রিটিশ প্রণীত শিক্ষাব্যবস্থার বড় সাফল্য। শিক্ষার লক্ষ্য শুধু অক্ষরজ্ঞান, হিসাবজ্ঞান বা কারিগরিজ্ঞান নয়, বরং শিক্ষার মধ্য দিয়েই ধর্ম, চিন্তা-চেতনা, দর্শন, রাজনীতি¸ সমাজনীতি, সংস্কৃতি ও রুচীবোধে আসে বিপ্লবী পরিবর্তন। মন পায় সঠিক দিকনির্দেশনা। তবে শিক্ষা শুধু সুশিক্ষা নয়, কুশিক্ষাও হতে পারে। ফিরাউন, নমরুদ, হিটলার, মুসোলিনির মত অতি দুর্বৃত্তদেরও একটি শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল। আজকের সাম্রাজ্যবাদী দুর্বৃত্তদেরও আছে। ভারতে তেমনি ব্রিটিশ শাসকদেরও ছিল। শিক্ষার মধ্য দিয়ে মিশনারিরা যেমন ছাত্রদের নিজ ধর্মের দিকে টানে, সাম্রাজ্যবাদীরা তেমনি গড়ে নিজেদের পক্ষে লাঠিধরার লোক। ভারতে তারা এতটা বিপুল সংখ্যায় গড়ে উঠেছিল যে তাদের ১৯০ বছর ঔপনিবেশিক শাসনে তাদের নিজেদের লাঠি ধরার প্রয়োজন খুব একটা দেখা দেয়নি। আর বাঙালী হিন্দুগণ লাঠিধরার কাজে ভারতের অন্য যে কোন ভাষাভাষীদের চেয়ে অধিক সংখ্যায় ছিল তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে?

 

ঔপনিবেশিক শাসন প্রসঙ্গে হিন্দু দর্শন ও মুসলিম দর্শন

মুসলমানদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা ইংরেজী শিখেনি। এটি সত্য, অধিকাংশ মুসলমানই ইংরাজী শেখায় ও ইংরেজদের সহযোগিতায় এগুয়নি। তারও বোধগম্য কারণ ছিল। সেটি বোঝাও সহজ। ঔপনিবেশিক আগ্রাসীদের সহযোগীতায় হাত বাড়ানো ইসলামে হারাম। এটি শুধু মুসলমানের রাজনীতির কথা নয়, ধর্মেরও কথা। ইসলামে জ্ঞানার্জন ফরজ। মুসলমান যেমন নামায-রোযার ন্যায় ইবাদত থেকে দূরে থাকতে পারে না, তেমনি দূরে থাকতে পারে না জ্ঞানার্জন থেকেও। বেঁচে থাকার জন্যই পানাহার ফরজ, কিন্তু সে পানাহারের নামে যদি হারাম বস্তু সেবনের ব্যবস্থা হয় তখন সেটি হারাম। তেমনি শিক্ষার বিষয়টিও। ব্রিটিশগণ শিক্ষার নামে সেটারই ব্যবস্থা করেয়ছিল।। ভারতের মুসলমানদের, বিশেষ করে, বাংলার মুসলমানদের সে শিক্ষা থেকে দূরে থাকার দূরে থাকার এটিই হল মূল কারণ। ফলে মুসলমানগণ তখন মসজিদ ও মাদ্রাসাকেন্দ্রীক বিকল্প শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলে। ব্রিটিশ প্রণীত শিক্ষাব্যবস্থা থেকে দূরে থাকার ফলে মুসলমানগণ চাকুরিবাকুরি ও অর্থনৈতিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হলেও তারা বেঁচেছিল ব্রিটিশের মানসিক গোলাম হওয়া থেকে। কতটা বেঁচেছিল তার উদাহরণ দেয়া যাক রবীন্দ্রনাথের লেখা থেকেই। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘রাজা রাজা’ প্রবন্ধে লিখেছেন, “কিছুদিন হইল একদল ইতর শ্রেণীর অবিবেচক মুসলমান কলিকাতার রাজপথে লৌহ খন্ড হস্তে উপদ্রবের চেষ্টা করিয়াছিল। তাদের জন্য বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, উপদ্রবের লক্ষ্যটা বিশেষরূপে ইংরেজদের প্রতি। তাহাদের যথেষ্ট শাস্তিও হইয়াছিল। …কেহ কেহ বলিল মুসলমানদের বস্তিগুলো একেবারে উড়াইয়া পুড়াইয়া দেওয়া যাক…।” –রবীন্দ্রনাথ রচনাবলী, ১০ম খন্ড, পৃঃ ৪২৮-৪২৯। ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদীরা যে কোন সভ্য দেশেই প্রতিরোধের মুখে পড়ে। সেদেশের শুধু শিক্ষিত লোকেরাই এ দুর্বৃত্তদের ঘৃনা করেনা, ঘৃনা করে এমনকি নিরক্ষর মানুষেরাও। তাদের বিরুদ্ধে মিছিল, লড়াই এমনকি অস্ত্র ধারনও তারা জায়েজ মনে করে। মানব মনে এমন ঘৃনা ও এমন প্রতিরোধ গড়ে উঠার জন্য বড় মহাত্ম বা সাধক হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। সুস্থ্য মানুষের এটাই তো মানবিক গুণ। কোলকাতার রাস্তার যে মুসলমান ব্যক্তিটিকে ইংরেজদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছে সে ব্যক্তিটি রবীন্দ্রনাথের ন্যায় নোবেল বিজয়ী ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারীও ছিল না। সে ছিল রাস্তার মানুষ। কিন্তু ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে ঘৃনা করার যে নৈতিক বল সে দেখিয়েছে, রবীন্দ্রনাথ কি সেটি পেরেছেন? অথচ রবীন্দ্রনাথ তাঁকে ইতর বলেছেন। অথচ রবীন্দ্রনাথের বই ব্যবহৃত হয়েছে সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে সাফাই গাওয়ার দলিল রূপে। তাঁর লেখা “চার অধ্যায়” উপন্যাসটির শত শত কপি ব্রিটিশ সরকার তাঁর অনুমতি নিয়ে ভারতের বিভিন্ন জেলে রাজবন্দীদের মাঝে বিতরণ করেছে যাতে সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে ব্রেইন ওয়াশ তথা মগজ ধোলাই করা যায়। (সূত্রঃ অরবিন্দ পোদ্দার)।

 

বাঙালী হিন্দুর মুসলিম ভীতি ও আত্মঘাত

রেনেসাঁর নামে বাংলার হিন্দুদের মগজে যেটি প্রবল ভাবে দানা বাঁধে সেটি মুসলিম ভীতি ও ইংরেজদের প্রতি সেবাদাস মানসিকতা। তাদের ভয়ের কারণ, ইংরেজদের চলে যাওয়ার পর না জানি মুসলিমগণ আবার ভারতের শাসনকর্তায় পরিণত হয়। অতিরিক্ত ভয় অনেক সময় মানুষ আত্মহত্যায় ধাবিত করে। বাঙালী হিন্দুদের ক্ষেত্রে সেটিই হয়েছে। সে ভয়ের কারণেই তারা ১৯০৫ সালে যেমন বাংলার বিভক্তির বিরোধীতা করেছে,আবার ১৯৪৭য়ে এসে বাংলাকে ভাগ করার পক্ষে জিদ ধরে। সে ভয় নিয়েই তারা ইংরেজ শাসনামলকে তারা নিজেদের অবকাঠামো মজবুত করার কাজে ব্যবহার করে। সেটি যেমন শিক্ষাদীক্ষায়, তেমনি রাজনীতি, অর্থনীতি, সাহিত্য ও শিল্পে। শিক্ষা-দীক্ষায় অগ্রগতির সাথে সাথে বাড়তে থাকে তাদের মনবল ও আত্মবিশ্বাস। সে সাথে নিজেদের মনে বৃদ্ধি ঘটায় মুসলিম বিদ্বেষ ও ঘৃনা। তাদের মাঝে প্রবলতর হয় অখন্ড হিন্দু রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন। যে স্বপ্ন এক কালে বঙ্কিম ও রবীন্দ্র সাহিত্যে প্রকাশ পেয়েছিল সেটিই পরবর্তীতে হিন্দু মহাসভা, জনসংঘ, ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজিপী) ও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতাদের নীতিতে পরিণত হয়। বাঙালী হিন্দুর রেনেসাঁ এ ভাবেই জন্ম দেয় ভারত জুড়ে হিন্দু জাগরন। সে সাথে মুসলিম শক্তির নির্মূলের স্বপ্নও। ঘৃনার ফলে তারা সামর্থ হারিয়েছে প্রতিবেশীকে বন্ধু রূপে দেখার।

 

ঘন আঁধার রাতে ভীতু মন দূরের আলোকে ভূতের আলো ভাবে। ভয়ে সে বাকশক্তি হারায়। একই অবস্থা বাঙালী হিন্দুর। এটাই তাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। অন্যরা না জানলেও তারা ভাল জানে তারা তাদের প্রতিবেশী সংখ্যাগরিষ্ট বাঙালী মুসলমানদের কতটা ঘৃনা, কতটা অবিশ্বাস ও কতটা ভয় করে। পাশের প্রতিবেশীকে অবিশ্বাস ও ভয়ানক শত্রু ভাবলে কেউ কি রাতে ঘুমুতে পারে? ঘুমুতে পারে না বলেই তারা ১৯৪৭ সালে পূর্ব বাংলা থেকে তারা পৃথক হয়ে যায়। এভাবে বাঙালী হিন্দুর রেনেসাঁর মৃত্যু হয়েছে অনেক আগেই। কিন্তু সে রেনাসাঁ কালে যে ঘৃনা ও বিদ্বেষের বিষবৃক্ষ রোপন করা হয়েছিল সেটি মরিনি, বরং তা প্রকান্ড রূপে বেড়ে উঠেছে। এখন সেটি বিষময় ফলও ফলাচ্ছে, এবং অবিরাম ভাবে। এবং বাঙালী হিন্দুর মৃত রেনেসাঁর সে মূল সুরটি এখন প্রতিধ্বনিত হচ্ছে ভারত সরকারের আগ্রাসী নীতির মধ্যে। সেটি সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে হিন্দু আধিপত্য প্রতিষ্ঠার। ফলে ১৯৪৮য়ে কাশ্মিরে ভারতীয় আগ্রসন ও জবরদখল, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বার বার যুদ্ধ, একাত্তরের পর বাংলাদেশের উপর ২৫ সালা দাসচুক্তি ছিল সে অভিন্ন আধিপত্যবাদী স্ট্রাটেজীরই অংশ। ফলে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর দেশটির সম্পদের নির্মম লুন্ঠন ও লুন্ঠনের মধ্য দিয়ে ১৯৭৪য়ে ভয়ানক দুর্ভিক্ষ ঘটাতে তাদের বিবেকে সামান্যতম দংশনও হয়নি। তখন লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশীর জীবনে ভারত জঠরজ্বালা ও মৃত্যু উপহার দিয়েছিল। আর এখন সে বিষের ফল সীমান্ত ঘিরে কাঁটাতারের বেড়া, উজানে পানি অপহরন, সমুদ্রসীমা ও তালপট্টি দখল, তিনবিঘা সহ সীমান্ত-ভূমি দখল এবং সীমান্তে লাগাতর মানুষ হত্যায় রূপ নিয়েছে। একটি জনগোষ্ঠীর অহংকারপূর্ণ অভিলাষ কিভাবে তার নিজের আত্মঘাত ও অন্যের বিরুদ্ধে নাশকতায় রূপ নেয় এ হল তার নমুনা। লন্ডন ১২/০৩/১১

গ্রন্থপঞ্জিঃ

1). Bengal Legislative Council Proceedings (BLCP) 1941, Vol. LIV No 6, p 216.

২). তপন রায়চৌধুরী, ২০০৭; বাঙালনামা, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, ৪৫ বেনিয়াটোলা লেন, কলকাতা ৭০০ ০০৯।

৩). শ্রী শিশির কর, নিষিদ্ধ বাংলা, পৃঃ ২৪,৩২, দরদী শরৎচন্দ্র, মনীন্দ্র চক্রবর্তী, শরৎচন্দ্রের টুকরো কথা, অবিনাশ চন্দ্র ঘোষ)।

৪). অরবিন্দ পোদ্দার, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, উচ্চারণ, কোলকাতা, পৃঃ৩২০)।

 




বিপর্যয়ের মুখে পাশ্চাত্যের পরিবার

মানব ইতিহাসের সবচেয়ে পুরাতন ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতষ্ঠান হলো পরিবার। মানব-সভ্যতার বয়সের সমান এর বয়স। সভ্যতার জন্ম ও অগ্রগতিতে পরিবারের অবদানই সর্বাধিক। নিছক মাতৃর্গভে জন্ম নিলেই মানব-শিশু মানব রুপে বেড়ে উঠেনা। সে মানব রূপে বেড়ে উঠার মূল সবক ও প্রশিক্ষণ পায় পরিবার থকে। পরিবারের অপরিসীমের গুরুত্বরে কথা হাদীস শরীফে বহুভাবে র্বণতি হয়ছে। নবী কারীম (সাঃ) বলছেন, “প্রতিটি মানব শিশুই জন্ম নয়ে মুসলমান রূপ, কিন্তু পিতা-মাতা বা পরিবারের প্রভাবে বেড়ে উঠে ইহুদী, নাসারা বা অমুসলমি রূপে।” সভ্যতা নির্মানের কাজ একমাত্র মানুষের, পশুদের নয়। আল্লাহর খলীফা হওয়ার কারণে প্রতিটি মুসলমানই একাজে দায়বদ্ধ। তবে এ লক্ষ্যে পরিবার অপরিহার্য। কারণ, সভ্যতার যারা নির্মাতা তাদের নির্মানেও তো প্রতিষ্ঠান চাই। পরিবার বস্তুতঃ সে কাজটিই করে।

মানব ইতিহাসের এই সনাতন প্রতিষ্ঠানটি আজ বিপর্যের মুখে। ফলে বিপন্ন আজ মানবতা। এবং থমকে দাঁড়িয়েছে সভ্যতার অগ্রগতি। ইট ধ্বসে গেলে প্রাসাদও ধ্বসে যায়। তেমনি পরিবার বিধ্বস্ত হলে বিধ্বস্ত হয় সভ্যতা। নির্জন বনে-বাদাড়ে বা মরুভূমিতে  কোন মানবশিশুই সভ্য রূপে বেড়ে উঠনো, সভ্যতাও সেখানে নির্মিত হয়না। উদ্ভিদ বা পশু-পাখীর পক্ষে একাকী বেড়ে উঠা সম্ভব হলেও মানুষরে পক্ষে তা অসম্ভব। পশুকুলে মানব শিশুকে ছেড়ে দিলে সে শুধু দৈহিক নিরাপত্তাই হারায়না, মানবিক গুন নিয়ে বেড়ে উঠার সুযোগও হারায়। মানুষ প্রভাবিত হয়ে তার আশে-পাশের অন্যকে দেখে। ছোট বেলা থেকেই যে শিশু ধর্মের নামে পিতামাতা ও প্রতিবেশীদের শাপ-শকুন, গরু, পাহাড়-পর্বত ও মুর্তির উপসানা দেখে সে শিশু পরবর্তীতে নোবেল প্রাইজ পেলেও ছোটবেলার ধর্মীয় বিশ্বাস ও অভ্যাস সহজে ছাড়তে পারে না। এজন্যই ভারতীয় হিন্দু বিজ্ঞানীগণ শাপ-শকুন, পাহাড়-পর্বত ও মুর্তি পূজার মধ্যে মুর্খতা দেখতে পায়না। একই অস্বাাবিঅসএকই কারণে পাশ্চাত্যরে একজন সেরা দার্শনিক বা ধার্মিক ব্যক্তি কোনরূপ অসভ্যতা দেখেনা উলঙ্গতা, ব্যভিচার, মদ্যপান ও সমকামিতার মধ্যে। পশু যেমন পাশে উলঙ্গতা বা ব্যভিচার হলেও তাতে ভ্রুক্ষেপও করে না, তেমনি অবস্থা পাশ্চাত্য দেশের এসব শিক্ষিতদের। জঘন্য পাপাচার ও কদর্য অসভ্যতাও তাদের কাছে অতিশয় স্বাভাবিক সভ্য-কর্ম রূপে গণ্য হয়। পাপাচারের প্রকাশ্য প্রদর্শণী এজন্যই সমাজে বন্ধ হওয়া জরুরী। এজন্যই জরুরী হল, পাপাচারমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্রের নির্মান। ইসলামে এটি র্সবশ্রষ্ঠে ইবাদাত। ঈমানদাররে এ কাজটিতেই অন্যরা সবচেয়ে বেশী উপকৃত হয়। পরিবার, রাষ্ট্র ও সমাজ একমাত্র এপথেই পুতঃপবিত্রতা পায়। এবং যে কোন সমাজে এটিই সবচেয়ে ব্যয়বহুল কাজ। নবীজী (সাঃ) ও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় কোরবানীটি পেশ করেছেন মূলতঃ এ মহান কাজে। রক্তক্ষয়ী জিহাদ লড়েছেন তারা আমৃত্যূ।এরূপ অর্থ-ব্যয়,রক্তক্ষয় নামায-রোযা-হজ্জ-যাকাত বা আল্লাহর অন্য কোন  বিধান পালনে হয় না।

 

এ বিশ্বে সব জাতি সভ্যতা গড়েনি। জন্ম দেয়নি উন্নত রুচিবোধ বা মূল্যবোধের। সুশৃঙ্খল পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মানে যারা সফল, এ কাজ বস্তুতঃ তাদের। আবর্জনার স্তুপের পাশের আবাদী ছেড়ে মানুষ যখন নগর গড়েছে, সভ্যতার নির্মাণও তখন শুরু হয়েছে। নৃশংস বর্বরতায় আরবরা এককালে ইতিহাস গড়েছিল। নিজের জীবিত কণ্যাকে তারা জ্যান্ত দাফন করতো। কিন্তু এ আরবরাই আবার র্সবকালরে সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার জন্ম দিয়েছিল। তাদের এ সফলতার কারণ, আল্লাহর হেদায়াতের অনুসরণ। এবং নিজেদের গড়েছেন নবীজীর (সাঃ)আদর্শে। বেদের বস্তি বা ভিখারীর কুড়ে ঘর নির্মানে নকশা বা মডেল লাগেনা, কিছু বাঁশ-কঞ্চি ও খড়-কুটো হলেই যথেষ্ট। কিন্তু সেটি অপরিহার্য তাজমহল নির্মানে। উন্নত সমাজ ও সভ্যতার নির্মানে তেমনি অপরিহার্য হলো উন্নত আদর্শ বা নির্দেশনা। ইসলামে সে আদর্শ বা মড়েল হলেন স্বয়ং নবীজী (সাঃ)। আর নির্দেশনা ও মূল নকশাটি দিয়েছেন খোদ আল্লাহতায়লা। এবং আল্লাহতায়লার সে নির্দেশনা বা হেদায়েত এসেছে পবিত্র কোরআনে। অসভ্য বসবাসে আদর্শ লাগে না। আইয়ামে জাহিলিয়াত যুগের আরবরাই শুধু নয়, আজও বহুশত কোটি মানুষ বসবাস করছে আল্লাহর হেদায়েত ছাড়াই। এতে সভ্যতর মানব সৃষ্টির কাজ সামনে এগুয়নি। বরং প্রচন্ড অসুস্থ বেড়েছে মানব সভ্যতার। হালাকু-চেংঙ্গিজের চেয়ে বর্বর মানুষের জন্ম হয়েছে সভ্যতার এ অসুস্থ্যতার কারণে।

 

আল্লাহর হেয়ায়েত এবং রাসূল (সাঃ)র আদর্শের অনুসরণের ফায়দা যে কত বিশাল ও কল্যাণকর সেটি প্রমাণ করেছেন প্রাথমিক কালের মুসলমানেরা। এবং সেটি মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা নির্মানের মধ্য দিয়ে। আলোর মশাল গভীর অন্ধকারেও পথ দেখায়। তেমনি ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নির্মানে পথ দেখায় নবী-রাসূলের আদর্শ। এক্ষেত্রে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ হলেন সর্বশেষ নবী হযরত মহম্মদ (সাঃ। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা তাঁকে “উসওয়াতুন হাসানা” বা উত্তম আর্দশ বলেছেন। মুসলমান হওয়ার অর্থ নবীজী (সাঃ)কে শুধু আল্লাহর রাসূল হিসাবে মৌখিক স্বীকৃতি দেয়া নয়, বরং জীবনের প্রতিপদে তাঁকে অনুকরণীয় আদর্শ রূপে কবুল করা। নবীজী (সাঃ)র সাথে সাহাবায়ে কেরামের আচরণ সেটিই ছিল। তাঁকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে উত্তম আদর্শ রূপে বিশ্বাস করা বা অনুসরণ করাই কুফরি। এটি ইসলাম থেকে বিচ্যুতি। সাহাবায়ে কেরাম তাদের সমস্ত কর্ম ও আচরণে –তা সে ইবাদত হোক বা ব্যক্তি-পরিবার-রাষ্ট্র ও সমাজ গঠন হোক – তার অনুসৃত আদর্শকে অনুসরণ করেছিলেন। আলোর ন্যায় নবীজি (সাঃ)র আর্দশও আরবের ঘরগুলোকে সেদিন আলোকিত করেছিল। ফলে দূরীভূত হয়েছিল মিথ্যা ও অজ্ঞতার অন্ধকার। তখন ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ শিক্ষালয়ে পরনিত করছেলি মুসলমানদের প্রতিটি ঘর্ ও প্রতিটি পরিবার। এবং এভাবে অতি দ্রুত অগ্রসর হয়েছিলেন উচ্চতর সভ্যতা নির্মানের দিকে। সে কালে কোন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না, কিন্তু মুষ্টিমেয় সাহাবীদের ঘর থেকে যে মাপের জ্ঞানবান মানুষ তৈরী হয়েছিল তা মুসলিম বিশ্বের সবগুলো বিশ্ববিদ্যায় বিগদ হাজার বছরে পারেনি। উচ্চতর সভ্যতা নির্মানের কাজ তো এভাবেই ঘর বা পরিবার থেকে শুরু হয়। একাজে পরিবার নিষ্ক্রীয় হলে ব্যাক্তির উন্নয়নের সাথে উম্মাহর উন্নয়ন থমকে দাড়ায়। সভ্যতা কি? এটি হলো জাতীয় জীবনে সভ্যতর ব্যক্তিসমুহের সৃষ্টিশীল কর্ম ও সভ্যতর পরিবর্তনের যোগফল। ফলে একই রকম কুঁড়ে ঘরে হাজার বছর বাস করলে তাতে সভ্যতা নির্মিত হয়না। কারন এটি স্থবিরতা। এমন স্থবিরতায় প্রকাশ পায় আদিম অজ্ঞতাকে আঁকড়ে ধরে বসবাসের প্রবনতা। অথচ পিরামিড বা তাজমহল গড়লে সেটি সভ্যতার অংশ হয়ে যায়। কারন তাজমহলের নির্মানে স্থাপত্যশিল্পকে কুঁড়ে ঘর নির্মানের কৌশল থেকে বহু পথ পাড়ি দিতে হয়। সভ্যতার গুণাগুণ বিচারে তো সে অগ্রগতিটুকুরই বিচার হয়। কিন্তু সভ্যতার তুলনামূলক বিচারে কৃষি, শিল্প, প্রাসাদ বা নগর নির্মানের পাশাপাশি উচ্চতর মানুষ গড়ার শিল্প কতটা সামনে এগুলো সেটিই বেশী গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সেটি যখন উৎকর্ষ পায় তখনই শ্রেষ্ঠতর সভ্যতা নির্মিত হয়। মিশরে বিস্ময়কর পিরামিড বা চীনে বিশাল প্রাচীর নির্মিত হলেও মানবিকতা সম্পন্ন সে বিশাল মাপের মানুষ নির্মিত হয়নি। অথচ সেটি সম্ভব হয়েছিল ইসলামে। অন্য সভ্যতা থেকে ইসলামি সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্ব তো এখানেই।

 

নবীজী (সাঃ) বলেছেন, “দুঃখ হয় ঐ ব্যক্তির জন্য যার জীবনে দুইটি দিন অতিক্রান্ত হলো অথচ তার জ্ঞান ও তাকওয়ার কোন পরর্বিতনই হলোনা”। অথচ আজ মুসলিম বিশ্বে এমন মানুষের সংখ্যা কোটি কোটি যাদের জীবনে শুধু শুধু দুটি দিন নয়, হাজারো দিন -এমন কি সমগ্র জীবন কেটে গেছে অথচ তাদের জ্ঞান ও তাকওয়ার ভান্ডারে কোন পরিবর্তনই আসেনি। সারাটা জীবন বাস করছে অজ্ঞতার ঘোর অন্ধকারের মাঝে। অতিবৃদ্ধ বয়সেও কোরআনের সামান্য একটি ছুরাও বোঝবার সামর্থ অর্জন করেনি। একজন মানুষের কাছেও দ্বীনের দাওয়াত পৌছানোর সামর্থ অর্জন করেনি। যে মুসলমানের জীবনে পরর্বিতনহীন দুইটি দিন যেখানে অসহ্য সে ব্যক্তি কাদা-মাটি, লতা-পাতা, বাঁশ-কঞ্চির ঘরে হাজারো বছর কাটায় কি করে? অথচ বাংলাদেশের ন্যায় দেশে মুসলমানেরা তো সেটিই করেছে। একই রূপ ঘর, একই রূপ কৃষিকাজ ও একই রূপ সংস্কৃতির মাঝে তাদের বসবাস বহুশত বছরের। প্রাথমিক যুগের মুষ্টিমেয় মুসলমানদের হাতে সে সময় উন্নত সভ্যতার জন্ম হয়ছেলি সেটি তো সামনে চলার প্রবল প্রেরণা থেকেই। যেখানে পরিবর্তন নেই সেখানে সভ্যতাও নাই। বিশ্বে বহু ভাষা ও বহু ধর্মের বহু জাতির মানুষের বাস। কিন্তু সভ্যতার জন্মদান সবার দ্বারা হয়নি। সভ্যতার জন্ম দানে যারা ব্যর্থ, তাদের সে ব্যর্থতার কারণঃ তারা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্ররে মত প্রতিষ্ঠানগুলো সঠিক ভাবে গড়ে তুলতে পারিনি। তবে এক্ষেত্রে মূল ব্যর্থতা, আদর্শ পরিবার গড়ায় ব্যর্থতা। কারণ, প্রাসাদ গড়তে যেমন ভাল ইট লাগে তেমনি উচ্চতর সমাজ ও সভ্যতা গড়তেও ভাল মানুষ ও পরিবার লাগে।

 

পারিবার গড়ে উঠেছে বস্তুতঃ মানবিক প্রয়োজনের তাগিদে। অন্য প্রানীকূল থেকে মানুষের শ্রেষ্ঠতম হওয়ার এটিই মূল কারন। পশুদের জীবনে সহস্র বছরেও পরর্বিতন আসে না। গবাদি পশুরা হাজার বছর পূর্বেও যেভাবে ঘাস খেত বা জীবন ধারন করতো এখনো তাই করে। অথচ মানুষ সামনে এগিয়েছে। এর কারণ পরিবার। এ জীবনে নিজের প্রয়োজন আর কতটুকু? কুকুর বিড়ালও সমাজে না খেয়ে মরে না। কারণ তাদের একার প্রয়োজন সব সমাজেই পূরণ হয়। অথচ মানুষকে ভাবতে হয় তার পরিবার ও আপনজনদের নিয়ে। এ ভাবনাই তাকে কর্মশীল, গতিশীল ও দুঃসাহসী করে। পাহাড়-পর্বত, সাগর-মহাসাগরও পাড়ি দয়ে। এরূপ অবিরাম উদ্যোগ ও আত্মনিয়োগই ব্যক্তির যোগ্যতা ও সৃজনশীলতা বাড়ায়। মানুষ জীবনে যা শেখে তার সিংহভাগই শেখে কাজ করতে করতে। তাই যার জীবনে কাজ নেই, তার জীবনে জ্ঞানের বৃদ্ধিও নেই। প্রয়োজনের তাগিদেই সৃষ্টি হয় নতুন আবিষ্কার। যার পরিবার নাই তার জীবনে কর্মে প্রেরণাও নাই। কারণ তার প্রয়োজনের মাত্রাটি অতি সামান্য। পরিবার পরিজনহীন সাধু-সন্যাসীদের দ্বারা তাই সভ্যতার নির্মান দূরে থাকে একখানি গৃহ নির্মানও অসম্ভব। ফলে এমন মানুষরে সংখ্যা বৃদ্ধিতে ক্ষতগ্রিস্থ হয় সমাজ ও রাষ্ট্র। এবং বাধাগ্রস্ত হয় সভ্যতার নির্মান বা অগ্রগতি। ইসলামে তাই বৈরাগ্য জীবনের কোন স্থান নেই।

 

মানব শিশু তার পরিবার থেকে শুধু প্রতিপালনই পায় না, জীবনের মূল পাঠগুলোও পায়। শেখে, কি ভাবে তাকে বেড়ে উঠতে হয়। শেখে কর্মকুশলতা। শেখে কিভাবে অন্যদের দূঃখে দূঃখী এবং সুখে সুখী হতে হয়। পরিবার থেকেই ব্যক্তি পায় উন্নত রুচিবোধ, মূল্যবোধ ও বাঁচবার সংস্কৃতি। মানুষ যখন কলজে-বিশ্ববিদ্যালয় গড়েনি তখনও জীবনের সর্বোচ্চ শিক্ষা পেত পিতা-মাতা, ভাই-বোন, দাদা-দাদী ও অন্যান্য আপনজনদের থেকে। পিরামিড বা তহজমহলের ন্যায় শ্রেষ্ঠ স্থাপত্যশিল্পগুলো যারা গড়ছেলিনে তারাও কোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিদ্যা হাসিল করেননি।সে উচ্চতর বিদ্যা পেয়েছেলিনে নিজেদের পরিবার থেকে। পরিবারই যে মানব জাতির শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয় – সে প্রমান তাই প্রচুর। অথচ আজ সেটিই ভয়ানক বিপর্যয়ের মুখে। বিশাল বিশাল কল-কারখানা বৃদ্ধির সাথে যেমন বিলুপ্ত হয়েছে পরিবার ভিত্তিক কুঠির শিল্প, যান্ত্রীকতা বৃদ্ধির সাথে তেমনি বিলুপ্ত হচ্ছে পরিবার ও পরিবার ভিত্তিক শিক্ষালয়। ফলে মানুষের কেতাবী বা কারিগরি জ্ঞান বাড়লেও বিধস্ত হচ্ছে মূল্যবোধ। সম্পদ বাড়লেও মানুষ নিঃস্ব হচ্ছে মানবিক গুনাবলীত।

 

একমাত্র পারিবারীক শান্তিই ব্যক্তিকে দেয় প্রকৃত শান্তি। পরিবার হলো জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। ব্যক্তির সকল ব্যস্ততাই শুধু নয়, তার সকল স্বপ্ন ও আশা-ভরসা দোল খায় এ পরিবারকে ঘিরে। ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত মানুষ যেখানে শান্তি খুঁজে পায় সেটি তার অফিস নয়, কারখানা বা অন্যকোন কর্মক্ষেত্রও নয়। বরং সেটি হলো তার পরিবার। অশান্তি একবার পরিবারে বাসা বাঁধলে সেটি কোন ঔষধ্ই দূর হবার নয়। অশান্তির সে আগুন তখন গৃহের সীমানা ডিঙ্গিয়ে রাজপথে, লোকালয়ে বা কর্মস্থলে গড়িয়ে পড়ে। তখন সামাজিক অশান্তি বাড়ে সর্বত্র জুড়ে। ক্রমঃর্বধমান মাদকাসক্তি, গ্যাংফাইট ও সন্ত্রাস – এসব তো জন্ম পায় পারিবারীক অশান্তি থেকেই। উলঙ্গতা, মদ্যপান, ব্যাভিচার ও নানা পাপাচার পরিবারে প্রতিপালন পেলে তখন তাতে সমাজও পরিপূর্ণ হয়ে উঠে। মানুষ তার ন্যায়বোধ, রুচিবোধ, মূল্যবোধ ও আচার-আচরন নিয়ে জন্মায়না, এগুলো সে পায় পরিবার থেকে। আর এগুলো নিয়েই তার সর্বত্র বিচরন। অপর দিকে বাইরের জগতে যতই সমৃদ্ধি হোক, তাতে পরিবারে শান্তি আসেনা। একাজ ব্যক্তির একান্তই নিজস্ব। পরিবারকে ঘিরেই শান্তির নিরাপদ দুর্গটি গড়ে উঠে প্রেম-প্রীতি ,ভালবাসা ও উচ্চতর মূল্যবোধরে ভত্তিতি। নিছক পানাহার, যৌনতা বা যৌথবাসই পরিবারের ভিত্তি নয়। এটি নিছক পশু সুলভ। পরিবার গড়ে উঠে উচ্চতর এক উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে। দেহ-ভিত্তিক বা যৌনতা-ভিত্তিকি সম্পর্ক প্রাধান্য পেলে মানুষ তখন আর পশু থেকে শ্রেষ্ঠতর থাকে না। এর জন্য পরিবারের প্রয়োজনও পড়নো। ঘরবাড়ি ও পরিবার ছাড়াই জীব-জন্তু যুগ যুগ বেঁচে আছে। তাদের বংশবিস্তারও হয়েছে। পশুর মত বসবাস, পানাহার বা অবাধ যৌনতা এ বিশ্বে কোন কালেই কম ছিল না। এরপরও মানুষ ঘর বেঁধেছে, পরিবার গড়েছে। শুধু নিজের নয়, সমগ্র পরিবার ও পরিবারের সাথে সংশ্লিষ্ট অন্যদরে দায়-দায়িত্বও মাথায় তুলে নিয়েছে। শুধু ভোগ নয়, দায়ত্ব-পালনও যে বাঁচবার অন্যতম মিশন – মানুষ এ ভাবেই তার স্বাক্ষর রেখেছে। সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মান দুরে থাক একাকী একখানি ঘরও উঠানো যায়না। এর জন্য পারস্পারিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতা চাই। পরিকার তো শিশুকাল থেকে সেটিরও অভ্যাস গড়ে তুলে। প্রাকটিসের জন্য দেয় একটি অবকাঠামো। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মাধ্যমে যে সংযোগ গড়ে উঠে সেটি নিছক দুটি ব্যক্তির নয়, বরং সেটি দুটি পরিবার, দুটি গোত্র বা দুটি জনপদের মাঝে। সৃষ্টি হয় সৌর্হাদ-সম্প্রীতির অভ্যাস। রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনে এসম্পর্ক সিমেন্টের কাজ করে। মানব সমাজ এতে সংঘবদ্ধতা বা সামাজিক বন্ধন পায়। বৃদ্ধি পায় পারস্পরকি আস্থা ও শ্রদ্ধাবোধ। পরিবারের মূল ভিত্তি শুধু আইন নয় বরং এ মূল্যবোধ। ফলে এ মূল্যবোধ বিলুপ্ত হলে বিলুপ্ত হয় পরিবার। বস্তবাদী জীবন দর্শনে যা কিছু দর্শনীয় ও চিত্তাকর্ষক, যাতে থাকে নগদপ্রাপ্তি সে গুলোই গুরুত্ব পায়। তখন গুরুত্ব হারায় নীতি-নৈতিকতা, র্ধমীয় মূল্যবোধ, পরকালীন ভয় ইত্যাদি অদৃশ্য বিষয়। এমন সেকুলার পরিবারে স্বার্থপরতাও ন্যায্য কর্মে পরিনত হয়। পরিবার তখন পরিনত হয় দুর্বৃত্তদের দুর্গে। পাপাচারী দুবৃত্তরা সেখানে শুধু প্রতিরক্ষাই পায় না, সম্মানও পায়। তখন পরিবারগুলো পরিণত হয় দুর্বৃত্তদের পাঠশালায়। তখন দেশে স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালের সংখ্যা বাড়লেও দুর্বৃত্তি কমে না। বরং আকাশচুম্বি হয়। চোর-ডাকাত, ঘুষ-খোর, সূদ-খোর, ব্যাভিচারি, সন্ত্রাসী এমন ঘরে তিরস্কৃত না হয়ে নন্দিত হয়। পায় নতুন দুর্বৃত্তির অনুপ্রেরণা। একারণ্ই আধুনিক মানুষ দুর্বৃত্তি ও মানব-হত্যায় অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। এমন মানুষ তার কর্মে ও উদ্যোগে অনুপ্রেরণা পায় অর্থনৈতিক স্বার্থ-সিদ্ধি, যৌনলিপ্সা ও প্রতিপত্তা বিস্তারের তাড়না থেকে। যেখানেই শিকার, শিকারী পশুর সেখানেই পদচারনা। অনুরূপ অবস্থা বস্তুবাদী ও ভোগবাদী স্বার্থশিকারীদেরও। এমন এক স্বার্থশিকারি চেতনায় নতুন যৌন শিকার ধরতে নানা বাহানায় বিচ্ছিন্ন হচ্ছে পুরনো শিকারী থেকে। এতে বিচ্ছেদ নেমে আসছে বিবাহবন্ধনে। গাড়ী পাল্টানোর চেয়ে স্ত্রী বা স্বামী পাল্টানো এজন্যই রুটিনে পরিণত হয়েছে। আর এতে বাড়ছে পারিবারীক বিপর্যয়।

 

নিজেদের ভোগ-বিলাস ও আনন্দ-উল্লাস বাড়াতে পাশ্চাত্যরে মানুষ নিজের ঘাড় থেকে দায়িত্বের বোঝা কমিয়েছে। আর মানুষের ঘাড়ে তো সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো তার স্ত্রী-পুত্র-কন্যা প্রতিপালনের দায়িত্ব। সে দায়িত্ব কমাতে গিয়ে বিধ্বস্ত করেছে পরিবার। অধিকাংশ নারী হারিয়েছে সন্তান জন্মদানের আগ্রহ। অথচ স্বামী-স্ত্রীর মাঝে সন্তান বন্ধনের কাজ করে। তাছাড়া পরিবার গড়তে হলে বৈবাহিক জীবনের স্থায়ীত্বটি জরুরী। চোরাবালীর উপর যেমন বিল্ডিং গড়া যায়না, তেমনি নড়বড়ে বৈবাহিক সম্পর্কের উপর নিভর করে পরিবার গড়ে উঠে না। এজন্য স্বামী-স্ত্রীর সুসম্পর্ক ও টেকসই সম্প্রীতি প্রয়োজন। বিবাহের পর স্বামী-স্ত্রীর মাঝে একে অপররে উপর শুধু অধিকারই প্রতিষ্ঠিত হয়না, দায়িত্বও অর্পিত হয়। সে দায়ত্বি এড়াতে পাশ্চাত্যরে মানুষ বিবাহ এড়িয়ে যাচ্ছে। এমন অসুস্থ্য চেতনায় মজবুত পরিবার গড়ে উঠবে সেটি কি আশা করা যায়?  ফলে বিধস্ত হচ্ছে পারিবারীক শান্তি। শান্তির খোঁজে পাশ্চাত্যের অশান্ত মানুষ এখন বিকল্প পথ ধরেছে। বেড়েছে প্রমোদ-ভ্রমন, বেড়েছে মদ্যপান, বেশ্যাবৃত্তি, যৌনতা ও ড্রাগের আসক্তি। এমন স্বেচ্ছাচারি জীবন-উপভোগে পারিবারীক বন্ধনকে এরা পায়ের বেড়ী মনে করে, একারণেই শত্রুতা এটির বিরুদ্ধেও। সন্তান যৌন-বাজারে বাজার-দর কমাবে এ ভয়ে গর্ভপাতের নামে অবাধে শিশু হত্যা হচ্ছে। এভাবে পরিবার পরিনত হয়েছে মানব-হত্যার প্রশিক্ষণ ক্ষেত্রে।

 

পরিবার বিধস্ত হওয়ায় সবচেয়ে বেশী অসহায় ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নারী। পাশ্চাত্য সমাজে তাদের কদর বেড়েছে বিজ্ঞাপন, পর্ণ-ফিল্ম ও নাচ-গানের মত বিনাদন শিল্পে। অথচ আবহমান কাল থেকেই নারীদের জন্য পরিবার ছিল সুরক্ষিত দুর্গ। সেখানে মা হিসাবে সন্তানদের গভীর সম্মান, কন্যা ও বোনরূপে আদর ও স্নেহ এবং স্ত্রী হিসাবে ভালবাসা তারা যুগ যুগ পেয়ে এসেছে। অথচ নারী স্বাধীনতা, নারীর ক্ষমতায়ন ও সম-অধিকার ইত্যাদি নানা বাহানায় সেখান থেকে বের করে তাদরকে অসহায় ও অরক্ষতি করা হয়েছে। ফলে তারা আজ ধর্ষণ, হত্যা ও নানাবধি পাশবকি অত্যাচাররে শিকার। সুরক্ষিত পরিবার থেকে বের করে তাদরকে যেন ক্ষুধার্ত ও হিংস্র পশুর সামনে ফেলা হয়েছে। এমন অরক্ষিত অবস্থান থেকে নারীর পক্ষে সন্তান পালনের মত দায়িত্ব-পালন কি সম্ভব? তাছাড়া সন্তান পালন কোন লঘু-দায়িত্ব নয়, খন্ডকালীন কাজও নয়। এ কাজ নিজেই রাতদিনের এক সার্বক্ষনিক ব্যস্ততা। কল-কারখানা, অফিস-আদালত, সেনা বা পুলিশ বাহিনীতে গুরুদায়িত্ব পালনের পর কি এ কাজের আর সামর্থ থাকে? নারীর মর্যাদা বাড়াতে গিয়ে এভাবে বিপর্যয় বাড়ানো হয়েছে। পণ্যের ন্যায় নারীকেও  বাজারে তুলা হয়েছে।

 

নারীর দুটি সত্বা। একটি তার নারীত্ব। অপরটি যৌনতা। পর্দা যৌনতাকে আড়াল করে, আর প্রকাশ করে তার মহান নারীত্বকে। তখন সে সমাজে মা-বোন বা স্ত্রীর সম্মানজনক মর্যাদা পায়। মায়ের পায়ের নীচে সন্তানের জান্নাতের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। নারীত্বের বদলে যথন যৌনতা প্রাধান্য পেয়েছে তখনই নারীর জীবনে প্রচন্ড বিযর্যয় নেমে এসেছে। তখন বিধ্বস্ত হয়েছে পরিবার। যৌনতা নিয়ে বাণিজ্য জমে, কিন্তু তাতে পরিবার প্রতিষ্ঠা পায় না। এজন্যই পতিতাদের কোন পরিবার থাকে না। পাশ্চাত্যে নারীর যৌন সত্ত্বা নিয়ে ব্যণিজ্যে যে কতটা রমরমা ভাব, সেটির প্রমাণ মেলে অলিতে গলিতে নাইট ক্লাব, মদ্যশালা বা পাব ও পতিতাপল্লির সংখ্যা দেখে। পণ্যের বাজারজাত করণে গুরুত্বপূর্ণ হলো আর্কষনীয় প্যাকেজিং। তেমনটি ঘটেছে নারীর ক্ষেত্রেও। এবং সেটি ঘটেছে নিত্য-নতুন ফ্যাশানের নামে। ফ্যাশানের প্রকোপে বিলুপ্ত হয়েছে পর্দা ও শালীন পোষাক। অথচ পর্দা যুগ যুগ ধরে নারীর যৌনতাকে ঢেকে রেখেছে এবং নিরাপত্তা দিয়েছে এবং মহীয়ান করেছে তার নারীত্বকে। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে পর্দা চিহ্নিত হয়ে এসেছে সভ্যতা ও শিষ্ঠতার প্রতীক রূপে। মানব জাতির এটি অতি সনাতন প্রথা। যখন বস্ত্র ছলিনা তখনও মানুষ গাছের পাতা বা ছাল, চামড়া ইত্যাদি দিয়ে লজ্জা নিবারনের চেষ্টা করেছে।

বাংকার বা পরিখার নিরাপদ আশ্রয় থেকে কাউকে বের করে খোলা ময়দানে গুলীর লক্ষ্যবস্তু বানানো সহজ। স্বার্থশিকারী পুরুষেরাও চায় চায় ঘরের নিরাপদ আশ্রয় থেকে নারীদরে বের করে আনতে। পাশ্চাত্যে বস্তুতঃ সেটিই করা হয়েছে। ফলে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির জোয়ারে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নারী। র্ধমহীন ও বিবেকহীন মানুষের শোষন, শাসন ও নির্যাতনের শিকার যেমন দুর্বল মানুষ, তেমনি যৌন শোষনের শিকার হলো দুর্বল নারী। অথচ নারী স্বাধীনতা ও সম-অধিকারের গলাবাজী ও প্রলোভনে তাদরেকে আত্মভোলা করে রাখা হয়েছে।

 

স্বামী-স্ত্রীর বৈবাহিক সর্ম্পকে আপোষ চলনো। তাদের সর্ম্পকে অন্য কেউ ভাগীদার হবে সেটিও অকল্পনীয়। কিন্তু ভোগবাদীদের কাছে এমন আপোষহীনতা কুসংস্কার। মদমত্ত নাচের তালে অন্যের স্ত্রীকে যেমন তারা কাছে টানে, তেমনি নিজের স্ত্রীকে সঁপে দেয় অন্যের আলঙ্গিনে। এরূপ সংস্কৃতির পরিচর্যা বাড়াতেই পাশ্চাত্যে প্রতি লোকালয়ে গড়ে উঠেছে নাইট ক্লাব। আর  এটিই   হলো আধুনিক পাশ্চাত্য সংস্কৃতি। এ সংস্কৃতিতে যেটি বাড়ে সেটি পাপ। প্রসেডিন্টে, প্রধানমন্ত্রী, সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক দলের কর্মী, উচ্চ পদস্থ কর্মচারী, এমনকি গীর্জার পাদ্রীও আক্রান্ত এ পাপাচারে। ফলে বিপন্ন হয়েছে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরকি আস্থা ও সর্ম্পক। এতে ভেঙ্গে যাচ্ছে পরিবার এবং সুফল মিলছে না মিলশিমশিনো বার বার বিবাহতেও। আর বিবাহিত জীবন ব্যর্থ হলে যেটি বাড়ে সেটি হলো ব্যাভিচার। পাশ্চাত্যে সেটিই হয়েছে। আর কোন রাষ্ট্র বা সমা পাপাচারে প্লাবিত হলে পাপের সংজ্ঞাই পাল্টে যায়। তখন পাপ আর পাপ রূপে গণ্য হয় না। গণ্য হয় শিষ্ঠ কর্ম রূপে। এমন পাপকে পাপীষ্ঠরা অতীতে র্ধম-র্কমও বলছে। যেমন কা’বাকে ঘিরে পৌত্তলিক কাফেরদের উলঙ্গ তোয়াফ বা ভারতীয় মন্দিরে যৌন দাসীদের সাথে ব্যাভীচার। ব্যাীব্যভববববববচিার। পাপতো তাই যা নীতি ও নৈতিকতা বিরোধী, যা শিষ্ঠতার খেলাপ। সে নীতি ও নৈতিকতাই যদি পাল্টে যায় তবে সে গুলো কি আর পাপ রূপে গন্য হয়? ব্যাভিচার, সমকামিতা বা হোমোসেক্সুয়ালিটি এ কারনেই পাশ্চাত্য সমাজে আজ আর অপরাধ নয়, বরং আইনসিদ্ধ বৈধ কর্ম। এখন এ পাপ গুলোকেই তারা বিশ্বব্যাপী সিদ্ধ করতে চাচ্ছে। এরা এ পাপাচারকেই এখন নাগরিক অধিকারে পরিণত করতে চায়। এ কাজে তারা ব্যাবহার করছে জাতিসংঘকে। পরিবার ভেঙ্গে যারা পতিতার পল্লীতে আশ্রয় নিয়েছে তাদেরকে বলছে সেক্স ওয়ার্কার। ব্যাভিচারের ন্যায় পাপাচারের বিরুদ্ধে এতকাল যে ঘৃনাবোধ ছিল এখন সেটিই বিলুপ্ত করছে। প্রশ্ন হলো, যে মূল্যবোধে এমন পাপাচার প্রশ্রয় পায় সে মূল্যবোধে কি পরিবার বাঁচে?

 

প্রশ্ন হলো এ বিনাশী বিপর্যয় থেকে উদ্ধার কোন পথে? পথ একটিই, আর তা হলো ইসলামের পূর্ণ অনুসরণ। সে সাথে পাশ্চাত্যের মূল্যবোধ, জীবনচেতনা ও সংস্কৃতিকে বর্জন করা। চিন্তা-চেতনার মডেল না পাল্টালে কর্ম ও আচরনেও কোন পরর্বিতন আসে না। নবীজি (সাঃ) সে কাজটিই করেছিলেন। বিপর্যস্ত পরিবার বস্তুতঃ রোগাগ্রস্ত  চেতনার সিম্পটম মাত্র। মূল রোগ আরো গভীর। আর সেটি হলো ইসলামে অজ্ঞতা।  অজ্ঞতায় যেটি বাড়ে সেটি আল্লাহ ও তাঁর দ্বীনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। মানব-সভ্যতা কোন কালেই  সম্পদের কমতির কারণে বিপর্যস্ত হয়নি। বিপর্যস্ত হয়েছে নৈতিক বিপর্যয়ের কারণে। দুর্ভিক্ষে যদিও প্রান নাশ হয় তবে তাতে সভ্যতার বিনাশ হয় না। প্রচীন কালে পাহাড় কেটে কেটে সামুদ জাতি সুরম্য প্রাসাদ গড়ছেলি। তারা নিশ্চিহ্ন হয়েছিল। নিশ্চিহ্ন হয়েছিল নমরূদ ফিরাউন। এর কারণ আল্লাহর অবাধ্যতা। অথচ ফিরোউন বহু হাজার বছর আগে স্থাপত্যে বিস্ময়কর ইতিহাস গড়েছিল।

 

পাশ্চাত্যের ঘাড়ে এই একই রোগ চেপেছে। প্রাচুর্যের অহংকার শুধু সত্যকে মেনে নিতেই অমনোযোগী করেনি। বরং সেটি আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে তাদেরকে যুদ্ধাংদেহীও করেছে। উদ্ধত ও প্রচন্ড অহংকারী করেছে হোমোসেক্সুয়ালিটি, মদ্যপান, উলঙ্গতা, পর্নোগ্রাফী এসব পাপ কর্ম নিয়েও। এমন পাপের অধিকারকে তারা মানবাধিকার বলছে। অতীতে যে দুর্ভোগ হয়েছে রোগ-ব্যাধির কারণে, এখন তার চেয়েও বেশী দুর্ভোগ হচ্ছে এরূপ বিধ্বস্ত মূল্যবোধ ও বিপর্যস্ত পরিবারের কারণে। পাশ্চাত্যের মূল বিপদ এখানেই। গাড়ীর মডল  নিয়ে তাদরে যতটা ব্যস্ততা, পথের ডিরেকশন নিয়ে ততটা নয়। এ অবস্থায় রোগ যেমন বাড়ছে তেমনি তীব্রতর হচ্ছে সিম্পটম। এমন বিপর্যয়ের মুখে পাশ্চাত্যের সমাজ-বিজ্ঞানী বা দার্শনিকগণ অসহায়। যে স্রোতের টানে তারা গা ভাসিয়ে দিয়েছে সেটিয়ে তাদের ভাসিয়ে নিয়ে ছাড়বে। এ অসুস্থ্য সভ্যতাকে বাঁচাতে তাদের সকল সামর্থ নিঃশেষ। বিশ্বের অন্য র্ধম ও মতবাদগুলোরও একই রূপ বেহাল অবস্থা। তাছাড়া এসব অনৈতিক চেতনা ও জীবন-বোধ পরিবারে শান্তি এনেছে -সমগ্র ইতিহাসে তার নজির নেই। এমন নৈতিক বিপর্যয়ের মোকাবেলায় একমাত্র ইসলামই শেষ ভরসা। তাছাড়া এমন বিপর্যয়ের মুখে মানব জাতির উদ্ধারে একমাত্র ইসলামই অতীতে সফলতা দেখিয়েছে। সেটি একবার নয়, বহুবার। শুধু একটি জনপদে নয়, অসংখ্য জনপদে। ইসলামের সে সার্মথ এখনও অম্লান। আল্লাহর প্রদর্শিত এ পথটি এখনও অক্ষত তার বিস্ময়কর নির্ভূলতা নিয়ে। স্রষ্টার পক্ষ থেকে বস্তুতঃ এটিই একমাত্র প্রেসক্রিপশন। এ প্রেসক্রিপশন অপরিহার্য শুধু সমাজ ও রাষ্ট্রের সুস্থ্যতা বিধানেই নয়, বিপর্যস্ত পরিবারকে বাঁচাতেও। বর্তমানের পারিবারিক বিপর্যয় থেকে উদ্ধারের এটিই একমাত্র পথ। লন্ডন, ১৯/০৭/২০০৯




আমার পরিচিতি

জন্ম ও স্কুল-কলেজের শিক্ষা বাংলাদেশে; লাহোরের কিং এডওয়ার্ড মেডিকেল কলেজ থেকে এম.বি.বি.এস পাশ; মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ক্যারোলিনা-চ্যাপেল হিল থেকে পাবলিক হেল্থে মাষ্টার ডিগ্রি এবং লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডার্মাটোলজিতে পোষ্ট গ্রাজুয়েশন ডিপ্লোমা; চিকিৎস্যক রূপে পাকিস্তান, ইরান, বাংলাদেশ ও বিলেতে পেশাদারিত্ব; সমাজ বিজ্ঞান ও ইসলামবিষয়ক গবেষক; ইন্টার ন্যাশনাল ইউনিয়ন অব সায়েন্টিফিক স্টাডি অব পপুলিশেন (আই.ইউ.এস.এস.পি)র ১৯৯৭ সালের চীনের বেইজিংয়ে এবং ১৯৯৮ সালে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগদান ও গবেষণা পেপার পেশ। গবেষণা প্রবন্ধ গৃহিত হয় ১৯৯৯ সালে নিউয়র্কে পপুলেশন এ্যাসোসিয়শন অব আমেরিকার কনফারেন্সে পেশের জন্য। সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতি, শিক্ষা, ধর্ম ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে বাংলা ও ইংরেজী ভাষায় প্রবন্ধ, পুস্তক ও পত্রিকার কলাম লেখক।




মায়ানমারে পরিকল্পিত রোহিঙ্গা নির্মূল

নির্মূল-প্রক্রিয়া পৌঁছেছে চুড়ান্ত পর্যায়ে

রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে মায়ানমার সরকারের জিনোসাইড বা গণহত্যাটি কোন সাম্প্রতিক নৃশংসতা নয়। সেটি চলছে তিন দশকের বেশী কাল ধরে, এবং সুপরিকল্পিত এক ব্লু-প্রিন্টের অংশ রূপে। সম্প্রতি সেটি পৌঁছেছে তার চুড়ান্ত পর্যায়ে। বিশ্বের  শক্তিবর্গ এ ঘৃন্যতম জিনোসাইডকে বন্ধ করা দুরে থাক, নিন্দা করতেও ব্যর্থ হয়েছে। সেটিই প্রকাণ্ড ভাবে ধরা পড়েছে গত ২৮ই সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে। সে বৈঠকটি কোনরূপ সিদ্ধান্ত ও মায়ানমারের বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব ছাড়াই শেষ হয়েছে। উক্ত বৈঠকে রোহিঙ্গাদের উপর হামলা ও তাদের নির্মূলের জন্য রাশিয়ার প্রতিনিধি মায়ানমারের সেনা চৌকির উপর রোহিঙ্গা আরাকান সালভেশন আর্মির হামলাকে দায়ী করেছে; এবং সমর্থন করেছে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত মায়ানমার সরকারের সকল নৃশংসতাকে। সমর্থন জানিয়েছে চীনও। এহেন নব্য ফাসিস্টদের সমর্থন করছে ভারত ও জাপানের মত দেশগুলিও  -গণতন্ত্র নিয়ে যাদের প্রচণ্ড গর্ব। বিশ্বের প্রধান প্রধান শক্তিগুলি যে কতটা হৃদয়হীন, নীতিহীন ও নৈতীকতা শূণ্য -এ হলো তারই প্রমাণ। এরূপ নৈতীক শূণ্যতার কারণেই অতীতে এরা দু’টি বিশ্বযুদ্ধ, ভয়ানক গণহত্যা ও বর্ণবাদী নির্মূল উপহার দিয়েছে।

কোন ব্যক্তির বর্বরতা ও বিবেকহীনতা শুধু তারা কর্মের মধ্যে ধরা পড়ে না। ধরা পড়ে, অন্যের দুর্বৃত্তি ও বর্বরতাকে সমর্থণ করার মধ্য দিয়েও। তাই মায়ানমার সরকারের নৃশংসক বর্বরতার প্রতি সমর্থনের কারণে রাশিয়া, চীন ও ভারতীয় শাসক মহলের নিজস্ব নৃশংস রূপটিও আর গোপন থাকেনি । তাছাড়া অধিকৃত মুসলিম ভূমিতে তাদের নিজেদের নৃশংসতাটিও কি কম? প্রেসিডেন্ট পুটিনের হাত রক্তাক্ত চেচেন ও দাগিস্তানী মুসলিমদের রক্তে। আশির দশকে আফগানিস্তান এবং ১৯৯৯-২০০০ সালে চেচনিয়ায় প্রচণ্ড ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর পর রাশিয়ার যুদ্ধ বিমানগুলি এখন হত্যা ও ধ্বংস-যজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে সিরিয়ার শহরগুলিতে। অপরদিকে চীন নিষ্ঠুর বর্বরতা চালাচ্ছে অধিকৃত জিনজিয়াংয়ে উইগুর মুসলিমদের উপর। তাদের মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণ, ইবাদত-বন্দেগী ও কোরআন শিক্ষার উপরও চাপানো হয়েছে কঠোর বিধি-নিষেধ। বিগত ৭০ বছর যাবৎ কাশ্মীরে চলছে ভারতীয় অধিকৃতি এবং সে সাথে ভারতীয় সেনা বাহিনীর পক্ষ থেকে হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের  যাঁতাকল। কোন অপরাধকে নিন্দা করার জন্য যা অপরিহার্য তা হলো নৈতীক বল। প্রশ্ন হলো, নিজ দেশে যারা মুসলিম-হত্যা ও নির্যাতনের সাথে জড়িত, তারা কি অন্যদেশের -বিশেষ করে মায়ানমার সরকারের জেনোসাইডকে নিন্দা করার নৈতীক বল রাখে? সম্প্রতি বৃহৎ শক্তিবর্গের নৈতীক বলের সে শূণ্যতাটিই প্রকট ভাবে ধরা পড়লো জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে। ,

রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে চলমান কয়েক দশকের নৃশংস নিষ্ঠুরতা্য় তাদের জনসংখ্য দ্রুত কমেছে। ১৯৫২ সালে রোহিঙ্গা মুসলিমদের সংখ্যা ছিল ১২ লাখ। (সূত্রঃ জেনোসাইড ইন মায়ানমার, লন্ডনের কুইন মেরী ইউনিভার্সিটির গবেষণা।) ১৯৫২ সাল থেকে ২০১৭ সাল এ দীর্ঘ ৬৫ বছরে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ন্যায় প্রতিটি মুসলিম দেশের জনসংখ্যা তিন থেকে চার গুণ বেড়েছে। কিন্তু কি বিস্ময়! বিগত ৬৫ বছরেও রোহিঙ্গা মুসলিমদের সংখ্যা বাড়েনি, বরং দারুন ভাবে কমছে। ২০১৭ সালে এসে এখন বলা হচ্ছে তাদের সংখ্যা ১.১ মিলিয়ন তথা ১১লাখ। তাদের বিরুদ্ধে সরকার পবরিচালিত নির্মূল প্রক্রিয়া যে কত্টা সফল এ হলো তারই দলিল। নইলে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা নিশ্চিত ৩৬ লাখে পৌঁছতো। ফল দাঁড়িয়েছে, মুসলিম সংগরিষ্ঠ আরাকান বা রাখাইন এখন বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় পরিণত হয়েছে। জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশই এখন বৌদ্ধ। তবে নির্মূল-কর্ম এখন যেরূপ গতি পেয়েছে তাতে অচিরেই একটি আরাকান মুসলিম-শূণ্য এলাকায় পরিণত হবে। রোহিঙ্গা নির্মূল প্রক্রিয়াটি যে শধু গণহত্যার মাধ্যমে চলছে তা নয়। সেটি চলছে আরো কয়েকটি পথে। রোহিঙ্গাদের সংখ্যা যাতে না বাড়ে সে জন্য সরকা্রের পক্ষ থেকে চাপানো হয়েছে বিবাহের উপর নিয়ন্ত্রণ। বিবাহিতদের বাধ্য করা হচ্ছে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণে। অপরাধ হলো, দু’টির অধীক শিশু জন্ম দেয়াকে। সে সাথে বাধ্য করা হচ্ছে দেশত্যাগে। সুদুর সৌদি আরবেই বসবাস করছে দেড় লাখ। তারা সেখানে গিয়েছিল ষাটের দশকে। লক্ষাধিক রোহিঙ্গার বাস মালয়েশিয়া।

জন্মহার কমানোর সাথে মায়ানমার সরকারের লক্ষ্য হলো মৃত্যুহার বাড়ানো। তাই রোহিঙ্গা শিশু, নারী ও পুরুষদের বঞ্চিত করা হচ্ছে চিকিৎসা-সেবা থেকে। মায়ানমারের কোন হাসপাতালে তাদের প্রবেশাধীকার নাই। ফলে তাদের মাঝে মৃত্যুর হার, বিশেষ করে শিশুদের মৃত্যুর হার, মায়ানমারের অন্যান্য এলাকা থেকে অধীক। হাসপাতালের চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত রাখার পাশাপাশি তাদেরকে বঞ্চিত করা হয়েছে শিক্ষা থেকেও। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা দূরে থাক, রোহিঙ্গা মুসলিমগণ বঞ্চিত হচ্ছে এমন কি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা থেকেও। সম্ভবতঃ তাদের ধারণা, দিন দিন দুর্বল হয়ে নির্মূল হওয়ার পথটি যাদের জন্য সরকারি নির্দিষ্ট তাদের আবার চাকুরি-বাকুরি, শিক্ষা ও চিকিৎসা-সেবার প্রয়োজন কি? লন্ডনের কুইন মেরী ইউনিভার্সিটির গবেষণায় প্রমাণ মেলেছে, আরাকানে মুসলিম নির্মূলকরণ প্রকল্প যেভাবে এ অবধি কার্যকর করা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে তা মূলতঃ ৬টি পরিকল্পিত স্তরে। প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী ফায়ারস্টাইনের মতে প্রতিদেশে এটিই হলো জেনাসাইডের সনাতন পদ্ধতি। ৫টি স্তর পাড়ি দিয়ে মায়ানমারে সেটি পৌঁছেছে এখন সর্বশেষ স্তরে। সে স্তরগুলির বিবরণ হলো নিম্নরূপঃ

 

 

প্রথম স্তর: স্টিগমাটাইজেশন

যে কোন দেশে জেনোসা্‌ইড বা গণনির্মূলকরণ প্রকল্পের এটিই হলো প্রথম ধাপ। এ স্তরটিতে টার্গেট জনগোষ্টিকে নানা ভাবে ডি-হিউম্যানাইজড ও দেশের সকল ব্যর্থতার জন্য বলির পাঠা বানানো হয়। যেমন জার্মানীর সকল পরাজয় ও ব্যর্থতার জন্য হিটলার ইহুদীদের দায়ী করতো। একই অবস্থা মায়ানমারের রোহিঙ্গা মুসিলমদের। তাদের গায়ে ইচ্ছামত সর্বপ্রকার অপবাদ লেপন করা হচ্ছে। তাদেরকে চিত্রিত করা হচ্ছে কালো, কালার, কুৎসিত ও বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারি রূপে।  পথে ঘাটে গরু-ছাগলের গলায় ছুরি চালালে তার বিরুদ্ধে কোন জনপদেই প্রতিবাদ উঠে না। কারণ, যাদের হত্যা করা হচ্ছে তারা তো পশু। তেমনি কাউকে মানব থেকে মানবেতর  স্তরে নামাতে পারলে তাদের নির্মূলের বিরুদ্ধেও কেউ প্রতিবাদ করে না। তারা যে নির্মূলযোগ্য ও হত্যাযোগ্য সেটিই তখন সমাজে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়। সে কাজটিই অতি পরিকল্পিত ভাবে হচ্ছে রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে। অতীতে জার্মান থেকে ইহুদী, আমেরিকা থেকে রেড ইন্ডিয়ান, অস্ট্রেলিয়া থেকে অ্যাবঅরিজিন এবং বসনিয়া থেকে মুসলিমদের নির্মূলের লক্ষ্যে তাদেরকেও এরূপ মানবেতর এক ঘৃণীত জীব রূপে চিত্রিত করা হয়েছিল। ডি-হিউম্যানাইজেশনের এ স্তরটি অতিক্রান্ত হলেই রাজনৈতীক দলের ক্যাডার, দেশের পুলিশ, সেনাসদস্য, সরকারি প্রশাসনের কর্মকর্তা, বিচার বিভাগের বিচারকগণও তখন নিজ নিজ ক্ষমতা নিয়ে নির্মূলের কাজে লেগে যায়। ১৯৭১য়ে তেমন একটি জঘন্য প্রক্রিয়ার শিকার হয়েছিল বাংলাদেশে বসবাসকারি কয়েক লক্ষ অবাঙালী নারী, পুরুষ ও শিশু। ফলে অবাঙালী হত্যা, অবাঙালী নারী ধর্ষণ এবং তাদেরকে নিজ নিজ ঘর থেকে উৎখাত করে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে পাঠানোর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণ, রাজনৈতীক নেতাকর্মী ও বুদ্ধিজীবীদের মাঝে কোন রূপ প্রতিবাদ উঠেনি। গণহত্যার নায়কগণ প্রতিদেশেই এভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটানোর আগে বিবেকের মৃত্যু ঘটায়। বাংলাদেশে তেমন একটি প্রক্রিয়া এখনও সুপরিকল্পিত ভাবে চলছে তাদের বিরুদ্ধে যারা একাত্তরে পাকিস্তান ভাঙ্গার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। সেটি গভীর হওয়ার কারণে তাদের বিরুদ্ধে দেয়া রায়কে আরো কঠোরতর করতে বাধ্য হয় দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকগণও। বাংলাদেশের মাটিতে ইসলামপন্থিদের নির্মূলে এ হলো ভারত ও ভারতীয় অর্থে প্রতিপালিত ইসলামের শত্রুপক্ষের অতি সুপরিচিত কৌশল। মায়ানমারে তেমন একটি নির্মূলমুখি পদ্ধতির শিকার হলো রোহিঙ্গা মুসলিমগণ।

 

দ্বিতীয় স্তর: হয়রানি,সহিংসতা ও সন্ত্রাস

যখন কোন সরকার একটি জনগোষ্ঠির নির্মূল চায়, তাদের বিরুদ্ধে নিজেদের কর্মকে শুধু ঘৃণা সৃষ্টির মধ্যে সীমিত রাখে না। সেগুলি আরো সহিংস ও আরো বর্বরতর করে। তখন রাজনৈতীক দলের ক্যাডার, সরকারি প্রতিষ্ঠান সমুহ  ও সরকারি কর্মচারিগণ পরিণত হয় তাদের বিরুদ্ধে নানারূপ হয়রানি, সহিংসতা ও সন্ত্রাসের প্রচণ্ড হাতিয়ারে। তখন সরকারেরর সহয়তায় সে জনগোষ্ঠির নির্মূলের দাবি নিয়ে শহরে শহরে নির্মূল কমিটি গড়ে উঠে এবং তারা নির্মূলে সহিংস পথেও নামে –যেমনটি একাত্তরে বাংলাদেশে বিহারীদের বিরুদ্ধে নেমেছিল। মায়ানমারে আজ যে বার্মীজ জাতীয়তাবাদীগণ রোহিঙ্গাদের নির্মূলে নেমেছে তারাদের জন্ম ও বেড়ে উঠাটিও মূলত বাঙালী জাতীয়তাবাদীদের ন্যায় একই রূপ সহিংস চেতনা নিয়ে। ফলে তারা আদর্শিক সহোদর হলো বাঙালী জাতীয়তাবাদীদের। একারণেই বার্মীজ সরকার যখন রোহিঙ্গাদের গ্রামগুলি একের পর জ্বালিয়ে দিতে ব্যস্ত, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে সেটি নিন্দনীয় গণ্য হয়নি। তিনি সেটিকে নিন্দা করে কোন বিবৃতিও দেননি। বরং নিজের খাদ্যমন্ত্রীকে মায়ানমারে পাঠিয়েছিলেন সেখান থেকে চাউল কিনতে। এবং মায়ানমার সরকারকে প্রতিশ্রুতি দেন, রোহিঙ্গা মুসলিমদের পক্ষ থেকে কোন সশস্ত্র লড়াই শুরু হলে বা্ংলাদেশের সেনাবাহিনী সেদেশের সরকারের পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে লড়বে। মায়ানমার সরকারের এরূপ মুসলিম-নির্মূল নীতির প্রতি গভীর আশির্বাদ রয়েছে ভারত সরকারেরও। সেটি জানাতেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ছুটে যান মায়ানমারে। এবং ঘোষণা দেন, মুসলিমদের বিরুদ্ধে সকল নির্মূল কর্মে ভারত সরকার মায়ানমার সরকারের পাশে থাকবে। সম্প্রতি প্রচণ্ড মুসলিম বিদ্বেষী ভারতীয় সংগঠন আর. এস. এস.য়ের নেতাগণও মায়ানমারে ছুটেছিল একই কথা জানাতে।

মায়ানমারে রোহিঙ্গা-নির্মূলকামী সংগঠনগুলোর সংখ্যা অনেক। তবে তাদের মধ্যে প্রধান হলো ‘মা বা থা’ এবং ‘৯৬৯ ন্যাশনালিস্ট মুভমেন্ট’। রোহিঙ্গাদের রোহিঙ্গা বলা হোক -তাতেও এসব সংগঠনের প্রচণ্ড আপত্তি। তাদের দাবি, রোহিঙ্গা বলে মায়ানমারে কোন জনগোষ্ঠি নাই। যারা আছে তারা হলো বাংলাদেশ থেকে আগত বাঙালী। অতএব দাবী, তাদের একমাত্র বাঙালীই বলতে হবে এবং বাংলাদেশেই তাদের ফিরে যেতে হবে। যেমন বাংলাদেশের নির্মূল কমিটির দাবি, সকল অবাঙালীদের পাকিস্তানে চলে যেতে হবে। জাতিসংঘের সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল বান কি মুন যখন তার বক্তৃতায় রোহিঙ্গাদের রোহিঙ্গা বলেছিলেন, তাঁর বিরুদ্ধেও এরা বিক্ষোভ করেছিল। রোহিঙ্গাদের এ ভয়াবহ বিপদ কালে তারা জাতিসংঘের ত্রাণসামগ্রীও রোহিঙ্গা গ্রামে পৌঁছতে বাধা দিচ্ছে। বাধা দিচ্ছে, বিদেশী কোন সাংবাদিককে ঢুকতেও। রোহিঙ্গা সমাস্যার সমাধান খুঁজতে জাতিসংঘের সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল কফি আনান যখন মায়ানমারে যান, তাঁর বিরুদ্ধেও তারা মিছিল করেছিল। মায়ানমারে ১৩০টির বেশী জাতিসত্ত্বা আছে। কিন্তু স্বীকৃতি নাই রোহিঙ্গাদের। শত শত বছর সে দেশে বসবাস করলে কি হবে, আইন করে তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়া হয়েছে। চিত্রিত হয়েছে অবৈধ অনুপ্রবেশকারি রূপে। তাদের দাবী, এ অবৈধদের থেকে তাদের বসত ভিটা্, ঘরবাড়ি, ব্যবসা-বাণিজ্য, জমি-জমা, চাকুরি-বাকুড়ি  ছিনিয়ে নেয়া হোক। ইতিমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে সেটি কার্যকরও করা হয়েছে।

তৃতীয় স্তর: আইসোলেশন ও পৃথকীকরণ

জাতিগত নির্মূলের এ হলো তৃতীয় পর্যায়। যতদিন পর্যন্ত সম্পূর্ণ নির্মূল বা দেশত্যাগে বাধ্য করার সুযোগ সৃষ্টি না করা যায়, ততদিন পর্যন্ত তাদের পলিসি হলো, চিহ্নিত জনগোষ্ঠিকে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠি থেকে পৃথক করা। হিটলার সে লক্ষ্যেই ইহুদীর জন্য গড়েছিল কনসেন্ট্রেশন কাম্প। গ্যাস চেম্বার নিয়ে হত্যা করার পূর্ব পর্যন্ত সে ক্যাম্পগুলোর নানা রূপ কষ্ট, অপুষ্টি ও বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর জন্য নিহত হওয়ার জন্য তাদেরকে প্রস্তুত করা। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে একই নীতির প্রয়োগ করা হয় অবাঙালীদেরকে বিরুদ্ধে। তাদেরকে নিজ নিজ ঘর-বাড়ী থেকে উঠিয়ে মহম্মদপুরের জেনেভা কাম্পের ন্যায় কনসেন্ট্রেশন কাম্পগুলোতে নিয়ে যায়। তেমনি মিয়ানমারেও রোহিঙ্গাদের জন্য গড়ে তোলা হয়েছে বহু কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প। এরূপ নতুন নতুন ক্যাম্প গড়ে তোলার লক্ষ্যে অথবা বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার জন্য কয়েক বছর পর পরই রোহিঙ্গা গ্রামগুলোর ঘরবাড়িতে আগুণ দেয়া হয়। এবং সেসব ক্যাম্প ঘিরে পুলিশ বা সেনাবাহিনীর ফাঁড়ি বসানো হয় যাতে সে ক্যাম্পের বন্দিদশা থেকে রোহিঙ্গা মুসলিমগণ বাইরে আসতে না পারে বা কোথাও গিয়ে আবার যেন কোন আবাদী গড়ে না তুলে।

এরূপ আইসোলেশন বা পৃথকীকরণ হলো মানুষকে শক্তিহীন করার সফল প্রক্রিয়া। সংঘবদ্ধতা ও সমাজবদ্ধতার মধ্যেই একটি জনগোষ্ঠির শক্তি। আইসোলেশন বা পৃথককরণের মধ্য দিয়ে একটি জনগোষ্ঠির পারস্পারিক সংযোগ বিলীন করা হয়। এভাবে তাদের দুর্বল করা হয়। দেশের সামাজিক, রাজনৈতীক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও মতাদর্শের অঙ্গণ থেকে তাদেরকে জোরপূর্বক বিচ্ছন্ন করা হয়। একারণে বস্তুবাসী রোহিঙ্গা মুসলিমগণ আজ নেতাশূণ্য ও সংগঠনশূণ্য। কোন মুসলিম সমাজে সংঘবদ্ধতা ও সমাজবদ্ধতা গড়ে তোলার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হলো মসজিদ। এটিই ইসলামের সনাতন সামাজিক ইন্সটিটিউশন। জমিনের উপর এটিই মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিষ্ঠান। সেটি ইসলাম ও মুসলিমের শত্রুদের অজানা নয়। ফলে প্রতিদেশেই ইসলামের শত্রুপক্ষ শুধু রাষ্ট্রের দখলদারিই হাতে নেয় না,  দখলদারি প্রতিষ্ঠা করে এবং পরিকল্পিত ভাবে ধ্বংস করে দেশের মসজিদগুলিও। রাশিয়া ও চীনে তাই হাজার হাজার মসজিদকে কম্যুনিষ্টগণ আস্তাবল বানিয়েছিল। একই ভাবে মায়ানমারে শত শত মসজিদকে ধ্বংস করা হয়েছে, অথবা সেগুলির দরজায় তালা লাগানো হয়েছে। মুসলিম নির্মূলকামী ‘মা বা থা’ এবং ‘৯৬৯ ন্যাশনালিস্ট মুভমেন্ট’এর নেতাগণ মসজিদকে বলে মুসলিমদের দুর্গ। তাই মসজিদকে তারা যেমন নিজেরা ধ্বংস করে, তেমনি সরকারেরর কাছেও দাবী করে সেগুলো দ্রুত বন্ধ করে দেয়ার। কোন চায়ের দোকানে বেশী মুসলিম জড়ো হলে তদন্ত শুরু হয়, সেটি মসজিদ কিনা।

 

চতুর্থ স্তর: পরিকল্পিত ও পর্যায়ক্রমীক দুর্বলীকরণ

রোহিঙ্গা মুসলিমদের নির্মূল করণে যে রোডম্যাপটি হুবহু অনুসরণ করা হচ্ছে তার একটি নৃশংস পর্যায় হলো, টার্গেট করে ক্রমান্বয়ে তাদেরকে দৈহীক, নৈতীক, অর্থনৈতীক, আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে দুর্বল ও নির্জীব করা। এজন্য তারা যেমন তাদেরকে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে ঠাসাঠাসী করে জড়ো করে, তেমনি ক্যাম্পে রেখে তাদেরকে আলো-বাতাস, শিক্ষা-দীক্ষা, ধর্মকর্ম, রাজনীতি, সমাজকর্ম ও পরস্পরে মেলামেশার ন্যায় অপরিহার্য বিষয়গুলো থেকেও বঞ্চিত করে। সে সাথে তাদের উপর চাপিয়ে দেয়া হয় লাগাতর অপমান, অবমাননা, ও নির্যাতন। পরিকল্পিত ভাবে অপুষ্টি, মহামারি ও চিকিৎসাহীনতা তাদের জন্য নিত্য সহচর করা হয়। যেসব রোহিঙ্গাগণ এক সময় স্বচ্ছল গৃহস্থ্য, চাকুরিজীবী বা ব্যবসায়ী ছিল, তাদের ঘর-বাড়ি, দোকান-পাঠ ও চাকুরি-বাকুড়ি কেড়ে নিয়ে নিঃস্ব বস্তিবাসী করা হয়েছে। যারা এক সময় মসজিদের ইমাম, স্কুল-কলেজের শিক্ষক বা রাজনৈতীক দলের নেতা ছিল তারা এখন নিঃস্ব বস্তিবাসী। তাদের যেমন শহরে প্রবেশাধীকার নেই, তেমনি নেই হাট-বাজার, হাসপাতাল, বিদ্যালয়ে প্রবেশের অধীকার। অধীকার নেই এমনকি মসজিদে যাওয়ার। বস্তির ঘরের আলো-বাতাসহীন স্যাঁত-সেঁতে মেঝেতে রোগাগ্রস্ত দুর্বল দেহ নিয়ে রাত-দিন শুয়ে থাকা ও ধুকে ধুকে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হওয়া ছাড়া তাদের সামনে কোন বিকল্প পথ খোলা রাখা হয়নি। চাকু চালিয়ে জবাই করা বা বন্দুকের গুলিতে হত্যাই একমাত্র গণহত্যা নয়। গণহত্যার আরেক নৃশংস রূপ হলো এভাবে মৃত্যুর দিকে জোরপূর্বক ঠেলে দেয়া।

 

পঞ্চম স্তর: মূলোৎপাটন

এটি হলো টার্গেট জনগোষ্ঠি নির্মূলের চুড়ান্ত পর্যায়। এ পর্যায়ে শুরু হয় হয় হত্যা ও বলপূর্বক দেশ থেকে বহিস্কারের ন্যায় ভয়ানক নৃশংসতা। মায়ানমারে সেটিই এখন তীব্র রূপ ধারণ করেছে। রোহিঙ্গা মুসলিমদের মূলোৎপাটনের সে লক্ষ্যকে সামনে রেখেই  অর্ধেকের বেশী রোহিঙ্গা মুসলিম গ্রামকে ইতিমধ্যেই মুসলিম শূণ্য করা হয়েছে। গ্রামগুলিতে আগুণ দিয়ে তাদের ঘর-বাড়ির চিহ্নপর্যন্ত বিলুপ্ত করা হয়েছে। শুধু ঘর-বাড়ীই নয়, মুসলিম সভ্যতা ও সংস্কৃতির যা কিছু নিদর্শন -যেমন মসজিদ-মাদ্রাসা, সেগুলিকেও নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে বা হচ্ছে্। বিগত তিন সপ্তাহে ৫ লাখের বেশী রোহিঙ্গা মুসলিমকে মায়ানমার ত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। জাতিসংঘের সেক্রেটারী জেনারেলের ভাষায় এটিই হলো মানব ইতিহাসের সবচেয়ে দ্রুত রিফিউজী-করণের ইতিহাস। যাদেরকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে তাদের ফেরত নেয়া তো দূরের কথা, প্রতিদিন অবশিষ্ঠ রোহিঙ্গাদেরও দেশত্যাগে বাধ্য করা হচ্ছে। এখনো যারা ঘর-বাড়ী ছাড়েনি, পরিকল্পিত ভাবে তাদের গ্রামগুলিতে গিয়ে সেনা হামলার ভয় দেখানো হচ্ছে। ফলে তারাও প্রাণ ভয়ে দ্রুত দেশ ছাড়ছে। প্রশ্ন হলো, এই যখন প্রতিবেশীদের আচরণ, তখন সে ভূমিতে রোহিঙ্গা মুসলিমগণ ভবিষ্যতে ফিরে যাওয়ার সাহসই বা পাবে কোত্থেকে? কারণ, কোন দেশে শুধু ঘরবাড়ির নির্মাণই বড় কথা নয়, সন্মান নিয়ে বাঁচার পরিবেশও তো জরুরী। সেটি কি কখনো আবার ফিরে আসবে?  যাদের মন এতটা বিষপূর্ণ তাদের কি সামর্থ থাকে?

 

ষষ্ঠ স্তর: মুসলিম-মূক্ত আরাকান

গণহত্যার এটিই হলো সর্বশেষ স্তর। রোহিঙ্গা মুসলিম নির্মূলের প্রকল্পটি এ স্তরে পৌঁছলে আরকানে যে মুসলিম জনবসতি ছিল, মুসলিম শাসন ও সভ্যতা ছিল, এবং সেখানে যে শত শত মসজিদ ও মাদ্রাসা ছিল -তার কোন আলামতই আর থাকবে না। যেমন নেই সাতশত বছরের অধীক কাল মুসলিম শাসনে থাকা স্পেনে। অথচ মুসলিম শাসনামলে স্পেন ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানের কেন্দ্রভূমি। সর্বত্র ছড়িয়ে ছিল মুসলিম তাহজিব ও তমুদ্দন। বহু বিখ্যাত মুসলিম আলেম ও মনিষীর জন্ম হয়েছে স্পেনে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা শাখায় বিদ্যার্জনের লক্ষ্যে ইউরোপের নানা দেশ থেকে ছাত্রগণ তখন স্পেনের শিক্ষা কেন্দ্রগুলোতে ভিড় করতো। অথচ সে দেশ থেকে লক্ষ লক্ষ মুসলিম নারী, পুরুষ, শিশুই শুধু বিলুপ্ত হয়ে যায়নি, বিলুপ্ত হয়ে গেছে তাদের ঘর-বাড়ি, মসজিদ-মাদ্রাসা ও শিক্ষা-সংস্কৃতিও। মুসলিমদের সে অতীত ইতিহাস খুঁজতে এখন যাদুঘর ও লাইব্রেরীতে যেতে হয়। আরাকানে দ্রুত সেটিই হতে যাচ্ছে। প্রশ্ন হলো, বিশ্বের ১.৬ বিলিয়ন মুসলিম কি রোহিঙ্গা মুসলিমদের তেমন একটি বিলুপ্তি-করণ প্রক্রিয়া নীরবে দেখবে? সেরূপ নীরবতা কি কখনো ঈমানের আলামত হতে পারে? ৩/১০/২০১৭

 




ড. হাসান রুহানীর সাথে কিছুক্ষণের স্মৃতি

ড. হাসান রুহানী আজ ইরানের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট।  নানা কারণে তিনি আজ বিশ্বের বহু আলোচিত ব্যক্তি। ক’দিন আগে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিয়ে তিনি আলোচনার শীর্ষবিন্দুতে পৌছে গেছেন। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামার সাথে টেলিফোন সংলাপের মধ্য দিয়ে ইরান-মার্কিন সম্পর্কে এতকাল যে বিচ্ছেদ ছিল সে ক্ষেত্রে নতুন সংযোগ গড়েছেন। ইরানে অবস্থান কালে আমার বিরল সুযোগ মিলেছিল জনাব রুহানীর সাথে প্রায় ৫-৬ ঘন্টা কাটানোর। সে স্মৃতি ভূলবার নয়। সে স্মৃতির বহুকিছু শুধু বিস্ময়করই নয়, শেখবারও।তাঁর সাথে সাক্ষাতের ফলে সুযোগ মেলে সে সময় যারা বিপ্লবের কান্ডারি ছিল তাদের চিন্তা-চেতনা সাথে কিছু পরিচয় লাভের। তখন উনার বয়স বত্রিশ। সময়টা ছিল ১৯৮০ সালের জুন মাস। আমি সবেমাত্র ইরানে এক সরকারি জেলা হাসপাতালে চিকিৎস্যক রূপে যোগ দিয়েছি,বিপ্লবের বয়স তখন এক বছর চার মাস। মহম্মদ রেজা শাহ পাহলভি ইরান ছেড়ে পলায়ন করে ১৯৭৯ সালের ১৬ই জানুয়ারিতে।তার পলায়নের পর পরই আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনী বহু বছরের নির্বাসন শেষে প্যারিস থেকে তেহরানে ফিরে আসেন। ফেব্রেয়ারি মাসের ১১ তারিখে শাহের সমর্থণপুষ্ট শাহপুর বখতিয়ার সরকারের পতন ঘটে এবং প্রতিষ্ঠিত হয় ড.মেহেদী বাজারগানের নেতৃত্বে বিপ্লবী সরকার।

আমি ইরানে পৌছি ১৯৮০ সালের মে মাসে। ইরানের আজকের প্রেসিডেন্ট জনাব ড. হাসান রুহানী তখন মজলিশে শুরার সদস্য। ইরানীরা পার্লামেন্টকে বলে মজলিশে শুরা অর্থাৎ পরামর্শ সভা। আমার কর্মস্থল তেহরান থেকে ১০৫ মাইল পূর্বে গরমসার নামক একটি জেলার জেলা হাসপাতালে। গরমসার সেমনান প্রদেশের পূর্বাঞ্চলীয় একটি জেলা শহর। ড.হাসান রুহানী তখন সেমনান জেলার এমপি।৫ বার তিনি সে পদে নির্বাচিত হয়েছেন;১৯৮০ সাল থেকে ২০০০ সাল অবধি ২০ বছর যাবত তিনি মজলিশে শুরার সদস্য ছিলেন।চতুর্থ ও পঞ্চম মেয়াদ কালে তিনি পার্লামেন্টের ডিপুটি স্পীকারও ছিলেন। আমি আমার ইরানে কর্মজীবনের পুরা ১০টি বছর কাটিয়েছি গরমসার জেলাতে। এত দীর্ঘকাল একই জেলাতে ডাক্তার রূপে কাজ করার ফলে জেলার সর্বস্তরের মানুষের সাথে গড়ে উঠে ব্যাপক পরিচিতি। অনেকের সাথে গভীর বন্ধুত্বও গড়ে উঠে। ভেড়ার রাখাল থেকে শুরু করে সাধারণ কৃষক,শিক্ষক,ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মকর্তা, জুম্মার ইমাম, এমপি, ধর্মীয় ও রাজনৈতীক নেতাকর্মীদের সাথে পরিচিতিও গড়ে উঠে। সুযোগ মেলেছে বহু বামপন্থি, শাহপন্থি, মোজাহিদীনে খালকের ন্যায় প্রচন্ড বিপ্লব বিরোধীদের সাথে কথা বলারও। এরা আমার কাছে এসেছে রোগী হিসাবে। এদের অনেকের বাসায় মেহমান রূপেও বহুবার আমন্ত্রিত হয়েছি।

বিদেশী হওয়ার কারণে এরা আমার সাথে কথা বলতো নির্ভয়ে। সে এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা। ডাক্তারি পেশার এটি এক  বাড়তি সুবিধা। এ পেশায় নানা স্তরের মানুষের সাথে মেলামেশায় কোন প্রাচীর থাকে না। বিলেতেও সেটি অনুভব করি। শুধু দেহের কথাই নয়, মনের কথাও তারা নির্ভয়ে বলে। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয় থেকে চাকুরির প্রস্তাব পাওয়ার সাথে সাথে আমি ফার্সি ভাষা শেখায় তাড়াহুড়া শুরু করে দেই। তখন দুশ্চিন্তা ছিল ফার্সি না জানলে আমি রোগীদের সাথে কথা বলবো কি করে? তাদের রোগই বা জানবো কি করে? ইরানে পৌছার পর ফার্সি ভাষা শেখার সে আগ্রহটা আরো তীব্রতর হয় ফারসী সাহিত্য ও ইরানের পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত সে দেশের বুদ্ধিজীবীদের লেখালেখির সাথে পরিচিতি লাভের জন্য। কারণ পত্র-পত্রিকা হলো জাতির চিন্তা-চেতনার প্রতিচ্ছবি। সেখানে সন্ধান মেলে একটি দেশের চিন্তাশীল ব্যক্তিবর্গ ও রাজনৈতীক কর্ণধারগণ দেশবাসী ও বিশ্ববাসীকে নিয়ে কি ভাবছেন তার পরিচয়। তাই কোন দেশের মানুষের মন ও মনন এবং তাদের রাজনৈতীক অভিলাষের খোঁজখবর পেতে হলে সে দেশের পত্র-পত্রিকা পাঠের বিকল্প নেই। তাছাড়া মুসলিম জগতে আরবীর পরই ফার্সি হলো দ্বিতীয় সমৃদ্ধ ভাষা। তাই যতদিন ইরানে ছিলাম ততদিন চেষ্টা করেছি ফার্সি ভাষা শেখার।ফার্সিতে কথা বলায় প্রথম তিন-চার মাস সমস্যা হলেও পরে আর সে সমস্যা থাকেনি। তাছাড়া ফার্সি ভাষাটি অতি সহজ,উর্দু জানা থাকলে সেটি আরো সহজ হয়ে যায়। কারণ এ দুটি ভাষার শব্দভান্ডারে রয়েছে বহু হাজার অভিন্ন শব্দ। ফার্সি বহু শত বছর ভারতের রাষ্ট্র ভাষাও ছিল। বহু ফার্সি শব্দ বাংলা ভাষাতেও রয়েছে। ফারসী জানা থাকলে সহজ হয়ে যায় আরবী ভাষা শিক্ষাও। কারণ ফার্সির প্রায় শতকরা ৭০ ভাগ শব্দই আরবী ভাষা থেকে নেয়া। ইরানে পৌঁছার কিছু দিনের মধ্যেই  আমি ফার্সি দৈনিক পত্রিকা পড়া শুরু করে দেই। কারণ আধুনিক ভাষা শেখার এটিই সবচেয়ে সফল উপায়। শিক্ষাসূত্রে লাহোরে থাকা কালে আমি উর্দু ভাষা শিখি এ পত্রিকা পড়েই। আর ভাষা হলো মানুষে মানুষে মনের সংযোগের সবচেয়ে সুন্দর বাহন। অন্যভাষীরা খুব খুশি হয় যখন অন্যদের তাদের ভাষায় কথা বলতে দেখে। তখন তারাও মনের দরজা খুলে দেয়। ফলে সহজ হয় তাদের মনের অতি কাছাকাছি পৌঁছার।

 

গরমসার জেলাটি একটি ক্ষুদ্র ও জনবিরল জেলা হলেও এ জেলার মানুষেরা অন্য জেলাবাসীর তুলনায় নিজেদেরকে চালাক-চতুর বা বুদ্ধিমান মনে করে। এবং তা নিয়ে গর্বও করে। সম্ভবত তার কিছু কারণও রয়েছে। শিক্ষাদীক্ষাতে এ জেলাবাসীরা অন্যান্য জেলার তুলনায় অনেক বেশী অগ্রসর। এ জেলার বহু শিক্ষিত মানুষ অন্য জেলায় গিয়ে শিক্ষাকতা করেন। বিশ্ববিদ্যাদয়ের শিক্ষক বা নামকরা ডাক্তার উঠে এসেছে গ্রাম থেকে।ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট ড. আহমেদী নেজাদও এ জেলারই এক ক্ষুদ্র গ্রামের সন্তান। গরমসারের অবস্থান ইরানের সবচেয়ে বড় মরুভূমি “দাশতে কবীর”এর উত্তর ভাগে। ফারসীতে “দাশত” বলতে বুঝায় প্রান্তর,মাঠ বা ক্ষেত্র। “কবীর” অর্থ বড় বা বিশাল। মরুভূমির পাশে অবস্থান হওয়ায় জেলার আবহাওয়া গ্রীষ্মকালে হয়ে পড়ে অত্যন্ত গরম; ইয়ার-কুলার বা ইয়ার-কন্ডিশনার ছাড়া ঘরে বসবাস করাই কঠিন। কিন্তু শীত কালে আবার প্রচন্ড শীত, মাঝে মধ্যে বরফে ঢেকে যায়।গরমসার শহর থেকে প্রায় ১১০ মাইল পূর্ব দিকে হলো প্রাদেশিক শহর সেমনান। গরমসারের অবস্থান সেমনান ও তেহরানের প্রায় মাঝামাঝিতে। সেমনান প্রদেশের পূর্বে প্রসিদ্ধ খোরাসান প্রদেশ এবং উত্তরে বিশাল আল বোরজ পর্বতমালা এবং পর্বতের ওপারেই কাস্পিয়ান সাগর তীরবর্তী নয়নাভিরাম মাজেন্দারান প্রদেশ। আর পশ্চিমে হলো কেন্দ্রীয় প্রদেশ তেহরান। গরমসার জেলাটি বিখ্যাত উন্নত মানের খোরবুজা, ডুমুর,আনার ও তুলা উৎপাদনের জন্য। ১৯৯০ সালে ইরান থেকে চলে আসার জানতে পারি জেলার দক্ষিণ ভাগে বড় ধরণের একটি বিমান ঘাঁটি নির্মিত হয়েছে।

 

ড. রুহানীর সাথে সাক্ষাতের পূর্বে তাঁর সাথে আমার কোন পরিচিতি ছিল না। তার নামও আগে শুনেনি। ড. হাসান রুহানীর সাথে  প্রায় ৫ -৬ ঘন্টা কাটানো কালে আদৌ বুঝতে পারিনি এ ব্যক্তিটি ইরানের প্রেসিডেন্ট হবেন এবং ইতিহাসে একজন বিখ্যাত ব্যক্তি রূপে প্রতিষ্ঠা পাবেন। সেরূপ ধারণা না থাকায় হয়তো ভালই হয়েছে। কারণ, সেরূপ ধারণা থাকলে হয়তো আমাদের কয়েক ঘন্টার আলোচনা এতটা খোলামেলা ও স্বাভাবিক হতো না। আমাদের আলোচনা হয়েছিল একই সমতলে, কে কত বড় তা নিয়ে অন্তত আমার মনে কোন ধারণাই আসেনি। হয়তো তার মনেও নয়। সম্ভবত সে কারণে আমি যেমন উনার সাথে নিঃসংকোচে কথা বলেছি, তেমনি উনিও বলেছেন। সেদিন উনার মাঝেও কোনরূপ কৃত্রিমতা বা অহংকার দেখিনি। ক’দিন আগে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ফার্সিতে দেয়া তাঁর ভাষণটি মনযোগ সহকারে শুনলাম। বহু দেশের বহু প্রেসিডেন্ট এবং বহু প্রধানমন্ত্রীই জাতিসংঘে ভাষন দিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট ওবামাও দিয়েছেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক প্রচার মাধ্যমে এবার সবচেয়ে বেশী গুরুত্ব পেয়েছে ড. রুহানীর ভাষণ। আল জাজিরা তারা পুরা ভাষণটি প্রচার করেছে। শুধু আল জাজিরা নয়, বিবিসিসহ বিশ্বের নানা গুরুত্বপূর্ণ টিভি চ্যানেল তাঁর ভাষণের উপর বিভিন্ন রাজনৈতীক বিশেষজ্ঞদের মন্তব্যও প্রচার করেছে। সবাই এ ব্যাপারে একমত যে প্রেসিডেন্ট রুহানীর বক্তৃতার মাঝে ছিল কুটনীতি-সুলভ প্রজ্ঞা ও রাষ্ট্রনায়ক-সুলভ দুরদৃষ্টি যা সাবেক প্রেসিডেন্ট আহমেদী নেজাদের বক্তৃতায় থাকতো না। জনাব আহমেদী নেজাদের আগে আয়াতুল্লাহ রাফজানজানি ও মুহাম্মদ খাতেমী যখন ইরানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন তখন ড. রুহানী ছিলেন তাঁদের ইরানের সেক্যুরিটি বিষয়ক পরামর্শদাতা। ইরানের পারমানবিক অস্ত্র নিয়ে গ্রেট ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানী -এ তিন ইউরোপীয় দেশের সাথে তিনিই ইরানের পক্ষ থেকে বৈঠক করতেন। ১৯৮৯ সাল থেকে ২০০৫ সাল অবধি ১৬ বছর যাবত তিনি ছিলেন ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিক্যুরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি।

 

ড. রুহানীর সাথে আমার সাক্ষাতের একটি ক্ষুদ্র পঠভূমিকা আছে। ইরানে আমার অবস্থান তখন একমাসও হয়নি। সে সময় কিছু প্রয়োজনীয় কাজে আমাকে সেমনান প্রদেশের হেলথ ডাইরেক্টরের অফিসে যেতে হয়। কাজ সেরে বিকেলে বাস যোগে কর্মস্থলে ফেরার চিন্তা করছি। এমন সময় আমার এক ইরানী বন্ধু বল্লেন, “বারাদার (ভাই), আমাদের শহরের এমপি সাহেব এখনই তেহরানের দিকে রওয়ানা দিচ্ছেন। আপনি বাসে না গিয়ে উনার গাড়ীতে যান। উনার গাড়ীতে জায়গাও আছে।” পরামর্শটি আমার জন্য খুবই ভাল মনে হল। সময় মত বাস পাওয়ার ঝামেলা বড় ঝামেলা। সেমনান থেকে গরমসারের কোন বাস সার্ভিস নাই। বাস নিতে হয় রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে হাত উঁচিয়ে দূরপাল্লার চলন্ত বাস থামিয়ে। অনেক সময় ঘন্টা খানেক লেগে যেত এরূপ চলন্ত বাসে জায়গা পেতে। সাধারনত এ বাসগুলো মাশহাদ, নিশাপুর, সবজাভার বা অন্যান্য দূরবর্তী শহর থেকে সেমনান ও গরমসারের পথ ধরে তেহরানমুখী ছুটতো। ফেরার পথে এমপি’র জিপে জায়গা হবে সেটি ছিল আমার জন্য খুবই আনন্দের বিষয়।তবে আমার কাছে আনন্দের মূল কারণটি শুধু বাস পাওয়ার ঝামেলা থেকে মুক্তি পাওয়া নয়, বরং একজন এমপি’র সাথে কিছু সময় কাটানোর।

 

আমার ইরানী বন্ধুটিই আমাকে এমপি সাহেবের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। ইরানে পৌছানোর পর যে কয়েক ইরানীর সাথে আমার পরিচয় ঘটে সে তাদেরই একজন। ড. রুহানী সাহেব তাঁর স্ত্রী ও বাচ্চাদের নিয়ে তেহরান যাচ্ছেন। বাচ্চা নিয়ে তাঁর স্ত্রী বসলেন পিছনের ছিটে। এমপি সাহেব এবং আমি বসেছি মাঝের সারিতে। চেহরাসুরত ও লেবাস দেখে বুঝতে বাঁকি থাকলো না তিনি একজন আলেম। তাঁর চেহারায় তখনও তারুন্য ও মুখে মিষ্টি হাঁসি। মাথায় শিয়া আলেমদের ন্যায় পাগড়ী। তিনি আমার সাথে ইংরাজীতে কথা বলা শুরু করলেন। উচ্চারন আমেরিকান এ্যাকসেন্টের এবং সুন্দর বিশুদ্ধ ইংরাজী। বিস্মিত হলাম,একজন আলেম এরূপ ইংরেজী শিখলেন কোত্থেকে? ভাবলাম,আমাদের দেশের ক’জন আলেম এরূপ ইংরেজীতে কথা বলতে পারেন? বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারিরাই বা ক’জন পারেন? তাদের অনেকে তো শুদ্ধ বাংলাও বলতে পারেন না। যাহোক যাত্রা পথে আমাদের আলোচনায় মাঝে ভাষার আর কোন প্রতিবন্ধকতা থাকলো না। সেমনান থেকে গরমসার প্রায় দুই ঘন্টার যাত্রাপথ। কিন্তু সে দুই ঘন্টায় মাঝে আমাদের আলোচনায় সম্ভবত দুই মিনিটও ছেদ পরিনি। ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি জ্ঞানের অন্যান্য রাজ্যেও যে তার পদচারণা আছে সেটি সেদিন সহজেই বুঝতে পেরেছিলাম।

 

আমাদের আলোচনার কোন নির্দিষ্ট বিষয় ছিলনা। আলাপ হচ্ছিল নানা বিষয়ে। বিশেষ করে বিপ্লব পরবর্তী অবস্থা ও ইরানের সমস্যা নিয়ে। কথা হচ্ছিল বাংলাদেশের সমস্যা নিয়েও। আলাপ হচ্ছিল মুসলিম বিশ্বের অনৈক্য, সাম্রাজ্যবাদের গোলামী ও পশ্চাদপদতা নিয়ে। কথা হচ্ছিল বিপ্লব বিরোধীদের এজেন্ডা নিয়েও। তিনি প্রচন্ড অমায়ীক ও মিষ্টভাষী। মনে হয়েছিল তিনি একজন ভাল মানের বুদ্ধিজীবীও। তিনি সেমনান শহরের এমপি হলেও তার পৈত্রীক নিবাস সেমনান থেকে প্রায় ১৫ মাইল দূরর সোরখে নামক এক ছোট্ট শহরে। এ শহরটি সেমনান থেকে তেহরান যাওয়ার যাত্রা পথেই পরে। সোরখে শহরটি দেখে মনে হয় এটি মরুদ্যান। গাছপালাহীন দীর্ঘ ধূসর মরুভূমি অতিক্রম কালে এ শহরটি তার সবুজ গাছপালা,ক্ষেতখামার আর ঘরবাড়ি নিয়ে পথের মাঝে হটাৎ করে হাজির হয়। তখন মনটাও যেন রুক্ষ ভাব থেকে হটাৎ জেগে উঠে। সবুজের স্পর্ষে মানুষের মন যে কতটা প্রবল আবেগে আন্দোলিত হয় সেটি এরূপ মরুদ্যানগুলো দেখলে বুঝা যায়। সম্ভবত ইরানের এরূপ মরুদ্যানগুলোতেই সেদেশের বিখ্যাত কবিদের জন্ম। বায়ুর মাঝে বসবাসে বায়ুর কদর বুঝা যায় না, তেমনি ছায়া ঢাকা,পাখি ডাকা সবুজ শ্যামল দেশে যাদের বসবাস তারাও প্রকৃতির অপরূপ রূপ দেখে এতটা পুলকিত হয় না। কিন্তু মরুভূমির দেশে প্রতিটি বৃক্ষ,প্রতিটি ফুল ও ফল,প্রতিটি গুল্মলতা এবং প্রতিটি ঝরণা অপরূপ সাজসজ্জা ও অলংকার মনে হয়।পবিত্র কোরআনে জান্নাতের বর্ণনা দিতে গিয়ে মহান আল্লাহতায়ালাও তাই সেগুলির বর্ণনা বার বার পেশ করেছেন। পবিত্র কোরআনের সে বর্ণনায় মরুবাসী আরবগণ যে দারুন ভাবে আন্দোলিত হতো তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে? সেটি আমি নিজ মনে তীব্রভাবে প্রথম অনুভব করেছি যখন গরমসারের রুক্ষ কর্মস্থল ছেড়ে অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা কাস্পিয়ান সাগর উপকূলবর্তী গিলান বা মাজেন্দারান প্রদেশে বেড়াতে গেছি। সে এক তীব্র অনুভূতি।

 

ইরানের সর্ববৃহৎ মরুভূমি দাশতে কবীরের বিশাল উত্তর ভাগ জুড়ে সেমনান প্রদেশ। এ প্রদেশের আর দুটি জেলা হলো দমঘান ও শাহরুদ। দমঘান বিখ্যাত পেস্তা উৎপাদনের জন্য। এ দাশতে কবীরের তাবাস’য়েই ১৯৭৯ সালে কয়েকটি মার্কিন হেলিকপ্টার তার আরোহী কমান্ডোদের নিয়ে বিধ্বস্ত হয়েছিল। এ ঘটনাটি ঘটে আমার ইরানে পৌছার আগেই। পত্রিকায় দেখিছি বিধ্বস্ত হেলিকপ্টার ও তার দগ্ধ আরোহীদের বীভৎস ছবি। জিমি কার্টার তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। ইরানী ছাত্রদের হাত থেকে দূতাবাসের জিম্মি মার্কিনীদের উদ্ধারের লক্ষ্যে এটি ছিল মার্কিন প্রশাসনের এক ব্যর্থ প্রচেষ্টা। এটি ব্যর্থ হওয়ায় কার্টারের দ্বিতীয় বার প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচনী বিজয়টিও ব্যর্থ হয়ে যায়। তিনি বিপুল ভোটে পরাজিত হন রোনাল্ড রেগানের কাছে।

 

ড. রুহানী বল্লেন, চলার পথে তিনি তাঁর সোরখের পৈত্রিক বাড়ীতে কিছুক্ষণের জন্য থামবেন। আমাকেও অনুরোধ করলেন, আমিও যেন কিছুক্ষণ বসি। তার পিত্রালয়ের গৃহটি কাদামাটির এবং অনেক কালের পুরনো। কোন বিলাসিতা নেই। কোনরূপ চাকচিক্য বা জাঁকজমকও নেই। নেই কোন টেবিল চেয়ার বা সোফাসেট। মেঝেতে দেয়াল থেকে দেয়াল অবধি কার্পেট। এমন কার্পেটই ঘরের চেহারা পাল্টে দেয়। আমি গ্রামের কৃষকের বাড়ীতেও এমন কার্পেট দেখিছি। কোন চেয়ার টেবিল নেই। দেয়ালের সাথে লাগোয়া ঠ্যাস-বালিশ। ফার্সিতে বলে পুশতি। পুশত হলো মানুষের পিঠ। এ বালিশগুলোতে পিঠ ঠ্যাকানো হয় বলেই হয়তো বলা হয় পুশতি। সবাই দেয়াল ঘেষে কার্পেটের উপর বসে। ইরানে যত বাড়ীতে গেছি, দুয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া সর্বত্র দেখেছি একই চিত্র। মনে হল, এটিই ইরানের রীতি। দেখলাম ড. রুহানী সাহেবের পরিবারের অনেকেই তাঁর আগমনের জন্য অপেক্ষায়। আমরা সবাই বসার একটি ঘরে চারপাশ ঘিরে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসলাম। মাঝে বিছানো হলো দস্তরখানা। ফার্সিতে দস্তরখানকে বলা হয় সোরফে। জনাব রুহানীর পিতা ও তার ভাইয়েরাও আসলেন। তাদের সামনে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হলো। সবাই আমাকে খোশআমদেদ বললেন, কিছু প্রশ্নও করলেন। দোভাষীর কাজ করছিলেন জনান রুহানী। জনাব রুহানীর পিতা হাজি আসাদুল্লাহ ফরীদুন একজন ধর্মভীরু ব্যক্তি,স্থানীয় বাজারে তাঁর মসলাপাতির দোকান। ব্যবসার পাশাপাশি দেশের রাজনীতিতেও তার গভীর আগ্রহ। শাহ-বিরোধী ও ইসলামপন্থি হওয়ায় শাহের আমলে তাঁকে বহুবার গ্রেফতার করা হয়। তিনি প্রথম গ্রেফতার হন ১৯৬২ সালে।

 

ড. হাসান রুহানী ধর্মীয় শিক্ষার শুরু সেমনানের এক মাদ্রাসায়। এরপর তিনি কোম নগরীতে যান। তৎকালীন বড় বড় আয়াতুল্লাহদের কাছে তিনি শিক্ষা লাভ করেন। ইমাম খোমেনী তখন প্যারিসে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন। তখনও তাঁকে ইমাম বলা হতো না। তিনি পরিচিত ছিলেন আর দশ জন আয়াতুল্লাহর ন্যায় একজন আয়াতুল্লাহ রূপে।আয়াতুল্লাহ খোমিনীর জ্যেষ্ঠ পুত্র মোস্তাফা খোমেনী শাহের গুপ্ত ঘাতকদের হাতে শহীদ হোন। তার মৃত্যু বার্ষিকী উদযাপনের আয়োজন হয়েছিল আরক মসজিদে। সে জলসায় এ তরুন যুবক হাসান রুহানীই আয়াতুল্লাহ খোমিনীর নামের সাথে প্রথম ইমাম শব্দটি যুক্ত করে দেন।এরপর থেকে অন্যরাও তাঁকে ইমাম বলা শুরু করে। শিয়াদের কাছে ইমাম খেতাবটি কোন মামূলী বিষয় নয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় মর্যাদাপূর্ণ খেতাব। কাউকে ইমাম বলার সাথে সাথে তাঁর প্রতি আনুগত্যের বিষয়টিও এসে যায়। তখন থেকেই ইমাম খোমিনী অন্যান্য আয়াতুল্লাহদের থেকে অধিক মর্যাদাবান ধর্মীয় ব্যক্তিতে পরিণত হন। কোনরূপ নির্বাচন বা রেফারেন্ডাম ছাড়াই এভাবে স্বীকৃতি ও বৈধতা পায় তাঁর নেতৃত্ব। এভাবে ইরানের ইতিহাসের সে গুরুত্বপূর্ণ লগ্নটিতে জনাব হাসান রুহানী এ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাটি পালন করেন। তখনও শাহের রাজত্ব। তার অতি কুখ্যাত সেক্যুরিটি বাহিনীর নাম ছিল  সাভাক। শুধু ইমাম খোমেনীর পুত্রই নন, ডক্টর আলী শরিয়তির ন্যায় বহু গুরুত্বপূর্ণ বিপ্লবী ব্যক্তি সাভাকের খুনিদের হাতে গুম হন। সাভাকের হিটলিস্টে জনাব রুহানীর নাম থাকায় আয়াতুল্লাহ বেহেশতী ও আয়াতুল্লাহ মোতাহারীর ন্যায় নেতাগণ জনাব রুহানীকে ইরান ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমানোর পরামর্শ দেন।

 

জনাব রুহানীর পৈতীক বাড়ীতে আমার অভিজ্ঞতা ভান্ডারে নতুন কিছু যোগ হলো। আমাদের সামনে আনা হোল ফলমূল ও চা। এই প্রথম দেখলাম ফলের ঝুলিতে শসা। শসা ইরানে ফলের মর্যাদা পেয়েছে। বাংলাদেশে জাংলায় ধরা বিশাল শসার তুলনায় এ শসাগুলো সরু ও ছোট। তবে স্বাদ অভিন্ন। বুঝতে বাঁকি থাকলো না, ড. রুহানী অতি সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসেছেন। একই অবস্থা সাবেক প্রেসিডেন্ট ড. আহমদী নেজাদের। আহমেদী নেজাদের ছোট্ট বাসাতেও কোন খাটপালং বা সোফা-টেবিল নাই। মেঝেতে বিছানা পেড়ে ঘুমোন। গণতন্ত্রের অর্থ তো এরূপ সৎ ও প্রতিভাধর যোগ্য মানুষদের জন্য ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে উঠার জন্য পথ করে দেয়া। কিন্তু সেটি যখন জিম্মি হয়ে পড়ে কোন মৃত নেতার অযোগ্য সন্তান বা স্ত্রীদের হাতে তখন কি তাকে গণতন্ত্র বলা যায়? জনগণও যখনসে জিম্মিদশাকে নিয়ে গর্ব করে এবং সেটিকে গণতন্ত্র বলে চিৎকার করে তখন কি সে জনগণকে গণতন্ত্রের পক্ষের শক্তি বলা যায়? এরূপ পরিবারতন্ত্রের সাথে রাজতন্ত্রের পার্থক্য কোথায়? রাজতন্ত্রেও তো রাজার পাগল বা দুর্বৃত্ব পুত্র বা কন্যা রাজা বা রানী হওয়ার সুযোগ পায়।

 

ড. রুহানীর পিতার বাড়ীতে প্রায় ঘন্টা খানেক অবস্থানের পর আবার আমাদের যাত্রা শুরু হলো। সারা পথ ধরে শুরু হলো আবার বিবিধ বিষয়ে আলোচনা। উনার থেকে জানতে পারলাম, আমার কর্মস্থল গরমসারেও তিনি যাত্রা বিরতি করবেন। বললেন, সেখানকার জামে মসজিদে তাঁর বক্তৃতার পূর্বনির্ধারিত অনুষ্ঠান। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমার হাতে সময় হবে কিনা মসজিদের সে জলসায় থাকার। ঐ রাতে হাসপাতালে আমার কোন ডিউটি ছিল না। অতএব রাজী হয়ে গেলাম। তিনিও খুশি হলেন। মাগরিবের সময় আমরা মসজিদে গিয়ে পৌঁছলাম। মাগরিবের নামাজের পর তাঁর সভা। তিনি ফার্সীতে বক্তৃতা দিলেন। সে বক্তৃতা পুরাপুরি বুঝে উঠার মত ফার্সি তখনও আমি শিখে উঠতে পারিনি। ইরানে রাজনৈতিক জলসাগুলো কোন ময়দানে হয় না, মসজিদেই হয়। মসজিদই ইরানের ধর্ম, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও সামজিকতার কেন্দ্রবিন্দু। নবীজীর আমলেও সেটিই ছিল রীতি। মসজিদ ভিন্ন তখন রাজনীতি চর্চার অন্য কোন প্রতিষ্ঠানই ছিল না। সাহাবায়ে কেরামদের আমলেও ছিল না। অথচ সেটি হতে দিতে রাজী নয় সেক্যুলারিস্টগণ। মসজিদে রাজনীতি চর্চাকে তারা বলে ইসলাম থেকে বিচ্যুতি। বলে রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার। অথচ ইসলামের শিক্ষা রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নয়,বরং ইসলামের শরিয়তি বিধানসহ সকল বিধিবিধানকে দেশের রাজনীতি, আদালতে ও প্রশাসনে পূর্ণাঙ্গ ভাবে মেনে চলা। অর্থাৎ রাজনীতির পরিপূর্ণ ইসলামীকরণ।সেটিই তো নবীজী (সাঃ)র শিক্ষা। ইসলামের বিধিবদ্ধ বিধানকে রাজনীতিতে পূর্ণ ভাবে মেনে না চললে কি ইসলাম পালন হয়? আর সেটি করতে হলে রাজনীতির চর্চাও মসজিদ থেকেই শুরু করতে হয়। কারণ মসজিদই হলো আল্লাহর দ্বীনের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান, সে সাথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানও। কিন্তু সেক্যুলারিস্টদের এজেন্ডা শুধু রাষ্ট্রের উপর তাদের দখলদারি প্রতিষ্ঠা নয়, বরং মসজিদের উপর দখলদারিও। তুরস্কে কামাল আতাতুর্ক মসজিদগুলো দখলে নিয়েছিল সেখানে সরকারের বেতনভোগী ইমামদের বসিয়ে। ধর্মপ্রচারে সেসব সরকারি ইমামদের কোন স্বাধীনতা ছিল না, বরং অর্পিত দায়ভারটি ছিল সরকারের পক্ষ থেকে ছাপানো খোতবা জুম্মার নামাজে পড়ে শোনানো। ইসলাম চর্চার ক্ষেত্রে সেক্যুলারিস্টগণ যে কীরূপ নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায় এ হলো তার নমুনা। বিলেতে দেখছি রাজনীতির চর্চা এদেশের চার্চে হয় না। সেটি হয় পাবে -যা আসলে মদ্যশালা। প্রতিগ্রাম ও প্রতিমহল্লায় রয়েছে মদ্যশালা। মানুষ এখানে শুধু মদ খেতেই আসে না, এখানে বসে টিভিতে খেলা দেখে, ঘন্টার পর ঘন্টা গল্প করে, রাজনীতি নিয়েও বিতর্ক করে। এমপিগণ এ মদ্যশালায় গিয়ে মানুষের সাথে কথা বলে। এভাবে তারা জনসংযোগ ও নির্বাচনি জলসা করে। এটিই ব্রিটিশ রাজনীতির সেক্যুলারিজম। তাদের রাজনীতিতে চার্চের যেমন স্থান নেই, তেমনি স্থান নেই ধর্মের। কিন্তু সেটি তো ইসলামের শিক্ষা নয়। খৃষ্টান ধর্ম থেকে ইসলাম ভিন্নতর শুধু আক্বিদা-বিশ্বাস ও ইবাদতের ধরণে নয়, বরং রাজনীতিতের ইসলামের প্রয়োগের ক্ষেত্রেও।

 

গরমসারের মসজিদে ঢুকে দেখলাম মসজিদের দেয়ালে অনেক পোস্টার। সেগুলির অধিকাংশই মূলত ইমাম খোমেনীর উক্তি। তেমন বহু উক্তি ক্যালিগ্রাফির ঢংয়ে ইরানের রাস্তাঘাটে শত শত দেখেছি। একই চিত্র দেখেছি ইরানের অন্যান্য মসজিদেও। মসজিদের পুরা মেঝে জুড়ে বিছানো অতি দামী দামী কার্পেট। অবাক হলাম মসজিদের গায়ে লটকানো ফটো দেখে। সেখানে শোভা পাচ্ছে ইমাম খোমিনীর ছবিও।দেখলাম জায়নামাজে বসে অনেকে চা খাচ্ছে। ইরানীরা চা খায় দুধ ছাড়া এবং চিনির টুকরো ভিজিয়ে ভিজিয়ে। চা বানানোর জন্য মসজিদের এক রুমে আলাদা আয়োজনও আছে। চা বানানোর সে বিশাল পাত্রটিকে বলা হয় সামাভার। সে পাত্রে তৈরী চা ভলিন্টিয়ারগণ সমবেত মুসল্লিদের মাঝে ফ্রি বিতরণ করছে। দেখলাম কেউ কেউ আবার ধুমপানও করছে। ইমাম খোমেনী তখন জোরে শোরে শিয়া-সূন্নীর উর্দ্ধে উঠে মুসলিম একতা ও ভাতৃত্বের কথা বলছেন। ইমাম খোমেনীর একতার সে বানী পাশ্চাত্যের কাছে ভাল লাগেনি। ভাল লাগেনি সৌদি বাদশাহদের ন্যায় মুসলিম দেশের স্বৈরাচারি শাসকদের কাছেও। কিন্তু মসজিদে বসে আমার মনে হল, ঢাকা, করাচী, লাহোর ও কাবুলের মুসল্লীরা যদি মসজিদের ভিতরে এরূপ ছবি টানানো ও ধুমপানের খবর জানতে পারে তবে শিয়া-সূন্নীর একতা বিনষ্টের জন্য কি কোন অমুসলিম বা বিদেশী শত্রুর প্রয়োজন পড়বে?

 

ড. রুহানীর বক্তৃতা শেষ হলো। বক্তৃতার পর শহরের গণ্যমান্য লোকদের সাথে কিছুক্ষণ বসলেন। তারপর প্রস্থানের উদ্যোগ নিলেন। আমাকে বল্লেন, রাতে গরমসার শহরেই তাঁর দাওয়াত আছে। আমাকেও তিনি দাওয়াত দিলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, আমি যেতে রাজী আছি কিনা। আমার পরিবার তখনও ইরানে পৌঁছেনি, হাসপাতালের বাসায় একা একা থাকি। ভাবলাম, বাসায় ফিরে একাকী কি করবো? ড. রুহানীর সাথে থাকায় ইরানী পরিবার,সমাজ ও রাজনীতিকে ভিতর থেকে দেখার যে সুযোগ পেলাম সেটি আমার কাছে অতি মূল্যবান মনে হল। বহু অর্থ বহু সময় ব্যয়েও ক’জন এরূপ দেখার সুযোগ পায়? তাছাড়া বিনা কারণে দাওয়াত অগ্রাহ্য করাও তো সূন্নতের খেলাপ। অতএব রাজী হয়ে গেলাম। অতিশয় অবাক হলাম ড. রুহানীর মেজবানের ঘরের দরজার সামনে গিয়ে। ড. রুহানীকে অভ্যার্থনা জানানোর জন্য ঘর থেকে তাঁর মেজবানগণ বেরিয়ে এলেন। জনাব রুহানী তাঁর সমবেত আত্মীয়দের মাঝে বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিকে পরিচয় করিয়ে দিলেন এই বলে, ‘ইনি আমার ফার্স্ট কাজিন’। তারপর বল্লেন, “ইনি এ শহরের নাপিত।”  আমি তো অবাক। সে এক বিশাল কালচারাল শক। আমি ভদ্রলোককে চিনতাম। কারণ, আমি গরমসার শহরে আসার পর তাঁর দোকানে চুল কাটাতে গেছি। কিন্তু সে যে তাঁর কাজিন সেটিই আমার বিস্ময়ের কারণ। তাঁর কাজিন যে নাপিত সেটি বলতে ড. রুহানীর সামান্যতম সংকোচও হলো না। ভাবলাম, আমার দেশে হলে ব্যাপারটি কেমন হতো? কেউ কি তার এমন আত্মীয়কে পরিচয় করিয়ে দিত? তাছাড়া প্রশ্ন হলো, কোন মুসলমান সন্তান কি নাপিতের পেশা গ্রহন করতো? বাংলাদেশে লক্ষ লক্ষ মানুষে পথে বসে ভিক্ষা করতে লজ্জা করে না, কিন্তু ক’জন পেশা রূপে নাপিতের কাজ করতে রাজী? বাংলাদেশে এ কাজ করে নিম্মশ্রেনীরা হিন্দুরা। মুসলমানদের মধ্যে যারা এ কাজটি করে তারা অবাঙালী বিহারী। ইসলামে শ্রেনীভেদ, জাতিভেদ ও বর্ণভেদ হারাম। হারাম হলো কারো কোন কাজ বা পেশাকে ঘৃনা করা। আর সবচেয়ে ঘৃনার কাজ হল ভিক্ষা করা। অথচ বাঙালী মুসলমানগণ নিজেদের ধর্মভীরু রূপে গর্ব করলেও ধর্মের এ মৌল শিক্ষাটিকে তাদের আচরণে স্থান দেয়নি। তাদের চেতনার মাঝে এখনও রয়ে গেছে হিন্দুদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার। ফলে এখনও রয়ে গেছে হিন্দুদের ন্যায় ডোম, মেথর, নাপিত, মুচীর কাজকে ঘৃনা করার সংস্কৃতি। অথচ ইরানের কোন গ্রামে বা মহল্লায় কোন ডোম-মেথর নাই। সবাইকে নিজ নিজ পায়খানা নিজ হাতে পরিস্কার করতে হয়। অথচ বাংলাদেশের চিত্রটাই ভিন্ন।  পাড়ায় পাড়ায় ভিক্ষা করবে তবুও কোন বাঙালী মুসলমান এসব কাজকে নিজের পেশা রূপে গ্রহন করবে না। যেন একাজ করার জন্যই জন্ম নিয়েছে নিম্ন শ্রেণীর অচ্ছুৎ হিন্দুরা। হিন্দু সংস্কৃতির সাথে বাঙালী মুসলমানের সংস্কৃতি এখানে একাকার হয়ে গেছে। অথচ একটি জনগোষ্ঠির সংস্কৃতি থেকেই পরিচয় মেলে তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসটি জনগণের চিন্তা ও চরিত্রে কতটা পরিশুদ্ধি বা সংস্কার এনেছে সেটির।তাই জনগণের ঈমানের পরিমাপটি পাওয়া যায় তাদের সংস্কৃতি থেকে।এমন হিন্দুয়ানি সংস্কৃতি নিয়ে কেউ ইরানে গেলে ‘কালচারাল শক’এর শিকার না হয়ে উপায় নেই। ইসলামি সংস্কৃতির মধ্যে যাদের বসবাস তারাও বিস্মিত হবে বাংলাদেশে এসে।

 

ড. হাসান রুহানী যে শুধু মাদ্রাসা-শিক্ষিত আলেম -তা নয়। তিনি ১৯৭২ সালে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জুডিশিয়াল ল’র উপর স্মাতক ডিগ্রি নিয়েছেন। এবং কন্সটিটিউশনাল ল’এর পিএইচড করেছেন গ্লাসগোর ক্যালিডোনিয়ান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। সেটি ১৯৯৯ সালে -যখন তিনি কাজ করছিলেন ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সেক্যুারিটির সেক্রেটারির ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ পদে। সে বছরেই তথা ১৯৯৯সালে তিনি নির্বাচিত হন ইরানের অতি মর্যাদাবান প্রতিষ্টান মজলিসে খুবরাগান বা এক্সপার্ট কাউন্সিলের সদস্য রূপে। এ মজলিসের কাজ হলো পার্লামেন্টে গৃহীত আইনের উপর নজরদারি রাখা। পার্লামেন্টের সদস্যদের আইন প্রণোয়নের অধিকার থাকলেও আল্লাহতায়ালা প্রদত্ত শরিয়তি বিধানের বিরুদ্ধাচারনের কোন অধিকার নেই। পাশ্চাত্যের গণতন্ত্র থেকে ইসলামের শুরাভিত্তিক গণতন্ত্রের এখানেই মূল পার্থক্য। জনাব রুহানী পার্লামেন্টের ডিফেন্স ও পরারাষ্ট্র নীতি বিষয়ক কমিটির প্রধানের দায়িত্বও পালন করেন। তিনি যে শুধু রাজনৈতীক অঙ্গণের যোদ্ধা তা নয়,ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময় তিনি যুদ্ধের ফ্রন্ট লাইনেও অস্ত্র ধরেছেন। অংশ নিয়েছেন ইরাকের অধিকৃতি থেকে খুররম শহর নামক নগরটিকে আযাদ করার যুদ্ধে।সে যুদ্ধে বীরত্বের জন্য তিনি সর্বোচ্চ “নাছর” পদকটি লাভ করেন। ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৫ সাল অবধি ইরাক-ইরাক যুদ্ধের সময় তিনি সশস্ত্র বাহিনীর ডিপুটি কমান্ডারও ছিলেন। লক্ষণীয় হলো, এরূপ নানা ব্যস্ততার মাঝে তিনি লেখাপড়ার কাজও চালিয়ে গেছেন। মনযোগ দিয়েছেন দেশের শিক্ষা ক্ষেত্রে বিপ্লব সাধনেও। তিনি তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়েরও একজন ট্রাস্টি। অংশ নিয়েছেন গবেষণার কাজেও। ১৯৯২ সাল থেকে কাজ করছেন সেন্টার ফর স্ট্রাটেজিক রিসার্চের প্রধান রূপে। কি শিক্ষা, কি রাজনীতি, কি যুদ্ধ, কি কুটনীতি, কি গবেষণা -সর্বক্ষেত্রে তিনি বিচরণ করেছেন সর্বশক্তি নিয়ে।এরূপ ব্যক্তিগণ যখন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হয় তখন সে দেশ যে পৃথিবীর মঞ্চে নিজের জন্য গৌরবময় স্থান করে নিবে সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? বাংলাদেশের অর্ধেক জনশক্তি নিয়ে এজন্যই ইরান আজ  গুরুত্বপূর্ণ শক্তি।

 

“ইনসানে কামেল” ইসলামে একটি বহুল প্রচলিত প্রতিশব্দ। কামেল শব্দের অর্থ পরিপূর্ণ। শিক্ষা, কর্ম ও ইবাদতের অঙ্গণে জীবনকে শুধু একটি ক্ষেত্রে সীমিত রাখলে সে কামালিয়াত বা পরিপূর্ণতা আসে না। সে জন্য তাকে যেমন নানা বিষয়ে জ্ঞানার্জন করতে হয়,তেমনি জীবন যুদ্ধের নানা রণাঙ্গণে অংশও নিতে হয়। এভাবেই ঈমানদারের জীবনে কামালিয়াত বা পূর্ণ আসে। এটিই নবীজীর মহান সূন্নত। নবীজী (সাঃ)শুধু সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ আলেমই ছিলেন না, ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ দায়ী বা ধর্মপ্রচারকও। ধর্মের বানী নিয়ে বহু জনপদে ঘুরেছেন। তিনি ছিলেন রণাঙ্গনের জেনারেল। ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ রাজনীতিবিদ, ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ট রাষ্ট্রনায়ক। ছিলেন আদর্শ পিতা, আদর্শ প্রতিবেশী ও আদর্শ ব্যবসায়ী। যারা নবীজী (সাঃ)র আদর্শের অনুসারি হতে চায় তাদের সামনে তাই বহুমুখি কাজে আত্মনিয়োগের বিকল্প নাই। সাহাবাগণের মধ্যে সে কামালিয়াত বা পূর্ণতা অর্জনের বাসনা ছিল প্রবল। ফলে সে সময় মুসলিম সমাজে নানামুখি উন্নয়ন ঘটেছে। তখন দেশে শুধু মসজিদ-মাদ্রাসার সংখ্যাই বাড়েনি,কৃষি, শিল্প,বিজ্ঞান ও সামরিক ক্ষেত্রেও বিপুল বিপ্লব এসেছে।উচ্চতর সভ্যতা তো এভাবেই নির্মিত হয়। ড.হাসান রুহানীর মাঝেও সে বাসনাটি যে অতি প্রবল ছিল সেটি বুঝা যায় তার শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবনের বহুমুখীতা দেখে। অথচ বাংলাদেশে কত আলেম সারা জীবন শুধু মসজিদের ইমামতি বা মাদ্রাসার শিক্ষাকতা করেই জীবনটি শেষ করছেন। ধর্মের লেবাসধারি অধিকাংশ মানুষ নিজেদের ধর্মকর্মকে সীমিত রেখেছেন শুধু নামাজ-রোযা ও হজ-যাকাতের মাঝে। দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে তারা যেমন মাঠে নামেন না, তেমনি আল্লাহর শরিয়তি বিধান আস্তাকুঁরে গিয়ে পড়লেও তা নিয়ে মাথা ঘামান না। তাদের জীবনে যেমন জিহাদ নেই, তেমনি ইসলামকে বিজয়ী করার কোন রাজনীতিও নাই। কোন জ্ঞানচর্চা বা বুদ্ধিবৃত্তিও নাই। আগ্রহ নাই নিজে শেখা ও অন্যদের শেখানোয়।বহু আলেমের অবস্থা তো এমন যে পয়সা না দিলে তারা মুখই খোলেন না। অথচ কোরআনের জ্ঞান বিতরণ করতে গিয়ে নবীজী (সাঃ)রকোন অর্থপ্রাপ্তি ঘটেনি। তাঁকে বরং কাফেরদের হাতে পাথর খেতে হয়েছে। এরপরও ভাবেন,তারা নবীজী (সাঃ)র সূন্নতের অনুসারি! প্রশ্ন হলো,এমন মুসলমানের সংখ্যা বৃদ্ধিতে শুধু বাংলাদেশ নয়, সমগ্র বিশ্বও যদি ভরে যায় তবুও কি তাতে ইসলামের কোন বিজয় আসবে? কল্যাণ হবে কি মুসলমানের?

 

বিস্ময়ের বিষয় শুধু ড. রুহানীর প্রেসিডেন্ট পদে অধিষ্টৃত হওয়াটি নয়। বরং অধিক বিস্ময়ের বিষয় হলো যারা তাকে নির্বাচিত করেছে সে ভোটাদাতাদের রুচী, দূরদৃষ্টি ও প্রজ্ঞা। একটি দেশের জনগোষ্ঠির রুচী ও প্রজ্ঞা তো ধরা পড়ে তাদের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বা এমপিদের চরিত্র দেখে। যে দেশে চোরডাকাত, খুনি,গণতন্ত্র হত্যাকারি বাকশালী,ব্যাভিচারি, স্বৈরাচারি, মিথ্যুক ও দূর্নীতিপরায়নরাও বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয় এবং জাতির পিতার আসন পায়,সে দেশের সাধারণ মানুষের অপরাধটিও কি কম? এমন দেশ বার বার দুর্বৃত্তদের দখলে যাবে সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? ডাকাত পাড়ায় কোন ভাল মানুষ সর্দার হতে পারে না। সে জন্য নিষ্ঠুর ডাকাত হওয়াটি জরুরী। এমন নিষ্ঠুর ডাকাত যখন গ্রামবাসীর ভোটে সর্দার নির্বাচিত হয় তখন কি সন্দেহ থাকে সে গ্রামবাসির চরিত্রের পচন নিয়ে? তাদের চরিত্রের পরিমাপে কি তখন আর কোন গজকাঠির প্রয়োজন হয়? বাংলাদেশ তো তেমনি এক দুর্বৃত্তকবলিত দেশ। এমন একটি দেশ দুর্বৃত্তিতে বিশ্বে বার বার চ্যাম্পিয়ান হবে সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? গণতন্ত্রের অর্থ শুধু বার বার নির্বাচন নয়, বরং সেটি হলো যোগ্য মানুষদের নির্বাচনে জনগণের সামর্থ। সে সামর্থ ছাড়া গণতন্ত্র ব্যর্থ হতে বাধ্য। বাংলাদেশের মানুষের সে সামর্থ কি আদৌ অর্জিত হয়েছে?

 

মানুষকে শুধু হিংস্র পশু,বিষধর শাপ ও বিষাক্ত পোকামাকড়কে চিনলে চলে না, তাকে ইসলামের শত্রু ও সমাজের দুর্বৃত্তদেরও চিনতে হয়। একটি দেশের সবচেয়ে বড় ক্ষতিটি হয় এরূপ দৃর্বৃত্তদের চিনতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে। হিংস্র পশু,বিষধর শাপ ও বিষাক্ত পোকামাকড়ের কামড়ে ক’জন মারা পড়ে? কিন্তু দুর্বৃত্তগণ ক্ষমতা পেলে বিপদে পড়ে সমগ্র জাতি। মানুষ তখন পথেঘাটে গুম বা খুন হয়। লুন্ঠিত হয় দেশের অর্থভান্ডার।দেশ তখন ভিক্ষার ঝুলিতে পরিণত হয়। তখন নেমে আসে আল্লাহতায়ালার আযাব। তাই মহান আল্লাহতায়ালা এমন দুর্বৃত্তদের শুধু চেনাটাই ফরজ করেননি, তাদের নির্মূল করাটাকেও ফরজ করেছেন। ইসলামে জিহাদকে ফরজ করা হয়েছে তো সে লক্ষ্যেই। নির্মূলের সে কাজটি করতে গিয়েই তো শতকরা ৬০ ভাগের বেশী সাহাবী শহীদ হয়ে গেছেন। গণতন্ত্র তো তখনই সফল হয়,যখন জনগণ সে সামর্থ পুরাপুরিটি অর্জন করে। তখন প্রাতিটি নির্বাচন ইসলামের শত্রু নির্মূলের কাজে ধারালো হাতিয়ার রূপে কাজ করে। খলিফায়ে রাশেদার আমলে তো সেরূপ গণতন্ত্রই প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। ফলে তখন রাজতন্ত্র ও পরিবারতন্ত্র নির্মূল হয়েছিল এবং নির্বাচিত হয়েছিলেন সমাজের সবচেয়ে যোগ্যবান ব্যক্তিগণ।সেটি না হলে গণতন্ত্রের পথ ধরে হিটলার,মুজিব ও হাসিনার ন্যায় ফ্যাসিবাদী খুনিদের হাতে দেশ অধিকৃত হয়। তখন দেশে গ্যাস চেম্বার বা শাপলা চত্বরের গণগত্যা নেমে আসে। বাংলাদেশে গণতন্ত্রের নামে গণদুষমণগণ বার বার নির্বাচিত হচ্ছে ও রাজপথ বার বার রক্তাত্ব হচ্ছে তো সে ব্যর্থতার কারণেই। ২৯/০৯/১৩




জিহাদ ও সন্ত্রাস

সন্ত্রাসের নাশকতা ও ঈমানী দায়ভার

ঈমানদারকে শুধু হারাম-হালাল ও হিংস্র জন্তু-জানোয়ারদের চিনলে চলে না, চিনতে হয় সমাজের অতি হিংস্র সন্ত্রাসী জীবদেরও। চিনতে হয় কোনটি জিহাদ এবং কোনটি সন্ত্রাস। তাকে সঠিক ভাবে চিনতে হয় কোনটি মহান আল্লাহতায়ালার পথ, এবং কোনটি শয়তানের। কারণ, প্রতি সমাজে এরাই সন্ত্রাসের মূল নায়ক। মানব জীবনে সবচেয়ে গুরুত্পূর্ণ ও সবচেয়ে উপকারী হলো এই জ্ঞান। মানব সমাজে সবচেয়ে বড় অভাব এইজ্ঞানের। বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলিতে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা ডিগ্রিধারীদের সংখ্যা বাড়লেও বাড়েনি সেরূপ জ্ঞানবানদের সংখ্যা। ফলে বাড়েনি সত্যকে চেনার সামর্থ্য। কোনটি জিহাদ এবং কোনটি সন্ত্রাস – তা নিয়ে গভীর অজ্ঞতার কারণে মানুষ তখন দলে দলে স্বৈরাচারী জালেম, কাফের ও ফাসেকদের পক্ষে ভোট দেয়, অর্থ দেয়, লেখালেখি করে, এমনকি যুদ্ধও করে। সে যুদ্ধে অনেকে প্রাণও দেয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমের দেশ এভাবে স্বৈরাচারী দুর্বৃত্তদের হাতে অধীকৃত হয়; এতে পরাজিত হয় ইসলাম; এবং বিলুপ্ত হয় শরিয়তী বিধান। তাদের মূল যুদ্ধটি মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে। ফলে তাদের বিজয়ে ব্যর্থ হয় মানব জাতিকে জান্নাতে নেয়ার মহান আল্লাহতায়ালার নিজস্ব প্রজেক্ট। মানব শিশুগণ তখন বেড়ে উঠে শয়তানের দলের নৃশংস সন্ত্রাসী রূপে। এমন অধিকৃত দেশ তখন দুর্বৃত্তি ও নৃশংস সন্ত্রাসে রেকর্ড গড়ে। শয়তানী শক্তির পক্ষে জানমালের এরূপ বিনিয়োগে সমাজে শান্তি আসে না, বরং যেটি সুনিশ্চিত হয় সেটি জাহান্নামের আযাব। পবিত্র কোর’আনে সে কঠোর হুশিয়ারীও বার বার এসেছে।

কোনটি জিহাদ আর কোনটি সন্ত্রাস -তা নিয়ে অজ্ঞতায় যা অসম্ভব তা হলো প্রকৃত মুসলিম রূপে বাঁচা ও বেড়ে উঠা। কারণ, ঈমানদার ও বেঈমান –উভয়ের জীবনেই লাগাতর যুদ্ধ আছে। বেঈমানের যুদ্ধটি শয়তানের এজেন্ডা পূরণে, সে অভিন্ন অঙ্গণে ঈমানদার যুদ্ধ করে মহান আল্লাহতায়ালার ইচ্ছাপূরণে। পবিত্র কোর’আনে সে ঘোষণাটি এসেছে এভাবে, “যারা ঈমান এনেছে তারা যুদ্ধ করে আল্লাহতায়ালার পথে এবং যারা কাফের তথা আল্লাহর অবাধ্য তারা যুদ্ধ করে শয়তানের পক্ষে; অতঃপর তোমরা শয়তানের বন্ধুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো, নিশ্চয়ই শয়তানের কৌশল দুর্বল।” –(সুরা নিসা, আয়াত ৭৬)। এজন্যই যুদ্ধরত প্রতিটি সৈনিকের জন্য যা জরুরী তা হলো তার নিজের বাহিনী বা পক্ষটিকে সঠিক  ভাবে চেনা। এখানে ভূল হলে ভূল হয় যুদ্ধে জানমালের বিনিয়োগে। বিভ্রান্ত সে ব্যক্তিটি কাফের বাহিনীকে আপন মনে করে তাদের বিজয়ে যুদ্ধ করবে এবং প্রাণ দিবে -সেটিই স্বাভাবিক। মুসলিম বাহিনীকে পরাজিত করতে এমন বিভ্রান্ত ব্যক্তিগণই অতীতে ইংরেজদের পক্ষে লড়েছে, এবং ১৯৭১’য়ে লড়েছে ভারতীয় কাফেরদের পক্ষে। ভারতীয়দের অস্ত্র কাঁধে নিয়ে তারা বাংলাদেশের উপর ভারতীয় অধিকৃতিকে সুনিশ্চিত করেছে। এটিই হলো অজ্ঞতা তথা জাহিলিয়াতের সবচেয়ে বড় নাশকতা। প্রশ্ন হলো, এরূপ অজ্ঞতা বা জাহিলিয়াত নিয়ে কি ইসলাম পালন বা সিরাতুল মুস্তাকীমে চলা সম্ভব? পবিত্র জিহাদ তখন সন্ত্রাস মনে হবে এবং সন্ত্রাসী নেতা-নেত্রীও তখন নির্বাচিত হবে –সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? এমন অজ্ঞতার কারণেই অতীতে বিপুল সংখ্যক মানুষ নমরুদ, ফিরাউন, হিটলার, স্টালীন ও মুজিবের ন্যায় নৃশংস সন্ত্রাসীদের বাহিনীতে যোগ দিয়েছে। এবং সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ, বর্ণবাদী নির্মূল, গণহত্যা, বিশ্বযুদ্ধ, গ্যাস চেম্বার, ড্রোন হামলা, ক্লাস্টার বোমা, ব্যারেল বোমা ও পারমানবিক বোমার ব্যবহারীগণও বৈধ শাসক রূপে গন্য হয়েছে।

জিহাদ জান্নাতের পথ; এবং সন্ত্রাস জাহান্নামের পথ। মু’মিনের প্রতিটি যুদ্ধই জিহাদ; এবং শয়তানের প্রতিটি যুদ্ধই সন্ত্রাস। বেঈমানের সন্ত্রাসে থাকে আল্লাহর শরিয়তী বিধানকে পরাজিত করার খায়েশ। অপরদিকে জিহাদে থাকে মহান আল্লাহতায়ালার ইচ্ছাপূরণের নিয়েত। থাকে, তাঁকে খুশি করার বাসনা। ফলে জিহাদে থাকে, ইসলামকে বিজয়ী করার যুদ্ধে মু’মিনের জান-মাল কোরবানীর পবিত্র আয়োজন। আভিধানিক অর্থে ত্রাস সৃস্টির প্রতিটি প্রয়াসই হলো সন্ত্রাস। ত্রাস সৃষ্টির মূল লক্ষ্যটি এখানে জনগণকে ভীত-সন্ত্রস্ত রাখা। রাখাল যেমন লাঠির ভয় দেখিয়ে ভেড়ার পালকে নিয়ন্ত্রনে রাখে, তেমনি জনগণের উপর নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠায় সন্ত্রাসী শক্তির মূল হাতিয়ারটি হলো সন্ত্রাস। বিশ্বব্যাপী ত্রাস সৃস্টির লক্ষ্যে সন্ত্রাসী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অতীতে পারমানবিক বোমাও ব্যবহার করেছে। মানব জাতির সমগ্র ইতিহাসে এটিই হলো সবচেয়ে নৃশংস সন্ত্রাস। হিরোশিমা ও নাগাসাকীর প্রায় দেড় লক্ষ মানবকে তারা নিমিষের মধ্যে হত্যা করেছে। সন্ত্রাসের সে নৃশংস মাত্রা আজও কেউ অতিক্রম করতে পারিনি। বিশ্বশক্তি রূপে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ও দাপটের মূল কারণ সন্ত্রাস সৃষ্টির সর্বাধিক সে সামর্থ্য।  দেশটি সে অবস্থানটি হারাতে চায় না। ফলে বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাস সৃষ্টির সে স্ট্রাটেজী এখনো  মার্কিন রাজনীতির মূল নীতি। ফলে দেশে দেশে তারা ব্যবহার করছে হাজার হাজার ক্লাস্টার বোমা, মিজাইল হামলা, বিমান ও ড্রোন হামলা। ত্রাস সৃষ্টির সে অভিন্ন লক্ষ্যে তারা বিশ্বব্যাপী স্থাপন করেছে অসংখ্য সামরিক ঘাঁটি এবং প্রতিষ্ঠা করেছে ন্যাটোর ন্যায় সামরিক জোট। এবং সে লক্ষ্যেই ক্ষুধার্ত কুমিরের ন্যায় তাদের অসংখ্য ডুবো জাহাজ ও বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ নানা দেশের উপকুলে ঘুরে।

রাজনৈতীক এজেন্ডা পূরণে সন্ত্রাস হলো সহিংস সেক্যুলার শক্তির হাতিয়ার। অথচ মু’মিনের মনে কাজ করে জাগতিক স্বার্থের উর্দ্ধে আল্লাহ-সচেতন এক পবিত্র ধর্মীয় চেতনা। সন্ত্রাসীর মনে তেমন কোন উচ্চতর বা পবিত্রতর চেতনা থাকে না। পবিত্রতার বদলে সন্ত্রাসে থাকে পার্থিব স্বার্থ পূরণের সহিংস খায়েশ। অস্ত্রের বলই তাদের একমাত্র বল; এবং নৃশংসতার মাঝেই তাদের উৎসব। সন্ত্রাসীদের মনে তাই নিরস্ত্র জনগণের উপর পারমানবিক বোমা, ক্লাস্টার বোমা, নাপাম বোমা ও ড্রোন হামলার মধ্যেও তীব্র আনন্দবোধ থাকে। কারণ, তাদের সেক্যুলার মনে থাকে না পরকালে জবাবদেহীতার ভয়। মার্কিনীগণ তাই আফগানিস্তান, ইরাক ও সিরিয়ায় বিজয়ের নামে শহরের পর শহর ধ্বংস করেছে। অথচ জিহাদে থাকে মহান আল্লাহতায়ালার কাছে  পরকালে জবাবদেহীতার ভয়, ফলে থাকে আত্মত্যাগের মাধ্যেম মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করার আগ্রহ। জিহাদ এভাবেই পরিণত হয় উচ্চতর ইবাদতে। তাই ঈমানদারদের জিহাদে কোন শহর বা জনপদ ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয় না।  জিহাদ ও সন্ত্রাসের মাঝে এটিই হলো মূল পার্থক্য। সন্ত্রাসীদের কারণেই ইরাক, সিরিয়া, আফগানিস্তান, লিবিয়া ও ইয়েমেনের অসংখ্য শহর ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে। এবং একই রূপ সেক্যুলার সন্ত্রাসীদের হাতে রক্তাত্ব হয়েছে ঢাকার শাপলা চত্ত্বর, ইসলামাবাদের হাফসা মাদ্রাসা ও কায়রোর রাবা আল আদাবিয়া অঙ্গণ।

 

পরিণতি ঈমানশূন্যতার

অতীতে অনেকেই নিজেদের মুসলিম পরিচিতি নিয়ে শত্রুপক্ষের সাথে সন্ত্রাসে নেমেছে। সন্ত্রাসের সীমিত, স্থানীয় ও দেশীয় রূপটি হলো ডাকাতী, রাহাজানী ও ফ্যাসীবাদী স্বৈরাচার। আর আন্তর্জাতীক রূপটি হলো দুর্বল দেশের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী ও ঔপনিবেশীক আগ্রাসন এবং সামরিক অধিকৃতি। বিবেকমান মানুষ মাত্রই যেমন ডাকাতী ও রাহাজানীতে অংশ নেয় না, তেমনি তারা সাম্রাজ্যবাদী সন্ত্রাসীদের দলে সৈনিক রূপেও যোগ দেয় না। শরিয়তের দৃষ্টিতে এটি কবিরা গুনাহ ও অপরাধ কর্ম। এমন কবিরা গুনাহ ও অপরাধ কর্মে অংশ নেয়া একমাত্র ঈমানশূন্যতাতেই সম্ভব। কিন্তু মুসলিম ইতিহাসে এমন অপরাধীদের সংখ্যা অসংখ্য। তারা সাম্রাজ্যবাদী সন্ত্রাসীদের সেনাদলে যোগ দিয়ে মুসলিম দেশে শুধু ধ্বংস ও গণহত্যাই বাড়ায়নি, মুসলিম ভূমিকে তাদের পদনতও করেছে। উদাহরণ দেয়া যাক। ১৯১৭ সালে ঔপনিবেশিক কাফের শক্তির হাতে অধিকৃত হয় ইসলামের পবিত্র ভুমি জেরুজালেম। সে ঔপনিবেশিক অধিকৃতিরই ভয়াবহ পরিণতি হলো আজকের ইসরাইল। সে পবিত্র ভূমিতে উসমানিয়া খলিফার সেনাদলকে পরাজিত করতে আগ্রাসী ব্রিটিশ বাহিনীতে যতজন ইংরেজ সৈনিক ছিল তার চেয়ে বেশী ছিল অইংরেজ। তাদের মাঝে বহু হাজার ছিল মুসলিম। বাঙালী মুসলিমের দ্বারা সেরূপ অপরাধ কর্ম যে শুধু ১৯৭১’য়ে হয়েছে তা নয়। তার পূর্বেও হয়েছে। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর হাতে ১৯১৭ সালে অধীকৃত হয় মুসলিম সভ্যতার কেন্দ্রভুমি ইরাক। ইরাক দখলের লক্ষ্যে হানাদার সে ব্রিটিশ বাহিনীতে কবি কাজী নজরুল ইসলামের ন্যায় বহু বাঙালী মুসলিমও স্বেচ্ছায় অংশ নিয়েছিল। তারা যুদ্ধ করেছিল খলিফার বাহিনীর বিরুদ্ধে এবং কাফেরদের এজেন্ডা পূরণে। সে ঔপনিবেশিক হানাদার ব্রিটিশ বাহিনীতে মনের আনন্দে অফিসার হয়েছিল আরেক অতি পরিচিত বাঙালী ব্যক্তি জেনারেল আতাউল গনি ওসমানী। আগরতলা ষড়যন্ত্রকে সফল করতে ভারতকে কোন বাঙালী হিন্দুর ঘাড়ে দায়িত্ব দেয়ার প্রয়োজন পড়েনি। মুসলিম দেশের অভ্যন্তরে মুসলিম হত্যায় এবং উম্মাহর বিরুদ্ধে নাশকতায় ইসলামের শত্রুগণ যুগে যুগে এভাবেই মুসলিমদের মধ্য থেকেই কলাবরেটর বেছে নিয়েছে। বাংলাদেশে সেটি যেমন ইংরেজদের হাতে হয়েছে, তেমনি ১৯৭১’য়ে ভারতীয় হিন্দুদের হাতেও হয়েছে। আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়াসহ বহু মুসলিম দেশে সে অভিন্ন ধারাই অব্যাহত রেখেছ মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা জোট। শত্রুগণ এভাবেই কই’য়ের তেলে কই ভাজার সুযোগ পেয়েছে।

মুসলিমদের জন্য আরো বিপদের কারণ, এরূপ হারাম অপরাধ-কর্ম নিয়ে দুঃখবোধও নাই। এবং আগ্রহ নাই সে নৈতীক রোগ থেকে আরোগ্য লাভে। বিবেকমান মানুষ মাত্রই দেহে রোগ দেখা দিলে চিন্তিত হয়। এবং সে রোগের চিকিৎসায় যত্নবান হয়। কিন্তু সেরূপ আগ্রহ বিবেকশূন্য মানুষের থাকে না। মুসলিমদের মাঝে সেরূপ বিবেকশূন্যতা ভর করেছে চেতনার রোগ নিয়ে। তাই নিজেদের চেতনার মারাত্মক রোগ নিয়ে তাদের দুঃখবেোধ হয় না। রোগাগ্রস্ত অপরাধীদের মাথায় তুলতে তাদের বিবেকে দংশনও হয়না। বরং ইতিহাসের বইয়ে ঈমানশূণ্য সে অপরাধীদের জাতির গৌরব গণ্য করা হয়। এবং এরই ফলে জনগণের মাঝে আগ্রহ বেড়েছে, এ অপরাধীদের অনুকরণে শত্রুর দলের সৈনিক হওয়ায়। তাই বাংলাদেশের উপর রাজনৈতীক, অর্থনৈতীক ও সাংস্কৃতীক অধিকৃতি বজায় রাখতে ভারতকে তার কাফের সৈন্যদের ব্যবহার করতে হয় না। হাজার হাজার বাঙালী মুসলিম সে কাজটি নিজ খরচে করে দিতে রাজী। এমন মানসিক দাসদের কারণেই বাংলার বুকে ঔপনিবেশিক কাফের শাসন ১৯০ বছর যাবৎ বলবৎ থেকেছে। আর এখন স্থায়ীত্ব পাচ্ছে ভারতের রাজনৈতীক, সাংস্কৃতিক, সামরিক ও অর্থনৈতীক অধিকৃতি। অথচ শরিয়তের বিধান হলোঃ মুসলিম ভূমিতে অমুসলিম সৈন্যের প্রবেশের সাথে সাথে জিহাদ আর ঐচ্ছিক থাকে না, সেটি তখন ফরজে আইনে পরিণত হয়। এরূপ পরিস্থিতিতে আগ্রাসী অমুসলিমদের সাথে সম্পর্ক রাখাটি হারাম; এবং সেটি গোমরাহী তথা পথভ্রষ্টতার দলীল। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশটি হলো, “হে মু’মিনগণ! তোমরা আমার শত্রু ও তোমাদের শত্রুকে বন্ধু রূপে গ্রহণ করো না। … তোমাদের মধ্যে যে এটি করে সে সরল পথ থেকে বিচ্যুত। তোমাদের কাবু করতে পারলে তারা তোমাদের শত্রু হয়ে যাবে এবং (তোমাদের বিরুদ্ধে নাশকতায়) তারা প্রসারিত করবে তাদের হাত ও রসনা। এবং চাইবে, তোমারাও (তাদের মত) কাফের হয়ে যাও।” –(সুরা মুমতেহানা আয়াত ১-২)।

 

হার মানায় পশুকেও

ঈমান না থাকলে মানুষ পশুর চেয়েও হিংস্রতর জীবে তথা সন্ত্রাসীতে পরিণত হয়। পবিত্র কোরআনে মানব চরিত্রের সে ভয়ানক নৃশংস দিকটি তুলে ধরেছেন মহান আল্লাহতায়ালা।[FK1] পবিত্র কোর’আনের ভাষায় “উলায়িকা কা’ আল অআনাম, বাল হুম আদাল”। অনুবাদঃ “ওরাই হলো পশু, বরং তার চেয়েও নিকৃষ্ট”। তখন পশুর চেয়েও মানুষের সে নিকৃষ্ট রূপটি প্রকাশ পায় সন্ত্রাসে। সমগ্র মানব ইতিহাসে যত নর-নারী ও শিশুর প্রাণনাশ বন্য পশুদের হাতে হয়েছে তার চেয়ে বহু হাজার গুণ বেশী হয়েছে মানব রূপী এসব হিংস্র পশুদের হাতে। তারা মাত্র দুটি বিশ্বযুদ্ধে হত্যা করেছে সাড়ে সাত কোটি মানুষকে। সর্বকালের সকল পশু মিলেও এর শতভাগের এক ভাগকেও হত্য করতে পারিনি। এরূপ মানব রূপী পশুদের হাতে সন্ত্রাসের মোক্ষম ক্ষেত্র গণ্য হয় দেশের রাজনীতি, প্রশাসন, যুদ্ধবিগ্রহ ও আইন-আদালত। তখন জনগণের জানমাল, মেধা, শ্রম ও সময়ের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগটি হয় সন্ত্রাস তথা ত্রাস সৃষ্টির অবকাঠামো নির্মাণে -তথা পুলিশ, প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর শক্তি বাড়াতে। এমন বিনিয়োগের কারণে গণহত্যা বা হলোকাস্ট যে শুধু হিটলারের হাতে হয়েছে -তা নয়। মানব ইতিহাসে –বিশেষ করে পাশ্চাত্য ইতিহাসে এরূপ হিটলারের সংখা অসংখ্য। তাদের ভাণ্ডারে মানুষ পুরিয়ে মারার গ্যাসচেম্বার না থাকলেও মানবতাধ্বংসী অস্ত্রের কোন কমতি ছিল না। তাই জার্মানীর হলোকাস্টে যত ইহুদীর মৃত্যু হয়েছে তার চেয়ে বহুগুণ বেশী রেড ইন্ডিয়ানের মৃত্যু হয়েছে ইউরোপীয় খৃষ্টানদের সৃষ্ট আমেরিকার হলোকাস্টে। ইংরেজদের হাতে অধিকৃত হওয়ার সাথে সাথে ভয়ানক হলোকাষ্ট তথা এথনিক ক্লিন্জিং নেমে এসেছিল অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের লক্ষ লক্ষ আদি বাসীর জীবনে। নৃশংস হলোকাস্ট নেমে এসেছিল স্পেনে বসবাসকারী লক্ষ লক্ষ  মুসলিমের জীবনেও। সে নৃশংস হত্যাকান্ডে বিলুপ্ত হয়েছে প্রায় ৭ শত বছর ধরে গড়ে উঠা মুসলিম সভ্যতা। খৃষ্টান হওয়াতে তাই ইউরোপীয়দের স্রেফ লেবেল বদলিয়েছে, কিন্তু সভ্য মানুষ রূপে বেড়ে হওয়াতে কোন সহায়তা মেলেনি। বরং মানবতাশূণ্য করেছে। তাই সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ, সাম্যবাদ, ঔপনিবেশবাদ, ফ্যাসীবাদ, নাযীবাদ ও বর্ণবাদের ন্যায় হিংস্র মতবাদের উৎপত্তি কোন বনে জঙ্গলে বা ডাকাত পুরীতে হয়নি, হয়েছে ইউরোপের খৃষ্টান ভূমিতে। হলোকাস্ট, বর্ণবাদী নির্মূল, দাস-রপ্তানী, বিশ্বযুদ্ধ ও যুদ্ধে পারমানবিক বোমা, রাসায়নিক বোমা, ক্লাস্টার বোমার ব্যবহারের ন্যায় মানব ইতিহাসের সবচেয়ে নৃশংসতম অপরাধগুলো সংগঠিত হয়েছে এই খৃষ্টানদের হাতেই।

 

বেঈমানের যুদ্ধই সন্ত্রাস

বেঈমানের যুদ্ধ মাত্রই সন্ত্রাস তথা ত্রাস সৃষ্টির নৃশংস হাতিয়ার। নিজেদের সে যুদ্ধগুলিকে তারাও কখনো জিহাদ বলে না। সেসব যুদ্ধে মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করার কোন নিয়েত থাকে না। বরং লক্ষ্য, প্রতিপক্ষের নির্মূল। ফলে তাতে মানবিকতা বা জাগতিক চেতনা-উর্দ্ধ কোন পবিত্রতাও থাকে না। অথচ ঈমানদারের যুদ্ধের ধারণাটাই সম্পূর্ণ ভিন্ন। তার জানমাল গণ্য হয় মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে আমানত রূপে। জানমালের মালিক যেহেতু মহান আল্লাহতায়ালা, তাই সে জানমালের বিনিয়োগটিও হতে হয় একমাত্র তাঁরই এজেন্ডা পূরণে। ফলে মু’মিনের প্রতিটি যুদ্ধই মহান আল্লাহতায়ালার পথে তথা পবিত্র জিহাদ। এরূপ জিহাদে থাকে মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করার নিয়েত। থাকে জালেম শক্তির নির্মূলের চেতনা; ফলে তাতে গণহত্যা বা হলোকাস্ট নেমে আসে না। তাই মুসলিম ইতিহাসে শত শত জিহাদ হলেও কোথাও হলোকাস্ট বা গণহত্যা নেমে আসেনি। তাই ঐতিহাসিক মক্কা ও জেরুজালেম বিজয়ের দিনে কোন প্রাণহানি হয়নি। অথচ বেঈমানের সন্ত্রাসে গণহত্যা হওয়াটিই রীতি। মার্কিনীদের হাতে অধিকৃত হওয়ায় এ জন্যই বিশাল গণহত্যা নেমে এসেছে ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান ও ইরাকে। রোমান রাজা কন্সটান্টিনোপলের খৃষ্টান হওয়ার সাথে সাথে তার রাজ্যে কাউকে খৃষ্টান ধর্মের বাইরে থাকার স্বাধীনতা দেয়া হয়নি। তখন প্রজাদের সামনে মাত্র দুটি পথ খোলা রাখা হয়। হয় খৃষ্টান ধর্মে দীক্ষা নেয়া, নতুবা মৃত্যুকে বেছে নেয়া। বেঈমানের দেশে এজন্যই রাজা বা শাসকের চেয়ে বড় কোন সন্ত্রাসী থাকে না। অথচ জিহাদে কোন জনগোষ্ঠির বিরুদ্ধে নির্মূলের এজেন্ডা থাকে না, এজেন্ডা স্রেফ জালেমের জুলুম ও মিথ্যা নির্মূল। ফলে ইসলামী সরকার কখনোই সন্ত্রাসের হাতিয়ারে পরিণত হয় না। তাই ৭ শত মুসলিম শাসনের পরও স্পেনের সংখ্যাগরিষ্ট জনগন নিজ নিজ ধর্ম নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার পেয়েছিল; এবং হলোকাস্ট আসেনি সংখ্যাগরিষ্ঠ খৃষ্টানদের জীবনে। অথচ খৃষ্টান রাজা ফার্ডিনান্ড ও রানী ইসাবেলার হাতে স্পেন অধিকৃত হওয়ার সাথে সাথে মুসলিম রূপে বেঁচে থাকার অধিকার কেড়ে নেয়া হয় স্পেনের বহুলক্ষ মুসলিমের জীবন থেকে। একই রূপ চিত্র দেখা যায় ভারতে। সেখানে ৭ শত বছরের মুসলিম শাসনের পরও সংখ্যাগরিষ্ট জনগণ হিন্দু রয়ে গেছে। মুসলিম শাসনামলে হিন্দুদের জীবনে হলোকাস্ট এসেছে -সে ইতিহাস নেই্। অথচ ভারতে মুসলিম নির্মূলের লাগাতর দাঙ্গা শুরু হয়েছে মুসলিম শাসন বিলুপ্তির সাথে সাথে। এবং অতীতে হিন্দু শাসনে হলোকাস্ট এসেছে লক্ষ লক্ষ বৌদ্ধদের জীবনে।

 

পরকালীন পুরস্কারের ভাবনা ও জিহাদ

জীবনের সফলতা ও বিফলতা নিয়ে যে যাই ভাবুক, তা নিয়ে মহান আল্লাহতায়ালার রয়েছে নিজস্ব বিচার ও মানদণ্ড। জীবনের চুড়ান্ত সে সফলতাটি হলো, আখেরাতে অনন্ত-অসীম কালের জান্নাতী জীবন। পবিত্র কোরআনে সে বিশাল প্রাপ্তিকে বলা হয়েছে “ফাউজুন আজীম” অর্থঃ বিশাল বিজয়। সে বিজয়ের তূলনায় দুনিয়ার জীবন এতই তুচ্ছ যে, তাঁর নিজের শত্রু  কাফেরদের পার্থিব আরাম-আয়েশ বাড়াতে তাদের ঘরবাড়ী, দালান-কোঠা এবং ঘরের দরজা, সিঁড়ি ও খাট-পালং সোনা-রূপা দিয়ে গড়ে দিতেও মহান আল্লাহতায়ালার কোনরূপ আপত্তি ছিল না। কিন্তু সেগুলি তাদেরকে এজন্য দেননি যে, কাফেরদের সে বিশাল পার্থিব প্রাপ্তি দেখে আশংকা ছিল সকল মানুষের কাফের হয়ে যাওয়ার। সে বর্ণনাটি এসেছে পবিত্র কোর’আনের সুরা জুখরুফের ৩৩, ৩৪ ও ৩৫ নম্বর আয়াতে। মহান নবীজী (সাঃ)র হাদীসঃ মহান আল্লাহতায়ালার কাছে পার্থিব জীবনের গুরুত্ব যদি মশার একটি ডানার সমানও গণ্য হত তবে তিনি কাফেরদের এ দুনিয়ায় কিছুই দিতেন না। এক ফোটা পানির সাথে সকল সাগর-মহাসাগরের পানির তূলনা হয়। কারণ সকল সাগর-মহাসাগরের সমুদয় পানি যত বিশালই হোক, তা অসীম নয়। ফলে তূলনা চলে দুই সসীমের মাঝে। কিন্তু  আখেরাতের জীবন তো অন্তহীন। ফলে দুনিয়ার অর্জন -তা যত বিশালই হোক, আখেরাতের জান্নাতী অর্জনের সাথে তার কোনরূপ তূলনাই হয় না। তাই পবিত্র কোর’আনে মহান আল্লাহতায়ালা ঈমানদারদের বার বার আখেরাতের সফলতায় মনযোগী হতে নির্দেশ দিয়েছেন। সে সাথে এ কথাও বার বার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, আখেরাতে সে বিশাল প্রাপ্তির জন্য ঈমানের পরীক্ষায় পাশ করাটি অপরিহার্য। জীবনের এ চুড়ান্ত পরীক্ষায় কোনরূপ ফাঁকি বা সুপারিশ চলে না। মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে অপার রহমত ও পুরস্কার জুটে একমাত্র সে পরীক্ষায় পাশের পর, পূর্বে নয়। নবী-রাসূল ও তাঁদের সাথীদেরও সে পরীক্ষায় পাশ করতে হয়েছে। পবিত্র কোর’আনে সে হুশিয়ারিটি ঘোষিত হয়েছে এভাবে, “মানুষ কি মনে করে নিয়েছে যে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’ এ কথা বললেই তাদেরকে পরীক্ষা না করেই অব্যাহতি দেয়া হবে? আমি তো তাদের পূর্ববর্তীদেরও পরীক্ষা করেছিলাম; আল্লাহ  অবশ্যই প্রকাশ করে দিবেন কারা (ঈমানের দাবীতে) সত্যবাদী এবং কারা মিথ্যাবাদী।” –(সুরা আনকাবুত, আয়াত ২-৩)।

মহান আল্লাহতায়ালার উপর ঈমান আনার অর্থ, মু’মিনের জীবনে পরীক্ষা যে অনিবার্য -সেটির উপরও ঈমান আনা। পরীক্ষার সে ক্ষেত্রটি হলো জিহাদ। সাচ্চা ঈমানদারদের বাছাইয়ে জিহাদ ফিল্টারের কাজ করে। বেছে নেয়া হয় জান্নাতের উপযোগী যোগ্যবান বাসিন্দাদের। সে বাছাই থেকে তখন বাদ পড়ে ভীরু-কাপুরুষ ও ঈমানের দাবীতে মিথ্যুক তথা মুনাফিকগণ। মদিনার ৩০০ জন মুনাফিক তাই জায়নামাজে তাদের মুনাফেকী দিনের পর দিন লুকিয়ে রাখতে পারলেও ওহুদের যুদ্ধ কালে সেটি লুকাতে পারিনি। যাচাই-বাছাইয়ের সে কাজে মুসলিম সমাজে জিহাদের প্রেক্ষাপট লাগাতর তৈরী করা হয় মহান আল্লাহতায়ালার নিজস্ব পরিকল্পনার অপরিহার্য অংশরূপে। পবিত্র কোর’আনে মহান আল্লাহতায়ালার সে পরিকল্পনার কথাটি ঘোষিত হয়েছে এভাবে, “(হে ঈমানদারগণ!) তোমাদের উপর দুর্দিন যদি আঘাত হেনে থাকে (তাতে বিস্ময়ের কি আছে?), সেরূপ আঘাত তো তাদের (কাফেরদের) উপরও এসেছে। আমি মানুষের মাঝে কালের আবর্তন ঘটাই এজন্য যে, যাতে জানতে পারি কারো (প্রকৃত) ঈমানদার।এবং তোমাদের মধ্য থেকে বেছে নেই্ শহীদদের। আল্লাহ জালিমদের পছন্দ করেন না।” -(সুরা আল –ইমরান আয়াত ১৪০)।

 

জিহাদেই বিজয়

ইসলামের বিজয়ে জিহাদের গুরুত্ব অন্য কারণেও। জিহাদের অঙ্গণে যেমন ঈমানের পরীক্ষা হয়, তেমনি সে পবিত্র অঙ্গণেই প্রাপ্তি ঘটে মহান আল্লাহতায়ার গায়েবী মদদ। আসে বিজয়। ফলে জিহাদ বন্ধ হলে মহান আল্লাহতায়ার পক্ষ থেকে সাহায্য লাভও বন্ধ হয়ে যায়। কারণ, মহান আল্লাহতায়ালা তার নিজের পক্ষ থেকে সাহায্যদানের পূর্বে মু’মিনের নিজের বিনিয়োগটি দেখতে চান। মু’মিনগণ যখন মহান আল্লাহতায়ালার পথে তাঁদের প্রিয় জীবনের কোরবানী পেশে জিহাদের ময়দানে হাজির হন, তখন সে ময়দানে তারা একাকী থাকেন না। তাদের সাহায্যে হাজির হন মহান আল্লাহতায়ালা ফেরেশতাগণও। ফলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বাহিনীও তখন বিশাল বিশাল বাহিনীর উপর বিজয়ী হয়। ইসলামের ইতিহাস তো সেরূপ ঘটনায় ভরপুর। মুসলিমদের পক্ষ থেকে জানমালের সে নিজ বিনিয়োগটি বন্ধ হলে বন্ধ হয়ে যায় মহান আল্লাহর বিনিয়োগও। আর মহান আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কি বিজয় সম্ভব? ফলে শুরু হয় লাগাতর পরাজয়। সে বিষয়টি ইসলামী আক্বীদার এতটাই মৌলিক বিষয় যে, জিহাদ তথা মহান আল্লাহতায়ালার গায়েবী সাহায্য লাভের সে পথটি অতীতে কখনোই বন্ধ করা হয়নি। গায়েবী সাহায্য লাভ ও জান্নাতের সে দ্বারটি খোলা রাখতে খোলাফায়ে রাশেদার আমলেই শুধু নয়, উমাইয়া, আব্বাসীয় ও উসমানিয়া আমলেও সরকারি নীতি ছিল ইসলামের শত্রুশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবছর জিহাদ সংগঠিত করা। সে সাথে জনগণকে মুসলিমদের মুজাহিদ রূপে বেড়ে উঠতে সাহায্য করা। তাছাড়া যুক্তি হলো, মহান আল্লাহতায়ালার নিজ মালিকানাধীন ভূমিতে কাফের তথা অবাধ্য-বিদ্রোহীদের দখলদারী থাকবে অথচ মু’মিনদের পক্ষ থেকে সে দখলদারী মুক্তির যুদ্ধ থাকবে না সেটিই বা কীরূপে ভাবা যায়?  মুসলিমের জীবনে এটিই তো প্রকৃত মুক্তযুদ্ধ। মুসলিম ভূমি থেকে যখনই লুপ্ত হয়েছে জিহাদ, তখনই শুরু হয়েছে দ্রুত নীচে নামার পালা। পতনের সে ধারা বস্তুত এখনও অব্যাহত রয়েছে।

 

চুক্তি মহান আল্লাহতায়ালার সাথে

মহান আল্লাহতায়ালার কাছে নবী-রাসূলদেরই পরই ছিদ্দীকীন ও শহীদদের মর্যাদা। হযরত মহম্মদ (সাঃ) এর পর আর কেউ নবীর মর্যাদা পাবেন না। কিন্তু শহীদের মর্যাদা পাবেন অনেকেই। শহীদগণ নিহত হয়েও জীবিতের সন্মান পান। পান বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশের সন্মানিত পুরস্কার। মহান আল্লাহতায়ালা সে মহান শহীদদের বেছে নেয়া হয় জিহাদের ময়দান থেকে; মসজিদ-মাদ্রাসা, জায়নামাজ বা আরাফার মাঠ থেকে নয়। মহান আল্লাহতায়ালার সাথে মু’মিনদের সম্পর্ক যে কত গভীর এবং শহীদ হওয়াটি তাদের জীবনে যে কতটা স্বাভাবিক -সে বিষয়টি আরো সুস্পষ্ট ভাষায় এসেছে পবিত্র কোর’আনে। বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই আল্লাহ মু’মিনদের থেকে কিনে নিয়েছেন তাদের জীবন ও সম্পদ; সেটি এ শর্তে যে বিনিময়ে তারা পাবে জান্নাত। তারা যুদ্ধ করে আল্লাহর রাস্তায়; তারা নিধন করে (ইসলামের শত্রুদের) এবং নিজরাও নিহত হয়। (আল্লাহর পক্ষ থেকে) এ বিষয়ে দৃঢ় ওয়াদা ব্যক্ত হয়েছে তাওরাত, ইঞ্জিল ও কোর’আনে। নিজ প্রতিজ্ঞা পালনে আল্লাহ অপেক্ষা আর কে শ্রেষ্ঠতর? তোমরা (আল্লাহর সাথে) ক্রয়-বিক্রয়ের যে চুক্তি করলে তাতে আনন্দ প্রকাশ করো। এটিই তো মহা সাফল্য। -(সুরা তাওবাহ, আয়াত ১১)।

একটি দেশে কতজন প্রকৃত ঈমানদারের বসবাস -সেটি সেদেশে মসজিদ-মাদ্রাসার সংখ্যা বা নামাজে ও তাবলীগ জামাতের এজতেমায় লোকসমাগম দেখে বুঝা যায় না। সেটি বুঝা যায় জিহাদের ময়দানে লড়াকু মুজাহিদদের সংখ্যা দেখে। বুঝা যায় শরিয়তের প্রতিষ্ঠা দেখে। ইসলামের শত্রুশক্তি তাই দেশে দেশে বিপুল সংখ্যক মসজিদ-মাদ্রাসা বা তাবলীগ জামাতের এজতেমায় বিশাল লোক-জমায়েত দেখে ভয় পায় না। ভয় পায় জিহাদের ময়দানে হাজিরা দেখে। ফলে প্রচারণা শুরু হয় জিহাদের ন্যায় ইসলামের সনাতন ইন্সটিটিউশনের বিরুদ্ধে। জিহাদকে তখন সন্ত্রাস বলা হয়। তখন জিহাদ রুখতে আন্তর্জাতিক কোয়ালিশন গড়ে উঠে পূর্ব ও পশ্চিমের ৬০’য়ের অধীক দেশ নিয়ে –যেমনটি দাবী করে থাকেন মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী জন কেরী। অথচ এতবড় কোয়ালিশন অতীতের দুটি বিশ্বযুদ্ধে কোন বিশ্বশক্তির হামলা রুখতেও গড়ে উঠেনি। জিহাদের মধ্যেই যে ইসলামের শক্তি এবং মুসলিমের বিজয় ও মর্যাদা –সেটি কি এরপরও বুঝতে বাঁকি থাকে? জিহাদের মধ্যে থাকে যে মহান আল্লাহতায়ালার অপ্রতিরোধ্য শক্তি -সেটি তারা রুখবে কেমনে? ২৯/০৮/২০১৬

 




হজ্বের গুরুত্ব ও মুসলিমদের ব্যর্থতা

ছবক পূর্ণ আত্মসমর্পণের

এ বিশ্বচরাচরে প্রতিটি মানব সন্তানের সামনে পথ মাত্র দুটি -যার একটিকে বেছে নেয়া ছাড়া সামনে কোন তৃতীয় বিকল্প পথ নেই। মানব জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাটি স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে হয় না, বরং সেটি হয় এ দুটি পথের মাঝে সঠিক পথটি বেছে নেয়ার ক্ষেত্রে। এখানে ফেল করলে জীবনের অন্যান্য অঙ্গণে হাজারো সফলতাতেও কোন লাভ হয় না; বরং অনন্ত-অসীম কালের জন্য ভয়ানক আযাবে পড়তে হয়। প্রথম পথটি হলো মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিটি হুকুমের প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণের। দ্বিতীয়টি, তাঁর বিরুদ্ধে অবাধ্যতা বা বিদ্রোহের। প্রকৃত সফলতা মেলে পূর্ণ আত্মসমর্পণে; এটিই মানব সৃষ্টিকে স্রষ্টার সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টিতে পরিণত করে। অপর দিকে যেখানেই আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে অবাধ্যতা, সেখানেই আসে পথভ্রষ্টতা ও বিপর্যয় -যা মানুষকে পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট জীবে পরিণত করে এবং পরকালে জাহান্নামে নিয়ে হাজির করে। তখন এ জীবনে বাঁচাটিই অন্তহীন আযাবের কারণ হয়।

ইসলামের মূল লক্ষ্য মূলতঃ সমগ্র মানব জাতির সামনের সাফল্যের সঠিক পথটি দেখানো। এটিই হলো ইসলামের সবচেয়ে বড় অবদান। মহান আল্লাহতায়ালা মানুষকে চাষাবাদ, বিজ্ঞান, ঘরবাড়ি বা রাস্তানির্মাণ শেখাতে নবী-রাসূল পাঠাননি, বরং লক্ষাধিক নবীরাসূল পাঠিয়েছেন জীবনের সঠিক পথটির সন্ধান দিতে। এবং পাঠিয়েছেন স্রষ্টার প্রতি আত্মসমর্পণ কীরূপে -সেটি শিক্ষা দিতে। এ দিক দিয়ে হজ্বের গুরুত্বটি বিশাল ও অনন্য। মহান আল্লাহতায়ালার প্রতি আত্মসমর্পণ কাকে বলে এবং সেটি কীরূপে –সেটি স্রেফ কোন কিতাবী বিষয় না। বরং তা চোখে আঙুল দিয়ে শিখিয়েছেন মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ তিন ব্যক্তি।  তাঁরা হলেন হযরত ইব্রাহীম (আঃ), বিবি হাজেরা ও হযরত ইসমাইল (আঃ)। আলোচ্য নিবন্ধে তাঁদের আত্মসমর্পণের কিছু বিবরণ পেশ করা হবে। মহান আল্লাহতায়ালার প্রতি আত্মসমর্পণে তারা যে রেকর্ড গড়েছিলেন –সেটিকে স্রেফ ইতিহাসের পাতায় না রেখে সে স্মৃতি হৃদয়ে ধারণ করে হজ্ব করাকে ইসলাম ইবাদতে পরিণত করেছেন। হজ্বের মঞ্চে মূল চরিত্র মূলতঃ তারাই। মহান আল্লাহতায়ালার প্রতি আত্মসমর্পণে তাদের অর্জনটি বিশাল। বিশ্বের নানা কোনের নানা শহর ও নানা গ্রামগঞ্জ থেকে লক্ষ লক্ষ ব্যস্ত মানুষকে মক্কার মরুপ্রান্তরে নিয়ে হজ্ব যেমন জীবনের মূল এজেন্ডা নিয়ে গভীর ভাবনার সুযোগ করে দেয়, তেমনি তাদের ধ্যানমগ্ন চেতনার ভূমিতে মানব ইতিহাসের উপরুক্ত তিন বিখ্যাত ব্যক্তিকে অনুকরণীয় মডেল রূপে খাড়া করে। প্রশ্ন হলো, মহান আল্লাহতায়ালার প্রতি আত্মসমর্পণের এরূপ মডেল এবং তাদের আদর্শে লোকগড়ার এরূপ সৃষ্টিশীল আয়োজন কি আর কোন ধর্মে আছে?

 

গুরুত্ব দর্শনের

কোন অনুষ্ঠানই শুধু ধর্মীয় হওয়ার কারণে শ্রেষ্ঠতর হয় না। সে সব অনুষ্ঠানে লক্ষ লক্ষ মানুষের জমায়েত হওয়াতেও তা কল্যাণকর বা শ্রেষ্ঠতর হয় না। কল্যাণকর ও শ্রেষ্ঠতর হয় অন্তর্নিহিত দর্শনের কারণে। মানুষ দৈহিক বল পায় পেশীবলের কারণে; কিন্তু চারিত্রিক, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক বলটি আসে দর্শনের বলের কারণে। দর্শন তো তাই যা মানুষের মনকে আলোকিত করে এবং ভাবতে ও বুঝতে শেখায়। ইসলামের অন্যান্য ইবাদতগুলির ন্যায় হজ্বের শ্রেষ্ঠত্ব এখানেই। হজ্বের প্রতি আচারের গভীরে লুকিয়ে আছে বিশাল এক দর্শন -যা মানুষকে তাঁর স্রষ্টার কাছে আত্মসমর্পিত এক দাস হতে শিক্ষা দেয়। সামর্থ্য দেয় সত্যকে মিথ্যা থেকে পৃথক করতে।  কিন্তু অন্যান্য ধর্মে বিস্তর আচার আছে কিন্তু তাতে দর্শন বা মনকে আলোকিত করার বিষয় কতটুকু?  ভারতে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রতিবছর গঙ্গাস্নানে হাজির হয়।পাহাড়-পর্বত অতিক্রম করে বহুমানুষ মন্দিরে যায়। প্রশ্ন হলো, মন আলোকিত হলে কেউ মানুষ মুর্তির পদতলে ভেট দেয়? গরু, শাপশকুন,পাহাড়-পর্বত ও লিঙ্গকে পূজনীয় মনে করে? এটি তো অন্ধকারাচ্ছন্ন মনের কাজ। মনের এ অন্ধকার নিয়ে আরবের লোকেরা এক কালে তাদের কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দিত। হিন্দুরা স্বামীহারা বিধবাদের আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করতো। ক্যাথলিক খৃষ্টানদের বিশ্বাস, শিশুর জন্মই পাপ নিয়ে। তাই বাপ্টিটিজমের নামে শিশুকে গোছল দিয়ে পবিত্র করে। কিন্তু পানিতে কি পাপ দূর হয়? পরিষ্কার হয় কি চেতনা ও চরিত্রের ময়লা? পবিত্র হয় কি মন? বিপ্লব আসে কি আচরনে? চারিত্রিক বিপ্লব তো দেহ ধৌত করায় আসে না। বিচিত্র বেশধারণ বা দেব-দেবী, সাধুসন্নাসী ও ভগবানের নামে নানারূপ রূপকথা, লোককথা বা অলৌলিক কিচ্ছাকাহিনী পাঠেও আসে না।

 

চরিত্র জন্ম নেয় চেতনার ভূমিতে। চেতনার সে ভূমি দুষ্ট চিন্তা ও দর্শনে অধিকৃত হলে চরিত্রে আসে দুর্বৃত্তি ও মিথ্যাচার। স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদ, জাতিয়তাবাদ, বর্ণবাদ, উপনিবেশবাদ ও কম্যুনিজমের ন্যায় ইতর মতবাদের জন্ম তো দুষ্ট দর্শনের কারণে। মানবের কল্যাণে এজন্যই অপরিহার্য হলো এমন এক বিপ্লবী দর্শন যা মানব মনের গভীরে প্রবেশ করে এবং আঘাত হানে চিন্তা-চেতনার মূল ভূমিতে। এবং বিলুপ্ত করে ধর্ম, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের নামে জমে উঠা অশিক্ষা, কুশিক্ষা ও কুসংস্কারের বিশাল আবর্জনাকে। চেতনার ভূমিতে পরিশুদ্ধি ও বিপ্লব এলেই পরিশুদ্ধি ও বিপ্লব আসে চরিত্রে। তখন বিপ্লব আসে রাষ্ট্রজুড়ে। এভাবেই তো উচ্চতর সভ্যতা নির্মিত হয়। ইসলামের আগমনে আরবের আলো-বাতাস, জলবায়ু ও খাদ্যপানীয়ে বিপ্লব আসেনি। বরং বিপ্লব এসেছিল তাদের চেতনার ভূমিতে। এবং সেটি কোরআনী জ্ঞানের আলোকে। ফলে আরবের বুকে গড়ে উঠেছিল মানব ইতিহাসের সর্বকালে সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা। হজ্ব তো সে বিপ্লবী দর্শন ও সৃষ্টিশীল ধ্যানমগ্নতা দেয়।

 

মানব জীবনে সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা বা বিপর্যয়টি খাদ্যাভাবে বা অর্থাভাবে আসে না। ভগ্ন স্বাস্থ্যেও নয়। সেটি আসে সত্যকে খুঁজে না পাওয়া বা সত্য থেকে বিচ্যুতি তথা পথভ্রষ্টতার কারণে। অপর দিকে মানব জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ কল্যানটি আসে সত্যকে খুঁজে পাওয়া, সে সত্যের পূর্ণ অনুসরণ ও বিভ্রান্তু থেকে মুক্তির মধ্য দিয়ে। মানব সভ্যতার সর্বশ্রেষ্ঠ আবিষ্কার তাই বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক আবিস্কার নয়। বরং সেটি হলো জীবন ও জগতের স্রষ্টা নিয়ে সত্যের আবিষ্কার। যারাই সত্যের আবিস্কারে সফল হয় তারাই সাফল্যের সিরাতুল মুস্তাকীম। আর সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাটি হলো সে সত্যকে না চেনা,বা সেটিকে খুঁজে না পাওয়ার ব্যর্থতা। এ ব্যর্থতা জীবনের অন্য সকল সফলতাকে বিফল করে দেয় এবং অবশেষে জাহান্নামের আগুণে হাজির করে। তখন সমাজ এবং রাষ্ট্র ভরে উঠে দুর্বৃত্তদের দিয়ে। দুনিয়ার বুকে তখন জাহান্নামের আযাব নেমে আসে। অপর দিকে সত্য-আবিস্কার ও সত্যের পথে চলার সফলতাটিই এ জীবনের সকল ব্যর্থতা ভূলিয়ে অনন্ত অসীম কালের জন্য জান্নাতপ্রাপ্তির অন্তহীন আনন্দ দেয়। এর চেয়ে বড় বিজয় এ জীবনে আর কি হতে পারে?

 

অনুকরণীয় মডেলঃ কেন অপরিহার্য

ইতিহাসের আরেক সত্য হলো, ব্যক্তি, সমাজ বা রাষ্ট্রীয় জীবনে বিপ্লবের জন্য শুধু বিপ্লবী দর্শনই জরুরী নয়, অপরিহার্য হলো এমন কিছু বিপ্লবী মহানায়ক যারা শুধু কথা দিয়ে নয়, নিজেদের কর্ম, চরিত্র ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েও মানুষকে পথ দেখায়। যাদের কর্ম ও চরিত্রের মধ্য দিয়ে তাদের সত্য-সুন্দর দর্শনটি কথা বলে। তখন তাদের সে দর্শনটি জানতে বই পড়তে হয় না, তাদের কর্মময় জীবনই দর্শনের বই’য়ে পরিণত হয়। এবং তাদের কারণেই অন্যরা অনুকরণীয় আদর্শ ও উন্নত চরিত্র পায়। মানব ইতিহাসের সে আদর্শ মহানায়কগণ হলেন নবী-রাসূলগণ। এবং তাঁরাই অনুকরণীয় মডেল রূপে নিয়োগপ্রাপ্ত মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে। প্রতিটি ব্যক্তির অপরিহার্য দায়িত্ব হলো তাদের প্রদর্শিত পথে চলাকে নিজ জীবনের মিশন বানিয়ে নেয়া। এটিই মু’মিনের ঈমানদারি। ব্যক্তি একমাত্র এভাবেই পায় সিরাতুল মুস্তাকীম। পায় নিজ জীবনে পরিশুদ্ধি ও পবিত্রতা। এবং পরকালে পায় নেয়ামত ভরা জান্নাত। পবিত্র কোরআনে তাই বলা হয়েছেঃ “তিনিই সেই মহান আল্লাহ যিনি উম্মীদের মাঝে তাদের মধ্য থেকেই একজনকে রাসূল নিযুক্ত করেছেন যিনি তাদের সামনে পাঠ করে শোনান তাঁর আয়াত এবং তাদের মধ্যে আনেন পরিশুদ্ধি ও পবিত্রতা, এবং শিক্ষা দেন কিতাব এবং প্রজ্ঞা। এবং এর পূর্বে তারা ছিল সুস্পষ্ট বিভ্রান্তিতে।”–(সুরা জুমু’আ, আয়াত ২)।

 

ব্যক্তি বা রাষ্ট্রীয় বিপ্লবে এমন আদর্শনীয় ব্যক্তিদের গুরুত্ব অপরিসীম। যে ব্যক্তি জীবনে নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত ও জিহাদের নির্দেশ শুনেছে কিন্তু কোনদিনই কাউকে সেগুলি পালন করতে দেখেনি, সে কী করে সেগুলি পালন করবে? তাই মানব জাতিকে পথ দেখাতে মহান আল্লাহতায়ালা শুধু আসমানি কিতাবই নাযিল করেননি, বরং সমাজের মধ্য থেকে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিকে রাসূল রূপে নিযুক্ত করেছেন। তাই ইসলাম শুধু মহান আল্লাহতায়ালার উপর বিশ্বাসকেই অপরিহার্য করে না,বরং অপরিহার্য করে নবীরাসূলদের বিশ্বাস করা ও তাদেরকে মেনে চলাকেও। পবিত্র কোরআনে তাই “আতিউল্লাহ”র সাথে “আতিউর রাসূল” ফরজ করা হয়েছে। ঈমানদার ব্যক্তি নামায-রোযা, হজ-যাকাত, জিহাদসহ ইবাদত পালনের হুকুম পায় পবিত্র কোরআন থেকে; কিন্তু সেগুলি কিভাবে পালন করতে হয় সেটি বাস্তবে দেখিয়ে গেছেন মহান নবীজী (সাঃ)। ইবাদতের নামে এর বাইরে নিজেদের মনগড়া কোন নিয়ম চালু করা এজন্যই ইসলামে হারাম।

 

হযরত ইব্রাহিম (আঃ): শ্রেষ্ঠ মডেল

সমগ্র মানব-ইতিহাসে বিশ্বজগতের স্রষ্টা এবং মানব জীবনের মূল এজেন্ডা আবিস্কারে সবচেয়ে সফল ও শিক্ষণীয় দৃষ্টান্তটি রেখেছেন হযরত ইব্রাহিম (আঃ)। হজ্বের মঞ্চে তিনিই প্রধান চরিত্র। তাঁর মূল কৃতিত্বটি হলো, ঘরসংসার, পানাহার, রুটিরুজী বা পেশাদারীর সন্ধানে তিনি হারিয়ে যাননি। বরং তাঁর জীবনে প্রবল তাড়নাটি ছিল এ বিশ্বজগতের প্রকৃত স্রষ্টা ও এ জীবনের মূল এজেন্ডাকে জানার। তাঁর সে প্রচেষ্ঠা ব্যর্থ হয়নি। তিনি যেমন মহান আল্লাহতায়ালাকে এ বিশ্বজগত ও সকল সৃষ্টিকূলের লা-শরিক স্রষ্টা রূপে সনাক্ত করেন, তেমনি তাঁর প্রতিটি হুকুমের প্রতি আত্মসমর্পণকে মানব জীবনের মূল এজেন্ডা রূপে নির্ধারণ করেন। মহান আল্লাহতায়ালাতে পুরাপুরি আত্মসমর্পিত সে ব্যক্তিকে ‘মুসলিম’ রূপে অভিহিত করাটিও তাঁর নিজের আবিস্কার। এভাবে তিনি দেখিয়েছেন মানব জীবনের প্রায়োরিটি। ঘর বাধা, সন্তান পালন ও পানাহারের প্রচেষ্ঠা তো পশুপাখির জীবনেও থাকে। মানবের মানবতা ও শ্রেষ্ঠত্ব তো সত্যকে গ্রহণ এবং মিথ্যাকে বর্জন করে বাঁচায়। এটিই ছিল হযরত ইব্রাহিম (আঃ)’য়ের জীবনের মূল মিশন। সত্যের আবিস্কারে তাঁর সে অবিরাম ভাবনা মহান আল্লাহতায়ালাকে এতটাই খুশি করেছিল যে সে ভাবনাকে অমর করতে এবং সমগ্র মানব জাতির জন্য তাঁকে অনুকরণীয় আদর্শ করতে তিনি পবিত্র কোরআনে তা লিপিবদ্ধ করেছেন। এই একটি মাত্র কারণেই তিনি সমগ্র মানব ইতিহাসে অতি শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি হওয়ার যোগ্যতা রাখেন।

 

হযরত ইব্রাহিম (আঃ)’য়ের জন্ম কোন পয়গম্বরের ঘরে হয়নি। বরং জন্ম হয়েছিল এক পৌত্তলিক পিতার ঘরে। মুর্তিপুজা ও মুর্তিনির্মাণই ছিল তার পেশা। সে সাথে ছিল নমরুদের দুর্বৃত্ত শাসন। সত্যের অনুসন্ধান এবং সত্যের পথে  চলা সে পরিবেশে অতি দণ্ডণীয়  অপরাধ গণ্য হতো। কিন্তু  সে দুষ্ট পরিবেশে জন্ম নিয়েও পৌত্তলিকতার স্রোতে তিনি ভেসে যাননি। বরং সত্যের আবিস্কারে তিনি নিজের সকল প্রতিভা ও সামর্থ্যকে নিয়োজিত করেছিলেন। বস্তুতঃ তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্যটি হলো, চলমান মিথ্যার স্রোতে ভেসে না যাওয়া। যখন তিনি এ বিশ্বজগতের স্রষ্টা মহান আল্লাহতায়ালাকে খুঁজে পেলেন তখন তিনি সে সত্যকে নিয়ে নীরবে বসে থাকেননি। বরং শুরু হয় জীবনের প্রতি পদে তাঁর হুকুম মেনে চলায় প্রচন্ড আপোষহীনতা। মহান আল্লাহতায়ালার পথে চলায় জীবন দানও তাঁর কাছে অতি তুচ্ছ বলে মনে হয়েছিল। নমরুদের বাহিনী যখন জ্বলন্ত আগুনে ফেলে তাঁকে পুড়িয়ে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল তখনও মানব ইতিহাসের এ মহান ব্যক্তিটি সত্য থেকে সামান্যতম বিচ্যুত হননি। এমন কি নিজের একমাত্র শিশুপুত্র ইসমাঈলের কোরবানীর হুকুম এলো তখনও সে হুকুম পালনে তিনি সামান্যতম ইতস্ততঃ করেননি।?

 

শত্রুর মোকাবেলায় হযরত ইব্রাহিম (আঃ)এর অধীনে নিজের কোন সেনাদল বা ক্যাডারবাহিনী ছিল না। ভক্তদের বিশাল কোন দলও ছিল না। তিনি ছিলেন একা। অথচ একাকী হয়েও তিনি যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন স্বৈরশাসক নমরুদ, নমরুদের আজ্ঞাবহ সেনাবাহিনী ও তার অনুসারি পৌত্তলিক সমাজ ও জনগণের বিরুদ্ধে। ঈমানদারদের থেকে মহান আল্লাহতায়ালার তো সেটিই প্রত্যাশা। লোকবলের অপেক্ষায় বসে থাকাটি ঈমানদারি নয়। পবিত্র কোরআনে নবীজী (সাঃ)র প্রতি সে নির্দেশটি এসেছে এভাবেঃ “বলুন (হে মুহাম্মদ), তোমাদের প্রতি আমার একটি মাত্র নসিহত, (সেটি হলো) খাড়া হয়ে যাও আল্লাহর জন্য, সঙ্গি পেলে তাকে নিয়ে নতুবা একাকীই।” –(সুরা সাবা, আয়াত ৪৬)। মহান আল্লাহতায়ালার উপর হযরত ইব্রাহিম (আঃ)’য়ের বিশ্বাস যে কতটা অটল ছিল এবং তাঁর দ্বীন অনুসরণে তিনি যে কতটা নির্ভীক ও আপোষহীন ছিলেন –সে সাক্ষ্যটি এসেছে খোদ মহান আল্লাহতায়ালা থেকে। নিজের সে সাক্ষ্যকে তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন পবিত্র কোরআন। বিশ্বের তাবত সত্যান্বেষী মানুষের জন্য এ মহান যোদ্ধাকেই তিনি আদর্শরূপে খাড়া করেছেন। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহতায়ালার সে পবিত্র ঘোষণাটি হলোঃ “তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ রয়েছে ইব্রাহিম ও তার সঙ্গিদের মাঝে” –(সুরা মুমতিহানা আয়াত ৪)। কিন্তু কেন তিনি উত্তম আদর্শ সে কারণটি তুলে ধরা হয়েছে উপরুক্ত আয়াতেরই বাঁকি অংশে। নিজের পরিবার ও দেশবাসীর উদ্দেশ্যে হযরত ইব্রাহিম (আঃ)’য়ের সে অবিস্মরণীয় ঘোষণাটি ছিল এরূপঃ “আমি নিজেকে মুক্ত ঘোষণা করছি তোমাদের থেকে এবং আল্লাহকে বাদ দিয়ে তোমরা যা কিছুর ইবাদত করো তা থেকে। আমার বিদ্রোহ তোমাদের বিরুদ্ধে। শুরু হলো, তোমাদের সাথে আমার অবিরাম যুদ্ধ ও শত্রুতা যতক্ষণ না তোমরা আল্লাহর একাত্ব অস্তিত্বকে মেনে না নিচ্ছো”।

 

মহান আল্লাহতায়ালা মানব ইতিহাসের এ সত্যসন্ধানী, সাহসী, জিহাদী ও আল্লাহর পথে অবিচল এ মহান ব্যক্তিকে সম্মানিত করেছেন শুধু মানবজাতির জন্য আদর্শ রূপে ঘোষণা দিয়ে নয়, বরং তাঁকে নিজের বন্ধু রূপে গ্রহন করার মধ্য দিয়েও। প্রশংসা করেছেন তাদেরও যারা তাঁর সে মহান আদর্শকে অনুসরণ করে। তাই পবিত্র কোরআনের ঘোষণাঃ “তাঁর অপেক্ষা দ্বীন পালনে কে উত্তম যে সৎকর্মপরায়ণ হয়ে আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করে এবং একনিষ্ঠ ভাবে ইব্রাহীমের ধর্মাদর্শ অনুসরণ করে? এবং আল্লাহ ইব্রাহিমকে নিজের বন্ধু রূপে গ্রহণ করেছেন।”-(সুরা নিসা, আয়াত ১২৫)। সত্যের অন্বেষণ ও অনুসরণে প্রবল সদ্বিচ্ছা ও লাগাতর প্রচেষ্টা থাকলে আল্লাহর সাহায্য লাভও ঘটে। তখন সফলতাও জুটে। হযরত ইব্রাহিম (আঃ)এর জীবনের সেটিও আরেক শিক্ষা। মানুষ তো পুরস্কার পায় তার ইচ্ছা ও প্রচেষ্টা কারণে। হযরত ইব্রাহিম (আঃ মহান আল্লাহতায়ালার বন্ধু হওয়ার সৌভাগ্য পেয়েছেন তো সে মহান নিয়েত ও প্রচেষ্টার বলেই।

 

হযরত ইব্রাহিমকে মহান আল্লাহতায়ালা ভূষিত করেছেন মুসলিম মিল্লাতের আদি পিতা রূপে। অথচ মানব ইতিহাসে প্রতিভাধর ব্যক্তির সংখ্যা কি কম? তাদের হাতে আবিষ্কারের সংখ্যাও কি কম? কোরআন নাযিলের শত শত বছর আগেও এসব প্রতিভাধরদের হাতে মিশরের পিরামিড, চীনের প্রাচীর ও ব্যাবিলনের ঝুলন্ত বাগিচা নির্মিত হয়েছে। ইতিহাসে সেগুলো বিস্ময়কর আবিস্কার রূপে স্বীকৃতিও পেয়েছে। কিন্তু মানব-প্রতিভার সে বিনিয়োগ নিয়ে মহান আল্লাহতায়ালা খুশি হননি,কারণ সে প্রতিভাবান মানুষেরা ব্যর্থ হয়েছে সত্যকে খুঁজে পাওয়ার ন্যায় অতি মৌলিক কাজে। আজও  কি এরূপ প্রতিভাধারিদের ব্যর্থতা কম? বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারে তারা নবেল প্রাইজ পেলেও সত্যকে খুঁজে পাওয়ার ক্ষেত্রে তারা আদিম বর্বর যুগের মানুষের ন্যায়ই মুর্খ। তাদের সে মুর্খতা কি হাজার হাজার বছর আাগের উলঙ্গ গুহাবাসীর চেয়ে কম? ফলে তাদের জীবনে বেড়েছে সত্য-চ্যুতি ও বিভ্রান্তি। অসভ্য গুহাবাসীর ন্যায় তাদের জীবনেও এসেছে তাই আদীম অজ্ঞতা ও পাপাচার। সনাতন মিথ্যা তো আজও  বেঁচে আছে মিথ্যার পক্ষে এসব প্রতিভাধারিদের অস্ত্র ধরার কারণে।এসব প্রতিভাবান আবিষ্কারকদের দুস্কৃতির কারণেই বিগত দুটি বিশ্বযুদ্ধে প্রাণ দিতে হয়েছে সাড়ে সাত কোটি মানুষকে। তারা আজও  হত্যা পাগল ইরাক, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, কাশ্মিরসহ বিশ্বের নানা প্রান্তরে। আজও তাদের হাতে লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ যাচ্ছে। হাজার হাজার নারীকে তাই আজও ধর্ষিতা হতে হচ্ছে। মানব সভ্যতার সবচেয়ে বড় বড় ক্ষতিগুলো হয়েছে সত্য আবিষ্কারে ব্যর্থতা ও ভ্রান্ত পথে মেধার বিপুল বিনিয়োগের ফলে। তাই সত্য আবিস্কারে হযরত ইব্রাহীমের নানা প্রচেষ্টার কথা পবিত্র কোরআনে বার বার বর্নিত হলেও এসব প্রতিভাধর বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারকদের নিয়ে এক ছত্র উল্লেখও নাই। মহান আল্লাহতায়ালা জাহান্নামের জ্বলন্ত আগুনে শুধু চোর-ডাকাত,খুনি,ব্যাভিচারি ও সন্ত্রাসীদেরই নিক্ষেপ করবেন না,নিক্ষেপ করবেন সত্য আবিস্কারে ও সত্যের অনুসরণে যারা বিফল তাদেরও। মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর প্রিয় বন্ধু এবং মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সত্য-আবিষ্কারক হযরত ইব্রাহিম (আঃ)কে সমগ্র হজ্ব অনুষ্ঠানের মধ্যমঞ্চে রেখে বিশ্ববাসীকে বহু কিছুই শেখাতে চান।সে মূল শিক্ষাটি হলো,সত্যের আবিস্কার ও সত্যের আপোষহীন অনুসরণে আমৃত্যু লেগে থাকার। সেটি সত্যের শত্রুর বিরুদ্ধে লাগাতর লড়াইয়ের। সে সাথে মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিটি হুকুমের কাছে আজীবন আত্মসমর্পণের। সেটিই হযরত ইব্রাহিম (আঃ)র পবিত্র সূন্নত। হজ্বের এখানেই অনন্যতা। কারণ, হজ্বে পালিত হয়, হযরত ইব্রাহিম (আঃ)’য়ের সূন্নত। হজ্ব এজন্যই মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্মীয় অনুষ্ঠান।

 

 

মহড়া বিশ্বজনীন মুসলিম ভাতৃত্বের

ঈমানের প্রকাশ শুধু নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত ও দান-খয়রাতে ঘটে না। সেটির প্রবল প্রকাশ ঘটে বিশ্বজনীন মুসলিম ভাতৃত্বের মধ্য  দিয়ে। তাই ইসলামের গৌরব যুগে বিলুপ্ত হয়েছিল ভাষা, বর্ণ, গোত্র ও ভৌগলিক ভিন্নতার ভিত্তিতে গড়ে উঠা বিভক্তির দেয়াল। মুসলিম ভূগোলে বিভক্তির দেয়াল বস্তুত ইসলাম থেকে দূরে সরার আলামত। মুসলিমগণ যখনই ইসলাম থেকে দূরে সরা শুরু করেছে তখনই ঐক্যের বদলে গড়ে উঠেছে অনৈক্য। প্রতিবছর মুসলিম জীবনে হজ্ব আসে ইসলামের বিশ্বজনীন ভাতৃত্বের ছবক নিয়ে। এবং সুস্পষ্ট ভাবে জানিয়ে দেয়, ভাষা, বর্ণ, গোত্র ও ভৌগলিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বিভক্ত মানচিত্র নিয়ে বাঁচাতে মহান আল্লাহতায়ালার কাছে কোন পুরস্কার নাই। বরং সেরূপ বিভক্তির জন্য অনিবার্য প্রাপ্তিটি হলো কঠিন আযাব। সে হুশিয়ারিটি এসেছে এভাবে, “এবং তোমরা কখনোই তাদের মত হয়োনা যারা (আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে) সুস্পষ্ট বিধান আসার পরও বিভক্ত হলো; এবং তাদের জন্য রয়েছে বিশাল আযাব।” –(সুরা আল-ইমরান, আয়াত ১০৫)।

 

উপরুক্ত আয়াতের উপর যার বিশ্বাস আছে সে কি ভাবতে পারে, মুসলিম দেশে বিভক্তি আসবে অথচ আযাব আসবে না? তাছাড়া প্রশ্ন হলো, মুসলিম বিশ্বের ৫৭টি রাষ্টে বিভক্ত মানচিত্রটি উম্মহর জীবনে কোন গৌরবটি বাড়িয়েছে? এ বিভক্তির ফলে মুসলিম ভূমিতে শত্রুর অধিকৃতি, রাজনৈতিক গোলামী, নির্যাতন, গণহত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, ঘর-বাড়ী থেকে উচ্ছেদ এবং ধ্বংসের তাণ্ডবই কি শুধু বাড়েনি? এগুলিকে কি আল্লাহর রহমত বলা যায়? অথচ আজকের মুসলিমদের প্রতিদিনের বসত তো এ আযাবগুলি নিয়েই। এবং যতদিন ত বিভক্ত থাকবে ততদিন এ আযাব ও অপমান থেকে যে মুক্তি নাই তা নিয়ে কি কোন সন্দেহ আছে?  অথচ মুসলিমদের মাঝে নানা বর্ণ, নানা ভাষা, নানা গোত্র ও নানা রূপ ভৌগলিক ভিন্নতা ইসলামের গৌরবযুগেও ছিল। কিন্তু তা নিয়ে মুসলিম উম্মাহর মাঝে বিভক্তির রাষ্ট্রীয় দেয়াল গড়া হয়নি। মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিশ্রুত আযাব থেকে বাঁচতে প্রতিটি মুসলিমের উপর ফরজ হলো দেয়াল ভাঙ্গার কাজে নিজ নিজ মেধা ও সামর্থ্যের বিনিয়োগ, দেয়াল গড়ার কাজে নয়। তাই ঈমানদারের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো, প্যান-ইসলামিক ভাতৃত্বের বন্ধনে একতা গড়া। সে ছবকটি দিতেই মহান আল্লাহতায়ালা হজ্বের দিনগুলিতে মক্কার বুকে নানা বর্ণ, নানা গোত্র ও নানা ভাষার মানুষকে পৃথিবীর নানা প্রান্তর থেকে একই মঞ্চে হাজির করেন। হজ্বের এটি এক অনন্য শ্রেষ্ঠত্ব। হজ্বের মঞ্চে পৃথিবীর সবচেয়ে কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তিটি যেমন জমা হয়, তেমনি তার পাশেই খাড়া হয় সবচেয়ে শেতাঙ্গ ব্যক্তিটিও। এভাবেই প্রকাশ ঘটে প্যান-ইসলামিক মুসলিম ভাতৃত্বের। পৃথিবীর নানা দেশ থেকে হজ্ব করতে এসে যখন লক্ষ লক্ষ মানুষকে হৃদয় কাঁপানো “লাব্বায়েক” (আমি হাজির) বলতে শোনে এবং ক্বাবাকে ঘিরে তাওয়াফ করতে দেখে -তখন তাঁর ঈমান আরো গভীরতর হয়। এবং দৃঢ়তর হয় তাঁর আত্মবিশ্বাস। তখন বুঝতে পারে, মহান আল্লাহতায়ালার খলিফা রূপে সে একা নয়, সাথে রয়েছে বহুদেশের বহুবর্ণের কোটি কোটি মানুষ। এরূপ অনুভুতি কি বিভক্ত ও বিচ্ছিন্ন মানুষের জীবনে আসে?

 

একতার মধ্যেই বিস্ফোরণ ঘটে শক্তির, বিভক্তিতে নয়। একতা যে ইসলামে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, হজ্ব হলো তারই নিদর্শন। হজ্বের একই মঞ্চে জমা হয় নানা দেশের শিয়া-সূন্নী,হানাফী-শাফেয়ী,হাম্বলী-মালেকী,দেউবন্দী-বেরেলভীগণ। তাদের মাঝে ফেকাহগত বিরোধ থাকলেও হজ্ব নিয়ে কোন বিরোধ নাই। সুযোগ নেই, হজ্বের দিন-ক্ষণ নিয়ে বিরোধের। কারণ, সেগুলী বেঁধে দিয়েছেন খোদ মহান আল্লাহতায়ালা। এমন মহামিলন ও এমন আচার কি আর কোন ধর্মে আছে? বাঙালী হিন্দুর দুর্গা পুজায় কি কোন বিহারী,গুজরাতী,মারাঠি বা পাঞ্জাবী হিন্দু যোগ দেয়? আবাঙালী হিন্দুর দেউয়ালীতেই বা ক’জন বাঙালী যোগ দেয়? তেমনি কাথলিক খৃষ্টানদের কোন অনুষ্ঠানে কি ইউরোপীয় প্রটেষ্টান্ট,মিশরীয় কপটিক,গ্রীক অর্থোডক্স বা আর্মেনিয়ান খৃষ্টানগণ নজরে পড়ে? খৃষ্টান ধর্মে কি এরূপ কোন অনুষ্ঠান আছে যেখানে ইউরোপীয় খৃষ্টানদের সাথে আফ্রিকান বা ভারতীয় খৃষ্টানদের যোগ দেয়াটি ফরজ?

 

অন্য ধর্মের ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলি তো এভাবে বেঁচে আছে ভিন্ন ভিন্ন ভাষা,বর্ণ ও ভূগোলের পরিচয় নিয়ে। হিন্দু ধর্ম,বৌদ্ধ ধর্ম,শিখ ও জৈন ধর্মের ন্যায় বহু ধর্মের ভিত্তিটা এতটাই বর্ণ ও আঞ্চলিকতায় আচ্ছন্ন যে এসব ধর্মের অনুসারিদের মাঝে আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ ও ইউরোপ-আমেরিকার শ্বেতাঙ্গদের খুঁজে পাওয়া কঠিন। এভাবে এ ধর্মগুলি কাজ করেছে মানব সমাজে বিভক্তি, সংঘাত ও অকল্যাণ বাড়াতে। অথচ হজ্ব শেখায় বিশ্বজনীন ভাতৃত্ব। শেখায়, নানা ভাষা, বর্ণ ও রাষ্ট্রের নামে গড়া বিভক্তির প্রাচীর ভাঙ্গতে।একতা গড়ার মিশনটি জোরদার করতেই হজ্ব পৃথিবীর সকল দেশ ও সকল ভাষার মুসলমানদের একই সময়ে,একই সাথে একই মঞ্চে হাজির করে। আল্লাহর বিধান যে কতটা নিখুঁত ও কল্যাণধর্মী -এ হলো তারই নমুনা। অন্য ধর্মের অনুষ্ঠানগুলির ন্যায় হজ্ব নিছক ধর্মীয় আচার নয়। পাদ্রী ও পুরোহিতের মন্ত্র পাঠে তা শেষ হয় না। এ অনুষ্ঠানে তাই কোন পুরোহিত নাই, কোন ইমামও নাই। বহু শ্রম, বহু অর্থ ব্যয়ে নিজের হজ্ব নিজেকেই পালন করতে হয়। হজ্ব দেয় মহান আল্লাহতায়ালার পথে আত্মত্যাগ ও কষ্টস্বীকারের শিক্ষা। শুরুটি হয় দীর্ঘ দিন যাত্রাপথের শারিরীক ক্লেষ ও বিপুল অংকের অর্থব্যয় দিয়ে। এভাবে হজ্ব গড়ে শুধু সম্পদ-ব্যয়ের অভ্যাসই নয়, শারিরীক কসরতেরও।

 

হজ্ব ও মুসলিম উম্মাহর ব্যর্থতা

যে পাঁচটি খুঁটির উপর ইসলামের ভিত্তি, তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ খুঁটি হলো হজ্ব। তাই হজ্বকে বাদ দিয়ে ইসলামের পূর্ণ ইমারত নির্মাণ করা যায় না। এবং ইসলামের এ বিশাল ইমারতটি ধ্বসিয়ে দেয়ার জন্য প্রয়োজন নেই পাঁচটি খুঁটির সবগুলি ধ্বংসের, যে কোন এই একটি খুঁটির বিনাশই সে জন্য যথেষ্ট? প্রশ্ন হলো, হজ্ব যে মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ অনুষ্ঠান -সে চেতনাটি ক’জন মুসলিমের? মহান আল্লাহতায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ এ আয়োজন থেকে শিক্ষা হাসিলের আয়োজনই বা কতটুকু? হজ্ব পালিত হয় জিলহজ্ব মাসের ৮ তারিখ থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত লাগাতর নানা পর্ব দিয়ে। হজ্বের সাথে আসে ঈদুল আযহা। হজ্ব পর্বটি মক্কা শরীফে পালিত হলেও ঈদুল আযহা পালিত হয় সমগ্র বিশ্বজুড়ে। হজ্বের শিক্ষাটিই বিশ্বময় ছড়িয়ে দেয় এই ঈদুল আযহা। কিন্তু কি সে শিক্ষা? কি এর দর্শন? ঈদুল আযহা কি শুধু পশু কোরবানী? ছোট্ট একটি সামাজিক অনুষ্ঠানেরও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকে। হজ্বের লক্ষ্য কি স্রেফ হজ্ব পালন? বহু অর্থ ও বহু শ্রম ব্যয়ে বিশ্বের নানা দেশ থেকে প্রায় তিরিশ লাখ মানুষ কেন মক্কায় হাজির হয়? সামর্থ্যবানদের উপর কেন এটি ফরজ? ক্বাবাকে ঘিরে কেন ৭ বার তাওয়াফ? কেন মিনায় তিন দিন অবস্থান? আরাফাতে কেন মহাজমায়েত? মোজদালেফায় খোলা অকাশের নিচে কেন শয়ন? শয়তানের স্তম্ভে কেন তিন দিন ধরে পাথর নিক্ষেপ? কেন সাফওয়া ও মারওয়ার মাঝে নারী-পুরুষ,যুবক-বৃদ্ধার দৌড়াদৌড়ি? সেটিও একবার নয়,সাতবার!কেন লক্ষ লক্ষ পশু কোরবানী? এগুলি কি নিছক আচার? এগুলির পিছনে গুরুত্বপূর্ণ কোন দর্শন ও উদ্দেশ্য থাকলে সেটিই বা কি? যে ইবাদতে এত অর্থব্যয়, শ্রমব্যয় ও সময়ব্যয় তা থেকে মুসলিম উম্মাহই বা কতটুকু লাভবান হচ্ছে? প্রতিবছর হাজী হয়ে ফিরছে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ,তাতেই বা তাদের কি কল্যাণ হচ্ছে? বিষয়গুলি অতিশয় ভাবনার। কিন্তু মুসলমানদের মাঝে সে ভাবনা কই? হজ্বের প্রতিপর্বের প্রতিটি অনুষ্ঠানের মূল পরিকল্পনাকারি যে মহান আল্লাহতায়ালা সে হুশ বা ক’জনের?

 

ব্যক্তির উপর অর্পিত দায়ভারটি যখন গুরুত্বপূর্ণ হয় তখন তাকে ময়দান নামতে হয় পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে। বস্তুতঃ প্রশিক্ষণ হয় দায়িত্বের গুরুত্ব অনুসারে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গের জন্য এ কারণেই চলে লাগাতর ট্রেনিংয়ের কার্যক্রম। এদিক দিয়ে একজন ঈমানদারের উপর অর্পিত দায়িত্বটি তো গুরুতর। সে দায়িত্বটি কোন রাজা বা শাসক বা কোন কোম্পানীর বেতনভোগী কর্মচারি হওয়া নিয়ে নয়। বরং সেটি খোদ মহান আল্লাহতায়ালার খলিফা তথা ভাইসরয় রূপে দায়িত্ব পালনের। সুনির্দিষ্ট সে দায়ভারটি হলো মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর আইনের শাসনের প্রতিষ্ঠা। মজুরীটি এখানে লাখ বা কোটি টাকার নয়; বরং নেয়ামত ভরা জান্নাতের। ফলে এরূপ বিশাল দায়িত্বপ্রাপ্ত  খলিফাদের ট্রিনিংয়ের আয়োজনটি যে বিশাল ও নিবীড় হবে -সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? পবিত্র কোরআনের গভীর জ্ঞানার্জন, প্রতিদিনের ৫ ওয়াক্ত নামায, মাসভর মাহে রামাদানের রোযা, হজ্ব, যাকাত ও লাগাতর জিহাদ তো সে প্রশিক্ষণেরই প্যাকেজ। প্রতিটি ঈমানদারের উপর ফরজ হলো এ প্রশিক্ষণে নিয়মিত অংশ নেয়া। প্রশিক্ষণ দেয় আধ্যাত্মীকতা, দেয় আল্লাহতায়ালার খলিফা রূপে দায়িত্ব পালনের সামর্থ্য। দেয় সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি রূপে বেড়ে উঠার যোগ্যতা।

 

মহান আল্লাহতায়ালা চান, প্রতিটি ঈমানদার নারী ও পুরুষ সে প্রশিক্ষন নিয়ে বেড়ে উঠুক। কারণ, একমাত্র সে ভাবে বেড়ে উঠার মধ্যেই মু’মিন ব্যক্তির সফলতা। তখন সে সফল হয় পৃথিবী পৃষ্ঠে খেলাফতের দায়িত্বপালনে। যার মধ্যে সে প্রশিক্ষণ গ্রহণে আগ্রহ নাই, বুঝতে হবে তাঁর মাঝে আল্লাহতায়ালার খলিফা রূপে দায়িত্ব পালনেও কোন আগ্রহ নাই। এমন ব্যক্তি পরকালে কি পুরস্কার পেতে পারে? আল্লাহপাক তো মু’মিনের জীবনে তাঁর খলিফা রূপে দায়িত্ব পালনের সফলতাটিই দেখতে চান। মু’মিন জান্নাত পাবে খেলাফতের দায়িত্ব পালতে সফল হওয়ার বিনিময়ে। যার মধ্যে সে প্রশিক্ষণ নাই, বুঝতে হবে তার মধ্যে আল্লাহর খলিফা রূপে দায়িত্বপালনের সামর্থ্যও নাই।

 

প্রশিক্ষণের অঙ্গণে হজ্বের অবদানটি অপরীসীম। প্রশিক্ষণের এটি এক অতি নিবীড় ও গভীর কার্যক্রম। হজ্বের প্রতিটি বিধান বেঁধে দেয়া হয়েছে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে। উচ্চমানের কোন প্রাসাদ গড়তে আর্কিটেক্টের আঁকা নকশা লাগে, তেমনি উচ্চ চরিত্র গড়তে কাঙ্খিত চরিত্রের মডেল লাগে। হজ্বের মঞ্চে শ্রেষ্ঠ চরিত্র ও অনুপ্রেরণার সে মডেল রূপে খাড়া হয় হযরত ইব্রাহিম (আঃ)কে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, তাঁর  চরিত্রের মধ্যে আছে বিশেষ শিক্ষণীয় দিক। সমগ্র অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয় সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহর পরিকল্পনা ও নির্দেশনায়,তাই বিশ্বের সর্ববৃহৎ এ জমায়েতের পরিকল্পনা ও পরিচালনা নিয়ে কোন বিরোধ নাই। ফলে হজ্বের সাথে অন্যধর্মের কোন অনুষ্ঠানের কি তুলনা হয়? সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যার মধ্যে হজ্ব নাই, বুঝতে হবে আল্লাহর খলিফা রূপে দায়িত্ব পালনে তার মধ্যে কোন আগ্রহ নেই। অথচ সে আগ্রহটি মুসলিম হওয়ার জন্য অতিজরুরী। আল্লাহর রাসূল (সা) বলেছেন, “সামর্থ্য থাকা সত্বেও হজ্ব না করে যার মৃত্যু হলো সে খৃষ্টানরূপে না ইহুদীরূপে মারা গেল তা নিয়ে তাঁর কিছু  যায় আসে না।” অর্থাং তার জন্য নবীজী (সাঃ)সুপারিশ করতে রাজি নন। বোখারী শরীফের হাদীসে বর্নীত হয়েছে, নবীজী (সাঃ) হযরত আয়েশাকে বলেছেন,হজ্বই তাঁর জন্য জিহাদ।

 

 

হজ্ব কেন শ্রেষ্ঠ ইবাদত?

ইসলামে প্রতিটি ইবাদতই অতি গুরুত্বপূর্ণ। মুসলিম রূপে বাঁচতে হয় এ ইবাদতগুলি নিয়েই। তবে সেগুলির মাঝে কোনটি শ্রেষ্ঠ ইবাদত তা নিয়ে অনেকেরই প্রশ্ন। সে প্রশ্ন জেগেছিল ইমাম হযরত আবু হানিফার (রহ) মনেও। হজ্ব সমাপনের পর তিনি বলেছেন, হজ্বই শ্রেষ্ঠ ইবাদত। হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলভী (রহ) বলেছেন,যাদের মনে আল্লাহতায়ালার প্রতি প্রবল ভালোবাসা,তারা তৃপ্তি পেতে পারেন হজ্বে গিয়ে। কিন্তু তবুও প্রশ্ন থেকে যায়,হজ্ব কেন শ্রেষ্ঠতম ইবাদত? কেনই বা এটি আল্লাহতায়ালার আশেকদের আত্মতৃপ্তি লাভের মাধ্যম? ইসলামে ইবাদত মূলতঃ দৈহিক, আর্থিক ও আত্মীক। একমাত্র হজ্বেই ঘটে সবগুলোর সমন্বয়। হজ্বের শ্রেষ্ঠত্ব এখানেই। কালেমায়ে শাহাদত উচ্চারনে দৈহিক কসরত নেই। তাতে অর্থব্যয়ও নেই। এতে পাহাড়-পর্ব্বত,বিজন মরুভুমি, নদনদী বা সমুদ্র-মহাসমুদ্র অতিক্রমেরও প্রয়োজন পড়ে না। তেমনি হজ্বের যে দৈহিক কসরত ও অর্থ ব্যয় -সেটি জায়নামাজে দাঁড়িয়ে নামায আদায়ে নেই। এতো কষ্টস্বীকার, অর্থব্যয় ও সময়ব্যয় রোজাতেও হয় না। যাকাতে অর্থব্যয় হলেও তাতে হজ্বের ন্যায় অর্থব্যয় নেই। শ্রমব্যয় এবং সময়ব্যয়ও নেই। বস্তুতঃ হজ্বের মধ্যে রয়েছে ইবাদতের সমগ্রতা তথা পূর্ণ প্যাকেজ। এ যুগে বিমানযোগে হজ্বের যে সুযোগ সেটি নিতান্তই সাম্প্রতিক। বিগত চৌদ্দ শত বছরের প্রায় সমগ্রভাগ জুড়ে মুসলমানরা হজ্ব করেছে পায়ে হেঁটে বা উঠ,ঘোড়া ও গাধার মত যানবাহনে চড়ে। তখন দৈহিক ক্লান্তির ভারে হজ্বে গিয়ে অনেকেই আর নিজ ঘরে ফিরে আসতেন না,পাড়ী জমাতেন পরপারে। তাই সে আমলে শেষ বিদায় নিয়ে দূর-দেশের লোকেরা মক্কার পথে বেরুতেন। হজ্ব পালনে যে প্রচন্ড শারিরীক কসরত তার মূল্যয়াণ করতে হবে সে আঙ্গিকেই।

 

তাছাড়া হজ্বের শ্রেষ্ঠতর হওয়ার আরেকটি কারণ, এখানে আছে আরাফা’র সমাবেশ। প্রতিশ্রুতি রয়েছে সেখানে দাঁড়িয়ে দোয়া করলে দোয়া কবুলের। প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে অতীতের সকল পাপমোচনের। বলা হয়েছে, শিশু যেমন নিষ্পাপ জন্মগ্রহণ করে, পবিত্র হজ্ব পালেনর পর তেমনি নিষ্পাপ হয় হাজী। এরূপ প্রতিশ্রুতি কি নামায, রোযা ও যাকাতের ন্যায় ইবাদতে আছে? সেগুলিতে আছে কি আরাফা? আছে কি অতীত পাপমোচনের অঙ্গিকার। যারা হজ্বে যায় তাদেরকে বলা হয়, মহান আল্লাহতায়ালার মেহমান। এ এক বিশাল মর্যাদা। মানব জীবনে এর চেয়ে বড় মর্যাদা এর চেয়ে বড় অর্জন আর কি ভাবা যায়? এ জগতে যারা তাঁর মেহমান হওয়ার গৌরব অর্জন করে আখেরাতেও যে তাঁর মেহমান হবে -সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? সে মর্যাদা কি অন্য কোন ইবাদতে হাছিল হয়? প্রশ্ন হলো, মহান আল্লাহতায়ালার মেহমান হওয়ার মর্যাদা যারা পেল তাঁরা ফিরবে পাপের বোঝা মাথায় নিয়ে ঘরে -তা কি ভাবা যায়? কোন মুসলিম ইয়াওমুল আরাফার দিনে সে ময়দানে দাঁড়িয়ে মোনাজাতে হাত তুললে মহান আল্লাহতায়ালা দোয়া কবুল না করে তাঁর হাত ফিরিয়ে দেন না, তিনি তাঁর দোয়া কবুল করেন। প্রতি মহান আল্লাহতায়ালা দোয়া কবুলের সে প্রতিশ্রুতি কোন মুনাফিককে দেননি। মুনাফিক তো তারাই যারা হ্জ্ব করে, উদাত্ত কণ্ঠে লাব্বায়েকও বলে, কোরবানিও দেয়, কিন্তু তারা বাঁচে মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমগুলির বিরুদ্ধে প্রচণ্ড বিদ্রোহ নিয়ে। দোয়া কবুলের শর্ত হলো, হজ্বটি হতে  হবে প্রকৃত মুসলিমের হজ্ব। মুসলমি তো সেই যে মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমে লাব্বায়েক বলে। দোয়া কবুলের ব্যাপারে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে ঘোষিত শর্তটি হলো, যে ব্যক্তি তাঁর ইচ্ছা পূরণ করেন, তিনিও তার ইচ্ছা পূরণ করেন। পবিত্র কোরআনে সে ঘোষণাটি এসেছে এভাবে, “আমার বান্দা যখন আমার সম্পর্কে আপনাকে জিজ্ঞাসা করে, (তাঁকে বলুন) নিশ্চয়ই আমি তাঁর অতি নিকটে। (তাঁকে আরো বলুন) আমাকে যে ডাকে আমি তাঁর ডাকে জওয়াব দেই। তবে (এটিও জানিয়ে দিন) তাদেরকেও অবশ্যই আমার ডাকে সাড়া দিতে  হবে এবং অবশ্য আমার উপর ঈমান আনতে হবে। সম্ভবতঃ এতে তাঁরা সঠিক পথের নির্দেশনা পাবে।” –সুরা বাকারা, আয়াত ১৮৬)।

 

এক্ষেত্রে মুসলিমদের ব্যর্থতা কি কম? নিজেদের ইচ্ছা পূরণে মহান আল্লাহতায়ালার কাছে তাদের মোনাজাতের ফিরিস্তি তো দীর্ঘ, কিন্তু মহান রাব্বুল আ’লামীনের ইচ্ছা পূরণে তাদের আগ্রহ ও উদ্যোগ সামান্যই। বরং মুসলিম ভূমিতে যা প্রবল ও লাগাতর তা হলো মহান আল্লাহতায়ালার ইচ্ছার বিরুদ্ধে অবাধ্যতা ও বিদ্রোহ। তিনি চান, মুসলিম উম্মাহর একতা, আর মুসলিমগণ বেছে নিয়েছে বিভক্তির পথ। ৫৭টি রাষ্ট্রে বিভক্ত মুসলিম উম্মাহর মানচিত্র এবং ২২ রাষ্ট্রে বিভক্ত আরব ভূমি তো সে বিদ্রোহেরই প্রতীক।  আরো বিভক্তি নিয়ে অধীকাংশের মাঝে কোন দুঃখবোধও নাই। বরং সে দেয়ালে ঘেরা বিভক্তিকে স্বাধীনতা বলা হয় এবং তা নিয়ে উৎসব করা হয়। মহান আল্লাহতায়ালা চান তাঁর নাযিলকৃত শরিয়ত ও হুদুদের আইন প্রতিষ্ঠা পাক। কিন্তু মুসলিমগণ সেটিও মানতে রাজী নয়। বরং তারা আদালতে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে বৃটিশ বা ফরাসীদের দেয়া কুফরি আইন। প্রশ্ন হলো, মহান আল্লাহতায়ালার ইচ্ছার বিরুদ্ধে এরূপ বিদ্রোহ নিয়ে মুসলিমগণ বার বার হজ্ব করলেও কি সে হজ্ব কবুল হয়?  শবে ক্বদরের রাতে এমন বিদ্রোহী ব্যক্তি সারা রাত জেগে দোয়া করলেও কি সে দোয়া কবুল হয়?

 

ইসলামের আরেক গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো হিজরত। মহান আল্লাহতায়ালার খলিফা রূপে গড়ে তোলার এটি এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণ। মুসলিমের যেখানে পূর্ণ আত্মসমর্পণের প্রশ্ন, সেখানে আপোষ চলে না। মহান আল্লাহতায়ালার প্রতি আত্মসমর্পণকে পূর্ণতর করতেই মুসলিম জীবনে আসে হিজরত। হিজরত এখানে নিজ ঘর, নিজ পরিবার, নিজ ব্যবসা-বাণিজ্য ও নিজ সহায়-সম্পদ পরিত্যাগ করে একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালার রাস্তায় বেরিয়ে পড়ার। নবীজী (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরাম মক্কায় তাঁদের ঘরবাড়ি, সহায়-সম্পদ ছেড়ে নিঃস্ব হাতে মদিনায় গিয়ে ঘর বেঁধেছিলেন। হযরত ইব্রাহিম (আঃ) তাঁর জন্মভূমি ছেড়ে ফিলিস্তিন, মিশর ও হিজাজের পথে পথে হাজার হাজার মাইল ঘুরেছেন। হিজরত করেছেন হযরত ইউসুফ (আঃ), হযরত ইয়াকুব (আঃ)ও হযরত মূসা (আঃ)এর ন্যায় আরো বহু নবী-রাসূল। নিজ দেশ, নিজ ঘর, নিজ ব্যবসা-বাণিজ্য ও পরিবার-পরিজনের বাঁধনে যে স্থবির জীবন, সে স্থবিরতা ছিন্ন করে হজ্ব গড়ে হিজরতের অভ্যাস। ব্যক্তিকে তার আপন ঘর থেকে বাইরে নিয়ে আসে। এভাবে ব্যক্তির জীবনে আনে গতিময়তা। উচ্চচতর জীবনবোধ ও সভ্যতার নির্মাণে জরুরী হলো এ গতিময়তা। ইতিহাসের সবগুলো উচ্চতর সভ্যতাই তাই মহাজিরদের সৃষ্টি।

 

জ্ঞানার্জন ইসলামে ফরয। বলা হয়ে থাকে,‘সফর নিছফুল ইলম”। এর অর্থঃ জ্ঞানের অর্ধেকটাই অর্জিত হয় ভ্রমন থেকে। ঈমানদারের জ্ঞানে সমৃদ্ধি আনতে হজ্বের অবদানটি তাই বিশাল। কারণ, হজ্বে রওনা দেয়ার সাথে সাথে যেমন সফর শুরু হয়, তেমনি জ্ঞানার্জনও শুরু হয়। সফরে রওনা দিলে শুধু চোখই খুলে না, মনের জানালাগুলিও খুলে যায়। আর নানা জনপদের নানা মানুষ ও নানারূপ পরিবেশ দেখলে মনের অঙ্গণে বইতে শুরু করে গভীর চিন্তার ঝড়। এভাবে হজ্ব সুযোগ সৃষ্টি করে অন্যদের দেখার এবং তাদের থেকে শেখার। দীর্ঘ যাত্রা পথে হজ্ব দেয় নানা দেশের নানা জনপদের বিচিত্র মানুষ ও বিচিত্র ভূ-প্রকৃতি নিয়ে চিন্তাভাবনা ও ধ্যানমগ্নতার সুযোগ। সকাল থেকে সন্ধ্যা, সন্ধ্যা থেকে সকাল -এরূপ বৃত্তাকারে ঘূর্ণায়নমান যে ব্যস্ত জীবন, সে জীবনে উচ্চতর লক্ষ্য ও মহত্তর কর্ম নিয়ে ভাববার অবসর কোথায়? অথচ জীবনের নানা বিষয় নিয়ে গভীর উপলদ্ধি ও সঠিক মূল্যায়নে চিন্তাভাবনার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।

 

নবীজীর হাদীসঃ “আফজালুল ইবাদাহ তাফাক্কুহ”। অর্থঃ শ্রেষ্ঠ ইবাদত হলো চিন্তাভাবনা করা। ইবাদতে মনযোগ ও ওজন বাড়ে তো চিন্তাভাবনার সংমিশ্রনে। মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে গুরুত্ব পায় তো ইবাদতের ওজন, সংখ্যা নয়। চিন্তাশূণ্য মানব ভাবনাশূণ্য গাধায় পরিণত হয়। চিন্তাভাবনার গুরুত্ব বোঝাতে মহাজ্ঞানী আল্লাহতায়ালা এ জন্যই পবিত্র কোরআনে বহু আয়াত নাজিল করেছেন। চেতনার ভূবনে সাড়া জাগাতে প্রশ্ন তুলেছেন, “আফালা তাফাক্কারুন”, “আফালা তাদাব্বারুন”, “আফালা তাক্বীলুন”। অর্থঃ অতঃপর তোমরা কেন চিন্তা ভাবনা করোনা? কেন ধ্যানমগ্ন হও না? কেন বুদ্ধি-বিবেককে কাজে লাগাও না? কোরআন থেকে জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রেও চাই একাগ্র ধ্যানমগ্নতা। “ফিকর” তথা চিন্তার সাথে চাই যিকর তথা স্মরণ। তাই পবিত্র কোরআনে বার বার প্রশ্ন তোলা হয়েছে, “হিদায়েত ও (আল্লাহর প্রতি) দায়বদ্ধতার বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্যই আমি কোরআনকে  নিশ্চয়ই সহজ করে নাযিল করেছি। কেউ কি আছে তা থেকে শিক্ষা নেয়ার?” -( সুরা আল-কামার, আয়াত ১৭,২২,৩২,৪০। মোজাদ্দিদ শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভি এবং বাংলার হাজী শরিয়াতুল্লাহ, দুদু মিয়া ও তিতুমীরের মত মহান ব্যক্তিবর্গ তাদের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছবক ও জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনাটি পেয়েছেন হজ্বে গিয়ে। হজ্বে গিয়েই ইরানের বিপ্লবী লেখক ড.আলী শরিয়তি এবং বিখ্যাত মার্কিন নওমুসলিম ম্যালকম এক্স-য়ের ন্যায় শত শত ব্যক্তি তাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাঠটি পেয়েছিলেন। হজ্ব শেষে তারা নিজ দেশে ফিরেছিলেন আমুত্যু মোজাহিদ রূপে। হজ্বে গিয়ে পেয়েছিলেন আল্লাহর খলিফা রূপে সুগভীর দায়বদ্ধতার প্রেরণা। পেয়েছিলেন এক মহৎ প্রশিক্ষণ। অথচ ভাবনাশূণ্য মানুষগুলো হজ্ব থেকে ফিরে স্রেফ হাজির খেতাব নিয়ে। এটি কি তাদের কম ব্যর্থতা?

 

লক্ষ্যঃ সামর্থ্য সৃষ্টি আমৃত্যু লাব্বায়েক বলায়

হজ্বের লক্ষ্য এ নয়, ঈমানদার ব্যক্তি স্রেফ হজ্বের কয়েকটি দিন মহান আল্লাহতায়ার ঘর ক্বাবার তাওয়াফে লাব্বায়েক বলবে এবং বাঁকি সময়ে লাব্বায়েক বলবে নিজের নাফসের খায়েশ মেটাতে অথবা জাতিয়তাবাদী,বর্ণবাদী, ফ্যাসিবাদী, পূজিবাদী, স্বৈরাচারি ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির নানা রূপ হুকুম পালনে। মহান আল্লাহতায়ালার উপস্থিতি, হুকুমত ও সার্বভৌমত্ব তো সমগ্র বিশ্বজুড়ে। ফলে তাঁর ডাকে লাব্বায়েক বলার জজবা শুধু তাঁর ঘর ক্বাবার তাওয়াফে সীমিত থাকবে কেন? এটি কি ঈমানদারি? বরং প্রকৃত মু’মিন তো সেই যে মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমে লাব্বায়েক বলবে সমাজ ও রাজনীতি প্রতি অঙ্গণে এবং জীবন যুদ্ধের প্রতি প্রান্তে। ঈমানের প্রমান তো এরূপ লাব্বায়েক বলাতে। দেহ যেমন ফুসফুসের উঠানামা ও হৃৎপিণ্ডের কম্পন নিয়ে বাঁচে থাকে তেমনি মু’মিনের ঈমান বাঁচে মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমে লাগাতর লাব্বায়েক বলা নিয়ে। সে সামর্থ্য না থাকার অর্থ ঈমান না থাকা। তবে সে সামর্থ্য এমনিতেই সৃষ্টি হয় না। সে সামর্থ্য সৃষ্টিতে মূল উপাদানটি হলো পবিত্র কোরআনের গভীর জ্ঞান। অক্সিজেন ছাড়া যেমন দেহ বাঁচে না, তেমনি কোরআনের জ্ঞান ছাড়া ঈমানও বাঁচে না। অন্য ধর্ম থেকে এখানেই ইসলামের পার্থক্য। অন্যধর্মে জ্ঞানার্জন বাধ্যতামূলক নয়। কিন্তু ইসলামে জ্ঞানার্জন শুধু বাধ্যতামূলক তথা ফরজই নয়, বরং অজ্ঞ থাকাটি কবিরা গুনাহ।

 

ঈমান বাঁচাতে ও ঈমানকে শক্তিশালী করতে মহান আল্লাহতায়ালার পবিত্র স্ট্রাটেজীটিও অতি লক্ষ্যণীয়।  নবীজীর উপর নবুয়তের দায়ভার দেয়ার সাথে সাথে তিনি নামায-রোযা, হজ-যাকাতের হুকুম দেননি। বরং হুকুম দিয়েছেন ইকরা’র তথা কোরআন পড়ার। এভাবে ফরজ করেছেন পবিত্র কোরআনের জ্ঞানলাভকে। সুরা মুজাম্মিল সর্বপ্রথম নাযিলকৃত সুরাগুলির একটি। এ সুরায় নবীজী (সাঃ)কে ৫ ওয়াক্ত নামাযের হুকুম  দেয়া হয়নি। বরং হুকুম দেয়া হয়েছে রাতের অর্ধেক বা এক-তৃতীয়াংশ বা তার চেয়ে কিছু বেশী বা কম সময় আস্তে আস্তে পবিত্র থেকে কোরআন থেকে তেলাওয়াত করে কাটাতে। একই নির্দেশ ছিল সাহাবাদের প্রতিও। কোরআনের জ্ঞান তো এভাবেই সাহাবায়ে কেরামদের মনে বদ্ধমূল হয়েছিল। খাওয়ার অর্থ খাদ্যকে গেলা। গেলার কাজটি না হলে তাকে খাওয়া হয়না। তেমনি কোন বই পড়ার অর্থ তার অর্থ উদ্ধার করা। অর্থ উদ্ধার না হলে তাকে পড়া বলাটি বেওকুপি। এমন কি শিশুও সেটি বুঝে; তাই কোন কিছু স্রেফ পড়ার খাতিরে সে পড়ে না। বুঝার সামর্থ্য না থাকলে কোন শিশুই কোন বই স্পর্শ করে না। প্রাথমিক যুগের মুসলিমগণ মহান আল্লাহতায়ালার সে পবিত্র স্ট্রাটেজীটি বুঝতে ভূল করেনি। ফলে স্রেফ পবিত্র কোরআনের অর্থ বুঝার খাতিরে মিশর, ইরাক, সিরিয়া, মরক্কো, সুদান, আলজিরিয়া, লিবিয়ার, মালি, মৌরতানিয়ার ন্যায় প্রায় ২০টি দেশের জনগণ -যাদের মাতৃভাষা আরবী ছিল না, মাতৃভাষাকে দাফন করে কোরআনের ভাষাকে নিজেদের  ভাষা রূপে গ্রহণ করেছিল। এরফলে মহান আল্লাহতায়ার পক্ষ থেকে প্রেরীত পয়গামটি বুঝতে কোন ধর্মগুরুর প্রয়োজন পড়েনি। একজন সাধারণ মুসলিমের পক্ষেও তখন সম্ভব হয়েছিল জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ যে পাঠটি সরাসরি বুঝা ও তাঁর সাথে একাত্ম হওয়া। মানব জাতির ভাষার ইতিহাসে সেটিই ছিল সবচেয়ে বিপ্লবী সিদ্ধান্ত।  তাতে সম্ভব হয়েছিল বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী শক্তি রূপে মুসলিম উম্মাহর উত্থান। এবং সম্ভব মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার নির্মাণ।

 

অথচ মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে আজকের মুসলিমদের বিদ্রোহটি কোন গোপন বিষয় নয়। চাকরি-বাকরি ও আয়-উপার্জন বাড়াতে দুনিয়ার যে কোন কাফেরদের ভাষা শিখতে জীবনের দশটি বা পনেরটি বছর কাটিয়ে দিতে তাতে রাজি, কিন্তু আগ্রহ নাই কোরআনের ভাষা শেখায়। মুসলিম দেশের শিক্ষা বাজেট ও সিলেবাসের বিশাল ভাগ ব্যয় হয় বিদেশী ভাষা বুঝা ও সে ভাষায় কথা বলার সামর্থ্য বাড়াতে। অপর দিকে কোরআনের ভাষা শিক্ষাকে গুরুত্ব না দিয়ে না বুঝে কোরআন তেলাওয়াতকে সওয়াবের কাজ গণ্য হয়। অথচ মহান আল্লাহতায়ার সবচেয়ে বড় এ নিয়ামতটি না বুঝে পড়ার মধ্যে কল্যাণই বা কি? কল্যাণ না হলে সওয়াবই বা কেন হবে? মহান আল্লাহতায়ার হুকুম তো কোরআন থেকে পথ-নির্দেশনা ও হুশিয়ারি নেয়ার। না বুঝলে সেটি সম্ভব কি করে? সমগ্র বিশ্ব মাঝে কি এমন কোন জাতি আছে যারা না বুঝে কোন বই পড়ে? এক্ষেত্রে মুসলিমরাই শুধু ব্যতিক্রম যারা না বুঝে কোন বই পড়ে। এমন বিদ্রোহ, এমন বেওকুপি কি মহান আল্লাহতায়ালা থেকে কোন ছওয়াব বা পুরস্কার আনতে পারে? বিদ্রোহ বা অবাধ্যতা তো শাস্তি আনে, সওয়াব নয়।  ফলে যে ঈমান সামর্থ্য দেয় মহান আল্লাহতায়ার প্রতি হুকুমে লাব্বায়েক বলার, সে ঈমানের মৃত্যু ঘটেছে বহু আগেই। ফলে মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব, তাঁর শরিয়তি আইন, হুদুদ, খেলাফত ও মুসলিম  উম্মাহর একতা বিলুপ্ত হয়েছে খোদ মুসলিম সংখ্যগরিষ্ঠ দেশগুলোতে। মহান আল্লাহতায়ার হুকুমের সাথে গাদ্দারিটি এরূপ পর্যায়ে পৌছেছে যে, যারা নিজেদেরকে আলেম, মুফতি, ফকিহ, ইমাম রূপে জাহির করে তারা লাব্বায়েক বলছে ইসলাম বিরোধী স্বৈরাচারী শাসকদের ডাকে।

 

দেয় ধ্যানমগ্নতা এবং জন্ম দেয় বিপ্লবের

পবিত্র কোরআনের জ্ঞানার্জনের সাথে অপরিহার্য হলো, নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাতের ন্যায় ইবাদতগুলোতে গভীর ধ্যান-মগ্নতা। চাই, আল্লাহতায়ালার পথে চলার প্রগাঢ় অঙ্গিকার ও তীব্র গতিময়তা। যাদের জীবনে মহান আল্লাহতায়ালার ইচ্ছাপূরণে প্রগাঢ় অঙ্গিকার ও গতিময়তা নাই, তাদের পক্ষে অসম্ভব হয় সিরাতুল মোস্তাকিমে চলা। তাদের জীবনে তখন ভর করে নিজের ঘরে, পীরের খানকায় বা কর্মস্থলে ডুবে থাকার প্রচণ্ড স্থবিরতা। অপরদিকে ভাবনা-শূন্যতাই মানুষকে ঈমানশূন্য করে। এমন ভাবনাশূণ্য ব্যক্তিগণই সকাল থেকে সন্ধ্যা, সন্ধ্যা থেকে সকাল এক আমৃত্যু চক্রে বন্দী। এ বন্দীদশাতেই অবশেষে তারা একদিন মৃত্যুর মধ্য দিয়ে হারিয়ে যায়। অসংখ্য উদ্ভিদ ও কীটপতঙ্গের ন্যয় এভাবেই অতীতের গর্ভে হারিয়ে গেছে হাজার হাজার কোটি মানুষ। হজ্বে মহান আল্লাহতায়ালা জীবনের সকল জড়তা ছেড়ে তাঁর ঘরে জমায়েত হওয়ার ডাক দেন। মিনা,আরাফাত ও উম্মুক্ত আকাশের নীচে মোযদাফিফায় অবস্থানকে বাধ্যতামূলক করে তার জীবনে ধ্যানমগ্ন হওয়ার সুযোগ করে দেন।

 

হিদায়েত দেয়ার মালিক একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালা। এটিই তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ দান। যে হিদায়েত পেল সেই জান্নাত পেল। তবে সে বিশাল দানই এমনিতেই জুটে না। ব্যক্তির দায়িত্ব হলো, সে দান-প্রাপ্তির জন্য নিজেকে যোগ্যবান রূপে গড়ে তোলে। হজ্ব মূলতঃ সে যোগ্যতা অর্জনে সাহায্য করে। সেজন্য উপযোগী পরিবেশও সৃষ্টি করে। বহু কষ্টে, বহু অর্থ ব্যয়ে এবং বহু হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে যে ব্যক্তি তাঁরই ঘরে গিয়ে লাব্বায়েক তথা ‘আমি হাজির’ বলে তাঁর সাথে মহান আল্লাহতায়ালার যে সংযোগ ঘটে –সেটি কি আর কোন ইবাদতে সম্ভব? এ দিক দিয়ে হজ্ব তুলনাহীন। এরূপ সংযোগের ফলে মহান আল্লাহতায়ালা তাঁকে যেমন পথ দেখান তেমনি তাঁর চেতনার গভীরে জীবনের মূল মিশনটি বদ্ধমূল করে দেন। তাঁরই ফযিলতের বরকতে মু’মিনের চেতনায় তখন ঈমানের প্লাবন শুরু হয়। এমন ব্যক্তির জীবনে লাব্বায়েক বলাটি হজ্ব শেষ হওয়াতেও শেষ হয় না। বরং সেটি আমৃত্যু চলে। জীবনের প্রতি মুহুর্তে, পথচলার প্রতিপদে এবং রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তির  প্রতি রণাঙ্গণে মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিটি হুকুমে সে লাব্বায়েক বলে। ইসলামের শত্রুশক্তির রণহুংকার শুনে এমন ব্যক্তি আত্মগোপন বা আত্মসমর্পণ করে না। ববং বীরদর্পে লাব্বায়েক বলতে সে রণাঙ্গণে হাজির হয়। এবং তাঁরই বাস্তব চিত্র দেখা গেছে সাহাবায়ে কেরামের জীবনে।

 

মহান আল্লাহতায়ালার ডাকে লাব্বায়েক বলার বিপরীতটি হলো তাঁর হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। সে বিদ্রোহ ব্যক্তিকে নিরেট পথভ্রষ্টতা দেয় এবং পরিণামে জাহান্নামে পৌঁছায়। হজ্ব এবং ইবাদতের অন্যান্য বিধানগুলি যেমন লাব্বায়েক বলার সামর্থ্য বাড়ায়, তেমনি বিদ্রোহ বাড়াতে পৃথিবীর প্রতি প্রাঙ্গণে রয়েছে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান। সেগুলি কাজ করে শিক্ষা-সংস্কৃতি, ধর্ম, প্রশাসন, রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তির নামে। এগুলির কারণে এমন কি খোদ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলিতে বেড়েছে ইসলামের ফরজ বিধানগুলির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। ফলে মহান আল্লাহতায়ালার কোরআনী বিধানগুলি স্রেফ কোরআনেই রয়ে গেছে। মুসলিমদের সংখ্যা যখন কয়েক লাখের বেশী ছিল না, ইসলামের পরাজয় তখনও এমনটি হয়নি। প্রশ্ন হলো, সমগ্র মুসলিম জাহান জুড়ে যেখানে আল্লাহর অবাধ্যতা, আল্লাহর সার্বভৌমত্ব যেখানে ভূলুন্ঠিত এবং রাজনীতি, পোষাক-পরিচ্ছদ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি যেখানে পরিণত হয়েছে আল্লাহর বিরুদ্ধে অবাধ্যতার প্রতীক -সেখানে ক্বাবার চার পাশে কেবল লাব্বায়ক উচ্চারনের মূল্য কতটুকু? মহান আল্লাহতায়ালা কি বান্দাদের এমন ফাঁকা বুলিতে খুশি হন? লাব্বায়েক শুধু হজ্বে নয়, সেটি বলা উচিত ছিল আল্লাহতায়ালার প্রতিটি হুকুমের জবাবে এবং তাঁর শত্রুদের নির্মূলে।

 

আত্মসমর্পণ ও ঈমানদারি

ঈমান লুকিয়ে থাকার বিষয় নয়। আগুনের প্রকাশ যেমন উত্তাপে, ঈমানের প্রকাশ তেমনি মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমে ‘লাব্বায়েক’ বলায়। লাব্বায়েক বলার সে সামর্থ্যটি না থাকায় সন্দেহ থাকে ঈমানদারিতে। নিজেকে মুসলিম রূপে দাবী করলেই অন্তরে ঈমানে প্রবেশ করে না। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহতায়ালা বলেন, “বেদুইনরা বলে, “আমরা ঈমান এনেছি।” (হে নবী) তাদেরকে বলুন: “তোমরা এখনো ঈমান অর্জন করতে পারনি।” বরং তোমরা বলো, “আমরা আত্মসমর্পণ করেছি তথা মুসলিম হয়েছি। এখনো তোমাদের হৃদয়ে যথার্থ ঈমান প্রবেশ করেনি। যদি তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কথা পালন করো (অর্থাৎ আল্লাহর হুকুমে লাব্বায়েক বলো), তাহলে তিনি তোমাদের সামান্যতম নেক কর্মও বিনষ্ট হতে দিবেন না; কেননা আল্লাহ অতি ক্ষমাময় ও মেহেরবান।” -(সুরা হুজরাত, আয়াত ১৪)।

 

মহান আল্লাহতায়ালায় আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে মুসলিম জীবনের শুরু। আত্মসমর্পণের অর্থ আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের বিলুপ্তি। আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে ব্যক্তির মনে বিপ্লবের শুরু মাত্র, কিন্তু তাতে পূর্ণতা মেলে না। বরং আত্মসমর্পিত ব্যক্তিটির মাঝে মহান আল্লাহতায়ালার ডাকে লাব্বায়েক বলার সামর্থ্য সৃষ্টি নাও হতে  পারে। সে সামর্থ্য অর্জনে তাকে বহুদূর এগিয়ে যেতে হয়। সে এগিয়ে যাওয়ার মধ্যেই বস্তুতঃ ঈমানদারী। এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যেই কাজ করে নানাবিধ ইবাদতের বিধান। ঈমানদারীর অর্থ স্রেফ আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের বিলুপ্তি নয়, বরং ইসলামের বিজয়ে নিবেদিত প্রাণ সৈনিক হওয়াও। তবে সৈনিক তো তারাই হতে পারে যারা মহান আল্লাহতায়ালার প্রতি ডাকে আমৃত্যু লাব্বায়েক বলে। সারা জীবন নামায-রোযা পালন করেও যদি সে সামর্থ্য সৃষ্টি হয়না, তবে বুঝতে হবে ফাঁকিবাজি আছে ইবাদতে।

 

মু’মিনের জীবনে লাব্বায়েক বলার সামর্থ্য সৃষ্টিতে হজ্বের গুরুত্বটি অপরিসীম। সে লক্ষ্যে হজ্ব মূলতঃ মহান আল্লাহতায়ালার নিজস্ব ইন্সটিটিউশন। এ ইন্সটিটিউশনে যে জ্ঞান লাভ ঘটে তা বিশ্বের অন্য কোন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বা মাদ্রসায় জুটে না। এখানে শিক্ষক স্রেফ হযরত ইব্রাহিম (আঃ) নন, তাঁর সাথে মানব ইতিহাসের আরো দুই মহান ব্যক্তিত্ব। তাঁরা হলেন তাঁর স্ত্রী হযরত হাজেরা ও তাঁর পুত্র হযরত ইসমাইল (আঃ)কে। আল্লাহতায়ালার প্রতি ডাকে লাব্বায়েক বলার ক্ষেত্রে হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর ন্যায় তাঁরাও বিস্ময়কর সামর্থ্য দেখিয়েছেন। ঘরবাড়ী, গাছপালা, খাদ্যপানীয় বিহীন মক্কার মরু প্রান্তরে যখন বিবি হাজেরাকে তাঁর শিশুপুত্র ইসমাইলসহ একাকী বসবাসের হুকুম শোনানো হয়েছিল তখন তিনি শুধু এটুকু জানতে চেয়েছিলেন এ হুকুম আল্লাহতায়ালার কিনা। যখন বলা হয়, হ্যা, এ হুকুম আল্লাহতায়ালার তখন তিনি লাব্বায়েক বলতে বিলম্ব করেননি।

 

মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমে লাব্বায়েক বলায় বালক ইসমাইল সে সামর্থ্য দেখিয়েছেন সেটি সমগ্র মানব-ইতিহাসে অনন্য। মসজিদ-মাদ্রাসায় যারা দীর্ঘ জীবন কাটিয়ে দেন স্রেফ তাদের মাঝেও যদি বালক ইসমাইলের ন্যায় আল্লাহতায়ালার ডাকে লাব্বায়েক বলার সামর্থ সৃষ্টি হতো তবে শুধু মুসলিম বিশ্বে নয়, সমগ্র পৃথিবী জুড়ে ইসলামের বিজয় আসতো। মহান আল্লাহতায়ালার ইচ্ছা পূরণে বালক ইসমাইল যেরূপ স্বতঃস্ফুর্ত লাব্বায়েক বলেছিলেন তাতে প্রকাশ পেয়েছিল তাঁর ঈমানের গভীরতা। মহান আল্লাহতায়ালা তাতে এতটাই খুশি হয়েছিলেন যে তাঁর সে কথাগুলিকে তিনি নিজের পবিত্র কিতাবে লিপবদ্ধ করে রেখেছেন। এভাবে বুঝিয়েছেন, ঈমান বলতে কি বুঝায়। ক্বিয়ামত অবধি যারাই নিজেদেরকে ঈমানদার রূপে দাবী করবে, হযরত ঈসমাইলের সে কথাগুলো তাদের চেতনায় গভীর খোরাক জোগাবে। মহান আল্লাহতায়ালার নিজের লিপিবদ্ধ সে হৃদয়স্পর্শী বিবরণটি হলো এরূপঃ “অতঃপর সে (ইসমাইল) যখন তাঁর পিতার সাথে কাজে অংশ নেয়ার মত বয়সে উপনিত হলো তখন ইব্রাহিম বল্লো, “হে পুত্র! আমি স্বপ্নে দেখেছি, আমি তোমাকে যবেহ করছি। এখন তোমার কি মত, বলো।” সে (ইসমাইল) বল্লো, “হে আমার পিতা! যে বিষয়ে আপনাকে হুকুম দেয়া হয়েছে তা পালন করুন। আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আপনাকে ধৈর্যশীল পাবেন।” –(সুরা সাফফাত, আয়াত ১০২)। হযরত ইসমাইলের স্বতঃস্ফুর্ত লাব্বায়েক ধ্বনিটি ছিল প্রাণদানে নিজের প্রস্তুতির। হজ্ব এবং হ্জ্ব-পরবর্তী কোরবানীর মূল লক্ষ্য তো ঈমানের যেরূপ প্রকাশ হযরত ইসমাইল (আঃ) ঘটিয়েছেন, সেটিকে প্রতিটি মুসলিমের জীবনে জীবন্ত রাখা। মুসলিমগণ অতীতে তখনই ইজ্জত পেয়েছে এবং মানব ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার জন্ম দিতে পেরেছে যখন হযরত ইব্রাহিম (আঃ) ও হযরত ইসমাইল (আঃ)’য়ের ন্যায় তারাও আল্লাহতায়ালার ইচ্ছা পূরণে প্রাণদানে হাজির হয়েছে। অপরদিকে পরাজয়, অপমান এবং দুর্গতির শুরু তো তখন থেকেই যখন আল্লাহতায়ালার প্রতি দায়বদ্ধতা ভূলে ব্যক্তি, গোত্র, বর্ণ, ভাষা ও দলের নামে নিজেদের জান, মাল ও মেধার কোরবানী দিতে শুরু করেছে।

 

কেন ব্যর্থ হচ্ছে হজ্ব?

মুসলিম জীবনে হজ্বের আজকের ইতিহাসটি প্রচণ্ড ব্যর্থতার। ইসলামের এ শ্রেষ্ঠ ইবাদতটি পরিণত হয়েছে স্রেফ আনুষ্ঠিকতায়। লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রতি বছর হাজী হচ্ছে বটে, কিন্তু খুব কম সংখ্যকই আল্লাহতায়ালার সৈনিক হচ্ছে। তারা ব্যর্থ হচ্ছে হজ্বের শিক্ষা নিয়ে বেড়ে উঠতে। অধীকাংশের জীবনে লাব্বায়েক বলা শেষ হচ্ছে হজ্ব শেষ হওয়ার সাথে সাথে। মহান আল্লাহতায়ালার নির্ধারিত এ গুরুত্বপূর্ণ ট্রেনিং কোর্সটি প্রাথমিক যুগের মুসলিমদের যেভাবে হযরত ইব্রাহিম (আঃ) ও হযরত ইসমাইল (আঃ)’য়ের আদর্শের অনুসারি রূপে গড়ে তুলতে পেরেছিল -আজ সেটি হচ্ছে না। পরিতাপের আরো কারণ, গরজ নাই ব্যর্থতার কারণগুলি খুঁজে বের করায়। আঁখকে চিনি বানাতে ব্যর্থ হলে চিনিকলের উপর গবেষণা শুরু হয়। ত্রুটি বের করে তার মেরামতও হয়। কিন্তু হজ্ব যে ব্যর্থ হচ্ছে চরিত্রে পরিশুদ্ধি আনতে -তা নিয়ে অধীকাংশ মুসলিমেরই কোন চিন্তা-নেই।

 

হজ্বের মূল শক্তিটি তার দর্শনে। হযরত ইব্রাহিম (আঃ) ও হযরত ইসমাইল (আঃ)’য়ের আদর্শে ব্যক্তির রূপান্তরটি নিতান্তই আত্মীক। আত্মার ভূবনে বিপ্লব ঘটানোর সে কাজটি করে ওহীর জ্ঞান-ভিত্তিক দর্শন। এখানে দর্শনের সাথে ঘটে ব্যক্তির আত্মার একাত্মতা। ব্যক্তির জীবনে মূল্যসংযোজনের এ এক বিস্ময়কর প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই মানুষ মহামানবে পরিণত হয়। এরূপ আত্মীক বিপ্লব থেকেই জন্ম নেয় চারিত্রকি বিপ্লব। মুসলিমের জীবনে সে বিপ্লবী দর্শনটি জোগায় পবিত্র কোরআন। যার মধ্যে কোরআনের জ্ঞান বা দর্শন নাই, হজ্ব তাঁর জীবনে স্রেফ অনুষ্ঠানই থেকে যায়। বার বার হজ্ব করেও এমন ব্যক্তি ইসলামের ডাকে লাব্বায়েক বলে না। বরং লাব্বায়েক বলে কাফেরের ডাকে। এরূপ নিষ্প্রাণ হজ্ব ও ওমরা ইসলাম-পূর্ব জাহিলিয়াত যুগেও ছিল।  ক্বাবাকে ঘিরে সে যুগের আরবগণও বার বার তাওয়াফ করতো। কিন্তু তাতে তাদের চরিত্রে সামান্যই পরিবর্তন আসতো। বরং যেসব পাপের ক্ষেত্রগুলো থেকে উঠে তারা আসতো, হজ্ব শেষে আবার সে একই পাপাচারে ফিরে যেত।

 

ইসলামের মিশন এবং মহান আল্লাহতায়ালার ভিশন নিয়ে ধারণাটি যথার্থ না হলে হজ্বের গুরুত্ব সঠিক ভাবে বুঝে উঠা তখনই অসম্ভব। মহান আল্লাহতায়ালার ভিশন হলো, তিনি পৃথিবীতে সকল ধর্মের উপর তাঁর দ্বীনের বিজয় দেখতে  চান। পবিত্র কোরআনে সে ভিশনটি কয়েকবার ঘোষণা হয়েছে এভাবেঃ “লিইউয’হিরাহু আলা দ্বীনি কুল্লিহি”; (অর্থঃ যেন সমগ্র ধর্ম উপর তার দ্বীন বিজয়ী হবে)। তিনি চান, প্রতিটি ঈমানদারকে জান্নাতে নিতে। জান্নাতে পৌঁছার সে কাজটি সহজ করতে সে যাত্রাপথের একটি নির্ভূল রোডম্যাপও পেশ করেছেন। সে রোডম্যাপটি  হলো পবিত্র কোরআন। এটিই হলো বহুঘোষিত সিরাতুল মুস্তাকীম। মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে মানব জাতির জন্য এটিই হলো সর্বশ্রেষ্ঠ দান। জান্নাতের পৌঁছার এছাড়া দ্বিতীয় রাস্তা নেই। সে পথে যাত্রা কোথা থেকে শুরু করতে হবে এবং কোথায় শেষ করতে হবে -সেটি জিবরাইল (আঃ) মারফত নবীজী (সাঃ)কে শিখিয়েছেন খোদ মহান আল্লাহতায়ালা। এবং তাঁকে দায়িত্ব দিয়েছেন, বিশ্ববাসীর সামনে জান্নাতের এ পথকে পরিচিত করার।

 

সিরাতুল মুস্তাকীম বেয়ে চলার কাজটি শুরু হয় মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান আনা ও পবিত্র কোরআনের জ্ঞানার্জন দিয়ে। এ পথে সামনে চলার কাজটি অব্যাহত রাখতে হয় নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত, হিজরত, জিহাদ ও ইসলামি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। এ যাত্রা পথেই আসে শরিয়ত, হুদুদ, একতা ও খেলাফতের প্রতিষ্ঠা এবং আসে ইসলামিক সভ্যতার নির্মাণ। তাই জান্নাতের এ যাত্রাপথে স্রেফ জ্ঞানার্জন, তাবলিগ, নামায-রোযা বা হজ্ব-যাকাতের ন্যায় কোন একটি স্তরে বন্দি থাকার অবকাশ নেই, ঈমানদারকে সামনে চলতে হয় প্রতিটি স্তর অতিক্রম করে। মর্দে মু’মিন তো এভাবেই ইনসানে কামেল তথা পূর্ণ মানুষে পরিণত হয়। রোডম্যাপ কি কখনো স্রেফ তেলাওয়াতের বিষয়? এটি তো পদে পদে অনুসরণের বিষয়। মুসলিমদের অপরাধ এবং সে সাথে ব্যর্থতার কারণ হলো, তারা রোড়ম্যাপকে স্রেফ তেলাওয়াতের বিষয় বানিয়েছে। এরই ফল হলো, মুসলিমগণ আজ বিভক্ত, পরাজিত, অপমানিত ও শত্রুর হাতে অধিকৃত।

 

প্রতি মুসলিমের ঈমানী দায়বদ্ধতা হলো, কোরআনী রোডম্যাপ তথা সিরাতুল মুস্তাকীমকে আমৃত্যু অনুসরণ করা। লম্বা যাত্রাপথের কোন একটি স্টেশনে থেমে গেলে কি গন্তব্যস্থলে পৌঁছা যায়? ইবাদতের কোন একটি স্তরে নিজেকে সীমিত রাখলে তেমনি ব্যাঘাত ঘটে প্রকৃত ঈমানদার রূপে বেড়ে উঠা। এজন্যই মুসলিমের ইবাদত স্রেফ নামায-রোযা-যাকাতে এসে থেমে গেলে চলে না। ইবাদতের অঙ্গণে শরিয়ত প্রতিষ্ঠার জিহাদও থাকতে হয়। নইলে কি সে নিজেকে সত্যিকার মুসলিম রূপে গড়ে তুলতে পারে? মুসলিম হওয়ার অর্থ তো মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিটি হুকুম পালনে আত্মনিয়োগের সামর্থ্য। মানব জীবনের সেটিই শ্রেষ্ঠ সামর্থ্য। একমাত্র এ সামর্থ্যটিই ব্যক্তিকে জান্নাতে নেয়। চলার পদে মূলতঃ সে সামর্থেরই পরীক্ষা হয়। হযরত ইব্রাহীমের জীবন থেকে সেটিই তো মূল শিক্ষ্যণীয় বিষয়। মুসলিমের জীবনে সে সামর্থ্য সৃষ্টির জন্যই ফরজ করা হয়েছে প্রতিটি ইবাদত। হজ্ব হলো, সে সামর্থ্য সৃষ্টিতে এক ইনটেনসিভ ট্রিনিং কোর্স। এবং যাকে এ কোর্সে শিক্ষক রূপে হাজির করা হয়েছে তিনি হলেন হযরত ইব্রাহিম (আঃ)। তাঁর জীবনের মূল শিক্ষাটি হলো, মহান আল্লাহতায়ালার প্রতি হুকুমে লাব্বায়েক বলা। হযরত ইব্রাহিম (আঃ) ছিলেন মানব ইতিহাসের অতি সাহসী যোদ্ধা। যখন তাঁকে লেলীহান আগুণের মাঝে ফেলার সিদ্ধান্ত শোনানো হয়েছে, তখনও তিনি বিচলিত না হয়ে লাব্বায়েক বলেছেন। যখন মাতৃভূমি ছেড়ে ফিলিস্তিনে হিজরত করার নির্দেশ এসেছে তখনও লাব্বায়েক বলেছেন। যখন স্ত্রী ও শিশু পুত্র ইসমাইলকে খাদ্য-পানীয় শুণ্য মক্কায় রেখে আসার নির্দেশ এসেছে তখনও তিনি লাব্বায়েক বলেছেন।  একমাত্র সন্তান ইসমাইলকে যখন কোরবানী করার নির্দেশ এসেছে তখনও তিনি লাব্বায়েক বলেছেন। এভাবে মহান আল্লাহতায়ালার প্রতি হুকুমে লাব্বায়েক বলার যে সূন্নত তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন সেটিই হলো মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ শিক্ষা। এবং শিক্ষার এ পাঠটি দেয়া হয় হজ্বের ইবাদতে। সে সামর্থ্য সৃষ্টি হলে বুঝতে সে হজ্ব ব্যর্থ্য হয়েছে। হজ্বের জন্য মক্কার চেয়ে উত্তম স্থান আর কোথায় হতে পারে? পৃথিবীর আর কোন নগরীতেই মহান আল্লাহর হুকুমে লাব্বায়েক বলার এতবড় ঘটনা আর কোন শহরেই ঘটেনি। শহরের পত্তন হয়, দেশের মানচিত্রে পরিবর্তন আনা হয় বিশেষ  এজেন্ডাকে এগিয়ে নিতে। কিন্তু মক্কার নগরীর পত্তন ঘটেছে স্রেফ মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশে এবং তাঁরই দ্বীনের এজেন্ডাকে প্রতিষ্ঠা দিতে। এবং মক্কা নগরীতেই গড়ে তোলা হয়েছে মহান আল্লাহতায়ালার প্রথম ঘরটি।

 

অধিকৃতি ঘরের শত্রুর

মুসলিম উম্মাহর বুকে চলমান বিদ্রোহটি কোন কাফের শক্তির বিরুদ্ধে নয়, বরং মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়তী আইনের বিরুদ্ধে। মুসলিম ভূমিতে ইসলামের ঘোরতর শত্রু তো তারাই যারা নিজেদেরকে মুসলিম রূপে পরিচয় দেয়। তাদের কারণেই খোদ মুসলিম ভূমিতে ইসলামের প্রতিষ্টা রুখতে কোন কাফির শক্তিকে মাঠে নামতে হচ্ছে না। সে কাজটি ইসলামের এ ঘরের শত্রুরাই করছে। মুসলিম দেশগুলিতে এরাই মূলতঃ বিজয়ী শক্তি। তাছাড়া রূঢ় বাস্তবতা হলো, এমনকি বিদেশী কাফের শক্তিও মুসলিম ভূমির উপর অধিকৃতি জমাতে এবং ইসলামের উত্থান ঠেকাতে মুসলিমদের মধ্য থেকে বিপুল সংখ্যক কলাবোরেটর পাচ্ছে। এরাই আফগানিস্তান, ইরাক ও সিরিয়া ও চেচনিয়ায় শত্রুর অধিকৃতিকে সহজতর করেছে। অথচ মুসলিমের ঈমানী দায়বদ্ধতার গণ্ডিটি বিশাল। এটি স্রেফ মুর্তিপূজা বা নানারূপ শিরক থেকে বাঁচা নয়, বরং ইসলাম ও শরিয়তি অনুশাসনের বিরুদ্ধে শত্রুদের যে বিদ্রোহ চলছে তা থেকে নিজেকে বাঁচানো। সে সাথে জরুরী হলো, মহান আল্লাহতায়ালার নিবেদিত-প্রাণ সৈনিক হওয়া। পবিত্র কোরআনে সেরূপ সৈনিক হওয়ার মধ্যেই জান্নাত প্রাপ্তির নিশ্চয়তা শোনানো হয়েছে।  বলা হয়েছে, “হে ঈমানদারগণ, তোমাদেরকে কি এমন এক ব্যবসার সন্ধান দিব যা তোমাদেরকে জাহান্নামের কষ্টদায়ক আযাব থেকে মুক্তি দিবে। সেটি হলো,তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান আনো এবং নিজেদের সম্পদ ও জান দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করো। এর মধ্যেই তোমাদের জন্য কল্যাণ -যদি তোমরা জানতে।” –( সুরা সাফ, আয়াত ১০-১১)।

 

ইসলামের শত্রু হওয়া থেকে নিজেকে বাঁচাতে হলে অতি জরুরী হলো, মানব জাতির বিভাজনটি সঠিক ভাবে বুঝা। আরো জরুরী হলো, কারা ইসলামের শত্রু ও কারা আল্লাহর পথের সৈনিক – এ দুটি পক্ষকে সনাক্ত করার যোগ্যতা অর্জন। ইসলামে নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাতই শুধু ফরজ নয়, বরং ফরজ হলো ইসলামের শত্রু-মিত্রদের চেনার সামর্থ্য অর্জন। এখানে ব্যর্থ হলে নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত কোন ফায়দা দেয় না। বরং শত্রুপক্ষে শামিল হওয়া এবং ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নামা তথা মুনাফিক হওয়াটিও সহজ হয়ে যায়। সেরূপ ব্যর্থতায় যা অনিবার্য হয় তা হলো, জাহান্নামে পৌঁছা। কোটি কোটি মুসলিম-সন্তান তো সে পথই ধরেছে।

 

মহান আল্লাহতায়ালা কাছে সমগ্র মানব জাতির বিভাজনটি মূলতঃ তিন শ্রেণীতে। এক). কাফের, দুই). মুনাফিক এবং তিন). ঈমানদার। পবিত্র কোরআনে এ তিন শ্রেণীর মানুষের বিবরণ বার বার এসেছে। এর বাইরে কোন চতুর্থ শ্রেণী নাই। কি কি কারণে মানুষ কাফের, মুনাফিক ও ঈমানদার হয় -সে বিষয়টিও পবিত্র কোরআনে সুস্পষ্ট করা হয়েছে। মুসলিমদের শুধু হিংস্র জীবজন্তু ও পোকামাকড় চিনলে চলে না, চিনতে হয় কারা কাফের, মুনাফিক ও ঈমানদার সেটিও। নইলে মুসলিমগণও দলে দলে কাফির ও মুনাফিকদের দলে শামিল হয়। তখন বিনা যুদ্ধেই মুসলিম রাষ্ট্রের উপর শত্রুশক্তি অধিকৃতি জমায়। তখন পরাজিত হয় ইসলাম ও ইসলামের সৈনিকগণ। এমন অধিকৃত দেশে ইসলামের বিজয়ী করার প্রচেষ্ঠা গণ্য হয় ভয়ানক অপরাধ রূপে। এবং যুদ্ধ শুরু হয় ইসলামের প্রতিষ্ঠা রুখতে। অধিকাংশ মুসলিম দেশগুলিতে তো সেটিই হচ্ছে। ফলে সে দেশগুলিতে যেমন মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব নেই, তেমনি শরিয়তের প্রতিষ্ঠাও নাই। এসব দেশের শাসকগণ নিজেরাই যেহেতু ইসলাম ও মুসলিমের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত, পৃথিবীর অন্য কোথাও মুসলিম নিধন চললে সেটি তাদের কাছে সেটি কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার নয়। ফলে মিয়ানমার, কাশ্মীর, ফিলিস্তিন, চেচনিয়া, জিংজিয়াং, মিন্ডানাও এবং সেন্ট্রাল আফ্রিকার মত দেশগুলিতে যেরূপ মুসলিম নির্মূল চলছে –এসব মুসলিম দেশগুলির নেতাদের তা নিয়ে কোন মাথা ব্যথা নেই। তাদের মাথা ব্যাথাটি শুধু ক্ষমতায় থাকা নিয়ে।

 

লাব্বায়েক’য়ের সংস্কৃতি ও মানব জাতির বিভাজন

মানুষ শুধু তার ধ্যান-ধারণা ও বিশ্বাস নিয়ে বাঁচে না; বাঁচে তার সংস্কৃতি নিয়েও। সংস্কৃতি বস্তুতঃ ধ্যান-ধারণা ও বিশ্বাসের প্রকাশ। এবং ব্যক্তির জীবনে সে প্রকাশটি ঘটে তার ধর্ম-কর্ম, পোষাক-পরিচ্ছদ, খাদ্য-পানীয়, ঘর-সংসার, সাহিত্য-সংগীত, রাজনীতি ও যুদ্ধ বিগ্রহে। এজন্যই একজন পৌত্তলিকের ধর্মবিশ্বাস যেমন এক নয়, তেমনি এক নয় তার সংস্কৃতিও। এক নয় সচারাচর উচ্চারিত মুখের বুলিও। কেউ মন্ত্র পাঠ করে এবং সাড়া দেয় গুরু, ঋষি, পুরোহিতের ডাকে, কেউ সাড়া দেয় কোরআনে ঘোষিত মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমে। মু’মিন ব্যক্তি তাই হজ্বে যায় এবং আল্লাহতায়ালার ডাকে লাব্বায়েক (অর্থঃ আপনার হুকুম পালনে আমি হাজির) বলে।

 

মানব জাতির মূল মূল ও গুরুত্বপূর্ণ বিভাজনটি তাই ভাষা, বর্ণ, গায়ের বংয়ের ভিত্তিতে হয় না। সেটি হয় মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমে প্রতি লাব্বায়েক বলার ভিত্তিতে। যে জীবনে লাব্বায়েক নাই, বুঝতে হবে সে জীবনে নিশ্চিত আছে বিদ্রোহ। সে বিদ্রোহটি যেমন গোপনে হতে পারে, তেমনি প্রকাশ্যেও হতে পারে। মহান করুণাময়ের ডাকে নিরব থাকাটিও অঘোষিত বিদ্রোহ। তবে মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে যাদের বিদ্রোহটি প্রকাশ্যে ঘোষিত হয় -তারাই কাফের। যাদের জীবনে সে বিদ্রোহটি চলে সংগোপনে -তারাই হলো মুনাফিক। গোপন বিদ্রোহ নিয়ে মুনাফিকগণ বসবাস করে প্রতিটি মুসলিম রাষ্ট্র ও সমাজে। তারাই হলো মুসলিমদের ঘরের শত্রু। মুনাফিকগণ যেমন প্রকাশ্যে নিজেদেরকে মুসলিম  রূপে পরিচয় দেয়, তেমনি নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাতও পালন করে। তবে বিদ্রোহ কখনোই গোপন থাকার বিষয় নয়। সেটি প্রকাশ পায়, ইসলামী রাষ্ট্র ও শরিয়ত প্রতিষ্ঠার বিরোধীতার মধ্য দিয়ে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলিতে যারা শরিয়ত ও হুদুদ প্রতিষ্ঠার তীব্র বিরোধীতা করে এবং ভাষা, গোত্র ও ফেরকার নামে বিভক্তির দেয়াল গড়ে -তারা তো কাফের নয়। তারা তো মুসলিম সমাজের মাঝে লুকিয়ে থাকা ঘরের শত্রু। তাদের বিদ্রোহ মহান আল্লাহতায়ার সে সব নির্দেশের বিরুদ্ধেও যাতে রয়েছে সমাজ থেকে কুফরি আইন, দুর্বৃত্তি, সুদ-ঘুষ ও পতিতাবৃত্তির নির্মূল। ইসলামের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয়ার পরও তাদের মুখে নিজেদেরকে কাফের বা অমুসলিম রূপে দাবী করার সাহস নেই। ইসলামের এ কপট শত্রুগণ এজন্যই মুনাফিক। মহান আল্লাহতায়ালার কাছে এরাই হলো সর্বনিকৃষ্ট। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, তাদের স্থান হবে জাহান্নামের নিম্নতম স্থানে।

 

মহান আল্লাহতায়ালার একটি মাত্র হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের কারণে ইবলিস অভিশপ্ত শয়তানে পরিণত হয়েছে। তেমন এক প্রেক্ষিতে প্রশ্ন হলো, পবিত্র কোরআনে ঘোষিত কোন একটি হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ নিয়ে কেউ কি তাই জান্নাতে পৌঁছতে পারে? বস্তুতঃ সে বিদ্রোহ থেকে বাঁচাই হলো মানব জীবনের শ্রেষ্ঠ সামর্থ্য। মু’মিন ব্যক্তির তাকওয়া হলো, সে বিদ্রোহ  থেকে নিজেকে বাঁচানোর প্রতি মুহুর্তের সতর্কতা। মহান আল্লাহতায়ালাকে যারা অস্বীকার করে এবং তাঁর শরিয়তি আইন ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে যাদের বিদ্রোহটি  সুস্পষ্ট –তারাই নিজেদের প্রতিষ্ঠা দেয় কাফের রূপে। এবং ঈমানদার হলো তারাই যারা রাব্বুল আলামীনের প্রতি হুকুমে লাব্বায়েক বলে। অপর দিকে যারা নিজেদের মুসলিম রূপে দাবী করে বটে কিন্তু আগ্রহ নাই তাঁর হুকুমে লাব্বায়েক বলার -তারাই হলো মুনাফিক। মানব জীবনের সবচেয়ে বড় ধোকাবাজী ও অসামর্থ্যতা হল এটি। এখানে ধোকাবাজীটি হলো মহান আল্লাহতায়ালার সাথে। এমন ধোকাবাজী ও অসামর্থ্যতা মানব জীবনের সকল অর্জনকে পুরাপুরি ব্যর্থ করে দেয়। মদিনার বুকে এমন চরিত্রের মানুষগণই মুনাফিক রূপে পরিচিতি পায়। আযানের ডাকে এরা মসজিদে গিয়ে নবীজী (সাঃ)র পিছনে নামায পড়তো বটে, কিন্তু আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে যখন জিহাদের হুকুম এলো তখন সে হুকুমের তারা বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। তারা লাব্বায়িক বলেছিল নফসের খায়েশের ডাকে।  তাদের নিজেদের খায়েশ সেদিন শয়তানের খায়েশের সাথে একাকার হয়ে গিয়েছিল।

 

আজকের মুসলিমগণ যেরূপ শরিয়তের আইন পালনে ব্যর্থ হচ্ছে তার কারণ, আল্লাহর হুকুমে লাব্বায়েক বলার সামর্থ্যহীনতা। তাদের সামনে আল্লাহর কোরআন আছে, কোরআনের হুকুমও আছে এবং নবীজী (সাঃ)র মহান সূন্নতও আছে, কিন্তু যা নাই তা হলো সে হুকুমের ডাকে লাব্বায়েক বলার সামর্থ্য। এমন অসামর্থ্যতাই মূলত আযাব ডেকে আনে। শুধু আখেরাতে নয়, দুনিয়াতেও। মহান আল্লাহর নাযিলকৃত তাওরাত নিয়ে ইহুদীরা খুবই গর্ব করতো –যেরূপ গর্ব করে আজকের মুসলিমগণ পবিত্র কোরআনকে নিয়ে। কিন্তু ইহুদীদের আগ্রহ ছিল না তাওরাতে বর্নিত মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমগুলি পালনে। সে অপরাধে মহান আল্লাহতায়ালা ইহুদীদেরকে ভারবাহি গর্দভ রূপে আখ্যায়ীত করেছেন। পবিত্র কোরআনে সে বর্ণনাটি এসেছে এভাবে, “যাদেরকে তাওরাতের দায়িত্বভার দেয়া হয়েছিল অথচ তারা সেটি বহন করেনি -তাদের দৃষ্টান্তটি হলো ভারবাহি গর্দভের ন্যায়। কতই না নিকৃষ্ট সে সম্প্রদায়ের দৃষ্টান্ত যারা আল্লাহর আয়াতগুলিকে অস্বীকার করে। আল্লাহ যালিম সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না।” –(সুরা জুমু’আ, আয়াত ৫)।

 

ভারবাহি পশুদের পিঠে মূল্যবান কিতাবের বিশাল বোঝা শোভা পেলেও সে কিতাবগুলির শিক্ষা ও হুকুম-আহকাম নিয়ে তারা ভাবে না। সেগুলির প্রতিষ্ঠাও তাদের কাছে গুরুত্ব পায় না। ইহুদীগণ তাই শুধু তাওরাতকে যুগ যুগ বহন করেই বেরিয়েছি, কিন্তু তার প্রতিষ্ঠায় কখনোই মনযোগী হয়নি। শরিয়ত হাওয়ার উপর প্রতিষ্ঠা করা যায় না; সে জন্য রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা দিতে হয়। মিসর থেকে মুক্তি দেয়ার পর মহান আল্লাহতায়ালা যখন তাদেরকে ফিলিস্তিনে গিয়ে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও শরিয়ত প্রতিষ্ঠার হুকুম দিলেন, সে দায়িত্ব পালনে তারা সরাসরি অস্বীকার করলো। রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজটি দোয়াদরুদে হয় না। সে জন্য জিহাদে প্রাণদানের প্রয়োজন হয়। মক্কার ন্যায় ফিলিস্তিনও সেদিন কাফের শক্তির হাতে অধিকৃত ছিল। তারা বলেছিল, “হে মুসা তুমি ও তোমার  আল্লাহ গিয়ে যুদ্ধ করো, আমরা অপেক্ষায় থাকলাম।” তাদের কাপুরুষতার জন্যই মুসা (আঃ) ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা দিতে ব্যর্থ হন এবং ব্যর্থ হন শরিয়তের প্রতিষ্ঠা দিতে। মহান আল্লাহতায়ালার কাছে ইহুহদীগণ একারণেই ভয়ানক অপরাধী। এরূপ অপরাধীগণ কি কোন পুরস্কার পেতে পারে? তাদের জন্য ফিলিস্তিনে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়। শাস্তি স্বরূপ ঘুরতে হয় নানা দেশের পথে পথে। একই পথ ধরেছে আজকের মুসলিমগণ। মুসলিম ভূমিগুলি আজ ইসলামের শত্রুশক্তির হাতে অধিকৃত। সে অধিকৃতি থেকে মুসলিম ভূমিকে মুক্তি করার লড়াই যেমন নাই, তেমনি নাই ইসলামের রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা এবং শরিয়ত পালনে আগ্রহ। ফলে মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিশ্রুত আযাব ঘিরে ধরেছে তাদেরও।

 

মু’মিনের লাব্বায়েক ও ঈমানদারি

লক্ষ লক্ষ হাফেজ, আলেম ও মুসল্লি ব্যস্ত শুধু কোরআনের আয়াতগুলি তেলাওয়াত ও মুখস্ত করা নিয়ে, কিন্তু সেগুলি বুঝাতে এবং তার উপর আমল করাতে আগ্রহ অতি সামান্যই। অথচ যে আয়াতে শরিয়তের হুকুম -সেটি তো শুধু পাঠের বা মুখস্ত করার বিষয় নয়। সেটি তো রাষ্ট্রের উপর প্রয়োগের বিষয়। নইলে অবাধ্যতা হয় মহান রাব্বুল আলামীনের। অথচ মুসলিমগণ বেঁচে আছে সে অবাধ্যতা নিয়ে। সে অবাধ্যতার কারণেই তাদের জীবনে মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনকে রাষ্ট্রে বিজয়ী করার লক্ষ্যে জিহাদও নেই। ফলে ইহুদীগণ যেমন তাওরাতের বিধান পালনে ব্যর্থ হয়েছে, তেমনি প্রায় একশত পঞ্চাশ কোটি মুসলিম ব্যর্থ হচ্ছে ইসলাম পালনে। ফলে ৫৭টি মুসলিম দেশের কোনটিতেও শরিয়তি বিধানের প্রতিষ্ঠা নেই। অথচ কোন রাষ্ট্রে কতটা ধর্ম পালন হয়, সেটির হিসাব কি মসজিদ-মাদ্রাসার সংখ্যা গুণে হয়? নামাযী, রোযাদার ও হাজীদের সংখ্যা দিয়ে কি সে বিচার চলে? সে বিচার তো হয় মহান আল্লাহর হুকুমের কতটা আনুগত্য হলো এবং তাঁর শরিয়তি বিধান কতটা প্রতিষ্ঠা পেল তা থেকে। ইসলামের আগমণ কি শুধু কারী ও হাফিজদের সংখ্যা বাড়াতে? ইসলামের মিশন কি শুধু নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাতের প্রতিষ্ঠা দেয়া? ধর্মপালন এভাবে সীমিত ও সিলেকটিভ হলে পবিত্র কোরআনে যে শরিয়তি আইন নাযিল করা হয়েছে -সেগুলির কি হবে? সেগুলি কি শুধু তেয়াওয়াতের জন্য? নিজের প্রণীত আইনের এরূপ আমলহীন তেয়াওয়াতে কি মহান আল্লাহ ছোবহানা ওয়া তায়ালা কি খুশি হবেন? নবীজী (সাঃ) ও তাঁর সাহাবাগণ কি কখনো শরিয়তের প্রতিষ্ঠা বাদ দিয়ে ইসলাম পালন করেছেন?

 

অন্যায়ের নির্মূল এবং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায় আইন-আদালতের বিকল্প নাই।  রাষ্ট্রের বুকে আইনের প্রয়োগ না হলে জুলুমের সয়লাব শুরু হয়। দুর্বৃত্তিতে মুসলিম দেশগুলি যে বিশ্ব-রেকর্ড গড়ছে তার মূল কারণ তো শরিয়তি আইনের অনুপস্থিতি। শরিয়তি আইনের প্রতিষ্ঠা ছাড়াই দুর্বৃত্তি নির্মূল হবে এবং শান্তি-শৃঙ্খলা ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা পাবে -সেটি বিশ্বাস করাই তো হারাম। গুরুতর রোগী ঔষধ ছাড়াই ভাল হয়ে উঠে –এমন বিশ্বাস কি কোন সুস্থ্য ব্যক্তির হতে পারে? অথচ মুসলিমদের মাঝে তেমনি একটি বিশ্বাস শরিয়তি আইনের বিরুদ্ধে। কোরআন-পাঠ, এবং নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাত পালন এমন কি মোনফেক,ফাসেক বা জালেমের পক্ষেও সম্ভব। অথচ আল্লাহপাক চান, শুধু তেলাওয়াত নয়, তাঁর প্রতিটি হুকুমের পূর্ণ প্রয়োগ। ঈমানদারের প্রতিটি কথা, কর্ম ও আচরণে প্রকাশ পাক, শরিয়তের প্রতিষ্ঠায় তাঁর পূর্ণ অঙ্গিকার। মু’মিন ব্যক্তি তো এভাবেই মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমে “লাব্বায়েক” বলে। এবং এরূপ “লাব্বায়েক” বলার মাঝেই ঈমানদারি। নামায-রোযা-হজ্ব-যাকাতের ন্যায় ইবাদতের মূল কাজ তো ঈমানদারের জীবনে আমৃত্যু “লাব্বায়েক” বলার সামর্থ্য সৃষ্টি। নামায-রোয ও হজ্ব-যাকাতের ন্যায় ইবাদতগুলি ব্যক্তির জীবনে কতটা সফল হলো -সেটি পরিমাপের নির্ভূল মিটারটি হলো “লাব্বায়েক” বলার সামর্থ্য। সে অর্জিত সামর্থ্যের বলে যেখানেই আল্লাহর নির্দেশ, সেখানেই ঈমানদার ব্যক্তি সে নির্দেশ পালনে বলে উঠে “আমি হাজির”। যারা মধ্যে সে সামর্থ্য নাই, বুঝতে হবে ইবাদত থেকে এমন ব্যক্তির অর্জন অতি সামান্যই। এমন ব্যর্থ ইবাদত কি কল্যাণ দিবে পরকালে?

 

ঈমানদারের পুরস্কার যেমন বিশাল,দায়বদ্ধতাও তেমনি বিশাল। বিশাল পুরস্কারটি হলো অনন্ত অসীম কালের জন্য অফুরন্ত নিয়ামত ভরা জান্নাতলাভ। আর দায়বদ্ধতা হলো,আমৃত্যু আল্লাহর সৈনিক রূপে কাজ করা। আল্লাহতায়ালা ঈমানদারের জানমাল কিনে নেন জান্নাতের বিনিময়ে। মহান আল্লাহর সে ঘোষণাটি এসেছে এভাবে,“নিশ্চয়ই আল্লাহ মু’মিনের জান ও মাল এ মূল্যে কিনে নিয়েছেন যে তাদের জন্য হবে জান্নাত। (এবং বিনিময়ে) তারা আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধে করে,সে যুদ্ধে তারা (শত্রুদের) হত্যা করে এবং (নিজেরাও শত্রুদের) হাতে নিহত হয়।” –(সুরা তাওবাহ, আয়াত ১১১)। মু’মিন হওয়ার অর্থ তাই মহান আল্লাহর ক্রয় করা সৈনিকে পরিণত হওয়া। তখন তার উপর একমাত্র আল্লাহর মালিকানার প্রতিষ্ঠা হয়ে যায়। আল্লাহর পথে শহীদ হওয়ায় এমন ব্যক্তির মাঝে কোন ভয় থাকে না। কারণ, শহীদ হওয়ার মধ্য দিয়ে ঈমানদার ব্যক্তি তাঁর নিজের উপর অর্পিত আল্লাহতায়ালার আমানতকে ফেরত দেয় মাত্র। আল্লাহর ভয় তাদেরকে মুক্তি দেয় মৃত্যুর ভয় থেকে। এমন এক বিশ্বাস থাকার কারণেই সংখ্যায় ক্ষুদ্র হয়েও মুসলিমগণ অতীতে বিশাল বিশাল কাফের বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছে।

 

যারা আল্লাহর সৈনিক, তাদের মুখে রাজা, স্বৈরাচারি শাসক বা সেক্যুলার নেতার ডাকে লাব্বায়েক বলাটি শোভা পায় না। তাদের বাঁচাতে তাঁরা যুদ্ধও করে না। যুদ্ধ করে না কোন দল, বর্ণ, গোত্র, ভাষা বা মতবাদের গৌরব বাড়াতে। বরং যুদ্ধ করে এবং সে যুদ্ধে নিহত হয় একমাত্র আল্লাহর দ্বীনের বিজয় আনতে। এবং যুদ্ধ করে মুসলিমদের স্ট্রাটেজিক স্বার্থ বাঁচাতে। এ পৃথিবীতে আর কোন নবী আসবেন না। তবে মুসলিমদের প্রতি মহান আল্লাহর পথে লড়াইয়ের হুকুমটি সুরক্ষিত রয়েছে পবিত্র কোরআনের ফরমানের মাঝে। মুসলিমদের মাঝে আজও সে পবিত্র কোরআন আছে। সে কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনের প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করতে জিহাদের হুকুমও আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মুসলিম জীবনে আল্লাহতায়ালার দ্বীনের প্রতিষ্ঠায় সে জিহাদ কই? অথচ মুসলিম জীবনে অসংখ্য যুদ্ধ আছে, সেসব যুদ্ধে জান ও মালের বিশাল ক্ষয়ক্ষতিও আছে। কিন্তু সেগুলি ব্যক্তি, দল, ভাষা, গোত্রের বিজয় ও গৌরবকে নিশ্চিত করতে। এভাবে মুসলিম মারছে ও মরছে জাহিলিয়াতের পথে। তাদের কোরবানী শুধু পশু কোরবানীতে সীমিত হয়ে আছে। এবং তারা নিজেরা বিপুল সংখ্যায় কোরবান হচ্ছে জাহিলিয়াতকে বাঁচাতে। পবিত্র জিহাদের বদলে তাদের জীবনে এসেছে সন্ত্রাস। মুসলিম দেশগুলির বিশাল বিশাল পুলিশ ও সেনাবাহিনীগুলি ব্যবহৃত হচ্ছে জনগণের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস সৃষ্টির কাজে। ইসলামের বিজয় বাড়াতে এসব বাহিনীর কোন ভূমিকাই নেই। অথচ মহান আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনে মুসলিমের বাঁচা ও মরা -সেটিই তো ইব্রাহীম (আঃ)’য়ের জীবনের মূল আদর্শ। কোরবানীর এটিই তো মূল শিক্ষা। কিন্তু বছর ঘুরে প্রতি বছর হ্জ্ব আসলেও মুসলিম জীবনে  মহান আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে বাঁচা ও মরার আয়োজন অতি সামান্যই।

 

মহান আল্লাহতায়ালার ডাকে সর্বাবস্থায় লাব্বায়েক বলতে গিয়ে ইব্রাহিম (আঃ) দেশছাড়াও হয়েছেন। বিচ্ছিন্ন হয়েছেন একমাত্র পুত্র ঈসমাইল ও বিবি হাজেরা থেকে। আল্লাহর নির্দেশে লাব্বায়েক বলতে তিনি তাদেরকে খাদ্য-পানীয়হীন অবস্থায় ছেড়েছেন জনবসতিহীন মক্কার মরুর প্রান্তরে। যখন হুকুম পেয়েছেন একমাত্র পুত্রের কোরবানীর, তখনও তিনি দ্বিধাদ্বন্দে পড়েননি। প্রবল ঈমানী বল নিয়ে সে হুকুম পালনে তখনও লাব্বায়েক বলেছেন। মহান আল্লাহতায়ালার প্রতি এভাবে লাব্বায়েক বলার ক্ষেত্রে ইব্রাহিম (আঃ) হচ্ছেন সমগ্র মানব ইতিহাসে এক শ্রেষ্ঠ আাদর্শ। শুধু হযরত ইব্রাহিম (আঃ) নন, তাঁর সাথে “লাব্বায়েক” বলেছেন হযরত ইব্রাহিম (আঃ)এর স্ত্রী বিবি হাজেরা এবং শিশু পুত্র ঈসমাইল(আ)ও। হযরত ঈসমাইল(আ)কে যখন বলা হয়েছিল, আল্লাহতায়ালা তোমার জানের কোরবানী চান তখন তিনিও সাগ্রহে বলেছিলেন,“লাব্বায়েক”। অথচ বাঁচবার সাধ কার না থাকে? কিন্তু আল্লাহর ডাকে লাব্বায়েক বলার চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ এ জীবনে আর কি থাকতে পারে? শিশু ঈসমাইলও সেটি বুঝেছিলেন। বুঝেছিলেন তাঁর মহান বিবি হাজেরাও। ফলে ঘরবাড়ী ও গাছপালা নেই,খাদ্য-পানীয় ও কোন প্রাণীর আলামত নেই -এমন এক রুক্ষ মরুর বুকে শিশু পুত্রকে নিয়ে একাকী অবস্থানের হুকুম এলে তিনিও তখন লাব্বায়েক বলেছিলেন। অতি কষ্টে প্রতিপালিত একমাত্র সে শিশু ইসমাইলককে যখন কোরবানী করার হকুম হলো বিবি হাজেরা তখনও দ্বিধান্বিত হননি। তিনি নবী ছিলেন না। কিন্তু আল্লাহর ডাকে লাব্বায়েক বলার চেয়ে বাঁচবার অন্য কোন উচ্চতর প্রেরণার কথা তিনিও ভাবতে পারেননি। তাই তিনি মহান আল্লাহর প্রতি নির্দেশে লাব্বায়েক বলেছেন সমগ্র অস্তিত্ব ও অঙ্গিকার নিয়ে। এভাবে আল্লাহর ডাকে সর্বাবস্থায় লাব্বায়েক বলার যে শিক্ষা ইব্রাহিম (আ) এবং তাঁর পরিবার রেখেছেন তা সমগ্র মানব জাতির ইতিহাসে আজও  অনন্য হয়ে আছে। প্রতি যুগের মুসলমান বাঁচবে সে ইব্রাহিমী মিশন নিয়ে। আল্লাহতায়ালা হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এবং তাঁর পরিবারের মিশনে ও আত্মত্যাগে এতই খুশি হয়েছিলেন যে সেটিকে পবিত্র কোরআনে বার বার উল্লেখ করেছেন। তাঁর সে মহান সূন্নতকে আল্লাহতায়ালা হ্জ্ব রূপে ফরয করেছেন। এভাবে সুস্পষ্ট করেছেন,আল্লাহপাক মোমেনের কোন ধরণের আমলে খুশি হন সেটিও।

 

লাব্বায়েক শয়তানের ডাকে

কিছু নামায-রোযা পালন, কিছু অর্থদান, কিছু সময়দান বা হজ্ব করে যারা আল্লাহকে খুশি করার স্বপ্ন দেখেন ইব্রাহিম (আঃ)’য়ের শিক্ষা থেকে তাদের বোধোদয় হওয়া উচিত। কারণ আল্লাহ চান, তাঁর হুকুমের প্রতি সর্বাবস্থায় পূর্ণ-আনুগত্য। তাই শুধু হজ্বে গিয়ে লাব্বায়েক বলায় কল্যাণ নেই। আল্লাহর নির্দেশের প্রতি লাব্বায়েক বলতে হবে দেশের রাজনীতি,সমাজনীতি, অর্থনীতি,শিক্ষা-সংস্কতি তথা সর্বক্ষেত্রে। তাই যে দেশে আল্লাহর শরিয়ত ও সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠা নেই এবং সে লক্ষ্যে কোন চেষ্টাও নেই –বুঝতে হবে আল্লাহর হুকুমের ডাকে সেদেশে লাব্বায়েক বলার লোকও তেমন একটা নেই। সূদী অর্থনীতি, পর্দাহীনতা, নাচ-গান, অশ্লিল যাত্রা-সিনেমা যে দেশের সংস্কৃতি, সে দেশে দৃশ্যমান হয় তো মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পতাকা। যে মহিলা হজ্ব করে অথচ বেপর্দা ভাবে জনসম্মুখে চলাফেরা করে, বুঝতে হবে হজ্বের সময় তাঁর মুখে লাব্বায়েক ধ্বনিত হলেও তাতে সাচ্চা ঈমানদারি ছিল না। সেটি ছিল নিছক আচার, আল্লাহর প্রতি পূর্ণ ঈমানদারি নয়। এমন হাজীরা তো শয়তানের ডাকেও লাব্বায়েক বলে। তাদের বেপর্দাগী ও রাজনীতিতে পুঁজিবাদ, জাতিয়তাবাদ ও সেক্যুলারিজম প্রতিষ্ঠায় তাদের আগ্রহটি তো তারই আলামত। এমন ভন্ডদের কারণেই বাংলাদেশে মত মুসলিম দেশগুলিতে হাজীর সংখ্যা বাড়লেও আল্লাহর শরিয়তী বিধানের প্রতিষ্ঠার জিহাদে লাব্বায়েক বলা লোকের সংখ্যা বাড়েনি। বরং বিপুল ভাবে বেড়ে চলেছে শয়তানের হুকুমের প্রতি লাব্বায়েক বলার লোক। তাদের কারণে লোকবল বাড়ছে শয়তানের দলে। ফলে বাড়ছে সূদী ব্যাংক, বাড়ছে পতিতাপল্লি, বাড়ছে দূর্নীতি, বাড়ছে মদ্যপান, বেপর্দাগী ও ব্যাভিচার। বাংলাদেশের রাজনীতি ও শিক্ষা-সংস্কৃতিতে তো এরূপ বিদ্রোহীরাই বিজয়ী। এরা হজ্ব পালন করে নিছক আচার রূপে, আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের মিশনকে নিজ জীবনে গ্রহণ করার সংকল্প নিয়ে নয়।

\

আল্লাহতায়ালা চান, তাঁর বান্দাহ ইসলামে পুরাপুরি প্রবেশ করুক। জাহান্নামের আগুণ থেকে বাঁচার এটিই একমাত্র পথ। পবিত্র কোরআনে তাই বলা হয়েছে,“উদখুলুস সিলমে কা’ফ্ফা” অর্থাৎ ইসলামে দাখিল হও পুরাপুরি ভাবে। তাই ঈমানদারির অর্থ শুধু নামায-রোযা-হজ্ব-যাকাত পালন নয়, বরং সেটি মিথ্যাচর্চা, সূদ-ঘুষ, ব্যাভিচারি, বেপর্দাগীর ন্যায় সকল প্রকার অবাধ্যতা থেকে দূরে থাকা। নইলে নেমে আসে কঠিন আযাব। মহান আল্লাহর সে কঠোর ঘোষণাটি এসেছে এভাবে,“তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে বিশ্বাস কর এবং কিছু অংশকে প্রত্যাখান কর? সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল পার্থিব জীবনে হীনতা এবং কিয়ামতের দিন তারা কঠিনতম শাস্তির মধ্যে নিক্ষপ্ত হবে। তারা যা করে আল্লাহ সে সম্বন্ধে বেখবর নন।” –(সুরা বাকারা, আয়াত ৮৫)। ইসলামে পুরাপুরি প্রবেশের সে ছবকটি দেয় হজ্ব। এবং সেটি লাব্বায়েক বলার সামর্থ্যটি চেতনার গভীরে প্রথীত করার মধ্য দিয়ে। তখন মু’মিন ব্যক্তিটি শুধু আযানের ডাকে বা হজ্বের ডাকে লাব্বায়েক বলে না, বরং লাগাতর লাব্বায়েক বলে মহান আল্লাহতায়ালার প্রতি হুকুমে। লাব্বায়েক বলে জিহাদের ডাকেও। হজ্বকালে ক্বাবার পবিত্র অঙ্গণ যেমন প্রবল ভাবে মুখরিত হয় “লাব্বায়েক” ধ্বণিতে, তেমনি “লাব্বায়েক” বলার জোয়ার শুরু হয় মুসলিম দেশের রাজনীতি, সংস্কৃতি ও ধর্মকর্মেও। এবং সেটি মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তি হুকুম পালনে। ইসলামের গৌরব কালে সেটিই তো ছিল মুসলিম সমাজের সংস্কৃতি। ফলে আল্লাহতায়ালার সাহায্য এসেছিল এবং তাতে বিজয় এসেছিল মুসলিমদের।

 

 

আযাবের গ্রাসে

কোন জনপদে রহমত নাযিলের যেমন প্রেক্ষাপট থাকে, তেমনি থাকে আযাবেরও। আযাবের রয়েছে নানারূপ।  মুসলিমদের আজকের যে পরাজয়, অপমান, শত্রুশক্তির অধিকৃতি ও ধ্বংস-প্রক্রিয়া –এগুলিকে কি রহমত বলা যায়? এগুলো তো আল্লাহতায়ালার বহু প্রতিশ্রুত আযাব এবং অর্জিত হয়েছে তাদের নিজেদের হাতে। বিশ্বের প্রায় ১৫০ কোটি মুসলিমের মানসম্মান ও ইজ্জতের এখনো কি কিছু অবশিষ্ঠ আছে? স্রেফ খাদ্য-উৎপাদন, শিল্প-উৎপাদন, সড়ক-উন্নয়ন বা শিক্ষার হার বাড়িয়ে কি এ হীনতা ও অপমান থেকে মুক্তি পাওয়া যায়? আযাব আসে ব্যর্থতার শাস্তি রূপে। মুসলিমদের মাঝে সে ব্যর্থতা কি কম? নামায-রোযা-হজ্ব-যাকাত পালন করে, এমন লোকের সংখ্যা মুসলিম বিশ্বে কোটি কোটি। কিন্ত ক’জনের মাঝে মহান আল্লাহতায়ালার ডাকে লাব্বায়েক বলার সামর্থ্য। বরং বিপুল ভাবে বেড়েছে এমন মানুষের সংখ্যা যারা লাব্বায়েক বলছে শয়তানী শক্তিবর্গের ডাকে। এটিই মুসলিমদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। এরূপ ব্যর্থতা আযাব ডেকে আনবে সেটিই কি স্বাভাবিক নয়?

 

মুসলিমদের ব্যর্থতাটি প্রকট ভাবে ধরা পড়ে ইসলাম থেকে তাদের দুরে সরা ও ইসলামি বিধানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের মাঝে। এর ফলে মুসলিম দেশগুলিতে বিপুল সংখ্যায় বেড়েছে চোর-ডাকাত, খুনি, সন্ত্রাসী, সূদখোর, ঘুষখোর, মদখোর ও ব্যাভিচারির সংখ্যা। মুসলিম রাষ্ট্রগুলির রাজনীতি, অর্থনীতি ও আইন-আদালত মূলতঃ তাদের হাতেই জিম্মি। দেশের সর্বাঙ্গণ জুড়ে বেড়েছে মহান আল্লাহতায়ালার অবাধ্যতা। এবং কোথাও বাস্তবায়ন ঘটেনি শরিয়তের। অথচ পবিত্র কোরআনে সুস্পষ্ট ঘোষণাটি হলো,“যারা আল্লাহতায়ালার নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী যারা বিচার ফয়সালা করে না তারা কাফের, …তারা জালেম ..তারা ফাসেক।” –(সুরা মায়েদা,আয়াত ৪৪-৪৭)।” ধর্মপালনের নামে মুসলমানদের মাঝে যা বেড়েছে তা হলো ইসলামের আংশিক অনুসরণ মাত্র। ইসলামের বাঁকি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিধানগুলির বিরুদ্ধে চলছে লাগাতর বিদ্রোহ। এবং সে বিদ্রোহের কারণে পরাভুত হয়েছে শরিয়ত, হুদুদ, মুসলিম ঐক্য ও খেলাফতের প্রতিষ্ঠা। এরূপ আংশিক অনুসরণ ও বিদ্রোহ মহান আল্লাহতায়ালার আযাব ডেকে আনবে –সেটিই কি স্বাভাবিক নয়?

 

মন-মগজ ও চিন্তা-চেতনার ভূমি কখনোই খালি থাকে না। সে ভূমিতে আল্লাহর জিকর ও তাঁর ডাকে লাব্বায়েক বলার চেতনাটি স্থান না পেলে তা ত্বরিৎ অধিকৃত হয় শয়তানের  হাতে। শয়তানের অধিকৃত সে চেতনার ভূমিতে শয়তানের বিধান প্রতিষ্ঠায় লাব্বায়েক ধ্বনি উঠবে –সেটিই তো স্বাভাবিক। বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলিতে পতিতাবৃত্তি, সূদ-ঘুষ ও দূর্নীতি যেরূপ প্রবলতর হয়েছে -সেটি তো শয়তানের অধিকৃতিরই দলিল। এরূপ অধিকৃতির কারণেই শিরক, জাতিয়তাবাদ, ফ্যাসিবাদ, গোত্রবাদ, বর্ণবাদ, সমাজবাদ, পূজিবাদের ন্যায় দুষ্ট মতবাদগুলোও মুসলিম ভূমিতে বিপুল সংখ্যক অনুসারি পায়। একই কারণে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের যে অঙ্গণগুলিতে ইসলামী বিধান-শূণ্য, সে অঙ্গণগুলি অধিকৃত হয়েছে শয়তানের এজেন্ডা ও ধ্যানধারণায়। এবং আদালত শরিয়তশূণ্য হওয়াতে সে অঙ্গণ অধিকৃত হয়েছে কাফেরদের প্রণীত আইনের হাতে। মুসলিম দেশের রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও পুলিশের ক্ষেত্রগুলি অধিকৃতি হয়েছে তাদের হাতে যাদের অধিকাংশই ‘লাব্বায়েক’ বলে শয়তানের ডাকে। মুসলিম উম্মাহর জন্য এর চেয়ে বড় বিপর্যয় আর কি হতে পারে? মুসলিম দেশগুলিতে আজ যে বিধান প্রতিষ্ঠিত সেটি আল্লাহর বিধান নয়,সেটি মানুষের গড়া। ইসলামের বদলে প্রতিষ্ঠা পেযেছে সেকুলারিজম। শয়তানের অধিকৃত ভূমিতে মহান আল্লাহতায়ালার রহমত নেমে আসবে সেটি কি আশা করা যায়?

 

ইব্রাহিমী ইনষ্টিটিউশন

হজ্ব মূলতঃ হযরত ইব্রাহিম (আঃ) ও তাঁর পরিবারের সূন্নত। এটি হল আদি পিতার আদর্শের সাথে পরবর্তীকালের মুসলমানদের একাত্মতার মহড়া। আল্লাহপাক তাঁর এই মহান বান্দাহ ও তাঁর পরিবারকে এভাবেই মহাসন্মানিত করেছেন। আল্লাহতায়ালা চান তার অনুগত বান্দাহগণ হযরত ইব্রাহীমের (আ) আদর্শে গড়ে উঠুক। গড়ে তুলুক এমন এক বাহিনী যার প্রতিটি সৈনিক হযরত ইব্রাহিম (আ)এর মতই আল্লাহর প্রতিটি নির্দেশে দ্বিধাহীন চিত্তে লাব্বায়েক বলবে। অনুগত বান্দাদের জন্য তিনিই শ্রেষ্ঠতম মডেল। সে মডেলের অনুসরণে নবীজী (সাঃ) ও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম শতকরা শতভাগ সফল হয়েছেন। ফলে নবীজী(সাঃ)র সে সফলতার কারণেই তাঁর ও তাঁর সাহাবাদের যুগকে মানব জাতির ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ যুগ বলা হয়। ইসলামের শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কোন নতুন ধর্মের প্রবর্তন করেননি। বরং তিনি হযরত ইব্রাহিম (আঃ)’য়ের ধর্মকেই নিষ্ঠার সাথে অনুসরণ করেছিলেন, এবং সে দ্বীনকেই ফরজ করা হয়েছে সকল মানব জাতির জন্য। মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে নবীজী (সাঃ)র উপর নাযিল কৃত সে নির্দেশটি হলো এরূপঃ “আপনি বলে দিনঃ আমার প্রতিপালক আমাকে সরল পথ প্রদর্শন করেছেন। সেটি একাগ্রচিত্ত ইব্রাহিমের বিশুদ্ধ ধর্ম। তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না।” –(সুরা আনয়াম, আয়াত ১৬১)।

 

বস্তুতঃ হজ্ব হলো সূন্নতে হযরত ইব্রাহিম (আঃ)এর আলোকে সত্যনিষ্ঠ মর্দে মু’মিন গড়ার পবিত্র ইনষ্টিটিউশন। এ ইনষ্টিটিউশনের শিক্ষক শুধু হযরত ইব্রাহিম (আঃ) নন, তাঁর সাথে পুত্র হযরত ইসমাইল (আঃ) ও স্ত্রী বিবি হাজেরা। হজ্ব ও ওমরা পালনকারি প্রতিটি ব্যক্তি হলো এ ইনষ্টিটিউশনের ছাত্র। ছাত্র তারাও যারা প্রতিবছর ঈদুল আযহা’তে অংশ নেয় ও কোরবানী দেয়। প্রতি ইনষ্টিটিউশনই সুনির্দিষ্ট একটি দর্শন দেয়; দেয় বিশেষ চেতনা ও মূল্যবোধের পরিচর্যা। এখানে সে দর্শনটি হলো, মহান আল্লাহতায়ালার কাছে আত্মসমর্পণ ও তাঁর প্রতি হুকুমে লাব্বায়েক বলা। পবিত্র কোরআনে আত্মসমর্পণের সে দর্শনটি বর্ননা করা হয়েছে এভাবে, “ক্বূল, ইন্নাস সালাতি ওয়া নুসুকি ওয়া মাহইয়ায়া ওয়া মামাতি লিল্লাহি রাব্বিল আ’লামিন।’’ অর্থঃ “বলুন (হে মুহাম্মদ), নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কোরবানী, আমার বেঁচে থাকা ও আমার মৃত্যু -সবকিছুই রাব্বুল আলামীনের জন্য।” –(সুরা আনআম, আয়াত ১৬২)। হাদীসে এসেছে, নবীজী (সাঃ) এ আয়াতটি পাঠ করতেন পশু কোরবানী কালে। হযরত ইব্রাহিম (আঃ) ছিলেন আল্লাহতায়ালার প্রতি দ্বিধাদ্বন্দহীন আত্মসমর্পণের প্রতীক। প্রতীক ছিলেন তাঁর প্রতি হুকুমে লাব্বায়েক বলায়। এমন ব্যক্তিকে বলা হয় হানিফ তথা অতি নিষ্ঠাবান মুসলিম। এবং তাঁকেই বলা হয় মুসলিম উম্মাহর আদি পিতা। কোরবানী নিছক পশু কোরবানী নয়,বরং নিজের মধ্যে বেড়ে উঠা পশু-চেতনা তথা স্বার্থ-চিন্তার কোরবানী। মুসলিমের পরিচয়টি হলো, সে নিজেকে খুশি করতে বাঁচে না; বরং বাঁচে মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করার লক্ষ্যে। হজ্ব ও ঈদুল আযহার পশু কোরবানীর মধ্যে দিয়ে সে চেতনাকেই প্রতিষ্ঠা দেয়া হয়। ঈমানদারের জীবনে এটিই হলো বাঁচবার মূল প্রেরণা। হজ্ব ও ওমরাহ’র অনুষ্ঠানগুলি এবং ঈদুল আযহার পশু কোরবানী মূলতঃ সেটিই শেখায়।

 

হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এবং তাঁর স্ত্রী-পুত্রের দ্বীনে হানিফের সাথে ঈমানদারকে একাত্ম করার লক্ষ্যেই হজ্ব ও ওমরায় ফরজ করা হয়েছে নানা রূপ রসম বা অনুষ্ঠান। সেগুলো পালন না করলে হজ্ব হয় না। বিবি হাজেরা তার শিশুপুত্রের তৃষ্ণা মেটাতে যেভাবে পানির খোঁজে সাফওয়া ও মারওয়ার মাঝে দৌড়িয়েছিলেন আজও  প্রতিটি হাজীকে -তা বৃদ্ধ হোক বা জোয়ান হোক, নারী হোক বা পুরুষ হোক, রাজা হোক বা প্রজা হোক, সকলকেই সেভাবে দৌড়াতে হয়। ‘সায়’ অর্থ প্রচেষ্ঠা। পানিহীন মরুভূমির মাঝেও হতাশ না হয়ে বিবি হাজেরা যেরূপ পানির খোঁজে স্বচেষ্ট হয়েছিলেন, তেমনি স্বচেষ্ট হতে হবে প্রতিটি মুসলমানকে জীবন-সমস্যার সমাধানে। তথা কল্যাণকর কাজে। এখানে কোন অলসতা চলে না। তাঁর সে নিরলস প্রচেষ্ঠাটি মানব জাতির জন্য এতটাই শিক্ষণীয় যে বিবি হাজেরার সে সূন্নত প্রতিষ্ঠা পেয়েছে হজ্বের ফরজ বিধান রূপে। সভ্যতা সভ্যতর হয় এবং মানব-জীবন উন্নততর হয় তো কল্যাণ কর্মে এমন প্রাণান্তকর প্রচেষ্ঠার কারণেই। এ চেতনাতেই মুসলিম ভিক্ষুক হয়না, হতাশ ও হতোদ্যম হয় না। এবং কর্ম থেকে অবসরও নেয় না। বরং সর্বাবস্থাতে আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশে নিজের মেধা, অর্থ, শ্রম, সময় ও রক্তের বিনিয়োগ করে। মু’মিনের “সায়” তাই স্রেফ সাফা ও মারওয়ার মাঝে শেষ হয় না, বরং সেটি আমৃত্যু চলে। মু’মিনের জীবনে এজন্য কোন অবসর বা রিটায়ারমেন্ট নাই। কর্ম থেকে অবসর নেয়াটি মূলতঃ সেক্যুলার ধারণা।

 

বিবি হাজেরা ছিলেন একজন দাসী। তাই ইব্রাহিম (আ)এর নিঃসন্তান প্রথম স্ত্রী বিবি সারার আপত্তি ছিল না তাঁকে স্বামীর দ্বিতীয় স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করায়। আল্লাহর প্রতি নিষ্ঠাপূর্ণ আনুগত্যের কারণেই বিবি হাজেরা পুরস্কৃত হয়েছেন। আল্লাহপাক এভাবে সম্মানিত করেছেন এক নারীকে। তার মর্যাদা এতই বিবি হাজেরার সূন্নত পালন না করলে হজ্ব হয় না। এমন সম্মান কোন রাজাবাদশাহ বা সম্ভ্রান্ত বংশের কোন অভিজাত নরনারীর ভাগ্যে জুটেনি। কোন পয়গম্বরের ভাগ্যেও জুটেনি। বরং পেয়েছে এমন এক বৃদ্ধা মা, ঈমানের পরীক্ষায় যার অর্জনটি ছিল অতি উচু লেভেলের। যখন মক্কার নির্জন মরুপ্রান্তরে তাঁকে খাদ্যহীন, পানীয়হীন ও ঘরহীন স্থানে বসবাসের নির্দেশ পান তখন নির্দ্বিধায় লাব্বায়েক বলেন। এ ছিল করুনাময় আল্লাহর উপর তাঁর গভীর ঈমানের প্রমাণ। তাঁর অটল বিশ্বাস ছিল, এ বিশ্বে সব কিছুই চলে মহাকরুণাময় আল্লাহতায়ালার পরিকল্পনা মাফিক। যার পক্ষ থেকে মক্কা থাকার নির্দেশ এসেছে, নিশ্চয়ই এর মধ্যে তাঁর কোন পরিকল্পনা আছে। এ বিজন ভূমিতে জীবন-ধারণের সামগ্রী জোগানোর দায়িত্ব করুণাময় মহান আল্লাহতায়ালার। তিনি মরুর বুকে কীটপতঙ্গদের খাদ্য জোগান। বান্দা রূপে ঈমানদারের দায়িত্ব তাঁর হুকুম পালন। তাই নিঃসংকোচে সেদিন লাব্বায়েক বলেছিলেন।

 

আমলের পুরস্কৃত তো হয় তার নিয়তের ভিত্তিতে। আল্লাহতায়ালা দেখেন বান্দার কোরবানীর নিয়ত ও আত্মনিয়োগটি। সে নিয়ত ও আত্মনিয়োগে হযরত ইব্রাহিম (আঃ) ও ইসমাইল (আঃ) এর মাঝে কি কোন কমতি ছিল? হযরত ইব্রাহিম (আঃ) যখন নিজের চোখ বেঁধে পুত্র ইসলামের গলায় ছুড়ি চালাচ্ছিলেন, তখন হযরত ইব্রাহিম (আঃ) ও ইসমাইল (আঃ)-এ দুজনের কেউ জানতেন না যে আল্লাহতায়ালা হযরত ইসমাইল (আঃ)’য়ের বদলে ভেড়াকে সেখানে কোরবানীর জন্য পেশ করবেন। খালেছ নিয়তের কারণেই তাদের কোরবানী সেদিন মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে গৃহীত হয়েছিলে। পশু কোরবানীর মধ্য দিয়ে তাদের সে কোরবানীর সূন্নত পালন করতে হয় বিশ্বের মুসলিমদের। এটি না করলে হাজীদের হজ্ব পালনই হয় না।

 

হজ্ব নিজেই কোন লক্ষ্য নয়, মানুষকে একটি মহত্বর লক্ষে গড়ে তোলার প্রক্রিয়া মাত্র। আল্লাহর চুড়ান্ত লক্ষ্যটি হলো ধর্ম, মতবাদ, ঐতিহ্যের নামে প্রচলিত সকল মিথ্যার উপর তাঁর দ্বীনকে তথা ইসলামকে বিজয়ী করা। বস্তুতঃ এটি হলো মিথ্যার উপর সত্যের বিজয়। মানব সভ্যতার বুকে এর চেয়ে কোন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নাই। কোন বিবেকমান মানুষ এ ইস্যুতে নিরব থাকতে পারে? পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে,”হিদায়াত ও সত্য দ্বীনসহ তিনি তাঁর রাসূলকে প্রেরণ করেছেন এ জন্য যে দুনিয়ার সকল দ্বীনের উপর এটি বিজয়ী হবে।-(সুরা ছফ,আয়াত ৯)। তবে এ বিজয় এমনিতে আসে না। এ কাজ ফেরেশতাদেরও নয়। বরং একাজ নিতান্তই মানুষদের। এ কাজ সমাধার জন্য ফেরেশতা হওয়ার যেমন প্রয়োজন নেই, তেমনি সুফি বা দরবেশ হওয়াও জরুরী নয়। বরং চাই জিহাদ। চাই সে জিহাদে অর্থদান, শ্রমদান, রক্তদান, এমনকি প্রাণদান। ইসলাম-বিরোধীদের নির্মূলে জরুরী হলো এমন এক বাহিনীর যারা আল্লাহর প্রতিটি নির্দেশের প্রতি নিষ্ঠারসাথে লাব্বায়েক বলবে। যেমনটি হযরত ইব্রাহিম (আ) বলেছিলেন। নইলে বিজয় অসম্ভব। আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে ফেরেশতাকুল নেমে আসে একমাত্র তখনই যখন পৃথিবী পৃষ্ঠে এমন একটি বাহিনী আল্লাহর পথে জান ও মালের কোরবানীতে প্রস্তুত হয়ে যায়। আল্লাহর শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা) এমন একটি বাহিনী গড়তে পেরেছিলেন বলেই তিনি বিজয়ী হয়েছিলেন। মুসলমানরাই হচ্ছে এ কাজে তার একমাত্র বাহিনী। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা সে বাহিনীকে আখ্যায়ীত করেছেন ‘হিযবুল্লাহ’ বা আল্লাহর দলরূপে। তবে নিছক দলই যথেষ্ট নয়। সে দলের জন্য লাগাতর ট্রেনিংও অপরিহার্য। সে ট্রেনিং শুধু দৈহিক নয়; আর্থিক ও আত্মীক হওয়াটাও জরুরী। নইলে অর্থ, রক্ত ও অর্থদানের জজবা আসবে কীরূপে? হজ্বের মধ্যে সমন্বয় ঘটেছে সবগুলোরই। লাব্বায়েক হলো বস্তুতঃ এ বাহিনীর শপথ বাক্য। এখানে শপথ আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যের। এটি হলো তাঁর লা-শরিক ওয়াহদানিয়াতের স্বীকৃতি এবং সে সাথে আল্লাহর ডাকে সদাসর্বদা লাব্বায়েক বলার। হাজীদের তাই বলতে হয়,”লাব্বায়েক, আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক,লাব্বায়েক লা-শারিকা লাকা লাব্বায়েক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নিয়ামাতা লাকাওয়াল মুলক, লা-শারিকা লাকা লাব্বায়েক।”

 

উম্মূক্ত মিউজিয়াম

ইসলামের বিজয় আনার দায়ভারটি একার নয়, এ কাজ সমষ্টির। একাকী সাধু, সুফি বা দরবেশ হওয়া যায়, কিন্তু তাতে আল্লাহতায়ালার মুজাহিদ হওয়া যায় না। ইসলামকে বিজয়ী করার মিশনে শরীকও হওয়া যায় না। তাই সাধু, সুফি বা দরবেশের বৃদ্ধিতে আল্লাহতায়ালার ভিশন বিজয়ী হয়না। তাতে মুসলিম বিশ্ব থেকে কাফেরদের অধিকৃতি নির্মূল হয় না। ইসলামের বিজয় আনতে অন্যদের সাথে একতা গড়তে হয়। তাই প্রয়োজন, আল্লাহতায়ালার বাহিনীর অন্যদের সাথে একত্রে বসার। প্রয়োজন হলো, নানা বর্ণ, নানা ভাষা ও নানা দেশের এ বিশ্ববাহিনীর সৈনিকদের পারস্পারিক পরিচয়ের। প্রয়োজন হলো, একে অপরের সমস্যার অনুধাবনের এবং একসাথে চিন্তাভাবনা ও স্ট্রাটিজী প্রণয়নের। এজন্য জরুরী হলো বিশ্বমুসলিমের সম্মেলন। জরুরী প্যান-ইসলামিক ভাতৃত্ব। তাই মুসলমান হওয়ার অর্থই হলো প্যান-ইসলামিক চেতনার সৈনিক হওয়া। বিশ্বভাতৃত্ব তাই মুসলমানের রাজনৈতিক শ্লোগান নয়, বরং তাঁর ঈমানের স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফুর্ত প্রকাশ। ফলে ঈমানদার ব্যক্তি পুতুল-পুজাকে যতটা ঘৃনা করে, ততটাই ঘৃনা করে বর্ণবাদ, গোত্রবাদ ও জাতীয়তাবাদকে। কারণ এগুলো হলো মুসলিম উম্মাহর বিশ্বজনীন ভাতৃত্বের চেতনা-বিনাশী ভাইরাস। আজ  মুসলিমগণ যেভাবে বিভক্ত ও বিপর্যস্ত -সেটি মূলতঃ ভূগোল, ভাষা, বর্ণ ও গোত্র-ভিত্তিক চেতনার নাশকতার ফসল।

 

পারস্পরিক বিভক্তি ও বিচ্ছিন্নতার কবিরা গুনাহ থেকে বাঁচাতে হজ্ব নানা ভাষা, নানা বর্ণ, নানা মজহাব ও নানা দেশে বিভক্ত মুসলিমদেরকে এক বিশ্বসম্মেলনে হাজির করে। এখানে ধনি-দরিদ্র, রাজা-প্রজা, সাদা-কালো সবার পোষাক যেমন এক, তেমনি আত্মার আকুতি এবং উচ্চরণও অভিন্ন। লক্ষ্য একটিই এবং সেটি হলো, মহান আল্লাহতায়ালার ডাকে লাব্বায়েক বলা এবং তাঁকে খুশি করা। মুসলিম উম্মাহর এমন এক মহামিলনের লক্ষ্যেই আল্লাহপাক তার নিজের ঘর বায়তুল্লাহ গড়েছিলেন। সেটিও নির্মিত হয়েছিল ইব্রাহিম (আঃ) ও তাঁর পুত্র ইসমাইল (আঃ)র হাত দিয়ে। এটিই হলো মানব জাতির ধর্মীয় ইতিহাসে প্রাচীনতম ইন্সটিটিউশন। মক্কা নগরীটি সে ইতিহাসের স্মৃতি বিজড়িত এক উম্মুক্ত মিউজিয়াম। এখানে পা রেখেছিলেন হযরত ইব্রাহিম, হযরত ঈসমাইল, বিবি হাজেরা, শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা) ও তাঁর বিখ্যাত সাহাবাগণ। এ নগরের প্রতিটি প্রান্তর, প্রতিটি অলিগলি, প্রতিটি পাহাড় এবং প্রতিটি ধুলিকণায় জড়িত রয়েছে মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম সন্তানদের স্মৃতি। এখানে রয়েছে হাজরে আসওয়াদ, মাকামে ইব্রাহিম, আরাফা, মিনা ও মোজদালেফা। মারেফাতের তথা আল্লাহর সান্নিধ্যলাভের প্রানকেন্দ্র হলো এগুলি। আল্লাহতায়ালার সৈনিকদের শপথ বাক্য উচ্চারণের এর চেয়ে পবিত্রতম আয়োজন আর কি হতে পারে? মহান আল্লাহতায়ালার শ্রেষ্ঠ সন্তানেরা মানব সভ্যতার এ শ্রেষ্ঠ ভূমিতে দাঁড়িয়েই আল্লাহতায়ালার নির্দেশের জবাবে লাব্বায়েক বলেছিলেন। ফলে গড়ে উঠেছিল মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম মানব। ইতিহাসের সেই একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে একই শপথ উচ্চারন করে বিশ্বের নানা কোন থেকে আগত আধুনিক যুগে ঈমানদারগণও। আধ্যাত্মিক উন্নয়নের এর চেয়ে পবিত্রতম স্থান এবং পবিত্রতম আয়োজন আর কি হতে পারে?

 

গুরুতর ভাবনার বিষয়

আন্তর্জাতিক এ মহাসম্মেলনের আয়োজক মহান আল্লাহতায়ালা খোদ নিজে। নইলে ইতিহাসের সর্ববৃহৎ এ সম্মেলনটি চৌদ্দ শত বছর ধরে সম্ভব হত না। নানা যুদ্ধ-বিগ্রহ ও দুর্যগের মাঝেও এ বিশাল সম্মেলনটি সুচারুভাবে সম্পন্ন হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে। অন্যরা এখানে মেহমান, আল্লাহতায়ালা এখানে মেজবান। উদ্দেশ্য  মহান আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন হওয়ায় এ সম্মেলনে যোগ হয় পবিত্রতা। লক্ষ্য যখন এক ও অভিন্ন, তখন দ্বন্দ থাকে না। দলাদলিও থাকে না। নানা বিভিন্নতা থেকে এসে এখানে এসে সবাই অভিন্ন হয়ে যায়। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে ধর্মপ্রাণ মানুষ এখানে ছুটে আসে নিজস্ব অর্থে। কারো অনুদানের প্রয়োজন হয়না। হেজাজের পুণ্যভূমি যখন বৈষয়িক সম্পদে দরিদ্র্য ছিল তখনও এ হজ্ব আয়োজিত হয়েছে মানুষের নিজস্ব উদ্যোগে। মক্কা হলো ইসলামের মূক্ত নগরী। এখানে আসার জন্য অনুমতিরও প্রয়োজন নেই। আসতে বাধা দেওয়াই পরম অধর্ম। বাধা দিলে সে বাধা অপসারণ করা সকল মুসলমানের ধর্মীয় দায়িত্ব হয়ে পড়ে। এভাবেই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে এ বিশ্ব সম্মেলনে।

 

মিনায় অবস্থান, আরাফার মহাজমায়েত, মোযদালিফায় রাত্রিযাপন, ক্বাবার তোয়াফ এবং শয়তানের স্তম্ভে পাথর নিক্ষেপের পর মুসলিম বিশ্বে আসে ঈদুল আযহা। আনে ঈদ তথা খুশি। ঈদের কারণটি নিজের বা অন্যের জন্ম নয়, বরং নিজের অর্জিত সাফল্য। মাতৃগর্ভ থেকে নিজের জন্মলাভে ব্যক্তির নিজের কোন কৃতিত্ব থাকে না, সে দানটি তো মহান আল্লাহর। ফলে প্রশংসা তো একমাত্র তারই প্রাপ্য। তাই অন্যান্য ধর্মে ধর্মীয় নেতার জন্মদিবস পালনের রীতি থাকলেও ইসলামে সেটি নাই। সাহাবায়ে কেরাম নবীজী (সাঃ)র জন্ম দিন পালনে করেছেন সে নজির নেই। মুসলমানের জীবনে প্রকৃত ঈদ মাত্র দুটি। একটি মাহে রমযানের,অপরটি ঈদুল আযহার। এ দুটি ঈদে উযপাপিত হয় ঈমানদারের জীবনের দুটি বিশাল বিজয়। একটি মাহে রমযানের মাসব্যাপী রোযা পালনের, অপরটি হজ্ব পালনের তথা আল্লাহর ডাকে লাব্বায়েক বলার।

 

হজ্ব যেন রোজ-হাশরের মহড়া। সর্বত্র এক পোষাক, এক বর্ণ, এবং একই আওয়াজ। সবার মধ্যে একই পেরেশানী। নানা দেশের ও নানা ভাষার মানুষ এখানে এক মানবসমুদ্রে লীন। মাথায় টুপি নেই, পায়ে জুতা নেই, গায়ে জামা নেই, আভিজাত্য প্রকাশের কোন মাধ্যমও নেই। দুই টুকরো সিলাই হীন কাপড় নিয়ে সবাই এখানে একই সমতলে। কাফনের কাপড় পরে লাশেরা যেন কবর থেকে লাখে লাখে বেরিয়ে এসেছে। সাদা-কালো, আমির-ওমরাহ, নারী-পুরুষ সবাই এখানে একাকার। সবাই ছুটেছে একই লক্ষ্যে। বান্দার মন নিংড়ানো লাব্বায়েক ধ্বনি স্মরণ করিয়ে দেয় মহান আল্লাহতায়ালার উপস্থিতিকে। আল্লাহতায়ালার স্মরণে কেঁপে উঠে বান্দার দেহ, মন তথা সমগ্র অস্তিত্ব। এখানে ভয়, বিনয় ও আনুগত্যের ভাব সর্বত্র। সবাই ঘুরছে আল্লাহতায়ালার ঘরকে কেন্দ্র করে। রোজ হাশরের দিনে মানুষ যে কতটা অসহায় হবে হজ্ব সেটিই স্মরণ করিয়ে দেয়। মৃত্যূবরণ না করেও যেন মৃত্যুর অভিজ্ঞতা। ফলে প্রেরণা মেলে সময় থাকতে জীবনের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের। ছবক দেয় রোজ হাশরের প্রস্তুতির। গুরুত্ব পায় মহান আল্লাহতায়ালার কাছে হিসাব দেওয়ার আগে নিজেই নিজের হিসাব নেয়ার। পরকালীন সাফল্য লাভে এ মূল্যায়নটুকুই তো মূল। এরূপ উপলদ্ধি ছাড়া আল্লাহতায়ালাতে পূর্ণ আত্মসমর্পণ ও শয়তানের দাসত্ব থেকে মূক্তি কীরূপে সম্ভব? হজ্ব সে সুযোগই এনে দেয়। কিন্তু আজকের মুসলিম জীবনে হজ্বের সে শিক্ষাটি কই? কোথায় সে আত্মসমর্পণ? কোথায় মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের জবাবে লাব্বায়েক? মুসলিম উম্মাহর জীবনে এটাই কি সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা নয়? এরূপ ব্যর্থতা নিয়ে কি মুক্তি মিলবে কি আখেরাতে? বিজয় ও গৌরব জুটবে কি এ জীবনে? প্রশ্ন হলো, এ ব্যর্থতা নিয়ে ভাবনা কোথায়? প্রথম সংস্করণ ২০/১০/২০১২, দ্বিতীয় সংস্করণ ১২/১০/২০১৩, তৃতীয় সংস্করণ ২৮/৯/২০১৪ চতুর্থ সংস্করণ ২৭/৮/২০১৮। Tweet:@drfmkamal; facebook.com/firozkamal




About me

Born and received early education in Bangladesh. Graduated in medicine from King Edward College in Lahore in Pakistan, and received a BSc. from the University of Punjab. Studied MPH (Masters in Public Health) at the University of North Carolina at Chapel Hill, USA, and received a Post-graduate Diploma in Dermatology from the University of London. Worked as a medical doctor in Pakistan, Iran, Bangladesh and in UK. Along with the medical practices, did researches on social sciences issues and presented the findings in international conferences of IUSSP (International Union of Scientific Studies of Population) at Beijing in 1997 and in Brazil in 1998; some of the articles published in international journals. Other engagements have been in writing articles and books on social, political, cultural, educational and international issues, both in Bengali and English. As a freelance columnist have been writing in several dailies and periodicals of Bangladesh, and also in blogs and websites, and had the opportunities to edit periodicals in London.