শেখ হাসিনার নাশকতার রাজনীতি ও বাঙালী মুসলিমের বিপদ

ফিরোজ মাহবুব কামাল

 গাদ্দারিটি ইসলাম ও দেশবাসীর সাথে

প্রতি দেশের বৈধ শাসকই দেশবাসীকে প্রতিনিধিত্ব করে। শেখ হাসিনার ধর্মীয় পরিচয় বা বিশ্বাসটি স্রেফ তাঁর ব্যক্তিগত বিষয় নয়, সেটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাংলাদেশের জনগণের কাছেও। কারণ তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী না হযে তিনি একজন সাধারণ মহিলা হলে নিজস্ব বিশ্বাস ও চিন্তা-চেতনা নিয়ে যেখানে ইচ্ছা সেখানে ঘর বাঁধতে পারতেন বা হারিয়েও যেতে পারতেন। বহু নাস্তিক,বহু কম্যুনিষ্ট এবং বহু হিন্দু-বৈদ্ধ-খৃষ্টান ইসলামের প্রতি অবিশ্বাস নিয়ে বাংলাদেশে বসবাস করে। কত বাংলাদেশীই তো মদ-গাজা-হিরোইন খায়। কত বাঙালীই তো কতকিছু লেখে বা বলে। বহুলক্ষ বাঙালীই তো নানা দেশে নিজ ধর্ম ও নিজ সংস্কৃতির বাঁধন ছিন্ন করে খড়কুটোর ন্যায় হারিয়েও যাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ক্ষেত্রে কি সেটি সাজে? সরকার-প্রধান রূপে তাঁর একটি দায়বদ্ধতা আছে। সেটি বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের চিন্তা-চেতনা ও ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি।

একটি মুসলিম দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের কাজ শুধু বিদেশী হামলা থেকে দেশের সীমান্ত বাঁচানো নয়। তাঁকে বাঁচাতে হয় জনগণের ধর্ম, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও আদর্শকেও। তাঁর দায়বদ্ধতা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ঈমান-আক্বীদা বাঁচানোর। মুসলমানরা পৃথক রাষ্ট্র নির্মান করে তো সে প্রয়োজনেই। ১৯৪৭ সালে পূর্ব বাংলা যে পশ্চিম বাংলার ন্যায় ভারতে বিলীন হয়নি তা তো সে কারণেই। শেখ হাসিনার বড় গাদ্দারিটি ভারতের জন্য ট্রানজিট দেয়া নয়। বাংলাদেশের বাজার, নদীর পানি বা ১২৩৯ একর জমি ভারতের হাতে তুলে দেয়াও নয়। বরং সেটি বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের ঈমান-আক্বীদার সাথে গাদ্দারি।সে গাদ্দারির ফলেই বাংলাদেশের আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন আজ  শত্রু দ্বারা অধিকৃত এবং বিপুল ভাবে পরাজিত ইসলাম ও শরিয়তি বিধান।   

বাংলাদেশ ভারত, নেপাল বা ভূটান নয়। ইউরোপ-আমেরিকার একটি দেশও নয়। বাংলাদেশের জনগণের শতকরা ৯০ ভাগ হলো মুসলিম। আর মুসলিম হওয়ার অর্থই হল একটি মিশন নিয়ে বাঁচা। তবে সে মিশন শুধু নামায-রোযা-হজ-যাকাতে পালিত হয় না। বরং বিপ্লব আনতে হয় রাজনীতি, সমাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও সভ্যতায়। ঈমানদারের সে বিপ্লব নিজের বিশ্বাস,আচরণ ও সংস্কৃতি থেকে শুরু হলেও সেখানে এসে সেটি থেমে যায় না। বিপ্লব আনে সমাজ ও রাষ্ট্রে। এমন কি পশুপাখি,পোকামাকড়ও যেখানে বাস করে সেখানকার পরিবেশটি তারা পাল্টিয়ে দেয়। ইসলামের বিজয়ের পর আরবের বুক থেকে তাই বিদায় নিয়েছিল কাফেরদের রাজনীতি,সমাজনীতি ও শিক্ষা-সংস্কৃতি,এবং সে ভূমিতে নির্মিত হয়েছিল সম্পূর্ণ এক নতুন সভ্যতা।

তাই বাঙালী মুসলমানদের চিন্তা-চেতনা, সভ্যতা-সংস্কৃতি ও রাজনীতি পশ্চিম বাংলার হিন্দু বাঙালীদের থেকে পৃথক হবে সেটি শুধু কাঙ্খিতই নয়, অনিবার্যও। সেটি না হলে বুঝতে হবে মুসলমানের মুসলমান হওয়া নিয়ে প্রকাণ্ড সমস্যা রয়ে গেছে। বরং হিন্দু বাঙালী থেকে সে পার্থক্য কতটা বিশাল ও ইসলামী তার উপরই নির্ভর করবে সে কতটা মুসলিম। কারণ পৌত্তলিকতা ও পৌত্তলিক সংস্কৃতি থেকে কে কতটা দূরে সরলো তা থেকেই বুঝা যায় সে কতটা ইসলামের কাছে আসলো। তাদের থেকে সে বিশাল ভিন্নতার কারণেই ১৯৪৭ সালেই বাঙালী মুসলিমরা বাঙালী হিন্দুদের সাথে ভারতে না গিয়ে অবাঙালী মুসলিমদের সাথে মিলে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করেছিল। ভারতের নানা প্রদেশের অবাঙালী মুসলমানদের সাথে তাদের ভাষার ভিন্নতা থাকলেও এ জীবনে বাঁচার মূল মিশনটি নিয়ে কোন ভিন্নতা ছিল না। বরং ছিল শতভাগ মিল। অথচ সে মিলটি বাঙালী হিন্দুদের সাথে শতকরা এক ভাগও ছিল না। ফলে শেখ হাসিনা শুধু বাংলায় কথা বলবেন বা বাঙালী রমনীর ন্যায় শাড়ী পড়বেন এবং ভাত-মাছ খাবেন সেটিই যথেষ্ট নয়। বরং তাঁর কথাবার্তা, চিন্তা-চেতনা ও রাজনীতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমের চিন্তা-চেতনা ও ঈমান-আক্বিদার প্রতিফলন ঘটবে -সেটাও জরুরী। নইলে তিনি একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশের প্রধানমন্ত্রী হন কোন অধিকারে?

ইসলামের আগে আরবের নেতা ছিল আবু লাহাব বা আবু জেহলের মত পৌত্তলিক কাফেরগণ। ইসলাম বিজয়ী হবার পর এসব কাফেরগণ ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল। তাদেরকে আস্তাকুঁড়ে ফেলাটাই সে সময়ের বিজয়ী মুসলিমদের জন্য ছিল ঈমানী দায়বদ্ধতা। কাফেরদের স্থলে তখন নেতা হয়েছেন মহান নবীজী (সাঃ)। নবীজী (সাঃ)’য়ের ওফাতের পর নেতা হয়েছেন হযরত আবু বকর (আঃ) এবং তাঁর পর হয়েছেন হযরত ওসমান (রাঃ) এবং তার পর হযরত আলী (রাঃ)। তাদের রাজনীতিতে তাঁরা নিজেরাও সার্বভৌম ছিলেন না, বরং সার্বভৌম ছিলেন একমাত্র মহান আল্লাহ। তারা ছিলেন সে সার্বভৌম মহান আল্লাহর অনুগত খলিফা তথা প্রতিনিধি।

 

দায়িত্বশূণ্য নয় প্রজারাও

ইসলামের রয়েছে পরিপূর্ণ জীবন-বিধান। মহান আল্লাহতায়ালা শুধু ইবাদতের বিধি-বিধান,খাদ্যপানীয়ের হারাম-হালাল, সম্পত্তির বন্টন-বিধি ও ড্রেস-কোডই বেঁধে দেননি, বেঁধে দিয়েছেন বিচার-আচার ও রাষ্ট্র পরিচালনার বিধানও। ঈমানদারের অধিকার নাই সে বিধিবদ্ধ বিধানের বাইরে যাওয়ার। অন্য কোন ধর্মে এমনটি নেই, ইসলাম তাই অনন্য। মুসলিম শাসকদের মূল দায়িত্ব হলো রাষ্ট্র জুড়ে সেটির প্রচার,প্রতিষ্ঠা ও প্রতিরক্ষাকে সুনিশ্চিত করা। মুসলিম দেশের শাসকদের জন্য আজও  সেটিই হলো আদর্শ। রাষ্ট্রের প্রজাগণও দায়িত্বশূণ্য নন। তাদের ঈমানী দায়িত্বটি হল,রাষ্ট্র যাতে সে নীতির উপর প্রতিদিন ও প্রতিক্ষণ প্রতিষ্ঠিত থাকে সেটির প্রতি নজর রাখা। নবীজী (সাঃ)’র প্রদর্শিত পথ থেকে রাষ্ট্র বিচ্যুত হলে সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা।  তাই খলিফা আবু বকর (রাঃ) যখন নবীজী (সাঃ)র ওফাতের পর খলিফা হন তখন এক সাহাবী তাঁর তরবারিটি খাপ থেকে বের করে বলেছিলেন,“আপনি যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাঃ)র নীতি থেকে সরে রাষ্ট্র পরিচালনা করেন তবে এ তরবারি দিয়ে আপনাকে দ্বিখণ্ডিত করে ফেলবো।” একজন সাধারণ মুসলিম নাগরিকও রাষ্ট্রের ইসলামী চরিত্র সংরক্ষণে কতটা অতন্দ্র প্রহরী এবং আপোষহীন -এ হলো তার নমুনা।

মুসলিম প্রজা তাই রাষ্ট্র পরিচালনার সব দায়িত্ব সরকারের হাতে দিয়ে নিশ্চিন্তায় ঘুমায় না। পবিত্র কোরআনে এমন মুসলিমকেই তো মহান আল্লাহর সৈনিক বলা হয়েছে -যারা যুদ্ধ করে আল্লাহর রাস্তায় (ইউকাতিলুউনা ফি সাবিলিল্লাহ)। এবং যারা সে হুকুমের অবাধ্য, তাদেরকে বলা হয়েছে শয়তানের সৈনিক। তারা যুদ্ধ করে শয়তানের পথে (ইউকাতিলুউনা ফি সাবিলিশ শায়তান)। একারণেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক চরিত্রটি ইসলামী হবে –সেটিই ছিল কাঙ্খিত। সেটি না হলে জনগণের জন্য অসম্ভব বা দুরুহ হয় সিরাতুল মোস্তাকিমে চলা। সে রাজনীতি বরং বিচ্যুতি বাড়ায় এবং ধাবিত করে জাহান্নামের দিকে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সে রূপ বিচ্যুতি করার কাজটাই হচ্ছে অতি  প্রকট ভাবে। এবং সেটি প্রকাশ পাচ্ছে শেখ হাসিনা ও তার সরকারের নীতিতে। সে বিচ্যুতির কারণেই হিন্দুদের পুঁজা মণ্ডপে গিয়ে দুর্গাপুজারীদের সাথে তিনি একাত্ব হয়ে গেছেন।

 

মহাবিপর্যের মুখে দেশ  

বাংলাদেশের মুসলমানদের জন্য আজ মহাবিপদ। বিপদ এখানে মদ্যপ এক মাতালকে যাত্রীভর্তি বাসের ড্রাইভিং সিটে বসানোর। দেশটির শাসন ক্ষমতায় আজ এমন এক ব্যক্তি যার আস্থা দুর্গার প্রতি। দুর্গার উপর আস্থা নিয়ে কেউ কি আল্লাহর উপর আস্থা রাখতে পারে? পারে না বলেই সংবিধান থেকে আল্লাহর উপর আস্থার বাণীটি সরানো তার জন্য এতোটা সহজ হয়েছে। হৃদয়ে শরিষার দান পরিমান ঈমান থাকলে সে জান দিত, তবুও আল্লাহর উপর আস্থার বানী কখনোই সরাতো না। তাঁর রাজনীতির লক্ষ্য,শরিয়তী বিধানের প্রতিষ্ঠাকে সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিহত করা। দেশে আজ নানা ধরণের অপরাধী। কেউ বা সরকারি তহবিল তছরুপ করছে, কেউবা ঘুষ খাচ্ছে, কেউবা টেন্ডার বাজী করছে, কেউবা রাস্তাঘাট ও বনভূমির গাছ কেটে নিচ্ছে। এবং সে সাথে কেউবা সন্ত্রাসের মাধ্যমে চাঁদাবাজি করছে এবং দেহব্যবসার ন্যায় পাপাচার ছড়াচ্ছে। এরাই দেশকে আবার তলাহীন ভিক্ষার ঝুলিতে পরিণত হতে যাচ্ছে।

ভিক্ষার পাত্রে তলা না থাকলে কেউ ভিক্ষাও দেয় না। ভিক্ষাদাতার তখন বিশ্বাস জন্মে, দেয়া অর্থ পাত্রে থাকবে না। অর্থদান তখন অর্থহীন হবে। একারণে শেখ হাসিনার পিতার আমলে দেশে দুর্ভিক্ষ নেমে আসলেও অনেকে ভিক্ষা দেয়নি। ফলে বিপদ বেড়েছে দেশবাসীর। হাসিনার আমলে তেমনি অবস্থা আবার সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্ব ব্যাংক তাই পদ্মা সেতুর অর্থ সাহায্য বন্ধ করে দিয়েছে। নইলে এক যুগ আগেই পদ্মা সেতু নির্মাণ হয়ে যেত। কিন্তু হাসিনা সরকারের তা নিয়ে মাথা ব্যাথা নেই। একারণেই দেশ অপরাধীদের দ্বারা ছেয়ে গেলে কি হবে, পুলিশ অপরাধীদের খুঁজছে না। তাদেরকে গ্রেফতার করে আদালতেও তুলছে না। কারণ, তাদের ব্যস্ততা সরকারি দুর্বৃত্তদের  পাহারা দেয়া। তাই পুলিশ কোমড় বেধেঁ হাজতে তুলছে তাদের যারা দুবৃত্তির অবসান চায়, মানবিক অধিকার চায় এবং  ইসলামের বিজয় ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠা চায়।

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আজ শত্রু মনে করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে হ্ত্যাযোগ্য মনে করা হয়। অপর দিকে যা ইচ্ছে করার স্বাধীনতা দেয়া হচ্ছে তাদের যারা দেশ ও ইসলামের শত্রু। কোন ইসলামি দলের পক্ষ থেকে কোন মিছিল-মিটিংয়ের আয়োজন হলেই হাজার হাজার পুলিশ তখন রাস্তায় নামে। শুরু হয় রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। পুলিশ দিয়ে লাঠি-পেটা করা, লগি-বৈঠা নিয়ে প্রাণনাশ করা বা গ্রেফতারকৃতদের পায়ে ডাণ্ডা-বেড়ি পড়িয়ে কারারুদ্ধ করা -তাই আজ আর কোন অপরাধ কর্ম নয়। গর্হিত কর্মও নয়। বরং এমন অপরাধ কর্মেই যেন শেখ হাসিনা ও তার সরকারের পুলক। সে পুলকের সাথে প্রচণ্ড উৎসব বাড়ে পুজা মণ্ডপে গেলে। পূজা উদযাপনে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনায় দেখে শেখ হাসিনার মন এতটাই পুলকিত হয়েছে যে দেশে ফসলের উৎপাদনবৃদ্ধি, অর্থনীতিতে ৭% ভাগ প্রবৃদ্ধি, মানুষ সুখ-শান্তিকে তিনি দুর্গার হাতিতে চড়ে আসার সাথে সম্পৃক্ত করে ফেলেন। সরকারের বড় সফলতা বলে যেটিকে তিনি দেখিয়েছেন সেটি হলো, পূজার উৎসবে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সব ধর্মের মানুষ একাত্ম হয়েছে। যেন দুর্গাপুজার আসরে মুসলমানদের হাজির করাটাকেই তার সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় অর্জন।

 

 ধর্মপালনে কতটুকু স্বাধীনতা মুসলিমদের?

দেশে হিন্দুদের ধর্ম পালনের স্বাধীনতা বেড়েছে তা নিয়ে সন্দেহ নেই। কোন মুসলিমের তা নিয়ে আপত্তি থাকারও কথা নয়। কিন্তু ধর্ম পালনে অনুরূপ স্বাধীনতা কতটুকু মিলেছে মুসলিমদের? ইসলামের বিধান শুধু নামায-রোযা-হজ-যাকাতের বিধান নয়। সে বিধানগুলির সাথে রয়েছে শিক্ষা-সংস্কৃতি,আইন-আদালত ও রাজনীতির বিধান। কোরআনে নিদের্শ এসেছে,“আ’মিরু বিল মারুফ ওয়া নিহি আনিল মুনকার” অর্থ ন্যায়র নির্দেশ এবং অন্যায়ের নির্মূল। ন্যায়-অন্যায়ের সংজ্ঞাও বেঁধে দিয়েছে খোদ মহান আল্লাহতায়ালা। শুধু মসজিদ-মাদ্রাসা গড়লে বা নামায-রোযা-হজ-যাকাত পালন করলে মুসলমানের ধর্ম পালন হয় না। ন্যায়র নির্দেশ এবং অন্যায়ের নির্মূল করার কাজে তাকে ইসলামি রাষ্ট্রও গড়তে হয়। নবীজী (সাঃ)এবং তাঁর মহান সাহাবীগণ তো সেটিই করেছেন। সে রাষ্ট্র নির্মাণে প্রতিযুগে মুসলিম উমআহর সবচেয়ে বেশী রক্তক্ষয়, অর্থক্ষয় ও শ্রমক্ষয় হয়েছে। আজও  সত্যিকার মুসলিম রূপে বাঁচা ও বেড়ে উঠার এছাড়া ভিন্ন পথ নেই। এজন্যই আরবের কাফেরদের নামায-রোযা নিয়ে বিরোধীতা ছিল না, বরং তাদের পক্ষ থেকে সবচেয়ে বড় হামলাটি হয়েছে ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মূলে। বদর, ওহুদ,খন্দক ও হুনায়ুনের ন্যায় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধগুলো তারা সংগঠিত করেছে তো সে লক্ষ্যেই।

আর হাসিনা সরকারের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে তেমন একটি ইসলামি রাষ্ট্র যাতে গড়ে উঠার সুযোগ না পায় -তার ব্যবস্থা করা। হাসিনা সরকার তাই চুরি-ডাকাতি-খুন-সন্ত্রাস বন্ধ করা নিয়ে এতটা উদগ্রিব নয় যতটা উদগ্রিব ইসলাম পন্থিদের দল-দফতর ও সভা-সমিতি বন্ধ করায়। তাই দেশ দুর্নীতিতে ছেয়ে গেলে কি হবে, দারুন ভাবে কমানো হয়েছে ইসলামপন্থিদের কর্মকাণ্ড। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য অপরাধ গণ্য হচ্ছে হোস্টেলের রুমে ইসলামি বই রাখা ও ইসলামি স্টাডি সার্কেল করা। নিছক বোরখা পড়ার কারণে অবরুদ্ধ করা হচ্ছে ছাত্রীদের, কোথাও কোথাও বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল থেকে তাদের বের করে দেয়া হচ্ছে। ছাত্রলীগ কর্মীরা কোথাও কোথাও নিছক নামায পড়ার কারণে সাধারণ ছাত্রদের উপর চড়াও হচ্ছে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে দাড়িটুপি নিয়ে চলাফেরা করা,বোরখা পড়া চিহ্নিত হচ্ছে জঙ্গিবাদ রূপে।

সম্প্রতি এ বিষয়ে বহু সংবাদ পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। যেমন,রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যোসাল ওয়ার্ক ডিপার্টমেন্টের চতুর্থ বর্ষের সবুজ নামক একজন ছাত্রকে নিছক নামায পড়ার কারণে ছাত্রলীগ কর্মীদের হাতে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। মেয়েদের বোরখা পড়ার উপর তারা নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সোসিওলজি ডিপার্টমেন্ট। উক্ত ডিপার্টমেন্টে সম্প্রতি চারজন নতুন শিক্ষককে নিয়োগ দেয়া হয়। তাদের উপর শর্ত লাগানো হয়, তারা দাড়ী রাখতে পারবে না, ক্লাসে পাঞ্জাবী পড়তে পারবে না এবং কোনরূপ ধর্মীয় প্রতীক নিয়ে ক্লাসে ঢুকতে পারবে না।– (দৈনিক আমার দেশ, ৩রা এপ্রিল, ২০১০)। শুধু ছাত্রলীগের গুন্ডারা নয়, বোরখা-পরিহিত ছাত্রীদের হয়রানিতে নেমেছে এমন কি পুলিশরাও। এ বিষয়ে সংবাদপত্রে প্রকাশিক সাম্প্রতিক খবরটি হল, পিরোজপুরে তিনজন রোরখাপরিহিত ছাত্রীকে কোন রূপ কারণ ছাড়াই পুলিশ একমাসেরও বেশী কাল ধরে গ্রেফতার করে রাখে। এবং নানারূপ হয়রানি মূলক প্রশ্ন করতে থাকে। তাদেরকে একমাত্র তখন ছেড়ে দেয়া হয় যখন সে গ্রেফতারীর বিরুদ্ধে দেশের হাইকোর্ট থেকে নির্দেশ দেয়া হয়। -(আমার দেশ, ১৯ ফেব্রেয়ারি, ২০১০)।  

 

কীর্তনে কি ইজ্জত বাড়ে?

শেখ হাসিনা ভেবেছেন, পূজামণ্ডপে গিয়ে দুর্গাকে মা বললে (যেমনটি তিনি ২০১১ সালের ৫ই অক্টোবর রাজধানীর ঢাকেশ্বরী মন্দির ও রামকৃষ্ণ মিশনে দুর্গা পূজা উপলক্ষে পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে গিয়ে বলেছিলেন) বা তার গুণকীর্তন করলেই হিন্দুদের মাঝে তার ইজ্জত বাড়বে। কিন্তু সে কীর্তনে কি ইজ্জত বাড়ে? ইজ্জত যে কতটা বেড়েছে সেটি তো ভারতীয় প্রধাণমন্ত্রী মনমোহন সিং তার বাংলাদেশ সফলে দেখিয়ে দিয়েছেন। দেখিয়েছেন পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী। তিস্তা পানিচুক্তি হয়নি, অথচ তারা নিয়ে গেছে করিডোর। এবং সে করিডোর দিয়ে ভৈরব-আখাউড়া রুটে ভারতীয় পণ্যবহনও শুরু হয়ে গেছে।

ইন্দীরা গান্ধীর কাছে প্রচুর মাথা নুইয়েছিলেন তারা পিতা শেখ মুজিবুর রহমান। কিন্তু তাতে পদ্মার পানি মিলেনি, তিন বিঘা করিডোরও জুটিনি। বরং তাতে বেরুবাড়ী গেছে, পদ্মার পানিও গেছে। তাঁর আমলে সীমান্ত বাণিজ্যের নামে ভারত বাংলাদেশের অর্থনীতির তলা ধ্বসিয়ে দূর্ভিক্ষ উপহার দিয়েছিল। ক্যারান্সি নোট ছাপানোর কন্ট্রাক্ট নিয়ে শত শত কোটির বেশী নোট ছেপে সে নোট দিয়ে লুটে নিয়েছিল সমগ্র বাংলাদেশ। শেখ হাসিনা নিজেও কোলকাতার এক সভায় প্রধানমন্ত্রী নয়, মুখ্যমন্ত্রী রূপে আখ্যায়ীত হয়েছেন। এই হল ভারতীয়দের কাছে তাঁর মান-সম্মান। তাঁর পিতাকেও দিল্লির শাসকচক্র নিজেদের সেবাদাস ছাড়া বেশী কিছু ভাবেনি।২৫সালা দাসচুক্তি স্বাক্ষরে বাধ্য করেছিল তো তেমন একটি ধারণার কারণেই। নইলে কোন স্বাধীন দেশের স্বাধীন প্রধানমন্ত্রীর সাথে কোন দেশ কি এমন চুক্তি করে?    

 

শেখ হাসিনার ধর্মব্যবসা

সকল ব্যবসারই একটি অভিন্ন লক্ষ্য থাকে। সেটি মুনাফা লাভ। আর সে মুনাফা লাভের লক্ষ্যে ব্যবসায়ী শুধু পূঁজি বিনিয়োগই করে না, সে পূজির পিছনে শ্রম দেয়, মেধা দেয় এবং প্রয়োজনে প্রচুর সময়ও দেয়। বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য যে শুধু হাটবাজারে হয় তা নয়। সবচেয়ে বড় ব্যবসাটি হয় রাজনীতির ময়দানে। সেখানে যে শুধু অর্থ দিয়ে ব্যবসা হয় তা নয়, ধর্ম নিয়েও। রাজনীতির ব্যবসার মূল লক্ষ্য ক্ষমতা লাভ। সেক্যুলার দোকানী তার দোকানে পুস্তকের কাটতি বাড়াতে শুধু কোরআন-হাদীসই রাখে না, গীতা-রামায়ন-বাইবেলও রাখে। সব ক্রেতার মন জোগানোই তার ব্যবসা। তেমনি অবস্থা সেক্যুলার রাজনীতিকের। যাদের ভোট আছে তাদের কাছে গিয়েই তারা ধর্না দেয়। ফলে মন্দির, মণ্ডপ বা গীর্জায় গিয়ে তাদের দেব-দেবী বা ধর্মীয় আচারের প্রতি একাত্ম হওয়াতে যদি ভোটপ্রাপ্তির সম্ভাবনা বাড়ে তবে সেটি করতে তারা পিছুপা হয় না।

ধর্ম-ব্যাবসায়ীর ব্যবসা ধরা পড়ে তারা চাল-চলন, কথাবার্তা ও ভণ্ডামী দেখে। প্রকৃত ধার্মিকেরা কখনও লোক দেখানোর জন্য ধর্ম পালন করেন না, সময় বুঝেও তারা ধার্মিক হন না। সর্ব সময়েই তারা ধার্মিক। ধর্মব্যবসাটি অতি সহজে ধরা পড়ে ইসলামের ক্ষেত্রে। কারণ, এখানে ধর্ম পালন করতে হয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে। ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন বিধান, তাই সে বিধানের অনুসরণ যেমন নামায-রোযা-হজ-যাকাতে ঘটাতে হয়, তেমনি ঘটাতে হয় রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিসহ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে। প্রতিক্ষণ ও প্রতিকর্মে তাকে ঈমানকে সঙ্গে নিয়ে  চলতে হয়; ঈমান কখনোই জায়নামাজে ফেলে আসার বস্তু নয়। তাই ধর্মপালনে মৌসূমী হওয়ার সুযোগ ইসলামে নাই। তাকে ঈমানদারকে মুসলিম হতে হয় প্রতি বছর, প্রতি মাস, প্রতি দিন ও প্রতিক্ষণের জন্য। আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঝাণ্ডা হাতে নিলে সে বিদ্রোহীর নামায-রোযা-হজ-উমরাহর কি কোন মূল্য থাকে? তাছাড়া মুসলমান হওয়ার শর্ত হলো, আল্লাহর উপর বিশ্বাসের আগে সকল দেব-দেবী ও উপাস্যের উপর অবিশ্বাসের ঘোষণাটি সর্বপ্রথম দিতে হয়। ফলে আল্লাহর উপর ঈমান আর মা দুর্গার উপর আস্থা –এ দুটো একসাথে চলে না। যখন একসাথে শুরু হয় তখন বুঝতে হবে, এর মধ্যে ধর্ম নেই। ব্যবসা আছে। সেক্যুলার দোকানদার যেমন কোরআন-হাদীস আর গীতা-মহাভারতকে একই আলমারিতে রাখে, এরাও তেমনি দূর্গা আর আল্লাহকে একই সাথে স্থান দেয়। 

সরকারি কর্মচারি মাত্রই কর্ম জীবনে বহু কর্ম দেশের জন্য করেন। তবে রাষ্ট্রদ্রোহী রূপে গণ্য হওয়ার জন্য দেশের বিরুদ্ধে একটি মাত্র বিদ্রোহ এবং দেশের শত্রুর সাথে মাত্র একটি বার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হওয়ার ঘটনাই যথেষ্ঠ। তখন তাঁকে ফাসিতে ঝুলতে হয়। তেমনি আল্লাহর একটি মাত্র হুকুমের অবাধ্যতাই প্রমাণ করে এমন অবাধ্য ব্যক্তিটি প্রকৃত মুসলিম নয়, সে কাফের। এ জন্যই যারা প্রকৃত ধার্মিক তারা ইসলামের প্রতিটি হুকুম পালনে নিষ্ঠাবান। এবং শাসকের আসনে বসলে আপোষহীন হয় শরিয়তের প্রতিষ্ঠায়। তার কাছে তখন আদর্শ হয় খোলাফায়ে রাশেদা।

প্রশ্ন হলো, শেখ হাসিনা নিজেকে মুসলিম রূপে দাবী করলেও তাঁর রাজনীতিতে ইসলাম কোথায়? তাঁর দলেই বা ইসলাম কই? শেখ হাসিনার রাজনৈতিক আদর্শ যে ইসলাম নয় সেটি তিনি গোপন রাখেননি। তাঁর আদর্শ জাতীয়তাবাদ ও সেক্যুলারিজম। সেক্যুলারিজম তাঁকে ইসলামে অঙ্গিকারবদ্ধ হতে বাধা দেয়। বরং ইসলামের অনুশাসনের প্রতি অঙ্গিকারবদ্ধতা তাঁর দৃষ্টিতে গণ্য হয় সাম্প্রদায়িকতা রূপে। শেখ হাসিনা একজন জাতীয়তাবাদী, এখানে জাতীয়তাবাদের ভিত্তি বাংলা ভাষা ও বাংলার ভূমি। এ ভাষা ও ভূগোলভিত্তিক জাতীয়তাবাদ তার জন্য অসম্ভব করে অন্য ভাষাভাষিদের আপন করে নিতে। ইসলামে এমন ধারণা তাই হারাম; যেমন হারাম হল সূদ, ঘুষ ও বেশ্যাবৃত্তি। কিন্তু বাংলাদেশে সূদ, ঘুষ ও বেশ্যাবৃত্তি যেমন প্রবল ভাবে বেঁচে আছে, তেমনি জাতীয়তাবাদ এবং সেক্যুলারিজমও প্রবল ভাবে বেঁচে আছে। এবং সেটি অতি প্রবল ভাবে বেঁচে আছে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের রাজনীতিতে। রাজনীতির ময়দানে মুনাফা বাড়াতে তারা হিন্দু, বৌদ্ধ ও খৃষ্টানদের দরবারেও হাজির হন। হিন্দু ভোটপ্রাপ্তির লক্ষ্যে যে চেতনা নিয়ে পূজামন্ডপে তিনি কথা বলেন সেটি বিশুদ্ধ হিন্দুর। তবে তাঁর ভণ্ডামিটি হলো, সেখানে তিনি নিজেকে হিন্দু রূপে পরিচয় দেননি, বরং নিজের মুসলিম পরিচয়টিকে ধরে রাখার চেষ্টা করেন। নিজে যে নামায পড়েন সেটিও বলেন।  

 

প্রকল্প ইসলাম বিনাশে

শেখ হাসিনার অন্যতম পরামর্শ দাতা হলো তার পুত্র সাজিব ওয়াজেদ জয়। সাজিব ওয়াজেদের ভয় বাংলাদেশে ইসলামের জাগরণ নিয়ে। সে জাগরণ কিভাবে রুখা যায় তা নিয়ে সে একটি প্রবদ্ধ লিখেছে। তবে সেটি সে তিনি একা লেখেনি। লেখা হয়েছে একজন মর্কিনীর সাথে যৌথ ভাবে। প্রবন্ধটির নাম “Stemming the Rise of Islamic Extremism in Bangladesh” অর্থাৎ “বাংলাদেশে ইসলামী চরমপন্থিদের উত্থান কীভাবে রুখা যায়” এ শিরোনামে। নিবন্ধটি “Harvard International Review” জার্নালের ২০০৮ সালের নভেম্বর সংখ্যায় ছাপা হয়েছে। সে নিবন্ধে বাংলাদেশে কীভাবে সেক্যুলারিজম প্রতিষ্ঠা করা যায় তার একটা রোডম্যাপ দেয়া হয়েছে। সেক্যুলারিজম প্রতিষ্ঠার পথে শত্রু রূপে দেখানো হয়েছে বাংলাদেশের মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে এবং সে সাথে আর্মি ও প্রশাসনে যে সব ইসলামপন্থি ব্যক্তিবর্গ চাকুরিরত তাদেরকে। সেক্যুলারিজম প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে স্ট্রাটেজী রূপে যে প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে তা হল: (1) displacing Islam and Islamic symbols from the political landscapes of Bangladesh, and (2) reclaiming the entire space of Islam for BAL. এর অর্থ হল:এক).বাংলাদেশের রাজনীতির অঙ্গন থেকে ইসলাম এবং ইসলামি প্রতীকগুলোর অপসারণ, এবং দুই). যে ক্ষেত্রগুলোতে ইসলামের অবস্থান সেগুলোর উপর আওয়ামী লীগের দখলদারি প্রতিষ্ঠা করা। মনে রাখতে হবে,সাজিব ওযাজেদ জয় শুধু শেখ হাসিনার পুত্রই নয়,তিনি শেখ হাসিনা পরামর্শদাতাও। আর পরামর্শ তো দেয়া হয় সেগুলো বাস্তবায়ন করার জন্য। সে প্রস্তাবনাগুলো যে বাস্তবায়ীত হচ্ছে তার আলামত তো বহু। আজ দেশের ইসলামি দলগুলোর উপর নির্যাতনের যে স্টীমরোলার চালানো হচ্ছে তা তো তাদের হাত থেকে দেশের রাজনীতির অঙ্গণ মূক্ত করার লক্ষ্যেই।

তবে সেক্যুলারিজমের প্রতিষ্ঠা বাড়াতে তাদের লক্ষ্য শুধু রাজনীতির ময়দান থেকে ইসলাম এবং এতদিনের প্রতিষ্ঠিত প্রতীকগুলো সরানো নয়। বরং খোদ জনগণের মগজ থেকে ইসলামের অপসারণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা শক্তিবর্গের এজেণ্ডাও একই রূপ। আওয়ামী লীগ চায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ সকল পশ্চিমা শক্তিবর্গ একাজে আওয়ামী লীগকে পার্টনার রূপে গ্রহণ করুক। শেখ হাসিনার পুত্র সে ওকালতিই করেছেন উক্ত নিবন্ধে। তবে অন্যদের মাঝে যাই হোক, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের চিন্তা-চেতনায় সেক্যুলারিজমের বীজ যে কতটা সফল ভাবে ঘটেছে তার জ্বলন্ড নজির খোদ শেখ হাসিনা নিজে। তবে সেক্যুলারিজমের টার্গেট মুসলমানদের মগজ থেকে ইসলামের অপসারণ হলেও অনুরূপ টার্গেট হিন্দুধর্ম, খৃষ্টান ধর্ম বা বৌদ্ধধর্ম নয়। শেখ হাসিনার মগজে তাই মজবুত ভাবেই রয়ে গেছে দুর্গাদেবীর প্রতি অতিবিশ্বাস ও অতিভক্তি।

তবে সেক্যুলারিস্টদের লক্ষ্য, নামায-রোযা-হজ-যাকাত থেকে মুসলিমদের সরানো নয়। মসজিদ মাদ্রাসাগুলো বন্ধ করাও নয়। বরং এগুলি বাঁচিয়ে রেখে ইসলামকে শক্তিহীন করা। কোন গাড়িকে অচল করার জন্য সব ক’টি চাকা খুলে নেয়া জরুরী নয়। একটি মাত্র চাকা খুলে নিলেই সেটি চলার সামর্থ হারায়। ব্রিটিশগণ  যখন ভারতের শাসন ক্ষমতা কুক্ষিগত করে তখন ইসলামের সবগুলো খুঁটি ধ্বংস করেনি, নামায-রোযা-হজ-যাকাতে তারা হাত দেয়নি। বরং তারা নিজ উদ্যোগে কোলকাতায় আলীয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছে। তার হাত দিয়েছিল জিহাদ বিষয়ক শিক্ষায়। সে লক্ষ্যে কঠোর ভাবে নিয়ন্ত্রিত করেছে দ্বীনি শিক্ষার সিলেবাস। হায়েজ-নিফাজের মসলা, নফল-সূন্নত-ওয়াজেবের প্রকারভেদ, শিয়া-সূন্নীর বিতর্ক, হানাফী-শাফেয়ী-মালেকী-হাম্বলীদের বিরোধ -এরূপ নানা বিষয়ে বিস্তর পড়াশুনার আয়োজন থাকলেও পাঠ্য তালিকা থেকে সুপরিকল্পিত ভাবে বাদ দিয়েছে জিহাদ বিষয়ক কোরআন-হাদীসের নির্দেশনাবলি। ফলে ছাত্ররা বেড়ে উঠেছে ইসলামের উপর অপূর্ণাঙ্গ ও বিকৃত ধারণা নিয়ে।

আজও একই ষড়যন্ত্র চলছে। মার্কিনীরা হোয়াইট হাউসে ইফতার পার্টি দেয়। নামাযের জন্য জায়নামাযও পেড়ে দেয়। অথচ এরাই মুসলিম দেশগুলিতে শিক্ষার সিলেবাস নিয়ন্ত্রণে নেমেছে। তাদের চাপে মাদ্রাসাগুলো বাদ দিচ্ছে জিহাদ বিষয়ক বই। সে মার্কিনীদের সাথে হাত মিলিয়েছে শেখ হাসিনার সরকার। তারই আলামত, মার্কিনীদের খুশি করতে সরকার পুলিশ ও র‌্যাবের সেপাইদের ময়দানে নামিয়েছে জিহাদ বিষয়ক বই বাজেয়াপ্ত করার। জিহাদ বইগুলোকে বলছে জঙ্গিবাদী বই। অথচ জিহাদ ফরজ। এবং জিহাদ লোপ পেলে বিলুপ্ত হয় মুসলমানের প্রতিরক্ষার সামর্থ। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিবর্গ এটি করছে মুসলিম দেশে তাদের প্রতিষ্ঠিত দখলদারিকে দীর্ঘস্থায়ী করার লক্ষ্যে।   

 

মুসলিমের ঈমানী দায়ভার

ঘরে আগুণ লাগলে দায়ভার বেড়ে যায়। সে ঘরের নারী-পুরুষ এবং শিশুরাই শুধু নয়, সে আগুণ নেভাতে প্রতিবেশীরাও তখন প্রাণপনে দৌড়াদৌড়ি শুরু করে। এমন বিপদে কেউ ঘুমিয়ে থাকলে ঘর বাঁচে না, তেমনি সেও নিজে বাঁচে না। সে সময় জায়নামাযে বসে ইবাদতে মগ্ন হলে প্রাণনাশ হয়। তেমনি মুসলিম ভূমির উপর শত্রুর হামলা শুরু হলে মসজিদ-মাদ্রাসায় ইবাদতে নামলে মুসলিম ভূমির সুরক্ষা হয় না। তখন ইবাদতের স্থান জিহাদের ময়দানে। নামায তখন মসজিদে নয়, জিহাদের ময়দানে গিয়ে পড়তে হয়। ১৭৫৭ সালে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ হামলার বিরুদ্ধে সে জিহাদ হয়নি বলেই ১৯০ বছরের গোলামী জুটেছিল। তেমন কোন প্রতিরোধ ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ অবধি ভারতীয় লুন্ঠনের বিরুদ্ধে হয়নি বলেই হাজার হাজার মানুষকে দুর্ভিক্ষে মারা যেতে হয়েছে। তখন লুন্ঠিত হয়েছে হয়েছে বেরুবাড়ী এবং হাজার হাজার কোটি টাকার সামরিক-বেসামরিক সম্পদই শুধু নয়, ধ্বংস করা হয়েছে দেশের শিল্প। তখন হাজার হাজার মানুষকে মারা যেতে হয়েছে ভারতীয় স্বার্থের সেবাদাস রক্ষি বাহিনীর হাতে। একই রূপ বিপর্যের মুখে আজকের বাংলাদেশ।

আজ হামলার শিকার শুধু বাংলাদেশের ভূগোল,নদ-নদী,সমূদ্রসীমা,শিল্প ও সংস্কৃতিও নয়, প্রচণ্ড হামলা শুরু হয়েছে দ্বীন ইসলামের উপর। অসম্ভব করা হয়েছে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা। ইসলামের প্রতিষ্ঠা প্রতিরোধে আওয়ামী লীগ সরকার আন্তর্জাতিক শত্রুদের সাথে কোয়ালিশন গড়েছে। শতকরা নব্বই ভাগ মুসলমানের দেশে আজ নাস্তিক কম্যুনিস্ট, ধর্মহীন সেক্যুলার,পৌত্তলিক হিন্দু, খৃষ্টান ও বৌদ্ধদের নিজ নিজ ধর্ম, কর্ম ও রাজনীতির পুরা আজাদী দেয়া হয়েছে। অথচ ইসলামের প্রতিষ্ঠা নিয়ে রাস্তায় নামলে তাদের উপর হামলা শুরু হয়। তাদেরকে কারাগারে তোলা হয়। পায়ে দণ্ডবেড়ি পড়ানো হয়। মন্দিরে দেবদেবীর পুঁজা দেখে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মনে আনন্দের হিল্লোল শুরু হয়, অথচ রাস্তায় আল্লাহু আকবর ধ্বনি শুনলে তাদের হামলায় হিংস্রতা বেড়ে যায়। এমন হামলার মুখে মুসলিমদের কাজ কি? দায়িত্বই বা কি? সেটি কি ঘুমিয়ে যাওয়া? ইসলামের শত্রুদের সামনে আত্মসমর্পণ করা এবং তাদের বিজয়-উৎসবে শামিল হওয়া?

পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, “আমি মুমিনদের জানমাল ক্রয় করে নিয়েছি জান্নাতের বিনিময়ে।” আল্লাহতায়ালার এ ক্রয় কি ইসলামের শত্রু শক্তির কাছে আত্মসমর্পণের লক্ষ্যে? কোরআনের ভাষায় সেটি তো এক মহান মিশন নিয়ে লড়াইয়ের। এবং সে লড়াইয়ে আত্মত্যাগের। ইতিহাসের কোন কালেই কোন বিজয় বা গৌরব আত্মসমর্পণে আাসেনি,এসেছে আত্মত্যাগে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা তাঁর ক্রয়কৃত মুমিনদের মিশন রূপে যা বলেছেন তা অতি সুস্পষ্ট। ইসলাম ও মুসলমানদের উপর শত্রুর হামলা হলে তাদের দায়িত্ব হবে,“তাঁরা যুদ্ধ করবে আল্লাহর রাস্তায়, তাঁরা (এ যুদ্ধে ইসলামের শত্রুদের) হত্যা করবে এবং নিজেরাও নিহত হবে।”–(সুরা তাওবাহ,আয়াত ১১১)। অথচ বিদেশী শক্তির তাঁবেদারগণ আল্লাহর নির্দেশিত এ মিশন থেকে মুসলমানদের হটাতে চায়। ইসলামের বিরুদ্ধে এটিই হলো শত্রুদের সবচেয়ে ভয়ানক বিনাশী প্রকল্প। এ প্রকল্প সফল হলে মুসলমান শুধু মহান আল্লাহর ক্রয়কৃত আমানত হওয়ার মনর্যাদাই হারাবে না,হারাবে দুনিয়াবী জীবনের গৌরব এবং আখেরাতের পুরস্কার। দেশ হবে অরক্ষিত। এবং জনগণ পরিনত হবে শয়তানি শক্তির শৃঙ্খলিত গোলামে। এবং জনগণের পায়ে গোলামীর বেড়ি পড়ানোর কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছে শেখ হাসিনা ও তার দল। ফলে শেখ হাসিনার ক্ষমতায়  থাকাতে বাঙালী মুসলিমের সামনের দিনগুলি আরো ভয়ানক হবে -তা নিয়ে কি কোন সন্দেহ আছে? ১ম সংস্করণ ১৬/১০/২০১১; ২য় সংস্করণ ২৭/১০/২০২০   

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *