স্বাধীনতা ও ইসলামী রাষ্ট্রবিপ্লবের স্বার্থে একাত্তরের বয়ানের দাফন কেন জরুরি?
- Posted by Dr Firoz Mahboob Kamal
- Posted on January 3, 2026
- Bangla Articles, Bangla বাংলা, বাংলাদেশ
- No Comments.
ফিরোজ মাহবুব কামাল
বয়ানের গুরুত্ব এবং দুষ্ট বয়ানের নাশকতা
মুসলিম জীবন অতি গুরুত্বপূর্ণ দুটি পবিত্র ইস্যু হলো: এক). স্বাধীনতা, দুই). ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ। মুসলিম রূপে বাঁচা ও বেড়ে উঠার জন্য স্বাধীনতা যেমন অপরিহার্য, তেমনি অপরিহার্য হলো ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ। এ দুটি ক্ষেত্রে কোন আপোষ চলে না। জিহাদ ফরজ হয়ে যায় যখন স্বাধীনতা কেড়ে নেয়া হয় বা ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের কাজে বাধা দেয়া হয়। তাছাড়া এ দুটির একটি আরেকটির পরিপূরক। স্বাধীনতা ছাড়া ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণে অংশ নেয়ার সুযোগ মেলে না, তেমনি ইসলামী রাষ্ট্র ছাড়া পূর্ণ ইসলাম পালনের স্বাধীনতা মেলে না। তখন অসম্ভব হয় পূর্ণ ইসলাম পালন। তখন শরিয়ার ন্যায় অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি শুধু কিতাবেই থেকে যায়।
বাংলাদেশে বুকে স্বাধীনতার সুরক্ষা ও ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের পথে মূল বাধাটি হলো একাত্তরের দুষ্ট বয়ান। বস্তুত ভারতের উস্কানিতে এ বয়ানটির জন্মই দেয়া হয়েছিল বাঙালি মুসলিমের স্বাধীনতা ও ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের অধিকার কেড়ে নেয়ার জন্য। কারণ, ভারতের রয়েছে প্রচণ্ড ইসলামভীতি। তাছাড়া কোন রাষ্ট্র ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত হলে সেটি আর সাধারণ রাষ্ট্র থাকে না; সেটি মহান রব’য়ের নিজ সার্বভৌমত্ব ও নিজ আইনে শাসিত তাঁর নিজস্ব রাষ্ট্রে পরিণত হয়। সে রাষ্ট্রের রক্ষায় ফিরেশতারা এসে খাড়া হয়। তখন সে রাষ্ট্রের ভিশন, মিশন ও এজেন্ডা নিজ ভূগোলের সীমানায় সীমিত থাকে না, দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ এক বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয়। নবীজী (সা:)’য়ের রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে তো সেটিই হয়েছে। জাতীয়তাবাদী, রাজতন্ত্রী বা সেক্যুলার রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে সেটি হয়না।
একাত্তরের বয়ান এতো কাল কাজ করেছে ইসলামপন্থীদের উপর সর্বপ্রকার দমন ও পীড়নের পক্ষে বৈধতা উৎপাদনে। মুজিব ক্ষমতায় এসেই কেড়ে নেয় ইসলামপন্থীদের রাজনীতির স্বাধীনতা। এবং নিষিদ্ধ করা হয় সকল ইসলামী দলকে। নেতাদের কারাগারে তোলা হয়েছে। ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের যে কোন উদ্যোগ গণ্য হয়েছে জঙ্গিবাদী সন্ত্রাস রূপে। সে অভিযোগে গুম করা, হত্যা করা এবং আয়না ঘরে রাখা জায়েজ করা হয়েছে। এভাবেই বাংলাদেশের মত একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে অসম্ভব করা হয়েছে পূর্ণ ইসলাম পালন।
মিথ্যা ধর্ম ও মিথ্যা মতবাদের ন্যায় মিথ্যা বয়ানের নাশকতা ভয়াবহ। জালেম শাসকেরা তাদের প্রতিপক্ষকে নির্মূলের লক্ষ্যে যুগে যুগে ইচ্ছামত বয়ান উৎপাদন করেছে। বয়ানের মাধ্যমে মানুষের গায়ে ইচ্ছামত লেবেল এঁটে দিয়েছে এবং তাদেরকে হত্যাযোগ্য বানিয়েছে। ফিরাউন হযরত মূসা (আ:)’য়ের বিরুদ্ধে বয়ান খাড়া করেছিল বিদ্রোহ ও দেশে অরাজকতা সৃষ্টির। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকার দেশপ্রেমিক ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামীদের দুষ্কৃতিকারী বলেছে। তেমনি আওয়ামী ফ্যাসিস্টরা ১৯৭১’য়ের পাকিস্তানপন্থীদের স্বাধীনতা বিরোধী, গণশত্রু ও গণহত্যাকারি বলেছে।
তবে বয়ানের ইতিবাচক গুরুত্বও রয়েছে। বয়ানের অর্থ বিবৃতি। যে কোন রাজনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক বিপ্লবের শুরুটি হয় বয়ান নির্মাণ দিয়ে। বয়ানই মানুষের ধ্যান-ধারণা, কর্ম, রাজনীতি ও চরিত্র পাল্টায়। কোন দেশের ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র, শাসক ও শাসন ব্যবস্থা পাল্টাতে হলে সর্বপ্রথম সে দেশের রাজনীতির বয়ান পাল্টাতে হয়। কারণ, সে বয়ানই দেশের সংহতি, স্বাধীনতা ও ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রের পক্ষে দলিল তৈরী করে। সে সাথে সে বয়ান জনগণের মনে সরকারের পক্ষে বৈধতা উৎপাদন করে। বস্তুত সে বয়ানই নির্ধারণ করে সমাজ ও রাষ্ট্রের বুকে কোনটি কাঙ্খিত ও অপরিহার্য এবং কোনটি ঘৃণ্য ও পরিতাজ্য। বয়ানই বলে দেয়, কারা দেশের মিত্র এবং কারা শত্রু।
এজন্যই ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগে বহু বছর ধরে মুসলিম লীগের নেতৃবৃন্দ এবং মুসলিম চিন্তাবিদগণ ভারত ভেঙে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পক্ষে শক্তিশালী বয়ান উৎপাদন করেছেন। তারা বুঝতে পারেন, ভাষা, বর্ণ ও অঞ্চলের নামে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মুসলিম রাষ্ট্র গড়ে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিমদের স্বাধীনতা বাঁচানো যাবে না। সেগুলি সংখ্যারিষ্ঠ হিন্দুরা সহজেই দখল করে নিবে। স্বাধীনতা বাঁচাতে হলে যেমন বিশাল ভূগোল চাই, তেমনি চাই বিশাল জনবল, সামরিক বল ও অর্থনৈতিক বল। তাই বৃহৎ রাষ্ট্র নির্মাণ করা নবীজী (সা:)’র শ্রেষ্ঠতম সূন্নত। তিনি ১০ বছরের মধ্যেই মদিনার ক্ষুদ্র গ্রামীন রাষ্ট্রকে বাংলাদেশের চেয়ে ২০ গুণ বৃহৎ এক বিশাল রাষ্ট্রে পরিণত করেছিলেন। নবীজী (সা:)’র সে মহান সূন্নতের সাথে গৌরব যুগের মুসলিমগণ গাদ্দারী করেননি। তাই তারা খোলাফায়ে রাশেদা, উমাইয়া, আব্বাসীয় ও উসমানিয়া আমলের বিশাল ভূগোল ভাঙতে একাত্তরের বাঙালি মুসলিমদের ন্যায় ভাষা ও বর্ণ ভিত্তিক রাষ্ট্রের নির্মাণে গৌরব বাড়ানোর লক্ষ্যে কোন মুক্তিযুদ্ধের বয়ান উৎপাদন করেনি। এবং মুক্তিযুদ্ধের নামে ভারতের ন্যায় কোন পৌত্তলিক কাফির শক্তি থেকে অস্ত্র, অর্থ, প্রশিক্ষণ ও সামরিক সাহায্য নেয়নি।
মুসলিমদের পতনের শুরু তখন থেকেই যখন ভূগোল বাড়ানোর বদলে ভূগোল ভাঙায় মনযোগী হয়েছে। কুয়ার ব্যাঙ গর্ত খোঁজে, কারণ বিশাল সমুদ্র দেখে সে ভয় পায়। তেমনি ছোটমনের ছোট লোকেরা বৃহৎ রাষ্ট্র দেখে ভয় পায়। তাই তারা বৃহৎ রাষ্ট্র ভেঙে ক্ষুদ্র রাষ্ট্র গড়ে। সে ক্ষুদ্রতা নিয়ে বাঁচাই হলো মুজিব ও তার অনুসারীদের চেতনা। একাত্তরের চেতনার মূল উপাদান হলো এই ক্ষুদ্রতা নিয়ে বাঁচার নেশা। তাই যে সব বাঙালি মুসলিম ইসলামী চেতনা ধারণ করে এবং নবীজী (সা:)’র সূন্নতের অনুসারী তারা যেমন ১৯৪৭ সালে তৎকালীন বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান গড়েছিল, তেমনি ১৯৭১’য়ে পৌত্তলিক ভারতের হাত থেকে সে অখণ্ড পাকিস্তানকে বাঁচানোরও চেষ্টা করেছিল। সে চেতনাই হলো ইতিহাসে রাজাকারের চেতনা। অপর দিকে পাকিস্তান ভাঙার প্রজেক্ট ছিল ভারতের পৌত্তলিক কাফিরদের। সে অভিন্ন প্রজেক্ট ছিল পৌত্তলিক কাফিরদের মিত্র ইসলামী চেতনাশূন্য বাঙালি ফ্যাসিস্ট, কম্যুনিস্ট ও সেক্যুলারিস্টগণ। ১৯৭১’য়ে ইসলামী বিধানের প্রতি অঙ্গীকারহীন প্রধান দলগুলি ছিল আওয়ামী লীগ, মস্কেপন্থী ও চীনপন্থী ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) এবং সে সময়ের নিষিদ্ধ ও নানা গ্রুপে বিভক্ত কম্যুনিস্ট পার্টি।
মুসলিম লীগের বুদ্ধিবৃত্তির পথ এবং আওয়ামী লীগের ষড়যন্ত্রের পথ
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ৭ বছর আগে ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ মুসলিম লীগ তার লাহোরে অনুষ্ঠিত সর্বভারতীয় সম্মেলনে মুসলিমদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র পাকিস্তানের প্রস্তাব গ্রহণ করে। সে প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে মুসলিম লীগ তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার ও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রসসহ সকল সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ভারতীয় মুসলিমদের জন্য তাদের প্রকল্পটি জানিয়ে দেয়। ফলে তারা সুযোগ পায় তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করার। অপর দিকে মুসলিম লীগের নেতাকর্মীগণ সমগ্র ভারত জুড়ে পাকিস্তানের পক্ষে জনমত গড়তে হাজার হাজার জনসভা ও মিছিল করে। সে সাথে শুরু হয় বিশাল বুদ্ধিবৃত্তিক অভিযান। কলকাতা, দিল্লি, লাহোর, মোব্বাই, করাচীর ন্যায় বড় বড় শহর থেকে অসংখ্য পত্রিকা ও পুস্তিকা প্রকাশ করে মুসলিমদের জন্য পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি কেন অপরিহার্য -সেটি বার বার বুঝিয়েছে। এরপর সে প্রকল্প নিয়ে জনগণের কাছে নির্বাচনে গেছে ও ভোটের মাধ্যমে জনগণে সমর্থণ নিয়েছে। পাকিস্তানের পক্ষের যুক্তি এতোই শক্তিশালী ছিল যে, পাকিস্তান প্রতিষ্টা দিতে মুসলিম লীগকে কোন যুদ্ধ করতে হয়নি। ১৯৪৬’য়ের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম ভোটার পাকিস্তানের পক্ষে রায়। সে নির্বাচনে বাংলার বুকে মুসলিম লীগের বিজয় ছিল বিশাল।
কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, মুজিব ও তার অনুসারীরা মুসলিম লীগের ন্যায় বুদ্ধিবৃত্তিক পথটি বেছে নেয়নি। মুজিব তার মনের কথাটি জনগণকে একবারও বলেনি। একবারও বলেনি পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ বানানোর কথা। বরং বেছে নেয় ষড়যন্ত্রের পথ -সেটি ষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকে। পাকিস্তান ভাঙার প্রকল্প নিয়ে মুজিব ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থা RAW’য়ের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়। সে চুক্তিতে সশস্ত্র বিদ্রোহ ও যুদ্ধের পরিকল্পনা ছিল। একাত্তরের যুদ্ধ ছিল বস্তুত সে ষড়যন্ত্রের চুড়ান্ত ধাপ। আর ষড়যন্ত্রে জনমত তৈরীর কাজ গুরুত্ব পায় না -সেটিই স্বাভাবিক। তাই স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে এমন কি আওয়ামী লীগের কোন দলীয় সম্মেলনেও স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে কোন প্রস্তাব গৃহীত হয়নি। দলীয় পত্রিকা দৈনিক ইত্তেফাকেও কোন নিবন্ধ ছাপা হয়নি। কোন পুস্তিকাও লেখা হয়নি। এমন কি শেখ মুজিব প্রকাশ্যে স্বাধীনতার পক্ষে কোন ডাক দেয়নি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ভোট নেয় স্বায়ত্বশাসনের নামে, স্বাধীনতার নামে নয়। নির্বাচনি জনসভাগুলিতে পাকিস্তান জিন্দাবাদও বলেছে। এবং নির্বাচনে বিজয়ের পর নামে পাকিস্তান ভাঙার কাজে -যা ছিল মুজিবের মূল লক্ষ্য। এভাবে বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধের কাজটি না করেই সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু করা হয়; এবং সেটি ভারতের ন্যায় একটি শত্রু দেশের অর্থ, অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও সামরিক সহায়তা নিয়ে।
বলা হয়ে থাকে, স্বাধীনতার দাবী তুললে মুজিবকে জেলে যেতে হতো এবং স্বাধীনতার প্রকল্প ব্যর্থ হতো। কথাটি ঠিক নয়। স্বাধীন সিন্ধু দেশ এবং স্বাধীন পাখতুনিস্তান বানানোর আন্দোলন শুরু হয়েছিল মুজিবের আগেই। কিন্তু সে জন্য কি কাউকে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়েছে? হয়নি। মুজিব যদি স্বাধীন বাংলাদেশ নির্মাণের দাবী তুলতো তবে ১৯৭১’য়ের রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধ এড়ানো যেত।
মুক্তিযুদ্ধে কেন এতো কম অংশগ্রহণ?
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে বাঙালি মুসলিমগণ দলে দলে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু তেমন সম্পৃক্ত মুক্তিযুদ্ধে দেখা যায়নি। কারণ, সে জন্য চেতনার ভূবনে বয়ান নির্মাণের কাজটি হয়নি। আওয়ামী লীগের উত্থান হঠাৎ করেই হয়েছে, হঠাৎ করেই থেমে গেছে। ফলে অস্তিত্ব বাঁচিয়ে রাখতে অস্ত্রের ও সন্ত্রাসের প্রয়োজন পড়ে। সেটি মুজিবের আমলে, তেমনি হাসিনার আমলে। তাই প্রয়োজন পড়েছে ভোটডাকাতির ও একদলীয় নির্বাচনের। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনেও আওয়ামী বড় রকমের সাফল্য দেখাতে পারিনি, বহু দলকে নিয়ে কোয়ালিশন করতে হয়েছে। মুজিবকে যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রিসভায় কোন গুরুত্বপূর্ণ পদও দেয়া হয়নি। ১৯৬৯ সালে যে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন হয়, তাতে প্রধান দল আওয়ামী লীগ ছিল না। তাতে PDM, DAC এবং সকল ছাত্র সংগঠন শামিল ছিল। তাতে ইসলামপন্থীদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
লক্ষণীয় হলো, ১৯৭১’য়ের যুদ্ধে বাংলাদেশের প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষদের মধ্য থেকে শতকরা ১ জনও অংশ নেয়নি। তখন দেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে ৭ কোটি। প্রাপ্ত পুরুষদের শতকরা ১ জন যুদ্ধে যোগ দিলে মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা ৪ লাখের বেশী হতো। অথচ প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা ছিল ১ লাখেরও কম। পরবর্তীতে নিজ দলের লোক ও স্বজনদের তহবিলে মোটা অংকের ভাতা গছিয়ে দেয়ার জন্য বিপুল সংখ্যায় ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা বানানো হয়। সে জালিয়াতির কারণে একাত্তরের বহু শিশুও মুক্তিযোদ্ধার ভাতা পাচ্ছে। রণাঙ্গণে যোদ্ধা না থাকায় মুক্তিবাহিনী তার সাড়ে ৮ মাসের যুদ্ধে কোন একটি জেলা দূরে থাক একটি থানাও দখলে নিতে পারিনি। এ কারণেই মুক্তি বাহিনী নয়, বরং ভারত তার বিশাল সামরিক সেনাবাহিনী নিয়ে যুদ্ধ করে পুরা দেশ মুজিবের হাতে তুলে দেয়। আগরতলা ষড়যন্ত্র এভাবেই পূর্ণতা পায়। অথচ মুজিব ও তার অনুসারীরা যদি পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ নির্মাণের পক্ষ বুদ্ধিবৃত্তিক কাজটি আগে করতো তবে একাত্তরের রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধের প্রয়োজন হতো না -যেমন প্রয়োজন পড়েনি পাকিস্তানের নির্মাণে তখন ভারতের উপর নির্ভর করতে হতো না।
রাজনৈতিক দখলদারি ও বু্দ্ধিবৃত্তিক দখলদারি
ভূ-রাজনীতির নিয়ম হলো, প্রতিটি দেশে রাজনৈতিক দখলদারি ও বু্দ্ধিবৃত্তিক দখলদারি একত্রে চলে। অনেক সময় বুদ্ধিবৃত্তিক অধিকৃতির কাজের শুরু হয় রাজনৈতিক অধিকৃতির পর। যেমন একাত্তরে আওয়ামী লীগের ফ্যাসিস্টদের হাতে দেশ দখলের পর শুরু হয় চেতনা পরিবর্তনের কাজ। সে পরিবর্তিত চেতনার নাম দেয় একাত্তরের চেতনা -যার মধ্যে স্থান পায় ভারতের প্রতি দাসত্ব, ধর্মনিরপেক্ষতার নামে ইসলামীবৈরীতা, জাতীয়তাবাদী ফ্যাসিবাদ এবং বাঙালি সংস্কৃতির নামে হিন্দুত্বায়ন। একাজে হাতিয়ার রূপে কাজ করে বাংলাদেশ ও ভারতের পত্র-পত্রিকা, সাহিত্য, শিক্ষা-ব্যবস্থা, পাঠ্য বই এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানসমূহ।
ইংরেজরাও জনগণের মগজ ধোলাইয়ের কাজটি করেছে দেশ দখলের পর, এবং সেটি শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে। অপরদিকে মুসলিম লীগ ভারতীয় মুসলিমদের মগজে বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লবের কাজটি প্রথমে করে; এবং সে বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লবের পর তারা ১৯৪৭’য়ে পায় রাজনৈতিক দখলদারি। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তারা সে বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধের ময়দানটি পরিত্যাগ করে এবং দর্শকের গ্যালারিতে স্থান নেয়। দৈনিক আজাদ, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক পাকিস্তানের ন্যায় তাদের প্রতিষ্ঠিত পত্রিকার দখল চলে যায় বামপন্থী, সেক্যুলারিস্ট ও জাতীয়তাবাদী কলামিস্ট ও লেখকদের হাতে। তারা পরিণত হয় পাকিস্তানের ঘরের শত্রুতে। অতি সহজে তারা দখলে নেয় পূর্ব পাকিস্তানের বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গণ। ছাত্র-ছাত্রী ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীগণ তখন কচুরিপানার ন্যায় ভেসে যায় সমাজতন্ত্র, সেক্যুলারিজম ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্রোতে। এভাবেই পাকিস্তান ব্যর্থ হয় বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যর্থতার কারণে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক লড়াইয়ের বদলে মুসলিম লীগের নেতাকর্মীরা ব্যস্ত হয়ে পড়ে হিন্দুদের পরিত্যক্ত ঘর-বাড়ি দখলে নেয়ার কাজে।
ইসলামী বিপ্লবের অলীক স্বপ্ন
ইসলামের নামে অর্জিত একটি দেশও যে ইসলামী বিপ্লব আনতে চরম ভাবে ব্যর্থ হয় -তার উত্তম উদাহরণ হলো পাকিস্তান। সে ব্যর্থতার শুরু বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লবের ব্যর্থতা থেকে। অথচ দেশটির প্রতিষ্ঠাই ঘটেছিল বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে। সে বিপ্লবে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আল্লামা ইকবাল। মুসলিমের বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লবের অর্থ ইসলামী বিপ্লব। বিপ্লব এখানে কুর’আনী জ্ঞানের। একটি দেশে কুর’আন থেকে জ্ঞানার্জনের কাজে কতটা অগ্রগতি হলো -তা দেখেই বলা যায় সেখানে ইসলামী বিপ্লবের কাজ কতটা সফল হবে। যেমন জমিতে কতটা চাষ হলো, কতটা পানি দেয়া হলো এবং কতটা উত্তম করে বীজ বুনা হলো -তা থেকে বুঝা সেখানো কীরূপ ফসল ফলবে।
মগজে মূর্তিপূজার চেতনা ধারণ করে কখনো মুসলিম হওয়া যায়না। তেমনি মুসলিম হওয়া যায়না একাত্তরের সেক্যুলার চেতনা ধারণ করে। বিপদের কারণ হলো, ফ্যাসিস্ট হাসিনা পলায়ন করলেও বহু মানুষের মাঝে একাত্তরের দুষ্ট চেতনা এখনো বেঁচে আছে। ইসলামী বিপ্লব ও ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের কাজ ব্যর্থ করার জন্য বেঁচে যাওয়া একাত্তরে সে বিষাক্ত বীজই যথেষ্ট। ইসলামের বিজয় ও স্বাধীনতার সুরক্ষার জন্য সে চেতনা নির্মূলের কাজটি অতি জরুরি; জিহাদটি এখানে অস্ত্রের নয়, বরং জ্ঞানের। লড়াই এখানে সত্যকে সত্য রূপে এবং মিথ্যাকে মিথ্যা রূপে প্রতিষ্ঠা দেয়ার। এ জিহাদে অস্ত্র হলো কুর’আনী জ্ঞানসমৃদ্ধ কথা ও লিখনী।
যেসব ধর্মব্যবসায়ীরা ওয়াজ বিক্রয় করে তাদের দ্বারা ইসলামকে বিজয়ী করার কাজ কখনো হবে না।এ কাজের জন্য খালেছ মুজাহিদ চাই -যারা কুর’আনের জ্ঞানকে হৃদয়ে ধারণ করে এবং অন্যের হৃদয়ে সে জ্ঞান পৌঁছে দেয়াকে ইবাদত মনে করে। দেশে ইসলামের বিজয় আসবে এ কুর’আনী জ্ঞানের প্লাবন আসার পর, আগে নয় -যেমনটি এসেছিল নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাদের যুগে। সশস্ত্র যুদ্ধে বিরতি থাকতে পারে, কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিক এ জিহাদটি বিরামহীন। জিহাদ এখানে জনগণে মনের মানচিত্রে বিপ্লব আনার।
একমাত্র জনগণের মনের মানচিত্রে বিপ্লবের পরই সম্ভব দেশের ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে বিপ্লব। একমাত্র তখনই সম্ভব হবে একাত্তরের চেতনার কবর। জনগণকে কুর’আনী জ্ঞানে অজ্ঞ রেখে ইসলামের বিজয়টি এক অলীক ভাবনা। আগুন যেমন উত্তাপ দেয়, কুর’আনী জ্ঞান দেয় তেমনি তাকওয়া; সৃষ্টি করে মুজাহিদ। অথচ বাংলাদেশ জুড়ে যে প্লাবনটি চোখে পড়ার মত সেটি কুর’আনী জ্ঞানের গভীর অজ্ঞতার। এদেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ কুর’আন তেলাওয়াত করে বটে, কিন্তু তারা কুর’আন বুঝায় গুরুত্ব দেয়া না। ফলে অজ্ঞতা নিয়ে বাঁচাই তাদের সংস্কৃতি। কথা হলো, অজ্ঞতার ভূমিতে কি কখনো বিপ্লব জন্ম নেয়? বরং অজ্ঞতার জোয়ার আর দুর্বৃত্তির জোয়ার একত্রে চলে। বাংলাদেশ হলো তারই উদাহরণ। এমন দেশে রাজনীতির নামে একাত্তরের দুষ্ট চেতনা বাঁচবে এবং ধর্মের নামে ধর্মব্যবসা চলবে -সেটিই তো স্বাভাবিক। বাংলাদেশে মূল বিপদ এখানেই। ০৩/০১/২০২৬
ANNOUNCEMENT
ওয়েব সাইটটি এখন আপডেট করা হচ্ছে। আগের লেখাগুলো নতুন ওয়েব সাইটে পুরাপুরি আনতে কয়েকদিন সময় নিবে। ধন্যবাদ।
LATEST ARTICLES
- হারাম যুদ্ধ, হালাল যুদ্ধ, একাত্তরের যুদ্ধ এবং প্রতারক মুজিব
- বাংলাদেশের জন্মের বৈধতার সংকট
- নির্বাচন হোক দুর্বৃত্তির নির্মূল ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার জিহাদ
- মার্কিনী জঙ্গলতন্ত্রের বিপদ: স্বাধীনতা বাঁচাতে হলে ভূগোল বদলাতে হবে
- স্বাধীনতা ও ইসলামী রাষ্ট্রবিপ্লবের স্বার্থে একাত্তরের বয়ানের দাফন কেন জরুরি?
বাংলা বিভাগ
ENGLISH ARTICLES
RECENT COMMENTS
- Fazlul Aziz on The Israeli Crimes, the Western Complicity and the Muslims’ Silence
- Fazlul Aziz on India: A Huge Israel in South Asia
- Fazlul Aziz on ইসলামী রাষ্ট্রের কল্যাণ এবং অনৈসালিমক রাষ্ট্রের অকল্যাণ
- Fazlul Aziz on বাংলাদেশে দুর্বৃত্তায়ন, হিন্দুত্ববাদ এবং ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ
- Fazlul Aziz on Gaza: A Showcase of West-led War Crimes and the Ethnic Cleansing
ARCHIVES
- January 2026
- December 2025
- November 2025
- October 2025
- September 2025
- August 2025
- July 2025
- June 2025
- May 2025
- April 2025
- March 2025
- February 2025
- January 2025
- December 2024
- October 2024
- September 2024
- August 2024
- July 2024
- June 2024
- May 2024
- April 2024
- March 2024
- February 2024
- January 2024
- December 2023
- November 2023
- October 2023
- September 2023
- August 2023
- July 2023
- June 2023
- May 2023
- April 2023
- March 2023
- January 2023
- December 2022
- November 2022
- October 2022
- September 2022
- August 2022
- July 2022
- June 2022
- May 2022
- April 2022
- March 2022
- February 2022
- January 2022
- November 2021
- October 2021
- September 2021
- August 2021
- July 2021
- June 2021
- May 2021
- April 2021
- March 2021
- February 2021
- January 2021
- December 2020
- November 2020
- October 2020
- April 2020
- March 2020
- February 2020
- January 2020
- December 2019
- November 2019
- October 2019
- September 2019
- August 2019
- July 2019
- June 2019
- May 2019
- April 2019
- March 2019
- February 2019
- January 2019
- December 2018
- November 2018
