স্বাধীনতার খরচ এবং বিপদের মুখে বাংলাদেশের স্বাধীনতা

ফিরোজ মাহবুব কামাল

 

স্বাধীনতার খরচ এবং বাঙালি মুসলিমের সামর্থ্য

স্বাধীনতা বাঁচানোর খরচটি বিশাল। আগ্রাসী প্রতিবেশীর সামনে ক্ষুদ্র দেশের সে সমার্থ্য থাকে না। স্বাধীনতা বাঁচাতে হলে জরুরি হলো দেশের বৃহৎ ভূগোল, বিশাল লোকবল, শক্তিশালী অর্থনীতি ও সামরিক বল। এখানেই একতার গুরুত্ব। স্বাধীনতা বাঁচাতে হলে তাই বিভক্তি থেকে বাঁচতে হয়। তাই ইসলামে সেটি ফরজ। দেশের ভৌগলিক আয়োতন ছোট হলে এবং সামিরক বাহিনী ক্ষুদ্র হলে স্বাধীনতা বাঁচে না। সিকিমের স্বাধীনতা তাই বাঁচেনি। ইতিহাসের এটি অতি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। স্বাধীনতা বাঁচাতে হলে এ শিক্ষা থেকে শিক্ষা নিতে হয়। শিক্ষা নিয়েছিলেন বলেই ১৯৪৭’য়ের প্রজ্ঞাবান মুসলিম লীগ নেতাগণ ক্ষুদ্র পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তানভূক্ত করেছিলেন। তাই সেদিন স্বাধীনতা বেঁচেছিল। সুবিশাল উসমানিয়া খেলাফতের মাঝে অন্তর্ভুক্ত ছিল বলেই ইসলামের কেন্দ্রভূমি আরব মধ্যপ্রাচ্য বহুশত বছর যাবত ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী হায়েনাদের আগ্রাসন থেকে নিরাপত্তা পেয়েছিল। ঔপনিবেশিক ইউরোপীয়গণ তাদের সাম্রাজ্য বাড়াতে হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে বাংলা, ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার দিকে আসলেও দীর্ঘকাল যাবত অতি কাছের কোন আরব ভূমিকে দখলে নিতে পারিনি। সে সুযোগ আসে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে উসমানিয়া খেলাফত ভেঙে যাওয়ার পর। তখন ফিলিস্তিন, ইরাক, সিরিয়ার ন্যায় আরব ভূমি ব্রিটিশ ও ফরাসীদের দ্বারা অধিকৃত হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে মিশর স্বাধীনতা হারিয়ে ফরাসী ও ব্রিটিশদের হাতে অধিকৃত হয়েছিল। কারণ, তারা উসমানিয়া খেলাফত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েল। তেমনি বাংলা ব্রিটিশের পদানত হয়েছে মোগল সাম্রাজ্য থেকে বিচ্ছিন্নতার পর। এসবই হলো বিচ্ছন্নতার পথ বেছে নেয়ার প্রতিশ্রুত শাস্তি -যার ঘোষণা এসেছে পবিত্র কুর’আনে। 

মুসলিম উম্মাহর স্বাধীনতা বাঁচানোর স্বার্থেই খেলাফত বাঁচানোর গুরুত্ব ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিমগণ গভীর ভারে বুঝেছিলেন। তাই তারা ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের হামলা থেকে খেলাফত বাঁচাতে ভারত জুড়ে তুমুল গণ-আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। সেটিই ছিল ভারতের বুকে প্রথম গণআন্দোলন। ইতিহাসে সেটি খেলাফত আন্দোলন রূপে পরিচিত। খেলাফত আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার গভীর বেদনা নিয়ে ভারতীয় মুসলিমগণ স্বপ্ন দেখেছিল দক্ষিণ এশিয়ার বুকে বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র নির্মাণের। উল্লেখ্য যে, বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম জনগোষ্ঠির বাস এই দক্ষিণ এশিয়াতেই। ফলে তাদের সে ভাবনা যুক্তিযুক্ত ছিল। তারা উদ্যোগ নেন খেলাফতের বিকল্প রূপে মুসলিম সভ্যতার পরিচয়বাহী একর্টি  civilisational state নির্মাণের। সেটিই ছিল ১৯৪৭‌’য়ে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান। মুসলিমদের কাছে civilisational state’য়ের অর্থ হলো, সে রাষ্ট্রের এজেন্ডা শুধু বিশেষ কোন ভাষা, বর্ণ ও ভূগোলের মুসলিমদের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও স্বার্থের সুরক্ষা দেয়া নয়, বরং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও স্বার্থের  সুরক্ষা নিয়ে সচেষ্ট হওয়া। পাকিস্তানের মিশন হবে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ‍” অর্থাৎ আল্লাহর এজেন্ডার সাথে একাত্মতা। সে সময় মুসলিম লীগের স্লোগান ছিল: “‍পাকিস্তান কা মতলব কিয়া? লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ‍”।  আর মিশন যেখানে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ‍”, তখন সে মিশনের ভাষা, বর্ণ ও অঞ্চল ভিত্তিক কোন সীমনা থাকেনা।

স্মরণীয় বিষয় হলো, পাকিস্তান আন্দোলনের প্রথম সারির বাঙালি মুসলিম নেতাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, দূরদৃষ্টি, সততা এবং বাংলার মুসলিমদের নিয়ে তাদের কল্যাণ চিন্তা শেখ মুজিব, তাজুদ্দীন, জিয়াউর রহমান ও সিরাজুল আলম খানদের চেয়ে বহুগুণ অধিক ছিল। খাজা নাজিমুদ্দীন লেখাপড়া করেছেন ক্যাম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী লেখাপড়া করেছেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে; তার পিতা ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি। মৌলভী তমিজুদ্দীন খান লেখাপড়া করেছেন কলকাতার প্রসিডেন্সি কলেজে। নূরল আমীন লেখাপড়া করেছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এরূপ শিক্ষাগত যোগ্যতা একাত্তরের কোন শীর্ষ নেতারই ছিল না। তাছাড়া পাকিস্তানপন্থী এসব নেতাদের কেউই মুজিবের ন্যায় গণতন্ত্রের শত্রু ছিলেন না। তাদের কেউ মুজিবের ন্যায় ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার বেতনভোগী চাকর ছিলেন না এবং ভারতীয় হিন্দুত্ববাদীদের সাথে নিয়ে তারা কখনোই কোন ষড়যন্ত্র করেননি -যেমনটি করেছে শেখ মুজিব। পাকিস্তান ভাঙা এবং দেশটিকে অধীনত করার এজেন্ডা নিয়ে ভারত ১৯৪৭’য়ে দেশটির জন্মলগ্ন থেকেই সক্রিয় ছিল। ভারতের হিন্দুত্ববাদী নেতাগণ পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা যেমন চায়নি, তেমনি দেশটি বেঁচে থাকুক -সেটিও চায়নি। 

শেখ মুজিব লালন করতে যে কোন উপায়ে গদিতে বসার অদম্য লিপ্সা। পাকিস্তান আন্দোলন কালে মুজিব মুসলিম লীগের কর্মী হলেও তার মগজে মুসলিম উম্মাহর civilisational state’য়ের ভিশন ও মিশন স্থান পায়নি। তার রাজনীতি পরিচালিত হতো কপট স্বার্থপরতা থেকে -যা পরবর্তী কালে তার শাসনামলে সুস্পষ্ট ভাবে প্রকাশ পায়। সে স্বার্থলিপ্সাই মুজিবকে ষাটের দশকে ভারতীয় এজেন্ডার সাথে একাকার করে ফেলে। ক্ষমতার লিপ্সা পূরণে মুজিব গণতন্ত্রকে কবরে পাঠায় এবং একদলীয় বাকশালের প্রতিষ্ঠা দেয়। মুজিব শুরু থেকেই জানতেন, ভারতের পাকিস্তান ভাঙার এজেন্ডা। ভারতের সে এজেন্ডাপূরণে শেখ মুজিব ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা RAW’য়ের ষড়যন্ত্রের সাথে একাত্ম হয়ে যায়। ইতিহাসে সেটিই আগরতলা ষড়যন্ত্র নামে পরিচিত। 

কম্যুনিস্ট পার্টির সদস্য এবং বিশিষ্ট লেখক বদরুদ্দীন উমর লিখেছেন, তাজুদ্দীন ছিলেন কম্যুনিস্ট পার্টির সদস্য। পাকিস্তান আমলে কম্যুনিস্টদের নানা দলে ঢুকানো হয়েছিল পাকিস্তান ভাঙার প্রকল্প বিজয়ী করার লক্ষ্যে। সে পরিকল্পনার অংশ রূপেই তাজুদ্দীনকে ঢুকানো হয়েছিল আওয়ামী লীগে। তাই যারা বলে, একাত্তরের যুদ্ধের কারণ, ১৯৭০ নির্বাচনের পর মুজিবের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করা – তারা সঠিক বলে না। এরূপ একটি যুদ্ধের পরিকল্পনা ছিল আগরতলা ষড়যন্ত্রের নীল নকশার মাঝে।  পাকিস্তান ভাঙার ভারতীয় প্রকল্পের শুরু ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই। সে যুদ্ধই চুড়ান্ত রূপ পায় ১৯৭১’য়ে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। ১৯৭০’য়ের নির্বাচনের পর শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর হলে পাকিস্তানের অখণ্ডতা বেঁচে যেত, মুজিব তাই ষড়যন্ত্র করে সেটি হতে দেয়নি।

শেখ মুজিবের পক্ষ থেকে পাকিস্তান ভাঙার প্রকল্পটির শুরু যে ১৯৪৭ সাল থেকেই -সে কথাটি মুজিব নিজে বলেছেন পাকিস্তান থেকে ফেরার পর ১৯৭২ সালে ১০ জানুয়ারীতে সোহরাওয়ার্দী উদ্দানের জনসভায়। এ বইয়ের লেখক তাঁর সে উক্তি সেদিন নিজ কানে শুনেছে। সেটি ছিল বিস্ময়ের বিষয়। কারণ, ১৯৭০ নির্বাচনে মুজিব ভোট নিয়েছিলেন অখণ্ড পাকিস্তানের ৬ দফা ভিত্তিক শাসনতন্ত্র নির্মাণের লক্ষ্যে। তিনি যে পাকিস্তান ভাঙাতে চান -সে কথাটি পাকিস্তান ভাঙার আগে একবারও বলেননি। বরং নির্বাচনি জনসভাগুলিতে “পাকিস্তান জিন্দাবাদ” স্লোগান দিতেন। এটি ছিল বাঙালি মুসলিমদের সাথে মুজিবের মিথ্যাচারীতা ও প্রতারণার রাজনীতি। মুজিবের মনের গোপন কথাটি জানালে জনগণ কি তাকে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী করতো?     

 

 

স্বাধীনতা বাঁচাতে হলে ভূগোলের অখণ্ডতা বাঁচাতে হয়

স্বাধীনতা বাঁচানোর খরচটি বিশাল। সে সামর্থ্য ক্ষুদ্র আয়তন, ক্ষুদ্র জনসংখ্যা ও দরিদ্র অর্থনীতির দেশের থাকে না। সে সামর্থ্য নাই বলেই স্বাধীনতা বাঁচাতে জার্মানী, ফ্রান্স, স্পেন ও ইতালির মত উন্নত দেশগুলিও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও NATO’তে যোগ দিয়েছে। কারণ এ দেশগুলির কোনটিরই একাকী রাশিয়ার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সামর্থ্য নাই। দেশের ভূগোল বাড়লে সে খরচ জুগানোর সামর্থ্য বাড়ে। এজন্যই সাহাবায়ে কেরাম অবিরাম ইসলামী রাষ্ট্রের আয়োতন বাড়িয়েছেন। এবং ভূগোল বাড়ানোর প্রয়োজনেই নবীজী (সা:) সাহাবাদের নসিহত করে যান, রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টানটিনোপল দখলে নেয়ার। এখানে নবীজী (সা:)’য়ের তাগিদটি ছিল মুসলিম দেশের ভূগোল বাড়ানোর। কারণ, নবীজী (সা:) চাইতেন তার মুসলিম উম্মাহ বাঁচবে স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও বিশ্বশক্তির মর্যাদা নিয়ে। সে লক্ষ্য অর্জনে বৃহৎ ভূগোলের বিকল্প নাই।

তাই যারা কোন মুসলিম দেশের আয়োতন ক্ষুদ্রতর করতে চায় -বুঝতে হবে তারা মুসলিমদের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ইজ্জত নিয়ে ভাবে না। এরাই মুসলিম উম্মাহর শত্রু।  মু’মিনের অখণ্ড ভূগোল বাঁচানোর ঈমানদারীকে তারা সাম্প্রদায়িকতা বলে। এবং নবীজী (সা:)’য়ের পথে চলাকে তারা পিছনের দিকে চলা বলে। অথচ সেটিই হলো জান্নাতের সঠিক পথ। যারা মুসলিম ভূমির বিভক্তি চায়, তারা প্রচণ্ড সংকীর্ণ ও স্বার্থপর। উম্মাহর বিরুদ্ধে নাশকতাই তাদের নীতি। তারা নিজেরা বসতে চায় শাসকের আসনে। এদের লালসা পূরণ করতেই আরব ভূমিকে ২২ টুকরোয় বিভক্ত করা হয়েছে। হিজাজের গভর্নর শরিফ হোসেন নিজে ছিল প্রচণ্ড ক্ষমতালোভী, তেমনিড ক্ষমতালোভী ছিল দুই পুত্র ফয়সাল ও আব্দুল্লাহ। শরিফ হোসেন ছিল উসমানিয়া খলিফার হিজাজ প্রদেশের গভর্নর; কিন্তু সে গাদ্দারী করে ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ নেয়। বিজয়ী হওয়ার পর ব্রিটিশ সরকার তার পুত্র ফয়সালকে ইরাকের রাজা বানায়। শরিফ হোসেন নিজে রাজা হয় হিজাজের। তার পুত্র আব্দুল্লাহ দাবী তোলে তাকেও রাজা বানাতে হবে। আব্দুল্লাহকে রাজা বানাতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল কায়রোর এক চায়ের টেবিলে সিরিয়ার মানচিত্রের এক টুকরোকে কেটে জর্দান নামে এক নতুন দেশের জন্ম দেয়। তেমনি ইরাকের এক জেলাকে বিচ্ছন্ন কুয়েত নামক এক নতুন দেশ বানানো হয়। লক্ষ্য কুয়েতের তেলের উপর দখলদারী। ওমানের পশ্চিমাংশ কেটে আমিরাত বানানো হয়।  ইরান থেকে বাহরাইন দ্বীপকে বিচ্ছিন্ন করে আলাদা দেশ বানানো হয়।

দেহের বড় বড় হাড্ডিগুলি ভেঙে গেলে সে ব্যক্তি আর দাঁড়াতে পারে না, তাকে শয্যাশায়ী হতে হয়। মুসলিম উম্মাহর ভূগোল খণ্ডিত হলে সে অভিন্ন অবস্থাটি হয় মুসলিম উম্মাহরও। তখন প্রতিরোধহীন ও আত্মসমর্পিত হতে হয়।  শত্রু শক্তি তো সেটিই চায়। তাই মুসলিম ভূগোলকে ক্ষুদ্রতর করার প্রকল্পটি ইসলামের শত্রু পক্ষের। সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ ও ফরাসীরা যেটি আরব বিশ্বে করেছে, ১৯৭১’য়ে ভারত সেটিই করেছে পাকিস্তানের মাটিতে। আর ভারতকে সহায়তা দিয়েছে মুসলিম উম্মাহর ঘরের শত্রু বাঙালি সেক্যুলারিস্ট, বাঙালি জাতীয়তাবাদী ফ্যাসিস্ট ও বাঙালি হিন্দুগণ। এভাবেই মুসলিম বিশ্ব খণ্ডিত হয়েছে ৫০টির বেশি টুকরোয়। স্বার্থান্বেষী মুজিবের কাছে তার নিজের স্বার্থটাই বড় হয়ে দাঁড়ায়; স্বার্থপূরণের সে নেশা নিয়ে মুজিব অংশ নেয় ভারতের পাকিস্তান ভাঙার প্রকল্পে। মুজিব বাংলাদেশের আমৃত্যু প্রেসিডেন্ট হতে চেয়েছিল। বাংলাদেশীদের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও মৌলিক মানবিক অধিকার নিয়ে সামান্যতম আগ্রহ থাকলে মুজিব কি কখনো গণতন্ত্রকে কবরে পাঠিয়ে একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠা দিত? একদলীয় বাকশাল প্রথা চালু করে মুজিব দেখিয়ে দেয়, জনগণের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকার তার কাছে কত তুচ্ছ। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরে নির্বাচনের আগের রাতে জনগণের ভোটের উপর ডাকাতি করে হাসিনাও জানিয়ে দেয় জনগণের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকার তার কাছে কত তুচ্ছ।    

 

 

১৯৪৭’য়ের প্রজ্ঞা ও ১৯৭১’য়ের গাদ্দারী

বৃহৎ ভারত দ্বারা ঘেরাও ক্ষুদ্র বাংলাদেশে বাঙালি মুসলিমগণ স্বাধীনতা ও জান মালের নিরাপত্তা পাবে -সে সম্ভাবনা দেখলে ১৯৪৭ সালেই মুসলিম লীগের নেতৃবৃন্দ পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তানভূক্ত না করে স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা দিতেন। সেটি করতে একাত্তরের ন্যায় যুদ্ধ করতে হতো না। শুধু দাবী করলেই চলতো। ১৯৪০’য়ের ২৩ মার্চ সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের লাহোর সম্মেলনে পাকিস্তান প্রস্তাব গৃহীত হয়। প্রস্তাবটি পাঠ করেন বাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা ফজলুল হক। সে প্রস্তাবে বাংলার অন্তর্ভুক্তি ছিল না। বাংলাকে পাকিস্তান প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয় ১৯৪৬ সালে দিল্লির মুসলিম লীগের পার্লামেন্টারী পার্টির সম্মেলনে। সে সম্মেলনে বাংলাকে পাকিস্তানভূক্ত করার প্রস্তাব পেশ করেন মুসলিম লীগ নেতা এবং বাংলার প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। সেদিন সে সভাতে প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিতে গৃহীত হয়। স্মরণীয় হলো, কোন বাঙালি মুসলিম নেতাই সেদিন বাংলার পাকিস্তান-ভূক্তির বিরোধীতা করেননি। কারণ, তাদের মনে ছিল প্রচণ্ড ভারত-ভীতি। সে সাথে ছিল উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ মুসলিম জনগোষ্ঠি রূপে মুসলিম উম্মাহর -বিশেষ করে ভারতীয় মুসলিমদের কল্যাণে কিছু করার গভীর দায়বোধ। শুধু কায়েদে আজম মহম্মদ আলী জিন্নাহ নন, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং শেরে বাংলা ফজলুল হকের ন্যায় অধিকাংশ বাঙালি মুসলিম নেতাই তাদের রাজনীতির শুরুটি করেন কংগ্রেসে যোগ দিয়ে। ফলে তারা পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান হিন্দু মানসের সাথে। এতে তারা সরাসরি জানতে পারেন ভারতীয় হিন্দু নেতাদের গভীর মুসলিম বিদ্বেষ। পাকিস্তানভূক্তির ফলেই বাঙালি মুসলিমগণ পেয়েছিল পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম রাষ্ট্রের এবং সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্রের  সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠি রূপে বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাব ফেলার সুযোগ। এমন সুযোগ বাঙালিগণ অতীতে কোন কালেই পায়নি।

তাছাড়া দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ কি কখনো সে দেশের সংখ্যালঘিষ্টদের থেকে পৃথক হয়? সমগ্র ইতিহাসে এমন কান্ড কি কখনো হয়েছে? সে কাজ তো কান্ডজ্ঞান-শূণ্য পাগলদের। সব সময় সংখ্যাগরিষ্ঠদের ভয়ে সংখ্যালঘুরা পৃথক হয়। যেমন সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু শাসনের ভীতি নিয়ে মুসলিমগণ পাকিস্তান সৃষ্টি করেছে।  ১৯৪৭’য়ে বাঙালি মুসলিম নেতাদের মাঝে যে প্রজ্ঞার পরিচয় মেলে সেটি ১৯৭১’য়ের ভারতসেবী বাকশালী ফ্যাসিস্টদের মাঝে দেখা যায়নি। বাঙালি ফ্যাসিস্টগণ ধরা দিয়েছে ভারতের ফাঁদে। বুঝতে হবে, মহান আল্লাহ তায়ালা শুধু নামাজ রোজা ও হজ্জ যাকাতের বিধান দেননি, বিধান দিয়েছেন রাজনীতি বা রাষ্ট্র নির্মাণেরও। হারাম হালালের সে বিধান ইসলাম থেকে দূরে-সরা মুসলিম নামধারী সেক্যুলারিস্ট, ন্যাশনালিস্ট, সোসালিস্ট, কম্যুনিস্ট এবং নাস্তিকদের কাছে গুরুত্ব পায়নি। পৌত্তলিকদের বন্ধু রূপে গ্রহণ করা যে হারাম -সে বিধানও তাদের কাছে গুরুত্ব পায়নি। ফলে একাত্তরে তারা ভারতীয় পৌত্তলিকদের কোলে গিয়ে উঠেছে এবং তাদেরকে সাথে নিয়ে একটি মুসলিম দেশকে ক্ষু্দ্রতর ও দুর্বল করার জন্য যুদ্ধ করেছে। নবীজী (সা:) তাঁর জীবনের সবচেয়ে বেশী সময় নামাজ রোজা ও হজ্জ যাকাত শেখাতে ব্যয় করেননি বরং ব্যয় করেছেন রাষ্ট্র নির্মাণ ও রাষ্ট্র পরিচালনা শেখাতে। সে ইবাদত পালনে তিনি আহত হয়েছেন এবং নিজের দাঁত হারিয়েছেন। সে পবিত্র কাজটি তিনি করেছেন ১০টি রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বে থেকে।  

ভাষা, বর্ণ ও অঞ্চল ভিত্তিক বিভক্তি নিয়ে কি কখনোই বিশ্বশক্তির জন্ম দেয়া যায়? একক ভাষা, একক বর্ণ ও একক অঞ্চলের মানুষদের নিয়ে ভূটানের মত বড়জোর একটি ক্ষুদ্র ট্রাইবাল রাষ্ট্রের জন্ম দেয়া যায়, কিন্তু সে পথে ইসলামী রাষ্ট্র দূরে থাক, মানবতাবাদী কোন শক্তিশালী রাষ্ট্রও প্রতিষ্ঠা দেয়া যায়না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আজ বিশ্বশক্তি; কারণ বৃহৎ ভূগোলের এ দেশটিতে রয়েছে নানা বর্ণ, নানা ভাষা ও নানা ধর্মের মানুষ। মুসলিম উম্মাহর যখন বিশ্বশক্তির মর্যাদা ছিল তখন তারাও ভাষা, বর্ণ ও আঞ্চলিকতা ভিত্তিক পরিচয়ের উর্দ্ধে উঠেছিল। এজন্যই মহান রব শুধু নামাজ রোজা ফরজ করেননি, ফরজ করেছেন একতাকেও। এবং সাবধান করেছেন বিভক্তি থেকে বাঁচতে। বিভক্তির পথ যে ভয়ানক আযাবের পথ -সে কথাটি পবিত্র কুর’আনে উল্লেখ করা হয়েছে।  

ঈমানদারকে তাই শুধু ভিন্ন বর্ণ, ভিন্ন ভাষা ও ভিন্ন এলাকার মানুষদের সাথে কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে একই জামায়াতে নামাজ পড়ার সামর্থ্য থাকলে চলে না, সামর্থ্য থাকতে হয় সে বিচিত্র মানুষদের নিয়ে একই রাষ্ট্রে একতাবদ্ধ বসবাসের সামর্থ্য। সে সামর্থ্যটি যেমন নবীজী (সা:) ও খোলাফায়ে রাশেদার আমলে দেখা গেছে, তেমনি  দেখা গেছে উমাইয়া, আব্বাসী ও উসমানিয়া খেলাফত কালে। ফলে বিশ্বের বিশাল ভূ-ভাগ জুড়ে খেলাফত বেঁচেছে প্রায় ১৩ শত বছর যাবত। খেলাফত হলো, ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইনস্টিটিউশন। মুসলিমদের সবচেয়ে বেশি জান মালের খরচ হয়েছে এই খেলাফতকে গড়তে ও বাঁচিয়ে রাখতে। সে খেলাফত যতদিন বেঁচেছিল ততদিন স্বাধীনতা ও জান মালের নিরাপত্তা বেঁচেছিল। ততদিন মুসলিম উম্মাহর হৃৎপিন্ডের উপর ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের কলোনী এবং ইসরাইল নির্মিত হয়নি। এবং গাজার ন্যায় গণহত্যা ও নৃশংস ধ্বংসকাণ্ডও ঘটেনি। , মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় নাশকতা হলো খেলাফত ভাঙা। আর এ নাশকতার কাজে সাহায্য মিলেছে ইংরেজ, ফরাসীদের ন্যায় কাফির শক্তি থেকে। এ যুগে মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে দ্বিতীয় বড় নাশকতার কাণ্ড হলো ১৯৭১‌য়ের পাকিস্তান ভাঙা। সে কাজেও সহায়তা মিলেছে আরেক কাফির শক্তি ভারতীয় পৌত্তলিকদের থেকে। যে পথ ভয়ানক আযাব আনে বাঙালি সেক্যুলারিস্ট, জাতীয়তাবাদী ও বামপন্থীরা সে পথেই একাত্তরে ধাবিত করেছে। পরিতাপের বিষয় হলো, সে ব্যর্থতার লিগ্যাসি নিয়ে ব্যর্থতার এ নায়কদের কোন অনুশোচনা চাই; বরং এখনো তা নিয়ে তাদের প্রচণ্ড অহংকার। যারা ১৯৭১’য়ে আগ্রাসী ভারতের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা বাঁচাতে যুদ্ধে নেমেছিল তাদেরকে আজও তারা স্বাধীনতার শত্রু বলে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য সমূহ বিপদের মূল কারণ এখানেই।  কারণ, স্বাধীনতার এ ঘরের শত্রুরা আবারো একাত্তরের সে ভারতীয় পথেই ফিরিয়ে নিতে চায়। ২৩/০৫/২০২৬      

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *