রাষ্ট্র কিরূপে হাতিয়ার হয় ভয়ানক অপরাধের অথবা মহা কল্যাণের?

ফিরোজ মাহবুব কামাল

 

মুসলিম দেশে মুরতাদদের দখলদারী এবং অপরাধের রাজনীতি

বাংলাদেশের ন্যায় অধিকাংশ মুসলিম দেশে চলছে মুরতাদদের দখলদারী এবং চলছে অপরাধের রাষ্ট্রীয় নীতি। প্রশ্ন হলো, মুরতাদ কারা? মুরতাদ তারাই যারা নিজেদেরকে মুসলিম রূপে ঘোষণা দেয়ার পরও ইসলামের শরিয়া বিধান মানতে অস্বীকৃতি জানায় এবং সে বিধানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। তাদের বিদ্রোহটি মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব, শুরা ভিত্তিক শাসন, প্যান-ইসলামী মুসলিম ভাতৃত্ব এবং অবিচারের নির্মূলে ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার জিহাদের বিরুদ্ধেও। বরং তারা বাঁচে স্বৈরাচার, দুর্বৃত্তি ও অবিচার নিয়ে।  তাদের বিদ্রোহের কারণেই নবীজী (সা:) যে ইসলাম প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন -সে ইসলাম মুসলিম বিশ্বের কোথাও বেঁচে নাই। ইসলামে এটি এক গুরুতর অপরাধ। অপরাধ এখানে মহান আল্লাহতায়ালার এজেন্ডাকে পরাজিত রাখার এবং শয়তানের এজেন্ডাকে বিজয়ী করার।  শুধু মুসলিম জনগণের চেতনার ভূমিতে নয়, এরা ফিতনা তথা বিদ্রোহাত্মক পরিবেশ সৃষ্টি করে সমগ্র রাষ্ট্র ও সমাজ জুড়ে।

মুসলিম হওয়ার অর্থ শুধু কালেমায়ে শাহাদত পাঠ নয়। শুধু নামাজ-রোজা ও হজ্জ-যাকাত পালন নয়। বরং সেটি হলো মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিটি হুকুমের পূর্ণ আনুগত্য নিচে বাঁচা। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুর’আনের নির্দেশ হলো, “উদ’খুলো ফিস্ সিলমে কা‌’ফফা।” অর্থ: “ইসলামে প্রবেশ করো পূর্ণ ভাবে।” এর অর্থ দাঁড়ায়, রাজনীতি, বিচার, অর্থনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, যুদ্ধ-বিগ্রহসহ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে থাকতে হবে ইসলামের পূর্ণ অনুসরণ। সেটি না হলে বিদ্রোহ হয় উপরিউক্ত কুর’আনী হুকুমের বিরুদ্ধে। ইসলামে আংশিক বা অপূর্ণাঙ্গ মুসলিম হওয়ার সুযোগ নাই। যে কোন কুর’আনী হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহই হলো বেঈমানী -সেটি কাফেরদের কাজ। রাজনীতির নামে বাংলাদেশের ন্যায় অধিকাংশ মুসলিম দেশে যা চলছে -তাতে ইসলামী বিধানের প্রতি কোথায় সে পূর্ণ আনুগত্য? বরং যা চলছে তা হলো মুসলিমদের মাঝে ফিতনা সৃষ্টি এবং ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সংঘটিত করার রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তি। বিদ্রোহ হচ্ছে জাতীয়তাবাদ, গোত্রবাদ, স্বৈরতন্ত্র, সেক্যুলারিজম ও জনগণের সার্বভৌমত্বের নামে।

তবে মুসলিম ইতিহাসে বিদ্রোহের চেষ্টা যে পূর্বে হয়নি -তা নয়। এমন কি খোলাফায়ে রাশেদার আমলেও হয়েছে। প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর (রা:)’র আমলে কিছু মুসলিম নামধারি ব্যক্তি ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঝান্ডা নিয়ে খাড়া হয়; তারা যাকাত দিতে অস্বীকার করে। সে মুরতাদদের সেদিন শাস্তি দেয়া হয়েছিল। ইসলামী বিধানের বিরুদ্ধে সেটিই ছিল প্রথম বিদ্রোহ। লক্ষণীয় হলো, তারা যে মহান আল্লাহতায়ালাকে অবিশ্বাস করেছিল বা নামাজ-রোজা পরিত্যাগ করেছিল -বিষয়টি সেরূপ ছিল  না। তাদের বিদ্রোহ ছিল সরকারি ভাণ্ডারে যাকাত দেয়ার বিরুদ্ধে। তারা নিজ দায়িত্বে যাকাত দিতে রাজী ছিল। হযরত আবু বকর (রা:) চাচ্ছিলেন, নবীজী (সা:)’য়ের আমলে যেরূপ সবাই সরকারি ভাণ্ডারে যাকাত দিয়েছে, সে রীতি বহাল রাখতে হবে। এ থেকে বুঝা যায়, মুরতাদ রূপে চিহ্নিত হওয়ার জন্য মহান আল্লাহতায়ালার সবগুলি হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হওয়ার প্রয়োজন নাই। যে কোন একটি হুকুমের বিরুদ্ধে অবাধ্যতাই এক্ষেত্রে যথেষ্ট।  

বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ইসলামের বিধান যে কত কঠোর -সেটি বুঝা যায় বনি ইসরাইলীদের বিষয়ে করুণাময় মহান আল্লাহতায়ালার সিদ্ধান্ত দেখে। বনি ইসরাইলকে তিনি সমগ্র মানব জাতির উপর মর্যাদা দিয়েছিলেন। ফিরাউনের হাত থেকে বাঁচাতে লোহিত সাগরকে তিনি দ্বিখন্ডিত করেছিলেন এবং তাদের চোখের সামনে ফিরাউনের বিশাল বাহিনীকে ডুবিয়ে হত্যা করেছিলেন। সিনা মরুভূমির উত্তপ্ত বালি ও সূর্যের প্রখর উত্তাপ থেকে বাঁচাতে তিনি তাদের মাথার উপর মেঘের সামিয়ানা লাগিয়ে দিয়েছিলেন। বছরের পর বছর আসমান থেকে খাদ্য রূপে মান্না ও সালওয়া নাযিল করেছিলেন। তাদের কোন মেহনত করতে হয়নি। পানির তৃষ্ণা মেটাতে হযরত মূসা (আ:)’র লাঠির আঘাতে বিশাল পাথরের বুক ফেটে পানির ১২টি ঝর্ণা বের হয়। সব কিছু ঘটেছিল তাদের চোখের সামনে এবং আল্লাহতায়ালার ইচ্ছায়। এতো নিয়ামত ভোগ করার পর তারাই হযরত মূসা (আ:)’র মাত্র ৪০ দিনের অবর্তমানে নিজ হাতে বাছুরের মূর্তি বানিয়ে সেটিকে পূজা শুরু করেছিল।

হযরত মূসা (আ:) ফিরে আসলে বনি ইসরাইলীরা সে পাপের জন্য অনুশোচনা করেছিল। এবং তারা তাওবাও করেছিল। কিন্তু আল্লাহতায়ালা তাদের সে তাওবা কবুল করেননি। তাওবা কবুলের কঠোর শর্ত রাখা হয়েছিল। যারা সেদিন সে কুফুরির সাথে জড়িত ছিল তাদেরকে বলা হয়েছিল নিজ হাতে নিজেদের হত্যা করতে। সেটি ছিল তাদের কুফুরির কাফফারা। এভাবে তাদের সামনের মাত্র দু্টি রাস্তা খোলা রাখা হয়। এক). নিজেকে নিজ হাতে হত্যা করে কুফুরির কাফফারা আদায় এবং পাপের মার্জনা। দুই), অনন্ত অসীম কালের জন্য জাহান্নামের আগুন। কাফফরা আদায়ের প্রক্রিয়ায় বহু হাজার ইহুদী নিহত হয়েছিল। এরপর তাদের তাওবাকে কবুল করা হয়েছিল। এ থেকে বুঝা যায়, জনগণ যখন মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও কুফুরিতে লিপ্ত হয় তখন তাদের উপর কঠোর শাস্তিও ধার্য হয়ে যায়। তখন সে বিদ্রোহীগণ মুখে যতই নিজেদের মুসলিম রূপে জাহির করুক এবং তাওবা ও দোয়া পাঠ করুক -তা কি কবুল হয়? আল্লাহতায়ালার কাছে মাগফিরাহ পেতে হলে প্রথমে বিদ্রোহের পথ ছেড়ে পূর্ণাঙ্গ আত্মসমর্পণের পথ ধরতে হয়, সে সাথে বিদ্রোহের কাফফরাও দিতে হয়। বনী ইসরাইলীগণ সে কাফফরা পেশ করেছে নিজেদের প্রাণ নাশের মধ্য দিয়ে।

 

শরিয়ার বিলুপ্তি ঘটিয়ে কেউ কি মুসলিম থাকা যায়?

মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বনি ইসরাইলীদের বিদ্রোহটি ঘটেছিল বাছুর পূজার মধ্য দিয়ে। তাতে নেতৃত্ব দিয়েছিল সামেরী নামক ব্যক্তি। তবে আজকের মুসলিমগণ বাছুর পূজায় না নামলেও তারা বাঁচছে সর্বস্তরে বিদ্রোহ নিয়ে। সে বিদ্রোহ যেমন মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে, তেমনি তাঁর শরিয়া আইনের বিরুদ্ধে। তাদের বিদ্রোহ ইসলামের প্যান-ইসলামী মুসলিম ভাতৃত্বের বিরুদ্ধেও। সে বিদ্রোহ নিয়ে তারা ভেসে গেছে জাতীয়তাবাদ, উপজাতীয়তাবাদ, ফ্যাসিবাদ, গোত্রবাদ, স্বৈরতন্ত্র ও সেক্যুলারিজমের স্রোতে এবং প্রতিষ্ঠা দিয়েছে ৫০টির বেশি জাতীয়, উপজাতীয় বা গোত্রীয় রাষ্ট্রে। এবং ব্যর্থ হয়েছে নানা বর্ণ, ননা ভাষা ও নানা অঞ্চলের জনগণদের নিয়ে সিভিলাইজেশনাল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা দিতে -যেমন প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল গৌরব যুগের মুসলিমগণ। এসবই হলো বিদ্রোহের দলিল। বাছুর পূজা যেমন কাফেরের কাজ, তেমনি আল্লাহর শরিয়া বিধান থেকে মুখ ফিরিয়ে আদালতে মানুষের তৈরী আইনকে প্রতিষ্ঠা দেয়াও কাফেরদের কাজ। সুরা মায়েদার ৪৪, ৪৫, ৪৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহতায়ালার নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী যারা বিচারকার্য করে না তারাই কাফের, .. তারাই জালিম…. তারাই ফাসিক। প্রশ্ন হলো, যারা নিজে দেশের আদালতে মহান রব’য়ের শরিয়া আইনে স্থান দিতে রাজী নয়, তারা কি নিজেদের মুসলিম রূপে দাবী করতে পারে? দাবী করলে কি বিদ্রোহীদের সে দাবী মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে গৃহিত হয়? এটি এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, বাংলাদেশের আলেমদের মাঝে এ শরয়ী মসলা নিয়ে কোন আলোচনা নেই।   

প্রশ্ন হলো, বনি ইসরাইলীদের বাছুর পূজার চেয়ে আজকের মুসলিমদের বিদ্রোহ কি কম জঘন্য? মুসলিম ভূমিতে মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে এ বিদ্রোহে হিন্দু, খৃষ্টান বা বৌদ্ধরা নেতৃত্ব দিচ্ছে না, বরং নেতৃত্ব দিচ্ছে মুসলিম নামধারি সেক্যুলার রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীগণ। আল্লাহর আইনকে সাড়ে ১৪ শত বছরের পুরোন আইন বলে তারা উপহাসও করে। তথাকথিত আলেমদের অপরাধ, তারা এ বিদ্রোহ ও উপহাসের শুধু নীরব দর্শকই নয়, বরং বহু ক্ষেত্রে তারা মিত্র এ বিদ্রোহী রাজনৈতিক নেতাদের। শরিয়া প্রতিষ্ঠার দাবী নিয়ে এসব আলেমদের ময়দানে দেখা যায় না। বরং বহু মোল্লা মৌলভী বিএনপির ন্যায় শরিয়া বিরোধীদের ভোট দিতে বলে এবং দলটির পক্ষ থেকে নির্বাচনে প্রার্থী হয়।

বাংলাদেশে আল্লাহতায়ালার আইনকে অমান্য করে আদালতে প্রতিষ্ঠা দেয়া হয়েছে কাফের ব্রিটিশদের তৈরী কুফরি আইনকে। সে আইনে ব্যাভিচার কোন অপরাধই নয় -যদি তা উভয় পক্ষের সম্মতিতে হয়। এমন কি আইনগত সিদ্ধ, পতিতাপল্লীর নামে জ্বিনার বানিজ্য। এবং অপরাধ নয় সূদ, ঘুষ এবং মদ্যপান। এমন বিদ্রোহীদের দখলদারির কারণে সমগ্র রাষ্ট্র ও তার প্রতিষ্ঠানগুলি হয়ে পড়েছে শয়তানের হাতিয়ারে। তারা অসম্ভব করে রেখেছে সিরাতাল মোস্তাকীমে চলা। এবং অসম্ভব করেছে ইসলামের জ্ঞানলাভ করা। ফলে অসম্ভব হয়েছে ইসলামের শরিয়া বিধানের পূর্ণ অনুসরণ। মুসলিম জীবনে ঢুকেছে সূদ, ঘুষ, বিপর্দাগীর ন্যায় আল্লাহর বিরুদ্ধে নানাবিধ বিদ্রোহ। এ বিদ্রোহের বিস্তার এ‌তোই ব্যাপক যে পতিতাপল্লীর জ্বিনাকে নিরাপত্তা দিতে রাতদিন যে পুলিশ প্রহরার ব্যবস্থা করা হয় -তারও খরচ জোগায় দেশের মুসলিম নামধারী নামাজী ও রোজাদারগণ। বিস্ময়ের বিষয় হলো, সে খরচ জোগাতে বিনা প্রতিপাদে তারা নিয়মিত রাজস্বও দেয়। তাদের নামাজ-রোজা ও হজ্জ-যাকাতে পালনে প্রকৃত ঈমানদারী থাকলে -তারা কি কখনো রাজস্ব দিয়ে এভাবে জ্বিনার প্রতিপালন ও প্রতিরক্ষা দিত? তখন তারা বরং পাপের নির্মূলে ময়দানে নামতো।  

নিজ ঘরে আগুন লাগলে সে আগুন থামানোর দায়িত্ব সে গৃহে বসবাসকারী সবার। সে সাথে পাড়ার লোকেরও। চোখের সামনে ঘর জ্বলতে দেখেও সে পরিবারের বা পাড়ার কেউ যদি আগুন নিভাতে উদ্যোগী না হয় -তবে কি তাদেরকে সুস্থ বলা যায়? এমন বিবেকহীনদের কি মানুষ বলা যায়? মদিনার ক্ষুদ্র নগরীতে ইসলামী রাষ্ট্রের যখন সবেমাত্র শুরু তখন আরবের বিভিন্ন গোত্রের অসভ্য কাফেরগণ জোট বেঁধেছিল সে রাষ্ট্রকে ভূপৃষ্ঠ থেকে বিলুপ্ত করার। ১০ হাজারের অধিক মানুষ সেদিন মদিনাকে ঘিরে ধরেছিল। ইতিহাসে সে যুদ্ধকে জঙ্গে আহযাব বলা হয়। বলা হয় খন্দকের যুদ্ধও। মদিনার প্রতিরক্ষা দিতে প্রতিটি মদিনাবাসী সেদিন সর্বসামর্থ্যের বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু গাদ্দরী করেছিল চুক্তিবদ্ধ ইহুদীরা। সে গাদ্দারীর প্রাপ্য শাস্তিও তাদের দেয়া হয়েছিল।    

 

রাষ্ট্র কিরূপে হাতিয়ার হয় অপরাধের অথবা কল্যাণের?

অনৈসলামী রাষ্ট্র মাত্রই অপরাধ কর্ম তথা পাপ কর্মের হাতিয়ার। এমন রাষ্ট্র পৃথিবী পৃষ্ঠে প্রতিষ্ঠা দেয় শয়তান ও তার অনুসারীদের দখলদারী। এমন রাষ্ট্রের সৈনিক হওয়াই গুরুতর অপরাধ -যা জাহান্নামে নেয়। তাই সর্বশ্রেষ্ঠ নেক কর্ম হলো এমন রাষ্ট্রের নির্মূলে জিহাদ এবং ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ। ইসলামী রাষ্ট্র কাজ করে সর্বরূপ কল্যাণ কর্মের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার রূপে। ইসলামী রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় কল্যাণ কর্মটি হলো, রাষ্ট্র তার রাজনীতি, শিক্ষা ব্যবস্থা, মিডিয়া, প্রকাশনা ও প্রশাসনকে কাজে লাগায় জনগণকে জান্নাতের যোগ্য রূপে গড়ে তোলায়। এভাবে সর্বতোভাবে সহায়ক ক্ষেত্র প্রস্তুত করে পূর্ণ ইসলাম পালনের। রাষ্ট্রের বুক থেকে নির্মূল করে দুর্বৃত্তির এবং প্রতিষ্ঠা দেয় সুবিচারের। এটি জিহাদ তথা সর্বোচ্চ ইবাদত।  এ ইবাদতকে রাষ্ট্রীয় নীতি ও জনগণের সংস্কৃতিতে পরিণত করাই হলো ইসলামী রাষ্ট্রের মিশন। ইসলামী রাষ্ট্রের অপার কল্যাণকারীতা হলো বস্তুত এ. রাষ্ট্রীয় মিশনের কারণে।

মুসলিম জীবনের মূল বৈশিষ্ট্য হলো দুর্বৃত্তি নির্মূল ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার জিহাদ। মহান আল্লাহতয়ালার কাছে মুমিনের সবচেয়ে প্রিয়তম আমল হলো এই জিহাদ। একমাত্র জিহাদই মুনাফিকদের থেকে ঈমানদারদের পৃথক করে। বহু মুনাফিকের জীবনে নামাজ রোজা ও হজ্জ যাকাত থাকে। কিন্তু ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণ ও দুর্বৃত্ত শক্তির নির্মূলে জিহাদ থাকে না। রাষ্ট্র থেকে শরিয়া বিলুপ্ত হলেও শরিয়ার দাবী নিয়ে তারা ময়দানে নামে না। রাষ্ট্র আত্মস্বীকৃত ইসলামবিরোধীদের দখলে গেলেও তারা জিহাদে নামে না। অথচ মহান রব ‘য়ের কাছে জিহাদ এতোই গুরুত্বপূর্ণ যে, একমাত্র এ জিহাদের ময়দান থেকেই তিনি তাঁর প্রিয় শহীদ বান্দাদের জান্নাতে তুলে নেন। নিহত হলেও তিনি তাদের রিযিক দেন।

জিহাদই কাজ করে নেক আমলের সর্বশ্রেষ্ঠ হাতিয়ার রূপে। যে জনগোষ্ঠির জীবনে জিহাদ থাকে একমাত্র তারাই নির্মাণ করতে পারে সর্বশ্রেষ্ঠ কল্যাণকর রাষ্ট্র। যাদের জীবনে জিহাদ নাই, তাদের সামর্থ্য থাকে না ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের ন্যায় সর্বশ্রেষ্ঠ নেক আমলের। মানব সভ্যতার বুকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্মটি হলো এই জিহাদ। পানাহার পশুপাখীরাও করে। কিন্তু মানব কতটা সভ্য ভাবে বাঁচবে বা বেড়ে উঠবে -সেটি নির্ভর করে এই জিহাদের উপর। এই জিহাদের পথ ধরেই মুসলিমগণ শুধু বিশ্বশক্তির জন্ম দেয়নি, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতারও জন্ম দিয়েছে। যে দেশে লাগাতর জিহাদ থাকে একমাত্র সেদেশেই পূর্ণ ইসলাম পালনের সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি হয়। নইলে মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়া বিধান শুধু কিতাবেই থেকে যায়। তখন অসম্ভব হয় দুর্বৃত্তির নির্মূল ও সুবিচারের প্রতিষ্ঠা। জিহাদ বিলুপ্তির সাথে সাথে বিলুপ্ত হতে থাকে নেক আমলের সামর্থ্য ও তাড়না। তখন জোয়ার আসে পাপাচারে। এদেশটিতে দুর্বৃত্তির নির্মূলে কখনোই জিহাদ হয়নি এবং এখনো হচ্ছে না। বাংলাদেশ দুর্বৃত্তিতে ৫ বার বিশ্বে প্রথম হওয়ার মূল কারণ হলো জিহাদশূণ্যতা।  

গৃহ থেকে আবর্জনা না সরালে -সে গৃহ বসবাসের অযোগ্য হয়। তেমনি দেশ থেকে দুর্বৃত্তির নির্মূল ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার কাজটি না হলে -সেদেশও বসবাসের অযোগ্য হয। তখন ইজ্জত-আবরু ও জানমালের নিরাপত্তা থাকেনা। মহান আল্লাহতায়ালার কাছে অতি গুরুত্বপূর্ণ হলো দুর্বৃত্তিমুক্ত ও সুবিচারপূর্ণ রাষ্ট্রের নির্মাণ। কারণ, তিনি তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানবের জন্য যেমন আখেরাতে শান্তিময় জান্নাত নির্মাণ করেছেন; তিনি চান এ পৃথিবীপৃষ্ঠেও মানব মুক্তিপাক দুর্বৃত্তি ও অবিচারের যাতনা থেকে। যারা এরূপ নেক আমলের মিশন নিয়ে বাঁচে একমাত্র তাদেরই তিনি বিজয় দেন, পুরস্কৃত করেন এবং সর্বশ্রেষ্ঠ জাতির মর্যাদা দেন। প্রকৃত মুসলিম মাত্রই যেমন নামাজ নিয়ে বাঁচে, তেমনি বাঁচে জিহাদ নিয়ে। এজন্যই মহান আল্লাহতায়ালা সুরা আল ইমরানের ১১০ আয়াতে এমন মুসলিমদের সর্বশ্রেষ্ঠ জাতির মর্যাদা দিয়েছেন।

পবিত্র কুর’আনে বার বার ঘোষিত মহান আল্লাহতায়ালার নিজস্ব এজেন্ডাটি হলো, দুর্বৃত্তির নির্মূল ও সুবিচারের প্রতিষ্ঠা এবং সকল ধর্ম ও মতবাদের উপর তার মনোনীত দ্বীন ইসলামের বিজয়। মুসলিম হওয়ার অর্থই হলো, মহান রব’য়ের সে এজেন্ডার সাথে একাত্ম হওয়া। সে এজেন্ডাকে বিজয়ী করার হাতিয়ারটি হলো জিহাদ। জিহাদের সে দায়টি প্রতিটি ঈমানদারের। সে জিহাদ নিয়ে বাঁচার জন্যই ঈমানদার চায় এমন এক রাষ্ট্রের নির্মাণ যা জিহাদকে রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিণত করে। মুসলিম উম্মাহ গৌরব কালে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়েছে সে নীতি নিয়ে। জিহাদ নিয়ে বেঁচেছে বলেই মহান আল্লাহতায়ালার তাদেরকে সর্বশ্রেষ্ঠ জাতির মর্যাদা দিয়েছেন। সে মর্যাদা ছিল ততদিনের জন্যই, যতদিন তারা বেঁচেছে জিহাদ নিয়ে। জীবন থেকে জিহাদ বিলুপ্ত হলে মর্যাদাও বিলুপ্তও হয়। সেটিই হলো আজকের বাস্তবতা। দুর্বৃত্তির নির্মূল এবং সুবিচারের জিহাদ তারা বহু আগেই পরিত্যাগ করেছে। ফলে বহু আগেই ভূ-লুণ্ঠিত হয়েছে মুসলিমদের অতীত দিনের সে মর্যাদা। বরং তারা আজ বাঁচছে দুর্বৃত্তি ও অবিচারের প্লাবনে হাবুডাবু খেয়ে। এবং তাড়না নাই, এবং ঈমানের সে বলও নাই সে বহমান প্লাবনের বিরুদ্ধে খাড়া হওয়ার।

মহান আল্লাহতায়ালার সামনে প্রতিটি মুসলিমকে অবশ্যই একটি প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। সেটি হলো, ইসলামের শত্রুদের হাতে মুসলিম দেশ যখন অধিকৃত, তখন তার ভূমিকা কি ছিল? সে কি তখন জিহাদ না করে ভোট দিয়ে, শ্রম দিয়ে ও রাজস্ব দিয়ে দখলদার জালেম শক্তিকে সাহায্য করেছিল? ইসলামের শত্রু নির্মূলে যে ঈমানদার ব্যক্তি প্রাণ দেয় সে শহীদের মর্যাদা পায়। শহীদদের মৃত্যু নেই; তাদেরকে মৃত বলা মহান আল্লাহতায়ালা হারাম করেছেন। তাদের জীবনে কবরের আযাব নাই, রোজ হাশরের বিচার নাই। থাকবে না বিচারের দিনে “ইয়া নফসি, ইয়া নফসি”র আর্তনাদ। থাকবে না আলমে বারযাখের অপেক্ষা। তারা সরাসরি যাবে জান্নাতে। শাহাদত প্রাপ্তির সাথে সাথে তারা মহান রাব্বুল আলামিনের মর্যাদাবান মেহমান হবেন। অন্যরা মারা গেলে খাদ্যপানীয় বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু শহীদগণ পাবেন রেজেক –যার প্রতিশ্রুতি পবিত্র কুর’আনে দেয়া হয়েছে। এমন মর্যাদা, সরাসরি জান্নাতে প্রবেশের এরূপ সুখবর বা প্রতিশ্রুতি কি কোন সুফি দরবেশ, বুজুর্গ আলেম, হাফেজ, ক্বারি, ইমাম, মোহাদ্দেস, মোফাচ্ছের বা পীরকে দেয়া হয়েছে? কিয়ামতের দিনে বরং “ইয়া নফসি, ইয়া নফসি” বলতে বলতে তাদের গা দিয়ে ঘাম ছুটবে। রোজ হাশরের বিচার দিনে মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে তাদেরকে চুলচেরা হিসাব দিতে হবে। পিতামাতা সেদিন নিজ সন্তানদের কথা ভুলে যাবে। সন্তানেরা ভুলে যাবে পিতামাতার কথা। ভাই ভাইকে ভুলে যাবে। সবাই সেদিন নিজেকে বাঁচানো নিয়ে দিশেহারা হবে। অথচ শহীদের জীবনে সে দিন কখনোই আসবে না। তারা সে সময় ফুর্তিতে থাকবে জান্নাতের আনন্দময় ভূমিতে। 03/05/2026

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *