মুসলিম বাঁচছে পূর্ণাঙ্গ ইসলাম পালন না করেই

ফিরোজ মাহবুব কামাল

 

ব্যর্থতা পূর্ণাঙ্গ মুসলিম হওয়ায়

বিশ্বের মুসলিমদের সবচেয়ে ভয়ানক ব্যর্থতাটি হলো তারা বাঁচছে পূর্ণাঙ্গ ইসলাম পালন না করেই। কৃষি শিল্প অর্থনীতি ও বিজ্ঞানে ব্যর্থতার জন্য তারা জাহান্নামে যাবে না, জাহান্নামে যাবে পূর্ণাঙ্গ ইসলাম পালনে ব্যর্থ হওয়ার কারণে। তাই এটিই হলো মুসলিম জীবনের সবচেয়ে ভয়ানক ব্যর্থতা। পরিতাপের বিষয় হলো সে ব্যর্থতা নিয়ে অধিকাংশ মুসলিমের কোন হুশ নাই। অনেকেই গর্বিত তাদের  কৃষি শিল্প অর্থনীতি ভৌতিক অবকাঠামো ও আধুনিক ঘরবাড়ি নির্মাণে সাফল্য দেখে।  পূর্ণাঙ্গ ইসলাম পালনে ব্যর্থ হওয়ার মোক্ষম দলিলটি হলো, পৃথিবী পৃষ্ঠের কোথাও আজ ইসলামী রাষ্ট্র নাই। ফলে মহান রব’য়ের ঘোষিত এজেন্ডার কোথাও পূর্ণ বাস্তবায়ন নাই।

ইসলামী রাষ্ট্র না থাকাতে ইচ্ছা থাকলেও সুযোগ নাই পূর্ণ ইসলাম পালনের। ফলে মুসলিমগণ বাঁচছে শুধু নামাজ রোজা, হজ্জ যাকাত ও দোয়া দরুদের ন্যায় আনুষ্ঠিকতা নিয়ে। মহান রব’য়ের সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়া নিয়ে তারা ভাবে না। ভাবে না মুসলিম উম্মাহর প্যান ইসলামী ঐক্য এবং দুর্বৃত্তি নির্মূলের জিহাদ নিয়ে। এবং ভাবে না বিশ্বশক্তির মর্যাদা নিয়ে বাঁচার। অথচ নিজ জীবনে এগুলির প্রতিষ্ঠার ভাবনা, তাড়না ও জিহাদ নিয়ে বাঁচাটি পূর্ণাঙ্গ মুসলিম হওয়ার মৌলিক দায়। নবীজী (সা:) ও সাহাবাগণ তো সেগুলি নিয়েই বেঁচেছেন। বিস্ময়ের বিষয় হলো, শরিয়া পালন না হলে যে ইসলাম পালন হয়না এবং তাতে কাফির জালিম ও ফাসিক হতে হয় -সে বোধটুকুও তাদের নাই। এমন কি যারা আলেম আল্লামা ও মুফতি বলে দাবী করেন তাদের মাঝেও সে বোধ নাই। সেরূপ বোধ থাকলে সেটি তো তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক ভাবনা ও তাড়নার মাঝে দেখা যেত। তাদের মাঝে তখন ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের লক্ষ্যে অবিরাম জিহাদ দেখা যেত। ফলে প্রতিষ্ঠা পেত ইসলামী রাষ্ট্র। বিস্ময়ের বিষয় হলো, অধিকাংশ মুসলিম বাঁচছে ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের ভাবনা, তাড়না ও জিহাদ ছাড়াই। তারা বাঁচছে স্রেফ নিজেদের পার্থিব এজেন্ডা নিয়ে, এবং সে ব্যক্তিগত পার্থিব এজেন্ডার ভিড়ে গুরুত্ব পাচ্ছে না মহান রব’য়ের এজেন্ডা।   

কোন ভূমিতে ইসলামী রাষ্ট্র এবং ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জিহাদ না থাকলে বুঝতে হবে, সে ভূমিতে বিপুল সংখ্যক নামাজী রোজাদার হাজী তাবলিগী মৌলভী মাওলানা ইমাম ও মোয়াজ্জিন থাকলেও প্রকৃত মু’মিন ও মুত্তাকীর সংখ্যাটি অতি নগন্য। কারণ, নামাজী রোজাদার হাজী তাবলিগী মসজিদের ইমাম মৌলভী মাওলানা ও মোয়াজ্জিন হওয়া এবং ঈমানদার হওয়া এক কথা নয়। মু’মিন ও মুত্তাকী হতে হলে তাকে অবশ্যই ঈমানের পরীক্ষায় পাশ করতে হয়। ঈমানের সে চুড়ান্ত পরীক্ষাটি মাহে রমযানের রোজায় ও জায়নামাজে হয় না। এমন কি হজ্জের দিনে আরাফার মাঠেও হয় না। তেমনটি হলে তো ঈমানের পরীক্ষায় বহু সূদখোর ঘুষখোর মিথ্যাবাদী ব্যাভিচারী এবং স্বৈরাচারী জালেমও অনায়াসে পাশ করতো। কারণ তারা তো নামাজ রোজা এবং হজ্জ পালন করার সামর্থ্য রাখে। ঈমানের সে চুড়ান্ত পরীক্ষাটি হয় জিহাদের ময়দানে। ঈমানের সে পরীক্ষায় পাশ করতে হয় জিহাদের ময়দানে অর্থ, শ্রম, মেধা ও প্রাণের কুরবানী পেশ করে। মহান আল্লাহ তায়ালা সে শর্তের ঘোষণা শুধু সুরা হুজরাতের ১৫ নম্বর আয়াতে নয়, বরং পবিত্র কুর’আনের আরো বহু আয়াতে দিয়েছেন। সেরূপ বর্ণনা এসেছে অসংখ্য হাদীসেও। 

নবীজী (সা:)’য়ের সাহাবাগণ তাই শুধু মসজিদ নির্মাণে অর্থ ও শ্রম দান করেননি; তারা নিজ অর্থ, নিজ শ্রম ও নিজ রক্তের বিশাল কুরবানী পেশ করছেন ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণে এবং সে রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষায়। তাদের সে বিশাল কুরবানীর ফলেই নির্মিত হয়েছে প্রকৃত মুসলিম রূপে বেড়ে উঠার সহায়ক রাষ্ট্রীয়, সামজিক, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ। বাঁচা ও বেড়ে উঠার জন্য সহায়ক পরিবেশ চায় এমন কি উদ্ভিদ ও পশুপাখীও। পূর্ণাঙ্গ মুসলিম রূপে বেড়ে উঠার জন্য প্রতিটি ঈমানদারও তেমনি সহায়ক পরিবেশ চায়। সেরূপ সহায়ক ও নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি করাই ইসলামী রাষ্ট্রের মূল কাজ। মাছ যেমন পানি চায়, ঈমানদারও তেমনি ইসলামী রাষ্ট্র চায়। ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে সেরূপ পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল বলেই সাহাবাগণ বেড়ে উঠেছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব রূপে। তাদের হাতেই নির্মিত হয়েছিল সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা। অথচ সেরূপ একটি সহায়ক রাষ্ট্র হযরত মূসা (আ:) ও হযরত ঈসা (আ:) এবং তাদের অনুসারীগণ নির্মাণ করতে পারেননি। ফলে তাদের অনুসারীগণ জালেম শাসকদের কোপানলে পড়েছেন এবং বিকৃত হয়েছে ধর্মীয় বিধান। আজকের মুসলিমদের পূর্ণ মু’মিন রূপে বেড়ে উঠায় যে বিশাল ব্যর্থতা তারও মূল কারণ হলো, তারা পায়নি পূর্ণ ঈমান নিয়ে বেড়ে উঠার জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষা-সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিচর্যা ও সহায়ক রাজনৈতিক পরিবেশ। ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ ছাড়া সেটি সম্ভবও নয়।

 

 

ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা রোধে শয়তানী শক্তির জোটবদ্ধতা

এ পৃথিবী পৃষ্ঠে মাত্র দুটি পক্ষ। একটি সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহ তায়ালার পক্ষ। অপরটি অভিশপ্ত শয়তানের পক্ষ। যারা আল্লাহর পক্ষে নয়, তারাই মূলত শয়তানের পক্ষে। ফলে হিসাবটি অতি সহজ। আল্লাহর পক্ষ চায় সর্বশক্তিমান মহান প্রভুর এজেন্ডাকে বিজয়ী করতে। লক্ষ্যটি এখানে মানুষকে জান্নাতে নেয়া। এ পক্ষের সদস্য হলেন সকল নবী রাসূল ও ঈমানদারগণ। শয়তানের পক্ষ কাজ করে শয়তানের এজেন্ডাকে বিজয়ী করার ব্রত নিয়ে। তাদের লক্ষ্যটি হলো, মানুষেকে জাহান্নামে নেয়া। এ পক্ষের সদস্য হলো সকল নাস্তিক, সকল পৌত্তলিক এবং ইসলাম ভিন্ন সকল ধর্মের অনুসারীগণ। মানব জাতির ইতিহাস হলো এই দুই পক্ষের সংঘাতের ইতিহাস। তবে বিশ্বযুদ্ধ, আঞ্চলিক যুদ্ধ ও সম্প্রসারণবাদী যুদ্ধে ন্যায় বহু যুদ্ধ সংঘটিট হয়েছে শয়তানের পক্ষের নানা বাহিনীর মধ্যেও।  

শয়তান ও তার অনুসারীদের কাছে ইসলামের মূল দুর্গের ও মূল শক্তির খবরটি অজানা নয়। মূল দুর্গটি হলো ইসলামী রাষ্ট্র; রাষ্ট্রের সৈনিকদের লড়াইয়ের আদর্শিক নৈতিক ও ঈমানী সামর্থ্য জুগায় পবিত্র কুর’আন।  তাই বিশ্বের তাবত শয়তানী শক্তির অভিন্ন এজেন্ডা ও স্ট্র্যাটেজি মসজিদ মাদ্রাসা ধ্বংস নয়, নামাজ রোজাও বিলুপ্ত করা নয়; বরং সেটি হলো ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার প্রতিরোধ এবং কোথাও ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পেলে সেটির ত্বরিৎ বিনাশ। সে সাথে এজেন্ডা হলো কুর’আন থেকে জ্ঞানদানের কার্যক্রম বন্ধ করা। ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা রুখতে মুসলিম ভূমিতে এরা প্রতিষ্ঠা দেয় জাতীয়তাবাদী, উপজাতীয়তাবাদী, গোত্রবাদী, ফ্যাসিবাদী, রাজতন্ত্রী ইত্যাদি নানা ব্রান্ডের অনৈসলামী রাষ্ট্র। আরব বিশ্বকে ২২ টুকরোয় খণ্ডিত করে সেখানে প্রতিষ্ঠা দেয়  নৃশংস ফাসিস্ট সামরিক ও রাজতন্ত্রী শাসনের। এরই ফলে ২২টি আরব দেশের কোনটিতেই গণতন্ত্র নাই; কোন মানবাধিকারও নাই। কেউ শাসক শক্তির সমালোচনা করলে তাকে জেল জুলুম ও গুম খুনের শিকার হতে হয়। সরকার বিরোধীদের জন্য প্রতিটি আরব দেশই হলো কারাগার। এরা নিজেদের শাসন বাঁচাতে নিরস্ত্র জনগণের উপর গণহত্যা চালায়।

দখলদার আরব স্বৈরশাসকদের নৃশংস বর্বরতার নমুনা হলো, প্রেসিডেন্ট ড. মহম্মদ মুরসিকে ক্ষমতা থেকে হটাতে দেশটির সামরিক বাহিনী সেনাপ্রধান জেনারেল আব্দুল ফাতাহ আল সিসির নেতৃত্বে অভ্যুত্থান করে। ২০১১ সালের ফেব্রেয়ারির গণ অভ্যুত্থানে সামরিক স্বৈরশাসক হোসনী মোবারককে হটানোর পর ড. মুরসি ছিলেন মিশরের ইতিহাসের প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। ষড়যন্ত্রমুলক সামরিক অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধ নিরস্ত্র জনগণ প্রতিবাদ রাস্তায় নেমে আসে। সে প্রতিবাদ থামাতে সামরিক বাহিনীর নৃশংস বর্বরতার আশ্রয় নেয়। সে নৃশংসতার নমুনা হলো, ২০১৩ সালে ১৪ আগস্ট কায়রোর রাবা আদাবিয়া চত্বরে অবস্থানকারি নিরস্ত্র নারী পুরুষ ও শিশুদের হত্যায় ট্যাংক নামনো হয়। সে হত্যাকাণ্ডে সরকার নিহতদের সঠিক তালিকা দেয়নি। তবে বেসরকারি সূত্রে নিহতদের সংখ্যা ১২ শত থেকে ১৫ শত। সেখানে আহত হয়েছিল বহু হাজার। প্রতিবাদ থামাতে সমগ্র মিশর জুড়ে চলে গণগ্রেফতারি; ৭০ হাজারের বেশী নারী পুরুষকে কারাবন্দী করা হয়। বিচারের নামে প্রহসন হয়। জনে জনে নয়, বিচারে তোলা হয় দলবদ্ধ ভাবে। বন্দীদের দীর্ঘকালীন জেল দেয়া হয়। আরব বিশ্বে থেকে স্বৈরাচারী শাসন নির্মূলের লক্ষ্যে ২০১১ সালে তিউনিসিয়া থেকে যে আরব বসন্ত শুরু হয়, সেটি রুখতেই ছিল এ নৃশংস সামরিক অভ্যুত্থান। গণতন্ত্র বিরোধী এ অভ্যুত্থানকে সমর্থন দেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পাশ্চাত্যের সকল দেশ। এবং সমর্থন ও সহায়তা দেয় আরব আমিরাত, সৌদি আরবসহ আরব বিশ্বের সকল স্বৈরাচারি শাসকগণ। এভাবেই আবার নামিয়ে আনা হয় স্বৈরশাসন।     

আরব স্বৈর শাসকদের নৃশংসতার আরেক নমুনা হলো কলামিস্ট জামাল খাসোগী হত্যা। জনাব জামাল খাসোগীর অপরাধ ছিল, তিনি The Washington Post পত্রিকায় সৌদি সরকারের পলিসির সমালোচনা করে নিবন্ধ লিখেছিলেন। সে অপরাধে এই সৌদি কলামিস্টকে ইস্তাম্বুলের সৌদি কনসাল অফিসে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়। হত্যার পর তাঁর দেহকে টুকরো টুকরো করে কেমিক্যাল দিয়ে গলিয়ে ড্রেনে ভাসিয়ে দেয়া হয়। সিরিয়ার নৃশংস জালেম শাসক বাশার আল-আসাদ নিজ দেশের জনগণের বিরুদ্ধে কেমিক্যাল বোমা ব্যবহার করেছে এবং অসংখ্য নিরীহ মানুষকে দগ্ধ করে হত্যা করেছে। জনগণের অপরাধ ছিল, তারা গণতান্ত্রিক অধিকার দাবী করেছিল। একই নৃশংস অপরাধ করেছে ইরাকের সাদ্দাম হোসেন। সাদ্দামের অপরাধ, ইরাকের কুর্দি ও ইরানী যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে সে রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করেছিল। ইরাক ও সিরিয়ার স্বৈর শাসকদের রাসায়নকি অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করেছিল ইউরোপের দেশগুলি। লক্ষ্যনীয় হলো,  ‌মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা মুসলিম বিশ্বের এসব নৃশংস ফাসিস্ট শাসকদের প্রাসাদের উপর কখনো বোমা ফেলে না; বরং তাদেরকে তারা নিজেদের War on Islam’র পার্টনার রূপে গ্রহণ করে। তাদের যুদ্ধ শুধু ইসলামের বিরুদ্ধে নয়, বরং সেটি War on Demoocracyও। ‌মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা মুসলিম বিশ্বের এসব নৃশংস জালেম শাসকদের প্রতিক্ষণ পাহারা দেয়। কারণ, এ আরব স্বৈর শাসকগণ তেল সম্পদ থেকে প্রাপ্ত বিপুল অর্থ তাদের হাতে তুলে দেয়। বিনিময়ে তারা নিজ গদির নিরাপত্তা পায়।  জনগণকে দমিয়ে রাখতে তারা যেসব কামান ও গোলাবারুদ ব্যবহার করে সেগুলি নিয়মিত পায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলি থেকে।

অপর দিকে ইসলামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের zero tolerance। তারা কোন ইসলামী রাষ্ট্রের অস্তিত্ব মানতে রাজি নয়। ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা রুখতে এসব সাম্রাজ্যবাদী শক্তির নৃশংসতারও কোন সীমা সরহাদ নাই। যে কোন নৃশংস নিষ্ঠুরতা গ্রহণে তারা দু’পায়ে খাড়া। কোথাও যদি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়, সেখান তারা হাজার হাজার টন বোমা ফেলে নৃশংস গণহত্যা চালায় এবং শহরগুলিকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়। War on Islam’য়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট ও রাশিয়ার যৌথ স্ট্র্যাটেজী হলো, ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা রুখতে এরা নিজেদের মধ্যকার বিভেদ ভূলে একত্রে বোমা বর্ষণ করে। তাই সিরিয়ার ইসলামী রাষ্ট্রপন্থীদের উপর ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে একত্রে বোমা বর্ষণ করেছে যুক্তরাষ্ট ও রাশিয়া। তাই রাশিয়া যখন চেচিনয়ার মুসলিমদের স্বাধীনতা রুখতে রাজধানী গ্রোজনীকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয় -সে বর্বরতাকে পূর্ণ সমর্থণ করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ সমগ্র পশ্চিমা বিশ্ব। সমগ্র গ্রোজনীকে ধ্বংস স্তুপে পরিণত করার পর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুটিন যখন লন্ডন সফরে আসে তখন তাকে ১০ ডাউনিং স্ট্রীটে লাল-গালিচা সংবর্ধনা দেয়া হয়।  

 

মুসলিমদের পরিবর্তিত গোলপোস্ট এবং আযাবমুখী যাত্রা

মুসলিমগণ যেদিন থেকে ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ ও সে রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষায় আগ্রহ হারিয়েছে তখন থেকে তাদের জীবনের গোলপোস্টও পরিবর্তিত হয়ে গেছে। তখন থেকেই থেমে গেছে একতা, বিজয় ও বিশ্বশক্তি রূপে স্বপ্ন দেখা ও উত্থানের যাত্রা। তখন বিলুপ্ত হয়েছে মহান রব’য়ের এজেন্ডাকে বিজয়ী করার জিহাদ। বরং শুরু হয়েছে বিভক্তি, আত্মসমর্পণ ও পতনমুখী যাত্রা। আত্মসমর্পণটি সেক্যুলারিজম, লিবারালিজম ও জাতীয়তাবাদী বিভক্তির কাছে। বাঙালি মুসলিম জীবনে সে আত্মসমর্পণটি অতি প্রকট। ফলে মহান রব’য়ের সার্বভৌমত্ব ও শরিয়তের বিলুপ্তি নিয়ে তাদের কোন দুঃখবোধ নাই। খেলাফত ভেঙে যাওয়াতেও তাদের কোন দুঃখ নাই। এবং তারা প্রচণ্ড উৎসব করে ১৯৭১’য়ে পাকিস্তান ভাঙাতে।  ইসলামের সত্য, সুনীতি ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার চিন্তা বাদ দিয়ে তারা বিশ্বরেকর্ড গড়েছে মিথ্যাচার ও দুর্বৃত্তিতে। এ শতাব্দীর শুরুতে তারা দুর্নীতিতে বিশ্বের ১৯৩টি হারিয়ে  ৫ বার প্রথম হয়েছে। মুসলিম ইতিহাসের এটি অতি কলঙ্কজনক অধ্যায়। ইসলামী রাষ্ট্র না থাকার এটিই হলো সবচেয়ে শোচনীয়  ও অপমানকর পরিণাম।

নামাজ রোজা ও হজ্জ যাকাত যেমন ব্যক্তির পরিশুদ্ধির হাতিয়ার, ইসলামী রাষ্ট্র হলো সমাজ ও রাষ্ট্রকে পরিশুদ্ধির হাতিয়ার। ইসলামী রাষ্ট্র না থাকলে পরিশুদ্ধির সে প্রক্রিয়া থাকে না। এমন দেশে দুর্বৃত্তি একটি নীতি; এবং দুর্বৃত্তরাই শাসক। তখন দুর্বৃত্তিতে দ্রুত বিশ্ব রেকর্ড গড়া সহজ হয়ে যায়। বাংলাদেশ সেটিই বিশ্ববাসীর সামনে প্রমাণ করে দেখিয়েছে। দুর্বৃত্ত অধিকৃত এমন রাষ্ট্রের দূষিত পরিবেশে মানুষ শুধু মু’মিন হতেই ব্যর্থ হয়না, ব্যর্থ হয় মানবিক গুণে বেড়ে উঠতেও। বরং পশুর চেয়েও তারা নিকৃষ্ট হয়। তখন প্রতিষ্ঠা পায় বদমায়েশতন্ত্র। বদ অর্থ খারাপ; আর মায়েশ অর্থ জীবিকা। বদমায়েশতন্ত্রে বিজয়ী হয় ঘুষ, সূদ ও চাঁদাবাজীর ন্যায় খারাপ জীবিকা নিয়ে বাঁচা। বাংলাদেশে এখন সেটিই সরকারি দলের নীতি। পশু আর যাই হোক দুর্বৃত্তিতে বিশ্ব রেকর্ড গড়ে না। পশু গণহত্যা, গণধর্ষণ, ভোটচুরি এবং ভোটডাকাতিও করেনা। পবিত্র কুর’আনে মহান আল্লাহ তায়ালা এমন বদমায়েশদের সম্বন্ধেই বলেছেন: “উলায়িকা কা’আল আনয়াম, বাল হুম আদাল।” অর্থ‍: “তারাই হলো পশুর ন্যায়, বরং পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট।” 

একমাত্র ঈমানশূণ্য এবং পরকালের ভয়শূণ্য ব্যক্তিগণই মুসলিম উম্মাহর এরূপ ভ্রষ্ট, বিভক্ত ও বিপন্ন অবস্থায় নীবব ও নিষ্ক্রিয় থাকতে পারে। জুলুম. অবিচার ও দুর্বৃত্তির সামনে নীববতা ও নিষ্ক্রিয়তা নিজেই এক গুরুতর অপরাধ। যেমন অপরাধ হলো কোন গৃহে আগুন লাগলে বা কোন শিশু পানিতে পড়তে দেখেও নীবব ও নিষ্ক্রিয় থাকা। তাই দেশ দুর্বৃত্তদের দখলে গেলে কোন ঈমানদার কি নীবব ও নিষ্ক্রিয় থাকতে পারে? নীববতা ও নিষ্ক্রিয়তা তো দুর্বৃত্তদেরই সাহস জোগায়। তখন দুর্বৃত্তিতে তারা আরো নৃশংসতর হয়। ইসলামে অপরাধ তাই শুধু অপরাধ করাই নয়, চোখের সামনে অপরাধ হতে দেখে নীবব ও নিষ্ক্রিয় থাকাও। অতিশয় পরিতাপের বিষয় হলো, অধিকাংশ মুসলিম সে হারাম পথটিই বেছে নিয়েছে। এবং সে পথ থেকে বেবিয়ে আসায় তাদের সামান্যতম আগ্রহ নাই। এ জন্যই এদের বিরুদ্ধে ইসলামের বিধান অতি কঠোর। তাই আযাব শুধু ফিরাউন নমরুদের  ন্যায় সক্রিয় অপরাধীদের উপরই আসে না, আসে তাদের সমর্থক নীবব ও নিষ্ক্রিয় অপরাধীদের উপরও। শুধু এ দুনিয়ায় নয়, আখেরাতেও।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *