মুসলিম দেশে শয়তানী শক্তির স্ট্র্যাটেজি এবং মুসলিমদের ব্যর্থতা

ফিরোজ মাহবুব কামাল

 

যুদ্ধটি আল্লাহ তায়ালার বিরুদ্ধে শয়তানের

মানবকে নিয়ে মহান আল্লাহ তায়ালার পরিকল্পনাটি শয়তান জানে। শয়তান আরো জানে, ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণে খালেছ জিহাদ শুরু জমিনের বুকে মহান আল্লাহ তায়ালার ফেরেশতাদের নামিয়ে আনে। কারণ, সেটি তখন সর্বশক্তিমান আল্লাহর যুদ্ধে পরিণত হয়। তখন বিজয়ী হয় ঈমানদারের লড়াই; তখন বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয় মুসলিম উম্মাহ। শয়তান আরো জানে, সভ্যতার দ্বন্দে একমাত্র ইসলামী রাষ্ট্রই মহান আল্লাহ তায়ালার প্রতিনিধিত্ব করে এবং তাঁর মূল হাতিয়ার রূপে কাজ করে; কোন রাজতন্ত্রী, সেক্যুলার ও জাতীয়তাবাদী মুসলিম রাষ্ট্র সে কাজটি করেনা। ইসলামী রাষ্ট্র বাঁচে ও যুদ্ধ করে একমাত্র মহান আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডাকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে। অতএব শয়তান ও তার অনুসারীগণ সেরূপ একটি ইসলামী রাষ্ট্রকে প্রতিপক্ষ ভাববে এবং সে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা রোধে এবং বিনাশে সর্বশক্তি নিয়োগ করবে -সেটিই অতি স্বাভাবিক। ইসলামী রাষ্ট্রকে বিলুপ্ত করা গেলে শয়তানের সামনে আর কোন প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রীয় শক্তি অবশিষ্ঠ থাকে না।

মিশর, পাকিস্তান, সৌদি আরব, আরব আমিরাত, বাহরাইনসহ বহু মুসলিম দেশে রয়েছে নৃশংস ফ্যাসিবাদী শাসক। এসব দেশে গণতন্ত্রের যেমন স্থান নাই; তেমনি স্থান নাই মহান আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডার। ক্ষমতাসীন শাসকদের এজেন্ডাই রাষ্ট্রের এজেন্ডা। ইসলামী রাষ্ট্র থেকে এসব মুসলিম রাষ্ট্রের এখানেই মূল পার্থক্য। এ রাষ্ট্রগুলি নামে মুসলিম হলেও পাশ্চাত্যের শক্তিসমূহ -এমন কি ভারতের ন্যায় শয়তানের পৌত্তলিক খলিফা রাষ্ট্রও এসব দেশের শাসকদের শত্রু মনে করে না। কারণ, এ রাষ্ট্রগুলির শাসকগণ কখনোই তাদের ইসলাম ও মুসলিম বিরোধী এজেন্ডার বিরুদ্ধে কোন ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ খাড়া করেনা। তাই গাজাতে গণহত্যা, ভারতে মুসলিম নিধন ও মসজিদ ভাঙা এবং রোহিঙ্গা মুসলিমদের উপর মায়ানমার সরকারের গণহত্যা ও গণনির্মূল কর্মসূচী এসব সরকারের কাছে কোন ইস্যু নয়। একারণেই পাশ্চাত্যের শক্তিবর্গ এসব দেশের স্বৈরশাসকদের বিশ্বস্ত পার্টনার রূপে গ্রহণ করে – বিশেষ করে কোন মুসলিম ভূ-খণ্ডে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা দেখা দিলে সেটির প্রতিরোধে। সেরূপ পার্টনারশিপ দেখা গেছে ফিলিস্তিন, আলজিরিয়া, মিশর, সিরিয়া, তিউনিসিয়ায় ইসলামপন্থীদের বিজয় রুখতে।  

নিরেট বাস্তবতা হলো, স্বৈরাচারী শাসক মাত্রই পরস্পরের আদর্শিক ভাই (ideological cousins)। তাদের সবাই ইসলামী রাষ্ট্রকে নিজেদের শত্রু রূপে দেখে। ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা রোধে তারা সবাই কাজ করে শয়তানের পার্টনার রূপে। শয়তানের এজেন্ডাকে বিজয়ী করাই তাদের এজেন্ডা। শয়তানের মূল লড়াইটি মহান আল্লাহ তায়ালার সাথে। একজন ঈমানদারের কাছে মহান আল্লাহ তায়ালার অস্তিত্ব এবং কুর’আনে ঘোষিত তাঁর এজেন্ডা যেমন সত্য; তেমনি সত্য হলো শয়তানের অস্তিত্ব ও তার ঘোষিত এজেন্ডা। তাই কোন ঈমানদারের কাছে শয়তান কোন কাল্পনিক সত্বা নয়; কোন মারেফতি জগতের বিষয়ও নয়; বরং অতি বাস্তব সত্য। যেখানেই ঈমানদারের অবস্থান, সেখানেই থাকে শয়তানের অবস্থান। নির্জন কোন পাহাড়ে বা মরুভূমিতে একাকী হাটলেও মুমিনের সাথে যে সত্বাটি সর্বক্ষণ থাকে -সে হলো শয়তান। তাই বাঁচতে হয় শয়তানের প্রতারণা ও প্ররোচনা থেকে। এজন্য ঈমানদারকে পদে পদে “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম”য়ের সাথে “আইযু বিল্লাহি মিনাশ শায়তানির রাযিম” বলতে হয়।

এজন্যই ঈমানদারকে শুধু মহান রব’য়ের পবিত্র এজেন্ডাকে জানলে চলে না; অবশ্যই জানতে হয় শয়তানের এজেন্ডাকে। সিরাতাল মুস্তাকীমের কোথায় কোথায় থাকতে পারে শয়তাদের ফাঁদ -সজাগ দৃষ্টি রাখতে হয় সেদিকেও।  প্রতিটি নেক কাজে শয়তানকে গণ্য করতে হয় প্রধান প্রতিপক্ষ রপে; অদৃশ্য ইবলিসকে সামনে দেখা না গেলেও তার এজেন্টদের প্রতিক্ষেত্রেই সশরীরে দেখা যায়। এরা হাজির হয় জালেম শাসকের পুলিশ, ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী, দুর্বৃত্ত বুদ্ধিজীবী, ভণ্ড পীর বা প্রতারক ধর্ম ব্যবসায়ী রূপে। তাই এসব শয়তানী শক্তির এজেন্ডার মোকাবেলায় নিজেদেরও এজেন্ডা প্রণয়ন করতে হয়। বুস্তত শয়তান শুধু মহান আল্লাহ তায়ালার শত্রু নয়, সবচেয়ে বড় শত্রু হলো মানব জাতির। মানবের সবচেয়ে বড় ক্ষতিটি করাই শয়তানের এজেন্ডা। অতি পরিতাপের বিষয় হলো, মুসলিমদের অজ্ঞতা শুধু মহান রাব্বুল আলামীনের এজেন্ডা নিয়ে নয়, বরয় চরম অজ্ঞতা শয়তানের এজেন্ডা নিয়েও। শয়তানের ঘোষিত এজেন্ডাটি বর্ণিত হয়েছে নিচের আয়াতে:

قَالَ فَبِمَا أَغْوَيْتَنِي لَأَقْعُدَنَّ لَهُمْ صِرَاطَكَ الْمُسْتَقِيمَ

ثُمَّ لَآتِيَنَّهُم مِّن بَيْنِ أَيْدِيهِمْ وَمِنْ خَلْفِهِمْ وَعَنْ أَيْمَانِهِمْ وَعَن شَمَائِلِهِمْ ۖ وَلَا تَجِدُ أَكْثَرَهُمْ شَاكِرِينَ

অর্থ: “সে (শয়তান) বললো, (হে আল্লাহ) আপনি আমাকে যেমন গোমরাহীর দিকে ধাবিত করেছেন, আমিও অবশ্য তাদের জন্যে আপনার দেখানো সিরাতাল মুস্তাকীমের উপর বসে থাকবো (এবং মানুষদের সিরাতাল মুস্তাকীমে চলায় বাধা সৃষ্টি করবো)। এরপর তাদের (মানবদের) কাছে আসবো তাদের সামনের দিক থেকে, পিছন দিক থেকে, ডান দিক থেকে এবং বাম দিক থেকে। আপনি তাদের (মানব জাতির) অধিকাংশকে কৃতজ্ঞ পাবেন না।” -(সুরা আরাফ, আয়াত ১৬-১৭)।

 

মূল লক্ষ্য: ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা রোধ

শয়তান জানে, মহান আল্লাহ তায়ালার মূল এজেন্ডা। আল্লাহ তায়ালার সে ঘোষিত এজেন্ডাটি হলো তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানবকে জান্নাতে নেয়া। সে জন্যই লক্ষাধিক নবী-রাসূল প্রেরণ ও ওহীর কিতাব নাযিল। জান্নাতে নেয়ার জন্যই পবিত্র কুর’আন নাযিল করে দেখিয়ে দিয়েছেন জান্নাতের পথ তথা সিরাতাল মুস্তাকীম। অপর দিকে ধর্ম কর্ম, রাজনীতি, রাষ্ট্র পরিচালনা, বুদ্ধিবৃত্তি, শিক্ষা সংস্কৃতি, আইন আদালত, সমাজ কর্ম ও যুদ্ধ বিগ্রহসহ জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে জান্নাতের পথ দেখায় ইসলামী রাষ্ট্র। মহান রব’য়ের নির্দেশিত পথে সেরূপ একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা দিয়ে নবীজী (সা:) দেখিয়ে গেছেন কিরূপে সেরূপ একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা দিতে হয়। ঈমানদারদের উপর ফরজ হলো সেরূপ একটি রাষ্ট্র নির্মাণের কাজে নবীজী (সা:)কে অনুসরণ করা। বুঝতে হবে নবীজী (সা:)কে অনুসরণের অর্থ আল্লাহকে অনুসরণ করা। ইসলামী রাষ্ট্র মহান রব’য়ের এজেন্ডাকে বিজয়ী করার কাজটি করে তার রাজনৈতিক, শিক্ষা সাংস্কৃতিক, বৈচারিক, প্রশাসনিক নীতির মাধ্যমে। শয়তানের এজেন্ডা যেহেতু মানুষকে জাহান্নামের আগুনে ফেলার, তাই মানুষকে সিরাতাল মুস্তাকীমে নেয়ার মহান রব’য়ের প্রকল্পকে সে বানচাল করতে চায়। শয়তানের পক্ষের শক্তি রূপে কাজ করে প্রতিটি ইসলামবিরোধী রাষ্ট্র, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। মানুষকে জাহান্নামে নেয়ার কাজে শয়তানের হাতিয়ার শুধু মূর্তপুজা ও দেবদেবী পূজা নয়; বরং হাজির হয় জাতি পূজা, বর্ণ পূজা, ভাষা পূজা, গোত্র পূজা, সেক্যুলারিজম, রাজতন্ত্র, নাস্তিকতা, সংশয়বাদ ইত্যাদি নানা হাতিয়ার নিয়ে। এবং এসব মত ও পথের অনুসারীদের সবার সম্মিলিত যুদ্ধটি ইসলামের বিরুদ্ধে।

ইসলামী রাষ্ট্র যেহেতু এ পৃথিবীপৃষ্ঠ মহান রাব্বুল আলামীনের এজেন্ডাকে বিজয়ী করার মূল হাতিয়ার, তাদের আক্রমণের মূল লক্ষ্যবস্তু তাই ইসলামী রাষ্ট্র। ফলে কোথাও ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা শুরু হলে -সে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তাদের সবাইকে একত্রে দেখা যায়। শত্রু শক্তির সেরূপ কোয়ালিশন দেখা গেছে নবীজী (সা:)’য়ের আমলে। নবীজী (সা:)’য়ের প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্রকে অঙ্কুরে বিনষ্ট করতে আরবের সকল গোত্রের পৌত্তলিকদের যেমন একজোট হয়ে যুদ্ধে নামতে দেখা গেছে, তেমনি তাদের পাশে ইহুদিদেরও দেখা গেছে। আজও সে ধারা বেঁচে আছে। ফলে কোথাও ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা শুরু হলে সেটির প্রতিরোধে একত্রে দেখা যায় পাশ্চাত্যের খৃষ্টান রাষ্ট্রবর্গ, রাশিয়া ও ইহুদিদের সাথে ভারতীয় পৌত্তলিকদের। সেসব অমুসলিম বিদেশী শত্রুদের সাথে যোগ দেয় মুসলিমদের ঘরের শত্রু জাতীয়তাবাদী, ফ্যাসিবাদী, সেক্যুলারিস্ট ও বামধারার প্রতিষ্ঠানগুলিও। পবিত্র কুর’আন যেহেতু সিরাতাল মুস্তাকীমের রোডম্যাপ, তাদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু পবিত্র কুর’আনও। ফলে তাদের স্ট্রাটেজী হলো, কুর’আন শিক্ষাকে মুসলিম দেশের স্কুল কলেজে নিষিদ্ধ করা -যেমনটি করেছিল ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকগণ।  

ইসলামী রাষ্ট্র না থাকাতে শত্রু শক্তির ঔদ্ধত্য যে কিরূপ নৃশংস বর্বর ও ধ্বংসাত্মক হতে পারে -তারই প্রমাণ হলো গাজার উপর ইসরাইলের সাম্প্রতিক হামলা। গাজার উপর দীর্ঘ দুই বছর ধরে চলেছে ইসরাইলের বিরামহীন বিমান ও মিজাইল হামলা। চলেছে অবিরাম বোমা বর্ষণ এবং ট্যাংক অভিযান। গাজাবাসীর কোন নিয়মিত সেনাবাহিনী নাই, কোন যুদ্ধবিমান নাই, কোন ট্যাংকও নাই। ফলে বিনাবাধায় ইসরাইল ইচ্ছামত চালিয়ে যাচ্ছে গণহত্যা। আবাসিক এলাকার উপর চলছে পরিকল্পিত ধ্বংস প্রক্রিয়া এবং চলছে গাজাবাসীদের নির্মূলীকরণ। গাজার জনসংখ্যা ২৩ লাখ। আয়তন ১৪১ বর্গ মাইল; ২৫ মাইল দীর্ঘ এবং গড়ে সাড়ে ৭ মাইল প্রশস্ত। যুদ্ধ শুরুর সাথে সাথে বন্ধ করে দেয়া হয় গাজার পানি, বিদ্যুৎ, জ্বালানী ও খাদ্য-পানীয়’র সাপ্লাই। উল্লেখ্য যে, গাজার জন্য বিদ্যুৎ, জ্বালানী ও পানির সরবরাহ আসে ইসরাইল থেকে। বোমার আঘাতে অধিকাংশ ভবনকে ধ্বংস করা হয়েছে।

গাজার সবগুলি হাসপাতালকেই ধ্বংস করা হয়েছে। হত্যা করা হয়েছে ৭৫ হাজারের অধিক গাজাবাসীকে, যার মধ্যে অর্ধেকের বেশিই হলো শিশু। বহু হাজার মানুষের কোন সন্ধান মিলছে না; ধারণা করা হচ্ছে তারা চাপা পড়েছে ধ্বংসস্তুপের নিচে। গাজাবাসী এখন ভয়ানক দুর্ভিক্ষের শিকার। যারা এতো দিন বোমা হামলা থেকে বেঁচে গিয়েছিল, তারা এখন মারা যাচ্ছে পরিকল্পিত ভাবে সৃষ্ট দুর্ভিক্ষে। দুর্ভিক্ষ পরিণত হয়েছে যুদ্ধাস্ত্রে। ফিলিস্তিনীদের কষ্ট দেয়াই ইসরাইলের রাষ্ট্রীয় নীতি -সেটিই এখন দৃশ্যমান। সে নীতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদেরও। অধিকাংশ গাজাবাসীর বসবাস জীর্ণ তাঁবুতে। বর্জ পানির নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় ময়লা পানির প্রবাহ তাঁবুগুলির পাশ দিয়ে। নর্দমা থেকে বড় বড় ঈদুর তাঁবুতে ঢুকে ক্ষত বিক্ষত করছে শিশুদের। এভাবে গাজা পরিণত হয়েছে আযাবের ক্ষেত্রে। 

 

উম্মাহর বিভক্তি এবং প্রতিশ্রুত আযাব

আরব ভূমি আজ ২২টি রাষ্ট্রে বিভক্ত। আজ যদি ২২টি আরব রাষ্ট্র তাদের বিভক্তির দেয়াল ভেঙে একটি বৃহৎ রাষ্ট্রে পরিণত হতো -তবে কি ইসরাইল এতো বড় গণহত্যার সাহস পেত। বিভক্তির নাশকতা যে কতটা ভয়ানক হতে পারে – বিভক্ত আরবগণ তারই দৃশ্যমান রূপ। পৃথিবীতে ১৫০ কোটির বেশি মুসলিম। কিন্তু তারা গাজার ২৩ লাখ মুসলিমদের প্রাণ বাঁচাতে একত্রে খাড়া হতে পারছে না। আল্লাহকে আর কি ভয় করে? তার চেয়ে বেশি ভয় করে ইসরাইলকে। মিশর গাজার প্রতিবেশি, কিন্তু ইসরাইলের ভয়ে মিশর কোন সাহায্য সামগ্রী গাজাতে পাঠাচ্ছে না। ইসরাইলী জুলুমের বিরুদ্ধে তারা নীরব ও নিষ্ক্রিয়।

মুসলিম উম্মাহকে শক্তিহীন করার লক্ষ্যেই ইসলামের দেশী বিদেশী শত্রুগুলি মুসলিমদের ৫০টির বেশি রাষ্ট্রে বিভক্ত করে রেখেছে। বিভক্ত করেছে ভাষা, গোত্র, বর্ণ ও অঞ্চলের নামে। মুসলিমদের মাঝে এ বিভক্তি বাঁচিয়ে রাখাকেই ইসলামের শত্রুপক্ষ মুসলিম বিশ্বের স্থিতিশীলতা বলছে। অপর দিকে বিভক্তির দেয়াল বাঁচাতে মুসলিম দেশগুলি যুদ্ধ করতে প্রস্তুত। অথচ বিভক্তির এ স্থিতিশীলতা মুসলিমদের দিয়েছে শক্তিহীনতা, পরাজয় ও পরাধীনতা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও উরোপীয়ান ইউনিয়নসহ সকল পাশ্চাত্য শক্তি চায়, স্থিতিশীলতার নামে মুসলিম বিশ্বের এ বিভক্তি মানচিত্রকে যেন যে কোন মূল্যে চিরকাল বাঁচিয়ে রাখা যায়। কারণ, মুসলিমদের বিভক্তির মাঝে তারা নিজেদের নিরাপত্তা দেখে। এ বিভক্ত মানচিত্র পাশ্চাত্য শক্তির জন্য প্রতিষ্ঠা দিয়েছে শোষণ ও লুণ্ঠনের অবকাঠামো। সে লক্ষপূরণে তারা চায়, মুসলিম দেশগুলিতে আরো বিভক্ত করতে। অপর দিকে মহান রব’য়ের হুঁশিয়ারি হলো,যতদিন মুসলিমগণ বিভক্তি নিয়ে বাঁচবে, ততদিন তাদের জন্য বরাদ্দ হলো “আযাবুন আজিম” তথা ভয়ানক আযাব -যা বলা হয়েছে সুরা আল ইমরানের ১০৫ নম্বর আয়াতে। তাই নিজ হাতে অর্জিত এই চলমান আযাব থেকে বাঁচতে হলে একতার বিকল্প নাই। অথচ মুসলিমদের মাঝে আগ্রহ নাই একতার পথে চলার।      

শত্রুশক্তির পক্ষ থেকে চাপিয়ে দেয়া বিভক্তির কারণে মুসলিমগণ প্রতিষ্ঠা দিতে পারিনি বহু ভাষী, বহু অঞ্চলীয় ও বহু বর্ণীয় ইসলামী সিভিলাইজেশনাল স্টেট তথা ইসলামী রাষ্ট্র -যেমন প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাগণ। খেলাফত ভেঙে যাওয়ার পর ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিমগণ ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে সেরূপ একটি বহু ভাষী, বহু অঞ্চলীয় ও বহু বর্ণীয় সিভিলাইজেশনাল স্টেট  প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মুসলিমদের নিজ ঘরে সৃষ্ট সেক্যুলারিস্ট, কম্যুনিস্ট ও ফ্যাসিস্ট শত্রু এবং ভারতীয় পৌত্তলিক শত্রু ১৯৭১’য়ে সে চেষ্টাও ব্যর্থ করে দেয়। বর্তমানে  মুসলিমরা বাঁচছে গোত্রীয়, জাতীয় ও উপজাতীয় রাষ্ট্রের পরিচয় নিয়ে। এসব দেশের শাসকদের রয়েছে দলীয়, গোত্রীয়, জাতীয়, উপজাতীয় বা রাজতান্ত্রিক এজেন্ডা। এবং তাদের নাই কোন প্যান ইসলামী এজেন্ডা। গাজার লোকগুলি যেহেতু তাদের নিজ ভাষা, নিজ গোত্রের, নিজ জাতির ও নিজ এলাকার নয়, তাদের বাঁচানো নিয়ে তুর্কি, মিশরি, ইরানি, পাকিস্তানি, বাংলাদেশি, সৌদি, ইন্দোনেশিয়ান ও অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্রের সরকারগুলির কোন মাথা ব্যাথা নাই। এর কারণ, তাদের মাঝে ছিন্ন হয়েছে কুর’আনী রশির বন্ধন।

 

বিলুপ্ত হয়েছে উম্মাহর ধারণা

নবীজী (সা:) মুসলিম উম্মাহকে একটি দেহের সাথে তুলনা করেছেন। দেহের এক অঙ্গে আঘাত লাগলে সমগ্র দেহ সে ব্যাথায় কেঁদে উঠে। এটিই তো প্যান ইসলামী চেতনার লক্ষণ। কিন্তু মুসলিমগণ সে প্যান ইসলামী চেতনা নিয়ে আজ বাঁচে না। তারা দূরে সরেছে ইসলামের মূল শিক্ষা থেকে। তাদের মাঝে বিলুপ্ত হয়েছে উম্মাহর ধারণা। উম্মাহর দর্শন দেয় অভিন্ন বিশ্বাস এবং মহান রব’য়ের দেয়া অভিন্ন এজেন্ডা নিয়ে একতাবদ্ধ হওয়ার। মুসলিমগণ সে দর্শন ও সে এজেন্ডা পরিত্যাগ করেছে বহু আগেই; তারা একতার প্রেরণা খোঁজে তাদের ভাষা, ভূগোল, বর্ণ ও আঞ্চলিক সংস্কৃতি থেকে। ফলে মুসলিম উম্মাহর দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাঁচাটিই এখন তাদের রাজনীতি ও সংস্কৃতি। দেহ খণ্ডিত হলে বিচ্ছন্ন টুকরোকে আগুনে ফেললেও দেহের বাকী অংশ সে ব্যাথা অনুভব করে না। তাই মুসলিম উম্মাহ ব্যর্থ হচ্ছে গাজা, কাশ্মীর, আরাকান ও উইঘুরের মজলুল মুসলিমদের দুঃসহ ব্যাথাটি বুঝতে ও তাতে সাড়া দিতে। এজন্যই ফিলিস্তিন, ভারত, কাশ্মির, আরাকান ও উইঘুরের মজলুম মুসলিমদের পাশে অন্য এলাকার মুসলিমদের দেখা যায় না। 

বিভক্তির এ বিপদ থেকে বাঁচাতেই মহান আল্লাহ তায়ালা মুসলিম উম্মাহর উপর বিভক্তি গড়াকে হারাম করেছেন -যেমন হারাম করেছেন মানব হত্যা, জ্বিনা ও মদ। এবং একতাকে ফরজ করেছেন -যেমন ফরজ করেছেন নামাজ রোজা ও হজ্জ যাকাত। কিন্তু এরপরও মুসলিমগণ মুসলিম দেশের মানচিত্র ভেঙেই চলেছে এবং বাঁচছে রাষ্ট্রের নামে গড়া বিভক্তির রাষ্ট্রীয় দেয়াল পাহারা দেয়ার পাপ নিয়ে। সে বিভক্তির দেয়াল বাঁচানোর হারাম এজেন্ডাই হলো প্রতিটি মুসলিম দেশের জাতীয় এজেন্ডা। সে লক্ষ্যে প্রতিটি মুসলিম দেশেরই রয়েছে সেনাবাহিনী। বাজেটের বিশাল অংশ হয় ব্যয় হয় সেনাবাহিনীর পিছনে তথা বিভক্তির দেয়াল বাঁচাতে। নিজ দেশের সীমানার বাইরে বসবাসকারী বিপদগ্রস্ত মুসলিমদের বিষয়ে নিশ্চুপ থাকাই তাদের সরকারি নীতি।

মুসলিম উম্মাহর স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ইজ্জতের সাথে মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধানদের গাদ্দারী আবারো দৃশ্যমান হলো ইরানের উপর ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হামলার ক্ষেত্রে। আক্রান্ত ইরানের পাশে দাঁড়াতে কোন মুসলিম রাষ্ট্রই এগিয়ে আসেনি; এমন কি সে হামলার নিন্দা পর্যন্ত করেনি। তারা নীরব দর্শক মাত্র। অধিকাংশ মুসলিম রাষ্ট্র ইরানের উপর ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হামলার এবং দেশটির শীর্ষ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনীর হত্যার নিন্দা পর্যন্ত করেনি। মুসলিম দেশের শাসকদের ঈমান ও বিবেকের মান যে কতটা তলানীতে গিয়ে ঠেকেছে -সেটি বুঝতে কি এরপরও কিছু বাকি থাকে? কিন্তু ইরান যখন উপসাগরীয় এলাকার মার্কিন ঘাঁটিগুলিতে জবাবী হামলা করেছে, তখনই নিন্দা করা শুরু হয়েছে ইরানী হামলার। 

 

বিভক্তি নিয়ে বাঁচাই আজ রাজনীতি ও সংস্কৃতি

মুসলিম জীবনে সবচেয়ে ক্ষতিকর বিদয়াত হলো স্বৈর শাসন এবং মুসলিম উম্মাহর বিভক্তি। কিন্তু এ বিদয়াতের বিরুদ্ধে কোন জিহাদ নাই। দেশের আলেম এবং বুদ্ধিজীবীগণও এ নিয়ে কথা বলে না। বরং বিভক্তির এ বিদয়াত নিয়ে বাঁচাই আজ মুসলিমদের সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে পরিণত হয়েছে। অথচ মুসলিম উম্মাহ যতদিন এরূপ বিভক্তি নিয়ে বাঁচবে ততদিন বঞ্চিত হবে স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ইজ্জত নিয়ে বাঁচা থেকে। কারণ, মহান আল্লাহ তায়ালা কখনো সে নিয়ামত বিভক্ত মুসলিমদের দেন না। বরং যা দেন -তা হলো প্রতিশ্রুত আযাব।

তাই বিপদ শুধু গাজার মুসলিমদের নয়। একই বিপদ ভারত, কাশ্মীর, রোহিঙ্গা ও উইঘুর মুসলিমদেরও। এমন কি সে বিপদ বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মিশর, সৌদি আরব, আমিরাতসহ অন্যান্য মুসলিম দেশের নাগরিকদেরও। কারণ সবাই বাঁচছে বিভক্তি নিয়ে। আর বিভক্তি নিয়ে বাঁচা মানেই মহান রব’য়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ নিয়ে বাঁচা। তখন সে বিদ্রোহের জন্য আযাব তথন অনিবার্য হয়ে পড়ে। মুসলিম উম্মাহ তাই আজ বিরামহীন আযাবের মধ্যে। সে আযাবে নমুনা হলো, সমগ্র মুসলিম বিশ্ব পরিণত হয়েছে এক বিশাল জেলখানায়। প্রতিটি রাষ্ট্র যেন সে জেলখানার একেকটি উঁচু দেয়াল ঘেরা কক্ষ।

মুসলিমদের ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রই প্রমাণ করে তারা মহান আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডা থেকে তারা কতটা বিচ্ছন্ন। তারা পরস্পরে বিচ্ছিন্ন হয়েছে মজহাব, ফিরকা, তরিকা ও পীর-মুরিদীর নামেও। এরূপ বিচ্ছিন্নতা বস্তুত আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর নির্দেশিত দ্বীন ইসলাম থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার দলিল। হৃদয়ে মহান রব’য়ের এজেন্ডার স্মরণ এবং ইসলাম ধারণ করে বাঁচলে তারা কি কখনো এরূপ পরস্পরে বিচ্ছিন্ন হতো? এরূপ বিভক্তি যেমন সূন্নত বিরোধী; তেমনি গুরুতর বিদ্রোহের অপরাধ মহান আল্লাহ তায়ালা হুকুমের বিরুদ্ধে। মুসলিম উম্মাহর মাঝে এরূপ বিভক্তি গড়াটি বস্তুত শয়তানের এজেন্ডা। কারণ এরূপ বিভক্তির মধ্য দিয়ে শয়তান মুসলিমদের দুর্বল করে। বস্তুত মুসলিম জনগণ কতটা শয়তানের এজেন্ডা নিয়ে বাঁচে -সেটি বুঝা যায় তাদের মাঝে বিভক্তির দেয়াল দেখে। সেটি আরো স্পষ্ট ভাবে দেখা যায় যখন বিভক্তির দিনগুলি নিয়ে তারা উৎসব করে। বাংলাদেশের মুসলিমগণ সেরূপ উৎসব করে প্রতিবছর ২৬ মার্চ ও ১৬ ডিসেম্বর তারিখে। এমন উৎসবে প্রচণ্ড খুশি হয় শয়তান ও তার ভারতীয় পৌত্তলিক খলিফাগণ। অথচ ঈমান যে বেঁচে আছে -সেটি তো বুঝা যায়  বিভক্তির দিনগুলিতে প্রচণ্ড বিষাদ বা মাতম দেখে।  এমন শোকের দিন উৎসবের কারণ, মৃত ঈমান এবং অসুস্থ বিবেক। ঈমানদার কখনোই তার রব’যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ নিয়ে উৎসব করে না।

 

বিভক্তি বেঈমানির দৃশ্যমান রুপ                                

বিভক্তি হলো বেঈমানির দৃশ্যমান রুপ। সে বেঈমানির কদর্যতা এতোই প্রকট যে নামাজ রোজা, হজ্জ যাকাত, তাহাজ্জুদ ও দোয়াদরুদ দিয়ে সে বেঈমানি ঢাকা যায়না। এবং যত ইবাদতই করা হোক, তা দিয়ে মুক্তি মেলেনা বিভক্তির নাশকতা থেকে। মুসলিম বিশ্বের বর্তমান বিপর্যয় তো তারই সাক্ষী। মুসলিম বিশ্বের বিভক্ত মানচিত্র নিয়ে যেরূপ উৎসব -তা থেকে বুঝা যায় মুসলিমগণ কতটা বিজয়ী করেছে শয়তান ও তার অনুসারীদের এজেন্ডাকে। বেঈমানির ন্যায় ঈমানও গোপন থাকার বিষয় নয়। ঈমান দৃশ্যমান হয় ভাষা, বর্ণ, অঞ্চল ভিত্তিক পরিচয়ের উর্দ্ধে উঠে ইস্পাতসম একতা গড়ার মধ্যে। মুসলিমদের যে গুণটি মহান আল্লাহ তায়ালাকে সবচেয়ে খুশি করে সেটি হলো তাদের মাঝের সীসাঢালা প্রাচিরসম একতা এবং তার দ্বীনকে বিজয়ী করার জিহাদ -যার উল্লেখ এসেছে সুরা সাফ’য়ের ৪ নম্বর আয়াতে। অথচ মুসলিমগণ আল্লাহকে খুশি করার বদলে খুশি করেছে শয়তানকে। এবং সেটি শয়তানের এজেন্ডাকে বিজয়ী করে এবং মহান রব’য়ের এজেন্ডাকে পরাজিত করে। শয়তানের বিজয় তো মুসলিমদের বিভক্তির মাঝে। এরপরও কি তারা করুণাময় মহান আল্লাহ থেকে করুণা আশা করতে পারে? 

বিভক্তি মুসলিম উম্মাহর জীবনে বার বার ভয়াবহ বিপদ ডেকে এনেছে। এ বিভক্তির কারণেই মুসলিমগণ হালাকু-চিঙ্গিসের হাতে নির্মম গণহত্যার শিকার হয়েছে। এবং বিভক্তির কারণেই মুসলিমগণ স্পেন থেকে নির্মূল হয়েছে। এবং বিভক্তির কারণেই ঔপনিবেশিক শাসনের দখলে গেছে অধিকাংশ মুসলিম ভূমি। অপর দিকে গণহত্যার শিকার হচ্ছে ফিলিস্তিন, কাশ্মীর, ভারত, আরাকান ও চীনের উইঘুরে। বিভক্তির এ বিপদ থেকে বাঁচার একটিই পথ। সেটি হলো, বিভক্তির বদলে প্যান ইসলামী মুসলিম ভাতৃত্বের একতা। এবং সেটিই হলো মহান আল্লাহ তায়ালা এজেন্ডা। এ বিভক্তিকে যদি তারা বাঁচিয়ে রাখে, তবে তাদের বিপদ কখনোই শেষ হবার নয়; বরং পরিণতি আরো ভয়াবহ হবে। তাদের জন্য প্রতি মুসলিম ভূমিতে অপেক্ষা করছে গাজার গণহত্যার ন্যায় গণহত্যা ও গণনির্মূল। বাংলাদেশও তা থেকে বাদ পড়বে না। কারণ যেখানেই রয়েছে মুসলিম, সেখানেই রয়েছে শয়তানী প্রকল্প নিয়ে সক্রিয় ইসরাইল। বাংলাদেশের জন্য সে বৈরী ইসরাইল হলো ভারত। 

 

বিভক্তি বাঁচলে আযাবও বেঁচে থাকবে

বিভক্তির পথ যারা বেছে নেয় তাদের শাস্তি দুনিয়াতে শুরু হলেও দুনিয়াতে শেষ হয়না, আখেরাতেও হাজির হয়। সে পাপ পাপীকে জাহান্নামে পৌঁছায়। সে হুঁশিয়ারিটি মহান আল্লাহ তায়ালা শুনিয়েছেন সুরা আল-ইমরানের ১০৫ নম্বর আয়াতে। তাই বিভক্তি কখনো একাকী আসে না। সাথে আনে মহান আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুত আযাব। সে আযাবই আজ মুসলিম বিশ্বকে ঘিরে ধরেছে। আজ গাজা, লেবানন, জর্দান নদীর পশ্চিম তীর, সিরিয়া বা আরব বিশ্বের অন্যত্র যা কিছু ঘটছে -সেটি আরবদের নিজ হাতের কামাই। কারণ, বিভক্তির পথে তাদের পাপ বিশাল অঙ্কের। তারা আরব বিশ্বকে ২২ টুকরোয় খণ্ডিত করেছে। এটি বিশাল অপরাধ। দেহ খণ্ডিত করলে দেহ বাঁচে না। দেশের ভূগোল খণ্ডিত করলে স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ইজ্জত বাঁচে না। ফলে ৪০ কোটি আরব মুসলিমের ইজ্জত, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা মাটির সাথে মিশে যাচ্ছে। তারা এখন নানা দেশের দ্বারে দ্বারে নিরাপত্তার ভিখারি। একই বিপদের মুখে পাকিস্তান ভাঙার অপরাধী বাঙালি মুসলিমগণ। তাদের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা এবং ইজ্জতও বিপন্ন। ভারতীয় সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়ায় লাশ হতে হয় এবং প্রতিনিয়ত গুলির খাদ্য হতে হয় বাংলা দেশীদের। বাঙালি মুসলিমের এমন বিপন্ন দশা পাকিস্তান আমলে ছিলনা।      

আরব মুসলিমগণ বিশাল বিশাল ৩টি হারাম কাজ একত্রে করেছে। এক). অভিন্ন ধর্ম, অভিন্ন ভাষা, অভিন্ন বর্ণ এবং এক অখণ্ড ভূ-খণ্ডের বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও আরবগণ বিভক্ত হয়েছে ২২ টি রাষ্ট্রে। দুই).তারা খলিফার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে এবং খেলাফত ভেঙেছে। তিনি). ১০ লাখের বেশি আরব মুসলিম ব্রিটিশ ও ফরাসীদের সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছে। অথচ হারাম হলো কোন কাফির বাহিনীতে যোগ দেয়া। এমনকি তাদের নাশকতার নমুনা হলো: খলিফার নির্মিত মদিনা-জেরুজালেম-দামেস্ক রেল লাইনকেও তারা উপড়িয়ে ফেলেছিল। রেল লাইনও তাদের কাছে অপরাধী গণ্য হয়েছিল। অপর দিকে স্থানীয়  ফিলিস্তিনীরা ধনশালী বিদেশী ইহুদিদের সাদরে গ্রহণ করেছিল এবং তাদের কাছে স্বেচ্ছায় জমি বিক্রয় করেছিল। এভাব ইসরাইলের প্রতিষ্ঠার জন্য ভূমি প্রস্তৃত করেছিল খোদ ফিলিস্তিনীরা। অথচ উসমানিয়া খেলাফত আমলে ইহুদিদের কাছে ফিলিস্তিনের জমি বিক্রয় নিষিদ্ধ ছিল। তাদের সে গুরুতর পাপ এখন আরবদের ঘরে ঘরে আযাব নিয়ে হাজির হয়েছে। পাপ আযাব আনতে বিলম্ব করে, তবে ছাড় দেয় না।

এ আযাব না আসলে বরং সুরা আল-ইমরানের ১০৫ নম্বর আয়াত অসত্য প্রমানিত হতো। ইরাক, সিরিয়া ও ফিলিস্তিন যেভাবে শত্রুশক্তির হাতে অধিকৃত হলো, লক্ষ লক্ষ আরব যে ভাবে গণহত্যার শিকার হলো এবং বহু লক্ষ আরব যেভাবে উদ্বাস্তু হলো -সেগুলিকে কি রহমত বলা যায়? মুসলিম উম্মাহর এ ভূ-রাজনৈতিক বিভক্তি মুষ্টিমেয় কিছু স্বার্থান্বেষী দুর্বৃত্তের রাজা-বাদশাহ ও স্বৈর শাসক হওয়ার সুযোগ করে দিলেও ভয়ানক ক্ষতির মুখে পড়েছে সমগ্র মুসলিম উম্মাহ। প্রশ্ন হলো, এরপরও কি তারা বিভক্তির দেয়ালগুলি বাঁচিয়ে রাখবে? বিভক্তির দেয়াল বাঁচলে আযাবও যে বেঁচে থাকবে এবং দিন দিন তা তীব্রতর হবে -তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে? 14/09/2026

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *