মুসলিম উম্মাহর পতনের শুরু কিভাবে?

ফিরোজ মাহবুব কামাল

 

শুরুটি ভূ-রাজনৈতিক বিভক্তির দিয়ে

মুসলিম উম্মাহর পতনের শুরু তখন থেকেই যখন মুসলিমগণ নিজ দেশের ভূগোলে বৃদ্ধি না ঘটিয়ে সেটিকে খণ্ডিত করা শুরু করেছে। অথচ দেশের ভূগোলে যখন বৃদ্ধি আসে তখন শক্তিও বৃদ্ধি পায়। এজন্যই কোন মুসলিম দেশের ভৌগলিক সীমানাকে সুরক্ষিত করার ন্যায় ভূগোল বৃদ্ধির যুদ্ধও পবিত্র জিহাদ। সে পবিত্র জিহাদ মু’মিনদের জন্য শাহাদতের রাস্তা খুলে দেয়। তাই মুসলিমদের প্রতিটি যুদ্ধ প্রতিরক্ষার যুদ্ধ -সেটি সত্য নয়।  বহু যুদ্ধ হয়েছে শয়তানী শক্তির হাত থেকে মহান রব’য়ের অধিকৃত ভূমিকে মুক্ত করতে। অপর দিকে হারাম হলো মুসলিম দেশের ভূগোল ভাঙা। এটি কবিরা গুনাহ। এ গুনাহ বিজয় বাড়ায় শয়তানী শক্তির।  মুসলিম উম্মাহর বর্তমান বিপর্যয়ের কারণ, তারা ফরজ জিহাদকে বাদ দিয়ে কবিরা গুনাহর পথটি বেছে নিয়েছে। এবং মুসলিম ভূমিতে বিজয় বাড়িয়েছে ইসলামের শত্রুপক্ষের।

মুসলিমদের আজকের বিপর্যয়ের কারণ এ নয় যে, নামাজী, রোজাদার, যাকাত দাতা ও হাজীদের সংখ্যা হঠাৎ কমে গেছে। এটিও নয় যে মুসলিম জনপদে মসজিদ মাদ্রাসাগুলি ধ্বংস হয়ে গেছে। বিপর্যয়ের মূল কারণ মুসলিম উম্মাহর বিভক্তি। হাত পা ভাঙলে যেমন দেহ দুর্বল হয়, মুসলিম দেশ ভাঙলে তেমনি দুর্বল হয় মুসলিম উম্মাহ। প্রতিটি বিভক্তির অর্থই শক্তিহানী। বিভক্তির ন্যায় যা কিছু মুসলিম উম্মাহর জন্য ক্ষতিকর, মহান রাব্বুল আলামীন সেগুলি হারাম করেছেন। মুসলিম ভূমি খণ্ডিত হলো দুর্বল হয় এবং সহজেই তা শত্রু শক্তির দখলে যায়। শত্রুর হাতে অধিকৃত সে দেশে তখন অসম্ভব হয় নিরাপদে পূর্ণ ইসলাম-পালন। সেটি আজ তীব্র ভাবে বুঝছে ভারতের মুসলিমগণ। সেদেশে মুসলিমদের ঘরবাড়ি ও মসজিদ ভাঙা হচ্ছে; মাইকে আযান এবং গরু কুরবানী নিষিদ্ধ করা হয়েছে। জুম্মার দিনে মসজিদে জায়গা না পেয়ে কেউ রাস্তায় নামাজে দাঁড়ালে তাকে মারপিট করা হয়। অথচ রাস্তা বন্ধ করে দিনরাত কীর্তন গাইলে বা পূজামণ্ডপ ও রথের মেলা বসালে সেটি সে দেশে কোন অপরাধ নয়। ইসলামের শত্রুশক্তির দখলে যে রাষ্ট্র, সে রাষ্ট্রে মুসলিমদের জন্য এভাবেই বিলুপ্ত করা হয় ধর্ম পালনের স্বাধীনতা, মানবাধিকার, নিরাপত্তা ও শান্তি। তখন সে রাষ্ট্রে অসম্ভব হয় মহান আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডাকে বিজয়ী করা।

অধিকৃত ফিলিস্তিনেই শুধু ইসরাইল নির্মিত হয়নি। বরং ইসরাইলে পরিণত হয়েছে নৃশংস ফ্যাসিস্ট শক্তির হাতে অধিকৃতি প্রতিটি মুসলিম ভূমি।  রাজপথে প্রতিবাদে নামলে শুধু ইসরাইলেই গুলিবিদ্ধ ও কারাবন্দী হতে হয়না, গুলিবিদ্ধ ও কারাবন্দী হতে হয়েছে মুজিব ও হাসিনার বাংলাদেশে এবং হাফিজ আল আসাদ এবং বাশার আল আসাদের সিরিয়াতেও। আজও কারাবন্দী ও গুলিবিদ্ধ হতে সৌদি রাজা, দুবাইয়ের শেখ বা মিশরের জেনারেল সিসি অধিকৃত রাষ্ট্রে। ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রটি বিশাল হলে সে বিশাল দেশকে কারাগারে পরিণত করা দুর্বৃত্ত শাসকদের জন্য এতোটা সহজ হয় না। এমন কি সামরিক শাসকও সে বিশাল দেশকে সহজে নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেনা। বিশাল ভূগোলের ন্যায় জনগণের শক্তিও তখন বাধা হয়ে দাড়ায়। ফলে ফ্যাসিস্ট মুজিব ও ফ্যাসিস্ট হাসিনা যতটা সহজে বাংলাদেশকে একটি কারাগারে পরিণত করেছিল এবং ইচ্ছামত বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের ফাঁসিতে চড়িয়েছে, গুম খুন করেছে এবং কারাগার ও আয়না ঘরে নিয়েছে -সেটি বিশাল অখণ্ড পাকিস্তানের ২৩ বছরে কখনোই হয়নি। ঈদুরকে সাপ সহজেই গিলে ফেলতে পারে, কিন্তু হাতির গায়ে এমনকি সিংহও দাঁত বসাতে পারে না। বৃহৎ ভূগোলের এটি এক বিশাল ফায়দা। তাই দেশের ভূগোল ক্ষুদ্রতর করা কখনোই কোন বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কোন কালেই এটি ঈমানদারদের কাজ ছিল না। সে হারাম কাজটি বার বার সংঘটিত হয়েছে ইসলামের বিদেশী ও দেশী শত্রুদের হাতে। ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বিদেশী শত্রু হলো সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও ভারতের ন্যায় আগ্রাসী শক্তিবর্গ; আর উম্মাহর দেশী শত্রু হলো মুসলিমের বেশধারী সেক্যুলারিস্ট, কম্যুনিস্ট, জাতীয়তাবাদী, স্বৈরাচারী ও রাজতন্ত্রী ফ্যাসিস্টগণ। ইসলামের এ দেশী ও বিদেশী শত্রুদের হাতে মুসলিম বিশ্ব আজ ৫০টির বেশি খণ্ডে বিভক্ত।

ইসলামের বিদেশী ও দেশী শত্রুরাই হলো শয়তানের অতি বিশ্বস্ত বন্ধু। মুসলিম উম্মাহর ক্ষতিসাধনে এরা সর্বত্র একত্রে কাজ করে। যেখানেই মুসলিম উম্মাহর একতাবদ্ধ ভাবে বেড়ে উঠার সম্ভাবনা, সেখানেই সে উত্থান রোধে তারা কোয়ালিশন গড়ে। শত্রুদের সে কোয়ালিশন ১৯৭১’য়ের পূর্ব পাকিস্তানের মাটিতে দেখা গেছে পাকিস্তান ভাঙতে; ১৯১৭ সালে সেরূপ কোয়ালিশন আরব ভূমিতে দেখা গেছে খেলাফত ভাঙতে। যেখানেই মুসলিম রাষ্ট্রকে খণ্ডিত করার যুদ্ধ, বুঝতে হবে সেটি শতভাগ শয়তানী প্রকল্প। এমন শয়তানী প্রকল্পের আশে পাশে সব সময়ই জমা হয় মুসলিম দেশে বসবাসকারী গুপ্ত বেঈমানেরা। এরাই ১৯৭১’য়ে পৌত্তলিক ভারতের কোলে আশ্রয় নিয়েছিল এবং ভারতের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ নিয়ে ভারতকে বিজয়ী করতে ভারতীয় সেনাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছিল। এরাই ১৯৭১’য়ে প্রায় ৩ লাখ বিহারি এবং বহু হাজার পাকিস্তানপন্থীকে হত্যা করেছে। এমন নাশকতার প্রকল্পে কখনোই কোন মুসলিম যোগ দেয় না। ১৯৭১’য়ে তাই কোন ইসলামপন্থী নেতাকর্মীকে ভারতে যেতে দেখা যায়নি। সে শয়তানী প্রকল্পে  বাঙালি সেক্যুলারিস্ট ও জাতীয়তাবাদী ফ্যাসিস্টদের দেখা গেছে ভারতীয় পৌত্তলিকদের কোলে; আর ১৯১৭ সালে আরব জাতীয়তাবাদী সেক্যুলারিস্টদের দেখা গেছে সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজ ও ফরাসীদের কোলে। সেক্যুলারিস্ট বাঙালিরা বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান ভেঙে দুর্বল বাংলাদেশ বানিয়েছে। আর সেক্যুলারিস্ট আরবগণ খেলাফাত ভেঙে ২২টি দুর্বল আরব রাষ্ট্র এবং শক্তিশালী ইসরাইলের জন্ম দিয়েছে। এরূপ বিভক্তির মধ্য দিয়ে আরবগণ মুসলিমদের প্রথম কিবলা জেরুজালেম ও ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমিকে ইসরাইলীদের হাতে তুলে দিয়েছে। একতার অর্থ যেমন মহান আল্লাহর হুকুমের প্রতি আনুগত্য; বিভক্তির অর্থই হলো বিদ্রোহ। সে বিদ্রোহ ও বিভক্তির নাশকতা যে কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে তার জাজ্জ্বল্যমান উদাহরণ হলো আজকের খণ্ডিত মুসলিম উম্মাহ।

 

উৎসব বিদ্রোহ ও বেঈমানী নিয়ে

বাংলাদেশে ন্যায় প্রায় প্রতিটি মুসলিম দেশে বছরের সবচেয়ে বড় উৎসবটি হয় নিজ দেশের খণ্ডিত মানিচত্র গড়ার দিনটিকে নিয়ে। বাংলাদেশে  প্রতি বছর সেটি হয় ২৬ মার্চে। বস্তুত এ উৎসবটি হয় মহান রব’য়ের একতার বিধানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ এবং মুসলিম দেশ ভাঙার হারাম কর্মকে মহিমান্বিত করতে। হৃদয়ে শরিষা দানা পরিমান ঈমান এবং মুসলিম উম্মাহর কল্যাণের ভাবনা থাকলে কেউ কি এমন  উৎসবে অংশ নিতে পারে? বিভক্তির এদিনগুলি তো মুসলিম উম্মাহর মুখ মলিন হওয়ার দিন। হৃদয়ে ঈমান থাকলে তো মুসলিম দেশ ভাঙার নাশকতা নিয়ে মাতম করতে দেখা যেত। প্রকৃত ঈমানদারের ঈমান দেখা যায় সে মাতমের মাঝে; তাঁর উৎসব তো মুসলিম উম্মাহর একতা ও বিজয় নিয়ে। মুসলিমের ঘর ভাঙা ও দেশ ভাঙা নিয়ে একমাত্র কাফির ও মুনাফিকগণই উৎসব করতে পারে; কোন ঈমানদার নয়। বস্তুত মুসলিম দেশ ভাঙার উৎসবের মাঝে দৃশ্যমান হয় তাদের গুপ্ত বেঈমানী। পরিতাপের বিষয় হলো বাংলাদেশের তথাকথিত বহু মোল্লা মৌলভী ও ইসলামপন্থীদের সে গুপ্ত বেঈমানী প্রতি বছর প্রকাশ পায়  ২৬ মার্চ ও ১৬ ডিসেম্বর এলে। তারাও আজ সেক্যুলারিস্টদের ন্যায় পৌত্তলিক ভারতের ১৯৭১’য়ের পাকিস্তান ভাঙার যুদ্ধকে মহান মুক্তিযুদ্ধ বলে। প্রশ্ন হলো, মুসলিম দেশ ভাঙার হারাম যুদ্ধটি মহান মুক্তিযুদ্ধ হয় কি করে? উল্লেখ্য ১৯৭১’য়ের যুদ্ধ চলা কালে জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামী, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মত দলের নেতাগণ এবং বহু নির্দলীয় আলেম পাকিস্তান ভাঙার যুদ্ধকে হারাম বলেছিলেন। ১৯৭১’য়ের যুদ্ধকালীন ৯ মাসে ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকাগুলির পাতা উল্টালে তার প্রমাণ মিলবে। এমন কি কোন পীর, কোন মুফতি, কোন প্রখ্যাত ইমামও এ যুদ্ধকে জায়েজ বলেননি এবং এ যুদ্ধকে সমর্থণ করেননি।   

ভারতীয় পৌত্তলিকদের ন্যায় বাঙালি জাতীয়তাবাদী ফ্যাসিস্ট, কম্যুনিস্ট এবং সেক্যুলারিস্টগণও পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা যেমন চায়নি, তেমনি দেশটি বেঁচে থাকুক সেটিও চায়নি। ইসলামের এ বাঙালি শত্রুগণ পৌত্তলিক ভারতের অর্থ, অন্ন, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ নিয়ে ১৯৭১’য়ে পাকিস্তান ভেঙে ইসলামের শত্রু শিবিরে বিজয় উপহার দিয়েছে। পাকিস্তান ভাঙার পরিণতিতে দক্ষিণ এশিয়ার বুকে দাপট বেড়েছে ভারতীয় হিন্দুত্ববাদীদের। ভারত পরিণত হয়েছে আঞ্চলিক শক্তিতে। বাংলাদেশ পরিণত হয়েছিল ভারতের একটি আশ্রিত রাজ্যে। এবং বাংলাদেশীরা হারিয়েছে পদ্মা, তিস্তাসহ ৫৪টি নদীর পানি। ভারতীয় মুসলিমদের ন্যায় নিরাপত্তা হারিয়েছে বাংলাদেশের মুসলিমগণও; তাদের প্রতিদিন বাঁচতে হচ্ছে ভারতীয় আগ্রাসনের ভয় নিয়ে।    

 

 

হারিয়ে গেল যে মহা সুযোগ

খেলাফত বাঁচিয়ে রাখলে মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় ৫০ কোটি আরব, তুর্কি ও কুর্দি জনগোষ্ঠি একত্রে বিশ্বশক্তির জন্ম দিতে পারতো। তাদের হাতে ছিল বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্ট্রাটেজিক এলাকা। হাতে রয়েছে তেল, গ্যাস ও স্বৈর শক্তির অঢেল ভাণ্ডার। তাছাড়া রয়েছে একতাবদ্ধ ভাবে বাঁচার হাজার বছরের অধিক ভূ-রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও ইতিহাস। অথচ ভূগোল খণ্ডিত হওয়াতে মুসলিম উম্মাহর সব সম্ভাবনাই পণ্ড হয়ে গেল। বিভিক্তির গভীর নাশকতা এভাবে আবারো প্রমাণিত হলো। অথচ সে বিভক্তি থেকে বাঁচতে মহান রাব্বুল আলামীন মুসলিমদের বার বার হুশিয়ার করেছেন। পবিত্র কুর’আনে বিভক্তিলব্ধ আযাবের কথাও তিনি জানিয়ে দিয়েছেন।  অথচ একতার কারণে খেলাফতের ছত্রছায়ায় মুসলিমগণ বিশ্বশক্তির মর্যাদা ভোগ করেছিল প্রায় সাড়ে চৌদ্দ শত বছর।

রাষ্ট্র ক্ষুদ্র হোক বা বড় হোক, সমস্যা থাকতেই পারে। সমস্যার সমাধান করতে হয় রাজনৈতিক ভাবে। দেশ ভাঙলে সমস্যার সমাধান হয়না, বরং বৃদ্ধি পায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আজ বিশ্বশক্তি। কারণ, দেশটিতে নানা বর্ণের ও নানা ভাষার মানুষ একতাবদ্ধ। দেশটি যেমন ইংরেজ, স্পানিশ, আইরিশ, জার্মান, ডাচ, ফরাসী, ইতালীয় ইত্যাদি ইউরোপীয়ানরা আছে, তেমনি আছে আফ্রিকান, আরব, পাকিস্তানী, ভারতীয়, চীনা ও বাংলাদেশী। এভাবে একতাবদ্ধ ভাবে বাঁচা মার্কিনীদের ভূ-রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। এমন একতাবদ্ধ ভাবে বাঁচার সংস্কৃতি মার্কিনীদের বিশ্বশক্তির মর্যাদা দিয়েছে। অথচ অতীতে দেশটি ভাঙতে উত্তর ও দক্ষিণ অঞ্চলের মাঝে দীর্ঘকালীন রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধ হয়েছে। অবশেষে তারা একতার পথ বেছে নিয়েছে।  কিন্তু মুসলিমদের কাছে একতাবদ্ধ হওয়াটি স্রেফ ভূ-রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিষয় নয়, বরং এটি ফরজ ইবাদত। বিভক্ত হওয়াটি হারাম; এবং সেটি ভয়ানক আযাবের পথ।     

পাকিস্তানে স্বৈরাচার ছিল, বৈষম্যও ছিল। তবে এ সমস্যাগুলির শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাধানও ছিল। কিন্তু ১৯৪৭’য়ে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা থেকেই ভারত দেশটিকে খণ্ডিত করার সুযেগ খুঁজছিল। সে সুযোগ আসে ১৯৭১’য়ে; ভারত অনুগত দাস রূপে হাতে পায় মুজিবের ন্যায় ক্ষমতালোভী পাকিস্তানের ঘরের শত্রুকে। ফলে আগ্রাসী ভারত পরিকল্পিত ভাবেই মুজিব ও তার অনুসারীদের শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথে যেতে দেয়নি। অনিবার্য করে একটি রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধ। অভিযোগ তোলা হয়, বৈষম্যের কারণে পাকিস্তান ভেঙে গেছে। বৈষম্যের কারণে দেশ ভাঙলে ভারত এতো দিনে ভেঙে যেত। কারণ, দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলির সাথে উত্তর ভারতের রাজ্যগুলির বৈষম্য আকাশচুম্বি। বিহারে মাথাপিছু বার্ষিক আয় মাত্র  ৮ শত মার্কিন ডলার। অথচ তামিল নাডুর মাথাপিছু বার্ষিক আয় ৩ হাজার ৩ শত ডলার -বিহারের ৪ গুণের অধিক। এমন বৈষম্য নিয়েও ভারত একতাবদ্ধ। এরূপ বিশাল বৈষম্য পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের মাঝে কখনোই ছিলনা।

গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইকে বিজয়ী করলে পাকিস্তানের ভবিষ্যতের চিত্রটি ভিন্নতর হতো। পাকিস্তান পরিণত হতো ৪৪ কোটি জনসংখ্যা নিয়ে গঠিত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম পারমানবিক শক্তি। বাঙালি মুসলিমগণ হতো সে রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক। ফলে স্থান পেত পারমানবিক অস্ত্রধারী সে দেশটির চালকের আসনে। তখন পাকিস্তান পরিণত হতো বহু ভাষা ও বহু বর্ণের জনগণ নিয়ে একটি সিভিলাইজেশনাল স্টেট। তখন বাঙালি মুসলিমগণ পেত বিশ্ব রাজনীতিতে -বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বের রাজনীতিতে প্রভাব ফেলার সুযোগ। তখন পাকিস্তান পেত ফিলিস্তিন, কাশ্মীর, আরাকানের মুসলিমদের পক্ষে দাঁড়ানোর নৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তি।

 

আল্লাহকে খুশি করার বদলে শয়তানকে খুশি করার এজেন্ডা

সবচেয়ে বড় কথা হলো, মুসলিম উম্মাহর একতা শয়তান ও তার অনুসারী কাফির ও মুনাফিকদের কাছে চক্ষুশূল হলেও তাতে মহান আল্লাহ তায়ালা প্রচণ্ড খুশি হতেন এবং নানা নিয়ামত দিয়ে পুরস্কৃত করতেন। কারণ, বিভক্তি থেকে বাঁচানো এবং একতার পথ দেখানোই মহান রব’য়ের নীতি। মুসলিম উম্মাহর জন্য সেরূপ একটি ভিশন, মিশন ও লক্ষ্য নিয়েই তো হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, খাজা নাজিমুদ্দীন, নূরুল আমীনের মত মুসলিম লীগের প্রজ্ঞাবান বাঙালি নেতাগণ ১৯৪৭ সালে বাংলাকে পাকিস্তানভূক্ত করেন। উম্মাহর কল্যাণের সে অভিন্ন ভাবনা নিয়ে ১৯৭১’য়ের প্রতিটি ইসলামী দলের নেতাকর্মী অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষ নেয়। কিন্তু ইসলামবিচ্যুৎ বাঙালি জাতীয়তাবাদী ফ্যাসিস্ট, কম্যুনিস্ট ও সেক্যুলারিস্টদের কাছে সে ভিশন ও মিশন গুরুত্ব পায়নি। আল্লাহ তায়ালাকে খুশি করার বদলে তাদের এজেন্ডা হয় শয়তান ও শয়তানের পৌত্তলিক খলিফাদের খুশি করা। তারা পশ্চিম পাকিস্তানী মুসলিমদের চেয়ে ভারতীয় হিন্দুত্ববাদীদেরকেই পরম বন্ধু মনে করে। অথচ ১৯৪৭’য়ে পশ্চিম পাকিস্তানী মুসলিমদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বাঙালি মুসলিমগণ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করেছিল। ভারতীয় পৌত্তলিকগণ সে সময় পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিরোধীতা করেছিল।

লক্ষণীয় হলো, বাঙালি জাতীয়তাবাদী ফ্যাসিস্ট, কম্যুনিস্ট ও সেক্যুলারিস্টদের কাছে স্বাধীন থাকার চেয়ে ভারতীয় এজেন্ডার সাথে একাত্ম হওয়াই অধিক গুরুত্ব পায়। ভারতের এজন্ডাই তাদের এজেন্ডায় পরিণত হয়। সেটি বুঝা যায় ভারতের সাথে তাজুদ্দীন ৭ দফা চুক্তি স্বাক্ষর করা থেকে। সে চুক্তিতে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী রাখার অধিকার ছিলনা। ছিলনা স্বাধীন পররাষ্ট্র নীতির অধিকার। এরপর মুজিব স্বাক্ষর করে ভারতের সাথে ২৫ সালা আনুগত্যের চুক্তি। ফলে এটি সুস্পষ্ট, ১৯৭১’য়ে স্বাধীনতা অর্জিত হয়নি, বরং অর্জিত হয়েছে ভারতের অধীনতা। গণতন্ত্রও অর্জিত হয়নি। গণতন্ত্র কবরে গেছে এবং অর্জিত হয়েছে বাকশালী ফ্যাসিবাদ। প্রতিশ্রুত ৮ আনা সের চাউল মেলেনি, সোনার বাংলাও নির্মিত হয়নি; বরং ১৯৭৩-৭৪’য়ের দুর্ভিক্ষে ১৫ লাখ মানুষকে অনাহারে মারা যেতে হয়েছে। আরো বিড়ম্বনা হলো, খুনি ও ফ্যাসিস্ট মুজিবের ন্যায় নৃশংস অপরাধীকে দেয়া হয়েছে জাতির পিতা ও বঙ্গবন্ধুর মর্যাদা। এবং ‍“নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবর” য়ের পবিত্র তাকবিরের বদলে জনগণকে বাধ্য করা হয়েছে পৌত্তলিক চেতনাসমৃদ্ধ “আমার সোনার বাংলা” গাইতে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *