ভারত চায় পরাধীন বাংলাদেশ

image_pdfimage_print

স্ট্রাটেজী আশ্রিত বাংলাদেশ নির্মাণের

ভারত বাংলাদেশের সাথে বন্ধুত্বের কথা বলে। তাদের কাছে সে বন্ধুত্বের বিশেষ একটি সংজ্ঞাও আছে। সেটি হলো ভারতের কাছে নিঃশর্ত অধীনতা। নইলে বন্ধুত্বের লক্ষণ কি এই, ভারত বাংলাদেশকে ঘিরে কাঁটা তারের বেড়া দিবে? পদ্মা, মেঘনা, তিস্তাসহ বাংলাদেশের নদীগুলোর পানি তুলে নিবে? সীমান্তে ভারতীয় বর্ডার সিক্যিউরিটি ফোর্স (বি.এস.এফ) ইচ্ছামত বাংলাদেশী নাগরিকদের হত্যা করবে? বাংলাদেশের বাজারে ভারতীয় পণ্যের অবাধ বাজার চাইবে অথচ ভারতের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করবে? বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ট্রানজিট চাইবে আর বাংলাদেশের প্রাপ্য ৩ বিঘা করিডোর দিতে গড়িমসি করবে? বন্ধুত্ব কে না চায়? তবে বন্ধুত্বের কথা বললেই কি বন্ধুত্ব হয়? সে জন্য তো জরুরী হলো বন্ধুসুলভ মানসিকতা ও আচরণ। কিন্তু লক্ষ্য যেখানে বাজার দখল, নদী দখল, সীমান্তদখল ও আধিপত্য বিস্তার -সেখানে কি বন্ধুত্ব হয়? ভারত বন্ধুত্বের দোহাই দেয় স্রেফ ধোকা দেয়ার জন্য। বন্ধুত্বের লেবাসে ভারত চায় নিঃশর্ত আনুগত্য ও দাসত্ব। এখানে লক্ষ্য, পরাধীন বাংলাদেশের নির্মাণ। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনামলে স্বাধীনতার দাবী তোলাটি বিবেচিত হতো বিদ্রোহ ও সন্ত্রাস রূপে। তেমনি আজ ভারতের অধীনতার বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলাটি গণ্য হচ্ছে ভারত-বিরোধীতা ও সন্ত্রাস রূপে।

ভারত যখন সাম্রাজ্যবাদী ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের দ্বারা অধিকৃত ছিল তখন এদেশের বিশাল এলাকা জুড়ে পাহারাদারির মত সামরিক বল, প্রশাসনিক সামর্থ ব্রিটিশদের ছিল না। এদেশে তারা বসবাসের জন্য আসেনি, এসেছিল লুণ্ঠনে। লুণ্ঠনের হাতিয়ার ছিল সামরিক আগ্রাসন, ক্ষমতা দখল ও বাজার দখল। বাণিজ্যের ময়দান থেকে প্রতিদ্বন্দিদের হটাতে তারা বাংলার মসলিন তাঁতশিল্পিদের আঙ্গুল কেটেছিল। ধ্বংস করেছিল দেশী শিল্প। তখন  ভারতে অবস্থিত ব্রিটিশ লোকবল কোন কালেই কয়েক লাখের বেশী ছিল না। নিজেদের সামরিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের পাহারাদারির কাজে তা কোন কালেই পর্যাপ্ত ছিল না, ফলে লোকবলের সে ঘাটতি পূরণে ব্রিটিশ সরকার শুরু থেকেই তাই পার্টনার খুঁজতে থাকে। বহু ভারতীয় –বিশেষ করে হিন্দুরা সে দায়িত্ব পালনে দ্রুত এগিয়ে আসে। ব্রিটিশ সরকার তাদেরকেই ভারতের বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় শাসক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে। ভারতীয় ইতিহাসে এরাই রাজা, মহারাজা, রানী, মহারানী ও নবাব রূপে প্রতিষ্ঠা পায়। তাদের সংখ্যা ছিল সহস্রাধিক। শক্তিশালী সামরিক বাহিনী গঠনের অধিকার তাদের ছিল না। বিদেশ থেকে অস্ত্র-ক্রয়েরও কোন অধিকার ছিল না। এসব রাজা-মহারাজাগণ নিজেদের স্বাধীন বলে দাবী করতো। স্বাধীনতা ও স্বায়ত্বশাসনের নামে তাদের যে অধিকার ছিল তা কিছু কিছু উজির-নাযির রাখার। অধিকার ছিল কিছু খাজনা আদায়ের, এবং সে কাজের জন্য অধিকার ছিল কিছু নায়েব, গোমাস্তা, তহসিলদার, পাইক-পেয়াদা রাখার। অধিকার ছিল আদালত বসানোর। তাদের কোন বিদেশ নীতি ছিল না, অন্য কোন দেশে তাদের কোন দূতাবাসও ছিল না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় এমন দেশকে বলা হয় প্রটেক্টরেট বা আশ্রিত রাষ্ট্র। আশ্রিত রাষ্ট্রগুলি সাধারণতঃ এমন সব স্বায়ত্বশাসিত ভূখণ্ড যা অন্য যে কোন কোন তৃতীয় রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য হামলার বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র কর্তৃক কূটনৈতিক ও সামরিক নিরাপত্তা পায়। এই নিরাপত্তা প্রাপ্তির বিনিময়ে উক্ত আশ্রিত রাষ্ট্রের উপর কিছু বাধ্যবাধকতা থাকে, এবং এর ফলে সংকুচিত হয় তার স্বাধীনতা। ব্রিটিশ আমলে হায়দারাবাদ, ভূপাল, জয়পুর, উদয়পুর, ত্রিপুরা, গোয়া, বাহাওয়ালপুর ইত্যাদি রাজ্যগুলো হল সেরূপ আশ্রিত রাষ্টের নমুনা। হায়দারাবাদের নিজাম বিশ্বের সবচেয়ে ধনি ব্যক্তি রূপে পরিচিত হলেও দরিদ্র আফগাণদের যে স্বাধীনতা ছিল সেটি তার ছিল না। বিশাল ভারতীয় ভুমি খণ্ডিত করে এসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দেশীয় রাজ্যগুলো সৃষ্টি করা হয়েছিল এ জন্য যে, ভারতের উপরে ব্রিটিশের সামরিক, অর্থনৈতিক এ সাংস্কৃতিক আধিপত্য স্থাপনে তারা সহযোগিতা দিবে। এর ফলে ভারত শাসনে ব্রিটিশের দায়ভার কমেছিল,এবং কমেছিল তাদের অর্থ ও রক্তক্ষয়। আশ্রিত রাষ্ট্রগুলোর শাসকদের উপর আরোপিত দায়িত্বটি ছিল, তাদের রাজ্যে ব্রিটিশদের বিরোধী কোন যুদ্ধ বা আন্দোলন গড়ে উঠতে দিবে না। ব্রিটিশ বিরোধী কোন সামরিক বা বেসামরিক নেতাকর্মীদের তারা যেমন আশ্রয় দিবে না, তেমনি কোন শত্রুদেশের সাথে তারা কূটনৈতিক বা সামরিক সম্পর্কও গড়বে না।

 

একাত্তরের অধীনতা 

১৯৭১এর যুদ্ধে ভারত বিজয়ী হয়, পরাজিত ও খণ্ডিত হয় পাকিস্তান। পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চল নিয়ে সৃ্ষ্টি হয় বাংলাদেশ। প্রশ্ন হল, বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের স্ট্রাটেজীটা কি ছিল? এবং কীরূপে সংজ্ঞায়িত করা যাবে মুজিব আমলের সে বাংলাদেশকে? ভারত কি আদৌ চাইতো স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা? বস্তুত ভারতের চাওয়া-পাওয়ার বিষয়টি আদৌও গোপন বিষয় নয়। শুধু ভারত কেন, কোন দেশের রাজনীতি, পররাষ্ট্র নীতি ও সামরিক নীতিই গোপনীয় বিষয় নয়। ব্যক্তির কথা ও আচরনের মধ্যে দিয়ে যেমন ধরা পড়ে সে নিজেকে এবং অন্যকে নিয়ে কীরূপ ভাবে সে বিষয়টি। তেমনি একটি দেশের সরকারের লক্ষ্য, আদর্শ,ভিশন এবং প্রতিবেশী নিয়ে তার ধারণাটি ধরা পড়ে সে দেশের রীতিনীতি, আচরণ ও অন্য দেশের সাথে তার লেনদেন, ব্যবসাবাণিজ্য ও স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলোর মাধ্যমে। একটি দেশের চরিত্র বুঝার জন্য এগুলো হলো অতি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। বাংলাদেশের সাথে ভারত সরকার অনেকগুলো চুক্তি করেছিল। ভারত নিজেকে কীরূপ ভাবে এবং বাংলাদেশকেই বা কি মনে করে সেটির সুষ্ঠ পরিচয় মেলে সে সময়ের স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলো দেখলে। ভারতের পক্ষ থেকে চুক্তির শুরু স্রেফ ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বরের পর নয়, বরং তার পূর্ব থেকেই। আওয়ামী লীগ নেতা তাজুদ্দীন যখন অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তখন ভারতের সাথে ৭ দফা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির শর্ত গুলো ছিল এরূপঃ এক). ভারতীয় সমরবিদদের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশে আধা সামরিক বাহিনী গঠন করা হবে। গুরুত্বের দিক হতে এবং অস্ত্রশস্ত্রে ও সংখ্যায় এই বাহিনী বাংলাদেশের মূল সামরিক বাহিনী হতে বড় ও তাৎপর্যপূর্ণ হবে। (পরবর্তীকালে এই চুক্তির আলোকে রক্ষী বাহিনী গড়া হয়)। দুই). ভারত হতে সমরোপকরণ অস্ত্রশস্ত্র ক্রয় করতে হবে এবং সেগুলি করতে হবে ভারতীয় সমরবিদদের পরামর্শানুযায়ী। তিন). ভারতীয় পরামর্শেই বাংলাদেশের বহিঃবাণিজ্য কর্মসূচী নির্ধারণ করতে হবে। চার). বাংলাদেশের বাৎসরিক ও পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ভারতীয় পরিকল্পনার সহিত সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। পাঁচ).বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতির অনুরূপ হতে হবে। ছয়).ভারত-বাংলাদেশ চুক্তিগুলি ভারতীয় সম্মতি ব্যতীত বাতিল করা যাবে না। সাত). ভারত যে কোন সময় যে কোন সংখ্যায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারবে। -(সূত্রঃ অলি আহাদ, জাতীয় রাজনীতিঃ ১৯৪৫ থেকে ১৯৭৫)। প্রশ্ন হল, কোন স্বাধীন দেশ কি এমন নীতি মেনে নিতে পারে? মেনে নিলে কি তার স্বাধীনতা থাকে? এ চুক্তির পর কি আর প্রমাণের অপেক্ষা রাখে,বাংলাদেশের স্বাধীনতা নয়, ভারতের প্রতি অধীনতাকে সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যেই সে চুক্তি সাক্ষর করা হয়েছিল। আওয়ামী লীগ নেতারা জনসভায় প্রচণ্ড হুংকার তুলেন স্বাধীনতার, কিন্তু ভারতের কাছে তারা যে কতটা আত্মসমর্পিত ছিলেন তা উপরুক্ত ৭ দফা চুক্তি পাঠ করার পরও কি বুঝতে বাঁকি থাকে?   

 

আত্মসমর্পিত মুজিব

আশ্রিত বাংলাদেশ নিমাণের ভারতীয় প্রকল্পটি প্রকট ভাবে ধরা পড়ে শুধু তাজুদ্দীনের সাথে স্বাক্ষরিত ৭ দফা চুক্তিতে নয়, শেখ মুজিবের সাথে ইন্দিরা গান্ধির সাক্ষরিত বারোটি অনুচ্ছেদবিশিষ্ট পঁচিশ বছর মেয়াদি চুক্তিটিতেও। ধরা পড়ে ভারতের প্রতি শেখ মুজিবের আত্মসমর্পিত চরিত্রটিও। পাকিস্তান আমলে শেখ মুজিবসহ কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা উঠেছিল। মামলায় অভিযোগ ছিল শেখ মুজিব ও তাঁর সাথীরা ভারতের সাহায্য নিয়ে পাকিস্তানকে ভাঙ্গতে চায়। সেদিন শেখ মুজিব কসম খেয়ে বলেছিলেন, এমন কোন ষড়যন্ত্রের সাথে তিনি জড়িত ছিলেন না। এ মামলার জবাবে বলেছিলেন, এটি এক মিথ্যা ষড়যন্ত্র মামলা। কিন্তু আজ আওয়ামী লীগ নেতাদের মুখে ভিন্ন কথা। তারা আজ গর্বের সাথে বলেন, সে ষড়যন্ত্রটি সঠিক ছিল। বরং আজ সে আগরতলা ষড়যন্ত্রটি নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতাদের এক বিরাট অহংকার। প্রশ্ন হল, গোপনে চোরা পথে যে ব্যক্তিটি ভারতের আগরতলায় যেতে পারে,ভারতের কাছ থেকে কি করেই বা তিনি উচ্চতর মুল্যায়ন পেতে পারেন? দেখা যাক ভারতের কাছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূলায়নটি কেমন ছিল। সে মূল্যায়নে ২৫ সালা চু্ক্তিটির বিভিন্ন অনুচ্ছেদ থেকে কিছু উদ্ধৃতি দেয়া যাকঃ 

Article 4 : “The high contracting parties shall maintain regular contacts with each other on major international problems affecting the interests of both states, through meetings and exchange of views at all levels.” অর্থঃ “চুক্তিবদ্ধ পক্ষদ্বয় তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সমস্যা প্রসঙ্গে সকল পর্যায়ে সভা ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করবে।”  প্রশ্ন, আন্তর্জাতিক সমস্যা যে শুধু ভারতের সাথে হবে সেটি কি করে বলা যাবে? অন্য দেশের সাথেও তো হতে পারে। সেটি যেমন বার্মা, ভূটান, চীনের সাথে হতে পারে, নেপাল, শ্রীলংকা ও পাকিস্তানের সাথেও হতে পারে। কিন্তু ভারত এখানে বাংলাদেশের উপর শর্ত লাগায়, যে কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভারতের সাথে প্রথমে পরামর্শ করতে হবে। অর্থাৎ ভারত বাংলাদেশের চারদিকে একটি বেড়া লাগিয়ে দেয়। সে বেড়া অতিক্রম করে অন্যকোন দেশে যাওয়ার উপর লাগায় খবরদারি।  

Article 9 : “Each of the high contracting parties shall refrain from giving any assistance to any third party taking part in and armed conflict against the other party. In case either party is attacked or threatened with attack, the high contracting parties shall immediately enter into mutual consultations in order to take appropriate effective measures to eliminate the threat and thus ensure the peace and security of their countries.”  অর্থঃ “চুক্তিবদ্ধ পক্ষদ্বয় কোনো তৃতীয় পক্ষের সঙ্গে সশস্ত্র সংঘাতে লিপ্ত হলে কোনো পক্ষই সেই তৃতীয় পক্ষকে কোনোরূপ সহায়তা প্রদান করবে না। যে কোনো পক্ষ আক্রান্ত হলে অথবা হুমকির সম্মুখীন হলে সেই আক্রমণ অথবা হুমকি মোকাবেলা করে শান্তি স্থাপন ও নিরাপত্তা বিধানে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করার লক্ষ্যে চুক্তিবদ্ধ পক্ষদ্বয় জরুরি আলোচনায় মিলিত হবে।” একটি দেশের স্বাধীনতা সবচেয়ে ব্শেী বুঝা যায় সে দেশের পররাষ্ট্র নীতি থেকে, -স্বরাষ্ট্র নীতি, কৃষি নীতি বা শিক্ষা নীতি থেকে নয়। ভারত তার ২৫ সালা চুক্তিতে যে শর্ত লাগায় তেমন শর্ত সাধারনতঃ লাগানো হয় কোন জোটবদ্ধ একটি দেশের সাথে। সোভিয়েত রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন ওয়ারশো জোটভূক্ত দেশগুলোর উপর রাশিয়া এমন একটি বাধ্যবাধকতা রেখেছিল। ফলে পোলাণ্ড, পূর্ব জার্মানি, হাঙ্গেরির মত দেশগুলো যাতে স্বাধীন পররাষ্ট্র নীতি গ্রহণ না করতে পারে সেটি এভাবে নিয়ন্ত্রিত করেছিল। চুক্তির এ শর্তের মাধ্যমে বাংলাদেশ পরিণত হয় ভারতের জোটভূক্ত একটি দেশে, এবং দিল্লির আজ্ঞাবহ। অথচ ১৯৪৭ সালে যখন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয় তখন এমন কোন চুক্তি করতে হয়নি,ফলে দেশটি কোন দেশের আজ্ঞাবহও হয়নি। ফলে একদিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অপরদিকে চীন এবং মুসলিম বিশ্বের সাথে স্বাধীন পররাষ্ট্র নীতি গড়ে তোলে। অথচ বাংলাদেশ তার জন্ম থেকেই হাতপা বাঁধা অবস্থায় যাত্রা শুরু করে।

Article 10 : “Each of the high contracting parties solemnly declares that it shall not undertake any commitments, secret or open, toward one or more states which may be incompatible with the present treaty.” অর্থঃ “চুক্তিবদ্ধ পক্ষদ্বয় এই মর্মে ঘোষণা দিচ্ছে যে, তারা অন্য কোনো এক বা একাধিক রাষ্ট্রের সঙ্গে গোপন অথবা প্রকাশ্য এমন কোনো প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ হবে না যা এই চুক্তির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে।” কথা হল, কে কার সাথে চুক্তি বা বন্ধুত্ব করবে সেটি অন্য কারো বিষয় নয়, সেটি প্রত্যেকের নিজস্ব বিষয়। এটিই ব্যক্তি স্বাধিনতার মূল কথা। তেমনি একটি দেশের সার্বভৌমত্বের পরিচয় ফুটে উঠে যে কোন দেশের সাথে বন্ধুত্ব গড়ার স্বাধিনতার মধ্য দিয়ে। সেটি নিয়ন্ত্রিত হলে স্বাধীনতা বা সার্বভৌমত্ব থাকে না, তখন শুরু হয় অধীনতা। অথচ ভারত ২৫ সালা চুক্তির মাধ্যমে সে স্বাধীন অধিকারটুকুই কেড়ে নেয়।  ভারত শর্ত লাগায়, অন্য কোন দেশের  সাথে সম্পর্ক গড়তে হলে ভারতের সাথে পরামর্শ করতে হবে।  এর অর্থ দাড়ায় ভারতে সাথে শত্রুতা আছে এমন দেশের সাথে বন্ধুত্ব গড়া যাবে না। আর ভারতের শত্রুতা তো বহু দেশের সাথে। চীন, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলংকাসহ কোন প্রতিবেশী দেশের সাথে ভারতের সুসম্পর্ক নেই।  অথচ এ দেশগুলো বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ। ফলে এদেশগুলির সাথে সম্পর্ক গড়া বাংলাদেশের জন্য জরুরীও। প্রতিবেশী এ দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক মজবুত করার মধ্য দিয়েই দেশটি নিজ পায়ের উপর দাঁড়াতে পারে। গড়ে তুলতে পারে সহযোগিতা মূলক অর্থনীতি। অথচ ভারত বাংলাদেশকে সে অধিকার দিতে রাজী ছিল না। ভারত চায়, বাংলাদেশ একমাত্র ভারতমুখি হোক। আর এজন্যই ২৫ সালা চু্ক্তির ১০ নম্বর ধারা। এ চুক্তির কারণেই মুজিবামলে ভারত ও রাশিয়ার বাইরে বাংলাদেশের কোন বন্ধু ছিল না। চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সৌদিআরব, ইরানসহ বহু গুরুত্বপূর্ন দেশের সাথেই মুজিব সুসম্পর্ক গড়তে পারেননি। অর্থনৈতিক দুর্দশা বা বিপদের দিনে ভারত বা রাশিয়ার সাহায্য দেয়ার সামর্থ ছিল না। রাশিয়ার কাজ ছিল মার্কসবাদের উপর সস্তা বই সরবরাহের। অপর দিকে ভারতের কাজ ছিল নট-নটি, গায়ক-গায়িকার সরবরাহ, আর কোলকাতার লেখকদের বইয়ের জোয়ার সৃষ্টি। অর্থাৎ সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। বিশ্বের সর্বাধিক দরিদ্র জনগোষ্ঠির বসবাস ভারতে। সে দেশে প্রতিদিন বহু শত মানুষ অভাবের তাড়নায় আত্মহত্যা করে মারা যায়। তারা অন্য দেশকে অর্থনৈতিক সাহায্য দিবে সেটি কি কল্পনা করা যায়? ফলে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মত এক সাহায্যনির্ভর দরিদ্র দেশের জন্য এ ছিল এক ভয়ানক দুরাবস্থা। ভারতের প্রতি আনুগত্যের কারণে বিদেশ থেকে সাহায্য সংগ্রহের কাজটিও ভারত কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হয়। চীন, সৌদি আরব, কুয়েতসহ বহু দেশই বাংলাদেশকে ভারতের একটি আশ্রিত দেশ ভাবতে থাকে। মুজিবের জীবদ্দশাতে তারা দূতাবাস স্থাপনেও ইতস্ততঃ করেছে। বিপদের দিনে এমন বন্ধুহীন দেশের জনগণকে লাখে লাখে প্রাণ দিয়ে খেসারত দিতে হয়। বাংলাদেশের জনগণের জীবনে তেমনি এক ভয়ানক বিপদ নেমে আসে ১৯৭৪ সালের ভয়ানক দুর্ভিক্ষে । সে দুর্দিনে মুজিব সরকার সাহায্য পেতে ব্যর্থ হয়। ফলে বহু লক্ষ মানুষ তখন না খেয়ে মারা যায়। বস্ত্রের অভাবে মহিলারা মাছধরা জাল পড়তে বাধ্য হয়। বাংলাদেশের সমগ্র ইতিহাসে এমন নজির এই প্রথম।

 

ভারতের বিশ্বাসঘাতকতা       

ভারত সরকার মুজিবের উপর ২৫ সালা চুক্তি চাপিয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা শৃঙ্খলিত করতে। চুক্তি স্বাক্ষরের এটিই ছিল মূল লক্ষ্য। তবে ভারত নিজে সে চুক্তিটি অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে সে বিষয়টি ভারতের কাছে কোন কালেই গ্রহণ যোগ্যতা পাইনি। তাই  শর্ত ভাঙতে ভারত সরকার কোনো দিনই দ্বিধা করেনি।  সেটির প্রমাণ পাওয়া যায় মুজিবের মৃত্যুর পর পরই। চুক্তির ৮ নম্বর অনুচ্ছেদে কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিবাদে কোনো বিদ্রোহী পক্ষকে সহায়তা না করার সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি থাকা সত্ত্বেও ভারত অবলীলায় চুক্তি ভঙ্গ করে বাংলাদেশের সীমান্তের উপর হামলায় কাদের সিদ্দিকীকে আশ্রয় দেয়, অর্থ দেয় এবং প্রশিক্ষণ ও অস্ত্রও দেয়। অথচ চুক্তিটির ৮ অনুচ্ছেদে শর্ত ছিলঃ “Each of the High Contracting parties shall refrain from any aggression against the other party and shall not allow the use of its territory of committing any act that may cause military damage to or constitute a threat to the security of the other High Contracting Party.”  অর্থঃ চুক্তিবদ্ধ পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে সর্বপ্রকার আগ্রাসী তৎপরতা থেকে বিরত থাকবে এবং নিজের ভূখণ্ড অন্য পক্ষের সামরিক ক্ষয়ক্ষতি কিংবা তার নিরাপত্তার বিরুদ্ধে হুমকি সৃষ্টিকারী কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হতে দেবে না।” অথচ ভারত সে শর্ত ভঙ্গ করে। এবং সেটি কাদের সিদ্দিকী এবং তথাকথিত শান্তি বাহিনীকে অস্ত্র, প্রশিক্ষণ, অর্থ এবং অন্যান্য সহায়তা দিয়ে। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ পরিচালনায় ভারত এভাবে সরাসরি অংশগ্রহণ করছে। ভারত তার নিজ ভূমিকে এভাবে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে ব্যবহৃত হতে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, ভারতে বসেই প্রাক্তন আওয়ামী সংসদ সদস্য চিত্তরঞ্জন সুতোর এবং আরেক নেতা কালিপদ বৈদ্য স্বাধীন বঙ্গভূমি আন্দোলন সংগঠিত করেছে। ভারত তাদেরকেও বাংলাদেশের হাতে তুলে দেয়নি। এতে যে বিষয়টি পরিস্কার হয় তা হল, এমন একটি শর্ত রাখার পিছনে ভারতের মূল লক্ষ্যটি হল বাংলাদেশের ভূমি যাতে ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত না হয় সেটি নিশ্চিত করা। ভারতের ভূমি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হওয়া বন্ধ করা নয়।  পরবর্তীতে একই ভাবে ভারতীয় ভূমি ব্যবহৃত হচ্ছে সান্তু লারমা ও তার চাকমা গেরিলারা।

 

ব্যয়হুল ও বিপদজনক স্বপ্ন

ভারত ১২০ কোটি মানুষের এক বিশাল দেশ। ইদানীং দেশটিতে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এসেছে। আর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বাড়লে স্বপ্ন এবং লিপ্সাও বাড়ে।ভারত চায় বিশ্বে না হোক অন্ততঃ এশিয়ার বুকে একটি আঞ্চলিক শক্তি রূপে আত্মপ্রকাশ করতে। আর সে স্বপ্ন পূরণটি যেমন ব্যয়বহুল,তেমনি বিপদজনকও। সে বিপদ যেমন ভারতের জন্য তেমনি প্রতিবেশী বাংলাদেশের জন্যও। সে স্বপ্ন পূরণে চাই বিপুল সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তি। তবে সবচেয়ে বেশী দরকার অর্থনিতক বল। কারণ বৃহৎ সামরিক শক্তি হওয়ার খরচ অতি বিশাল। একটি যুদ্ধবিমান ক্রয়ের খরচ কেড়ে নেয় কয়েকটি হাসপাতাল বা স্কুল প্রতিষ্ঠার খরচ। সামরিক খরচের ভারে সোভিয়েত রাশিয়া খণ্ডিত হয়ে গেল। এবং একই কারণে বিশ্ব-শক্তির মঞ্চ থেকে হারিয়ে গেছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য। একই রূপ বিশাল খরচের ভারে প্রচণ্ড ধ্বস নেমেছে মার্কিন অর্থনীতিতে। দেশটি হাজার বিলিয়ন ডলারেরও বেশী ঋণগ্রস্ত একমাত্র চীনের কাছে। তবে মার্কিনীদের সুবিধা হল, দেশটির পূর্ব ও পশ্চিম সীমান্ত দুই মহাসমুদ্র দ্বারা সুরক্ষিত। উত্তর ও দক্ষিণের সীমান্তেও কোন যুদ্ধ লড়তে হয় না; কোন রূপ যুদ্ধ লড়তে হচ্ছে না দেশের অভ্যন্তরেও। দেশটির অভ্যন্তরে যেমন কাশ্মীর, আসাম, নাগাল্যান্ড, মিজোরাম যেমন নাই তেমনি সীমান্তে বা আশে পাশে চীন,পাকিস্তান বা আফগানিস্তানও নাই। অথচ ভারতের সে সুযোগটি নেই। প্রায় ৬০ বছর ধরে চলছে কাশ্মির, আসাম, ত্রিপুরা, মিজারাম, নাগাল্যাণ্ডে চলছে স্বাধীনতা যুদ্ধ -যা থামার নামা নেয়া দূরে থাক দিন দিন আরো তীব্রতর হচ্ছে। বরং দেশটির জন্য বিপদের বড় কারণ, দেশটিকে শত শত কোটি টাকা ব্যয় হয় স্রেফ সীমান্ত পাহারা দিতে। সে খরচ কমাতে এখন বাতিক চেপেছে তারকাঁটার বেড়া দেয়ার।যেন কাঁটা তারার বেড়া অলংঘনীয় বা দুর্লংঘনীয় কিছু। অথচ সে বাতিক মেটাতে খরচ বাড়ছে শত শত কোটি রুপীর।

স্মৃতি-বিলুপ্তি ভারত সরকারেরও কম নয়। ভারত ভূলে যায়, মুজিবের শাসন যেমন চিরকালের জন্য ছিল না, তেমনি হাসিনাও চিরকাল থাকার জন্য আসেনি। আজ হোক কাল হোক হাসিনা অপসারিত হবেই, এবং অন্যরা ক্ষমতায় আসবে। হাসিনাকে এতটা মাথায় তোলার পর কি ভারত অন্যদের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে পারবে? তাছাড়া হাসিনার ভরাডুবির জন্য ভারত থাকতে কি অন্য কোন শক্তির প্রয়োজন আছে? মুজিবের পতনের জন্য মুজিবের বাকশালী স্বৈরাচার ও তার দলের সীমাহীন দূর্নীতি যতটা দায়ী,তার চেয়ে বেশী দায়ী ভারতীয় লুণ্ঠন ও নীতিহীনতা। নিজে দস্যুতা করা ভয়ানক অপরাধ, কিন্তু দুর্বৃত্ত দস্যুর পক্ষ নেয়াও কি কম অপরাধ? অথচ মুজিবের সে অপরাধটি ছিল বিশাল। ভারতীয়দের লুণ্ঠন রোধে তিনি কোন ভূমিকাই নেননি। বরং তাদের সহযোগী হয়েছেন, যেমন অর্থ ও অস্ত্র লুণ্ঠনে তেমনি পদ্মার পানি লুণ্ঠনে। ভারতের লুণ্ঠন বাড়াতে তিনি সীমান্ত বাণিজ্যের নামে বাংলাদেশের সীমান্ত বিলুপ্ত করেছিলেন। এবং ক্যারেন্সি নোট ছাপার ঠিকাদারি দিয়েছিলেন ভারতীদের। এভাবে ভারতকে সুযোগ করে দিয়েছিলেন শত শত কোটি টাকার জাল নোট ছাপার। মুজিব ধ্বংস করেছিলেন বাংলাদেশের পাটশিল্প, এভাবে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিলেন পাকিস্তানী আমলে বহু কষ্টে গড়ে তোলা পাটের আন্তর্জাতিক বাজার।

 

আত্মঘাতি নির্বু্দ্ধিতা

ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলার হিন্দুরা নিজেদের মাঝে রেনেসাঁ এনেছিল। ভারতবর্ষের ইতিহাসে সেটি বাঙালী রেনেসাঁ নামে পরিচিত। আসলে এটি ছিল বাঙালী হিন্দুদের রেনেসাঁ। তারা বাঙালী মুসলমানদের পিছনে রেখে নিজেরা এগিয়ে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু তাতে তাদের কোন কল্যাণই হয়নি। যে দেশের মানুষের সাথে তাদের আলোবাতাস, নদ-নদী, পথঘাট ব্যবহার করতে হয় তাদের সাথে শত্রুতা করে কি কোন কল্যাণ হয়? তাদের সে নির্বু্দ্ধিতার কারণেই বাংলা সেদিন বিভক্ত হয়েছিল এবং তাদেরকে পৈতিক ভিটামাটি ছেড়ে ভারতে পাড়ি জমাতে হয়েছিল। আজও ভারত প্রতিবেশী দেশগুলিকে পিছনে ফেলে বৃহৎ শক্তি হতে চায়। তাদের আগ্রাসী নীতি বিপদে ফেলছে বাংলাদেশে বসবাসকারি আজকের হিন্দুদের। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও ইসরাইলকে মিত্ররূপে পাওয়ার তাড়নায় ভারত বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মুসলমানদের মৌলবাদী ও সন্ত্রাসী রূপে চিত্রিত করছে। আর যতই বাড়চ্ছে ভারতীয়দের এরূপ প্রচারণা ততই ভয় বাড়ছে বাংলাদেশের হিন্দুদের মনে। ভারতের এ নীতির কারণে তারা নিজেরাই নিজেদের অপরাধী ভাবছে। যেমনটি ১৯৪৭ সালে ভারতের পাকিস্তান বিরোধী নীতির কারণে তারা যেমনটি ভেবেছিল। বাংলাদেশে কোন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নেই। কিন্তু ভারতের নীতির কারণে বাংলাদেশের হিন্দুরা এদেশকে আর নিরাপদ ভাবতে পারছে না। একই রূপ ভারতীয় নীতির কারণে কাশ্মীর থেকে হিন্দুদের দেশ ত্যাগ করতে হয়েছে।

ভারতের আত্মঘাতি নীতির কারণেই প্রচণ্ড সংঘাত বাড়াচ্ছে বাংলাদেশের রাজনীতিতেও। আর এতে বিপদ বাড়ছে সকল নাগরিকের, সে সাথে হিন্দুদেরও। আওয়ামী লীগের কাঁধে বন্দুক রেখে ভারত ইসলাম ও বাঙালী মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছে। লক্ষ্য, বাংলাদেশের মানুষের কাছ থেকে ইসলামকে ছিনিয়ে নেয়া। জিহাদের ন্যায় ইসলামের মৌলশিক্ষাকে তারা জঙ্গিবাদ আখ্যা দিচ্ছে। একাজে নামিয়েছে তাদের নিজেদের প্রতিপালিত লেখক,বু্দ্ধিজীবী,কিছু মতলববাজ আলেম, সাংবাদিক ও মিডিয়াকর্মীদের। অথচ নবীজীর প্রসিদ্ধ হাদীসঃ যে ব্যক্তি জীবনে জিহাদ করলো না, এবং জিহাদের নিয়তও করলো না, সে মারা গেলে মারা যায় মুনাফিক রূপে। জনগণকে ইসলাম থেকে দূরে টানতে তারা দীক্ষা দিচ্ছে সেক্যুলারিজমে। বাংলাদেশে শরিয়তের প্রতিষ্ঠাকে তারা মেনে নিবে সে ঘোষণাও তারা বার বার দিচ্ছে। অথচ এটি বাংলাদেশের নিতান্তই অভ্যন্তরীন বিষয়।

ভারতীয়রা নিজেদেরকে প্রচণ্ড বুদ্ধিমান ও কৌশলী ভাবে। অথচ তাদের বুদ্ধিহীনতার কারণেই ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের সৃষ্টি করতে শিক্ষাদীক্ষা ও অর্থনীতিতে পশ্চাদপদতায় মুসলমানদের বড় একটা বেগ পেতে হয়নি। বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে তাদের সে বুদ্ধিহীনতাই মুজিবের পতন ডেকে এনেছিল। অনাচারি মানুষের মনযোগ নিছক অনাচার বা দুর্বৃত্তিতে,সুনীতি, সুবিচারের প্রয়োগ নিয়ে তার আগ্রম থাকে না। তেমনি অবস্থা আগ্রাসী দেশেরও। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান ছিল ভারতের চেয়ে ক্ষুদ্র ও অর্থনৈতিক ভাবে সর্বক্ষেত্রে অনগ্রসর দেশ। ভারতের উচিত ছিল উপমহাদেশের শান্তির সার্থে পাকিস্তানের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা। উচিত ছিল, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তারা হামলা করবে না সে অভয় দেয়া। এতে উভয় দেশের দরিদ্র মানুষের কল্যাণ হত। কিন্তু ভারত সে পথে যায়নি। স্বাধীনতা লাভের প্রথম দিন থেকেই দেশটির বিরুদ্ধে যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি করে। খণ্ডিত ভারত এবং পাকিস্তানের সৃষ্টি তাদের কাছে অগ্রহণযোগ্য -সেটি তারা শুরু থেকেই বলতে থাকে। এভাবে নিরাপত্তাহীন পাকিস্তানকে তারা সিয়াটো ও সেন্টো জোটে যোগ দিতে বাধ্য করে। ভারত বিভাগের সময় অখণ্ড ভারতের অর্থভাণ্ডারে কয়েক শত কোটি টাকার রিজার্ভ ফাণ্ড ছিল।  কিন্তু ভারতীয়দের অসততা হল,১৯৪৭-এ পাকিস্তানের প্রাপ্য অর্থ তারা দেয়নি। এর ফলটা হল,পাকিস্তানীদের প্রচণ্ড ভারত-বিরোধী করতে সেদেশে আর কোন নতুন জিন্নাহর প্রয়োজন পড়েনি। মানুষ সেখানে ভারত বিরোধী বোমায় পরিণত হচ্ছে, বিস্ফোরিত হচ্ছে মোম্বাই,দিল্লি ও কাশ্মীরে। ভারত মুসলিম শাসিত হায়দারাবাদ, গোয়া,মানভাদর দখল করে নেয়। দখল করে নেয় কাশ্মির। গণভোট অনুষ্ঠানের ওয়াদা দিয়েও কাশ্মিরে তারা নির্বাচন দেয়নি। ফলে এভাবে নিজ ঘাড়ে নিজেরাই চাপিয়ে নিয়েছে রক্তাক্ষয়ী এক লাগাতর যুদ্ধ। সে যুদ্ধাবস্থা আজও শেষ হয়নি। একই ভাবে বন্ধুত্ব রূপে পেতে ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশের জনগণকেও। অথচ ১৯৭১-এর পর বাংলাদেশের সাথে ভারত লাগাতর সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে পারতো। অথচ ভারত সে পথে যায়নি, বরং দেশটির সেনাবাহিনী বাংলাদেশে বর্বর লুণ্ঠনে নামে এবং  উপহার দেয় একটি ভয়ানক দুর্ভিক্ষ। ফলে মুজিবী শাসনের নির্মূলে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী বা কোন রাজাকারকে ময়দানে নামতে হয়নি।

অপর দিকে ভারতের আজকের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দেশটিকে ভয়ানক রাজনৈতিক সংকটের দিকে ধাবিত করছে। যতই বাড়ছে প্রবৃদ্ধি ততই বাড়ছে সামাজিক ও রাজনৈতিক সংঘাত। বাড়ছে রক্তক্ষয়ী লড়াই। ফলে আজ থেকে ৫০ বছর আগে কাশ্মীর, আসাম, নাগাল্যাণ্ড, মিজোরাম, ঝাড়খণ্ড, বিহার ও মধ্যপ্রদেশে যে রক্তক্ষয়ী বিদ্রোহ ছিল না এখন তা প্রকাণ্ড ভাবে আছে। ফল দাড়িয়েছে, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যাণ্ড এমনকি সিঙ্গাপুর তাদের নাগরিকদের জীবনে অর্থনৈতিক প্রাচুর্য আনতে পারলেও ভারত তা পারেনি। ফলে হাজার মানুষ সেখানে ঋণের ভারে ও অনাহারে আত্মহত্যা করছে। দেশটিতে তীব্রতর হচ্ছে মাওবাদীদের বিদ্রোহ। বাড়ছে বিচ্ছিন্নতা। দেশে শান্তি আনতে হলে সুবিচার ও ন্যায়নীতির বিকল্প নেই -ভারতীয় নেতারা সে পাঠটি নেয়নি। অনাচার ও অবিচার নিয়ে ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন ধর্ম ও ভিন্ন বর্ণের মানুষ দূরে থাক, সহদোর ভায়েরাও একত্রে শান্তিতে বসবাস করতে পারে না। অথচ ভারত জেনে বুঝে অনাচার,অবিচার ও আগ্রাসনের পথ ধরেছে। সেদেশে হরিজন, আদিবাসী ও মুসলমানদের এজন্যই এত বঞ্চনা। কাশ্মীরীদের আত্মনিয়ন্ত্রনের অধিকার দিতে এজন্যই তাদের এত আপত্তি। অথচ ১৯৪৮ সালেই প্রধানমন্ত্রী জওহারলাল নেহেরু সেখানে গণভোট অনুষ্ঠানের ওয়াদা দিয়েছিল। অবিচার ও আগ্রাসনের নীতি একটি দেশের জনগণের জীবনে যে কতটা বিপদ আনে আজকের ভারত হল তারই নমুনা।

 

মুজিব-হাসিনার স্বৈরাচারি অনিবার্যতা

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতপন্থি হওয়া বা হিন্দুদের সাথে মিত্রতার পথটি জনপ্রিয় হওয়ার পথ নয়, বরং সে পথ রাজনৈতিক আত্মহত্যার। হিন্দুদের মুসলিম বিরোধী আগ্রাসী চেতনার সাথে বাঙালী মুসলমানদের যতটা পরিচিতি তা সমগ্র ভারতের আর কোন প্রদেশের মুসলমানদের ছিল না। বাঙালী হিন্দুদের বিবেক ও চেতনার মানটি এতটাই নীচু ও অসুস্থ্য ছিল যে মুসলমানদের সামান্যতম কল্যাণে তাদের মাঝে মাতম দেখা দিত। সুস্থ্য চেতনার লক্ষণ তো এটাই,বিশ্ববিদ্যায় দূরে থাক দেশে একখানি পাঠশালা নির্মিত হতে দেখেও দেহমন জুড়ে আনন্দের শিহরণ উঠবে। কারণ মানুষকে মানুষ রূপে বেড়ে ঊঠার এটাই তো পথ। মানব জাতির সমগ্র ইতিহাসে এমন নজির নেই, কোন দেশে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে রাস্তায় মিছিল হয়েছে! তবে এক্ষেত্রে একমাত্র ব্যতিক্রম হল বাংলার হিন্দুরা। এক্ষেত্রে বিশ্বরেকর্ড গড়েছে একমাত্র তারা। ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা রুখতে তারা কোলকাতার রাস্তায় মিছিল করেছে। সে মিছিলে যে হিন্দু মহাসভা¸আর.এস.এস বা কংগ্রেসের মুসলিম বিরোধী উগ্র হিন্দুগুণ্ডরা অংশ নিয়েছে তা নয়, অংশ নিয়েছে খোদ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। অথচ এই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেই বলা হয় শ্রেষ্ঠ বাঙালী হিন্দু। বাঙালী হিন্দুদের এই হল চেতনার মান। বেরুবাড়ি গেছে, পদ্মার পানি লুণ্ঠিত হচ্ছে,মমতা ব্যানার্জি আজ তিস্তার পানি কেড়ে নিতে চায় -সেটির কারণ তো মনের সেই নীচুতা ও অসুস্থ্যতা। ১৯০৫ সালে যখন পূর্ব বাংলা ও আসাম নিয়ে যখন আলাদা প্রদেশ গঠন করা হয় তখন সেটির বিরোধীতার মূলেও ছিল সেই একই কারণ। একই রূপ মুসলিম বিদ্বেষ নিয়ে বিরোধীতা করেছিল পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠার এবং দেশটির বেঁচে থাকার।

মুসলমানদের ঘাড়ে হিন্দু জমিদারদের নির্যাতন ও শোষনের জোয়ালটি ছিল অতি কঠোর ও নির্মম। দাড়ি রাখার জন্যও খাজনা দিতে হত। ফলে এ প্রদেশেই জন্ম নেয় মুসলিম লীগ। এবং এ প্রদেশেই প্রতিষ্ঠিত হয় মুসলিম লীগের প্রথম সরকার। ব্যক্তির মৃত্যু ঘটে, কিন্তু তার অভিজ্ঞতা ও স্মৃতি যুগ যুগ বেঁচে থাকে।  আর লক্ষ লক্ষ মানুষের সে বেঁচে থাকা স্মৃতি নিয়েই গড়ে উঠে জাতীয় মানস। ১৯৭১এর পর বাঙালী মুসলমানের সে স্মৃতিকে ভূলিয়ে দেয়ার চেষ্ঠা হয়েছে প্রচুর। কিন্তু সে চেষ্ঠা সফল হয়নি। বরং একাত্তরের পর ভারতীয় লুণ্ঠন ও শোষন সে পুরোন স্মৃতিকে নতুন তীব্রতা দিয়েছে। তার তাতেই পতন ডেকে এনেছে তাদের সবচেয়ে পছন্দের ব্যক্তি শেখ মুজিবের। আর আজ শেখ মুজিবের পতনের ন্যায় শেখ হাসিনার পতনকে ভারত নিজ হাতে ত্বরান্বিত করছে। সেটি করতে বাংলাদেশকে ট্রানিজিট দিতে বাধ্য করছে, তুলে নিচ্ছে পদ্মার পানি এবং বাঁধ দিচ্ছে তিস্তা, মেঘনাসহ বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত পানি। পক্ষি শিকারের ন্যায় সীমান্তে মনুষ্য শিকারও করছে। ভারতীয় টিভির জন্য ভারতীয় টিভির জন্য খোলা বাজার আাদায় করলেও দরজা বন্ধ রেখেছে বাংলাদেশী টিভি সম্প্রচারের বিরুদ্ধে। বাধা সৃষ্টি করছে বাংলাদেশের পণ্য ঢুকতেও। লাগাতর প্রচেষ্ঠা চলছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা হননের। ফলে ভারতপ্রেমী হাসিনার পতন ঘটাতেও কি কোন শক্তিশালী বিরোধী দলের প্রয়োজন আছে? এ মুহুর্তে ভারতের পক্ষ নেয়াই আত্মঘাতি, এমন আত্মঘাতি রাজনীতিতে টিকে থাকার স্বার্থে শেখ হাসিনা স্বৈরাচারি হতে বাধ্য হচ্ছে। একই কারণে শেখ মুজিবও ধরেছিলেন বাকশালী স্বৈরাচারের পথ।

অপরদিকে ভারত তার নিজের পরাজয় ঠেকাতে বাংলাদেশকে টানছে নিজের উত্তর-পূর্ব সীমান্তের যুদ্ধে। বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ট্রানজিট নেয়ার মূল উদ্দেশ্য তো সেটাই্। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কোন উলফা নেতা আশ্রয় নিলে তাকে গ্রেফতার করে ভারতে পাঠনোর দাবী তোলে। অথচ চিত্তরঞ্জণ সুতোর,কাদের সিদ্দিকী,সান্তু লারমা ভারতে আশ্রয় নিল এবং বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র পাকালো তখন ভারত তাদের গ্রেফতার করেনি,বাংলাদেশে ফিরতও পাঠায়নি। আলজিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বুমেদীনসহ কয়েকটি মুসলিম দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের চাপে পড়ে শেখ মুজির ১৯৭৪ সালে ইসলামী রাষ্ট্রপ্রধানদের সম্মেলনে যোগ দিতে লাহোরে গিয়েছিলেন। কিন্তু ভারত তাতে খুশি হয়নি। চীন ও পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশ মজবুত গড়ে তুলুক ভারত আজও  সেটি চায় না। বাংলাদেশ একটি মজবুত সেনাবাহিনী গড়ে তুলুক সেটিতেও  ভারতের তুমুল আপত্তি। এরশাদের আমলে বাংলাদেশে কয়েকখানি মিগ-২১ কিনেছিল। তাতেই ভারতীয় মহলে প্রতিবাদ উঠেছিল। মুজিব আমলে আমলে বাংলাদেশের মাত্র এক ডিভিশন সৈন্য ছিল। শেখ মুজিব সে সৈন্য সংখ্যা বাড়াতে আগ্রহী ছিলেন না। ট্যাংক,কামান বা বিমান ক্রয় নিয়েও তাঁর আগ্রহ ছিল না। আগ্রহ ছিল না কোন সামরিক এ্যাকাডেমী স্থাপন নিয়েও। তাঁর আমলে বাংলাদেশের এসবের কোন বালাই ছিলনা। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সে সময় একটি প্রকাণ্ড যুদ্ধের জন্য যে বিশাল অস্ত্র সংগ্রহ ছিল মুজিব সেগুলোও ভারতীয় হাতে তুলে দিয়ে যেন আপদ বিদায় করেছিলেন। অথচ সেগুলির ক্রয়ে বেশী অর্থ জুগিয়েছিল পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ পুর্ব পাকিস্তানীরা। মুজিবের অস্ত্রাতার আগ্রহ ছিল একমাত্র রক্ষিবাহিনী আর লাল বাহিনী নিয়ে। কারণ তার ভাবনা দেশের প্রতিরক্ষা নিয়ে ছিল না, বরং প্রচণ্ড দুঃশ্চিন্তা ছিল নিজের গদীরক্ষা নিয়ে। ভারতের প্রতি এমন আত্মসমর্পিত নীতির কারণেই ভারতপ্রেমীদের কাছে শেখ মুজিব সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী।প্রশ্ন হল,একটি পরাধীন দেশ হওয়ার জন্য কি এরপর অন্য আর কিছু লাগে? ব্রিটিশ শাসনামলে কয়েক শত দেশীয় রাজা-মহারাজা কি এর চেয়ে বেশী কিছু ব্রিটিশের হাতে তুলে দিয়েছিল? মুজিব তো পাকিস্তানী অস্ত্রবিদায়, ২৫ সালা চুক্তি, সীমান্তবাণিজ্য চুক্তি, বেরুবাড়ী দান, পদ্মার পানি দান,ভারতীয় পণ্যের জন্য অবাধ-বাজার,স্বদেশী শিল্প-ধ্বংস সহ সব কিছুই নিশ্চিত করেছিলেন। ভারত তো এসবই চায়।একটি দেশের অধীনতা বলতে এর চেয়ে বেশী কিছু কি বোঝায়? শেখ হাসিনার পিতার তো সেটিই আদর্শ। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের বিশাল পুঁজি,দেশটির আঁনাচে কাঁনাচে বিপুল সংখ্যক ভারতীয় চর, ভারতীয় স্ট্রাটেজিস্ট ও ভারতীয় পরামর্শদাতারা তো চায় মুজিবের সে আদর্শেরই প্রতিষ্ঠা।

 

বিনিয়োগ এবং প্রস্তুতি আগ্রাসনের

মুজিবের উপর ভারতের অর্পিত সবচেয়ে গুরু দায়ভারটি ছিল ভারতীয় অধীনতার বিরুদ্ধে যে কোন বিদ্রোহের দমন এবং সে সাথে ইসলামী শক্তির বিনাশ। আর এতে ব্যয়ভার কমেছিল ভারতের। ভারত শুধু ফসলই তুলেছিল। অথচ কাশ্মীরে সে কাজটি সমাধা করতে ভারতকে ৭ লাখ সৈন্যের সমাবেশসহ বিপুল অর্থ ব্যয়ে প্রায় যুগ ব্যপী এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ লড়তে হচ্ছে। ভারতের সে অধীনতা নিশ্চিত করতেই শেখ মুজিব ইসলামপন্থিদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছিলেন এবং হরণ করেছিলেন দেশবাসীর সকল নাগরিক অধিকার। প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন একদলীয় বাকশালী স্বৈরশাসন। অথচ তিনি ১৯৭০-এর নির্বাচনে ভোটি নিয়েছিলেন বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে।শেখ হাসিনা দেশকে আজ  তাঁর নিজ পিতার সে পথ ধরেই এগিয়ে নিচ্ছেন। পিতার সে স্বৈরাচারি আদর্শ নিয়ে তাঁর এখ্নও প্রচণ্ড অহংকার। সে আদর্শের প্রতিষ্ঠায় তিনি আপোষহীনও। পিতার স্বৈরাচারি আদর্শ নিয়ে এমন অহংকার ও আপোষহীনতা ছিল ফিরাউনের বংশধরদেরও। সমগ্র প্রশাসন, আইন-আদালত,সেনা-পুলিশ ও রাজস্বের অর্থ ব্যয় হত সে ফিরাউনি আদর্শ ও ঐতিহ্যকে যুগ যুগ বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে। এবং সে সাথে হযরত মূসা (আঃ)ও তাঁর অনুসারিদের চিত্রিত করা হয়েছিল দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতার দুষমন রূপে। বাংলাদেশে ইসলামপন্থি নেতাকর্মীদের উপর র‌্যাব-পুলিশের অত্যাচার,মিথ্যামামলা,জেল-জুলুম,দণ্ডবেড়ির শাস্তি তো নেমে আসছে তো সে কারণেই। এসব কিছুই ঘটছে একটি রোড ম্যাপকে সামনে রেখে। সেটি ভারতের অধীনতাকেই আরো পাকাপোক্ত করার।

ভারতের সৌভাগ্য যে, কাশ্মীর দখলে রাখতে ভারত সরকারকে ৭ লাখ সৈন্য ও হাজার হাজার কোটি টাকার অর্থ ব্যয়ে যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ লড়তে হচ্ছে বাংলাদেশের মাটিতে তারা সে অধীনতাটি পাচ্ছে বাংলাদেশের রাজনীতি, মিডিয়া, সংস্কৃতি ও জাতীয় নির্বাচনে মাত্র কয়েক শত কোটি টাকার বিনিয়োগে। ভারতের পক্ষে সে যুদ্ধটি করছে সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী, তাঁবেদার মিডিয়াকর্মী, আওয়ামী লীগের ক্যাডার বাহিনী,বাংলাদেশী র‌্যাব ও পুলিশ। ভারতীয় সেনা ও পুলিশ বাহিনী কাশ্মীরে এত ইসলামী বই বাজেয়াপ্ত করেনি এবং এত বেশী ইসলামী নেতাকর্মীদের ডাণ্ডাবেরী পড়ায়নি যা পড়িয়েছে বাংলাদেশী র‌্যাব ও পুলিশ। এদিক দিয়ে ভারতকে ভাগ্যবানই বলতে হবে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতীয় বিনিয়োগ যে বিপুল বাম্পার ফলন দিচ্ছে এ হল তার নমুনা। ২০০৮ সালে নির্বাচনের তেমন এক বিনিয়োগের কথাই সম্প্রতি প্রকাশ করেছে লন্ডনের বিখ্যাত ইকোনমিস্ট পত্রিকা। তাই বাংলাদেশের দেশপ্রেমিকদের জন্য আজ এক ভয়ানক বিপদের দিন। তবে বিপদের আরো কারণ, ভারতের আরোপীত অধীনতাকে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা সুনিশ্চিত করতে না পারলে ভারত সীমান্তের ওপারে বসে বসে আঙুল চুষবে না। ১৯৭৫এর ১৫ই আগষ্ট থেকে তারা শিক্ষা নিয়েছে। ভারত এবার তার নিজস্ব বাহিনী নিয়ে ময়দানে নামবে। বাংলাদেশকে ঘিরে ভারত তার অভিপ্রায়ের কথাটি তাজুদ্দীনের সাথে ৭ দফা চুক্তি এবং শেখ মুজিবের সাথে ২৫ দফা চুক্তির মধ্য দিয়ে সুস্পষ্ট ভাবে জানিয়ে দিয়েছিল। এখন ভারত তেমন একটি আগ্রাসনের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ নিয়ে দিবারাত্রি ব্যস্ত। সেটি যেমন রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামরিক ক্ষেত্রে,তেমনি যোগাযোগের ক্ষেত্রেও। বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে তারা করিডোর আদায় করে নিল তো সে লক্ষ্যেই। ২০/১১/১১

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *