ভারতের জন্য করিডোর এবং বাংলাদেশের আত্মঘাত

image_pdfimage_print

বিশাল বিজয় ভারতের

ভারত যা চায় সেটি সহজেই পায়। কিন্তু বাংলাদেশ যা চায় সেটি পায় না। ভারত তাই করিডোর পেল, কিন্তু বাংলাদেশ পানি পায়নি। প্রভু রাষ্ট্র ও গোলাম রাষ্ট্রের মাঝে এটিই মূল পার্থক্য। একাত্তরে ভারতের সামরিক বিজয়ের পর থেকে এটিই হলো বাংলাদেশের জন্য নতুন বাস্তবতা। বাংলাদেশের এ অসহয়তা বুঝার জন্য তাই কি বেশী গবেষণার প্রয়োজন আছে? দীর্ঘদিন যাবত বাংলাদেশ তিস্তা নদীর ন্যয্য হিস্যা দাবী করে আসছে। কিন্তু আজও তা জুটেনি। ন্যয্য হিস্যা জুটেনি পদ্মার পানিরও। পানির অভাবে বাংলাদেশ আজ দ্রুত মরুভূমি হতে যাচ্ছে। অথচ কলকাতার হুগলি নদীতে ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে পদ্মার পানি তুলে নেয়াতে বার মাস পাড় উপচানো জোয়ার। পদ্মা নদীতে নৌকা চলে না, কিন্তু হুগলী নদীতে সমুদ্রগামী জাহাজ চলে। হাসিনা সরকার তাতেই খুশি। বাংলাদেশকে ন্যয্য পাওনা দেয়া নিয়ে ভারত সরকারের কারোই কোন মাথা ব্যথা নেই। দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকার বলছে, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সম্মতি ছাড়া পানি সমস্যার কোন সমাধান হবে না। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে পশ্চিমবঙ্গের প্রাদেশিক সরকারকে একত্রে বসাবে কে? পানি সমস্যার সমাধান নিয়ে মোদীর সাথে মমতা  বানার্জিকে একবারও একত্রে বসানো যায়নি। কিন্তু করিডোর আদায়ে নরেন্দ্র মোদীর আগেই পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ঢাকায় এসেছে। কারণ গরজটি এখানে কিছু দেয়া ছিল না। সেটি ছিল করিডোরের ন্যায় বাংলাদেশ থেকে বিশাল কিছু নেয়া।

ভারত যা শুরু থেকে চেয়ে এসেছে তা সহজেই পেয়েছে। অথচ এর আগে ভারত তা নিতে পারিনি। হেতু কি? কারণটি অতি সহজ। বাংলাদেশে থেকে কিছু সহজে আদায় করতে ভারতের জন্য সবচেয়ে মোক্ষম সময়  ২০১৪’য়ের ভোট ডাকাতির পরবর্তী কালীন সময়। সে নির্বাচনে শেখ হাসিনা ও তার মিত্রগণ জনগণের ভোট নিয়ে ক্ষমতায় আসেনি। শতকরা ৫% ভোটকেন্দ্রে যায়নি। অর্ধেক সিটে একটি ভোটও ঢালা হয়নি। তবে ভোট ডাকাতি বাংলাদেশ বিশ্বরেকর্ড করেছে ২০১৮ সালের সংসদীয় নির্বাচনে। ভোটারগণ ভোট কেন্দ্রে গিয়েও ভোট দিতে পারেনি। তাদের ব্যালট পেপার ছিনতাই হয়ে যায় আগের রাতেই। ফলে যে কোন বিচারে হাসিনার সরকার একটি অবৈধ সরকার। এমন ডাকাত সরকার জনগণে সাহায্য ও সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় থাকে না, নির্ভরশীল হয় পড়ে বিদেশীদের উপর। শেখ হাসিনার সে নির্ভরশীলতাটি প্রতিবেশীর ভারতের উপর। এমন একটি ভারত-নির্ভর সরকারের পক্ষে ভারতীয় দাবীর বিরুদ্ধে না বলার সামর্থ হাসিনার নেই। সেটি শেখ মুজিবের বা তাজুদ্দীনের ও ছিল না। ভারত সেটি জানে। ভারত তাই মুজিবকে দিয়ে ২৫ সালা দাসচুক্তি এবং তাজুদ্দীনকে দিয়ে ৭ দফা গোলামী নামা লিখিয়ে নেয়। এবং হাসিনা থেকে বাংলাদেশের বুক চিরে করিডোর নিতেও দেনদরবার করতে হয়নি। গোলামীর শিকল পড়াতে পারলে যে কোন দিকে ই্চ্ছামত টানা যায় – ভারত সেটিই প্রমাণ করলো।   

বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ভারত করিডোর নিয়ছে যেমন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রয়োজনে, তেমনি সামরিক ও নিরাপত্তার প্রয়োজনে।বাংলাদেশের বুকের উপর দিয়ে ভারতের করিডোর নেয়ার বিষয়টি বুঝতে হলে বুঝতে হবে দেশটির উচ্চবর্ণ ব্রাহ্মনদের আসমুদ্র-হিমাচল ব্যাপী এক হিন্দু সাম্রাজ্য গড়ার আগ্রাসী মানসিকতাকে। নিজ দেশের দরিদ্র মানুষদের প্রতি এসব বর্ণবাদী আগ্রাসী হিন্দুদের কোন দরদ নেই। তারা বেছে বেছে সেখানেই বিনিয়োগ বাড়ায় যা তাদের সে আগ্রাসী অভিলাষ পুরণে জরুরী। আর সেচিত্রটিই ফুটে উঠে বাংলাদেশের প্রতি তাদের বিদেশ নীতি ও স্ট্রাটেজীতে। বাংলাদেশ একটি দরিদ্র দেশ। এদেশের উন্নয়নে বহু দূরবর্তী দেশের পূঁজিপতিও বিনিয়োগ করেছে। পাকিস্তান আমলে বিনিয়োগ করেছে আদমজী, দাউদ, বাওয়ানী, ইস্পাহানী, আমিনের ন্যায় বহু অবাঙালীও। কিন্তু বাংলাদেশের মাটিতে ভারতীয়দের বিনিয়োগ যে ছিল না তা নয়। তবে সেটি কখনই শিল্প বা অর্থনীতিতে নয়, ছিল রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও মিডিয়ার  ময়দানে। ভারত আজও বিনিয়োগের সে ধারাই অব্যাহত রেখেছে।  ফলে বাংলাদেশের মাটিতে ভারতীয় শিল্প-পণ্য উৎপাদিত না হলে কি হবে, সংখ্যায় বিপুল ভাবে বেড়েছে ভারত-ভক্ত ও ভারতীয় স্বার্থের সেবাদাস।

                                                                                                                                         

ভারতের যুদ্ধে বাংলাদেশ

বাংলাদেশের মাটিতে ভারতের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ ছিল একাত্তরের যু্দ্ধে। সেটি ছিল যেমন বিপুল অর্থের, তেমনি রক্তেরও। ৪ হাজারের বেশী ভারতীয় সৈনিক এ যুদ্ধে মারা যায়। এ বিষয়টি অস্বীকারের উপায় নেই,ভারতীয়দের সে বিনিয়োগ না হলে বাংলাদেশ সৃষ্টিই হত না। তবে ভারতের সে বিনিয়োগ কি ছিল বাংলাদেশের স্বার্থে? ভারত কোন বিদেশীদের স্বাধীনতার স্বার্থে কখনো কি একটি তীরও ছুঁড়েছে? একটি পয়সাও কি ব্যয় করেছে? বরং ভারতের ইতিহাস তো অন্যদেশে সামরিক আগ্রাসন ও স্বাধীনতা লুন্ঠনের। সে লুন্ঠনের শিকার কাশ্মির, সিকিম, মানভাদর, হায়দারাবাদের স্বাধীনতা। ভারতীয়দের কাছে একাত্তরের যুদ্ধটি ছিল শতকরা শতভাগ ভারতীয় যুদ্ধ। তাই সে যুদ্ধের ঘোষণা যেমন শেখ মুজিব থেকে আসেনি, তেমনি কোন বাংলাদেশী জেনারেলের পক্ষ থেকেও আসেনি। আরো সত্য হলো, একাত্তে সে যুদ্ধের কমাণ্ড শেখ মুজিব বা তার অনুসারিদের হাতেও ছিল না। ভারতীয় অর্থ, নেতৃত্ব ও পরিকল্পনা দ্বারা পরিচালিত এ যুদ্ধটি ছিল সর্বক্ষেত্রেই একটি ভারতীয় যুদ্ধ। মুজিব স্বাধিনতার ঘোষনা দিল কি দিল না, মূক্তি বাহিনী যুদ্ধ করলো কি করলো না – ভারত সে অপেক্ষায় ছিল না। এ যুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিল ভারতীয় ভূমি থেকে,এবং ভারতীয় জেনারেলদের নেতৃত্বে। সে যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে ভারতীয় সেনানিবাস, বহু লক্ষ ভারতীয় সৈন্য এবং বহু ভারতীয় বিমান, কামান, ট্যাংক এবং গোলাবারুদ। বরং ভারতীয়দের সফলতা হলো, বহুদিনের কাঙ্খিত একান্ত নিজদের যুদ্ধটিকে তারা মুক্তিযুদ্ধ রূপে বাংলাদেশীদের ঘাড়ে চাপাতে সমর্থ হয়েছিল। মুক্তিবাহিনীকে তারা নিজ অর্থে গড়ে তুলেছিল স্রেফ নিজস্ব প্রয়োজনে। তারা সেদিন কইয়ের তেলে কই ভেজেছিল। বিশ্ববাসীর কাছেও সে সত্যটি কখনই গোপন থাকেনি। বরং সেটি প্রকাণ্ড ভাবে প্রকাশ পায় যখন পাকিস্তানী সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করে শুধুমাত্র ভারতীয় সেনাবাহিনীর জেনারেলদের কাছে, কোন বাংলাদেশী জেনারেল বা মুক্তি যোদ্ধার কোন কমাণ্ডারের কাছে নয়। আরো প্রকাশ পায়, যখন পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর ফেলে যাওয়া বিপুল পরিমান যুদ্ধাস্ত্র যখন ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়। একাত্তরে সে যুদ্ধটি যদি বাংলাদেশীদের দ্বারা বাংলাদেশের যুদ্ধ হত তবে পাকিস্তানের ফেলে যাওয়া বিপুল যুদ্ধাস্ত্র ভারতে যায় কি করে? পাকিস্তানী যুদ্ধবন্দীদেরকেই বা কেন ভারতে নেয়া হবে? এসব বিষয়গুলো বুঝার সামর্থ কি ভারতের সেবাদাসদের আছে?

একাত্তরে ভারতের অর্থ, রক্ত, শ্রম ও মেধার বিনিয়োগটি ভারতের কোন খয়রাতি প্রকল্পও ছিল না, ছিল তাঁর নিজ সাম্রাজ্য বিস্তারের অনিবার্য প্রয়োজনে। ছিল পাকিস্তান ভাঙ্গার লক্ষে। এবং সে সাথে সামরিক দিক দিয়ে পঙ্গু, রাজনৈতিক ভাবে অধিকৃত এবং অর্থনৈতিক দিক দিয়ে ভারতনির্ভর এক বাংলাদেশ সৃষ্টির। এমন একটা যুদ্ধ নিজ খরচে লড়ার জন্য ভারত ১৯৪৭ সাল থেকেই দুপায়ে খাড়া ছিল। ভারত পাকিস্তানের সৃষ্টি যেমন চাইনি, তেমনি দেশটি বেঁচে থাকুক সেটিও চায়নি। তাই ভারতের সে বিনিয়োগটি যেমন একাত্তরে শুরু হয়নি, তেমনি একাত্তরে শেষও হয়নি। সেটির শুরু হয়েছিল সাতচল্লিশে, এবং চলছে আজও। তবে চলছে ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে ও ভিন্ন ভিন্ন রণাঙ্গনে। বিশেষ করে সে সব খাতে যা আঞ্চলিক শক্তি রূপে প্রতিষ্ঠা লাভের জন্য তারা জরুরী মনে করে। করিডোর হল তেমনই এক গুরুত্বপূর্ণ খাত। তাই ভারত সরকারের পক্ষ থেকে করিডোরের দাবী, চট্রগ্রাম ও চালনা বন্দরসহ বাংলাদেশের নৌ ও বিমান বন্দর ব্যবহারের দাবি, বাংলাদেশের মিডিয়া খাতে ভারতীয়দের বিনিয়োগ, শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে আওয়াম লীগ ও তার মিত্রদের লাগাতর প্রতিপালন –এবিষয়গুলো বুঝতে হলে ভারতের সে আগ্রাসী মনভাব ও সামরিক প্রয়োজনটি অবশ্যই বুঝতে হবে। তখন সুস্পষ্ট হবে, যে দুই বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ নিয়ে ভারত এগিয়ে আসছে সেটিও কোন খয়রাতি প্রজেক্ট নয়। ভারত এর চেয়ে অনেক বেশী বিনিয়োগ করে তার পূর্ব সীমান্তের সামরিক বাহিনীর পিছনে। বাংলাদেশের মাটিতে ভারতের এ বিনিয়োগ আসছে দেশটির সে আগ্রাসী স্ট্রাটেজীর অবিচ্ছিন্ন অংশ রূপে। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশীদের যে যাই বলুক,ভারতীয়দের মাঝে এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে কোন অস্পষ্টতা নেই। সেটি তার খোলাখোলী ভাবেই বলে। এবং সেটিই ফুটে উঠেছে “ইন্ডিয়ান ডিফেন্স রিভিউ” জার্নালের সম্পাদক মি. ভরত ভার্মার লেখা এক নিবন্ধে। এ প্রবন্ধে মি. ভার্মার সে নিবদ্ধ থেকে উদ্বৃতি দিয়ে বিষয়টি আরো সুস্পষ্ট করা হবে। তবে এ নিয়ে কোন রূপ রাখঢাক নাই তাদের সহযোগী বাংলাদেশী আওয়ামী বাকশালীদের মনেও। তারাও চায় বাঙালীর জীবনে একাত্তর বার বার ফিরে আসুক। এবং বাঙালী আবার লিপ্ত হোক ভারতীয়দের নেতৃত্বে এবং ভারতীয়দের অস্ত্র নিয়ে আরেকটি যুদ্ধে।

 

ভারত চায় আগ্রাসনের অবকাঠামো

বিশ্ব রাজনীতিতে যে অবস্থান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের, ভারত সেটিই হতে চায় সমগ্র এশিয়ার বুকে। আর সে অবস্থায় পৌঁছতে হলে অন্যদেশের অভ্যন্তরে শুধু দালাল বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদ প্রতিপালন করলে চলে না। আগ্রাসনকে বিজয়ী ও স্থায়ী করতে নিজেদের বিশাল দূতাবাস, ঘাঁটি,সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনায় স্পাই নেটওয়ার্কের পাশাপাশি সেনা ও রশদ সরবরাহের অবকাঠামোও গড়ে তুলতে হয়। প্রয়োজনে সামরিক আগ্রাসনও চালাতে হয়। শুধু হামিদ কারজাইদের মত ব্যক্তিদের কারণে আফগানিস্তান মার্কিনীদের হাতে অধিকৃত হয়নি। এলক্ষে ঘাঁটি, বন্দর ও সড়ক নির্মানও করতে হয়েছে। অবিরাম গতিতে রক্তক্ষয়ী একটি যুদ্ধও চালিয়ে যেতে হচ্ছে। ভারতও তেমনি শুধু শেখ মুজিব, শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের প্রতিপালন নিয়ে খুশি নয়। পাকিস্তান ভাঙ্গার ভারতীয় প্রজেক্ট শুধু আগরতলা ষড়যন্ত্রের মাঝে সীমাবদ্ধ রাখলে তা কখনই সফল হত না। এ জন্য ভারতকে নিজের বিশাল বাহিনী নিয়ে একাত্তরে প্রকান্ড একটি যুদ্ধও লড়তে হয়েছে।

এটি এখন আর লুকানো বিষয় নয়, ২০০৮ সালের নির্বাচনে ভারত শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছিল তার অনুগত পক্ষকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে। সে তথ্যটিই বিশ্বময় ফাঁস করে দিয়েছে ব্রিটিশ প্রভাবশালী পত্রিকা ইকোনমিস্ট। তবে ভারতের এ বিনিয়োগ শুধু ২০০৮ সালে নয়, প্রতি নির্বাচনেই। যেমন ১৯৭০ সালের নির্বাচনে, তেমনি ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের নির্বাচনেও। তবে শুধু নির্বাচনী বিনিয়োগের মধ্য দিয়েই ভারতের আসল লক্ষ্য পূরণ হওয়ার নয়। ভারত ভাল ভাবেই জানে, শুধু নিজ দেশের সেনবাহিনীতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে বাংলাদেশের উপর আধিপত্য বিস্তার সম্ভব নয়। সে জন্য চাই,বাংলাদেশের রাজনীতি, মিডিয়া, বুদ্ধিবৃত্তি ও যোগাযোগসহ নানা ক্ষেত্রে লাগাতর বিনিয়োগ। তাছাড়া তাদের কাছে যুদ্ধ আগামী দিনের কোন বিষয় নয়,বরং প্রতি দিনের। দেশটি এক আগ্রাসী যুদ্ধে লিপ্ত তার জন্ম থেকেই। উত্তর-পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিম -এ দুই প্রান্তে দুটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের শুরু আজ থেকে প্রায় ৭০ বছর আগে। এখন তা অবিরাম গতিতে চলছে। ভারতে বহু সরকার ক্ষমতায় এসেছে, বিদায়ও নিয়েছে। কিন্তু সে যুদ্ধ দুটি থামার নামই নিচ্ছে না। ভারতের উত্তর-পূর্ব সীমান্তে চলমান যুদ্ধের প্রতিবেশী দেশ হল বাংলাদেশ। পাকিস্তানকে সংশ্লিষ্ট করা ছাড়া আফগান যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্টের পক্ষে বিজয় দূরে থাক টিকে থাকাই যেমন অসম্ভব তেমনি অবস্থা ভারতের জন্য বাংলাদেশের সংশ্লিষ্টতা। পাকিস্তানের রাজনীতি, মিডিয়া, সামরিক বাহিনী ও যুদ্ধ-অবকাঠামোতে এ কারণেই মার্কিনীদের বিশাল বিনিয়োগ। জেনারেল  মোশাররফকে হটিয়ে পিপলস পার্টিকে ক্ষমতায় বসানোর মূল কারণ ছিল মার্কিনীদের সে যুদ্ধে পাকিস্তানীদের শামিল করার বিষয়টিকে নিশ্চিত করা। একই কারণে উত্তর-পূর্বের রণাঙ্গণে ভারত অপরিহার্য মনে করে বাংলাদেশকে সম্পৃক্ত করা।সে লক্ষেই বাংলাদেশের রাজনীতি, মিডিয়া, বুদ্ধিবৃত্তিতে ভারতের এত বিনিয়োগ। “শেখ হাসীনার ফারাক্কার পানিচুক্তিতে পদ্মায় পানি বেড়েছে বা টিপাইমুখ বাঁধের ফলে সুরমা, কুশিয়ারা ও মেঘনায় পানি থৈ থৈ করবে, বা একাত্তরের হাতিয়ার গর্জে উঠুক আরেকবার” –বাংলাদেশী বুদ্ধিজীবীরা তো এমন কথা বলে সে পুঁজি বিনিয়োগের ফলেই। একাত্তরের হাতিয়ার যে ছিল ভারতীয় হাতিয়ার সে কথা কি অস্বীকারের উপায় আছে? এবং সে হাতিয়ার নির্মিত হয়েছে যে স্রেফ ভারতীয় বিজয় ও ভারতীয় আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে তা নিয়েও কি কোন বিতর্ক আছে?

 

ভারতীয়দের ভয় ও স্ট্রাটেজী

সাম্রাজ্য বিস্তারে ভারতের যেমন স্বপ্ন আছে, তেমনি ভয়ও আছে। দেশটির সাম্রাজ্য-লিপ্সু নেতাদের মাঝে যেমন রয়েছে প্রচণ্ড পাকিস্তানভীতি ও ইসলামভীতি, তেমনি রয়েছে চীনভীতিও। চীন দ্রুত অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিসঞ্চয় করছে। প্রতিবেশী নেপালও এখন চীনের পক্ষে।  মধ্য ভারতের কয়েকটি প্রদেশে জুড়ে লড়াই করে চলেছে হাজার হাজার মাওবাদী বিপ্লবী। প্রাক্তন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ভাষায় মাওবাদীদের এ যুদ্ধই ভারতীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে বর্তমান কালের সবচেয়ে বড় হুমকি। অপরদিকে পাকিস্তানও এখন আর একাত্তরের দুর্বল পাকিস্তান নয়। তার হাতে এখন পারমাণবিক বোমা। রয়েছে দূরপাল্লার শত শত মিজাইল। রয়েছে হাজার হাজার আত্মত্যাগী ইসলামী বোমারু যোদ্ধা – যাদের মাত্র কয়েকজন মোম্বাই শহরকে কয়েকদিনের জন্য অচল করে দিয়েছিল। ১৯৪৮, ১৯৬৫ এবং ১৯৭১-এর যুদ্ধের কারণে অসম্ভব ও অচিন্তনীয় হয়ে পড়েছে পাকিস্তানের সাথে দেশটির বন্ধুত্ব। সম্প্রতি আফগানিস্তানে মার্কিনীদের সাথে ভারতের সহযোগী ভূমিকা ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানীদের সে ঘৃনা আরো তীব্রতর করছে। তাছাড়া লাগাতর যুদ্ধ চলছে কাশ্মীরে। সে যুদ্ধ থামার নাম নিচ্ছে না। কাশ্মিরী যুবকদের মধ্য থেকে বিলুপ্ত হয়েছে। তারই প্রমান, গত ফেব্রেয়ারি (২০১৯) এক কাশ্মিরে যুবকের হাতে ৪০ জন সেনা সদস্যের মৃত্যু।  ভারতের পক্ষে বিজয় সেখানে অসাধ্য হয়ে উঠছে। সে সত্যটি ভারতীয় সমরবিদদের কাছেও দিন দিন স্পষ্টতর হচ্ছে। বিজয় একই ভাবে অসাধ্য হয়ে উঠছে উত্তরপূর্ব সীমান্তের প্রদেশগুলির যুদ্ধেও। ভারতের আরো ভয়, আফগানিস্তানের যুদ্ধেও মার্কিনীদের অনুগত সরকার দ্রুত পরাজিত হতে চলেছে। ফলে তাদের আশংকা, দেশটি পুনরায় দখলে যাচ্ছে তালেবানদের হাতে -যারা পাকিস্তানের মিত্র। ভারতীয়দের ভয়,তালেবানগণ কাবুলের উপর বিজয় অর্জনের পর মনযোগী হবে ভারত থেক কাশ্মীর আজাদ করতে। কাশ্মীরের মজলুল মুসলমানদের দুর্দশায় আফগানিস্তানের সেকুলার নেতৃবৃন্দ নিশ্চুপ থাকলেও ধর্মপ্রাণ তালেবানগণ সেটি সইবে না। বরং তাদের পক্ষে যুদ্ধ লড়াটি তারা ধর্মীয় ফরজ জ্ঞান করবে। সে সাথে ভারতীয়দের আতংক ধরেছে দেশটির উত্তর-পূর্ব সীমান্তের যুদ্ধে চীনের ক্রমঃবর্ধমান আগ্রহ দেখে।

ভারতীয়দের ভয়ের আরো কারণ, উত্তর-পূর্ব সীমান্তের ৭টি প্রদেশ তিনদিক দিয়েই শত্রু দ্বারা ঘেরাও। প্রদেশগুলি মূল ভারতের সাথে সংযুক্ত মাত্র ১৭ মাইল চওড়া শিলিগুড়ি করিডোর দিয়ে। মুরগির ঘাড়ের ন্যায় সরু এ করিডোরটি চীন যে কোন সময় বন্ধ করে দিতে পারে। বন্ধ করতে পারে পূর্ব সীমান্তের বিদ্রোহী বিচ্ছিন্ততাবাদীরাও। ভারতীয়দের সে ভয় ও আতংকের ভাবই প্রকাশ পেয়েছে মি. ভরত ভার্মার প্রবন্ধে। তবে তার লেখায় শুরুতে যেটি প্রকাশ পেয়েছে তা হলো আগ্রাসী ভারতীয়দের নিজ অভিলাষের কথা। তিনি লিখেছেন, “India has the potential to be to Asia, what America is to the world… Possibly India is the only country in Asia that boasts of the potential to occupy the strategic high ground gradually being vacated by the retreating western forces, provided it develops offensive orientation at the political level. অর্থঃ “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে মর্যাদা অর্জন করেছে সমগ্র পৃথিবীতে, ভারতের সামর্থ রয়েছে এশিয়ার বুকে সে অবস্থায় পৌঁছার।… সম্ভবতঃ ভারতই এশিয়ার একমাত্র দেশ যার সামর্থ রয়েছে পিছেহঠা পশ্চিমা শক্তিবর্গের ফেলে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ স্ট্রাটেজিক ক্ষেত্রগুলো দখলের। তবে সেটি সম্ভব হবে যদি দেশটি রাজনীতির ময়দানে আক্রমণাত্মক ছকে নিজেকে গড়ে তোলে।”

কোন বৃহৎ শক্তির একার পক্ষেই এখন আর বিশ্ব-রাজনীতি নিজ নিয়ন্ত্রনে রাখা সম্ভব নয়। একাজ অতি ব্যয়বহুল। আফগানিস্তানকে কবজায় রাখার বিপুল খরচ সোভিয়েত রাশিয়াকে শুধু পরাজিতই করেনি, টুকরো টুকরো করে ফেলেছে। তেমনি ইরাক ও আফগানিস্তান দখলদারির খরচ বিপাকে ফেলেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে। দেশটি আজ চীনের চেয়েও দুর্বল অর্থনৈতিক ভাবে। ফলে বিজয় দূরে থাক, তাদেরকে পিছু হটার রাস্তা খুঁজতে বাধ্য হতে হয়েছে। ভারতের খায়েশ, তারা সে শূণ্যস্থান দখলে নিবে। আর সে জন্য তারা এখন আগ্রাসী স্ট্রাটেজী নিয়ে এগুচ্ছে। অথচ একটি এশিয়ান শক্তি হওয়ার খরচও কম নয়। তবে এমন বাতিক শুধু হঠকারিই করে না, বিবেকশূণ্যও করে। তাই বিশ্বের সর্বাধিক দরিদ্র মানুষের বসবাস ভারতে হলে কি হবে, দেশটির বাতিক উঠেছে শত শত কোটি টাকার অস্ত্র কেনার। এবং প্রস্তুতি নিচ্ছে পাকিস্তান ও চীনের বিরুদ্ধে একটি প্রকান্ড যুদ্ধের। এ জন্যই প্রয়োজন পড়েছে বাংলাদেশের অভ্যন্তর দিয়ে করিডোরের। কারণ, ভারতীয় সমরবিদদের বিবেচনায় শিলিগুরি সরু করিডোরটি আদৌও নিরাপদ নয়। সম্ভব নয় এ পথ দিয়ে কোন যুদ্ধকালীন সময়ে ভারতের পূর্ব সীমান্তে লাগাতর রশদ সরবরাহ। সংকীর্ন এ গিরিপথের উপর ভরসা করে দীর্ঘকাল ব্যাপী কোন যুদ্ধ পরিচালনা অসম্ভব। ভারতীদের আতংক যে এ নিয়ে কতটা প্রকট সে বিবরণও পাওয়া যায় মি. ভার্মার লেখায়। তিনি লিখেছেন, “Beijing is likely to para-drop a division of its Special Forces inside the Siliguri Corridor to sever the Northeast. There will be simultaneous attacks in other parts of the border and linkup with the Special Forces holding the Siliguri Corridor will be selected. All these will take place under the nuclear overhang. In concert Islamabad will activate the second front to unhook Kashmir by making offensive moves across the IB in the plains… Meanwhile the fifth columnists supporting these external forces will unleash mayhem inside. অর্থঃ “বেইজিং উত্তর-পূর্ব অঞ্চলকে বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যে শিলিগুরি করিডোরে এক ডিভিশন স্পেশাল ফোর্সকে প্যারাসুট যোগে নামাতে পারে। শিলিগুরি করিডোরের উপর স্পেশাল ফোর্সের দখলদারি বলবৎ রাখার জন্য সে সময় সীমান্তের অন্যান্য ক্ষেত্রেও একযোগে হামলা হতে পারে। সব কিছুই হবে এমন এক সময় যখন আনবিক বোমার ভয়ও মাথার উপর ঝুলতে থাকবে। এরই সাথে তাল মিলিয়ে কাশ্মীরকে বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যে ইসলামাবাদ কতৃপক্ষ আন্তর্জাতিক সীমান্ত বরাবর দ্বিতীয় রণাঙ্গণ খুলবে। দেশের অভ্যন্তরে একই সময় চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে পঞ্চম বাহিনীর লোকেরা।”

ভারতীয়দের মাথাব্যাথা শুধু শিলিগুড়ি, কাশ্মির বা আভ্যন্তরীন মাওবাদীদের নিয়ে নয়, আতংক বেড়েছে আফগানিস্তানকে নিয়েও। ভয়ের বড় কারণ, একমাত্র ব্রিটেশদের হামলা বাদে দিল্লি অভিমুখে অতীতের সবগুলি হামলা হয়েছে আফগানিস্তানের মধ্য দিয়ে। আর আফগানিস্তানের মধ্য দিয়ে প্রসারিত হল মধ্য এশিয়ার দেশগুলির যাওয়ার রাস্তা। সে আফগানিস্তান আজ দখলে যাচ্ছে পাকিস্তানপন্থি তালেবানদের হাতে! ভারতীয় এটি ভাবতেও ভয় হয়। মি. ভার্মা লিখেছেন, “With Afghanistan being abandoned by the West, Islamabad will craft a strategy to take over Kabul with the help of Islamic fundamentalist groups. The Taliban will initially concentrate on unravelling a soft target like India in concert with Beijing -Islamabad -Kabul or Chinese Communists- Pakistan Army- Irregular Forces axis.” অর্থঃ পশ্চিমা শক্তিবর্গ যখন আফগানিস্তান ছেড়ে চলে যাবে তখন ইসলামাবাদ কর্তৃপক্ষ ইসলামী মৌলবাদীদের সাথে মিলে পরিকল্পনা নিবে কাবুল দখলের। তালেবানগণ তখন বেইজিং-ইসলামাবাদ-কাবুল অথবা চীনা কম্যুনিষ্ট-পাকিস্তান সেনাবাহিনী-অনিয়মিত সৈন্য –এরূপ অক্ষীয় জোটের সাহায্য নিয়ে শুরুতে ভারতের ন্যায় সহজ টারগেটের উপর আঘাত হানতে মনযোগী হবে।”

ভারতীয়দের দৃষ্টিতে বাংলাদেশ ভারতের সীমান্ত প্রতিরক্ষা সীমানার বাইরের কোন দেশ নয়। বাংলাদেশকে সে পরিকল্পিত প্রতিরক্ষা বুহ্যের বাইরের দেশ ধরলে ভারতের জন্য কোন মজবুত ডিফেন্স স্ট্রাটেজী গড়ে তোলাই অসম্ভব। সেটি ভারত হাড়ে হাড়ে বুঝেছে ১৯৬২ সালে যখন চীনের সাথে ভারতের যুদ্ধ হয়। সে যুদ্ধে ভারত চরম ভাবে পরাজিত হয়। চীনের বিশাল বাহিনীর মোকাবেলায় ভারত প্রয়োজনীয় সংখ্যক সৈন্যসমাবেশই করতে পারেনি। কারণ সেরূপ রাস্তাই ভারতের জন্য সে সময় ছিল না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়ে ভারত তখন পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের উপর চাপ দিয়েছিল যাতে পূর্ব পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে সৈন্য সমাবেশের সুযোগ দেয়। কিন্তু আইয়ুব খান সে চাপের কাছে নতি স্বীকার করেননি। কিন্তু একাত্তরে পাকিস্তানের পরাজয়ের পর ভারতের সামনে সম্ভাবনার রাস্তা খুলে যায়। এশিয়ায় প্রভূত্ব বিস্তারে ভারত আজ যে স্বপ্ন দেখছে সেটি মুলতঃ একাত্তরের বিজয়ের ফলশ্রুতিতেই।

 

বৈধতা দেয়া হলো সামরিক হস্তক্ষেপের

কাউকে নিজ ঘরে দাওয়াত দিলে তাকে নিরাপত্তাও দিতে হয়। মেহমানদারির এ এক মহা দায়ভার। নিজ গৃহে অন্যের উপর হামলা হলে সেটি আর তখন আভ্যন্তরীণ বিষয় থাকে না। তাকে বাঁচাতে অন্যরা তখন ঘরে ঢুকার বৈধতা পায়। তাছাড়া শত শত মাইল ব্যাপী করিডোরে শত শত ভারতীয় যানবাহন ও হাজার হাজার ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা দেয়ার দায়ভার কি এতই সহজ? পাকিস্তান, ইরাক, আফগানিস্তান, ইয়েমেনসহ বিশ্বের বহু দুর্বল দেশে নিজেদের নিরাপত্তার দায়ভার মার্কিনীরা নিজ হাতে তুলে নিয়েছে। এখন সেসব দেশে মার্কিনীরা লাগাতর ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। ফলে ভারতকে করিডোর দেয়ার ফলে সে করিডোরে চলমান ভারতীয় যানবাহনের উপর হামলা হলে তখন নিরাপত্তার দায়ভারও ভারতীয়রা নিজ হাতে নিতে চাইবে। তখন বাংলাদেশে ভারতীয় সৈন্য সমাবেশ যেমন বাড়বে, তেমনি বাড়বে তাদের উপর হামলাও। এর ফলে তীব্রতর হবে যুদ্ধও। এভাবেই বাংলাদেশের কাঁধে চাপবে ভারতের যুদ্ধ।

ভারত জানে, করিডোর দিলে ভারতের যুদ্ধে বাংলাদেশকে নামানো সহজতর হবে। কারণ করিডোর দিয়ে চলমান ভারতীয় যানের উপর হামলা রোধে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাহিনী তখন সীমান্ত ছেড়ে কামানের নলগুলি নিজ দেশের জনগণের দিকে তাক করতে বাধ্য হবে। দেশটি তখন পরিণত হবে আরেক ইরাক,আরেক আফগানিস্থান বা কাশ্মীরে। করিডোরে চলমান ভারতীয় যানবাহনের উপর হামলা হলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতীয় হস্তক্ষেপও বাড়বে। বাড়বে ভারতীয় সৈন্য সমাবেশও। কারণ, ভারতীয় যানবাহন ও নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হলে ভারত নিশ্চিয়ই চুপচাপ বসে থাকবে? ভারত তখন বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র আখ্যা দিয়ে নিজেদের যানবাহন ও নাগরিকদের নিরাপত্তা নিজ হাতে নিতে আগ্রহী হবে। যে অজুহাতে মার্কিনী বাহিনী পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ঢুকে যাকে ইচ্ছা তাকে গ্রেফতার করছে বা হত্যা করছে, এবং যখন তখন ড্রোন হামলা করছে, সেটিই যে ভারত বাংলাদেশের অভ্যন্তরে করবে তা নিয়ে কি কোন সন্দেহ আছে? ভারতীয় বিএসএফ যেটি বাংলাদেশের সীমান্তে করছে সেটিই করবে দেশের ভিতরে ঢুকে। ভারতীয় বাহিনীর সে কাজে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার ও তার পশ্চিমা মিত্রগণও যে ভারতকে অকুণ্ঠ সমর্থন দিবে -তা নিয়েও কি কোন সংশয় আছে?  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তো ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে, ভারত দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক শক্তি রূপে দায়িত্ব পালন করুক। অর্থাৎ আফগানিস্তান এবং ইরাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যা কিছু করছে সেটিই ভারত বাংলাদেশ এবং পাশ্বর্ব্তী অন্যান্য দেশে পালন করুক। ভারত একই ভাবে মার্কিনীদের পাশে দাড়িয়েছে আফগানিস্তানে। বরং ভারতের আব্দার, মার্কিন বাহিনী যেন পুরাপুরি আফগানিস্তান ত্যাগ না করে।

ভারতের বিদেশ নীতিতে সম্প্রতি আরেক উপসর্গ যোগ হয়েছে। ভারতের যে কোন শহরে বোমা বিস্ফোরণ হলে তদন্ত শুরুর আগেই ভারত সরকার পাকিস্তানীদের পাশাপাশি বাংলাদেশীদের দায়ী করে বিবৃতি দিচ্ছে। যেন এমন একটি বিবৃতি প্রচারের জন্য পূর্ব থেকেই প্রস্তুত থাকে। কিন্তু এ অবধি এমন কাজে বাংলাদেশীদের জড়িত থাকার পক্ষে আজ অবধি কোন প্রমান তারা পেশ করতে পারিনি। এমন অপপ্রচারের লক্ষ্য একটিই। করিডোরসহ ভারত যে সুবিধাগুলো চায় সেগুলি আদায়ে এভাবে প্রচন্ড চাপসৃষ্টি করা। ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতির এটিই হলো এখন মূল স্ট্রাটেজী। লক্ষ্যনীয় হল, সেদেশে বার বার সরকার পরিবর্তন হলেও বাংলাদেশের প্রতি তাদের এ নীতিতে কোন পরিবর্তন নেই। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য বিপদ বাড়বে যদি এ লড়ায়ে বালাদেশ ভারতের পক্ষ নেয়। পণ্যের পাশাপাশি সৈন্য ও সামরিক রশদ তখন রণাঙ্গণে গিয়ে পৌঁছবে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে। ফলে পূর্ব এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে প্রতিপক্ষ রূপে চিহ্নিত হবে বাংলাদেশ। আজ অবধি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যারা একটি তীরও ছুঁড়েনি তারাই পরিণত হবে পরম শত্রুরূপে। তখন সসস্ত্র হামলার লক্ষ্যে পরিণত হবে বাংলাদেশের সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনা। তখন অশান্ত হয়ে উঠবে দেশের হাজার মাইল ব্যাপী উত্তর ও পূর্ব সীমান্ত। অহেতুক এক রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে বাংলাদেশ। কথা হলো, যে গেরিলা যোদ্ধাদের মোকাবিলা করতে গিয়ে বিশাল ভারতীয় বাহিনীই হিমসিম খাচ্ছে সেখানে বাংলাদেশের মত দেশ কি সফলতা পাবে? তখন বাংলাদেশের সম্ভাব্য বিচ্ছিন্নতাবাদীরা বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা বিদ্রোহীগণ বন্ধু ও নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পাবে এ এলাকায়। এ কারণেই বাংলাদেশের জন্য অতিশয় আত্মঘাতি হলো ভারতের জন্য ট্রানজিট দান।

 

খাল কাটা হলো কুমির আনতে

খাল কাটলে কুমির আসাবেই। সেটি শুধু স্বাভাবিকই নয়, অনিবার্যও। অথচ বাংলাদেশ সরকার সে পথেই এগুলো। করিডোর দেয়াতে আগ্রাসী শক্তির পদচারণা হবেই। এখন শুধু মালবাহী ভারতীয় ট্রাকই আসবে না, সৈন্যবাহী যানও আসবে। তাদের বাঁচাতে ড্রোন হামলাও হবে। বাংলাদেশ প্রকৃত অর্থেই তখন ভারতের এক অধিকৃত দেশে পরিনত হবে। ফলে আজকের আফগানিস্তান ও কাশ্মীরের যে অধিকৃত দশা সেটি বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ঘটবে। এবং সে পরাধীনতাকে স্বাধীনতা বলার মত লোকের অভাব যেমন আফগানিস্তান ও কাশ্মীরে হয়নি, তেমনি বাংলাদেশেও হবে না। “ফারাক্কার পানিচুক্তির ফলে বাংলাদেশ লাভবান হয়েছে”, “টিপাই মুখ বাঁধ দেয়াতে সুরমা, কুশিয়ারা ও মেঘনায় পানি থৈ থৈ করবে” এবং “ভারতকে করিডোর দিলে হাজার হাজার কোটি টাকার অর্থ লাভ হবে” এমন কথা বলার লোক কি বাংলাদেশে কম? তারাই সেদিন ভারতের পক্ষে তাদের গলা জড়িয়ে প্রশংসা গীত গাইবে।

আরো লক্ষ্যণীয় হলো, বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী এ এলাকাটিতে ভূ-রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিবর্তন হচ্ছে অতি দ্রুতগতিতে। মেঘালায়, মিজোরাম ও ন্যাগাল্যান্ড রাজ্যগুলি ইতিমধ্যেই পরিণত হয়েছে খৃষ্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্যে। খৃষ্টান ধর্ম জোরে সোরে প্রচার পাচ্ছে পাশ্ববর্তী প্রদেশগুলিতেও। ফিলিপাইনের পর সমগ্র এশিয়ায় এটিই এখন সর্ববৃহৎ খৃষ্টান অধ্যুষিত এলাকা। তাছাড়া ভারতীয় সংখ্যাগরিষ্ট হিন্দুদের আচরণে এ ধর্মমতের অনুসারিরাও অতি অতিষ্ট। উগ্র হিন্দুদের কাছে হিন্দু ধর্ম ছাড়া অন্য ধর্মে দীক্ষা নেওয়া এক অমার্জনীয় অপরাধ। ফলে অতি জোরদার হচেছ খৃষ্টান অধ্যুষিত এলাকা নিয়ে একটি অখন্ড খৃষ্টান রাষ্ট্র নির্মানের ধারণা। পশ্চিমা খৃষ্টান জগতে এমন রাষ্ট্রের পক্ষে আগ্রহ দিন দিন বাড়বে সেটিই স্বাভাবিক। ইন্দোনেশিয়া থেকে পূর্ব তিমুরকে আলাদা করার পিছনে যে যুক্তি দেখানো হয়েছিল সে যুক্তির প্রয়োগ হবে ভারতের বিরুদ্ধেও। ফলে খৃষ্টান জগত এবং চীনের ন্যায় বৃহৎ শক্তিবর্গও তখন নিজ নিজ স্বার্থে স্বাধীনতাকামীদের পক্ষ নিবে।

এ অবস্থায় ভারতের পক্ষ নেওয়ার খেসারত দিতে হবে অন্যান্য আঞ্চলিক ও বৃহৎ শক্তির বিরাগ-ভাজন হয়ে। বাংলাদেশের জন্য সেটি হবে আত্মঘাতি। কিন্তু ভারতের জন্য চরম সুখের বিষয়টি হল, বাংলাদেশের মানুষের গলায় এ ঘাতক ফাঁসটি তাকে নিজে পড়িয়ে দিতে হচ্ছে না। দেশবাসীর গলায় সে ফাঁসটি পড়ানোর দায়িত্ব নিয়েছে বাংলাদেশের সরকার নিজে। ভারতীয়দের সৌভাগ্য যে, সে কাজে তারা একটি সেবাদাস সরকারও পেয়ে গেছে। এ মুহুর্তে ভারত সরকারের কাজ হয়েছে, সে পরিকল্পিত ফাঁসটি এ নতজানু সরকারের হাতে তুলে দেওয়া। একাত্তরের যুদ্ধের ফসল যেভাবে তারা নিজেরা ঘরে তুলেছিল,তারা একই কৌশল নিয়ে এগুচ্ছে এবারও। একাত্তরের যুদ্ধ শেষে তারা বাংলাদেশীদের উপহার দিয়েছিল স্বাধীনতার নামে ভারতের পদানত একদলীয় একটি বাকশালী সরকার, রক্ষিবাহিনীর নৃশংসতা, “ভিক্ষার তলাহীন ঝুড়ি” এবং ভয়ানক দুর্ভিক্ষ। উনিশ শ’ সত্তরের নির্বাচন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে হলেও দেশবাসীর ভাগ্যে সে গণতন্ত্র জুটেনি। সে নির্বাচনে যারা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন তার বাংলাদেশীদের ভবিষ্যত নিয়ে একাত্তরে একদিনের জন্যও কোন বৈঠকে বসেননি। তারা স্বাধীনতার ঘোষনা যেমন দেননি, তেমনি একাত্তরের যুদ্ধের ঘোষণা ও সে যুদ্ধের পরিচালনাও করেননি। সবই করেছে ভারত সরকার, ভারতীয় পার্লামেন্ট, ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থা ও সেনাবাহিনী। মুজিবামলে গণতন্ত্রকেই বধ করা হয়েছিল শেখ মুজিবের স্বৈরাচারি বাকশালী শাসনকে স্থায়ীরূপ দিতে। একই ভাবে গণতন্ত্র অকার্যকর করা হয়েছে ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর  থেকে; এবং আজও সে ধারা চলছে। বিরোধী দলীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের গ্রেফতার এবং তাদের উপর অত্যাচার, এমন কি সংসদ সদস্যদের রাজপথে পিটানো এখন রাজনীতির সংস্কৃতিতে পরিণত করা হয়েছে। অধিকৃত রাষ্ট্রে গণতন্ত্র থাকে না; বরং যা বিকট ভাবে শোভা পায় তা হলো গোলামীর শিকল। সে গোলামীরই আলামত হলো বাংলাদেশে ভিতর দিয়ে ভারতের করিডোর। ২৬/০৩/২০১৯

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *