ভারতীয় চ্যালেঞ্জ, ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের দায় এবং বাঙালি মুসলিমের ব্যর্থতা
- Posted by Dr Firoz Mahboob Kamal
- Posted on January 1, 2026
- Bangla Articles, Bangla বাংলা, আমার কবিতা, সমাজ ও রাজনীতি
- No Comments.
ফিরোজ মাহবুব কামাল
ভারতের ঘোষিত এজেন্ডা
স্বাধীন ও শক্তিশালী বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসী ভারতের ষড়যন্ত্রটি প্রতিদিন ও প্রতি মুহুর্তের। একারণে বাঙালি মুসলিমের জীবনে প্রতিদিন একাত্তর। আর একাত্তর বাঙালি মুসলিম জীবনে কখনোই একাকী আসে না। সাথে আনে ভারতীয় ষড়যন্ত্র, যুদ্ধ, সীমাহীন লুণ্ঠন, মুজিবের বাকশাল, রক্ষিবাহিনী, গণতন্ত্রের কবর, দুর্ভিক্ষ। এবং আনে হাসিনার গুম, খুন, ফাঁসি, ভোটডাকাতি, পিলখানা হত্যাকাণ্ড. শাপলা চত্বর ও আয়না ঘর। ১৯৭১ থেকে শুরু করে আজ অবধি বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, অর্থনীতি এবং জনগণের জান-মালের বিরুদ্ধে যত নাশকতা হয়েছে তার সাথে ভারত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে জড়িত। ২০২৪’য়ে আগস্ট ভারতসেবী হাসিনার পতন হলেও ভারতের ষড়যন্ত্র শেষ হয়নি। বাংলাদেশ জুড়ে সৃষ্টি হচ্ছে ভারতীয় আগ্রাসনের নতুন পরিকল্পনা। পশ্চিম বঙ্গ বিজিপি’র সংসদীয় নেতা শুভেন্দ্র অধিকারী প্রকাশ্যে বলেছে, “ইসরাইল যেরূপ গাজা ধ্বংস করেছে, বাংলাদেশকেও আমরা তেমনি মাটিতে মিশিয়ে দিব।” বাংলাদেশকে কেন ধ্বংসপ্রাপ্ত গাজায় পরিণত করতে চায় এবং কেন সেখানে গণহত্যা সংঘটিত করতে চায় -শুভেন্দ্র অধিকারী তার কোন কারণই উল্লেখ করেনি। তবে কারণটি বলা না হলেও সুস্পষ্ট। বাংলাদেশ ভারতের খাঁচা থেকে বেরিয়ে স্বাধীন হতে চায় -সেটিই বাংলাদেশের অপরাধ। সেরূপ একটি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাকে রুখতেই ভারত এ এলাকায় আরেক ইসরাইলী দানব হতে চায়। বাংলাদেশের জন্য এটি হলো বিশাল চ্যালেঞ্জ।
১৯৭১’য়ে ভারত পাকিস্তানকে ভেঙেছিল। এবার বাংলাদেশেরও কোমর ভাঙতে চায়। কারণ, তাদের বিশ্বাস, পাকিস্তানের বীজ বাংলাদেশীদের মাঝেও রয়ে গেছে। তারা জানে, ১৯৪৭’য়ে বাঙালি মুসলিমরাই সৃষ্টি করেছিল পাকিস্তান। মুসলিম লীগের জন্ম হয়েছিল ঢাকাতেই এবং মুসলিম লীগের মূল দুর্গ ছিল অবিভক্ত বাংলা। তাছাড়া তারা আরো জানে, পাকিস্তান শুধু একটি দেশের নাম নয়, এটি এক প্যান-ইসলামী আদর্শ, স্বপ্ন, ভিশন ও মিশনের নাম -যা যুগে যুগে এবং দেশে দেশে অসংখ্য বিজয় এনেছে। তাই স্বাধীন ও শক্তিশালী বাংলাদেশ মানে ভারতের জন্য চ্যালেঞ্জ। ভারত তাই সে চ্যালেঞ্জকে নির্মূল করতে চায়। ভারতের সকল ভূ-রাজনীতি মূলত সে লক্ষ্যকে সামনে রেখেই।
ভারতীয়দের পাকিস্তান ভীতি ও ইসলাম ভীতি
ভারতীয় হিন্দুত্ববাদীদের রয়েছে প্রচণ্ড পাকিস্তান ভীতি। তাদের বিশ্বাস, ১৯৭১’য়ে পাকিস্তান ভেঙে গেলেও বাঙালি মুসলিমদের মাঝে পাকিস্তানী চেতনা রয়ে গেছে। কারণ, দেশ ভাঙলেও চেতনাকে ভাঙা যায়না। তাদের সে পাকিস্তান ভীতি ও মুসলিম ভীতি প্রবলতর হয়েছে ২০২৪’য়ের আগস্ট বিপ্লবের। কারণ, ভারতসেবী হাসিনা সরকারের উৎখাতে সবচেয়ে সম্মুখ ভাগের ভূমিকাটি রেখেছিল ইসলামপন্থীরাই। তাদের পাকিস্তান ভীতি তীব্রতর হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে “তুমি কে? আমি কে? রাজাকার রাজাকার” গগণবিদারী এ স্লোগানটি শুনে। এতো কাল যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেক্যুলারিজম ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের দুর্গ রূপে পরিচিত ছিল -সেখানে এরূপ স্লোগান উঠবে, সেটি তারা ভাবতেও পারিনি। যাদের চেতনায় শরিষার দানা পরিমাণ ভারত প্রেম ও একাত্তরের সেক্যুলার বয়ান বেঁচে আছে তারা কি এমন স্লোগান মুখে আনতে পারে?
ভারতের রয়েছে প্রচণ্ড ইসলাম ভীতিও। সে ভীতি আরো বেড়েছে বাংলাদেশে ইসলামপন্থীদের জনসমর্থন পাকিস্তানের চেয়েও অধিক দেখে। সে ভীতি প্রচণ্ডতর হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়, চটগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যায় বাংলাদেশের প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ইসলামী ছাত্র শিবিরের ভূমিধ্বস বিজয়ে দেখে। ভারতীয় সেনা বাহিনীর বিশাল যুদ্ধের ফসল যে বাংলাদেশ, সেখানে ইসলামপন্থীগণ এরূপ বিজয়ী হবে সেটি হিন্দুত্ববাদী ভারত কখনো কল্পনাও পারিনি। প্রয়াত বিজিপি নেতা এবং ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর ন্যায় এখন অনেক ভারতীয় বলতে শুরু করেছে, ভারত এক পাকিস্তানকে ভেঙে দুই পাকিস্তান বানিয়েছে।
ভারতের হাতে ধর্ষিত স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র
ভারতই বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের মূল শত্রু। সেটির প্রমাণ ভারত নিজেই। ১৯৭১’য়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীর দখলদারির পর থেকে ভারত পরিকল্পিত ভাবে বাংলাদেশে গণতন্ত্র চর্চা হতে দেয়নি। বাংলাদেশকে স্বাধীন ও শক্তিশালী রূপে বেড়ে উঠতেও দেয়নি। বাংলাদেশের কোমর ভাঙার কাজের শুরু একাত্তরে ভারতের বিজয়ের পরই। ভারতীয় বাহিনী লুণ্ঠন করে নিয়ে যায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী অব্যবহৃত বহু হাজার কোটি টাকার অস্ত্র, যানবাহন ও ক্যান্টনমেন্টের আসবাবপত্র। ভারতীয় সেনাবাহিনী দ্বারা পূর্ব পাকিস্তান অধিকৃত বিজয়ের পর ভারতের সমর্থন নিয়ে চেপে বসেছে শেখ মুজিবের বাকশালী ফ্যাসিবাদ। পরবর্তীতে আসে জেনারেল এরশাদের সামরিকতন্ত্র এবং ভোটডাকাত হাসিনার গুম, খুন, গণহত্যা, ভোটডাকাতি ও আয়না ঘরের নৃশংসতা। স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আইনের শাসন স্থান পায় কবরস্থানে। এসবই ঘটেছে ভারতের সমর্থণ ও সহযোগিতা নিয়ে। বরং মুজিব ও হাসিনার গণতন্ত্র হরণ, ভারত তোষণ ও ইসলামপন্থীদের দমনের নীতি ভারত থেকে প্রচুর সাবাশও পেয়েছে।
একাত্তরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর আগেই ভারত সরকার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী তাজুদ্দীন আহমেদকে দিয়ে ৭ দফা চুক্তি স্বাক্ষর করিয়ে নেয়। সে চুক্তিতে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নির্মাণের কোন প্রতিশ্রিত ছিল না। বরং ছিল ভারতের অধীনত এক গোলাম বাংলাদেশের কথা। সে ৭ দফা চুক্তিতে ছিল, বাংলাদেশে থাকবে না কোন সেনাবাহিনী। থাকবে না কোন স্বাধীন পররাষ্ট্র নীতি। পররাষ্ট্র নীতি পরিচালিত হবে ভারতের সাথে পরামর্শের ভিত্তিতে। ফলে অনুমতি ছিল না স্বাধীন ভাবে কোন দেশের সাথে সামরিক চুক্তি স্বাক্ষরের। অনুমতি ছিল সেনাবাহিনীর বদলে রক্ষিবাহিনীর ন্যায় প্যারা মিলিটারি বাহিনী গঠনের। এ জন্যই শেখ মুজিব সেনা বাহিনীর শক্তি না বাড়িয়ে রক্ষিবাহিনীকে শক্তিশালি করেছিল।
১৯৭১’য়ে ভারতে আশ্রয় নেয়া আওয়ামী লীগ নেতারা ছিল ভারতের মাটিতে উদ্বাস্তু ও অসহায়। তাদের পায়ের নীচে মাটি ছিল না। তারা নির্ভর করতো ভারতের করুণার উপর। এপ্রিলের শেষ ভাগেই পাক আর্মি পুরা দেশের উপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। ফলে তাদের জন্য দেশে ফেরা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। অথচ নির্বাচনে জিতে ক্ষমতার নেশায় তারা ছিল উম্মাদ। কোন নারী এরূপ আশ্রয়হীন, উদ্বাস্তু ও অসহায় হলে সহজেই বার বার ধর্ষণের শিকার হয়। একই কারণে আওয়ামী লীগ ভারতের হাতে হয়েছে রাজনৈতিক ধর্ষণের শিকার। ভারত যুদ্ধ করে ক্ষমতায় বসাবে এ আশায় ভারতীয় শাসকচক্র যা বলেছে, তাতেই তারা স্বাক্ষর করে দিয়েছে। কথিত আছে, ৭ দফা দাস চুক্তি স্বাক্ষরের পর সৈয়দ নজরুল ইসলাম নাকি বেহুশ হয়ে পড়ে। ভারতের হাতে এভাবে শুরুতেই ধর্ষিত হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র।
ভারত যা পেতে চায়
ভারতের সাথে মুজিবের ২৫ সালা চুক্তির মেয়াদ শেষ হলেও তাজুদ্দীনের সাথে স্বাক্ষরিত ৭ দফা চুক্তি বাতিল হয়েছে -তার কোন প্রমাণ নাই। ভারত চায়, বাংলাদেশের প্রতিটি সরকার বাঁচুক সে ৭ দফা চুক্তির প্রতিটি শর্ত মেনে। ভারত চায়, বাংলাদেশের প্রতিটি সরকার হাসিনার ন্যায় ভারতকে করিডোর দিবে, সমুদ্র ও নদী বন্দরের সুবিধা দিবে, মুক্ত বাজার দিবে, কেড়ে নিবে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার এবং মুসলিমদের দূরে সরাবে ইসলাম থেকে। বিরোধীদের রাখা হবে কারাগারে অথবা আয়না ঘরে। সে সাথে চায়, বাঙালি মুসলিমের সংস্কৃতি হবে মঙ্গল প্রদীপ জ্বালানো, মূর্তি নির্মাণ, মূর্তিতে পূজাদান এবং বর্ষবরণ ও বসন্ত বরণের দিনে রাস্তায় আলপনা ও জীবজন্তুর মূর্তি নিয়ে মিছিল। এভাবেই অসম্ভব করতে চায় বাঙালি মুসলিমদের মুসলিম রূপে বেড়ে উঠাকে।
ভারতের দেখানো পথে চললে ভারত সরকার বাংলাদেশের পক্ষে সারা বিশ্ব জুড়ে সুনাম গাইতে রাজী –যেমন সুনাম গেয়েছে ফ্যাসিস্ট মুজিব ও হাসিনার পক্ষে। মুজিবের হাতে গণতন্ত্রের কবর, বাকশালী স্বৈরাচার, দুর্নীতি, ২০ হাজারের বেশী বিরোধী দলীয় নেতাকর্মী খুন এবং হাসিনার গুম, খুন, ভোট ডাকাতি, আয়না ঘর, এক দলীয় নির্বাচন, পিল খানা হত্যাকাণ্ড এবং শাপলা চত্বরে গণহত্যার ন্যায় অপরাধ ভারতের কাছে কোন অপরাধ গণ্য হয়নি। বরং সে সব অপরাধগুলি লুকাতে ভারতীয় দূতাবাসগুলি নানা দেশের রাজধানীতে লাগাতর ওকালতি করেছে। ভারতীয় কূটনীতিবিদগণ বিদেশীদের বুঝিয়েছে, হাসিনার বিকল্প নাই। তারা বলেছে, হাসিনা না থাকলে বাংলাদেশ ইসলামী জঙ্গীদের কবলে পড়বে। অপর দিকে হাসিনার পলায়নের পর ইউনুস সরকারের বিরুদ্ধে ভারত সরকারের বয়ান পাল্টে গেছে। অভিযোগ তুলেছে, বাংলাদেশ নাকি উগ্রপন্থীদের কবলে। আরো অভিযোগ, বাংলাদেশের মাটিতে পাকিস্তানকে জায়গা করে দিচ্ছে। আসল বিষয়টি ভিন্ন। ভারতের গোলাম না হওয়াটাই প্রফেসর ইউনুসের মূল অপরাধ। ভারত চায় না, বাংলাদেশ স্বাধীন ও শক্তিশালি রাষ্ট্র রূপে খাড়া হোক।
ভারত সরকার বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্র নীতিকে ভারত বৈরীতা রূপে দেখে। ভারত ইসরাইলসহ যে কোন দেশের সাথে বন্ধুত্ব করতে পারবে –সেটি তাদের স্বাধীনতা। কিন্তু বাংলাদেশ পাকিস্তান, তুরস্ক ও চীনের সাথে বন্ধুত্ব করলে –সেটি গণ্য হয় ভারত বিরোধী নীতি রূপে। ভারত রাশিয়া, ফ্রান্স, ইসরাইল থেকে অস্ত্র কিনলে সেটি দোষের নয়। কিন্তু ভারতের কাছে অসহ্য হলো, বাংলাদেশ যদি চীন, তুরস্ক ও পাকিস্তান থেকে অস্ত্র ক্রয় করে। সে অস্ত্র ক্রয় ভারতের জন্য বিপদ রূপে চিহ্নিত হয়। মুজিব, এরশাদ ও হাসিনার আমলেও ভারত তাই বাংলাদেশকে অস্ত্র ক্রয় করতে দেয়নি। অথচ স্বাধীনতা বাঁচানোর সামর্থ্য ছাড়া কি স্বাধীনতা বাঁচে? তাই শক্তিশালী সেনা বাহিনীর বিকল্প নাই ভারত বুঝিয়ে দিয়েছে, স্বাধীন বাংলাদেশ নির্মাণের জন্য তারা ১৯৭১’য়ে যুদ্ধ করেনি।
যে দায় সবার
বাংলাদেশের মূল যুদ্ধটি শুধু হাসিনাপন্থী বা মুজিবপন্থীদের বিরুদ্ধে নয়, বরং সেটি হলো তাদের প্রভু ভারতের বিরুদ্ধে। ভারতীয় আধিপত্য রুখবার যুদ্ধই হলো বাঙালি মুসলিমের আজকের এবং আগামী দিনের রাজনীতি। সে রাজনীতির লক্ষ্য শুধু স্বৈরাচার নির্মূল ও দেশের স্বাধীনতার সুরক্ষা নয়, বরং মহান আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডার পূর্ণ বিজয়। এটি পবিত্র জিহাদ। মুসলিম হওয়ার অর্থই হলো প্রতিক্ষণ জিহাদ নিয়ে বাঁচা –যেমনটি বেঁচেছিলেন নবীজী (সা🙂 ও তাঁর সাহাবাগণ। কারণ শত্রুপক্ষও প্রতিক্ষণ বাঁচে যুদ্ধ নিয়ে। তাই প্রতিরোধে ঢিল দিলে পরাজয় অনিবার্য। তাছাড়া ঈমানদারের জিহাদ শুধু রাজনীতি ও রক্তাক্ত রণাঙ্গনে নয়, বুদ্ধিবৃত্তিতেও। কারণ, মুসলিম রূপে বাঁচার জন্য চেতনার ভুমিকেও মুক্ত করতে হয় অসত্য বয়ান তথা জাহিলিয়াতের দখলদারি থেকে। জিহাদ থাকতে হয় রাষ্ট্রীয় অঙ্গণ থেকে শয়তানী শক্তির দখলদারি নির্মূলে। আর এসবই হলো মুসলিম হওয়ার ধারাবাহিক পরম্পরা।
তাই স্রেফ গণতান্ত্রিক অধিকার ও স্বাধীনতা অর্জিত হলেই ঈমানদারের রাজনীতি থেমে যায়না। এবং স্রেফ নামাজী, রোজাদার ও হাজী হলেই থেমে যায় না মুসলিমদের সিরাতাল মুস্তাকীমে চলার যাত্রা। বরং অবিরাম চলতে হয় পূর্ণতা প্রাপ্তির দিকে। এবং সে পূর্ণতার প্রাপ্তি ঘটে মহান আল্লাহ তায়ালার জমিনে তাঁর এজেন্ডার পূর্ণ বিজয়ের মধ্য দিয়ে। একমাত্র তখনই পূর্ণ দ্বীন পালন হয়। তখন প্রতিষ্ঠা জুটে বিশ্বশক্তি রূপে। সেটিই মহা নবীজী (সা:)’য়ের পথ। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা অর্জিত হওয়ার পর পাকিস্তানের ভূমিতে গাদ্দারী হয়েছে মহান রব’য়ের এজেন্ডার সাথে। বিজয়ী করা হয়নি মহান আল্লাহর এজেন্ডাকে। গাদ্দারী হয়েছে “পাকিস্তান কা মতলব কিয়া? লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” মুসলিম লীগের ১৯৪৭’য়ের এই পবিত্র স্লোগানে সাথে।
মহান রব’য়ের এজেন্ডার অর্থ, তাঁর সার্বভৌমত্ব ও শরিয়ার প্রতিষ্ঠা, জনগণের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা, দুর্বৃত্তির নির্মূল ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং প্যান-ইসলামী মুসলিম ভাতৃত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত পূর্ণাঙ্গ ইসলামী রাষ্ট্র। ইসলামের এমন বিজয় এলে সে বিজয় কোন রাষ্ট্রের সীমান্তে সীমিত থাকে না, প্লাবনের পানির ন্যায় সর্বদিকে প্লাবন আনে। অবিকল সেটিই দেখা গেছে নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবায়ে কেরামদের আমলে। শয়তান ও তার দুর্বৃত্ত খলিফারা সেটি জানে। তাই তারা কখনোই সেটি হতে দিতে রাজী নয়, তারা মুসলিমের সে যাত্রাকে স্রেফ নামাজ-রোজা ও হজ্জ-যাকাতে থামিয়ে দিতে চায়। ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের উদ্যোগকে তারা সফল হতে দিতে রাজী নয়। সেটিকে তারা মৌলবাদ ও উগ্রবাদ বলে। ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ রুখতে এমন কি তারা যুদ্ধও করে। এরাই মুসলিম উম্মাহর ঘরের শত্রু। ২০২৪’য়ের জুলাই-আগস্ট বিপ্লবকে তারা স্রেফ হাসিনার উৎখাত ও গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠার মধ্যেই সীমিত রাখতে চায়। অথচ প্রতিটি ঈমানদারের দায়িত্ব হলো, ফ্যাসিস্ট হাসিনার উৎখাত যে সুযোগ এনে দিয়েছে সেটিকে মহান রব’য়ের এজেন্ডাকে পূর্ণ ভাবে বিজয়ী করার লক্ষ্যে কাজে লাগানো।
স্রেফ নামাজ-রোজা, হ্জ্জ-যাকাত ও দোয়া-দরুদ পালনের অর্থ পূর্ণ ইসলাম পালন নয়। পূর্ণ ইসলাম পালনের স্বাধীনতার জন্য চাই পূর্ণ রাজনৈতিক স্বাধীনতা। পরাধীন দেশে পূর্ণ ইসলাম পালনের কাজটি হয়না। এমন কি সে পূর্ণ স্বাধীনতা বাংলাদেশের ন্যায় অধিকাংশ মুসলিম দেশেও নাই। সে স্বাধীনতা না থাকার কারণেই বাংলাদেশ আদালতে শরিয়া পালন করা যায় না। সংবিধান ও সংসদে পালন করা যায় না মহান রব’য়ের সার্বভৌমত্ব। দেশের স্কুল-কলেজে নাই কুর’আন শিক্ষার স্বাধীনতা। স্বাধীনতা নাই পতিতাবৃত্তি, জুয়া, সূদী ব্যাংকয়ের দুর্বৃত্তির বিরুদ্ধে জিহাদের। বাংলাদেশে এখনো বলবৎ রয়ে গেছে সেক্যুলার শিক্ষায় বেড়ে উঠা ইসলামের শত্রু পক্ষের সামরিক-বেসামরিক deep state। দেশের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ তো এদের হাতেই। দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ক্ষমতায় আসে যায়, কিন্তু এরা থেকেই যায়।
ইসলাম পালনের পূর্ণ স্বাধীনতা পেতে হলে শয়তান ও তার সেক্যুলারিস্ট খলিফাদের দখলদারি থেকে দেশকে মুক্ত করতে হয়। সেটিই হলো আসল বিপ্লব। কিন্তু বাংলাদেশের বুকে সে বিপ্লবটি কখনোই হয়নি। ২০২৪’য়ের আগস্টে যেমন হয়নি; ১৯৪৭’য়ের আগস্টেও হয়নি। সেরূপ একটি বিপ্লব করতে হলে বাঁচতে হয় নবীজী (সা🙂 ও তাঁর সাহাবাদের ন্যায় আমৃত্যু জিহাদ নিয়ে। একমাত্র জিহাদই কাজ করে মহান আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডাকে বিজয়ী করার হাতিয়ার রূপে। সে জিহাদে শরীক হওয়ার ও শহীদ হওয়ার নিয়ত ও প্রস্তুতি থাকতে হয়। কিন্তু ক’জন বাঙালি মুসলিমের রয়েছে সে নিয়ত ও প্রস্তুতি। তারা তো বাঁচে নিজের, নিজ দলের বা নিজ ফেরকার এজেন্ডাকে বিজয়ী করার রাজনীতি নিয়ে। ফলে বাঙালি মুসলিম ইতিহাস গড়ছে শুধু ব্যর্থতায়।
বাঙালি মুসলিমদের অপরাধনামা
বাঙালি মুসলিমদের অপরাধের তালিকাটি দীর্ঘ। তাদের ঐতিহাসিক প্রথম অপরাধটি হলো, ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধ কালে কাফির ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে তারা জিহাদে নামেনি। অথচ দেশের স্বাধীনতা বাঁচানোর দায় সেদিন শুধু নবাব সিরাজুদ্দৌলা ও তাঁর সেনাবাহিনীর উপর ছিল না, সে দায় ছিল এ বঙ্গীয় বদ্বীপে বসবাসকারী প্রতিটি মুসলিমের। কিন্তু সে অর্পিত দায়িত্বের সাথে চরম গাদ্দারী হয়েছে। মহান আল্লাহ তায়ালা সে গাদ্দারীর শাস্তি দিয়েছেন ১৯০ বছরের গোলামী দিয়ে। জিহাদ থেকে দূরে থাকলে মাথাার উপর এভাবেই আযাব নেমে আসে।
বাঙালি মুসলিমদের দ্বিতীয় বড় অপরাধ, তারা বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানকে পৌত্তলিক ভারত ও ভারতের সেবাদাস আওয়ামী ফ্যাসিবাদী দুর্বৃত্তদের হাত থেকে বাঁচাতে পারিনি। বরং ১৬ ডিসেম্বর ভারতের কাফির সেনাদের ঢাকার রাস্তায় হাত নাড়িয়ে অভিনন্দন জানিয়েছে। লেখক সেটি সেদিন স্বচোখে দেখেছে। এট তো হৃদয় বিদারক কাণ্ড। এমন কাণ্ড একমাত্র শয়তান ও তার খলিফাদেরই খুশি করতে পারে, মহান রবকে নয়। একাত্তরে এভাবেই দেশ অধিকৃত হয়েছে ইসলাম, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের শত্রুদের হাতে। সে শত্রু শক্তির অধিকৃতির ধারাবাহিকতায় ক্ষমতায় এসেছে মুজিব, এরশাদ ও হাসিনার মত ভারতসেবী দুর্বৃত্তগণ। মুসলিম দেশ ভাঙা শরিয়তে হারাম। বাঙালি মুসলিমদের অপরাধ, একাত্তরের সে হারাম অর্জন নিয়ে তারা ৫৪ বছর যাবত উৎসব করে আসছে – যেমনটি করে ভারতের পৌত্তলিক কাফিরগণ। ভাবটা এমন, পৌত্তলিক কাফিরদের ১৬ ডিসেম্বরের বিজয় যেন তাদেরও বিজয়। কাফিরদের বিজয় কি কখনো মুসলিমের বিজয় হয়? বিস্ময়ের বিষয়, সেটুকু বোঝার সামর্থ্যই বা ক’জন বাঙালি মুসলিমের?
বাঙালি মুসলিমগণ এ যাবত বহু আন্দোলন করেছে। আন্দোলন করেছে বেতন বৃদ্ধি, দলীয় নেতার মুক্তি, গণতন্ত্র, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, কোটা বিলুপ্তি, নিরাপদ সড়ক ইত্যাদি নানা বিষয়ে। কিন্তু এ অবধি তারা মহান আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়ত প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করেছে -তার প্রমান নাই। যেন এটি কোন বিষয়ই নয়। তারা মসজিদ-মাদ্রাসার নির্মাণ নিয়ে ব্যস্ত, কিন্তু আগ্রহ নাই ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের জিহাদে। যেন এটি কোন ইস্যুই নয়। অথচ ইসলামী রাষ্ট্র কাজ করে এ পৃথিবী পৃষ্ঠে মহান রব’য়ের দ্বীনকে বিজয়ী করার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার রূপে। ফলে ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের জিহাদের চেয়ে বড় নেক কর্ম এ পৃথিবী পৃষ্ঠে নাই। তাই যারা মহান আল্লাহ তায়ালাকে খুশি করতে চায় এবং তাঁর এজেন্ডার সাথে একাত্ম হতে চায় -তাদের দেখা যায় ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের জিহাদে। তাই নবীজী (সা:)’র অর্ধেকের বেশী সাহাবা এ কাজে শহীদ হয়ে গেছেন। অথচ বাঙালি মুসলিমগণ এ কাজে নাই। প্রশ্ন হলো, নবীজী (সা:) ও তার সাহাবাদের পথে না চলে কি সিরাতাল মুস্তাকীমে চলা যায়? পৌঁছা যায় কি জান্নাতে?
ANNOUNCEMENT
ওয়েব সাইটটি এখন আপডেট করা হচ্ছে। আগের লেখাগুলো নতুন ওয়েব সাইটে পুরাপুরি আনতে কয়েকদিন সময় নিবে। ধন্যবাদ।
LATEST ARTICLES
- হারাম যুদ্ধ, হালাল যুদ্ধ, একাত্তরের যুদ্ধ এবং প্রতারক মুজিব
- বাংলাদেশের জন্মের বৈধতার সংকট
- নির্বাচন হোক দুর্বৃত্তির নির্মূল ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার জিহাদ
- মার্কিনী জঙ্গলতন্ত্রের বিপদ: স্বাধীনতা বাঁচাতে হলে ভূগোল বদলাতে হবে
- স্বাধীনতা ও ইসলামী রাষ্ট্রবিপ্লবের স্বার্থে একাত্তরের বয়ানের দাফন কেন জরুরি?
বাংলা বিভাগ
ENGLISH ARTICLES
RECENT COMMENTS
- Fazlul Aziz on The Israeli Crimes, the Western Complicity and the Muslims’ Silence
- Fazlul Aziz on India: A Huge Israel in South Asia
- Fazlul Aziz on ইসলামী রাষ্ট্রের কল্যাণ এবং অনৈসালিমক রাষ্ট্রের অকল্যাণ
- Fazlul Aziz on বাংলাদেশে দুর্বৃত্তায়ন, হিন্দুত্ববাদ এবং ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ
- Fazlul Aziz on Gaza: A Showcase of West-led War Crimes and the Ethnic Cleansing
ARCHIVES
- January 2026
- December 2025
- November 2025
- October 2025
- September 2025
- August 2025
- July 2025
- June 2025
- May 2025
- April 2025
- March 2025
- February 2025
- January 2025
- December 2024
- October 2024
- September 2024
- August 2024
- July 2024
- June 2024
- May 2024
- April 2024
- March 2024
- February 2024
- January 2024
- December 2023
- November 2023
- October 2023
- September 2023
- August 2023
- July 2023
- June 2023
- May 2023
- April 2023
- March 2023
- January 2023
- December 2022
- November 2022
- October 2022
- September 2022
- August 2022
- July 2022
- June 2022
- May 2022
- April 2022
- March 2022
- February 2022
- January 2022
- November 2021
- October 2021
- September 2021
- August 2021
- July 2021
- June 2021
- May 2021
- April 2021
- March 2021
- February 2021
- January 2021
- December 2020
- November 2020
- October 2020
- April 2020
- March 2020
- February 2020
- January 2020
- December 2019
- November 2019
- October 2019
- September 2019
- August 2019
- July 2019
- June 2019
- May 2019
- April 2019
- March 2019
- February 2019
- January 2019
- December 2018
- November 2018
