বিবিধ ভাবনা-৪

image_pdfimage_print

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১.

ইবনে খলদুনকে বলা হয় সমাজ বিজ্ঞানের পিতা। মানব সভ্যতার উত্থান ও পতন নিয়ে তাঁর লেখনি অত্যন্ত ধারালো। তাঁর অভিমত হলো,শক্তিহীনতা সভ্যতার  ধ্বংস ডেকে আনে। নিজ সভ্যতা ও সংস্কৃতি নিয়ে স্বাধীন ভাবে বেঁচে থাকতে হলে শুধু সংখ্যায় ও সম্পদে নয় অস্ত্রেও শক্তশালী হতে হয়। প্রতিবেশীর করুণার উপর কখনোই স্বাধীনতা বাঁচে না। জানমাল, ইজ্জত-আবরুও বাঁচে না। থাকতে হয় শত্রুর হামলার মুখে প্রতিরক্ষার পর্যাপ্ত সামর্থ্য। নইলে শত্রুর গোলাম হতে হয়। তখন বাঁচতে হয় অপমান ও গ্লানি নিয়ে। এরই উদাহরণ হলো বাংলাদেশ। ভারত অবাধে ডাকাতি করছে পদ্মা, তিস্তার পানির উপর। বাস্তবতা হলো, শুধু দুয়েকটি নদী নয়, বাংলাদেশর সবগুলি নদীর পানি তুলে নিলেও বাংলাদেশের সামর্থ্য নাই ভারতের সে অপরাধের বিরুদ্ধ প্রতিবাদ করার। এমন কি সাহস নাই ভারতের এ অপরাধ নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে ধর্ণা দেয়ার।  গোলাম তার প্রতিবেশী মনিবের বিরুদ্ধে মামলা করবে -সেটি কি ভাবা যায়?

দেশের সীমান্তে প্রতি বছর বহু বাংলাদেশী নাগরিক ভারতীয় সেনাদের হাতে প্রাণ হারায়।বিশ্বের আর কোন দেশের সীমান্তে এরূপ হত্যাকান্ড  ঘটে না। কিন্তু এরূপ নৃশংস হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধ প্রতিবাদ করবে -সে সাহসও বাংলাদেশের নাই। বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে ট্রানজিট চাইলে ভারতকে সেটিও দিতে হয়েছে। অথচ ভারত রাজি নয় নেপাল ভূটানে যেতে বাংলাদেশকে ট্রানজিট দিতে। ভারতকে দিতে হয়েছে চট্টগ্রাম ও চালনা বন্দরে তাদের মাল উঠানামার সুযোগ। পাকিস্তান আমলের ২৩ বছরে ভারত সে সুযোগ পায়নি। গোলামী এমন অপমানজনক অবস্থায় পৌঁছেছে যে বাংলাদেশে কে শাসক হবে সেটিও নির্ধারণ করে দিচ্ছে ভার।বাংলাদেশের বুকে আজ যে ভোটডাকাত শেখ হাসিনার দুর্বিসহ শাসন -তা তো  বেঁচে আছে ভারতের সাহায্য নিয়েই। একই ভাবে বাংলাদেশের উপর চেপে  বসেছিল শেখ মুজিবের ফ্যাসিবাদী বাকশালী শাসন। এসবই হলো একাত্তরের অর্জন যা ভারতসেবী বাঙালীদের ভাষায় স্বাধীনতা।      

২.

ইতিহাসের অতি সহজ সরল পাঠটি হলো, ইজ্জত ও শক্তি নিয়ে বাঁচতে হলে দেশের ভূগোল বাড়াতে হয়। রাশিয়ার অর্থনীতি দক্ষিণ কোরিয়ার চেয়ে দুর্বল। কিন্তু রাশিয়া বাঁচে বিশ্বশক্তির সন্মান নিয়ে। কারণ রাশিয়ার রয়েছে বিশাল ভূগোল। বিশ্বজনীন সভ্যতার নির্মাণে বৃহৎ ভূগোলের গুরুত্ব মহান নবীজী (সাঃ) বুঝতেন। তিনি জানতেন মুসলিম রাষ্ট্রের সীমান্ত আরব ভূমিতে সীমিত থাকলে বিশ্বশক্তি রূপে মুসলিমদের উত্থান অসম্ভব হবে। অসম্ভব হবে দ্বীনের দ্রুত প্রসার। তাই তিনি সাহবীদেরকে তৎকালীন বিশ্বশক্তি রোমান সাম্রাজ্য ও তার রাজধানি কন্সটান্টিনোপল দখলের নসিহত করে যান। নবীজী (সাঃ)’র সে স্বপ্ন পূরণ করেন উসমানিয়া খলিফা সুলতান মুহম্মদ ফাতেহ ১৪৫৩ সালে। পুরনো সে কন্সটান্টিনোপল হলো তুরস্কের ইস্তাম্বুল।

ক্ষুদ্র বাংলা মানেই ভারতের অধিনস্থ এক গোলাম বাংলা –সেটি খাজা নাযিমুদ্দিন, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ারর্দি, শেরে বাংলা ফজলুল হকের ন্যায় মুসলিম নেতারা বুঝতেন। তাই তারা ১৯৪৭’য়ে পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তানভূক্ত করেছিলেন। এবং সেটি এজন্য সম্ভব হয়েছিল যে, তাদের কেউই শেখ মুজিবের ন্যায় ভারতের এজেন্ট ছিলেন না। কান্ডজ্ঞানহীনও ছিলেন না। বরং তাদের মাঝে ছিল প্রজ্ঞা ও বাঙালী মুসলিমদের কল্যাণ চিন্তা। কিন্তু ১৯৭১’য়ে যারা ভারতের কোলে যে সব ইসলামচ্যুৎ কাপালিকগণ আশ্রয় নিয়েছিল তাদের মাঝে সে হুশ ছিল না। তাই তারা ভারতকে বন্ধু মনে করে এবং ভারতীয় বাহিনীকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ডেকে আনে। এভাবে ভারতীয় সেনাদের জন্য সুযোগ করে দেয় ব্যাপক লুটতরাজের। পাকিস্তানের সর্ববৃহৎ জনগোষ্ঠি রূপে স্বাধীন থাকাটি তাদের কাছে ভাল লাগেনি। ভাল লাগেনি অখন্ড পাকিস্তানের শরীক রূপে বিশ্বরাজনীতিতে ভূমিকা রাখার কাজটিও। বরং ভাল লেগেছে ভারতের গোলামী। বাংলাদেশের বুকে আজ যেরূপ গুম, খুন, ধর্ষণ, সন্ত্রাস ও ফ্যাসিবাদের তান্ডব তা তো এসব ভারতসেবী কাপালিকদেরই সৃষ্টি।

৩.

৫৭টি মুসলিম দেশের প্রতিটি ঘর যদি প্রাসাদ হয়, মাথাপিছু আয় যদি  ১০ বৃদ্ধিও পায় এবং  নির্মিত হয় হাজার হাজার রাস্তাঘাট ও ব্রিজ -তবুও মুসলিমগণ যে ভারতীয় হিন্দুদের থেকে দুর্বলই থাকবে তা নিয়ে কি কোন সন্দেহ আছে? কারণ হিন্দুগণ ৫৭ টুকরায় বিভক্ত নয়। বিভক্তির কারণে যেরূপ শক্তিহানী ও ইজ্জতহানী হয় -তা সম্পদ, রাস্তাঘাট বা কলকারখানা গড়ে পূরণ করা যায় না।বাংলাদেশের ন্যায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মুসলিম দেশগুলির মূল দুর্বলতা তাই ভূগোলে।

৪.

ঈমানদারের কাছে গুরুত্ব পায় সত্যিকার মুসলিম পরিচয় নিয়ে বেড়ে উঠা। মুসলিম জীবনে এটিই মূল এজেন্ডা। এ এজেন্ডা পূরণে ব্যক্তির অর্জন কতটুকু মহান আল্লাহতায়ালার কাছে সেটিরই হিসাব দিতে হবে। ভাষা, ভৌগলিক ও গোত্রীয় পরিচয় সেদিন মূল্যহীন হবে। অথচ আজ মুসলিমদের সম্পদ, মেধা ও শ্রম ব্যয় হচ্ছে নিজেদের ভাষা, ভূগোল ও গোত্র ভিত্তিক পরিচয় বাড়াতে। এ লক্ষে তারা যুদ্ধ করছে এবং প্রাণও দিচ্ছে। একাত্তরে বাঙালী মুসলিমগণ ভাষাভিত্তিক সে পরিচয় বাড়াতে ভারতীয় কাফেরদের সাথে নিয়ে প্রকান্ড রক্তক্ষয়ী এক যুদ্ধ লড়েছে। এটি ছিল মহান আল্লাহর দেয়া জানমালের এক খেয়ানত। এমন খেয়ানতে কি মহান আল্লাহতায়ালা খুশি হতে পারেন? একাজে  খুশি হয় তো শয়তান ও তার কাফের অনুসারিরা।

৫.

জিহাদ হলো সমাজকে পাপ মুক্ত ও দুর্বৃত্ত মুক্ত করার পবিত্র লড়াই। উচ্চতর ও সভ্যতর সমাজ নির্মাণের এছাড়া বিকল্প পথ নাই। কোটি কোটি মানুষের নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাতে সমাজ পাপমুক্ত হয়না। মসজিদ-মাদ্রাসায় দেশ ভরে ফেললেও সেটি হয় না। সে লক্ষ্যে জিহাদ চাই। তাই যে সমাজে জিহাদ নাই সে সমাজে প্রতিষ্ঠা পায় গুম,খুন,ধর্ষণ, স্বৈরাচার ও বিচারহীন হত্যার শাসন। বাংলাদেশ তারই উদাহরণ। এজন্যই জিহাদ হলো সেরা ইবাদত। এ ইবাদত প্রাণ গেলে বিনা হিসাবে জুটে জান্নাত।

৬.

যারা শরিয়ত প্রতিষ্ঠার বিরোধী এবং নিষিদ্ধ করে শরিয়তের দাবী নিয়ে আন্দোলনে নামা -তাদেরকে মুসলিম বা ঈমানদার বললে অবাধ্যতা হয় মহান আল্লাহর হুকুমের। তাদেরকে  সম্মান দেখানো ও তাদেরকে শাসক রূপে প্রতিষ্ঠা দেয়ার কাজটি বেঈমানের। শরিয়তের বিরুদ্ধে যাদের অবস্থান মহান আল্লাহতায়ালা তাদেরকে পবিত্র কোর’আনের সুরা মায়েদায়  কাফের, জালেম ও ফাসেক বলেছেন। আর মহান আল্লাহতায়ালা যাদেরকে কাফের, জালেম ও ফাসেক বলেন তাদেরকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, নেতা, জাতির পিতা বা বঙ্গবন্ধু বললে কি ঈমান থাকে? এটি তো বেঈমানদের পথ। মসজিদ-মাদ্রাসা গড়ে বা নামায-রোযা করে কি সে বিশাল বেঈমানী ঢাকা যায়? অথচ বাঙালী মুসলিমদের দ্বারা সে বেঈমানীর কাজটিই অতি ব্যপক ভাবে হচ্ছে।

 

৭.

বাংলাদেশের জনগণের  মূল দুশমন হলো দেশটির দুর্বৃত্ত শাসক চক্র। এরা শয়তানের এজেন্ট। এদের কাজ গুম, খুন, স্বৈরাচার ও ধর্ষণের রাজত্ব কায়েম করা। এবং জনগণকে শয়তানের নির্দেশিত পথে তথা জাহান্নামের পথে নেয়া। তাই এমন একটি দেশে সবচেয়ে বড় নেক কর্মটি হিংস্র পশু তাড়ানো বা পোকা-মাকড় মারা নয়, বরং এ দুর্বৃত্ত শাসকদের তাড়ানো। হিংস্র পশু বা পোকা-মাকড় কোন ব্যক্তিকে জাহান্নামের আগুনে নেয় না, কিন্তু এ দুর্বৃত্ত শাসকেরা নেয়। তারা কঠিন করে সিরাতুল মুস্তাকীমে চলা।

 

৮.

বাংলাদেশের অবস্থা আজ এতটাই খারাপ যে, চোর, ডাকাত, খুনি, ধর্ষক ও নৃশংস স্বৈরাচারিদের কাছে বিচার ভিক্ষা করতে হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, সভ্য সমাজে যেসব অপরাধীদের স্থান হওয়া উচিত ছিল কারাগারে বা প্রাপ্য ছিল প্রাণদন্ড -তাদের থেকে কি  বিচার আশা করা যায়? চোর, ডাকাত, খুনি ও স্বৈরাচারিদেপর কাজ তো দুর্বৃত্তদের আদালতের শাস্তি থেকে বাঁচানো। এবং ফাঁসিতে ঝুলায় তাদের যারা তাদের বিরুদ্ধে খাড়া হয়। একারণেই বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে ভয়ানক অপরাধীদের অভয় অরণ্যে।

৯.

সভ্য মানুষদের ভাষা, বর্ণ ও অঞ্চল ভিন্ন হলেও তারা একত্রে শান্তিতে বসবাস করে। এটি মানব জীবনের শ্রেষ্ঠ গুণ।ঈমানদারকে তাই শুধু নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাতে সিদ্ধ হলে চলে না, তাকে অন্যদের সাথে শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থানের গুণটিও অর্জন করতে হয়। এরূপ ভাতৃসুলভ গুণ অর্জন করাটি ইসলামে  ফরজ। নইলে সমাজ অশান্ত ও সংঘাতময় হয়। মহান আল্লাহতায়ালার কাছে সেটি অপছন্দের। তাই ঈমানদার মাত্রই কসমোপলিটান এবং একে অপরের ভাই।

মানুষের মাঝে নানা ভাষা ও বর্ণের যে  পরিচয় সেটি বিভক্তি গড়ার জন্য নয়। তেমন একটি কসমোপলিটান ভাতৃত্ব ও সহ-অবস্থান দেখা গেছে মুসলিমদের গৌরব কালে। তাই তুর্কি, কুর্দি, আরব, মুর, ইরানীদের মাঝে নিজ নিজ ভাষার পরিচয়ে পৃথক পৃথক রাষ্ট্র গড়ার প্রয়োজন পড়েনি। তারা একত্রে শান্তিতে অবস্থান করেছে। এবং এক বিশ্বশক্তির জন্ম দিয়েছে। তাতে নিরাপত্তা পেয়েছে মুসলিমদের জানমাল। ১৯৪৭-পূর্ব ভারতে তেমন একটি প্যান-ইসলামিক চেতনা প্রবল কাজ করেছিল মুসলিমদের মাঝে। ফলে ইংরেজ ও হিন্দুদের বাধা সত্ত্বেও তারা প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের। কিন্তু শয়তানী কাফের শক্তির সেটি ভাল লাগেনি। ফলে তাদের হাতে ১৯৪৭ থেকেই শুরু হয় পাকিস্তান বিনাশের কাজ।  ১৯৭১’য়ে সে শয়তানি প্রকল্পে যোগ দেয় শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বাঙালী কাপালিকগণও। বাংলাদেশের বুকে আজ যে দুর্বৃত্ত শাসন ও ভারতের প্রতি গোলামী তা তো তাদের কারণেই। ১২/১০/২০২০ 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *