বিবিধ ভাবনা-১

image_pdfimage_print

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১.

মানব জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জান্নাতের পথে চলার যোগ্যতা। সেটি ভাত-মাছে হয়না, তেমনি ডিগ্রি বা অর্থ লাভেও হয় না।সে জন্য চাই কোরআন বুঝা ও তা থেকে শিক্ষা নেয়ার সামর্থ্য। তাই ইসলামে এ কাজ ফরজ। এ জন্যই মহান আল্লাহতায়ালা প্রথমে নামায-রোযা, হজ-যাকাত ফরজ করেননি। ফরজ করেছন জ্ঞানার্জনকে। এবং নাযিল করেছন কোর’আন। কোর’আনী জ্ঞানার্জনের ফরজ আদায় না হলে মুসলিম হওয়াই অসম্ভব হয়। এবং নামায-রোযাও প্রাণহীন হয়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা বলেছেন, একমাত্র জ্ঞানবানগণই আমাকে ভয় করে। আল্লাহভীরু মুসলিম হওয়ার জন্য তাই জ্ঞানবান হওয়াটি জরুরী। ভিত ছাড়া যেমন দালান গড়া যায় না, তেমনি কোর’আনী জ্ঞান ছাড়া মুসলিমও যায় না।

২.

চুরি-ডাকাতি করা গুরুতর অপরাধ।এবং গুরুতর অপরাধ হলো চোর-ডাকাতদের শাস্তি না দিয়ে সন্মান করা ও নেতার আসনে বসানো।অথচ বাংলাদেশে সে অপরাধই বেশী বেশী হচ্ছে।এ অপরাধ আযাব ডেকে আনে। তখন প্রতিষ্ঠা পায় চোর-ডাকাত, ভোটডাকাত, ধর্ষক ও খুনিদের শাসন। বাংলাদেশ হলো তারই নমুনা।

মহান আল্লাহতায়ালা সুরা আল-ইমরানের ১১০ নম্বর আয়াতে মুসলিমদের শ্রেষ্ঠ জাতি বলেছেন। সেটি এজন্য় নয় যে্, তারা বেশী বেশী নামায-রোযা করে। বরং এজন্য যে তারা অন্যায় কর্মের নির্মূল করে এবং ন্যায় কর্মের প্রতিষ্ঠা দেয়। এভাবে সভ্যতর এক সমাজ নির্মাণ করে। যখন কোন দেশ গুম, খুন, ধর্ষন ও দুর্নীতিতেঁ রেকর্ড গড়ে তখন কি বুঝতে বাঁকি থাকে, মুসলিম রূপে দেশবাসীর বেড়ে উঠার ক্ষেত্রে ব্যর্থতাটি কত বিশাল?

৩.

মানব জীবনে  সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা হলো মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে মাগফিরাত লাভ এবং জান্নাত লাভের জন্য নিজেকে যোগ্যতর রূপে গড়ে তোলা। এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে জুটে জাহান্নাম। এ ক্ষেত্রে তারাই ব্যর্থ হয় যাদের সমগ্র সামর্থ্য ব্যয় হয় দুনিয়াবী স্বার্থ হাছিলে এবং দায়িত্বহীন হয় নিজেদেরকে মানবিক গুণে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে।

৪.

আল্লাহতায়ালার প্রতিটি হুকুম মেনে চলার মধ্যেই ঈমানের পরিচয়। অবাধ্যতা কাফের বানায়। আল্লাহতায়ালা চান মুসলিম নিরপেক্ষ হবে না বরং পক্ষ নিবে ইসলামের। এবং পরম নিষ্ঠার পরিচয় দিবে ইসলামী বিধানকে বিজয়ী করতে। এবং ভাষা, বর্ণ ও অঞ্চলের নামে বিভক্ত না হয়ে ঐক্যবদ্ধ এক বিশ্বশক্তির জন্ম দিবে। যেমনটি মুসলিমদের গৌরবকালে দেখা গেছে। তাই মুসলিম কখনোই ইসলামে অঙ্গিকারশুণ্য সেক্যুলার হয় না; জাতীয়তাবাদীও হয় না। ভাঙ্গে না কোন মুসলিম দেশকে। এগুলো হলো এমন হারাম কাজ যা শুধু এ পার্থিব জীবনেই আযাব আনে না, পরকালেও জাহান্নামে নেয়।

অথচ মুসলিমগণ সে কদর্য হারাম কাজকেই নিজেদের রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে পরিণত করেছে। এরূপ পাপ নিয়ে তাদের সামান্যতম অনুশোচনাও নাই। বরং কাফেরদের সাথে নিয়ে মুসলিম দেশ ভাঙ্গা তথা শক্তিহানীর দিনকে তারা উৎসবের দিনে পরিণত করেছে। কাফেরদের বিজয়কে তারা নিজেদের বিজয়ে পরিণত করেছে।

যেমন উৎসব হয় ১৬ই ডিসেম্বরে বাংলাদেশে। ফলে আযাব তাদের ঘিরে ধরেছে। এ পাপের কারণে বাংলাদেশীদের ঘাড়ে চেপে বসেছে ভারতের গোলামী। এ গোলামী থেকে মুক্তি পাওয়ার সামর্থ্য কি বাংলাদেশীদের আছে? ভারতের ন্যায় উগ্র আগ্রাসী ও শক্তিশালী প্রতিবেশীর সামনে স্বাধীন ভাবে বাঁচার খরচ তো বিশাল। সে সামর্থ্য বাংলাদেশীদের কতটুকু? এজন্যই ইসলামে একতা গড়া ফরজ। এবং হারাম হলো বিভক্তি গড়া। রাষ্ট্র ক্ষুদ্র হলে স্বাধীন থাকার সামর্থ্য বিলুপ্ত হয়। এমন একটি চেতনা শেরে বাংলা ফজলুল হক, খাজা নাজিমুদ্দিন, সহরোওয়ার্দি ন্যায় ১৯৪৭-পূর্ব বাঙালী মুসলিম নেতাদের মাঝে কাজ করেছিল বলেই তারা পশ্চিম পাকিস্তানীদের সাথে মিলে অখন্ড পাকিস্তান কায়েম করেছিল। কিন্তু সে বোধ মুজিবের ন্যায় বিদেশী শক্তির গোলামের থাকার কথা নয়। এসব গোলামেরা শুধু নিজেদের স্বৈরাচারি শাসন ও পরাধীনতাই বাড়াতে পারে, স্বাধীনতা নয়।

নানা ভাষা, নানা বর্ণ ও নানা অঞ্চলের মুসলিমগণ একতাবদ্ধ হলে খুশি হন মহান আল্লাহতায়ালা,আর তাতে দংশন শুরু হয় ইসলামের শত্রু পক্ষের মনে। একতাবদ্ধ হওয়ার এ গুণ এক বিশাল গুণ। বেঈমানদের তা থাকে না। তাই ইসলামের শত্রু পক্ষের তরফ থেকে পাকিস্তান ভাঙ্গার ষড়যন্ত্রের শুরু ১৯৭০’য়ে নয়, বরং শুরু হয়েছিল ১৯৪৭ সালে দেশটির প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকেই। মুজিব সে কথাটাই বলেছিল ১৯৭২ সালে পাকিস্তানের জেল থেকে ফিরে ১০ই জানুয়ারির সহরোওয়ার্দি ময়দানের জনসভায়।

৫.

আল্লাহতায়ালার হুকুম: তোমরা কাউকে আমার প্রতিদ্বন্দ্বী রূপে খাড়া করোনা।অথচ সে হারাম কাজটিই হচ্ছে শরয়তি আইনের বদলে আদালতে কাফেরদের আইন প্রতিষ্ঠা দিয়ে। এরূপ অবাধ্যতা তো শয়তানের। যে আদালতে শরিয়তী আইনের প্রতিষ্ঠা দেওয়ার কথা সেখানে নিজেদের বা কাফেরদের রচিত আইনের প্রতিষ্ঠা দিলে কি আল্লাহতায়ালার দাসত্ব হয়? এটি তো অমার্জনীয় শিরক। এমন শিরক যে মুশরিক বানায় এবং জাহান্নামে ন্যায় সে হুশ ক’জনের। অথচ সে হুশ থাকার কারণেই ঔপোনিবেশিক কাফেরদের হাতে অধিকৃত হওয়ার পূর্বে প্রতিটি  মুসলিম দেশের আদালতে শরিয়তী আইনে বিচার হতো।

 

৬.

বাংলাদেশে এমন একটি পক্ষ আছে যারা ইসলামের বিজয় ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠা চায় না। শয়তানও সেটিই চায়। রাজনীতির ময়দানে এরাই শয়তানের পক্ষ। বাংলাদেশে এরাই বিজয়ী পক্ষ।এদের কাজে খুশি হয় কাফেরগণ। ইসলামের বিজয় রুখতে কাফেরগণ তাদেরকে ব্যবহার করে। এবং তাদেরকে  ক্ষমতায় রাখতে সর্বতো ভাবে সহায়তাও দেয়। তাই ভারত যেমন অতীতে শেখ মুজিবকে ভৃত্যের ন্যায় ব্যবহার করেছে, এখন করছে হাসিনাকে।

৭.

ঈমানদারকে যে ভাবনাটি সব সময় পেরেশান রাখে তা হলো, কি করে নিজেকে জান্নাতের উপযোগী রূপে গড়ে তোলা যায় সেটি। জীবনের প্রকৃত সফলতা তো সে যোগ্যতা অর্জনে। এমন একটি চেতনার জন্য যেসব কথা ও কাজে মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের অবাধ্যতা হয় তা থেকে ঈমানদারগণ সযত্নে বাঁচে। কিন্তু  সে হুঁশ বেঈমানের থাকে না।

৮.

বাংলাদেশীদের অতিশয় গর্ব স্বাধীনতা নিয়ে। তাদের গর্ব একাত্তরে তারা স্বাধীনতা এনেছে।এ গর্ব শুধু আওয়ামী লীগের একার নয়, বরং দেশের সকল রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের। খাঁচাবন্ধি পাখির ন্যায় তারা  স্বাধীনতার অর্থ বুঝতেও রাজী নয়। কেউ বুঝালে তার বিরুদ্ধে গালিগালাজ শুরু করে।নামায়-রোযা করলে কি হবে, একটি মুসলিম দেশ ভাঙ্গা যে হারাম সে সামান্যতম হুঁশই বা ক’জন বাংলাদেশীর? এমন আত্মঘাতী কাজে খুশি হয় শয়তান ও কাফেরগণ।   ভারত তাই ১৯৭১’য়ের সে অর্জন নিয়ে উৎসব করে।

একাত্তরে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছন্নতা ঘটলেও বাঙালীর স্বাধীনতা আসেনি। ইতিহাসের বইয়ে একটি বিকট মিথ্যা ঢুকানো হয়েছে যে, মুক্তি বাহিনী স্বাধীনতা এনেছে। এ নিরেট মিথ্যাটি বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীগণই গর্ভভরে বলে। অথচ ৯ মাসের যুদ্ধে মুক্তিবাহিনী কোন জেলা বা মহকুমা স্বাধীন করেছিল তার কোন প্রমান আছে কি? ১৯৭১য়ে যুদ্ধটি ছিল ভারত ও পাকিস্তানের যুদ্ধ। সে কথাটি ভারতীয় ইতিহাসের বইয়েই শুধু পড়ানো হয়না, বাংলাদেশ ছাড়া বিশ্বের তাবত দেশেই পড়ানো হয়। সে যুদ্ধে ভারত জিতেছে এবং হেরেছে পাকিস্তান। বিজয়ী ভারত তার পদসেবীদের হাতে বাংলাদেশকে তুলে দিয়ে লাগাতর নিজের এজেন্ডা পালন করছে। এব্ং যেসব ভারতসেবীগণ আজ ক্ষমতাসীন তারা সে পদসেবা দিয়েই ক্ষমতায় থাকতে চায়। একাত্তরের অর্জনটা তাই নিতান্তই ভারতের। এটি যেমন দিল্লির শাসক চক্রের গোলামী প্রতিষ্ঠা,তেমনি বাংলার ভূমিতে ইসলামকে পরাজিত রাখা এবং উপমহাদেশের মুসলিমদের শক্তিহীন রাখার।

৯.

ভারত শুধু পদ্মা, তিস্তার পানির উপর ডাকাতি করেনি, ডাকাতি করেছে বাঙালী মুসলিমদের স্বাধীনতা, ভোটাধিকার ও ইজ্জত নিয়ে বাঁচার অধিকারের উপরও। বিধ্বস্ত করেছে বাংলাদেশীদের চেতনার ভূমিও। চেতনা বিলুপ্ত হওয়াতে বিলুপ্ত হয়েছে স্বাধীন থাকার আগ্রহ ও মর্যদাবোধও। চেতনার সে বিলুপ্ত ভূমিতে ভারত চাপিয়ে দিয়েছে নিজের আজ্ঞাবহ এক নওকররাজ। বাংলাদেশীদের বিবেক ও আত্মসন্মান এতটাই বিলুপ্ত হয়েছে, যে ভারতীয় নওকরদের তারা জাতির পিতা, মহামান্য নেত্রী, প্রধানমন্ত্রী বলে মাথায় তুলেছে।

দেশের বুকে ১৮ কোটি গরু-ছাগলের বাস হলে তারাও মানবরূপী এ দুর্বৃত্ত পশুদের তাড়াতে  ধাওয়া করতো। জোরে শোরে দুর্বৃত্তদের গায়ে গুতাও মারতো। কিন্তু বাংলাদেশীদের সে সামর্থ্য কৈ? এ হলো বাঙালীর মানুষ রূপে বেড়ে উঠার ক্ষেত্রে  চরম ব্যর্থতা। এ ব্যর্থতার কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের দরবারে ৫ বার সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ রূপ চিহ্নিত হয়েছে। বাঙালীর এ ব্যর্থতা নিয়ে এমন কি কবি রবিন্দ্রনাথও প্রচন্ড আফসোস করেছেন। রবীন্দ্রনাথ বিধাতার কাছে ফরিয়াদ তুলেছেন,”৭ কোটি প্রাণীকে রেখেছো বাঙালী করে, মানুষ করোনি।” তবে রবীন্দ্রনাথের অজ্ঞতা হলো, এ ব্যর্থতা যে বিধাতার নয় বরং নিতান্তই বাঙালীর নিজস্ব অর্জন -তা পৌত্তলিক রবীন্দ্রনাথের চোখে ধরা পড়েনি। অথচ মানব জীবেনর সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি হয় -কে কতটা মানবতা নিয়ে বেড়ে উঠলো তা থেকে। এ পরীক্ষায় সাফল্যের ভিত্তিতেই পরকালে জান্নাত জুটবে। ফলে এ ব্যর্থতার দায়ভার বিধাতার উপর চাপানোটি আরেক অপরাধ।

১০.

ঈমানদার এবং বেঈমানের মাঝে পার্থক্যগুলি বিশাল। তবে সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো ঈমানদার বাঁচে প্রতিটি কথা, কাজ ও আচরনে থাকে মহান আল্লাহকে খুশি করার লাগাতর চেতনা নিয়ে।এটিই মানব জীবনে সবচেয়ে বড় গুণ যা মানুষকে জান্নাতের উপযোগী করে। পরকালে সে সামর্থ্যেরই বিচার হবে। বেঈমানের সে হুঁশ থাকে না। তার ব্যস্ততা স্রেফ জৈবিক তাড়না পুরণে। সে তাড়নায় তারা যেমন মিথ্যা বলে, তেমনি চুরি-ডাকাতি,ভোটডাকাতি, গুম-খুন, সন্ত্রাস ও ধর্ষণেও নামে।

মহান আল্লাহতায়ালা কখনোই তার নিয়ামত ভরা জান্নাতে অবাধ্য ও দুর্বৃত্তদের স্থান দিবেন না। প্রতি অফিস-আদালতে কে কত নিষ্ঠার সাথে অর্পিত দায়ভার পালন করে তার ভিত্তিতে প্রমোশন মেলে।দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ বা অবহেলা হলে চাকুরি যায় বা শাস্তি মেলে। সে বিধান মহান আল্লাহতায়ালারও। মানবকে মহান আল্লাহতায়ালা সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি ও তাঁর নিজের খলিফা তথা প্রতিনিধি রূপে সৃষ্টি করেছেন। সে দায়ভার পালনে অধিকাংশ সাহাবা শহীদ হয়েছেন।এজন্যই তারা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব। কিন্তু বাঙালী মুসলিমগণ সে সব মহান সাহাবী থেকে শিক্ষা নিয়েছে কতটুকু? বরং তারা ইতিহাস গড়েছে অবাধ্যতায়। তাদের মাঝে বিপুল সংখ্যক মানুষ কাজ করছে শয়তানের খলিফা রূপে। তাদের সে অবাধ্যতার কারণে এ বঙ্গীয় ভূমিতে যেমন ইসলাম যেমন পরাজিত, তেমনি বিজয়ের আসনে বসে আছে শয়তানের খলিফাগণ। মহান আল্লাহতায়ালার কাছে কি এ কদর্য ব্যর্থতার হিসাব দিতে হবে না? ৬/১০/২০২০

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *