বিবিধ ভাবনা (১৮)

image_pdfimage_print

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. বাংলাদেশীদের মুখে চুনকালী

আল-জাজিরার ডকুমেন্টেরী হাসিনা ও তার সরকারকে উলঙ্গ করে ছেড়েছে। কিন্তু চোরডাকাত তো উলঙ্গ হওয়াতে শরম পায় না। শরম থাকলে তো চুরিডাকাতিতে নামতো না। তারা ভয় পায় একমাত্র সাহসী জনগণকে যখন তাদের মারতে ধাওয়া করে। কিন্তু বাংলাদেশে সে সাহসী জনগণ কই? জনগণ তো ইতিহাস গড়েছে দুর্বৃত্তদের কাছে আত্মসমর্পণে।

তবে আল-জাজিরার ডকুমেন্টারী দেখে বাংলাদেশীদের খুশি হওয়ার কিছু নাই। এটি বাংলাদেশের জনগণকেও উলঙ্গ করে ছেড়েছে। চুনকালী লাগিয়েছে সমগ্র বাংলাদেশীদের মুখে। সভ্য মানুষের মহল্লায় নেকড়ে ঢুকলে মহল্লার লোকেরা হাতের কাছে যা পায় তা দিয়ে নেকড়া মারতে ময়দানে নামে। সেটি না হলে বুঝতে হবে সে মহল্লাও আরেক জঙ্গল। তেমনি কোন দুর্বৃত্ত দেশের শাসক হলে তার বিরুদ্ধে সভ্য জনগণ লড়াইয়ে নামে। অথচ বাংলাদেশে মানুষ বিশ্ববাসীর সামনে প্রমাণ করে ছেড়েছে চোর-ডাকাত ও দুর্বৃত্তদের কি রূপে সন্মান জানাতে হয়। তারা হাসিনার ন্যায় ভোটডাকাত এক দুর্বৃত্তকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলে। বহু আলেম তাকে কওমী জননী বলে। এবং গণহত্যাকারি, বাকশালি, ভারতীয় এজেন্ট ও হাজার হাজার মানুষের খুনি শেখ মুজিবকে তারা নিজেদের পিতা (জাতির পিতা) ও বঙ্গের বন্ধু (বঙ্গবন্ধু) বলে। কোন প্রমাণিত খুনি, চোরডাকাত, বিদেশী এজেন্ট ও দুর্বৃত্ত কি পৃথিবীর আর কোন দেশে এতোটা সন্মান পায় –যা বাংলাদেশে পায়? বাঙালীর চেতনার রোগ কি এরপরও গোপন থাকে?

এই বাঙালীরাই ১৯৭১’য়ে দেখিয়েছে কিভাবে অবাঙালীদের খুন, ধর্ষণ ও তাদের ঘরবাড়ীকে দখলে নিয়ে তাদের রাস্তায় বসাতে হয়। এ বাঙালীদের নিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “হে বিধাতা সাত কোটি প্রাণীরে রেখেছো বাঙালী করে; মানুষ করোনি।” আল-জাজিরার ডকুমেন্টেরী আবার চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল বাঙালীর মানুষ রূপে বেড়ে উঠায় ব্যর্থতাটি আজও কত বিশাল। বাঙালীর ব্যর্থতার এ চিত্রটি এখন বিশ্ববাসী দেখছে। শেখ হাসিনার এ বাঙালী চেতনার প্রতিনিধিত্ব করে মাত্র। বাঙালীর নিজের চেতনায় বসে আছে স্বৈরাচারপ্রীতি, দুর্বৃত্তপ্রীতি ও বিদেশী-এজেন্টপ্রীতি। বাঙালীর জীবনে জিহাদটি তাই সেখান থেকে শুরু হওয়া উচিত।

২.
ঘরে আগুণ লাগলে ঘরের সবাই সে আগুণ থামানোর চেষ্টা করে। বাংলাদেশে এখন দুর্বৃত্তির আগুণ। বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে দুর্বৃত্ত-অধিকৃত এক জঙ্গলে। এ দুর্বৃত্তদের নির্মূলে আমাদের কার কি ভূমিকা -সে বিচার কি আমরা করি? ঈমানের মূল পরীক্ষাটি তো এখানেই হয়। নিজেদের ঘরের আগুণ তো অন্যরা থামাবে না, নিজেদেরই থামাতে হবে। দুনিয়ার মানুষ বাংলাদেশীদের দিকে তাকিয়ে আছে। তারা দেখতে চায়, বাংলাদেশীগণ আরো কতকাল দুর্বৃত্তদের না তাড়িয়ে রাজস্ব দিয়ে তারা প্রতিপালন করে।

৩. রেকর্ডটি একমাত্র বাংলাদেশের
বাংলাদেশের চোরডাকাতদের ক্ষমতাটি অন্য যে কোন দেশের চোরডাকাতদের চেয়ে অধিক। অন্য দেশের চোরডাকাতগণ অর্থ লুট করে। কিন্তু তারা গৃহস্থ্যের গৃহ খানি ডাকাতি করে নিজ মালিকানায় নেয় না। অথচ বাংলাদেশের ভোটডাকাতগণ ভোটডাকাতির মাধ্যমে পুরা দেশটিকে ডাকাতি করে নিয়েছে। দেশের মালিক তারাই। বাংলাদেশ অতীতে দুর্বৃত্তিতে ৫ বার বিশ্বে প্রথম হয়েছে। এখন যদি প্রতিযোগিতা হয় কোন দেশের ডাকাতগণ পুরা দেশ ডাকাতি করে নিতে পারে, তবে  বাংলাদেশ বিশ্বের সবগুলো দেশকে হারিয়ে তাতে প্রথম হবে। তবে শুধু সেটিই নয়, এমন ডাকাতি কর্মের রেকর্ড সমগ্র বিশ্বে যে একমাত্র তাদেরই সেটিও প্রমাণিত হবে।

৪. ঈমান দেখা যায়
ঈমান সুস্পষ্ট দেখা যায়। ঈমান দেয় অন্যায়কে ঘৃনা ও নির্মূলের সামর্থ্যে। যে ব্যক্তি দুর্বৃত্তকে নেতা বানায়, ভোট দেয় ও তার দলে যোগ দেয় -সে নামাযী ও রোযাদার হতে পারে, কিন্তু সে ঈমানদার নয়। ঈমানদার একমাত্র তারাই যাদের জীবনে দুর্বৃত্ত নির্মূলের জিহাদ থাকে।

ইসলামের শত্রু সেক্যুলারিস্টগণ জিহাদকে ফ্যানাটিসিজম বলে। অথচ মহান আল্লাহতায়ালা ঈমানদার হওয়ার জন্য জিহাদকে অপরিহার্য বলেন। তাই সুরা হুজরাতের ১৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ঈমানের দাবীতে একমাত্র তারাই সত্যবাদী যারা আল্লাহ ও রাসূলের উপর বিশ্বাসের সাথে নিজের সম্পদ ও জান দিয়ে জিহাদ করে। এর অর্থ দাড়ায় যার জীবনে জিহাদ নাই সে মানুষের কাছে আলেম, আল্লামা, পীর বা মুফতি রূপে পরিচিত হতে পারে, সে নামাযী বা রোযাদারও হতে পারে, কিন্তু মহান আল্লাহর দরবারে সে প্রকৃত ঈমানদার নয়। বাংলাদেশীদের মূল সমস্যাটি এখানেই। এমন জনগণের শাসক চোর-ডাকাত ও ভোটডাকাতের ন্যায় আরেক দুর্বৃত্ত বেঈমান হবে –সেটিই কি অতি স্বাভাবিক নয়?

৫. রাষ্ট্রের শক্তি

 রাষ্ট্রই পৃথিবী পৃষ্টে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। কি কুকর্ম, কি সুকর্মে রাষ্ট্রের ক্ষমতার তূলনা হয়না। দুর্বৃত্তদের দখলে গেলে রাষ্ট্রকে তারা সভ্য ভাবে বসবাসের অযোগ্য করে তোলে। তখন বিলুপ্ত হয় আইনের শাসন। আসে গুম, খুন, সন্ত্রাসের প্লাবন। বাংলাদেশে সেটি যেমন মুজিবের আমলে হয়েছিল, এখন হয়েছে হাসিনার আমলে।

রাজনীতি হলো রাষ্ট্রকে জনগণকে জাহান্নামের আগুণ থেকে বাঁচানো এবং জান্নাতে নেয়ার বাহন রূপে গড়ে তোলার জিহাদ। একাজ স্রেফ মসজিদ-মাদ্রাসা গড়ে সম্ভব নয়। তাই রাজনীতি হলো শ্রেষ্ঠ ইবাদত। এ জিহাদ না থাকলে রাষ্ট্র শয়তানের দখল যায়। তারই উদাহরণ হলো বাংলাদেশ।

নবীজী (সা:)’র মহান সূন্নত হলো তিনি রাজনীতিকে দুর্বৃত্ত নির্মূলের হাতিয়ারে পরিণত করেছিলেন। তিনি নিজে শাসকের পদে বসেছেন। এটিই হলো নবীজী (সা:)’র শ্রেষ্ঠ সূন্নত। প্রাথমিক যুগের মুসলিমগণ সে সূন্নত ধরে রেখে ছিলেন। সে কারণে তারা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার নির্মাণ করতে পেরেছিলেন। অথচ বাংলাদেশের আলেমগণ রাজনীতি থেকে দূরে থাকাকে সওয়াবের কাজ ও ধর্মভীরুতা মনে করে। এমন কি তাদের অনেকে ভোটডাকাত হাসিনাকে কওমী জননী বলে। দুর্বৃত্তদের নির্মূলের বদলে তাদের সাথে সম্পৃতি হলো তাদের নীতি।

৬. সবচেয়ে বড় নেক আমল

সবচেয়ে বড় নেক আমল হলো জনগণের জাহান্নামের আগুণ থেকে বাঁচানো। রাষ্ট্র ইসলামী হলে সেটিই সে রাষ্ট্রের রাজনীতি, সংস্কৃতি ও প্রশাসনিক পলিসিতে পরিণত হয়। অপর দিকে সবচেয়ে বড় গুনাহ হলো জনগণকে জাহান্নামে নেয়া। অনৈসলামিক রাষ্ট্রের সেটিই রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। বাংলাদেশে ন্যায় দুর্বৃত্ত-অধিকৃত রাষ্ট্র শয়তানের সে এজেন্ডাটি বাস্তবায়ন করে শিক্ষা, সংস্কৃতি, প্রশাসন, আইন-আদালতসহ সমগ্র রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোকে হাতিয়ার রূপে ব্যবহার করে।

৭.
কর্মের ছওয়াব নিয়েত অনুসারে। যারা না বুঝে কোর’আন পড়ে তাদের নিয়েতটা কি? সেটি কি স্রেফ না বুঝে তেলাওয়াত? অথচ মহান আল্লাহতায়ালা কোর’আনের জ্ঞান অর্জন ফরজ করেছেন, না বুঝে তেলাওয়াত নয়।

৮. ২টি মূল কাজ

মুসলিম জীবনে ২টি মূল কাজ:১).যত দিন দেহে প্রাণ আছে ততদিন শিখবে এবং অন্যকে শেখাবে। ২).অন্যায়ের নির্মূল ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায় নিজের সকল সামর্থের বিনিয়োগ করবে।এ দুটি কাজ শ্রেষ্ঠ ইবাদত। উচ্চতর সমাজ ও সভ্যতার নির্মাণে এ দুটিই হলো মূল হাতিয়ার। যে সমাজে এ দুটো হাতিয়ার কাজ করে না সে দেশের জনগণ অজ্ঞতায় ইতিহাস গড়ে এবং সুনামী আনে দুর্বৃত্তিতে। এরই উদাহরণ বাংলাদেশ।

৯. বেঈমানী দেখা যায়

বেঈমানী ও মুনাফিকি নামায-রোযায় ধরা পড়ে না। ধরা পড়ে রাজনীতিতে। রাজনীতিতে জীবনে লড়াইটি দৃশ্যমান হয়। দেখা যায়, তার বিনিয়োগের ক্ষেত্রটি। তখন দেখা যায়, সে আল্লাহর দ্বীন তথা শরিয়তের বিজয় চায় না, না বিজয়ী করে শয়তানের এজেন্ডাকে।

১০.
দুর্নীতিতে বাংলাদেশ আরো নীচে নেমেছে। বার্লিন ভিত্তিক ট্রান্সপ্যারেনসি ইন্টারন্যাশনালের ২০২০ সালের রিপোর্ট মতে ১৮০ টি দেশের মধ্যে সবচেয়ে দুর্নীতি কবলিত ১২টি দেশের একটি হলো বাংলাদেশ। অথচ বাংলাদেশ সরকারের তা নিয়ে কোন ক্ষোভ নাই। কারণ চুরিডাকাতি যাদের নেশা, চুরিডাকাতি তাদের কাছে দোষের মনে হয়না। ফলে অন্যরা চোরডাকাত বললেও তাতে তাদের শরম হয়না। ০২/০২/২০২১।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *