বিবিধ প্রসঙ্গ-৬

image_pdfimage_print

১. নৈতিক বিপ্লব কীরূপে?

এখন এটি ধ্রুব সত্য, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় বড় ডিগ্রি চরিত্র, কর্ম ও নীতিতে আদৌ কোন বিপ্লব আনে না। সেটি সম্ভব হলে বাংলাদেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসন ও উচ্চ আদালতের অঙ্গণে নৈতীক বিপ্লব আসতো। সে বিপ্লবের ফলে সেখানে যারা বসে আছে তারা চোর-ডাকাত ও ভোট-ডাকাত সরকারের চাকর-বাকর বা দাসী-বাঁদি না হয়ে তাদের বিদায়ের রাস্তা দেখিয়ে দিত।  কারণ, তারা তো কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় বড় ডিগ্রিধারি। দেশ তখন দূর্নীতিমুক্ত হতো। কিন্তু বাংলাদেশে ঘটেছে উল্টোটি। তাদের কারণেই দেশে নির্বাচনের নামে ভোট ডাকাতি হয়। সম্ভব হয় ব্যাংক লুট, শেয়ার মার্কেট লুট –এমন কি রাষ্ট্রীয় বিজার্ভ লুট। এ শতাব্দীর শুরুতে বাংলাদেশকে যারা বিশ্বমাঝে দূ্র্বৃত্তিতে ৫ বার প্রথম স্থানে পৌঁছিয়ে দিয়েছিল তারাও দেশের নিরক্ষর কৃষক-শ্রমিক ছিল না। তারা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ ডিগ্রিধারীরাই। যেখানে আবরার ফাহাদের মত নিরীহ ছাত্রকে নির্মম ভাবে শহীদ হতে হলো সেটিও কোন নিভৃত বন-জঙ্গল ছিল না, সেটিও ছিল তথাকথিত শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গণ।

মানব জীবনে নৈতীক বিপ্লব আনে আখেরাতের ভয়। সে ভয়ে মানুষ ফেরেশতায় পরিণত হয়। তখন তাঁকে জোর করেও ঘুষ বা সূদ খাওয়ানো যায় না। তার কাছে সেটি বিষপানের ছেয়েও ভয়ংকর মনে হয়। মানুষের মন নিজেই তখন পুলিশে পরিণত হয়। ঘরে আগুণ লাগলে পানির জন্য ছুটাছুটি শুরু হয়। আখেরাতের ভয়ে তেমনি লাগাতর ছুটাছুটি শুরু হয় বেশী বেশী নেক আমলে। তেমন এক ভয় নিয়ে বাংলাদেশের চেয়ে  প্রায় ৫০ গুণ বৃহৎ রাষ্ট্রের শাসক খলিফা হযরত উমর (রাঃ) নিজের চাকরকে উটের পিঠে বসিয়ে নিজে রশি ধরে টেনেছেন। মধ্যরাতে না ঘুমিয়ে খাদ্যের ভান্ডার কাঁধে উঠিয়ে মদিনার রাস্তায় রাস্তায় ক্ষুদার্ত মানুষ খুঁজেছেন। মহান নবীজী (সাঃ) সাহাবাদের জীবনে যে চারিত্রিক বিপ্লবটি এনেছিলেন তার মূলে রাজনৈতীক বা অর্থনৈতীক বিপ্লব ছিল না, ছিল আখেরাতের প্রচন্ড ভয়। সমগ্র মানব ইতিহাসের মাঝে এটিই ছিল সর্বশ্রেষ্ঠ বিপ্লব।

মহাজ্ঞানী মহান আল্লাহতায়ালা কাফেরদের বেঈমানীর মূল কারণটি বর্ণনা করেছেন সুরা মুদাচ্ছেরের ৫৩ নম্বর আয়াতে। বলেছেনঃ “কাল্লা বাল্লা ইয়াখাফুনাল আখেরা”; অর্থঃ  না, (এদের এরূপ অবস্থার মূল কারণ), তারা আখেরাতকে ভয় করে না। আখেরাতের ভয় সৃষ্টি হয় পবিত্র কোর’আনের জ্ঞান থেকে। কোর’আনের জ্ঞান বাড়ায় ব্যক্তির মনের দৃষ্টি। মনের সে দৃষ্টিতে ঈমানদার ব্যক্তি জাহান্নাম ও জান্নাতকে ততটাই পরিস্কার দেখতে পায় যতটা দেখতে পায় মেঘমুক্ত দিনে সূর্য্যকে। এমন ব্যক্তি তখন সে জান্নাত লাভের লক্ষ্যে নিজের জান ও মালের কোরবানীতে লেগে যায়। শুরু হয় জিহাদে সর্বসামর্থ্যের বিনিয়োগ। যার মধ্যে সে বিনিয়োগে তাড়াহুড়া নাই সে ব্যক্তি যতই নামাযী, রোযাদার বা হাজী হোক না কেন, কোর’আনের জ্ঞান যে তার মধ্যে প্রবেশ করেনি -তা নিয়ে সন্দেহ সামান্যই। এজন্যই মহান আল্লাহতায়ালা তার মিশনটি নামায-রোযা ফরজ করা দিয়ে শুরু করেননি। বরং শুরু করেছেন কোরআন শিক্ষাকে ফরজ করার মধ্য দিয়ে। ৫ ওয়াক্ত নামায ফরজ হয়েছে কোর’আন নাযিল শুরু হওয়ার ১১ বছর পর।

যে সমাজে কোর’আনী জ্ঞানের চর্চা প্রবলতর হয়, সেখান শুরু হয় অন্যায়ের নির্মূলে এবং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায়  লাগাতর জিহাদ –যেরূপ হয়েছিল সাহাবায়ে কেরামের আমলে। এজন্যই ইসলামের শত্রুপক্ষ মসজিদের দরজায় তালা লাগায় না, জায়নামাযও কেড়ে নেয় না। বরং বন্ধ করে কোর’আন বুঝার কাজকে। সে লক্ষ্যে শয়তানের বিনিয়োগটিও বিশাল। সে মিশন পূরণে শয়তান ধর্মব্যবসায়ীদের ময়দানে নামায়। তারা যু্ক্তি দেখায়, কোর’আন না বুঝে তেলাওয়াতেই প্রচুর ছওয়াব, অতএব না বুঝলেও চলে। ফলে এ ধর্মব্যবসায়ীদের আগ্রহ নাই নর-নারীর মাঝে কোর’আন বুঝার সামর্থ্য দৃষ্টিতে। তারা বরং দায়িত্ব সারে স্রেফ তেলাওয়াত শিখিয়ে। এভাবেই পরিকল্পিত ভাবে মুসলিমদের কোর’আন থেকে দূরে সরানো হয়েছে। বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলিতে ধর্মব্যবসায়ীদের সাফল্য এতটাই বিশাল যে কোর’আন বুঝা যে প্রতিটি নরনারীর উপর ফরজ -সে ধারণাটাই বিলুপ্ত হয়েছে। এরফলে কোর’আনের জ্ঞানে অধিকাংশ মুসলিম জাহেলই থেকে গেছে। ফলে গড়ে উঠেনি মুসলিমদের চরিত্র। এতে বিজয় এসেছে শয়তানের এবং পরাজয় বেড়েছে মুসলিমদের। অথচ কোর’আন বুঝার ফরজ পালন করতে গিয়ে মিশর, ইরাক, সিরিয়া, সূদান, মরক্কো, আলজিরিয়াসহ বহু দেশের জনগণ নিজেদের মাতৃভাষা দাফন করে আরবী ভাষাকে নিজেদের ভাষা বানিয়ে নিয়েছে। কারণ, তাদের কাছে গুরুত্ব পেয়েছিল ভাষা-পূজার বদলে মহান আল্লাহতায়ালা-প্রদত্ত পথনির্দেশনা বুঝার ফরজ কাজটি।        

২. হারাম রাজনীতি ও ফরজ রাজনীতি

প্রতিকর্মে মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণকে মগজে নিয়ে চলতে হয় প্রতিটি ঈমানদারকে। এটিই হলো যিকর। আল্লাহতায়ালার এ যিকর যেমন প্রতিপদে সিরাতুল মোস্তাকীম দেখায়, তেমনি পরকালে জান্নাতে পৌঁছায়। মহান আল্লাহতায়ালার সে স্মরণটি না থাকার বিপদটি ভয়ংকর। শাস্তি স্বরূপ তখন ঘাড়ের উপর সাথি রূপে জুটে শয়তান; এতে অসম্ভব হয় জান্না্তের পথে চলা। মহা ভীতিকর এ ঘোষণাটি এসেছে সুরা জুখরুফের ৩৬ নম্বর আয়াতে। বিষয়টি অন্য ভাবেও বুঝা যায়। পশুর গোশতো তখনই হালাল হয় যখন জবাইটি বিসমিল্লাহ ও আল্লাহু আকবর বলে করা হয়। নইলে সেটি হারাম। বিষয়টি তেমন রাজনীতির বেলায়ও। রাজনীতি হলো মানব জীবনের অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এখানে বিনিয়োগ হয় কোটি কোটি মানুষের ভোটই শুধু নয়, বরং শ্রম, অর্থ, মেধা ও সময়। থাকে হাজার হাজার মানুষের প্রাণের কোরবানী। রাজনীতি থেকেই নির্ধারিত হয় দেশ ও দেশবাসীর ভাগ্য। নির্ধারীত হয় দেশের বুকে কার নীতি, আদর্শ্ বা আইন বাধ্যবাধকতা এবং ইসলামের প্রতিষ্ঠা পাবে সে বিষয়টি।

রাজনীতিতেই প্রকাশ পায় ব্যক্তির অদৃশ্য ঈমান। ঈমানদার এখানে হাজির হয় ইসলামের অতি নিজস্ব রাজনৈতিক এজেন্ডা নিয়ে। কখনো বা সেটি রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধে রূপ নেয়। ক্ষেত-খামার বা কল-কারখানাতে সেটি ঘটেনা। তাই কৃষি, শিল্প বা বাণিজ্যের চেয়েও অধীকতর গুরুত্বপূর্ণ হলো রাজনীতি। ফলে অতি গুরুত্বপূর্ণ হলো রাজনীতির হালাল হওয়ার বিষয়টিও। কারণ, হালাল না হলে জান ও মালের সমগ্র বিনিয়োগে যা জুটে তা হলো জাহান্নাম। রাজনীতি তখনই হালাল হয় যখন সে রাজনীতির মূলে থাকে ইসলামের বিজয় এবং শরিয়তের প্রতিষ্ঠা। থাকে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের নির্মূলের অঙ্গিকার। এমন রাজনীতি শুধু হালালই নয়, বরং ফরজ।এমন রাজনীতিতে শুধু ভোট দিলে চলে না, মাল, মেধা ও জানের বিনিয়োগও করতে হয়। ব্যক্তির প্রতিটি সামর্থ্যই মহান আল্লাহ-প্রদত্ত আমানত। সে আমানতের বিনিয়োগটি ইসলামের বিজয় এবং মহান আল্লাহর ইচ্ছাপূরণ ভিন্ন অন্য খাতে হওয়াটি হারাম। এটিই হলো ইসলামী আক্বীদার অতি মৌলিক বিষয়। সেক্যুলার রাজনীতি ইসলামের বিজয়ের সে অঙ্গিকার থাকে না বলেই সে রাজনীতিতে জানমাল তথা সামর্থ্যের বিনিয়োগটি হারাম।     

পবিত্র কোর’আনের সুরা মুদাছছেরের ৩ নম্বর আয়াতে ঘোষিত হয়েছে মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশঃ “ওয়া রাব্বাকা ফাকাব্বির” অর্থঃ “এবং তোমার রব যে আকবর তথা সর্বশ্রেষ্ঠ সেটির ঘোষণা দাও।” তাই ঈমানদারকে শুধু আযানে ও নামাযে আল্লাহু আকবার বললে চলে না, সেটি বলতে হয় জীবনের প্রতি অঙ্গণে। এবং এ ঘোষণাটি দেয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গণ হলো রাজনীতি। এক্ষেত্রটিকে ঈমানদারগণ কখনোই অন্য ধর্ম বা অন্য মতাদর্শের অনুসারীদের জন্য ছেড়ে দিতে পারে না। সেটি গণ্য হয় পরাজয় বা আত্মসমর্পণ রূপে। মুসলিমের রাজনীতির মূলপ্রত্যয়, স্লোগান বা যিকর হলো আল্লাহু আকবার। যে রাজনীতিতে সে প্রত্যয় বা বিশ্বাস গুরুত্ব পায় না -সে রাজনীতি কখনোই হালাল হয়না।

তাই বেঈমানের রাজনীনিতে ভাষা, দেশ, নেতা বা দলের নামে জয়োধ্বনি উঠলেও মুসলিম চিরকালই রাজপথে ও রণাঙ্গণে আল্লাহু আকবার বলেই গগনবিদারী আওয়াজ তুলেছে। তাই বাংলার মুসলিমগণ অতীতে কখনোই কংগ্রেসী হিন্দুদের সাথে গলা মিলিয়ে বন্দেমাতরম বা “জয় হিন্দ” বলেনি, বরং ধ্বনি তুলেছে আল্লাহু আকবারের। সে অভিন্ন কারণে “জয় বাংলা” বলার রাজনীতিও হালাল হয় না। কারণ “জয় বাংলা”র রাজনীতিতে বাদ পড়ে মহান আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করার অঙ্গিকার। তাতে ধ্বণিত হয় দেশ বন্দনার চেতনা। গলায় আওয়াজ তোলার সামর্থ্যটি দেশের মাটি বা আলো-বাতাস দেয়না, দেয় মহান আল্লাহতায়ালা। তাই সে সামর্থ্যটি ব্যয় হবে আল্লাহু আকবর বলায়, জয় বাংলা বলাতে নয়। এভাবেই তো প্রকাশ ঘটে ঈমানের।

৩.     
চোর-ডাকাত কখনোই জনগণের বন্ধু  হয় না, তারা শত্রু। এরা শুধু জনগণের পকেটে, দোকানে বা গৃহের উপরই হানা দেয় না, হানা দেয় ভোটের বাক্সেও। এরা জানে, জনগণের শক্তি বাড়লে তাদের বিপদ বাড়ে। তাই ভোট ডাকাতি করে ক্ষমতায় গেলে এদের প্রথম কাজটি হয় জনগণকে শক্তিহীন করা। সেটি করে বাকস্বাধীনতা ও সভা-সমিতির স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে। সে সাথে শক্তিবৃদ্ধি করে নিজ দলের চোর-ডাকাতদের। একাজে হাত পড়ে সরকারি কোষাগার ও ব্যাংকের উপর। ব্যাংক থেকে এসব চোর-ডাকাতদের শত শত কোটি কোটি টাকা লোন দেয়া হয় ফেরত নেওয়ার জন্য নয়, বরং তাদেরকে ধনী করার লক্ষ্যে। সরকারের পক্ষে লাঠি ধরে বলে এটি তাদের বেতন। যেহেতু তারা জানে তাদের ক্ষমতা চিরদিনের নয়, চুরির টাকায় বিদেশে বাড়ি, গাড়ি ও সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলে। বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো এদের কারণেই আজ দেউলিয়া। এদের কাছে স্বাধীনতার অর্থ জনগণের স্বাধীনতা নয়, বরং এরূপ লুটপাটের স্বাধীনতা।

৪.
ভারতে এখন অতিশয় অসভ্য ও নৃশংসদের শাসন চলছে। সে শাসনে মহাবিপদে পড়েছে সে দেশে বসবাস করা অসহায় ২০ কোটি মুসলিম। তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছে না এমনকি প্রতিবেশী বাংলাদেশও।বাংলাদেশ বলছে, ভারতে যা কিছু হচ্ছে সেটি দেশটির নিজস্ব বা আভ্যন্তরীণ বিষয় ব্যাপার। 

অথচ কোন ঘরে যখন খুন বা ধর্ষণ হয় -তখন সেটি আর সে ঘরের নিজস্ব বা আভ্যন্তরীণ বিষয় থাকে না। সে নৃশংস অসভ্যতা রুখাটি অন্যদের উপরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হয়ে পড়ে। সভ্য প্রতিবেশীরা তখন দ্রুত ছুটে আসে। কিন্তু প্রতিবেশী নিজেই যদি গুম, খুন, হত্যা, ধর্ষণ ও সন্ত্রাসের ন্যায় নানারূপ নৃশংস অসভ্যতায় লিপ্ত হয় তখন তার কাজ হয় পাশের ঘরের অসভ্যতাকে সমর্থণ করা। ভারতে মুসলিমদের উপর চলছে গণহত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের নিষ্ঠুর রাজনীতি। কিন্তু শেখ হাসিনার মুখে তা নিয়ে সামান্যতম প্রতিবাদও না। বরং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে পিতার জন্ম শত বার্ষিকীতে দাওয়াত দিয়ে সন্মানিত করেছে। ১১/০৩/২০২০

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *