বাংলাদেশে ইসলামপন্থীদের অন্ধকার ভবিষ্যৎ

ফিরোজ মাহবুব কামাল

 

রোগটি ভীরুতা ও ভ্রষ্টতার

নবীজী (সা:) যে ভূ-রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা নিয়ে মুসলিম উম্মাহকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, আজকের মুসলিমগণ তার ধারে কাছেও নাই। তিনি ছিলেন তাঁর আদর্শে অটল ও আপোষহীন। একমাত্র মহান আল্লাহকে খুশি করা এবং তাঁর এজেন্ডাকে বিজয়ী করা ছাড়া তাঁর আরো কোন এজেন্ডা ছিল না। মহান রব’য়ের সে এজেন্ডা বিজয়ী করতে তিনি ৮৩টি যুদ্ধ সংঘটিত করেছেন, যুদ্ধে নিজে আহত হয়েছেন। মাত্র ১০ বছরে বাংলাদেশের চেয়ে ২০ গুণ বৃহৎ রাষ্ট্র গড়েছেন -যা ভেঙে আজ ৬টি রাষ্ট্র। তৎকালীন বিশ্বের সর্ববৃহৎ সর্ববৃহৎ বিশ্বশক্তির সাথে টক্কর দিয়েছেন। আজকের মুসলিমদের সংখ্যা ১৫০ কোটি হলেও সে মুরোদ নাই। কারণ, সে কাজে তাদের তেমন  আগ্রহ এবং প্রস্তুতিও নাই।

মুসলিমদের মূল সংকটটি তাদের ঈমান ও চেতনার ভূবনে। ভীরুতা ও ভ্রষ্টতা তাদের খেয়ে ফেলেছে। যে কুর’আন পথ দেখায় -সে কুব’আন বুঝায় তাদের আগ্রহ নাই। যে ইসলামী রাষ্ট্র পূর্ণ দ্বীন পালনের সহয়াক পরিবেশ দেয় এবং সর্বশ্রেষ্ঠ নেক আমলের হাতিয়ার রূপে কাজ করে -সেরূপ- একটি ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণেও কোন আগ্রহ নাই। তারা বর্তমান রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার উপর কিছু সংস্কার বা সংশোধন হলেই খুশি। বিপ্লবের ঝুঁকি নিতে তারা রাজী নয়।  সে অভিন্ন রোগ বাংলাদেশের ইসলামপন্থী দলগুলিরও। এ দলগুলি তাদের সংগঠনের শাখা-প্রশাখার বিস্তার, ক্যাডার সংখ্যার বৃদ্ধি, সংসদে কিছু আসন এবং কিছু মসজিদ মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাকে বিশাল অর্জন মনে করে। তা নিয়ে তাদের মাঝে রয়েছে প্রচণ্ড আত্মতৃপ্তিও। দখলদার ইসলামবিরোধী শক্তির নির্মূল এবং ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণের জিহাদ তাদের কাছে এতোটা গুরুত্ব পায়না। শরিয়ার প্রতিষ্ঠা এবং জিহাদ শব্দটি এখন আর তাদের কাছে কোন প্রিয় রাজনৈতিক পরিভাষা নয়।

 

১৯৭১’য়ের হারাম পথ ও হারাম পথ  

১৯৭১’য়ে ভারতীয় পৌত্তলিক শক্তি তৎকালীন বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানকে দুই টুকরো করতে ষড়যন্ত্র শুরু করে এবং এক পর্যায়ে সামরিক হামলা করে। ভারতের সেরূপ একটি এজেন্ডা ছিল ১৯৪৭’য়ে পাকিস্তানের জন্ম থেকেই; দিল্লির শাসকচক্র শুধু মোক্ষম মওকা ও পার্টনার খুঁজছিল। তা জুটে ১৯৭১সালে। এটি শুধু পাকিস্তানকে শক্তিহীন করার ষড়যন্ত্র ছিল না, বরং সেটি ছিল মুসলিম উম্মাহকে -বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিমদের শক্তিহীন করার ষড়যন্ত্র। ভারতীয় সে ষড়যন্ত্রটি রুখতে এগিয়ে আসে তৎকালীন রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগ, নূরুল আমীন ও শাহ আজিজের নেতৃত্বাধীন পিডিপি (পাকিস্তান ডিমোক্রাটিক পার্টি), কৃষক শ্রমিক পার্টি, জামায়াতে ইসলামী, নেজামী ইসলামী, খেলাফতে রাব্বানী পার্টি ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলামসহ অন্যান্য ইসলামপন্থী দলের নেতাকর্মীগণ। প্রতিরোধে তাদের কর্মীগণ রাজাকার বাহিনী এবং জেলা, থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে শান্তি কমিটি গড়ে তোলে। বাঙালি মুসলিমদের জন্য সেটি ছিল অতি বিপদকালীন সময়। পাকিস্তানের পক্ষ নেয় পূর্ব পাকিস্তানের গণ্যমান্য প্রতিটি আলেম, মুফতি, ইমাম ও পীর। একটি মুসলিম দেশ ভাঙা তাদের কাছে হারাম গণ্য হয়। বাঙালি ইসলামপন্থীদের ইতিহাসের সেটি ছিল সবচেয়ে গৌরবজনক কর্ম। ইসলামী শরিয়ার দিক দিয়ে একাত্তরে এটিই ছিল একমাত্র হালাল পথ। সে সময় ভারতীয়  হামলার মুখে নিষ্ক্রিয় থাকা বা ভারতের পক্ষ নেয়াটি ছিল শতভাগ হারাম। অথচ সে হারাম পথটি বেছে নেয় ভারতপন্থী বাঙলি সেক্যুলারিস্ট, জাতীয়তাবাদী ফ্যাসিস্ট, কম্যুনিস্ট ও হিন্দুত্ববাদীগণ। তাদের অনেকে পৌত্তলিক ভারতের আশ্রয়, অর্থ, অন্ন, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ নিয়ে ভারতীয় সৈন্যদের সাথে কাঁধে কাঁধে যুদ্ধে লিপ্ত হয় এবং ভারতকে বিজয়ী করে। বাংলার মুসলিম ইতিহাসে এটিই হলো সবচেয়ে কলঙ্কিত দিন।

ইসলামপন্থীদের ১৯৭১’য়ের ভূমিকা ইসলামের শত্রু ও ভারতপন্থীদের কাছে নিন্দনীয় ছিল এবং চিরকাল নিন্দনীয়ই থাকবে। যা কিছু ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর জন্য কল্যাণকর -তার পক্ষে দাঁড়ানোটাই শয়তান ও তার অনুসারীদের কাছে চিরদিন নিন্দনীয়। তাদের সে নীতিতে কোন দিন পরিবর্তন আসবে না। কিন্তু বিস্মিত হতে ইসলামপন্থীদের আজকের নীতি দেখে। তাদের চেতনার পচন এতোটাই গভীরে পৌঁছেছে যে, তারা নিজেরাও এখন আর তাদের ১৯৭১’য়ের সে গৌরবজনক ভূমিকাকে ধারণ করে না। বরং ধারণ করে একাত্তরের সেক্যুলার ভারতীয় বয়ানকে। এজন্যই পৌত্তলিক ভারতের পাকিস্তান ভাঙার  যুদ্ধকে তারা মহান মুক্তিযুদ্ধ বলে। এবং যারা পৌত্তলিকদের আশ্রয়ে, পানাহারে ও অর্থে প্রতিপালিত হয়ে মুসলিম দেশ ভাঙার হারাম যুদ্ধ করলো তাদেরকে তারা মহান মুক্তি যোদ্ধা বলে সম্মানিত করে। এবং প্রতি বছরে ১৬ ডিসেম্বর এলে ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিজয়কে নিজেদের মহান বিজয় বলে উৎসব করে।

পরিতাপের বিষয় হলো, জামায়াতে ইসলামীর ন্যায় ইসলামপন্থী দলগুলির কাছে রাজনৈতিক ময়দানে টিকে থাকাটাই অধিক গুরুত্ব পেয়েছে, সত্যের পক্ষে অবস্থান নেয়া নয়।। অথচ আজ যেমন আগ্রাসী ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে দাঁড়ানো পবিত্র জিহাদ, তেমনি পবিত্র জিহাদ ছিল ১৯৭১’য়ে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে দাঁড়ানো। ভারত আজ যেমন বন্ধু নয়, তেমনি বন্ধু ছিলনা ১৯৭১য়েও।  মহান আল্লাহ সব কিছুই দেখেন, তিনি দেখেন কারা একাত্তরে পৌত্তলিক কাফির শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করেছে এবং কারা সে কাফির শক্তির কোলে গিয়ে উঠেছে এবং তাদের থেকে অন্ন, অর্থ ও অস্ত্র নিয়ে মুসলিম দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। এটি বুঝে উঠা আদৌ কঠিন নয় যে, ১৯৭১’য়ে ইসলামপন্থীদের ভূমিকা ছিল শত ভাগ সঠিক। এপথটি ছাড়া তাদের সামনে ভিন্ন যে পথটি খোলা ছিল সেটি হলো পৌত্তলিক ভারতের সৈনিক হওয়া। সেটি ছিল শত ভাগ হারাম পথ।

বাংলাদেশের ইসলামপন্থীদের দায়িত্ব হলো, একাত্তরের সত্যকে জনগণের সামনে তুলে ধরা। একাত্তর তাদের জন্য আদৌ কোন নেগেটিভ বিষয় নয়, বরং দারুন পজেটিভ বিষয়। নিজ দেশের অখণ্ডতার পক্ষে এবং ভারতের ন্যায় এক আগ্রাসী ইসরাইলের বিরুদ্ধে খাড়া হওয়ার চেয়ে গৌরবজনক কর্ম এ পৃথিবীতে আর কি হতে পারে? শত শত বছর পরও তাদের একাত্তরের ভূমিকা নন্দিত হবে। ঘৃণ্যতম কাজ তো তারা করেছে যারা পৌত্তলিক ভারতের কোলে ভারতের অর্থ ও অন্নে প্রতিপালিত হয়েছে। এবং তাদের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ নিয়ে মুসলিম দেশ ভাঙতে যুদ্ধ করেছে। এ অপরাধের জন্য শত শত বছর পরও তারা নিন্দিত হবে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে অতি গুরুত্বপূর্ণ হলো, ইসলামপন্থীরা যদি তাদের ১৯৭১’য়ের গৌরবজনক ভূমিকাকে জনগণের সামনে পেশ করতে না পারে, তবে তাদের বিপদ কাটছে না।  বাংলাদেশের উগ্র সেক্যুলারিস্ট, জাতীয়তাবাদী ফ্যাসিস্ট, কম্যুনিস্ট ও হিন্দুত্ববাদীগণ বছরের পর বছর তাদেরকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার শত্রু বলে চরিত্রহনন করতেই থাকে। এটিকে তারা নিজেদের রাজনৈতিক পুঁজি মনে করে।  নতুন প্রজন্মের সামনে তারা যদি এভাবে ইসলামপন্থীদের -বিশেষ করে জামায়াতের নেতাকর্মীদের স্বাধীনতার শত্রু রূপে চিত্রিত হতে থাকে, তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাদের কি কোন ভবিষ্যৎ আছে? এ বিষাক্ত ধারা চলতে থাকলে বিভ্রান্ত নতুন প্রজন্ম তাদের বিরুদ্ধে মিছিল করবে এবং মিছিলে ফাঁসি চাইবে -যেমনটি চেয়েছিল ২০১৩ সালে শাহবাগ চত্বরে। ইসলামের শত্রুপক্ষ তো সেটিই চায়। রাজনীতিতে দল ও দলীয় নেতাদের ভাবমূর্তি অতি গুরুত্বপূর্ণ। সে ভাবমূর্তির উপর লাগাতর হামলা হলে কঠিন হয় রাজনীতির লড়াইয়ে বিজয়ী হওয়া।                

 

১৯৭১’য়ের সেক্যুলার বয়ান এবং ইসলামী বয়ান

জামায়াতে ইসলামীর মত সংগঠনের শত্রু তারা নিজেরাই। তারা শত্রু নিজ দলীয় আদর্শের। আজ যে আদর্শ ধারণ করে তারা ১৯৭১’য়ের ভারতীয় আগ্রাসনের যুদ্ধকে মহান যুদ্ধ বলে এবং ১৬ ডিসেম্বরের ভারতীয়  বিজয়কে নিজেদের বিজয় দিবস রূপে উৎসব করে -সেটি তাদের ১৯৭১’য়ের দলীয় বয়ান ও  নেতাকর্মীদের দর্শন নয়। কোন কালেই সেটি কোন ইসলামী দলে আদর্শ হতে পারে না। একটি দলের রাজনীতিতে বার বার যুদ্ধ আসে, অনেক সময় বিপর্যয়ও আসে। কিন্তু আদর্শবান ব্যক্তিগণ কখনোই তাদের আদর্শ বদলায়না। আদর্শ গাছের ঝরে পড়া পাতা নয় যে ঝড়ে তা উড়ে যাবে।  কিন্তু জাময়াতের নেতাকর্মীগণ ব্যর্থ হয়েছে তাদের দলীয় আদর্শে অটল থাকতে। যারা আদর্শবান, তারা তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক যুদ্ধটি লড়তে হয় চেতনার অঙ্গণে দলের শাশ্বত দর্শনকে ধারণ করে, সেটি বর্জন করে নয়। শত্রুর বয়ানের কাছে আত্মসমর্পণ করেও নয়। সে সাথে স্মৃতির পাতায় ধারণ করতে হয় শহীদ সহযোদ্ধাদের স্মৃতি। সে শাশ্বত দর্শন ও শহীদদের সে স্মৃতি যুদ্ধে পথ দেখায় এবং নিজ আদর্শে অনড় রাখে। ১৯৭১’য়ে জামায়াতসহ ইসলামপন্থী দলগুলির হাজার হাজার নেতাকর্মীদের শুধু এ অপরাধে শহীদ করা হয়েছিল যে তারা অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল। কিন্তু জামায়াতের নেতাকর্মীদের বক্তব্য শুনলে মনে হয় না সে ইসলামী দর্শন এবং সে সহযোদ্ধা শহীদদের স্মৃতিকে তারা ধারন করে না। তাদের বয়ানে তাই বার বার মহান মুক্তিযুদ্ধ ও মহান মুক্তিযোদ্ধার কথা। ভাবটা যেন ১৯৭১’য়ে ভারতপালিত এ মুক্তিযোদ্ধারা তাদের আপন জন ছিল।      

বুঝতে হবে, কোন অপরাধের বিচারে মানুষ তার নিজের রায় পেশ করে চেতনায় ধারণকৃত দর্শনের আলোকে। ইসলামপন্থীদের বিচার ধারা তাই সেক্যুলারিস্টদের বিচার থেকে ভিন্নতর হয়। বিচারকের দর্শনটি সেক্যুলার হলে ব্যাভিচারও তার কাছে প্রেম এবং জ্বিনার বাণিজ্য বৈধ ব্যবসা গণ্য হয়। ব্রিটিশ কাফিরদের প্রণীত বাংলাদেশের আইনে মুক্তিযোদ্ধা কোন অপরাধই নয়; ফলে তার কোন শাস্তিও নেই। অথচ ইসলামী বিধানে জ্বিনার শাস্তি হলো বিবাহিতদের জন্য পাথর মেরে হত্যা। তেমনি সেক্যুলারিস্টদের কাছে পাকিস্তানের মত একটি মুসলিম দেশ ভাঙা কোন অপরাধই নয়; সেটি বরং প্রশংসনীয় স্বাধীনতার লড়াই। সেক্যুলারিস্টগণ সে কাজে বাহবা দিবে এবং ভারতের ন্যায় রাষ্ট্র সে কাজে আর্থিক ও সামরিক সাহায্য দিবে এবং প্রবয়োজনে নিজ খরচে যুদ্ধও লড়ে দিবে। ১৯৭১’য়ে তো সেটিই দেখা গেছে। এবং যারা সে দেশ ভাঙার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে তাদের স্বাধীনতার শত্রু বলবে। কিন্তু শরিয়তের বিচারে মুসলিম দেশের বিরুদ্ধে এমন বিদ্রোহ ও নাশকতার শাস্তি প্রাণদণ্ড। এমন কি ভারতেও সে অপরাধের শাস্তি প্রাণদণ্ড।

যারা ইসলামের মৌলিক জ্ঞান রাখে তাদের মাঝে এ নিয়ে বিতর্ক নেই, ইসলামী দলগুলির ১৯৭১’য়ে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেয়াটি ছিল শতভাগ সঠিক। কারণ শরিয়া কখনোই কোন মুসলিম দেশ ভাঙাকে জায়েজ করে না। বরং প্রতি দেশে দেশ ভাঙার কাজটি সব সময়ই ইসলামের শত্রুপক্ষের। পাকিস্তান ভাঙার এজেন্ডা ছিল পৌত্তলিক ভারত এবং ভারত-সমর্থিত বাঙালি সেক্যুলারিস্ট, কম্যুনিস্ট ও জাতীয়তাবাদী ফ্যাসিস্টদের। শরিয়ার দৃষ্টিতে সেটি ছিল শত ভাগ হারাম। যার মধ্য শরিষার দানা পরিমাণ ঈমান আছে, সে কখনোই কোন মুসলিম দেশ ভাঙার হারাম যুদ্ধে অংশ নিতে পারে না। যারা হাক্কানী আলেম তাদের মাঝে বহু বিষয়ে মতভেদ আছে; কিন্তু শরিয়তের এ বিষয়ে কোন মতভেদ নাই। এ ধরণের কথা ১৯৭১’য়ের ইসলামপন্থী নেতা ও আলেমদের মুখে শোনা যেত। সে সময়ের পত্রিকাগুলি খুঁজলে তার প্রমাণ মিলবে। পরিতাপের বিষয় হলো, জামায়াতের নেতাকর্মীগণ ইসলামের এ সত্য কথাগুলি এখন আর মুখে আনে না। কারণ, এরূপ সত্য কথা বলার মধ্যে তারা তাদের জন্য রাজনৈতিক ক্ষতি দেখে। তারা ভাবে, সে কথাগুলি বললে সেক্যুলারিস্টগণ ক্ষেপে যাবে এবং রাজনৈতিক বিবাদ বাড়বে। অথচ এভাবে সত্য গোপন করলে একাত্তরের বিবাদ কখনোই তাতে দূর হবে না; বরং এতে মহা পাপ হবে সত্য গোপনের। তখন অপরাধী মুক্তিযোদ্ধাদেরও মহান মুক্তিযোদ্ধা বলতে হবে। তাছাড়া এটি বুদ্ধিবৃদ্ধির যুদ্ধের বিষয়। এ যুদ্ধে মোক্ষম অস্ত্রটি হলো সত্য বয়ান। সে সত্য বয়ানকে এ যুদ্ধে কাজে লাগাতে হবে।   

বুঝতে হবে, ১৯৭১’য়ে ইসলামী দলগুলির নেতাকর্মীগণ ভারত ও ভারতসেবী বাঙালিদের পাকিস্তান ভাঙার প্রকল্পের  বিরুদ্ধে খাড়া হওয়াকে ঈমানী দায়িত্ব মনে করতো। তারা চেতনায় ছিল মুসলিম উম্মাহর বিশেষ করে বাঙালি মুসলিমের কল্যাণের ভাবনা। তারা বিশ্বাস করতো পাকিস্তান ভাঙলে সংকটে পড়বে বাঙালি মুসলিমের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা -যেমনটি পড়েছে কাশ্মীরের মুসলিমদের। তারা বিশ্বাস করতো, ভারতীয় মুসলিমদের বিরুদ্ধে যে ভারত গণহত্যা চালায় এবং মুসলিমদের গৃহ ও মসজিদ ধ্বংস করে তারা কখনোই বাঙালি মুসলিমদের স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি হতে পারে না। তারা বরং চায় বাংলাদেশকে একটি আশ্রিত গোলাম রাষ্ট্র বানাতে। ইসলামপন্থীদের বিশ্বাস ছিল, অখণ্ড পাকিস্তান বাঁচলে সে দেশটি হবে চীন ও ভারতের পর বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম রাষ্ট্র এবং দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক রূপে বাঙালি মুসলিমগণ পাবে পাকিস্তান রাষ্ট্রের চালকের সিটে বসার সুযোগ; তারা বিশ্বরাজনীতিতে প্রভাব ফেলার সুযোগ। তাছাড়া পাকিস্তান কোন মামুলি রাষ্ট্র নয়, সেটি একটি পারমানবিক শক্তি। উল্লেখ্য যে, পাকিস্তানের ২৪ বছরের ইতিহাসে ৪ জন প্রধানমন্ত্রী, দুইজন রাষ্ট্রপ্রধান, তিন জন স্পীকার হয়েছিলেন বাঙালি। পাকিস্তানে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা ছিল; কিন্তু সে সমস্যাকে রাজনৈতিক ভাবে সমাধান করা যেত। দেশটিকে খণ্ডিত করার মাঝে কোন সমাধান ছিল না। পাকিস্তান ভাঙায় লাভবান হয়েছে কেবল ভারত এবং ভারতসেবী ইসলামের শত্রুপক্ষ। এবং দুর্বল হয়েছে বাঙালি মুসলিম এবং মুসলিম উম্মাহ।

 

শিক্ষণীয় আছে ভারতীয় বিজিপি এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক ( RSS) থেকে

জনগণ দেখতে চায়, আদর্শের প্রতি দল এবং দলের নেতাকর্মীদের অটল অবস্থান। আদর্শের সাথে গাদ্দারী কখনোই কোন ভাল গুণ নয়, ইসলামে এটিকে মুনাফিকি বলা হয়। এক্ষেত্রে  ভারতীয় রাজনৈতিক দল ভারতীয় জ্নতা পার্টি (বিজিপি) এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক ( RSS) থেকে শিক্ষণীয় বহু কিছু আছে।  এ দলটি তার মূল আদর্শের সাথে কখনো গাদ্দারী করেনি। তাদের দলীয় আদর্শ যতই অজনপ্রিয় হোক -তা থেকে তারা বিচ্যুত হয়নি। তারা কংগ্রেস নেতা গান্ধিকে হিন্দু স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর মনে করেছে, অতএব গান্ধির বিপুল জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও তাকে হত্যা করেছে। সে অপরাধে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক ( RSS) নিষিদ্ধ হয়েছিল। এরপরও তারা নীতি ছাড়েনি। গান্ধিকে হত্যার কারণ, ভারত বিভক্তির জন্য তারা গান্ধিকে দায়ী করে। তারা মনে করে, গান্ধি মুসলিম লীগের পাকিস্তান দাবী মেনে না নিলে ভারত কখনো বিভক্ত হতো না।

বিজিপি এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক ( RSS) য়ের প্রতিষ্ঠাতারা ব্রিটিশ শাসনকে হিন্দুদের জন্য কল্যাণকর ভেবেছে। এজন্য তারা কংগ্রেসের স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরোধীতা করেছে। কারণ, তারা মনে করতো ব্রিটিশরা যেভাবে হিন্দুদের কল্যাণ করছে, উন্নয়নের সে ধারাটি আরো কিছু কাল অব্যাহত থাকুক। তাদের যুক্তি ছিল, ব্রিটিশরা যেরূপ সমগ্র দক্ষিণ এশিয়াকে একত্রিত করে হিন্দুদের হাতে তুলে দেয়ার ব্যবস্থা করছে, সেটি হিন্দুদের একার পক্ষে করা সম্ভব নয়।  কারণ, হিন্দুরা অতীতে কোন কালেই সমগ্র ভারতকে একীভূত করতে পারিনি। প্রথম বার ভারত একীভূত করেছিল মৌর্য শাসকগণ -তারা ছিল ধর্মে জৈন ও বৌদ্ধ। দ্বিতীয়বার একীভুত করেছিল মুসলিমগণ এবং শেষবার একীভূত করে ব্রিটিশগণ। এবং ব্রিটিশরা শাসন ক্ষমতা হাতে পেয়ে হিন্দুদের তারা ভারত শাসনে পার্টনার রূপে গ্রহণ করেছিল এবং হিন্দুদের মূল প্রতিদ্বন্দি মুসলিমদের শিক্ষা দীক্ষা, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে কোমর ভেঙে দিয়েছে। এবং অগ্রগতির রাস্তা খুলে দিয়েছে হিন্দুদের। তাই হিন্দুত্ববাদীরা মুসলিমদের বহিরাগত এবং শত্রু মনে করলেও ব্রিটিশদের বন্ধু মনে করেছে। ভারত ভাগের সময়ও ব্রিটিশরা হিন্দুদের পক্ষে পক্ষপাতিত্ব করেছে।

বিজিপি এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক ( RSS) এমন কি ভারতীয় সংবিধান মানতেও রাজী নয়। কারণ তাতে ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র বানানোর কোন বিধি নাই।  তারা খুশি নয় এমন কি ভারতের জাতীয় পতাকা নিয়েও। তাদের অভিযোগ পতাকাটি গেরুয়া রংয়ের নয়। এজন্য রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক ( RSS) তার কানপুর শহরের কেন্দ্রীয় অফিসে ১৯৪৭’য়ের পর বহু কাল ভারতীয় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেনি।  কিন্তু এতে কি ভারতে তাদের রাজনৈতিক বিজয় থেমে গেছে? বরং হিন্দুদের কাছে তাদের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। জামায়াত যদি ১৯৭১’য়ের বিশুদ্ধ ইসলামী চেতনায় অটল থাকতো তবে সেটি বিশুদ্ধ ইসলামপন্থীদের কাছে প্রশংসিত হতো। এবং সেটি প্রশংসিত হতো মহান আল্লাহতায়ালার কাছেও। কারণ মহান রব কখনোই বিশুদ্ধ ইসলামী চেতনা থেকে সরে যাওয়াকে পছন্দ করেন না।  ০২/০৮/২০২৬ 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *