বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদ ও রাজতান্ত্রিক অসভ্যতার বিজয়

ফিরোজ মাহবুব কামাল

 

সভ্য রাজনীতি ও অসভ্য রাজনীতি

ইসলামে রাজনীতি হলো জুলুম, দুর্বৃত্তি, স্বৈরাচার, মিথ্যাচার, মিথ্যা মতবাদ, মিথ্যা ধর্ম ও অবিচার নির্মূলের যুদ্ধ। এজেন্ডা এখানে মহান আল্লাহ তায়ালার ভূ-রাজনৈতিক, শিক্ষা সাংস্কৃতিক ও আর্থ-সামাজিক এজেন্ডাকে বিজয়ী করার -যেমন করেছিলেন নবীজী (সা:)।  একমাত্র এটিই হলো মানব ইতিহাসের সভ্য রাজনীতি। এ রাজনীতি হলো সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ও সেগুলির সমগ্র জনবলকে পুর্ণ মুসলিম বানানোর জিহাদ। যে দেশে রাজনীতির এমন পবিত্র জিহাদ নাই, সেখানে কখনোই সভ্য রাষ্ট্র নির্মিত হয়না। একমাত্র এ জিহাদের রাজনীতিই মুমিনকে সর্বশ্রেষ্ঠ নেক আমল নিয়ে বাঁচার তাড়না দেয়। এবং রাস্তা খুলে দেয় মহান রব’য়ের এজেন্ডার সাথে একাত্ম হওয়ার ও শাহাদতের। বস্তুত এমন জিহাদের রাজনীতি  কাজ করে জনগণকে জাহান্নাম থেকে বাঁচানোর হাতিয়ার রূপে। 

অথচ রাজনীতির সে ফরজ জিহাদটি অসম্ভব হয় যদি ধর্মকর্মকে শুধু দোয়া দরুদ, নামাজ রোজা ও হজ্জ-যাকাতে সীমিত রাখা হয়। সে সীমিতকরণের কুফলটি হলো, রাষ্ট্র তখন শয়তানী শক্তির দখলে যায়। এজন্যই ইসলামের শত্রু পক্ষ ইসলাম ও ইসলামপন্থীদের রাজনীতিতে আসতে দিতে রাজী নয়। তখন  রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো এবং তার রাজনৈতিক ও শিক্ষা সাংস্কৃতিক ইঞ্জিনীয়ারিং জনগণকে জাহান্নামে নেয়ার হাতিয়ারে পরিণত হয়। রাষ্ট্রের বুকে তখন নানা রূপ অপরাধ কর্মের প্লাবন আসে।  এটিই হলো অসভ্য অনৈসলামী রাজনীতি। বুঝতে হবে প্রতিটি দুর্নীতিই হলো একটি অসভ্য কর্ম। পরিতাপের বিষয় হলো, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমের দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে বিজয় পেয়েছে এই অসভ্য সেক্যুলার রাজনীতি। এবং এ অসভ্য রাজনীতির পথ বেয়ে বাংলাদেশে দুর্নীতিতে তথা অসভ্যতায় ৫ বার বিশ্বে প্রথম হয়েছে। জার্মানীর স্কুলে যেমন হিটলারের ইহুদি নিধনের নৃশংসতার ইতিহাস পড়ানো হয়, তেমনি বাংলাদেশের স্কুলের পাঠ্য বইয়ে এ বিষয়টি অবশ্যই পড়ানো উচিত। এবং সে সাথে আরো পড়ানো উচিত কি করে বাংলাদেশীরা ৫ বার পৌছলো এ অসভ্যতার উচ্চ শিখরে? কারণ এ থেকে শিক্ষা নেয়ার বিষয় অনেক। এখান থেকে শিক্ষা না নিলে এ অসভ্যতা থেকে বাঁচার কাজটি হবে না। তখন যুগ যুগ চাঁদাবাজী, ঘুষ, প্রতারণা, চুরিডাকাতি, অর্থ পাচার, ঋণখেলাফি,খুন গুম ও সন্ত্রাসের অসভ্যতা নিয়েই বাঁচতে হবে।        

প্রখ্যাত গ্রীক দার্শনিক এরিস্টোটল মানবকে সংজ্ঞায়ীত করেছেন রাজনৈতিক পশু রূপে। তার মতে মানব জীবন থেকে রাজনীতি বাদ পড়লে সে ব্যক্তিটি আর মানুষ থাকে না, নিরেট পশুতে পরিণত হয়। পশুর জীবন যাপন পানাহার ও প্রজননে সীমিত। দুর্বৃত্তির নির্মূল, ন্যায়ের  প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্র নির্মাণ নিয়ে পশুকে ভাবতে হয় না। পশুর জীবনে তাই নেক আমলের তাড়না ও জিহাদ থাকে না। মানব সমাজেও মানব রূপী পশুদের সংখ্যাটি বিশাল। মানব রূপী পশুদের জীবনেও দুর্বৃত্তির নির্মূল, ন্যায়ের  প্রতিষ্ঠা এবং উন্নত রাষ্ট্রের নির্মাণ নিয়ে জিহাদ থাকেনা। এমন মানুষদের আচরণ পশু থেকে ভিন্নতর হয়না। মুসলিমগণ অতীতে সর্ববৃহৎ বিশ্বশক্তির জন্ম দিয়েছিল এবং সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার নির্মাণ করেছিল। সেটি এজন্য নয় যে, তারা বহু হাজার মসজিদ মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন এবং বিপুল সংখ্যক মানুষকে নামাজী ও রোজাদার বানাতে পেরেছিলেন। শুধু মসজিদ মাদ্রাসা এবং নামাজী-রোজাদারের সংখ্যাবৃদ্ধিতে সেটি সম্ভব হলে আজকের মুসলিমগণও বিশ্বশক্তিতে পরিণত হতো। কারণ, আজকের যুগে মসজিদ মাদ্রাসা এবং নামাজী-রোজাদারের সংখ্যা অতীতের গৌরব যুগে চেয়ে বহুগুণ বেশি।

জীবন থেকে রাজনীতির জিহাদ বাদ দিলে মানব সন্তানও পশুতে পরিণত হয়। চোখের সামনে খুন, ধর্ষণ ও ডাকাতি হলেও গরু যেমন নীরবে ঘাষ খায়, পশুবৎ মানব সন্তানও তেমনি নিরাপদ দূরত্বে বসে তৃপ্তি ভরে পানাহার করে, বাঁচার খাতিরে বাঁচে ও যৌন সম্ভোগ করে। এটিই হলো নিরেট পশুত্ব। এরা নিজেদের মুসলিম বলে দাবী করে, কিন্তু মহান আল্লাহ তায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়া আইন বিলুপ্ত করা হলেও এরা রাস্তায় নামে না। অনৈসলামী রাজনীতির এটিই হলো সবচেয়ে বড় নাশকতা। এরূপ দায়শূণ্য লোক দেখা গেছে নবীজী (সা:)’য়ের যুগেও। নবীজী (সা:)’য়ের পিছনে এরা নিয়মিত নামাজ পড়েছে, রোজা রেখেছে, এবং দান-খয়রাতও করেছে। কিন্তু মক্কার কাফিরদের পক্ষ থেকে যখন হামলা হয়েছে, তখন এরা শান্তিবাদী সেজেছে এবং জিহাদ থেকে দূরে থেকেছে। এরাই হলো মুসলিম ইতিহাসের অতি পরিচিত মুনাফিক। এরা ইসলাম ও মুসলিমের বিজয় চায় না, বরং পরাজয় চায়। নবীজী (সা:)’য়ের যুগে এদের সর্দার ছিল আব্দুল্লাহ বিন উবাই। মদিনার বুকে মুনাফিকগণ জিততে পারিনি। কিন্তু বাংলাদেশে তারাই বিজয়ী; পরাজয় এদেশটিতে ইসলামের পক্ষের শক্তির।

 

রাজনীতি ভীতি এবং রাজনীতিশূণ্যতার বিপদ

অনেকের রয়েছে প্রচণ্ড রাজনীতি ভীতি। কারণ, রাজনীতিতে আছে অর্থ, শ্রম, সময়, মেধা ও রক্তের খরচ। এজন্যই রাজীনীতিকে আত্মকেন্দ্রিক স্বার্থপর ব্যক্তিগণ আপদ মনে করে। ফলে ঝামেলামুক্ত জীবনের জন্য রাজনীতি থেকে তারা সযত্নে দূরে থাকে। তাদের কাছে রাজনীতি হলো স্বার্থ হাছিলের পেশা। ক্ষমতালোভী স্বার্থপর সেক্যুলারিস্টদের বেলায় কথাটি সত্য। রাজনীতি হলো ধারালো অস্ত্রের ন্যায়; অস্ত্র দিয়ে খুন করা যায়, তেমনি প্রতিরক্ষার কাজও হয়। ফিরাউনের রাজনীতি ছিল নৃশংস জুলুমের হাতিয়ার। অথচ নবীজী (সা:)’য়ের কাছে রাজনীতি ছিল কল্যাণকর রাষ্ট্র নির্মাণ এবং জনকল্যাণের  হাতিয়ার। তাঁর কাছে রাজনীতি গণ্য হয়েছে জিহাদ তথা শ্রেষ্ঠ ইবাদত রূপে। কারো জীবনে জিহাদের রাজনীতি না থাকার অর্থ: সভ্যতর মানব, সভ্যতর সমাজ ও সভ্যতর রাষ্ট্র নির্মাণের ভাবনা না থাকা। এমন ব্যক্তির থাকে না দুর্বৃত্তির নির্মূল ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার জিহাদ। এটি নিরেট দায়িত্বহীনতা ও স্বার্থপরতা। এমন মানুষদের তাড়না স্রেফ চাষাবাদ, পশুপালন, মৎসপালন, ব্যবসা বাণিজ্য ইত্যাদি নানারূপ পেশাদারী নিয়ে; কিন্তু তারা রাজী নয় দুর্বৃত্তমুক্ত সভ্য রাষ্ট্রের নির্মাণে। এমন চেতনাধারীদের সংখ্যাটি বাংলাদেশে বিশাল। বাংলাদেশের সকল ব্যর্থতার জন্য দায়ী শুধু দুর্বৃত্ত রাজনীতিবিদরা নয়, বরং দায়ী হলো রাজনীতিশূণ্য এসব নীরব ও নিষ্ক্রিয় মানুষ। নীরব ও নিষ্ক্রিয় মানুষগণ যে দেশের বিরুদ্ধে কতটা ভয়াবহ নাশকতা ঘটাতে পারে -তার প্রমাণ হলো বাংলাদেশ।  রাজনৈতিক ময়দানের দখলদারিটা তারা বিনা লড়াইয়ে স্বার্থান্বেষীদের হাতে সঁপে দেয়। রাজনীতি থেকে দূরে থাকা এমন লোকদের মাঝে রয়েছে দেশটির অধিকাংশ আলেম, মুফতি, মসজিদের ইমাম, পীর, তাবলিগ জামায়াতের লোক এবং মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকগণ। তাদের নিষ্ক্রিয়তার কারণে বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশের রাজনীতি ও শাসন ক্ষমতা ইসলামের শত্রুপক্ষের দখলে। অথচ নিজ দেশ ইসলামের শত্রুশক্তির দখলে গেলে এবং আদালতে শরিয়া আইনের বিচার না থাকলে জিহাদ ফরজ হয়ে যায়। তখন নীরব ও নিষ্ক্রিয় থাকাটি হারাম।

মুসলিম উম্মাহর অতীত সাফল্যের মূল কারণ, সে কালের মুসলিমদের শতকরা শতভাগই সর্বসামর্থ্য দিয়ে অংশ নিয়েছিলেন রাজনীতির জিহাদে। কেউই রাজনীতির নীরব ও নিষ্ক্রিয় দর্শক ছিলেন না। বাগানে শতকোটি বৃক্ষ থেকে লাভ কি, যদি ফলবান বৃক্ষের সংখ্যা মাত্র গুটি কয়েক? আজকের মুসলিমদের অবস্থা তেমনি এক ফলশূণ্য বৃক্ষের বাগানের ন্যায়। অতীতের মুসলিমদের রাজনীতি স্রেফ ভোটদান ও মিটিং মিছিলের রাজনীতি ছিল না। বরং সেটি ছিল নিজ অর্থ, নিজ মেধা, নিজ শ্রম ও নিজ রক্ত বিনিয়োগের রাজনীতি। সেটি ছিল জিহাদের রাজনীতি।  সে রাজনীতি নিয়ে বাঁচতে অর্ধেকের বেশি সাহাবাশহীদ হয়েছেন। সে রাজনীতি নিয়ে বাঁচতে এবং সেটিকে প্রতিষ্ঠা দিতে নবীজী (সা:) ১০টি বছর রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন এবং অস্ত্র হাতে নিজে রণাঙ্গণে যুদ্ধে নেমেছেন এবং আহত হয়েছেন। এটি হলো নবীজী (সা:)’য়ের সবচেয়ে ব্যয়বহুল এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূন্নত; মুসলিম জীবনে সে সূন্নত প্রতিষ্ঠা পাওয়ার কারণেই মুসলিম উম্মাহর উত্থান হয়েছিল বিশ্বশক্তি রূপে। রাজনীতির এ ফরজ ইবাদতকে বাদ দিয়ে শুধু  দাড়ি রাখা, খেজুর খাওয়া, পাগড়ি বাধা, মেছওয়াক করার ন্যায় সূন্নতগুলি নিয়ে বাঁচলে কি সেটি সম্ভব হতো? 

বাংলাদেশের শতকরা ৯১ ভাগ জনগণ নিজেদেরকে মুসলিম রূপে পরিচয় দেয়। কিন্তু তাদের অধিকাংশের মাঝে নবীজী (সা:)’য়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূন্নত এবং ফরজ জিহাদটি বেঁচে নাই। তবে তারা যে রাজনীতিশূণ্য -বিষয়টি তা নয়। তাদের জীবনেও রাজনীতি আছে। সেটি হলো ইসলাম থেকে দূরে সরা চোর ডাকাত, ভোটডাকাত, সেক্যুলারিস্ট দুর্বৃ্ত্তদের বিজয়ী করার রাজনীতি। সে সাথে সেটি ইসলামকে পরাজিত রাখার রাজনীতি। সে রাজনীতি নিয়ে বাঁচাতে তারা দল বেঁধে সভা সমিতিতে যায়, প্রচার নামে, লাঠি ধরে, অর্থ দেয় এবং নির্বাচনে ভোট দেয়। কিন্তু সে রাজনীতিতে তাড়না নাই শরিয়া প্রতিষ্ঠার এবং ইসলামকে বিজয়ী করার। অথচ যে রাজনীতিতে ইসলাম ও তার শরিয়া আইনকে বিলুপ্ত রাখা হয় -সে রাজনীতি তো নিশ্চিত জাহান্নামে নেয়ার হাতিয়ার। 

 

শ্রেষ্ঠতম বীর ও জঘন্যতম অপরাধী

মুসলিম ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম বীর তো তারাই যারা দেশে দেশে ইসলামের দ্রুত প্রসার বাড়িয়েছে, মুসলিম উম্মাহর ভূগোলে বিশাল বৃদ্ধি এনেছে এবং মুসলিমদের বিশ্বশক্তির  আসনে বসিয়েছে। সে কাজটি সাধিত হয়েছে গৌরব যুগের মুসলিমদের দ্বারা। তাদের জান, মাল, মেধা ও শ্রমের বিশাল কুরবানীর কারণেই মদিনার ক্ষু্দ্র শহরে জন্ম নেয়া ইসলামী রাষ্ট্র দ্রুত বিস্তার পেয়েছে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের বৃহৎ ভূ-ভাগ জুড়ে। তাদের কারণে মুসলিমগণ পেয়েছে অপরাজেয় বিশ্বশক্তির মর্যাদা। সমগ্র মুসলিম ইতিহাসে এরাই হলো মুসলিম উম্মাহর শ্রেষ্ঠতম সন্তান। তাদের কারণে মুসলিম নর-নারীগণ পেয়েছে জান, মাল ও ইজ্জতের নিরাপত্তা। পেয়েছে স্বাধীনতা। আজকের মত সেদিন গোত্র, বর্ণ ও ভাষার ভিত্তিতে মুসলিম ভূমিতে বিভক্তির প্রাচীর ছিল না। বরং ছিল প্যান-ইসলামী মুসলিম ভাতৃত্বের বিজয়।

অপর দিকে মুসলিম ইতিহাসে সবচেয়ে বড় গাদ্দার এবং সবচেয়ে নিকৃষ্ট অপরাধী ব্যক্তি তো তারাই যারা মুসলিম দেশকে খণ্ডিত করে দুর্বল করেছে। যারা শত্রুশক্তির হাতে মুসলিম ভূমিকে তুলে দিয়েছে এবং মুসলিম জনগণকে গোলামে পরিণত করেছে। এদের নাশকতার তালিকাটি বিশাল। এরাই উসমানিয়া খেলাফত ভেঙেছে, পাকিস্তান ভেঙেছে এবং অখণ্ড আরব ভূমিকে ২২ টুকরোয় বিভক্ত করেছে। এরাই হলো সেসব ঘৃণীত জীব -যারা নিজেদের নাশকতার কদর্য অপরাধ কাণ্ডগুলি নিয়ে উৎসব করে। এরাই মুসলিম উম্মাহর ক্ষতি সাধনে কোয়ালিশন গড়েছে পৌত্তলিক ও অপৌত্তলিক কাফির শক্তির সাথে। এরাই হলো ইসলাম থেকে দূরে সরা মুসলিম নামধারী সেক্যুলারিস্ট, ন্যাশনালিস্ট, গোত্রবাদী, বর্ণবাদী ও রাজতন্ত্রী।  আরব বিশ্বে এদের দেখা গেছে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ, ফরাসী ও ইতালীয়দের সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে তাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করে তাদের এজেন্ডাকে বিজয়ী করতে। সেটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ কালে। এরাই ফিলিস্তিনকে খেলাফত থেকে  বিচ্ছিন্ন করে ব্রিটিশদের হাতে তুলে দিয়েছে এবং সে অধিকৃত ভূমিতে জন্ম দিয়েছে অবৈধ ইসরাইলের।  ১৯৭১ সালে ইসলাম থেকে দূরে সরা বাঙালি মুসলিমদের দেখা গেছে সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে পৌত্তলিক ভারতীয় সৈন্যদের পাশে। ভারতীয়দের অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ নিয়ে এরা মুসলিমদের হত্যা করেছে এবং ভারতকে বিজয়ী করেছে।

নামাজের ইবাদত সফল করতে জরুরি হলো নানা ভাষা, নানা বর্ণ ও নানা এলাকার মানুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একত্রে দাঁড়ানো সামর্থ্য। সে সামর্থ্যের মাঝে ঈমান দেখা যায়। ভাষা, বর্ণ ও এলাকা ভিত্তিক ঘৃণা থাকলে দূরত্ব তৈরী হয়; সে দূরত্ব নিয়ে জায় নামাজে দাঁড়ালে নামাজ হয়না। তেমনি রাজনীতির ইবাদতকে সফল করতে হলে ফরজ হলো, ভাষা, বর্ণ ও ভূগোল ভিত্তিক পরিচয়ের উর্দ্ধে উঠে একতাবদ্ধ হওয়া; সেগুলি নিয়ে দূরত্ব গড়ার যে রাজনীতি -সেটি হারাম রাজনীতি। বাঙালি জাতীয়তাবাদ বাঙালি মুসলিম জীবনে সে হারাম রাজনীতির প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। ১৯৭১’য়ে পাকিস্তান ভেঙেছে সে হারাম রাজনীতির নাশকতায়। ইসলাম শুধু জনগণের ধর্মীয় বিশ্বাসে বিপ্লব আনেনি; বিপ্লব এনেছিল তাদের রাজনৈতিক বিশ্বাসেও। মুক্তি দিয়েছিল গোত্রবাদ, জাতীয়তাবাদ, বর্ণবাদ ও রাজতান্ত্রিক চেতনার জাহিলিয়াত থেকে। ফলে খলিফা হওয়ার জন্য কোন বিশেষ গোত্রের, বর্ণের বা কোন খলিফার পুত্র হওয়ার প্রয়োজন পড়তো না। গুরুত্ব পেত স্রেফ তাকওয়া ও যোগ্যতা। তাই খোলাফায়ে রাশেদার কেউ রাজপুত্র বা খলিফার পুত্র ছিলেন না। চেতনা রাজ্যের এ বিপ্লব মুসলিমদের সর্ববৃহৎ বিশ্ব শক্তি রূপে বেড়ে উঠার গৌরব দিয়েছে। কিন্তু আজ সে সামর্থ্য বিলুপ্ত হয়েছে।

জাতীয়তাবাদ ও রাজতন্ত্রের জাহিলিয়াত নিয়ে যে অসভ্য রাজনীতি -সেটি তো বেঈমানীর আলামত। এ রাজনীতিতে কোন অবাঙালি ফিরেশতা বা পয়গম্বর হলেও তার কোন স্থান নাই। অথচ আজ থেকে ৮০ বছর আগেও বাঙালি মুসলিম যথেষ্ট ঈমানদার ছিল; এবং তারা ইসলামের অনেক কাছে ছিল। তারা অবাঙালি মহম্মদ আলী জিন্নাহকে শুধু নেতাই মেনে নেয়নি, তাকে বরং কায়দে আজম তথা শ্রেষ্ঠ নেতা বলে সম্মানিত করেছে। অথচ বাঙালি মুসলিমরা আজ ইতিহাস গড়েছে ইসলাম থেকে দূরে সরে। ফলে যে কায়েদে আজমের সফল নেতৃত্বের কারণে পূর্ব বাংলার বাঙালি মুসলিমগণ পৌত্তলিক ভারতের পেটে হজম হওয়া থেকে বাঁচলো -আজ তাঁর নাম পর্যন্ত সহ্য করতে রাজী নয়। তাঁর নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ছাত্রাবাস ছিল সেটিকে তারা সূর্য সেন হলো বানিয়েছে। যেন সূর্য সেনের অবদান কায়েদে আজমের চেয়ে বেশি ছিল!    

মুসলিমরা ফিরে গেছে ইসলাম পূর্ব আদিম জাহিলিয়াতে। তারই নমুনা হলো, বাংংলাদেশে তাই প্রতিষ্ঠা পেয়েছে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও রাজতন্ত্রের অসভ্য জাহিলিয়াত। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি -এ দুটি দল শুধু বাঙালি ট্রাইবাল জাতীয়তাবাদের প্রতিষ্ঠা দেয়নি; প্রতিষ্ঠা দিয়েছে কদর্য রাজতন্ত্রেরও। এ দুটি দলে গণতন্ত্র মুখোশ মাত্র। রাজতন্ত্রে নেতা হতে যোগ্যতা লাগে না, বরং রাজার অথর্ব বেকুব পুত্রও রাজা হতে পারে। রাজা হতে লাগে শুধু মৃত রাজার সাথে রক্তের সম্পর্ক। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতা হতেও তাই মৃত নেতার সাথে রক্তের সম্পর্ক থাকা লাগে। রক্তের সূত্র ধরে অযোগ্য ও অপরাধী  হাসিনা যেমন নেতা হতে পেরেছে, তেমনি অযোগ্য ও অপরাধী তারিক জিয়াও নেতা হতে পেরেছে। নেতা বা নেত্রীর সবচেয়ে বড় অপরাধ হলো রাজনীতি ও প্রশাসনে দুর্বৃত্তদের প্রতিপালন ও প্রশ্ন দেয়া। সেটি যেমন হাসিনা দিয়েছে, তেমনি তারিক জিয়াও দিচ্ছে। তারিক জিয়ার প্রশ্রয়ে আজ দেশ জুড়ে চাঁদাবাজদের  মহা তাণ্ডব। রাজতন্ত্র আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করেছে। কিন্তু  দলটি ধ্বংস হওয়ার আগে প্রচণ্ড নাশকতা ঘটিয়ে গেছে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। তেমনি রাজতন্ত্র বিএনপিও ধ্বংস করবে। তবে বিএনপিও নিজে ধ্বংস হওয়ার আগে দেশের বিরুদ্ধে ভয়ানক নাশকতা ঘটিয়ে যাবে। জনগণের নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তায় এ নাশকতা দিন দিন আরো ভয়ানক হয়ে উঠবে। ১৭/০৯/২০২৬  

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *