নবীজী (সা:)’য়ের যুগের মুসলিম এবং এ যুগের মুসলিম

 ফিরোজ মাহবুব কামাল

 

মূল পার্থক্যটি ইসলাম বুঝায় এবং ইসলাম নিয়ে বাঁচায়

নবীজী (সা:)’য়ের যুগের মুসলিম ও এ যুগের মুসলিমদের মাঝে পার্থক্যটি বিশাল ও অতি সুস্পষ্ট। যে কোন সুস্থ ও বিবেকবান মানুষ সেটি বুঝতে পারে। মূল পার্থক্যটি হলো, ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝায় এবং সে ইসলাম নিয়ে বাঁচায়। সে যুগের মুসলিমগণ ইসলামকে যে ভাবে দেখতেন ও পালন করতেন, আজকের মুসলিমগণ ইসলামকে সেভাবে দেখে না এবং পালন করে না। তাদের ইসলাম পালনে পবিত্র কুর’আন দেখা যেত, আজকে দেখা যায় কুর’আন থেকে বিচ্যুতি। আজকের মুসলিমগণ ইসলাম বলতে বুঝে কালেমায়ে শাহাদা পাঠ, নামাজ রোজা, হজ্জ যাকাত, মসজিদ মাদ্রাসা, তাবলিগ, ওরশ, ইজতেমা নিয়ে বাঁচা। তাদের ভাবনায় মহান আল্লাহ তায়ালার সার্বভৌমত্ব ও শরিয়ার প্রতিষ্ঠা স্থান পায় না। মিথ্যা, দুর্বৃত্তি ও অবিচারের নির্মূলের বদলে তারা বাঁচে সেগুলির প্রতিষ্ঠা ও প্লাবন নিয়ে। সত্য ও সুবিচারের প্রতিষ্ঠা এবং মুসলিম উম্মাহর প্যান-ইসলামী ঐক্য -এগুলি তাদের কাছে অন্য গ্রহের বিষয়। তারা বাঁচে ভাষা, বর্ণ ও আঞ্চলিক পরিচয়ের নামে গড়া বিভক্তির দেয়াল নিয়ে। সে বিভক্তির দেয়াল বাঁচানোই তাদের রাজনীতি ও দেশপ্রেম।  

অথচ নবীজী (সা:)’য়ের যুগের ইসলাম পালনে শুধু কালেমা পাঠ, নামাজ রোজা ও হজ্জ যাকাত স্থান পায়নি, গুরুত্ব পেয়েছিল ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ। সে রাষ্ট্রে ছিল মহান আল্লাহ তায়ালার সার্বভৌমত্ব ও শরিয়ার প্রতিষ্ঠা। ভাষা, বর্ণ, গোত্র ও অঞ্চলের নামের গড়া বিভক্তির দেয়াল ভাঙাই ছিল সে রাষ্ট্রের রাজনীতি ও ইসলাম প্রেম। তাদের অর্থ, শ্রম, মেধা ও প্রাণের সর্বাধিক কুর’আনী হতো সে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠায় ও প্রতিরক্ষায়। তারা শতশত মাইল হেঁটেছেন সে রাষ্ট্রের সীমান্তের পাহারায়। অথচ আজকের মুসলিমদের উৎসব হলো মুসলিম দেশ খণ্ডিত করায় -বাঙালি মুসলিমরা সেটি করে ২৬ মার্চ ও ১৬ ডিসেম্বর এলে। ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার জিহাদ ছিল তাদের সর্বোচ্চ ইবাদত। এবং সে লক্ষ্য শাহাদত ছিল জীবনের সর্বোচ্চ অর্জন। কিন্তু আজকের মুসলিমগণ সেরূপ একটি রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে রাজী নয়। এবং রাজী নয় সেরূপ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠায় জান ও মালের কুরবানী পেশ করতে। অর্থ পেলে তারা বরং যুদ্ধ করে পৌত্তলিক কাফির বা ব্রিটিশদের বিজয়ী করতে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তাদের দেখা গেছে কাফির ব্রিটিশ শিবিরে এবং ১৯৭১য়ে দেখা গেছে ভারতীয় পৌত্তলিক শিবিরে।  

আজকের মুসলিমরা নামাজকে তারা জান্নাতের চাবি মনে করে; ফলে নামাজের সে চাবী হাতে পেলেই প্রচণ্ড খুশি। তারা ভাবে, হজ্জে গিয়ে আরাফাতে মোনাজাত করলে সব পাপ মার্জনা হয়ে যায়। তারা ভাবে, কিছু ওজিফা ও কিছু তাসবিহ পাঠ করলেই জান্নাতের দরওয়াজা খুলে যায় -যেমন সুইচ টিপলে আলো জ্বলে উঠে। এভাবে নামাজ রোজা-হজ্জ যাকাত ও তাসবিহ পাঠের মাঝে তারা জান্নাত দেখে; ফলে হিজরত ও জিহাদে জান মালের বিনিয়োগের ন্যায় ব্যয়বহুল বিনিয়োগ নিয়ে তারা আগ্রহী নয়। ফলে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা তাদের কাছে অতি সেকেলে মনে হয়; এবং একালে তা অসম্ভব মনে হয়। মোল্লা-মৌলভীগণ মসজিদ মাদ্রাসায় চাকুরি পেলেই খুশি; এবং আরো খুশি হয় যদি তাদেরকে ওয়াজের মহফিলে বক্তা রূপে খাড়া করা হয় এবং মোটা অংকের অর্থ দেয়া হয়। বড় বড় ওয়াজ মাহফিল, ওরশ মাহফিল ও ইজতেমার মাঝে তারা ইসলামের বিজয় দেখতে পায়।

ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠায় জিহাদ দূরে থাক, তা নিয়ে তারা ভাবতেও রাজী নয়। সেরূপ ভাবনাকে তারা সন্ত্রাসী উগ্রবাদ বলে। তাদের মডারেট ইসলামে ইসলামী রাষ্ট্রের যেমন স্থান নাই, তেমনি স্থান নাই জিহাদের। যেন ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণে জিহাদ করে নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাগণ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করেছিলেন! তাই নবীজী (সা:)’য়ের সে পথে না চলাটাই তাদের ইসলাম। তাই বাংলাদেশের মত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে গ্রামে গ্রামে মসজিদ মাদ্রাসা নির্মিত হলেও জিহাদ নাই ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণে। ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের প্রকল্প নিয়ে কেউ যদি নির্বাচনে দাঁড়ায় তবে জনগণ তাকে ভোট দিতেও রাজী নয়। ভোট দেয় ইসলাম থেকে দূরে সরা সেসব সেক্যুলারিস্ট, ফ্যাসিস্ট, কম্যুনিস্ট, ব্যাংক লুটেরা ঋণখেলাপি ও চাঁদাবাজ দুর্বৃত্তদের -যাদের যুদ্ধ শরিয়া ও ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে। এ থেকে কি সুস্পষ্ট হয়না, বাংলাদেশের মুসলিমগণ কতটা দূরে সরেছেন নবীজী (সা:) ইসলাম থেকে? তারা মুসলিম নাম নিয়ে বাঁচতে আগ্রহী, কিন্তু বাঁচতে রাজী নয় নবীজী (সা:)’য়ের ইসলাম নিয়ে -যাতে রয়েছে ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের জিহাদ।   

 

সেদিনের সাফল্য এবং আজকের ব্যর্থতা: হেতু কী?

রাষ্ট্রের গুণাগুণের মাঝে সে রাষ্ট্রে বসবাসকারী জনগণের ঈমান, আমল, চেতনা, দর্শন ও চরিত্র ধরা পড়ে। রাষ্ট্রের আচার, বিচার, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও সভ্যতা হলো জনগণের দর্শন ও স্বপ্নের দৃশ্যমান রূপ। তাই ঈমানদারদের রাষ্ট্র ও বেঈমানদের রাষ্ট্রের মাঝে পার্থক্যটি সহজেই ধরা পড়ে। ঈমানদারদের রাষ্ট্রটি হলো ইসলামী রাষ্ট্র, সে রাষ্ট্রের আদালতে থাকে মহান আল্লাহর শরিয়া আইন, সংবিধানে থাকে মহান রব’য়ের সার্বভৌমত্ব, রাজনীতিতে থাকে দুর্বৃত্তির নির্মূল এবং সুবিচার প্রতিষ্ঠার জিহাদ। বেঈমানদের শাসিত রাষ্ট্রে থাকে স্বৈরাচার, থাকে জাতীয়তাবাদ, দলবাদ, সেক্যুলারিজম ও রাজতন্ত্রের ন্যায় জাহিলী মতবাদে দখলদারি। আদালতে থাকে কাফিরদের প্রণীত আইন -যে আইনে পতিতাপল্লীর জ্বিনাও বৈধ ব্যবসা। দেশ জুড়ে থাকে মিথ্যাচার, নির্যাতন, প্রতারণা, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও দুর্বৃত্তির প্লাবন। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান ও তার কর্মকর্তারা পরিণত হয় বেঈমানী ও মুনাফিকির শো-কেসে। এমন দেশের জনগণ নামে মুসলিম হলেও নবীজী (সা:)’য়ের ইসলাম নিয়ে বাঁচেনা। তাদের ব্যর্থতা কুর’আন বুঝায় এবং ঈমান নিয়ে বেড়ে উঠায়। বুঝতে হবে পবিত্র কুর’আন ও নবীজী (সা:)’য়ের জীবনী থেকে পাঠদানের কাজটি তদের জন্য হয়নি। বরং, বেশি বেশি হয়েছে সেদেশে স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাদানের নামে ইসলাম থেকে দূরে সরানোর কাজটি।

মুসলিমকে শুধু নামাজ রোজা ও ওজু গোছলের ফরজ আদায় করলে চলে না, আদায় করতে হয় জ্ঞানার্জনের ফরজও। নামাজের ফরজ আদায় না হলে নামাজ হয়না, ওজুর ফরজ আদায় না করলে ওজু হয়না। তেমনি জ্ঞানার্জনের ফরজ আদায় না হলে ঈমানদার রূপে বেড়ে উঠার কাজটি হয়না। এজন্যই মহান আল্লাহ তায়ালার ৫ ওয়াক্ত নামাজ ও মাহে রমযানের ১ মাস রোজা ফরজ করার এক যুগ আগে কুর’আন থেকে জ্ঞানার্জন ফরজ করেছেন। জ্ঞানার্জনের ফরজ তো একমাত্র তখনই পালিত হয়, যখন পালিত হয় কুর’আন থেকে জ্ঞানার্জনের কাজ। মহান আল্লাহর ইচ্ছা মানুষকে ঈমানদার বানানো, ঈমানহীন নামাজী, রোজাদার ও হাজী বানানো নয়। অথচ আজ জ্ঞানার্জনের ফরজ আদায় না হওয়ায় বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশগুলিতে নামাজী, রোজাদার ও হাজীদের সংখ্যা বিপুল ভাবে বাড়লেও ঈমানদারদের সংখ্যাটি অতি নগণ্য। ঈমানদার হওয়ার কাজটি না হয় বহু নামাজী এবং বহু হাজী ঘুষ খায়, সূদ খায়, ব্যাভিচারি করে এবং ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণ রোধে সেক্যুলার রাজনীতির নেতাকর্মী হয়। ঈমানদার হওয়ার সে ব্যর্থতাটি দেখা যায় মাদ্রাসার বহু শিক্ষকের মাঝে -যারা ফ্যাসিস্ট হাসিনার ন্যায় খুনিকে কওমী জননী বলেছে এবং নির্বাচন এলে সেক্যুলার রাজনৈতিক দলের পক্ষে ভোট দিতে বলে। জনগণের মাঝে ঈমান শূণ্যতাটি বুঝা যায় দেশের নির্বাচনে শয়তানের অনুসারীদের বিশাল বিজয় দেখে। শয়তানের সে বিজয় দৃশ্যমান হয় রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদ, দলবাদ ও সেক্যুলারিজমের বিজয়, অর্থনীতিতে সূদ, সংস্কৃতিতে হিন্দুত্ব এবং নগরে বন্দরে পতিতাবৃত্তি ও অশ্লিলতা দেখে।    

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এতো বেঈমানী, এতো চাঁদাবাজী ও এতো প্রতারণা এবং প্রশাসনে এতো দূর্নীতির মূল কারণ: আদায় হয়নি জ্ঞানার্জনের ফরজ। কারণ জ্ঞান মানুষকে পাল্টায়; বিপ্লব আনে মানুষের চরিত্র, রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তিতে। জ্ঞানদান ও জ্ঞানার্জনের কাজ ব্যর্থ হওয়ার কারণেই ব্যর্থ হয়েছে ঈমানদার মানুষ গড়ার কাজ। সে ব্যর্থতার কারণে প্লাবন এসেছে বেঈমানীর। যে দেশের শিক্ষালয়ে পবিত্র কুর’আন থেকে পাঠদান দেয়া হয়না এবং পড়ানো হয়না নবীজী (সা:)’য়ের জীবনী, বরং পড়ানো হয় রবীন্দ্র সাহিত্য, শরৎ সাহিত্য, বঙ্কিম সাহিত্য এবং পথভ্রষ্ট বেঈমানদের মতবাদ, সে দেশে কিরূপে আদায় হবে জ্ঞানার্জনের ফরজ? ছাত্র ছাত্রীরা ঈমানদার রূপে বেড়ে উঠতে ব্যর্থ হবে -সেটিই তো স্বাভাবিক। শীর্ণকায় দুর্বল দেহে পরিচয় মেলে অপুষ্টির; তেমনি বেঈমানী ও চরিত্রহীনতার মাঝে পরিচয় মেলে অশিক্ষা ও কুশিক্ষার। এরাই কর্ম জীবনে ঘুষখোর কর্মচারি, চাঁদাবাজ ক্যাডার, প্রতারক রাজনীতিবিদ, ঋণখেলাপি ব্যবসায়ী এবং সন্ত্রাসী ডাকাত হয়। এমন ব্যর্থ শিক্ষা ব্যবস্থার কারণে দেশ দুর্বৃত্তিতে বিশ্বরেকর্ড গড়বে -সেটিই স্বাভাবিক। বাংলাদেশ সেটি প্রমাণ করেছে দুর্নীতিতে বিশ্বে ৫ বার প্রথম হয়ে। বুঝতে হবে, এমন ব্যর্থ দেশে সভ্য, ভদ্র ও ঈমানদার মানুষ গড়ার কোন শিক্ষা সাংস্কৃতিক অবকাঠামো নাই। ফলে পবিত্র কুর’আনের মধ্য দিয়ে মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাদের যা বলতে চান বা বুঝাতে হবে, সেগুলি শেখানোর ও বুঝানোর কোন ব্যবস্থা নাই। এমন দেশে ইসলামের নামে যা বেঁচে থাকে তা নিতান্তই বিকৃত ও অপূর্ণাঙ্গ ইসলাম। বাংলাদেশসহ অধিকাংশ মুসলিম দেশের মুসলিমদের এখানেই মূল সমস্যা।

কুর’আনী জ্ঞানের অজ্ঞতা নিয়ে বেড়ে উঠেছে যে অপূর্ণাঙ্গ ও বিকৃত ইসলাম, সেটি অসম্ভব করেছে নবীজী (সা:)’য়ের ইসলামের উপর সঠিক ধারণা নিয়ে বাঁচা ও বেড়ে উঠা। ফলে মুসলিমগণ ইসলাম পালন করছে সঠিক ইসলাম না জেনেই। এরাই দলে দলে তাবলিগী হয়, পীরের মুরিদ হয়, তথাকথিত ইসলামী দলের সদস্য হয়। এরা আগ্রহী নয় কুর’আন বুঝতে। রাজী নয় কুর’আনী জ্ঞান লব্ধ কোন বই পড়তে। যেন ইসলাম না জেনে ও না বুঝেই তারা ইসলাম পালন করবে! এমন দেশের মুসলিমগণ ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণ দূরের কথা, নবীজী (সা:)’য়ের গড়া মদিনার মসজিদের ন্যায় একখানি মসজিদ গড়ার সামর্থ্যও রাখে না। বরং সত্য তো এটাই, বাংলাদেশে মসজিদের সংখ্যা ৩ লাখের অধিক হলেও মদিনার মসজিদের ন্যায় একটি মসজিদও নাই। নবীজী (সা:)’য়ের মসজিদ শুধু নামাজ আদায়ের জায়গা ছিল না; বরং কাজ করেছে ইসলামের দুর্গ, কুর’আন শিক্ষার কেন্দ্র, নানা গোত্রের নারী পুরুষের মিলন ভূমি, রাজনৈতিক চর্চা, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা এবং মুসলিমদের মাঝে একতা ও সংহতি গড়ার প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো রূপে। তখন মদিনার পাড়ায় পাড়ায় মসজিদ ছিল না। সমগ্র মদিনা নগরীতে মাত্র একটি মসজিদ ছিল। প্রতিদিন ৫ ওয়াক্ত নামাজে সবাইকে সেখানে আসতে হতো। ফলে সেখানে একে অপরের সাথে মিলন ঘটতো। অথচ বাংলাদেশের প্রায় ৩ লাখ মসজিদ কাজ করছে গ্রাম, গোত্র, পাড়া, মহল্লা, ফেরকা, মাযহাব ভিত্তিক বিভক্তিকে বাঁচিয়ে রাখার হাতিয়ার রূপে। নামাজ আদায়ের পর অধিকাংশ মসজিদের তালা লাগিয়ে দেয়া হয়। রাজনৈতিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা এসব মসজিদে নিষিদ্ধ। প্রশ্ন হলো, যারা নবীজী (সা:)’য়ের নির্মিত মসজিদের অনুসরণে একটি মসজিদ নির্মাণ করতে পারে না, তারা কিরূপে প্রতিষ্ঠা দিবে তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের আদলে ইসলামী রাষ্ট্র? 

     

প্রকৃত ইসলাম এবং বিকৃত ইসলাম: কীরূপে বুঝা যায়?

প্রশ্ন হলো, কারা বাঁচছে পূর্ণ ও প্রকৃত ইসলাম নিয়ে এবং কারা বাঁচছে অপূর্ণাঙ্গ ও বিকৃত ইসলাম নিয়ে -সে বিচার কিরূপে সম্ভব? বিচারটি অতি সহজ। সেটি অতি সহজেই জানা যায়, ব্যক্তির বাঁচার আয়োজনে এবং তার রাজনীতিতে জিহাদ আছে কিনা -সেটি দেখে। এখানে ধরা পড়ে ব্যক্তির ঈমান, জীবন দর্শন, আক্বিদা, রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি, যুদ্ধ বিগ্রহ এবং এ জীবনে বাঁচা মরার এজেন্ডা। যে ব্যক্তি নিজে ডাক্তার, ইঞ্জিনীয়ার বা অধ্যাপক তার স্কুলের সার্টিফিকেট দেখার প্রয়োজন পড়ে কি? তেমনি যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে জিহাদের নিজের অর্থ, শ্রম, সময় ও প্রাণের কুরবানী দিতে যুদ্ধে নেমেছে সে কি নামাজ রোজা, হজ্জ যাকাত থেকে দূরে থাকতে পারে? তা নিয়ে কি কোন প্রশ্ন করা চলে?

জিহাদ হলো রাষ্ট্র ও সমাজকে দুর্বৃত্ত মুক্ত করা এবং মহান আল্লাহর তায়ালার এজেন্ডাকে বিজয়ী করার একমাত্র হাতিয়ার। নামাজ রোজা বহু সূদখোর, ঘুষখোর এবং প্রতারকও পালন করতে পারে। কিন্তু তারা কখনোই জিহাদের ময়দানে নিজের প্রাণ দিতে হাজির হয়না। জিহাদ হলো ইবাদতের সর্বোচ্চ চূড়া। সে চূড়ায় উঠতে হলে নিচের সবগুলি ধাপ অতিক্রম করতে হয়। নিচের সে ধাপগুলি হলো কালেমা পাঠ, তাসবিহ পাঠ, কুর’আন-হাদীসের জ্ঞানার্জন, নামাজ রোজা, হজ্জ যাকাত, তাসবিহ পাঠ এবং দ্বীনের তাবলিগ। বস্তুত জিহাদ দেয় একজন মুসলিমের জীবনে পূর্ণ ইসলাম পালনের পরিমাপ। তাই যাদের থাকে পূর্ণ ইসলাম নিয়ে বাঁচার প্রচণ্ড তাড়না, তাদের সবার জীবনে শুধু কুর’আন পাঠ, নামাজ রোজা, হজ্জ যাকাতই থাকেনা, অবশ্যই থাকে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জিহাদ। কারণ, ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ ছাড়া পূর্ণ ইসলাম পালন যে অসম্ভব -সে বিষয়টি কুর’আনী জ্ঞানসমৃদ্ধ কোন ঈমানদারের অজানা থাকার কথা নয়। ইসলামের সে অতি মৌলিক বিষয়টুকু বুঝতে বড় আলেম বা আল্লামা হওয়া লাগেনা, নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাদের যুগে দ্বীনের সে মৌলিক বিষয়টি ভেড়ার রাখাল, কৃষক, শ্রমিক, দোকানদার তথা সাধারণ মুসলিমগণও বুঝতো। বুঝতো বলেই নিজের অর্থ, নিজের অস্ত্র, নিজ ঘরের খাবার ও নিজের ঘোড়া নিয়ে জিহাদের ময়দানে হাজির হতো।

অথচ আজ সে মৌলিক বিষয়টি বাংলাদেশের সাধারন নামাজী  ও হাজী দূরে থাক, এমন কি অধিকাংশ আলেম, আল্লামা, মুফতি, পীর, হাফিজে কুর’আন, মাদ্রাসার মোহাদ্দেস এবং মসজিদের ইমামও বুঝে না। বুঝলে তো তাদেরকে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জিহাদে দেখা যেত। তখন বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা পেত ইসলামী রাষ্ট্র। কারণ নবীজী (সা:)’য়ের যতজন সাহাবী ছিলেন তার চেয়ে বহুগুণ বেশি মানুষ আলেম, আল্লামা, মুফতি, পীর, হাফিজ, মোহাদ্দেস এবং মসজিদের ইমাম রূপে বাংলাদেশে বসবাস করে। জিহাদশূণ্যতার বিপদ তো ভয়ানক। শহর থেকে ময়লা আবর্জনা সরানোর ব্যবস্থা না থাকলে সে শহর বসবাসের উপযোগী থাকে না। তেমনি রাষ্ট্রের বুকে দুর্বৃত্ত নির্মূল ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার জিহাদ না থাকলে সমগ্র রাষ্ট্র দুর্বৃত্তদের দখলে চলে যায়। রাষ্ট্র তখন বসবাসের অনুপযোগী হয়। শাসনক্ষমতায় তখন বসে চোর ডাকাত, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, প্রতারক ও ভোটডাকাত দুর্বৃত্তরা। তখন দেশে দুর্বৃত্তির প্লাবন আসে। সেরূপ বিপ্লব এখন বাংলাদেশে। মহান আল্লাহর তায়ালার বিধান তখন স্রেফ কুর’আনে বন্দি থেকে যায়; তা কেবল লক্ষ লক্ষ মানুষের কণ্ঠে প্রতি দিন পাঠ হতে দেখা যায়। বাংলাদেশে তো সেটিই হচ্ছে। এটাকে কি সত্যিকার ইসলাম পালন বলা যায়? অথচ এমন বিকৃত ও অপূর্ণাঙ্গ ইসলাম পালন নিয়েই বাঙালি মুসলিমদের কত গর্ব!

প্রশ্ন হলো, যারা নামাজ রোজা, হ্জ্জ যাকাত, পীর মুরিদী ও তাবলিগ জামায়াত নিয়ে বাঁচাকে পূর্ণাঙ্গ ইসলাম মনে করে -তারা কেন ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জিহাদে নামবে? কেনই বা তারা জিহাদে নিজেদের জান, মাল, সময় ও মেধার বিনিয়োগ করবে? কারণ, ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়টি তো তাদের ইসলামের অংশ নয়। ফলে কেন সেটির প্রতিষ্ঠা নিয়ে তারা লড়াইয়ে নামবে? যার লক্ষ্য লন্ডনে যাওয়া, সে কেন টোকিওর টিকিট কিনবে?  ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণে নিয়ে তাদের এ নিষ্ক্রিয়তার মূল কারণ, ইসলাম নিয়ে তাদের ভ্রান্ত ধারণা। শুধু নামাজ রোজা, হজ্জ যাকাত, তাবলিগ ও তাসবিহ পাঠ এগুলি ইসলামের অংশ; কিন্তু সেগুলিই পূর্ণাঙ্গ ইসলাম নয়। কিন্তু সেটি বুঝার মত জ্ঞান তাদের নাই। কারণ, সে জ্ঞান তাদের দেয়া হয়নি। সে ব্যর্থতা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার। ফলে অধিকাংশ মুসলিম বাঁচছে ভ্রান্ত ধারণা ও অপূর্ণাঙ্গ ইসলাম নিয়ে। অধিকাংশ মানুষ জাহান্নামে যাবে মানুষ খুন, চুরিডাকাতি বা ধর্ষণের অপরাধে নয়; বরং অজ্ঞতা, ভ্রান্ত ধারণা ও অপূর্ণাঙ্গ ইসলাম নিয়ে বাঁচায়। কারণ এগুলি সিরাতাল মুস্তাকীমে চলা অসম্ভব করে; বরং ধাবিত করে জাহান্নামের পথে। অথচ বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, বুদ্ধিবৃত্তি ও ধর্মচর্চা  সে অজ্ঞতা ও অপূর্ণাঙ্গ ইসলাম নিয়ে বাঁচাকে অভ্যাসে পরিণত করেছে। এভাবেই বিজয় তুলে দেয়া হয়েছে ইসলামবিরোধী দুর্বৃত্ত শিবিরে। উম্মাহ যেহেতু জিহাদশূণ্য, ফলে শত্রুর হামলার মুখে ইসলাম ও মুসলিম ভূমিকে প্রতিরক্ষা দেয়ার কেউ নাই। ফলে অধিকাংশ মুসলিম ভূমি অধিকৃত হয়ে গেছে ইসলামের দেশী ও বিদেশী শত্রুদের হাতে। দেশী শত্রু রূপে হাজির হয়েছে সেক্যুলারিস্ট, জাতীয়তাবাদী, ফ্যাসিবাদী ও রাজতন্ত্রী দুর্বৃত্তগণ।

নবীজী (সা:)’য়ের যুগে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার পথে একমাত্র বাধাটি আসতো কাফিরদের থেকে। কিন্তু আজ কাফিরদের বাধার পাশে বাড়তি বড় বাধাটি আসছে মুসলিম রাষ্ট্রগুলির মুসলিম নামধারী দখলদার শাসক এবং সেক্যুলার ঘরানার রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী এবং সামরিক ও বেসামরিক আমলাদের থেকে। এরাই প্রতিটি মুসলিম দেশে ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের মূল শত্রু। ইসলামের প্রশংসায় বহু কথা বহু কাফিরও বলেছে। কিন্তু তাতের ইসলামের কোন লাভ হয়নি। লাভ তো তখনই হয় যখন ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পায়। তখন মুসলিম উম্মাহর স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা সুরক্ষিত হয়। তাই প্রতিটি ঈমানদারে ঈমানী দায় হলো, ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের সৈনিক হওয়া -যেমন সৈনিক ছিলেন নবীজী (সা:) এবং তাঁর প্রতিটি সাহাবী।

তাই যারা ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের শত্রু, তারাই ইসলামের প্রকৃত শত্রু। তবে ইসলামের শত্রু হলেও এদের কাফির বলা যাবে না; কারণ তারা নিজেদের মুসলিম রূপে দাবী করে। তাদের মুনাফিক বলতে হবে। বস্তুত এরাই হলো text book case of মুনাফিক। ইসলামের এ শত্রুপক্ষীয় মুনাফিকদের ভোট দিয়ে, অর্থ দিয়ে এবং রাজপথে লাঠি ধরে সমর্থণ দিচ্ছে এমন সব ব্যক্তি -যাদের বিপুল সংখ্যক হলো নামাজী, রোজাদার ও হাজী। এভাবে মুসলিম নামধারী বিপুল সংখ্যক মানুষ কাজ করছে ইসলামের গুপ শত্রু রূপে। বুঝতে হবে মুনাফির সর্দার আব্দুল্লাহ বিন উবাইও নবীজী (সা:)’য়ের পিছনে প্রথম কাতারে নামাজ পড়তো এবং রোজা রাখতো। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে ঈমানদার হতে। তাই ইসলামে নামাজী, রোজাদার ও হাজী হওয়ার চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ ঈমানদার হওয়া। ঈমানদার হতে ব্যর্থ হলে নামাজ রোজা ও হজ্জ যাকাত পালন করেও মুনাফিক হতে হয়। বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশগুলিতে এমন মুনাফিকদের সংখ্যা ঈমানদার থেকে বহুগুণ বেশী। এরাই মুসলিম উম্মাহর ঘরের শত্রু। ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি নাশকতা তো এই ঘরের শত্রুদের। খেলাফত ভেঙে গেছে, পাকিস্তান ভেঙে গেছে এবং মুসলিম বিশ্ব ৫০টির বেশি খণ্ডে খণ্ডিত হয়েছে তো এই ঘরের শত্রু মুনাফিকদের কারণে। এরাই অসম্ভব করছে মুসলিম ভূমিতে ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ। মহান আল্লাহতায়ালার কাছে মুনাফিকগণ কেন কাফিরদের চেয়েও জঘন্য -সেটি স্পষ্ট বুঝা যায় এ মুনাফিকদের হাতে সৃষ্ট মুসলিম উম্মাহর বিভক্ত ও বিপর্যস্ত অবস্থা দেখে। ২০/৮/২০২৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *