জনগণের চরিত্র বদলাতে চাই কুর’আনী জ্ঞানসমৃদ্ধ বইয়ের প্লাবন

ফিরোজ মাহবুব কামাল

খবরে প্রকাশ,জামায়াতের আমির ডা: শফিকুর রহমান সাহেব জাতীয় সংসদের কর্মচারীদের মাঝে আম বিতরণ করেছেন। ‌ তিনি আগস্ট বিপ্লবের পর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মাঝে বহু লক্ষ টাকার গরুর গোশত বিতরণ করেছেন। সম্ভবত তিনি মনে করেন, বাংলাদেশীদের রয়েছে ‌দৈহিক পুষ্টির অভাব। তাই তিনি পুষ্টি জুগিয়ে যাচ্ছেন। জামায়াত গরুর গোশত বিতরণের কাজটি মফস্বলের জেলাগুলিতে করেছে। দৈহিক পুষ্টি জোগানো ভালো -এই নিয়ে সন্দেহ নাই। তবে তাঁর প্রোয়োরিটি নির্ধারণ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

বুঝতে হবে, বাংলাদেশীরা দৈহিক পুষ্টির কারণে বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে না। তারা আজ বিপর্যয়ের মুখে  পড়েছে চেতনায় চরম অপুষ্টির কারণে। অপুষ্টিটি কুর’আনী জ্ঞানের।  বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ কুরআন বুঝে না। ফলে কুরআনের পথ জানা ও সে পথে চলার সামর্থ্যও তারা পাচ্ছে না। কুরআনের জ্ঞানসমৃদ্ধ পর্যাপ্ত বই তারা পাচ্ছে না, বাজারে থাকলেও অনেকের নাই কেনার সামর্থ্য।

অনেকের অর্থ থাকলেও তাদের নাই বই কেনার অভ্যাস।  ফলে সম্ভবত দেশের শতকরা  ৯০ ভাগ মানুষের ঘরে সেরূপ কোন কুরআনী জ্ঞানসমৃদ্ধ বই নেই। বহু মানুষ কুর’আন তেলাওয়াত করে বটে, কিন্তু কুরআন বুঝে না। ফলে আল্লাহ তাআলার সবচেয়ে বড় নিয়ামতটি থেকে তারা কোন ফায়দায় নিতে পারছে না। ঘরে কোটি কোটি টাকার সঞ্চয় থাকা সত্ত্বেও না খেয়ে মারা যাওয়াটি বেদনাদায়ক। তার চেয়েও বড় বেদনাদায়ক হলো ঘরে কুর’আন থাকা সত্ত্বেও জান্নাতের পথ না পাওয়া।  সে ব্যর্থতার কারণেই ধর্ম পাল, রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি ও সংস্কৃতির অঙ্গণে তারা পথ হারা।

জাতিকে পাল্টাতে হলে বই পড়া ও বই কেনার ক্ষেত্রে মানুষের অভ্যাসকে পাল্টাতে হবে।  নতুন বস্ত্র কেনার চেয়ে ভাল একখানী বই কেনা যে অনেক বেশী রুচিসম্মত এবং অধিক প্রজ্ঞার -সেটি বুঝতে হবে। জনগণ যেহেতু কুর’আন বুঝে না, তাই প্রয়োজন হলো এমন বইয়ের -যা কুর’আনের জ্ঞানকে বাংলা ভাষায় প্যাকেজিং করে মানুষের ঘরে পৌঁছিয়ে দিতে পারে। ‌দেশের স্কুল কলেজ মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলি সে কাজ করতে ব্যর্থ। তারা যদি সফল হতো তবে তো ঘরে ঘরে ইসলামী জ্ঞানের প্লাবন আসতো। জনগণ তখন নির্বাচনে শরিয়া বিরোধীদের বিজয়ী না করে ইসলামকে বিজয়ী করতে রাজপথে নামতো।

দেশের সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যে জ্ঞান বিতরণ করছে তাতে ছাত্র-ছাত্রীদের চেতনায় কুরআনী জ্ঞানের পুষ্টি মিলছে না। অথচ কোন দেশে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিপ্লব আনতে হলে প্রথমে চেতনার রাজ্যে জ্ঞানের বিপ্লব আনতে হয়। নবীজি (সা:) সে কাজটি শুরু করেছিলেন পবিত্র কুরআন দিয়ে। মহান আল্লাহ তায়ালা মুসলিমদের উপর সর্বপ্রথম যে ইবাদতটি ফরজ করেন সেটি হলো কুর’আন থেকে জ্ঞানার্জন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও মাহে রময়ানের মাস ব্যাপী রোজা ফরজ করা হয়েছে নবুয়তপ্রাপ্তির ১১ বছর পর -সেটি নবীজী (সা:)’য়ের মিরাজে গমনের পর ।

পরিতাপের বিষয় হলো, বাংলাদেশের অধিকাংশ মুসলিমদের জীবনে কুর’আনী জ্ঞানার্জনের প্রথম ফরজটি পালিত হচ্ছে না। অথচ কোন বিল্ডিং নির্মাণে যেমন মজবুত ফাউন্ডেশন গড়তে হয়, তেমনি মুসলিম রূপে বেড়ে উঠতে হলে প্রথমে কুর’আনী জ্ঞানের মজবুত ভিত নির্মাণ করতে হয়। নামাজ রোজা ও হজ্জ যাকাতের খুঁটি তখন সে শক্ত ফাউন্ডেশনের উপর দাঁড়াতে পারে। অথচ বাঙালি মুসলিমের মূল ব্যর্থতাটি মূলত এখানেই। তাদের নামাজ রোজা দাঁড়িয়ে আছে কোন ফাউন্ডেশন ছাড়াই চোরা বালি ও কাদার উপর। ফলে তারা ব্যর্থ হচ্ছে ইসলামের গৃহ নির্মাণে। ইসলামের সে গৃহটি হলো ইসলামী রাষ্ট্র।  অথচ সে মজবুত ভিত নির্মানের প্রয়োজনে ইরাক, মিশর, সূদান, সিরিয়া, লিবিয়া, আলজিরিয়া, তিউনিসিয়া ও মরক্কোর ন্যায় বহু দেশের মানুষ মাতৃভাষা পরিত্যাগ করে আরবী ভাষাকে গ্রহণ করেছিল।

বাংলাদেশের সবচেয়ে ব্যর্থ খাত হলো শিক্ষাখাত। এ খাতে সরকারের বাজেট বরাদ্দ অতি অপ্রতুল। সে সাথে প্রচণ্ড অভাব হলো পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা ও প্রায়োরিটি নির্ধারণে। ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ছাত্রদের হাতে কুরআনী জ্ঞান পৌঁছে দিতে পারছে না। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকগণ নিজেরাই কুরআনের জ্ঞানে শিক্ষিত নয়। তারা শিক্ষা নিয়েছে রবিন্দ্র সাহিত্য, বঙ্কিম সাহিত্য, শরৎ সাহিত্য, বাউল সঙ্গীত ও ডারউনের দর্শনে। স্কুলে নাচ গানের শিক্ষক থাকলেও নাই কুরআনের শিক্ষক। কুর’আনের সাথে কি অমার্জনীয় অপরাধ! বাংলাদেশের ন্যায় একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের জন্য এর চেয়ে পরিতাপের বিষয় আর কি থাকতে পারে? আরো দুঃখ ও বিস্ময়ের বিষয় হলো, বাংলাদেশের মুসলিমগণ এ ব্যর্থতা নিয়ে কোন প্নতিবাদ করেনা। এটি যেন তাদের কাছে কোন চিন্তার বিষয় নয়!

বাংলাদেশে আজ জাহিলিয়াতের প্রবল প্লাবন। মানুষ শুধু নাক ভাসিয়ে ডুবে আছে কুরআনী জ্ঞানের অজ্ঞতা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও সেকুলারিজমের প্লাবনে। কোন দেশেই জাহিলিয়াত একাকী আসে না। সাথে আনে দুর্বৃত্তি, দুঃশাসন ও পথভ্রষ্টতা। এজন্যই বাংলাদেশের পক্ষে দূবৃত্তিতে বিশ্বে পাঁচবার প্রথম হওয়াটি এতোটা সহজ হয়েছে।  

তাই বাংলাদেশের প্রথম যুদ্ধটি এবং মূল যুদ্ধটি হতে হবে জাহিলিয়াতের নির্মূলের লক্ষ্যে। মানুষের অন্ধকার মনকে আলোকিত করতে হবে কুরআনী জ্ঞানে। মানবতার মানদণ্ডে উপরে উঠার সিঁড়ির এটিই হলো প্রথম ধাপ। এ যুদ্ধের অস্ত্র কুরআনী জ্ঞানসমৃদ্ধ বই। এরকম বই বাংলাদেশের জনগণের দ্বার প্রান্তে পৌঁছাতে হবে। জামায়াতের অর্থনৈতিক সামর্থ্যের এদিকে বিনিয়োগ হওয়া উচিত। 

দেশের অর্থশালী ব্যক্তিদেরও এ কাজে এগিয়ে আসা উচিত। কারণ, বুদ্ধিবৃত্তিক এ জিহাদে অংশ নেয়া প্নতিটি ঈমানদারের উপর ফরজ। জ্ঞানদানের এ কাজটি হলো সকল নবী রাসুলদের পবিত্র সুন্নত। তাঁরা অর্থশালী ছিলেন না। ফলে তাদের ছিল না কাউকে অর্থদান, গৃহদান ও বস্ত্রদানের সামর্থ্য। কিন্তু তারা আমৃত্যু জ্ঞানদান করে গেছেন।  ওহীর জ্ঞানকে তাঁরা ব্যবহার করেছেন মানুষকে জান্নাতে নেয়ার হাতিয়ার রূপে। জ্ঞানদানের সে কাজটি হতে পারে বইদানে মধ্য দিয়ে।

বুঝতে হবে অর্থ, বস্ত্র ও সুন্দর গৃহ মানুষকে জান্নাতের পথ দেখায় না, সে কাজটি করে কুর’আনী জ্ঞান। তাই বাংলাদেশের বুকে জ্ঞানদানের ক্ষেত্রে নবী রাসুলদের পবিত্র ‌সুন্নতকে অবশ্যই প্রতিষ্ঠা দিতে হবে। আনতে হবে জ্ঞানের রাজ্যে বিশাল বিপ্লব। একাজটি যেমন লেখকদের, তেমনি পাঠকদের ও বিত্তশালীদের। একমাত্র এ কুরআনী জ্ঞানই পার্থিব জীবনে ও আখিরাতের জীবনে মুক্তির পথ দেখাতে পারে। এটি যেহেতু বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদ এবং এ জিহাদের অস্ত্র যেহেতু পবিত্র কুরআনের জ্ঞান সমৃদ্ধ বই‌ -শেখ ইউসুফ আল কারদাবী তাঁর যাকাতের বিধান কিতাবে এ কাজে যাকাতের অর্থব্যয়ও জায়েজ বলেছেন। তাই যাকাতের অর্থ শুধু বস্ত্র বিতরণে ব্যয় না হয়ে বই বিতরণে ব্যয় হওয়া উচিত। এতে জনগণ জাহিলিয়াত থেকে মুক্তি পাবে। মানব জীবনের সবচেয়ে বড় কল্যাণ তো জাহিলিয়াত থেকে মুক্তি। কারণ জাহিলিয়াত থেকে যারা মুক্তি পায়, একমাত্র তারাই পায় জান্নাতের পথ।  ২৪/০৬/২০২৬

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *