কোরআনী জ্ঞানের অপরিহার্যতা 

image_pdfimage_print

জনগণের জীবনে রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, চারিত্রিক ও নৈতীক বিপ্লবের পূর্বে যে বিপ্লবটি অপরিহার্য তা হলো চেতনা-রাজ্যে কোর’আনী জ্ঞানের গভীর বিপ্লব। এটিই মহান আল্লাহতায়ালার পবিত্র সূন্নত। নবীজী (সাঃ)কে তাই সর্বপ্রথম নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত বা জিহাদ দিয়ে ইসলামী রাষ্ট্র গড়ার কাজ শুরু করতে বলেননি। বরং তাঁকে প্রথম যে নির্দেশটি দিয়েছেন তা হলো “ইকরা” তথা পড় অর্থাৎ জ্ঞানার্জনে মগ্ন হওয়ার। নবীজী (সাঃ)কে বলা হয়েছে, রাতের অর্ধেকাংশ বা এক-তৃতীয়াংশ ধীরে ধীরে পবিত্র কোরআন পাঠে কাটিয়ে দিতে –যেমনটি বর্ণিত হয়েছে সুরা মুজাম্মিলে। পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরজ করা হয়েছে নবুয়ত লাভের দীর্ঘ  এগারো বছর পর। রোযা, হজ্ব, যাকাত ও জিহাদ ফরজ হয়েছে তারও পর। ঘোড়ার আগে গাড়ি জোড়া যায় না। তাই কোর’আনের জ্ঞানে আলোকিত করার পূর্বে যারা ইসলামী রাষ্ট্র গড়ার লড়াই শুরু করেন -তারা বস্তুতঃ ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়তে চান। তাতে শুধু রক্তক্ষয়ই বাড়ে, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়না।

ইসলামের গৌরব যুগে মুসলিমদের মাঝে পবিত্র কোরআনের জ্ঞানার্জনের আগ্রহটি  এতই প্রবল ছিল যে, তারা নিজেদের মাতৃভাষাকে দাফন করে আরবী ভাষাকে গ্রহণ করেছিল। ফলে ইরাক, সিরিয়া, মিশর, মরক্বো, আলজিরিয়া, লিবিয়া, মালি, সূদানের দেশের জনগণ আরব না হয়েও আরবে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু আজ অবস্থাটি ভিন্ন। পবিত্র কোরআন থেকে মুসলিমদের দূরে রাখার ষড়যন্ত্রটি ছিল কাফের ব্রিটিশ শাসকদের। তাদের ভয় ছিল, মুসলিমগণ কোরআন বুঝলে তারা জানতে পারবে শরিয়তের আইন প্রতিষ্ঠা ছাড়া মুসলিম হওয়া যায় না। তারা জানবে, মুসলিমদের উপর ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা দেয়া ও প্রতিক্ষা দেয়া ফরজ। এবং এ লক্ষ্যে জিহাদ হলো সর্বোচ্চ ইবাদত। ফলে এমন জ্ঞানের প্রচার হলে বিপদে পড়তো ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন। ফলে তাদের প্রকল্প ছিল মুসলিমদের কোর’আন থেকে দূরে রাখা। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখেই তারা ময়দানে নামায় মোল্লা-মৌলভীদের –যারা বলতে শুরু করে কোরআন তেলাওয়াতেই অনেক সওয়াব, বুঝার দরকার নেই। এ প্রসঙ্গে তারা নবীজীর একটি হাদীসের উল্লেখ করে। সেটি হলো, নবীজী (সাঃ) বলেছেনঃ পবিত্র কোরআনের একটি অক্ষর যে পড়বে সে ব্যক্তি দশটি নেকী পাবে। প্রশ্ন হলো, নবীজী (সাঃ) কি না বুঝে পড়তে বলেছেন? কোন সুস্থ্য ব্যক্তি কি এমন কথা বলতে পারে? খাওয়ার অর্থ খাদ্যকে গলাধঃকরণ করা এবং হজম করা; নইলে সেটিকে খাওয়া বলা যায় না। তেমনি কোন কিছু না বুঝলে কি পড়া হয়? তাছাড়া বহু আয়াত নাজিল হয়েছে পবিত্র কোরআন যাতে বুঝে পড়া হয় -সেটির উপর তাগিদ দিয়ে।

একটি জাতিকে শিক্ষিত করার কাজটি অতিশয় বিশাল। এটিই রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত। এটিকে ইসলামে পবিত্র ইবাদতের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। ইহকালে ও আখেরাতে ব্যক্তির প্রকৃত সফলতাটি নির্ভর করে এখাতের উপর। জনগণ কতটা মুসলিম রূপে বেড়ে উঠবে সেটি নির্ভর করে জ্ঞানদানের এ আয়োজনের উপর। এজন্য চাই, লক্ষ লক্ষ শিক্ষক। চাই, লক্ষ লক্ষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। চাই, প্রতি মহল্লায় পবিত্র কোর’আন শিক্ষার আয়োজন। প্রতিটি মসজিদকে এ জন্য মাদ্রাসায় পরিণত হতে হয়।  এজন্য প্রতি মুসলিমকে হয় শিক্ষক অথবা ছাত্র হতে হয় –যেমনটি নবীজী (সাঃ) বলেছেন। (হাদীসঃ মুসলিম জীবনের দুই অবস্থা। হয় সে শিক্ষক, না হয় ছাত্র।) কিন্তু বাংলাদেশে এটিই সবচেয়ে ব্যর্থ খাত।  ছাত্রগণ স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরুচ্ছে পবিত্র কোর’আনের একটি আয়াত না বুঝেই।

দেশের হাজার হাজার মাদ্রাসা থেকে যারা বেরুচ্ছে তারাও স্রেফ নিজেদের ঘর-সংসার ও রুটিরুজী নিয়ে ব্যস্ত। দেশের রাজনৈতিক ও সমাজ বিপ্লবের অঙ্গণে দায়িত্ব পালন থেকে তারা বহু দূরে। নিজেদর সার্টিফিকেট আদায় বা বেতন বৃদ্ধির জন্য তারা দলে দলে রাস্তায় নামলেও ইসলামী রাষ্ট্র ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠা নিয়ে তাদের কোন ভাবনা নাই। আন্দোলনও নাই। আদালতে মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তি বিধানের বদলে কুফরি আইনকে প্রতিষ্ঠা দিলে বা সেটিকে মেনে নিলে যে মুসলিম থাকা যায় না -সে হুশই বা মাদ্রাসায় শিক্ষিতদের মাঝে ক’জনের? সে হুশ থাকলে তো তারা রাস্তায় নেমে আসতো। রাষ্ট্রপ্রধানের যে আসনে খোদ নবীজী (সাঃ) বসেছেন সে আসনে কোন ভোট-চোর, ভোট-ডাকাত ও গুম-খুনের রাজনীতির অনৈসলামিক ব্যক্তিকে বসতে দিলে যে নবীজী (সাঃ)র সূন্নত বাঁচে না এবং জনগণের ইসলাম নিয়ে বেড়ে উঠাটিও সুনিশ্চিত হয় না –সে হুশই বা ক’জনের?

 

 

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *