কতটুকু সফল হচ্ছে পূর্ণ ইসলাম পালন ও সিরাতাল মুস্তাকীমে চলা?

ফিরোজ মাহবুব কামাল

 

বিদ্রোহটি আল্লাহ তায়ালার বিরুদ্ধে!

বাংলাদেশের সংবিধান বৈধতা দেয় মহান আল্লাহ তায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের। তার প্রমাণ, বাংলাদেশের সংবিধানে আল্লাহ তায়ালার সার্বভৌমত্বের কোন স্থান নাই; সেটি সংবিধান বিরোধী। দেশটিতে সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহ তায়ালার উপর আস্থার কোন স্থান নাই এবং স্থান নাই তাঁর শরিয়া আইনের। দেশটির সংবিধানে সার্বভৌম বলা হয়েছে জনগণকে। অথচ  মহান আল্লাহ তায়ালার কুর’আনী বয়ানে মানুষ তাঁর খলিফা মাত্র; সার্বভৌমত্ব একমাত্র মহান আল্লাহ তায়ালার। সার্বভৌম তো একমাত্র সেই -যারা থাকে আইন প্রণয়নের পূর্ণ অধিকার। খলিফার দায়িত্ব সে আইন পালন করা; প্রণয়ন নয়। সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহ তায়ালার সে সার্বভৌম অধিকার কেড়ে নেয়ার অর্থ হলো তাঁর বিরুদ্ধ বিদ্রোহ। এরূপ বিদ্রোহ মানুষকে কাফির বানায়। অথচ আল্লাহ তায়ালার সে সার্বভৌম অধিকার কেড়ে নিয়েছে বাংলাদেশের সংবিধান। এটি তো গুরুতর অপরাধ! অথচ এ অপরাধ নিয়ে বাংলাদেশের আলেম, আল্লামা, মুফতি, ইমাম এবং ইসলামী দলের নেতারা জিহাদে নামে না। এমন সাংবিধানিক বিদ্রোহ নিয়ে কোন জাতি কি সিরাতাল মুস্তাকীমে চলতে পারে? সেটি তো জাহান্নামের পথ। সিরাতাল মুস্তাকীমের পথ তো মহান আল্লাহ তায়ালার প্রতিটি হুকুমের প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণের পথ। তাই সে পথে চলতে হলে যাত্রার শুরুতেই মহান আল্লাহ তায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়া আইনের প্রতি প্রথমেই আত্মসমর্পণ করতে হয়। মহান রব’য়ের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পথটি শয়তান ও তার অনুসারীদের। সে পথটি কখনোই সিরাতাল মুস্তাকীম নয়, বরং জাহান্নামের। অথচ জাহান্নামের সে পথটিই দেখায় বাংলাদেশের সংবিধান।

১৯৭১’য়ে হিন্দুত্ববাদী ভারত ও তার সেবাদাসদের হাতে অধিকৃত হওয়ার ফল হলো, বাংলাদেশে নিষিদ্ধ হয়েছে এবং নানা ভাবে অসম্ভব করা হয়েছে সিরাতাল মুস্তাকীমে চলা। এবং সেটি সাংবিধানিক ভাবে। বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যাক। সিরাতাল মুস্তাকীমে চলার অর্থ তো শুধু নামাজ রোজা, হজ্জ যাকাত দোয়া দরুদ পালন করা নয়। মসজিদ মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠা এবং ওয়াজ মহফিল করাও নয়। নবীজী (সা:) কি শুধু এগুলি প্রতিষ্ঠা দিয়ে গেছেন? সিরাতাল মুস্তাকীম হলো পবিত্র কুর’আনে নাযিলকৃত রোডম্যাপ। সিরাতাল মুস্তাকীম বেয়ে চলতে গিয়ে নবীজী (সা:) তাঁর জীবনের শেষ দিন অবধি মানুষকে দ্বীনের দাওয়াত দিয়েছেন। তাঁর জীবনে যেমন পবিত্র কুর’আন থেকে জ্ঞানদান, নামাজ রোজা হজ্জ যাকাত ছিল, তেমনি ছিল অন্যায়ের নির্মূল ও সুবিচারের প্রতিষ্ঠার জিহাদ। এবং সে সাথে ছিল ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ ও সে রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষার জিহাদ। তাই ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ এবং সে রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষায় জিহাদ বাদ দিয়ে শুধু নামাজ রোজা, হজ্জ যাকাত দোয়া দরুদ নিয়ে বাঁচলে সিরাতাল মুস্তাকীমে চলার কখনোই কাজটি হয়না। শুধু মসজিদ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা দিলেও চলে না। বরং পূর্ণ প্রতিষ্ঠা দিতে হয় মহান আল্লাহ তায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়তের। জনগণের চেতনার ভূমিকে যেমন জাহিলিয়াত মুক্ত করতে হয় পবিত্র কুর’আনের জ্ঞান নিয়ে, তেমনি রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গণকে দুর্বৃত্তমুক্ত করতে হয় অবিরাম জিহাদের মাধ্যমে। এটিই হলো নবীজী (সা:)’য়ের দেখানো সিরাতাল মুস্তাকীম।

 

কতটুকু হচ্ছে সিরাতাল মুস্তাকীমে চলা?

সিরাতাল মুস্তাকীম হলো জান্নাতের একমাত্র পথ। সে পথের যাত্রাকে সফল করতে হলে পথচলায় কোন অংশকেই বাদ রাখা যায়না। পূর্ণ ইসলাম পালন না করে সিরাতাল মুস্তাকীমের সমগ্র পথটি অতিক্রম করা অসম্ভব। যাত্রা পথে একটি খাল অতিক্রমে ব্যর্থ হলে অসম্ভব হয় গন্তব্যে পৌঁছা।  সিরাতাল মুস্তাকীমে অবশ্যই রয়েছে জিহাদ; এবং সে জিহাদে থাকতে হয় অর্থ, শ্রম, মেধা ও প্রাণের বিনিয়োগ। যারা সে জিহাদে অংশ নেয় না, তারা কি ভাবে জান্নাতে পৌঁছবে? সে জন্যই মহান আল্লাহ তায়ালার তাগিদ: “উদখুলো ফিস সিলমি কা’ফ‌ফা।” অর্থ: ইসলামের মাঝে প্রবেশ করো পূর্ণ ভাবে। কিন্তু অনৈসলামী রাষ্ট্রে অসম্ভব হয় সে পূর্ণ ইসলাম পালনের কাজ। কারণ, অনৈসলামী রাষ্ট্রে কুর’আনী জ্ঞানার্জন ও জ্ঞান দানের কাজটি অসম্ভব। দ্বীনের দাওয়াতের কাজ সেখানে নিয়ন্ত্রিত। সেখানে অসম্ভব হলো শরিয়া আইনের বিচার। অসম্ভব হলো দুর্বৃত্তের নির্মূল ও  সুবিচার প্রতিষ্ঠার জিহাদ। অনৈসলামী রাষ্ট্র এভাবেই অসম্ভব করে সিরাতাল মুস্তাকীমে চলা। সে বাধাগুলি দূর করতেই নবীজী (সা:)কে ইসলামী রাষ্ট্র  প্রতিষ্ঠা দিতে হয়েছিল। আজও তার বিকল্প নাই।  ইসলামী রাষ্ট্র  প্রতিষ্ঠা ছাড়া নবীজী (সা:)‘য়ের অনুসরণের কাজটি হয়না। তাছাড়া সেরূপ একটি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা না দিলে অসম্ভব হয় পূর্ণ ইসলাম পালন। এবং অসম্ভব হয় সিরাতাল মুস্তাকীমের সবটুকু অংশ পাড়ি দেয়া। অথচ অতি পরিতাপের বিষয় হলো, পবিত্র কুর’আনের জ্ঞান নাই, দ্বীনের তাবলিগ নাই, শরিয়া আইনের বিচার নাই, প্যান-ইসলামী মুসলিম ভাতৃত্ব নাই, ইসলামী রাষ্ট্র নাই, দুর্বৃত্তি নির্মূল ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার জিহাদ নাই -দ্বীন পালনে এমন শূণ্যতা ও ফাঁকিবাজি নিয়েও অনেকে ভাবে তারা সিরাতাল মুস্তাকীমে চলছে! ভাবে, এ পথেই তারা জান্নাতে পৌঁছবে! এরূপ অপূর্ণ ইসলাম পালনের মধ্য দিয়ে নিজের অজ্ঞ মনকে তৃপ্ত করা যায়, কিন্তু তা দিয়ে কি সিরাতাল মুস্তাকীমে চলার কাজটি হয়? খুশি করা যায় কি মহান আল্লাহ তায়ালাকে? 

কম্যুনিজম নিয়ে বাঁচার জন্য চাই কম্যুনিস্ট রাষ্ট্র। সে জন্যই কম্যুনিস্টগণ রাশিয়া, চীন, কিউবা, আলবানিয়া’তে রাষ্ট্রীয় বিপ্লব আনে। সেটি শতভাগ সত্য ইসলামের জন্যও। অর্থাৎ পূর্ণ ইসলাম পালনের জন্য চাই ইসলামী রাষ্ট্র। অথচ বাংলাদেশে মুসলিমদের সংখ্যা বাড়লেও ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা দেয়ার কাজটি হয়নি। ফলে পূর্ণ ইসলাম পালনের কাজটিও হচ্ছে না। যে শরিয়া অনুযায়ী বিচার না করলে কাফির, জালিম ও ফাসিক হতে হয় -সে শরিয়া পালনের কাজটিও হচ্ছে না। শেখ মুজিবের ন্যায় যে বাকশালী ফ্যাসিস্টকে বাংলাদেশে নেতা, পিতা ও বন্ধু রূপে সম্মান করা হয় -তার যুদ্ধটি ছিল ইসলামের উত্থান প্রতিরোধে। ইসলামের বিরুদ্ধে সে যুদ্ধকে হাসিনা আরো তীব্রতর করে। ইসলামের বিরুদ্ধে সে যুদ্ধটি ছিল ভারতেরও। তাই ১৯৭১’য়ে ভারতের সামরিক বিজয়ে শেখ মুজিব তার ইসলামবিরোধী এজেন্ডা পূরণে শক্তিশালী পার্টনার পেয়েছিল। ভারতকে সাথে নিয়ে মুজিবের সে ধারা অব্যাহত রেখেছিল হাসিনাও।

 

নবীজী (সা:) ছিলেন কুর’আনের শো’কেস এবং বাঙালি মুসলিম হলো বিদ্রোহের শো‌‘কেস

নবীজী (সা:)’য়ের ইসলামের মূল পরিচয়টি সুস্পষ্ট। তিনি নিজে পবিত্র কুর’আনের শো’কেস; অর্থাৎ তাঁর মধ্যে দেখা যায় পবিত্র কুর’আনের শিক্ষা। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে যে ভাবে দেখতে চান, নবীজী (সা:) ছিলেন তারই প্রতিচ্ছবি। তাঁর হাতে প্রতিষ্ঠা পাওয়া ইসলামে ছিল মহান আল্লাহ তায়ালার একক সার্বভৌমত্ব, আদালতে শরিয়া আইন এবং দুর্বৃত্তির নির্মূল ও সুবিচারের প্রতিষ্ঠার জিহাদ। নবীজী (সা:)’য়ের প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের মূল পলিসি ছিল জনগণকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানো এবং তাদেরকে জান্নাতে নেয়া। এমন এজেন্ডা কোন সেক্যুলার রাষ্ট্রের থাকে না। তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রে এক দিকে যেমন ছিল দ্বীনের তাবলিগ, মিথ্যার বিলুপ্তি এবং কুর’আন ও হাদীস থেকে জ্ঞানদান, তেমনি প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল প্যান-ইসলামী মুসলিম ভাতৃত্ব। ফলে গড়ে উঠেছিল আরব, ইরানি, কুর্দি, তুর্কি, হাবশি, মুর, আফগানি ইত্যাদি নানা ভাষী মানুষদের নিয়ে এক বিশাল মুসলিম উম্মাহ। অথচ বাঙালি মুসলিমগণ নবীজী (সা:)’য়ের সে ইসলাম নিয়ে বাঁচে না। তারা বাঁচে ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের শো’কেস রূপে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কিছুকাল পরই পূর্ব পাকিস্তানের বিজয় পেয়েছে উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বর্ণবাদ। অথচ বর্ণবাদ ও জাতীয়তাবাদের প্লাবনে কখনো মানবতা বাঁচেনা। তখন কবরে যায় প্যান-ইসলামী মুসলিম ভাতৃত্ব। বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের কাছে শত্রু গণ্য করেছে বাংলাদেশে বসবাসকারী প্রায় ৬ বা ৭ লাখ বিহারি মুসলিম। বিহারিরা তাদের হাতে গণহত্যা ও গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। হারিয়েছে তাদের ঘরবাড়িসহ সর্বস্ব। 

আজকের তূলনায় ১৯৪৭’য়ে বাঙালি মুসলিমগণ ইসলামের অধিক কাছে ছিল এবং অধিক মানবিক ছিল। তাদের মাঝে সেদিন বেঁচেছিল ঈমানী চেতনা, মানবতা ও প্যান-ইসলামী মুসলিম ভাতৃত্ববোধ। ফলে বিহারি, পাঞ্জাবি, পাঠান, গুজরাতি ও অন্যান্য অবাঙালি মুসলিমদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সেদিন তারা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করেছিল। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ভারতের হিন্দুত্ববাদীদের হাত থেকে প্রাণ বাঁচাতে আসা বহু লক্ষ বিহারি মুসলিমকে তারা পূর্ব পাকিস্তানের নানা শহরে আশ্রয় দিয়েছিল। কিন্তু বাঙালি মুসলিমদের সে ঈমানী চেতনাকে হত্যা করে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বর্ণবাদের অনুসারীগণ। তারা বাঙালি মুসলিমদের ইসলাম থেকে দূরে সরায় এবং গণহত্যা ও গণধর্ষণের বীভৎস ইতিহাস গড়ে বিহারি নারী-পুরুষদের বিরুদ্ধে।

একাত্তরের যুদ্ধে সকল বিহারি বাঙালিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিল -সে প্রমাণ নাই। কিন্তু একাত্তরের বিজয়ের পর প্রতিটি বিহারির গৃহ, দোকান ও চাকুরি কেড়ে নিয়ে বস্তিতে পাঠানো হয়। এখনো তাদের বসবাস বস্তিতে। বাঙালি মুসলিমের সমগ্র ইতিহাসে এটিই হলো সবচেয়ে বড় ও নৃশংসতম অপরাধ কর্ম। বাঙালি মুসলিমদের এ নৃশংস বর্বরতা বহু দেশের ইতিহাসের বই’য়ে স্থান পাবে এবং স্কুল-কলেজে পড়ানো হবে। আজ থেকে বহু শত বছর পরও বাঙালি মুসলিমদের এ অসভ্য কর্ম সভ্য মানুষের মহলে ঘৃণা কুড়াবে। বিস্ময়ের বিষয় হলো, বাঙালি ইতিহাসবিদ, শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবীগণ বাঙালি মুসলিমের এ কদর্য ইতিহাস নিয়ে নিশ্চুপ। জার্মানীতেও ইহুদিদের বিরুদ্ধে সংঘটিত নাযী ফ্যাসিস্টদের বর্বরতার নিয়ে বহু বই লেখা হয়েছে। সেগুলি সেদেশে স্কুল-কলেজে পড়ানো হয়। কিন্তু বাংলাদেশে বিহারিদের বিরুদ্ধে সংঘটিত সে বাঙালি ফ্যাসিস্টদের বর্বরতা নিয়ে তেমন কোন বই লেখা হয়নি। বাঙালির বিবেক ধ্বংসে বাঙালি ফ্যাসিস্টগণ যে কতটা সফল হয়েছে -এ হলো তার নজির। অতি বিস্ময়ের বিষয় হলো, সেরূপ একটি বিবেক ধ্বংসের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এ বর্বর ফ্যাসিস্টগণ নিজেদেরকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি রূপে প্রচার করেছিল। ১৪/০৭/২০২৬                  

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *