এতো ভ্রষ্টতা ও বিপর্যয় কেন বাংলাদেশে?

image_pdfimage_print

রাজনীতিঃ জাতীয় জীবনের ইঞ্জিন

জাতীয় জীবনে মূল ইঞ্জিনটি হলো ক্ষমতাসীনদের রাজনীতি। এ ইঞ্জিনই জাতিকে সামনে টানে। এবং সে সামনে চলাটি কোন পথে হবে -নিছক বৈষয়ীক উন্নয়ন না নৈতিক ও সার্বিক মানবিক উন্নয়নের পথে- সেটি নির্ভর করে এ ইঞ্জিনের চালকদের উপর। কোন একটি জাতির ব্যর্থতা দেখে নিশ্চিত বলা যায়, সে জাতির রাজনৈতিক নেতাগণ সঠিক ভাবে কাজ করেনি। আর বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মূলতঃ সেটিই ঘটেছে। কোন দেশের উন্নয়ন বা সুখ-সমৃদ্ধির জন্য এটি জরুরী নয় যে, সেদেশের জলবায়ু, আবহাওয়া বা প্রাকৃতিক সম্পদে বিপুল বিপ্লব আসতে হবে। বরং বিপ্লব আনতে হয় নেতৃত্বে এবং সেদেশের রাজনীতিতে। রাজনীতির মাধ্যমে সাধারণ মানুষ পায় পথ-নির্দেশনা, রাজনৈতিক নেতাদের মাঝে পায় অনুকরণীয় মডেল খুজে পায়। আলেকজান্ডারের আমলে গ্রীস যখন বিশ্বশক্তি রূপে আত্মপ্রকাশ তখন গ্রীসের জলবায়ু, আবহাওয়া বা প্রাকৃতিক সম্পদে কোন পরিবর্তন আসেনি। পরিবর্তন এসেছিল রাজনৈতিক নেতৃত্বে। তেমনি আরবের মুসলিমগণ যখন বিশ্বের প্রধান শক্তি রূপে আত্মপ্রকাশ করলো তখন আরবের জলবায়ু, আবহাওয়া বা প্রাকৃতিক সম্পদে কোন বিপ্লব আসেনি। বরং বিপ্লব এসেছিল তাদের চরিত্রে, নেতৃত্বে ও রাজনীতিতে।

রাজনীতি হল সমাজসেবার সর্বশ্রেষ্ঠ হাতিয়ার। মুসলিম সমাজে এ কাজ করেছেন ইসলামের মহান নবী এবং তাঁর শ্রেষ্ঠতম সাহাবীগণ। রাষ্ট্রপ্রধানের আসনে দেশের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিকে বসানো তাই নবীজী (সাঃ)র সূন্নত। এ আসনে বসেছেন খোদ নবীজী (সাঃ)। নবীজী (সাঃ)র ওফাতের পর বসেছেন শ্রেষ্ঠ সাহাবাগণ। তাঁরা ছিলেন এমন সাহাবা যারা জীবদ্দশাতেই জান্নাতের সুসংবাদ পেয়েছিলেন। নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত পালনের পাশাপাশি যারা আল্লাহর রাস্তায় নিজের সময়, মেধা ও জানমাল কোরবান করতে দু’পায়ে খাড়া এ কাজটি মূলতঃ তাদের। কিন্তু সমাজসেবার এ মাধ্যমটি যদি ক্ষমতালিপ্সু ও স্বার্থশিকারী দুর্বৃত্তদের হাতে হাইজ্যাক হযে যায় তখন সে জাতির পতন, পরাজয় বা বিশ্বজোড়া অপমানের জন্য কি কোন বিদেশী শত্রুর প্রয়োজন পড়ে? ঝাড়ুদার হতে হলেও সততা লাগে, নইলে রাস্তা থেকে আবর্জনা দূর হয় না। আর রাজনীতিবিদদের মূল দায়িত্ব হলো রাষ্ট্র ও সমাজ থেকে আবর্জনারূপী দুর্বৃত্তদের সরানো। সে সাথে সুনীতির প্রতিষ্ঠা। কোরআনের ভাষায় মু’মিনের সে মিশনটি “আমারু বিল মারুফ” এবং “নেহী আনিল মুনকার”। অর্থাৎ ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং অন্যায়ের নির্মূল। সে কাজের প্রতি অতিশয় গুরুত্ব দিয়ে মহান আল্লাহতায়ালার ঘোষনাটি হলোঃ “তোমাদের মধ্যে অবশ্যই এমন একদল মানুষ থাকতে হবে যারা কল্যাণের পথে মানুষকে ডাকবে এবং ন্যায়ের নির্দেশ দিবে ও অন্যায়ের পথ থেকে রুখবে, এবং তারাই হল সফলকাম”। -সুরা আল-ইমরান, আয়াত ১০৪। আর এটাই তো মুসলমানের বাঁচা-মরা ও রাজনীতির মূল মিশন। নিছক নামায-রোযার মধ্য দিয়ে কি আল্লাহর নির্দেশিত এ হুকুমটি পালিত হয়? মেলে কি সফলতা? তাই আল্লাহতায়ালার কাছে যারা সফল হিসাবে গণ্য হতে চায় তাদেরকে শুধু নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত পালন করলে চলে না। পাশাপাশি এ পবিত্র কাজকেও জীবনের মিশন রূপে বেছে নিতে হয়। তাই তাই প্রকৃত ঈমানদারদের কাজ শুধু রাজনীতিতে অংশ নেওয়া নয়; বরং সে কাজে অর্থদান, শ্রমদান এমনকি প্রাণদানও। সাহাবায়ে কেরামের জীবনে তো সেটিই দেখা গেছে।

অথচ বাংলাদেশের অবস্থাটি ভিন্নতর। দেশটির লাখ লাখ মসজিদ ভরতে নামাযীর অভাব হয় না। এ দেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ রোযা রাখে। বহু হাজার মানুষ প্রতিবছর হজ্ব করে। বহু লক্ষ মানুষ প্রতিদিন কোরআন তেলাওয়াতও করে। অথচ ন্যায়ের পথে মানুষকে ডাকছে ক’জন? ক’জন সমাজ ও রাষ্ট্রের বুকে ন্যায়ের নির্দেশ দিচ্ছে? দুর্বৃত্ত মানুষদের রুখছেই বা ক’জন? অথচ রাজনীতিতে দেশের নামাজীরা যে অংশ নিচ্ছে না তা নয়। বরং তারাই সারি বেধে ভোট দেয় ইসলাম বিরোধীদের বিজয়ী করতে। নবীজী(সাঃ)র আমলে লক্ষ লক্ষ মসজিদ ছিল না, কোটি কোটি নামাযীও ছিল না। সংখ্যায় নগন্য সংখ্যক হয়েও তাঁরা আরব ভূমি থেকে দূর্নীতি ও দুর্বত্তদের নির্মূল করেছিলেন। নির্মূল করেছিলেন আবু লাহাব ও আবু জেহেলদের মত ইসলাম বিরোধী সকল নেতাদের। অথচ বাংলাদেশে ঘটেছে উল্টেটি। দেশটির সংখ্যাগরিষ্ট মুসলমানদের হাতে দুর্বৃত্ত ও ইসলাম-বিরোধী রাজনৈতিক নেতারা শুধু বিপুল ভোটে নির্বাচিত ও প্রতিপালিতই হয় না, প্রতিরক্ষাও পায়। বিপুল গণসমর্থণ নিয়ে এরা নেতা হয়, মন্ত্রী হয়, প্রশসনের কর্মকর্তাও হয়। দেশটির রাজনীতির ময়দানটি অধিকৃত হয়ে গেছে অতি দুষ্ট ও দুর্বত্ত প্রকৃতির লোকদের হাতে। অথচ যে দেশে আইনের শাসন আছে সে দেশে দূর্নীতিবাজদের পক্ষে নেতা হওয়া দূরে থাক, রাস্তার ঝাড়ুদার হওয়াও অসম্ভব। দূর্নীতিবাজদের দিয়ে রাস্তার ময়লা তোলার কাজটি যথার্থভাবে হয় না। কারণ খুটেঁ খুটেঁ ময়লা তোলার কাজেও অতি নিষ্ঠাবান ও দায়িত্বশীল হওয়াটি জরুরী। বরং জাতীয় জীবনে প্রকৃত আবর্জনা হল এ দূর্নীতিবাজেরা, তাই প্রতিদেশেই তাদের স্থান হয় কারাগারে। আবর্জনার ন্যায় তাদেরও স্থান হওয়া উচিত আস্তাকুঁড়ে। দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে ইসলাম অতি কঠোর ও আপোষহীন। যারা চুরি করে কোরআন তাদের হাত কেটে দিতে বলে।

 

ব্যর্থতার জন্য দায়ী দুষ্ট রাজনীতি

বাংলাদেশের ব্যর্থতা এজন্য নয় যে, দেশটিতে সম্পদের কমতি রয়েছে বা দেশের ভূগোল বা জলবায়ু প্রতিকূল। ব্যর্থতার জন্য মূলতঃ দায়ী দেশের দুষ্ট রাজনীতি। কারণ, বাংলাদেশে যে রাজনীতির চর্চা হচ্ছে সেটি আল্লাহতায়ালার প্রদর্শিত পথ বেয়ে এগুচ্ছে না। মহান আল্লাহতায়ালার প্রদর্শিত সে সরল পথটি হল সিরাতুল মোস্তাকিম, যা প্রকাশ পেয়েছে পবিত্র কোরআন ও নবীজী (সাঃ)র সূন্নাহতে। আর এ সিরাতুল মোস্তাকিম শুধু নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত, ইবাদত-বন্দেগীর পথই দেখায় না। দেখায় সুস্থ্য রাজনীতি, আইন-আদালত, শিক্ষা-সংস্কৃতি এবং অর্থনীতির পথও। আল্লাহর প্রদর্শিত পথ অনুসরণ না করে রাষ্ট্র, সমাজ বা পরিবারে শান্তি আসবে এরূপ বিশ্বাস করাই তো কুফরি তথা ঈমান-বিরুদ্ধ। এটি শিরক। তাই প্রশ্ন, এমন বিশ্বাস নিয়ে কি কেউ মুসলিম থাকতে পারে? আল্লাহর প্রদর্শিত পথ তথা ইসলাম ছাড়া শান্তি ও সমৃদ্ধি সম্ভব হলে তো ইসলামের প্রয়োজনই ফুরিয়ে যায়। অথচ তেমন একটি প্রচন্ড ইসলাম বিরোধী চেতনার প্রতিফলন ঘটছে বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও আইন-আদালতে। এ ক্ষেত্রগুলোতে ইসলামের প্রয়োজনই অনুভব করা হচ্ছে না। ইসলাম সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে নিছক মসজিদে ও কিছু পরিবারে। ফলে সমগ্র রাষ্ট্র জুড়ে বাড়ছে সূদ, পতিতাবৃত্তি, ব্যভিচার, ঘুষ, চুরি-ডাকাতি, সন্ত্রাস ও মদ্যপানের ন্যায় সর্ববিধ হারাম কাজ।

অথচ ইসলামের আগমন শুধু ব্যক্তির পরিশুদ্ধির লক্ষ্যে নয়, সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিশুদ্ধির লক্ষ্যেও। সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিবেশ যদি পাপে জর্জরিত থাকে তবে কি কোন মানব শিশু সহজে সিরাতুল মুস্তাকীম পায়? নবীজী (সাঃ)র হাদিসঃ প্রত্যেক মানব শিশুর জন্ম হয় মুসলিম রূপে। কিন্তু সে ইসলাম থেকে বিচ্যুত হয়ে হয়ে অমুসলিম হয় (পারিবারীক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়) পরিবেশের প্রভাবে। কোন শিশুই তার পরিবেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সামর্থ্য নিয়ে হাজির হয় না। যারা নবেল প্রাইজ পেয়েছে সে সামর্থ্য তাদেরও ছিল না। সে সামর্থ্য তো একটি বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধের। এজন্য তো চাই ওহীর তথা কোরাআনীর জ্ঞান। তাই কোন শিশুকে জাহান্নামের আগুণ থেকে বাঁচাতে হলে তাকে শুধু পানাহার দিলে চলে না; জাহিলিয়াত তথা অজ্ঞতার অন্ধকার পরিবেশ থেকে মুক্তি দিতে হয়। জাহিলী পরিবেশে এমন কি সিরাতুল মুস্তাকীম পায় না এমন কি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারীগণও। তাই সবচেয়ে সওয়াবে কাজ হলো, সমাজ ও রাষ্ট্রকে অজ্ঞতা তথা জাহিলিয়াত-মুক্ত করা। রাষ্ট্রের অবকাঠামো ও তার পরিচালনা কোর’আনের জ্ঞানে অজ্ঞ সেক্যুলারিস্টদের হাতে রেখে রাষ্ট্র বা সামাজের পরিবেশকে কি জাহিলিয়াত-মুক্ত করা যায়? সেটি অসম্ভব বলেই নবীজী (সাঃ) তার কর্মের পরিধি স্রেফ মসজিদ নির্মাণ ও কোর’আনের জ্ঞান বিতরণের মাঝে সীমিত রাখেননি। ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণ করেছেন এবং নিজে সে রাষ্ট্রের প্রধান রূপে দায়িত্ব পালন করেছেন।  

মানব জীবনের সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটে পথভ্রষ্ট অপরাধীদের হাতে রাষ্ট্র অধিকৃত হলে। রাষ্ট্র তখন জনগণকে জাহান্নামে নেয়ার দ্রুতগামী ট্রেনে পরিণত হয়। একটি বাসের সকল যাত্রী মাতাল হলেও তাদের সঠিক গন্তব্যস্থলে পৌঁছার সম্ভাবনা থাকে যদি চালক সুস্থ্য হয় এবং জ্ঞান রাখে সঠিক পথের। কিন্তু চালক নিজে মাতাল বা অজ্ঞ হলে সবার ভূল পথে চলাটি অনিবার্য হয়ে উঠে। এজন্যই ইসলামে শ্রেষ্ঠ নেক কর্মটি মসজিদ বা মাদ্রাসা নির্মাণ নয়, সেটি রাষ্ট্রকে অনৈসলামিক শক্তির হাত থেকে মুক্ত করে পরিপূর্ণ ইসলামী করা। বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশের জনগণের জন্য ভয়ানক বিপদের কারণ, দেশ অধিকৃত হয়েছে ভয়ানক অপরাধীদের হাতে। তাদের নিজেদের নাই পবিত্র কোরআনের তথা সিরাতুল মুস্তাকীমের জ্ঞান। তাদের রাষ্ট্র অধিকৃত হওয়ায় রাষ্ট্র পরিণত হয়েছে পথভ্রষ্ট করার হাতিয়ারে। ফলে ভ্রষ্ট্তা বাড়ছে শুধু শিশুদের নয়, বয়স্কদেরও। শিক্ষা ও সংস্কৃতির নামে সোসল ইঞ্জিনীয়ারিং হচ্ছে জনগণকে ইসলাম থেকে দূরে সরানোর কাজে। মৌলবাদ বলে পরিহার করা হচ্ছে ইসলামের বিধানকে।

ইসলামের প্রতি এরূপ আচরনকে শুধু ভ্রষ্টতা বললে ভূল হবে, বরং এটি হল আল্লাহর বিরুদ্ধে পরিপূর্ণ বিদ্রোহ। আর সে বিদ্রোহই প্রকাশ পাচ্ছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে। মুষ্টিমেয় ইসলামি দল ছাড়া বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলো আল্লাহর প্রদর্শিত সে সিরাতুল মোস্তাকিমের অনুসরণ দূরে থাক, সেটির প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করে না। আল্লাহর বিরুদ্ধে এটি কি সীমাহীন ঔদ্ধতা। এমন আচরণের তুলনা চলে চিকিৎস্যক ও তার দেওয়া চিকিৎসার বিরুদ্ধে মরনাপন্ন রোগীর ঔদ্ধতার সাথে। এরাই রাজনীতিকে পরিণত হয়েছে লুটপাঠ, শোষন এবং আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ারে। রাজনৈতিক দলের বহুলক্ষ কর্মী ও নেতা, সামরিক বাহিনীর শত শত অফিসার, শত শত সরকারি আমলা, হাজার হাজার ধনি ব্যবসায়ী ও ধর্মব্যবসায়ীসহ নানা জাতের সুযোগ সন্ধানীরা নেমেছে এ পেশাতে। কোন ডাকাত দলে বা সন্তাসী দলে এত দুর্বৃত্ত ও ধোকাবাজের সমাবেশ ঘটেনি যা ঘটেছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে। দুর্বত্তদের যারা যত বেশী দলে ভেড়াতে পারে তারাই বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে প্রভাবশালী ও প্রতাপশালী। রাজনীতির নামে রাস্তায় লগিবৈঠা দিয়ে পিঠিয়ে মানুষ হত্যা বা যাত্রীভর্তি বাসে আগুণ দেওয়া এরূপ রাজনৈতিক কর্মী ও নেতাদের কাছে কোন অপরাধই নয়। বরং ক্ষমতায় যাওয়ার লক্ষ্যে সেটিকে তারা অপরিহার্য মনে করে। বাংলাদেশের ইতিহাস এমন বর্বর ও বীভৎস অপরাধ কর্মে ভরপুর। খুণোখুণির ঘটনা ঘটেছে এমনকি সংসদেও। গণতন্ত্রের নামে দেশে বার বার নির্বাচন হয়, কিন্ত সে নির্বাচনে সৎ ও যোগ্য মানুষের নির্বাচন কি সম্ভব? মিথ্যা ওয়াদা ও ধোকাবাজীর উপর যে দেশে নিয়ন্ত্রণ নেই, সে দেশে কি দুর্বৃত্তদের পরাজিত করা যায়? নির্বাচন তাদের সামনে বরং রাস্তা খুলে দেয়।

নির্বাচন পরিণত হয়েছে নাশকতার আরেক হাতিয়ারে। ডাকাতি হয় ব্যালটের পর। এবং বিজয়ী হয় চোর-ডাকাতেরা। এরাই দখলে নেয় দেশের প্রশাসন, শিল্প, আইন-আদালতসহ সকল গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। ফলে বাংলাদেশে বার বার নির্বাচন হলেও শোষন, লুটপাঠ, দুবৃত্তি ও দূর্নীতি থেকে দেশবাসীর মূক্তি মিলছে না। বরং দিন দিন তা বেড়েই চলেছে। অপরাধীদের হাতে রাষ্ট্র অধিকৃত হলে কোন জাতি কি কখনো সুপথ পায়? তখন তো বিভ্রান্তি নেমে আসে সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বত্র জুড়ে। তেমনি বিপদ নেমে আসে রাজনীতি বিপথগামী হলে। তাই জাতীয় জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন ইস্যু হল, রাজনীতির ভ্রষ্টতা দূর করা। ইসলামে এটিই জিহাদ। নবীজীর আমলে মুসলমানদের সবচেয়ে বেশী কোরবানী পেশ করতে হয়েছে রাজনীতির ময়দানের আবর্জনা সরাতে। সে সমাজেও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের প্রতিরোধের পথে বড় বাধা রূপে কাজ করছিল আবু লাহাব, আবু জেহলের মত দুর্বৃত্ত নেতারা। এসব দুর্বৃত্তদের সরাতে যত লড়াই ও রক্তক্ষয় হয়েছে সমাজে নামায-রোয়া, হজ্ব-যাকাত বা অন্য কোন বিধান প্রতিষ্ঠা করতে তা হয়নি। মুসলমানের বাঁচার মধ্যে যেমন লক্ষ্য থাকে, তেমনি লক্ষ্য থাকে প্রতিটি কর্মের মধ্যেও। ইসলামী পরিভাষায় সেটিই হল নিয়ত। আর সে নিয়তের কারণেই মুসলমানের প্রতিটি কর্ম -তা যত ক্ষুদ্রই হোক- ইবাদতে পরিণত হয়।

কিন্তু কথা হল বাংলাদেশের রাজনীতির সে লক্ষ্যটি কি? রাজনীতির মূল ইস্যু বা এজেন্ডা কি শুধু সরকার পরিবর্তন? এটি কি নিছক নির্বাচন? লক্ষ্য কি শুধু রাস্তাঘাট, অফিস-আদালত ও কলকারাখানা নির্মান? অথবা পণ্য বা মানব রপ্তানীতে বৃদ্ধি? বাংলাদেশে এ অবধি নির্বাচন ও সে সাথে সরকার পরিবর্তন হয়েছে বহুবার। নানা দল নানা এজেন্ডা নিয়ে ক্ষমতায় গেছে। কিন্তু দেশ কতটুকু সামনে এগিয়েছে? জনগণের জীবনে উচ্চতর মানবিক মূল্যবোধই বা কতটুকু প্রতিষ্ঠা পেয়েছে? তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো এ জন্য দরিদ্র নয় যে, সেখানে সম্পদের অভাব। বরং দারিদ্র্যের কারণ, সে সব প্রাকৃতিক সম্পদে তারা অতি কমই মূল্য সংযোজন করতে পারে। তারা যেমন ব্যর্থ নিজেদের মূল্য বাড়াতে, তেমনি ব্যর্থ খনিজ বা প্রাকৃতিক সম্পদের মূল্য বাড়াতে। এটিই তাদের সবচেয়ে বড় অক্ষমতা। একটি দেশের প্রাচুর্য্য তো বাড়ে সে দেশে মানব ও প্রাকৃতিক সম্পদের উপর কতটুকু মূল্য সংযোজন হল তার উপর। পাট, তূলা, চা, কফি, তেল, গ্যাস, তামা, কপার, ইউরেনিয়াম, বক্সাইট, টিনের ন্যায় অধিকাংশ কৃষি ও খনিজ সম্পদের উৎস হল তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো। কিন্তু এ সম্পদের কারণে বেশী লাভবান হয়েছে পাশ্চাত্য। কারণ এসব কৃষি ও খণিজ সম্পদের উপর সিংহভাগ মূল্য সংযোজন হয়েছে পাশ্চাত্য দেশগুলির কারখানায়। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো রয়ে গেছে কাঁচামাল বা খনিজ সম্পদের জোগানদার রূপে। পাশ্চাত্য দেশের কোম্পানীগুলোর কারণেই আফ্রিকার কোকো সারা দুনিয়ার মানুষের কাছে চকলেট হিসাবে প্রচুর সমাদার পাচ্ছে। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ নানা ব্রান্ডের চকলেটের পিছনে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচও করছে। এভাবে চকলেট বিক্রি করে ধনী হয়েছে পাশ্চাত্য কোম্পানীগুলো। অথচ প্রচন্ড অনাহারে ভুগছে কোকা উৎপাদনকারি আফ্রিকার দেশগুলো। একই ভাবে তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারি দেশগুলোর চেয়ে বেশী অর্থ কামিয়েছে পাশ্চাত্যের তেল ও গ্রাস কোম্পানীগুলি। মূল্য সংযোজনের ফায়দা তো এটাই। তাই যারা ব্যবসা বুঝে তারা একত্রে হলে চেষ্টা করে কারখানা খোলার। কারণ, কারখানা হল মূল্য সংযোজনের অংগন।

তবে জাতি সবচেয়ে বেশী লাভবান হয় যখন মূল্য সংযোজন হয় মানুষের উপর। কারণ, মানুষই হলো আল্লাহতায়ালার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। তেলের বা সোনার মূল্য হাজারো গুণ বাড়লেও সেটি কি গুণবান ও সৃষ্টিশীল মানুষের সমান হতে পারে? মানুষের উপর মূল্য সংযোজন হলে সে মানুষটি মহৎ গুণে বেড়ে উঠে। সে মানুষটির সামর্থ্য বাড়ে প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদের উপর মূল্য সংযোজনে। এজন্যই শিল্পোন্নত দেশগুলো শিক্ষাখাতে তথা মানব সম্পদের উন্নয়নে এত ব্যয় করে। মানুষের মূল্য বৃদ্ধি বা গুণ বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা বা উদ্যোগ নেওয়া এজন্যই ইসলামে এত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামে মসজিদ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার সওয়াব এজন্যই এতো বেশী। কারণ এ প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজই হল মানুষের উপর মূল্য সংযোজন করা তথা তাদেরকে মহত্তর গুণ নিয়ে বেড়ে উঠায় সহায়তা দেওয়া। তাদের কারণে সমাজ ও রাষ্ট্র তখন বহুগুণে সমৃদ্ধ হয়। এমন রাষ্ট্রের বুকেই নির্মিত হয় উচ্চতর সভ্যতা। মানুষ গড়ার এ মহান কাজটিই এ জন্যই তো মুসলিম রাজনীতির মূল এজেন্ডা। তখন রাজনীতির মূল লক্ষ্য হয়, মানুষকে জান্নাতের যোগ্য করে গড়ে তোলা। এমন মানুষের গুণেই আল্লাহর সাহায্য ও শান্তি নেমে আসে ধরাপৃষ্টে। নবীজী (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামের আমলে তো সেটিই হযেছিল। ইসলামে এমন রাজনীতি তাই গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। কিন্তু বাংলাদেশে সে কাজটিই হয়নি। এজন্যই দেশটি বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পেয়েছে তলাহীন ভিক্ষার ঝুলি ও সর্বাধিক দূর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্র রূপে।

যে কোন দেশে রাজনীতির মূল ইস্যুটি নির্ধারিত হয় সে দেশের জনগণের ধর্ম, জীবনদর্শন, মূল্যবোধ, সংস্কৃতি এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রয়োজন থেকে। তাই পূঁজিবাদী ও সমাজবাদী দেশের রাজনৈতিক এজেন্ডা এক নয়। তেমনি এক নয় মুসলিম ও অমুসলিম দেশের রাজনৈতিক এজেন্ডা। ব্যক্তির অন্তরে বা চেতনায় লালিত আদর্শ বা বিশ্বাস শুধু তার ধর্ম-কর্ম, ইবাদত-বন্দেগী, খাদ্য-পানীয়ের ব্যাপারেই নিয়ম বেঁধে দেয় না, নির্ধারিত করে দেয় তার জীবনের মূল কাজটিও। তা থেকেই নির্ধারিত হয় মুসলমানের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক এজেন্ডা। তাই আরবের কাফেরদের এজেন্ডা ও মুসলমানদের এজেন্ডা এক ছিল না। মুসলমান যখন বিজয়ী হয় তখন সমাজ থেকে শুধু মূর্তিগুলোই অপসারিত হয়নি। অপসারিত হয়েছিল তাদের প্রচলিত সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক রীতিনীতি ও মূল্যবোধ। অপসারিত হয়েছিল ইসলাম বিরোধী নেতৃত্ব। কারণ, একটি মুসলিম সমাজ কখনই অমুসলিম বা সেকুলার মূল্যবোধ ও নেতৃত্বের অধীনে গড়ে উঠতে পারে না। এবং এগুতে পারে না কাঙ্খিত লক্ষ্যে। যেমন প্লেনের ইঞ্জিন নিয়ে কোন রেল গাড়ী সামনে এগুতে পারে না। রাজনীতি যেমন জাতির ইঞ্জিন, তেমনি সে ইঞ্জিনের জ্বালানী শক্তি হল উচ্চতরদর্শন বা ফিলোসফি। মুসলমানদের ক্ষেত্রে সেটি হল ইসলাম তথা কোরআনী দর্শন।

যে রাজনীতিতে উচ্চতর দর্শন নেই, সে রাজনীতিতে গতি সৃষ্টি হয় না উচ্চতর লক্ষ্যে চলার। তখন নেমে আসে জগদ্দল পাথরের ন্যায় স্থবিরতা। স্রোতহীন জলাশয়ে যেমন মশামাছি বাড়ে, তেমনি দর্শন-শূণ্য স্থবির রাজনীতিতে বৃদ্ধি ঘটে দর্শনশুন্য দুর্বৃ্ত্ত মানব-কীটদের। সেটিরই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো বাংলাদেশের রাজনীতি। নবীজী(সাঃ)র আমলে আরবের স্থবির ও পাপাচার-পূর্ণ জীবনে মানবিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে যে প্রচন্ড বিপ্লব ও গতি সৃষ্টি হয়েছিল তার কারণ, রাজনীতির ইঞ্জিন তখন আল্লাহপ্রদত্ত দর্শন পেয়েছিল। চালকের পদে বসেছিলেন মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মানবগণ। অথচ সে প্রচন্ড শক্তি থেকে দারুন ভাবে বঞ্চিত হচ্ছে বাংলাদেশের আজকের রাজনীতি। কারণ, বাংলাদেশের ড্রাইভিং সিটে বসে চোর-ডাকাত ও ভোট-ডাকাতগণ। দেশটির রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতির অঙ্গনে ইসলাম ও আল্লাহর নাম নেওয়া তাদের কাছে সাম্প্রদায়ীকতা। তারা দাবী তুলছে ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধ করার। স্বৈরাচারি আওয়ামী-বাকশালী আমলে নিষিদ্ধ হয়েছিল ইসলামের নামে রাজনীতির সে মৌলিক নাগরিক অধিকার। সরকারি মহলে নিষিদ্ধ হয়েছিল বিসমিল্লাহ। অপসারিত হয়েছিল সরকারি প্রতিষ্ঠানের মনোগ্রোম থেকে কোরআন ও আল্লাহর নাম। এভাবে দর্শনশূণ্য হয়েছিল মুজিবামলের রাজনীতি। এবং প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল মুজিব-বন্দনা। ফল দাড়িয়েছিল, সবচেযে বড় ও দ্রুত ধ্বংস নেমেছিল নীতি-নৈতিকতা, আইন-শৃঙ্খলা ও অর্থনীতিতে। সৃষ্টি হয়েছিল ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। প্রাণ হারিয়েছিল লক্ষ লক্ষ মানুষই শুধু নয়, দেশের স্বাধীনতা, মানবতা ও ণ্যূনতম মানবিক অধিকার। তখন ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের পায়ের তলায় পিষ্ট হযেছিল দেশের সার্বভৌমত্ব। গণতন্ত্র ও মানবতার সে কবরের উপর প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল মুজিবের একদলীয় বাকশালী স্বৈরাচার।

দাবী উঠেছে, ইসলামের নামে রাজনীতি নিষিদ্ধ করার। কথা হল, এ দাবী উঠানোর হেতু কি? কারণ একটিই, আর তা হল বাংলাদেশকে নীচে নামানোর কাজকে আবার তীব্রতর করা। ইসলামী দর্শন, আইন ও মূল্যবোধের পরাজয়ের মধ্যেই তাদের আনন্দ। রাজনীতির ইঞ্জিনকে পুণরায় দর্শন-শূণ্য করাই তাদের মূল লক্ষ্য, তাদের প্রভু ভারতও সেটিই চায়। সত্তরের দশকেও তারা সেটিই করেছিল। দাবীটিও এসেছে সেই একই আওয়ামী বাকশালীদের পক্ষ থেকে। এর কারণ, তাদের প্রচন্ড ইসলামি ভীতি। তাদের ভয়ের কারণ, বাংলাদেশের ৯০%ভাগ মানুষ মুসলমান। দেশটিতে প্রবল ভাবে বাড়ছে ইসলামী জ্ঞানচর্চা এবং সে সাথে প্রবলতর হচ্ছে ইসলামী চেতনা। ফলে বাড়ছে ইসলামপন্থিদের রাজনৈতিক শক্তি। আর ইসলামের বিজয় মানেই শরিয়তী আইনের প্রতিষ্ঠা। ইসলামের বিজয় মানে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতিতে ইসলামী বিধানের পূর্ণ-প্রয়োগ এবং সেকুলার মূল্যবোধ ও রীতি-নীতির বিলুপ্তি। তখন রাজনৈতিক পরাজয় ও বিলুপ্তি ঘটবে দেশের ইসলাম বিরোধী শক্তির রাজনীতির। আর এ কারণেই বাংলাদেশের আওয়ামী-বাকশালী সেকুলার মহলটির মনে ঢুকেছে প্রবল ইসলাম ভীতি। নিজেদের জন্য তেমন একটি পরাজয় মেনে নিতে রাজী নয়। তাই সে চুড়ান্ত লড়াইটি শুরু হওয়ার আগেই ইসলামের নামে দেশের ইসলামপন্থি জনগণকে সংগঠিত হওয়াটিকেই নিষিদ্ধ করতে চায়। আর সংগঠিত না হতে পারলে ইসলামপন্থিগণ তখন সে লড়াই বা করবে কি করে? একাকী কারো পক্ষেই বড় কিছু করা সম্ভব নয়। রাজনীতির ক্ষেত্রে তো নয়ই। আওয়ামী-বাকশালী সেকুলারদের পরাজয় করাটি তখন তাদের সাধ্য এবং সে সাথে স্বপ্নেরও বাইরে থেকে যাবে। আর এভাবে সহজেই নিশ্চিত হবে দেশের রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানে তাদের বর্তমানের বিজয়ী অবস্থাকে ধরে রাখা। ইসলামপন্থিগণ যাতে শক্তি সঞ্চয় করতে পারে সে জন্য এখন থেকেই তাদের বিরুদ্ধে নির্মূলের হুমকী দেয়। এমন একটি রাজনৈতিক লক্ষ্য কাফের বা ইসলামের চিহ্নিত দূষমনদের জন্য অস্বাভাবিক নয়, নতুনও নয়। কিন্তু প্রশ্ন হল, যে দেশের শতকরা ৯০ ভাগ মুসলমান সে দেশে এমন রাজনীতি বাজার পায় কি করে? বাংলাদেশের রাজনীতির এটি কি কম ভ্রষ্টতা? ২৫/১০/০৮

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *