একাত্তরের যুদ্ধ কেন স্বাধীনতার যুদ্ধ নয় বরং ফিতনা; এবং ফিতনা কেন মানব হত্যার চেয়েও গুরুতর অপরাধ?
- Posted by Dr Firoz Mahboob Kamal
- Posted on December 16, 2025
- Bangla Articles, Bangla বাংলা, বাংলাদেশ
- No Comments.
ফিরোজ মাহবুব কামাল
ফিতনার সংজ্ঞা ও নাশকতা
প্রশ্ন হলো, ফিতনা কি? ফিতনার নাশকতাই বা কি? এ বিষয় দুটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ। একজন মুসলিমকে শুধু নামাজ-রোজা ও হজ্জ-যাকাত পালন করলে চলে না; তাকে অবশ্যই ফরজ-ওয়াজেব, হালাল-হারাম, কুফুরি-শিরক এবং ফিতনা বিষয়েও অবশ্যই জানতে হয়। নামাজ-রোজা যেমন ফরজ, তেমনি ফরজ হলো এ বিষয়গুলির উপর জ্ঞানার্জন। এ বিষয়গুলি জানা এতোই গুরুত্বপূর্ণ যে, সর্বজ্ঞানী মহান আল্লাহ তায়ালা নামাজ-রোজা ফরজ করার ১১ বছরে আগে এসব বিষয়ে জ্ঞানার্জনকে ফরজ করেছিলেন। নামাজ-রোজা, হজ্জ-যাকাত ও দোয়া-দরুদ পালন করেও অসংখ্য মানুষ জাহান্নামে যাবে, এবং সেটি অতি মৌলিক বিষয়ে অজ্ঞতার কারণে। স্মরণে রাখতে হবে, আব্দুল্লাহ বিন উবাইয়ের মত কয়েক শত মানুষ নবীজী (সা:)’র পিছনে নামাজ পড়ে ও রোজা পালন করেও মুনাফিক হয়েছে এবং জাহান্নামের যাত্রী হয়েছে। কেন সেটি হলো সেটি জানা অতি গুরুত্বপূর্ণ।এবং সেটি এ যুগের আব্দুল্লাহ বিন উবাই হওয়া থেকে বাঁচার প্রয়োজনে।
খাদ্যের অভাবে দৈহিক মৃত্যু ঘটে, আর জ্ঞানের অভাবে মৃত্যু ঘটে বিবেক ও ঈমানের। তাই অনাহার থেকে বাঁচা যেমন ফরজ, তেমনি ফরজ হলো অজ্ঞতা তথা জাহিলিয়াত থেকে বাঁচা। কুর’আনী জ্ঞানে অজ্ঞ ব্যক্তিরাই হলো এ পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধি; তাদের জীবনে সবচেয়ে বড় বিকলাঙ্গতা হলো, তার অক্ষম সিরাতাল মুস্তাকীম তথা সঠিক পথ চেনায় এবং সে পথে চলায়। নানা ভ্রান্ত ধর্ম, ভ্রান্ত মত ও ভ্রান্ত পথের ভিড়ে তারা পথ হারিয়ে শয়তানের সৈনিক হয় এবং জাহান্নামে পৌঁছে। ভারতে যে শত কোটির অধিক মানুষ মূর্তিপূজা, গরুপূজা ও লিঙ্গ পূজা নিয়ে বাঁচে বা গোবরকে পবিত্র মনে করে -তাদের সবাই কি নিরক্ষর? উ্চচ শিক্ষিত হয়েও তারা পথ হারিয়েছে।অভাব এখানে কুর’আনী জ্ঞানের। তেমনি অজ্ঞতার কারণে বাংলাদেশেও কোটি কোটি মানুষ পথ হারিয়েছে এবং ফিতনায় লিপ্ত হয়েছে। ফলে রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত ও ধর্মব্যবসায়ীগণ এদেশে বিপুল সংখ্যায় অনুসারী পায় ।
ফিতনা একটি আরবী শব্দ; শব্দটির উৎপত্তি আরবী ক্রিয়াপদ ফাতানা থেকে। “ফাতানা” শব্দের অভিধানিক অর্থ: কাউকে বিদ্রোহে উস্কানি দেয়া, ক্ষতিকর কিছুতে প্রলুব্ধ করা, প্রতারণা করা বা কাউকে পরীক্ষার মধ্যে ফেলা। এবং “ফিতনা” শব্দটির অর্থ হলো: বিদ্রোহ, গৃহযুদ্ধ, বিশৃঙ্খলা, পরীক্ষা, মতবিরোধ, বেঈমানী, অধর্ম, পাপ, পাগলামী, দুশ্চরিত্র, প্রতারণা, প্রলুব্ধকরণ। ফিতনা এক বচন, বহু বচনে ফিতান। -(সূত্র: Arabic English Dictionary for Advanced Learners by J. G. Hava)।
কোন ব্যক্তিকে হত্যা করলে সে প্রাণ হারায়। কিন্তু খুনি তাকে জাহান্নামে পাঠায় না। সেটি খুনির নিয়তও নয়। জাহান্নামে নেয়ার কাজটি করে শয়তান। এবং সেটিই হলো শয়তানের মিশন। আর ফিতনা হলো সে কাজে শয়তানের প্রধান হাতিয়ার। ফিতনার সাহায্যে শয়তান মানুষকে প্রলুব্ধ ও প্রতারণা করে, পাপের পথে নেয় এবং অনুগত সৈনিকে পরিণত করে। মানুষ তখন নিজেই দৃশ্যমান শয়তানে পরিণত হয় এবং অন্যকে জাহান্নামে নেয়ার চেষ্টায় লেগে যায়। বস্তুত ফিতনা হলো এমন কিছু ভাবনা, তাড়না, দর্শন, মতবাদ, ফিরকা, রাজনীতি, বুদ্ধিবৃ্ত্তি, কলহ-বিবাদ -যা ব্যক্তির চেতনা থেকে মহান আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডাকে ভুলিয়ে দেয় এবং বাঁচতে বাধ্য করে শয়তানের এজেন্ডা নিয়ে। ফিতনা অসম্ভব করে পূর্ণ ইসলাম পালন এবং বিপন্ন করে মুসলিম উম্মাহর ভূ-রাজনৈতিক অখণ্ডতা, সংহতি, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা।
একাত্তরের যুদ্ধ কেন ফিতনা?
মানব জীবনে নানা কারণে যুদ্ধ আসে। প্রতিটি পানাহারকে যেমন হালাল হতে হয়, তেমনি প্রতিটি যুদ্ধকেও হালাল হতে হয়। এবং প্রতিটি হালাল যুদ্ধই হলো জিহাদ। আর যে যুদ্ধ জিহাদ নয়, সেটিই হলো হারাম যুদ্ধ। আর প্রতিটি হারাম যুদ্ধটিই হলো ফিতনা। ঈমানদারের দায়িত্ব হলো, সে ফিতনা থেকে বাঁচা। হারাম যুদ্ধগুলি হয় ভাষা, বর্ণ, অঞ্চল বা গোত্রভিত্তিক স্বার্থকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে; এখানে ইসলামকে বিজয়ী করা বা মুসলিম উম্মাহর সংহতি, শক্তি ও স্বাধীনতা বৃদ্ধির কোন উদ্দেশ্য নয়। এসব যুদ্ধে নাশকতা হয় মুসলিম উম্মাহর ভূগোল ও সংহতির বিরুদ্ধে – যেমন একাত্তরের যুদ্ধে নাশকতা হয়েছিল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। ১৯৭১’য়ের বাঙালি জাতীয়তাবাদী যুদ্ধের ন্যায় একটি হারাম যুদ্ধকে যারা মহান মুক্তিযুদ্ধ বলে, বুঝতে হবে তারা ভেসে গেছে সেক্যুলারিজম, হিন্দুত্ববাদ ও জাতীয়তাবাদের স্রোতে। তারা যদি নামাজী ও রোজাদার হয়, তবে বুঝতে হবে তারা হলো এ যুগের আব্দুল্লাহ বিন উবাই। আব্দুল্লাহ বিন উবাই নবীজী (সা:)’র পিছনে নামাজ পড়ে এবং রোজা রেখেও ইসলামের মূল এজেন্ডাকে বুঝতে পারিনি। ফলে একাত্ম হতে পারিনি সে এজেন্ডার সাথে। আব্দুল্লাহ বিন উবাই এজন্যই ওহুদের যুদ্ধে শামিল হয়নি। আজকের আব্দুল্লাহ বিন উবাইগণও নামাজ-রোজা পালন করেও বুঝতে পারিনি ইসলামের ভূ-রাজনৈতিক এজেন্ডাকে।
বুঝতে হবে, মুসলিম হওয়ার অর্থ শুধু আল্লাহ তায়ালার উপর বিশ্বাস করা নয়। তাঁর উপর বিশ্বাস তো মক্কার সেসব পৌত্তলিক কাফিরগণও করতো -যারা নিজ সন্তানের নাম আব্দুল্লাহ ও আব্দুর রহমান রাখতো। বরং মুসলিম হওয়ার অর্থ মহান রব’য়ের এজেন্ডার সাথে পূর্ণ ভাবে একাত্ম হওয়া এবং সেটিকে বিজয়ী করা। তাই শুধু নামাজ-রোজা, হজ্জ-যাকাত ও দোয়া-দরুদ পালন করলে মহান আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডাকে বিজয়ী করার কাজটি হয় না -আরো বহুদূর এগিয়ে যেতে হং। মহান রব’য়ের এজেন্ডাকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে নবীজী (সা:) প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন বাংলাদেশের চেয়ে ২০ গুণ বৃহৎ একটি রাষ্ট্রের। সাহাবাগণ সেটিকে আরো কয়েক গুণ বাড়িয়েছিলেন। তাই মুসলিম হতে হলে ভাষা, বর্ণ ও অঞ্চল ভিত্তিক পরিচয়ের উর্দ্ধে উঠে নানা ভাষা ও নানা অঞ্চলের মুসলিমদের সাথে নিয়ে একতাবদ্ধ এক বৃহৎ ইসলামী রাষ্ট্র নির্মানের তাড়না ও জিহাদ থাকতে হয়। নইলে গাদ্দারী হয় মহান আল্লাহর এজেন্ডা ও নবীজী (সা:)’র সূন্নতের সাথে। বাঙালি মুসলিমের মাঝে সেরূপ ঈমানী তাড়না দেখা গেছে ১৯৪৭ সালে। অথচ বিপুল সংখ্যক বাঙালি মুসলিমের মাঝে প্রচণ্ড বেঈমানী দেখা গেছে ১৯৭১’য়ে পাকিস্তান ভাঙার যুদ্ধে। পৌত্তলিক ভারতের এজেন্ডাই তাদের এজেন্ডায় পরিণত হয়।
বুঝতে হবে, পৃথিবী পৃষ্ঠের প্রতিটি ভূ-খন্ডের সৃষ্টিকর্তা এবং মালিক হলেন মহান আল্লাহতায়ালা। তাঁর প্রতিটি ভূ-খন্ডই নির্দোষ। দোষী হলো সে ভূ-খণ্ডের উপর দখলদার দুর্বৃত্ত জালেম শাসক। তাই ফরজ জিহাদ হলো সে অধিকৃত ভূমি থেকে জালেম শাসককে তাড়ানো ও সেখানে সুশাসনের প্রতিষ্ঠা দেয়া। এবং হারাম হলো সে ভূ-খণ্ডকে খণ্ডিত করা। কারণ তাতে, ক্ষতি হয় আল্লাহ তায়ালার জমিনের। ঈমানদারকে যেমন প্রতিটি হারাম খাদ্য থেকে বাঁচতে হয়, তেমনি বাঁচতে হয় প্রতিটি হারাম যুদ্ধ থেকেও। আর প্রতিটি হারাম থেকে বাঁচার প্রতিক্ষণের তাড়নাকেই বলা হয় মুমিনের তাকওয়া। বুঝতে হবে, মুমিনের জিহাদ মুসলিম উম্মাহর বিজয় আনে এবং নিরাপত্তা দেয় মুসলিম নর-নারীর জান-মাল ও ইজ্জত-আবরুর। ফিতনার কাজ, সে জিহাদ থেকে মুসলিমদের দূরে রাখা।
অথচ ১৯৭১’য়ে পাকিস্তানের বিশাল ভূ-খণ্ডকে খণ্ডিত করে তার এক খণ্ডে মুজিবের নয় এক নৃশংস ফ্যাসিস্ট দুর্বৃত্তকে শাসক রূপ বসানো হয়েছিল। সে অপরাধী মুজিব বাংলাদেশকে ভারতের গোলাম রাষ্ট্র বানিয়েছে, গণতন্ত্রের কবর দিয়েছে এবং হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছে। ১৯৭৪’য়ে দুর্ভিক্ষ জন্ম দিয়ে ১৫ লাখ বাংলাদেশীর জীবনে মৃত্যু ডেকে এনেছে। এটি ছিল মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে বিশাল নাশকতা; এরূপ হারাম অপরাধ কর্মকে কি কখনো মহান স্বাধীনতার যুদ্ধ হতে পারে? এরূপ এক হারাম যুদ্ধকে মহান বললে ও তা নিয়ে উৎসব করলে কি ঈমান থাকে? আল্লাহতায়ালা যে বিভক্তিকে পছন্দ করেন না এবং হারাম করেছেন -তা নিয়ে কি কখনো উৎসব হতে পারে? একমাত্র চেতনার তীব্র দূষণেই সেটি সম্ভব। অথচ পরিতাপের বিষয় হলো, বহু ইসলামপন্থী নেতা-কর্মীও এখন একাত্তরের হারাম যুদ্ধকে মহান মুক্তিযুদ্ধ বলে! এমন কি জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান আমির ডা. শফিকুর রহমানও সে কথা বলেন। অথচ একাত্তরে জামায়াতে ইসলামী ও নেজামে ইসলামীসহ প্রতিটি ইসলামী দল, সকল মুফতি, সকল পীর ও সকল হাক্কানী আলেম পাকিস্তান ভাঙাকে হারাম বলেছেন। এবং বহু হাজার ইসলামপন্থী নেতা-কর্মী ও আলেম পাকিস্তানের পক্ষ নেয়াতে শহীদ হয়েছেন। জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান নেতারা কি তবে তাদের পূর্বসূরীদের আদর্শ থেকে দূরে সরার পথকে বেছে নিয়েছেন?
১৯১৭ সালের ফিতনা এবং ১৯৭১’য়ের ফিতনা
মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে ফিতনার সবচেয়ে বড় নাশকতাটি ঘটে উম্মাহর বিভক্তি ও মুসলিম ভূ-খণ্ডের খণ্ডিত করার মধ্য দিয়ে। ১৯১৭ সালে সৃষ্ট ফিতনায় খণ্ডিত হয় আরব বিশ্ব এবং ১৯৭১ সালে খণ্ডিত হয় পাকিস্তান। ইসলামের শত্রুপক্ষ সব সময়ই ফিতনা ন্যায় গুরুতর অপরাধকে মুক্তিযুদ্ধ বা স্বাধীনতা যুদ্ধ বলে মহামান্বিত করে -যেমন কবরপূজরী ও পীরপূজারী মুশিরকগণও নিজেদের শিরকের কুফুরিকে ধর্ম কর্ম বলে। ইসলাম থেকে দূরে সরা জাতীয়তাবাদী ও আঞ্চলিকতাবাদী ফ্যাসিস্ট, সেক্যুলারিস্ট ও বামপন্থীগণ সব সময়ই কাজ করে ফিতনার নায়ক রূপে। একাত্তরের যুদ্ধে বাঙালি ফেতনা সৃষ্টিকারীদের সাহায্য করেছিল এবং তাদের বিজয়ী করতে সর্বাত্মক যুদ্ধ করেছিল ভারত। আর ১৯০১৭ সালে আরব ফিতনা সৃষ্টিকারীদের সাহায্য করেছিল ব্রিটিশ, ফরাসী ও অন্যান্য ইউরোপীয়গণ। মুসলিমদের মাঝে ফিতনার শিখা দেখা দিলে কাফির শক্তি তাতে পেট্রোল ঢালে।
মুসলিম বিশ্ব আজ ৫০টির বেশি টুকরোয় বিভক্ত। এ বিভক্তির মূল কারণ হলো নানা ভাষা, নানা অঞ্চল, নানা ফিরকা ও নানা মতবাদভিত্তিক ফিতনার বিজয়। ১৯১৭ সালের ফেতনা কালে আরবগণ মক্কা-মদিনার পবিত্র ভূমিতে তুর্কিদের হত্যা করেছে। উসমানিয়া খলিফা বহু অর্থ ব্যয়ে দামেস্ক থেকে জেরুজালেম এবং জেরুজালেম থেকে মদিনা অবধি ১৩০০ কিলো মিটারের যে দীর্ঘ রেল লাইন বসিয়েছিল -সেটিকেও তারা ইংরেজদের ইশারায় উপড়িয়ে ফেলেছিল। ফিতনার নায়কগণ যে কতটা আত্মঘাতী -এ হলো তার নমুনা। তারা খেলাফত ভেঙেছে এবং অখণ্ড আরব ভূমিকে ২২ টুকরোয় বিভক্ত করেছে। সে আত্মনাশী ফিতনাকে তারা মহান স্বাধীনতার যুদ্ধ বলে এবং সে হারাম কর্ম নিয়ে প্রতি বছর উৎসব করে। ১৯৭১’য়ের ফিতনা সৃষ্টিকারীরা কয়েক লক্ষ বিহারীকে তারা হত্যা করেছে এবং তাদের বাড়ি-ঘর ও দোকান-পাটকে দখলে নিয়েছে। এসব ছিল জঘন্য অপরাধ। এবং পাকিস্তান ভাঙার এ অপরাধমূলক যুদ্ধকে তারা মহান মুক্তিযুদ্ধ বলে। কথা হলো, যে বিভক্তিকে মহান আল্লাহ তায়ালা হারাম করলেন, তা নিয়ে উৎসব করলে একমাত্র পৌত্তলিক কাফির শিবিরেই আনন্দ বাড়ে। বাঙালি মুসলিমগণ সে পথটিকেই বেছে নিয়েছে।
কোন দেশে ফেতনা শুরু হলে সে দেশে অসম্ভব হয় আল্লাহ তায়ালার পথে পূর্ণ ভাবে চলা এবং তাঁর দ্বীনকে বিজয়ী করা। তখন জনগণের মাঝে আসে বিভক্তি, বিশৃঙ্খলা, পথভ্রষ্টতা এবং ভাতৃঘাতী সংঘাত। তখন ভাষা, বর্ণ, গোত্র বা অঞ্চল ভিত্তিক এজেন্ডাকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হয়। ফিতনার পরিণত হলো: দেশ পরাজিত ও পরাধীন হয় শত্রুশক্তির হাতে। জাতীয়তাবাদ, বর্ণবাদ, গোত্রবাদ, আঞ্চলিকতাবাদের ন্যায় মতবাদগুলি সব সময়ই ফেতনা সৃষ্টির হাতিয়ার রূপে কাজ করে। একটি দেশে মুসলিমদের মাঝে বিভক্তি, ইসলামের পরাজয় এবং শত্রু শক্তির বিজয় দেখে নিশ্চিত বলা যায়, সেদেশে বিজয়টি ফিতনার নায়কদের। কোন দেশে ফিতনা বিজয় পেলে সেখানে নিষিদ্ধ হয় জিহাদ। ফ্যাসিস্ট হাসিনার শাসনামলে জিহাদ সংগঠিত করা দূরে থাক, জিহাদ বিষয়ক পুস্তক পাঠ ও জিহাদের উপর ওয়াজ অপরাধ গণ্য হত।
আরব বিশ্ব অখণ্ড থাকলে সেখানে জন্ম নিত ৪০ কোটি জনসংখ্যার এক বিশাল রাষ্ট্র। অর্থবল ও ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের কারণে সে রাষ্ট্রটি সহজেই বিশ্বশক্তিতে পরিণত হতো। তখন প্রতিষ্ঠা পেত না ইসরাইল; এবং গণহত্যা ও গোলামীর শিকার হতো না ফিলিস্তিনীগণ। একই ভাবে ১৯৭১ সালে বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান তার অখণ্ডতা নিয়ে বেঁচে থাকলে ৪৪ কোটি মানুষের বিশাল সে দেশটি হতো চীন ও ভারতের পর তৃতীয় বৃহত্তম পারমাণবিক শক্তি। তখন একটি মুসলিম ন্যাটো গড়ে তোলায় ক্ষেত্রে পাকিস্তান একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারতো। কিন্তু শয়তান ও তার পৌত্তলিক খলিফা ভারত তা চায়নি। এবং চায়নি শেখ মুজিবের ন্যায় ভারতের এজেন্ট ও তার অনুসারী বাঙালি ফ্যাসিস্ট, সেক্যুলারিস্ট, কম্যুনিস্ট ও হিন্দুত্ববাদীগণ।
ফিতনা কেন হত্যার চেয়েও গুরুতর অপরাধ?
মহান আল্লাহতায়ালার মূল এজেন্ডা হলো মানুষকে জান্নাতে নেয়া। সে এজেন্ডাকে সফল করতেই তিনি লক্ষাধিক নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন। নাযিল করেছেন অনেকগুলি আসমানী কিতাব। সে লক্ষ্যে শেষ রাসূল হলেন মহান নবীজী (সা:) এবং শেষ কিতাব হলো পবিত্র কুর’আন। ইসলাম হলো তার মনোনীত একমাত্র দ্বীন। ইসলামী রাষ্ট্র হলো মানুষকে জান্নাতের জন্য তৈরী করা ও তাদেরকে জান্নাতের দিকে নেয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। সর্বজ্ঞানী মহান রব তাঁর প্রকল্পের প্রতিটি শত্রুকে চিনেন। মহান রব’য়ের মূল প্রতিপক্ষ হলো অভিশপ্ত শয়তান। সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহ তায়ালা যেমন শাশ্বত সত্য, তেমনি বাস্তবতা হলো অভিশপ্ত ইবলিস শয়তান ও তার শয়তানী প্রকল্প। তাই ইসলামকে বুঝতে হলে যেমন মহান আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডাকে অবশ্যই বুঝতে হয়, তেমনি বুঝতে হয় শয়তানের এজেন্ডাকেও। তাই পবিত্র কুর’আনে মহান আল্লাহ তায়ালা শুধু তাঁর নিজের এজেন্ডার কথাই বর্ণনা করেননি, বর্ণনা করেছেন শয়তানের এজেন্ডা ও তাঁর ফাঁদগুলির কথাও।
শয়তানের মূল এজেন্ডা হলো মানুষকে জাহান্নামে নেয়া। আর সে লক্ষ্য সাধনে শয়তানের মূল ফাঁদটি হলো ফিতনা। শয়তানকে দেখা যায়না; কিন্তু প্রতিটি জনপদে শয়তানের সে ফাঁদগুলি দেখা যায়। যারা জান্নাতে যেতে চায় তাদের জন্য জরুরি হলো মহান আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডার সাথে একাত্ম হওয়া এবং সে সাথে শয়তানের সৃষ্ট ফিতনার ফাঁদ গুলি চেনা এবং তা থেকে বাঁচা। শয়তান তার ফিতনাগুলি নানা দেশে নানা সময়ে নানা নামে হাজির করে। সে যেমন পৌত্তলিকতা বা নাস্তিকতা নিয়ে হাজির হয়, তেমনি হাজির হয় জাতীয়তাবাদ, বর্ণবাদ, গোত্রবাদ, দলবাদ, ফ্যাসিবাদ, ফিরকা ও কম্যুনিজম নিয়ে। আবার কখনো বা হাজির হয় কবর পূজা ও পীর পূজা নিয়ে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর সবগুলিই হলো শয়তানের ফাঁদ। এসব ফিতনাকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি করা হয়েছে রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধ। ১৯৭১’য়ে শয়তান বাঙালি মুসলিমদের কাছে হাজির হয় এক বিশাল ফিতনা নিয়ে। সেটিই হলো ভারতের অর্থ, অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও পরিচালনায় একাত্তরের যুদ্ধ। আর সে বিশাল ফিতানার বিশাল নাশকতায় ভেঙে যায় পৃথিবী পৃষ্ঠের সবচেয়ে বড় মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান। আর গৃহ যেমন একটি পরিবারকে আশ্রয় দেয়, রাষ্ট্র তেমনি একটি জাতিকে নিরাপদ আশ্রয় দেয়। তাই নবীজী (সা:)’র আমলে মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বেশী জান ও মালের খরচ রাষ্ট্র গড়তে। বৃহৎ রাষ্ট্রের বিকল্প নাই -সে সত্যটি ভারতীয় হিন্দুত্ববাদীরা বুঝে। তাই বাঙালি, বিহারী, গুজরাতী, মারাঠা, পাঞ্জাবী, তামিল ইত্যাদি নানা পরিচিতির ভারতীয় নিজ দেশ ভাঙতে রাজী নয়। পশ্চিম বাংলার বাঙালিদের যতই উস্কানি দেয়া হোক -তারা কখনোই ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হতে রাজী নয়। সে নসিহত দিলে তারা লাঠি নিয়ে তেড়ে আসবে। হিন্দুরা নিজ দেশের সাথে তারা কখনো গাদ্দারী করবে না। অথচ ইসলামের দেশ ভাঙা হারাম হলেও হিন্দু ধর্মে সেটি হারাম নয়। কিন্তু সে সামান্যতম দেশপ্রেম ১৯৭১’য়ে বাঙালি মুসলিমদের দেখা যায়নি। যে পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক বাঙালি ছিল সে দেশের সাথেই তারা গাদ্দারী করেছে। ভারতে এ গাদ্দারী শাস্ত্রি মৃত্যুদণ্ড। নিজেদের দেশ পাকিস্তান ভাঙতে তারা ভারতীয় কাফিরদের বন্ধু রূপে গ্রহণ করেছে ও তাদের কোলে গিয়ে উঠেছে -অথচ মহান রব কাফিরদের বন্ধু রূপে গ্রহণ করাটি সুস্পষ্ট ভাষায় সুরা আল ইমরানের ২৮ নম্বর আয়াতে এবং সুরা মুমতাহানার ১ নম্বর আয়াতে হারাম করেছেন। প্রশ্ন হলো, বাঙালি মুসলিমগণ কি পবিত্র কুর’আন পড়ে না? এসব আয়াতের বাণী কি তাদের কানে প্রবেশ করে না? কুর’আনের বাণী না বুঝলে এবং না মানলে তারা কিসের মুসলিম?
অধিকাংশ মানুষ জাহান্নামে যাবে খুন, ধর্ষণ বা চুরি-ডাকাতির জন্য নয়। বরং ফিতনার ফাঁদে আটকা পড়ায়; এবং ফিতনার নেতা, সৈনিক ও সমর্থক হওয়াতে। কারণ ফিতনায় জড়িত হওয়ার অর্থই হলো মহান আল্লাহ তায়ালার প্রতিপক্ষ হয়ে খাড়া হওয়া। তারা তখন ভোট দিয়ে, অর্থ দিয়ে, মিটিং-মিছিলে স্লোগান দিয়ে এবং রণাঙ্গণে যুদ্ধ করে মহান আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডাকে প্রতিহত করে। ১৯৭১’য়ে তো সেটিই দেখা গেছে। তখন লক্ষ লক্ষ নারী-পুরুষ এবং ছাত্র-অছাত্র বাঙালি মুসলিম আটকা পড়েছিল জাতীয়তাবাদ, সেক্যুলারিজম, হিন্দুত্ববাদ ও কম্যুনিজম নামক ফিতনার ফাঁদে। মুক্তি বাহিনীতে যোগ দিয়ে অনেকে পৌত্তলিক কাফিরদের শিবিরে গিয়ে উঠেছিল।
মহান রাব্বুল আলামীন চান মুসলিম উম্মাহর একতা, শক্তি ও বিজয়। তিনি চান মুসলিমদের জান-মাল ও ইজ্জত-আবরুর নিরাপত্তা। এজন্যই তিনি দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিমদের জন্য রহমত স্বরূপ দান করেছিলেন বিশ্বের সর্ব বৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান। শত্রুর হাত থেকে মুসলিমদের জান, মাল, ইজ্জত ও স্বাধীনতার নিরাপত্ত দিতে এমন একটি বৃহৎ রাষ্ট্রের প্রয়োজন ছিল। এমন একটি রাষ্ট্র গড়া নবীজী (সা:)’র সূন্নত। কিন্তু দেশটির জন্ম থেকেই শয়তানি শক্তির ফিতনা শুরু হয় পাকিস্তানকে খণ্ডিত করায়। বাঙালি মুসলিম ইতিহাস গড়েছে সে নিয়ামতের সাথে খেয়ানত করে। বাঙালি মুসলিমের সমগ্র ইতিহাসে এটিই হলো সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ। আরো অপরাধ হলো, সে অপরাধ কর্ম নিয়ে তারা প্রতি বছর ২৬ মার্চ ও ১৬ ডিসেম্বর এলে উৎসব করে!
পাকিস্তান ভাঙার ভারতীয় প্রকল্পের সাথে মুজিব জড়িত হয় ষাটের দশক থেকেই। ইতিহাসে সেটিই আগরতলা ষড়যন্ত্র নামে পরিচিত। মুজিবের সে ষড়যন্ত্রের সাথে ১৯৭১’য়ে জড়িত হয় বাঙালি ফ্যাসিস্ট, সেক্যুলারিস্ট, বামপন্থী ও হিন্দুত্ববাদীগণ। তাদের সম্মিলিত ষড়যন্ত্র ও যুদ্ধের ফলে পাকিস্তান খণ্ডিত হয়। বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে ভারত পরিবেষ্ঠিত এক অরক্ষিত রাষ্ট্রে। অরক্ষিত রাষ্ট্র গড়াই ছিল, ভারত সরকারের সাথে তাজুদ্দীনের ৭ দফা চুক্তির মূল কথা। সে চুক্তিতে বাংলাদেশে সামরিক বাহিনীর কোন অস্তিত্ব ছিল। বড় জোর পুলিশ ও রক্ষিবাহিনীর ন্যায় মিলিশিয়া বাহিনী রাখার অনুমতি ছিল। সেরূপ এক অরক্ষিত রাষ্ট্রের অর্থই তো পরাধীন রাষ্ট্র। বস্তুত এটিই হলো একাত্তরের মূল অর্জন। কথা হলো, যে যুদ্ধের অর্জন এক অরক্ষিত বাংলাদেশ -সে যুদ্ধকে স্বাধীনতার যুদ্ধ বলা যায় কি করে?
ANNOUNCEMENT
ওয়েব সাইটটি এখন আপডেট করা হচ্ছে। আগের লেখাগুলো নতুন ওয়েব সাইটে পুরাপুরি আনতে কয়েকদিন সময় নিবে। ধন্যবাদ।
LATEST ARTICLES
- হারাম যুদ্ধ, হালাল যুদ্ধ, একাত্তরের যুদ্ধ এবং প্রতারক মুজিব
- বাংলাদেশের জন্মের বৈধতার সংকট
- নির্বাচন হোক দুর্বৃত্তির নির্মূল ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার জিহাদ
- মার্কিনী জঙ্গলতন্ত্রের বিপদ: স্বাধীনতা বাঁচাতে হলে ভূগোল বদলাতে হবে
- স্বাধীনতা ও ইসলামী রাষ্ট্রবিপ্লবের স্বার্থে একাত্তরের বয়ানের দাফন কেন জরুরি?
বাংলা বিভাগ
ENGLISH ARTICLES
RECENT COMMENTS
- Fazlul Aziz on The Israeli Crimes, the Western Complicity and the Muslims’ Silence
- Fazlul Aziz on India: A Huge Israel in South Asia
- Fazlul Aziz on ইসলামী রাষ্ট্রের কল্যাণ এবং অনৈসালিমক রাষ্ট্রের অকল্যাণ
- Fazlul Aziz on বাংলাদেশে দুর্বৃত্তায়ন, হিন্দুত্ববাদ এবং ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ
- Fazlul Aziz on Gaza: A Showcase of West-led War Crimes and the Ethnic Cleansing
ARCHIVES
- January 2026
- December 2025
- November 2025
- October 2025
- September 2025
- August 2025
- July 2025
- June 2025
- May 2025
- April 2025
- March 2025
- February 2025
- January 2025
- December 2024
- October 2024
- September 2024
- August 2024
- July 2024
- June 2024
- May 2024
- April 2024
- March 2024
- February 2024
- January 2024
- December 2023
- November 2023
- October 2023
- September 2023
- August 2023
- July 2023
- June 2023
- May 2023
- April 2023
- March 2023
- January 2023
- December 2022
- November 2022
- October 2022
- September 2022
- August 2022
- July 2022
- June 2022
- May 2022
- April 2022
- March 2022
- February 2022
- January 2022
- November 2021
- October 2021
- September 2021
- August 2021
- July 2021
- June 2021
- May 2021
- April 2021
- March 2021
- February 2021
- January 2021
- December 2020
- November 2020
- October 2020
- April 2020
- March 2020
- February 2020
- January 2020
- December 2019
- November 2019
- October 2019
- September 2019
- August 2019
- July 2019
- June 2019
- May 2019
- April 2019
- March 2019
- February 2019
- January 2019
- December 2018
- November 2018
