ঈমানদারীর স্বরূপ ও বেঈমানীর স্বরূপ

 ফিরোজ মাহবুব কামাল

 

ব্যক্তি তার নিজেকে সঠিক চিনতে পারে

হযরত ইমাম ইবনে কাইয়্যেম (রহ:) অতি একটি জ্ঞানগর্ভ কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, “একজন মানুষ মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে কতটা প্রিয় -সেটি সে নিজেই জানতে পারে। সে জন্য তাকে দেখতে হবে, কি ধরনের কাজে সে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছে।” মহা করুণাময় আল্লাহ তায়ালার অনুমতি ছাড়া গাছের একটি মরা পাতাও ঝরে পড়ে না -এটিই হলো ঈমানদারের আকিদা। তেমনি তাঁর অনুমতি ছাড়া কোন ব্যক্তি কোন ভাল বা মন্দ কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখতে পারে না। কোন কাজে নিয়ত, প্রস্তুতি ও আত্মনিয়োগটি ব্যক্তির নিজের; কিন্তু সে কাজে সাফল্য আসে একমাত্র মহান আল্লাহ তায়ালা থেকে। সে জান্নাত বা জাহান্নাম পায় তার নিয়ত, প্রস্তুতি ও আত্মনিয়োগের জন্য; কাজে সফল হওয়ার জন্য নয়। সাফল্য বা বিজয় আসে একমাত্র মহান আল্লাহ তায়ালা থেকে। যারা ঈমানদার, তাদের বন্ধু হলেন মহান রাব্বুল আলামীন -একথাটি খোদ মহান রব’য়ের। মহান রবের নীতি হলো, তিনি কখনোই তাঁর প্রিয় বান্দাকে জাহান্নামের পথে তথা দ্বীনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও গুনাহের কাজে লিপ্ত থাকার সুযোগ ও সামর্থ্য দেন না। সে পাপ থেকে তিনি তাদেরকে নিজ করুণা দিয়ে উদ্ধার করেন এবং সিরাতুল মুস্তাকীমের উপর বহাল রাখেন। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তায়ালার ঘোষণা হলো:

 

ٱللَّهُ وَلِىُّ ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ يُخْرِجُهُم مِّنَ ٱلظُّلُمَـٰتِ إِلَى ٱلنُّورِ ۖ وَٱلَّذِينَ كَفَرُوٓا۟ أَوْلِيَآؤُهُمُ ٱلطَّـٰغُوتُ يُخْرِجُونَهُم مِّنَ ٱلنُّورِ إِلَى ٱلظُّلُمَـٰتِ ۗ أُو۟لَـٰٓئِكَ أَصْحَـٰبُ ٱلنَّارِ ۖ هُمْ فِيهَا خَـٰلِدُونَ

 

অর্থ: “যারা ঈমান এনেছে তাদের অভিভাবক হলো আল্লাহ, তাদেরকে তিনি অন্ধকার থেকে আলোতে বের করে আনেন; এবং যারা কুফুরি করলো অর্থাৎ আল্লাহকে অস্বীকার করলো তাদের অভিভাবক হলো তাগুত (তথা শয়তান ও তার অনুসারীরা), তাদেরকে তারা আলো থেকে বের করে অন্ধকারে নেয়। ঐসব লোকেরাই হলো জাহান্নামের বাসিন্দা, তারা সেখানে চিরকাল থাকবে।” –(সুরা বাকারা, আয়াত ২৫৭)। 

                             

উপরিউক্ত আয়াতে ঈমানদারদের জন্য রয়েছে বিশাল সুখবর। সেটি সুখবরটি হলো, তাদের অভিভাবক অন্য কেউ নন, খোদ সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহ তায়ালা। সে ঘোষণাটি এসেছে খোদ মহান রব’য়ের পক্ষ থেকে। তাঁর পক্ষ থেকে এ মর্মে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে, ঈমানদারদের তিনি জাহিলিয়াত তথা অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে বের করে আলোতে নিয়ে আসেন এবং তাদেরকে তিনি পথ দেখান সিরাতাল মুস্তাকীমের। অর্থাৎ অসম্ভব করেন ঈমানদারদের জন্য জাহান্নামের পথে চলা। এটিই হলো এ জীবনের চুড়ান্ত বিজয়ের পথ। তাই ঈমানদারকে চেনা যায় সিরাতাল মুস্তাকীমে চলা দেখে। ঈমানদার হওয়ার এটিই হলো সবচেয়ে বড় প্রতিদান। সুরা বাকারার উপরিউক্ত আয়াতে ভয়ানক দুঃসংবাদ রয়েছে বেঈমানদের জন্য। যারা বেঈমান, তাদের ঘাড়ের উপর চেপে বসে শয়তান। সে বেঈমানকে তখন চলতে হয় শয়তানের প্রদর্শিত জাহান্নামের পথে। তার পক্ষে অসম্ভব হয় জিহাদের পথে চলা। বেঈমান হওয়ার এটিই হলো সবচেয়ে বড় শাস্তি। সে বেঈমানি দেখা যায় শুধু মূর্তিপূজাতে নয়, বরং অশ্লিলতার সংস্কৃতি এবং জাতীয়তাবাদী, ফ্যাসিবাদী, বামধারার রাজনীতিতে। বেঈমানদের দেখা যায় মুসলিম দেশ ভাঙার যুদ্ধে। তাই ঈমানদারকে কখনোই জাতীয়তাবাদী, ফ্যাসিবাদী, রাজতন্ত্রী, সেক্যুলার ও বামধারার কুফুরি রাজনীতিতে দেখা যায় না। ঈমানদারকে দেখা যায় না মুসলিম দেশ ভাঙার রাজনীতিতে। কারণ তাদের অভিভাবক মহান রব সে রাজনীতিতে তাদের রাখেন না। এজন্যই ১৯৭১‌’য়ে কোন ইসলামী দলকে পাকিস্তান ভাঙার ভারতীয় যুদ্ধে দেখা যায়নি।

 

 

ঈমানদারের এবং বেঈমানের স্বরূপ ও প্রাপ্তি

 

ঈমানদার হওয়ার অর্থ কি শুধু মহান আল্লাহ তায়ালা, তাঁর নবী রাসূল, তাঁর নাযিলকৃত কিতাব, ফিরেশতা, আখেরাত, জান্নাত ও জাহান্নামের ন্যায় বিষয়গুলিকে বিশ্বাস করা? লক্ষ লক্ষ সূদখোর, ঘুষখোর, মিথ্যচারী, ব্যভিচারী, সেক্যুলারিস্ট, ন্যাশনালিস্ট, স্বৈরাচারী ও নৃশংস ফ্যাসিস্টও মহান আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর নবী রাসূলকে বিশ্বাস করে। বিশ্বাস করে তাঁর কিতাব, ফিরেশতাকুল, আখেরাত, জান্নাত ও জাহান্নামের উপর। প্রশ্ন হলো, এরূপ বিশ্বাসের কারণে তারা কি মহান আল্লাহ তায়ালাকে অভিভাবক রূপে পায়? তারা কি পায় তাঁর পক্ষ থেকে প্রটেকশন তথা সুরক্ষা? প্রটেকশন যে পায় না -সে প্রমাণ তো অনেক। প্রটেকশন পেলে কি তারা জাতীয়তাবাদী, ফ্যাসিবাদী, রাজতন্ত্রী ও বামপন্থী সেক্যুলার হারাম রাজনীতির নেতা কর্মী হতো? ১৯৭১’য়ে কি তারা পৌত্তলিক ভারতের কোলে গিয়ে উঠতো? যুদ্ধকালে একজন ব্যক্তিকে পৌত্তলিক শিবিরে দেখে নিশ্চিত বলা যায়, সে মুসলিম হতে পারে না। 

শুধু মহান রব ও তাঁর রাসূলের উপর বিশ্বাস করলেই কেউ ঈমানদার হয়না। ইবলিসও আল্লাহ তায়ালাকে বিশ্বাস করতো। সে বিশ্বাস তাকে মুমিন বানাতে পারিনি। বিশ্বাসের সাথে আমলও থাকতে হয়। সে অপরিহার্য আমলটি হলো, মহান আল্লাহ তায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর বিধানকে বিজয়ী করা জিহাদ। ঈমানের দাবী একজন ঘুষখোর, সূদখোর, চাঁদাবাজ প্রতারকও করতে পারে না। কিন্তু যার মধ্যে জিহাদ নাই, বুঝতে হবে তার ঈমানও নাই। এমন জিহাদশূণ্য ব্যক্তি ঈমানের দাবী করলে বুঝতে হবে সে মুনাফিক। মহান আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে ঈমানের সংজ্ঞাটি এসেছে সুরা হুজরাতের ১৫ নম্বর আয়াতে। উক্ত আয়াতে বলা হয়েছে, ঈমানের দাবীতে একমাত্র সে লোকগুলিই সত্যবাদী -যার মধ্যে আল্লাহর পথে জিহাদ আছে। যারা সে জিহাদে নাই, বুঝতে হবে তাদের ঈমানও নাই। এমন ব্যক্তির নামাজ রোজা ও হ্জ্জ-যাকাত তাকে ঈমানদার বানাতে পারেনা। ঈমানদার হওয়ার শর্ত হলো, থাকতে হয় মহান রব’য়ের এজেন্ডার সাথে একাত্ম হওয়ার সামর্থ্য, নামতে হয় সে এজেন্ডাকে বিজয়ী করার জিহাদে। মহান আল্লাহ তায়ালার সে এজেন্ডাটি হলো, “লি’ইউয’হিরাহু আলা দ্বীনি কুল্লিহি”। অর্থ: সকল ধর্ম ও সকল মতবাদের উপর ইসলামের বিজয়। জিহাদ না থাকাতে নবীজী (সা:) পিছনে প্রথম কাতারে নামাজ পড়েও আব্দুল্লাহ বিন উবাই ঈমানদার হতে পারেনি।

চুরি ডাকাতি, খুন ধর্ষণ, সূদ ঘুষ, স্বৈরাচার ফ্যাসিবাদ, রাজতন্ত্র সন্ত্রাস, ভোটডাকাতি, সেক্যুলার রাজনীতি, ধর্মব্যবসা, ওয়াজ ব্যবসা, কম্যুনিজম, সেক্যুলারিজম ও জাতীয়তাবাদ নিয়ে যারা বাঁচে -বুঝতে হবে তাদের জীবনের বড় ব্যর্থতাটি করুণাময় মহান আল্লাহ তায়ালার প্রিয় বান্দা হওয়ায়। তারা নিজেদের মুসলিম রূপে দাবী করলেও তাদের অভিভাবকত্বের দায়িত্ব মহান রব নেননি। সে দায়িত্ব নিলে, সে পেশায় তাদেরকে তিনি থাকতে দিতেন না। তাদের কর্ম, রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তি তাদেরকে প্রিয়তর করে শয়তান এবং শয়তানের পৌত্তলিক, নাস্তিক ও জালিম খলিফাদের কাছে। মহান রাব্বুল আলামীন এমন অপরাধী ব্যক্তিদের গলার রশি ঢিল করে দেন। এমন ব্যক্তিরাই দেশে দেশে শয়তানের সৈনিক হয় এবং ছুটে চলে জাহান্নামের দিকে। তারা যদি নিজেদের মুসলিম রূপে দাবী করে, বুঝতে হবে, সেটি নিছক প্রতারণা। এরাই হলো মুসলিম নামধারী মুনাফিক। মুসলিম দেশগুলি এদের হাতেই অধিকৃত। তারাই মুসলিম দেশে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকে অসম্ভব করে রেখেছে এবং বিলুপ্ত করে রেখেছে মহান আল্লাহ তায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়া আইন। মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে এরাই হলো সবচেয়ে ঘৃণিত ব্যক্তি।

অপর দিকে যে ব্যক্তির ব্যস্ততা ও তাড়না পবিত্র কুর’আন বুঝায়, মানুষের কাছে পবিত্র কুর’আনের জ্ঞান পৌঁছিয়ে দেয়ায়, বেশি বেশি নেক আমল করায় এবং আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করার জিহাদে -বুঝতে হবে তাঁর উপর বর্ষিত হচ্ছে মহান আল্লাহ তায়ালার অসীম রহমত। বুঝতে হবে মহান রব তাকে সিরাতাল মুস্তাকীমের উপর রেখেছেন। বেঈমানের বিপুল ধন সম্পদ ও বহু সন্তান-সন্ততি থাকতে পারে, কিন্তু সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামতটি সে পায়না। সর্বশ্রেষ্ঠ সে নিয়ামতটি হলো জান্নাতের পথ। ফলে বেঈমানদের ছুটতে হয় জাহান্নামের দিকে। মহান আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে সেটিই হলো তাদের জন্য প্রতিশ্রুত আযাব। এবং অন্তহীন আযাব রয়েছে জাহান্নামে।

মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় বান্দাদের এ পৃথিবী পৃষ্ঠের সবচেয়ে ইজ্জতপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্বটি দেন। সেটি হলো তাঁর সার্বভৌমত্ব, তাঁর শরিয়া এবং অন্যায়ের নির্মূল ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার পবিত্র জিহাদে সম্মানিত সৈনিকের। সে দায়িত্বপালনের জন্য তাদেরকে দেন শহীদের মর্যাদা। এ পবিত্র জিহাদে তিনি কখনোই কোন মিথ্যাবাদী, সূদখোর ঘুষখোর, মদখোর, ব্যভিচারী, জাতীয়তাবাদী, সোসালিস্ট, কম্যুনিস্ট, সেক্যুলারিস্টদের নিয়োগ দেন না। পৃথিবী পৃষ্ঠের সর্বশ্রেষ্ঠ এ কর্মের অঙ্গণে তাদের জন্য প্রবেশদ্বার তিনি বন্ধ রাখেন। জিহাদের ন্যায় সর্বশ্রেষ্ঠ এ ইবাদতে তারাও শামিল হওয়ার সুযোগ পায় না যারা ধর্মের লেবাসধারী ধর্মব্যবসায়ী প্রতারক ও মুনাফিক। 1/10/2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *