ইহুদিদের গাদ্দারীর পথে আজকের মুসলিমরা
- Posted by Dr Firoz Mahboob Kamal
- Posted on July 19, 2026
- Bangla Articles, Bangla বাংলা, মুসলিম জাহান
- No Comments.
ফিরোজ মাহবুব কামাল
বনি ইসরাইলীদের গাদ্দারী ও ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় হযরত মূসা (আ:)’র ব্যর্থতা
হযরত মূসা (আ:) ব্যর্থ হয়েছেন ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা দিতে। অথচ তাঁর উপর নাযিল হয়েছিল তাওরাত; তাতে ছিল শরিয়া বিধান। বুঝতে হবে, মহান আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে যখনই কোন আইন নাযিল হয়, তখন সেটি শুধু তেলাওয়াতের জন্য নাযিল হয়না। সেগুলি পূর্ণ প্রয়োগ করতে হয় দেশের আদালতে -যেমনটি করেছেন নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাগণ। শরিয়া প্রতিষ্ঠার কাজটি শুধু মসজিদ মাদ্রাসা নির্মাণ করলে হয় না, সে জন্য নির্মাণ করতে হয় রাষ্ট্র জুড়ে আদালতের অবকাঠামো। সে রকম বৈচারিক অবকাঠামো কখনোই কোন অনৈইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণ করতে দেয়না; সেটি নির্মাণ করতে হলে প্রতিষ্ঠা দিতে হয় ইসলামী -রাষ্ট্রের। সে বিশাল কাজে ইসলামের হাতিয়ার হলো জিহাদ। এ হাতিয়ারের প্রয়োগ করাটি প্রত্যেক ঈমানদারের উপর ফরজ। জিহাদ পালিত না হলে ইসলাম কখনোই বিজয়ের মুখ দেখে না।
কোন রাষ্ট্রে মহান আল্লাহ তায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়া বিধান কতটা প্রতিষ্ঠা পাবে -সেটি বিশাল মুসলিম জনসংখ্যা ও বিপুল সংখ্যক মসজিদ মাদ্রাসার উপর নির্ভর করেনা। বরং সেটি সম্পূর্ণ নির্ভর করে কতজন ঈমানদার জিহাদে অংশ নিল এবং ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণে কতটা সফল হলো -তার উপর। নবীজী (সা:)’য়ের আমলে জিহাদে অংশগ্রহণের হার ছিল সমগ্র মানব ইতিহাসে সর্বাধিক। পঙ্গু, অন্ধ ও অতি বৃদ্ধ ছাড়া সুস্থ ও সক্ষম মুসলিমদের মাঝে জিহাদে অংশ গ্রহনের হার ছিল শতকরা শতভাগ। অর্ধেকের বেশি সাহাবা সে জিহাদে শহীদ হয়েছিলেন। মহান আল্লাহতায়ালার এজেন্ডাকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে প্রাণদানের এটিই হলো সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ রেকর্ড। সে অভূতপূর্ব কুরবানীর কারণে তারা পেয়েছিলেন মহান রব’য়ের প্রতিশ্রুত সাহায্য; ফেরশতাগণ সেদিন সারিবদ্ধ ভাবে রণাঙ্গণে নেমে এসেছিলেন। ফলে ইসলাম সেদিন বিজয়ী হয়েছিল এবং প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল মহান আল্লাহ তায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়া। কিন্তু সে জিহাদ হযরত মূসা (আ:)’র অনুসারীদের দ্বারা পালিত হয়নি। ফলে তাদের হাতে ইসলামের বিজয় জুটেনি।
তাওরাত নাযিলের পর হযরত মূসা (আ:)কে হুকুম দেয়া হয়েছিল বনি ইসরাইলীদের সাথে নিয়ে শত্রু শক্তির হাত থেকে অধিকৃত কানানকে (আজকের ফিলিস্তিন) মুক্ত করার। তখন কানানে চলছিল এক জালেম শাসকের শাসন। তাদেরকে হুকুম দেয়া হয়েছিল, সে জালেম শাসক নির্মূল করে সেখানে তাওরাতে নাযিলকৃত শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠার। কিন্তু বনি ইসরাইলীগণ সে হুকুমের উপর আমল না করে বিদ্রোহ করেছিল। অথচ সে হুকুমের উপর আমল করলে সে আমলেই নির্মিত হতে পারতো ইসলামী রাষ্ট্র। এবং নির্মিত হতে পারতো খেলাফতে রাশেদা। তাতে বনি ইসরাইলীদের উত্থান ঘটতো বিশ্বশক্তি রূপে এবং নির্মিত হতো ইসলামী সভ্যতা। পরিতাপের বিষয় হলো, বনি ইসরাইলীগণ সে নির্দেশিত পথে যায়নি। অথচ সে সময় বনি ইসরাইলীদের যে বিশাল লোকবল ছিল তা নবীজী (সা:)’য়ের হাতে ছিল না। অথচ তারা পরিণত হয়েছে ইসলামের ব্যর্থ ছাত্রে এবং নিজ হাতে অর্জন করেছে প্রতিশ্রুত আযাব। শাস্তি স্বরূপ ফিলিস্তিনে প্রবেশ তাদের উপর ৪০ বছরের জন্য হারাম করা হয়েছিল। ফলে নানা দেশের নানা জনপদে তাদের ঘুরতে হয়েছে লাঞ্ছিত উদ্বাস্তুর বেশে। কোথাও তারা ইজ্জত ও নিরাপত্তা পায়নি। মহান রব গাদ্দারদের এভাবেই শাস্তি দিয়ে থাকেন।
লক্ষণীয় হলো, পবিত্র কুর’আনে নবীজী (সা:) নাম যতবার উল্লেখ করা হয়েছে তার চেয়ে বহুগুণ বেশি উল্লেখ করা হয়েছে হযরত মূসা (আ:)’র নাম। সে সাথে বার বার বর্ণিত হয়েছে বনি ইসরাইলীদের কাহিনী। হেতু কি? এরূপ উল্লেখের কারণ, মহান আল্লাহ তায়ালা চান, মুসলিমগণ শিক্ষা নিক বনি ইসরাইলীদের ব্যর্থতাগুলি থেকে। ইসলামের এ ব্যর্থ ছাত্রগণ অর্পিত দায়িত্ব পালনে কিভাবে ব্যর্থ হয়েছে এবং মহান রব’য়ের হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে নিজেদের উপর আযাব নামিয়ে এনেছে -ইতিহাসের সেটি অতি গুরুত্বপূ্ণ শিক্ষণীয় বিষয়। সর্বজ্ঞানী মহান আল্লাহ তায়ালা জানেন, যেসব কারণে বনি ইসরাইলীগণ ব্যর্থ হয়েছে, সে একই কারণে ব্যর্থ হবে আগামী দিনের মুসলিমগণও। সেটিই আজও প্রমাণিত হচ্ছে। সর্বযুগে ব্যর্থতার সেটিই হলো পরীক্ষিত রোডম্যাপ। ব্যর্থতার সে পথটি অনুসরণ করেছিল বনি ইসরাইলীগণ। অপর দিকে নবীজী (সা:) দেখিয়ে গেছেন সাফল্যের পরীক্ষিত রোডম্যাপটি। বনি ইসরাইলীদের ব্যর্থতার সে ইতিহাস লিপিবদ্ধ করতে সে সময় সেখানে কোন সাংবাদিক বা ইতিহাসবিদ উপস্থিত ছিল না, ফলে সে কাজটি করেছেন খোদ মহান আল্লাহ তায়ালা। তাদের সে ব্যর্থতার বিবরণ পবিত্র কুর’আনে লিপিবদ্ধ করে মহান রব সে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাকে ইতিহাস থেকে হারিয়ে যেতে দেননি।
পবিত্র কুর’আনে বনি ইসরাইলীদের ব্যর্থতাগুলি বার বার লিপিবদ্ধ করারপ মূল কারণ, মহান আল্লাহ তায়ালা চান, মুসলিমগণ শিক্ষা নিক ইসলামের এই ব্যর্থ ছাত্রদের ব্যর্থতা থেকে। এখানেই ইতিহাসের গুরুত্ব। ইতিহাস থেকে যারা শিক্ষা নেয়, একমাত্র তারাই বাঁচে অনুরূপ ব্যর্থতা থেকে এবং সাফল্যের পথ পায়। শুধু বনি ইসরাইলের ব্যর্থতাগুলি নয়, আদ,সামুদ, লুত (আ:)’য়ের কওম, মাদায়েনের অধিবাসীসহ নানা জাতির ব্যর্থতা তুলে ধরা হয়েছে পবিত্র কুর’আনে। সমগ্র মানব ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষণীয় ঘটনা নিয়ে একমাত্র পবিত্র কুর’আনের এ বয়ানগুলিই হলো শতভাগ নির্ভুঁল। উল্লেখ্য যে, সকল নবী রাসূলদের ধর্মই ছিল ইসলাম এবং তাদের অনুসারীদের সবাই ছিলেন মুসলিম। মুসলিম শব্দটির প্রথম ব্যবহার করেন হযরত ইব্রাহীম (আ:)। এক মুসলিম অপর মুসলিমের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিক এবং সফল হোক -সেটিই চান মহান আল্লাহ তায়ালা। এক্ষেত্রেও কি মুসলিমদের ব্যর্থতা কম? তারা পবিত্র কুর’আন পাঠ করে বটে কিন্তু বুঝার চেষ্টা করেনা। আর যারা কুর’আন বুঝে না, তারা কুর’আনের শিক্ষা অনুসরণ করবে কিরূপে? ফলে বনি ইসরাইলগণ যে কারণে ব্যর্থ হয়েছিল, সে একই কারণে আজকের মুসলিমগণও ব্যর্থতার পর ব্যর্থতার ইতিহাস গড়ছে। কারণ যুগে যুগে মানুষ পাল্টায় বটে, কিন্তু সাফল্যের রোডম্যাপ যেমন পাল্টায় না, তেমনি পাল্টায় না ব্যর্থতার রোডম্যাপও। ইহুদীগণ ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা দেয়নি, আদালতে শরিয়তের প্রতিষ্ঠাও দেয়নি। আজকের মুসলিমগণ তো সেটিই করছে। জিহাদ পরিত্যাগ করাতে ইহুদিগণ যেমন পরাজিত ও নির্যাতিত হয়েছে, সেরূপ জিহাদ পরিত্যাগ করে বাঁচছে আজকের মুসলিমগণও। জিহাদশূণ্য মুসলিমগণ নিজ দেশের মাটিতে বিজয় তুলে দিয়েছে চিহ্নিত বদমায়েশদের হাতে; এবং বিনা যুদ্ধে পরাজয় মেনে নিয়েছে ইসলামের। ফলে তারাও একই ভাবে পূর্ব কালের ইহুদীদের ন্যায় পরাজিত, নির্যাতিত ও লাঞ্ছিত হচ্ছে।
জিহাদের বিকল্প পথটি আত্মসমর্পণ ও গোলামীর
শত্রুশক্তির হাতে অধিকৃত ভূমিতে কখনোই ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের সুযোগ থাকে না। ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের জন্য অপরিহার্য হলো, দখলদার জালেম শক্তির নির্মূল। সে নির্মূলের কাজে জিহাদের বিকল্প নাই। বিকল্প পথটি আত্মসমর্পণ ও গোলামী। তাই জিহাদের বিকল্প ছিল না হযরত মূসা (আ:)’য়ের সময়ও। কিন্তু বনি ইসরাইলীগণ জিহাদের পথে যায়নি। ফলে তাওরাতে নাযিলকৃত শরিয়া বিধান স্রেফ কিতাবেই থেকে গেছে। তাদের নিষ্ক্রিয়তা এবং জিহাদে অনীহা মহান আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডাকেই ব্যর্থ করে দেয়। এটিই হলো তাদের গুরুতর অপরাধ। মহান আল্লাহ তায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে বনি ইসরাইলীদের বিদ্রোহের বিবরণ এসেছে নিচের আয়াতে। বলা হয়েছে:
قَالُوا۟ يَـٰمُوسَىٰٓ إِنَّا لَن نَّدْخُلَهَآ أَبَدًۭا مَّا دَامُوا۟ فِيهَا ۖ فَٱذْهَبْ أَنتَ وَرَبُّكَ فَقَـٰتِلَآ إِنَّا هَـٰهُنَا قَـٰعِدُونَ
অর্থ: “তারা (হযরত মূসা (আ:)’র অনুসারীগণ) বললো, “হে মূসা যতদিন তারা (দখলদার শক্তি) সেখানে (সে অধিকৃত কানানে) অবস্থান করবে, ততদিন আমরা সেখানে কখনোই প্রবেশ করবো না; সুতরাং তুমি ও তোমার রব যাও এবং (তাদের বিরুদ্ধে) যুদ্ধ করো। আমরা এখানে (তোমার) অপেক্ষায় বসেই থাকবো।” –(সুরা মায়েদা, আয়াত ২৪)।
এই হলো সর্বশক্তিমান আল্লাহ তায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে বনি ইসরাইলীদের বিদ্রোহের নমুনা। লক্ষণীয় হলো, নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনে তারা কোন দায়িত্বই নিতে রাজী হয়নি। অথচ নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন এবং সে লক্ষ্যে ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের দায়টি মহান আল্লাহ তায়ালার খলিফা রূপে প্রতিটি ঈমানদারের -ফিরেশতাদের নয়। মহান আল্লাহ তায়ালার কুর’আনে ঘোষিত নীতিটি হলো,
إِنَّ ٱللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّىٰ يُغَيِّرُوا۟ مَا بِأَنفُسِهِمْ
অর্থ: “নিশ্চয়ই আল্লাহ কোন কওমের অবস্থার পরিবর্তন করেন না -যতক্ষন না সে জাতির লোকেরা নিজেরাই নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন করে।”–(সুরা রা’দ, আয়াত ১১)।
উপরিউক্ত আয়াতে এটি সুস্পষ্ট, মহান আল্লাহ তায়ালা চান, একটি জাতি তার নিজ অবস্থার পরিবর্তনের দায় নিজ কাঁধে তুলে নিক। করুণাময় মহান আল্লাহ তায়ালার ঘোষিত নীতি হলো, তিনি একমাত্র তাদেরই সাহায্য করেন -যারা নিজেরা নিজেদের সাহায্য করে। নবী রাসূলদের ক্ষেত্রেও এ নীতির ব্যতিক্রম ঘটেনি। নবীজী (সা:)কেও তাই অস্ত্র হাতে রণাঙ্গণে হাজির হতে হয়েছে এবং আহত হতে হয়েছে। যারা হাত গুটিয়ে বসে থাকে, তাদের সাহায্য না করাই মহান আল্লাহ তায়ালার সূন্নত। বন ইসরাইলীগণ নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের দায় নিজ কাঁধে নিতে চায়নি। তারা চেয়েছিল, তাদের জন্য একটি নিরাপদ রাষ্ট্র নির্মাণের কাজটি খোদ মহান আল্লাহ তায়ালা নিজ দায়িত্বে সমাধা করে দিক। তারা ভেবেছিল, অধিকৃত কানানের দখলদার শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধের দায়িত্ব শুধুমাত্র হযরত মূসা (আ:) ও তাঁর রবের। বন ইসরাইলীদের কাজ শুধু হাত গুটিয়ে অপেক্ষা করা। বন ইসরাইলীদের সে নীতি তাদের জন্য মহান আযাব ডেকে এনেছে।
ইহুদিদের পথে আজকের মুসলিমগণ
পরিতাপের বিষয় হলো, আজকের মুসলিমগণ অনুসরণ করছে বনি ইসরাইলীদের তথা ইহুদিদের নীতি। তারা নাই ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জিহাদে। বনি ইসরাইলীগণ যেমন কোথাও খেলাফতে রাশেদা প্রতিষ্ঠা দেয়নি, আজকের মুসলিমগণও প্রতিষ্ঠা দেয়নি কোন ইসলামী রাষ্ট্র। বনি ইসরাইলীদের মত তাদেরও আগ্রহ নাই মহান আল্লাহ তায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়া প্রতিষ্ঠায়। তারা ব্যস্ত নিজেদের সেক্যুলার জাতীয়, উপজাতীয়, রাজতন্ত্রী ও গোত্রীয় রাষ্ট্রকে সুরক্ষিত করার কাজে। তারা ভাবে, তাদের কাজ শুধু নামাজ রোজা ও হজ্জ যাকাত পালন এবং দোয়া দরুদ পাঠ। এবং ভাবে, তাদের নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্বটি মহান আল্লাহ তায়ালার। তারা মনে করে, সর্বশক্তিমান মহান রব যেমন পবিত্র ক্বাবা বাঁচাতে আবাবিল পাখি পাঠিয়ে আবরাহার বিশাল বাহিনীকে ধ্বংস করেছিলেন, আজও তেমনি ধ্বংস করবেন তাদের শত্রুদের।
নিজেদের নিষ্ক্রিয়তাকে জায়েজ করতেই জিহাদকে তারা সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদ বলে এবং পরিত্যাজ্য মনে করে জিহাদের ন্যায় ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদতকে। তারা ভুলে যায়, মহান আল্লাহ তায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ নিয়ে বাঁচাটি আযাবপ্রাপ্ত ও অভিশপ্ত ইহুদিদের নীতি। পরিতাপের বিষয় হলো, আজকের মুসলিমদের জীবনে বিজয় পেয়েছে ইহুদিদের সে জিহাদমুক্ত নিষ্ক্রিয়তার নীতি, এবং বিলুপ্ত হয়েছে নবীজী (সা:)’য়ের সে নীতি -যাতে ছিল ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ ও সে রাষ্ট্রকে প্রতিরক্ষা দেয়ার জিহাদ।
এ নিয়ে কোন অস্পষ্টতা নাই, যারা মহান আল্লাহ তায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী -তাদেরকে কঠিন আযাব দেয়াই মহান আল্লাহ তায়ালার সূন্নত। সে আযাব এসেছে বনি ইসরাইলের উপরও। তারা বঞ্চিত হয়েছে মহান আল্লাহ তায়ালার রহমত থেকে। অথচ তাদের উপর মহান আল্লাহ তায়ালার রহমত ছিল বিশাল। তিনি তাদেরকে ফিরাউনে হাত থেকে মুক্তি দিতে সাগরের মধ্য দিয়ে রাস্তা বানিয়েছিলেন। সায়’নাই মরুভূমিতে বছরের পর বছর আসমান থেকে মান্না ও সালওয়া নামিয়ে খাইয়েছেন। পাথরের পেট চিড়ে ১২টি ঠান্ডা পানির ঝরণা প্রবাহিত করেছেন। এরপরও তারা বেছে নিয়েছে জিহাদ থেকে দূরে থাকা ও বিদ্রোহের পথ।
অথচ মহান আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডার সাথে একাত্ম হওয়ার সওয়াবটি বিশাল। তাঁর সূন্নত হলো, যখন কোন মু’মিন বান্দাদের দল তাঁর হুকুম মান্য করে, তাদের উপর তিনি অফুরন্ত রহমত নাযিল করেন। কয়েকগুণ বৃহৎ শত্রু বাহিনীর বিরুদ্ধেও তাদের বিজয় দান করেন। তাই এটি নিশ্চিত, নবীজী (সা:)’য়ের সাহাবাদের ন্যায় বনি ইসরাইলীগণ যদি কানানকে শত্রুমুক্ত করার জিহাদে লিপ্ত হতো, তবে তারাও গায়েবী সাহায্য পেত। তখন তারাও বিজয়ী হত। তাদের হাতে তখন প্রতিষ্ঠা পেত মানব ইতিহাসের প্রথম খেলাফায়ে রাশেদা। তারা পরিণত হতো বিশ্বশক্তিতে। কিন্তু সে বিশাল মর্যাদাটি পেতে বনি ইসরাইলীগণ ব্যর্থ হয়েছে। কারণ, সে কাজে তাদের অঙ্গীকার, নিষ্ঠা ও কুরবানী ছিল না। ছিল না তাদের সর্ব সামর্থ্যের বিনিয়োগ। কিন্তু সে গৌরবটি পেয়েছেন নবীজী (সা:) ও তাঁর অনুগত সাহাবাগণ। কারণ, সে কাজে নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাদের অঙ্গীকার ও কুরবানী ছিল বিশাল।
মহান আল্লাহ তায়ালা বনি ইসরাইলীদের বিদ্রোহ ও হযরত মূসা (আ:)’র প্রতি তাদের বিদ্রুপাত্মক বক্তব্যের কদর্যতার বিষয়টি ইতিহাস থেকে হারিয়ে যেতে দেননি। পবিত্র কুর’আনে নিজ কালেমার পাশে তা লিপিবদ্ধ করে সেটিকে ক্বিয়ামত অবধি জীবিত রাখার ব্যবস্থা করেছেন। তাদের সে দায়িত্বহীনতা ও বিশ্বাসঘাতকতার কাহিনী যখন কেউ হাজার বছর পর পড়বে, তখন সে শুধু বিস্মিতই হবে না, বরং ভাববে, মহান আল্লাহ তায়ালার এতো নিয়ামত ভোগ করেও বনি ইসরাইলীগণ এতোটা গাদ্দার, বিদ্রোহী ও দায়িত্বহীন হলো কি করে?
নিজ সাহাবীদের বেঈমানী, গাদ্দারী ও জিহাদে অনাগ্রহ দেখে হযরত মূসা (আ:) অতিশয় মর্মাহত হয়েছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, মহান আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডাকে বিজয়ী করার কাজে তাঁর সাথে নিজের ভাই হারুন (আ:) ছাড়া আর কেউ নেই। তিনি তখন চরম নিঃসঙ্গ। সে নিঃসঙ্গতা তাঁকে চরম ভাবে দুঃখ-ভারাক্রান্ত করেছিল। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ ও তাওরাতে নাযিলকৃত শরিয়তের প্রতিষ্ঠায় তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। অথচ নবীজী (সা:)’য়ের ন্যায় তিনিও চাচ্ছিলেন ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। কারণ ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ছাড়া শরিয়তের প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। সম্ভব নয় সুবিচারের প্রতিষ্ঠা। সম্ভব নয় একটি সভ্য ও নিরাপদ রাষ্ট্র নির্মাণ। অথচ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, সে মহান কাজে তিনি সফল হচ্ছেন না -সেটিই ছিল তাঁর বেদনার মূল কারণ। মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে তিনি তাঁর নিজের ব্যর্থতার কৈফিয়ত দিয়েছেন অতি মর্মস্পর্শী বেদনাসিক্ত ভাষায়। তাঁর হৃদয়ের সে করুণ বেদনাও মহান রব ইতিহাস থেকে হারিয়ে যেতে দেননি, তুলে ধরেছেন নিচের আয়াতে:
قَالَ رَبِّ إِنِّى لَآ أَمْلِكُ إِلَّا نَفْسِى وَأَخِى ۖ فَٱفْرُقْ بَيْنَنَا وَبَيْنَ ٱلْقَوْمِ ٱلْفَـٰسِقِينَ
অর্থ: “(হযরত মূসা (আ:)) বলেন, হে রব! আমার ও আমার ভাই ছাড়া অন্য কারো উপর আমার কোন প্রভাব নাই। অতএব (হে রব!) অবাধ্য কউম থেকে আমাদেরকে পৃথক করে দেন।” –(সুরা মায়েদা, আয়াত ২৫)।
হযরত মূসা (আ:) তাঁর কাওমের উপর এতটাই আশা হারিয়ে ফেলেন যে, তিনি মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে আবেদন তুলেছেন তাঁকে ও তাঁর ভাইকে অবাধ্য ও দুর্বৃত্ত বনি ইসরাইলীদের থেকে পৃথক করার জন্য। সে গাদ্দার ও বিদ্রোহীদের সাথে একত্রে অবস্থান তাঁর কাছে অতি অসহ্য হয়ে উঠেছিল। যে মহান রব ফিরাউনের জুলুম-নির্যাতন থেকে মুক্তি দিলেন, সাগর খণ্ডিত করে যিনি তাদের জন্য পথ করে দিলেন, বছরের পর বছর যিনি আসমান থেকে খাদ্য নাযিল করে খাওয়ালেন -তাঁর হুকুমের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা দেখে এ ছিল তাঁর হৃদয়ের আর্তনাদ।
অথচ নবীজী (সা:)’য়ের ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্নতর ছিল। অনুরূপ করুণ পরিস্থিতি নবীজী (সা:)’য়ের জীবনেও এসেছে। শক্তিশালী কাফির বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের হুকুম তাঁর ও তাঁর সাহাবাদের উপরও এসেছে। কয়েকগুণ অধীক শক্তিশালী মক্কার কাফিরদের মোকাবেলার নির্দেশ এসেছে। বদর, ওহুদ, খন্দক, হুনায়ুনের যুদ্ধ এসে হাজির হয়েছে। নবীজী (সা:)’য়ের ডাকে সাহাবীগণ প্রতিটি যুদ্ধেই লাব্বায়েক বলেছেন। বদর যুদ্ধের প্রাক্কালে সাহাবাগণ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। তাদের কাছে খবর আসে মুসলিমদের নির্মূলে মক্কার ১ হাজার সেরা কাফির যোদ্ধা যুদ্ধের পরিকল্পনা নিয়ে আক্রমণে আসছে। সে যুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রশ্নে নবীজী (সা:) সাহাবাদের মতামত জানতে চান। সাহাবাদের মধ্য থেকে মোহাজির সাহাবী মিকদাদ বিন আমর (রা:) বলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ আপনাকে যেভাবে এগুতে বলেছেন, আপনি এগিয়ে যান। আমরা আপনার সাথে আছি। আমরা কখনোই বনি ইসরাইলীদের মত বলবো না, “আপনি ও আপনার আল্লাহর যান, যুদ্ধ করুন এবং আমরা আপনার ফেরার অপেক্ষায় রইলাম”।”
নবীজী (সা:) যুদ্ধে যোগদানের ব্যাপারে আনসার সাহাবাদের অভিমত জানতে চান। তখন আনসারদের নেতা সা’দ বিন মুয়াদ (রা:) বলেন, “হে রাসূলুল্লাহ! আমরা আপনার উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছি। আমরা সাক্ষ্য দিয়েছি যে আপনি আমাদের কাছে সত্য দ্বীন নিয়ে এসেছেন। আপনি যেভাবে এগুতে চান, এগিয়ে যান। যিনি আপনাকে রাসূল রূপে পাঠিয়েছেন সে আল্লাহর কসম, “আপনি যদি আমাদের সাগরের দিকে ধাবিত করেন, আমরা আপনার সাথে সে সাগরে প্রবেশ করবো। আমাদের মধ্য থেকে একজনও পিছনে পড়ে থাকবে না। আশা করি আল্লাহ তায়ালা আমাদের কিছু ভাল কর্মকে আপনাকে দেখিয়ে দিবেন -যাতে আপনি হতাশ না হয়ে বরং আমাদের নিয়ে গর্ব করবেন।” সাহাবাদের সে কথাগুলি শুনে নবীজী (সা:)’য়ের মুখমণ্ডল আনন্দে উজ্জল হয়ে উঠেছিল।
নবীজী (সা:)’য়ের নেতৃত্ব ও সাহাবাদের বিপুল বিনিয়োগের কারণে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল শক্তিশালী ইসলামী রাষ্ট্র -যা ত্বরিৎ বেগে পরিণত হয়েছিল বিশ্বশক্তিতে। খৃষ্টান ধর্মের প্রচারের কাজটি যেরূপ রোমান সম্রাট এবং রাশিয়ার জারের ন্যায় স্বৈরশাসকদের রাজকীয় বাহিনীর ছায়াতলে হয়েছিল, ইসলামের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার কাজটি সেভাবে হয়নি। ফলে ইসলাম বেঁচে গেছে স্বৈরশাসক চক্রের দূষিতকরণ প্রক্রিয়া থেকে। ইসলামী রাষ্ট্রের শুরুর ১০ বছর যাবত স্বয়ং নবীজী (সা:) ছিলেন সে রাষ্ট্রের প্রধান। নবীজী (সা:)’য়ের ইন্তেকালের পর আরো ২৯ বছর সে রাষ্ট্রকে বাঁচিয়ে রাখেন খোলাফায়ে রাশেদার ৪ জন খলিফা। নবীজী (সা:)’য়ের ইন্তেকালের পর পরই শুরু হয় বহু ভণ্ড নবীদের উত্থান। তাদের ছিল বিশাল সমর্থক বাহিনী। ভণ্ড নবীদের ষড়যন্ত্রের সাথে শুরু হয় যাকাতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। সে বিদ্রোহীরাও সংখ্যায় কম ছিল না। সে সময়টি ছিল ইসলামের জন্য অতি বিপদকাল। খোলাফয়ে রাশেদা না থাকলে কে রুখতো সে ভণ্ড নবীদের? কে রুখতো যাকাতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা না দিয়ে নবীজী (সা:) যদি শুধু নামাজ রোজা, হজ্জ যাকাত ও দোয়া দরুদ শিখিয়ে দায়িত্ব শেষ করতেন, তবে কি ইসলাম কি পূর্ণতা ও বিশুদ্ধতা নিয়ে বাঁচার সুযোগ পেত? মুসলিমগণ কি পেত, শত্রু-পরিবেষ্টিত পৃথিবীতে জান মাল-ইজ্জতের নিরাপত্তা নিয়ে বাঁচার নিরাপদ স্থান।
এমন কি একটা গাছও বেড়ে উঠার জন্য শুরুর কয়েকটি বছর নিরাপদ পরিবেশ চায়। নইলে সে গাছকে যে কেউ উপড়িয়ে ফেলতে পারে বা গরু-মহিষের পায়ের তলায় পিষ্ট হয়ে মারা যেতে পারে। অথচ শিকড় ও কাণ্ড শক্ত করার সুযোগ পেলে প্রচণ্ড ঝড়ের মাঝেও সে গাছ কাণ্ড সোজা রেখে বেঁচে থাকে। সেটি সত্য ধর্মের বেলায়ও। নবীজী (সা:)’য়ের ১০ বছর এবং খোলাফায়ের রাশেদার ২৯ বছরের শাসন ইসলামকে তার সঠিক শিক্ষা নিয়ে বেড়ে উঠার নিরাপদ পরিবেশই দিয়েছিল। সে সুযোগটি না পেলে মহান আল্লাহ তায়ালার সর্বশেষ নবীর শিক্ষাও বিলুপ্ত হতো; অথবা ভ্রষ্টতায় পূর্ণ হতো -যেমনটি ঘটেছে হযরত মূসা (আ:) ও হযরত ঈসা (আ:)’র শিক্ষার সাথে।
ব্যর্থতার মূল কারণটি কুর’আন থেকে বিচ্ছিন্নতা
রাষ্ট্রের পরিশুদ্ধির সে কঠিন কাজটি কখনোই শুধু নামাজ রোজা, দোয়া দরুদ ও কুর’আনে পাঠে সম্ভব নয়; সে জন্য চাই সকল প্রকার দুর্বৃ্ত্ত শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ্ব। সে যুদ্ধ চাই যেমন বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গণে, তেমনি রাজনৈতিক ও সামরিক অঙ্গণে। শত্রুর হামালা সংঘটিত হয় এ ৪টি রণাঙ্গণেই। ইসলামের পরিভাষায় এরূপ সর্বাত্মক যুদ্ধই হলো পবিত্র জিহাদ। জিহাদ চায় অর্থ, শ্রম, সময়, মেধা ও রক্তের বিশাল কুরবানী। এমন বিনিয়োগ আর কোন ইবাদতে ঘটে না। এজন্যই জিহাদ হলো ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত। পবিত্র কুর’আনে প্রকৃত ঈমানদার একমাত্র তাদেরকেই বলা হয়েছে যাদের রয়েছে সর্বশ্রেষ্ঠ সে ইবাদতের সামর্থ্য। মহান আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে সে বিষয়ে সুস্পষ্ট বয়ান এসেছে সুরা হুজরাতের ১৫ নম্বর আয়াতে। যার মধ্যে সে সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত তথা জিহাদ নাই সে নিজেকে মুসলিম দাবী করলেও সে আসলে মুনাফিক। সেরূপ মুনাফিকের নমুনা হলো নবীজী (সা:)’য়ের যুগের মুনাফিক নেতা আব্দুল্লাহ বিন উবাই। কালেমা পাঠ, কুর’আন পাঠ ও নামাজ রোজার ন্যায় ধর্মকর্ম তাকে মুসলিম বানাতে পারিনি। জিহাদশূণ্যতার কারণে সে নিরেট মুনাফিকে পরিণত হয়েছে। আজও মুসলিম বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের নামাজ রোজা, হজ্জ যাকাত, দোয়া দরুদ ও কুর’আন তেলাওয়াত যে তাদের ঈমানদার বানাতে পারিনি -সে প্রমাণ তো চোখের সামনে। এরা নিজেদের মুসলিম রূপে দাবী করলেও বাঁচে ইসলামের পরাজয় এবং ইসলামের শত্রুদের বিজয় মেনে নিয়ে। নিজ রাষ্ট্রে আল্লাহ তায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়া আইনের বিলুপ্তি দেখেও তাদের দুঃখ হয় না। তারা নিজ দল, নিজ জাতি ও নিজ গোত্রের জন্য যুদ্ধ করলেও মহান আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডাকে বিজয়ী করতে কখনোই জিহাদের ময়দানে খাড়া হয়না। বরং ইসলামের চিহ্নিত শত্রু স্বৈরশাসকদেরও সামনেও তারা শ্রদ্ধেয় ও মাননীয় বলে মাথা নোয়ায়। তাদের হৃদয়ে শরিষার দানা পরিমান ঈমান থাকলে কি তারা এমন আচরণ করতো? মহান আল্লাহ তায়ালার প্রতি সামান্যতম ইশক ও মহব্বত থাকলে কি তাঁর সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়া আইনের বিলুপ্তি দেখেও নীরব ও নিষ্ক্রিয় থাকতো?
নবীজী (সা:)’য়ের আমলে মুসলিমগণ বেড়ে উঠেছিল পবিত্র কুর’আনকে আঁকড়ে ধরে। কারণ, কুর’আনের পথই হলো সিরাতাল মুস্তাকীমের পথ। তারা প্রতিক্ষণ সতর্ক থাকতেন পবিত্র কুর’আন থেকে বিচ্যুত হওয়া থেকে বাঁচতে। বিচ্যুতির এমন তীব্র ভয় এবং সদা সিরাতাল মুস্তাকীমের উপর থাকার তীব্র তাড়নাই হলো মু’মিনের তাকওয়া। সে তাকওয়ার কারণেই তারা পুরোপুরি একাত্ম হতে পেরেছিলেন নবীজী (সা:)’য়ের মিশনের সাথে। ফলে সে আমলে ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণের কাজটি শুধু নবীজী (সা:)’য়ের নিজের এজেন্ডা ছিল না, বরং সেটি ছিল সকল ঈমানদারদের এজেন্ডাও। কিন্তু আজকের মুসলিমগণ ব্যর্থ হয়েছে পবিত্র কুর’আনের শিক্ষা নিয়ে বেড়ে উঠতে, ফলে ব্যর্থ হয়েছে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জিহাদে অংশ নিতে। আজকের মুসলিমদের মূল ব্যর্থতা ও সংকট এখানেই। শূণ্যতাটি এখানে তাকওয়ার ভাণ্ডারে। ফলে তাড়না নেই শরিয়তের প্রতিষ্ঠায় ও দুর্বৃত্তির নির্মূলে। এর মূল কারণ, পবিত্র কুর’আনের শিক্ষা ও দর্শন থেকে বিচ্ছিন্নতা।
পানাহারের অভাবে যেমন দৈহিক মৃত্যু ঘটে; কুর’আনী জ্ঞানের অভাবে তেমনি মৃত্যু ঘটে ঈমান ও তাকওয়ার। তখন বিচ্যুতি বাড়ে সিরাতাল মুস্তাকীম থেকে। মুসলিম ভূমিতে তখন পরাজিত ও বিলুপ্ত হয় নবীজী (সা:)’য়ের প্রতিষ্ঠিত ইসলাম। তখন বাঁচে মনগড়া বিকৃত ইসলাম। সে বিকৃত ইসলামে ধারণা থাকে না ইসলামী রাষ্ট্রের। ধারণা থাকে না মহান আল্লাহ তায়ালার সার্বভৌমত্ব ও শরিয়ার। তখন নামাজ রোজা ও হজ্জ যাকাত বেঁচে থাকলেও মুসলিম জীবন থেকে বিলুপ্ত হয় দুর্বৃত্তির নির্মূল ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার জিহাদ এবং প্যান-ইসলামী মুসলিম ভাতৃত্ব। এটিই হলো আজকের মুসলিম জীবনের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়। মুসলিমগণ বাঁচছে নবীজী (সা:)’য়ের অনুসৃত ইসলাম ছাড়াই। প্রশ্ন হলো, ঈমান, আমল ও তাকওয়ার এমন বিপর্যয় নিয়ে কেউ কি জান্নাত আশা করতে পারে?
নবীজী (সা:)‘য়ের ভবিষ্যৎ বাণী ও উম্মাহর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ
নবীজী (সা:) আজ থেকে সাড়ে চৌদ্দশত বছরে আগেই সে ভয়ানক বিষয়টি বুঝতে পেরেছিলেন তা হলো, মুসলিমগণ একদিন পবিত্র এ কুর’আনকে পরিত্যাগ করবে। মহান রব’য়ের এ রোডম্যাপ পরিত্যাগ করে তারা অন্য পথ অনুসরণ করবে। নবীজী (সা:) আরো বুঝতে পেরেছিলেন, কুর’আনী জ্ঞানের অভাবে তাদের ঈমান মারা যাবে এবং ইসলামের পূর্ণ অনুসরণ ছাড়াই তারা মুসলিম হওয়ার দাবী করবে। মুসলিমদের সে ভয়ানক বিপর্যয় নিয়ে নবীজী (সা:) প্রচণ্ড শংকিত হয়েছিলেন। নিজের সে শংকার কথা তিনি মহান আল্লাহ তায়ালাকেও জানিয়েছিলেন। পবিত্র কুর’আনে মহান আল্লাহ তায়ালা নবীজী (সা:)’য়ের সে তীব্র শংকার কথাও রেকর্ড করে রেখেছেন -যাতে মানুষ তা পাঠ করে সতর্ক হয় এবং মৃত্যুর আগেই নিজেদের শুধরিয়ে নেয়। সেটি বর্ণিত হয়েছে এভাবে:
وَقَالَ ٱلرَّسُولُ يَـٰرَبِّ إِنَّ قَوْمِى ٱتَّخَذُوا۟ هَـٰذَا ٱلْقُرْءَانَ مَهْجُورًۭا
অর্থ: “এবং রাসূল বললেন, হে রব! আমার কউম তো এই কুর’আনকে পরিত্যাজ্য গণ্য করেছে।” -(সুরা ফুরকান, আয়াত ৩০)।
নবীজী (সা:)’য়ের জীবনের মোজেজা অনেক। এটিও অতি বিস্ময়কর এক মোজেজা যে, তিনি আজ থেকে সাড়ে চৌদ্দশত বছর পূর্বেই বুঝতে পেরেছিলেন পবিত্র কুর’আন কতটা পরিত্যাজ্য হবে পরবর্তী কালের মুসলিমদের কাছে। নবীজী (সা:) যা নিয়ে মহান আল্লাহ সোবহানা ওয়া তায়ালার আছে ফরিয়াদ তুলেছিলেন সেটিই হলো আজকের মুসলিম জীবনের নিরেট সত্য। তারই প্রমাণ, বাংলাদেশের ন্যায় একটি মুসলিম দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, বিচার ব্যবস্থা, রাজনীতি ও আর্থ সামাজিক অঙ্গণে পবিত্র কুর’আনের কোন স্থান নাই। তাই শরিয়া পরিত্যাজ্য গণ্য হয়েছে বাংলাদেশের আইন আদালতে; সেখানে দখল জমিয়েছে কাফিরদের প্রণীত আইন। পবিত্র কুর’আনে যেরূপ অন্যায়ের নির্মূলে এবং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায় জিহাদের কথা বলে -সেটিও আজ পরিত্যাজ্য হয়েছে মুসলিম রাজনীতি থেকে। মুসলিম সন্তানেরা নানা জনের লেখা গদ্য পদ্য পাঠ করে; বিশ্বের নানা দেশের নানা ভাষাও শেখে। কিন্তু কুর’আন বুঝতে তারা রাজী নয়। পবিত্র কুর’আনের ভাষা শিখতেও তারা রাজী নয়। কারণ, তাতে তাদের অর্থলাভ হয়না। ইসলাম থেকে এতটো বিচ্ছিন্ন হয়ে কেউ কি মুসলিম থাকতে পারে? এটি তো ইসলাম ছাড়াই মুসলিম হওয়ার প্রচেষ্টা! ফলে মুসলিমগণ ইতিহাস গড়েছে ব্যর্থতা ও দুর্বৃত্তিতে। ফলে তাদের জন্য বড় ব্যর্থতা ও বিপর্যয় অপেক্ষা করছে আখেরাতে। কারণ, আল্লাহ তায়ালার দ্বীনকে যারা পরাজিত করে রাখে তাদেরকে তিনি কখনো জান্নাত দিয়ে পুরস্কৃত করেন না। বরং শাস্তি দেন জাহান্নামের আযাব। মুসলিম সজ্ঞানে সে আযাবের দিকেও ধাবিত হচ্ছে -সেটি বুঝা যায় ইসলাম থেকে দূরে সরা এবং মহান রব’য়ের এজেন্ডার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দেখে।
ANNOUNCEMENT
ওয়েব সাইটটি এখন আপডেট করা হচ্ছে। আগের লেখাগুলো নতুন ওয়েব সাইটে পুরাপুরি আনতে কয়েকদিন সময় নিবে। ধন্যবাদ।
LATEST ARTICLES
- বেঈমানী, বিভক্তি ও পতনের পথে আজকের মুসলিম
- বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় তিনটি মিথ্যা ও মিথ্যার নাশকতা
- বাংলাদেশে ইসলামপন্থীদের অন্ধকার ভবিষ্যৎ
- রাজনীতির ফরজ বিষয় ও হারাম বিষয় এবং বাঙালি মুসলিমের পাপের রাজনীতি
- হবিগঞ্জে এনসিপি নেতাদের উপর হামলা: গর্ত থেকে বেরিয়ে এলো কি বিএনপির লেবাসে গুপ্ত ফ্যাসিস্টরা?
বাংলা বিভাগ
ENGLISH ARTICLES
RECENT COMMENTS
- Fazlul Aziz on The Israeli Crimes, the Western Complicity and the Muslims’ Silence
- Fazlul Aziz on India: A Huge Israel in South Asia
- Fazlul Aziz on ইসলামী রাষ্ট্রের কল্যাণ এবং অনৈসালিমক রাষ্ট্রের অকল্যাণ
- Fazlul Aziz on বাংলাদেশে দুর্বৃত্তায়ন, হিন্দুত্ববাদ এবং ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ
- Fazlul Aziz on Gaza: A Showcase of West-led War Crimes and the Ethnic Cleansing
ARCHIVES
- August 2026
- July 2026
- June 2026
- May 2026
- April 2026
- March 2026
- February 2026
- January 2026
- December 2025
- November 2025
- October 2025
- September 2025
- August 2025
- July 2025
- June 2025
- May 2025
- April 2025
- March 2025
- February 2025
- January 2025
- December 2024
- October 2024
- September 2024
- August 2024
- July 2024
- June 2024
- May 2024
- April 2024
- March 2024
- February 2024
- January 2024
- December 2023
- November 2023
- October 2023
- September 2023
- August 2023
- July 2023
- June 2023
- May 2023
- April 2023
- March 2023
- January 2023
- December 2022
- November 2022
- October 2022
- September 2022
- August 2022
- July 2022
- June 2022
- May 2022
- April 2022
- March 2022
- February 2022
- January 2022
- November 2021
- October 2021
- September 2021
- August 2021
- July 2021
- June 2021
- May 2021
- April 2021
- March 2021
- February 2021
- January 2021
- December 2020
- November 2020
- October 2020
- April 2020
- March 2020
- February 2020
- January 2020
- December 2019
- November 2019
- October 2019
- September 2019
- August 2019
- July 2019
- June 2019
- May 2019
- April 2019
- March 2019
- February 2019
- January 2019
- December 2018
- November 2018
