Home •আন্তর্জাতিক মধ্যপ্রাচ্যে বিপ্লবঃ পাল্টে দিবে কি বিশ্বরাজনীতি?
মধ্যপ্রাচ্যে বিপ্লবঃ পাল্টে দিবে কি বিশ্বরাজনীতি? PDF Print E-mail
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Friday, 11 February 2011 02:11

মানব ইতিহাসের সবচেয়ে মহান ও গুরুত্বপূর্ণ বিপ্লবটি সাধিত হয়েছিল আজ থেকে প্রায় চৌদ্দ শত বছর আগে। এবং সেটি ইউরোপ-আমেরিকা, চীন-ভারত বা বিশ্বের অন্য কোন দেশে নয়, বরং জনবিরল আরব ভূমিতে। সে বিপ্লব মানব জাতির ইতিহাসই পাল্টে দিয়েছিল। পাল্টে দিয়েছিল ন্যায়-অন্যায়, সত্য-অসত্য, কল্যাণ-অকল্যাণ, শ্লিল-অশ্লিল ও সভতা-অসভ্যতার সংজ্ঞা। বিলুপ্ত করেছিল রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্য -সে সময়ের এ দুটি বিশ্বশক্তিকে। দ্রুত পাল্টে দিয়েছিল বিশ্বের বিশাল ভূ-ভাগের মানুষের ধর্ম, রাজনীতি, সমাজনীতি, আইন-আদালত, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ও দর্শন। তখন বিলুপ্ত হয়েছিল ক্রীতদাস প্রথা, অধিকার পেয়েছিল নারী। সে বিশাল বিপ্লবটি যে শক্তিটির বলে সম্ভব হযেছিল সেটি কোন লোকবল, অর্থবল, বা সামরিক বলের কারণে নয়। মক্কা-মদীনাকে ঘিরে গড়ে উঠা সে ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের সেরূপ কোন বলই ছিল না। বরং সে বিপ্লবের প্রকৃত শক্তি ছিল ইসলাম। সে ইসলামই তাদেরকে অন্যদের থেকে ভিন্নতর করেছিল।

 

মানব জাতির সমগ্র ইতিহাসে আরবগণ সবচেয়ে বড় গৌরবের অধিকারি হয়েছে মূলত সে ইসলামী বিপ্লবের বরকতেই। অথচ সে বিপ্লবী শক্তিকে আরবগণ ধরে রাখতে পারেনি। ইসলামের শিক্ষা থেকে আরবগণ যতই দূরে সরেছে ততই তারা পরাজয়, বিভক্তি ও জিল্লতির শিকার হয়েছে। আজকের আরবদের নিজেদের অর্জন অতি সামান্যই। তাদের হাতে আজ যে বিপুল তেল ও গ্যাসের ভান্ডার, সে দান তো মহান আল্লাহর। যা তাদের নিজেদের কামাই তা হল বিবাদ ও বিভক্তি। তারা এতটাই নিচে নেমেছে যে আরব দেশগুলো বিশ্বব্যায়ী পরিচয় পেয়েছে স্বৈরাচারি শাসকদের চারনভূমি রূপে। সমগ্র বিশ্নের আর কোন অঞ্চলে যেমন এত তেল-গ্যাস নাই, তেমনি এত বিভক্তি এবং এত স্বৈরাচারি শাসকও নাই। এক বর্ণ, এক ভাষা, এক ধর্ম এবং এক ভূখণ্ড হওয়া সত্ত্বেও আরবগণ বিভক্ত ২২টি রাষ্ট্রে। স্বাধীন ভাবে কথাবলা, লেখালেখি করা, পত্রিকা বা বই প্রকাশ করা এবং রাজনীতি করা বা রাজনৈতিক সংগঠন গড়া -এসব দেশগুলির প্রায় সবগুলিতেই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কোন কোন দেশে সে অপরাধে প্রাণদণ্ড দেয়া হয়। ইতিহাস এখানে মধ্যযুগীয় বর্বরতায় আটকা পড়ে আছে। আর সে বর্বরতাকে দীর্ঘায়ীত করতে মদদ দিচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, গ্রেট ব্রিটেন, জার্মানী ও ফ্রান্সসহ পশ্চিমা বিশ্বের প্রায় তাবত রাষ্ট্রগুলো। মধ্যযুগীয় এ বর্বরতায় আরবদের এ স্থবিরতাকে তারা বলছে এলাকার স্থিতিশীলতা। এ স্থিতিশীলতার লক্ষ্য, আরবদের সম্পদ লুন্ঠনের লক্ষ্যে যে রাজনৈতিক, সামরিক, অর্থনৈতিক অবকাঠামো পাশ্চাত্যের শক্তিবর্গ দীর্ঘকাল ধরে গড়ে তুলেছে সেটিকে বাঁচিয়ে রাখা। সে অবকাঠামোরই অবিচ্ছেদ্দ অংশ হল আরবদের মাঝে রাজনৈতিক বিভক্তি ও কলহকে বাঁচিয়ে রাখা। ইসরাইলের নিরাপত্তাকে সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যেও এমন বিভক্তি অতি অপরিহার্য। কারণ একটি জাতির শক্তির সবচেয়ে বড় উৎস হল তার জনগণের একতা। বিভক্ত জনগণের হাতে সম্পদ যতই থাক তাতে শক্তি বাড়ে না, বাড়ে দুর্বলতা। বাড়ে পরাজয় ও পরনির্ভরতা। তাই আরবদের হাতে তেল-গ্যাসের বিস্তর মওজুদ থাকলে কি হবে তাতে শক্তি বাড়েনি। ইজ্জতও বাড়েনি। বরং বিশ কোটির বেশী আরব জিম্মি হয়ে আছে ক্ষুদ্র ইসরাইলের কাছে। অধিকৃত হয়েছে ফিলিস্তিন, এবং প্রথম কেবলা মসজিদুল আকসা।

 

আরবদের এ দুর্বলতা টিকেয়ে রাখার জন্য শত্রুর স্ট্রাটেজী শুধু এ বিভক্তিকে টিকিয়ে রাখা নয়, বরং স্বৈরাচারি শাসকদের বাঁচিয়ে রাখাও। কারণ, স্বৈরাচারি শাসকগণই হল এ বিভক্ত আরব ভূমির মূল পাহারাদার। তারা এমন বিভক্তিকে দীর্ঘস্থায়ী করতে চায় নিজ স্বার্থে। সেটি নিজেদের শাসন টিকিয়ে রাখার স্বার্থে। আরবদের একতার তারাই মূল দুষমন। ফলে তাদের দুষমনী আরবদের যে কোন বিজয় বা গৌরবেরও বিরুদ্ধেও। তাই অতীতে ইসরাইলের সাথে লেবাননে হিজবুল্লাহ বা গাজায় হামাসের যে লড়াই হল মিসর, সৌদিআরব ও জর্দানের স্বৈরাচারি শাসকেরা সে লড়ায়ে হিজবুল্লাহ বা হামাসর বিজয় চায়নি। গাজার অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনীদের মাথার উপর যখন বৃষ্টির ন্যায় ইসরাইলীদের বোমা পড়ছিল, তখনও হোসনী মোবারক সরকার প্রাণ বাঁচাতে সে অসহায় ফিলিস্তিনীদের মিসরে আশ্রয় নিতে দেয়নি। ক্ষুদার্ত এবং আহত ফিলিস্তিনীদদের জন্য খাদ্য ও ঔষধও পৌঁছতে দেয়নি। বরং সযত্নে পাহারা দিয়েছে ইসরাইলী স্বার্থের। প্রতিদানে ইসরাইল থেকে যেমন বাহবা পেয়েছে, তেমনি বছরে দেড় বিলিয়ন ডলার পেয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। মধ্যপ্রাচ্যে গণতন্ত্রের মূল শত্রু তাই শুধু এলাকার স্বৈরাচারি শাসকগণই নয়, বরং ইসরাইলসহ পাশ্চাত্য শক্তিবর্গও। তারা চায় স্বৈরাচারি শাসকদের দীর্ঘায়ু। মিশরে বিপ্লব শুরু হয়েছিল ২৫ জানুয়ারী থেকে। কিন্তু সামরিক বাহিনী গত ২ সপ্তাহ ধরে সে বিপ্লব ঠেকিয়ে রেখেছে। সেনাবাহিনীর মূল কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে, হোসনী মোবারককে পাহারা দেয়া, দেশ বা দেশবাসীকে নয়। তাই সেনাবাহিনীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রবার্ট গেটস। মিশরে নিযুক্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত এক কথাও বলেছেন, হোসনী মোবারকের উচিত ক্ষমতায় টিকে থাকা। ফলে সাহস পাচ্ছে হোসনী মোবারকও। কিন্তু বিপ্লবের যে হাওয়া শুরু হয়েছে তা থেকে কি তিনি বাঁচতে পারবেন?

 

সরকার পরিবর্তনের শান্তিপূর্ণ পথ কোন দেশে জোর করে বন্ধ করা হলে সেখানে পরিবর্তন অনিবার্য হয় অশান্তির পথে। এটাই ইতিহাসের নিয়ম। স্বৈরাচারি শাসকদের বর্বরতা যেমন অনেক, তেমনি তাদের অজ্ঞতাও অনেক। তবে সবচেয়ে বড় অজ্ঞতাটি হল, তারা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না। তাই অন্ধের ন্যায় স্বৈরাচারিদের পা দুটিও সব সময়ই গর্তে পড়ে। তারা যত শক্তিধরই হোক, তাদের শেষ পরিনতিটা আদৌ তাই সুখের হয় না। তাদের প্রাণে বাঁচাটাই অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। রোমানিয়ার চসেস্কোর ন্যায় অনেকেই জনতার হাতে মারা পড়েছেন। অনেকে ভাগ্যগুণে প্রাণে বাঁচলেও ইজ্জত বাঁচাতে পারেনি। ফলে তিউনিসিয়ার বিন আলী যেমন দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন, তেমনি পালিয়েছিলেন ইরানের মহম্মদ রেজা শাহ। স্বৈরাচারি শাসকদের এমন করুণ পরিনতির ইতিহাস কি বাংলাদেশেও কম? শেখ মুজিব তাঁর গদী রক্ষার কাজটি সমাধা করতে চেয়েছিলেন একদলীয় বাকশালী স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠা করে। এ লক্ষ্যে সকল বিরোধী পত্র-পত্রিকাগুলোকে তিনি বন্ধ করেছিলেন। নিষিদ্ধ করেছিলেন সকল বিরোধী দল। মোসাহেবী চাটুকারদের ছাড়া তিনি আর কাউকে রাজনীতির অধিকার দেননি। কিন্তু তার ফলটা তাঁর নিজের জন্য ভাল হয়নি। এতে যেমন তাঁর গদি বাঁচেনি, তেমনি নিজেও বাঁচেননি।

 

আরব বিশ্বে এবারের বিপ্লবের শুরু হল তিউনিসিয়া থেকে। সে বিপ্লব ছড়িয়ে পড়ছে মিশর, জর্দান, ইয়েমেন, আলজিরিয়াসহ অন্যান্য দেশে। তবে বিপ্লবের নামেও আরব দেশগুলিতে এর পূর্বে জালিয়াতি বা ধোকাবাজী কম হয়নি। এর আগে বহু আরব দেশে সামারিক জান্তারা সামরিক অভ্যুর্ত্থান ঘটিযে সেটিকে জনগণের বিপ্লব বলতো। বিগত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে জেনারেল নজিব এবং জামাল আব্দুর নাসের রাজা ফারুককে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করে ক্ষমতায় বসেছিলেন। তখন থেকেই দেশটি সামরিক বাহিনীর হাতে অধিকৃত। জরুরী আইন ও শাসনতণ্ত্রের নামে জনগণকে রাখা হয়েছে শাসন ক্ষমতার বাইরে। নাসেরের মৃত্যুর পর ক্ষমতায় বসেন আনোয়ার সাদাত। হোসনী মোবারক ভাইস প্রেসিডেন্ট হন ১৯৭৫ সালে। আঁতোতায়ীর গুলিতে আনোয়ার সাদাত নিহত হন ১৯৮১ সালে । তখন ক্ষমতায় বসেন হোসনী মোবারক। হোসনী মোবারক ক্ষমতায় আছেন বিগত ৩৫ বছরেরও বেশী কাল ধরে। এর মধ্যে ৩০ বছর প্রেসিডেন্ট রূপে। চার্চিল বা রুজভেল্টের ন্যায় বহু ব্রিটিশ ও মার্কিন নেতা বিশ্বযুদ্ধ জয় করেছেন। কিন্তু তারা সংক্ষিপ্ত এক সীমিত সময়ের বেশী ক্ষমতায় থাকতে পারেননি। সে তুলনায় দেশের জন্য বা জাতির জন্য হোসনী মোবারক, বিন আলী, গাদ্দাফীর অবদান কতটুকু? অথচ তারা ক্ষমতায় থাকতে চায়ন আজীবন।

 

সামরিক অভ্যুর্ত্থানের নায়কগণ বিপ্লবের নামে জনগণের সাথে যেমন প্রতারণা করেছেন, তেমনি প্রচণ্ড প্রতারণা করেছেন গণতন্ত্রের সাথেও। হোসনী মোবারক কোন বিরোধী দলীয় প্রার্থীকে নির্বাচনে তার বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দিতা করতে দেননি। বিগত নির্বাচনে লোক দেখানোর স্বার্থে অন্যদের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দিতার সুযোগ দিয়েছিলেন। সেটি যে কতটা প্রতারণাপূর্ণ ছিল সেটি প্রকাশ পেতে বেশী সময় লাগেনি। কেফায়া আন্দোলনের নেতা আয়মন নূর সে নির্বাচনে সাহস করে মোবারকের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দিতায় দাঁড়িয়েছিলেন। এর আগে মোবারক শতকরা ৯৮.৫ ভাগের বেশী ভোট পেয়ে বিজয়ী হতেন। কিন্তু এবারে বিপুল ভোটে জিতলেও ভোটের মাত্রা অন্য বারের ন্যায় শতকরা ৯৮.৫ ভাগ থাকেনি। আর এটুকুও তিনি সহ্য করতে পারেননি। এতেই শাস্তি নেমে আসে পরাজিত প্রার্থী আয়মন নূরের কপালে। তাঁকে জেলে যেতে হয়।  রাজা যেমন তার রাজ্যে কাউকে প্রতিদ্বন্দী রূপে মেনে নেয় না, তেমনি মানতে রাজী নয় এসব স্বৈরাচারি শাসকগণও। তারা চায় নিজেদের প্রতি সকল নাগরিকের নিঃশর্ত আনুগত্য। কেউ বিপক্ষে ভোট দিক বা কেউ নির্বাচনে তার প্রতিদ্বন্দী হোক -সেটি এসব স্বৈরাচারি শাসকদের কাছে অসহ্য। আনুগত্য প্রকাশ ছাড়া স্বৈরাচারি শাসকেরা জনগণের হাতে আর কোন রাজনৈতিক অধিকার সহজে ছেড়ে দিতে রাজী নয়। তারা শুধু দেশ শাসনেই স্বেচ্ছাচারি নয়, প্রচণ্ড স্বেচ্ছাচারিতা  খেয়াল-খুশি ও অভিলাশেও। তাদের স্বেচ্ছাচারি সে ভাবনার মূল কথাটি হল, ক্ষমতায় থাকার অধিকার একমাত্র তাদের ও তাদের বংশধরদের। রাজা যেমন তার নাবালক সন্তানকেও সবার চেয়ে বুদ্ধিমান ও যোগ্যবান ভাবে, তেমন ধারণা স্বৈরাচারি শাসকদেরও। হোসনী মোবারকও তাই পুত্র জামাল মোবারককে তাঁর উত্তরাধিকারী রূপে গদীতে বসাবার পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। সিরিয়ার আসাদ বসিয়েছেন তার পুত্র বাশারকে। গাদ্দাফী বসাতে চাচ্ছেন তার পুত্র সাইফুল ইসলাম গাদ্দাফীকে। মধ্যপ্রাচ্যের স্বৈরাচারি শাসকগণ যেন রাজতন্ত্রকে আধুনিক লেবাসে প্রতিষ্ঠিত করতে ব্যস্ত। আর সে লেবাসটি হল গণতন্ত্রের। যে গণতন্ত্রে বিরোধী দল থাকবে না, বিরোধী পত্রিকাও থাকবে না এবং থাকবে না কোন শক্তিশালী নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দীও ।  তবে থাকবে কঠোর নিরাপত্তা আইন -যা মিশরে গত তিরিশ বছর ধরে বলবৎ রাখা হয়েছে। বলা হয়, এ আইনের লক্ষ্য, জনগণ বা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা। অথচ এ আইনের মূল প্রোয়োগটি হয় স্বৈরাচারি সরকারের নিরাপত্তা ও দীর্ঘায়ু নিশ্চিত করতে। বিরোধীদের গ্রেফতার, নির্যাতন ও বিনা বিচারে বছরের পর বছর কারারুদ্ধ রাখাও এ আইনে সিদ্ধ। এ আইনে গ্রেফতার হলে বা আদালতে শাস্তি হলে আপিলেরও সুযোগ নাই। এমন গণতন্ত্রে মিশরে আজও নিষিদ্ধ হল সে দেশের সর্ব বৃহৎ বিরোধী দল ইখওয়ানুল মুসলিমুন। আইন ও গণতন্ত্রের দোহাই দিয়েই ফাঁসীতে চড়ানো হয়েছিল বিখ্যাত চিন্তাবিদ ও কোরআনের বিখ্যাত তাফসিরকারক সায়েদ কুতুবসহ আরো অনেককে। দীর্ঘকালের জন্য কারাবাসে পাঠানো হয়েছিল হাজার হাজার নিরাপররাধ মানুষকে। সব গরু যেমন ঘাস খায়, তেমনি সব স্বৈরাচারিই জনগণের অধিকার খায়। গণতন্ত্রের দো্হাই দিয়ে শেখ মুজিবও তাই দেশের সকল ইসলামপন্থি দলগুলোকে নিষিদ্ধ করেছিলেন। জেলে ঢুকিয়েছিলেন এসব দলের নেতাদের। নিছক রাজনৈতিক স্বার্থ হাছিলের লক্ষ্যে এভাবেই কবরস্থ হয়েছিল বহু লক্ষ মানুষের নাগরিক অধিকার। গণতন্ত্রের জোব্বাটি যত বড়ই হোক, আজও কি বাংলাদেশ এমন স্বৈরাচার থেকে মূক্ত? স্বৈরাচারি শাসন জেঁকে বসে আছে লিবিয়া, সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, সিরিয়া, জর্দান, ইয়েমেন, বাহরাইন, দুবাই, ওমানসহ প্রায় প্রতিটি আরব দেশে। এসব দেশে সাধারণ মানুষের কোন দল গড় অধিকার নেই। রাজা-বাদশাহ ও স্বৈরাচারি সরকারেরা পর্বত-প্রমাণ অন্যায় করলেও তা নিয়ে প্রতিবাদ জানানোর অধিকারও নেই।           

 

স্বৈরাচারিরা শধু জনগণের শত্রু নয়। তারা শত্রু মহান আল্লাহরও। তারা শুধু জনগণকেই ক্ষমতাহীন করে না, আল্লাহর দ্বীনের প্রতিষ্ঠাকেও তারা অসম্ভব করে। তারা চায় নির্ভেজাল নিজেদের স্বার্বভৌমত্ব; জনগণের যেমন নয়, তেমনি আল্লাহরও নয়। স্বৈরাচারি শাসনের বিপদ তাই শুধু এ নয় যে, জনগণের পার্থিব স্বার্থ তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বরং তাতে ভয়ানক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় আখেরাতের স্বার্থও। প্রতিটি স্বৈরাচারি শাসকের আরধ্য মডেল হল ফিরাউন। অতীতের ফিরাউনদের ন্যায় নব্য ফিরাউনগণও সর্বার্থে সকল ক্ষমতার অধিকারি হতে চায়। তারা চায়, একমাত্র তাদের কথা বা তাদের নির্দেশ আইনে পরিনত হোক। পার্লামেন্টের দায়িত্ব হল, তাদের সে খায়েশকে ত্বরিৎ আইনে রূপ দেয়া। তাই বাংলাদেশে এক দলীয় বাকশাল কায়েম করতে পার্লামেন্টে দীর্ঘ আলোচনা হয়নি। সে সাহস ও ক্ষমতাও পার্লামেন্টের সদস্যদর ছিল না। জনগণকে বিভ্রান্ত করার স্বার্থেই তারা আল্লাহর প্রদর্শিত সিরাতুল মোস্তাকিমকে জনগণ থেকে আড়াল করে। প্রতিষ্ঠা করে নিজেদের মত ও পথ। স্বৈরাচারি শাসনে তাই সহজতর, ব্যাপকতর ও প্রবলতর হয় আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও অবাধ্যতা। কঠিনতম হয়ে পড়ে আল্লাহর দ্বীনের পূর্ণ অনুসরণ। তাই মধ্যপ্রাচ্যের স্বৈরাচার কবলিত রাষ্ট্রগুলো পরিণত হয়েছে টুরিজমের নামে ব্যাভিচারী ও মদ্যপায়ীদের অভয়-অরণ্যে। পাপাচারের চারণ ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে দেশের ক্লাব-ক্যাসিনো ও সমুদ্র সৈকতগুলো। স্বৈরাচারি শাসকগণ মদ, জুয়া, উলঙ্গতা ও ব্যাভিচারের ন্যায় পাপাচারকে শুধু প্রবলতরই করে না, কঠোর নিরাপত্তাও দেয়। অপর দিকে জেলে পাঠায় ও নির্যাতন করে তাদের যারা ব্যক্তি ও রাষ্ট্রীয় জীবনের ইসলামের পরিপূর্ণ অনুসরণ চায়। তিউনিসিয়ার স্বৈরাচারি সরকার স্কুল-কলেজ ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে মহিলাদের পর্দাকেও নিষিদ্ধ করা করেছিল। একই নীতি ছিল ইরানে শাহ ও তুরস্কের স্বৈরাচারিদের।

   

তিউনিসার বিপ্লব সঠিক অর্থেই জনগণের বিপ্লব। স্বৈরাচারি সরকারের পতনের আন্দোলনে এ বিপ্লব জনগণকে নতুন পথ দেখালো। জনগণের ক্ষমতার কাছে জালেম যে কতটা দুর্বল সেটি এ বিপ্লব নতুন করে প্রমাণ করলো। লক্ষ লক্ষ মানুষ একত্রে কোন দেয়ালে ঝাঁকুনী দিলে সেটি ভেঙ্গে পড়তে বাধ্য। তাই স্বৈরাচারি জালেম সরকারকে ক্ষমতা থেকে হঠাতে যেটি জরুরী সেটি সামরিক শক্তি নয়, সেটি হল জনগণের একতা, সাহস ও কোরবানী। তিউনিসা ও মিশরের বিপ্লবের নায়ক কোন নেতা নয়, কোন সংগঠনও নয়। এখানেই এ বিপ্লবের মূল শক্তি। সুনিদ্দিষ্ট কান নেতা বা সংগঠন না থাকায় স্বৈরাচারি সরকার কাউকে গ্রেফতার করে ও কোন দলের দফতরে তালা ঝুলিয়ে এ বিপ্লবকে বিফল করতে পারিনি। ইন্টারনেট একটি দেশে জনগনকে উদ্বুদ্ধ করতে যে কতটা বলিষ্ট ও বিপ্লবী ভূমিকা রাখতে পারে তার প্রমাণ তিউনিসিয়া ও মিশরের এ বিপ্লব। সংগঠন ছাড়াও যে জনগণ কি ভাবে সংগঠিত হতে পারে সেটিই এ বিপ্লবের সবচেয়ে বড় শিক্ষা। এমনই আরেক বিপ্লব ঘটেছিল ১৯৭৯ সালে ইরানে। জনগণ এখানে প্রবল ভাবে আন্দোলিত হয়েছে তাদের আলোকিত চেতনা, বুদ্ধি-বিবেচনা ও দায়িত্ববোধ থেকে। নবীজী (সাঃ)র আমলে মানুষ এমনি এক দায়িত্ববোধে মানুষ নিজ শ্রম বা নিজ অর্থ ব্যয়ে অস্ত্র গড়ে নিজ খরচে যুদ্ধের ময়দানে হাজির হত। একই চেতনাবোধে কায়রোর হাজার হাজার মানূষ নিজ নিজ বিছানা ও খাদ্য-পানীয় নিয়ে প্রচণ্ড শীতের রাতে কায়রোর তাহরির ময়দানে সারা রাত কাটাচ্ছে, দিনের পর দিন মিছিল করছে। জনগণের মাঝে এ তীব্র জাগরণ আনতে এবং দায়িত্ববোধ সৃষ্টিতে এখানে ব্যাপক ভাবে কাজ করেছে ইন্টারনেট ভিত্তিক মিডিয়া যা জ্ঞানের বিতরণে প্রবল ভাবে কাজ করছে।

 

যে কোন সমাজ বিপ্লবের মূল শক্তি হল একটি বিপ্লবী দর্শন। এছাড়া জনগণ রাস্তায় নামে না, কোন বিপ্লব হয় না। তবে সে দর্শনটি তখনই বিপ্লবী শক্তিতে পরিণত হয় যখন সেটি কোটি কোটি মানুষের মগজে বেড়ে উঠার সুযোগ পায়। ইসলামের মূল সে শক্তিটি হল কোরআনী দর্শন। এ দর্শন মন থেকে মানুষের ভয় দূর করে আল্লাহর ভয় প্রতিষ্ঠিত করে। মানুষ তখন নির্ভয়ে শত্রুর মুখোমুখী দাঁড়ায়। নবীজী (সাঃ)র যুগে বিপ্লব এসেছিল মূলত সে দর্শনের গুণেই। দর্শনই মানুষকে ভাবনায় বা চিন্তায় নিবিষ্ট করে। নবীজী (সাঃ) বলেছেন, আফজালুল ইবাদাহ তাফাক্কুহ। অর্থঃ চিন্তাশীলতা শ্রেষ্ঠ ইবাদত। চিন্তাশূণ্য মানুষকে পবিত্র কোরআনে গবাদী পশুর সাথে তুলনা করা হয়েছে। নামায-রোযা, হজ-যাকাতের মাধ্যমে যদি সে চিন্তাশীলতাই বেড়ে না উঠে তবে সে নামায-রোযা, হজ-যাকাতে খুব একটা লাভ হয়না। বাংলাদেশের একটি জেলায় যত নামাযীর সংখ্যা খোলাফায়ে রাশেদার সময় কি তার অর্ধেকও ছিল? কিন্তু সে নামাযীদের মাঝে চিন্তাশীলতা সৃষ্টি হচ্ছে কতটুকু? চিন্তাশীলতা ও বিবেকবোধ থাকলে বাংলাদেশে কি আল্লাহর আইন পরাজিত হত? দর্শনের বলই বড় বল। মানুষ শ্রেষ্ঠত্ব পায় সে দর্শনের বা চিন্তার বল থেকেই, দেহের বল থেকে নয়। দেহের বলে সে তো ছোটখাটো পশুকেও হারাতে পারে না। চিন্তাশীলতা বা দর্শনের বল বাড়াতেই ইসলামের শেষ নবী রাতের পর রাত হীরা পর্বতের গুহায় কাটিয়েছেন। সে বল বাড়াতে আল্লাহতায়ালা হযরত মূসা (আঃ)কে তুর পাহাড়ে ৪০ দিনের জন্য ডেকেছিলেন। চিন্তার সে সামর্থই হল প্রকৃত আধ্যাত্মিকতা। সফল ইসলামী বিপ্লবের আগে তাই প্রবল আধ্যাত্মীক বিপ্লব আনতে হয়। এটিই রাষ্ট্রীয় বিপ্লবের ইসলামী ধারা। আরব বিশ্বে পবিত্র কোরআনের শিক্ষা সে কাজটিই মূলত নীরবে করছে।  

 

স্বৈরাচারি শাসকদের বড় অপরাধ, তারা এমন এক সৃষ্টিশীল দর্শনের প্রচার ও প্রতিষ্ঠাকেই অবসম্ভব করে তোলে। তারা চায় মানুষ চিন্তাশুণ্য মোসাহেব বা স্তাবক রূপে বেড়ে উঠুক। তারা চায়, মানুষকে যা বলা হয় বা শেখানো হয় সেগুলো নিয়েই বেড়ে উঠুক। রাজনীতি ও প্রশাসনের পাশাপাশি তাদের দখলদারি প্রতিষ্ঠিত হয় ধর্মচর্চা, জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রেও। বাংলাদেশে স্বৈরাচারি শাসকের পুলিশ ও র‌্যাব বাহিনী একারণে মাদ্রাসা থেকে বই বাজেয়াপ্ত করে এবং সাহসী লেখক ও আলেমদের ধরে শারীরীক নির্যাতন করে এবং কারারুদ্ধও করে। স্বৈরাচারি শাসনামলে তাই শুধু রাজনৈতিক দুর্বৃত্তিই বাড়ে না, বাড়ে নৈতিক ভাবে পঙ্গু মানুষের সংখ্যাও। তখন প্রচণ্ড আকাল দেখা দেয় জ্ঞানবান ও দায়িত্ববান মানুষের। অথচ ইসলামে নামায-রোযার আগে প্রতিটি নরনারীর উপর ফরজ করা হয়েছে জ্ঞানচর্চা। অজ্ঞতা বা চিন্তাশূণ্যতার কারণেই লক্ষ লক্ষ মানুষ ফিরাউনের ন্যায় দুর্বৃত্তদেরও খোদা বলে স্বীকার করত। এরূপ অজ্ঞতার কারণে শুধু ফিরাউন বা নমরুদই নয়, মাটির মুর্তি বা শাপ-শকুনের ন্যায় ইতর প্রাণীও হাজার হাজার বছর ধরে কোটি কোটি মানুষের পুজা পেয়েছে এবং আজও পাচ্ছে। বাংলাদেশে অতি দুর্বৃত্ত স্বৈরাচারিও যে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী রূপে চিত্রিত হয়, সেটি তো এ চিন্তাশীলতা না থাকার কারণেই। একই কারণে দৃর্বৃত্ত নেতারা তাদের পক্ষে বিপুল সংখ্যক ভোটদাতা, অর্থদাতা ও লাঠি ধরার লোক পায়। তাই শয়তানী শক্তির প্রচণ্ড ক্ষতি যেমন জ্ঞানের প্রচারে, তেমনি প্রচণ্ড লাভ অজ্ঞতার বৃদ্ধিতে। দুর্বৃত্তদের কাছে অতি প্রিয় হল রাতের আঁধার, দিনের আলো নয়। শয়তানের প্রধানতম কাজ তাই মানুষকে আলো থেকে অন্ধকারে তথা অজ্ঞতার দিকে নিয়ে যাওয়া। পবিত্র কোরআনের ভাষায় শয়তানের সে মিশনটি বর্নীত হয়েছে এভাবে, “এবং যারা কুফরি করে তথা আল্লাহর অবাধ্যতা করে তাদের বন্ধু হল শয়তান, এবং সে তাদেরকে আলো থেকে আঁধারের দিয়ে নিয়ে যায়।” -সুরা বাকারা, আয়াত ২৫৭)।  

 

চৌদ্দ শত বছর পূর্বের বিপ্লবের ন্যায় আজও আরব বিশ্বের বিপ্লবের মূল শক্তি তার দর্শনে। সেটি ইসলামী দর্শন। এ দর্শনের প্রচারের ইন্টারনেট সে বিশাল কাজ করছে। আরব বিশ্বের সবচেয়ে বড় সম্পদ এখন শুধু তেল বা গ্যাস নয়, বরং বড় শক্তি হল দর্শনের শক্তি। সেটি কোরআনী দর্শন। সেখানে জন্ম নিয়েছে শহীদ কুতুব, হাসানূল বান্নাহর মত মহান চিন্তাশীল ব্যক্তিবর্গ। দর্শনের বলে আরব দেশগুলিতে বিপুল সংখ্যক চিন্তাশীল মানুষ সৃষ্টি করেছে। সেটি বুঝা যায় বিভিন্ন ঠিভি চ্যানেল, পত্র-পত্রিকা ও বইয়ের আলোচক বা লেখকদের চিন্তাশীলতা দেখে। মুসলমানদের জাগরণের এটিই এক মহা সম্ভাবনার দিক। তারা বিশ্ববাসীকে শুধু তেল-গ্যাস দেয়ার সামর্থই রাখে না, প্রবলতম একটি দর্শন দেয়ার সামর্থও রাখে। বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় অভাব তো এ ক্ষেত্রটিতেই। তাই তিউনিসিয়ায় বা মিশরে যা কিছু ঘটছে তা কোন সামান্য ঘটনা নয়। নিছক সরকার পরিবর্তনও নয়। বরং এমন এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা যা দ্রুত পাল্টে দিতে পারে মানব জাতির ইতিহাসও। পাল্টে দিতে পারে বিশ্ব রাজনীতিও। এবং গূণগত পরিবর্তন আনতে পারে মানব সভ্যতায়। মধ্যপাচ্যের বিপ্লবের এটিই হল সবচেয়ে আশাপ্রদ দিক। ১০/০২/১১   
বিশেষ কথাঃ এ লেখাটি শেষ করার পরের দিন ১১/০২/১১ তারিখে হোসনী মোবারক প্রেসিডেন্ট পদ থেকে পদত্যাগ করেন।

 

 

 

 

 

 

 

         



Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 
Comments (1)
analytical and impressive
1 Thursday, 24 February 2011 06:50
probashimojumder

Dear brother,


Assalaamu Alaikum. Thanks and appreciatiation for  your analytical and impressive writting on the present situation in the Arab world. I do believe that Allah will lead Muslims in the right way. After a lot of suffering, these traitor leaders will fall down and Islamic civilization will return which are needed in this unstable situation.


 Regards


 Probashi Mojumder

Last Updated on Saturday, 12 February 2011 18:37
 
Dr Firoz Mahboob Kamal, Powered by Joomla!; Joomla templates by SG web hosting
Copyright © 2017 Dr Firoz Mahboob Kamal. All Rights Reserved.
Joomla! is Free Software released under the GNU/GPL License.