Home •বাংলাদেশ শেখ হাসিনার মা-দুর্গা ও ইসলামবিরোধী নাশকতা
শেখ হাসিনার মা-দুর্গা ও ইসলামবিরোধী নাশকতা PDF Print E-mail
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Sunday, 16 October 2011 17:46

শেখ হাসিনার মা-দুর্গা 

গত ৫ই অক্টোবর রাজধানীর ঢাকেশ্বরী মন্দির ও রামকৃষ্ণ মিশনে দুর্গা পূজা উপলক্ষে পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেখানে গিয়ে তিনি বলেছেন, “আমরা জানি এবং শুনেছি মা দুর্গা প্রত্যেক বছর কোনো না কোনো বাহন চড়ে আমাদের এ বসুন্ধরায় আসেন। এবার আমাদের দেবী এসেছেন গজে চড়ে। জানি, গজে চড়ে এলে এ পৃথিবী ধন-ধান্যে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে—তা আমরা দেখতেই পাচ্ছি। এবার ফসল ভালো হয়েছে। মানুষ সুখেই-শান্তিতে আছে। দেশের জিডিপি বৃদ্ধি পেয়ে ৭ ভাগে দাঁড়িয়েছে।”-(দৈনিক আমার দেশ,৬ই অক্টোবর, ২০১১)।

 

এ কথাগুলো শেখ হাসিনা কোনরুপ নেশার ঘোরে বলেননি। জ্বরের প্রকোপে বিকার গ্রস্ততায়ও বলেননি।কোন দৈত্যদানবের ভয়ে বা র‌্যাব-পুলিশের রিমাণ্ডে গিয়েও বলেননি। তিনি সুস্থ্য মাথায় “জানেন এবং শুনেছেন” এমন দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে বলেছেন। দুর্গাকে তিনি আমাদের দেবী বলেছেন। “পৃথিবী ধন-ধান্যে পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে এবং জিডিপি বেড়েছে” এতে দুর্গা যে গজে চড়ে এসেছে সে বিশ্বাসটি আরো মজবুত হয়েছে -সেটিও বলেছেন। শেখ হাসিনা এ কথাগুলো বলেছেন মনের মাধুরি মিশিয়ে, এবং পুজা মণ্ডপে দাঁড়িয়ে।এমন অবস্থায় মানুষ যখন কথা বলে তখন সে অন্যের শেখানো কথা বলে না, একান্ত নিজের মনের কথাগুলোই অতি নির্ভয়ে বলে।

 

মানুষের অন্তরে কি আছে সেটি দেখা যায় না। তবে দেখা না গেলেও সেটি গোপন থাকে না। কারণ চেতনারও ভাষা আাছে। প্রকাশের জন্য তারও প্রচণ্ড আকুতি আছে। তাই সুযোগ পেলেই মুখের কথায় সেটি ফুঠে উঠে। মানুষে ভিতরের রূপটি এভাবেই বাইরে চলে আসে। তাই ঈমানদারের ঈমানদারি যেমন গোপন থাকে না,তেমনি গোপন থাকে মুনাফিকের মুনাফেকি, মিথ্যুকের মিথ্যাচার এবং পৌত্তলিকের পৌত্তলিকতাও। সেটির প্রকাশ ঘটে যেমন কথায়, তেমনি কর্ম ও আচরণে। উচ্চতর মারেফত এবং প্রগাড় প্রজ্ঞার অধিকারি ছিলেন হযরত আলী (রাঃ)। তিনে অতি মূল্যবান কথা বলেছেন মানুষের ব্যক্তিত্ব নিয়ে। বলেছেন,“মানুষের ব্যক্তিত্ব তার জিহবাতে।” ব্যক্তিত্বের মধ্যেই প্রকাশ পায় মো’মেনের ঈমানদারি,আর সে ঈমানদারির প্রবল প্রকাশটি ঘটে তাঁর জিহবাতে। ঈমান আনার সাথে সাথে সে ঈমান বাইরে বেরিয়ে আসে কালেমায়ে শাহাদত পাঠের মধ্য দিয়ে। ব্যক্তির ঈমানপূর্ণ ভিতরের রূপটি এভাবেই বাইরে প্রকাশ পায়। অপর দিকে কাফেরের বেঈমানিটাও জাহির হয় তার কথায়। এখানে জিহবা সে বেঈমানিরই সাক্ষ্য দেয়। সেটি পৌত্তলিকতা বা গায়রুল্লাহর পক্ষে সাক্ষ্য দেয়ার মধ্য দিয়ে। সবচেয়ে বেশী পাপ হয় এই জিহবার দ্বারা। নবীজীর হাদীস, “যে দুটি অঙ্গের ব্যবহারের জন্য বেশীর ভাগ মানুষ জাহান্নামে যাবে তার একটি হল তার জিহ্ববা, অপরটি যৌনাঙ্গ।” নবীজী (সাঃ) এ হাদীসে বুঝাতে চেয়েছেন, মানুষের অধিকাংশ পাপকর্ম হয় এ দুটি অঙ্গের দ্বারা। জিহবা থেকে নেক আমলের যেমন শুরু, তেমনি পাপকর্মেরও। জিহবা দ্বারাই ঈমানদার ব্যক্তি জীবনভর মহান আল্লাহ ও তাঁর দ্বীনের পক্ষে সাক্ষি দেয়। অন্যদের ডাকে ইসলামের দিকে, এবং বাঁচায় জাহান্নামের কঠিন আযাব থেকে। অপর দিকে এ জিহ্ববা দিয়েই কাফেরগণ বিদ্রোহ আনে আল্লাহর বিরুদ্ধে। প্রচার এবং প্রতিষ্ঠা দেয় কুফরির।  

 

শেখ হাসিনা কোন পক্ষে?

কালেমা পাঠ শুধু মুসলমানই করে না, অমুসলমানেরা করে। কালেমা পাঠের অর্থ কোন  কিছু বলা বা ঘোষণা দেয়া। কথা বলা বা বক্তৃতা দেয়ার অর্থ কিছু শব্দ, কিছু আওয়াজ বা কিছু বাক্য তৈরি নয়। বরং তাতে প্রকাশ পায় ব্যক্তির চিন্তা-চেতনা,জীবন-দর্শন, সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায় ও ধর্ম-অধর্ম নিয়ে তার বিশ্বাসটি। ধরা পড়ে তার ঈমান। কথা বা বক্তৃতার মধ্য দিয়েই সে সাক্ষ্য দেয় তার কাছে কোন ধর্ম বা বিশ্বাসটি সত্য এবং কোনটি অসত্য। তখন জনসম্মুখে প্রকাশ পায় সে কোন পক্ষের। ইসলামে এটি অতি গুরুত্বপূর্ণ।  কারণ পৃথিবীতে পক্ষ মাত্র দুটিঃ একটি আল্লাহর অপরটি গায়রুল্লাহ বা শয়তানের। তাকে যে কোন একটি পক্ষ নিতে হয়, উভয় পক্ষে থাকার বিধান নিতে হয়। আল্লাহতায়ালা প্রতিটি ব্যক্তি থেকে জানতে চায় সে কোন পক্ষের। তিনি চান,সে পরিচয়টি সমাজের অন্যরাও জানুক। তাই ব্যক্তির ধর্মীয় এ পরিচয়টি ইসলামে গোপন রাখার বিধান নেই। কালেমায়ে শাহাদাত পাঠের মধ্য দিয়ে ইসলাম কবুলের প্রথম দিনেই জনসম্মুখে সেটি জানিয়ে দিতে হয়। যে ব্যক্তি সে সাক্ষ্য দেয়নি,সে মুসলমানও হয়নি। আল্লাহর কাছে মুসলমান বা অমুসলমান হিসাবে পরিচয় পায় মূলত এ সাক্ষ্যদানের ভিত্তিতেই। তবে সে সাক্ষ্যদানেই তার দায়িত্ব শেষ হয় না, শুধু ৫ ওয়াক্ত নামায আদায় ও একমাস রোযা আদায়েও সে দায়িত্ব শেষ হয় না। বরং তাকে মুসলমান রূপে বাঁচতে হয় প্রতিদিন, প্রতি মুহুর্ত। ফলে শুরু হয় আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাঃ) এবং তার নাযিলকৃত ইসলামি বিধানের পক্ষে আজীবন সাক্ষ্যদানের কাজটি,মো’মেনের জীবনে সেটিই প্রকৃত ঈমানদারি।

 

‍“শাহাদাহ”‌‍‍ আরবী শব্দ, অর্থ সাক্ষ্যদান। আর “কালেমায়ে শাহাদত”র অর্থ “সাক্ষ্যদান মূলক বাক্য”। কালেমা পাঠের মধ্য দিয়ে তাকে এ জগতের সবচেয়ে বড় সত্যটির পক্ষ নিতে হয়। আর সেটি “লা-শরিক আল্লাহ” যে একমাত্র মাবুদ বা উপাস্য এবং হযরত মুহাম্মদ যে তাঁর দাস ও রাসূল সে সত্যটির।সাক্ষ্যদানের সে কাজটি প্রতিটি ঈমানদারকে আমৃত্যু জারি রাখতে হয়। সেটি যেমন নামায-রোযা-হজ-যাকাত ও জিহাদে লাগাতর অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে, তেমনি ঘর-সংসার, কর্মস্থল, ইবাদতগাহ, রাজনীতি, প্রশাসন, শিক্ষালয়, বিচারালয়সহ জীবনের সর্ব ক্ষেত্রে। এবং সেটি পবিত্র কোরআনে বর্নিত আল্লাহর প্রতিটি হুকুমের অনুসরণের মধ্য দিয়ে। সে হুকুমের বিরুদ্ধে যেখানেই বিদ্রোহ বা অবাধ্যতা সেখানেই কুফরি। তাই কুফুরি শুধু মুর্তিপুজা নয়, বরং আল্লাহর বিরুদ্ধে প্রতিটি বিদ্রোহ ও অবাধ্যতা। রাজনীতিতে সে প্রবল বিদ্রোহটি ঘটে ইসলামের শরিয়ত বিধানকে প্রতিষ্ঠা না করার মধ্য দিয়ে। এবং সে সাথে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের বদলে শাসক, দল বা জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করে। বাংলাদেশে তো সেটি ঘটেছে।  

 

ইসলাম কবুলের মূল চাবিটি হল “কালেমায়ে শাহাদত”। কালেমা পাঠে সর্বপ্রথম ‘লা ইলাহা’ বলতে হয়।‘লা ইলাহা’ র অর্থঃ “নাই কোন উপাস্য”,এবং এর পর আসে “ইল্লাল্লাহ” যার অর্থ “একমাত্র আল্লাহ ছাড়া”। ইসলাম কবুলের সর্বপ্রথম শর্তটি তাই একমাত্র আল্লাহ ছাড়া সকল উপাস্যের অস্বীকৃতি। মুসলমান হওয়ার পথে এটি এক অলংঘনীয় বাধ্যবাধকতা। অন্তরে কোন দেবদেবী বা উপাস্যের প্রতি সামান্য বিশ্বাস অবশিষ্ঠ রেখে আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপনের কোন সুযোগ “কালেমায়ে শাহাদত” এ রাখা হয়নি। মা-দুর্গা বলে কোন উপাস্য আছে, সে গজে চড়ে আসে এবং তার মর্তে নামাতে ভাল ফসল ফলে –এসব স্বীকার করে নিলে কালেমায়ে শাহাদত পাঠ অর্থহীন হয়ে যায়। এমন কথা বলার অর্থ কালেমায়ে শাহাদতের সুস্পষ্ট বিরুদ্ধাচরন। নামায-রোযা’র হুকুমটি এসেছে তো পরে। প্রশ্ন হল, কোন মুসলমান কি এমন কুফরি বাক্য মুখে আনতে পারে? মুসলমান হওয়ার দায়বদ্ধতা হল, সত্য দ্বীনের পক্ষে আজীবন সাক্ষ্যদানের পাশাপাশি তাকে সযত্নে বাঁচতে হয় অসত্য, অন্যায় ও পৌত্তলিকতার ন্যায় সকল কুফরির বিরুদ্ধে সাক্ষ্যদান থেকেও। নইলে তার ঈমান বাঁচে না। ঈমান বাঁচাতে মুসলমানকে শুধু হারাম খাদ্য-পানীয় ও কর্ম থেকে বাঁচলে চলে না, এমন হারাম উচ্চারণ থেকেও বাঁচতে হয়।  

 

আঘাত ইসলামের মূল খুঁটিতে

শেখ হাসিনার কাণ্ডটি ভয়ানক। যেমন আখেরাতে তাঁর নিজের জন্য, তেমনি বাংলাদেশের জন্যও। ৫ই অক্টোবর সজ্ঞানে ও স্বেচ্ছায় তিনি এক প্রকাণ্ড সাক্ষ্য দিয়েছেন। সাক্ষ্যদানের সে পর্ব ও আয়োজনটিও লক্ষণীয়। সেটি ছিল ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দির ও রামকৃষ্ণ মিশনের পূজামণ্ডপ। টিভি ও পত্র-পত্রিকায় তাঁর সে সাক্ষ্যদানের পর্বটি বিপুল প্রচার পেয়েছে, কোটি কোটি মানুষের কাছে তা পৌঁছেও গেছে। তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী, ফলে তার সে সাক্ষ্যদানে কোটি কোটি মানুষ যে প্রভাবিত হবে সেটিই স্বাভাবিক। বাংলাদেশের বিপদ এখানেই। একজন সাধারণ মানুষের সাক্ষ্যদানেও আদালতের বিজ্ঞ বিচারকগণও প্রভাবিত হয় এবং আসামীকে ফাঁসীতে ঝুলিয়ে দেয়। সঠিক সাক্ষ্যদান তাই মানুষ জীবনের অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজ, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সে সাক্ষদানটি হল আল্লাহ এ তার রাসূলের পক্ষে  সাক্ষ্যদান। ইসলামের পাঁচটি খুঁটির মাঝে এটিই সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ খুঁটি। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও সারা জগত জুড়ে মুসলমানদের লাগাতর সে সাক্ষ্যটি দিতে হয়। ইসলামের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার শুরু এখান থেকেই। ইসলামের ঘর ধ্বসানোর জন্য সবগুলি খুটি ধ্বংসের প্রয়োজন পড়েনা, এই একটি মাত্র খুঁটির বিনাশই যথেষ্ট। নামায-রোযা বেঁচে থাকলেও তখন ইসলাম কখোনই বিজয়ী শক্তি রূপে প্রতিষ্ঠা পাবে না। এবং শরিয়তও কোনদিন প্রতিষ্ঠা পাবে না। আর সে খুঁটিতেই আঘাত হানলেন শেখ হাসিনা। ইসলামের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনা এবং তাঁর সরকারের সবচেয়ে বড় নাশকতা তো এটাই। “দুর্গাকে মা বলে এবং তার গজে আসাতে দেশে ফসলের উৎপাদন বেড়েছে” বলে পৌত্তলিকতার যে সাফাই তিনি গাইলেন তাতে বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের বিবেকের আদালতগুলি কি প্রভাবিত হবে না? এখানে তিনি পক্ষ নিয়েছেন সুস্পষ্ট কুফরির। রেডি ও টিভিতে তার সে কুফরি বাক্যের প্রচার করা হল দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের রাজস্বের অর্থে। মুসলমানদের অর্থে এভাবে ভয়ানক ক্ষতি করে চলেছেন ইসলামের।

 

মুর্তিপূজকেরা দুর্গাকে মা বলে, তার পদতলে মাথা নুয়ায়,এবং পূঁজাও দেয়। এসবই তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস। বাংলাদেশে হিন্দুদের সে স্বাধীনতাও রয়েছে। কিন্তু কোন মুসলমান মুর্তিকে মা বলবে এবং সে মুর্তিটি হাতিতে চড়ে প্রতিবছর আসে এবং তার আসার কারণে ফসলের উৎপাদন বাড়ে - সেটি বিশ্বাস বাংলাদেশে নতুন। এটি শতভাগ পৌত্তলিকতা। অথচ শেখ হাসিনা সেটিরই প্রচার করছেন। দুর্গা পুজা এতকাল বাঙালী হিন্দুদের নিজস্ব পুজা ছিল, আর হাসিনার আওয়ামী সরকার সেটিকে বাঙালীর সার্বজনীন পুঁজাতে পরিনত করতে চাচ্ছে। নবীজীর আমলে মূর্তির অভাব ছিল না, খোদ কা’বার মধ্যে ছিল ৩৬০টি মুর্তি। নবীজীর সূন্নত তো কা’বা থেকে মুর্তি সরানোর, সেগুলিকে শ্রদ্ধাভরা “মা” বলা নয়। অথচ শেখ হাসিনা তার বক্তৃতায় সেটিই বলেছেন। এটি শিরক। আল্লাহ ও তার দ্বীনের বিরুদ্ধে এটি এক ভয়ংকর বিদ্রোহ।  মাটিতে বীজ গজানো,সেটির বেড়ে উঠে এবং ফসল দেয়া নতুন ঘটনা নয়। এসব চিরকালই ঘটছে মহান আল্লাহর রহমতের বরকতে, দুর্গা বা কোন দেব-দেবীর গজে চড়ে আসা-যাওয়ার কারণে নয়। তাছাড়া গজে চড়ে সেরূপ আসা-যাওয়ার ক্ষমতা কি এসব মুর্তিদের আছে? এরূপ বিশ্বাস করা তো মহান আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। ইচ্ছা করলে দয়াময় মহান আল্লাহ তাঁর ঈমানদার বান্দার সব গুনাহ মাফ করে দেন, কিন্তু এরূপ শিরকের গুনাহ মাফ হয় না। নবীজীর এ ঘোষণাটি তো হাদীসে বহুবার এসেছে।

 

নামাযীর বিদ্রোহ?

শেখ হাসিনা ১২ই অক্টোবর,২০১১-এ নিলফামারীর এক জনসভায় দাবী করেছেন, তিনি ৫ ওয়াক্ত নামায পড়েন। কথা হল, তিনি কত ওয়াক্ত নামায পড়েন সেটি যেমন দেখার বিষয় নয়, তেমনি জনসভায় প্রচারেরর বিষয়ও  নয়। বরং দেখার বিষয় হল, তিনি বাস্তবে কি করছেন সেটি। নামায-রোযা পালনের ফলে আল্লাহ ও তাঁর দ্বীনের প্রতি আস্থা গভীরতর হবে এবং তাঁর শরিয়তী বিধান প্রতিষ্ঠায় অঙ্গিকার বাড়বে -সেটিই তো স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু শেখ হাসিনার অঙ্গিকার তো ইসলামী বিধানের বিনাশে। এবং ইসলামপন্থিদের কোমর ভাঙ্গায়। তারই প্রমাণ, সংবিধান থেকে তিনি আল্লাহর উপর আস্থার বাণী বিলুপ্ত করেছেন। শরিয়তী বিধানের প্রতিষ্ঠাকে তিনি মৌলবাদ বলছেন এবং ইসলামের পবিত্র জিহাদকে বলছেন জঙ্গিবাদ। অথচ পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহর সুস্পষ্ট ঘোষণাটি হল, “যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী বিচার-আচারে ফয়সালা দেয় না তারা কাফের, …তারা যালিম, … এবং ..তারাই ফাসিক।” সুরা মায়েদা, আয়াত ৪৪-৪৭)। মুসলমান তাই যখন রাষ্ট্র ক্ষমতা হাতে পায় তখন নামায-রোযার ন্যায় আল্লাহর কোরআনী বিধান তথা শরিয়তের প্রতিষ্ঠাকে ফরজ মনে করে। ভারতে মুসলিম শাসনের শেষ দিন পর্যন্ত আদালতে যে বিধানটি কায়েম ছিল সেটি তো এই শরিয়তি বিধান। কিন্তু ঔপনিবেশিক কাফেরগণ সেটি উৎখাত করে, এবং প্রতিষ্ঠা করে কুফরভিত্তিকর ব্রিটিশ পেনাল কোড। আর বাংলাদেশের সেক্যুলারগণ সযত্নে সে ধারাটিই অব্যাহত রেখেছেন। এবং শেখ হাসিনা সে ধারারই নেত্রী। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও আগ্রাসী ভারত ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে যে অবস্থান নিয়েছে তাঁর নীতিও তো সেটাই।

 

বার বার হজ-উমরাহ করে এবং ৫ ওয়াক্ত নামায পড়েও মানুষ যে ভয়ানক অপরাধী ও ইসলামের পরম শত্রু হতে পারে সে প্রমান তো প্রচুর। তাদের সংখ্যা এমন কি নবীজী (সাঃ)র যুগেও কি কম ছিল? নামায-রোযা নিয়মিত পালন করা যায়, মাথায় রুমাল বেঁধে নির্বাচনের সময় পর্দা-নশীন সাজাও কঠিন কাজ নয়,কিন্তু তাতে কি ঈমানদারি বা ইসলামে অঙ্গিকার বাড়ে? নির্মিত হয় কি ইসলামি ব্যক্তিত্ব? ইসলামি ব্যক্তিত্ব তো নির্মিত হয় আল্লাহর ভয় এবং ইসলামের বিজয় ও শরিয়তী বিধান প্রতিষ্ঠায় আপোষহীন অঙ্গিকার থেকে। তাই খোদ নবীজী (সাঃ)র পিছনে বহুবছর নামায পড়েও মুনাফিকগণ তাই ঈমানদার হতে পারেনি, সুস্থ্য ব্যক্তিত্বের অধিকারিও হতে পারিনি।  মুসলমানের বেশ ধরলেও তারা বেড়ে উঠেছে ভয়ানক অপরাধী এবং ইসলামের ঘোরতর শত্রু রূপে। নামায-রোযা পালন করলেও ইসলামের বিজয় রোধে ও বিনাশে তারা মক্কার কাফের আর মদিনার ইহুদীর সাথে জোটবদ্ধ হয়েছিল।  আজও  যারা নামায-রোযা-হজ-ওমরাহ পালন করে তাদের অনেকের অপরাধ শুধু দুর্গাকে নিছক মা বলার মধ্যে সীমিত নয়। এরা জোট বেঁধেছে তাদের সাথে যারা ইসলামের বিনাশ চায়। তারা মদদ নিচ্ছে তাদের থেকে যারা কাশ্মীর, গুজরাত, বোম্বাইয়ে মুসলিম নিধন, অযোধ্যায় মসজিদ ধ্বংস, বাংলাদেশের সীমান্তে কাটাতার দেয়া ও বাংলাদেশী নাগরিক হত্যা এবং পদ্মা-মেঘনা-তিস্তার পানি তুলে নেয়াকে জাতীয় নীতি বানিয়েছে।

 

শেখ হাসিনার কথাবার্তা থেকে মনে হয়,তিনি যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সে বোধটি তাঁর নেই। ভূলে গেছেন, বাংলাদেশের শতকরা ৯০ ভাগের বেশী মানুষ যে মুসলমান সেটিও। নিজেকে একটি মুসলিম দেশের প্রধানমন্ত্রী গণ্য করলে তাঁর কথাবার্তা,ধর্মীয় বিশ্বাস, আচরণ ও রাজনীতিতে ইসলামী চেতনার প্রতিফলনটি স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু কার্যত সেটি হয়নি। বরং সুস্পষ্ট বুঝা যায়, ইসলামী আক্বীদা-বিশ্বাস থেকে তিনি কতটা বিচ্ছিন্ন। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ইসলামী আক্বীদা-বিশ্বাস থেকে তিনি কতটা বিচ্ছিন্ন সম্প্রতি সেটির প্রবল প্রকাশ ঘটেছে তাঁর বক্তৃতায়। পূঁজামণ্ডপে গিয়ে যা বলেছেন সেটি কোন মুসলমানের মুখে উচ্চারিত হওয়ার কথা নয়। এটি যেমন অস্বাভাবিক,তেমনি অকল্পনীয়। তিনি যেন ভিন্ন এক মেরুর। তিনি যেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নন, বরং কোন অমুসলিম দেশের।

 

 

 জিহাদ যেখানে জঙ্গিবাদ

 মুসলমানের পুরস্কার যেমন বিশাল,তেমনি বিশাল তার দায়বদ্ধতাও। সে দায়বদ্ধতা শয়তানের সাথে লড়াই করে আজীবন আল্লাহর পথে চলার। এ লড়াই থেকে কোন মুসলমানেরই নিস্তার নেই। যে কাজে প্রমোশন ও পুরস্কার আছে, সে কাজে কঠিন পরীক্ষাও আছে। আর মুসলমানের জন্য তো রয়েছে এমন অভাবনীয় পুরস্কার যা এ দুনিয়ায় বসে ধারণাও অসম্ভব। সেটি জান্নাতপ্রাপ্তির। জান্নাতের এক ইঞ্চি ভূমিও কি হিমালয় সমান স্বর্ণ দিয়ে কেনা যায়? জান্নাতের নিয়ামত বিক্রয় হয় ভিন্ন মুদ্রায়,সেটি আমিলুস সালেহ বা নেক আমলের। সে নেক আমল  শুধু পথের কাঁটা সরানো নয়। কাউকে দান-সাদকা দেয়াও নয়। সেটি স্রেফ নামায-রোযা-হজ-যাকাত পালনও নয়। বরং সবচেয়ে বড় আমিলুস সালেহ বা নেক আমল হল অসত্য,অন্যায় ও কুফরির বিরুদ্ধে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জিহাদ। সে জিহাদের অর্থদান, শ্রমদান এবং প্রাণদান। নামায-রোযা-হজ-যাকাতসহ সকল ইবাদত-বন্দেগীর কাজ তো সর্বশ্রেষ্ঠ সে নেক আমলে সামর্থ সৃষ্টি। কিন্তু যে ব্যক্তির নামায-রোযা-হজ-ওমরাহ মা-দুর্গার প্রতি আস্থা বাড়ায় তাকে কি আদৌ কোন ইবাদত? যিনি প্রকৃত ঈমানদার তার ইবাদতে শুধু ব্যক্তির ঈমান-আখলাক ও কর্মই পাল্টে যায় না,পাল্টে যায় সমাজ,রাষ্ট্র ও সভ্যতাও। প্রচণ্ড ভাবে বাড়ে জিহাদের জজবা। সে নেক-আমলের বরকতেই প্রাথমিক যুগের মুসলমানগণ ইসলামের বিজয় এনেছিলেন,এবং জন্ম দিতে পেরেছিলেন মানব-ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার। সে নেক-আমলে নবীজী (সাঃ)র শতকরা ৬০ ভাগের বেশী সাহাবা শহিদ হয়েছিলেন। অন্য কোন আমলে বা ইসলামের অন্য কোন বিধান পালনে মুসলমানদের এত রক্তক্ষয় হয়নি। ঈমানের চুড়ান্ত পরীক্ষা হয় মূলত এ ক্ষেত্রটিতে। আজও  যার মধ্যে ঈমান আছে,তার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ এ নেকআমলটিও আছে। ইহকালে ইসলামের বিজয় ও পরকালে জান্নাতপ্রাপ্তির এ ছাড়া ভিন্ন পথ নেই। ভিন্ন পথ নেই জাহান্নামের ভয়ানক আযাব থেকে বাঁচারও। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা সে নেক আমলের তাগিদ দিয়েছেন এভাবেঃ “হে ঈমানদারগণ! তোমাদেরকে কি এমন এক ব্যবসার কথা বলে দিব যা তোমাদের কঠিন আযাব থেকে রক্ষা করবে? সেটি হল, তোমরা আল্লাহ ও তার রাসূলের উপর ঈমান আনো এবং জিহাদ কর আল্লাহর রাস্তায় নিজেদের জান ও মাল দিয়ে, এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর যদি তোমরা জানতে।” –সুরা সাফ, আয়াত ১০-১১। জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার এটিই মহান আল্লাহর প্রদর্শিত পথ। সে পথটি বেছে নিয়েছিল নবী করীম (সাঃ) এবং তাঁর সাহাবাগণ। কিছু পঙ্গু,অন্ধ ও বধির ছাড়া এমন কোন সাহাবা কি ছিল যিনি সে জিহাদে অংশ নেননি? অথচ শেখ হাসিনা সে পবিত্র জিহাদকে বলছেন জঙ্গিবাদ। মহান আল্লাহর বিরুদ্ধে এর চেয়ে বড় ধৃষ্টতা আর কি হতে পারে?

 

 

বিজয়ী শয়তান ও পরাজিত হাসিনা

তাগুত তথা শয়তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে আল্লাহর বাহিনীর লড়াইটি সর্বকালের। আল্লাহতায়ালা চান,ঈমানদারের জীবনে সে লড়াইয়ে অংশগ্রহণের তাড়নাটি তীব্রতর হোক। সে লড়াই তীব্রতর ও অনিবার্য করার স্বার্থেই মহান আল্লাহতায়ালা প্রতিটি ঈমানদারের বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষ রূপে শয়তানকে খাড়া করে দিয়েছেন। শয়তানকে নিয়োজিত করেছেন এমন কি নবী-রাসূলগণেরও পিছনেও। কারণ ঈমানের পরীক্ষায় তাদেরও পাশ করতে হয়। পবিত্র কোরআনে মহান রাব্বুল আলামীনের সে পরিকল্পনাটি ব্যক্ত হয়েছে এভাবেঃ “এবং এমনিভাবে আমি প্রত্যেক নবীর বিরুদ্ধে মানুষ ও জিনরূপী শয়তানদের শত্রু রূপে নিয়োজিত করেছি” –(সুরা আনয়াম, আয়াত ১১২)। নবীজী (সাঃ)র যে হাদীসটি কোরআনের উপরুক্ত আয়াতেরই প্রতিধ্বনি করে তা হলঃ “প্রতিটি মানুষের উপরই একজন শয়তান আছে।” একজন সাহাবী জিজ্ঞাসা করলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আপনার উপরও কি শয়তান আছে?” তিনি জবাব দিলেন, “হাঁ আমার উপরও শয়তান আছে।তবে আমি সে শয়তানকে মুসলমান করে রেখেছি।”

শয়তানের মূল কাজটি,ঈমানদারকে লাগাতর পরীক্ষায় ফেলা। আল্লাহর পথে পথচলায় পদে পদে বাধা সৃষ্টি করা।শুধু নামায-রোযা-হজ-যাকাতের ন্যায় ইবাদতে নয়,ব্যবসা-বাণিজ্য,রাজনীতি,শিক্ষা-সংস্কৃতি,বিচার-আচার,প্রশাসনে এমনকি নির্জন জঙ্গল বা বিজন মরুভূমিতেও ঈমানদার ব্যক্তির পক্ষে নিরাপদে ধর্ম পালনের সুযোগ নেই। প্রতি স্থানে ও প্রতি মুহুর্তে তাঁর বিরুদ্ধে কাজ করে শয়তান। লাগাত চেষ্টা চালায় প্রতি পদে তাকে পথভ্রষ্ট করায়। এভাবে ঈমানদারের পরীক্ষা হয় প্রতি মুহুর্তে। জিহাদ তাই মো’মেনের জীবনে প্রতি দিন ও প্রতি মুহুর্তে। ঈমানদারের প্রকৃত বিজয় এবং সে সাথে জান্নাত লাভের মহা পুরস্কার সে পরীক্ষায় পাশ করায়। শয়তানের লাগাতর হামলা ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিপদে বিজয়ী হওয়াতেই ঈমানদারের প্রকৃত সাফল্য,স্রেফ নামাযী বা রোযাদার, হাজী বা সুফী সাজাতে নয়। তবে শয়তানের হাতে পরাজয় কখনও গোপন থাকে না। গাড়ী যখন খাদে পড়ে তখন যেমন সবাই সেটি টের পায়,তেমনি কোন ব্যক্তি যখন পথভ্রষ্ট বা বেঈমান হয় সেটিও ধরা পড়ে। আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে প্রতিটি বিদ্রোহ বা অবাধ্যতাই পথভ্রষ্টতা। সেটি প্রকাশ পায় তার কথাবার্তা, ধর্মকর্ম, আচরণ, সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে। ঈমানদারের দায়বদ্ধতা শুধু ইবাদত-বন্দেগী নয়,বরং আল্লাহ প্রদত্ত শরিয়তি বিধান পালনে। কিন্তু আল্লাহর অবাধ্যরা সে শরিয়ত মানতে রাজি নয়। একই অবস্থা শেখ হাসিনা ও তাঁর দলের। তারা শরিয়তের প্রতিষ্ঠাতে তাই রাজী নয়। এক্ষেত্রে দলটির অবস্থান ইসলামের বিপক্ষে। ‘মা দুর্গা’ গজে চড়ে এসেছে বলে দেশে ফসল বেড়েছে,-এ থেকে কি বলা যায় যে দলটির নেত্রীর মুখ দিয়ে ইসলামের শিক্ষা ও দর্শন বেরুচ্ছে? শয়তান যে তাঁর উপর প্রবল ভাবে বিজয়ী তা নিয়ে কি এর পরও সন্দেহ থাকে? এমন ব্যক্তিরা ক্ষমতায় গেলে আল্লাহর দ্বীনের প্রতিষ্ঠাকে অসম্ভব করে এবং বিজয় আনে শয়তানী শক্তির। শয়তানের বিজয় বাড়াতেই বাংলাদেশে স্কুলছাত্রীদের হাতে হরামনিয়াম ও ডুগি-তবলা তুলে দিচ্ছে এবং মেয়েদের ফুট বল খেলায় নামাচ্ছে। এই যখন সরকারের নীতি তখন জনসভায় ‘৫ ওয়াক্ত নামায পড়ি’ এ কথা বলার অর্থ কি? এর লক্ষ্য কি জনগণকে স্রেফ ধোকা দেয়া নয়?  

 

শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকারের চরিত্র এবং বাংলাদেশের বিপদ নিয়ে আরেকটু গভীরে যাওয়া যাক। আল্লাহর উপর আস্থা হল ঈমানের নির্যাস। ঈমানদার মাত্রই তাই প্রতিকর্মে আল্লাহর উপর আস্থা রাখে। ঈমান যে আছে আস্থা হল তারই প্রমাণ। ঈমানদারগণের মুখে তাই উচ্চারিত হয়,“ওয়া মা তাওফিক ইল্লাহ বিল্লাহ” অর্থঃ আল্লাহর দেয়া সামর্থ ছাড়া কারোই কোন সামর্থ নাই। এক্ষেত্রে আপোষ হলে এবং আস্থা কোন দেব-দেবীর উপর গড়ালে তার ঈমান থাকে না। অথচ শেখ হাসিনার আস্থা এখানে দুর্গার উপর গড়িয়েছে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে,“ওয়া মা তাশাউনা ইল্লা আঁই ইয়াশাল্লাহু রাব্বুল আলামীন” অর্থঃ “এবং তোমরা যা ইচ্ছা করো তা হয় না,যদি না জগতসমূহের মহাপ্রভু আল্লাহ ইচ্ছা করেন”।–সুরা তাকবির, আয়াত ২৯)। অর্থাৎ মানুষের কোন ইচ্ছাই আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া পূরণ হয় না। তাই ব্যক্তির জীবনে যতই ঈমান বাড়ে, ততই বাড়ে মহান আল্লাহর উপর আস্থা। মার্কিনীরা এতটা ধর্মভীরু নয়,বরং তাদের পরিচিতি আধুনিক ও সেক্যুলার রূপে। কিন্তু ডলারের নোটের উপর “We trust in God” লিখেছে। যার অর্থ “আমরা আল্লাহর উপর আস্থা রাখি”। এ বাক্যটি লিখতে তাদের সে সেক্যুলারিজমে বা আধুনিকতায় বাঁধেনি। কোন নাস্তিক প্রেসিডেন্ট হলেও আল্লাহর উপর আস্থার সে ঘোষণাটি বিলুপ্ত করে না। সেটি করে না সংখ্যাগরিষ্ঠ মার্কিন জনগণের ধর্মীয় বিশ্বাসের দিকে নজর রেখে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কাণ্ডটি ভিন্ন। তিনি নির্বাচনকালে হাতে তসবিহ নেন, মাজারে যান, রাস্তায় মিছিল থামিয়ে নামাযেও দাঁড়িয়ে যান। তাবলিগ জামায়াতের ইজতেমা হলে সেখানে দোয়ার মজলিসে গিয়ে হাজির হন এবং মাথায় পটিও বাঁধেন। কিন্তু তিনিই দেশের সংবিধান থেকে আল্লাহর উপর আস্থার বাণীটি উচ্ছেদ করে ছেড়েছেন। শয়তানের কাজে শুধু ঈমানশূন্য করা নয়, আল্লাহই উপর আস্থা শুণ্য করাও। ফলে আল্লাহর উপর আস্থার যে বানীটি বাংলাদেশের সংবিধানে ছিল সেটি শয়তানে কাছে পছন্দনীয় ছিল না। অসহ্য ছিল শয়তানের পক্ষের শক্তিরও। শয়তানের সে সাধটি পূরণ হয়েছে শেখ হাসিনার হাত দিয়ে।

 

গাদ্দারি দেশবাসীর সাথে

শাসক তাঁর দেশবাসীকে প্রতিনিধিত্ব করে। শেখ হাসিনার ধর্মীয় পরিচয় বা বিশ্বাসটি স্রেফ তাঁর ব্যক্তিগত বিষয় নয়,সেটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাংলাদেশের জনগণের কাছেও। কারণ তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী না হযে তিনি একজন সাধারণ মহিলা হলে নিজস্ব বিশ্বাস ও চিন্তা-চেতনা নিয়ে যেখানে ইচ্ছা সেখানে ঘর বাঁধতে পারতেন বা হারিয়েও যেতে পারতেন। বহু নাস্তিক,বহু কম্যুনিষ্ট এবং বহু হিন্দু-বৈদ্ধ-খৃষ্টান ইসলামের প্রতি অবিশ্বাস নিয়ে বাংলাদেশে বসবাস করে। কত বাংলাদেশীই তো মদ-গাজা-হিরোইন খায়। কত বাঙালীই তো কতকিছু লেখে বা বলে। বহুলক্ষ বাঙালীই তো নানা দেশে নিজ ধর্ম ও নিজ সংস্কৃতির বাঁধন ছিন্ন করে খড়কুটোর ন্যায় হারিয়েও যাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ক্ষেত্রে সেটি সাজে না। সরকার-প্রধান রূপে তাঁর একটি দায়বদ্ধতা আছে। সেটি বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের চিন্তা-চেতনা ও ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি। একটি মুসলিম দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের কাজ শুধু বিদেশী হামলা থেকে দেশের সীমান্ত বাঁচানো নয়। তাঁকে বাঁচাতে হয় জনগণের ধর্ম, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও আদর্শকেও। তাঁর দায়বদ্ধতা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ঈমান-আক্বীদা বাঁচানোর। মুসলমানরা পৃথক রাষ্ট্র নির্মান করে তো সে প্রয়োজনেই। ১৯৪৭ সালে পূর্ব বাংলা যে পশ্চিম বাংলার ন্যায় ভারতে বিলীন হয়নি তা তো সে কারণেই। শেখ হাসিনার বড় গাদ্দারিটি ভারতের জন্য ট্রানজিট দেয়া নয়। বাংলাদেশের বাজার, নদীর পানি বা ১২৩৯ একর জমি ভারতের হাতে তুলে দেয়াও নয়। বরং সেটি বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের ঈমান-আক্বীদার সাথে গাদ্দারি।সে গাদ্দারির ফলেই বাংলাদেশের আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন আজ  শত্রু দ্বারা অধিকৃত এবং বিপুল ভাবে পরাজিত ইসলাম ও তার শরিয়তি বিধান।    

 

বাংলাদেশ ভারত, নেপাল বা ভূটান নয়। ইউরোপ-আমেরিকার একটি দেশও নয়। বাংলাদেশের শতকরা ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশ। আর মুসলমান হওয়ার অর্থই হল একটি মিশন নিয়ে বাঁচা। তবে সে মিশন শুধু নামায-রোযা-হজ-যাকাত পালনে নয়। দেশের জলবায়ু বা ভূপ্রকৃতি পাল্টানোও নয়। বরং বিপ্লব আনা রাজনীতি,সমাজনীতি,শিক্ষা-সংস্কৃতি ও সভ্যতায়। ঈমানদারের সে বিপ্লব নিজের বিশ্বাস,আচরণ ও সংস্কৃতি থেকে শুরু হলেও সেখানে এসে থেমে যায় না। বিপ্লব আনে সমাজ ও রাষ্ট্রে। এমন কি পশুপাখি,পোকামাকড়ও যেখানে বাস করে সেখানকার পরিবেশটি পাল্টিয়ে দেয়। ইসলামের বিজয়ের পর আরবের বুক থেকে তাই বিদায় নিয়েছিল কাফেরদের রাজনীতি,সমাজনীতি ও শিক্ষা-সংস্কৃতি,এবং নির্মিত হয়েছিল সম্পূর্ণ এক নতুন সভ্যতা। তাই বাঙালী মুসলমানদের চিন্তা-চেতনা, সভ্যতা-সংস্কৃতি ও রাজনীতি পশ্চিম বাংলার হিন্দু বাঙালীদের থেকে পৃথক হবে সেটি শুধু কাঙ্খিতই নয়, অনিবার্যও। সেটি না হলে বুঝতে হবে মুসলমানের মুসলমান হওয়া নিয়ে প্রকাণ্ড সমস্যা আছে। বরং হিন্দু বাঙালী থেকে সে পার্থক্য কতটা বিশাল ও ইসলামী তার উপরই নির্ভর করবে সে কতটা মুসলমান। কারণ পৌত্তলিকতা ও পৌত্তলিক সংস্কৃতি থেকে যতটা দূরে সরা যায় সেটিই তো ইসলাম। তাদের থেকে সে বিশাল ভিন্নতার কারণেই ১৯৪৭ সালেই বাঙালী মুসলমানরা বাঙালী হিন্দুদের সাথে ভারতে না গিয়ে অবাঙালী মুসলমানদের সাথে মিলে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করেছিল। ভারতের নানা প্রদেশের অবাঙালী মুসলমানদের সাথে তাদের ভাষার ভিন্নতা থাকলেও এ জীবনে বাঁচার মূল মিশনটি নিয়ে কোন ভিন্নতা ছিল না। বরং ছিল শতভাগ মিল। অথচ সে মিলটি বাঙালী হিন্দুদের সাথে শতকরা এক ভাগও ছিল না। ফলে শেখ হাসিনা শুধু বাংলায় কথা বলবেন বা বাঙালী রমনীর ন্যায় শাড়ী পড়বেন এবং ভাত-মাছ খাবেন সেটিই যথেষ্ট নয়। বরং তাঁর কথাবার্তা, চিন্তা-চেতনা ও রাজনীতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের চিন্তা-চেতনা ও ঈমান-আক্বিদার প্রতিফলন ঘটবে -সেটাও জরুরী। নইলে তিনি একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশের প্রধানমন্ত্রী হন কোন অধিকারে? ইসলামের আগে আরবের নেতা ছিল আবু লাহাব বা আবু জেহলের মত পৌত্তলিক কাফেরগণ। ইসলাম বিজয়ী হবার পর এসব কাফেরগণ ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল। তাদেরকে আস্তাকুঁড়ে ফেলাটাই সে সময়ের বিজয়ী মুসলমানের জন্য ছিল ঈমানী দায়বদ্ধতা। কাফেরদের স্থলে তখন নেতা হয়েছেন মহান নবীজী (সাঃ)। নবীজী (সাঃ)র ওফাতের পর নেতা হয়েছেন হযরত আবু বকর (রাঃ), হযরত উমর (রাঃ), হযরত উসমান (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ)র ন্যায় মহান ব্যক্তিবর্গ। তাদের রাষ্ট্রশাসনের লক্ষ্য নিজের বা নিজ দল ও  নিজ গোত্রের স্বার্থ উদ্ধার ছিল না। জনগণের খেয়ালখুশি বা সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠাও নয়। সে রাজনীতিতে তাঁরা নিজেরাও সার্বভৌম ছিলেন না,বরং সার্বভৌম ছিলেন একমাত্র মহান আল্লাহ। তারা ছিলেন সে সার্বভৌম আল্লাহর খলিফা তথা প্রতিনিধি।

 

দায়িত্বশূণ্য নয় প্রজারাও

ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন-বিধান। মহান আল্লাহতায়ালা শুধু ইবাদতের বিধি-বিধান,খাদ্যপানীয়ের হারাম-হালাল, সম্পত্তির বন্টন-বিধি ও ড্রেস-কোডই বেঁধে দেননি, বেঁধে দিয়েছেন বিচার-আচার ও রাষ্ট্র পরিচালনার বিধানও। অন্য কোন ধর্মে এমনটি নেই,ইসলাম তাই অনন্য। মুসলিম শাসকদের মুল দায়িত্বটি মূলত রাষ্ট্র জুড়ে সেটির প্রচার,প্রতিষ্ঠা ও প্রতিরক্ষাকে সুনিশ্চিত করা। মুসলিম দেশের শাসকদের জন্য আজও  সেটিই হল মূল আদর্শ, সে সাথে তাদের মূল দায়িত্বও। রাষ্ট্রের প্রজাগণও দায়িত্বশূণ্য নন। তাদের ঈমানী দায়িত্বটি হল,রাষ্ট্র যাতে সে নীতির উপর প্রতিদিন ও প্রতিক্ষণ প্রতিষ্ঠিত থাকে সেটি সুনিশ্চিত করা। তাই খলিফা আবু বকর (রাঃ) যখন নবীজী (সাঃ)র ওফাতের পর খলিফা হন তখন এক সাহাবী তাঁর তরবারিটি খাপ থেকে বের করে বলেছিলেন,“আপনি যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাঃ)র নীতি থেকে সরে রাষ্ট্র পরিচালনা করেন তবে এ তরবারি দিয়ে আপনাকে দ্বিখণ্ডিত করে ফেলবো।” একজন সাধারণ মুসলিম নাগরিকও রাষ্ট্রের ইসলামী চরিত্র সংরক্ষণে কতটা অতন্দ্র প্রহরী এবং আপোষহীন এ হল তার নমুনা। পবিত্র কোরআনে এমন মুসলমানকেই তো আল্লাহর সৈনিক বলা হয়েছে -যারা যুদ্ধ করে আল্লাহর রাস্তায় (ইউকাতিলুউনা ফি সাবিলিল্লাহ)। আর যারা তার সে হুকুমের অবাধ্য তাদেরকে বলা হয়েছে শয়তানের সৈনিক। তারা যুদ্ধ করে শয়তানের পথে (ইউকাতিলুউনা ফি সাবিলিশ শায়তান)। একারণেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক চরিত্র এবং শিক্ষানীতি,অর্থনীতি ও আইন-আদালত অমুসলিম দেশ থেকে ভিন্নতর হবে সেটাই স্বাভাবিক। সেটি না হলে বরং প্রকাশ পাবে,আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে দেশের সরকার ও প্রজাগণ কতটা বিদ্রোহী সেটি। বিদ্রোহের সে রাজনীতি দেশবাসীর জন্য যেটি অসম্ভব বা দুরুহ করে সেটি হল,সিরাতুল মোস্তাকিমে চলা। সে রাজনীতি বরং বিচ্যুতি বাড়ায় এবং ধাবিত করে জাহান্নামের দিকে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সে বিচ্যুতিটাই আজ  প্রকট। এবং সেটি প্রকাশ পাচ্ছে শেখ হাসিনা ও তার সরকারের নীতিতে। সে বিচ্যুতির কারণেই হিন্দুদের পুঁজা মণ্ডপে গিয়ে দুর্গাপুজারীদের সাথে তিনি একাত্ব হয়ে গেছেন।

 

মহাবিপর্যের মুখে দেশ  

বাংলাদেশের মুসলমানদের জন্য আজ মহাবিপদ। দেশটির শাসন ক্ষমতায় আজ এমন এক ব্যক্তি যার আস্থা দুর্গার প্রতি। দুর্গার উপর আস্থা নিয়ে কি আল্লাহর উপর আস্থা রাখা যায়? যায় না বলেই সংবিধান থেকে আল্লাহর উপর আস্থার বাণীটি সরাতে তিনি এতটা আপোষহীন ছিলেন। সেটি সরাতে অবশেষে সংবিধানে সংশোধনী পর্যন্ত এনেছেনে। তাঁর রাজনীতির লক্ষ্য,শরিয়তী বিধানের প্রতিষ্ঠাকে সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিহত করা। দেশে আজ নানা ধরণের অপরাধী। কেউ বা সরকারি তহবিল তছরুপ করছে, কেউবা ঘুষ খাচ্ছে, কেউবা টেন্ডার বাজী করছে, কেউবা রাস্তাঘাট ও বনভূমির গাছ কেটে নিচ্ছে, কেউবা সন্ত্রাসের মাধ্যমে চাঁদাবাজি করছে। কেউ বা দেহব্যবসার ন্যায় পাপাচার ছড়াচ্ছে। দেশ আবার তলাহীন ভিক্ষার ঝুলিতে পরিণত হতে যাচ্ছে।

 

ভিক্ষার পাত্রে তলা না থাকলে কেউ ভিক্ষাও দেয় না। ভিক্ষাদাতার তখন বিশ্বাস জন্মে তার দেয়া অর্থ পাত্রে থাকবে না। একারণে শেখ হাসিনার পিতার আমলে দেশে দুর্ভিক্ষ নেমে আসলেও অনেকে ভিক্ষা দেয়নি। ফলে বিপদ বেড়েছে দেশবাসীর। হাসিনার আমলে তেমনি অবস্থা আবার সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্ব ব্যাংক তাই পদ্মা সেতুর অর্থ সাহায্য বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু হাসিনা সরকারের তা নিয়ে মাথা ব্যাথা নেই। দেশ অপরাধীদের দ্বারা ছেয়ে গেলে কি হবে,পুলিশ অপরাধীদের খোঁজছে না। তাদেরকে গ্রেফতার করে আদালতেও তুলছে না। অথচ কোমড় বেধেঁছে তাদের দমনে যারা মানবিক অধিকার চায়, ইসলামের বিজয় এবং শরিয়তের প্রতিষ্ঠা চায়।

 

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আজ শত্রু মনে করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে হ্ত্যাযোগ্য মনে করা হচেছ। অপর দিকে যা ইচ্ছে করার স্বাধীনতা দেয়া হচ্ছে দেশ ও ইসলামের শত্রুদের। কোন ইসলামি দলের পক্ষ থেকে কোন মিছিল-মিটিংয়ের আয়োজন হলেই হাজার হাজার পুলিশ তখন রাস্তায় নামে। শুরু হয় রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। পুলিশ দিয়ে লাঠি-পেটা করা, লগি-বৈঠা নিয়ে প্রাণনাশ করা বা গ্রেফতারকৃতদের পায়ে ডাণ্ডা-বেড়ি পড়িয়ে কারারুদ্ধ করা তাই আজ আর কোন অপরাধ কর্ম নয়। গর্হিত কর্মও নয়। বরং এমন অপরাধ কর্মেই যেন শেখ হাসিনা ও তার সরকারের পুলক। সে পুলকের সাথে প্রচণ্ড উৎসব বাড়ে পুজা মণ্ডপে গেলে। পূজা উদযাপনে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনায় দেখে শেখ হাসিনার মন এতটাই পুলকিত হয়েছে যে দেশে ফসলের উৎপাদনবৃদ্ধি, অর্থনীতিতে ৭% ভাগ প্রবৃদ্ধি, মানুষ সুখ-শান্তিকে তিনি দুর্গার হাতিতে চড়ে আসার সাথে সম্পৃক্ত করে ফেলেছেন। সরকারের বড় সফলতা বলে যেটিকে তিনি দেখিয়েছেন সেটি হল, পূজার উৎসবে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সব ধর্মের মানুষ একাত্ম হয়েছে। যেন দুর্গাপুজার আসরে মুসলমানদের হাজির করাটাকেই তার সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় অর্জন।

 

 

ধর্মপালনে কতটুকু স্বাধীনতা মুসলমানদের?

 

দেশে হিন্দুদের ধর্ম পালনের স্বাধীনতা বেড়েছে তা নিয়ে সন্দেহ নেই। কোন মুসলমানের তা নিয়ে আপত্তি থাকারও কথা নয়। কিন্তু ধর্ম পালনে অনুরূপ স্বাধীনতা কতটুকু মিলেছে মুসলমানদের? ইসলামের বিধান শুধু নামায-রোযা-হজ-যাকাতের বিধান নয়। সে বিধানগুলির সাথে রয়েছে শিক্ষা-সংস্কৃতি,আইন-আদালত ও রাজনীতির বিধান। কোরআনে নিদের্শ এসেছে,“আ’মিরু বিল মারুফ ওয়া নিহি আনিল মুনকার” অর্থ ন্যায়র নির্দেশ এবং অন্যায়ের নির্মূল। ন্যায়-অন্যায়ের সংজ্ঞাও বেঁধে দিয়েছে ইসলাম। শুধু মসজিদ-মাদ্রাসা গড়লে ও নামায-রোযা-হজ-যাকাত পালন করলে মুসলমানের ধর্ম পালন হয় না। ন্যায়র নির্দেশ এবং অন্যায়ের নির্মূল করার কাজে তাকে ইসলামি রাষ্ট্রও গড়তে হয়। নবীজী (সাঃ)এবং তাঁর মহান সাহাবীগণ তো সেটিই করেছেন। সে রাষ্ট্র নির্মানে প্রতিযুগে মুসলমানদের সবচেয়ে বেশী রক্তক্ষয়, অর্থক্ষয় ও শ্রমক্ষয় হয়েছে। আজও  সত্যিকার মুসলমান হওয়ার এছাড়া ভিন্ন পথ নেই। আরবের কাফেরদের সবচেয়ে বড় হামলাটি হয়েছে ইসলামি রাষ্ট্রের নির্মূলে। বদর, ওহুদ,খন্দক ও হুনায়ুনের ন্যায় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধগুলো তারা সংগঠিত করেছে তো সে লক্ষ্যেই। আর হাসিনা সরকারের কাজ হয়ে দাড়িয়েছে তেমন একটি ইসলামি রাষ্ট্র যাতে গড়ে উঠার সুযোগ না পায় তার ব্যবস্থা করা। হাসিনা সরকার তাই চুরি-ডাকাতি-খুন-সন্ত্রাস বন্ধ করা নিয়ে এতটা উদগ্রিব নয় যতটা উদগ্রিব ইসলাম পন্থিদের দল-দফতর ও সভা-সমিতি বন্ধ করায়। তাই দেশ দুর্নীতিতে ছেয়ে গেলে কি হবে, দারুন ভাবে কমানো হয়েছে ইসলামপন্থিদের কর্মকাণ্ড। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য অপরাধ গণ্য হচ্ছে হোস্টেলের রুমে ইসলামি বই রাখা ও ইসলামি স্টাডি সার্কেল করা। নিছক বোরখা পড়ার কারণে অবরুদ্ধ করা হচ্ছে ছাত্রীদের, কোথাও কোথাও বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল থেকে তাদের বের করে দেয়া হচ্ছে। ছাত্রলীগ কর্মীরা কোথাও কোথাও নিছক নামায পড়ার কারণে সাধারণ ছাত্রদের উপর চড়াও হচ্ছে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে দাড়িটুপি নিয়ে চলাফেরা করা,বোরখা পড়া চিহ্নিত হচ্ছে জঙ্গিবাদ রূপে। সম্প্রতি এ বিষয়ে বহু সংবাদ পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। যেমন,রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যোসাল ওয়ার্ক ডিপার্টমেন্টের চতুর্থ বর্ষের সবুজ নামক একজন ছাত্রকে নিছক নামায পড়ার কারণে ছাত্রলীগ কর্মীদের হাতে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। মেয়েদের বোরখা পড়ার উপর তারা নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সোসিওলজি ডিপার্টমেন্ট। উক্ত ডিপার্টমেন্টে সম্প্রতি চারজন নতুন শিক্ষককে নিয়োগ দেয়া হয়। তাদের উপর শর্ত লাগানো হয়, তারা দাড়ী রাখতে পারবে না, ক্লাসে পাঞ্জাবী পড়তে পারবে না এবং কোনরূপ ধর্মীয় প্রতীক নিয়ে ক্লাসে ঢুকতে পারবে না।– (দৈনিক আমার দেশ, ৩রা এপ্রিল, ২০১০)। শুধু ছাত্রলীগের গুণ্ডারা নয়, বোরখা-পরিহিত ছাত্রীদের হয়রানিতে নেমেছে এমন কি পুলিশরাও। এ বিষয়ে সংবাদপত্রে প্রকাশিক সাম্প্রতিক খবরটি হল,পিরোজপুরে তিনজন রোরখাপরিহিত ছাত্রীকে কোন রূপ কারণ ছাড়াই পুলিশ একমাসেরও বেশী কাল ধরে গ্রেফতার করে রাখে। এবং নানারূপ হয়রানি মূলক প্রশ্ন করতে থাকে। তাদেরকে একমাত্র তখন ছেড়ে দেয়া হয় যখন সে গ্রেফতারীর বিরুদ্ধে দেশের হাইকোর্ট থেকে নির্দেশ দেয়া হয়। -(আমার দেশ, ১৯ ফেব্রেয়ারি, ২০১০)।  

 

 

কীর্তনে কি ইজ্জত বাড়ে?

 

শেখ হাসিনা ভেবেছেন, পূজামণ্ডপে গিয়ে দুর্গাকে মা বললে বা তার গুণকীর্তন করলেই হিন্দুদের মাঝে ইজ্জত বাড়বে। কিন্তু সে কীর্তনে কি ইজ্জত বাড়ে? ইজ্জত যে কতটা বেড়েছে সেটি তো ভারতীয় প্রধাণমন্ত্রী মনমোহন সিং তার সাম্প্রতিক বাংলাদেশ সফলে দেখিয়ে দিলেন। দেখিয়ে দিলেন পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী। তিস্তা পানিচুক্তি হয়নি, অথচ তারা নিয়ে গেছে করিডোর। এবং সে করিডোর দিয়ে ভৈরব-আখাউড়া দিয়ে ভারতীয় পণ্যবহনও শুরু হয়ে গেছে। ইন্দীরা গান্ধীর কাছে প্রচুর মাথা নুইয়েছিলেন তারা পিতা শেখ মুজিবুর রহমান। কিন্তু তাতে পদ্মার পানি মিলেনি, তিন বিঘা করিডোরও জুটিনি। বরং তাতে বেরুবাড়ী গেছে, পদ্মার পানিও গেছে। তাঁর আমলে সীমান্ত বাণিজ্যের নামে ভারত বাংলাদেশের অর্থনীতির তলা ধ্বসিয়ে দূর্ভিক্ষ উপহার দিয়েছিল। ক্যারান্সি নোট ছাপানোর কন্ট্রাক্ট নিয়ে শত শত কোটির বেশী নোট ছেপে সে নোট দিয়ে লুটে নিয়েছিল সমগ্র বাংলাদেশ। শেখ হাসিনা নিজেও কোলকাতার এক সভায় প্রধানমন্ত্রী নয়, মুখ্যমন্ত্রী রূপে আখ্যায়ীত হয়েছেন। এই হল ভারতীয়দের কাছে তাঁর মান-সম্মান। তাঁর পিতাকেও ভারত সেবাদাস ছাড়া বেশী কিছু ভাবেনি।২৫সালা দাসচুক্তি স্বাক্ষরে বাধ্য করেছিল তো তেমন একটি ধারণার কারণেই। নইলে কোন স্বাধীন দেশের স্বাধীন প্রধানমন্ত্রীর সাথে কোন দেশ কি এমন চুক্তি করে?    

 

 

শেখ হাসিনার ধর্মব্যবসা

সকল ব্যবসারই একটি অভিন্ন লক্ষ্য থাকে। সেটি মুনাফা লাভ। আর সে মুনাফা লাভের লক্ষ্যে ব্যবসায়ী শুধু পূঁজি বিনিয়োগই করে না, সে পূজির পিছনে শ্রম দেয়, মেধা দেয় এবং প্রয়োজনে প্রচুর সময়ও দেয়। বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য যে শুধু হাটবাজারে হয় তা নয়। সবচেয়ে বড় ব্যবসাটি হয় রাজনীতির ময়দানে। সেখানে যে শুধু অর্থ নিয়ে ব্যবসা নামে তা নয়, ধর্ম নিয়েও। রাজনীতির ব্যবসার মূল লক্ষ্য ক্ষমতা লাভ। সেক্যুলার দোকানী তার দোকানে পুস্তকের কাটতি বাড়াতে শুধু কোরআন-হাদীসই রাখে না, গীতা-রামায়ন-বাইবেলও রাখে। সব ক্রেতার মন জোগানোই তার ব্যবসা। তেমনি অবস্থা সেক্যুলার রাজনীতিকের। যাদের ভোট আছে তাদের কাছে গিয়েই তারা ধর্না দেয়। তাদের মন্দির, মণ্ডপ বা গীর্জায় গিয়ে তাদের দেব-দেবী বা ধর্মীয় আচারের প্রতি একাত্ম হওয়াতে যদি ভোটপ্রাপ্তির সম্ভাবনা বাড়ে তবে সেটি করতে তারা পিছুপা হয় না।

ধর্ম-ব্যাবসায়ীর ব্যবসা ধরা পড়ে তারা চাল-চলন, কথাবার্তা ও ভণ্ডামী দেখে। প্রকৃত ধার্মিকেরা কখনও লোক দেখানোর জন্য ধর্ম পালন করেন না, সময় বুঝেও তারা ধার্মিক হন না। তারা সর্ব সময়েই ধার্মিক। ধর্মব্যবসাটি অতি সহজে ধরা পড়ে ইসলামের ক্ষেত্রে। কারণ, এখানে ধর্ম পালন করতে হয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে। ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন বিধান, তাই সে বিধানের অনুসরণ যেমন নামায-রোযা-হজ-যাকাতে ঘটাতে হয়, তেমনি ঘটাতে হয় রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিসহ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে। তাই ধর্মপালনে মৌসূমী হওয়ার সুযোগ ইসলামে নাই, তাকে মুসলমান হতে হয় প্রতি বছর, প্রতি মাস, প্রতি দিন ও প্রতিক্ষণের জন্য। আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঝাণ্ডা হাতে নিলে সে বিদ্রোহীর নামায-রোযা-হজ-উমরাহর কি কোন মূল্য থাকে? তাছাড়া মুসলমান হওয়ার শর্ত হল, আল্লাহর উপর বিশ্বাসের আগে সকল দেব-দেবী ও উপাস্যের উপর অবিশ্বাসের ঘোষণাটি এখানে প্রথমে দিতে হয়। ফলে আল্লাহর উপর ঈমান আর মা দুর্গার উপর আস্থা –এ দুটো একসাথে চলে না। যখন একসাথে শুরু হয় তখন বুঝতে হবে, এর মধ্যে ধর্ম নয় ব্যবসা আছে। সেক্যুলার দোকানদার যেমন কোরআন-হাদীস আর গীতা-মহাভারতকে একই আলমারিতে রাখে এরাও তেমনি দূর্গা আর আল্লাহকে একই সাথে স্থান দেয়। 

 

সরকারি কর্মচারি মাত্রই কর্ম জীবনে বহু কর্ম দেশের জন্য করেন। তবে রাষ্ট্রদ্রোহী রূপে গণ্য হওয়ার জন্য দেশের বিরুদ্ধে একটি মাত্র বিদ্রোহ এবং দেশের শত্রুর সাথে মাত্র একবার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হওয়ার ঘটনাই যথেষ্ঠ। তেমনি আল্লাহর একটি মাত্র হুকুমের অবাধ্যতাই প্রমাণ করে এমন অবাধ্য ব্যক্তি প্রকৃত মুসলমান নয়। যারা প্রকৃত ধার্মিক তারা ইসলামের প্রতিটি হুকুম পালনে নিষ্ঠাবান,এবং শাসক হলে আপোষহীন হয় শরিয়তের প্রতিষ্ঠায়। তার কাছে তখন আদর্শ হয় খোলাফায়ে রাশেদা। প্রশ্ন হলো, শেখ হাসিনা নিজেকে মুসলমান রূপে দাবী করলেও তাঁর রাজনীতিতে ইসলাম কোথায়? তাঁর দলেই বা ইসলাম কই? শেখ হাসিনার রাজনৈতিক আদর্শ যে ইসলাম নয় সেটি তিনি গোপন রাখেননি। তাঁর আদর্শ জাতিয়তাবাদ ও সেক্যুলারিজম। সেক্যুলারিজম তাঁকে ইসলামে অঙ্গিকারবদ্ধ হতে বাধা দেয়। ইসলামের অনুশাসনের প্রতি অঙ্গিকারবদ্ধতা তাঁর দৃষ্টিতে সাম্প্রদায়িকতা। শেখ হাসিনা একজন জাতিয়তাবাদী, এখানে জাতিয়তাবাদের ভিত্তি বাংলা ভাষা ও বাংলার ভূমি। এ ভাষা ও ভূগোলভিত্তিক জাতিয়তাবাদ তার জন্য অসম্ভব করে অন্য ভাষাভাষিদের আপন করে নিতে। ইসলামে এমন ধারণা তাই হারাম; যেমন হারাম হল সূদ, ঘুষ ও বেশ্যাবৃত্তি। কিন্তু বাংলাদেশে সূদ, ঘুষ ও বেশ্যাবৃত্তি যেমন প্রবল ভাবে বেঁচে আছে, তেমনি জাতিয়তাবাদ এবং সেক্যুলারিজমও প্রবল ভাবে বেঁচে আছে। এবং অতি প্রবল ভাবে বেঁচে আছে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের চেতনা ও রাজনীতিতে। রাজনীতির ময়দানে মুনাফা বাড়াতে তারা হিন্দু, বৌদ্ধ ও খৃষ্টানদের দরবারেও হাজির হন। তবে এমন হাজির হওয়া তাঁকে ভণ্ড করে না, বরং ভণ্ড করে তিনি সেখানে গিয়ে যা বলেন সেগুলি। হিন্দু ভোটপ্রাপ্তির লক্ষ্যে যে চেতনা নিয়ে সেখানে তিনি কথা বলেন সেটি বিশুদ্ধ হিন্দুর। তবে তাঁর ভণ্ডামিটি হল,সেখানে তিনি নিজেকে হিন্দু রূপে পরিচয় দেননি, বরং নিজের মুসলিম পরিচয়টিকে ধরে রাখার চেষ্টা করেন। নিজে যে নামায পড়েন সেটিও বলেন।  

 

 

প্রকল্প ইসলামের বিনাশে

শেখ হাসিনার অন্যতম পরামর্শ দাতা হলেন তার পুত্র সাজিব ওয়াজেদ জয়। তার ভয় বাংলাদেশে ইসলামের জাগরণ নিয়ে। সে জাগরণ কিভাবে রুখা যায় তা নিয়ে তিনি একটি প্রবদ্ধ লিখেছেন। তবে তিনি একা লেখেননি। লিখেছেন একজন মর্কিনীর সাথে যৌথ ভাবে। প্রবন্ধটির নাম “Stemming the Rise of Islamic Extremism in Bangladesh” অর্থাৎ “বাংলাদেশে ইসলামী চরমপন্থিদের উত্থান কীভাবে রুখা যায়” এ শিরোনামে। নিবন্ধটি “Harvard International Review” জার্নালের ২০০৮ সালের নভেম্বর সংখ্যায় ছাপা হয়েছে। সে নিবন্ধে বাংলাদেশে কীভাবে সেক্যুলারিজম প্রতিষ্ঠা করা যায় তার একটা রোডম্যাপ দেয়া হয়েছে। সেক্যুলারিজম প্রতিষ্ঠার পথে শত্রু রূপে দেখানো হয়েছে বাংলাদেশের মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে এবং সে সাথে আর্মি ও প্রশাসনে যে সব ইসলামি ব্যক্তিবর্গ চাকুরিরত তাদেরকে। সেক্যুলারিজম প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে স্ট্রাটেজী রূপে যে প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে তা হল: (1) displacing Islam and Islamic symbols from the political landscapes of Bangladesh, and (2) reclaiming the entire space of Islam for BAL. এর অর্থ হল:এক).বাংলাদেশের রাজনীতির অঙ্গন থেকে ইসলাম এবং ইসলামি প্রতীকগুলোর অপসারণ, এবং দুই). যে ক্ষেত্রগুলোতে ইসলামের অবস্থান সেগুলোর উপর আওয়ামী লীগের দখলদারি প্রতিষ্ঠা করা। মনে রাখতে হবে,সাজিব ওযাজেদ জয় শুধু শেখ হাসিনার পুত্রই নয়,তিনি শেখ হাসিনা পরামর্শদাতাও। আর পরামর্শ তো দেয়া হয় সেগুলো বাস্তবায়ন করার জন্য। সেপ্রস্তাবনাগুলো যে বাস্তবায়ীত হচ্ছে তার আলামত তো বহু। আজ দেশের ইসলামি দলগুলোর উপর নির্যাতনের যে স্টীমরোলার চালানো হচ্ছে তা তো তাদের হাত থেকে দেশের রাজনীতির অঙ্গণ মূক্ত করার লক্ষ্যেই।

 

তবে সেক্যুলারিজমের প্রতিষ্ঠা বাড়াতে তাদের লক্ষ্য শুধু রাজনীতির ময়দান থেকে ইসলাম এবং এতদিনের প্রতিষ্ঠিত প্রতীকগুলো সরানো নয়। বরং খোদ জনগণের মগজ থেকে ইসলামের অপসারণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা শক্তিবর্গের এজেণ্ডাও একই রূপ। আওয়ামী লীগ চায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা শক্তিবর্গ একাজে আওয়ামী লীগকে পার্টনার রূপে গ্রহণ করুক। শেখ হাসিনার পুত্র সে ওকালতিই করেছেন উক্ত নিবন্ধে। তবে অন্যদের মাঝে যাই হোক, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের চিন্তা-চেতনায় সেক্যুলারিজমের বীজ যে কতটা সফল ভাবে ঘটেছে তার জ্বলন্ড নজির খোদ শেখ হাসিনা নিজে। তবে সেক্যুলারিজমের টার্গেট মুসলমানদের মগজ থেকে ইসলামের অপসারণ হলেও অনুরূপ টার্গেট হিন্দুধর্ম, খৃষ্টান ধর্ম বা বৌদ্ধধর্ম নয়। শেখ হাসিনার মগজে তাই মজবুত ভাবেই রয়ে গেছে দুর্গাদেবীর প্রতি অতিবিশ্বাস ও অতিভক্তি।

 

 

তবে সেক্যুলারিস্টদের লক্ষ্য, নামায-রোযা-হজ-যাকাত থেকে মুসলমানদের সরানো নয়। মসজিদ মাদ্রাসাগুলো বন্ধ করাও নয়। বরং এগুলি বাঁচিয়ে রেখে ইসলামকে শক্তিহীন করা। কোন গাড়িকে অচল করার জন্য সব ক’টি চাকা খোলা নেয়া জরুরী নয়। একটি মাত্র চাকা খুলে নিলেই সেটি চলার সামর্থ হারায়। ব্রিটিশগণ  যখন ভারতের শাসন ক্ষমতা কুক্ষিগত করে তখন ইসলামের সবগুলো খুঁটি ধ্বংস করেনি, নামায-রোযা-হজ-যাকাতে তারা হাত দেয়নি। বরং তারা নিজ উদ্যোগে কোলকাতায় আলীয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছে। তার হাত দিয়েছিল জিহাদ বিষয়ক শিক্ষায়। সে লক্ষ্যে কঠোর ভাবে নিয়ন্ত্রিত করেছে দ্বীনি শিক্ষার সিলেবাস। হায়েজ-নিফাজের মসলা, নফল-সূন্নত-ওয়াজেবের প্রকারভেদ, শিয়া-সূন্নীর বিতর্ক, হানাফী-শাফেয়ী-মালেকী-হাম্বলীদের বিরোধ -এরূপ নানা বিষয়ে বিস্তর পড়াশুনার আয়োজন থাকলেও পাঠ্য তালিকা থেকে সুপরিকল্পিত ভাবে বাদ দিয়েছে জিহাদ বিষয়ক কোরআন-হাদীসের নির্দেশনাবলি। ফলে ছাত্ররা বেড়ে উঠেছে ইসলামের উপর অপূর্ণাঙ্গ ও বিকৃত ধারণা নিয়ে। আজও একই ষড়যন্ত্র চলছে। মার্কিনীরা আজ মুসলিম দেশে শিক্ষার সিলেবাস নিয়ন্ত্রনে নেমেছে। তাদের চাপে মাদ্রাসাগুলো বাদ দিচ্ছে জিহাদ বিষয়ক বই। তাদের সাথে হাত মিলিয়েছে শেখ হাসিনার সরকার। তারই আলামত, সরকার পুলিশ ও র‌্যাবের সেপাইদের ময়দানে নামিয়েছে জিহাদ বিষয়ক বই বাজেয়াপ্ত করার। জিহাদ বইগুলোকে বলছে জঙ্গিবাদী বই। অথচ জিহাদ লোপ পেলে বিলুপ্ত হয় মুসলমানের প্রতিরক্ষার সামর্থ। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিবর্গ এটি করছে মুসলিম দেশে তাদের প্রতিষ্ঠিত দখলদারিকে দীর্ঘস্থায়ী করার লক্ষ্যে।   

 

 

মুসলমানের দায়ভার

 

ঘরে আগুণ লাগলে দায়ভার বেড়ে যায়। সে ঘরের নারী-পুরুষ এবং শিশুরাই শুধু নয়, সে আগুণ নেভাতে প্রতিবেশীরাও তখন প্রাণপনে দৌড়াদৌড়ি শুরু করে। এমন বিপদে কেউ ঘুমিয়ে থাকলে যেমন ঘর বাঁচে না, তেমনি সেও নিজে বাঁচে না। সে সময় জায়নামাযে বসে ইবাদতে মগ্ন হলে প্রাণনাশ হয়। তেমনি মুসলিম ভূমির উপর শত্রুর হামলা শুরু হলে মসজিদ-মাদ্রাসায় ইবাদতে নামলে মুসলিম ূমভূমির সুরক্ষা হয় না। তখন ইবাদতের স্থান জিহাদের ময়দানে। নামায তখন মসজিদে নয়, জিহাদের ময়দানে গিয়ে পড়তে হয়। ১৭৫৭ সালে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ হামলার বিরুদ্ধে সে জিহাদ হয়নি বলেই ১৯০ বছরের গোলামী জুটেছিল। তেমন কোন প্রতিরোধ ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ অবধি ভারতীয় লুন্ঠনের বিরুদ্ধে হয়নি বলেই হাজার হাজার মানুষকে দুর্ভিক্ষে মারা যেতে হয়েছে। তখন লুন্ঠিত হয়েছে হয়েছে বেরুবাড়ী এবং হাজার হাজার কোটি টাকার সামরিক-বেসামরিক সম্পদই শুধু নয়, ধ্বংস করা হয়েছে দেশের শিল্প। তখন হাজার হাজার মানুষকে মারা যেতে হয়েছে ভারতীয় স্বার্থের সেবাদাস রক্ষি বাহিনীর হাতে। একই রূপ বিপর্যের মুখে আজকের বাংলাদেশ।

 

আজ হামলার শিকার শুধু বাংলাদেশের ভূগোল,নদ-নদী,সমূদ্রসীমা,শিল্প ও সংস্কৃতিও নয়,প্রচণ্ড হামলা শুরু হয়েছে দ্বীন ইসলামের উপর।অসম্ভব করা হয়েছে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা। ইসলামের প্রতিষ্ঠা প্রতিরোধে আওয়ামী লীগ সরকার আন্তর্জাতিক শত্রুদের সাথে কোয়ালিশন গড়েছে। শতকরা নব্বই ভাগ মুসলমানের দেশে আজ নাস্তিক কম্যুনিস্ট, ধর্মহীন সেক্যুলার,পৌত্তলিক হিন্দু, খৃষ্টান ও বৌদ্ধদের নিজ নিজ ধর্ম, কর্ম ও রাজনীতির পুরা আজাদী দেয়া হয়েছে। অথচ ইসলামের প্রতিষ্ঠা নিয়ে রাস্তায় নামলে তাদের উপর হামলা শুরু হয়। তাদেরকে কারাগারে তোলা হয়।পায়ে দণ্ডবেড়ি পড়ানো হয়।মন্দিরে দেবদেবীর পুঁজা দেখে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মনে আনন্দের হিল্লোল শুরু হয়,অথচ রাস্তায় আল্লাহু আকবর ধ্বনি শুনলে তাদের হামলায় হিংস্রতা বেড়ে যায়। এমন হামলার মুখে মুসলমানদের কাজ কি? দায়িত্বই বা কি? সেটি কি ঘুমিয়ে যাওয়া? ইসলামের শত্রুদের সামনে আত্মসমর্পণ করা এবং তাদের বিজয়-উৎসবে শামিল হওয়া? পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, “আমি মুমিনদের জানমাল ক্রয় করে নিয়েছি জান্নাতের বিনিময়ে।” আল্লাহতায়ালার এ ক্রয় কি ইসলামের শত্রু শক্তির কাছে আত্মসমর্পণের লক্ষ্যে? কোরআনের ভাষায় সেটি তো এক মহান মিশন নিয়ে লড়াইয়ের। এবং সে লড়াইয়ে আত্মত্যাগের। ইতিহাসের কোন কালেই কোন বিজয় বা গৌরব আত্মসমর্পণে আাসেনি,এসেছে আত্মত্যাগে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা তাঁর ক্রয়কৃত মুমিনদের মিশন রূপে যা বলেছেন তা অতি সুস্পষ্ট। ইসলাম ও মুসলমানদের উপর শত্রুর হামলা হলে তাদের দায়িত্ব হবে,“তাঁরা যুদ্ধ করবে আল্লাহর রাস্তায়, তাঁরা (এ যুদ্ধে ইসলামের শত্রুদের) হত্যা করবে এবং নিজেরাও নিহত হবে।”–(সুরা তাওবাহ,আয়াত ১১১)। অথচ বিদেশী শক্তির তাঁবেদারগণ আল্লাহর নির্দেশিত এ মিশন থেকে মুসলমানদের হটাতে চায়। ইসলামের বিরুদ্ধে এটিই হল শত্রুদের সবচেয়ে ভয়ানক বিনাশী প্রকল্প। এ প্রকল্প সফল হলে মুসলমান শুধু মহান আল্লাহর ক্রয়কৃত আমানত হওয়ার মর্যাদাই হারাবে না,হারাবে দুনিয়াবী জীবনের গৌরব এবং আখেরাতের পুরস্কার। দেশ হবে অরক্ষিত। এবং পরিনত হবে শয়তানি শক্তির শৃঙ্খলিত গোলামে।বাংলাদেশের মুসলমানগণ কি সেদিকেই ধাবিত হচ্ছে? ১৬/১০/২০১১  

 

 



Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 
Comments (2)
বেশি দিন বাকি নেই
2 Tuesday, 18 October 2011 12:33
ভজন

জয় ও জয়ধরদের এই দেশের গণভবনে স্থায়ী পূজো-মন্ডপ নির্মাণের আর বেশি দিন বাকি নেই।


 

Hasina's God Mother Durga
1 Monday, 17 October 2011 22:53
Sheikh Ahmad

Remarkable article from Islamic perspective.  Hasina has hurted me as many other people. 

 
Dr Firoz Mahboob Kamal, Powered by Joomla!; Joomla templates by SG web hosting
Copyright © 2017 Dr Firoz Mahboob Kamal. All Rights Reserved.
Joomla! is Free Software released under the GNU/GPL License.